📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 আল্লাহর সিফাতের ভাষ্যসমূহের সাথে আচরণের ব্যাপারে মানুষের প্রকারভেদ

📄 আল্লাহর সিফাতের ভাষ্যসমূহের সাথে আচরণের ব্যাপারে মানুষের প্রকারভেদ


মোটকথা, সিফাতের আয়াত ও হাদীসের ব্যাপারে সম্ভাব্য ছয়টি প্রকার পাওয়া যায় (১০৫৭); প্রত্যেক প্রকারের মধ্যে ক্বিবলার অনুসারী কোনো না কোনো গোষ্ঠী রয়েছে। (প্রথম) দু'প্রকার: তারা বলে, এ সিফাতগুলো 'যাহির' এর ওপর পরিচালিত হবে। অন্য দু প্রকার বলে: এ সিফাতগুলো যাহির এর বিপরীতে পরিচালিত হবে। আর বাকী দু' প্রকার: এ ব্যাপারে নীরব থাকে।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 যারা বলে এসব ভাষ্যকে প্রকাশ্য অর্থের ওপর পরিচালিত করা হবে তাদের পরিচয়

📄 যারা বলে এসব ভাষ্যকে প্রকাশ্য অর্থের ওপর পরিচালিত করা হবে তাদের পরিচয়


তন্মধ্যে প্রথম দু' প্রকারের লোকেরা নিম্নোক্তভাবে বিভক্ত:
প্রথম, যারা সেগুলোকে যাহিরের ওপর চালায় আর তাদের নিকট এসব সিফাতের যাহির বা প্রকাশ্য অর্থ হচ্ছে এগুলো সৃষ্টির সিফাতের শ্রেণিভুক্ত; এরাই হলো মুশাব্বিহা। (১০৫৮) এদের মত বাতিল, সালাফগণ সেটা অস্বীকার করেছেন। হক্বপন্থীদের পক্ষ থেকে যখন 'তাশবীহ' মতবাদ খণ্ডন করা হয় তখন তা তাদের দিকেই প্রত্যাবর্তিত হয়ে থাকে। (১০৫৯)
দ্বিতীয়, যারা এসব ভাষ্যকে আল্লাহর জন্য উপযোগী এমন যাহিরের ওপর পরিচালিত করে; যেমন তারা 'আলীম, ক্বাদীর, রব্ব, ইলাহ, মওজুদ, যাত ইত্যাদি সবগুলোকে আল্লাহর জন্য মানানসই এমন যাহিরের ওপর পরিচালিত করে। কেননা সৃষ্টির ক্ষেত্রে এসব সিফাতের যাহির হয় সৃষ্ট 'জাওহার' হবে, না হয় তার সাথে যুক্ত 'আরদ্ব' হবে।
তাই ইলম (জানা), কুদরত (ক্ষমতা), কালাম (কথা), মাশীয়াত (ইচ্ছা), রহমত (দয়া), রিদ্বা (সন্তুষ্টি), গাদ্বাব (ক্রোধ), ইত্যাদি বান্দার ক্ষেত্রে 'আরছ' হিসেবেই ধরা হবে। আর চোখ, চেহারা, হাত এগুলো বান্দার ক্ষেত্রে 'জিসম'।
সুতরাং (সিফাতী তথা) গুণ সাব্যস্তকারীদের সবার নিকট(১৮০) আল্লাহ যখন ইলম, ক্ষমতা, কালাম (কথা) ইচ্ছা ইত্যাদি গুণে গুণান্বিত, যদিও সেগুলো আরদ্ব নয়, তখন তার ওপর সেটা ব্যবহার জায়েয যেটা মাখলুকের জন্য ব্যবহার জায়েয; তাহলে (১৯৬১) আল্লাহর হাত, চেহারা এগুলো সিফাত হবে; এগুলো জিসিম হবে না, তার ওপর সেটা ব্যবহার জায়েয যেটা মাখলুকের জন্য ব্যবহার করা জায়েয।

টিকাঃ
১০৫৮. মুশাব্বিহাদের সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে, আল-হিকামিয়্যাহ সম্প্রদায়, যারা হিশাম ইবনুল হিকাম আর-রাফেদ্বীর অনুসারী। সে মনে করত যে, আল্লাহ জিসিম; তাঁর রয়েছে নির্দিষ্ট সীমা ও শেষ ঠিকানা। আর তিনি বেশ দীর্ঘ ও বেশ চওড়া। তার লম্বা ও চওড়া সমপর্যায়ের। তাদের মধ্যকার আরেক সম্প্রদায় হচ্ছে, আল-জাওয়ালীকিয়‍্যাহ, যারা হিশাম ইবন সালেম আল- জাওয়ালীকী এর অনুসারী। সে ছিল কঠিন রাফেদ্বী, তার মত হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা মানুষের সূরতে। তাদের মধ্যে আরেক সম্প্রদায় হচ্ছে, আল-হুওয়ারিয়‍্যাহ, যারা দাউদ আল-হুওয়ারীর অনুসারী। তাদের মতে তাদের মা'বুদ মানুষের সকল অঙ্গের মতো তবে লজ্জাস্থান ও দাঁড়ি ব্যতীত। তাদের মধ্যে আরেক সম্প্রদায় হচ্ছে সীমালঙ্ঘনকারী সূফী সম্প্রদায়, যারা হুলুল ও ইত্তেহাদে বিশ্বাস করে। তাদের মধ্যে আরেক সম্প্রদায় হচ্ছে কাররামিয়্যাহ সম্প্রদায়, যারা বলে আল্লাহ তা'আলা জিসম। এভাবে মুশাব্বিহাদের সংখ্যা অনেক।
বর্তমান সময়ে কাদিয়ানী সম্প্রদায় মুশাব্বিহা। তারা আল্লাহকে সামুদ্রিক অক্টোপাসের মতো মনে করে। আলেমগণ যুগ যুগ ধরে তাদের এসব কথা অস্বীকার করেছেন, তাদের অনেককে কাফেরও বলেছেন, বরং তাদেরকে এমন বাড়াবাড়ি সম্প্রদায়ের অন্তভুক্ত করেছেন যারা ৭৩ ফির্কা থেকে বের হয়ে সরাসরি কাফির হয়ে গেছে। এদের সম্পর্কে জানার জন্য দেখুন, আশ'আরী, মাক্বালাতুল ইসলামিয়্যীন (১/২৮১); বাগদাদী, আল- ফারকু বাইনার ফিরাক, পৃ. ২১৪-২১৯; উসুলুদ্দীন, পৃ. ৩৩৭-৩৩৮; রাযী, ই'তিক্বাদাতু ফিরাকিল মুসলিমীন ওয়াল মুশরিকীন, পৃ. ৯৭-১০০; শাহরাস্তানী, আল-মিলাল ওয়ান নিহাল (১/১১৮-১৩১); ইবন তাইমিয়্যাহ, মিনহাজুস সুন্নাহ (২/৫৯৮)..; মাজমূ'আতুর রাসায়িলিল কুবরা (১/১১৫); মাজমু ফাতাওয়া (৩/১৮৬), (৪/১৩৮), (৬/৩৫-৩৬), (১২/২৬৪-২৬৫)।
১০৫৯. অর্থাৎ আমাদের আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আত তথা সালাফীদের পক্ষ থেকে যখন তাশবীহ বা তামসীল নীতির খণ্ডন করা হয় তখন তাদেরকেই উদ্দেশ্য করা হয়। কিছু মু'তাযিলী, আশআরী, মাতুরিদী, কাররামীরা এদের ছাড়াও অন্যদের উদ্দেশ্য নিয়ে থাকে।
১০৬০. যেমন আশ'আরী মতবাদের লোকেরা বলে থাকে। তাদের নিকট এগুলো সাব্যস্ত করা হবে। এগুলো আরদ্ব নয়। এগুলোর এসব নাম সৃষ্টির জন্য থাকলেও আল্লাহর জন্য ব্যবহৃত হতে কোনো অসুবিধা নেই।
১০৬১. যেমন সালাফে সালেহীন ও তাদের অনুসারীদের বক্তব্য। তাদের নিকট এগুলো সাব্যস্ত করতে হবে। এগুলো জিসিম নয়। এগুলোর এসব নাম সৃষ্টির জন্য থাকলেও আল্লাহর জন্য ব্যবহৃত হতে কোনো অসুবিধা নেই; কারণ কিছু গুণের ব্যাপারে যা বলা হবে, অপর গুণের ব্যাপারেও একই নীতি অনুসৃত হতে হবে।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 যারা বলে যে বা সবর ব্যাপারে যে বক্তব্য গুণের ব্যাপারেও একই বক্তব্য প্রযোজ্য যে কেউ তার খণ্ডন জিজ্ঞেস করবে তাকে আল্লাহর সত্তার ধরন জিজ্ঞেস করা হবে

📄 যারা বলে যে বা সবর ব্যাপারে যে বক্তব্য গুণের ব্যাপারেও একই বক্তব্য প্রযোজ্য যে কেউ তার খণ্ডন জিজ্ঞেস করবে তাকে আল্লাহর সত্তার ধরন জিজ্ঞেস করা হবে


এটিই হচ্ছে সালাফদের মাযহাব যা খাত্তাবী রাহিমাহুল্লাহ ও অন্যান্যরা বর্ণনা করেছেন (১০৬২)। যারা সালাফদের বক্তব্য বর্ণনা করেছেন এটাই তাদের অধিকাংশের কথা। বাকীদের কথা এর বিপরীত নয়। (১০৮০) এটি একটি সুস্পষ্ট বিষয়; কেননা সিফাত (গুণাবলি) তো যাত (সত্তা) এর মতোই। (১০৬৪) কাজেই আল্লাহর যাত যেমন মাখলুকের মতো না হয়েও সেটা প্রকৃতভাবেই বিদ্যমান থাকতে পারলো, তেমনিভাবে তার সিফাতও মাখলুকের মতো না হয়েও সেটা প্রকৃতভাবেই বিদ্যমান থাকতে পারে।
এখন কেউ যদি বলে: আমি জ্ঞান, হাত এগুলো দ্বারা পরিচিত জ্ঞান ও হাত যেগুলো আছে সে যাতের ছাড়া আর কিছু বুঝি না, তখন তাকে বলা হবে: (যখন তুমি আল্লাহর জন্য সত্তা সাব্যস্ত করো, অথচ তুমি সে সত্তাকে দেখনি), তাহলে তুমি পরিচিত (সৃষ্টির) সত্তা ছাড়া আল্লাহর যাত কীভাবে বুঝলে? আর এটা জ্ঞাত যে, প্রত্যেক গুণওয়ালার গুণ তার সত্তা ও প্রকৃত অবস্থার সাথে উপযোগী ও সামঞ্জস্যশীল হিসেবে হয়ে থাকে। কাজেই যে আল্লাহর সিফাত- যার মতো কোনো কিছুই নেই- সেগুলোকে কেবল সৃষ্টির উপযোগী করেই বুঝেছে সে তো তার দীন ও বুদ্ধির ক্ষেত্রে পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে।
জনৈক সালাফ (১০৬৫) কতইনা সুন্দর বলেছেন: তোমাকে যখন কোনো জাহমী বলে: তিনি কীভাবে ('আরশে) আরোহন করেছেন, তিনি কীভাবে অবতরণ করেন, কেমন তাঁর হাত ইত্যাদি? তাহলে তুমি তাকে বল: কেমন তিনি তাঁর সত্তায়? অতঃপর যখন সে বলবে: তিনি কেমন এটা তিনি ছাড়া আর কেউ জানেন না, সৃষ্টিকর্তার আসল স্বরূপ মানুষের অজানা।
তাহলে তাকে বল: সিফাত (গুণ) এর ধরণ জানার জন্য মাওসুফ (যার গুণ বর্ণনা করা হচ্ছে তাঁর) ধরণ জানা আবশ্যক। তাহলে তুমি কীভাবে এমন মাওসূফের সিফাত জানতে চাও যার (সত্তার) ধরণ তোমার জানা নেই? বরং তাঁর যাত-সত্তা, তাঁর গুণাবলির বিষয়ে তো তাঁর জন্য উপযোগী হিসেবে মোটের ওপর এজমালিভাবে জানা যাবে, বিস্তারিত নয়। বরং দুনিয়াতে আমরা জান্নাতের যেসব মাখলুকের কথা শুনেছি, (যেমন জান্নাতের আঙ্গুর, কলা, ফল-ফলাদি ইত্যাদি) সেগুলো নজীর হিসেবে জান্নাতে থাকবে(১০৬০); যেমনটি ইবন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা বলেছেন, "দুনিয়াতে জান্নাতের যা যা থাকবে বলা হচ্ছে তাতে শুধু নামের দিক থেকে মিল থাকবে”। (১০৬৭)

টিকাঃ
১০৬২, শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ ইতোপূর্বে ইমাম খাত্তাবী থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন যে, তিনি বলেছেন, 'সালাফে সালেহীনের অভিমত ছিল এসব আয়াত ও হাদীসের অর্থ সাব্যস্ত করা, এগুলোকে তাদের যাহের বা প্রকাশ্য অর্থে পরিচালিত করা। আর এগুলোর জন্য কোনো ধরণ ও সাদৃশ্য নির্ধারণ না করা।'
১০৬৩. অর্থাৎ, এ কথাটি সালাফে সালেহীনের অধিকাংশ থেকে প্রচার-প্রসার লাভ করেছে; যদিও তাদের সকলে এ কথাটি স্পষ্টভাবে বলেননি। উদ্দেশ্য এটা নয় যে সেখানে কোনো বিরোধী মত রয়েছে। বাকীদের কারো কথা এর বিপরীতে আসেনি এটাই বলা উদ্দেশ্য।
১০৬৪. শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ তার আর-রিসালাতুত তাদমুরিয়্যাহ গ্রন্থে এ মূলনীতিটি বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন এভাবে যে, 'গুণের ব্যাপারে কথা যাত বা সত্তার ব্যাপারে কথা বলার মতোই'। এ বিষয়ে আরো দেখুন খতীবে বাগদাদীর বক্তব্য, যা ইমাম যাহাবী, তার আল-উলু লিল আলিয়্যিল আযীম গ্রন্থে নিয়ে এসেছেন, পৃ. ১৮৫।
১০৬৫. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ তার আর-রিসালাতুত তাদমুরিয়্যাহতেও অনুরূপ কথা বলেছেন (পৃ. ৪৪), যা থেকে মনে হয় এটা ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহরই বক্তব্য। তবে ইতোপূর্বে ইমাম উসমান ইবন সা'ঈদ আদ-দারেমী রাহিমাহুল্লাহ অনুরূপ কথা বলেছেন। দেখুন, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ, পৃ. ৯৩।
১০৬৬. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ তার একাধিক গ্রন্তে জান্নাতের উদাহরণ টেনেছেন, যেমন: ইবন তাইমিয়্যাহ, মিনহাজুস সুন্নাহ (২/১৫৭); আত-তিস'ঈনিয়্যাহ (২/৫৪৬); আস-সাফাদিয়্যাহ (১/২৮৮); আত-তাদমুরিয়্যাহ, পৃ. ৪৬; মাজমু' ফাতাওয়া (৫/২০৭, ২৫৭, ৩৪৭), (৯/২৯৫), (১১/৪৮২), (১৭/৩২৬)।
১০৬৭. ইবন জরীর আত-ত্বাবারী (১/১৭৪); আবু নু'আইম আল-আসফাহানী, সিফাতুল জান্নাহ, হাদীস নং ১২৪; বাইহাক্বী, আল-বা'সু ওয়ান নুশুর, হাদীস নং ৩৩২; ইবন আসাকির, মু'জামুশ শুয়ূখ, নং ১১৯৪; দ্বিয়াউদ্দীন আল-মাক্বদেসী, আল-আহাদীসুল মুখতারাহ (১০/১৬), হাদীস নং ৬; সিলসিলাহ সহীহাহ, নং ২১৮৮; ইবন কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম (১/৯১); সুয়ূত্বী, আদ-দুররুল মানসূর (১/৯৬)। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ অন্যত্র বলেছেন, 'যদি এসব বাস্তব জিনিস, যার নাম আল্লাহ জানিয়েছেন, তা দুনিয়াতে অস্তিত্বশীল বাস্তব জিনিসের নামের সাথে মিলে যায়, কিন্তু তা একরকম না হয়, বরং উভয়ের মধ্যে এমন পার্থক্য রয়েছে যা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না, তাহলে রাব্বুল আলামীন খালেক জাল্লা জালালাহুর সাথে অবশ্যই সৃষ্টিকুলের বড় রকমের পার্থক্য থাকবে। বরং দুনিয়ার অস্তিত্বশীল জিনিসের আখেরাতে অস্তিত্বের পার্থক্যের চেয়েও সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টির মাঝে বড় পার্থক্য সেখানে থাকবে; কারণ নামের দিক থেকে সৃষ্টির সাথে সৃষ্টির মিল থাকা বেশি কাছে, স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির মিল হওয়ার চেয়ে। আর এ বিষয়টি বেশি প্রকাশিত ও স্পষ্ট।' আর-রিসালাতুত তাদমুরিয়্যাহ, পৃ. ৪৭। অন্যত্র বলেন, 'এসব বাস্তব জিনিস যা জান্নাতে থাকবে বলে আল্লাহ আমাদের জানিয়েছেন, দুনিয়াতে এ নামে যেসব অস্তিত্বশীল বস্তু রয়েছে সেগুলোর সমান নয়; যাতে করে দুনিয়ার বস্তুগুলোর জন্য যা বৈধ হিসেবে প্রযোজ্য আখেরাতে একই নামের বস্তুগুলোর জন্য তা প্রযোজ্য হওয়া বৈধ হতে পারে, অনুরূপ দুনিয়ার বস্তুগুলোর ওপর যা প্রযোজ্য হওয়া আবশ্যক আখেরাতের বস্তুগুলোর জন্যও তা প্রযোজ্য হওয়া আবশ্যক হতে পারে, তদ্রুপ দুনিয়ার বস্তুগুলোর জন্য যা প্রযোজ্য হওয়া নিষিদ্ধ আখেরাতের বস্তুগুলোর জন্যও তা প্রযোজ্য হওয়া নিষিদ্ধ হতে পারে, তেমনি দুনিয়ার বস্তুগুলোর সৃষ্টির উপাদান আখেরাতের বস্তুগুলোর সৃষ্টি উপাদানে একই হতে হয়, অনুরূপভাবে দুনিয়ার বস্তুগুলো যেভাবে সময়ের আবর্তে অন্যকিছুতে রূপান্তরিত হয়ে যায়, আখেরাতের বস্তুগুলোও তেমনি অন্য কিছুতে রুপান্তরিত হতে হয়। বস্তুত এগুলোর কোনোটিতেই দুনিয়ার জিনিসের সাথে আখেরাতের জিনিসে মিল নেই; কারণ আমরা জানি আখেরাতের পানি বিনষ্ট হবে না, তার দুধের স্বাদ পরিবর্তন হবে না, তার মদিরা পানে মাথাব্যাথা হবে না, বিবেক বিকারগ্রস্ত হবে না, কেননা জান্নাতের পানি মাটি ভেদ করে বের হবে না, মেঘ থেকেও পড়বে না, যেমনটি দুনিয়ার মেঘের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে, অনুরূপ আখেরাতের দুধ চতুষ্পদ জন্তু থেকে হবে না, যেমনটি দুনিয়ার বুকে হয়ে থাকে, ইত্যাদি ইত্যাদি। অতঃপর যদি আখেরাতের সেসব সৃষ্ট জিনিস তার নামে দুনিয়ার সৃষ্ট জিনিসের সাথে মিলে যায়, অথচ উভয়ের মধ্যে মিল হওয়ার একক একটি পরিমাণ ও সাদৃশ্যতা রয়েছে, আর আমাদেরকে যে সম্বোধনে তা জানানো হয়েছে তা আমরা জানতে পেরেছি, অথচ এ হাকীকত ঐ হাকীকতের মতো নয়; তাহলে জান্নাতের সৃষ্ট জিনিসের সাথে একই নামের দুনিয়ার জিনিসের দূরত্বের চেয়েও মহান স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টির কারও মত হওয়া থেকে অনেক অনেক দূরে। মাজমূ' ফাতাওয়া (৯/২৯৬)। অন্যত্র তিনি বলেন, 'যদি সেসব অদৃশ্য সৃষ্টগুলো এসব দৃশ্য সৃষ্টগুলোর মতো না হয়, যদিও তাদের নাম একই, তাহলে সৃষ্ট জিনিস থেকে অপর সৃষ্ট জিনিসের যে পার্থক্য, মহান স্রষ্টার সাথে তার সৃষ্টির পার্থক্য আরও বেশি উপরে ও বেশি পৃথক, যদিও নাম একই হয়।' মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/২৫৮)।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 নাম একই হওয়ার কারণে ধরন নির্ধারিত হওয়া আবশ্যক নয়

📄 নাম একই হওয়ার কারণে ধরন নির্ধারিত হওয়া আবশ্যক নয়


আর আল্লাহ তা'আলা জানিয়েছেন যে, “সেখানে চক্ষু শীতলকারী যা গোপন করে রাখা হয়েছে তা কোনো আত্মা জানতে পারেনি।”(১০৬৮) অনুরূপ নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'জান্নাতে এমন কিছু থাকবে যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শুনেনি, কোনো মানুষের অন্তরেও উদিত হয়নি। (১০৬৯) জান্নাতের নি'আমতগুলো মাখলুক হয়েও যখন দুনিয়া ও আখেরাতের মধ্যে সেগুলোতে এত পার্থক্য, তাহলে সৃষ্টিকর্তার ব্যাপারে আমাদের ধারণা কেমন হওয়া উপযোগী? (১০৭০)
তেমনি রূহ (আত্মা) (১০৭১) যা বনি আদমের মধ্যে রয়েছে, এটা তার শরীরের মধ্যেই আছে। রূহের প্রকৃত অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে মানুষের যে টলটলায়মান অবস্থা প্রত্যেক বিবেকবানই তা জানে। ভাষ্যসমূহ সেটার ধরণ বর্ণনা করতে অপারগ। (১০৭২) এ আত্মার বিষয়টি সম্পর্কে (প্রকৃত অবস্থা জানতে অক্ষম হওয়া) বিবেকবান মানুষের জন্য আল্লাহর ধরণ সম্পর্কে কথা বলা থেকে বিরত থাকা কি উচিত নয়? (১০৭৩) অথচ আমরা দৃঢ়ভাবে জানি যে, এ আত্মা আমাদের দেহের মধ্যেই আছে। এটাকে দেহ থেকে বের করা হয়, আসমানের উপরে উঠে যায়, মৃত্যুর সময় এটাকে ছিনিয়ে নেয়া হয়, যেমনটি সহীহ নসসমূহ স্পষ্ট বক্তব্য প্রদান করেছে। এ ব্যাপারে আমরা রূহকে গুণশূন্য বানিয়ে বাড়াবাড়ি করে ঐসব দার্শনিকদের মতো বলি না যারা বলে যে, এটা নামেও না, উঠেও না, শরীরে যুক্তও হয় না, আবার শরীর থেকে বিচ্ছিন্নও হয় না। তাতে তারা এতই উল্টাপ্টা কথা বলেছে যে, (তাদের নিকট) এটি শরীর বা তার শরীরজাতভুক্ত কিছু নয়, শরীরের গুণভুক্তও নয়।
বস্তুত এভাবে আত্মা, কোনো শরীরের মতো না হয়েও এসব গুণসহ তার মতো করে তার অস্তিত্ব থাকা অস্বীকার করা হয় না। তবে যদি তাদের (ভিন্ন মতাবলম্বী দার্শনিকদের) কথাকে কুরআন ও সুন্নাহ'র ভাষ্য অনুযায়ী ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে বলতে হবে যে, তারা শব্দে ভুল করেছে। কিন্তু তারা কি আর সেটা করবে?
আর আমরা বলি না যে, আত্মা তো কেবল শরীরের অঙ্গসমূহের একটি অঙ্গ। যেমন, রক্ত, বায়ু ইত্যাদি অথবা দেহ ও জীবনের গুণসমূহের একটি গুণ, তা ভিন্ন ভিন্ন শরীরে, তবে সকল শরীরে সেটার সীমা ও বাস্তবতা সম পর্যায়ে, যেমনটি কোনো কোনো কালামশাস্ত্রবিদরা বলে থাকে। বরং আমরা দৃঢ়ভাবে বলি, রূহ বা আত্মা মানুষের দেহ ব্যতীত ভিন্ন অস্তিত্বশীল একটি সত্তা। আর তা শরীরের মতো নয়, আর রূহের যেসব গুণ কুরআন ও সুন্নাহ'র ভাষ্যে বর্ণিত হয়েছে, তা দ্বারা তা প্রকৃত পক্ষেই গুণান্বিত, সেখানে কোনো রূপক কিছু নেই। সুতরাং যদি রূহের হাকীকত ও রূহের গুণের ব্যাপারে এটিই আমাদের অভিমত হয়, যা (এসব গুণকে) নিষ্ক্রীয়কারী সম্প্রদায় ও (এসব গুণকে শরীরের মতো করে) সাদৃশ্য সাব্যস্তকারী সম্প্রদায়ের মাঝামাঝিতে থাকতে পারে, তাহলে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের গুণাবলির ব্যাপারে আমাদের কেমন ধারণা করা উচিত?! (১০৭৪) (অর্থাৎ আল্লাহর সিফাতও সৃষ্টিকুলের সিফাতের জাতভুক্ত না হয়ে থাকতে পারে।)

টিকাঃ
১০৬৮. সূরা আস-সাজদাহ: ১৭।
১০৬৯. বুখারী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ৩২৪৪, ৪৭৭৯; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২৮২৪।
১০৭০. দুনিয়াতে যা আছে আর আখেরাতে যা আছে বলে কুরআন ও সুন্নাহ'র ভাষ্যে ঘোষণা করা হয়েছে সেগুলোর কিছুর মাঝে নামের মিল রয়েছে, যেমন, দুধ, মধু, গোস্ত ইত্যাদি। আর জানা কথা যে এসব নামধারী জিনিসের মাঝে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। অথচ দু'টিই আল্লাহর সৃষ্টি। তাহলে স্রষ্টা তো সৃষ্টি থেকে আরও বেশি ভিন্ন হবেন, যদিও নাম বা গুণের দিক থেকে একই শব্দ ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বরং এ দু'য়ের মাঝে তুলনা করার কোনো সুযোগই নেই। দেখুন, শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়‍্যাহ, আত-তাদমুরিয়‍্যাহ, পৃ. ৪৬-৫০; মাজমূ' ফাতাওয়া (৬/৩৪৭)।
১০৭১. রূহ এর উদাহরণ শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ অনেক জায়গায় এনেছেন। যেমন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/১৩২, ২৪৩), (৫/৪৫৮-৪৫৯, ৫২৭) (শারহু হাদীসিন নুযূল), আত-তাদমুরিয়্যাহ, পৃ. ৫০।
১০৭২. রূহ এর প্রকৃত অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে লোকেরা বিভিন্ন মতে বিভক্ত: কারও কারও মতে, রূহ হচ্ছে জিসিম, আর তা নাফস। অপর কারও মতে, রূহ হচ্ছে 'আরদ্ব। [যা নিজের অস্তিত্বের জন্য অন্য কিছুর ওপর নির্ভর করতে হয়] আবার অন্য গোষ্ঠী বলে, আমরা জানি না, রূহ জাওহার [যা নিজের ওপর নিজে নির্ভর করতে পারে পারে আর যাতে কোনো বাড়তি কিছু নেই] নাকি 'আরদ্ব। কারও কারও মতে, রূহ হচ্ছে চারটি প্রকৃতির সমতা বিধান হওয়া। সে চারটি হচ্ছে, উষ্ণতা, ঠাণ্ডা, আর্দ্রতা ও শুষ্কতা। কারও কারও মতে, রূহ উক্ত চারটি ব্যতীত পঞ্চম আরেকটি অর্থ। কারও কারও মতে, রূহ হচ্ছে বিশুদ্ধ খাটি রক্ত, যাতে পঁচা ও ময়লা কিছুই নেই। আরও বহু কথা রয়েছে।
ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, রূহ হচ্ছে একটি জিসিম যা মুল দিক থেকে আমাদের এ অনুভূত জিসিম থেকে ভিন্ন। এটি আলোকময়, উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন, হাল্কা, জীবিত, সচল, যা বিভিন্ন অঙ্গের 'জাওহার' বা মূল অংশে প্রবেশ করে, আর তাতে এমনভাবে বিচরণ করে থাকে যেমন গোলাপ ফুলে পানি থাকে, যাইতুনে তেল বিচরণ করে থাকে, কয়লায় আগুন বিচরণ করে। যতক্ষণ পর্যন্ত এসব অঙ্গ তার উপর সে সূক্ষ্ম শরীর থেকে প্রভাব গ্রহণের যোগ্য থাকবে ততক্ষণ সে সূক্ষ্ম শরীর উক্ত অঙ্গসমূহের সাথে ওৎপ্রোৎভাবে জড়িত থাকে। এসব প্রভাবের কারণে অনুভূতি, ইচ্ছাকৃত সচলতা আসে। আর যখন এসব অঙ্গ বিভিন্ন প্রকার মোটা মিশ্রণের মাধ্যমে বিনষ্ট হয়ে যায়, আর তাতে প্রভাব গ্রহণ করার যোগ্যতা থাকে না, তখন রূহ শরীর থেকে আলাদা হয়ে যায় এবং রূহের জগতে চলে যায়। তারপর তিনি বলেন, এ কথাটিই হচ্ছে এ মাসআলায় সঠিক। এটি ব্যতীত অন্যগুলো শুদ্ধ নয়। বাকী কথাগুলো সবই বাতিল। এর ওপরই কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবায়ে কিরামের ইজমা', বিবেকের যুক্তি ও ফিত্বরাত বা স্বাভাবিক মানব মনের আহ্বানের প্রমাণ রয়েছে। আর এ কথাটিই ইমাম ইবন আবিল ইয্য আল-হানাফী প্রাধান্য দিয়েছেন।
তবে রূহের ধরণ ও তার প্রকৃত রূপ, তা তো কেবল আল্লাহই জানেন, আল্লাহ বলেন, "আর আপনাকে তারা রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বলুন, 'রূহ আমার রবের আদেশঘটিত এবং তোমাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছে অতি সামান্যই।" [সূরা আল-ইসরা: ৮৫] শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়‍্যাহ বলেন, কুরআন, সুন্নাহ'তে এটি নেই যে, মুসলিমদেরকে রূহ সম্পর্কে কুরআন ও সুন্নাহ যা প্রমাণ করছে তা বলতে নিষেধ করা হয়েছে, রূহের সত্তার ব্যাপারেও নয়, রূহের গুণের ব্যাপারেও নয়। তবে বিনা ইলমে কথা বলা তা সবকিছুতেই হারাম। তিনি আরও বলেন, আবশ্যক হচ্ছে শরী'আতের নস বা ভাষ্য যা বলেছে সেখানে অবস্থান করা, যা কুরআন হাদীসে এসেছে তা সাব্যস্ত করা হবে, আর যা আসেনি তা সাব্যস্ত করা হবে না। তিনি আরও বলেন, তিনি রূহের যেসব গুণ ও অবস্থা জানা যায় তা জানেন, আরও জানেন যে, যেসব দেহ বা শরীর দৃশ্যমান হয় সেগুলোতে তিনি রূহের কোনো দৃষ্টান্ত দেখতে পাচ্ছেন না। দেখুন, ইবনুল কাইয়্যেম, আর-রূহ: ২৪৫-২৪৯; ইবন তাইমিয়‍্যাহ, আত-তাদমুরিয়‍্যাহ, পৃ. ৫০- ৫২; মাজমূ' ফাতাওয়া (৪/২১৬-২৩১), (৯/২৮৯-৩০২)। আরও দেখুন, আশ'আরী, মাকালাতুল ইসলামিয়্যীন, পৃ. ৩৩৩-৩৩৬; জুওয়াইনী, আল-ইরশাদ, পৃ. ৩৭৭; আবু সা'ঈদ আন-নাইসাপূরী, আল-গুনইয়াতু ফী উসূলিদ দীন, পৃ. ১৬৫; ইবন আবিল ইয্য, শারহুত ত্বাহাওয়িয়্যাহ (২/৫৬৪- ৫৬৫)।
১০৭৩. কারণ, রূহ জীবিত, উপরে উঠে, নিচে নামে, আসে ও যায়। রূহের জন্য এসব গুণাবলি সাব্যস্ত হওয়ার পরও কেউ সেটার ধরণ বলতে পারে না, সংজ্ঞায়িত করতে পারে না। কারণ আমরা যা দেখি তাতে সেটার কোনো দৃষ্টান্ত নেই। তারপরও কথা হচ্ছে যে, রূহ সৃষ্ট আর তা মানুষের সবচেয়ে কাছের বস্তু। তাহলে স্রষ্টার সত্তা ও গুণের ধরণ না জানা, স্রষ্টার হাকীকত জ্ঞানের মাধ্যমে অর্জন করতে না পারার বিষয়টি আরও বেশি উত্তমভাবে প্রমাণিত হলো। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়াহ বলেন, 'অনুরূপভাবে বনী আদমের রূহ শোনে ও দেখে, কথা বলে, নামে ও উঠে, যেমনটি সহীহ হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত, আর যা স্পষ্ট বিবেক দ্বারাও প্রমাণিত, তারপরও সেটার গুণ ও কর্ম কখনও শরীরের গুণ ও কর্মের মত নয়। তাহলে যখন এটা বলা না যায় যে, রূহ এর গুণাবলি ও তার কর্ম তার জিসিম যা তার শরীর সেটার গুণাবলির মত, অথচ তা তার সাথে মিশেই আছে, আর এ দু'টো মিলেই একজন মানুষ, এভাবে যখন একজন মানুষের রূহ তার জিসিম এর মতো নয় যা একটি শরীর, তাহলে মহান রাব্বুল আলামীনের সত্তা, গুণাবলি ও কর্ম কীভাবে জিসিম, তার গুণাবলি ও তার কর্মের মত হওয়া বৈধ হয়? মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/৩৫৪) শারহু হাদীসিন নুযূল।
ইমাম যাহাবী বলেন, 'আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমরা অপারগ, অযোগ্য, অসহায় হয়ে যাই আমাদের মাঝে থাকা রূহ এর সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে, কীভাবে প্রতি রাতে তার মালিক রাব্বুল আলামীন মৃত্যু দিলে সেটা উপরে উঠে যায়, কীভাবে আবার ফেরৎ পাঠায়, মৃত্যুর পর কীভাবে আলাদা সত্তা হিসেবে থাকে, শহীদদের জীবনই বা কেমন যাদের হত্যা করার পর তারা তাদের রবের কাছ থেকে রিযিকপ্রাপ্ত হয়, আর নবীদের জীবনই বা এখন কেমন?....' যাহাবী, আল-'উলু লিল 'আলিয়্যিল 'আযীম (২/১৩৩০)।
একদল আলেম রূহ এর ব্যাপারে কথা বলতে নিষেধ করেছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন জুনাইদ ইবন মুহাম্মাদ, তিনি বলেন, 'রূহ এমন যে তার জ্ঞান কেবল আল্লাহ তা'আলা নিজের কাছে প্রাধান্য দিয়ে রেখে দিয়েছেন, তার সৃষ্টির কাউকে সেটার জ্ঞান প্রদান করেননি, সুতরাং সেটার অস্তিত্ব আছে এর বাইরে আর কোনো কথা জায়েয নয়।' হাফেয ইবন হাজার এর পরে যোগ করে বলেন, 'আর এ নীতির ওপরই চলেছেন ইবন 'আতিয়‍্যাহ ও একদল মুফাসসির'। ফাতহুল বারী (৮/৪০৩-৪০৪)।
আর বাইজুরী (আশ'আরী) জুনাইদের কথা থেকে বুঝেছেন যে, তিনি এটা নিয়ে কথা বলাকে হারাম হিসেবে নিষেধ করেছেন। দেখুন, শারহুল জাওহারাহ, পৃ. ৩৫৭।
বাইজুরী এরপর বলেন, হে মুকাল্লাফ (আদিষ্ট) ব্যক্তি, তুমি রূহ এর হাকীকত খোঁজার কাজে লিপ্ত হয়ো না, কারণ এতে প্রবৃত্ত হওয়া মাকরূহ; কারণ এ ব্যাপারে কিছুই জানা যায় না।' [প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫৯] বস্তুত রূহের ব্যাপারে আলোচনা না করার এ নীতি একদল উসূলশাস্ত্রবিদেরও। যেমন মুরতাদ্বা আয- যাবীদী বলেন, 'অধিকাংশের মত হচ্ছে রূহ এর ব্যাপারে আলোচনায় না যাওয়া; কারণ সেটার অস্তিত্ব অবশ্যম্ভাবীভাবে জানা রয়েছে। আর অধিকাংশ উসূলবিদ এটাতে আলোচনায় প্রবৃত্ত হতে নিষেধ করেছেন। কারণ আল্লাহ এটা বর্ণনা করা হতে বিরত ছিলেন সুতরাং আমরাও বিরত থাকবো। যেমনটি বলেছেন সুবুকী ও অন্যান্যরা।' যাবীদী, তাজুল আরূস (৬/৪০৮)।
বরং রূহ এর ব্যাপারে আলোচনা না করা এটা কোনো কোনো দার্শনিকের অভিমত। যেমন আবুল কাসেম তার 'আল-ইফসাহ' গ্রন্থে বর্ণনা করেন, প্রসিদ্ধ দার্শনিকরা রূহ এর বিষয়ে কথা বলা থেকে বিরত ছিলেন। তারা বলতো, এটি তো আমাদের ইন্দ্রীয়ানুভূতির বাইরের ব্যাপার, বিবেক কখনো এটার কুল কিনারা করার পথ খুঁজে পায় না। দেখুন, মার'ঈ আল-কারামী, আক্বাওয়ীলুস সিক্কাত, পৃ. ১৯১।
এটিই পছন্দ করেছেন আবুল ফারজ ইবনুল জাওযী ও জামালুদ্দীন আল-কাসেমী। দেখুন, ইবনুল জাওযী, সাইদুল খাতির, পৃ. ৪৫০; কাসেমী, মাহাসিনুত তা'ওয়ীল (৯/২৮২)। বরং আল-কাসেমী কারও কারও থেকে বর্ণনা করেছেন সে রূহ এর ব্যাপারে কথা বলাকে দীনের মধ্যে বিদ'আত প্রবর্তনের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। কারণ কুরআনের আয়াতে যা এসেছে এর বাইরে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল বেশি বর্ণনা করেননি। সুতরাং রূহ এর ব্যাপারে অতিরিক্তি তদন্ত এমন বাড়াবাড়ির পর্যায়ে যাবে যা কুরআনের আসেনি, যার পক্ষে কোনো প্রমাণাদি নেই, আর যা এ পর্যায়ের হবে তাতে অযথা গবেষণা করা সীমালঙ্ঘন ও বিরোধিতা!! দেখুন, ড. আলী আল-উবাইদী, আর-রূহ ইনদা আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আতি, পৃ. ২৯ ও তার পরের অংশ।
১০৭৪. রূহ ও জান্নাতের সামগ্রীর উদাহরণ দেয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সিফাত বুঝানোর বিষয়টি উঁচু পযায়ের উদাহরণ। আর তার সারকথা হচ্ছে, সৃষ্টের জন্য যেসব গুণাবলি পূর্ণতার অর্থ জ্ঞাপক, যাতে কোনো প্রকার ত্রুটি নেই, সেসব রাব্বুল আলামীনের জন্য সাব্যস্ত করা আরও বেশি উপযোগী। আর যে ত্রুটি থেকে একজন মানুষকে মুক্ত ও পবিত্র বলা হবে, রাব্বুল আলামীন তা থেকে অবশ্যই মুক্ত ও পবিত্র হবেন।
এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে এটা সাব্যস্ত করা যে, অনেক সৃষ্ট জিনিস নামে পূর্ণ মিল থাকার পরও একটি আরেকটির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে যায় না। তাহলে নাম বা গুণে মিল হলেও স্রষ্টা অবশ্যই সৃষ্টির সাদৃশ্য হয়ে যাওয়া থেকে মুক্ত হবেন।
সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, রূহ ও জান্নাতের ফল-ফলাদি, অনেক গুণে গুণান্বিত, তারপরও দৃশ্যমান অনুরূপ সৃষ্ট জিনিস তার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নয়, তাহলে রাব্বুল আলামীন তাঁর সৃষ্টি থেকে আলাদা হওয়ার আরও বেশি উপযোগী, যদি নামের দিক থেকে মিল হয়ে যায়। দেখুন, শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, আর-রিসালাতুত তাদমুরিয়্যাহ, পৃ. ৫০,৫৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00