📘 আল ফিতান ওয়াল মালাহিম 📄 লেখকের জীবনবৃত্তান্ত

📄 লেখকের জীবনবৃত্তান্ত


নাম ও বংশ
তাঁর নাম ইসমাঈল ইবনু উমর ইবনু কাসির ইবনু কাসির ইবনু দিরা আল-কুরাইশী। তাঁর বংশ কুরাইশের বনী হাসালা শাখা গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। সম্ভ্রান্ত গোত্ররূপে এ গোত্রটির খ্যাতি রয়েছে।

তাঁর জন্ম:
৭০১ হিজরী সনে ইবনু কাসির রাহিমাহুল্লাহ জন্মগ্রহণ করেন। যেমনটি ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’তে তিনি উল্লেখ করেছেন। তাঁর পিতা হলেন খতীব শিহাবউদ্দীন আবু হাফস উমর ইবনু কাসির। তিনি বসরা নগরীর পশ্চিমে অবস্থিত ‘শারকাবীন’ গ্রামে বসবাস করতেন। বসরা ও শারকাবীনের দূরত্ব খুবই সামান্য। খতীব শিহাবউদ্দীন ৬৪০ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। বসরার আননাকা অঞ্চলের বিদ্যালয়সমূহে তিনি লেখাপড়া করেন। তারপর বসরার পূর্বদিকে অবস্থিত বিতাবা জনপদে চলে যান। তিনি শাফিঈ মাযহাব অবলম্বন করেন এবং ইমাম নওয়াবী ও ইমাম গাযালীর নিকট বিদ্যা শিক্ষা করেন। তিনি সেখানে প্রায় ১২ বছর অবস্থান করেন। এরপর ফিরে আসেন ‘মিজদাল’-এ। এখানে তার বিবাহ হয়। আবদুল ওহ্হাব, আবদুল আযীয ও ইসমাঈল নামক তিন পুত্রের জন্মের পর তার কয়েকজন কন্যা সন্তানও জন্মগ্রহণ করে। এছাড়া ইউনুস ও ইদ্রীস নামক দুই পুত্রও জন্মগ্রহণ করে। ৭০৩ হিজরীতে মিজদাল-এ ইবনু কাসিরের পিতার ইনতিকাল হয়। তখন ইসমাঈল (ইবনু কাসির রাহিমাহুল্লাহ)-এর বয়স প্রায় তিন বছর।

শৈশব ও যৌবন:
ইবনু কাসির রাহিমাহুল্লাহ-এর সহোদর আবদুল ওহ্হাব ৭০৭ হিজরীতে সপরিবারে দামেশকে চলে যান। তাঁর সম্পর্কে ইবনু কাসিরের মন্তব্য, ‘তিনি আমাদের সহোদর এবং আমাদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহবৎসল ছিল।’ ইবনু কাসির রাহিমাহুল্লাহ হিজরী ৮ম শতাব্দীতে মামলুক সুলতানদের শাসনামলে তাঁর যৌবনকাল অতিবাহিত করেন। তাতারীদের আক্রমণ, একাধিক দুর্ভিক্ষ, হৃদয়-বিদারক দুর্যোগগুলো তিনি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেন। তখন দুর্ভিক্ষে লক্ষ-লক্ষ লোকের প্রাণহানি ঘটে। তিনি ফিরিঙ্গীদের সাথে সংঘটিত ক্রুসেড যুদ্ধগুলোও দেখেছেন। ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র রাজ্যের প্রতিষ্ঠা, শাসকদের পারস্পরিক সংঘাত ইত্যাদি তাঁর সম্মুখেই সংঘটিত হয়। এতদসত্ত্বেও এ যুগে শিক্ষা-দীক্ষা এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানে উৎকর্ষ সাধনের প্রবল উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হয়। আমীর-উমারাদের আগ্রহ এবং বিজ্ঞজন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যে অকাতরে দান করার কারণে প্রচুর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বহুসংখ্যক গ্রন্থ রচিত ও সংকলিত হয়।

শিক্ষা-দীক্ষা:
ইবনু কাসির রাহিমাহুল্লাহ প্রখর মেধাশক্তির অধিকারী ছিলেন। দশ বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই তিনি কুরআনুল কারীম মুখস্থ করেন। তিনি তাঁর দেশের বিভিন্ন আলিমদের থেকে ইলম অর্জন করেন। সে কারণেই তাঁর উপাধি 'ইমাদ আদ্-দ্বীন' বা দ্বীনের স্তম্ভ। তিনি ইমাম, ফক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাচ্ছির, ঐতিহাসিক, ইবনু তাইমিয়ার ছাত্র এবং হিজরী ৮ম শতকের অন্যতম মনীষী। তিনি হচ্ছেন কুরআনের অন্যতম বিশুদ্ধ তাফসীর গ্রন্থ 'তাফসীর আল-কুরআন আল-আজীম' ও সর্বাধিক বিশুদ্ধ ইতিহাস গ্রন্থ 'আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া' এর লেখক।

তাঁর উস্তাদ:
শত শত শাইখের নিকট তিনি শিক্ষা গ্রহণ করেন। তবে তিনি যাদের দ্বারা প্রভাবিত হন এবং যাদের তিনি অনুসরণ করেন তাদের সংখ্যা খুবই অল্প ছিল। এদের মধ্যে শায়খ তকী উদ্দীন ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহু অন্যতম। কারণ তাঁর সাথে ইবনু কাসির রাহিমাহুল্লাহ-এর অনেক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ইবনু কাসির তাঁর অভিমত অনুসরণ করতেন এবং তালাকের মাসআলায় তাঁর মতানুযায়ী ফতোয়া দিতেন। এ ব্যাপারে তিনি বিপদেও পড়েছিলেন এবং কষ্টও ভোগ করেছেন। আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে ইবনু কাসির রাহিমাহুল্লাহ-এর লিখিত তথ্য সূত্রে আমরা তা জানতে পারি। হিজরী ৮ম শতাব্দীর প্রথমার্ধের বড় বড় ঘটনার বর্ণনায় এ তথ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়।

ইতিহাস শাস্ত্রে তিনি সিরিয়ার ইতিহাসবিদ কাসিম ইবনু মুহাম্মদ রাহিমাহুল্লাহু (মৃত্যু ৭৩৯ হিঃ) -এর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। কাসিম ইবনু মুহাম্মদ রাহিমাহুল্লাহ-এর ইতিহাস গ্রন্থ যা মূলত শাইখ শিহাবুদ্দীন আবু শামা মাকদেসী-এর ইতিহাস গ্রন্থের পরিশিষ্ট। ইবনু কাসিরের ইতিহাস গ্রন্থে উপরোল্লেখিত গ্রন্থের সবিশেষ প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

হাদিস শাস্ত্রে তাঁর উপর প্রভাব বিস্তার করেছেন শাইখ মিযয়ী ইউসুফ ইবনু আবদুর রহমান জামালুদ্দীন (মৃত্যু ৭৪৪ হিঃ)। তিনি সে যুগে গোটা মিসরে স্বীকৃত ও প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ছিলেন। 'তাহযীবুল কামাল' গ্রন্থটি তাঁর রচিত। ইবনু কাসির রাহিমাহুল্লাহ শাইখ 'মিযয়ী'-এর অধিকাংশ গ্রন্থ তাঁর কাছে অধ্যয়ন করেন। ইবনু কাসির রাহিমাহুল্লাহ উক্ত শাইখের এতই ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য অর্জন করেছিলেন যে, শাইখের কন্যা যায়নাবকে তিনি বিবাহ করেন। তিনি হাদিসশাস্ত্র ও রাবীদের জীবনী সম্পর্কে শাইখ মিযয়ী থেকে প্রভূত জ্ঞান অর্জন করেন। এ ছাড়াও তাঁর অনেক উস্তাদ ছিলেন। যেমন:
(১) জনাব ইজুদ্দীন আবু ইয়া'লা, হামযা ইবনু মুআইয়িদুদ্দীন আবুল মা'আলী, আসা'আদ ইবনু ইজ্জদীন আবু গালিব মুযাফফর ইবনুল ওষীর আত তামীমী দামেশকী। ইবনুল কালানসী (মৃঃ ৭২৯ হিঃ)। তিনি মুহাদ্দিস ছিলেন। নেতৃত্বের গুণাবলীও তাঁর মধ্যে ছিল। ৭১০ হিজরী সনে তিনি মন্ত্রীত্ব লাভ করেছিলেন।
(২) ইবরাহীম ইবনু আবদুর রহমান গাযালী রাহিমাহুল্লাহু। ইবনু কাসির রাহিমাহুল্লাহ তাঁর নিকট শাফিঈ মাযহাবের দীক্ষা গ্রহণ করেছেন এবং সহীহ মুসলিম ও অন্যান্য হাদিস গ্রন্থ তাঁর কাছে অধ্যয়ন করেন।
(৩) নাজমুদ্দীন ইবনুল আসকালানী রাহিমাহুল্লাহ। ৯টি মজলিসে ইবনু কাসির রাহিমাহুল্লাহ তাঁর নিকট সহীহ মুসলিম অধ্যয়ন করেন।
(৪) শিহাবুদ্দীন আলহিজার ওরফে ইবনু শাহনা। আশরাফিয়া দারুল হাদীসে তিনি হাদীসের প্রায় ৫০০টি পুস্তিকা অধ্যয়ন করেন। ৭৩০ হিজরীতে তাঁর ইনতিকাল হয়। তাঁর নাম ছিল আহমদ ইবনু আবু তালিব।
(৫) কামালুদ্দীন ইবনু কাষী শাহবাহ, তাঁর নিকট ইবনু হাজিব রচিত উসূল বিষয়ক গ্রন্থ 'মুখতাসার' পাঠ করেন।
(৬) শায়খ নাজমুদ্দীন মূসা ইবনু আলী ইবনু মুহাম্মদ জীলী দামেশকী। ইনি বিদগ্ধ জ্ঞানীজন এবং লেখক ছিলেন। ইবনুল বাসীস নামে তিনি সুপরিচিত ছিলেন। লিপি বিদ্যায় উস্তাদ এবং স্থানীয় বিশেষজ্ঞ বলে তিনি বিবেচিত হতেন। ৭১৬ হিজরী সনে তাঁর মৃত্যু হয়।
(৭) শাইখ হাফিজ ও ইতিহাসবিদ শামসুদ্দীন যাহাবী মুহাম্মদ ইবনু আহমদ কায়মায—তাঁর নিকটও তিনি শিক্ষা লাভ করেন। ৭৪৮ হিজরী সনে তাঁর মৃত্যু হয়।
(৮) নাজমুদ্দীন মূসা ইবনু আলী ইবনু মুহাম্মদ রাহিমাহুল্লাহু, তিনি একাধারে শাইখ এবং উচ্চমানের কবি ছিলেন। ৭১৬ হিজরীতে তিনি ইন্তেকাল করেন।
(৯) কাসিম ইবনু আসাকির, ইবনু শীরযাই, ইসহাক আসাদী মিসর থেকে তাঁকে অনুমতি দিয়েছেন আবু মুসা কুরাফী এবং আবুল ফাতাহ দাবৃসী।

তাঁর শাগরেদ:
ইবনু কাসির রাহিমাহুল্লাহুর অনেক ছাত্র ছিলেন যারা তাঁর থেকে হাদিস এবং তাফসীর শিখেছেন। ইবনু কাসীর রাহিমাহুল্লাহুর ছাত্র ইবনু হাজ্জি তাঁর সম্পর্কে বলেন— "প্রতিবার যখনই তাঁর সাথে আমার সাক্ষাৎ হতো, আমি তাঁর থেকে উপকৃত হতাম"।

তাঁর ব্যাপারে অন্যান্যদের প্রশংসাবাণী:
এমন একজন মানুষ যিনি তাঁর সমসাময়িক যুগের শ্রেষ্ঠ ইতিহাসবিদ, হাদিসবিশারদ, তাফসীরকারগণ এবং অংক শাস্ত্রবিদগণের কাছে গভীর জ্ঞান অর্জন করেছেন, এ ধরনের বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মানুষ খুব কমই দেখা যায়। দাউদী রাহিমাহুল্লাহু তাঁর প্রশংসা করেছেন এভাবে— 'আমরা যাদেরকে পেয়েছি তাদের মধ্যে ইবনু কাসির রাহিমাহুল্লাহ হাদীসের মূল পাঠ কণ্ঠস্থকারীদের মধ্যে অগ্রগামী ছিলেন এবং হাদীসের উৎস, পরিচিতি, রিজাল পরিচিতি এবং শুদ্ধাশুদ্ধ বিচারে তিনি ছিলেন বিজ্ঞতম ব্যক্তি। তাঁর সমকালীন বিদগ্ধজন ও তাঁর শায়খগণ তাঁর স্বীকৃতি দিতেন। ফিকাহ ও ইতিহাস শাস্ত্রের বহু কিছু তাঁর নখদর্পণে ছিল। তিনি যা শুনতেন তা খুব কমই ভুলতেন। তিনি গভীর প্রজ্ঞার অধিকারী উত্তম ফিকাহবিদ ছিলেন। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। আরবী ভাষার আলোচনায় তিনি সার্থকভাবে অংশ নিতেন। কবিতা রচনা করতেন। আমি বহুবারই তাঁর কাছে গিয়েছি। কিন্তু কোনো বার কিছু না শিখে এসেছি বলে আমার মনে পড়ে না।'

হাফিজ যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন— 'তিনি হাদিসসমূহের উৎস নির্ণয় করেছেন, সেগুলো যাচাই-বাছাই করেছেন, গ্রন্থ রচনা করেছেন, তাফসীর গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং এসব ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছেন।' 'আল মুজামুল মুখতাস' গ্রন্থে বলেছেন, 'তিনি ফতোয়াবিশারদ ইমাম, প্রাজ্ঞ ও প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস, বিজ্ঞ ফকীহ এবং হাদীসের বরাত সমৃদ্ধ তাফসীরে সিদ্ধহস্ত।'

আবুল মুহাসিন হুসাইনী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন— 'তিনি একই সাথে ফতোয়া দিয়েছেন, শিক্ষকতা করেছেন, তর্কযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, ফিকাহ, তাফসীর ও ব্যাকরণ শাস্ত্রে নতুন রচনাশৈলী উদ্ভাবন করেছেন এবং হাদিস বর্ণনাকারী ও হাদীসের সত্যাসত্য বিচারের ক্ষেত্রে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন।'

আল্লামা সুয়ূতী রাহিমাহুল্লাহ তাঁর সম্পর্কে বলেছেন— 'তাঁর তাফসীর গ্রন্থটি অভূতপূর্ব, তাঁর পদ্ধতিতে আর কোনো তাফসীর গ্রন্থ সংকলিত হয়নি।'

গবেষণামূলক বিষয়াদিতে যেমন ইতিহাসবিদ, তাফসীরকার এবং হাদিস বিশারদরূপে তিনি সামাজিক জীবনে এবং চিন্তার জগতে রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। আল্লামা যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ-এর পর তিনি উন্মুসসা'ওয়াত তানাকুরিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তিনি 'নুজায়বিয়ায়' শিক্ষকতা করেন এবং ৭৪৮ হিজরী সনে ফাওকানী বিশ্ববিদ্যালয়েও অধ্যাপনা করেন। দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, তিনি সিরিয়ার নায়েবে সুলতানের সাথে সাক্ষাত করেছিলেন এবং সাইপ্রাসবাসীদের ভীতি প্রদর্শন ও শাস্তির ঘোষণা প্রদানসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি সম্পর্কে তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। অন্যত্র তিনি উল্লেখ করেছেন যে, তিনি খলীফার সাথে সাক্ষাত করেছিলেন এবং খলীফা তাঁকে বিনয়ী, বিচক্ষণ ও মিষ্টভাষী বলে প্রশংসা করেছিলেন।

তাঁর লিখিত কিতাবাদি:
ইবনু কাসির রাহিমাহুল্লাহ বিশেষত ইতিহাস, তাফসীর এবং হাদিস বিষয়ে প্রচুর গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর প্রকাশিত ও পাণ্ডুলিপি আকারে বহু গ্রন্থ রয়েছে।
তাঁর প্রকাশিত রচনাবলী:
(১) আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া।
(২) তাফসীরুল কুরআনিল করীম (তাফসীরে ইবনু কাসির): এটি প্রথমে ছাপা হয় বুলাকে, কানুজীর 'ফাতহুল বয়ানের' পার্শ্বটীকা রূপে এটি প্রকাশিত হয়েছিল ১০ খণ্ডে। পুনরায় ছাপা হয় ১৩০০ হিজরীতে সাইয়িদ আবু তায়িব সিদীক ইবনু হাসান খান রচিত 'মাজমাউল বিয়ান কী মাকাসিদিল কুরআন' গ্রন্থের পার্শ্বটীকা স্বরূপ। ইবনু কাসির রাহিমাহুল্লাহ কুরআনুল করীমের তাফসীর কুরআনের আয়াত দ্বারা, অতঃপর হাদিস দ্বারা এই নীতির অনুসরণ করেছেন। ইসরাঈলীদের মনগড়া বর্ণনাগুলোর তিনি সমালোচনা করেছেন। এগুলোর প্রতি তাঁর কোনো আস্থা ছিল না। তবে শরীয়ত যেগুলো সমর্থন করে, সেগুলো ব্যতিক্রম। তিনি তাফসীর গ্রন্থের সাথে 'ফাযায়েলুল কুরআন'ও সংযুক্ত করে দিয়েছেন। যা ১৩৪৮ হিজরীতে স্বতন্ত্রভাবে মিসরে ছাপা হয়েছিল। অতঃপর তাঁর তাফসীরের সাথে পুনরায় ছাপা হয়।
(৩) আল ইজতিহাদ কী তালাবিল জিহাদ: দারুল কুতুব আল মিসূরিয়্যাতে এর একটি কপি সংরক্ষিত আছে। 'আলমাখতৃতাত ইন্সটিটিউটে' এর ফটোকপি মজুদ আছে। এ কিতাবটি অতি সাধারণভাবে কোনো প্রকারের পরিশোধন পরিমার্জন ব্যতীত প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে ছিল বহু ভুল ও বিকৃতি। ১৩৪৭ হিজরী সনে 'আবুল হাওল' প্রেসে এটি মুদ্রিত হয়। তবে পরিশোধিত ও পরিমার্জিত প্রকাশনা হলো ১৪০১ হিজরী মুতাবিক ১৯৮১ খৃস্টাব্দে বৈরুতে প্রকাশিত মুদ্রণটি। আবদুল্লাহ আবদুর রহীম উসায়লীন এই মুদ্রণের তত্ত্বাবধান করেন।
(৪) ইখতিসাব-ই-উলুমিল হাদিস: এটি হাদিসের পরিভাষা বিষয়ক একটি পুস্তিকা।
(৫) শামাইলুর রাসূল ওয়া দালাইলু নুবুওয়াতিহী ওয়া ফাযায়েলিলী ওয়া খাসাইসিহী।
(৬) ইখতিসারু আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ।
(৭) আহাদীসুত তাওহীদ ওয়ার রাদ্দু আলাশ শিরক।
(৮) জামিউল মাসানীদ: এ গ্রন্থটি ৮ খণ্ডে সমাপ্ত। শায়খ মুহাম্মদ আবদুর রাযযাক হামজা এটির নামকরণ করেছেন 'আল-হাদস্ ওয়াস সুনান কী আহাদীসিল মাসানীদ ওয়াস সুনান'।
(৯) তাবাকাতুশ শাফিঈয়্যা: কায়রোর আল মাখতৃতাত ইন্সটিটিউটে ৭৮৯ ক্রমিক নম্বরে এ পুস্তকটির একটি ফটোকপি মওজুদ আছে।

তাঁর বিলুপ্ত রচনাবলী:
ইবনু কাসির রাহিমাহুল্লাহ-এর যে সকল রচনা আমরা পাইনি কিন্তু তাঁর গ্রন্থাদিতে কিংবা পূর্ববর্তী যুগের লেখকদের গ্রন্থে সেগুলোর নাম পাওয়া যায় তার কতকগুলোর কথা আমরা নিম্নে উল্লেখ করছি:
(১০) আত তাকমীল কী মা'রিফাতিস সিকাতি ওয়াদ দুআ'ফা ওয়াল মাজহীল।
(১১) আল কাওয়াকিবুদ দারায়ী ফীত তারিখ।
(১২) সীরাতুশ শায়খায়ন।
(১৩) আল ওয়াদিহুন নাফীস ফী মানাকিবিল ইমাম মুহাম্মদ ইবনু ইদ্রীস।
(১৪) কিতাবুল আহকাম।
(১৫) আল আহকামুল কবীরা।
(১৬) তাখরিজুল আহাদীসি আদিল্লাতিৎ তানবীহ কী ফুরুইশ শাফি'ঈয়্যা।
(১৭) ইখতিসারু কিতাবি আল মাদখাল।
(১৮) শারহু সহীহ আল-বুখারি।

মৃত্যুঃ
৭৭৪ হিজরীতে ২৬ শে শাবান, বৃহস্পতিবার, ইমাম ইবনু কাসির ৭৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জানাযায় বহুসংখ্যক লোকের সমাগম ঘটে। তাঁর ওসীয়ত অনুসারে তাঁকে শায়খুল ইসলাম তকী উদ্দীন ইবনু তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ-এর পাশে দাফন করা হয়, যা দামেশকের বাব আন-নাসর-এর সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে জান্নাতের উচু মাকাম দান করুন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px