📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 ওয়াসওয়াসা ও শুচিবায়ু

📄 ওয়াসওয়াসা ও শুচিবায়ু


ওয়াসওয়াসা হলো, অতৃপ্ত ও অস্থির মনে অযৌক্তিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তার আচ্ছন্নতা। ওয়াসওয়াসার শিকার হয়ে মানুষ দোদুল্যমান ও অস্থিরচিত্ত হয়ে পড়ে। যত দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও সন্দেহ-সংশয় তাকে ঘিরে ধরে। প্রশান্তি ও স্বস্তির কোনো পথ সে খুঁজে পায় না।

ওয়াসওয়াসার ব্যাধির সবচেয়ে ভয়ানক ও আশঙ্কাজনক রূপটি হলো obsessive-compulsive disorder (অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসর্ডার)। সহজ বাংলায় যাকে বলা হয় “শুচিবায়ু”। চিকিৎসাশাস্ত্রে এটি একটি মানসিক ব্যাধি হিসেবে আখ্যায়িত। ব্যক্তি যখন এ রোগে আক্রান্ত হয় সময়ে সময়ে তার মনে নানা অযৌক্তিক অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তা-ভাবনা দানা বাঁধতে থাকে, যা তাকে প্রায়ই অস্থিরচিত্ত ও সংশয়গ্রস্ত করে রাখে। এমন পরিস্থিতিতে নিজের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। দ্বিধা-সংশয় তাকে সম্পূর্ণরূপে কাবু করে ফেলে।

শুচিবায়ুগ্রস্ত রোগী ঘুরে ফিরে একই কাজ বারবার করতে থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে একই চিন্তায় ঘুরপাক খেতে থাকে। এ সময় অন্য কোনো যৌক্তিক ও স্বতঃসিদ্ধ চিন্তা-ভাবনা তার দেমাগ মস্তিষ্কে কাজ করে না। সাধারণত অযু, গোসল, পবিত্রতা অর্জন, নামায ও এ জাতীয় ইবাদতের ক্ষেত্রে শুচিবায়ু রোগ দেখা দেয়। এমনকি ব্যক্তিগত গণ্ডির বাইরে সামাজিক ও সামগ্রিক ক্ষেত্রেও শুচিবায়ু প্রবল হতে পারে। ব্যক্তি তখন আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। চারপাশের মানুষ তার থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলে।

শুচিবায়ুগ্রস্ত রোগী কোনো ইবাদত সম্পন্ন করতে পারে না। কোনো কাজেই তৃপ্তিবোধ করে না। তার মানসিক অবস্থা প্রথমে হ্যালোসিনেশন, পর্যায়ক্রমে পাগলামিতে পরিণত হয়। কখনো কখনো পরিস্থিতি এতই গুরুতর হয়ে দাঁড়ায়, ভুক্তভোগী আত্মহত্যার পথে পা বাড়ায়।

তাই এ মানসিক সংকট থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে শুরুতেই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এর সঠিক সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।

সমাধান:
১. যে সমস্ত চিন্তা-ভাবনা আপনার মনে সংশয় ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে তা সমস্তই শয়তানের কারসাজি। শয়তান মানুষের স্বাভাবিক জীবন প্রবাহে বেঘাত ঘটাতে চায়। মানসিক প্রশান্তি ব্যাহত করতে চায়। তাই আপনি সবসময় প্রশান্ত ও স্থিরচিত্ত থাকুন। কোথাও স্থবির না হয়ে, পিছিয়ে না পড়ে সামনে অগ্রসর হোন। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। বিশ্বাস করুন, ওয়াসওয়াসা ও শুচিবায়ু রোগ খুব দ্রুত কেটে যাবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
﴿إِنَّمَا النَّجْوَى مِنَ الشَّيْطَنِ لِيَحْزُنَ الَّذِينَ آمَنُوا وَلَيْسَ بِضَارِهِمْ شَيْئًا إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ﴾ (المجادلة: ١٠)
অর্থ: 'গোপন পরামর্শ তো হল মুমিনরা যাতে দুঃখ পায় সে উদ্দেশ্যে কৃত শয়তানের কুমন্ত্রণা মাত্র। আর আল্লাহর অনুমতি ছাড়া সে তাদের কিছুই ক্ষতি করতে পারে না। অতএব আল্লাহরই ওপর মুমিনরা যেন তাওয়াক্কুল করে।' (মুজাদালা, ৫৮: ১০)

২. মনে যদি কোনো সন্দেহ-সংশয় দেখা দেয় তাহলে أَعُوْذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ পাঠ করে শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে আল্লাহ তা'আলার আশ্রয় গ্রহণ করুন। পবিত্র কুরআনের নির্দেশ:
﴿وَإِمَّا يَنْزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَنِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ إِنَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ﴾ (الأعراف: ٢٠٠)
অর্থ: 'আর যদি শয়তানের দিক থেকে কোন প্ররোচনা তোমাকে প্ররোচিত করে, তবে তুমি আল্লাহর আশ্রয় চাও। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।' (আরাফ, ৭: ২০০)
জেনে রাখুন, মনের এই দ্বিধা-সংশয়, অস্বস্তি ও অতৃপ্তি-সমস্তই শয়তানের মিথ্যা প্ররোচনা। রাসূলুল্লাহ ﷺ শয়তানের ব্যাপারে বলেছেন, كَذُوبُ (চরম মিথ্যাবাদী)।

৩. মনে রাখবেন, মনের দ্বিধা-দ্বন্দ্বের তাড়নায় কাজ করতে গিয়ে প্রকারান্তরে গুনাহের ভাগিদার হচ্ছেন। কেননা এতে আপনি শয়তানের কথায় কান দিচ্ছেন। তার কুমন্ত্রণার ফাঁদে পা দিচ্ছেন। পক্ষান্তরে আপনি যদি মনের সন্দেহ-সংশয় আমলে না নিয়ে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বেঁচে থাকতে পারেন, তাহলে একটি গুনাহ থেকে বেঁচে গেলেন। নিশ্চিত থাকুন, মনের খুঁতখুঁতে মানসিকতা আমলে না নেওয়ার কারণে আপনার ওযু, নামায ও ইবাদত-বন্দেগিতে কোনো ক্ষতি হবে না। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لَأُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا مَا لَمْ يَتَكَلَّمُوا أَوْ يَعْمَلُوا بِهِ».
অর্থ: আবু হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন, 'কথা বা কাজে পরিণত না করা পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা আমার উম্মাতের জন্য তাদের মনে কল্পনাগুলোকে মাফ করে দিয়েছেন।' (মুসলিম: ১/১১৬)

৪. সন্দেহ-সংশয় দূর করার জন্য দলিল-প্রমাণের সাহায্য গ্রহণ করুন। বিদ্যা-বুদ্ধি কাজে লাগান। বিদ্যা ও জ্ঞান হলো চলার পথে আলোকবর্তিকা স্বরূপ। তা সমস্ত সন্দেহ-সংশয় দূর করে দেয়। আপনার বিদ্যা-বুদ্ধির ভাণ্ডার যত সমৃদ্ধ হবে, বিবেক-বুদ্ধি যত প্রয়োগ করবেন, আপনার দেমাগ ও মস্তিষ্কে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও সন্দেহ সংশয়ের ছিদ্র-পথগুলো বন্ধ হতে থাকবে। শুচিবায়ু রোগ থেকে আপনার আরোগ্য ত্বরান্বিত হবে।

৫. সবসময় কোনো একটি ভালো কাজে ব্যস্ত থাকুন। কখনো অবসর সময় কাটাবেন না। অবসর হলো শয়তানের চারণভূমি। শয়তানের প্ররোচনার সুবর্ণ সুযোগ। জ্ঞানী, গুণী ও সজ্জনদের সংস্পর্শে থাকুন; কিংবা পরিবার ও বন্ধুজনদের সঙ্গে সময় কাটান। জীবনের কোলাহল ব্যস্ততা ছেড়ে কখনো একাকিত্ব ও নিঃসঙ্গতায় পড়ে থাকবেন না। কেননা শয়তান হলো নিঃসঙ্গতার পরম বন্ধু। এ সময় দেমাগ মস্তিষ্কে যত অযৌক্তিক অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তা-চেতনা বাসা বাঁধে। মার্কিন মনোবিজ্ঞানী উইলিয়াম জেমস বলেন, 'অবসর ও দ্বিধা-সংশয়ের ওপর কর্মব্যস্ততার ছুরি চালাও। চিকিৎসকগণ মানসিক রোগ থেকে সত্তর ভাগ আরোগ্য লাভের নিশ্চয়তা দিবে।'

৬. আপনার জীবনের সফল ইতিবাচক দিকগুলো সম্পর্কে ভাবুন। জীবনের সুখস্মৃতি ও সফল মুহূর্তগুলোর কথা চিন্তা করুন। এভাবে আপনার মন-মানসিকতাকে ইতিবাচক ও স্বস্তিদায়ক চিন্তা-ভাবনায় গড়ে তুলুন। দেমাগ ও মস্তিষ্ক হলো পাত্রতুল্য। উপকারী ও কার্যকর চিন্তা-চেতনায় আপনি তা পরিপূর্ণ করতে পারেন, আবার অনর্থক অযাচিত জল্পনা-কল্পনায় আকীর্ণ করে ফেলতে পারেন।

৭. কল্যাণকর ও ফলপ্রসূ উদ্যোগ আয়োজনে নিয়োজিত থাকুন। মন-মস্তিষ্ককে কর্মব্যস্ত রাখুন। যেন অযাচিত জল্পনা-কল্পনা ও দ্বিধা-সংশয় তাতে বাসা বাঁধতে না পারে। পূর্বের দৈনন্দিন রুটিন পরিবর্তন করে ফেলুন। নতুন একটি কর্মসূচি প্রস্তুত করুন। মসজিদে ওযু ও নামাযের স্থান পরিবর্তন করে ফেলুন। নির্দিষ্ট মসজিদে একই জায়গায় না থাকতে বিভিন্ন মসজিদে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে নামায আদায় করুন।

৮. শুচিবায়ু ও সংশয়প্রবণতার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। এর কারণে ভুক্তভোগী চরম মানসিক অস্থিরতা, দুশ্চিন্তা ও বিষণ্ণতার শিকার হয়। জীবনের মূল্যবান সময় ও সম্পদ নষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্বীন-ধর্মও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমন ভয়াবহ পরিণতির কথা চিন্তা করে শুচিবায়ুমুক্ত হওয়ার চেষ্টা করুন। জীবনের মূল্যবান সময় ও সম্পদ রক্ষায় যত্নবান হোন। দ্বিধা-সংশয়মুক্ত হয়ে দ্বীন-ধর্ম ও ইবাদতগুজারে সচেষ্ট হোন।

৯. সুসংবাদ গ্রহণ করুন, শয়তানের প্ররোচনা ও সংশয়প্রবণতা সৃষ্টির বিরুদ্ধে আপনার চেষ্টা-প্রচেষ্টা ও প্রতিশ্রুতিশীল মানসিকতা "মোজাহাদা” হিসেবে গণ্য হবে। আপনি বিরাট প্রতিদানের হকদার হবেন। এর স্বপক্ষে ওলামায়ে কেরামের সুস্পষ্ট স্বীকৃতি বিদ্যমান। তাছাড়া যারা প্রকৃত মুমিন বান্দা তাদের বিরুদ্ধেই শয়তানের যত প্ররোচনা। কিন্তু যারা পাপাচারী, কাফের তাদের বিষয়ে শয়তান নিশ্চিন্ত ও দায়িত্বমুক্ত। জনৈক মনীষী যথার্থ বলেছেন, 'বিরান বাড়ি, চোর তো সেদিকে ফিরেও তাকায় না।'

১০. যেকোনো কাজ কিংবা ইবাদত শুরু করুন-না-কেন, তা শয়তানের ধোঁকা ও প্ররোচনার বিরুদ্ধে জিহাদের শামিল। তা শেষ করে তবেই ক্ষান্ত হোন। অনবরত কাজ করার প্রচেষ্টাই আপনার মনের খুঁতখুঁতে প্রবণতা দূর করে দিবে। আত্মবিশ্বাসী হোন। আল্লাহর ওপর ভরসা করুন।

১১. মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে নরম কাদামাটি থেকে দুর্বল করে। আর শয়তানের সৃষ্টি হয়েছে প্রবল আগুন থেকে। কিন্তু মানুষের ইচ্ছাশক্তি ও প্রতিজ্ঞাবলের সামনে শয়তানের প্ররোচনা নিতান্তই ঠুনকো দুর্বল। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
إِنَّ كَيْدَ الشَّيْطَانِ كَانَ ضَعِيفًا (النساء: ٧٦)
অর্থ: 'শয়তানের ষড়যন্ত্র নিশ্চয়ই দুর্বল।' (নিসা, ৪: ৭৬)

১১. একনিষ্ঠ আনুগত্য ও ইবাদত আপনার মনের সমস্ত অযৌক্তিক অনাকাঙ্ক্ষিত সন্দেহ-সংশয় দূর করে দিবে। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ (يوسف : ٢٤)
অর্থ: 'আমি তা দেখিয়েছিলাম তাকে অসৎ কর্ম ও নির্লজ্জতা থেকে সরিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে, সে ছিল বিশুদ্ধ-হৃদয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।'
সুতরাং মসজিদে জামাতের সাথে পাঁচওয়াক্ত নামায নিয়মিত আদায় করুন। আল্লাহর দরবারে বেশি বেশি দু'আ করুন। যিকির তিলাওয়াতে যবান সতেজ রাখুন। আপনার মন অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তা-ভাবনা ও মানসিক অস্থিরতামুক্ত থাকবে। সকাল-সন্ধ্যার মাসনূন যিকির ও দু'আ নিয়মিত পাঠ করুন। তা আপনার জন্য মজবুত রক্ষাকবচ। 'সূরা ফালাক' ও 'সূরা নাস' বেশি বেশি পাঠ করুন। সুন্নত হিসেবে প্রমাণিত যিকির ও দু'আ পাঠ করুন। শুচিবায়ু-রোগমুক্ত হওয়ার জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকর আমল।

১২. দ্বিধা-সংশয় ও শুচিবায়ু রোগের ক্ষেত্রে আপনাকে সচেতন ও সাহসী হতে হবে। অন্যথায় প্রশ্রয় পেয়ে শয়তান আপনার প্রতি প্রলুব্ধ হবে। তার ওয়াসওয়াসা ও প্ররোচনার ঝাঁপি খুলে আপনার ওপর জেঁকে বসবে। তাই ওয়াসওয়াসা এড়িয়ে কাজে মনোযোগী হোন। শয়তানকে আপনার মানসিক শক্তি ও প্রবল ইচ্ছাশক্তি দেখিয়ে দিন।

১৩. গভীর চিন্তাশীল দৃষ্টিতে পবিত্র কুরআন পাঠ করুন। তাতে রয়েছে এমনসব দিকনির্দেশনা ও দলিল-প্রমাণ যা আপনাকে স্বস্তি ও প্রশান্তির স্বাদ দিবে।

১৪. দুঃখ-বেদনার মুহূর্তে মনের মধ্যে শুচিবায়ু ও সংশয়প্রবণতা দানা বাঁধে, আবার হাসি-আনন্দের সময় তা স্তিমিত হয়ে যায়। তাই যাবতীয় দুঃখ-বেদনার কার্যকারণগুলো এড়িয়ে হাসি আনন্দে উজ্জীবিত থাকুন। আপনার হাসি-আনন্দ ও উৎফুল্লতাই শয়তানকে নিরাশ করে দিবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন:
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَنِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُمْ مُبْصِرُونَ ﴾ [الأعراف: ٢٠١]
অর্থ: 'নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়।' (আরাফ, ৭: ২০১)

১৫. জনৈক সুফী-সাধক শুচিবায়ু রোগের একটি কার্যকর প্রতিষেধক বাতলে দিয়েছেন: 'নির্দিষ্ট কোনো ইবাদতে মশগুল হওয়া, কুরআন হিফজ করা, দ্বীনি ইল্ম চর্চা করা ইত্যাদিতে প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা গড়ে তুলুন। প্রতিযোগিতা হতে পারে আপনার স্বজন-বন্ধুজন, সহকর্মী কিংবা সহপাঠীদের সঙ্গে। এভাবে আপনার প্রতিদিনের জীবন যখন ব্যস্ত ও কর্মমুখর হয়ে উঠবে, মনের মধ্যে সন্দেহ ও সংশয়প্রবণতা বাসা বাঁধার সুযোগ পাবে না।'

১৬. হাঁটা-চলা ও সাঁতার কাটার মতো প্রতিদিনের সহজাত শরীরচর্চায় অভ্যস্ত হোন। নিয়মিত ব্যায়াম করুন। ভালো হয় যদি প্রাণোচ্ছল, হাস্যবদন ও আশাবাদী বন্ধুজনদের সঙ্গে শরীর চর্চা করতে পারেন। পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে বিচিত্র দর্শনীয় স্থানে বেড়াতে যান।

১৭. শুচিবায়ু রোধে রাসূল ﷺ-এর আদর্শই হলো শ্রেষ্ঠ প্রতিষেধক। মনের দ্বিধা-সংশয়ের সাথে তাল না-মিলিয়ে শয়তানের প্ররোচনা থেকে বেঁচে থাকুন। আল্লাহ তা'আলার বড়ত্ব ও মহত্ত্বসংবলিত যিকির ও দু'আ এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি দরূদ পাঠে মশগুল থাকুন।

১৮. চারপাশের অসৎসঙ্গ বর্জন করে সৎ, নীতিবান ও জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শে থাকুন। সংশয়প্রবণতা ও শুচিবায়ুর দুর্দশায় তারাই হবেন আপনার সুপরামর্শক। সংশয়প্রবণ মানসিকতা দূর করে আপনার জীবনকে উচ্ছল প্রাণবন্ত করতে তারা হবেন আপনার সহযোগী বন্ধু।

১৯. অবসর যাপন থেকে বেঁচে থাকুন। অবসর হলো দ্বিধা-সংশয়ের উর্বরভূমি। অবসরে কোনো প্রশিক্ষণমূলক কার্যক্রম কিংবা জনহিতকর উদ্যোগে অংশগ্রহণ করুন।

২০. যে সমস্ত পাঠ অধ্যয়ন ও দর্শনের বিচার-বিশ্লেষণ আপনার মনে সংশয় সৃষ্টি করে, তা থেকে বিরত থাকুন। এছাড়াও স্বভাবজাত কিছু কাজ আছে, যা আপনাকে সন্দেহপ্রবণ করে তুলবে। যেমন: চার পাশের সমাজ ও মানুষের প্রতি নেতিবাচক ধারণা, স্বামী স্ত্রীর কিংবা স্ত্রী স্বামীর মোবাইল চেক করা, মানুষের দোষ খুঁজে বেড়ানো ইত্যাদি। এ সমস্ত প্রবণতা থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করুন।

২১. শুচিবায়ুগ্রস্ত ব্যক্তির মধ্যে সন্দেহ-সংশয়ের নেতিবাচক প্রভাব ও ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। গুরুত্ব দিয়ে বোঝাতে হবে যে, সাইক্রিয়াটিস্ট ও মনোবিদ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া লজ্জাজনক কিছু নয়। সেবাদানকারীদের প্রতি নির্দেশ থাকবে, তারা যেন সংশয়গ্রস্ত রোগীদের সাথে সদয় ও কোমল আচরণ করে। ধারাবাহিক আলোচনা-পর্যালোচনার মাধ্যমে সংশয়-প্রবণ মানসিকতা দূর করে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে হবে।

২২. সন্দেহ-সংশয় দূর করার জন্য দৃঢ় প্রত্যয় ও সুনিশ্চয়তার সাথে 'না' শব্দটিকে ব্যবহার করুন। ওযু করেছেন, শয়তান আপনার মনে সন্দেহ জাগাবে-ওযু পুরোপুরি হয়নি, কিছু একটা বাকি রয়েছে। আপনি বলুন, 'না', আমার ওযু যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ হয়েছে। অবচেতন মনে শয়তান যদি এমন সন্দেহ সৃষ্টি করে-আপনি তো স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন। আপনি বলুন, 'কখনো না, হতেই পারে না।' শয়তান যদি মনের মধ্যে এ প্ররোচনা ঢুকিয়ে দেয়-আপনার সন্তান বিপদে পড়েছে। আপনি দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে বলুন, 'না, আল-হামদুলিল্লাহ, সে খুব ভালো আছে। আল্লাহ তার পরম রক্ষণা-বেক্ষণকারী।' যদি এমন সংশয় সৃষ্টি করে-আপনার নামায হয়নি। আপনি বলুন, 'না, আমার নামায ত্রুটিমুক্ত ও পূর্ণাঙ্গ হয়েছে।' এভাবে দৃঢ়প্রত্যয় ও আত্মবিশ্বাসের সাথে জীবনের প্রতিটি কাজ সম্পন্ন করুন।

২৩. সর্বশেষ আপনার প্রতি আমার উপদেশ হলো, দ্বিধা-সংশয়ের পরওয়া না করে প্রশান্তচিত্ত হোন। নির্বিঘ্নে জীবনযাপন করুন। মহান আল্লাহ তা'আলার তাওফিক কামনা করুন এবং তাঁরই ওপর ভরসা করুন। শয়তান আপনার পিছু লেগে থাকে, আপনার মনে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করার কাজে মত্ত থাকে। এতেই প্রমাণিত হয় আপনার ঈমান পরিপক্ক। আপনার ঈমানী বলে শয়তান শঙ্কিত। সুতরাং, নিজের ঈমানী বলপ্রয়োগ করুন, শয়তানের প্ররোচনা নিষ্ফল করে দিন।

পরিশিষ্ট:
* চাক্ষুষ দলিল-প্রমাণের আলোকে দ্বিধা-সংশয় দূর করে অগাধ বিশ্বাস লাভের ঘটনাটি ঘটেছে তাওহিদ ও একত্ববাদের দীক্ষার প্রাণপুরুষ ইবরাহিম (আ.)-এর ক্ষেত্রে। তিনি আল্লাহ তা'আলার নিকট আরজ করলেন:
﴿رَبِّ أَرِنِي كَيْفَ تُحِيِي الْمَوْتَى﴾ [البقرة: ٢٦٠]
অর্থ: 'হে আমার রব! আমাকে দেখান, কীভাবে আপনি মৃতদের জীবিত করে তুলেন।' (বাকারা, ২: ২৬০)
তাঁর রব জিজ্ঞেস করলেন: ﴿أَوَلَمْ تُؤْمِنْ﴾ [البقرة: ٢٦٠] অর্থ: 'তবে কি তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না?' (বাকারা, ২: ২৬০) তিনি বললেন: ﴿بَلَى وَلَكِنْ لِيَطْمَئِنَّ قَلْبِي﴾ [البقرة: ٢٦٠] অর্থ: 'বিশ্বাস তো হয়েছে। কিন্তু মনের প্রশান্তির জন্য (বলছি)।' (বাকারা, ২: ২৬০)
এরপর আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে তিনি চারটি পাখি আনলেন। পাখিগুলোকে টুকরো টুকরো করে চারটি পাহাড়ের চূড়ায় উঠে শূন্যে উড়িয়ে দিলেন। বাতাসের তোড়ে পাখির টুকরোগুলো মুহূর্তেই চারপাশে মিলিয়ে গেল। ইবরাহিম (আ.) চার পাহাড়ের কেন্দ্রে এসে দাঁড়ালেন। উঁচু আওয়াজে পাখিগুলোকে ডাকলেন। আল্লাহ তা'আলার অপার কুদরতে প্রতিটি পাখি নিজ আকৃতিতে ফিরে এলো। হযরত ইবরাহিম (আ.) বিস্ময় ভরে দেখলেন, প্রতিটি পাখি অবিকল আগের মতোই পূর্ণাঙ্গ অবয়ব ধারণ করে ফিরে এসেছে। তিনিও হৃদয়াত্মা জুড়ে আস্বস্তি ও প্রশান্তির শীতলতা অনুভব করলেন। আপন রবের প্রজ্ঞা, ক্ষমতা ও শক্তিমত্তার প্রতি অগাধ বিশ্বাসে সমৃদ্ধ হলেন।

কবি বলেন: 'জীবনের বিচিত্রময় বহু লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের পিছনে ছুটে এখন নিজেই দিশেহারা। তার জীবনের নেই কোনো সফলতা, নেই ব্যর্থতা।'

সহিহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, সাহাবায়ে কেরাম রাসূল ﷺ-এর দরবারে এসে আরজ করলেন, 'ঈমানের বিষয়ে তাঁদের মনে কখনো-কখনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাজ করে।' রাসূল ﷺ বললেন: "ذَلِكَ مَحْضُ الْإِيمَانِ". (مسند إسحاق بن راهويه) ٣ / ١٠٢٢ অর্থ: 'এটাও ঈমানের অংশ।'
অর্থাৎ, মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই শয়তানের প্ররোচনা ও দ্বিধা-সংশয় সৃষ্টি হবে। এ জাতীয় সন্দেহ-সংশয়কে ঘৃণা করা, তা থেকে বাঁচার জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করাই হলো ঈমানের পরিচায়ক।

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 রিয়া ও লৌকিকতা

📄 রিয়া ও লৌকিকতা


রিয়া ও লৌকিকতা হলো আল্লাহ তা'আলার প্রতিদান ও শাস্তির পরোয়া না করে, লোকসমাজে প্রশংসা ও সুখ্যাতি লাভের উদ্দেশ্যে আমল করা এবং নিজের যতো বৈশিষ্ট্য ও যোগ্যতা জাহির করা।
(الرِّيَاءُ) রিয়া শব্দটি الرُّؤْيَةُ থেকে এসেছে। রিয়া হলো লোক-দেখানোর উদ্দেশ্যে কাজ করা। আর ইখলাস হলো একমাত্র আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমল করা। সুতরাং রিয়া ও ইখলাস একটি অপরটির বিপরীত, একটি অপরটির সাথে সংঘর্ষিক।

রিয়াকারী তার কাজকর্মে ও উদ্দেশ্যে দোদুল্যমান দ্বিধা-দ্বন্দ্বগ্রস্ত। তার চিন্তা-চেতনা ও মন-মানসিকতা পরিশুদ্ধ নয়, অসুস্থ চিত্ত। জনসম্মুখে উদ্যমী কর্মতৎপর, আর লোকচক্ষুর অন্তরালে অলস অকর্মা। একটু প্রশংসাতেই খুশিতে টগমগ হয়ে উঠে। সামান্য নিন্দার মুখে হতাশায় ভেঙে পড়ে। কেননা তার পরম কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য হলো লোকমুখে প্রশংসিত হওয়া। সমাজের চোখে শ্রদ্ধা ও মর্যাদার পাত্র হওয়া। পরকাল ও আখেরাত সম্পর্কে তার কোনো চিন্তা-ফিকির নেই। আল্লাহ তা'আলার দরবারে হিসেব-নিকেশের কোনো পরোয়া নেই।

কোনো ভালো কাজ করতে হলে জনসম্মুখে করে। কোনো নেক আমল করলে মানুষের কাছে তার কথা ছড়িয়ে বেড়ায় খ্যাতি ও সম্মান লাভের আশায়। তার যাবতীয় কাজকর্ম ও উদ্যোগ-আয়োজন সৃষ্টিকে দেখানোর জন্য; স্রষ্টার সন্তুষ্টি লাভের জন্য নয়। চারপাশের সমাজ ও মানুষের বাহ্যিক ক্ষমতা শক্তিমত্তা ও চাকচিক্যতেই সে মুগ্ধ। মহান রব ও স্রষ্টার সৃষ্টিশীলতা ও সর্বময় ক্ষমতা তার মনে দাগ কাটে না। তাই সে স্রষ্টাকে ছেড়ে সৃষ্টির পেছনে ছোটে। মহান আল্লাহ তা'আলার পুরস্কার ও তিরস্কারের পরোয়া না করে সৃষ্টির মুখে প্রশংসার পালিশে খুশি হয়।

রিয়াকারী যতো ভালো কাজই করুক-না-কেন, এর বিনিময়ে পরকালে সে কোনো পুরস্কার পাবে না। তার ভাগ্যে জুটবে শুধু তিরস্কার ও ভর্ৎসনা। কেননা আল্লাহ তা'আলা শুধু বান্দার এমন আমল কবুল করেন, যা রিয়া ও লৌকিকতামুক্ত। যাতে লোক দেখানো ও প্রদর্শনবাদিতার কোনো ছাপ থাকে না।

নিজেদের জীবনকে সুন্দর সাবলীল করে তোলার জন্য, আমলের প্রতিদান লাভের জন্য এবং পরকালের সফলতা লাভের উদ্দেশ্যে অবশ্যই আমাদের লৌকিকতামুক্ত হতে হবে। কিন্তু তার উপায় কী? এ ক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কী?

সমাধান:
১. চিন্তা করে দেখুন, আল্লাহ তা'আলা কতো মহান সত্তা, আর আপনি কতো নগণ্য বান্দা। একবার ভেবে দেখুন, আল্লাহ তা'আলার সাথে আপনার সম্পর্কের ভিত্তি কী? এ সম্পর্কের মহত্ত্ব ও তাৎপর্য উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন। সমাজ ও মানুষের সাথে আপনার সম্পর্ক কীসের? এ সম্পর্কের ক্ষুদ্রতা ও ক্ষণস্থায়িত্ব মনে রাখুন। চূড়ান্তে গিয়ে আপনাকে একক অদ্বিতীয় মহান সত্তার সামনেই দাঁড়াতে হবে।

২. সবসময় মনে রাখুন, মুশরিক, রিয়াকারী ও প্রদর্শনবাদী লোকদের সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
﴿وَقَدِمْنَا إِلَى مَا عَمِلُوا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْتُهُ هَبَاءً مَنْثُورًا﴾ [سورة الفرقان: ٢٣]
অর্থ: তারা (দুনিয়ায়) যা কিছু আমল করেছে, আমি তার ফায়সালা করতে আসব এবং সেগুলোকে শূন্যে বিক্ষিপ্ত ধুলোবালি (এর মত মূলহীন) করে দিব। (ফুরকান, ২৫: ২৩)

৩. রিয়া ও লৌকিকতার খোলসমুক্ত হয়ে আল্লাহ তা'আলার তাওফীক ও সাহায্য প্রার্থনা করুন। সাহায্য প্রার্থনার সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা হলো ধৈর্য, অবিচলতা ও সালাত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلوةَ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّبِرِينَ﴾ [البقرة: ١٥٣]
অর্থ: হে মুমিনগণ! সবর ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবরকারীদের সাথে আছেন। (বাকারা, ২: ১৫৩)

৪. স্রষ্টার সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক, বাকি সৃষ্টির সঙ্গে যাবতীয় সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং তাদের থেকে নির্মুখাপেক্ষী করে। এ পর্যায়ে উপনীত হয়ে ব্যক্তি সমাজ ও লোকমুখের প্রশংসাবিমুখ হয়ে মহান রবের সন্তুষ্টি প্রত্যাশী হয়ে উঠে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
﴿فَإِن تَوَلَّوْا فَقُلْ حَسْبِيَ اللهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ﴾ (التوبة: ١٢٩)
অর্থ: তারপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে (হে রাসূল! তাদেরকে) বলে দাও, আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তিনি ছাড়া কোনও মাবুদ নেই। তারই উপর আমি ভরসা করেছি এবং তিনি মহা আরশের মালিক। (তাওবা, ৯: ১২৯)

৫. যে সমস্ত নেক আমল প্রকাশ্যে কিংবা জামাতবদ্ধ হয়ে পালন করা আবশ্যক নয় তা একান্তে নির্জনে সম্পন্ন করুন। আর প্রকাশ্যে জামাতবদ্ধ হয়ে অবশ্যপালনীয় কাজগুলো ইখলাস ও একনিষ্ঠতার সাথে পুরা করুন।

৬. মনে রাখুন, আপনি সর্বদা আল্লাহ তা'আলার তত্ত্বাবধানে ও নিবিড় পর্যবেক্ষণে আছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
﴿إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا ﴾ [النساء : ١]
অর্থ: 'নিশ্চিত জেনো রেখ, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের উপর লক্ষ্য রাখছেন।' (নিসা, ৪: ১)

৭. হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: أَنَا خَيْرُ الشُّرَكَاءِ، مَنْ عَمِلَ لِي عَمَلًا أَشْرَكَ فِيهِ غَيْرِي فَأَنَا بَرِيءٌ مِنْهُ، وَهُوَ لِلَّذِي أَشْرَكَ" (مسند أحمد مخرجا ٣٨٢/١٥) অর্থ: 'শরীকদের মধ্যে আমিই সর্বশ্রেষ্ঠ। যে ব্যক্তি কোনো আমল করে এবং তাতে আমার সাথে অন্যকে শরীক করে, আমি তার আমল থেকে দায়মুক্ত। সে যে শরীক করেছে, আমলটি তার জন্য সাব্যস্ত হবে।' (মুসনাদে আহমাদ: ১৫/৩৮২) রাসূল ﷺ-এর এ বাণীটিও স্মরণ রাখুন: عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: "مَنْ سَمَّعَ سَمَّعَ اللَّهُ بِهِ وَمَنْ رَاءَى رَاءَى اللَّهُ بِهِ". (صحيح المسلم برقم: ٧٣٦٦) অর্থ: ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি জনসম্মুখে প্রচারের ইচ্ছায় নেক আমল করে আল্লাহ তা'আলাও তার কৃতকর্মের অভিপ্রায়ের কথা লোকদেরকে জানিয়ে ও শুনিয়ে দিবেন। আর যে ব্যক্তি লৌকিকতার উদ্দেশ্যে কোন নেক কাজ করে, আল্লাহ তা'আলাও তার প্রকৃত উদ্দেশ্যের কথা লোকেদের মাঝে ফাঁস করে দিবেন।' (মুসলিম, হাদীস নং: ৭৩৬৬)

৮. নিজেকে একবার জিজ্ঞাসা করুন, যাদের আপনি নিজের কর্ম-কীর্তি দেখিয়ে বেড়াচ্ছেন, যাদের সামনে নিজের যোগ্যতা ও সামর্থ্যের প্রদর্শনী করছেন, তারা কে? তারা না আপনাকে সৃষ্টি করেছে, না আছে তাদের এক মুঠো রিযিক দানের সামর্থ্য। তাদের না আছে ক্ষমা করার যোগ্যতা, না আছে আরোগ্য দানের ক্ষমতা। জীবন দান করা, মৃত্যু দেওয়া এবং পরকালে আমলনামার হিসাব গ্রহণ করা-এসব কিছুই তাদের মানবিক ক্ষমতার বহু ঊর্ধ্বে।

৯. আপনি একজন মানুষ। আপনাকে দুর্বল করে সৃষ্টি করা হয়েছে। যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনি মহা পরাক্রমশালী, মহা প্রজ্ঞাবান। তিনিই আপনাকে রিযিক দান করেন। যাবতীয় বিপদ-আপদ থেকে উদ্ধার করেন। সুস্থতা-অসুস্থতা, জীবন-মৃত্যু-এসবের চাবিকাঠি তাঁরই হাতে। এমন মহান প্রতিপালকের সন্তুষ্টি অর্জন বাদ দিয়ে দুর্বল মরণশীল মানবজাতিকে খুশি করার জন্য জীবনভর কাজ করে যাবেন, সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি কখনো তা সমর্থন করবে না।

১০. একটিবার কি ভেবে দেখেছেন, জীবনের মতো নামায-রোযা, দান-সদকা, ইলম চর্চা ও জ্ঞান সাধনা-সমস্তই বরবাদ হয়ে যাবে; গোটা জীবনের শ্রম-সাধনা পণ্ড শ্রমে পরিণত হবে, শুধু রিয়া ও লৌকিকতার কারণে।

১১. রিয়ামুক্ত থাকার জন্য সবসময় এ দু'আটি পাঠ করুন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُ بِكَ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ وَأَنَا أَعْلَمُ، وَأَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لَا أَعْلَمُ.
অর্থ: 'হে আল্লাহ সজ্ঞানে শিরক করা থেকে আপনার পানাহ্ চাই। যা না জেনে, না বুঝে করছি, তার জন্য ক্ষমা চাই।'

১১. মনে রাখুন, যে মানুষ নিজেই নিজের উপকার করতে পারে না, নিজেকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারে না, সুস্থতা-অসুস্থতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, জীবন-মৃত্যুর কর্তৃত্ব রাখে না, সে কীভাবে আপনার উপকার ও কল্যাণ সাধন করতে পারে?! তাকে মানানোর জন্য, খুশি করার জন্য নিজেকে প্রদর্শন করার এবং কল্যাণমুখী উদ্যোগ-আয়োজনে ব্যস্ত থাকার কী অর্থ হতে পারে?!

১২. কাল কেয়ামতের ময়দানে কতো জ্ঞানী-গুণী, কতো সাধক পুরুষ শুধু রিয়ার কারণে তাদের জ্ঞানচর্চা ও সাধনার প্রতিদান থেকে বঞ্চিত হবে। কতো সংস্কারক ও সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব আমৃত্যু সংস্কারকার্য ও সংগ্রামের পুরস্কার-বঞ্চিত হয়ে তিরস্কার ও ভর্ৎসনার শিকার হবে, শুধু লৌকিকতার কারণে।
তাই প্রতিটি কাজের আগে নতুনভাবে নিয়ত করুন। নিয়তকে শুদ্ধ-পরিশুদ্ধ করুন। প্রতিটি কাজ একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য করুন। রিয়া ও লৌকিকতা থেকে সদা সতর্ক থাকুন।

পরিশিষ্ট:
বিশ্ববিখ্যাত গ্রিক বিজ্ঞানী ও দার্শনিক এরিস্টটল বলেছেন: 'ইহকালীন জীবনে পূর্ণ সম্মান ও মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকতে হলে আপনার জন্য সংক্ষিপ্ত পথটি হলো, আপনার ভেতর-বাহির এক হওয়া।'

ইসলামী খেলাফতের চতুর্থ খলীফা, আলী ইবনে আবু তালেব (রা.) বলেছেন: 'লৌকিক ও প্রদর্শনবাদী লোকের আলামতগুলো হলো, নির্জনে একাকীত্বে সে অলস অকর্মা থাকবে। আর জনসম্মুখে সর্বকর্মা হয়ে আত্মপ্রকাশ করবে। আত্মপ্রশংসায় খুশিতে আটখানা হয়ে কাজের গতি বাড়িয়ে দিবে। একটু নিন্দা ও বদনামে ভেঙে পড়বে।'

টিকাঃ
২৫. তাঁকে প্রাণীবিজ্ঞানের জনক বলা হয়। এছাড়া প্লেটোর সাথে যৌথভাবে তাঁকে "পশ্চিমা দর্শনের জনক” বলে অভিহিত করা হয়। এরিস্টটল সক্রেটিস ও প্লেটোর দর্শনসহ তাঁর পূর্বের সময়ের বিদ্যমান বিভিন্ন দর্শনের জটিল ও সদৃশ সমন্বয় দেখান। জন্ম খৃস্টপূর্ব ৩৮৫। মৃত্যু খৃষ্টপূর্ব ৩২৩।

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 মিথ্যা

📄 মিথ্যা


মিথ্যা হলো, একটি সত্য ও বাস্তবতার আংশিক কিংবা আগাগোড়া পরিবর্তন করে ফেলা। যা আদৌ ঘটেনি তা বানিয়ে বলাও মিথ্যা। মিথ্যার মূল উদ্দেশ্য হলো ধোঁকা দেওয়া ও প্রতারণা করা। মানবিক স্বভাব-চরিত্রে মিথ্যেই হলো সবচেয়ে ঘৃণ্য নিকৃষ্ট।

এর কারণে ব্যক্তি চারপাশের মানুষের আস্থা ও বিশ্বস্ততা হারিয়ে ফেলে। পরিবার ও সমাজে চরম উপেক্ষিত হয়ে পড়ে। ইসলামের দৃষ্টিতে অসত্য ও মিথ্যা হলো মুনাফেকির আলামত। সমাজের অধিকাংশ গুনাহ, নাফরমানি, অন্যায়-অনাচারের অন্যতম কারণ হলো অসত্য ও মিথ্যা, যা মানুষের মনুষ্যত্ব, নীতি-নৈতিকতাকে সমূলে ধসিয়ে দেয়।

ব্যক্তি যদি সমাজে একবার মিথ্যাবাদী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যায় চারপাশের মানুষ তাকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে। তার থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলে। তার সাথে ওঠা-বসা ও চলা-ফেরায় সদা সতর্ক থাকে-না জানি কখন তার মিথ্যার ফাঁদে পা ফসকায়।

মিথ্যা চোরাবালির মতো ভয়ানক। একটা মিথ্যার ফাঁদে জড়িয়ে গেলে আরও দশটি মিথ্যা তাকে ঘিরে ধরে। ক্রমশ আরও একটি মিথ্যা তাকে গ্রাস করে ফেলে। একপর্যায়ে অবস্থা এতই গুরুতর হয় যে, তার সত্য কথাও মানুষ বিশ্বাস করতে চায় না।

সুষ্ঠু সমাজ বিনির্মাণে অসত্য ও মিথ্যার স্বভাব পরিহার করে ন্যায় ও সত্য অবলম্বনের বিকল্প নেই। এ লক্ষ্যে আমাদের করনীয় কী?

সমাধান:
১. মিথ্যার নিন্দা করে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন:
﴿انْظُرْ كَيْفَ يَفْتَرُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ طَ وَكَفَى بِهِ إِثْمًا مُّبِينًا﴾ [النساء: ٥٠]
অর্থ: দেখ, তারা আল্লাহর প্রতি কি রকমের মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে। প্রকাশ্য গুনাহের জন্য এটাই যথেষ্ট। (নিসা, ৪: ৫০)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "آيَةُ الْمُنَافِقِ ثَلَاثُ: إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ". (صحيح البخاري) ١/١٦
অর্থ: 'মুনাফিকের আলামত তিনটি: কথা বললে মিথ্যা বলে। প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভঙ্গ করে। আমানত রাখা হলে খেয়ানত করে।' (বুখারী: ১/১৬)

২. মিথ্যার ব্যাপারে সদা সতর্ক থাকতে হবে। কেননা তা কখনো কখনো নেফাক ও কপটতা থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে কুফুরির দিকে ঠেলে দেয়। পবিত্র কুরআনের বাণী: ﴿إِنَّمَا يَفْتَرِي الْكَذِبَ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْكَاذِبُونَ﴾ [النحل: ١٠٥]
অর্থ: আল্লাহর প্রতি অপবাদ আরোপ তো তারাই করে, যারা আল্লাহর আয়াতের উপর ঈমান রাখে না। প্রকৃতপক্ষে তারাই মিথ্যাবাদী। (নহল, ১৬: ১০৫)

৩. সন্তানদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক দীক্ষায় অনুপ্রাণিত করতে হবে। সততা ও সত্যবাদিতার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বরোপ করা কর্তব্য। ইহকালে ও পরকালে মিথ্যার অশুভ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করতে হবে।

৪. আজ থেকে নিজেই নিজের সঙ্গে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হোন, কখনো মিথ্যা বলবেন না, গুরুত্বপূর্ণ ও গুরুতর বিষয়ে তো নয়-ই; এমনকি হাসি-তামাশাতেও না। সদা সত্য বলুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বাণী মনে রাখুন:
وَمَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَصْدُقُ وَيَتَحَرَّى الصَّدْقَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللهِ صِدِّيقًا". (صحيح مسلم) ٤ /٢٠١٣
অর্থ: 'ব্যক্তি সত্য বলতে থাকে; সততায় সচেষ্ট থাকে, একপর্যায়ে আল্লাহ তা'আলার দরবারে সত্যবাদী হিসেবে তার নাম লিপিবদ্ধ হয়।' (মুসলিম: ৪/২০১৩)

৫. মিথ্যার ব্যাপারে সদা সতর্ক থাকুন। কখনো যেন আল্লাহ তায়ালার দরবারে মিথ্যাবাদীদের খাতায় আপনার নাম না ওঠে। সবসময় রাসূল ﷺ-এর বাণী মনে রাখুন:
وَإِيَّاكُمْ وَالْكَذِبَ، فَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ، وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ، وَمَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَكْذِبُ وَيَتَحَرَّى الْكَذِبَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللهِ كَذَّابًا
অর্থ: 'মিথ্যা ও অসত্য থেকে বেঁচে থাকো। কেননা মিথ্যা শুধু পাপাচারের পথ খুলে দেয়। পাপাচার জাহান্নামের পথ দেখায়। ব্যক্তি অনবরত মিথ্যা বলতে থাকে। মিথ্যায় লিপ্ত থাকে। এক পর্যায়ে আল্লাহ তা'আলার দরবারে মিথ্যাবাদী হিসেবে তার নাম লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। (মুসলিম: ৪/২০১৩)

৬. মিথ্যা কখনো কোনো সমস্যার সমাধান হতে পারে না, মুক্তির উপায় হতে পারে না। মিথ্যার কারণে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে ও জটিল আকার ধারণ করে। তাই মনে রাখতে হবে-সত্যেই মুক্তি; মিথ্যায় ধ্বংস। সৎ ও ধার্মিক ব্যক্তিদের সান্নিধ্যে থাকুন। তাঁদের সান্নিধ্য আপনাকে সততা ও ন্যায়-নিষ্ঠতায় অনুপ্রাণিত করবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন:
﴿يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّدِقِينَ﴾
অর্থ: 'হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমরা সত্যবাদীদের সঙ্গে থাক।' (তাওবা, ৯: ১১৯)

৭. চরম সংকট ও প্রতিকূলতার মুহূর্তেও যারা সততার পথ বেছে নিয়েছেন, সদিচ্ছার পরিচয় দিয়েছেন, আল্লাহর উপর ভরসা করে বিপদ ও সংকট থেকে রক্ষা পেয়েছেন, তাদের ঘটনা পড়ে শিক্ষার্জন করুন। কিন্তু যারা মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে, কপটতার কূটকৌশল খাটিয়ে সমস্যা ও সংকটের বেড়াজালে আরও ভালোভাবে ফেঁসে গেছে তাদের ঘটনা পরিণতি জেনে সতর্ক হোন।

৮. সতর্ক হোন, প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হোন-হাসি-তামাশায় ভুলেও ছোট-ছোট মিথ্যায় প্রবৃত্ত হবেন না। মিথ্যা যতো নগণ্য হোক, অসত্যের দোষে দুষ্টতা বর্জনীয়। হাদীসে রাসূল ﷺ এরশাদ করেছেন: عَنْ أَبِي أُمَامَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: "أَنَا زَعِيمُ بِبَيْتٍ فِي رَبَضِ الْجَنَّةِ لِمَنْ تَرَكَ الْمِرَاءَ وَإِنْ كَانَ مُحِقًّا وَبِبَيْتٍ فِي وَسَطِ الْجَنَّةِ لِمَنْ تَرَكَ الْكَذِبَ وَإِنْ كَانَ مَازِحًا وَبِبَيْتٍ فِي أَعْلَى الْجَنَّةِ لِمَنْ حَسَّنَ خُلُقَهُ ". (سنن أبي داود) ٢٥٣/٤ অর্থ: আবূ উমামাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, 'যে ব্যক্তি ন্যায়সঙ্গত হওয়া সত্ত্বেও ঝগড়া পরিহার করবে আমি তার জন্য জান্নাতের বেষ্টনীর মধ্যে একটি ঘরের জিম্মাদার; আর যে ব্যক্তি তামাশার ছলেও মিথ্যা বলে না আমি তার জন্য জান্নাতের মাঝখানে একটি ঘরের জিম্মাদার। আর যে ব্যক্তি তার চরিত্রকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছে আমি তার জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থিত একটি ঘরের জিম্মাদার।' (আবু দাউদ: ৪/২৫৩)

৯. শোনা কথায় কান দিবেন না। কেননা এর কারণে একপর্যায়ে মিথ্যার বদভ্যাস হয়ে যায়। যে কোনো তথ্য ও সংবাদ আগে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানুন এবং সুনিশ্চিত হোন, তারপরই তা গ্রহণ করুন এবং প্রচার করুন। "তারা বলেছে, তারা বলে"-এ ধরণের পরিভাষা পরিহার করুন। এ পরিভাষাগুলো ধারণা ও অনুমান মাত্র। মানুষের কিছু ধারণা ও অনুমান গুনাহ সমান। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ﴾ [الحجرات: ١٢]
অর্থ: নিশ্চয় কোন কোন অনুমান তো পাপ। (হুজুরাত, ৪৯: ১২)

১০. জীবনের প্রতিটি সর্বাঙ্গনে ন্যায় ও সততাকে প্রধান নীতি হিসেবে অবলম্বন করুন এবং মিথ্যার জঘন্যতা ও অশুভ পরিণতির কথা ভেবে মিথ্যা থেকে বেঁচে থাকুন। দেশ, রাষ্ট্র, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও ধর্ম-কর্ম-নির্বিশেষে অতীত-বর্তমানের সকল জ্ঞানীজন একমত-মিথ্যা ও কপটতা চরম নিকৃষ্ট স্বভাব। একজন সভ্য-ভদ্র মানুষ কখনো এ দোষে দুষ্ট হতে পারে না।

১১. মনে রাখুন, যে মিথ্যা বলে, ধোঁকা দেয়, মানুষ ও সমাজ তার ব্যাপারে কতো খারাপ ধারণা পোষণ করে! কী কদর্যভাবে তার সমালোচনা করে! শুধু মানুষের খারাপ ধারণা ও সমালোচনাই নয়, মিথ্যাবাদী ও তার সন্তান-সন্ততি সামাজিকভাবে নানা প্রতিকূলতার শিকার হয়। তাই সর্বদা পবিত্র কুরআনের এই আয়াতটি মনে রাখুন:
ثُمَّ نَبْتَهِلْ فَنَجْعَلْ لَعْنَتَ اللَّهِ عَلَى الْكَذِبِينَ﴾ [آل عمران: ٦١]
অর্থ: 'তারপর আমরা সকলে মিলে আল্লাহর সামনে কাকুতি-মিনতি করি এবং যারা মিথ্যাবাদী, তাদের প্রতি আল্লাহর লানত পাঠাই।' (সূরা আলে-ইমরান, ৩: 61)
কে-ই-বা চাবে আল্লাহ তা'আলার অভিশাপের পাত্র হতে।

১২. একটি বিষয়ে সতর্ক হোন, মিথ্যা আপনাকে নিন্দা ও সমালোচনার সম্মুখীন করবে, ক্ষতি ও বরবাদির দিকে ঠেলে দিবে এবং জাহান্নামে যাওয়ার পথ তরান্বিত করবে। কেননা তা ঈমানের পরিপন্থি, নীতি-নৈতিকতা ও মনুষ্যত্বের বিরোধী। তা সমস্ত মহৎ গুণাবলি নিঃশেষ করে দেয়। সুতরাং অসত্য ও মিথ্যা থেকে বেঁচে থাকুন। নিরাপদ সুখী জীবনযাপন করুন।

১৩. আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে সততার প্রতিদান লাভে নিয়ত প্রয়াসী হোন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন:
﴿قَالَ اللَّهُ هَذَا يَوْمُ يَنْفَعُ الصَّدِقِينَ صِدْقُهُمْ لَهُمْ جَنَّتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ خُلِدِينَ فِيهَا أَبَدًا رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ﴾ [المائدة: ١١٩]
অর্থ: 'আল্লাহ বলবেন, 'এটা হল সেই দিন যেদিন সত্যবাদীগণকে তাদের সততা উপকার করবে। তাদের জন্য আছে জান্নাতসমূহ যার নীচে প্রবাহিত হবে নদীসমূহ। সেখানে তারা হবে চিরস্থায়ী। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন, তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। এটা মহাসাফল্য।' (মায়িদা, ৫: ১১৯)

১৪. সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:
"إِنْ تَصْدُقِ اللَّهَ يَصْدُقْكَ". (سنن النسائي) ٦٠/٤
অর্থ: 'আল্লাহ তা'আলার বিধিবিধান পালনে তুমি যদি একনিষ্ঠ হও, সততার পরিচয় দাও, আল্লাহ তা'আলাও তোমাকে তাঁর পুরস্কারের ওয়াদা সত্য করে দেখাবেন।' (সুনানুন নাসায়ী: ৪/৬০)

পরিশিষ্ট:
প্রখ্যাত গবেষক ও সাহিত্যিক আমীন রায়হানী বলেন: 'প্রকৃতপক্ষে মিথ্যাবাদীরা যদি কাউকে বিশ্বাসও করে তবুও কেউ তাদের বিশ্বাস করে না।'

আল্লামা ইবনুল কায়্যিম জাওযী (রহ.) (৬৯১-৭৫১ হি.) বলেছেন: 'লক্ষ্য করুন-আল্লাহ তা'আলা হযরত আবু বকর (রা.)-কে সততার কী শ্রেষ্ঠ পোশাকটিই পরিধান করিয়েছেন। সততার গুণে তিনি বিশ্বাস করেছিলেন জগতের শ্রেষ্ঠ সত্যবাদীকে (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে)। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা এর স্বীকৃতিও দিয়েছেন:
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ أُولَئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
অর্থ: 'আর যে ব্যক্তি সত্য কথা নিয়ে আসে এবং নিজেও তা বিশ্বাস করে, এরূপ লোকই মুত্তাকী।' (সূরা যুমার, ৩৯: ৩৩)

এর বিপরীতে লক্ষ্য করুন, আল্লাহ তা'আলা 'মুসাইলামাতুল কাযযাব'-এর দেহে অসত্য ও মিথ্যার কী কালিমা লেপে দিয়েছেন। আজও তার নামের সাথে মিথ্যার দুর্গন্ধ লেগে আছে। মানুষ আজও তাকে কায্যাব (চরম মিথ্যাবাদী) হিসেবে স্মরণ করে।

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 পরনিন্দা ও চোগলখুরি

📄 পরনিন্দা ও চোগলখুরি


গীবত ও পরনিন্দা হলো অনুপস্থিত ব্যক্তির সমালোচনা করা। যা প্রমাণ করে, গীবতকারীর ধার্মিকতায় খাদ আছে। পরনিন্দা ও দোষচর্চার মূল কারণ হলো হিংসুটে মন ও অসুস্থ মানসিকতা। পরনিন্দা নিন্দুকের ভীরুতা ও কাপুরুষতার কথা বলে দেয়। কেননা নিন্দুক কখনো তার সমালোচিত ব্যক্তিটির মুখোমুখি হওয়ার সাহস করে না, কখনো স্পষ্টবাদী হয়ে মনের খেদ প্রকাশ করতে পারে না।

গীবত ও পরনিন্দা হলো অনুপস্থিত সমালোচিত ব্যক্তির মানহানি করার কদর্য পন্থা। আর চোগলখুরি হলো মানুষের মাঝে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কথা রটিয়ে বেড়ানো। যেমন কোনো ব্যক্তি দু' বন্ধুর সম্পর্ক নষ্ট করার উদ্দেশ্যে একজনের কথা অপরজনের কানে দেওয়া, অথবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কথা লাগিয়ে গোল বাঁধানো। চোগলখুরির ক্ষেত্রে ব্যক্তির রটানো কথা সত্য হোক বা মিথ্যা, হোক না তার উদ্দেশ্য সৎ কিংবা অসৎ, এর চূড়ান্ত পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ।

পরনিন্দা ও চোগলখুরি ভালবাসা ও সম্প্রীতির ভিত নাড়িয়ে দেয়। ভ্রাতৃত্বের মতো পবিত্র সম্পর্ক কলুষিত করে। পরস্পর আস্থা ও বিশ্বাস ধ্বংস করে দেয়। বিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞজন যথার্থ বলেছেন: 'পরনিন্দা ও চোগলখুরি হলো গলিত পূঁজ ও দুর্গন্ধ বমি। যা কলুষিত মন থেকে বেরিয়ে মুখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে।'

পরনিন্দা ও চোগলখুরি-কাজ দুটি অত্যন্ত জঘন্য ও নিরব বিধ্বংসী। এর কারণে বহু দেশ, সমাজ ও সভ্যতায় হিংসা-বিদ্বেষ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ক্রমশ তা বনের লেলিহান আগুনের মতো সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। বাতাস যতো জোরালো ঝাপটায় বনের আগুন প্রতিহত করার চেষ্টা করে, আগুন মুহুর্মুহু বনের গভীর হতে গহীনে ছড়িয়ে পড়ে। এর কারণে অনেক বিপর্যয় বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। বহু রক্তপাত হয়েছে। বহু ধ্বংস-বিনাশ ঘটেছে।

সমাজে যদি মান-সম্মানের সাথে বেঁচে থাকতে হয়, গৌরব ও মর্যাদা অটুট রাখতে হয়, অবশ্যই পরনিন্দা ও চোগলখুরির মতো ঘৃণ্য স্বভাবদোষ পরিহার করতে হবে। এ লক্ষ্যে কার্যকর উপায় ও করনীয় পদক্ষেপ কী?

সমাধান:
১. তাকওয়া ও খোদাভীতি অবলম্বন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, অন্যের দোষচর্চা করা ও পরনিন্দা করা কুরআন সুন্নাহর বিধানে হারাম এবং মানবীয় দুশ্চরিত্রের জঘন্যতম। পবিত্র কুরআনে গীবত ও পরনিন্দার বিষয়টিকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার মতো জঘন্য কাজ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে:
وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ﴾ [الحجرات: ١٢]
অর্থ: 'এবং একে অপরের গীবত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোস্ত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা অপছন্দই করে থাক।' (হুজুরাত, ৪৯: ১২)

২. শয়তান আপনাকে মিষ্টি কথায় এভাবে ভোলানোর চেষ্টা করবে: 'মানুষ বেপরোয়াভাবে অন্যায়-অপরাধ করবে, আর আপনি বলতেও পারবেন না? আপনি তো মিথ্যা বলছেন না, সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে ভুলভাল বকছেন না, যা বলছেন নিরেট সত্য, তাতে গীবত ও পরনিন্দা হলো কীভাবে?'

শয়তানের এমন সাধূচরিত্রের মিষ্টি কথায় প্ররোচিত হবেন না। এ ক্ষেত্রে রাসূল ﷺ-এর বাণীই চূড়ান্ত। তিনি বলেছেন:
أَتَدْرُونَ مَا الْغِيبَةُ؟ قَالُوا: اللهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ. قَالَ: ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ قِيلَ: أَفَرَأَيْتَ إِنْ كَانَ فِي أَخِي مَا أَقُولُ؟ قَالَ: إِنْ كَانَ فِيهِ مَا تَقُولُ فَقَدْ اغْتَبْتَهُ، وَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِيهِ فَقَدْ بَهَتَهُ» (صحيح مسلم) ٢٠٠١/٤
অর্থ: 'তোমরা কি জানো গীবত কাকে বলে?' সাহাবায়ে কেরাম বললেন: 'আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।' রাসূল ﷺ বললেন: '(গীবত হলো) তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে।' জিজ্ঞাসা করা হলো: 'ভাই সম্পর্কে আমার মন্তব্য যদি (সত্য ও বাস্তব) হয় তাহলেও?'
রাসূল ﷺ বললেন: 'তার সম্পর্কে তোমার কথা যদি বাস্তব হয় তবেই তো গীবত। আর যদি অবাস্তব ও অসত্য হয় তাহলে তো তুমি তার উপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ করলে।' (মুসলিম: ৪/২০০১)

৩. কিয়ামতের দিন চোগলখুরি, বান্দা ও তার জান্নাতের মাঝে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ نَمَّام» (صحيح مسلم ১০১/১) অর্থ: 'কোনো চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না।' (মুসলিম, ১/১০১)

৪. কুরআন-সুন্নাহর অনেক স্পষ্ট ভাষ্য এটা প্রমাণ করে যে, চোগলখুরি হারাম ও নিকৃষ্টতম কবীরা গুনাহ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
وَلَا تُطِعْ كُلَّ حَلَّافٍ مَّهِينٍ * هَمَّازٍ مَشَاء بِنَمِيمٍ﴾ [القلم: ١٠، ١١] অর্থ: 'এবং এমন কোনও ব্যক্তির কথায়ও চলো না, যে অত্যাধিক কসম করে, যে হীন, যে নিন্দা করতে অভ্যস্ত, চোগলখুরি করে বেড়ায়।' (কলাম, ৬৮: ১০-১১)
গীবত চোগলখুরি ব্যক্তির নেক আমল বরবাদ করে দেয়। সুতরাং পরনিন্দা ও চোগলখুরি করে ব্যক্তিত্ব, আত্মমর্যাদা ও নেক আমলগুলোকে তুচ্ছ মূল্যে বিকে দিবেন না। কষ্ট করে যে নামায, রোযা ও দান সদকা করেছেন তা পণ্ডশ্রমে পরিণত করবেন না।

৫. লোকদের কাজকর্ম ও খুটিনাটি বিষয়ের পিছু পড়বেন না। কারো সম্পর্কে যদি কথা বলতেই হয় ভেবে-চিন্তে বলুন। কথাটি যদি মঙ্গলজনক হয় তবেই বলুন। অন্যথায় চুপ থাকাই শ্রেয়। রাসলূল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَاليَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ". (صحيح البخاري (۱۱/৮) অর্থ: 'যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ও পরকালের উপর বিশ্বাস করে সে যেন ভালো কথা বলে, নয় তো চুপ থাকে।' (বুখারী, ৮/১১)

৬. জ্ঞানী-গুণী, ধার্মিক ও পরহেযগার ব্যক্তিদের সংস্পর্শে থাকুন। সময়ের সদ্ব্যবহার, কথাবার্তায় পরিমিতি রক্ষা এবং আল্লাহর যিকিরের ক্ষেত্রে তাদের সংস্পর্শ আপনার জন্য সহায়ক হবে, গুনাহমুক্ত জীবন-যাপনের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। পরনিন্দুক ও চোগলখোর, তাদের সঙ্গ ত্যাগ করুন। কেননা এসব চারিত্রিক ভ্রষ্টতা হলো মহা সংক্রামক ব্যাধি। ক্ষণিকের সংস্পর্শেই এর বীজ ছড়াতে থাকে। সংবাদের মূল উৎস ও প্রধান সূত্রের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার আগে কোনো কথা বিশ্বাস করবেন না এবং মানুষের কাছে প্রচার করে বেড়াবেন না।

৭. সবসময় সচেতন থাকুন। নিজেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হোন-কখনো পরনিন্দা করবেন না। প্রয়োজনে নিজের উপর ক্ষতিপূরণ আরোপ করুন। যেমন: ভুলে অনিচ্ছায় গীবত কিংবা চোগলখুরি করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থদণ্ড আরোপ করুন এবং স্বতস্ফূর্তভাবে তা বাস্তবায়ন করুন। অথবা কোনো নেক আমল করুন। এভাবে ভালো কাজে নিয়োজিত হয়ে খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকা সহজ হবে।

৮. যিকির ও এস্তেগফারে যবান তরতাজা রাখুন। হৃদয়-মনের নিষ্কলুষতা ও পরিশুদ্ধি লাভে সচেষ্ট হোন। কেননা পরনিন্দা ও চোগলখুরি অন্তরে পুষে-রাখা হিংসা বিদ্বেষের জের ধরেই হয়ে থাকে।

৯. সবসময় কোনো-না-কোনো ভালো কাজে ব্যস্ত থাকুন। যেন পরনিন্দা ও কুটনামি করার সুযোগ না হয়।

১০. অন্যের দোষ না ঘেঁটে আত্মসমালোচনায় মনোযোগী হোন। পরিশ্রম ও নিয়তির কল্যাণে যতোটুকু অর্জিত হয় তাতেই তুষ্ট থাকুন। অন্যের সুখ-সৌভাগ্য দেখে হিংসা করা সমীচীন নয়। হিংসুক নিজেই তার হিংসার আগুনে জ্বলে-পুড়ে মরে।

১১. আপনার মনে যখন গীবত চোগলখুরি উসখুস করবে তখন স্মরণ করবেন, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদের সম্পর্কে কী বলেছেন:
وَإِذَا لَقُوا الَّذِينَ آمَنُوا قَالُوا آمَنَّا مَن وَإِذَا خَلَوْا إِلَى شَيْطِيْنِهِمْ * قَالُوا إِنَّا مَعَكُمْ إِنَّمَا نَحْنُ مُسْتَهْزِعُونَ﴾ [البقرة: ١٤]
অর্থ: 'যারা ঈমান এনেছে, তাদের সাথে যখন এরা মিলিত হয়, তখন বলে, আমরা ঈমান এনেছি আর যখন নিজেদের শয়তানদের সাথে একান্তে মিলিত হয়, তখন বলে, আমরা তোমাদেরই সঙ্গে আছি। আমরা তো কেবল তামাশা করছিলাম।' (বাকারা, ২: ১৪) নিজেকে, নিজের বিবেককে একবার জিজ্ঞাসা করুন, আপনার পক্ষে কি সম্ভব স্বভাব-চরিত্রে, দেহ-রক্তে মুনাফিকের স্বভাব ধারণ করা?

১২. সন্তানদের গঠনমূলক শিক্ষা-দীক্ষায় গড়ে তুলতে হবে। পরনিন্দা ও চোগলখুরির কারণে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ যে অসুস্থ পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে, সে ব্যাপারে সতর্ক করতে হবে।

১৩. একটি বিষয় সুনিশ্চিত, যারা অন্যের সমালোচনায় লিপ্ত থাকে, পরনিন্দা ও চোগলখুরিতে মজে থাকে সমালোচিত ব্যক্তিরা কিয়ামতের দিন তাদের প্রতিপক্ষ ও বিবাদী হয়ে দাঁড়াবে। চোগলখুরি ও পরনিন্দার কারণে যে আন্তরিক বন্ধুত্বে চিড় ধরবে, ভ্রাতৃত্ব বন্ধন ছিন্ন হবে এবং পারিবারিক সম্পর্কে অনিশ্চয়তা দেখা দিবে তার দায়ভার নিন্দুক ও চোগলখোর ব্যক্তিকেই বহন করতে হবে। এ পাপের বোঝা তার ঘারেই চাপিয়ে দেওয়া হবে। মনে রাখুন, কথাবার্তায় পরিমিতি রক্ষা করা ও ন্যায়ানুগতা অবলম্বন করা হলো জান্নাতে প্রবেশে অন্যতম উপায়।

১৪. আপনি কি চান, গীবত ও চোগলখুরি করে মু'মিন বান্দাদের অভিশাপের পাত্র হতে? পারিবারিক সম্পর্কে ফাটল ধরাতে? মানুষের মনে-মনে হিংসা বিদ্বেষের বিষ ছড়াতে? সমাজে বিভেদ-বিৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে? মুনাফেকি স্বভাবদোষে কলুষিত হয়ে মানবজাতির নিকৃষ্ট ইনসানে পরিণত হতে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী শুনুন: إِنَّ شَرَّ النَّاسِ ذُو الوَجْهَيْنِ الَّذِي يَأْتِي هَؤُلاءِ بِوَجْهِ، وَهَؤُلَاءِ بوجه". (صحيح البخاري (۷১/৯) অর্থ: 'দু'মুখো মানুষ হলো সবচে' নিকৃষ্ট। যে এক দলের সাথে এক চেহারা জাহির করে, পরক্ষণেই অপর দলের সাথে ভিন্ন চেহারায় হাজির হয়।' (বুখারী, ৯/৭১) হাদীসের অখ্যায়িত নিকৃষ্টতম ব্যক্তিটি হলে পরনিন্দুক ও চোগলখোর।

১৫. যে ব্যক্তি অন্যের মান-মর্যাদা রক্ষা করে চলবে আল্লাহ তা'আলাও তার মান মর্যাদা বজায় রাখবেন। আর যে অন্যের দোষ-ত্রুটি খুঁজে বেড়াবে, ছিদ্রান্বেষণে মেতে থাকবে। আল্লাহ তায়ালাও তার গোপন বিষয় জাহির করে দিবেন। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) (১৫০-২০২ হি.) বলেছেন: 'অন্যের দোষচর্চা করবেন না। অন্যের মতো দোষ-গুণে মিলিয়ে আপনিও তো একজন মানুষ। আপনার চোখ যেমন অন্যের ভুল-বিচ্যুতি খুঁজে বেড়াচ্ছে চারপাশের চোখগুলোও আপনার ভুলগুলো শনাক্ত করছে। সুতরাং অন্যের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখাই শ্রেয়।'

পরিশিষ্ট:
বিখ্যাত জার্মান-আমেরিকান কবি সাহিত্যিক ও উপন্যাসিক চার্লস বুকৌসকি (১৯২০-১৯৯৪ খৃষ্টাব্দ) বলেছেন: 'লোকদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলুন। এতো ঘনিষ্ট হবেন না যে, পরে পস্তাতে হয়। এতো বেশি দূরে থাকবেন না যে, মানুষ পর ভাবে। আপনাকে থাকতে হবে সবার মধ্যে, সবার সাথে মিশে, অভিজাত ঈষৎ দূরত্ব বজায় রেখে।'

'চোগলখুরি হলো একটি কদর্য স্বভাব। যা আপনাকে লাঞ্ছিত অপমানিত করে ছাড়বে। তাই পরনিন্দা না করে মানুষের ইতিবাচক দিকগুলোর প্রশংসা করুন।' -আয়েয আল-কারনী

বহু শাস্ত্রজ্ঞানী ইবনে হাযাম আন্দালুসী (রহ.) (৩৮৪-৪৫৬ হি.) বলেছেন: 'যুগে-যুগে যতো রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে, যতো অন্যায় রক্তপাত হয়েছে, ইজ্জত-আবরু লুণ্ঠিত হয়েছে তার অন্যতম কারণ ছিল ধোঁকা-প্রতারণা ও চোগলখুরি।'

বিখ্যাত তাবেয়ী ও নাহুশাস্ত্র প্রণেতা আবুল আসওয়াদ দু'আলী (রহ.) (৬৯ হি.) বলেছেন: 'যে চোগলখুরিই আপনার কানে আসুক তার কোনোটাই মেনে নিবেন না। চোগলখোরকে এক বিন্দু প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক নয়। আজ যে আপনার কাছে অন্যের কুৎসা রটনা করছে, অন্যের নামে কানপড়া দিচ্ছে কাল সে আপনাকে নিয়ে একই কাজ করে বেড়াবে।'

বিখ্যাত মিশরীয় লেখক নাগীব মাহফুজ (১৯১১-২০০৬ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'আজ যে আপনার কাছে লোকদের নিন্দা সমালোচনা করছে, কোনো সন্দেহ নেই, কাল সে আপনার নামেই লোকদের কাছে কুৎসা রটিয়ে বেড়াবে।'

টিকাঃ
২৬. অন্যায়-অন্যায্য হলে গোপনে তার চর্চা করা, আর প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করা-স্পষ্টতই দু'টি ভিন্ন বিষয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00