📄 তাসাখ্খুত
আত-তাসাখখুত হলো আল্লাহর ফায়সালা, অবধারিত নিয়তি ও ভাগ্যের প্রতি অসন্তোষ। বান্দার জন্য রিযিকের যে ফায়সালা চূড়ান্ত তাতে অসন্তোষ প্রকাশ করা এবং বিশ্বজগত পরিচালনায় আল্লাহ তা'আলার কার্যপদ্ধতিতে আপত্তি উত্থাপন করা। এমন ব্যক্তি মানসিক সংকীর্ণতা, অস্থিরতা ও বিমর্ষতায় ভুগে। নিজের ভাগ্যে কখনো সন্তুষ্ট হতে পারে না। উপার্জিত রিযিকে তুষ্ট হতে পারে না। আল্লাহর কোনো ফায়সালায় সে স্থিরচিত্ত ও সুস্থির হতে পারে না। সে অসহনীয় মানসিক অস্থিরতা, দুর্ভাগ্য ও বিমর্ষতায় জীবনযাপন করে।
নিয়তি ও ভাগ্যের প্রতি অসন্তোষ কিয়ামতের আলামত। যেমন রাসূলুল্লাহ বলেছেন: (আউফ ইবনে মালেক (রা.)- কে উদ্দেশ্য করে) রাসূল বলেন, 'কিয়ামতের ছয়টি আলামত গণনা করো। ... অর্থ- সম্পদের এমন প্রাচুর্য যে, ব্যক্তিকে একশত দিনার দান করা হবে। কিন্তু এতেও সে সন্তুষ্ট হবে না।' (বুখারী ৪/১০২)
তাকদির ও নিয়তির ফায়সালায় আপনি সন্তুষ্ট কি না-এ বিষয়টি যদি যাচাই করে দেখতে চান, তবে নিজেকে এই প্রশ্নগুলো করুন:
১. আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে আপনি যে বিভিন্ন পরীক্ষার সম্মুখীন হন, তাতে কি ধৈর্যধারণ করেন, না কি অভিযোগ-অনুযোগ করে বেড়ান?
২. কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে আপনি কি এ ধরনের কথা উচ্চারণ করেন কিংবা মনে মনে ভাবেন যে, 'হে আল্লাহ! আমাকে কেন এমন পরিস্থিতির শিকার করলেন?'
৩. অন্যকে স্বাচ্ছন্দ্য ও সচ্ছলতায় থাকতে দেখে আপনি কি মানসিক সংকীর্ণতা ও নিরাশাগ্রস্ত হন? অনুতাপ ও আফসোসের জ্বালায় পুড়েন?
৪. কোনো সংকটের মুখে পড়ে আপনি সন্তুষ্ট চিত্তে ধৈর্যধারণ করতে পারেন, নাকি অধৈর্য, অস্থির ও ক্রোধান্বিত হয়ে পড়েন? এসব প্রশ্নের উত্তর হয় যদি 'হ্যাঁ', তবে আপনার সমাধানের পথ হলো:
সমাধান:
১. শরীয়তের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ তিন ধরনের অসন্তোষ ও অতুষ্টি থেকে বিরত থাকুন:
> তাকদির ও নিয়তির প্রতি মনে মনে চাপা ক্ষোভ ও অসন্তোষ পোষণ করা। এ ধারণা পোষণ করা যে, আল্লাহ যে ফায়সালা করেছেন, তাতে তিনি আপনার উপর জুলুম করেছেন。
> ভাগ্যলিপির ওপর মনের চাপা ক্ষোভ ও অসন্তোষ মুখে প্রকাশ করা। সর্বদা নিজের হতভাগ্য ও দুর্ভাগ্যের কথা বলে বেড়ানো। এমন সব কথা উচ্চারণ করা, যা আল্লাহর ফায়সালার প্রতি আপনার অসন্তোষ প্রকাশ করে।
> আচার-অচরণে অসন্তোষ প্রকাশ করা। যেমন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ও বঞ্চনার শিকার হয়ে, নিজের নিয়তির প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে কপাল চাপড়ানো, জামা-কাপড় ছিঁড়ে ছিন্নভিন্ন করা। এ ধরনের যেকোনো কাজই শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম ও নিষিদ্ধ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন: "মানুষের মধ্যে কেউ কেউ এমনও আছে, যে আল্লাহর ইবাদত করে এক প্রান্ত থেকে। যদি (দুনিয়ায়) তার কোনো কল্যাণ লাভ হয়, তবে তাতে সে আশ্বস্ত হয়ে যায়। আর যদি সে কোনো পরীক্ষার সম্মুখীন হয়, তবে সে মুখ ফিরিয়ে (কুফরের দিকে) চলে যায়। এরূপ ব্যক্তি দুনিয়াও হারায় এবং আখেরাতও। এটাই তো সুস্পষ্ট ক্ষতি। (হাজ, ২২: ১১)
রাসূল বলেছেন: ‘যে গাল-চাপড়ায়, জামা-কাপড় ছিড়ে ফেলে অথবা জাহেলি যুগের মতো বিলাপ করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (মুসলিম: ১/৯৯)
২. মনে রাখবেন, তাকদির (নিয়তি) ও আল্লাহ তা'আলার ফায়সালার প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করা গুরুতর শিরকের নামান্তর। কেননা যখন আপনি তাকদিরের প্রতি অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করলেন, আপনি যেন আল্লাহ তা'আলার ফায়সালার যৌক্তিকতা ও যথার্থতা নিয়ে আপত্তি উত্থাপন করলেন। এ যেন আসমানি ফায়সালা অস্বীকার করার নামান্তর। কেননা তাকদিরের ভালো-মন্দের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ।
৩. কাঙ্ক্ষিত সুবিধাজনক অবস্থানে উৎফুল্ল হওয়া, আর অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিকূল পরিস্থিতির শিকার হয়ে ক্ষুব্ধ হওয়া-আল্লাহর ফায়সালা দেখে মুনাফিকদের মতো এমন আচরণ করা সমীচীন নয়। প্রকৃত মু'মিন বান্দার বৈশিষ্ট্য হলো সর্বাবস্থায় আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকা; তাকদিরের ভালো-মন্ড সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করা। সুতরাং আপনার কর্তব্য হলো মু'মিনের এ অনন্য বৈশিষ্ট্য অর্জন করা এবং নিয়তির প্রতি ক্ষোভ ও অসন্তোষ পরিহার করা, কেননা তা মুনাফিকের খাসলত*। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদের অবস্থা সম্পর্কে বলেন: তাদের (অর্থাৎ, মুনাফিকদের) মধ্যে এমন লোকও আছে, যারা সদকা (বণ্টন) সম্পর্কে আপনাকে দোষারোপ করে। সদকা থেকে তাদেরকে তাদের (মনমতো) দেওয়া হলে তারা খুশি হয়ে যায়। আর তাদেরকে যদি তা থেকে না দেওয়া হয়, অমনি তারা ক্ষুব্ধ হয়। (তাওবা, ৯: ৫৮)
৪. তোমার ভাগ্যে যা আছে, তা অবশ্যম্ভাবী, এর কোনো ব্যত্যয় ঘটবে। কিন্তু যা তোমার ভাগ্যে নেই, তা কিছুতেই তোমার অর্জিত হবে না। বিশ্বজগতের পরিচালনার চাবিকাঠি একমাত্র মহান স্রষ্টা আল্লাহর হাতে। তাঁর প্রতিটি ফায়সালা, প্রতিটি সিদ্ধান্তে নিগূঢ় কোনো তত্ত্ব রয়েছে, যা আমাদের বোধগম্য নয়।
৫. তাকদিরের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে নিজের নেক আমলসমূহ নষ্ট করবেন না। ইতঃপূর্বে আপনি যত মহৎ নেক আমলই করেন না কেন, তাকদিরের প্রতি অসন্তোষ ও ঘৃণা তা নষ্ট করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। পবিত্র কুরআনের বিধান: ‘এটি এ জন্য যে, তারা এমন সব বিষয়ের অনুসরণ করেছে যা আল্লাহকে ক্রোধান্বিত করেছে এবং তারা তাঁর সন্তোষকে অপছন্দ করেছে। ফলে আল্লাহ তাদের কর্মসমূহ নিষ্ফল করে দিয়েছেন।’ (মুহাম্মদ, ৪৭: ২৮)
৬. সন্তুষ্ট চিত্তে আল্লাহর ফায়সালা মেনে নিন। তার চূড়ান্ত বিধানের সামনে নিজেকে সমর্পণ করুন। এ বিশ্বাস ধারণ করুন যে, নিজের কল্যাণে আপনার সিদ্ধান্তের চেয়ে আল্লাহ তা'আলার ফায়সালাই অধিক সংগত ও কল্যাণকর। আপনার সন্তোষ ও তুষ্টির মানসিকতা উত্তম পাথেয়। কেননা মনের সচ্ছলতাই প্রকৃত সচ্ছলতা। রাসূলুল্লাহ বলেছেন: ‘আল্লাহ তা'আলা তোমার জন্য যে ফায়সালা করেছেন, তাতে সন্তুষ্ট থাক। তবেই আপনি মানুষের মাঝে প্রকৃত সচ্ছল ও ধনী হতে পারবে।’ (তিরমিজী ৪/১২৭)
৭. নিকৃষ্ট বিতারিত ইবলিসের শিষ্য হতে যাবেন না, সে মানুষের মনে তাকদির ও নিয়তির বিষয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে; বান্দার ইচ্ছাশক্তি ও কর্মক্ষমতা এবং আল্লাহর তা'আলার ফায়সালা ও নিয়তির বিষয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলে দুর্বোধ্য করে তোলে। বিশ্বজগতে সর্বপ্রথম যে অবাধ্যাচার ও নাফরমানি ঘটেছিল, তা আল্লাহ তা'আলার ফায়সালার প্রতি অসন্তোষের কারণেই হয়েছিল। আদম-কে সিজদা করার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ এসেছিল, ইবলিস তা সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিতে পারেনি। তাই আল্লাহ তা'আলা তাকে আযাবে পাকড়াও করলেন।
৮. আপন রবের প্রতি গভীরভাবে এ বিশ্বাস ধারণ করতে হবে যে, জীবনের বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে আল্লাহ আপনাকে পরীক্ষার সম্মুখীন করেন। এর মাধ্যমে মূলত তিনি আপনাকে তাঁর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দা হওয়ার সুযোগ দান করেন। বিভিন্ন অবস্থা ও পরিস্থিতির সম্মুখীন করেন রবের উপর আস্থা ও বিশ্বাস, ধৈর্য ও অবিচলতা পরখ করার জন্য, আপনার তাসবীহ্*, তাহলীল*, আল্লাহ তা'আলার দরবারে সবিনয় কাকুতি-মিনতি ও ক্রন্দন দেখার জন্য। কোনো সন্দেহ নেই যে, এসব আমলের মাধ্যমে বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়, আল্লাহর দরবারে তার মাকাম উচ্চ হতে উচ্চস্তরে উন্নীত হয়।
৯. আপন রবকে অসন্তুষ্ট করে শয়তানকে খুশি করবেন না। আল্লাহর ফায়সালা ও তাকদিরের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করে আপনার পরিবার-পরিজনকে কষ্টে ফেলবেন না; বরং জীবনে সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না সবই হাসিমুখে প্রসন্নচিত্তে বরণ করুন। এতে মহান রবের পক্ষ হতে প্রতিদানপ্রাপ্ত হবেন, তাঁর সন্তুষ্টি লাভে ধন্য হবেন। পরিবার-পরিজন ও বন্ধুবান্ধব আপনার মানসিকতায় আশ্বস্ত হবে।
১০. সর্বদা নিজেকে এ কথা বলুন যে, আপনি আল্লাহর বান্দা। সুতরাং তিনি যদি আপনার মঙ্গলের ফায়সালা করেন, আপনার কর্তব্য তাঁর প্রশংসা জ্ঞাপন করা। তিনি যদি আপনার অমঙ্গলের ফায়সালা করেন, তাহলে পুণ্য লাভের আশায় সন্তুষ্টচিত্তে ধৈর্যধারণ করাও কর্তব্য। কেননা তিনি আপনার খালিক-মালিক (স্রষ্টা ও কর্তৃত্বাধিকারী)।
১১. আল্লাহর ফায়সালার প্রতি অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ না হয়ে যদি প্রফুল্ল চিত্তে ধৈর্য্যধারণ করতে পারেন, তবে রাসূল -এর যবানে বিরাট প্রতিদান ও মহা পুণ্যের সুসংবাদ গ্রহণ করুন: মু'মিন বান্দার অবস্থা বড়ই আশ্চর্যের! তাঁর প্রতিটি অবস্থাই তো তার জন্য মঙ্গলজনক। প্রকৃত মু'মিন বান্দাই এ কল্যাণের হকদার। সে কোনো সুসংবাদ ও আনন্দ পেলে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে। যা তার জন্য মঙ্গল বয়ে আনে। কোনো দুঃসংবাদ ও দুঃখের সম্মুখীন হলে ধৈর্যধারণ করে। এটাও তার জন্য মঙ্গল বয়ে আনে।” (মুসলিম ৪/২২৯৫)
১২. আপনি যে বিপদ ও সংকটে পড়েছেন, তার চেয়েও বড় বিপদ ও গুরুতর সংকটের আশঙ্কাও রয়েছে, তাতেও তো আক্রান্ত হতে পারতেন-এ কথা মনে করে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করুন। প্রকৃত বাস্তবতা হলো, বিপদের চেয়ে মহাবিপদ বিদ্যমান। সংকটের চেয়ে মহাসংকট বর্তমান। যেমন: কোনো ব্যক্তি পুত্রের মৃত্যু শোকে বিহ্বল হয়েও আল্লাহর দরবারে শোকর আদায় করল যে, আমি তো একটিমাত্র সন্তান হারিয়েছি, যদি সকল সন্তানকে হারাতাম! আল্লাহ মেহেরবান! বাকিরা তো সুস্থ স্বাভাবিক বেঁচে আছে। কারো পা ভেঙে যাওয়ার পরও আল্লাহর দরবারে শোকর আদায় করল যে, আমার পা ভেঙেছে মাত্র। পঙ্গু অকেজো হয়ে যাইনি। চিকিৎসা গ্রহণ করে আমি পুনরায় সুস্থ-স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারব।
১৩. দুঃখ-কষ্ট ও ব্যথা-বেদনার অনুভূতি ব্যক্ত করা ব্যতীত আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট ও প্রসন্নচিত্ত হতে হবে-এমন কোনো বিধিবদ্ধ বিধান নেই। অসুস্থ ব্যক্তি ব্যথায় কাতরাতে-কাতরাতে তিতা ওষুধ সেবন করছে; কিন্তু মনে-প্রাণে সে আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট। রোযাদার গরমের দাবদাহ সহ্য করেও রোযা রাখছে। প্রসন্নচিত্তেই সে গরমের এ কষ্টটুকু সহ্য করে যাচ্ছে। এ কষ্টে তার কোনো অভিযোগ-অনুযোগ নেই। সুতরাং তাকদির ও নিয়তির ভালোমন্ড মেনে নিয়ে, শরীয়তের বিধান লঙ্ঘন না করে, দুঃখ-বেদনা ও দুর্দশার কথা ব্যক্ত করা যেতে পারে। তাতে কোনো বাধা নেই।
১৪. আল্লাহর ফায়সালা ও তাকদিরের ভালোমন্ড মেনে নেওয়ার তিনটি স্তর রয়েছে:
সর্বোচ্চ স্তর হলো সন্তুষ্ট ও কৃতজ্ঞচিত্তে গ্রহণ করা। মধ্যস্তর হলো নিয়তির সামনে নিজেকে সঁপে দিয়ে ধৈর্যধারণ করা। নিম্নস্তর হলো অসন্তোষ, বিরক্তি ও ক্ষোভ প্রকাশ করা। সর্বোচ্চ স্তর হলো পুণ্যবান মুত্তাকীদের অবস্থা। মধ্যস্তর হলো মধ্যম পর্যায়ের মু'মিন বান্দার অবস্থা। নিম্নস্তর হলো ক্ষতিগ্রস্ত ও যালিম বান্দার অবস্থা। সুতরাং আপনি তুষ্টি ও সন্তুষ্টি, শোকর ও কৃতজ্ঞতার সর্বোচ্চ স্তর অর্জনে সচেষ্ট হোন।
১৫. এমন কেউ নেই যে, অদৃশ্যে জ্ঞাত। কারো এ সামর্থ্য নেই যে, কী ঘটতে যাচ্ছে, সে তা আগাম সংবাদ দিতে পারে। এমনকি এর ওপর ভিত্তি করে কী মঙ্গল বয়ে আসছে কিংবা অমঙ্গল ধেয়ে আসছে, তাও জানিয়ে দিতে পারে। একমাত্র মহান আল্লাহ তা'আলা অদৃশ্যে জ্ঞাত, অদৃষ্টির দ্রষ্টা। সুতরাং তাঁর বিধানেই সন্তুষ্ট থাকুন। তাঁর ফায়সালার সামনে নিজেকে সমর্পণ করুন। লোকমান হাকীম তাঁর পুত্রকে অসীয়ত⁷ করেছিলেন: 'আমি তোমাকে কয়েকটি মহৎ গুণ অর্জনের উপদেশ দিচ্ছি, যার মাধ্যমে তুমি আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারবে এবং তাঁর ক্রোধের পাত্র হওয়া থেকে বেঁচে থাকতে পারবে। আল্লাহর ইবাদত করবে, তাঁর সঙ্গে শিরক করবে না। ভালো-মন্ড সবক্ষেত্রে আল্লাহ ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকবে।'
১৬. আকৃতি-অবয়বে, জীবিকা-উপার্জনে, পদ ও সম্মানে, স্বাস্থ্য ও সুস্থতায় ইত্যাদি যাবতীয় ক্ষেত্রে আপনার নিম্নশ্রেনীর লোকদের অবস্থা লক্ষ করুন। ফলে আপন রবের প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ বজায় থাকবে। রাসূল -এর বাণী স্মরণ করুন: ‘তোমাদের চেয়ে নিম্নস্তরের লোকদের প্রতি দৃষ্টি দাও। তবে তোমাদের চেয়ে উঁচু স্তরের লোকেদের দিকে লক্ষ্য করো না। কেননা আল্লাহর নি'আমাতকে তুচ্ছ না ভাবার এটাই উত্তম পন্থা।’ (মুসলিম ৪/২২৭৫)
১৭. ইহজাগতিক বাস্তবতার সাথে নিজের মন-মানসিকতা, চিন্তা-চেতনা সর্বপরি নিজেকে মানিয়ে নিন। জাগতিক জীবন হলো বিপদ-আপদ, সংকট-সংকীর্ণতায় আকীর্ণ। যত দিন আপনি এ জীবনযাপন করবেন, আপনাকে দুঃখ-দুর্দশা মোকাবিলা করে বেঁচে থাকতে হবে। প্রকৃত সুখ, চিরস্থায়ী শান্তি শুধু জান্নাতই লাভ করতে পারবেন। তখন এ ঘোষণা শুনতে পাবেন: ‘তোমরা তাতে প্রবেশ কর নিরাপদে নিশ্চিন্তে।’ (হিজর, ১৫: ৪৬)
১৮. আপনি যদি আল্লাহর অবধারিত হুকুম মেনে নিতে না চান, তাঁর ফায়সালার সামনে নিজেকে সমর্পণ করতে প্রস্তুত না থাকেন, তবে আপনার কি-ই বা করার আছে? এর বিকল্পে আপনার কি-ই বা ইচ্ছাশক্তি ও কার্যক্ষমতা আছে? কপালে জুটবে শুধু মানসিক সংকীর্ণতা, অস্থিরতা, অনর্থক অভিযোগ-অনুযোগ, চাপা ক্ষোভ ও অসন্তোষ। এসব মানসিক অস্থিরতা আপনার জীবিকায় সচ্ছলতা ফিরিয়ে দিবে না, শারীরিক সুস্থতা দান করবে না, আপনার হারানো সন্তান পুনর্জীবিত করতে পারবে না। উল্টো আপনার মধ্যে আক্ষেপ-অনুতাপ, মানসিক যন্ত্রণা বাড়িয়ে দিবে। আপন রবের ওপর আস্থা ও বিশ্বাসের সাথে ধৈর্যধারণ করার মহা প্রতিদান থেকে বঞ্চিত করবে। রাসূল বলেছেন: বিপদ-আপদ যত কঠিন হবে, এর ধৈর্যের প্রতিদানও তত বিরাট হবে। আল্লাহ তা'আলা যদি কোনো সম্প্রদায়কে পছন্দ করেন, তাদেরকে পরীক্ষার সম্মুখীন করেন। যে আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকে, সে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে। আর যে অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ হয়, সে আল্লাহর ক্রোধের পাত্রে পরিণত হয়। (সহীহ ইবনে মাজাহ ২/১৩৩৮)
১৯. নবীগণদের জীবনচরিত পড়ে দেখুন, নেককার বান্দাদের জীবনচরিত পড়ে দেখুন, কীভাবে তাঁরা জীবনের পদে-পদে কঠিন থেকে কঠিনতর পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন! কত মহা বিপদ-দুর্যোগ মোকাবিলা করেছেন! তাঁদের তুলনায় আমাদের জীবনের সংকটগুলো তো নিতান্তই নগণ্য, তুচ্ছ। তা সত্ত্বেও তাদের হৃদয়াত্মা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টিতে পরিতৃপ্ত, আত্মসমর্পণের পরম সৌভাগ্যে অপুত, দেহের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ধৈর্য ও স্থৈর্যের পরীক্ষায় সদা অনঢ়। তাঁরা আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট। আল্লাহ তা'আলাও তাঁদের ফায়সালায় সন্তুষ্ট।
২০. পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার বাণী: ‘কেবল (সাফল্য লাভ করবে) সে ব্যক্তি যে বিশুদ্ধ অন্তর নিয়ে আল্লাহর নিকট আসবে।’ (শুআরা, ২৬: ৮৯) সুতরাং শুদ্ধ ও নিষ্কলুষ মন ব্যতীত আমরা মুক্তি পেতে পারি না। সন্তুষ্টচিত্তে তাকদিরের ভালোমন্ডের ফায়সালা মেনে নেওয়া ব্যতীত হৃদয়াত্মার পরিশুদ্ধি ও নিষ্কলুষতা সাধিত হতে পারে না। তাই হিংসা-বিদ্বেষ, ক্ষোভ-আক্রোশ, ধোঁকা-প্রবঞ্চনা থেকে অন্তর পবিত্র করে আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টি লালন করুন।
২১. আপনি যদি আপন রবের প্রতি গভীর আস্থা ও বিশ্বাস, সন্তুষ্টি, সমর্পণ, তাকদিরের ভালোমন্ড সাদরে গ্রহণ করার মতো বিরাট নিয়ামতপ্রাপ্ত হয়ে থাকেন, তবে তোমার রবের প্রাশংসা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করুন। কেননা আপনি অন্তর্জাগতিক বিরাট নিয়ামতপ্রাপ্ত হয়েছেন। ঈমানের উচ্চস্তর লাভ করেছেন। আখেরাতের বিশাল ধনভাণ্ডার সঞ্চয় করে নিয়েছেন।
২২. বিশ্বনন্দিত কোনো ইঞ্জিনিয়ার যদি বিশাল অট্টালিকা নির্মাণ করে, বড় বড় দরজা-জানালা ও প্রবেশপথ দিয়ে ভবনের প্রতিটি স্তর সাজায়, এরপর সে আবার ভাঙা-গড়ার কাজ শুরু করে, নতুনভাবে ভবনটি নির্মাণ করে, তবেও কি কারো সাধ্য আছে যে, তার নির্মাণশৈলীর সমালোচনা করবে? তাহলে যিনি মহা প্রজ্ঞাবান, যাবতীয় কল্যাণ-অকল্যাণের দ্রষ্টা, তাঁর সিদ্ধান্তের প্রতি কীভাবে অসন্তোষ ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হতে পারে? তাঁর ভালোমন্ডের ফায়সালা কি বিনা বাক্যে মেনে নেওয়া সমীচীন নয়?
২৩. ব্যক্তি যখন তার আপাদমস্তক বিজ্ঞ ডাক্তারের কাছে সঁপে দেয়, ডাক্তার প্রয়োজনবোধে কোনো অঙ্গ অবশ করেন, অথবা কেটে ফেলেন, কিংবা কোথাও অপারেশন করেন। সকলেই বলে, 'ডাক্তার যথার্থ করেছেন।' চিকিৎসকের অভিজ্ঞতার কারনেই সবাই নির্দ্বিধায় তার চিকিৎসার প্রশংসা করে। তাহলে যিনি মহাপ্রজ্ঞাবান, বিশ্বের দৃশ্য-অদৃশ্য যাবতীয় বিষয়ে সর্বজ্ঞ সত্তা, তিনি যদি আপনাকে কোনো কিছু থেকে বঞ্চিত করেন, কোনো সংকটে ফেলেন, তবে নিজ প্রজ্ঞা ও বিজ্ঞতার গুণেই তিনি তা করেছেন। তাই তাঁর ভালোমন্ডের ফায়সালার সামনে নিজেকে সমর্পণ করুন। পবিত্র কুরআনের বাণী স্মরণ করুন: ‘যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি জানবেন না? অথচ তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক জ্ঞাত।’ (মুলক, ৬৭: ১৪)
২৪. আল্লাহর তরফ থেকে অবধারিত তাকদিরের ভালোমন্ডের ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকুন। নিজের মন-মানসিকতা এভাবে প্রস্তুত করে নিন যে, ইহজাগতিক জীবনে কাঙ্ক্ষিত যত সুখ-শান্তির ছোঁয়া, অনাকাঙ্ক্ষিত যত দুঃখ-বিষাদের থাবা, সবই বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর পক্ষ থেকে পূর্বনির্ধারিত ও চূড়ান্ত অবধারিত, এর কোনো ব্যত্যয় ঘটবে। রাসূল ﷺ বলেছেন: যদি কোনো কিছু (বিপদ) তোমার উপর আপতিত হয় তবে এরূপ বলবে না যে, যদি আমি তেমনটি করতাম তাহলে এমনটি হতো; বরং বলুন যে, আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন এবং তিনি যা চেয়েছেন তাই করেছেন। কেননা, আপনার ঐ (যদি) শব্দটি শয়তানের আমলের দুয়ার খুলে দেয়। (মুসলিম ৪/২০৫২)
২৫. এ কথাটি মনে মনে পাঠ করতে থাকুন: ‘আমি রব ও প্রতিপালক হিসেবে আল্লাহকে পেয়ে, ধর্ম হিসেবে ইসলাম গ্রহণ করে এবং নবী হিসেবে মুহাম্মদ-এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে সন্তুষ্ট।’ এতে আপনি পরম সৌভাগ্য ও ঈমানের প্রকৃত স্বাদ অনুভব করতে পারবেন। রাসূলুল্লাহ বলেছেন: যে ব্যক্তি রব ও প্রতিপালক হিসেবে আল্লাহকে পেয়ে, ধর্ম হিসেবে ইসলাম গ্রহণ করে এবং নবী হিসেবে মুহাম্মদ-এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে সন্তুষ্ট, সে ঈমানের প্রকৃত স্বাদ আস্বাদন করতে পারবে। (মুসলিম: ১/৬২)
রাসূলুল্লাহ অন্যত্র বলেছেন: যে ব্যক্তি বলবে, আমি রব ও প্রতিপালক হিসেবে আল্লাহকে পেয়ে, ধর্ম হিসেবে ইসলাম গ্রহণ করে এবং নবী হিসেবে মুহাম্মদ -এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে সন্তুষ্ট, তার জন্য জান্নাত অবধারিত হয়ে যাবে। (সহীহ ইবনে হিব্বান: ৩/১৪৫)
২৬. প্রকৃত মুসলিমের পরিচয় হলো, যে বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ তা'আলার সামনে আত্মসমর্পণ করে। তাঁর সমস্ত বিধিবিধান ও ফায়সালা সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেয়। নিয়তির ভালোমন্ড ফায়সালা সম্পর্কে তার কোনো অভিযোগ-অনুযোগ থাকে না। সর্বোপরি ইহজাগতিক জীবনের প্রকৃত বাস্তবতা মেনে নিয়েই সে আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকে। আপন রবের প্রতি সুধারণা পোষণ করবে। আল্লহ্ তা'আলা যে তার মতো নগণ্য বান্দার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং তার যাবতীয় বিষয় পরিচালনা করছেন, এর জন্য তাঁর দরবারে স্বপ্রশংস কৃতজ্ঞচিত্ত থাকে। সুতরাং আপনিও নিজেকে এভাবে গড়ে তোলায় সচেষ্ট হোন।
২৭. আপনি যদি প্রকৃত সুখ-শান্তি, আনন্দ ও প্রশান্তি পেতে চান, তাহলে তুষ্টি ও সন্তুষ্টির মানসিকতা লালন করুন। ইহকালেই তা আপনার সামনে জান্নাতের দ্বার উন্মোচন করবে। আর অসন্তোষ ও ক্রোধ হলো দুঃখ-কষ্ট ও আফসোস-অনুতাপের কারণ। যা আপনার মনে দ্বিধা ও সংশয় সৃষ্টি করবে; আপনাকে আল্লাহর ক্রোধের পাত্রে পরিণত করবে। সুতরাং আপন রবের প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন। তাঁর ফায়সালা সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করুন。
টিকাঃ
* স্বভাবজাত বদভ্যাস।
* আল্লাহ তা'আলার মহত্ত্বের ঘোষণা।
* আল্লাহ তা'আলার বড়ত্বের ঘোষণা।
৭. উপদেশ।
পরিশিষ্ট: বিখ্যাত ভাষাবিদ ইবনে ফারেস শুধু রুটি ও পানি খেয়েই জীবনধারণ করতেন। লোকেরা তাঁর কাছে জানতে চাইল: 'আপনি কীভাবে জীবন-যাপন করেন?' বললেন: 'আমি তো আল্লাহ প্রতি সন্তুষ্টি অবলম্বন করেই বেঁচে আছি।' এরপর তিনি এই কবিতা আবৃতি করেন:
পানি, রুটি ও ছায়াদার বাসস্থান, এ-ই তো আমার জন্য বিরাট নিয়ামত। যদি বলি, এতো আমার জন্য অতি সামান্য, তাহলে আমি হবো আমার রবের নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞ।
আমেরিকার বিখ্যাত লেখক ডেল কার্নেগী (১৮৮৮-১৯৫৫ খৃস্টাব্দ) একটি ঘটনা লিখেছেন:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন নৌবাহিনীর প্রধান জাপানের সমুদ্রে ডুবে গেলেন। এক পর্যায়ে তার মনে হলো, প্রাণ নিয়ে আর তীরে ফিরতে পারবেন না। কিন্তু নৌবাহিনীর অন্য সদস্যদের সাহায্যে তিনি এ যাত্রায় বেঁচে গেলেন। পরে এ ঘটনায় তার অনুভূতি জানতে চাওয়া হলো। বললেন, 'আমি জীবনের একটি শিক্ষা লাভ করেছি-যে ব্যক্তি তার ভাগ্য ও নিয়তি সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিতে পারবে এবং জীবনধারণের জন্য গরম রুটি ও শীতল পানি পাবে, সে সুখী জীবনযাপন করতে পারবে।'
বিশিষ্ট সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) (৩২ হি.) বলেন: 'আল্লাহ তা'আলা তাঁর ন্যায়ানুগতা ও ন্যায়পরায়ণতার মাধ্যমে অগাধ বিশ্বাস ও সন্তুষ্টির মানসিকতার মধ্যে প্রকৃত সুখ নিহিত রেখেছেন। আর দ্বিধা-সংশয়, অসন্তোষ ও ক্ষোভের মধ্যে দুঃখ-দুর্দশা ও মানসিক অপ্রসন্নতা ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে দিয়েছেন।'
📄 খেলাধুলা নিয়ে অন্যায় বাড়াবাড়ি ও পক্ষপাতিত্ব
খেলাধুলা নিয়ে অন্যায় বাড়াবাড়ি ও পক্ষপাতিত্ব একটি মানসিক ব্যাধি। যা ব্যক্তিকে তার পছন্দের খেলোয়াড় ও দলের সমর্থনে এবং প্রতিপক্ষের বিপক্ষে প্রান্তিক ও উগ্র করে তোলে। সমর্থনের এই বাড়াবাড়ি ও উগ্রতা কখনো কখনো অন্যকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, গালমন্দ, আরেক কদম আগে বেড়ে হাতাহাতির রূপ ধারণ করে। অর্থাৎ এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, যা খেলাধুলার স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা ব্যাহত করে।
অন্ধ ক্রীড়া উন্মাদনা সমর্থকদের মাঝে পরস্পর হিংসা, বিদ্বেষ, ঝগড়া-বিবাদ ও সম্পর্কচ্ছেদের মতো বিশ্রি পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। কখনো কখনো তা আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে হাতাহাতি ও মারপিটের রূপ পরিগ্রহ করে। অনেক পত্র-পত্রিকায় দেখা যায়, তারা এমন এমন রিপোর্ট করছে, যা ক্রীড়ামোদী সমর্থকদের মাঝে ক্রীড়া-উন্মাদনা উস্কে দেয়। বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়া ও স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোতে খেলাধুলা নিয়ে অনেক বাকবিতণ্ডা ও তর্কযুদ্ধ দেখা যায়। যার কোনো কোনোটি শেষ অবধি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। এভাবে অন্ধ ক্রীড়া-উন্মাদনার কারণে আনন্দ-উৎফুল্লতা বিষাদ-বেদনায় পর্যবসিত হয়, পরস্পর সৌহার্দ্য-ভালোবাসা বিভেদ-বিসংবাদের রূপ পরিগ্রহ করে। কোনো কোনো খেলার ম্যাচ দেখা গেছে সুষ্ঠুভাবে শেষ হয়ে পুরস্কার উদযাপনের পরিবর্তে গণ্ডগোল ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা বাঁধিয়ে সমাপ্ত হয়েছে।
এ ধরনেরর ক্রীড়া-উন্মাদনা ও দুর্গতি থেকে আমরা আমাদের প্রজন্মকে কীভাবে রক্ষা করতে পারি, কীভাবে তাদের মাঝে সুস্থ ক্রীড়া-বিনোদনের প্রাণ সঞ্চার করতে পারি, যা তাদের মাঝে বিভেদের পরিবর্তে সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করবে; বিদ্বেষের পরিবর্তে আন্তরিকতা বাড়াবে; সম্পর্কচ্ছেদের বন্ধন অটুট করবে?
সমাধান:
১. সামাজিক অঙ্গনে, বিশেষ করে ক্রীড়াঙ্গনে অহংকার-দাম্ভিকতা ও ঘৃণার সংস্কৃতি বাদ দিয়ে মানবিক উদারতা ও সুস্থ ক্রীড়া-মননশীলতার সংস্কৃতি বজায় রাখতে হবে। যাতে খেলোয়াড়, সমর্থক ও দায়িত্বশীলদের মন-মানসিকতা ও আচার-আচরণে অন্ধ বাড়াবাড়ি ও ক্রীড়া-উন্মাদনার কোনো ছাপ না থাকে এবং বর্তমান প্রজন্মের মাঝে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির সম্পর্ক গড়ে উঠে। কেননা খেলাধুলা কোনো বিপর্যয়-বিশৃঙ্খলা ও ঝগড়া-বিবাদের ক্ষেত্র নয়। তা হলো শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ রক্ষার একটি মাধ্যম মাত্র।
২. খেলাধুলা নিয়ে অন্যায় বাড়াবাড়ির বিষয়টি প্রশ্রয় না দিয়ে একে শাস্তিযোগ্য অপরাধের আওতাভুক্ত করতে হবে। এক্ষেত্রে যারাই খেলাধুলার অপব্যবহার করে উগ্রতা উসকে দিবে, অন্ধ উন্মাদনা মাতাবে, তাদেরকে শাস্তির আওতাভুক্ত করতে হবে।
৩. ক্রীড়াঙ্গনে যারা সুস্থ মননশীলতা, উদারতা, নিয়ম-নীতির অনুবর্তিতার পরিচয় দিবে, তাদেরকে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কৃত করতে হবে। যেন তারা নিজেদের এ বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে পারে এবং তাদের দেখে অন্যরাও অনুপ্রাণিত হয়।
৪. কথাবার্তায় সংযম, অন্যের প্রতি সদাচার, কাউকে কষ্ট না দেওয়া, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া ইত্যাদি বিষয়সংবলিত কুরআনের আয়াত ও হাদীস ব্যাপকভাবে প্রচার করা কর্তব্য।
৫. মনে রাখবেন, হোক ক্রীড়াঙ্গন কিংবা যেকোনো অঙ্গন, শরীয়তের দৃষ্টিতে সবক্ষেত্রেই বাড়াবাড়ি, উন্মাদনা ও পক্ষপাতিত্ব এবং এর কারণে যে ঝগড়া-বিবাদ, গালমন্দ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়-তা সবই নিষিদ্ধ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন: ‘তারপর লোকেরা তাদের মাঝে তাদের দীনকে বহুভাগে বিভক্ত করেছে। প্রত্যেক দলই তাদের কাছে যা আছে তা নিয়ে উৎফুল-।’ (মু'মিনুন, ২৩: ৫৩)
৬. সমাজের প্রতিটি স্তরে অভিভাবকগণ নিজেদের পরিবার ও ঘরে সন্তানদের মাঝে সৌহার্দ্য, উদারতা, প্রতিযোগিতামূলক চেতনা ও সহনশীল মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি অহংকার, দাম্ভিকতা, স্বজনপ্রীতির মতো নোংরা স্বভাবগুলো থেকে বিরত রাখতে হবে।
৭. প্রত্যেক দল ও ক্রীড়া সংস্থার পক্ষ থেকে প্রীতি-মিলন সভা আয়োজন কিংবা "ক্রীড়াঙ্গনে স্বজনপ্রীতিকে না বলুন” শিরোনামে প্রীতি ম্যাচের আয়োজন করতে হবে। এ ম্যাচ থেকে অর্জিত আয় এতিম-দুস্থদের কল্যাণ ফান্ডে জমা হবে। যাতে করে খেলোয়াড়, দর্শক ও ক্রীড়াসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যেও মানবিকতা ও দয়ার্দ্রতার অনুভূতি জাগরূক থাকে।
৮. খেলাধুলার বিষয়টি আনন্দ-বিনোদন ও সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার আঙ্গিকে গড়ে তুলতে হবে। একে এমন ছাঁচে ঢেলে সাজাতে হবে, যেন তা বিশ্বমানবতার দরবারে ধার্মিকতা, নীতি-নৈতিকতা ও মানবিকতার মহৎ বার্তার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে মূল্যায়িত হয়। যা মানুষের ইসলামের মহৎ শিক্ষাদীক্ষার বিস্তার ঘটাবে।
৯. খেলোয়াড় ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ ও সাধারণ কর্মকর্তাগণ বিবৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিটি কথা, প্রতিটি শব্দ ভেবে চিন্তে উচ্চারণ করবেন। তাদের কোনো কথা যেন পক্ষপাতদুষ্ট না হয় এবং অন্যের জন্য কষ্টদায়ক না হয়। কেননা ক্রীড়া বিভাগের অন্যদের জন্য তারা অনুসরণীয়।
১০. সাংবাদিক ও কলামিস্টদের কর্তব্য হলো সুস্থ ক্রীড়ামননশীলতা ভাব বজায় রেখে রিপোর্ট করা। তাদের লেখায় ক্রীড়া-উন্মাদনা ও পক্ষপাতের কোনো ছাপ না থাকে কিংবা সমর্থকদের মাঝে তা উস্কে দেওয়ার প্রবণতা না থাকে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন: ‘ তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে একে অন্যকে সহযোগিতা করবে। অন্যায় ও যুলুমের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে না। আল্লাহকে ভয় করে চলো। নিশ্চয়ই আল্লাহর শাস্তি অতি কঠিন।’ (সূরা মায়েদা, ৫: ২)
১১. এ মানসিকতা বদ্ধমূল করতে হবে যে, খেলায় হার-জিত স্বতঃসিদ্ধ ও অবশ্যম্ভাবী। হার কিংবা জিত কোনোটিই স্থায়ী নয়। সুতরাং ফলাফল যা-ই হোক না কেন, পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়ে তা স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে হবে।
১২. যে ব্যানার কিংবা প্ল্যাকার্ড দর্শকদের মাঝে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, তাদের সমর্থনে আঘাত হানে, তা নিয়ে স্টেডিয়ামে প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে হবে।
১৩. স্বাস্থ্য সচেতন হোন, এবং উন্মাদনা, বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জনের কারণে যে ধরনের রোগ-ব্যাধির জন্ম হয় (যেমন: ব্রেইন স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, হার্ট এ্যাটাক ইত্যাদি) থেকে বেঁচে থাকুন। সীমাহীন উন্মাদনা ও বাড়াবাড়ির বশবর্তী হয়ে টিভি পর্দায় ও স্টেডিয়ামে অনেককে এ ধরনের রোগে আক্রান্ত হতে দেখা গেছে。
পরিশিষ্ট:
সুফইয়ান ইবনু 'উয়াইনাহ্ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, আমর (রহ.) জাবির (রা.)-কে বলতে শুনেছেন, আমরা এক যুদ্ধে নবী করিম-এর সঙ্গে ছিলাম। তখন একজন মুহাজির একজন আনসারের নিতম্বে আঘাত করল। সে সময় আনসারী চিৎকার করে বলল, 'হে আনসারীরা!' আর মুহাজির ব্যক্তি হাঁক দিল, 'হে মুহাজিরগণ!' তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, 'কী ব্যাপার! জাহিলিয়্যা যুগের মতো হাঁক-ডাক কেন?' তারা বলল, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ! একজন মুহাজির একজন আনসারকে পাছায় আঘাত করেছে।' রাসূলুল্লাহ বললেন, 'তোমরা এরূপ কথাবার্তা ছেড়ে দাও। কেননা, এ-তো (দুর্গন্ধময়) ন্যক্কারজনক।' (মুসলিম, ৪/১৯৯৮)
আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম জাওযী (রহ.) (৬৯১-৭৫১ হি.) বলেছেন: 'দুধরনের বেশ ধারণ করা থেকে বিরত থাকুন। যে তার কোনো একটা ধারণ করবে, সে তিরস্কার ও ভর্ৎসনার শিকার হবেন।' এক. "জাহেলে মুরাক্কাব*"। দুই. তার চেয়ে জঘন্য হলো স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতিত্বের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া। আপনি বরং ন্যায়ানুগতার ভূমিকা পালন করুন। এটাই শ্রেষ্ঠ ভূমিকা।'
মোহনচাঁদ করমচাঁদ গান্ধী (মহাত্মা গান্ধী) (১৮৬৯-১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'মুষ্টিবদ্ধ হাতের সাথে আপনি কখনো হাত মেলাতে পারবেন না। বিবেক-বুদ্ধিতে জড়তাগ্রস্ত লোকের সঙ্গে তর্ক করে বোঝাতে পারবেন না।'
টিকাঃ
৮. যে জানে না। সে যে জানে না, এটাও জানে না।
📄 ব্যর্থতা
ব্যর্থতা হলো মানবজীবনের একটি কঠিনতম মুহূর্ত। আপনি যখন স্বপ্ন পূরণে নিজের অক্ষমতা টের পাবেন, হোক না তা সাময়িক, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে নিজের অপারগতা বুঝতে পারবেন, হোক না তা আপেক্ষিক, তা আপনার জীবনের স্বাভাবিক গতিপথকে ব্যাহত করবে এবং জীবনের পরম সুখ ও সৌভাগ্য অর্জনে আপনার পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে।
জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সফল হওয়ার জন্য আপনি যত চেষ্টাই করুন-না-কেন, ব্যর্থতার তিক্ত অভিজ্ঞতা আপনাকে কোনো না কোনো মুহূর্তে আস্বাদন করতেই হবে। এটাই হলো মানবজীবনের এক অবধারিত নীতি। মানুষের ক্ষমতা নেই, শতো সাধ্য-সাধনা করেও জীবনের এ তিক্ত বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার এবং তা থেকে মুক্তি লাভ করার। লেখাপড়া, চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিবাহ-শাদী মোটকথা জীবনের যেকোনো অঙ্গনেই আপনি যখন ব্যর্থ হবেন, তখন তা আপনার জন্য এক কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে। জীবন-যুদ্ধই হলো জয়-পরাজয়, দুঃখ-বেদনা, দারিদ্র্য-সচ্ছলতা, সফলতা-ব্যর্থতার নাম। আজকের দিনটি আপনার বেশ কাটবে তো আরেকদিন আপনাকে ভীষণভাবে ভোগাবে।
ব্যক্তি উচ্চ মনোবল, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ধৈর্য ও সহনশীলতা অনুযায়ী তার ব্যর্থতা বিভিন্ন রকম। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে, মনোবল হারিয়ে ফেলে। একপর্যায়ে ব্যর্থতার ঘূর্ণাবর্তে তার জীবনটাই হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ স্থবির। কখনো কখনো এ ব্যর্থতা জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে বিরাট দুশ্চিন্তা ও মানসিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জীবনভর সে অনুতাপ-আক্ষেপে ভুগতে থাকে। ব্যর্থতার কাটিয়ে সফলতা লাভ করার উপায় কী? জীবনের এ তিক্ততার সম্মুখীন হলে আমাদের করণীয় কী?
সমাধান:
১. প্রথমেই নিজের ব্যর্থতা ও বিফলতার দায় স্বীকার করুন। ব্যর্থতার দায়ভার অন্যের কাঁধে চাপিয়ে দায়মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করা বোকামি। এতে আপনার কাপুরুষতা ও সামনে অগ্রসর হওয়ার অপারগতা প্রকাশ পাবে। ব্যর্থতার কারণগুলো শনাক্ত করে তা সমাধানের চেষ্টা করুন এবং সফলতা লাভের জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও প্রতিশ্রুতিশীল হোন। তাহলেই সংকট ও প্রতিকূলতা কাটিয়ে সফলতা অর্জনের পথ সুগম হবে।
২. জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কী, কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য কী-এ মৌলিক প্রশ্নের উত্তর যদি আপনার জানা না থাকে, তাহলে আপনার পক্ষে কিছুতেই সফলতা অর্জন করা সম্ভব নয়। তাই প্রথমেই নিজের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নির্ধারণ করুন। তা বাস্তবায়নে যথাযথভাবে উদ্যোগী হোন। ব্যর্থ, নিরাশাবাদী ও হিংসুক লোকদের কথায় ভ্রূক্ষেপ করবেন না।
৩. বিজ্ঞ, অভিজ্ঞ ও গুণীজনদের পরামর্শ গ্রহণ করুন। তাদের বিজ্ঞতা, অভিজ্ঞতার পাথেয় সংগ্রহ করুন। যে সমস্ত কারণে আপনার ব্যর্থতার আশঙ্কা রয়েছে, তা চিহ্নিত করে এর যথাযথ সমাধান খুঁজে বের করুন এবং বাস্তব জীবনে তা থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করুন।
৪. ধৈর্য, সহনশীলতা ও নিরন্তর চেষ্টা-প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে রাসূল-এর শ্রেষ্ঠ আদর্শের অনুসরণ করুন। তাঁর মহৎ জীবনচরিত পাঠ করুন। তাতে ব্যর্থতা মোকাবিলা করার এবং সফলতার শীর্ষ চূড়ায় আরোহণ করার পথ ও পাথেয় বিদ্যমান।
৫. জীবন পরিবর্তনশীল, সফলতা ও ব্যর্থতার গণ্ডিতে আবর্তিত। তাই ব্যর্থতার তিক্ত অভিজ্ঞতায় ভেঙে পড়া, দুঃখ-ভারাক্রান্ত মনে একাকিত্ব বরণ করা সমীচীন নয়। ধৈর্যধারণ করুন। সহনশীল হোন। বিশ্বাস করুন, এ ব্যর্থতা ও প্রতিকূলতা নিতান্তই আপেক্ষিক। অচিরেই তা কেটে যাবে। আগত ভবিষ্যৎ আরও সুন্দর, আরও উজ্জ্বল। মনে রাখবেন, প্রত্যেক সফল ব্যক্তিরা আশাবাদী। ভবিষ্যতের উজ্জ্বল আশা বুকে ধারণ করেই তারা বেঁচে থাকেন। উন্নতি-অগ্রগতির পথে এগিয়ে যান।
৬. সফলতা অর্জনের পথে একের-পর-এক ভুল হওয়ার পরও অনবরত চেষ্টা করতে থাকুন। জীবনের একটি অঙ্গনে বিফল হওয়ার অর্থ এই নয় যে, সর্বক্ষেত্রেই বিফলতা অনিবার্য। তাই মেধা, যোগ্যতা ও সামর্থ্য অনুযায়ী নতুন কোনো ক্ষেত্রে চেষ্টা করুন। চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও লেখাপড়া-প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটি উপায় ও পন্থা যদি কাজে না আসে তবে ভিন্ন পথ ও পন্থা অবলম্বন করুন। একটি পিপীলিকা বারবার চেষ্টা-প্রচেষ্টার পরই সফল হতে পারে। বিদ্যুৎ আবিষ্কারক এডিসন সাতশতোবারের চেয়েও বেশি ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর বিদ্যুৎ আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
৭. অনেক পথে অগ্রসর হয়েছেন, বহু উপায় অবলম্বন করেছেন, কিন্তু কোনোটিতেই সফলতার দেখা পাননি। অবশেষে এমন এক পন্থা অবলম্বন করলেন, যা বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন ও দুরুহ। দুঃসাধ্য সাধন করার মানসিকতা নিয়ে সফলতা লাভের জন্য এ পথেই অগ্রসর হলেন। কিন্তু সফলতা অধরাই রয়ে গেল। তারপরও থেমে যাবেন না। নিরাশ হবেন না। নতুন আরেকটি পথ খুঁজে বের করুন। সে পথে অগ্রসর হোন। অতীতের সব ব্যর্থতার কথা ভুলে যান। নতুনভাবে শুরু করুন।
৮. অতীতের যেকোনো মহামনীষী, মহা আবিষ্কারক ও সফল ব্যক্তিগণ জীবনের কোনো-না-কোনো পর্যায়ে একবার হলেও ব্যর্থতার শিকার হয়েছেন। তাদের মাধ্যমে সান্ত্বনা গ্রহণ করুন।
৯. কল্পনাপ্রসূত ও বাস্তবতাবিবর্জিত এমন লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নির্ধারণ করবেন না, যা বাস্তবায়ন করা শুধু দুঃসাধ্যই নয়, রীতিমতো অসম্ভব। মেধা ও যোগ্যতা, সাধ্য ও সাধনা অনুযায়ী সম্ভাব্য লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নির্ধারণ করুন। যে কোনো লক্ষ্য বাস্তবায়নের পূর্বে তার ভালো-মন্দ বিচার-বিশ্লেষণ করে, বিজ্ঞজনের পরামর্শ গ্রহণ করে তবেই শুরু করুন।
১০. ব্যর্থতা ও অকৃতকার্যতা হলো জীবনের এমন এক প্রতিকূল পরিস্থিতি, যখন সহনশীলতা ও ধৈর্যধারণের মাধ্যমে আপনি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে প্রতিদানপ্রাপ্ত হতে পারেন। মনে করতে হবে, সাময়িক ব্যর্থতা হলো নিজের ভুল-বিচ্যুতির প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ। নিজের প্রচেষ্টা যখন ব্যর্থ হবে, নিষ্ফল হবে, তখন আল্লাহ তা'আলার এই মহান বাণী স্মরণ করুন: ‘তোমরা কোনো বিষয় অপছন্দ করো; কিন্তু আশা করা যায় তাতেই তোমাদের জন্য মঙ্গল রয়েছে।’ (বাকারা, ২: ২১৬)
১১. আলাহ তা'আলার আশ্রয় গ্রহণ করুন। নিজের যাবতীয় গুনাহ, ও নাফরমানি থেকে তওবা করুন। কেননা গুনাহ পাপাচার হলো সমস্ত ব্যর্থতা, অকৃতকার্যতা ও পরাজয়ের অন্যতম কারণ। উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয়ে আল্লাহ তা'আলা তাঁদের উদ্দেশ্যে বলেন (পবিত্র কুরআনের ভাষায়): ‘আপনি বলুন, এ পরাজয় তোমাদের নিজেদের কারণেই হয়েছে।’ (আলে ইমরা, ৩: ১৬৫)
১২. আপনার মন থেকে এ ধরনের শব্দগুলো চিরতরে মুছে ফেলুন-'আমি পারব না, আমার দ্বারা হবে না, আমি কিছুতেই সফল হতে পারব না, হয়ত আমি ব্যর্থ হব।' সমস্ত নেতিবাচক চিন্তা-চেতনা ঝেড়ে ফেলুন। উচ্চাকাঙ্ক্ষা, দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ও বুক ভরা আশা নিয়ে অনবরত চেষ্টা করুন।
১৩. জীবনের সাময়িক ব্যর্থতা মেনে নিন। ব্যর্থতার অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে সফলতার পথ আবিষ্কার করুন। এ বিপর্যয়কে এতটুকুন প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না, যা আপনার ওপর চেপে বসে, মন-মানসিকতাকে নিস্তেজ করে ফেলে, আপনার নিরাশা ও হতাশার চূড়ান্ত করে ছাড়ে। জীবনের এই উত্থান-পতনকে জীবনপাঠের ইতিবাচক প্রক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করুন।
14. বিশ্বাস করুন, ব্যর্থতা হলো আপনার অভিজ্ঞতার পরিমার্জন, ভুল-বিচ্যুতির সংশোধন এবং সফলতার প্রাসাদ গড়ার জন্য এক-একটি পোড়া ইটের মতো। ব্যর্থতা আপনার অভিজ্ঞতা ও চিন্তার জগৎকে আরও প্রসারিত করবে, সফলতার পথে পাথেয় জোগাবে।
১৫. গঠনমূলক আত্মসমালোচনা এবং নিজেকে অনবরত তিরস্কার ভর্ৎসনা-এ দু'টি বিষয়ের মাঝে পার্থক্য বোঝার চেষ্টা করুন। আপনাকে অতি অবশ্যই নিয়মিত আত্মসমালোচনা করতে হবে এবং তা হতে হবে গঠনমূলক। নিজের ভুল-বিচ্যুতিগুলো সংশোধন করার এবং তা থেকে শিক্ষণীয় পাথেয় অর্জন করার ক্ষেত্রে এটা কার্যকর উপায়। জেনে রাখুন, কোনো একটি ক্ষেত্রে ব্যর্থতা এটা প্রমাণ করে না যে, সর্বক্ষেত্রেই আপনি ব্যর্থ অকৃতকার্য; বরং এর মাধ্যমে আপনি এমন একটি পথ সম্পর্কে জানতে পারলেন, যা আপনার লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের জন্য উপযুক্ত ছিল না।
১৬. আপনার ব্যর্থতার কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন। আসল সমস্যা কোথায়-তা চিহ্নিত করুন। তা কি আপনার অনুসৃত পথ- পন্থায় না কি স্বয়ং লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে। কেননা আমাদের অনেকেই যখন ব্যর্থ হয়, আপন লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে শুরু করে। অথচ সমস্যাটা ভিন্ন জায়গায়, তার অনুসৃত পথ ও পন্থায়। আবার কখনো কখনো সমস্যা লুকিয়ে থাকে স্বয়ং উদ্দেশ্যের মধ্যেই। তাই প্রথমেই তা চিহ্নিত করে খুঁজে বের করতে হবে এরপর সে অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।
১৭. অতীতের যত নিষ্ফল কার্যকলাপ, ব্যর্থ চেষ্টা-প্রচেষ্টা, তার কথা স্মরণ করে আফসোস-অনুতাপে ডুবে থাকবেন না। হা-হুতাশ করে কেঁদে মরবেন না। এভেবে সান্ত্বনা গ্রহণ করুন, অতীতের বিফলতায় শিক্ষার অনেক কিছুই আছে, যা আপনার অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছে। জীবনের এ বাস্তব শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা অমূল্য সম্পদ।
১৮. লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে আপনি দৃঢ়চেতা ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হোন। যত অবহেলা-অলসতা সব ঝেড়ে ফেলুন। আল্লাহ তা'আলার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করুন। তাঁর ওপর ভরসা করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা তাঁর ওপর ভরসাকারীদের পছন্দ করেন।
১৯. আলবার্ট আইনস্টাইনের কথা চিন্তা করুন, চার বছর বয়স পর্যন্ত তিনি একটি কথাও শিখে উঠতে পারেননি। নয় বছর বয়স অবধি লিখতেও জানতেন না। জীবনের প্রথম ধাপেই এই পিছিয়ে পড়া, এই অধঃপতন তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। নিরাশা ও হতাশা তাকে গ্রাস করতে পারেনি। অদম্য মানসিকতা ও নিরন্তর অধ্যবসায় তাকে ইতিহাসের মহামনীষীদের কাতারে শামিল করেছে।
২০. ব্যর্থতার পর্যায় অতিক্রম করে সফলতার গন্তব্যে পৌঁছতে হলে আপনাকে নিজের দুর্বলতার দিকগুলো চিহ্নিত করতে হবে। সামর্থ্য ও শক্তিমত্তার দিকগুলোও সুনির্দিষ্ট করতে হবে। এর মাধ্যমে দুর্বলতা কাটিয়ে উঠে যোগ্যতার সফল প্রয়োগ সুনিশ্চিত করতে সক্ষম হবেন।
২১. দিনের প্রতিটি মুহূর্তকে একটি ছকে বেঁধে নিন। রুটিন মাফিক জীবনযাপন করুন। প্রতিদিনের একটি কার্যপরিকল্পনা নির্ধারণ করুন। তা বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হোন। প্রতিদিনের দু'-এক কদম করে অগ্রসর একদিন আপনাকে সুদূর লক্ষ্যে পৌঁছে দিবে। আর সময় নষ্ট করা এবং অনর্থক কাজে পড়ে থাকা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। পরিকল্পনাহীন কাজ, ছাড়া লাগামহীন জীবনযাপন আপনাকে নানামুখী ও বিধ্বস্ত করে ফেলবে। উদ্দেশ্যহীন নানা লক্ষ্যের দিকে ছুটে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য বিপন্ন হবে।
২২. চেষ্টা করুন। পরিশ্রম করুন। আল্লাহ তা'আলা আপনাকে যেমন আদেশ করেছেন, তা মেনে চলুন। আপনার যাবতীয় কল্যাণের ফায়সালা তাঁর হাতেই ন্যস্ত করুন। এমন লোকদের মতো হবেন না, যারা কোনো চেষ্টা-পরিশ্রম ও অধ্যবসায় ছাড়া অথর্ব জড়পদার্থের ন্যায় পড়ে থাকে, বসে বসে সফলতার দিন গুণে, কৃতকার্যতার আকাশকুসুম কল্পনা করে।
২৩. আত্মবিশ্বাসী হোন। নিজের সামর্থ্য ও শক্তিমত্তার প্রতি সজাগ হোন। অনাস্থা ও হীনম্মন্যতা, সৃজনশীলতা ও সৃষ্টিশীলতায় আপনার সামর্থ্যকে দুর্বল করে দিবে, দ্রুত ব্যর্থতা ও হতাশার পথে ঠেলে দিবে।
২৪. বিশ্বাস করুন, আপনার সমস্যার সমাধান নিশ্চয়ই আছে। ব্যর্থতার তিক্ত অভিজ্ঞতাই আপনাকে সফলতার পথ দেখাবে। স্মরণ করুন মহান রবের শক্তিমত্তার কথা, কোনো কিছুই যাকে অক্ষম করতে পারে না, যে সত্তা রাতের অন্ধকারের পর আলোকময় ভোর উদিত করেন, সে সত্তা আপনার সমস্যার সমাধানও করতে জানেন।
২৫. উজ্জ্বল আগামীর প্রতি আশাবাদী হোন। দিল-দেমাগ থেকে যত নেগেটিভ চিন্তা-ভাবনা ঝেড়ে ফেলুন। সবসময় পজেটিভ ও ইতিবাচক চিন্তা করতে শিখুন। কেননা জীবন তো চিন্তা-চেতনারই বাস্তব চিত্র। স্বপ্নবান ও আশাবাদী ব্যক্তিদের সঙ্গে উঠাবসা করুন। ব্যর্থ ও নিরাশাবাদী লোকদের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকুন।
২৬. যেকোনো দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে সুচারুভাবে সম্পন্ন করুন। সমস্ত অলসতা ও হতাশা ঝেড়ে ফেলে আপন লক্ষ্যে নিরন্তর এগিয়ে যান। কয়েক দিন লম্ফঝম্ফ করে কিছু দিনের মধ্যেই সফলতা অর্জন করে ফেলার চিন্তা অবান্তর। নিজের কাজগুলো নিখুঁতভাবে করে যান। জগতের চির অবধারিত রীতি অনুযায়ী সফলতা আপনার হাতে ধরা দিবে। আল্লাহ তা'আলার বানী স্মরণ করুন: ‘আল্লাহ তা'আলা নিশ্চয়ই উত্তম আমলকারীদের প্রতিদান নষ্ট করবেন না।’ (তওবা, ৯: ১২০)
পরিশিষ্ট:
বিশিষ্ট জার্মান ধর্মযাজক ও প্রটেস্ট্যান্ট ধর্মবিপ্লবের সূতিকাগার (১৪৮৩-১৫৪৬ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'গভীর আস্থা ও অগাধ আত্মবিশ্বাস নিয়ে লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের প্রথম ধাপটি শুরু করে দিন। চূড়ান্ত লক্ষ্যে আপনাকে পৌঁছতেই হবে-এমন আবশ্যকীয়তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। আপনি যখন সিঁড়ির সর্বোচ্চ ধাপটি দেখতে পাচ্ছেন, তখন সিঁড়ির প্রথম ধাপটি নিশ্চিন্তে অতিক্রম করতে পারেন।'
বিখ্যাত আরব কবি আবূ তায়্যেব মুতানাব্বি (৩০৩-৩৫৪ হি.) বলেছেন: 'আপনি যখন শীর্ষ চূড়ায় উঠে পড়েছেন, তখন আকাশের তারা না ছুঁয়ে দমে যাবেন না। কেননা হীন তুচ্ছ কাজে মৃত্যুর স্বাদ আর বিরাট মহৎ কাজে মৃত্যুর স্বাদ-দুটি একই রকম।'
আলজেরিয়ান বিশিষ্ট লেখিকা ও ঔপন্যাসিকা আহলাম মুসতাগনেমি (জন্ম: ১৯৫৩ খৃষ্টাব্দ) বলেছেন: 'ব্যর্থতার মতো সফলতাও একটি দারুণ অভিজ্ঞতা, যা আপনার চারপাশের মানুষকে দারুণভাবে উপকৃত করতে পারে। যে আপনার কাছের মানুষ বন্ধুজন, আপনার সফলতাকে পুঁজি করে সে নিজের উন্নতি-অগ্রগতিতে কাজে লাগাবে। কিন্তু যে আপনার প্রতি বিরুদ্ধভাবাপন্ন, আপনার সফলতা তার ব্যর্থতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিবে। আর যে সফলতা লাভ করতে গিয়ে ব্যর্থতার শিকার হয়েছে, আপনার সফলতা দেখে সে নিজের জীবনে সতর্কতা অবলম্বন করবে।'
সিরিয়ার প্রবাসী কবি ইলিয়াস কানসাল (১৯১১-১৮১ খৃষ্টাব্দ) বলেছেন:
দৃঢ় অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধতার তরবারি খাপ মুক্ত কর। এর সাহায্যে আপন লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন কর। দ্বিধা, সংশয় মানুষের মাঝে যত দুর্বলতা, হীনম্মন্যতা ও অলসতা সৃষ্টি করে।
চেষ্টা-প্রচেষ্টা যতই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হোক-না-কেন, ভীরুতা দ্বিধা-সংশয়, অলসতা থেকে তা হাজার গুণে উত্তম।
অলসতা শৈথিল্য অর্থর্বতা-এগুলোকে অসতর্কতা ও অসাবধানতা বলে যতই চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করো-না-কেন, তা কতই না মন্দ। মৃত্যু ও প্যারালাইসিস-এর মধ্যে পার্থক্য কতই না ক্ষুদ্র।
জীবনের মর্যাদা ও গৌরব তো এমন ব্যক্তির জন্যই, জীবনে সফল হতে পেরে যে তৃপ্ত পরিতৃপ্ত। যেকোনো সফলতা, কৃতকার্যতা নিয়ে চিন্তা করে দেখো, তাতে সামান্য হলেও ব্যর্থতা ও অকৃতকার্যতার অবদান রয়েছে।
📄 মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের অবাধ্যতা
মা-বাবা কখনো কখনো ছেলে-মেয়ের অবাধ্যাচারে চরম ভোগান্তির শিকার হন। পরস্পর ভালোবাসা ও আন্তরিকতা ক্ষোভে পরিণত হয়। পরিবারে মা-বাবা ও সন্তানদের মাঝে ঘৃণা ও অবজ্ঞার এক অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সন্তানদের চরম অবাধ্যতার একটি পর্যায়ে এসে অনেক মা-বাবাই তাদের প্রতি নিরাশ হয়ে পড়েন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে বাধ্য হন।
তাদের কেউ কেউ গায়ের জোর ও শক্তি খাটিয়ে, কঠোরতা ও শাস্তি প্রয়োগ করে সন্তানদের অবাধ্যতা রোধ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু অধিকাংশ সময়ই তা হিতে বিপরীত হয়। মা-বাবার কঠোর অবস্থান ও বাধ্যবাধকতার মানসিকতা সন্তানদের অবাধ্যতা ও বিরুদ্ধাচারের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। আবার কোনো কোনো মা-বাবা আদর-সোহাগ ও মায়া-মমতা দিয়ে সন্তানকে বোঝাতে চান। চেষ্টা করেন তাকে অবাধ্যতার পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু অনেক সন্তানই বাধ্য হওয়ার পরিবর্তে মা-বাবার আদর-সোহাগকে দুর্বলতা ও অপারগতা ভেবে অবাধ্যতা ও স্বেচ্ছাচারিতাতেই মজে থাকে।
মা-বাবা সন্তানদের থেকে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও তিক্ত অভিজ্ঞতার শিকার হয়ে তাদের অভিযোগ-অনুযোগের আর কোনো শেষ থাকে না। সন্তানকে নিয়ে তাদের ভেতর মানসিক অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা কাজ করে। যে পারিবার হয়ে উঠার কথা ছিল সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যময় জান্নাতের টুকরা, মা-বাবার প্রতি সন্তানের অবাধ্যতা ও বিরুদ্ধাচারিতায় একসময় তা-ই হয়ে উঠে জাহান্নামের গহীন গর্ত। অবস্থা তো কখনো কখনো এমন সঙ্গিন আকার ধারণ করে যে, পিতা-মাতা সন্তানকে ঘরছাড়া করতে বাধ্য হন। সন্তানের অবাধ্যতায় ক্ষোভ ও ঘৃণা, অসন্তোষ ও দুশ্চিন্তা এমন চরম পর্যায়ে এসে ঠেকে, মা-বাবা নিজেকে এ প্রবোধ দিয়েই সান্ত্বনা গ্রহণ করেন যে, তারা কোনো সন্তানের জন্ম দেননি। কোনো শিশু মানব-মানবীর চেহারা দেখেননি। এ হলো একজন মা-বাবার জীবনে চরম বঞ্চনা ও নিরাশার পরিস্থিতি।
পিতা-মাতা সমাজের জ্ঞানীগুণী বিজ্ঞজনদের নিকট নানাভাবে বহু প্রশ্ন করে তাদের সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ ও পন্থা জানতে চান। অস্থির চিত্তে তারা তাদের গুরুতর সমস্যা সমাধানের পথ খোঁজেন। প্রকৃতপক্ষে এ সমস্যার সমাধান কী? এ সংকট থেকে উত্তরণের পথ কী?
সমাধান:
১. সন্তানের প্রতি যত্নবান হোন তাদের সাথে সহজ সরল ও আন্তরিকভাবে মিশে থাকুন। মায়া মমতা ও হাসি-আনন্দে তাদের জীবনকে ভরিয়ে তুলুন। একটি শুষ্ক ভূমি যেমন অবিরাম বৃষ্টির প্রতীক্ষায় থাকে, তেমন সন্তানরাও যেন আপনার আগমনের অপেক্ষায় অধীর থাকে।
২. সন্তানদের মঙ্গল ও কল্যাণ কামনা করে দোয়া করুন। আল্লাহ তা'আলার কাছে তাওফিক কামনা করুন। সন্তানদের সাথে কোনো প্রকার বৈষম্যমূলক আচরণ করবেন না। আপনার ঐকান্তিক চেষ্টা থাকবে, সন্তানদের প্রতি সমান আন্তরিকতা, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের পরিচয় দেওয়া।
৩. সন্তানদের ছোটোখাটো ভুল-ত্রুটিতে কিংবা গুরুতর কোনো ভুলই হোক-না-কেন, অন্যদের সামনে তাদের বকাঝকা করা, তিরস্কার-ভর্ৎসনা করার মানসিকতা পরিহার করুন। কারণ, এর ফলে সন্তানের মনে আপনার প্রতি যে বিশ্বাস ছিল, তা ভেঙে যাবে এবং তারা আত্মবিশ্বাস হারাবে। আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলা আত্মহত্যারই নামান্তর।
৪. সন্তানদের ধর্মেকর্মে অনুপ্রাণিত করুন। কেননা তারা যখন আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবাসতে শিখবে, তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে এমন মহৎ কাজগুলো করতে থাকবে যার মাধ্যমে তারা আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করতে পারে। আর মা-বাবার প্রতি সদাচার করা আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম।
৫. সন্তানদের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনা করুন। তাদের জীবনের নানা বিষয় সম্পর্কে তাদের মতামত ও অভিব্যক্তি জানতে চেষ্টা করুন। কোনো ভুল-বিচ্যুতি চোখে পড়লে সুন্দরভাবে তা বুঝিয়ে দিন। কঠোর ভাষা ও গালমন্দের ভাষা পরিহার করুন।
৬. মা-বাবার প্রতি সদাচারী হোন। আপনার সদাচার সন্তানদের মধ্যে ক্রিয়াশীল হবে। এ যেন প্রকারান্তরে আপনার কর্মের প্রতিফল। বিজ্ঞজনদের বাণী, 'তুমি তোমার মা-বাবার প্রতি সদাচারী হোন, সন্তানরাও আপনার প্রতি সদাচারী হবে।'
৭. সন্তানদের লালন-পালন ও তাদের শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে মা-বাবার পরস্পর সহযোগিতা ও বোঝাপড়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মা-বাবার পরস্পর ঝগড়া-বিবাদ, বৈরিতাপূর্ণ আচার-ব্যবহার পরিবারের মাঝে অস্থিরতা, বিক্ষুব্ধতা সৃষ্টি করে। যা সন্তানদের মন-মানসিকতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দিন-দিন তারাও মা-বাবার পরস্পর ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে পড়ে। তাই পারিবারিক বন্ধন মজবুত করুন। পরস্পর সহযোগিতা ও বোঝাপড়ার মানসিকতা অবলম্বন করুন।
৮. পারিবারিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সন্তানদের মতামত যাচাই করুন। বাস্তব জীবনের নানা-বিষয়ে তাদের চিন্তা ও অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করার সুযোগ দান করুন। যৌক্তিকতা ও যথার্থতার ভিত্তিতে প্রয়োজনে তাদের মতামত গ্রহণ করুন। এ ক্ষেত্রে তাদের মেধা ও বুদ্ধির প্রশংসা করে তাদেরকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলুন।
৯. সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৎসঙ্গ আপনার সন্তানকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে। আর অসৎ সঙ্গ তাদের চারিত্রিক ও নৈতিক অবনতি ঘটাবে। তাদেরকে বড়দের প্রতি অশ্রদ্ধা ও অবাধ্যতায় দুঃসাহসী করে তুলবে।
১০. কথা-কাজের অমিল হওয়ার ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক থাকুন। অনেক মা-বাবাই সন্তানদের একরকম শেখায়, আর নিজেরা অন্য রকম করে। কথা-কাজের এমন অমিল সন্তানদের চোখে মা-বাবার ব্যক্তিত্বকে খাটো করে। তাদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
সম্মানদের প্রতি কয়েকটি মূল্যবান উপদেশ:
১. মা-বাবার সাথে সদাচারের ক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করুন। তাঁরা হলেন আপনার জন্য জান্নাতের খোলা দরজা। আপনার কুকীর্তির কারণে তা যেন বন্ধ না হয়ে যায়।
২. কোনোভাবে যদি আপনি আপনার মা-বাবার সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারেন, তাদের দু'আ লাভ করতে পারেন, তাহলে তা হবে আপনার সফলতা ও সৌভাগ্যের বিরাট অর্জন।
৩. মনে রাখবেন, আপনি যতই উচ্চশিক্ষিত হোন না, যতই উচ্চপদস্থ হোন না কেন, আর মা-বাবা যতই অজ্ঞ-সাধারণ হোন না কেন, আপনি যখন তাঁদের কাছে অবস্থান করবেন, তাদের অনুগত সেবক হয়ে থাকবেন।
৪. মা-বাবার উদ্দেশ্যে কিছুতেই এমন শব্দ উচ্চারণ করবেন না, যাতে তাদের মনে এতটুকুন ব্যথার উদ্রেগ ঘটে। এ হলো আপনার প্রতি মাহান আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ: ‘আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করবে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উফ্’ বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না। আর তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বল।’ (বনী ইসরাঈল, ১৭: ২৩)
৫. মা-বাবার কোনো একজন যখন আপনাকে ডাকবে, যত গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত থাকেন-না-কেন, সব ছেড়ে তাদের ডাকে সাড়া দিন। প্রথমে তাদের আদেশ পালন করুন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেন: ‘হে আমার রব, তাদের প্রতি দয়া করুন যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে লালন-পালন করেছেন।’ (বনী ইসরাঈল, ১৭: ২৪)
৬. প্রত্যেক নামাযে, প্রত্যেক ইবাদতে, যেকোনো দু'আর উপলক্ষ্যে মা- বাবার জন্য দু'আ করতে ভুলবেন না। দু'আ কবুলের বিশেষ মুহূর্তগুলোতে মা-বাবার জন্য বেশি বেশি করে দু'আ করুন।
৭. মা-বাবা যখন কথা বলবে, তাদের কথার মাঝে কথা বলবেন না। উচ্চ স্বরে কথা বলবেন না। পূর্ণ মনোযোগ ও আগ্রহ ভরে তাদের কথা শুনুন। আপনার কিছু বলার থাকলে বিনম্রভাবে বলুন।
৮. আপনার স্বার্থে মা-বাবা যে ত্যাগ শিকার করেছেন, তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন। আপনার প্রয়োজনের আগে তাঁদের প্রয়োজনের কথা ভাবুন। আপনার কাজটি সমাধা করার আগে তাঁদের কাজ সমাধা করুন।
৯. কোনোক্রমেই মা-বাবার সঙ্গে ঝগড়ায় জড়াবেন না, এমনকি তাঁদের ভুল-বিচ্যুতিতেও না। এক্ষেত্রে আপনার করণীয় হবে বিনম্রভাবে যথার্থ বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করা। কখনো স্ত্রী, সন্তান ও বন্ধু-বান্ধবদের, মা-বাবার ওপর প্রাধান্য দিবেন না।
১০. বিভিন্ন আয়োজন-উপলক্ষ্যে মা-বাবাকে উপহার প্রদান করুন। এতে তাঁদের প্রতি আপনার সম্মান ও আন্তরিকতাবোধ প্রকাশ পাবে। উপহার- উপঢৌকন হলো পরস্পর সম্পর্কোন্নয়ন ও আন্তরিকতা বৃদ্ধির অন্যতম উপায়।
টিকাঃ
১. البحر المديد في تفسير القرآن المجيد (৩/ ১৯৩) *
পরিশিষ্ট:
মুফাসসির সাআলাবী ও আরও কয়েকজন মুফাসসির এ ঘটনাটি বর্ণনা করেন: এক ব্যক্তি রাসূল -এর দরবারে এসে হাযির হলো। কেঁদে-কেঁদে অভিযোগ-অনুযোগ করতে লাগলো। নিজ সন্তানের ব্যাপারেই তার সব অভিযোগ-অনুযোগ:
'আমি কত রাত জেগেছি, যেন সে শান্তিতে ঘুমাতে পারে। আমি ক্ষুধার্ত থেকেছি, যেন সে তৃপ্তিভরে আহার করতে পারে। তার সুখের জন্য আমি কত কষ্ট করেছি। এখন সে শক্তিশালী যুবক। আর আমি দুর্বল বৃদ্ধ। পিতা হিসেবে তার ওপর আমার যে অধিকার রয়েছে, নির্লজ্জভাবে সে তা অস্বীকার করেছে। তার ওপর আমার যে অবদান ও অনুগ্রহ রয়েছে, সে তার প্রতি অবজ্ঞা ও অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। সে আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আল্লাহ্ তা'আলাও তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিক।' এতটুকু বলেই লোকটি আবার কাঁদতে লাগল। সে ছিল কবি। রাসূল তাকে জিজ্ঞেস করলেন: 'এ নিয়ে কি কোনো কবিতা রচনা করেছ?' বলল, 'হ্যাঁ।' এরপর লোকটি আবৃত্তি করতে শুরু করলো:
'আমি তোমাকে লালন-পালন করেছি, তখন তুমি শিশু ছিলে। যখন তুমি যুবক হয়েছ, তখনো আমি তোমার পরিপূর্ণ দেখভাল করেছি। আমার সাধ্য ও সামর্থ্যের সবটুকু ব্যয় করে তোমার আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছি। কত রাত তোমার অসুস্থতায় শিয়রে বসে বিনিদ্র রজনী কাটিয়েছি। তোমার অসুস্থতার পীড়া দেখে এমন মানসিক যন্ত্রণায় ভুগেছি, দু'চোখ এমন ভীষণভাবে অশ্রু বিসর্জন করেছে, যেন স্বয়ং আমিই অসুস্থ। আজ আমার জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে তুমি যখন যৌবনে পদার্পণ করেছ, কঠোরতা ও রূঢ়তার তিক্ত প্রতিদানে তুমি আমাকে জর্জরিত করলে। ভাবখানা এমন যে, এতকাল ধরে তুমিই আমার ওপর অনুগ্রহ করে এসেছ। আমি ছিলাম তোমার অনুগ্রহ প্রার্থী। হায় আফসোস! তুমি যদি আমার পিতৃত্বের সম্মানটুকুও দিতে না পার, তবে তা-ই কর। যেমন অনেক দুষ্ট লোক তার প্রতিবেশীর সাথে করে। আমাকে তুমি বিকারগ্রস্ত বলে আখ্যায়িত করো। অথচ তোমার বোধ-বুদ্ধি বিকারগ্রস্ততায় জর্জরিত।'
তার কবিতা শুনে রাসূল ও উপস্থিত সাহাবাগণ কেঁদে ফেললেন। রাসূল তার ছেলেটিকে ডেকে পাঠালেন। তাকে তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করলেন এবং ছেলেটির জামা ধরে তার উদ্দেশ্যে বললেন:
'তুমি ও তোমার তোমার সম্পদ তোমার পিতার কল্যাণে।'
হে আল্লাহ! আপনি আমাদের মা-বাবার প্রতি সন্তুষ্ট হোন। তাঁদের মধ্যে যারাই জীবিত আছেন, তাদেরকে সুস্থতা ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দান করুন। তাঁদের মধ্য হতে যারা কবরবাসী হয়েছেন, তাদেরকে আপনি ক্ষমা করুন এবং তাদের প্রতি রহম করুন। আমীন।