📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 সালাফে সালেহীনের বক্তব্য: তিনি ‘জ্ঞানে তাদের সাথে আছেন’ এর অর্থ

📄 সালাফে সালেহীনের বক্তব্য: তিনি ‘জ্ঞানে তাদের সাথে আছেন’ এর অর্থ


বস্তুত এ معية )সঙ্গে থাকা) বিষয়টি উপস্থাপনা ও ব্যবহারের ভিন্নতা অনুযায়ী তার বিধান ভিন্ন হয়।(১১৪) তাই যখন তিনি বললেন: ﴿يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ﴾ [الحديد: ٤] “তিনি জানেন যা কিছু যমীনে প্রবেশ করে এবং যা কিছু তা থেকে বের হয়, আর আসমান থেকে যা কিছু অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যা কিছু উত্থিত হয়। আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন—তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন” [সূরা আল-হাদীদ: ০৪] প্রকাশ্য অর্থে তখন বুঝান হলো যে, এই সঙ্গে থাকার চাহিদা হচ্ছে: তিনি তোমাদের দেখছেন, খোঁজ রাখছেন, তোমাদের উপরে সাক্ষী, তোমাদের সংরক্ষক, তোমাদের সম্পর্কে জানেন, এটাই সালাফে সালেহীনের বক্তব্যের অর্থ যে, তিনি স্বীয় ইলম দ্বারা তাদের সাথে আছেন। এটা প্রকাশ্য সম্বোধন এবং হাকীকত, রূপক নয়。
তেমনি তাঁর বাণী:
﴿مَا يَكُونُ مِن نَّجْوَىٰ ثَلَثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ وَلَا خَمْسَةٍ إِلَّا هُوَ سَادِسُهُمْ وَلَا أَدْنَىٰ مِن ذَٰلِكَ وَلَا أَكْثَرَ إِلَّا هُوَ مَعَهُمْ أَيْنَ مَا كَانُوا﴾ [المجادلة: ٧]
“তিন ব্যক্তির মধ্যে এমন কোনো গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থ জন হিসেবে তিনি থাকেন না এবং পাঁচ ব্যক্তির মধ্যেও হয় না যাতে ষষ্ঠজন হিসেবে তিনি থাকেন না। তারা এর চেয়ে কম হোক বা বেশি হোক তিনি তো তাদের সঙ্গেই আছেন তারা যেখানেই থাকুক না কেন।”(৯৯৫) [সূরা আল-মুজাদালাহ: ০৭]
অনুরূপ যখন গুহায় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাথীকে বলেন: لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهُ مَعَنَا﴾ [التوبة: ٤٠] “তুমি ভয় পেও না, নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।” [সূরা আত-তাওবাহ: ৪০] এটিও প্রকাশ্য অর্থের উপরে হাকীকত হিসেবে ধর্তব্য হবে (রূপক নয়)। আর অবস্থার দ্বারা বুঝা গেল -এখানে সঙ্গে থাকার অর্থ দেখার সাথে সাহায্য- সহযোগিতাও করা。
তেমনি তাঁর বাণী: ﴿إِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذِينَ اتَّقَواْ وَالَّذِينَ هُم تُحْسِنُونَ﴾ [النحل: ۱۲۸] “নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সঙ্গে আছেন যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা মুহসিন।” [সূরা আন-নাহল: ১২৮]
অনুরূপ মূসা ও হারূন ‘আলাইহিমাস সালামের জন্য তাঁর কথা: ﴿إِنَّنِي مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى﴾ [٤٦:৬] “আমি তো আপনাদের সংগেই আছি, আমি শুনি ও আমি দেখি।” [সূরা ত্বা-হা: ৪৬] এখানেও মা‘য়িয়‍্যাহ (সঙ্গে) তার প্রকাশ্য অর্থেই। আর এখানে সে প্রকাশ্য অর্থ হচ্ছে সাহায্য সহযোগিতা করা。
আবার যেমন- কোনো বাচ্চাকে কেউ ভয় দেখাচ্ছে তখন সে কাঁদছে, আর তার পিতা ছাদের থেকে তাকিয়ে বলছে: ভয় করো না আমি তোমার সাথে আছি অথবা আমি এখানে আছি অথবা আমি উপস্থিত আছি ইত্যাদি। এভাবে তিনি তার সন্তানকে এমন সাথে থাকার কথা বলছেন যা সে অবস্থার জন্য উপযোগী, যাতে সন্তান থেকে তিনি অপছন্দনীয় কোনো বিষয় দূর করতে পারেন। সুতরাং সঙ্গে থাকার অর্থ ও তার চাহিদার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। (১৯৯৭) তাইতো কখনও কখনও সেটার চাহিদাই অর্থ হিসেবে নির্ধারিত হয়, তাই অবস্থাভেদে সেটার অর্থে ভিন্নতা আসে।

টিকাঃ
৯৯৪. অর্থাৎ ‘মা‘আ’ )مع( শব্দটির সম্বন্ধ ও সম্পর্ক কিসের সঙ্গে করা হয়েছে তা অনুযায়ী তার অর্থ ভিন্ন হয়ে থাকে। মানুষের অন্তর তার সাথে থাকা এক ধরণের, মানুষের জ্ঞানের, ক্ষমতার, শক্তির সাথে থাকা আরেক ধরণের, মানুষের স্ত্রী তার সাথে থাকা আরেক ধরণের,... এসব কিছুর ভিন্নতা ও বিভিন্ন প্রকার হওয়া সত্ত্বেও ‘সাথে’ বলা সাব্যস্ত। তাই তো বলা যায় তার সাথে তার স্ত্রী রয়েছে অথচ হয়ত তাদের দু’জনের মাঝে বিস্তর ফারাক, এভাবেই। তাহলে বুঝা গেল যে, ‘সাথে থাকা’ এর সর্বোচ্চ পর্যায় হচ্ছে সঙ্গী-সাথী হওয়া, একমত হওয়া, কোনো কাজে মিল থাকা। আর এ মিল হওয়া অবস্থা ও ব্যবহার অনুসারে ভিন্ন হতে বাধ্য। দেখুন, ইবনুল কাইয়োম, মুখতাসারুস সাওয়া’য়িক (৩/১২৪৫- ১২৪৬)। আবু মুহাম্মাদ ইবন কুতাইবাহ বলেন, ‘আর আমরা আল্লাহ তা‘আলার বাণী “আপনি কি লক্ষ্য করেন না যে, আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে আল্লাহ তা জানেন? তিন ব্যক্তির মধ্যে এমন কোনো গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থ জন হিসেবে তিনি থাকেন না এবং পাঁচ ব্যক্তির মধ্যেও হয় না যাতে ষষ্ঠ জন হিসেবে তিনি থাকেন না। তারা এর চেয়ে কম হোক বা বেশি হোক তিনি তো তাদের সঙ্গেই আছেন তারা যেখানেই থাকুক না কেন। তারপর তারা যা করে, তিনি তাদেরকে কিয়ামতের দিন তা জানিয়ে দেবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত।” [সূরা আল-মুজাদালাহ: ০৭] এর ব্যাপারে বলি যে, আল্লাহ তা‘আলা তারা কী করছে এ ব্যাপারে তাদের সাথে জ্ঞানের মাধ্যমে রয়েছেন। যেমন, তুমি কোনো লোককে দূর কোনো দেশে পাঠাও, তাকে তোমার কোনো কাজের দায়িত্ব প্রদান কর তখন তাকে বল: সাবধান, তোমাকে যে কাজের দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছি এ ব্যাপারে কোনো ত্রুটি বরদাশত করা হবে না; কারণ আমি তোমার সাথে আছি। এখানে এ সাথে থাকার অর্থ, তোমার কাছে তার ত্রুটি গোপন থাকবে না, অথবা তুমি তার প্রতিটি কাজে যথাযথ খেয়াল রাখছ, তোমার কর্মকাণ্ডের খোঁজখবর রাখছ, সেটার ব্যাপারে কতটুকু সিরিয়াস সেটা জানিয়ে দেয়া। যদি সেটা একজন সৃষ্টির ব্যাপার বৈধ হয় যিনি গায়েব জানেন না, তাহলে স্রষ্টার ব্যাপারে আরও উত্তমরূপে বৈধ, যিনি গায়েব জানেন।’ দেখুন, তা’ওয়ীলু মুখতালাফিল হাদীস, পৃ. ৭০৯-৭১০। আর ইবন তাইমিয়্যাহ তা তার ফাতাওয়াতে নিয়ে এসেছেন, দেখুন (৫/৩০৪); (শারহু হাদীসিন নুযূল)। ইবন তাইমিয়্যাহ আরও বলেন, [﴿وَهُوَ مَعَكُمْ﴾ [الحديد: ٤ ‘আর তিনি তোমাদের সাথে আছেন’ [সূরা আল-হাদীদ: ০৪] এ আয়াতের যাহের বা প্রকাশ্য অর্থ কখনও এটা বুঝায় না যে, তিনি আল্লাহ সৃষ্টির মাঝে আছেন। আর এটাও বুঝায় না যে, তিনি সৃষ্টির সাথে মিশে বা লেগে আছেন ইত্যাদি যেসব বাতিল অর্থ মানুষ করে থাকে। বস্তুত (২৩) কখনও এ অর্থের ওপর কোনো দিক থেকেই প্রমাণবহ নয়। এটা প্রকাশ্য অর্থ হওয়া তো আরও দূরের কথা। এর কারণ হচ্ছে (২৩) শব্দটি কুরআনের বহু জায়গায় ব্যবহৃত হয়েছে, তেমনি তা আরবী ভাষাতেও এসেছে, সেসব জায়গার কোথাও এটা আবশ্যক করে না তার একটি অপরটির মধ্যে থাকবে, কিংবা মিশে যাবে। বস্তুত কোনো শব্দের অর্থ ও প্রকাশ্য অর্থ কেবল তার ব্যবহার বিধি থেকেই নেয়া হয়ে থাকে। তারপর ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, (مَعَ) শব্দটি (ظرف مكان) বা স্থান নির্দেশক, তার অর্থ হচ্ছে সাথিত্ব, সংযোগ ও মিল হওয়া। যদি বলা হয়, এটি এটির সাথে, তখন এটা ধরে নেয়া হয় যে, সেটি স্থান বা অবস্থানে দ্বিতীয়টির সাথে কোনো সংযোগে রয়েছে। যাতে করে উভয়টি সাথিত্বে থাকবে বা একমত হবে। আর এটাই সে অর্থ, যা কোনো কোনো নাহুবিদ বলে থাকেন: ‘নিশ্চয় (مَعَ) শব্দটি (مصاحبة) বা সাথিত্ব বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। তবে সে সংযোগ আরও কিছু বিষয়ের ওপর প্রমাণবহ থাকে যা সংযোগ থাকা দাবি করে। সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা যখন বললেন, তিনি তার সৃষ্টির সাথে, তখন সেটার দাবি হচ্ছে, তিনি তাদের ব্যাপারে জানেন, তাদের সবকিছু পরিচালনা করেন, তাদের ওপর ক্ষমতাবান। তারপর যদি কারও ব্যাপারে বিশেষত্ব বুঝানোর দরকার হবে তখন বাক্যের আগে-পরে এমন কোনো কিছু থাকতে হবে যা বর্ণনা করবে যে তিনি তাদের সাহায্য করবেন ও সহযোগিতা করবেন।
তারপর শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়‍্যাহ বলেন, যে কেউ কুরআন নিয়ে গবেষণা করবে সে অবশ্যম্ভাবীরূপে জানতে সক্ষম হবে যে, তিনি বান্দাদের সাথে থাকার অর্থ তার সত্তা তাদের মাঝে থাকা নয়, তাদের সাথে মিশে থাকাও নয়, যেমনিভাবে যত জায়গায় (مَعَ) শব্দটি ব্যবহার হয় সেখানেও তা হওয়া দাবি করে না। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়‍্যাহ (৬/২০-২৫)। আরও দেখুন, জামে‘উর রাসায়িল (৩/১৬২)। তিনি আরও বলেন, ‘যদি মা’য়িয়‍্যাত (معية) দ্বারা লেগে থাকা ও মিশে যাওয়া বুঝানো হতো, আর তিনি সব জায়গায় সাধারণভাবে সত্তাসহ থাকতেন তাহলে (معية) বিশেষভাবে হতে পারতো না। সুতরাং যে কেউ মনে করবে যে, মা’য়িয়‍্যাত এর অর্থ হচ্ছে লেগে থাকা ও মিশে থাকা আর এর প্রকাশ্য অর্থ সব জায়গায় হওয়াকে বুঝায়, তাহলে সে লোক অবশ্যই ভুলে পতিত হলো, বরং মা’য়িয়‍্যাত যদিও ‘মুসাহাবাত’ বা সাথিত্ব ও মিল হওয়া অর্থে হয় তবুও সেটি প্রত্যেক স্থানে তার পূর্বাপর অবস্থা ও অবস্থান যা নির্দেশ করবে সেটাই ধরা হবে।’ জামে‘উর রাসায়িল (৩/১৬৪)। ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, আয়াতে যে মা’য়িয়‍্যাত (معية) এসেছে তার শব্দ বা প্রকাশ্য অর্থ কোনোটিই এটা বুঝায় না যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা সৃষ্টির সাথে মিশে আছেন। আর (مَعَ) শব্দটি এ অর্থে কোনোভাবেই আসে না, সেটা শব্দের প্রকৃত অর্থ বা বিষয়বস্তু হওয়া তো দূরের কথা। কারণ আরবদের ভাষায় (مَعَ) বলতে বুঝায় ‘যথোপযুক্ত সাথিত্ব’। মুখতাসারুস সাওয়া’য়িক (৩/১২৪৫)।
৯৯৫. এ আয়াতে কথার শুরু করা হয়েছে ‘ইলম’ বা জ্ঞান শব্দ দিয়ে, আবার শেষও করা হয়েছে সেই ‘ইলম’ বা জ্ঞান দিয়ে। এজন্যই ইবন আব্বাস, দাহহাক, সুফইয়ান আস-সাওরী ও আহমাদ ইবন হাম্বল বলেন, ‘তিনি ইলম বা জ্ঞানে তাদের সাথে আছেন।’ দেখুন, মাজমূ‘ ফাতাওয়া (১১/২৫০)। এ আয়াত থেকে একদল যিন্দীক (ইসলাম বিরোধী গোপন গোষ্ঠী) দলীল দিয়েছে যে, আল্লাহ তা‘আলা সব জায়গায়, এমনকি ময়লার জায়গাতেও, মানুষের পেটেও, জীব জন্তুর অভ্যন্তরেও, ঘরের কোণে ও কক্ষের ভিতরে।... তারা যা বলেছে তা থেকে আল্লাহ কতই না পবিত্র ও উপরে। তখন ইমাম উসমান ইবন সা‘ঈদ আদ-দারেমী রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করলেন যে, আয়াতের শুরু ও শেষের দিকে তাকিয়ে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য তিনি তাঁর বান্দাদের অবস্থা সম্পর্কে জানেন, তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে খবর রাখেন।
এটা নয় যে, তিনি সব জায়গায় তাদের সাথে আছেন। দেখুন, মহান আল্লাহর কথা, “আপনি কি লক্ষ্য করেন না যে, আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে আল্লাহ তা জানেন? তিন ব্যক্তির মধ্যে এমন কোনো গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থ জন হিসেবে তিনি থাকেন না এবং পাঁচ ব্যক্তির মধ্যেও হয় না যাতে ষষ্ঠ জন হিসেবে তিনি থাকেন না। তারা এর চেয়ে কম হোক বা বেশি হোক তিনি তো তাদের সঙ্গেই আছেন তারা যেখানেই থাকুক না কেন। তারপর তারা যা করে, তিনি তাদেরকে কিয়ামতের দিন তা জানিয়ে দেবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত।” [সূরা আল-মুজাদালাহ: ০৭]
তারপর তিনি বলেন, ‘আমরা বললাম, তিনি তাদের সাথে ইলম বা জ্ঞানের মাধ্যমে আছেন যা দিয়ে আয়াত শুরু করা হয়েছে আর যা দিয়ে আয়াত শেষ করা হয়েছে। কারণ তিনি অনেক আয়াতে এমন কথা বলেছেন যা দৃঢ়করে প্রতিষ্ঠিত করেছে যে, তিনি তাঁর ‘আরশের উপরে, সকল আসমানের উপরে। সুতরাং তিনি সেখানেই এতে কোনো সন্দেহ নেই। আর যখন তিনি বলেছেন তিনি প্রত্যেক শলা-পরামর্শকারীর সাথে, আমরা বললাম, তাঁর জ্ঞান ও দেখা তাদেরকে পরিবেষ্টন করে আছে, যদিও তিনি স্বয়ং তাঁর যাবতীয় পূর্ণতাসহ তাঁর ‘আরশের উপর, যেমনটি তিনি তাঁর গুণ বর্ণনা করেছেন। কারণ তার থেকে কোনো কিছু আড়াল হয় না। উপরস্থ সাত আসমানের কোনো কিছু তাঁর জ্ঞান ও দেখা থেকে ছুটে যেতে পারে না, অনুরূপ সাত যমীনের নিচের কিছুও নয়। আর সেটা তেমনি যেমনটি তিনি মূসা ও হারূন ‘আলাইহিমাস সালামকে বলেছিলেন, “তিনি বললেন, ‘আপনারা ভয় করবেন না, আমি তো আপনাদের সংগে আছি, আমি শুনি ও আমি দেখি’।” [সূরা ত্বা-হা: ৪৬] অর্থাৎ ‘আরশের উপর থেকে।’ দেখুন, উসমান ইবন সা‘ঈদ আদ-দারেমী, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ, পৃ. ৪৩-৪৪।
তারও আগে ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল যখন দেখলেন যে, জাহমিয়্যারা এ আয়াতের অপব্যাখ্যা করে বলছে যে, আল্লাহ আমাদের মাঝে ও আমাদের মধ্যে। তখন ইমাম আহমাদ বললেন, ‘আমরা বললাম, তোমরা আল্লাহর আয়াতের মাধ্যমে দেয়া সংবাদের প্রথম অংশ কেন কর্তন করেছ? আল্লাহ তা‘আলা তো বলেছেন, “আপনি কি দেখেননি নিশ্চয় আল্লাহ জানেন তা যা আসমানসমূহ ও যা যমীনে আছে।” [সূরা আল-মুজাদালাহ: ০৭] তারপর বলেছেন, “তিনজনের শলা-পরামর্শ হলে সেখানে তিনি চতুর্থজন হন।” [সূরা আল-মুজাদালাহ: ০৭] অর্থাৎ তিনি তাঁর জ্ঞান ও ইলমে তাদের চতুর্থজন। “আর নয় চতুর্থ জন যেখানে তিনি পঞ্চম জন না হন।” [সূরা আল-মুজাদালাহ: ০৭] অর্থাৎ আল্লাহ তাঁর ইলমের মাধ্যমে তাদের সাথে আছেন। “আর না তাদের ষষ্ঠজন, বা তার থেকে কম বা তার থেকে বেশি, তিনি তাদের সাথে রয়েছেন।” [সূরা আল-মুজাদালাহ: ০৭] অর্থাৎ তিনি তাদের সাথে ইলমের মাধ্যমে রয়েছেন। “যেখানেই তারা থাকুক না কেন, তারপর তিনি তাদেরেকে জানিয়ে দিবেন সেটা যা তারা করেছে, নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু সম্পর্কে সর্বজ্ঞ।” [সূরা আল-মুজাদালাহ: ০৭] এভাবে সংবাদ শুরু করেছেন ইলমের মাধ্যমে আর সংবাদ শেষ করেছেন ইলমের মাধ্যমে।’ আর-রাদ্দু আলায় যানাদিকাতি ওয়াল জাহমিয়্যাহ, পৃ. ২৯৬-২৯৭। ইবন তাইমিয়‍্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এ আয়াত সম্পর্কে বলেন, এভাবে আল্লাহ আয়াতটি শুরু করেছেন ‘ইলম’ দিয়ে, আর শেষ করেছেন ‘ইলম’ দিয়ে। তাহলে জানা গেল যে, তিনি এ আয়াতে সাথে থাকার দ্বারা ইচ্ছা করেছেন তিনি তাদের সম্পর্কে জানেন, তাঁর কাছে কোনো কিছু গোপন নেই, আর এরকম তাফসীরই করেছেন ইমাম আহমাদ আর তার পূর্বেকার আলেমগণ যেমন ইবন আব্বাস, দাহহাক, সুফইয়ান আস-সাওরী।’ ইবন তাইমিয়্যাহ, মিনহাজুস সুন্নাহ (৮/৩৭৮)। অন্যত্র তিনি বলেন, এ আয়াতের শুরু ও শেষ প্রমাণ করছে যে, এখানে ‘ইলম’ উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে, আর তিনি তাঁর ‘আরশে উপর রয়েছেন। এ হচ্ছে সকল মুসলিমদের কথা। জামে‘উর রাসায়িল (৩/১৫৯)।
আর এ আয়াত ইলম দ্বারা শুরু ও ইলম দ্বারা শেষ করা প্রমাণ করে যে এখানে সাথে থাকার অর্থ ‘ইলমের মাধ্যমে সাথে থাকা’। এ বিষয়টি বহু আলেম যুগ যুগ ধরে বলেছেন। যেমন, ইবন বাত্তাহ আল-উকবারী, আল-ইবানাহ (৩/১৪৪); আজুররী, আশ-শরী‘আহ (৩/১০৭৫-১০৭৬); ইয়াহইয়া ইবন আবিল খাইর আল-‘ইমরানী, আল-ইন্তেসার ফির রাদ্দি আলাল মু‘তাযিলাতিল কাদারিয়‍্যাতিল আশরার (২/৬১৭); ইবন তাইমিয়‍্যাহ, মাজমূ‘ ফাতাওয়া (১১/২৪৯); জামে‘উর রাসায়িল (৩/১৬৪); ইবন কাসীর, আত-তাফসীর (৮/৪১)। ইবন কাসীর সেখানে ইমাম আহমাদের বক্তব্য নিয়ে এসেছেন।
৯৯৬. আর এটাই হচ্ছে, বিশেষ অর্থে সাথে থাকা, দেখুন, মাজমূ‘ ফাতাওয়া (১১/২৪৯-২৫০)।
৯৯৭. সুতরাং মা‘য়িয়্যাত (معية) এর অর্থ হচ্ছে সাথিত্ব ও মিল থাকা যার চাহিদা হচ্ছে জ্ঞান ও ক্ষমতা। আবার কখনও কখনও সেটার চাহিদা থাকে সাহায্য-সহযোগিতা করা। ইবন তাইমিয়‍্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘(২৩) এর অর্থ হচ্ছে সাথীত্ব ও মিল হওয়া... তারপর এ মিল অন্যান্য বিষয়ের ওপর প্রমাণবহ যা মিল থাকলে তা হওয়া দাবি করে। সুতরাং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা যখন বলেছেন, তিনি বান্দার সাথে আছেন তখন সেটার দাবি হচ্ছে তিনি তাদের সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন, তাদের পরিচালনা করেন, তাদের ওপর ক্ষমতাবান। আর যদি তিনি তাদের কারও সাথে বিশেষভাবে থাকেন তবে বক্তব্যের পূর্বাপরে এমন কিছু থাকবে যা বর্ণনা করবে যে, তিনি তাদের সাহায্য করবেন, সহযোগিতা করবেন।’ ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়‍্যাহ (৬/২৩-২৪)।

বস্তুত এ معية )সঙ্গে থাকা) বিষয়টি উপস্থাপনা ও ব্যবহারের ভিন্নতা অনুযায়ী তার বিধান ভিন্ন হয়।(১১৪) তাই যখন তিনি বললেন: ﴿يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ﴾ [الحديد: ٤] “তিনি জানেন যা কিছু যমীনে প্রবেশ করে এবং যা কিছু তা থেকে বের হয়, আর আসমান থেকে যা কিছু অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যা কিছু উত্থিত হয়। আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন—তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন” [সূরা আল-হাদীদ: ০৪] প্রকাশ্য অর্থে তখন বুঝান হলো যে, এই সঙ্গে থাকার চাহিদা হচ্ছে: তিনি তোমাদের দেখছেন, খোঁজ রাখছেন, তোমাদের উপরে সাক্ষী, তোমাদের সংরক্ষক, তোমাদের সম্পর্কে জানেন, এটাই সালাফে সালেহীনের বক্তব্যের অর্থ যে, তিনি স্বীয় ইলম দ্বারা তাদের সাথে আছেন। এটা প্রকাশ্য সম্বোধন এবং হাকীকত, রূপক নয়。
তেমনি তাঁর বাণী:
﴿مَا يَكُونُ مِن نَّجْوَىٰ ثَلَثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ وَلَا خَمْسَةٍ إِلَّا هُوَ سَادِسُهُمْ وَلَا أَدْنَىٰ مِن ذَٰلِكَ وَلَا أَكْثَرَ إِلَّا هُوَ مَعَهُمْ أَيْنَ مَا كَانُوا﴾ [المجادلة: ٧]
“তিন ব্যক্তির মধ্যে এমন কোনো গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থ জন হিসেবে তিনি থাকেন না এবং পাঁচ ব্যক্তির মধ্যেও হয় না যাতে ষষ্ঠজন হিসেবে তিনি থাকেন না। তারা এর চেয়ে কম হোক বা বেশি হোক তিনি তো তাদের সঙ্গেই আছেন তারা যেখানেই থাকুক না কেন।”(৯৯৫) [সূরা আল-মুজাদালাহ: ০৭]
অনুরূপ যখন গুহায় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাথীকে বলেন: لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهُ مَعَنَا﴾ [التوبة: ٤٠] “তুমি ভয় পেও না, নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।” [সূরা আত-তাওবাহ: ৪০] এটিও প্রকাশ্য অর্থের উপরে হাকীকত হিসেবে ধর্তব্য হবে (রূপক নয়)। আর অবস্থার দ্বারা বুঝা গেল -এখানে সঙ্গে থাকার অর্থ দেখার সাথে সাহায্য- সহযোগিতাও করা。
তেমনি তাঁর বাণী: ﴿إِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذِينَ اتَّقَواْ وَالَّذِينَ هُم تُحْسِنُونَ﴾ [النحل: ۱۲۸] “নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সঙ্গে আছেন যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা মুহসিন।” [সূরা আন-নাহল: ১২৮]
অনুরূপ মূসা ও হারূন ‘আলাইহিমাস সালামের জন্য তাঁর কথা: ﴿إِنَّنِي مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى﴾ [٤٦:৬] “আমি তো আপনাদের সংগেই আছি, আমি শুনি ও আমি দেখি।” [সূরা ত্বা-হা: ৪৬] এখানেও মা‘য়িয়‍্যাহ (সঙ্গে) তার প্রকাশ্য অর্থেই। আর এখানে সে প্রকাশ্য অর্থ হচ্ছে সাহায্য সহযোগিতা করা。
আবার যেমন- কোনো বাচ্চাকে কেউ ভয় দেখাচ্ছে তখন সে কাঁদছে, আর তার পিতা ছাদের থেকে তাকিয়ে বলছে: ভয় করো না আমি তোমার সাথে আছি অথবা আমি এখানে আছি অথবা আমি উপস্থিত আছি ইত্যাদি। এভাবে তিনি তার সন্তানকে এমন সাথে থাকার কথা বলছেন যা সে অবস্থার জন্য উপযোগী, যাতে সন্তান থেকে তিনি অপছন্দনীয় কোনো বিষয় দূর করতে পারেন। সুতরাং সঙ্গে থাকার অর্থ ও তার চাহিদার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। (১৯৯৭) তাইতো কখনও কখনও সেটার চাহিদাই অর্থ হিসেবে নির্ধারিত হয়, তাই অবস্থাভেদে সেটার অর্থে ভিন্নতা আসে।

টিকাঃ
৯৯৪. অর্থাৎ ‘মা‘আ’ )مع( শব্দটির সম্বন্ধ ও সম্পর্ক কিসের সঙ্গে করা হয়েছে তা অনুযায়ী তার অর্থ ভিন্ন হয়ে থাকে। মানুষের অন্তর তার সাথে থাকা এক ধরণের, মানুষের জ্ঞানের, ক্ষমতার, শক্তির সাথে থাকা আরেক ধরণের, মানুষের স্ত্রী তার সাথে থাকা আরেক ধরণের,... এসব কিছুর ভিন্নতা ও বিভিন্ন প্রকার হওয়া সত্ত্বেও ‘সাথে’ বলা সাব্যস্ত। তাই তো বলা যায় তার সাথে তার স্ত্রী রয়েছে অথচ হয়ত তাদের দু’জনের মাঝে বিস্তর ফারাক, এভাবেই। তাহলে বুঝা গেল যে, ‘সাথে থাকা’ এর সর্বোচ্চ পর্যায় হচ্ছে সঙ্গী-সাথী হওয়া, একমত হওয়া, কোনো কাজে মিল থাকা। আর এ মিল হওয়া অবস্থা ও ব্যবহার অনুসারে ভিন্ন হতে বাধ্য। দেখুন, ইবনুল কাইয়োম, মুখতাসারুস সাওয়া’য়িক (৩/১২৪৫- ১২৪৬)। আবু মুহাম্মাদ ইবন কুতাইবাহ বলেন, ‘আর আমরা আল্লাহ তা‘আলার বাণী “আপনি কি লক্ষ্য করেন না যে, আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে আল্লাহ তা জানেন? তিন ব্যক্তির মধ্যে এমন কোনো গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থ জন হিসেবে তিনি থাকেন না এবং পাঁচ ব্যক্তির মধ্যেও হয় না যাতে ষষ্ঠ জন হিসেবে তিনি থাকেন না। তারা এর চেয়ে কম হোক বা বেশি হোক তিনি তো তাদের সঙ্গেই আছেন তারা যেখানেই থাকুক না কেন। তারপর তারা যা করে, তিনি তাদেরকে কিয়ামতের দিন তা জানিয়ে দেবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত।” [সূরা আল-মুজাদালাহ: ০৭] এর ব্যাপারে বলি যে, আল্লাহ তা‘আলা তারা কী করছে এ ব্যাপারে তাদের সাথে জ্ঞানের মাধ্যমে রয়েছেন। যেমন, তুমি কোনো লোককে দূর কোনো দেশে পাঠাও, তাকে তোমার কোনো কাজের দায়িত্ব প্রদান কর তখন তাকে বল: সাবধান, তোমাকে যে কাজের দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছি এ ব্যাপারে কোনো ত্রুটি বরদাশত করা হবে না; কারণ আমি তোমার সাথে আছি। এখানে এ সাথে থাকার অর্থ, তোমার কাছে তার ত্রুটি গোপন থাকবে না, অথবা তুমি তার প্রতিটি কাজে যথাযথ খেয়াল রাখছ, তোমার কর্মকাণ্ডের খোঁজখবর রাখছ, সেটার ব্যাপারে কতটুকু সিরিয়াস সেটা জানিয়ে দেয়া। যদি সেটা একজন সৃষ্টির ব্যাপার বৈধ হয় যিনি গায়েব জানেন না, তাহলে স্রষ্টার ব্যাপারে আরও উত্তমরূপে বৈধ, যিনি গায়েব জানেন।’ দেখুন, তা’ওয়ীলু মুখতালাফিল হাদীস, পৃ. ৭০৯-৭১০। আর ইবন তাইমিয়্যাহ তা তার ফাতাওয়াতে নিয়ে এসেছেন, দেখুন (৫/৩০৪); (শারহু হাদীসিন নুযূল)। ইবন তাইমিয়্যাহ আরও বলেন, [﴿وَهُوَ مَعَكُمْ﴾ [الحديد: ٤ ‘আর তিনি তোমাদের সাথে আছেন’ [সূরা আল-হাদীদ: ০৪] এ আয়াতের যাহের বা প্রকাশ্য অর্থ কখনও এটা বুঝায় না যে, তিনি আল্লাহ সৃষ্টির মাঝে আছেন। আর এটাও বুঝায় না যে, তিনি সৃষ্টির সাথে মিশে বা লেগে আছেন ইত্যাদি যেসব বাতিল অর্থ মানুষ করে থাকে। বস্তুত (২৩) কখনও এ অর্থের ওপর কোনো দিক থেকেই প্রমাণবহ নয়। এটা প্রকাশ্য অর্থ হওয়া তো আরও দূরের কথা। এর কারণ হচ্ছে (২৩) শব্দটি কুরআনের বহু জায়গায় ব্যবহৃত হয়েছে, তেমনি তা আরবী ভাষাতেও এসেছে, সেসব জায়গার কোথাও এটা আবশ্যক করে না তার একটি অপরটির মধ্যে থাকবে, কিংবা মিশে যাবে। বস্তুত কোনো শব্দের অর্থ ও প্রকাশ্য অর্থ কেবল তার ব্যবহার বিধি থেকেই নেয়া হয়ে থাকে। তারপর ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, (مَعَ) শব্দটি (ظرف مكان) বা স্থান নির্দেশক, তার অর্থ হচ্ছে সাথিত্ব, সংযোগ ও মিল হওয়া। যদি বলা হয়, এটি এটির সাথে, তখন এটা ধরে নেয়া হয় যে, সেটি স্থান বা অবস্থানে দ্বিতীয়টির সাথে কোনো সংযোগে রয়েছে। যাতে করে উভয়টি সাথিত্বে থাকবে বা একমত হবে। আর এটাই সে অর্থ, যা কোনো কোনো নাহুবিদ বলে থাকেন: ‘নিশ্চয় (مَعَ) শব্দটি (مصاحبة) বা সাথিত্ব বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। তবে সে সংযোগ আরও কিছু বিষয়ের ওপর প্রমাণবহ থাকে যা সংযোগ থাকা দাবি করে। সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা যখন বললেন, তিনি তার সৃষ্টির সাথে, তখন সেটার দাবি হচ্ছে, তিনি তাদের ব্যাপারে জানেন, তাদের সবকিছু পরিচালনা করেন, তাদের ওপর ক্ষমতাবান। তারপর যদি কারও ব্যাপারে বিশেষত্ব বুঝানোর দরকার হবে তখন বাক্যের আগে-পরে এমন কোনো কিছু থাকতে হবে যা বর্ণনা করবে যে তিনি তাদের সাহায্য করবেন ও সহযোগিতা করবেন।
তারপর শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়‍্যাহ বলেন, যে কেউ কুরআন নিয়ে গবেষণা করবে সে অবশ্যম্ভাবীরূপে জানতে সক্ষম হবে যে, তিনি বান্দাদের সাথে থাকার অর্থ তার সত্তা তাদের মাঝে থাকা নয়, তাদের সাথে মিশে থাকাও নয়, যেমনিভাবে যত জায়গায় (مَعَ) শব্দটি ব্যবহার হয় সেখানেও তা হওয়া দাবি করে না। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়‍্যাহ (৬/২০-২৫)। আরও দেখুন, জামে‘উর রাসায়িল (৩/১৬২)। তিনি আরও বলেন, ‘যদি মা’য়িয়‍্যাত (معية) দ্বারা লেগে থাকা ও মিশে যাওয়া বুঝানো হতো, আর তিনি সব জায়গায় সাধারণভাবে সত্তাসহ থাকতেন তাহলে (معية) বিশেষভাবে হতে পারতো না। সুতরাং যে কেউ মনে করবে যে, মা’য়িয়‍্যাত এর অর্থ হচ্ছে লেগে থাকা ও মিশে থাকা আর এর প্রকাশ্য অর্থ সব জায়গায় হওয়াকে বুঝায়, তাহলে সে লোক অবশ্যই ভুলে পতিত হলো, বরং মা’য়িয়‍্যাত যদিও ‘মুসাহাবাত’ বা সাথিত্ব ও মিল হওয়া অর্থে হয় তবুও সেটি প্রত্যেক স্থানে তার পূর্বাপর অবস্থা ও অবস্থান যা নির্দেশ করবে সেটাই ধরা হবে।’ জামে‘উর রাসায়িল (৩/১৬৪)। ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, আয়াতে যে মা’য়িয়‍্যাত (معية) এসেছে তার শব্দ বা প্রকাশ্য অর্থ কোনোটিই এটা বুঝায় না যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা সৃষ্টির সাথে মিশে আছেন। আর (مَعَ) শব্দটি এ অর্থে কোনোভাবেই আসে না, সেটা শব্দের প্রকৃত অর্থ বা বিষয়বস্তু হওয়া তো দূরের কথা। কারণ আরবদের ভাষায় (مَعَ) বলতে বুঝায় ‘যথোপযুক্ত সাথিত্ব’। মুখতাসারুস সাওয়া’য়িক (৩/১২৪৫)।
৯৯৫. এ আয়াতে কথার শুরু করা হয়েছে ‘ইলম’ বা জ্ঞান শব্দ দিয়ে, আবার শেষও করা হয়েছে সেই ‘ইলম’ বা জ্ঞান দিয়ে। এজন্যই ইবন আব্বাস, দাহহাক, সুফইয়ান আস-সাওরী ও আহমাদ ইবন হাম্বল বলেন, ‘তিনি ইলম বা জ্ঞানে তাদের সাথে আছেন।’ দেখুন, মাজমূ‘ ফাতাওয়া (১১/২৫০)। এ আয়াত থেকে একদল যিন্দীক (ইসলাম বিরোধী গোপন গোষ্ঠী) দলীল দিয়েছে যে, আল্লাহ তা‘আলা সব জায়গায়, এমনকি ময়লার জায়গাতেও, মানুষের পেটেও, জীব জন্তুর অভ্যন্তরেও, ঘরের কোণে ও কক্ষের ভিতরে।... তারা যা বলেছে তা থেকে আল্লাহ কতই না পবিত্র ও উপরে। তখন ইমাম উসমান ইবন সা‘ঈদ আদ-দারেমী রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করলেন যে, আয়াতের শুরু ও শেষের দিকে তাকিয়ে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য তিনি তাঁর বান্দাদের অবস্থা সম্পর্কে জানেন, তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে খবর রাখেন।
এটা নয় যে, তিনি সব জায়গায় তাদের সাথে আছেন। দেখুন, মহান আল্লাহর কথা, “আপনি কি লক্ষ্য করেন না যে, আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে আল্লাহ তা জানেন? তিন ব্যক্তির মধ্যে এমন কোনো গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থ জন হিসেবে তিনি থাকেন না এবং পাঁচ ব্যক্তির মধ্যেও হয় না যাতে ষষ্ঠ জন হিসেবে তিনি থাকেন না। তারা এর চেয়ে কম হোক বা বেশি হোক তিনি তো তাদের সঙ্গেই আছেন তারা যেখানেই থাকুক না কেন। তারপর তারা যা করে, তিনি তাদেরকে কিয়ামতের দিন তা জানিয়ে দেবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত।” [সূরা আল-মুজাদালাহ: ০৭]
তারপর তিনি বলেন, ‘আমরা বললাম, তিনি তাদের সাথে ইলম বা জ্ঞানের মাধ্যমে আছেন যা দিয়ে আয়াত শুরু করা হয়েছে আর যা দিয়ে আয়াত শেষ করা হয়েছে। কারণ তিনি অনেক আয়াতে এমন কথা বলেছেন যা দৃঢ়করে প্রতিষ্ঠিত করেছে যে, তিনি তাঁর ‘আরশের উপরে, সকল আসমানের উপরে। সুতরাং তিনি সেখানেই এতে কোনো সন্দেহ নেই। আর যখন তিনি বলেছেন তিনি প্রত্যেক শলা-পরামর্শকারীর সাথে, আমরা বললাম, তাঁর জ্ঞান ও দেখা তাদেরকে পরিবেষ্টন করে আছে, যদিও তিনি স্বয়ং তাঁর যাবতীয় পূর্ণতাসহ তাঁর ‘আরশের উপর, যেমনটি তিনি তাঁর গুণ বর্ণনা করেছেন। কারণ তার থেকে কোনো কিছু আড়াল হয় না। উপরস্থ সাত আসমানের কোনো কিছু তাঁর জ্ঞান ও দেখা থেকে ছুটে যেতে পারে না, অনুরূপ সাত যমীনের নিচের কিছুও নয়। আর সেটা তেমনি যেমনটি তিনি মূসা ও হারূন ‘আলাইহিমাস সালামকে বলেছিলেন, “তিনি বললেন, ‘আপনারা ভয় করবেন না, আমি তো আপনাদের সংগে আছি, আমি শুনি ও আমি দেখি’।” [সূরা ত্বা-হা: ৪৬] অর্থাৎ ‘আরশের উপর থেকে।’ দেখুন, উসমান ইবন সা‘ঈদ আদ-দারেমী, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ, পৃ. ৪৩-৪৪।
তারও আগে ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল যখন দেখলেন যে, জাহমিয়্যারা এ আয়াতের অপব্যাখ্যা করে বলছে যে, আল্লাহ আমাদের মাঝে ও আমাদের মধ্যে। তখন ইমাম আহমাদ বললেন, ‘আমরা বললাম, তোমরা আল্লাহর আয়াতের মাধ্যমে দেয়া সংবাদের প্রথম অংশ কেন কর্তন করেছ? আল্লাহ তা‘আলা তো বলেছেন, “আপনি কি দেখেননি নিশ্চয় আল্লাহ জানেন তা যা আসমানসমূহ ও যা যমীনে আছে।” [সূরা আল-মুজাদালাহ: ০৭] তারপর বলেছেন, “তিনজনের শলা-পরামর্শ হলে সেখানে তিনি চতুর্থজন হন।” [সূরা আল-মুজাদালাহ: ০৭] অর্থাৎ তিনি তাঁর জ্ঞান ও ইলমে তাদের চতুর্থজন। “আর নয় চতুর্থ জন যেখানে তিনি পঞ্চম জন না হন।” [সূরা আল-মুজাদালাহ: ০৭] অর্থাৎ আল্লাহ তাঁর ইলমের মাধ্যমে তাদের সাথে আছেন। “আর না তাদের ষষ্ঠজন, বা তার থেকে কম বা তার থেকে বেশি, তিনি তাদের সাথে রয়েছেন।” [সূরা আল-মুজাদালাহ: ০৭] অর্থাৎ তিনি তাদের সাথে ইলমের মাধ্যমে রয়েছেন। “যেখানেই তারা থাকুক না কেন, তারপর তিনি তাদেরেকে জানিয়ে দিবেন সেটা যা তারা করেছে, নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু সম্পর্কে সর্বজ্ঞ।” [সূরা আল-মুজাদালাহ: ০৭] এভাবে সংবাদ শুরু করেছেন ইলমের মাধ্যমে আর সংবাদ শেষ করেছেন ইলমের মাধ্যমে।’ আর-রাদ্দু আলায় যানাদিকাতি ওয়াল জাহমিয়্যাহ, পৃ. ২৯৬-২৯৭। ইবন তাইমিয়‍্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এ আয়াত সম্পর্কে বলেন, এভাবে আল্লাহ আয়াতটি শুরু করেছেন ‘ইলম’ দিয়ে, আর শেষ করেছেন ‘ইলম’ দিয়ে। তাহলে জানা গেল যে, তিনি এ আয়াতে সাথে থাকার দ্বারা ইচ্ছা করেছেন তিনি তাদের সম্পর্কে জানেন, তাঁর কাছে কোনো কিছু গোপন নেই, আর এরকম তাফসীরই করেছেন ইমাম আহমাদ আর তার পূর্বেকার আলেমগণ যেমন ইবন আব্বাস, দাহহাক, সুফইয়ান আস-সাওরী।’ ইবন তাইমিয়্যাহ, মিনহাজুস সুন্নাহ (৮/৩৭৮)। অন্যত্র তিনি বলেন, এ আয়াতের শুরু ও শেষ প্রমাণ করছে যে, এখানে ‘ইলম’ উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে, আর তিনি তাঁর ‘আরশে উপর রয়েছেন। এ হচ্ছে সকল মুসলিমদের কথা। জামে‘উর রাসায়িল (৩/১৫৯)।
আর এ আয়াত ইলম দ্বারা শুরু ও ইলম দ্বারা শেষ করা প্রমাণ করে যে এখানে সাথে থাকার অর্থ ‘ইলমের মাধ্যমে সাথে থাকা’। এ বিষয়টি বহু আলেম যুগ যুগ ধরে বলেছেন। যেমন, ইবন বাত্তাহ আল-উকবারী, আল-ইবানাহ (৩/১৪৪); আজুররী, আশ-শরী‘আহ (৩/১০৭৫-১০৭৬); ইয়াহইয়া ইবন আবিল খাইর আল-‘ইমরানী, আল-ইন্তেসার ফির রাদ্দি আলাল মু‘তাযিলাতিল কাদারিয়‍্যাতিল আশরার (২/৬১৭); ইবন তাইমিয়‍্যাহ, মাজমূ‘ ফাতাওয়া (১১/২৪৯); জামে‘উর রাসায়িল (৩/১৬৪); ইবন কাসীর, আত-তাফসীর (৮/৪১)। ইবন কাসীর সেখানে ইমাম আহমাদের বক্তব্য নিয়ে এসেছেন।
৯৯৬. আর এটাই হচ্ছে, বিশেষ অর্থে সাথে থাকা, দেখুন, মাজমূ‘ ফাতাওয়া (১১/২৪৯-২৫০)।
৯৯৭. সুতরাং মা‘য়িয়্যাত (معية) এর অর্থ হচ্ছে সাথিত্ব ও মিল থাকা যার চাহিদা হচ্ছে জ্ঞান ও ক্ষমতা। আবার কখনও কখনও সেটার চাহিদা থাকে সাহায্য-সহযোগিতা করা। ইবন তাইমিয়‍্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘(২৩) এর অর্থ হচ্ছে সাথীত্ব ও মিল হওয়া... তারপর এ মিল অন্যান্য বিষয়ের ওপর প্রমাণবহ যা মিল থাকলে তা হওয়া দাবি করে। সুতরাং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা যখন বলেছেন, তিনি বান্দার সাথে আছেন তখন সেটার দাবি হচ্ছে তিনি তাদের সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন, তাদের পরিচালনা করেন, তাদের ওপর ক্ষমতাবান। আর যদি তিনি তাদের কারও সাথে বিশেষভাবে থাকেন তবে বক্তব্যের পূর্বাপরে এমন কিছু থাকবে যা বর্ণনা করবে যে, তিনি তাদের সাহায্য করবেন, সহযোগিতা করবেন।’ ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়‍্যাহ (৬/২৩-২৪)।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 কুরআন ও সুন্নাহ’য় مع (সঙ্গে থাকা) শব্দের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার

📄 কুরআন ও সুন্নাহ’য় مع (সঙ্গে থাকা) শব্দের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার


বস্তুত معية মা'য়িয়‍্যাত শব্দটি কুরআন-হাদীসে বিভিন্ন স্থানে অবস্থা ও অবস্থানের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এক স্থানে যে অর্থের চাহিদা এসেছে অন্যস্থানে সে অর্থের চাহিদা আসেনি। তাই হয় معية মা'য়িয়্যাত এর অর্থকে স্থান হিসেবে ভিন্ন হয় বলে নির্ধারণ করা হবে বলতে হবে, নতুবা বলতে হবে যে সকল স্থানে যেভাবে এ শব্দটি যেসব অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে সেখানে একটি (قدر مشترك) কমন অর্থ রয়েছে। (১৯৯৮) যদিও প্রত্যেক স্থানে ব্যবহারের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সুতরাং (স্থান-কাল-পাত্র ভেদে ভিন্ন হওয়া অথবা কমন অর্থে মিল হওয়া) উভয় অবস্থাতেই معية মা'য়িয়্যাত (সঙ্গে থাকা) মহান রাব্বুল আলামীন সৃষ্টির সাথে মিলে-মিশে একাকার হওয়া দাবি করে না। তাই একথা বলা কখনো সঠিক হবে না যে, বড় মা'য়িয়্যাত এর অর্থ জ্ঞান, দেখা, শোনা, সাহায্য করা ইত্যাদি করা হলে এর দ্বারা শব্দটিকে তার প্রকাশ্য চাহিদা থেকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হয়েছে।

টিকাঃ
৯৯৬. আর এটাই হচ্ছে, বিশেষ অর্থে সাথে থাকা, দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (১১/২৪৯-২৫০)।
৯৯৭. সুতরাং মা'য়িয়্যাত (معية) এর অর্থ হচ্ছে সাথিত্ব ও মিল থাকা যার চাহিদা হচ্ছে জ্ঞান ও ক্ষমতা। আবার কখনও কখনও সেটার চাহিদা থাকে সাহায্য-সহযোগিতা করা। ইবন তাইমিয়‍্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, '(২৩) এর অর্থ হচ্ছে সাথীত্ব ও মিল হওয়া... তারপর এ মিল অন্যান্য বিষয়ের ওপর প্রমাণবহ যা মিল থাকলে তা হওয়া দাবি করে। সুতরাং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা যখন বলেছেন, তিনি বান্দার সাথে আছেন তখন সেটার দাবি হচ্ছে তিনি তাদের সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন, তাদের পরিচালনা করেন, তাদের ওপর ক্ষমতাবান। আর যদি তিনি তাদের কারও সাথে বিশেষভাবে থাকেন তবে বক্তব্যের পূর্বাপরে এমন কিছু থাকবে যা বর্ণনা করবে যে, তিনি তাদের সাহায্য করবেন, সহযোগিতা করবেন।' ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়‍্যাহ (৬/২৩-২৪)।
৯৯৮. আর তা হচ্ছে, সাধারণভাবে মিল থাকা ও সাধারণভাবে সাথীত্বে থাকা।

বস্তুত معية মা'য়িয়‍্যাত শব্দটি কুরআন-হাদীসে বিভিন্ন স্থানে অবস্থা ও অবস্থানের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এক স্থানে যে অর্থের চাহিদা এসেছে অন্যস্থানে সে অর্থের চাহিদা আসেনি। তাই হয় معية মা'য়িয়্যাত এর অর্থকে স্থান হিসেবে ভিন্ন হয় বলে নির্ধারণ করা হবে বলতে হবে, নতুবা বলতে হবে যে সকল স্থানে যেভাবে এ শব্দটি যেসব অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে সেখানে একটি (قدر مشترك) কমন অর্থ রয়েছে। (১৯৯৮) যদিও প্রত্যেক স্থানে ব্যবহারের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সুতরাং (স্থান-কাল-পাত্র ভেদে ভিন্ন হওয়া অথবা কমন অর্থে মিল হওয়া) উভয় অবস্থাতেই معية মা'য়িয়্যাত (সঙ্গে থাকা) মহান রাব্বুল আলামীন সৃষ্টির সাথে মিলে-মিশে একাকার হওয়া দাবি করে না। তাই একথা বলা কখনো সঠিক হবে না যে, বড় মা'য়িয়্যাত এর অর্থ জ্ঞান, দেখা, শোনা, সাহায্য করা ইত্যাদি করা হলে এর দ্বারা শব্দটিকে তার প্রকাশ্য চাহিদা থেকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হয়েছে।

টিকাঃ
৯৯৬. আর এটাই হচ্ছে, বিশেষ অর্থে সাথে থাকা, দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (১১/২৪৯-২৫০)।
৯৯৭. সুতরাং মা'য়িয়্যাত (معية) এর অর্থ হচ্ছে সাথিত্ব ও মিল থাকা যার চাহিদা হচ্ছে জ্ঞান ও ক্ষমতা। আবার কখনও কখনও সেটার চাহিদা থাকে সাহায্য-সহযোগিতা করা। ইবন তাইমিয়‍্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, '(২৩) এর অর্থ হচ্ছে সাথীত্ব ও মিল হওয়া... তারপর এ মিল অন্যান্য বিষয়ের ওপর প্রমাণবহ যা মিল থাকলে তা হওয়া দাবি করে। সুতরাং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা যখন বলেছেন, তিনি বান্দার সাথে আছেন তখন সেটার দাবি হচ্ছে তিনি তাদের সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন, তাদের পরিচালনা করেন, তাদের ওপর ক্ষমতাবান। আর যদি তিনি তাদের কারও সাথে বিশেষভাবে থাকেন তবে বক্তব্যের পূর্বাপরে এমন কিছু থাকবে যা বর্ণনা করবে যে, তিনি তাদের সাহায্য করবেন, সহযোগিতা করবেন।' ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়‍্যাহ (৬/২৩-২৪)।
৯৯৮. আর তা হচ্ছে, সাধারণভাবে মিল থাকা ও সাধারণভাবে সাথীত্বে থাকা।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 কুরআনবিয়াহ ও উবূদিয়্যাহ শব্দের আর সকল সৃষ্টি উভয়ের মধ্যে কমনভাবে অংশীনার থাকা

📄 কুরআনবিয়াহ ও উবূদিয়্যাহ শব্দের আর সকল সৃষ্টি উভয়ের মধ্যে কমনভাবে অংশীনার থাকা


কিছু দিক থেকে (মা'য়িয়‍্যাাহ) এর উদাহরণ হচ্ছে, রবুবিয়‍্যাহ ও উবুদিয়‍্যাহ তথা রব্ব হওয়া ও দাস হওয়া এর মত (১৮৯) কেননা উভয়টি 'আসল রুবুবিয়‍্যাত' ও 'আসল উলুহিয়াত' হিসেবে (قدر مشترك) কমন একটি অর্থে মিল থাকলেও, স্থান-কাল-পাত্র ভেদে তার অর্থ ভিন্ন হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। যদিও মূল অর্থ সব স্থানে একই।
সুতরাং [রুবুবিয়াত শব্দটি] যখন আল্লাহ বললেন: ﴿رَبِّ الْعَالَمِينَ - رَبِّ مُوسَى وَهَارُونَ﴾ [الأعراف: ١٢٢،١٢١] "বিশ্ব-জাহানের রব্ব, মূসা ও হারুনের রব্ব।" [সূরা আল-আ'রাফ: ১২১, ১২২] এখানে মূসা এবং হারূনের জন্য রব্ব হওয়া বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন, যা বিশ্বজাহানের অপর সৃষ্টি রব্ব হওয়া থেকে একটু বেশি। কারণ কাউকে যদি আল্লাহ তা'আলা পূর্ণতা বেশি প্রদান করেন তবে তা দ্বারা তিনি অন্যদের থাকে তাকে বেশি লালন-পালন করেছেন, বিশেষভাবে তারবিয়াত ও প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, তার তারবিয়াত অন্যদের চেয়ে বেশি।
অনুরূপভাবে [উবুদিয়াত শব্দটিও সাধারণভাবে ও বিশেষ অর্থে হয়, যদিও শব্দের মূল অর্থ দাসত্বের একটি জায়গায় কমন মিল থাকে, তারপরও তা সাধারণভাবে সকলের জন্য ব্যবহৃত হয়, আবার বিশেষ অর্থেও ব্যবহৃত হয়, যেমন বিশেষ অর্থে ব্যবহার হয়েছে] তাঁর ﴿ عَيْنًا يَشْرَبُ بِهَا عِبَادُ اللَّهِ يُفَجِّرُونَهَا تَفْجِيرًا) [الإنسان: ٦] এবং (سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلاً) [الإسراء:1]।
বাগীতে যেখানে আল্লাহ বলেন, [“এমন একটি প্রস্রবণ যা থেকে আল্লাহর বান্দাগণ পান করবে, তারা এ প্রস্রবণকে যথেচ্ছা প্রবাহিত করবে।” [সূরা আল-ইনসান: ০৬] “পবিত্র মহিমাময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতের মাধ্যমে ভ্রমণ করালেন।” [সূরা আল-ইসরা: ০১] (১০০০)
কারণ এই 'আব্দ' শব্দটি দ্বারা কখনো উদ্দেশ্য হয়, 'মু'আব্বাদ' বা যা অধীনতায় আবদ্ধ বা দাসত্বের নীতির অধীন, (ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়) এ অর্থ সমগ্র সৃষ্টির ক্ষেত্রে সাধারণভাবে প্রযোজ্য, এটার উদাহরণ আল্লাহর বাণী, (إِن كُلُّ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ إِلَّا آتِي الرَّحْمَنِ عَبْدًا) [مريم: ٩٣] “আসমানসমূহ ও যমীনে এমন কেউ নেই, যে দয়াময়ের কাছে বান্দারূপে উপস্থিত হবে না।” [সূরা মারইয়াম: ৯৩] আবার কখনো 'আব্দ' শব্দটি দ্বারা উদ্দেশ্য হয় 'আবেদ' বা ইবাদতকারী, দাসত্বকারী। (যা কেবল ইচ্ছাকৃত ইবাদতকারীকে বুঝায়) আর তখন সেটি বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত হয়। তারপর তাতে বিভিন্ন স্তর হয়, (আবদ) যদি কেউ জ্ঞান ও অবস্থা অনুযায়ী বেশি ইবাদত করে, তার ইবাদত হবে বেশি পরিপূর্ণ; তখন তাঁর দিকে সম্পৃক্ত হওয়া পূর্ণতাজ্ঞাপক; যদিও সকল অবস্থাতেই এটি তার আসল বা হাকীকী অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। (অর্থাৎ কাফেরও দাস, ঈমানদারও দাস, অথচ উভয়ের দাসত্বের অবস্থা সমান নয়, কিন্তু তাই বলে কারও দাস হাকীকী বা প্রকৃত, আর কারও দাস মাজাযী বা রূপক নয়। উভয়ের দাসত্বই প্রকৃত দাসত্ব।)

টিকাঃ
৯৯৯. অর্থাৎ মা'য়িয়্যাহ এর অর্থ কী হবে, তা বুঝতে হলে এটিকে রুবুবিয়্যাহ ও উবুদিয়্যাহ'র মতো করে বুঝতে হবে। রুবুবিয়্যাহ যেমন সাধারণভাবে সকলের জন্য রয়েছে, তেমনি বিশেষ করে বিশেষ লোকদের জন্যও রয়েছে। অনুরূপভাবে উবুদিয়্যাহ বা আল্লাহর দাসত্ব সাধারণভাবে সবাই ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক তা মানতে বাধ্য, আবার বিশেষভাবে কিছু লোকদের জন্য তা নির্ধারিত হয়, যারা তাঁকে ইচ্ছাকৃত রব্ব মেনে নিয়ে তাঁর সন্তুষ্টির জন্ন প্রতিনিয়ত ইবাদত করে চলেছে। তাই মা'য়িয়‍্যাহ শব্দটিকেও আমরা উভয়ভাবে দেখতে পারি, তা যেমন মায়িয়‍্যাহ 'আম্মাহ (সকলের সাথে) হয়, তেমনি তা মা'য়িয়‍্যাহ খাসসাহ (বিশেষ লোকদের সাথে) হয়, এভাবে আমরা এগুলোকে দু'ভাগে করা যায় দেখতে পাই।
১০০০. 'আবদ' শব্দটি কুরআনে কারীমে কেবল তার জন্যই ব্যবহৃত হয়েছে যে দাসত্ব করেছে। তাই যে দাসত্ব করে না তার জন্য বলা হয় না যে তিনি ইবাদত করেছেন। যেমন আল্লাহ বলেন, "বিভ্রান্তদের মধ্যে যে তোমার অনুসরণ করবে সে ছাড়া আমার বান্দাদের ওপর তোমার কোনো ক্ষমতাই থাকবে না।" [সূরা আল-হিজর: ৪২] তবে এ আয়াতের শেষে যে ব্যতিক্রম থাকার কথা এসেছে, "বিভ্রান্তদের মধ্যে যে তোমার অনুসরণ করবে সে ছাড়া" তা বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম, যা আগের সাথে সম্পৃক্ত নয়। যেমনটি অধিকাংশ মুফাসসির ও আলেমগণ বলেছেন। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (১/৪৩)। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আল-'আবদ' দুটি অর্থকে গ্রহণ করে: এক. যে অনিচ্ছায় দাসত্ব করে। যেমন আল্লাহ বলেন, "আসমানসমূহ ও যমীনে এমন কেউ নেই, যে দয়াময়ের কাছে বান্দারূপে উপস্থিত হবে না।" [সূরা মারইয়াম: ৯৩] আরও বলেন, "তারা কি চায় আল্লাহ্ দীনের পরিবর্তে অন্য কিছু? অথচ আসমান ও যমীনে যা কিছু রয়েছে সবকিছুই ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। আর তাঁর দিকেই তাদের ফিরিয়ে নেয়া হবে।" [সূরা আলে ইমরান: ৮৩] এ দাসত্ব থেকে কেউ মুক্ত থাকতে পারে না। দুই, যে ইচ্ছায় ইবাদত করে, তাঁর কাছে সাহায্য চায়। বস্তুত এটিই কুরআনে কারীমে বেশি এসেছে। যেমন, "আর 'রহমান'-এর বান্দা তারাই, যারা যমীনে অত্যন্ত বিনম্রভাবে চলাফেরা করে এবং যখন জাহেল ব্যক্তিরা তাদেরকে (অশালীন ভাষায়) সম্বোধন করে, তখন তারা বলে, 'সালাম'।” [সূরা আল-ফুরকান: ৬৩] আরও বলেন, "এমন একটি প্রস্রবণ যা থেকে আল্লাহর বান্দাগণ পান করবে, তারা এ প্রস্রবণকে যথেচ্ছা প্রবাহিত করবে।" [সূরা আল-ইনসান: ০৬]
এ দাসত্ব থেকে কখনও কখনও মানুষ মুক্ত থাকতে পারে। কিন্তু প্রথম প্রকার দাসত্ব সেটা যে কোনো সৃষ্টির অবিচ্ছিন্ন বাধ্য গুণ। কারণ এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে তার ওপর তাকদীরের সকল কিছু যথাযথভাবে সংঘটিত হবে আর স্রষ্টা তার ওপর সবকিছু পরিচালনা করেন।' দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (১৪/২৯-৩০), (১০/১৫৪-১৫৮, ১৮০)। রিসালাতুল উবুদিয়্যাহ।

কিছু দিক থেকে (মা'য়িয়‍্যাাহ) এর উদাহরণ হচ্ছে, রবুবিয়‍্যাহ ও উবুদিয়‍্যাহ তথা রব্ব হওয়া ও দাস হওয়া এর মত (১৮৯) কেননা উভয়টি 'আসল রুবুবিয়‍্যাত' ও 'আসল উলুহিয়াত' হিসেবে (قدر مشترك) কমন একটি অর্থে মিল থাকলেও, স্থান-কাল-পাত্র ভেদে তার অর্থ ভিন্ন হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। যদিও মূল অর্থ সব স্থানে একই।
সুতরাং [রুবুবিয়াত শব্দটি] যখন আল্লাহ বললেন: ﴿رَبِّ الْعَالَمِينَ - رَبِّ مُوسَى وَهَارُونَ﴾ [الأعراف: ١٢٢،١٢١] "বিশ্ব-জাহানের রব্ব, মূসা ও হারুনের রব্ব।" [সূরা আল-আ'রাফ: ১২১, ১২২] এখানে মূসা এবং হারূনের জন্য রব্ব হওয়া বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন, যা বিশ্বজাহানের অপর সৃষ্টি রব্ব হওয়া থেকে একটু বেশি। কারণ কাউকে যদি আল্লাহ তা'আলা পূর্ণতা বেশি প্রদান করেন তবে তা দ্বারা তিনি অন্যদের থাকে তাকে বেশি লালন-পালন করেছেন, বিশেষভাবে তারবিয়াত ও প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, তার তারবিয়াত অন্যদের চেয়ে বেশি।
অনুরূপভাবে [উবুদিয়াত শব্দটিও সাধারণভাবে ও বিশেষ অর্থে হয়, যদিও শব্দের মূল অর্থ দাসত্বের একটি জায়গায় কমন মিল থাকে, তারপরও তা সাধারণভাবে সকলের জন্য ব্যবহৃত হয়, আবার বিশেষ অর্থেও ব্যবহৃত হয়, যেমন বিশেষ অর্থে ব্যবহার হয়েছে] তাঁর ﴿ عَيْنًا يَشْرَبُ بِهَا عِبَادُ اللَّهِ يُفَجِّرُونَهَا تَفْجِيرًا) [الإنسان: ٦] এবং (سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلاً) [الإسراء:1]।
বাগীতে যেখানে আল্লাহ বলেন, [“এমন একটি প্রস্রবণ যা থেকে আল্লাহর বান্দাগণ পান করবে, তারা এ প্রস্রবণকে যথেচ্ছা প্রবাহিত করবে।” [সূরা আল-ইনসান: ০৬] “পবিত্র মহিমাময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতের মাধ্যমে ভ্রমণ করালেন।” [সূরা আল-ইসরা: ০১] (১০০০)
কারণ এই 'আব্দ' শব্দটি দ্বারা কখনো উদ্দেশ্য হয়, 'মু'আব্বাদ' বা যা অধীনতায় আবদ্ধ বা দাসত্বের নীতির অধীন, (ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়) এ অর্থ সমগ্র সৃষ্টির ক্ষেত্রে সাধারণভাবে প্রযোজ্য, এটার উদাহরণ আল্লাহর বাণী, (إِن كُلُّ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ إِلَّا آتِي الرَّحْمَنِ عَبْدًا) [مريم: ٩٣] “আসমানসমূহ ও যমীনে এমন কেউ নেই, যে দয়াময়ের কাছে বান্দারূপে উপস্থিত হবে না।” [সূরা মারইয়াম: ৯৩] আবার কখনো 'আব্দ' শব্দটি দ্বারা উদ্দেশ্য হয় 'আবেদ' বা ইবাদতকারী, দাসত্বকারী। (যা কেবল ইচ্ছাকৃত ইবাদতকারীকে বুঝায়) আর তখন সেটি বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত হয়। তারপর তাতে বিভিন্ন স্তর হয়, (আবদ) যদি কেউ জ্ঞান ও অবস্থা অনুযায়ী বেশি ইবাদত করে, তার ইবাদত হবে বেশি পরিপূর্ণ; তখন তাঁর দিকে সম্পৃক্ত হওয়া পূর্ণতাজ্ঞাপক; যদিও সকল অবস্থাতেই এটি তার আসল বা হাকীকী অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। (অর্থাৎ কাফেরও দাস, ঈমানদারও দাস, অথচ উভয়ের দাসত্বের অবস্থা সমান নয়, কিন্তু তাই বলে কারও দাস হাকীকী বা প্রকৃত, আর কারও দাস মাজাযী বা রূপক নয়। উভয়ের দাসত্বই প্রকৃত দাসত্ব।)

টিকাঃ
৯৯৯. অর্থাৎ মা'য়িয়্যাহ এর অর্থ কী হবে, তা বুঝতে হলে এটিকে রুবুবিয়্যাহ ও উবুদিয়্যাহ'র মতো করে বুঝতে হবে। রুবুবিয়্যাহ যেমন সাধারণভাবে সকলের জন্য রয়েছে, তেমনি বিশেষ করে বিশেষ লোকদের জন্যও রয়েছে। অনুরূপভাবে উবুদিয়্যাহ বা আল্লাহর দাসত্ব সাধারণভাবে সবাই ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক তা মানতে বাধ্য, আবার বিশেষভাবে কিছু লোকদের জন্য তা নির্ধারিত হয়, যারা তাঁকে ইচ্ছাকৃত রব্ব মেনে নিয়ে তাঁর সন্তুষ্টির জন্ন প্রতিনিয়ত ইবাদত করে চলেছে। তাই মা'য়িয়‍্যাহ শব্দটিকেও আমরা উভয়ভাবে দেখতে পারি, তা যেমন মায়িয়‍্যাহ 'আম্মাহ (সকলের সাথে) হয়, তেমনি তা মা'য়িয়‍্যাহ খাসসাহ (বিশেষ লোকদের সাথে) হয়, এভাবে আমরা এগুলোকে দু'ভাগে করা যায় দেখতে পাই।
১০০০. 'আবদ' শব্দটি কুরআনে কারীমে কেবল তার জন্যই ব্যবহৃত হয়েছে যে দাসত্ব করেছে। তাই যে দাসত্ব করে না তার জন্য বলা হয় না যে তিনি ইবাদত করেছেন। যেমন আল্লাহ বলেন, "বিভ্রান্তদের মধ্যে যে তোমার অনুসরণ করবে সে ছাড়া আমার বান্দাদের ওপর তোমার কোনো ক্ষমতাই থাকবে না।" [সূরা আল-হিজর: ৪২] তবে এ আয়াতের শেষে যে ব্যতিক্রম থাকার কথা এসেছে, "বিভ্রান্তদের মধ্যে যে তোমার অনুসরণ করবে সে ছাড়া" তা বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম, যা আগের সাথে সম্পৃক্ত নয়। যেমনটি অধিকাংশ মুফাসসির ও আলেমগণ বলেছেন। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (১/৪৩)। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আল-'আবদ' দুটি অর্থকে গ্রহণ করে: এক. যে অনিচ্ছায় দাসত্ব করে। যেমন আল্লাহ বলেন, "আসমানসমূহ ও যমীনে এমন কেউ নেই, যে দয়াময়ের কাছে বান্দারূপে উপস্থিত হবে না।" [সূরা মারইয়াম: ৯৩] আরও বলেন, "তারা কি চায় আল্লাহ্ দীনের পরিবর্তে অন্য কিছু? অথচ আসমান ও যমীনে যা কিছু রয়েছে সবকিছুই ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। আর তাঁর দিকেই তাদের ফিরিয়ে নেয়া হবে।" [সূরা আলে ইমরান: ৮৩] এ দাসত্ব থেকে কেউ মুক্ত থাকতে পারে না। দুই, যে ইচ্ছায় ইবাদত করে, তাঁর কাছে সাহায্য চায়। বস্তুত এটিই কুরআনে কারীমে বেশি এসেছে। যেমন, "আর 'রহমান'-এর বান্দা তারাই, যারা যমীনে অত্যন্ত বিনম্রভাবে চলাফেরা করে এবং যখন জাহেল ব্যক্তিরা তাদেরকে (অশালীন ভাষায়) সম্বোধন করে, তখন তারা বলে, 'সালাম'।” [সূরা আল-ফুরকান: ৬৩] আরও বলেন, "এমন একটি প্রস্রবণ যা থেকে আল্লাহর বান্দাগণ পান করবে, তারা এ প্রস্রবণকে যথেচ্ছা প্রবাহিত করবে।" [সূরা আল-ইনসান: ০৬]
এ দাসত্ব থেকে কখনও কখনও মানুষ মুক্ত থাকতে পারে। কিন্তু প্রথম প্রকার দাসত্ব সেটা যে কোনো সৃষ্টির অবিচ্ছিন্ন বাধ্য গুণ। কারণ এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে তার ওপর তাকদীরের সকল কিছু যথাযথভাবে সংঘটিত হবে আর স্রষ্টা তার ওপর সবকিছু পরিচালনা করেন।' দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (১৪/২৯-৩০), (১০/১৫৪-১৫৮, ১৮০)। রিসালাতুল উবুদিয়্যাহ।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 উপরোক্ত শব্দগুলো মূলত যুক্তিবাহ্যিক, যা মূলত মুতাওয়াতিরহাই এরই অংশ

📄 উপরোক্ত শব্দগুলো মূলত যুক্তিবাহ্যিক, যা মূলত মুতাওয়াতিরহাই এরই অংশ


এরূপ শব্দগুলোকে কেউ কেউ মুশাক্কিকাহা( مشککة) বলে, কারণ এগুলো শ্রোতাকে এ সন্দেহের মধ্যে ফেলে দেয় যে, এগুলোকে 'আল-আসমাউল মুতাওয়াত্বিয়াহ' (الأسماء المتواطئة) বলা হবে, নাকি এগুলো নিছক 'আল-মুশতারাকুল লাফযী' (المشترك اللفظي) এর অন্তর্ভুক্ত হবে?
মুহাক্কিক আলেমগণ জানেন যে, এগুলো মুতাওয়াত্বিয়াহ শ্রেণির বাইরে নয়। কারণ ভাষা নির্মাতা সেটাকে 'কাদরে মুশতারাক' তথা অর্থের তুল্য অংশটুকুর জন্য রেখেছেন। আর মুশাক্কিকাহ যদিও 'মুতাওয়াত্বিয়াহ' এর একটি প্রকার, তবুও এটার জন্য ভিন্ন পরিভাষা ব্যবহার করতে কোনো সমস্যা নেই। (১০০২)

টিকাঃ
১০০১. একই শব্দ বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হলে তার মাঝে বিভিন্ন প্রকার সম্পর্ক হতে পারে, যেমন, ১- মুশতারিক, একই শব্দ, তবে আলাদা আলাদা অর্থ, অর্থগুলোর মাঝে কোনো কমন (সাধারণ) অর্থ নেই। যেমন, আরবী ভাষায় 'আইন'। তা চোখের জন্যও ব্যবহৃত হয়, পানির ঝর্ণার জন্যও ব্যবহৃত হয়, গোয়েন্দার জন্যও ব্যবহৃত হয়। ২- মুতাওয়াত্বি', একই শব্দ, তবে আলাদা আলাদা অর্থ, কিন্তু অর্থগুলোর মাঝে সাধারণ একটি মিল পাওয়া যায়। ক. যদি সাধারণ অর্থটুকু সমানভাবে প্রতিটি অর্থেই পাওয়া যায় তবে সেটাকে মুতাওয়াত্বি' (মুতাসাওয়ী) বলা হয়। যেমন, ওজুদ, ইনসান ইত্যাদি। আর মুতাওয়াত্বি' বলতে সাধারণত এটাকেই বুঝায়। খ. যদি সাধারণ অর্থটুকু প্রতিটি অর্থেই সমানভাবে না বুঝিয়ে ভিন্ন অনুপাতে পাওয়া যায় তবে সেটাকে মুশাক্কিক বলা হবে। যেমন, নূর, তা সূর্যের আলো, চাঁদের আলো, বাতির আলো সবকিছুর অর্থ দেয়, তবে মাত্রায় ভিন্নতা আছে। অনুরূপ 'আবয়াছ' বা সাদা শব্দটি, তা হাতির দাঁতের শুভ্রতাকেও বুঝায় আবার বরফের শুভ্রতাকেও বুঝায়। ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, একই শব্দকে কখনও মুশতারাক বলা যায়, আবার কখনো মুতাওয়াত্বি'ও বলা যায়। তা নির্ভর করবে অর্থের কোন অংশটুকু উদ্দেশ্য করে ব্যবহার করা হয়েছে সেটার ওপর। যেমন, 'দাব্বাহ'। যমীনের উপর হাল্কা যারাই চলে এমন সবকিছুকে শামিল করে, সে হিসেবে ঘোড়ার ক্ষেত্রে, গাধার ক্ষেত্রে এটা ব্যবহার করা মুতাওয়াত্বি'। কিন্তু দাব্বাহ এর বিশেষ অর্থ হচ্ছে ঘোড়া। তখন 'দাব্বাহ' শব্দটি ঘোড়া ও অন্যান্য প্রাণীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে 'মুশতারাক' হয়ে যাবে।
১০০২. এখানকার অধিকাংশ কথার সংক্ষিপ্ত উদ্দেশ্য এটা বলা যে, আল্লাহর নাম, তাঁর গুণ আর আল্লাহর সৃষ্টির নাম ও তাদের গুণাবলির মাঝে কিছু অংশে মিল থাকতেই পারে, আর এটুকু মিলের অস্তিত্ব না থাকলে মানুষে কখনো আল্লাহর সম্বোধনই বুঝতে সক্ষম হতো না। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/৭৬- ৭৭, ১৮৮-১৯১), (৫/২০৪-২১২, ৩২৮-৩৩১), (৯/১৪৫-১৪৭), (২০/৪২৩-৪৩১); নাক্বদ্ভুত তা'সীস (২/৩৭৮-৩৮২)।

এরূপ শব্দগুলোকে কেউ কেউ মুশাক্কিকাহা( مشککة) বলে, কারণ এগুলো শ্রোতাকে এ সন্দেহের মধ্যে ফেলে দেয় যে, এগুলোকে 'আল-আসমাউল মুতাওয়াত্বিয়াহ' (الأسماء المتواطئة) বলা হবে, নাকি এগুলো নিছক 'আল-মুশতারাকুল লাফযী' (المشترك اللفظي) এর অন্তর্ভুক্ত হবে?
মুহাক্কিক আলেমগণ জানেন যে, এগুলো মুতাওয়াত্বিয়াহ শ্রেণির বাইরে নয়। কারণ ভাষা নির্মাতা সেটাকে 'কাদরে মুশতারাক' তথা অর্থের তুল্য অংশটুকুর জন্য রেখেছেন। আর মুশাক্কিকাহ যদিও 'মুতাওয়াত্বিয়াহ' এর একটি প্রকার, তবুও এটার জন্য ভিন্ন পরিভাষা ব্যবহার করতে কোনো সমস্যা নেই। (১০০২)

টিকাঃ
১০০১. একই শব্দ বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হলে তার মাঝে বিভিন্ন প্রকার সম্পর্ক হতে পারে, যেমন, ১- মুশতারিক, একই শব্দ, তবে আলাদা আলাদা অর্থ, অর্থগুলোর মাঝে কোনো কমন (সাধারণ) অর্থ নেই। যেমন, আরবী ভাষায় 'আইন'। তা চোখের জন্যও ব্যবহৃত হয়, পানির ঝর্ণার জন্যও ব্যবহৃত হয়, গোয়েন্দার জন্যও ব্যবহৃত হয়। ২- মুতাওয়াত্বি', একই শব্দ, তবে আলাদা আলাদা অর্থ, কিন্তু অর্থগুলোর মাঝে সাধারণ একটি মিল পাওয়া যায়। ক. যদি সাধারণ অর্থটুকু সমানভাবে প্রতিটি অর্থেই পাওয়া যায় তবে সেটাকে মুতাওয়াত্বি' (মুতাসাওয়ী) বলা হয়। যেমন, ওজুদ, ইনসান ইত্যাদি। আর মুতাওয়াত্বি' বলতে সাধারণত এটাকেই বুঝায়। খ. যদি সাধারণ অর্থটুকু প্রতিটি অর্থেই সমানভাবে না বুঝিয়ে ভিন্ন অনুপাতে পাওয়া যায় তবে সেটাকে মুশাক্কিক বলা হবে। যেমন, নূর, তা সূর্যের আলো, চাঁদের আলো, বাতির আলো সবকিছুর অর্থ দেয়, তবে মাত্রায় ভিন্নতা আছে। অনুরূপ 'আবয়াছ' বা সাদা শব্দটি, তা হাতির দাঁতের শুভ্রতাকেও বুঝায় আবার বরফের শুভ্রতাকেও বুঝায়। ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, একই শব্দকে কখনও মুশতারাক বলা যায়, আবার কখনো মুতাওয়াত্বি'ও বলা যায়। তা নির্ভর করবে অর্থের কোন অংশটুকু উদ্দেশ্য করে ব্যবহার করা হয়েছে সেটার ওপর। যেমন, 'দাব্বাহ'। যমীনের উপর হাল্কা যারাই চলে এমন সবকিছুকে শামিল করে, সে হিসেবে ঘোড়ার ক্ষেত্রে, গাধার ক্ষেত্রে এটা ব্যবহার করা মুতাওয়াত্বি'। কিন্তু দাব্বাহ এর বিশেষ অর্থ হচ্ছে ঘোড়া। তখন 'দাব্বাহ' শব্দটি ঘোড়া ও অন্যান্য প্রাণীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে 'মুশতারাক' হয়ে যাবে।
১০০২. এখানকার অধিকাংশ কথার সংক্ষিপ্ত উদ্দেশ্য এটা বলা যে, আল্লাহর নাম, তাঁর গুণ আর আল্লাহর সৃষ্টির নাম ও তাদের গুণাবলির মাঝে কিছু অংশে মিল থাকতেই পারে, আর এটুকু মিলের অস্তিত্ব না থাকলে মানুষে কখনো আল্লাহর সম্বোধনই বুঝতে সক্ষম হতো না। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/৭৬- ৭৭, ১৮৮-১৯১), (৫/২০৪-২১২, ৩২৮-৩৩১), (৯/১৪৫-১৪৭), (২০/৪২৩-৪৩১); নাক্বদ্ভুত তা'সীস (২/৩৭৮-৩৮২)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00