📄 দাজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচার উপায়
দাজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচার উপায় হল তা থেকে দূরে থাকা।
حَدَّثَنَا أَبُو الْيَمَانِ، قَالَ أَخْبَرَنَا شُعَيْبٌ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، قَالَ أَخْبَرَنَا عُرْوَةُ بْنُ الزُّبَيْرِ، عَنْ عَائِشَةَ، زَوْجِ النَّبي صلى الله عليه وسلم أَخْبَرَتْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ يَدْعُو فِي الصَّلَاةِ " اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَفِتْنَةِ الْمَمَاتِ اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْمَأْثَمِ وَالْمَغْرَمِ .
'উরওয়াহ ইবনু যুবাইর রাহিমাহুল্লাহু থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর স্ত্রী 'আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে বলেছেন যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাতে এ বলে দু'আ করতেন—
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعوذُبِكَ مِن عَذاب القبر واعوذُبِكَ مِن فتنة المسيح الدجال واعوذُبِكَ من فِتْنَةِ المَحيَا وَفِتْنَةِ المَمَاتِ اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْمَأْثَمِ وَالْمَغْرَمِ
"হে আল্লাহ! কবরের আযাব হতে, মাসীহে দাজ্জালের ফিতনা হতে এবং জীবন ও মৃত্যুর ফিতনা হতে আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। হে আল্লাহ! গুনাহ ও ঋণগ্রস্ততা হতে আপনার নিকট আশ্রয় চাই।"
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি, ২/৮৩২। সহিহ মুসলিম, ৪/৪৯, ৫০, ৫১, ৫২।
📄 সূরা কাহাফের দশ আয়াত
حَدَّثَنَا حَفْصُ بْنُ عُمَرَ، حَدَّثَنَا هَمَّامُ، حَدَّثَنَا قَتَادَةُ، عَنْ سَالِمِ بْنِ أَبِي الْجُعْدِ، عَنْ مَعْدَانَ بْنِ أَبِي طَلْحَةَ، عَنْ حَدِيثِ أَبِي الدَّرْدَاءِ، يَرْوِيهِ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ " مَنْ حَفِظَ عَشْرَ آيَاتٍ مِنْ أَوَّلِ سُورَةِ الْكَهْفِ عُصِمَ مِنْ فِتْنَةِ الدَّجَّالِ ". قَالَ أَبُو دَاوُدَ وَكَذَا قَالَ هِشَامُ الدَّسْتَوَانِي عَنْ قَتَادَةَ إِلَّا أَنَّهُ قَالَ " مَنْ حَفِظَ مِنْ خَوَاتِيمِ سُورَةِ الْكَهْفِ " . وَقَالَ شُعْبَةُ عَنْ قَتَادَةَ "مِنْ آخِرِ الْكَهْفِ".
আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-যে ব্যক্তি সূরাহ আল-কাহফের প্রথম দশ আয়াত মুখস্ত করবে সে দাজ্জালের ফিতনা হতে মুক্তি পাবে।
ইমাম আবু দাউদ রাহিমাহুল্লাহু বলেন-হিশাম আদ-দাস্তাওয়াঈ কাতাদার সূত্রে এরূপই বলেছেন; কিন্তু তিনি একথাটি এভাবে বলেছেন: যে ব্যক্তি সূরাহ কাহফের শেষের কয়েকটি আয়াত হিফাযাত করবে। আর শু'বাহ বলেনঃ যে ব্যক্তি সূরাহ কাহফের শেষাংশ মুখস্ত রাখবে।
এর পূর্বের বর্ণনাটি অধিক সহীহ এবং অধিক বর্ণিত।
কোন কোন বর্ণনায় আছে, )"آيات من أول سورة الكهف عصم من الدجال"( সূরা কাহাফের প্রথম অংশ পাঠে মুক্তি মেলে দাজ্জাল থেকে।
শু'বা রাহিমাহুল্লাহ কাতাদা থেকে বর্ণনা করেন, )"من حفظ عشر آيات من آخر سورة الكهف عصم من فتنة الدجال"( যে ব্যক্তি সূরা কাহাফের শেষ দশ আয়াত পাঠ করবে সে দাজ্জালে ফিতনা থেকে রেহায় পাবে।
টিকাঃ
২. সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৩২৩। হাদিসের মান: সহিহ হাদিস।
📄 আমার বাসস্থান মদিনা এবং মক্কা দাজ্জাল প্রবেশ থেকে নিরাপদ থাকবে
حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ، قَالَ حَدَّثَنِي مَالِكَ، عَنْ نُعَيْمِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ الْمُجْمِرِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رضى الله عنه ـ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " عَلَى أَنْقَابِ الْمَدِينَةِ مَلَائِكَةُ، لَا يَدْخُلُهَا الطَّاعُونُ وَلَا الدَّجَّالُ ".
আবু হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- মদিনার প্রবেশ পথসমূহে ফেরেস্তা পাহারায় নিয়োজিত আছে। তাই প্লেগ রোগ এবং দাজ্জাল মদিনায় প্রবেশ করতে পারবে না।
حَدَّثَنَا عَبْدُ الْعَزِيزِ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ حَدَّثَنِي إِبْرَاهِيمُ بْنُ سَعْدٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ جَدِهِ، عَنْ أَبِي بَكْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ " لَا يَدْخُلُ الْمَدِينَةَ رُعْبُ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ، لَهَا يَوْمَئِذٍ سَبْعَةُ أَبْوَابٍ، عَلَى كُلِّ بَاب مَلَكَانِ ".
আবু বাকরাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- মদিনাতে দাজ্জালের ত্রাস ও ভীতি প্রবেশ করতে পারবে না। ঐ সময় মদিনার সাতটি প্রবেশ পথ থাকবে। প্রত্যেক পথে দু'জন করে ফেরেশতা (মোতায়েন) থাকবে।
حَدَّثَنَا عَبْدَةُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ الْخُزَاعِيُّ الْبَصْرِيُّ، حَدَّثَنَا يَزِيدُ بْنُ هَارُونَ، أَخْبَرَنَا شُعْبَةُ، عَنْ قَتَادَةَ، عَنْ أَنَسٍ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم " يَأْتِي الدَّجَّالُ الْمَدِينَةَ فَيَجِدُ الْمَلَائِكَةَ يَحْرُسُونَهَا فَلَا يَدْخُلُهَا الطَّاعُونُ وَلَا الدَّجَّالُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ .
আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- দাজ্জাল মদিনায় উপস্থিত হয়ে দেখতে পাবে যে, ফেরেশতাগণ তা পাহারা দিচ্ছেন। অতএব, আল্লাহ্ তা'আলার ইচ্ছায় মহামারী ও দাজ্জাল মদিনায় প্রবেশ করতে পারবে না।
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি, হাদিস নং ১৮৮০।
২. সহিহুল বুখারি, হাদিস নং ১৮৭৯।
৩. সুনানুত তিরমিজি, হাদিস নং ২২৪২।
📄 দাজ্জালের সংক্ষিপ্ত জিবনি
সে একজন আদম সন্তান। শেষযুগে মানুষের পরীক্ষার জন্য আল্লাহর তাকে সৃষ্টি করেছেন-
يضل به كثيرا ويهدى به كثيرا وما يضل به الا الفاسقين
হাফেজ আহমদ ইবনু আলি আবার তার 'তারীখ' গ্রন্থে মুজালিদ সূত্রে শা'বী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, দাজ্জালের উপনাম আবু ইউসুফ। ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু, প্রমুখ সাহাবীর বর্ণনা মতে, ইতঃপূর্বে গত হয়েছে যে, তার নাম হলো ইবনু সাইয়াদ। ইমাম আহমদ বর্ণনা করেন... আবু বাকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দাজ্জালের মাতা-পিতার ত্রিশ বছর যাবৎ কোনো সন্তান হবে না। ত্রিশ বছর পর টেরা একটি সন্তান হবে। ক্ষতি বেশি করবে, কম উপকারী হবে। তার দুচোখ ঘুমালেও অন্তর ঘুমাবে না।
এরপর তার পিতা-মাতার দেহাবয়ব বর্ণনা করেন, তার পিতা হবে মাংসাবহুল, লম্বা নাকধারী। যেন তার নাম করাত। তার মায়ের স্তন হবে বড়। অতঃপর আমরা শুনতে পেলাম, মদিনার এক ইহুদী পরিবারে একটি সন্তান জন্মেছে। খবর শুনে আমি ও যুবাইর ইবনুল আওয়াম তাদের বাড়িতে গেলাম। দাজ্জালের মাতা- পিতার যে গুণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন, তার মাতা- পিতার মাঝেও আমরা তা পেলাম।
আমরা দেখতে পেলাম বাচ্চাটি রোদ পোহাচ্ছে আমরা তার মাতা-পিতাকে জিজ্ঞেস করলাম, তারা বলল, ত্রিশ বছর যাবৎ আমাদের কোনো সন্তান হচ্ছিল না। অতঃপর এ সন্তান জন্মে। চোখটেরা, বেশি ক্ষতিকর, কম উপকারী। অতঃপর আমরা বের হয়ে তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। সে বলল, তোমরা কী নিয়ে কথা বলছিলে আমি জানি। আমরা বললাম, তুমি শুনেছ? সে বলল, হ্যাঁ, নিশ্চয় আমার দুচোখ ঘুমালেও অন্তর ঘুমায় না। সে ছিল ইবনু সাইয়াদ।
ইমাম তিরমিযী হাম্মাদ ইবনু সালামা সূত্রে হাদিসটি বর্ণনা করে বলেছেন, হাদিসটি মদিনার ইহুদী পরিবারে ইবনু সাইয়াদের জন্ম। তার উপাধি ছিল আবদুল্লাহ। 'সাফ'-ও বলা হয়। এই এই বর্ণনা এসেছে। হতে পারে তার মূলনাম সাফ। ইসলাম গ্রহণের পর তার নাম হয় ইবনু আবদুল্লাহ। তার ছেলে ওমারা ইবনু আবদুল্লাহ ছিলেন নেতৃস্থানীয় তাবেয়ী। তাঁর থেকে ইমাম মালেক প্রমুখ হাদিস বর্ণনা করেছেন। পূর্বে গত হয়েছে, বিশুদ্ধ মত হলো, ইবনু সাইয়াদ দাজ্জাল নয়। মূলত সে ছোট দাজ্জালগুলোর একজন ছিল। পরবর্তী সময় তাওবা করে ইসলাম গ্রহণ করে। তার রহস্য সম্পর্কে মহান আল্লাহই ভালো জানেন।
ফাতেমা বিনতে কাইম রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর হাদিসে বড় দাজ্জালের বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তামীমে দায়ী থেকে। ওই বর্ননায় জাসসার ঘটনা আছে। শেষ যুগে যখন মুসলমানরা রোমের নগরী কসতুনতুনিরা জয় করবে, তখন তাকে আবির্ভাবের অনুমতি দেওয়া হবে। ইস্পাহানের হাররা থেকে প্রকাশ ঘটবে। তাকে ইহুদিয়্যা-ও বলা হয়। ওই অঞ্চলের সত্তর হাজার ইহুদি তাকে সাহায্য করবে। তাদের মাথায় সবুজ টুপি এবং তারা অস্ত্রসজ্জিত হবে। এমনিভাবে সত্তর হাজার তাতার এবং খোরাসানের কিছু তাকে সাহায্য করবে। প্রথমে সে একজন অত্যাচারী শাসকের রূপে আভির্ভূত হবে। যথাক্রমে সে নবুয়ত অতঃপর খোদায়ী দাবী করবে। বনি আদমের কিছু মূর্খ-আম জনসাধারণ তার অনুসরণ করবে। আল্লাহর নেককার ও মুত্তাকি ব্যক্তিরা তার বিরোধিতা করবে। এক এক করে সে পৃথিবীর সব ভূখণ্ড চষে বেড়াবে। শুধু মক্কা-মদিনায় প্রবেশ করতে পারবে না। পৃথিবীতে সে চল্লিশ দিন অবস্থান করবে। উক্ত চল্লিশ দিনের একদিন এক বছর সমান, একদিন এক মাসের সমান, একদিন এক সপ্তাহের সমান। বাকি দিনগুলো স্বাভাবিক দিনের মতো হবে। মোট হয় এক বছর আড়াইমাস। মহান আল্লাহ তাকে কিছু বিস্ময়কর ক্ষমতা প্রদান করবেন। এ দিয়ে সে কিছু মানুষকে পথভ্রষ্ট করবে। এগুলো দেখে মুমিনদের ঈমান আরও বৃদ্ধি পাবে। দাজ্জালের অবস্থানের এই দিনগুলোতে ঈসা (আ.) দামেশকের পূর্ব মিনারে অবতরণ করবেন। মুমিনগণ গিয়ে তাঁর সঙ্গে যোগ দিবেন। তাদের নিয়ে ঈসা (আ.) দাজ্জালের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। তিনি বাইতুল মুকাদ্দাসের পথে যাওয়ার সময় আকাবায়ে আফীক নামক স্থানে তাকে পাবেন। দাজ্জাল তাঁর কাছে পরাস্ত হবে। তিনি তাকে বাবে লুদ শহরে নিয়ে যাবেন এবং বর্শা দিয়ে তাকে হত্যা করবেন।
তিনি ওই শহরে প্রবেশ করার সময় বলবেন, আমি তোকে একটি আঘাত করবো, যা কোনোভাবেই ব্যর্থ হবে না। দাজ্জাল তার মুখোমুখী হলে গলে যাবে, লবণ যেমন পানিতে গলে যায়। অতঃপর ঈসা ইবনু মারিয়াম (আ.) তাকে হত্যা করবেন বর্শা দিয়ে বাবে লুব্ধ নামক স্থানে।
সেখানেই সে মৃত্যুবরণ করবে। (لعنه الله ) বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত সহিহ হাদিসসমূহ থেকে বিষয়টি স্পষ্ট হয়। পূর্বে যেমনটি গত হয়েছে এবং সামনেও আসছে।
ইমাম তিরমিযী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, কুতায়বা ইবনু সাইদ রাহিমাহুল্লাহ হাদিস বর্ণনা করেছেন, মুজাম্মা ইবনু জারিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূল সা.-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, ঈসা ইবনু মারইয়াম 'বাবে লুদ্ধ'-এ দাজ্জালকে হত্যা করবেন।
ইমাম আহমাদ অন্য সনদে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন।
ইমাম তিরমিযী হাদিটি বর্ণনার পর বলেন, হাদিসটি সহীহ। এ বিষয়ে অন্যান্য সাহাবী যেমন, ইমরান ইবনু হুসাইন, নাফে' ইবনু ওতবা, আবু বারযাহ, হুজাইফা ইবনু উমাইদ, আবু হুরাইরাহ, কাইসান, ওাসূমান ইবনু আবুল আস, আবু উসমা, ইবনু মাসউদ, আবদুল্লাহ ইবনু আমর, সামুরা ইবনু জুনদুব, নাওয়াস ইবনু সামআন, আমর ইবনু আশুফ, হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকেও হাদিস বর্ণিত আছে।
ইবনু আবু শায়বা রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এক ইহুদীকে দাজ্জাল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে বলল, ইহুদী পরিবারে তার জন্ম। নিশ্চয় ঈসা ইবনু মারইয়াম তাকে হত্যা করবেন।
দাজ্জালের বাহ্যিক আকৃতি: কিছু হাদিসে পূর্বে গত হয়েছে, সে টেরা হবে, তার গায়ে চুল ও পশম হবে বেশি। কিছু বর্ণনা মতে, সে বেঁটে। আর এক বর্ণনা মতে, সে দীর্ঘ দেহধারী। এক বর্ণনায় এসেছে, সে যে গাধায় আরোহণ করবে, তার দু কানের মাঝখানের দূরত্ব হবে চল্লিশ গজ। যেমনটি পূর্বে গত হয়েছে।
জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদিস এবং অন্য একটি হাদিসের ভাষা মতে এ দূরত্ব সত্তর গজ। হাদিসটি সহীহ নয়। প্রথমটি প্রশ্নবিদ্ধ বর্ণনা।
'মাআরিফাতুম সাহাবা' গ্রন্থে আবদান বলেন, সুফিয়ান সাওরী রাহিমাহুল্লাহ আবদুল্লাহ ইবনু মাইসারা সূত্রে হাওত আবাদী থেকে বর্ণনা করেন, মাসউদ বলেন, দাজ্জালের গাধার ছায়ায় সত্তর হাজার লোক বসতে পারবে। আমাদের হাফেজ যাহাবী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, উক্ত বর্ণনার রাবী 'খাওত' একজন অজ্ঞাত রাবী। আর হাদিসটি মুনকাফ। তার দুচোখের মাঝে লেখা থাকবে 'কাফের'। প্রত্যেক মুমিন তা পড়তে পারবে। وان رأسه فمن ورائه حبك حيك
অন্য হাদিসে বর্ণিত এ হাদিসের একটি শাহেদ ইতঃপূর্বে গত হয়েছে। حبك হচ্ছে, কোকড়ানো যেমন মহান আল্লাহর বানী : والسماء ذات الحبك
আবু হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—লাইলাতুল কদর ও দাজ্জালের আগমনের নির্দিষ্ট তারিখ জানতে তোমাদের বলার জন্য আমি বের হয়েছিলাম। এ সময় দুজন মানুষ মসজিদে আঙ্গিনায় ঝগড়া করছিল। তাদের দূর করতে গিয়ে আমি এ দুই তারিখ ভুলে গেছি সুতরাং তোমরা শেষ দমকের বিজোড় রাতসমূহ শবে কদর অনুসন্ধান করো। আঃ" দাজ্জালের দেহাকৃতি হবে, চোখ টেরা, উজ্জ্বল কপাল ও প্রশস্ত গন্ডদেশ। দেখেত যে কাতান ইবনু আবদুল উজ্জার মতো হবে। কাতান বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! তার মতো হওয়ায় আমার কি কোনো ক্ষতি হবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না। বরং তুমি একজন মুসলিম ব্যক্তি আর সে হবে কাফের।
তাবারানী বলেন, সুলায়মান ইবনু শিহাব কাইসী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু মাগনাম রাদিয়াল্লাহু আনহু এলেন। তিনি ছিলেন রাসূল সা.-এর একজন সাহাবী। তিনি আমাকে রাসূল সা.-এর হাদিসটি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, দাজ্জার বিষয়ে কোনো অস্পষ্টতা নেই। সে পূর্বদিক থেকে আসবে। সে এসেই সত্যের দিকে ডাকবে। লোকজন তার অনুসারী হবে। মানুষ অসত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে বিজয়ী হবে। এ অবস্থায় সে কুফায় আগমন করবে। সে স্পষ্ট আল্লাহর দীনের স্বীকৃতি দিয়ে এবং তদনুযায়ী আমল করবে। ফলে লোকজন তার অনুসারী হবে এবং তারা ভালোবাসবেন। অতঃপর সে নিজেকে নবি দাবী করবে, এতে বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী মানুষজন হতভম্ব হয়ে পড়বেন আর তাকে ছেড়ে সরে যাবেন। এর কিছুদিন পর সে নিজেকে আল্লাহ দাবি করবে।
মহান আল্লাহ তার দুচোখ বুঝে দিবেন, দুই কান কেটে দিবেন। তার দুই চোখের মাঝখানে লেখা থাকবে 'কাফের'। ফলে মুসলিমদের কাছে অস্পষ্ট থাকবে না। যার অন্তরে শস্যদানা সমান ঈমান থাকবে, সে তার সঙ্গ দিবে না। ইহুদী, খ্রিষ্টান, অগ্নিপূজক ও অনারব মুশরিকেরা তার দলে যোগ দিবে। অতঃপর সে এক ব্যক্তিকে ডাকবে।.... তার নির্দেশে তাকে হত্যা করা হবে এবং সকল আছে কেটে পৃথক করা হবে। অতঃপর লোকজনের সামনে সব অঙ্গ একত্র করে তাতে লাঠি দিয়ে আঘাত করবে। এতে লোকটি সম্পূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়ে যাবে। অতপর দাজ্জাল বলবে, আমিই আল্লাহ, জীবন ও মৃত্যু দেই। এ মূলত জাদু। এ দিয়ে সে মানুষকে জাদু করবে। এর কিছুই মূলত সে করতে সক্ষম হবে না।
আমাদের শায়খ যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এবং তা বর্ণনা করেন ইয়াহইয়া ইবনু মুসা সাঈদ ইবনু মুসা সাকাফি থেকে। আর তিনি হলেন,... আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু দাজ্জাল সম্পর্কে বলেন, তার নাম হলো, সাফী ইবনু সায়েদ। তার জন্ম হবে ইসফাহানের এক ইহুদি পরিবারে। তার বাহন হবে একটি লেজকাটা গাধা। তার দোকানের মধ্যবর্তী দূরত্ব হবে চল্লিশ গজ। এক পায়ের খুর থেকে অন্য পায়ের দূরত্ব হবে চারদিনের পথ। হাত দিয়ে সে আকাশ ছুতে পারবে। তার সামনে হবে ধোয়ার পাহাড়। তার পেছনে হবে আরেকটি পাহাড়। তার দু চোখের মাঝখানে লেখা থাকবে 'কাফের'। সে বলবে, আমিই তোমাদের বড় প্রভু। বিয়াকার লোকজন এবং জারজ সন্তানেরা তার সঙ্গী হবে, আবু অমীয়বাণী এটি 'কিতাবুদ দাজ্জালে' এটি বর্ণনা করেছেন। এর ইসনাদ শুদ্ধ নয়।
মহান আল্লাহ বলেন-
وَقَوْلِهِمْ إِنَّا قَتَلْنَا الْمَسِيحَ عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ رَسُولَ اللَّهِ وَمَا قَتَلُوْهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَكِنْ شُبِّهَ لَهُمْ وَإِنَّ الَّذِينَ اخْتَلَفُوْا فِيْهِ لَفِي شَكٍّ مِّنْهُ مَا لَهُم بِهِ مِنْ عِلْمٍ إِلَّا اتَّبَاعَ الظَّنِّ وَمَا قَتَلُوهُ يَقِيْنَا - بَلْ رَّفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا
'আর তাদের এ কথা বলার কারণে যে, আমরা মারইয়িয়াম পুত্র ঈসা মসিহকে হত্যা করেছি, যিনি ছিলেন আল্লাহর রাসূল। অথচ তারা না তাকে হত্যা করেছে, না শূলিতে চরিয়েছে। বরং তারা এরপ ধাঁধাঁয় পতিত হয়েছিলেন। বস্তুত: তারা এ ব্যাপারে নানান কথা বলে। তারা এ ক্ষেত্রে সন্দেহের মাঝে পড়ে আছে। শুধু মাত্র অনুমান করা ছাড়া তারা এ বিষয়ে কোন খবরই রাখে না। আর নিশ্চয় তাকে তারা হত্যা করেনি। বরং আল্লাহ তায়ালা তাকে উঠিয়ে নিয়েছেন। আল্লাহ হচ্ছেন মহা পরাক্রমশালী এবং প্রজ্ঞাময়।' [সুরা নিসা: ১৫৭-১৫৮]
ইবনু জারির তাঁর তাফসীরাসূন্থে লিখেন—আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। কুরআনের আয়াত وان من اهل الكتاب الا ليؤمنن به قبل موته এর ব্যাখায় তিনি বলেন, এ আয়াতের মানে "ঈসা (আ.)-এর মৃত্যুর পূর্বে" উদ্দেশ্য। এ বর্ণনার সনদ সহীহ, আওফী এমনই বর্ণনা করেছেন ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে।
ঈসা (আ.) কী মৃত্যুবরণ করেছেন নাকি তাঁকে আসমানে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে? আবু মালেক বলেন, ঈসা (আ.) আসমান থেকে অবতরণের পরই আহলে কিতাব সকলে তার প্রতি ঈমান আনবে। তিনি এখন মহান আল্লাহর কাছে জীবিত অবস্থায়।
রয়েছেন। যখন তিনি যখন অবতরণ করবেন, তারা সকলে তার প্রতি ঈমান আনবে। ইবনু জারীর এটি বর্ণনা করেছেন। ইবনু আবি হাতেম তাঁর থেকে বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি হাসান বসরী (র.)-কে এ আয়াতের তাফসীর জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ঈসা (আ.)-কে মহান আল্লাহ মৃত্যুর আগে আসমানে উঠিয়ে নিয়েছেন। কিয়ামতের পূর্বে তাঁকে এমন একটি মাকামে তাকে পাঠাবেন যে, নেককার-বদকার সকলে তার প্রতি ঈমান আনবে। কাতাদা ইবনু দিআমা, আবদুর রহমান ইবনু যায়েদ ইবনু আসলাম প্রমুখ এমনই বলেছেন। এটি আবু হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বুখারী ও মুসলিমে প্রমাণিত আছে। যেমনটি সামনে আসবে, এক বর্ণনায় মাওকুফ আর অন্য বর্ণনা মারফু সূত্রে। والله تعالى اعلم
এখানে মূল্য উদ্দেশ্য, ঈসা (আ.) আসমানে আছেন- এ বিষয়ে সংবাদ প্রদান। বিষয়টি মুখ আহলে কিতাব যেমন ভাবে তেমন নয় যে, তারা তাঁকে ক্রশবিদ্ধ করেছে। বরং সত্য হলো, তাঁকে মহান আল্লাহ আসমানে উঠিয়ে নিয়েছেন। অতঃপর তিনি কিয়ামতের পূর্বে আসমান থেকে অবতরণ করবেন। বিভিন্ন মুতাওয়াতির হাদিসে এমনই বর্ণিত হয়েছে। এ হাদিসগুলোর কিছু দাজ্জাল সম্পর্কিত হাদিসগুলোর সঙ্গে উল্লেখিত হয়েছে। আর কিছু সামনে আসবে। এজন্য আল্লাহর সাহায্য চাচ্ছি। তাঁর ওপরই একমাত্র ভরসা। মহাপ্রজ্ঞাবান ও মর্যাদার অধিকারী আল্লাহ ব্যতীত কোনো শক্তি-সামর্থ্য উপায় নেই। তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তিনিই আবশের দয়াবান প্রভু।
ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রমুখ থেকে অন্য একটি বর্ণনা আছে এমন, من قبل موت اهل الكتاب (من قبل موته )আয়াতে, মতান্তরে হলে এর সাথে সাংঘর্ষিক হবে। তবে যেটি আমি উল্লেখ করেছি, অর্থ-উদ্দেশ্য ও সনদ বিচারে তা-ই সঠিক। ‘কিতাবুত তাফসীরে’ আমি বিষয়টি স্ববিস্তার আলোচনা করেছি।
টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমাদ।