📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 পারিবারিক সমস্যা

📄 পারিবারিক সমস্যা


বিবাহিত জীবনের মূল উদ্দেশ্য হলো, স্বামী-স্ত্রী পরস্পর বিবাদ-বিসংবাদে না জড়িয়ে নির্ঝঞ্ঝাট প্রশান্তিময় জীবন-যাপন করা। কিন্তু নিয়তির চিরাচরিত রীতি হলো, পরিবেশ-পরিস্থিতি সবসময় বান্দার অনুকূল হয় না। মানুষ চাইলেও সবসময় নিজ ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে পারে না।

এ পর্যায়ে একটি বিষয়ে হয়ত সবাই আমার সঙ্গে একমত হবেন যে, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক যতোই পারস্পরিক বোঝাপড়ার সমন্বয়ে গড়ে উঠুক, যতই আন্তরিক ভালোবাসাপূর্ণ হোক, সম্পর্ক যতই সুদৃঢ় মজবুত হোক, পৃথিবীর কোনো একটি ঘর, কোনো একটি পরিবারও পারিবারিক সমস্যামুক্ত নয়। তবে স্বামী-স্ত্রী উভয়ই যখন সমস্যা সমাধানে সচেষ্ট হবে, এ লক্ষ্যে কাঙ্ক্ষিত পথ-পন্থা অবলম্বন করবে, তখন পরিবারে নিজেদের মাঝে কদাচিত ঘটে যাওয়া নানা অনাকাঙ্ক্ষিত অপ্রীতিকর পরিস্থিতিগুলো তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে পারবে না, সম্পর্কের মাঝে এক বিন্দু চির ধরাতে পারবে না।

কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর কেউ যদি শুরুতেই পারস্পরিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে সচেষ্ট না হয়, তাহলে অতিসামান্য নগণ্য বিরোধও দিন দিন বাড়বাড়ন্তের রূপ ধারণ করবে এবং তার নিষ্পত্তিও দুরূহ হয়ে উঠবে। স্বামী-স্ত্রীর বিরোধের বড় ক্ষতি হলো, তা শুধু পারিবারিক জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকে না; জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও নানা জটিলতা সৃষ্টি করে এবং মন-মানসিকতা বিদঘুটে করে তোলে। যেমন: কর্মস্থলে, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে, আত্মীয়স্বজনের সাথে ও নিজের আচার-আচরণে। যে ব্যক্তি নিজ ঘরেই স্ত্রীর সঙ্গে নির্ঝঞ্ঝাট প্রশান্তিময় জীবনযাপন করতে পারে না, সে পৃথিবীর অন্য কোনো ক্ষেত্রেই ঝামেলামুক্ত সুস্থির থাকতে পারবে না। তাহলে এই জটিল সমস্যার সমাধান কীসে?

সমাধান:
১. স্বামী যখন রাগ করবে, স্ত্রী যেন নিশ্চুপ থাকে। স্ত্রী যখন রাগ করবে, স্বামীও যেন কোনো প্রত্যুত্তর না করে। উভয় দিকে থেকে ক্ষুব্ধ মনোভাব ও আক্রমণাত্মক মানসিকতা-তা নেভানো বড় দায়। এর জেড় ধরে ঘটে যেতে পারে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘনা।
২. বিবাদ-বিসংবাদে না জড়িয়ে আলোচনা ও সমঝোতার পথ অবলম্বন করুন। পরস্পর গালমন্দ করে, মারপিট করে এবং সর্বশেষ তালাক দিয়ে সম্পর্কের ইতি টানার চেয়ে এটাই প্রকৃত সমাধানের পথ।
৩. স্বামীর উদ্দেশ্যে বলছি, প্রথম সাক্ষাতেই হাসিমুখে সালাম প্রদান করুন, উত্তম কথা বলুন। হাসিমুখে বিনম্র কথা ও আন্তরিক আচার-আচরণও অনেক কঠিন ও জটিল সমস্যার সহজ সমাধান।
৪. স্বামী-স্ত্রী, আপনাদের কেউ ভাববেন না যে, পৃথিবীর কোনো পরিবার কিংবা কোনো একটি ঘর পারিবারিক সমস্যামুক্ত ছিল কিংবা আছে। এমনকি রাসূল -এর ঘরও এ ধরনের সমস্যা হতে মুক্ত ছিল না। অন্যদের কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই সচরাচর বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। সমস্যার সমাধানের পথ বেছে নিয়েই চলতে হবে।
৫. ধৈর্যধারণ করা, সহনশীলতা অবলম্বন, ক্রোধ দমন করার মানসিকতা অর্জন করুন। এগুলো হলো শ্রেষ্টতম মানবিক গুণাবলি। সুতরাং এ ধরনের গুণাবলি অর্জনে সচেষ্ট হোন এবং জীবনাচারে তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা করুন। নিজেদের সন্তানদেরও এ ধরনের মহৎ গুণাবলির শিক্ষা দান করুন।
৬. পারিবারিক যেকোনো বিষয় ভালোভাবে না বুঝে, যাচাই না করে তড়িৎ লম্ফঝম্ফ করা উচিত নয়। অন্যের দোষ-ত্রুটি খুঁজে বেড়ানোর প্রবণতা, আগপিছ না ভেবে নিজের যেকোনো ইচ্ছার বাস্তবায়ন ঘটানোর মানসিকতা পরিহার করতে হবে। অন্যাথায় যে বিপত্তি ঘটবে, তা হয়ত আপনার পক্ষে সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না। আল্লাকে ভয় করুন এবং নিয়তির ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকুন। এতেই আপনার পারিবারিক প্রশান্তি নিহিত।
৭. পরিবারে যদি কোনো সমস্যা দেখা দেয়, তবে স্বামী-স্ত্রীর ভূমিকা হবে অগ্নিনির্বাপণ টিমের মতো-আগুন নেভানোর জন্য তারা যেমন নিরাপদ দূরত্বে থেকে আপ্রাপণ চেষ্টা করে, স্বামী-স্ত্রীও তেমনি সমস্যার গভীরে না গিয়ে তা থেকে উত্তরণের পথ অবলম্বন করবে।
৮. স্বামী-স্ত্রী উভয়েই সন্তানদের জন্য উত্তম আদর্শ হয়ে থাকুন। পরিবারের সবার মাঝে শ্রেষ্ঠ আদর্শবান ব্যক্তিত্বের পরিচয় দিন। পরিবারের মাঝে ঝগড়া-বিবাদ, শোরগোল-চেচামেচি থেকে বিরত থেকে সুখ-শান্তি ও ভালোবাসাপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখুন। ফলে আপনার ঘর হবে জান্নাতের টুকরো।
৯. স্বামী-স্ত্রী যদি পরস্পর সাংঘাতিক বিরোধে জড়িয়ে পড়ে, নিজেদের পক্ষে মীমাংসা করা সম্ভব না হয়, তাহলে মধ্যস্থতা করার জন্য স্ত্রীর পক্ষ থেকে ও স্বামীর পক্ষ থেকে বিজ্ঞজনদের দ্বারস্থ হতে হবে। স্বামী-স্ত্রীর কল্যাণ বিবেচনা করে তাদের ন্যায়ানুগ ও আন্তরিক ফায়সালা বিনা প্রতিবাদে মেনে নিতে হবে।
১০. উত্তম হলো, কিছুকাল পরপর একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্বামী-স্ত্রী উভয়েই একে অপরের হতে পৃথক থাকা। এ সময়ে প্রত্যেকেই পারিবারিক দায়দায়িত্ব থেকে অবসর যাপন করবে। নিজেকে নিয়ে একান্তে সময় কাটাবে। ফলে গতানুগতিক সাংসারিক জীবনের একঘেয়েমি দূর হবে, পাশাপাশি সামান্য সময়ের দূরত্বের কারণে তাদের মধ্যে প্রীতি ও ভালোবাসার নতুন মাত্রা যোগ হবে। জীবনে একজন অপরজনের অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারবে।
১১. স্বামীর কর্তব্য, কখনো তালাক ও ডিভোর্সের চিন্তা মনে স্থান না দেওয়া। কেননা তালাক হলো আল্লাহ তা'আলার নিকট বৈধ; কিন্তু সর্বাধিক ঘৃণিত। তালাক ও ডিভোর্স স্বামী-স্ত্রীর জন্য যতটা না বেদনাদায়ক, সন্তানদের জন্য তার চেয়ে বেশি মর্মবিদারক। তবে হ্যাঁ, যদি তালাক ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো উপায় না থাকে, তবে ভিন্ন বিষয়। কেননা সর্বশেষ চিকিৎসা হলো, অপারেশন করে কেটে ফেলা。

স্বামীর জন্য কিছু বিশেষ বার্তাঃ
১২. যখন আপনি ঘরে আসবেন, হাসিমুখে সালাম প্রদান করুন, উত্তমভাবে কথা বলুন। পরিবারের সবার সাথে হাস্যরসিকতায় মেতে উঠুন। ঘরের সবাইকে আনন্দ-উৎফুল্লতায় ভরিয়ে দিন।
১৩. স্ত্রীর প্রতি অত্যন্ত যত্নবান হোন। কেননা সে তার পরিবার-পরিজন ও ঘরবাড়ি ছেড়ে, শৈশব-কৈশোরের হাজারো হাসি-আনন্দের স্মৃতি পেছনে ফেলে আপনার টানে চলে এসেছে; আপনার স্বার্থে নিজের অতীত ফেলে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পরিবারের কল্যাণে উৎসর্গ করেছে।
১৪. কখনো স্ত্রীকে এটা বোঝাতে যাবেন না যে, আপনি সঠিক আর সে ভুল; বরং মতভিন্নতা ও সমস্যার শুরুতেই নিজেকে দমিয়ে রাখুন। তার সমস্ত কথা মেনে নিয়ে ভুল স্বীকার করে নিন।
১৫. বিরোধ ও উচ্চবাচ্যের মুহূর্তে নমনীয় সুরে 'বারবার 'দুঃখিত'-'দুঃখিত' বলতে থাকুন। আপনার এমন আচরণ তার অভিযোগ-অনুযোগের মাত্রা কমিয়ে দিবে। তার রাগ ও ক্রোধের আগুনে শীতল পানি ঢেলে দিবে।
১৬. স্ত্রীর সামনে কখনো নিজের সঠিকতা ও যথার্থতার, আর তার বেঠিকতা ও অনর্থকতার ওপর যুক্তি-প্রমাণ পেশ করবেন না। এতে আপনাদের মাঝে বিদ্যমান সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করবে।
১৭. স্ত্রীকে তার অভিযোগ-অনুযোগগুলো স্বাধীনভাবে ব্যক্ত করার সুযোগ দিন। নীরবে বিনম্রভাবে তার কথাগুলো শুনে যান; কোনো প্রত্যুত্তর করবেন না। নিজেদের মাঝে বিবাদ-বিসংবাদ মেটানোর এটাই প্রথম সমাধান।
১৮. পরিবারের মাঝে উচ্চবাচ্য ও হম্বিতম্বি করে নিজেকে হয়ত কর্তৃত্ববান পুরুষের ভূমিকায় সাময়িক দাঁড় করানো যাবে; কিন্তু কখনই ভাববেন না, এভাবে আপনি স্ত্রীর সামনে নিজেকে সুপুরুষ হিসেবে প্রমাণিত করতে পারবেন, তার মন জয় করতে পারবেন, কিংবা তাকে বাগে আনতে পারবেন; বরং হিতে বিপরীত হবে, আপনার কাছে তার মূল্যহীনতার বিষয়টি তার মানসিক কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। একপর্যায়ে সে আপনার থেকে একেবারেই বিমুখ হয়ে যাবে।
১৯. ঘরের প্রতিটি বস্তুরই প্রশংসা করুন। এমনকি রান্নাঘরের চামচ, ছুরি ও খাবার প্লেটের ঝকঝকে তকতকে পরিষ্কারের বিষয়টিও আগ্রহভরে বলে যান। এভাবে মুহূর্তেই তার মন জয় করে নিতে পারবেন।
২০. কল্পনার রাজ্যে বাস করে স্ত্রীর কাছে এমন কিছুর প্রত্যাশা করা সমীচীন নয়, যা শুধু জান্নাতের হুর গেলমানদের বৈশিষ্ট্য। এ ক্ষেত্রে বাস্তবতা মেনে আল্লাহ তা'আলার ফায়সালায় তুষ্ট থাকাই কর্তব্য।
২১. স্ত্রীকে কখনো অন্য মেয়ের সাথে তুলনা করতে যাবেন না। আপনার বোনের মেধা, মাতার ধৈর্য-সহনশীলতা কিংবা দাদির মহানুভবতা, অথবা খালার বিশ্বস্ততা ইত্যাদির কোনোটিই তার কাছে আলোচনায় তুলবেন না। আপনি শুধু আন্তরিকভাবে তার প্রশংসা করে যান。

স্ত্রীর জন্য কিছু বিশেষ বার্তাঃ
২২. বোন আমার! স্বামীর মধ্যে কখনো এমন বৈশিষ্ট্য খুঁজতে যাবেন না, যা শুধু ফেরেশতা ও নবীদের মাঝেই সম্ভব। মানুষ মাত্রই ভুল ক্ষুদ্রতা ও দুর্বলতার পাত্র। আল্লাহর ফায়সালায় আপনি যাকে পেয়েছেন, তাতেই তুষ্ট থাকুন।
২৩. আপনার ঘরটিকে জান্নাতের টুকরা বানিয়ে রাখুন, যেখানে স্বামী দিনের কর্মব্যস্ততা ও দুনিয়ার ঝক্কিঝামেলা শেষে পরম স্বস্তি খুঁজে পাবে।
২৪. স্বামীর আগমনে হাসিমুখে তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানান। তার সাথে উত্তমভাবে ও প্রফুল্লচিত্তে কথা বলুন। তাকে পেয়েই নানা সমস্যা ও সংকটের আলোচনা পাড়তে শুরু করবেন না।
২৫. মানুষ মাত্রই প্রশংসা পেতে ভালোবাসে। প্রশংসার কথা শুনে খুশী হয়। আপনি তার ছোট ছোট কাজ হতে শুরু করে পরিবারের গুরুদায়িত্ব পালনের স্বতঃস্ফূর্ত প্রশংসা করুন।
২৬. যে গুণগুলো আপনার স্বামীর মধ্যে নেই, তার প্রশংসা করাও আপনার জন্য বৈধ। কৃত্রিমভাবে সে গুণগুলোর কথা বলে তাকে খুশী করাতে বাধা নেই। যেমন: অতি কৃপণ কিংবা মিতব্যয়ী স্বামীকে খুশী করার জন্য তাকে বলা যেতে পারে: 'আপনি কত উদার দানশীল! ঠিক যেমন হাতেম তাঈ!'
২৭. সর্বদা স্বামীর পজেটিভ ও ইতিবাচক দিকগুলো লক্ষ করুন। আল্লাহ তা'আলা তাকে যে বৈশিষ্ট্য দান করেছেন, তা ভুলে গেলে চলবে না। মানুষ হিসেবে স্বামীর মধ্যে যে ত্রুটিবিচ্যুতি রয়েছে, আলোচনার মাধ্যমে ও সুকৌশলে তা শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করুন।
২৮. মনে রাখবেন, যে তার পরিবারের মাঝে সুখী হতে পারে না, সে জীবনের অন্য কোনো অঙ্গনেই সুখী হতে পারে না। সুতরাং আপনি স্বামী ও পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের দোষত্রুটি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করুন। এতেই আপনার পরিবারের যাবতীয় সমস্যার সমাধান নিহিত।
২৯. অন্যের গুণগ্রাহিতা হলো অন্যতম মানবিক বৈশিষ্ট্য। কারো উত্তম কথা ও ইতিবাচক আচরণের বিষয়টি মুখে স্বীকার করাও মানবতা ও ধার্মিকতার শামিল। তাই অকপটে পরিবারের যে কারো অবদান ও কৃতিত্বের কথা স্বীকার করুন।
৩০. স্বামী বাড়িতে থাকাকালীন তাকে সময় না দিয়ে টিভি, মোবাইল ও সোস্যাল মিডিয়া নিয়ে ব্যস্ত হয়ে থাকা সমীচীন নয়। এতে আপনার প্রতি স্বামীর আন্তরিকতা ও ভালোবাসা হারাবে।

পারিবারিক সমস্যা সমাধানের যথার্থ উপায়: স্ত্রীর সাথে যখন মতবিরোধ দেখা দিবে, বাকবিতণ্ডা শুরু হবে, আপনি তখন নীরব ভূমিকা পালন করুন। বাধা না দিয়ে, উচ্চবাচ্য না করে তাকে স্বাধীনভাবে বলতে দিন। 'তুমি ভুল বলছ, মিথ্যা বকছ'-এ ধরনের কিছু বলা থেকে বিরত থাকুন। তার মনে যত নালিশ আছে, যত অভিযোগ-অনুযোগ জমে আছে, এক-এক করে সব বলতে দিন। নারীরা এভাবে বলে সুখ পায়। স্বামীকে মনের খেদ জানাতে পারলে মানসিকভাবে হালকা বোধ করে। সুতরাং এমন মুহূর্তে আপনি আত্মসমর্পণের মানসিকতা অবলম্বন করুন। তার কোনো কথার প্রত্যুত্তর করতে যাবেন না, ন্যায়সংগতভাবেও না। নিশ্চুপ থেকে তার কথা শেষ হওয়ার অপেক্ষা করুন। কথা শেষ হলে তার সমস্ত কথা মেনে নিয়ে ভুল স্বীকার করে নিন। তাকে এ বলে সান্ত্বনা দিন, 'তুমি যা বলেছ, সবই সত্য। স্বীকার করছি, আমিই ভুল ছিলাম। আমি তওবা করছি, তোমাকে কথা দিচ্ছি, আর কখনো এমন হবে না।'

স্ত্রী আপনাকে অনর্থক ভুল বুঝে থাকলেও আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আপনি ধৈর্যধারণ করুন। তার সামনে নমনীয় হয়ে থাকুন। মনে রাখবেন, এসব ক্ষেত্রে শয়তান আপনাদের নিয়ে খেলায় মেতে উঠে। তাকে পরাভূত করাই মূল উদ্দেশ্য; স্ত্রীকে নয়। তাই স্ত্রীর কথা ভুল হলেও মেনে নিন, শয়তানের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিন।

মনে রাখবেন, নারীরা স্বভাবগতভাবেই অত্যন্ত কোমল হৃদয়ের, সদয় প্রকৃতির। পুরুষের তুলনায় সে অনেক উদার, মহৎ। নিজে অসুস্থ হলেও সে আপনার সেবার ক্ষেত্রে কোনো কার্পণ্য করবে না। সন্তান ও স্বামীর অবস্থান হলো তার হৃদয়ের গহিনে, অন্তরের অন্তস্তলে। নিজের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে সে তাদের সেবা করে।

কিন্তু সামান্য বিবাদেই যদি স্বামী, স্ত্রীর প্রতিটি কথার প্রত্যুত্তর করতে থাকে, কথায়-কথায় তাকে ভুল প্রমাণিত করায় প্রবৃত্ত হয়, স্ত্রী আরও উচ্চবাচ্য করতে শুরু করবে। রেগে অপমানে অগ্নিশর্মা হয়ে স্বামীকে গালমন্দ করা শুরু করবে। এভাবে স্বামী-স্ত্রীর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ খণ্ডন ও বাকবিতণ্ডা যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছবে, একে অন্যের গায়ে হাত তুলতেও পরোয়া করবে না। মারপিট ও ঘাত-প্রতিঘাতের মুহূর্তে, রাগ-ক্ষোভের চূড়ান্তে স্বামীর মুখ ফস্কে তিন তালাকের শব্দ বেরিয়ে আসা অসম্ভব নয়। ফলে মুহূর্তেই দীর্ঘদিনের সাজানো সংসার, প্রীতি ও ভালোবাসার সম্পর্ক ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। তখন উভয় পক্ষের শত আফসোস-অনুতাপেও কোনো কাজ হবে না। তার চেয়ে বরং স্বামী-স্ত্রী উভয়ই যদি উদার ও মহৎপ্রাণের অধিকারী হয়, পরস্পর নমনীয় মানসিকতা ধারণ করে, নির্বিবাদে ভুল স্বীকার করে নেয়, তাহলে পারিবারিক খুঁটিনাটি সমস্যা জটিল আকার ধারণ করবে না। নিজেদের মাঝে ঝগড়া-বিবাদ থেকে শুরু করে অনেক জটিল সমস্যাও দু-এক কথায় কিংবা পরস্পর বোঝাপড়ায় মিটে যাবে。

পরিশিষ্ট: * স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস, প্রীতি ও ভালোবাসার সবচেয়ে মহান আখ্যানটি হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ ও খাদীজা (রা.)-এর। ইতিহাসে তা এক প্রবাদতুল্য আখ্যান। নবুয়তের সূচনা লগ্নে ও দ্বীনের দাওয়াতের প্রথম দাওয়াতগুলোতে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর জীবনের কঠিন সময় পার করছিলেন, তখন সর্বপ্রথম খাদীজা (রা.) তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। দৃঢ়চেতা সাহসী সহযোগীর ভূমিকা পালন করেছেন। ভয়ে সাহস যুগিয়েছেন। নিরাশার মুহূর্তে আশার সঞ্চার করেছেন। বিপদে সান্ত্বনা দিয়ে, আপন রবের ওপর ভরসা করে সামনে চলার সাহস জুগিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনের সেই কঠিন মুহূর্তগুলোতে খাদীজা (রা.)-এর ভূমিকা এতটা গুরুত্ব ও মহত্ত্বপূর্ণ ছিল যে, একবার স্বয়ং জিবরাঈল আমীন রাসূল ﷺ-এর দরবারে এসে আরজ করলেন: 'হে আলাহ্র রাসূল! ঐ যে খাদীজাহ (রা.) একটি পাত্র নিয়ে আসছেন। ঐ পাত্রে তরকারী, অথবা খাদ্যদ্রব্য অথবা পানীয় ছিল। যখন তিনি পৌঁছে যাবেন তখন তাঁকে তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ হতে এবং আমার পক্ষ থেকেও সালাম জানাবেন আর তাঁকে জান্নাতের এমন একটি ভবনের খোশ খবর দিবেন, যার অভ্যন্তর ফাঁকা-মোতি দ্বারা তৈরি করা হয়েছে। সেখানে থাকবে না কোন প্রকার শোরগোল; কোন প্রকার দুঃখ-ক্লেশ।' (বুখারী, ৫/৩৯)

হাদীস বিশারদগণ বলেন: 'হাদীসে বর্ণিত জান্নাতের ভবনটি হবে খাদীজা (রা.)-এর দুনিয়ার বাড়ির মতোই। রাসূল ﷺ-এর সাথে তাঁর গৃহে যেমন কোনো হৈচৈ ও শোরগোল ছিল না, নীরব প্রশান্তির আবেশ ছিল, জান্নাতেও তাঁর ভবনটি এমনই প্রশান্তিপূর্ণ হবে। রাসূলুল্লাহ -এর গৃহে খাদীজা (রা.) যেমন কোনো কষ্টের লেশমাত্র রাখেননি, তেমনি জান্নাতেও তাঁর বালাখানায় দুঃখ-কষ্টের লেশমাত্রও থাকবে না। অবশ্য জান্নাতের সমস্ত বালাখানাই শান্তি ও আরাম-আয়েশপূর্ণ হবে।'

খাদীজা (রা.) যখন ইন্তেকাল করেন, রাসূল অত্যন্ত শোকাহত হয়ে পড়েন। সে বছরটি হয়ে গেল শোকের বছর। আজও ইতিহাসের পাতায় তা শোকের বছর নামেই পরিচিত। খাদীজা (রা.)-এর ইন্তেকালের কয়েক বছর পরও তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রাসূল -এর হৃদয়-আত্মা জুড়ে বিরাজ করছিল। রাসূল যখনই তাঁর কথা স্মরণ করতেন, দু' চোখ বেয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরত। স্ত্রীর প্রতি আন্তরিকতা ও ভালোবাসার টানে তাঁর আত্মীয়স্বজন ও বান্ধবীদেরও খোঁজখবর নিতেন। তাঁর তরফ থেকে দান-সদকা করতেন। তাঁর মঙ্গলের দু'আ করতেন। রাসূলুল্লাহ প্রায়ই খাদীজা (রা.)-এর প্রশংসা ও স্তুতির কথা আলোচনা করতেন। তাঁর সঙ্গে কাটানো অতীতের দিনগুলোর কথা স্মরণ করতেন। পরস্পর শ্রদ্ধা-ভালোবাসা, সহযোগিতা ও সহমর্মিতার এমন সব ঘটনা শুনাতেন, যা শুনে চোখ অশ্রুসিক্ত হয়, হৃদয় বিগলিত হয়। উম্মুল মু'মিনীন খাদীজা (রা.)-এর ওপর আল্লাহর পক্ষ হতে রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। গোটা নারীজাতির জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ আদর্শ হয়ে আছেন。

* এক লোক নিজ গ্রামে স্ত্রীর সাথে বসে ছিল। সামনেই ছোট একটি মাটির ডিবি। স্বামী স্ত্রীকে বলল:
-মনে করো এই মাটিগুলো হলো আটা। আটাগুলো তুমি ছেনে খামিরা তৈরি করে আমার জন্য সুস্বাদু রুটি বানিয়ে আনবে।
-এ কাজ আমি করতে যাব?! না, তা আমার পক্ষে সম্ভব না。
-তুমি অবশ্যই পারবে এবং তোমাকেই তা করতেই হবে।
-আমার পক্ষে এ কাজ কিছুতেই সম্ভব নয়。
-তোমার এত বড় স্পর্ধা! আমার কথা অমান্য করছ? তোমাকে এ কাজটি করতেই হবে। নচেৎ! নচেৎ তিন তালাক হবে!!
-আর যা হবার হোক। আমার পক্ষে এ কাজ কিছুতেই কস্মিনকালেও সম্ভব নয়।
এরপর স্বামী উঠে স্ত্রীকে বেদম প্রহার করতে লাগল। একপর্যায়ে তাকে তিন তালাক দিয়ে তবেই ক্ষান্ত হলো।

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 সভ্যতা-সংস্কৃতির বিপর্যয়

📄 সভ্যতা-সংস্কৃতির বিপর্যয়


যেকোনো জাতিগোষ্ঠীর প্রধান উপজীবিকা হলো তার সভ্যতা-সংস্কৃতি। একই সঙ্গে তা সমাজ ও রাষ্ট্রের সঞ্চালক। পৃথিবীতে মানবজাতির অস্তিত্বের সূচনালগ্ন থেকেই সংস্কৃতির পদযাত্রা শুরু হয়েছে। মানবজাতি তার জন্মলগ্ন থেকেই সংস্কৃতির অনুগামী হয়ে আছে।

সভ্যতা-সংস্কৃতির অধঃপতন যেকোনো জাতি-গোষ্ঠীর চূড়ান্ত জড়াগ্রস্ততা ও অচলতার লক্ষণ। যে জাতি সভ্যতা-সংস্কৃতির বিপর্যয়ের শিকার সে জাতি কখনো মানবতার পৃষ্ঠপোষকতায়, উন্নতি-অগ্রগতিতে ও জীবন-জগতের বিচিত্র প্রেক্ষাপটে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না। যুগোপযোগী বার্তা বহন করতে পারে না। নীতি-নৈতিকতা ও আত্মোন্নয়নে তার যাবতীয় ভূমিকা অকার্যকর হয়ে পড়ে। জাগতিক উন্নয়ন তথা জ্ঞান-বিজ্ঞান, সমাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও সে শতক্রোশ দূরে অবস্থান করে।

মোটকথা, সভ্যতা-সংস্কৃতির অধঃপতন যেকোনো জাতি-গোষ্ঠীকে স্বকীয় আবেগ-অনুভূতি ও চিন্তা-চেতনা থেকে বিচ্যুত করে ছাড়ে। আবিষ্কার ও সৃজনশীলতায় চরম সংকট ও বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়। বিশ্বের দরবারে তার অধোগতি, লাঞ্ছনা ও অপদস্থতার চূড়ান্ত করে ছাড়ে। একটি জাতির উন্নতি-অগ্রগতি সচল রাখার জন্য এবং কোনো জাতির পুনরুত্থান ও পুনর্গঠনের জন্যও স্বকীয় সভ্যতা-সংস্কৃতির লালন করতে হবে, এর যথার্থ চর্চা, ও পরিচর্যা সুনিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু এর উপায় কী? এ লক্ষ্যে আমাদের করণীয় কী?

সমাধান:
১. মহান পূর্বসূরিদের গৌরবগাঁথা-অতীতের গান গেয়ে মুখে ফেনা তুললেই হবে না, জ্বলজ্বলে বর্তমানের দাবি অনুধাবন করতে হবে। সভ্য-সংস্কৃতির অধঃপতন মেনে নিয়ে তা থেকে উত্তরণের পথ বের করতে হবে। সর্বোপরি অতীতের গৌরবময় সভ্যতা-সংস্কৃতির পুনঃজাগরণ ঘটিয়ে হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।
২. সভ্যতা-সংস্কৃতিতে নিজেদের পশ্চাদগামিতার কারণগুলো চিহ্নিত করতে হবে। বিশ্বে অন্যান্য সফল জাতিবর্গের সভ্যতা-সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা করে তাদের ইতিবাচক দিকগুলো গ্রহণ করতে হবে। নেতিবাচক দিকগুলো পরিহার করে নিজেদের সংকট কাটিয়ে উঠার পথ আবিষ্কার করতে হবে।
৩. নিজেদের যাবতীয় ভুল-বিচ্যুতির দায় আসমানি ফায়সালার ওপর চাপিয়ে এবং অধোগতির পেছনে বহিঃষড়যন্ত্রের দিকে আঙুল উঁচিয়ে দায়সারা হয়ে বসে থাকলে চলবে না। বর্তমানের কর্তব্য নির্ধারণ করে তা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হতে হবে। নিজেদের ভুল সংশোধনে আত্মনিয়োগ করতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ‘আপনি বলুন, এটা তোমাদের নিজেদের কারণেই হয়েছে।’ (আলে ইমরান, ১৬৫)
৪. শিক্ষা বিভাগের প্রতিটি সেক্টরে যারা পরীক্ষিত মেধাবী ও প্রতিভাবান, উন্নত রাষ্ট্রগুলোর শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানে তাদের শিক্ষার সুযোগ করে দিতে হবে। যেন তারা আরও উন্নত শিক্ষা ও গবেষণার আলোকে নতুন অভিজ্ঞতা এবং উদ্ভাবনী শক্তি অর্জন করতে পারে। দেশ ও দশের উন্নতি-অগ্রগতিতে যুগোপযোগী ভূমিকা রাখতে পারে।
৫. শিক্ষা, বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও যুগোপযোগী আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের লক্ষ্যে গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর জন্য পর্যাপ্ত বাজেট পাশ করার পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও বিত্তবান শ্রেণিকেও এ ক্ষেত্রে সাহায্য-সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে হবে।
৬. দেশের উচ্চ শ্রেণি থেকে নিম্ন শ্রেণি, প্রত্যেককেই দেশ ও সমাজের ক্ষুদ্র হতে শুরু করে গুরুতর প্রতিটি আইন-কানুনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করতে হবে। যারা দেশের সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত সুযোগ-সুবিধার আড়ালে অন্যায়ভাবে ফায়দা লুটার চেষ্টা করে এবং দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে তাদের সতর্ক করার লক্ষ্যে আর্থিক জরিমানা কিংবা উপযুক্ত শাস্তির বিধান কার্যকর করতে হবে।
৭. যুবক শ্রেণি ও গ্রাজুয়েট শ্রেণির প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ইনস্টিটিউট গড়ে তুলতে হবে। উদ্দেশ্য, দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের লক্ষ্যে এমন একটি প্রতিশ্রুতিশীল ও কর্মদক্ষ শ্রেণি গড়ে তোলা, যারা সময়োপযোগী দায়িত্ব গ্রহণে সদা প্রস্তুত থাকবে এবং বিভিন্ন অঙ্গনে উন্নয়ন ও অগ্রতি সাধনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। মনে রাখতে হবে, দেশ গড়ার আগে যোগ্য ব্যক্তিত্বের বিনির্মাণ অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
৮. নীতি-নৈতিকতা, উত্তম শিষ্টাচার ও মহৎ চরিত্রের অধিকারী হতে হবে। এ ক্ষেত্রে পিতা-মাতা হতে শুরু করে শিক্ষক ও সমাজের মহৎ জ্ঞানী-গুণীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। সমাজের তরুণ প্রজন্মকে মহৎ চারিত্রিক শিক্ষা, মানবীয় মূল্যবোধ ও ধর্মীয় শিক্ষা-দীক্ষায় উজ্জীবিত করতে হবে। এ বিষয়গুলো তাদের চিন্তা-চেতনা ও গবেষণায় প্রথিত করে দিতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ‘নিশ্চিত জেনো, আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা ততক্ষণ পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।’ (সূরা রা'দ, ১১)
৯. প্রত্যেক শহর-পল্লিতে লোকদের স্বেচ্ছাসেবায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। প্রত্যেক এলাকা ও শহরে কফিশপ, রেস্টুরেন্টগুলোতে নৈতিক শিক্ষামূলক কার্যক্রমের ব্যবস্থা থাকতে হবে, যেন লোকেরা অবসর ও গল্পগুজবের সময়গুলোতেও শিক্ষা ও নীতি-নৈতিকতার ছোঁয়া পায়।
১০. অনর্থক অন্যায় অপচয় ও মাত্রাতিরিক্ত ভোগবিলাসের মানসিকতা পরিহার করতে হবে। কেননা অপচয় ও ভোগবিলাস অতীতের অনেক জাতিবর্গকে নিঃস্ব করে ছেড়েছে, অনেক উন্নত রাষ্ট্রের চূড়ান্ত অধঃপতন ডেকে এনেছে। আর্থিক ক্ষেত্রে সঞ্চয়ের মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। ব্যয়ের ক্ষেত্রে পরিমিতি বোধ ও মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে।
১১. সমাজের সকল শ্রেণিকে পরস্পর সাহায্য-সহযোগিতায় অনুপ্রাণিত করতে হবে। জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমগুলোতে একাকী পদক্ষেপ গ্রহণ না করে সকলের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এ পর্যায়ের কাজগুলো সকলে মিলেই বাস্তবায়িত করতে হবে। কেননা একক উদ্যোগে বাস্তবায়িত কাজে একার অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটে। পক্ষান্তরে, সকলের অংশীদারিত্বে বহু পরামর্শ ও অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটে। তন্মধ্যে যে পরামর্শ ও অভিজ্ঞতা যৌক্তিক ও বাস্তবমুখী, তা যথাযথভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ হয়।
১২. ব্যক্তিতন্ত্র, স্বজনপ্রীতি ও সাম্প্রদায়িকতার বীজ মূলোৎপাটন করে, আদর্শিক রাজনৈতিক ও জাতিগত বিভেদ ভুলে, জাতীয় কল্যাণে এক হয়ে কাজ করতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশঃ আল্লাহর রশিকে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখো এবং পরস্পরে বিভেদ করো না। (আলে ইমরান, ১০৩)
১৩. দ্বীন-ধর্ম ও মাতৃভূমির কল্যাণে, নেক আমল ও তাকওয়া অবলম্বনে পরস্পর সহযোগিতায় এবং অন্যায় এবং পাপাচারে নিষেধ ও প্রতিরোধে জাতির প্রতেক সদস্যকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। ধোঁকা-প্রতারণা ও দেশের শত্রুদের সহযোগিতা বর্জন এবং জাতীয় ধোঁকাবাজ ও প্রতারকদের বিরুদ্ধে কঠিন শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
১৪. দেশের প্রতিটি শ্রেণি ও পেশার মানুষকে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখতে হবে। নিম্নশ্রেণি ও সাধারণ পেশার লোকদের অবহেলা ও অসম্মানের দৃষ্টিতে দেখা অনুচিত। তাদের মানবিক ও নৈতিক অধিকারগুলো সুনিশ্চিত করে কর্মক্ষেত্রে তাদের আগ্রহ-উদ্দীপনা বজায় রাখতে হবে। কেননা একটি জাতির উন্নতি-অগ্রগতির পথে শিক্ষিত উচ্চবিত্ত শ্রেণির বিদ্যা-বুদ্ধির পাশাপাশি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির শ্রম-পরিশ্রম সমান গুরুত্বপূর্ণ। এর একটিকে ছাড়া অপরটি অচল।
১৫. ধনীদের টেক্স আদায়ে সচেষ্ট ও আন্তরিক হতে হবে এবং দরিদ্রদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে হবে। দেশের উৎপাদন ও ফলন বৃদ্ধি করতে হবে। যুবসমাজের জন্য পর্যাপ্ত কর্মক্ষেত্র প্রস্তুত করতে হবে। সর্বোপরি দেশের উন্নয়নে আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করা কর্তব্য।
১৬. কৃষি ও শ্রমক্ষেত্রে এতটা উন্নয়ন সাধন করতে হবে, এ ক্ষেত্রে যেন দেশ স্বনির্ভরতা অর্জন করতে পারে। খাদ্যপণ্যে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে উন্নত কৃষিব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। রপ্তানি আয়ের খাতগুলোতে উন্নতি লাভে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। কৃষি ও রপ্তানি হলো পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রগুলোর অন্যতম প্রধান অবলম্বন। এ ক্ষেত্রে বর্তমান বিশ্বে চীন আমাদের জন্য প্রবাদতুল্য রাষ্ট্র।
১৭. মিডিয়াকে ভিজ্যুয়াল, প্রিন্ট এবং অডিও ফর্ম্যাটগুলোতে উন্নত করতে হবে। মিডিয়ায় সম্প্রচারিত বিষয়গুলো গঠনমূলক, কল্যাণমুখী, সঠিক রুচিবোধের অনুগামী, দেশের উন্নয়ন ও পরিশীলন সহায়ক কি না-তা নিশ্চিত করতে হবে।
১৮. একটি সুনির্দিষ্ট উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ-পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সাধ্যানুযায়ী সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে একটি বাস্তবমুখী সময়সীমা নির্ধারণ করা আবশ্যক। এক্ষেত্রে জাপান হলো আমাদের সামনে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ১৮৭৬ সালে জাপানের শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি সময়াবদ্ধ উদ্যোগ গ্রহণ করে। তা হলো, আগামী বিশ বছরের মধ্যে জাপানের ভূমি থেকে মূর্খতা ও নিরক্ষরতা দূর করা। বাস্তবে তারা সফলও হয়েছে। ১৮৯৬ সালের মধ্যে বিশ্ব দরবারে নিজেদের সুশিক্ষিত জাতিরূপে প্রতিষ্ঠিত করে দেখিয়েছে।
১৯. আধুনিক শক্তিশালী সামরিক শক্তি ও দৃঢ় সংঘবদ্ধ পুলিশ বাহিনীর মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বহিঃশক্তির আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ফলে দেশের শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনসাধারণের অর্থ-সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। সঙ্গে সঙ্গে নিজের দেশকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সংস্থাগুলোর বিনিয়োগের নিরাপদ উর্বর ভূমিতে পরিণত হবে।
২০. দেশের প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য, রুটিনমাফিক জীবনযাপন করা এবং সময়ের যথাযথ মূল্যায়ন করা। যেমন: ট্রেন চালক যদি নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত হতে বিলম্ব করে তাহলে এক ব্যক্তির বিলম্বের কারণে কত হাজার চাকরিজীবী ও শ্রমিকের কর্মক্ষেত্রে উপস্থিত হতে বিলম্ব হবে। যা স্বাভাবিকভাবেই দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতিকে ব্যাহত করবে।
২১. কর্মক্ষেত্রে প্রত্যেকের উচিত, সুনিপুণভাবে নিজের দায়-দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করা। কেননা যেকোনো কাজই নিখুঁতভাবে সম্পাদিত না হলে তার কাঙ্ক্ষিত সুফল অর্জিত হয় না। রাসূলুল্লাহ বলেছেন: ‘তোমাদের কেউ যখন কোনো কাজ করবে সে যেন তা নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করে। কেননা এটা আল্লাহ তা'আলার নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয়।’ (শুআবুল ঈমান, ৭/২৩৩)
২২. যেকোনো ক্ষেত্রে সামান্য পর্যায়ের দুর্নীতিকেও আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করে সকল প্রকার দুর্নীতি স্থায়িভাবে মূলোৎপাটন করতে হবে। দুর্নীতিপরায়ণ লোকদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পবিত্র কুরআনে বিনির্মাণ ও উন্নয়নে উৎসাহিত করে গোলযোগ ও দুর্নীতি থেকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে: ‘পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার পর তাতে অশান্তি সৃষ্টি করো না।’ (আরাফ, ৫৬)
২৩. কামপ্রবৃত্তি ও অন্যায় ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা থেকে বেঁচে থাকতে হবে। নামাযের প্রতি পূর্ণ যত্নবান হতে হবে। নামাযের মাধ্যমেই উচ্চাকাঙ্ক্ষা, দৃঢ় প্রত্যয় ও কর্মোদ্দীপনা সৃষ্টি হবে। যে নামাযে অবহেলা করবে, নামাযের হক নষ্ট করবে সে এসব কিছু থেকে বঞ্চিত হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেন: ‘তারপর তাদের স্থলাভিষিক্ত হলো এমন লোক, যারা নামায নষ্ট করল এবং ইন্দ্রিয়-চাহিদার অনুগামী হলো। সুতরাং অচিরেই তারা নিজেদের পথভ্রষ্টতার সম্মুখীন হবে।’ (মারয়াম, ১৯: ৫৯)
২৪. সর্বক্ষেত্রে প্রযুক্তির উন্নয়নে কাজ করতে হবে এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বৈদ্যুতিক সেবা-পরিসেবা সক্রিয় রাখা কর্তব্য। এ দু'টি ক্ষেত্রে সহনীয় মূল্যে উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
২৫. অতীতের গৌরবগাঁথা সভ্যতা-সংস্কৃতি নিয়ে আত্মতুষ্ট হয়ে নির্ভয়ে বসে থাকলে চলবে না। আবার পশ্চিমা সভ্যতা-সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণও নিরাপদ নয়। এক্ষেত্রে পৃথিবীর উন্নত জাতিবর্গের ইতিবাচক দিকগুলো সযত্নে গ্রহণ করার পাশাপাশি নেতিবাচক দিকগুলো পরিহার করা কর্তব্য। নিজের স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা বিকিয়ে দিয়ে নিঃস্ব পরমুখাপেক্ষী হওয়ার চেয়ে অপমান ও লাঞ্ছনা আর কিছুই হতে পারে না। এক্ষেত্রে ইমাম মালেক (র.)-এর বাণীই যথার্থ: ‘মহান পূর্বসূরিদের পথেই এই উত্তরসূরিদের কল্যাণ নিহিত।
২৬. পরিস্থিতি-পরিবেশ যতই প্রতিকূল হোক, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অর্জনে যতই বাধা-প্রতিবন্ধকতা আসুক, মন-মানসিকতায় কিছুতেই যেন নিরাশার ছাপ না পড়ে। উন্নতি-অগ্রগতি ও সফলতা অর্জনে নিরাশাই এক কঠিন বাধা।

পরিশিষ্ট:
বিংশ শতাব্দীর বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ মালেক ইবনে নবী (১৯০৫- ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'যেকোনো সভ্যতা সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য তার গুণগত মান ও পরিমাণের মাঝে সামঞ্জস্যতার ভিত্তি মজবুত হতে হবে। বাহ্যিক উপায়- অবলম্বনের সঙ্গে হৃদয়াত্মার সংযোগ থাকতে হবে। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য বাস্তবমুখী উপায় অবলম্বন করতে হবে। এর কোনো একটি ক্ষেত্রে ঘাটতি দেখা দিলে সে সভ্যতার অধঃপতন সুনিশ্চিত।'

প্রখ্যাত মিশরীয় ইসলামি চিন্তাবিদ শাইখ মুহাম্মাদ আব্দুহু (১৮৪৯- ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'যেকোনো জাতির মাথা উঁচু করে টিকে থাকার বিষয়টি সুনিশ্চিত হয় তার যুগোপযোগী প্রস্তুতির মাধ্যমে। সময়ের সাথে যে টেক্কা দিতে যায়, সময় তাকে কাবু করে ফেলে।'

জাপানের প্রেসিডেন্টকে প্রশ্ন করা হলো, 'তাদের উন্নয়নের প্রধান রহস্য কী?' উত্তরে বললেন, 'অন্যরা যেখানে এসে থেমেছে, তাদের ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে আমরা সেখান থেকে অগ্রসর হয়েছি।'

'সভ্যতা-সংস্কৃতি হলো মানবজাতি ও স্থান-কাল-পাত্রের গতিময়তা ও আন্দোলন। আসমানি শরীয়ত ব্যতীত যা কখনো পবিত্র ও পরিশুদ্ধ হতে পারে না।' -ড. আয়েয আল-কারনী

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 ফাসাদ ও দুর্নীতি

📄 ফাসাদ ও দুর্নীতি


ফাসাদ ও দুর্নীতি হলো ন্যায় ও ন্যায়ানুগতা, সততা ও নৈতিকতা থেকে বিচ্যুতি। সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য দুর্নীতি এক দুরারোগ্য ব্যাধি ও ধ্বংসাত্মক বিপর্যয়। যা ব্যক্তি হতে শুরু করে সমাজ, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রযন্ত্রের রগরেশায় ছড়িয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের প্রতিটি সেক্টরে অন্যায়-অনাচার, ধোঁকা-প্রতারণার জাল বিস্তার করে। উন্নয়ন ও অগ্রগতির চাকা স্থবির করে দেয়।

দুর্নীতির উপসর্গগুলো হলো, ঘুষ, ছিনতাই, অপহরণ, জনসাধারণের অর্থ-সম্পদ আত্মসাৎ, স্বজনপ্রীতি, সাম্প্রদায়িকতা ও অন্যের অধিকার হরণ ইত্যাদি। কোনো সমাজের সর্বত্র যখন দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ে এবং শিকড় গেড়ে বসে তখন তা নির্মূল করা দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ, ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য। আন্তর্জাতিক দুর্নীতিদমন কমিশন ফাসাদ ও দুর্নীতিকে 'ব্যক্তিগত লাভ এবং স্বার্থসিদ্ধির জন্য ক্ষমতার অপব্যবহার' বলে আখ্যায়িত করেছে।

ফাসাদ ও দুর্নীতির বহু ধরন রয়েছে। যেমন: মানুষের নীতি-নৈতিকতা, চিন্তা-চেতনার অধঃপতন, বোধ ও বিশ্বাসের ভ্রষ্টতা, সামাজিক কৃষ্টিকালচারের বিচ্যুতি, শান্তি ও নিরাপত্তার সংকট, আর্থিক দুর্নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ও রাজনৈতিক অনাচার ইত্যাদি। এ ছাড়া আরও অসংখ্য বিচিত্র দুর্নীতি রয়েছে। যা মানুষের দেশ, বর্ণ, ধর্ম ও মতাদর্শের ভিন্নতার কারণে হয়ে থাকে। বর্তমান বিশ্ব এই মহাসংকটে জর্জরিত। এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কী? দুর্নীতি থেকে বাঁচার উপায় কী?

সমাধান:
১. বর্তমান তরুণ প্রজন্মকে নৈতিক শিক্ষাদীক্ষা ও সুস্থ চিন্তা-চেতনার আলোকে গড়ে তুলতে হবে। তাদের নীতি-নৈতিকতা ও ধর্মপরায়ণতায় অনুপ্রাণিত করতে হবে। যেন দৈনন্দিন জীবনে ধর্মীয় বিধি-নিষেধ মেনে চলার পাশাপাশি সুস্থ বিবেক-বুদ্ধিতে বিচার-বিশ্লেষণ করতে শেখে।
২. তরুণ প্রজন্মকে দেশ, জাতি ও সমাজের উন্নয়নে অনুপ্রাণিত করতে হবে এবং তা শুরু হবে পরিবার থেকে, মা-বাবার পক্ষ থেকে। পর্যায়ক্রমে প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকমণ্ডলী ও মসজিদের মিম্বরে আলেমগণের পক্ষ থেকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
৩. পূর্ববর্তী জাতিবর্গ তাদের বোধ-বিশ্বাস, স্বভাব-চরিত্র ও নীতি-নৈতিকতায় অনাচারের কারণে যে অধঃপতন ও বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে, সে সম্পর্কে তরুণ প্রজন্মকে সচেতন করতে হবে।
৪. আকিদা ও ধর্মবিশ্বাস পরিশুদ্ধ করে সকলকে কল্যাণ ও উন্নতির দিকনির্দেশনা প্রদান করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে অন্যায়, বিশৃঙ্খলা, ধ্বংস ও বরবাদির পথ থেকে বারণ করা কর্তব্য। এ ক্ষেত্রে দ্বীনের দায়ী, খতীব, শিক্ষক, চিন্তাবিদ ও লেখক-প্রত্যেককেই কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। যেন গণমানুষের স্বভাবজাত প্রবণতাই হয়ে উঠে সংশোধন ও কল্যাণমুখী, অনিষ্ট ও অকল্যাণ-বিমুখ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন: ‘আর যখন তাদের বলা হয়, তোমরা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা বিস্তার করো না, তখন তারা বলে, আমরা তো শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী। মনে রেখ, এরাই বিশৃঙ্খলা বিস্তারকারী। কিন্তু এর উপলব্ধি তাদের নেই।’ (বাকারা, ২: ১১, ১২)
৫. কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ ও যাচাই-বাছাই করে নিয়োগ দেওয়া কর্তব্য। সৎ, নীতিবান, বিবেকবান, বিচক্ষণ, যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। “যোগ্য পদে যোগ্য ব্যক্তির নিয়োগ”- এ মূলনীতি যেন ঠিক থাকে। এতে করে দুর্নীতির পথ বন্ধ হবে। ন্যায়-নীতি, সততা ও কল্যাণের পথ সুগম হবে। শ্রমিক ও কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও বিশ্বস্ততা হলো প্রধান মানদণ্ড। পবিত্র কুরআনেই রয়েছে এর দিকনির্দেশনা : ‘আপনি পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাউকে কাজে নিতে চাইলে সেজন্য এমন ব্যক্তিই উত্তম, যে হবে শক্তিশালী এবং আমানতদারও।’ (কাসাস, ২৮: ২৬)
৬. তরুণ নেতৃবৃন্দ, যারা উন্নতি-অগ্রগতিে দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, প্রয়োজনীয় নিত্যনতুন আবিষ্কার ও সংস্কারে সচেষ্ট, দেশ ও জাতির কল্যাণে গঠনমূলক সংস্কারে তৎপর, তাদের তারুণ্যদীপ্ত সৎ নেতৃত্বগুণকে কাজে লাগাতে হবে। যেন তারা কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি সাধন করে যুগের দাবি ও চাহিদা মেটাতে পারে।
৭. কোনো কর্মকর্তাকে একই পদে দীর্ঘ দিন বহাল রাখা সমীচীন নয়। যেন অসৎ শ্রেণি স্বীয় পদ, খ্যাতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করতে না পারে। যোগ্য কোনো ব্যক্তিকে যদি দীর্ঘ দিন উন্নত পদে বহাল রাখতে হয় তাহলে তার ওপর পূর্ণ নজরদারি বহাল রাখতে হবে।
৮. চারিত্রিক ও নৈতিক অধঃপতন রোধ করতে হবে। এ লক্ষ্যে সমাজের প্রতিটি শ্রেণি, বিশেষভাবে যুব শ্রেণির মধ্যে নৈতিক ও ধর্মীয় প্রেরণা মজবুত করতে হবে। তাদেরকে মহৎ চরিত্র ও উত্তম শিষ্টাচারে অনুপ্রাণিত করতে হবে। দেশ ও জাতির আসন্ন উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের লক্ষ্যে তাদের ধর্মীয় ও জাতীয় দায়দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করে গড়ে তুলতে হবে। যে সমস্ত টিভি ও ইন্টারনেট চ্যানেল অশ্লীলতা ছড়ায়, নৈতিক ও ধর্মীয় অনাচারে প্ররোচিত করে, বিশৃঙ্খলা ও বিপর্যয়ের পথে ধাবিত করে, তা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিতে হবে।
৯. সমাজে নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতির সমস্ত অপচেষ্টাগুলো সমূলে নির্মূল করার লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। কেননা সমাজে নিরাপত্তা ও সুরক্ষাহীন পরিবেশ অসৎ শ্রেণির মধ্যে যাবতীয় অন্যায়-অপকর্মের প্রবণতা সৃষ্টি করে। তাদের সামনে ঘুস, আত্মসাৎ ও অন্যের অধিকার হরণের পথ খুলে দেয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন: ‘আল্লাহ তা'আলা এক জনবসতির দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন, যা ছিল বেশ নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ। চতুর্দিক থেকে তার জীবিকা চলে আসত পর্যাপ্ত পরিমাণে। তারপর তারা আল্লাহর নে'আমতের অকৃতজ্ঞতা শুরু করে দিল। ফলে আল্লাহ তাদের কৃতকর্মের কারণে তাদের ক্ষুধা ও ভীতির পোশাক আস্বাদন করালেন।’ (নাহল, ১৬: ১১২)
১০. সরকারি দায়িত্বে ও কার্যনির্বাহে আমলাতন্ত্রের একচ্ছত্র আধিপত্য রদ করে তাদের জনগণের সেবক ও প্রশাসকরূপে গড়ে তুলতে হবে। কেননা আমলাতন্ত্রে স্বাধীনতা কোনো কোনো আমলাকে দুর্নীতিবাজ করে তোলে। তারা নিজেদের নৈতিক-অনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য সরকারি পদ ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে। জনস্বার্থে সামান্য পরিশ্রমের মামুলি কাজ করার জন্যেও তারা বেশ সিদ্ধহস্ত।
১১. প্রযুক্তিসেবা বৃদ্ধির পাশাপাশি তা নিখুঁত ও ফাঁক-ফোকরমুক্ত করতে হবে। আর্থিক লেনদেনগুলোর ক্ষেত্রে প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবশক্তিকেও যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। ইলেক্ট্রনিক ও ইন্টারনেট সেবা-পরিষেবাগুলোর মানোন্নয়ন করে তা এমনভাবে সচল রাখতে হবে, যেন দেশের যেকোনো নাগরিক ইন্টারনেটে অত্যন্ত সহজে দ্রুত আর্থিক লেনদেন করতে পারে।
১২. প্রতিষ্ঠানে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগের সময় তার ও পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের স্থাবর-অস্থাবর যাবতীয় সম্পত্তির হিসাব-বিবরণী গ্রহণ করতে হবে। একইভাবে চাকরি থেকে অব্যাহতির সময় এ বিষয়টি পুনরায় খতিয়ে দেখতে হবে। জন-অর্থ-সংরক্ষণ অধিদফতরকে তার কার্য সম্পাদনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকতে হবে। প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেক কর্মকর্তা তার কাজের মানোন্নয়ন, দায়িত্বপালনের ক্ষেত্রে শতভাগ বিশ্বস্ততা ও সুনিপুণতার ক্ষেত্রে দায়বদ্ধ হওয়া কর্তব্য। বিশেষ কোনো স্বার্থসিদ্ধির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার অপব্যবহার ও অন্যের ক্ষতিসাধন রোধে কোম্পানির কর্তাব্যক্তিদের কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
১৩. একটি গঠনমূলক নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। যার ভিত্তিতে কর্মচারীদের কাজের দক্ষতা ও নিপুণতা যাচাই করা হবে। যারা নিজেদের দক্ষতা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে পারবে এবং তুলনামূলক শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় দিতে পারবে, বাৎসরিক সম্মেলনে তাদের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মাননা প্রদান ও মূল্যবান পুরস্কার প্রদান করা কর্তব্য। এতে প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেক কর্মকর্তা নিজের যোগ্যতা প্রমাণে সচেষ্ট ও উদ্বুদ্ধ হবে। পাশাপাশি যেকোনো ব্যক্তির অবহেলা ও দুর্নীতি প্রমাণিত হবে, তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে, যেন অন্যদের জন্য তা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। যে ব্যক্তিই দুর্নীতি শনাক্ত করতে পারবে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কৃত করা কর্তব্য। এর ফলে প্রত্যেক নাগরিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হবে।
প্রত্যেক নাগরিকের নৈতিক দায়িত্বই হলো নিজ নিজ শক্তি ও সামর্থ্য অনুযায়ী দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা। রাসূলুল্লাহ বলেছেন: ‘তোমাদের মধ্যে যে-ই কোনো অন্যায় দেখবে, সে যেন নিজ হাতে তা প্রতিহত করে। যদি তার এ সামর্থ্য না থাকে, তবে মুখে (যেন অন্যায়ের প্রতিবাদ করে।) এতটুকু সামর্থ্যও যদি না থাকে, তবে মনে মনে (সে যেন অন্যায়কে ঘৃণা করে।)’ (মুসলিম, ১/৬৯)
১৪. পদোন্নতির ক্ষেত্রে, প্রবীণ হওয়া ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাই একমাত্র ও চূড়ান্ত মানদণ্ড নয়। তাই অভিজ্ঞতার পাশাপাশি প্রত্যেকের মাসিক ও বাৎসরিক কাজের পরিমাণ ও গুণগত মান যাচাই করে দেখতে হবে। কর্মচারীদের জ্ঞানগভীরতা, কর্মদক্ষতা, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও প্রতিষ্ঠানে তাদের ভাবমর্যাদা ইত্যাদি দিকগুলো বিবেচনা করতে হবে।
১৫. সততা, ন্যায়নিষ্ঠতা, দৃঢ়তা, অবিচলতা ও কর্মনিপুণতায় যারা নিজেদের দৃষ্টান্তস্বরূপ প্রমাণ করতে পেরেছে, সমাজের সামনে তাদের সফলতা তুলে ধরতে হবে। তাদের ব্যক্তিত্বগুণকে উত্তম আদর্শরূপে ফুটিয়ে তুলতে হবে। যেন পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্র-প্রতিটি অঙ্গনেই মানুষ তাদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়। তাদের আদর্শগুণে মুগ্ধ হয়ে তাদের অনুসরণে সচেষ্ট হয়।
১৬. দুর্নীতি প্রতিরোধ-ব্যবস্থামূলক কঠোর আইন প্রণয়ন করে সকলের ক্ষেত্রে তা সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে। সমাজের উচ্চ শ্রেণি, নিম্ন শ্রেণিভেদে আইনের মধ্যে কোনো বৈষম্য হতে পারবে না। প্রত্যেক অপরাধীই যেন উপযুক্ত শাস্তির সম্মুখীন হয় এবং তাদের শাস্তি অন্যদের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে কোনো স্বজনপ্রীতি কিংবা শ্রেণিবৈষম্য যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। তাহলে সমাজ চরম বিপর্যয়-বিশৃঙ্খলার শিকার হবে। প্রায় পনেরোশ বছর পূর্বে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর উম্মতের উদ্দেশ্যে এ সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন: ‘হে লোকসকল, তোমাদের পূর্ববর্তী জাতির ধ্বংসের অন্যতম কারণ ছিল, কোনো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি যদি চুরি করত, তারা তার সাজা মওকুফ করে দিত। কিন্তু দুর্বল শ্রেণির কেউ চুরি করলে তার শাস্তি যথাযথভাবে কার্যকর করে ছাড়তো। আল্লাহর শপথ! মুহাম্মদের কন্যা ফাতেমাও যদি চুরি করে মুহাম্মদ তার হাত কেটে দিবে।’ (বুখারী, ৮/১৬০)
১৭. সার্বক্ষণিক নিরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ-ব্যবস্থা চালু করে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে তা সক্রিয় রাখতে হবে। কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার নীতি বজায় রাখতে হবে। প্রতিটি কাজেই একটি মৌলিক প্রশ্নের জবাবদিহিতা থাকতে হবে। প্রশ্নটি হলো, “এই কাজটির যৌক্তিকতা ও প্রাসঙ্গিকতা কী?”
১৮. একটি দুর্নীতি দমন কমিশন চালু করে সৎ, নীতিবান ও বিশ্বস্ত লোকদের মাধ্যমে তা পরিচালনা করতে হবে। সমাজের আনাচে-কানাচে, আড়ালে-আবডালে যত অন্যায়-অনাচার চলছে, তার বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করাই হবে তাদের প্রধান লক্ষ্য-উদ্দেশ্য।
১৯. সমতা ও বৈষম্যহীনতা হলো একটি জাতির উন্নতি-অগ্রগতির মূল ভিত্তি। যে জাতি নিজের মাঝে শ্রেণিবৈষম্য নির্মূল করে সাম্য ও সমতার নীতি অবলম্বন করেছে তারা উদারতা, নির্মলতা, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ‘তোমার প্রতিপালক এমন নন যে, তিনি জনপদসমূহ অন্যায়ভাবে ধ্বংস করে দিবেন; অথচ তার বাসিন্দাগণ সদাচারী।’ (হুদ, ১১: ১১৭)
২০. কোনো জাতির পতন, অধঃপতন, পর্যায়ক্রমে চূড়ান্ত ধ্বংসের মূল কারণ হলো অন্যায় ও দুর্নীতি-এ চরম বাস্তবতা সমাজের প্রতিটি শ্রেণি, প্রত্যেক ব্যক্তির মনে বদ্ধমূল করা আবশ্যক। সমাজবিজ্ঞানী আল্লামা ইবনে খালদুন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'মুকাদ্দামা ইবনে খালদুন'-এর মধ্যে এ বিষয়ে আলোকপাত করেছেন: 'অন্যায় ও দুর্নীতির অপরিহার্য পরণতি হলো সীমাহীন অপব্যয় ও লাগামহীন বিলাসিতা। যা কোনো জাতিকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।' পবিত্র কুরআনের এ সত্য প্রতীয়মান: ‘যখন কোনো জনপদ ধ্বংস করার ইচ্ছা করি, তখন তাদের বিত্তবান লোকদের (ঈমান ও আনুগত্যের) হুকুম দেই। তখন তারা তাতে নাফরমানিতে লিপ্ত হয়। ফলে তাদের সম্পর্কে ফায়সালা চূড়ান্ত হয়ে যায় এবং আমি তাদেরকে ধ্বংস করে ফেলি।’ (বনী ইসরাঈল, ১৭: ১৬)
২১. স্বভাবতই অজ্ঞতা-মূর্খতা ও অভাব-অনাটনের কবলে মানবিক মূল্যবোধ ধ্বসে পড়ে, ন্যায়-অন্যায়ের বিচারবোধ প্রাণশক্তিহীন হয়ে পড়ে। তাই সমাজ থেকে মূর্খতা ও অশিক্ষা দূর করার পাশাপাশি অভাব ও দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। বেকারত্বের কবলে পড়ে, দারিদ্র্যের শিকার হয়ে দেশের একটি নাগরিকও যেন অন্যায় ও দুর্নীতির পথে পা না-বাড়ায়, সে লক্ষ্যে প্রতিটি নাগরিকের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।
২২. অডিও-ভিজ্যুয়াল, প্রিন্ট মিডিয়া ও সোস্যাল মিডিয়ায় অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত রাখতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস ও বাণিজ্যিক কোম্পানির পক্ষ থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা কর্তব্য। যেখানে দ্বীনের একনিষ্ঠ আহ্বায়ক ও সমাজের জ্ঞানী-গুণীজন মানুষের সামনে দুর্নীতির জঘন্যতা, ভয়বহতা তুলে ধরবেন। ইহকাল ও পরকালে দুর্নীতির কঠোর শাস্তির ব্যাপারেও সতর্ক করবেন। অতীতের যে সমস্ত জাতিবর্গ অন্যায় ও দুর্নীতির কারণে যে অবক্ষয় ও ধ্বংসের শিকার হয়েছে এবং বর্তমানেও হচ্ছে, মানুষের সামনে তা সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরবেন। এর ফলে দেশের নাগরিকদের মধ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে এবং জীবনের সকল অঙ্গনে নৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণে তৎপর হবে।
২৩. যাবতীয় অনাচার-পাপাচার, গুনাহ ও নাফরমানি পরিহার করতে হবে। কুপ্রবৃত্তি ও অন্যায় ঝোঁক-প্রবণতা থেকে বেঁচে থাকতে হবে। কেননা তা সমস্ত নষ্টের মূল। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় কখনো কোনো নাফরমানি হয়ে গেলে, তার বিপরীতে নেক আমল ও তওবাই হলো একমাত্র প্রতিকার। তাই নিয়মিত নামায, ইবাদত ও রবের আনুগত্যের সঙ্গে সঙ্গে তওবা করে যেতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন: ‘জলে-স্থলে যে অশান্তি ছড়িয়ে পড়ে তা মানুষের কৃতকর্মের ফসল। আল্লাহ তাদের কতক কৃতকর্মের স্বাদ আস্বাদন করাবেন। হয়ত (এর ফলে) তারা ফিরে আসবে।’ (রূম, ৩০: ৪১)
২৪. যে কোনো কর্মী, চাকরিজীবী ও দায়িত্ববানদের প্রতি আমার উপদেশ হলো, 'একনিষ্ঠতার সাথে ও সুচারুরূপে আপনার দায়িত্ব পালন করুন। এটা আপনার প্রধান দায়িত্ব। মনে রাখবেন, কাজেকর্মে মালিকের চোখ ফাঁকি দিলেও আসল মনিব আল্লাহকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব নয়।' মানুষের ফাঁকিবাজির স্বভাবদোষকে আল্লাহ কুরআনে এভাবে ব্যক্ত করেছেন: ‘তারা মানুষ থেকে তো লজ্জা করে; কিন্তু আল্লাহ থেকে লজ্জা করে না। অথচ তারা রাতের বেলা যখন আল্লাহর অপছন্দনীয় কথা বলে তখনো তিনি তাদের সঙ্গে থাকেন। তারা যা-কিছু করছে তা সবই আল্লাহর আয়ত্তে।’ (নিসা, ৪: ১০৮)

পরিশিষ্ট:
হাদীসে বর্ণিত হয়েছে: আবূ হুমায়দ সায়েদী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ আসদ গোত্রের জনৈক ব্যক্তিকে কর্মচারী নিযুক্ত করলেন। যাকে ইবনুল লুৎবিয়া নামে অভিহিত করা হতো। রাবী আমর ও ইবনু আবূ উমার বলেন, 'সদকা উসূলের জন্য' (তাকে নিযুক্ত করা হয়)। যখন সে ব্যক্তি ফিরে এলো তখন সে বলল, 'এটা আপনাদের (অর্থাৎ বায়তুল মালের) আর এটা আমাকে উপটোকন হিসেবে দেওয়া হয়েছে।' বর্ণনাকারী বলেন, তখন রাসূলুল্লাহ মিম্বরের উপরে দাঁড়ালেন এবং আল্লাহর প্রশংসা করার পর বললেন, সে কর্মচারীর কী হলো, যাকে আমি (তহশীলদাররূপে) প্রেরণ করেছি। আর সে বলে, 'এটা আপনাদের, আর এটা আমাকে উপটোকন দেওয়া হয়েছে। সে তার পিতার বা মাতার ঘরে বসে থেকে দেখুক না, তাকে উপঢৌকন দেওয়া হয় কিনা? মুহাম্মদের প্রাণ যে পবিত্র সত্তার হাতে তাঁর কসম! যে কেউ এরূপ সম্পদের কিছুমাত্র হস্তগত করবে, কিয়ামতের দিন সে তা নিজ ঘাড়ে বহন করে নিয়ে আসবে। (তার ঘাড়ের উপর) চিৎকাররত উট হবে অথবা হাম্বা-হাম্বারত গাভি হবে অথবা ম্যাঁ-ম্যাঁরত বকরি হবে। তারপর তিনি দু'হাত উপরের দিকে উঠালেন। এমনকি তাঁর বগলের শুভ্রতা আমাদের দৃষ্টিগোচর হলো। তিনি বললেন, হে আল্লাহ, আমি কি (আপনার নির্দেশ) পৌঁছে দিয়েছি।' এ কথা তিনি দু'বার বললেন। (মুসলিম, ৩/১৪৬৩)

সিঙ্গাপুরের সুদীর্ঘ তিন দশকের প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ (১৯২৩-২০১৫ খ্রিষ্টাব্দ) বলেছেন: 'সিঁড়ি পরিষ্কার করার মতো দুর্নীতি সাফ করুন। সর্বোচ্চস্তর থেকে শুরু হবে, সর্বনিম্নস্তরে এসে শেষ হবে।'

বিখ্যাত আরব কবি আবূ তায়্যেব মুতানাব্বি (৩০৩-৩৫৪ হি.) বলেছেন: 'পিতার মৃত্যুর পর অভিভাবক ও মনিব শ্রেণির চটকদার কথা যেন তোমাকে প্রতারিত না করে। কেননা তাদের শত্রুতা-পুষে- রাখা মন এর ঠিক উল্টো। তাদের ক্ষেত্রে তুমি হবে এমন ভয়াবহ মৃত্যু, কোনো শোকাহতের শোকে যার হৃদয় গলে না; প্রাণ হরণ করে, দেহের তাজা রক্ত পান করেই যে পরম তৃপ্তি লাভ করে। তারা হলো এমন ফোঁড়ার মতো, দেহের অন্তরালে পচন থাকার কারণে যা থেকে ফুলে-ফেঁপে উঠে।'

📘 আল হাল্লু জীবন সমস্যার সমাধান > 📄 পারিবারিক সহিংসতা

📄 পারিবারিক সহিংসতা


পারিবারিক সহিংসতা অন্যতম বৈশ্বয়িক সংকট। বহু পরিবার এ সংকটে জর্জরিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সহিংসতার পরিচয়ে বলেছে: 'পরিবারের যেকোনো ব্যক্তি কর্তৃক পরিবারের অন্য এক কিংবা একাধিক সদস্যের বিরুদ্ধে নিজের ক্ষমতা ও শক্তির অপব্যবহার করা। এর কারণে পীড়িত ব্যক্তি ক্ষতির শিকার হয়। মানসিক কষ্টে ভোগে। লাঞ্ছনা ও বঞ্চনার সম্মুখীন হয়। তার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিঘ্নিত হয়।'

অথবা পারিবারিক সহিংসতা হলো: 'পরিবারের কোনো ব্যক্তি কর্তৃক স্বামী, স্ত্রী কিংবা সন্তানদের কারো বিরুদ্ধে ক্ষমতা ও পেশিশক্তির অপব্যবহার। যার কারণে ভুক্তভোগী শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। অশান্তি ও নিরাপত্তার শিকার হয়। পরিবারের সদস্যদের পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়ে যায়। সর্বোপরি পারিবারিক সম্পর্কগুলোতে অবনতি ঘটে। সামাজিক বন্ধনে ফাটল ধরে। একটি সুন্দর পরিপাটি সমাজের মৃত্যু হয়। কেননা পারিবারিক বন্ধনই হলো সুষ্ঠু সমাজের মূল ভিত্তি।'

পারিবারিক সহিংসতার সমাধানে অনেক গবেষণা ও বিশ্লেষণ হয়েছে। অনেক আলোচনা-পর্যালোচনা হয়েছে। ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে এর গুরুত্ব অনুধাবন করার চেষ্টা করা হয়েছে। এ সমস্যা সমাধানে বহু পথ-পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত সমাধান কোথায়?

সমাধান:
১. পারিবারিক সহিংসতা থেকে মুক্ত থাকার জন্য বিবাহের প্রথম ধাপ থেকেই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে পাত্রপক্ষ এমন পাত্রী নির্বাচন করবে, যে শিক্ষিত, ভদ্র, মার্জিত, ধার্মিক, চাত্রিক গুণাবলি ও শিষ্টাচারের অধিকারী। একইভাবে পাত্রী পক্ষও এমন পাত্র নির্বাচন করবে, যে এসব মহৎ গুণের অধিকারী।
২. বিবাহের পূর্বে অবশ্যই পাত্র ও পাত্রী উভয় পক্ষকেই স্বাস্থ্য-পরীক্ষা করাতে হবে। তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে পরিপূর্ণ সুস্থ-সবল কি না-এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে। এ কথা সত্য যে, সুস্থতা-অসুস্থতা আল্লাহ্ তা'আলার হাতে। এ দুয়ে মিলেই তো জীবন। তবুও স্বাস্থ্য- পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া কর্তব্য-কে কতটুকু সুস্থ কিংবা অসুস্থ।
৩. পাত্র-পাত্রী পক্ষের শিক্ষাগত যোগ্যতা, তাদের সুস্থ মনমানসিকতা পারিবারিক সচেতনতা ইত্যাদি বিষয় যথাযথভাবে যাচাই করতে হবে। যেন সংসার জীবনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিশেষভাবে সন্তান লালন-পালনে কোনো প্রকার সহিংসতার অশঙ্কা না থাকে এবং উদ্ভুত সমস্যার সমাধানে পরস্পর বোঝাপড়া ও ফলপ্রসূ আলোচনাই প্রাধান্য পায়।
৪. পারিবারিক অধিকার, পারিবারিক সহিংসতা মোকাবিলা, এর যথার্থ সমাধান ও তা থেকে সুরক্ষা ইত্যাদি বিষয়গুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বর্তমান তরুণ প্রজন্মকে পরস্পর সদয়তা, আন্তরিক বোঝাপড়া ও আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান ইত্যাদি মহৎ মানসিকতার ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে। সাথে সাথে পারিবারিক সহিংসতা বর্জনে উদ্বুদ্ধ করে এর ক্ষতিকর দিকগুলোর ব্যাপারে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
৫. এ ক্ষেত্রে মিম্বরে খতীব সাহেবের বয়ান, প্রচার মাধ্যমের ঐকান্তিক সম্প্রচার ও পরিবারের সকল সদস্যদের জন্য শিক্ষাদীক্ষামূলক আলোচনা অত্যন্ত কার্যকর। এ সমস্ত মাধ্যমে পারিবারিক সহিংসতার নেতিবাচক ও ক্ষতিকর দিকগুলো সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। সাথে সাথে ইসলামে যে দয়া, সদয়তা, বিনম্রতা ও আপস-মীমাংসার মহৎ শিক্ষা রয়েছে, তা আঁকড়ে ধরতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
৬. কুরআন-সুন্নাহর যেখানে প্রহারের কথা বলা হয়েছে, ইমাম, খতীব ও দ্বীনের আহ্বায়কগণের পক্ষ থেকে এর সঠিক ব্যাখ্যা তুলে ধরা কর্তব্য। যেন কোনো অজ্ঞ-মূর্খ এর অপব্যবহার করে পারিবারিক সহিংসতা সৃষ্টিতে প্রবৃত্ত না হয়। পারিবারিক জীবনে রাসূল কেমন ছিলেন, স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে তাঁর আচার-ব্যবহার কেমন ছিল-বিষয়টি জাতির সামনে সুস্পষ্ট থাকতে হবে। কেননা তিনিই আমাদের শ্রেষ্ঠ আদর্শ।
৭. পরিবার ও সমাজে শিশুদের প্রতি যে ধরনের অন্যায় ও সহিংসতা দেখা দেয়, এ ব্যাপারে শিশুদের পূর্ব-সতর্ক করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে তাদের যথোপযুক্ত করণীয় কী হবে, তা-ও শিখিয়ে দিতে হবে। কোনো অন্যায় ও সহিংসতার শিকার হলে অভয় দিয়ে সাহস যোগাতে হবে। যেন ডর-ভয় না রেখে তার সাথে ঘটে-যাওয়া অন্যায়ের কথা সে বলতে পারে, এর প্রতিবাদে সরব হতে পারে।
৮. পারিবারিক সহিংসতা বিষয়ক একটি বিশেষ মন্ত্রণালয় গঠন করতে হবে। এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হবে, পারিবারিক সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিদের অভিযোগ গ্রহণ করা। যথাযথভাবে অভিযোগ যাচাই করা। কোনো প্রকার অবহেলা ও কালবিলম্ব না করে এর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এর সাথে সাথে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিদের সাহস যোগাতে হবে, যেন তারা নির্বিঘ্নে নিঃসংকোচে অভিযোগ দায়ের করতে পারে। স্পর্শকাতর বিষয়ে তাদেরকে শতভাগ গোপনীয়তার নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে। কোনো ধরনের প্রচার-সম্প্রচার ব্যতীত বিষয়টি সমাধান করতে হবে। প্রতিটি সমস্যার প্রথম ধাপেই তা সমাধানের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কেননা যেকোনো সমস্যা দীর্ঘায়িত হলে পর্যায়ক্রমে তা এমন ঘোলাটে ও জটিল হয়ে পড়ে, যার সমাধান কখনো কখনো ভীষণ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
৯. পারিবারিক সহিংসতার বিচার বিশেষ আদালতে দ্রুত সম্পন্ন করে প্রকৃত অপরাধীর বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তি কার্যকর করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো প্রকার বিলম্ব ও অবহেলার সুযোগ নেই। কেননা বিচার বিভাগের সামান্য গাফলতি ও অবহেলার কারণে যেকোনো অপরাধী ও অপরাধ ও প্রশ্রয় পায়, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে নির্বিঘ্নে ছড়িয়ে পড়ে।
১০. পারিবারিক সহিংসতার ক্ষেত্রে মা-বাবাই যদি প্রধান দায়ি হয়ে থাকে, তাহলে প্রয়োজনে সন্তানের প্রতি তাদের দায়-দায়িত্ব প্রত্যাহার করে এমন নিকটাত্মীয়ের দায়িত্বে ন্যস্ত করতে হবে, যারা তাদের প্রতি যত্নশীল হবে। তাদের যথাযথ দেখভাল করবে। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি যদি কোনো প্রকার মানসিক কিংবা শারীরিকভাবে আক্রান্ত হয়ে থাকে, তবে তার দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
১১. সংক্ষুব্ধ শিশুর যাবতীয় অধিকার রক্ষা করে তার জন্য সুস্থ নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তাকে পর্যাপ্ত শিক্ষাদীক্ষার সুযোগ দিয়ে দেশের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। যেন সে ভবিষ্যতে দেশ ও দশের উপকারে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
১২. সন্তান লালন-পালনে ভুল পন্থাগুলো থেকে দূরে থাকতে হবে। যেমন : মারপিট করে শারীরিক শাস্তি দেওয়া। কঠোর ও রূঢ় কথা বলে, গালমন্দ করে মানসিক অস্বস্তিতে ফেলা। এর বিপরীতে আরও ফলপ্রসূ ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করতে হবে। বোঝানোর মাধ্যমে সন্তানের ভুলগুলো শুধরে দিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস যোগাতে হবে। তার ছোট ছোট সফলতার প্রশংসা করে অনুপ্রাণিত করতে হবে।
১৩. প্রত্যেক মা-বাবার প্রতি আমার সুস্পষ্ট বক্তব্য হলো: সন্তান লালন-পালনের অর্থ শুধু অন্নবস্ত্রের বন্দোবস্ত ও ব্যয়ভার বহন করাই নয়; বরং সন্তানের প্রতি আন্তরিকতা, সযত্ন ভালোবাসা, সদয়তা-দয়ার্দ্রতা ও সঠিক শিক্ষাদীক্ষা প্রদান করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তাই মা-বাবাকে সন্তানের বন্ধু সেজে তাদের সঙ্গে মিশে চলতে হবে। সন্তানের কাছাকাছি থেকে তাদের সমস্যাগুলো গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে। যেকোনো সমস্যায় সবার আগে মা-বাবাকেই তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। পৃথিবীতে প্রতিটি সন্তান তার মা-বাবার সদাচারের প্রথম হকদার। মা-বাবা যদি তার চোখের অশ্রু মুছে না দেয়, ধীরে ধীরে শত-সহস্র অশ্রুফোঁটা জমাট বেঁধে পুঞ্জীভূত ক্রোধের রূপ ধারণ করে।
১৪. প্রত্যেক পিতার কর্তব্য হলো, পরিবারের কাছে এতটা প্রিয় হওয়া, যেন পরিবারের প্রতিটি সদস্যই তার আগমনের অপেক্ষায় থাকে। যেমন শুষ্ক ভূমি অঝোর বৃষ্টির জন্য অধীর থাকে। পরিবারের মাঝে কখনো সিংহের মতো গম্ভীর কঠোরপ্রাণ হওয়া, আবার গাম্ভীর্যের মুহূর্তে বালখিল্যতা করা-কোনোটাই বাঞ্ছনীয় নয়। রাসূল এর শ্রেষ্ঠ আদর্শ অবলম্বন করাই যথার্থ। রাসূল যখন ঘরে প্রবেশ করতেন, হাস্যোজ্জ্বল থাকতেন। শিশুদের সাথে হাস্যরসিকতা করতেন। রাসূল বলেছেন: “তোমাদের মধ্যে সে-ই সর্বোত্তম, যে নিজ পরিবারের নিকট সর্বোত্তম। আমার পরিবারের নিকট আমিই তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।” (তিরমিজী: ৫/৭০৯)
১৫. পরিবারের সদস্যদের মাঝে পরস্পর সহযোগিতা, মমতাপূর্ণ মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। তাদের মাঝে সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত ও অটুট রাখতে হবে। ইসলাম পরিচিত-অপরিচিত নির্বিশেষে সকলের মাঝে সহযোগিতা ও ভ্রাতৃত্ববন্ধন অটুট রাখতে অনুপ্রাণিত করেছে। তাহলে যে পরিবারের মাঝে রক্তের বাঁধন, সেক্ষেত্রে পরস্পর সহযোগিতা, সহমর্মিতা, মায়া-মমতার বন্ধন কতটা সুদৃঢ় হওয়া আবশ্যক? পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- আর আল্লাহর রশিকে দৃঢ়ভাবে ধরে রেখো। পরস্পর বিভেদ করো না। (আলে ইমরান: ৩: ১০৩)
১৬. সমাজে যে পরিবার শিক্ষা-দীক্ষা, মহৎ চরিত্র, শিষ্টাচার ও মানবিক মূল্যবোধ ইত্যাদি ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় দিবে, পুরস্কৃত করে তাদের অনুপ্রাণিত করা কর্তব্য। বিপরীতে যে পরিবারে শিক্ষা-দীক্ষার কোনো বালাই নেই, পারিবারিক বন্ধন উপেক্ষিত, পারিবারিক সহিংসতাগ্রস্ত, তাদের ভর্ৎসনা ও তিরস্কারের মাধ্যমে তাদের সতর্ক করা কর্তব্য। যেন অন্যান্য পরিবারগুলোও এ ধরনের মানসিকতা বর্জন করে সচেতন হতে পারে। ব্যক্তি খারাপ কাজ করলো, সমাজে কেউ তাকে তিরস্কার করলো না, আরেক ব্যক্তি ভালো কাজ করলো, কারো পক্ষ থেকে সে পুরস্কৃত হলো না, বুঝতে হবে সমাজে অবক্ষয় চলছে।
১৭. পরিবারের সদস্যদের মাঝে মীমাংসা ও সুরাহা করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। পবিত্র কুরআনের দিকনির্দেশনা- ‘আর মীমাংসাই উত্তমপন্থা।’ (নিসা, ৪: ১২৮) কোনো জটিল সমস্যার ক্ষেত্রে স্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বামীর জন্য হোক কিংবা স্বামীর তরফ হতে স্ত্রীর জন্য হোক; অথবা সন্তানদের পক্ষ থেকেই হোক, মোটকথা মেনে নেওয়া ও নমনীয় মানসিকতার ভিত্তিতে যে মীমাংসা হবে, তাতে পরিবারের মাঝে আন্তরিকতা, ভালোবাসা, মায়া-মমতার বন্ধন অটুট থাকবে।
১৮. এ কথা মনে রাখতে হবে যে, পারিবারিক সহিংসতা একটি পরিবার ভেঙ্গে যাওয়ার অন্যতম কারণ। ফলে সামাজিক ভিত্তি ভেঙ্গে পড়ে। বংশের সুনাম নষ্ট হয়। সন্তানরা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে ধাবিত হয়। সন্তানের বিচ্ছেদে মা-বাবার জীবন হয়ে উঠে দুর্বিষহ। তারা বেঁচে থাকার কোনো অবলম্বন ও সার্থকতা খুঁজে পায় না। তাই পারিবারিক বন্ধন অটুট রাখার ক্ষেত্রে সদাসতর্ক থাকতে হবে। পরিবারের মাঝে ধর্মীয় অনুশাসন বজায় রাখতে হবে। নামায হতে শুরু করে প্রতিটি ইবাদত সমান গুরুত্বের সাথে পালন করতে হবে এবং যাবতীয় গুনাহ ও নাফরমানি থেকে বেঁচে থাকতে হবে। যে আল্লাহ্ তা'আলার নির্দেশ অনুযায়ী নিজেকে পরিচালিত করবে, ইহকাল ও পরকালে আল্লাহ তাকে সুখময়, সাচ্ছন্দ্যময় জীবন দান করবেন।
১৯. ইসলাম হলো শান্তি-নিরাপত্তা, দয়া ও মমতার ধর্ম। যা মানুষকে কঠোরতা ও বর্বরতা থেকে বারণ করে। ছোটদের স্নেহ করা, বড়দের শ্রদ্ধা করা এবং স্ত্রীর সাথে সদাচরণ করা-এগুলো হলো ইসলামের মৌলিক শিষ্টাচারের অন্তর্ভুক্ত। পবিত্র কুরআনে আদেশ- ‘আর তাদের (স্ত্রীদের সাথে) সদ্ভাবে জীবনযাপন করুন।’ (নিসা: ৪: ১৯) আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল হযরত হাসান (রা.)-কে চুমু খেলেন। আকরা ইবনে হাবেস তামীমী (রা.) পাশেই বসা ছিলেন। বললেন, 'আমার দশটি সন্তান রয়েছে। তাদের কাউকে আমি কখনো চুমু খাইনি।' রাসূল তার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'যে দয়া করতে জানে না, সে দয়াপ্রাপ্ত হয় না।' (বুখারী: ৭/৮)
২০. কর্ম জীবনের যত ঝামেলা ও ঝঞ্ঝাট-তা ঘরের বাইরে রেখে আসতে হবে। এসব বিষয় নিয়ে পরিবারে আলোচনা-পর্যালোচনা সমীচীন নয়। কেননা তা থেকে ঝগড়া-বিবাদের সৃষ্টি হয়। স্বামী-স্ত্রী উভয়ের কর্তব্য হলো পরিবারের মাঝে শান্তিপূর্ণ সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখা। স্নেহভালোবাসা ও আন্তরিকতাপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা। মায়া-মমতা ও সদয়তার ক্ষেত্রে তারা হবেন সন্তানদের জন্য শ্রেষ্ঠ আদর্শ। রাসূল বলেছেন: "সদয়তা ও বিনম্রতার পরশে যেকোনো বিষয়ই শোভামণ্ডিত হয়। নম্রতা ও কোমলতা ছাড়া যেকোনো কিছুই তার সৌন্দর্য হারায়।” (মুসনাদে আহমদ)
২১. মা-বাবাকে একটি বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে, কখনো যেন সন্তানদের সামনে তারা বিবাদে না জড়ান। কেননা সন্তান মা-বাবাকে ভীষনরকম অনুকরণ করে। মা-বাবার পরস্পর ঝগড়া-বিবাদে তারা নেতিবাচক মানসিকতায় প্রভাবিত হয়। ঝগড়া-বিবাদের আশঙ্কা হলে নিকটাত্মীয় কাউকে সুরাহাকারী মেনে নেওয়া এবং তাৎক্ষণিক বিবাদ থেকে দূরে থাকা কর্তব্য।
২২. মা-বাবার কর্তব্য হলো, সন্তানদের জন্য বেশি বেশি দু'আ করা। তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকবে, সন্তানদের মাঝে সমতা বজায় রাখা। তাদের কোনো আচার-আচরণে যেন কোনো সন্তানের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি না হয়। সাথে সাথে নেক আমলেও তাদেরকে যথেষ্ট সচেষ্ট হতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- আর তার জন্য তার স্ত্রীকে যোগ্যতা সম্পন্ন করেছিলাম; তারা সৎকর্মে প্রতিযোগিতা করত, তারা আমাকে ডাকত আশা ও ভীতির সাথে এবং তারা ছিল আমার নিকট বিনীত। (আম্বিয়া: ২১: ৯০)
২৩. সন্তানদের নিকট মানবীয় উত্তম গুণাবলি সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে হবে এবং তা অমলম্বন করার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এর প্রতিদানে ইহকাল ও পরকালে উত্তম প্রতিদানের সুসংবাদ প্রদান করে অনুপ্রাণিত করতে হবে। সাথে সাথে তাদের মনে অসদাচার ও মানবিক বিচ্যুতিগুলোর প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করতে হবে। এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে তাদেরকে সতর্ক ও সচেতন করে তুলতে হবে।
২৪. প্রত্যেক মায়ের কর্তব্য হলো, কন্যাদেরকে পূত-পবিত্রতা, চারিত্রিক বিশুদ্ধতা ও প্রতিশ্রুতিশীলতা ইত্যাদি মানবিক গুণের দীক্ষা প্রদান করা। তাদেরকে জগতের শ্রেষ্ঠ নারীগণ 'উম্মাহাতুল মু'মিন' (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীগণ)-এর জীবনাচার অনুসরণে উদ্বুদ্ধ করা।
২৫. সন্তানের দোষ-ত্রুটি ও নৈতিক বিচ্যুতির ক্ষেত্রে তাকে প্রকাশ্যে তিরস্কার না করে নম্রভাবে বুঝিয়ে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে হবে।
২৬. অসৎ সঙ্গের কবল থেকে সন্তানের সুরক্ষা এবং সৎ সঙ্গে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। যা তাদের সফলতা ও উন্নতির পথ সুগম করবে। বিকৃত রুচির টিভি-অনুষ্ঠান কিংবা অনলাইন-প্রোগ্রাম থেকে বিরত রাখতে হবে। সমাজে যেকোনো ধরনের সহিংসতা, অন্যায়-অত্যাচার, যা তাদের মনমানসিকতায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, এর ভিডিও ফুটেজ দেখা থেকে বিরত রাখতে হবে।

টিকাঃ
* "সংক্ষুদ্ধ ব্যক্তি" অর্থ: কোন শিশু বা নারী যিনি পারিবারিক সম্পর্ক থাকিবার কারণে পরিবারের অপর কোন সদস্য কতৃর্ক পারিবারিক সহিংসতার শিকার হইয়াছেন বা হইতেছেন বা সহিংসতার ঝুঁকির মধ্যে রহিয়াছেন।

পরিশিষ্ট:
‘আর যারা ঈমান গ্রহণ করেছে এবং তাদের সন্তান-সন্ততি ঈমানের সাথে তাদের অনুসরণ করেছে, আমরা তাদের সাথে তাদের সন্তানদের মিলিত করব এবং তাদের কর্মের কোন অংশই কমাব না। প্রত্যেক ব্যক্তি তার কামাইয়ের ব্যাপারে দায়ী থাকবে।’ (তুর, ৫২: ২১)

আয়েশাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ তাঁর স্বহস্তে কোন দিন কাউকে আঘাত করেননি, কোন নারীকেও না, সেবককেও না, আলাহ্র রাস্তায় জিহাদ ব্যতীত। আর যে তাঁর অনিষ্ট করেছে তার থেকেও প্রতিশোধ নেননি। তবে আলাহুর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয় এমন বিষয়ে তিনি তাঁর প্রতিশোধ নিয়েছেন। (মুসলিম: ৪/৮১৪)

'দয়ার্দ্রতা, ভালোবাসা ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে চরম শত্রুকে পরম বন্ধুতে পরিণত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। যা মহৎ বিজ্ঞজনদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। আর রূঢ়তা ও অসদাচারের মাধ্যমে পরম বন্ধুকে চরম শত্রুভাবাপন্ন করা মূর্খতার পরিচয়। ক্রোধের আগুন বাইরে জ্বলার আগে হৃদয়ে দাউদাউ করে জ্বলে। সুতরাং আগে তোমার মনের আগুন নেভাও। সহিংসতার আগুন আপনাতেই নিভে যাবে। পরিবারের সাথে হাসিখুশি থাক। হাস্যরসিকতায় সময় কাটাও। এ জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত। হতে পারে আজকের পর কাল পরিবারের মুখ দেখার ভাগ্য না-ও হতে পারে।' -আয়েয আল-কারনী

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00