📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 ইমাম আবুল হাসান আল-আশ‘আরী রাহিমাহুল্লাহ’র বক্তব্য, তার মাকলাত গ্রন্থে

📄 ইমাম আবুল হাসান আল-আশ‘আরী রাহিমাহুল্লাহ’র বক্তব্য, তার মাকলাত গ্রন্থে


ইমাম আবুল হাসান আল-আশ'আরী, কালামশাস্ত্রবিদ, কালামশাস্ত্রের বিশেষ পদ্ধতির প্রধান, যা তার দিকে সম্পৃক্ত করা হয়(৯১৪), তিনি তাঁর 'মাক্কালাতুল ইসলামিয়্যীন ওয়া ইখতিলাফুল মুসাল্লীন' (৯১৫) এ গ্রন্থে রাফেযী (৯১৬), খারেজী, মুরজিয়াহ (৯১৭), মু'তাযিলা এবং অন্যান্য দলের কথা তুলে ধরেন। তারপর বলেন, (৯১৮) সংক্ষিপ্তভাবে (৯১৯) আহলুস সুন্নাহ ও আসহাবুল হাদীসের মতাদর্শ: "আহলুস সুন্নাহ ও আসহাবুল হাদীসের বক্তব্য হচ্ছে: স্বীকৃতি দেয়া আল্লাহকে, তাঁর ফিরিশতাদেরকে, তাঁর কিতাবসমূহকে, রাসূলগণকে এবং মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে যা এসেছে আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিশ্বস্ত সূত্রে যা বর্ণিত হয়েছে। এগুলোর কোনোটিকেই তারা প্রত্যাখ্যান করে না। (৯২০)
আর আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়, ফারদ(৯২১) বা অনন্য, অন্যের প্রয়োজন মুক্ত। তিনি ভিন্ন কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনি কোনো সঙ্গিনী ও সন্তান গ্রহণ করেননি। মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। জান্নাত সত্য, জাহান্নাম সত্য, কিয়ামত সংঘটিত হবে নিঃসন্দেহে, কবরস্থদেরকে আল্লাহ পুনরায় জীবিত করবেন।

নিশ্চয় আল্লাহ 'আরশের উপরে, যেমন তিনি বলেন: ﴿الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى﴾ “রহমান 'আরশের উপরে উঠেছেন।” [সূরা ত্বা-হা: ০৫]

আর তাঁর রয়েছে দুটি হাত কোনো ধরণ নির্ধারণ ছাড়া। তিনি বলেন, خَلَقْتُ بِيَدَىَّ "আমি যাকে আমার দু'হাতে সৃষ্টি করেছি” [সূরা স্বদ: ৭৫] তিনি অন্যত্র বলেন, بَلْ يَدَاهُ مَبْسُوطَتَانِ "বরং আল্লাহর উভয় হাতই প্রসারিত।” [সূরা আল-মায়েদাহ: ৬৪]

আর তাঁর রয়েছে দুটি চোখ(৯২২) কোনো ধরণ নির্ধারণ ছাড়া। যেমন তিনি বলেন: تَجْرِي بِأَعْيُنِنَا “যা চলত আমার চোখের সামনে।” [সূরা আল-ক্বামার: ১৪]

আবার তাঁর রয়েছে চেহারা, যেমন তিনি বলেন: ﴿وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ﴾ “আর অবিনশ্বর শুধু আপনার রবের চেহারা (সত্তাসহ), যিনি মহিমাময়, মহানুভব।” [সূরা আর- রহমান: ২৭]

আর আল্লাহর নামকে বলা যাবে না যে, এগুলো আল্লাহ ভিন্ন অন্য কিছু। যেমন মু'তাযিলা, খারিজীরা বলে থাকে। (৯২৩)

আর তারা (আসহাবুল হাদীস ও আহলুস সুন্নাহ) স্বীকৃতি প্রদান করেন যে, আল্লাহর রয়েছে ইলম বা জ্ঞান। যেমন তিনি বলেন: ﴿أَنزَلَهُ بِعِلْمِهِ﴾ “তিনি তা নাযিল করেছেন নিজ জ্ঞানে।” [সূরা আন-নিসা: ১৬৬] অনুরূপ তিনি বলেন, ﴿وَمَا تَحْمِلُ مِنْ أُنثَى وَلَا تَضَعُ إِلَّا﴾ ﴿بِعِلْمِهِ﴾ “আল্লাহর অজ্ঞাতে কোনো নারী গর্ভ ধারণ করে না এবং প্রসবও করে না।” [সূরা ফাতির: ১১]

আর তারা (আসহাবুল হাদীস ও আহলুস সুন্নাহ) আল্লাহর জন্য শ্রবণ করা, দর্শন করার গুণ সাব্যস্ত করেছেন। তার থেকে সেগুলো নাকচ করেননি যেমনটি নাকচ করে মু'তাযিলারা।

আর তারা (আসহাবুল হাদীস ও আহলুস সুন্নাহ) আল্লাহর জন্য শক্তি সাব্যস্ত করেন, যেমন- আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴿أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّ اللَّهَ الَّذِي خَلَقَهُمْ هُوَ أَشَدُّ مِنْهُمْ قُوَّةً﴾ “তারা কি লক্ষ্য করেনি যে, যে আল্লাহ তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি তাদের অপেক্ষা অধিক শক্তিধর?” [সূরা ফুসসিলাত: ১৫]

আর তিনি তাক্বদীরের ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের মতামত বর্ণনা করেন। শেষে তিনি [ইমাম আশ'আরী] বলেন, আর তারা [আহলুস সুন্নাত] বলেন: কুরআন আল্লাহর বাণী, সৃষ্ট নয়। আর কুরআনের 'লাফয' এর ব্যাপারে কথা বলা ও 'কুরআন আল্লাহর বাণী' বলার পর বিরত থাকা(৯২৪), এ বিষয়ে (বক্তব্য হচ্ছে): যে কেউ বলবে: কুরআন নিয়ে আমার 'লাফয' সৃষ্ট, আর যে কেউ কুরআন নিয়ে মতামত প্রদানের ব্যাপারে চুপ থাকে (৯২৫), এরা সবাই আহলুস সুন্নাত এর নিকট বিদ'আতী। বলা যাবে না, কুরআন নিয়ে 'লাফয' বা উচ্চারণ সৃষ্ট বা কুরআন নিয়ে 'লাফয' বা উচ্চারণ অসৃষ্ট। আর তারা [আহলুস সুন্নাহ] স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন যে, আল্লাহকে কিয়ামতের দিন চক্ষু দ্বারা দেখা যাবে, যেমন পূর্ণিমার রাতে চাঁদকে দেখা যায়। মুমিনগণ তাকে দেখতে পাবে, কাফিরগণ দেখতে পাবে না; কেননা তাদেরকে আল্লাহর থেকে আড়াল করে রাখা হবে। আল্লাহ্ বলেন: ﴿ كَلَّا إِنَّهُمْ عَن رَّبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لَمَحْجُوبُونَ ﴾ [المطففين: ١٥] "কক্ষনো না, অবশ্যই তারা সেদিন তাদের প্রতিপালক (দর্শন) থেকে পর্দাবৃত থাকবে।” [সূরা আল-মুতাফফিফীন: ১৫]
আর তিনি [ইমাম আশ'আরী] ইসলাম, ঈমান, হাউয, শাফা'আত, অনুরূপ আরও কিছু বিষয় প্রসঙ্গে তাদের [আহলুস সুন্নাতের] মতামত উল্লেখ করেন।
অতঃপর [ইমাম আশ'আরী] বলেন: "আর তারা [আহলুস সুন্নাহ] স্বীকৃতি দেন যে, ঈমান হচ্ছে কথা ও কাজের নাম। আবার তা বাড়ে ও কমে। তারা বলেন না যে, তা মাখলুক বা সৃষ্ট। আর তারা [আহলুস সুন্নাহ] কবীরা গুনাহে লিপ্ত কোনো ব্যক্তিকে জাহান্নামী বলে সাক্ষ্য দেন না।
শেষে তিনি বলেন, আর তারা দীনের মধ্যে ঝগড়া-বিতর্ক অনুমোদন দেন না। যেসব ব্যাপারে বিতর্ককারী সম্প্রদায় পরস্পর ঝগড়া-বিবাদ ও মুনযারা করে সেগুলো নিয়ে বিবাদ-বিতর্কও মেনে নেন না। তাঁরা বিশুদ্ধ বর্ণনাসমূহ মেনে নেন। নির্ভরযোগ্য সূত্রে ন্যায়পরায়ণ থেকে ন্যায়পরায়ণের মাধ্যম হয়ে সর্বশেষ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত গিয়ে শেষ হওয়া সকল বিশুদ্ধ হাদীস ও আছারসমূহ মেনে নেন। তারা বলেন না যে, কীভাবে(৯২৭) ও কী জন্য(৯২৮)? কারণ সেটা তাদের নিকট বিদ'আত。

তারপর তিনি বলেন, তারা স্বীকৃতি দেন যে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন আসবেন। আল্লাহ বলেন, ﴿وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا﴾ [الفجر: ٢٢] "এবং যখন তোমার প্রতিপালক আগমন করবেন আর সারিবদ্ধভাবে ফিরিশতাগণও (আসবেন)।" [সূরা আল ফাজর: ২২]
আর আল্লাহ যেভাবে ইচ্ছা বান্দার নিকটবর্তী হন। যেমন তিনি বলেন, ﴿وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ﴾ [ق: ١٦] “আমরা তার গ্রীবাস্থিত ধমনী থেকেও অধিক নিকটবর্তী।” [সূরা কাফ: ১৬](৯২৯)

শেষে তিনি [আশ'আরী] বলেন যে, তারা মনে করেন যে, প্রত্যেক বিদ'আতের দিকে আহ্বানকারী থেকে দূরে থাকতে হবে। আর কুরআন তিলাওয়াত, হাদীস ও আছার লেখা, ফিকহ শিক্ষা ও গবেষণা নিয়ে মশগুল থাকতে হবে। বিনয়-নম্রতা, উত্তম আচরণ, ভালো কাজ করা, কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। গীবত ও চোগলখোরী ও অযথা অভিযোগ প্রদান, খাবার পানীয়ের ব্যাপারে অযাচিত খোজ-খবর নেয়া ছেড়ে দিতে হবে।
তিনি [ইমাম আবুল হাসান আল-আশ'আরী] বলেন, এ হলো সেসবের বর্ণনা যা তারা নির্দেশ দিতেন, মেনে নিতেন, মতামত দিতেন; তারা যা যা বলতেন আমরা সেসকল কথা বলি এবং সেই মত পোষণ করি। আল্লাহ আমাদের তাওফীকদাতা এবং আর তিনিই সাহায্যকারী।

অনুরূপভাবে আবুল হাসান আশ'আরী 'আরশের ব্যাপারে কিবলাপন্থীদের মতানৈক্য (৯৩০) প্রসঙ্গে বলেন, "আহলুস সুন্নাহ ও আসহাবুল হাদীসগণ বলেন, তিনি জিসিম নন (৯৩১) এবং কোনো কিছুর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নন।(৯৩২) আর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন; যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴿الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى ﴾ [ত্বা-হা: ০৫] "রহমান আরশের উপর উঠেছেন।" [সূরা ত্বা-হা: ০৫] আমরা আল্লাহর সামনে আগ-বাড়িয়ে কথা না বলি, বরং বলি যে, তিনি ইস্তেওয়া বা উপরে উঠেছেন, তবে কোনো ধরণ নির্ধারণ ছাড়া।

আর তার রয়েছে চেহারা, যেমন তিনি বলেছেন: ﴿وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ﴾ [আর-রহমান: ২৭] "আর অবিনশ্বর শুধু আপনার রবের (সত্তাসহ) চেহারা, যিনি মহিমাময়, মহানুভব।" [সূরা আর-রহমান: ২৯]

তাঁর রয়েছে দুই হাত, যেমন তিনি বলেছেন: ﴿خَلَقْتُ بِيَدَيَّ﴾ "আমার নিজ দু' হাতে সৃষ্টি করেছি।" [সূরা স্বদ: ৭৫]

তাঁর রয়েছে দুটি চোখ, যেমন তিনি বলেছেন: ﴿تَجْرِي بِأَعْيُنِنَا﴾ "সে জাহাজটি চলত আমাদের চোখের সামনে।" [সূরা আল-কামার: ১৪]

আর কিয়ামত দিবসে তিনি এবং ফিরিশতাগণ আসবেন, যেমনটি আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: "আর আপনার রব ও ফিরিশতারা আসবেন কাতারে কাতারে।" [সূরা আল-ফাজর: ২২] আর তিনি নিকটতম আসমানে নেমে আসেন যেমনটি হাদীসে এসেছে। আর তারা আল্লাহর কিতাবে যা পেয়েছে ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যা বর্ণিত হয়ে এসেছে তা ছাড়া কিছুই বলেন না।

আর মু'তাযিলারা বলে, إن الله استوى على العرش এ অর্থ, নিশ্চয় আল্লাহ আরশকে استولى বা দখল করেছেন বা 'আরশে কর্তৃত্ব স্থাপন করেছেন।(৯৩৩) তারপর তিনি অন্যান্য মতবাদ নিয়ে বর্ণনা করেছেন।

টিকাঃ
৯১৪. কালামশাস্ত্রের যে অংশের নেতৃত্ব তার দিকে সম্পৃক্ত করা হয় সে অংশের নাম হচ্ছে আশ'আরী মতবাদ। আমরা আগেই জেনেছি যে, আল্লাহর গুণাবলির ক্ষেত্রে আশ'আরী মতবাদের অধিকাংশ লোকের অভিমত হচ্ছে, সেসব গুণাবলিকে সাব্যস্ত করা যেগুলোকে তারা আক্বলী সিফাত তথা বিবেকের যুক্তিনির্ভর গুণ বলে থাকেন। আর তারা সেসব গুণাবলিকে অস্বীকার করে থাকে যেগুলোকে বলা হয় খবরী সিফাত তথা কুরআন ও সুন্নাহ নির্ভর আল্লাহর গুণাবলি। আর যেসব আক্কলী সিফাত তারা সাব্যস্ত করে থাকে তাও সব নয়, বরং সেটি সাতটি মাত্র, ১. হায়াত বা জীবন, ২. ইলম বা জ্ঞান, ৩. ইরাদাহ বা ইচ্ছা, ৪. কুদরাত বা ক্ষমতা, ৫. সাম' বা শোনা, ৬. বাছার বা দেখা, ৭. কালামে নাফসী বা আত্মিক কথা। এ মতবাদটি সারা মুসলিম জাহানে ব্যাপক প্রচার ও প্রসার লাভ করে। বরং কখনও কখনও এটিকেই আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মাযহাব হিসেবে ধরা হতে থাকে। এভাবে ভুল আকীদাকে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আকীদাহ নামে প্রচার-প্রসার করার কিছু কারণ রয়েছে,
১- এ মতবাদটি মুসলিম খিলাফতের কেন্দ্রভূমি, তৎকালীন সভ্যতার লালনক্ষেত্র বাগদাদে সেটার উৎপত্তি হয়ে সেখান থেকে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়া।
২- বহু আমীর ও ওযীর কর্তৃক এ আশ'আরী মতবাদটিকে বিশুদ্ধ আকীদাহ হিসেবে গ্রহণ ও প্রচার করণ। মোটকথা: রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা এর একটি বড় কারণ। এর বিপরীতে সহীহ আকীদাহ'র প্রচার-প্রসারে খুব বেশি আমীর ও ওযীররা সম্পৃক্ত হয়নি।
৩- বহু আমীর কর্তৃক এসব আকীদাহ প্রতিষ্ঠা ও প্রচারের জন্য বড় ছোট সর্বপ্রকার বিদ্যায়তনগুলো প্রতিষ্ঠা। যেমন বাগদাদের নিযামিয়্যাহ বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও অনেক বিশ্বিবিদ্যালয় শুধু এসব আকীদাহই প্রচার-প্রসার করতো।
৪- অনেক বিখ্যাত আলেম কর্তৃক এ মতবাদ গ্রহণ ও প্রচার-প্রসারে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা পরিচালনা। যেমন, আল-বাকেল্লানী, ইবন ফুওরাক, আসফারায়ীনী, জুওয়াইনী, বাইহাকী, বাগদাদী, রাযী প্রমুখ।
৫- উপরোক্ত আলেমগণ কর্তৃক মু'তাযিলাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ও তাদের সন্দেহের অপনোদন, শিয়াদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান ও তাদের ষড়যন্ত্র নস্যাতকরণে ব্যাপক ভূমিকা পেশকরণ। ফলে তারা মানুষের বিশ্বস্ততার জায়গায় চলে গেলেন, তারা তাদের ভালো-মন্দ সবই বিনা বিচারে গ্রহণ করে নিলেন।
৬- তৎকালীন বড় বড় মাদ্রাসা ও মসজিদগুলোর শিক্ষক ও খত্বীব হওয়ার জন্য মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দ্বারা পূর্বশর্ত হিসেবে এটা লিপিবদ্ধ থাকা যে, তাকে অবশ্যই আশ'আরী মতবাদের অনুসারী হতে হবে। যেমন ইবন কাসীর রাহিমাহুল্লাহ এমন সমস্যায় পতিত হয়েছিলেন।
৭- আশ'আরী মতবাদের লোকদের দ্বারা তাদের আকীদাহ'র ওপর অনেক গ্রন্থ এমনভাবে রচিত হওয়া যাতে এটাকেই আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের একমাত্র সঠিক মুখপাত্র হিসেবে তাদের নিজেদের তুলে ধরা। কুরআন ও সুন্নাহ'র ব্যাখ্যাকারীদের দ্বারা এসব নুসূসের অপব্যাখ্যা কিংবা বিকৃতি জনগণের মধ্যে প্রচার করা।
৮- কালামশাস্ত্রের কিছু নীতি অলঙ্ঘনীয় সত্য হিসাবে জনগণের কাছে প্রচার ও প্রসার লাভ করা। যেমনটি রাযী কিংবা গাযালীর গ্রন্থের মাধ্যমে মানুষের মাঝে ব্যাপক আকারে ঢুকে পড়েছিল।
৯- কুরআন ও সুন্নাহ'র সঠিক ইলম এর প্রচার প্রসারে সংকীর্ণতা আরোপ। সালাফে সালেহীনের আকীদার অনুসারীদেরকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন-নিপীড়ন করে বিশুদ্ধ আকীদার প্রচার-প্রসারকে স্তব্দ করে দেয়া।
১০- সহীহ আকীদাহ'র লোকদেরকে বিভিন্ন খারাপ নামে অভিহিত করা, যেমন তাদেরকে মুজাসসিমা, দেহবাদী, হাশাওয়িয়্যাহ, সাধারণ মানুষ, মুশাব্বিহা বা সাদৃশ্যবাদী ইত্যাদি নাম দিয়ে জনগণকে তা থেকে দূরে রাখার বিভিন্ন কলা-কৌশল অবলম্বন।
৯১৫. মাকালাতুল ইসলামিয়্যীন ওয়া ইখতিলাফুল মুসাল্লীন, এ গ্রন্থটি প্রথম বের করে প্রাচ্যবিদ হেলমুত রীতার। তারপর মুহাম্মাদ মুহীউদ্দীন আব্দুল হামীদ তা বের করেন। তিনি মূলত 'রীতার' এর তাহকীকের ওপর নির্ভর করেছেন। বিভিন্ন হস্তলেখার মধ্যকার পার্থক্যের দিকে কোনো ইঙ্গিত করেননি।
এ কিতাবটি 'মাকালাতুল ইসলামিয়্যীন ওয়া ইখতিলাফুল মুসাল্লীন' এ নামেই ইবন তাইমিয়‍্যাহ রাহিমাহুল্লাহ'র বিভিন্ন গ্রন্থে এসেছে, যেমন, - ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/৩৯৭), (২/২৭)। - ইবন তাইমিয়্যাহ, মিনহাজুস সুন্নাহ (২/১০৪), (২/২১৭), (২/৫৫২)। কখনও কখনও ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ শুধু 'মাকালাতুল ইসলামিয়্যীন' বলতেন, যেমন, - ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/৩৮০)। - ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আক্কলি ওয়ান নাক্কলি (১/৯৩)। - ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/৩৮৬)। - ইবন তাইমিয়্যাহ, আন-নুবুওয়াত (২/৬৩১)। কখনও কখনও তিনি এর নাম শুধু 'আল-মাকালাত' বলতেন। যেমন,
- ইবন তাইমিয়্যাহ, মিনহাজুস সুন্নাহ (২/৩৯৪)। - ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আক্কলি ওয়ান নাকলি (৭/২৪৬)। কখনও কখনও তিনি এর নাম দিয়েছেন, 'আল-মাক্বালাতুস সগীর'। যেমন, - ইবন তাইমিয়্যাহ, মিনহাজুস সুন্নাহ (২/২২৪)। ইমাম আশ'আরী রাহিমাহুল্লাহ'র আরেকটি গ্রন্থ ছিল, যার নাম 'মাকালাতু গাইরিল ইসলামিয়‍্যীন'। ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, সেটি মাকালাতুল ইসলামিয়‍্যীন থেকে বড়। আর তাতে দার্শনিকদের অনেক মতবাদ তিনি নিয়ে এসেছেন যা সাধারণত সেসব লোকেরা নিয়ে আসে না যারা ইবন সীনা থেকে দর্শন শিখেছে। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, মিনহাজুস সুন্নাহ (৫/২৮২-২৮৩)। আর এ কিতাবটিকে অন্যান্য বেশ কিছু গ্রন্থে নাম দেয়া হয়েছে 'মাকালাতুল মুলহিদীন'। দেখুন, ইবন আসাকির, তাবয়ীনি কাযিবিল মুফতারী, পৃ. ১৩১; ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৫/৮৭); তাজউদ্দীন আস- সুবুকী, ত্বাবাক্বাতুশ শাফে'ঈয়্যাহ আল-কুবরা (৩/৩৬১); যিরিকলী, আল-আ'লাম (৪/২৬২)।
৯১৬. রাফেযী: শব্দটির অর্থ অস্বীকারকারী। যারা আবু বকর ও 'উমার এর খিলাফতকে অস্বীকার করে তারাই রাফেদ্বী বা রাফেযী। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়‍্যাহ অধিকাংশ ব্যবহারের ভিত্তিতে বর্তমান শিয়াদের ওপর রাফেযী শব্দটি ব্যবহার করেন। যদিও রাফেযীরা শিয়াদের একটি ফিরকা বা উপদল। ইমাম আবুল হাসান আল-আশ'আরী তার মাকালাতুল ইসলামিয়‍্যীন গ্রন্থে শিয়াদেরকে তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন: এক, আল-গালিয়াহ বা চরমপন্থী, সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়, দুই, আর- রাওয়াফিদ্ব বা রাফেদ্বী গোষ্ঠী, তিন, যায়েদী শিয়া গোষ্ঠী। বলা হয়ে থাকে, প্রথমে এ ফির্কার সকলকে শিয়া বলা হতো, শিয়া শব্দের অর্থ দল। শিয়া আলী বা আলীর দল। তারপর প্রথম তাদের মধ্য থেকে রাফেরী বা রাফেযীরা বের হয়, যখন তাদের মধ্যে এক গোষ্ঠী আবু বকর ও 'উমার এর খিলাফতকে অস্বীকার করতে শুরু করে। কারও কারও মতে, তাদেরকে রাফেদ্বী বা রাফেযী তখন বলা হয়েছিল যখন তারা যায়েদ ইবন আলী ইবনুল হুসাইনের কথা মেনে নিতে অস্বীকার করেছিল, যখন তিনি আবু বকর ও 'উমার রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ঘোষণা প্রদান করলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, 'রাফাদ্বতুমূনী' তোমরা আমাকে প্রত্যাখ্যান করলে? আর তাই তখন থেকে সেসব (আবু বকর ও 'উমারকে) অস্বীকারকারী গোষ্ঠী রাফেদ্বী নামে খ্যাত হলো। বস্তুত এ রাফেদ্বী (রাফেযী)রা শিয়াদের মধ্যকার চরমপন্থী একটি গোষ্ঠী। এদেরও আবার অনেকগুলো ফির্কা বা উপদল রয়েছে, আল-জারূদিয়্যাহ, আল-ইমামিয়্যাহ, (আল- ইসনা আশারিয়‍্যাহ) আল-কাইসানিয়‍্যাহ, আল-হাশেমিয়‍্যাহ, আল-গুরাবিয়্যাহ। তারা মনে করে থাকে যে, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম খিলাফতের ব্যাপারে আলী রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুর নাম স্পষ্ট কর বলে গেছেন। তারা আবু বকর ও 'উমার রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে সম্পর্কচ্যুতি ঘোষণা করে। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পরে আলীকে খেলাফত না দেয়ায় অধিকাংশ সাহাবী পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে এটাও বিশ্বাস করে থাকে। আরও বিশ্বাস করে যে, আলীকে খেলাফত না দেয়ায় উম্মত মুরতাদ হয়ে গেছে। তাদের অনেকেই তাদের ইমামদের মা'সূম বা নিরপরাধ হওয়ার দাবি করে, ইত্যাদি তাদের যাবতীয় কুফরী ও শির্কী আকীদাহ বিশ্বাস। বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, আশ'আরী, মাকালাতুল ইসলামিয়‍্যীন, পৃ. ১৬; আল-আসফারায়ীনী, আত-তাবসীর ফিদ-দীন, পৃ. ১৬; মালাজ্বী, আত-তাম্বীহ ওয়ার রাদ্দ, পৃ. ১৫৬; রাযী, ই'তিক্বাদু ফিরাকিল মুসলিমীনা ওয়াল মুশরিকীন, পৃ. ৭৭; সাকসাকী, আল-বুরহান ফী মা'রিফাতি আক্বায়িদি আহলিল আদইয়ান, পৃ. ৬৫।
৯১৭. মুরজিয়া: শব্দটি ইরজা থেকে। ইরজা শব্দের দু'টি অর্থ রয়েছে। ১- ইরজা অর্থ দেরী করা, দূরে রাখা, পিছিয়ে দেয়া। যেমন; আল্লাহ তাআলা বলেন, ফির'আউন বলেছিল, 'আরিজহ ওয়া আখাহু' [সূরা আল-আ'রাফ: ১১১] অর্থাৎ "মূসা ও তার ভাইকে একটু বিলম্ব করাও"। আর সে হিসেবে এদেরকে মুরজিয়া বলার কারণ তারা আমলকে ঈমানের সংজ্ঞায় প্রবেশ করায় না। তারা বলে, ঈমান হচ্ছে শুধু অন্তরে বিশ্বাসের নাম। আবার তাদের মাঝে কেউ কেউ বলে ঈমান হচ্ছে মুখের স্বীকৃতির নাম। তাদের আরেক দল মনে করে ঈমান হচ্ছে অন্তরের বিশ্বাস ও মুখের স্বীকৃতির নাম। এ শেষোক্তদেরকে বলা হয় 'মুরজিয়া আল ফুকাহা'।
২- ইরজা অর্থ আশাবাদী থাকা, কাউকে আশা প্রদান করা। যেমন কুরআনে এসেছে, 'ইন্নাল্লাযীনা লা ইরজুনা লিকাআনা' [সূরা ইউনুস: ০৭] "নিশ্চয় যারা আমার সাক্ষাতের আশা করে না"। অনুরূপ সূরা হূদ: ৬২। আর সে হিসেবে তাদেরকে মুরজিয়া বলার কারণ তারা শুধু আশা প্রদান করে যায়। তারা মনে করে ঈমান আনার পরে যত গুনাহই করা হোক না কেন তা ঈমানের কোনো ক্ষতি করবে না। যেমনিভাবে কুফরীর সাথে কোনো আনুগত্য কাজে লাগে না। সে হিসেবে তারা এসব গুনাহগারের ঈমান কোনো ক্ষতি না হওয়ার আশা করে থাকে। তাদের কোনো কোনো গোষ্ঠী আবার এতই আশাবাদী যে, তাদের নিকট ঈমানদার যতই গুনাহগার হোক তাকে জান্নাত দেয়া আল্লাহর কর্তব্য। এগুলো অবশ্যই ভুল আকীদাহ। এ ফির্কার লোকেরা অনেকভাবে বিভক্ত; যেমন, জাহমিয়‍্যাহ, ইউনুসিয়‍্যাহ, গাসসানিয়‍্যাহ, তুওমনিয়‍্যাহ, সাওবানিয়‍্যাহ, মারিসিয়‍্যাহ প্রমুখ। দেখুন, আশ'আরী, মাকালাতুল ইসলামিয়‍্যীন, পৃ. ১৩২; শাহরাস্তানী, আল-মিলাল ওয়ান নিহাল (১/১৬১); আল-আসফারায়ীনী, আত-তাবসীর ফিদ-দীন, পৃ. ৫৯; বাগদাদী, আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক, পৃ. ১৯০; রাযী, ই'তিক্বাদু ফিরাক্কিল মুসলিমীনা ওয়াল মুশরিক্বীন, পৃ. ১০৭; সাকসাকী, আল-বুরহান ফী মা'রিফাতি আকায়িদি আহলিল আদইয়ান, পৃ. ৩৩; ইয়াফে'ঈ, যিকরু মাযাহিবিল ফিরাকিস সিনতাইনি ওয়াস সাব'ঈন, পৃ. ১৩২।
৯১৮. মাকালাতুল ইসলামিয়‍্যীন ও ইখতিলাফুল মুসাল্লীন, পৃ. ৩৪৫-৩৪৮।
৯১৯. শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ বিভিন্ন গ্রন্থে আবুল হাসান আল-আশ'আরী কর্তৃক সালাফে সালেহীনের মতাদর্শ জানার পরিধি তুলে ধরেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, 'আবুল হাসান আশ'আরী সালাফে সালেহীনে যে মতাদর্শ জানতেন তা তার এ 'মাকালাতুল ইসলামিয়‍্যীন' তুলে ধরেছেন, আর তিনি এটাকে পছন্দও করেছেন। তিনি আরও বলেছেন, 'আল-মাকালাত' গ্রন্থে যা তিনি উল্লেখ করেছেন তা সুন্নাহ ও হাদীসের নিকটবর্তী। তবে সেখানে এমন কিছু কথা তিনি এনেছেন যা আহলুস সুন্নাহ ও হাদীসের কেউ বলেননি। বস্তুত আহলুস সুন্নাহ ওয়াল হাদীসের আকীদাহ বিষয়ক মতাদর্শ তিনি জানতেনও না; তিনি সেগুলো সম্পর্কে অভিজ্ঞও ছিলেন না।' দেখুন, আন-নুবুওয়াত (২/৬৩১)। তাছাড়া তিনি অন্যত্র বলেন, 'আশআরী তার এ কিতাবে (মাকালাত গ্রন্থে) আহলুল হাদীস ওয়াস সুন্নাহ এর যে মতাদর্শ তুলে ধরেছেন তা হচ্ছে তাই যা তিনি তাদের থেকে বুঝেছেন। মাকালাত লেখকদের সমগোত্রীয়দের মাঝে তার চেয়ে আহলুস সুন্নাত ওয়াল হাদীসের নিকটতম ব্যক্তি আর নেই। তা সত্ত্বেও কুরআনে কারীম, আল্লাহর দীদার, আল্লাহর সিফাত, তাকদীর ইত্যাদি উসূলুদ্দীনের মাসআলাসমূহের ব্যাপারে আহলুস সুন্নাত ওয়াল হাদীসের আসল যে বক্তব্য, যা কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবায়ে কিরামের কথা ও তাদের সুন্দর অনুসারী তাবেয়ীনে 'ইযামের ভাষ্যে এসেছে, তা তার কিতাবে দেখা যায় না।' শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ আরও বলেন, তিনি সিফাতের ক্ষেত্রে ইবন কুল্লাবের নীতির সাহায্য করেছেন, কারণ তা মু'তাযিলাদের কথার চেয়ে হক্ক ও সুন্নাত এর দিক থেকে অধিক নিকটে। তিনি এর বাইরে অন্য (সালাফী) মতাদর্শ জানতেন না। কারণ তিনি সুন্নাহ, হাদীস, সাহাবায়ে কিরামের বক্তব্য, তাবেয়ীনে 'ইযামরে ভাষ্য ইত্যাদি সম্পর্কে বেশি খবর রাখতেন না। অথচ কুরআনে সালাফী তাফসীর ও নিরেট সুন্নাত জানার বিষয়টি কেবল উপরোক্ত উৎসসমূহ থেকেই উপকৃত হয়ে জানা যায়। তাই দেখা গেছে যখনই তিনি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল হাদীসের মতাদর্শ বর্ণনা করতে গেছেন তখনি তিনি মুজমাল বা সংক্ষিপ্ত বাখ্যাসাপেক্ষ্য কথা বলেছেন, যার অধিকাংশই তিনি যাকারিয়া ইবন ইয়াহইয়া আস-সাজী থেকে গ্রহণ করেছিলেন। তার কিছু অংশ তিনি নিয়েছেন বাগদাদের হাম্বলীদের ও অনুরূপ লোকদের থেকে। মুজমাল বা সংক্ষিপ্ত এসব জ্ঞান কি কখনো বিস্তারিত জ্ঞানের মত হতে পারে? দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, মিনহাজুস সুন্নাহ (৫/২৭৫-২৭৯)।
৯২০. যারাই নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশুদ্ধ ও সাব্যস্ত হাদীস প্রত্যাখ্যান করেছে তাদের বিরুদ্ধে সালাফে সালেহীন সর্বদা কঠোর অবস্থানে ছিলেন। এমনকি মু'আয ইবন জাবাল রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসে মিথ্যারোপ করা কুফরী'। দেখুন, আত-তাইমী, আল-হুজ্জাহ ফী বায়ানিল মাহাজ্জাহ (২/৫৩১)।
আইয়্যুব আস-সাখতিয়ানী বলেন, 'যখন তুমি কোনো লোককে সুন্নাত ও হাদীস শুনাবে তারপর যদি সে বলে, এটা এখন ছাড়, আমাদেরকে কুরআন থেকে শোনাও, তখন জেনে নিবে যে এ লোকটি নিজে পথভ্রষ্ট ও অন্যকে পথভ্রষ্টকারী।' দেখুন, হারওয়ী, যাদুল কালামি ওয়া আহলিহী, পৃ. ২০৮।
ইমাম আওযা'ঈ বলেন, 'যার কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো হাদীস পৌঁছার পর সে তাতে মিথ্যারোপ করবে তাহলে তো সে তিনজনের ওপর মিথ্যারোপ করলো, আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও যে তাকে হাদীসটি বর্ণনা করেছে তার ওপর।' দেখুন, আবুল কাসেম আত-তাইমী, আল-হুজ্জাহ ফী বায়ানিল মাহাজ্জাহ (২/৫৩১)।
ইমাম শাফে'য়ী বলেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কিতাবের পাশাপাশি সুন্নাতকেও প্রবর্তন করেছেন। আবার সেসব জায়গাতেও সুন্নাত প্রবর্তন করেছেন যেখানে সরাসরি আল্লাহর কিতাবে কোনো ভাষ্য নেই। আর যা কিছু রাসূল প্রবর্তন করেছেন সেসবের আনুগত্য করা তো আল্লাহ আমাদের ওপর বাধ্য করে দিয়েছেন। কারণ তিনি রাসূলের অনুসরণের মাধ্যমে তাঁর আনুগত্যের বিষয়টি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সেসব সুন্নাত মানতে অস্বীকৃতি হচ্ছে এমন অপরাধ যার জন্য আল্লাহ কাউকে ছাড় বা ওযর পেশ করার সুযোগ দেননি। আর তার জন্য আল্লাহর রাসূলের সুন্নাতসমূহ অনুসরণ করা থেকে বাইরে যাওয়ার কোনো পথ রাখেননি।' আর-রিসালাহ, পৃ. ৮৮-৮৯।
ইমাম আহমাদ বলেন, 'যে কেউ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো হাদীস প্রত্যাখ্যান করবে সে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।' দেখুন, লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ, নং ৭৩৩।
সুন্নাত প্রত্যাখ্যান করার বিষয়টি কেবল বিদ'আতী মু'তাযিলাদের কাছ থেকেই প্রসিদ্ধ হয়ে আছে। তারা তা করত তাদের বাতিল মতাদর্শকে সাহায্য করতে, আর এজন্য যে তাদের কলব ফিতনা ও হিদায়াত থেকে বক্রতায় ছেয়ে গেছে। যেমন তারা অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করেছিল কবীরা গুনাহকারীদের ব্যাপারে শাফা'আত এর হাদীস, অনুরূপভাবে আল্লাহর দীদার সংক্রান্ত হাদীস, তদ্রূপ কবরের আযাবের হাদীস, ইত্যাদি। বিষয়টি দেখা যায় মু'তাযিলাদের গ্রন্থসমূহে, যেমন, কাযী আব্দুল জব্বার এর লেখা, শারহু উসূলিল খামসাহ, পৃ. ২৬৮; ৬৯০; রাসায়িলিল আদলি ওয়াত তাওহীদ, পৃ. ২৮৪; আল-কাসেম আর-রাম্সী, আল-আদলু ওয়াত তাওহীদ, কাযী আব্দু জাব্বার, আল-মুখতাসার ফী উসূলিদ দীন, পৃ. ২৪৫।
বস্তুত সুন্নাত এর ব্যাপারে যারাই অস্বীকার কিংবা বক্রনীতি অবলম্বন করেছে তারাই অবশেষে ফির্কায় পরিণত হয়েছে। বিদ'আতে নিপতিত হয়েছে। এ ধারাবাহিকতায় আমরা দেখতে পাই খারেজীরা পথভ্রষ্ট হয়েছে। মু'তাযিলারা পথ হারিয়েছে। শিয়ারাও একই পথের পথিক হয়েছে। মুরজিয়ারাও আহলুস সুন্নাহ থেকে বের হয়ে গেছে। বর্তমান সময়েও একইভাবে সেসব লোকদেরকে পথভ্রষ্ট হয়ে যেতে দেখছি যারা রাসূলের সুন্নাহ এর ব্যাপারে মুহাদ্দিসগণের অবলম্বনকৃত নীতির বাইরে কোনো ধরনের বক্রপথে চলতে চেয়েছে।
৯২১. আল্লাহ তা'আলার জন্য 'ফারদ' নাম বা গুণ হিসেবে সহীহ হাদীসে তা আসেনি। এ ব্যাপারে বাইহাক্বী রাহিমাহুল্লাহ'র আল-আসমা ওয়াস সিফাতে আসা হাদীসটি অত্যন্ত দুর্বল। দেখুন, বাইহাক্বী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (১/২২৭), নং ১৬০। যদিও হালীমী এটাকে আল্লাহর হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু যেহেতু হাদীসটি সাব্যস্ত নয় তাই এটি আল্লাহর নাম বা গুণ হিসেবে উল্লেখ করা যাবে না। তবে যদি কেউ এটা দিয়ে আল্লাহ সম্পর্কে সংবাদ দেয়, তবে সেটাতে সমস্যা নেই; কারণ আল্লাহ সম্পর্কে সংবাদ দেয়া বা কিছু জানানো জায়েয, তবে শর্ত হচ্ছে আল্লাহর নাম ও গুণের মৌলিক নীতিমালার সাথে বিরোধী না হওয়া। কারণ এ অধ্যায়টি নাম ও গুণের চেয়ে আরও প্রশস্ত। এজন্য এভাবে বলা যাবে যে, সালাফে সালেহীনের ইজমা' বা ঐকমত্য রয়েছে যে মহান আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়, অনন্য, অমুখাপেক্ষী।' দেখুন, ইজতিমা'উল জুয়ুশ, পৃ. ১৭৫।
৯২২. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ যখনই আল্লাহ তা'আলার চোখ গুণটির কথা বর্ণনা করেন, তখন সেখানেই তিনি আশ'আরী রাহিমাহুল্লাহ'র বর্ণনা করা ইজমা'র উদ্ধৃতি প্রদান করেন। তিনি বলেন, 'দু' চোখ, এটি কুরআনে উল্লেখ নেই, তবে তা হাদীসে এসেছে। আর আশ'আরী আহলুস সুন্নাত ওয়াল হাদীস থেকে বর্ণনা করেছেন যে তারা বলে: নিশ্চয় আল্লাহর দু'টি চোখ রয়েছে। তবে যা কুরআনে এসেছে তা হচ্ছে, "তুমি তাকে সিন্দুকের মধ্যে রাখ, তারপর তা দরিয়ায় ভাসিয়ে দাও যাতে দরিয়া তাকে তীরে ঠেলে দেয়, ফলে তাকে আমার শত্রু ও তার শত্রু নিয়ে যাবে। আর আমি আমার কাছ থেকে আপনার ওপর ভালোবাসা ঢেলে দিয়েছিলাম, আর যাতে আপনি আমার চোখের সামনে প্রতিপালিত হন।" [সূরা ত্বা-হা: ৩৯], "আর আপনি আমাদের চাক্ষুষ তত্ত্বাবধানে ও আমাদের ওহী অনুযায়ী নৌকা নির্মাণ করুন এবং যারা যুলুম করেছে তাদের সম্পর্কে আপনি আমাকে কোনো আবেদন করবেন না; তারা তো নিমজ্জিত হবে।” [সূরা হূদ: ৩৭] "আর নূহকে আমরা আরোহণ করালাম কাঠ ও পেরেগ নির্মিত এক নৌযানে, যা চলত আমাদের চোখের সামনে; এটা পুরস্কার তার জন্য, যার সাথে কুফরী করা হয়েছিল।" [সূরা আল-কামার: ১৩-১৪] অনুরূপ যখন ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ যারা আল্লাহর 'চোখ' গুণটির তা'ওয়ীল (অপব্যাখ্যা) বা তাফওয়ীদ্ব (অর্থ না করার) নীতি অবলম্বন করে, যেমন আবুল মা'আলী আল-জুওয়াইনীর দু'টি মতের একটিতে, যখন শাইখুল ইসলাম তাদের এ নীতির সাথে বিতর্ক করেছেন তখন বলেছেন, তাদের ইমাম আবুল হাসান আল-আশ'আরী থেকে এসব গুণাবলি (চেহারা, হাত ও 'আরশের উপর উঠা) ও সেগুলোর ভাষ্যের ব্যাখ্যা দেয়ার ক্ষেত্রে দু'টি মত নেই। বরং এ ব্যাপারে মতভেদ নেই যে, ইমাম আশ'আরী সেগুলোকে সাব্যস্ত করতেন, সেগুলোর অর্থ নাই বলে থেমে যেতেন না, বরং যারা এসব সিফাতের তা'ওয়ীল বা অপব্যাখ্যা দাঁড় করায় তিনি তাদের কর্মকাণ্ডকে অস্বীকার করতেন।' দেখুন, ইবন তাইমিয়‍্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আক্কলি ওয়ান নাক্কলি (৩/৩৮১); আর আশ'আরীর বক্তব্য দেখুন, আল-ইবানাহ 'আন উসৃলিদ দিয়ানাহ, পৃ. ৪৪০।
৯২৩. নাম ও নামকৃত বস্তু বা বিষয় বা ব্যক্তি সংক্রান্ত আলোচনা ইতোপূর্বে চলে গেছে।
৯২৪. অর্থাৎ কেউ যদি বলে 'কুরআন আল্লাহর বাণী' তারপর চুপ করে থাকবে, 'সৃষ্ট নয়' বলা থেকে বিরত থককে সে অবশ্যই বিদ'আতী। কেননা যখন মানুষ এটা নিয়ে খারাপ আকীদাহ রচনা করছে তখন চুপ থাকার মাধ্যমে প্রকারান্তরে খারাপ আকীদাকেই সাপোর্ট করলো। ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল ও অন্যান্য সুন্নাহ'র ইমামগণ বলতেন, 'যে বলবে, কুরআন নিয়ে আমার উচ্চারণ বা কুরআন নিয়ে আমার শব্দ সৃষ্ট হিসেবে ধরা হবে, সে জাহমী। আর যে বলবে, কুরআনে আমার উচ্চারণ করা বা শব্দ করা সৃষ্ট নয় সে বিদ'আতী। কারণ শব্দ এর দু'টি অর্থ হয়, এক. বান্দার কাজ, আর বান্দার কাজ তো সৃষ্ট। দুই, আবার শব্দ দ্বারা বুঝানো হয় শব্দকৃত বাণী। অর্থাৎ সে কথাটি যা উচ্চারণকারী আওড়াচ্ছে। আর সেটা তো আল্লাহর বাণী, উচ্চারণকারীর কথা নয়। সুতরাং কেউ যদি বলে, সেটা সৃষ্ট, তাহলে তো সে বললো: আল্লাহ তা'আলা এ কুরআন দিয়ে কথা বলেননি। আর তখন সেটা জাহমিয়‍্যাদের বক্তব্য হয়ে গেল, সে কারণে ইমাম আহমদ তাকে জাহমি বলতেন। কিন্তু কুরআন নিয়ে বান্দার আওয়াজ করা সেটা অবশ্যই সৃষ্ট। ইমাম আহমাদ ও অন্যান্যগণ এটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, বান্দার কাছ থেকে যে শব্দ শুনা যায় সেটি বান্দার শব্দ। ইমাম আহমাদ কখনো বলেননি, যে কেউ বলবে কুরআন নিয়ে আমার আওয়াজ করা সৃষ্ট সে জাহমী। তিনি তো বলেছেন, যে কেউ বলবে কুরআন নিয়ে আমার শব্দ সৃষ্ট (বললে সে জাহমী)। শব্দ ও (আওয়াজ) করা এ দু'য়ের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট। কারণ কেউ যদি অন্য কারও কথা তার শব্দে পৌঁছে দেয় তাহলে সেটা তো অন্যের শব্দ পৌঁছানো হয় নিজের শব্দ নয়। হ্যাঁ সে উক্ত শব্দ তার নিজের আওয়াজে পৌঁছিয়েছে অন্যের আওয়াজে পৌঁছায়নি। ইমাম আহমাদ বলেন, আমরা বলবো: কুরআন আল্লাহর বাণী, সৃষ্ট নয়, যেভাবেই সেটাকে ব্যবহার করা হোক না কেন। যেভাবেই তিলাওয়াত করা হোক, লেখা হোক পড়া হোক। যা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর বাণী। সেটা তাঁরই বাণী, আর তাঁর বাণী সৃষ্ট নয়। আর যা বান্দার গুণাবলি ও তাদের কর্ম রয়েছে, যা দিয়ে তারা পড়ে ও কথা লিখে, যেমন তাদের আওয়াজ করা তাদের কালি তা তো সৃষ্ট। যে কেউ এ পার্থক্য করতে সক্ষম হবে না সে এখানে বিস্মিত ও সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (১২/৭৪-৭৫)। আরও দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া ১২/২০৬-২১১; ১২/৩২৫, ৩৫৯, ৩৬৪, ৩৬৬, ৩৭৩, ৩৭৫, ৩৯২, ৪২১, ৫৭৩।
৯২৫. এখানে 'বিরত থাকা' বলে বুঝানো হয়েছে, কুরআনের ব্যাপারে বর্ণনা দেয়ার সময় থেমে যাওয়া, বর্ণনা পূর্ণ না করা। কুরআনকে সৃষ্ট বা অসৃষ্ট কিছুই না বলা। আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আত যারা এ রকম থেমে যায়, বিরত থাকে, তাদেরকে 'আল-ওয়াকিফাহ' বলে থাকেন। আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের ইমামগণ এ ধরনের থেমে যাওয়ার নিন্দা করেছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে সোচ্ছার ছিলেন। ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বলকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তাদের জন্য কি এ ছাড় রয়েছে যে, কোনো লোক বলবে, "কুরআন আল্লাহ বাণী" তারপর চুপ থাকবে? তিনি বলেন, কেন চুপ থাকবে? যদি মানুষের মাঝে এ ব্যাপারে কিছু না ঘটতো তবে তাদের জন্য চুপ থাকার সুযোগ থাকতো, কিন্তু মানুষ যখন এর পরে অন্য কথাও বলেছে সুতরাং আর কারো জন্যই এর পরে চুপ করে থাকার বিষয়টি অনুমোদিত নয়।' ইমাম আজুররী রাহিমাহুল্লাহ ইমাম আহমাদ এর উপরোক্ত কথার ওপর টীকা দিয়ে বলেন, "ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বলের কথার অর্থ হচ্ছে, তিনি বলছেন, ঈমানের অধিকারীরা কোনোদিনই এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেনি যে, কুরআন মহান আল্লাহর বাণী। তারপর যখন তাদের মাঝে জাহম ইবন সাফওয়ানের আগমন ঘটলো এবং 'কুরআন সৃষ্ট' এ কথার মাধ্যমে কুফরী মতবাদের প্রচার- প্রসার ঘটালো, তখন আলেমগণের ওপর কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে এটার খণ্ডন করা। আর সে খণ্ডন করার জন্যই তারা বলতে বাধ্য হলো, 'কুরআন মহান আল্লাহর বাণী, সৃষ্ট নয়', কোনো সন্দেহ করে নয়, নিঃসন্দেহে তা বলতে হবে, তাতে কোনো চুপ থাকা যাবে না। সুতরাং যে কেউ 'সৃষ্ট নয়' বলবে না, সে 'ওয়াকিফা' ও তার দীনের মধ্যে সন্দেহকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।" ইমাম আহমাদের ছাত্র আবু তালেব বলেন, আমি আবু আব্দুল্লাহ আহমাদ ইবন হাম্বলকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে, যে ব্যক্তি বিরত থেকে বলেছে, আমি বলবো না, 'তা মাখলুক নয়'। যখন সে আমাকে রাস্তায় পাবে আর আমাকে সালাম দিবে, তখন কি আমি তার সালামের জবাব দিব? তিনি বললেন, তুমি তার সাথে সালাম বিনিময় করবে না, তার সাথে কথা বলবে না। না হলে লোকেরা কীভাবে বুঝবে যে, সে কত খারাপ লোক? কীভাবে লোকেরা বুঝবে যে তুমি তার মতামত খণ্ডন করছ? যখন তুমি তাকে সালাম দিবে না তখন লোকেরা সেটাকে এ লোকের জন্য অপমান বুঝবে, আরও বুঝবে যে তুমি তার কর্মকাণ্ডের নিন্দা করছ, আর মানুষ তখন তাকে চিনতে পারবে। ইমাম আবু দাউদ বলেন, আমি ইমাম আহমাদকে বলতে শুনেছি, তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ঐ ব্যক্তির পিছনে সালাত আদায় করা সম্পর্কে আপনি কী বলেন? যে কুরআন সম্পর্কে বলে: 'আল্লাহর বাণী' আর (অন্য কিছু বলা হতে) বিরত থাকে? তখন তিনি বলেন, আমার কাছে আনন্দদায়ক হবে তাকে নাজেহাল করা। বরং আলেমগণ এমন লোকদেরকে জাহমিয়্যাদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল বলেছেন, 'জাহমিয়্যারা তিনভাবে বিভক্ত: একভাগ বলে, কুরআন সৃষ্ট। অপরভাগ বলে, কুরআন আল্লাহর বাণী তারপর চুপ থেকেছে। আরেকভাগ বলে, 'কুরআন নিয়ে আমাদের 'লাফয' বা উচ্চারণ সৃষ্ট'।
ইবন আবী বাযযাহ বলেন, 'যে কেউ বলবে, কুরআন সৃষ্ট অথবা কুরআন আল্লাহর বাণী বলে চুপ করে যাবে, আর যে বলবে কুরআন নিয়ে আমার উচ্চারণ সৃষ্ট অথবা এর মতো কিছু বলবে, সে অবশ্যই মহান আল্লাহর দীনের বাইরে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের দীনের বাইরে, যতক্ষণ না তাওবা করে ফিরে আসবে। বস্তুত আলেমগণ এ ধরনের 'ওয়াক্কিফা' বা বিরত থাকার নীতি অবলম্বনকারীদের মত খণ্ডন করেছেন আর তাদের ওপর কঠোরতা আরোপ করেছিলেন, বিশেষ করে ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ।
বিস্তারিত দেখুন, আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ, আস-সুন্নাহ (১/১৭৯); আবু দাউদ, মাসায়িলি ইমাম আহমাদ, পৃ. ২৬৩, ২৭০, ২৭১; দারেমী, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ, পৃ. ১৬৮-১৭০; আজুররী, আশ-শরী'আহ, পৃ. ৮৭-৮৮, লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ (১/৩২৩); আল-আসফাহানী, আল-হুজ্জাহ ফী বায়ানিল মাহাজ্জাহ (১/৩৯০)।
৯২৬. সালাফে সালেহীন থেকে মুতাওয়াতির সূত্রে দীনের মধ্যে বিবাদ বিসম্বাদ সৃষ্টি থেকে সাবধান করা হয়েছে। এটাও বর্ণনা করা হয়েছে যে কোনো মানুষের ওপর এসব বিবাদ-বিসম্বাদের কারণে তার মনে সন্দেহ-সংশয় দানা বাঁধতে থাকে। যার ফলে একজন মানুষের দীন ও আকীদাহ বরবাদ হয়ে যায়। 'উমার ইবন আব্দুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'যে কেউ তার দীনকে বিবাদ-বিসম্বাদের জায়গা বানাবে সে অনবরত অবস্থান পরিবর্তন করতে থাকবে।' দেখুন, আব্দুল্লাহ ইবন ইমাম আহমাদ, আস-সুন্নাহ, নং ১০৩; লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ, নং ২১৬।
ইমাম আওযা'ঈ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আল্লাহ যখন কোনো জাতির অকল্যাণ চান তখন তাদেরকে (দীনের মধ্যে) ঝগড়া-বিবাদে লাগিয়ে রাখেন, আর তাদেরকে আমল করা থেকে বিরত রাখেন।' দেখুন, লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ, নং ২৯৬; হারওয়ী, যাম্মুল কালাম, নং ৯১৭।
ইমাম মালেক ইবন আনাস রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'যখনই কোনো ঝগড়ায় পটু লোক যে অন্যের তুলনায় বেশি ঝগড়াটে, সে আমাদের কাছে ঝগড়া করতে আসবে, তার ঝগড়ার কারণে আমরা তা কি ছেড়ে দিব যা জিবরীল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর নাযিল করেছেন?' দেখুন, লালেকাঈ, শারহু উসৃলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আাহ, নং ২৯৩।
সালাফে সালেহীন রাহিমাহুমুল্লাহ এসব ঝগড়া-বিবাদ-বিসম্বাদ থেকে সর্বদা সাবধান করতেন সেজন্য তারা যেসব পথ দিয়ে এসব ঝগড়া বিবাদের সূত্রপাত হতে পারে তা রুদ্ধ করতেন, যেমন তারা বিদ'আতীদেরকে পরিত্যাগ করে চলতেন, ইলম ও আমল নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন, ইসলাম ও মুসলিমদের কল্যাণে রত থাকতেন। ইসহাক্ক ইবন ইবরাহীম আল-ক্বামী বলেন, আওযা'ঈ ও সাওর ইবন ইয়াযীদ 'জিসর' এর কাছে একত্রিত হলেন। তখন আওযা'ঈ বলেন, হে সাওর, যদি (বিদ'আতী) পরিত্যাগ করা দীনের মূলনীতি না হতো তবে আমি তোমাকে সালাম দিতাম। তিনি আরও বলেন, 'সাওর' কাদারিয়াদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। দেখুন, হারওয়ী, যাম্মুল কালাম, নং ৯২০।
শু'বাহ বলেন, সুফইয়ান আস-সাওরী প্রবৃত্তির অনুসারীদের ঘৃণা করতেন, তাদের সাথে বসা থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করতেন। তিনি বলতেন, 'তোমার ওপর কর্তব্য হচ্ছে 'আছার' বা সালাফদের কথার ওপর থাকা, তোমরা আল্লাহর সত্তার ওপর কথা বলা থেকে বেঁচে থাক।' দেখুন, হারওয়ী, যাম্মুল কালাম, নং ৯৩৬।
আব্দুল্লাহ ইবন মাসলামাহ আল-কা'নাবী বলেন, 'মালেক ইবন আনাস বলেন, যত কিছু নিয়েই তুমি খেল-তামাশা কর, তুমি তোমার দীনের বিষয় নিয়ে খেল-তামাশা করো না।' দেখুন, লালেকাঈ, শারহু উসৃলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ, নং ২৯৫। এ অধ্যায়ে সালাফদের থেকে আসা আছারসমূহ অনেক বেশি।
৯২৭. অর্থাৎ আল্লাহর সিফাতের ক্ষেত্রে তারা এ প্রশ্ন করতো না; কারণ তারা ভালো করেই জানে যে, এর প্রকৃত জ্ঞান আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে নেই।
৯২৮. অর্থাৎ আল্লাহর কর্মের ক্ষেত্রে। কারণ তাঁর কর্ম সম্পর্কে প্রশ্ন করতে আমাদের নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, "তিনি কী করবেন সেটা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা যাবে না, তাদেরকেই তো প্রশ্ন করা হবে।" [সূরা আল-আম্বিয়া: ২৩]
৯২৯. আশ'আরী রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহর 'কুরব' বা নৈকট্যকে তাঁর ব্যাপক গুণ সাব্যস্ত করতে চাচ্ছেন। বস্তুত তা সঠিক নয়। সঠিক হচ্ছে আল্লাহর 'কুরব' বা 'নৈকট্য' কেবল তাঁর বিশেষ গুণ যা দোআ কবুল বা সাওয়াব প্রদানের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। 'মা'য়িয়্যাত' বা সঙ্গে থাকার মত সবার জন্য 'কুরব' বা 'নৈকট্য' সাব্যস্ত করার গুণ আল্লাহর জন্য কুরআন ও সুন্নাহ'য় আসেনি। বিষয়টি নিয়ে ইতোপূর্বে আলোচনা চলে গেছে।
৯৩০. এটি তার 'মাকালাতুল ইসলামিয়্যীন ওয়া ইখতিলাফুল মুসাল্লীন' গ্রন্থের একটি শিরোনাম, যা তিনি আহলুস সুন্নাহ ও আসহাবুল হাদীসের আকীদাহ বর্ণনা করার আগেই 'মুজাসসিমাহ'দের আকীদাহ বর্ণনা করার মাঝে বর্ণনা করেছেন। সেটার অধ্যায় শিরোনাম হচ্ছে, বাবু ইখতিলাফুহুম ফিল বারী, হাল হুয়া ফী মাকানিন.....। তারপর তিনি সেখানে আল্লাহর 'আরশের উপরে থাকা নিয়ে আহলুস সুন্নাহ ও আসহাবুল হাদীসগণের মত আলোচনা করেন। দেখুন, পৃ. ২৮৫। অনেকে এটিকে আলাদা গ্রন্থ মনে করে থাকবেন, তাই বিষয়টির ব্যাপারে সাবধান করা হলো।
৯৩১. আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আত জিসিম শব্দটি আল্লাহর জন্য ব্যবহার করেন না। 'জিসিম' শব্দের প্রচলিত অর্থ দেহ, বদন, শরীর ইত্যাদি। এখানে আশ'আরী জিসিম অস্বীকার করেছেন সম্ভবত এ অর্থেই। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আকলি ওয়ান নাকলি (১/১১৯); ইবন তাইমিয়্যাহ, মিনহাজুস সুন্নাহ (২/৫৫০)। তবে 'জিসিম' শব্দটি মানতিক বা কালামশাস্ত্রবিদদের নিকট ভিন্ন অর্থ প্রদান করে। তাদের নিকট কয়েকটি 'জাওহার' মিলে একটি 'জিসিম' হয়। আর জাওহার হচ্ছে এমন কিছু যা সম্পূর্ণ একক বা মৌলিক। যা নিজেই নিজের অস্তিত্বের জন্য যতেষ্ট। যাতে কোনো (আরদ্ব) বা গুণ এর সমাহার নেই বা সমাহার হতে পারে না। আর যখনই এটা বলা হবে যে, কয়েকটি জাওহার নিয়ে জিসিম হয়; তখনই তাদের নিকট জিসিম এর সংজ্ঞা দাঁড়ায়, যার ডান-বাম, উপ-নিচ আছে। বিশুদ্ধ কথা হচ্ছে, 'জিসিম' শব্দটি একটি মুজমাল শব্দ। এটাকে স্বীকার কিংবা অস্বীকার করার জন্য বিস্তারিত প্রশ্ন করে জেনে নিতে হবে, এর দ্বারা বক্তার উদ্দেশ্য কী? কোনো প্রকার বাচ-বিচার না করে জিসিম অস্বীকার করাও আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মানহাজ নয়। যারা বলে সালাফে সালেহীনের মতাদর্শ হচ্ছে তাওহীদ সাব্যস্ত করা, আল্লাহকে পবিত্র করা, তাজসীম (শরীর) ও তাশবীহ (সাদৃশ্য) প্রদান করা নয়, এভাবে পাইকারী কথা বলার ব্যাপারে ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ সাবধান করেছেন। তিনি বলেন, তাজসীম বা তাশবীহ এ শব্দদ্বয় সালাফে সালেহীনের কোনো ভাষ্যে আসেনি। তারা সেটা সাব্যস্ত করা বা না করার কোনোটিই তারা করেননি (কুরআন ও সুন্নাতেও তা আল্লাহর জন্য হ্যাঁ বা না কোনোভাবেই ব্যবহৃত হয়ে আসেনি)। তাহলে কীভাবে এটা বলা সম্ভব যে 'তাজসীম' বা জিসিম শব্দটি সাব্যস্ত করা বা নিষেধ করা সালাফদের মতাদর্শ? অথচ শব্দটি তারা উল্লেখও করেননি, আর শব্দটি দ্বারা কী উদ্দেশ্য নেয়া হচ্ছে সেটাও তাদের থেকে বর্ণনা করা হয়নি।' মাজমূ' ফাতাওয়া (৪/১৫২)।
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ একাধিক জায়গায় এটি প্রতিষ্ঠা করেছেন যে, জিসিম শব্দটি একটি মুজমাল বা সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যেয় শব্দ। বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে উদ্দেশ্য বর্ণনা ব্যতীত সেটা সাব্যস্ত করা কিংবা না করা কোনোটাই বিশুদ্ধ হবে না। তিনি বলেন, 'আর 'জিসিম' শব্দটি এটি একটি মুজমাল শব্দ, শরী'আতে এর কোনো মৌলিক ভিত্তি নেই। সেটাকে না করতে বা সেটাকে হ্যাঁ বলতেও দলীল বা বিস্তারিত বর্ণনা দেয়ার প্রয়োজন হবে।' মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/৩০৭)। আরও দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, মিনহাজুস সুন্নাহ (২/১৯৮); ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আক্কলি ওয়ান নাক্কলি (২/১১)। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ আরও সাব্যস্ত করে দেখিয়েছেন যে, 'জিসিম' এর ব্যাপারে কথা বলা, অনুরূপ মুজমাল শব্দ ব্যবহার করা কেবল জাহমিয়‍্যাহ, কালামশাস্ত্রবিদ প্রমুখ বিদ'আতীদের থেকেই এসেছে। সালাফে সালেহীন তাদের বক্তব্যে জাহমিয়্যাদের দ্বারা 'জিসিম' অস্বীকার করার ব্যাপারে কঠোর নিন্দা করেছেন। তারা এটাও বলেছেন যারা এ শব্দটি সাব্যস্ত করে তাদের থেকে এরা যারা এটাকে না করে তারা বেশি পথভ্রষ্ট ও বিদ'আতী। তিনি বলেন, 'এটা বলা যে, আল্লাহ জিসিম নন, জাওহার নন, মুতাহায়িয নন, জগতের ভিতরেও নন, বাইরেও নন ইত্যাদি বক্তব্যগুলো কখনও উম্মতের কোনো সালাফে সালেহীনের বক্তব্য নয়, অনুরূপ কোনো ইমামও তা বলেননি, আর না তার ভিত্তি আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাবসমূহের কোনোটিতে আছে, না নবী-রাসূলগণ থেকে আসা কোনো ভাষ্যে সেটা এসেছে। বরং উম্মতের সালাফে সালেহীন ও ইমামগণ থেকে মুতাওয়াতির বা নিরবিচ্ছিন্ন বিশুদ্ধ বহু লোকের বর্ণনায় এসেছে যে, যারা উপরোক্ত কথা বলতো তাদের এসব কথাকে সালাফ ও ইমামগণ অস্বীকার করতেন এবং এসব বক্তার বিদ'আতী হওয়ার বিষয়ে মত প্রকাশ করতেন...。
তারপর বলেন, সালাফে সালেহীন ও ইমামগণ আল্লাহর জন্য এসব নাম সাব্যস্তও করতেন না, অস্বীকারও করতে না। কারণ সাব্যস্ত করা কিংবা অস্বীকার করা উভয়টির মধ্যেই দীনের মধ্যে বিদ'আতের অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়, কেননা তাতে রয়েছে ইজমাল বা সংক্ষিপ্ততা ও ইশতিরাক বা বহুমুখী অর্থের সংশ্লিষ্টতা। তা দ্বারা বাতিল সাব্যস্ত করা হয়ে যেতে পারে আবার হক্ককেও বাতিল করা হয়ে যেতে পারে।... বস্তুত জিসিম শব্দটির ব্যাপারে সালাফগণের কারও কাছ থেকে সেটার নিন্দা কিংবা অস্বীকার করার ব্যাপারে কিছু সংরক্ষিত হয়ে আসেনি। যেমনিভাবে তাদের কাছ থেকে সেটার প্রশংসা কিংবা স্বীকারোক্তিও আসেনি।' ইবন তাইমিয়াহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়‍্যাহ (২/৪৯৮-৪৯৯)।
তারপর ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যদি 'জিসিম' শব্দটি দ্বারা উদ্দেশ্য হয়, এমন কিছু যা নিজ সত্তায় অস্তিত্বশীল, নিজেই নিজের ওপর অবস্থান করে অস্তিত্বশীল হয়ে আছে, অথবা এমন এক সত্তা যার গুণাবলি রয়েছে, অথবা যাকে আখেরাতে দেখা যাবে, অথবা যাকে দেখা সম্ভব, অথবা যিনি জগতের বিপরীতে তার উপরে ইত্যাদি অর্থসমূহ, যেসব অর্থ শরী'আত ও বিবেকের দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে (এগুলো উদ্দেশ্য হিসেবে বললে), তবে তাকে বলা হবে, এ অর্থগুলো তো বিশুদ্ধ; কিন্তু এ অর্থগুলোর জন্য তোমার এ 'জিসিম' শব্দটির ব্যবহার শরী'আতের দৃষ্টিতে বিদ'আত, ভাষার নিয়মের বিপরীত। কারণ কোনো শব্দে যখন হক্ক ও বাতিল উভয় অর্থ করার সম্ভাবনা দেখা দেয় তখন সেটি নিঃশর্তভাবে ব্যবহার করা যাবে না। বরং এমন শব্দ ব্যবহার করতে হবে যা হক্ককে প্রতিষ্ঠিত করে আর বাতিলকে দূর করে।' দেখুন, ইবন তাইমিয়‍্যাহ, মিনহাজুস সুন্নাহ (২/২১১-২১৪)।
৯৩২. এ বক্তব্যটিও সালাফে সালেহীনের বক্তব্য নয়। এ বক্তব্যকে তাদের দিকে সম্পৃক্ত করা ঠিক হবে না। আহলুস সুন্নাহ ও আসহাবুল হাদীস কখনো এটিকে ব্যবহার করতেন না। কারণ 'তাশবীহ' শব্দটি একটি মুজমাল তথা সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যেয় শব্দ যা ব্যাখ্যার দাবি রাখে। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়‍্যাহ একাধিক স্থানে এ বিষয়টি বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, 'তাশবীহ' শব্দটি মুজমাল বা সংক্ষিপ্ত অথচ ব্যাখ্যার দাবি রাখে এমন শব্দ।' দেখুন, ইবন তাইমিয়াহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/১০৯, ৩৮৯); মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/৩৬৪)। আর যেহেতু এ শব্দটিতে ইজমাল (সংক্ষিপ্ততা) ও ইশতিারক (বহুমুখী অর্থের সমাহার) রয়েছে, ইবন তাইমিয়াহ রাহিমাহুল্লাহ যখন 'আল-আকীদাতুল ওয়াসেত্বিয়‍্যাহ' রচনা করেছিলেন তখন এ শব্দটিকে পরিহার করেন। তিনি কুরআন, সুন্নাহ ও সালাফে সালেহীনের ভাষ্যে আসা শব্দ ব্যবহার করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন 'তামসীল' ও 'তাকয়ীফ' ব্যতীত। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/১৯৫), হিকায়াতু মুনাযারাতিল ওয়াসিত্বিয়্যাহ। তিনি বলেন, 'আমি আল্লাহর সিফাতের ব্যাপারে যা তাঁর থেকে না করতে হবে সেটা বর্ণনার সময় 'তামসীল' শব্দটি ব্যবহার করেছি, 'তাশবীহ' শব্দটি ব্যবহার করিনি; কারণ আল্লাহ তা'আলা তাঁর কিতাবের সরাসরি শব্দ দিয়ে 'তামসীল'কেই না করেছেন, যখন তিনি বলেন, لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ "তাঁর মতো কোনো কিছু নেই।” [সূরা আশ-শূরা: ১১] আরও বলেছেন, ﴾هَلْ تَعْلَمُ لَهُ سَمِيًّاً "তুম "কি তার সমনামের কাউকে জান?" [সূরা মারইয়াম: ৬৫] আর এটি আমার নিকট সেসব শব্দ থেকে বেশি প্রিয় যা আল্লাহর কিতাবে নেই, আর যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামে সুন্নাতে নেই, যদিও কখনও কখনও সে শব্দ (তাশবীহ) দ্বারা 'না' করা দ্বারা বিশুদ্ধ অর্থ উদ্দেশ্য হতে পারে, কিন্তু এর দ্বারা বাতিল অর্থও উদ্দেশ্য নেয়া যায়।' মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/১৬৬)।
সালাফে সালেহীনের অনেকেই সেসব মুশাব্বিহাদের নিন্দা করেছেন যারা আল্লাহর গুণাবলিকে বান্দার গুণাবলির মতো মনে করতো। তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন আব্দুর রহমান ইবন মাহদী, ইয়াযীদ ইবন হারূন আল-ওয়াসেত্বী, আহমাদ ইবন হাম্বল, ইসহাক্ক ইবন রাহওয়িয়াহ প্রমুখ। [ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/১৮৭)]
যারা 'তাশবীহ' শব্দটি নিঃশর্তভাবে সাব্যস্ত কিংবা অসাব্যস্ত করেছেন তাদের ব্যাপারে বিশুদ্ধ ও তাহকীকী কথা হচ্ছে, যদি এ 'তাশবীহ' শব্দটি দিয়ে যা কুরআন নিষেধ করেছে, আর বিবেক যার ওপর প্রমাণবহ এমন কিছু উদ্দেশ্য হয় তবে তা হক্ক ও যথাযথ; কারণ মহান রবের বৈশিষ্ট্যের কোনো কিছু দিয়ে সৃষ্টির কাউকে গুণান্বিত করা যাবে না, আর মহান আল্লাহর কোনো গুণাবলিতে তাঁর সৃষ্টির সামান্যতম সাদৃশ্য থাকতে পারে না।
আর যদি 'তাশবীহ' দ্বারা উদ্দেশ্য এটা হয় যে, আল্লাহ তা'আলার জন্য কোনো সিফাত সাব্যস্ত করা যাবে না। যেমন বলা হবে না যে, তাঁর ইলম রয়েছে, তাঁর কুদরত রয়েছে, তাঁর জীবন রয়েছে; কারণ বান্দা তো এসব গুণে গুণান্বিত, এরকম বক্তব্য যদি সত্য হয় তবে তো আল্লাহকে জীবিত, জ্ঞানী ও ক্ষমতাবানও বলা যাবে না; কারণ বান্দাকেও কখনও কখনও এ সব নামে নামকরণ করা হয়ে থাকে। অনুরূপভাবে তাঁর কথা, শোনা, দেখা ও তাঁকে দেখা ইত্যাদির ব্যাপারেও একই কথা বলা যাবে। তারা (কালামশাস্ত্রবিদ আশায়েরা ও মাতুরিদীরা) আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের সাথে একমত হয়ে বলে যে, আল্লাহ তা'আলা (মাওজুদ) অস্তিত্ববান, তিনি (হাইয়্যুন) জীবিত, তিনি (আলীমুন) জ্ঞানী, তিনি (কাদেরুন) সক্ষম। অপর দিকে সৃষ্টিকেও বলা হয় অস্তিত্বশীল, জীবিত, জ্ঞানী, সক্ষম। অথচ বলা হয় না যে এটা তো 'তাশবীহ', যা আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা হবে না, বা এগুলো আল্লাহর থেকে না করা ফরয। আর এটি এমন এক বিষয় যার ওপর কুরআন, সুন্নাহ ও স্পষ্ট বিবেকের যুক্তি সাক্ষ্য দিচ্ছে। কোনো বিবেকবান মানুষের পক্ষে সেটার বিরোধিতা করা সম্ভব নয়; কারণ আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিজেকে এমনসব নাম দিয়ে নামকরণ করেছেন, যার অনুরূপ নাম দিয়ে তিনি তাঁর কোনো কোনো বান্দারও নামকরণ করেছেন। তেমনিভাবে তিনি তাঁর গুণাবলির জন্য এমনসব বিশেষ্য ব্যবহার করেছেন যেগুলোর কোনো কোনোটি দিয়ে তাঁর সৃষ্টির কারও গুণ বর্ণনা করেছেন। এ নামকৃত সত্তা কখনও সে নামকৃত সত্তার মতো নয়।' [মিনহাজুস সুন্নাহ (২/১১২)]
এখানে ইমাম আশ'আরী রাহিমাহুল্লাহ যে কথাটি বলেছেন যে, 'তিনি কোনো কিছুর সাথে তাশবীহ রাখেন না'। এর মাধ্যমে ভিন্ন একটি নিষিদ্ধ অর্থ নেয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই সেটি বলা যাবে না যার মাধ্যমে আল্লাহর সিফাত বা গুণাবলি অস্বীকার করার সম্ভাবনা আসতে পারে। যেমনটি ইমাম আহমদ রাহিমাহুল্লাহ জাহমিয়্যাদের সাথে মুনাযারার সময় বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, 'আমরা তাদেরকে বললাম, তিনি (আল্লাহ) কি শাই' (কিছু)? তখন তারা বললো, তিনি (শাইয়ূন লা কাল আশইয়ায়ি) শাই' তবে অন্য সব শাই' এর মত নয় (কিছু তবে অন্যকিছুর মত নয়)। তখন আমরা বললাম, যে শাই' কোনো শাই' এর মত নয় বিবেকবানরা জানে যে সেটা আসলে কিছুই না। তখন মানুষের কাছে স্পষ্ট হয় গেল যে, জাহমিয়ারা আসলে কোনো কিছুর ওপরই ঈমান আনে না। তবে তারা প্রকাশ্যে সেটা ঘোষণা না দেয়ার মাধ্যমে নিজেদের দোষ ঢাকার চেষ্টা করে।' আর-রাদ্দু আলায যানাদিকাহ ওয়াল জাহমিয়‍্যাহ, পৃ. ২০৯।
এখানে লক্ষণীয় যে, ইমাম আহমাদ বলেছেন, যে শাই' কোনো শাই' এর মত নয় বিবেকবানরা জানে যে সেটা আসলে কিছুই না।' অথচ আল্লাহ তা'আলা নিজের জন্য শাই' দিয়ে সংবাদ দেয়া সাব্যস্ত করেছেন। [যেমন, সূরা আল-আন'আম: ১৯] সেখানেও মু'আত্তিলা সম্প্রদায় আল্লাহকে শাই' বলতে রাযী নয়। আশা'য়েরা ও মাতুরিদিয়‍্যাহ সম্প্রদায় যদি আল্লাহকে 'লা ইয়ুশবিহুল আশইয়া' বলে, (যা শরী'আতে কখনও সাব্যস্ত কিংবা নিষেধ করা হয়নি) তাহলে তো তারা এর মাধ্যমে মূলত আল্লাহর গুণাবলি অস্বীকার করার অশুভ পঁয়তারা করেই তা ব্যবহার করলো।
তবে সম্ভবত ইমাম আবুল হাসান আল-আশ'আরী রাহিমাহুল্লাহ সে উদ্দেশ্যে 'তাশবীহ' (সাদৃশ্য) কথাটি ব্যবহার করেননি, কারণ তিনি সিফাত সাব্যস্ত করেছেন। কিন্তু তার অনুসারী কেউ এ শব্দ অযথা তর্ক করতে পারে তাই 'তাশবীহ' শব্দটির ব্যাপারে সালাফে সালেহীনের অবস্থান জানিয়ে দেয়া হলো।
৯৩৩. এভাবে 'ইস্তিওয়া' শব্দটিকে অপব্যাখ্যা করে 'ইস্তাওলা' বা 'কাহারা' এ অর্থে নিয়েছে কোনো কোনো মু'তাযিলা। সর্বপ্রথম জাহমিয়্যারা এ অর্থ নেয়, তারপর জাহমিয়্যদের দ্বারা প্রভাবিত পরবর্তী কালাম -শাস্ত্রবিদদের অনেকেই এ অপব্যাখ্যার আশ্রয় নেয়। [দেখুন, আবুল হাসান আল-আশ'আরী, আল- মাক্কালাত ও আল-ইবানাহ] আর অধিকাংশ ভাষাবিদরা মু'তাযিলীদের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ায় তারাও সেটা অনায়াসে গ্রহণ করে নেয়। যেমন, ১- আব্দুল্লাহ ইবন ইয়াহইয়া ইবনুল মুবারক মৃত্যু, ২৩৭ হিজরী, গারীবুল কুরআন ওয়া তাফসীরুহু। ২- আবু ইসহাক্ক ইবরাহীম ইবনুস সারী আয-যাজ্জাজ মৃত্যু ৩১১ হিজরী, মা'আনিল কুরআন। ৩- আবু মানসূর আল-মাতুরিদী আল-হানাফী, মৃত্যু ৩৩৩ হিজরী, তা'ওয়ীলাতু আহলিস সুন্নাহ।
৪- আবুল কাসেম আয-যাজ্জাজী, মৃত্যু ৩৪০ হিজরী, ইশতিকাকি আসমায়িল্লাহি। ৫- আবু বকর আহমাদ আর-রাযী আল-জাসসাস, মৃত্যু ৩৭০ হিজরী, আহকামুল কুরআন। ৬- কাযী আব্দুল জাব্বার, মৃত্যু ৪১৫ হিজরী, তাঁর শারহুল উসূলিল খামসাহ গ্রন্থে পৃ. ১৫১। ৭- আবুল হাসান আল-মাওয়ারদী, মৃত্যু ৪৫০ হিজরী, তাফসীর আন-নুকাতু ওয়াল 'উয়ূন। ৮- হাফেয বাইহাক্বী, মৃত্যু ৪৫৮ হিজরী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত। ৯- আবুল হাসান আল-ওয়াহেদী, মৃত্যু ৪৭৮ হিজরী, আল-ওয়াজীয়। ১০- হুসাইন ইবন মুহাম্মাদ আদ-দামেগানী আল-হানাফী, ৪৭৮ হিজরী, ইসলাহুল ওজুহ। ১১- ইমামুল হারামাইন, আব্দুল মালেক ইবন আব্দুল্লাহ আল-জুওয়াইনী, মৃত্যু ৪৭৮ হিজরী, আল-ইরশাদ। ১২- আব্দুর রহমান ইবন মুহাম্মাদ আশ-শাফে'ঈ, আল-মুতাওয়াল্লী, মৃত্যু ৪৭৮ হিজরী, আল-গুনইয়া। ১৩- আবুল কাসেম হুসাইন ইবন মুহাম্মাদ আর-রাগেব আল-আসফাহানী, মৃত্যু ৫০২ হিজরী, আল-মুফারাদাত। ১৪- আবু হামেদ মুহাম্মাদ ইবন মুহাম্মাদ আল-গাযালী, মৃত্যু ৫০৫ হিজরী, এহইয়াউ উলুমিদ্দীন। ১৫- আব্দুর রহীম ইবন আব্দুল কারীম আল-কুশাইরী, মৃত্যু ৫১৪ হিজরী, আত-তাযকিরাতুশ শারকিয়্যাহ। ১৬- আবুল ওয়ালীদ ইবন রুশদ আল-জাদ্দ, মৃত্যু ৫২০ হিজরী, আল-মাদখাল লি ইবনিল হাজ্জ। ১৭- আবুস সানা আল-লামুশী আল-হানাফী আল-মাতুরিদী, মৃত্যু ষষ্ঠ শতাব্দীর শুরুতে। ১৮- আব্দুর রহমান ইবনুল জাওযী, মৃত্যু ৫৯৭ হিজরী, দাফ'উ শুবাহিত তাশবীহ। ১৯- ফখরুদ্দীন আর-রাযী, মৃত্যু ৬০৬ হিজরী, তাফসীর মাফাতীহুল গাইব, আসাসুত তাকদীস পৃ. ১১৬। ২০- সাইফুদ্দীন আল-আমেদী, মৃত্যু ৬৩১ হিজরী, আবকারুল আফকার। এরপর সেটা পরবর্তী আশআরী আর মাতুরিদীদের মধ্যে ব্যাপক হয়ে যায়।
একটু চিন্তা ও গবেষণা করলে সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠবে যে, ১- 'ইস্তেওয়া'কে 'ইস্তাওলা' এ অর্থ কোনো সাহাবী, তাবেয়ী, গ্রহণযোগ্য ইমামদের থেকে বর্ণিত হয়ে আসেনি। ২- প্রথম তিন যুগ, যাদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তম হওয়ার সুসংবাদ দিয়েছেন তাদের কেউ এ অর্থ করেছেন দেখা যায় না। ৩- সর্বপ্রথম এ অপব্যাখ্যা বা বিকৃতিটির সূত্রপাত হয়েছে জাহমিয়্যাহ ও কোনো কোনো মু'তাযিলাদের থেকে। ৪- তারপর এ অপব্যাখ্যাটি মু'তাযিলাদের ছাত্র আরবী ভাষাবিদদের মধ্যে পরবর্তীতে সেটা ব্যাপক হয়ে পড়ে। ৫- পরবর্তী যারাই তাফসীর করেছেন তারা এসব ভাষাবিদদের বক্তব্য নিয়ে আসায় এখানে ভুলে নিপতিত হয়েছেন। ৬- বস্তুত ইস্তিওয়াকে 'ইস্তাওলা' বলার পক্ষে আরবী ভাষার কোনো নযীর নেই। বরং খালীল ইবন আহমাদ আল-ফারাহীদী, আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবন যিয়াদ (ইবনুল আ'রাবী), আবুল আব্বাস সা'লাব, আবু আব্দুল্লাহ নিফতাওয়াইহ, তারা সবাই ইস্তিওয়াকে ইস্তাওলা অর্থ করা আরবী ভাষায় নেই বলেছেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য আমার "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন" এ গ্রন্থটি দেখা যেতে পারে।
৯৩৪. উপরে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়াহ'র ভাষ্য অনুযায়ী কিতাবটির নাম দেখানো হয়েছে, আল-ইবানাহ ফী উসুলিদ দিয়ানাহ। কিন্তু এ কিতাবটি কয়েকটি মুদ্রণে 'আল-ইবানাহ 'আন উসূলিদ দিয়ানাহ' এভাবে ছাপা হয়েছে। যার কোনো কোনোটি তাহক্বীককৃত, আবার কোনো কোনোটি তাহক্বীক ছাড়াই। তন্মধ্যে বর্তমানে যেগুলো প্রসিদ্ধ তা হচ্ছে,
১- আল-ইবানাহ আন উসূলিদ দিয়ানাহ, তাহকীক ড. ফাওকীয়াহ বিনতে হুসাইন মাহমূদ, প্রথম ছাপা, ১৩৯৭ হিজরী, দারুল আনসার। এ ছাপার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তাতে একাধিক পাণ্ডুলিপির ওপর নির্ভর করা হয়েছে। আর তাতে ইমাম আবুল হাসান আল-আশআরীর ব্যাপারে ব্যাপক আলোচনা স্থান পেয়েছে। যদিও এ ছাপায় কিছু দৃষ্টি আকর্ষণীয় বিষয় আছে, আর তার বড়টি হচ্ছে, এমন একক নুসখাকে মূল ধরা হয়েছে যাতে বাড়তি অনেক কথা স্থান পেয়েছে যা অন্যান্য কপিগুলোতে নেই। আরেক সমস্যা হচ্ছে এ বাড়তি অংশ মূল কিতাবের অংশ হিসেবে প্রবিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। এসব বাড়তি কথার কোনো কোনো অংশ সালাফে সালেহীনের মানহাজ বিরোধী, যা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, তা কিতাবের মানহাজ পরিপন্থী। ড. আব্দুর রহমান সালেহ আলে মাহমূদ এ মুদ্রিত কপিটির দোষগুলো বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। দেখুন, মাওকাফু ইবন তাইমিয়্যাহ মিনাল আশা'য়িরাহ (১/৩৫২-৩৫৫)।
২- ড. সালেহ আল-উসাইমী, তিনি এ কিতাবটির সুন্দর তাহকীক করেছেন। এটি সবচেয়ে চমৎকার। এতে তিনি ড. ফাওকীয়ার তাহকীকের ভুলগুলো তুলে ধরেছেন। দেখুন, পৃ. ১২২-১৩৩।
৩- আরেকটি ছাপা যা ইমাম মুহাম্মাদ ইবন সা'উদ আল-ইসলামিয়্যাহ কর্তৃক ১৪০০ হিজরী সালে সম্পন্ন হয়েছে, যাতে কোনো তাহকীক বা টাকা নেই।
৪- আরেকটি ছাপা যা মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক মদীনার তৎকালীন শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস শাইখ হাম্মাদ আল-আনসারীর ভূমিকাসহ বের হয়েছে, এতেও কোনো তাহকীক বা টীকা নেই।
বস্তুত এ কিতাবটির ব্যাপারে মানুষের বিতর্ক চরমে। কারণ এ কিতাবের বক্তব্য পরবর্তী আশ'আরী মতবাদের লোকদের আকীদাহ-বিশ্বাস পরিপন্থী। বিশেষ সিফাতে খাবরিয়‍্যাহ তথা আল্লাহর কুরআন ও রাসূলের হাদীসে আসা সিফাতের ব্যাপারে ইমাম আশ'আরীর এ কিতাবের বক্তব্য পরবর্তী আশ'আরী মতবাদের লোকদের নীতির সরাসরি বিরোধী। কারণ এ কিতাবে তাদের নীতির বাইরে আল্লাহর জন্য সত্তাগত সর্বোচ্চ সত্তা হওয়া এবং 'আরশের উপরে উঠা সাব্যস্ত করার পাশাপাশি প্রায় সকল সিফাতে যাতিয়্যাহ ও সিফাতে ফিলিয়্যাহ সাব্যস্ত করা হয়েছে।
আল-ইবানাহ ও ইমাম আশ'আরী: এ কিতাবটি যে ইমাম আবুল হাসান আল-আশ'আরীর রচনা এ ব্যাপারে প্রাচীনকালের আশঙ্খারী মতবাদের কারও দ্বিমত ছিল না। যারা যারা এ কিতাবটি ইমাম আবুল হাসান আল-আশ'আরীর বলে উল্লেখ করেছেন, তারা হচ্ছেন, ১- ইমাম বাইহাক্কী, আল-ই'তিক্বাদ, পৃ. ১০৮। ২- আৰু 'উসমান আস-সাবুনী, যেমনটি বর্ণনা করেছেন ইবন আসাকির, তাবয়ীনু কাযিবিল মুফতারী, পৃ. ৬৭৮; আরও দেখুন, ইবন রাজাব, ফাতহুল বারী (৫/১০২)। ৩- ইবন আসাকির, তাবঈনি কাযিবিল মুফতারী, পৃ. ৩৮৮-৩৮৯। ৪- আল-বাকেল্লানী, শারহুল ইবানাহ। এটি মূলত ইমাম আবুল হাসান আল-আশ'আরীর গ্রন্থের ব্যাখ্যা। ৫- ইবন ফারহূন, আদ-দীবাজুল মুযাহহাব, পৃ. ১৯৩। ৬- ইবনুল 'ইমাদ, শাযরাতুয যাহাব (২/৩০৩)। আর বলেছেন এটি তার সর্বশেষ কিতাব। ৭- আবুল কাসেম আব্দুল মালেক ইবন 'ঈসা ইবন দারবাস আশ-শাফেয়ী, আয-যাব্বু আন আবিল হাসান আশ'আরী। ৮- আবু আলী আল-হাসান ইবন আলী ইবন ইবরাহীম আল-ফারেসী। ৯- শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, তিনি এ কিতাবের ব্যাপারে অনেক গুরুত্ব দিতেন। এজন্য এ কিতাব থেকে তিনি বহু অধ্যায় নিজের অনেক কিতাবে নিয়ে এসেছেন। যেমন, দারউত তা'আরুদ্ব (২/১৬), (৫/৬), (৭/১০৩), (১০/২৬২)। বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/৪২০), (২/১৫, ২৭, ৩৩৪, ৩৪৮, ৩৯৭)। মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/১২, ২০৫), (৫/১৪৪, ১৮৬, ১৮৮), (৬/৫২), (১২/২০৩, ৩৬৩), (১৩/১৭৪), (১৬/৯১)।
১০- ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুয়ূশ পৃ. ২৮৬; আস-সাওয়ায়িকুল মুরসালাহ (৪/১২৪৩)।
১১- ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৫/৯০); আল-আরশ ১৯২, ১৯৫, ১৯৭; যাহাবী, আল-'উলু লিল 'আলিয়িয়ল 'আযীম (২/১২৪৫), নং ৪৯৮। তিনি আরও বর্ণনা করেছেন যে, ইমাম নাওয়াওয়ী স্বহস্তে তার পাণ্ডুলিপি লিখেছেন।
১২- ইবন কাসীর, ত্বাবাক্বাতুল ফুকাহা আশাফে'ইয়‍্যাহ (১/২০৫), জীবনী নং ৯৩। সেখানে তিনি এটাও বর্ণনা করেছেন যে, ইমাম আবুল হাসান আল-আশ'আরীর জীবনের তিনটি স্তর ছিল। সর্বশেষ স্তরে এসে তিনি এ গ্রন্থটি লিখেছেন।
১৩- ইবন আব্দুল হাদী আল-মাক্কদেসী, আল-কালামু আলা মাসআলাতিল ইস্তিওয়া আলাল 'আরশি, পৃ. ৭৩।
১৪- সাফাদী, আল-ওয়াফী বিল ওফায়াত (১২/১১), (১৯/১১৭)।
১৫- তাজউদ্দীন আস-সুবুকী, ত্বাবাক্বাতুশ শাফে'ঈয়্যাহ আল-কুবরা (১/১৩৩)।
১৬- ইবন রাজাব, ফাতহুল বারী (৫/১০২)।
১৭- ইবনু হাজার, লিসানুল মীযান (৪/৪৮৭)।
১৮- মার'ঈ ইবন ইউসুফ আল-কারামী, আক্বাওয়ীলুস সিক্কাত, পৃ. ১৪৫।
১৯- সাফারীনী, লাওয়ামি'উল আনওয়ার আল-বাহিয়‍্যাহ ১/২২, ৬৭, ১৯৭, ২৪০।
২০- আস-সাইয়্যেদ মুরতাদ্বা আয- যাবীদী, ইতহাফুস সাদাতিল মুত্তাকীন (২/৩-৪) (দারুল ফিকর)।
২১- খাইরুদ্দীন আল-আলুসী, জালাউল 'আইনাইন, পৃ. ২৪৭, ২৫২।
সর্বোপরি এ কিতাবের রয়েছে অনেক পাণ্ডুলিপি। সকলেই কিতাবটিকে ইমাম আবুল হাসান আল-আশ'আরীর বলে দাবি করেছেন। আর যারা সেসব কিতাবের পাণ্ডুলিপি লিখেছেন তারা বিখ্যাত আলেমে দীন ও মুসান্নিফীনে কুতুবে দীন। তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন ইমাম নাওয়াওয়ী। যা এর সত্যতার একটি বড় প্রমাণ।
বরং ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রাহিমাহুল্লাহ ইমাম আবুল হাসান আশ'আরী রাহিমাহুল্লাহ'র ছাত্রদের এ ব্যাপারে ঐক্য বর্ণনা করেছেন যে, আল-ইবানাহ ইমাম আশ'আরীর রচিত গ্রন্থ। দেখুন, আহকামু আহলিয যিম্মাহ (২/১১৩৮)।
এত দলীল-প্রমাণের পরও বর্তমান সময়ের কোনো কোনো লেখককে দেখা যায় প্রাচ্যবিদ কারও কারও দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এ কিতাবকে ইমাম আবুল হাসান আল-আশ'আরীর দিকে সম্পৃক্ত করতে সন্দেহ প্রকাশ করতে। তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ড. আব্দুর রহমান বাদাওয়ী, মাযাহিবুল ইসলামিয়‍্যীন (১/৫১৭-৫১৮)। অনুরূপ প্রাচ্যবিদদের মধ্যে প্রাচ্যবিদ মুকার্থী, আলার। আর যাহেদ কাউসারী তথা পরবর্তী আশ'আরীদের মত হচ্ছে ইমাম আশ'আরী এ গ্রন্থটি হাম্বলীদের খুশি করার জন্য লিখেছেন। কারণ তিনি বাগদাদে প্রবেশ করে ইমাম বারবাহারীর মজলিসে বসার পর যখন বললেন যে, তিনি জাহমিয়্যাহ, মু'তাযিলা প্রমুখদের বিরুদ্ধে রদ্দ করেছেন, তখন বারবাহারী বললেন, আমি তো এসব কিছুকে কোনো কাজই মনে করছি না, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য এগুলো বড় কাজ নয়। বিশুদ্ধ আকীদাহ ও সুন্নাহ'র প্রসারে কাজ যা হবে সেটাই কাজ। তখন নাকি ইমাম আশ'আরী সেখানকার হাম্বলীদের খুশি করার জন্য এটা লিখেছিলেন।
না'ঊযুবিল্লাহ, 'তা'আস্সুব' বা গোঁড়ামী মানুষকে কত অন্ধ করে দেখুন, তারা তাদের ইমামকে মুনাফিক বানিয়ে ছাড়লো। তারপরও ইমামের কাছে থাকা হক্ক গ্রহণ করতে রাযী হলো না। এভাবেই শয়তান তার অনুসারীদের নিয়ে খেলা করে থাকে। আমরা বিশ্বাস করি যে, নিশ্চয় ইমাম আশ'আরী হক্ক বুঝেই এ কিতাব রচনা করেছেন, কোনো কপটতা করার জন্য নয়। আল্লাহ এসব গোঁড়াদেরকে হিদায়াত দিন।
এর বিপরীতে এ কিতাবের প্রশংসা যারা করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন, ১- ইমাম বাইহাক্বী রাহিমাহুল্লাহ্ ২- ইমাম ইবন আসাকির রাহিমাহুল্লাহ। ৩- অনুরূপ ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ।
তিনি যখন আশ'আরী মতবাদের লোকদের আলোচনা করছিলেন তখন বলেন, "আর আশ'আরীদের মধ্যে যারা বলে যে, 'আল-ইবানাহ' কিতাবটি ইমাম আশ'আরী জীবনের শেষাংশে লিখেছেন, আর তার কাছ থেকে এর বিপরীত কিছু এর পর প্রকাশ পায়নি, তাকে আহলুস সুন্নাহ এর অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য করা হবে।" মাজমু' ফাতাওয়া (৬/৩৫৯)। ৪- তদ্রূপ ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রাহিমাহুল্লাহ। তিনি ইমাম আশ'আরীর কিছু বাণী উদ্ধৃত করার পর বলেন, "এ হচ্ছে তার ভাষ্য, যা তার সবচেয়ে সম্মানিত কিতাবে ও বড় কিতাবে এসেছে, যা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত বর্ণনায়, আর তা তার থেকে প্রসিদ্ধ, যা 'আল-ইবানাহ' নামে প্রসিদ্ধ। যার ওপর নির্ভর করেছেন তার ব্যাপারে বেশি জ্ঞানী, তার থেকে প্রতিরোধকারী আহলুল হাদীস আলেম ইমাম আবুল কাসেম ইবন আসাকির। কারণ ইবন আসাকির তার 'তাবয়ীনি কাযিবিল মুফতারী' গ্রন্থে এ কিতাবের ওপর নির্ভর করেছেন এবং এ কিতাবকে ইমাম আশ'আরীর বড় মর্যাদার বিষয় বলে বর্ণনা করেছেন।" ইবনুল কাইয়্যেম, আস-সাওয়া'য়িকুল মুরসালাহ (৪/১২৮১-১২৮২)।
৫- ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ। তিনি বলেন, "যদি আমাদের মুতাকাল্লিম ভাইয়েরা (আশ'আরীদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন) তারা যদি আবুল হাসান এর এ মতগুলোই সর্বশেষ মত হিসেবে গ্রহণ করতো আর সেগুলোকে আবশ্যকভাবে গ্রহণ করতো, তবে তারা তো অবশ্যই ভালো কাজটিই করতো।” যাহাবী, আল-'উলু লিল 'আলিয়্যিল 'আযীম (২/১২৫৫)।
৬- অনুরূপ ইমাম ইবন রাজাব রাহিমাহুল্লাহ। তিনি বলেন, "...আর তার কিতাব, যার নাম আল-ইবানাহ, এটি তার মর্যাদাপূর্ণ কিতাবের অন্তর্ভুক্ত। তার ওপরই আলেমগণ তার মতামত বর্ণনার ব্যাপারে নির্ভর করে থাকে এবং তা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে থাকেন। যেমন বাইহাকী, আবু উসমান আস-সাবুনী, আবুল কাসেম ইবন আসাকির প্রমুখ। আর এ কিতাবটির ব্যাখ্যাই করেছেন কাযী আবু বকর ইবনুল বাকেল্লানী।" ইবন রাজাব, ফাতহুল বারী (৫/১০২)।
তাছাড়া প্রখ্যাত আলেমগণের অনেকে স্পষ্ট করে ঘোষণা করেছেন যে, এ 'আল-ইবানাহ' কিতাবটি ইমাম আশ'আরী তার শেষ জীবনে সর্বশেষ কাজ হিসেবে করেছেন, যেমন, ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/১৩৬); ইবনুল 'ইমাদ, শাযরাতুয যাহাব (৪/১৩১); ইবন কাসীর, তাবাক্বাতুল ফুক্বাহাউশ শাফে'য়ি‍্যীন (১/২০৫); নু'আন খাইরুদ্দীন আল-আলুসী, জালাউল 'আইনাইন, পৃ. ৪৬২ প্রমুখ।
৯৩৫. কাদারিয়‍্যাহ বলতে সাধারণত তাদেরকে বুঝায়, যারা বিশ্বাস করে যে, বান্দা নিজের কর্ম নিজে সৃষ্টি করে থাকে। আর তারা মূলত মু'তাযিলা নামে খ্যাত। তাদেরকে কখনও কখনও কাদারিয়‍্যাহ-মু'তাযিলা নামে একসাথেও বলা হয়। কিন্তু যখন কেউ বলে মু'তাযিলা ও কাদারিয়্যাহ তখন সেখানে কাদারিয়‍্যাহ শব্দ দিয়ে জাবরিয়াদের বুঝানো হয়। যারা বান্দার কোনো কাজের ক্ষমতা স্বীকার করে না।
৯৩৬. ইসলাম ও ঈমান বিষয়ক মাসআলা, আর এ দু'টি কি একটি অপরটির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে? আবু জা'ফর মুহাম্মাদ ইবন আলী আল-বাকের রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'এ হচ্ছে ইসলাম, তারপর তিনি একটি বড় বৃত্ত আঁকলেন। তারপর তিনি সে বড় বৃত্তের মাঝখানে ছোট্ট একটি বৃত্ত এঁকে বললেন, এ হচ্ছে ঈমান। বস্তুত ইসলাম ও ঈমান এ দু'টির মাঝে ব্যাপকতা ও বিশেষতার সম্পর্ক। বলা হয়ে থাকে, যখন এ দুটি একসাথ হয় তখনই তা ভিন্ন ভিন্ন অর্থ দিতে আরম্ভ করে, আর যখন আলাদা থাকে তখন একটি অপরটির সমার্থে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ যখন কোথাও ইসলামের সাথে ঈমান ব্যবহৃত হয় তখন ঈমান বলতে বুঝাবে কেবল সেসব আমল যা অন্তরের সাথে সম্পৃক্ত হয় যেমন আল্লাহর ওপর ঈমান, ফিরিশিতাদের ওপর ঈমান, কিতাবের ওপর ঈমান, রাসূলগণের ওপর ঈমান, আখেরাতের ওপর ঈমান, শেষ দিবসের ওপর ঈমান, তাক্বদীরের ওপর ঈমান। আর তখন ইসলাম বলতে বুঝাবে প্রকাশ্য আমলসমূহ, কালেমা তাইয়্যেবার শাহাদাত, কালেমায়ে রিসালাতের শাহাদাত, সালাত, যাকাত, সাওম, হজ ইত্যাদি। এ বিস্তারিত অবস্থানটিই আমরা হাদীসে জিবরীল নামে খ্যাত রাসূলের মুখ নিঃসৃত বাণীতে পার্থক্য হিসেবে দেখতে পাই। যখন জিবরীল 'আলাইহিস সালাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইসলাম, ঈমান ও ইহসান সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন। হাদীসটি দেখুন, বুখারী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং (১/১১৪), নং ৫০; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ৮। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরীলের হাদীসে ইসলাম কাকে বলা হবে, ঈমান কাকে বলা হবে আর ইহসান কাকে বলা হবে এগুলোর মধ্যে পার্থক্য করেছেন। বরং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম দীনের তিনটি স্তর নির্ধারণ করেছেন, সর্বোচ্চ স্তর ইহসান, মধ্যম স্তর ঈমান, আর তার পরে হচ্ছে ইসলাম। সুতরাং প্রত্যেক মুহসিন অবশ্যই মুমিন, আর প্রত্যেক মুমিন অবশ্যই মুসলিম, কিন্তু প্রত্যেক মুমিন ব্যক্তি মুহসিন নয়, অনুরূপ প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তি মুমিন নাও হতে পারে। তবে এ পার্থক্য দ্বারা এটা আবশ্যক হয় না যে, তার একটি অপরটি থেকে সম্পূর্ণভাবে পৃথক হয়ে যাবে।
তারপর ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, ইহসান স্বয়ং ব্যাপক বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত হলেও ব্যক্তিদের দিক থেকে ঈমানের চেয়ে বিশেষায়িত। অনুরূপ ঈমান স্বয়ং ব্যাপক বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত হলেও ব্যক্তিদের দিক থেকে ইসলামের চেয়ে বিশেষায়িত। সুতরাং ইহসানের অভ্যন্তরে ঈমান প্রবেশ করবে, আর ঈমানের অভ্যন্তরে ইসলাম প্রবেশ করবে। কিন্তু মুহসিনগণ মুমিনগণের তুলনায় বিশেষায়িত, আর মুমিনগণ মুসলিমগণের তুলনায় বিশেষায়িত। দেখুন, ঈমান, পৃ. ১-৭; ২৪৩, ৩০২, ৩৫০।
এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন, শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, আল-ঈমান, পৃ. ১-১০, ১৫৩-১৬৩, ২৪৬ ও তৎপরবর্তী, ইবন আবিল ইযা, শারহুত ত্বাহাওয়িয়্যাহ (২/৪৮৮-৪৯৪)।
৯৩৭. 'প্রতিটি ইসলাম ঈমান নয়' এ কথাটির অর্থ ইসলাম বিভিন্ন কারণে কোনো মানুষের জন্য ব্যবহার করা যায়, যা ঈমানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। যেমন এক প্রকার ইসলাম হচ্ছে তা যার ওপর সাওয়াব হয়, যার কারণে কুফরী ও নিফাক্বী থেকে বের হয়ে যায়, যেমন বেদুঈনদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, "বেদুঈনরা বলে, 'আমরা ঈমান আনলাম'। বলুন, 'তোমরা ঈমান আননি, বরং তোমরা বল, 'আমরা আত্মসমর্পণ করেছি', কারণ ঈমান এখনো তোমাদের অন্তরে প্রবেশ করেনি। আর যদি তোমরা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর তবে তিনি তোমাদের আমলসমূহের সাওয়াব সামান্য পরিমাণও লাঘব করবেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু'।” [সূরা আল-হুজুরাত: ১৪] আরেক প্রকার ইসলাম আছে যাতে কেউ মৃত্যু থেকে বেঁচে যায়, যেমন মুনাফিকদের ইসলামের পরিচয়। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, আল-ঈমান, পৃ. ৩৩২, ৩৪২, ৩৯৭।
৯৩৮. ইমাম আশ'আরী রাহিমাহুল্লাহ এখানে আল্লাহ কর্তৃক বান্দার নৈকট্য লাভের বিষয়টিকে ব্যাপক হিসেবে নিয়েছেন। বিশুদ্ধ কথা হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য বিশেষ গুণ। সেটা 'সাথে থাকা'র মত ব্যাপক গুণ নয়। এ মাসআলাটি ইতোপূর্বে বর্ণিত হয়েছে।
৯৩৯. আমরা পূর্বে এ আয়াতের আলোচনায় জানিয়েছি যে, প্রাধান্যপ্রাপ্ত মতে এখানে 'ফিরিশতাদের' বুঝানো হয়েছে। এখানে আল্লাহকে বুঝানো হয়নি। এ বিষয়ে আরও দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৬/৩০)।
৯৪০. সম্ভবত ইমাম আশ'আরী রাহিমাহুল্লাহ এখানে 'দুনুও' বা নিকটে হওয়া দ্বারা আল্লাহ কর্তৃক তাঁর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটবর্তী হওয়া বুঝেছেন, যা ইবন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা ও মুকাতিল ইবন সুলাইমান থেকে একটি বর্ণনায় এসেছে। দেখুন, ইবন জারীর আত-তাবারী, জামেউল বায়ান 'আন তা'ওয়ীলে আয়িল কুরআন (২২/৫০২); ইবনুল জাওযী, যাদুল মাসীর (৮/৬৫-৬৬); কুরতুবী, আল-জামে' লি আহকামিল কুরআন (১৭/৮৯); সুয়ূত্বী, আদ-দুররুল মানসূর (৭/৬৪৫)।
কিন্তু এ আয়াতের তাফসীরে বিশুদ্ধ মত হচ্ছে, এখানে জিবরীল 'আলাইহিস সালাম কর্তৃক মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটবর্তী হওয়াকে বুঝানো হয়েছে। আর এটিই অধিকাংশ সাহাবী, তাবে'য়ী যেমন কাতাদাহ, হাসান আল-বসরী, রবী ইবন আনাস প্রমুখের মত। ইবন আতিয়্যাহ আল- আন্দালুসী বলেন, এটিই অধিকাংশের মত। দেখুন, আল-মুহাররার আল-ওয়াজীয় (১৪/৮৯-৯০)। ইবন কাসীর বলেন, 'এখানে নিকটে হওয়া দ্বারা জিবরীলকে বুঝানো হয়েছে। যেমনটি বুখারী ও মুসলিমে সাব্যস্ত হয়েছে। [বুখারী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ৩২৩৫, ৪৮৫৬; মুসলিম, আস- সহীহ, হাদীস নং ১৭৪, ১৭৭] আর তা উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা, ইবন মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু, থেকে বর্ণিত। তাছাড়া তা সহীহ মুসলিমে আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত। [মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ১৭৫] আর সাহাবায়ে কিরামের মধ্য থেকে এ আয়াতকে এ হাদীস দ্বারা তাফসীর করার ব্যাপারে কোনো বিরোধিতা পাওয়া যায়নি, তাই সেটাই প্রাধান্য পাবে।' ইবন কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম (৫/৮)।
অন্যত্র ইবন কাসীর বলেন, মুফাসসিরগণের মতামত থেকে বিশুদ্ধটি হচ্ছে, বরং অকাট্যভাবে এটাই বলা হবে যে, এ আয়াতে যাকে নিকটে আসা বুঝানো হয়েছে তিনি জিবরীল 'আলাইহিস সালাম। যেমনটি বুখারী ও মুসলিম তাদের সহীহ গ্রন্থে আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করেছেন, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'এ হচ্ছে জিবরীল।' সুতরাং এ হাদীস সকল বাদানুবাদের পথ বন্ধ করে দিয়েছে, আর সংশয় দূর করে দিয়েছে।' ইবন কাসীর, আল-ফুসূল ফী সীরাতির রাসূল, পৃ. ২৬১। আর এখানে ইবন কাসীর রাহিমাহুল্লাহ যে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন 'তা ইমাম মুসলিমের বর্ণিত শব্দ। দেখুন, মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ১৭৭। এজন্য আমাদের উস্তাদগণের উস্তাদ শাইখ মুহাম্মাদ আল-আমীন আশ-শানক্কীত্বী বলেন, 'তিনি হচ্ছেন জিবরীল এটাই তাহকীকী কথা, মহান আল্লাহ নন।' দেখুন, আশ-শানকীত্বী, আদ্বওয়াউল বায়ান (৩/১০)।
এখানে একটি বিষয়ে সাবধান করা দরকার, তা হচ্ছে, সূরা আন-নাজম এর এ আয়াতে বর্ণিত 'দুনুও' ও 'তাদাল্লী' বা 'নিকটে আসা ও কাছে আসা' এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক ইসরা ও মি'রাজের রাত্রির ব্যাপারে বর্ণিত 'দুনুও' ও 'তাদাল্লী' এক নয়। কারণ সূরা আন- নাজম এর আয়াতে জিবরীল কর্তৃক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে আসা ও কাছে থাকা বুঝানো হয়েছে, যেমনটি আয়েশা ও ইবন মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহুম 'আনহা বলেছেন, আর আয়াতের পূর্বাপর বিশ্লেষণ তার ওপরই প্রমাণবহ। কারণ আল্লাহ বলেন, "তাকে শিক্ষা দান করেছেন প্রচণ্ড শক্তিশালী।" [সূরা আন-নাজম: ০৫] এটা অবশ্যই জিবরীল, এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই, তারপর বলা হয়েছে "সৌন্দর্যপূর্ণ সত্তা। অতঃপর তিনি স্থির হয়েছিলেন, আর তিনি ছিলেন ঊর্ধ্বদিগন্তে, তারপর তিনি তার কাছাকাছি হলেন, অতঃপর খুব কাছাকাছি।” [সূরা আন-নাজম: ৬-৮] এটাও জিবরীলই হবেন; যাতে করে সর্বনামগুলো এক দিকে প্রর্ত্যাবর্তন করানো যায়। আর তা হচ্ছে শক্তিশালী শিক্ষক, যিনি অত্যন্ত সুন্দর জিবরীল 'আলাইহিস সালাম।
কিন্তু ইসরা ও মি'রাজের হাদীসে আসা 'দুনুও' ও 'তাদাল্লী' বা নিকটে আসা ও কাছে হওয়ার বিষয়টিতে এটাই সুস্পষ্ট যে, সেখানে মহান রাব্বুল আলামীন কর্তৃক মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে আসা বুঝানো হয়েছে। সূরা আন-নাজমে মোটেই সেটার দিকে ইঙ্গিত করা হয়নি।' দেখুন, ইবনুল কাইয়্যেম, যাদুল মা'আদ (৩/৩৮)।
৯৪১. এখানে আল্লাহর বাণী উল্লেখ করার আগে অন্যের 'কাহিনী বর্ণনা' এ শব্দটি ইমাম আশ'আরী বর্ণনা করেছেন। এ বিষয়টি কারও কারও কাছে সমস্যাগ্রস্ত মনে হতে পারে। কারণ পরবর্তী আশ'আরী ও মাতুরিদিয়্যাহ সম্প্রদায়ের লোকেরা সাধারণত আল্লাহর কুরআনকে সরাসরি আল্লাহর বাণী বলার চেয়ে আল্লাহর বাণীর বর্ণনা বলতে পছন্দ করেন। কারণ তারা মনে করে যে, আল্লাহর বাণী তো তাঁর অন্তরে, বাইরে যা বর্ণ ও ভাষায় এসেছে তা সে বাণীর কাহিনী রূপ। সে জন্য আল্লাহর বাণীকে কখনও আল্লাহর বাণীর কাহিনী বলা জায়েয হবে না। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/১৪৪, ১৭৫, ১৯৯), (১২/২৭২, ৩৭৫)।
কিন্তু ইমাম আশ'আরী এখানে সে উদ্দেশ্যে বলেননি। কারণ ইমাম আশ'আরী অন্য সব জায়গায় আল্লাহর বাণী বলেছেন, যা দ্বারা বুঝা যায় তিনি উক্ত বিদ'আতী বক্তব্য দেননি। বরং তিনি কুরআনকে সরাসরি আল্লাহর বাণীই সাব্যস্ত করেন। এজন্য উত্তম অর্থে সেটাকে নিতে হবে, আর তা হচ্ছে তিনি বুঝাতে চেয়েছেন উক্ত বক্তব্যটি প্রথমে ফির'আউন তার সহচর হামানকে বলেছিল, কিন্তু কীভাবে কোন ভাষায় ছিল সেটা আমরা জানি না, অতঃপর আল্লাহ আমাদেরকে উক্ত বক্তব্য বর্ণনা করেছেন আল্লাহর নিজস্ব শব্দে।
ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, কেউ যদি বলে কুরআন হচ্ছে 'কাহিনী বর্ণনা' অর্থাৎ কুরআনকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন, যেমন বলা হয়, 'তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রচার করেছেন', 'তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে আদায় করেছেন', তাহলে সে অবশ্যই বিশুদ্ধ অর্থ উদ্দেশ্য নিয়েছে। দেখুন, মাজমু' ফাতাওয়া (১২/২৮০); বকর আবু যাইদ, মু'জামুল মানাহিল লাফযিয়্যাহ, পৃ. ৪২৫ ও তার পরের বর্ণনা।
বস্তুত এভাবে বলার বিষয়টি যুগ যুগ ধরে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের ইমামগণের মাঝে প্রচলিত হয়ে এসেছে। বিষয়টির ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে আরও দেখা যায়, আবুল কাসেম আত- তাইমী, আল-হুজ্জাহ ফী বায়ানিল মাহাজ্জাহ (১/৩৪৩), (২/১৭৭); আবুল কাসেম আল-বাগাওয়ী, তাফসীর মা'আলিমুত তানযীল (১/৭৩); ইবন তাইমিয়‍্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়‍্যাহ (১/১৭৪); জামে'উ'র রাসায়িল (১/২১৪), (২/১৩৬); মাজমূ' ফাতাওয়া (১০/৫০৭), (৩০/৩৬৭); যাহাবী, আল- 'আরশ, পৃ. ১৯২-১৯৩; আদ-দুরারুস সানিয়্যাহ (১/১৯৯, ৪১৮), (৩/১২৩), (৯/২৬৬, ২৭০); আশ-শানকীত্বী, আদ্বওয়াউল বায়ান (৭/২৮২)।
বস্তুত আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আলেমগণ যখন 'কাহিনী বর্ণনা' বাক্য ব্যবহার করেন, আর যখন আশ'আরী ও কুল্লাবিয়া সম্প্রদায় ব্যবহার করে উভয়ের উদ্দেশ্যের মধ্যে বিশাল পার্থক্য বিদ্যমান। দেখুন, মাজমু' ফাতাওয়া (৩/১৪৪, ১৭৫, ১৯৯), (১২/২৭২, ৩৭৫)।
৯৪৭. ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রাহিমাহুল্লাহ এ বাতিল তা'ওয়ীলকে ৪২টি উপায়ে খণ্ডন করেন, যা যেকোনো মানুষের জন্য যথেষ্ট হতে পারে। দেখুন, মুখতাসারুস সাওয়া'য়িক (২/১৩৭-১৫২)।
৯৪৮. ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহর 'হাত' গুণটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করেছেন, আর তিনি যারা এ গুণটির অপব্যাখ্যা করেছেন সেসব জাহমিয়্যাহ ও তাদের অনুসারীদের বক্তব্য দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে খণ্ডন করেছেন। সেখানে তিনি সেসব জাহমিয়‍্যাহ ও তাদের অনুসারীদের বক্তব্য খন্ডনের বহু দিক তুলে ধরেছেন, কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফদের অনেক আছার নিয়ে এসেছেন, তারপর বলেন, 'যদি আমরা আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের সব বক্তব্য নিয়ে আসি তবে সেটা শতাধিক হয়ে যাবে।' দেখুন, মুখতাসারুস সাওয়া'য়িক (৩/৯৪৬-৩৮৪)। তিনি আরও বলেন, 'ইয়াদ' শব্দটি কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবায়ে কিরামের ভাষ্য, তাবেয়ীনে 'ইযামের বক্তব্যে একশ' এর বেশি স্থানে এসেছে। আর তার আসার ধরণও বিচিত্র, আর তা এমনসব দলীল-প্রমাণাদি সমৃদ্ধ যা প্রমাণ করে যে, এটা দ্বারা প্রকৃত হাতই বুঝানো হয়েছে। যেমন এসেছে ধারণ করা, ভাঁজ করা, মুষ্ঠিবদ্ধ করা, প্রশস্ত করে দেয়া, মুসাফাহা করা, আঁজলা, হাত দিয়ে পানির ঝাপটা দেয়া, দু' হাতে সৃষ্টি করা, দু' হাত সরাসরি ব্যবহার করা...' দেখুন, মুখতাসারুস সাওয়ায়িক (৩/৯৮৪)..।
৯৪৯. হাদীসটির তাখরীজ ইতোপূর্বে চলে গেছে।
৯৫০. হাদীসটির তাখরীজ ইতোপূর্বে চলে গেছে।
৯৫১. এ হাদীসটি এ শব্দে কোথাও পাওয়া যায়নি। তবে কাছাকাছি শব্দে তা বিভিন্ন গ্রন্থে এসেছে, যেমন: ১- দারাকুতনী, আস-সিফাত, হাদীস নং ২৮। ২- আবুশ শাইখ, আল-আযামাহ, হাদীস নং ১০১৭। ৩- বাইহাক্বী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (২/১২৫), হাদীস নং ৬৯২; আব্দুল্লাহ ইবনুল হারেস, তার পিতা থেকে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "নিশ্চয় আল্লাহ তিনটি বস্তু নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন, তাওরাত নিজ হাতে লিখেছেন, ফিরদাউস নিজ হাতে স্থাপন করেছেন....." হাদীসের শেষ পর্যন্ত। এরপর বাইহাক্বী বলেন, হাদীসটির সনদ মুরসাল। তার সনদে আবু মি'শার নাজীহ ইবন আব্দুর রহমান রয়েছেন। তিনি দুর্বল বর্ণনাকারী। ৪- ইমাম আবু নু'আইম তার 'সিফাতুল জান্নাত' (১/৪৮-৪৯) নং ২৩ এ রকম একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। ৫- অনুরূপ হাদীস ইবন 'উমার রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকেও মাওকুফ সূত্রে হাকেম তার মুস্তাদরাকে বর্ণনা করেছেন (২/৩৪৯), তার শব্দ হচ্ছে, "আল্লাহ তা'আলা চারটি জিনিস নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন, 'আরশ, জান্নাতু 'আদন, আদম ও কালাম।" তারপর হাকেম বলেন, এ হাদীসটির সনদ বিশুদ্ধ তবে বুখারী ও মুসলিম তারা কেউই তা সংকলন করেননি, আর তার সাথে যাহাবী একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। ৬- আরও সংকলন করেছেন উসমান ইবন সা'ঈদ আদ-দারেমী। দেখুন, আর-রাদ্দু আলা বিশর আল-মিররীসী (১/৪৭২)। ৭- অনুরূপ বর্ণনা জাবের রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে মাওকুফ সূত্রে এসেছে। তার শব্দ হচ্ছে, "নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিজ হাতে তিনটি জিনিস ব্যতীত কিছু স্পর্শ করেননি, জান্নাত নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন.. আদমকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন, তাওরাতকে মুসার জন্য নিজ হাতে লিখেছেন।" ইবন আবী শাইবাহ তা তার আল-মুসান্নাফে (১৩/১৯৬) সংকলন করেন। ৮- আরও সংকলন করেছেন আব্দুল্লাহ ইবন ইমাম আহমাদ আস-সুন্নাহ (১/২৯৫), নং ৫৭০ ইবন আব্বাস থেকে। তবে তার সনদ দুর্বল। কারণ তাতে আলী ইবন যায়েদ ইবন জুদ'আন রয়েছেন। ৯- তাছাড়া এ রকম আরও কিছু বর্ণনা মাওকুফ সূত্রে কা'ব আল-আহবার থেকে এসেছে, 'নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা তিনটি জিনিস ব্যতীত কোনো কিছু নিজ হাতে করেননি, আদম, তাওরাত; কারণ তা তিনি মূসার জন্য লিখেছেন, তৃবা যা জান্নাতের এক প্রকার গাছ, আল্লাহ তা'আলা নিজ হাতে তা লাগিয়েছেন।' দেখুন, আজুররী, আশ-শরী'আহ, পৃ. ৩০৩। তবে বিশুদ্ধ কথা হচ্ছে হাদীসটি ইবন 'উমার রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমার ওপর মাওকুফ। দেখুন, ইবনুল কাইয়্যেম, হাদীউল আরওয়াহ (১/২১৫)।
৯৫২. আবুল হাসান আল-আশ'আরী, তিনি কালামশাস্ত্রবিদ হওয়া সত্ত্বেও সেসব কালামশাস্ত্রবিদদের মতবাদকে চূর্ণ করলেন, যারা আল্লাহর দু' হাত থাকার গুণটি অস্বীকার করে, তিনি সেটা সাব্যস্ত করার জন্য কুরআন থেকে দলীল নিলেন, যেখানে আল্লাহ বলেছেন, "যা আমার দু' হাত সৃষ্টি করেছে"। [সূরা স্বদ: ৭৫] বস্তুত আল্লাহর দু'হাত সাব্যস্ত করার ব্যাপারে এটি সবচেয়ে স্পষ্ট আয়াত। কারণ দ্বি-বচন দিয়ে যা বলা হয় তা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, সুনির্দিষ্ট সংখ্যাকেই বুঝায়। দেখুন, আত-তাদমুরিয়‍্যাহ, পৃ. ২২১; ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়‍্যাহ (৫/৪৭৮-৪৮৫)। আর যখনই কোথাও 'ইয়াদ' (হাত) দ্বিবচনের শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তখন সেটা প্রকৃত হাত অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে, এর বাইরে কখনও ব্যবহৃত হয়নি। দেখুন, ইবনুল কাইয়্যেম, মুখতাসারুস সাওয়া'য়িক (২/১৫৫)। আর যখন তা 'বা' অব্যয় দিয়ে সমাপিকা ক্রিয়া হিসেবে 'ইয়াদ' বা হাতের সাথে সম্পৃক্ত হয় তখন সেটা দ্বারা কেবল নিজ হাতে সম্পন্ন করাই বুঝায়। দেখুন, ইবনুল কাইয়্যেম, মুখতাসারুস সাওয়া'য়িক (২/২৭০)।
ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'ইয়াদাইন' শব্দটি দ্বি-বচনে নি'আমত অর্থেও ব্যবহৃত হয়নি, ক্ষমতা অর্থেও ব্যবহৃত হয়নি। আর যা বলা হয় যে, একের জন্য দুই আর দু'য়ের জন্য এক ব্যবহৃত হওয়ার নিয়ম রয়েছে, সে কথার কোনো ভিত্তি নেই। কারণ এগুলো সংখ্যা, আর সংখ্যা তার অর্থ অতিক্রম করে না, নির্দিষ্ট করে শুধু তাই বুঝায়।
সুতরাং ]إِنَا خَلَقْتُ بِيَدَى﴾ [ص : ٧٥ "যা আমার দু' হাত সৃষ্টি করেছে” [সূরা স্বদ: ৭৫] এর দ্বারা কোনোভাবেই কুদরত বা ক্ষমতা অর্থ করা যাবে না, কারণ কুদরত একটি গুণ, আর একটি গুণকে দুই সংখ্যা বাচক শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা কখনো বৈধ হয় না। অনুরূপভাবে এর দ্বারা 'নি'আমত' অর্থও করা যায় না, কারণ আল্লাহর নি'আমত অগণিত অসংখ্য। সুতরাং অগণিত অসংখ্য নি'আমতকে দুই সংখ্যা বাচক শব্দ দিয়ে বুঝানো কখনো বৈধ হয় না। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, আর-রিসালাতুল মাদানিয়্যাহ, পৃ. ৬০-৬১।
আর যদি ধরে নেয়া হয় যে, ﴾مَا مَنْعَكَ أَن تَسْجُدَ لِمَا خَلَقْتُ بِيَدَيَّ﴿ এখান بِیّدَى দ্বি-বচন সূরা ইয়াসীনে আসা أَوْ لَمْ يَرَوْا أَنَّا خَلَقْنَا لَهُم مِّمَّا عَمِلَتْ أَيْدِينَا أَننا এর বহু বচনের মতই, তাহলে তো মু'আত্ত্বিলা তথা নিষ্ক্রীয়কারীদের দ্বারা সূরা ইয়াসীনের আয়াত দ্বারা 'হাত' অস্বীকার করে সেটাকে আমল দ্বারা ব্যাখ্যা করার সুযোগ থাকে না। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, সূরা ইয়াসীনের এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা নিজেকে কাজ সম্পাদনকারীর গুণে গুণান্বিত করেছেন। কিন্তু এ রীতি অথবা এমন ব্যবহার কেবল তার জন্যই হতে পারে যার হাত রয়েছে। 'কারণ যখন কেউ বলে يده الملك অর্থাৎ 'তার হাতে যাবতীয় রাজত্ব' অথবা عملته يداك 'যা তোমার দু'হাত করেছে' তখন এর দ্বারা দু'টি জিনিস বুঝানো হয়: এক. হাত সাব্যস্ত করা। দুই. কাজ তার দিকে সম্পৃক্ত করা। হ্যাঁ, দ্বিতীয়টিতে রূপক অর্থ অনেক সময় হয়, কিন্তু প্রথমটি কেবল তখনই ব্যবহৃত হয় যখন প্রকৃত অর্থেই তার হাত রয়েছে। তারা বলে না, বাতাসের হাত বা পানির হাত।
আচ্ছা ধরে নিলাম যে, (بيده الملك 'যার হাতে আছে যাবতীয় রাজত্ব' [সূরা আল-মুলক: ০১[ এখানে 'ইয়াদ' দ্বারা কুদরত বা ক্ষমতা বুঝানো হয়েছে, কিন্তু সেটা কেবল তার জন্যই হতে পারে যার প্রকৃত হাত রয়েছে।' ইবন তাইমিয়‍্যাহ, আর-রিসালাতুল মাদানিয়‍্যাহ, পৃ. ৬০-৬১; আরও দেখুন, আর-রিসালাতুত তাদমুরিয়‍্যাহ, পৃ. ৭৩-৭৬। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানার জন্য আরও দেখুন, শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়‍্যাহ, মাজমূ' ফাতাওয়া (৬/৩৬৩-৩৭৩); ইবনুল কাইয়্যেম, মুখতাসারুস সাওয়া'য়িক (২/১৫৩-১৭৪)।
৯৫৩. দেখুন, আবুল হাসান আল-আশ'আরী, আল-ইবানাহ 'আন উসৃলিদ দিয়ানাহ, পৃ. ১৫-৫৪।
৯৫৪. তিনি হচ্ছেন, কাযী আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনুত তাইয়্যেব ইবন মুহাম্মাদ ইবন জা'ফর ইবন কাসেম আল-বসরী আল-বাগদাদী। তিনি আবু বকর আল-বাকেল্লানী বলে প্রসিদ্ধ। আবু বকর আল-ক্বাতি'ঈ, যিনি মুসনাদে ইমাম আহমাদ এর বর্ণনাকারী, তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন, অনুরূপ তার উস্তাদগণের মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন, আবু বকর আল-আবহুরী, আবু আব্দুল্লাহ ইবন মুজাহিদ, আবুল হাসান আল- বাহেলী (আশ'আরীর ছাত্র), আবু আব্দুল্লাহ ইবন খাফীফ, ইবন আবী যাইদ আল-কাইরোয়ানী (রিসালাতু ইবন আবু যাইদের লেখক) প্রমুখ। আর তার ছাত্রত্ব বরণ করেন কাযী আব্দুল ওয়াহাব আল-মালেকী আল-বাগদাদী, আবু যর আল-হারাওয়ী, আবু জা'ফর আস-সিমনানী, আবু আব্দুর রহমান আস-সুলামী প্রমুখ। প্রকৃতপক্ষেই তিনি সে যুগের লোকদের শিক্ষক ছিলেন। তিনি অনেক বড় সম্মানিত ইমাম ও আলেম ছিলেন। বুদ্ধিমত্তা ও সাবধানতার দিক থেকে শীর্ষে অবস্থানকারী ব্যক্তিত্ব, তিনি সর্বদা দলীল-প্রমাণাদি দ্রুত উপস্থাপনে পারদর্শী ছিলেন, উপস্থিত বুদ্ধিতে প্রসিদ্ধ ছিলেন।
বলা হয়ে তাকে খলীফাতুল মুসলিমীন রোমকদের রাজার কাছে পাঠালেন। তিনি সেখানে গিয়ে দেখতে পেলেন যে, তিনি এমন এক প্রাসাদে অবস্থান করছেন যেখানে ঢুকতে হলে রুকুর মতো হয়ে প্রবেশ করতে হয়। বাকেল্লানী তাৎক্ষণিকভাবে তাদের ষড়যন্ত্র বুঝতে পারলেন। তিনি দরজার দিকে নিজের পিঠের দিক দিয়ে ঢুকলেন এবং পিছনের দিকে চলতে চলতে প্রবেশ করলেন। তারপর যখন ভিতরে প্রবেশ করলেন তখন সোজা হলেন এবং রোম সম্রাটের সাথে কথা বললেন। সেখানে যেসব কথা ও আলোচনা হয়েছে তাতে ইমাম বাকেল্লানীর বুদ্ধিমত্তা ও সূক্ষ্ম জ্ঞান ও বুঝের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল।
তিনি রাফেদ্বী, মু'তাযিলা, খারেজী, জাহমিয়‍্যাহ ও কাররামিয়্যাহদের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন। তার মাঝে ও মু'তাযিলাদের মধ্যে খলীফার মজলিসে সর্বদা মুনাযারা ও বহস লেগেই থাকতো। আকীদাহ'র দিক থেকে তিনি আশআরী মতবাদের বিশেষ ব্যক্তি বিবেচিত হতেন। বরং তাদের প্রধান আলেমগণের একজন, যাকে আশ'আরী মতবাদের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা বিবেচনা করা হয়। আর ফিকহের দিক থেকে তিনি ইমাম মালেক এর মত অনুসরণ করতেন। তার সম্পর্কে কাযী ইয়াদ্ধ বলেন, 'আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনুত তাইয়্যেব, তিনি শাইখুস সুন্নাহ ও লিসানুল উম্মাহ উপাধীতে ভূষিত ছিলেন। আহলুল হাদীস ও সিফাত সাব্যস্তকারীদের নীতির কালামশাস্ত্রবিদ ছিলেন। আর তিনি ছিলেন আবুল হাসান আল-আশ'আরীর পদ্ধতি অনুসরণকারী।
তার সম্পর্কে শাইখুল ইসলাম অনেক বড় ধারণা করতেন ও তার ভূয়সী প্রশংসা করতেন আর বলতেন, আশ'আরীর গ্রন্থ 'ইবানা'র পরে তিনি সবচেয়ে বেশি (সিফাত) সাব্যস্তকারী ছিলেন। ইবন ফুওরাক এর স্থান তার পরে। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৬/৫২)।
শাইখুল ইসলাম আরও বলেন, বাতেনীদের গোপন রহস্যভেদ করা, তাদের রদ্দ করার ক্ষেত্রে তার অনেক অবদান ছিল। অনুরূপভাবে নাস্তিক ও বিদ'আতীদের বিরুদ্ধেও তার ছিল ব্যাপক প্রচেষ্টা। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/৫৫৮); শারহুল আসফাহানিয়্যাহ, পৃ. ২৪৪।
শাইখুল ইসলাম আরও বলেন, কাযী আবু বকর আল-বাকেল্লানী ও তার মতো লোকেরা আকীদাহ ও সুন্নাহ'র ব্যাপারে আবুল মা'আলী ও তার মত লোকদের চেয়ে বেশি জানতেন। দেখুন, শারহুল আসফাহানিয়্যাহ, পৃ. ৬৩২, মাজমূ' ফাতাওয়া (১২/২০৩)।
তিনি আরও বলেন, কাযী আবু বকর ইবন আল-বাকেল্লানী ও তার মতো লোকেরা সুন্নাহ'র অধিক নিকটবর্তী ও ইমাম আহমাদ ও তার মতো ইমামদের অধিক অনুসারী ছিলেন, খোরাসানের সেসব লোকদের থেকে, যারা ইবন কুল্লাব এর প্রবর্তিত নীতির দিকে বেশি ঝুঁকে গিয়েছিলেন। দেখুন, ইবন তাইমিয়‍্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আক্কলি ওয়ান নাক্বলি (১/২৭০)।
তার সম্পর্কে ইমাম যাহাবী বলেন, 'তিনি ইমাম, আল্লামাহ, একক কালামশাস্ত্রবিদ, আকীদাহ'র ইমামদের একজন, আবুল হাসান আল-আশ'আরীর পদ্ধতির জন্য মুনাযারা করেছেন। তবে কোথাও কোথাও তার বিরোধিতাও করেছেন। কারণ তিনি তার মতোই আলেম। তিনি আশ'আরীর ছাত্রদের থেকে এ বিদ্যা গ্রহণ করেছেন। তিনি মু'তাযিলী, রাফেদ্বী ও মুশাব্বিহা গোষ্ঠীর ওপর উন্মুক্ত অসি ছিলেন। তার অধিকাংশ নীতিই ছিল সুন্নাতের ওপর প্রতিষ্ঠিত।'
ইমাম যাহাবী আরও বলেন, 'আবু বকর আল-বাকেল্লানী রাফেদ্বী, মু'তাযিলা, খারেজী, জাহমিয়্যাহ, কাররামিয়্যাহ এদের সবার বিরুদ্ধে কলম ধরেন, আবুল হাসান আল-আশ'আরীর পক্ষ অবলম্বন করেন। আবার সংকীর্ণতা দেখা দিলে আশ'আরীর বিরোধিতাও করেছেন। কারণ তিনি আশ'আরীর সমপর্যায়ের লোক, তিনি আশ'আরীর ছাত্রদের থেকে ইলমুন নযর গ্রহণ করেন।' ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৭/১৯০)।
ইমাম যাহাবী অন্যত্র বলেন, 'কালামশাস্ত্রবিদ আশ'আরীদের মধ্যে তার মতো উত্তম আর কেউ নেই, তার আগেও নয়, পরেও নয়। দেখুন, আল-আরশ, পৃ. ২৪৬; অনুরূপই বলেছেন, আল-উলু গ্রন্থে, পৃ. ২/১২৯৮। দেখুন, আব্দুর রহমান সালেহ আলে মাহমূদ, মাওকিফু ইবন তাইমিয়্যাহ মিনাল আশা'য়িরাহ (২/৫২৬-৫৫৪)।
তিনি হিজরী ৪০৩ সালে মারা যান। তার রচিত গ্রন্থাবলির সংখ্যা ৫৫ এর মতো। যার অধিকাংশের নাম কাযী ইয়াদ্ধ তার তারতীবুল মাদারিক গ্রন্থে নিয়ে এসেছেন। সেসব গ্রন্থের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, ই'জাযুল কুরআন, তামহীদুল আওয়ায়েল ওয়া তালখীসুদ দালায়েল, আল-ইনসাফ ফীমা ইয়াজিবু ই'তিক্কাদুহু ইত্যাদি।
দেখুন, কাযী ইয়াছ, তারতীবুল মাদারিক (২/৫৮৫০; ইবনু খাল্লিকান, ওফায়াতুল আ'ইয়ান (৪/২৬৯); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৭/১৯০); ইবন কাসীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (১১/৩৫০); আব্দুর রহমান সালেহ আলে মাহমূদ, মাওকিফু ইবন তাইমিয়‍্যাহ মিনাল আশা'য়েরা (২/৫৫৪)।
৯৫5. কিতাবটির পূর্ণ নাম হচ্ছে, 'আল-ইবানাহ 'আন ইবত্বালি মাযহাবি আহলিল কুফরি ওয়াদ দ্বালালাহ'। এটি ইমাম বাকেল্লানীর বিখ্যাত গ্রন্থ। তবে এটি বর্তমানে হারিয়ে যাওয়া কিতাবের অন্তর্ভুক্ত। এ কিতাবটি তার রচিত বলে যারা বলেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন কাযী ইয়াছ, তারতীবুল মাদারিক (২/৬০১); ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আকলি ওয়ান নাকলি (৩/৩৮২), (৩/২০৬); নাকদ্বত তা'সীস (২/৩৪); ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুয়ূশ, পৃ. ৩০৩; ইবন কাসীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (১১/৩৫০); তবে তিনি সেটার নাম দিয়েছেন, 'শারহুল ইবানাহ'; যাহাবী, আল-উলু, পৃ. ১৭৩; সিযকীন এ কিতাবটিকে বাকেল্লানীর রচিত গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। দেখুন, তারীখুত তুরাস (৪/১৫); তবে তিনি এর কোনো পাণ্ডুলিপি কোথাও আছে কিনা তার হদীস দেননি।
৯৬৯. মনে হচ্ছে শাইখুল ইসলাম পরবর্তী কোনো কোনো আশ'আরী ও মাতুরিদীদের দিকে ইঙ্গিত করছেন, যারা তাদের মতাদর্শের জন্য প্রচণ্ড রকমের গোঁড়ামী করে। তারা তাদের মত থেকে এক বিন্দুও নড়তে নারাজ। যদিও তাদের সেসব মতাদর্শের অনেকগুলো তাদেরই পূর্বতন আলেমগণের আদর্শ বিরোধী প্রমাণিত হয়। যেমনটি আমরা দেখতে পাই, পরবর্তী আশ'আরী মতবাদের লোকদের নিকট তারা তাদের পূর্ববর্তী বড় ইমামগণ যেমন ইমাম আবুল হাসান আল-আশ'আরী ও ইমাম আবু বকর আল-বাকেল্লানীর কথারও বিরোধিত করে থাকে। কারণ ইমাম আবুল হাসান আল-আশ'আরী ও ইমাম আল-বাকেল্লানী আল্লাহর জন্য সিফাতে খবারিয়‍্যাহ সাব্যস্ত করতেন। যেমনটি আমরা ইতোপূর্বে আলোচনায় দেখেছি তারা আল্লাহর সত্তাগত গুণ চেহারা হাত, পা, চোখ সাব্যস্ত করতেন। আর তারা আল্লাহর 'আরশের উপর উঠাকেও সাব্যস্ত করেছেন এবং সেটার পক্ষে দলীল প্রদান করেছেন। ইবন তাইময়‍্যাহ রাহিমাহুল্লাহ অন্যত্র বলেন, আর এ রকম সমস্যায় অনেক ইলম ও দীনের দিকে সম্পর্কিত বিশেষ কিছু গোষ্ঠীকেও নিপতিত হতে দেখা যায়। তাদের মধ্যে রয়েছেন অনেক ফকীহ, বহু সূফী ও অন্যান্য লোকেরা। অনুরূপ নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত বিশেষ কোনো দীনের সম্মানিত নেতার অনুসারীদের মাঝেও এমনটি দেখা যায়, তারা দীনের ফিকহের জ্ঞান কিংবা হাদীসের জ্ঞানের কিছুই গ্রহণ করে না, যতক্ষণ না তা তাদের তথাকথিত দীনী নেতা ও তার গোষ্ঠীর অনুসারীদের মাধ্যম হয়ে না আসে। অথচ দীনে ইসলাম তাদের ওপর আবশ্যক করে দিয়েছে হক্কের অনুসরণ করতে নিঃশর্তভাবে।' দেখুন, ইবন তাইমিয়‍্যাহ, ইকতিদ্বাউস সিরাতিল মুস্তাকীম (১/৭৩)। তারপর ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ কখনও কখনও কেন তিনি কালামশাস্ত্রবিদদের বক্তব্য নিয়ে এসে সেখান থেকে হকের কথা ব্যক্ত করেন তার কারণ বর্ণনা করে বলেন, 'আমি সেসব বিবেকের যুক্তির প্রধান্যদানকারী গোষ্ঠীর নেতাদের সেসব বক্তব্য পেশ করি, যা হক্ককে প্রকাশ করবে। এটা এজন্য নয় যে হক্ক বুঝা ও জানার জন্য আমরা তাদের মুখাপেক্ষী, কিন্তু এজন্য যে, (১) বিভিন্ন গোষ্ঠীর নেতারাও এসব বিষয় যে বাতিল ও নষ্ট তার স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। যেসব বিষয়কে সেসব নেতাদের অনুসারীরা অকাট্য বলে ধরে নিয়েছে অথচ তা শরী'আত বিরোধী। আর এ জন্য যে, (২)
যখন মানুষের মন এটা জানতে পারে যে এ কথাটি বিরোধী দলের ইমামগণও বলেছেন তখন সেটা তার অন্তরে রেখাপাত করে, সে তা গ্রহণ করার জন্য প্রশান্তি পায় ও ঘনিষ্ঠতা অনুভব করে। আর এ এজন্য যে, (৩) এর মাধ্যমে প্রকাশ পাবে যে, এ মাসআলাটিতে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মাঝে মতভেদ রয়েছে, তখন অন্ধ অনুসরণ ও অনুকরণের গ্রন্থি খুলে যাবে ও বাড়াবাড়ি করে ভুলের ওপর অবস্থান করা পরিত্যাগ করবে।' ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আক্বলি ওয়ান নাকলি (১/৩৭৭)।
৯৭০. আবুল মা'আলী আল-জুওয়াইনী, তিনি হচ্ছেন আব্দুল মালেক ইবন আব্দুল্লাহ ইবন ইউসুফ, আল-জুওয়াইনী, আশ-শাফেয়ী। তিনি ইমামুল হারামাইন নামে প্রসিদ্ধ। হিজরী ৪১৯ সালে তার জন্ম। তার পিতার কোলে বেড়ে উঠেন আর তার হাতেই শিক্ষা জীবন শুরু করেন। তাছাড়া তার উস্তাদদের মধ্যে ছিলেন আবুল কাসেম আল-আসফারায়ীনী যিনি 'আল-ইসকাফ' নামে খ্যাত। তার ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন আবু হামেদ আল-গাযালী, ইলকিয়া আল-হাররাসী, আবুল কাসেম আল-আনসারী প্রমুখ।
প্রথম জীবনে তিনি মু'তাযিলাদের কিতাব দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন, বিশেষ করে আবু হাশেম ইবন আবু আলী আল-জুব্বায়ীর গ্রন্থ দ্বারা। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আবুল মা'আলী অধিক পরিমাণে আবু হাশেম ইবন আবু আলী আল-জুব্বায়ীর গ্রন্থ পড়তেন। আর তিনি নিজে ছিলেন জগতের বুদ্ধিমানদের একজন।' ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (২/৮৭)।
অন্যত্র তিনি বলেন, 'আবুল মা'আলী প্রচুর পরিমাণে আবু হাশেম (মু'তাযিলী) এর গ্রন্থ পড়তেন, তবে তিনি সাহাবায়ে কিরাম, তাবেয়ীনে 'ইযام ও সালাফে সালেহীন ইমামগণের 'আছার' এর ব্যাপারে খুব কম জানতেন। ফলে দু'টি বিষয় তার মাঝে প্রচুর প্রভাব ফেলে।' মাজমূ' ফাতাওয়া (৬/৫২)।
অন্যত্র বলেন, 'তিনি তো কেবল অধিক পরিমাণে মু'তাযিলা ও তাদের অনুসারীদের গ্রন্থ পড়তেন, সালাফে সালেহীন ও ইমামগণের 'আছার' সম্পর্কে কম জানতেন ও কম খেয়াল রাখতেন। তাছাড়া তিনি ইসলামের বিভিন্ন গোষ্ঠী, যেমন ফকীহ, মুহাদ্দিস, সূফীদের বক্তব্য সম্পর্কে স্বল্পই ওয়াকিফহাল ছিলেন। এমনকি কালামশাস্ত্রবিদদের মতাদর্শও কম জানতেন।' ইবন তাইমিয়‍্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়‍্যাহ (১/৩৪৭)।
অন্যত্র বলেন, আবুল মা'আলীর অধিকাংশ কালামশাস্ত্রের বিষয়াদি কাযী আবু বকর প্রমুখ থেকে নেয়া, আর তিনি আবু হাশেম আল-জুব্বায়ীর কালাম কথা থেকে বিভিন্ন অংশ পছন্দ করে নিয়েছেন। তিনি কালামশাস্ত্র শিখেছিলেন আবুল কাসেম আল-ইসকাফ হতে, যা তিনি শিখেছিলেন আবু ইসহাক আসফারায়ীনী হতে। কিন্তু তাদের মাঝে কাযীই বেশি উত্তম। তিনি কাযীর পথ থেকে বেশ কিছু স্থানে মু'তাযিলাদের মতের দিকে চলে গিয়েছিলেন। আর তিনি আবুল হাসান আশ'আরীর কালাম থেকে তেমন কিছু গ্রহণ করতেন না। তিনি কেবল তার কথা বর্ণনা করতেন যেভাবে অন্য মানুষেরা বর্ণনা করে।' আস-সাব'ঈনিয়্যাহ, 'বুগইয়াতুল মুরতাদ', পৃ. ৪৫০।
তার ব্যাপারে যেটা প্রসিদ্ধ তা হচ্ছে, তিনি আবুল হাসান আল আশ'আরীর মতবাদকে টেনে নিয়ে মু'তাযিলাদের নিকটবর্তী করে দিয়েছেন। ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, 'আবুল মা'আলী অনেক জায়গায় আবুল হাসান আশ'আরীর মূলনীতির পরিবর্তন সাধন করেন, সেগুলোতে তিনি মু'তাযিলাদের মতবাদের দিকে ঝুঁকে গিয়েছিলেন।' ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৫/৫০৭)।
ইমাম যাহাবীর মতে আবুল মা'আলী হাদীসের ক্ষেত্রে দুর্বল ছিলেন, অর্থাৎ কম জানতেন। তিনি বলেন, 'এ ইমাম তার অসাধারণ ধীশক্তি, মাযহাবের মূল ও শাখা-প্রশাখার জ্ঞানে ইমাম হওয়া, মুনাযারা বা বিতর্কে শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও হাদীসকে যথাযথভাবে জানতেন না। মতনের দিক থেকেও নয়, সনদের দিক থেকেও নয়।' ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৮/৪৭১)। বরং ইবন তাইমিয়্যাহ এটা স্পষ্ট করে বলেছেন যে, 'হাদীসের ব্যাপারে তিনি এতই কম জানতেন যে এ ময়দানের সাধারণদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্যতাও তার ছিল না, বিশেষ লোক হওয়া তো দূরের কথা।' দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৪/৭১)। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ প্রায়ই তাকে বুদ্ধিমান, সাবধানী, উৎকৃষ্ট তর্কবাগীশ ইত্যাদি উপাধিতে ভূষিত করতেন। দেখুন, আস-সাফাদিয়্যাহ (১/২৯৪); দারউত তা'আরুদ্ব (১/১৫৮), (৩/৪৪৪), (৮/৩২১); মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/২৯৪)।
আবু বকর ইবনুল আরাবী (মৃত্যু ৫৪৩ হিজরী) তিনি আবুল মা'আলীর 'আশ-শামেল' গ্রন্থ দিয়ে খুবই প্রভাবিত হয়েছিলেন যখন তিনি মুসলিম বিশ্বের পূর্ব অঞ্চলে সফর করেছিলেন। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তাআরুদ্বিল আক্কলি ওয়ান নাকলি (২/১০২)।
ইবন তাইমিয়্যাহ আরও বলেন, 'ফখরুদ্দীন আর-রাযীর আশ'আরী মতবাদ সংক্রান্ত যত কালামশাস্ত্রের জ্ঞান তা অর্জিত হয়েছিল আবুল মা'আলীর গ্রন্থ যেমন আল-ইরশাদ ও অনুরূপ গ্রন্থ থেকেই।' দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আক্বলি ওয়ান নাকলি (২/১৫৯)।
বরং ইবন তাইমিয়্যাহ এটাও বলেছেন যে, 'আবুল মা'আলীর 'আল-ইরশাদ' গ্রন্থটি পরবর্তী আশ'আরী মতবাদের লোকদের যাবুর গ্রন্থ নামে খ্যাত।' দেখুন, আত-তিস'ঈনিয়‍্যাহ (২/৬৪৫)।
'এই আবুল মা'আলী আল-জুওয়াইনী, যারা কুরআন ও সুন্নাহ'য় আসা আল্লাহর 'সিফাতে খবরিয়াহ' যাবতীয় গুণাবলি সাব্যস্ত করতো (অর্থাৎ সালাফীদেরকে), তিনি তাদেরকে 'হাশাওয়িয়‍্যাহ' বলে খারাপ উপাধীতে অভিহিত করবেন।' দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়‍্যাহ (২/১২৮-১২৯); মাজমূ' ফাতাওয়া (৪/৮৮)।
মোটকথা: সে সময়ে চতুর্দিকে তার নাম-ডাক ছড়িয়ে পড়ে। তিনি ফিকহের দিক থেকে শাফেয়ী মাযহাবের লোক ছিলেন। কিন্তু উসূল তথা আকীদাহ'র মূলনীতির দিক থেকে আশ'আরীদের ইমাম বিবেচিত হতেন। ইমাম যাহাবী উল্লেখ করেন যে, তিনি শেষ জীবনে সালাফে সালেহীনের মতাদর্শে ফিরে এসেছিলেন। তার থেকে বর্ণিত আছে তিনি বলেছিলেন, "আমি যে কাজ করে এসেছি তা যদি আবার নতুন করে করার ক্ষমতা আমার থাকতো তবে আমি কখনো কালামশাস্ত্র চর্চা করতাম না।" তার থেকে আরও এসেছে, তিনি মৃত্যু শয্যায় বলেছিলেন, "আমি তোমাদেরকে সাক্ষী বানাচ্ছি, আমি সুন্নাহ বিরোধী আমার যাবতীয় বক্তব্য থেকে প্রত্যাবর্তন করলাম, আর আমি মারা যাচ্ছি নাইসাপূরের বুড়িদের আকীদাহ'র ওপর।" এ কিতাবের শুরুতে এ ব্যাপারে কিছু আলোচনা চলে গেছে। তিনি জীবনের শেষ সময়ে মক্কার হারামের দিকে হিজরত করে যান। আর সেখানেই অবস্থান করেন, অবশেষে হিজরী ৪৭৮ সালে মারা যান। তার রচিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে বিখ্যাত হচ্ছে আল-ইরশাদ ফী উসূলিদ দীন, আশ-שামেল ফী উসূলিদ দীন, আল-বুরহান ফী উসূলিল ফিকহ, লুমা'উল আদিল্যাহ, আল-আক্বীদাতুন নিযামিয়্যাহ ইত্যাদি। দেখুন, ইবন আসাকির, তাবয়ীনু কিযবিল মুফতারী, পৃ. ২৭৮; তারীখে বাগদাদের সংযুক্তি (১/৮৫); ইবনু খাল্লিকান, ওফায়াতুল আ'ইয়ান (৩/১৬৭); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৮/৪৬৮); ইবনুল 'ইমাদ, শাযরাতুয যাহাব (৩/৩৫৮)।
৯৭১. এটি তাঁর জীবনের সর্বশেষ গ্রন্থ। এটি 'আর-রিসালাহ অথবা আল-আকীদাতুন নিযামিয়্যাহ ফিল আরকানিল ইসলামিয়‍্যাহ' এর একটি অংশ। এ কিতাবে শাফেয়ী মাযহাবের ফিকহের বহু অধ্যায় স্থান পেয়েছে। গ্রন্থের বর্ণনাকারীরা এ অংশকে আলাদা করে নিয়ে এ নাম দিয়েছে। যেমনটি বর্ণনা করেছেন আবু বকর ইবনুল আরাবী ইমাম আবু হামেদ আল-গাযালী থেকে, আর তিনি জুওয়াইনী থেকে। দেখুন, আর-রিসালাতুন নিযামিয়্যাহ, পৃ. ৯৭; আল-ইমাম আল-জুওয়াইনী, ড. মুহাম্মাদ আয-যুহাইলী, পৃ. ১০৭।
পরবর্তীতে তা 'আল-আকীদাতুন নিযামিয়‍্যাহ' নামে মুহাম্মাদ যাহেদ কাউসারীর তাহক্বীকে ১৩৬৭ সালে মিসরের মাতবা'আতুল আনওয়ার থেকে ছাপা হয়েছে। তারপর আবার ড. আহমাদ আস-সাক্কা এর তাহক্বীকে ১৩৯৮ সালে মিসরের দারুস শাবাব ছাপা হয়েছে। তাতে যাহেদ কাউসারীর তাহক্বীক অবশিষ্ট রয়েছে।
গ্রন্থটির নাম 'আন-নিযামিয়্যাহ' রাখা হয়েছে বিখ্যাত মন্ত্রী নিযامুল মুলকের দিকে সম্পৃক্ত করে। তখন তিনি মন্ত্রী ছিলেন। লেখক সেটা গ্রন্থের শুরুতে বর্ণনা করেছেন। যার ফলে নিযامুল মুলক তাকে মাদরাসা নিযامিয়্যাতে নিযুক্ত করেন, আর তিনি সেখান থেকে আশ'আরী মতবাদ প্রচার প্রসারে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। যাবীদী তার ইতহাফুস সাদাতিল মুত্তাকীন গ্রন্থে (২/১১১) বলেছেন এ গ্রন্থটি জুওয়াইনী রচিত সর্বশেষ গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত।
আবুল মা'আলীর এ গ্রন্থ থেকে বহু আলেম পরবর্তী আশ'আরী মতবাদের কথা নিয়ে এসেছেন। যেমন, ১- শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়‍্যাহ, দারউত তা'আরুদ্ব (২/১৮), (৩/৩৫৬, ৩৮১), (৫/২৪৯); আল-ইস্তেকামাহ (১/৪৪), (২/৯৭), মাজমূ' ফাতাওয়া (৮/৩৪৫), (১০/৬৯৫), (১২/২০৩), (১৬/৪০৮); আল-মুস্তাদরাক আলাল ফাতাওয়া (১/৮৫)। ২- ইবনুল কাইয়্যেম, ই'লামুল মুওয়াকে'ঈন (৪/২৪৬); ইজতিমা'উল জুয়ুশ, পৃ. ২৮৬; আস-সাওয়া'য়িকুল মুরসালাহ (৪/১৪৫৩); মাদারেজুস সালেকীন (২/৮৭); শিফাউল 'আলীল (২/৭৬৩, ৮৩৯)। ৩- ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৮/৪৭৩); আল-'উলু লিল 'আলিয়ي‍্যল 'আযীম (২/১৩৪০), নং ৫৩৬; আল-'আরশ, পৃ. ২৭৭; তাজউদ্দীন আস-সুবুকী, ত্বাবাক্বাতুশ শাফে'ঈয়্যাহ আল-কুবরা (৫/১৭২, ১৯১)।
এ গ্রন্থে জুওয়াইনীর মানহাজ ছিল, তিনি কুরআন ও সুন্নায় আসা আল্লাহর গুণাবলি তথা 'সিফাতে খবরিয়‍্যাহ'র ক্ষেত্রে তা'ওয়ীল করা থেকে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন, যেমনটি শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়‍্যাহ বর্ণনা করেছেন। আর তা তার আর-রিসালাতুন নিযامিয়্যাহ, পৃ. ৩২-৩৩ গ্রন্থে উল্লেখ আছে। অনুরূপভাবে তিনি 'আল-কুদরাতুল হাদেসাহ' নামক (সৃষ্টির কুদরত নতুন হওয়া সংক্রান্ত) মাসআলা থেকেও ফেরত এসেছিলেন এবং কর্ম হওয়ার ক্ষেত্রে তার প্রভাবের কথাও স্বীকার করেছিলেন, অথচ ইতোপূর্বে তিনি বলতেন যে, এর কোনো প্রভাব নেই।
তবে তিনি বেশ কিছু মাসআলায় আশ'আরী মতবাদের ওপরই আমরণ ছিলেন, যেমন, আল্লাহর অস্তিত্ব সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে 'হুদুসুল আজসাম' এর মাসআলা, পৃ. ১৬; আল্লাহর বাণী এর মাসআলা, পৃ. ২৭-৩০; আল্লাহকে দেখার ক্ষেত্রে সামনের বিপরীত ব্যতীত দেখার মাসআলা, পৃ. ৩৯। আর তিনি বেশ কিছু সিফাতের তা'ওয়ীলও করেছেন, যেমন ভালোবাসাকে ইচ্ছা করা দ্বারা অপব্যাখ্যা করা, পৃ. ৬১; আর তিনি ঈমানের দু'টি সংজ্ঞা দিয়েছেন, বিশ্বাস করা, পৃ. ৮৫, আর সালাফদের কথাও এনেছেন, পৃ. ৯০; তবে তিনি উভয় মতের মধ্য থেকে কোনোটিকেই প্রাধান্য দেননি। দেখুন, ড. আব্দুর রহমান সালেহ আলে মাহমূদ, মাওকিফু ইবন তাইমিয়্যাহ মিনাল আশা'য়িরাহ (২/৬২০-৬২১); ড. আহমাদ আলে আব্দুল লাতীফ, মানহাজু ইমামিল হারামাইন ফী দিরাসাতিল আকীদাহ, পৃ. ৩১৮; ড. আহমাদ আল-কাযী, মাযহাবু আহলিত তাফওয়ীদ্ব ফী নুসূসিস সিফাত, পৃ. ২১৮।
৯৭২. অর্থাৎ আল্লাহর সিফাত বিষয়ক আয়াত ও হাদীসের শব্দসমূহ।
৯৭৩. এটি ছিল আবুল মা'আলী আল-জুওয়াইনীর প্রথম জীবনের মতাদর্শ। যেমনটি বুঝা যায় তার 'আশ-শামিল' গ্রন্থ থেকে, পৃ. ৫৪৩। এ কিতাবে তিনি তা'ওয়ীল এর জন্য দু'টি কাজ করার ওপর জোর দেন: ১- প্রকাশ্য অর্থ দূর করা। ২- উদ্দেশ্য নির্ধারণ।
এজন্য যে কেউ আল্লাহর জন্য 'জিহাত' বা 'দিক' হওয়া না করবে, সে তা'ওয়ীলের দু' অঙ্গের বড় অঙ্গটি প্রতিষ্ঠিত করলো, আর তা হচ্ছে প্রকাশ্য অর্থ তিরোহিত করা। সুতরাং যে কেউ আল্লাহর জন্য 'জিহাত' বা 'দিক' অস্বীকার করলো সে তো স্পষ্টভাবে 'ইস্তেওয়া' এর প্রকাশ্য অর্থ দূর করলো। জুওয়াইনী বলেন, 'আর যদি তারা স্পষ্টভাবে আল্লাহর জন্য 'জিহাত' বা দিক সাব্যস্ত করা না করলো, তবে তো তারা আমাদের মতবাদের সাথে একাত্ম হলো আর তা'ওয়ীলের বড় অঙ্গটি স্বীকার করে নিল। কারণ যারা তা'ওয়ীল অস্বীকার করে তারা যে জিনিসটি থেকে সাবধান করে তা হচ্ছে প্রকাশ্য অর্থ বাদ দেয়া, আর যে ব্যক্তি দিক অস্বীকার করলো সে তো 'ইস্তেওয়া' এর প্রকাশ্য অর্থ দূর করলো, কিন্তু সে 'ইস্তেওয়া' শব্দকে তার প্রকাশ্য অর্থ থেকে মুক্ত করার পর কোনো অর্থ নির্ধারণ করলো না, আর যারা তা'ওয়ীল করে তারা একটি অর্থ নির্ধারণ করে নেয়, সুতরাং যখন ব্যাপারটি এখানে এসে থামলো তখন উদ্দেশ্য সাধন অতি সহজ।' দেখুন, আশ-শامিল, পৃ. ৫১২। যেসব কারণে আবুল মা'আলীর কাছে তা'ওয়ীল বা আল্লাহর গুণাবলির অপব্যাখ্যা করতে হবে বলে তিনি মত ব্যক্ত করেছেন তা দু'টি:
১- এ দাবি তোলা যে, এসব আয়াতের প্রকাশ্য অর্থ আক্কলী বা বিবেকের যুক্তির সাথে বিরোধ করছে। সেজন্যই তিনি আল্লাহর বাণী, "তিনি বললেন, 'হে ইবলীস! আমি যাকে আমার দু'হাতে সৃষ্টি করেছি, তার প্রতি সাজদাবনত হতে তোমাকে কিসে বাধা দিল? তুমি কি ঔদ্ধত্য প্রকাশ করলে, না তুমি অধিকতর উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন'?'" [সূরা স্বদ: ৭৫] এখানে আসা 'ইয়াদ' শব্দটির তা'ওয়ীল করেছেন। তিনি সেটাকে তা'ওয়ীল করে কুদরত তথা 'ক্ষমতা' এর অর্থে নিয়ে গেছেন। এ দাবি করে যে বিবেক প্রমাণ করেছে, সৃষ্টি করতে হলে ক্ষমতার প্রয়োজন পড়ে। দেখুন, আল-ইরশাদ, পৃ. ১৫৬।
২- এ দাবি করা যে, এ আয়াতসমূহ ও কুরআন হাদীসের অন্যান্য দলীলের মাঝে বিরোধ আছে। যেমন আল্লাহর বাণী “দৃষ্টিসমূহ তাঁকে আয়ত্ব করতে পারে না, অথচ তিনি সকল দৃষ্টিকে আয়ত্ব করেন এবং তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবহিত।” [সূরা আল-আন'আম: ১০৩] আয়াতকে তা'ওয়ীল করা হয়েছে এ কারণে যে, অন্য আয়াত এর বিরোধী হয়েছে, আর সেটা হচ্ছে, "সেদিন কোনো কোনো মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে, তারা তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে।" [সূরা আল-কিয়ামাহ: ২২-২৩] দেখুন, আল-ইরশাদ, পৃ. ১৮২। আবুল মা'আলীর পক্ষ থেকে তা'ওয়ীল করার কারণ হিসেবে যে দু'টি যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে তা একেবারেই ঠুনকো। প্রথম কারণটি সবচেয়ে বেশি হাস্যকর। কারণ ক্ষমতা লাগলেই সেখানে 'হাত' থাকতে পারবে না এমনটি কোনো যুক্তিই নয়। ক্ষমতাও আছে তার অতিরিক্ত হাতও আল্লাহ ব্যবহার করেছেন। সুতরাং সমস্যা কোথায়? আর দ্বিতীয় কারণটি মূল সমস্যা না বুঝার কারণে হয়েছে। আমাদের নিকট কখনও কুরআন ও হাদীসের বাণীর মধ্যে স্ব-বিরোধিতা নেই। বুঝের অভাবে অনেক সময় তা মনে হয়। এখানে সূরা আল-আন'আম এর আয়াতে আয়ত্ব করতে পারবে না বলা হয়েছে, দেখাকে নিষেধ করার হয়নি। কিন্তু সূরা আল-কিয়ামাহ এর আয়াতদ্বয়ে দেখার কথা বলা হয়েছে। সুতরাং কোনো বিরোধ নেই। আবুল মা'আলী আল-জুওয়াইনী কীভাবে প্রকাশ্য অর্থের তা'ওয়ীল করতো তা জানতে দেখুন, ড. আহমদ আলে আব্দুল লতীফ, মানহাজু ইমামিল হারামাইন ফী দিরাসাতিল আকীদাহ, পৃ. ২৬৫- ৩০৫।
৯৭৪. বস্তুত এটি সালাফদের মত নয়। কোনো সালাফ এ মতের ওপর ছিলেন না। এটি মুফাওয়িদ্বাহ বা 'আল্লাহর কিছু গুণের ক্ষেত্রে অর্থ না জানা' নীতি অবলম্বনকারীদের নীতি। ইমামুল হারামাইন সর্বশেষ এ মতে এসে অবস্থান নিয়েছিলেন। যেমনটি তার 'আর-রিসালাতুন নিযামিয়্যাহ' গ্রন্থ থেকে স্পষ্ট। তিনি তার অন্যান্য গ্রন্থে তা'ওয়ীলের প্রতি জোর দিলেও এ গ্রন্থ, যা তার জীবনের শেষাংশে লিখেছেন, এখানে এসে তিনি তাফওয়ীদ্ব নীতির দিকে চলে যান। তিনি মনে করেছিলেন এটাই সালাফদের মতাদর্শ। তার ওপর ভিত্তি করে তিনি এ গ্রন্থে আল্লাহর যাবতীয় সিফাতে খবরিয়‍্যাহ বা কুরআন ও হাদীসে আসা গুণাবলির কোনোরূপ তা'ওয়ীল করতে মানা করেন। এ পর্যায়ে এসে তিনি তা'ওয়ীলকে বিদ'আত মনে করতেন, মা সালাফগণ করেননি। কিন্তু সাথে সাথে তিনি এটাও বিশ্বাস করতেন যে, সালাফে সালেহীন তথা হকপন্থীরা এর অর্থ বা উদ্দেশ্য বুঝাও নিষেধ মনে করতেন। সেজন্য তিনি মত দেন যে, এসব আয়াতে যেসব গুণাবলির কথা বলা হয়েছে, তার অর্থ বুঝার বিষয়টি আল্লাহর ওপর ন্যস্ত করতে হবে। এ ধারণা করে যে, সাহাবায়ে কিরাম এগুলোর অর্থ না বুঝে আল্লাহর দিকে সোপর্দ করে দিতেন, এ বিশ্বাসে যে, সালাফগণ এগুলোর ব্যাখ্যা ও বর্ণনা পরিত্যাগ করেছিলেন। তিনি তাঁর এ কথার ওপর দলীল হিসাবে এ তাফওয়ীদ্ব নীতির ওপর তথাকথিত সালাফের ইজমা' হয়েছে দাবি করেন। আরও বলেন যে, সিফাত সংক্রান্ত আয়াত ও হাদীষসমূহ 'মুতাশাবিহ' এর অন্তর্ভুক্ত। আর যেহেতু তার নিকট মুতাশাবিহ আয়াতের অর্থ জানা যায়না তাই সূরা আলে ইমরানে আসা ]۷ :وَمَا يَعْلَمُ تَأْوِيلَهُ إِلَّا اللَّهُ﴾ [آل عمران﴿ “অথচ আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ এর ব্যাখ্যা জানে না।" [সূরা আলে ইমরান: ০৭] তাঁর নিকট আয়াতে 'ইল্লাল্লাহ' কথার ওপর থামতে হবে, এখানে থামা বাধ্যতামূলক। তারপর ﴾وَالرَّسِحُونَ فِي الْعِلْمِ থেকে নতুন করে পড়া শুরু করতে হবে। তাছাড়া তিনি ইমাম মালেক থেকে আসা 'ইস্তেওয়া' জানা, তার ধরণ অজানা' সে বিখ্যাত আছার দিয়েও দলীল গ্রহণ করেছেন। দেখুন, আর-রিসালাতুন নিযামিয়্যাহ, পৃ. ৩২: ড. আহমাদ আলে আব্দুল লতীফ, মানহাজু ইমামিল হারামাইন ফী দিরাসাতিল আকীদাহ, পৃ. ৩১৮। এখানে লক্ষণীয় যে, ইমামুল হারামাইন তাফওয়ীদ্ব এর পক্ষে তিনটি দলীল দিয়েছেন। অথচ তার কোনোটিই সঠিকভাবে তিনি পেশ করতে পারেননি। কারণ, এক. সাহাবায়ে কিরাম এগুলোর অর্থ বুঝতেন। এগুলোর অর্থ না বুঝলে সববে নুযুল কীভাবে সার্থক হবে? দুই. কুরআনের সূরা আলে ইমরানের ৭ নং আয়াত দিয়ে দলীল নেয়া যাবে না; কেননা ক. সিফাতের আয়াতসমূহকে সালাফদের কেউ কোনো দিন মুতাশাবিহাতের অন্তর্ভুক্ত বলেননি। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, আল-ইকলীল ফিল মুতাশাবাহ ওয়াত তা'ওয়ীল, মাজমূ' ফাতাওয়া (১৩/২৯৪-২৯৫)। খ. এ আয়াতে অর্থ ভেদে উভয় জায়গাতেই থামা যাবে, 'ইল্লাল্লাহ' এর পরে ও 'আল-ইলম' এর পরে। উভয় প্রকার ওয়াকফই শুদ্ধ; তা'ওয়ীল যদি তাফসীর অর্থে হয় তবে 'ওয়ার রাসিখুনা ফিল ইলমে' এর পরে থামবে। আর যদি তাওয়ীল অর্থ প্রকৃত অবস্থা হয় তবে 'ইল্লাল্লাহ' এর পরে থামতে হবে। তিন. আর ইমাম মালেকের এ 'আছার' মোটেই তার দাবির পক্ষে দলীল নয়, বরং তার বিপক্ষে, কারণ 'ইস্তেওয়া' তো অজানা নয়, ধরণ বিবেক ধারণ করতে পারে না।' এর দ্বারা স্পষ্টই বুঝা গেল যে, এগুলোর অর্থ সালাফগণ জানতেন ও করতেন। সুতরাং আবুল মা'আলীর সকল দাবি অসার প্রমাণিত হলো।
ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আবুল মা'আলী ও তার অনুসারীরা এসব সিফাতে খবরিয়‍্যাহ সাব্যস্ত করা না করে দিয়েছে মু'তাযিলা ও জাহমিয়‍্যাদের সাথে একাত্ম হয়ে। তারপর এতে তাদের দু'টি বক্তব্য রয়েছে, এক. এসব ভাষ্যকে তা'ওয়ীল করতে হবে। যা ছিল আবুল মা'আলীর প্রথম মত, যেমনটি আল-ইরশাদ গ্রন্থে এসেছে। দুই, তাফওয়ীদ্ব বা অর্থ না করে আল্লাহর দিকে সোপর্দ করা। এটি আবুল মা'আলীর সর্বশেষ মত। যেমনটি তিনি তার আর-রিসালাতুন নিযامিয়‍্যাহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। আর তাও উল্লেখ করেছেন যা প্রমাণ করবে যে সালাফে সালেহীন একমত ছিলেন যে, তাও'য়ীল অগ্রহণযোগ্য আর তা আবশ্যকও নয়।' ইবন তাইমিয়‍্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আক্কলি ওয়ান নাক্কলি (৫/২৪৯)।
সম্ভবত প্রথম যারা সালাফে সালেহীনের দিকে আল্লাহ তা'আলার সিফাতের আয়াতসমূহে তাফওয়ীদ্ব নীতিকে সম্পৃক্ত করেছে তাদের মধ্যে আবুল মা'আলী অন্যতম। দেখুন, ড. আহমাদ আল-কাযী, মাযহাবু আহলিত তাফওয়ীদ্ব ফী নুসূসিস সিফাত, পৃ. ২২৬।
৯৭৫. এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, সাহাবায়ে কিরাম রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুম সিফাত সংক্রান্ত এসব ভাষ্যের 'ধরণ' উদ্ঘাটনে লিপ্ত হননি। এটা নয় যে, তারা এসব ভাষ্য শুধু এমনভাবে শুনতেন ও পড়তেন যেন তারা কোনো অনারব ভাষার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। কখনো তা নয়। তারা অবশ্যই তা বুঝতেন ও অনুধাবণ করতেন আল্লাহ তা'আলা সাম' (শোনা) বা 'বাসার' (দেখা) বলতে কী বুঝিয়েছেন। তারা অবশ্যই বুঝতেন মাজী' (আগমন) এর অর্থ কী? তারা অবশ্যই বুঝতেন নুযুল (অবতরণ) এর অর্থ কী? বস্তুত এগুলো যে কোনো সাধারণ আরবও বুঝতে পারে, তাই তা সাহাবায়ে কিরাম অবশ্যই বুঝতে পারতেন। আর তারা বুঝতে পারতেন যে, একটি শব্দ আরেকটি শব্দের অর্থে নয়। তারা সবগুলোকে একই জিনিস মনে করতেন না। একটি উদাহরণ দেয়া যাক, আবু রাযীন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন 'আমাদের রব তাঁর বান্দার নিরাশ হওয়া.... দেখে হাসেন। এটা শুনে আবু রাযীন বললেন, আমাদের রব্ব কী হাসেন? তখন নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ। তখন আবু রাযীন রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু বললেন, যে রব্ব হাসেন তাঁর কোনো কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হবো না।' [ইবন মাজাহ ১৮১] চিন্তা করে দেখুন, সাহাবী তার ফিত্বরত তথ্য স্বাভাবিক প্রকৃতি নিয়েই 'দ্বাহেক' অর্থ হাসা বুঝলেন। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এ বুঝের নিন্দা করেননি। ঠিক কুরআন ও হাদীসের ভাষ্যে আসা সিফাত সংক্রান্ত নসসমূহের ব্যাপারে সকল সাহাবী তেমনি বুঝতেন। তাছাড়া সাহাবায়ে কিরাম তাবে'য়ীদের কাছে কুরআনের তাফসীর করেছেন। যেমন, মুজাহিদ বলেন, 'আমি ইবন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমার কাছে কুরআনে কারীমকে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পুরোটা পেশ করেছি, এর প্রতিটি আয়াতের কাছে তাকে দাঁড় করাতাম এবং তাকে জিজ্ঞেস করতাম।' এজন্য সুফইয়ান আস-সাওরী বলতেন, যদি তোমার কাছে মুজাহিদ থেকে কোনো তাফসীর আসে তবে সেটা তোমার জন্য যথেষ্ট। আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু বলতেন, 'যদি আমি জানতাম যে কেউ আমার থেকেও আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে বেশি জানে আর সেখানে উটে চড়ে যাওয়া সম্ভব তবে আমি অবশ্যই তার কাছে যেতাম।' আর আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ ও আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমের ছাত্রদের প্রতিজন থেকে এত বেশি পরিমাণ লোক তাফসীর গ্রহণ করেছেন যে যার সংখ্যা কেবল আল্লাহই জানেন। এ বিষয়ে সাহাবায়ে কিরাম ও তাবে'য়ীনে 'ইযام থেকে এত বেশি বর্ণনা সাব্যস্ত হয়েছে যা আলেমগণ সকলেই জানেন।' দেখুন, শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, আল-কায়িদাতুল মারাকেশিয়্যাহ, পৃ. ৩৬-৩৭।
ইবন তাইমিয়্যাহ অন্যত্র বলেন, 'সাহাবায়ে কিরাম ও তাবেয়ীগণ পুরো কুরআনের তাফসীর করেছেন। আর তারা বলতেন, আলেমগণ কুরআনের তাফসীর জানে আর তারা তাও জানে যা এর দ্বারা উদ্দেশ্য। যদিও তারা জানে না আল্লাহ তা'আলা যা তার নিজের সম্পর্কে জানিয়েছেন সেটার ধরণ। যেমনিভাবে তারা গায়েবী বিষয়সমূহের ধরণ জানেন না। কারণ আল্লাহ তা'আলা তাঁর বন্ধুদের জন্য এমনসব নি'আমত প্রস্তুত করে রেখেছেন যা কোনো চোখ দেখেনি, যা কোনো কান শুনেনি, আর না কোনো মানুষের অন্তরে তা উদিত হয়েছে। সুতরাং এই যে বিষয়গুলোর কথা বলা হলো তা কেবল আল্লাহই জানেন। সুতরাং সালাফদের মধ্যে যদি কেউ বলে থাকে যে মুতাশাবিহাত এর ব্যাখ্যা কেবল আল্লাহই জানেন তবে তা এ অর্থে সঠিক। কিন্তু যে কেউ বলবে, কুরআনের আয়াতসমূহের তাফসীর বা ব্যাখ্যা করা, আয়াত দ্বারা কী উদ্দেশ্য, তা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না, এমন কথা তো সকল সাহাবায়ে কিরাম, তাবে'ীনে ইযামের কর্মকাণ্ডের বিরোধী কথা, সে এ কথার মাধ্যমে তাদের সাথে বিরোধ সৃষ্টি করেছে; কেননা তারা পুরো কুরআনের তাফসীর করেছেন। এজন্য তারা কুরআনকে দীনের জন্য প্রয়োজন সকল জ্ঞানসমৃদ্ধ বলে মনে করতেন।' দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আক্কলি ওয়ান নাক্বলি (১/২০৭-২০৮)।
৯৭৬. সাহাবায়ে কিরাম অবশ্যই কুরআনের প্রকাশ্য অর্থই বুঝতেন। তারা এগুলো গুরুত্বসহকারে তাবে'য়ীগণকে শিখিয়েছেন। কুরআনের এমন কোনো আয়াত নেই যার তাফসীর হয়নি। সুতরাং আবুল মা'আলীর কথা এখানে গ্রহণযোগ্য নয়।
৯৭৭. অবশ্যই এ কথাটি প্রকাশ্য ভুল। কারণ আল্লাহর যাবতীয় সিফাতের অর্থ জানা রয়েছে। শুধু ধরণ জানা নেই। এর দ্বারা আরও স্পষ্ট হয়ে গেল যে, আবুল মা'আলী 'আহলুত তাজহীল' বা তাফওয়ীদ্ব নীতির অনুসারীদের একজন। দেখুন, ইবন তাইমিয়‍্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আক্বলি ওয়ান নাক্কলি (৫/২৪৮)।
৯৭৮. আল-জুওয়াইনী, আর-রিসালাতুন নিযামিয়্যাহ, পৃ. ৩২-৩৪; তাহকীক, আহমাদ আস-সাক্কা। বস্তুত এ নীতিটি ভুল। ভুলের ওপর প্রতিষ্ঠিত। দুর্ভাগ্যবশত পরবর্তী আশ'আরীরা এ ভুলকেই আঁকড়ে ধরে আছে।
৯৭৯. অর্থাৎ এ পুস্তিকার শুরুতে যে প্রশ্ন করা হয়েছিল তার উত্তরে উদ্ধৃত এ জবাব। বস্তুত পুরো গ্রন্থটিই উক্ত প্রশ্নের উত্তর।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00