📄 অবৈধ সম্পর্ক
নারী-পুরুষের মাঝে আল্লাহ তা'আলা যে পবিত্র সম্পর্কের বিধান দিয়েছেন, তা হলো বৈবাহিক সম্পর্ক। এর বাইরে যত ধরনের সম্পর্ক প্রচলিত আছে, তা সবই নিষিদ্ধ ও অবৈধ সম্পর্ক। প্রথম পরিচয় থেকে শুরু করে কথাবার্তা, আন্তরিকতা, সহাবস্থান করা পর্যায়ক্রমে যিনা ও ব্যভিচারের দিকে ধাবিত হওয়া-এর প্রত্যেকটিই অবৈধ সম্পর্কের দোষে দুষ্ট। আর যে অবৈধ প্রেম-ভালোবাসার উদগ্র বাসনা তরুণ সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে, তার কবলে প্রেমিক-প্রেমিকা হিস্ট্রিয়াগ্রস্ত ও মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে।
প্রকৃত মুসলিম নর-নারী কখনো অবৈধ সম্পর্কে জড়াতে পারে না। কেননা কুরআন-হাদীসে কঠোরভাবে অবৈধ সম্পর্ককে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শরীয়তের দৃষ্টিতে তা জঘন্য কবিরা গুনাহ। তবে বৈবাহিক সম্পর্ক ও বিবাহের আগে পাত্রী দেখা-এ দু'টি বিষয় শরীয়তসম্মত। এর বাইরে নারী-পুরুষের যত সম্পর্ক বিদ্যমান, তার যত উপসর্গ রয়েছে- সবই অবৈধ ও নিষিদ্ধ।
নারী-পুরুষের অবৈধ সম্পর্ক সমাজে চারিত্রিক নষ্টাচার, পাপাচার ও অশ্লীলতা ছড়ায়। পিতা-পুত্রের বংশীয় সম্পর্ক, বৈবাহিক প্রথা ও পারিবারিক অবকাঠামো ধ্বংস করে। এর কারণে নারীর ইজ্জত-আবরু চরম অনিশ্চয়তার শিকার হয়। সামাজিক ও মানবিক উন্নতি-উগ্রগতি ধ্বংসের মুখে পড়ে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে উভয় শ্রেণির মাঝে আইবুড়োত্বের সমস্যা চরম আকার ধারণ করে। গোটা সমাজ আল্লাহ তা'আলার ক্রোধের পাত্রে পরিণত হয়; আসমানি আযাবের হুমকির সম্মুখীন হয়।
তাহলে এ জটিল সমস্যার সমাধান কী? এ সংকট থেকে উত্তরণের পথ কী?
সমাধান:
১. আল্লাহকে ভয় করুন, যিনি সর্বজ্ঞ, যিনি জানেন চোখের অপব্যবহার এবং আপনার মনের যত গোপন বিষয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার এ বাণী স্মরণ রাখুন:
﴿مَا يَكُونُ مِنْ نَّجْوٰى ثَلٰثَةٍ اِلَّا هُوَ রَابِعُهُمْ وَلَا خَمْسَةٍ اِلَّا هُوَ سَادِسُهُمْ وَلَاۤ اَدْنٰى مِنْ ذٰلِكَ وَلَاۤ اَكْثَرَ اِلَّا هُوَ مَعَهُمْ اَيْنَ مَا كَانُوْا ﴾ [المجادلة: ٧]
অর্থ: 'তারা যেখানেই থাকুক না কেন, তিনি তাদের সাথে আছেন।' (মুজাদালা, ৫৮: ৭)
মন যদি কোনো অবৈধ কাজে প্ররোচিত হয়, তবে মনে রাখবেন, আল্লাহ আপনাকে দেখছেন। আপনি নাফরমানিতে লিপ্ত, এমতাবস্থায় আপনার রব আপনাকে দেখছেন। সুতরাং তাঁকেই ভয় করুন। তাঁকেই লজ্জা করুন। ভয় ও লজ্জা করার জন্য তিনিই অধিক উপযুক্ত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿يَسْتَخْفُوْنَ مِنَ النَّاسِ وَلَا يَسْتَخْفُوْنَ مِنَ اللّٰهِ وَهُوَ مَعَهُمْ اِذْ يُّبَيِّتُوْنَ مَا لَا يَرْضٰى مِنَ الْقَوْلِ وَكانَ اللّٰهُ بِمَا يَعْمَلُوْنَ مُحِيْطًا﴾ [النساء: ١০৮]
অর্থ: 'তারা মানুষ থেকে তো লজ্জা করে; কিন্তু আল্লাহ থেকে লজ্জা করে না, অথচ তারা রাতের বেলা যখন আল্লাহর অপছন্দনীয় কথা বলে, তখনও তিনি তাদের সঙ্গে থাকেন। তারা যা-কিছু করছে, তা সবই আল্লাহর আয়ত্তে।' (নিসা: ১০৮)
২. সোস্যাল মিডিয়ার উপর নজরদারি বজায় রাখতে হবে। চরিত্র বিধ্বংসী ওয়েবসাইটগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। পারিবারিকভাবে সন্তানদেরকে সযত্ন তত্ত্বাবধান করতে হবে। সন্তানরা একান্ত সময়গুলো কীভাবে কাটাচ্ছে, অবসরে কী ধরনের বইপুস্তক পড়ছে, ইন্টারনেটে কোন ওয়েবসাইটগুলো তাদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু- প্রতিটি বিষয়ই অত্যন্ত সচেতনতার সাথে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। লেখাপড়া ও অধ্যবসায় তাদেরকে অনুপ্রাণিত করে তুলতে হবে।
৩. সন্তানদেরকে প্রকৃত ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর গড়ে তুলতে হবে। তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে পাশাপাশি থাকতে হবে। এর মাধ্যমে প্রধানত দুটি উপকার হবে: এক. সন্তানরা কী ধরনের পরিবেশ-পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে, মন-মানসিকতায় কী ধরনের চিন্তা-চেতনা লালন করছে, তাদের আবেগ-উদ্দীপনা কোন দিকে ধাবিত হচ্ছে, অভিভাবকগণ তা সহজেই অনুধাবন করতে পারবেন। দুই. সন্তানরা জীবনের পদে পদে সমস্যা ও প্রতিকূলতার মুখে সাধারণত অনভিজ্ঞ বন্ধুদের অপরিণামদর্শী সমাধানের দ্বারস্থ হয়। কিন্তু পিতা-মাতা ও অন্যান্য অভিভাবকদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কারণে এখন নিঃসংকোচে নিজেদের সমস্যার কথা খুলে বলতে পারবে। অভিজ্ঞ পিতা-মাতার দূরদর্শী পরামর্শের সাহায্যে জীবনের সমস্যা ও প্রতিকূলতাগুলো সহজেই কাটিয়ে উঠতে পারবে।
৪. মিডিয়ায় যে অনৈতিক ও অসুস্থ প্রেম-ভালোবাসার সংস্কৃতি প্রচার করা হয়, তরুণ-সমাজকে অবাধ মেলামেশায় প্রলুব্ধ করা হয়, তার অন্ধ অনুকরণ থেকে বেঁচে থাকতে হবে। অন্যদের অবৈধ প্রেম-ভালোবাসার সুখকর অনুভূতি; নাটক, সিরিয়াল ও ফিল্মে রচিত প্রেম কাহিনি দেখে দেখে ব্যক্তিজীবনে অবিকল কল্পনা করা চরম নির্বুদ্ধিতা। নাটক, সিরিয়াল ও ফিল্ম দেখা থেকে বিরত থাকতে হবে। অবৈধ প্রেম-ভালোবাসার সুরসুরি জাগানিয়া লেখা ও রচনা, গল্প ও কবিতা পড়া বন্ধ করতে হবে।
৫. তরুণ সমাজে চারিত্রিক বিশুদ্ধতার শুদ্ধ চর্চা ও পরিচর্যার বাস্তবায়ন করতে হবে। আল্লাহকে ভয় করে দৃষ্টি অবনত রাখতে হবে। নারীদের পর্দার বিধান মেনে চলার সঙ্গে সঙ্গে লজ্জাশীলতা, গাম্ভীর্যতা বজায় রাখা কর্তব্য। কোমল সুরে কথা বলা, অবৈধ দেখা-সাক্ষাৎ থেকে বেঁচে থাকা বাঞ্ছনীয়। মোটকথা, এমন যেকোনো আচার-উচ্চারণ, যা অবৈধ সম্পর্কের উপসর্গ, অবৈধ প্রেম-ভালোবাসার উপকরণ, তা হারাম ও নিষিদ্ধ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
﴿وَلْيَسْتَعْفِفِ الَّذِينَ لَا يَجِدُونَ نِكَاحًا حَتَّى يُغْنِيَهُمُ اللهُ مِنْ فَضْلِهِ﴾ [النور: ٣٣]
অর্থ: 'যাদের বিবাহ করার সামর্থ্য নেই, তারা সংযম অবলম্বন করবে, যতক্ষণ না আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করেন।' (নূর, ২৪: ৩৩)
৬. ইন্টারনেট, সোস্যাল মিডিয়া ও যোগাযোগ রক্ষার এপ্লিকেশন ব্যবহারে সতর্ক ও সচেতন হতে হবে। কেননা এগুলোর মাধ্যমেই যত অসুস্থ ও বিকৃত চিন্তা-চেতনার বিষ ছড়ানো হয়। অনিশ্চিত, সংশয়পূর্ণ অবৈধ সম্পর্কের বীজ বপন করা হয়।
৭. চারপাশে যত অসৎ সঙ্গ ছেড়ে জ্ঞানী, গুণী, সৎ ও ধর্মভীরু ব্যক্তিদের সংস্পর্শে থাকতে হবে।
৮. যে নারী-পুরুষ অবৈধ প্রেম-ভালোবাসায় জড়িয়ে পড়েছে, উভয়ের সম্মতি নিয়ে তাদেরকে বিবাহে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। বিবাহের মোহর ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সহজসাধ্য করে যথাসম্ভব দ্রুত বিবাহকার্য সম্পন্ন করা বাঞ্ছনীয়। যেন অবৈধ প্রেমের সম্পর্ক খুব সহজেই বৈধ বৈবাহিক সম্পর্কে রূপান্তরিত হয়।
৯. সবসময় মনে রাখতে হবে, যিনা ও ব্যভিচার মারাত্মক কবিরা গুনাহ ও চরম অশ্লীলতা। যে পাপের শাস্তি ইহকালে ও পরকালে অনিবার্য। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
﴿وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا ﴾ [الإسراء: ٣٢]
অর্থ: 'আর তোমরা যিনা-ব্যভিচারের কাছেও যেও না, নিশ্চয় তা হচ্ছে অশ্লীল কাজ আর অত্যন্ত জঘন্য পথ।' (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:৩২)
১০. প্রত্যেকেই নিজেকে এ জবাবদিহিতার সম্মুখীন করবে, সে কি চায় যে, তার স্ত্রী, মেয়ে, মা-বোন, খালা-ফুপি তারা প্রেম-ভালোবাসার অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ুক? এক্ষেত্রে অবশ্যই তাকে ন্যায়ানুগ ও আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন হতে হবে। মনে রাখতে হবে, যে মানুষের ইজ্জত-আবরুতে আঘাত করে, মানুষও তার মান-ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলে। সুতরাং সে যেন অন্যের ইজ্জত-আবরু রক্ষায় আল্লাহকে ভয় করে।
১১. যে লোক অবৈধ সম্পর্কে মজেছে, প্রেম-ভালোবাসায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত, যেকোনো মূল্যেই তাকে এ পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে হবে। নিকটাত্মীয় ও ঘনিষ্ঠজনদের করণীয় হবে, হিতোপদেশ ও নীতি-নৈতিকতার শিক্ষা দিয়ে তাকে তার কার্যকলাপের জঘন্যতা ও গুরুতরতা বোঝানো। এর কারণে তাকে সামাজিকভাবে কত প্রতিকূল পরিস্থিতির শিকার হতে হবে, পরকালে কত ভয়াবহ শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে-এ সম্পর্কে সতর্ক করা।
১২. আত্মকেন্দ্রিক হয়ে একাকী পড়ে থাকবেন না। শুয়ে-বসে অলস কর্মহীন সময় পার করবেন না। পরিবার ও বন্ধুজনদের সঙ্গে ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ু ন। নতুন জায়গায় নতুন অভিজ্ঞতার মুহূর্তগুলোকে প্রফুল্লচিত্তে উপভোগ করুন। সামাজ-কল্যাণমূলক ও জনহিতকর কাজে অংশগ্রহণ করুন। অবসর সময় না কাটিয়ে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের সদ্ব্যবহার করুন। অবসর হলো ইবলিস-শয়তানের চারণভূমি এবং যত অনর্থকতার কেন্দ্র। তাই অবসর-অকর্মণ্য মস্তিষ্কে দানা বাঁধে যত অন্যায়-অনাচার, কুমন্ত্রণা ও কুপ্রবৃত্তি।
১৩. বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করুন। হৃদয়াত্মা যখন আল্লাহর মহব্বতে সিক্ত হবে, তাঁর সান্নিধ্যে তৃপ্ত হবে, তখন তা নগণ্য সৃষ্টির ক্ষণিকের ভালোবাসাবিমুখ হয়ে মহান সত্তার চিরন্তন প্রেমে বিলীন হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُمْ بِذِكْرِ اللَّهِ إِلَّا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُ الْقُلُوبُ ﴾ [الرعد: ২৮]
অর্থ: 'জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।' (রা'দ, ১৩: ২৮)
১৪. এই দু'আগুলো বারবার পাঠ করুন। বিশেষভাবে সিজদারত হয়ে:
اللَّهُمَّ اكْفِنِي بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ.
অর্থ: 'হে আল্লাহ! হারাম উপার্জন থেকে বিরত রেখে হালাল রিযিকের মাধ্যমে সচ্ছলতা দান করুন। আপনি ব্যতীত অন্য সমস্ত সৃষ্টি হতে অমুখাপেক্ষী করুন।'
اللَّهُمَّ طَهَّرْ قَلْبِي وَحَصِّنْ فَرَجِيْ.
অর্থ: 'হে আল্লাহ! আমার হৃদয়াত্মা পবিত্র পরিশুদ্ধ করুন। আমার লজ্জাস্থান অশ্লীলতামুক্ত রাখুন।'
১৫. অবৈধ প্রেম-ভালোবাসার মারাত্মক ব্যাধির সফল চিকিৎসা এই যে, প্রেমাস্পদের রূপমাধুর্য ও বহিরাঙ্গের চাকচিক্য কল্পনা না করে তার যাবতীয় দোষ-ত্রুটি বারবার মনে করতে হবে। ফলে ব্যক্তির মনে তার প্রেমাস্পদের প্রতি অনীহা ও ঘৃণা সৃষ্টি হবে। এ থেকেই অবৈধ সম্পর্কের অবনতি ঘটবে।
১৬. নিজের জন্য একটি দৈনন্দিন রুটিন তৈরি করুন। যেমন: পবিত্র কুরআনের কয়েকটি আয়াত মুখস্থ করা। এর প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ জেনে নেওয়া। নির্দিষ্ট পরিমাণ হাদীস মুখস্থ করা। একটি ভালো বই নির্বাচন করে প্রতিদিন কিছু অংশ পাঠ করা। পরোপকারে স্বতঃস্ফূর্ত ভূমিকা পালন করা। যেমন: রোগীর সেবা-শুশ্রূষা করা। এতিম-মিসকিনের দেখভাল করা। দৈনন্দিন এ রুটিন মেনে চলার ক্ষেত্রে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হতে হবে।
১৭. অবৈধ প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে সাথে সাথে আল্লাহর দরবারে তওবা করুন। অপরপক্ষের সঙ্গে সার্বিক যোগাযোগ বন্ধ করে দিন। প্রয়োজনে মোবাইল নাম্বার পরিবর্তন করে ফেলুন। তার স্মৃতি বহন করে, তার কথা মনে করিয়ে দেয়-এমন যাবতীয় বস্তু ত্যাগ করুন। নিজের প্রতি আস্থাশীল হোন। মনে রাখবেন, যে ব্যক্তির আল্লাহ সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো কিছু ছেড়ে দেয়, আল্লাহ তা'আলা তাকে তুলনামূলক উত্তম বিনিময় দান করেন। ইনশাআল্লাহ, ইহকাল ও পরকালে আপনিও উত্তম বিনিময় লাভ করবেন।
১৮. অবৈধ প্রেম-ভালোবাসার সঙ্গিন মুহূর্তে সাধ্যমতো রোযা রাখুন। কুপ্রবৃত্তি দমনের ক্ষেত্রে রোযা হলো মু'মিন বান্দর মজবুত ঢাল। পরকালের কঠিন শাস্তির হতে রক্ষাকবচ। শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আত্মরক্ষার দুর্ভেদ্য প্রাচীর। চারিত্রিক বিশুদ্ধতা ও পরিশুদ্ধি লাভ করার সহজ উপায়। রাসূল ﷺ তরুণ সমাজকে উপদেশ প্রদান করেছেন:
يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ، مَنِ اسْتَطَاعَ البَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ، فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ، وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ وجاء". صحيح البখারী (৩/৭)
অর্থ: 'হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তির সামর্থ্য আছে, সে যেন বিবাহ করে। কেননা বিবাহ দৃষ্টিকে অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে সংরক্ষণ করে। আর যার সামর্থ্য নেই, সে যেন রোযা রাখে। কেননা রোযা তার প্রবৃত্তিকে দমন করে।' (বুখারী ৭/৩)
পরিশিষ্ট:
হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:
عَنْ أَبِي أُمَامَةَ قَالَ: إِنَّ فَنِّى شَابًّا أَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ، ائْذَنْ لِي بِالزَّنَا، فَأَقْبَلَ الْقَوْمُ عَلَيْهِ فَزَجَرُوهُ وَقَالُوا: مَهْ مَهُ. فَقَالَ: ادْنُهُ، فَدَنَا مِنْهُ قَرِيبًا". قَالَ: فَجَلَسَ قَالَ: أَتُحِبُّهُ لِأُمِّكَ؟ قَالَ: لَا وَاللَّهِ جَعَلَنِي اللهُ فِدَاءَكَ. قَالَ: "وَلَا النَّاسُ يُحِبُّونَهُ لِأُمَّهَاتِهِمْ". قَالَ: "أَفَتُحِبُّهُ لِابْنَتِكَ؟ قَالَ: لَا. وَاللَّهِ يَا رَسُولَ اللهِ جَعَلَنِي اللهُ فِدَاءَكَ قَالَ: "وَلَا النَّاسُ يُحِبُّونَهُ لِبَنَاتِهِمْ. قَالَ: "أَفَتُحِبُّهُ لِأُخْتِكَ؟ قَالَ: لَا. وَاللَّهِ جَعَلَنِي اللهُ فِدَاءَكَ. قَالَ: "وَلَا النَّاسُ يُحِبُّونَهُ لِأَخَوَاتِهِمْ. قَالَ: أَفَتُحِبُّهُ لِعَمَّتِكَ؟ قَالَ: لَا. وَاللهِ جَعَلَنِي اللهُ فِدَاءَكَ. قَالَ: "وَلَا النَّاسُ يُحِبُّونَهُ لِعَمَّاتِهِمْ. قَالَ: " أَفَتُحِبُّهُ لِخَالَتِكَ؟ قَالَ: لَا. وَاللَّهِ جَعَلَنِي اللهُ فِدَاءَكَ. قَالَ: "وَلَا النَّاسُ يُحِبُّونَهُ لِخَالَاتِهِمْ. قَالَ: فَوَضَعَ يَدَهُ عَلَيْهِ وَقَالَ: "اللهُمَّ اغْفِرْ ذَنْبَهُ وَطَهَّرْ قَلْبَهُ، وَحَصِّنْ فَرْجَهُ قَالَ: فَلَم يَكُنْ بَعْدُ ذَلِكَ الْفَتَى يَلْتَفِتُ إِلَى شَيْءٍ. مسند أحمد (٥٤٥/٣٦)
অর্থ: আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক যুবক রাসূল ﷺ-এর দরবারে এসে আরয করল, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে যিনা (ব্যভিচার) করার অনুমতি দিন।' (এমন স্পর্ধার কথা শুনে) উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম তার দিকে ফিরে তাকালেন। ধমকের সুরে বললেন, 'থাম! কথা বন্ধ কর!' রাসূল ﷺ বললেন, 'তাকে কাছে আসতে দাও।' যুবকটি রাসূল ﷺ-এর কাছে এসে বসল। রাসূল ﷺ বললেন, 'তুমি কি তোমার মায়ের ক্ষেত্রে যিনা-ব্যভিচার পছন্দ করবে?' যুবকটি বলল, 'নিশ্চয়ই না। আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য কোরবান করুন।' রাসূল ﷺ বললেন, 'লোকেরাও তাদের মায়েদের ব্যাপারে এমনটি পছন্দ করবে না।' রাসূল ﷺ বললেন, 'তুমি কি তোমার মেয়ের ক্ষেত্রে যিনা-ব্যভিচার পছন্দ করবে?' যুবকটি বলল, 'নিশ্চয়ই না। আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য কোরবান করুন।' রাসূল ﷺ বললেন, 'লোকেরাও তাদের মেয়েদের ব্যাপারে এমনটি পছন্দ করবে না।' রাসূল ﷺ বললেন, 'তুমি কি তোমার চাচির ক্ষেত্রে যিনা-ব্যভিচার পছন্দ করবে?' যুবকটি বলল, 'নিশ্চয়ই না। আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য কোরবান করুন।' রাসূল ﷺ বললেন, 'লোকেরাও তাদের চাচিদের ব্যাপারে এমনটি পছন্দ করবে না।' রাসূল ﷺ বললেন, 'তুমি কি তোমার খালার ক্ষেত্রে যিনা-ব্যভিচার পছন্দ করবে?' যুবকটি বলল, 'নিশ্চয়ই না। আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য কোরবান করুন।' রাসূল ﷺ বললেন, 'লোকেরাও তাদের খালাদের ব্যাপারে এমনটি পছন্দ করবে না।' এ সময় রাসূল ﷺ তার উপর হাত রেখে দু'আ করলেন, 'হে আল্লাহ! আপনি তার গুনাহ মাফ করুন। তার হৃদয় পাক-সাফ করুন। তার লজ্জাস্থান হেফাজত করুন।' এর পর থেকে সে যুবক এসব বিষয়ে আর কখনো আগ্রহী হয়নি। (আহমাদ: ৩৬/৫৪৫)
উরওয়া ইবনে হিযাম। ইতিহাসের পাতায় তার অমর প্রেমকাহিনী আজও বিখ্যাত। যখন মাতা-পিতার মৃত্যু হয়, তখন সে অবুঝ শিশু। এরপর থেকে আপন চাচা তাকে লালন-পালন করেন। চাচার বাড়িতে পিঠাপিঠি চাচাতো ভাই-বোন উরওয়া ও আফরার শৈশবের দিনগুলো বেশ আনন্দেই কেটেছে। শৈশব-কৈশোর পেরিয়ে কখন তারুণ্যে এসে পৌঁছেছে, তা যেমন টের পায়নি। একজন আরেকজনের প্রেমে কীভাবে আকণ্ঠ মজে গেছে, মনে কখনো সে কথা ভাববার ফুরসত হয়নি। প্রকৃতিই যেন তার উদারতায় চাচাতো ভাই-বোনের অমর প্রেমের মাহা আয়োজনের বন্দোবস্ত করে দিয়েছে।
উরওয়া এখন টগবগে যুবক। সমাজ-সংসার ও ব্যক্তি-জীবনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে উপযুক্ত। জীবনের এতগুলো দিন যার সাথে কাটিয়েছে, যাকে সাধনা করে এসেছে, তাকে সাথে নিয়েই জীবনের বাকি দিনগুলো কাটানোর ইচ্ছা তার। কোনো দ্বিধা-সংকোচ না করে চাচার কাছে তার মেয়েকে বিবাহের ইচ্ছা প্রকাশ করল। কিন্তু চাচা-চাচি একজনও তাতে অসম্মতি প্রকাশ করতে না পারলেও সম্মত হলো না। কারণ, তার অসচ্ছলতা ও আর্থিক অনটন। তাদের একান্ত ইচ্ছা, আদরের দুলালীকে তারা কোনো বিরাট ধনাঢ্য যুবকের কাছে বিবাহ দিবে। যে তাকে সোনা-গয়না, সুখ-শান্তি ও প্রাচুর্য-ঐশ্বর্য দিয়ে সযত্নে আগলে রাখবে।
এদিকে পুত্রতুল্য যে ভাতিজাকে এতদিন আদর সোহাগে লালন-পালন করেছে, তাকেও নিরাশ করতে পারল না। তাই শর্ত জুড়ে দিল, মোটা অঙ্কের মোহরের শর্ত। এ যেন মোহর নয়; মোহরের বোঝা। চাচা-চাচি প্রতিশ্রুতি দিল, নির্দিষ্ট অঙ্কের মোহর যদি সে আদায় করতে পারে, তবেই সে তার মনের মানুষটিকে চিরকালের জন্য আপন করে নিতে পারবে। সেই পর্যন্ত মেয়েটিকে অন্য কোথাও বিবাহ না দিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করবে।
উরওয়া তার হবু বধূর মোহর সংগ্রহে লেগে গেল। বহু দূর পথ পারি দিয়ে সে এক নিকট আত্মীয়ের বাড়িতে এসে পৌঁছল। এতিম শিশুকে আজ তারুণ্যদীপ্তরূপে দেখে আত্মীয়রা যারপরনাই খুশি। উরওয়ার প্রতি তাদের কত সেবা-যত্ন, কত আদর-আপ্যায়ন। তার সম্পর্কে, তার চাচা-চাচির সম্পর্কে তাদের কত কৌতূহল, কত জিজ্ঞাসা! সব শেষে এল প্রয়োজনের কথা: 'কীভাবে চলছে তার জীবন-যাপন? এত কষ্ট করে এত দূরের পথ পারি দিয়ে কী উদ্দেশ্যে তার আগমন?'
উরওয়া নিঃসকোচে তার বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা খুলে বলল। তাকে পেয়েই আত্মীয়-স্বজন যারপরনাই খুশি, তার জন্য কিছু করতে মুখিয়ে আছে। এখন তার প্রয়োজনের কথা শুনে তারা যেন এর যথার্থতা খুঁজে পেল। বিবাহের মোহরস্বরূপ আত্মীয়রা তাকে একশ উট প্রস্তুত করে দিল। বিশাল উটের পাল নিয়ে উরওয়া চাচার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো।
কিন্তু যে বিপত্তির অজানা আশঙ্কা এত দিন গুমোট বেঁধে ছিল, উরওয়ার অনুপস্থিতিতে তা-ই বাস্তব হয়ে দেখা দিল। ইয়েমেনের বনু উমাইয়া গোত্রের এক সম্ভ্রান্ত ধনাঢ্য যুবকের সাথে আফরার বিয়ে হয়ে গেল। আফরা এখন সুদূর শাম দেশে স্বামীর বাড়িতে। এ বিয়েতে উরওয়ার চাচা-চাচি প্রথমে সম্মত ছিলেন না। কিন্তু পাত্র পক্ষের পীড়াপীড়ি ও তাদের ধন-দৌলতের প্রাচুর্য ও ঐশ্বর্য দেখে “না” বলতে পারলেন না। এ ক্ষেত্রে আফরার তীব্র অসম্মতিও কোনো মূল্য পেল না। মা-বাবার সম্মতি ও আত্মীয়স্বজনের পীড়াপীড়ির সামনে আফরা ছিল একা অসহায়। এ জীবনে যাকে পাওয়ার কামনা করেছিল, অধির আগ্রহে যার আগমনের পথ পানে চেয়েছিল, যার সাথে সুখের ঘর বাঁধার স্বপ্ন বুনেছিল, তার সমস্ত স্মৃতি বুকে ধারণ করে অচেনা-অজানা এক যুবকের হাত ধরে চলতে হলো।
এদিকে উরওয়া তার চাচাতো বোন আফরার মোহর বাবদ একশ উটের বিশাল পাল নিয়ে হাযির হলো। চাচা ইতঃপূর্বেই এলাকাবাসীদের রাজি করাতে সক্ষম হয়েছিল- উরওয়ার আগমনে তারা দুঃখ-ভারাক্রান্ত হয়ে আফরার মৃত্যু সংবাদ প্রচার করবে। এমনকি আফরার নামে একটি নতুন কবর বানিয়ে রাখলো। দেখে বোঝার উপায় নেই, এ যে কৃত্রিম কবর। যে স্বপ্নের ঘর বাঁধবে বলে উরওয়া বিশাল আয়োজনে এসেছিল, এক নিমিষেই তা ধ্বসে পড়ল। পায়ের তলা থেকে বালি ঝুর-ঝুর করে সরে গেল। মুখ থুবড়ে পড়ল একটি সাজানো স্বপ্নের সংসার।
প্রিয়তমা আফরার আকস্মিক মৃত্যু সংবাদ শুনে শোকে বেদনায় মুষড়ে পড়ল। আফরার কবরের সামনে এসে সে অঝোর কান্নায় ভেঙে পড়ল। সব কিছুই গ্রামবাসীর পূর্বপরিকল্পনামাফিক হচ্ছিল; কিন্তু সবই ছিল বানোয়াট মিথ্যা। যেটুকু সত্য, তা ছিল উরওয়ার শোক-বেদনা ও অঝোর কান্না। তার শোকের মূল্য ছিল। কান্নার যথার্থ কারণ ছিল। জনপদের এক নারীর মুখে বিষয়টি ফাঁস হয়ে গেল।
উরওয়া তৎক্ষণাৎ শামের উদ্দেশে যাত্র করল। আফরাকে একটি বারের জন্য দেখার উদ্দেশ্যে। একদিন সে সুদূর শাম দেশে আফরার ঠিকানায় পৌঁছল। তাদের ইতিবৃত্তি শুনে আফরার স্বামী আবেগাপ্লুত হলেন। উরওয়া ও আফরাকে পরস্পর দেখা করার সুযোগ করে দিলেন। প্রিয়তমার সুখের সাজানো সংসারের কথা ভেবে উরওয়া সৌজন্য সাক্ষাৎ করে দেশে ফিরে এল। কিন্তু আফরার অতীত স্মৃতি তাকে তাড়া করে ফিরল। কিছুতেই প্রিয়তমা আফরার কথা ভুলতে পারল না। মা-বাবা তুল্য চাচা-চাচির এমন অবিশ্বাস্য প্রতারণার জ্বালা তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে গ্রাস করতে লাগল।
সীমাহীন মানসিক জ্বালা-যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ল। গ্রামবাসী কত চিকিৎসক-কবিরাজের শরণাপন্ন হলো। কিছুতেই কোনো কাজ হলো না। দিন-দিন তার শরীর-স্বাস্থ্য ও মানসিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটতে লাগল। প্রেম-ভালোবাসার দহনে দগ্ধ হয়েই একদিন সে চির বিদায় নিল। মৃত্যুর আগে সে সারাক্ষণ কয়েকটি লাইন আওরাতো। যা ছিল প্রিয়তমা আফরার ভালোবাসা ও চাচার প্রতারণার বিষয় সংবলিত।
উরওয়ার মৃত্যুর সংবাদে সুদূর শাম দেশ থেকে আফরা ছুটে এল। একটি বারের জন্য উরওয়ার কবর যিয়ারত করার উদ্দেশ্যে। কবরের সামনে দাঁড়িয়ে সে বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়ল। কান্নার ধকল সইতে না পেরে আফরারও মৃত্যু হলো। এ জীবনের সব দুঃখ-কষ্ট পেছনে ফেলে প্রিয়তমের সান্নিধ্য গ্রহণ করল। উরওয়ার কবরের পাশেই আফরার সমাধি রচিত হলো।
মৃত্যুর আগ মুহূর্তগুলোতে উরওয়ার মুখে আবৃত কবিতার লাইনগুলো:
جَعَلْتُ لِعَرَّافِ الْيَمَامَة حِكْمَة
وعَرَّافِ نَجْد إِنْ هُما شَفَيَانِي
فَما تَرَكَا مِنْ حِيلَة يَعْلَمَانِها
وَلَا سَلْوَة إلا بها سَقَياني
فقَالا: شَفَاكَ اللهُ وَاللَّهِ مَا لَنا
بِمَا حَمَلَتْ مِنْكَ الضُّلُوعُ يَدَانِ
فَيَا لَيْتَ كل اثنين بَيْنَهما هوى
مِنَ النَّاسِ وَالْأَنْعَامِ يَلْتَقِيانِ
অর্থ: 'ইয়ামামা ও নাজদের চিকিৎসকের হাতে নিজেকে সঁপে দিয়েছি, তারা যদি আমার আরোগ্য ফিরিয়ে আনতে পারে। তাদের অভিজ্ঞতার সমস্ত ওষুধ আমাকে সেবন করিয়েছে; সমস্ত ধরনের ঝাড়ফুঁক দিয়েছে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। অবশেষে নিরুপায় হয়ে তারা বলতে বাধ্য হয়েছে: 'এখন একমাত্র আল্লাহ তা'আলাই পরম ভরসা। যে রোগে তুমি আক্রান্ত হয়েছ, তাতে আমাদের সাধ্য নেই কিছু করার। হায়! যদি এ পৃথিবীতে যত প্রেমিক যুগল আছে, শেষ পরিণামে যদি তাদের মধুর মিলন হতো!'
📄 খেয়ানত ও প্রতারণা
প্রতারণা হলো, কথার বরখেলাপ করা এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা। যেমন: স্বামী-স্ত্রীর একজন অপরজনের সঙ্গে প্রতারণা করা, এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে ধোঁকা দেওয়া, দায়িত্ববান ব্যক্তি নিজ দায়িত্বে অবহেলা করা ইত্যাদি। এ সম্পর্কে ইবনে আশুর বলেন:
'ব্যক্তির নিকট কোনো বিষয় ও বস্তু যে উদ্দেশ্যে আমানত রাখা হয়, আমানত প্রদানকারীর অজ্ঞাতসারেই সে যদি কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্যের বিপরীত করে, তবেই তা খেয়ানত। এমন ব্যক্তিকে "খায়েন” খেয়ানতকারী ও প্রতারক বলা হয়।'
ধোঁকা ও প্রতারণা সম্পর্ক নষ্ট করে। মানুষের আস্থা-বিশ্বাস, একনিষ্ঠতা-ঐকান্তিকতার মতো মানবিক মূল্যবোধ ধ্বংস করে দেয়। এর কারণে ব্যক্তির সাথে “ধোঁকাবাজ” ও “প্রতারক”-এর মতো চরম অপমানজনক ও লাঞ্ছনাকর তকমা সেঁটে যায়।
কারো প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও আস্থা পোষণ করে আপনি যখন তার কাছে কোনো কিছু গচ্ছিত রাখবেন, আর বিনিময়ে বিশ্বাসঘাতকতা ও শঠতার পরিচয় পাবেন, মনে হবে হৃদয়ে একটি বিষাক্ত তীর বিদ্ধ হয়েছে। বিশ্বাসভঙ্গের অমানসিক জ্বালা-যন্ত্রণা, অবিশ্বাসের ও অনিশ্চয়তা আপনাকে সংশয়গ্রস্ত করে ফেলবে। এভাবে যখন কয়েকবার প্রতারণার শিকার হবেন, তখন চারপাশের সমাজে কোথাও এক বিন্দু আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গা খুঁজে পাবেন না।
তাহলে এ মানসিক সংকট উত্তরণের পথ কী? এর পথ বন্ধ করার উপায় কী?
১. সন্তানদেরকে আমানতদারিতা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা, আল্লাহভীতি, কথা-কাজে, আচরণ-উচ্চারণে সততা, ন্যায়নিষ্ঠতার ওপর গড়ে তুলতে হবে। শঠতা, বিশ্বাসঘাতকতা, ধোঁকা ও প্রতারণার মতো নিকৃষ্ট দোষগুলো তাদের কাছে ঘৃণিত করে তুলতে হবে।
২. মনে রাখতে হবে, খেয়ানত ও ধোঁকা হলো মুনাফেকি আচরণ। রাসূল ﷺ বলেছেন:
أَرْبَعُ مَنْ كُنَّ فِيهِ كَانَ مُنَافِقًا خَالِصًا، وَمَنْ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنْهُنَّ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنَ النِّفَاقِ حَتَّى يَدَعَهَا: إِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ، وَإِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ، وَإِذَا خَاصَمَ فَجَرَ.
অর্থ: 'চারটি দোষ যে ব্যক্তির মধ্যে থাকবে, সে নির্ঘাত মুনাফিক। যার মধ্যে এর কোনো একটি থাকবে, সে তা থেকে মুক্ত হওয়া পর্যন্ত একটি মুনাফেকি দোষে দুষ্ট থাকবে। (চারটি দোষ হলো:) আমানত রাখা হলে খেয়ানত করবে, কথা বললে মিথ্যে বলবে, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবে এবং ঝগড়ায় লিপ্ত হলে পাপাচার করে বসবে।' (বুখারী: ১/১৬)
৩. প্রত্যেককেই নিজ-নিজ সাধ্য ও সামর্থ্য অনুযায়ী দায়িত্ব ও আমানত গ্রহণ করতে হবে। এর ফলে ব্যক্তি আমানতের দায়িত্ব অনায়াসে পালন করতে পারবে। আমানত রক্ষার ক্ষেত্রেও তাকে কপটতার আশ্রয় নিতে হবে না। কোনো জটিল পথ মাড়াতে হবে না।
৪. সমাজে এমন বহু লোক আছে, যারা ধোঁকা, প্রতারণাকে অনায়াস মনে করে। মানুষের বিশ্বাস রক্ষা করা, আমানতদারিতা বজায় রাখার মতো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে কঠিন ও জটিল করে দেখে। এমন অসৎ লোকদের অসৎ সঙ্গ থেকে বেঁচে থাকা কর্তব্য। সততা ও বিশ্বস্ততা, প্রতিজ্ঞা ও অঙ্গীকার রক্ষায় যারা প্রতিশ্রুতিশীল, এমন চরিত্রবান ও নীতিবান ব্যক্তিদের সংস্পর্শে থাকা বাঞ্ছনীয়।
৫. বর্তমান প্রজন্মের মন-মানসিকতায় বিশ্বস্ততা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার মূল্যবোধ বদ্ধমূল করে দিতে হবে। তাদের মাঝে ধর্মীয় শিক্ষার প্রচার-প্রসার ঘটাতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে ধোঁকা, প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতার মতো চারিত্রিক দোষগুলোকে জঘন্য ও ঘৃণিতরূপে তুলে ধরতে হবে। এর অশুভ পরিণতি ও এর কারণে সামাজিক অবক্ষয় সম্পর্কে সচেতন করা কর্তব্য। এ ক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রধান ভূমিকা পালন করবে।
৬. খেয়ানতকারী ও ধোঁকাবাজ আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত-বিষয়টি জোর তাকিদ দিয়ে প্রচার করতে হবে এবং বারবার স্মরণ করিয়ে দিতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ مَنْ كَانَ خَوَانًا أَثِيمًا [النساء: ١٠٧]
অর্থ: 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা বিশ্বাস ভঙ্গকারী পাপিষ্ঠকে পছন্দ করেন না।' (নিসা, ৪: ১০৭)
এ আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে ইমাম তাবারী (রহ.) 'জামেউল বায়ান ফি তা'উয়িলিল কুরআন' গ্রন্থে বলেন: 'যে লোক মানুষের অর্থ-সম্পদে খেয়ানত করে, অন্যায় বাড়াবাড়ি করে, আল্লাহ তা'আলা তাকে পছন্দ করেন না।'
৭. প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যেই ধোঁকা ও প্রতারণার প্রতি ঘৃণাবোধ থাকতে হবে। সর্বাত্মক চেষ্টা থাকবে, কোনোভাবেই যেন এ জঘন্য পাপে জড়িয়ে না পড়ে। পরহেযগারি ও আল্লাহভীতি অবলম্বন করতে হবে। সবার আগে আপন রবের আদেশ-নিষেধ মেনে চলার ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে মা-বাবা, ভাইবোন, স্ত্রী, পরিজন, বন্ধু-বান্ধব ও অংশীদার প্রত্যেকের সঙ্গে অঙ্গীকার রক্ষা করে চলতে হবে।
৮. মনে রাখতে হবে, "যেমন কর্ম, তেমন ফল।” কেউ যদি কারো সাথে ধোঁকা ও প্রতারণা করে, জীবনে কোনো পর্যায়ে সেও তার চেয়ে ভয়াবহ প্রতারণার শিকার হবে। ইবনুস সা'দী 'তাইসীরুল কারীমির রহমান' কিতাবে পবিত্র কুরআনের এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন:
﴿وَأَنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي كَيْدَ الْخَائِنِينَ﴾ [يوسف : ٥٢]
অর্থ: 'আর আল্লাহ অবশ্যই বিশ্বাসঘাতকদের চক্রান্ত লক্ষ্যে পৌঁছতে দেন না।' (ইউসুফ, ১২: ৫২)
ইবনুস সাদীর ব্যাখ্যা: 'যে কোনো প্রতারক, বিশ্বাসঘাতক ও ষড়যন্ত্রকারীর অন্যায়ের পরিণতি তাকেও ভোগ করতে হয়। এর থেকে তার কোনো নিস্তার নাই।'
৯. সবসময় মনে রাখতে হবে, আপনার ওপর আল্লাহ তা'আলার সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান রয়েছে। আপনি যেখানেই থাকুন-না-কেন, যা-ই করুন-না-কেন, তিনি আপনাকে দেখছেন। প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে, নির্জনে-বাহিরে, রাত-দিনে তিনি আমাদের সাথেই আছেন। আমাদের সমস্ত কথা শুনছেন, কৃতকর্ম দেখছেন। আমাদের কোনো আচার-আচরণ তাঁর থেকে গোপন নয়। এমনকি মনের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষাও নয়। পবিত্র কুরআনের বাণী:
﴿يَسْتَخْفُونَ مِنَ النَّاسِ وَلَا يَسْتَخْفُونَ مِنَ اللَّهِ وَهُوَ مَعَهُمْ اِذْ يُبَيِّتُونَ مَا لَا يَرْضَى مِنَ الْقَوْلِ وَكَانَ اللَّهُ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطًا ﴾ [النساء : ١٠٨]
অর্থ: 'তারা মানুষ থেকে তো লজ্জা করে; কিন্তু আল্লাহ থেকে লজ্জা করে না, অথচ তারা রাতের বেলা যখন আল্লাহর অপছন্দনীয় কথা বলে, তখনো তিনি তাদের সঙ্গে থাকেন। তারা যা-কিছু করছে তা সবই আল্লাহর আয়ত্তে।' (নিসা, ৪: ১০৮)
১০. মানুষের নফস (মন) কুমন্ত্রণাপ্রবণ। নফসের বিরুদ্ধে বিবেকের তাড়নায় সক্রিয় হোন। কাল কেয়ামতে আপনাকেও আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে। নিজ কৃতকর্মের কৈফিয়ত দিতে হবে। অতি সামান্য থেকে গুরুতর প্রতিটি বিষয় আপনার আমলনামায় লিপিবদ্ধ হচ্ছে-এমন সজাগ মানসিকতা যদি আপনার মধ্যে জাগরূক থাকে, তাহলেই সততা, বিশ্বস্ততা ও অঙ্গীকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিশীল হয়ে বেঁচে থাকতে পারবেন।
১১. সুলাইমান (আ.)-এর রাজ্যে হুদহুদ পাখি ছিল একটি নগণ্য প্রাণী। বিশ্বস্ততা ও আমানত রক্ষায় সে কী অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে! যথাযথ নিষ্ঠা ও দায়িত্বের সাথে সুলাইমান (আ.)-এর পত্র যথাস্থানে পৌঁছে দিয়েছে। আপনি তো মানুষ। আল্লাহ তা'আলার শ্রেষ্ঠ জীব। আপনার তুলনায় হুদহুদ পাখি নিতান্তই নগণ্য। আপনি কেন পারবেন না সততা, বিশ্বস্ততা রক্ষা করতে? প্রতিশ্রুতি ও ওয়াদা পালন করতে?
১২. অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সংকল্পবদ্ধ ও সক্রিয় হতে হবে। মানুষ তার দুর্বল স্বভাব-প্রকৃতির কারণেই ভুল, অবহেলা ও শিথিলতাপ্রবণ। তাই রাসূল ﷺ প্রত্যেক দায়িত্ববানকে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে জবাবদিহিতা এবং আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নিজের ভুল-বিচ্যুতিগুলো শুধরে নিতে উদ্বুদ্ধ করতেন।
১৩. মানুষ মাত্রই সৃষ্টিগতভাবে ও স্বভাববৈশিষ্ট্যে দুর্বল প্রকৃতির। পদে পদে ভুল করা, অবহেলা করা তার স্বভাবজাত-বিষয়টি আপনাকে মনে রাখতে হবে এবং এর সঙ্গেই নিজেকে মানিয়ে নিতে হবে। সুতরাং ইহকালীন জীবনে আপনি একমাত্র ঐ সত্তার ওপরই ভরসা করতে পারেন, যার কোনো দুর্বলতা নেই, কোনো অসুস্থতা নেই। যিনি যুলুম করেন না এবং তার ওপর কেউ যুলুম করতে পারে না। তাঁকে পরাজিত করতে পারে না। তাঁর কোনো মৃত্যু নেই। তিনি অবিনশ্বর। জীবন ও মৃত্যুর স্রষ্টা। তিনি মহান আল্লাহ তা'আলা।
১৪. নির্ভরযোগ্য ও আস্থাভাজন কারো কাছ থেকে যদি ধোঁকা ও প্রতারণার শিকার হন, তাহলে মনঃকষ্টে ভেঙে পড়বেন না। রাগে-ক্ষোভে ফেটে পড়বেন না। মনে রাখবেন, এ জীবন হলো বিপদসংকুল এক পরীক্ষাক্ষেত্র। স্বয়ং নবীগণই তাঁদের আপনজনদের থেকে অবিশ্বাসের ও প্রবঞ্চনার শিকার হয়েছেন। লুত (আ.) ও নূহ (আ.)-এর স্ত্রী তাঁদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। নূহ (আ.)-এর স্বীয় পুত্র তাঁর ঈমানের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে। এ ধরনের আরও বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে।
১৫. ধোঁকা ও প্রতারণা পরবর্তী সময়ে প্রতারকের প্রতারণা মেনে নিয়েই তার সম্মুখীন হোন। তার অজান্তেই প্রকৃত অবস্থার তদন্ত করতে থাকুন, যেন খারাপ ধারণার বশবর্তী হয়ে তার ওপর যুলুম না করে বসেন। প্রতারণার শিকার হয়ে দুঃখ-বেদনার কথা চেপে না রেখে অকপটে প্রকাশ করতে পারেন। তবে ধোঁকা ও বিশ্বাসভঙ্গ করার বিষয়টি একেবারেই চেপে যান। একান্ত প্রয়োজনে উপযুক্ত স্বল্প পরিসরে তা প্রকাশ করতে পারেন। কেননা প্রতারণার কথা প্রকাশ করার কারণে নতুন কোনো বিপদের সম্মুখীন হওয়ার এবং আরও কঠিন ভোগান্তির শিকার হওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে।
১৬. জীবনের পতিটি অঙ্গনে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর এ বাণীটি স্মরণ রাখুন:
"أَدَّ الأَمَانَةَ إِلَى مَنْ ائْتَمَنَكَ، وَلَا تَخُنْ مَنْ خَانَكَ".
অর্থ: যে তোমার কাছে আমানত রেখেছে, তার আমানত রক্ষা কর। যে তোমাকে ধোঁকা দিয়েছে, তাকে তুমি ধোঁকা দিয়ো না। (তিরমিজী: ২/৫৫৫)
কারো দ্বারা প্রতারণার শিকার হলে তার প্রতি প্রতিশোধপরায়ণ হবেন না। আল্লাহকে ভয় করে ধৈর্য ও প্রজ্ঞার আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন। বিশ্বাস করুন, আল্লাহর নিকট আপনার জন্য যে প্রতিদান বরাদ্দ আছে, তা সর্বোত্তম ও স্থায়ী। তা ছাড়া কুকুর আপনাকে কামড়ে দিয়েছে, বিপরীতে আপনিও কুকুরকে ধরে সজোরে কামড়ে দিলেন-এটা তো সুস্থ বিবেক-বুদ্ধির পরিচয় হতে পারে না।
১৭. যবান সংযত রাখুন। কাছের যে কাউকে বিশ্বাস করে লাগামহীনভাবে নিজের সমস্ত গোপন বিষয় ফাঁস করে দেওয়া ঠিক নয়। অপ্রকাশিত ও গোপন বিষয় হলো মানবজীবনের দুর্বল অংশ। জীবন পরিবর্তনশীল। ক্ষণে ক্ষণে তার রং বদলায়। কে কখন আপনার দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে ধোঁকা দেওয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত হবে, তা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। তাই পবিত্র কুরআনের আদেশ মেনে চলুন এবং সবসময় সতর্ক থাকুন:
﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا خُذُوا حِذْرَكُمْ﴾ [سورة النساء: ۷১]
অর্থ: 'হে মু'মিনগণ! সতর্কতা অবলম্বন কর।' (নিসা: ৭১)
১৮. না জেনে, না বুঝে যে কাউকে বিশ্বাস করে বসবেন না, বন্ধুরূপে গ্রহণ করবেন না এবং আর্থিক ক্ষেত্রে অংশীদার বানিয়ে নিবেন না। বিবাহ ক্ষেত্রে পাত্র নির্বাচনেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের আচার-ব্যবহার, বিচার-বুদ্ধি, সামাজিক সুনাম-সুখ্যাতি যাচাই করে নেওয়া আবশ্যক। যেন পরে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিকূল পরিস্থিতির শিকার না হতে হয়।
১৯. আপনি যদি প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হন, তাহলে আপনার প্রতি আমার উপদেশ হলো, শান্ত-স্থিরচিত্ত থাকার চেষ্টা করুন। রাগ ও ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে এমন কিছু করে বসবেন না, যাতে পরে পস্তাতে হয়। রাগ-ক্ষোভ, দুঃখ বেদনার মতো মানসিক প্রতিকূলতার মুহূর্তে ভেঙে পড়া, চারপাশের পরিচিত সমাজ ছেড়ে নীরব-নিভৃতে একাকীত্ব বরণ করা থেকে বিরত থাকুন।
আপনি নিশ্চিত থাকুন, ধোঁকাবাজ, প্রতারক সে নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত, আপনি নন। সুতরাং চিন্তা-ভাবনা থেকে ইতর শ্রেণির কথা ঝেড়ে ফেলুন। যা ঘটেছে, তা সম্পূর্ণরূপে ভুলে যান। জীবনের ইতিবাচক দিক নির্বাচন করে সে পথে অগ্রসর হোন। নিতান্ত নগণ্য এক প্রতারকের ইতরতার কারণে আপনার বর্তমানের স্বচ্ছতা কর্দমাক্ত করবেন না, ভবিষ্যতের উজ্জ্বলতা মলিন করবেন না।
পরিশিষ্ট:
জাহেলী যুগের বিশিষ্ট কবি ও পরবর্তী যুগে রাসূল ﷺ-এর বিশিষ্ট সাহাবী মাআন বিন আউস (রা.) বলেছেন:
أُعَلِّمُهُ الرِّمَايَةَ كُلَّ يَوْمٍ فَلَمَّا اشْتَدَّ سَاعِدُهُ رَمَانِي
وَكَمْ عَلَّمْتُهُ نَظْمَ القَوَافِي فَلَمَّا قَالَ قَافِيَةٌ هَجَانِي
অর্থ: 'প্রতিদিন কী নিবিড় তত্ত্বাবধানে তাকে তীরন্দাজি শিখাই। কিন্তু যখনই তার বাহু শক্ত হলো, তীরন্দাজি পাকাপোক্ত হলো, সবার আগে আমার দিকেই তীর তাক করে বসল। কবিতা রচনার শিল্প তাকে কতোভাবে শেখালাম। কিন্তু যখনই কবিতার প্রথম শ্লোকটি রচনা করলো, আমাকে ব্যঙ্গ ও উপহাস করে ছাড়লো।'
জাতিসংঘের প্রস্তাবক ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ফ্রাঙ্কলিন ডি. রোজভেন্ট (১৮৮২-১৯৪৫ খৃষ্টাব্দ) বলেছেন: 'কেউ যদি আপনাকে একবার ধোঁকা দেয়, তাহলে এটা তার পাপ-অন্যায়। কিন্তু যদি সুযোগ পেয়ে দ্বিতীয়বার ধোঁকা দেয়, তাহলে এটার দায় আপনার।'
জনৈক কবির কবিতা:
يَخُونُكَ ذُو الْقُرْبَى مِرَارًا، وَرُبَّمَا وَفَى لك عِنْدَ العَهْدِ مَنْ لَا تُنَاسِبُهُ
وَلَا خَيْرِ فِي قُربيَ لِغَيْرِكَ نَفْعُها وَلَا فِي صَدِيقَ لَا تَزالُ تُعَاتِبُهُ
وَحَسْبُ الْفَتَى مِنْ نُصْحِهِ وَوَفَائِهِ تَمَنَّيْهِ أَن يُؤْذَى وَيَسْلَمَ صَاحِبُهُ
অর্থ: 'নিকটজন আপনাকে বারবার ধোঁকা দেয়, অথচ আপনি যাকে প্রতিশ্রুতি রক্ষার যোগ্য মনে করেন না, সে-ও কদাচিত আস্থা ও বিশ্বাসের পরিচয় দেয়। প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে চলে। এমন আত্মীয়ের কি-ই বা মূল্য আছে, যে আপনার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না। এমন বন্ধুরই বা কী প্রয়োজন, যার কাজে অতিষ্ঠ হয়ে তাকে ভর্ৎসনা করতে থাকেন। ব্যক্তির পরার্থপরতা ও দায়িত্ববোধের পরিচায়ক হিসেবে এতটুকুই যথেষ্ট যে, নিজে কষ্টের শিকার হয়েও সে বন্ধুর নিরাপত্তা কামনা করে।'
কবি সুলতান সাঈদ আল বুসাঈদী বলেন:
يَا مَنْ هَوَاهُ أَعَزَّ وَأَذلَّنِي كيف السبيلُ إِلَى وَصَالِكَ دُلَّنِي
أنت الذي حلفتني وحلفت لي وحلفت أنك لا تَخُونُ فَخُنْتَني
وحلفت أنك لا تَمِيلَ مَعَ الْهَوَى أين اليَمِينُ وأين ما عاهدتني
لأقعدنَّ عَلى الطريق وأَشْتَكِي وأقول مظلوم وأنتَ ظَلَمْتَنِي
ولأدعُوَنَّ عَلَيْكَ فِي غَسَقِ الدُّجَى يُبْلِيْكَ رَبِّي مِثْلَمَا أَبْلَيْتَنِي
অর্থ: ঐ ব্যক্তি কোথায়, যার চাহিদা-বাসনা আমাকে অপমান করে হলেও তার মান-মর্যাদা সমুন্নত করেছে। বলে দাও! কীভাবে আমি তোমার কাছে পৌঁছতে পারি? তুমিই তো আমাকে শপথ করিয়েছিলে, নিজেও শপথ করেছিলে যে, কখনো প্রতারণা করবে না; কিন্তু করলে তো প্রতারণা। অঙ্গীকার করেছিলে, কখনো প্রবৃত্তির তাড়নায় ছুটবে না। আজ কোথায় তোমার সে অঙ্গীকার, সে প্রতিশ্রুতি!? আমি তো পথের ধারে বসে যাব। যত অভিযোগ-অনুযোগ বলে যাব, 'আমি নিরীহ মজলুম, আর তুমি পাষণ্ড যালেম। আমি নিরীহ নিঃগৃহীত, আর তুমি কঠোর উৎপীড়ক। রাতের শেষ প্রহরের পরম মুহূর্তে তোমার নামে নালিশ করব, 'তুমি যেমন আমাকে কপর্দকহীন রিক্তহস্ত করে ছেড়েছ, আমার রবও তোমাকে তোমার কৃতকর্মের পরিণতি ভোগ করাবেন।
টিকাঃ
১৫. মুহাম্মদ তাহের ইবনে আশুর। ১৮৭৯ খৃষ্টাব্দে তিউনিসে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৭৩ খৃষ্টাব্দে মৃত্যু বরণ করেন। একই সঙ্গে তিনি লেখক, সাহিত্যিক, বিচারক ও মুফতী ছিলেন। প্রতিটি শাখায় তিনি অত্যন্ত সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
📄 নাস্তিকতা
নাস্তিকতা ও ধর্মহীনতা একটি প্রাচীন সমস্যা। নাস্তিকতা হলো মহান স্রষ্টা আল্লাহ্ তা'আলার অস্তিত্বকে অস্বীকার করা। একজন নাস্তিক বিশ্বাস করে, এ বিশাল পৃথিবীর কোনো স্রষ্টা নেই, তা এমনি-এমনি সৃষ্টি হয়েছে, কিংবা তা প্রকৃতির সৃষ্টি।
নাস্তিকতা ও ধর্মহীনতার নেপথ্য কারণ হলো অজ্ঞতা ও ভ্রষ্ট জ্ঞানচর্চা। আবার কখনো কখনো একধরনের মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েও মানুষ নাস্তিকতার পথে ধাবিত হয়। তখন ব্যক্তির মনে এমন এমন দ্বিধা-সংশয় দেখা দেয়, যা থেকে মুক্তি পাওয়া অত্যন্ত দুরূহ বিষয়। কেননা এ ধরনের রোগীরা কখনো এমন কোনো বিজ্ঞ আলেমের শরণাপন্ন হয় না, যিনি তার দ্বিধা-সংশয়ের যথার্থ উত্তর দিতে পারেন এবং এই দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে তাকে উদ্ধার করতে পারেন।
নাস্তিকতার আরেকটি কারণ হলো, নাস্তিকতার দোষে দুষ্ট কোনো বন্ধুর সাথে উঠাবসা ও চলাফেরা করা। এই সঙ্গদোষ ব্যক্তিকে পর্যায়ক্রমে ধর্মহীনতার পথে ধাবিত করে।
তরুণ ও যুবসমাজের মধ্যে নাস্তিকতার প্রবণতা প্রবল। ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব ও শূন্যতা হলো এর মূল কারণ। যেকোনো নতুনত্ব তাদের মাঝে দ্রুত সংক্রমিত হয়। আবার কখনো কখনো অর্থ-সম্পদের লিপ্সা, যশ-খ্যাতি, সম্মান ও মর্যাদার মোহে পড়ে তারা নাস্তিকতার আশ্রয় গ্রহণ করে। নিজের ব্যক্তিত্ব ও ধর্মীয় স্বকীয়তা বিকিয়ে দিয়ে পরাশ্রিত হয়ে পড়ে।
সমাজে দিন-দিন নাস্তিকতা সংক্রমক ব্যাধি হয়ে দেখা দিচ্ছে। এ সমস্যার সমাধান কী? এ থেকে উত্তরণের পথ কী?
সমাধান:
১. নাস্তিক ব্যক্তিকে আলোচনার মাধ্যমে বোঝাতে হবে। তার সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক ও কুরআন হাদীসের দলিলের ভিত্তিতে মৌলিক আলোচনা করতে হবে। কেননা জ্ঞানভিত্তিক মৌলিক আলোচনাই হলো সমস্যা সমাধানের অন্যতম পথ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
قُلْ هَلْ عِنْدَكُمْ مِّنْ عِلْمٍ فَتُخْرِجُوهُ لَنَا﴾ [سورة يونس: ١٤৮]
অর্থ: 'আপনি বলুন, আছে কি তোমাদের কাছে কোনো দলিল? তাহলে পেশ করুন আমার সামনে।' (আনআম, ৬: ১৪৮) পবিত্র কুরআনে অন্যত্র ইরশাদ করেন-
قُلْ هَاتُوا بُرْهُنَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ صَدِقِينَ﴾ [سورة البقرة: ١১১]
অর্থ: 'তোমরা যদি আসলেই সত্যবাদী হয়ে থাক, তাহলে প্রমাণ নিয়ে আস দেখি।' (বাকারা, ২: ১১১)
২. আমাদের চারপাশে উন্মুক্ত পৃথিবী, আমাদের হাতে পবিত্র কুরআন-এ দু'টি বিষয় নিয়ে চিন্তা-ফিকির করা আবশ্যক। এ সম্পর্কে বিচার-বিশ্লেষণ ও গবেষণা করা কর্তব্য। এ দু'টি বিষয় মহান স্রষ্টা আল্লাহ তা'আলার অস্তিত্ব ও একত্ববাদের প্রমাণ বহন করে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
قُلِ انْظُرُوا مَاذَا فِي السَّمَاتِ وَالْأَرْضِ﴾ [سورة يونس: ١০১]
অর্থ: 'আপনি বলুন, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, তার প্রতি লক্ষ কর।' (ইউনূস, Scolar: ১০১)
أَفَلَا يَنْظُرُونَ إِلَى الْإِبِلِ كَيْفَ خُلِقَتْ * وَإِلى السَّمَاءِ كَيْفَ رُفِعَتْ * وَإِلى الْجِبَالِ كَيْفَ نُصِبَتْ﴾ [سورة الغاشية : ১q - ১b - ১৯]
অর্থ: 'তবে কি তারা লক্ষ করে না উটের প্রতি, কীভাবে তা সৃষ্টি করা হয়েছে। আকাশের প্রতি, কীভাবে তাকে উঁচু করা হয়েছে। পাহাড়সমূহের প্রতি, কীভাবে তা (ভূমিতে) প্রথিত করা হয়েছে।' (গাশিয়া, ৮৮: ১৭, ১৮, ১৯)
৩. যে কোনো ধর্মীয় বিষয়ে সংশয় দেখা দিলে, দ্বিধা-দ্বন্দ্বের শিকার হলে তৎক্ষণাৎ এমন ব্যক্তির শরণাপন্ন হতে হবে, যিনি অগাধ ধর্মীয় জ্ঞানের অধিকারী, আমল-আখলাকে কুরআন-সুন্নাহর অনুসারী। পবিত্র কুরআনে সুস্পষ্টভাবে এ নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে:
﴿فَسْئَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ﴾ [سورة النحل ٤٣]
অর্থ : তোমরা যদি না জান, তবে জ্ঞানীগণকে জিজ্ঞেস কর। (সূরা নাহল, ১৬: ৪৩)
জ্ঞানীদের কাছে জানতে চাওয়ার বিষয়ে পবিত্র কুরআনে অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে:
﴿وَلَوْ رَدُّوهُ إِلَى الرَّسُولِ وَإِلَى أُولِي الْأَمْرِ مِنْهُمْ لَعَلِمَهُ الَّذِينَ يَسْتَنْبِطُونَهُ مِنْهُمْ ﴾ [سورة النساء: ٨٣]
অর্থ: তারা যদি তা রাসূল বা যারা কর্তৃত্বের অধিকারী, তাদের কাছে নিয়ে যেত, তবে তাদের মধ্যে যারা তার তথ্য অনুসন্ধানী, তারা তার বাস্তবতা জেনে নিত। (নিসা, ৪: ৮৩)
৪. কৌতূহল, চিন্তা-গবেষণা ও অনুসন্ধিৎসা নিয়ে নবীদের ঘটনা পাঠ করুন। আল্লাহ তা'আলার কুদরতের বিস্ময় সম্পর্কে ভাবুন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
﴿وَكُلًّا نَقُصُّ عَلَيْكَ مِنْ الباءِ الرُّسُلِ مَا نُثَبِّتُ بِهِ فُؤَادَكَ وَجَاءَكَ فِي هَذِهِ الْحَقُّ وَمَوْعِظَةٌ وَذِكْرَى لِلْمُؤْمِنِينَ﴾ [سورة هود : ١٢٠]
অর্থ: '(হে নবী!) আমি আপনাকে বিগত নবীগণের এমনসব ঘটনা শোনাচ্ছি, যার মাধ্যমে আমি আপনার অন্তরে শক্তি যোগাই। আর এসব ঘটনার ভেতর দিয়ে আপনার কাছে যে বাণী এসেছে, তা স্বয়ং সত্যও এবং উপদেশ ও স্মারক ঐ ব্যক্তিদের জন্য, যারা ঈমান গ্রহণ করেছে।' (হুদ, ১১: ১২০)
৫. রাসূল ﷺ-এর মোজেজা এবং তার জ্ঞানগরিমার মোজেজা সম্পর্কে জানুন এবং নিরপেক্ষভাবে আল্লাহ তা'আলার কুদরতের নিদর্শন অবলোকন করুন। আব্বাসী খেলাফতকালের বিখ্যাত কবি আবুল আতাহিয়া (১৩০-২১১ হি.) বলেছেন:
وَفِي كُلِّ شَيْءٍ لَهُ آيَةٌ تَدُلُّ عَلَى أَنَّهُ واحِدُ فَيا عَجَباً كَيْفَ يُعصى الإِلَهُ أَمْ كَيْفَ يَجِحَدُهُ الجَاحِدُ
অর্থ: 'প্রতিটি বস্তুতেই তাঁর নিদর্শন বিরাজমান। যা প্রমাণ করে যে, তিনি এক আল্লাহ মহান। তারপরও কী আশ্চর্য! মানুষ কীভাবে তাঁর নাফরমানি করে! অস্বীকারকারী কীভাবে তাঁর অস্তিত্ব অস্বীকার করে!'
৬. বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে ঈমান, আকীদা ও ধর্মীয় মৌলিক বিষয়ের সঠিক শিক্ষার প্রচার করতে হবে। এ উদ্দেশ্যে ধর্মীয় বিষয়সংবলিত প্রচুর সভাসেমিনারের আয়োজন করতে হবে। কেননা আল্লাহভিরুতা ও ধর্মপরায়ণতাই হলো মানুষের হৃদয়ে ঈমানের মূল চালিকাশক্তি। যেমন পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
وَلَكِن كُونُوا رَبَّنِينَ بِمَا كُنْتُمْ تُعَلِّمُونَ الْكِتٰبَ وَبِمَا كُنْتُمْ تَدْرُ سُونَ﴾ [سورة آل عمران: ۷৯]
অর্থ: বরং সে বলবে, 'তোমরা রববানী হও। যেহেতু তোমরা কিতাব শিক্ষা দিতে এবং তা অধ্যয়ন করতে।' (আলে ইমরান, ৩: ৭৯)
৭. সমাজের আনাচে-কানাচে আজ নাস্তিকতা ও ধর্মহীনতার ডাল-পালা বিস্তৃত। তাই বর্তমান প্রজন্মকে সঠিক ইসলামি শিক্ষা-দীক্ষার আলোকে গড়ে তুলতে হবে। দ্বীনের প্রতিটি বিষয় দলিল-প্রমাণ ও আলোচনা-পর্যালোচনা ভিত্তিতে তাদের মধ্যে বদ্ধমূল করে দিতে হবে। রাসূল ﷺ বলেছেন:
مَا مِنْ مَوْلُودٍ إِلَّا يُولَدُ عَلَى الفِطْرَةِ، فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ، وَيُنَصِّرَانِهِ، أَوْ يُمَحِّسَانِهِ» صحيح البখারী (٢/ ٩٥)
অর্থ: 'প্রতিটি নবজাতকই জন্মলাভ করে ফিত্রাতের (তাওহীদের) উপর। অতঃপর তার মা-বাবা তাকে ইয়াহুদী বা খ্রিস্টান বা অগ্নিপূজারীরূপে গড়ে তোলে।' (বুখারী: ২/৯৫)
৮. যখনই মনে কোনো সন্দেহ-সংশয় উঁকি দিবে, নামায ও দু'আর মাধ্যমে ঈমান ও বিশ্বাসের পথে ফিরে আসা কর্তব্য। রাসূলুল্লাহ ﷺ যখনই কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়ের সম্মুখীন হতেন, নির্দেশ করতেন:
يَا بِلَالُ، أَرِحْنَا بِالصَّلَاةِ» مسند أحمد (۳۸/ ১৭৮)
অর্থ: 'হে বেলাল! নামাযের মাধ্যমে আমাকে স্বস্তি দাও।' (মুসনাদে আহমাদ: ৩৮/১৭৮)
সামান্য আশঙ্কাতেই রাসূল ﷺ নামাযে মশগুল হতেন। সে তুলনায় ঈমান ও বিশ্বাস তো সবকিছুর ঊর্ধ্বে, সবকিছুর অগ্রে। সুতরাং ঈমানের ক্ষেত্রে সংশয় দেখা দিলে নামাযে মশগুল হওয়াই তো প্রথম করণীয়।
৯. যৌবনে যেমন দেহ-মন সতেজ ও প্রফুল্ল থাকে, তেমনি ঈমান ও বিশ্বাসের জায়গাটাও সুদৃঢ় হতে হবে, সুরক্ষিত হতে হবে। আল্লাহ তা'আলার একত্ববাদের বিশ্বাস মনের মধ্যে বদ্ধমূল করে নিতে হবে। মনীষী যথার্থ বলেছেন: 'দ্বিধা-সংশয়ের মুহূর্তে নিজের মনের ওপর মাত্রারিক্ত আস্থাশীল হয়ে পড়ো না। কেননা সন্দেহ-সংশয় দুর্বল প্রাণকে সহজেই কাবু করে ফেলে।'
১০. নাস্তিকদের সন্দেহ-সংশয়মিশ্রিত বক্তব্য খণ্ডন করে ঈমান ও বিশ্বাসের যথার্থতা তুলে ধরার জন্য আলোচনাসভা ও সেমিনার আয়োজন করা গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। মহাকাশ ও ভূমণ্ডলে আল্লাহ তা'আলার নিদর্শনের অলৌকিকতা, তাঁর অলৌকিক সৃজনশীলতার বিষয়টি সুস্পষ্টরূপে তুলে ধরা এবং মহাবিশ্বে আল্লাহ তা'আলার শক্তিমত্তা ও মহত্ত্ব প্রমাণ করে দেখানো আবশ্যক।
১১. ধর্মীয় বোধ ও বিশ্বাসে সন্দেহ-সংশয়ের শিকার হলে আল্লাহ তা'আলার দরবারে একাগ্রচিত্তে বেশি বেশি ইস্তেকগফার করতে হবে। মহান রবের সামনে সিজদাবনত হয়ে কায়মনোবাক্যে এই দু'আ করতে হবে:
وَقُلْ رَبِّ أَعُوذُ بِكَ مِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ وَأَعُوذُ بِكَ رَبِّ أَنْ يَحْضُرُونِ
অর্থ: 'হে রব! আপনার দরবারে পানাহ চাই শয়তানের প্ররোচনা থেকে। পানাহ চাই শয়তানের উপস্থিতি থেকে।'
১২. নাস্তিক ও সন্দেহবাদীদের সঙ্গ ত্যাগ করতে হবে। মু'মিন বান্দার জন্য এটাই কুরআনী দিকনির্দেশনা:
وَإِذَا رَأَيْتَ الَّذِينَ يَخُوضُونَ فِي آيَتِنَا فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ وَإِمَّا يُنْسِيَنَّكَ الشَّيْطَنُ فَلَا تَقْعُدُ بَعْدَ الذِّكْرَى مَعَ الْقَوْمِ الظَّلِمِينَ (سورة الأنعام : ٦٨)
অর্থ: 'আপনি যখন দেখেন, তারা আমার নিদর্শনসমূহ সম্বন্ধে উপহাসমূলক আলোচনায় মগ্ন হয়, তখন আপনি তাদের থেকে সরে পড়েন, যে পর্যন্ত না তারা অন্য প্রসঙ্গে ব্যস্ত হয়। আর শয়তান যদি আপনাকে ভুলিয়ে দেয়, তবে মনে হওয়ার পর যালিম লোকদের সঙ্গে বসবেন না।' (আনআম: ৬৮)
১৩. যে সমস্ত সোস্যাল মিডিয়া ও ওয়েবসাইটগুলো ধর্ম সম্পর্কে সন্দেহ-সংশয়ের বীজ বপন করে, যে সমস্ত বই পাঠকদের মনে সুকৌশলে নাস্তিকতা ও ধর্মহীনতার বিষ ছড়ায়, তা থেকে বেঁচে থাকতে হবে। এ হলো একটি অন্যতম ঈমানী সুরক্ষা। ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন: 'সন্দেহ-সংশয়ের সামনে তোমার মনটাকে স্পঞ্জ করে রেখো না। তাহলে তা চারপাশের সমস্ত সন্দেহ-সংশয় তার অন্তর্বস্তুসহ শুষে নিবে। তোমার হৃদয়টাকে মজবুত স্বচ্ছ কাঁচের মতো গড়ে তোলো। তার পিচ্ছিলতায় দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও সংশয় কখনোই স্থির হতে পারবে না। কিন্তু কাঁচ তার স্বচ্ছতায় আবর্জনাগুলোকে ঠিকই ধরতে পারবে এবং মসৃণতার বলে অনায়াসে এড়িয়ে যাবে।'
১৪. নাস্তিকতা ও ধর্মহীনতার বিরুদ্ধে রচিত বই-পুস্তক পড়তে হবে। এ সম্পর্কে অনেক বই রচিত হয়েছে। কয়েকটি নাম বলে দিচ্ছি:
الطب محراب الإيمان، الله يتجلى في عصر العلم، أفي الله شك؟، العالم ليس عقلا، صراع مع الملاحدة حتى العظم.
১৫. নাস্তিকের কোনো ধর্ম নেই, সুদৃঢ় কোনো ধর্মবিশ্বাস নেই। তার অবস্থা হলো প্রাণীর মতো, যা যেখানে-সেখানে চড়ে বেড়ায়। নিশ্চিন্তে নির্বিঘ্নে অপরাধ ও কুপ্রবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়ে। তার কাছে বিবেক-বোধের কোনো মূল্য নেই। চিন্তা-চেতনার কোনো দাম নেই। ধর্মহীনের ব্যক্তির এমন কোনো সঠিক নীতিমালা নেই, যা তাকে নীতি-নৈতিকতার বার্তা দিবে, সুষ্ঠু-স্বাভাবিক জীবনাচারের সুসংহত পয়গাম দিবে এবং অন্যায়-অনাচার থেকে বিরত রাখবে। তার একমাত্র পুঁজি হলো, মানব-মস্তিষ্কপ্রসূত এমন কিছু নীতিমালা, অন্য ব্যক্তি নিজের খেয়াল-খুশি মতো যুক্তি দাঁড় করিয়ে অনায়াসেই সে নীতিমালা খণ্ডাতে পারে, তা থেকে সরে আসার যথার্থ কারণ দর্শাতে পারে।
১৬. সন্দেহ-সংশয়ের সময় কুরআনের এ আয়াতটি বারবার পাঠ করুন:
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ. (سورة آل عمران : ৮)
অর্থ: 'হে আমাদের রব! আপনি হিদায়াত দেয়ার পর আমাদের অন্তরসমূহ বক্র করবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান করুন। নিশ্চয় আপনি মহাদাতা।' (আলে ইমরান, ৩: ৮) সিজদাবনত হয়ে রাসূল ﷺ এ দু'আটি পড়তেন: يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوْبِ، ثَبِّتْ قَلْبِيْ عَلَى دِينِكِ.
অর্থ: 'হে অন্তরের নিয়ন্ত্রণকর্তা, তোমার দ্বীনের ওপর আমার অন্তরকে অবিচল রাখো!' রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অনুসরণ করে আপনিও এ দু'আটি বারবার পাঠ করুন।
১৭. সন্তানদের সঙ্গে গাম্ভীর্যতা বজায় রেখে বন্ধুসুলভ সম্পর্ক গড়ে তোলা কর্তব্য। তাদের কাছাকাছি থেকে, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তাদের মনে কী ধরনের চিন্তা-চেতনা বিরাজ করছে, তা অনুধাবন করা প্রয়োজন। ঈমান ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে কোনো সন্দেহ-সংশয় আঁচ করতে পারলে সঠিক বিষয়ের দিকনির্দেশনা প্রদান করতে হবে। সর্বোপরি দু'আ করতে হবে, তারা যেন মৃত্যু পর্যন্ত ঈমানের পথে অবিচল থাকে।
১৮. ধর্মহীনতা ও নাস্তিকতার পথ থেকে সতর্ক থেকে লোকদেরকে ঈমান ও বিশ্বাসের বন্ধন অটুট রাখতে হবে। কেননা নাস্তিকতা ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনে ফাটল সৃষ্টি করে, ক্রমান্বয়ে তা ছিন্ন হতে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। গোটা সমাজে এক ভয়ংকর বন্য পরিবেশের সৃষ্টি হয়, যেখানে সবল দুর্বলকে গ্রাস করার প্রবণতায় মেতে উঠে। শক্তি ও দাপট দেখিয়ে স্বীয় মতবাদ প্রচার ও প্রতিষ্ঠার উদগ্র মানসিকতায় মদমত্ত হয়ে পড়ে। কেননা স্রষ্টা, পরকাল ও ন্যায়-অন্যায়ের বিচার ইত্যাদির কোনোটিতেই তারা বিশ্বাসী নয়।
১৯. মনে রাখতে হবে, নাস্তিকতা ও ধর্মীয় অবিশ্বাস জীবনে দুশ্চিন্তা-বিষণ্ণতা, মানসিক অস্থিরতা ডেকে আনে। ব্যক্তির মনে অহংকার, লোভ-লালসা, অপরাধ-প্রবণতা সৃষ্টি করে। কারণ, নাস্তিক বিশ্বাস করে না, এ বিশ্বজগতের কোনো স্রষ্টা আছেন, কিংবা আছেন কোনো মহাপ্রজ্ঞাবান তত্ত্বাবধায়ক, যার অধীনে যাবতীয় কিছু পরিচালিত হচ্ছে, যিনি পরকালে ন্যায়-অন্যায়ের ফায়সালা করবেন এবং প্রতিদান দান করবেন কিংবা শাস্তি দিবেন। সুতরাং একজন নাস্তিক-চোখ থাকতেও কানা। কান থাকতেও কালা। দিল থাকতেও মুর্দা।
২০. মনের সমস্ত অহংকার-দাম্ভিকতা ঝেড়ে ফেলে বিনয়াবনত হয়ে সত্য গ্রহণ করতে হবে। যে কেউ নাস্তিকতার পথে ধাবিত হয়, তার মতাদর্শের বাইরে অন্যদেরকে তুচ্ছ-নগণ্য ভাবতে শুরু করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
الْكِبْرُ بَطَرُ الْحَقِّ، وَغَمْطُ النَّاسِ. (صحيح مسلم (১/ ৯৩)
অর্থ: 'প্রকৃতপক্ষে অহংকার হচ্ছে দম্ভভরে সত্য ও ন্যায় অস্বীকার করা এবং মানুষকে ঘৃণা করা।' (মুসলিম: ১/৯৩)
২১. ধর্মীয় অজ্ঞতা দূর করার লক্ষ্যে সমাজে ধর্মীয় শিক্ষা-দীক্ষা ও সভ্যতা-সংস্কৃতির বিপ্লব ঘটাতে হবে। এ ক্ষেত্রে দ্বীনের দায়ীগণ, আলেম সমাজ ও চিন্তাবিদগণকে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। তাঁরা জাতির সামনে ঈমান ও আকীদার মৌলিক বিষয়গুলো সুস্পষ্টরূপে তুলে ধরবেন। এর অকাট্যতা ও অব্যর্থতা প্রমাণ করে দেখাবেন। ইসলাম ও ইবাদতের মূল শিক্ষা, আত্মসমর্পণ ও আত্মনিবেদনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বোঝাবেন। ইসলামের মৌলিক বিষয় সম্পর্কে আলেম সমাজের এ আলোচনাগুলো আধুনিক প্রযুক্তি ও সোস্যাল মিডিয়ার সাহায্যে, মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে বিশ্বের প্রতিটি নাগরিকের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
২২. যেকোনো ধরনের বাড়াবাড়ি, প্রান্তিকতা ও সংকীর্ণ মানসিকতা থেকে বেঁচে থাকতে হবে। এ সমস্ত কারণে ব্যক্তি ন্যায়ানুগতা ও নীতি-নৈতিকতা থেকে বিচ্যুত হয় এবং স্বভাবধর্ম ইসলামের সরল পথ ছেড়ে নাস্তিকতার মতো স্বভাববিরুদ্ধ প্রান্তিকতায় ফেঁসে যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«هَلَكَ الْمُتَنَطِّعُونَ» قَالَهَا ثَلَاثًا صحيح مسلم (٤ / ٢٠٥٥)
অর্থ: 'অতিরঞ্জনকারীরা ধ্বংস হয়েছে।' তিনি এ কথাটি তিনবার বলেছেন। (মুসলিম: ৪/২০৫৫)
২৩. যে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করবে, আল্লাহ তা'আলা তাকে পরম সান্নিধ্য দান করবেন। যে আল্লাহ বিধি-বিধান অটুট রাখবে, আল্লাহ তা'আলা তার পরম রক্ষাকর্তা হয়ে যাবেন। সুতরাং ফরয ইবাদতগুলোতে যত্নবান হোন এবং নফল ইবাদতে সচেষ্ট হোন। দু'আকে আপনার রক্ষাকবচ বানিয়ে নিন। প্রতিদানে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে সুরক্ষা ও মুক্তির সুসংবাদ গ্রহণ কর। রাসূল ﷺ বলেছেন:
احْفَظِ اللَّهَ يَحْفَظْكَ، احْفَظِ اللَّهَ تَجِدْهُ تُجَاهَكَ، إِذَا سَأَلْتَ فَاسْأَلِ اللَّهَ، وَإِذَا اسْتَعَنْتَ فَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ. سنن الترمذي (٦٦٧/٤)
অর্থ: 'আপনি আল্লাহ তা'আলার বিধি-বিধান সংরক্ষণ করুন, আল্লাহ আপনার 'হেফাজতকারী' (রক্ষাকর্তা) হয়ে যাবেন। আল্লাহ তা'আলার আদেশ-নিষেধ মেনে চলুন। সর্বদা তাঁকে পাশে পাবেন। যদি প্রার্থনা করেন, আল্লাহ তা'আলার কাছেই প্রার্থনা করুন। যদি সাহায্য চান, আল্লাহ তা'আলার কাছেই সাহায্য চান।' (তিরমিজী: ৪/৬৬৭)
২৪. মহান আল্লাহর পবিত্র সত্তা ও ধর্মীয় বিষয়ে যে ধৃষ্টতা প্রদর্শন করবে, ইসলাম ও ইসলামের নবী সম্পর্কে অন্যায্য আচরণ-উচ্চারণ করবে, তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি আরোপ করতে হবে। আল্লাহ তা'আলা সর্বশ্রেষ্ঠ মহান সত্তা। বিশ্বজগতে তিনিই একমাত্র সর্বোচ্চ সম্মানের হকদার। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য প্রেরিত আসমানি ধর্মও সম্মান ও মর্যাদার হকদার। অন্যায়ভাবে প্রাণী-হত্যার কারণে, মানুষকে কষ্ট দেওয়ার কারণে বিচার ও শাস্তি হওয়া উচিত। তাহলে বিশ্বজগৎ ও মানবজাতির স্রষ্টা মহান আল্লাহ, তাঁর প্রেরিত শ্রেষ্ঠ মানব রাসূল ﷺ ও শ্রেষ্ঠ ধর্ম ইসলাম সম্পর্কে বিরোধিতা করা হলে তার শাস্তি কতটা কঠোর হওয়া উচিত? মানবজীবনে সবচেয়ে বড় ও জঘন্য পাপ হলো নিজ স্রষ্টাকে অস্বীকার করা, তাঁর সাথে শরিক করা এবং তাঁর পক্ষ থেকে প্রেরিত জীবন-বিধান নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা ও উপহাস করা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ قُلْ أَبِاللَّهِ وَايْتِهِ وَرَسُولِهِ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِعُونَ﴾ (سورة التوبة : ٦٥ )
অর্থ: 'আর যদি তুমি তাদেরকে প্রশ্ন কর, অবশ্যই তারা বলবে, 'আমরা আলাপচারিতা ও খেল-তামাশা করছিলাম। বল, 'আলাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলের সাথে তোমরা বিদ্রূপ করছিলে? (তাওবা, ৯: ৬৫)
পরিশিষ্ট:
* মিশরীয় কবি, ঈমানী জাগরণের কবি ইবরাহীম বাদাওয়ী (১৯০৩-১৯৮৩ খৃষ্টাব্দ) বলেছেন:
اللهِ فِي الْآفَاقِ آياتٌ لَعَلَّ أَقَلُّهَا هُو مَا إِلَيْهِ هَدَاكَ
ولَعَلَّ مَا فِي النَّفْسِ مِنْ آيَاتِهِ عَجَبٌ عُجَاب لَوْ تَرَى عَيْنَاكَ
وَالكَوْنِ مَشْحُونَ بِأَسْرَارٍ إِذا حاولت تفسيراً لها أعياك
قُلْ لِلْجَنِين يَعِيْشِ مَعْزُولا بِلَا راع ومَرْعى، ما الذي يَرْعَاكَا؟
وَاسْأَلْ بُطُونِ النَّحْلِ كَيْفَ تَقَاطَرَت شَهْداً وقُلْ لِلشَّهْد مَن حَلَّاكَ
يا مُدْرِك الأبصار والأَبْصَار لا تَدْرِي له ولكنهه إدراكا
إِنْ لَمْ تَكُنْ عَيْنِي تَرَاكَ فَإِنَّنِي فِي كُلِّ شَيْءٍ أَسْتَبِينُ عُلَاكا..
অর্থ: পৃথিবীর দিগ-দিগন্তে আল্লাহ তা'আলার কত অজস্র নিদর্শন ছড়িয়ে আছে। তার মধ্যে আপনি যেগুলোর সন্ধান পেয়েছেন, তা নিতান্তই কম। আপনার সত্তার মধ্যেই আল্লাহ তা'আলার মহাবিস্ময়কর নিদর্শন লুকিয়ে আছে। আপনার দৃষ্টি যদি তা দেখতে পেত! কত নিগূঢ় রহস্যে ঠাসা এ বিশ্বজগৎ। আপনি যদি তা উদ্ঘাটন করতে যান, জীবন ফুরিয়ে যাবে, সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাবে। যে নবজাতক বেঁচে আছে, যার কোনো আশ্রয় নেই, যাকে দেখানোর কোনো অভিভাবক নেই, তাকে জিজ্ঞেস করে দেখুন- কে তাঁকে বাঁচিয়ে রাখছে? কে তার দেখাশোনা করছে? মৌমাছিকে জিজ্ঞেস করুন, কে তার উদর মধুতে ভরে দিয়েছে? মধুকে জিজ্ঞেস করে দেখুন, কে তার মধ্যে এত মিষ্টতা ঢেলে দিয়েছে? হে দৃষ্টিশক্তির স্রষ্টা, দৃষ্টিশক্তি যার নাগাল পায় না! আমার সাধ্য কি তোমাকে দেখার? কিন্তু আমি যে সবকিছুতেই তোমার অস্তিত্ব, তোমার মহত্ত্ব অনুভব করি।
মিশরীয় লেখক, চিকিৎসক ও দার্শনিক মোস্তফা মাহমুদ (১৯২১-২০০৯ খৃষ্টাব্দ) বলেছেন:
'প্রকৃত ঈমান ও বিশ্বাসের বলেই মন প্রশান্ত হয়। মু'মিন বান্দার জীবনে কঠিন সংকট ও প্রতিকূলতা প্রশান্ত সমুদ্রে একটি উত্তাল তরঙ্গমাত্র। যা মুহূর্তেই নিস্তেজ হয়ে পড়ে এবং সমুদ্র আগের মতো প্রশান্ত হয়ে যায়।'
বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন (১৮৭৯-১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন:
'বিশ্বজগতের স্রষ্টার অস্তিত্ব ও তাঁর শক্তিমত্তা নিয়ে যখনই কোনো সন্দেহ-সংশয় জাগে, চারপাশের উন্মুক্ত সৃষ্টিজীব দেখতে থাকি। উপলব্ধি করতে পারি, এ বিশ্বজগতের স্রষ্টা নিছক সাধারণ কেউ নন, যে বসে-বসে পাশা খেলায় মত্ত থাকে। তিনি মহান, মহাপ্রজ্ঞাবান।'
বিংশ শতাব্দীর অন্যতম মিশরীয় কবি সাহিত্যিক আব্বাস মাহমুদ আক্কাদ (১৮৮৯-১৯৬৪ খৃষ্টাব্দ) বলেছেন:
'নাস্তিক ও ধর্মহীন চরম নির্বোধ ও মানসিক প্রতিবন্ধী।'
টিকাঃ
১৮. অলৌকিক ঘটনা
📄 শিরক
পূর্ব চীনের ল্যাঙ্গ থেকে পশ্চিম ফ্রান্স পর্যন্ত সফর করে বেড়িয়েছি। কতো বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও নতুনত্ব চোখে পড়েছে। তবে যে বিষয়টি সবচেয়ে প্রকটরূপে চোখে বেঁধেছে, তা হলো 'শিরক'।
শিরক হলো প্রভুত্বের ও উপাস্যত্বের ক্ষেত্রে মহান আল্লাহ তা'আলার কোনো সমকক্ষ ও অংশীদার নির্ধারণ করা, তাঁর সঙ্গে অন্যকে ইলাহ সাব্যস্ত করা। প্রকৃত সত্য হলো, মহান আল্লাহ তা'আলা এক ও একক। তাঁর কোনো অংশীদার নেই। তিনি ছাড়া নেই কোনো রব ও ইলাহ। নেই কোনো স্রষ্টা ও উপাস্য। পৃথিবীতে শিরকই হলো সবচেয়ে গুরুতর জঘন্য পাপ। এমন মহা পাপ থেকে মানবজাতিকে উদ্ধারের উদ্দেশ্যেই আল্লাহ তা'আলা যুগেযুগে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন এবং আসমানি কিতাব নাযিল করেছেন। কত দলিল-প্রমাণ পেশ করেছেন, যেন মানবজাতি বুঝতে পারে, তাদের একজন স্রষ্টা আছেন, যিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। তিনিই একমাত্র উপাস্য। তিনি এক ও একক।
আল্লাহ তা'আলা বান্দার সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন। কিন্তু শিরক ক্ষমা করেন না। যুগে-যুগে প্রেরিত নবী-রাসূলগণের ওপর প্রথম গুরুদায়িত্বটি ছিল আল্লাহ তা'আলার তাওহিদ ও একত্ববাদের দাওয়াত প্রদান করা। তাই তো প্রত্যেক নবী-রাসূল নিজ নিজ সম্প্রদায়ের সামাজিক অনাচার ও রাজনৈতিক কদাচারগুলো এড়িয়ে প্রথমেই তাওহিদ ও একত্ববাদের দাওয়াত দিয়েছেন।
তাওহিদ ও একত্ববাদ হলো শিরক ও বহুশ্বরবাদের পরিপন্থি। এ দুয়ের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। তাওহিদ হলো সবচেয়ে মহৎ ইবাদত, আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ উপায়। আর শিরক হলো সবচেয়ে জঘন্য, অমার্জনীয় পাপ, যে পাপের শাস্তি অনিবার্য। তাওহীদে বিশ্বাসী হওয়া ছাড়া তা থেকে নিস্তারের দ্বিতীয় কোনো পথ নেই।
অত্যন্ত অনুতাপের বিষয় হলো, আমরা কিছু আনুষাঙ্গিক বিষয়ে মতবিরোধের জের ধরে রেখেছি। তা নিয়ে ব্যতিব্যস্ত থাকছি। এদিকে তাওহিদ ও একত্ববাদের প্রচার-প্রসার, মুসলমানদের আকীদা ও ধর্মীয়বিশ্বাস সংশোধনের দায়িত্ব বেমালুম ভুলে বসেছি।
এ সমস্যার সমাধান কীসে? এ অচলাবস্থার উন্নতি কীসে?
সমাধান:
১. হৃদয়ে আল্লাহ তা'আলার প্রতি দৃঢ় ঈমান ও অগাধ বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। যখন আল্লাহর যিকিরে মশগুল হবেন, পবিত্র কুরআন ও বিশ্বজগতের সৃষ্টি রহস্য সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনায় নিমগ্ন হবেন, হৃদয়ের গভীর থেকে ধ্বনিত হবে:
أَشْهَدُ أَلَّا إِلهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ.
অর্থ: 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, এক আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ্ নেই। তাঁর সমকক্ষ কোনো অংশীদার নেই।'
২. নবী-রাসূলগণের পক্ষ থেকে উম্মতের ওপর তাওহিদ ও একত্ববাদের আহ্বান প্রচারের যে দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে, সে বিষয়ে সবসময় সচেষ্ট থাকতে হবে। মানুষকে জোর দিয়ে বোঝাতে হবে, শিরকমুক্ত হয়ে তাওহিদ ও একত্ববাদে বিশ্বাসী হওয়া ছাড়া নামায, রোযা, যাকাত ও অন্যান্য সমস্ত ইবাদতই বৃথা, এর কোনো মূল্য নেই। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَقَدِمْنَا إِلَى مَا عَمِلُوا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنَهُ هَبَاءً مِّنْثُورًا
অর্থ: 'তারা (দুনিয়ায়) যে আমাল করেছিল আমি সেদিকে অগ্রসর হব, এরপর তাকে বানিয়ে দেব ছড়ানো ছিটানো ধূলিকণা (সদৃশ)।' (ফুরকান, ২৫: ২৩)
৩. মনে রাখতে হবে, নবী-রাসূলগণের প্রত্যেকেই মূলত তাওহিদ ও একত্ববাদের দাওয়াত প্রচার করেছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
﴿وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُونَ﴾ [النحل : ٣٦]
অর্থ: 'নিশ্চয়ই আমি প্রত্যেক উম্মতের ভেতর কোনো না কোনো রাসূল পাঠিয়েছি এই নির্দেশ দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুতকে পরিহার কর।' (সূরা নাহল, ১৬: ৩৬) তাওহিদ ও একত্ববাদের প্রচারে নবী-রাসূলগণের একটিই আহ্বান ছিল। পবিত্র কুরআনের ভাষায়-
﴿فَأَرْسَلْنَا فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْهُمْ أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِّنْ إِلَهِ غَيْرُهُ افَلَا تَتَّقُونَ ﴾ [المؤمنون: ٣٢]
অর্থ: 'আর তাদের মাঝে তাদেরই একজনকে রাসূল করে পাঠিয়েছিলাম এই বলে যে, তোমরা আল্লাহর 'ইবাদাত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের কোন ইলাহ নেই, তবুও কি তোমরা (তাঁকে) ভয় করবে না?' (মু'মিনুন, ২৩: ৩২) আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রিয় রাসূল ﷺ-কে সর্বপ্রথম যে নির্দেশ প্রদান করেছেন, তা হলো একত্ববাদের নির্দেশ। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
﴿فاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَتِ﴾ [محمد : ١٩]
অর্থ: 'সুতরাং জেনে রাখুন, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই। ক্ষমা প্রার্থন করুন আপনার ও মু'মিন নর-নারীদের ত্রুটির জন্য।' (মুহাম্মদ, ৪৭: ১৯)
৪. রাসূল ﷺ ও তাঁর সাচ্চা অনুসারীগণ প্রজ্ঞা, হিতোপদেশ ও আসমানি কিতাবের বাণীর মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর একত্ববাদের দিকে আহ্বান করেছেন। একই পথ অনুসরণ করে আমাদেরও তাওহিদ ও একত্ববাদের দাওয়াত প্রচার করতে হবে। আল্লাহ তা'আলা এ বিষয়ে রাসূলগণ ও আসমানি কিতাবপ্রাপ্ত জাতিবর্গের প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ لَتُبَيِّنَهُ لِلنَّاسِ وَلَا تَكْتُمُونَهُ [ العمران : ۱৮৭]
অর্থ: 'আর (সেই সময়ের কথা তাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়) যখন আল্লাহ 'আহলে কিতাব' থেকে এই প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন যে, তোমরা এ কিতাবকে অবশ্যই মানুষের সামনে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করবে।' (আলে ইমরান, ৩: ১৮৭)
৫. দ্বীনের আলেম ও দায়ীগণকে পৃথিবীর দূর-দূরান্তে একত্ববাদের বাণী পৌঁছে দিতে হবে। ব্যক্তিগত পরিসরে, পারিবারিক জীবনে ও সামাজিক অঙ্গনে শিরকের ভয়াবহ পরিণতি তুলে ধরতে হবে। শিরকের যত ধরন-প্রকৃতি প্রচলিত আছে, যেমন: মূর্তি পূজা, প্রতিমা পূজা, কবর পূজা, মাজার পূজা, যাদুটোনা ও জ্যোতিষবিদ্যা ইত্যাদি কার্যকলাপ থেকে সতর্ক করতে হবে।
৬. আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, তাঁর একত্ববাদে বিশ্বাস সুরক্ষিত ও অটুট রাখার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক থেকে শুরু করে উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চতর গবেষণাকেন্দ্রে পর্যন্ত 'ঈমান ও একত্ববাদের বিশ্বাস'-বিষয়টি সিলেবাসভুক্ত করতে হবে। কেননা একজন মুসলমান যত উচ্চ শিক্ষিতই হোক-না-কেন, উন্নতি-অগ্রগতির যত শীর্ষস্থান অধিকার করুক-না-কেন, আল্লাহ তা'আলার একত্ববাদে একনিষ্ঠ খাঁটি বিশ্বাসী না হওয়া পর্যন্ত সে প্রকৃত মুসলমান হতে পারে না।
৭. কুরআন-সুন্নাহ আঁকড়ে ধরতে হবে। কুরআন-সুন্নাহ সম্পর্কে জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় ও গবেষণায় উৎসাহিত করতে হবে। সমাজ ও জাতির ঝোঁক-প্রবণতার দিকে সজাগ দৃষ্টি রেখে তা সঠিক পথে পরিচালিত করা আবশ্যক। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيلِهِ ذَلِكُمْ وَضَكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ﴾ [الأنعام : ١٥৩]
অর্থ: 'এবং এ-ই পথই আমার সরল পথ। সুতরাং তোমরা এর অনুসরণ কর এবং বিভিন্ন পথের অনুসরণ কর না। অন্যথায় তা তোমাদেরকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিবে। হে মানুষ! এসব বিষয়ে আল্লাহ তোমাদেরকে গুরুত্বের সাথে আদেশ করেছেন, যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার।' (আনআম, ৬: ১৫৩)
৮. পবিত্র কুরআনের ঘটনাসমূহে, দৃষ্টান্ত-উপমায়, দলিল-প্রমাণে, তথ্য ও তত্ত্বে আল্লাহ তা'আলার একত্ব ও অদ্বিতীয়তা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত। যেমন: সুলাইমান (আ.)-এর যামানায় পিপীলিকা ও হুদহুদ পাখির ঘটনা, মৌমাছির আলোচনা, সালেহ্ (আ.)-এর উটনীর ঘটনা। প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটি বিষয়ের চমৎকার সমন্বয় ঘটেছে। তা হলো, আল্লাহ তা'আলার একত্ববাদ ও অদ্বিতীয়তা।
৯. সন্তানদেরকে শিরকের জঘন্যতা ও গুরুতরতা সম্পর্কে সতর্ক করার সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর একত্ববাদের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা কর্তব্য। লুকমান (আ.) যেমনটি করেছেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
وَإِذْ قَالَ لُقْمَانُ لِابْنِهِ وَهُوَ يَعِظُهُ يُبُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ إِنَّ الشَّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ﴾ [لقمان: ١৩].
অর্থ: 'এবং (সেই সময়ের কথা) স্মরণ করুন, যখন সে তার পুত্রকে উপদেশচ্ছলে বলেছিল, ওহে আমার পুত্র! আল্লাহর সাথে শিরক কর না। নিশ্চিত মনে রেখ, শিরক চরম অন্যায়।' (সূরা লুকমান, ৩১: ১৩)
সমাজের বিশেষ-সাধারণ নির্বিশেষে প্রতিটি শ্রেণির হৃদয়ে, প্রতিটি প্রজন্মের অন্তরে এ আয়াতের দাবি ও মর্ম বদ্ধমূল করে দিতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا﴾ [النساء : ٢٨]
অর্থ: 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শিরক করার বিষয়টি ক্ষমা করেন না। এর চেয়ে নিচের যেকোনো বিষয়ে যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করে, সে এমন এক অপবাদ আরোপ করে, যা গুরুতর পাপ।' (নিসা, ৪: ৪৮)
১০. দ্বীনের দাওয়াতের পন্থা সহজ-সাবলীল হতে হবে। তাতে বিতর্কিত বিষয়ের আঁচ থাকবে না। দর্শনের জটিল ও দুর্বোধ্য বিষয়ের ঝাঁঝ থাকবে না। ইসলাম হলো সাবলীল ও স্বভাবজাত ধর্ম। সুতরাং তার দাওয়াতের পন্থাও হবে সহজাত সাবলীল। পবিত্র কুরআনে দ্বীনের দাওয়াতসংবলিত দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে:
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ ﴾ [النحل: ۱۲৫]
অর্থ: 'আপনি নিজ প্রতিপালকের প্রতি মানুষকে ডাকবেন হিকমত ও সদুপদেশের মাধ্যমে আর (যদি কখনো বিতর্কের দরকার পড়ে, তবে) তাদের সাথে বিতর্ক করবেন উৎকৃষ্ট পন্থায়।' (নাহল, ১২৫)
১১. দ্বীনের দায়ী ও আহ্বায়ককে প্রথমেই মানুষের আকীদা ও বিশ্বাস সংশোধনে কাজ করতে হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে নীতি-নৈতিকতা, সামাজিক শিষ্টাচার, আল্লাহর নৈকট্য লাভের সাধনা ইত্যাদি বিষয়ে অগ্রসর হতে হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ পবিত্র মক্কা নগরীতে তের বছর অবস্থান করেছেন। এ দীর্ঘ সময়ে তিনি শুধু আল্লাহ তা'আলার একত্ববাদের দাওয়াত প্রচার করেছেন। لَا إِلَهَ إِلَّا الله-এর অর্থ ও মর্ম মানুষের মনে বদ্ধমূল করার চেষ্টা করেছেন।
১২. একটি হাদীসে কুদসী, যা সবসময় মনে রাখা কর্তব্য। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: قَالَ اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى: أَنَا أَغْنَى الشَّرَكَاءِ عَنِ الشَّرْكِ مَنْ عَمِلَ عَمَلاً أَشْرَكَ فِيهِ مَعِي غَيْرِي تَرَكْتُهُ وَشِرْكَهُ". صحيح مسلم (٤/ ٢٢٨٩)
অর্থ: আবূ হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মহান আল্লাহ বলেন, 'আমি শারীকদের শিরক হতে সম্পূর্ণ মুক্ত। যদি কোন লোক কোন কাজ করে এবং এতে আমি ছাড়া অপর কাউকে শারীক করে, তবে আমি তাকে ও তার শিরকি কাজকে প্রত্যাখ্যান করি।' (মুসলিম: ৪/২২৮৯)
যত দিন বেঁচে আছেন, لَا إِلَهَ إِلَّا الله কালিমাটি বারবার পাঠ করুন। لَا إِلَهَ (কোনো ইলাহ্ নেই) অংশটি সমস্ত প্রভু ও উপাস্যের অস্তিত্বকে নাকচ করে। إِلَّا الله (আল্লাহ ছাড়া) অংশটি প্রভুত্ব ও উপাসনার অধিকার একমাত্র আল্লাহ তা'আলার জন্য সাব্যস্ত করে।
প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় এ দু'আ পাঠ করুন: اللهُمَّ إِنِّي أَعوذُ بِكَ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ وَأَنَا أَعْلَمُ، وَأَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لَا أَعْلَمُ.
অর্থ: 'হে আল্লাহ! জেনে-বুঝে তোমার সঙ্গে শিরক করা থেকে পানাহ চাই। না জেনে, না বুঝে যে গুনাহ ও পাপাচার করেছি, তার জন্য ক্ষমা চাই।'
পরিশিষ্ট:
* ধ্রুপদি আরবি কবিতার শ্রেষ্ঠ কবিদের অন্যতম কবি আবূ নুয়াস (৭৫৬-৮১৪ খৃষ্টাব্দ) বলেছেন: 'পৃথিবীর যত গাছপালা, তরুলতা আছে, তা পরখ করে দেখো, মহান স্রষ্টা যা সৃষ্টি করেছেন, তা পর্যবেক্ষণ করে দেখ, তাতে কত অসংখ্য প্রমাণ ও নিদর্শন জাজ্বল্যমান, যা প্রমাণ করে যে, মহান আল্লাহ এক ও একক। তাঁর নেই কোনো শরিক, সমকক্ষ।'
* শাইখুল ইসলাম হাফেয ইবনে তাইমিয়া (রহ.) (৬৬১-৭২৮ হি.) বলেছেন: 'তাওহিদ ও একত্ববাদের মূল দাবি হলো, আমরা এক আল্লাহ তা'আলার ইবাদত করব। তাকেই ডাকব। তাকেই ভয় করব। একমাত্র তাঁর ওপর ভরসা করব। এ শাশ্বত দ্বীন তাঁরই পক্ষ থেকে প্রদত্ত।'
* 'তাওহিদ ও একত্ববাদ হলো পৃথিবীতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, মঙ্গলজনক হিতোপদেশ। পরকালের জন্য বান্দার শ্রেষ্ঠ পাথেয়।' -আয়েয আল-কারনী
টিকাঃ
১৯ অংশীদারিত্ব নির্ধারণ করা।
২০ অবর্তীর্ণ।
২১ ‘তাগুত’ শয়তানকেও বলা হয় আবার প্রতিমাদেরকেও বলা হয়। সে হিসেবে বাক্যটির দু'টি ব্যাখ্যা হতে পারে। (ক) তোমরা শয়তানকে বর্জন করো, তার অনুগামী হয়ো না। (খ) তোমরা মূর্তিপূজা হতে বেঁচে থাকো। (তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন)
**. বিজ্ঞজন ও দ্বীন প্রচারকারী