📄 যারা কোনো গোত্রের পক্ষে অন্ধ গোঁড়ামী করে, কিন্তু তাদের কাছে যে হকটুকু পাওয়া যায় তা গ্রহণ করে না, তারা ইয়াহুদীদের সাথে তুলনীয়
বস্তুত যে কেউ সুনির্দিষ্ট দল ছাড়া অন্য কারও কাছ থেকে সত্য গ্রহণ করে না, অতঃপর সে দলে সত্যের কোনো অংশ থাকলে তাও গ্রহণ করে না, তার মধ্যে তো ইয়াহুদীদের সাথে সাদৃশ্যতা রয়েছে, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন: ﴿وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ آمِنُوا بِمَا أَنزَلَ اللهُ قَالُوا نُؤْمِنُ بِمَا أُنزِلَ عَلَيْنَا وَيَكْفُرُونَ بِمَا وَرَاءَهُ، وَهُوَ الْحَقُّ مُصَدِّقًا لِّمَا مَعَهُمْ قُلْ فَلِمَ تَقْتُلُونَ أَنْبِيَاءَ اللهِ مِن قَبْلُ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ ﴾ [البقرة: ٩١] “আর যখন তাদেরকে বলা হয়, ‘আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তাতে ঈমান আনো’, তারা বলে, ‘আমাদের প্রতি যা নাযিল হয়েছে আমরা কেবল তাতে ঈমান আনি’। অথচ এর বাইরে যা কিছু আছে সবকিছুই তারা অস্বীকার করে, যদিও তা সত্য এবং তাদের নিকট যা আছে তার সত্যায়নকারী। বলুন, ‘যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাক, তবে কেন তোমরা অতীতে আল্লাহর নবীদেরকে হত্যা করেছিলে?” [সূরা আল-বাকারাহ: ৯১]
কারণ ইয়াহুদীরা বলেছিল, আমাদের কাছে যা নাযিল হয়েছে কেবল তার ওপরই ঈমান আনব, তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে বললেন, قُلْ فَلِمَ تَقْتُلُونَ أَنْبِيَاءَ اللَّهِ مِن قَبْلُ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ) [البقرة: ۹۱] “বলুন, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাক, তবে কেন তোমরা অতীতে আল্লাহর নবীদেরকে হত্যা করেছিলে?” [সূরা আল-বাকারাহ: ৯১] অর্থাৎ যদি তোমরা তোমাদের প্রতি নাযিলকৃত বিধানের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাক (তবে কেন তোমাদের নবীদের হত্যা করেছ?)। বরং তোমরা তোমাদের নবীগণ যা নিয়ে এসেছেন তারও অনুসরণ করো না, আর না তোমরা অন্য নবীগণ যা নিয়ে এসেছেন সেটার অনুসরণ কর। তোমরা কেবল তোমাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে থাক। মূলত এটাই হচ্ছে তার অবস্থা যে সত্যকে অনুসরণ করে না, নিজের দলের থেকেও না, অন্যের থেকেও না। অথচ সে নিজের দলের পক্ষে গোঁড়ামী করে, যে গোঁড়ামীর পিছনে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো প্রমাণও নেই, বর্ণনাও নেই।
টিকাঃ
৯৬৯. মনে হচ্ছে শাইখুল ইসলাম পরবর্তী কোনো কোনো আশ‘আরী ও মাতুরিদীদের দিকে ইঙ্গিত করছেন, যারা তাদের মতাদর্শের জন্য প্রচণ্ড রকমের গোঁড়ামী করে। তারা তাদের মত থেকে এক বিন্দুও নড়তে নারাজ। যদিও তাদের সেসব মতাদর্শের অনেকগুলো তাদেরই পূর্বতন আলেমগণের আদর্শ বিরোধী প্রমাণিত হয়। যেমনটি আমরা দেখতে পাই, পরবর্তী আশ‘আরী মতবাদের লোকদের নিকট তারা তাদের পূর্ববর্তী বড় ইমামগণ যেমন ইমাম আবুল হাসান আল-আশ‘আরী ও ইমাম আবু বকর আল-বাকেল্লানীর কথারও বিরোধিত করে থাকে। কারণ ইমাম আবুল হাসান আল-আশ‘আরী ও ইমাম আল-বাকেল্লানী আল্লাহর জন্য সিফাতে খবারিয়্যাহ সাব্যস্ত করতেন। যেমনটি আমরা ইতোপূর্বে আলোচনায় দেখেছি তারা আল্লাহর সত্তাগত গুণ চেহারা হাত, পা, চোখ সাব্যস্ত করতেন। আর তারা আল্লাহর ‘আরশের উপর উঠাকেও সাব্যস্ত করেছেন এবং সেটার পক্ষে দলীল প্রদান করেছেন। ইবন তাইময়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ অন্যত্র বলেন, আর এ রকম সমস্যায় অনেক ইলম ও দীনের দিকে সম্পর্কিত বিশেষ কিছু গোষ্ঠীকেও নিপতিত হতে দেখা যায়। তাদের মধ্যে রয়েছেন অনেক ফকীহ, বহু সূফী ও অন্যান্য লোকেরা। অনুরূপ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত বিশেষ কোনো দীনের সম্মানিত নেতার অনুসারীদের মাঝেও এমনটি দেখা যায়, তারা দীনের ফিকহের জ্ঞান কিংবা হাদীসের জ্ঞানের কিছুই গ্রহণ করে না, যতক্ষণ না তা তাদের তথাকথিত দীনী নেতা ও তার গোষ্ঠীর অনুসারীদের মাধ্যম হয়ে না আসে। অথচ দীনে ইসলাম তাদের ওপর আবশ্যক করে দিয়েছে হক্কের অনুসরণ করতে নিঃশর্তভাবে।’ দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, ইকতিদ্বাউস সিরাতিল মুস্তাকীম (১/৭৩)। তারপর ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ কখনও কখনও কেন তিনি কালামশাস্ত্রবিদদের বক্তব্য নিয়ে এসে সেখান থেকে হকের কথা ব্যক্ত করেন তার কারণ বর্ণনা করে বলেন, ‘আমি সেসব বিবেকের যুক্তির প্রধান্যদানকারী গোষ্ঠীর নেতাদের সেসব বক্তব্য পেশ করি, যা হক্ককে প্রকাশ করবে। এটা এজন্য নয় যে হক্ক বুঝা ও জানার জন্য আমরা তাদের মুখাপেক্ষী, কিন্তু এজন্য যে, (১) বিভিন্ন গোষ্ঠীর নেতারাও এসব বিষয় যে বাতিল ও নষ্ট তার স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। যেসব বিষয়কে সেসব নেতাদের অনুসারীরা অকাট্য বলে ধরে নিয়েছে অথচ তা শরী‘আত বিরোধী। আর এ জন্য যে, (২) যখন মানুষের মন এটা জানতে পারে যে এ কথাটি বিরোধী দলের ইমামগণও বলেছেন তখন সেটা তার অন্তরে রেখাপাত করে, সে তা গ্রহণ করার জন্য প্রশান্তি পায় ও ঘনিষ্ঠতা অনুভব করে। আর এ এজন্য যে, (৩) এর মাধ্যমে প্রকাশ পাবে যে, এ মাসআলাটিতে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মাঝে মতভেদ রয়েছে, তখন অন্ধ অনুসরণ ও অনুকরণের গ্রন্থি খুলে যাবে ও বাড়াবাড়ি করে ভুলের ওপর অবস্থান করা পরিত্যাগ করবে।’ ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা‘আরুদ্বিল আক্বলি ওয়ান নাকলি (১/৩৭৭)।
📄 ইমামুল হারামাইন যা যা এখানে বলেছে সেসব আহলুস সুরাতের কথা নয়
আমি [ইবন তাইমিয়্যাহ] বলি: প্রশ্নকারীর জানা উচিত যে, [ইমামুল হারামাইন আবুল মা‘আলী আল-জুওয়াইনী ও তার মতো লোকদের থেকে উদ্ধৃত] এই জবাবা [এখানে উল্লেখ করা দ্বারা] উদ্দেশ্য ঐসব আলেমদের কতিপয় বক্তব্য উল্লেখ করা, যারা এ অধ্যায়ে সালাফে সালেহীনের মত সংকলন করেছেন। (১৮০) আর আমরা কালামপন্থী ও অন্যান্যদের যে কথাগুলো এখানে উদ্ধৃত করেছি, এ অধ্যায় ও অন্যান্য অধ্যায়ে আমরা যা যা বলি তারা সেসব বলেনি। (১৮১) তবে সত্য যেই বলুক তার থেকে গ্রহণ করা যাবে। (১৮২) মু‘আয ইবন জাবাল রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু তার সে বিখ্যাত বক্তব্যে বলতেন, যেটি আবু দাউদে তার সুনানে নিয়ে এসেছেন,
اقبلوا الحق من كل من جاء به؛ وإن كان كافرا - أو قال فاجرا - واحذروا زيغة الحكيم. قالوا: كيف نعلم أن الكافر يقول الحق ؟ قال : إن على الحق نورا
“সত্য যেই নিয়ে আসুক তা গ্রহণ করো। যদিও সে কাফের হয়” বা তিনি বলেছেন “পাপি হয়” আর বিজ্ঞের পদস্খলন থেকে সতর্ক থাকো। তারা বলল: আমরা কীভাবে জানবো যে, কাফের সত্য বলেছে? তিনি বললেন: নিশ্চয় সত্যের ওপর নূর আছে।”১৮৩) অথবা এ ধরনের কথা, যার অর্থ এমন।
টিকাঃ
৯৮০. এখানে দু’টি বিষয় বলা আবশ্যক তা হচ্ছে, এক. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ কর্তৃক একদল সূফী ও কালামশাস্ত্রবিদদের বক্তব্য উল্লেখ করার অর্থ এটা নয় যে, সালাফে সালেহীনের ইমামগণ তথা সাহাবা, তাবেয়ীন ও তাদের পরে যারা তাদের মত হক্কের ওপর ছিল তাদের এ ব্যাপারে কোনো বক্তব্য নেই। বরং হক হচ্ছে সেটাই যার ওপর সালাফগণ অবস্থান করেছিলেন। ইবন তাইমিয়্যাহ এখানে যে মাসআলার অবতারণাই করেছেন তাতে সালাফে সালেহীনের নিকট থেকে বহুগুণ বেশি প্রকাশ্য বর্ণনা ও দলীল রয়েছে। কিন্তু ইবন তাইমিয়্যাহ’র উদ্দেশ্য হচ্ছে, অনুসারীদেরকে তাদের ইমামরা হক্কের যে অংশের ওপর ছিল তা জানিয়ে দিয়ে সেটা মানতে বাধ্য করা। দুই. এসব তর্কবাগীশ, শাইখ, উস্তাদ প্রমুখ লোকদের থেকে এখানে যেসব বক্তব্যের মাধ্যমে দলীল- প্রমাণাদি নিয়ে আসা হয়েছে, কুরআন ও সুন্নাহ’য় সেসবের আরও অনেক এমনসব দলীল ও প্রমাণ রয়েছে যা তাদের বক্তব্য থেকে বড় ও সুন্দর। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এ বিষয়টির তাগিদ দিয়ে বলেন, ‘কুরআনে কারীমে দীনের এমনসব মূলনীতির বর্ণনা রয়েছে যার ভূমিকাসমূহ স্পষ্ট বিবেকের যুক্তির মাধ্যমে জানা যায়, যা কোনো মানুষের কথায় পাওয়া যায় না। বরং অত্যন্ত দক্ষ তর্কবাগীশরা যেসব বিবেকের যুক্তির দলীল নিয়ে আসে কুরআন সেগুলোর সারাংশ সমৃদ্ধ বরং সেগুলো থেকে আরও সুন্দর। দলীল প্রমাণে ঋদ্ধ। মহান আল্লাহ বলেন, “আর তারা আপনার কাছে যে বিষয়ই উপস্থিত করে না কেন, আমরা সেটার সঠিক সমাধান ও সুন্দর ব্যাখ্যা আপনার কাছে নিয়ে আসি।” [সূরা আল-ফুরক্বান ৩৩] আরও বলেন, “আর অবশ্যই আমরা মানুষের জন্য এ কুরআনে সব ধরনের দৃষ্টান্ত দিয়েছি। আর আপনি যদি তাদের কাছে কোন নিদর্শন উপস্থিত করেন, তবে যারা কুফরী করেছে তারা অবশ্যই বলবে, ‘তোমরা তো বাতিলপন্থী’।” [সূরা আর-রূম: ৫৮] আরও বলেন, “যদি আমরা এ কুরআন পর্বতের উপর নাযিল করতাম তবে আপনি তাকে আল্লাহর ভয়ে বিনীত বিদীর্ণ দেখতেন। আর আমরা এসব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য, যাতে তারা চিন্তা করে।” [সূরা আল-হাশর: ২১] মাজমু‘ ফাতাওয়া (১২/৮১); আরও দেখুন, মাজমূ‘ ফাতাওয়া (১৯/১৬৯)। তিনি অন্যত্র বলেন, বিবেকের যুক্তিবিদ দাবিদারদের কাছে আল্লাহর বিষয়ে যেসব দৃঢ় প্রমাণাদি ও জ্ঞান রয়েছে তার সারাংশ অবশ্যই কুরআন ও সুন্নাহ’য় রয়েছে। এর বাইরে কুরআন ও সুন্নাহ’য় এ ব্যাপারে বাড়তি ও পূর্ণতা প্রদানকারী বহু প্রমাণাদি রয়েছে যার দিশা সেসব লোকেরা পায়নি, কেবল তারাই পেয়েছে যাদেরকে তিনি তাঁর সম্বোধন গ্রহণ করার মাধ্যমে হিদায়াত প্রদান করে ধন্য করেছেন। ফলে রাসূল যেসব যুক্তিগত দলীল ও দৃঢ় জ্ঞান নিয়ে এসেছেন তা আগের ও পরের সকল বুদ্ধিজীবীদের সকল বুদ্ধির উপরে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছিল।’ ইবন তাইমিয়্যাহ, মিনহাজুস সুন্নাহ (২/১১০)।
৯৮১. আল্লামা মুহাম্মাদ ইবন ইবরাহীম আলুশ শাইখ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “এর অর্থ হচ্ছে, ইবনে তাইমিয়্যাহ তাদের থেকে তাদের কিছু আকীদাহ বর্ণনা করেছেন মাত্র, এর অর্থ এটা নয় যে, তাদের প্রত্যেকেই এসব অধ্যায়ে পুরোপুরি সঠিক পথে ছিলেন।” [ফাতাওয়া শাইখ মুহাম্মাদ ইবন ইবরাহীম (১/২১১)] বস্তুত এ ফতোয়ার মাধ্যমে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এর পাণ্ডিত্য ও যোগ্যতা প্রকাশ পেয়েছে, যার কারণে তার গ্রন্থসমূহ সবচেয়ে বেশি উপকারী ও মর্যাদাপূর্ণ প্রমাণিত হয়েছে। যেমনটি তিনি নিজেই বলেছিলেন, ‘যদি কারও ইলম থাকে আর তার সাথে উত্তম বিতর্ক যুক্ত হয় তবে সেটার মাধ্যমে আল্লাহ তাকে উঁচু স্তরে উড্ডীন করেন।’ ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/৪৯২)।
এখানেও শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহর জন্য উলু ও ইস্তেওয়া তথা সর্বোচ্চ সত্তা হওয়া ও তাঁর ‘আরশের উপর উঠা এ গুণ দু’টির ব্যাপারে এবং সিফাতে খাবারিয়্যাহ (কুরআন ও সুন্নাহ’য় আসা আল্লাহর যাবতীয় গুণ) এর ব্যাপারে কালামশাস্ত্রবিদদের পূর্ববর্তী ও তাদের মতো লোকদের বক্তব্য নিয়ে এসেছেন আর এগুলো দিয়ে তাদের পরবর্তীদের বিরুদ্ধে প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করেছেন যে, তোমাদের পূর্ববর্তীরা তা মানতো, তোমাদেরও তা মানা উচিত। তবে তিনি সে সব পূর্ববর্তীদের বক্তব্যের বিস্তারিত অংশের সমালোচনা করা থেকে বিরত ছিলেন। কিন্তু একেবারে পুরোপুরি চুপ থাকেননি। বরং বলেছেন, ‘কালামশাস্ত্রবিদরা যা যা বলেছে সেগুলো আমরা এখানে উল্লেখ করলেও আমাদের সব কথা তারা বলেনি’। কারণ পুরোপুরি তাদের সব কথার সমালোচনা করতে নামলে তাদের কথা দিয়ে দলীল নিয়ে তাদেরই আরেক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পেশ করার কাজটি ব্যাহত হতো; প্রমাণটি দুর্বল হয়ে যেতো। এর বিপরীতে ইবন তাইময়্যাহ তার একাধিক কিতাবে পরবর্তী কালামশাস্ত্রবিদ যেমন, রাযী, আমেদী প্রমুখের বক্তব্য তুলে ধরেছেন যাতে তারা তাদের পূর্ববর্তীদের কথার সমালোচনা করেছেন; যার মাধ্যমে পরবর্তীরা আল্লাহর সিফাতে ইখতিয়ারিয়্যাহ বা যখন যা ইচ্ছা করার গুণগুলো অস্বীকার করেছিল। দেখুন, মাজমু‘ ফাতাওয়া (৬/২৪); দারউত তা‘আরুদ্ব (২/২১০); আব্দুররহমান আলে মাহমূদ, মাওকিফু ইবন তাইমিয়্যাহ মিনাল আশা’য়িরাহ (৩/১২১১)।
৯৮২. কিছু আগেই আমরা শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ’র বক্তব্য এনেছি, যাতে তিনি পরবর্তী আশ‘আরী মতবাদের লোকদের ওপর দোষারোপ করেছেন যে, তারা তাদের ইমামদের থেকে হক্ক কথা হলেও তা গ্রহণ করে না, অন্য কারও কাছ থেকে হক তাদের জানানো হলে তা তো গ্রহণ করেই না। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এ ব্যাপারে তাদের এ কাজকে ইয়াহূদীর কর্মকাণ্ডের সাথে তুলনা করেছেন; কারণ ইয়াহূদীরাও তাদের কিতাব থেকে হক্ক গ্রহণ করে না, অন্যদের কিতাব থেকে তো গ্রহণই করে না।
৯৮৩. এ আছারটি সুনান আবী দাউদে এসেছে (৫/১৭-১৮), হাদীস নং ৪৬১১। কিতাবুস সুন্নাহ, বাবু লুযূমিস সুন্নাহ। হাদীসটিকে শাইখ আবু আব্দুর রহমান মুহাম্মাদ নাসেরুদ্দীন আল-আলবানী মাওকুফ সহীহ বলেছেন। এর বিস্তারিত বিবরণ হচ্ছে, ইবন শিহাব আয-যুহরী বলেন, আবু ইদরীস ‘আয়েয উল্লাহ আল- খাওলানী বলেন, ইয়াযীদ ইবন উমাইরাহ, যিনি মু‘আয ইবন জাবাল রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুর ছাত্র ছিলেন। তিনি বলেন, মু‘আয রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু যখনই কোনো ইলমী মজলিসে বসতেন তখনই বসার সময় বলতেন, আল্লাহ, তিনি মহান বিচারক, ইনসাফকারী, সন্দেহকারীদের ধ্বংস হোক। অতঃপর একদিন মু‘আয ইবন জাবাল রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন, ‘তোমাদের সামনের দিনগুলোতে ফিতনার অভ্যুদয় হবে, আর তাতে সম্পদ অনেক বেশি হবে। আর কুরআনও সর্বত্র প্রচারিত ও প্রসারিত হবে, তখন তা মুমিন-মুনাফিক, পুরুষ-মহিলা, ছোট-বড়, দাস-স্বাধীন সবাই গ্রহণ করবে। তখন কোনো বক্তা অচিরেই বলে বসবে, মানুষের কী হলো, মানুষ তো আমার অনুসরণ করছে না, অথচ আমি কুরআন পাঠ করেছি? মানুষ তো আমার অনুসরণ করবে বলে মনে হচ্ছে না, যতক্ষণ না আমি তাদের জন্য এর বাইরে কিছু বিদ‘আতের প্রচলন না ঘটাব। তখন তোমরা সাবধান থাকবে সে যারা বিদ‘আত চালু করবে তাদের সম্পর্কে জানা আবশ্যক। কারণ, যে বিদ‘আত চালু করবে, সে পথভ্রষ্ট হবে। আমি তোমাদেরকে বিজ্ঞ ব্যক্তিদের ভুল পথে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে সাবধান করছি। শয়তান কখনো কখনো বিজ্ঞজনের মুখ থেকে পথভ্রষ্টতার বাক্য বের করে, আবার কখনো মুনাফিকও হক কথা বলে। ইয়াযীদ ইবন উমাইরাহ বলেন, আমি তখন মু‘আয রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুকে বললাম, আল্লাহ আপনার প্রতি রহমত করুন, আমাকে কিসে জানাবে যে প্রাজ্ঞ ব্যক্তিটি পথভ্রষ্টতার কথা বলেছে আর মুনাফিকটি হক্ক কথা বলেছে? তখন তিনি বললেন, অবশ্যই জানতে পারবে, প্রাজ্ঞজনের বিখ্যাত সেসব কথা পরিত্যাগ কর যেগুলো সম্পর্কে বলা হয়, এটা তিনি কী বললেন, তবে তার থেকে এ কারণে তুমি মুখ ফিরিয়ে নিও না; কারণ হতে পারে তিনি ফিরে আসবেন। আর যখন হক্ক কথা শুনবে তখন সেটা গ্রহণ করে নিবে; কারণ হকের উপর নূর বা আলো রয়েছে।
আছারটি আরও যারা যারা সংকলন করেছেন, ১- হাকেম তার মুস্তাদরাকে সংকলন করেছেন (৪/৪৬৬); আর বলেছেন, বুখারী ও মুসলিমের শর্তে, যদিও তারা এটিকে সংকলন করেননি। ইমাম যাহাবী এ বিষয়ে হাকেম এর সাথে ঐকমত্য পোষণ করেন। ২- ইবন আবী শাইবাহ, আল-মুসান্নাফ (১১/৩৬৩-৩৬৪), নং ২০৭৫০। ৩- আজুররী, আশ-শরী‘আহ, পৃ. ৪৭-৪৮। ৪- লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই‘তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা‘আহ (১/৮৮-৮৯), নং ১১৬। ৫- আবু নু‘আইম আল-হিলইয়া (১/২৩২-২৩৩)। ৬- ইবন বাত্তাহ, আল-ইবানাহ (১/৩০৭-৩০৮)। ৭- আল-ফাসাওয়ী, আল-মা‘রিফাতু ওয়াত-তারীখ (২/৩২১-৩২২)। ৮- বাইহাক্বী, আল-মাদখালু ইলাস সুনানিল কুবরা, পৃ. ৪৪৪, নং ৮৩৪। ৯- ফিরইয়াবী, সিফাতুন নিফাক্ব ও যাম্মুল মুনাফিক্বীন, পৃ. ৮১-৮২, নং ৩৯। ১০- মা‘মার ইবন রাশেদ, আল-জামে‘উ (১১/৩৬৩), নং ২০৭৫০। ১১- ইবন মান্দাহ, আত-তাওহীদ (২/১১০)। ১২- আবু নু‘আইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া (১/২৩৩)। ১৩- বাইহাকী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (১/২০০), নং ১৩৫। ১৪- বাইহাক্বী, আস-সুনানুল কুবরা (১০/৩৫৫), নং ২০৯১৬। ১৫- বাইহাক্বী, শু‘আবুল ঈমান (১১/৩১২), নং ৮৫৮১। ১৬- ইবন আব্দিল বার, জামে‘উ বায়ানিল ইলমি ওয়াফাদ্বলিহী (২/৯৮১), নং ১৮৭১। ১৭- ইমাম ত্বাহাওয়ী, শারহু মুশকিলুল আছার (১০/৩৮), নং ৩৮৯৫।
আমি [ইবন তাইমিয়্যাহ] বলি: প্রশ্নকারীর জানা উচিত যে, [ইমামুল হারামাইন আবুল মা‘আলী আল-জুওয়াইনী ও তার মতো লোকদের থেকে উদ্ধৃত] এই জবাবা [এখানে উল্লেখ করা দ্বারা] উদ্দেশ্য ঐসব আলেমদের কতিপয় বক্তব্য উল্লেখ করা, যারা এ অধ্যায়ে সালাফে সালেহীনের মত সংকলন করেছেন। (১৮০) আর আমরা কালামপন্থী ও অন্যান্যদের যে কথাগুলো এখানে উদ্ধৃত করেছি, এ অধ্যায় ও অন্যান্য অধ্যায়ে আমরা যা যা বলি তারা সেসব বলেনি। (১৮১) তবে সত্য যেই বলুক তার থেকে গ্রহণ করা যাবে। (১৮২) মু‘আয ইবন জাবাল রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু তার সে বিখ্যাত বক্তব্যে বলতেন, যেটি আবু দাউদে তার সুনানে নিয়ে এসেছেন,
اقبلوا الحق من كل من جاء به؛ وإن كان كافرا - أو قال فاجرا - واحذروا زيغة الحكيم. قالوا: كيف نعلم أن الكافر يقول الحق ؟ قال : إن على الحق نورا
“সত্য যেই নিয়ে আসুক তা গ্রহণ করো। যদিও সে কাফের হয়” বা তিনি বলেছেন “পাপি হয়” আর বিজ্ঞের পদস্খলন থেকে সতর্ক থাকো। তারা বলল: আমরা কীভাবে জানবো যে, কাফের সত্য বলেছে? তিনি বললেন: নিশ্চয় সত্যের ওপর নূর আছে।”১৮৩) অথবা এ ধরনের কথা, যার অর্থ এমন।
টিকাঃ
৯৮০. এখানে দু’টি বিষয় বলা আবশ্যক তা হচ্ছে, এক. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ কর্তৃক একদল সূফী ও কালামশাস্ত্রবিদদের বক্তব্য উল্লেখ করার অর্থ এটা নয় যে, সালাফে সালেহীনের ইমামগণ তথা সাহাবা, তাবেয়ীন ও তাদের পরে যারা তাদের মত হক্কের ওপর ছিল তাদের এ ব্যাপারে কোনো বক্তব্য নেই। বরং হক হচ্ছে সেটাই যার ওপর সালাফগণ অবস্থান করেছিলেন। ইবন তাইমিয়্যাহ এখানে যে মাসআলার অবতারণাই করেছেন তাতে সালাফে সালেহীনের নিকট থেকে বহুগুণ বেশি প্রকাশ্য বর্ণনা ও দলীল রয়েছে। কিন্তু ইবন তাইমিয়্যাহ’র উদ্দেশ্য হচ্ছে, অনুসারীদেরকে তাদের ইমামরা হক্কের যে অংশের ওপর ছিল তা জানিয়ে দিয়ে সেটা মানতে বাধ্য করা। দুই. এসব তর্কবাগীশ, শাইখ, উস্তাদ প্রমুখ লোকদের থেকে এখানে যেসব বক্তব্যের মাধ্যমে দলীল- প্রমাণাদি নিয়ে আসা হয়েছে, কুরআন ও সুন্নাহ’য় সেসবের আরও অনেক এমনসব দলীল ও প্রমাণ রয়েছে যা তাদের বক্তব্য থেকে বড় ও সুন্দর। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এ বিষয়টির তাগিদ দিয়ে বলেন, ‘কুরআনে কারীমে দীনের এমনসব মূলনীতির বর্ণনা রয়েছে যার ভূমিকাসমূহ স্পষ্ট বিবেকের যুক্তির মাধ্যমে জানা যায়, যা কোনো মানুষের কথায় পাওয়া যায় না। বরং অত্যন্ত দক্ষ তর্কবাগীশরা যেসব বিবেকের যুক্তির দলীল নিয়ে আসে কুরআন সেগুলোর সারাংশ সমৃদ্ধ বরং সেগুলো থেকে আরও সুন্দর। দলীল প্রমাণে ঋদ্ধ। মহান আল্লাহ বলেন, “আর তারা আপনার কাছে যে বিষয়ই উপস্থিত করে না কেন, আমরা সেটার সঠিক সমাধান ও সুন্দর ব্যাখ্যা আপনার কাছে নিয়ে আসি।” [সূরা আল-ফুরক্বান ৩৩] আরও বলেন, “আর অবশ্যই আমরা মানুষের জন্য এ কুরআনে সব ধরনের দৃষ্টান্ত দিয়েছি। আর আপনি যদি তাদের কাছে কোন নিদর্শন উপস্থিত করেন, তবে যারা কুফরী করেছে তারা অবশ্যই বলবে, ‘তোমরা তো বাতিলপন্থী’।” [সূরা আর-রূম: ৫৮] আরও বলেন, “যদি আমরা এ কুরআন পর্বতের উপর নাযিল করতাম তবে আপনি তাকে আল্লাহর ভয়ে বিনীত বিদীর্ণ দেখতেন। আর আমরা এসব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য, যাতে তারা চিন্তা করে।” [সূরা আল-হাশর: ২১] মাজমু‘ ফাতাওয়া (১২/৮১); আরও দেখুন, মাজমূ‘ ফাতাওয়া (১৯/১৬৯)। তিনি অন্যত্র বলেন, বিবেকের যুক্তিবিদ দাবিদারদের কাছে আল্লাহর বিষয়ে যেসব দৃঢ় প্রমাণাদি ও জ্ঞান রয়েছে তার সারাংশ অবশ্যই কুরআন ও সুন্নাহ’য় রয়েছে। এর বাইরে কুরআন ও সুন্নাহ’য় এ ব্যাপারে বাড়তি ও পূর্ণতা প্রদানকারী বহু প্রমাণাদি রয়েছে যার দিশা সেসব লোকেরা পায়নি, কেবল তারাই পেয়েছে যাদেরকে তিনি তাঁর সম্বোধন গ্রহণ করার মাধ্যমে হিদায়াত প্রদান করে ধন্য করেছেন। ফলে রাসূল যেসব যুক্তিগত দলীল ও দৃঢ় জ্ঞান নিয়ে এসেছেন তা আগের ও পরের সকল বুদ্ধিজীবীদের সকল বুদ্ধির উপরে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছিল।’ ইবন তাইমিয়্যাহ, মিনহাজুস সুন্নাহ (২/১১০)।
৯৮১. আল্লামা মুহাম্মাদ ইবন ইবরাহীম আলুশ শাইখ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “এর অর্থ হচ্ছে, ইবনে তাইমিয়্যাহ তাদের থেকে তাদের কিছু আকীদাহ বর্ণনা করেছেন মাত্র, এর অর্থ এটা নয় যে, তাদের প্রত্যেকেই এসব অধ্যায়ে পুরোপুরি সঠিক পথে ছিলেন।” [ফাতাওয়া শাইখ মুহাম্মাদ ইবন ইবরাহীম (১/২১১)] বস্তুত এ ফতোয়ার মাধ্যমে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এর পাণ্ডিত্য ও যোগ্যতা প্রকাশ পেয়েছে, যার কারণে তার গ্রন্থসমূহ সবচেয়ে বেশি উপকারী ও মর্যাদাপূর্ণ প্রমাণিত হয়েছে। যেমনটি তিনি নিজেই বলেছিলেন, ‘যদি কারও ইলম থাকে আর তার সাথে উত্তম বিতর্ক যুক্ত হয় তবে সেটার মাধ্যমে আল্লাহ তাকে উঁচু স্তরে উড্ডীন করেন।’ ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/৪৯২)।
এখানেও শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহর জন্য উলু ও ইস্তেওয়া তথা সর্বোচ্চ সত্তা হওয়া ও তাঁর ‘আরশের উপর উঠা এ গুণ দু’টির ব্যাপারে এবং সিফাতে খাবারিয়্যাহ (কুরআন ও সুন্নাহ’য় আসা আল্লাহর যাবতীয় গুণ) এর ব্যাপারে কালামশাস্ত্রবিদদের পূর্ববর্তী ও তাদের মতো লোকদের বক্তব্য নিয়ে এসেছেন আর এগুলো দিয়ে তাদের পরবর্তীদের বিরুদ্ধে প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করেছেন যে, তোমাদের পূর্ববর্তীরা তা মানতো, তোমাদেরও তা মানা উচিত। তবে তিনি সে সব পূর্ববর্তীদের বক্তব্যের বিস্তারিত অংশের সমালোচনা করা থেকে বিরত ছিলেন। কিন্তু একেবারে পুরোপুরি চুপ থাকেননি। বরং বলেছেন, ‘কালামশাস্ত্রবিদরা যা যা বলেছে সেগুলো আমরা এখানে উল্লেখ করলেও আমাদের সব কথা তারা বলেনি’। কারণ পুরোপুরি তাদের সব কথার সমালোচনা করতে নামলে তাদের কথা দিয়ে দলীল নিয়ে তাদেরই আরেক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পেশ করার কাজটি ব্যাহত হতো; প্রমাণটি দুর্বল হয়ে যেতো। এর বিপরীতে ইবন তাইময়্যাহ তার একাধিক কিতাবে পরবর্তী কালামশাস্ত্রবিদ যেমন, রাযী, আমেদী প্রমুখের বক্তব্য তুলে ধরেছেন যাতে তারা তাদের পূর্ববর্তীদের কথার সমালোচনা করেছেন; যার মাধ্যমে পরবর্তীরা আল্লাহর সিফাতে ইখতিয়ারিয়্যাহ বা যখন যা ইচ্ছা করার গুণগুলো অস্বীকার করেছিল। দেখুন, মাজমু‘ ফাতাওয়া (৬/২৪); দারউত তা‘আরুদ্ব (২/২১০); আব্দুররহমান আলে মাহমূদ, মাওকিফু ইবন তাইমিয়্যাহ মিনাল আশা’য়িরাহ (৩/১২১১)।
৯৮২. কিছু আগেই আমরা শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ’র বক্তব্য এনেছি, যাতে তিনি পরবর্তী আশ‘আরী মতবাদের লোকদের ওপর দোষারোপ করেছেন যে, তারা তাদের ইমামদের থেকে হক্ক কথা হলেও তা গ্রহণ করে না, অন্য কারও কাছ থেকে হক তাদের জানানো হলে তা তো গ্রহণ করেই না। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এ ব্যাপারে তাদের এ কাজকে ইয়াহূদীর কর্মকাণ্ডের সাথে তুলনা করেছেন; কারণ ইয়াহূদীরাও তাদের কিতাব থেকে হক্ক গ্রহণ করে না, অন্যদের কিতাব থেকে তো গ্রহণই করে না।
৯৮৩. এ আছারটি সুনান আবী দাউদে এসেছে (৫/১৭-১৮), হাদীস নং ৪৬১১। কিতাবুস সুন্নাহ, বাবু লুযূমিস সুন্নাহ। হাদীসটিকে শাইখ আবু আব্দুর রহমান মুহাম্মাদ নাসেরুদ্দীন আল-আলবানী মাওকুফ সহীহ বলেছেন। এর বিস্তারিত বিবরণ হচ্ছে, ইবন শিহাব আয-যুহরী বলেন, আবু ইদরীস ‘আয়েয উল্লাহ আল- খাওলানী বলেন, ইয়াযীদ ইবন উমাইরাহ, যিনি মু‘আয ইবন জাবাল রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুর ছাত্র ছিলেন। তিনি বলেন, মু‘আয রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু যখনই কোনো ইলমী মজলিসে বসতেন তখনই বসার সময় বলতেন, আল্লাহ, তিনি মহান বিচারক, ইনসাফকারী, সন্দেহকারীদের ধ্বংস হোক। অতঃপর একদিন মু‘আয ইবন জাবাল রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন, ‘তোমাদের সামনের দিনগুলোতে ফিতনার অভ্যুদয় হবে, আর তাতে সম্পদ অনেক বেশি হবে। আর কুরআনও সর্বত্র প্রচারিত ও প্রসারিত হবে, তখন তা মুমিন-মুনাফিক, পুরুষ-মহিলা, ছোট-বড়, দাস-স্বাধীন সবাই গ্রহণ করবে। তখন কোনো বক্তা অচিরেই বলে বসবে, মানুষের কী হলো, মানুষ তো আমার অনুসরণ করছে না, অথচ আমি কুরআন পাঠ করেছি? মানুষ তো আমার অনুসরণ করবে বলে মনে হচ্ছে না, যতক্ষণ না আমি তাদের জন্য এর বাইরে কিছু বিদ‘আতের প্রচলন না ঘটাব। তখন তোমরা সাবধান থাকবে সে যারা বিদ‘আত চালু করবে তাদের সম্পর্কে জানা আবশ্যক। কারণ, যে বিদ‘আত চালু করবে, সে পথভ্রষ্ট হবে। আমি তোমাদেরকে বিজ্ঞ ব্যক্তিদের ভুল পথে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে সাবধান করছি। শয়তান কখনো কখনো বিজ্ঞজনের মুখ থেকে পথভ্রষ্টতার বাক্য বের করে, আবার কখনো মুনাফিকও হক কথা বলে। ইয়াযীদ ইবন উমাইরাহ বলেন, আমি তখন মু‘আয রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুকে বললাম, আল্লাহ আপনার প্রতি রহমত করুন, আমাকে কিসে জানাবে যে প্রাজ্ঞ ব্যক্তিটি পথভ্রষ্টতার কথা বলেছে আর মুনাফিকটি হক্ক কথা বলেছে? তখন তিনি বললেন, অবশ্যই জানতে পারবে, প্রাজ্ঞজনের বিখ্যাত সেসব কথা পরিত্যাগ কর যেগুলো সম্পর্কে বলা হয়, এটা তিনি কী বললেন, তবে তার থেকে এ কারণে তুমি মুখ ফিরিয়ে নিও না; কারণ হতে পারে তিনি ফিরে আসবেন। আর যখন হক্ক কথা শুনবে তখন সেটা গ্রহণ করে নিবে; কারণ হকের উপর নূর বা আলো রয়েছে।
আছারটি আরও যারা যারা সংকলন করেছেন, ১- হাকেম তার মুস্তাদরাকে সংকলন করেছেন (৪/৪৬৬); আর বলেছেন, বুখারী ও মুসলিমের শর্তে, যদিও তারা এটিকে সংকলন করেননি। ইমাম যাহাবী এ বিষয়ে হাকেম এর সাথে ঐকমত্য পোষণ করেন। ২- ইবন আবী শাইবাহ, আল-মুসান্নাফ (১১/৩৬৩-৩৬৪), নং ২০৭৫০। ৩- আজুররী, আশ-শরী‘আহ, পৃ. ৪৭-৪৮। ৪- লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই‘তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা‘আহ (১/৮৮-৮৯), নং ১১৬। ৫- আবু নু‘আইম আল-হিলইয়া (১/২৩২-২৩৩)। ৬- ইবন বাত্তাহ, আল-ইবানাহ (১/৩০৭-৩০৮)। ৭- আল-ফাসাওয়ী, আল-মা‘রিফাতু ওয়াত-তারীখ (২/৩২১-৩২২)। ৮- বাইহাক্বী, আল-মাদখালু ইলাস সুনানিল কুবরা, পৃ. ৪৪৪, নং ৮৩৪। ৯- ফিরইয়াবী, সিফাতুন নিফাক্ব ও যাম্মুল মুনাফিক্বীন, পৃ. ৮১-৮২, নং ৩৯। ১০- মা‘মার ইবন রাশেদ, আল-জামে‘উ (১১/৩৬৩), নং ২০৭৫০। ১১- ইবন মান্দাহ, আত-তাওহীদ (২/১১০)। ১২- আবু নু‘আইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া (১/২৩৩)। ১৩- বাইহাকী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (১/২০০), নং ১৩৫। ১৪- বাইহাক্বী, আস-সুনানুল কুবরা (১০/৩৫৫), নং ২০৯১৬। ১৫- বাইহাক্বী, শু‘আবুল ঈমান (১১/৩১২), নং ৮৫৮১। ১৬- ইবন আব্দিল বার, জামে‘উ বায়ানিল ইলমি ওয়াফাদ্বলিহী (২/৯৮১), নং ১৮৭১। ১৭- ইমাম ত্বাহাওয়ী, শারহু মুশকিলুল আছার (১০/৩৮), নং ৩৮৯৫।
📄 এ সংক্ষিপ্ত ফতোয়া সব রকমের সন্দেহ, মতামত ও সেগুলোর খণ্ডন করার স্থান সংকুলান হবে না
বস্তুতঃ দলিলের মাধ্যমে বিষয়টির সত্যতা প্রমাণ করা, সন্দেহ দূর করা এবং বিষয়টির বিশ্লেষণ করে হৃদয়ঙ্গম করা যাতে বিশ্বাস জন্মে। আর মানুষের বিভিন্ন মতামতের মধ্যে সঠিক মতটি বেছে নেয়া জরুরি। ফতোয়া এগুলোর জন্য যথেষ্ট নয়। তবে ইতিপূর্বে আমি এ বিষয়ে কিছু লিখেছি এবং আমাদের মজলিসে কিছু আলোচনাও করেছি। ইনশাআল্লাহ, ভবিষ্যতে এ ব্যাপারে আমার উদ্দেশ্য সফল হবে।
হয় তেমন লেখা লিখব।
টিকাঃ
৯৮৪. আল্লাহ তা‘আলা ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহর এ আশা বাস্তবায়ন করেছেন, এ ব্যাপারে তিনি একাধিক গ্রন্থে আলোচনা করেছেন, যেমন, ১- জাওয়াবুল ই‘তিরাদ্বাতিল মিসরিয়্যাহ আলাল ফুতইয়া আল-হামাওয়িয়্যাহ। ২- বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ। ইত্যাদি। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/৬-৭)।
বস্তুতঃ দলিলের মাধ্যমে বিষয়টির সত্যতা প্রমাণ করা, সন্দেহ দূর করা এবং বিষয়টির বিশ্লেষণ করে হৃদয়ঙ্গম করা যাতে বিশ্বাস জন্মে। আর মানুষের বিভিন্ন মতামতের মধ্যে সঠিক মতটি বেছে নেয়া জরুরি। ফতোয়া এগুলোর জন্য যথেষ্ট নয়। তবে ইতিপূর্বে আমি এ বিষয়ে কিছু লিখেছি এবং আমাদের মজলিসে কিছু আলোচনাও করেছি। ইনশাআল্লাহ, ভবিষ্যতে এ ব্যাপারে আমার উদ্দেশ্য সফল হবে।
হয় তেমন লেখা লিখব।
টিকাঃ
৯৮৪. আল্লাহ তা‘আলা ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহর এ আশা বাস্তবায়ন করেছেন, এ ব্যাপারে তিনি একাধিক গ্রন্থে আলোচনা করেছেন, যেমন, ১- জাওয়াবুল ই‘তিরাদ্বাতিল মিসরিয়্যাহ আলাল ফুতইয়া আল-হামাওয়িয়্যাহ। ২- বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ। ইত্যাদি। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/৬-৭)।
📄 কুরআন ও সুন্নাহ এ দুটিতেই রয়েছে নূর ও হিদায়াত
এ ব্যাপারে মোটকথা হচ্ছে, নিশ্চয় কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা পূর্ণ হিদায়াত ও নূর অর্জিত হয় তার জন্য যে কুরআন-সুন্নাহ গবেষণা করে, সত্য অনুসরণের সংকল্প করে, কথাকে তার স্থান থেকে বিকৃত করা থেকে ফিরে থাকে(১৮৫), আল্লাহর নাম ও তাঁর আয়াতে ইলহাদ বা বা অস্বীকার করার ধর্মহীনতার মাধ্যমে পরিবর্তন করা থেকে দূরে থাকে (১৯৮৬)। কোনো ধারণাকারী যেন কখনো এ ধারণা না করে যে, এগুলো (কুরআন ও সুন্নাহ’র ভাষ্যের) কোনো কোনোটি অন্যটির বিপরীত ১৮৭); যেমন কেউ বলল: কুরআনে যে আছে আল্লাহ ‘আরশের উপরে- এটা প্রকাশ্যভাবে ঐ কথার বিপরীত যাতে আল্লাহ বলেন, (وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ “তোমরা যেখানেই থাক তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন” [সূরা আল-হাদীদ: ৪] এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: إذا قام أحدكم إلى الصلاة فإن الله قبل وجهه “তোমাদের কেউ যখন সালাতে দাঁড়ায় তখন আল্লাহ তার চেহারার সামনে থাকেন” ইত্যাদি ভাষ্যসমূহের বিপরীত। (১৮৮) (তার এ সন্দেহের উত্তরে আমরা বলব) নিশ্চয় তার এ বুঝ ও এ বক্তব্যটি মারাত্মক মারাত্মক ভুলের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
টিকাঃ
৯৮৫. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলছেন যে, কুরআন ও সুন্নাহ’র ভাষ্য থেকে উপকৃত হতে হলে, তা দ্বারা হিদায়াত ও আলোতে উদ্ভাসিত হতে হলে তাকে অবশ্যই দু’টি জিনিস রাখতে হবে: ১- ফিকহ, গভীর চিন্তা, ইলম। ২- সৎ নিয়্যত, বিশুদ্ধ উদ্দেশ্য, বিকৃতি করা থেকে বিমুখ থাকা, আল্লাহর নাম ও আয়াতসমূহে ইলহাদমুক্ত থাকা। বস্তুত এ দু’টির মাধ্যমেই ‘আহলুত তাজহীল’ বা যারা আল্লাহ তা‘আলার সিফাত সংক্রান্ত আয়াত ও হাদীসকে অর্থশূন্য করে তাদের নীতি, অনুরূপ আহলুত তাখয়ীল বা যারা আল্লাহর সিফাতগুলোকে শুধু ধারণা করা বিষয় মনে করে তাদের নীতি, তদ্রূপ আহলুত তা’ওয়ীল আল-মাযমুম, যারা আল্লাহর সিফাতগুলোর অপব্যাখ্যা করে, তাদের খপ্পর থেকে দূরে থাকা সম্ভব হবে। অন্যত্র ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, ‘উসূলুদ্দীন বা আকীদাহ’র যাবতীয় অধ্যায়ে কর্তব্য হচ্ছে আল্লাহর বাণী, রাসূলের বাণী ও উম্মতের ইজমা‘ দ্বারা যা সাব্যস্ত হবে সেটাকে সুদৃঢ় ভাষ্য হিসেবে গ্রহণ করা।’ দেখুন, মাজমূ‘ ফাতাওয়া (৮/২৯৪)। তিনি আরও বলেন, ‘দীনের মূলনীতি ও শাখা-প্রশাখায় দলীল প্রদান ও মাসআলা উদ্ঘাটনে কুরআনের বাতলানো পদ্ধতি সর্বোত্তম পদ্ধতি।’ দেখুন, মাজমূ‘ ফাতাওয়া (২/৮)। তিনি আরও বলেন, ‘দীনের মূলনীতি ও শাখা-প্রশাখায় কুরআনকে ইমাম বা নেতা হিসেবে গ্রহণ করে অনুসরণ করাই হচ্ছে দীনে ইসলাম। এটিই হচ্ছে সাহাবায়ে কিরাম, তাদের সুন্দর অনুসারী তাবে’য়ীনে ‘ইযাম ও মুসলিমগণের প্রখ্যাত ইমামগণের পদ্ধতি। তারা কখনো কারও কাছ থেকে কোনো বিবেকের যুক্তি কিংবা স্বাধীন মতকে কুরআনের বিপরীতে দাঁড় করাতেন না। হ্যাঁ, কোনো মানুষের কাছে সংশয় দেখা দিলে তিনি প্রশ্ন করে জেনে নিবেন, যাতে তার সন্দেহ তিরোহিত হয়। আর এজন্যই চার ইমাম ও অন্যান্যগণ তাওহীদ ও সিফাতের ক্ষেত্রে কুরআন ও রাসূলের দিকে প্রত্যাবর্তন করতেন, কারও মত কিংবা বিবেকের যুক্তি কিংবা কিয়াসের দিকে যেতেন না।’ মাজমূ‘ ফাতাওয়া (১৬/৪৭১)।
৯৮৬. শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘পথভ্রষ্টতার সবচেয়ে বড় নীতি হচ্ছে, আল্লাহর রাসূলের পক্ষ থেকে যে দলীল-প্রমাণাদি, আয়াত-নিদর্শনসমূহ বর্ণনা করা হয়েছে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকা। কারণ যারা এগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকবে তারা হয় তারা কোনো প্রকার দলীল প্রমাণ ও জ্ঞান ব্যতীতই রাসূল কে সত্য বলে বিশ্বাস করবে ও তাঁর কথাকে গ্রহণ করবে। তার ওপর ঈমান আনবে অথবা এর ওপর রাসূলের দেয়া দলীল প্রমাণাদী ব্যতীত অন্য কোনো দলীল প্রদান করবে... যদি এগুলোর ওপর রাসূল যেসব আয়াত-নিদর্শন ও প্রমাণাদি দিয়ে মানুষদের ডেকেছে সেগুলো ব্যতীত অন্য কোনো দলীল প্রদান করে তবে সে বিদআতী হওয়ার সাথে সাথে ভুলও করবে আর পথভ্রষ্টও হবে।
আর যদি কেউ মনে করে সে রাসূল যেসব প্রমাণ ও দলীল নিয়ে এসেছেন তার বাইরে গিয়ে রাসূলের নিয়ে আসা বিষয়ের ওপর প্রমাণবহ আরও দলীল নিয়ে আসবে তবে সে কাজটি হবে সে ইবাদতের মতো যা রাসূল প্রবর্তন করেননি, কিন্তু সে মনে করছে এর মাধ্যমে তার উদ্দেশ্য সাধিত হবে।’ দেখুন, আন-নুবুওয়াত (১/২৪৫-২৪৬)। আমরা ইতোপূর্বে জেনেছি যে, শাইখুল ইসলাম এখানে দলীল নেয়ার ক্ষেত্রে যে ভূমিকাটি উল্লেখ করেছেন এ বিষয়ে অনেক কালামশাস্ত্রবিদরাই বিরোধিতা করে থাকে, তারা বলে থাকে যে, কুরআন ও সুন্নাহ’য় আসা দলীল-প্রমাণসমূহ ‘যন্নী’ বা ধারণার উদ্রেক করে, আরও বলবে যে, খবরে ওয়াহিদ ইলম বা দৃঢ় জ্ঞানের উপকারিতা দেয় না, বরং তা তো কেবল ধারণামূলক জ্ঞান প্রদান করে, আর ধারণা হকের পৌঁছার ব্যাপারে সামান্যও কাজে লাগে না (নাউযুবিল্লাহ)। এ জন্যই শাইখুল ইসলাম কালামশাস্ত্রবিদদের উপরোক্ত দু’টি ভূমিকার নাম দিয়েছেন ‘যিন্দীকদের দু’টি ভূমিকা’। দেখুন, মাজমূ‘ ফাতাওয়া (৪/১০৪)।
৯৮৭. অর্থাৎ কুরআন ও সুন্নাহ কখনো একটি অপরটির বিপরীত নয়, অনুরূপ কুরআন-সুন্নাহ ও বিবেকের যুক্তি একটি অপরটির বিপরীতও নয়। বস্তুত সালাফে সালেহীনের মতাদর্শ সম্পূর্ণরূপে সরল সোজা, সুদৃঢ়, বিশুদ্ধ, সর্বত্র প্রবর্তনযোগ্য, আর তা সুস্পষ্ট বিবেক ও বিশুদ্ধ নকল (কুরআন ও সুন্নাহ) এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। দেখুন, মাজমূ‘ ফাতাওয়া (৫/২১৩)।
৯৮৮. হাদীসটি নিয়ে এসেছেন, বুখারী, আল-জামে‘উস সহীহ (২/২৩৫), নং ৭৫৩; অনুরূপ মুসলিম, আস- সহীহ (১/৩৮৮), হাদীস নং ৫৪৭।
৯৮৯. অর্থাৎ এভাবে তারা কুরআনের ‘আরশের উপর উঠা সংক্রান্ত আয়াতের বিপরীতে সূরা আল-হাদীদে বর্ণিত ‘সাথে থাকা’ ও রাসূলের হাদীসে বর্ণিত ‘সামনে থাকা’র বর্ণনা দিয়ে স্ববিরোধিতা প্রমাণের চেষ্টা চালায়, তাদের ব্যাপারে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, তাদের এ কাজটি মারাত্মক ভুল। কারণ কোনো প্রতিষ্ঠিত সত্যকে সন্দেহ-সংশয় নিয়ে এসে গ্রহণ না করার প্রবণতা অন্তরের বক্রতার ওপর প্রমাণ। সাচ্ছা ঈমানদার দলীলসমূহে সমন্বয় করে। অপর দিকে বিদ‘আতী লোকেরা দলীল- প্রমাণাদীতে স্ববিরোধীতা খুঁজে।
এ ব্যাপারে মোটকথা হচ্ছে, নিশ্চয় কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা পূর্ণ হিদায়াত ও নূর অর্জিত হয় তার জন্য যে কুরআন-সুন্নাহ গবেষণা করে, সত্য অনুসরণের সংকল্প করে, কথাকে তার স্থান থেকে বিকৃত করা থেকে ফিরে থাকে(১৮৫), আল্লাহর নাম ও তাঁর আয়াতে ইলহাদ বা বা অস্বীকার করার ধর্মহীনতার মাধ্যমে পরিবর্তন করা থেকে দূরে থাকে (১৯৮৬)। কোনো ধারণাকারী যেন কখনো এ ধারণা না করে যে, এগুলো (কুরআন ও সুন্নাহ’র ভাষ্যের) কোনো কোনোটি অন্যটির বিপরীত ১৮৭); যেমন কেউ বলল: কুরআনে যে আছে আল্লাহ ‘আরশের উপরে- এটা প্রকাশ্যভাবে ঐ কথার বিপরীত যাতে আল্লাহ বলেন, (وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ “তোমরা যেখানেই থাক তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন” [সূরা আল-হাদীদ: ৪] এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: إذا قام أحدكم إلى الصلاة فإن الله قبل وجهه “তোমাদের কেউ যখন সালাতে দাঁড়ায় তখন আল্লাহ তার চেহারার সামনে থাকেন” ইত্যাদি ভাষ্যসমূহের বিপরীত। (১৮৮) (তার এ সন্দেহের উত্তরে আমরা বলব) নিশ্চয় তার এ বুঝ ও এ বক্তব্যটি মারাত্মক মারাত্মক ভুলের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
টিকাঃ
৯৮৫. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলছেন যে, কুরআন ও সুন্নাহ’র ভাষ্য থেকে উপকৃত হতে হলে, তা দ্বারা হিদায়াত ও আলোতে উদ্ভাসিত হতে হলে তাকে অবশ্যই দু’টি জিনিস রাখতে হবে: ১- ফিকহ, গভীর চিন্তা, ইলম। ২- সৎ নিয়্যত, বিশুদ্ধ উদ্দেশ্য, বিকৃতি করা থেকে বিমুখ থাকা, আল্লাহর নাম ও আয়াতসমূহে ইলহাদমুক্ত থাকা। বস্তুত এ দু’টির মাধ্যমেই ‘আহলুত তাজহীল’ বা যারা আল্লাহ তা‘আলার সিফাত সংক্রান্ত আয়াত ও হাদীসকে অর্থশূন্য করে তাদের নীতি, অনুরূপ আহলুত তাখয়ীল বা যারা আল্লাহর সিফাতগুলোকে শুধু ধারণা করা বিষয় মনে করে তাদের নীতি, তদ্রূপ আহলুত তা’ওয়ীল আল-মাযমুম, যারা আল্লাহর সিফাতগুলোর অপব্যাখ্যা করে, তাদের খপ্পর থেকে দূরে থাকা সম্ভব হবে। অন্যত্র ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, ‘উসূলুদ্দীন বা আকীদাহ’র যাবতীয় অধ্যায়ে কর্তব্য হচ্ছে আল্লাহর বাণী, রাসূলের বাণী ও উম্মতের ইজমা‘ দ্বারা যা সাব্যস্ত হবে সেটাকে সুদৃঢ় ভাষ্য হিসেবে গ্রহণ করা।’ দেখুন, মাজমূ‘ ফাতাওয়া (৮/২৯৪)। তিনি আরও বলেন, ‘দীনের মূলনীতি ও শাখা-প্রশাখায় দলীল প্রদান ও মাসআলা উদ্ঘাটনে কুরআনের বাতলানো পদ্ধতি সর্বোত্তম পদ্ধতি।’ দেখুন, মাজমূ‘ ফাতাওয়া (২/৮)। তিনি আরও বলেন, ‘দীনের মূলনীতি ও শাখা-প্রশাখায় কুরআনকে ইমাম বা নেতা হিসেবে গ্রহণ করে অনুসরণ করাই হচ্ছে দীনে ইসলাম। এটিই হচ্ছে সাহাবায়ে কিরাম, তাদের সুন্দর অনুসারী তাবে’য়ীনে ‘ইযাম ও মুসলিমগণের প্রখ্যাত ইমামগণের পদ্ধতি। তারা কখনো কারও কাছ থেকে কোনো বিবেকের যুক্তি কিংবা স্বাধীন মতকে কুরআনের বিপরীতে দাঁড় করাতেন না। হ্যাঁ, কোনো মানুষের কাছে সংশয় দেখা দিলে তিনি প্রশ্ন করে জেনে নিবেন, যাতে তার সন্দেহ তিরোহিত হয়। আর এজন্যই চার ইমাম ও অন্যান্যগণ তাওহীদ ও সিফাতের ক্ষেত্রে কুরআন ও রাসূলের দিকে প্রত্যাবর্তন করতেন, কারও মত কিংবা বিবেকের যুক্তি কিংবা কিয়াসের দিকে যেতেন না।’ মাজমূ‘ ফাতাওয়া (১৬/৪৭১)।
৯৮৬. শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘পথভ্রষ্টতার সবচেয়ে বড় নীতি হচ্ছে, আল্লাহর রাসূলের পক্ষ থেকে যে দলীল-প্রমাণাদি, আয়াত-নিদর্শনসমূহ বর্ণনা করা হয়েছে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকা। কারণ যারা এগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকবে তারা হয় তারা কোনো প্রকার দলীল প্রমাণ ও জ্ঞান ব্যতীতই রাসূল কে সত্য বলে বিশ্বাস করবে ও তাঁর কথাকে গ্রহণ করবে। তার ওপর ঈমান আনবে অথবা এর ওপর রাসূলের দেয়া দলীল প্রমাণাদী ব্যতীত অন্য কোনো দলীল প্রদান করবে... যদি এগুলোর ওপর রাসূল যেসব আয়াত-নিদর্শন ও প্রমাণাদি দিয়ে মানুষদের ডেকেছে সেগুলো ব্যতীত অন্য কোনো দলীল প্রদান করে তবে সে বিদআতী হওয়ার সাথে সাথে ভুলও করবে আর পথভ্রষ্টও হবে।
আর যদি কেউ মনে করে সে রাসূল যেসব প্রমাণ ও দলীল নিয়ে এসেছেন তার বাইরে গিয়ে রাসূলের নিয়ে আসা বিষয়ের ওপর প্রমাণবহ আরও দলীল নিয়ে আসবে তবে সে কাজটি হবে সে ইবাদতের মতো যা রাসূল প্রবর্তন করেননি, কিন্তু সে মনে করছে এর মাধ্যমে তার উদ্দেশ্য সাধিত হবে।’ দেখুন, আন-নুবুওয়াত (১/২৪৫-২৪৬)। আমরা ইতোপূর্বে জেনেছি যে, শাইখুল ইসলাম এখানে দলীল নেয়ার ক্ষেত্রে যে ভূমিকাটি উল্লেখ করেছেন এ বিষয়ে অনেক কালামশাস্ত্রবিদরাই বিরোধিতা করে থাকে, তারা বলে থাকে যে, কুরআন ও সুন্নাহ’য় আসা দলীল-প্রমাণসমূহ ‘যন্নী’ বা ধারণার উদ্রেক করে, আরও বলবে যে, খবরে ওয়াহিদ ইলম বা দৃঢ় জ্ঞানের উপকারিতা দেয় না, বরং তা তো কেবল ধারণামূলক জ্ঞান প্রদান করে, আর ধারণা হকের পৌঁছার ব্যাপারে সামান্যও কাজে লাগে না (নাউযুবিল্লাহ)। এ জন্যই শাইখুল ইসলাম কালামশাস্ত্রবিদদের উপরোক্ত দু’টি ভূমিকার নাম দিয়েছেন ‘যিন্দীকদের দু’টি ভূমিকা’। দেখুন, মাজমূ‘ ফাতাওয়া (৪/১০৪)।
৯৮৭. অর্থাৎ কুরআন ও সুন্নাহ কখনো একটি অপরটির বিপরীত নয়, অনুরূপ কুরআন-সুন্নাহ ও বিবেকের যুক্তি একটি অপরটির বিপরীতও নয়। বস্তুত সালাফে সালেহীনের মতাদর্শ সম্পূর্ণরূপে সরল সোজা, সুদৃঢ়, বিশুদ্ধ, সর্বত্র প্রবর্তনযোগ্য, আর তা সুস্পষ্ট বিবেক ও বিশুদ্ধ নকল (কুরআন ও সুন্নাহ) এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। দেখুন, মাজমূ‘ ফাতাওয়া (৫/২১৩)।
৯৮৮. হাদীসটি নিয়ে এসেছেন, বুখারী, আল-জামে‘উস সহীহ (২/২৩৫), নং ৭৫৩; অনুরূপ মুসলিম, আস- সহীহ (১/৩৮৮), হাদীস নং ৫৪৭।
৯৮৯. অর্থাৎ এভাবে তারা কুরআনের ‘আরশের উপর উঠা সংক্রান্ত আয়াতের বিপরীতে সূরা আল-হাদীদে বর্ণিত ‘সাথে থাকা’ ও রাসূলের হাদীসে বর্ণিত ‘সামনে থাকা’র বর্ণনা দিয়ে স্ববিরোধিতা প্রমাণের চেষ্টা চালায়, তাদের ব্যাপারে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, তাদের এ কাজটি মারাত্মক ভুল। কারণ কোনো প্রতিষ্ঠিত সত্যকে সন্দেহ-সংশয় নিয়ে এসে গ্রহণ না করার প্রবণতা অন্তরের বক্রতার ওপর প্রমাণ। সাচ্ছা ঈমানদার দলীলসমূহে সমন্বয় করে। অপর দিকে বিদ‘আতী লোকেরা দলীল- প্রমাণাদীতে স্ববিরোধীতা খুঁজে।