📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 ইমাম আবুল হাসান আল-আশ‘আরীর বক্তব্য তার ‘আল-ইবানাহ’ গ্রন্থে

📄 ইমাম আবুল হাসান আল-আশ‘আরীর বক্তব্য তার ‘আল-ইবানাহ’ গ্রন্থে


আবুল হাসান আশ‘আরী তার রচিত গ্রন্থ, যার নাম তিনি দিয়েছেন, ‘আল-ইবানাহ ফী উসূলিদ দিয়ানাহ’(১০৪), যেটি সম্পর্কে তার ছাত্ররা বলেছেন যে, এটি তাঁর সর্বশেষ কিতাব, আর তাঁর প্রতি দোষারোপকারীদের প্রতিবাদে যে গ্রন্থের ওপর নির্ভর করা হয় সে কিতাবে তিনি বলেন:

টিকাঃ
৯৩৪. উপরে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়াহ'র ভাষ্য অনুযায়ী কিতাবটির নাম দেখানো হয়েছে, আল-ইবানাহ ফী উসুলিদ দিয়ানাহ। কিন্তু এ কিতাবটি কয়েকটি মুদ্রণে ‘আল-ইবানাহ ‘আন উসূলিদ দিয়ানাহ’ এভাবে ছাপা হয়েছে। যার কোনো কোনোটি তাহক্বীককৃত, আবার কোনো কোনোটি তাহক্বীক ছাড়াই। তন্মধ্যে বর্তমানে যেগুলো প্রসিদ্ধ তা হচ্ছে,
১- আল-ইবানাহ আন উসূলিদ দিয়ানাহ, তাহকীক ড. ফাওকীয়াহ বিনতে হুসাইন মাহমূদ, প্রথম ছাপা, ১৩৯৭ হিজরী, দারুল আনসার। এ ছাপার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তাতে একাধিক পাণ্ডুলিপির ওপর নির্ভর করা হয়েছে। আর তাতে ইমাম আবুল হাসান আল-আশআরীর ব্যাপারে ব্যাপক আলোচনা স্থান পেয়েছে। যদিও এ ছাপায় কিছু দৃষ্টি আকর্ষণীয় বিষয় আছে, আর তার বড়টি হচ্ছে, এমন একক নুসখাকে মূল ধরা হয়েছে যাতে বাড়তি অনেক কথা স্থান পেয়েছে যা অন্যান্য কপিগুলোতে নেই। আরেক সমস্যা হচ্ছে এ বাড়তি অংশ মূল কিতাবের অংশ হিসেবে প্রবিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। এসব বাড়তি কথার কোনো কোনো অংশ সালাফে সালেহীনের মানহাজ বিরোধী, যা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, তা কিতাবের মানহাজ পরিপন্থী। ড. আব্দুর রহমান সালেহ আলে মাহমূদ এ মুদ্রিত কপিটির দোষগুলো বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। দেখুন, মাওকাফু ইবন তাইমিয়্যাহ মিনাল আশা’য়িরাহ (১/৩৫২-৩৫৫)।
২- ড. সালেহ আল-উসাইমী, তিনি এ কিতাবটির সুন্দর তাহকীক করেছেন। এটি সবচেয়ে চমৎকার। এতে তিনি ড. ফাওকীয়ার তাহকীকের ভুলগুলো তুলে ধরেছেন। দেখুন, পৃ. ১২২-১৩৩।
৩- আরেকটি ছাপা যা ইমাম মুহাম্মাদ ইবন সা'উদ আল-ইসলামিয়্যাহ কর্তৃক ১৪০০ হিজরী সালে সম্পন্ন হয়েছে, যাতে কোনো তাহকীক বা টাকা নেই।
৪- আরেকটি ছাপা যা মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক মদীনার তৎকালীন শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস শাইখ হাম্মাদ আল-আনসারীর ভূমিকাসহ বের হয়েছে, এতেও কোনো তাহকীক বা টীকা নেই। বস্তুত এ কিতাবটির ব্যাপারে মানুষের বিতর্ক চরমে। কারণ এ কিতাবের বক্তব্য পরবর্তী আশ‘আরী মতবাদের লোকদের আকীদাহ-বিশ্বাস পরিপন্থী। বিশেষ সিফাতে খাবরিয়‍্যাহ তথা আল্লাহর কুরআন ও রাসূলের হাদীসে আসা সিফাতের ব্যাপারে ইমাম আশ‘আরীর এ কিতাবের বক্তব্য পরবর্তী আশ‘আরী মতবাদের লোকদের নীতির সরাসরি বিরোধী। কারণ এ কিতাবে তাদের নীতির বাইরে আল্লাহর জন্য সত্তাগত সর্বোচ্চ সত্তা হওয়া এবং ‘আরশের উপরে উঠা সাব্যস্ত করার পাশাপাশি প্রায় সকল সিফাতে যাতিয়্যাহ ও সিফাতে ফিলিয়্যাহ সাব্যস্ত করা হয়েছে।
আল-ইবানাহ ও ইমাম আশ‘আরী: এ কিতাবটি যে ইমাম আবুল হাসান আল-আশ‘আরীর রচনা এ ব্যাপারে প্রাচীনকালের আশঙ্খারী মতবাদের কারও দ্বিমত ছিল না। যারা যারা এ কিতাবটি ইমাম আবুল হাসান আল-আশ‘আরীর বলে উল্লেখ করেছেন, তারা হচ্ছেন, ১- ইমাম বাইহাক্কী, আল-ই‘তিক্বাদ, পৃ. ১০৮। ২- আৰু ‘উসমান আস-সাবুনী, যেমনটি বর্ণনা করেছেন ইবন আসাকির, তাবয়ীনু কাযিবিল মুফতারী, পৃ. ৬৭৮; আরও দেখুন, ইবন রাজাব, ফাতহুল বারী (৫/১০২)। ৩- ইবন আসাকির, তাবঈনি কাযিবিল মুফতারী, পৃ. ৩৮৮-৩৮৯। ৪- আল-বাকেল্লানী, শারহুল ইবানাহ। এটি মূলত ইমাম আবুল হাসান আল-আশ‘আরীর গ্রন্থের ব্যাখ্যা। ৫- ইবন ফারহূন, আদ-দীবাজুল মুযাহহাব, পৃ. ১৯৩। ৬- ইবনুল ‘ইমাদ, শাযরাতুয যাহাব (২/৩০৩)। আর বলেছেন এটি তার সর্বশেষ কিতাব। ৭- আবুল কাসেম আব্দুল মালেক ইবন ‘ঈসা ইবন দারবাস আশ-শাফেয়ী, আয-যাব্বু আন আবিল হাসান আশ‘আরী। ৮- আবু আলী আল-হাসান ইবন আলী ইবন ইবরাহীম আল-ফারেসী। ৯- শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, তিনি এ কিতাবের ব্যাপারে অনেক গুরুত্ব দিতেন। এজন্য এ কিতাব থেকে তিনি বহু অধ্যায় নিজের অনেক কিতাবে নিয়ে এসেছেন। যেমন, দারউত তা‘আরুদ্ব (২/১৬), (৫/৬), (৭/১০৩), (১০/২৬২)। বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/৪২০), (২/১৫, ২৭, ৩৩৪, ৩৪৮, ৩৯৭)। মাজমূ‘ ফাতাওয়া (৩/১২, ২০৫), (৫/১৪৪, ১৮৬, ১৮৮), (৬/৫২), (১২/২০৩, ৩৬৩), (১৩/১৭৪), (১৬/৯১)।
১০- ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা‘উল জুয়ূশ পৃ. ২৮৬; আস-সাওয়ায়িকুল মুরসালাহ (৪/১২৪৩)।
১১- ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা (১৫/৯০); আল-আরশ ১৯২, ১৯৫, ১৯৭; যাহাবী, আল-‘উলু লিল ‘আলিয়িয়ল ‘আযীম (২/১২৪৫), নং ৪৯৮। তিনি আরও বর্ণনা করেছেন যে, ইমাম নাওয়াওয়ী স্বহস্তে তার পাণ্ডুলিপি লিখেছেন।
১২- ইবন কাসীর, ত্বাবাক্বাতুল ফুকাহা আশাফে‘ইয়‍্যাহ (১/২০৫), জীবনী নং ৯৩। সেখানে তিনি এটাও বর্ণনা করেছেন যে, ইমাম আবুল হাসান আল-আশ‘আরীর জীবনের তিনটি স্তর ছিল। সর্বশেষ স্তরে এসে তিনি এ গ্রন্থটি লিখেছেন।
১৩- ইবন আব্দুল হাদী আল-মাক্কদেসী, আল-কালামু আলা মাসআলাতিল ইস্তিওয়া আলাল ‘আরশি, পৃ. ৭৩।
১৪- সাফাদী, আল-ওয়াফী বিল ওফায়াত (১২/১১), (১৯/১১৭)।
১৫- তাজউদ্দীন আস-সুবুকী, ত্বাবাক্বাতুশ শাফে‘ঈয়্যাহ আল-কুবরা (১/১৩৩)।
১৬- ইবন রাজাব, ফাতহুল বারী (৫/১০২)।
১৭- ইবনু হাজার, লিসানুল মীযান (৪/৪৮৭)।
১৮- মার‘ঈ ইবন ইউসুফ আল-কারামী, আক্বাওয়ীলুস সিক্কাত, পৃ. ১৪৫।
১৯- সাফারীনী, লাওয়ামি‘উল আনওয়ার আল-বাহিয়‍্যাহ ১/২২, ৬৭, ১৯৭, ২৪০।
২০- আস-সাইয়্যেদ মুরতাদ্বা আয- যাবীদী, ইতহাফুস সাদাতিল মুত্তাকীন (২/৩-৪) (দারুল ফিকর)।
২১- খাইরুদ্দীন আল-আলুসী, জালাউল ‘আইনাইন, পৃ. ২৪৭, ২৫২।
সর্বোপরি এ কিতাবের রয়েছে অনেক পাণ্ডুলিপি। সকলেই কিতাবটিকে ইমাম আবুল হাসান আল-আশ‘আরীর বলে দাবি করেছেন। আর যারা সেসব কিতাবের পাণ্ডুলিপি লিখেছেন তারা বিখ্যাত আলেমে দীন ও মুসান্নিফীনে কুতুবে দীন। তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন ইমাম নাওয়াওয়ী। যা এর সত্যতার একটি বড় প্রমাণ।
বরং ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রাহিমাহুল্লাহ ইমাম আবুল হাসান আশ‘আরী রাহিমাহুল্লাহ’র ছাত্রদের এ ব্যাপারে ঐক্য বর্ণনা করেছেন যে, আল-ইবানাহ ইমাম আশ‘আরীর রচিত গ্রন্থ। দেখুন, আহকামু আহলিয যিম্মাহ (২/১১৩৮)।
এত দলীল-প্রমাণের পরও বর্তমান সময়ের কোনো কোনো লেখককে দেখা যায় প্রাচ্যবিদ কারও কারও দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এ কিতাবকে ইমাম আবুল হাসান আল-আশ‘আরীর দিকে সম্পৃক্ত করতে সন্দেহ প্রকাশ করতে। তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ড. আব্দুর রহমান বাদাওয়ী, মাযাহিবুল ইসলামিয়‍্যীন (১/৫১৭-৫১৮)। অনুরূপ প্রাচ্যবিদদের মধ্যে প্রাচ্যবিদ মুকার্থী, আলার। আর যাহেদ কাউসারী তথা পরবর্তী আশ‘আরীদের মত হচ্ছে ইমাম আশ‘আরী এ গ্রন্থটি হাম্বলীদের খুশি করার জন্য লিখেছেন। কারণ তিনি বাগদাদে প্রবেশ করে ইমাম বারবাহারীর মজলিসে বসার পর যখন বললেন যে, তিনি জাহমিয়্যাহ, মু‘তাযিলা প্রমুখদের বিরুদ্ধে রদ্দ করেছেন, তখন বারবাহারী বললেন, আমি তো এসব কিছুকে কোনো কাজই মনে করছি না, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য এগুলো বড় কাজ নয়। বিশুদ্ধ আকীদাহ ও সুন্নাহ’র প্রসারে কাজ যা হবে সেটাই কাজ। তখন নাকি ইমাম আশ‘আরী সেখানকার হাম্বলীদের খুশি করার জন্য এটা লিখেছিলেন।
না’ঊযুবিল্লাহ, ‘তা’আস্সুব’ বা গোঁড়ামী মানুষকে কত অন্ধ করে দেখুন, তারা তাদের ইমামকে মুনাফিক বানিয়ে ছাড়লো। তারপরও ইমামের কাছে থাকা হক্ক গ্রহণ করতে রাযী হলো না। এভাবেই শয়তান তার অনুসারীদের নিয়ে খেলা করে থাকে। আমরা বিশ্বাস করি যে, নিশ্চয় ইমাম আশ‘আরী হক্ক বুঝেই এ কিতাব রচনা করেছেন, কোনো কপটতা করার জন্য নয়। আল্লাহ এসব গোঁড়াদেরকে হিদায়াত দিন।
এর বিপরীতে এ কিতাবের প্রশংসা যারা করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন, ১- ইমাম বাইহাক্বী রাহিমাহুল্লাহ্ ২- ইমাম ইবন আসাকির রাহিমাহুল্লাহ। ৩- অনুরূপ ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ।
তিনি যখন আশ‘আরী মতবাদের লোকদের আলোচনা করছিলেন তখন বলেন, “আর আশ‘আরীদের মধ্যে যারা বলে যে, ‘আল-ইবানাহ’ কিতাবটি ইমাম আশ‘আরী জীবনের শেষাংশে লিখেছেন, আর তার কাছ থেকে এর বিপরীত কিছু এর পর প্রকাশ পায়নি, তাকে আহলুস সুন্নাহ এর অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য করা হবে।” মাজমু' ফাতাওয়া (৬/৩৫৯)। ৪- তদ্রূপ ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রাহিমাহুল্লাহ। তিনি ইমাম আশ‘আরীর কিছু বাণী উদ্ধৃত করার পর বলেন, “এ হচ্ছে তার ভাষ্য, যা তার সবচেয়ে সম্মানিত কিতাবে ও বড় কিতাবে এসেছে, যা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত বর্ণনায়, আর তা তার থেকে প্রসিদ্ধ, যা ‘আল-ইবানাহ’ নামে প্রসিদ্ধ। যার ওপর নির্ভর করেছেন তার ব্যাপারে বেশি জ্ঞানী, তার থেকে প্রতিরোধকারী আহলুল হাদীস আলেম ইমাম আবুল কাসেম ইবন আসাকির। কারণ ইবন আসাকির তার ‘তাবয়ীনি কাযিবিল মুফতারী’ গ্রন্থে এ কিতাবের ওপর নির্ভর করেছেন এবং এ কিতাবকে ইমাম আশ‘আরীর বড় মর্যাদার বিষয় বলে বর্ণনা করেছেন।” ইবনুল কাইয়্যেম, আস-সাওয়া’য়িকুল মুরসালাহ (৪/১২৮১-১২৮২)।
৫- ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ। তিনি বলেন, “যদি আমাদের মুতাকাল্লিম ভাইয়েরা (আশ‘আরীদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন) তারা যদি আবুল হাসান এর এ মতগুলোই সর্বশেষ মত হিসেবে গ্রহণ করতো আর সেগুলোকে আবশ্যকভাবে গ্রহণ করতো, তবে তারা তো অবশ্যই ভালো কাজটিই করতো।” যাহাবী, আল-‘উলু লিল ‘আলিয়্যিল ‘আযীম (২/১২৫৫)।
৬- অনুরূপ ইমাম ইবন রাজাব রাহিমাহুল্লাহ। তিনি বলেন, “...আর তার কিতাব, যার নাম আল-ইবানাহ, এটি তার মর্যাদাপূর্ণ কিতাবের অন্তর্ভুক্ত। তার ওপরই আলেমগণ তার মতামত বর্ণনার ব্যাপারে নির্ভর করে থাকে এবং তা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে থাকেন। যেমন বাইহাকী, আবু উসমান আস-সাবুনী, আবুল কাসেম ইবন আসাকির প্রমুখ। আর এ কিতাবটির ব্যাখ্যাই করেছেন কাযী আবু বকর ইবনুল বাকেল্লানী।” ইবন রাজাব, ফাতহুল বারী (৫/১০২)।
তাছাড়া প্রখ্যাত আলেমগণের অনেকে স্পষ্ট করে ঘোষণা করেছেন যে, এ ‘আল-ইবানাহ’ কিতাবটি ইমাম আশ‘আরী তার শেষ জীবনে সর্বশেষ কাজ হিসেবে করেছেন, যেমন, ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/১৩৬); ইবনুল ‘ইমাদ, শাযরাতুয যাহাব (৪/১৩১); ইবন কাসীর, তাবাক্বাতুল ফুক্বাহাউশ শাফে’য়ি‍্যীন (১/২০৫); নু’আন খাইরুদ্দীন আল-আলুসী, জালাউল ‘আইনাইন, পৃ. ৪৬২ প্রমুখ।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 পরিচ্ছেদে: আহলে হক ও আহলুস সুন্নাহ’র বক্তব্য স্পষ্টকরণ:

📄 পরিচ্ছেদে: আহলে হক ও আহলুস সুন্নাহ’র বক্তব্য স্পষ্টকরণ:


যদি কেউ বলে যে, তোমরা মু‘তাযিলা, ক্বাদারিয়া), জাহমিয়্যাহ, হারুরিয়া, রাফেযী, মুরজিয়াদের কথা অস্বীকার করে থাক তাহলে তোমরা যা বলো এবং তোমরা যে দীন অনুসরণ করো তা আমাদের জানিয়ে দাও।

টিকাঃ
৯৩৫. কাদারিয়‍্যাহ বলতে সাধারণত তাদেরকে বুঝায়, যারা বিশ্বাস করে যে, বান্দা নিজের কর্ম নিজে সৃষ্টি করে থাকে। আর তারা মূলত মু‘তাযিলা নামে খ্যাত। তাদেরকে কখনও কখনও কাদারিয়‍্যাহ-মু‘তাযিলা নামে একসাথেও বলা হয়। কিন্তু যখন কেউ বলে মু‘তাযিলা ও কাদারিয়‍্যাহ তখন সেখানে কাদারিয়‍্যাহ শব্দ দিয়ে জাবরিয়াদের বুঝানো হয়। যারা বান্দার কোনো কাজের ক্ষমতা স্বীকার করে না।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 ইমাম আশ‘আরী কর্তৃক ইমাম আহমাদ এর আকীদাহ ধারণ করার স্পষ্ট ঘোষণা

📄 ইমাম আশ‘আরী কর্তৃক ইমাম আহমাদ এর আকীদাহ ধারণ করার স্পষ্ট ঘোষণা


তাহলে তাকে বলা হবে, আমরা যে কথা বলি এবং আমরা যে দীন অনুসরণ করি তা হলো আমরা ধারণ করি যা আমাদের প্রভুর বাণী, নবীর সুন্নত, আর যা সাহাবী, তাবে‘য়ী ও হাদীসের ইমামদের থেকে বর্ণিত হয়ে এসেছে, আমরা তা শক্তভাবে আঁকড়ে ধরি। আর যা ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (আল্লাহ তার চেহারা উজ্জ্বল করুন, মর্যাদা উন্নত করুন) বলেছেন আমরাও তাই বলি। তার কথার বিপরীত যাদের কথা হবে আমরা তাদের বিরোধিতা করি। কেননা তিনি হচ্ছেন শ্রেষ্ঠ ইমাম, পরিপূর্ণ নেতা, যার মাধ্যমে আল্লাহ সত্যকে প্রস্ফুটিত করেছেন এবং ভ্রষ্টতাকে তুলে দিয়েছেন, মানহাজ তথা পথ-পন্থাকে প্রকাশ করে দিয়েছেন। তাঁর মাধ্যমে বিদ‘আতীদের বিদ‘আত, বক্রপথ অবলম্বনকারীদের বক্রতা, সংশয়ীদের সংশয় উপড়ে ফেলেছেন। তাই আল্লাহর রহমত সেই অগ্র নেতা মহা সম্মানিত, মহান ব্যক্তি, বড় সমঝদার ব্যক্তির ওপর আপতিত হোক。
মোটকথা, আমরা স্বীকার করি আল্লাহকে, তাঁর ফিরিশতাদেরকে, তার কিতাবসমূহকে, তাঁর রাসূলগণকে, আর তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে যা নিয়ে এসেছিলেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে নির্ভরযোগ্য সূত্রে যা বর্ণিত হয়েছে সেগুলোকে। তার কোনোটাই আমরা প্রত্যাখ্যান করি না। নিশ্চয় আল্লাহ এক, তিনি ব্যতীত সত্য কোনো ইলাহ নেই। তিনি অদ্বিতীয়, অমুখাপেক্ষী। গ্রহণ করেননি স্ত্রী ও সন্তান। নিশ্চয় মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল। তাকে তিনি হিদায়াত ও দীন সহ প্রেরণ করেছেন সকল দীনের ওপর বিজয়ী করার জন্য। নিশ্চয় জান্নাত ও জাহান্নাম সত্য। কিয়ামত ঘটবে, কবরস্থকে আল্লাহ পুনরুত্থিত করবেন。
নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর ‘আরশের উপরে সমুন্নত হয়ে আছেন। যেমনটি তিনি বলেন, الرَّحْنُ عَلَى الْعَرْشِ أَسْتَوَى “রহমান ‘আরশের উপর উঠেছেন।” [সূরা ত্বা-হা: ০৫] তাঁর রয়েছে চেহারা, যেমন তিনি বলেন, وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ والإكرام "আর অবিনশ্বর শুধু আপনার রবের (সত্তাসহ) চেহারা, যিনি মহিমাময়, মহানুভব।" [সূরা আর-রহমান: ২৭] তাঁর রয়েছে ধরণ অজানা দুটি হাত। যেমনটি তিনি বলেছেন, بَلْ يَدَاهُ مَبْسُوطَنَانِ يُنفِقُ كَيْفَ يَشَاءُ "বরং আল্লাহর উভয় হাতই প্রসারিত; যেভাবে ইচ্ছা তিনি দান করেন।" [সূরা আল-মায়েদাহ: ৬৪] আর তাঁর রয়েছে দুটি চোখ, যেগুলোর ধরণ অজানা। যেমন তিনি বলেন, تجْرِي بِأَعْيُنِنَا "সে জাহাজ চলত আমাদের চোখের সামনে।" [সূরা আল-ক্বামার: ১৪] আর আমরা আরও স্বীকার করি যে, ‘যে ধারণা করবে যে, আল্লাহর নাম তিনি ভিন্ন অন্য কিছু, সে তো পথভ্রষ্ট।” আর তিনি [আশ‘আরী] ফিরাকের বর্ণনায় যা বলেছেন, (মাকালাতুল ইসলামিয়‍্যীন গ্রন্থে) সেটার মতো এখানেও উল্লেখ করেন। তারপর বলেন, নিশ্চয় ইসলাম ঈমান থেকে প্রশস্ত। কাজেই প্রত্যেক ইসলাম ঈমান নয়। (১০৭) আর আমরা দীন হিসাবে বিশ্বাস করি যে, নিশ্চয় আল্লাহ কলবসমূহকে উলটপালট করেন, যা মহান আল্লাহর আঙ্গুলসমূহের দু’ আঙুলের মাঝে রয়েছে。
আরও বিশ্বাস করি যে, নিশ্চয় মহান আল্লাহ, তিনি এক আঙ্গুলের উপর আসমানকে রাখবেন আর যমীনসমূহকে অপর আঙ্গুলের উপর রাখবেন। যেমনটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সহীহ বর্ণনায় এসেছে。
শেষে [আশ‘আরী] বলেন, নিশ্চয় ঈমান হচ্ছে কথা ও কাজের নাম। তা বাড়ে ও কমে। আর নির্ভরযোগ্য সূত্রে ন্যায়পরায়ণ থেকে ন্যায়পরায়ণের মাধ্যম হয়ে সর্বশেষ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত গিয়ে শেষ হওয়া সকল বিশুদ্ধ হাদীস ও আছারসমূহ আমরা মেনে নিই。
শেষে বলেন, আর আমরা হাদীস বর্ণনাকারীদের দ্বারা সুসাব্যস্ত করা যাবতীয় বর্ণনাসমূহকে সত্য বলে মেনে নিই, যাতে আল্লাহ কর্তৃক দুনিয়ার আসমানে নেমে আসাকে সাব্যস্ত করা হয়েছে। আর মহান রব বলতে থাকেন, ‘কোনো যাঞ্চাকারী আছে কী? কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছে কী?’ অনুরূপ যাবতীয় বিষয় যা তারা বর্ণনা দ্বারা নিয়ে এসেছেন এবং সাব্যস্ত করেছেন, যা বক্রপথ অবলম্বনকারী ও ভ্রষ্টপথের অনুসারীদের পদ্ধতির বিপরীত。
আর আমাদের নিজেদের মাঝে মতানৈক্য হলে আমাদের রবের কিতাব কুরআন, আমাদের নবীর সুন্নাহ, মুসলিমদের ইজমা‘, আর যা এর মত রয়েছে সেগুলোর দিকে প্রত্যাবর্তন করি। দীনের মধ্যে কোনো বিদ‘আতের প্রচলন করি না, যা করার জন্য তিনি আমাদের অনুমতি দেননি। আর আমরা যা জানি না তা আল্লাহর ব্যাপারে বলি না।
আর আমরা বলি যে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন আল্লাহ (হাশরের মাঠে) আসবেন। যেমনটি তিনি বলেছেন, "وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا ﴾ [الفجر: ২২] "এবং যখন আপনার রব আগমন করবেন আর সারিবদ্ধভাবে ফিরিশতাগণও (উপস্থিত হবে)।" [সূরা আল-ফাজর: ২২] আর আল্লাহ যেমন চান তেমনিভাবে তিনি তাঁর বান্দাদের নিকটবর্তী হন।
যেমনটি তিনি বলেছেন, "وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ [ق: ১৬] "আর আমরা তার গ্রীবাস্থিত ধমনী থেকেও অধিক নিকটবর্তী।" [সূরা, ক্বাফ: ১৬] আরও যেমন বলেছেন, "ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّى فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى ﴾ [আন-নাজম: ৯,৮] "তারপর তিনি তার কাছাকাছি হলেন, অতঃপর খুব কাছাকাছি, ফলে তাদের মধ্যে দু’ ধনুকের ব্যবধান রইল অথবা তারও কম।" [সূরা আন-নাজম: ৯-৮] অতঃপর তিনি বলেন, আমরা আমাদের যে কথা উল্লেখ করেছি, আর যা উল্লেখ করিনি, অবশিষ্ট রয়েছে, সে সবের একটি একটি করে দলীলসহ উল্লেখ করব। অতঃপর তিনি এ বিষয়ে আলোচনা করেন যে, আল্লাহকে দেখা যাবে, সেটার ওপর প্রমাণও পেশ করেছেন। তারপর তিনি এ বিষয়ে আলোচনা করেন যে, কুরআন সৃষ্ট নয়, সেটার ওপর দলীলও পেশ করেন। তারপর যে কেউ কুরআন নিয়ে কথা বলা থেকে বিরত থাকে এবং বলে আমি সেটাকে মাখলুক বা সৃষ্টও বলি না, অসৃষ্টও বলি না, সে ব্যক্তির বিষয়ে তিনি আলোচনা করেন এবং তার বক্তব্য খণ্ডন করেন।

টিকাঃ
৯৩৬. ইসলাম ও ঈমান বিষয়ক মাসআলা, আর এ দু’টি কি একটি অপরটির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে? আবু জা‘ফর মুহাম্মাদ ইবন আলী আল-বাকের রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘এ হচ্ছে ইসলাম, তারপর তিনি একটি বড় বৃত্ত আঁকলেন। তারপর তিনি সে বড় বৃত্তের মাঝখানে ছোট্ট একটি বৃত্ত এঁকে বললেন, এ হচ্ছে ঈমান। বস্তুত ইসলাম ও ঈমান এ দু’টির মাঝে ব্যাপকতা ও বিশেষতার সম্পর্ক। বলা হয়ে থাকে, যখন এ দুটি একসাথ হয় তখনই তা ভিন্ন ভিন্ন অর্থ দিতে আরম্ভ করে, আর যখন আলাদা থাকে তখন একটি অপরটির সমার্থে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ যখন কোথাও ইসলামের সাথে ঈমান ব্যবহৃত হয় তখন ঈমান বলতে বুঝাবে কেবল সেসব আমল যা অন্তরের সাথে সম্পৃক্ত হয় যেমন আল্লাহর ওপর ঈমান, ফিরিশিতাদের ওপর ঈমান, কিতাবের ওপর ঈমান, রাসূলগণের ওপর ঈমান, আখেরাতের ওপর ঈমান, শেষ দিবসের ওপর ঈমান, তাক্বদীরের ওপর ঈমান। আর তখন ইসলাম বলতে বুঝাবে প্রকাশ্য আমলসমূহ, কালেমা তাইয়্যেবার শাহাদাত, কালেমায়ে রিসালাতের শাহাদাত, সালাত, যাকাত, সাওম, হজ ইত্যাদি। এ বিস্তারিত অবস্থানটিই আমরা হাদীসে জিবরীল নামে খ্যাত রাসূলের মুখ নিঃসৃত বাণীতে পার্থক্য হিসেবে দেখতে পাই। যখন জিবরীল ‘আলাইহিস সালাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইসলাম, ঈমান ও ইহসান সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন। হাদীসটি দেখুন, বুখারী, আল-জামে‘উস সহীহ, হাদীস নং (১/১১৪), নং ৫০; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ৮। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরীলের হাদীসে ইসলাম কাকে বলা হবে, ঈমান কাকে বলা হবে আর ইহসান কাকে বলা হবে এগুলোর মধ্যে পার্থক্য করেছেন। বরং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম দীনের তিনটি স্তর নির্ধারণ করেছেন, সর্বোচ্চ স্তর ইহসান, মধ্যম স্তর ঈমান, আর তার পরে হচ্ছে ইসলাম। সুতরাং প্রত্যেক মুহসিন অবশ্যই মুমিন, আর প্রত্যেক মুমিন অবশ্যই মুসলিম, কিন্তু প্রত্যেক মুমিন ব্যক্তি মুহসিন নয়, অনুরূপ প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তি মুমিন নাও হতে পারে। তবে এ পার্থক্য দ্বারা এটা আবশ্যক হয় না যে, তার একটি অপরটি থেকে সম্পূর্ণভাবে পৃথক হয়ে যাবে。
তারপর ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, ইহসান স্বয়ং ব্যাপক বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত হলেও ব্যক্তিদের দিক থেকে ঈমানের চেয়ে বিশেষায়িত। অনুরূপ ঈমান স্বয়ং ব্যাপক বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত হলেও ব্যক্তিদের দিক থেকে ইসলামের চেয়ে বিশেষায়িত। সুতরাং ইহসানের অভ্যন্তরে ঈমান প্রবেশ করবে, আর ঈমানের অভ্যন্তরে ইসলাম প্রবেশ করবে। কিন্তু মুহসিনগণ মুমিনগণের তুলনায় বিশেষায়িত, আর মুমিনগণ মুসলিমগণের তুলনায় বিশেষায়িত। দেখুন, ঈমান, পৃ. ১-৭; ২৪৩, ৩০২, ৩৫০।
এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন, শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, আল-ঈমান, পৃ. ১-১০, ১৫৩-১৬৩, ২৪৬ ও তৎপরবর্তী, ইবন আবিল ইযা, শারহুত ত্বাহাওয়িয়্যাহ (২/৪৮৮-৪৯৪)।
৯৩৭. ‘প্রতিটি ইসলাম ঈমান নয়’ এ কথাটির অর্থ ইসলাম বিভিন্ন কারণে কোনো মানুষের জন্য ব্যবহার করা যায়, যা ঈমানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। যেমন এক প্রকার ইসলাম হচ্ছে তা যার ওপর সাওয়াব হয়, যার কারণে কুফরী ও নিফাক্বী থেকে বের হয়ে যায়, যেমন বেদুঈনদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, “বেদুঈনরা বলে, ‘আমরা ঈমান আনলাম’। বলুন, ‘তোমরা ঈমান আননি, বরং তোমরা বল, ‘আমরা আত্মসমর্পণ করেছি’, কারণ ঈমান এখনো তোমাদের অন্তরে প্রবেশ করেনি। আর যদি তোমরা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর তবে তিনি তোমাদের আমলসমূহের সাওয়াব সামান্য পরিমাণও লাঘব করবেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’।” [সূরা আল-হুজুরাত: ১৪] আরেক প্রকার ইসলাম আছে যাতে কেউ মৃত্যু থেকে বেঁচে যায়, যেমন মুনাফিকদের ইসলামের পরিচয়। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, আল-ঈমান, পৃ. ৩৩২, ৩৪২, ৩৯৭।
৯৩৮. ইমাম আশ‘আরী রাহিমাহুল্লাহ এখানে আল্লাহ কর্তৃক বান্দার নৈকট্য লাভের বিষয়টিকে ব্যাপক হিসেবে নিয়েছেন। বিশুদ্ধ কথা হচ্ছে, আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য বিশেষ গুণ। সেটা ‘সাথে থাকা’র মত ব্যাপক গুণ নয়। এ মাসআলাটি ইতোপূর্বে বর্ণিত হয়েছে।
৯৩৯. আমরা পূর্বে এ আয়াতের আলোচনায় জানিয়েছি যে, প্রাধান্যপ্রাপ্ত মতে এখানে ‘ফিরিশতাদের’ বুঝানো হয়েছে। এখানে আল্লাহকে বুঝানো হয়নি। এ বিষয়ে আরও দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৬/৩০)।
৯৪০. সম্ভবত ইমাম আশ‘আরী রাহিমাহুল্লাহ এখানে ‘দুনুও’ বা নিকটে হওয়া দ্বারা আল্লাহ কর্তৃক তাঁর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটবর্তী হওয়া বুঝেছেন, যা ইবন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমা ও মুকাতিল ইবন সুলাইমান থেকে একটি বর্ণনায় এসেছে। দেখুন, ইবন জারীর আত-তাবারী, জামেউল বায়ান ‘আন তা’ওয়ীলে আয়িল কুরআন (২২/৫০২); ইবনুল জাওযী, যাদুল মাসীর (৮/৬৫-৬৬); কুরতুবী, আল-জামে‘ লি আহকামিল কুরআন (১৭/৮৯); সুয়ূত্বী, আদ-দুররুল মানসূর (৭/৬৪৫)।
কিন্তু এ আয়াতের তাফসীরে বিশুদ্ধ মত হচ্ছে, এখানে জিবরীল ‘আলাইহিস সালাম কর্তৃক মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটবর্তী হওয়াকে বুঝানো হয়েছে। আর এটিই অধিকাংশ সাহাবী, তাবে‘য়ী যেমন কাতাদাহ, হাসান আল-বসরী, রবী ইবন আনাস প্রমুখের মত। ইবন আতিয়্যাহ আল- আন্দালুসী বলেন, এটিই অধিকাংশের মত। দেখুন, আল-মুহাররার আল-ওয়াজীয় (১৪/৮৯-৯০)। ইবন কাসীর বলেন, ‘এখানে নিকটে হওয়া দ্বারা জিবরীলকে বুঝানো হয়েছে। যেমনটি বুখারী ও মুসলিমে সাব্যস্ত হয়েছে। [বুখারী, আল-জামে‘উস সহীহ, হাদীস নং ৩২৩৫, ৪৮৫৬; মুসলিম, আস- সহীহ, হাদীস নং ১৭৪, ১৭৭] আর তা উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা, ইবন মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু, থেকে বর্ণিত। তাছাড়া তা সহীহ মুসলিমে আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত। [মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ১৭৫] আর সাহাবায়ে কিরামের মধ্য থেকে এ আয়াতকে এ হাদীস দ্বারা তাফসীর করার ব্যাপারে কোনো বিরোধিতা পাওয়া যায়নি, তাই সেটাই প্রাধান্য পাবে।’ ইবন কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম (৫/৮)।
অন্যত্র ইবন কাসীর বলেন, মুফাসসিরগণের মতামত থেকে বিশুদ্ধটি হচ্ছে, বরং অকাট্যভাবে এটাই বলা হবে যে, এ আয়াতে যাকে নিকটে আসা বুঝানো হয়েছে তিনি জিবরীল ‘আলাইহিস সালাম। যেমনটি বুখারী ও মুসলিম তাদের সহীহ গ্রন্থে আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করেছেন, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘এ হচ্ছে জিবরীল।’ সুতরাং এ হাদীস সকল বাদানুবাদের পথ বন্ধ করে দিয়েছে, আর সংশয় দূর করে দিয়েছে।’ ইবন কাসীর, আল-ফুসূল ফী সীরাতির রাসূল, পৃ. ২৬১। আর এখানে ইবন কাসীর রাহিমাহুল্লাহ যে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ‘তা ইমাম মুসলিমের বর্ণিত শব্দ। দেখুন, মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ১৭৭। এজন্য আমাদের উস্তাদগণের উস্তাদ শাইখ মুহাম্মাদ আল-আমীন আশ-শানক্কীত্বী বলেন, ‘তিনি হচ্ছেন জিবরীল এটাই তাহকীকী কথা, মহান আল্লাহ নন।’ দেখুন, আশ-শানকীত্বী, আদ্বওয়াউল বায়ান (৩/১০)।
এখানে একটি বিষয়ে সাবধান করা দরকার, তা হচ্ছে, সূরা আন-নাজম এর এ আয়াতে বর্ণিত ‘দুনুও’ ও ‘তাদাল্লী’ বা ‘নিকটে আসা ও কাছে আসা’ এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক ইসরা ও মি‘রাজের রাত্রির ব্যাপারে বর্ণিত ‘দুনুও’ ও ‘তাদাল্লী’ এক নয়। কারণ সূরা আন- নাজম এর আয়াতে জিবরীল কর্তৃক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে আসা ও কাছে থাকা বুঝানো হয়েছে, যেমনটি আয়েশা ও ইবন মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহুম ‘আনহা বলেছেন, আর আয়াতের পূর্বাপর বিশ্লেষণ তার ওপরই প্রমাণবহ। কারণ আল্লাহ বলেন, “তাকে শিক্ষা দান করেছেন প্রচণ্ড শক্তিশালী।” [সূরা আন-নাজম: ০৫] এটা অবশ্যই জিবরীল, এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই, তারপর বলা হয়েছে “সৌন্দর্যপূর্ণ সত্তা। অতঃপর তিনি স্থির হয়েছিলেন, আর তিনি ছিলেন ঊর্ধ্বদিগন্তে, তারপর তিনি তার কাছাকাছি হলেন, অতঃপর খুব কাছাকাছি।” [সূরা আন-নাজম: ৬-৮] এটাও জিবরীলই হবেন; যাতে করে সর্বনামগুলো এক দিকে প্রর্ত্যাবর্তন করানো যায়। আর তা হচ্ছে শক্তিশালী শিক্ষক, যিনি অত্যন্ত সুন্দর জিবরীল ‘আলাইহিস সালাম।
কিন্তু ইসরা ও মি‘রাজের হাদীসে আসা ‘দুনুও’ ও ‘তাদাল্লী’ বা নিকটে আসা ও কাছে হওয়ার বিষয়টিতে এটাই সুস্পষ্ট যে, সেখানে মহান রাব্বুল আলামীন কর্তৃক মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে আসা বুঝানো হয়েছে। সূরা আন-নাজমে মোটেই সেটার দিকে ইঙ্গিত করা হয়নি।’ দেখুন, ইবনুল কাইয়্যেম, যাদুল মা‘আদ (৩/৩৮)।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 আল্লাহ কর্তৃক তাঁর আরশের উপর উঠার ব্যাপারে আশ‘আরীর অভিমত

📄 আল্লাহ কর্তৃক তাঁর আরশের উপর উঠার ব্যাপারে আশ‘আরীর অভিমত


অতঃপর তিনি [আশ‘আরী] বলেন, “অধ্যায়: ‘আরশের উপর উঠার বর্ণনা।” তিনি বলেন, যদি কেউ বলে: ইসতিওয়া (استواء) এর ব্যাপারে তোমাদের কী বক্তব্য? তাকে বলা হবে: আমরা বলি: নিশ্চয় আল্লাহ ‘আরশের উপর সমুন্নত হয়ে আছেন; যেমন আল্লাহ বলেন: [طه: 5] ﴿ الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى ﴾ “রহমান ‘আরশের উপর উঠেছেন।” [সূরা ত্বা-হা: ০৫]
আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন, ﴿ إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ وَالْعَمَلُ الصَّالِحُ يَرْفَعُهُ ﴾ [فاطر: ١٠]: “তাঁরই দিকে পবিত্র বাণীসমূহ উঠে যায় এবং সৎকাজ, তিনি তা উপরে তুলেন।” [সূরা আল-ফাতির: ১০]
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন, ﴿ بَل رَّفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ ﴾ [النساء: ١٥٨]: “বরং আল্লাহ তাকে তাঁর নিকট উপরে তুলে নিয়েছেন।” [সূরা আন-নিসা: ১৫৮]
আল্লাহ আরও বলেন, ﴿ يُدَبِّرُ الْأَمْرَ مِنَ السَّمَاءِ إِلَى الْأَرْضِ ثُمَّ يَعْرُجُ إِلَيْهِ ﴾ [السجدة: 5]: “তিনি আসমান থেকে যমীন পর্যন্ত সমুদয় বিষয় পরিচালনা করেন, তারপর তা তাঁর সমীপে উঠে যায়।” [সূরা আস-সাজদাহ: ০৫]
আর আল্লাহ তা‘আলা ফির‘আউনের কাহিনী বর্ণনায়(১৪১) বলেন, ﴿ يَا هَامَانُ ابْنِ لِي صَرْحًا لَّعَلِّي أَبْلُغُ الْأَسْبَابَ أَسْبَابَ السَّمَوَاتِ فَأَطَّلِعَ إِلَى إِلَهِ مُوسَى وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ كَاذِبًا ﴾ [গাফির: ৩৬, ৩৭] হামান! আমার জন্য তুমি নির্মাণ কর এক সুউচ্চ প্রাসাদ যাতে আমি অবলম্বন পাই, আসমানে আরোহণের অবলম্বন, যেন দেখতে পাই মূসার ইলাহকে; আর নিশ্চয় আমি তাকে মিথ্যাবাদী মনে করি।” [সূরা গাফির: ৩৬, ৩৭] তিনি মূসাকে মিথ্যাবাদী বললেন তার (মূসার) এ কথায়: যে নিশ্চয় আল্লাহ আসমানের উপরে。
অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ﴿أَأَمِنتُم مَّن فِي السَّمَاءِ أَن يَخْسِفَ بِكُمُ الْأَرْضَ﴾ [আল-মুলক: ১৬] “তোমরা কি এ থেকে নির্ভয় হয়েছ যে, যিনি আসমানে রয়েছেন তিনি তোমাদেরকে সহ যমীনকে ধ্বসিয়ে দিবেন।” [সূরা আল-মুলক: ১৬] সুতরাং সকল আসমানের উপরে রয়েছে ‘আরশ। আর যেহেতু ‘আরশ আসমানসমূহের উপরে, তাই তিনি বলেন, “যিনি আসমানে আছেন তাঁর থেকে কী তোমরা নিরাপদ হয়ে গেছে?” কেননা তিনি সে ‘আরশের উপরে রয়েছেন যা আসমানসমূহের উপরে। আর প্রত্যেক যা উপরে তাই আসমান। তাই ‘আরশ সকল আসমানসমূহ থেকে উঁচুতে বা ঊর্ধ্বে। আর যখন তিনি বললেন: “যিনি আসমানে আছেন...” তখন তিনি সকল আসমান বুঝাননি, বরং শুধু তিনি ‘আরশকে বুঝিয়েছেন যেটা সকল আসমানের উঁচুতে। তুমি কি দেখ না যে, তিনি উল্লেখ করেছেন: “সকল আসমান” যেমন তিনি বলেন, ﴾وَجَعَلَ الْقَمَرَ فِيهِنَّ نُورًا﴿ “আর সেখানে চাঁদকে স্থাপন করেছেন আলোকরূপে।” [সূরা আন-নূহ: ১৬] এখানে তিনি বুঝাননি যে, চাঁদ সকল আসমানকে পূর্ণ করে আছে, আর তা সকল আসমানে আছে।
আর আমরা সকল মুসলিমকে দেখি দো‘আয় আসমানের দিকে হাত উঠায়; কেননা তিনি আসমানের উপরে ‘আরশে আছেন। যদি আল্লাহ ‘আরশের উপর না হতেন তবে তারা তাদের হাত ‘আরশের দিকে উঠাতো না; যেমনটি তারা যখন দো‘আ করে তখন যমীনের দিকে নামায় না।
[আবুল হাসান আল-আশ‘আরী কর্তৃক ইস্তেওয়া অর্থ ইসতীলা করার খণ্ডন]
অতঃপর তিনি [আশ‘আরী] বলেন, পরিচ্ছেদ:
মু‘তাযিলা, জাহমিয়্যাহ, হারুরিয়‍্যাহ সম্প্রদায় বলে থাকে যে, আল্লাহর বাণী: الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى “রহমান ‘আরশের উপর উঠেছেন।” [সূরা ত্বা-হা: ০৫] এর অর্থ আধিপত্য বিস্তার করেছেন, জবরদখল করেছেন, কর্তৃত্ব লাভ করেছেন। তারা আরও বলে যে, নিশ্চয় আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান। আল্লাহ তাঁর ‘আরশের উপরে এটা তারা অস্বীকার করে। আবার তারা ‘ইস্তিওয়া’কে কুদরত বা ক্ষমতা অর্থে নেয়। তারা যা বলে তাই যদি হতো তাহলে ‘আরশ আর সপ্তম যমীনের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকত না। কেননা আল্লাহ সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান। যমীনের উপরে, বাথরুমের উপরে, জগতের সবকিছুর ওপরই তিনি ক্ষমতাবান। তাই যদি আল্লাহর ‘আরশের উপরে মুস্তাওয়ী (j) হওয়ার বিষয়টি ক্ষমতাবান অর্থে হতো অথচ তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান, তাহলে অবশ্যই তিনি ‘আরশের উপরে, যমীনের উপরে, আসমানের উপরে, বাথরুমের উপরে, ময়লার উপরে (j) ক্ষমতাবান বলতে হয়; কেননা তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান, সবকিছুর ওপর কর্তৃত্বকারী। আর যখন তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান বলবেন, আর কোনো মুসলিমের মতেই জায়েয না এটা বলা যে, আল্লাহ ময়লার ওপর, পায়খানার ওপর (j) মুস্তাওয়ী বা কর্তত্বকারী। তাহলে বুঝা গেল যে, এভাবে ‘আরশের উপরে ‘ইস্তিওয়া’ এর অর্থ استيلاء (ইসতীলা) করা কোনোভাবেই জায়েয হয় না; কেননা তা সবকিছুকেই শামিল করে। বরং আবশ্যক হলো استواء ‘ইস্তিওয়া’ এর এমন অর্থ করা যা ‘আরশের সাথে সুনির্দিষ্ট হবে; অন্য কোনো কিছুর সাথে সম্পৃক্ত হবে না। এরপর তিনি এর ওপর কুরআন, হাদীস, ইজমা‘ ও আক্কল থেকে বিভিন্ন দলিল-প্রমাণ উস্থাপন করেন।

টিকাঃ
৯৪১. এখানে আল্লাহর বাণী উল্লেখ করার আগে অন্যের ‘কাহিনী বর্ণনা’ এ শব্দটি ইমাম আশ‘আরী বর্ণনা করেছেন। এ বিষয়টি কারও কারও কাছে সমস্যাগ্রস্ত মনে হতে পারে। কারণ পরবর্তী আশ‘আরী ও মাতুরিদিয়্যাহ সম্প্রদায়ের লোকেরা সাধারণত আল্লাহর কুরআনকে সরাসরি আল্লাহর বাণী বলার চেয়ে আল্লাহর বাণীর বর্ণনা বলতে পছন্দ করেন। কারণ তারা মনে করে যে, আল্লাহর বাণী তো তাঁর অন্তরে, বাইরে যা বর্ণ ও ভাষায় এসেছে তা সে বাণীর কাহিনী রূপ। সে জন্য আল্লাহর বাণীকে কখনও আল্লাহর বাণীর কাহিনী বলা জায়েয হবে না। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে দেখুন, মাজমূ‘ ফাতাওয়া (৩/১৪৪, ১৭৫, ১৯৯), (১২/২৭২, ৩৭৫)।
কিন্তু ইমাম আশ‘আরী এখানে সে উদ্দেশ্যে বলেননি। কারণ ইমাম আশ‘আরী অন্য সব জায়গায় আল্লাহর বাণী বলেছেন, যা দ্বারা বুঝা যায় তিনি উক্ত বিদ‘আতী বক্তব্য দেননি। বরং তিনি কুরআনকে সরাসরি আল্লাহর বাণীই সাব্যস্ত করেন। এজন্য উত্তম অর্থে সেটাকে নিতে হবে, আর তা হচ্ছে তিনি বুঝাতে চেয়েছেন উক্ত বক্তব্যটি প্রথমে ফির‘আউন তার সহচর হামানকে বলেছিল, কিন্তু কীভাবে কোন ভাষায় ছিল সেটা আমরা জানি না, অতঃপর আল্লাহ আমাদেরকে উক্ত বক্তব্য বর্ণনা করেছেন আল্লাহর নিজস্ব শব্দে।
ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, কেউ যদি বলে কুরআন হচ্ছে ‘কাহিনী বর্ণনা’ অর্থাৎ কুরআনকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন, যেমন বলা হয়, ‘তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রচার করেছেন’, ‘তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে আদায় করেছেন’, তাহলে সে অবশ্যই বিশুদ্ধ অর্থ উদ্দেশ্য নিয়েছে। দেখুন, মাজমু‘ ফাতাওয়া (১২/২৮০); বকর আবু যাইদ, মু‘জামুল মানাহিল লাফযিয়্যাহ, পৃ. ৪২৫ ও তার পরের বর্ণনা।
বস্তুত এভাবে বলার বিষয়টি যুগ যুগ ধরে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের ইমামগণের মাঝে প্রচলিত হয়ে এসেছে। বিষয়টির ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে আরও দেখা যায়, আবুল কাসেম আত- তাইমী, আল-হুজ্জাহ ফী বায়ানিল মাহাজ্জাহ (১/৩৪৩), (২/১৭৭); আবুল কাসেম আল-বাগাওয়ী, তাফসীর মা‘আলিমুত তানযীল (১/৭৩); ইবন তাইমিয়‍্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়‍্যাহ (১/১৭৪); জামে‘উ‘র রাসায়িল (১/২১৪), (২/১৩৬); মাজমূ‘ ফাতাওয়া (১০/৫০৭), (৩০/৩৬৭); যাহাবী, আল- ‘আরশ, পৃ. ১৯২-১৯৩; আদ-দুরারুস সানিয়্যাহ (১/১৯৯, ৪১৮), (৩/১২৩), (৯/২৬৬, ২৭০); আশ-শানকীত্বী, আদ্বওয়াউল বায়ান (৭/২৮২)।
বস্তুত আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আলেমগণ যখন ‘কাহিনী বর্ণনা’ বাক্য ব্যবহার করেন, আর যখন আশ‘আরী ও কুল্লাবিয়া সম্প্রদায় ব্যবহার করে উভয়ের উদ্দেশ্যের মধ্যে বিশাল পার্থক্য বিদ্যমান। দেখুন, মাজমু‘ ফাতাওয়া (৩/১৪৪, ১৭৫, ১৯৯), (১২/২৭২, ৩৭৫)।
৯৪২. এখন প্রশ্ন হতে পারে যে, চাঁদ কি সকল আসমানকে আলোকিত করে? এর জবাব হচ্ছে, (১) এখানে সকল আসমান বলা হলেও উদ্দেশ্য কেবল ঊর্ধ্বজগতের কিছু অংশ। এটাকে বলা হয় ‘যিকরুল কুল্ল ওয়া ইরাদাতুল জুয’ অর্থাৎ ব্যাপক উল্লেখ করে অংশবিশেষ উদ্দেশ্য নেয়া। (২) আরবী ভাষায় ‘ফী’ শব্দটি ছাড়া কোনো কিছুর পূর্ণ অংশ বুঝানো আবশাক করে না। কিছু বুঝাতেও ‘ফী’ ব্যবহার করা যায়।
৯৪৩. এটি হচ্ছে ফিতুরী দলীল। মানবীয় মনের স্বভাবজাত প্রমাণ। যার মাধ্যমে বান্দা তার উপাস্য মা‘বুদ আল্লাহকে সবকিছুর উপরে বিশ্বাস করে। এ ব্যাপারে একটি বিখ্যাত ঘটনা রয়েছে, তা হচ্ছে একবার আশ‘আরী আলেম আবুল মা‘আলী আল-জুওয়াইনী মিম্বরের উপর উঠে বললেন, “আল্লাহ ছিলেন তখন ‘আরশও ছিল না।” তখন আবু জা‘ফর আল-হামাদানী বলেন, ওহে উস্তায, আমাদেরকে ‘আরশের বর্ণনা ছেড়ে দিন, অর্থাৎ এটি তো কেবল কুরআন-সুন্নাহ’য় এসেছে, আমাদেরকে সে অত্যাবশ্যক বিষয়টির ব্যাপারে জানান যা আমরা আমাদের অন্তরে পাই, কারণ যখনই কোনো আল্লাহওয়ালা ব্যক্তি বলে, ‘হে আল্লাহ’, তখনই তার হৃদয়ে এমন অত্যাবশ্যকতা পায়, যা তার মনকে উপরের দিকে নিবদ্ধ করতে বাধ্য করে, সেটা ডানেও যায় না, বামেও যায় না। তাহলে কীভাবে এ অত্যাবশ্যকতাকে আমাদের হৃদয় থেকে প্রতিরোধ করব? তিনি বলেন, তখন আবুল মা‘আলী তার মাথায় আঘাত করে বলতে আরম্ভ করলেন, হামাদানী আমাকে হয়রান করে দিলো, হামাদানী আমাকে হয়রান করে দিলো, আর তিনি মিম্বর থেকে অবতরণ করলেন।’ দেখুন, ইবন তাইমিয়‍্যাহ, মাজমূ‘ ফাতাওয়া (৪/৪৪, ৬১); ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়‍্যাহ (২/৪৪৬, ৪৬৮)। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘মুমিনদের যে কেউ নিজের সত্তায় একবার পরীক্ষা করে দেখবে, সে নিজের সত্তায় সুদৃঢ়ভাবে অত্যাবশ্যক জ্ঞান হিসেবে তার অন্তরে পাবে যে, যখনই সে তার অন্তর দিয়ে আল্লাহর ইবাদতে, তাকে আহ্বান করার ক্ষেত্রে, তাঁর দিকে নিজেকে নিবদ্ধ করার ব্যাপারে সত্য হবে, তখনই তাকে কোনো একটি দিকে সেটার উদ্দেশ্য করা জরুরী হয়ে পড়বে। অতঃপর যদি সে তার ফিত্বরাতের ওপর থাকে যার ওপর তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে, অথবা যদি সেটার সাথে সে রাসূলরা যা নিয়ে এসেছেন তার ওপর ঈমানদার হয় তিনি অবশ্যই উপরের দিকে নিজেকে সর্বদা নিবদ্ধ করবে, কিন্তু যদি তার ফিত্বরাত বা স্বভাবজাত বিশ্বাসের পরিবর্তন এসে থাকে তবে সে সকল দিকেই নিবদ্ধ করবে এবং সকল অস্তিত্বশীল বস্তুর দিকই উদ্দেশ্য করবে।’ দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়‍্যাহ (২/৪৬৮)।
ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ আরও বলেন, মহান আল্লাহ তিনি সকল সৃষ্টিকুলের উপর হওয়া, তাদের থেকে পৃথক হওয়ার বিষয়টি, অত্যাবশ্যক ফিতরাতের মাধ্যমে জানা যায়, যাতে সকল বনী আদম সমানভাবে অংশীদার। যে যত বেশি আল্লাহকে চিনবে, যত বেশি তাঁর ইবাদত করবে, যত বেশি তাঁর কাছে যাচঞা করবে, যার হৃদয়ে যত বেশি তাঁকে স্মরণ করবে, তার কাছে এ অত্যাবশ্যকতা তত বেশি শক্তিশালী ও পরিপূর্ণভাবে ধরা পড়বে। কারণ ফিতরাত বা স্বভাবজাত জ্ঞান, অবতীর্ণ করা ফিতরাতকে পূর্ণতা দেয়। কারণ স্বভাবজাত জ্ঞানে যে কোনো জিনিস মুজমাল বা সংক্ষিপ্তভাবে জানতে পারে, শরী‘আত সেটাকে বিস্তারিত বর্ণনা করে, প্রকাশ করে ও এমন কিছুর সাক্ষ্য দেয় যা ফিতরাত একাকী বুঝতে পারে না। মাজমূ‘ ফাতাওয়া (৪/৪৪); আরও দেখুন, জামে‘উল মাসায়িল (৪/৭৯-৮৫)।
৯৪৪. অর্থাৎ এটিই প্রমাণ করে যে, তিনি উপরে আছেন, যত উপরে একজন মানুষ জানতে পারে তারও উপরে। তিনি আসমানসমূহের উপরে, ‘আরশের উপরে।
৯৪৫. এসব যে জাহমিয়‍্যাহ, মু‘তাযিলা ও হারুরিয়্যাদের বক্তব্য তার প্রমাণ হিসেবে দেখুন, কাযী আব্দুল জাব্বার আল-মু‘তাযিলীর, শারহুল উসূলিল খামসাহ, পৃ. ২২৬; তাছাড়া আরও যারা এ বক্তব্যকে জাহমিয়্যাহ, মু‘তাযিলাদের দিকে সম্পৃক্ত করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ইমাম আশ‘আরী তার মাক্কালাতুল ইসলামিয়্যীন গ্রন্থে, পৃ. ১৫৭, ২১১; আরও দেখুন, আব্দুল কাহের আল-বাগদাদীর উসূলুদ্দীন, পৃ. ১১২।
৯৪৬. এখানে সম্ভবত আরেক দলের কথা আলোচনা করা হচ্ছে, যারা ‘আরশের উপর আল্লাহর ‘ইস্তেওয়া’ করাকে কুদরত বা ক্ষমতার অর্থে নেয়। তখন সেটি আর আল্লাহর কর্মগত গুণ থাকে না। তখন সেটি সত্তাগত গুণ হয়ে যায়। বস্তুতই যারা আল্লাহর কর্মগত গুণ সাব্যস্ত করে না তারা এ পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকে, তারা সকল প্রকার কর্মগত গুণকে হয় কুদরত ও ইচ্ছার দিকে নিয়ে যায়, নতুবা সেগুলোকে ‘তাকওয়ীন’ নামক তথাকথিত সৃষ্টি কর্মের দিকে নিয়ে যায়। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একদল লোক ‘ইস্তেওয়া’কে সত্তাগত গুণ হিসেবে বর্ণনা করে, অপর দল সেটাকে কর্মগত গুণ হিসেবে বলে। তারপর তিনি বলেন, যারা বলে এটি সত্তাগত গুণ তারা আয়াতের অর্থ করতে গিয়ে তা’ওয়ীল করে বলে, ‘তিনি ‘আরশের উপর ক্ষমতাবান হলেন’। তারপর তিনি এ মতটিকে কয়েক দিক থেকে দুর্বল সাব্যস্ত করলেন:
১- আল্লাহ বলেন, ثُمَّ اسْتَرَى عَلَى الْعَرْشِ [الأعراف: ৫ “তারপর তিনি ‘আরশের উপর...”। [সূরা আ‘রাফ: ৫৪] এখানে আল্লাহ তা‘আলা সে কাজটিকে ‘তারপর’ বলে জানিয়েছেন। যদি ক্ষমতা অর্থ করা হয় তবে কি তিনি আল্লাহ তা‘আলা আগে ‘আরশের উপর ক্ষমতাবান ছিলেন না?
২- এখানে একটি ক্রিয়া আরেকটি ক্রিয়ার ওপর ‘আতফ’ তথা নির্ভর করে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথম ক্রিয়াটি ‘খালাকা’ তারপরেরটি ‘ইস্তেওয়া’। অর্থাৎ সৃষ্টি করেছেন তারপর ইস্তেওয়া বা উপরে উঠেছেন। এখন যদি পরেরটি ‘কুদরত’ অর্থ করা হয়, তখন আর ক্রিয়ার উপর ক্রিয়ার ‘আত্বফ’ হয় না, ক্রিয়ার ওপর বিশেষ্যকে ‘আতফ’ করতে হয় যা আরবী ব্যাকরণের দিক থেকে দৃষ্টিকটু।
৩- তারা যা বলে অর্থাৎ ‘ক্ষমতাবান হওয়া’ অর্থ করা হলে ‘আরশ ও অন্য কিছুর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। কারণ আল্লাহ তা‘আলা তো সবকিছুর উপরই ক্ষমতাবান। এখন যদি বলা হয়, ‘আরশ উল্লেখ করার কারণ হচ্ছে, ‘আরশ সবচেয়ে বড় সৃষ্টি, তাই সেটাকে আলাদা করে বর্ণনা করা হয়েছে, (বলা হবে যে,) বড় সৃষ্টি হওয়ার কারণেই সেটা বিশেষায়িত হয়ে যায় না, কারণ আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “মহা ‘আরশের রব্ব”। [সূরা আত-তাওবাহ: ১২৯] এখানেও ‘আরশের রবকে উল্লেখ করা হয়েছে, আর রব্ব হওয়া ব্যাপক বিষয়কে শামিল করে, তাই এটা বলা বৈধ হয় যে, তিনি আসমানসমূহের রব্ব, যমীনসমূহের রব্ব ও মহা ‘আরশের রব্ব। আরও বলা হয়, ‘রাব্বুল আলামীন’, আরও বলা হয়, ‘রাব্বি মূসা ওয়া হারুন’ (তাহলে বুঝা গেল যে, ইস্তিওয়া আলাল ‘আরশ এর অর্থ যদি ‘আরশের উপর ‘ক্ষমতাবান হওয়া’ বলা হয়, তাহলে সেটার বিশেষত্ব থাকে না, যেমনিভাবে রব্বুল ‘আরশ বলা হলেও সেটার বিশেষত্ব থাকে না)। অথচ ‘ইস্তেওয়া’ ক্রিয়াটি মুসলিমদের সর্বসম্মত মত অনুযায়ী ‘আরশের সাথে একান্তভাবে বিশেষায়িত। যদিও তিনি আসমান-যমীন ও এ দুয়ের মধ্যবর্তী সবকিছুর ওপর আধিপত্য বিস্তারকারী ক্ষমতাধর সত্তা।
এখন যদি তাঁর ‘আরশের উপর ইস্তেওয়া’কে ‘আরশের ওপর ক্ষমতাবান’ এ অর্থ করা হয়, তাহলে এটা বলাও শুদ্ধ হবে যে, তিনি আসমান, যমীন ও এতদুভয়ের মাঝে যা আছে তার ওপরও ক্ষমতাধর। (তখন আর শুধু ‘আরশের উপর ‘ইস্তেওয়া’ এর বিশেষত্ব থাকে না)। এটি দিয়ে বেশ কিছু আলেম (‘ইস্তেওয়া’ অর্থ ‘ক্ষমতাবান হওয়া’ বিশুদ্ধ না হওয়ার) দলীল পেশ করেছেন, তাদের মধ্যে ইমাম আশ‘আরী একজন। দেখুন, মাজমূ‘ ফাতাওয়া (১৬/৩৯৫-৩৯৭)।
৯৪৭. ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রাহিমাহুল্লাহ এ বাতিল তা’ওয়ীলকে ৪২টি উপায়ে খণ্ডন করেন, যা যেকোনো মানুষের জন্য যথেষ্ট হতে পারে। দেখুন, মুখতাসারুস সাওয়া’য়িক (২/১৩৭-১৫২)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00