📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান 📄 রিয়া ও লৌকিকতা

📄 রিয়া ও লৌকিকতা


রিয়া ও লৌকিকতা হলো আল্লাহ তা'আলার প্রতিদান ও শাস্তির পরোয়া না করে, লোকসমাজে প্রশংসা ও সুখ্যাতি লাভের উদ্দেশ্যে আমল করা এবং নিজের যতো বৈশিষ্ট্য ও যোগ্যতা জাহির করা।
(الرِّيَاءُ) রিয়া শব্দটি الرُّؤْيَةُ থেকে এসেছে। রিয়া হলো লোক-দেখানোর উদ্দেশ্যে কাজ করা। আর ইখলাস হলো একমাত্র আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমল করা। সুতরাং রিয়া ও ইখলাস একটি অপরটির বিপরীত, একটি অপরটির সাথে সংঘর্ষিক।

রিয়াকারী তার কাজকর্মে ও উদ্দেশ্যে দোদুল্যমান দ্বিধা-দ্বন্দ্বগ্রস্ত। তার চিন্তা-চেতনা ও মন-মানসিকতা পরিশুদ্ধ নয়, অসুস্থ চিত্ত। জনসম্মুখে উদ্যমী কর্মতৎপর, আর লোকচক্ষুর অন্তরালে অলস অকর্মা। একটু প্রশংসাতেই খুশিতে টগমগ হয়ে উঠে। সামান্য নিন্দার মুখে হতাশায় ভেঙে পড়ে। কেননা তার পরম কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য হলো লোকমুখে প্রশংসিত হওয়া। সমাজের চোখে শ্রদ্ধা ও মর্যাদার পাত্র হওয়া। পরকাল ও আখেরাত সম্পর্কে তার কোনো চিন্তা-ফিকির নেই। আল্লাহ তা'আলার দরবারে হিসেব-নিকেশের কোনো পরোয়া নেই।

কোনো ভালো কাজ করতে হলে জনসম্মুখে করে। কোনো নেক আমল করলে মানুষের কাছে তার কথা ছড়িয়ে বেড়ায় খ্যাতি ও সম্মান লাভের আশায়। তার যাবতীয় কাজকর্ম ও উদ্যোগ-আয়োজন সৃষ্টিকে দেখানোর জন্য; স্রষ্টার সন্তুষ্টি লাভের জন্য নয়। চারপাশের সমাজ ও মানুষের বাহ্যিক ক্ষমতা শক্তিমত্তা ও চাকচিক্যতেই সে মুগ্ধ। মহান রব ও স্রষ্টার সৃষ্টিশীলতা ও সর্বময় ক্ষমতা তার মনে দাগ কাটে না। তাই সে স্রষ্টাকে ছেড়ে সৃষ্টির পেছনে ছোটে। মহান আল্লাহ তা'আলার পুরস্কার ও তিরস্কারের পরোয়া না করে সৃষ্টির মুখে প্রশংসার পালিশে খুশি হয়।

রিয়াকারী যতো ভালো কাজই করুক-না-কেন, এর বিনিময়ে পরকালে সে কোনো পুরস্কার পাবে না। তার ভাগ্যে জুটবে শুধু তিরস্কার ও ভর্ৎসনা। কেননা আল্লাহ তা'আলা শুধু বান্দার এমন আমল কবুল করেন, যা রিয়া ও লৌকিকতামুক্ত। যাতে লোক দেখানো ও প্রদর্শনবাদিতার কোনো ছাপ থাকে না।

নিজেদের জীবনকে সুন্দর সাবলীল করে তোলার জন্য, আমলের প্রতিদান লাভের জন্য এবং পরকালের সফলতা লাভের উদ্দেশ্যে অবশ্যই আমাদের লৌকিকতামুক্ত হতে হবে। কিন্তু তার উপায় কী? এ ক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কী?

সমাধান:
১. চিন্তা করে দেখুন, আল্লাহ তা'আলা কতো মহান সত্তা, আর আপনি কতো নগণ্য বান্দা। একবার ভেবে দেখুন, আল্লাহ তা'আলার সাথে আপনার সম্পর্কের ভিত্তি কী? এ সম্পর্কের মহত্ত্ব ও তাৎপর্য উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন। সমাজ ও মানুষের সাথে আপনার সম্পর্ক কীসের? এ সম্পর্কের ক্ষুদ্রতা ও ক্ষণস্থায়িত্ব মনে রাখুন। চূড়ান্তে গিয়ে আপনাকে একক অদ্বিতীয় মহান সত্তার সামনেই দাঁড়াতে হবে।

২. সবসময় মনে রাখুন, মুশরিক, রিয়াকারী ও প্রদর্শনবাদী লোকদের সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
﴿وَقَدِمْنَا إِلَى مَا عَمِلُوا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْتُهُ هَبَاءً مَنْثُورًا﴾ [سورة الفرقان: ٢٣]
অর্থ: তারা (দুনিয়ায়) যা কিছু আমল করেছে, আমি তার ফায়সালা করতে আসব এবং সেগুলোকে শূন্যে বিক্ষিপ্ত ধুলোবালি (এর মত মূলহীন) করে দিব। (ফুরকান, ২৫: ২৩)

৩. রিয়া ও লৌকিকতার খোলসমুক্ত হয়ে আল্লাহ তা'আলার তাওফীক ও সাহায্য প্রার্থনা করুন। সাহায্য প্রার্থনার সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা হলো ধৈর্য, অবিচলতা ও সালাত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلوةَ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّبِرِينَ﴾ [البقرة: ١٥٣]
অর্থ: হে মুমিনগণ! সবর ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবরকারীদের সাথে আছেন। (বাকারা, ২: ১৫৩)

৪. স্রষ্টার সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক, বাকি সৃষ্টির সঙ্গে যাবতীয় সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং তাদের থেকে নির্মুখাপেক্ষী করে। এ পর্যায়ে উপনীত হয়ে ব্যক্তি সমাজ ও লোকমুখের প্রশংসাবিমুখ হয়ে মহান রবের সন্তুষ্টি প্রত্যাশী হয়ে উঠে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
﴿فَإِن تَوَلَّوْا فَقُلْ حَسْبِيَ اللهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ﴾ (التوبة: ١٢٩)
অর্থ: তারপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে (হে রাসূল! তাদেরকে) বলে দাও, আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তিনি ছাড়া কোনও মাবুদ নেই। তারই উপর আমি ভরসা করেছি এবং তিনি মহা আরশের মালিক। (তাওবা, ৯: ১২৯)

৫. যে সমস্ত নেক আমল প্রকাশ্যে কিংবা জামাতবদ্ধ হয়ে পালন করা আবশ্যক নয় তা একান্তে নির্জনে সম্পন্ন করুন। আর প্রকাশ্যে জামাতবদ্ধ হয়ে অবশ্যপালনীয় কাজগুলো ইখলাস ও একনিষ্ঠতার সাথে পুরা করুন।

৬. মনে রাখুন, আপনি সর্বদা আল্লাহ তা'আলার তত্ত্বাবধানে ও নিবিড় পর্যবেক্ষণে আছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
﴿إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا ﴾ [النساء : ١]
অর্থ: 'নিশ্চিত জেনো রেখ, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের উপর লক্ষ্য রাখছেন।' (নিসা, ৪: ১)

৭. হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: أَنَا خَيْرُ الشُّرَكَاءِ، مَنْ عَمِلَ لِي عَمَلًا أَشْرَكَ فِيهِ غَيْرِي فَأَنَا بَرِيءٌ مِنْهُ، وَهُوَ لِلَّذِي أَشْرَكَ" (مسند أحمد مخرجا ٣٨٢/١٥) অর্থ: 'শরীকদের মধ্যে আমিই সর্বশ্রেষ্ঠ। যে ব্যক্তি কোনো আমল করে এবং তাতে আমার সাথে অন্যকে শরীক করে, আমি তার আমল থেকে দায়মুক্ত। সে যে শরীক করেছে, আমলটি তার জন্য সাব্যস্ত হবে।' (মুসনাদে আহমাদ: ১৫/৩৮২) রাসূল ﷺ-এর এ বাণীটিও স্মরণ রাখুন: عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: "مَنْ سَمَّعَ سَمَّعَ اللَّهُ بِهِ وَمَنْ رَاءَى رَاءَى اللَّهُ بِهِ". (صحيح المسلم برقم: ٧٣٦٦) অর্থ: ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি জনসম্মুখে প্রচারের ইচ্ছায় নেক আমল করে আল্লাহ তা'আলাও তার কৃতকর্মের অভিপ্রায়ের কথা লোকদেরকে জানিয়ে ও শুনিয়ে দিবেন। আর যে ব্যক্তি লৌকিকতার উদ্দেশ্যে কোন নেক কাজ করে, আল্লাহ তা'আলাও তার প্রকৃত উদ্দেশ্যের কথা লোকেদের মাঝে ফাঁস করে দিবেন।' (মুসলিম, হাদীস নং: ৭৩৬৬)

৮. নিজেকে একবার জিজ্ঞাসা করুন, যাদের আপনি নিজের কর্ম-কীর্তি দেখিয়ে বেড়াচ্ছেন, যাদের সামনে নিজের যোগ্যতা ও সামর্থ্যের প্রদর্শনী করছেন, তারা কে? তারা না আপনাকে সৃষ্টি করেছে, না আছে তাদের এক মুঠো রিযিক দানের সামর্থ্য। তাদের না আছে ক্ষমা করার যোগ্যতা, না আছে আরোগ্য দানের ক্ষমতা। জীবন দান করা, মৃত্যু দেওয়া এবং পরকালে আমলনামার হিসাব গ্রহণ করা-এসব কিছুই তাদের মানবিক ক্ষমতার বহু ঊর্ধ্বে।

৯. আপনি একজন মানুষ। আপনাকে দুর্বল করে সৃষ্টি করা হয়েছে। যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনি মহা পরাক্রমশালী, মহা প্রজ্ঞাবান। তিনিই আপনাকে রিযিক দান করেন। যাবতীয় বিপদ-আপদ থেকে উদ্ধার করেন। সুস্থতা-অসুস্থতা, জীবন-মৃত্যু-এসবের চাবিকাঠি তাঁরই হাতে। এমন মহান প্রতিপালকের সন্তুষ্টি অর্জন বাদ দিয়ে দুর্বল মরণশীল মানবজাতিকে খুশি করার জন্য জীবনভর কাজ করে যাবেন, সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি কখনো তা সমর্থন করবে না।

১০. একটিবার কি ভেবে দেখেছেন, জীবনের মতো নামায-রোযা, দান-সদকা, ইলম চর্চা ও জ্ঞান সাধনা-সমস্তই বরবাদ হয়ে যাবে; গোটা জীবনের শ্রম-সাধনা পণ্ড শ্রমে পরিণত হবে, শুধু রিয়া ও লৌকিকতার কারণে।

১১. রিয়ামুক্ত থাকার জন্য সবসময় এ দু'আটি পাঠ করুন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُ بِكَ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ وَأَنَا أَعْلَمُ، وَأَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لَا أَعْلَمُ.
অর্থ: 'হে আল্লাহ সজ্ঞানে শিরক করা থেকে আপনার পানাহ্ চাই। যা না জেনে, না বুঝে করছি, তার জন্য ক্ষমা চাই।'

১১. মনে রাখুন, যে মানুষ নিজেই নিজের উপকার করতে পারে না, নিজেকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারে না, সুস্থতা-অসুস্থতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, জীবন-মৃত্যুর কর্তৃত্ব রাখে না, সে কীভাবে আপনার উপকার ও কল্যাণ সাধন করতে পারে?! তাকে মানানোর জন্য, খুশি করার জন্য নিজেকে প্রদর্শন করার এবং কল্যাণমুখী উদ্যোগ-আয়োজনে ব্যস্ত থাকার কী অর্থ হতে পারে?!

১২. কাল কেয়ামতের ময়দানে কতো জ্ঞানী-গুণী, কতো সাধক পুরুষ শুধু রিয়ার কারণে তাদের জ্ঞানচর্চা ও সাধনার প্রতিদান থেকে বঞ্চিত হবে। কতো সংস্কারক ও সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব আমৃত্যু সংস্কারকার্য ও সংগ্রামের পুরস্কার-বঞ্চিত হয়ে তিরস্কার ও ভর্ৎসনার শিকার হবে, শুধু লৌকিকতার কারণে।
তাই প্রতিটি কাজের আগে নতুনভাবে নিয়ত করুন। নিয়তকে শুদ্ধ-পরিশুদ্ধ করুন। প্রতিটি কাজ একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য করুন। রিয়া ও লৌকিকতা থেকে সদা সতর্ক থাকুন।

পরিশিষ্ট:
বিশ্ববিখ্যাত গ্রিক বিজ্ঞানী ও দার্শনিক এরিস্টটল বলেছেন: 'ইহকালীন জীবনে পূর্ণ সম্মান ও মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকতে হলে আপনার জন্য সংক্ষিপ্ত পথটি হলো, আপনার ভেতর-বাহির এক হওয়া।'

ইসলামী খেলাফতের চতুর্থ খলীফা, আলী ইবনে আবু তালেব (রা.) বলেছেন: 'লৌকিক ও প্রদর্শনবাদী লোকের আলামতগুলো হলো, নির্জনে একাকীত্বে সে অলস অকর্মা থাকবে। আর জনসম্মুখে সর্বকর্মা হয়ে আত্মপ্রকাশ করবে। আত্মপ্রশংসায় খুশিতে আটখানা হয়ে কাজের গতি বাড়িয়ে দিবে। একটু নিন্দা ও বদনামে ভেঙে পড়বে।'

টিকাঃ
২৫. তাঁকে প্রাণীবিজ্ঞানের জনক বলা হয়। এছাড়া প্লেটোর সাথে যৌথভাবে তাঁকে "পশ্চিমা দর্শনের জনক” বলে অভিহিত করা হয়। এরিস্টটল সক্রেটিস ও প্লেটোর দর্শনসহ তাঁর পূর্বের সময়ের বিদ্যমান বিভিন্ন দর্শনের জটিল ও সদৃশ সমন্বয় দেখান। জন্ম খৃস্টপূর্ব ৩৮৫। মৃত্যু খৃষ্টপূর্ব ৩২৩।

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান 📄 মিথ্যা

📄 মিথ্যা


মিথ্যা হলো, একটি সত্য ও বাস্তবতার আংশিক কিংবা আগাগোড়া পরিবর্তন করে ফেলা। যা আদৌ ঘটেনি তা বানিয়ে বলাও মিথ্যা। মিথ্যার মূল উদ্দেশ্য হলো ধোঁকা দেওয়া ও প্রতারণা করা। মানবিক স্বভাব-চরিত্রে মিথ্যেই হলো সবচেয়ে ঘৃণ্য নিকৃষ্ট।

এর কারণে ব্যক্তি চারপাশের মানুষের আস্থা ও বিশ্বস্ততা হারিয়ে ফেলে। পরিবার ও সমাজে চরম উপেক্ষিত হয়ে পড়ে। ইসলামের দৃষ্টিতে অসত্য ও মিথ্যা হলো মুনাফেকির আলামত। সমাজের অধিকাংশ গুনাহ, নাফরমানি, অন্যায়-অনাচারের অন্যতম কারণ হলো অসত্য ও মিথ্যা, যা মানুষের মনুষ্যত্ব, নীতি-নৈতিকতাকে সমূলে ধসিয়ে দেয়।

ব্যক্তি যদি সমাজে একবার মিথ্যাবাদী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যায় চারপাশের মানুষ তাকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে। তার থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলে। তার সাথে ওঠা-বসা ও চলা-ফেরায় সদা সতর্ক থাকে-না জানি কখন তার মিথ্যার ফাঁদে পা ফসকায়।

মিথ্যা চোরাবালির মতো ভয়ানক। একটা মিথ্যার ফাঁদে জড়িয়ে গেলে আরও দশটি মিথ্যা তাকে ঘিরে ধরে। ক্রমশ আরও একটি মিথ্যা তাকে গ্রাস করে ফেলে। একপর্যায়ে অবস্থা এতই গুরুতর হয় যে, তার সত্য কথাও মানুষ বিশ্বাস করতে চায় না।

সুষ্ঠু সমাজ বিনির্মাণে অসত্য ও মিথ্যার স্বভাব পরিহার করে ন্যায় ও সত্য অবলম্বনের বিকল্প নেই। এ লক্ষ্যে আমাদের করনীয় কী?

সমাধান:
১. মিথ্যার নিন্দা করে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন:
﴿انْظُرْ كَيْفَ يَفْتَرُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ طَ وَكَفَى بِهِ إِثْمًا مُّبِينًا﴾ [النساء: ٥٠]
অর্থ: দেখ, তারা আল্লাহর প্রতি কি রকমের মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে। প্রকাশ্য গুনাহের জন্য এটাই যথেষ্ট। (নিসা, ৪: ৫০)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "آيَةُ الْمُنَافِقِ ثَلَاثُ: إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ". (صحيح البخاري) ١/١٦
অর্থ: 'মুনাফিকের আলামত তিনটি: কথা বললে মিথ্যা বলে। প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভঙ্গ করে। আমানত রাখা হলে খেয়ানত করে।' (বুখারী: ১/১৬)

২. মিথ্যার ব্যাপারে সদা সতর্ক থাকতে হবে। কেননা তা কখনো কখনো নেফাক ও কপটতা থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে কুফুরির দিকে ঠেলে দেয়। পবিত্র কুরআনের বাণী: ﴿إِنَّمَا يَفْتَرِي الْكَذِبَ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْكَاذِبُونَ﴾ [النحل: ١٠٥]
অর্থ: আল্লাহর প্রতি অপবাদ আরোপ তো তারাই করে, যারা আল্লাহর আয়াতের উপর ঈমান রাখে না। প্রকৃতপক্ষে তারাই মিথ্যাবাদী। (নহল, ১৬: ১০৫)

৩. সন্তানদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক দীক্ষায় অনুপ্রাণিত করতে হবে। সততা ও সত্যবাদিতার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বরোপ করা কর্তব্য। ইহকালে ও পরকালে মিথ্যার অশুভ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করতে হবে।

৪. আজ থেকে নিজেই নিজের সঙ্গে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হোন, কখনো মিথ্যা বলবেন না, গুরুত্বপূর্ণ ও গুরুতর বিষয়ে তো নয়-ই; এমনকি হাসি-তামাশাতেও না। সদা সত্য বলুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বাণী মনে রাখুন:
وَمَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَصْدُقُ وَيَتَحَرَّى الصَّدْقَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللهِ صِدِّيقًا". (صحيح مسلم) ٤ /٢٠١٣
অর্থ: 'ব্যক্তি সত্য বলতে থাকে; সততায় সচেষ্ট থাকে, একপর্যায়ে আল্লাহ তা'আলার দরবারে সত্যবাদী হিসেবে তার নাম লিপিবদ্ধ হয়।' (মুসলিম: ৪/২০১৩)

৫. মিথ্যার ব্যাপারে সদা সতর্ক থাকুন। কখনো যেন আল্লাহ তায়ালার দরবারে মিথ্যাবাদীদের খাতায় আপনার নাম না ওঠে। সবসময় রাসূল ﷺ-এর বাণী মনে রাখুন:
وَإِيَّاكُمْ وَالْكَذِبَ، فَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ، وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ، وَمَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَكْذِبُ وَيَتَحَرَّى الْكَذِبَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللهِ كَذَّابًا
অর্থ: 'মিথ্যা ও অসত্য থেকে বেঁচে থাকো। কেননা মিথ্যা শুধু পাপাচারের পথ খুলে দেয়। পাপাচার জাহান্নামের পথ দেখায়। ব্যক্তি অনবরত মিথ্যা বলতে থাকে। মিথ্যায় লিপ্ত থাকে। এক পর্যায়ে আল্লাহ তা'আলার দরবারে মিথ্যাবাদী হিসেবে তার নাম লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। (মুসলিম: ৪/২০১৩)

৬. মিথ্যা কখনো কোনো সমস্যার সমাধান হতে পারে না, মুক্তির উপায় হতে পারে না। মিথ্যার কারণে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে ও জটিল আকার ধারণ করে। তাই মনে রাখতে হবে-সত্যেই মুক্তি; মিথ্যায় ধ্বংস। সৎ ও ধার্মিক ব্যক্তিদের সান্নিধ্যে থাকুন। তাঁদের সান্নিধ্য আপনাকে সততা ও ন্যায়-নিষ্ঠতায় অনুপ্রাণিত করবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন:
﴿يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّدِقِينَ﴾
অর্থ: 'হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমরা সত্যবাদীদের সঙ্গে থাক।' (তাওবা, ৯: ১১৯)

৭. চরম সংকট ও প্রতিকূলতার মুহূর্তেও যারা সততার পথ বেছে নিয়েছেন, সদিচ্ছার পরিচয় দিয়েছেন, আল্লাহর উপর ভরসা করে বিপদ ও সংকট থেকে রক্ষা পেয়েছেন, তাদের ঘটনা পড়ে শিক্ষার্জন করুন। কিন্তু যারা মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে, কপটতার কূটকৌশল খাটিয়ে সমস্যা ও সংকটের বেড়াজালে আরও ভালোভাবে ফেঁসে গেছে তাদের ঘটনা পরিণতি জেনে সতর্ক হোন।

৮. সতর্ক হোন, প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হোন-হাসি-তামাশায় ভুলেও ছোট-ছোট মিথ্যায় প্রবৃত্ত হবেন না। মিথ্যা যতো নগণ্য হোক, অসত্যের দোষে দুষ্টতা বর্জনীয়। হাদীসে রাসূল ﷺ এরশাদ করেছেন: عَنْ أَبِي أُمَامَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: "أَنَا زَعِيمُ بِبَيْتٍ فِي رَبَضِ الْجَنَّةِ لِمَنْ تَرَكَ الْمِرَاءَ وَإِنْ كَانَ مُحِقًّا وَبِبَيْتٍ فِي وَسَطِ الْجَنَّةِ لِمَنْ تَرَكَ الْكَذِبَ وَإِنْ كَانَ مَازِحًا وَبِبَيْتٍ فِي أَعْلَى الْجَنَّةِ لِمَنْ حَسَّنَ خُلُقَهُ ". (سنن أبي داود) ٢٥٣/٤ অর্থ: আবূ উমামাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, 'যে ব্যক্তি ন্যায়সঙ্গত হওয়া সত্ত্বেও ঝগড়া পরিহার করবে আমি তার জন্য জান্নাতের বেষ্টনীর মধ্যে একটি ঘরের জিম্মাদার; আর যে ব্যক্তি তামাশার ছলেও মিথ্যা বলে না আমি তার জন্য জান্নাতের মাঝখানে একটি ঘরের জিম্মাদার। আর যে ব্যক্তি তার চরিত্রকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছে আমি তার জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থিত একটি ঘরের জিম্মাদার।' (আবু দাউদ: ৪/২৫৩)

৯. শোনা কথায় কান দিবেন না। কেননা এর কারণে একপর্যায়ে মিথ্যার বদভ্যাস হয়ে যায়। যে কোনো তথ্য ও সংবাদ আগে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানুন এবং সুনিশ্চিত হোন, তারপরই তা গ্রহণ করুন এবং প্রচার করুন। "তারা বলেছে, তারা বলে"-এ ধরণের পরিভাষা পরিহার করুন। এ পরিভাষাগুলো ধারণা ও অনুমান মাত্র। মানুষের কিছু ধারণা ও অনুমান গুনাহ সমান। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ﴾ [الحجرات: ١٢]
অর্থ: নিশ্চয় কোন কোন অনুমান তো পাপ। (হুজুরাত, ৪৯: ১২)

১০. জীবনের প্রতিটি সর্বাঙ্গনে ন্যায় ও সততাকে প্রধান নীতি হিসেবে অবলম্বন করুন এবং মিথ্যার জঘন্যতা ও অশুভ পরিণতির কথা ভেবে মিথ্যা থেকে বেঁচে থাকুন। দেশ, রাষ্ট্র, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও ধর্ম-কর্ম-নির্বিশেষে অতীত-বর্তমানের সকল জ্ঞানীজন একমত-মিথ্যা ও কপটতা চরম নিকৃষ্ট স্বভাব। একজন সভ্য-ভদ্র মানুষ কখনো এ দোষে দুষ্ট হতে পারে না।

১১. মনে রাখুন, যে মিথ্যা বলে, ধোঁকা দেয়, মানুষ ও সমাজ তার ব্যাপারে কতো খারাপ ধারণা পোষণ করে! কী কদর্যভাবে তার সমালোচনা করে! শুধু মানুষের খারাপ ধারণা ও সমালোচনাই নয়, মিথ্যাবাদী ও তার সন্তান-সন্ততি সামাজিকভাবে নানা প্রতিকূলতার শিকার হয়। তাই সর্বদা পবিত্র কুরআনের এই আয়াতটি মনে রাখুন:
ثُمَّ نَبْتَهِلْ فَنَجْعَلْ لَعْنَتَ اللَّهِ عَلَى الْكَذِبِينَ﴾ [آل عمران: ٦١]
অর্থ: 'তারপর আমরা সকলে মিলে আল্লাহর সামনে কাকুতি-মিনতি করি এবং যারা মিথ্যাবাদী, তাদের প্রতি আল্লাহর লানত পাঠাই।' (সূরা আলে-ইমরান, ৩: 61)
কে-ই-বা চাবে আল্লাহ তা'আলার অভিশাপের পাত্র হতে।

১২. একটি বিষয়ে সতর্ক হোন, মিথ্যা আপনাকে নিন্দা ও সমালোচনার সম্মুখীন করবে, ক্ষতি ও বরবাদির দিকে ঠেলে দিবে এবং জাহান্নামে যাওয়ার পথ তরান্বিত করবে। কেননা তা ঈমানের পরিপন্থি, নীতি-নৈতিকতা ও মনুষ্যত্বের বিরোধী। তা সমস্ত মহৎ গুণাবলি নিঃশেষ করে দেয়। সুতরাং অসত্য ও মিথ্যা থেকে বেঁচে থাকুন। নিরাপদ সুখী জীবনযাপন করুন।

১৩. আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে সততার প্রতিদান লাভে নিয়ত প্রয়াসী হোন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন:
﴿قَالَ اللَّهُ هَذَا يَوْمُ يَنْفَعُ الصَّدِقِينَ صِدْقُهُمْ لَهُمْ جَنَّتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ خُلِدِينَ فِيهَا أَبَدًا رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ﴾ [المائدة: ١١٩]
অর্থ: 'আল্লাহ বলবেন, 'এটা হল সেই দিন যেদিন সত্যবাদীগণকে তাদের সততা উপকার করবে। তাদের জন্য আছে জান্নাতসমূহ যার নীচে প্রবাহিত হবে নদীসমূহ। সেখানে তারা হবে চিরস্থায়ী। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন, তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। এটা মহাসাফল্য।' (মায়িদা, ৫: ১১৯)

১৪. সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:
"إِنْ تَصْدُقِ اللَّهَ يَصْدُقْكَ". (سنن النسائي) ٦٠/٤
অর্থ: 'আল্লাহ তা'আলার বিধিবিধান পালনে তুমি যদি একনিষ্ঠ হও, সততার পরিচয় দাও, আল্লাহ তা'আলাও তোমাকে তাঁর পুরস্কারের ওয়াদা সত্য করে দেখাবেন।' (সুনানুন নাসায়ী: ৪/৬০)

পরিশিষ্ট:
প্রখ্যাত গবেষক ও সাহিত্যিক আমীন রায়হানী বলেন: 'প্রকৃতপক্ষে মিথ্যাবাদীরা যদি কাউকে বিশ্বাসও করে তবুও কেউ তাদের বিশ্বাস করে না।'

আল্লামা ইবনুল কায়্যিম জাওযী (রহ.) (৬৯১-৭৫১ হি.) বলেছেন: 'লক্ষ্য করুন-আল্লাহ তা'আলা হযরত আবু বকর (রা.)-কে সততার কী শ্রেষ্ঠ পোশাকটিই পরিধান করিয়েছেন। সততার গুণে তিনি বিশ্বাস করেছিলেন জগতের শ্রেষ্ঠ সত্যবাদীকে (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে)। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা এর স্বীকৃতিও দিয়েছেন:
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ أُولَئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
অর্থ: 'আর যে ব্যক্তি সত্য কথা নিয়ে আসে এবং নিজেও তা বিশ্বাস করে, এরূপ লোকই মুত্তাকী।' (সূরা যুমার, ৩৯: ৩৩)

এর বিপরীতে লক্ষ্য করুন, আল্লাহ তা'আলা 'মুসাইলামাতুল কাযযাব'-এর দেহে অসত্য ও মিথ্যার কী কালিমা লেপে দিয়েছেন। আজও তার নামের সাথে মিথ্যার দুর্গন্ধ লেগে আছে। মানুষ আজও তাকে কায্যাব (চরম মিথ্যাবাদী) হিসেবে স্মরণ করে।

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান 📄 পরনিন্দা ও চোগলখুরি

📄 পরনিন্দা ও চোগলখুরি


গীবত ও পরনিন্দা হলো অনুপস্থিত ব্যক্তির সমালোচনা করা। যা প্রমাণ করে, গীবতকারীর ধার্মিকতায় খাদ আছে। পরনিন্দা ও দোষচর্চার মূল কারণ হলো হিংসুটে মন ও অসুস্থ মানসিকতা। পরনিন্দা নিন্দুকের ভীরুতা ও কাপুরুষতার কথা বলে দেয়। কেননা নিন্দুক কখনো তার সমালোচিত ব্যক্তিটির মুখোমুখি হওয়ার সাহস করে না, কখনো স্পষ্টবাদী হয়ে মনের খেদ প্রকাশ করতে পারে না।

গীবত ও পরনিন্দা হলো অনুপস্থিত সমালোচিত ব্যক্তির মানহানি করার কদর্য পন্থা। আর চোগলখুরি হলো মানুষের মাঝে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কথা রটিয়ে বেড়ানো। যেমন কোনো ব্যক্তি দু' বন্ধুর সম্পর্ক নষ্ট করার উদ্দেশ্যে একজনের কথা অপরজনের কানে দেওয়া, অথবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কথা লাগিয়ে গোল বাঁধানো। চোগলখুরির ক্ষেত্রে ব্যক্তির রটানো কথা সত্য হোক বা মিথ্যা, হোক না তার উদ্দেশ্য সৎ কিংবা অসৎ, এর চূড়ান্ত পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ।

পরনিন্দা ও চোগলখুরি ভালবাসা ও সম্প্রীতির ভিত নাড়িয়ে দেয়। ভ্রাতৃত্বের মতো পবিত্র সম্পর্ক কলুষিত করে। পরস্পর আস্থা ও বিশ্বাস ধ্বংস করে দেয়। বিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞজন যথার্থ বলেছেন: 'পরনিন্দা ও চোগলখুরি হলো গলিত পূঁজ ও দুর্গন্ধ বমি। যা কলুষিত মন থেকে বেরিয়ে মুখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে।'

পরনিন্দা ও চোগলখুরি-কাজ দুটি অত্যন্ত জঘন্য ও নিরব বিধ্বংসী। এর কারণে বহু দেশ, সমাজ ও সভ্যতায় হিংসা-বিদ্বেষ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ক্রমশ তা বনের লেলিহান আগুনের মতো সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। বাতাস যতো জোরালো ঝাপটায় বনের আগুন প্রতিহত করার চেষ্টা করে, আগুন মুহুর্মুহু বনের গভীর হতে গহীনে ছড়িয়ে পড়ে। এর কারণে অনেক বিপর্যয় বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। বহু রক্তপাত হয়েছে। বহু ধ্বংস-বিনাশ ঘটেছে।

সমাজে যদি মান-সম্মানের সাথে বেঁচে থাকতে হয়, গৌরব ও মর্যাদা অটুট রাখতে হয়, অবশ্যই পরনিন্দা ও চোগলখুরির মতো ঘৃণ্য স্বভাবদোষ পরিহার করতে হবে। এ লক্ষ্যে কার্যকর উপায় ও করনীয় পদক্ষেপ কী?

সমাধান:
১. তাকওয়া ও খোদাভীতি অবলম্বন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, অন্যের দোষচর্চা করা ও পরনিন্দা করা কুরআন সুন্নাহর বিধানে হারাম এবং মানবীয় দুশ্চরিত্রের জঘন্যতম। পবিত্র কুরআনে গীবত ও পরনিন্দার বিষয়টিকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার মতো জঘন্য কাজ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে:
وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ﴾ [الحجرات: ١٢]
অর্থ: 'এবং একে অপরের গীবত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোস্ত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা অপছন্দই করে থাক।' (হুজুরাত, ৪৯: ১২)

২. শয়তান আপনাকে মিষ্টি কথায় এভাবে ভোলানোর চেষ্টা করবে: 'মানুষ বেপরোয়াভাবে অন্যায়-অপরাধ করবে, আর আপনি বলতেও পারবেন না? আপনি তো মিথ্যা বলছেন না, সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে ভুলভাল বকছেন না, যা বলছেন নিরেট সত্য, তাতে গীবত ও পরনিন্দা হলো কীভাবে?'

শয়তানের এমন সাধূচরিত্রের মিষ্টি কথায় প্ররোচিত হবেন না। এ ক্ষেত্রে রাসূল ﷺ-এর বাণীই চূড়ান্ত। তিনি বলেছেন:
أَتَدْرُونَ مَا الْغِيبَةُ؟ قَالُوا: اللهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ. قَالَ: ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ قِيلَ: أَفَرَأَيْتَ إِنْ كَانَ فِي أَخِي مَا أَقُولُ؟ قَالَ: إِنْ كَانَ فِيهِ مَا تَقُولُ فَقَدْ اغْتَبْتَهُ، وَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِيهِ فَقَدْ بَهَتَهُ» (صحيح مسلم) ٢٠٠١/٤
অর্থ: 'তোমরা কি জানো গীবত কাকে বলে?' সাহাবায়ে কেরাম বললেন: 'আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।' রাসূল ﷺ বললেন: '(গীবত হলো) তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে।' জিজ্ঞাসা করা হলো: 'ভাই সম্পর্কে আমার মন্তব্য যদি (সত্য ও বাস্তব) হয় তাহলেও?'
রাসূল ﷺ বললেন: 'তার সম্পর্কে তোমার কথা যদি বাস্তব হয় তবেই তো গীবত। আর যদি অবাস্তব ও অসত্য হয় তাহলে তো তুমি তার উপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ করলে।' (মুসলিম: ৪/২০০১)

৩. কিয়ামতের দিন চোগলখুরি, বান্দা ও তার জান্নাতের মাঝে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ نَمَّام» (صحيح مسلم ১০১/১) অর্থ: 'কোনো চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না।' (মুসলিম, ১/১০১)

৪. কুরআন-সুন্নাহর অনেক স্পষ্ট ভাষ্য এটা প্রমাণ করে যে, চোগলখুরি হারাম ও নিকৃষ্টতম কবীরা গুনাহ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
وَلَا تُطِعْ كُلَّ حَلَّافٍ مَّهِينٍ * هَمَّازٍ مَشَاء بِنَمِيمٍ﴾ [القلم: ١٠، ١١] অর্থ: 'এবং এমন কোনও ব্যক্তির কথায়ও চলো না, যে অত্যাধিক কসম করে, যে হীন, যে নিন্দা করতে অভ্যস্ত, চোগলখুরি করে বেড়ায়।' (কলাম, ৬৮: ১০-১১)
গীবত চোগলখুরি ব্যক্তির নেক আমল বরবাদ করে দেয়। সুতরাং পরনিন্দা ও চোগলখুরি করে ব্যক্তিত্ব, আত্মমর্যাদা ও নেক আমলগুলোকে তুচ্ছ মূল্যে বিকে দিবেন না। কষ্ট করে যে নামায, রোযা ও দান সদকা করেছেন তা পণ্ডশ্রমে পরিণত করবেন না।

৫. লোকদের কাজকর্ম ও খুটিনাটি বিষয়ের পিছু পড়বেন না। কারো সম্পর্কে যদি কথা বলতেই হয় ভেবে-চিন্তে বলুন। কথাটি যদি মঙ্গলজনক হয় তবেই বলুন। অন্যথায় চুপ থাকাই শ্রেয়। রাসলূল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَاليَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ". (صحيح البخاري (۱۱/৮) অর্থ: 'যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ও পরকালের উপর বিশ্বাস করে সে যেন ভালো কথা বলে, নয় তো চুপ থাকে।' (বুখারী, ৮/১১)

৬. জ্ঞানী-গুণী, ধার্মিক ও পরহেযগার ব্যক্তিদের সংস্পর্শে থাকুন। সময়ের সদ্ব্যবহার, কথাবার্তায় পরিমিতি রক্ষা এবং আল্লাহর যিকিরের ক্ষেত্রে তাদের সংস্পর্শ আপনার জন্য সহায়ক হবে, গুনাহমুক্ত জীবন-যাপনের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। পরনিন্দুক ও চোগলখোর, তাদের সঙ্গ ত্যাগ করুন। কেননা এসব চারিত্রিক ভ্রষ্টতা হলো মহা সংক্রামক ব্যাধি। ক্ষণিকের সংস্পর্শেই এর বীজ ছড়াতে থাকে। সংবাদের মূল উৎস ও প্রধান সূত্রের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার আগে কোনো কথা বিশ্বাস করবেন না এবং মানুষের কাছে প্রচার করে বেড়াবেন না।

৭. সবসময় সচেতন থাকুন। নিজেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হোন-কখনো পরনিন্দা করবেন না। প্রয়োজনে নিজের উপর ক্ষতিপূরণ আরোপ করুন। যেমন: ভুলে অনিচ্ছায় গীবত কিংবা চোগলখুরি করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থদণ্ড আরোপ করুন এবং স্বতস্ফূর্তভাবে তা বাস্তবায়ন করুন। অথবা কোনো নেক আমল করুন। এভাবে ভালো কাজে নিয়োজিত হয়ে খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকা সহজ হবে।

৮. যিকির ও এস্তেগফারে যবান তরতাজা রাখুন। হৃদয়-মনের নিষ্কলুষতা ও পরিশুদ্ধি লাভে সচেষ্ট হোন। কেননা পরনিন্দা ও চোগলখুরি অন্তরে পুষে-রাখা হিংসা বিদ্বেষের জের ধরেই হয়ে থাকে।

৯. সবসময় কোনো-না-কোনো ভালো কাজে ব্যস্ত থাকুন। যেন পরনিন্দা ও কুটনামি করার সুযোগ না হয়।

১০. অন্যের দোষ না ঘেঁটে আত্মসমালোচনায় মনোযোগী হোন। পরিশ্রম ও নিয়তির কল্যাণে যতোটুকু অর্জিত হয় তাতেই তুষ্ট থাকুন। অন্যের সুখ-সৌভাগ্য দেখে হিংসা করা সমীচীন নয়। হিংসুক নিজেই তার হিংসার আগুনে জ্বলে-পুড়ে মরে।

১১. আপনার মনে যখন গীবত চোগলখুরি উসখুস করবে তখন স্মরণ করবেন, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদের সম্পর্কে কী বলেছেন:
وَإِذَا لَقُوا الَّذِينَ آمَنُوا قَالُوا آمَنَّا مَن وَإِذَا خَلَوْا إِلَى شَيْطِيْنِهِمْ * قَالُوا إِنَّا مَعَكُمْ إِنَّمَا نَحْنُ مُسْتَهْزِعُونَ﴾ [البقرة: ١٤]
অর্থ: 'যারা ঈমান এনেছে, তাদের সাথে যখন এরা মিলিত হয়, তখন বলে, আমরা ঈমান এনেছি আর যখন নিজেদের শয়তানদের সাথে একান্তে মিলিত হয়, তখন বলে, আমরা তোমাদেরই সঙ্গে আছি। আমরা তো কেবল তামাশা করছিলাম।' (বাকারা, ২: ১৪) নিজেকে, নিজের বিবেককে একবার জিজ্ঞাসা করুন, আপনার পক্ষে কি সম্ভব স্বভাব-চরিত্রে, দেহ-রক্তে মুনাফিকের স্বভাব ধারণ করা?

১২. সন্তানদের গঠনমূলক শিক্ষা-দীক্ষায় গড়ে তুলতে হবে। পরনিন্দা ও চোগলখুরির কারণে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ যে অসুস্থ পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে, সে ব্যাপারে সতর্ক করতে হবে।

১৩. একটি বিষয় সুনিশ্চিত, যারা অন্যের সমালোচনায় লিপ্ত থাকে, পরনিন্দা ও চোগলখুরিতে মজে থাকে সমালোচিত ব্যক্তিরা কিয়ামতের দিন তাদের প্রতিপক্ষ ও বিবাদী হয়ে দাঁড়াবে। চোগলখুরি ও পরনিন্দার কারণে যে আন্তরিক বন্ধুত্বে চিড় ধরবে, ভ্রাতৃত্ব বন্ধন ছিন্ন হবে এবং পারিবারিক সম্পর্কে অনিশ্চয়তা দেখা দিবে তার দায়ভার নিন্দুক ও চোগলখোর ব্যক্তিকেই বহন করতে হবে। এ পাপের বোঝা তার ঘারেই চাপিয়ে দেওয়া হবে। মনে রাখুন, কথাবার্তায় পরিমিতি রক্ষা করা ও ন্যায়ানুগতা অবলম্বন করা হলো জান্নাতে প্রবেশে অন্যতম উপায়।

১৪. আপনি কি চান, গীবত ও চোগলখুরি করে মু'মিন বান্দাদের অভিশাপের পাত্র হতে? পারিবারিক সম্পর্কে ফাটল ধরাতে? মানুষের মনে-মনে হিংসা বিদ্বেষের বিষ ছড়াতে? সমাজে বিভেদ-বিৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে? মুনাফেকি স্বভাবদোষে কলুষিত হয়ে মানবজাতির নিকৃষ্ট ইনসানে পরিণত হতে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী শুনুন: إِنَّ شَرَّ النَّاسِ ذُو الوَجْهَيْنِ الَّذِي يَأْتِي هَؤُلاءِ بِوَجْهِ، وَهَؤُلَاءِ بوجه". (صحيح البخاري (۷১/৯) অর্থ: 'দু'মুখো মানুষ হলো সবচে' নিকৃষ্ট। যে এক দলের সাথে এক চেহারা জাহির করে, পরক্ষণেই অপর দলের সাথে ভিন্ন চেহারায় হাজির হয়।' (বুখারী, ৯/৭১) হাদীসের অখ্যায়িত নিকৃষ্টতম ব্যক্তিটি হলে পরনিন্দুক ও চোগলখোর।

১৫. যে ব্যক্তি অন্যের মান-মর্যাদা রক্ষা করে চলবে আল্লাহ তা'আলাও তার মান মর্যাদা বজায় রাখবেন। আর যে অন্যের দোষ-ত্রুটি খুঁজে বেড়াবে, ছিদ্রান্বেষণে মেতে থাকবে। আল্লাহ তায়ালাও তার গোপন বিষয় জাহির করে দিবেন। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) (১৫০-২০২ হি.) বলেছেন: 'অন্যের দোষচর্চা করবেন না। অন্যের মতো দোষ-গুণে মিলিয়ে আপনিও তো একজন মানুষ। আপনার চোখ যেমন অন্যের ভুল-বিচ্যুতি খুঁজে বেড়াচ্ছে চারপাশের চোখগুলোও আপনার ভুলগুলো শনাক্ত করছে। সুতরাং অন্যের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখাই শ্রেয়।'

পরিশিষ্ট:
বিখ্যাত জার্মান-আমেরিকান কবি সাহিত্যিক ও উপন্যাসিক চার্লস বুকৌসকি (১৯২০-১৯৯৪ খৃষ্টাব্দ) বলেছেন: 'লোকদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলুন। এতো ঘনিষ্ট হবেন না যে, পরে পস্তাতে হয়। এতো বেশি দূরে থাকবেন না যে, মানুষ পর ভাবে। আপনাকে থাকতে হবে সবার মধ্যে, সবার সাথে মিশে, অভিজাত ঈষৎ দূরত্ব বজায় রেখে।'

'চোগলখুরি হলো একটি কদর্য স্বভাব। যা আপনাকে লাঞ্ছিত অপমানিত করে ছাড়বে। তাই পরনিন্দা না করে মানুষের ইতিবাচক দিকগুলোর প্রশংসা করুন।' -আয়েয আল-কারনী

বহু শাস্ত্রজ্ঞানী ইবনে হাযাম আন্দালুসী (রহ.) (৩৮৪-৪৫৬ হি.) বলেছেন: 'যুগে-যুগে যতো রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে, যতো অন্যায় রক্তপাত হয়েছে, ইজ্জত-আবরু লুণ্ঠিত হয়েছে তার অন্যতম কারণ ছিল ধোঁকা-প্রতারণা ও চোগলখুরি।'

বিখ্যাত তাবেয়ী ও নাহুশাস্ত্র প্রণেতা আবুল আসওয়াদ দু'আলী (রহ.) (৬৯ হি.) বলেছেন: 'যে চোগলখুরিই আপনার কানে আসুক তার কোনোটাই মেনে নিবেন না। চোগলখোরকে এক বিন্দু প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক নয়। আজ যে আপনার কাছে অন্যের কুৎসা রটনা করছে, অন্যের নামে কানপড়া দিচ্ছে কাল সে আপনাকে নিয়ে একই কাজ করে বেড়াবে।'

বিখ্যাত মিশরীয় লেখক নাগীব মাহফুজ (১৯১১-২০০৬ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'আজ যে আপনার কাছে লোকদের নিন্দা সমালোচনা করছে, কোনো সন্দেহ নেই, কাল সে আপনার নামেই লোকদের কাছে কুৎসা রটিয়ে বেড়াবে।'

টিকাঃ
২৬. অন্যায়-অন্যায্য হলে গোপনে তার চর্চা করা, আর প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করা-স্পষ্টতই দু'টি ভিন্ন বিষয়।

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান 📄 নামাযে অবহেলা

📄 নামাযে অবহেলা


নামায হলো ইসলামের দ্বিতীয় রোকন। কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম বান্দার নামাযের হিসেব গ্রহণ করা হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّ أَوَّلَ مَا يُحَاسَبُ بِهِ العَبْدُ يَوْمَ القِيَامَةِ مِنْ عَمَلِهِ صَلَاتُهُ، فَإِنْ صَلُحَتْ فَقَدْ أَفْلَحَ وَأَنْجَحَ، وَإِنْ فَسَدَتْ فَقَدْ خَابَ وَخَسِرَ". (سنن الترمذي) ২/২৭০
অর্থ: 'কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম বান্দার নামাযের হিসেব গ্রহণ করা হবে। যদি তা যথাযথ ঠিক হয় তাহলে বান্দা সফল কৃতকার্য। আর যদি নামাযে গরবর হয় তাহলে বান্দার ক্ষতি ও ধ্বংস অনিবার্য।' (তিরমিজী, ২/২৭০)

নামায ত্যাগ করা গুরুতর কবীরা গুনাহ। কোনো কোনো ইমাম ও ফকীহ-এর মতে কুফুরি, যা বান্দাকে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের করে দেয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
العَهْدُ الَّذِي بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمُ الصَّلَاةُ، فَمَنْ تَرَكَهَا فَقَدْ كَفَرَ. (سنن الترمذي) ৫/১৪

অর্থ: 'আমাদের মাঝে ও তাদের (কাফেরদের) মাঝে পার্থক্য রেখা হলো নামায। সুতরাং যে নামায ছেড়ে দিলো, সে যেন কুফুরি করলো।' (তিরমিজী, ৫/১৪)

কুরআন সুন্নাহর বহু জায়গায় নামাযের গুরুত্ব ও তাৎপর্য সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কখনো নামায কায়েমের আদেশ এবং নামাযে অবহেলার ব্যাপারে নিষেধ করার মাধ্যমে, আবার কখনো পুরস্কারের সুসংবাদ দিয়ে এবং কঠিন শাস্তির সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বহুবার বিভিন্নভাবে নামাযের গুরুত্ব ও মহত্ত্ব বোঝানো হয়েছে।

নামায হলো আল্লাহ তা'আলার সাথে বান্দার সম্পর্কের সেতুবন্ধন। সুতরাং, যে নামায ত্যাগ করলো সে যেন আপন রবের সাথে তার বাঁধন ছিন্ন করলো, রিযিকের পথ সংকুচিত করলো এবং ইহকাল ও পরকালের সৌভাগ্য সফলতার পথ রুদ্ধ করলো।

যুগের আধুনিকায়ন, বাহ্যিক চাকচিক্য, চারপাশের যান্ত্রিক ব্যস্ততার ভিড়ে নামাযের মতো মৌলিক ইবাদত নিতান্ত গৌণ হয়ে পড়ছে। সঙ্গে-সঙ্গে ইসলাম ও মুসলমানের অধঃপতন ত্বরান্বিত হচ্ছে। মুসলিম জাতির চলমান এ সংকট কাটিয়ে উঠার পথ কী? এ ব্যাপক সমস্যার সমাধানই বা কী?

সমাধান:
১. সন্তানদের মধ্যে নামাযের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। নামায কায়েমে পুরস্কার এবং নামাযে অবহেলায় তিরস্কার-উভয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর পন্থা। পুরস্কার ও প্রশংসায় ব্যক্তির উৎসাহ উদ্দীপনা বৃদ্ধি পায়। তিরস্কার ও ভর্ৎসনায় সতর্কতা ও সচেতনতা তৈরি হয়।

২. অভিভাবকগণ, সন্তানদের নামায কায়েমের লক্ষ্যে আপনাদের করণীয় কী হবে? জেনে রাখুন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদীসের ভাষ্য থেকে:
عَلِّمُوا أَوْلَادَكُمُ الصَّلَاةَ إِذَا بَلَغُوا سَبْعًا وَاضْرِبُوهُمْ عَلَيْهَا إِذَا بَلَغُوا عَشْرًا". (مسند البزار - البحر الزخار) ১৭ /১৮৯
অর্থ: 'সাত বছর বয়সে তোমাদের সন্তানদের নামায শিক্ষা দাও। দশ বছর বয়সে নামায ত্যাগ করার কারণে শাসন কর।' (মুসনাদুল বায়্যার, ১৭/১৮৯)

৩. সন্তানদের নামাযের গুরুত্ব ও ফযীলতসংবলিত পবিত্র কুরআনের আয়াত ও হাদীস পাঠ করে শোনাতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ:
وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلوةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا ﴾ [طه: ١٣٢]
অর্থ: 'এবং নিজ পরিবারবর্গকে নামাযের আদেশ কর এবং নিজেও তাতে অবিচল থাক।' (সূরা তহা, ২০: ১৩২)

৪. ইহকাল ও পরকালে নামাযের সুফল সুনিশ্চিত। পরকালের আগে অন্তত ইহকালের সুফলগুলো মনে রাখুন-হৃদয়ের প্রশস্ততা, মানসিক প্রশান্তি, সফলতা সৌভাগ্য ও নেক আমলের তাওফীক-এর চেয়ে বড় সুফলতা ও প্রাপ্তি আর কী হতে পারে?!

৫. দু'আ হিসেবে পবিত্র কুরআনের এ আয়াতটি বারবার পাঠ করুন:
رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلُوةِ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي عَن رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ
অর্থ: 'হে আমার প্রতিপালক! আমাকেও নামায কায়েমকারী বানিয়ে দিন এবং আমার আওলাদের মধ্যে হতেও (এমন লোক সৃষ্টি করুন, যারা নামায কায়েম করবে)। হে আমার প্রতিপালক! এবং আমার দু'আ কবুল করুন।' (ইবরাহীম, ১৪: ৪০)

৬. নামায ত্যাগ করার ভয়াবহ পরিণতির কথা একবার ভাবুন-পরকালে কবরের আযাব ও জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তি তো অবশ্যম্ভাবী। তার আগে ইহকালে সকরুণ পরিণতির শিকার হতে হবে। নামায ত্যাগ করার কারণে অভাব-অনটন, বঞ্চনা-গঞ্জনা, দুঃখ-দুর্দশা, কাজেকর্মে ব্যর্থতাসহ ব্যক্তি-জীবনে নানা সংকট ও প্রতিকূলতা থেকে নিস্তার নেই।

৭. মাতা-পিতাকে নামাযের প্রতি যত্নবান হতে হবে, নিজের ও পরিবারের মঙ্গলের স্বার্থে। সন্তানদের জীবনে তারাই হলেন প্রথম ও প্রধান অনুসৃত ব্যক্তিত্ব। পিতা তার ছেলেকে মসজিদে নিয়ে যাবেন। মা তার মেয়েকে সাথে নিয়ে নামায আদায় করবেন। পিতা-মাতার সততা ও কল্যাণমুখিতা সন্তানদের জীবনে গভীর উৎসাহ উদ্দীপনা জোগাবে।

৮. একটি মহৎ অভ্যাসে নিজেকে অভ্যস্ত করুন, আযান শোনামাত্রই সমস্ত কাজ বন্ধ করে দিন। লেখাপড়া, আলোচনা-পর্যালোচনা, সভা-অনুষ্ঠান, যাবতীয় সবকিছু বন্ধ করে একমাত্র নামাযের জন্য প্রস্তুত হন। নামাযই হলো যাবতীয় কল্যাণ, সফলতা ও সৌভাগ্যের সোপান।

৯. মসজিদে পাঁচওয়াক্ত নামাযের নির্ধারিত সময় মনে রাখতে হবে। আযান শোনা মাত্রই নামাযের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। এক মুহূর্তও বিলম্ব করা যাবে না। কেননা তা অলসতা থেকে শুরু করে একপর্যায়ে অবহেলা ও নামায ত্যাগের অভ্যাসে পরিণত হয়।

১০. যে সময়টুকু নামাযে ব্যয় করছেন, জীবনের অন্যান্য ব্যতিব্যস্ততার তুলনায় তা নিতান্তই কম। তাই কখনো এমনটা ভাবা সমীচীন নয়, নামাযের কারণে আমার পেশা ও কাজকর্মের ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে।

১১. মনে রাখুন, যে নামায ছুটে যাবে, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আপনার ওপর তার কাযা আদায় করা ওয়াজিব। অন্যথায় মৃত্যুর পর প্রথমে কবরে, তারপর কেয়ামত দিবসে কঠিন হিসেবের সম্মুখীন হতে হবে।

১২. কর্মক্ষেত্রে ও শিক্ষাঙ্গনে, সর্বত্র নামাযের পরিবেশ গড়ে তুলুন। সহকর্মী ও সহপাঠীদের নামাযে উদ্বুদ্ধ করুন। যে কাজ করতে গিয়ে নামাযে অবহেলা হয় আল্লাহ তা'আলা তাতে বরকত দান করেন না। শুধু কর্মী ও কর্ম দ্বারা কাঙ্ক্ষিত সুফল অর্জিত হয় না।

১৩. নামাযের প্রতি যত্নবান-এমন ব্যক্তিদের সংস্পর্শে থাকুন। তাদের সংস্পর্শ আপনার জন্য সহায়ক হবে। নামাযে শৈথিল্যকারী অবহেলাকারী লোকদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন। তাদের অসৎ সঙ্গ আপনার ক্ষতির কারণ হবে। মানুষ হলো অনুকরণপ্রিয় জাতি। সঙ্গ দোষে কিংবা সঙ্গগুণে সে খুব দ্রুত প্রভাবিত হয়।

১৪. আপনি যদি ফরজ নামাযে রীতিমতো অভ্যস্ত হয়ে থাকেন তাহলে নফল নামাযে যত্নবান হোন। কেননা তা ফরজ নামাযের জন্য নিরাপত্তা-প্রাচীর স্বরূপ। দুটি কারণে সুন্নত ও নফল নামাযে যত্নবান হতে হবে। প্রথমত: মানুষ মাত্র অবসাদ ও অলসতাপ্রবণ। দীর্ঘ জীবনে কৃত অভ্যস্ত কাজে সে কখনো-সখনো উদাসীন হয়ে পড়ে। সুতরাং, ব্যক্তি যদি ফরজ নামাযের পাশাপাশি সুন্নত ও নফল নামাযেও যত্নবান হয়, তাহলে কখনো ব্যস্ততা কিংবা উদাসীনতার কারণে সুন্নত ও নফল নামায ছুটে যেতে পারে। প্রথমেই ফরজ ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা নেই। আর যে ব্যক্তির মূল পুঁজিই হলো ফরজ নামায, অলসতা শৈথিল্যের কারণে প্রথম ধাপেই তার ফরজ নামায কাযা হয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত: কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম বান্দার নামাযের হিসাব নেওয়া হবে। তখন ফরজ নামাযে ত্রুটি-বিচ্যুতি পাওয়া গেলে সুন্নত নফলের মাধ্যমে সে ঘাটতি পূরণ করা হবে। সহীহ হাদীসে রাসূল ﷺ বলেছেন:
"إِنَّ أَوَّلَ مَا يُحَاسَبُ بِهِ الْعَبْدُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ عَمَلِهِ صَلَاتُهُ، فَإِنْ صَلُحَتْ فَقَدْ أَفْلَحَ وَأَنْجَحَ، وَإِنْ فَسَدَتْ فَقَدْ خَابَ وَخَسِرَ، فَإِنْ انْتَقَصَ مِنْ فَرِيضَتِهِ شَيْءٍ، قَالَ الرَّبُّ عَزَّ وَجَلَّ: اُنْظُرُوا هَلْ لِعَبْدِي مِنْ تَطَوُّع فَيُكَمَّلَ بِهَا مَا انْتَقَصَ مِنَ الفَرِيضَةِ، ثُمَّ يَكُونُ سَائِرُ عَمَلِهِ عَلَى ذَلِكَ".
অর্থ: 'নিশ্চয়ই কিয়ামতের দিন বান্দার (হুকুকুল্লাহর মধ্যে) যে কাজের হিসাব সর্বপ্রথম নেওয়া হবে তা হচ্ছে তার নামায। সুতরাং যদি তা সঠিক হয় তাহলে সে পারিত্রাণ পাবে। আর যদি (নামায) পণ্ড ও খারাপ হয় তাহলে সে ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদি তার ফরজ (নামাযের) মধ্যে কিছু কম পড়ে যায় তাহলে আল্লাহ তা'আলা বলবেন, 'দেখ তো! আমার বান্দা কিছু নফল (নামায) আছে কি না, যা দিয়ে ফরজের ঘাটতি পূরণ করে দেওয়া হবে?' তারপর এ ভিত্তিতে বান্দার অবশিষ্ট আমলের হিসাব গ্রহণ করা হবে। (তিরমিজী, ২/২৭০)

১৫. দু'আর মাধ্যমে আল্লাহমুখী হোন। সাচ্চা নামাযী হওয়ার জন্য আল্লাহ তা'আলার তাওফীক প্রার্থনা করুন। মনোযোগের সাথে আযান শুনুন এবং আযানের জবাব প্রদানে সচেষ্ট হোন। বিশেষভাবে মুআজ্জিনের حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ حَيَّ عَلَى الصَّلَاةِ বাণীর মর্ম উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন। لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ বলে এর উত্তর প্রদান করুন।

১৬. যাবতীয় গুনাহ ও নাফরমানি থেকে বেঁচে থাকুন। কেননা পাপাচার মানুষকে সদাচার থেকে বিরত রাখে। তাকে অন্যায়-অকল্যাণের পথে ঠেলে দেয়। এক ব্যক্তি হাসান বসরী (রহ.)-এর নিকট অনুযোগ করলো: 'ফজর নামাযের জন্য ভোরে উঠতে চাই, কিন্তু পারি না।' তিনি বললেন: 'গুনাহ ও নাফরমানি তোমাকে বিরত রাখে।'

১৭. ইন্টারনেট, সোস্যাল মিডিয়া ও টেলিভিশন ইত্যাদি ক্ষেত্রে সতর্ক হোন। আনন্দ-ফুর্তি ও খেল-তামাশা পরিহার করুন। কেননা তা বান্দাকে নামায থেকে বিরত রাখে। বিষয়টি সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে:
فَخَلَفَ مِنْ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلوةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيَّا﴾ [مريم: ٥٩]
অর্থ: 'তারপর তাদের স্থলাভিষিক্ত হল এমন লোক, যারা নামায নষ্ট করল এবং ইন্দ্রিয়-চাহিদার অনুগামী হল। সুতরাং তারা অচিরেই তাদের পথভ্রষ্টতার সম্মুখীন হবে।' (সূরা মারইয়াম, ১৯: ৫৯)

১৮. সিজদায় পড়ে, নামাযের শেষে কায়মনো বাক্যে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করুন। তিনি যেন আপনাকে নামায কায়েমের তাওফিক দান করেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ মুআয বিন জাবাল (রা.)-কে অসিয়ত করেছিলেন:
لَا تَدَعْ أَنْ تَقُولَ فِي كُلِّ صَلَاةٍ ... (المعجم الكبير للطبراني ٢٠ / ١٢٥)
অর্থ: প্রত্যেক নামাযের পর অবশ্যই এ দু'আ পাঠ করবে:
اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ وَشُكْرِكَ وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ.
অর্থ: 'হে আল্লাহ, আমাকে আপনার যিকির শোকর ও ইবাদতের তাওফীক দান করুন।' (মুজামুল কাবীর লিততাবারানী: ২/১২৫)

১৯. নামাযে যত্নবান হোন। কেননা তা আপনার গুনাহ মাফের অন্যতম উপায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ تَوَضَّأَ لِلصَّلَاةِ فَأَسْبَغَ الْوُضُوءَ، ثُمَّ مَشَى إِلَى الصَّلَاةِ الْمَكْتُوبَةِ، فَصَلَّاهَا مَعَ النَّاسِ أَوْ مَعَ الْجَمَاعَةِ أَوْ فِي الْمَسْجِدِ غَفَرَ اللهُ لَهُ ذُنُوبَهُ» (صحیح مسلم) ٢٠٨/١
অর্থ: 'নামাযের উদ্দেশ্যে যে ব্যক্তি ওযু করবে এবং যথাযথভাবে ওযু করবে, এরপর নামাযের উদ্দেশ্যে হেঁটে রওয়ানা হবে এবং লোকদের সাথে কিংবা জামাতবদ্ধ হয়ে, অথবা মসজিদে নামায আদায় করবে, আল্লাহ তা'আলা তার গুনাহ মাফ করে দিবেন।' (মুসলিম, ১/২০৮)

২০. বিশ্বাস করুন, নামায কায়েম করা ব্যতীত জীবনের পরম সুখ ও সৌভাগ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। নামায হলো আপন রবের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করার শ্রেষ্ঠ উপায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلوة﴾ [البقرة : ٤٥]
অর্থ: 'এবং সবর ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর।'

২১. মনে রাখুন, প্রচণ্ড গরমে মসজিদে যাতায়াত আপনাকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবে। জাহান্নামের "যামহারীর"-এর শীতের তীব্রতা থেকে উদ্ধার করবে।

২২. আপনি যদি আল্লাহ তা'আলার সামনে সিজদাবনত না হন, তবে আপনাকে কামপ্রবৃত্তি ও শয়তানের প্ররোচনার সামনে নতজানু হতে হবে। আর যদি নামাযে যত্নবান হন, আল্লাহর সামনে সিজদাবনত হন তাহলে অবশ্যই প্রবৃত্তির তাড়না ও শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচতে পারবেন।

২৩. মনে রাখতে হবে, মানসিক সংকট ও অস্থিরতা থেকে মুক্তির অন্যতম উপায় হলো নামায। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: وَلَقَدْ نَعْلَمُ أَنَّكَ يَضِيقُ صَدْرُكَ بِمَا يَقُولُونَ ﴾ [الحجر: ৯৭] অর্থ: 'আমি অবশ্যই জানি, ওরা যা বলে তাতে আপনার মনটা ছোট হয়ে যায়।' (আল হিজর, ১৫: ৯৭) সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তা'আলা মুক্তির উপায় বাতলে দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়: فَسَبِّحُ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَكُنْ مِّنَ السُّجِدِينَ ﴾ [الحجر: ৯৮] অর্থ: 'অতএব আপনি নিরঙ্কুশ প্রশংসা সহকারে আপনার প্রভুর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করুন এবং সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হোন।' (আল হিজর, ১৫: ৯৮) পবিত্র কুরআনের সমাধানই শ্রেষ্ঠ সমাধান।

২৪. নামায ছাড়া বান্দার জীবন ব্যর্থ ক্ষতিগ্রস্ত। নামাযবিহীন জীবনে না আছে প্রাণ, না আছে প্রেরণা। এমন জীবনের কোনো সৌন্দর্য ও অর্থময়তা নেই। সালাতবিমুখ জীবনে চূড়ান্ত অধোগতি ও ধ্বংস অনিবার্য। সুতরাং নামাযের প্রতি যত্নবান হয়ে নিজেকে বাঁচান; নিজের জীবনটাকে বাঁচান।

২৫. যদি পাঁচওয়াক্ত ফরয নামাযে যত্নবান না হন তাহলে এ জীবনে অর্জিত মান-মর্যাদা, যশ-খ্যাতি, অর্থবিত্ত, সন্তান-সন্ততি ও বিলাসবহুল অট্টালিকা-এসবের কোনোটাই আপনার কাজে আসবে না। কিয়ামতের দিন সব নিমিষেই ধুলোয় মিশে যাবে।

২৬. কিয়ামতের দিন হাশরের ময়দানে কোনো ছায়ার অস্তিত্ব থাকবে না। মাথার কাছে সূর্য এসে দাঁড়াবে। প্রচণ্ড তাপে প্রাণ ওষ্ঠাগত হওয়ার উপক্রম হবে। তখন আল্লাহ তা'আলা সাত ব্যক্তিকে আরশের ছায়াতলে আশ্রয় দান করবেন। আপনি যদি নামাযের যত্নশীল হন তাহলে সুসংবাদ গ্রহণ করুন। কাল কিয়ামতের দিন আপনিও আল্লাহর আরশের ছায়াতলে আশ্রয় লাভ করবেন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, সাত ব্যক্তি আল্লাহর আরশের ছায়াতলে আশ্রয় লাভ করবে। তাদের মধ্যে একজন হলো (হাদীসের ভাষায়):
«وَرَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّقٌ فِي المَسَاجِدِ». (صحيح البخاري ١ /١٣٣)
অর্থ: 'এমন ব্যক্তি যার মন মসজিদের সাথে জুড়ে থাকে।' (বুখারী, ১/১৩৩)

২৭. বেশি রাত না করে সকাল-সকাল ঘুমিয়ে পড়ুন। তাতে দুটি উপকারিতা রয়েছে। এক, ফজর নামাযের জন্য সময়মতো জেগে ওঠা সহজ হয়। দুই, শরীর-স্বাস্থ্যের জন্যও তা উপকারী।

পরিশিষ্ট:
আপনি যদি পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামাযে যত্নবান হতে না পারেন তাহলে নীতি-নৈতিকতা, শালীনতা, শিষ্টাচার, মানবিক মূল্যবোধ, মহৎ উদ্দেশ্য ও হিতবাদী দর্শনের প্রচার-প্রসারে মুখর হওয়ার কোনো অর্থ নেই। এসবই তখন অন্তঃসারশূন্য ফাঁকা বুলি। তা শ্রোতাদের কানে পৌঁছাবে মাত্র; তাদের হৃদয়াত্মা স্পর্শ করতে পারবে না।

যে নামায ত্যাগ করে সে তো সর্বহারা মিসকিন। নিজেকে সে শেষ করে দিয়েছে। আক্ষরিক অর্থে সে বেঁচে আছে। কিন্তু পৃথিবীর বুকে তার অস্তিত্বের কোনো প্রভাব নেই, কার্যকারিতা নেই। অনেক লোককে দেখা যায়, বিয়ে ওলীমা, আকীকা, সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান পালনে বেশ সজাগ-সচেতন। প্রতিটি উপলক্ষেই ঠিক সময়ে সমহিমায় উপস্থিত। কিন্তু নামাযের প্রতি তার কোনো গুরুত্ব নেই, কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। ধর্মীয় এ অধঃপতন অধোগতির শেষ কোথায়?!

আযানের শুরুতেই 'আল্লাহু আকবার' বলে আল্লাহ তা'আলার বড়ত্ব ও মহিমার ঘোষণা করা হয়। প্রতিটি মানুষের মর্মে এ বাণী পৌঁছে দেওয়া উদ্দেশ্য-আপনার চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান ইত্যাদি সমস্ত কিছু থেকে আল্লাহ বড়। তাঁর ইবাদত ও আনুগত্য গুরুত্বপূর্ণ। -আয়েয করনী

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ حَافَظَ عَلَى الصَّلَاةِ كَانَتْ لَهُ نُورًا، وَبُرْهَانًا، وَنَجَاةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَمَنْ لَمْ يُحَافِظُ عَلَيْهَا لَمْ يَكُنْ لَهُ نُورُ، وَبُرْهَانٌ، وَنَجَاةٌ، وَكَانَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَعَ قَارُونَ، وَفِرْعَوْنَ، وَهَامَانَ، وَأُتِيَ بْنِ خَلَفٍ» (مسند أحمد) ١٤١/١١

অর্থ: 'যে ব্যক্তি নামাযে যত্নবান হবে কিয়ামতের দিন নামায তার জন্য নূর হবে। তার স্বপক্ষে দলিল হবে। জাহান্নামের আযাব থেকে মুক্তির উপায় হবে। আর যে নামাযে যত্নবান হবে না নামায তার জন্য নূর হবে না। তার স্বপক্ষে দলিলও হবে না। তার মুক্তির উপায়ও হবে না। কিয়ামতের দিন ফেরাউন, হামান, কারুন ও উবাই ইবনে খলফের সাথে তার হাশর হবে।' (মুসনাদে আহমাদ, ১১/১৪১)

টিকাঃ
২৭. কোন বান্দা যদি শীতকালে জাহান্নামের কথা স্মরণ করে আল্লাহ তা'আলার কাছে পানাহ চায়, তাহলে আল্লাহ তা'আলা তাকে জাহান্নামের শীতলতা থেকে মুক্তি দান করেন। এ ব্যাপারে হাদীস শরিফে এসেছে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন, 'যদি কোন বান্দা তীব্র ঠাণ্ডার সময় বলে, লা ইলাহা ইল্লাহ (আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই)। আজকে দিনটি কতই না শীতল। হে আল্লাহ! আপনি আমাকে জাহান্নামের জামহারীর থেকে মুক্তি দান করুন। তখন আল্লাহ তায়ালা জাহান্নামকে লক্ষ্য করে বলেন, আমার এক বান্দা তোমার জামহারীর থেকে আমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করেছে। আমি তোমাকে সাক্ষ্য রেখে বলছি, আমি তাকে মুক্তি দিলাম।' সাহাবীগণ বললেন, জামহারীর কী? উত্তরে রাসূল ﷺ বললেন: 'জামহারীর হলো এমন একটি ঘর, যেখানে কাফেরদেরকে নিক্ষেপ করা হবে। ফলে এর ঠাণ্ডার প্রচণ্ডতায় তারা বিবর্ণ হয়ে যাবে।' (অনুবাদক)

ফন্ট সাইজ
15px
17px