📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 খেলাধুলা নিয়ে অন্যায় বাড়াবাড়ি ও পক্ষপাতিত্ব

📄 খেলাধুলা নিয়ে অন্যায় বাড়াবাড়ি ও পক্ষপাতিত্ব


খেলাধুলা নিয়ে অন্যায় বাড়াবাড়ি ও পক্ষপাতিত্ব একটি মানসিক ব্যাধি। যা ব্যক্তিকে তার পছন্দের খেলোয়াড় ও দলের সমর্থনে এবং প্রতিপক্ষের বিপক্ষে প্রান্তিক ও উগ্র করে তোলে। সমর্থনের এই বাড়াবাড়ি ও উগ্রতা কখনো কখনো অন্যকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, গালমন্দ, আরেক কদম আগে বেড়ে হাতাহাতির রূপ ধারণ করে। অর্থাৎ এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, যা খেলাধুলার স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা ব্যাহত করে।

অন্ধ ক্রীড়া উন্মাদনা সমর্থকদের মাঝে পরস্পর হিংসা, বিদ্বেষ, ঝগড়া-বিবাদ ও সম্পর্কচ্ছেদের মতো বিশ্রি পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। কখনো কখনো তা আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে হাতাহাতি ও মারপিটের রূপ পরিগ্রহ করে। অনেক পত্র-পত্রিকায় দেখা যায়, তারা এমন এমন রিপোর্ট করছে, যা ক্রীড়ামোদী সমর্থকদের মাঝে ক্রীড়া-উন্মাদনা উস্কে দেয়। বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়া ও স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোতে খেলাধুলা নিয়ে অনেক বাকবিতণ্ডা ও তর্কযুদ্ধ দেখা যায়। যার কোনো কোনোটি শেষ অবধি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। এভাবে অন্ধ ক্রীড়া-উন্মাদনার কারণে আনন্দ-উৎফুল্লতা বিষাদ-বেদনায় পর্যবসিত হয়, পরস্পর সৌহার্দ্য-ভালোবাসা বিভেদ-বিসংবাদের রূপ পরিগ্রহ করে। কোনো কোনো খেলার ম্যাচ দেখা গেছে সুষ্ঠুভাবে শেষ হয়ে পুরস্কার উদযাপনের পরিবর্তে গণ্ডগোল ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা বাঁধিয়ে সমাপ্ত হয়েছে।

এ ধরনেরর ক্রীড়া-উন্মাদনা ও দুর্গতি থেকে আমরা আমাদের প্রজন্মকে কীভাবে রক্ষা করতে পারি, কীভাবে তাদের মাঝে সুস্থ ক্রীড়া-বিনোদনের প্রাণ সঞ্চার করতে পারি, যা তাদের মাঝে বিভেদের পরিবর্তে সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করবে; বিদ্বেষের পরিবর্তে আন্তরিকতা বাড়াবে; সম্পর্কচ্ছেদের বন্ধন অটুট করবে?

সমাধান:
১. সামাজিক অঙ্গনে, বিশেষ করে ক্রীড়াঙ্গনে অহংকার-দাম্ভিকতা ও ঘৃণার সংস্কৃতি বাদ দিয়ে মানবিক উদারতা ও সুস্থ ক্রীড়া-মননশীলতার সংস্কৃতি বজায় রাখতে হবে। যাতে খেলোয়াড়, সমর্থক ও দায়িত্বশীলদের মন-মানসিকতা ও আচার-আচরণে অন্ধ বাড়াবাড়ি ও ক্রীড়া-উন্মাদনার কোনো ছাপ না থাকে এবং বর্তমান প্রজন্মের মাঝে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির সম্পর্ক গড়ে উঠে। কেননা খেলাধুলা কোনো বিপর্যয়-বিশৃঙ্খলা ও ঝগড়া-বিবাদের ক্ষেত্র নয়। তা হলো শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ রক্ষার একটি মাধ্যম মাত্র।
২. খেলাধুলা নিয়ে অন্যায় বাড়াবাড়ির বিষয়টি প্রশ্রয় না দিয়ে একে শাস্তিযোগ্য অপরাধের আওতাভুক্ত করতে হবে। এক্ষেত্রে যারাই খেলাধুলার অপব্যবহার করে উগ্রতা উসকে দিবে, অন্ধ উন্মাদনা মাতাবে, তাদেরকে শাস্তির আওতাভুক্ত করতে হবে।
৩. ক্রীড়াঙ্গনে যারা সুস্থ মননশীলতা, উদারতা, নিয়ম-নীতির অনুবর্তিতার পরিচয় দিবে, তাদেরকে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কৃত করতে হবে। যেন তারা নিজেদের এ বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে পারে এবং তাদের দেখে অন্যরাও অনুপ্রাণিত হয়।
৪. কথাবার্তায় সংযম, অন্যের প্রতি সদাচার, কাউকে কষ্ট না দেওয়া, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া ইত্যাদি বিষয়সংবলিত কুরআনের আয়াত ও হাদীস ব্যাপকভাবে প্রচার করা কর্তব্য।
৫. মনে রাখবেন, হোক ক্রীড়াঙ্গন কিংবা যেকোনো অঙ্গন, শরীয়তের দৃষ্টিতে সবক্ষেত্রেই বাড়াবাড়ি, উন্মাদনা ও পক্ষপাতিত্ব এবং এর কারণে যে ঝগড়া-বিবাদ, গালমন্দ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়-তা সবই নিষিদ্ধ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন: ‘তারপর লোকেরা তাদের মাঝে তাদের দীনকে বহুভাগে বিভক্ত করেছে। প্রত্যেক দলই তাদের কাছে যা আছে তা নিয়ে উৎফুল-।’ (মু'মিনুন, ২৩: ৫৩)
৬. সমাজের প্রতিটি স্তরে অভিভাবকগণ নিজেদের পরিবার ও ঘরে সন্তানদের মাঝে সৌহার্দ্য, উদারতা, প্রতিযোগিতামূলক চেতনা ও সহনশীল মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি অহংকার, দাম্ভিকতা, স্বজনপ্রীতির মতো নোংরা স্বভাবগুলো থেকে বিরত রাখতে হবে।
৭. প্রত্যেক দল ও ক্রীড়া সংস্থার পক্ষ থেকে প্রীতি-মিলন সভা আয়োজন কিংবা "ক্রীড়াঙ্গনে স্বজনপ্রীতিকে না বলুন” শিরোনামে প্রীতি ম্যাচের আয়োজন করতে হবে। এ ম্যাচ থেকে অর্জিত আয় এতিম-দুস্থদের কল্যাণ ফান্ডে জমা হবে। যাতে করে খেলোয়াড়, দর্শক ও ক্রীড়াসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যেও মানবিকতা ও দয়ার্দ্রতার অনুভূতি জাগরূক থাকে।
৮. খেলাধুলার বিষয়টি আনন্দ-বিনোদন ও সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার আঙ্গিকে গড়ে তুলতে হবে। একে এমন ছাঁচে ঢেলে সাজাতে হবে, যেন তা বিশ্বমানবতার দরবারে ধার্মিকতা, নীতি-নৈতিকতা ও মানবিকতার মহৎ বার্তার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে মূল্যায়িত হয়। যা মানুষের ইসলামের মহৎ শিক্ষাদীক্ষার বিস্তার ঘটাবে।
৯. খেলোয়াড় ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ ও সাধারণ কর্মকর্তাগণ বিবৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিটি কথা, প্রতিটি শব্দ ভেবে চিন্তে উচ্চারণ করবেন। তাদের কোনো কথা যেন পক্ষপাতদুষ্ট না হয় এবং অন্যের জন্য কষ্টদায়ক না হয়। কেননা ক্রীড়া বিভাগের অন্যদের জন্য তারা অনুসরণীয়।
১০. সাংবাদিক ও কলামিস্টদের কর্তব্য হলো সুস্থ ক্রীড়ামননশীলতা ভাব বজায় রেখে রিপোর্ট করা। তাদের লেখায় ক্রীড়া-উন্মাদনা ও পক্ষপাতের কোনো ছাপ না থাকে কিংবা সমর্থকদের মাঝে তা উস্কে দেওয়ার প্রবণতা না থাকে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন: ‘ তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে একে অন্যকে সহযোগিতা করবে। অন্যায় ও যুলুমের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে না। আল্লাহকে ভয় করে চলো। নিশ্চয়ই আল্লাহর শাস্তি অতি কঠিন।’ (সূরা মায়েদা, ৫: ২)
১১. এ মানসিকতা বদ্ধমূল করতে হবে যে, খেলায় হার-জিত স্বতঃসিদ্ধ ও অবশ্যম্ভাবী। হার কিংবা জিত কোনোটিই স্থায়ী নয়। সুতরাং ফলাফল যা-ই হোক না কেন, পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়ে তা স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে হবে।
১২. যে ব্যানার কিংবা প্ল্যাকার্ড দর্শকদের মাঝে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, তাদের সমর্থনে আঘাত হানে, তা নিয়ে স্টেডিয়ামে প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে হবে।
১৩. স্বাস্থ্য সচেতন হোন, এবং উন্মাদনা, বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জনের কারণে যে ধরনের রোগ-ব্যাধির জন্ম হয় (যেমন: ব্রেইন স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, হার্ট এ্যাটাক ইত্যাদি) থেকে বেঁচে থাকুন। সীমাহীন উন্মাদনা ও বাড়াবাড়ির বশবর্তী হয়ে টিভি পর্দায় ও স্টেডিয়ামে অনেককে এ ধরনের রোগে আক্রান্ত হতে দেখা গেছে。

পরিশিষ্ট:
সুফইয়ান ইবনু 'উয়াইনাহ্ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, আমর (রহ.) জাবির (রা.)-কে বলতে শুনেছেন, আমরা এক যুদ্ধে নবী করিম-এর সঙ্গে ছিলাম। তখন একজন মুহাজির একজন আনসারের নিতম্বে আঘাত করল। সে সময় আনসারী চিৎকার করে বলল, 'হে আনসারীরা!' আর মুহাজির ব্যক্তি হাঁক দিল, 'হে মুহাজিরগণ!' তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, 'কী ব্যাপার! জাহিলিয়্যা যুগের মতো হাঁক-ডাক কেন?' তারা বলল, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ! একজন মুহাজির একজন আনসারকে পাছায় আঘাত করেছে।' রাসূলুল্লাহ বললেন, 'তোমরা এরূপ কথাবার্তা ছেড়ে দাও। কেননা, এ-তো (দুর্গন্ধময়) ন্যক্কারজনক।' (মুসলিম, ৪/১৯৯৮)

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম জাওযী (রহ.) (৬৯১-৭৫১ হি.) বলেছেন: 'দুধরনের বেশ ধারণ করা থেকে বিরত থাকুন। যে তার কোনো একটা ধারণ করবে, সে তিরস্কার ও ভর্ৎসনার শিকার হবেন।' এক. "জাহেলে মুরাক্কাব*"। দুই. তার চেয়ে জঘন্য হলো স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতিত্বের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া। আপনি বরং ন্যায়ানুগতার ভূমিকা পালন করুন। এটাই শ্রেষ্ঠ ভূমিকা।'

মোহনচাঁদ করমচাঁদ গান্ধী (মহাত্মা গান্ধী) (১৮৬৯-১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'মুষ্টিবদ্ধ হাতের সাথে আপনি কখনো হাত মেলাতে পারবেন না। বিবেক-বুদ্ধিতে জড়তাগ্রস্ত লোকের সঙ্গে তর্ক করে বোঝাতে পারবেন না।'

টিকাঃ
৮. যে জানে না। সে যে জানে না, এটাও জানে না।

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 ব্যর্থতা

📄 ব্যর্থতা


ব্যর্থতা হলো মানবজীবনের একটি কঠিনতম মুহূর্ত। আপনি যখন স্বপ্ন পূরণে নিজের অক্ষমতা টের পাবেন, হোক না তা সাময়িক, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে নিজের অপারগতা বুঝতে পারবেন, হোক না তা আপেক্ষিক, তা আপনার জীবনের স্বাভাবিক গতিপথকে ব্যাহত করবে এবং জীবনের পরম সুখ ও সৌভাগ্য অর্জনে আপনার পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে।

জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সফল হওয়ার জন্য আপনি যত চেষ্টাই করুন-না-কেন, ব্যর্থতার তিক্ত অভিজ্ঞতা আপনাকে কোনো না কোনো মুহূর্তে আস্বাদন করতেই হবে। এটাই হলো মানবজীবনের এক অবধারিত নীতি। মানুষের ক্ষমতা নেই, শতো সাধ্য-সাধনা করেও জীবনের এ তিক্ত বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার এবং তা থেকে মুক্তি লাভ করার। লেখাপড়া, চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিবাহ-শাদী মোটকথা জীবনের যেকোনো অঙ্গনেই আপনি যখন ব্যর্থ হবেন, তখন তা আপনার জন্য এক কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে। জীবন-যুদ্ধই হলো জয়-পরাজয়, দুঃখ-বেদনা, দারিদ্র্য-সচ্ছলতা, সফলতা-ব্যর্থতার নাম। আজকের দিনটি আপনার বেশ কাটবে তো আরেকদিন আপনাকে ভীষণভাবে ভোগাবে।

ব্যক্তি উচ্চ মনোবল, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ধৈর্য ও সহনশীলতা অনুযায়ী তার ব্যর্থতা বিভিন্ন রকম। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে, মনোবল হারিয়ে ফেলে। একপর্যায়ে ব্যর্থতার ঘূর্ণাবর্তে তার জীবনটাই হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ স্থবির। কখনো কখনো এ ব্যর্থতা জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে বিরাট দুশ্চিন্তা ও মানসিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জীবনভর সে অনুতাপ-আক্ষেপে ভুগতে থাকে। ব্যর্থতার কাটিয়ে সফলতা লাভ করার উপায় কী? জীবনের এ তিক্ততার সম্মুখীন হলে আমাদের করণীয় কী?

সমাধান:
১. প্রথমেই নিজের ব্যর্থতা ও বিফলতার দায় স্বীকার করুন। ব্যর্থতার দায়ভার অন্যের কাঁধে চাপিয়ে দায়মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করা বোকামি। এতে আপনার কাপুরুষতা ও সামনে অগ্রসর হওয়ার অপারগতা প্রকাশ পাবে। ব্যর্থতার কারণগুলো শনাক্ত করে তা সমাধানের চেষ্টা করুন এবং সফলতা লাভের জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও প্রতিশ্রুতিশীল হোন। তাহলেই সংকট ও প্রতিকূলতা কাটিয়ে সফলতা অর্জনের পথ সুগম হবে।
২. জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কী, কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য কী-এ মৌলিক প্রশ্নের উত্তর যদি আপনার জানা না থাকে, তাহলে আপনার পক্ষে কিছুতেই সফলতা অর্জন করা সম্ভব নয়। তাই প্রথমেই নিজের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নির্ধারণ করুন। তা বাস্তবায়নে যথাযথভাবে উদ্যোগী হোন। ব্যর্থ, নিরাশাবাদী ও হিংসুক লোকদের কথায় ভ্রূক্ষেপ করবেন না।
৩. বিজ্ঞ, অভিজ্ঞ ও গুণীজনদের পরামর্শ গ্রহণ করুন। তাদের বিজ্ঞতা, অভিজ্ঞতার পাথেয় সংগ্রহ করুন। যে সমস্ত কারণে আপনার ব্যর্থতার আশঙ্কা রয়েছে, তা চিহ্নিত করে এর যথাযথ সমাধান খুঁজে বের করুন এবং বাস্তব জীবনে তা থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করুন।
৪. ধৈর্য, সহনশীলতা ও নিরন্তর চেষ্টা-প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে রাসূল-এর শ্রেষ্ঠ আদর্শের অনুসরণ করুন। তাঁর মহৎ জীবনচরিত পাঠ করুন। তাতে ব্যর্থতা মোকাবিলা করার এবং সফলতার শীর্ষ চূড়ায় আরোহণ করার পথ ও পাথেয় বিদ্যমান।
৫. জীবন পরিবর্তনশীল, সফলতা ও ব্যর্থতার গণ্ডিতে আবর্তিত। তাই ব্যর্থতার তিক্ত অভিজ্ঞতায় ভেঙে পড়া, দুঃখ-ভারাক্রান্ত মনে একাকিত্ব বরণ করা সমীচীন নয়। ধৈর্যধারণ করুন। সহনশীল হোন। বিশ্বাস করুন, এ ব্যর্থতা ও প্রতিকূলতা নিতান্তই আপেক্ষিক। অচিরেই তা কেটে যাবে। আগত ভবিষ্যৎ আরও সুন্দর, আরও উজ্জ্বল। মনে রাখবেন, প্রত্যেক সফল ব্যক্তিরা আশাবাদী। ভবিষ্যতের উজ্জ্বল আশা বুকে ধারণ করেই তারা বেঁচে থাকেন। উন্নতি-অগ্রগতির পথে এগিয়ে যান।
৬. সফলতা অর্জনের পথে একের-পর-এক ভুল হওয়ার পরও অনবরত চেষ্টা করতে থাকুন। জীবনের একটি অঙ্গনে বিফল হওয়ার অর্থ এই নয় যে, সর্বক্ষেত্রেই বিফলতা অনিবার্য। তাই মেধা, যোগ্যতা ও সামর্থ্য অনুযায়ী নতুন কোনো ক্ষেত্রে চেষ্টা করুন। চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও লেখাপড়া-প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটি উপায় ও পন্থা যদি কাজে না আসে তবে ভিন্ন পথ ও পন্থা অবলম্বন করুন। একটি পিপীলিকা বারবার চেষ্টা-প্রচেষ্টার পরই সফল হতে পারে। বিদ্যুৎ আবিষ্কারক এডিসন সাতশতোবারের চেয়েও বেশি ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর বিদ্যুৎ আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
৭. অনেক পথে অগ্রসর হয়েছেন, বহু উপায় অবলম্বন করেছেন, কিন্তু কোনোটিতেই সফলতার দেখা পাননি। অবশেষে এমন এক পন্থা অবলম্বন করলেন, যা বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন ও দুরুহ। দুঃসাধ্য সাধন করার মানসিকতা নিয়ে সফলতা লাভের জন্য এ পথেই অগ্রসর হলেন। কিন্তু সফলতা অধরাই রয়ে গেল। তারপরও থেমে যাবেন না। নিরাশ হবেন না। নতুন আরেকটি পথ খুঁজে বের করুন। সে পথে অগ্রসর হোন। অতীতের সব ব্যর্থতার কথা ভুলে যান। নতুনভাবে শুরু করুন।
৮. অতীতের যেকোনো মহামনীষী, মহা আবিষ্কারক ও সফল ব্যক্তিগণ জীবনের কোনো-না-কোনো পর্যায়ে একবার হলেও ব্যর্থতার শিকার হয়েছেন। তাদের মাধ্যমে সান্ত্বনা গ্রহণ করুন।
৯. কল্পনাপ্রসূত ও বাস্তবতাবিবর্জিত এমন লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নির্ধারণ করবেন না, যা বাস্তবায়ন করা শুধু দুঃসাধ্যই নয়, রীতিমতো অসম্ভব। মেধা ও যোগ্যতা, সাধ্য ও সাধনা অনুযায়ী সম্ভাব্য লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নির্ধারণ করুন। যে কোনো লক্ষ্য বাস্তবায়নের পূর্বে তার ভালো-মন্দ বিচার-বিশ্লেষণ করে, বিজ্ঞজনের পরামর্শ গ্রহণ করে তবেই শুরু করুন।
১০. ব্যর্থতা ও অকৃতকার্যতা হলো জীবনের এমন এক প্রতিকূল পরিস্থিতি, যখন সহনশীলতা ও ধৈর্যধারণের মাধ্যমে আপনি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে প্রতিদানপ্রাপ্ত হতে পারেন। মনে করতে হবে, সাময়িক ব্যর্থতা হলো নিজের ভুল-বিচ্যুতির প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ। নিজের প্রচেষ্টা যখন ব্যর্থ হবে, নিষ্ফল হবে, তখন আল্লাহ তা'আলার এই মহান বাণী স্মরণ করুন: ‘তোমরা কোনো বিষয় অপছন্দ করো; কিন্তু আশা করা যায় তাতেই তোমাদের জন্য মঙ্গল রয়েছে।’ (বাকারা, ২: ২১৬)
১১. আলাহ তা'আলার আশ্রয় গ্রহণ করুন। নিজের যাবতীয় গুনাহ, ও নাফরমানি থেকে তওবা করুন। কেননা গুনাহ পাপাচার হলো সমস্ত ব্যর্থতা, অকৃতকার্যতা ও পরাজয়ের অন্যতম কারণ। উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয়ে আল্লাহ তা'আলা তাঁদের উদ্দেশ্যে বলেন (পবিত্র কুরআনের ভাষায়): ‘আপনি বলুন, এ পরাজয় তোমাদের নিজেদের কারণেই হয়েছে।’ (আলে ইমরা, ৩: ১৬৫)
১২. আপনার মন থেকে এ ধরনের শব্দগুলো চিরতরে মুছে ফেলুন-'আমি পারব না, আমার দ্বারা হবে না, আমি কিছুতেই সফল হতে পারব না, হয়ত আমি ব্যর্থ হব।' সমস্ত নেতিবাচক চিন্তা-চেতনা ঝেড়ে ফেলুন। উচ্চাকাঙ্ক্ষা, দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ও বুক ভরা আশা নিয়ে অনবরত চেষ্টা করুন।
১৩. জীবনের সাময়িক ব্যর্থতা মেনে নিন। ব্যর্থতার অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে সফলতার পথ আবিষ্কার করুন। এ বিপর্যয়কে এতটুকুন প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না, যা আপনার ওপর চেপে বসে, মন-মানসিকতাকে নিস্তেজ করে ফেলে, আপনার নিরাশা ও হতাশার চূড়ান্ত করে ছাড়ে। জীবনের এই উত্থান-পতনকে জীবনপাঠের ইতিবাচক প্রক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করুন।
14. বিশ্বাস করুন, ব্যর্থতা হলো আপনার অভিজ্ঞতার পরিমার্জন, ভুল-বিচ্যুতির সংশোধন এবং সফলতার প্রাসাদ গড়ার জন্য এক-একটি পোড়া ইটের মতো। ব্যর্থতা আপনার অভিজ্ঞতা ও চিন্তার জগৎকে আরও প্রসারিত করবে, সফলতার পথে পাথেয় জোগাবে।
১৫. গঠনমূলক আত্মসমালোচনা এবং নিজেকে অনবরত তিরস্কার ভর্ৎসনা-এ দু'টি বিষয়ের মাঝে পার্থক্য বোঝার চেষ্টা করুন। আপনাকে অতি অবশ্যই নিয়মিত আত্মসমালোচনা করতে হবে এবং তা হতে হবে গঠনমূলক। নিজের ভুল-বিচ্যুতিগুলো সংশোধন করার এবং তা থেকে শিক্ষণীয় পাথেয় অর্জন করার ক্ষেত্রে এটা কার্যকর উপায়। জেনে রাখুন, কোনো একটি ক্ষেত্রে ব্যর্থতা এটা প্রমাণ করে না যে, সর্বক্ষেত্রেই আপনি ব্যর্থ অকৃতকার্য; বরং এর মাধ্যমে আপনি এমন একটি পথ সম্পর্কে জানতে পারলেন, যা আপনার লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের জন্য উপযুক্ত ছিল না।
১৬. আপনার ব্যর্থতার কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন। আসল সমস্যা কোথায়-তা চিহ্নিত করুন। তা কি আপনার অনুসৃত পথ- পন্থায় না কি স্বয়ং লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে। কেননা আমাদের অনেকেই যখন ব্যর্থ হয়, আপন লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে শুরু করে। অথচ সমস্যাটা ভিন্ন জায়গায়, তার অনুসৃত পথ ও পন্থায়। আবার কখনো কখনো সমস্যা লুকিয়ে থাকে স্বয়ং উদ্দেশ্যের মধ্যেই। তাই প্রথমেই তা চিহ্নিত করে খুঁজে বের করতে হবে এরপর সে অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।
১৭. অতীতের যত নিষ্ফল কার্যকলাপ, ব্যর্থ চেষ্টা-প্রচেষ্টা, তার কথা স্মরণ করে আফসোস-অনুতাপে ডুবে থাকবেন না। হা-হুতাশ করে কেঁদে মরবেন না। এভেবে সান্ত্বনা গ্রহণ করুন, অতীতের বিফলতায় শিক্ষার অনেক কিছুই আছে, যা আপনার অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছে। জীবনের এ বাস্তব শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা অমূল্য সম্পদ।
১৮. লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে আপনি দৃঢ়চেতা ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হোন। যত অবহেলা-অলসতা সব ঝেড়ে ফেলুন। আল্লাহ তা'আলার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করুন। তাঁর ওপর ভরসা করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা তাঁর ওপর ভরসাকারীদের পছন্দ করেন।
১৯. আলবার্ট আইনস্টাইনের কথা চিন্তা করুন, চার বছর বয়স পর্যন্ত তিনি একটি কথাও শিখে উঠতে পারেননি। নয় বছর বয়স অবধি লিখতেও জানতেন না। জীবনের প্রথম ধাপেই এই পিছিয়ে পড়া, এই অধঃপতন তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। নিরাশা ও হতাশা তাকে গ্রাস করতে পারেনি। অদম্য মানসিকতা ও নিরন্তর অধ্যবসায় তাকে ইতিহাসের মহামনীষীদের কাতারে শামিল করেছে।
২০. ব্যর্থতার পর্যায় অতিক্রম করে সফলতার গন্তব্যে পৌঁছতে হলে আপনাকে নিজের দুর্বলতার দিকগুলো চিহ্নিত করতে হবে। সামর্থ্য ও শক্তিমত্তার দিকগুলোও সুনির্দিষ্ট করতে হবে। এর মাধ্যমে দুর্বলতা কাটিয়ে উঠে যোগ্যতার সফল প্রয়োগ সুনিশ্চিত করতে সক্ষম হবেন।
২১. দিনের প্রতিটি মুহূর্তকে একটি ছকে বেঁধে নিন। রুটিন মাফিক জীবনযাপন করুন। প্রতিদিনের একটি কার্যপরিকল্পনা নির্ধারণ করুন। তা বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হোন। প্রতিদিনের দু'-এক কদম করে অগ্রসর একদিন আপনাকে সুদূর লক্ষ্যে পৌঁছে দিবে। আর সময় নষ্ট করা এবং অনর্থক কাজে পড়ে থাকা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। পরিকল্পনাহীন কাজ, ছাড়া লাগামহীন জীবনযাপন আপনাকে নানামুখী ও বিধ্বস্ত করে ফেলবে। উদ্দেশ্যহীন নানা লক্ষ্যের দিকে ছুটে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য বিপন্ন হবে।
২২. চেষ্টা করুন। পরিশ্রম করুন। আল্লাহ তা'আলা আপনাকে যেমন আদেশ করেছেন, তা মেনে চলুন। আপনার যাবতীয় কল্যাণের ফায়সালা তাঁর হাতেই ন্যস্ত করুন। এমন লোকদের মতো হবেন না, যারা কোনো চেষ্টা-পরিশ্রম ও অধ্যবসায় ছাড়া অথর্ব জড়পদার্থের ন্যায় পড়ে থাকে, বসে বসে সফলতার দিন গুণে, কৃতকার্যতার আকাশকুসুম কল্পনা করে।
২৩. আত্মবিশ্বাসী হোন। নিজের সামর্থ্য ও শক্তিমত্তার প্রতি সজাগ হোন। অনাস্থা ও হীনম্মন্যতা, সৃজনশীলতা ও সৃষ্টিশীলতায় আপনার সামর্থ্যকে দুর্বল করে দিবে, দ্রুত ব্যর্থতা ও হতাশার পথে ঠেলে দিবে।
২৪. বিশ্বাস করুন, আপনার সমস্যার সমাধান নিশ্চয়ই আছে। ব্যর্থতার তিক্ত অভিজ্ঞতাই আপনাকে সফলতার পথ দেখাবে। স্মরণ করুন মহান রবের শক্তিমত্তার কথা, কোনো কিছুই যাকে অক্ষম করতে পারে না, যে সত্তা রাতের অন্ধকারের পর আলোকময় ভোর উদিত করেন, সে সত্তা আপনার সমস্যার সমাধানও করতে জানেন।
২৫. উজ্জ্বল আগামীর প্রতি আশাবাদী হোন। দিল-দেমাগ থেকে যত নেগেটিভ চিন্তা-ভাবনা ঝেড়ে ফেলুন। সবসময় পজেটিভ ও ইতিবাচক চিন্তা করতে শিখুন। কেননা জীবন তো চিন্তা-চেতনারই বাস্তব চিত্র। স্বপ্নবান ও আশাবাদী ব্যক্তিদের সঙ্গে উঠাবসা করুন। ব্যর্থ ও নিরাশাবাদী লোকদের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকুন।
২৬. যেকোনো দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে সুচারুভাবে সম্পন্ন করুন। সমস্ত অলসতা ও হতাশা ঝেড়ে ফেলে আপন লক্ষ্যে নিরন্তর এগিয়ে যান। কয়েক দিন লম্ফঝম্ফ করে কিছু দিনের মধ্যেই সফলতা অর্জন করে ফেলার চিন্তা অবান্তর। নিজের কাজগুলো নিখুঁতভাবে করে যান। জগতের চির অবধারিত রীতি অনুযায়ী সফলতা আপনার হাতে ধরা দিবে। আল্লাহ তা'আলার বানী স্মরণ করুন: ‘আল্লাহ তা'আলা নিশ্চয়ই উত্তম আমলকারীদের প্রতিদান নষ্ট করবেন না।’ (তওবা, ৯: ১২০)

পরিশিষ্ট:
বিশিষ্ট জার্মান ধর্মযাজক ও প্রটেস্ট্যান্ট ধর্মবিপ্লবের সূতিকাগার (১৪৮৩-১৫৪৬ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'গভীর আস্থা ও অগাধ আত্মবিশ্বাস নিয়ে লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের প্রথম ধাপটি শুরু করে দিন। চূড়ান্ত লক্ষ্যে আপনাকে পৌঁছতেই হবে-এমন আবশ্যকীয়তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। আপনি যখন সিঁড়ির সর্বোচ্চ ধাপটি দেখতে পাচ্ছেন, তখন সিঁড়ির প্রথম ধাপটি নিশ্চিন্তে অতিক্রম করতে পারেন।'

বিখ্যাত আরব কবি আবূ তায়্যেব মুতানাব্বি (৩০৩-৩৫৪ হি.) বলেছেন: 'আপনি যখন শীর্ষ চূড়ায় উঠে পড়েছেন, তখন আকাশের তারা না ছুঁয়ে দমে যাবেন না। কেননা হীন তুচ্ছ কাজে মৃত্যুর স্বাদ আর বিরাট মহৎ কাজে মৃত্যুর স্বাদ-দুটি একই রকম।'

আলজেরিয়ান বিশিষ্ট লেখিকা ও ঔপন্যাসিকা আহলাম মুসতাগনেমি (জন্ম: ১৯৫৩ খৃষ্টাব্দ) বলেছেন: 'ব্যর্থতার মতো সফলতাও একটি দারুণ অভিজ্ঞতা, যা আপনার চারপাশের মানুষকে দারুণভাবে উপকৃত করতে পারে। যে আপনার কাছের মানুষ বন্ধুজন, আপনার সফলতাকে পুঁজি করে সে নিজের উন্নতি-অগ্রগতিতে কাজে লাগাবে। কিন্তু যে আপনার প্রতি বিরুদ্ধভাবাপন্ন, আপনার সফলতা তার ব্যর্থতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিবে। আর যে সফলতা লাভ করতে গিয়ে ব্যর্থতার শিকার হয়েছে, আপনার সফলতা দেখে সে নিজের জীবনে সতর্কতা অবলম্বন করবে।'

সিরিয়ার প্রবাসী কবি ইলিয়াস কানসাল (১৯১১-১৮১ খৃষ্টাব্দ) বলেছেন:
দৃঢ় অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধতার তরবারি খাপ মুক্ত কর। এর সাহায্যে আপন লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন কর। দ্বিধা, সংশয় মানুষের মাঝে যত দুর্বলতা, হীনম্মন্যতা ও অলসতা সৃষ্টি করে।
চেষ্টা-প্রচেষ্টা যতই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হোক-না-কেন, ভীরুতা দ্বিধা-সংশয়, অলসতা থেকে তা হাজার গুণে উত্তম।
অলসতা শৈথিল্য অর্থর্বতা-এগুলোকে অসতর্কতা ও অসাবধানতা বলে যতই চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করো-না-কেন, তা কতই না মন্দ। মৃত্যু ও প্যারালাইসিস-এর মধ্যে পার্থক্য কতই না ক্ষুদ্র।
জীবনের মর্যাদা ও গৌরব তো এমন ব্যক্তির জন্যই, জীবনে সফল হতে পেরে যে তৃপ্ত পরিতৃপ্ত। যেকোনো সফলতা, কৃতকার্যতা নিয়ে চিন্তা করে দেখো, তাতে সামান্য হলেও ব্যর্থতা ও অকৃতকার্যতার অবদান রয়েছে।

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের অবাধ্যতা

📄 মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের অবাধ্যতা


মা-বাবা কখনো কখনো ছেলে-মেয়ের অবাধ্যাচারে চরম ভোগান্তির শিকার হন। পরস্পর ভালোবাসা ও আন্তরিকতা ক্ষোভে পরিণত হয়। পরিবারে মা-বাবা ও সন্তানদের মাঝে ঘৃণা ও অবজ্ঞার এক অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সন্তানদের চরম অবাধ্যতার একটি পর্যায়ে এসে অনেক মা-বাবাই তাদের প্রতি নিরাশ হয়ে পড়েন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে বাধ্য হন।

তাদের কেউ কেউ গায়ের জোর ও শক্তি খাটিয়ে, কঠোরতা ও শাস্তি প্রয়োগ করে সন্তানদের অবাধ্যতা রোধ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু অধিকাংশ সময়ই তা হিতে বিপরীত হয়। মা-বাবার কঠোর অবস্থান ও বাধ্যবাধকতার মানসিকতা সন্তানদের অবাধ্যতা ও বিরুদ্ধাচারের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। আবার কোনো কোনো মা-বাবা আদর-সোহাগ ও মায়া-মমতা দিয়ে সন্তানকে বোঝাতে চান। চেষ্টা করেন তাকে অবাধ্যতার পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু অনেক সন্তানই বাধ্য হওয়ার পরিবর্তে মা-বাবার আদর-সোহাগকে দুর্বলতা ও অপারগতা ভেবে অবাধ্যতা ও স্বেচ্ছাচারিতাতেই মজে থাকে।

মা-বাবা সন্তানদের থেকে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও তিক্ত অভিজ্ঞতার শিকার হয়ে তাদের অভিযোগ-অনুযোগের আর কোনো শেষ থাকে না। সন্তানকে নিয়ে তাদের ভেতর মানসিক অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা কাজ করে। যে পারিবার হয়ে উঠার কথা ছিল সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যময় জান্নাতের টুকরা, মা-বাবার প্রতি সন্তানের অবাধ্যতা ও বিরুদ্ধাচারিতায় একসময় তা-ই হয়ে উঠে জাহান্নামের গহীন গর্ত। অবস্থা তো কখনো কখনো এমন সঙ্গিন আকার ধারণ করে যে, পিতা-মাতা সন্তানকে ঘরছাড়া করতে বাধ্য হন। সন্তানের অবাধ্যতায় ক্ষোভ ও ঘৃণা, অসন্তোষ ও দুশ্চিন্তা এমন চরম পর্যায়ে এসে ঠেকে, মা-বাবা নিজেকে এ প্রবোধ দিয়েই সান্ত্বনা গ্রহণ করেন যে, তারা কোনো সন্তানের জন্ম দেননি। কোনো শিশু মানব-মানবীর চেহারা দেখেননি। এ হলো একজন মা-বাবার জীবনে চরম বঞ্চনা ও নিরাশার পরিস্থিতি।

পিতা-মাতা সমাজের জ্ঞানীগুণী বিজ্ঞজনদের নিকট নানাভাবে বহু প্রশ্ন করে তাদের সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ ও পন্থা জানতে চান। অস্থির চিত্তে তারা তাদের গুরুতর সমস্যা সমাধানের পথ খোঁজেন। প্রকৃতপক্ষে এ সমস্যার সমাধান কী? এ সংকট থেকে উত্তরণের পথ কী?

সমাধান:
১. সন্তানের প্রতি যত্নবান হোন তাদের সাথে সহজ সরল ও আন্তরিকভাবে মিশে থাকুন। মায়া মমতা ও হাসি-আনন্দে তাদের জীবনকে ভরিয়ে তুলুন। একটি শুষ্ক ভূমি যেমন অবিরাম বৃষ্টির প্রতীক্ষায় থাকে, তেমন সন্তানরাও যেন আপনার আগমনের অপেক্ষায় অধীর থাকে।
২. সন্তানদের মঙ্গল ও কল্যাণ কামনা করে দোয়া করুন। আল্লাহ তা'আলার কাছে তাওফিক কামনা করুন। সন্তানদের সাথে কোনো প্রকার বৈষম্যমূলক আচরণ করবেন না। আপনার ঐকান্তিক চেষ্টা থাকবে, সন্তানদের প্রতি সমান আন্তরিকতা, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের পরিচয় দেওয়া।
৩. সন্তানদের ছোটোখাটো ভুল-ত্রুটিতে কিংবা গুরুতর কোনো ভুলই হোক-না-কেন, অন্যদের সামনে তাদের বকাঝকা করা, তিরস্কার-ভর্ৎসনা করার মানসিকতা পরিহার করুন। কারণ, এর ফলে সন্তানের মনে আপনার প্রতি যে বিশ্বাস ছিল, তা ভেঙে যাবে এবং তারা আত্মবিশ্বাস হারাবে। আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলা আত্মহত্যারই নামান্তর।
৪. সন্তানদের ধর্মেকর্মে অনুপ্রাণিত করুন। কেননা তারা যখন আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবাসতে শিখবে, তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে এমন মহৎ কাজগুলো করতে থাকবে যার মাধ্যমে তারা আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করতে পারে। আর মা-বাবার প্রতি সদাচার করা আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম।
৫. সন্তানদের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনা করুন। তাদের জীবনের নানা বিষয় সম্পর্কে তাদের মতামত ও অভিব্যক্তি জানতে চেষ্টা করুন। কোনো ভুল-বিচ্যুতি চোখে পড়লে সুন্দরভাবে তা বুঝিয়ে দিন। কঠোর ভাষা ও গালমন্দের ভাষা পরিহার করুন।
৬. মা-বাবার প্রতি সদাচারী হোন। আপনার সদাচার সন্তানদের মধ্যে ক্রিয়াশীল হবে। এ যেন প্রকারান্তরে আপনার কর্মের প্রতিফল। বিজ্ঞজনদের বাণী, 'তুমি তোমার মা-বাবার প্রতি সদাচারী হোন, সন্তানরাও আপনার প্রতি সদাচারী হবে।'
৭. সন্তানদের লালন-পালন ও তাদের শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে মা-বাবার পরস্পর সহযোগিতা ও বোঝাপড়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মা-বাবার পরস্পর ঝগড়া-বিবাদ, বৈরিতাপূর্ণ আচার-ব্যবহার পরিবারের মাঝে অস্থিরতা, বিক্ষুব্ধতা সৃষ্টি করে। যা সন্তানদের মন-মানসিকতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দিন-দিন তারাও মা-বাবার পরস্পর ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে পড়ে। তাই পারিবারিক বন্ধন মজবুত করুন। পরস্পর সহযোগিতা ও বোঝাপড়ার মানসিকতা অবলম্বন করুন।
৮. পারিবারিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সন্তানদের মতামত যাচাই করুন। বাস্তব জীবনের নানা-বিষয়ে তাদের চিন্তা ও অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করার সুযোগ দান করুন। যৌক্তিকতা ও যথার্থতার ভিত্তিতে প্রয়োজনে তাদের মতামত গ্রহণ করুন। এ ক্ষেত্রে তাদের মেধা ও বুদ্ধির প্রশংসা করে তাদেরকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলুন।
৯. সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৎসঙ্গ আপনার সন্তানকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে। আর অসৎ সঙ্গ তাদের চারিত্রিক ও নৈতিক অবনতি ঘটাবে। তাদেরকে বড়দের প্রতি অশ্রদ্ধা ও অবাধ্যতায় দুঃসাহসী করে তুলবে।
১০. কথা-কাজের অমিল হওয়ার ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক থাকুন। অনেক মা-বাবাই সন্তানদের একরকম শেখায়, আর নিজেরা অন্য রকম করে। কথা-কাজের এমন অমিল সন্তানদের চোখে মা-বাবার ব্যক্তিত্বকে খাটো করে। তাদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

সম্মানদের প্রতি কয়েকটি মূল্যবান উপদেশ:
১. মা-বাবার সাথে সদাচারের ক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করুন। তাঁরা হলেন আপনার জন্য জান্নাতের খোলা দরজা। আপনার কুকীর্তির কারণে তা যেন বন্ধ না হয়ে যায়।
২. কোনোভাবে যদি আপনি আপনার মা-বাবার সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারেন, তাদের দু'আ লাভ করতে পারেন, তাহলে তা হবে আপনার সফলতা ও সৌভাগ্যের বিরাট অর্জন।
৩. মনে রাখবেন, আপনি যতই উচ্চশিক্ষিত হোন না, যতই উচ্চপদস্থ হোন না কেন, আর মা-বাবা যতই অজ্ঞ-সাধারণ হোন না কেন, আপনি যখন তাঁদের কাছে অবস্থান করবেন, তাদের অনুগত সেবক হয়ে থাকবেন।
৪. মা-বাবার উদ্দেশ্যে কিছুতেই এমন শব্দ উচ্চারণ করবেন না, যাতে তাদের মনে এতটুকুন ব্যথার উদ্রেগ ঘটে। এ হলো আপনার প্রতি মাহান আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ: ‘আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করবে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উফ্’ বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না। আর তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বল।’ (বনী ইসরাঈল, ১৭: ২৩)
৫. মা-বাবার কোনো একজন যখন আপনাকে ডাকবে, যত গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত থাকেন-না-কেন, সব ছেড়ে তাদের ডাকে সাড়া দিন। প্রথমে তাদের আদেশ পালন করুন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেন: ‘হে আমার রব, তাদের প্রতি দয়া করুন যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে লালন-পালন করেছেন।’ (বনী ইসরাঈল, ১৭: ২৪)
৬. প্রত্যেক নামাযে, প্রত্যেক ইবাদতে, যেকোনো দু'আর উপলক্ষ্যে মা- বাবার জন্য দু'আ করতে ভুলবেন না। দু'আ কবুলের বিশেষ মুহূর্তগুলোতে মা-বাবার জন্য বেশি বেশি করে দু'আ করুন।
৭. মা-বাবা যখন কথা বলবে, তাদের কথার মাঝে কথা বলবেন না। উচ্চ স্বরে কথা বলবেন না। পূর্ণ মনোযোগ ও আগ্রহ ভরে তাদের কথা শুনুন। আপনার কিছু বলার থাকলে বিনম্রভাবে বলুন।
৮. আপনার স্বার্থে মা-বাবা যে ত্যাগ শিকার করেছেন, তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন। আপনার প্রয়োজনের আগে তাঁদের প্রয়োজনের কথা ভাবুন। আপনার কাজটি সমাধা করার আগে তাঁদের কাজ সমাধা করুন।
৯. কোনোক্রমেই মা-বাবার সঙ্গে ঝগড়ায় জড়াবেন না, এমনকি তাঁদের ভুল-বিচ্যুতিতেও না। এক্ষেত্রে আপনার করণীয় হবে বিনম্রভাবে যথার্থ বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করা। কখনো স্ত্রী, সন্তান ও বন্ধু-বান্ধবদের, মা-বাবার ওপর প্রাধান্য দিবেন না।
১০. বিভিন্ন আয়োজন-উপলক্ষ্যে মা-বাবাকে উপহার প্রদান করুন। এতে তাঁদের প্রতি আপনার সম্মান ও আন্তরিকতাবোধ প্রকাশ পাবে। উপহার- উপঢৌকন হলো পরস্পর সম্পর্কোন্নয়ন ও আন্তরিকতা বৃদ্ধির অন্যতম উপায়।

টিকাঃ
১. البحر المديد في تفسير القرآن المجيد (৩/ ১৯৩) *

পরিশিষ্ট:
মুফাসসির সাআলাবী ও আরও কয়েকজন মুফাসসির এ ঘটনাটি বর্ণনা করেন: এক ব্যক্তি রাসূল -এর দরবারে এসে হাযির হলো। কেঁদে-কেঁদে অভিযোগ-অনুযোগ করতে লাগলো। নিজ সন্তানের ব্যাপারেই তার সব অভিযোগ-অনুযোগ:
'আমি কত রাত জেগেছি, যেন সে শান্তিতে ঘুমাতে পারে। আমি ক্ষুধার্ত থেকেছি, যেন সে তৃপ্তিভরে আহার করতে পারে। তার সুখের জন্য আমি কত কষ্ট করেছি। এখন সে শক্তিশালী যুবক। আর আমি দুর্বল বৃদ্ধ। পিতা হিসেবে তার ওপর আমার যে অধিকার রয়েছে, নির্লজ্জভাবে সে তা অস্বীকার করেছে। তার ওপর আমার যে অবদান ও অনুগ্রহ রয়েছে, সে তার প্রতি অবজ্ঞা ও অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। সে আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আল্লাহ্ তা'আলাও তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিক।' এতটুকু বলেই লোকটি আবার কাঁদতে লাগল। সে ছিল কবি। রাসূল তাকে জিজ্ঞেস করলেন: 'এ নিয়ে কি কোনো কবিতা রচনা করেছ?' বলল, 'হ্যাঁ।' এরপর লোকটি আবৃত্তি করতে শুরু করলো:

'আমি তোমাকে লালন-পালন করেছি, তখন তুমি শিশু ছিলে। যখন তুমি যুবক হয়েছ, তখনো আমি তোমার পরিপূর্ণ দেখভাল করেছি। আমার সাধ্য ও সামর্থ্যের সবটুকু ব্যয় করে তোমার আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছি। কত রাত তোমার অসুস্থতায় শিয়রে বসে বিনিদ্র রজনী কাটিয়েছি। তোমার অসুস্থতার পীড়া দেখে এমন মানসিক যন্ত্রণায় ভুগেছি, দু'চোখ এমন ভীষণভাবে অশ্রু বিসর্জন করেছে, যেন স্বয়ং আমিই অসুস্থ। আজ আমার জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে তুমি যখন যৌবনে পদার্পণ করেছ, কঠোরতা ও রূঢ়তার তিক্ত প্রতিদানে তুমি আমাকে জর্জরিত করলে। ভাবখানা এমন যে, এতকাল ধরে তুমিই আমার ওপর অনুগ্রহ করে এসেছ। আমি ছিলাম তোমার অনুগ্রহ প্রার্থী। হায় আফসোস! তুমি যদি আমার পিতৃত্বের সম্মানটুকুও দিতে না পার, তবে তা-ই কর। যেমন অনেক দুষ্ট লোক তার প্রতিবেশীর সাথে করে। আমাকে তুমি বিকারগ্রস্ত বলে আখ্যায়িত করো। অথচ তোমার বোধ-বুদ্ধি বিকারগ্রস্ততায় জর্জরিত।'

তার কবিতা শুনে রাসূল ও উপস্থিত সাহাবাগণ কেঁদে ফেললেন। রাসূল তার ছেলেটিকে ডেকে পাঠালেন। তাকে তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করলেন এবং ছেলেটির জামা ধরে তার উদ্দেশ্যে বললেন:
'তুমি ও তোমার তোমার সম্পদ তোমার পিতার কল্যাণে।'
হে আল্লাহ! আপনি আমাদের মা-বাবার প্রতি সন্তুষ্ট হোন। তাঁদের মধ্যে যারাই জীবিত আছেন, তাদেরকে সুস্থতা ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দান করুন। তাঁদের মধ্য হতে যারা কবরবাসী হয়েছেন, তাদেরকে আপনি ক্ষমা করুন এবং তাদের প্রতি রহম করুন। আমীন।

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 বিপদ-আপদ

📄 বিপদ-আপদ


এ পৃথিবীতে প্রত্যেকেই কোনো-না-কোনো বিপদ-আপদ, সমস্যা ও সংকটে জর্জরিত। জীবনের এই প্রতিকূলতা ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি হলো আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে পরীক্ষাস্বরূপ। এ হলো আমাদের ধৈর্য ও সহনশীলতা, আল্লাহ তা'আলার ফায়সালার সামনে নিজেকে আপত্তিহীন ও প্রশ্নাতীতভাবে সমর্পণের পরীক্ষা।

বিপদ-আপদ হলো জীবনের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিকূল পরিস্থিতি। ব্যক্তি-জীবন, পারিবারিক জীবন, লোকসমাজ অনেক বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হয়। অর্থ-সম্পদ, সুনাম-সুখ্যাতি, পদমর্যাদা ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রে বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ও প্রতিকূলতার শিকার হয়। যেমন: কাজেকর্মে বিফলতা, লেখপড়ায় কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জনে ব্যর্থতা, ব্যবসা-বাণিজ্যে আর্থিক লোকসান, নিকটজন ও আপনজনের পক্ষ থেকে প্রতারণা, রোগ-বিরোগ, কারাবরণ, গুম-হত্যা ও মৃত্যু ইত্যাদি। এ ধরনের বিপদ-আপদ জীবনের স্বতঃস্ফূর্ততা ও প্রাণচঞ্চলতাকে ব্যাহত করে। ব্যক্তির মন-মানসিকতায় ও চিন্তা-চেতনায় গভীর রেখাপাত করে। তার অনুভব-অনুভূতিকে ভীষণভাবে প্রকম্পিত করে। ফলে বিপদ ও সংকটের সঙ্গে সঙ্গে সে মানসিক অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তার বোঝা বয়ে বেড়ায়। পরিণতিতে কেউ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হয়, কেউ হার্ট স্টোক করে, কেউ বা জ্ঞান হারায়। জীবনের এই কঠিন বাস্তবতা মোকাবিলা করার উপায় কী? এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কী?

সমাধান:
১. নিয়তির অবধারিত লিখন ও আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকুন। যাবতীয় বিষয় আল্লাহ তা'আলার যিম্মায় ন্যস্ত করুন। মনে রাখবেন, আপনি যে সংকটে পড়েছেন, তা অবধারিত ছিল। তা খণ্ডানোর কোনো উপায় নেই। জীবনের এক-একটি বিপদ দুর্যোগ আল্লাহ তা'আলার নিকট আপনার মর্যাদা বৃদ্ধি করবে। আপনি যদি সন্তুষ্টচিত্তে, অম্লান বদনে ধৈর্যধারণ করতে পারেন, তবে মনে রাখবেন, ধৈর্য হলো ইবাদতে যত্নশীল বান্দার জান্নাত ও ধর্মভীরু ব্যক্তির জন্য মুক্তির উপায়।
২. বিপদ-আপদ মোকাবিলা করার কয়েকটি পর্যায় রয়েছে:
(ক) আল্লাহর ফায়সালা সন্তুষ্ট থাকা এবং কৃতজ্ঞচিত্তে সংকট মোকাবিলা করা। এটাই শ্রেষ্ঠতম পন্থা।
(খ) উত্তম প্রতিদানের আশায় ধৈর্য ও সহনশীলতার সঙ্গে বিপদ মোকাবেলা কর। এটা মধ্যম পন্থা।
(গ) বিপদের সম্মুখীন হয়ে অস্বস্তি ও বিরক্তি প্রকাশ করা এবং ক্ষোভে ফেটে পড়া-শরীয়তের দৃষ্টিতে এমনটি হারাম। আপনার কর্তব্য হলো প্রথম পন্থাটি অবলম্বন করা। যা সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ। রাসূল বলেছেন: ‘মু'মিন বান্দা যে কষ্ট-ক্লান্তি ও রোগ-ব্যাধির শিকার হন, যে রোগ-ব্যাধি ও দুঃখ-যাতনায় আক্রান্ত হন, এমনকি তার দেহে যে একটি কাঁটা ফুটে, তার বিনিময়েও আল্লাহ তা'আলা তার গুনাহ মাফ করেন।’ (মুসনাদে আহমদ: ১৩/৩৯৭)
৩. নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করুন যে, ইহজাগতিক এ জীবন হলো বিপদ- দুর্যোগ, সমস্যা ও সংকটবহুল। যেমন পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন: ‘আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফলাদির স্বল্পতার মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।’ (বাকারা, ২: ১৫৫)
৪. যেকোনো বিপদের থেকে মুক্ত হওয়ার গোপন রহস্য ও মূল চাবিকাঠি হলো: ‘নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয় আমরা তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।’ (বাকারা, ২: ১৫৬) প্রথম পর্যায়েই আপনি মুক্তির এ চাবিকাঠি অবলম্বন করুন। এতে আসন্ন বিপদমুক্তি ও সুখ-সৌভাগ্যের পথ ত্বরান্বিত হবে। মহান প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তিনটি মহান পুরস্কার লাভ করতে পারবেন। যেমন পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করেছেন: ‘তাদের উপরই রয়েছে তাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও রহমত এবং তারাই হিদায়াতপ্রাপ্ত।’ (বাকারা, ২: ১৫৭)
৫. চরম অস্থিরতায় ও শোচনীয় পরিস্থিতিতেও স্থির প্রশান্ত থাকার চেষ্টা করুন। বিশ্বাস করুন, আপনি একাই এমন প্রতিকূলতার শিকার নন, অতীতে বহু লোক এর চেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হয়েছে, বর্তমানেও হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হতে পারে। তাদের তুলনায় আপনি বরং ভালো অবস্থানেই আছেন। ধৈর্যের সঙ্গে আসন্ন সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের অপেক্ষা করুন। আলোর পর আঁধার, অসুস্থতার পর সুস্থতা-এটাই পৃথিবীর বুকে আল্লাহ তা'আলার চিরন্তন নীতি। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন: ‘প্রকৃতপক্ষে কষ্টের সাথে স্বস্তি থাকে। নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি থাকে।’ (ইনশিরাহ্, ৯৪: ৫, ৬)
৬. মনে রাখবেন, এ পৃথিবী যেমন নশ্বর, পৃথিবীর ক্ষুদ্র-বৃহৎ সবই নশ্বর। সর্ববৃহৎ বস্তু ও অতিক্ষুদ্র কণা, কোনো কিছুই তাতে অবশিষ্ট থাকবে না। ধ্বংসশীল এ পৃথিবীতে রাসূল স্বীয় অবস্থা এভাবে বর্ণনা করেছেন: ‘(ইহকালের কোনো বাসিন্দা হলো) এমন এক মুসাফির, যে গ্রীষ্মকালের কোনো এক দিনে সফরে বের হয়েছে। কোনো একটি ছায়াদার গাছের নিচে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে ইহকাল ত্যাগ করেছে।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং: ২৭৪৪) বিশ্বাস করুন, জীবনের কোনো অবস্থাই স্থায়ী নয়। তাই জীবনের পরিবর্তশীলতার সঙ্গে নিজেকে সুন্দরভাবে মানিয়ে নিন। বিপদ ও সংকটের মুহূর্তে ধৈর্য ও সহনশীলতায় অভ্যস্ত হোন। সৃষ্টির প্রথম দিন থেকেই এ পৃথিবী পরিবর্তনশীল। মানবজাতির জন্য তা এক বিরাট পরীক্ষার ক্ষেত্র। মনীষীগণ বলেছেন: 'যে সতর্ক ও সচেতন, সে অস্থির ধৈর্যহারা হবে না। যে আল্লাহকে ভয় করবে, সে অন্য কিছুতে সন্ত্রস্ত হবে না। যে কল্যাণের আশাবাদী হবে, দুঃখ-বেদনা তাকে স্পর্শ করতে পারবে না।'
৭. সর্বদা প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতার মানসিকতা ধারণ করুন। তিরমিজী শরীফে বর্ণিত হয়েছে: আবু তালহা আল- খাওলানী কবরের কিনারায় বসা ছিলেন। রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'যখন কোন বান্দার সন্তান মারা যায় তখন আল্লাহ তা'আলা ফেরিশতাদের বলেন, 'তোমরা আমার বান্দার সন্তান কবয করে নিয়ে এলে?' তার বলে, 'হ্যাঁ।' আল্লাহ্ তাআলা বলেন, 'তোমরা তার হৃদয়ের ফল কবয করে নিয়ে এলে?' তার বলে, 'হ্যাঁ।' আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'আমার বান্দা কী বলেছে?' তারা বলে, 'আপনার প্রশংসা বাণী উচ্চারণ করেছে এবং “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” পড়েছে।' আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, 'আমার এই বান্দার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ কর এবং তার নামকরণ কর "বায়তুল হামদ” বা প্রশংসালয়।' (তিরমিজী, হাদিস নম্বর: ১০২১) যারা আল্লাহর প্রশংসা করে, আল্লাহ তাদের বিরাট প্রতিদান দান করেন। শতো প্রতিকূলতার মুহূর্তেও তাদের সঠিক পথে অবিচল রাখেন। সুতরাং চরম বিপদের মুহূর্তেও আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করতে, তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ভুলবেন না। মনে রাখবেন, আপনি যে সংকটের সম্মুখীন হবেন, তা সর্বোচ্চ আপনার জাগতিক জীবনের সাময়িক কিছু ক্ষতি করবে, পরকালের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।
৮. বিপদের সম্মুখীন হলে একটি সুসংবাদ গ্রহণ করুন! বিপদ হলো আপনার ভুল-বিচ্যুতির প্রায়শ্চিত্ত, গুনাহ-পাপাচার হতে পরিশুদ্ধি এবং মহান রবের পক্ষ থেকে ক্ষমাস্বরূপ। আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকুন। আশা করা যায়, তাতে এমন অনেক কল্যাণ নিহিত আছে, যা আপনার অজানা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ‘এবং হতে পারে কোন বিষয় তোমরা অপছন্দ করছ অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর হতে পারে কোন বিষয় তোমরা পছন্দ করছ অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না।’ (বাকারা, ২: ২১৬)
৯. বিপদের মুহূর্তে বিরক্তি ও ধৈর্যচ্যুতি থেকে বেঁচে থাকুন। অসহায় অভিযোগ-অনুযোগ থেকে বিরত থাকুন। বারবার এ দু'আটি পাঠ করুন: ‘হে আল্লাহ! আমাকে বিপদমুক্ত করুন। এর বিনিময়ে আমাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।’ (মুসলিম: ২/৬৩১) রাসূল বলেছেন: যে কোনো বান্দাই বিপদগ্রস্ত হয়ে এই দু'আ পাঠ করবে: (আমরা সকলে আল্লাহরই এবং আমাদেরকে তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে। হে আল্লাহ! এ বিপদে আমাদের আশ্রয় দান করুন। এর বিনিময়ে আমাদের উত্তম প্রতিদান দান করুন) আল্লাহ তা'আলা তাকে বিপদে আশ্রয় দান করবেন এবং এর বিনিময়ে তাকে উত্তম বিনিময় দান করবেন।” (মুসলিম: ২/৬৩২)
১০. মনটাকে আস্বস্ত করুন, হৃদয়াত্মাকে প্রশান্ত করুন। রাসূল বলেছেন: ‘মু'মিনের অবস্থা বিস্ময়কর। সকল কাজই তার জন্য কল্যাণকর। মু'মিন ছাড়া অন্য কেউ এ বৈশিষ্ট্য লাভ করতে পারে না। তারা সুখ-শান্তি লাভ করলে শুকর-গুজার করে আর অস্বচ্ছলতা বা দুঃখ-মুসীবতে আক্রান্ত হলে সবর করে, প্রত্যেকটাই তার জন্য কল্যাণকর।’ (৪/২২৯৫)
১১. হাসান বসরী (রহ.) বলেন, 'আপনার ওপর যত বিপদ-আপদ, সংকট ও দুর্যোগ আসুক না কেন, আপনি তাতে ক্ষুব্ধ হবেন না। কেননা আপনার অপছন্দের এমন অনেক বিষয় আছে, যাতে আপনার কল্যাণ ও মুক্তি নিহিত। আবার পছন্দের এমন অনেক বিষয় আছে, যাতে আপনার ক্ষতি ও অকল্যাণের সমূহ আশঙ্কা রয়েছে।'
১২. পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন: ‘সবর (ধৈর্য) ও সালাতের (নামাযের) মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর।’ (বাকারা, ২: ৪৫) বিপদ যত কঠিন হোক-না-কেন, সংকট যত ভয়ানক হোক-না-কেন, আল্লাহর দরবারে সাহায্য প্রার্থনা করার সর্বোত্তম পন্থা হলো সবর ও সালাত*। সুতরাং আল্লাহর ফায়সালার প্রতি সন্তুষ্টচিত্তে ধৈর্যধারণ করুন এবং বিনয়াবনত হয়ে নামাযে মশগুল হোন। রাসূল যখন কোনো গুরুতর বিষয়ের সম্মুখীন হতেন, নামাযে মশগুল হতেন। কেননা সবকিছুর চাবিকাঠি একমাত্র আল্লাহ তা'আলার হাতে। তাঁর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করার প্রধান মাধ্যম হলো নামায।
১৩. বিপদ-আপদ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করুন। এই দু'আটি বারবার পাঠ করে আল্লাহ তা'আলার নিয়ামত ও অনুগ্রহ লাভ করুন: পবিত্র কুরআনে আল্লাহ ত'আলা ইরশাদ করেন: ‘এবং তারা বলেছিল, "আল্লাহ তা'আলা আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক!" অতঃপর তারা ফিরে এসেছে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে নিআমত ও অনুগ্রহসহ। কোন মন্দ তাদের স্পর্শ করেনি এবং তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির অনুসরণ করেছিল। আর আলাহ মহা অনুগ্রহশীল।’ (আলে ইমরান, ৩: ১৭৩, ১৭৪)
১৪. পবিত্র কুরআনের বাণী: ‘স্মরণ রেখ, কেবল আল্লাহর যিকিরই সেই জিনিস, যা দ্বারা অন্তরে প্রশান্তি লাভ হয়।’ (রা'দ, ১৩: ২৮) যখনই কোনো প্রতিকূলতার শিকার হবেন, কোনো বিপন্নতার সম্মুখীন হবেন, আল্লাহর যিকিরে নিমগ্ন হোন। এতে আত্মিক ও মানসিক প্রশান্তি অর্জিত হবে, বিপদ ও প্রতিকূলতার চাপ লাঘব হবে, অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তাজনিত কারণে সৃষ্ট রোগ-ব্যাধি থেকে থেকেও মুক্ত থাকবেন, ইনশাআল্লাহ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন: ‘কোনো মুসিবতই আল্লাহ তা'আলার হুকুম ছাড়া আসে না। যে কেউ আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, আল্লাহ তা'আলা তার অন্তরকে হেদায়াত দান করেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞাত।’ (তাগাবুন, ৬৪: ১১)
১৫. বেশি-বেশি ইস্তেগফার* করুন। রাসূল বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি বেশি বেশি ইস্তেগফার করবে, আল্লাহ তা'আলা তার সামনে সমস্ত বিপদ হতে মুক্তির পথ খুলে দিবেন। যেকোনো প্রতিকূলতা থেকে নিষ্কৃতির পথ দেখিয়ে দিবেন। তাকে এমন ক্ষেত্র থেকে রিযিক দান করবেন, যা সে কল্পনাও করত না।’ (মুসনাদে আহমাদ: ৪/১০৪) বারবার পাঠ করতে থাকুন। কেননা তা জান্নাতের অন্যতম খাযানা। এর মাধ্যমে যত বাধা-বিপত্তির অবসান হয়। শতো প্রতিকূলতার ঝঞ্ঝাট দূর হয়। মহান আল্লাহ তা'আলা খুশি হন।
১৬. বিশ্বাস করুন, বিপদ হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে ভালোবাসার আলামত। এ যেন এমন ওষুধ, যা স্বাদে তিক্ত, ফলে মিষ্ট। কিছু ওষুধ আছে, যা স্বাদে ভীষণ তিক্ত হলেও মধুর চেয়ে কার্যকর। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে: ‘বিপদ-আপদ যত বিরাট ও কঠিন হবে, এর প্রতিদানও বিরাট হবে। আল্লাহ তা'আলা যখন কোনো সম্প্রদায়কে পছন্দ করেন, তাদের পরীক্ষা করেন। (পরীক্ষার সম্মুখীন হয়ে) যে সন্তুষ্ট থাকে, সে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে। আর যে অসন্তোষ প্রকাশ করে, ক্ষুব্ধ হয়, সে আল্লাহ তা'আলার ক্রোধের পাত্রে পরিণত হয়।’ (তিরমিজী: ৪/৬০1)
১৭. যে ব্যক্তি বিপদের সংবাদ দিবে, তার কর্তব্য হলো, বিষয়টিকে যথাসম্ভব সহজভাবে উপস্থাপন করা। জনৈক সাহাবা (রা.)-এর স্ত্রী যেমনটি করেছিলেন : দীর্ঘ সফর থেকে স্বামী যখন ঘরে ফিরে এলেন, অসুস্থ সন্তানের অবস্থা জানতে চাইলেন। স্ত্রী বললেন, 'সে তো ভালো আছে। এখন বেশ প্রশান্ত।' সফরের ক্লান্তিতে স্বামী বিশ্রামে চলে গেলেন। যখন সতেজ দেহে, প্রশান্ত মনে ঘুম থেকে জেগে উঠলেন, স্ত্রী তাকে আসল ঘটনা খুলে বললেন, 'তার সন্তান রোগাক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে।' সাহাবি রাসূল -এর নিকট এ ঘটনা খুলে বললেন। রাসূল তাঁর স্ত্রীর অনেক প্রশংসা করলেন। এক দুরারোগ্য ব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তির কথা আমিও জানি। ডাক্তার তাকে বলে দিয়েছেন, 'আপনার ক্যান্সার হয়েছে। সর্বোচ্চ আর তিন মাস বেঁচে থাকতে পারবেন। এরপর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ, মৃত্যুর আশঙ্কাই প্রকট।' জীবদ্দশায় নিজ কানে নিজের সুনিশ্চিত মৃত্যুর কথা শুনে রোগী তৎক্ষণাৎ হার্টঅ্যাটাক করে মারা গেল। রাসূল বলেছেন: ‘তোমরা যখন কোনো অসুস্থ ব্যক্তির কাছে যাবে, (সুস্থ হয়ে) বেঁচে থাকার ব্যাপারে তার মনে আশা জাগাবে। তোমাদের আশান্বিত কথায় তার নিয়তির ফায়সালা খণ্ডাবে না। তবে তাতে অসুস্থ ব্যক্তি মানসিক প্রশান্তি বোধ করবে।’
১৮. এ কথা ভেবে আপনার মনকে প্রশান্ত রাখুন, পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় বিপদ ও সংকটের বিষয় ছিল সাহাবায়ে কেরামের উপস্থিতিতে রাসূল -এর মৃত্যু ঘটা এবং ওহি বন্ধ হয়ে যাওয়া। সাহাবায়ে কেরামের জন্য এ যে কত কষ্ট ও বেদনাদায়ক ছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আপনি যদি সিরাতের গ্রন্থে রাসূল মৃত্যুরোগ ও মৃত্যু পরবর্তী অবস্থা সম্পর্কে পড়ে দেখেন, তবে এর কিছুটা আন্দাজ করতে পারবেন এবং সচরাচর জীবনে আপনার বিপদগুলো নিতান্ত ক্ষুদ্র ও ঠুনকো মনে হবে। রাসূল বলেছেন: ‘তোমাদের কেউ যখন কোনো বিপদে আক্রান্ত হবে, সে যেন আমার মৃত্যুতে আসন্ন বিপদের কথা স্মরণ করে। কেননা তা হবে মহাদুর্যোগের একটি।’ (আল মু'জামুল কাবীর ৭/১৬৭)
১৯. কোনো প্রতিকূলতা ও জটিলতায় ফেঁসে গিয়ে ক্ষোভে লজ্জায় নিঃসঙ্গ হয়ে পড়বেন না। তাহলে আপনার ওপর শয়তান চেপে বসবে এবং আপনাকে মানসিক যন্ত্রণা, অন্যায়, পাপাচার ও কুধারণা ইত্যাদি অবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে ফেলবে। এ পরিস্থিতিতে এমন কাজে মনোনিবেশ করুন, যা নিজের জন্য ও অন্যের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে। আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের সংস্পর্শে থাকুন, তাদের কাছে সান্ত্বনা পাবেন, সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ পাবেন এবং বর্তমান প্রতিকূলতা লাঘব হবে। পবিত্র কুরআন যেন হয় আপনার অন্তরঙ্গ বন্ধু। তার মতো একনিষ্ঠ বন্ধু দ্বিতীয়টি নেই।
২০. মনে রাখুন, যেকোনো বিপদ আপনার জন্য আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে প্রতিদান লাভের রাস্তা খুলে দিবে। হাসি-আনন্দ, দুঃখ-বেদনা জীবনেরই অবধারিত অংশ। এসবই নিয়তির লিখন, তা খণ্ডানোর সাধ্য কারো নেই। হাসি-আনন্দের মুহূর্তগুলো আপনি যেভাবে সাদরে গ্রহণ করেন, দুঃখ-বেদনার পরিস্থিতিগুলোও যদি একইভাবে মেনে নেন, আল্লাহর তা'আলার ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকেন, ধৈর্য ও সহনশীলতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেন, ইন্নালিল্লাহি পাঠ করেন এবং আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে মুক্তির পথ ও রহমতের আশা করেন, তবে এমন প্রতিটি আমলের জন্য আপনি বিরাট প্রতিদান লাভ করবেন। আল্লাহ তা'আলার প্রশংসাই তো আপনার জন্য জান্নাতে একটি বালাখানা প্রস্তুত করে দিবে। যার নাম হবে 'বাইতুল হাম্দ'। এমন একটি প্রতিদানই তো আপনার ওপর আপতিত শত কঠিন সংকট থেকে শ্রেষ্ঠ। 'সুনানে তিরমিজি' গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে: ‘কিয়ামতের দিন ইহকালে বিপদগ্রস্ত লোকদের প্রতিদানের মহত্ত্ব দেখে সাধারণ মানুষ এই কামনা করবে যে, ইহকালে তাদের দেহের চামড়াগুলো যদি ছুরি দিয়ে কাটা হতো!’ (আসসুনানুল কুবরা লিল বাইহাক্বী: ৩/৫২৬)
২১. রাগ, ক্ষোভ, ক্রোধ ইত্যাদি চারিত্রিক অন্যায় থেকে বিরত থাকুন। চেহারায় আঘাত করা, জামা-কাপড় ছিঁড়ে ফেলা, নিজের ধ্বংস কামনা করা, নিয়তির ফায়সালার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করা ইত্যাদি অন্যায় ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে বেঁচে থাকুন। এগুলোর প্রত্যেকটা জাহেলি যুগের কুসংস্কার। এ ধরনের কার্যকলাপ আপনার মানসিক শক্তিকে আরও দুর্বল করে দিবে। সবর ও ধৈর্য, রবের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও প্রশংসার প্রতিদান থেকে আপনাকে বঞ্চিত করবে। শয়তান খুশি হবে, আপনাকে আল্লাহর ক্রোধের পাত্র বানাবে।
২২. বিপদের সম্মুখীন হয়ে কল্যাণের সুসংবাদ গ্রহণ করুন। কেননা আল্লাহ তা'আলা আপনাকে কঠিন পরীক্ষার জন্য নির্বাচন করেছেন। তিনি তো বান্দাকে তার ঈমানের স্তর অনুযায়ী পরীক্ষা করেন। আরেকটি সুসংবাদ গ্রহণ করুন, বিপদ-আপদের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা আপনাকে পাপ-পঙ্কিলতামুক্ত করবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘নবীগণ। এরপর পর্যায়ক্রমে ব্যক্তিবর্গ। প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার ঈমানের স্তর অনুযায়ী পরীক্ষা করা হয়। যে ব্যক্তির ধার্মিকতা যত মজবুত, সুসংহত, তার পরীক্ষাও তত কঠিন। যার ঈমান ও ধার্মিকতার কোনো শক্তি নেই, তার পরীক্ষাও সাধারণ নগণ্য। আবার কোনো ব্যক্তি মানুষের মাঝে হেঁটে বেড়াচ্ছে, তার কোনো দোষ-ত্রুটি নেই, সে-ও বিপদগ্রস্ত হয়।’ (সহীহ ইবনে হিব্বান: ৭/১৮৪)
২৩. আমি, আপনি এমনকি পৃথিবীর কারো সাধ্য নেই পরকালের শাস্তির ভয়াবহতা সহ্য করার। আপনি যদি বিপদগ্রস্ত হন, আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করুন এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করুন এজন্য যে, ইহাকালে লঘু শাস্তির মাধ্যমে পরকালের গুরুদণ্ড থেকে আপনাকে রেহাই দিচ্ছেন, আপনার গুনাহ মাফ করছেন, পাপ-পঙ্কিলতামুক্ত হয়ে কবরে যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছেন। এর চেয়ে সৌভাগ্যের বিষয় আর কী হতে পারে?! রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: ‘আল্লাহ তা'আলা যখন কোনো বান্দার কল্যাণ চান, ইহকালেই তার পাপের সাজা ভোগ করান। আর আল্লাহ তা'আলা যখন কোনো বান্দার অকল্যাণ চান, ইহকালে তার পাপের সাজা না দিয়ে পরকালে তার পূর্ণ শাস্তিতে পাকড়াও করেন।’ (তিরমিজী: ৪/৬০1)
২৪. জীবনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত হলো, ব্যক্তি যখন আল্লাহমুখী হয়, আপন রবের দরবারে আশ্রয় প্রার্থনা করে, কাকুতি-মিনতি করে প্রার্থনায় মগ্ন হয়। যখন সে বিশ্বাস করে, আল্লাহ তা'আলাই একমাত্র পরম মুক্তিদাতা, রক্ষাকারী। এরপর যখন সে আল্লাহর অনুগ্রহে বিপদমুক্ত হয়, অনুভব করতে পারে, দুঃখ-কষ্টের পর সুখানন্দ এবং সংকট ও বিপর্যয়ের পর প্রফুল্লতা ও প্রশান্তি কতই না তৃপ্তিদায়ক!
২৫. বিপদ ও সংকট মোকাবেলা করার অনেক ইতিবাচক দিক রয়েছে: অহংকার, দাম্ভিকতা, আত্মতৃপ্তি ও আত্মমুগ্ধতা ইত্যাদি জঘন্য স্বভাবদোষগুলো দূর হতে শুরু করে। ব্যক্তি যখন নিষ্কণ্টক ও নির্ঝঞ্ঝাট জীবন-যাপন করতে থাকে, আরাম-আয়েশ ও ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকে, সে অহংকারী ও দাম্ভিক হয়ে উঠে। ব্যক্তি যখন নানা প্রতিকূলতার শিকার হয়, জটিল সমস্যার সম্মুখীন হয়, নিজের দুর্বলতা ও অক্ষমতা চোখে পড়ে, নিজেকে সে ক্ষুদ্র নগণ্য ভাবতে শেখে। মনের অহংকার দূর হতে থাকে। আমাদের ওপর আল্লাহ তা'আলা অপার অনুগ্রহ হলো, তিনি আমাদের জন্য যেকোনো সমস্যার সমাধান দিয়েছেন এবং যেকোনো সংকট হতে উত্তরণের পথ বাতলে দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার বাণী: ‘বস্তুত মানুষ অবাধ্যতা করছে। কেননা সে নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করে।’ (আলাক, ৯৬: ৬, ৭)
২৬. সাময়িক যে বিপদে আক্রান্ত হয়েছেন, আল্লাহর তা'আলার পক্ষ থেকে তা এক রক্ষাকবচ, যা আপনাকে এমন কোনো জঘন্য অন্যায়-অনাচার থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে, যাতে লিপ্ত হয়ে আল্লাহ তা'আলার ক্রোধের পাত্রে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। কোনো এক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির শিকার হয়ে অবশেষে আপনি তাতে জড়াননি। আল্লাহ তা'আলা সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়। কখনো আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন বিপদ-আপদের মাধ্যমে। কখনো অনুগ্রহ করেন নায-নিয়ামতের মাধ্যমে।
২৭. যেকোনো জটিলতা ও প্রতিকূলতা সফলভাবে, শরীয়ত নির্দেশিত পন্থায় মোকাবিলা করার চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন, এ হলো আপনার জীবনের অন্যতম পরীক্ষা। তাতে সফল হওয়ার পথ হলো, নিয়তির উপর অগাধ বিশ্বাস এবং আপন রবের ফায়সালার সামনে পূর্ণ আত্মসমর্পণ। তাকদির ও নিয়তিতে বিশ্বাসের মতো ঈমানের মৌলিক বিষয়টিকে আপনি ঐচ্ছিক ও অপসনাল হিসেবে গ্রহণের কোনো অবকাশ নেই। নিয়তির ফায়সালা আপনার মর্জিমাফিক হলো তো বেজায় খুশি হলেন। আর একটু প্রতিকূলতার গন্ধ পেয়েই অস্বীকার করে বসলেন। আনুগত্য ও ইবাদতের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের মানসিকতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
২৮. আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে প্রাপ্ত নিয়ামতের কথা স্মরণ করুন, তাহলেই উপলব্ধি হবে, এখনও যে নিয়ামত বর্তমান, তা অগণিত সীমাহীন; যা থেকে বঞ্চিত, তা নিতান্ত নগণ্য। সুস্থতার দিনগুলোর কথা ভেবে দেখুন, তা দীর্ঘ কত দিন! আর অসুস্থতার দিনগুলো গুণে দেখুন, তা সামান্য কয়েকটা দিন। সুতরাং আধিক্য বিবেচনা করে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করুন এবং সামান্য না-পাওয়া ও বঞ্চনার অভিযোগ- অনুযোগ মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন।
২৯. বিশ্বাস করুন! যে কোনো বিপদ-তার ফায়সালা আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়। ভালো-মন্দের চাবিকাঠি তার হাতে। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকুন। এমনটি ভাবা সমীচীন নয়, ইশ! যদি এমনটি করতাম! আহা, যদি তেমনটি না করতাম! তার চেয়ে বরং এ বিশ্বাস ধারণ করুন, আল্লাহ যা করেছেন, মঙ্গলের জন্যই করেছেন। তাঁর ফায়সালাই অবধারিত। রাসূল বলেছেন: ‘যদি কোনো কিছু (বিপদ) তোমার ওপর আপতিত হয় তবে এরূপ বলবে না যে, যদি আমি এরূপ করতাম তবে এরূপ এরূপ হত; বরং বল যে, আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন এবং তিনি যা চেয়েছেন তাই করেছেন। কেননা, তোমার ঐ (যদি) শব্দটি শয়তানের সক্রিয় হওয়ার দুয়ার খুলে দেয়।’ (মুসলিম: ৪/২০৫২)
৩০. পবিত্র কুরআনের বাণী: ‘যারা ধৈর্যধারণ করে, নিশ্চয়ই তাদেরকে বেহিসাব প্রতিদান দেওয়া হবে।’ (যুমার, ৩৯: ১০) বিজ্ঞ আলেমগণের অভিমত হলো, সবর ও ধৈর্য তিন প্রকার: প্রথমত, আল্লাহ তা'আলার আনুগত্যের ওপর অটল-অবিচল থাকা। দ্বিতীয়ত, সব ধরনের অন্যায়, অনাচার ও পাপাচার থেকে বিরত থাকা। তৃতীয়ত, বিপদ-আপদে ধৈর্যধারণ করা। সুতরাং ব্যক্তি যখন বিপদগ্রস্ত হয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে, ক্ষুব্ধ হয়, ভাগ্যলিপি ও নিয়তিকে গালমন্দ করে, তখন সে ধৈর্য ও সহনশীলতার বিধান লঙ্ঘন করে। বিপদ ও প্রতিকূলতার শুরুতে ধৈর্যধারণ করা কর্তব্য। রাসূল বলেছেন: ‘বিপদের প্রথম ধাপেই ধৈর্যধারণ করাই পকৃত ধৈর্য।’ (বুখারী ২/৭৯, মুসলিম ২/৬৩৭)
৩১. আপনি যে সমস্যা ও সংকটে পড়েছেন, তা থেকে পরিত্রাণের উপায় হলো, মনে করতে হবে, যা হারিয়েছেন, আপনি তার আসল মালিক নন। সাময়িকভাবে তা আপনার হস্তগত হয়েছিল মাত্র। কোনো একদিন তা হাতছাড়া হতোই। এর প্রকৃত মালিক তো আল্লাহ তা'আলা। তিনি যখন ইচ্ছা, যেভাবে ইচ্ছা, নিয়ে নিতে পারেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ‘সবকিছুই ধ্বংসশীল। শুধু আল্লাহর সত্তাই ব্যতিক্রম। শাসন কেবল তাঁরই এবং তাঁরই কাছে তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে।’ (কাসাস, ২৮: ৮৮)
৩২. কঠিন দিনগুলোর কথা বারবার স্মরণ করে, অতীতের দুঃখ-বেদনার কথা টেনে এনে কষ্টদায়ক স্মৃতিগুলো জ্বলজ্বলে তাজা করে তুলবেন না। এতে মানসিক প্রশান্তি বিঘ্নিত হবে, অস্থিরতা ও যন্ত্রণা বাড়তে থাকবে। যা-কিছু কষ্টদায়ক বেদনাদায়ক, সব ভুলে থাকার চেষ্টা করুন। যে জটিলতা প্রতিকূলতা গত হয়েছে, তার পিছু পড়বেন না। আমিরুল মু'মিনীন, ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেছেন: ‘অতীতের দুঃখ-কষ্টের স্মৃতিচারণ করে কেঁদে মরো না।’
৩৩. আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা করুন। আপন রবের প্রতি সুধারণা পোষণ করুন। তাঁর পক্ষ থেকে কল্যাণ ও মঙ্গলের প্রত্যাশা করুন। সর্বদা এ বিশ্বাস রাখুন, আসমানি ফায়সালার বাইরে আপনার ভাগ্যে কিছুই ঘটবে না। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: ‘বলে দাও, আল্লাহ আমাদের তাকদিরে যে কষ্ট লিখে রেখেছেন, তা ছাড়া অন্য কোনো কষ্ট আমাদেরকে কিছুতেই স্পর্শ করবে না। তিনিই আমাদের অভিভাবক। আর আল্লাহরই ওপর মু'মিনদের ভরসা করা উচিত।’ (তাওবা, ৯: ৫১) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘প্রতিটি বিষয়েরই মৌলিকতা রয়েছে। কোনো ব্যক্তি ঈমানের মৌলিকতা লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না সে এ বিশ্বাস ধারণ করবে যে, সে যা লাভ করেছে, তা তার হাতছাড়া হওয়ার ছিল না। আর যা হাতছাড়া হয়েছে, তা কখনো অর্জনের ছিল না।’ (মুসনাদে আহমাদ: ৪৫/৪৮২)

টিকাঃ
১০ ধৈর্য ও নামায।
১১ আল্লাহর নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা।

পরিশিষ্ট:
১৪১৮ হিজরিতে (১৯৯৭ সাল) ঘটে-যাওয়া দুর্ঘটনার কথা আমি ভুলতে পারব না। তা ছিল ভয়াবহ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। মা-বাবা ও ভাই-বোন মিলে সুন্দর সাজানো পরিবার। তায়েফ থেকে ওমরা পালনের উদ্দেশ্যে মক্কার পথে যাচ্ছিল। ছেলে-মেয়ে আলাদা প্রাইভেটকারে। তাদের পেছনে মা-বাবা আলাদা প্রাইভেটকারে। হাইওয়ের একটি মোড়ে ক্ষিপ্রগতির একটি চলন্ত বাসের সঙ্গে সন্তানদের গাড়িটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। বাসটির গতি এত বেশি ছিল যে, প্রাইভেটকারের যাত্রীরা রাস্তায় ও আশেপাশে ছিটকে পড়ে। আরও মর্মান্তিক হলো, তাদের কারো দেহই অক্ষত নেই। চারপাশে হাত-পা, দেহ-মাথা ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে আছে। তাদের গাড়িটি একেবারে পিষে গেছে। পেছনের গাড়িতে মা-বাবা। তাদের চোখের সামনেই সন্তানদের এমন করুণ মৃত্যু। সন্তানদের এমন নির্মম মৃত্যু দেখে মা নিথর হয়ে পড়লেন। দুঃখে-শোকে পাথর। বাবা কম্পিত পায়ে গাড়ি থেকে নেমে এলেন। কেবলামুখী হয়ে সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন। পথিমধ্যেই দীর্ঘক্ষণ সিজদায় পড়ে থাকলেন। মহান রবের দরবারে প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে সিজদা থেকে মাথা উঠালেন। বারবার চোখের পানি মুছতে লাগলেন। মুখে একটি কথাই বারবার উচ্চারিত হতে লাগল: "ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।” এরপর তিনি সন্তানদের মৃতদেহের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালেন। জবানে তার একটি কথাই বারবার উচ্চারিত হচ্ছে "ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।” বাবার এমন প্রশান্ত চিত্ত মানুষের অযাচিত শোরগোল, হা- হুতাশ অনেকটাই স্তিমিত করে দিল। জীবনের এমন কঠিন মর্মান্তিক মুহূর্তেও মৃত সন্তানদের বাবা ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। জীবনের কঠিনতম মুহূর্তে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করেছেন। এটাই ছিল ঈমান ও শরীয়তের হুকুম, দৃঢ় মনোবল ও আত্মসংবরণের পরিচায়ক। আল্লাহ তা'আলা তাকে বিরাট প্রতিদান দান করুন। তাকে মাফ করুন। সন্তানদেরকে শহিদী মর্যাদা দান করুন। এ মহান পিতা পরবর্তীতে পরিচিতজনদের বলতেন, 'আল্লাহ তা'আলার দরবারে লাখো-কোটি কৃতজ্ঞতা জানাই যে, এমন বিরাট পরীক্ষার জন্য তিনি আমাকে ও আমার স্ত্রীকে মনোনীত করেছেন। সন্তানদের শহিদী মৃত্যু নসিব করেছেন আর আমাদের ধৈর্য ও সহনশীলতা অবলম্বন করার তাওফীক দান করেছেন।'

কবিদল বলেছেন: 'মানুষের জীবনে আটটি বিষয় অবধারিত: আনন্দ-বেদনা, মিলন ও বিচ্ছেদ, সচ্ছলতা-দরিদ্রতা, সুস্থতা-অসুস্থতা।'

এক নারী তার সন্তানকে নিয়ে রাসূল-এর দরবারে হাযির হলো। বলল, 'হে আল্লাহর নবী! আপনি আমার সন্তানের জন্য দু'আ করে দিন। এ পর্যন্ত আমার তিন-তিনটি সন্তানের মৃত্যু হয়েছে।' রাসূল জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার তিন সন্তানের মৃত্যু হয়েছে?' বলল, 'হ্যাঁ।' রাসূল বললেন, 'তুমি তো জাহান্নামের আগুনের রক্ষা হওয়ার আশ্রয়কেন্দ্র পেয়ে গেছ।' (মুসলিম: ৪/২০৩০)

ইবনুল কাইয়্যিম জাওযী (রহ.) (৬৯১-৭৫১ হি.) বলেছেন: 'আল্লাহ যখন কোনো বান্দার মঙ্গল চান, ঈমানের স্তর অনুযায়ী তাকে পরীক্ষা করেন। একের-পর-এক পরীক্ষা করে ধ্বংসাত্মক বহু বিষয় থেকে মুক্ত করেন। অবশেষে তাকে শুদ্ধ-পরিশুদ্ধ, পবিত্র ও পঙ্কিলতামুক্ত করেন। তাকে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ মর্যাদা দান করেন। আর তা হলো, আপন রবের ইবাদত-বন্দেগি। পরকালের শ্রেষ্ঠ নিয়ামত দান করেন। আর তা হলো, আল্লাহ তা'আলার পবিত্র সত্তার দর্শন ও নৈকট্য-লাভ।'

আমিরুল মু'মিনীন ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) যখন বিপদগ্রস্ত হতেন, তিনবার আল্লাহর প্রশংসা করতেন। শোকর আদায় করে বলতেন: 'আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি, এ বিপদ আমার দ্বীনের কোনো ক্ষতি করেনি। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যে, তিনি আমাকে এর চেয়ে বড় কঠিন বিপদ থেকে মুক্ত রেখেছেন। কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি, তিনি আমাকে বিপদে ধৈর্যধারণ করার তাওফীক দান করেছেন।'

আব্বাসীয় যুগের বিশিষ্ট কবি আবূল আতাহিয়া (১৩০-২১৩ হি) বলেন: 'যেকোনো বিপদে ধৈর্যধারণ করুন। অবিচল থাকুন। মনে রাখবেন, মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী। আপনি দেখুন না, পৃথিবীতে মানুষের জীবন কত বিপদসঙ্কুল! মৃত্যু তাকে গ্রাস করার জন্য ওঁত পেতে আছে। কখনো কি এমন কাউকে দেখেছেন, যে আজীবন বিপদমুক্ত!? বিপদ হলো পার্থিব জীবনের এমন অবধারিত অনুষঙ্গ, যা থেকে নিষ্কৃতি নেই। আপনি বরং মুহাম্মদ-এর বিপদ-আপদের প্রেক্ষাপটগুলো স্মরণ করে দেখুন। তারপর আপনার বিপদ ও প্রতিকূলতা তুলনা করে দেখুন। নিশ্চয় পরিমাণ ও ভয়াবহতায় আকাশ-পাতাল তফাত হবে।'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00