📄 কুরআনবিয়াহ ও উবূদিয়্যাহ শব্দের আর সকল সৃষ্টি উভয়ের মধ্যে কমনভাবে অংশীনার থাকা
কিছু দিক থেকে (মা'য়িয়্যাাহ) এর উদাহরণ হচ্ছে, রবুবিয়্যাহ ও উবুদিয়্যাহ তথা রব্ব হওয়া ও দাস হওয়া এর মত (১৮৯) কেননা উভয়টি 'আসল রুবুবিয়্যাত' ও 'আসল উলুহিয়াত' হিসেবে (قدر مشترك) কমন একটি অর্থে মিল থাকলেও, স্থান-কাল-পাত্র ভেদে তার অর্থ ভিন্ন হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। যদিও মূল অর্থ সব স্থানে একই।
সুতরাং [রুবুবিয়াত শব্দটি] যখন আল্লাহ বললেন: ﴿رَبِّ الْعَالَمِينَ - رَبِّ مُوسَى وَهَارُونَ﴾ [الأعراف: ١٢٢،١٢١] "বিশ্ব-জাহানের রব্ব, মূসা ও হারুনের রব্ব।" [সূরা আল-আ'রাফ: ১২১, ১২২] এখানে মূসা এবং হারূনের জন্য রব্ব হওয়া বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন, যা বিশ্বজাহানের অপর সৃষ্টি রব্ব হওয়া থেকে একটু বেশি। কারণ কাউকে যদি আল্লাহ তা'আলা পূর্ণতা বেশি প্রদান করেন তবে তা দ্বারা তিনি অন্যদের থাকে তাকে বেশি লালন-পালন করেছেন, বিশেষভাবে তারবিয়াত ও প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, তার তারবিয়াত অন্যদের চেয়ে বেশি।
অনুরূপভাবে [উবুদিয়াত শব্দটিও সাধারণভাবে ও বিশেষ অর্থে হয়, যদিও শব্দের মূল অর্থ দাসত্বের একটি জায়গায় কমন মিল থাকে, তারপরও তা সাধারণভাবে সকলের জন্য ব্যবহৃত হয়, আবার বিশেষ অর্থেও ব্যবহৃত হয়, যেমন বিশেষ অর্থে ব্যবহার হয়েছে] তাঁর ﴿ عَيْنًا يَشْرَبُ بِهَا عِبَادُ اللَّهِ يُفَجِّرُونَهَا تَفْجِيرًا) [الإنسان: ٦] এবং (سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلاً) [الإسراء:1]।
বাগীতে যেখানে আল্লাহ বলেন, [“এমন একটি প্রস্রবণ যা থেকে আল্লাহর বান্দাগণ পান করবে, তারা এ প্রস্রবণকে যথেচ্ছা প্রবাহিত করবে।” [সূরা আল-ইনসান: ০৬] “পবিত্র মহিমাময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতের মাধ্যমে ভ্রমণ করালেন।” [সূরা আল-ইসরা: ০১] (১০০০)
কারণ এই 'আব্দ' শব্দটি দ্বারা কখনো উদ্দেশ্য হয়, 'মু'আব্বাদ' বা যা অধীনতায় আবদ্ধ বা দাসত্বের নীতির অধীন, (ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়) এ অর্থ সমগ্র সৃষ্টির ক্ষেত্রে সাধারণভাবে প্রযোজ্য, এটার উদাহরণ আল্লাহর বাণী, (إِن كُلُّ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ إِلَّا آتِي الرَّحْمَنِ عَبْدًا) [مريم: ٩٣] “আসমানসমূহ ও যমীনে এমন কেউ নেই, যে দয়াময়ের কাছে বান্দারূপে উপস্থিত হবে না।” [সূরা মারইয়াম: ৯৩] আবার কখনো 'আব্দ' শব্দটি দ্বারা উদ্দেশ্য হয় 'আবেদ' বা ইবাদতকারী, দাসত্বকারী। (যা কেবল ইচ্ছাকৃত ইবাদতকারীকে বুঝায়) আর তখন সেটি বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত হয়। তারপর তাতে বিভিন্ন স্তর হয়, (আবদ) যদি কেউ জ্ঞান ও অবস্থা অনুযায়ী বেশি ইবাদত করে, তার ইবাদত হবে বেশি পরিপূর্ণ; তখন তাঁর দিকে সম্পৃক্ত হওয়া পূর্ণতাজ্ঞাপক; যদিও সকল অবস্থাতেই এটি তার আসল বা হাকীকী অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। (অর্থাৎ কাফেরও দাস, ঈমানদারও দাস, অথচ উভয়ের দাসত্বের অবস্থা সমান নয়, কিন্তু তাই বলে কারও দাস হাকীকী বা প্রকৃত, আর কারও দাস মাজাযী বা রূপক নয়। উভয়ের দাসত্বই প্রকৃত দাসত্ব।)
টিকাঃ
৯৯৯. অর্থাৎ মা'য়িয়্যাহ এর অর্থ কী হবে, তা বুঝতে হলে এটিকে রুবুবিয়্যাহ ও উবুদিয়্যাহ'র মতো করে বুঝতে হবে। রুবুবিয়্যাহ যেমন সাধারণভাবে সকলের জন্য রয়েছে, তেমনি বিশেষ করে বিশেষ লোকদের জন্যও রয়েছে। অনুরূপভাবে উবুদিয়্যাহ বা আল্লাহর দাসত্ব সাধারণভাবে সবাই ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক তা মানতে বাধ্য, আবার বিশেষভাবে কিছু লোকদের জন্য তা নির্ধারিত হয়, যারা তাঁকে ইচ্ছাকৃত রব্ব মেনে নিয়ে তাঁর সন্তুষ্টির জন্ন প্রতিনিয়ত ইবাদত করে চলেছে। তাই মা'য়িয়্যাহ শব্দটিকেও আমরা উভয়ভাবে দেখতে পারি, তা যেমন মায়িয়্যাহ 'আম্মাহ (সকলের সাথে) হয়, তেমনি তা মা'য়িয়্যাহ খাসসাহ (বিশেষ লোকদের সাথে) হয়, এভাবে আমরা এগুলোকে দু'ভাগে করা যায় দেখতে পাই।
১০০০. 'আবদ' শব্দটি কুরআনে কারীমে কেবল তার জন্যই ব্যবহৃত হয়েছে যে দাসত্ব করেছে। তাই যে দাসত্ব করে না তার জন্য বলা হয় না যে তিনি ইবাদত করেছেন। যেমন আল্লাহ বলেন, "বিভ্রান্তদের মধ্যে যে তোমার অনুসরণ করবে সে ছাড়া আমার বান্দাদের ওপর তোমার কোনো ক্ষমতাই থাকবে না।" [সূরা আল-হিজর: ৪২] তবে এ আয়াতের শেষে যে ব্যতিক্রম থাকার কথা এসেছে, "বিভ্রান্তদের মধ্যে যে তোমার অনুসরণ করবে সে ছাড়া" তা বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম, যা আগের সাথে সম্পৃক্ত নয়। যেমনটি অধিকাংশ মুফাসসির ও আলেমগণ বলেছেন। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (১/৪৩)। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আল-'আবদ' দুটি অর্থকে গ্রহণ করে: এক. যে অনিচ্ছায় দাসত্ব করে। যেমন আল্লাহ বলেন, "আসমানসমূহ ও যমীনে এমন কেউ নেই, যে দয়াময়ের কাছে বান্দারূপে উপস্থিত হবে না।" [সূরা মারইয়াম: ৯৩] আরও বলেন, "তারা কি চায় আল্লাহ্ দীনের পরিবর্তে অন্য কিছু? অথচ আসমান ও যমীনে যা কিছু রয়েছে সবকিছুই ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। আর তাঁর দিকেই তাদের ফিরিয়ে নেয়া হবে।" [সূরা আলে ইমরান: ৮৩] এ দাসত্ব থেকে কেউ মুক্ত থাকতে পারে না। দুই, যে ইচ্ছায় ইবাদত করে, তাঁর কাছে সাহায্য চায়। বস্তুত এটিই কুরআনে কারীমে বেশি এসেছে। যেমন, "আর 'রহমান'-এর বান্দা তারাই, যারা যমীনে অত্যন্ত বিনম্রভাবে চলাফেরা করে এবং যখন জাহেল ব্যক্তিরা তাদেরকে (অশালীন ভাষায়) সম্বোধন করে, তখন তারা বলে, 'সালাম'।” [সূরা আল-ফুরকান: ৬৩] আরও বলেন, "এমন একটি প্রস্রবণ যা থেকে আল্লাহর বান্দাগণ পান করবে, তারা এ প্রস্রবণকে যথেচ্ছা প্রবাহিত করবে।" [সূরা আল-ইনসান: ০৬]
এ দাসত্ব থেকে কখনও কখনও মানুষ মুক্ত থাকতে পারে। কিন্তু প্রথম প্রকার দাসত্ব সেটা যে কোনো সৃষ্টির অবিচ্ছিন্ন বাধ্য গুণ। কারণ এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে তার ওপর তাকদীরের সকল কিছু যথাযথভাবে সংঘটিত হবে আর স্রষ্টা তার ওপর সবকিছু পরিচালনা করেন।' দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (১৪/২৯-৩০), (১০/১৫৪-১৫৮, ১৮০)। রিসালাতুল উবুদিয়্যাহ।
কিছু দিক থেকে (মা'য়িয়্যাাহ) এর উদাহরণ হচ্ছে, রবুবিয়্যাহ ও উবুদিয়্যাহ তথা রব্ব হওয়া ও দাস হওয়া এর মত (১৮৯) কেননা উভয়টি 'আসল রুবুবিয়্যাত' ও 'আসল উলুহিয়াত' হিসেবে (قدر مشترك) কমন একটি অর্থে মিল থাকলেও, স্থান-কাল-পাত্র ভেদে তার অর্থ ভিন্ন হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। যদিও মূল অর্থ সব স্থানে একই।
সুতরাং [রুবুবিয়াত শব্দটি] যখন আল্লাহ বললেন: ﴿رَبِّ الْعَالَمِينَ - رَبِّ مُوسَى وَهَارُونَ﴾ [الأعراف: ١٢٢،١٢١] "বিশ্ব-জাহানের রব্ব, মূসা ও হারুনের রব্ব।" [সূরা আল-আ'রাফ: ১২১, ১২২] এখানে মূসা এবং হারূনের জন্য রব্ব হওয়া বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন, যা বিশ্বজাহানের অপর সৃষ্টি রব্ব হওয়া থেকে একটু বেশি। কারণ কাউকে যদি আল্লাহ তা'আলা পূর্ণতা বেশি প্রদান করেন তবে তা দ্বারা তিনি অন্যদের থাকে তাকে বেশি লালন-পালন করেছেন, বিশেষভাবে তারবিয়াত ও প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, তার তারবিয়াত অন্যদের চেয়ে বেশি।
অনুরূপভাবে [উবুদিয়াত শব্দটিও সাধারণভাবে ও বিশেষ অর্থে হয়, যদিও শব্দের মূল অর্থ দাসত্বের একটি জায়গায় কমন মিল থাকে, তারপরও তা সাধারণভাবে সকলের জন্য ব্যবহৃত হয়, আবার বিশেষ অর্থেও ব্যবহৃত হয়, যেমন বিশেষ অর্থে ব্যবহার হয়েছে] তাঁর ﴿ عَيْنًا يَشْرَبُ بِهَا عِبَادُ اللَّهِ يُفَجِّرُونَهَا تَفْجِيرًا) [الإنسان: ٦] এবং (سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلاً) [الإسراء:1]।
বাগীতে যেখানে আল্লাহ বলেন, [“এমন একটি প্রস্রবণ যা থেকে আল্লাহর বান্দাগণ পান করবে, তারা এ প্রস্রবণকে যথেচ্ছা প্রবাহিত করবে।” [সূরা আল-ইনসান: ০৬] “পবিত্র মহিমাময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতের মাধ্যমে ভ্রমণ করালেন।” [সূরা আল-ইসরা: ০১] (১০০০)
কারণ এই 'আব্দ' শব্দটি দ্বারা কখনো উদ্দেশ্য হয়, 'মু'আব্বাদ' বা যা অধীনতায় আবদ্ধ বা দাসত্বের নীতির অধীন, (ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়) এ অর্থ সমগ্র সৃষ্টির ক্ষেত্রে সাধারণভাবে প্রযোজ্য, এটার উদাহরণ আল্লাহর বাণী, (إِن كُلُّ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ إِلَّا آتِي الرَّحْمَنِ عَبْدًا) [مريم: ٩٣] “আসমানসমূহ ও যমীনে এমন কেউ নেই, যে দয়াময়ের কাছে বান্দারূপে উপস্থিত হবে না।” [সূরা মারইয়াম: ৯৩] আবার কখনো 'আব্দ' শব্দটি দ্বারা উদ্দেশ্য হয় 'আবেদ' বা ইবাদতকারী, দাসত্বকারী। (যা কেবল ইচ্ছাকৃত ইবাদতকারীকে বুঝায়) আর তখন সেটি বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত হয়। তারপর তাতে বিভিন্ন স্তর হয়, (আবদ) যদি কেউ জ্ঞান ও অবস্থা অনুযায়ী বেশি ইবাদত করে, তার ইবাদত হবে বেশি পরিপূর্ণ; তখন তাঁর দিকে সম্পৃক্ত হওয়া পূর্ণতাজ্ঞাপক; যদিও সকল অবস্থাতেই এটি তার আসল বা হাকীকী অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। (অর্থাৎ কাফেরও দাস, ঈমানদারও দাস, অথচ উভয়ের দাসত্বের অবস্থা সমান নয়, কিন্তু তাই বলে কারও দাস হাকীকী বা প্রকৃত, আর কারও দাস মাজাযী বা রূপক নয়। উভয়ের দাসত্বই প্রকৃত দাসত্ব।)
টিকাঃ
৯৯৯. অর্থাৎ মা'য়িয়্যাহ এর অর্থ কী হবে, তা বুঝতে হলে এটিকে রুবুবিয়্যাহ ও উবুদিয়্যাহ'র মতো করে বুঝতে হবে। রুবুবিয়্যাহ যেমন সাধারণভাবে সকলের জন্য রয়েছে, তেমনি বিশেষ করে বিশেষ লোকদের জন্যও রয়েছে। অনুরূপভাবে উবুদিয়্যাহ বা আল্লাহর দাসত্ব সাধারণভাবে সবাই ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক তা মানতে বাধ্য, আবার বিশেষভাবে কিছু লোকদের জন্য তা নির্ধারিত হয়, যারা তাঁকে ইচ্ছাকৃত রব্ব মেনে নিয়ে তাঁর সন্তুষ্টির জন্ন প্রতিনিয়ত ইবাদত করে চলেছে। তাই মা'য়িয়্যাহ শব্দটিকেও আমরা উভয়ভাবে দেখতে পারি, তা যেমন মায়িয়্যাহ 'আম্মাহ (সকলের সাথে) হয়, তেমনি তা মা'য়িয়্যাহ খাসসাহ (বিশেষ লোকদের সাথে) হয়, এভাবে আমরা এগুলোকে দু'ভাগে করা যায় দেখতে পাই।
১০০০. 'আবদ' শব্দটি কুরআনে কারীমে কেবল তার জন্যই ব্যবহৃত হয়েছে যে দাসত্ব করেছে। তাই যে দাসত্ব করে না তার জন্য বলা হয় না যে তিনি ইবাদত করেছেন। যেমন আল্লাহ বলেন, "বিভ্রান্তদের মধ্যে যে তোমার অনুসরণ করবে সে ছাড়া আমার বান্দাদের ওপর তোমার কোনো ক্ষমতাই থাকবে না।" [সূরা আল-হিজর: ৪২] তবে এ আয়াতের শেষে যে ব্যতিক্রম থাকার কথা এসেছে, "বিভ্রান্তদের মধ্যে যে তোমার অনুসরণ করবে সে ছাড়া" তা বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম, যা আগের সাথে সম্পৃক্ত নয়। যেমনটি অধিকাংশ মুফাসসির ও আলেমগণ বলেছেন। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (১/৪৩)। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আল-'আবদ' দুটি অর্থকে গ্রহণ করে: এক. যে অনিচ্ছায় দাসত্ব করে। যেমন আল্লাহ বলেন, "আসমানসমূহ ও যমীনে এমন কেউ নেই, যে দয়াময়ের কাছে বান্দারূপে উপস্থিত হবে না।" [সূরা মারইয়াম: ৯৩] আরও বলেন, "তারা কি চায় আল্লাহ্ দীনের পরিবর্তে অন্য কিছু? অথচ আসমান ও যমীনে যা কিছু রয়েছে সবকিছুই ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। আর তাঁর দিকেই তাদের ফিরিয়ে নেয়া হবে।" [সূরা আলে ইমরান: ৮৩] এ দাসত্ব থেকে কেউ মুক্ত থাকতে পারে না। দুই, যে ইচ্ছায় ইবাদত করে, তাঁর কাছে সাহায্য চায়। বস্তুত এটিই কুরআনে কারীমে বেশি এসেছে। যেমন, "আর 'রহমান'-এর বান্দা তারাই, যারা যমীনে অত্যন্ত বিনম্রভাবে চলাফেরা করে এবং যখন জাহেল ব্যক্তিরা তাদেরকে (অশালীন ভাষায়) সম্বোধন করে, তখন তারা বলে, 'সালাম'।” [সূরা আল-ফুরকান: ৬৩] আরও বলেন, "এমন একটি প্রস্রবণ যা থেকে আল্লাহর বান্দাগণ পান করবে, তারা এ প্রস্রবণকে যথেচ্ছা প্রবাহিত করবে।" [সূরা আল-ইনসান: ০৬]
এ দাসত্ব থেকে কখনও কখনও মানুষ মুক্ত থাকতে পারে। কিন্তু প্রথম প্রকার দাসত্ব সেটা যে কোনো সৃষ্টির অবিচ্ছিন্ন বাধ্য গুণ। কারণ এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে তার ওপর তাকদীরের সকল কিছু যথাযথভাবে সংঘটিত হবে আর স্রষ্টা তার ওপর সবকিছু পরিচালনা করেন।' দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (১৪/২৯-৩০), (১০/১৫৪-১৫৮, ১৮০)। রিসালাতুল উবুদিয়্যাহ।
📄 উপরোক্ত শব্দগুলো মূলত যুক্তিবাহ্যিক, যা মূলত মুতাওয়াতিরহাই এরই অংশ
এরূপ শব্দগুলোকে কেউ কেউ মুশাক্কিকাহা( مشککة) বলে, কারণ এগুলো শ্রোতাকে এ সন্দেহের মধ্যে ফেলে দেয় যে, এগুলোকে 'আল-আসমাউল মুতাওয়াত্বিয়াহ' (الأسماء المتواطئة) বলা হবে, নাকি এগুলো নিছক 'আল-মুশতারাকুল লাফযী' (المشترك اللفظي) এর অন্তর্ভুক্ত হবে?
মুহাক্কিক আলেমগণ জানেন যে, এগুলো মুতাওয়াত্বিয়াহ শ্রেণির বাইরে নয়। কারণ ভাষা নির্মাতা সেটাকে 'কাদরে মুশতারাক' তথা অর্থের তুল্য অংশটুকুর জন্য রেখেছেন। আর মুশাক্কিকাহ যদিও 'মুতাওয়াত্বিয়াহ' এর একটি প্রকার, তবুও এটার জন্য ভিন্ন পরিভাষা ব্যবহার করতে কোনো সমস্যা নেই। (১০০২)
টিকাঃ
১০০১. একই শব্দ বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হলে তার মাঝে বিভিন্ন প্রকার সম্পর্ক হতে পারে, যেমন, ১- মুশতারিক, একই শব্দ, তবে আলাদা আলাদা অর্থ, অর্থগুলোর মাঝে কোনো কমন (সাধারণ) অর্থ নেই। যেমন, আরবী ভাষায় 'আইন'। তা চোখের জন্যও ব্যবহৃত হয়, পানির ঝর্ণার জন্যও ব্যবহৃত হয়, গোয়েন্দার জন্যও ব্যবহৃত হয়। ২- মুতাওয়াত্বি', একই শব্দ, তবে আলাদা আলাদা অর্থ, কিন্তু অর্থগুলোর মাঝে সাধারণ একটি মিল পাওয়া যায়। ক. যদি সাধারণ অর্থটুকু সমানভাবে প্রতিটি অর্থেই পাওয়া যায় তবে সেটাকে মুতাওয়াত্বি' (মুতাসাওয়ী) বলা হয়। যেমন, ওজুদ, ইনসান ইত্যাদি। আর মুতাওয়াত্বি' বলতে সাধারণত এটাকেই বুঝায়। খ. যদি সাধারণ অর্থটুকু প্রতিটি অর্থেই সমানভাবে না বুঝিয়ে ভিন্ন অনুপাতে পাওয়া যায় তবে সেটাকে মুশাক্কিক বলা হবে। যেমন, নূর, তা সূর্যের আলো, চাঁদের আলো, বাতির আলো সবকিছুর অর্থ দেয়, তবে মাত্রায় ভিন্নতা আছে। অনুরূপ 'আবয়াছ' বা সাদা শব্দটি, তা হাতির দাঁতের শুভ্রতাকেও বুঝায় আবার বরফের শুভ্রতাকেও বুঝায়। ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, একই শব্দকে কখনও মুশতারাক বলা যায়, আবার কখনো মুতাওয়াত্বি'ও বলা যায়। তা নির্ভর করবে অর্থের কোন অংশটুকু উদ্দেশ্য করে ব্যবহার করা হয়েছে সেটার ওপর। যেমন, 'দাব্বাহ'। যমীনের উপর হাল্কা যারাই চলে এমন সবকিছুকে শামিল করে, সে হিসেবে ঘোড়ার ক্ষেত্রে, গাধার ক্ষেত্রে এটা ব্যবহার করা মুতাওয়াত্বি'। কিন্তু দাব্বাহ এর বিশেষ অর্থ হচ্ছে ঘোড়া। তখন 'দাব্বাহ' শব্দটি ঘোড়া ও অন্যান্য প্রাণীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে 'মুশতারাক' হয়ে যাবে।
১০০২. এখানকার অধিকাংশ কথার সংক্ষিপ্ত উদ্দেশ্য এটা বলা যে, আল্লাহর নাম, তাঁর গুণ আর আল্লাহর সৃষ্টির নাম ও তাদের গুণাবলির মাঝে কিছু অংশে মিল থাকতেই পারে, আর এটুকু মিলের অস্তিত্ব না থাকলে মানুষে কখনো আল্লাহর সম্বোধনই বুঝতে সক্ষম হতো না। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/৭৬- ৭৭, ১৮৮-১৯১), (৫/২০৪-২১২, ৩২৮-৩৩১), (৯/১৪৫-১৪৭), (২০/৪২৩-৪৩১); নাক্বদ্ভুত তা'সীস (২/৩৭৮-৩৮২)।
এরূপ শব্দগুলোকে কেউ কেউ মুশাক্কিকাহা( مشککة) বলে, কারণ এগুলো শ্রোতাকে এ সন্দেহের মধ্যে ফেলে দেয় যে, এগুলোকে 'আল-আসমাউল মুতাওয়াত্বিয়াহ' (الأسماء المتواطئة) বলা হবে, নাকি এগুলো নিছক 'আল-মুশতারাকুল লাফযী' (المشترك اللفظي) এর অন্তর্ভুক্ত হবে?
মুহাক্কিক আলেমগণ জানেন যে, এগুলো মুতাওয়াত্বিয়াহ শ্রেণির বাইরে নয়। কারণ ভাষা নির্মাতা সেটাকে 'কাদরে মুশতারাক' তথা অর্থের তুল্য অংশটুকুর জন্য রেখেছেন। আর মুশাক্কিকাহ যদিও 'মুতাওয়াত্বিয়াহ' এর একটি প্রকার, তবুও এটার জন্য ভিন্ন পরিভাষা ব্যবহার করতে কোনো সমস্যা নেই। (১০০২)
টিকাঃ
১০০১. একই শব্দ বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হলে তার মাঝে বিভিন্ন প্রকার সম্পর্ক হতে পারে, যেমন, ১- মুশতারিক, একই শব্দ, তবে আলাদা আলাদা অর্থ, অর্থগুলোর মাঝে কোনো কমন (সাধারণ) অর্থ নেই। যেমন, আরবী ভাষায় 'আইন'। তা চোখের জন্যও ব্যবহৃত হয়, পানির ঝর্ণার জন্যও ব্যবহৃত হয়, গোয়েন্দার জন্যও ব্যবহৃত হয়। ২- মুতাওয়াত্বি', একই শব্দ, তবে আলাদা আলাদা অর্থ, কিন্তু অর্থগুলোর মাঝে সাধারণ একটি মিল পাওয়া যায়। ক. যদি সাধারণ অর্থটুকু সমানভাবে প্রতিটি অর্থেই পাওয়া যায় তবে সেটাকে মুতাওয়াত্বি' (মুতাসাওয়ী) বলা হয়। যেমন, ওজুদ, ইনসান ইত্যাদি। আর মুতাওয়াত্বি' বলতে সাধারণত এটাকেই বুঝায়। খ. যদি সাধারণ অর্থটুকু প্রতিটি অর্থেই সমানভাবে না বুঝিয়ে ভিন্ন অনুপাতে পাওয়া যায় তবে সেটাকে মুশাক্কিক বলা হবে। যেমন, নূর, তা সূর্যের আলো, চাঁদের আলো, বাতির আলো সবকিছুর অর্থ দেয়, তবে মাত্রায় ভিন্নতা আছে। অনুরূপ 'আবয়াছ' বা সাদা শব্দটি, তা হাতির দাঁতের শুভ্রতাকেও বুঝায় আবার বরফের শুভ্রতাকেও বুঝায়। ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, একই শব্দকে কখনও মুশতারাক বলা যায়, আবার কখনো মুতাওয়াত্বি'ও বলা যায়। তা নির্ভর করবে অর্থের কোন অংশটুকু উদ্দেশ্য করে ব্যবহার করা হয়েছে সেটার ওপর। যেমন, 'দাব্বাহ'। যমীনের উপর হাল্কা যারাই চলে এমন সবকিছুকে শামিল করে, সে হিসেবে ঘোড়ার ক্ষেত্রে, গাধার ক্ষেত্রে এটা ব্যবহার করা মুতাওয়াত্বি'। কিন্তু দাব্বাহ এর বিশেষ অর্থ হচ্ছে ঘোড়া। তখন 'দাব্বাহ' শব্দটি ঘোড়া ও অন্যান্য প্রাণীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে 'মুশতারাক' হয়ে যাবে।
১০০২. এখানকার অধিকাংশ কথার সংক্ষিপ্ত উদ্দেশ্য এটা বলা যে, আল্লাহর নাম, তাঁর গুণ আর আল্লাহর সৃষ্টির নাম ও তাদের গুণাবলির মাঝে কিছু অংশে মিল থাকতেই পারে, আর এটুকু মিলের অস্তিত্ব না থাকলে মানুষে কখনো আল্লাহর সম্বোধনই বুঝতে সক্ষম হতো না। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/৭৬- ৭৭, ১৮৮-১৯১), (৫/২০৪-২১২, ৩২৮-৩৩১), (৯/১৪৫-১৪৭), (২০/৪২৩-৪৩১); নাক্বদ্ভুত তা'সীস (২/৩৭৮-৩৮২)।
📄 আল্লাহ আসমানে থাকার অর্থ
অতঃপর যে ধারণা করবে যে, 'আল্লাহ আসমানে' অর্থ আসমান তাকে বেষ্টন করে রেখেছে, তাহলে সে অবশ্যই হয় মিথ্যাবাদী যদি অন্যের কথা সংকলন করে (১০০৪), আর না হয় পথভ্রষ্ট যদি সে তার রবের ব্যাপারে এমনটি বিশ্বাস করে। এ শব্দ থেকে কেউ এমন বুঝেছে এমনটি আমরা শুনিনি। আর কাউকে একজন থেকেও এমনটি বর্ণনা করতে আমরা দেখিনি। যদি সকল মুসলিমকে জিজ্ঞেস করা হয়, আল্লাহ আসমানে কথা দ্বারা কি তোমরা এটা বুঝেছ যে, আসমান তাকে ঘিরে রেখেছে, বেষ্টন করে রেখেছে?, তাহলে সবাই অতি দ্রুত বলত: এটা আমাদের কল্পনাতেও আসেনি। (১০০৫)
সুতরাং যখন প্রকৃত অবস্থা এমন হলো তখন প্রকাশ্য বিষয়কে অসম্ভব অবোধগম্য বানানো, যাতে মানুষ না বুঝে, ফলে তাকে তা'ওয়ীল করতে চাইবে, এটাই হচ্ছে 'তাকাল্লুফ' বা অযাচিত আচরণ করা; বরং মুসলিমদের নিকট এটাই নির্ধারিত যে, তিনি আসমানে, তিনি 'আরশের উপরে দু'টো একই কথা। যেহেতু আসমান দ্বারা উদ্দেশ্য উঁচু, তাই এটার অর্থ তিনি উঁচুতে, নিচুতে নয়। আবার মুসলিমগণ জানে যে, আল্লাহর কুরসীতে আসমান- যমীনের জায়গা হয়, আর কুরসী 'আরশের তুলনায় শূন্য ভূখণ্ডে ফেলে রাখা আংটির ন্যায়। আর 'আরশ আল্লাহর সৃষ্টিসমূহের একটি, আল্লাহর ক্ষমতা ও বড়ত্ব-মহত্বের সাথে সেটার কোনো তুলনা নেই। এর পরেও কীভাবে ধারণা করা যেতে পারে যে, একটা মাখলুক তাঁকে পরিবেষ্টন করতে পারে?
আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: (ফির'আউন বলেছিল) ﴿وَلَأُصَلِّبَنَّكُمْ فِي جُذُوعِ النَّخْلِ) [طه: ٧١] 'আর আমি তোমাদেরকে খেজুর গাছের কাণ্ডে শূলিবিদ্ধ করবই।" [সূরা ত্বা-হা: ৭১] তিনি আরও বলেন, ﴿فَسِيرُوا فِي الأَرْضِ﴾ [آل عمران: ۱۳۷] "সুতরাং তোমরা যমীনে ভ্রমণ কর।" [সূরা আলে ইমরান: ১৩৭] এখানে في টি على অর্থে। (১০০৬) অনুরূপ আরও আছে। এটা তো হাকীকী আরবী কথা, রূপক নয়। এটা সেই জানে যে (হুরুফুল মা'আনী) আরবী অর্থপূর্ণ হরফসমূহের হাকীকী অর্থ জানে। বস্তুত এ (হুরুফুল মা'আনী) গুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে মুতাওয়াত্বিয়াহ (প্রতিটি অর্থের মাঝে একক কোনো জায়গায় মিল থাকবে), মুশতারিকা (প্রতিটি অর্থ পরস্পর বিরোধপূর্ণ, এমন) নয়। (১০০৭)
"ইজা ক্বা-মা আহাদুকুম ইলাস সালাতি ফাইন্নাল্লাহা ক্বিলা ওয়াজহাহু, فালা ইয়াবসুক্ব ক্বিলা ওয়াজহিহী : তোমাদের কেউ সালাতে দাঁড়ালে আল্লাহ তার চেহারার সম্মুখে থাকেন, কাজেই সে যেন সামনে থুথু না ফেলে।"(১০০৮) এ হাদীসটিও হক্ক ও যথার্থভাবে তার যাহেরী বা প্রকাশ্য অর্থেই গ্রহণ করা হবে। কারণ মহান আল্লাহ 'আরশের উপরে, আবার তিনি মুসল্লির সম্মুখেও। (১০০৯) তাছাড়া এ গুণটি তো মাখলুক বা সৃষ্টির জন্যও সাব্যস্ত হতে পারে; কেননা মানুষ যদি আকাশের সাথে আলাপ করে বা চন্দ্র-সূর্যের সাথে চুপে চুপে আলাপ করে তাহলে আসমান, চন্দ্র-সূর্য তার উপরে থাকে এবং তার সম্মুখেও থাকে।
বস্তুত নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দ্বারা উপমা পেশ করেছেন। আর আল্লাহর জন্য তো রয়েছে সর্বোচ্চ উপমা। তবে উপমা দ্বারা উদ্দেশ্য এটা জায়েয ও সম্ভব বর্ণনা করা, স্রষ্টাকে সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য দেয়া নয়। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
«ما منكم من أحد إلا سيرى ربه مخليا به». فقال له أبو رزين العقيلي : كيف يا رسول الله، وهو واحد ونحن جميع؟ فقال النبي صلى الله عليه وسلم: «سأنبئك مثل ذلك في آلاء الله، هذا القمر كلكم يراه مخليا به وهو آية من آيات الله، فالله أكبر»(১০১০) অথবা নবীজি যেমনটি বলেছেন তেমন।
তিনি আরও বলেছেন: «إنكم سترون ربكم كما ترون الشمس والقمر "তোমরা তোমাদের রবকে অবশ্যই দেখতে পাবে যেমন তোমরা চন্দ্র-সূর্য দেখে থাক।"(১০১১) নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখাকে দেখার সাথে সাদৃশ্য দিয়েছেন, যদিও দৃষ্টটি অপর দৃষ্টের সদৃশ নয়। (১০১২) তাই মুমিনগণ যখন তাদের রবকে কিয়ামতের দিন দেখতে পাবে এবং তাঁর সাথে কথা বলবে প্রত্যেকেই তাঁকে উপরে সম্মুখে দেখবে, যেমন চন্দ্র-সূর্যকে দেখে। কোনো বৈপরীত্য নেই।
টিকাঃ
১০০৩. ঊর্ধ্ব দিক একটি পূর্ণাঙ্গ গুণ ও প্রশংসার গুণ। চাই সেটাকে সত্তাগতভাবে উপরে বলা হোক কিংবা সম্মানের দিক থেকে উপরে ধরা হোক। তার বিপরীতে নিচে থাকা সাধারণত নিন্দিত। তাই আল্লাহ তা'আলাকে নিচে থাকার গুণ প্রদান করা হলে মানুষ তার স্বাভাবিক ফিত্বরাতের মাধ্যমেই বুঝতে পারে যে, আল্লাহ তা থেকে পবিত্র। নিচে থাকা মানুষের জন্যও নিন্দিত, তাহলে স্রষ্টার জন্য সেটা তো নিন্দিত হবেই। যেমনটি ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল বলেন, 'আমি যত নিচের জিনিস পেয়েছি সবই নিন্দিত...'। দেখুন, আর-রাদ্দু 'আলায় যানাদিক্কাতি ওয়াল জাহমিয়্যাহ, পৃ. ২৮৭; ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৫/৭৩, ৯৯)।
১০০৪. বিশেষ করে যদি কেউ সালাফদের থেকে এমন কথা বর্ণনা করে। কারণ সালাফরা কেউই এমন কথা বলেননি।
১০০৫. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ অন্যত্র এ অংশের ব্যাখ্যা করে বলেন, 'তুমি যদি সেসব লোকদের জিজ্ঞাসা কর যারা তাদের রবকে ডাকে, তুমি কি তোমার রব আল্লাহ তা'আলাকে তোমার অন্তরে তোমার দেখা কোনো জীবিত সক্ষম ও জ্ঞানী মানুষের মত বিশ্বাস কর? তবে তুমি যাকে প্রশ্ন করেছ সে অবশ্যই বলবে, এ বিষয়টি কখনও আমার অন্তরে উদিত হয়নি, বরং যে এ রকম বলেছে, অথবা যে এমন বিশ্বাস করবে তাকে এত ঘৃণা করবে সে রকম ঘৃণার চেয়েও বেশি যে ফিরিশতাদেরকে মাছি বা চড়ুই পাখির মতো মনে করবে। মোটকথা: বনী আদম এটা নিজেদের ব্যাপারে ভালো করেই জানে যে, তাদেরকে এ বিশ্বাসের দিকে কোনো কিছুই ঠেলে দেয় না যে তারা আল্লাহকে মানুষের মতো মনে করবে বা মনুষ্য প্রজাতির মনে করবে। সুতরাং বনী আদমের ওপর এমন দাবি করা তাদের ওপর মিথ্যা রটনা।' ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৪/৬১০-৬১১)।
১০০৬. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এ বিষয়টি তার আর-রিসালাতুত তাদমুরিয়্যাহ গ্রন্থের চতুর্থ নীতিতে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। বিষয়টির সারসংক্ষেপ হচ্ছে: ক) যে কেউ মনে করবে আল্লাহ তা'আলাকে আসমানে বা আরশের উপর সাব্যস্ত করা দ্বারা প্রকাশ্য অর্থে সৃষ্টির মত করে ফেলা হয়, তাহলে সে সর্বসম্মতিতে মূর্খ ও পথভ্রষ্ট। খ) ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, 'ফী' অব্যয়টি, যাকে আরবী ব্যাকরণের নাহুবিদরা 'যরফ' বা স্থান বলে, তা মূলত প্রতি জায়গায় তার ব্যবহারবিধি উপযোগী অর্থ প্রদান করে। যখন বলা হবে, ফলের মাঝে স্বাদ, রং ও গন্ধ ঢুকানো আছে অথবা বলা হবে, জ্ঞান, ক্ষমতা ও কথা এগুলো বক্তার মাঝে প্রবিষ্ট আছে, তাহলে সে অর্থটি (যরফ) বা স্থান বুঝানো অবশ্যই বিবেকের যুক্তির দাবি। কিন্তু যখন বলা হবে, এ লোকটি তার ঘরে প্রবিষ্ট অথবা পানি তার ভাণ্ডারে প্রবিষ্ট তখন সেটার ভিন্ন। কারণ আগের উদাহরণ দু'টিতে সিফাত তার মাওসূফে প্রবিষ্ট ছিল, কিন্তু পরবর্তী উদাহরণ দু'টিতে পূর্ণ অবয়ব বিশিষ্ট সত্তা যা জিসিম বা জাওহার বলা হয় তা তার প্রবিষ্ট হওয়ার স্থানে প্রবেশ করেছে। সেজন্যই লোকদের বাসস্থানের জায়গাকে মহল্লা বলা হয়। আর বলা হয়, অমুক প্রবেশ করেছে অমুক জায়গাতে। আর যখন বলা হয়, সূর্য ও চন্দ্র পানির মাঝে, অথবা আয়নার মাঝে, অথবা অমুকের চেহারা আয়নার মাঝে অথবা অমুকের কথা কাগজের মধ্যে, তখন সেটার ভিন্ন আরেক অর্থ রয়েছে যা মানুষ মাত্রই বুঝতে পারে। তারা জানতে পারে যে, সূর্য, চাঁদ ও চেহারা আয়নায় প্রকাশিত হয়েছে ও তাতে দেখা গেছে, সেগুলোর সত্তা কখনও তাতে প্রবেশ করেনি। তাতে তো প্রবেশ করেছে কেবল প্রতিবিম্বের মত কিছু, যারা এটা বলে থাকে। অনুরূপভাবে কোনো কথা যখন কাগজে লেখা হয়, তখন মানুষ ভালো করেই জানে যে, এ কথা তাতে লেখা হয়েছে, তাতে পঠিত হবে, তার দিকে তাকিয়ে থাকা হবে। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, আল-জাওয়াবুস সহীহ (৩/৯১-৯২)।
তিনি আরও বলেন, 'নিঃসন্দেহে 'ফী' অব্যয়টি তার আগের ও পরের কথার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে অর্থ প্রকাশ করে। সুতরাং সেটি কিসের দিকে সম্বন্ধিত হলো তা দেখতে হবে, সেটা অনুসারেই তার অর্থ নির্ধারিত হবে। আর সে জন্যই কোনো কিছু কোনো স্থানে থাকা আর কোনো জিসিম অপর (হাইয়্যেয) অবস্থানে থাকা এবং কোনো 'আরাদ্ব' (গুণ) জিসিমের (শরীরের) মাঝে থাকা, কোনো চেহারা আয়নায় থাকা, কোনো কথা কাগজে থাকা এগুলোর মধ্যে পার্থক্য করা জরুরী। কারণ এর প্রতিটি প্রকারের রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য যা তাকে অন্যদের থেকে পৃথক করে দেয়, যদিও সেসব জায়গার সব স্থানেই 'ফী' ব্যবহার করা হয়েছে।
তাই যদি কেউ বলে, 'আরশ কি আসমানে নাকি যমীনে? তাকে বলা হবে, আসমানে। আর যদি বলা হয়, জান্নাত কি আসমানে নাকি যমীনে? তাকে বলা হবে, জান্নাত আসমানে। এর দ্বারা এটা আবশ্যক হয় না যে, আরশ আসমানসমূহের ভিতরে, বরং অনুরূপভাবে জান্নাতও নয়।' মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/৫২); আর-রিসালাতুত তাদমুরিয়্যাহ, পৃ. ৮৫-৮৬।
গ) আল্লাহ আসমানে বা 'আরশে উভয় কথার উদ্দেশ্য একই। আর তা হচ্ছে, নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা উপরে, আর উপরে থাকা এ কথাটি সকল সৃষ্টিকুলের উপরে থাকাকেই বুঝায়। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আক্কলি ওয়ান নাকলি (৭/১৬)।
ঘ) যদি ধরে নেয়া হয় যে, আসমান দ্বারা উপরস্থিত গোলকসমূহকে বুঝানো হয়েছে। তবে অবশ্যই অর্থ করতে হবে, তিনি সেটারও উপরে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, )فَسِيحُوا فِي الْأَرْضِ( 'অতঃপর তোমরা যমীনের মাঝে বিচরণ করো' [সূরা আত-তাওবাহ: ০২] অর্থাৎ যমীনের উপরে।
১০০৭. বিষয়টি বুঝার জন্য দেখুন, ইবন তাইমিয়্যা, নাকছুত তা'সীস (১/৫৫৭)...; মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/৫২), (৫/২৫৬-২৫৮)।
১০০৮. হাদীসটির তাখরীজ আগে চলে গেছে।
১০০৯. এটা স্থিরিকৃত বিষয় যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর আসমানসমূহের উপরে তাঁর 'আরশের উপরে, সৃষ্টিকুল থেকে পৃথক, তাঁর সৃষ্টিকুলের মাঝে তাঁর সত্তার কোনো কিছু নেই, আর না সত্তায় তাঁর সৃষ্টিকুলের কোনো কিছু আছে। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা 'আরশের প্রতি মুখাপেক্ষী নন, সকল সৃষ্টিকুলের কারো প্রতিই তিনি মুখাপেক্ষী নন। বরং তিনিই তাঁর ক্ষমতায় 'আরশ ও 'আরশ বহনকারীদের বহন করে আছেন। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (১/৩৬৭), কায়েদাহ জালীলাহ ফিত তাওয়াসসুলে ওয়াল ওসীলাহ, পৃ. ৩৩৫।
বান্দা যখন সালাতে দাঁড়ায় তখন সে তার রবের মুখোমুখি হয় আর আল্লাহও তার দিকে তাঁর চেহারা নিয়ে অগ্রসর হন, যখন না বান্দা তার চেহারাকে অন্য দিকে না ঘুরায়। বস্তুত এটার ওপর বহু সহীহ হাদীস মুতাওয়াতির সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়ে এসেছে। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী, 'যখন তোমাদের কেউ সালাতে দাঁড়ায় তখন তো সে তার রবের মুখোমুখি হয়', যদি তাই হয়ে থাকে, তবে বান্দা যেদিকেই মুখ করুক না কেন সে তো আল্লাহর চেহারার মুখোমুখি হয়। আর আল্লাহ তাঁর 'আরশের উপর, তাঁর আসমানসমূহের উপর, অথচ তিনি পুরো জগতকে ঘিরে আছেন, সুতরাং বান্দা যদিকেই মুখ ফিরাক না কেন আল্লাহ তা'আলা তো তার সামনে হবেই।' দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৬/৭৬); মাজমু ফাতাওয়া (৬/১৭)।
এ হাদীসটিকে একদল হাদীস ব্যাখ্যাতা তা'ওয়ীল বা অপব্যাখ্যা করেছে। তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন হাফেয ইবন হাজার, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন, তিনি এ হাদীসে আসা ভাষ্য 'অথবা তাঁর রব্ব অবশ্যই তার ও কিবলার মাঝে থাকেন।' এর ব্যাখ্যায় ইবন হাজার বলেন, 'অনুরূপ এর পরের হাদীসে এসেছে, 'কারণ আল্লাহ তা'আলা তার চেহারার বিপরীতে', তাই খাত্তাবী বলেন, এর অর্থ হচ্ছে, কিবলার দিকে তার মুখ করে দাঁড়ানোই তাকে তার রবের ইচ্ছার দিকে নিয়ে যাবে।' তাই সূক্ষ্ম অর্থ হবে, 'তখন তার উদ্দেশ্য তো তার ও তার কেবলার মাঝখানে। আবার কারও কারও মতে, সেখানে একটি মুযাফ বা সন্ধন্ধ পদ উহ্য রয়েছে, অর্থাৎ আল্লাহর মহত্ব অথবা আল্লাহর সাওয়াব। ইবন আব্দিল বার বলেন, এটি একটি বাক্য যা কিবলার মর্যাদার মহত্ব বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। এর ওপর ভিত্তি করে কোনো কোনো মু'তাযিলা দলীল নিয়েছে যে, আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান, নিঃসন্দেহে এটি প্রকাশ্য মূর্খতা। কারণ হাদীসে এসেছে সে যেন তার পায়ের নিচে থুতু ফেলে, এর মাঝে তাদের মূলনীতি ধূলিস্মাৎ হয়ে যায়। আর এর মাঝে তাদের কথারও খণ্ডন রয়েছে যারা বলে, আল্লাহ তা'আলা সত্তাগতভাবে 'আরশের উপর, আর এটাকে যেভাবে তা'ওয়ীল করা হবে ঐটাকেও অনুরূপ তা'ওয়ীল করে বলা যাবে।' ইবন হাজার, ফাতহুল বারী (১/৫০৮)। আর খাত্তাবীর কথা শুনুন তারই গ্রন্থ আ'লামুস সুনান (১/৩৮৬)।
ইবন হাজার রাহিমাহুল্লাহর এ বক্তব্যের যথাযথ সমালোচনা করেছেন দু'জন প্রখ্যাত আলেম। একজন হচ্ছেন শাইখ আব্দুল আযীয ইবন আব্দুল্লাহ ইবন বায, আরেকজন হচ্ছেন শাইখ আব্দুর রহমান ইবন সালেহ আল-বাররাক। শাইখ আব্দুল আযীয ইবন বায রাহিমাহুল্লাহ যখন ইবন হাজার রাহিমাহুল্লাহ'র এ কথাটি ভুল হওয়া তুলে ধরলেন যেখানে তিনি বলেছেন, 'এ হাদীসে তাদের বক্তব্যের খণ্ডন রয়েছে যারা বলে আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং 'আরশের উপরে'... তখন তিনি বললেন, 'এসব ভাষ্য ও অনুরূপ ভাষ্যকে আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক তাঁর 'আরশের উপর উঠার ভাষ্যসমূহের বিপরীতে দাঁড় করানো জায়েয হবে না; কারণ তাঁর 'আরশের উপর উঠা সংক্রান্ত ভাষ্যগুলো অকাট্য, সুদৃঢ় ও সুস্পষ্ট।' দেখুন, ফাতহুল বারীর ওপর শাইখ ইবন বায রাহিমাহুল্লাহ'র টীকা (১/৫০৮)। শাইখ আব্দুর রহমান সালেহ আল-বাররাক বলেন, '... অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলার সর্বোচ্চ সত্তা হওয়া, 'আরশের উপরে উঠা সংক্রান্ত যা কিছু এসেছে তা এ হাদীস, যেখানে বলা হয়েছে যে, 'নিশ্চয় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা সালাত আদায়কারীর চেহারার সম্মুখে থাকেন' অথবা 'তিনি সালাত আদায়কারী ও কিবলার মাঝখানে থাকেন' এ হাদীসের বিপরীত বা বিরোধী নয়; কারণ এখানে সেটাই বলা হবে যা আল্লাহর নৈকট্য ও সাথে থাকার ব্যাপারে বলা হয়ে থাকে। এসব কিছুর কোনোটিই তাঁর সর্বোচ্চ সত্তা হওয়া বিরোধী নয়। এসবের কোনো কিছুই মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাঁর সৃষ্টিকুলের মধ্যে প্রবিষ্ট হওয়া আবশ্যক করে না। দেখুন, ফাতহুল বারীর ওপর শাইখ আল-বাররাক এর টীকা (২/১৩২)।
১০১০ হাদীসটি কাছাকাছি শব্দে যারা বর্ণনা করেছেন, ১- আবু দাউদ, আস-সুনান (৫/৯৯-১০০), নং ৪৭৩১। ২- ইবন মাজাহ, আস-সুনান (১/৬৪), নং ১৮০। ৩- আহমাদ, আল-মুসনাদ (৪/১১-১৪), নং ১৬১৮৬, ১৬১৯২, ১৬১৯৮। ৪- ত্বায়ালিসী, পৃ. ১৪৭, নং ১০৯৪; ৫- হাকিম, আলমুস্তাদরাক (৪/৬০৫)। হাদীসটি হাসান। ৬- ইবন হিব্বান, আস-সহীহ, পৃ. ৪০, নং ৩৯। ৭- ইবন আবী আসেম, আস-সুন্নাহ (১/২০০), নং ৪৫৯, ৪৬০। ৮- ইবন খুযাইমাহ, আত-তাওহীদ (১/৪৩৮-৪৩৯), নং ২৫৩-২৫৪। ৯- আজুররী, 'আত-তাসদীক বিন-নাযরি ইলাল্লাহ বিল আখিরাহ, পৃ. ৫৩-৫৪। ১০- লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ (২/৪৮৩)।
১০১১. এর তাখরীজ আগে চলে গেছে।
১০১২, দেখাকে দেখার সাথে তুলনা করা হয়েছে, দৃষ্টকে দৃষ্টের সাথে তুলনা করা হয়নি। এ বিষয়টি ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বহু জায়গায় তুলে ধরেছেন। যেমন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/৪৭), (৫/১৭৫), (১১/৪৮১), (১৭/৩১৯), (১৮/২০০)। আর আল্লাহর দেখাকে সূর্য ও চন্দ্র দেখার সাথে তুলনার কারণ: ১- প্রকাশিত ও স্পষ্ট হওয়ার দিক থেকে। ২- উপরে ও ঊর্ধ্বে হওয়ার দিক থেকে। ৩- দেখার মাধ্যমে পূর্ণ আয়ত্ব বা পরিবেষ্টন করা সম্ভব না হওয়ার দিক থেকে। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'এভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখাকে দেখার সাথে তুলনা করলেন, কিন্তু দেখা জিনিসকে দেখা জিনিসের সাথে তুলনা করেননি; কেননা 'কাফ' হচ্ছে তাশবীহ বা 'তুলনা' প্রদানকারী অব্যয় যা 'রুইয়াহ' বা দেখার ওপর ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। অনুরূপ ইমাম বুখারীর বর্ণনায় এসেছে, 'তারা তাঁকে চাক্ষুষ দেখতে পাবে'। আর জানা কথা যে, আমরা সূর্য ও চাঁদকে চাক্ষুষ সামনাসামনি দেখতে পাই, তাই হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী আমরা আল্লাহকে সেভাবে দেখা আবশ্যক। কিন্তু যে জিনিস চাক্ষুষ হয় না, বা যে জিনিসের মুখোমুখি হওয়া যায় না, তা দেখার বিষয়টি বিবেক কখনো কল্পনাও করতে পারে না, তাহলে সেটা সূর্য বা চাঁদ দেখার সাথে তুলনীয় কীভাবে হতে পারে? মাজমূ' ফাতাওয়া (১৬/৮৪-৮৫)। (সুতরাং চাঁদ দেখার সাথে তুলনা করার উপকারিতা জানা গেল যে, তাঁকে উপরের দিকে দেখা যাবে।)
অতঃপর যে ধারণা করবে যে, 'আল্লাহ আসমানে' অর্থ আসমান তাকে বেষ্টন করে রেখেছে, তাহলে সে অবশ্যই হয় মিথ্যাবাদী যদি অন্যের কথা সংকলন করে (১০০৪), আর না হয় পথভ্রষ্ট যদি সে তার রবের ব্যাপারে এমনটি বিশ্বাস করে। এ শব্দ থেকে কেউ এমন বুঝেছে এমনটি আমরা শুনিনি। আর কাউকে একজন থেকেও এমনটি বর্ণনা করতে আমরা দেখিনি। যদি সকল মুসলিমকে জিজ্ঞেস করা হয়, আল্লাহ আসমানে কথা দ্বারা কি তোমরা এটা বুঝেছ যে, আসমান তাকে ঘিরে রেখেছে, বেষ্টন করে রেখেছে?, তাহলে সবাই অতি দ্রুত বলত: এটা আমাদের কল্পনাতেও আসেনি। (১০০৫)
সুতরাং যখন প্রকৃত অবস্থা এমন হলো তখন প্রকাশ্য বিষয়কে অসম্ভব অবোধগম্য বানানো, যাতে মানুষ না বুঝে, ফলে তাকে তা'ওয়ীল করতে চাইবে, এটাই হচ্ছে 'তাকাল্লুফ' বা অযাচিত আচরণ করা; বরং মুসলিমদের নিকট এটাই নির্ধারিত যে, তিনি আসমানে, তিনি 'আরশের উপরে দু'টো একই কথা। যেহেতু আসমান দ্বারা উদ্দেশ্য উঁচু, তাই এটার অর্থ তিনি উঁচুতে, নিচুতে নয়। আবার মুসলিমগণ জানে যে, আল্লাহর কুরসীতে আসমান- যমীনের জায়গা হয়, আর কুরসী 'আরশের তুলনায় শূন্য ভূখণ্ডে ফেলে রাখা আংটির ন্যায়। আর 'আরশ আল্লাহর সৃষ্টিসমূহের একটি, আল্লাহর ক্ষমতা ও বড়ত্ব-মহত্বের সাথে সেটার কোনো তুলনা নেই। এর পরেও কীভাবে ধারণা করা যেতে পারে যে, একটা মাখলুক তাঁকে পরিবেষ্টন করতে পারে?
আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: (ফির'আউন বলেছিল) ﴿وَلَأُصَلِّبَنَّكُمْ فِي جُذُوعِ النَّخْلِ) [طه: ٧١] 'আর আমি তোমাদেরকে খেজুর গাছের কাণ্ডে শূলিবিদ্ধ করবই।" [সূরা ত্বা-হা: ৭১] তিনি আরও বলেন, ﴿فَسِيرُوا فِي الأَرْضِ﴾ [آل عمران: ۱۳۷] "সুতরাং তোমরা যমীনে ভ্রমণ কর।" [সূরা আলে ইমরান: ১৩৭] এখানে في টি على অর্থে। (১০০৬) অনুরূপ আরও আছে। এটা তো হাকীকী আরবী কথা, রূপক নয়। এটা সেই জানে যে (হুরুফুল মা'আনী) আরবী অর্থপূর্ণ হরফসমূহের হাকীকী অর্থ জানে। বস্তুত এ (হুরুফুল মা'আনী) গুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে মুতাওয়াত্বিয়াহ (প্রতিটি অর্থের মাঝে একক কোনো জায়গায় মিল থাকবে), মুশতারিকা (প্রতিটি অর্থ পরস্পর বিরোধপূর্ণ, এমন) নয়। (১০০৭)
"ইজা ক্বা-মা আহাদুকুম ইলাস সালাতি ফাইন্নাল্লাহা ক্বিলা ওয়াজহাহু, فালা ইয়াবসুক্ব ক্বিলা ওয়াজহিহী : তোমাদের কেউ সালাতে দাঁড়ালে আল্লাহ তার চেহারার সম্মুখে থাকেন, কাজেই সে যেন সামনে থুথু না ফেলে।"(১০০৮) এ হাদীসটিও হক্ক ও যথার্থভাবে তার যাহেরী বা প্রকাশ্য অর্থেই গ্রহণ করা হবে। কারণ মহান আল্লাহ 'আরশের উপরে, আবার তিনি মুসল্লির সম্মুখেও। (১০০৯) তাছাড়া এ গুণটি তো মাখলুক বা সৃষ্টির জন্যও সাব্যস্ত হতে পারে; কেননা মানুষ যদি আকাশের সাথে আলাপ করে বা চন্দ্র-সূর্যের সাথে চুপে চুপে আলাপ করে তাহলে আসমান, চন্দ্র-সূর্য তার উপরে থাকে এবং তার সম্মুখেও থাকে।
বস্তুত নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দ্বারা উপমা পেশ করেছেন। আর আল্লাহর জন্য তো রয়েছে সর্বোচ্চ উপমা। তবে উপমা দ্বারা উদ্দেশ্য এটা জায়েয ও সম্ভব বর্ণনা করা, স্রষ্টাকে সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য দেয়া নয়। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
«ما منكم من أحد إلا سيرى ربه مخليا به». فقال له أبو رزين العقيلي : كيف يا رسول الله، وهو واحد ونحن جميع؟ فقال النبي صلى الله عليه وسلم: «سأنبئك مثل ذلك في آلاء الله، هذا القمر كلكم يراه مخليا به وهو آية من آيات الله، فالله أكبر»(১০১০) অথবা নবীজি যেমনটি বলেছেন তেমন।
তিনি আরও বলেছেন: «إنكم سترون ربكم كما ترون الشمس والقمر "তোমরা তোমাদের রবকে অবশ্যই দেখতে পাবে যেমন তোমরা চন্দ্র-সূর্য দেখে থাক।"(১০১১) নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখাকে দেখার সাথে সাদৃশ্য দিয়েছেন, যদিও দৃষ্টটি অপর দৃষ্টের সদৃশ নয়। (১০১২) তাই মুমিনগণ যখন তাদের রবকে কিয়ামতের দিন দেখতে পাবে এবং তাঁর সাথে কথা বলবে প্রত্যেকেই তাঁকে উপরে সম্মুখে দেখবে, যেমন চন্দ্র-সূর্যকে দেখে। কোনো বৈপরীত্য নেই।
টিকাঃ
১০০৩. ঊর্ধ্ব দিক একটি পূর্ণাঙ্গ গুণ ও প্রশংসার গুণ। চাই সেটাকে সত্তাগতভাবে উপরে বলা হোক কিংবা সম্মানের দিক থেকে উপরে ধরা হোক। তার বিপরীতে নিচে থাকা সাধারণত নিন্দিত। তাই আল্লাহ তা'আলাকে নিচে থাকার গুণ প্রদান করা হলে মানুষ তার স্বাভাবিক ফিত্বরাতের মাধ্যমেই বুঝতে পারে যে, আল্লাহ তা থেকে পবিত্র। নিচে থাকা মানুষের জন্যও নিন্দিত, তাহলে স্রষ্টার জন্য সেটা তো নিন্দিত হবেই। যেমনটি ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল বলেন, 'আমি যত নিচের জিনিস পেয়েছি সবই নিন্দিত...'। দেখুন, আর-রাদ্দু 'আলায় যানাদিক্কাতি ওয়াল জাহমিয়্যাহ, পৃ. ২৮৭; ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৫/৭৩, ৯৯)।
১০০৪. বিশেষ করে যদি কেউ সালাফদের থেকে এমন কথা বর্ণনা করে। কারণ সালাফরা কেউই এমন কথা বলেননি।
১০০৫. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ অন্যত্র এ অংশের ব্যাখ্যা করে বলেন, 'তুমি যদি সেসব লোকদের জিজ্ঞাসা কর যারা তাদের রবকে ডাকে, তুমি কি তোমার রব আল্লাহ তা'আলাকে তোমার অন্তরে তোমার দেখা কোনো জীবিত সক্ষম ও জ্ঞানী মানুষের মত বিশ্বাস কর? তবে তুমি যাকে প্রশ্ন করেছ সে অবশ্যই বলবে, এ বিষয়টি কখনও আমার অন্তরে উদিত হয়নি, বরং যে এ রকম বলেছে, অথবা যে এমন বিশ্বাস করবে তাকে এত ঘৃণা করবে সে রকম ঘৃণার চেয়েও বেশি যে ফিরিশতাদেরকে মাছি বা চড়ুই পাখির মতো মনে করবে। মোটকথা: বনী আদম এটা নিজেদের ব্যাপারে ভালো করেই জানে যে, তাদেরকে এ বিশ্বাসের দিকে কোনো কিছুই ঠেলে দেয় না যে তারা আল্লাহকে মানুষের মতো মনে করবে বা মনুষ্য প্রজাতির মনে করবে। সুতরাং বনী আদমের ওপর এমন দাবি করা তাদের ওপর মিথ্যা রটনা।' ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৪/৬১০-৬১১)।
১০০৬. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এ বিষয়টি তার আর-রিসালাতুত তাদমুরিয়্যাহ গ্রন্থের চতুর্থ নীতিতে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। বিষয়টির সারসংক্ষেপ হচ্ছে: ক) যে কেউ মনে করবে আল্লাহ তা'আলাকে আসমানে বা আরশের উপর সাব্যস্ত করা দ্বারা প্রকাশ্য অর্থে সৃষ্টির মত করে ফেলা হয়, তাহলে সে সর্বসম্মতিতে মূর্খ ও পথভ্রষ্ট। খ) ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, 'ফী' অব্যয়টি, যাকে আরবী ব্যাকরণের নাহুবিদরা 'যরফ' বা স্থান বলে, তা মূলত প্রতি জায়গায় তার ব্যবহারবিধি উপযোগী অর্থ প্রদান করে। যখন বলা হবে, ফলের মাঝে স্বাদ, রং ও গন্ধ ঢুকানো আছে অথবা বলা হবে, জ্ঞান, ক্ষমতা ও কথা এগুলো বক্তার মাঝে প্রবিষ্ট আছে, তাহলে সে অর্থটি (যরফ) বা স্থান বুঝানো অবশ্যই বিবেকের যুক্তির দাবি। কিন্তু যখন বলা হবে, এ লোকটি তার ঘরে প্রবিষ্ট অথবা পানি তার ভাণ্ডারে প্রবিষ্ট তখন সেটার ভিন্ন। কারণ আগের উদাহরণ দু'টিতে সিফাত তার মাওসূফে প্রবিষ্ট ছিল, কিন্তু পরবর্তী উদাহরণ দু'টিতে পূর্ণ অবয়ব বিশিষ্ট সত্তা যা জিসিম বা জাওহার বলা হয় তা তার প্রবিষ্ট হওয়ার স্থানে প্রবেশ করেছে। সেজন্যই লোকদের বাসস্থানের জায়গাকে মহল্লা বলা হয়। আর বলা হয়, অমুক প্রবেশ করেছে অমুক জায়গাতে। আর যখন বলা হয়, সূর্য ও চন্দ্র পানির মাঝে, অথবা আয়নার মাঝে, অথবা অমুকের চেহারা আয়নার মাঝে অথবা অমুকের কথা কাগজের মধ্যে, তখন সেটার ভিন্ন আরেক অর্থ রয়েছে যা মানুষ মাত্রই বুঝতে পারে। তারা জানতে পারে যে, সূর্য, চাঁদ ও চেহারা আয়নায় প্রকাশিত হয়েছে ও তাতে দেখা গেছে, সেগুলোর সত্তা কখনও তাতে প্রবেশ করেনি। তাতে তো প্রবেশ করেছে কেবল প্রতিবিম্বের মত কিছু, যারা এটা বলে থাকে। অনুরূপভাবে কোনো কথা যখন কাগজে লেখা হয়, তখন মানুষ ভালো করেই জানে যে, এ কথা তাতে লেখা হয়েছে, তাতে পঠিত হবে, তার দিকে তাকিয়ে থাকা হবে। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, আল-জাওয়াবুস সহীহ (৩/৯১-৯২)।
তিনি আরও বলেন, 'নিঃসন্দেহে 'ফী' অব্যয়টি তার আগের ও পরের কথার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে অর্থ প্রকাশ করে। সুতরাং সেটি কিসের দিকে সম্বন্ধিত হলো তা দেখতে হবে, সেটা অনুসারেই তার অর্থ নির্ধারিত হবে। আর সে জন্যই কোনো কিছু কোনো স্থানে থাকা আর কোনো জিসিম অপর (হাইয়্যেয) অবস্থানে থাকা এবং কোনো 'আরাদ্ব' (গুণ) জিসিমের (শরীরের) মাঝে থাকা, কোনো চেহারা আয়নায় থাকা, কোনো কথা কাগজে থাকা এগুলোর মধ্যে পার্থক্য করা জরুরী। কারণ এর প্রতিটি প্রকারের রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য যা তাকে অন্যদের থেকে পৃথক করে দেয়, যদিও সেসব জায়গার সব স্থানেই 'ফী' ব্যবহার করা হয়েছে।
তাই যদি কেউ বলে, 'আরশ কি আসমানে নাকি যমীনে? তাকে বলা হবে, আসমানে। আর যদি বলা হয়, জান্নাত কি আসমানে নাকি যমীনে? তাকে বলা হবে, জান্নাত আসমানে। এর দ্বারা এটা আবশ্যক হয় না যে, আরশ আসমানসমূহের ভিতরে, বরং অনুরূপভাবে জান্নাতও নয়।' মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/৫২); আর-রিসালাতুত তাদমুরিয়্যাহ, পৃ. ৮৫-৮৬।
গ) আল্লাহ আসমানে বা 'আরশে উভয় কথার উদ্দেশ্য একই। আর তা হচ্ছে, নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা উপরে, আর উপরে থাকা এ কথাটি সকল সৃষ্টিকুলের উপরে থাকাকেই বুঝায়। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আক্কলি ওয়ান নাকলি (৭/১৬)।
ঘ) যদি ধরে নেয়া হয় যে, আসমান দ্বারা উপরস্থিত গোলকসমূহকে বুঝানো হয়েছে। তবে অবশ্যই অর্থ করতে হবে, তিনি সেটারও উপরে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, )فَسِيحُوا فِي الْأَرْضِ( 'অতঃপর তোমরা যমীনের মাঝে বিচরণ করো' [সূরা আত-তাওবাহ: ০২] অর্থাৎ যমীনের উপরে।
১০০৭. বিষয়টি বুঝার জন্য দেখুন, ইবন তাইমিয়্যা, নাকছুত তা'সীস (১/৫৫৭)...; মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/৫২), (৫/২৫৬-২৫৮)।
১০০৮. হাদীসটির তাখরীজ আগে চলে গেছে।
১০০৯. এটা স্থিরিকৃত বিষয় যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর আসমানসমূহের উপরে তাঁর 'আরশের উপরে, সৃষ্টিকুল থেকে পৃথক, তাঁর সৃষ্টিকুলের মাঝে তাঁর সত্তার কোনো কিছু নেই, আর না সত্তায় তাঁর সৃষ্টিকুলের কোনো কিছু আছে। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা 'আরশের প্রতি মুখাপেক্ষী নন, সকল সৃষ্টিকুলের কারো প্রতিই তিনি মুখাপেক্ষী নন। বরং তিনিই তাঁর ক্ষমতায় 'আরশ ও 'আরশ বহনকারীদের বহন করে আছেন। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (১/৩৬৭), কায়েদাহ জালীলাহ ফিত তাওয়াসসুলে ওয়াল ওসীলাহ, পৃ. ৩৩৫।
বান্দা যখন সালাতে দাঁড়ায় তখন সে তার রবের মুখোমুখি হয় আর আল্লাহও তার দিকে তাঁর চেহারা নিয়ে অগ্রসর হন, যখন না বান্দা তার চেহারাকে অন্য দিকে না ঘুরায়। বস্তুত এটার ওপর বহু সহীহ হাদীস মুতাওয়াতির সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়ে এসেছে। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী, 'যখন তোমাদের কেউ সালাতে দাঁড়ায় তখন তো সে তার রবের মুখোমুখি হয়', যদি তাই হয়ে থাকে, তবে বান্দা যেদিকেই মুখ করুক না কেন সে তো আল্লাহর চেহারার মুখোমুখি হয়। আর আল্লাহ তাঁর 'আরশের উপর, তাঁর আসমানসমূহের উপর, অথচ তিনি পুরো জগতকে ঘিরে আছেন, সুতরাং বান্দা যদিকেই মুখ ফিরাক না কেন আল্লাহ তা'আলা তো তার সামনে হবেই।' দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৬/৭৬); মাজমু ফাতাওয়া (৬/১৭)।
এ হাদীসটিকে একদল হাদীস ব্যাখ্যাতা তা'ওয়ীল বা অপব্যাখ্যা করেছে। তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন হাফেয ইবন হাজার, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন, তিনি এ হাদীসে আসা ভাষ্য 'অথবা তাঁর রব্ব অবশ্যই তার ও কিবলার মাঝে থাকেন।' এর ব্যাখ্যায় ইবন হাজার বলেন, 'অনুরূপ এর পরের হাদীসে এসেছে, 'কারণ আল্লাহ তা'আলা তার চেহারার বিপরীতে', তাই খাত্তাবী বলেন, এর অর্থ হচ্ছে, কিবলার দিকে তার মুখ করে দাঁড়ানোই তাকে তার রবের ইচ্ছার দিকে নিয়ে যাবে।' তাই সূক্ষ্ম অর্থ হবে, 'তখন তার উদ্দেশ্য তো তার ও তার কেবলার মাঝখানে। আবার কারও কারও মতে, সেখানে একটি মুযাফ বা সন্ধন্ধ পদ উহ্য রয়েছে, অর্থাৎ আল্লাহর মহত্ব অথবা আল্লাহর সাওয়াব। ইবন আব্দিল বার বলেন, এটি একটি বাক্য যা কিবলার মর্যাদার মহত্ব বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। এর ওপর ভিত্তি করে কোনো কোনো মু'তাযিলা দলীল নিয়েছে যে, আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান, নিঃসন্দেহে এটি প্রকাশ্য মূর্খতা। কারণ হাদীসে এসেছে সে যেন তার পায়ের নিচে থুতু ফেলে, এর মাঝে তাদের মূলনীতি ধূলিস্মাৎ হয়ে যায়। আর এর মাঝে তাদের কথারও খণ্ডন রয়েছে যারা বলে, আল্লাহ তা'আলা সত্তাগতভাবে 'আরশের উপর, আর এটাকে যেভাবে তা'ওয়ীল করা হবে ঐটাকেও অনুরূপ তা'ওয়ীল করে বলা যাবে।' ইবন হাজার, ফাতহুল বারী (১/৫০৮)। আর খাত্তাবীর কথা শুনুন তারই গ্রন্থ আ'লামুস সুনান (১/৩৮৬)।
ইবন হাজার রাহিমাহুল্লাহর এ বক্তব্যের যথাযথ সমালোচনা করেছেন দু'জন প্রখ্যাত আলেম। একজন হচ্ছেন শাইখ আব্দুল আযীয ইবন আব্দুল্লাহ ইবন বায, আরেকজন হচ্ছেন শাইখ আব্দুর রহমান ইবন সালেহ আল-বাররাক। শাইখ আব্দুল আযীয ইবন বায রাহিমাহুল্লাহ যখন ইবন হাজার রাহিমাহুল্লাহ'র এ কথাটি ভুল হওয়া তুলে ধরলেন যেখানে তিনি বলেছেন, 'এ হাদীসে তাদের বক্তব্যের খণ্ডন রয়েছে যারা বলে আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং 'আরশের উপরে'... তখন তিনি বললেন, 'এসব ভাষ্য ও অনুরূপ ভাষ্যকে আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক তাঁর 'আরশের উপর উঠার ভাষ্যসমূহের বিপরীতে দাঁড় করানো জায়েয হবে না; কারণ তাঁর 'আরশের উপর উঠা সংক্রান্ত ভাষ্যগুলো অকাট্য, সুদৃঢ় ও সুস্পষ্ট।' দেখুন, ফাতহুল বারীর ওপর শাইখ ইবন বায রাহিমাহুল্লাহ'র টীকা (১/৫০৮)। শাইখ আব্দুর রহমান সালেহ আল-বাররাক বলেন, '... অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলার সর্বোচ্চ সত্তা হওয়া, 'আরশের উপরে উঠা সংক্রান্ত যা কিছু এসেছে তা এ হাদীস, যেখানে বলা হয়েছে যে, 'নিশ্চয় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা সালাত আদায়কারীর চেহারার সম্মুখে থাকেন' অথবা 'তিনি সালাত আদায়কারী ও কিবলার মাঝখানে থাকেন' এ হাদীসের বিপরীত বা বিরোধী নয়; কারণ এখানে সেটাই বলা হবে যা আল্লাহর নৈকট্য ও সাথে থাকার ব্যাপারে বলা হয়ে থাকে। এসব কিছুর কোনোটিই তাঁর সর্বোচ্চ সত্তা হওয়া বিরোধী নয়। এসবের কোনো কিছুই মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাঁর সৃষ্টিকুলের মধ্যে প্রবিষ্ট হওয়া আবশ্যক করে না। দেখুন, ফাতহুল বারীর ওপর শাইখ আল-বাররাক এর টীকা (২/১৩২)।
১০১০ হাদীসটি কাছাকাছি শব্দে যারা বর্ণনা করেছেন, ১- আবু দাউদ, আস-সুনান (৫/৯৯-১০০), নং ৪৭৩১। ২- ইবন মাজাহ, আস-সুনান (১/৬৪), নং ১৮০। ৩- আহমাদ, আল-মুসনাদ (৪/১১-১৪), নং ১৬১৮৬, ১৬১৯২, ১৬১৯৮। ৪- ত্বায়ালিসী, পৃ. ১৪৭, নং ১০৯৪; ৫- হাকিম, আলমুস্তাদরাক (৪/৬০৫)। হাদীসটি হাসান। ৬- ইবন হিব্বান, আস-সহীহ, পৃ. ৪০, নং ৩৯। ৭- ইবন আবী আসেম, আস-সুন্নাহ (১/২০০), নং ৪৫৯, ৪৬০। ৮- ইবন খুযাইমাহ, আত-তাওহীদ (১/৪৩৮-৪৩৯), নং ২৫৩-২৫৪। ৯- আজুররী, 'আত-তাসদীক বিন-নাযরি ইলাল্লাহ বিল আখিরাহ, পৃ. ৫৩-৫৪। ১০- লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ (২/৪৮৩)।
১০১১. এর তাখরীজ আগে চলে গেছে।
১০১২, দেখাকে দেখার সাথে তুলনা করা হয়েছে, দৃষ্টকে দৃষ্টের সাথে তুলনা করা হয়নি। এ বিষয়টি ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বহু জায়গায় তুলে ধরেছেন। যেমন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/৪৭), (৫/১৭৫), (১১/৪৮১), (১৭/৩১৯), (১৮/২০০)। আর আল্লাহর দেখাকে সূর্য ও চন্দ্র দেখার সাথে তুলনার কারণ: ১- প্রকাশিত ও স্পষ্ট হওয়ার দিক থেকে। ২- উপরে ও ঊর্ধ্বে হওয়ার দিক থেকে। ৩- দেখার মাধ্যমে পূর্ণ আয়ত্ব বা পরিবেষ্টন করা সম্ভব না হওয়ার দিক থেকে। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'এভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখাকে দেখার সাথে তুলনা করলেন, কিন্তু দেখা জিনিসকে দেখা জিনিসের সাথে তুলনা করেননি; কেননা 'কাফ' হচ্ছে তাশবীহ বা 'তুলনা' প্রদানকারী অব্যয় যা 'রুইয়াহ' বা দেখার ওপর ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। অনুরূপ ইমাম বুখারীর বর্ণনায় এসেছে, 'তারা তাঁকে চাক্ষুষ দেখতে পাবে'। আর জানা কথা যে, আমরা সূর্য ও চাঁদকে চাক্ষুষ সামনাসামনি দেখতে পাই, তাই হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী আমরা আল্লাহকে সেভাবে দেখা আবশ্যক। কিন্তু যে জিনিস চাক্ষুষ হয় না, বা যে জিনিসের মুখোমুখি হওয়া যায় না, তা দেখার বিষয়টি বিবেক কখনো কল্পনাও করতে পারে না, তাহলে সেটা সূর্য বা চাঁদ দেখার সাথে তুলনীয় কীভাবে হতে পারে? মাজমূ' ফাতাওয়া (১৬/৮৪-৮৫)। (সুতরাং চাঁদ দেখার সাথে তুলনা করার উপকারিতা জানা গেল যে, তাঁকে উপরের দিকে দেখা যাবে।)
📄 কুরআন ও সুন্নাহ’র যাহের বা প্রকাশ্য ভাবের অর্থ উদ্দেশ্য কী না?
আর যার আল্লাহ সম্পর্কে কিছু অবগতি আছে, আল্লাহ সম্পর্কে মজবুত জ্ঞান আছে, কুরআন ও সুন্নাহ'কে যেভাবে তা আছে সেভাবে স্বীকৃতি প্রদান করা তার কাছে ততোটা সৃদৃঢ়।
জেনে রাখ! পরবর্তীদের মধ্যে কেউ কেউ বলেন: সালাফে সালেহীনের মত হচ্ছে যা এসেছে, যেভাবে এসেছে, সেভাবে মেনে নেয়া। সাথে সাথে এই বিশ্বাস থাকা যে, এগুলোর যাহির (প্রকাশ্য অর্থ) উদ্দেশ্য নয় (১০১০)।
এ কথাটি 'মুজমাল' অস্পষ্ট বা ব্যাখ্যাসাপেক্ষ্য বিষয়(১০১৪); কেননা তার কথা "যাহের উদ্দেশ্য নয়” এটা সম্ভাবনা রাখে যে, তিনি 'যাহির' দ্বারা সৃষ্টির না'ত ও অপ্রাচীনের সিফাত (১০১০) উদ্দেশ্য নিয়েছেন। যেমন উপরোক্ত হাদীসের অর্থ কেউ এটা গ্রহণ করলো যে, আল্লাহ তা'আলা মুসল্লির সম্মুখে অর্থাৎ মুসল্লির সম্মুখস্থ দেওয়ালের মধ্যে স্থির হয়ে আছেন যেদিকে ফিরে সে সালাত আদায় করছে; তেমনি (কুরআনের আয়াতে) "আল্লাহ আমাদের সাথে" মানে আল্লাহ আমাদের পাশে ইত্যাদি, তাহলে সন্দেহ নেই যে, এটা উদ্দেশ্য নয়। আর যে বলবে, সালাফদের মতেও "এটা (উপরোক্ত অর্থ) উদ্দেশ্য নয়” (১০১৯) তবে অর্থের দিক থেকে তার কথাটি ঠিকই আছে। কিন্তু তার ভুল হচ্ছে, মুতলাক তথা নিঃশর্তভাবে এ কথা বলা যে, এটাই আয়াতের ও হাদীসের যাহির (প্রকাশ্য) অর্থ; কেননা (এগুলোর যাহির অর্থ হিসেবে যখন 'সাদৃশ্য প্রদান' নির্ধারণ করা হবে) তখন এটা নিশ্চিতভাবেই বলতে হবে যে, এটি অগ্রহণযোগ্য ও অসম্ভব অর্থ। আর জানা কথা যে এ অসম্ভব অর্থটি (১০১৭) কখনও যাহির (প্রকাশ্য) অর্থ নয়, যেমনটি আমরা অন্যত্র বর্ণনা করেছি। হ্যাঁ, হয়ত কিছু মানুষের কাছে এই নিষিদ্ধ অর্থটি যাহির অর্থ হিসেবে মনে হতে পারে। তাহলে এই দৃষ্টিকোণ থেকে এ বক্তার কথা সঠিক হতে পারে, তখন তার জন্য এভাবে (সাদৃশ্য)কে যাহির অর্থ বলার জন্য ওযর পেশ করতে পারে ।(১০১৮)
কেননা যাহির-বাতিন (প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য) মানুষের অবস্থার ভিন্নতায় ভিন্ন হয়, এটি একটি আপেক্ষিক বিষয়।(১০১৯) তবে উত্তম ছিল- যে বিশ্বাস করে যে, এটাই যাহির- তার জন্য এ বর্ণনা দেয়া যে, এটা যাহির নয়, যাতে সে কুরআনের ও হাদীসের শব্দ ও অর্থের যথার্থ হক্ক প্রদান করতে পারে।
আর সালাফদের কথা বর্ণনাকারী যদি, 'যাহির উদ্দেশ্য নয়' একথা দ্বারা, এটা উদ্দেশ্য নেয় যে, এসব আয়াত ও হাদীসের থেকে যে অর্থ প্রকাশ্যে বুঝা যায়, যা আল্লাহর বড়ত্ব-মহত্বের সাথে উপযুক্ত, মাখলুকের গুণের সাথে খাস নয়, বরং সেটা আল্লাহর জন্য ওয়াজিব বা জায়েয, (মনে ধরে নেয়া জায়েয, বা বাইরে অস্তিত্বশীল জায়েয) কিন্তু সেটা উদ্দেশ্য নয়, তাহলে এমন কথা কেউ সালাফদের থেকে বর্ণনা করলে তার ব্যাপারে এটা নিশ্চিতভাবে বলতে হবে যে, এই সংকলনকারী সালাফদের কথা সংকলনে ভুল করেছে অথবা ইচ্ছা করে মিথ্যা বলেছে। কেননা এটা কখনো কারো জন্য সম্ভব নয় যে, সে সালাফদের থেকে সংকলন করতে পারবে এমন কথা যে, তারা বিশ্বাস করতেন, আল্লাহ 'আরশের উপরে নন, আর আল্লাহর জন্য প্রকৃতপক্ষে কোনো শ্রবণ নেই, নেই কোনো চোখ, নেই কোনো হাত।
টিকাঃ
১০১৩, উসূলে ফিকহের আলেমগণ 'যাহির' ও 'নস' দু'টি পরিভাষা ব্যবহার করে থাকেন। তন্মধ্যে নস হচ্ছে যাতে অন্য অর্থ করার কোনো সুযোগ নেই। যেমন: তিন, চার অথবা যায়েদ, 'আমর ইত্যাদি। আর যাহির হচ্ছে, যার একটি প্রকাশ্য অর্থ বুঝা যাচ্ছে, কিন্তু ইচ্ছা করলে দূরবর্তী অর্থ গ্রহণ করার সুযোগ নেয়া যায়। যত অপব্যাখ্যা, বিকৃতি, নিষ্ক্রীয়করণ, সাদৃশ্য প্রদান, দূরবর্তী কোনো অর্থ গ্রহণ কিংবা তৈরি করা ইত্যাদি এসবই বাতিলপন্থীদের প্রধান অস্ত্র। তারা এ সুযোগ গ্রহণ করার মাধ্যমে দীনের আকীদাহ ও শরী'আহকে বিনষ্ট করেছে। এজন্য শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহকে আমরা দেখি তিনি এ মাসআলাতে অত্যন্ত সোচ্চার। বিষয়টি নিয়ে তিনি ব্যাপক আলোচনা করেছেন এবং তাদের মতামত বিস্তারিত বর্ণনা করে খণ্ডন করেছেন যারা বলে, যাহির বা প্রকাশ্য অর্থটিই গ্রহণ করা হবে না, বরং দূরবর্তী অর্থ গ্রহণ করতে হবে। দেখুন, আত-তাদমুরিয়্যাহ, তৃতীয় নীতি, পৃ. ৬৯; মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/২০৭), (৬/৩৫৫-৩৫৮), (২০/২১৮), (২৩/১৭৭-১৮৬)।
১০১৪. 'যাহেরুন নুসূস' অথবা 'যাহের' এ শব্দটিকে কালামশাস্ত্রবিদরা এতো বেশি অপব্যবহার করেছে যে তাতে ইজমাল (সংক্ষিপ্ত, ব্যাখ্যাসাপেক্ষ) ও ইশতিয়াক (একাধিক অর্থে ব্যবহৃত) শব্দ হিসেবে গণ্য হয়ে গিয়েছে। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বিষয়টি একাধিক কিতাবে আলোচনা করে স্পষ্ট করেছেন। যেমন, দারউত তা'আরুদ্ব (৭/৪৫, ১০৭); মিনহাজুস সুন্নাহ (৪/১৭৯); আত-তিস'ঈনিয়্যাহ (২/৫৫৭); মাজমূ' ফাতাওয়া (২০/১৬৬)। তিনি বলেন, 'যাহির' শব্দটিতে ইজমাল ও ইশতিরাক রয়েছে। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/৪৩); আর-রিসালাতুত তাদমুরিয়্যাহ, পৃ. ৬৯। অন্যত্র বলেন, 'যাহির' শব্দটি মুশতারাক'। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/২০৭)। অন্যত্র বলেন, 'যাহির' শব্দটি, পরবর্তীদের পরিভাষায় তাতে 'ইশতিরাক' এসে পড়েছে। মাজমূ' ফাতাওয়া (১৩/৩৭৯); আরও দেখুন, (৩৩/১৭৫); জামে'উর রাসায়িল (৮/১৮৯)। অন্যত্র তিনি এ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, 'যাহিরুল কালাম' বা কথার প্রকাশ্য রূপ বলতে বুঝায়, কোনো ভাষার লোকেরা যারা ভাষা বুঝে তাদের নিরোগ বিবেকের কাছে যা প্রথমেই যে অর্থটি প্রতিভাত হয়। দেখুন, আর-রিসালাতুল মাদানিয়্যাহ, পৃ. ৩১। তিনি আরও বর্ণনা করেন, 'যাহির' শব্দটি দ্বারা কখনও কখনও উদ্দেশ্য হয়, যা মানুষের কাছে প্রকাশ পায়। আবার কখনও কখনও এর দ্বারা উদ্দেশ্য হয় শব্দ যার ওপর প্রমাণবহ। তারপর তিনি বলেন, প্রথম উদ্দেশ্যটি মানুষের বুঝ অনুসারে হয়ে থাকে, কুরআনে কারীমে অশুদ্ধ বুঝের বিপরীত অনেক কিছু রয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটি, আর তা হচ্ছে, শব্দ যার ওপর প্রমাণবহ সেখানেই যত কথা ও যত মতভেদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, মিনহাজুস সুন্নাহ (৪/১৭৯); মাজমূ' ফাতাওয়া (২০/১৬৬)।
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ যখন 'কুরআন কি তার প্রকাশ্য অর্থের ওপর নেয়া হবে? এ প্রশ্নের উত্তর নিয়ে বক্তব্য দিলেন তখন বলেছিলেন, 'আর 'যাহির' অর্থের ওপর পরিচালিত করা বলতে যদি সে যাহির উদ্দেশ্য হয়, যে যাহির ছিল উম্মতের সালাফগণের পরিভাষা, আর তা দ্বারা কোনো শব্দকে তার স্থান বা অবস্থা বিকৃত না করে পরিচালিত করা হয়, অনুরূপ আল্লাহর নামসমূহে কোনো রূপ ইলহাদ বা বিকৃতি না করে গ্রহণ করা হয়, কুরআন ও হাদীসকে আহলুস সুন্নাহ ও উম্মতের সালাফদের ব্যাখ্যার বিরোধিতা করে ব্যাখ্যা না করা হয়, বরং সেগুলোকে ভাষ্যের চাহিদা অনুযায়ী পরিচালিত করা হয়, কুরআন ও সুন্নাহ'র দলীলসমূহের সাথে সামঞ্জস্য করা হয়, সালাফে সালেহীন যেসব বিষয়ের ওপর ইজমা' করেছে সেগুলোর সাথে মিলিয়ে প্রকাশ করা হয়, তবে সে অবশ্যই তাতে সঠিক পথে আছে। আর সেটাই হক্ক বা যথাযথ।' আত-তিস'ঈনিয়্যাহ (২/৫৪৬)।
১০১৫. ইবনুল কাইয়্যেম রাহিমাহুল্লাহ না'ত এবং সিফাত এর মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরেছেন তিনভাবে:
১) না'ত শুধু সেসব গুণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যা কর্মজাতীয় আর যা নতুন করে হয়। যেমন আল্লাহর বাণী, "নিশ্চয় তোমাদের রব্ব আল্লাহ যিনি আসমানসমূহ ও যমীন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন। তিনিই দিনকে রাত দিয়ে ঢেকে দেন, তাদের একে অন্যকে দ্রুতগতিতে অনুসরণ করে। আর সূর্য, চাঁদ ও নক্ষত্ররাজি, যা তাঁরই হুকুমের অনুগত, তা তিনিই সৃষ্টি করেছেন। জেনে রাখ, সৃজন ও আদেশ তাঁরই। সৃষ্টিকুলের রব্ব আল্লাহ কত বরকতময়!" [সূরা আল-আ'রাফ: ৫৪] অনুরূপ আল্লাহর বাণী "যিনি তোমাদের জন্য যমীনকে বানিয়েছেন শয্যা এবং তাতে বানিয়েছেন তোমাদের চলার পথ, যাতে তোমরা সঠিক পথ পেতে পার; আর যিনি আসমান থেকে বারি বর্ষণ করেন পরিমিতভাবে। অতঃপর তা দ্বারা আমরা সঞ্জীবিত করি নির্জীব জনপদকে। এভাবেই তোমাদেরকে বের করা হবে। আর যিনি সকল প্রকারের জোড়া যুগল সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন এমন নৌযান ও গৃহপালিত জন্তু যাতে তোমরা আরোহন কর।” [সূরা আয-যুখরুফ: ১০-১২] ও অনুরূপ আয়াতসমূহ। অপরদিকে সিফাত কেবল স্থায়ী সত্তাগত গুণাবলির জন্য ব্যবহৃত হয়, যেমন আল্লাহর বাণী "তিনিই আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই, তিনি গায়েব ও উপস্থিত বিষয়াদির জ্ঞানী; তিনি দয়াময়, পরম দয়ালু। তিনিই আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ্ নেই। তিনিই অধিপতি, মহাপবিত্র, শান্তি-ত্রুটিমুক্ত, নিরাপত্তা বিধায়ক, রক্ষক, পরাক্রমশালী, প্রবল, অতীব মহিমান্বিত। তারা যা শরীক স্থির করে আল্লাহ তা হতে পবিত্র, মহান।" [সূরা আল-হাশর: ২২-২৩] ও অনুরূপ আয়াতসমূহ।
২) সত্তাগত গুণাবলির জন্য না'ত ব্যবহৃত হয় না; যেমন চেহারা, দু' হাত, পা, আঙ্গুল। এগুলোকে 'সিফাত' বলতে হয়। সালাফরা এগুলোকে এ নামই দিয়েছেন। অনুরূপভাবে কালামশাস্ত্রবিদদের মধ্যে যারা আল্লাহর গুণাবলি সাব্যস্ত করে তারাও এ নাম দিয়েছেন। যদিও কেউ কেউ এ নাম অপছন্দ করেছেন যেমন আবুল ওফা ইবন আকীল ও আরও কয়েকজন। তিনি বলতেন, এগুলোকে সিফাতের ভাষ্য বলা যাবে না, বলতে হবে সম্বন্ধীয় আয়াত। কারণ জীবন্ত সত্তাকে তার হাত বা চেহারা দিয়ে গুণান্বিত করা হয় না। জীবন্ত সত্তার পুরোটাই তো মাওসুফ, সেটা আবার সিফাত হয় কী করে?! তাছাড়া সিফাত এমন এক অর্থকে শামিল করে তা আবার মাওসুফ হয়ে যায়, তাহলে সেটাকে সিফাত কীভাবে বলা হবে? বস্তুত আবুল ওফা ও তার মত যারা আছে তাদের এ মতভেদ শাব্দিক। নামকরণ নিয়ে মতভেদ। তারাও এসব সম্বন্ধ আল্লাহর সাথে করেন, তারাও বলেন, এগুলো দিয়ে আল্লাহ সম্পর্কে সংবাদ দিতে হবে কোনো প্রকার তামসীল (কারো মত) বা তা'তীল (নিষ্ক্রীয়করণ) না করে। সেটাকে সিফাত নামকরণ হোক বা না হোক।
৩) না'ত সেসব গুণাবলির জন্য ব্যবহৃত হয় যা প্রকাশিত ও বিখ্যাত, আর যা সাধারণ ও বিশেষ সকলেই জানতে পারে, কিন্তু সিফাত তা অনেক ব্যাপক, প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত সকল কিছুকেই শামিল করে।
তাহলে বুঝা গেল যে, না'ত ও সিফাত এর পার্থক্য খাস ও আম এর পার্থক্যের মতো। এ জন্যই কোনো কিছুর পরিচয় দিতে গিয়ে বলা হয়, তার না'ত হচ্ছে এটা ও এটা যা সেখানে প্রকাশ পায়। কারও কারও মতে, বস্তুত না'ত ও সিফাত একই জিনিসের দু'টি নাম। এজন্যই বসরার নাহুবিদরা বলে: বাবুস সিফাত। আর কুফার নাহুবিদরা বলে: বাবুন না'ত। একই উদ্দেশ্য। আসলে বিষয়টি কাছাকাছি। দেখুন, মাদারিজুস সালেকীন (৩/৩৪৫-৩৪৫)।
১০১৬. অর্থাৎ কেউ যদি বলে সিফাতের ভাষ্যসমূহের প্রকাশ্য অর্থ হচ্ছে 'তামসীল' বা কারো মতো হওয়া, তবে তাকে বলা হবে এটা অবশ্যই সালাফদের কেউ বলেননি, তাই এটা যদি কেউ বলে যে এ প্রকাশ্য অর্থ সালাফদের উদ্দেশ্য নয়, তবে তার বলা ঠিক আছে। কিন্তু এভাবে বিনা ব্যাখ্যায় বলা ঠিক নয়।
১০১৭. অর্থাৎ কারও কারও এটা বুঝা যে, এসব আয়াত ও হাদীসের প্রকাশ্য অর্থ সাদৃশ্য প্রদান করে, আর এ সাদৃশ্য ছাড়া আর কিছু বুঝা যাচ্ছে না। কারণ সালাফগণ কখনো এ রকম সাদৃশ্য অর্থকে 'যাহির' বলতেন না। তারা কেউই কুরআন ও হাদীসের প্রকাশ্য অর্থকে কুফরী ও বাতিল বানাতে রাযী নন। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, আর-রিসালাতুত তাদমুরিয়্যাহ (তৃতীয় নীতি), পৃ. ৬৯।
১০১৮. অর্থাৎ সবার ক্ষেত্রে এ সাদৃশ্যপূর্ণ অর্থ বুঝাকে 'যাহির' অর্থ বলার কোনো সুযোগ নেই, তারা এগুলোকে সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য করে বুঝে না, কেবল মুষ্টিমেয় লোক এগুলোর অর্থ সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য করে বুঝলে এটা তাদের বুঝের দোষ, এটা কখনও কুরআন ও হাদীসের 'যাহির' অর্থ নয়।
১০১৯. শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ এ বিষয়টি একাধিক জায়গায় তুলে ধরেছেন। যেমন এক জায়গায় তিনি বলেন, 'নিঃসন্দেহে প্রকাশিত হওয়া ও গোপন থাকা এটি একটি আপেক্ষিক বিষয়' ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আকলি ওয়ান নাকলি (৩/৯৭)।
আবার তিনি যখন ইলম ও ই'তিক্কাদ এর আলোচনা করেছেন আর সেখানে কাত'ঈ ও যন্ত্রী বিষয়টির অবতারণা হলো, তখন তিনি বলেন, 'কোনো জ্ঞান অত্যাবশ্যকভাবে প্রমাণিত হওয়া আর চিন্তা গবেষণা লব্ধ অর্জিত জ্ঞান হওয়া অথবা অকাট্য হওয়া বা প্রবল ধারণার মাধ্যমে অর্জিত হওয়ার বিষয়টি আপেক্ষিক বিষয়। কারণ কোনো কোনো বিষয় এক ব্যক্তির নিকট এক অবস্থায় অকাট্য হয়, সে একই জ্ঞান অপর ব্যক্তির কাছে অন্য অবস্থায় অজানা বিষয়ই থেকে যায়। সেখানে ধারণা নির্ভর হওয়ার মতো জ্ঞানও তার অর্জিত হয় না। আবার কোনো কোনো বস্তু কোনো ব্যক্তির কাছে কোনো অবস্থায় অত্যাবশ্যকভাবে প্রমাণিত হয়, আবার অপর ব্যক্তির নিকট অন্য অবস্থায় চিন্তা-গবেষণালব্ধ জ্ঞান হিসেবে ধরা দেয়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বিষয়ের সংবাদ দিয়েছেন তা স্বয়ং হক্ক, সত্য ও যথাযথ, মানুষের বিশ্বাস বা অবস্থার ভিন্নতায় তাতে কোনো হেরফের হতে পারে না। তাই সেটা সত্যই যার বিপরীতটি কখনোও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এ জন্যই যা কিছু এর বিপরীত হবে তা সর্বতোভাবে বাতিল হিসেবে ধর্তব্য হবে।' দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আকলি ওয়ান নাকলি (৩/৩০৪)।
অন্যত্র শাইখুল ইসলাম বলেন, 'বাদীহী (চিন্তা করে বের করা লাগে না) ও নাযরী (চিন্তা গবেষণা করে যা বের করতে হয়) এ দু'য়ের মধ্যে পার্থক্যের বিষয়টিও ব্যক্তি সম্পর্কিত ও আপেক্ষিক বিষয়। কখনও কখনও কারও কাছে কোনো জ্ঞান স্পষ্ট হয়ে পড়ে, তার অন্তরে সেটা জায়গা করে নেয় ফলে সেটা বাদীহী বিবেচিত হয়, কিন্তু সে একই জ্ঞান অপরের নিকট নাযরী তথা স্বল্প কিংবা দীর্ঘ চিন্তার ফসল হয়ে দাঁড়ায়। বরং এমনও হতে পারে যে অন্যের কাছে তা অর্জন করা অনেক কঠিন বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। দেখুন, আর-রাদ্দু আলাল মানত্বিকিয়্যীন, পৃ. ৮৮-৮৯, ৩৬৩।
বরং শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ সাদৃশ্যের ব্যাপারটিও আপেক্ষিক হওয়ার বিষয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি যখন আল্লাহর বাণী, وَهُوَ الَّذِي أَنزَلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ مِنْهُ وَآيَاتٌ مُحْكَمَاتٌ هُنَّ أُمُّ الْكِتَابِ ۖ وَأُخَرُ مُتَشَابِهَاتٌ [আল ইমরান: ৭] কিছু আয়াত 'মুহকাম', এগুলো কিতাবের মূল; আর অন্যগুলো 'মুতাশাবিহ্'।" [সূরা আলে ইমরান: ০৭] এর মধ্যকার সাদৃশ্যপূর্ণ বা 'মুতাশাবিহাত' এর ওপর আলোচনা করছিলেন তখন বলেন, বিশুদ্ধ কথা হচ্ছে, 'তাশাবুহ' বা সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ার বিষয়টিও আপেক্ষিক। কখনও কখনও এর কাছে যা সাদৃশ্যপূর্ণ মনে হবে অন্যের কাছে তা সাদৃশ্যপূর্ণ মনে হবে না। বরং এসব সাদৃশ্যপূর্ণ আয়াতের অর্থ জানা গেলে তখন সেটি আর সাদৃশ্যপূর্ণ আয়াতের অন্তর্ভুক্ত থাকে না।' দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (১৩/১৪৪)।