📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 বিদ‘আতীরা আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের ওপর নিকৃষ্ট উপাধি প্রয়োগ করে থাকে

📄 বিদ‘আতীরা আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের ওপর নিকৃষ্ট উপাধি প্রয়োগ করে থাকে


আবু ইসহাক ইবরাহীম ইবন উসমান ইবন দারবাস আশ-শাফেয়ী (১০০২) একটি পুস্তিকা রচনা করেছেন, যার নাম দিয়েছেন "তানযীহুস শরী'আহ 'আনিল আলক্বাবিশ শানী'আহ” (১০০০) যাতে তিনি এসব ব্যাপারে সালাফদের বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, বিদ'আতীদের প্রত্যেক গোষ্ঠীই সম্পূর্ণ মিথ্যাচার করে 'আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের লোকদেরকে' মারাত্মক দোষণীয় উপাধী প্রদান করে থাকে, তারা তাদের নষ্ট মত অনুযায়ী এটাকেই বিশুদ্ধ মনে করে। যেমন, মুশরিকরা আল্লাহর নবীকে এমনসব উপাধী প্রদান করতো যা মূলত তারা মিথ্যা ও অপবাদ হিসেবে রটনা করেছিল। (১০০৪)
তাই দেখা যায়, রাফেযীরা(১০০০) আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের লোকদেরকে বলে “নাওয়াসিব” (১০০৬) বা নাসেবী। কাদারিয়‍্যাহরা (১০০৭) আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের লোকদেরকে বলে "মুজবিরাহ" বা জাবরিয়‍্যাহ। (১০০৮)
মুরজিয়ারা (১০৩৯) আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতকে বলে "শুককাক” (১০০০)।
জাহমিয়্যারা(১০০৪১) আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতকে বলে “মুশাব্বিহা” (১০৪২)।
কালামপন্থীরা (১০৪৩) আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতকে বলে "হাশাওয়িয়‍্যাহ” (১০৪৪)
"নাওয়াবিতা(১০৪৫), গুছা (১০৪৬) (খড়কুটো), গাছারা (১০৪৭) (গণ্ডমূর্খ) ইত্যাদি ইত্যাদি।(১০৪৮)
যেমনি ইতোপূর্বে কুরাইশরা নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একবার বলত পাগল, আরেকবার কবি, আরেকবার গণক, আরেকবার স্বরচয়িতা।
এজন্য সালাফগণ বলেন: এটা হচ্ছে সত্যিকারের উত্তরসূরীর এবং পূর্ণ অনুগামীর আলামত। তারা আরও বলেন, সুন্নাত হচ্ছে- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবীগণ যে বিশ্বাস, মধ্যমপন্থা, কথা, কাজের ওপর ছিলেন সেটা। সুতরাং রাসূলের আদর্শচ্যুতরা যেমন তাঁকে বিভিন্ন নিন্দিত নামে অভিহিত করত, যদিও তারা তাদের নষ্ট আকীদাহ'র ভিত্তিতে এর (তাদের এসব কথার) সত্যতায় বিশ্বাস করত, অনুরূপভাবে রাসূলের যথাযথ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন অনুসারীগণ, যারা সকলের মধ্যে রাসূলের জীবনে, মরনে, ভেতর, বাহির সর্বাবস্থায় বেশি নিকটতম, তাদের ওপর এমন মিথ্যা উপাধী আপতিত হবেই।
এর বিপরীতে যারা অভ্যন্তরীন দিকে রাসূলের সাথে একমত কিন্তু প্রকাশ্য দিক প্রতিষ্ঠায় অক্ষম হয়েছে, আবার যারা প্রকাশ্য দিক দিয়ে রাসূলের সাথে একমত কিন্তু অভ্যন্তরীন দিককে বাস্তবায়ন করতে অক্ষম হয়েছে অথবা যারা ভেতর-বাহির যতটুকু সম্ভব দু'টি ক্ষেত্রেই তার সাথে একমত হয়েছে, তাদের প্রত্যেকে গোষ্ঠীর বিরুদ্ধেই সুন্নাত থেকে বিচ্যুতরা এমন কোনো ত্রুটির কথা বিশ্বাস করবে(১০৪৯), যার মাধ্যমে তারা তাদের ওপর দোষারোপ করবে এবং তাদেরকে বিভিন্ন মিথ্যা নামেও অভিহিত করবে, যদিও তারা (সুন্নাহ বিচ্যূতরা) এসব কিছু সত্য বিশ্বাসেই বলে থাকে। যেমন,
রাফেযীদের বক্তব্য: যে ব্যক্তি আবু বকর ও 'উমারকে ঘৃণা করে না সে আলীকে ঘৃণা করল; কেননা আলীর বন্ধুত্ব ঐ দুইজন থেকে মুক্ত হওয়ার দ্বারাই অর্জিত হবে। তারপর ব্যক্তি আবু বকর ও 'উমারকে যে ভালোবাসবে রাফেযীরা তাকে নাসেবী বলবে। তাদের এ বাতিল তালাযুম )لازم( )কথার দাবী) এর ভিত্তিতে যেটাকে তারা সঠিক বলে বিশ্বাস করে; অথবা তা জেনে শুনে মানতে অস্বীকার করে থাকে, আর এটাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঘটেছে। (১০৫০) আর যেমন কাদারিয়‍্যাদের বক্তব্য: যে কেউ বিশ্বাস করে যে আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টি জগতের ইচ্ছা করেছেন, বান্দার কর্ম সৃষ্টি করেছেন, সে তো বান্দার ইচ্ছা ও শক্তিকে দূর করে দিল এবং তাদেরকে জড় পদার্থ বানিয়ে দিল, যার কোনো ইচ্ছা বা ক্ষমতা নেই।
তেমনি জাহমীর বক্তব্য: যে ব্যক্তি বলে যে, আল্লাহ 'আরশের উপরে, সে ধারণা করল যে, তিনি সীমাবদ্ধ আর তিনি 'মুরাক্কাব(১০৫১) জিসিম' বা যৌগিক পদার্থ, যার হাদ বা সীমা আছে এবং তিনি স্বীয় সৃষ্টির সদৃশ।
তেমনি জাহমী মু'তাযিলীর বক্তব্য: যে ব্যক্তি বলে যে, নিশ্চয় আল্লাহর ইলম আছে, ক্ষমতা আছে- এ কথা যে বলবে সে মনে করল যে, তিনি )مرکب( যৌগিক পদার্থ এবং সে মুশাব্বিহ বা সাদৃশ্য প্রদানকারী। কেননা এ সিফাতগুলো তো 'আর্দ্ব )عرض( )১০৫২) বা পরিবর্তনশীল। আরবীতে লেখা অংশ:
আর 'আরছ (عرض) যা কখনো 'স্থানে সীমাবদ্ধ' (মুতাহাইয়্যিয়)(১০০৩) 'জাওহার'(১০৫৪) (جوهر) ছাড়া অস্তিত্বে আসতে পারে না। আর প্রত্যেক 'স্থানে সীমাবদ্ধ'ই যৌগিক পদার্থ। আর যে এমনটি বলবে সে মুসাব্বিহা; কেননা জিসিম বা পদার্থসমূহ সাদৃশ্যপূর্ণ। (১০৫৫)
মানুষদের «المقالات» ও 'মাক্বালাত' তথা 'মতবাদ' বর্ণনা করেছে আর নিজেদের আকীদাহ'র ওপর নির্ভর করে তাদের আকীদাহ'র বিরোধী লোকদের ওপর এসব মিথ্যা নামকরণ করেছে, সুতরাং বিষয়টি তারা এবং তাদের রব বোঝাপড়া করবেন, আল্লাহ তাদেরকে পিছন থেকে পাকড়াও করবেন আর জানা কথা যে, খারাপ কুটকৌশল কেবল ঐ কৌশলকারীকেই পাকড়াও করে। (১০৫৬)
মোটকথা, সিফাতের আয়াত ও হাদীসের ব্যাপারে সম্ভাব্য ছয়টি প্রকার পাওয়া যায় (১০৫৭); প্রত্যেক প্রকারের মধ্যে ক্বিবলার অনুসারী কোনো না কোনো গোষ্ঠী রয়েছে। (প্রথম) দু'প্রকার: তারা বলে, এ সিফাতগুলো 'যাহির' এর ওপর পরিচালিত হবে। অন্য দু প্রকার বলে: এ সিফাতগুলো যাহির এর বিপরীতে পরিচালিত হবে। আর বাকী দু' প্রকার: এ ব্যাপারে নীরব থাকে।

টিকাঃ
১০৩২, তিনি হচ্ছেন আবু ইসহাক ইবরাহীম ইবন উসমান ইবন 'ঈসা ইবন দারবাস, জালালুদ্দীন আল-মারানী, আল-কুদী আল-মিসরী। হাদীস সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ সফরকারী ব্যক্তি তিনি যেসব দেশ সফর করেছেন তন্মধ্যে রয়েছে, মিসর, ইরাক, দামেশক, খুরাসান, আসফাহান ইত্যাদি। অনেক লিখেছেন। তার থেকে হাদীস নিয়েছেন আব্দুল আযীম আল-মুনযেরী প্রমুখ। তার সম্পর্কে যাহাবী বলেন, 'তিনি শাফে'য়ী মাযহাব সম্পর্কে ভালো জানতেন। তার পিতার কাছেই ফিকহ অর্জন করেন। তিনি নেককার ও কল্যাণকামী ছিলেন। যুহদ ও স্বল্পে তুষ্টিতা, দুনিয়া বিমুখ, আখেরাতের কাজে অগ্রণী মানুষ ছিলেন। হিন্দুস্তান ও ইয়ামানের মাঝখানে হিজরী ৬২২ সালে তার মৃত্যু হয়। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (২২/২৯০); আসনাওয়ী, ত্বাবাক্বাতুশ শাফে'ঈয়্যাহ (১/১২৮)।
১০৩৩, শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ এ কিতাবটির কথা অন্যান্য গ্রন্থেও উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন, 'তিনি এ গ্রন্থে এ অধ্যায়ে সালাফে সালেহীন ও ইমামগণের বহু বক্তব্য উল্লেখ করেছেন।' ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/৩৮০)।
১০০৪. শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ অন্যত্র বলেছেন, "তুমি দেখ এমনভাবে কাফেররা নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কবি বলতো, জাদুকর বলতো, গণক বলতো। অনুরূপভাবে বিদ'আতীরা আহলুস সুন্নাহকে নাসেবী বলে, মুজবিরাহ বলে, মুশাব্বিহা বলে।"... দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৩/৬৪৩)।
১০০৫. রাফেদ্বী হচ্ছে সেসব সম্প্রদায় যারা আবু বকর ও 'উমারের ওপর আলীকে স্থান দেয়। এদের বিস্তারিত পরিচয় আগে চলে গেছে।
১০০৬. 'নাওয়াসেব' শব্দটি বহুবচন। যার একবচন হচ্ছে নাসেবী, যা নাসব শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ শত্রুতা। সাধারণত যারা আলী রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু ও তার সাথীদের ঘৃণা করে তাদেরকে নাসেবী বলা হয়। তাদের মধ্যে খারেজীদের সকল গোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত ধরা হয়। কারো কারো মতে, যারা আলী রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু ও আলে বাইত থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকে তাদেরকে 'নাসেবী' বলা হবে। দেখুন, ইবন হাজার, হাদইউস সারী মুকাদ্দিমাতু ফাতহিল বারী ৯১/৪৫৯); ফাতহুল বারী (১০/৪২০)। কারও কারও মতে, নাসেবী হচ্ছে তারা যারা 'আলে বাইত' বা রাসূলের পরিবারকে কথা বা কাজে কষ্ট দেয়। এটি ইবন তাইমিয়‍্যাহ বলেছেন। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/১৫৪)। বস্তুত এটিই সঠিক সংজ্ঞা।
মনে হয় এ পরিভাষাটি রাফেদ্বীদের মধ্যে সর্বপ্রথম যে ব্যবহার করেছে সে হচ্ছে কবি ইসমা'ঈল ইবন মুহাম্মাদ আল-হিমইয়ারী, যাকে 'আস-সাইয়্যেদ' উপাধী প্রদান করা হয়, হিজরী ১৭৩-১৭৯ সালের মধ্যে যার মৃত্যু হয়।
আর আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকদের মধ্যে এ 'নাসেবী' পরিভাষাটি যে প্রাচীন ভাষ্যে পাওয়া যায় তা হচ্ছে 'আলী ইবনুল মাদীনী'র বক্তব্যে। (মৃত্যু ২৩৪ হিজরী)। যখন তিনি বলেছিলেন, যে কেউ বলবে, 'অমুক মুশাব্বিহ' আমরা জানব যে, লোকটি জাহমী। আর যে কেউ বলবে, 'অমুক মুজবির' আমরা বুঝবো যে লোকটি কাদারিয়‍্যাহ, আর যে কেউ বলবে যে, 'অমুক নাসেবী' আমরা জেনে নেব যে, লোকটি 'রাফেদ্বী'। লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ, নং ৩০৬।
কিন্তু রাফেদ্বী সম্প্রদায়, তারা এ নামটি প্রদান করে এমন সকলকেই যারা আবু বকর ও 'উমার রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমাকে ভালোবাসে, তাদের সাথে সুসম্পর্ক রাখে। বস্তুত এটা তাদের সে নীতি অনুযায়ী, যাতে তারা বলে থাকে, যারাই আবু বকর ও 'উমারকে ভালোবাসবে তারাই আলীকে ঘৃণা করেছে। আর সেজন্য তারা আহলুস সুন্নাহকে নাওয়াসিব বলে থাকে।" দেখুন, মাজমু' ফাতাওয়া (২৫/৩০১); আত-তাদমুরিয়‍্যাহ, পৃ. ১২২-১২৩।
১০০৭. কাদারিয়‍্যাহ বলতে তাদেরকেই বলা হয় যারা তাক্বদীর অস্বীকার করে। কিন্তু এখানে তা দ্বারা মু'তাযিলাদের বুঝানো হয়েছে।
১০৩৮. মুজবিরাহ বা জাবরিয়‍্যাহ বলতে তাদেরকে বুঝায় যারা তাক্বদীর সাব্যস্ত করতে গিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে। তারা মানুষদের থেকে সকল কর্ম ও তাদের স্বাধীনতা হরণ করেছে। তারা বান্দার সকল কাজ আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করে। আল্লাহই সব করেছেন বান্দা কিছুই করেনি। তারা দু' ভাগে বিভক্ত: এক. খাঁটি জাবরিয়‍্যাহ, যারা আল্লাহর জন্য কোনো কাজই সাব্যস্ত করে না, তাদের মতে বান্দার কাজ করার ক্ষমতাই নেই। দুই. মাঝামাঝি ধরনের জাবরিয়্যাহ, যারা বান্দার জন্য প্রভাবহীন কুদরত বা ক্ষমতা সাব্যস্ত করে (জাবরে মা'নাওয়ী)। দেখুন, মাক্কালাতুল ইসলামিয়‍্যীন, পৃ. ২৭৯- ২৮৭। তবে কাদারিয়‍্যাহ ফির্কার লোকেরা জাবরিয়া বা মুজবিরাহ বলে আহলুস সুন্নাহকে উদ্দেশ্য নিয়ে থাকে। কারণ আহলুস সুন্নাহ বিশ্বাস করে যে, সবকিছু আল্লাহর নির্ধারণ ও ইচ্ছা অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হয়, তবে বান্দার কাজ করার ক্ষমতা আছে।
কাদারিয়া গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতকে জাবরিয়া বা 'মুজবিরাহ' বলে বদনামী করার বিষয়টি ইমাম ইবন আবী হাতেম তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, যখন তিনি বিদ'আতীদের আলামত সম্পর্কে আলোচনা করেন তখন বলেন, 'আমার পিতাকে বলতে শুনেছি তুমি বিদ'আতীর পরিচয় পাবে যখন তুমি দেখবে যে তারা সেসব লোকের বিরুদ্ধে লেগে যায় যারা 'আছার' (সালাফদের মত) অনুসরণ করে।... আর কাদারিয়‍্যাদের আলামত হচ্ছে তারা সেসব লোককে মুজবিরাহ বলে যারা 'আছার' (সালাফদের মত) অনুসরণ করে।' দেখুন, লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ (১/১৭৯)।
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ কাদারিয়্যাদের দ্বারা আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতকে এ মিথ্যা ভিত্তিহীন নামের প্রতিবাদ করেছেন এবং তা বাতিল হওয়া প্রমাণ করেছেন; কারণ আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আত এটাই বিশ্বাস করে যে, বান্দা প্রকৃত অর্থেই কাজ করে, তার ইচ্ছা ও ক্ষমতা রয়েছে। তিনি বলেন, 'বিদ'আতীরা সেসব লোকদেরকে বাতিল নাম প্রদান করে যারা আল্লাহ তা'আলার পথের অনুসরণ করে, যে পথের বিষয়টি বর্ণনা করে আল্লাহ বলেন, "বলুন, 'এটাই আমার পথ, আল্লাহর প্রতি মানুষকে আমি ডাকি জেনে-বুঝে, আমি এবং যারা আমার অনুসরণ করেছে তারাও। আর আল্লাহ কতই না পবিত্র মহান এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই'।” [সূরা ইউসুফ: ১০৮] যেমন কাদারিয়‍্যারা আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতকে মুজবিরা নাম দেয় অথচ আহলুস সুন্নাহ এটা বিশ্বাস করে যে, বান্দা সত্যিই কর্মসম্পাদনকারী, তার রয়েছে ইচ্ছা ও ক্ষমতা; মূলথ কাদারিয়‍্যাহরা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতকে তাদের সাথে তুলনা করে যারা বান্দার কর্ম নেই বলে, আর বান্দাকে যারা জড় পদার্থের মতো মনে করে যাদের কোনো ইচ্ছা নেই। কাদারিয়্যারা আহলুস সুন্নাহকে জাবরিয়া বলার কারণ হচ্ছে, আহলুস সুন্নাহ বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ সবকিছুর স্রষ্টা, তিনি বান্দার স্রষ্টা, বান্দার গুণের স্রষ্টা আর বান্দার কর্মেরও স্রষ্টা।' দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়‍্যাহ (৬/৬৪৩-৬৪৪)।
১০৩৯. মুরজিয়া: এদের পরিচিতি ইতোপূর্বে চলে গেছে।
১০৪০, শুককাক; অর্থ সন্দেহকারী। মুরজিয়া সম্প্রদায় আহলুস সুন্নাহকে এ নামে অভিহিত করে; কারণ আহলুস সুন্নাহ ঈমানের ব্যাপারে প্রশ্ন করলে 'ইনশা-আল্লাহ' বলে। কেউ যদি অপর কাউকে বলে, আপনি কি ঈমানদার? তখন আহলুস সুন্নাহ এর জাওয়াব হচ্ছে, ইনশা-আল্লাহ। অথচ বিশুদ্ধ কথা হচ্ছে আহলুস সুন্নাহ এভাবে নিঃশর্তভাবে তা বলে না, তারা বিশেষ অর্থে তা বলে, যখন কেউ বুঝাতে চায় সে সকল আমল করতে সক্ষম হয়েছে কী না? অনুরূপভাবে যখন কেউ মুমিন বলে জান্নাতী হওয়ার দাবি করবে বসবে। তদ্রূপ যখন কেউ আমলকে ঈমানের অংশ মনে না করার জন্য চালাকি করে প্রশ্ন করবে। তেমনিভাবে যখন কেউ 'তাযকিয়াতুন নাফস' করে বলার চেষ্টা করবে, তা থেকে বাঁচার জন্য তারা ইনশা-আল্লাহ বলে থাকে।
মুরজিয়ারা আহলুস সুন্নাহ'র ব্যাপারে বলে, তারা তাদের ঈমানে সন্দেহে থাকার কারণে ইনশা-আল্লাহ বলে। আমরা যেমনটি জানিয়েছি, তা আহলুস সুন্নাহ'র ওপর মিথ্যাচার। আমরা কখনও সন্দেহের কারণে তা বলি না। বরং আমরা মনে করি দৃঢ় বিষয়েও ইনশা-আল্লাহ বলার নযীর কুরআন ও হাদীসে আছে। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া ৭/৪২৯, ৪৫০, ৬৬৬; শারহুত ত্বাহাওয়িয়‍্যাহ (২/৪৯৭)। ইমাম আব্দুর রহমান ইবন মাহদী বলেন, 'ইরজা' বা 'মুরজিয়া' হওয়ার প্রথম লক্ষণ হচ্ছে 'ইস্তেসনা' বা ইনশা-আল্লাহ বলা ত্যাগ করা।' অর্থাৎ যখন তাদেরকে ঈমানদার কী না এ প্রশ্ন করা হবে তখন আমলকে ঈমানের অধীন না করার জন্য তারা দৃঢ়ভাবে বলে আমি ঈমানদার। অথচ বলার দরকার ছিল, আমি ইনশা-আল্লাহ ঈমানদার। দেখুন, আল-খাল্লাল, আস-সুন্নাহ (৩/৫৯৮)। মুরজিয়ারা মনে করে ঈমানের পরিচয় দিতে দিয়ে ইনশা-আল্লাহ বলে ঈমানে সন্দেহ করা হয়। দেখুন, শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, আল-ফুরক্বান বাইনাল হাক্কি ওয়াল বুত্বলান, পৃ. ২৭৬।
১০৪১. জাহমিয়্যাহ, তাদের পরিচয় আগেই চলে গেছে।
১০৪২. জাহমিয়্যারা আহলুস সুন্নাহকে 'মুশাব্বিহা' বলে, কারণ আহলুস সুন্নাহ আল্লাহর নাম ও গুণাবলি সাব্যস্ত করে। সেগুলোর কোনো তা'ওয়ীল (অপব্যাখ্যা) করে না, তা'ত্বীল (নিষ্ক্রীয়করণ) করে না। যেমনটি জাহমিয়‍্যারা করে থাকে। সুতরাং যারাই আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতকে মুশাব্বিহা সাদৃশ্যদানকারী বলবে, তারাই জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়। কম বেশি তারা জাহমিয়্যাদের দ্বারা প্রভাবিত।
১০৪৩. সম্ভবত শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়‍্যাহ এখানে কালামপন্থী বলে আশা'য়েরা ও মাতুরিদিয়া সম্প্রদায়কে বুঝিয়েছেন। কারণ তারাই আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকদেরকে 'হাশাওয়িয়‍্যাহ' বলে। তাদের গ্রন্থ এসব বদনামীতে ভর্তি। আর এও সম্ভব যে এখানে মু'তাযিলাদেরকেও বুঝানো হয়েছে। কারণ নীতির দিক থেকে মু'তাযিলা, আশা'য়েরা ও মাতুরিদিয়া এ তিন সম্প্রদায় বিবেকের যুক্তিকে কুরআন ও সুন্নাহ'র ওপর প্রাধান্য দেয়ার নীতি মেনে নিয়েছে, যা কালামশাস্ত্রের প্রথম পাঠ। সুতরাং তারা সকলেই এ দিক থেকে একই পর্যায়ের। যদিও কিছু সিফাত সাব্যস্ত করার কারণে আশ'আরী ও মাতুরিদীদেরকে সিফাতিয়্যাদের অন্তর্ভুক্ত ধরা হয়।
১০৪৪. হাশওয়িয়্যাহ, শব্দটি 'হাশও' শব্দ থেকে বের হয়েছে। 'হাশও' শব্দের অর্থ কথার মাঝে এমন বাড়তি কথা বলা যার ওপর নির্ভর করা যায় না, মানুষের মাঝে যারা নিম্নশ্রেণি, তাদের জন্য উপহাসমূলক অহংকারীরা এটি ব্যবহার করে থাকে। দেখুন, ইবন মাঞ্জুর, লিসানুল আরাব (১৪/১৮০)। এখানে 'হাশওয়িয়্যাহ' শব্দ দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য, সাধারণ মানুষ, যারা কোনো দর্শনবিদ্যার ধার ধারে না অথবা সাধারণ কথা, যারা খুব সিম্পল কথা বলে। এর মাধ্যমে তারা আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতকে বুঝাতো; এর বিপরীতে তারা নিজেদেরকে বুদ্ধিজীবী বলে প্রচার করতো। বস্তুত 'হাশাওয়িয়্যাহ' শব্দটি একটি বিদ'আতী শব্দ যা মু'তাযিলারা আহলুস সুন্নাহ'র ইমামদের জন্য ব্যবহার করতো। 'আমর ইবন উবাইদ আল-মু'তাযেলী সর্বপ্রথম তা ব্যবহার করে। সে বলেছিল, আব্দুল্লাহ ইবন 'উমার তো হাশাওয়ী ছিল। [নাউযুবিল্লাহ] আর তারা সাধারণ মানুষদের 'হাশউ' বলতো। ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আক্কলি ওয়ান নাকলি (৭/৩৫১)। আরও দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৪/২৩, ১৪৪-১৪৮), (১২/১৭৬); মিনহাজুস সুন্নাহ (২/৫২০-৫২২)। অন্যত্র তিনি বলেন, "এ 'হাশওয়িয়‍্যাহ' শব্দটি সর্বপ্রথম মু'তাযিলারা আবিষ্কার করে, তারা আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আত ও বিরাট জনগোষ্ঠীকে 'হাশও' বলত। যেমনিভাবে রাফেদ্বীরা আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আত ও সাধারণ মানুষদের 'জমহুর' বলে। বস্তুত 'হাশউন নাস' এর অর্থ সাধারণ মানুষ ও অধিকাংশ লোক। তারা সেসব লোকের বাইরে যারা বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। যেমন বলা হয়, এ তো সাধারণ মানুষ, যেমন বলা হয়, এরা অধিকাংশ লোকের অন্তর্ভুক্ত। প্রথম এটি ব্যবহার করেছে 'আমর ইবন উবাইদ, সে বলেছিল, আব্দুল্লাহ ইবন 'উমার তো হাশাওয়ী ছিলেন। এভাবে মু'তাযিলারা আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতকে হাশাওয়ী বলতে আরম্ভ করে, যেমন রাফেদ্বীরা আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতকে 'জমহুর' সর্বসাধারণ নামে অভিহিত করে।" মাজমু' ফাতাওয়া (৩/১৮৫-১৮৬)।
এভাবে তারা হাশাওয়িয়‍্যাহ বলে অপমান করতে চায় এটা বলে যে, এরা মানুষের মাঝে অর্বাচীন, এদের কোনো যোগ্যতা নেই। মু'তাযিলারা তাদেরকে হাশাওয়ী বলে যারা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তাক্বদীর নির্ধারণ সাব্যস্ত করে। জাহমিয়্যারা তাদেরকে হাশাওয়িয়্যাহ বলে যারা আল্লাহর জন্য তাঁর সিফাতসমূহ সাব্যস্ত করে। কারামিত্বারা (হাকেম লি আমরিল্লাহর মিশরের উবাইদী শাসকের অনুসারী, যাদেরকে অন্যায়ভাবে ফাতেমী শাসক বলা হয়), যারা সালাত, যাকাত, সাওম, হজ ফরয বলে তাদেরকে হাশাওয়ী বলে। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (১২/১৭৬), (২২/৩৬৬)। ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, "হাশাও' শব্দটি যে ভাষায় ব্যবহৃত হয়, সেখানে এটা এমন কোনো গোষ্ঠীর জন্য ব্যবহৃত হয় না যাদের একজন নেতা রয়েছে তিনি কোনো কথা বললেন আর তারা তার অনুসরণ করলো। যেমন জাহমিয়্যাহ, কুল্লাবিয়্যাহ, আশ'আরিয়‍্যাহ (কারণ তারাই একজনের কথা অনুসরণ করে চলে)। অনুরূপ এ শব্দটি এমন কোনো বক্তব্যের নামও নয় যে, যারা এমন বক্তব্য অনুসরণ করবে তারাও সেটা হয়ে যাবে। বস্তুত কোনো গোষ্ঠী বা দল তো তাদের কোনো বক্তব্য দ্বারা অথবা তাদের নেতা দ্বারাই পরিচিতি লাভ করে থাকে।" দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/২৪২); আরও দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, মিনহাজুস সুন্নাহ (২/৫২০-৫২১)।
১০৪৫. নাওয়াবিত শব্দটি নাবেত এর বহুবচন। নবীন বয়স বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হলেও এখানো পিচ্ছি বলা উদ্দেশ্য। এ শব্দটিও অপমানজনকভাবে তারা আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের জন্য ব্যবহার করে থাকে। দেখুন, ইবন মাঞ্জুর, লিসানুল আরাব (২/৯৬)।
১০৪৬. গুছা শব্দটির অর্থ খড়কুটো যা বানে ভেসে আসে। এর মাধ্যমে প্রত্যেক নিকৃষ্ট মানুষ ও বস্তুকে বুঝানো হয়। কুরআনে কারীমে এ অর্থেই শব্দটি এসেছে। দেখুন, ইবন মাঞ্জুর, লিসানুল আরাব (১৫/১১৬)।
১০৪৭. গাছরা শব্দটির অর্থ মূর্খ শ্রেণির মানুষ। উসমান রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুকে হত্যা করতে যারা ঢুকেছিল, তিনি তাদের সম্পর্কে বলেছিলেন, "ইন্না হা-উলায়ে রি'আউন গাছারাহ", অর্থাৎ তারা ছিল রাখাল বর্বর টাইপের লোক। দেখুন, ইবন মাঞ্জুর, লিসানুল আরব (৫/৭)।
১০৪৮. আহলুস সুন্নাহ এর অনেক ইমাম যেমন, ইমাম আহমাদ, ইবন আবী হাতেম, ইবন কুতাইবাহ, আবুল কাসেম আল-আসফাহানী প্রমুখ, তাদের কাছ থেকে বর্ণিত হয়ে এসেছে, তারা বলেছেন, বিদ'আতীদের চিহ্ন হচ্ছে তারা এসব খারাপ খারাপ নাম ও গুণসমূহ দিয়ে আহলুস সুন্নাহকে অভিহিত করবে। কেউ বলবে নাওয়াসিব, কেউ বলবে মুশাব্বিহা, কেউ বলবে হাশাওয়িয়‍্যাহ...। এগুলো বলে তারা আহলুস সুন্নাহকে কলঙ্কিত করতে চায়, তাদের বদনামী করতে চায়, তাদের মানহানী করতে চায়। অথচ প্রকৃত অর্থে ঐসব লোকেরাই এসব খারাপ গুণের বেশি উপযুক্ত, এসব নিকৃষ্ট গুণের অধিক হক্কদার। কবি বলেন,
لا يضر البحر أمسى زاخراً ... ان رمى فيه غلام بحجر
"সমুদ্র টুইটম্বুর হলে সেখানে যদি কোনো বালক তাতে পাথর নিক্ষেপ করে তবে তার কিছু যায় আসে না।" অন্য কবি বলেন,
تقول هذا جنى النحل تمدحه... وإن تشأ قلت ذا قيء الزنابير مدحاً وذماً وما جاوزت ... والحق قد يعتربه سوء تعبير
"তুমি বলছ যে, অমুক তো মধু আহরণ করেছে, আর যদি তুমি চাও বলতে পার যে, বোলতা তাতে বমি করে দিয়েছে তাতে যা ইচ্ছা প্রশংসা যোগ করতে পার, যা ইচ্ছা নিন্দা যুক্ত করে দিতে পার, কারণ হক্ক কখনো কখনো খারাপ বিবৃতির সম্মুখীন হয়ে থাকে।" ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম আল্লাহর বেশ কিছু গুণাবলি উল্লেখ করার পর বলেন, এসব গুণ আল্লাহ তা'আলার জন্য সাব্যস্ত; তিনি এগুলো দ্বারা গুণান্বিত। আমরা এগুলো কখনও অস্বীকার করবো না, যতই তোমরা এগুলো গুণান্বিত সত্তাকে 'জিসিম' বল। যেমনিভাবে আমরা সাহাবায়ে কিরামকে গালি দিই না, রাফেদ্বীদের দ্বারা তাদেরকে নাসেবী বলার কারণে, যারা সাহাবায়ে কিরামকে ভালোবাসে। অনুরূপভাবে আমরা রব্বুল আলামীনের তাক্বদীর নির্ধারণকে অস্বীকার করি না, কাদরিয়াদের দ্বারা তাদেরকে জাবরিয়া বলার কারণে, যারা তাক্বদীর সাব্যস্ত করে। তদ্রূপ আমরা সত্যবাদী নবী আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর সত্তা, নাম, গুণ ও কর্ম সম্পর্কে যে সংবাদ দিয়েছেন তা প্রত্যাখ্যান করি না, হাদীসের শত্রুদের দ্বারা আমাদেরকে হাশওয়িয়াহ বলার আশঙ্কায়। তেমনিভাবে আমরা আমাদের স্রষ্টার গুণাবলিকে অস্বীকার করবো না, তাঁর সৃষ্টির উপরে থাকা, 'আরশের উপরে উঠা সাব্যস্ত করা পরিত্যাগ করবো না, ফির'আউনী মু'আত্তিলাদের দ্বারা, যারা তা সাব্যস্ত করে তাদেরকে মুজাসসিমা ও মুশাব্বিহা বলার কারণে।
فإن كان تجسيم ثبوت استوانه ... على عرشه إلي إذا لمجسم وإن كان تشبها ثبوت صفاته .... فمن ذلك التشبه لا أتكتم
"যদি আল্লাহর 'আরশের উপর উঠা সাব্যস্ত করার কারণে আমাকে মুজাসসিমা বা দেহবাদী বলা হয়, তবে আমি মুজাসসিম।" "আর যদি তাঁর সিফাত সাব্যস্ত করার কারণে আমাকে মুশাব্বিহা বা সাদৃশ্যবাদী বলা হয়, তবে এ তাশবীহ দেয়াকে আমি গোপন করি না।" এরপর তিনি বলেন, আর আল্লাহ আমাদের শাইখ অর্থাৎ ইবন তাইমিয়্যাহ' এর ওপর সন্তুষ্ট হোন, যখন তিনি বলেছিলেন,
فإن كان نصباً ولاء الصحاب ***** فإني كما زعموا ناصبي وإن كان رفضاً ولاء آله *** فلا برح الرفض من جانبي
"যদি সাহাবায়ে কিরামের সাথে সুসম্পর্ক রাখাকে নাসেবী বলা হয়, তবে তারা যা মনে করেছে আমি নাসেবী। আর যদি রাসূলের পরিবার পরিজনের সাথে সম্পর্ক রাখার কারণে আমাকে রাফেযী বলা হয়, তাহলে এ রাফেযী হওয়া আমার দিক থেকে আমি দূর করবো না।" ইবনুল কাইয়্যেম, আস- সাওয়া'য়িকুল মুরসালাহ (৩/৯৪০-৯৪১)। আরও দেখুন, লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ (১/১৭৯-১৮২); আবু ইয়া'লা, ইবত্বালুত তা'ওয়ীলাত, পৃ. ৪৫-৪৬; ইবন কুতাইবাহ, তা'ওয়ীলু মুখতালাফুল হাদীস, পৃ. ৫৫; সাবৃনী, আকীদাতুস সালাফ, পৃ. ১০৫; আবু ইয়া'লা, ত্বাবাক্বাতুল হানাবিলাহ (১/৩৫-৩৬); যাহাবী, আল-'উলু লিল 'আলিয়ি‍্যল 'আযীম, পৃ. ১৩৯; ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্ব আল- আকলি ওয়ান নাকলি (৪/১৪৮); মাজমু' ফাতাওয়া (৩৩/১৭১); আক্বীদাতুর রাযীয়াইন, পৃ. ৬৯।
১০৪৯. শাইখ আব্দুল্লাহ আবু বাতীন রাহিমাহুল্লাহ এ প্রকারগুলোর বর্ণনা দিয়েছেন, তিনি বলেন, 'যারা আকীদাতে একমত হয়েছে কিন্তু কথা ও আমলের ক্ষেত্রে অপারগ হয়েছে যেমন আল্লাহর পথে দাওয়াত দান। আরেকদল তারা প্রকাশ্য কর্মকাণ্ডে তাদের সাথে একমত হয়েছে কিন্তু আভ্যন্তরীন দিক দিয়ে অপারগ হয়েছে, তাদের অন্তর দিয়ে হক্ক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য করার ব্যাপারে। তাদের মধ্যে এ অংশে ত্রুটি রয়েছে। আরেক দল তাদের সাথে একমত হয়েছে প্রকাশ্য ও আভ্যন্তরীন দিক থেকে যতটুকু সম্ভব, কিন্তু তারা তাঁর সেসব প্রথম সারির অনুসারীদের চেয়ে নিম্নমানের, যারা অত্যন্ত প্রখর দৃষ্টির সাথে আকীদাহ, মধ্যপন্থা, কথা ও কাজে একাত্ম হয়েছিল।' মাজমু'আতুর রাসায়িলিন নাজদিয়্যাহ (৩/১৬৮); আদ-দুরারুস সানিয়‍্যাহ (১/৩৭১)। অর্থাৎ যে যত বেশি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসারী হবে তার ওপর নিন্দা ও বদনামীর ভাগটা একটু বেশিই পড়বে। যত কম হবে তত কম হবে, একেবারে বাদ যাবে না।
১০৫০. রাফেযীদের নিকট এ নীতির নাম হচ্ছে, (আত-তাওয়াল্লি ওয়াত তাবাররি) অর্থাৎ সম্পর্কস্থাপন ও সম্পর্কচ্যুতি ঘটানোর নীতি। তারা বলে: (লা ওলাআ ইল্লা বি বারাআ) অর্থাৎ যতক্ষণ পর্যন্ত আলী ব্যতীত অন্যদের থেকে কেউ সম্পর্কচ্যুতি ঘটাবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনোভাবেই কেউ আলীর বন্ধুত্বে আসতে পারে না।
১০৫১. যারা সিফাত অস্বীকার করে তাদের বড় সন্দেহগুলোর অন্যতম হচ্ছে, 'জিসিম সাব্যস্ত করা সংক্রান্ত সন্দেহ' আর 'তারকীব সাব্যস্ত করা সংক্রান্ত সন্দেহ।' তন্মধ্যে যারা জিসিম নিয়ে সন্দেহে পড়ে আছে তারা বলে, যদি আল্লাহর জন্য এসব সিফাত সাব্যস্ত করা হয় তবে সেটার দাবি হচ্ছে আল্লাহ 'জিসিম' হবেন। কারণ আমরা দৃশ্যমান জগতে এসব গুণে গুণান্বিত কাউকে 'জিসিম' ছাড়া দেখতে পাচ্ছি না। আর 'জিসিম' সবসময় সাদৃশ্যপূর্ণই হয়ে থাকে। তাহলে তো তাশবীহ হয়েই গেল। আর যারা 'তারকীব' শব্দ নিয়ে সন্দেহে পড়ে আছে তারা বলে, যদি আল্লাহর জন্য এসব সিফাত সাব্যস্ত করা হয়, তাহলে তার অর্থ হচ্ছে অনেকগুলো সিফাতের সমষ্টি। আর অনেকগুলো সিফাত এর অর্থ দাঁড়ায় তারকীব হওয়া বা যৌগিক হয়ে যাওয়া। আর আল্লাহ মুরাক্কাব হবেন তা হতে পারে না। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ তাদের এ দু'টি সন্দেহ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে অপনোদন করেছেন এবং বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। দেখুন, শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়‍্যাহ, আত-তাদমুরিয়্যাহ, পৃ. ৩৫,৪০; মাজমূ' ফাতাওয়া ৫/২১২-২২৫, ৪২১-৪৩৫; ৬/৩৩-৫১, ৭৩-৭৫, ১০২-১০৪, ৩৪৪- ৩৫১, ১৩/২৯৮-৩০৫; ১৭/৩১২।
১০৫২. 'আরদ্ব' শব্দটির বহুবচন 'আ'রাদ্ব'। আর তা হচ্ছে এমন জিনিস, যা কখনও স্বয়ং বেশিক্ষণ অবশিষ্ট থাকা বিশুদ্ধ হতে পারে না। বরং তা সর্বদা অন্যের ওপর ভর করে থাকে, সেজন্য 'আরদ্ব' সর্বদা জাওহার ও জিসিমে প্রকাশ পায়। দ্বিতীয়বার কোনো জাওহার বা জিসিমের অস্তিত্ব হলে সেটা বাতিল হয়ে যায়। দেখুন, আল-বাকেল্লানী, আত-তামহীদ, পৃ. ৩৮। আল্লাহর সিফাতকে কি 'আরদ্ব' বলা যাবে? শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়‍্যাহ এর বিস্তারিত উত্তর দিয়েছেন, তিনি এটাও বলেছেন এগুলো কালামশাস্ত্রবিদরা বিদ'আত হিসেবে তৈরি করেছে। সরাসরি হ্যাঁ বা না বলা যাবে না। জিজ্ঞেস করে যা বিশুদ্ধ অর্থ হয় তার অর্থ গ্রহণ করা হবে, আর যা ভুল অর্থ হবে তা শব্দ ও অর্থ উভয়টিই বাতিল করা হবে। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া ৬/৯০-৯১, ১০৩-১০৪। হাফেয কিওয়ামুস সুন্নাহ আবুল কাসেম আল-আসফাহানী বলেন, সালাফে সালেহীন জাওয়াহির ও আ'রাদ্ব নিয়ে কথা বলতে রাযী হননি। তারা বলেন, এ শব্দটি দু'টি সাহাবায়ে কিরাম ও তাবে'য়ীগণের যুগে ছিল না। আল্লাহ সাহাবায়ে কিরামের ওপর সন্তুষ্ট হোন, আর তাবেয়ীগণের ওপর রহম করুন। তারা এসব শব্দ নিয়ে কথা বলা থেকে চুপ ছিলেন, এর কারণ হয় তারা এগুলো জেনেও কথা বলতে চাননি, তাহলে আমাদের এ ব্যাপারে চুপ থাকতে অসুবিধা কোথায়? তারা যেভাবে চুপ ছিলেন, আমরাও তেমনি চুপ থেকে যাব। অথবা তারা না জেনে চুপ ছিলেন, তাহলে যে জিনিস তারা না জেনেও সমস্যা হয়নি, সেগুলো না জানলে আমাদেরও সমস্যা হবে না। দেখুন,
আল-হুজ্জাহ ফী বায়ানিল মাহাজ্জাহ (১/৯৯-১০০)।
১০৫৩. মূল আরবী হচ্ছে 'হাইয়্যেয' যার সাধারণ অর্থ হচ্ছে স্থান, অথবা স্থান ধরে নেয়া। কালামশাস্ত্রবিদদের কেউ কেউ প্রত্যেক জিসমকেই মুতাহাইয়্যেয বা স্থান জুড়ে আছে বলে থাকে। দেখুন, আমেদী, আল-মুবীন ফী শারহি মা'আনী আলফাযিল হুকামায়ি ওয়াল মুতাকাল্লিমীন, পৃ. ৯৬; ইবন তাইমিয়্যাহ, মিনহাজুস সুন্নাহ (২/৫৫৫)।
প্রশ্ন হচ্ছে, আল্লাহকে মুতাহাইয়্যেয বা স্থান জুড়ে আছে বলা যাবে কি না? হাইয়্যেয বা মুতাহাইয়্যেয উভয় শব্দটি মুজমাল বা সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যাসাপেক্ষ শব্দ। কুরআন ও সুন্নায় তা আসেনি। সুতরাং তাতে হক্ক ও বাতিল উভয় সম্ভবনা বিদ্যমান। যতক্ষণ পর্যন্ত এর দ্বারা কী উদ্দেশ্য তা এর প্রবক্তাকে জিজ্ঞেস করে নির্ধারণ না করা হবে ততক্ষণ পর্যন্ত তা আল্লাহর জন্য ব্যবহার করা যাবে না। এটি জিসিম, জিহা, তারকীব ইত্যাদি নতুন বানোনো মুজমাল শব্দের মতোই। তবে মৌলিক নীতি হচ্ছে তা আল্লাহর জন্য ব্যবহার করা যাবে না; কিন্তু কেউ যদি ব্যবহার করে ফেলে তখন কেবল তার উদ্দেশ্য জিজ্ঞেস করা হবে, অর্থ শুদ্ধ হলে অর্থটি অন্য বিশুদ্ধ শব্দের মাধ্যমে বর্ণনা করা হবে, আর যদি অর্থ শুদ্ধ না হয় তবে তার শব্দ ও অর্থটি উভয়টি বাতিল বলে গণ্য হবে।
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "পরবর্তী লোকেরা যেসব শব্দ আল্লাহর জন্য ব্যবহার করা নিয়ে ইতিবাচক বা নেতিবাচক যে মতভেদে লিপ্ত হয়েছে, তাতে কারও জন্য জায়েয নয় নিজে তা আল্লাহর জন্য ব্যবহার করবে অথবা অন্য কেউ ব্যবহার করলে তার সাথে সেটাতে একমত হবে; যতক্ষণ না সেটার প্রবক্তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানা যাচ্ছে। যদি হক্ক কোনো অর্থ হয় তবে অর্থটি গ্রহণ করা হবে। আর যদি বাতিল হয়, তবে সেটি প্রত্যাখ্যান করা হবে। আর যদি তার বক্তব্য হক্ক ও বাতিল উভয়টি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয় তবে মোটেই তা গ্রহণ করা হবে না, তবে সকল অর্থ প্রত্যাখ্যান করা হবে না। শব্দটিকে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়ে অর্থকে ব্যাখ্যা করে বিশুদ্ধ আকারে বুঝিয়ে দিতে হবে। যেমনটি দেখা যায়, কিছু মানুষ জিহা ও হাইয়্যেয নিয়ে মতভেদ করেছে।" দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, আত-তাদমুরিয়‍্যাহ ৬৫-৬৬; মাজমু' ফাতাওয়া (৩/২৯৮-৩০৯), (১২/১১৪-১১৬), (১৩/১৪৫-১৪৬, ৩০৪-৩০৫); ইবন তাইমিয়্যাহ, মিনহাজুস সুন্নাহ (২/১৩৫, ৫২৭, ৫৫৫, ৫৬১); নাক্বদূত তা'সীস (১/৪৭৭-৪৭৮), (২/১৩-১৪)।
১০৫৪. 'জাওহার' হচ্ছে এমন কোনো জিনিস যা নিজের ওপর নিজে অবস্থান নিতে পারে, আর যা জায়গা জুড়ে থাকে (মুতাহাইয়্যিয)। জাওহার দু' প্রকার: এক. জাওহার 'বাসীত্ব', সেটি এমন জাওহার যাকে 'আল-জাওহার আল-ফারদ' বলা হয়। এর বেশিষ্ট্য হচ্ছে যে, এ জাওহারটি এত ছোট এটম যে, তা আর বাস্তবে বা ক্ষমতা কোনোভাবেই ভাগ করা যায় না। দুই, 'জাওহার মুরাক্কাব', সেটি এমন জাওহার যাকে জিসিম বলা হয়। এর পরিচয় হচ্ছে যে, তাতে দুই বা ততোধিক 'আল-জাওহার আল-ফারদ' দিয়ে গঠিত। আল-মুবীন ফী শারহি মা'আনী আলফাযিল হুকামারি ওয়াল মুতাকাল্লিমীন, পৃ. ১০৯-১১০।
১০৫৫. শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ অন্য জায়গায় এসব শব্দ অর্থাৎ জিসিম, তারকীব, তাহাইয়্যুয ইত্যাদি নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, জিসিম, তারকীব, তাহাইয়্যুষ... এ শব্দগুলোতে ইশতেরাক (একাধিক সম অর্থ) ও ইজমাল (সংক্ষিপ্ত ও ব্যাখ্যাসাপেক্ষ) রয়েছে, যা বিস্তারিত আলোচনা ও বর্ণনার দাবি রাখে।
আর সিফাত বা গুণাবলিকে আরাদ্ব নাম দেয়া, আর সকল 'আরাদ্ব' জিসিম ও জাওহার ছাড়া থাকতে পারে না, এটি একটি বাতিল কথা। কারণ সিফাত বা গুণাবলি কখনো জিসিম বা জাওহারের বৈশিষ্ট্য নয়, বরং আরাদ্ব আরাদ্বের ওপর ভিত্তি করেও থাকতে পারে, সেজন্য 'আরাদ্ব' এরও গুণ হতে পারে, যেমন বলা হয় (حر شدید) কঠিন গরম (محبة قوية) শক্তিশালী ভালোবাসা...। আর তাদের দাবি, প্রতিটি জিসিমই 'জাওয়াহির মুফরাদাহ' (একাধিক জাওহার আল ফার্দ) দ্বারা সৃষ্ট, এ তো দিশেহারা, থেমে যাওয়া, মতভেদ ও অস্থিরতার জায়গা (এ ব্যাপারে এগুলো সবই রয়েছে)। তারপর তারা যে 'জাওহার আল-ফার্দ' এর দাবি করছে তার অস্তিত্বের ওপরই কোনো প্রমাণ নেই। এজন্য শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, 'জাওহার আল-ফার্স' এটি রাফেদ্বী সম্প্রদায়ের মা'সূম (নিরপরাধ) নীতির মতো, মুস্তাযির (অপেক্ষমান) ব্যক্তির মতো এবং সূফীদের গাউস এর মতো।' দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (২/২৫৯)। আর তারা যে তামাসুলুল আজসাম (تماثل الأجسام) 'সকল জিসিম একই রকম' এ নীতির দাবি করছে এটি হচ্ছে সবচেয়ে বড় বাতিল ও অসার কথা; বরং এটি যে বিনষ্ট নীতি তা অত্যাবশ্যকীয়ভাবে জানা যায়। কেউ কি বলবে যে, মাটি কখনো সর্বদিক থেকে সোনার মতো?! দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আকলি ওয়ান নাকলি (১/১০০, ১৫৮), (৫/২৪৭); মিনহাজুস সুন্নাহ (২/৫৪০); মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/৩৪০, ৪৩৬); আল-আসফাহানিয়্যাহ, পৃ. ৪৪৮; আস-সাফাদিয়্যাহ (২/১৭); বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (২/২৫৩), (৪/১৫৪)।
১০৫৬. যেমন গ্রন্থকার যদি আশ'আরী মতবাদের হয় তখন তিনি সালাফীদেরকে মুজাসসিমা, মুশাব্বিহা নাম দিয়েছে, নিজেদের জন্য আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আত দাবি করেছে। আমরা তা স্পষ্ট দেখতে পাই উস্তাদ আবু মানসুর আল-বাগদাদীর আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক্ক গ্রন্থে, শাহরাস্তানীর আল-মিলাল ওয়ান নিহাল গ্রন্থে, অনুরূপভাবে ইবন হাযমের আল-ফাসলু গ্রন্থে। এর মধ্যে কেবল ইমাম আশ'আরী তার মাকালাত গ্রন্থে কিছুটা ইনসাফ করেছেন, যা শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ অন্যত্র উল্লেখ করেছেন। তবে আশ'আরীর সমস্যা হচ্ছে তিনি সালাফ ও আসহাবুল হাদীসের আকীদাহ ও বিশ্বাস পুরোপুরি জানতেন না।
১০৫৭. এ ছয় প্রকার লোকদের কথা শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ তার মাজমূ' ফাতাওয়ার অন্যত্রও বর্ণনা করেছেন। যেমন, (১৬/৩৯৮)।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 আল্লাহর সিফাতের ভাষ্যসমূহের সাথে আচরণের ব্যাপারে মানুষের প্রকারভেদ

📄 আল্লাহর সিফাতের ভাষ্যসমূহের সাথে আচরণের ব্যাপারে মানুষের প্রকারভেদ


মোটকথা, সিফাতের আয়াত ও হাদীসের ব্যাপারে সম্ভাব্য ছয়টি প্রকার পাওয়া যায় (১০৫৭); প্রত্যেক প্রকারের মধ্যে ক্বিবলার অনুসারী কোনো না কোনো গোষ্ঠী রয়েছে। (প্রথম) দু'প্রকার: তারা বলে, এ সিফাতগুলো 'যাহির' এর ওপর পরিচালিত হবে। অন্য দু প্রকার বলে: এ সিফাতগুলো যাহির এর বিপরীতে পরিচালিত হবে। আর বাকী দু' প্রকার: এ ব্যাপারে নীরব থাকে।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 যারা বলে এসব ভাষ্যকে প্রকাশ্য অর্থের ওপর পরিচালিত করা হবে তাদের পরিচয়

📄 যারা বলে এসব ভাষ্যকে প্রকাশ্য অর্থের ওপর পরিচালিত করা হবে তাদের পরিচয়


তন্মধ্যে প্রথম দু' প্রকারের লোকেরা নিম্নোক্তভাবে বিভক্ত:
প্রথম, যারা সেগুলোকে যাহিরের ওপর চালায় আর তাদের নিকট এসব সিফাতের যাহির বা প্রকাশ্য অর্থ হচ্ছে এগুলো সৃষ্টির সিফাতের শ্রেণিভুক্ত; এরাই হলো মুশাব্বিহা। (১০৫৮) এদের মত বাতিল, সালাফগণ সেটা অস্বীকার করেছেন। হক্বপন্থীদের পক্ষ থেকে যখন 'তাশবীহ' মতবাদ খণ্ডন করা হয় তখন তা তাদের দিকেই প্রত্যাবর্তিত হয়ে থাকে। (১০৫৯)
দ্বিতীয়, যারা এসব ভাষ্যকে আল্লাহর জন্য উপযোগী এমন যাহিরের ওপর পরিচালিত করে; যেমন তারা 'আলীম, ক্বাদীর, রব্ব, ইলাহ, মওজুদ, যাত ইত্যাদি সবগুলোকে আল্লাহর জন্য মানানসই এমন যাহিরের ওপর পরিচালিত করে। কেননা সৃষ্টির ক্ষেত্রে এসব সিফাতের যাহির হয় সৃষ্ট 'জাওহার' হবে, না হয় তার সাথে যুক্ত 'আরদ্ব' হবে।
তাই ইলম (জানা), কুদরত (ক্ষমতা), কালাম (কথা), মাশীয়াত (ইচ্ছা), রহমত (দয়া), রিদ্বা (সন্তুষ্টি), গাদ্বাব (ক্রোধ), ইত্যাদি বান্দার ক্ষেত্রে 'আরছ' হিসেবেই ধরা হবে। আর চোখ, চেহারা, হাত এগুলো বান্দার ক্ষেত্রে 'জিসম'।
সুতরাং (সিফাতী তথা) গুণ সাব্যস্তকারীদের সবার নিকট(১৮০) আল্লাহ যখন ইলম, ক্ষমতা, কালাম (কথা) ইচ্ছা ইত্যাদি গুণে গুণান্বিত, যদিও সেগুলো আরদ্ব নয়, তখন তার ওপর সেটা ব্যবহার জায়েয যেটা মাখলুকের জন্য ব্যবহার জায়েয; তাহলে (১৯৬১) আল্লাহর হাত, চেহারা এগুলো সিফাত হবে; এগুলো জিসিম হবে না, তার ওপর সেটা ব্যবহার জায়েয যেটা মাখলুকের জন্য ব্যবহার করা জায়েয।

টিকাঃ
১০৫৮. মুশাব্বিহাদের সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে, আল-হিকামিয়্যাহ সম্প্রদায়, যারা হিশাম ইবনুল হিকাম আর-রাফেদ্বীর অনুসারী। সে মনে করত যে, আল্লাহ জিসিম; তাঁর রয়েছে নির্দিষ্ট সীমা ও শেষ ঠিকানা। আর তিনি বেশ দীর্ঘ ও বেশ চওড়া। তার লম্বা ও চওড়া সমপর্যায়ের। তাদের মধ্যকার আরেক সম্প্রদায় হচ্ছে, আল-জাওয়ালীকিয়‍্যাহ, যারা হিশাম ইবন সালেম আল- জাওয়ালীকী এর অনুসারী। সে ছিল কঠিন রাফেদ্বী, তার মত হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা মানুষের সূরতে। তাদের মধ্যে আরেক সম্প্রদায় হচ্ছে, আল-হুওয়ারিয়‍্যাহ, যারা দাউদ আল-হুওয়ারীর অনুসারী। তাদের মতে তাদের মা'বুদ মানুষের সকল অঙ্গের মতো তবে লজ্জাস্থান ও দাঁড়ি ব্যতীত। তাদের মধ্যে আরেক সম্প্রদায় হচ্ছে সীমালঙ্ঘনকারী সূফী সম্প্রদায়, যারা হুলুল ও ইত্তেহাদে বিশ্বাস করে। তাদের মধ্যে আরেক সম্প্রদায় হচ্ছে কাররামিয়্যাহ সম্প্রদায়, যারা বলে আল্লাহ তা'আলা জিসম। এভাবে মুশাব্বিহাদের সংখ্যা অনেক।
বর্তমান সময়ে কাদিয়ানী সম্প্রদায় মুশাব্বিহা। তারা আল্লাহকে সামুদ্রিক অক্টোপাসের মতো মনে করে। আলেমগণ যুগ যুগ ধরে তাদের এসব কথা অস্বীকার করেছেন, তাদের অনেককে কাফেরও বলেছেন, বরং তাদেরকে এমন বাড়াবাড়ি সম্প্রদায়ের অন্তভুক্ত করেছেন যারা ৭৩ ফির্কা থেকে বের হয়ে সরাসরি কাফির হয়ে গেছে। এদের সম্পর্কে জানার জন্য দেখুন, আশ'আরী, মাক্বালাতুল ইসলামিয়্যীন (১/২৮১); বাগদাদী, আল- ফারকু বাইনার ফিরাক, পৃ. ২১৪-২১৯; উসুলুদ্দীন, পৃ. ৩৩৭-৩৩৮; রাযী, ই'তিক্বাদাতু ফিরাকিল মুসলিমীন ওয়াল মুশরিকীন, পৃ. ৯৭-১০০; শাহরাস্তানী, আল-মিলাল ওয়ান নিহাল (১/১১৮-১৩১); ইবন তাইমিয়্যাহ, মিনহাজুস সুন্নাহ (২/৫৯৮)..; মাজমূ'আতুর রাসায়িলিল কুবরা (১/১১৫); মাজমু ফাতাওয়া (৩/১৮৬), (৪/১৩৮), (৬/৩৫-৩৬), (১২/২৬৪-২৬৫)।
১০৫৯. অর্থাৎ আমাদের আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আত তথা সালাফীদের পক্ষ থেকে যখন তাশবীহ বা তামসীল নীতির খণ্ডন করা হয় তখন তাদেরকেই উদ্দেশ্য করা হয়। কিছু মু'তাযিলী, আশআরী, মাতুরিদী, কাররামীরা এদের ছাড়াও অন্যদের উদ্দেশ্য নিয়ে থাকে।
১০৬০. যেমন আশ'আরী মতবাদের লোকেরা বলে থাকে। তাদের নিকট এগুলো সাব্যস্ত করা হবে। এগুলো আরদ্ব নয়। এগুলোর এসব নাম সৃষ্টির জন্য থাকলেও আল্লাহর জন্য ব্যবহৃত হতে কোনো অসুবিধা নেই।
১০৬১. যেমন সালাফে সালেহীন ও তাদের অনুসারীদের বক্তব্য। তাদের নিকট এগুলো সাব্যস্ত করতে হবে। এগুলো জিসিম নয়। এগুলোর এসব নাম সৃষ্টির জন্য থাকলেও আল্লাহর জন্য ব্যবহৃত হতে কোনো অসুবিধা নেই; কারণ কিছু গুণের ব্যাপারে যা বলা হবে, অপর গুণের ব্যাপারেও একই নীতি অনুসৃত হতে হবে।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 যারা বলে যে বা সবর ব্যাপারে যে বক্তব্য গুণের ব্যাপারেও একই বক্তব্য প্রযোজ্য যে কেউ তার খণ্ডন জিজ্ঞেস করবে তাকে আল্লাহর সত্তার ধরন জিজ্ঞেস করা হবে

📄 যারা বলে যে বা সবর ব্যাপারে যে বক্তব্য গুণের ব্যাপারেও একই বক্তব্য প্রযোজ্য যে কেউ তার খণ্ডন জিজ্ঞেস করবে তাকে আল্লাহর সত্তার ধরন জিজ্ঞেস করা হবে


এটিই হচ্ছে সালাফদের মাযহাব যা খাত্তাবী রাহিমাহুল্লাহ ও অন্যান্যরা বর্ণনা করেছেন (১০৬২)। যারা সালাফদের বক্তব্য বর্ণনা করেছেন এটাই তাদের অধিকাংশের কথা। বাকীদের কথা এর বিপরীত নয়। (১০৮০) এটি একটি সুস্পষ্ট বিষয়; কেননা সিফাত (গুণাবলি) তো যাত (সত্তা) এর মতোই। (১০৬৪) কাজেই আল্লাহর যাত যেমন মাখলুকের মতো না হয়েও সেটা প্রকৃতভাবেই বিদ্যমান থাকতে পারলো, তেমনিভাবে তার সিফাতও মাখলুকের মতো না হয়েও সেটা প্রকৃতভাবেই বিদ্যমান থাকতে পারে।
এখন কেউ যদি বলে: আমি জ্ঞান, হাত এগুলো দ্বারা পরিচিত জ্ঞান ও হাত যেগুলো আছে সে যাতের ছাড়া আর কিছু বুঝি না, তখন তাকে বলা হবে: (যখন তুমি আল্লাহর জন্য সত্তা সাব্যস্ত করো, অথচ তুমি সে সত্তাকে দেখনি), তাহলে তুমি পরিচিত (সৃষ্টির) সত্তা ছাড়া আল্লাহর যাত কীভাবে বুঝলে? আর এটা জ্ঞাত যে, প্রত্যেক গুণওয়ালার গুণ তার সত্তা ও প্রকৃত অবস্থার সাথে উপযোগী ও সামঞ্জস্যশীল হিসেবে হয়ে থাকে। কাজেই যে আল্লাহর সিফাত- যার মতো কোনো কিছুই নেই- সেগুলোকে কেবল সৃষ্টির উপযোগী করেই বুঝেছে সে তো তার দীন ও বুদ্ধির ক্ষেত্রে পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে।
জনৈক সালাফ (১০৬৫) কতইনা সুন্দর বলেছেন: তোমাকে যখন কোনো জাহমী বলে: তিনি কীভাবে ('আরশে) আরোহন করেছেন, তিনি কীভাবে অবতরণ করেন, কেমন তাঁর হাত ইত্যাদি? তাহলে তুমি তাকে বল: কেমন তিনি তাঁর সত্তায়? অতঃপর যখন সে বলবে: তিনি কেমন এটা তিনি ছাড়া আর কেউ জানেন না, সৃষ্টিকর্তার আসল স্বরূপ মানুষের অজানা।
তাহলে তাকে বল: সিফাত (গুণ) এর ধরণ জানার জন্য মাওসুফ (যার গুণ বর্ণনা করা হচ্ছে তাঁর) ধরণ জানা আবশ্যক। তাহলে তুমি কীভাবে এমন মাওসূফের সিফাত জানতে চাও যার (সত্তার) ধরণ তোমার জানা নেই? বরং তাঁর যাত-সত্তা, তাঁর গুণাবলির বিষয়ে তো তাঁর জন্য উপযোগী হিসেবে মোটের ওপর এজমালিভাবে জানা যাবে, বিস্তারিত নয়। বরং দুনিয়াতে আমরা জান্নাতের যেসব মাখলুকের কথা শুনেছি, (যেমন জান্নাতের আঙ্গুর, কলা, ফল-ফলাদি ইত্যাদি) সেগুলো নজীর হিসেবে জান্নাতে থাকবে(১০৬০); যেমনটি ইবন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা বলেছেন, "দুনিয়াতে জান্নাতের যা যা থাকবে বলা হচ্ছে তাতে শুধু নামের দিক থেকে মিল থাকবে”। (১০৬৭)

টিকাঃ
১০৬২, শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ ইতোপূর্বে ইমাম খাত্তাবী থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন যে, তিনি বলেছেন, 'সালাফে সালেহীনের অভিমত ছিল এসব আয়াত ও হাদীসের অর্থ সাব্যস্ত করা, এগুলোকে তাদের যাহের বা প্রকাশ্য অর্থে পরিচালিত করা। আর এগুলোর জন্য কোনো ধরণ ও সাদৃশ্য নির্ধারণ না করা।'
১০৬৩. অর্থাৎ, এ কথাটি সালাফে সালেহীনের অধিকাংশ থেকে প্রচার-প্রসার লাভ করেছে; যদিও তাদের সকলে এ কথাটি স্পষ্টভাবে বলেননি। উদ্দেশ্য এটা নয় যে সেখানে কোনো বিরোধী মত রয়েছে। বাকীদের কারো কথা এর বিপরীতে আসেনি এটাই বলা উদ্দেশ্য।
১০৬৪. শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ তার আর-রিসালাতুত তাদমুরিয়্যাহ গ্রন্থে এ মূলনীতিটি বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন এভাবে যে, 'গুণের ব্যাপারে কথা যাত বা সত্তার ব্যাপারে কথা বলার মতোই'। এ বিষয়ে আরো দেখুন খতীবে বাগদাদীর বক্তব্য, যা ইমাম যাহাবী, তার আল-উলু লিল আলিয়্যিল আযীম গ্রন্থে নিয়ে এসেছেন, পৃ. ১৮৫।
১০৬৫. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ তার আর-রিসালাতুত তাদমুরিয়্যাহতেও অনুরূপ কথা বলেছেন (পৃ. ৪৪), যা থেকে মনে হয় এটা ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহরই বক্তব্য। তবে ইতোপূর্বে ইমাম উসমান ইবন সা'ঈদ আদ-দারেমী রাহিমাহুল্লাহ অনুরূপ কথা বলেছেন। দেখুন, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ, পৃ. ৯৩।
১০৬৬. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ তার একাধিক গ্রন্তে জান্নাতের উদাহরণ টেনেছেন, যেমন: ইবন তাইমিয়্যাহ, মিনহাজুস সুন্নাহ (২/১৫৭); আত-তিস'ঈনিয়্যাহ (২/৫৪৬); আস-সাফাদিয়্যাহ (১/২৮৮); আত-তাদমুরিয়্যাহ, পৃ. ৪৬; মাজমু' ফাতাওয়া (৫/২০৭, ২৫৭, ৩৪৭), (৯/২৯৫), (১১/৪৮২), (১৭/৩২৬)।
১০৬৭. ইবন জরীর আত-ত্বাবারী (১/১৭৪); আবু নু'আইম আল-আসফাহানী, সিফাতুল জান্নাহ, হাদীস নং ১২৪; বাইহাক্বী, আল-বা'সু ওয়ান নুশুর, হাদীস নং ৩৩২; ইবন আসাকির, মু'জামুশ শুয়ূখ, নং ১১৯৪; দ্বিয়াউদ্দীন আল-মাক্বদেসী, আল-আহাদীসুল মুখতারাহ (১০/১৬), হাদীস নং ৬; সিলসিলাহ সহীহাহ, নং ২১৮৮; ইবন কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম (১/৯১); সুয়ূত্বী, আদ-দুররুল মানসূর (১/৯৬)। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ অন্যত্র বলেছেন, 'যদি এসব বাস্তব জিনিস, যার নাম আল্লাহ জানিয়েছেন, তা দুনিয়াতে অস্তিত্বশীল বাস্তব জিনিসের নামের সাথে মিলে যায়, কিন্তু তা একরকম না হয়, বরং উভয়ের মধ্যে এমন পার্থক্য রয়েছে যা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না, তাহলে রাব্বুল আলামীন খালেক জাল্লা জালালাহুর সাথে অবশ্যই সৃষ্টিকুলের বড় রকমের পার্থক্য থাকবে। বরং দুনিয়ার অস্তিত্বশীল জিনিসের আখেরাতে অস্তিত্বের পার্থক্যের চেয়েও সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টির মাঝে বড় পার্থক্য সেখানে থাকবে; কারণ নামের দিক থেকে সৃষ্টির সাথে সৃষ্টির মিল থাকা বেশি কাছে, স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির মিল হওয়ার চেয়ে। আর এ বিষয়টি বেশি প্রকাশিত ও স্পষ্ট।' আর-রিসালাতুত তাদমুরিয়্যাহ, পৃ. ৪৭। অন্যত্র বলেন, 'এসব বাস্তব জিনিস যা জান্নাতে থাকবে বলে আল্লাহ আমাদের জানিয়েছেন, দুনিয়াতে এ নামে যেসব অস্তিত্বশীল বস্তু রয়েছে সেগুলোর সমান নয়; যাতে করে দুনিয়ার বস্তুগুলোর জন্য যা বৈধ হিসেবে প্রযোজ্য আখেরাতে একই নামের বস্তুগুলোর জন্য তা প্রযোজ্য হওয়া বৈধ হতে পারে, অনুরূপ দুনিয়ার বস্তুগুলোর ওপর যা প্রযোজ্য হওয়া আবশ্যক আখেরাতের বস্তুগুলোর জন্যও তা প্রযোজ্য হওয়া আবশ্যক হতে পারে, তদ্রুপ দুনিয়ার বস্তুগুলোর জন্য যা প্রযোজ্য হওয়া নিষিদ্ধ আখেরাতের বস্তুগুলোর জন্যও তা প্রযোজ্য হওয়া নিষিদ্ধ হতে পারে, তেমনি দুনিয়ার বস্তুগুলোর সৃষ্টির উপাদান আখেরাতের বস্তুগুলোর সৃষ্টি উপাদানে একই হতে হয়, অনুরূপভাবে দুনিয়ার বস্তুগুলো যেভাবে সময়ের আবর্তে অন্যকিছুতে রূপান্তরিত হয়ে যায়, আখেরাতের বস্তুগুলোও তেমনি অন্য কিছুতে রুপান্তরিত হতে হয়। বস্তুত এগুলোর কোনোটিতেই দুনিয়ার জিনিসের সাথে আখেরাতের জিনিসে মিল নেই; কারণ আমরা জানি আখেরাতের পানি বিনষ্ট হবে না, তার দুধের স্বাদ পরিবর্তন হবে না, তার মদিরা পানে মাথাব্যাথা হবে না, বিবেক বিকারগ্রস্ত হবে না, কেননা জান্নাতের পানি মাটি ভেদ করে বের হবে না, মেঘ থেকেও পড়বে না, যেমনটি দুনিয়ার মেঘের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে, অনুরূপ আখেরাতের দুধ চতুষ্পদ জন্তু থেকে হবে না, যেমনটি দুনিয়ার বুকে হয়ে থাকে, ইত্যাদি ইত্যাদি। অতঃপর যদি আখেরাতের সেসব সৃষ্ট জিনিস তার নামে দুনিয়ার সৃষ্ট জিনিসের সাথে মিলে যায়, অথচ উভয়ের মধ্যে মিল হওয়ার একক একটি পরিমাণ ও সাদৃশ্যতা রয়েছে, আর আমাদেরকে যে সম্বোধনে তা জানানো হয়েছে তা আমরা জানতে পেরেছি, অথচ এ হাকীকত ঐ হাকীকতের মতো নয়; তাহলে জান্নাতের সৃষ্ট জিনিসের সাথে একই নামের দুনিয়ার জিনিসের দূরত্বের চেয়েও মহান স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টির কারও মত হওয়া থেকে অনেক অনেক দূরে। মাজমূ' ফাতাওয়া (৯/২৯৬)। অন্যত্র তিনি বলেন, 'যদি সেসব অদৃশ্য সৃষ্টগুলো এসব দৃশ্য সৃষ্টগুলোর মতো না হয়, যদিও তাদের নাম একই, তাহলে সৃষ্ট জিনিস থেকে অপর সৃষ্ট জিনিসের যে পার্থক্য, মহান স্রষ্টার সাথে তার সৃষ্টির পার্থক্য আরও বেশি উপরে ও বেশি পৃথক, যদিও নাম একই হয়।' মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/২৫৮)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00