📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 ফাসাদ ও দুর্নীতি

📄 ফাসাদ ও দুর্নীতি


ফাসাদ ও দুর্নীতি হলো ন্যায় ও ন্যায়ানুগতা, সততা ও নৈতিকতা থেকে বিচ্যুতি। সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য দুর্নীতি এক দুরারোগ্য ব্যাধি ও ধ্বংসাত্মক বিপর্যয়। যা ব্যক্তি হতে শুরু করে সমাজ, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রযন্ত্রের রগরেশায় ছড়িয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের প্রতিটি সেক্টরে অন্যায়-অনাচার, ধোঁকা-প্রতারণার জাল বিস্তার করে। উন্নয়ন ও অগ্রগতির চাকা স্থবির করে দেয়।

দুর্নীতির উপসর্গগুলো হলো, ঘুষ, ছিনতাই, অপহরণ, জনসাধারণের অর্থ-সম্পদ আত্মসাৎ, স্বজনপ্রীতি, সাম্প্রদায়িকতা ও অন্যের অধিকার হরণ ইত্যাদি। কোনো সমাজের সর্বত্র যখন দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ে এবং শিকড় গেড়ে বসে তখন তা নির্মূল করা দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ, ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য। আন্তর্জাতিক দুর্নীতিদমন কমিশন ফাসাদ ও দুর্নীতিকে 'ব্যক্তিগত লাভ এবং স্বার্থসিদ্ধির জন্য ক্ষমতার অপব্যবহার' বলে আখ্যায়িত করেছে।

ফাসাদ ও দুর্নীতির বহু ধরন রয়েছে। যেমন: মানুষের নীতি-নৈতিকতা, চিন্তা-চেতনার অধঃপতন, বোধ ও বিশ্বাসের ভ্রষ্টতা, সামাজিক কৃষ্টিকালচারের বিচ্যুতি, শান্তি ও নিরাপত্তার সংকট, আর্থিক দুর্নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ও রাজনৈতিক অনাচার ইত্যাদি। এ ছাড়া আরও অসংখ্য বিচিত্র দুর্নীতি রয়েছে। যা মানুষের দেশ, বর্ণ, ধর্ম ও মতাদর্শের ভিন্নতার কারণে হয়ে থাকে। বর্তমান বিশ্ব এই মহাসংকটে জর্জরিত। এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কী? দুর্নীতি থেকে বাঁচার উপায় কী?

সমাধান:
১. বর্তমান তরুণ প্রজন্মকে নৈতিক শিক্ষাদীক্ষা ও সুস্থ চিন্তা-চেতনার আলোকে গড়ে তুলতে হবে। তাদের নীতি-নৈতিকতা ও ধর্মপরায়ণতায় অনুপ্রাণিত করতে হবে। যেন দৈনন্দিন জীবনে ধর্মীয় বিধি-নিষেধ মেনে চলার পাশাপাশি সুস্থ বিবেক-বুদ্ধিতে বিচার-বিশ্লেষণ করতে শেখে।
২. তরুণ প্রজন্মকে দেশ, জাতি ও সমাজের উন্নয়নে অনুপ্রাণিত করতে হবে এবং তা শুরু হবে পরিবার থেকে, মা-বাবার পক্ষ থেকে। পর্যায়ক্রমে প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকমণ্ডলী ও মসজিদের মিম্বরে আলেমগণের পক্ষ থেকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
৩. পূর্ববর্তী জাতিবর্গ তাদের বোধ-বিশ্বাস, স্বভাব-চরিত্র ও নীতি-নৈতিকতায় অনাচারের কারণে যে অধঃপতন ও বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে, সে সম্পর্কে তরুণ প্রজন্মকে সচেতন করতে হবে।
৪. আকিদা ও ধর্মবিশ্বাস পরিশুদ্ধ করে সকলকে কল্যাণ ও উন্নতির দিকনির্দেশনা প্রদান করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে অন্যায়, বিশৃঙ্খলা, ধ্বংস ও বরবাদির পথ থেকে বারণ করা কর্তব্য। এ ক্ষেত্রে দ্বীনের দায়ী, খতীব, শিক্ষক, চিন্তাবিদ ও লেখক-প্রত্যেককেই কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। যেন গণমানুষের স্বভাবজাত প্রবণতাই হয়ে উঠে সংশোধন ও কল্যাণমুখী, অনিষ্ট ও অকল্যাণ-বিমুখ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন: ‘আর যখন তাদের বলা হয়, তোমরা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা বিস্তার করো না, তখন তারা বলে, আমরা তো শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী। মনে রেখ, এরাই বিশৃঙ্খলা বিস্তারকারী। কিন্তু এর উপলব্ধি তাদের নেই।’ (বাকারা, ২: ১১, ১২)
৫. কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ ও যাচাই-বাছাই করে নিয়োগ দেওয়া কর্তব্য। সৎ, নীতিবান, বিবেকবান, বিচক্ষণ, যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। “যোগ্য পদে যোগ্য ব্যক্তির নিয়োগ”- এ মূলনীতি যেন ঠিক থাকে। এতে করে দুর্নীতির পথ বন্ধ হবে। ন্যায়-নীতি, সততা ও কল্যাণের পথ সুগম হবে। শ্রমিক ও কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও বিশ্বস্ততা হলো প্রধান মানদণ্ড। পবিত্র কুরআনেই রয়েছে এর দিকনির্দেশনা : ‘আপনি পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাউকে কাজে নিতে চাইলে সেজন্য এমন ব্যক্তিই উত্তম, যে হবে শক্তিশালী এবং আমানতদারও।’ (কাসাস, ২৮: ২৬)
৬. তরুণ নেতৃবৃন্দ, যারা উন্নতি-অগ্রগতিে দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, প্রয়োজনীয় নিত্যনতুন আবিষ্কার ও সংস্কারে সচেষ্ট, দেশ ও জাতির কল্যাণে গঠনমূলক সংস্কারে তৎপর, তাদের তারুণ্যদীপ্ত সৎ নেতৃত্বগুণকে কাজে লাগাতে হবে। যেন তারা কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি সাধন করে যুগের দাবি ও চাহিদা মেটাতে পারে।
৭. কোনো কর্মকর্তাকে একই পদে দীর্ঘ দিন বহাল রাখা সমীচীন নয়। যেন অসৎ শ্রেণি স্বীয় পদ, খ্যাতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করতে না পারে। যোগ্য কোনো ব্যক্তিকে যদি দীর্ঘ দিন উন্নত পদে বহাল রাখতে হয় তাহলে তার ওপর পূর্ণ নজরদারি বহাল রাখতে হবে।
৮. চারিত্রিক ও নৈতিক অধঃপতন রোধ করতে হবে। এ লক্ষ্যে সমাজের প্রতিটি শ্রেণি, বিশেষভাবে যুব শ্রেণির মধ্যে নৈতিক ও ধর্মীয় প্রেরণা মজবুত করতে হবে। তাদেরকে মহৎ চরিত্র ও উত্তম শিষ্টাচারে অনুপ্রাণিত করতে হবে। দেশ ও জাতির আসন্ন উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের লক্ষ্যে তাদের ধর্মীয় ও জাতীয় দায়দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করে গড়ে তুলতে হবে। যে সমস্ত টিভি ও ইন্টারনেট চ্যানেল অশ্লীলতা ছড়ায়, নৈতিক ও ধর্মীয় অনাচারে প্ররোচিত করে, বিশৃঙ্খলা ও বিপর্যয়ের পথে ধাবিত করে, তা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিতে হবে।
৯. সমাজে নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতির সমস্ত অপচেষ্টাগুলো সমূলে নির্মূল করার লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। কেননা সমাজে নিরাপত্তা ও সুরক্ষাহীন পরিবেশ অসৎ শ্রেণির মধ্যে যাবতীয় অন্যায়-অপকর্মের প্রবণতা সৃষ্টি করে। তাদের সামনে ঘুস, আত্মসাৎ ও অন্যের অধিকার হরণের পথ খুলে দেয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন: ‘আল্লাহ তা'আলা এক জনবসতির দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন, যা ছিল বেশ নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ। চতুর্দিক থেকে তার জীবিকা চলে আসত পর্যাপ্ত পরিমাণে। তারপর তারা আল্লাহর নে'আমতের অকৃতজ্ঞতা শুরু করে দিল। ফলে আল্লাহ তাদের কৃতকর্মের কারণে তাদের ক্ষুধা ও ভীতির পোশাক আস্বাদন করালেন।’ (নাহল, ১৬: ১১২)
১০. সরকারি দায়িত্বে ও কার্যনির্বাহে আমলাতন্ত্রের একচ্ছত্র আধিপত্য রদ করে তাদের জনগণের সেবক ও প্রশাসকরূপে গড়ে তুলতে হবে। কেননা আমলাতন্ত্রে স্বাধীনতা কোনো কোনো আমলাকে দুর্নীতিবাজ করে তোলে। তারা নিজেদের নৈতিক-অনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য সরকারি পদ ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে। জনস্বার্থে সামান্য পরিশ্রমের মামুলি কাজ করার জন্যেও তারা বেশ সিদ্ধহস্ত।
১১. প্রযুক্তিসেবা বৃদ্ধির পাশাপাশি তা নিখুঁত ও ফাঁক-ফোকরমুক্ত করতে হবে। আর্থিক লেনদেনগুলোর ক্ষেত্রে প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবশক্তিকেও যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। ইলেক্ট্রনিক ও ইন্টারনেট সেবা-পরিষেবাগুলোর মানোন্নয়ন করে তা এমনভাবে সচল রাখতে হবে, যেন দেশের যেকোনো নাগরিক ইন্টারনেটে অত্যন্ত সহজে দ্রুত আর্থিক লেনদেন করতে পারে।
১২. প্রতিষ্ঠানে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগের সময় তার ও পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের স্থাবর-অস্থাবর যাবতীয় সম্পত্তির হিসাব-বিবরণী গ্রহণ করতে হবে। একইভাবে চাকরি থেকে অব্যাহতির সময় এ বিষয়টি পুনরায় খতিয়ে দেখতে হবে। জন-অর্থ-সংরক্ষণ অধিদফতরকে তার কার্য সম্পাদনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকতে হবে। প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেক কর্মকর্তা তার কাজের মানোন্নয়ন, দায়িত্বপালনের ক্ষেত্রে শতভাগ বিশ্বস্ততা ও সুনিপুণতার ক্ষেত্রে দায়বদ্ধ হওয়া কর্তব্য। বিশেষ কোনো স্বার্থসিদ্ধির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার অপব্যবহার ও অন্যের ক্ষতিসাধন রোধে কোম্পানির কর্তাব্যক্তিদের কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
১৩. একটি গঠনমূলক নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। যার ভিত্তিতে কর্মচারীদের কাজের দক্ষতা ও নিপুণতা যাচাই করা হবে। যারা নিজেদের দক্ষতা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে পারবে এবং তুলনামূলক শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় দিতে পারবে, বাৎসরিক সম্মেলনে তাদের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মাননা প্রদান ও মূল্যবান পুরস্কার প্রদান করা কর্তব্য। এতে প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেক কর্মকর্তা নিজের যোগ্যতা প্রমাণে সচেষ্ট ও উদ্বুদ্ধ হবে। পাশাপাশি যেকোনো ব্যক্তির অবহেলা ও দুর্নীতি প্রমাণিত হবে, তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে, যেন অন্যদের জন্য তা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। যে ব্যক্তিই দুর্নীতি শনাক্ত করতে পারবে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কৃত করা কর্তব্য। এর ফলে প্রত্যেক নাগরিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হবে।
প্রত্যেক নাগরিকের নৈতিক দায়িত্বই হলো নিজ নিজ শক্তি ও সামর্থ্য অনুযায়ী দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা। রাসূলুল্লাহ বলেছেন: ‘তোমাদের মধ্যে যে-ই কোনো অন্যায় দেখবে, সে যেন নিজ হাতে তা প্রতিহত করে। যদি তার এ সামর্থ্য না থাকে, তবে মুখে (যেন অন্যায়ের প্রতিবাদ করে।) এতটুকু সামর্থ্যও যদি না থাকে, তবে মনে মনে (সে যেন অন্যায়কে ঘৃণা করে।)’ (মুসলিম, ১/৬৯)
১৪. পদোন্নতির ক্ষেত্রে, প্রবীণ হওয়া ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাই একমাত্র ও চূড়ান্ত মানদণ্ড নয়। তাই অভিজ্ঞতার পাশাপাশি প্রত্যেকের মাসিক ও বাৎসরিক কাজের পরিমাণ ও গুণগত মান যাচাই করে দেখতে হবে। কর্মচারীদের জ্ঞানগভীরতা, কর্মদক্ষতা, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও প্রতিষ্ঠানে তাদের ভাবমর্যাদা ইত্যাদি দিকগুলো বিবেচনা করতে হবে।
১৫. সততা, ন্যায়নিষ্ঠতা, দৃঢ়তা, অবিচলতা ও কর্মনিপুণতায় যারা নিজেদের দৃষ্টান্তস্বরূপ প্রমাণ করতে পেরেছে, সমাজের সামনে তাদের সফলতা তুলে ধরতে হবে। তাদের ব্যক্তিত্বগুণকে উত্তম আদর্শরূপে ফুটিয়ে তুলতে হবে। যেন পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্র-প্রতিটি অঙ্গনেই মানুষ তাদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়। তাদের আদর্শগুণে মুগ্ধ হয়ে তাদের অনুসরণে সচেষ্ট হয়।
১৬. দুর্নীতি প্রতিরোধ-ব্যবস্থামূলক কঠোর আইন প্রণয়ন করে সকলের ক্ষেত্রে তা সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে। সমাজের উচ্চ শ্রেণি, নিম্ন শ্রেণিভেদে আইনের মধ্যে কোনো বৈষম্য হতে পারবে না। প্রত্যেক অপরাধীই যেন উপযুক্ত শাস্তির সম্মুখীন হয় এবং তাদের শাস্তি অন্যদের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে কোনো স্বজনপ্রীতি কিংবা শ্রেণিবৈষম্য যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। তাহলে সমাজ চরম বিপর্যয়-বিশৃঙ্খলার শিকার হবে। প্রায় পনেরোশ বছর পূর্বে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর উম্মতের উদ্দেশ্যে এ সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন: ‘হে লোকসকল, তোমাদের পূর্ববর্তী জাতির ধ্বংসের অন্যতম কারণ ছিল, কোনো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি যদি চুরি করত, তারা তার সাজা মওকুফ করে দিত। কিন্তু দুর্বল শ্রেণির কেউ চুরি করলে তার শাস্তি যথাযথভাবে কার্যকর করে ছাড়তো। আল্লাহর শপথ! মুহাম্মদের কন্যা ফাতেমাও যদি চুরি করে মুহাম্মদ তার হাত কেটে দিবে।’ (বুখারী, ৮/১৬০)
১৭. সার্বক্ষণিক নিরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ-ব্যবস্থা চালু করে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে তা সক্রিয় রাখতে হবে। কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার নীতি বজায় রাখতে হবে। প্রতিটি কাজেই একটি মৌলিক প্রশ্নের জবাবদিহিতা থাকতে হবে। প্রশ্নটি হলো, “এই কাজটির যৌক্তিকতা ও প্রাসঙ্গিকতা কী?”
১৮. একটি দুর্নীতি দমন কমিশন চালু করে সৎ, নীতিবান ও বিশ্বস্ত লোকদের মাধ্যমে তা পরিচালনা করতে হবে। সমাজের আনাচে-কানাচে, আড়ালে-আবডালে যত অন্যায়-অনাচার চলছে, তার বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করাই হবে তাদের প্রধান লক্ষ্য-উদ্দেশ্য।
১৯. সমতা ও বৈষম্যহীনতা হলো একটি জাতির উন্নতি-অগ্রগতির মূল ভিত্তি। যে জাতি নিজের মাঝে শ্রেণিবৈষম্য নির্মূল করে সাম্য ও সমতার নীতি অবলম্বন করেছে তারা উদারতা, নির্মলতা, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ‘তোমার প্রতিপালক এমন নন যে, তিনি জনপদসমূহ অন্যায়ভাবে ধ্বংস করে দিবেন; অথচ তার বাসিন্দাগণ সদাচারী।’ (হুদ, ১১: ১১৭)
২০. কোনো জাতির পতন, অধঃপতন, পর্যায়ক্রমে চূড়ান্ত ধ্বংসের মূল কারণ হলো অন্যায় ও দুর্নীতি-এ চরম বাস্তবতা সমাজের প্রতিটি শ্রেণি, প্রত্যেক ব্যক্তির মনে বদ্ধমূল করা আবশ্যক। সমাজবিজ্ঞানী আল্লামা ইবনে খালদুন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'মুকাদ্দামা ইবনে খালদুন'-এর মধ্যে এ বিষয়ে আলোকপাত করেছেন: 'অন্যায় ও দুর্নীতির অপরিহার্য পরণতি হলো সীমাহীন অপব্যয় ও লাগামহীন বিলাসিতা। যা কোনো জাতিকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।' পবিত্র কুরআনের এ সত্য প্রতীয়মান: ‘যখন কোনো জনপদ ধ্বংস করার ইচ্ছা করি, তখন তাদের বিত্তবান লোকদের (ঈমান ও আনুগত্যের) হুকুম দেই। তখন তারা তাতে নাফরমানিতে লিপ্ত হয়। ফলে তাদের সম্পর্কে ফায়সালা চূড়ান্ত হয়ে যায় এবং আমি তাদেরকে ধ্বংস করে ফেলি।’ (বনী ইসরাঈল, ১৭: ১৬)
২১. স্বভাবতই অজ্ঞতা-মূর্খতা ও অভাব-অনাটনের কবলে মানবিক মূল্যবোধ ধ্বসে পড়ে, ন্যায়-অন্যায়ের বিচারবোধ প্রাণশক্তিহীন হয়ে পড়ে। তাই সমাজ থেকে মূর্খতা ও অশিক্ষা দূর করার পাশাপাশি অভাব ও দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। বেকারত্বের কবলে পড়ে, দারিদ্র্যের শিকার হয়ে দেশের একটি নাগরিকও যেন অন্যায় ও দুর্নীতির পথে পা না-বাড়ায়, সে লক্ষ্যে প্রতিটি নাগরিকের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।
২২. অডিও-ভিজ্যুয়াল, প্রিন্ট মিডিয়া ও সোস্যাল মিডিয়ায় অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত রাখতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস ও বাণিজ্যিক কোম্পানির পক্ষ থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা কর্তব্য। যেখানে দ্বীনের একনিষ্ঠ আহ্বায়ক ও সমাজের জ্ঞানী-গুণীজন মানুষের সামনে দুর্নীতির জঘন্যতা, ভয়বহতা তুলে ধরবেন। ইহকাল ও পরকালে দুর্নীতির কঠোর শাস্তির ব্যাপারেও সতর্ক করবেন। অতীতের যে সমস্ত জাতিবর্গ অন্যায় ও দুর্নীতির কারণে যে অবক্ষয় ও ধ্বংসের শিকার হয়েছে এবং বর্তমানেও হচ্ছে, মানুষের সামনে তা সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরবেন। এর ফলে দেশের নাগরিকদের মধ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে এবং জীবনের সকল অঙ্গনে নৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণে তৎপর হবে।
২৩. যাবতীয় অনাচার-পাপাচার, গুনাহ ও নাফরমানি পরিহার করতে হবে। কুপ্রবৃত্তি ও অন্যায় ঝোঁক-প্রবণতা থেকে বেঁচে থাকতে হবে। কেননা তা সমস্ত নষ্টের মূল। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় কখনো কোনো নাফরমানি হয়ে গেলে, তার বিপরীতে নেক আমল ও তওবাই হলো একমাত্র প্রতিকার। তাই নিয়মিত নামায, ইবাদত ও রবের আনুগত্যের সঙ্গে সঙ্গে তওবা করে যেতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন: ‘জলে-স্থলে যে অশান্তি ছড়িয়ে পড়ে তা মানুষের কৃতকর্মের ফসল। আল্লাহ তাদের কতক কৃতকর্মের স্বাদ আস্বাদন করাবেন। হয়ত (এর ফলে) তারা ফিরে আসবে।’ (রূম, ৩০: ৪১)
২৪. যে কোনো কর্মী, চাকরিজীবী ও দায়িত্ববানদের প্রতি আমার উপদেশ হলো, 'একনিষ্ঠতার সাথে ও সুচারুরূপে আপনার দায়িত্ব পালন করুন। এটা আপনার প্রধান দায়িত্ব। মনে রাখবেন, কাজেকর্মে মালিকের চোখ ফাঁকি দিলেও আসল মনিব আল্লাহকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব নয়।' মানুষের ফাঁকিবাজির স্বভাবদোষকে আল্লাহ কুরআনে এভাবে ব্যক্ত করেছেন: ‘তারা মানুষ থেকে তো লজ্জা করে; কিন্তু আল্লাহ থেকে লজ্জা করে না। অথচ তারা রাতের বেলা যখন আল্লাহর অপছন্দনীয় কথা বলে তখনো তিনি তাদের সঙ্গে থাকেন। তারা যা-কিছু করছে তা সবই আল্লাহর আয়ত্তে।’ (নিসা, ৪: ১০৮)

পরিশিষ্ট:
হাদীসে বর্ণিত হয়েছে: আবূ হুমায়দ সায়েদী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ আসদ গোত্রের জনৈক ব্যক্তিকে কর্মচারী নিযুক্ত করলেন। যাকে ইবনুল লুৎবিয়া নামে অভিহিত করা হতো। রাবী আমর ও ইবনু আবূ উমার বলেন, 'সদকা উসূলের জন্য' (তাকে নিযুক্ত করা হয়)। যখন সে ব্যক্তি ফিরে এলো তখন সে বলল, 'এটা আপনাদের (অর্থাৎ বায়তুল মালের) আর এটা আমাকে উপটোকন হিসেবে দেওয়া হয়েছে।' বর্ণনাকারী বলেন, তখন রাসূলুল্লাহ মিম্বরের উপরে দাঁড়ালেন এবং আল্লাহর প্রশংসা করার পর বললেন, সে কর্মচারীর কী হলো, যাকে আমি (তহশীলদাররূপে) প্রেরণ করেছি। আর সে বলে, 'এটা আপনাদের, আর এটা আমাকে উপটোকন দেওয়া হয়েছে। সে তার পিতার বা মাতার ঘরে বসে থেকে দেখুক না, তাকে উপঢৌকন দেওয়া হয় কিনা? মুহাম্মদের প্রাণ যে পবিত্র সত্তার হাতে তাঁর কসম! যে কেউ এরূপ সম্পদের কিছুমাত্র হস্তগত করবে, কিয়ামতের দিন সে তা নিজ ঘাড়ে বহন করে নিয়ে আসবে। (তার ঘাড়ের উপর) চিৎকাররত উট হবে অথবা হাম্বা-হাম্বারত গাভি হবে অথবা ম্যাঁ-ম্যাঁরত বকরি হবে। তারপর তিনি দু'হাত উপরের দিকে উঠালেন। এমনকি তাঁর বগলের শুভ্রতা আমাদের দৃষ্টিগোচর হলো। তিনি বললেন, হে আল্লাহ, আমি কি (আপনার নির্দেশ) পৌঁছে দিয়েছি।' এ কথা তিনি দু'বার বললেন। (মুসলিম, ৩/১৪৬৩)

সিঙ্গাপুরের সুদীর্ঘ তিন দশকের প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ (১৯২৩-২০১৫ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'সিঁড়ি পরিষ্কার করার মতো দুর্নীতি সাফ করুন। সর্বোচ্চস্তর থেকে শুরু হবে, সর্বনিম্নস্তরে এসে শেষ হবে।'

বিখ্যাত আরব কবি আবূ তায়্যেব মুতানাব্বি (৩০৩-৩৫৪ হি.) বলেছেন: 'পিতার মৃত্যুর পর অভিভাবক ও মনিব শ্রেণির চটকদার কথা যেন তোমাকে প্রতারিত না করে। কেননা তাদের শত্রুতা-পুষে- রাখা মন এর ঠিক উল্টো। তাদের ক্ষেত্রে তুমি হবে এমন ভয়াবহ মৃত্যু, কোনো শোকাহতের শোকে যার হৃদয় গলে না; প্রাণ হরণ করে, দেহের তাজা রক্ত পান করেই যে পরম তৃপ্তি লাভ করে। তারা হলো এমন ফোঁড়ার মতো, দেহের অন্তরালে পচন থাকার কারণে যা থেকে ফুলে-ফেঁপে উঠে।'

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 পারিবারিক সহিংসতা

📄 পারিবারিক সহিংসতা


পারিবারিক সহিংসতা অন্যতম বৈশ্বয়িক সংকট। বহু পরিবার এ সংকটে জর্জরিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সহিংসতার পরিচয়ে বলেছে: 'পরিবারের যেকোনো ব্যক্তি কর্তৃক পরিবারের অন্য এক কিংবা একাধিক সদস্যের বিরুদ্ধে নিজের ক্ষমতা ও শক্তির অপব্যবহার করা। এর কারণে পীড়িত ব্যক্তি ক্ষতির শিকার হয়। মানসিক কষ্টে ভোগে। লাঞ্ছনা ও বঞ্চনার সম্মুখীন হয়। তার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিঘ্নিত হয়।'

অথবা পারিবারিক সহিংসতা হলো: 'পরিবারের কোনো ব্যক্তি কর্তৃক স্বামী, স্ত্রী কিংবা সন্তানদের কারো বিরুদ্ধে ক্ষমতা ও পেশিশক্তির অপব্যবহার। যার কারণে ভুক্তভোগী শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। অশান্তি ও নিরাপত্তার শিকার হয়। পরিবারের সদস্যদের পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়ে যায়। সর্বোপরি পারিবারিক সম্পর্কগুলোতে অবনতি ঘটে। সামাজিক বন্ধনে ফাটল ধরে। একটি সুন্দর পরিপাটি সমাজের মৃত্যু হয়। কেননা পারিবারিক বন্ধনই হলো সুষ্ঠু সমাজের মূল ভিত্তি।'

পারিবারিক সহিংসতার সমাধানে অনেক গবেষণা ও বিশ্লেষণ হয়েছে। অনেক আলোচনা-পর্যালোচনা হয়েছে। ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে এর গুরুত্ব অনুধাবন করার চেষ্টা করা হয়েছে। এ সমস্যা সমাধানে বহু পথ-পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত সমাধান কোথায়?

সমাধান:
১. পারিবারিক সহিংসতা থেকে মুক্ত থাকার জন্য বিবাহের প্রথম ধাপ থেকেই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে পাত্রপক্ষ এমন পাত্রী নির্বাচন করবে, যে শিক্ষিত, ভদ্র, মার্জিত, ধার্মিক, চাত্রিক গুণাবলি ও শিষ্টাচারের অধিকারী। একইভাবে পাত্রী পক্ষও এমন পাত্র নির্বাচন করবে, যে এসব মহৎ গুণের অধিকারী।
২. বিবাহের পূর্বে অবশ্যই পাত্র ও পাত্রী উভয় পক্ষকেই স্বাস্থ্য-পরীক্ষা করাতে হবে। তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে পরিপূর্ণ সুস্থ-সবল কি না-এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে। এ কথা সত্য যে, সুস্থতা-অসুস্থতা আল্লাহ্ তা'আলার হাতে। এ দুয়ে মিলেই তো জীবন। তবুও স্বাস্থ্য- পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া কর্তব্য-কে কতটুকু সুস্থ কিংবা অসুস্থ।
৩. পাত্র-পাত্রী পক্ষের শিক্ষাগত যোগ্যতা, তাদের সুস্থ মনমানসিকতা পারিবারিক সচেতনতা ইত্যাদি বিষয় যথাযথভাবে যাচাই করতে হবে। যেন সংসার জীবনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিশেষভাবে সন্তান লালন-পালনে কোনো প্রকার সহিংসতার অশঙ্কা না থাকে এবং উদ্ভুত সমস্যার সমাধানে পরস্পর বোঝাপড়া ও ফলপ্রসূ আলোচনাই প্রাধান্য পায়।
৪. পারিবারিক অধিকার, পারিবারিক সহিংসতা মোকাবিলা, এর যথার্থ সমাধান ও তা থেকে সুরক্ষা ইত্যাদি বিষয়গুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বর্তমান তরুণ প্রজন্মকে পরস্পর সদয়তা, আন্তরিক বোঝাপড়া ও আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান ইত্যাদি মহৎ মানসিকতার ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে। সাথে সাথে পারিবারিক সহিংসতা বর্জনে উদ্বুদ্ধ করে এর ক্ষতিকর দিকগুলোর ব্যাপারে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
৫. এ ক্ষেত্রে মিম্বরে খতীব সাহেবের বয়ান, প্রচার মাধ্যমের ঐকান্তিক সম্প্রচার ও পরিবারের সকল সদস্যদের জন্য শিক্ষাদীক্ষামূলক আলোচনা অত্যন্ত কার্যকর। এ সমস্ত মাধ্যমে পারিবারিক সহিংসতার নেতিবাচক ও ক্ষতিকর দিকগুলো সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। সাথে সাথে ইসলামে যে দয়া, সদয়তা, বিনম্রতা ও আপস-মীমাংসার মহৎ শিক্ষা রয়েছে, তা আঁকড়ে ধরতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
৬. কুরআন-সুন্নাহর যেখানে প্রহারের কথা বলা হয়েছে, ইমাম, খতীব ও দ্বীনের আহ্বায়কগণের পক্ষ থেকে এর সঠিক ব্যাখ্যা তুলে ধরা কর্তব্য। যেন কোনো অজ্ঞ-মূর্খ এর অপব্যবহার করে পারিবারিক সহিংসতা সৃষ্টিতে প্রবৃত্ত না হয়। পারিবারিক জীবনে রাসূল কেমন ছিলেন, স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে তাঁর আচার-ব্যবহার কেমন ছিল-বিষয়টি জাতির সামনে সুস্পষ্ট থাকতে হবে। কেননা তিনিই আমাদের শ্রেষ্ঠ আদর্শ।
৭. পরিবার ও সমাজে শিশুদের প্রতি যে ধরনের অন্যায় ও সহিংসতা দেখা দেয়, এ ব্যাপারে শিশুদের পূর্ব-সতর্ক করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে তাদের যথোপযুক্ত করণীয় কী হবে, তা-ও শিখিয়ে দিতে হবে। কোনো অন্যায় ও সহিংসতার শিকার হলে অভয় দিয়ে সাহস যোগাতে হবে। যেন ডর-ভয় না রেখে তার সাথে ঘটে-যাওয়া অন্যায়ের কথা সে বলতে পারে, এর প্রতিবাদে সরব হতে পারে।
৮. পারিবারিক সহিংসতা বিষয়ক একটি বিশেষ মন্ত্রণালয় গঠন করতে হবে। এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হবে, পারিবারিক সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিদের অভিযোগ গ্রহণ করা। যথাযথভাবে অভিযোগ যাচাই করা। কোনো প্রকার অবহেলা ও কালবিলম্ব না করে এর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এর সাথে সাথে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিদের সাহস যোগাতে হবে, যেন তারা নির্বিঘ্নে নিঃসংকোচে অভিযোগ দায়ের করতে পারে। স্পর্শকাতর বিষয়ে তাদেরকে শতভাগ গোপনীয়তার নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে। কোনো ধরনের প্রচার-সম্প্রচার ব্যতীত বিষয়টি সমাধান করতে হবে। প্রতিটি সমস্যার প্রথম ধাপেই তা সমাধানের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কেননা যেকোনো সমস্যা দীর্ঘায়িত হলে পর্যায়ক্রমে তা এমন ঘোলাটে ও জটিল হয়ে পড়ে, যার সমাধান কখনো কখনো ভীষণ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
৯. পারিবারিক সহিংসতার বিচার বিশেষ আদালতে দ্রুত সম্পন্ন করে প্রকৃত অপরাধীর বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তি কার্যকর করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো প্রকার বিলম্ব ও অবহেলার সুযোগ নেই। কেননা বিচার বিভাগের সামান্য গাফলতি ও অবহেলার কারণে যেকোনো অপরাধী ও অপরাধ ও প্রশ্রয় পায়, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে নির্বিঘ্নে ছড়িয়ে পড়ে।
১০. পারিবারিক সহিংসতার ক্ষেত্রে মা-বাবাই যদি প্রধান দায়ি হয়ে থাকে, তাহলে প্রয়োজনে সন্তানের প্রতি তাদের দায়-দায়িত্ব প্রত্যাহার করে এমন নিকটাত্মীয়ের দায়িত্বে ন্যস্ত করতে হবে, যারা তাদের প্রতি যত্নশীল হবে। তাদের যথাযথ দেখভাল করবে। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি যদি কোনো প্রকার মানসিক কিংবা শারীরিকভাবে আক্রান্ত হয়ে থাকে, তবে তার দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
১১. সংক্ষুব্ধ শিশুর যাবতীয় অধিকার রক্ষা করে তার জন্য সুস্থ নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তাকে পর্যাপ্ত শিক্ষাদীক্ষার সুযোগ দিয়ে দেশের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। যেন সে ভবিষ্যতে দেশ ও দশের উপকারে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
১২. সন্তান লালন-পালনে ভুল পন্থাগুলো থেকে দূরে থাকতে হবে। যেমন : মারপিট করে শারীরিক শাস্তি দেওয়া। কঠোর ও রূঢ় কথা বলে, গালমন্দ করে মানসিক অস্বস্তিতে ফেলা। এর বিপরীতে আরও ফলপ্রসূ ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করতে হবে। বোঝানোর মাধ্যমে সন্তানের ভুলগুলো শুধরে দিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস যোগাতে হবে। তার ছোট ছোট সফলতার প্রশংসা করে অনুপ্রাণিত করতে হবে।
১৩. প্রত্যেক মা-বাবার প্রতি আমার সুস্পষ্ট বক্তব্য হলো: সন্তান লালন-পালনের অর্থ শুধু অন্নবস্ত্রের বন্দোবস্ত ও ব্যয়ভার বহন করাই নয়; বরং সন্তানের প্রতি আন্তরিকতা, সযত্ন ভালোবাসা, সদয়তা-দয়ার্দ্রতা ও সঠিক শিক্ষাদীক্ষা প্রদান করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তাই মা-বাবাকে সন্তানের বন্ধু সেজে তাদের সঙ্গে মিশে চলতে হবে। সন্তানের কাছাকাছি থেকে তাদের সমস্যাগুলো গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে। যেকোনো সমস্যায় সবার আগে মা-বাবাকেই তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। পৃথিবীতে প্রতিটি সন্তান তার মা-বাবার সদাচারের প্রথম হকদার। মা-বাবা যদি তার চোখের অশ্রু মুছে না দেয়, ধীরে ধীরে শত-সহস্র অশ্রুফোঁটা জমাট বেঁধে পুঞ্জীভূত ক্রোধের রূপ ধারণ করে।
১৪. প্রত্যেক পিতার কর্তব্য হলো, পরিবারের কাছে এতটা প্রিয় হওয়া, যেন পরিবারের প্রতিটি সদস্যই তার আগমনের অপেক্ষায় থাকে। যেমন শুষ্ক ভূমি অঝোর বৃষ্টির জন্য অধীর থাকে। পরিবারের মাঝে কখনো সিংহের মতো গম্ভীর কঠোরপ্রাণ হওয়া, আবার গাম্ভীর্যের মুহূর্তে বালখিল্যতা করা-কোনোটাই বাঞ্ছনীয় নয়। রাসূল এর শ্রেষ্ঠ আদর্শ অবলম্বন করাই যথার্থ। রাসূল যখন ঘরে প্রবেশ করতেন, হাস্যোজ্জ্বল থাকতেন। শিশুদের সাথে হাস্যরসিকতা করতেন। রাসূল বলেছেন: “তোমাদের মধ্যে সে-ই সর্বোত্তম, যে নিজ পরিবারের নিকট সর্বোত্তম। আমার পরিবারের নিকট আমিই তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।” (তিরমিজী: ৫/৭০৯)
১৫. পরিবারের সদস্যদের মাঝে পরস্পর সহযোগিতা, মমতাপূর্ণ মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। তাদের মাঝে সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত ও অটুট রাখতে হবে। ইসলাম পরিচিত-অপরিচিত নির্বিশেষে সকলের মাঝে সহযোগিতা ও ভ্রাতৃত্ববন্ধন অটুট রাখতে অনুপ্রাণিত করেছে। তাহলে যে পরিবারের মাঝে রক্তের বাঁধন, সেক্ষেত্রে পরস্পর সহযোগিতা, সহমর্মিতা, মায়া-মমতার বন্ধন কতটা সুদৃঢ় হওয়া আবশ্যক? পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- আর আল্লাহর রশিকে দৃঢ়ভাবে ধরে রেখো। পরস্পর বিভেদ করো না। (আলে ইমরান: ৩: ১০৩)
১৬. সমাজে যে পরিবার শিক্ষা-দীক্ষা, মহৎ চরিত্র, শিষ্টাচার ও মানবিক মূল্যবোধ ইত্যাদি ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় দিবে, পুরস্কৃত করে তাদের অনুপ্রাণিত করা কর্তব্য। বিপরীতে যে পরিবারে শিক্ষা-দীক্ষার কোনো বালাই নেই, পারিবারিক বন্ধন উপেক্ষিত, পারিবারিক সহিংসতাগ্রস্ত, তাদের ভর্ৎসনা ও তিরস্কারের মাধ্যমে তাদের সতর্ক করা কর্তব্য। যেন অন্যান্য পরিবারগুলোও এ ধরনের মানসিকতা বর্জন করে সচেতন হতে পারে। ব্যক্তি খারাপ কাজ করলো, সমাজে কেউ তাকে তিরস্কার করলো না, আরেক ব্যক্তি ভালো কাজ করলো, কারো পক্ষ থেকে সে পুরস্কৃত হলো না, বুঝতে হবে সমাজে অবক্ষয় চলছে।
১৭. পরিবারের সদস্যদের মাঝে মীমাংসা ও সুরাহা করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। পবিত্র কুরআনের দিকনির্দেশনা- ‘আর মীমাংসাই উত্তমপন্থা।’ (নিসা, ৪: ১২৮) কোনো জটিল সমস্যার ক্ষেত্রে স্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বামীর জন্য হোক কিংবা স্বামীর তরফ হতে স্ত্রীর জন্য হোক; অথবা সন্তানদের পক্ষ থেকেই হোক, মোটকথা মেনে নেওয়া ও নমনীয় মানসিকতার ভিত্তিতে যে মীমাংসা হবে, তাতে পরিবারের মাঝে আন্তরিকতা, ভালোবাসা, মায়া-মমতার বন্ধন অটুট থাকবে।
১৮. এ কথা মনে রাখতে হবে যে, পারিবারিক সহিংসতা একটি পরিবার ভেঙ্গে যাওয়ার অন্যতম কারণ। ফলে সামাজিক ভিত্তি ভেঙ্গে পড়ে। বংশের সুনাম নষ্ট হয়। সন্তানরা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে ধাবিত হয়। সন্তানের বিচ্ছেদে মা-বাবার জীবন হয়ে উঠে দুর্বিষহ। তারা বেঁচে থাকার কোনো অবলম্বন ও সার্থকতা খুঁজে পায় না। তাই পারিবারিক বন্ধন অটুট রাখার ক্ষেত্রে সদাসতর্ক থাকতে হবে। পরিবারের মাঝে ধর্মীয় অনুশাসন বজায় রাখতে হবে। নামায হতে শুরু করে প্রতিটি ইবাদত সমান গুরুত্বের সাথে পালন করতে হবে এবং যাবতীয় গুনাহ ও নাফরমানি থেকে বেঁচে থাকতে হবে। যে আল্লাহ্ তা'আলার নির্দেশ অনুযায়ী নিজেকে পরিচালিত করবে, ইহকাল ও পরকালে আল্লাহ তাকে সুখময়, সাচ্ছন্দ্যময় জীবন দান করবেন।
১৯. ইসলাম হলো শান্তি-নিরাপত্তা, দয়া ও মমতার ধর্ম। যা মানুষকে কঠোরতা ও বর্বরতা থেকে বারণ করে। ছোটদের স্নেহ করা, বড়দের শ্রদ্ধা করা এবং স্ত্রীর সাথে সদাচরণ করা-এগুলো হলো ইসলামের মৌলিক শিষ্টাচারের অন্তর্ভুক্ত। পবিত্র কুরআনে আদেশ- ‘আর তাদের (স্ত্রীদের সাথে) সদ্ভাবে জীবনযাপন করুন।’ (নিসা: ৪: ১৯) আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল হযরত হাসান (রা.)-কে চুমু খেলেন। আকরা ইবনে হাবেস তামীমী (রা.) পাশেই বসা ছিলেন। বললেন, 'আমার দশটি সন্তান রয়েছে। তাদের কাউকে আমি কখনো চুমু খাইনি।' রাসূল তার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'যে দয়া করতে জানে না, সে দয়াপ্রাপ্ত হয় না।' (বুখারী: ৭/৮)
২০. কর্ম জীবনের যত ঝামেলা ও ঝঞ্ঝাট-তা ঘরের বাইরে রেখে আসতে হবে। এসব বিষয় নিয়ে পরিবারে আলোচনা-পর্যালোচনা সমীচীন নয়। কেননা তা থেকে ঝগড়া-বিবাদের সৃষ্টি হয়। স্বামী-স্ত্রী উভয়ের কর্তব্য হলো পরিবারের মাঝে শান্তিপূর্ণ সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখা। স্নেহভালোবাসা ও আন্তরিকতাপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা। মায়া-মমতা ও সদয়তার ক্ষেত্রে তারা হবেন সন্তানদের জন্য শ্রেষ্ঠ আদর্শ। রাসূল বলেছেন: "সদয়তা ও বিনম্রতার পরশে যেকোনো বিষয়ই শোভামণ্ডিত হয়। নম্রতা ও কোমলতা ছাড়া যেকোনো কিছুই তার সৌন্দর্য হারায়।” (মুসনাদে আহমদ)
২১. মা-বাবাকে একটি বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে, কখনো যেন সন্তানদের সামনে তারা বিবাদে না জড়ান। কেননা সন্তান মা-বাবাকে ভীষনরকম অনুকরণ করে। মা-বাবার পরস্পর ঝগড়া-বিবাদে তারা নেতিবাচক মানসিকতায় প্রভাবিত হয়। ঝগড়া-বিবাদের আশঙ্কা হলে নিকটাত্মীয় কাউকে সুরাহাকারী মেনে নেওয়া এবং তাৎক্ষণিক বিবাদ থেকে দূরে থাকা কর্তব্য।
২২. মা-বাবার কর্তব্য হলো, সন্তানদের জন্য বেশি বেশি দু'আ করা। তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকবে, সন্তানদের মাঝে সমতা বজায় রাখা। তাদের কোনো আচার-আচরণে যেন কোনো সন্তানের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি না হয়। সাথে সাথে নেক আমলেও তাদেরকে যথেষ্ট সচেষ্ট হতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- আর তার জন্য তার স্ত্রীকে যোগ্যতা সম্পন্ন করেছিলাম; তারা সৎকর্মে প্রতিযোগিতা করত, তারা আমাকে ডাকত আশা ও ভীতির সাথে এবং তারা ছিল আমার নিকট বিনীত। (আম্বিয়া: ২১: ৯০)
২৩. সন্তানদের নিকট মানবীয় উত্তম গুণাবলি সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে হবে এবং তা অমলম্বন করার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এর প্রতিদানে ইহকাল ও পরকালে উত্তম প্রতিদানের সুসংবাদ প্রদান করে অনুপ্রাণিত করতে হবে। সাথে সাথে তাদের মনে অসদাচার ও মানবিক বিচ্যুতিগুলোর প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করতে হবে। এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে তাদেরকে সতর্ক ও সচেতন করে তুলতে হবে।
২৪. প্রত্যেক মায়ের কর্তব্য হলো, কন্যাদেরকে পূত-পবিত্রতা, চারিত্রিক বিশুদ্ধতা ও প্রতিশ্রুতিশীলতা ইত্যাদি মানবিক গুণের দীক্ষা প্রদান করা। তাদেরকে জগতের শ্রেষ্ঠ নারীগণ 'উম্মাহাতুল মু'মিন' (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীগণ)-এর জীবনাচার অনুসরণে উদ্বুদ্ধ করা।
২৫. সন্তানের দোষ-ত্রুটি ও নৈতিক বিচ্যুতির ক্ষেত্রে তাকে প্রকাশ্যে তিরস্কার না করে নম্রভাবে বুঝিয়ে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে হবে।
২৬. অসৎ সঙ্গের কবল থেকে সন্তানের সুরক্ষা এবং সৎ সঙ্গে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। যা তাদের সফলতা ও উন্নতির পথ সুগম করবে। বিকৃত রুচির টিভি-অনুষ্ঠান কিংবা অনলাইন-প্রোগ্রাম থেকে বিরত রাখতে হবে। সমাজে যেকোনো ধরনের সহিংসতা, অন্যায়-অত্যাচার, যা তাদের মনমানসিকতায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, এর ভিডিও ফুটেজ দেখা থেকে বিরত রাখতে হবে।

টিকাঃ
* "সংক্ষুদ্ধ ব্যক্তি" অর্থ: কোন শিশু বা নারী যিনি পারিবারিক সম্পর্ক থাকিবার কারণে পরিবারের অপর কোন সদস্য কতৃর্ক পারিবারিক সহিংসতার শিকার হইয়াছেন বা হইতেছেন বা সহিংসতার ঝুঁকির মধ্যে রহিয়াছেন।

পরিশিষ্ট:
‘আর যারা ঈমান গ্রহণ করেছে এবং তাদের সন্তান-সন্ততি ঈমানের সাথে তাদের অনুসরণ করেছে, আমরা তাদের সাথে তাদের সন্তানদের মিলিত করব এবং তাদের কর্মের কোন অংশই কমাব না। প্রত্যেক ব্যক্তি তার কামাইয়ের ব্যাপারে দায়ী থাকবে।’ (তুর, ৫২: ২১)

আয়েশাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ তাঁর স্বহস্তে কোন দিন কাউকে আঘাত করেননি, কোন নারীকেও না, সেবককেও না, আলাহ্র রাস্তায় জিহাদ ব্যতীত। আর যে তাঁর অনিষ্ট করেছে তার থেকেও প্রতিশোধ নেননি। তবে আলাহুর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয় এমন বিষয়ে তিনি তাঁর প্রতিশোধ নিয়েছেন। (মুসলিম: ৪/৮১৪)

'দয়ার্দ্রতা, ভালোবাসা ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে চরম শত্রুকে পরম বন্ধুতে পরিণত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। যা মহৎ বিজ্ঞজনদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। আর রূঢ়তা ও অসদাচারের মাধ্যমে পরম বন্ধুকে চরম শত্রুভাবাপন্ন করা মূর্খতার পরিচয়। ক্রোধের আগুন বাইরে জ্বলার আগে হৃদয়ে দাউদাউ করে জ্বলে। সুতরাং আগে তোমার মনের আগুন নেভাও। সহিংসতার আগুন আপনাতেই নিভে যাবে। পরিবারের সাথে হাসিখুশি থাক। হাস্যরসিকতায় সময় কাটাও। এ জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত। হতে পারে আজকের পর কাল পরিবারের মুখ দেখার ভাগ্য না-ও হতে পারে।' -আয়েয আল-কারনী

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 তাসাখ্খুত

📄 তাসাখ্খুত


আত-তাসাখখুত হলো আল্লাহর ফায়সালা, অবধারিত নিয়তি ও ভাগ্যের প্রতি অসন্তোষ। বান্দার জন্য রিযিকের যে ফায়সালা চূড়ান্ত তাতে অসন্তোষ প্রকাশ করা এবং বিশ্বজগত পরিচালনায় আল্লাহ তা'আলার কার্যপদ্ধতিতে আপত্তি উত্থাপন করা। এমন ব্যক্তি মানসিক সংকীর্ণতা, অস্থিরতা ও বিমর্ষতায় ভুগে। নিজের ভাগ্যে কখনো সন্তুষ্ট হতে পারে না। উপার্জিত রিযিকে তুষ্ট হতে পারে না। আল্লাহর কোনো ফায়সালায় সে স্থিরচিত্ত ও সুস্থির হতে পারে না। সে অসহনীয় মানসিক অস্থিরতা, দুর্ভাগ্য ও বিমর্ষতায় জীবনযাপন করে।

নিয়তি ও ভাগ্যের প্রতি অসন্তোষ কিয়ামতের আলামত। যেমন রাসূলুল্লাহ বলেছেন: (আউফ ইবনে মালেক (রা.)- কে উদ্দেশ্য করে) রাসূল বলেন, 'কিয়ামতের ছয়টি আলামত গণনা করো। ... অর্থ- সম্পদের এমন প্রাচুর্য যে, ব্যক্তিকে একশত দিনার দান করা হবে। কিন্তু এতেও সে সন্তুষ্ট হবে না।' (বুখারী ৪/১০২)

তাকদির ও নিয়তির ফায়সালায় আপনি সন্তুষ্ট কি না-এ বিষয়টি যদি যাচাই করে দেখতে চান, তবে নিজেকে এই প্রশ্নগুলো করুন:
১. আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে আপনি যে বিভিন্ন পরীক্ষার সম্মুখীন হন, তাতে কি ধৈর্যধারণ করেন, না কি অভিযোগ-অনুযোগ করে বেড়ান?
২. কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে আপনি কি এ ধরনের কথা উচ্চারণ করেন কিংবা মনে মনে ভাবেন যে, 'হে আল্লাহ! আমাকে কেন এমন পরিস্থিতির শিকার করলেন?'
৩. অন্যকে স্বাচ্ছন্দ্য ও সচ্ছলতায় থাকতে দেখে আপনি কি মানসিক সংকীর্ণতা ও নিরাশাগ্রস্ত হন? অনুতাপ ও আফসোসের জ্বালায় পুড়েন?
৪. কোনো সংকটের মুখে পড়ে আপনি সন্তুষ্ট চিত্তে ধৈর্যধারণ করতে পারেন, নাকি অধৈর্য, অস্থির ও ক্রোধান্বিত হয়ে পড়েন? এসব প্রশ্নের উত্তর হয় যদি 'হ্যাঁ', তবে আপনার সমাধানের পথ হলো:

সমাধান:
১. শরীয়তের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ তিন ধরনের অসন্তোষ ও অতুষ্টি থেকে বিরত থাকুন:
> তাকদির ও নিয়তির প্রতি মনে মনে চাপা ক্ষোভ ও অসন্তোষ পোষণ করা। এ ধারণা পোষণ করা যে, আল্লাহ যে ফায়সালা করেছেন, তাতে তিনি আপনার উপর জুলুম করেছেন。
> ভাগ্যলিপির ওপর মনের চাপা ক্ষোভ ও অসন্তোষ মুখে প্রকাশ করা। সর্বদা নিজের হতভাগ্য ও দুর্ভাগ্যের কথা বলে বেড়ানো। এমন সব কথা উচ্চারণ করা, যা আল্লাহর ফায়সালার প্রতি আপনার অসন্তোষ প্রকাশ করে।
> আচার-অচরণে অসন্তোষ প্রকাশ করা। যেমন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ও বঞ্চনার শিকার হয়ে, নিজের নিয়তির প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে কপাল চাপড়ানো, জামা-কাপড় ছিঁড়ে ছিন্নভিন্ন করা। এ ধরনের যেকোনো কাজই শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম ও নিষিদ্ধ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন: "মানুষের মধ্যে কেউ কেউ এমনও আছে, যে আল্লাহর ইবাদত করে এক প্রান্ত থেকে। যদি (দুনিয়ায়) তার কোনো কল্যাণ লাভ হয়, তবে তাতে সে আশ্বস্ত হয়ে যায়। আর যদি সে কোনো পরীক্ষার সম্মুখীন হয়, তবে সে মুখ ফিরিয়ে (কুফরের দিকে) চলে যায়। এরূপ ব্যক্তি দুনিয়াও হারায় এবং আখেরাতও। এটাই তো সুস্পষ্ট ক্ষতি। (হাজ, ২২: ১১)

রাসূল বলেছেন: ‘যে গাল-চাপড়ায়, জামা-কাপড় ছিড়ে ফেলে অথবা জাহেলি যুগের মতো বিলাপ করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (মুসলিম: ১/৯৯)

২. মনে রাখবেন, তাকদির (নিয়তি) ও আল্লাহ তা'আলার ফায়সালার প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করা গুরুতর শিরকের নামান্তর। কেননা যখন আপনি তাকদিরের প্রতি অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করলেন, আপনি যেন আল্লাহ তা'আলার ফায়সালার যৌক্তিকতা ও যথার্থতা নিয়ে আপত্তি উত্থাপন করলেন। এ যেন আসমানি ফায়সালা অস্বীকার করার নামান্তর। কেননা তাকদিরের ভালো-মন্দের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ।
৩. কাঙ্ক্ষিত সুবিধাজনক অবস্থানে উৎফুল্ল হওয়া, আর অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিকূল পরিস্থিতির শিকার হয়ে ক্ষুব্ধ হওয়া-আল্লাহর ফায়সালা দেখে মুনাফিকদের মতো এমন আচরণ করা সমীচীন নয়। প্রকৃত মু'মিন বান্দার বৈশিষ্ট্য হলো সর্বাবস্থায় আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকা; তাকদিরের ভালো-মন্ড সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করা। সুতরাং আপনার কর্তব্য হলো মু'মিনের এ অনন্য বৈশিষ্ট্য অর্জন করা এবং নিয়তির প্রতি ক্ষোভ ও অসন্তোষ পরিহার করা, কেননা তা মুনাফিকের খাসলত*। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদের অবস্থা সম্পর্কে বলেন: তাদের (অর্থাৎ, মুনাফিকদের) মধ্যে এমন লোকও আছে, যারা সদকা (বণ্টন) সম্পর্কে আপনাকে দোষারোপ করে। সদকা থেকে তাদেরকে তাদের (মনমতো) দেওয়া হলে তারা খুশি হয়ে যায়। আর তাদেরকে যদি তা থেকে না দেওয়া হয়, অমনি তারা ক্ষুব্ধ হয়। (তাওবা, ৯: ৫৮)
৪. তোমার ভাগ্যে যা আছে, তা অবশ্যম্ভাবী, এর কোনো ব্যত্যয় ঘটবে। কিন্তু যা তোমার ভাগ্যে নেই, তা কিছুতেই তোমার অর্জিত হবে না। বিশ্বজগতের পরিচালনার চাবিকাঠি একমাত্র মহান স্রষ্টা আল্লাহর হাতে। তাঁর প্রতিটি ফায়সালা, প্রতিটি সিদ্ধান্তে নিগূঢ় কোনো তত্ত্ব রয়েছে, যা আমাদের বোধগম্য নয়।
৫. তাকদিরের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে নিজের নেক আমলসমূহ নষ্ট করবেন না। ইতঃপূর্বে আপনি যত মহৎ নেক আমলই করেন না কেন, তাকদিরের প্রতি অসন্তোষ ও ঘৃণা তা নষ্ট করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। পবিত্র কুরআনের বিধান: ‘এটি এ জন্য যে, তারা এমন সব বিষয়ের অনুসরণ করেছে যা আল্লাহকে ক্রোধান্বিত করেছে এবং তারা তাঁর সন্তোষকে অপছন্দ করেছে। ফলে আল্লাহ তাদের কর্মসমূহ নিষ্ফল করে দিয়েছেন।’ (মুহাম্মদ, ৪৭: ২৮)
৬. সন্তুষ্ট চিত্তে আল্লাহর ফায়সালা মেনে নিন। তার চূড়ান্ত বিধানের সামনে নিজেকে সমর্পণ করুন। এ বিশ্বাস ধারণ করুন যে, নিজের কল্যাণে আপনার সিদ্ধান্তের চেয়ে আল্লাহ তা'আলার ফায়সালাই অধিক সংগত ও কল্যাণকর। আপনার সন্তোষ ও তুষ্টির মানসিকতা উত্তম পাথেয়। কেননা মনের সচ্ছলতাই প্রকৃত সচ্ছলতা। রাসূলুল্লাহ বলেছেন: ‘আল্লাহ তা'আলা তোমার জন্য যে ফায়সালা করেছেন, তাতে সন্তুষ্ট থাক। তবেই আপনি মানুষের মাঝে প্রকৃত সচ্ছল ও ধনী হতে পারবে।’ (তিরমিজী ৪/১২৭)
৭. নিকৃষ্ট বিতারিত ইবলিসের শিষ্য হতে যাবেন না, সে মানুষের মনে তাকদির ও নিয়তির বিষয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে; বান্দার ইচ্ছাশক্তি ও কর্মক্ষমতা এবং আল্লাহর তা'আলার ফায়সালা ও নিয়তির বিষয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলে দুর্বোধ্য করে তোলে। বিশ্বজগতে সর্বপ্রথম যে অবাধ্যাচার ও নাফরমানি ঘটেছিল, তা আল্লাহ তা'আলার ফায়সালার প্রতি অসন্তোষের কারণেই হয়েছিল। আদম-কে সিজদা করার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ এসেছিল, ইবলিস তা সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিতে পারেনি। তাই আল্লাহ তা'আলা তাকে আযাবে পাকড়াও করলেন।
৮. আপন রবের প্রতি গভীরভাবে এ বিশ্বাস ধারণ করতে হবে যে, জীবনের বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে আল্লাহ আপনাকে পরীক্ষার সম্মুখীন করেন। এর মাধ্যমে মূলত তিনি আপনাকে তাঁর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দা হওয়ার সুযোগ দান করেন। বিভিন্ন অবস্থা ও পরিস্থিতির সম্মুখীন করেন রবের উপর আস্থা ও বিশ্বাস, ধৈর্য ও অবিচলতা পরখ করার জন্য, আপনার তাসবীহ্*, তাহলীল*, আল্লাহ তা'আলার দরবারে সবিনয় কাকুতি-মিনতি ও ক্রন্দন দেখার জন্য। কোনো সন্দেহ নেই যে, এসব আমলের মাধ্যমে বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়, আল্লাহর দরবারে তার মাকাম উচ্চ হতে উচ্চস্তরে উন্নীত হয়।
৯. আপন রবকে অসন্তুষ্ট করে শয়তানকে খুশি করবেন না। আল্লাহর ফায়সালা ও তাকদিরের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করে আপনার পরিবার-পরিজনকে কষ্টে ফেলবেন না; বরং জীবনে সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না সবই হাসিমুখে প্রসন্নচিত্তে বরণ করুন। এতে মহান রবের পক্ষ হতে প্রতিদানপ্রাপ্ত হবেন, তাঁর সন্তুষ্টি লাভে ধন্য হবেন। পরিবার-পরিজন ও বন্ধুবান্ধব আপনার মানসিকতায় আশ্বস্ত হবে।
১০. সর্বদা নিজেকে এ কথা বলুন যে, আপনি আল্লাহর বান্দা। সুতরাং তিনি যদি আপনার মঙ্গলের ফায়সালা করেন, আপনার কর্তব্য তাঁর প্রশংসা জ্ঞাপন করা। তিনি যদি আপনার অমঙ্গলের ফায়সালা করেন, তাহলে পুণ্য লাভের আশায় সন্তুষ্টচিত্তে ধৈর্যধারণ করাও কর্তব্য। কেননা তিনি আপনার খালিক-মালিক (স্রষ্টা ও কর্তৃত্বাধিকারী)।
১১. আল্লাহর ফায়সালার প্রতি অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ না হয়ে যদি প্রফুল্ল চিত্তে ধৈর্য্যধারণ করতে পারেন, তবে রাসূল -এর যবানে বিরাট প্রতিদান ও মহা পুণ্যের সুসংবাদ গ্রহণ করুন: মু'মিন বান্দার অবস্থা বড়ই আশ্চর্যের! তাঁর প্রতিটি অবস্থাই তো তার জন্য মঙ্গলজনক। প্রকৃত মু'মিন বান্দাই এ কল্যাণের হকদার। সে কোনো সুসংবাদ ও আনন্দ পেলে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে। যা তার জন্য মঙ্গল বয়ে আনে। কোনো দুঃসংবাদ ও দুঃখের সম্মুখীন হলে ধৈর্যধারণ করে। এটাও তার জন্য মঙ্গল বয়ে আনে।” (মুসলিম ৪/২২৯৫)
১২. আপনি যে বিপদ ও সংকটে পড়েছেন, তার চেয়েও বড় বিপদ ও গুরুতর সংকটের আশঙ্কাও রয়েছে, তাতেও তো আক্রান্ত হতে পারতেন-এ কথা মনে করে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করুন। প্রকৃত বাস্তবতা হলো, বিপদের চেয়ে মহাবিপদ বিদ্যমান। সংকটের চেয়ে মহাসংকট বর্তমান। যেমন: কোনো ব্যক্তি পুত্রের মৃত্যু শোকে বিহ্বল হয়েও আল্লাহর দরবারে শোকর আদায় করল যে, আমি তো একটিমাত্র সন্তান হারিয়েছি, যদি সকল সন্তানকে হারাতাম! আল্লাহ মেহেরবান! বাকিরা তো সুস্থ স্বাভাবিক বেঁচে আছে। কারো পা ভেঙে যাওয়ার পরও আল্লাহর দরবারে শোকর আদায় করল যে, আমার পা ভেঙেছে মাত্র। পঙ্গু অকেজো হয়ে যাইনি। চিকিৎসা গ্রহণ করে আমি পুনরায় সুস্থ-স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারব।
১৩. দুঃখ-কষ্ট ও ব্যথা-বেদনার অনুভূতি ব্যক্ত করা ব্যতীত আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট ও প্রসন্নচিত্ত হতে হবে-এমন কোনো বিধিবদ্ধ বিধান নেই। অসুস্থ ব্যক্তি ব্যথায় কাতরাতে-কাতরাতে তিতা ওষুধ সেবন করছে; কিন্তু মনে-প্রাণে সে আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট। রোযাদার গরমের দাবদাহ সহ্য করেও রোযা রাখছে। প্রসন্নচিত্তেই সে গরমের এ কষ্টটুকু সহ্য করে যাচ্ছে। এ কষ্টে তার কোনো অভিযোগ-অনুযোগ নেই। সুতরাং তাকদির ও নিয়তির ভালোমন্ড মেনে নিয়ে, শরীয়তের বিধান লঙ্ঘন না করে, দুঃখ-বেদনা ও দুর্দশার কথা ব্যক্ত করা যেতে পারে। তাতে কোনো বাধা নেই।
১৪. আল্লাহর ফায়সালা ও তাকদিরের ভালোমন্ড মেনে নেওয়ার তিনটি স্তর রয়েছে:
সর্বোচ্চ স্তর হলো সন্তুষ্ট ও কৃতজ্ঞচিত্তে গ্রহণ করা। মধ্যস্তর হলো নিয়তির সামনে নিজেকে সঁপে দিয়ে ধৈর্যধারণ করা। নিম্নস্তর হলো অসন্তোষ, বিরক্তি ও ক্ষোভ প্রকাশ করা। সর্বোচ্চ স্তর হলো পুণ্যবান মুত্তাকীদের অবস্থা। মধ্যস্তর হলো মধ্যম পর্যায়ের মু'মিন বান্দার অবস্থা। নিম্নস্তর হলো ক্ষতিগ্রস্ত ও যালিম বান্দার অবস্থা। সুতরাং আপনি তুষ্টি ও সন্তুষ্টি, শোকর ও কৃতজ্ঞতার সর্বোচ্চ স্তর অর্জনে সচেষ্ট হোন।
১৫. এমন কেউ নেই যে, অদৃশ্যে জ্ঞাত। কারো এ সামর্থ্য নেই যে, কী ঘটতে যাচ্ছে, সে তা আগাম সংবাদ দিতে পারে। এমনকি এর ওপর ভিত্তি করে কী মঙ্গল বয়ে আসছে কিংবা অমঙ্গল ধেয়ে আসছে, তাও জানিয়ে দিতে পারে। একমাত্র মহান আল্লাহ তা'আলা অদৃশ্যে জ্ঞাত, অদৃষ্টির দ্রষ্টা। সুতরাং তাঁর বিধানেই সন্তুষ্ট থাকুন। তাঁর ফায়সালার সামনে নিজেকে সমর্পণ করুন। লোকমান হাকীম তাঁর পুত্রকে অসীয়ত⁷ করেছিলেন: 'আমি তোমাকে কয়েকটি মহৎ গুণ অর্জনের উপদেশ দিচ্ছি, যার মাধ্যমে তুমি আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারবে এবং তাঁর ক্রোধের পাত্র হওয়া থেকে বেঁচে থাকতে পারবে। আল্লাহর ইবাদত করবে, তাঁর সঙ্গে শিরক করবে না। ভালো-মন্ড সবক্ষেত্রে আল্লাহ ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকবে।'
১৬. আকৃতি-অবয়বে, জীবিকা-উপার্জনে, পদ ও সম্মানে, স্বাস্থ্য ও সুস্থতায় ইত্যাদি যাবতীয় ক্ষেত্রে আপনার নিম্নশ্রেনীর লোকদের অবস্থা লক্ষ করুন। ফলে আপন রবের প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ বজায় থাকবে। রাসূল -এর বাণী স্মরণ করুন: ‘তোমাদের চেয়ে নিম্নস্তরের লোকদের প্রতি দৃষ্টি দাও। তবে তোমাদের চেয়ে উঁচু স্তরের লোকেদের দিকে লক্ষ্য করো না। কেননা আল্লাহর নি'আমাতকে তুচ্ছ না ভাবার এটাই উত্তম পন্থা।’ (মুসলিম ৪/২২৭৫)
১৭. ইহজাগতিক বাস্তবতার সাথে নিজের মন-মানসিকতা, চিন্তা-চেতনা সর্বপরি নিজেকে মানিয়ে নিন। জাগতিক জীবন হলো বিপদ-আপদ, সংকট-সংকীর্ণতায় আকীর্ণ। যত দিন আপনি এ জীবনযাপন করবেন, আপনাকে দুঃখ-দুর্দশা মোকাবিলা করে বেঁচে থাকতে হবে। প্রকৃত সুখ, চিরস্থায়ী শান্তি শুধু জান্নাতই লাভ করতে পারবেন। তখন এ ঘোষণা শুনতে পাবেন: ‘তোমরা তাতে প্রবেশ কর নিরাপদে নিশ্চিন্তে।’ (হিজর, ১৫: ৪৬)
১৮. আপনি যদি আল্লাহর অবধারিত হুকুম মেনে নিতে না চান, তাঁর ফায়সালার সামনে নিজেকে সমর্পণ করতে প্রস্তুত না থাকেন, তবে আপনার কি-ই বা করার আছে? এর বিকল্পে আপনার কি-ই বা ইচ্ছাশক্তি ও কার্যক্ষমতা আছে? কপালে জুটবে শুধু মানসিক সংকীর্ণতা, অস্থিরতা, অনর্থক অভিযোগ-অনুযোগ, চাপা ক্ষোভ ও অসন্তোষ। এসব মানসিক অস্থিরতা আপনার জীবিকায় সচ্ছলতা ফিরিয়ে দিবে না, শারীরিক সুস্থতা দান করবে না, আপনার হারানো সন্তান পুনর্জীবিত করতে পারবে না। উল্টো আপনার মধ্যে আক্ষেপ-অনুতাপ, মানসিক যন্ত্রণা বাড়িয়ে দিবে। আপন রবের ওপর আস্থা ও বিশ্বাসের সাথে ধৈর্যধারণ করার মহা প্রতিদান থেকে বঞ্চিত করবে। রাসূল বলেছেন: বিপদ-আপদ যত কঠিন হবে, এর ধৈর্যের প্রতিদানও তত বিরাট হবে। আল্লাহ তা'আলা যদি কোনো সম্প্রদায়কে পছন্দ করেন, তাদেরকে পরীক্ষার সম্মুখীন করেন। যে আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকে, সে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে। আর যে অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ হয়, সে আল্লাহর ক্রোধের পাত্রে পরিণত হয়। (সহীহ ইবনে মাজাহ ২/১৩৩৮)
১৯. নবীগণদের জীবনচরিত পড়ে দেখুন, নেককার বান্দাদের জীবনচরিত পড়ে দেখুন, কীভাবে তাঁরা জীবনের পদে-পদে কঠিন থেকে কঠিনতর পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন! কত মহা বিপদ-দুর্যোগ মোকাবিলা করেছেন! তাঁদের তুলনায় আমাদের জীবনের সংকটগুলো তো নিতান্তই নগণ্য, তুচ্ছ। তা সত্ত্বেও তাদের হৃদয়াত্মা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টিতে পরিতৃপ্ত, আত্মসমর্পণের পরম সৌভাগ্যে অপুত, দেহের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ধৈর্য ও স্থৈর্যের পরীক্ষায় সদা অনঢ়। তাঁরা আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট। আল্লাহ তা'আলাও তাঁদের ফায়সালায় সন্তুষ্ট।
২০. পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার বাণী: ‘কেবল (সাফল্য লাভ করবে) সে ব্যক্তি যে বিশুদ্ধ অন্তর নিয়ে আল্লাহর নিকট আসবে।’ (শুআরা, ২৬: ৮৯) সুতরাং শুদ্ধ ও নিষ্কলুষ মন ব্যতীত আমরা মুক্তি পেতে পারি না। সন্তুষ্টচিত্তে তাকদিরের ভালোমন্ডের ফায়সালা মেনে নেওয়া ব্যতীত হৃদয়াত্মার পরিশুদ্ধি ও নিষ্কলুষতা সাধিত হতে পারে না। তাই হিংসা-বিদ্বেষ, ক্ষোভ-আক্রোশ, ধোঁকা-প্রবঞ্চনা থেকে অন্তর পবিত্র করে আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টি লালন করুন।
২১. আপনি যদি আপন রবের প্রতি গভীর আস্থা ও বিশ্বাস, সন্তুষ্টি, সমর্পণ, তাকদিরের ভালোমন্ড সাদরে গ্রহণ করার মতো বিরাট নিয়ামতপ্রাপ্ত হয়ে থাকেন, তবে তোমার রবের প্রাশংসা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করুন। কেননা আপনি অন্তর্জাগতিক বিরাট নিয়ামতপ্রাপ্ত হয়েছেন। ঈমানের উচ্চস্তর লাভ করেছেন। আখেরাতের বিশাল ধনভাণ্ডার সঞ্চয় করে নিয়েছেন।
২২. বিশ্বনন্দিত কোনো ইঞ্জিনিয়ার যদি বিশাল অট্টালিকা নির্মাণ করে, বড় বড় দরজা-জানালা ও প্রবেশপথ দিয়ে ভবনের প্রতিটি স্তর সাজায়, এরপর সে আবার ভাঙা-গড়ার কাজ শুরু করে, নতুনভাবে ভবনটি নির্মাণ করে, তবেও কি কারো সাধ্য আছে যে, তার নির্মাণশৈলীর সমালোচনা করবে? তাহলে যিনি মহা প্রজ্ঞাবান, যাবতীয় কল্যাণ-অকল্যাণের দ্রষ্টা, তাঁর সিদ্ধান্তের প্রতি কীভাবে অসন্তোষ ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হতে পারে? তাঁর ভালোমন্ডের ফায়সালা কি বিনা বাক্যে মেনে নেওয়া সমীচীন নয়?
২৩. ব্যক্তি যখন তার আপাদমস্তক বিজ্ঞ ডাক্তারের কাছে সঁপে দেয়, ডাক্তার প্রয়োজনবোধে কোনো অঙ্গ অবশ করেন, অথবা কেটে ফেলেন, কিংবা কোথাও অপারেশন করেন। সকলেই বলে, 'ডাক্তার যথার্থ করেছেন।' চিকিৎসকের অভিজ্ঞতার কারনেই সবাই নির্দ্বিধায় তার চিকিৎসার প্রশংসা করে। তাহলে যিনি মহাপ্রজ্ঞাবান, বিশ্বের দৃশ্য-অদৃশ্য যাবতীয় বিষয়ে সর্বজ্ঞ সত্তা, তিনি যদি আপনাকে কোনো কিছু থেকে বঞ্চিত করেন, কোনো সংকটে ফেলেন, তবে নিজ প্রজ্ঞা ও বিজ্ঞতার গুণেই তিনি তা করেছেন। তাই তাঁর ভালোমন্ডের ফায়সালার সামনে নিজেকে সমর্পণ করুন। পবিত্র কুরআনের বাণী স্মরণ করুন: ‘যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি জানবেন না? অথচ তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক জ্ঞাত।’ (মুলক, ৬৭: ১৪)
২৪. আল্লাহর তরফ থেকে অবধারিত তাকদিরের ভালোমন্ডের ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকুন। নিজের মন-মানসিকতা এভাবে প্রস্তুত করে নিন যে, ইহজাগতিক জীবনে কাঙ্ক্ষিত যত সুখ-শান্তির ছোঁয়া, অনাকাঙ্ক্ষিত যত দুঃখ-বিষাদের থাবা, সবই বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর পক্ষ থেকে পূর্বনির্ধারিত ও চূড়ান্ত অবধারিত, এর কোনো ব্যত্যয় ঘটবে। রাসূল ﷺ বলেছেন: যদি কোনো কিছু (বিপদ) তোমার উপর আপতিত হয় তবে এরূপ বলবে না যে, যদি আমি তেমনটি করতাম তাহলে এমনটি হতো; বরং বলুন যে, আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন এবং তিনি যা চেয়েছেন তাই করেছেন। কেননা, আপনার ঐ (যদি) শব্দটি শয়তানের আমলের দুয়ার খুলে দেয়। (মুসলিম ৪/২০৫২)
২৫. এ কথাটি মনে মনে পাঠ করতে থাকুন: ‘আমি রব ও প্রতিপালক হিসেবে আল্লাহকে পেয়ে, ধর্ম হিসেবে ইসলাম গ্রহণ করে এবং নবী হিসেবে মুহাম্মদ-এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে সন্তুষ্ট।’ এতে আপনি পরম সৌভাগ্য ও ঈমানের প্রকৃত স্বাদ অনুভব করতে পারবেন। রাসূলুল্লাহ বলেছেন: যে ব্যক্তি রব ও প্রতিপালক হিসেবে আল্লাহকে পেয়ে, ধর্ম হিসেবে ইসলাম গ্রহণ করে এবং নবী হিসেবে মুহাম্মদ-এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে সন্তুষ্ট, সে ঈমানের প্রকৃত স্বাদ আস্বাদন করতে পারবে। (মুসলিম: ১/৬২)
রাসূলুল্লাহ অন্যত্র বলেছেন: যে ব্যক্তি বলবে, আমি রব ও প্রতিপালক হিসেবে আল্লাহকে পেয়ে, ধর্ম হিসেবে ইসলাম গ্রহণ করে এবং নবী হিসেবে মুহাম্মদ -এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে সন্তুষ্ট, তার জন্য জান্নাত অবধারিত হয়ে যাবে। (সহীহ ইবনে হিব্বান: ৩/১৪৫)
২৬. প্রকৃত মুসলিমের পরিচয় হলো, যে বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ তা'আলার সামনে আত্মসমর্পণ করে। তাঁর সমস্ত বিধিবিধান ও ফায়সালা সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেয়। নিয়তির ভালোমন্ড ফায়সালা সম্পর্কে তার কোনো অভিযোগ-অনুযোগ থাকে না। সর্বোপরি ইহজাগতিক জীবনের প্রকৃত বাস্তবতা মেনে নিয়েই সে আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকে। আপন রবের প্রতি সুধারণা পোষণ করবে। আল্লহ্ তা'আলা যে তার মতো নগণ্য বান্দার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং তার যাবতীয় বিষয় পরিচালনা করছেন, এর জন্য তাঁর দরবারে স্বপ্রশংস কৃতজ্ঞচিত্ত থাকে। সুতরাং আপনিও নিজেকে এভাবে গড়ে তোলায় সচেষ্ট হোন।
২৭. আপনি যদি প্রকৃত সুখ-শান্তি, আনন্দ ও প্রশান্তি পেতে চান, তাহলে তুষ্টি ও সন্তুষ্টির মানসিকতা লালন করুন। ইহকালেই তা আপনার সামনে জান্নাতের দ্বার উন্মোচন করবে। আর অসন্তোষ ও ক্রোধ হলো দুঃখ-কষ্ট ও আফসোস-অনুতাপের কারণ। যা আপনার মনে দ্বিধা ও সংশয় সৃষ্টি করবে; আপনাকে আল্লাহর ক্রোধের পাত্রে পরিণত করবে। সুতরাং আপন রবের প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন। তাঁর ফায়সালা সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করুন。

টিকাঃ
* স্বভাবজাত বদভ্যাস।
* আল্লাহ তা'আলার মহত্ত্বের ঘোষণা।
* আল্লাহ তা'আলার বড়ত্বের ঘোষণা।
৭. উপদেশ।

পরিশিষ্ট: বিখ্যাত ভাষাবিদ ইবনে ফারেস শুধু রুটি ও পানি খেয়েই জীবনধারণ করতেন। লোকেরা তাঁর কাছে জানতে চাইল: 'আপনি কীভাবে জীবন-যাপন করেন?' বললেন: 'আমি তো আল্লাহ প্রতি সন্তুষ্টি অবলম্বন করেই বেঁচে আছি।' এরপর তিনি এই কবিতা আবৃতি করেন:
পানি, রুটি ও ছায়াদার বাসস্থান, এ-ই তো আমার জন্য বিরাট নিয়ামত। যদি বলি, এতো আমার জন্য অতি সামান্য, তাহলে আমি হবো আমার রবের নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞ।

আমেরিকার বিখ্যাত লেখক ডেল কার্নেগী (১৮৮৮-১৯৫৫ খৃস্টাব্দ) একটি ঘটনা লিখেছেন:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন নৌবাহিনীর প্রধান জাপানের সমুদ্রে ডুবে গেলেন। এক পর্যায়ে তার মনে হলো, প্রাণ নিয়ে আর তীরে ফিরতে পারবেন না। কিন্তু নৌবাহিনীর অন্য সদস্যদের সাহায্যে তিনি এ যাত্রায় বেঁচে গেলেন। পরে এ ঘটনায় তার অনুভূতি জানতে চাওয়া হলো। বললেন, 'আমি জীবনের একটি শিক্ষা লাভ করেছি-যে ব্যক্তি তার ভাগ্য ও নিয়তি সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিতে পারবে এবং জীবনধারণের জন্য গরম রুটি ও শীতল পানি পাবে, সে সুখী জীবনযাপন করতে পারবে।'

বিশিষ্ট সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) (৩২ হি.) বলেন: 'আল্লাহ তা'আলা তাঁর ন্যায়ানুগতা ও ন্যায়পরায়ণতার মাধ্যমে অগাধ বিশ্বাস ও সন্তুষ্টির মানসিকতার মধ্যে প্রকৃত সুখ নিহিত রেখেছেন। আর দ্বিধা-সংশয়, অসন্তোষ ও ক্ষোভের মধ্যে দুঃখ-দুর্দশা ও মানসিক অপ্রসন্নতা ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে দিয়েছেন।'

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 খেলাধুলা নিয়ে অন্যায় বাড়াবাড়ি ও পক্ষপাতিত্ব

📄 খেলাধুলা নিয়ে অন্যায় বাড়াবাড়ি ও পক্ষপাতিত্ব


খেলাধুলা নিয়ে অন্যায় বাড়াবাড়ি ও পক্ষপাতিত্ব একটি মানসিক ব্যাধি। যা ব্যক্তিকে তার পছন্দের খেলোয়াড় ও দলের সমর্থনে এবং প্রতিপক্ষের বিপক্ষে প্রান্তিক ও উগ্র করে তোলে। সমর্থনের এই বাড়াবাড়ি ও উগ্রতা কখনো কখনো অন্যকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, গালমন্দ, আরেক কদম আগে বেড়ে হাতাহাতির রূপ ধারণ করে। অর্থাৎ এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, যা খেলাধুলার স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা ব্যাহত করে।

অন্ধ ক্রীড়া উন্মাদনা সমর্থকদের মাঝে পরস্পর হিংসা, বিদ্বেষ, ঝগড়া-বিবাদ ও সম্পর্কচ্ছেদের মতো বিশ্রি পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। কখনো কখনো তা আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে হাতাহাতি ও মারপিটের রূপ পরিগ্রহ করে। অনেক পত্র-পত্রিকায় দেখা যায়, তারা এমন এমন রিপোর্ট করছে, যা ক্রীড়ামোদী সমর্থকদের মাঝে ক্রীড়া-উন্মাদনা উস্কে দেয়। বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়া ও স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোতে খেলাধুলা নিয়ে অনেক বাকবিতণ্ডা ও তর্কযুদ্ধ দেখা যায়। যার কোনো কোনোটি শেষ অবধি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। এভাবে অন্ধ ক্রীড়া-উন্মাদনার কারণে আনন্দ-উৎফুল্লতা বিষাদ-বেদনায় পর্যবসিত হয়, পরস্পর সৌহার্দ্য-ভালোবাসা বিভেদ-বিসংবাদের রূপ পরিগ্রহ করে। কোনো কোনো খেলার ম্যাচ দেখা গেছে সুষ্ঠুভাবে শেষ হয়ে পুরস্কার উদযাপনের পরিবর্তে গণ্ডগোল ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা বাঁধিয়ে সমাপ্ত হয়েছে।

এ ধরনেরর ক্রীড়া-উন্মাদনা ও দুর্গতি থেকে আমরা আমাদের প্রজন্মকে কীভাবে রক্ষা করতে পারি, কীভাবে তাদের মাঝে সুস্থ ক্রীড়া-বিনোদনের প্রাণ সঞ্চার করতে পারি, যা তাদের মাঝে বিভেদের পরিবর্তে সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করবে; বিদ্বেষের পরিবর্তে আন্তরিকতা বাড়াবে; সম্পর্কচ্ছেদের বন্ধন অটুট করবে?

সমাধান:
১. সামাজিক অঙ্গনে, বিশেষ করে ক্রীড়াঙ্গনে অহংকার-দাম্ভিকতা ও ঘৃণার সংস্কৃতি বাদ দিয়ে মানবিক উদারতা ও সুস্থ ক্রীড়া-মননশীলতার সংস্কৃতি বজায় রাখতে হবে। যাতে খেলোয়াড়, সমর্থক ও দায়িত্বশীলদের মন-মানসিকতা ও আচার-আচরণে অন্ধ বাড়াবাড়ি ও ক্রীড়া-উন্মাদনার কোনো ছাপ না থাকে এবং বর্তমান প্রজন্মের মাঝে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির সম্পর্ক গড়ে উঠে। কেননা খেলাধুলা কোনো বিপর্যয়-বিশৃঙ্খলা ও ঝগড়া-বিবাদের ক্ষেত্র নয়। তা হলো শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ রক্ষার একটি মাধ্যম মাত্র।
২. খেলাধুলা নিয়ে অন্যায় বাড়াবাড়ির বিষয়টি প্রশ্রয় না দিয়ে একে শাস্তিযোগ্য অপরাধের আওতাভুক্ত করতে হবে। এক্ষেত্রে যারাই খেলাধুলার অপব্যবহার করে উগ্রতা উসকে দিবে, অন্ধ উন্মাদনা মাতাবে, তাদেরকে শাস্তির আওতাভুক্ত করতে হবে।
৩. ক্রীড়াঙ্গনে যারা সুস্থ মননশীলতা, উদারতা, নিয়ম-নীতির অনুবর্তিতার পরিচয় দিবে, তাদেরকে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কৃত করতে হবে। যেন তারা নিজেদের এ বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে পারে এবং তাদের দেখে অন্যরাও অনুপ্রাণিত হয়।
৪. কথাবার্তায় সংযম, অন্যের প্রতি সদাচার, কাউকে কষ্ট না দেওয়া, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া ইত্যাদি বিষয়সংবলিত কুরআনের আয়াত ও হাদীস ব্যাপকভাবে প্রচার করা কর্তব্য।
৫. মনে রাখবেন, হোক ক্রীড়াঙ্গন কিংবা যেকোনো অঙ্গন, শরীয়তের দৃষ্টিতে সবক্ষেত্রেই বাড়াবাড়ি, উন্মাদনা ও পক্ষপাতিত্ব এবং এর কারণে যে ঝগড়া-বিবাদ, গালমন্দ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়-তা সবই নিষিদ্ধ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন: ‘তারপর লোকেরা তাদের মাঝে তাদের দীনকে বহুভাগে বিভক্ত করেছে। প্রত্যেক দলই তাদের কাছে যা আছে তা নিয়ে উৎফুল-।’ (মু'মিনুন, ২৩: ৫৩)
৬. সমাজের প্রতিটি স্তরে অভিভাবকগণ নিজেদের পরিবার ও ঘরে সন্তানদের মাঝে সৌহার্দ্য, উদারতা, প্রতিযোগিতামূলক চেতনা ও সহনশীল মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি অহংকার, দাম্ভিকতা, স্বজনপ্রীতির মতো নোংরা স্বভাবগুলো থেকে বিরত রাখতে হবে।
৭. প্রত্যেক দল ও ক্রীড়া সংস্থার পক্ষ থেকে প্রীতি-মিলন সভা আয়োজন কিংবা "ক্রীড়াঙ্গনে স্বজনপ্রীতিকে না বলুন” শিরোনামে প্রীতি ম্যাচের আয়োজন করতে হবে। এ ম্যাচ থেকে অর্জিত আয় এতিম-দুস্থদের কল্যাণ ফান্ডে জমা হবে। যাতে করে খেলোয়াড়, দর্শক ও ক্রীড়াসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যেও মানবিকতা ও দয়ার্দ্রতার অনুভূতি জাগরূক থাকে।
৮. খেলাধুলার বিষয়টি আনন্দ-বিনোদন ও সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার আঙ্গিকে গড়ে তুলতে হবে। একে এমন ছাঁচে ঢেলে সাজাতে হবে, যেন তা বিশ্বমানবতার দরবারে ধার্মিকতা, নীতি-নৈতিকতা ও মানবিকতার মহৎ বার্তার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে মূল্যায়িত হয়। যা মানুষের ইসলামের মহৎ শিক্ষাদীক্ষার বিস্তার ঘটাবে।
৯. খেলোয়াড় ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ ও সাধারণ কর্মকর্তাগণ বিবৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিটি কথা, প্রতিটি শব্দ ভেবে চিন্তে উচ্চারণ করবেন। তাদের কোনো কথা যেন পক্ষপাতদুষ্ট না হয় এবং অন্যের জন্য কষ্টদায়ক না হয়। কেননা ক্রীড়া বিভাগের অন্যদের জন্য তারা অনুসরণীয়।
১০. সাংবাদিক ও কলামিস্টদের কর্তব্য হলো সুস্থ ক্রীড়ামননশীলতা ভাব বজায় রেখে রিপোর্ট করা। তাদের লেখায় ক্রীড়া-উন্মাদনা ও পক্ষপাতের কোনো ছাপ না থাকে কিংবা সমর্থকদের মাঝে তা উস্কে দেওয়ার প্রবণতা না থাকে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন: ‘ তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে একে অন্যকে সহযোগিতা করবে। অন্যায় ও যুলুমের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে না। আল্লাহকে ভয় করে চলো। নিশ্চয়ই আল্লাহর শাস্তি অতি কঠিন।’ (সূরা মায়েদা, ৫: ২)
১১. এ মানসিকতা বদ্ধমূল করতে হবে যে, খেলায় হার-জিত স্বতঃসিদ্ধ ও অবশ্যম্ভাবী। হার কিংবা জিত কোনোটিই স্থায়ী নয়। সুতরাং ফলাফল যা-ই হোক না কেন, পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়ে তা স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে হবে।
১২. যে ব্যানার কিংবা প্ল্যাকার্ড দর্শকদের মাঝে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, তাদের সমর্থনে আঘাত হানে, তা নিয়ে স্টেডিয়ামে প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে হবে।
১৩. স্বাস্থ্য সচেতন হোন, এবং উন্মাদনা, বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জনের কারণে যে ধরনের রোগ-ব্যাধির জন্ম হয় (যেমন: ব্রেইন স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, হার্ট এ্যাটাক ইত্যাদি) থেকে বেঁচে থাকুন। সীমাহীন উন্মাদনা ও বাড়াবাড়ির বশবর্তী হয়ে টিভি পর্দায় ও স্টেডিয়ামে অনেককে এ ধরনের রোগে আক্রান্ত হতে দেখা গেছে。

পরিশিষ্ট:
সুফইয়ান ইবনু 'উয়াইনাহ্ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, আমর (রহ.) জাবির (রা.)-কে বলতে শুনেছেন, আমরা এক যুদ্ধে নবী করিম-এর সঙ্গে ছিলাম। তখন একজন মুহাজির একজন আনসারের নিতম্বে আঘাত করল। সে সময় আনসারী চিৎকার করে বলল, 'হে আনসারীরা!' আর মুহাজির ব্যক্তি হাঁক দিল, 'হে মুহাজিরগণ!' তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, 'কী ব্যাপার! জাহিলিয়্যা যুগের মতো হাঁক-ডাক কেন?' তারা বলল, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ! একজন মুহাজির একজন আনসারকে পাছায় আঘাত করেছে।' রাসূলুল্লাহ বললেন, 'তোমরা এরূপ কথাবার্তা ছেড়ে দাও। কেননা, এ-তো (দুর্গন্ধময়) ন্যক্কারজনক।' (মুসলিম, ৪/১৯৯৮)

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম জাওযী (রহ.) (৬৯১-৭৫১ হি.) বলেছেন: 'দুধরনের বেশ ধারণ করা থেকে বিরত থাকুন। যে তার কোনো একটা ধারণ করবে, সে তিরস্কার ও ভর্ৎসনার শিকার হবেন।' এক. "জাহেলে মুরাক্কাব*"। দুই. তার চেয়ে জঘন্য হলো স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতিত্বের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া। আপনি বরং ন্যায়ানুগতার ভূমিকা পালন করুন। এটাই শ্রেষ্ঠ ভূমিকা।'

মোহনচাঁদ করমচাঁদ গান্ধী (মহাত্মা গান্ধী) (১৮৬৯-১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'মুষ্টিবদ্ধ হাতের সাথে আপনি কখনো হাত মেলাতে পারবেন না। বিবেক-বুদ্ধিতে জড়তাগ্রস্ত লোকের সঙ্গে তর্ক করে বোঝাতে পারবেন না।'

টিকাঃ
৮. যে জানে না। সে যে জানে না, এটাও জানে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00