📄 মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের অবাধ্যতা
মা-বাবা কখনো কখনো ছেলে-মেয়ের অবাধ্যাচারে চরম ভোগান্তির শিকার হন। পরস্পর ভালোবাসা ও আন্তরিকতা ক্ষোভে পরিণত হয়। পরিবারে মা-বাবা ও সন্তানদের মাঝে ঘৃণা ও অবজ্ঞার এক অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সন্তানদের চরম অবাধ্যতার একটি পর্যায়ে এসে অনেক মা-বাবাই তাদের প্রতি নিরাশ হয়ে পড়েন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে বাধ্য হন।
তাদের কেউ কেউ গায়ের জোর ও শক্তি খাটিয়ে, কঠোরতা ও শাস্তি প্রয়োগ করে সন্তানদের অবাধ্যতা রোধ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু অধিকাংশ সময়ই তা হিতে বিপরীত হয়। মা-বাবার কঠোর অবস্থান ও বাধ্যবাধকতার মানসিকতা সন্তানদের অবাধ্যতা ও বিরুদ্ধাচারের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। আবার কোনো কোনো মা-বাবা আদর-সোহাগ ও মায়া-মমতা দিয়ে সন্তানকে বোঝাতে চান। চেষ্টা করেন তাকে অবাধ্যতার পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু অনেক সন্তানই বাধ্য হওয়ার পরিবর্তে মা-বাবার আদর-সোহাগকে দুর্বলতা ও অপারগতা ভেবে অবাধ্যতা ও স্বেচ্ছাচারিতাতেই মজে থাকে।
মা-বাবা সন্তানদের থেকে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও তিক্ত অভিজ্ঞতার শিকার হয়ে তাদের অভিযোগ-অনুযোগের আর কোনো শেষ থাকে না। সন্তানকে নিয়ে তাদের ভেতর মানসিক অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা কাজ করে। যে পারিবার হয়ে উঠার কথা ছিল সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যময় জান্নাতের টুকরা, মা-বাবার প্রতি সন্তানের অবাধ্যতা ও বিরুদ্ধাচারিতায় একসময় তা-ই হয়ে উঠে জাহান্নামের গহীন গর্ত। অবস্থা তো কখনো কখনো এমন সঙ্গিন আকার ধারণ করে যে, পিতা-মাতা সন্তানকে ঘরছাড়া করতে বাধ্য হন। সন্তানের অবাধ্যতায় ক্ষোভ ও ঘৃণা, অসন্তোষ ও দুশ্চিন্তা এমন চরম পর্যায়ে এসে ঠেকে, মা-বাবা নিজেকে এ প্রবোধ দিয়েই সান্ত্বনা গ্রহণ করেন যে, তারা কোনো সন্তানের জন্ম দেননি। কোনো শিশু মানব-মানবীর চেহারা দেখেননি। এ হলো একজন মা-বাবার জীবনে চরম বঞ্চনা ও নিরাশার পরিস্থিতি।
পিতা-মাতা সমাজের জ্ঞানীগুণী বিজ্ঞজনদের নিকট নানাভাবে বহু প্রশ্ন করে তাদের সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ ও পন্থা জানতে চান। অস্থির চিত্তে তারা তাদের গুরুতর সমস্যা সমাধানের পথ খোঁজেন। প্রকৃতপক্ষে এ সমস্যার সমাধান কী? এ সংকট থেকে উত্তরণের পথ কী?
সমাধান:
১. সন্তানের প্রতি যত্নবান হোন তাদের সাথে সহজ সরল ও আন্তরিকভাবে মিশে থাকুন। মায়া মমতা ও হাসি-আনন্দে তাদের জীবনকে ভরিয়ে তুলুন। একটি শুষ্ক ভূমি যেমন অবিরাম বৃষ্টির প্রতীক্ষায় থাকে, তেমন সন্তানরাও যেন আপনার আগমনের অপেক্ষায় অধীর থাকে।
২. সন্তানদের মঙ্গল ও কল্যাণ কামনা করে দোয়া করুন। আল্লাহ তা'আলার কাছে তাওফিক কামনা করুন। সন্তানদের সাথে কোনো প্রকার বৈষম্যমূলক আচরণ করবেন না। আপনার ঐকান্তিক চেষ্টা থাকবে, সন্তানদের প্রতি সমান আন্তরিকতা, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের পরিচয় দেওয়া।
৩. সন্তানদের ছোটোখাটো ভুল-ত্রুটিতে কিংবা গুরুতর কোনো ভুলই হোক-না-কেন, অন্যদের সামনে তাদের বকাঝকা করা, তিরস্কার-ভর্ৎসনা করার মানসিকতা পরিহার করুন। কারণ, এর ফলে সন্তানের মনে আপনার প্রতি যে বিশ্বাস ছিল, তা ভেঙে যাবে এবং তারা আত্মবিশ্বাস হারাবে। আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলা আত্মহত্যারই নামান্তর।
৪. সন্তানদের ধর্মেকর্মে অনুপ্রাণিত করুন। কেননা তারা যখন আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবাসতে শিখবে, তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে এমন মহৎ কাজগুলো করতে থাকবে যার মাধ্যমে তারা আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করতে পারে। আর মা-বাবার প্রতি সদাচার করা আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম।
৫. সন্তানদের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনা করুন। তাদের জীবনের নানা বিষয় সম্পর্কে তাদের মতামত ও অভিব্যক্তি জানতে চেষ্টা করুন। কোনো ভুল-বিচ্যুতি চোখে পড়লে সুন্দরভাবে তা বুঝিয়ে দিন। কঠোর ভাষা ও গালমন্দের ভাষা পরিহার করুন।
৬. মা-বাবার প্রতি সদাচারী হোন। আপনার সদাচার সন্তানদের মধ্যে ক্রিয়াশীল হবে। এ যেন প্রকারান্তরে আপনার কর্মের প্রতিফল। বিজ্ঞজনদের বাণী, 'তুমি তোমার মা-বাবার প্রতি সদাচারী হোন, সন্তানরাও আপনার প্রতি সদাচারী হবে।'
৭. সন্তানদের লালন-পালন ও তাদের শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে মা-বাবার পরস্পর সহযোগিতা ও বোঝাপড়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মা-বাবার পরস্পর ঝগড়া-বিবাদ, বৈরিতাপূর্ণ আচার-ব্যবহার পরিবারের মাঝে অস্থিরতা, বিক্ষুব্ধতা সৃষ্টি করে। যা সন্তানদের মন-মানসিকতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দিন-দিন তারাও মা-বাবার পরস্পর ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে পড়ে। তাই পারিবারিক বন্ধন মজবুত করুন। পরস্পর সহযোগিতা ও বোঝাপড়ার মানসিকতা অবলম্বন করুন।
৮. পারিবারিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সন্তানদের মতামত যাচাই করুন। বাস্তব জীবনের নানা-বিষয়ে তাদের চিন্তা ও অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করার সুযোগ দান করুন। যৌক্তিকতা ও যথার্থতার ভিত্তিতে প্রয়োজনে তাদের মতামত গ্রহণ করুন। এ ক্ষেত্রে তাদের মেধা ও বুদ্ধির প্রশংসা করে তাদেরকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলুন।
৯. সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৎসঙ্গ আপনার সন্তানকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে। আর অসৎ সঙ্গ তাদের চারিত্রিক ও নৈতিক অবনতি ঘটাবে। তাদেরকে বড়দের প্রতি অশ্রদ্ধা ও অবাধ্যতায় দুঃসাহসী করে তুলবে।
১০. কথা-কাজের অমিল হওয়ার ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক থাকুন। অনেক মা-বাবাই সন্তানদের একরকম শেখায়, আর নিজেরা অন্য রকম করে। কথা-কাজের এমন অমিল সন্তানদের চোখে মা-বাবার ব্যক্তিত্বকে খাটো করে। তাদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
সম্মানদের প্রতি কয়েকটি মূল্যবান উপদেশ:
১. মা-বাবার সাথে সদাচারের ক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করুন। তাঁরা হলেন আপনার জন্য জান্নাতের খোলা দরজা। আপনার কুকীর্তির কারণে তা যেন বন্ধ না হয়ে যায়।
২. কোনোভাবে যদি আপনি আপনার মা-বাবার সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারেন, তাদের দু'আ লাভ করতে পারেন, তাহলে তা হবে আপনার সফলতা ও সৌভাগ্যের বিরাট অর্জন।
৩. মনে রাখবেন, আপনি যতই উচ্চশিক্ষিত হোন না, যতই উচ্চপদস্থ হোন না কেন, আর মা-বাবা যতই অজ্ঞ-সাধারণ হোন না কেন, আপনি যখন তাঁদের কাছে অবস্থান করবেন, তাদের অনুগত সেবক হয়ে থাকবেন।
৪. মা-বাবার উদ্দেশ্যে কিছুতেই এমন শব্দ উচ্চারণ করবেন না, যাতে তাদের মনে এতটুকুন ব্যথার উদ্রেগ ঘটে। এ হলো আপনার প্রতি মাহান আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ: ‘আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করবে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উফ্’ বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না। আর তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বল।’ (বনী ইসরাঈল, ১৭: ২৩)
৫. মা-বাবার কোনো একজন যখন আপনাকে ডাকবে, যত গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত থাকেন-না-কেন, সব ছেড়ে তাদের ডাকে সাড়া দিন। প্রথমে তাদের আদেশ পালন করুন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেন: ‘হে আমার রব, তাদের প্রতি দয়া করুন যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে লালন-পালন করেছেন।’ (বনী ইসরাঈল, ১৭: ২৪)
৬. প্রত্যেক নামাযে, প্রত্যেক ইবাদতে, যেকোনো দু'আর উপলক্ষ্যে মা- বাবার জন্য দু'আ করতে ভুলবেন না। দু'আ কবুলের বিশেষ মুহূর্তগুলোতে মা-বাবার জন্য বেশি বেশি করে দু'আ করুন।
৭. মা-বাবা যখন কথা বলবে, তাদের কথার মাঝে কথা বলবেন না। উচ্চ স্বরে কথা বলবেন না। পূর্ণ মনোযোগ ও আগ্রহ ভরে তাদের কথা শুনুন। আপনার কিছু বলার থাকলে বিনম্রভাবে বলুন।
৮. আপনার স্বার্থে মা-বাবা যে ত্যাগ শিকার করেছেন, তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন। আপনার প্রয়োজনের আগে তাঁদের প্রয়োজনের কথা ভাবুন। আপনার কাজটি সমাধা করার আগে তাঁদের কাজ সমাধা করুন।
৯. কোনোক্রমেই মা-বাবার সঙ্গে ঝগড়ায় জড়াবেন না, এমনকি তাঁদের ভুল-বিচ্যুতিতেও না। এক্ষেত্রে আপনার করণীয় হবে বিনম্রভাবে যথার্থ বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করা। কখনো স্ত্রী, সন্তান ও বন্ধু-বান্ধবদের, মা-বাবার ওপর প্রাধান্য দিবেন না।
১০. বিভিন্ন আয়োজন-উপলক্ষ্যে মা-বাবাকে উপহার প্রদান করুন। এতে তাঁদের প্রতি আপনার সম্মান ও আন্তরিকতাবোধ প্রকাশ পাবে। উপহার- উপঢৌকন হলো পরস্পর সম্পর্কোন্নয়ন ও আন্তরিকতা বৃদ্ধির অন্যতম উপায়।
টিকাঃ
১. البحر المديد في تفسير القرآن المجيد (৩/ ১৯৩) *
পরিশিষ্ট:
মুফাসসির সাআলাবী ও আরও কয়েকজন মুফাসসির এ ঘটনাটি বর্ণনা করেন: এক ব্যক্তি রাসূল -এর দরবারে এসে হাযির হলো। কেঁদে-কেঁদে অভিযোগ-অনুযোগ করতে লাগলো। নিজ সন্তানের ব্যাপারেই তার সব অভিযোগ-অনুযোগ:
'আমি কত রাত জেগেছি, যেন সে শান্তিতে ঘুমাতে পারে। আমি ক্ষুধার্ত থেকেছি, যেন সে তৃপ্তিভরে আহার করতে পারে। তার সুখের জন্য আমি কত কষ্ট করেছি। এখন সে শক্তিশালী যুবক। আর আমি দুর্বল বৃদ্ধ। পিতা হিসেবে তার ওপর আমার যে অধিকার রয়েছে, নির্লজ্জভাবে সে তা অস্বীকার করেছে। তার ওপর আমার যে অবদান ও অনুগ্রহ রয়েছে, সে তার প্রতি অবজ্ঞা ও অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। সে আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আল্লাহ্ তা'আলাও তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিক।' এতটুকু বলেই লোকটি আবার কাঁদতে লাগল। সে ছিল কবি। রাসূল তাকে জিজ্ঞেস করলেন: 'এ নিয়ে কি কোনো কবিতা রচনা করেছ?' বলল, 'হ্যাঁ।' এরপর লোকটি আবৃত্তি করতে শুরু করলো:
'আমি তোমাকে লালন-পালন করেছি, তখন তুমি শিশু ছিলে। যখন তুমি যুবক হয়েছ, তখনো আমি তোমার পরিপূর্ণ দেখভাল করেছি। আমার সাধ্য ও সামর্থ্যের সবটুকু ব্যয় করে তোমার আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছি। কত রাত তোমার অসুস্থতায় শিয়রে বসে বিনিদ্র রজনী কাটিয়েছি। তোমার অসুস্থতার পীড়া দেখে এমন মানসিক যন্ত্রণায় ভুগেছি, দু'চোখ এমন ভীষণভাবে অশ্রু বিসর্জন করেছে, যেন স্বয়ং আমিই অসুস্থ। আজ আমার জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে তুমি যখন যৌবনে পদার্পণ করেছ, কঠোরতা ও রূঢ়তার তিক্ত প্রতিদানে তুমি আমাকে জর্জরিত করলে। ভাবখানা এমন যে, এতকাল ধরে তুমিই আমার ওপর অনুগ্রহ করে এসেছ। আমি ছিলাম তোমার অনুগ্রহ প্রার্থী। হায় আফসোস! তুমি যদি আমার পিতৃত্বের সম্মানটুকুও দিতে না পার, তবে তা-ই কর। যেমন অনেক দুষ্ট লোক তার প্রতিবেশীর সাথে করে। আমাকে তুমি বিকারগ্রস্ত বলে আখ্যায়িত করো। অথচ তোমার বোধ-বুদ্ধি বিকারগ্রস্ততায় জর্জরিত।'
তার কবিতা শুনে রাসূল ও উপস্থিত সাহাবাগণ কেঁদে ফেললেন। রাসূল তার ছেলেটিকে ডেকে পাঠালেন। তাকে তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করলেন এবং ছেলেটির জামা ধরে তার উদ্দেশ্যে বললেন:
'তুমি ও তোমার তোমার সম্পদ তোমার পিতার কল্যাণে।'
হে আল্লাহ! আপনি আমাদের মা-বাবার প্রতি সন্তুষ্ট হোন। তাঁদের মধ্যে যারাই জীবিত আছেন, তাদেরকে সুস্থতা ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দান করুন। তাঁদের মধ্য হতে যারা কবরবাসী হয়েছেন, তাদেরকে আপনি ক্ষমা করুন এবং তাদের প্রতি রহম করুন। আমীন।
📄 বিপদ-আপদ
এ পৃথিবীতে প্রত্যেকেই কোনো-না-কোনো বিপদ-আপদ, সমস্যা ও সংকটে জর্জরিত। জীবনের এই প্রতিকূলতা ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি হলো আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে পরীক্ষাস্বরূপ। এ হলো আমাদের ধৈর্য ও সহনশীলতা, আল্লাহ তা'আলার ফায়সালার সামনে নিজেকে আপত্তিহীন ও প্রশ্নাতীতভাবে সমর্পণের পরীক্ষা।
বিপদ-আপদ হলো জীবনের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিকূল পরিস্থিতি। ব্যক্তি-জীবন, পারিবারিক জীবন, লোকসমাজ অনেক বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হয়। অর্থ-সম্পদ, সুনাম-সুখ্যাতি, পদমর্যাদা ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রে বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ও প্রতিকূলতার শিকার হয়। যেমন: কাজেকর্মে বিফলতা, লেখপড়ায় কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জনে ব্যর্থতা, ব্যবসা-বাণিজ্যে আর্থিক লোকসান, নিকটজন ও আপনজনের পক্ষ থেকে প্রতারণা, রোগ-বিরোগ, কারাবরণ, গুম-হত্যা ও মৃত্যু ইত্যাদি। এ ধরনের বিপদ-আপদ জীবনের স্বতঃস্ফূর্ততা ও প্রাণচঞ্চলতাকে ব্যাহত করে। ব্যক্তির মন-মানসিকতায় ও চিন্তা-চেতনায় গভীর রেখাপাত করে। তার অনুভব-অনুভূতিকে ভীষণভাবে প্রকম্পিত করে। ফলে বিপদ ও সংকটের সঙ্গে সঙ্গে সে মানসিক অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তার বোঝা বয়ে বেড়ায়। পরিণতিতে কেউ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হয়, কেউ হার্ট স্টোক করে, কেউ বা জ্ঞান হারায়। জীবনের এই কঠিন বাস্তবতা মোকাবিলা করার উপায় কী? এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কী?
সমাধান:
১. নিয়তির অবধারিত লিখন ও আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকুন। যাবতীয় বিষয় আল্লাহ তা'আলার যিম্মায় ন্যস্ত করুন। মনে রাখবেন, আপনি যে সংকটে পড়েছেন, তা অবধারিত ছিল। তা খণ্ডানোর কোনো উপায় নেই। জীবনের এক-একটি বিপদ দুর্যোগ আল্লাহ তা'আলার নিকট আপনার মর্যাদা বৃদ্ধি করবে। আপনি যদি সন্তুষ্টচিত্তে, অম্লান বদনে ধৈর্যধারণ করতে পারেন, তবে মনে রাখবেন, ধৈর্য হলো ইবাদতে যত্নশীল বান্দার জান্নাত ও ধর্মভীরু ব্যক্তির জন্য মুক্তির উপায়।
২. বিপদ-আপদ মোকাবিলা করার কয়েকটি পর্যায় রয়েছে:
(ক) আল্লাহর ফায়সালা সন্তুষ্ট থাকা এবং কৃতজ্ঞচিত্তে সংকট মোকাবিলা করা। এটাই শ্রেষ্ঠতম পন্থা।
(খ) উত্তম প্রতিদানের আশায় ধৈর্য ও সহনশীলতার সঙ্গে বিপদ মোকাবেলা কর। এটা মধ্যম পন্থা।
(গ) বিপদের সম্মুখীন হয়ে অস্বস্তি ও বিরক্তি প্রকাশ করা এবং ক্ষোভে ফেটে পড়া-শরীয়তের দৃষ্টিতে এমনটি হারাম। আপনার কর্তব্য হলো প্রথম পন্থাটি অবলম্বন করা। যা সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ। রাসূল বলেছেন: ‘মু'মিন বান্দা যে কষ্ট-ক্লান্তি ও রোগ-ব্যাধির শিকার হন, যে রোগ-ব্যাধি ও দুঃখ-যাতনায় আক্রান্ত হন, এমনকি তার দেহে যে একটি কাঁটা ফুটে, তার বিনিময়েও আল্লাহ তা'আলা তার গুনাহ মাফ করেন।’ (মুসনাদে আহমদ: ১৩/৩৯৭)
৩. নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করুন যে, ইহজাগতিক এ জীবন হলো বিপদ- দুর্যোগ, সমস্যা ও সংকটবহুল। যেমন পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন: ‘আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফলাদির স্বল্পতার মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।’ (বাকারা, ২: ১৫৫)
৪. যেকোনো বিপদের থেকে মুক্ত হওয়ার গোপন রহস্য ও মূল চাবিকাঠি হলো: ‘নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয় আমরা তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।’ (বাকারা, ২: ১৫৬) প্রথম পর্যায়েই আপনি মুক্তির এ চাবিকাঠি অবলম্বন করুন। এতে আসন্ন বিপদমুক্তি ও সুখ-সৌভাগ্যের পথ ত্বরান্বিত হবে। মহান প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তিনটি মহান পুরস্কার লাভ করতে পারবেন। যেমন পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করেছেন: ‘তাদের উপরই রয়েছে তাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও রহমত এবং তারাই হিদায়াতপ্রাপ্ত।’ (বাকারা, ২: ১৫৭)
৫. চরম অস্থিরতায় ও শোচনীয় পরিস্থিতিতেও স্থির প্রশান্ত থাকার চেষ্টা করুন। বিশ্বাস করুন, আপনি একাই এমন প্রতিকূলতার শিকার নন, অতীতে বহু লোক এর চেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হয়েছে, বর্তমানেও হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হতে পারে। তাদের তুলনায় আপনি বরং ভালো অবস্থানেই আছেন। ধৈর্যের সঙ্গে আসন্ন সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের অপেক্ষা করুন। আলোর পর আঁধার, অসুস্থতার পর সুস্থতা-এটাই পৃথিবীর বুকে আল্লাহ তা'আলার চিরন্তন নীতি। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন: ‘প্রকৃতপক্ষে কষ্টের সাথে স্বস্তি থাকে। নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি থাকে।’ (ইনশিরাহ্, ৯৪: ৫, ৬)
৬. মনে রাখবেন, এ পৃথিবী যেমন নশ্বর, পৃথিবীর ক্ষুদ্র-বৃহৎ সবই নশ্বর। সর্ববৃহৎ বস্তু ও অতিক্ষুদ্র কণা, কোনো কিছুই তাতে অবশিষ্ট থাকবে না। ধ্বংসশীল এ পৃথিবীতে রাসূল স্বীয় অবস্থা এভাবে বর্ণনা করেছেন: ‘(ইহকালের কোনো বাসিন্দা হলো) এমন এক মুসাফির, যে গ্রীষ্মকালের কোনো এক দিনে সফরে বের হয়েছে। কোনো একটি ছায়াদার গাছের নিচে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে ইহকাল ত্যাগ করেছে।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং: ২৭৪৪) বিশ্বাস করুন, জীবনের কোনো অবস্থাই স্থায়ী নয়। তাই জীবনের পরিবর্তশীলতার সঙ্গে নিজেকে সুন্দরভাবে মানিয়ে নিন। বিপদ ও সংকটের মুহূর্তে ধৈর্য ও সহনশীলতায় অভ্যস্ত হোন। সৃষ্টির প্রথম দিন থেকেই এ পৃথিবী পরিবর্তনশীল। মানবজাতির জন্য তা এক বিরাট পরীক্ষার ক্ষেত্র। মনীষীগণ বলেছেন: 'যে সতর্ক ও সচেতন, সে অস্থির ধৈর্যহারা হবে না। যে আল্লাহকে ভয় করবে, সে অন্য কিছুতে সন্ত্রস্ত হবে না। যে কল্যাণের আশাবাদী হবে, দুঃখ-বেদনা তাকে স্পর্শ করতে পারবে না।'
৭. সর্বদা প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতার মানসিকতা ধারণ করুন। তিরমিজী শরীফে বর্ণিত হয়েছে: আবু তালহা আল- খাওলানী কবরের কিনারায় বসা ছিলেন। রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'যখন কোন বান্দার সন্তান মারা যায় তখন আল্লাহ তা'আলা ফেরিশতাদের বলেন, 'তোমরা আমার বান্দার সন্তান কবয করে নিয়ে এলে?' তার বলে, 'হ্যাঁ।' আল্লাহ্ তাআলা বলেন, 'তোমরা তার হৃদয়ের ফল কবয করে নিয়ে এলে?' তার বলে, 'হ্যাঁ।' আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'আমার বান্দা কী বলেছে?' তারা বলে, 'আপনার প্রশংসা বাণী উচ্চারণ করেছে এবং “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” পড়েছে।' আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, 'আমার এই বান্দার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ কর এবং তার নামকরণ কর "বায়তুল হামদ” বা প্রশংসালয়।' (তিরমিজী, হাদিস নম্বর: ১০২১) যারা আল্লাহর প্রশংসা করে, আল্লাহ তাদের বিরাট প্রতিদান দান করেন। শতো প্রতিকূলতার মুহূর্তেও তাদের সঠিক পথে অবিচল রাখেন। সুতরাং চরম বিপদের মুহূর্তেও আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করতে, তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ভুলবেন না। মনে রাখবেন, আপনি যে সংকটের সম্মুখীন হবেন, তা সর্বোচ্চ আপনার জাগতিক জীবনের সাময়িক কিছু ক্ষতি করবে, পরকালের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।
৮. বিপদের সম্মুখীন হলে একটি সুসংবাদ গ্রহণ করুন! বিপদ হলো আপনার ভুল-বিচ্যুতির প্রায়শ্চিত্ত, গুনাহ-পাপাচার হতে পরিশুদ্ধি এবং মহান রবের পক্ষ থেকে ক্ষমাস্বরূপ। আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকুন। আশা করা যায়, তাতে এমন অনেক কল্যাণ নিহিত আছে, যা আপনার অজানা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ‘এবং হতে পারে কোন বিষয় তোমরা অপছন্দ করছ অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর হতে পারে কোন বিষয় তোমরা পছন্দ করছ অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না।’ (বাকারা, ২: ২১৬)
৯. বিপদের মুহূর্তে বিরক্তি ও ধৈর্যচ্যুতি থেকে বেঁচে থাকুন। অসহায় অভিযোগ-অনুযোগ থেকে বিরত থাকুন। বারবার এ দু'আটি পাঠ করুন: ‘হে আল্লাহ! আমাকে বিপদমুক্ত করুন। এর বিনিময়ে আমাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।’ (মুসলিম: ২/৬৩১) রাসূল বলেছেন: যে কোনো বান্দাই বিপদগ্রস্ত হয়ে এই দু'আ পাঠ করবে: (আমরা সকলে আল্লাহরই এবং আমাদেরকে তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে। হে আল্লাহ! এ বিপদে আমাদের আশ্রয় দান করুন। এর বিনিময়ে আমাদের উত্তম প্রতিদান দান করুন) আল্লাহ তা'আলা তাকে বিপদে আশ্রয় দান করবেন এবং এর বিনিময়ে তাকে উত্তম বিনিময় দান করবেন।” (মুসলিম: ২/৬৩২)
১০. মনটাকে আস্বস্ত করুন, হৃদয়াত্মাকে প্রশান্ত করুন। রাসূল বলেছেন: ‘মু'মিনের অবস্থা বিস্ময়কর। সকল কাজই তার জন্য কল্যাণকর। মু'মিন ছাড়া অন্য কেউ এ বৈশিষ্ট্য লাভ করতে পারে না। তারা সুখ-শান্তি লাভ করলে শুকর-গুজার করে আর অস্বচ্ছলতা বা দুঃখ-মুসীবতে আক্রান্ত হলে সবর করে, প্রত্যেকটাই তার জন্য কল্যাণকর।’ (৪/২২৯৫)
১১. হাসান বসরী (রহ.) বলেন, 'আপনার ওপর যত বিপদ-আপদ, সংকট ও দুর্যোগ আসুক না কেন, আপনি তাতে ক্ষুব্ধ হবেন না। কেননা আপনার অপছন্দের এমন অনেক বিষয় আছে, যাতে আপনার কল্যাণ ও মুক্তি নিহিত। আবার পছন্দের এমন অনেক বিষয় আছে, যাতে আপনার ক্ষতি ও অকল্যাণের সমূহ আশঙ্কা রয়েছে।'
১২. পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন: ‘সবর (ধৈর্য) ও সালাতের (নামাযের) মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর।’ (বাকারা, ২: ৪৫) বিপদ যত কঠিন হোক-না-কেন, সংকট যত ভয়ানক হোক-না-কেন, আল্লাহর দরবারে সাহায্য প্রার্থনা করার সর্বোত্তম পন্থা হলো সবর ও সালাত*। সুতরাং আল্লাহর ফায়সালার প্রতি সন্তুষ্টচিত্তে ধৈর্যধারণ করুন এবং বিনয়াবনত হয়ে নামাযে মশগুল হোন। রাসূল যখন কোনো গুরুতর বিষয়ের সম্মুখীন হতেন, নামাযে মশগুল হতেন। কেননা সবকিছুর চাবিকাঠি একমাত্র আল্লাহ তা'আলার হাতে। তাঁর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করার প্রধান মাধ্যম হলো নামায।
১৩. বিপদ-আপদ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করুন। এই দু'আটি বারবার পাঠ করে আল্লাহ তা'আলার নিয়ামত ও অনুগ্রহ লাভ করুন: পবিত্র কুরআনে আল্লাহ ত'আলা ইরশাদ করেন: ‘এবং তারা বলেছিল, "আল্লাহ তা'আলা আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক!" অতঃপর তারা ফিরে এসেছে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে নিআমত ও অনুগ্রহসহ। কোন মন্দ তাদের স্পর্শ করেনি এবং তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির অনুসরণ করেছিল। আর আলাহ মহা অনুগ্রহশীল।’ (আলে ইমরান, ৩: ১৭৩, ১৭৪)
১৪. পবিত্র কুরআনের বাণী: ‘স্মরণ রেখ, কেবল আল্লাহর যিকিরই সেই জিনিস, যা দ্বারা অন্তরে প্রশান্তি লাভ হয়।’ (রা'দ, ১৩: ২৮) যখনই কোনো প্রতিকূলতার শিকার হবেন, কোনো বিপন্নতার সম্মুখীন হবেন, আল্লাহর যিকিরে নিমগ্ন হোন। এতে আত্মিক ও মানসিক প্রশান্তি অর্জিত হবে, বিপদ ও প্রতিকূলতার চাপ লাঘব হবে, অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তাজনিত কারণে সৃষ্ট রোগ-ব্যাধি থেকে থেকেও মুক্ত থাকবেন, ইনশাআল্লাহ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন: ‘কোনো মুসিবতই আল্লাহ তা'আলার হুকুম ছাড়া আসে না। যে কেউ আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, আল্লাহ তা'আলা তার অন্তরকে হেদায়াত দান করেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞাত।’ (তাগাবুন, ৬৪: ১১)
১৫. বেশি-বেশি ইস্তেগফার* করুন। রাসূল বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি বেশি বেশি ইস্তেগফার করবে, আল্লাহ তা'আলা তার সামনে সমস্ত বিপদ হতে মুক্তির পথ খুলে দিবেন। যেকোনো প্রতিকূলতা থেকে নিষ্কৃতির পথ দেখিয়ে দিবেন। তাকে এমন ক্ষেত্র থেকে রিযিক দান করবেন, যা সে কল্পনাও করত না।’ (মুসনাদে আহমাদ: ৪/১০৪) বারবার পাঠ করতে থাকুন। কেননা তা জান্নাতের অন্যতম খাযানা। এর মাধ্যমে যত বাধা-বিপত্তির অবসান হয়। শতো প্রতিকূলতার ঝঞ্ঝাট দূর হয়। মহান আল্লাহ তা'আলা খুশি হন।
১৬. বিশ্বাস করুন, বিপদ হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে ভালোবাসার আলামত। এ যেন এমন ওষুধ, যা স্বাদে তিক্ত, ফলে মিষ্ট। কিছু ওষুধ আছে, যা স্বাদে ভীষণ তিক্ত হলেও মধুর চেয়ে কার্যকর। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে: ‘বিপদ-আপদ যত বিরাট ও কঠিন হবে, এর প্রতিদানও বিরাট হবে। আল্লাহ তা'আলা যখন কোনো সম্প্রদায়কে পছন্দ করেন, তাদের পরীক্ষা করেন। (পরীক্ষার সম্মুখীন হয়ে) যে সন্তুষ্ট থাকে, সে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে। আর যে অসন্তোষ প্রকাশ করে, ক্ষুব্ধ হয়, সে আল্লাহ তা'আলার ক্রোধের পাত্রে পরিণত হয়।’ (তিরমিজী: ৪/৬০1)
১৭. যে ব্যক্তি বিপদের সংবাদ দিবে, তার কর্তব্য হলো, বিষয়টিকে যথাসম্ভব সহজভাবে উপস্থাপন করা। জনৈক সাহাবা (রা.)-এর স্ত্রী যেমনটি করেছিলেন : দীর্ঘ সফর থেকে স্বামী যখন ঘরে ফিরে এলেন, অসুস্থ সন্তানের অবস্থা জানতে চাইলেন। স্ত্রী বললেন, 'সে তো ভালো আছে। এখন বেশ প্রশান্ত।' সফরের ক্লান্তিতে স্বামী বিশ্রামে চলে গেলেন। যখন সতেজ দেহে, প্রশান্ত মনে ঘুম থেকে জেগে উঠলেন, স্ত্রী তাকে আসল ঘটনা খুলে বললেন, 'তার সন্তান রোগাক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে।' সাহাবি রাসূল -এর নিকট এ ঘটনা খুলে বললেন। রাসূল তাঁর স্ত্রীর অনেক প্রশংসা করলেন। এক দুরারোগ্য ব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তির কথা আমিও জানি। ডাক্তার তাকে বলে দিয়েছেন, 'আপনার ক্যান্সার হয়েছে। সর্বোচ্চ আর তিন মাস বেঁচে থাকতে পারবেন। এরপর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ, মৃত্যুর আশঙ্কাই প্রকট।' জীবদ্দশায় নিজ কানে নিজের সুনিশ্চিত মৃত্যুর কথা শুনে রোগী তৎক্ষণাৎ হার্টঅ্যাটাক করে মারা গেল। রাসূল বলেছেন: ‘তোমরা যখন কোনো অসুস্থ ব্যক্তির কাছে যাবে, (সুস্থ হয়ে) বেঁচে থাকার ব্যাপারে তার মনে আশা জাগাবে। তোমাদের আশান্বিত কথায় তার নিয়তির ফায়সালা খণ্ডাবে না। তবে তাতে অসুস্থ ব্যক্তি মানসিক প্রশান্তি বোধ করবে।’
১৮. এ কথা ভেবে আপনার মনকে প্রশান্ত রাখুন, পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় বিপদ ও সংকটের বিষয় ছিল সাহাবায়ে কেরামের উপস্থিতিতে রাসূল -এর মৃত্যু ঘটা এবং ওহি বন্ধ হয়ে যাওয়া। সাহাবায়ে কেরামের জন্য এ যে কত কষ্ট ও বেদনাদায়ক ছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আপনি যদি সিরাতের গ্রন্থে রাসূল মৃত্যুরোগ ও মৃত্যু পরবর্তী অবস্থা সম্পর্কে পড়ে দেখেন, তবে এর কিছুটা আন্দাজ করতে পারবেন এবং সচরাচর জীবনে আপনার বিপদগুলো নিতান্ত ক্ষুদ্র ও ঠুনকো মনে হবে। রাসূল বলেছেন: ‘তোমাদের কেউ যখন কোনো বিপদে আক্রান্ত হবে, সে যেন আমার মৃত্যুতে আসন্ন বিপদের কথা স্মরণ করে। কেননা তা হবে মহাদুর্যোগের একটি।’ (আল মু'জামুল কাবীর ৭/১৬৭)
১৯. কোনো প্রতিকূলতা ও জটিলতায় ফেঁসে গিয়ে ক্ষোভে লজ্জায় নিঃসঙ্গ হয়ে পড়বেন না। তাহলে আপনার ওপর শয়তান চেপে বসবে এবং আপনাকে মানসিক যন্ত্রণা, অন্যায়, পাপাচার ও কুধারণা ইত্যাদি অবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে ফেলবে। এ পরিস্থিতিতে এমন কাজে মনোনিবেশ করুন, যা নিজের জন্য ও অন্যের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে। আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের সংস্পর্শে থাকুন, তাদের কাছে সান্ত্বনা পাবেন, সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ পাবেন এবং বর্তমান প্রতিকূলতা লাঘব হবে। পবিত্র কুরআন যেন হয় আপনার অন্তরঙ্গ বন্ধু। তার মতো একনিষ্ঠ বন্ধু দ্বিতীয়টি নেই।
২০. মনে রাখুন, যেকোনো বিপদ আপনার জন্য আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে প্রতিদান লাভের রাস্তা খুলে দিবে। হাসি-আনন্দ, দুঃখ-বেদনা জীবনেরই অবধারিত অংশ। এসবই নিয়তির লিখন, তা খণ্ডানোর সাধ্য কারো নেই। হাসি-আনন্দের মুহূর্তগুলো আপনি যেভাবে সাদরে গ্রহণ করেন, দুঃখ-বেদনার পরিস্থিতিগুলোও যদি একইভাবে মেনে নেন, আল্লাহর তা'আলার ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকেন, ধৈর্য ও সহনশীলতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেন, ইন্নালিল্লাহি পাঠ করেন এবং আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে মুক্তির পথ ও রহমতের আশা করেন, তবে এমন প্রতিটি আমলের জন্য আপনি বিরাট প্রতিদান লাভ করবেন। আল্লাহ তা'আলার প্রশংসাই তো আপনার জন্য জান্নাতে একটি বালাখানা প্রস্তুত করে দিবে। যার নাম হবে 'বাইতুল হাম্দ'। এমন একটি প্রতিদানই তো আপনার ওপর আপতিত শত কঠিন সংকট থেকে শ্রেষ্ঠ। 'সুনানে তিরমিজি' গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে: ‘কিয়ামতের দিন ইহকালে বিপদগ্রস্ত লোকদের প্রতিদানের মহত্ত্ব দেখে সাধারণ মানুষ এই কামনা করবে যে, ইহকালে তাদের দেহের চামড়াগুলো যদি ছুরি দিয়ে কাটা হতো!’ (আসসুনানুল কুবরা লিল বাইহাক্বী: ৩/৫২৬)
২১. রাগ, ক্ষোভ, ক্রোধ ইত্যাদি চারিত্রিক অন্যায় থেকে বিরত থাকুন। চেহারায় আঘাত করা, জামা-কাপড় ছিঁড়ে ফেলা, নিজের ধ্বংস কামনা করা, নিয়তির ফায়সালার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করা ইত্যাদি অন্যায় ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে বেঁচে থাকুন। এগুলোর প্রত্যেকটা জাহেলি যুগের কুসংস্কার। এ ধরনের কার্যকলাপ আপনার মানসিক শক্তিকে আরও দুর্বল করে দিবে। সবর ও ধৈর্য, রবের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও প্রশংসার প্রতিদান থেকে আপনাকে বঞ্চিত করবে। শয়তান খুশি হবে, আপনাকে আল্লাহর ক্রোধের পাত্র বানাবে।
২২. বিপদের সম্মুখীন হয়ে কল্যাণের সুসংবাদ গ্রহণ করুন। কেননা আল্লাহ তা'আলা আপনাকে কঠিন পরীক্ষার জন্য নির্বাচন করেছেন। তিনি তো বান্দাকে তার ঈমানের স্তর অনুযায়ী পরীক্ষা করেন। আরেকটি সুসংবাদ গ্রহণ করুন, বিপদ-আপদের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা আপনাকে পাপ-পঙ্কিলতামুক্ত করবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘নবীগণ। এরপর পর্যায়ক্রমে ব্যক্তিবর্গ। প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার ঈমানের স্তর অনুযায়ী পরীক্ষা করা হয়। যে ব্যক্তির ধার্মিকতা যত মজবুত, সুসংহত, তার পরীক্ষাও তত কঠিন। যার ঈমান ও ধার্মিকতার কোনো শক্তি নেই, তার পরীক্ষাও সাধারণ নগণ্য। আবার কোনো ব্যক্তি মানুষের মাঝে হেঁটে বেড়াচ্ছে, তার কোনো দোষ-ত্রুটি নেই, সে-ও বিপদগ্রস্ত হয়।’ (সহীহ ইবনে হিব্বান: ৭/১৮৪)
২৩. আমি, আপনি এমনকি পৃথিবীর কারো সাধ্য নেই পরকালের শাস্তির ভয়াবহতা সহ্য করার। আপনি যদি বিপদগ্রস্ত হন, আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করুন এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করুন এজন্য যে, ইহাকালে লঘু শাস্তির মাধ্যমে পরকালের গুরুদণ্ড থেকে আপনাকে রেহাই দিচ্ছেন, আপনার গুনাহ মাফ করছেন, পাপ-পঙ্কিলতামুক্ত হয়ে কবরে যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছেন। এর চেয়ে সৌভাগ্যের বিষয় আর কী হতে পারে?! রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: ‘আল্লাহ তা'আলা যখন কোনো বান্দার কল্যাণ চান, ইহকালেই তার পাপের সাজা ভোগ করান। আর আল্লাহ তা'আলা যখন কোনো বান্দার অকল্যাণ চান, ইহকালে তার পাপের সাজা না দিয়ে পরকালে তার পূর্ণ শাস্তিতে পাকড়াও করেন।’ (তিরমিজী: ৪/৬০1)
২৪. জীবনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত হলো, ব্যক্তি যখন আল্লাহমুখী হয়, আপন রবের দরবারে আশ্রয় প্রার্থনা করে, কাকুতি-মিনতি করে প্রার্থনায় মগ্ন হয়। যখন সে বিশ্বাস করে, আল্লাহ তা'আলাই একমাত্র পরম মুক্তিদাতা, রক্ষাকারী। এরপর যখন সে আল্লাহর অনুগ্রহে বিপদমুক্ত হয়, অনুভব করতে পারে, দুঃখ-কষ্টের পর সুখানন্দ এবং সংকট ও বিপর্যয়ের পর প্রফুল্লতা ও প্রশান্তি কতই না তৃপ্তিদায়ক!
২৫. বিপদ ও সংকট মোকাবেলা করার অনেক ইতিবাচক দিক রয়েছে: অহংকার, দাম্ভিকতা, আত্মতৃপ্তি ও আত্মমুগ্ধতা ইত্যাদি জঘন্য স্বভাবদোষগুলো দূর হতে শুরু করে। ব্যক্তি যখন নিষ্কণ্টক ও নির্ঝঞ্ঝাট জীবন-যাপন করতে থাকে, আরাম-আয়েশ ও ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকে, সে অহংকারী ও দাম্ভিক হয়ে উঠে। ব্যক্তি যখন নানা প্রতিকূলতার শিকার হয়, জটিল সমস্যার সম্মুখীন হয়, নিজের দুর্বলতা ও অক্ষমতা চোখে পড়ে, নিজেকে সে ক্ষুদ্র নগণ্য ভাবতে শেখে। মনের অহংকার দূর হতে থাকে। আমাদের ওপর আল্লাহ তা'আলা অপার অনুগ্রহ হলো, তিনি আমাদের জন্য যেকোনো সমস্যার সমাধান দিয়েছেন এবং যেকোনো সংকট হতে উত্তরণের পথ বাতলে দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার বাণী: ‘বস্তুত মানুষ অবাধ্যতা করছে। কেননা সে নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করে।’ (আলাক, ৯৬: ৬, ৭)
২৬. সাময়িক যে বিপদে আক্রান্ত হয়েছেন, আল্লাহর তা'আলার পক্ষ থেকে তা এক রক্ষাকবচ, যা আপনাকে এমন কোনো জঘন্য অন্যায়-অনাচার থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে, যাতে লিপ্ত হয়ে আল্লাহ তা'আলার ক্রোধের পাত্রে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। কোনো এক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির শিকার হয়ে অবশেষে আপনি তাতে জড়াননি। আল্লাহ তা'আলা সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়। কখনো আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন বিপদ-আপদের মাধ্যমে। কখনো অনুগ্রহ করেন নায-নিয়ামতের মাধ্যমে।
২৭. যেকোনো জটিলতা ও প্রতিকূলতা সফলভাবে, শরীয়ত নির্দেশিত পন্থায় মোকাবিলা করার চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন, এ হলো আপনার জীবনের অন্যতম পরীক্ষা। তাতে সফল হওয়ার পথ হলো, নিয়তির উপর অগাধ বিশ্বাস এবং আপন রবের ফায়সালার সামনে পূর্ণ আত্মসমর্পণ। তাকদির ও নিয়তিতে বিশ্বাসের মতো ঈমানের মৌলিক বিষয়টিকে আপনি ঐচ্ছিক ও অপসনাল হিসেবে গ্রহণের কোনো অবকাশ নেই। নিয়তির ফায়সালা আপনার মর্জিমাফিক হলো তো বেজায় খুশি হলেন। আর একটু প্রতিকূলতার গন্ধ পেয়েই অস্বীকার করে বসলেন। আনুগত্য ও ইবাদতের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের মানসিকতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
২৮. আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে প্রাপ্ত নিয়ামতের কথা স্মরণ করুন, তাহলেই উপলব্ধি হবে, এখনও যে নিয়ামত বর্তমান, তা অগণিত সীমাহীন; যা থেকে বঞ্চিত, তা নিতান্ত নগণ্য। সুস্থতার দিনগুলোর কথা ভেবে দেখুন, তা দীর্ঘ কত দিন! আর অসুস্থতার দিনগুলো গুণে দেখুন, তা সামান্য কয়েকটা দিন। সুতরাং আধিক্য বিবেচনা করে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করুন এবং সামান্য না-পাওয়া ও বঞ্চনার অভিযোগ- অনুযোগ মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন।
২৯. বিশ্বাস করুন! যে কোনো বিপদ-তার ফায়সালা আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়। ভালো-মন্দের চাবিকাঠি তার হাতে। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকুন। এমনটি ভাবা সমীচীন নয়, ইশ! যদি এমনটি করতাম! আহা, যদি তেমনটি না করতাম! তার চেয়ে বরং এ বিশ্বাস ধারণ করুন, আল্লাহ যা করেছেন, মঙ্গলের জন্যই করেছেন। তাঁর ফায়সালাই অবধারিত। রাসূল বলেছেন: ‘যদি কোনো কিছু (বিপদ) তোমার ওপর আপতিত হয় তবে এরূপ বলবে না যে, যদি আমি এরূপ করতাম তবে এরূপ এরূপ হত; বরং বল যে, আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন এবং তিনি যা চেয়েছেন তাই করেছেন। কেননা, তোমার ঐ (যদি) শব্দটি শয়তানের সক্রিয় হওয়ার দুয়ার খুলে দেয়।’ (মুসলিম: ৪/২০৫২)
৩০. পবিত্র কুরআনের বাণী: ‘যারা ধৈর্যধারণ করে, নিশ্চয়ই তাদেরকে বেহিসাব প্রতিদান দেওয়া হবে।’ (যুমার, ৩৯: ১০) বিজ্ঞ আলেমগণের অভিমত হলো, সবর ও ধৈর্য তিন প্রকার: প্রথমত, আল্লাহ তা'আলার আনুগত্যের ওপর অটল-অবিচল থাকা। দ্বিতীয়ত, সব ধরনের অন্যায়, অনাচার ও পাপাচার থেকে বিরত থাকা। তৃতীয়ত, বিপদ-আপদে ধৈর্যধারণ করা। সুতরাং ব্যক্তি যখন বিপদগ্রস্ত হয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে, ক্ষুব্ধ হয়, ভাগ্যলিপি ও নিয়তিকে গালমন্দ করে, তখন সে ধৈর্য ও সহনশীলতার বিধান লঙ্ঘন করে। বিপদ ও প্রতিকূলতার শুরুতে ধৈর্যধারণ করা কর্তব্য। রাসূল বলেছেন: ‘বিপদের প্রথম ধাপেই ধৈর্যধারণ করাই পকৃত ধৈর্য।’ (বুখারী ২/৭৯, মুসলিম ২/৬৩৭)
৩১. আপনি যে সমস্যা ও সংকটে পড়েছেন, তা থেকে পরিত্রাণের উপায় হলো, মনে করতে হবে, যা হারিয়েছেন, আপনি তার আসল মালিক নন। সাময়িকভাবে তা আপনার হস্তগত হয়েছিল মাত্র। কোনো একদিন তা হাতছাড়া হতোই। এর প্রকৃত মালিক তো আল্লাহ তা'আলা। তিনি যখন ইচ্ছা, যেভাবে ইচ্ছা, নিয়ে নিতে পারেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ‘সবকিছুই ধ্বংসশীল। শুধু আল্লাহর সত্তাই ব্যতিক্রম। শাসন কেবল তাঁরই এবং তাঁরই কাছে তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে।’ (কাসাস, ২৮: ৮৮)
৩২. কঠিন দিনগুলোর কথা বারবার স্মরণ করে, অতীতের দুঃখ-বেদনার কথা টেনে এনে কষ্টদায়ক স্মৃতিগুলো জ্বলজ্বলে তাজা করে তুলবেন না। এতে মানসিক প্রশান্তি বিঘ্নিত হবে, অস্থিরতা ও যন্ত্রণা বাড়তে থাকবে। যা-কিছু কষ্টদায়ক বেদনাদায়ক, সব ভুলে থাকার চেষ্টা করুন। যে জটিলতা প্রতিকূলতা গত হয়েছে, তার পিছু পড়বেন না। আমিরুল মু'মিনীন, ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেছেন: ‘অতীতের দুঃখ-কষ্টের স্মৃতিচারণ করে কেঁদে মরো না।’
৩৩. আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা করুন। আপন রবের প্রতি সুধারণা পোষণ করুন। তাঁর পক্ষ থেকে কল্যাণ ও মঙ্গলের প্রত্যাশা করুন। সর্বদা এ বিশ্বাস রাখুন, আসমানি ফায়সালার বাইরে আপনার ভাগ্যে কিছুই ঘটবে না। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: ‘বলে দাও, আল্লাহ আমাদের তাকদিরে যে কষ্ট লিখে রেখেছেন, তা ছাড়া অন্য কোনো কষ্ট আমাদেরকে কিছুতেই স্পর্শ করবে না। তিনিই আমাদের অভিভাবক। আর আল্লাহরই ওপর মু'মিনদের ভরসা করা উচিত।’ (তাওবা, ৯: ৫১) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘প্রতিটি বিষয়েরই মৌলিকতা রয়েছে। কোনো ব্যক্তি ঈমানের মৌলিকতা লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না সে এ বিশ্বাস ধারণ করবে যে, সে যা লাভ করেছে, তা তার হাতছাড়া হওয়ার ছিল না। আর যা হাতছাড়া হয়েছে, তা কখনো অর্জনের ছিল না।’ (মুসনাদে আহমাদ: ৪৫/৪৮২)
টিকাঃ
১০ ধৈর্য ও নামায।
১১ আল্লাহর নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা।
পরিশিষ্ট:
১৪১৮ হিজরিতে (১৯৯৭ সাল) ঘটে-যাওয়া দুর্ঘটনার কথা আমি ভুলতে পারব না। তা ছিল ভয়াবহ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। মা-বাবা ও ভাই-বোন মিলে সুন্দর সাজানো পরিবার। তায়েফ থেকে ওমরা পালনের উদ্দেশ্যে মক্কার পথে যাচ্ছিল। ছেলে-মেয়ে আলাদা প্রাইভেটকারে। তাদের পেছনে মা-বাবা আলাদা প্রাইভেটকারে। হাইওয়ের একটি মোড়ে ক্ষিপ্রগতির একটি চলন্ত বাসের সঙ্গে সন্তানদের গাড়িটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। বাসটির গতি এত বেশি ছিল যে, প্রাইভেটকারের যাত্রীরা রাস্তায় ও আশেপাশে ছিটকে পড়ে। আরও মর্মান্তিক হলো, তাদের কারো দেহই অক্ষত নেই। চারপাশে হাত-পা, দেহ-মাথা ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে আছে। তাদের গাড়িটি একেবারে পিষে গেছে। পেছনের গাড়িতে মা-বাবা। তাদের চোখের সামনেই সন্তানদের এমন করুণ মৃত্যু। সন্তানদের এমন নির্মম মৃত্যু দেখে মা নিথর হয়ে পড়লেন। দুঃখে-শোকে পাথর। বাবা কম্পিত পায়ে গাড়ি থেকে নেমে এলেন। কেবলামুখী হয়ে সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন। পথিমধ্যেই দীর্ঘক্ষণ সিজদায় পড়ে থাকলেন। মহান রবের দরবারে প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে সিজদা থেকে মাথা উঠালেন। বারবার চোখের পানি মুছতে লাগলেন। মুখে একটি কথাই বারবার উচ্চারিত হতে লাগল: "ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।” এরপর তিনি সন্তানদের মৃতদেহের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালেন। জবানে তার একটি কথাই বারবার উচ্চারিত হচ্ছে "ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।” বাবার এমন প্রশান্ত চিত্ত মানুষের অযাচিত শোরগোল, হা- হুতাশ অনেকটাই স্তিমিত করে দিল। জীবনের এমন কঠিন মর্মান্তিক মুহূর্তেও মৃত সন্তানদের বাবা ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। জীবনের কঠিনতম মুহূর্তে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করেছেন। এটাই ছিল ঈমান ও শরীয়তের হুকুম, দৃঢ় মনোবল ও আত্মসংবরণের পরিচায়ক। আল্লাহ তা'আলা তাকে বিরাট প্রতিদান দান করুন। তাকে মাফ করুন। সন্তানদেরকে শহিদী মর্যাদা দান করুন। এ মহান পিতা পরবর্তীতে পরিচিতজনদের বলতেন, 'আল্লাহ তা'আলার দরবারে লাখো-কোটি কৃতজ্ঞতা জানাই যে, এমন বিরাট পরীক্ষার জন্য তিনি আমাকে ও আমার স্ত্রীকে মনোনীত করেছেন। সন্তানদের শহিদী মৃত্যু নসিব করেছেন আর আমাদের ধৈর্য ও সহনশীলতা অবলম্বন করার তাওফীক দান করেছেন।'
কবিদল বলেছেন: 'মানুষের জীবনে আটটি বিষয় অবধারিত: আনন্দ-বেদনা, মিলন ও বিচ্ছেদ, সচ্ছলতা-দরিদ্রতা, সুস্থতা-অসুস্থতা।'
এক নারী তার সন্তানকে নিয়ে রাসূল-এর দরবারে হাযির হলো। বলল, 'হে আল্লাহর নবী! আপনি আমার সন্তানের জন্য দু'আ করে দিন। এ পর্যন্ত আমার তিন-তিনটি সন্তানের মৃত্যু হয়েছে।' রাসূল জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার তিন সন্তানের মৃত্যু হয়েছে?' বলল, 'হ্যাঁ।' রাসূল বললেন, 'তুমি তো জাহান্নামের আগুনের রক্ষা হওয়ার আশ্রয়কেন্দ্র পেয়ে গেছ।' (মুসলিম: ৪/২০৩০)
ইবনুল কাইয়্যিম জাওযী (রহ.) (৬৯১-৭৫১ হি.) বলেছেন: 'আল্লাহ যখন কোনো বান্দার মঙ্গল চান, ঈমানের স্তর অনুযায়ী তাকে পরীক্ষা করেন। একের-পর-এক পরীক্ষা করে ধ্বংসাত্মক বহু বিষয় থেকে মুক্ত করেন। অবশেষে তাকে শুদ্ধ-পরিশুদ্ধ, পবিত্র ও পঙ্কিলতামুক্ত করেন। তাকে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ মর্যাদা দান করেন। আর তা হলো, আপন রবের ইবাদত-বন্দেগি। পরকালের শ্রেষ্ঠ নিয়ামত দান করেন। আর তা হলো, আল্লাহ তা'আলার পবিত্র সত্তার দর্শন ও নৈকট্য-লাভ।'
আমিরুল মু'মিনীন ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) যখন বিপদগ্রস্ত হতেন, তিনবার আল্লাহর প্রশংসা করতেন। শোকর আদায় করে বলতেন: 'আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি, এ বিপদ আমার দ্বীনের কোনো ক্ষতি করেনি। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যে, তিনি আমাকে এর চেয়ে বড় কঠিন বিপদ থেকে মুক্ত রেখেছেন। কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি, তিনি আমাকে বিপদে ধৈর্যধারণ করার তাওফীক দান করেছেন।'
আব্বাসীয় যুগের বিশিষ্ট কবি আবূল আতাহিয়া (১৩০-২১৩ হি) বলেন: 'যেকোনো বিপদে ধৈর্যধারণ করুন। অবিচল থাকুন। মনে রাখবেন, মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী। আপনি দেখুন না, পৃথিবীতে মানুষের জীবন কত বিপদসঙ্কুল! মৃত্যু তাকে গ্রাস করার জন্য ওঁত পেতে আছে। কখনো কি এমন কাউকে দেখেছেন, যে আজীবন বিপদমুক্ত!? বিপদ হলো পার্থিব জীবনের এমন অবধারিত অনুষঙ্গ, যা থেকে নিষ্কৃতি নেই। আপনি বরং মুহাম্মদ-এর বিপদ-আপদের প্রেক্ষাপটগুলো স্মরণ করে দেখুন। তারপর আপনার বিপদ ও প্রতিকূলতা তুলনা করে দেখুন। নিশ্চয় পরিমাণ ও ভয়াবহতায় আকাশ-পাতাল তফাত হবে।'
📄 দেশাত্মবোধের অভাব
দেশপ্রেম ও দেশাত্মবোধ এমন শব্দ, যা অনেক মহৎ চিন্তা-চেতনা, বোধ- উপলব্ধি ও কর্মকীর্তি ধারণ করে। প্রকৃত দেশাত্মবোধ হলো, নিখাঁদ দেশপ্রেম, দেশের প্রতি একনিষ্ঠতা, দেশের কল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া এবং এর উন্নতি-অগ্রগতিতে সর্বাত্মক চেষ্টা-সাধনা করা।
আল্লাহ তা'আলা যখন রাসূল -কে নির্দেশ প্রদান করলেন, স্বীয় মাতৃভূমি মক্কা নগরী ত্যাগ করে মদিনার উদ্দেশে হিজরত করতে, রাসূল মক্কা ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন। স্বীয় মাতৃভূমি থেকে বিচ্ছেদের মুহূর্তে তাঁর পবিত্র জবান থেকে উচ্চারিত হলো এমন মর্মস্পর্শী বাণী, যা স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার উপযুক্ত, প্রজন্ম পরম্পরায় যা সকলের জন্য শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে: 'আল্লাহর শপথ! (হে মক্কা নগরী!) আমি তোমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছি। কোনো সন্দেহ নেই যে, গোটা পৃথিবীর মধ্যে তুমি আমার সর্বাধিক প্রিয় নগরী, আল্লাহর নিকট শ্রেষ্ঠ নগরী। তোমার অধিবাসীরা যদি আমাকে দেশত্যাগে বাধ্য না করত, আমি কখনো তোমার পবিত্র ভূমি ত্যাগ করতাম না।'
মক্কা নগরীতে আশৈশব জীবন এবং উম্মতের চরম প্রতিকূলতা ও বিপর্যয়ের মুখেও রাসূল -এর পবিত্র জবানের এ কথাগুলোয় স্বদেশের প্রতি তাঁর নিখাঁত ভালোবাসা, গভীর মমত্ববোধ ফুটে উঠে। মক্কার কাফের দ্বারা রাসূল যে অমানবিক যুলুম-অত্যাচার, নির্যাতন-নিগ্রহের শিকার হয়েছেন, তা সত্ত্বেও তিনি মক্কার প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও আবেগ-অনুভূতিতে এতটুকু চির ধরেনি।
বর্তমান বিশ্বে প্রতিটি দেশে এমন অনেক নাগরিক আছে, দেশপ্রেম, দেশাত্মবোধ যাদের কাছে চরম অবহেলার শিকার। এ বিষয়ে তারা বিন্দুমাত্র তাগিদ অনুভব করে না। নিজ নিজ কল্যাণ ও স্বার্থসিদ্ধিতে তাদের উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখে যতই মুগ্ধ হোন-না-কেন, দেশের স্বার্থে ও দশের কল্যাণে তারা একেবারেই নিরুদ্বিগ্ন নির্জীব। তাদের হৃদয়গুলো অনুভূতিহীন শক্ত পাথর। কোনো সন্দেহ নেই, দেশ ও জাতির সামগ্রিক উন্নতি-অগ্রগতির পথে তা এক জটিল বাধা। এ বাধা কাটিয়ে উঠার উপায় কী? এ সংকট থেকে উত্তরণের পথ কী?
সমাধান:
১. বর্তমান প্রজন্মের মাঝে দেশাত্মবোধ ও দেশপ্রেমের গভীর অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে হবে। কেননা শিশু-কিশোররা পারিবারিক শিক্ষা-দীক্ষার মাধ্যমে যা অর্জন করে, আগামীর জীবনে তা প্রেরণা ও কর্মশক্তি হিসেবে কাজ করে।
২. ছাত্রসমাজের মাঝে দেশাত্মবোধের শিক্ষা জাগরূক করার ক্ষেত্রে মাদরাসা ও ইউনিভার্সিটিগুলোর যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে। দেশের চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কে ছাত্রদেরকে সজাগ-সচেতন করে তোলা কর্তব্য। এক্ষেত্রে তাদেরকে ইতিবাচক কার্যকর ভূমিকা পালনে অনুপ্রাণিত করতে হবে। কেননা তারাই হলো দেশের কল্যাণে আগামীর সূর্য-সন্তান, দেশের সেবক ও রক্ষক।
৩. শিক্ষা-সংস্কৃতি, মিডিয়া ও সম্প্রচারের মাধ্যমে দেশাত্মবোধ ও দেশপ্রেমের অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে হবে। বিষয়টি যেন তরুণ প্রজন্মের চিন্তা-চেতনায়, তাদের মন-মস্তিষ্কে স্থায়িভাবে গেঁথে যায় এবং বিষয়টিকে তারা যেন জীবনের অবিচ্ছেদ্য লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করে।
৪. বিশ্বাস করুন, ন্যায়-নীতিবান ও মহান ব্যক্তিদের জন্য স্বদেশ ত্যাগ করে ভিন দেশে পারি জমানো সাধারণ কোনো বিষয় নয়। তাঁদের বিবেক ও মহৎ মানসিকতা কখনো তা সমর্থন করবে না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা স্বদেশ ত্যাগের বিষয়টিকে আত্মহত্যার সমতুল্যরূপে উল্লেখ করেছেন: ‘আমি যদি তাদের ওপর ফরয করে দিতাম যে, তোমরা নিজেরা নিজেদেরকে হত্যা কর অথবা নিজেদের ঘর-বাড়ি থেকে বের হয়ে যাও, তবে তারা তা করত না, অল্পসংখ্যক লোক ছাড়া।’ (নিসা, ৪: ৬৬)
৫. মনে রাখুন! যতো দিন বেঁচে আছেন, দেশের কল্যাণে কাজ করা, দেশের মঙ্গলে সচেষ্ট থাকা আপনার অনিবার্য দায়িত্ব। এই ভূমিতেই আপনি জন্মগ্রহণ করেছেন। এ মাটি, এ পরিবেশের যত কল্যাণ, আপনি উপভোগ করেছেন।
৬. বিশ্বাস করুন! দেশের প্রতি মমত্ববোধ, ভালোবাসা, একনিষ্ঠতা, দেশের সুরক্ষা, দেশের সীমান্ত প্রহরা-এ সবই মহত্ত্ব ও মহানুভবতার পরিচায়ক, মর্যাদা ও গৌরবের প্রতীক।
৭. দেশ ও জাতির স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে দৃঢ়চেতা ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে। এ লক্ষ্যে দেশীয় সংস্থা ও সংগঠনগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা কর্তব্য। দেশীয় সম্পদ ব্যবহারে যেকোনো অপচয় ও দুর্নীতি রোধ করা আবশ্যক।
৮. এমন কিছু কর্মসূচি সক্রিয় করতে হবে, যা দেশীয় সংগঠনগুলোর মধ্যে দেশপ্রেমের চেতনা আরও সজাগ ও সুদৃঢ় করবে এবং দেশের সর্বস্তরের জনগণের মাঝে সাম্য, ন্যায়-নীতি ও মানবীয় মূল্যবোধের চেতনা ছড়িয়ে দিবে। মনে রাখবেন, দেশের সন্তানদের মধ্যে যদি দেশাত্মবোধের চেতনার মৌলিক চর্চা ও পরিচর্যা না হয়, তাহলে দেশ সুদীর্ঘ কালের জন্য শত্রুদের নিরাপদ চারণভূমিতে পরিণত হবে।
৯. দেশের মিডিয়া ও প্রচার-মাধ্যমগুলোর কর্তব্য হলো, একচেটিয়াভাবে দেশের সংকট ও দুর্দশার চিত্র তুলে না ধরে দেশের ইতিবাচক দিকগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে সম্প্রচার করা। অন্যথায় তরুণ প্রজন্মের মধ্যে স্বদেশের প্রতি হতাশা ও নিরাশা প্রকট হবে। মাতৃভূমিকে কেন্দ্র করে তাদের গর্ব ও গৌরবে চিড় ধরবে।
১০. একটি বিষয় জোর তাগিদ দিয়ে বুঝিয়ে দিতে হবে-দেশাত্মবোধ ও দেশপ্রেম শুধু কিছু অন্তঃসারশূন্য বুলি, সারবত্তাহীন আচার-অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশাত্মবোধ হলো দেশের কল্যাণ-চিন্তা, জাতীয় দায়দায়িত্বে একনিষ্ঠতা, প্রতিশ্রুতিবদ্ধতা ও দেশের স্বার্থে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার নাম। কোনো প্রকার দ্বিধা-সংশয় ও কালবিলম্ব করা ব্যতীত দেশের প্রতিটি নাগরিকের এ দায়িত্ব পালন করা কর্তব্য।
১১. মুসলিম সমাজের উল্লেখযোগ্য একটা শ্রেণি পশ্চিমা জীবনযাপনের অন্ধ অনুকরণে অতি উৎসাহী। স্বদেশের প্রতি দায়িত্ববোধের কথা চরমভাবে বিস্মৃত হয়ে ভিনদেশী চিন্তা-চেতনা ও সভ্যতা-সংস্কৃতি নিয়ে মেতে উঠেছে। তাদের সামনে ইসলামের গৌরবগাঁথা ইতিহাস, মহান পূর্বসূরিদের অবিস্মরণীয় কীর্তি, আমাদের মহান বিজয়ের কাহিনী তুলে ধরতে হবে এবং ইসলামের চিরন্তন সভ্যতা-সংস্কৃতির রূপরেখা উপস্থাপন করতে হবে।
১২. দেশের কল্যাণে সামান্য অবদান ও ক্ষুদ্র ভূমিকাগুলোকে খাটো করে দেখা সমীচীন নয়। প্রত্যেক নাগরিকের চেষ্টা-প্রচেষ্টার যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। কেননা এর মাধ্যমে জনগণ দেশের কল্যাণে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হবে। দেশাত্মবোধ ও দেশভক্তির চেতনা লালনে অনুপ্রাণিত হবে।
১৩. দেশের তরুণ সমাজ ও শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা সফরের সুযোগ-সুবিধা প্রদান করতে হবে, যেন তারা অতি সহজেই দেশের ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থানগুলোর সঙ্গে পরিচিত হতে পারে। অতীত ইতিহাসের অনেক শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা লাভের জন্য এটি একটি সুবর্ণ সুযোগ। এর মাধ্যমে তারা দেশের গৌরবময় কীর্তি সম্পর্কে জানতে পারবে। যা তাদের মাঝে দেশের বর্তমান উন্নতি-অগ্রগতির পথে এক নব উদ্যমতা সৃষ্টি করবে, নতুনভাবে অনুপ্রেরণা যোগাবে।
১৪. আঞ্চলিক ও সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতার মানসিকতা বর্জন করে, ইসলামের ভ্রাতৃত্ববোধের চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে কাজ করতে হবে। মাতৃভূমির কল্যাণে সংঘবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
১৫. সবার আগে দেশ ও দশের কল্যাণের বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়া আবশ্যক। দেশীয় সংস্থা ও সংগঠনগুলোকে মূল্যায়ন করা এবং দেশীয় সম্পদের যথাযথ সংরক্ষণ করা সমান গুরুত্বপূর্ণ। মতভিন্নতা ও বিবাদ-বিসংবাদের ক্ষেত্রেও জাতীয় স্বার্থ সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। তাই আলোচনার মাধ্যমেই জাতীয় ঐক্যের সূত্র খুঁজে বের করতে হবে এবং দেশের জন্য, দশের জন্য মঙ্গলজনক-এমন একটি ফলপ্রসূ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হবে।
১৬. দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষার ক্ষেত্রে উদার মানসিকতার গুরুত্ব ব্যাপক ভাবে প্রচার করা কর্তব্য। এ কথা জোর তাগিদ দিয়ে বোঝাতে হবে যে, দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষা করার দায়িত্ব শুধু নিরাপত্তাবাহিনীর নয়, প্রতিটি নাগরিকের স্ব-স্ব অবস্থান থেকে ঐকান্তিকতার সঙ্গে এ মহান দায়িত্ব পালন করা কর্তব্য।
১৭. মহৎ শিষ্টাচার, নীতি-নৈতিকতা ও মানবীয় মূল্যবোধ-যেমন: অন্যের সাহায্য-সহযোগিতায় এগিয়ে যাওয়া, প্রত্যেক নাগরিক নিজ পরিবার ও প্রতিবেশীর হক আদায় করা, চারপাশের সমাজ বিনির্মাণে সচেষ্ট হওয়া, স্বার্থপরতার মানসিকতা ছেড়ে পরার্থপরতার মহত্ত্ব অবলম্বন করা এবং দেশের প্রতিটি নাগরিকের মাঝে পরস্পর ভ্রাতৃত্ববোধ ও আন্তরিক ভালোবাসা বজায় রাখা-ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতিশীল ও দায়বদ্ধ হতে হবে।
১৮. মহান পূর্বপুরুষগণের অবিস্মরণীয় কীর্তি ও গৌরবে এতটা মোহাচ্ছন্ন হয়ে থাকা সমীচীন নয়, যার কারণে ব্যক্তি আত্মবিস্মৃত হয়ে বর্তমানের উন্নতি-অগ্রগতি ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের কথা ভুলে বসে। এক্ষেত্রে অতীতের মর্যাদা ও গৌরব পুঁজি করে বর্তমানের পথে এগিয়ে যাওয়া এবং সুন্দর আগামীর পথ সুগম করা কর্তব্য।
১৯. দেশে আকস্মিক কিংবা শত্রুদের পূর্বপরিকল্পিত যেকোনো সংকটজনক সঙ্গিন পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সদা প্রস্তুত থাকতে হবে। কঠিন পরিস্থিতিতে প্রত্যেকের দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিলেও দেশের স্বার্থ রক্ষা করা ও উদ্ধার করা। এ জাতীয় ক্ষেত্রে স্পষ্ট হয়ে যায়, দেশাত্মবোধ ও দেশপ্রেমে কোন শ্রেণির নাগরিক নিখাত একনিষ্ঠ, আর কোন শ্রেণি প্রদর্শনবাদী ও স্বার্থপর।
পরিশিষ্ট:
ইবনে রূমী (২২১-২৮৩ হি.) বলেছেন: শৈশব, তারুণ্য, যৌবনের সুখস্মৃতিগুলো একজন সুনাগরিকের হৃদয়ে মাতৃভূমির প্রতি গভীর ভালোবাসা সৃষ্টি করে। তাই মানুষ যখন স্বদেশের কথা মনে করে, স্বদেশ তাকে অতীতের সুখস্মৃতিগুলো মনে করিয়ে দেয়। তাই দেশের প্রতি তাদের মন এতটা উদগ্রীব, উতলা হয়ে থাকে。
স্কটিশ দার্শনিক ও ঐতিহাসিক টমাস কার্লাইল (১৭৯৫-১৮৮১ খৃষ্টাব্দ) বলেছেন: 'কতই না গৌরবের বিষয়-কোনো নাগরিক স্বদেশের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া। তার চেয়ে গৌরবের বিষয় হলো, দেশের স্বার্থে বেঁচে থাকা, দেশের কল্যাণে সক্রিয় থাকা।'
ইরাকের বিখ্যাত কবি আব্দুল মুহসিন আল-কাজেমী (১৮৭১-১৯৩৫ খৃষ্টাব্দ) বলেছেন: 'যে নাগরিক মাতৃভূমিকে গর্ব ও গৌরবের প্রতীক মনে করে না, মর্যাদা ও গৌরবের ক্ষেত্রে তার কোনো স্থান নেই। আর যে নাগরিক দেশের একনিষ্ঠ কল্যাণকামী ও রক্ষক হয়ে বেঁচে থাকে, তার সুনাম-সুখ্যাতি বিশ্বদরবারে মেশকের সুগন্ধির মতো ছড়িয়ে পড়ে।'
📄 তালাক ও ডিভোর্স
স্বামী-স্ত্রীর মাঝে কলহ-বিবাদ কখনো কখনো এমন ভয়ানক আকার ধারণ করে, যার চূড়ান্ত হলো বিচ্ছেদ ও ডিভোর্স। ডিভোর্স হলো স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অমিল ও কলহ-বিবাদ নিরসনের সর্বশেষ তিক্ত সমাধান, যা আল্লাহ তা'আলার নিকট বৈধ; কিন্তু সর্বাধিক ঘৃণিত।
সামাজিকভাবেও এটি লজ্জা ও ঘৃণার বিষয়। কেননা দু'জন মানব-মানবীর মাঝে তিলে-তিলে যে প্রীতি ও ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, যে মানবিক মূল্যবোধ ও ঔদার্যের বন্ধন সৃষ্টি হয়েছে, তালাক ও ডিভোর্সের মাধ্যমে তা এক মুহূর্তেই ছিন্ন হয়ে পড়ে। এমন পরিবারে জন্মানো সন্তানরা পারিবারিকভাবে ও সামাজিকভাবে নানা বঞ্চনার শিকার হয়। প্রথমেই তারা সুন্দর সাজানো পারিবারিক পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হয়। বাবা-মা-র আদর-সোহাগ, স্নেহ-ভালোবাসা ও শাসন-অনুশাসন থেকে বঞ্চিত হয়।
তবে যে ব্যক্তি গভীর দৃষ্টিতে ডিভোর্স-এর বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করবে, চূড়ান্ত মুহূর্তে এর প্রয়োজনীয়তা ও অপরিহার্যতার বিষয়টি ভেবে দেখবে, তার কাছে ডিভোর্স কোনো সামাজিক আপদ বলে মনে হবে না। কেননা কখনো কখনো স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের এতটাই অবনতি ঘটে, বিচ্ছেদই এর মন্দের ভালোয় পরিণতি হয়। তখন যদি ডিভোর্সের পথ খোলা না থাকে, তাহলে স্বামী-স্ত্রীর তিক্ত সম্পর্কের জের ধরে সংসার ভাঙ্গার চেয়ে আরও ভয়ানক আত্মবিধ্বংসী পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার সমূহ আশঙ্কা থাকে। তালাক ও ডিভোর্সের কারণে একটি সুন্দর সাজানো পারিবারিক অবকাঠামো ধসে পড়ে। পরিবার-সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকেই মানসিক অস্থিরতা ও সামাজিক বঞ্চনার শিকার হয়। এক ঘোর অন্ধকার অনিশ্চয়তা তাদেরকে ঘিরে ধরে। একটি সুন্দর, সুশীল পরিবার গড়ে তোলার লক্ষ্যে স্বামী-স্ত্রীর দীর্ঘদিনের শত চেষ্টা-শ্রম পণ্ড হয়।
এটাও সত্য যে, পারিবারিক বন্ধন ও বিচ্ছেদ-সবই আল্লাহর ফায়সালা এবং আমাদের জীবনের স্বাভাবিক ও চরম বাস্তবতার অংশ। একটি সামাজিক ব্যবস্থা, পারিবারিক ব্যবস্থা যতই উন্নত ও ভারসাম্যপূর্ণ হোক, তাতে ডিভোর্স ও তালাকের স্থান অনিবার্য। সুতরাং কথিত অন্তঃসারশূন্য সুশীল সমাজেই নয়; সত্যিকারের সভ্য-সুশীল সমাজে ও পরিবারে তালাকের বাস্তবায়ন ঘৃণিত; কিন্তু অপরিহার্য। তালাকের বহু কারণ-উপকরণ, ঘটক-অনুঘটক রয়েছে। যার অনৌচিত্যের ব্যাপারে কারো সন্দেহ নেই। আবার সম্ভাবনার বিষয়টিও কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। ডিভোর্স যখন অপছন্দনীয় তখন তা থেকে বেঁচে থাকার উপায় কী? তালাক যখন অনিবার্য তখন তার সুষ্ঠু বাস্তবায়নের পন্থা কী?
সমাধান:
১. ঝগড়াঝাঁটি ও কলহ-বিবাদের সময় স্বামী-স্ত্রীর একজন অপরজনকে এড়িয়ে চলাই শ্রেয়। আরও ভালো হয়, তারা যদি নির্দিষ্ট কিছুদিনের জন্য অবসরযাপনের জন্য চলে যায়। অবশ্যই তাদেরকে পৃথকভাবে অবসরযাপন করতে হবে, যেন পারিবারিক দায়দায়িত্বের চাপমুক্ত হয়ে নিশ্চিন্ত মনে নিজেকে নিয়ে সময় কাটাতে পারে। মন-মানসিকতায় প্রশান্তি ও সতেজতা ফিরে আসে। পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা ও অনুরাগ নতুনত্ব লাভ করে। এ সময় তাদের কেউ তালাক ও সম্পর্কচ্ছেদ নিয়ে ভাববে না। কেননা আল্লাহ তা'আলার নিকট তা বৈধ হলেও সর্বাধিক ঘৃণিত। এতে পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে চরম বঞ্চনার শিকার হতে হয়। তবে যদি ডিভোর্স ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পথ খোলা না থাকে, তাহলে তা-ই শ্রেয়。
২. একপর্যায়ে এসে যদি ডিভোর্স হয়েই যায়, তখন স্বামীর কর্তব্য হলো স্ত্রীকে সুন্দরভাবে বিদায় জানানো। তার প্রতি সদাচার করা। তার সঙ্গে আন্তরিক ও সুন্দর আচরণ করা। ডিভোর্সের সময় একটি নারী মানসিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। এ কঠিন সময়ে স্বামী তার সাঙ্গে কঠোর ও রূঢ় আচরণ করা থেকে বিরত থাকবে।
৩. ডিভোর্স প্রদানকারী স্বামীকে অবশ্যই শরীয়তের বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে। শরীয়ত সমর্থিত স্ত্রীর প্রতিটি হক যথাযথভাবে আদায় করতে হবে। স্ত্রীর মোহর বাকি থাকলে তা পরিশোধ করা, তালাক পরবর্তী সময়কালে স্ত্রীর উত্তম ভরণ-পোষণ বন্দোবস্ত করা, স্ত্রীর পরিবার-পরিজনের সাথে সদয় আচরণ করা, স্ত্রীর সমালোচনায় মত্ত না হয়ে তার উত্তম গুণাবলির প্রশংসা করা-এসবই হলো স্বামীর ধার্মিকতা, সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি, মানবিকতা ও পৌরুষত্বের পরিচয়।
৪. আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকতে হবে। কেননা আল্লাহর ফায়সালায় চূড়ান্ত কল্যাণ নিহিত। এক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী উভয় পক্ষই পবিত্র কুরআনের এ বাণী মনে রাখবে: ‘আর যদি উভয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে আল্লাহ নিজের (কুদরত ও রহমতের) প্রাচুর্য দ্বারা তাদের প্রত্যেককে (অপরের প্রয়োজন থেকে) অমুখাপেক্ষী করে দিবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, প্রভূত হিকমতের অধিকারী।’ (নিসা, ৪: ১৩০)
৫. তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর কর্তব্য হলো, পূর্বের স্বামীর দুর্নাম না রটিয়ে তার সুনাম বজায় রাখা। এতে স্ত্রীর সুনামও বজায় থাকবে। যে নারী তার পূর্বের স্বামীর দুর্নাম রটিয়ে বেড়ায়, সমাজও তাকে সুনজরে দেখে না। দীর্ঘ দিনের অতীত সংসার-জীবনে স্বামীর অবদানের প্রতি তার অকৃতজ্ঞতা, দায়বদ্ধহীন মানসিকতা সমাজ কুৎসিতরূপেই বিবেচনা করে।
৬. ডিভোর্সের পর স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই আল্লাহ তা'আলার ফায়সালা সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিতে হবে। তাদের মনে করতে হবে, যে সংসার-জীবন অতীত হয়েছে, তা জীবনেরই একটি সুন্দর অধ্যায়, যা সদ্য সমাপ্ত হয়েছে। ডিভোর্সের মাধ্যমে জীবনের যে নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে, তাতেই হয়ত অধিক কল্যাণ রয়েছে। বাহ্যিকভাবে কত ক্ষতি মানুষের জন্য কল্পনাতীত কল্যাণ বয়ে আনে।
৭. সমাজে এ মানসিকতা দৃঢ়মূল করতে হবে, ডিভোর্স, তালাক কোনো দূষণীয় বিষয় নয়। এটি একটি শরীয়তসম্মত সামাজিক সমাধান। তাই তালাকপ্রাপ্ত নারীকে দোষারোপ করা, তাকে বাঁকা চোখে দেখা, তাকে অবজ্ঞা করা, অপয়া-অলুক্ষণে মনে করা- এসবই দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষুদ্রতা ও অসুস্থ মানসিকতার পরিচায়ক।
৮. তালাক প্রদানকারী স্বামী কিংবা তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী! বিশ্বাস করুন, আপনার জীবন কোনো নারী কিংবা পুরুষ সত্তার সঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়। একজনের জন্য অপরের জীবন থেমে থাকতে পারে না। তাই প্রত্যেকেই নতুন জীবনের পথে অগ্রসর হোন। আল্লাহর সীমাহীন দান-অনুগ্রহের ওপর গভীর আস্থা রেখে নতুন জীবন শুরু করুন। যা অতীত হয়েছে, স্মৃতির পাতা থেকে মুছে ফেলুন, যেন তা আদৌ ঘটেনি। আপন রবের প্রতি সুধারণা পোষণ করুন। যে আল্লাহ আপনাকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই আপনার কল্যাণ সম্পর্কে সর্বজ্ঞ।
৯. ডিভোর্সের অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, স্বামী-স্ত্রী উভয় পক্ষই আপসোস-অনুতাপ করতে থাকে এবং ডিভোর্স হওয়ার নেপথ্যে কাদের ভূমিকা ছিল, তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে মেতে উঠে। এমনটা করা সমীচীন নয়।
১০. অনুকূল-প্রতিকূল পরিস্থিতি-দুয়ে মিলেই জীবন। সংসার যেমন গড়েছে, তা ভাঙ্গারও সম্ভাবনা রয়েছে। তাই কখনো যদি সংসার ভাঙ্গার প্রতিকূলতার শিকার হন, মানসিকভাবে ভেঙে পড়বেন না। আত্মবিশ্বাস রাখুন। সমাজে আপনার ইতঃপূর্বের স্বাভাবিক জীবনযাপন বজায় রাখুন। দুষ্ট লোকদের বাঁকা দৃষ্টির ভয়ে একাকিত্ব বরণ করে ঘরকুনো হয়ে পড়ে থাকবেন না। তালাক ও ডিভোর্স জীবনেরই অংশ। জীবনে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা-অনুঘটনার মতো এটাকেও স্বাভাবিক দৃষ্টিতে বিবেচনা করুন।
১১. বিশ্বাস করুন, পারিবারিক সম্পর্কচ্ছেদের কারণে আপনার জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে যাবে-জীবন এত ক্ষুদ্র ও মূল্যহীন নয়। বাস্তবতা মেনে নিয়ে নতুন জীবন শুরু করুন। যা ঘটেছে, তা থেকে ইতিবাচক শিক্ষা নিয়ে সামনের পথে অগ্রসর হোন।
১২. স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কচ্ছেদ জীবনের একটি কঠিন প্রতিকূলতা বটে; কিন্তু এতটা গুরুতর নয় যে, এর কারণে পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জীবন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। মানবজীবন অমূল্য ও সম্ভাবনাময়। প্রতিদিনই নতুন ভোরের স্নিগ্ধতা উপভোগ করে, নতুন সূর্য আলেঅয় স্নাত হয়। জীবনচাকা নতুন গতিতে চলতে শুরু করে।
১৩. পারিবারিক জীবনে প্রতিবন্ধকতার শিকার হলে নিজের ভুলগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন। সংসারিক প্রতিকূলতা আপনার জন্য তিক্ত ও বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা। তবে তাতে স্থবির হয়ে পড়ার কারণ নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আপনি জেনে যাবেন, এ অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে কীভাবে অনুকূলতার পথ আবিষ্কার করবেন এবং সামনের পথে অগ্রসর হবেন।
১৪. ডিভোর্স পরবর্তী সময় কোনো বিষয়েই তাড়াহুড়ো করবেন না। এ সময়ে জীবনের এ কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতাকে পাশ কাটিয়ে নতুন কিছুতে জড়াবেন না। হয়ত এভাবে আপনি সাময়িক মানসিক কষ্ট-যাতনা ভুলে থাকতে পারবেন; কিন্তু ভিন্ন কোনো নতুন তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কাও থেকে যাবে। তাই এ ক্ষেত্রে নিজেকে পর্যাপ্ত সময় দিন। নিজেকে নিয়ে ভাবুন। আপনার প্রতিটি খুঁটিনাটি সম্পর্কে চিন্তা-ফিকির করুন। নিজেকে যখন আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারবে, আত্মপোলব্ধির মর্মমূলে পৌঁছতে পারবেন, ভবিষ্যৎ লক্ষ্য স্থির করা সহজ হবে।
১৫. বিবাহ বিচ্ছেদের কারণে যে তিক্ত অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন, তাতে আপনার ভুলগুলো পর্যালোচনা করে দেখুন। যেন পরবর্তীতে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি না হয়। অন্যকে যাচাই করার আগে নিজেকে যাচাই করুন। বিবেক-বুদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করুন।
১৬. আত্মবিশ্বাসী হোন। সাহসিকতার সাথে নতুন জীবনের পথে অগ্রসর হোন। দ্বিধা-দ্বন্দ্বহীন চিত্তে একটি নতুন পরিবার গড়ে তোলায় সচেষ্ট হোন। কেননা মানুষ হলো সমাজবদ্ধ প্রাণী। পরিবার ও সমাজ ছাড়া সে সুস্থ-স্বাভাবিক থাকতে পারে না।
পরিশিষ্ট:
'ভালোবাসার শক্তিতে গ্যালাক্সি রচিত হয়। ভালোবাসার কারণেই মুখে হাসি ফুটে। আনন্দ চিরস্থায়ী হয়। ভোরের মৃদু হাওয়া বয়। পাখিরা গান করে। ভালোবাসাহীন পৃথিবী যেন মরুময়, বাগান ফুলশূন্য, চোখ আলোহীন, কান শ্রবণশক্তিহীন।' -আয়েয কারনী
জর্জ বার্নাড শ (১৮৫৬-১৯৫০ খৃষ্টাব্দ) বলেছেন: 'বিবাহের আগ পর্যন্ত নারী এক অজানা আশঙ্কায় ভোগে। বিবাহের পর তার সব ভয়-ভীতি কেটে যায়। কিন্তু পুরুষ, বিবাহের পরই তার যত ডর-ভয় দেখা দেয়।'
সাহিত্য, ইতিহাস ও শরীয়াবিশেষজ্ঞ শায়েখ আলী তানতাভী (১৯০৯-১৯৯৯ খৃষ্টাব্দ) বলেছেন: 'ক্যাসেশন কোর্টে দীর্ঘ সাতাশ বছর বিচারক ছিলাম। তখন দেখেছি যে, ডিভোর্স ও তালাকের প্রধানতম কারণ হলো, স্বামীর সীমাহীন ক্রোধ আর স্ত্রীর নির্বোধসুলভ আচরণ।'