📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 আল্লাহ কর্তৃক তাঁর আরশের উপর উঠার ব্যাপারে আশ‘আরীর অভিমত

📄 আল্লাহ কর্তৃক তাঁর আরশের উপর উঠার ব্যাপারে আশ‘আরীর অভিমত


অতঃপর তিনি [আশ‘আরী] বলেন, “অধ্যায়: ‘আরশের উপর উঠার বর্ণনা।” তিনি বলেন, যদি কেউ বলে: ইসতিওয়া (استواء) এর ব্যাপারে তোমাদের কী বক্তব্য? তাকে বলা হবে: আমরা বলি: নিশ্চয় আল্লাহ ‘আরশের উপর সমুন্নত হয়ে আছেন; যেমন আল্লাহ বলেন: [طه: 5] ﴿ الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى ﴾ “রহমান ‘আরশের উপর উঠেছেন।” [সূরা ত্বা-হা: ০৫]
আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন, ﴿ إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ وَالْعَمَلُ الصَّالِحُ يَرْفَعُهُ ﴾ [فاطر: ١٠]: “তাঁরই দিকে পবিত্র বাণীসমূহ উঠে যায় এবং সৎকাজ, তিনি তা উপরে তুলেন।” [সূরা আল-ফাতির: ১০]
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন, ﴿ بَل رَّفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ ﴾ [النساء: ١٥٨]: “বরং আল্লাহ তাকে তাঁর নিকট উপরে তুলে নিয়েছেন।” [সূরা আন-নিসা: ১৫৮]
আল্লাহ আরও বলেন, ﴿ يُدَبِّرُ الْأَمْرَ مِنَ السَّمَاءِ إِلَى الْأَرْضِ ثُمَّ يَعْرُجُ إِلَيْهِ ﴾ [السجدة: 5]: “তিনি আসমান থেকে যমীন পর্যন্ত সমুদয় বিষয় পরিচালনা করেন, তারপর তা তাঁর সমীপে উঠে যায়।” [সূরা আস-সাজদাহ: ০৫]
আর আল্লাহ তা‘আলা ফির‘আউনের কাহিনী বর্ণনায়(১৪১) বলেন, ﴿ يَا هَامَانُ ابْنِ لِي صَرْحًا لَّعَلِّي أَبْلُغُ الْأَسْبَابَ أَسْبَابَ السَّمَوَاتِ فَأَطَّلِعَ إِلَى إِلَهِ مُوسَى وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ كَاذِبًا ﴾ [গাফির: ৩৬, ৩৭] হামান! আমার জন্য তুমি নির্মাণ কর এক সুউচ্চ প্রাসাদ যাতে আমি অবলম্বন পাই, আসমানে আরোহণের অবলম্বন, যেন দেখতে পাই মূসার ইলাহকে; আর নিশ্চয় আমি তাকে মিথ্যাবাদী মনে করি।” [সূরা গাফির: ৩৬, ৩৭] তিনি মূসাকে মিথ্যাবাদী বললেন তার (মূসার) এ কথায়: যে নিশ্চয় আল্লাহ আসমানের উপরে。
অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ﴿أَأَمِنتُم مَّن فِي السَّمَاءِ أَن يَخْسِفَ بِكُمُ الْأَرْضَ﴾ [আল-মুলক: ১৬] “তোমরা কি এ থেকে নির্ভয় হয়েছ যে, যিনি আসমানে রয়েছেন তিনি তোমাদেরকে সহ যমীনকে ধ্বসিয়ে দিবেন।” [সূরা আল-মুলক: ১৬] সুতরাং সকল আসমানের উপরে রয়েছে ‘আরশ। আর যেহেতু ‘আরশ আসমানসমূহের উপরে, তাই তিনি বলেন, “যিনি আসমানে আছেন তাঁর থেকে কী তোমরা নিরাপদ হয়ে গেছে?” কেননা তিনি সে ‘আরশের উপরে রয়েছেন যা আসমানসমূহের উপরে। আর প্রত্যেক যা উপরে তাই আসমান। তাই ‘আরশ সকল আসমানসমূহ থেকে উঁচুতে বা ঊর্ধ্বে। আর যখন তিনি বললেন: “যিনি আসমানে আছেন...” তখন তিনি সকল আসমান বুঝাননি, বরং শুধু তিনি ‘আরশকে বুঝিয়েছেন যেটা সকল আসমানের উঁচুতে। তুমি কি দেখ না যে, তিনি উল্লেখ করেছেন: “সকল আসমান” যেমন তিনি বলেন, ﴾وَجَعَلَ الْقَمَرَ فِيهِنَّ نُورًا﴿ “আর সেখানে চাঁদকে স্থাপন করেছেন আলোকরূপে।” [সূরা আন-নূহ: ১৬] এখানে তিনি বুঝাননি যে, চাঁদ সকল আসমানকে পূর্ণ করে আছে, আর তা সকল আসমানে আছে।
আর আমরা সকল মুসলিমকে দেখি দো‘আয় আসমানের দিকে হাত উঠায়; কেননা তিনি আসমানের উপরে ‘আরশে আছেন। যদি আল্লাহ ‘আরশের উপর না হতেন তবে তারা তাদের হাত ‘আরশের দিকে উঠাতো না; যেমনটি তারা যখন দো‘আ করে তখন যমীনের দিকে নামায় না।
[আবুল হাসান আল-আশ‘আরী কর্তৃক ইস্তেওয়া অর্থ ইসতীলা করার খণ্ডন]
অতঃপর তিনি [আশ‘আরী] বলেন, পরিচ্ছেদ:
মু‘তাযিলা, জাহমিয়্যাহ, হারুরিয়‍্যাহ সম্প্রদায় বলে থাকে যে, আল্লাহর বাণী: الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى “রহমান ‘আরশের উপর উঠেছেন।” [সূরা ত্বা-হা: ০৫] এর অর্থ আধিপত্য বিস্তার করেছেন, জবরদখল করেছেন, কর্তৃত্ব লাভ করেছেন। তারা আরও বলে যে, নিশ্চয় আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান। আল্লাহ তাঁর ‘আরশের উপরে এটা তারা অস্বীকার করে। আবার তারা ‘ইস্তিওয়া’কে কুদরত বা ক্ষমতা অর্থে নেয়। তারা যা বলে তাই যদি হতো তাহলে ‘আরশ আর সপ্তম যমীনের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকত না। কেননা আল্লাহ সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান। যমীনের উপরে, বাথরুমের উপরে, জগতের সবকিছুর ওপরই তিনি ক্ষমতাবান। তাই যদি আল্লাহর ‘আরশের উপরে মুস্তাওয়ী (j) হওয়ার বিষয়টি ক্ষমতাবান অর্থে হতো অথচ তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান, তাহলে অবশ্যই তিনি ‘আরশের উপরে, যমীনের উপরে, আসমানের উপরে, বাথরুমের উপরে, ময়লার উপরে (j) ক্ষমতাবান বলতে হয়; কেননা তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান, সবকিছুর ওপর কর্তৃত্বকারী। আর যখন তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান বলবেন, আর কোনো মুসলিমের মতেই জায়েয না এটা বলা যে, আল্লাহ ময়লার ওপর, পায়খানার ওপর (j) মুস্তাওয়ী বা কর্তত্বকারী। তাহলে বুঝা গেল যে, এভাবে ‘আরশের উপরে ‘ইস্তিওয়া’ এর অর্থ استيلاء (ইসতীলা) করা কোনোভাবেই জায়েয হয় না; কেননা তা সবকিছুকেই শামিল করে। বরং আবশ্যক হলো استواء ‘ইস্তিওয়া’ এর এমন অর্থ করা যা ‘আরশের সাথে সুনির্দিষ্ট হবে; অন্য কোনো কিছুর সাথে সম্পৃক্ত হবে না। এরপর তিনি এর ওপর কুরআন, হাদীস, ইজমা‘ ও আক্কল থেকে বিভিন্ন দলিল-প্রমাণ উস্থাপন করেন।

টিকাঃ
৯৪১. এখানে আল্লাহর বাণী উল্লেখ করার আগে অন্যের ‘কাহিনী বর্ণনা’ এ শব্দটি ইমাম আশ‘আরী বর্ণনা করেছেন। এ বিষয়টি কারও কারও কাছে সমস্যাগ্রস্ত মনে হতে পারে। কারণ পরবর্তী আশ‘আরী ও মাতুরিদিয়্যাহ সম্প্রদায়ের লোকেরা সাধারণত আল্লাহর কুরআনকে সরাসরি আল্লাহর বাণী বলার চেয়ে আল্লাহর বাণীর বর্ণনা বলতে পছন্দ করেন। কারণ তারা মনে করে যে, আল্লাহর বাণী তো তাঁর অন্তরে, বাইরে যা বর্ণ ও ভাষায় এসেছে তা সে বাণীর কাহিনী রূপ। সে জন্য আল্লাহর বাণীকে কখনও আল্লাহর বাণীর কাহিনী বলা জায়েয হবে না। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে দেখুন, মাজমূ‘ ফাতাওয়া (৩/১৪৪, ১৭৫, ১৯৯), (১২/২৭২, ৩৭৫)।
কিন্তু ইমাম আশ‘আরী এখানে সে উদ্দেশ্যে বলেননি। কারণ ইমাম আশ‘আরী অন্য সব জায়গায় আল্লাহর বাণী বলেছেন, যা দ্বারা বুঝা যায় তিনি উক্ত বিদ‘আতী বক্তব্য দেননি। বরং তিনি কুরআনকে সরাসরি আল্লাহর বাণীই সাব্যস্ত করেন। এজন্য উত্তম অর্থে সেটাকে নিতে হবে, আর তা হচ্ছে তিনি বুঝাতে চেয়েছেন উক্ত বক্তব্যটি প্রথমে ফির‘আউন তার সহচর হামানকে বলেছিল, কিন্তু কীভাবে কোন ভাষায় ছিল সেটা আমরা জানি না, অতঃপর আল্লাহ আমাদেরকে উক্ত বক্তব্য বর্ণনা করেছেন আল্লাহর নিজস্ব শব্দে।
ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, কেউ যদি বলে কুরআন হচ্ছে ‘কাহিনী বর্ণনা’ অর্থাৎ কুরআনকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন, যেমন বলা হয়, ‘তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রচার করেছেন’, ‘তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে আদায় করেছেন’, তাহলে সে অবশ্যই বিশুদ্ধ অর্থ উদ্দেশ্য নিয়েছে। দেখুন, মাজমু‘ ফাতাওয়া (১২/২৮০); বকর আবু যাইদ, মু‘জামুল মানাহিল লাফযিয়্যাহ, পৃ. ৪২৫ ও তার পরের বর্ণনা।
বস্তুত এভাবে বলার বিষয়টি যুগ যুগ ধরে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের ইমামগণের মাঝে প্রচলিত হয়ে এসেছে। বিষয়টির ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে আরও দেখা যায়, আবুল কাসেম আত- তাইমী, আল-হুজ্জাহ ফী বায়ানিল মাহাজ্জাহ (১/৩৪৩), (২/১৭৭); আবুল কাসেম আল-বাগাওয়ী, তাফসীর মা‘আলিমুত তানযীল (১/৭৩); ইবন তাইমিয়‍্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়‍্যাহ (১/১৭৪); জামে‘উ‘র রাসায়িল (১/২১৪), (২/১৩৬); মাজমূ‘ ফাতাওয়া (১০/৫০৭), (৩০/৩৬৭); যাহাবী, আল- ‘আরশ, পৃ. ১৯২-১৯৩; আদ-দুরারুস সানিয়্যাহ (১/১৯৯, ৪১৮), (৩/১২৩), (৯/২৬৬, ২৭০); আশ-শানকীত্বী, আদ্বওয়াউল বায়ান (৭/২৮২)।
বস্তুত আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আলেমগণ যখন ‘কাহিনী বর্ণনা’ বাক্য ব্যবহার করেন, আর যখন আশ‘আরী ও কুল্লাবিয়া সম্প্রদায় ব্যবহার করে উভয়ের উদ্দেশ্যের মধ্যে বিশাল পার্থক্য বিদ্যমান। দেখুন, মাজমু‘ ফাতাওয়া (৩/১৪৪, ১৭৫, ১৯৯), (১২/২৭২, ৩৭৫)।
৯৪২. এখন প্রশ্ন হতে পারে যে, চাঁদ কি সকল আসমানকে আলোকিত করে? এর জবাব হচ্ছে, (১) এখানে সকল আসমান বলা হলেও উদ্দেশ্য কেবল ঊর্ধ্বজগতের কিছু অংশ। এটাকে বলা হয় ‘যিকরুল কুল্ল ওয়া ইরাদাতুল জুয’ অর্থাৎ ব্যাপক উল্লেখ করে অংশবিশেষ উদ্দেশ্য নেয়া। (২) আরবী ভাষায় ‘ফী’ শব্দটি ছাড়া কোনো কিছুর পূর্ণ অংশ বুঝানো আবশাক করে না। কিছু বুঝাতেও ‘ফী’ ব্যবহার করা যায়।
৯৪৩. এটি হচ্ছে ফিতুরী দলীল। মানবীয় মনের স্বভাবজাত প্রমাণ। যার মাধ্যমে বান্দা তার উপাস্য মা‘বুদ আল্লাহকে সবকিছুর উপরে বিশ্বাস করে। এ ব্যাপারে একটি বিখ্যাত ঘটনা রয়েছে, তা হচ্ছে একবার আশ‘আরী আলেম আবুল মা‘আলী আল-জুওয়াইনী মিম্বরের উপর উঠে বললেন, “আল্লাহ ছিলেন তখন ‘আরশও ছিল না।” তখন আবু জা‘ফর আল-হামাদানী বলেন, ওহে উস্তায, আমাদেরকে ‘আরশের বর্ণনা ছেড়ে দিন, অর্থাৎ এটি তো কেবল কুরআন-সুন্নাহ’য় এসেছে, আমাদেরকে সে অত্যাবশ্যক বিষয়টির ব্যাপারে জানান যা আমরা আমাদের অন্তরে পাই, কারণ যখনই কোনো আল্লাহওয়ালা ব্যক্তি বলে, ‘হে আল্লাহ’, তখনই তার হৃদয়ে এমন অত্যাবশ্যকতা পায়, যা তার মনকে উপরের দিকে নিবদ্ধ করতে বাধ্য করে, সেটা ডানেও যায় না, বামেও যায় না। তাহলে কীভাবে এ অত্যাবশ্যকতাকে আমাদের হৃদয় থেকে প্রতিরোধ করব? তিনি বলেন, তখন আবুল মা‘আলী তার মাথায় আঘাত করে বলতে আরম্ভ করলেন, হামাদানী আমাকে হয়রান করে দিলো, হামাদানী আমাকে হয়রান করে দিলো, আর তিনি মিম্বর থেকে অবতরণ করলেন।’ দেখুন, ইবন তাইমিয়‍্যাহ, মাজমূ‘ ফাতাওয়া (৪/৪৪, ৬১); ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়‍্যাহ (২/৪৪৬, ৪৬৮)। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘মুমিনদের যে কেউ নিজের সত্তায় একবার পরীক্ষা করে দেখবে, সে নিজের সত্তায় সুদৃঢ়ভাবে অত্যাবশ্যক জ্ঞান হিসেবে তার অন্তরে পাবে যে, যখনই সে তার অন্তর দিয়ে আল্লাহর ইবাদতে, তাকে আহ্বান করার ক্ষেত্রে, তাঁর দিকে নিজেকে নিবদ্ধ করার ব্যাপারে সত্য হবে, তখনই তাকে কোনো একটি দিকে সেটার উদ্দেশ্য করা জরুরী হয়ে পড়বে। অতঃপর যদি সে তার ফিত্বরাতের ওপর থাকে যার ওপর তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে, অথবা যদি সেটার সাথে সে রাসূলরা যা নিয়ে এসেছেন তার ওপর ঈমানদার হয় তিনি অবশ্যই উপরের দিকে নিজেকে সর্বদা নিবদ্ধ করবে, কিন্তু যদি তার ফিত্বরাত বা স্বভাবজাত বিশ্বাসের পরিবর্তন এসে থাকে তবে সে সকল দিকেই নিবদ্ধ করবে এবং সকল অস্তিত্বশীল বস্তুর দিকই উদ্দেশ্য করবে।’ দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়‍্যাহ (২/৪৬৮)।
ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ আরও বলেন, মহান আল্লাহ তিনি সকল সৃষ্টিকুলের উপর হওয়া, তাদের থেকে পৃথক হওয়ার বিষয়টি, অত্যাবশ্যক ফিতরাতের মাধ্যমে জানা যায়, যাতে সকল বনী আদম সমানভাবে অংশীদার। যে যত বেশি আল্লাহকে চিনবে, যত বেশি তাঁর ইবাদত করবে, যত বেশি তাঁর কাছে যাচঞা করবে, যার হৃদয়ে যত বেশি তাঁকে স্মরণ করবে, তার কাছে এ অত্যাবশ্যকতা তত বেশি শক্তিশালী ও পরিপূর্ণভাবে ধরা পড়বে। কারণ ফিতরাত বা স্বভাবজাত জ্ঞান, অবতীর্ণ করা ফিতরাতকে পূর্ণতা দেয়। কারণ স্বভাবজাত জ্ঞানে যে কোনো জিনিস মুজমাল বা সংক্ষিপ্তভাবে জানতে পারে, শরী‘আত সেটাকে বিস্তারিত বর্ণনা করে, প্রকাশ করে ও এমন কিছুর সাক্ষ্য দেয় যা ফিতরাত একাকী বুঝতে পারে না। মাজমূ‘ ফাতাওয়া (৪/৪৪); আরও দেখুন, জামে‘উল মাসায়িল (৪/৭৯-৮৫)।
৯৪৪. অর্থাৎ এটিই প্রমাণ করে যে, তিনি উপরে আছেন, যত উপরে একজন মানুষ জানতে পারে তারও উপরে। তিনি আসমানসমূহের উপরে, ‘আরশের উপরে।
৯৪৫. এসব যে জাহমিয়‍্যাহ, মু‘তাযিলা ও হারুরিয়্যাদের বক্তব্য তার প্রমাণ হিসেবে দেখুন, কাযী আব্দুল জাব্বার আল-মু‘তাযিলীর, শারহুল উসূলিল খামসাহ, পৃ. ২২৬; তাছাড়া আরও যারা এ বক্তব্যকে জাহমিয়্যাহ, মু‘তাযিলাদের দিকে সম্পৃক্ত করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ইমাম আশ‘আরী তার মাক্কালাতুল ইসলামিয়্যীন গ্রন্থে, পৃ. ১৫৭, ২১১; আরও দেখুন, আব্দুল কাহের আল-বাগদাদীর উসূলুদ্দীন, পৃ. ১১২।
৯৪৬. এখানে সম্ভবত আরেক দলের কথা আলোচনা করা হচ্ছে, যারা ‘আরশের উপর আল্লাহর ‘ইস্তেওয়া’ করাকে কুদরত বা ক্ষমতার অর্থে নেয়। তখন সেটি আর আল্লাহর কর্মগত গুণ থাকে না। তখন সেটি সত্তাগত গুণ হয়ে যায়। বস্তুতই যারা আল্লাহর কর্মগত গুণ সাব্যস্ত করে না তারা এ পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকে, তারা সকল প্রকার কর্মগত গুণকে হয় কুদরত ও ইচ্ছার দিকে নিয়ে যায়, নতুবা সেগুলোকে ‘তাকওয়ীন’ নামক তথাকথিত সৃষ্টি কর্মের দিকে নিয়ে যায়। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একদল লোক ‘ইস্তেওয়া’কে সত্তাগত গুণ হিসেবে বর্ণনা করে, অপর দল সেটাকে কর্মগত গুণ হিসেবে বলে। তারপর তিনি বলেন, যারা বলে এটি সত্তাগত গুণ তারা আয়াতের অর্থ করতে গিয়ে তা’ওয়ীল করে বলে, ‘তিনি ‘আরশের উপর ক্ষমতাবান হলেন’। তারপর তিনি এ মতটিকে কয়েক দিক থেকে দুর্বল সাব্যস্ত করলেন:
১- আল্লাহ বলেন, ثُمَّ اسْتَرَى عَلَى الْعَرْشِ [الأعراف: ৫ “তারপর তিনি ‘আরশের উপর...”। [সূরা আ‘রাফ: ৫৪] এখানে আল্লাহ তা‘আলা সে কাজটিকে ‘তারপর’ বলে জানিয়েছেন। যদি ক্ষমতা অর্থ করা হয় তবে কি তিনি আল্লাহ তা‘আলা আগে ‘আরশের উপর ক্ষমতাবান ছিলেন না?
২- এখানে একটি ক্রিয়া আরেকটি ক্রিয়ার ওপর ‘আতফ’ তথা নির্ভর করে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথম ক্রিয়াটি ‘খালাকা’ তারপরেরটি ‘ইস্তেওয়া’। অর্থাৎ সৃষ্টি করেছেন তারপর ইস্তেওয়া বা উপরে উঠেছেন। এখন যদি পরেরটি ‘কুদরত’ অর্থ করা হয়, তখন আর ক্রিয়ার উপর ক্রিয়ার ‘আত্বফ’ হয় না, ক্রিয়ার ওপর বিশেষ্যকে ‘আতফ’ করতে হয় যা আরবী ব্যাকরণের দিক থেকে দৃষ্টিকটু।
৩- তারা যা বলে অর্থাৎ ‘ক্ষমতাবান হওয়া’ অর্থ করা হলে ‘আরশ ও অন্য কিছুর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। কারণ আল্লাহ তা‘আলা তো সবকিছুর উপরই ক্ষমতাবান। এখন যদি বলা হয়, ‘আরশ উল্লেখ করার কারণ হচ্ছে, ‘আরশ সবচেয়ে বড় সৃষ্টি, তাই সেটাকে আলাদা করে বর্ণনা করা হয়েছে, (বলা হবে যে,) বড় সৃষ্টি হওয়ার কারণেই সেটা বিশেষায়িত হয়ে যায় না, কারণ আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “মহা ‘আরশের রব্ব”। [সূরা আত-তাওবাহ: ১২৯] এখানেও ‘আরশের রবকে উল্লেখ করা হয়েছে, আর রব্ব হওয়া ব্যাপক বিষয়কে শামিল করে, তাই এটা বলা বৈধ হয় যে, তিনি আসমানসমূহের রব্ব, যমীনসমূহের রব্ব ও মহা ‘আরশের রব্ব। আরও বলা হয়, ‘রাব্বুল আলামীন’, আরও বলা হয়, ‘রাব্বি মূসা ওয়া হারুন’ (তাহলে বুঝা গেল যে, ইস্তিওয়া আলাল ‘আরশ এর অর্থ যদি ‘আরশের উপর ‘ক্ষমতাবান হওয়া’ বলা হয়, তাহলে সেটার বিশেষত্ব থাকে না, যেমনিভাবে রব্বুল ‘আরশ বলা হলেও সেটার বিশেষত্ব থাকে না)। অথচ ‘ইস্তেওয়া’ ক্রিয়াটি মুসলিমদের সর্বসম্মত মত অনুযায়ী ‘আরশের সাথে একান্তভাবে বিশেষায়িত। যদিও তিনি আসমান-যমীন ও এ দুয়ের মধ্যবর্তী সবকিছুর ওপর আধিপত্য বিস্তারকারী ক্ষমতাধর সত্তা।
এখন যদি তাঁর ‘আরশের উপর ইস্তেওয়া’কে ‘আরশের ওপর ক্ষমতাবান’ এ অর্থ করা হয়, তাহলে এটা বলাও শুদ্ধ হবে যে, তিনি আসমান, যমীন ও এতদুভয়ের মাঝে যা আছে তার ওপরও ক্ষমতাধর। (তখন আর শুধু ‘আরশের উপর ‘ইস্তেওয়া’ এর বিশেষত্ব থাকে না)। এটি দিয়ে বেশ কিছু আলেম (‘ইস্তেওয়া’ অর্থ ‘ক্ষমতাবান হওয়া’ বিশুদ্ধ না হওয়ার) দলীল পেশ করেছেন, তাদের মধ্যে ইমাম আশ‘আরী একজন। দেখুন, মাজমূ‘ ফাতাওয়া (১৬/৩৯৫-৩৯৭)।
৯৪৭. ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রাহিমাহুল্লাহ এ বাতিল তা’ওয়ীলকে ৪২টি উপায়ে খণ্ডন করেন, যা যেকোনো মানুষের জন্য যথেষ্ট হতে পারে। দেখুন, মুখতাসারুস সাওয়া’য়িক (২/১৩৭-১৫২)।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 আবুল হাসান আল-আশ‘আরী কর্তৃক ইস্তেওয়া অর্থ ইসতীলা করার খণ্ডন

📄 আবুল হাসান আল-আশ‘আরী কর্তৃক ইস্তেওয়া অর্থ ইসতীলা করার খণ্ডন


অতঃপর তিনি [আশ‘আরী] বলেন, পরিচ্ছেদ:
মু‘তাযিলা, জাহমিয়্যাহ, হারুরিয়‍্যাহ সম্প্রদায় বলে থাকে যে, আল্লাহর বাণী: الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى "রহমান ‘আরশের উপর উঠেছেন।” [সূরা ত্বা-হা: ০৫] এর অর্থ আধিপত্য বিস্তার করেছেন, জবরদখল করেছেন, কর্তৃত্ব লাভ করেছেন।(১৪৪) তারা আরও বলে যে, নিশ্চয় আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান। আল্লাহ তাঁর ‘আরশের উপরে এটা তারা অস্বীকার করে। আবার তারা ‘ইস্তিওয়া’কে কুদরত বা ক্ষমতা অর্থে নেয়।(১৪৫) তারা যা বলে তাই যদি হতো তাহলে ‘আরশ আর সপ্তম যমীনের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকত না। কেননা আল্লাহ সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান। যমীনের উপরে, বাথরুমের উপরে, জগতের সবকিছুর ওপরই তিনি ক্ষমতাবান। তাই যদি আল্লাহর ‘আরশের উপরে মুস্তাওয়ী (j) হওয়ার বিষয়টি ক্ষমতাবান অর্থে হতো অথচ তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান, তাহলে অবশ্যই তিনি ‘আরশের উপরে, যমীনের উপরে, আসমানের উপরে, বাথরুমের উপরে, ময়লার উপরে (j) ক্ষমতাবান বলতে হয়; কেননা তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান, সবকিছুর ওপর কর্তৃত্বকারী। আর যখন তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান বলবেন, আর কোনো মুসলিমের মতেই জায়েয না এটা বলা যে, আল্লাহ ময়লার ওপর, পায়খানার ওপর (j) মুস্তাওয়ী বা কর্তত্বকারী। তাহলে বুঝা গেল যে, এভাবে ‘আরশের উপরে ‘ইস্তিওয়া’ এর অর্থ استيلاء (ইসতীলা) করা কোনোভাবেই জায়েয হয় না; কেননা তা সবকিছুকেই শামিল করে। বরং আবশ্যক হলো استواء ‘ইস্তিওয়া’ এর এমন অর্থ করা যা ‘আরশের সাথে সুনির্দিষ্ট হবে; অন্য কোনো কিছুর সাথে সম্পৃক্ত হবে না। এরপর তিনি এর ওপর কুরআন, হাদীস, ইজমা‘ ও আক্কল থেকে বিভিন্ন দলিল-প্রমাণ উস্থাপন করেন।

টিকাঃ
৯৪৪. অর্থাৎ এটিই প্রমাণ করে যে, তিনি উপরে আছেন, যত উপরে একজন মানুষ জানতে পারে তারও উপরে। তিনি আসমানসমূহের উপরে, ‘আরশের উপরে।
৯৪৫. এসব যে জাহমিয়‍্যাহ, মু‘তাযিলা ও হারুরিয়্যাদের বক্তব্য তার প্রমাণ হিসেবে দেখুন, কাযী আব্দুল জাব্বার আল-মু‘তাযিলীর, শারহুল উসূলিল খামসাহ, পৃ. ২২৬; তাছাড়া আরও যারা এ বক্তব্যকে জাহমিয়্যাহ, মু‘তাযিলাদের দিকে সম্পৃক্ত করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ইমাম আশ‘আরী তার মাক্কালাতুল ইসলামিয়্যীন গ্রন্থে, পৃ. ১৫৭, ২১১; আরও দেখুন, আব্দুল কাহের আল-বাগদাদীর উসূলুদ্দীন, পৃ. ১১২।
৯৪৬. এখানে সম্ভবত আরেক দলের কথা আলোচনা করা হচ্ছে, যারা ‘আরশের উপর আল্লাহর ‘ইস্তেওয়া’ করাকে কুদরত বা ক্ষমতার অর্থে নেয়। তখন সেটি আর আল্লাহর কর্মগত গুণ থাকে না। তখন সেটি সত্তাগত গুণ হয়ে যায়। বস্তুতই যারা আল্লাহর কর্মগত গুণ সাব্যস্ত করে না তারা এ পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকে, তারা সকল প্রকার কর্মগত গুণকে হয় কুদরত ও ইচ্ছার দিকে নিয়ে যায়, নতুবা সেগুলোকে ‘তাকওয়ীন’ নামক তথাকথিত সৃষ্টি কর্মের দিকে নিয়ে যায়। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একদল লোক ‘ইস্তেওয়া’কে সত্তাগত গুণ হিসেবে বর্ণনা করে, অপর দল সেটাকে কর্মগত গুণ হিসেবে বলে। তারপর তিনি বলেন, যারা বলে এটি সত্তাগত গুণ তারা আয়াতের অর্থ করতে গিয়ে তা’ওয়ীল করে বলে, ‘তিনি ‘আরশের উপর ক্ষমতাবান হলেন’। তারপর তিনি এ মতটিকে কয়েক দিক থেকে দুর্বল সাব্যস্ত করলেন:
১- আল্লাহ বলেন, ثُمَّ اسْتَرَى عَلَى الْعَرْشِ [الأعراف: ৫ “তারপর তিনি ‘আরশের উপর...”। [সূরা আ‘রাফ: ৫৪] এখানে আল্লাহ তা‘আলা সে কাজটিকে ‘তারপর’ বলে জানিয়েছেন। যদি ক্ষমতা অর্থ করা হয় তবে কি তিনি আল্লাহ তা‘আলা আগে ‘আরশের উপর ক্ষমতাবান ছিলেন না?
২- এখানে একটি ক্রিয়া আরেকটি ক্রিয়ার ওপর ‘আতফ’ তথা নির্ভর করে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথম ক্রিয়াটি ‘খালাকা’ তারপরেরটি ‘ইস্তেওয়া’। অর্থাৎ সৃষ্টি করেছেন তারপর ইস্তেওয়া বা উপরে উঠেছেন। এখন যদি পরেরটি ‘কুদরত’ অর্থ করা হয়, তখন আর ক্রিয়ার উপর ক্রিয়ার ‘আত্বফ’ হয় না, ক্রিয়ার ওপর বিশেষ্যকে ‘আতফ’ করতে হয় যা আরবী ব্যাকরণের দিক থেকে দৃষ্টিকটু।
৩- তারা যা বলে অর্থাৎ ‘ক্ষমতাবান হওয়া’ অর্থ করা হলে ‘আরশ ও অন্য কিছুর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। কারণ আল্লাহ তা‘আলা তো সবকিছুর উপরই ক্ষমতাবান। এখন যদি বলা হয়, ‘আরশ উল্লেখ করার কারণ হচ্ছে, ‘আরশ সবচেয়ে বড় সৃষ্টি, তাই সেটাকে আলাদা করে বর্ণনা করা হয়েছে, (বলা হবে যে,) বড় সৃষ্টি হওয়ার কারণেই সেটা বিশেষায়িত হয়ে যায় না, কারণ আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “মহা ‘আরশের রব্ব”। [সূরা আত-তাওবাহ: ১২৯] এখানেও ‘আরশের রবকে উল্লেখ করা হয়েছে, আর রব্ব হওয়া ব্যাপক বিষয়কে শামিল করে, তাই এটা বলা বৈধ হয় যে, তিনি আসমানসমূহের রব্ব, যমীনসমূহের রব্ব ও মহা ‘আরশের রব্ব। আরও বলা হয়, ‘রাব্বুল আলামীন’, আরও বলা হয়, ‘রাব্বি মূসা ওয়া হারুন’ (তাহলে বুঝা গেল যে, ইস্তিওয়া আলাল ‘আরশ এর অর্থ যদি ‘আরশের উপর ‘ক্ষমতাবান হওয়া’ বলা হয়, তাহলে সেটার বিশেষত্ব থাকে না, যেমনিভাবে রব্বুল ‘আরশ বলা হলেও সেটার বিশেষত্ব থাকে না)। অথচ ‘ইস্তেওয়া’ ক্রিয়াটি মুসলিমদের সর্বসম্মত মত অনুযায়ী ‘আরশের সাথে একান্তভাবে বিশেষায়িত। যদিও তিনি আসমান-যমীন ও এ দুয়ের মধ্যবর্তী সবকিছুর ওপর আধিপত্য বিস্তারকারী ক্ষমতাধর সত্তা।
এখন যদি তাঁর ‘আরশের উপর ইস্তেওয়া’কে ‘আরশের ওপর ক্ষমতাবান’ এ অর্থ করা হয়, তাহলে এটা বলাও শুদ্ধ হবে যে, তিনি আসমান, যমীন ও এতদুভয়ের মাঝে যা আছে তার ওপরও ক্ষমতাধর। (তখন আর শুধু ‘আরশের উপর ‘ইস্তেওয়া’ এর বিশেষত্ব থাকে না)। এটি দিয়ে বেশ কিছু আলেম (‘ইস্তেওয়া’ অর্থ ‘ক্ষমতাবান হওয়া’ বিশুদ্ধ না হওয়ার) দলীল পেশ করেছেন, তাদের মধ্যে ইমাম আশ‘আরী একজন। দেখুন, মাজমূ‘ ফাতাওয়া (১৬/৩৯৫-৩৯৭)।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 সিফাতে খাবারিয়া তথা কুরআন ও হাদীসে আসা আখবার এর ব্যাপারে আবুল হাসান আল-আশ‘আরীর মত

📄 সিফাতে খাবারিয়া তথা কুরআন ও হাদীসে আসা আখবার এর ব্যাপারে আবুল হাসান আল-আশ‘আরীর মত


অতঃপর তিনি বলেন, “অধ্যায়: চেহারা, দু’ চোখ, দর্শনেন্দ্রিয় এবং দু’হাত (১৪৮)” আর তিনি এগুলোর ওপর প্রমাণবহ আয়াতসমূহ উল্লেখ করেন। আর যারা এগুলোর তা’ওয়ীল বা অপব্যাখ্যা করে তাদের মত খণ্ডন করেন দীর্ঘ বক্তব্যের মাধ্যমে, যার বর্ণনা এখানে সঙ্কুলান হবে না। যেমন তিনি বলেন, আমাদেরকে যদি প্রশ্ন করা হয়, তোমরা কী বলো যে, আল্লাহর দু’টি হাত আছে?
তাহলে বলা হবে: হ্যাঁ, আমরা সেটা বলি। এর প্রমাণ আল্লাহ তা‘আলার বাণী: يَدُ اللَّهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ “আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর।” [সূরা আল-ফাতহ: ১০] এবং তাঁর বাণী: ﴿خَلَقْتُ بِيَدَىّ “যা আমি আমার দুহাতে সৃষ্টি করেছি।” [সূরা স্বদ: ৭৫] আর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, إن الله مسح ظهر آدم بيده، فاستخرج منه ذريته “নিশ্চয় আল্লাহ স্বীয় হাত দ্বারা আদমের পিঠে মাসেহ করলেন”।(১৪৯) আরও বলেন, وخلق جنة عدن بيده، وكتب التوراة بيده আর তিনি নিজ হাতে জান্নাতু ‘আদন সৃষ্টি করেছেন, আর তাওরাত নিজ হাতে লিখেছেন।”(৮৫০)
তাছাড়া নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এসেছে, إن الله خلق آدم بيده، وخلق جنة عدن بيده، وكتب التوراة بيده، وغرس شجرة طوبی بیده “আল্লাহ তা‘আলা নিজ হাতে আদমকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি নিজ হাতে জান্নাতে আদন সৃষ্টি করেছেন, তিনি নিজ হাতে তাওরাত লিখেছেন, তিনি নিজ হাতে তুবা বৃক্ষ রোপণ করেছেন।”(১৫১)
আর আরবি ভাষায় বা বাক্যালাপকারীদের অভ্যাসে এটা জায়েয নয় যে, কেউ বলবে “আমি নিজের দু’হাতে এমনটি করেছি” আর তা দ্বারা সে নি‘আমত উদ্দেশ্য করবে। আর আল্লাহ যখন আরবদেরকে তাদের নিজেদের ভাষায় সম্বোধন করেছেন এবং তা দ্বারা সম্বোধন করেছেন যা তাদের কথায় বুঝে নিতে হয় এবং যা তাদের বক্তৃতায় মাধ্যমে বোধগম্য হয় আর আরবী ভাষাভাষীদেরকে এটা বলা জায়েয নয় যে, “আমি স্বীয় দু’হাতে করেছি” বলে উদ্দেশ্য হবে নি‘আমত, তাহলে আল্লাহর বাণী: بيدي বা “আমার দু’হাতে” এর অর্থ নি‘আমত হওয়া বাতিল সাব্যস্ত হলো। ১৯২৯ এ প্রসঙ্গে তিনি এটা ও অনুরূপ কিছু সাব্যস্ত করতে আরও দীর্ঘ কথা বলেন।

টিকাঃ
৯৪৭. ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রাহিমাহুল্লাহ এ বাতিল তা’ওয়ীলকে ৪২টি উপায়ে খণ্ডন করেন, যা যেকোনো মানুষের জন্য যথেষ্ট হতে পারে। দেখুন, মুখতাসারুস সাওয়া’য়িক (২/১৩৭-১৫২)।
৯৪৮. ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহর ‘হাত’ গুণটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করেছেন, আর তিনি যারা এ গুণটির অপব্যাখ্যা করেছেন সেসব জাহমিয়‍্যাহ ও তাদের অনুসারীদের বক্তব্য দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে খণ্ডন করেছেন। সেখানে তিনি সেসব জাহমিয়‍্যাহ ও তাদের অনুসারীদের বক্তব্য খন্ডনের বহু দিক তুলে ধরেছেন, কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফদের অনেক আছার নিয়ে এসেছেন, তারপর বলেন, ‘যদি আমরা আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের সব বক্তব্য নিয়ে আসি তবে সেটা শতাধিক হয়ে যাবে।’ দেখুন, মুখতাসারুস সাওয়া’য়িক (৩/৯৪৬-৩৮৪)। তিনি আরও বলেন, ‘ইয়াদ’ শব্দটি কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবায়ে কিরামের ভাষ্য, তাবেয়ীনে ‘ইযামের বক্তব্যে একশ’ এর বেশি স্থানে এসেছে। আর তার আসার ধরণও বিচিত্র, আর তা এমনসব দলীল-প্রমাণাদি সমৃদ্ধ যা প্রমাণ করে যে, এটা দ্বারা প্রকৃত হাতই বুঝানো হয়েছে। যেমন এসেছে ধারণ করা, ভাঁজ করা, মুষ্ঠিবদ্ধ করা, প্রশস্ত করে দেয়া, মুসাফাহা করা, আঁজলা, হাত দিয়ে পানির ঝাপটা দেয়া, দু’ হাতে সৃষ্টি করা, দু’ হাত সরাসরি ব্যবহার করা...’ দেখুন, মুখতাসারুস সাওয়ায়িক (৩/৯৮৪)..
৯৪৯. হাদীসটির তাখরীজ ইতোপূর্বে চলে গেছে।
৯৫০. হাদীসটির তাখরীজ ইতোপূর্বে চলে গেছে।
৯৫১. এ হাদীসটি এ শব্দে কোথাও পাওয়া যায়নি। তবে কাছাকাছি শব্দে তা বিভিন্ন গ্রন্থে এসেছে, যেমন: ১- দারাকুতনী, আস-সিফাত, হাদীস নং ২৮। ২- আবুশ শাইখ, আল-আযামাহ, হাদীস নং ১০১৭। ৩- বাইহাক্বী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (২/১২৫), হাদীস নং ৬৯২; আব্দুল্লাহ ইবনুল হারেস, তার পিতা থেকে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তিনটি বস্তু নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন, তাওরাত নিজ হাতে লিখেছেন, ফিরদাউস নিজ হাতে স্থাপন করেছেন.....” হাদীসের শেষ পর্যন্ত। এরপর বাইহাক্বী বলেন, হাদীসটির সনদ মুরসাল। তার সনদে আবু মি‘শার নাজীহ ইবন আব্দুর রহমান রয়েছেন। তিনি দুর্বল বর্ণনাকারী। ৪- ইমাম আবু নু‘আইম তার ‘সিফাতুল জান্নাত’ (১/৪৮-৪৯) নং ২৩ এ রকম একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। ৫- অনুরূপ হাদীস ইবন ‘উমার রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকেও মাওকুফ সূত্রে হাকেম তার মুস্তাদরাকে বর্ণনা করেছেন (২/৩৪৯), তার শব্দ হচ্ছে, “আল্লাহ তা‘আলা চারটি জিনিস নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন, ‘আরশ, জান্নাতু ‘আদন, আদম ও কালাম।” তারপর হাকেম বলেন, এ হাদীসটির সনদ বিশুদ্ধ তবে বুখারী ও মুসলিম তারা কেউই তা সংকলন করেননি, আর তার সাথে যাহাবী একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। ৬- আরও সংকলন করেছেন উসমান ইবন সা‘ঈদ আদ-দারেমী। দেখুন, আর-রাদ্দু আলা বিশর আল-মিররীসী (১/৪৭২)। ৭- অনুরূপ বর্ণনা জাবের রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে মাওকুফ সূত্রে এসেছে। তার শব্দ হচ্ছে, “নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নিজ হাতে তিনটি জিনিস ব্যতীত কিছু স্পর্শ করেননি, জান্নাত নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন.. আদমকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন, তাওরাতকে মুসার জন্য নিজ হাতে লিখেছেন।” ইবন আবী শাইবাহ তা তার আল-মুসান্নাফে (১৩/১৯৬) সংকলন করেন। ৮- আরও সংকলন করেছেন আব্দুল্লাহ ইবন ইমাম আহমাদ আস-সুন্নাহ (১/২৯৫), নং ৫৭০ ইবন আব্বাস থেকে। তবে তার সনদ দুর্বল। কারণ তাতে আলী ইবন যায়েদ ইবন জুদ‘আন রয়েছেন। ৯- তাছাড়া এ রকম আরও কিছু বর্ণনা মাওকুফ সূত্রে কা‘ব আল-আহবার থেকে এসেছে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা তিনটি জিনিস ব্যতীত কোনো কিছু নিজ হাতে করেননি, আদম, তাওরাত; কারণ তা তিনি মূসার জন্য লিখেছেন, তৃবা যা জান্নাতের এক প্রকার গাছ, আল্লাহ তা‘আলা নিজ হাতে তা লাগিয়েছেন।’ দেখুন, আজুররী, আশ-শরী‘আহ, পৃ. ৩০৩। তবে বিশুদ্ধ কথা হচ্ছে হাদীসটি ইবন ‘উমার রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমার ওপর মাওকুফ। দেখুন, ইবনুল কাইয়্যেম, হাদীউল আরওয়াহ (১/২১৫)।
৯৫২. আবুল হাসান আল-আশ‘আরী, তিনি কালামশাস্ত্রবিদ হওয়া সত্ত্বেও সেসব কালামশাস্ত্রবিদদের মতবাদকে চূর্ণ করলেন, যারা আল্লাহর দু’ হাত থাকার গুণটি অস্বীকার করে, তিনি সেটা সাব্যস্ত করার জন্য কুরআন থেকে দলীল নিলেন, যেখানে আল্লাহ বলেছেন, “যা আমার দু’ হাত সৃষ্টি করেছে”। [সূরা স্বদ: ৭৫] বস্তুত আল্লাহর দু’হাত সাব্যস্ত করার ব্যাপারে এটি সবচেয়ে স্পষ্ট আয়াত। কারণ দ্বি-বচন দিয়ে যা বলা হয় তা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, সুনির্দিষ্ট সংখ্যাকেই বুঝায়। দেখুন, আত-তাদমুরিয়‍্যাহ, পৃ. ২২১; ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়‍্যাহ (৫/৪৭৮-৪৮৫)। আর যখনই কোথাও ‘ইয়াদ’ (হাত) দ্বিবচনের শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তখন সেটা প্রকৃত হাত অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে, এর বাইরে কখনও ব্যবহৃত হয়নি। দেখুন, ইবনুল কাইয়্যেম, মুখতাসারুস সাওয়া’য়িক (২/১৫৫)। আর যখন তা ‘বা’ অব্যয় দিয়ে সমাপিকা ক্রিয়া হিসেবে ‘ইয়াদ’ বা হাতের সাথে সম্পৃক্ত হয় তখন সেটা দ্বারা কেবল নিজ হাতে সম্পন্ন করাই বুঝায়। দেখুন, ইবনুল কাইয়্যেম, মুখতাসারুস সাওয়া’য়িক (২/২৭০)।
ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘ইয়াদাইন’ শব্দটি দ্বি-বচনে নি‘আমত অর্থেও ব্যবহৃত হয়নি, ক্ষমতা অর্থেও ব্যবহৃত হয়নি। আর যা বলা হয় যে, একের জন্য দুই আর দু’য়ের জন্য এক ব্যবহৃত হওয়ার নিয়ম রয়েছে, সে কথার কোনো ভিত্তি নেই। কারণ এগুলো সংখ্যা, আর সংখ্যা তার অর্থ অতিক্রম করে না, নির্দিষ্ট করে শুধু তাই বুঝায়।
সুতরাং ]إِنَا خَلَقْتُ بِيَدَى﴾ [ص : ٧٥ “যা আমার দু’ হাত সৃষ্টি করেছে” [সূরা স্বদ: ৭৫] এর দ্বারা কোনোভাবেই কুদরত বা ক্ষমতা অর্থ করা যাবে না, কারণ কুদরত একটি গুণ, আর একটি গুণকে দুই সংখ্যা বাচক শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা কখনো বৈধ হয় না। অনুরূপভাবে এর দ্বারা ‘নি‘আমত’ অর্থও করা যায় না, কারণ আল্লাহর নি‘আমত অগণিত অসংখ্য। সুতরাং অগণিত অসংখ্য নি‘আমতকে দুই সংখ্যা বাচক শব্দ দিয়ে বুঝানো কখনো বৈধ হয় না। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, আর-রিসালাতুল মাদানিয়্যাহ, পৃ. ৬০-৬১।
আর যদি ধরে নেয়া হয় যে, ﴾مَا مَنْعَكَ أَن تَسْجُدَ لِمَا خَلَقْتُ بِيَدَيَّ﴿ এখান بِیّدَى দ্বি-বচন সূরা ইয়াসীনে আসা أَوْ لَمْ يَرَوْا أَنَّا خَلَقْنَا لَهُم مِّمَّا عَمِلَتْ أَيْدِينَا أَننا এর বহু বচনের মতই, তাহলে তো মু‘আত্ত্বিলা তথা নিষ্ক্রীয়কারীদের দ্বারা সূরা ইয়াসীনের আয়াত দ্বারা ‘হাত’ অস্বীকার করে সেটাকে আমল দ্বারা ব্যাখ্যা করার সুযোগ থাকে না। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, সূরা ইয়াসীনের এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা নিজেকে কাজ সম্পাদনকারীর গুণে গুণান্বিত করেছেন। কিন্তু এ রীতি অথবা এমন ব্যবহার কেবল তার জন্যই হতে পারে যার হাত রয়েছে। ‘কারণ যখন কেউ বলে يده الملك অর্থাৎ ‘তার হাতে যাবতীয় রাজত্ব’ অথবা عملته يداك ‘যা তোমার দু’হাত করেছে’ তখন এর দ্বারা দু’টি জিনিস বুঝানো হয়: এক. হাত সাব্যস্ত করা। দুই. কাজ তার দিকে সম্পৃক্ত করা। হ্যাঁ, দ্বিতীয়টিতে রূপক অর্থ অনেক সময় হয়, কিন্তু প্রথমটি কেবল তখনই ব্যবহৃত হয় যখন প্রকৃত অর্থেই তার হাত রয়েছে। তারা বলে না, বাতাসের হাত বা পানির হাত।
আচ্ছা ধরে নিলাম যে, (بيده الملك ‘যার হাতে আছে যাবতীয় রাজত্ব’ [সূরা আল-মুলক: ০১] এখানে ‘ইয়াদ’ দ্বারা কুদরত বা ক্ষমতা বুঝানো হয়েছে, কিন্তু সেটা কেবল তার জন্যই হতে পারে যার প্রকৃত হাত রয়েছে।’ ইবন তাইমিয়‍্যাহ, আর-রিসালাতুল মাদানিয়‍্যাহ, পৃ. ৬০-৬১; আরও দেখুন, আর-রিসালাতুত তাদমুরিয়‍্যাহ, পৃ. ৭৩-৭৬। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানার জন্য আরও দেখুন, শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়‍্যাহ, মাজমূ‘ ফাতাওয়া (৬/৩৬৩-৩৭৩); ইবনুল কাইয়্যেম, মুখতাসারুস সাওয়া’য়িক (২/১৫৩-১৭৪)।
৯৫৩. দেখুন, আবুল হাসান আল-আশ‘আরী, আল-ইবানাহ ‘আন উসৃলিদ দিয়ানাহ, পৃ. ১৫-৫৪।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 কুরআন ও সুন্নাহ এ দুটিই যথেষ্ট, মানুষের বক্তব্য বর্ণনার প্রয়োজন পড়ে না

📄 কুরআন ও সুন্নাহ এ দুটিই যথেষ্ট, মানুষের বক্তব্য বর্ণনার প্রয়োজন পড়ে না


কাযী আবু বকর আল-বাকেল্লানী, তিনি স্বীয় ‘আত-তামহীদ’ (১৬৫) গ্রন্থে এর চেয়েও অনেক বেশি আলোচনা করেছেন। (১০) কিন্তু কিতাবটির কপি আমার কাছে এখন নেই। (১৯৮৭) বস্তুত এ ব্যাপারে কালামপন্থীদের বক্তব্য খুঁজলে অনেক পাওয়া যাবে, যদিও আমরা কুরআন-সুন্নাহ এবং সালাফে সালেহীনদের বক্তব্যের পর অন্য কারো বক্তব্যের প্রয়োজন মুক্ত হয়ে যাই。
মোদ্দাকথা, বড় প্রাপ্তি হচ্ছে আল্লাহ কর্তৃক বান্দাকে এমন হিকমত ও ঈমান দান করা যাতে সে তার বিবেককে কাজে লাগাতে পারে ও দীনকে বুঝতে সক্ষম হবে। তারপর (এমন নেয়ামত প্রাপ্তির পর) কুরআন-সুন্নাহ’র আলো তাকে সকল কিছু থেকে অমুখাপেক্ষী করে দেয়। কিন্তু অনেক মানুষ কালামপন্থী কোনো না কোনো দলের সাথে সম্পর্কযুক্ত হয়ে গেছে এবং অন্য (সালাফ ও ইমাম)দের বাদ দিয়ে এসব কালামপন্থীদের প্রতিই তাদের সুধারণা পোষণ করে, আর এ অবাঞ্ছিত চিন্তা করে যে, এ বিষয়ে তারা যতটুকু সত্যে উপনীত হয়েছেন অন্যদের তা হয়নি। সুতরাং যদি কেউ সকল আয়াত বা নিদর্শন নিয়ে আসে তাহলেও তারা তা মানবে না, যতক্ষণ না কালামশাস্ত্রবিদদের থেকে কিছু আনা হয়।

টিকাঃ
৯৬৫. এ কিতাবটির নাম, ‘তামহীদুল আওয়ায়েল ফী তালখীসিদ দালায়িল’। ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, (যা সাফারীনী লাওয়ামি‘উল আনওয়ারের ১/১৯৮, ৪২০ পৃষ্ঠায় তার থেকে বর্ণনা করেছেন যে), “এটি কাযী আল-বাকেল্লানীর বিখ্যাত গ্রন্থ”। গ্রন্থটি তিনি আদ্বদুদ দৌলাহ এর সন্তানের অনুরূধে লিখেছিলেন বলে গ্রন্থের ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন। কিতাবটি বেশ কয়েকবার ছাপা হয়েছে। তন্মধ্যে বিখ্যাত ছাপাটি হচ্ছে যা ‘ইমাদুদ্দীন আহমাদ হাইদার’ এর তাহকীকে মুআসসাসাতুল কুতুবিস সাক্বাফিয়্যাহ, ১৪০7 সালে প্রথমবার ছাপা হয়েছিল, তখন সেটি ৫৬৭ পৃষ্ঠায় বের হয়েছিল। সাথে গ্রন্থকারের সংক্ষিপ্ত জীবনীও সংযুক্ত ছিল। দুর্ভাগ্যবশত এটি সবচেয়ে মারাত্মক খেয়ানতপূর্ণ ছাপা। কারণ তাহকীক করার নাম দিয়ে তিনি বিরাট অংশ বাদ দিয়ে বের করেছেন। কারণ সেখানে আল্লাহর গুণাবলি সাব্যস্ত করা হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ, তার সে খেয়ানত প্রকাশ হয়ে পড়ে, যখন প্রাচ্যবিদ পাদ্রী রিচার্ড যোসেফ মুকার্থী আল-ইয়াসূ‘য়ী তা পূর্ণরূপে বের করেছেন। এভাবেই আল্লাহ হক্ককে প্রকাশ করে দেন।
৯৬৬. দেখুন, আত-তামহীদ, পৃ. ২৯৫-২৯৯।
৯৬৭. তার এ বক্তব্যের মাধ্যমে বুঝা যায়, শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ কতবড় আমানতদার ছিলেন। তার কাছে যা নেই তা অনায়াসে বলে দিয়েছেন। সেজন্য সেটা তিনি নিয়ে আসেননি। আলহামদুলিল্লাহ এ গ্রন্থ থেকে বিস্তারিত বর্ণনা আমি আমার “রহমান ‘আরশের উপর উঠেছেন” গ্রন্থে নিয়ে এসেছি। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়‍্যার আমানতদারীর আরও কিছু নমুনা দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়‍্যাহ (১/১০৫); ইকতিদ্বা’উস সিরাত্বিল মুস্তাকীম (১/৭২, ৪২৪); আর-রাদ্দু আলাল বিকরী (২/৫৯০); আস-সাব‘ঈনিয়্যাহ, বুগইয়াতুল মুরতাদ, পৃ. ৩৪৯; ইস্তেকামাহ (১/৭২); জাওয়াবুল ই‘তিরাদ্বাতুল মিসরিয়‍্যাহ আলাল ‘ফুতইয়া আল-হামাওয়িয়‍্যাহ, পৃ. ১৭২; আল-ফাতাওয়াল কুবরা (১/১৬৬), (৬/৮৬); মাজমূ‘ ফাতাওয়া (৩/১৬৩), (৪/২৩৪), (৬/৪০৬, ৪২০), (১০/৭২৭), (২২/৪৫৭), (২৭/৪৫৫), (২৯/৩২৯), (৩৫/২২১)। তাছাড়াও আরও অনেক জায়গা। তাছাড়া আরও লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে এসবের অধিকাংশই তিনি নিজের হিফয থেকে মানুষদের কাছে বলেছেন তারা লিখে নিয়েছে। অনেক কিছু তিনি জেলখানায় লিখেছেন, সেখানে তার কাছে কোনো গ্রন্থও ছিল না, তারপরও আপনি প্রায় হুবহু কথা তার মুখ থেকে নিঃসৃত হয়েছে দেখে আশ্চর্য হবেন। যেমনটি বলেছেন তারই ছাত্র ইবন আব্দুল হাদী, আল-উদ্বুদুদ দুররিয়্যাহ, পৃ. ৩৭।
৯৬৮. ইবন তাইমিয়্যাহ সর্বদা মানুষদেরকে আল্লাহ তা‘আলার দিকেই নিজের অভাব ও নিঃস্ব অবস্থা তুলে ধরার অত্যাবশ্যকতা বর্ণনা করতেন। তিনি বলতেন, ‘বান্দা তার রব্ব আল্লাহর মুখাপেক্ষী হবে যাতে তিনি তাকে সঠিক পথের দিশা দেন, ভালো কাজগুলোর দিকে যাওয়ার ইঙ্গিত প্রদান করেন। তিনি বলেন, ‘হতে পারে কোনো মানুষ অনেক বেশি বুদ্ধিমান, প্রখর মেধার অধিকারী, কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা তাকে সবচেয়ে প্রকাশিত জিনিস থেকে অন্ধ করে রাখেন। আবার হতে পারে একজন মানুষ অনেক বোকা, দুর্বল দৃষ্টির অধিকারী কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা তাঁরই অনুমতিক্রমে মানুষের মাঝে যে বিষয়ে মতভেদ হয়েছে তাকে সে হকের সহজ দিশা প্রদান করেন। সুতরাং লা হাউলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লাবিল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোনো উপায় নেই, তিনি ব্যতীত কোনো ক্ষমতা নেই। তাই এটা স্পষ্টভাবে বলা যায়, যে কেউ নিজের দৃষ্টির ওপর নির্ভর করবে অথবা নিজের বিবেকের ওপর ভরসা করবে সে অবশ্যই অপমানিত ও লাঞ্ছিত হবে এবং হিদায়াত থেকে মাহরুম হয়ে যাবে।’ ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা‘আরুদ্বিল আক্কলি ওয়ান নাকলি (৯/৩৪)। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘সুতরাং আল্লাহ যার অন্তরকে আলোকিত করবেন তাকে এমন হিদায়াত দিবেন যা তাকে মঞ্জিলে মাকসুদে পৌঁছে দিবে। অন্যদিকে যাকে বা যার অন্তরকে অন্ধ করে দিবেন, অনেক গ্রন্থ তার হয়রানী ও পথভ্রষ্টতাই শুধু বাড়িয়ে দিবে।’ মাজমূ‘ ফাতাওয়া (১০/৬৬৫) (আল-ওয়াসিয়্যাতুস সুগরা)।
ইবন তাইমিয়্যাহ আরো বলেন, ‘দৃঢ়ভাবে সাব্যস্ত হক্ক কেউ বিশ্বাস করতে সমর্থ হলে সেটা তার মাঝে ধারণ করার ক্ষমতা, আয়ত্ব করার যোগ্যতা শক্তিশালী করে ও পরিশুদ্ধ করে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَالَّذِينَ اهْتَدَوْا زَادَهُمْ هُدَى [محمد : ۱۷] “আর যারা হিদায়াতপ্রাপ্ত হয়েছে তিনি তাদের হিদায়াত বাড়িয়ে দিবেন।” [সূরা মুহাম্মাদ: ১৭] আরও বলেন,
وَلَوْ أَنَّهُمْ فَعَلُوا مَا يُوعَظُونَ بِهِ لَكَانَ خَيْرًا لَّهُمْ وَأَشَدَّ تَثْبِيتًا * وَإِذَا لَا تَيْتَهُم مِّن لَّدُنَّا أَجْرًا عَظِيمًا وَلَهَدَيْتَهُمْ صِرَاطًا مُسْتَقِيمًا [النساء : ٦٦ - ٦٨] “যা করতে তাদেরকে উপদেশ দেয়া হয়েছিল তারা তা করলে তাদের ভাল হত এবং চিত্তস্থিরতায় তারা দৃঢ়তর হত। আর অবশ্যই তখন আমরা তাদেরকে আমাদের কাছ থেকে মহাপুরস্কার প্রদান করতাম এবং অবশ্যই আমরা তাদেরকে সরল পথে পরিচালিত করতাম।” [সূরা আন-নিসা: ৬৬-৬৮]’ দেখুন, মাজমূ‘ ফাতাওয়া (৪/১০)।
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ আরও বলেন, ‘যে কেউ যা জেনেছে তার ওপর আমল করবে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে যা জানেনি সে জ্ঞানের ওয়ারিস বানাবেন। সৎ উদ্দেশ্য ইলম অর্জন ও তা ধারণ করার ক্ষেত্রে বড় সহযোগী হিসেবে প্রমাণিত। শরী‘আতের জ্ঞান অর্জন করা সৎ উদ্দেশ্য ও সৎ আমলের জন্য বড় সহযোগী হিসেবে পরীক্ষিত। কারণ ইলম হচ্ছে কায়েদ (সম্মুখ পরিচালক) আর আমল হচ্ছে সায়েক (পিছনের দিক থেকে হাঁকিয়ে নেয়ার চালক)। আত্মা হচ্ছে একগুঁয়ে, সুতরাং যখন কায়েদ (সম্মুখ পরিচালক) কাজ করতে অলসতা করবে তখন সায়েক (পিছনের দিক থেকে হাঁকানো) ব্যক্তির পক্ষে কাজ করা সম্ভব হয় না, আর যখন সায়েক অলসতা করবে তখন কায়েদ সামনে এগুতে সক্ষম হবে না। যখন ইলম দুর্বল হবে পথচারী তখন বিভ্রাটে পড়বে, জানতে পারবে না কোন পথে চলবে, সর্বশেষ অবস্থা হবে তাকদীরের ওপর নিজের ডোর ছেড়ে দেয়া। আর যখন কেউ আমল ছেড়ে দেয় তখন পথচারী পথ হারিয়ে ভুল পথে পরিচালিত হবে, যদিও সে জানছে যে সে পথ হারিয়ে বসেছে। এভাবে ইলমে দুর্বল ব্যক্তি হতভম্ব ও হয়রান, জানে না কোন পথে চলবে, যদিও তার সামনে চলার পথ অনেক। আর আমল পরিত্যাগকারী ব্যক্তিও হতভম্ব ও হয়রান, পথ থেকে বিচ্যুত, তবে সে জানে যে সে পথ হারিয়ে বসেছে।’ মাজমু‘ ফাতাওয়া (১০/544)। আরও দেখুন, জামে‘উর রাসায়িল (২/১৮০); মাজমূ‘ ফাতাওয়া (১৩/২৪৫-২৪৬), (১৮/১৭৬)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00