📄 আল্লাহ আসমানে থাকার অর্থ
অতঃপর যে ধারণা করবে যে, 'আল্লাহ আসমানে' অর্থ আসমান তাকে বেষ্টন করে রেখেছে, তাহলে সে অবশ্যই হয় মিথ্যাবাদী যদি অন্যের কথা সংকলন করে (১০০৪), আর না হয় পথভ্রষ্ট যদি সে তার রবের ব্যাপারে এমনটি বিশ্বাস করে। এ শব্দ থেকে কেউ এমন বুঝেছে এমনটি আমরা শুনিনি। আর কাউকে একজন থেকেও এমনটি বর্ণনা করতে আমরা দেখিনি। যদি সকল মুসলিমকে জিজ্ঞেস করা হয়, আল্লাহ আসমানে কথা দ্বারা কি তোমরা এটা বুঝেছ যে, আসমান তাকে ঘিরে রেখেছে, বেষ্টন করে রেখেছে?, তাহলে সবাই অতি দ্রুত বলত: এটা আমাদের কল্পনাতেও আসেনি। (১০০৫)
সুতরাং যখন প্রকৃত অবস্থা এমন হলো তখন প্রকাশ্য বিষয়কে অসম্ভব অবোধগম্য বানানো, যাতে মানুষ না বুঝে, ফলে তাকে তা'ওয়ীল করতে চাইবে, এটাই হচ্ছে 'তাকাল্লুফ' বা অযাচিত আচরণ করা; বরং মুসলিমদের নিকট এটাই নির্ধারিত যে, তিনি আসমানে, তিনি 'আরশের উপরে দু'টো একই কথা। যেহেতু আসমান দ্বারা উদ্দেশ্য উঁচু, তাই এটার অর্থ তিনি উঁচুতে, নিচুতে নয়। আবার মুসলিমগণ জানে যে, আল্লাহর কুরসীতে আসমান- যমীনের জায়গা হয়, আর কুরসী 'আরশের তুলনায় শূন্য ভূখণ্ডে ফেলে রাখা আংটির ন্যায়। আর 'আরশ আল্লাহর সৃষ্টিসমূহের একটি, আল্লাহর ক্ষমতা ও বড়ত্ব-মহত্বের সাথে সেটার কোনো তুলনা নেই। এর পরেও কীভাবে ধারণা করা যেতে পারে যে, একটা মাখলুক তাঁকে পরিবেষ্টন করতে পারে?
আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: (ফির'আউন বলেছিল) ﴿وَلَأُصَلِّبَنَّكُمْ فِي جُذُوعِ النَّخْلِ) [طه: ٧١] 'আর আমি তোমাদেরকে খেজুর গাছের কাণ্ডে শূলিবিদ্ধ করবই।" [সূরা ত্বা-হা: ৭১] তিনি আরও বলেন, ﴿فَسِيرُوا فِي الأَرْضِ﴾ [آل عمران: ۱۳۷] "সুতরাং তোমরা যমীনে ভ্রমণ কর।" [সূরা আলে ইমরান: ১৩৭] এখানে في টি على অর্থে। (১০০৬) অনুরূপ আরও আছে। এটা তো হাকীকী আরবী কথা, রূপক নয়। এটা সেই জানে যে (হুরুফুল মা'আনী) আরবী অর্থপূর্ণ হরফসমূহের হাকীকী অর্থ জানে। বস্তুত এ (হুরুফুল মা'আনী) গুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে মুতাওয়াত্বিয়াহ (প্রতিটি অর্থের মাঝে একক কোনো জায়গায় মিল থাকবে), মুশতারিকা (প্রতিটি অর্থ পরস্পর বিরোধপূর্ণ, এমন) নয়। (১০০৭)
"ইজা ক্বা-মা আহাদুকুম ইলাস সালাতি ফাইন্নাল্লাহা ক্বিলা ওয়াজহাহু, فালা ইয়াবসুক্ব ক্বিলা ওয়াজহিহী : তোমাদের কেউ সালাতে দাঁড়ালে আল্লাহ তার চেহারার সম্মুখে থাকেন, কাজেই সে যেন সামনে থুথু না ফেলে।"(১০০৮) এ হাদীসটিও হক্ক ও যথার্থভাবে তার যাহেরী বা প্রকাশ্য অর্থেই গ্রহণ করা হবে। কারণ মহান আল্লাহ 'আরশের উপরে, আবার তিনি মুসল্লির সম্মুখেও। (১০০৯) তাছাড়া এ গুণটি তো মাখলুক বা সৃষ্টির জন্যও সাব্যস্ত হতে পারে; কেননা মানুষ যদি আকাশের সাথে আলাপ করে বা চন্দ্র-সূর্যের সাথে চুপে চুপে আলাপ করে তাহলে আসমান, চন্দ্র-সূর্য তার উপরে থাকে এবং তার সম্মুখেও থাকে।
বস্তুত নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দ্বারা উপমা পেশ করেছেন। আর আল্লাহর জন্য তো রয়েছে সর্বোচ্চ উপমা। তবে উপমা দ্বারা উদ্দেশ্য এটা জায়েয ও সম্ভব বর্ণনা করা, স্রষ্টাকে সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য দেয়া নয়। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
«ما منكم من أحد إلا سيرى ربه مخليا به». فقال له أبو رزين العقيلي : كيف يا رسول الله، وهو واحد ونحن جميع؟ فقال النبي صلى الله عليه وسلم: «سأنبئك مثل ذلك في آلاء الله، هذا القمر كلكم يراه مخليا به وهو آية من آيات الله، فالله أكبر»(১০১০) অথবা নবীজি যেমনটি বলেছেন তেমন।
তিনি আরও বলেছেন: «إنكم سترون ربكم كما ترون الشمس والقمر "তোমরা তোমাদের রবকে অবশ্যই দেখতে পাবে যেমন তোমরা চন্দ্র-সূর্য দেখে থাক।"(১০১১) নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখাকে দেখার সাথে সাদৃশ্য দিয়েছেন, যদিও দৃষ্টটি অপর দৃষ্টের সদৃশ নয়। (১০১২) তাই মুমিনগণ যখন তাদের রবকে কিয়ামতের দিন দেখতে পাবে এবং তাঁর সাথে কথা বলবে প্রত্যেকেই তাঁকে উপরে সম্মুখে দেখবে, যেমন চন্দ্র-সূর্যকে দেখে। কোনো বৈপরীত্য নেই।
টিকাঃ
১০০৩. ঊর্ধ্ব দিক একটি পূর্ণাঙ্গ গুণ ও প্রশংসার গুণ। চাই সেটাকে সত্তাগতভাবে উপরে বলা হোক কিংবা সম্মানের দিক থেকে উপরে ধরা হোক। তার বিপরীতে নিচে থাকা সাধারণত নিন্দিত। তাই আল্লাহ তা'আলাকে নিচে থাকার গুণ প্রদান করা হলে মানুষ তার স্বাভাবিক ফিত্বরাতের মাধ্যমেই বুঝতে পারে যে, আল্লাহ তা থেকে পবিত্র। নিচে থাকা মানুষের জন্যও নিন্দিত, তাহলে স্রষ্টার জন্য সেটা তো নিন্দিত হবেই। যেমনটি ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল বলেন, 'আমি যত নিচের জিনিস পেয়েছি সবই নিন্দিত...'। দেখুন, আর-রাদ্দু 'আলায় যানাদিক্কাতি ওয়াল জাহমিয়্যাহ, পৃ. ২৮৭; ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৫/৭৩, ৯৯)।
১০০৪. বিশেষ করে যদি কেউ সালাফদের থেকে এমন কথা বর্ণনা করে। কারণ সালাফরা কেউই এমন কথা বলেননি।
১০০৫. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ অন্যত্র এ অংশের ব্যাখ্যা করে বলেন, 'তুমি যদি সেসব লোকদের জিজ্ঞাসা কর যারা তাদের রবকে ডাকে, তুমি কি তোমার রব আল্লাহ তা'আলাকে তোমার অন্তরে তোমার দেখা কোনো জীবিত সক্ষম ও জ্ঞানী মানুষের মত বিশ্বাস কর? তবে তুমি যাকে প্রশ্ন করেছ সে অবশ্যই বলবে, এ বিষয়টি কখনও আমার অন্তরে উদিত হয়নি, বরং যে এ রকম বলেছে, অথবা যে এমন বিশ্বাস করবে তাকে এত ঘৃণা করবে সে রকম ঘৃণার চেয়েও বেশি যে ফিরিশতাদেরকে মাছি বা চড়ুই পাখির মতো মনে করবে। মোটকথা: বনী আদম এটা নিজেদের ব্যাপারে ভালো করেই জানে যে, তাদেরকে এ বিশ্বাসের দিকে কোনো কিছুই ঠেলে দেয় না যে তারা আল্লাহকে মানুষের মতো মনে করবে বা মনুষ্য প্রজাতির মনে করবে। সুতরাং বনী আদমের ওপর এমন দাবি করা তাদের ওপর মিথ্যা রটনা।' ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৪/৬১০-৬১১)।
১০০৬. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এ বিষয়টি তার আর-রিসালাতুত তাদমুরিয়্যাহ গ্রন্থের চতুর্থ নীতিতে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। বিষয়টির সারসংক্ষেপ হচ্ছে: ক) যে কেউ মনে করবে আল্লাহ তা'আলাকে আসমানে বা আরশের উপর সাব্যস্ত করা দ্বারা প্রকাশ্য অর্থে সৃষ্টির মত করে ফেলা হয়, তাহলে সে সর্বসম্মতিতে মূর্খ ও পথভ্রষ্ট। খ) ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, 'ফী' অব্যয়টি, যাকে আরবী ব্যাকরণের নাহুবিদরা 'যরফ' বা স্থান বলে, তা মূলত প্রতি জায়গায় তার ব্যবহারবিধি উপযোগী অর্থ প্রদান করে। যখন বলা হবে, ফলের মাঝে স্বাদ, রং ও গন্ধ ঢুকানো আছে অথবা বলা হবে, জ্ঞান, ক্ষমতা ও কথা এগুলো বক্তার মাঝে প্রবিষ্ট আছে, তাহলে সে অর্থটি (যরফ) বা স্থান বুঝানো অবশ্যই বিবেকের যুক্তির দাবি। কিন্তু যখন বলা হবে, এ লোকটি তার ঘরে প্রবিষ্ট অথবা পানি তার ভাণ্ডারে প্রবিষ্ট তখন সেটার ভিন্ন। কারণ আগের উদাহরণ দু'টিতে সিফাত তার মাওসূফে প্রবিষ্ট ছিল, কিন্তু পরবর্তী উদাহরণ দু'টিতে পূর্ণ অবয়ব বিশিষ্ট সত্তা যা জিসিম বা জাওহার বলা হয় তা তার প্রবিষ্ট হওয়ার স্থানে প্রবেশ করেছে। সেজন্যই লোকদের বাসস্থানের জায়গাকে মহল্লা বলা হয়। আর বলা হয়, অমুক প্রবেশ করেছে অমুক জায়গাতে। আর যখন বলা হয়, সূর্য ও চন্দ্র পানির মাঝে, অথবা আয়নার মাঝে, অথবা অমুকের চেহারা আয়নার মাঝে অথবা অমুকের কথা কাগজের মধ্যে, তখন সেটার ভিন্ন আরেক অর্থ রয়েছে যা মানুষ মাত্রই বুঝতে পারে। তারা জানতে পারে যে, সূর্য, চাঁদ ও চেহারা আয়নায় প্রকাশিত হয়েছে ও তাতে দেখা গেছে, সেগুলোর সত্তা কখনও তাতে প্রবেশ করেনি। তাতে তো প্রবেশ করেছে কেবল প্রতিবিম্বের মত কিছু, যারা এটা বলে থাকে। অনুরূপভাবে কোনো কথা যখন কাগজে লেখা হয়, তখন মানুষ ভালো করেই জানে যে, এ কথা তাতে লেখা হয়েছে, তাতে পঠিত হবে, তার দিকে তাকিয়ে থাকা হবে। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, আল-জাওয়াবুস সহীহ (৩/৯১-৯২)।
তিনি আরও বলেন, 'নিঃসন্দেহে 'ফী' অব্যয়টি তার আগের ও পরের কথার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে অর্থ প্রকাশ করে। সুতরাং সেটি কিসের দিকে সম্বন্ধিত হলো তা দেখতে হবে, সেটা অনুসারেই তার অর্থ নির্ধারিত হবে। আর সে জন্যই কোনো কিছু কোনো স্থানে থাকা আর কোনো জিসিম অপর (হাইয়্যেয) অবস্থানে থাকা এবং কোনো 'আরাদ্ব' (গুণ) জিসিমের (শরীরের) মাঝে থাকা, কোনো চেহারা আয়নায় থাকা, কোনো কথা কাগজে থাকা এগুলোর মধ্যে পার্থক্য করা জরুরী। কারণ এর প্রতিটি প্রকারের রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য যা তাকে অন্যদের থেকে পৃথক করে দেয়, যদিও সেসব জায়গার সব স্থানেই 'ফী' ব্যবহার করা হয়েছে।
তাই যদি কেউ বলে, 'আরশ কি আসমানে নাকি যমীনে? তাকে বলা হবে, আসমানে। আর যদি বলা হয়, জান্নাত কি আসমানে নাকি যমীনে? তাকে বলা হবে, জান্নাত আসমানে। এর দ্বারা এটা আবশ্যক হয় না যে, আরশ আসমানসমূহের ভিতরে, বরং অনুরূপভাবে জান্নাতও নয়।' মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/৫২); আর-রিসালাতুত তাদমুরিয়্যাহ, পৃ. ৮৫-৮৬।
গ) আল্লাহ আসমানে বা 'আরশে উভয় কথার উদ্দেশ্য একই। আর তা হচ্ছে, নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা উপরে, আর উপরে থাকা এ কথাটি সকল সৃষ্টিকুলের উপরে থাকাকেই বুঝায়। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আক্কলি ওয়ান নাকলি (৭/১৬)।
ঘ) যদি ধরে নেয়া হয় যে, আসমান দ্বারা উপরস্থিত গোলকসমূহকে বুঝানো হয়েছে। তবে অবশ্যই অর্থ করতে হবে, তিনি সেটারও উপরে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, )فَسِيحُوا فِي الْأَرْضِ( 'অতঃপর তোমরা যমীনের মাঝে বিচরণ করো' [সূরা আত-তাওবাহ: ০২] অর্থাৎ যমীনের উপরে।
১০০৭. বিষয়টি বুঝার জন্য দেখুন, ইবন তাইমিয়্যা, নাকছুত তা'সীস (১/৫৫৭)...; মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/৫২), (৫/২৫৬-২৫৮)।
১০০৮. হাদীসটির তাখরীজ আগে চলে গেছে।
১০০৯. এটা স্থিরিকৃত বিষয় যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর আসমানসমূহের উপরে তাঁর 'আরশের উপরে, সৃষ্টিকুল থেকে পৃথক, তাঁর সৃষ্টিকুলের মাঝে তাঁর সত্তার কোনো কিছু নেই, আর না সত্তায় তাঁর সৃষ্টিকুলের কোনো কিছু আছে। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা 'আরশের প্রতি মুখাপেক্ষী নন, সকল সৃষ্টিকুলের কারো প্রতিই তিনি মুখাপেক্ষী নন। বরং তিনিই তাঁর ক্ষমতায় 'আরশ ও 'আরশ বহনকারীদের বহন করে আছেন। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (১/৩৬৭), কায়েদাহ জালীলাহ ফিত তাওয়াসসুলে ওয়াল ওসীলাহ, পৃ. ৩৩৫।
বান্দা যখন সালাতে দাঁড়ায় তখন সে তার রবের মুখোমুখি হয় আর আল্লাহও তার দিকে তাঁর চেহারা নিয়ে অগ্রসর হন, যখন না বান্দা তার চেহারাকে অন্য দিকে না ঘুরায়। বস্তুত এটার ওপর বহু সহীহ হাদীস মুতাওয়াতির সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়ে এসেছে। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী, 'যখন তোমাদের কেউ সালাতে দাঁড়ায় তখন তো সে তার রবের মুখোমুখি হয়', যদি তাই হয়ে থাকে, তবে বান্দা যেদিকেই মুখ করুক না কেন সে তো আল্লাহর চেহারার মুখোমুখি হয়। আর আল্লাহ তাঁর 'আরশের উপর, তাঁর আসমানসমূহের উপর, অথচ তিনি পুরো জগতকে ঘিরে আছেন, সুতরাং বান্দা যদিকেই মুখ ফিরাক না কেন আল্লাহ তা'আলা তো তার সামনে হবেই।' দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৬/৭৬); মাজমু ফাতাওয়া (৬/১৭)।
এ হাদীসটিকে একদল হাদীস ব্যাখ্যাতা তা'ওয়ীল বা অপব্যাখ্যা করেছে। তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন হাফেয ইবন হাজার, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন, তিনি এ হাদীসে আসা ভাষ্য 'অথবা তাঁর রব্ব অবশ্যই তার ও কিবলার মাঝে থাকেন।' এর ব্যাখ্যায় ইবন হাজার বলেন, 'অনুরূপ এর পরের হাদীসে এসেছে, 'কারণ আল্লাহ তা'আলা তার চেহারার বিপরীতে', তাই খাত্তাবী বলেন, এর অর্থ হচ্ছে, কিবলার দিকে তার মুখ করে দাঁড়ানোই তাকে তার রবের ইচ্ছার দিকে নিয়ে যাবে।' তাই সূক্ষ্ম অর্থ হবে, 'তখন তার উদ্দেশ্য তো তার ও তার কেবলার মাঝখানে। আবার কারও কারও মতে, সেখানে একটি মুযাফ বা সন্ধন্ধ পদ উহ্য রয়েছে, অর্থাৎ আল্লাহর মহত্ব অথবা আল্লাহর সাওয়াব। ইবন আব্দিল বার বলেন, এটি একটি বাক্য যা কিবলার মর্যাদার মহত্ব বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। এর ওপর ভিত্তি করে কোনো কোনো মু'তাযিলা দলীল নিয়েছে যে, আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান, নিঃসন্দেহে এটি প্রকাশ্য মূর্খতা। কারণ হাদীসে এসেছে সে যেন তার পায়ের নিচে থুতু ফেলে, এর মাঝে তাদের মূলনীতি ধূলিস্মাৎ হয়ে যায়। আর এর মাঝে তাদের কথারও খণ্ডন রয়েছে যারা বলে, আল্লাহ তা'আলা সত্তাগতভাবে 'আরশের উপর, আর এটাকে যেভাবে তা'ওয়ীল করা হবে ঐটাকেও অনুরূপ তা'ওয়ীল করে বলা যাবে।' ইবন হাজার, ফাতহুল বারী (১/৫০৮)। আর খাত্তাবীর কথা শুনুন তারই গ্রন্থ আ'লামুস সুনান (১/৩৮৬)।
ইবন হাজার রাহিমাহুল্লাহর এ বক্তব্যের যথাযথ সমালোচনা করেছেন দু'জন প্রখ্যাত আলেম। একজন হচ্ছেন শাইখ আব্দুল আযীয ইবন আব্দুল্লাহ ইবন বায, আরেকজন হচ্ছেন শাইখ আব্দুর রহমান ইবন সালেহ আল-বাররাক। শাইখ আব্দুল আযীয ইবন বায রাহিমাহুল্লাহ যখন ইবন হাজার রাহিমাহুল্লাহ'র এ কথাটি ভুল হওয়া তুলে ধরলেন যেখানে তিনি বলেছেন, 'এ হাদীসে তাদের বক্তব্যের খণ্ডন রয়েছে যারা বলে আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং 'আরশের উপরে'... তখন তিনি বললেন, 'এসব ভাষ্য ও অনুরূপ ভাষ্যকে আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক তাঁর 'আরশের উপর উঠার ভাষ্যসমূহের বিপরীতে দাঁড় করানো জায়েয হবে না; কারণ তাঁর 'আরশের উপর উঠা সংক্রান্ত ভাষ্যগুলো অকাট্য, সুদৃঢ় ও সুস্পষ্ট।' দেখুন, ফাতহুল বারীর ওপর শাইখ ইবন বায রাহিমাহুল্লাহ'র টীকা (১/৫০৮)। শাইখ আব্দুর রহমান সালেহ আল-বাররাক বলেন, '... অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলার সর্বোচ্চ সত্তা হওয়া, 'আরশের উপরে উঠা সংক্রান্ত যা কিছু এসেছে তা এ হাদীস, যেখানে বলা হয়েছে যে, 'নিশ্চয় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা সালাত আদায়কারীর চেহারার সম্মুখে থাকেন' অথবা 'তিনি সালাত আদায়কারী ও কিবলার মাঝখানে থাকেন' এ হাদীসের বিপরীত বা বিরোধী নয়; কারণ এখানে সেটাই বলা হবে যা আল্লাহর নৈকট্য ও সাথে থাকার ব্যাপারে বলা হয়ে থাকে। এসব কিছুর কোনোটিই তাঁর সর্বোচ্চ সত্তা হওয়া বিরোধী নয়। এসবের কোনো কিছুই মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাঁর সৃষ্টিকুলের মধ্যে প্রবিষ্ট হওয়া আবশ্যক করে না। দেখুন, ফাতহুল বারীর ওপর শাইখ আল-বাররাক এর টীকা (২/১৩২)।
১০১০ হাদীসটি কাছাকাছি শব্দে যারা বর্ণনা করেছেন, ১- আবু দাউদ, আস-সুনান (৫/৯৯-১০০), নং ৪৭৩১। ২- ইবন মাজাহ, আস-সুনান (১/৬৪), নং ১৮০। ৩- আহমাদ, আল-মুসনাদ (৪/১১-১৪), নং ১৬১৮৬, ১৬১৯২, ১৬১৯৮। ৪- ত্বায়ালিসী, পৃ. ১৪৭, নং ১০৯৪; ৫- হাকিম, আলমুস্তাদরাক (৪/৬০৫)। হাদীসটি হাসান। ৬- ইবন হিব্বান, আস-সহীহ, পৃ. ৪০, নং ৩৯। ৭- ইবন আবী আসেম, আস-সুন্নাহ (১/২০০), নং ৪৫৯, ৪৬০। ৮- ইবন খুযাইমাহ, আত-তাওহীদ (১/৪৩৮-৪৩৯), নং ২৫৩-২৫৪। ৯- আজুররী, 'আত-তাসদীক বিন-নাযরি ইলাল্লাহ বিল আখিরাহ, পৃ. ৫৩-৫৪। ১০- লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ (২/৪৮৩)।
১০১১. এর তাখরীজ আগে চলে গেছে।
১০১২, দেখাকে দেখার সাথে তুলনা করা হয়েছে, দৃষ্টকে দৃষ্টের সাথে তুলনা করা হয়নি। এ বিষয়টি ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বহু জায়গায় তুলে ধরেছেন। যেমন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/৪৭), (৫/১৭৫), (১১/৪৮১), (১৭/৩১৯), (১৮/২০০)। আর আল্লাহর দেখাকে সূর্য ও চন্দ্র দেখার সাথে তুলনার কারণ: ১- প্রকাশিত ও স্পষ্ট হওয়ার দিক থেকে। ২- উপরে ও ঊর্ধ্বে হওয়ার দিক থেকে। ৩- দেখার মাধ্যমে পূর্ণ আয়ত্ব বা পরিবেষ্টন করা সম্ভব না হওয়ার দিক থেকে। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'এভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখাকে দেখার সাথে তুলনা করলেন, কিন্তু দেখা জিনিসকে দেখা জিনিসের সাথে তুলনা করেননি; কেননা 'কাফ' হচ্ছে তাশবীহ বা 'তুলনা' প্রদানকারী অব্যয় যা 'রুইয়াহ' বা দেখার ওপর ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। অনুরূপ ইমাম বুখারীর বর্ণনায় এসেছে, 'তারা তাঁকে চাক্ষুষ দেখতে পাবে'। আর জানা কথা যে, আমরা সূর্য ও চাঁদকে চাক্ষুষ সামনাসামনি দেখতে পাই, তাই হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী আমরা আল্লাহকে সেভাবে দেখা আবশ্যক। কিন্তু যে জিনিস চাক্ষুষ হয় না, বা যে জিনিসের মুখোমুখি হওয়া যায় না, তা দেখার বিষয়টি বিবেক কখনো কল্পনাও করতে পারে না, তাহলে সেটা সূর্য বা চাঁদ দেখার সাথে তুলনীয় কীভাবে হতে পারে? মাজমূ' ফাতাওয়া (১৬/৮৪-৮৫)। (সুতরাং চাঁদ দেখার সাথে তুলনা করার উপকারিতা জানা গেল যে, তাঁকে উপরের দিকে দেখা যাবে।)
অতঃপর যে ধারণা করবে যে, 'আল্লাহ আসমানে' অর্থ আসমান তাকে বেষ্টন করে রেখেছে, তাহলে সে অবশ্যই হয় মিথ্যাবাদী যদি অন্যের কথা সংকলন করে (১০০৪), আর না হয় পথভ্রষ্ট যদি সে তার রবের ব্যাপারে এমনটি বিশ্বাস করে। এ শব্দ থেকে কেউ এমন বুঝেছে এমনটি আমরা শুনিনি। আর কাউকে একজন থেকেও এমনটি বর্ণনা করতে আমরা দেখিনি। যদি সকল মুসলিমকে জিজ্ঞেস করা হয়, আল্লাহ আসমানে কথা দ্বারা কি তোমরা এটা বুঝেছ যে, আসমান তাকে ঘিরে রেখেছে, বেষ্টন করে রেখেছে?, তাহলে সবাই অতি দ্রুত বলত: এটা আমাদের কল্পনাতেও আসেনি। (১০০৫)
সুতরাং যখন প্রকৃত অবস্থা এমন হলো তখন প্রকাশ্য বিষয়কে অসম্ভব অবোধগম্য বানানো, যাতে মানুষ না বুঝে, ফলে তাকে তা'ওয়ীল করতে চাইবে, এটাই হচ্ছে 'তাকাল্লুফ' বা অযাচিত আচরণ করা; বরং মুসলিমদের নিকট এটাই নির্ধারিত যে, তিনি আসমানে, তিনি 'আরশের উপরে দু'টো একই কথা। যেহেতু আসমান দ্বারা উদ্দেশ্য উঁচু, তাই এটার অর্থ তিনি উঁচুতে, নিচুতে নয়। আবার মুসলিমগণ জানে যে, আল্লাহর কুরসীতে আসমান- যমীনের জায়গা হয়, আর কুরসী 'আরশের তুলনায় শূন্য ভূখণ্ডে ফেলে রাখা আংটির ন্যায়। আর 'আরশ আল্লাহর সৃষ্টিসমূহের একটি, আল্লাহর ক্ষমতা ও বড়ত্ব-মহত্বের সাথে সেটার কোনো তুলনা নেই। এর পরেও কীভাবে ধারণা করা যেতে পারে যে, একটা মাখলুক তাঁকে পরিবেষ্টন করতে পারে?
আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: (ফির'আউন বলেছিল) ﴿وَلَأُصَلِّبَنَّكُمْ فِي جُذُوعِ النَّخْلِ) [طه: ٧١] 'আর আমি তোমাদেরকে খেজুর গাছের কাণ্ডে শূলিবিদ্ধ করবই।" [সূরা ত্বা-হা: ৭১] তিনি আরও বলেন, ﴿فَسِيرُوا فِي الأَرْضِ﴾ [آل عمران: ۱۳۷] "সুতরাং তোমরা যমীনে ভ্রমণ কর।" [সূরা আলে ইমরান: ১৩৭] এখানে في টি على অর্থে। (১০০৬) অনুরূপ আরও আছে। এটা তো হাকীকী আরবী কথা, রূপক নয়। এটা সেই জানে যে (হুরুফুল মা'আনী) আরবী অর্থপূর্ণ হরফসমূহের হাকীকী অর্থ জানে। বস্তুত এ (হুরুফুল মা'আনী) গুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে মুতাওয়াত্বিয়াহ (প্রতিটি অর্থের মাঝে একক কোনো জায়গায় মিল থাকবে), মুশতারিকা (প্রতিটি অর্থ পরস্পর বিরোধপূর্ণ, এমন) নয়। (১০০৭)
"ইজা ক্বা-মা আহাদুকুম ইলাস সালাতি ফাইন্নাল্লাহা ক্বিলা ওয়াজহাহু, فালা ইয়াবসুক্ব ক্বিলা ওয়াজহিহী : তোমাদের কেউ সালাতে দাঁড়ালে আল্লাহ তার চেহারার সম্মুখে থাকেন, কাজেই সে যেন সামনে থুথু না ফেলে।"(১০০৮) এ হাদীসটিও হক্ক ও যথার্থভাবে তার যাহেরী বা প্রকাশ্য অর্থেই গ্রহণ করা হবে। কারণ মহান আল্লাহ 'আরশের উপরে, আবার তিনি মুসল্লির সম্মুখেও। (১০০৯) তাছাড়া এ গুণটি তো মাখলুক বা সৃষ্টির জন্যও সাব্যস্ত হতে পারে; কেননা মানুষ যদি আকাশের সাথে আলাপ করে বা চন্দ্র-সূর্যের সাথে চুপে চুপে আলাপ করে তাহলে আসমান, চন্দ্র-সূর্য তার উপরে থাকে এবং তার সম্মুখেও থাকে।
বস্তুত নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দ্বারা উপমা পেশ করেছেন। আর আল্লাহর জন্য তো রয়েছে সর্বোচ্চ উপমা। তবে উপমা দ্বারা উদ্দেশ্য এটা জায়েয ও সম্ভব বর্ণনা করা, স্রষ্টাকে সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য দেয়া নয়। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
«ما منكم من أحد إلا سيرى ربه مخليا به». فقال له أبو رزين العقيلي : كيف يا رسول الله، وهو واحد ونحن جميع؟ فقال النبي صلى الله عليه وسلم: «سأنبئك مثل ذلك في آلاء الله، هذا القمر كلكم يراه مخليا به وهو آية من آيات الله، فالله أكبر»(১০১০) অথবা নবীজি যেমনটি বলেছেন তেমন।
তিনি আরও বলেছেন: «إنكم سترون ربكم كما ترون الشمس والقمر "তোমরা তোমাদের রবকে অবশ্যই দেখতে পাবে যেমন তোমরা চন্দ্র-সূর্য দেখে থাক।"(১০১১) নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখাকে দেখার সাথে সাদৃশ্য দিয়েছেন, যদিও দৃষ্টটি অপর দৃষ্টের সদৃশ নয়। (১০১২) তাই মুমিনগণ যখন তাদের রবকে কিয়ামতের দিন দেখতে পাবে এবং তাঁর সাথে কথা বলবে প্রত্যেকেই তাঁকে উপরে সম্মুখে দেখবে, যেমন চন্দ্র-সূর্যকে দেখে। কোনো বৈপরীত্য নেই।
টিকাঃ
১০০৩. ঊর্ধ্ব দিক একটি পূর্ণাঙ্গ গুণ ও প্রশংসার গুণ। চাই সেটাকে সত্তাগতভাবে উপরে বলা হোক কিংবা সম্মানের দিক থেকে উপরে ধরা হোক। তার বিপরীতে নিচে থাকা সাধারণত নিন্দিত। তাই আল্লাহ তা'আলাকে নিচে থাকার গুণ প্রদান করা হলে মানুষ তার স্বাভাবিক ফিত্বরাতের মাধ্যমেই বুঝতে পারে যে, আল্লাহ তা থেকে পবিত্র। নিচে থাকা মানুষের জন্যও নিন্দিত, তাহলে স্রষ্টার জন্য সেটা তো নিন্দিত হবেই। যেমনটি ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল বলেন, 'আমি যত নিচের জিনিস পেয়েছি সবই নিন্দিত...'। দেখুন, আর-রাদ্দু 'আলায় যানাদিক্কাতি ওয়াল জাহমিয়্যাহ, পৃ. ২৮৭; ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৫/৭৩, ৯৯)।
১০০৪. বিশেষ করে যদি কেউ সালাফদের থেকে এমন কথা বর্ণনা করে। কারণ সালাফরা কেউই এমন কথা বলেননি।
১০০৫. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ অন্যত্র এ অংশের ব্যাখ্যা করে বলেন, 'তুমি যদি সেসব লোকদের জিজ্ঞাসা কর যারা তাদের রবকে ডাকে, তুমি কি তোমার রব আল্লাহ তা'আলাকে তোমার অন্তরে তোমার দেখা কোনো জীবিত সক্ষম ও জ্ঞানী মানুষের মত বিশ্বাস কর? তবে তুমি যাকে প্রশ্ন করেছ সে অবশ্যই বলবে, এ বিষয়টি কখনও আমার অন্তরে উদিত হয়নি, বরং যে এ রকম বলেছে, অথবা যে এমন বিশ্বাস করবে তাকে এত ঘৃণা করবে সে রকম ঘৃণার চেয়েও বেশি যে ফিরিশতাদেরকে মাছি বা চড়ুই পাখির মতো মনে করবে। মোটকথা: বনী আদম এটা নিজেদের ব্যাপারে ভালো করেই জানে যে, তাদেরকে এ বিশ্বাসের দিকে কোনো কিছুই ঠেলে দেয় না যে তারা আল্লাহকে মানুষের মতো মনে করবে বা মনুষ্য প্রজাতির মনে করবে। সুতরাং বনী আদমের ওপর এমন দাবি করা তাদের ওপর মিথ্যা রটনা।' ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৪/৬১০-৬১১)।
১০০৬. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এ বিষয়টি তার আর-রিসালাতুত তাদমুরিয়্যাহ গ্রন্থের চতুর্থ নীতিতে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। বিষয়টির সারসংক্ষেপ হচ্ছে: ক) যে কেউ মনে করবে আল্লাহ তা'আলাকে আসমানে বা আরশের উপর সাব্যস্ত করা দ্বারা প্রকাশ্য অর্থে সৃষ্টির মত করে ফেলা হয়, তাহলে সে সর্বসম্মতিতে মূর্খ ও পথভ্রষ্ট। খ) ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, 'ফী' অব্যয়টি, যাকে আরবী ব্যাকরণের নাহুবিদরা 'যরফ' বা স্থান বলে, তা মূলত প্রতি জায়গায় তার ব্যবহারবিধি উপযোগী অর্থ প্রদান করে। যখন বলা হবে, ফলের মাঝে স্বাদ, রং ও গন্ধ ঢুকানো আছে অথবা বলা হবে, জ্ঞান, ক্ষমতা ও কথা এগুলো বক্তার মাঝে প্রবিষ্ট আছে, তাহলে সে অর্থটি (যরফ) বা স্থান বুঝানো অবশ্যই বিবেকের যুক্তির দাবি। কিন্তু যখন বলা হবে, এ লোকটি তার ঘরে প্রবিষ্ট অথবা পানি তার ভাণ্ডারে প্রবিষ্ট তখন সেটার ভিন্ন। কারণ আগের উদাহরণ দু'টিতে সিফাত তার মাওসূফে প্রবিষ্ট ছিল, কিন্তু পরবর্তী উদাহরণ দু'টিতে পূর্ণ অবয়ব বিশিষ্ট সত্তা যা জিসিম বা জাওহার বলা হয় তা তার প্রবিষ্ট হওয়ার স্থানে প্রবেশ করেছে। সেজন্যই লোকদের বাসস্থানের জায়গাকে মহল্লা বলা হয়। আর বলা হয়, অমুক প্রবেশ করেছে অমুক জায়গাতে। আর যখন বলা হয়, সূর্য ও চন্দ্র পানির মাঝে, অথবা আয়নার মাঝে, অথবা অমুকের চেহারা আয়নার মাঝে অথবা অমুকের কথা কাগজের মধ্যে, তখন সেটার ভিন্ন আরেক অর্থ রয়েছে যা মানুষ মাত্রই বুঝতে পারে। তারা জানতে পারে যে, সূর্য, চাঁদ ও চেহারা আয়নায় প্রকাশিত হয়েছে ও তাতে দেখা গেছে, সেগুলোর সত্তা কখনও তাতে প্রবেশ করেনি। তাতে তো প্রবেশ করেছে কেবল প্রতিবিম্বের মত কিছু, যারা এটা বলে থাকে। অনুরূপভাবে কোনো কথা যখন কাগজে লেখা হয়, তখন মানুষ ভালো করেই জানে যে, এ কথা তাতে লেখা হয়েছে, তাতে পঠিত হবে, তার দিকে তাকিয়ে থাকা হবে। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, আল-জাওয়াবুস সহীহ (৩/৯১-৯২)।
তিনি আরও বলেন, 'নিঃসন্দেহে 'ফী' অব্যয়টি তার আগের ও পরের কথার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে অর্থ প্রকাশ করে। সুতরাং সেটি কিসের দিকে সম্বন্ধিত হলো তা দেখতে হবে, সেটা অনুসারেই তার অর্থ নির্ধারিত হবে। আর সে জন্যই কোনো কিছু কোনো স্থানে থাকা আর কোনো জিসিম অপর (হাইয়্যেয) অবস্থানে থাকা এবং কোনো 'আরাদ্ব' (গুণ) জিসিমের (শরীরের) মাঝে থাকা, কোনো চেহারা আয়নায় থাকা, কোনো কথা কাগজে থাকা এগুলোর মধ্যে পার্থক্য করা জরুরী। কারণ এর প্রতিটি প্রকারের রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য যা তাকে অন্যদের থেকে পৃথক করে দেয়, যদিও সেসব জায়গার সব স্থানেই 'ফী' ব্যবহার করা হয়েছে।
তাই যদি কেউ বলে, 'আরশ কি আসমানে নাকি যমীনে? তাকে বলা হবে, আসমানে। আর যদি বলা হয়, জান্নাত কি আসমানে নাকি যমীনে? তাকে বলা হবে, জান্নাত আসমানে। এর দ্বারা এটা আবশ্যক হয় না যে, আরশ আসমানসমূহের ভিতরে, বরং অনুরূপভাবে জান্নাতও নয়।' মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/৫২); আর-রিসালাতুত তাদমুরিয়্যাহ, পৃ. ৮৫-৮৬।
গ) আল্লাহ আসমানে বা 'আরশে উভয় কথার উদ্দেশ্য একই। আর তা হচ্ছে, নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা উপরে, আর উপরে থাকা এ কথাটি সকল সৃষ্টিকুলের উপরে থাকাকেই বুঝায়। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আক্কলি ওয়ান নাকলি (৭/১৬)।
ঘ) যদি ধরে নেয়া হয় যে, আসমান দ্বারা উপরস্থিত গোলকসমূহকে বুঝানো হয়েছে। তবে অবশ্যই অর্থ করতে হবে, তিনি সেটারও উপরে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, )فَسِيحُوا فِي الْأَرْضِ( 'অতঃপর তোমরা যমীনের মাঝে বিচরণ করো' [সূরা আত-তাওবাহ: ০২] অর্থাৎ যমীনের উপরে।
১০০৭. বিষয়টি বুঝার জন্য দেখুন, ইবন তাইমিয়্যা, নাকছুত তা'সীস (১/৫৫৭)...; মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/৫২), (৫/২৫৬-২৫৮)।
১০০৮. হাদীসটির তাখরীজ আগে চলে গেছে।
১০০৯. এটা স্থিরিকৃত বিষয় যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর আসমানসমূহের উপরে তাঁর 'আরশের উপরে, সৃষ্টিকুল থেকে পৃথক, তাঁর সৃষ্টিকুলের মাঝে তাঁর সত্তার কোনো কিছু নেই, আর না সত্তায় তাঁর সৃষ্টিকুলের কোনো কিছু আছে। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা 'আরশের প্রতি মুখাপেক্ষী নন, সকল সৃষ্টিকুলের কারো প্রতিই তিনি মুখাপেক্ষী নন। বরং তিনিই তাঁর ক্ষমতায় 'আরশ ও 'আরশ বহনকারীদের বহন করে আছেন। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (১/৩৬৭), কায়েদাহ জালীলাহ ফিত তাওয়াসসুলে ওয়াল ওসীলাহ, পৃ. ৩৩৫।
বান্দা যখন সালাতে দাঁড়ায় তখন সে তার রবের মুখোমুখি হয় আর আল্লাহও তার দিকে তাঁর চেহারা নিয়ে অগ্রসর হন, যখন না বান্দা তার চেহারাকে অন্য দিকে না ঘুরায়। বস্তুত এটার ওপর বহু সহীহ হাদীস মুতাওয়াতির সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়ে এসেছে। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী, 'যখন তোমাদের কেউ সালাতে দাঁড়ায় তখন তো সে তার রবের মুখোমুখি হয়', যদি তাই হয়ে থাকে, তবে বান্দা যেদিকেই মুখ করুক না কেন সে তো আল্লাহর চেহারার মুখোমুখি হয়। আর আল্লাহ তাঁর 'আরশের উপর, তাঁর আসমানসমূহের উপর, অথচ তিনি পুরো জগতকে ঘিরে আছেন, সুতরাং বান্দা যদিকেই মুখ ফিরাক না কেন আল্লাহ তা'আলা তো তার সামনে হবেই।' দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৬/৭৬); মাজমু ফাতাওয়া (৬/১৭)।
এ হাদীসটিকে একদল হাদীস ব্যাখ্যাতা তা'ওয়ীল বা অপব্যাখ্যা করেছে। তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন হাফেয ইবন হাজার, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন, তিনি এ হাদীসে আসা ভাষ্য 'অথবা তাঁর রব্ব অবশ্যই তার ও কিবলার মাঝে থাকেন।' এর ব্যাখ্যায় ইবন হাজার বলেন, 'অনুরূপ এর পরের হাদীসে এসেছে, 'কারণ আল্লাহ তা'আলা তার চেহারার বিপরীতে', তাই খাত্তাবী বলেন, এর অর্থ হচ্ছে, কিবলার দিকে তার মুখ করে দাঁড়ানোই তাকে তার রবের ইচ্ছার দিকে নিয়ে যাবে।' তাই সূক্ষ্ম অর্থ হবে, 'তখন তার উদ্দেশ্য তো তার ও তার কেবলার মাঝখানে। আবার কারও কারও মতে, সেখানে একটি মুযাফ বা সন্ধন্ধ পদ উহ্য রয়েছে, অর্থাৎ আল্লাহর মহত্ব অথবা আল্লাহর সাওয়াব। ইবন আব্দিল বার বলেন, এটি একটি বাক্য যা কিবলার মর্যাদার মহত্ব বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। এর ওপর ভিত্তি করে কোনো কোনো মু'তাযিলা দলীল নিয়েছে যে, আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান, নিঃসন্দেহে এটি প্রকাশ্য মূর্খতা। কারণ হাদীসে এসেছে সে যেন তার পায়ের নিচে থুতু ফেলে, এর মাঝে তাদের মূলনীতি ধূলিস্মাৎ হয়ে যায়। আর এর মাঝে তাদের কথারও খণ্ডন রয়েছে যারা বলে, আল্লাহ তা'আলা সত্তাগতভাবে 'আরশের উপর, আর এটাকে যেভাবে তা'ওয়ীল করা হবে ঐটাকেও অনুরূপ তা'ওয়ীল করে বলা যাবে।' ইবন হাজার, ফাতহুল বারী (১/৫০৮)। আর খাত্তাবীর কথা শুনুন তারই গ্রন্থ আ'লামুস সুনান (১/৩৮৬)।
ইবন হাজার রাহিমাহুল্লাহর এ বক্তব্যের যথাযথ সমালোচনা করেছেন দু'জন প্রখ্যাত আলেম। একজন হচ্ছেন শাইখ আব্দুল আযীয ইবন আব্দুল্লাহ ইবন বায, আরেকজন হচ্ছেন শাইখ আব্দুর রহমান ইবন সালেহ আল-বাররাক। শাইখ আব্দুল আযীয ইবন বায রাহিমাহুল্লাহ যখন ইবন হাজার রাহিমাহুল্লাহ'র এ কথাটি ভুল হওয়া তুলে ধরলেন যেখানে তিনি বলেছেন, 'এ হাদীসে তাদের বক্তব্যের খণ্ডন রয়েছে যারা বলে আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং 'আরশের উপরে'... তখন তিনি বললেন, 'এসব ভাষ্য ও অনুরূপ ভাষ্যকে আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক তাঁর 'আরশের উপর উঠার ভাষ্যসমূহের বিপরীতে দাঁড় করানো জায়েয হবে না; কারণ তাঁর 'আরশের উপর উঠা সংক্রান্ত ভাষ্যগুলো অকাট্য, সুদৃঢ় ও সুস্পষ্ট।' দেখুন, ফাতহুল বারীর ওপর শাইখ ইবন বায রাহিমাহুল্লাহ'র টীকা (১/৫০৮)। শাইখ আব্দুর রহমান সালেহ আল-বাররাক বলেন, '... অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলার সর্বোচ্চ সত্তা হওয়া, 'আরশের উপরে উঠা সংক্রান্ত যা কিছু এসেছে তা এ হাদীস, যেখানে বলা হয়েছে যে, 'নিশ্চয় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা সালাত আদায়কারীর চেহারার সম্মুখে থাকেন' অথবা 'তিনি সালাত আদায়কারী ও কিবলার মাঝখানে থাকেন' এ হাদীসের বিপরীত বা বিরোধী নয়; কারণ এখানে সেটাই বলা হবে যা আল্লাহর নৈকট্য ও সাথে থাকার ব্যাপারে বলা হয়ে থাকে। এসব কিছুর কোনোটিই তাঁর সর্বোচ্চ সত্তা হওয়া বিরোধী নয়। এসবের কোনো কিছুই মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাঁর সৃষ্টিকুলের মধ্যে প্রবিষ্ট হওয়া আবশ্যক করে না। দেখুন, ফাতহুল বারীর ওপর শাইখ আল-বাররাক এর টীকা (২/১৩২)।
১০১০ হাদীসটি কাছাকাছি শব্দে যারা বর্ণনা করেছেন, ১- আবু দাউদ, আস-সুনান (৫/৯৯-১০০), নং ৪৭৩১। ২- ইবন মাজাহ, আস-সুনান (১/৬৪), নং ১৮০। ৩- আহমাদ, আল-মুসনাদ (৪/১১-১৪), নং ১৬১৮৬, ১৬১৯২, ১৬১৯৮। ৪- ত্বায়ালিসী, পৃ. ১৪৭, নং ১০৯৪; ৫- হাকিম, আলমুস্তাদরাক (৪/৬০৫)। হাদীসটি হাসান। ৬- ইবন হিব্বান, আস-সহীহ, পৃ. ৪০, নং ৩৯। ৭- ইবন আবী আসেম, আস-সুন্নাহ (১/২০০), নং ৪৫৯, ৪৬০। ৮- ইবন খুযাইমাহ, আত-তাওহীদ (১/৪৩৮-৪৩৯), নং ২৫৩-২৫৪। ৯- আজুররী, 'আত-তাসদীক বিন-নাযরি ইলাল্লাহ বিল আখিরাহ, পৃ. ৫৩-৫৪। ১০- লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ (২/৪৮৩)।
১০১১. এর তাখরীজ আগে চলে গেছে।
১০১২, দেখাকে দেখার সাথে তুলনা করা হয়েছে, দৃষ্টকে দৃষ্টের সাথে তুলনা করা হয়নি। এ বিষয়টি ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বহু জায়গায় তুলে ধরেছেন। যেমন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/৪৭), (৫/১৭৫), (১১/৪৮১), (১৭/৩১৯), (১৮/২০০)। আর আল্লাহর দেখাকে সূর্য ও চন্দ্র দেখার সাথে তুলনার কারণ: ১- প্রকাশিত ও স্পষ্ট হওয়ার দিক থেকে। ২- উপরে ও ঊর্ধ্বে হওয়ার দিক থেকে। ৩- দেখার মাধ্যমে পূর্ণ আয়ত্ব বা পরিবেষ্টন করা সম্ভব না হওয়ার দিক থেকে। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'এভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখাকে দেখার সাথে তুলনা করলেন, কিন্তু দেখা জিনিসকে দেখা জিনিসের সাথে তুলনা করেননি; কেননা 'কাফ' হচ্ছে তাশবীহ বা 'তুলনা' প্রদানকারী অব্যয় যা 'রুইয়াহ' বা দেখার ওপর ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। অনুরূপ ইমাম বুখারীর বর্ণনায় এসেছে, 'তারা তাঁকে চাক্ষুষ দেখতে পাবে'। আর জানা কথা যে, আমরা সূর্য ও চাঁদকে চাক্ষুষ সামনাসামনি দেখতে পাই, তাই হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী আমরা আল্লাহকে সেভাবে দেখা আবশ্যক। কিন্তু যে জিনিস চাক্ষুষ হয় না, বা যে জিনিসের মুখোমুখি হওয়া যায় না, তা দেখার বিষয়টি বিবেক কখনো কল্পনাও করতে পারে না, তাহলে সেটা সূর্য বা চাঁদ দেখার সাথে তুলনীয় কীভাবে হতে পারে? মাজমূ' ফাতাওয়া (১৬/৮৪-৮৫)। (সুতরাং চাঁদ দেখার সাথে তুলনা করার উপকারিতা জানা গেল যে, তাঁকে উপরের দিকে দেখা যাবে।)
📄 কুরআন ও সুন্নাহ’র যাহের বা প্রকাশ্য ভাবের অর্থ উদ্দেশ্য কী না?
আর যার আল্লাহ সম্পর্কে কিছু অবগতি আছে, আল্লাহ সম্পর্কে মজবুত জ্ঞান আছে, কুরআন ও সুন্নাহ'কে যেভাবে তা আছে সেভাবে স্বীকৃতি প্রদান করা তার কাছে ততোটা সৃদৃঢ়।
জেনে রাখ! পরবর্তীদের মধ্যে কেউ কেউ বলেন: সালাফে সালেহীনের মত হচ্ছে যা এসেছে, যেভাবে এসেছে, সেভাবে মেনে নেয়া। সাথে সাথে এই বিশ্বাস থাকা যে, এগুলোর যাহির (প্রকাশ্য অর্থ) উদ্দেশ্য নয় (১০১০)।
এ কথাটি 'মুজমাল' অস্পষ্ট বা ব্যাখ্যাসাপেক্ষ্য বিষয়(১০১৪); কেননা তার কথা "যাহের উদ্দেশ্য নয়” এটা সম্ভাবনা রাখে যে, তিনি 'যাহির' দ্বারা সৃষ্টির না'ত ও অপ্রাচীনের সিফাত (১০১০) উদ্দেশ্য নিয়েছেন। যেমন উপরোক্ত হাদীসের অর্থ কেউ এটা গ্রহণ করলো যে, আল্লাহ তা'আলা মুসল্লির সম্মুখে অর্থাৎ মুসল্লির সম্মুখস্থ দেওয়ালের মধ্যে স্থির হয়ে আছেন যেদিকে ফিরে সে সালাত আদায় করছে; তেমনি (কুরআনের আয়াতে) "আল্লাহ আমাদের সাথে" মানে আল্লাহ আমাদের পাশে ইত্যাদি, তাহলে সন্দেহ নেই যে, এটা উদ্দেশ্য নয়। আর যে বলবে, সালাফদের মতেও "এটা (উপরোক্ত অর্থ) উদ্দেশ্য নয়” (১০১৯) তবে অর্থের দিক থেকে তার কথাটি ঠিকই আছে। কিন্তু তার ভুল হচ্ছে, মুতলাক তথা নিঃশর্তভাবে এ কথা বলা যে, এটাই আয়াতের ও হাদীসের যাহির (প্রকাশ্য) অর্থ; কেননা (এগুলোর যাহির অর্থ হিসেবে যখন 'সাদৃশ্য প্রদান' নির্ধারণ করা হবে) তখন এটা নিশ্চিতভাবেই বলতে হবে যে, এটি অগ্রহণযোগ্য ও অসম্ভব অর্থ। আর জানা কথা যে এ অসম্ভব অর্থটি (১০১৭) কখনও যাহির (প্রকাশ্য) অর্থ নয়, যেমনটি আমরা অন্যত্র বর্ণনা করেছি। হ্যাঁ, হয়ত কিছু মানুষের কাছে এই নিষিদ্ধ অর্থটি যাহির অর্থ হিসেবে মনে হতে পারে। তাহলে এই দৃষ্টিকোণ থেকে এ বক্তার কথা সঠিক হতে পারে, তখন তার জন্য এভাবে (সাদৃশ্য)কে যাহির অর্থ বলার জন্য ওযর পেশ করতে পারে ।(১০১৮)
কেননা যাহির-বাতিন (প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য) মানুষের অবস্থার ভিন্নতায় ভিন্ন হয়, এটি একটি আপেক্ষিক বিষয়।(১০১৯) তবে উত্তম ছিল- যে বিশ্বাস করে যে, এটাই যাহির- তার জন্য এ বর্ণনা দেয়া যে, এটা যাহির নয়, যাতে সে কুরআনের ও হাদীসের শব্দ ও অর্থের যথার্থ হক্ক প্রদান করতে পারে।
আর সালাফদের কথা বর্ণনাকারী যদি, 'যাহির উদ্দেশ্য নয়' একথা দ্বারা, এটা উদ্দেশ্য নেয় যে, এসব আয়াত ও হাদীসের থেকে যে অর্থ প্রকাশ্যে বুঝা যায়, যা আল্লাহর বড়ত্ব-মহত্বের সাথে উপযুক্ত, মাখলুকের গুণের সাথে খাস নয়, বরং সেটা আল্লাহর জন্য ওয়াজিব বা জায়েয, (মনে ধরে নেয়া জায়েয, বা বাইরে অস্তিত্বশীল জায়েয) কিন্তু সেটা উদ্দেশ্য নয়, তাহলে এমন কথা কেউ সালাফদের থেকে বর্ণনা করলে তার ব্যাপারে এটা নিশ্চিতভাবে বলতে হবে যে, এই সংকলনকারী সালাফদের কথা সংকলনে ভুল করেছে অথবা ইচ্ছা করে মিথ্যা বলেছে। কেননা এটা কখনো কারো জন্য সম্ভব নয় যে, সে সালাফদের থেকে সংকলন করতে পারবে এমন কথা যে, তারা বিশ্বাস করতেন, আল্লাহ 'আরশের উপরে নন, আর আল্লাহর জন্য প্রকৃতপক্ষে কোনো শ্রবণ নেই, নেই কোনো চোখ, নেই কোনো হাত।
টিকাঃ
১০১৩, উসূলে ফিকহের আলেমগণ 'যাহির' ও 'নস' দু'টি পরিভাষা ব্যবহার করে থাকেন। তন্মধ্যে নস হচ্ছে যাতে অন্য অর্থ করার কোনো সুযোগ নেই। যেমন: তিন, চার অথবা যায়েদ, 'আমর ইত্যাদি। আর যাহির হচ্ছে, যার একটি প্রকাশ্য অর্থ বুঝা যাচ্ছে, কিন্তু ইচ্ছা করলে দূরবর্তী অর্থ গ্রহণ করার সুযোগ নেয়া যায়। যত অপব্যাখ্যা, বিকৃতি, নিষ্ক্রীয়করণ, সাদৃশ্য প্রদান, দূরবর্তী কোনো অর্থ গ্রহণ কিংবা তৈরি করা ইত্যাদি এসবই বাতিলপন্থীদের প্রধান অস্ত্র। তারা এ সুযোগ গ্রহণ করার মাধ্যমে দীনের আকীদাহ ও শরী'আহকে বিনষ্ট করেছে। এজন্য শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহকে আমরা দেখি তিনি এ মাসআলাতে অত্যন্ত সোচ্চার। বিষয়টি নিয়ে তিনি ব্যাপক আলোচনা করেছেন এবং তাদের মতামত বিস্তারিত বর্ণনা করে খণ্ডন করেছেন যারা বলে, যাহির বা প্রকাশ্য অর্থটিই গ্রহণ করা হবে না, বরং দূরবর্তী অর্থ গ্রহণ করতে হবে। দেখুন, আত-তাদমুরিয়্যাহ, তৃতীয় নীতি, পৃ. ৬৯; মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/২০৭), (৬/৩৫৫-৩৫৮), (২০/২১৮), (২৩/১৭৭-১৮৬)।
১০১৪. 'যাহেরুন নুসূস' অথবা 'যাহের' এ শব্দটিকে কালামশাস্ত্রবিদরা এতো বেশি অপব্যবহার করেছে যে তাতে ইজমাল (সংক্ষিপ্ত, ব্যাখ্যাসাপেক্ষ) ও ইশতিয়াক (একাধিক অর্থে ব্যবহৃত) শব্দ হিসেবে গণ্য হয়ে গিয়েছে। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বিষয়টি একাধিক কিতাবে আলোচনা করে স্পষ্ট করেছেন। যেমন, দারউত তা'আরুদ্ব (৭/৪৫, ১০৭); মিনহাজুস সুন্নাহ (৪/১৭৯); আত-তিস'ঈনিয়্যাহ (২/৫৫৭); মাজমূ' ফাতাওয়া (২০/১৬৬)। তিনি বলেন, 'যাহির' শব্দটিতে ইজমাল ও ইশতিরাক রয়েছে। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/৪৩); আর-রিসালাতুত তাদমুরিয়্যাহ, পৃ. ৬৯। অন্যত্র বলেন, 'যাহির' শব্দটি মুশতারাক'। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/২০৭)। অন্যত্র বলেন, 'যাহির' শব্দটি, পরবর্তীদের পরিভাষায় তাতে 'ইশতিরাক' এসে পড়েছে। মাজমূ' ফাতাওয়া (১৩/৩৭৯); আরও দেখুন, (৩৩/১৭৫); জামে'উর রাসায়িল (৮/১৮৯)। অন্যত্র তিনি এ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, 'যাহিরুল কালাম' বা কথার প্রকাশ্য রূপ বলতে বুঝায়, কোনো ভাষার লোকেরা যারা ভাষা বুঝে তাদের নিরোগ বিবেকের কাছে যা প্রথমেই যে অর্থটি প্রতিভাত হয়। দেখুন, আর-রিসালাতুল মাদানিয়্যাহ, পৃ. ৩১। তিনি আরও বর্ণনা করেন, 'যাহির' শব্দটি দ্বারা কখনও কখনও উদ্দেশ্য হয়, যা মানুষের কাছে প্রকাশ পায়। আবার কখনও কখনও এর দ্বারা উদ্দেশ্য হয় শব্দ যার ওপর প্রমাণবহ। তারপর তিনি বলেন, প্রথম উদ্দেশ্যটি মানুষের বুঝ অনুসারে হয়ে থাকে, কুরআনে কারীমে অশুদ্ধ বুঝের বিপরীত অনেক কিছু রয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটি, আর তা হচ্ছে, শব্দ যার ওপর প্রমাণবহ সেখানেই যত কথা ও যত মতভেদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, মিনহাজুস সুন্নাহ (৪/১৭৯); মাজমূ' ফাতাওয়া (২০/১৬৬)।
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ যখন 'কুরআন কি তার প্রকাশ্য অর্থের ওপর নেয়া হবে? এ প্রশ্নের উত্তর নিয়ে বক্তব্য দিলেন তখন বলেছিলেন, 'আর 'যাহির' অর্থের ওপর পরিচালিত করা বলতে যদি সে যাহির উদ্দেশ্য হয়, যে যাহির ছিল উম্মতের সালাফগণের পরিভাষা, আর তা দ্বারা কোনো শব্দকে তার স্থান বা অবস্থা বিকৃত না করে পরিচালিত করা হয়, অনুরূপ আল্লাহর নামসমূহে কোনো রূপ ইলহাদ বা বিকৃতি না করে গ্রহণ করা হয়, কুরআন ও হাদীসকে আহলুস সুন্নাহ ও উম্মতের সালাফদের ব্যাখ্যার বিরোধিতা করে ব্যাখ্যা না করা হয়, বরং সেগুলোকে ভাষ্যের চাহিদা অনুযায়ী পরিচালিত করা হয়, কুরআন ও সুন্নাহ'র দলীলসমূহের সাথে সামঞ্জস্য করা হয়, সালাফে সালেহীন যেসব বিষয়ের ওপর ইজমা' করেছে সেগুলোর সাথে মিলিয়ে প্রকাশ করা হয়, তবে সে অবশ্যই তাতে সঠিক পথে আছে। আর সেটাই হক্ক বা যথাযথ।' আত-তিস'ঈনিয়্যাহ (২/৫৪৬)।
১০১৫. ইবনুল কাইয়্যেম রাহিমাহুল্লাহ না'ত এবং সিফাত এর মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরেছেন তিনভাবে:
১) না'ত শুধু সেসব গুণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যা কর্মজাতীয় আর যা নতুন করে হয়। যেমন আল্লাহর বাণী, "নিশ্চয় তোমাদের রব্ব আল্লাহ যিনি আসমানসমূহ ও যমীন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন। তিনিই দিনকে রাত দিয়ে ঢেকে দেন, তাদের একে অন্যকে দ্রুতগতিতে অনুসরণ করে। আর সূর্য, চাঁদ ও নক্ষত্ররাজি, যা তাঁরই হুকুমের অনুগত, তা তিনিই সৃষ্টি করেছেন। জেনে রাখ, সৃজন ও আদেশ তাঁরই। সৃষ্টিকুলের রব্ব আল্লাহ কত বরকতময়!" [সূরা আল-আ'রাফ: ৫৪] অনুরূপ আল্লাহর বাণী "যিনি তোমাদের জন্য যমীনকে বানিয়েছেন শয্যা এবং তাতে বানিয়েছেন তোমাদের চলার পথ, যাতে তোমরা সঠিক পথ পেতে পার; আর যিনি আসমান থেকে বারি বর্ষণ করেন পরিমিতভাবে। অতঃপর তা দ্বারা আমরা সঞ্জীবিত করি নির্জীব জনপদকে। এভাবেই তোমাদেরকে বের করা হবে। আর যিনি সকল প্রকারের জোড়া যুগল সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন এমন নৌযান ও গৃহপালিত জন্তু যাতে তোমরা আরোহন কর।” [সূরা আয-যুখরুফ: ১০-১২] ও অনুরূপ আয়াতসমূহ। অপরদিকে সিফাত কেবল স্থায়ী সত্তাগত গুণাবলির জন্য ব্যবহৃত হয়, যেমন আল্লাহর বাণী "তিনিই আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই, তিনি গায়েব ও উপস্থিত বিষয়াদির জ্ঞানী; তিনি দয়াময়, পরম দয়ালু। তিনিই আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ্ নেই। তিনিই অধিপতি, মহাপবিত্র, শান্তি-ত্রুটিমুক্ত, নিরাপত্তা বিধায়ক, রক্ষক, পরাক্রমশালী, প্রবল, অতীব মহিমান্বিত। তারা যা শরীক স্থির করে আল্লাহ তা হতে পবিত্র, মহান।" [সূরা আল-হাশর: ২২-২৩] ও অনুরূপ আয়াতসমূহ।
২) সত্তাগত গুণাবলির জন্য না'ত ব্যবহৃত হয় না; যেমন চেহারা, দু' হাত, পা, আঙ্গুল। এগুলোকে 'সিফাত' বলতে হয়। সালাফরা এগুলোকে এ নামই দিয়েছেন। অনুরূপভাবে কালামশাস্ত্রবিদদের মধ্যে যারা আল্লাহর গুণাবলি সাব্যস্ত করে তারাও এ নাম দিয়েছেন। যদিও কেউ কেউ এ নাম অপছন্দ করেছেন যেমন আবুল ওফা ইবন আকীল ও আরও কয়েকজন। তিনি বলতেন, এগুলোকে সিফাতের ভাষ্য বলা যাবে না, বলতে হবে সম্বন্ধীয় আয়াত। কারণ জীবন্ত সত্তাকে তার হাত বা চেহারা দিয়ে গুণান্বিত করা হয় না। জীবন্ত সত্তার পুরোটাই তো মাওসুফ, সেটা আবার সিফাত হয় কী করে?! তাছাড়া সিফাত এমন এক অর্থকে শামিল করে তা আবার মাওসুফ হয়ে যায়, তাহলে সেটাকে সিফাত কীভাবে বলা হবে? বস্তুত আবুল ওফা ও তার মত যারা আছে তাদের এ মতভেদ শাব্দিক। নামকরণ নিয়ে মতভেদ। তারাও এসব সম্বন্ধ আল্লাহর সাথে করেন, তারাও বলেন, এগুলো দিয়ে আল্লাহ সম্পর্কে সংবাদ দিতে হবে কোনো প্রকার তামসীল (কারো মত) বা তা'তীল (নিষ্ক্রীয়করণ) না করে। সেটাকে সিফাত নামকরণ হোক বা না হোক।
৩) না'ত সেসব গুণাবলির জন্য ব্যবহৃত হয় যা প্রকাশিত ও বিখ্যাত, আর যা সাধারণ ও বিশেষ সকলেই জানতে পারে, কিন্তু সিফাত তা অনেক ব্যাপক, প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত সকল কিছুকেই শামিল করে।
তাহলে বুঝা গেল যে, না'ত ও সিফাত এর পার্থক্য খাস ও আম এর পার্থক্যের মতো। এ জন্যই কোনো কিছুর পরিচয় দিতে গিয়ে বলা হয়, তার না'ত হচ্ছে এটা ও এটা যা সেখানে প্রকাশ পায়। কারও কারও মতে, বস্তুত না'ত ও সিফাত একই জিনিসের দু'টি নাম। এজন্যই বসরার নাহুবিদরা বলে: বাবুস সিফাত। আর কুফার নাহুবিদরা বলে: বাবুন না'ত। একই উদ্দেশ্য। আসলে বিষয়টি কাছাকাছি। দেখুন, মাদারিজুস সালেকীন (৩/৩৪৫-৩৪৫)।
১০১৬. অর্থাৎ কেউ যদি বলে সিফাতের ভাষ্যসমূহের প্রকাশ্য অর্থ হচ্ছে 'তামসীল' বা কারো মতো হওয়া, তবে তাকে বলা হবে এটা অবশ্যই সালাফদের কেউ বলেননি, তাই এটা যদি কেউ বলে যে এ প্রকাশ্য অর্থ সালাফদের উদ্দেশ্য নয়, তবে তার বলা ঠিক আছে। কিন্তু এভাবে বিনা ব্যাখ্যায় বলা ঠিক নয়।
১০১৭. অর্থাৎ কারও কারও এটা বুঝা যে, এসব আয়াত ও হাদীসের প্রকাশ্য অর্থ সাদৃশ্য প্রদান করে, আর এ সাদৃশ্য ছাড়া আর কিছু বুঝা যাচ্ছে না। কারণ সালাফগণ কখনো এ রকম সাদৃশ্য অর্থকে 'যাহির' বলতেন না। তারা কেউই কুরআন ও হাদীসের প্রকাশ্য অর্থকে কুফরী ও বাতিল বানাতে রাযী নন। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, আর-রিসালাতুত তাদমুরিয়্যাহ (তৃতীয় নীতি), পৃ. ৬৯।
১০১৮. অর্থাৎ সবার ক্ষেত্রে এ সাদৃশ্যপূর্ণ অর্থ বুঝাকে 'যাহির' অর্থ বলার কোনো সুযোগ নেই, তারা এগুলোকে সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য করে বুঝে না, কেবল মুষ্টিমেয় লোক এগুলোর অর্থ সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য করে বুঝলে এটা তাদের বুঝের দোষ, এটা কখনও কুরআন ও হাদীসের 'যাহির' অর্থ নয়।
১০১৯. শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ এ বিষয়টি একাধিক জায়গায় তুলে ধরেছেন। যেমন এক জায়গায় তিনি বলেন, 'নিঃসন্দেহে প্রকাশিত হওয়া ও গোপন থাকা এটি একটি আপেক্ষিক বিষয়' ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আকলি ওয়ান নাকলি (৩/৯৭)।
আবার তিনি যখন ইলম ও ই'তিক্কাদ এর আলোচনা করেছেন আর সেখানে কাত'ঈ ও যন্ত্রী বিষয়টির অবতারণা হলো, তখন তিনি বলেন, 'কোনো জ্ঞান অত্যাবশ্যকভাবে প্রমাণিত হওয়া আর চিন্তা গবেষণা লব্ধ অর্জিত জ্ঞান হওয়া অথবা অকাট্য হওয়া বা প্রবল ধারণার মাধ্যমে অর্জিত হওয়ার বিষয়টি আপেক্ষিক বিষয়। কারণ কোনো কোনো বিষয় এক ব্যক্তির নিকট এক অবস্থায় অকাট্য হয়, সে একই জ্ঞান অপর ব্যক্তির কাছে অন্য অবস্থায় অজানা বিষয়ই থেকে যায়। সেখানে ধারণা নির্ভর হওয়ার মতো জ্ঞানও তার অর্জিত হয় না। আবার কোনো কোনো বস্তু কোনো ব্যক্তির কাছে কোনো অবস্থায় অত্যাবশ্যকভাবে প্রমাণিত হয়, আবার অপর ব্যক্তির নিকট অন্য অবস্থায় চিন্তা-গবেষণালব্ধ জ্ঞান হিসেবে ধরা দেয়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বিষয়ের সংবাদ দিয়েছেন তা স্বয়ং হক্ক, সত্য ও যথাযথ, মানুষের বিশ্বাস বা অবস্থার ভিন্নতায় তাতে কোনো হেরফের হতে পারে না। তাই সেটা সত্যই যার বিপরীতটি কখনোও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এ জন্যই যা কিছু এর বিপরীত হবে তা সর্বতোভাবে বাতিল হিসেবে ধর্তব্য হবে।' দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আকলি ওয়ান নাকলি (৩/৩০৪)।
অন্যত্র শাইখুল ইসলাম বলেন, 'বাদীহী (চিন্তা করে বের করা লাগে না) ও নাযরী (চিন্তা গবেষণা করে যা বের করতে হয়) এ দু'য়ের মধ্যে পার্থক্যের বিষয়টিও ব্যক্তি সম্পর্কিত ও আপেক্ষিক বিষয়। কখনও কখনও কারও কাছে কোনো জ্ঞান স্পষ্ট হয়ে পড়ে, তার অন্তরে সেটা জায়গা করে নেয় ফলে সেটা বাদীহী বিবেচিত হয়, কিন্তু সে একই জ্ঞান অপরের নিকট নাযরী তথা স্বল্প কিংবা দীর্ঘ চিন্তার ফসল হয়ে দাঁড়ায়। বরং এমনও হতে পারে যে অন্যের কাছে তা অর্জন করা অনেক কঠিন বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। দেখুন, আর-রাদ্দু আলাল মানত্বিকিয়্যীন, পৃ. ৮৮-৮৯, ৩৬৩।
বরং শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ সাদৃশ্যের ব্যাপারটিও আপেক্ষিক হওয়ার বিষয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি যখন আল্লাহর বাণী, وَهُوَ الَّذِي أَنزَلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ مِنْهُ وَآيَاتٌ مُحْكَمَاتٌ هُنَّ أُمُّ الْكِتَابِ ۖ وَأُخَرُ مُتَشَابِهَاتٌ [আল ইমরান: ৭] কিছু আয়াত 'মুহকাম', এগুলো কিতাবের মূল; আর অন্যগুলো 'মুতাশাবিহ্'।" [সূরা আলে ইমরান: ০৭] এর মধ্যকার সাদৃশ্যপূর্ণ বা 'মুতাশাবিহাত' এর ওপর আলোচনা করছিলেন তখন বলেন, বিশুদ্ধ কথা হচ্ছে, 'তাশাবুহ' বা সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ার বিষয়টিও আপেক্ষিক। কখনও কখনও এর কাছে যা সাদৃশ্যপূর্ণ মনে হবে অন্যের কাছে তা সাদৃশ্যপূর্ণ মনে হবে না। বরং এসব সাদৃশ্যপূর্ণ আয়াতের অর্থ জানা গেলে তখন সেটি আর সাদৃশ্যপূর্ণ আয়াতের অন্তর্ভুক্ত থাকে না।' দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (১৩/১৪৪)।
📄 সালাফগণের নীতি কালামশাস্ত্রবিদদের নীতির বিপরীত
আমি দেখেছি, সালাফদের মতামত বর্ণনাকারী কেউ কেউ সালাফদের কারো কারো প্রতি মিথ্যারোপ করে উপরোক্ত এ অর্থ ও উদ্দেশ্য (অর্থাৎ অর্থটি আল্লাহর মর্যাদার সাথে উপযুক্ত, বান্দার গুণের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ না হওয়ার পরও এই প্রকাশ্য অর্থ উদ্দেশ্য নয়। এমনটি কোনো সালাফ থেকে কেউ যদি বর্ণনা করে তবে সে সালাফদের নামে মিথ্যা বলেছে) তাদের দিকে সম্পৃক্ত করে থাকে। তারা বলে, তা'ওয়ীলকারীদের তরীকা মূলত সালাফদের তরীকা। অর্থাৎ উভয় পক্ষ (১০২০) এ ব্যাপারে একমত হয়ে গেল যে, এসব আয়াত ও হাদীস দ্বারা আল্লাহর কোনো সিফাত বুঝানো হয়নি। (১০২১) বরং সালাফ বা পূর্বসূরীগণ এগুলোর তা'ওয়ীল করা থেকে নীরব ছিলেন, কিন্তু খালাফ বা পরবর্তীরা এগুলোর তা'ওয়ীল করাকে স্বার্থকর মনে করেছে; কারণ এভাবে তা'ওয়ীল করার প্রয়োজন রয়েছে (১০২২)। তারা আরও বলে: পার্থক্য হচ্ছে- পরবর্তী খালাফরা তা'ওয়ীলের মাধ্যমে এগুলোর অর্থ ও উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট করে, অপরদিকে পূরবর্তী সালাফরা এগুলোর অর্থ ও উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট করে না- এই কারণে যে, অন্য কিছুও উদ্দেশ্য হতে পারে। বস্তুত নিঃসন্দেহে এ কথাটি সালাফদের ওপর স্পষ্ট মিথ্যাচার।
টিকাঃ
১০২০. অর্থাৎ আহলুত তাজহীল বা তাফওয়ীদ্ব (যারা বলে এগুলোর অর্থ করা জানা যায় না) আর আহলুত তা'ওয়ীল (যারা বলে এগুলোর অর্থ আমরা আমাদের বিবেক দিয়ে নির্ধারণ করব)।
১০২১. উভয় গোষ্ঠীই এ (মিথ্যা) কথার অংশীদার যে, তারা বলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিফাত সংক্রান্ত ভাষ্যসমূহের বর্ণনা প্রদান করেননি। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আকলি ওয়ান নাকলি (১/১৬)।
১০২২. এটিই তাদের সে প্রবচনের অর্থ, যেখানে তারা বলেছিল যে, 'সালাফদের পদ্ধতি নিরাপদ আর খালাফ বা পরবর্তীদের পদ্ধতি বেশি জ্ঞান প্রকাশক ও বেশি প্রজ্ঞার পরিচায়ক'। আর আমরা দেখেছি যে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ এ গ্রন্থের শুরুতে কীভাবে এ মিথ্যা প্রবচণটিকে খণ্ডন করেছেন।
📄 সালাফে সালেহীন স্পষ্ট করে বলেছেন যে, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর ‘আরশের উপর আল্লাহর সিফাতে খবরিয়াহ (কুরআন ও সুন্নাহ’র মাধ্যমে প্রাপ্ত) গুণাবলি সাব্যস্ত করার ব্যাপারে সালাফে সালেহীনের ইজমা’ বা ঐকমত্য
অধিকাংশ সিফাতের ক্ষেত্রে তো সে মিথ্যাচার করার বিষয়টি নিশ্চিত। যেমন- আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপরে। কেননা সালাফদের থেকে সংকলিত, যার দশভাগের একভাগও এখানে আলোচনায় আসেনি, সালাফদের সেসব কথা নিয়ে যে কেউ চিন্তা গবেষণা করবে সে অবশ্যই জানতে পারবে যে, তারা স্পষ্টভাবেই বলেছেন, আল্লাহ প্রকৃতই 'আরশের উপরে এবং এর বিপরীত কখনো কোনো কিছু তারা বিশ্বাস করেননি। আর তাদের অনেকেই বহু সিফাতের ক্ষেত্রে এরূপটি স্পষ্ট করে বলেছেন।
আল্লাহ জানেন যে, আমি পূর্ণ গবেষণার পর এবং সালাফদের কথা যথাসম্ভব অধ্যয়ন করার পর তাদের কারও কথাই এমন পাইনি যে, তা প্রকাশ্যে স্পষ্টভাবে বা ইঙ্গিতে সিফাতে খবরিয়্যাহ (কুরআন ও সুন্নাহ'র মাধ্যমে প্রাপ্ত সিফাত) কে নাকচ করা বুঝায়। বরং যেটা আমি পেয়েছি তা হচ্ছে, তাদের বহু কথা, হয় নস (অকাট্য) ভাবে না হয় যাহের (প্রকাশ্য অর্থ) ভাবে, এ জাতীয় সিফাত সাব্যস্ত করার ওপর প্রমাণ বহন করছে। (১০২০) আমি প্রত্যেকের থেকে প্রত্যেক সিফাত সাব্যস্ত করার বিষয়টি বর্ণনা করছি না, তবে আমি যা দেখেছি তা হচ্ছে, তারা সামগ্রিকভাবে এ জাতীয় সিফাতগুলোকে সাব্যস্ত করেছেন। আবার এটাও পাইনি যে, তারা সিফাতগুলো নাকচ করেছেন। তারা কেবল নাকচ করেছেন সাদৃশ্য দেয়া। আর যারা আল্লাহকে সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য দেয় এমন মুশাব্বিহাদের বক্তব্য তারা অস্বীকার করেছেন। সাথে সাথে আমি তাদেরকে দেখেছি যারা সিফাত অস্বীকার করে তাদের কথাও অস্বীকার করেছেন।(১০২৪) যেমন, ইমাম বুখারীর শাইখ নু'আইম ইবন হাম্মাদ আল-খুযা'য়ী বলেছেন:
من شبه الله بخلقه فقد كفر، ومن جحد ما وصف الله به نفسه فقد كفر، وليس ما وصف الله به نفسه ولا رسوله تشبيهاً
"যে আল্লাহকে মাখলুকের সাথে সাদৃশ্য দিল সে কাফের হয়ে গেলো, আবার আল্লাহ যা নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন সেটা যে অস্বীকার করলো সেও কাফের হয়ে গেল। আর আল্লাহ নিজের ব্যাপারে যে বর্ণনা দিয়েছেন এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বর্ণনা করেছেন তাঁর সম্পর্কে তা বর্ণনা করা সাদৃশ্য দেয়া নয়।” (১০২৫)
তারা (সালাফগণ) যখন কোনো লোককে দেখতেন যে, সে সাদৃশ্য নাকচ করতে গিয়ে খুব বাড়াবাড়ি করেছে, কিন্তু সিফাত সাব্যস্তের কথা আলোচনা করেনি, তখন তারা বলতেন: লোকটি মু'আত্ত্বিল (আল্লাহর গুণ অস্বীকারকারী) জাহমী। তাদের কথায় এরূপ অনেক রয়েছে; কেননা আজ পর্যন্ত জাহমিয়্যাহ, মু'তাযিলারা যখনই কাউকে সিফাত সাব্যস্ত করতে দেখেছে, তখনই তারা তাদের মিথ্যা ও অপবাদের আশ্রয় নিয়ে বলেছে, সে তো মুশাব্বিহা (সাদৃশ্যদানকারী)। (১০২৬) এমনকি তাদের অনেক উগ্রবাদী লোক নবীদেরকে পর্যন্ত তাঁর উপর শান্তি বর্ষিত হোক, এমনকি তিনি ছিলেন জাহমীয়দের প্রধান থুমামাহ ইবনে আশরাস এর উক্তি: নবীদের মধ্যে তিনজন দেখতে একই রকম, মুশাব্বিহা বলে অপবাদ দিয়েছে। এমনকি জাহমিয়্যাহ (১০২৭) নেতা সুমামাহ ইবনুল আশরাস (১০২৮) বলেছে: তিনজন নবী মুশাব্বিহা (১০২৯) ছিলেন।
(১) মূসা 'আলাইহিস সালাম, যখন তিনি বলেছিলেন: ﴿إِنْ هِيَ إِلَّا فِتْنَتُكَ﴾ [আল-আ'রাফ: ১৫৫] "এটা তোমার পরীক্ষা বৈ কিছুই নয়।" [সূরা আল-আ'রাফ: ১৫৫]
(২) 'ঈসা 'আলাইহিস সালাম, যখন তিনি বলেছিলেন: ﴿تَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِي وَلَا أَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِكَ﴾ [المائدة: ١١٦] "আমার অন্তরের কথাতো আপনি জানেন, কিন্তু আপনার নিকট যা আছে তা আমি জানি না" [সূরা আল-মায়েদাহ: ১১৬]
(৩) মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম, যখন তিনি বলেছেন: "আমাদের রব্ব অবতরণ করেন।”(১০০০) [নাউযুবিল্লাহ]
এমনকি মু'তাযিলাদের অধিকাংশ গোষ্ঠী, বিশুদ্ধ আকীদাহ'র অধিকাংশ ইমাম ও তাদের ছাত্রগণ যেমন, ইমাম মালেক ও তার ছাত্রগণ, সাওরী ও ছাত্রগণ, আওয়া'ঈ ও তার ছাত্রগণ, শাফেয়ী ও তার ছাত্রগণ, আহমদ ও তার ছাত্রগণ, ইসহাক ইবন রাহওয়াই, আবু উবাইদ প্রমুখকে তারা মুশাব্বিহা শ্রেণিভুক্ত গণ্য করত। (১০০১)
টিকাঃ
১০২৩. যেমনটি শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ তার বিরোধীদেরকে, যখন তাদের সাথে আকীদায়ে ওয়াসেত্বিয়্যাহ নিয়ে বিতর্ক করছিলেন তখন চ্যালেঞ্জ প্রদান করে বলেছিলেন, 'যারা এর (আল্লাহর সিফাত সাব্যস্ত করা সংক্রান্ত ওয়াসেত্বিয়্যাহ গ্রন্থে যা এসেছে তার) কোনো কিছুর বিরোধিতা করবে তাদের সকলকে তিন বছর সময় দিলাম, তারা যদি আমি যা বর্ণনা করেছি তার কোনো কানাকড়ির বিরুদ্ধে প্রথম তিন প্রজন্মের কাছ থেকে এর বিপরীত কিছু আনতে পারে তাহলে আমি তা থেকে প্রত্যাবর্তন করব, আর আমার ওপর দায়িত্ব-কর্তব্য হচ্ছে প্রথম তিন প্রজন্মের সকল গোষ্ঠী থেকে উদ্ধৃতি আনার, যা দিয়ে আমি যা বলেছি, তার পক্ষে প্রমাণ পেশ করবো।' মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/১৬৯), (৬/১৫)।
কেউ যদি এসব সিদ্ধান্তের দিকে তাকায় তবে তার কাছে ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ'র প্রশস্ত জ্ঞান, শক্তিশালী অনুসরণ, পূর্ণ পর্যবেক্ষণ, সালাফরা যার ওপর ছিলেন তার প্রতি পূর্ণ আত্মবিশ্বাস ও তাঁর সর্বোচ্চ সূক্ষ্ম কর্মকাণ্ডের পরিচয় পেয়ে আশ্চর্যন্বিত না হয়ে পারবে না।
১০২৪. জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায় তাওহীদের বিপরীতে নিয়ে এসেছে 'তাশবীহ'কে। আর 'তাশবীহ' বলতে তারা বুঝে সিফাত সাব্যস্ত করাকে। ইবন তাইমিয়্যাহ সেটার অসারতা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'তাওহীদের বিপরীত হচ্ছে আল্লাহর সাথে শির্ক, আর তাকে তার সৃষ্টির মত মনে করা। এটা (আল্লাহকে সৃষ্টির মত মনে করা) যদিও তাওহীদের বিপরীত, কিন্তু তারা যেটাকে তাশবীহ বা সাদৃশ্য মনে করে তাওহীদের বিপরীতে নিয়ে এসেছে সেটা উদ্দেশ্য নয়, কারণ তারা সিফাসতমূহের অর্থকে এমনসব নাম দিয়েছে (যেমন তাশবীহ) যার সপক্ষে আল্লাহ কখনো কোনো প্রমাণ নাযিল করেননি।' দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/৪২৮-৪২৯)।
১০২৫. দেখুন, লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ (২/৫৩২), নং ৯৩৬; ইবন আসাকির, তারীখে দামেশক (১৭/৬১২); যাহাবী, আল-'আরশ, পৃ. ১২০, নং ২০৯; আল-উলু লিল আলিয়্যিল আযীম (২/১০৯৩), নং ৪২৯; মুখতাসারুল উলু, পৃ. ১৮৪; সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৩/২৯৯)।
শাইখ মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী এ বর্ণনাটিকে সহীহ বলেছেন। তিনি আরও বলেন, এ বর্ণনার সনদের লোকগুলো নির্ভরযোগ্য। দেখুন, মুখতাসারুল উলু, পৃ. ১৮৪; তাছাড়া এ বর্ণনাটি ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রাহিমাহুল্লাহ নিয়ে এসেছেন, তাঁর ইজতিমা'উল জুয়ুশিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ২২১; শাইখুল ইসলাম তার মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/২৬৩)।
ইমাম যাহাবী বলেন, আর আমাদের কাছে এটি সহীহ সনদে বর্ণিত হয়ে এসেছে। কতই না সুন্দর এ উক্তি। ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৩/২৯৯)।
তিনি অন্যত্র বলেন, 'এ কথাটি হক, সত্য ও যথাযথ। 'তাশবীহ' থেকে আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই, অনুরূপ সিফাত সংক্রান্ত হাদীস অস্বীকার করা হতেও। যে দীনের বুঝ অর্জন করেছে সে কখনও এসব সিফাতের সাব্যস্ত ভাষ্যগুলো অস্বীকার করে না। এ জায়গায় দু'টি নিন্দিত অবস্থান রয়েছে,
(১) সেগুলোকে তা'ওয়ীল করা ও তার অর্থকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা। সালাফরা কখনোও এগুলোর তা'ওয়ীল করেননি, আর তারা এগুলোর শব্দসমূহকে বক্র করে স্থানচ্যুতও করেননি, বরং এগুলোর অর্থের ওপর ঈমান এনেছেন এবং (ধরণ নির্ধারণে প্রবৃত্ত না হয়ে) এগুলোকে যেভাবে এসেছে সেভাবে পার করে দিয়েছেন।
(২) দ্বিতীয় নিন্দিত অবস্থান হচ্ছে, এগুলো সাব্যস্ত করতে গিয়ে বাড়াবাড়ি করা, এগুলোকে মানুষের গুণের মত ধারণা করা, অন্তরে এগুলোর আকার নির্ধারণ করা, এটি নিঃসন্দেহে বড় ধরনের মূর্খতা ও পথভ্রষ্টতা। এখানে এটা জানা আবশ্যক যে, গুণ সব সময় মাওসূফ তথা যার গুণ বর্ণনা করা হচ্ছে তার অবস্থা ও অবস্থান অনুসারে হয়ে থাকে। তাহলে যেহেতু আমরা মাওসুফ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলাকে দেখিনি, আর আমাদের কাছে কেউ সংবাদ দেয়নি যে, তিনি তাঁকে দেখেছেন, সাথে সাথে আমাদের সামনে রয়েছে আল্লাহর বাণী, )لَيْسَ كَمِثْلِه شَيْ “তাঁর মতো কোনো কিছু নেই।” [সূরা আশ-শূরা: ১১] তাহলে কীভাবে আমাদের ব্রেনে মহান আল্লাহর ধরণ নির্ধারণের বিষয়টি অবশিষ্ট থাকতে পারে? আল্লাহ তা থেকে কতই না ঊর্ধ্বে। অনুরূপভাবে তাঁর পবিত্র সিফাতসমূহের ব্যাপারেও একই কথা কার্যকর, আমরা সেগুলোকে স্বীকার করি, আর বিশ্বাস করি যে, তা হক্ক, সত্য ও যথাযথ। কিন্তু আমরা এগুলোকে কোনো প্রকার তামসীল বা কারো মত মনে করি না, কোনো আকার নির্ধারণ করি না।' ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১০/৬১০-৬১১)।
১০২৬. তাশবীহ বা সাদৃশ্য অস্বীকারকারী সম্প্রদায়, আল্লাহ তা'আলার জন্য যারাই কোনো নাম বা গুণ সাব্যস্ত করে তাদেরকেই 'মুশাব্বিহা' নামে অভিহিত করে। ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেন, জাহম ইবন সাফওয়ান মনে করেছে, যে কেউ আল্লাহ তা'আলাকে সেসব গুণে গুণান্বিত করে যা দিয়ে তিনি নিজেকে তার কিতাবে গুণান্বিত করেছেন অথবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেগুলো দিয়ে হাদীসে তাকে গুণান্বিত করেছেন, সে কাফের হয়ে যাবে, আর সে মুশাব্বিহা হয়ে যাবে। দেখুন, ইমাম আহমাদ, আর-রাদ্দু আলায যানাদিকাতি ওয়াল জাহমিয়্যাহ, পৃ. ২০৬।
অনুরূপভাবে 'জাহম' ইবন সাফওয়ানের পরে যত সিফাত অস্বীকারকারী এসেছে সকলেই এ কাজটি করেছে। যারাই আল্লাহ তা'আলার সিফাত সাব্যস্ত করেছে তাদেরকেই তারা 'মুশাব্বিহা' বা দেহবাদী বলেছে। এমনকি শেষ পর্যন্ত সিফাত অস্বীকারকারীদের একটি চিহ্নে পরিণত হয়েছে তারা এর মাধ্যমে পরিচিতি পেতে থাকে। এজন্য ইমাম ইসহাক্ব ইবন রাহওয়িয়াহ বলেন, 'জাহম ও তার অনুসারীদের আলামত হচ্ছে তারা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের ওপর মিথ্যাচার করে বলে, এরা মুশাব্বিহা।
যারা এভাবে আহলুস সুন্নাহকে মুশাব্বিহা বলত, তাদের মধ্যে একজন হচ্ছেন আবুল মা'আলী আল-জুওয়াইনী। তিনি বলেন, 'জেনে রাখ, হক্ক মতবাদ হচ্ছে, মহান রব্ব সুবহানাহু ওয়া তা'আলা যেকোনো হাইয়্যেয বা স্থানে হওয়া থেকে পবিত্র, অনুরূপ কোনো দিক দ্বারা বিশেষিত হওয়া থেকে পবিত্র। আর যারা মুশাব্বিহা তারা বলে, নিশ্চয় মহান আল্লাহ উপরের দিক দ্বারা বিশেষিত।' আশ-শামিল, পৃ. ৫১১। উল্লেখ্য, এখানে তিনি হক্ক মতবাদ বলে আশ'আরীদের বুঝিয়েছেন।
অনুরূপ কাজটি শাহরাস্তানীও করেছে। তিনি বলেন, 'পরবর্তী একটি গোষ্ঠী সালাফে সালেহীন যা বলেছে তার ওপর বাড়তি করেছে, তারা বলেছে, এসব আয়াত ও হাদীসকে তার প্রকাশ্য অর্থে নিতে হবে, এভাবে তারা কেবল তাশবীহ বা সাদৃশ্য প্রদানেই নিপতিত হয়েছে, যা সালাফদের বিশ্বাসের বিপরীত।' আল-মিলাল ওয়ান নিহাল (১/১৪৬০।
বরং কোনো কোনো কালামশাস্ত্রবিদ হাম্বলীদের দিকে তাশবীহ এর দোষ যুক্ত করতো; কারণ ফিকহী মাযহাবের অনুসারীদের মাঝে তারাই অধিক পরিমাণে আল্লাহ তা'আলার সিফাত সাব্যস্তকরণে বিখ্যাত ছিল। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এর সাথে যারা বিতর্ক করে বলেছিল, 'আহমাদ এর দিকে বেশ কিছু হাশাওয়িয়্যাহ (অক্ষরবাদী) ও মুশাব্বিহা গোষ্ঠী নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করে নিয়েছে', একথার জবাবে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ তিনি তাদের দাবি খণ্ডন করে বলেছিলেন, ইমাম আহমাদের সাথীদের ছাড়া অন্যদের মধ্যে মুশাব্বিহা ও মুজাসসিমাদের সংখ্যা অনেক বেশি। এই যে কুর্দীরা তারা সবাই শাফেয়ী মাযহাবভুক্ত, তাদের মধ্যে যত তাশবীহ আর তাজসীম পাওয়া যায় তা অন্য কোনো প্রজাতির মধ্যে পাওয়া যায় না। জীলানের অধিবাসীরা তাদের মধ্যে শাফেয়ী ও হাম্বলী। একান্ত হাম্বলী যারা তাদের মাঝে এসব কিছু নেই যা অন্যদের মধ্যে আছে। এই যে কাররামিয়্যাহ মুজাসসিমাহ, এরা সবাই হানাফী'। মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/১৯৭); হিকায়াতু মুনাযারাতিল ওয়াসেত্বয়ি্যাহ।
ইবন আবিল ইয্য আল-হানাফী রাহিমাহুল্লাহ ইমাম ইসহাক ইবন রাহওয়িয়াহ'র পূর্বোক্ত বক্তব্য বর্ণনার পরে বলেন, 'অনুরূপভাবে সালাফগণের অনেক ইমাম বলেছেন, জাহমিয়্যাদের আলামত হচ্ছে তারা আহলুস সুন্নাহকে মুশাব্বিহা (সাদৃশ্যবাদী) বলে; কারণ আল্লাহর নাম ও গুণ অস্বীকারকারী প্রতিটি সম্প্রদায় যারা নাম ও গুণ সাব্যস্ত করে তাদেরকে মুশাব্বিহা বলতো। এজন্য সিফাত অস্বীকারকারী জাহমিয়্যাহ, মু'তাযিলা, রাফেযী প্রমুখ লোকদের কিতাবসমূহ, যারা আল্লাহর জন্য সিফাত সাব্যস্ত করে তাদেরকে, মুশাব্বিহা ও মুজাসসিমা নামক অপবাদে ভরপুর।' ইবন আবিল ইয্য আল-হানাফী, শারহুল আকীদাতিত ত্বাহাওয়িয়্যাহ (১/১৭৯)।
১০২৭. 'জাহমিয়্যাহ' শব্দটি কখনও কখনও তাদের জন্য প্রয়োগ করা হয়, যারা আল্লাহর গুণাবলি নিষ্ক্রীয় করে অথবা সেগুলোর কিছু কিছুকে নিষ্ক্রীয় করে। সে হিসেবে মু'তাযিলাদেরকে জাহমিয়্যাহ বলা হয়, কারণ তারা আল্লাহর প্রায় সকল গুণকেই অস্বীকার করে। অনুরূপভাবে তা দ্বারা আশা'য়েরা ও মাতুরিদিয়্যাদেরকেও বুঝানো হয়; কারণ সামান্য কিছু সিফাত বাদে সকল সিফাতকে অস্বীকার করে থাকে। তবে সাধারণভাবে যখন 'জাহমিয়্যাহ' ফির্কা হিসেবে বর্ণনা করা হয় তখন যারা আল্লাহর সকল নাম ও গুণ অস্বীকার করে তাদেরকে বুঝানো হয়। বিশেষ করে যখন জাহমিয়্যাহ বলার পরে ভিন্ন করে মু'তাযিলা, আশা'য়েরা ও মাতুরিদিয়্যাহ বলা হয় তখন প্রত্যেক গোষ্ঠীকে আলাদা বুঝানো হবে। যেমন কেউ বললো, জাহমিয়্যাহ, আশা'য়েরা ও মাতুরিদিয়্যাহ সম্প্রদায় আহলুস সুন্নাত এর আকীদাহ বিরোধী। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/৯৯), (৬/৫৫, ৩৫৮); আর রিসালাতুল মাদানিয়্যাহ, পৃ. ৩৬।
১০২৮. তিনি হচ্ছেন আবু মা'ন সুমামাহ ইবন আশরাস আন-নুমাইরী আল-মু'তাযিলী। বিশর ইবনুল মু'তামির আল-মু'তাযিলির ছাত্র। তাছাড়া সে জাহেয এর ছাত্রত্বও গ্রহণ করে। খলীফা হারুন-অর-রশীদ ও তার ছেলে মামুনের সাথে যোগাযোগ রাখত। মামুনের বিশেষ লোক ছিল। তার মুনাযারায় সে আজে বাজে ফালতু কথা নিয়ে আসত। মামুন তাকে ওযীর বানাতে চেয়েছিল কিন্তু সে অপারগতা প্রকাশ করে। হিজরী ২১৩ সালে সে মারা যায়। মাকরীযী তাকে ধ্বংসাত্মক এক ফির্কার প্রধান হিসেবে গণ্য করেছেন। তার অনুসারীরা 'সুমামিয়্যাহ' নামে প্রসিদ্ধ। মু'তাযিলাদের থেকে তার কিছু মাসআলা আলাদা ছিল। তার মতামতের মধ্যে ছিল, সে বলতো, জগত আল্লাহর প্রকৃতির কর্ম। আহলুল কিতাব, মূর্তিপুজকদের মধ্যে যারা মুকাল্লিদ তারা জাহান্নামে যাবে না, বরং তারা মাটি হয়ে যাবে। যারা কবীরা করতে করতে মারা যাবে তারা চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে। ঈমানদারদের বাচ্চারা মাটি হয়ে যাবে।
তার সম্পর্কে ইবন কুতাইবাহ বলেন, দীনের স্বল্পতা, ইসলামের বিনষ্টতা, ইসলাম নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ, যাচ্ছে তাই মুখ চালানোর ব্যাপারে তার মতো এমন কোনো মানুষ দেখা যায়নি, যারা আল্লাহকে জানে ও তার ওপর ঈমান রাখে। ইমাম যাহাবী বলেন, বড় মু'তাযিলাদের একজন, পথভ্রষ্টদের শিরোমনি। সাফাদী বলেন, দীনদারীতে অধঃপতিত ও বাজে কথা জমাকারী এক ব্যক্তি ছিল। দেখুন, ইবনুল মুরতাদ্বা, ত্বাবাক্বাতুল মু'তাযিলাহ, পৃ. ৬২-৬৭; খত্নীবে বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ (৭/১৪৫); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১০/২০৩); মীযানুল ই'তিদাল (১/৩৭১); ইবন হাজার, লিসানুল মীযান (২/৩৯৮); সাফাদী, আল-ওয়াফী বিল ওফায়াত (১১/১৬); যিরিকলী, আল-আ'লাম (২/১০০)।
১০২৯. নবী-রাসূলগণকে কারা মুশাব্বিহা বলতে পারে? কতবড় ধৃষ্ঠতা। তারা দীন কি তাহলে কাফেরদের থেকে পেয়েছে? এমন কথা কোনো ঈমানদার বলতে পারে? অথচ এমন সময়ও হয়ত আসবে কেউ এই সুমামার মতাদর্শ কেউ কেউ প্রচার করবে। কারণ প্রতিটি গোষ্ঠীর পরবর্তীতে ওয়ারিশ রয়েছে। মতের প্রবক্তা মরলেও মত মরে যায় না। নাউযুবিল্লাহ।
১০০০. সুমামাহ এর এ বক্তব্যটি অন্য কোনো সূত্রে পাওয়া যায়নি। তবে এমন বক্তব্য দিয়েছিলেন ইবন আবী দুআদ। দেখুন, যাহাবী, আল-'উলু লিল 'আলিয়ি্যল 'আযীম, পৃ. ১৪০; অনুরূপ ইবন আবী হাতেম, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহতেও তা এসেছে, যা যাহাবী বর্ণনা করেছেন তার থেকে।
১০৩১. অন্যত্র শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, 'মু'তাযিলাহ, জাহমিয়্যাহ ও তাদের মত যারা আল্লাহ তা'আলার সিফাত বা গুণাবলি অস্বীকারকারী আছে, যারা যারা আল্লাহ তা'আলার সিফাত সাব্যস্ত করে তারা তাদের প্রত্যেককে মুজাসসিমা (দেহবাদী) মুশাব্বিহা (সাদৃশ্য প্রদানকারী) বলে। আবার তাদের মধ্যে অনেকেই বিখ্যাত ইমাম যেমন মালেক, শাফে'য়ী, আহমাদ ও তার সাথীদেরকে মুজাসসিমা ও মুশাব্বিহা হিসেবে গণ্য করে। যেমনটি 'আয-যীনাহ' গ্রন্থের লেখক আবু হাতেম ও তার মতো অন্যান্যরা উল্লেখ করেছে। সে যখন মুশাব্বিহাদের বিভিন্ন উপদলের বর্ণনা দিচ্ছিল তখন বলে, 'আর তাদের মধ্যে আরেক গোষ্ঠী রয়েছে, যাদেরকে বলা হয় মালেকী, তারা এক লোকের দিকে নিজেদের সম্পৃক্ত করে যাকে বলা হয় মালেক ইবন আনাস। আবার তাদের মধ্যে আরেক গোষ্ঠী রয়েছে, যাদেরকে বলা হয় শাফে'য়ী, তারা এক লোকের দিকে নিজেদের সম্পৃক্ত করে, যাকে বলা হয় শাফেয়ী....।' ইবন তাইমিয়্যাহ, মিনহাজুস সুন্নাহ (২/১০৫)।
ইবন তাইমিয়্যাহ আরও বলেন, 'বস্তুত 'মুশাব্বিহা' নামটির কোনো নিন্দাসূচক কিছু কুরআনেও আসেনি, হাদীসেও আসেনি, এমনকি কোনো সাহাবী, তাবে'য়ীদের কথাতেও আসেনি। তবে সালাফে সালেহীনের একটি গোষ্ঠী যেমন, আব্দুর রহমান ইবন মাহদী, ইয়াযীদ ইবন হারুন, আহমাদ ইবন হাম্বল, ইসহাক ইবন রাহওয়িয়াহ, নু'আইম ইবন হাম্মাদ প্রমুখ থেকে আল্লাহ তা'আলার গুণাবলিতে 'তাশবীহ' বা সাদৃশ্য প্রদানের নিন্দা সংক্রান্ত ভাষ্য এসেছে। তারা তাদের দ্বারা যেসব মুশাব্বিহাদের নিন্দা করেছেন সেটা বলেও দিয়েছেন যে, তারা হচ্ছে ঐসব লোক যারা আল্লাহ তা'আলার গুণাবলিকে সৃষ্টির গুণাবলির মতো মনে করে। এর মাধ্যমে তারা সেসব লোকদের নিন্দা করেছে যারা কুরআন ও সুন্নাহ'র বিরোধিতা করেছে, কারণ তারা তামসীল অর্থাৎ স্রষ্টার গুণকে সৃষ্টির গুণের মতো করে সাব্যস্ত করেছে। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/৩৮৭)। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ আরও বর্ণনা করেছেন যে, 'এসব নাম অর্থাৎ হাশাওয়িয়্যাহ, মুশাব্বিহা.. এ নামগুলোর সপক্ষে আল্লাহ কখনও কোনো প্রমাণ নাযিল করেননি। বস্তুত যার প্রশংসা সম্মানের আর যার নিন্দা অসম্মানের তিনি হচ্ছেন আল্লাহ তা'আলা। দীনের মধ্যে যেসব নামের ব্যাপারে প্রশংসা ও নিন্দা জড়িত তা তো কেবল সেসব নামের যার সপক্ষে আল্লাহ তা'আলা কোনো প্রমাণ অবতীর্ণ করেছেন, আর যার ওপর কুরআন ও সুন্নাহ অথবা ইজমা' প্রমাণবহ। যেমন মুমিন ও কাফের, আলেম ও জাহিল, মুকতাসেদ বা মধ্যপন্থা অনুসরণকারী ও মুলহিদ বা বিশ্বাস ধ্বংসকারী। কিন্তু এসব নাম (হাশাওয়িয়্যাহ, মুশাব্বিহা ইত্যাদি) তা আল্লাহর কিতাবে নেই, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসেও নেই, উম্মতের সালাফে সালেহীনের ইমামগণের কেউ সেটার পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো কথা বলেননি। সর্বপ্রথম যারা এসব দিয়ে নিন্দা জ্ঞাপনের সংস্কৃতি আবিষ্কার করে তারা হচ্ছে মু'তাযিলা গোষ্ঠী, যারা মুসলিমদের দল থেকে নিজেরা আলাদা দল গঠন করেছিল।' দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৪/১৪৬)।
তিনি আরও সাব্যস্ত করে দেখিয়েছেন যে, মু'তাযিলারা 'তাশবীহ' এর বিরাট অংশ গ্রহণ করেছে। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে, মু'তাযিলারা কাদারিয়্যা, যারা আল্লাহর কর্মকাণ্ডে তাশবীহ দিয়েছে, তাই তাদেরকে বলা হয়, 'মুশাব্বিহা ফিল আফ'আল'; কারণ তারা আল্লাহ তা'আলার কর্মে স্রষ্টাকে সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য দেয় আর সৃষ্টিকে স্রষ্টার সাথে তাশবীহ দেয়। (কেননা নিজেরা নিজেদের কর্মকাণ্ডের স্রষ্টা দাবি করে থাকে, অথচ আল্লাহ বান্দা ও বান্দার কর্ম সবই সৃষ্টি করেছেন। এর মাধ্যমে তারা নিজেদেরকে স্রষ্টার সাথে তাশবীহ দিল।) দেখুন, মাজমু' ফাতাওয়া (৮/৪৩১)।
তাছাড়া তারা আল্লাহর নাম ও গুণাবলি অস্বীকার করার আগে সেটাকে তামসীল ও তাশবীহ দিয়ে নিয়েছে। কারণ তারা প্রথমেই মনে করেছে আল্লাহ তা'আলার গুণ সাব্যস্ত করার অর্থ দাঁড়ায় আল্লাহকে সৃষ্টির মত মনে করা, তারপর সেটাকে প্রতিরোধ করতে নেমেছে না করা ও নিষ্ক্রীয় করার মাধ্যমে। কেননা একটি বিশুদ্ধ কথা হচ্ছে, সকল (মু'আত্তিল) নিষ্ক্রীয়কারী (তামসীল) সমতা বিধানকারী। যেমনটি অনেকবার বর্ণিত হয়েছে।