📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 দেশাত্মবোধের অভাব

📄 দেশাত্মবোধের অভাব


দেশপ্রেম ও দেশাত্মবোধ এমন শব্দ, যা অনেক মহৎ চিন্তা-চেতনা, বোধ- উপলব্ধি ও কর্মকীর্তি ধারণ করে। প্রকৃত দেশাত্মবোধ হলো, নিখাঁদ দেশপ্রেম, দেশের প্রতি একনিষ্ঠতা, দেশের কল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া এবং এর উন্নতি-অগ্রগতিতে সর্বাত্মক চেষ্টা-সাধনা করা।

আল্লাহ তা'আলা যখন রাসূল -কে নির্দেশ প্রদান করলেন, স্বীয় মাতৃভূমি মক্কা নগরী ত্যাগ করে মদিনার উদ্দেশে হিজরত করতে, রাসূল মক্কা ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন। স্বীয় মাতৃভূমি থেকে বিচ্ছেদের মুহূর্তে তাঁর পবিত্র জবান থেকে উচ্চারিত হলো এমন মর্মস্পর্শী বাণী, যা স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার উপযুক্ত, প্রজন্ম পরম্পরায় যা সকলের জন্য শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে: 'আল্লাহর শপথ! (হে মক্কা নগরী!) আমি তোমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছি। কোনো সন্দেহ নেই যে, গোটা পৃথিবীর মধ্যে তুমি আমার সর্বাধিক প্রিয় নগরী, আল্লাহর নিকট শ্রেষ্ঠ নগরী। তোমার অধিবাসীরা যদি আমাকে দেশত্যাগে বাধ্য না করত, আমি কখনো তোমার পবিত্র ভূমি ত্যাগ করতাম না।'

মক্কা নগরীতে আশৈশব জীবন এবং উম্মতের চরম প্রতিকূলতা ও বিপর্যয়ের মুখেও রাসূল -এর পবিত্র জবানের এ কথাগুলোয় স্বদেশের প্রতি তাঁর নিখাঁত ভালোবাসা, গভীর মমত্ববোধ ফুটে উঠে। মক্কার কাফের দ্বারা রাসূল যে অমানবিক যুলুম-অত্যাচার, নির্যাতন-নিগ্রহের শিকার হয়েছেন, তা সত্ত্বেও তিনি মক্কার প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও আবেগ-অনুভূতিতে এতটুকু চির ধরেনি।

বর্তমান বিশ্বে প্রতিটি দেশে এমন অনেক নাগরিক আছে, দেশপ্রেম, দেশাত্মবোধ যাদের কাছে চরম অবহেলার শিকার। এ বিষয়ে তারা বিন্দুমাত্র তাগিদ অনুভব করে না। নিজ নিজ কল্যাণ ও স্বার্থসিদ্ধিতে তাদের উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখে যতই মুগ্ধ হোন-না-কেন, দেশের স্বার্থে ও দশের কল্যাণে তারা একেবারেই নিরুদ্বিগ্ন নির্জীব। তাদের হৃদয়গুলো অনুভূতিহীন শক্ত পাথর। কোনো সন্দেহ নেই, দেশ ও জাতির সামগ্রিক উন্নতি-অগ্রগতির পথে তা এক জটিল বাধা। এ বাধা কাটিয়ে উঠার উপায় কী? এ সংকট থেকে উত্তরণের পথ কী?

সমাধান:
১. বর্তমান প্রজন্মের মাঝে দেশাত্মবোধ ও দেশপ্রেমের গভীর অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে হবে। কেননা শিশু-কিশোররা পারিবারিক শিক্ষা-দীক্ষার মাধ্যমে যা অর্জন করে, আগামীর জীবনে তা প্রেরণা ও কর্মশক্তি হিসেবে কাজ করে।
২. ছাত্রসমাজের মাঝে দেশাত্মবোধের শিক্ষা জাগরূক করার ক্ষেত্রে মাদরাসা ও ইউনিভার্সিটিগুলোর যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে। দেশের চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কে ছাত্রদেরকে সজাগ-সচেতন করে তোলা কর্তব্য। এক্ষেত্রে তাদেরকে ইতিবাচক কার্যকর ভূমিকা পালনে অনুপ্রাণিত করতে হবে। কেননা তারাই হলো দেশের কল্যাণে আগামীর সূর্য-সন্তান, দেশের সেবক ও রক্ষক।
৩. শিক্ষা-সংস্কৃতি, মিডিয়া ও সম্প্রচারের মাধ্যমে দেশাত্মবোধ ও দেশপ্রেমের অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে হবে। বিষয়টি যেন তরুণ প্রজন্মের চিন্তা-চেতনায়, তাদের মন-মস্তিষ্কে স্থায়িভাবে গেঁথে যায় এবং বিষয়টিকে তারা যেন জীবনের অবিচ্ছেদ্য লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করে।
৪. বিশ্বাস করুন, ন্যায়-নীতিবান ও মহান ব্যক্তিদের জন্য স্বদেশ ত্যাগ করে ভিন দেশে পারি জমানো সাধারণ কোনো বিষয় নয়। তাঁদের বিবেক ও মহৎ মানসিকতা কখনো তা সমর্থন করবে না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা স্বদেশ ত্যাগের বিষয়টিকে আত্মহত্যার সমতুল্যরূপে উল্লেখ করেছেন: ‘আমি যদি তাদের ওপর ফরয করে দিতাম যে, তোমরা নিজেরা নিজেদেরকে হত্যা কর অথবা নিজেদের ঘর-বাড়ি থেকে বের হয়ে যাও, তবে তারা তা করত না, অল্পসংখ্যক লোক ছাড়া।’ (নিসা, ৪: ৬৬)
৫. মনে রাখুন! যতো দিন বেঁচে আছেন, দেশের কল্যাণে কাজ করা, দেশের মঙ্গলে সচেষ্ট থাকা আপনার অনিবার্য দায়িত্ব। এই ভূমিতেই আপনি জন্মগ্রহণ করেছেন। এ মাটি, এ পরিবেশের যত কল্যাণ, আপনি উপভোগ করেছেন।
৬. বিশ্বাস করুন! দেশের প্রতি মমত্ববোধ, ভালোবাসা, একনিষ্ঠতা, দেশের সুরক্ষা, দেশের সীমান্ত প্রহরা-এ সবই মহত্ত্ব ও মহানুভবতার পরিচায়ক, মর্যাদা ও গৌরবের প্রতীক।
৭. দেশ ও জাতির স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে দৃঢ়চেতা ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে। এ লক্ষ্যে দেশীয় সংস্থা ও সংগঠনগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা কর্তব্য। দেশীয় সম্পদ ব্যবহারে যেকোনো অপচয় ও দুর্নীতি রোধ করা আবশ্যক।
৮. এমন কিছু কর্মসূচি সক্রিয় করতে হবে, যা দেশীয় সংগঠনগুলোর মধ্যে দেশপ্রেমের চেতনা আরও সজাগ ও সুদৃঢ় করবে এবং দেশের সর্বস্তরের জনগণের মাঝে সাম্য, ন্যায়-নীতি ও মানবীয় মূল্যবোধের চেতনা ছড়িয়ে দিবে। মনে রাখবেন, দেশের সন্তানদের মধ্যে যদি দেশাত্মবোধের চেতনার মৌলিক চর্চা ও পরিচর্যা না হয়, তাহলে দেশ সুদীর্ঘ কালের জন্য শত্রুদের নিরাপদ চারণভূমিতে পরিণত হবে।
৯. দেশের মিডিয়া ও প্রচার-মাধ্যমগুলোর কর্তব্য হলো, একচেটিয়াভাবে দেশের সংকট ও দুর্দশার চিত্র তুলে না ধরে দেশের ইতিবাচক দিকগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে সম্প্রচার করা। অন্যথায় তরুণ প্রজন্মের মধ্যে স্বদেশের প্রতি হতাশা ও নিরাশা প্রকট হবে। মাতৃভূমিকে কেন্দ্র করে তাদের গর্ব ও গৌরবে চিড় ধরবে।
১০. একটি বিষয় জোর তাগিদ দিয়ে বুঝিয়ে দিতে হবে-দেশাত্মবোধ ও দেশপ্রেম শুধু কিছু অন্তঃসারশূন্য বুলি, সারবত্তাহীন আচার-অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশাত্মবোধ হলো দেশের কল্যাণ-চিন্তা, জাতীয় দায়দায়িত্বে একনিষ্ঠতা, প্রতিশ্রুতিবদ্ধতা ও দেশের স্বার্থে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার নাম। কোনো প্রকার দ্বিধা-সংশয় ও কালবিলম্ব করা ব্যতীত দেশের প্রতিটি নাগরিকের এ দায়িত্ব পালন করা কর্তব্য।
১১. মুসলিম সমাজের উল্লেখযোগ্য একটা শ্রেণি পশ্চিমা জীবনযাপনের অন্ধ অনুকরণে অতি উৎসাহী। স্বদেশের প্রতি দায়িত্ববোধের কথা চরমভাবে বিস্মৃত হয়ে ভিনদেশী চিন্তা-চেতনা ও সভ্যতা-সংস্কৃতি নিয়ে মেতে উঠেছে। তাদের সামনে ইসলামের গৌরবগাঁথা ইতিহাস, মহান পূর্বসূরিদের অবিস্মরণীয় কীর্তি, আমাদের মহান বিজয়ের কাহিনী তুলে ধরতে হবে এবং ইসলামের চিরন্তন সভ্যতা-সংস্কৃতির রূপরেখা উপস্থাপন করতে হবে।
১২. দেশের কল্যাণে সামান্য অবদান ও ক্ষুদ্র ভূমিকাগুলোকে খাটো করে দেখা সমীচীন নয়। প্রত্যেক নাগরিকের চেষ্টা-প্রচেষ্টার যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। কেননা এর মাধ্যমে জনগণ দেশের কল্যাণে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হবে। দেশাত্মবোধ ও দেশভক্তির চেতনা লালনে অনুপ্রাণিত হবে।
১৩. দেশের তরুণ সমাজ ও শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা সফরের সুযোগ-সুবিধা প্রদান করতে হবে, যেন তারা অতি সহজেই দেশের ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থানগুলোর সঙ্গে পরিচিত হতে পারে। অতীত ইতিহাসের অনেক শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা লাভের জন্য এটি একটি সুবর্ণ সুযোগ। এর মাধ্যমে তারা দেশের গৌরবময় কীর্তি সম্পর্কে জানতে পারবে। যা তাদের মাঝে দেশের বর্তমান উন্নতি-অগ্রগতির পথে এক নব উদ্যমতা সৃষ্টি করবে, নতুনভাবে অনুপ্রেরণা যোগাবে।
১৪. আঞ্চলিক ও সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতার মানসিকতা বর্জন করে, ইসলামের ভ্রাতৃত্ববোধের চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে কাজ করতে হবে। মাতৃভূমির কল্যাণে সংঘবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
১৫. সবার আগে দেশ ও দশের কল্যাণের বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়া আবশ্যক। দেশীয় সংস্থা ও সংগঠনগুলোকে মূল্যায়ন করা এবং দেশীয় সম্পদের যথাযথ সংরক্ষণ করা সমান গুরুত্বপূর্ণ। মতভিন্নতা ও বিবাদ-বিসংবাদের ক্ষেত্রেও জাতীয় স্বার্থ সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। তাই আলোচনার মাধ্যমেই জাতীয় ঐক্যের সূত্র খুঁজে বের করতে হবে এবং দেশের জন্য, দশের জন্য মঙ্গলজনক-এমন একটি ফলপ্রসূ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হবে।
১৬. দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষার ক্ষেত্রে উদার মানসিকতার গুরুত্ব ব্যাপক ভাবে প্রচার করা কর্তব্য। এ কথা জোর তাগিদ দিয়ে বোঝাতে হবে যে, দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষা করার দায়িত্ব শুধু নিরাপত্তাবাহিনীর নয়, প্রতিটি নাগরিকের স্ব-স্ব অবস্থান থেকে ঐকান্তিকতার সঙ্গে এ মহান দায়িত্ব পালন করা কর্তব্য।
১৭. মহৎ শিষ্টাচার, নীতি-নৈতিকতা ও মানবীয় মূল্যবোধ-যেমন: অন্যের সাহায্য-সহযোগিতায় এগিয়ে যাওয়া, প্রত্যেক নাগরিক নিজ পরিবার ও প্রতিবেশীর হক আদায় করা, চারপাশের সমাজ বিনির্মাণে সচেষ্ট হওয়া, স্বার্থপরতার মানসিকতা ছেড়ে পরার্থপরতার মহত্ত্ব অবলম্বন করা এবং দেশের প্রতিটি নাগরিকের মাঝে পরস্পর ভ্রাতৃত্ববোধ ও আন্তরিক ভালোবাসা বজায় রাখা-ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতিশীল ও দায়বদ্ধ হতে হবে।
১৮. মহান পূর্বপুরুষগণের অবিস্মরণীয় কীর্তি ও গৌরবে এতটা মোহাচ্ছন্ন হয়ে থাকা সমীচীন নয়, যার কারণে ব্যক্তি আত্মবিস্মৃত হয়ে বর্তমানের উন্নতি-অগ্রগতি ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের কথা ভুলে বসে। এক্ষেত্রে অতীতের মর্যাদা ও গৌরব পুঁজি করে বর্তমানের পথে এগিয়ে যাওয়া এবং সুন্দর আগামীর পথ সুগম করা কর্তব্য।
১৯. দেশে আকস্মিক কিংবা শত্রুদের পূর্বপরিকল্পিত যেকোনো সংকটজনক সঙ্গিন পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সদা প্রস্তুত থাকতে হবে। কঠিন পরিস্থিতিতে প্রত্যেকের দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিলেও দেশের স্বার্থ রক্ষা করা ও উদ্ধার করা। এ জাতীয় ক্ষেত্রে স্পষ্ট হয়ে যায়, দেশাত্মবোধ ও দেশপ্রেমে কোন শ্রেণির নাগরিক নিখাত একনিষ্ঠ, আর কোন শ্রেণি প্রদর্শনবাদী ও স্বার্থপর।

পরিশিষ্ট:
ইবনে রূমী (২২১-২৮৩ হি.) বলেছেন: শৈশব, তারুণ্য, যৌবনের সুখস্মৃতিগুলো একজন সুনাগরিকের হৃদয়ে মাতৃভূমির প্রতি গভীর ভালোবাসা সৃষ্টি করে। তাই মানুষ যখন স্বদেশের কথা মনে করে, স্বদেশ তাকে অতীতের সুখস্মৃতিগুলো মনে করিয়ে দেয়। তাই দেশের প্রতি তাদের মন এতটা উদগ্রীব, উতলা হয়ে থাকে。

স্কটিশ দার্শনিক ও ঐতিহাসিক টমাস কার্লাইল (১৭৯৫-১৮৮১ খৃষ্টাব্দ) বলেছেন: 'কতই না গৌরবের বিষয়-কোনো নাগরিক স্বদেশের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া। তার চেয়ে গৌরবের বিষয় হলো, দেশের স্বার্থে বেঁচে থাকা, দেশের কল্যাণে সক্রিয় থাকা।'

ইরাকের বিখ্যাত কবি আব্দুল মুহসিন আল-কাজেমী (১৮৭১-১৯৩৫ খৃষ্টাব্দ) বলেছেন: 'যে নাগরিক মাতৃভূমিকে গর্ব ও গৌরবের প্রতীক মনে করে না, মর্যাদা ও গৌরবের ক্ষেত্রে তার কোনো স্থান নেই। আর যে নাগরিক দেশের একনিষ্ঠ কল্যাণকামী ও রক্ষক হয়ে বেঁচে থাকে, তার সুনাম-সুখ্যাতি বিশ্বদরবারে মেশকের সুগন্ধির মতো ছড়িয়ে পড়ে।'

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 তালাক ও ডিভোর্স

📄 তালাক ও ডিভোর্স


স্বামী-স্ত্রীর মাঝে কলহ-বিবাদ কখনো কখনো এমন ভয়ানক আকার ধারণ করে, যার চূড়ান্ত হলো বিচ্ছেদ ও ডিভোর্স। ডিভোর্স হলো স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অমিল ও কলহ-বিবাদ নিরসনের সর্বশেষ তিক্ত সমাধান, যা আল্লাহ তা'আলার নিকট বৈধ; কিন্তু সর্বাধিক ঘৃণিত।

সামাজিকভাবেও এটি লজ্জা ও ঘৃণার বিষয়। কেননা দু'জন মানব-মানবীর মাঝে তিলে-তিলে যে প্রীতি ও ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, যে মানবিক মূল্যবোধ ও ঔদার্যের বন্ধন সৃষ্টি হয়েছে, তালাক ও ডিভোর্সের মাধ্যমে তা এক মুহূর্তেই ছিন্ন হয়ে পড়ে। এমন পরিবারে জন্মানো সন্তানরা পারিবারিকভাবে ও সামাজিকভাবে নানা বঞ্চনার শিকার হয়। প্রথমেই তারা সুন্দর সাজানো পারিবারিক পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হয়। বাবা-মা-র আদর-সোহাগ, স্নেহ-ভালোবাসা ও শাসন-অনুশাসন থেকে বঞ্চিত হয়।

তবে যে ব্যক্তি গভীর দৃষ্টিতে ডিভোর্স-এর বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করবে, চূড়ান্ত মুহূর্তে এর প্রয়োজনীয়তা ও অপরিহার্যতার বিষয়টি ভেবে দেখবে, তার কাছে ডিভোর্স কোনো সামাজিক আপদ বলে মনে হবে না। কেননা কখনো কখনো স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের এতটাই অবনতি ঘটে, বিচ্ছেদই এর মন্দের ভালোয় পরিণতি হয়। তখন যদি ডিভোর্সের পথ খোলা না থাকে, তাহলে স্বামী-স্ত্রীর তিক্ত সম্পর্কের জের ধরে সংসার ভাঙ্গার চেয়ে আরও ভয়ানক আত্মবিধ্বংসী পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার সমূহ আশঙ্কা থাকে। তালাক ও ডিভোর্সের কারণে একটি সুন্দর সাজানো পারিবারিক অবকাঠামো ধসে পড়ে। পরিবার-সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকেই মানসিক অস্থিরতা ও সামাজিক বঞ্চনার শিকার হয়। এক ঘোর অন্ধকার অনিশ্চয়তা তাদেরকে ঘিরে ধরে। একটি সুন্দর, সুশীল পরিবার গড়ে তোলার লক্ষ্যে স্বামী-স্ত্রীর দীর্ঘদিনের শত চেষ্টা-শ্রম পণ্ড হয়।

এটাও সত্য যে, পারিবারিক বন্ধন ও বিচ্ছেদ-সবই আল্লাহর ফায়সালা এবং আমাদের জীবনের স্বাভাবিক ও চরম বাস্তবতার অংশ। একটি সামাজিক ব্যবস্থা, পারিবারিক ব্যবস্থা যতই উন্নত ও ভারসাম্যপূর্ণ হোক, তাতে ডিভোর্স ও তালাকের স্থান অনিবার্য। সুতরাং কথিত অন্তঃসারশূন্য সুশীল সমাজেই নয়; সত্যিকারের সভ্য-সুশীল সমাজে ও পরিবারে তালাকের বাস্তবায়ন ঘৃণিত; কিন্তু অপরিহার্য। তালাকের বহু কারণ-উপকরণ, ঘটক-অনুঘটক রয়েছে। যার অনৌচিত্যের ব্যাপারে কারো সন্দেহ নেই। আবার সম্ভাবনার বিষয়টিও কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। ডিভোর্স যখন অপছন্দনীয় তখন তা থেকে বেঁচে থাকার উপায় কী? তালাক যখন অনিবার্য তখন তার সুষ্ঠু বাস্তবায়নের পন্থা কী?

সমাধান:
১. ঝগড়াঝাঁটি ও কলহ-বিবাদের সময় স্বামী-স্ত্রীর একজন অপরজনকে এড়িয়ে চলাই শ্রেয়। আরও ভালো হয়, তারা যদি নির্দিষ্ট কিছুদিনের জন্য অবসরযাপনের জন্য চলে যায়। অবশ্যই তাদেরকে পৃথকভাবে অবসরযাপন করতে হবে, যেন পারিবারিক দায়দায়িত্বের চাপমুক্ত হয়ে নিশ্চিন্ত মনে নিজেকে নিয়ে সময় কাটাতে পারে। মন-মানসিকতায় প্রশান্তি ও সতেজতা ফিরে আসে। পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা ও অনুরাগ নতুনত্ব লাভ করে। এ সময় তাদের কেউ তালাক ও সম্পর্কচ্ছেদ নিয়ে ভাববে না। কেননা আল্লাহ তা'আলার নিকট তা বৈধ হলেও সর্বাধিক ঘৃণিত। এতে পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে চরম বঞ্চনার শিকার হতে হয়। তবে যদি ডিভোর্স ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পথ খোলা না থাকে, তাহলে তা-ই শ্রেয়。
২. একপর্যায়ে এসে যদি ডিভোর্স হয়েই যায়, তখন স্বামীর কর্তব্য হলো স্ত্রীকে সুন্দরভাবে বিদায় জানানো। তার প্রতি সদাচার করা। তার সঙ্গে আন্তরিক ও সুন্দর আচরণ করা। ডিভোর্সের সময় একটি নারী মানসিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। এ কঠিন সময়ে স্বামী তার সাঙ্গে কঠোর ও রূঢ় আচরণ করা থেকে বিরত থাকবে।
৩. ডিভোর্স প্রদানকারী স্বামীকে অবশ্যই শরীয়তের বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে। শরীয়ত সমর্থিত স্ত্রীর প্রতিটি হক যথাযথভাবে আদায় করতে হবে। স্ত্রীর মোহর বাকি থাকলে তা পরিশোধ করা, তালাক পরবর্তী সময়কালে স্ত্রীর উত্তম ভরণ-পোষণ বন্দোবস্ত করা, স্ত্রীর পরিবার-পরিজনের সাথে সদয় আচরণ করা, স্ত্রীর সমালোচনায় মত্ত না হয়ে তার উত্তম গুণাবলির প্রশংসা করা-এসবই হলো স্বামীর ধার্মিকতা, সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি, মানবিকতা ও পৌরুষত্বের পরিচয়।
৪. আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকতে হবে। কেননা আল্লাহর ফায়সালায় চূড়ান্ত কল্যাণ নিহিত। এক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী উভয় পক্ষই পবিত্র কুরআনের এ বাণী মনে রাখবে: ‘আর যদি উভয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে আল্লাহ নিজের (কুদরত ও রহমতের) প্রাচুর্য দ্বারা তাদের প্রত্যেককে (অপরের প্রয়োজন থেকে) অমুখাপেক্ষী করে দিবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, প্রভূত হিকমতের অধিকারী।’ (নিসা, ৪: ১৩০)
৫. তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর কর্তব্য হলো, পূর্বের স্বামীর দুর্নাম না রটিয়ে তার সুনাম বজায় রাখা। এতে স্ত্রীর সুনামও বজায় থাকবে। যে নারী তার পূর্বের স্বামীর দুর্নাম রটিয়ে বেড়ায়, সমাজও তাকে সুনজরে দেখে না। দীর্ঘ দিনের অতীত সংসার-জীবনে স্বামীর অবদানের প্রতি তার অকৃতজ্ঞতা, দায়বদ্ধহীন মানসিকতা সমাজ কুৎসিতরূপেই বিবেচনা করে।
৬. ডিভোর্সের পর স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই আল্লাহ তা'আলার ফায়সালা সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিতে হবে। তাদের মনে করতে হবে, যে সংসার-জীবন অতীত হয়েছে, তা জীবনেরই একটি সুন্দর অধ্যায়, যা সদ্য সমাপ্ত হয়েছে। ডিভোর্সের মাধ্যমে জীবনের যে নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে, তাতেই হয়ত অধিক কল্যাণ রয়েছে। বাহ্যিকভাবে কত ক্ষতি মানুষের জন্য কল্পনাতীত কল্যাণ বয়ে আনে।
৭. সমাজে এ মানসিকতা দৃঢ়মূল করতে হবে, ডিভোর্স, তালাক কোনো দূষণীয় বিষয় নয়। এটি একটি শরীয়তসম্মত সামাজিক সমাধান। তাই তালাকপ্রাপ্ত নারীকে দোষারোপ করা, তাকে বাঁকা চোখে দেখা, তাকে অবজ্ঞা করা, অপয়া-অলুক্ষণে মনে করা- এসবই দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষুদ্রতা ও অসুস্থ মানসিকতার পরিচায়ক।
৮. তালাক প্রদানকারী স্বামী কিংবা তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী! বিশ্বাস করুন, আপনার জীবন কোনো নারী কিংবা পুরুষ সত্তার সঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়। একজনের জন্য অপরের জীবন থেমে থাকতে পারে না। তাই প্রত্যেকেই নতুন জীবনের পথে অগ্রসর হোন। আল্লাহর সীমাহীন দান-অনুগ্রহের ওপর গভীর আস্থা রেখে নতুন জীবন শুরু করুন। যা অতীত হয়েছে, স্মৃতির পাতা থেকে মুছে ফেলুন, যেন তা আদৌ ঘটেনি। আপন রবের প্রতি সুধারণা পোষণ করুন। যে আল্লাহ আপনাকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই আপনার কল্যাণ সম্পর্কে সর্বজ্ঞ।
৯. ডিভোর্সের অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, স্বামী-স্ত্রী উভয় পক্ষই আপসোস-অনুতাপ করতে থাকে এবং ডিভোর্স হওয়ার নেপথ্যে কাদের ভূমিকা ছিল, তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে মেতে উঠে। এমনটা করা সমীচীন নয়।
১০. অনুকূল-প্রতিকূল পরিস্থিতি-দুয়ে মিলেই জীবন। সংসার যেমন গড়েছে, তা ভাঙ্গারও সম্ভাবনা রয়েছে। তাই কখনো যদি সংসার ভাঙ্গার প্রতিকূলতার শিকার হন, মানসিকভাবে ভেঙে পড়বেন না। আত্মবিশ্বাস রাখুন। সমাজে আপনার ইতঃপূর্বের স্বাভাবিক জীবনযাপন বজায় রাখুন। দুষ্ট লোকদের বাঁকা দৃষ্টির ভয়ে একাকিত্ব বরণ করে ঘরকুনো হয়ে পড়ে থাকবেন না। তালাক ও ডিভোর্স জীবনেরই অংশ। জীবনে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা-অনুঘটনার মতো এটাকেও স্বাভাবিক দৃষ্টিতে বিবেচনা করুন।
১১. বিশ্বাস করুন, পারিবারিক সম্পর্কচ্ছেদের কারণে আপনার জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে যাবে-জীবন এত ক্ষুদ্র ও মূল্যহীন নয়। বাস্তবতা মেনে নিয়ে নতুন জীবন শুরু করুন। যা ঘটেছে, তা থেকে ইতিবাচক শিক্ষা নিয়ে সামনের পথে অগ্রসর হোন।
১২. স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কচ্ছেদ জীবনের একটি কঠিন প্রতিকূলতা বটে; কিন্তু এতটা গুরুতর নয় যে, এর কারণে পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জীবন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। মানবজীবন অমূল্য ও সম্ভাবনাময়। প্রতিদিনই নতুন ভোরের স্নিগ্ধতা উপভোগ করে, নতুন সূর্য আলেঅয় স্নাত হয়। জীবনচাকা নতুন গতিতে চলতে শুরু করে।
১৩. পারিবারিক জীবনে প্রতিবন্ধকতার শিকার হলে নিজের ভুলগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন। সংসারিক প্রতিকূলতা আপনার জন্য তিক্ত ও বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা। তবে তাতে স্থবির হয়ে পড়ার কারণ নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আপনি জেনে যাবেন, এ অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে কীভাবে অনুকূলতার পথ আবিষ্কার করবেন এবং সামনের পথে অগ্রসর হবেন।
১৪. ডিভোর্স পরবর্তী সময় কোনো বিষয়েই তাড়াহুড়ো করবেন না। এ সময়ে জীবনের এ কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতাকে পাশ কাটিয়ে নতুন কিছুতে জড়াবেন না। হয়ত এভাবে আপনি সাময়িক মানসিক কষ্ট-যাতনা ভুলে থাকতে পারবেন; কিন্তু ভিন্ন কোনো নতুন তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কাও থেকে যাবে। তাই এ ক্ষেত্রে নিজেকে পর্যাপ্ত সময় দিন। নিজেকে নিয়ে ভাবুন। আপনার প্রতিটি খুঁটিনাটি সম্পর্কে চিন্তা-ফিকির করুন। নিজেকে যখন আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারবে, আত্মপোলব্ধির মর্মমূলে পৌঁছতে পারবেন, ভবিষ্যৎ লক্ষ্য স্থির করা সহজ হবে।
১৫. বিবাহ বিচ্ছেদের কারণে যে তিক্ত অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন, তাতে আপনার ভুলগুলো পর্যালোচনা করে দেখুন। যেন পরবর্তীতে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি না হয়। অন্যকে যাচাই করার আগে নিজেকে যাচাই করুন। বিবেক-বুদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করুন।
১৬. আত্মবিশ্বাসী হোন। সাহসিকতার সাথে নতুন জীবনের পথে অগ্রসর হোন। দ্বিধা-দ্বন্দ্বহীন চিত্তে একটি নতুন পরিবার গড়ে তোলায় সচেষ্ট হোন। কেননা মানুষ হলো সমাজবদ্ধ প্রাণী। পরিবার ও সমাজ ছাড়া সে সুস্থ-স্বাভাবিক থাকতে পারে না।

পরিশিষ্ট:
'ভালোবাসার শক্তিতে গ্যালাক্সি রচিত হয়। ভালোবাসার কারণেই মুখে হাসি ফুটে। আনন্দ চিরস্থায়ী হয়। ভোরের মৃদু হাওয়া বয়। পাখিরা গান করে। ভালোবাসাহীন পৃথিবী যেন মরুময়, বাগান ফুলশূন্য, চোখ আলোহীন, কান শ্রবণশক্তিহীন।' -আয়েয কারনী

জর্জ বার্নাড শ (১৮৫৬-১৯৫০ খৃষ্টাব্দ) বলেছেন: 'বিবাহের আগ পর্যন্ত নারী এক অজানা আশঙ্কায় ভোগে। বিবাহের পর তার সব ভয়-ভীতি কেটে যায়। কিন্তু পুরুষ, বিবাহের পরই তার যত ডর-ভয় দেখা দেয়।'

সাহিত্য, ইতিহাস ও শরীয়াবিশেষজ্ঞ শায়েখ আলী তানতাভী (১৯০৯-১৯৯৯ খৃষ্টাব্দ) বলেছেন: 'ক্যাসেশন কোর্টে দীর্ঘ সাতাশ বছর বিচারক ছিলাম। তখন দেখেছি যে, ডিভোর্স ও তালাকের প্রধানতম কারণ হলো, স্বামীর সীমাহীন ক্রোধ আর স্ত্রীর নির্বোধসুলভ আচরণ।'

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 নারী-নির্যাতন

📄 নারী-নির্যাতন


নারী কোনো পণ্য নয়, যা কেনা-বেচার জন্য উপস্থাপন করা হবে। নারী হলো এক মহা মানবী। অনুভব-অনুভূতি ও মন-মানসিকতায় নাজুক ও সংবেদনশীল। মায়াবী হৃদয় ও মহৎ প্রাণের অধিকারিণী। জগতে নারী হলো কারো মা, খালা, ফুফু ও চাচি। কারো বোন, স্ত্রী কিংবা কন্যা। পৃথিবীতে নারীজাতি হলো মানব গড়ার কারিগর। অতীত ও বর্তমানে যত মনীষী ও মহাপুরুষের জন্ম হয়েছে, তার পেছনে কোনো না কোনো নারীর ঐকান্তিক ভূমিকা অনস্বীকার্য।

জগতে নারীদের ভূমিকাগুলো সর্বদা সমাজ ও লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যায়। সমগ্র বিশ্বে যাঁরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্যের শীর্ষ ছুঁয়েছেন, প্রায় সবার ক্ষেত্রেই কোনও না কোনো নারীর ত্যাগব্রতে নন্দিত ও ললিত হাতের স্পর্শ এবং আকাশ-উদার স্বার্থশূন্য হৃদয়ের প্রণোদনা রয়েছে। সে ভূমিকায় জননী, জায়া, কন্যা-যে কেউ অবতীর্ণ হয়ে দুরন্ত ঢেউয়ের মাথায় দোল খাওয়া ছেঁড়া-ছেঁড়া স্বপ্নগুলোর সুমধুর সহাবস্থান ঘটিয়ে দিতে পারেন।

মহাপুরুষের ইতিহাস বাহিরের কাজে এবং জীবনবৃত্তান্তে স্থায়ী হয়। আর মহৎ নারীর ইতিহাস তাঁর পুত্রের চরিত্রে, স্বামীর কীর্তিতে রচিত হতে থাকে এবং সে লেখায় তাঁর নামোল্লেখ থাকে না।

একজন স্বামী, একটি সন্তান যখন সমাজে সফলতার স্বীকৃতিতে ভূষিত হয়, সবার আগে স্ত্রী ও মায়ের হৃদয়ই আনন্দে গর্বে ভরে উঠে। এ ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকা সামাজিক স্বীকৃতি না পেলেও সফল সন্তান ও স্বামী কিন্তু অবলীলায় মা ও স্ত্রীর ভূমিকার কথা বেশ গর্ব করেই বলে থাকে। নারী তখন সফলতা ও কৃতকার্যতার যে সীমাহীন আনন্দ ও পুলক অনুভব করেন, তা বর্ণনাতীত। নারীর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা যদি দিতে হয়, তাহলে সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল ﷺ তার যথার্থ বর্ণনা দিয়েছেন:

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، قَالَ: كَانَ النَّبِيُّ ﷺ فِي مَسِيرٍ لَهُ، فَحَدًا الحَادِي، فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ: «ارْفُقْ يَا أَنْجَشَةُ، وَيُحَكَ بِالقَوَارِيرِ»

অর্থ: আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার নবী ﷺ (নারীদের সহ) এক সফরে ছিলেন। হুদী গায়ক হুদীগান গেয়ে যাচ্ছিল। তখন নবী ﷺ বললেন, 'আফসোস তোমার প্রতি ওহে আন্‌ন্জাশা! তুমি কাচপাত্রতুল্য সওয়ারীদের প্রতি সদয় হও।' (বুখারী: ৮/৪৭)

ইসলাম নারীর সুরক্ষা ও নারী-অধিকার প্রদানে অনুপ্রাণিত করেছে। নারীর মর্যাদা রক্ষা ও তার অধিকার সুরক্ষার প্রতিদানে জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করেছে। নারীর অধিকার হরণের পরিণতিতে জাহান্নামের কঠিন শাস্তির ব্যাপারে সতর্ক করেছে।

নারীর স্বভাববৈশিষ্ট্য হলো দুর্বলতা, নাজুকতা ও সংবেদনশীলতা। তাই রাসূল ﷺ নারীদের ব্যাপারে অনেক উপদেশ প্রদান করেছেন। নারী-অধিকার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন:

"اللَّهُمَّ إِنِّي أُحَرِّجُ حَقَّ الضَّعِيفَيْنِ: الْيَتِيمِ وَالْمَرْأَةِ"

অর্থ: 'হে আল্লাহ! আমি দু'টি দুর্বল শ্রেণি: এতিম ও নারী-অধিকার (হরণ) জঘন্য অপরাধ ও শাস্তিযোগ্য বলে ঘোষণা করছি।' (মুসনাদে আহমাদ: ১৫/৪১৬)

বর্বর জাহেলি যুগে নারী ছিল যুলুম নির্যাতন ও নিগ্রহের শিকার। এ ক্ষেত্রে নির্দয় পিতা, ভাই, অত্যাচারী স্বামী ও অবাধ্য সন্তান-কেউ পিছিয়ে ছিল না। যুগে যুগে মানুষ নীতি-নৈতিকতা ও ধর্মীয় অনুশাসন থেকে যতই বিচ্যুত হয়েছে, তাদের মাঝে নারীর অধিকার হরণ ও নারী-নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে এ সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। এর প্রকৃত সমাধান কী? এ সংকট থেকে উত্তরণের উপায় কী?

সমাধান:
১. ইসলামে নারীর অবস্থান ও মর্যাদা সম্পর্কে জানতে হবে। নারী সম্পর্কে কুরআন হাদীসে যে আদেশ-নিষেধ এসেছে, তার মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার বিষয়ে যে দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে, তার চর্চা করতে হবে এবং বাস্তব জীবনে তার প্রয়োগ ঘটাতে হবে।
২. শরীয়ত নির্দেশিত পন্থায় উত্তরাধিকার সম্পদে নারীর সুনির্দিষ্ট অংশ বুঝিয়ে দিতে হবে। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছেঃ

وَآتُوا الْيَتَامَى أَمْوَالَهُمْ وَلَا تَتَبَدَّلُوا الْخَبِيثَ بِالطَّيِّبِ وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَهُمْ إِلَى أَمْوَالِكُمْ إِنَّهُ كَانَ حُوبًا كَبِيرًا﴾ [النساء: ২]

অর্থ: "এতিমদেরকে তাদের সম্পদ দিয়ে দাও আর ভালো সম্পদ মন্দ সম্পদ দ্বারা পরিবর্তন করো না। আর তাদের (এতিমদের) সম্পদ নিজের সম্পদের সাথে মিশিয়ে খেও না। নিশ্চয়ই এটা অতি বড় গুনাহ।” (নিসা: ২)
৩. শিক্ষা-দীক্ষা নারীর মানবিক অধিকার। নারীশিক্ষা, বিষয়টি শরীয়ত নির্দেশিত। তাতে অবহেলার কোনো সুযোগ নেই। সুতরাং নারীকে উপযুক্ত শিক্ষা-দীক্ষার বিষয়টি সুনিশ্চিত করতে হবে। একজন শিক্ষিত নারী ও মায়ের পক্ষেই সম্ভব একটি শিক্ষিত সফল জাতি গড়ে তোলা, যা শিক্ষা-দীক্ষাহীন নারীজাতির পক্ষ থেকে কখনোই আশা করা যায় না।
৪. নারী নির্যাতন প্রতিরোধ করতে হবে। নারী নির্যাতনের সঙ্গে নির্দয় পিতা, ভাই, অত্যাচারী স্বামী ও অবাধ্য সন্তান কিংবা অন্য পক্ষ- যে-ই জড়িত থাকুক-না-কেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠিন শাস্তির বিধান জারি করতে হবে। নারী নির্যাতনের মামলাগুলোর বিচার দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে।
৫. নারীকে উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে তার আর্থিক স্বাবলম্বিতার পাশাপাশি মান-মর্যাদা ও ইজ্জত আবরুর সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করা কর্তব্য। রাসূল ﷺ-এর পবিত্র যুগেও নারীরা ধর্মীয় বিধি-বিধান মেনে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। শিক্ষা-দীক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাষাবাদ এতিমদের লালন-পালন ইত্যাদি ক্ষেত্রেও নারীদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল।
৬. পারিবারিক ও সামাজিক বিষয়ে নারীর অংশগ্রহণ, এসব ক্ষেত্রে তাদের মতামত ও পরামর্শ গ্রহণ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। রাসূল ﷺ উম্মে সালামা (রা.)-এর পরামর্শ চেয়েছিলেন। ওমর (রা.) বিবাহের মোহর বিষয়ে নারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। ইতিহাসের বহু ঘটনা এর উজ্জ্বল প্রমাণ।
৭. একটি সামাজিক সুরক্ষা তহবিল গঠন করে বিধবা, তালাকপ্রাপ্ত, অভাবী ও প্রয়োজনগ্রস্ত নারীদের কল্যাণে এ তহবিলের অর্থ ব্যয় করতে হবে।
৮. অজ্ঞ, নির্বোধ ও মানবিক মূল্যবোধহীন শ্রেণি, নারীদের প্রতি তাদের অশ্রদ্ধা ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যপূর্ণ মানসিকতা দূর করার লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। সংসারে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও অপরিহার্যতা তুলে ধরতে হবে। এক্ষেত্রে সোস্যাল মিডিয়া ও প্রিন্ট মিডিয়া ও সম্প্রচার মাধ্যমগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।
৯. সমাজে প্রকৃত সফল নারীদের তালিকা করে তাদের সম্মাননা প্রদান করতে হবে। নারীজাতির সামনে তাদেরকে আদর্শরূপে তুলে ধরতে হবে। যেন অন্যরাও তাদের মতো মহৎ ব্যক্তিত্ব অর্জনে, কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে অনুপ্রাণিত হয়।
১০. মনে রাখতে হবে, পরিবার ও সমাজে নারীই হলো সর্বপ্রথম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। নারীই হলো মনীষী ও মহাপুরুষ গড়ার কারিগর। একজন নারীই পারে তার সন্তানদের মাঝে নীতি-নৈতিকতা ও মানবীয় মূল্যবোধ বদ্ধমূল করে দিতে।
১১. প্রচলিত নারী-অধিকার, নারী-স্বাধীনতার পেছনে না পড়ে কুরআন-হাদীসের দিকনির্দেশনার আলোকে নারী-অধিকার বাস্তবায়ন করতে হবে। পছন্দের স্বামী নির্বাচন, শিক্ষা-দীক্ষা, উপযুক্ত কর্মক্ষেত্র বেছে নেওয়া ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারীকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে। তবে কোনো ক্ষেত্রেই শরীয়তের সীমালঙ্ঘন করা যাবে না।
১২. কন্যা সন্তান লালন-পালন, তার শিক্ষা-দীক্ষা ও বিবাহ ক্ষেত্রে উপযুক্ত পাত্র নির্বাচন করা ইত্যাদি ক্ষেত্রে কোনো অভিভাবকের জন্যই জাগতিক স্বার্থকে মুখ্য করে দেখা সমীচীন নয়। এসব ক্ষেত্রে কন্যাসন্তানের সুখ-শান্তি ও তার কল্যাণের বিষয়টিই মুখ্য হিসেবে বিবেচিত উচিত।
১৩. নারীর অর্থ-সম্পদ, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদে কোনোভাবেই অনধিকার চর্চা করা যাবে না। নারীর সম্পদে অন্যায় হস্তক্ষেপ সমাজে নানা অন্যায়-অপরাধের পথ খুলে দেয়।
১৪. নারীর প্রতি সদয় হতে হবে। তাকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে হবে। দৈনন্দিন কাজকর্ম, ঘর-সংসার ও সামাজিক দায়-দায়িত্ব ইত্যাদির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তাকে সহযোগিতা করতে হবে।
১৫. নারীর প্রতি সদাচার হলো জাহান্নাম থেকে মুক্তির পথ। এর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশ মান্য করা হয়। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:

مَنْ يَلِي مِنْ هَذِهِ البَنَاتِ شَيْئًا، فَأَحْسَنَ إِلَيْهِنَّ، كُنَّ لَهُ سِتْرًا مِنَ النَّارِ» صحيح البখারী (৭/৮)

অর্থ: যাকে কন্যা সন্তানদের দিয়ে কোন পরীক্ষা করা হয়, তারপর সে তাদের সাথে ভাল ব্যবহার করে, এ কন্যারা তার জন্য জাহান্নামের আগুন থেকে প্রতিবন্ধক হবে। (বুখারী: ৭/৮)
১৬. প্রত্যেক ব্যক্তির উদ্দেশ্যে বলছি: 'আপনার মা, বোন ও কন্যার জন্য যে আচার-আচরণ আপনার পছন্দ নয়, অন্য নারীর ক্ষেত্রেও আপনি তা থেকে বিরত থাকুন। আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করুন। নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা ধর্মপরায়ণ ও খোদাভীরু বান্দাদের পছন্দ করেন।

পরিশিষ্ট:
'যখন তোমার দেহে আত্মা ফুঁকে দেওয়া হয়, তুমি মাতৃগর্ভে থাক। শৈশবে যখন নিরুপায় কান্না জুড়ে দাও, তুমি তখন মায়ের কোলে। যখন তোমার মাঝে প্রেম-ভালোবাসার উদ্রেগ হয়, তখনো তুমি কোনো নারীর হৃদয়ে। সুতরাং নারীর প্রতি সদয় হও। তার জন্য সুখ-শান্তি ও ভরসার প্রতীক হও। নারী হলো তোমার জিম্মায় এক মহৎ আমানত। অন্যায় অবহেলার পাত্র হিসেবে নারীকে সৃষ্টি করা হয়নি।' -আয়েয করনী

বিশিষ্ট ফরাসী চিন্তাবিদ ও গবেষক মার্সেল বাওয়াযার বলেছেন: 'আন্দালুসে মুসলমানদের সোনালি যুগে মুসলিম কবিগণই তো ইউরোপের খ্রিষ্ট সমাজকে নারীদের প্রতি সম্মান দেখাতে শিখিয়েছে।'

আব্বাসীয় খেলাফতকালীন বিখ্যাত আরব কবি আবূ তায়্যেব মুতানাব্বি (৩০৩-৩৫৪ হি.) বলেছেন: 'নারীজাতিরকে আমরা যেভাবে চিনতে পেরেছি, নারীরা যদি তেমন হতো, তাহলে অবশ্যই পুরুষজাতির ওপর নারীজাতির শ্রেষ্ঠত্ব অর্জিত হতো। সুতরাং شَمْسٌ (সূর্য) শব্দটি স্ত্রীলিঙ্গ হওয়াতে দোষের কিছু নেই। আবার هِلَالٌ (নতুন চাঁদ) শব্দটি পুংলিঙ্গ হওয়াতেও গর্বের কিছু নেই।'

টিকাঃ
১৩. আবূ কিলাবা বর্ণনা করেন, কাঁচপাত্রতুল্য শব্দ দ্বারা নবী মহিলাদের বুঝিয়েছেন। (বুখারী)
১৪. আয়াতে এতীমের বিষয়টি আলোচিত হলেও যে কোনো দুর্বল ও পতিত শ্রেণি এ আয়াতের ব্যাপক হুকুমের আওতাভুক্ত। (সাফওয়াতুত তাফাসীর)
১৫. পশ্চিমা বিশ্বের আদলে গড়ে উঠা কথিত নারীবাদী সংগঠনগুলোর লোক দেখানো সফল নারী নয়। (অনুবাদক)

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 আইবুড়োত্ব

📄 আইবুড়োত্ব


আইবুড়োত্ব হলো, তরুণ-তরুণীদের বিয়ের বয়স পার হয়ে যাওয়ার পরও বিবাহ না হওয়া। দেশ ও সমাজ ভিন্নতায় আইবুড়োত্বের বয়সের প্রভেদ হয়ে থাকে। গ্রাম্য ও পল্লি সমাজে নারীদের বয়স বিশের কোঠা পেরোলেই তাদেরকে আইবুড়ো মনে করা হয়। অপরদিকে শহুরে সামাজিকতায় আইবুড়োত্বের বয়সের মাত্রটা প্রায় ত্রিশ।

এক্ষেত্রে একটি প্রাচীন সামাজিক ভুল ধারণা প্রকটভাবে দেখা দেয়। তা হলো, আইবুড়োত্বের তকমাটা সবার আগে মেয়েদের কপালেই সেঁটে দেওয়া হয়। ছেলেদের বেলায় যেন আইবুড়োত্বের অস্তিত্ব কল্পনাও করা দায়। এ ধরনের বৈষম্য ঠিক নয়। উভয় শ্রেণির ক্ষেত্রে তা সমানভাবে বিবেচনা করা উচিত। তা না হলে বিবাহের প্রতি ছেলেদের অনাগ্রহ অনীহা প্রকাশ স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়াবে। আর এটা তো সুনিশ্চিত যে, বিবাহে নারী-পুরুষের একটি শ্রেণি পিছ-পা হলে অপর পক্ষের বিবাহ বিলম্বিত হবে।

বর্তমানে আইবুড়ো সমস্যা যে প্রকট আকার ধারণ করেছে, ক্রমান্বয়ে তা প্রকট থেকে প্রকটতর হতে থাকবে। যে পরিবারে আইবুড়োত্বের সমস্যা বিদ্যমান, তারা সর্বদা মানসিক যন্ত্রণা ও অস্থিরতায় ভুগতে থাকে। হীনম্মন্যতা, বিষণ্ণতা, দুঃখ-কষ্ট আঁকড়ে ধরে। তারা সমাজের বাঁকা চাহনি, উপহাস, তাচ্ছিল্য এড়িয়ে চলতে লোকচক্ষুর আড়াল হয়ে থাকতে পছন্দ করে। এ সমস্যার সমাধান কী? এ সংকট থেকে উত্তরণের পথ কী?

সমাধান:
১. আইবুড়োত্ব সমস্যা ও বিবাহ বিলম্বের কারণে সমাজে যে নৈতিক ও চারিত্রিক নষ্টাচার দেখা দেয়, তা নিরসনের লক্ষ্যে বহু-বিবাহের বিষয়টি স্বাভাবিক ও সহজাত করতে হবে। এ সম্পর্কে পর্যাপ্ত শিক্ষা-দীক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। ইসলামি শরীয়ত বহুবিবাহ অনুমোদন করেছে এবং এর জন্য কিছু সুষ্ঠু নিয়ম-নীতি বেঁধে দিয়েছে। যদি তা যথাযথভাবে মান্য করা হয়, তাহলে পরিবার ও সমাজ-ব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হবে।
২. কল্যাণমূলক সংস্থা ও সংগঠন গড়ে তুলতে হবে, যারা বৈবাহিক অচলাবস্থা সংশোধনের লক্ষ্যে কাজ করবে। এ ক্ষেত্রে তারা দিকনির্দেশনার ও সাহায্য-সহযোগিতার ভিত্তিতে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে এবং বৈবাহিক আচার-অনুষ্ঠানগুলোকে অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়িমুক্ত করে বিবাহের পুরো বিষয়টিকে সহজসাধ্য করে তুলবে।
৩. সমাজে একটি শ্রেণি আছে, যারা বিবাহে আগ্রহী; কিন্তু আর্থিক অসংগতির কারণে তাদের বিবাহ বিলম্বিত হচ্ছে। তাদের বিবাহ সম্পন্ন করার জন্য বিত্তবান শ্রেণির এগিয়ে আসা কর্তব্য।
৪. অবাধ যৌনাচারের কবল থেকে সমাজকে রক্ষা করতে হবে। এ লক্ষ্যে সচেতনতা গড়ে তোলার পাশাপাশি সমাজে নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। বিশেষভাবে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার মানসিকতা বদ্ধমূল করতে হবে।
৫. নারী-পুরুষকে পারস্পরিক অবৈধ সম্পর্ক স্থাপনে প্ররোচিত করে-এমন সমস্ত কাজ নিষিদ্ধ করতে হবে, যেন তরুণ প্রজন্মের কাছে তা বিবাহের বিকল্প 'শর্টকার্ট' পন্থা হিসেবে আবির্ভূত হতে না পারে।
৬. মোহর, আবাসন, ভরণপোষণ-ইত্যাদি বিষয়গুলোতে অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ি আরোপের মানসিকতা বর্জন করতে হবে। রাসূল ﷺ-এর দিকনির্দেশনা অনুযায়ী বিবাহের পুরো কন্সেপ্টটিকে স্বাভাবিক ও সহজসাধ্য করে তুলতে হবে। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:

إِذَا خَطَبَ إِلَيْكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوِّجُوهُ، إِلَّا تَفْعَلُوا تَكُنْ فِتْنَةٌ فِي الأَرْضِ، وَفَسَادُ عَرِيضُ سنن الترمذي (٣٨٦/٣)

অর্থ: 'কোনো ব্যক্তি যদি তোমাদের কাছে বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে আসে, যার দ্বীন-ধার্মিকতা ও চাল-চলন তোমাদের পছন্দ, তাহলে তার কাছে মেয়ে বিবাহ দাও। অন্যথায় যমিনে বিশৃঙ্খলা ও ব্যাপক অনাচার দেখা দিবে।' (সুনানে তিরমিজী: ৩/৩৮৬)
৭. সহজতার জন্য বিবাহের মোহর দু'ভাগে বিভক্ত করা যেতে পারে। এক ভাগ বিবাহের সময় নগদ প্রদান করতে হবে। দ্বিতীয় ভাগ সময়সাপেক্ষ। যা-আল্লাহ না করুন!-তালাক বা ডিভোর্সের সময় আদায় করতে হবে। এর মধ্যে দু'টি কল্যাণ নিহিত: প্রথমত, বিবাহচুক্তি সহজসাধ্য হবে। দ্বিতীয়ত, তালাক ও ডিভোের্স দুঃসাধ্য হবে।
৮. তরুণ-তরুণীকে বিবাহে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। চারিত্রিক অনাচার থেকে আত্মরক্ষা ও পরিবার গঠন মানব-জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা কত চমৎকারভাবে তা বর্ণনা করেছেন:

وَمِنْ ايْتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِّنْ اَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَتٍ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ) [الروم: ٢١]

অর্থ: 'তাঁর (আল্লাহ তা'আলার) নিদর্শনসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদেরই মধ্য হতে স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে গিয়ে শান্তি লাভ কর এবং তিনি তোমাদের পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয়ই এর ভেতর নিদর্শন আছে সেই সব লোকের জন্য, যারা চিন্তা-ভাবনা করে।' (রূম, ৩০: ২১)
৯. প্রতিটি শহর ও গ্রামে "বৈবাহিক তহবিল বা ফান্ড" গড়ে তুলতে হবে। বিবাহ-উপযুক্ত অসচ্ছল পাত্র-পাত্রীদের সাহায্যে কিংবা ঋণ প্রদানে এ ফান্ডের অর্থ ব্যয় করা হবে। সামাজিক অবস্থা ও পরিস্থিতির বিবেচনায় সুষ্ঠু নিয়ম-নীতি অনুযায়ী 'বৈবাহিক ঋণ' কিস্তিতে পরিশোধযোগ্য হবে।
১০. একটি বিষয়ে মা-বাবা ও অভিভাবকদের মধ্যে এ সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে-কন্যা বিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের কষ্ট ও ভোগান্তির অন্যতম কারণ হলো, কন্যার সুখ-শান্তি ও কল্যাণের বিষয়টি মুখ্য না ধরে ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধার করার নিকৃষ্ট হীন মানসিকতা। যেমন: মেয়ের উপার্জিত অর্থ ভোগ করা কিংবা পাত্র পক্ষ থেকে অধিক হতে অধিকতর মোহর উসূল করার প্রবণতা। মা-বাবা ও অভিভাবকের এমন আচরণ চরম অন্যায় ও জঘন্য পাপ।
১১. সর্বদা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর এ নির্দেশ মনে রাখুন:

يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ، مَنِ اسْتَطَاعَ البَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ، فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ، وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ وجاء". صحيح البখারী (৩/৭)

অর্থ: 'হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তির সামর্থ্য আছে, সে যেন বিবাহ করে নেয়। কেননা বিবাহ চোখকে অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে সংরক্ষণ করে। আর যার সামর্থ্য নেই, সে যেন সাওম বা রোযা পালন করে। সাওম তার প্রবৃত্তিকে দমন করে।' (বুখারী ৭/৩)
১২. লেখাপড়ায় বাধা সৃষ্টি হবে-এই ভেবে বিবাহের বিষয়টি এড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। লেখাপড়ার ক্ষেত্রে বিবাহ-শাদী প্রতিবন্ধক হতে পারে না; বরং সহায়ক ও পরিপূরক। কেননা বিবাহের মধ্যে আত্মিক প্রশান্তি, মনে স্থিরতা ও বিবেক-মস্তিষ্কের স্বচ্ছতা নিহিত আছে।
১৩. পাত্র-পাত্রী পছন্দ করার ক্ষেত্রে কোনো স্বপ্নের পুরুষ কিংবা রমণীর সন্ধান করে বেড়ানো বাড়াবাড়ি বৈ কিছু নয়। এমন বৈশিষ্ট ও গুণাগুণের ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে, যা মৌলিক ও বাস্তবসম্মত। বাহ্যিক রূপমাধুর্য ও চাকচিক্যকে প্রাধান্য না দিয়ে অন্তরের ঐশ্বর্যের দিকেও নজর দিতে হবে। টাকা-কড়ি, বাড়ি-গাড়িকে মুখ্য না ভেবে বিদ্যা-বুদ্ধি, ভদ্রতা-নম্রতা ও দ্বীন-ধার্মিকতার মতো মৌলিক বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এতে বিবাহ-শাদী যেমন স্বাভাবিক ও সহজবোধ্য হবে, আগামী ভবিষ্যতের বৈবাহিক জীবনও প্রশান্তিময় হয়ে উঠবে।
১৪. একই অনুষ্ঠানে বহু দম্পতির বিবাহ আয়োজন করার প্রচলন ঘটাতে হবে। যেখানে একই সাথে দশ কিংবা একশ দম্পতির বিবাহকার্য সম্পন্ন হবে। এভাবে বিবাহকার্য বেশ স্বাভাবিক ও সহজসাধ্য হবে। বহু দেশ ও রাষ্ট্রে এ ধরনের অনুষ্ঠান বেশ সফলভাবে আয়োজিত হয়েছে এবং হচ্ছে।
১৫. সমাজে এমন বহু রীতি-নীতি ও ধ্যান-ধারণা প্রচলিত আছে, শরীয়তের বিধি-বিধানের সাথে যেগুলোর কোনো মিল নেই। ইসলামি মূল্যবোধ যেগুলোকে বিন্দুমাত্র সমর্থন করে না। যেমন: স্বগোত্রীয় কাউকে বিবাহ করতে হবে। ছোট মেয়ের আগে বড় মেয়েকে বিবাহ দিতে হবে। বোনের বিয়ের আগে বড় ভাইয়ের বিবাহ হতে পারে না ইত্যাদি। এ ধরনের অবান্তর ধ্যান-ধারণা ও কুসংস্কার বর্জন করতে হবে।
১৬. আল্লাহ তা'আলার দরবারে দু'আ ও প্রার্থনা করতে হবে। তিনিই পরম আশ্রয় এবং মহান রিযিকদাতা, যিনি আপনাকে রিযিক দান করবেন। তিনিই মহাধনী, যিনি আপনাকে সচ্ছলতা দান করবেন। দু'আ কবুলকারী, আপনার দু'আ করবেন। মহান দাতা, যিনি আপনাকে উত্তম জীবনসঙ্গী ও সন্তান-সন্তদি দান করবেন।
১৭. সমাজের যত মিথ্যাচারী গণক, জ্যোতিষী, তারা আপনার বিবাহ বিলম্বের সমস্যার সমাধান করে দিবে-এই বিশ্বাস নিয়ে কখনো তাদের দ্বারস্থ হবেন না। রাসূল ﷺ স্পষ্টভাবে তাদের দ্বারস্থ হতে নিষেধ করেছেন:

مَنْ أَتَى كَاهِنًا، أَوْ عَرَّافًا، فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ، فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ". مسند أحمد (৩৩১/১৫)

অর্থ: 'যে ব্যক্তি কোনো গণক কিংবা জ্যোতিষীর দ্বারস্থ হলো, তার কথা বিশ্বাস করল, সে যেন মুহাম্মদের ওপর যে কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে, তা অস্বীকার করল।' (মুসনাদে আহমদ: ১৫/৩৩১)
১৮. সমাজের প্রতিটি শ্রেণির মধ্যে পারস্পরিক দূরত্ব ও সম্পর্কের টানাপোড়েন দূর করতে হবে। লোকদের মাঝে দলীয় বিরোধের জের ধরে যে সমালোচনা হয়ে থাকে, তা সাধারণত মৌলিক ও গঠনমূলক সমালোচনা নয়। সুতরাং এর কারণে কোনো সভ্য-ভদ্র ও ধার্মিক পাত্রের বিবাহ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা ঠিক নয়।
১৯. পাত্র-পাত্রীর ব্যক্তিগত ও বংশীয় সুনাম-সুখ্যাতির বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা আবশ্যক। কেননা তা আল্লাহ প্রদত্ত দান। যে ব্যক্তি সুনাম-সুখ্যাতি অর্জন করতে পেরেছে, সে সকলেরই শ্রদ্ধার পাত্র, প্রীতিভাজন।
২০. প্রত্যেক পাত্র-পাত্রীর প্রতি আমার অনুরোধ, অলুক্ষুণে হবে না। সবসময় মঙ্গল ও কল্যাণের আশা কর। অতীতে এমন বহু সফল ব্যক্তি গত হয়েছেন, যারা সুন্দরভাবে সফলভাবে বৈবাহিক জীবন কাটিয়েছেন। পরম শান্তি-প্রশান্তি নিয়ে এ জীবন উপভোগ করেছেন। তুমি তাদের সুখানুভূতি ও অভিজ্ঞতার দিকে নজর দাও। বৈবাহিক জীবনের ব্যর্থতার তিক্ত অভিজ্ঞতার কাহিনিও শুনবে। কিন্তু তা নিতান্তই কম। এমন স্বল্পসংখ্যক তিক্ত অভিজ্ঞতা তোমার মন-মস্তিষ্কে স্থান দিও না।
২১. প্রত্যেক তরুণ-তরুণীর উদ্দেশ্যে বলছি, 'তোমার জীবনের সফলতা ও সৌভাগ্যের ট্রেন ছুটে যায়নি; বরং তা আরও সুন্দর ও উজ্জ্বলরূপে ফিরে আসছে এবং বৈবাহিক জীবনের মাধ্যমে তা আরও উত্তম ও বরকতপূর্ণরূপে ফিরে আসছে। মহান রাব্বুল আলামীন এমনই ওয়াদা করেছেন:

﴿فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا * إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا﴾ [الشرح: ٥، ٦]

অর্থ: 'সুতরাং কষ্টের সাথেই রয়েছে সুখ। নিশ্চয় কষ্টের সাথেই রয়েছে সুখ।' (ইনশিরাহ, ৯৪: ৫, ৬)

সুতরাং নিজেদের যাবতীয় বিষয় আপন রবের যিম্মায় ন্যস্ত করুন। তাঁর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না। আল্লাহ তা'আলার এ বাণী স্মরণ করুন:
﴿وَلَا تَايْنَسُوا مِنْ رَّوْحِ اللَّهِ إِنَّهُ لَا يَايْنَسُ مِنْ رَّوْحِ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكُفِرُونَ﴾ [يوسف: ٨٧]

অর্থ: 'আর তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না, কেননা কাফির কওম ছাড়া কেউই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয় না।' (ইউসুফ, ১২: ৮৭)

পরিশিষ্ট:
* বিশিষ্ট আইরিশ সাংবাদিক ও সাহিত্যসমালোচক জর্জ বার্নাড শ (১৮৫৬-১৯৫০ খৃষ্টাব্দ) বলেছেন: 'বিবাহের আগ পর্যন্ত নারী এক অজানা আশঙ্কায় ভোগে। বিবাহের পর তার সব ভয়-ভীতি কেটে যায়। কিন্তু পুরুষ, বিবাহের পরই তার যত ডর-ভয় দেখা দেয়।'
* আরব্য প্রবচন: 'আইবুড়োর জীবন হতাশ স্বামী, গোমরা মুখ ও দুর্ভাগ্য থেকে সুন্দর।'
* 'অনেক আইবুড়োত্বের জীবন অসুখী জীবন, অসুখী দম্পতি ও হতাশাগ্রস্ত জীবনাচার থেকে উত্তম। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর ফায়সালাই চূড়ান্ত। তার ফায়সালায় পরম কল্যাণ নিহিত।' -আয়েয কারনী

টিকাঃ
১৬. বাংলা ভাষায় এর স্বপক্ষে প্রমাণ হলো, বাংলা ভাষায় আইবুড়ি শব্দ আছে; কিন্তু আইবুড়া শব্দ পাওয়া যায় না। (অনুবাদক)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00