📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 শিরক

📄 শিরক


পূর্ব চীনের ল্যাঙ্গ থেকে পশ্চিম ফ্রান্স পর্যন্ত সফর করে বেড়িয়েছি। কতো বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও নতুনত্ব চোখে পড়েছে। তবে যে বিষয়টি সবচেয়ে প্রকটরূপে চোখে বেঁধেছে, তা হলো 'শিরক'।

শিরক হলো প্রভুত্বের ও উপাস্যত্বের ক্ষেত্রে মহান আল্লাহ তা'আলার কোনো সমকক্ষ ও অংশীদার নির্ধারণ করা, তাঁর সঙ্গে অন্যকে ইলাহ সাব্যস্ত করা। প্রকৃত সত্য হলো, মহান আল্লাহ তা'আলা এক ও একক। তাঁর কোনো অংশীদার নেই। তিনি ছাড়া নেই কোনো রব ও ইলাহ। নেই কোনো স্রষ্টা ও উপাস্য। পৃথিবীতে শিরকই হলো সবচেয়ে গুরুতর জঘন্য পাপ। এমন মহা পাপ থেকে মানবজাতিকে উদ্ধারের উদ্দেশ্যেই আল্লাহ তা'আলা যুগেযুগে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন এবং আসমানি কিতাব নাযিল করেছেন। কত দলিল-প্রমাণ পেশ করেছেন, যেন মানবজাতি বুঝতে পারে, তাদের একজন স্রষ্টা আছেন, যিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। তিনিই একমাত্র উপাস্য। তিনি এক ও একক।

আল্লাহ তা'আলা বান্দার সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন। কিন্তু শিরক ক্ষমা করেন না। যুগে-যুগে প্রেরিত নবী-রাসূলগণের ওপর প্রথম গুরুদায়িত্বটি ছিল আল্লাহ তা'আলার তাওহিদ ও একত্ববাদের দাওয়াত প্রদান করা। তাই তো প্রত্যেক নবী-রাসূল নিজ নিজ সম্প্রদায়ের সামাজিক অনাচার ও রাজনৈতিক কদাচারগুলো এড়িয়ে প্রথমেই তাওহিদ ও একত্ববাদের দাওয়াত দিয়েছেন।

তাওহিদ ও একত্ববাদ হলো শিরক ও বহুশ্বরবাদের পরিপন্থি। এ দুয়ের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। তাওহিদ হলো সবচেয়ে মহৎ ইবাদত, আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ উপায়। আর শিরক হলো সবচেয়ে জঘন্য, অমার্জনীয় পাপ, যে পাপের শাস্তি অনিবার্য। তাওহীদে বিশ্বাসী হওয়া ছাড়া তা থেকে নিস্তারের দ্বিতীয় কোনো পথ নেই।

অত্যন্ত অনুতাপের বিষয় হলো, আমরা কিছু আনুষাঙ্গিক বিষয়ে মতবিরোধের জের ধরে রেখেছি। তা নিয়ে ব্যতিব্যস্ত থাকছি। এদিকে তাওহিদ ও একত্ববাদের প্রচার-প্রসার, মুসলমানদের আকীদা ও ধর্মীয়বিশ্বাস সংশোধনের দায়িত্ব বেমালুম ভুলে বসেছি।

এ সমস্যার সমাধান কীসে? এ অচলাবস্থার উন্নতি কীসে?

সমাধান:
১. হৃদয়ে আল্লাহ তা'আলার প্রতি দৃঢ় ঈমান ও অগাধ বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। যখন আল্লাহর যিকিরে মশগুল হবেন, পবিত্র কুরআন ও বিশ্বজগতের সৃষ্টি রহস্য সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনায় নিমগ্ন হবেন, হৃদয়ের গভীর থেকে ধ্বনিত হবে:

أَشْهَدُ أَلَّا إِلهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ.

অর্থ: 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, এক আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ্ নেই। তাঁর সমকক্ষ কোনো অংশীদার নেই।'
২. নবী-রাসূলগণের পক্ষ থেকে উম্মতের ওপর তাওহিদ ও একত্ববাদের আহ্বান প্রচারের যে দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে, সে বিষয়ে সবসময় সচেষ্ট থাকতে হবে। মানুষকে জোর দিয়ে বোঝাতে হবে, শিরকমুক্ত হয়ে তাওহিদ ও একত্ববাদে বিশ্বাসী হওয়া ছাড়া নামায, রোযা, যাকাত ও অন্যান্য সমস্ত ইবাদতই বৃথা, এর কোনো মূল্য নেই। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَقَدِمْنَا إِلَى مَا عَمِلُوا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنَهُ هَبَاءً مِّنْثُورًا

অর্থ: 'তারা (দুনিয়ায়) যে আমাল করেছিল আমি সেদিকে অগ্রসর হব, এরপর তাকে বানিয়ে দেব ছড়ানো ছিটানো ধূলিকণা (সদৃশ)।' (ফুরকান, ২৫: ২৩)
৩. মনে রাখতে হবে, নবী-রাসূলগণের প্রত্যেকেই মূলত তাওহিদ ও একত্ববাদের দাওয়াত প্রচার করেছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:

﴿وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُونَ﴾ [النحل : ٣٦]

অর্থ: 'নিশ্চয়ই আমি প্রত্যেক উম্মতের ভেতর কোনো না কোনো রাসূল পাঠিয়েছি এই নির্দেশ দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুতকে পরিহার কর।' (সূরা নাহল, ১৬: ৩৬) তাওহিদ ও একত্ববাদের প্রচারে নবী-রাসূলগণের একটিই আহ্বান ছিল। পবিত্র কুরআনের ভাষায়-

﴿فَأَرْسَلْنَا فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْهُمْ أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِّنْ إِلَهِ غَيْرُهُ افَلَا تَتَّقُونَ ﴾ [المؤمنون: ٣٢]

অর্থ: 'আর তাদের মাঝে তাদেরই একজনকে রাসূল করে পাঠিয়েছিলাম এই বলে যে, তোমরা আল্লাহর 'ইবাদাত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের কোন ইলাহ নেই, তবুও কি তোমরা (তাঁকে) ভয় করবে না?' (মু'মিনুন, ২৩: ৩২) আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রিয় রাসূল ﷺ-কে সর্বপ্রথম যে নির্দেশ প্রদান করেছেন, তা হলো একত্ববাদের নির্দেশ। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:

﴿فاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَتِ﴾ [محمد : ١٩]

অর্থ: 'সুতরাং জেনে রাখুন, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই। ক্ষমা প্রার্থন করুন আপনার ও মু'মিন নর-নারীদের ত্রুটির জন্য।' (মুহাম্মদ, ৪৭: ১৯)
৪. রাসূল ﷺ ও তাঁর সাচ্চা অনুসারীগণ প্রজ্ঞা, হিতোপদেশ ও আসমানি কিতাবের বাণীর মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর একত্ববাদের দিকে আহ্বান করেছেন। একই পথ অনুসরণ করে আমাদেরও তাওহিদ ও একত্ববাদের দাওয়াত প্রচার করতে হবে। আল্লাহ তা'আলা এ বিষয়ে রাসূলগণ ও আসমানি কিতাবপ্রাপ্ত জাতিবর্গের প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:

وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ لَتُبَيِّنَهُ لِلنَّاسِ وَلَا تَكْتُمُونَهُ [ العمران : ۱৮৭]

অর্থ: 'আর (সেই সময়ের কথা তাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়) যখন আল্লাহ 'আহলে কিতাব' থেকে এই প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন যে, তোমরা এ কিতাবকে অবশ্যই মানুষের সামনে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করবে।' (আলে ইমরান, ৩: ১৮৭)
৫. দ্বীনের আলেম ও দায়ীগণকে পৃথিবীর দূর-দূরান্তে একত্ববাদের বাণী পৌঁছে দিতে হবে। ব্যক্তিগত পরিসরে, পারিবারিক জীবনে ও সামাজিক অঙ্গনে শিরকের ভয়াবহ পরিণতি তুলে ধরতে হবে। শিরকের যত ধরন-প্রকৃতি প্রচলিত আছে, যেমন: মূর্তি পূজা, প্রতিমা পূজা, কবর পূজা, মাজার পূজা, যাদুটোনা ও জ্যোতিষবিদ্যা ইত্যাদি কার্যকলাপ থেকে সতর্ক করতে হবে।
৬. আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, তাঁর একত্ববাদে বিশ্বাস সুরক্ষিত ও অটুট রাখার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক থেকে শুরু করে উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চতর গবেষণাকেন্দ্রে পর্যন্ত 'ঈমান ও একত্ববাদের বিশ্বাস'-বিষয়টি সিলেবাসভুক্ত করতে হবে। কেননা একজন মুসলমান যত উচ্চ শিক্ষিতই হোক-না-কেন, উন্নতি-অগ্রগতির যত শীর্ষস্থান অধিকার করুক-না-কেন, আল্লাহ তা'আলার একত্ববাদে একনিষ্ঠ খাঁটি বিশ্বাসী না হওয়া পর্যন্ত সে প্রকৃত মুসলমান হতে পারে না।
৭. কুরআন-সুন্নাহ আঁকড়ে ধরতে হবে। কুরআন-সুন্নাহ সম্পর্কে জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় ও গবেষণায় উৎসাহিত করতে হবে। সমাজ ও জাতির ঝোঁক-প্রবণতার দিকে সজাগ দৃষ্টি রেখে তা সঠিক পথে পরিচালিত করা আবশ্যক। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:

وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيلِهِ ذَلِكُمْ وَضَكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ﴾ [الأنعام : ١٥৩]

অর্থ: 'এবং এ-ই পথই আমার সরল পথ। সুতরাং তোমরা এর অনুসরণ কর এবং বিভিন্ন পথের অনুসরণ কর না। অন্যথায় তা তোমাদেরকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিবে। হে মানুষ! এসব বিষয়ে আল্লাহ তোমাদেরকে গুরুত্বের সাথে আদেশ করেছেন, যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার।' (আনআম, ৬: ১৫৩)
৮. পবিত্র কুরআনের ঘটনাসমূহে, দৃষ্টান্ত-উপমায়, দলিল-প্রমাণে, তথ্য ও তত্ত্বে আল্লাহ তা'আলার একত্ব ও অদ্বিতীয়তা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত। যেমন: সুলাইমান (আ.)-এর যামানায় পিপীলিকা ও হুদহুদ পাখির ঘটনা, মৌমাছির আলোচনা, সালেহ্ (আ.)-এর উটনীর ঘটনা। প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটি বিষয়ের চমৎকার সমন্বয় ঘটেছে। তা হলো, আল্লাহ তা'আলার একত্ববাদ ও অদ্বিতীয়তা।
৯. সন্তানদেরকে শিরকের জঘন্যতা ও গুরুতরতা সম্পর্কে সতর্ক করার সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর একত্ববাদের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা কর্তব্য। লুকমান (আ.) যেমনটি করেছেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:

وَإِذْ قَالَ لُقْمَانُ لِابْنِهِ وَهُوَ يَعِظُهُ يُبُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ إِنَّ الشَّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ﴾ [لقمان: ١৩].

অর্থ: 'এবং (সেই সময়ের কথা) স্মরণ করুন, যখন সে তার পুত্রকে উপদেশচ্ছলে বলেছিল, ওহে আমার পুত্র! আল্লাহর সাথে শিরক কর না। নিশ্চিত মনে রেখ, শিরক চরম অন্যায়।' (সূরা লুকমান, ৩১: ১৩)

সমাজের বিশেষ-সাধারণ নির্বিশেষে প্রতিটি শ্রেণির হৃদয়ে, প্রতিটি প্রজন্মের অন্তরে এ আয়াতের দাবি ও মর্ম বদ্ধমূল করে দিতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:

إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا﴾ [النساء : ٢٨]

অর্থ: 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শিরক করার বিষয়টি ক্ষমা করেন না। এর চেয়ে নিচের যেকোনো বিষয়ে যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করে, সে এমন এক অপবাদ আরোপ করে, যা গুরুতর পাপ।' (নিসা, ৪: ৪৮)
১০. দ্বীনের দাওয়াতের পন্থা সহজ-সাবলীল হতে হবে। তাতে বিতর্কিত বিষয়ের আঁচ থাকবে না। দর্শনের জটিল ও দুর্বোধ্য বিষয়ের ঝাঁঝ থাকবে না। ইসলাম হলো সাবলীল ও স্বভাবজাত ধর্ম। সুতরাং তার দাওয়াতের পন্থাও হবে সহজাত সাবলীল। পবিত্র কুরআনে দ্বীনের দাওয়াতসংবলিত দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে:

ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ ﴾ [النحل: ۱۲৫]

অর্থ: 'আপনি নিজ প্রতিপালকের প্রতি মানুষকে ডাকবেন হিকমত ও সদুপদেশের মাধ্যমে আর (যদি কখনো বিতর্কের দরকার পড়ে, তবে) তাদের সাথে বিতর্ক করবেন উৎকৃষ্ট পন্থায়।' (নাহল, ১২৫)
১১. দ্বীনের দায়ী ও আহ্বায়ককে প্রথমেই মানুষের আকীদা ও বিশ্বাস সংশোধনে কাজ করতে হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে নীতি-নৈতিকতা, সামাজিক শিষ্টাচার, আল্লাহর নৈকট্য লাভের সাধনা ইত্যাদি বিষয়ে অগ্রসর হতে হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ পবিত্র মক্কা নগরীতে তের বছর অবস্থান করেছেন। এ দীর্ঘ সময়ে তিনি শুধু আল্লাহ তা'আলার একত্ববাদের দাওয়াত প্রচার করেছেন। لَا إِلَهَ إِلَّا الله-এর অর্থ ও মর্ম মানুষের মনে বদ্ধমূল করার চেষ্টা করেছেন।
১২. একটি হাদীসে কুদসী, যা সবসময় মনে রাখা কর্তব্য। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: قَالَ اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى: أَنَا أَغْنَى الشَّرَكَاءِ عَنِ الشَّرْكِ مَنْ عَمِلَ عَمَلاً أَشْرَكَ فِيهِ مَعِي غَيْرِي تَرَكْتُهُ وَشِرْكَهُ". صحيح مسلم (٤/ ٢٢٨٩)

অর্থ: আবূ হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মহান আল্লাহ বলেন, 'আমি শারীকদের শিরক হতে সম্পূর্ণ মুক্ত। যদি কোন লোক কোন কাজ করে এবং এতে আমি ছাড়া অপর কাউকে শারীক করে, তবে আমি তাকে ও তার শিরকি কাজকে প্রত্যাখ্যান করি।' (মুসলিম: ৪/২২৮৯)

যত দিন বেঁচে আছেন, لَا إِلَهَ إِلَّا الله কালিমাটি বারবার পাঠ করুন। لَا إِلَهَ (কোনো ইলাহ্ নেই) অংশটি সমস্ত প্রভু ও উপাস্যের অস্তিত্বকে নাকচ করে। إِلَّا الله (আল্লাহ ছাড়া) অংশটি প্রভুত্ব ও উপাসনার অধিকার একমাত্র আল্লাহ তা'আলার জন্য সাব্যস্ত করে।

প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় এ দু'আ পাঠ করুন: اللهُمَّ إِنِّي أَعوذُ بِكَ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ وَأَنَا أَعْلَمُ، وَأَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لَا أَعْلَمُ.

অর্থ: 'হে আল্লাহ! জেনে-বুঝে তোমার সঙ্গে শিরক করা থেকে পানাহ চাই। না জেনে, না বুঝে যে গুনাহ ও পাপাচার করেছি, তার জন্য ক্ষমা চাই।'

পরিশিষ্ট:
* ধ্রুপদি আরবি কবিতার শ্রেষ্ঠ কবিদের অন্যতম কবি আবূ নুয়াস (৭৫৬-৮১৪ খৃষ্টাব্দ) বলেছেন: 'পৃথিবীর যত গাছপালা, তরুলতা আছে, তা পরখ করে দেখো, মহান স্রষ্টা যা সৃষ্টি করেছেন, তা পর্যবেক্ষণ করে দেখ, তাতে কত অসংখ্য প্রমাণ ও নিদর্শন জাজ্বল্যমান, যা প্রমাণ করে যে, মহান আল্লাহ এক ও একক। তাঁর নেই কোনো শরিক, সমকক্ষ।'
* শাইখুল ইসলাম হাফেয ইবনে তাইমিয়া (রহ.) (৬৬১-৭২৮ হি.) বলেছেন: 'তাওহিদ ও একত্ববাদের মূল দাবি হলো, আমরা এক আল্লাহ তা'আলার ইবাদত করব। তাকেই ডাকব। তাকেই ভয় করব। একমাত্র তাঁর ওপর ভরসা করব। এ শাশ্বত দ্বীন তাঁরই পক্ষ থেকে প্রদত্ত।'
* 'তাওহিদ ও একত্ববাদ হলো পৃথিবীতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, মঙ্গলজনক হিতোপদেশ। পরকালের জন্য বান্দার শ্রেষ্ঠ পাথেয়।' -আয়েয আল-কারনী

টিকাঃ
১৯ অংশীদারিত্ব নির্ধারণ করা।
২০ অবর্তীর্ণ।
২১ ‘তাগুত’ শয়তানকেও বলা হয় আবার প্রতিমাদেরকেও বলা হয়। সে হিসেবে বাক্যটির দু'টি ব্যাখ্যা হতে পারে। (ক) তোমরা শয়তানকে বর্জন করো, তার অনুগামী হয়ো না। (খ) তোমরা মূর্তিপূজা হতে বেঁচে থাকো। (তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন)
**. বিজ্ঞজন ও দ্বীন প্রচারকারী

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 বিদ‘আত

📄 বিদ‘আত


কুরআন-সুন্নাহয় কোনো ভিত্তি নেই-এমন উদ্ভাবিত কোনো কথা, কাজ কিংবা ইবাদতই হলো বিদ'আত। আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) বিদ'আতের পরিচয় এভাবে তুলে ধরেছেন, 'যে বিষয়টি শরীয়ত পরিপন্থি, কিংবা যা বিশুদ্ধ ইবাদতে সংযোজন-বিয়োজন ঘটায়, তা-ই বিদ'আত।'

যে বিদ'আতী, শরীয়তে ভিত্তিহীন কাজের উদ্ভাবক, তার কাজটিকে শয়তান তারই কাছে সুন্দর শ্রেষ্ঠরূপে তুলে ধরে। ফলে তার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মায়-এ নতুন পদ্ধতিই তো আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ উপায়। অথচ তা আল্লাহ তা'আলার চরম নাফরমানি এবং রাসূল ﷺ-এর আদর্শ-পরিপন্থি। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

فَإِنَّ كُلَّ مُحدَثَةٍ بِدْعَةً، وكل بدعة ضلالة".

অর্থ: 'নতুন উদ্ভাবিত প্রতিটি বিষয়ই বিদ'আত এবং যে কোনো বিদ'আত ভ্রষ্টতার উপলক্ষ।' (আবু দাউদ, ৭/১৭)

বিদ'আতী, সে তো অজ্ঞতার ঘোরে ডুবে থাকে। কেননা শয়তান তার কারসাজিতে ব্যক্তির সামনে উদ্ভাবিত কাজটাকে সুন্দর ও চাকচিক্যমণ্ডিতরূপে উপস্থাপন করে। ফলে তার দৃঢ় বিশ্বাস-তার কাজটিই সঠিক ও যথার্থ। তাতে একচুল ভুল-বিচ্যুতির অবকাশ নেই।

মানুষের মধ্যে ধর্মীয় অজ্ঞতা ও অসচেতনতার সুযোগে সমাজে বিদ'আত মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। ধর্মীয় শিক্ষা-দীক্ষার প্রচার-প্রসারে আলেম সমাজের নীরব নির্জীব ভূমিকার কারণে সমাজের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে বিদ'আত ছড়িয়ে পড়ে। ক্রমেই তা মানুষের মধ্যে রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ ও আদর্শের বিচ্যুতি ঘটায়। দ্বীনের প্রকৃত শিক্ষা ও তাৎপর্য ধ্বংস করে দেয়। মুসলমানদের পারস্পরিক কলহ-বিবাদ, ঝগড়া-ফাসাদের মুখে ঠেলে দেয়।

বর্তমান সমাজে বিদ'আত একটি ভয়ানক জটিল সমস্যার রূপ ধারণ করেছে। এ থেকে উত্তরণের পথ কী? এ জটিল সংকট কাটিয়ে উঠার উপায় কী?

সমাধান:
১. মিডিয়া ও প্রচারমাধ্যমগুলো, যেমন: মসজিদ, বিশ্ববিদ্যালয়, সেমিনার, আলোচনা সভা ও শিক্ষা সিলেবাস–সর্বত্র রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ ও আদর্শ তুলে ধরে বিদ'আত ও তার ভয়াবহ পরিণতি থেকে সতর্ক করতে হবে। সমাজের সাধারণ মুসলমান যেন সুন্নাহ ও বিদ'আত একসাথে গুলিয়ে না ফেলে এবং বিদ'আতের বাহ্যিক চাকচিক্যে প্রতারিত না হয়, সে বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
২. ধর্ম সম্পর্কে, শরীয়তের বিধি-বিধান সম্পর্কে অজ্ঞতা ও অসচেতনতা দূর করতে হবে। অজ্ঞতা ও মূর্খতা যে কোনো ক্ষেত্রেই মানুষকে ভুল পথে ঠেলে দেয়। বিশেষ করে ধর্মীয় অজ্ঞতা ব্যক্তিকে বিদ'আতের পথে ধাবিত করে। তাই সমাজের সর্বত্র দ্বীনি শিক্ষা-দীক্ষার প্রচার-প্রসার ঘটাতে হবে। ধর্মীয় চিন্তা-চেতনার জাগরণ সৃষ্টি করতে হবে। শাতেবী (রহ.) বলেন, 'যে ব্যক্তি ইসলাম সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করেছে, অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেছে, তার পক্ষ থেকে বিদ'আতের কোনো আশঙ্কা নেই। কিন্তু ইসলাম সম্পর্কে, ইসলামের বিধি-বিধান সম্পর্কে যে ব্যক্তির সঠিক জ্ঞান নেই, তার দ্বারা বিদ'আত ও কুসংস্কারের সমূহ আশঙ্কা রয়েছে।'
৩. সহীহ হাদীস ও জাল হাদীস সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। বিদ'আতীরা যে হাদীস 'ব্যবহার' করে, কিংবা হাদীসের অপব্যাখ্যা করে, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
৪. ইবাদতের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি পথ বর্জন করা কর্তব্য। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের সতর্ক করে বলেছেন:
﴿يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ﴾ (النساء : ۱৭১)

অর্থ: 'হে কিতাবিগণ! নিজেদের দ্বীনে সীমালঙ্ঘন কর না।' (নিসা, ৪: ১৭১)
৫. কুরআন সুন্নাহ সম্পর্কে বিজ্ঞ এবং শরীয়তের বিধি-বিধান সম্পর্কে অভিজ্ঞ ওলামায়ে কেরামের নিকট থেকে ফতোয়া গ্রহণ করতে হবে। যারা না-জেনে, না-বুঝে ফতোয়া প্রদানকারীর বেশ ধারণ করেছে তাদের ফতোয়া বর্জন করতে হবে।
৬. কোনো ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের অনুসরণে অন্ধবিশ্বাস ও অন্যায় গোঁড়ামি থেকে বেঁচে থাকতে হবে। নিজ নিজ পছন্দের পীর মাশায়েখের প্রতি অন্ধভক্তি, তাদের অন্ধ-অনুকরণ, পীর-মাশায়েখের মতাদর্শ গ্রহণে অন্যায় গোঁড়ামি, এমনকি কুরআন-সুন্নাহর ওপর তা প্রাধান্য দেওয়া-এ সমস্তই হলো বিদ'আতীদের চরিত্র।
৭. কথা-কাজে, আচরণে-উচ্চারণে রাসূল ﷺ-এর প্রকৃত আদর্শের অনুসারী হতে হবে। কাফের, মুশরিক ও বিদ'আতীদের রীতিনীতি ও কুসংস্কার থেকে বেঁচে থাকতে হবে।
৮. বিদ'আত ও কুসংস্কারের পরিণতি ভয়াবহ। ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে এর ক্ষতিকর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। তাই ভার্চুয়াল মিডিয়া, সোস্যাল মিডিয়া, মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদ'আতের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্কতা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন।
৯. বিদ'আতীদের সাথে আলোচনা-পর্যালোচনা ও বিতর্কে অংশগ্রহণ করতে হবে। পবিত্র কুরআনের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী উত্তম পন্থায় আলোচনাই বাঞ্ছনীয়।
১০. পুস্তক ও গ্রন্থ রচনার মাধ্যমে মানুষের সামনে বিদ'আত ও কুসংস্কারের স্বরূপ উন্মোচন করতে হবে। এ উদ্দেশ্যে স্যাটেলাইট চ্যানেল, ইন্টারনেট ওয়েবসাইট ও দাওয়াতি কার্যক্রম-যেখানে শুধু কুরআন-সুন্নাহর আদর্শ প্রচারিত হবে-বাস্তবায়িত করা কর্তব্য।
১১. সঠিক সুন্নাহ ও ইসলামি আদর্শ ধারণ ও লালন করার ক্ষেত্রে যারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে ও শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় দিবে, তাদের পুরস্কৃত করে সমাজের মধ্যে সম্মান ও গৌরবের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে হবে।
১২. যে সমস্ত জাতি ও সমাজের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে বিদ'আত ছড়িয়ে পড়েছে, মহামারি আকার ধারণ করেছে সেখানে ইসলামি ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা করে কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষা-দীক্ষার সুব্যবস্থা করতে হবে। ইসলামি আদর্শ, সংস্কার ও সংস্কৃতির ব্যাপক প্রচলন ঘটাতে হবে।
১৩. রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ ও আদর্শ বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে যে সমস্ত পদক্ষেপ ও উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে, তা বাস্তবায়নের জন্য আর্থিক ফান্ড গড়ে তুলতে হবে। যার সাহায্যে পুস্তক প্রকাশ করা হবে। স্যাটেলাইট চ্যানেল ও ইন্টারনেট ওয়েবসাইট খোলা হবে। এ ফান্ড থেকে দ্বীনের দায়ী ও ইসলামি শিক্ষায় নিয়োজিত শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ব্যয় করা হবে।
১৪. রাসূল ﷺ-এর এ হাদীসটি সবসময় মনে রাখতে হবে:

مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا، فَهُوَ رَدُّ

অর্থ: 'আমাদের আদর্শ সমর্থন করে না এমন কোনো কাজ যে করবে তা প্রত্যাখ্যাত বলে বিবেচিত হবে।' (মুসনাদে আহমাদ, ৪২/২৯৯)
১৫. কুরআন-সুন্নাহ হলো বিদ'আত, কুসংস্কার, আদর্শিক বিচ্যুতি ও ভ্রষ্টতা থেকে মুক্তির সোপান। তাই জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে কুরআন-সুন্নাহর বিধান আঁকড়ে থাকতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:

وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيلِهِ ذَلِكُمْ وَضَكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ﴾

অর্থ: 'আর এটাই আমার সঠিক সরল পথ, কাজেই তোমরা তার অনুসরণ কর, আর নানান পথের অনুসরণ করো না, করলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে। এভাবে তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যাতে তোমরা তাঁকে ভয় করে যাবতীয় পাপ থেকে বেঁচে চলতে পার।' (আনআম, ৬: ১৫৩)
১৬. যখন কারো কথা ও হিতোপদেশ শুনে, কারো আচারণ-বিচরণ দেখে বোধোদয় হয়-আমি তো ভুল-বিচ্যুতির পথে আছি, আমি তো বিদ'আত-কুসংস্কারে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছি তখন অহংকার ও গোঁড়ামির মানসিকতা পরিহার করে সত্য ও ন্যায়ের পথে ফিরে আসতে হবে। সহীহ সুন্নাহ ও আদর্শ ধারণ করতে হবে।
১৭. যারা ইসলামি জ্ঞান-গবেষণার প্রকৃত ধারক-বাহক তাঁদের সংস্পর্শে জ্ঞানার্জন করা কর্তব্য। শরীয়তের বিধি-বিধানসমূহের দলিল-প্রমাণ যথাযথভাবে বুঝতে হবে। কোনো প্রাসঙ্গিক বিষয়ে মতের অমিল হয়েছে বলে কিংবা আমার ভুল শুধরে দেওয়ার কারণে কাউকে অমূলকভাবে দোষারোপ করার মানসিকতা পরিহার করতে হবে।
১৮. বিদ'আতীদের তোষামোদ ও পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বিরত থাকতে হবে। বিদ'আতীদের সম্মান করা, বিদ'আত ও কুসংস্কারসংবলিত বই-পুস্তকের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করা, তাদের সমর্থনে মিথ্যা রটনা করা, বানোয়াট ও জোর-আপত্তি দাঁড় করানো-এ সমস্তই বিদ'আতীতের সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতার নামান্তর।
১৯. সবসময় সজাগ সচেতন থাকুন। আত্মমুগ্ধ হয়ে, নিজের প্রতি অতি আস্থাশীল হয়ে, নিজের কাজগুলোকে সুন্দর সুশোভিত করে দেখে আত্মঃপ্রতারণার শিকার হবেন না। কখনো কখনো নিজের কাজটিকে সঠিক ও যথার্থ বলে দৃঢ় বিশ্বাস হবে; কিন্তু আপনি হয়ত বাস্তবে ভুলের মধ্যে ডুবে আছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার বাণী স্মরণ রাখুন:

أَفَمَنْ زُيِّنَ لَهُ سُوءُ عَمَلِهِ فَرَاهُ حَسَنًا (فاطر: (৮)

অর্থ: তবে কি যার দৃষ্টিতে তার মন্দ কাজগুলো সুদৃশ্য করে দেখানো হয়েছে ফলে সে তার মন্দ কাজকে ভালো মনে করে (সে কি সৎকর্মশীল ব্যক্তির সমান হতে পারে?) (ফাতির, ৩৫: ৮)
২০. জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে রিয়া ও লৌকিকতা থেকে বিরত থেকে ইখলাস ও একনিষ্ঠতা অবলম্বন করতে হবে। কেননা রিয়া ও লৌকিকতা ব্যক্তিকে প্রচলিত পরিবেশ-পরিস্থিতির মর্জিমাফিক কাজ করতে প্ররোচিত করে। ফলে সে চারপাশের মানুষের মন জয় করতে গিয়ে সে শরীয়তের বিধি-নিষেধের ও বাধ্য-বাধকতার তোয়াক্কা করে না।
২১. একটি বিষয় দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে হবে-বিশ্বে প্রচলিত সমস্ত আদর্শ, সভ্যতা ও সামাজিকতা একটি নিরিখে যাচাই করা হবে। তা হলো পবিত্র কুরআন ও রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ।

পরিশিষ্ট:

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যম জাওযী (রহ.) (৬৯১-৭৫১ হি.) বলেছেন:
'যে বিষয়েই মনের ঝোঁক-প্রবণতা ও চাহিদা-বাসনা প্রাধান্য পাবে, বিষয়টির আগা-গোড়া বরবাদ করে ছাড়বে। তা এমনই মারাত্মক, জ্ঞান বিদ্যার সাথে মিশে তাকে বিদ'আত ও ভ্রষ্টতার পথে ধাবিত করে; জ্ঞানী ও বিদ্বান ব্যক্তিকে প্রবৃত্তিপূজারিতে পরিণত করে। যদি তা আল্লাহ তা'আলার ইবাদত ও আনুগত্যে প্রভাববিস্তার করতে পারে, তাহলে বান্দাকে লৌকিকতা ও প্রদর্শনবাদিতায় প্ররোচিত করে। আর যদি রাজ্যশাসনে মিশে যেতে পারে, গোটা শাসকশ্রেণিকে অন্যায় ও যুলুমের পথে ঠেলে দেয়।'

বিশিষ্ট সাহাবী আবু দারদা (রা.) বলেছেন:
'বিদ'আত পালনে বহু চেষ্টা মোজাহাদা করার চেয়ে যথার্থভাবে একটি সুন্নাহর অনুসরণই শ্রেয়। বিদ'আতের অনুগামী হওয়ার চেয়ে সুন্নতের অনুসারী হওয়া উত্তম। যতদিন রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ ও আদর্শ আঁকড়ে থাকবে আপনার দ্বারা কোনো ভুল-বিচ্যুতি হবে না।'

হাদীস শাস্ত্রের প্রখ্যাত ইমাম সুফিয়ান সাওরী (রহ.) (৯৭-১৬১ হি.) বলেছেন:
'ইবলিস শয়তানের কাছে নাফরমানির তুলনায় বিদ'আত অধিক পছন্দনীয়। কেননা নাফরমান বান্দা এক পর্যায়ে নিজের ভুল বুঝতে পারে। তওবা করে সৎপথে ফিরে আসে। কিন্তু একজন বিদ'আতী, সে তো নিজেকে সঠিক পথের অনুসারী বলে দাবি করে। তার তাওবা নসীব হবে কীভাবে?!'

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 ওয়াসওয়াসা ও শুচিবায়ু

📄 ওয়াসওয়াসা ও শুচিবায়ু


ওয়াসওয়াসা হলো, অতৃপ্ত ও অস্থির মনে অযৌক্তিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তার আচ্ছন্নতা। ওয়াসওয়াসার শিকার হয়ে মানুষ দোদুল্যমান ও অস্থিরচিত্ত হয়ে পড়ে। যত দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও সন্দেহ-সংশয় তাকে ঘিরে ধরে। প্রশান্তি ও স্বস্তির কোনো পথ সে খুঁজে পায় না।

ওয়াসওয়াসার ব্যাধির সবচেয়ে ভয়ানক ও আশঙ্কাজনক রূপটি হলো obsessive-compulsive disorder (অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসর্ডার)। সহজ বাংলায় যাকে বলা হয় “শুচিবায়ু”। চিকিৎসাশাস্ত্রে এটি একটি মানসিক ব্যাধি হিসেবে আখ্যায়িত। ব্যক্তি যখন এ রোগে আক্রান্ত হয় সময়ে সময়ে তার মনে নানা অযৌক্তিক অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তা-ভাবনা দানা বাঁধতে থাকে, যা তাকে প্রায়ই অস্থিরচিত্ত ও সংশয়গ্রস্ত করে রাখে। এমন পরিস্থিতিতে নিজের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। দ্বিধা-সংশয় তাকে সম্পূর্ণরূপে কাবু করে ফেলে।

শুচিবায়ুগ্রস্ত রোগী ঘুরে ফিরে একই কাজ বারবার করতে থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে একই চিন্তায় ঘুরপাক খেতে থাকে। এ সময় অন্য কোনো যৌক্তিক ও স্বতঃসিদ্ধ চিন্তা-ভাবনা তার দেমাগ মস্তিষ্কে কাজ করে না। সাধারণত অযু, গোসল, পবিত্রতা অর্জন, নামায ও এ জাতীয় ইবাদতের ক্ষেত্রে শুচিবায়ু রোগ দেখা দেয়। এমনকি ব্যক্তিগত গণ্ডির বাইরে সামাজিক ও সামগ্রিক ক্ষেত্রেও শুচিবায়ু প্রবল হতে পারে। ব্যক্তি তখন আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। চারপাশের মানুষ তার থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলে।

শুচিবায়ুগ্রস্ত রোগী কোনো ইবাদত সম্পন্ন করতে পারে না। কোনো কাজেই তৃপ্তিবোধ করে না। তার মানসিক অবস্থা প্রথমে হ্যালোসিনেশন, পর্যায়ক্রমে পাগলামিতে পরিণত হয়। কখনো কখনো পরিস্থিতি এতই গুরুতর হয়ে দাঁড়ায়, ভুক্তভোগী আত্মহত্যার পথে পা বাড়ায়।

তাই এ মানসিক সংকট থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে শুরুতেই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এর সঠিক সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।

সমাধান:
১. যে সমস্ত চিন্তা-ভাবনা আপনার মনে সংশয় ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে তা সমস্তই শয়তানের কারসাজি। শয়তান মানুষের স্বাভাবিক জীবন প্রবাহে বেঘাত ঘটাতে চায়। মানসিক প্রশান্তি ব্যাহত করতে চায়। তাই আপনি সবসময় প্রশান্ত ও স্থিরচিত্ত থাকুন। কোথাও স্থবির না হয়ে, পিছিয়ে না পড়ে সামনে অগ্রসর হোন। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। বিশ্বাস করুন, ওয়াসওয়াসা ও শুচিবায়ু রোগ খুব দ্রুত কেটে যাবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
﴿إِنَّمَا النَّجْوَى مِنَ الشَّيْطَنِ لِيَحْزُنَ الَّذِينَ آمَنُوا وَلَيْسَ بِضَارِهِمْ شَيْئًا إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ﴾ (المجادلة: ١٠)
অর্থ: 'গোপন পরামর্শ তো হল মুমিনরা যাতে দুঃখ পায় সে উদ্দেশ্যে কৃত শয়তানের কুমন্ত্রণা মাত্র। আর আল্লাহর অনুমতি ছাড়া সে তাদের কিছুই ক্ষতি করতে পারে না। অতএব আল্লাহরই ওপর মুমিনরা যেন তাওয়াক্কুল করে।' (মুজাদালা, ৫৮: ১০)

২. মনে যদি কোনো সন্দেহ-সংশয় দেখা দেয় তাহলে أَعُوْذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ পাঠ করে শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে আল্লাহ তা'আলার আশ্রয় গ্রহণ করুন। পবিত্র কুরআনের নির্দেশ:
﴿وَإِمَّا يَنْزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَنِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ إِنَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ﴾ (الأعراف: ٢٠٠)
অর্থ: 'আর যদি শয়তানের দিক থেকে কোন প্ররোচনা তোমাকে প্ররোচিত করে, তবে তুমি আল্লাহর আশ্রয় চাও। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।' (আরাফ, ৭: ২০০)
জেনে রাখুন, মনের এই দ্বিধা-সংশয়, অস্বস্তি ও অতৃপ্তি-সমস্তই শয়তানের মিথ্যা প্ররোচনা। রাসূলুল্লাহ ﷺ শয়তানের ব্যাপারে বলেছেন, كَذُوبُ (চরম মিথ্যাবাদী)।

৩. মনে রাখবেন, মনের দ্বিধা-দ্বন্দ্বের তাড়নায় কাজ করতে গিয়ে প্রকারান্তরে গুনাহের ভাগিদার হচ্ছেন। কেননা এতে আপনি শয়তানের কথায় কান দিচ্ছেন। তার কুমন্ত্রণার ফাঁদে পা দিচ্ছেন। পক্ষান্তরে আপনি যদি মনের সন্দেহ-সংশয় আমলে না নিয়ে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বেঁচে থাকতে পারেন, তাহলে একটি গুনাহ থেকে বেঁচে গেলেন। নিশ্চিত থাকুন, মনের খুঁতখুঁতে মানসিকতা আমলে না নেওয়ার কারণে আপনার ওযু, নামায ও ইবাদত-বন্দেগিতে কোনো ক্ষতি হবে না। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لَأُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا مَا لَمْ يَتَكَلَّمُوا أَوْ يَعْمَلُوا بِهِ».
অর্থ: আবু হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন, 'কথা বা কাজে পরিণত না করা পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা আমার উম্মাতের জন্য তাদের মনে কল্পনাগুলোকে মাফ করে দিয়েছেন।' (মুসলিম: ১/১১৬)

৪. সন্দেহ-সংশয় দূর করার জন্য দলিল-প্রমাণের সাহায্য গ্রহণ করুন। বিদ্যা-বুদ্ধি কাজে লাগান। বিদ্যা ও জ্ঞান হলো চলার পথে আলোকবর্তিকা স্বরূপ। তা সমস্ত সন্দেহ-সংশয় দূর করে দেয়। আপনার বিদ্যা-বুদ্ধির ভাণ্ডার যত সমৃদ্ধ হবে, বিবেক-বুদ্ধি যত প্রয়োগ করবেন, আপনার দেমাগ ও মস্তিষ্কে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও সন্দেহ সংশয়ের ছিদ্র-পথগুলো বন্ধ হতে থাকবে। শুচিবায়ু রোগ থেকে আপনার আরোগ্য ত্বরান্বিত হবে।

৫. সবসময় কোনো একটি ভালো কাজে ব্যস্ত থাকুন। কখনো অবসর সময় কাটাবেন না। অবসর হলো শয়তানের চারণভূমি। শয়তানের প্ররোচনার সুবর্ণ সুযোগ। জ্ঞানী, গুণী ও সজ্জনদের সংস্পর্শে থাকুন; কিংবা পরিবার ও বন্ধুজনদের সঙ্গে সময় কাটান। জীবনের কোলাহল ব্যস্ততা ছেড়ে কখনো একাকিত্ব ও নিঃসঙ্গতায় পড়ে থাকবেন না। কেননা শয়তান হলো নিঃসঙ্গতার পরম বন্ধু। এ সময় দেমাগ মস্তিষ্কে যত অযৌক্তিক অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তা-চেতনা বাসা বাঁধে। মার্কিন মনোবিজ্ঞানী উইলিয়াম জেমস বলেন, 'অবসর ও দ্বিধা-সংশয়ের ওপর কর্মব্যস্ততার ছুরি চালাও। চিকিৎসকগণ মানসিক রোগ থেকে সত্তর ভাগ আরোগ্য লাভের নিশ্চয়তা দিবে।'

৬. আপনার জীবনের সফল ইতিবাচক দিকগুলো সম্পর্কে ভাবুন। জীবনের সুখস্মৃতি ও সফল মুহূর্তগুলোর কথা চিন্তা করুন। এভাবে আপনার মন-মানসিকতাকে ইতিবাচক ও স্বস্তিদায়ক চিন্তা-ভাবনায় গড়ে তুলুন। দেমাগ ও মস্তিষ্ক হলো পাত্রতুল্য। উপকারী ও কার্যকর চিন্তা-চেতনায় আপনি তা পরিপূর্ণ করতে পারেন, আবার অনর্থক অযাচিত জল্পনা-কল্পনায় আকীর্ণ করে ফেলতে পারেন।

৭. কল্যাণকর ও ফলপ্রসূ উদ্যোগ আয়োজনে নিয়োজিত থাকুন। মন-মস্তিষ্ককে কর্মব্যস্ত রাখুন। যেন অযাচিত জল্পনা-কল্পনা ও দ্বিধা-সংশয় তাতে বাসা বাঁধতে না পারে। পূর্বের দৈনন্দিন রুটিন পরিবর্তন করে ফেলুন। নতুন একটি কর্মসূচি প্রস্তুত করুন। মসজিদে ওযু ও নামাযের স্থান পরিবর্তন করে ফেলুন। নির্দিষ্ট মসজিদে একই জায়গায় না থাকতে বিভিন্ন মসজিদে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে নামায আদায় করুন।

৮. শুচিবায়ু ও সংশয়প্রবণতার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। এর কারণে ভুক্তভোগী চরম মানসিক অস্থিরতা, দুশ্চিন্তা ও বিষণ্ণতার শিকার হয়। জীবনের মূল্যবান সময় ও সম্পদ নষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্বীন-ধর্মও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমন ভয়াবহ পরিণতির কথা চিন্তা করে শুচিবায়ুমুক্ত হওয়ার চেষ্টা করুন। জীবনের মূল্যবান সময় ও সম্পদ রক্ষায় যত্নবান হোন। দ্বিধা-সংশয়মুক্ত হয়ে দ্বীন-ধর্ম ও ইবাদতগুজারে সচেষ্ট হোন।

৯. সুসংবাদ গ্রহণ করুন, শয়তানের প্ররোচনা ও সংশয়প্রবণতা সৃষ্টির বিরুদ্ধে আপনার চেষ্টা-প্রচেষ্টা ও প্রতিশ্রুতিশীল মানসিকতা "মোজাহাদা” হিসেবে গণ্য হবে। আপনি বিরাট প্রতিদানের হকদার হবেন। এর স্বপক্ষে ওলামায়ে কেরামের সুস্পষ্ট স্বীকৃতি বিদ্যমান। তাছাড়া যারা প্রকৃত মুমিন বান্দা তাদের বিরুদ্ধেই শয়তানের যত প্ররোচনা। কিন্তু যারা পাপাচারী, কাফের তাদের বিষয়ে শয়তান নিশ্চিন্ত ও দায়িত্বমুক্ত। জনৈক মনীষী যথার্থ বলেছেন, 'বিরান বাড়ি, চোর তো সেদিকে ফিরেও তাকায় না।'

১০. যেকোনো কাজ কিংবা ইবাদত শুরু করুন-না-কেন, তা শয়তানের ধোঁকা ও প্ররোচনার বিরুদ্ধে জিহাদের শামিল। তা শেষ করে তবেই ক্ষান্ত হোন। অনবরত কাজ করার প্রচেষ্টাই আপনার মনের খুঁতখুঁতে প্রবণতা দূর করে দিবে। আত্মবিশ্বাসী হোন। আল্লাহর ওপর ভরসা করুন।

১১. মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে নরম কাদামাটি থেকে দুর্বল করে। আর শয়তানের সৃষ্টি হয়েছে প্রবল আগুন থেকে। কিন্তু মানুষের ইচ্ছাশক্তি ও প্রতিজ্ঞাবলের সামনে শয়তানের প্ররোচনা নিতান্তই ঠুনকো দুর্বল। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
إِنَّ كَيْدَ الشَّيْطَانِ كَانَ ضَعِيفًا (النساء: ٧٦)
অর্থ: 'শয়তানের ষড়যন্ত্র নিশ্চয়ই দুর্বল।' (নিসা, ৪: ৭৬)

১১. একনিষ্ঠ আনুগত্য ও ইবাদত আপনার মনের সমস্ত অযৌক্তিক অনাকাঙ্ক্ষিত সন্দেহ-সংশয় দূর করে দিবে। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ (يوسف : ٢٤)
অর্থ: 'আমি তা দেখিয়েছিলাম তাকে অসৎ কর্ম ও নির্লজ্জতা থেকে সরিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে, সে ছিল বিশুদ্ধ-হৃদয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।'
সুতরাং মসজিদে জামাতের সাথে পাঁচওয়াক্ত নামায নিয়মিত আদায় করুন। আল্লাহর দরবারে বেশি বেশি দু'আ করুন। যিকির তিলাওয়াতে যবান সতেজ রাখুন। আপনার মন অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তা-ভাবনা ও মানসিক অস্থিরতামুক্ত থাকবে। সকাল-সন্ধ্যার মাসনূন যিকির ও দু'আ নিয়মিত পাঠ করুন। তা আপনার জন্য মজবুত রক্ষাকবচ। 'সূরা ফালাক' ও 'সূরা নাস' বেশি বেশি পাঠ করুন। সুন্নত হিসেবে প্রমাণিত যিকির ও দু'আ পাঠ করুন। শুচিবায়ু-রোগমুক্ত হওয়ার জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকর আমল।

১২. দ্বিধা-সংশয় ও শুচিবায়ু রোগের ক্ষেত্রে আপনাকে সচেতন ও সাহসী হতে হবে। অন্যথায় প্রশ্রয় পেয়ে শয়তান আপনার প্রতি প্রলুব্ধ হবে। তার ওয়াসওয়াসা ও প্ররোচনার ঝাঁপি খুলে আপনার ওপর জেঁকে বসবে। তাই ওয়াসওয়াসা এড়িয়ে কাজে মনোযোগী হোন। শয়তানকে আপনার মানসিক শক্তি ও প্রবল ইচ্ছাশক্তি দেখিয়ে দিন।

১৩. গভীর চিন্তাশীল দৃষ্টিতে পবিত্র কুরআন পাঠ করুন। তাতে রয়েছে এমনসব দিকনির্দেশনা ও দলিল-প্রমাণ যা আপনাকে স্বস্তি ও প্রশান্তির স্বাদ দিবে।

১৪. দুঃখ-বেদনার মুহূর্তে মনের মধ্যে শুচিবায়ু ও সংশয়প্রবণতা দানা বাঁধে, আবার হাসি-আনন্দের সময় তা স্তিমিত হয়ে যায়। তাই যাবতীয় দুঃখ-বেদনার কার্যকারণগুলো এড়িয়ে হাসি আনন্দে উজ্জীবিত থাকুন। আপনার হাসি-আনন্দ ও উৎফুল্লতাই শয়তানকে নিরাশ করে দিবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন:
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَنِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُمْ مُبْصِرُونَ ﴾ [الأعراف: ٢٠١]
অর্থ: 'নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়।' (আরাফ, ৭: ২০১)

১৫. জনৈক সুফী-সাধক শুচিবায়ু রোগের একটি কার্যকর প্রতিষেধক বাতলে দিয়েছেন: 'নির্দিষ্ট কোনো ইবাদতে মশগুল হওয়া, কুরআন হিফজ করা, দ্বীনি ইল্ম চর্চা করা ইত্যাদিতে প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা গড়ে তুলুন। প্রতিযোগিতা হতে পারে আপনার স্বজন-বন্ধুজন, সহকর্মী কিংবা সহপাঠীদের সঙ্গে। এভাবে আপনার প্রতিদিনের জীবন যখন ব্যস্ত ও কর্মমুখর হয়ে উঠবে, মনের মধ্যে সন্দেহ ও সংশয়প্রবণতা বাসা বাঁধার সুযোগ পাবে না।'

১৬. হাঁটা-চলা ও সাঁতার কাটার মতো প্রতিদিনের সহজাত শরীরচর্চায় অভ্যস্ত হোন। নিয়মিত ব্যায়াম করুন। ভালো হয় যদি প্রাণোচ্ছল, হাস্যবদন ও আশাবাদী বন্ধুজনদের সঙ্গে শরীর চর্চা করতে পারেন। পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে বিচিত্র দর্শনীয় স্থানে বেড়াতে যান।

১৭. শুচিবায়ু রোধে রাসূল ﷺ-এর আদর্শই হলো শ্রেষ্ঠ প্রতিষেধক। মনের দ্বিধা-সংশয়ের সাথে তাল না-মিলিয়ে শয়তানের প্ররোচনা থেকে বেঁচে থাকুন। আল্লাহ তা'আলার বড়ত্ব ও মহত্ত্বসংবলিত যিকির ও দু'আ এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি দরূদ পাঠে মশগুল থাকুন।

১৮. চারপাশের অসৎসঙ্গ বর্জন করে সৎ, নীতিবান ও জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শে থাকুন। সংশয়প্রবণতা ও শুচিবায়ুর দুর্দশায় তারাই হবেন আপনার সুপরামর্শক। সংশয়প্রবণ মানসিকতা দূর করে আপনার জীবনকে উচ্ছল প্রাণবন্ত করতে তারা হবেন আপনার সহযোগী বন্ধু।

১৯. অবসর যাপন থেকে বেঁচে থাকুন। অবসর হলো দ্বিধা-সংশয়ের উর্বরভূমি। অবসরে কোনো প্রশিক্ষণমূলক কার্যক্রম কিংবা জনহিতকর উদ্যোগে অংশগ্রহণ করুন।

২০. যে সমস্ত পাঠ অধ্যয়ন ও দর্শনের বিচার-বিশ্লেষণ আপনার মনে সংশয় সৃষ্টি করে, তা থেকে বিরত থাকুন। এছাড়াও স্বভাবজাত কিছু কাজ আছে, যা আপনাকে সন্দেহপ্রবণ করে তুলবে। যেমন: চার পাশের সমাজ ও মানুষের প্রতি নেতিবাচক ধারণা, স্বামী স্ত্রীর কিংবা স্ত্রী স্বামীর মোবাইল চেক করা, মানুষের দোষ খুঁজে বেড়ানো ইত্যাদি। এ সমস্ত প্রবণতা থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করুন।

২১. শুচিবায়ুগ্রস্ত ব্যক্তির মধ্যে সন্দেহ-সংশয়ের নেতিবাচক প্রভাব ও ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। গুরুত্ব দিয়ে বোঝাতে হবে যে, সাইক্রিয়াটিস্ট ও মনোবিদ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া লজ্জাজনক কিছু নয়। সেবাদানকারীদের প্রতি নির্দেশ থাকবে, তারা যেন সংশয়গ্রস্ত রোগীদের সাথে সদয় ও কোমল আচরণ করে। ধারাবাহিক আলোচনা-পর্যালোচনার মাধ্যমে সংশয়-প্রবণ মানসিকতা দূর করে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে হবে।

২২. সন্দেহ-সংশয় দূর করার জন্য দৃঢ় প্রত্যয় ও সুনিশ্চয়তার সাথে 'না' শব্দটিকে ব্যবহার করুন। ওযু করেছেন, শয়তান আপনার মনে সন্দেহ জাগাবে-ওযু পুরোপুরি হয়নি, কিছু একটা বাকি রয়েছে। আপনি বলুন, 'না', আমার ওযু যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ হয়েছে। অবচেতন মনে শয়তান যদি এমন সন্দেহ সৃষ্টি করে-আপনি তো স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন। আপনি বলুন, 'কখনো না, হতেই পারে না।' শয়তান যদি মনের মধ্যে এ প্ররোচনা ঢুকিয়ে দেয়-আপনার সন্তান বিপদে পড়েছে। আপনি দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে বলুন, 'না, আল-হামদুলিল্লাহ, সে খুব ভালো আছে। আল্লাহ তার পরম রক্ষণা-বেক্ষণকারী।' যদি এমন সংশয় সৃষ্টি করে-আপনার নামায হয়নি। আপনি বলুন, 'না, আমার নামায ত্রুটিমুক্ত ও পূর্ণাঙ্গ হয়েছে।' এভাবে দৃঢ়প্রত্যয় ও আত্মবিশ্বাসের সাথে জীবনের প্রতিটি কাজ সম্পন্ন করুন।

২৩. সর্বশেষ আপনার প্রতি আমার উপদেশ হলো, দ্বিধা-সংশয়ের পরওয়া না করে প্রশান্তচিত্ত হোন। নির্বিঘ্নে জীবনযাপন করুন। মহান আল্লাহ তা'আলার তাওফিক কামনা করুন এবং তাঁরই ওপর ভরসা করুন। শয়তান আপনার পিছু লেগে থাকে, আপনার মনে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করার কাজে মত্ত থাকে। এতেই প্রমাণিত হয় আপনার ঈমান পরিপক্ক। আপনার ঈমানী বলে শয়তান শঙ্কিত। সুতরাং, নিজের ঈমানী বলপ্রয়োগ করুন, শয়তানের প্ররোচনা নিষ্ফল করে দিন।

পরিশিষ্ট:
* চাক্ষুষ দলিল-প্রমাণের আলোকে দ্বিধা-সংশয় দূর করে অগাধ বিশ্বাস লাভের ঘটনাটি ঘটেছে তাওহিদ ও একত্ববাদের দীক্ষার প্রাণপুরুষ ইবরাহিম (আ.)-এর ক্ষেত্রে। তিনি আল্লাহ তা'আলার নিকট আরজ করলেন:
﴿رَبِّ أَرِنِي كَيْفَ تُحِيِي الْمَوْتَى﴾ [البقرة: ٢٦٠]
অর্থ: 'হে আমার রব! আমাকে দেখান, কীভাবে আপনি মৃতদের জীবিত করে তুলেন।' (বাকারা, ২: ২৬০)
তাঁর রব জিজ্ঞেস করলেন: ﴿أَوَلَمْ تُؤْمِنْ﴾ [البقرة: ٢٦٠] অর্থ: 'তবে কি তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না?' (বাকারা, ২: ২৬০) তিনি বললেন: ﴿بَلَى وَلَكِنْ لِيَطْمَئِنَّ قَلْبِي﴾ [البقرة: ٢٦٠] অর্থ: 'বিশ্বাস তো হয়েছে। কিন্তু মনের প্রশান্তির জন্য (বলছি)।' (বাকারা, ২: ২৬০)
এরপর আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে তিনি চারটি পাখি আনলেন। পাখিগুলোকে টুকরো টুকরো করে চারটি পাহাড়ের চূড়ায় উঠে শূন্যে উড়িয়ে দিলেন। বাতাসের তোড়ে পাখির টুকরোগুলো মুহূর্তেই চারপাশে মিলিয়ে গেল। ইবরাহিম (আ.) চার পাহাড়ের কেন্দ্রে এসে দাঁড়ালেন। উঁচু আওয়াজে পাখিগুলোকে ডাকলেন। আল্লাহ তা'আলার অপার কুদরতে প্রতিটি পাখি নিজ আকৃতিতে ফিরে এলো। হযরত ইবরাহিম (আ.) বিস্ময় ভরে দেখলেন, প্রতিটি পাখি অবিকল আগের মতোই পূর্ণাঙ্গ অবয়ব ধারণ করে ফিরে এসেছে। তিনিও হৃদয়াত্মা জুড়ে আস্বস্তি ও প্রশান্তির শীতলতা অনুভব করলেন। আপন রবের প্রজ্ঞা, ক্ষমতা ও শক্তিমত্তার প্রতি অগাধ বিশ্বাসে সমৃদ্ধ হলেন।

কবি বলেন: 'জীবনের বিচিত্রময় বহু লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের পিছনে ছুটে এখন নিজেই দিশেহারা। তার জীবনের নেই কোনো সফলতা, নেই ব্যর্থতা।'

সহিহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, সাহাবায়ে কেরাম রাসূল ﷺ-এর দরবারে এসে আরজ করলেন, 'ঈমানের বিষয়ে তাঁদের মনে কখনো-কখনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাজ করে।' রাসূল ﷺ বললেন: "ذَلِكَ مَحْضُ الْإِيمَانِ". (مسند إسحاق بن راهويه) ٣ / ١٠٢٢ অর্থ: 'এটাও ঈমানের অংশ।'
অর্থাৎ, মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই শয়তানের প্ররোচনা ও দ্বিধা-সংশয় সৃষ্টি হবে। এ জাতীয় সন্দেহ-সংশয়কে ঘৃণা করা, তা থেকে বাঁচার জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করাই হলো ঈমানের পরিচায়ক।

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 রিয়া ও লৌকিকতা

📄 রিয়া ও লৌকিকতা


রিয়া ও লৌকিকতা হলো আল্লাহ তা'আলার প্রতিদান ও শাস্তির পরোয়া না করে, লোকসমাজে প্রশংসা ও সুখ্যাতি লাভের উদ্দেশ্যে আমল করা এবং নিজের যতো বৈশিষ্ট্য ও যোগ্যতা জাহির করা।
(الرِّيَاءُ) রিয়া শব্দটি الرُّؤْيَةُ থেকে এসেছে। রিয়া হলো লোক-দেখানোর উদ্দেশ্যে কাজ করা। আর ইখলাস হলো একমাত্র আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমল করা। সুতরাং রিয়া ও ইখলাস একটি অপরটির বিপরীত, একটি অপরটির সাথে সংঘর্ষিক।

রিয়াকারী তার কাজকর্মে ও উদ্দেশ্যে দোদুল্যমান দ্বিধা-দ্বন্দ্বগ্রস্ত। তার চিন্তা-চেতনা ও মন-মানসিকতা পরিশুদ্ধ নয়, অসুস্থ চিত্ত। জনসম্মুখে উদ্যমী কর্মতৎপর, আর লোকচক্ষুর অন্তরালে অলস অকর্মা। একটু প্রশংসাতেই খুশিতে টগমগ হয়ে উঠে। সামান্য নিন্দার মুখে হতাশায় ভেঙে পড়ে। কেননা তার পরম কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য হলো লোকমুখে প্রশংসিত হওয়া। সমাজের চোখে শ্রদ্ধা ও মর্যাদার পাত্র হওয়া। পরকাল ও আখেরাত সম্পর্কে তার কোনো চিন্তা-ফিকির নেই। আল্লাহ তা'আলার দরবারে হিসেব-নিকেশের কোনো পরোয়া নেই।

কোনো ভালো কাজ করতে হলে জনসম্মুখে করে। কোনো নেক আমল করলে মানুষের কাছে তার কথা ছড়িয়ে বেড়ায় খ্যাতি ও সম্মান লাভের আশায়। তার যাবতীয় কাজকর্ম ও উদ্যোগ-আয়োজন সৃষ্টিকে দেখানোর জন্য; স্রষ্টার সন্তুষ্টি লাভের জন্য নয়। চারপাশের সমাজ ও মানুষের বাহ্যিক ক্ষমতা শক্তিমত্তা ও চাকচিক্যতেই সে মুগ্ধ। মহান রব ও স্রষ্টার সৃষ্টিশীলতা ও সর্বময় ক্ষমতা তার মনে দাগ কাটে না। তাই সে স্রষ্টাকে ছেড়ে সৃষ্টির পেছনে ছোটে। মহান আল্লাহ তা'আলার পুরস্কার ও তিরস্কারের পরোয়া না করে সৃষ্টির মুখে প্রশংসার পালিশে খুশি হয়।

রিয়াকারী যতো ভালো কাজই করুক-না-কেন, এর বিনিময়ে পরকালে সে কোনো পুরস্কার পাবে না। তার ভাগ্যে জুটবে শুধু তিরস্কার ও ভর্ৎসনা। কেননা আল্লাহ তা'আলা শুধু বান্দার এমন আমল কবুল করেন, যা রিয়া ও লৌকিকতামুক্ত। যাতে লোক দেখানো ও প্রদর্শনবাদিতার কোনো ছাপ থাকে না।

নিজেদের জীবনকে সুন্দর সাবলীল করে তোলার জন্য, আমলের প্রতিদান লাভের জন্য এবং পরকালের সফলতা লাভের উদ্দেশ্যে অবশ্যই আমাদের লৌকিকতামুক্ত হতে হবে। কিন্তু তার উপায় কী? এ ক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কী?

সমাধান:
১. চিন্তা করে দেখুন, আল্লাহ তা'আলা কতো মহান সত্তা, আর আপনি কতো নগণ্য বান্দা। একবার ভেবে দেখুন, আল্লাহ তা'আলার সাথে আপনার সম্পর্কের ভিত্তি কী? এ সম্পর্কের মহত্ত্ব ও তাৎপর্য উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন। সমাজ ও মানুষের সাথে আপনার সম্পর্ক কীসের? এ সম্পর্কের ক্ষুদ্রতা ও ক্ষণস্থায়িত্ব মনে রাখুন। চূড়ান্তে গিয়ে আপনাকে একক অদ্বিতীয় মহান সত্তার সামনেই দাঁড়াতে হবে।

২. সবসময় মনে রাখুন, মুশরিক, রিয়াকারী ও প্রদর্শনবাদী লোকদের সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
﴿وَقَدِمْنَا إِلَى مَا عَمِلُوا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْتُهُ هَبَاءً مَنْثُورًا﴾ [سورة الفرقان: ٢٣]
অর্থ: তারা (দুনিয়ায়) যা কিছু আমল করেছে, আমি তার ফায়সালা করতে আসব এবং সেগুলোকে শূন্যে বিক্ষিপ্ত ধুলোবালি (এর মত মূলহীন) করে দিব। (ফুরকান, ২৫: ২৩)

৩. রিয়া ও লৌকিকতার খোলসমুক্ত হয়ে আল্লাহ তা'আলার তাওফীক ও সাহায্য প্রার্থনা করুন। সাহায্য প্রার্থনার সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা হলো ধৈর্য, অবিচলতা ও সালাত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلوةَ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّبِرِينَ﴾ [البقرة: ١٥٣]
অর্থ: হে মুমিনগণ! সবর ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবরকারীদের সাথে আছেন। (বাকারা, ২: ১৫৩)

৪. স্রষ্টার সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক, বাকি সৃষ্টির সঙ্গে যাবতীয় সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং তাদের থেকে নির্মুখাপেক্ষী করে। এ পর্যায়ে উপনীত হয়ে ব্যক্তি সমাজ ও লোকমুখের প্রশংসাবিমুখ হয়ে মহান রবের সন্তুষ্টি প্রত্যাশী হয়ে উঠে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
﴿فَإِن تَوَلَّوْا فَقُلْ حَسْبِيَ اللهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ﴾ (التوبة: ١٢٩)
অর্থ: তারপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে (হে রাসূল! তাদেরকে) বলে দাও, আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তিনি ছাড়া কোনও মাবুদ নেই। তারই উপর আমি ভরসা করেছি এবং তিনি মহা আরশের মালিক। (তাওবা, ৯: ১২৯)

৫. যে সমস্ত নেক আমল প্রকাশ্যে কিংবা জামাতবদ্ধ হয়ে পালন করা আবশ্যক নয় তা একান্তে নির্জনে সম্পন্ন করুন। আর প্রকাশ্যে জামাতবদ্ধ হয়ে অবশ্যপালনীয় কাজগুলো ইখলাস ও একনিষ্ঠতার সাথে পুরা করুন।

৬. মনে রাখুন, আপনি সর্বদা আল্লাহ তা'আলার তত্ত্বাবধানে ও নিবিড় পর্যবেক্ষণে আছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
﴿إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا ﴾ [النساء : ١]
অর্থ: 'নিশ্চিত জেনো রেখ, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের উপর লক্ষ্য রাখছেন।' (নিসা, ৪: ১)

৭. হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: أَنَا خَيْرُ الشُّرَكَاءِ، مَنْ عَمِلَ لِي عَمَلًا أَشْرَكَ فِيهِ غَيْرِي فَأَنَا بَرِيءٌ مِنْهُ، وَهُوَ لِلَّذِي أَشْرَكَ" (مسند أحمد مخرجا ٣٨٢/١٥) অর্থ: 'শরীকদের মধ্যে আমিই সর্বশ্রেষ্ঠ। যে ব্যক্তি কোনো আমল করে এবং তাতে আমার সাথে অন্যকে শরীক করে, আমি তার আমল থেকে দায়মুক্ত। সে যে শরীক করেছে, আমলটি তার জন্য সাব্যস্ত হবে।' (মুসনাদে আহমাদ: ১৫/৩৮২) রাসূল ﷺ-এর এ বাণীটিও স্মরণ রাখুন: عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: "مَنْ سَمَّعَ سَمَّعَ اللَّهُ بِهِ وَمَنْ رَاءَى رَاءَى اللَّهُ بِهِ". (صحيح المسلم برقم: ٧٣٦٦) অর্থ: ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি জনসম্মুখে প্রচারের ইচ্ছায় নেক আমল করে আল্লাহ তা'আলাও তার কৃতকর্মের অভিপ্রায়ের কথা লোকদেরকে জানিয়ে ও শুনিয়ে দিবেন। আর যে ব্যক্তি লৌকিকতার উদ্দেশ্যে কোন নেক কাজ করে, আল্লাহ তা'আলাও তার প্রকৃত উদ্দেশ্যের কথা লোকেদের মাঝে ফাঁস করে দিবেন।' (মুসলিম, হাদীস নং: ৭৩৬৬)

৮. নিজেকে একবার জিজ্ঞাসা করুন, যাদের আপনি নিজের কর্ম-কীর্তি দেখিয়ে বেড়াচ্ছেন, যাদের সামনে নিজের যোগ্যতা ও সামর্থ্যের প্রদর্শনী করছেন, তারা কে? তারা না আপনাকে সৃষ্টি করেছে, না আছে তাদের এক মুঠো রিযিক দানের সামর্থ্য। তাদের না আছে ক্ষমা করার যোগ্যতা, না আছে আরোগ্য দানের ক্ষমতা। জীবন দান করা, মৃত্যু দেওয়া এবং পরকালে আমলনামার হিসাব গ্রহণ করা-এসব কিছুই তাদের মানবিক ক্ষমতার বহু ঊর্ধ্বে।

৯. আপনি একজন মানুষ। আপনাকে দুর্বল করে সৃষ্টি করা হয়েছে। যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনি মহা পরাক্রমশালী, মহা প্রজ্ঞাবান। তিনিই আপনাকে রিযিক দান করেন। যাবতীয় বিপদ-আপদ থেকে উদ্ধার করেন। সুস্থতা-অসুস্থতা, জীবন-মৃত্যু-এসবের চাবিকাঠি তাঁরই হাতে। এমন মহান প্রতিপালকের সন্তুষ্টি অর্জন বাদ দিয়ে দুর্বল মরণশীল মানবজাতিকে খুশি করার জন্য জীবনভর কাজ করে যাবেন, সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি কখনো তা সমর্থন করবে না।

১০. একটিবার কি ভেবে দেখেছেন, জীবনের মতো নামায-রোযা, দান-সদকা, ইলম চর্চা ও জ্ঞান সাধনা-সমস্তই বরবাদ হয়ে যাবে; গোটা জীবনের শ্রম-সাধনা পণ্ড শ্রমে পরিণত হবে, শুধু রিয়া ও লৌকিকতার কারণে।

১১. রিয়ামুক্ত থাকার জন্য সবসময় এ দু'আটি পাঠ করুন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُ بِكَ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ وَأَنَا أَعْلَمُ، وَأَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لَا أَعْلَمُ.
অর্থ: 'হে আল্লাহ সজ্ঞানে শিরক করা থেকে আপনার পানাহ্ চাই। যা না জেনে, না বুঝে করছি, তার জন্য ক্ষমা চাই।'

১১. মনে রাখুন, যে মানুষ নিজেই নিজের উপকার করতে পারে না, নিজেকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারে না, সুস্থতা-অসুস্থতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, জীবন-মৃত্যুর কর্তৃত্ব রাখে না, সে কীভাবে আপনার উপকার ও কল্যাণ সাধন করতে পারে?! তাকে মানানোর জন্য, খুশি করার জন্য নিজেকে প্রদর্শন করার এবং কল্যাণমুখী উদ্যোগ-আয়োজনে ব্যস্ত থাকার কী অর্থ হতে পারে?!

১২. কাল কেয়ামতের ময়দানে কতো জ্ঞানী-গুণী, কতো সাধক পুরুষ শুধু রিয়ার কারণে তাদের জ্ঞানচর্চা ও সাধনার প্রতিদান থেকে বঞ্চিত হবে। কতো সংস্কারক ও সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব আমৃত্যু সংস্কারকার্য ও সংগ্রামের পুরস্কার-বঞ্চিত হয়ে তিরস্কার ও ভর্ৎসনার শিকার হবে, শুধু লৌকিকতার কারণে।
তাই প্রতিটি কাজের আগে নতুনভাবে নিয়ত করুন। নিয়তকে শুদ্ধ-পরিশুদ্ধ করুন। প্রতিটি কাজ একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য করুন। রিয়া ও লৌকিকতা থেকে সদা সতর্ক থাকুন।

পরিশিষ্ট:
বিশ্ববিখ্যাত গ্রিক বিজ্ঞানী ও দার্শনিক এরিস্টটল বলেছেন: 'ইহকালীন জীবনে পূর্ণ সম্মান ও মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকতে হলে আপনার জন্য সংক্ষিপ্ত পথটি হলো, আপনার ভেতর-বাহির এক হওয়া।'

ইসলামী খেলাফতের চতুর্থ খলীফা, আলী ইবনে আবু তালেব (রা.) বলেছেন: 'লৌকিক ও প্রদর্শনবাদী লোকের আলামতগুলো হলো, নির্জনে একাকীত্বে সে অলস অকর্মা থাকবে। আর জনসম্মুখে সর্বকর্মা হয়ে আত্মপ্রকাশ করবে। আত্মপ্রশংসায় খুশিতে আটখানা হয়ে কাজের গতি বাড়িয়ে দিবে। একটু নিন্দা ও বদনামে ভেঙে পড়বে।'

টিকাঃ
২৫. তাঁকে প্রাণীবিজ্ঞানের জনক বলা হয়। এছাড়া প্লেটোর সাথে যৌথভাবে তাঁকে "পশ্চিমা দর্শনের জনক” বলে অভিহিত করা হয়। এরিস্টটল সক্রেটিস ও প্লেটোর দর্শনসহ তাঁর পূর্বের সময়ের বিদ্যমান বিভিন্ন দর্শনের জটিল ও সদৃশ সমন্বয় দেখান। জন্ম খৃস্টপূর্ব ৩৮৫। মৃত্যু খৃষ্টপূর্ব ৩২৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00