📄 ইমাম আব্দুল কাদের আল-জীলানী রাহিমাহুল্লাহ’র বক্তব্য
সূফীগণের পরবর্তী ইমাম শাইখ আবু মুহাম্মদ আব্দুল কাদির ইবন আবি সালিহ আল-জীলানী স্বীয় ‘আল-গুনইয়াহ৮০) গ্রন্থে বলেন, সংক্ষিপ্তভাবে দলীল-প্রমাণ ও নিদর্শনাবলির মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তাকে চেনা ও জানা, আর তো হচ্ছে: এটা জানা ও দৃঢ় বিশ্বাস করা যে, আল্লাহ এক ও একজনই।...
শেষে বলেন, তিনি উপরের দিকে, 'আরশের উপরে অবস্থানকারী, রাজত্বকে আয়ত্বাধীনকারী, তাঁর জ্ঞান সবকিছুকে পরিবেষ্টনকারী。
﴿إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ وَالْعَمَلُ الصَّالِحُ يَرْفَعُهُ ﴾ [فاطر: ١٠] “তাঁরই দিকে পবিত্র বাণীসমূহ উঠে যায় এবং সৎকাজ, তিনি তা উপরে উঠান।” [সূরা ফাতির, আয়াত: ১০]
﴿يُدَبِّرُ الْأَمْرَ مِنَ السَّمَاءِ إِلَى الْأَرْضِ ثُمَّ يَعْرُجُ إِلَيْهِ فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ أَلْفَ سَنَةٍ مِّمَّا تَعُدُّونَ ﴾ [السجدة: ٥] "তিনি আসমান থেকে যমীন পর্যন্ত সমুদয় বিষয় পরিচালনা করেন, তারপর সব কিছুই তাঁর সমীপে উঠে এমন এক দিনে, যার পরিমাণ হবে তোমাদের গণনা অনুসারে হাজার বছর।" [সূরা আস-সাজদাহ: ০৫]
আর তাঁকে এ গুণ দিয়ে বলা জায়েয নয় যে, তিনি সর্বত্র বিরাজমান।(৮০) বরং বলা হবে, তিনি আকাশের উপরে, 'আরশের উপরে। যেমন তিনি বলেছেন: الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى [ طه : ٥] "রহমান 'আরশের উপরে উঠেছেন।" [সূরা ত্বা-হা: ০৫] তিনি আরও আয়াত ও হাদীস উল্লেখ করে শেষে বলেন: "কোনো তা'ওয়ীল বা ব্যাখ্যা- বিশ্লেষণ ছাড়া ইসতিওয়া (আরোহন করা, উপরে উঠা) গুণ প্রয়োগ করা উচিত। আর তা হলো তাঁর যাত (৮৬৪) বা সত্তা 'আরশের উপরে হওয়া。
এ তো গেল, 'আরশের উপর উঠার ক্ষেত্রে 'যাত' বা সত্তাসহ শব্দটি ব্যবহার নিয়ে আলোচনা। যাতে প্রত্যেক গোষ্ঠীর কথার পিছনেই যুক্তি রয়েছে। কিন্তু তারা কেউই তাদের অন্তর্ভুক্ত নয়, যারা আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর উঠাকে অস্বীকার করে কিংবা অপব্যাখ্যা করে ভিন্ন পথে পরিচালিত করে। এভাবে আল্লাহর আরেকটি সিফাত বা গুণ হচ্ছে 'মহান আল্লাহর নেমে আসা'। এই গুণটির ব্যাপারেও অনুরূপ মতভেদ হয়েছে, সেখানে কি এটা বলা হবে যে, তিনি 'যাতসহ অবতরণ করেন'? এখানে আলেমগণের মধ্যে তিনটি মত দেখা যায়।
এক, যারা বলেন যে, তা বলা যাবে, তাদের কথা হচ্ছে এ ব্যাপারে একটি হাদীস এসেছে, কিন্তু বাস্তবে হাদীসটি দুর্বল। তারা আরও বলেন, এখানে 'সত্তা' বলে 'স্বয়ং' বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার কোনো নির্দেশ বা রহমত বা তার কোনো ফিরিশতা নাযিল হওয়া নয়, বরং তিনি স্বয়ং নাযিল হন। তাই এটি বললে সেসব মু'আত্ত্বিলাদের অপব্যাখ্যার মূলোৎপাটন করা হয়, সুতরাং তা ব্যবহার করা যাবে। এ মতের পক্ষে রয়েছেন আহলুল হাদীস ও আহলুস সুন্নাহ'র কিছু ইমাম, সূফীদের কিছু শাইখ আর কিছু কালামশাস্ত্রবিদ। আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মধ্যে যারা তা বলেছেন তাদের অন্যতম হচ্ছেন, নু'আইম ইবন হাম্মাদ আল-মারওয়াযী, আবুল কাসেম আত- তাইমী, (কিওয়ামুস সুন্নাহ), প্রখ্যাত আলেম 'কুহতাহ', আবু আব্দুল্লাহ ইবন হামেদ, আব্দুর রহমান ইবন আবু আব্দুল্লাহ ইবন মানদাহ।
দুই. যারা বলেন যে 'আল্লাহ তা'আলা সত্তাসহ বা স্বয়ং অবতরণ করেন' একথা বলা যাবে না, তাদের কথা হচ্ছে, এটি কুরআন ও সুন্নাহ'য় আসেনি, তাই আমরা তা বলা থেকে বিরত থাকব। এটি মূলত বিদ'আতী কালামশাস্ত্রবিদ অপব্যাখ্যাকারীদের মত। কিন্তু কোনো কোনো আহলুস সুন্নাতের ইমাম এখানে 'সত্তাগতভাবে' বা 'স্বয়ং' বলা যাবে না বলে মত প্রকাশ করে কালামশাস্ত্রবিদদের অনুরূপ অভিমত দিয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন, ইমাম ইবন কুতাইবাহ, ইবন আব্দিল বার, খাত্তাবী। সম্ভবত ইবন কুতাইবাহ এখানে অবতরণ ও 'আরশের উপর থাকার মধ্যে সমন্বয় করতে গিয়ে কালামশাস্ত্রবিদদের সাথে এই একটি মাসআলায় 'স্বয়ং' শব্দটি বলতে নিষেধ করেছেন।
তিন, যারা বলেন, আমরা শুধু 'মহান আল্লাহ অবতরণ করেন' এতটুকু বলবো, তার থেকে বেশি বাড়িয়ে বলবো না। তবে তারা আল্লাহ কর্তৃক অবতরণ করার গুণটি সাব্যস্ত করেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন, ইমাম আবু মূসা আল-মাদীনী, ইমাম আবুল কাসেম আত-তামীমী ও ইমাম শামসুদ্দীন আয-যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (২০/৩৩১)। এ ব্যাপারে বিস্তারিত দেখুন, গামেদী, সিফাতিন নুযুলিল ইলাহী ওয়া রাদ্দুশ শুবুহাত হাওলাহা, পৃ. ২১৫-২২১।
বস্তুত ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ'র এমতটিও একদিক থেকে ঠিক আছে, আর তা হচ্ছে, এমন প্রতিটি কথা যার শব্দ বা অর্থ কুরআন ও সুন্নাহয় আসেনি, আর সালাফগণও তা বলেননি, তা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ তা তখন শর'য়ী দলীলের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। আর এটির বিরোধিতা করা কিংবা এর সাথে একাত্ম হওয়ার সাথে সুন্নাত বা বিদ'আত সম্পৃক্ত হয় না। সুন্নাত তো তাই যা শর'য়ী দলীল অনুযায়ী হবে, আর বিদ'আত তাই যা শর'য়ী দলীলের বিরোধী হবে। আবার কখনও কখনও যা শরী'আতের অনুযায়ী কিনা তা জানা যায় না এমন কিছুকেও বিদ'আত বলা হয়ে থাকে; কারণ এখানে মূলনীতি হচ্ছে, যা শরী'আত বলে জানা যাবে না তা শরী'আত ও দীন হিসেবে নেয়া যাবে না। সুতরাং যদি কেউ এমন কোনো কাজ করে যা শরী'আত অনুমোদিত বলে জানা যায়নি তাহলে সে বিদআতের প্রচলন করলো; যদিও পরবর্তীতে তার কাছে সেটা জানা হয় যে তা শরী'আত অনুমোদিত। অনুরূপভাবে যে কেউ দীনের মধ্যে এমন কোনো কথা বলবে যার সপক্ষে শর'য়ী কোনো দলীল নেই সেও বিদ'আতে নিপতিত হলো, যদিও পরবর্তীতে তার সে কাজ সুন্নাত অনুসারে হয়েছে জানা হয়। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আকলি ওয়ান নাক্কলি (১/২৪৪)।
তবে নিঃসন্দেহে এটা বলতেই হবে যে, সালাফগণের মধ্য হতে যারা মুহাক্কিক বা সত্যনিষ্ঠ বলে খ্যাতি লাভ করেছেন, যেমন ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল, উসমান ইবন সা'ঈদ আদ-দারেমী প্রমুখ তারা এসব শব্দের সাথে যে পন্থা অবলম্বন করেছেন সেটাই অনুসরণ করা উচিত। সুতরাং যখন আল্লাহ তা'আলার অবতরণ' সাব্যস্ত করা হবে তখন শরী'আতের ভাষ্যে যা এসেছে তার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু যখন বিদ'আতীরা এমন কোনো শব্দ ব্যবহার করবে যা শরয়ী ভাষ্যে আসেনি, তখন সেটা দ্বারা কী উদ্দেশ্য তা বিস্তারিত জিজ্ঞাসা করতে হবে। যাতে করে যা হক্ক অর্থ তা সাব্যস্ত করা যায়, আর যা বাতিল অর্থ হবে তা না করা যায়। কিন্তু সবসময় যদি এটি ব্যবহার করতে মানা করা হয়, তখন তার একটি অসুবিধা হলো, যারা এসব শব্দ ব্যবহার করতে নিজেদেরকে গুটিয়ে রাখে তারা বিরোধীদের কথার জাওয়াবের সময় নিজেরা অপারগ হয়ে যাবে ও রনে ভঙ্গ দেয়া ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় থাকবে না। অর্থাৎ তখন লোকেরা বলবে সে জানে না, তার উত্তর দেয়ার জ্ঞান নেই। আর বাতিল এমনসব শব্দ ব্যবহার করেই সবসময় জিতে যেতে চায়। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আকলি ওয়ান নাকলি (১/২২৯), (৯/৩৩৫); বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (২/৫৮)।
তিনি বলেন, তাঁর 'আরশের উপরে হওয়া প্রত্যেক নাযিল হওয়া কিতাবে ও প্রত্যেক প্রেরিত নবী থেকে উল্লেখ রয়েছে, কোনো ধরণ-পদ্ধতি নির্ধারণ ছাড়া। আর তিনি দীর্ঘ আলোচনা করেছেন যা এ স্থানে নিয়ে আসা সম্ভব নয়। আর তিনি আল্লাহর সকল সিফাতের ব্যাপারেও একই কথা বলেছেন। (৮৫৮) এ প্রসঙ্গে সকল ইমামের কথা উল্লেখ করলে কিতাব অনেক লম্বা হয়ে যাবে। (৮৬০)
টিকাঃ
৮৬১. তিনি হচ্ছেন মুহিউদ্দীন আবু মুহাম্মাদ আব্দুল কাদের ইবন আবী সালেহ আব্দুল্লাহ আল-জীলী বা জীলানী, আল-হাম্বলী। তার জন্ম হয়েছিল হিজরী ৪৭১ সালে জীলান নগরীতে। যুহদ, তাকওয়া, ইবাদতে প্রসিদ্ধ ছিলেন। নিজ হাতে কাজ করে খাবার সংগ্রহ করতেন। তার প্রচার ও প্রসার সারা দুনিয়া জুড়ে। সূফীদের বড় একজন। তার দিকে সম্পর্কিত করে বলা হয় কাদেরিয়্যাহ ত্বরীকা যা বর্তমান কালেও বিখ্যাত একটি সূফী ত্বরীকা।
তিনি হাদীস শুনেন আবু গালেব আল বাকেল্লানী, জা'ফর ইবন আহমাদ আস-সাররাজ প্রমুখ থেকে। আর তার থেকে হাদীস শুনেন আস-সাম'আনী, হাফেয আব্দুল গনী, শাইখ মুওয়াফফাকুদ্দীন ইবন কুদামাহ প্রমুখ।
তাঁর সম্পর্কে ইমাম যাহাবী বলেন, 'আশ-শাইখ, আল-ইমাম, আল-আলেম, আয-যাহেদ, আল- 'আরেফ, আল-কুদওয়াহ, শাইখুল ইসলাম, আলামুল আওলিয়া...'। আর তার জীবনী বর্ণনা করার শেষে বলেন, মোটকথা: শাইখ আব্দুল কাদের ছিলেন অত্যন্ত মর্যাদাবান ব্যক্তি, তার ওপর তার কিছু কথা ও দাবির বিষয়ে দোষ ধরা যায়, আল্লাহর কাছেই সেগুলোর জন্য ওয়াদা, তবে অনেক কিছুই তার ওপর মিথ্যারোপ করে ছড়ানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বড় শাইখদের মধ্য হতে কারও এত হাল ও কারামাত ছিল না যা ছিল শাইখ আব্দুল কাদের জিলানীর। তবে সেগুলোর অনেক কিছুই বিশুদ্ধ নয়, তন্মধ্যে কোনো কোনোটি আছে অসম্ভব পর্যায়ের।
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ শাইখ আব্দুল কাদের থেকে বর্ণনা করেন যে, তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কোনো মানুষের পক্ষে কি ইমাম আহমাদের আকীদাহ'র বাইরে গিয়ে ওলী হওয়া সম্ভব? তিনি বলেছিলেন, না। কখনো তা হয়নি, আর তা কখনও হওয়ার নয়।
ইমাম ইবন কাসীর রাহিমাহুল্লাহ তার সম্পর্কে বর্ণনা করেন, 'লোকেরা তার দ্বারা ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছে। তার অনুসারী ও তার ছাত্রদের এ ব্যাপারে অনেক কথা রয়েছে। আর লোকেরা ইমাম আব্দুল কাদের জীলানী থেকে বেশ কিছু কথা, কাজ ও কাশফ বর্ণনা করে থাকে, যার অধিকাংশই বাড়াবাড়ি পর্যায়ের। তবে তিনি ছিলেন নেককার ও পরহেযগার। অবশেষে ইবন কাসীর বলেন, মোটকথা: তিনি সূফী শাইখদের একজন বিখ্যাত নেতা ছিলেন।
তার সম্পর্কে ইমাম ইবন রাজাব রাহিমাহুল্লাহ, তার বেশ কিছু অসমর্থিত ও অসাব্যস্ত বিষয় উল্লেখ করার পর বলেন, তবে শাইখ আব্দুল কাদের রাহিমাহুল্লাহ'র বেশ কিছু উত্তম বাণী রয়েছে তাওহীদ, আল্লাহর গুণাবলি ও তাকদীরের ব্যাপারে। অনুরূপ কিছু মা'রিফাত বিষয়ক ইলম রয়েছে যা সুন্নাহ'র সাথে সামঞ্জস্যশীল। দেখুন, যাইলু ত্বাবাক্বাতিল হানাবিলাহ (২/১৯৮)।
শাইখ আব্দুল্লাহ ইবন জিবরীন বলেন, এসব সূফীদের থেকে অধিকাংশ যা বর্ণিত হয় যেগুলো এমনসব কাজ ও কর্মকাণ্ড যার সাথে শরী'আতের মিল হয় না, সেগুলো তারা বলেননি, তারা সেগুলো করেননি। এগুলো তাদের ছাত্র কিংবা অনুসারীদের দ্বারা তৈরি করা।
তিনি হিজরী ৫৬১ সালে মারা যান। দেখুন ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (২০/৪৩৯); ইবন কাসীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (১২/২৫২)।
তার রচিত গ্রন্থাবলির মধ্যে বিখ্যাত হচ্ছে, ১- আল-গুনইয়াতু লি ত্বালিবী ত্বারীকিল হাক। ২- আল-ফাতহুর রাব্বানী। ৩- ফুতূহল গাইব। ৪- আল-ফুযূদ্বাতুর রাব্বানিয়াহ। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (২০/৪৩৯); আল-কাতবী, ফাওয়াতুল ওয়াফায়াত ওয়ায যাইলু আলাইহা (২/৩৭৩); ইবন রাজাব, যাইলু ত্বাবাক্বাতিল হানাবিলাহ (৩/২৯০); ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আক্কলি ওয়ান নাকলি (৫/৫); ইবন কাসীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (১২/২৫২); যিরিকলী, আল-আ'লাম (৪/৪৭)।
আব্দুল কাদের জীলানীর ওপর সবচেয়ে বেশি কঠোর ছিলেন ইবনুল জাওযী। ইমাম ইবন রজব বলেন, ইমাম ইবনুল জাওযী রাহিমাহুল্লাহ ইমাম আব্দুল কাদের জীলানী রাহিমাহুল্লাহ'র ওপর একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন, যাতে তিনি আব্দুল কাদের জীলানীর বহু ভুল ধরেছেন। তবে ইবন রজব বলেন, ইবনুল জাওযী রাহিমাহুল্লাহ পরবর্তী সূফী শাইখদের ওযর গ্রহণ করতেন না যারা তাদের তরীকার পূর্ববর্তীদের বিরোধিতা করে কোনো পন্থা রচনা করেছেন। তিনি তাদের ওপর কঠোর ছিলেন। দেখুন, ইবন রজব, যাইলু ত্বাবাক্বাতিল হানাবিলাহ (২/১৯৮)।
অবশ্য শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ ইমাম আব্দুল কাদের আল-জীলানীর প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, আব্দুল কাদের জীলানী ইসলামের এমন শাইখদের একজন, আল্লাহ তা'আলা তার জন্য উম্মতের মাঝে সত্য রসনার ব্যবস্থা করেছেন। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (২/৪৭৪)। তিনি আরও বলেন, তিনি হক্ক ও ইস্তেকামাতের ওপর ছিলেন। দেখুন, মাজমু' ফাতাওয়া (১০/৫১৬)। অন্যত্র বলেন, 'তিনি শরী'আতের আদেশ ও নিষেধের সবচেয়ে বেশি মান্যকারী ছিলেন। তিনি তাকদীরের সাথে চলা ও তাকদীর দিয়ে দলীল দেয়ার মত (বিভ্রান্তিকর) মতবাদ থেকে সাবধান করেছেন। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৮/৩০৬, ৩৬৯)।
আরও বলেন, নবুওয়াত ও বেলায়েত সম্পর্কে সূফীদের যে মতবাদ তা থেকে তিনি সবচেয়ে বেশি মুক্ত ও তাদের ভ্রষ্টতা থেকে বেশি দূরে অবস্থানকারী একজন শাইখ ছিলেন। আর যারা নবুওয়াত ও বেলায়েত নিয়ে বাড়াবাড়ি করে তিনি তাদের সবচেয়ে বড় অস্বীকারকারী ছিলেন। তিনি সেসব বিখ্যাত সূফী মাশায়েখগণের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন যারা আল্লাহর সিফাত তথা গুণাবলি সাব্যস্ত করতেন, জাহমিয়্যাহ ও হুলুলিয়্যাহ সম্প্রদায়দ্বয়ের নিন্দা করতেন। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আকলি ওয়ান নাকলি (৫/৪)।
আরও বলেন, তিনি কেবল শর'য়ী 'সামা'তে বিশ্বাসী ছিলেন, যার ওপর নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কিরাম ও তাদের পরবর্তী উম্মতের সালাফগণ চলেছেন। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/৪২৬-৪২৭)।
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ ইমাম আব্দুল কাদের জীলানীর 'ফুতুহুল গাইব' গ্রন্থের একটি অংশের ব্যাখ্যা করেছেন। যে অংশ শাইখ মুহাম্মাদ রাশাদ সালেম তার জামে'উর রাসায়িল গ্রন্থে তাহকীক করেছেন, দেখুন, (২/৭৩-১৮৯); আর ফুতুহল গায়েব কিতাবটিও ছাপা হয়েছে, যাতে তার ৭৮টি প্রবন্ধ রয়েছে।
৮৬২. কিতাবটির নাম, 'আল-গুনইয়াতু লি ত্বালিবী তারীকিল হাক্ব আয্যা ওয়া জাল্লা'। এর অপর নাম, আল-গুনইয়াতু। বঙ্গদেশে অনুবাদের সময় গুনিয়াতুত ত্বালেবীন এ নামে খুব প্রসিদ্ধ হয়েছে। গ্রন্থটি প্রথম আরবীতে ছাপা হয়েছিল কুতুহুল গাইব এর সাথে একত্রে, লাহোরস্থ ইসলামী প্রেস থেকে, যার পৃষ্ঠা সংখ্যা ৯২৭; যার পাশে ছিল ফুতুহুল গাইব। তখন তার প্রতিটি ছত্রের উর্দু অনুবাদ হয়েছিল। এ গ্রন্থের শুরুতে ইমাম আব্দুল কাদের জীলানী রাহিমাহুল্লাহ বলেছিলেন, পৃ. ৪, তিনি এ গ্রন্থটি কিছু সঙ্গী-সাথীর অনুরোধে রচনা করেছেন। এ কিতাবটিতে আকীদাহ ও আমল উভয় প্রকার মাসআলাই রয়েছে। তিনি বলেন, পৃ. ৪, যখন আমি দেখলাম যে, সে সত্যি সত্যিই শরী'আতের আদাব, ফরয, সুন্নাত ও পদ্ধতি জানতে আগ্রহী, আল্লাহ তা'আলাকে তাঁর নিদর্শন ও আলামতের মাধ্যমে জানতে উদগ্রীব, তারপর কুরআন দিয়ে নসীহত করা, নাবাওয়ী হাদীসের শব্দাবলি যা আমরা আমাদের মজলিসে বর্ণনা করি তা জানতে উৎসুক, আর সে সালেহীন তথা নেককারদের জীবনী ও চরিত্র অবগত হতে চায়, যা আমাদের এ কিতাবের মাঝে অতিক্রম করবে, তাই আমি সেটা লিখতে মনস্থ করেছি, যাতে তা তার জন্য আল্লাহর পথে চলার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করে।... আর তিনি তার কিতাবকে পর্ব, অধ্যায় ও অনুচ্ছেদে বিভক্ত করে তা লিপিবদ্ধ করেন। যুগে যুগে আলেমগণ এ গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি এনেছেন। যেমন ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/২১৪); মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/২২২, ২৬৪); ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুয়ুশ, পৃ. ২৭৭; ইবন রাজাব, যাইলু ত্বাবাক্বাতিল হানাবিলাহ (২/১৯৯); যাহাবী, কিতাবুল 'আরশ, পৃ. ২৮৪; আল-'উলু লিল 'আলিয়্যিল আযীম (২/১৩৭০), নং ৫৪৮; সাফারীনী, লাওয়ামি'উল আনওয়ার আল- বাহিয়্যাহ (১/১৯৬)। অনুরূপভাবে হাম্বলী মাযহাবের পরবর্তী আলেমগণের অনেকেই এ কিতাব থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। যেমন, আলাউদ্দীন আল-মারদাওয়ী, আল-ইনসাফ (২/১২৩, ১৩১, ১৩৫); বাহুতী, কাশশাফুল কানা' (৫/১৭৬)।
৮৬৩. যেমনটি সর্বেশ্বরবাদী, অহংবাদী ও সোহংবাদীরা বিশ্বাস করে থাকে, তারা মনে করে আল্লাহ সবকিছুতে বিদ্যমান। সবকিছুতে প্রবেশ করতে পারেন, সবকিছু আল্লাহতে বিদ্যমান। নাউযুবিল্যাহ। অনেক সূফীরাও এ ধরনের বিশ্বাসে বিশ্বাসী।
৮৬৪. আরবী ভাষাভাষী একদল লোক 'যাত' শব্দটি আল্লাহর জন্য ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ভিন্নমত পোষণ করতেন। কারণ 'যাত' শব্দটি কোনো কিছুর দিকে 'মুযাফ' বা সম্বন্ধ পদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি কোনো 'মুযাফ ইলাহহি' নয়, বা 'ইসম' নয়। সুতরাং 'যাত' শব্দটি ব্যবহার করা হলে তাতে 'আলিফ লাম' প্রবেশ করানো যায় না। 'আয-যাত' বলা যাবে না। এ হচ্ছে আরবী ভাষী অনেকের মত।
ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'ইবন বারহান, জাওয়ালীকী প্রমুখ লোকেরা আল্লাহর জন্য 'যাত' শব্দটি ব্যবহার করাকে অস্বীকার করেছেন। তারা আরও বলেছেন, শব্দটি স্ত্রীবাচক। আর আল্লাহর জন্য স্ত্রী বাচক শব্দ ব্যবহার চলতে পারে না। কিন্তু যারা নিঃশর্তভাবে ব্যবহার করেছে তারা এর দ্বারা উদ্দেশ্য নিয়েছে নাম ওয়ালা সত্তাকে অথবা নাম ওয়ালা কোনো বাস্তব কিছুর জন্য।' ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আকলি ওয়ান নাকলি (১০/১৫৭)।
ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ আরও বলেন, 'আর 'যাত' শব্দটি একটি নব উদ্ভাবিত শব্দ, যা 'যু' শব্দের স্ত্রীবাচক শব্দ। আর 'যাত' শব্দের অর্থ: 'ওয়ালা' যেমন, যাতু ইলম বা ইলম ওয়ালা, যাতু কুদরাত বা ক্ষমতা ওয়ালা, যাতু হায়াত বা জীবন ওয়ালা। সুতরাং 'যাত' শব্দটিকে কোনো গুণের সাথে সম্পৃক্ত করা না হলে তা দ্বারা ধরে নিতে হবে এখানে এটি 'মুদ্বাফ' বা সম্বন্ধ রয়েছে যাতে সম্বন্ধপদ আসেনি।' ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আকলি ওয়ান নাকলি (১০/১৫৭)।
তিনি আরও বলেন, বেশ কিছু আলেম এটাকে ব্যবহার করা অস্বীকার করেছেন। যেমন আবুল ফাতহ ইবন বারহান, ইবনুদ দাহহান প্রমুখ। তারা বলেন, এ শব্দটি আরবী নয়। কিন্তু অন্য আলেগমণ তাদের এ মতের বিরোধিতা করেছেন, যেমন, কাযী ও ইবন আকীল প্রমুখ। এ ব্যাপারে ফয়সালাকারী কথা হচ্ছে, এ শব্দটি প্রসিদ্ধ খাঁটি আরবী শব্দ নয়। বরং এটি নতুনভাবে ব্যবহৃত উদ্ভুত শব্দ। যেমন 'মাওজুদ' শব্দটি, 'মাহিয়াত' শব্দটি, 'কাইফিয়াত' শব্দ ও অনুরূপ শব্দাবলি। এ শব্দটি দাবি করে কিছু গুণ থাকা যার দিকে সত্তাকে সম্পৃক্ত করা হবে। ফলে বলা হবে, যাতু ইলম বা ইলম ওয়ালা, যাতু কুদরাত বা কুদরত ওয়ালা, যাতু কালাম বা কথাওয়ালা...।' মাজমূ' ফাতাওয়া (৬/৯৯)। আরও দেখুন, আস-সাওয়া'য়িকুল মুরসালাহ (৪/১৩৮৪)।
আল্লামা মুহাম্মাদ ইবন ইবরাহীম রাহিমাহুল্লাহ শাইখ আব্দুল কাদের আল-জীলানীর বক্তব্যের অর্থ করেছেন এভাবে যে, 'অর্থাৎ সত্যিকারের উপরে উঠা।' বহু বিখ্যাত আলেম ও প্রখ্যাত বড় আলেমগণ 'যাত' শব্দটি ব্যবহার করেছেন। আবার আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের কেউ কেউ তা ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন, তারা প্রত্যেকেই কল্যাণের ওপর রয়েছে।
যারা বলেছেন 'আরশের উপরে উঠার উঠার অর্থ, 'আরশের উপর আল্লাহর 'যাত' বা সত্তা উঠা, তারা যাবতীয় তা'ওয়ীল নামীয় তা'ত্বীল থেকে আল্লাহর সিফাতকে মুক্ত করতে চেয়েছেন। কারণ কেউ কেউ 'আরশের উপরে উঠেছেন' এটা বলে তবে তারা তা'ওয়ীল না করেও বলে থাকে যে, এর দ্বারা 'আল্লাহর সত্তা 'আরশের উপরে উঠা' বুঝানো হয়নি। তাই যাতে কেউ আল্লাহ তা'আলার সত্তা 'আরশের উপরে উঠাকে অস্বীকার করতে না পারে সেজন্য তারা স্পষ্টভাবে 'আল্লাহ তা'আলার সত্তা শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
আর যারা 'যাত' বা সত্তা শব্দটি ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন, তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলার নাম ও গুণের বিষয়টি 'তাওক্বীফী' বা কুরআন ও সুন্নাহ'র জানানোর ওপর নির্ভরশীল। আর কুরআন ও সুন্নাহ'র কোথাও 'আরশের উপরে উঠেছেন' এর সাথে 'যাত' কথাটি আসেনি। বস্তুত তাদেরও উদ্দেশ্য হক ও সত্য। যারা 'যাত' শব্দটি আল্লাহর জন্য ব্যবহার করেছেন তাদেরও উদ্দেশ্য মহৎ। এরা আকীদাহ'র অধ্যায়ে একটি ফায়েদার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন, বান্দাদের হিদায়াতের কারণ হয়েছেন, যথাযথভাবে আল্লাহর সিফাত সাব্যস্ত করেছেন। আর অন্যরা যারা 'যাত' শব্দটি আল্লাহর জন্য ব্যবহার করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তারা শুধু কুরআন ও সুন্নাহ'য় যা এসেছে তাই ব্যবহার করছে, তারা চায়নি কোনো শব্দ বাড়াতে। কিন্তু এ অধ্যায়ে যখন কোনো শব্দ বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দেয়, আর তার মাধ্যমে কোনো পথভ্রষ্টতা কিংবা বিদ'আত প্রতিহত করা উদ্দেশ্য তখন তা আনয়ন করা যাবে, এতে কোনো নিষেধ নেই। তিনি কি তাঁর সত্তা ব্যতীতই 'আরশের উপর উঠেছেন? সুতরাং যে কেউ এ 'যাত' শব্দ ব্যবহার করেননি তিনিও সঠিক পথে আছেন, তবে শর্ত হচ্ছে তাদের কাছে... (আল্লাহর গুণ সাব্যস্ত করার বিষয়টি স্পষ্ট থাকতে হবে)। দেখুন, মুহাম্মাদ ইবন ইবরাহীম আলুশ শাইখ, ফাতাওয়া ও রাসায়িল (১/২০৯-২১০)।
৮৬৫. দেখুন, আল-গুনইয়া, পৃ. ১২১-১২৮; আরও দেখুন, ইবন রাজাব, যাইলু ত্বাবাক্বাতিল হানাবিলাহ (৩/২৯৬); ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুয়ুশিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ২৭৭; যাহাবী, আল-'উলু লিল 'আলিয়্যিল 'আযীম, পৃ. ১৯৩; মুখতাসার, পৃ. ২৮৪।
৮৬৬. এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে হলে পড়তে পারেন আমার অপর গ্রন্থ "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন"。
সূফীগণের পরবর্তী ইমাম শাইখ আবু মুহাম্মদ আব্দুল কাদির ইবন আবি সালিহ আল-জীলানী স্বীয় ‘আল-গুনইয়াহ৮০) গ্রন্থে বলেন, সংক্ষিপ্তভাবে দলীল-প্রমাণ ও নিদর্শনাবলির মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তাকে চেনা ও জানা, আর তো হচ্ছে: এটা জানা ও দৃঢ় বিশ্বাস করা যে, আল্লাহ এক ও একজনই।...
শেষে বলেন, তিনি উপরের দিকে, 'আরশের উপরে অবস্থানকারী, রাজত্বকে আয়ত্বাধীনকারী, তাঁর জ্ঞান সবকিছুকে পরিবেষ্টনকারী。
﴿إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ وَالْعَمَلُ الصَّالِحُ يَرْفَعُهُ ﴾ [فاطر: ١٠] “তাঁরই দিকে পবিত্র বাণীসমূহ উঠে যায় এবং সৎকাজ, তিনি তা উপরে উঠান।” [সূরা ফাতির, আয়াত: ১০]
﴿يُدَبِّرُ الْأَمْرَ مِنَ السَّمَاءِ إِلَى الْأَرْضِ ثُمَّ يَعْرُجُ إِلَيْهِ فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ أَلْفَ سَنَةٍ مِّمَّا تَعُدُّونَ ﴾ [السجدة: ٥] "তিনি আসমান থেকে যমীন পর্যন্ত সমুদয় বিষয় পরিচালনা করেন, তারপর সব কিছুই তাঁর সমীপে উঠে এমন এক দিনে, যার পরিমাণ হবে তোমাদের গণনা অনুসারে হাজার বছর।" [সূরা আস-সাজদাহ: ০৫]
আর তাঁকে এ গুণ দিয়ে বলা জায়েয নয় যে, তিনি সর্বত্র বিরাজমান।(৮০) বরং বলা হবে, তিনি আকাশের উপরে, 'আরশের উপরে। যেমন তিনি বলেছেন: الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى [ طه : ٥] "রহমান 'আরশের উপরে উঠেছেন।" [সূরা ত্বা-হা: ০৫] তিনি আরও আয়াত ও হাদীস উল্লেখ করে শেষে বলেন: "কোনো তা'ওয়ীল বা ব্যাখ্যা- বিশ্লেষণ ছাড়া ইসতিওয়া (আরোহন করা, উপরে উঠা) গুণ প্রয়োগ করা উচিত। আর তা হলো তাঁর যাত (৮৬৪) বা সত্তা 'আরশের উপরে হওয়া。
এ তো গেল, 'আরশের উপর উঠার ক্ষেত্রে 'যাত' বা সত্তাসহ শব্দটি ব্যবহার নিয়ে আলোচনা। যাতে প্রত্যেক গোষ্ঠীর কথার পিছনেই যুক্তি রয়েছে। কিন্তু তারা কেউই তাদের অন্তর্ভুক্ত নয়, যারা আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর উঠাকে অস্বীকার করে কিংবা অপব্যাখ্যা করে ভিন্ন পথে পরিচালিত করে। এভাবে আল্লাহর আরেকটি সিফাত বা গুণ হচ্ছে 'মহান আল্লাহর নেমে আসা'। এই গুণটির ব্যাপারেও অনুরূপ মতভেদ হয়েছে, সেখানে কি এটা বলা হবে যে, তিনি 'যাতসহ অবতরণ করেন'? এখানে আলেমগণের মধ্যে তিনটি মত দেখা যায়।
এক, যারা বলেন যে, তা বলা যাবে, তাদের কথা হচ্ছে এ ব্যাপারে একটি হাদীস এসেছে, কিন্তু বাস্তবে হাদীসটি দুর্বল। তারা আরও বলেন, এখানে 'সত্তা' বলে 'স্বয়ং' বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার কোনো নির্দেশ বা রহমত বা তার কোনো ফিরিশতা নাযিল হওয়া নয়, বরং তিনি স্বয়ং নাযিল হন। তাই এটি বললে সেসব মু'আত্ত্বিলাদের অপব্যাখ্যার মূলোৎপাটন করা হয়, সুতরাং তা ব্যবহার করা যাবে। এ মতের পক্ষে রয়েছেন আহলুল হাদীস ও আহলুস সুন্নাহ'র কিছু ইমাম, সূফীদের কিছু শাইখ আর কিছু কালামশাস্ত্রবিদ। আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মধ্যে যারা তা বলেছেন তাদের অন্যতম হচ্ছেন, নু'আইম ইবন হাম্মাদ আল-মারওয়াযী, আবুল কাসেম আত- তাইমী, (কিওয়ামুস সুন্নাহ), প্রখ্যাত আলেম 'কুহতাহ', আবু আব্দুল্লাহ ইবন হামেদ, আব্দুর রহমান ইবন আবু আব্দুল্লাহ ইবন মানদাহ।
দুই. যারা বলেন যে 'আল্লাহ তা'আলা সত্তাসহ বা স্বয়ং অবতরণ করেন' একথা বলা যাবে না, তাদের কথা হচ্ছে, এটি কুরআন ও সুন্নাহ'য় আসেনি, তাই আমরা তা বলা থেকে বিরত থাকব। এটি মূলত বিদ'আতী কালামশাস্ত্রবিদ অপব্যাখ্যাকারীদের মত। কিন্তু কোনো কোনো আহলুস সুন্নাতের ইমাম এখানে 'সত্তাগতভাবে' বা 'স্বয়ং' বলা যাবে না বলে মত প্রকাশ করে কালামশাস্ত্রবিদদের অনুরূপ অভিমত দিয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন, ইমাম ইবন কুতাইবাহ, ইবন আব্দিল বার, খাত্তাবী। সম্ভবত ইবন কুতাইবাহ এখানে অবতরণ ও 'আরশের উপর থাকার মধ্যে সমন্বয় করতে গিয়ে কালামশাস্ত্রবিদদের সাথে এই একটি মাসআলায় 'স্বয়ং' শব্দটি বলতে নিষেধ করেছেন।
তিন, যারা বলেন, আমরা শুধু 'মহান আল্লাহ অবতরণ করেন' এতটুকু বলবো, তার থেকে বেশি বাড়িয়ে বলবো না। তবে তারা আল্লাহ কর্তৃক অবতরণ করার গুণটি সাব্যস্ত করেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন, ইমাম আবু মূসা আল-মাদীনী, ইমাম আবুল কাসেম আত-তামীমী ও ইমাম শামসুদ্দীন আয-যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (২০/৩৩১)। এ ব্যাপারে বিস্তারিত দেখুন, গামেদী, সিফাতিন নুযুলিল ইলাহী ওয়া রাদ্দুশ শুবুহাত হাওলাহা, পৃ. ২১৫-২২১।
বস্তুত ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ'র এমতটিও একদিক থেকে ঠিক আছে, আর তা হচ্ছে, এমন প্রতিটি কথা যার শব্দ বা অর্থ কুরআন ও সুন্নাহয় আসেনি, আর সালাফগণও তা বলেননি, তা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ তা তখন শর'য়ী দলীলের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। আর এটির বিরোধিতা করা কিংবা এর সাথে একাত্ম হওয়ার সাথে সুন্নাত বা বিদ'আত সম্পৃক্ত হয় না। সুন্নাত তো তাই যা শর'য়ী দলীল অনুযায়ী হবে, আর বিদ'আত তাই যা শর'য়ী দলীলের বিরোধী হবে। আবার কখনও কখনও যা শরী'আতের অনুযায়ী কিনা তা জানা যায় না এমন কিছুকেও বিদ'আত বলা হয়ে থাকে; কারণ এখানে মূলনীতি হচ্ছে, যা শরী'আত বলে জানা যাবে না তা শরী'আত ও দীন হিসেবে নেয়া যাবে না। সুতরাং যদি কেউ এমন কোনো কাজ করে যা শরী'আত অনুমোদিত বলে জানা যায়নি তাহলে সে বিদআতের প্রচলন করলো; যদিও পরবর্তীতে তার কাছে সেটা জানা হয় যে তা শরী'আত অনুমোদিত। অনুরূপভাবে যে কেউ দীনের মধ্যে এমন কোনো কথা বলবে যার সপক্ষে শর'য়ী কোনো দলীল নেই সেও বিদ'আতে নিপতিত হলো, যদিও পরবর্তীতে তার সে কাজ সুন্নাত অনুসারে হয়েছে জানা হয়। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আকলি ওয়ান নাক্কলি (১/২৪৪)।
তবে নিঃসন্দেহে এটা বলতেই হবে যে, সালাফগণের মধ্য হতে যারা মুহাক্কিক বা সত্যনিষ্ঠ বলে খ্যাতি লাভ করেছেন, যেমন ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল, উসমান ইবন সা'ঈদ আদ-দারেমী প্রমুখ তারা এসব শব্দের সাথে যে পন্থা অবলম্বন করেছেন সেটাই অনুসরণ করা উচিত। সুতরাং যখন আল্লাহ তা'আলার অবতরণ' সাব্যস্ত করা হবে তখন শরী'আতের ভাষ্যে যা এসেছে তার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু যখন বিদ'আতীরা এমন কোনো শব্দ ব্যবহার করবে যা শরয়ী ভাষ্যে আসেনি, তখন সেটা দ্বারা কী উদ্দেশ্য তা বিস্তারিত জিজ্ঞাসা করতে হবে। যাতে করে যা হক্ক অর্থ তা সাব্যস্ত করা যায়, আর যা বাতিল অর্থ হবে তা না করা যায়। কিন্তু সবসময় যদি এটি ব্যবহার করতে মানা করা হয়, তখন তার একটি অসুবিধা হলো, যারা এসব শব্দ ব্যবহার করতে নিজেদেরকে গুটিয়ে রাখে তারা বিরোধীদের কথার জাওয়াবের সময় নিজেরা অপারগ হয়ে যাবে ও রনে ভঙ্গ দেয়া ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় থাকবে না। অর্থাৎ তখন লোকেরা বলবে সে জানে না, তার উত্তর দেয়ার জ্ঞান নেই। আর বাতিল এমনসব শব্দ ব্যবহার করেই সবসময় জিতে যেতে চায়। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আকলি ওয়ান নাকলি (১/২২৯), (৯/৩৩৫); বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (২/৫৮)।
তিনি বলেন, তাঁর 'আরশের উপরে হওয়া প্রত্যেক নাযিল হওয়া কিতাবে ও প্রত্যেক প্রেরিত নবী থেকে উল্লেখ রয়েছে, কোনো ধরণ-পদ্ধতি নির্ধারণ ছাড়া। আর তিনি দীর্ঘ আলোচনা করেছেন যা এ স্থানে নিয়ে আসা সম্ভব নয়। আর তিনি আল্লাহর সকল সিফাতের ব্যাপারেও একই কথা বলেছেন। (৮৫৮) এ প্রসঙ্গে সকল ইমামের কথা উল্লেখ করলে কিতাব অনেক লম্বা হয়ে যাবে। (৮৬০)
টিকাঃ
৮৬১. তিনি হচ্ছেন মুহিউদ্দীন আবু মুহাম্মাদ আব্দুল কাদের ইবন আবী সালেহ আব্দুল্লাহ আল-জীলী বা জীলানী, আল-হাম্বলী। তার জন্ম হয়েছিল হিজরী ৪৭১ সালে জীলান নগরীতে। যুহদ, তাকওয়া, ইবাদতে প্রসিদ্ধ ছিলেন। নিজ হাতে কাজ করে খাবার সংগ্রহ করতেন। তার প্রচার ও প্রসার সারা দুনিয়া জুড়ে। সূফীদের বড় একজন। তার দিকে সম্পর্কিত করে বলা হয় কাদেরিয়্যাহ ত্বরীকা যা বর্তমান কালেও বিখ্যাত একটি সূফী ত্বরীকা।
তিনি হাদীস শুনেন আবু গালেব আল বাকেল্লানী, জা'ফর ইবন আহমাদ আস-সাররাজ প্রমুখ থেকে। আর তার থেকে হাদীস শুনেন আস-সাম'আনী, হাফেয আব্দুল গনী, শাইখ মুওয়াফফাকুদ্দীন ইবন কুদামাহ প্রমুখ।
তাঁর সম্পর্কে ইমাম যাহাবী বলেন, 'আশ-শাইখ, আল-ইমাম, আল-আলেম, আয-যাহেদ, আল- 'আরেফ, আল-কুদওয়াহ, শাইখুল ইসলাম, আলামুল আওলিয়া...'। আর তার জীবনী বর্ণনা করার শেষে বলেন, মোটকথা: শাইখ আব্দুল কাদের ছিলেন অত্যন্ত মর্যাদাবান ব্যক্তি, তার ওপর তার কিছু কথা ও দাবির বিষয়ে দোষ ধরা যায়, আল্লাহর কাছেই সেগুলোর জন্য ওয়াদা, তবে অনেক কিছুই তার ওপর মিথ্যারোপ করে ছড়ানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বড় শাইখদের মধ্য হতে কারও এত হাল ও কারামাত ছিল না যা ছিল শাইখ আব্দুল কাদের জিলানীর। তবে সেগুলোর অনেক কিছুই বিশুদ্ধ নয়, তন্মধ্যে কোনো কোনোটি আছে অসম্ভব পর্যায়ের।
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ শাইখ আব্দুল কাদের থেকে বর্ণনা করেন যে, তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কোনো মানুষের পক্ষে কি ইমাম আহমাদের আকীদাহ'র বাইরে গিয়ে ওলী হওয়া সম্ভব? তিনি বলেছিলেন, না। কখনো তা হয়নি, আর তা কখনও হওয়ার নয়।
ইমাম ইবন কাসীর রাহিমাহুল্লাহ তার সম্পর্কে বর্ণনা করেন, 'লোকেরা তার দ্বারা ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছে। তার অনুসারী ও তার ছাত্রদের এ ব্যাপারে অনেক কথা রয়েছে। আর লোকেরা ইমাম আব্দুল কাদের জীলানী থেকে বেশ কিছু কথা, কাজ ও কাশফ বর্ণনা করে থাকে, যার অধিকাংশই বাড়াবাড়ি পর্যায়ের। তবে তিনি ছিলেন নেককার ও পরহেযগার। অবশেষে ইবন কাসীর বলেন, মোটকথা: তিনি সূফী শাইখদের একজন বিখ্যাত নেতা ছিলেন।
তার সম্পর্কে ইমাম ইবন রাজাব রাহিমাহুল্লাহ, তার বেশ কিছু অসমর্থিত ও অসাব্যস্ত বিষয় উল্লেখ করার পর বলেন, তবে শাইখ আব্দুল কাদের রাহিমাহুল্লাহ'র বেশ কিছু উত্তম বাণী রয়েছে তাওহীদ, আল্লাহর গুণাবলি ও তাকদীরের ব্যাপারে। অনুরূপ কিছু মা'রিফাত বিষয়ক ইলম রয়েছে যা সুন্নাহ'র সাথে সামঞ্জস্যশীল। দেখুন, যাইলু ত্বাবাক্বাতিল হানাবিলাহ (২/১৯৮)।
শাইখ আব্দুল্লাহ ইবন জিবরীন বলেন, এসব সূফীদের থেকে অধিকাংশ যা বর্ণিত হয় যেগুলো এমনসব কাজ ও কর্মকাণ্ড যার সাথে শরী'আতের মিল হয় না, সেগুলো তারা বলেননি, তারা সেগুলো করেননি। এগুলো তাদের ছাত্র কিংবা অনুসারীদের দ্বারা তৈরি করা।
তিনি হিজরী ৫৬১ সালে মারা যান। দেখুন ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (২০/৪৩৯); ইবন কাসীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (১২/২৫২)।
তার রচিত গ্রন্থাবলির মধ্যে বিখ্যাত হচ্ছে, ১- আল-গুনইয়াতু লি ত্বালিবী ত্বারীকিল হাক। ২- আল-ফাতহুর রাব্বানী। ৩- ফুতূহল গাইব। ৪- আল-ফুযূদ্বাতুর রাব্বানিয়াহ। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (২০/৪৩৯); আল-কাতবী, ফাওয়াতুল ওয়াফায়াত ওয়ায যাইলু আলাইহা (২/৩৭৩); ইবন রাজাব, যাইলু ত্বাবাক্বাতিল হানাবিলাহ (৩/২৯০); ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আক্কলি ওয়ান নাকলি (৫/৫); ইবন কাসীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (১২/২৫২); যিরিকলী, আল-আ'লাম (৪/৪৭)।
আব্দুল কাদের জীলানীর ওপর সবচেয়ে বেশি কঠোর ছিলেন ইবনুল জাওযী। ইমাম ইবন রজব বলেন, ইমাম ইবনুল জাওযী রাহিমাহুল্লাহ ইমাম আব্দুল কাদের জীলানী রাহিমাহুল্লাহ'র ওপর একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন, যাতে তিনি আব্দুল কাদের জীলানীর বহু ভুল ধরেছেন। তবে ইবন রজব বলেন, ইবনুল জাওযী রাহিমাহুল্লাহ পরবর্তী সূফী শাইখদের ওযর গ্রহণ করতেন না যারা তাদের তরীকার পূর্ববর্তীদের বিরোধিতা করে কোনো পন্থা রচনা করেছেন। তিনি তাদের ওপর কঠোর ছিলেন। দেখুন, ইবন রজব, যাইলু ত্বাবাক্বাতিল হানাবিলাহ (২/১৯৮)।
অবশ্য শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ ইমাম আব্দুল কাদের আল-জীলানীর প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, আব্দুল কাদের জীলানী ইসলামের এমন শাইখদের একজন, আল্লাহ তা'আলা তার জন্য উম্মতের মাঝে সত্য রসনার ব্যবস্থা করেছেন। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (২/৪৭৪)। তিনি আরও বলেন, তিনি হক্ক ও ইস্তেকামাতের ওপর ছিলেন। দেখুন, মাজমু' ফাতাওয়া (১০/৫১৬)। অন্যত্র বলেন, 'তিনি শরী'আতের আদেশ ও নিষেধের সবচেয়ে বেশি মান্যকারী ছিলেন। তিনি তাকদীরের সাথে চলা ও তাকদীর দিয়ে দলীল দেয়ার মত (বিভ্রান্তিকর) মতবাদ থেকে সাবধান করেছেন। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৮/৩০৬, ৩৬৯)।
আরও বলেন, নবুওয়াত ও বেলায়েত সম্পর্কে সূফীদের যে মতবাদ তা থেকে তিনি সবচেয়ে বেশি মুক্ত ও তাদের ভ্রষ্টতা থেকে বেশি দূরে অবস্থানকারী একজন শাইখ ছিলেন। আর যারা নবুওয়াত ও বেলায়েত নিয়ে বাড়াবাড়ি করে তিনি তাদের সবচেয়ে বড় অস্বীকারকারী ছিলেন। তিনি সেসব বিখ্যাত সূফী মাশায়েখগণের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন যারা আল্লাহর সিফাত তথা গুণাবলি সাব্যস্ত করতেন, জাহমিয়্যাহ ও হুলুলিয়্যাহ সম্প্রদায়দ্বয়ের নিন্দা করতেন। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আকলি ওয়ান নাকলি (৫/৪)।
আরও বলেন, তিনি কেবল শর'য়ী 'সামা'তে বিশ্বাসী ছিলেন, যার ওপর নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কিরাম ও তাদের পরবর্তী উম্মতের সালাফগণ চলেছেন। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/৪২৬-৪২৭)।
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ ইমাম আব্দুল কাদের জীলানীর 'ফুতুহুল গাইব' গ্রন্থের একটি অংশের ব্যাখ্যা করেছেন। যে অংশ শাইখ মুহাম্মাদ রাশাদ সালেম তার জামে'উর রাসায়িল গ্রন্থে তাহকীক করেছেন, দেখুন, (২/৭৩-১৮৯); আর ফুতুহল গায়েব কিতাবটিও ছাপা হয়েছে, যাতে তার ৭৮টি প্রবন্ধ রয়েছে।
৮৬২. কিতাবটির নাম, 'আল-গুনইয়াতু লি ত্বালিবী তারীকিল হাক্ব আয্যা ওয়া জাল্লা'। এর অপর নাম, আল-গুনইয়াতু। বঙ্গদেশে অনুবাদের সময় গুনিয়াতুত ত্বালেবীন এ নামে খুব প্রসিদ্ধ হয়েছে। গ্রন্থটি প্রথম আরবীতে ছাপা হয়েছিল কুতুহুল গাইব এর সাথে একত্রে, লাহোরস্থ ইসলামী প্রেস থেকে, যার পৃষ্ঠা সংখ্যা ৯২৭; যার পাশে ছিল ফুতুহুল গাইব। তখন তার প্রতিটি ছত্রের উর্দু অনুবাদ হয়েছিল। এ গ্রন্থের শুরুতে ইমাম আব্দুল কাদের জীলানী রাহিমাহুল্লাহ বলেছিলেন, পৃ. ৪, তিনি এ গ্রন্থটি কিছু সঙ্গী-সাথীর অনুরোধে রচনা করেছেন। এ কিতাবটিতে আকীদাহ ও আমল উভয় প্রকার মাসআলাই রয়েছে। তিনি বলেন, পৃ. ৪, যখন আমি দেখলাম যে, সে সত্যি সত্যিই শরী'আতের আদাব, ফরয, সুন্নাত ও পদ্ধতি জানতে আগ্রহী, আল্লাহ তা'আলাকে তাঁর নিদর্শন ও আলামতের মাধ্যমে জানতে উদগ্রীব, তারপর কুরআন দিয়ে নসীহত করা, নাবাওয়ী হাদীসের শব্দাবলি যা আমরা আমাদের মজলিসে বর্ণনা করি তা জানতে উৎসুক, আর সে সালেহীন তথা নেককারদের জীবনী ও চরিত্র অবগত হতে চায়, যা আমাদের এ কিতাবের মাঝে অতিক্রম করবে, তাই আমি সেটা লিখতে মনস্থ করেছি, যাতে তা তার জন্য আল্লাহর পথে চলার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করে।... আর তিনি তার কিতাবকে পর্ব, অধ্যায় ও অনুচ্ছেদে বিভক্ত করে তা লিপিবদ্ধ করেন। যুগে যুগে আলেমগণ এ গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি এনেছেন। যেমন ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/২১৪); মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/২২২, ২৬৪); ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুয়ুশ, পৃ. ২৭৭; ইবন রাজাব, যাইলু ত্বাবাক্বাতিল হানাবিলাহ (২/১৯৯); যাহাবী, কিতাবুল 'আরশ, পৃ. ২৮৪; আল-'উলু লিল 'আলিয়্যিল আযীম (২/১৩৭০), নং ৫৪৮; সাফারীনী, লাওয়ামি'উল আনওয়ার আল- বাহিয়্যাহ (১/১৯৬)। অনুরূপভাবে হাম্বলী মাযহাবের পরবর্তী আলেমগণের অনেকেই এ কিতাব থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। যেমন, আলাউদ্দীন আল-মারদাওয়ী, আল-ইনসাফ (২/১২৩, ১৩১, ১৩৫); বাহুতী, কাশশাফুল কানা' (৫/১৭৬)।
৮৬৩. যেমনটি সর্বেশ্বরবাদী, অহংবাদী ও সোহংবাদীরা বিশ্বাস করে থাকে, তারা মনে করে আল্লাহ সবকিছুতে বিদ্যমান। সবকিছুতে প্রবেশ করতে পারেন, সবকিছু আল্লাহতে বিদ্যমান। নাউযুবিল্যাহ। অনেক সূফীরাও এ ধরনের বিশ্বাসে বিশ্বাসী।
৮৬৪. আরবী ভাষাভাষী একদল লোক 'যাত' শব্দটি আল্লাহর জন্য ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ভিন্নমত পোষণ করতেন। কারণ 'যাত' শব্দটি কোনো কিছুর দিকে 'মুযাফ' বা সম্বন্ধ পদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি কোনো 'মুযাফ ইলাহহি' নয়, বা 'ইসম' নয়। সুতরাং 'যাত' শব্দটি ব্যবহার করা হলে তাতে 'আলিফ লাম' প্রবেশ করানো যায় না। 'আয-যাত' বলা যাবে না। এ হচ্ছে আরবী ভাষী অনেকের মত।
ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'ইবন বারহান, জাওয়ালীকী প্রমুখ লোকেরা আল্লাহর জন্য 'যাত' শব্দটি ব্যবহার করাকে অস্বীকার করেছেন। তারা আরও বলেছেন, শব্দটি স্ত্রীবাচক। আর আল্লাহর জন্য স্ত্রী বাচক শব্দ ব্যবহার চলতে পারে না। কিন্তু যারা নিঃশর্তভাবে ব্যবহার করেছে তারা এর দ্বারা উদ্দেশ্য নিয়েছে নাম ওয়ালা সত্তাকে অথবা নাম ওয়ালা কোনো বাস্তব কিছুর জন্য।' ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আকলি ওয়ান নাকলি (১০/১৫৭)।
ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ আরও বলেন, 'আর 'যাত' শব্দটি একটি নব উদ্ভাবিত শব্দ, যা 'যু' শব্দের স্ত্রীবাচক শব্দ। আর 'যাত' শব্দের অর্থ: 'ওয়ালা' যেমন, যাতু ইলম বা ইলম ওয়ালা, যাতু কুদরাত বা ক্ষমতা ওয়ালা, যাতু হায়াত বা জীবন ওয়ালা। সুতরাং 'যাত' শব্দটিকে কোনো গুণের সাথে সম্পৃক্ত করা না হলে তা দ্বারা ধরে নিতে হবে এখানে এটি 'মুদ্বাফ' বা সম্বন্ধ রয়েছে যাতে সম্বন্ধপদ আসেনি।' ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আকলি ওয়ান নাকলি (১০/১৫৭)।
তিনি আরও বলেন, বেশ কিছু আলেম এটাকে ব্যবহার করা অস্বীকার করেছেন। যেমন আবুল ফাতহ ইবন বারহান, ইবনুদ দাহহান প্রমুখ। তারা বলেন, এ শব্দটি আরবী নয়। কিন্তু অন্য আলেগমণ তাদের এ মতের বিরোধিতা করেছেন, যেমন, কাযী ও ইবন আকীল প্রমুখ। এ ব্যাপারে ফয়সালাকারী কথা হচ্ছে, এ শব্দটি প্রসিদ্ধ খাঁটি আরবী শব্দ নয়। বরং এটি নতুনভাবে ব্যবহৃত উদ্ভুত শব্দ। যেমন 'মাওজুদ' শব্দটি, 'মাহিয়াত' শব্দটি, 'কাইফিয়াত' শব্দ ও অনুরূপ শব্দাবলি। এ শব্দটি দাবি করে কিছু গুণ থাকা যার দিকে সত্তাকে সম্পৃক্ত করা হবে। ফলে বলা হবে, যাতু ইলম বা ইলম ওয়ালা, যাতু কুদরাত বা কুদরত ওয়ালা, যাতু কালাম বা কথাওয়ালা...।' মাজমূ' ফাতাওয়া (৬/৯৯)। আরও দেখুন, আস-সাওয়া'য়িকুল মুরসালাহ (৪/১৩৮৪)।
আল্লামা মুহাম্মাদ ইবন ইবরাহীম রাহিমাহুল্লাহ শাইখ আব্দুল কাদের আল-জীলানীর বক্তব্যের অর্থ করেছেন এভাবে যে, 'অর্থাৎ সত্যিকারের উপরে উঠা।' বহু বিখ্যাত আলেম ও প্রখ্যাত বড় আলেমগণ 'যাত' শব্দটি ব্যবহার করেছেন। আবার আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের কেউ কেউ তা ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন, তারা প্রত্যেকেই কল্যাণের ওপর রয়েছে।
যারা বলেছেন 'আরশের উপরে উঠার উঠার অর্থ, 'আরশের উপর আল্লাহর 'যাত' বা সত্তা উঠা, তারা যাবতীয় তা'ওয়ীল নামীয় তা'ত্বীল থেকে আল্লাহর সিফাতকে মুক্ত করতে চেয়েছেন। কারণ কেউ কেউ 'আরশের উপরে উঠেছেন' এটা বলে তবে তারা তা'ওয়ীল না করেও বলে থাকে যে, এর দ্বারা 'আল্লাহর সত্তা 'আরশের উপরে উঠা' বুঝানো হয়নি। তাই যাতে কেউ আল্লাহ তা'আলার সত্তা 'আরশের উপরে উঠাকে অস্বীকার করতে না পারে সেজন্য তারা স্পষ্টভাবে 'আল্লাহ তা'আলার সত্তা শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
আর যারা 'যাত' বা সত্তা শব্দটি ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন, তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলার নাম ও গুণের বিষয়টি 'তাওক্বীফী' বা কুরআন ও সুন্নাহ'র জানানোর ওপর নির্ভরশীল। আর কুরআন ও সুন্নাহ'র কোথাও 'আরশের উপরে উঠেছেন' এর সাথে 'যাত' কথাটি আসেনি। বস্তুত তাদেরও উদ্দেশ্য হক ও সত্য। যারা 'যাত' শব্দটি আল্লাহর জন্য ব্যবহার করেছেন তাদেরও উদ্দেশ্য মহৎ। এরা আকীদাহ'র অধ্যায়ে একটি ফায়েদার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন, বান্দাদের হিদায়াতের কারণ হয়েছেন, যথাযথভাবে আল্লাহর সিফাত সাব্যস্ত করেছেন। আর অন্যরা যারা 'যাত' শব্দটি আল্লাহর জন্য ব্যবহার করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তারা শুধু কুরআন ও সুন্নাহ'য় যা এসেছে তাই ব্যবহার করছে, তারা চায়নি কোনো শব্দ বাড়াতে। কিন্তু এ অধ্যায়ে যখন কোনো শব্দ বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দেয়, আর তার মাধ্যমে কোনো পথভ্রষ্টতা কিংবা বিদ'আত প্রতিহত করা উদ্দেশ্য তখন তা আনয়ন করা যাবে, এতে কোনো নিষেধ নেই। তিনি কি তাঁর সত্তা ব্যতীতই 'আরশের উপর উঠেছেন? সুতরাং যে কেউ এ 'যাত' শব্দ ব্যবহার করেননি তিনিও সঠিক পথে আছেন, তবে শর্ত হচ্ছে তাদের কাছে... (আল্লাহর গুণ সাব্যস্ত করার বিষয়টি স্পষ্ট থাকতে হবে)। দেখুন, মুহাম্মাদ ইবন ইবরাহীম আলুশ শাইখ, ফাতাওয়া ও রাসায়িল (১/২০৯-২১০)।
৮৬৫. দেখুন, আল-গুনইয়া, পৃ. ১২১-১২৮; আরও দেখুন, ইবন রাজাব, যাইলু ত্বাবাক্বাতিল হানাবিলাহ (৩/২৯৬); ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুয়ুশিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ২৭৭; যাহাবী, আল-'উলু লিল 'আলিয়্যিল 'আযীম, পৃ. ১৯৩; মুখতাসার, পৃ. ২৮৪।
৮৬৬. এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে হলে পড়তে পারেন আমার অপর গ্রন্থ "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন"。
📄 ইমাম ইবন আকিল বার রাহিমাহুল্লাহ’র বক্তব্য
আবু 'উমার ইবন আবদুল বার বলেন, "মালিক, সুফিয়ান সাওরী, সুফিয়ান ইবন 'উয়াইনাহ, আওযা'য়ী, মা'মার ইবন রাশেদথেকে সিফাতের হাদীসের ব্যাপারে আমাদের কাছে বর্ণিত হয়ে এসেছে যে, তারা সকলেই বলেছেন: "এসব সিফাতকে যেভাবে এসেছে সেভাবে চালিয়ে দাও।" (৮৬৮)
আবু 'উমার বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবীগণ থেকে বিশ্বস্তভাবে যা এসেছে সেটিই ইলম, তার আনুগত্য করতে হবে। আর যা পরবর্তীতে উদ্ভাবন করা হয়েছে, যেগুলোর কোনো মূল ভিত্তি নেই সেগুলো বিদ'আত ও গোমরাহী।"(৮৬৯) আর "মুওয়াত্তার" ব্যাখ্যায় (৮৭০) যখন নুযুল (অবতরণ করা) এর হাদীসের ৮০) প্রসঙ্গে আলোচনা করেন তখন তিনি বলেন; এটি ভাষ্যের দিক থেকে প্রমাণিত, বিশুদ্ধসূত্রে সংকলিত হাদীস। হাদীসবেত্তাগণ এটার বিশুদ্ধতার ব্যাপারে মতবিরোধ করেননি। এ সূত্র ব্যতীত তা আরও অনেক সূত্রে ন্যায়পরায়ণদের মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়ে এসেছে। এ হাদীস এটার ওপর দলীল যে, আল্লাহ আসমানে 'আরশের উপরে আছেন, সাত আসমানের উপরে। যেমনটি আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আত বলেছেন। তাদের একথা মু'তাযিলাদের কথার বিপক্ষে দলীল, তারা বলে: আল্লাহ তাঁর পবিত্রসত্তা সহ সর্বত্র বিরাজমান। (৮৭৩)
তিনি আরও বলেন, হকপন্থীরা যা বলেছে তার বিশুদ্ধতার পক্ষে রয়েছে আল্লাহর বাণী। অতঃপর তিনি [ইবন আব্দিল বার] বেশকিছু আয়াত উল্লেখ করে(৮৭৪) বলেন: এটা বিশেষ ও সাধারণ সকল শ্রেণির লোকদের নিকট প্রসিদ্ধ ও জানা, যা উল্লেখ করার পর আর বেশি বর্ণনার প্রয়োজনমুক্ত। এটি অবশ্যম্ভাবী বিষয় (৮০), এ ব্যাপারটি স্বীকার করার বিষয়টি কাউকে জানাতে হয়নি। [অর্থাৎ ফিত্বরী বিষয়, যা সকলের অন্তর অবশ্যম্ভাবীরূপে স্বীকৃতি প্রদান করে থাকে] (৮৭৬)
আবু 'উমার ইবন আব্দিল বার আরও বলেন, "যাদের থেকে ব্যাখ্যা গ্রহণ করা হয়েছে সেসব সাহাবী ও তাবে'য়ী আলেমগণ একমত যে, এই আয়াত وَمَا فِي الْأَرْضِ مَا يَكُونُ مِن نَّجْوَى ثَلَاثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ ﴾ [المجادلة: ٧] "তিন ব্যক্তির মধ্যে এমন কোনো গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থ জন হিসেবে তিনি থাকেন না।” [সূরা আল-মুজাদালাহ: ০৭] এর ব্যাখ্যা হলো: তিনি 'আরশের উপরে, তাঁর জ্ঞান সর্বত্র। এ ব্যাপারে যাদের কথা গ্রহণযোগ্য হতে পারে এমন কেউ তাদের বিরোধিতা করেনি। (৮৭৭)
আবু 'উমার আরও বলেন, আহলুস সুন্নাহগণের এ ব্যাপারে ঐকমত্য রয়েছে যে, কুরআনে বর্ণিত ও হাদীসে উল্লিখিত সকল সিফাত স্বীকার করা হবে, ঈমান আনতে হবে, সেগুলোকে প্রকৃত অর্থে ব্যবহার করতে হবে, রূপক অর্থে নয়। তবে তারা এগুলোর কোনোটির ধরণ বর্ণনা করেননি এবং কোনো সীমায় সীমিতও করেননি। (৮৭৮)
অপরদিকে বিদ'আতপন্থীরা যেমন জাহমিয়্যাহ, মু'তাযিলা, খারেজী, তারা এগুলোকে অস্বীকার করে। একটিকেও প্রকৃত অর্থে ব্যবহার করে না। বরং তারা মনে করে, যে ব্যক্তি এগুলো স্বীকার করবে সে মুশাব্বিহা তথা সাদৃশ্যদানকারী।
যারা এ গুণগুলোকে যথাযথভাবে স্বীকার করে তাদের নিকট এ (জাহমিয়্যাহ, মু'তাযিলা, খারেজী) লোকগুলো মূলত: মা'বুদকেই অস্বীকারকারী। (৮৭৯) সত্য হচ্ছে তাদের কথায়, যারা কুরআন-সুন্নাহ যা বলে তাই বলে, তারা তো আহলুস সুন্নাহর ইমামগণ। এ হলো মুসলিম বিশ্বের পশ্চিমাঞ্চলের ইমাম ইবন আব্দিল বার এর বক্তব্য। (৮৮০)
টিকাঃ
৮৬৭. তিনি হচ্ছেন ইমাম আবু উরওয়া মা'মার ইবন রাশেদ ইবন আবী উরওয়া আল-আষদী, তাদের বসরী মাওলা বা আযাদকৃত দাস। তার জন্ম হয়েছিল হিজরী ৯৫ বা ৯৬ সালে। মৃত্যু হয়েছিল হিজরী ১৫৩ সালে। তার সম্পর্কে ইবন জুরাইজ বলেন, 'তোমরা মা'মারকে আঁকড়ে থাকো; কারণ তার সময়ে তার মতো জ্ঞানী আর নেই।' ইবন সা'দ বলেন, মা'মার ছিলেন, সহিষ্ণু, মানবিক ও নিজে ব্যক্তিগতভাবে শরীফ ও ভদ্র-নম্র মানুষ। দেখুন, ইবন সা'দ, আত-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা (৫/৫৪৬); ইমাম যাহাবী, তাযকিরাতুল হুফফায (১/১৯০); সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৭/৫); ইবনুল 'ইমাদ, শাযরাতুয যাহাব (১/২৩৫)।
৮৬৮. এ কিতাবের শুরুতেই শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এ কথার বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন।
৮৬৯. ইবন আব্দিল বার, জামে'উ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাদলিহী (২/১১৮); তবে সেখানে বাড়তি আছে, 'যেমন আল্লাহর নিকটতম আসমানে অবতরণের হাদীস, অনুরূপ হাদীস: আল্লাহ তা'আলা আদমকে তার সূরতে সৃষ্টি করেছেন, অনুরূপ: তিনি তাঁর পা জাহান্নামে রাখবেন, আর যা এসব হাদীসের মত রয়েছে সেসব'। তবে সেখানে 'যা নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে... এটুকু নেই। অবশ্য সেটা অন্যত্র এসেছে এভাবে,
قَالَ أَبُو عُمَرَ: مَا جَاءَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ نَقْلِ الثَّقَاتِ وَجَاءَ عَنِ الصَّحَابَةِ وَصَحْ عَنْهُمْ فَهُوَ عِلْمٌ يُدَانُ بِهِ، وَمَا أُحْدِثَ بَعْدَهُمْ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ أَصْلُ فِيمَا جَاءَ عَنْهُمْ فَبِدْعَةٌ وَضَلَالَةٌ وَمَا جَاءَ فِي أَسْمَاءِ الله أَوْ صِفَاتِهِ عَنْهُمْ سَلِمَ لَهُ، وَلَمْ يُنَاظِرْ فِيهِ كَمَا لَمْ يُنَاظِرُوا.
"আবু 'উমার বলেন, যা নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিশ্বস্ত নির্ভরযোগ্যদের মাধ্যমে হয়ে বর্ণিত হয়ে এসেছে আর যা সাহাবায়ে কিরামের কাছ থেকে এসেছে তা হচ্ছে ইলম বা জ্ঞান, যার আনগত্য করতে হবে। আর যা তাদের পরে নব উত্থাপিত হয়েছে, যার সপক্ষে পূর্বোক্তদের পক্ষ থেকে কোনো মূলনীতি নেই, সেটি বিদ'আত ও পথভ্রষ্টতা। আর আল্লাহর নাম ও গুণের ব্যাপারে তাদের কাছ থেকে যা এসেছে সেগুলো মেনে নেয়া হবে আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করার মাধ্যমে। সেগুলোতে কোনো প্রকার বিবাদে লিপ্ত হওয়া যাবে না, যেমনিভাবে সাহাবায়ে কিরাম বিবাদে জড়াননি" [জামে'উ বায়ানিল ইলমি ওয়াফাদ্বলিহী (২/৯৪৫); প্যারা নং ১৮০৬] এরপর ইবন আব্দুল বার বলেন, সালাফগণ এসব হাদীস বর্ণনা করে সেগুলোর ব্যাপারে অপব্যাখ্যা না করে চুপ ছিলেন, অথচ তারা ইলম বা জ্ঞানের দিক থেকে গভীর জ্ঞানের অধিকারী, বুঝের দিক থেকে প্রশস্ত বুঝের অধিকারী, লৌকিকতা তাদের মাঝে ছিল শূন্যের কোঠায়, তারা এসব হাদীসের ব্যাখ্যার ব্যাপারে চুপ থাকা কোনোভাবেই অজ্ঞতা বা অপারঙ্গমতা থেকে নয়, সুতরাং যে ব্যক্তি সাহাবায়ে কিরাম যা দিয়ে যথেষ্ট হয়েছে তা দিয়ে নিজেকে যথেষ্ট না করবে সে তো ব্যর্থ হয়েছে ও ক্ষতিগ্রস্ততায় লিপ্ত হয়েছে। [২/৯৪৫]
৮৭০. মুওয়াত্তার ব্যাখ্যাগ্রন্থ বলে বুঝানো হয়েছে, ইমাম আব্দুল বার এর সুবিখ্যাত গ্রন্থ 'আত-তামহীদ লিমা ফিল মুওয়াত্তা মিনাল মা'আনী ওয়াল আসানীদ'। এটি একটি অতীব প্রয়োজনীয় গ্রন্থ। বর্তমানে এটি ২৩ খণ্ডে ছাপা হয়েছে। ইবন আব্দুল বার রাহিমাহুল্লাহ এ গ্রন্থটি ৩০ বছরে লেখেছেন। যুগ যুগ ধরে ইমামগণ এ কিতাবের প্রশংসা করেছেন। আবু মুহাম্মাদ ইবন হাযম বলেন, আমাদের সঙ্গী আবু 'উমার এর 'আত-তামহীদ', হাদীসের ফিকহে যে কিতাবের মতো আর কোনো গ্রন্থ আছে কিনা আমার জানা নেই, এর থেকে উত্তম তো দূরের কথা। দেখুন রাসায়িলি ইবন হাযম (২/১৭৯)। আবু আলী আল-গাসসানী বলেন, 'কিতাবুত তামহীদ' এর মতো কিতাব তার আগে কেউ লিখেনি।' ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৮/১৫৭)। ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, এ বিষয়ে একটি সবচেয়ে মানসম্মত গ্রন্থ। মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/২২০); কখনও কখনও বলেছেন, এটি এ বিষয়ে লেখা সবচেয়ে সম্মানিত গ্রন্থ। মাজমু' ফাতাওয়া (৩/২৬৩)। ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ ইমাম ইয্যুদ্দীন ইবন আব্দিস সালামের বক্তব্য, 'আমি ইসলামের কিতাবের মধ্যে ইলমের দিক থেকে ইবন হাযমের মুহাল্লা, ইবন কুদামার মুগনীর মত কিতাব দেখিনি' এটুকু উদ্ধৃত করার পর ইমাম যাহাবী বলেন, শাইখ ইয্যুদ্দীন সত্য বলেছেন, তৃতীয়টি হচ্ছে বাইহাকীর আস-সুনানুল কাবীর, আর চতুর্থটি হচ্ছে, ইবন আব্দিল বার এর আত- তামহীদ। যে কেউ এ চারটি দিওয়ান (বড় গ্রন্থ) তার কাছে একত্রিত করতে পারবে, সে যদি বুদ্ধিমান মুফতি হয়, আর তাতে নিয়মিত নজর বুলাতে থাকে তবে সে ব্যক্তি সত্যিকারের আলেম হয়ে যাবে।' ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৮/১৯৩)।
৮৭১. নুযূল এর হাদীস বলতে, মহান আল্লাহ কর্তৃক প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে নিকটতম আসমানে নেমে আসার বিষয়ে বর্ণিত হাদীসটি বুঝানো হয়েছে যা আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু কর্তৃক বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "আমাদের রব, তিনি বরকতময় ও সুউচ্চ, প্রতি রাতে নিকটতম আসমানে নেমে আসেন..."। হাদীসটির তাখরীজ আগে চলে গেছে।
৮৭২. ইবন আব্দুল বার এ হাদীসটির বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন, যা বর্তমান তামহীদ কিতাবের ৭ম খণ্ডে ১২৮ পৃষ্ঠা থেকে ১৫৯ পৃষ্ঠা পর্যন্ত বিস্তৃত।
৮৭৩. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন যে, যারা বলে 'আল্লাহর সর্বত্র বিরাজমান' এ কথাটি মূলত জাহমিয়্যাদের মধ্যে যারা ইবাদত কর্মে লিপ্ত তারা বলে, অর্থাৎ মু'তাযিলাদের মধ্যকার ইবাদত ও তাসাওউফে প্রসিদ্ধ তারাই বলে থাকে। আর তাদের মধ্য থেকে প্রসিদ্ধ আরেকটি কথা, 'তিনি আল্লাহ জগতের ভিতরেও নন, জগতের বাইরেও নন,' এ বক্তব্য তাদের মধ্যকার যারা তর্কবাগীশ ও তাদের মধ্যকার কালামশাস্ত্রবিদদের। সেজন্য বলা হয়ে থাকে, জাহমীদের মধ্যকার কালাম শাস্ত্রবিদরা কিছুরই ইবাদত করে না, আর জাহমিয়্যাদের মধ্যকার সূফীরা সবকিছুর ইবাদত করে থাকে। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (২/২৯৮)। বরং শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ অন্যত্র বলেন, তাদের অনেকের মধ্যে এ দু'টি পরস্পর বিরোধী বক্তব্যের সমাহার ঘটেছে। তারা যখন গবেষণা করতে নামে তখন আল্লাহকে বিপরীতমুখী দু'টি গুণ প্রদান করে, অর্থাৎ তখন তারা বলে, 'তিনি জগতের বাইরেও নন, জগতের ভিতরেও নন।' আর যখন ইবাদত করার চিন্তা করে তখন বলে, 'তিনি সব জায়গায়, তার থেকে কোনো কিছু বিমুক্ত নয়।' এমনকি তাদের মধ্য হতে কেউ কেউ স্পষ্ট করে বলে, তিনি সকল অস্তিত্বশীল বস্তুতে প্রবিষ্ট হয়ে আছেন। জীব-জন্তু ও অন্যান্য সবকিছুতে। বরং তারা বলে সবকিছুতে তিনি একাকার হয়ে আছেন। বরং আরও অগ্রসর হয়ে বলেন, সত্তা তো একটিই, অর্থাৎ স্রষ্টা তো অস্তিত্বশীল বস্তুই। দেখুন, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/৭); মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/২৭২)।
৮৭৪. যেমন, আল্লাহর বাণী, "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন।” [সূরা ত্বা-হা: ০৫], অনুরূপ তাঁর বাণী, "আল্লাহ, যিনি আসমানসমূহ, যমীন ও এ দু'য়ের অন্তর্বর্তী সবকিছু সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে। তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন। তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো অভিভাবক নেই এবং সুপারিশকারীও নেই; তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?" [সূরা আস-সাজদাহ: ০৪], অনুরূপ আল্লাহর বাণী, "তারপর তিনি আসমানের প্রতি ইচ্ছে করলেন, যা (পূর্বে) ছিল ধোঁয়া। অতঃপর তিনি ওটাকে (আসমান) ও যমীনকে বললেন, 'তোমরা উভয়ে আস ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়।' তারা বলল, 'আমরা আসলাম অনুগত হয়ে'।" [সূরা ফুসসিলাত: ১১]
৮৭৫. এ অবশ্যম্ভাব্যতার কথা যা তিনি বর্ণনা করেছেন তা হচ্ছে, আরব হোক আজম হোক যারাই তাওহীদের অনুসারী, তাদের যখনই কোনো সমস্যা হয় বা বিপদ হয়, তখনই তারা তাদের হাতসমূহ আসমানের দিকে তুলে ধরে, এর মাধ্যমে তারা তাদের রবের সাহায্য কামনা করে। আত-তামহীদ (৭/১৩৪)।
৮৭৬. ইবন আব্দিল বার রাহিমাহুল্লাহ'র পূর্ণ বক্তব্য নিয়ে আসা হলে তা বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করবে, তিনি বলেন, 'আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপরে থাকা, সাত আসমানে উপরে হওয়ার আরেকটি প্রমাণ হচ্ছে, আরব হোক, অনারব হোক, তাওহীদবাদীদের যখন কোনো সমস্যা দেখা দেয় অথবা তাদের কোনো বিপদ আসে, তারা তাদের চেহারাকে আসমানের দিকে উঠিয়ে তাদের রবের কাছে উদ্ধার কামনা করতে থাকে, এটি সাধারণ ও বিশেষ লোকদের মাঝে এতই প্রসিদ্ধ যে, এটি বর্ণনা করার অতিরিক্ত প্রমাণ উপস্থাপনের প্রয়োজন হয় না। কারণ এটি এমন এক অবশ্যম্ভাবী কাজ যা করতে কেউ তাদেরকে ধমক দেয়নি, আর কোনো মুসলিমও তা কোনো দিন মানতে অস্বীকার করেনি। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে দাসীকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, যাকে তার মনিব মুক্ত করতে চেয়েছিলেন যদি সে ঈমানদার হয়, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে পরীক্ষা করে বলেন, 'আল্লাহ কোথায়?' তখন সে দাসী উপরের দিকে ইঙ্গিত করলো। তারপর তিনি দাসীকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কে? সে বললো, আল্লাহর রাসূল। তখন রাসূল বললেন, তুমি তাকে স্বাধীন করে দাও, সে তো ঈমানদার।' এখানে দেখা যাচ্ছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিছক আকাশের দিকে মাথা তোলাকেই যথেষ্ট হিসেবে নিয়েছেন; তিনি এটাকেই অন্য সবকিছু জিজ্ঞাসা করা থেকে যথেষ্ট মনে করেছেন।' আত-তামহীদ (৭/১৩৪)।
৮৭৭. 'আল্লাহর ইলম সব জায়গায়' এ বক্তব্যটি সাহাবায়ে কিরাম ও তাদের পরবর্তী সুন্দর উত্তরসূরীদের কাছ থেকে এসেছে। যেমন, ১) ইবন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে বর্ণিত হয়েছে। দেখুন, আবুল কাসেম আত-তাইমী, আল-হুজ্জাহ ফী বায়ানিল মাহাজ্জাহ (২/১১৪), নং ৬৩। ২) অনুরূপভাবে তা আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকেও এসেছে। ৩) দ্বাহহাক ইবন মুযাহিম থেকেও এসেছে। দেখুন, ইবন আব্দিল বার, আত-তামহীদ (৭/১৩৯); ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুযূশ, পৃ. ১৪৮। ৪) তদ্রূপ তা ইমাম মালেক ইবন আনাস থেকেও এসেছে। দেখুন, আব্দুল্লাহ ইবন ইমাম আহমাদ, আস-সুন্নাহ ১১, ৫৩২; লালেকাঈ, শারহু উসুলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ, নং ৬৭৩; ইবন বাত্তাহ, আল-ইবানাহ (৩/১৫৩), নং ১১০; ইবন কুদামাহ, ইসবাতু সিফাতিল উলু, পৃ. ১১৫। ৫) তাছাড়া তা ইমাম আবু যুর'আহ থেকেও এসেছে, দেখুন, যাহাবী, আল-'উলু লিল 'আলিয়ি্যল 'আযীম (২/১১৫৩); নং ৪৬৫; ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুয়ূশ, পৃ. ২৩৪। আর ইমাম ইবন আব্দিল বার এর এ বক্তব্য আরও যারা উদ্ধৃত করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন, শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, দারুউত তা'আরুদ্ব (৬/২৫৪-২৫৬); বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (২/৩৯); মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/২২১); ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুয়ূশ, পৃ. ১৪৮; আস-সাওয়া'য়িকুল মুরসালাহ (৪/১২৮৮); যাহাবী, আল-'উলু লিল 'আলিয়ি্যল আযীম (২/১৩২৫), নং ৫৩১।
৮৭৮. অর্থাৎ কোনো প্রকার আয়ত্ত্ব করার কথা বলেননি। যেমনটি আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: "তাঁকে কোনো চোখ আয়ত্ব করতে সক্ষম নয়।" [সূরা আল-আন'আম: ১০৩] দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু ভালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৩/৭০৮)।
৮৭৯. ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ ইবন আব্দিল বার থেকে এতটুকু উদ্ধৃত করার পর বলেন, 'আল্লাহর শপথ করে বলছি, তিনি সত্য বলেছেন; কারণ যে কেউ গুণাবলির অপব্যাখ্যা করে সেগুলো থেকে যা কিছু কুরআন ও হাদীসে এসেছে তা রূপকের ওপর ফেলে দেয়, তখন এভাবে সেগুলোকে না করার মাধ্যমে সে মূলত আল্লাহ তা'আলাকে অস্বীকার করে বসে, তাঁকে অস্তিত্বহীনের সাথে সাদৃশ্য প্রদান করে। যেমন হাম্মাদ ইবন যায়েদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, 'জাহমিয়্যাদের উদাহরণ হচ্ছে এমন লোকদের মত, যারা বলেছে যে আমাদের বাড়ীতে খেজুর গাছ আছে। বলা হলো, সে গাছের কি ডালপালা আছে? বললো, না। প্রশ্ন করা হলো, সে গাছের কি ডালের গোড়া আছে? সে বলল, না। তারপর বলা হলো, সে গাছের কি কাঁচা খেজুর ও পাকা খেজুর আছে? সে বলল, না। তারপর বলা হলো, আচ্ছা সে গাছের কি কাণ্ড আছে? সে বলল, না। তখন তাকে বলা হলো, আসলে তোমাদের বাড়ীতে খেজুর গাছই নেই।' ইমাম যাহাবী বলেন, আমি বলি, আল্লাহ তা'আলার সিফাত অস্বীকারকারীদের অবস্থা এমনই। তারা বলে যে আমাদের উপাস্য হচ্ছেন আল্লাহ। তবে তিনি কোনো কালে নন, জায়গায় নন, দেখা যায় না, শুনেন না, তিনি দেখেন না, তিনি কথা বলেন না, তিনি সন্তুষ্ট হন না, তিনি রাগ করেন না, তিনি ইচ্ছা করেন না, তিনি ... না, তিনি...না, আর বলে, তিনি তো সকল গুণ থেকে পবিত্র।
বরং আমরা বলি, মহান পবিত্র আল্লাহ, তিনি সর্বোচ্চ সত্তা, মহান সত্তা, শ্রোতা, দর্শক, ইচ্ছাকারী, যিনি মূসার সাথে কথা বলেছেন, ইবরাহীমকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাঁকে আখেরাতে দেখা যাবে, সেসব গুণে গুণান্বিত যা দিয়ে তিনি নিজেকে গুণান্বিত করেছেন অথবা তা দিয়ে তাঁকে তার রাসূল গুণান্বিত করেছেন, তিনি সৃষ্টিকুলের মতো হওয়া থেকে পবিত্র, অস্বীকারকারীদের অস্বীকার থেকে মুক্ত, তাঁর মতো কোনো কিছু নেই, তিনি সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা।' যাহাবী, আল-'উলু লিল 'আলিয়্যিল 'আযীম (২/১৩২৬-১৩২৭)।
৮৮০. দেখুন, আত-তামহীদ (৭/১২৮)...। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এখানে সংক্ষেপে তা এনেছেন。
আবু 'উমার ইবন আবদুল বার বলেন, "মালিক, সুফিয়ান সাওরী, সুফিয়ান ইবন 'উয়াইনাহ, আওযা'য়ী, মা'মার ইবন রাশেদথেকে সিফাতের হাদীসের ব্যাপারে আমাদের কাছে বর্ণিত হয়ে এসেছে যে, তারা সকলেই বলেছেন: "এসব সিফাতকে যেভাবে এসেছে সেভাবে চালিয়ে দাও।" (৮৬৮)
আবু 'উমার বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবীগণ থেকে বিশ্বস্তভাবে যা এসেছে সেটিই ইলম, তার আনুগত্য করতে হবে। আর যা পরবর্তীতে উদ্ভাবন করা হয়েছে, যেগুলোর কোনো মূল ভিত্তি নেই সেগুলো বিদ'আত ও গোমরাহী।"(৮৬৯) আর "মুওয়াত্তার" ব্যাখ্যায় (৮৭০) যখন নুযুল (অবতরণ করা) এর হাদীসের ৮০) প্রসঙ্গে আলোচনা করেন তখন তিনি বলেন; এটি ভাষ্যের দিক থেকে প্রমাণিত, বিশুদ্ধসূত্রে সংকলিত হাদীস। হাদীসবেত্তাগণ এটার বিশুদ্ধতার ব্যাপারে মতবিরোধ করেননি। এ সূত্র ব্যতীত তা আরও অনেক সূত্রে ন্যায়পরায়ণদের মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়ে এসেছে। এ হাদীস এটার ওপর দলীল যে, আল্লাহ আসমানে 'আরশের উপরে আছেন, সাত আসমানের উপরে। যেমনটি আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আত বলেছেন। তাদের একথা মু'তাযিলাদের কথার বিপক্ষে দলীল, তারা বলে: আল্লাহ তাঁর পবিত্রসত্তা সহ সর্বত্র বিরাজমান। (৮৭৩)
তিনি আরও বলেন, হকপন্থীরা যা বলেছে তার বিশুদ্ধতার পক্ষে রয়েছে আল্লাহর বাণী। অতঃপর তিনি [ইবন আব্দিল বার] বেশকিছু আয়াত উল্লেখ করে(৮৭৪) বলেন: এটা বিশেষ ও সাধারণ সকল শ্রেণির লোকদের নিকট প্রসিদ্ধ ও জানা, যা উল্লেখ করার পর আর বেশি বর্ণনার প্রয়োজনমুক্ত। এটি অবশ্যম্ভাবী বিষয় (৮০), এ ব্যাপারটি স্বীকার করার বিষয়টি কাউকে জানাতে হয়নি। [অর্থাৎ ফিত্বরী বিষয়, যা সকলের অন্তর অবশ্যম্ভাবীরূপে স্বীকৃতি প্রদান করে থাকে] (৮৭৬)
আবু 'উমার ইবন আব্দিল বার আরও বলেন, "যাদের থেকে ব্যাখ্যা গ্রহণ করা হয়েছে সেসব সাহাবী ও তাবে'য়ী আলেমগণ একমত যে, এই আয়াত وَمَا فِي الْأَرْضِ مَا يَكُونُ مِن نَّجْوَى ثَلَاثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ ﴾ [المجادلة: ٧] "তিন ব্যক্তির মধ্যে এমন কোনো গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থ জন হিসেবে তিনি থাকেন না।” [সূরা আল-মুজাদালাহ: ০৭] এর ব্যাখ্যা হলো: তিনি 'আরশের উপরে, তাঁর জ্ঞান সর্বত্র। এ ব্যাপারে যাদের কথা গ্রহণযোগ্য হতে পারে এমন কেউ তাদের বিরোধিতা করেনি। (৮৭৭)
আবু 'উমার আরও বলেন, আহলুস সুন্নাহগণের এ ব্যাপারে ঐকমত্য রয়েছে যে, কুরআনে বর্ণিত ও হাদীসে উল্লিখিত সকল সিফাত স্বীকার করা হবে, ঈমান আনতে হবে, সেগুলোকে প্রকৃত অর্থে ব্যবহার করতে হবে, রূপক অর্থে নয়। তবে তারা এগুলোর কোনোটির ধরণ বর্ণনা করেননি এবং কোনো সীমায় সীমিতও করেননি। (৮৭৮)
অপরদিকে বিদ'আতপন্থীরা যেমন জাহমিয়্যাহ, মু'তাযিলা, খারেজী, তারা এগুলোকে অস্বীকার করে। একটিকেও প্রকৃত অর্থে ব্যবহার করে না। বরং তারা মনে করে, যে ব্যক্তি এগুলো স্বীকার করবে সে মুশাব্বিহা তথা সাদৃশ্যদানকারী।
যারা এ গুণগুলোকে যথাযথভাবে স্বীকার করে তাদের নিকট এ (জাহমিয়্যাহ, মু'তাযিলা, খারেজী) লোকগুলো মূলত: মা'বুদকেই অস্বীকারকারী। (৮৭৯) সত্য হচ্ছে তাদের কথায়, যারা কুরআন-সুন্নাহ যা বলে তাই বলে, তারা তো আহলুস সুন্নাহর ইমামগণ। এ হলো মুসলিম বিশ্বের পশ্চিমাঞ্চলের ইমাম ইবন আব্দিল বার এর বক্তব্য। (৮৮০)
টিকাঃ
৮৬৭. তিনি হচ্ছেন ইমাম আবু উরওয়া মা'মার ইবন রাশেদ ইবন আবী উরওয়া আল-আষদী, তাদের বসরী মাওলা বা আযাদকৃত দাস। তার জন্ম হয়েছিল হিজরী ৯৫ বা ৯৬ সালে। মৃত্যু হয়েছিল হিজরী ১৫৩ সালে। তার সম্পর্কে ইবন জুরাইজ বলেন, 'তোমরা মা'মারকে আঁকড়ে থাকো; কারণ তার সময়ে তার মতো জ্ঞানী আর নেই।' ইবন সা'দ বলেন, মা'মার ছিলেন, সহিষ্ণু, মানবিক ও নিজে ব্যক্তিগতভাবে শরীফ ও ভদ্র-নম্র মানুষ। দেখুন, ইবন সা'দ, আত-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা (৫/৫৪৬); ইমাম যাহাবী, তাযকিরাতুল হুফফায (১/১৯০); সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৭/৫); ইবনুল 'ইমাদ, শাযরাতুয যাহাব (১/২৩৫)।
৮৬৮. এ কিতাবের শুরুতেই শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এ কথার বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন।
৮৬৯. ইবন আব্দিল বার, জামে'উ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাদলিহী (২/১১৮); তবে সেখানে বাড়তি আছে, 'যেমন আল্লাহর নিকটতম আসমানে অবতরণের হাদীস, অনুরূপ হাদীস: আল্লাহ তা'আলা আদমকে তার সূরতে সৃষ্টি করেছেন, অনুরূপ: তিনি তাঁর পা জাহান্নামে রাখবেন, আর যা এসব হাদীসের মত রয়েছে সেসব'। তবে সেখানে 'যা নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে... এটুকু নেই। অবশ্য সেটা অন্যত্র এসেছে এভাবে,
قَالَ أَبُو عُمَرَ: مَا جَاءَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ نَقْلِ الثَّقَاتِ وَجَاءَ عَنِ الصَّحَابَةِ وَصَحْ عَنْهُمْ فَهُوَ عِلْمٌ يُدَانُ بِهِ، وَمَا أُحْدِثَ بَعْدَهُمْ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ أَصْلُ فِيمَا جَاءَ عَنْهُمْ فَبِدْعَةٌ وَضَلَالَةٌ وَمَا جَاءَ فِي أَسْمَاءِ الله أَوْ صِفَاتِهِ عَنْهُمْ سَلِمَ لَهُ، وَلَمْ يُنَاظِرْ فِيهِ كَمَا لَمْ يُنَاظِرُوا.
"আবু 'উমার বলেন, যা নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিশ্বস্ত নির্ভরযোগ্যদের মাধ্যমে হয়ে বর্ণিত হয়ে এসেছে আর যা সাহাবায়ে কিরামের কাছ থেকে এসেছে তা হচ্ছে ইলম বা জ্ঞান, যার আনগত্য করতে হবে। আর যা তাদের পরে নব উত্থাপিত হয়েছে, যার সপক্ষে পূর্বোক্তদের পক্ষ থেকে কোনো মূলনীতি নেই, সেটি বিদ'আত ও পথভ্রষ্টতা। আর আল্লাহর নাম ও গুণের ব্যাপারে তাদের কাছ থেকে যা এসেছে সেগুলো মেনে নেয়া হবে আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করার মাধ্যমে। সেগুলোতে কোনো প্রকার বিবাদে লিপ্ত হওয়া যাবে না, যেমনিভাবে সাহাবায়ে কিরাম বিবাদে জড়াননি" [জামে'উ বায়ানিল ইলমি ওয়াফাদ্বলিহী (২/৯৪৫); প্যারা নং ১৮০৬] এরপর ইবন আব্দুল বার বলেন, সালাফগণ এসব হাদীস বর্ণনা করে সেগুলোর ব্যাপারে অপব্যাখ্যা না করে চুপ ছিলেন, অথচ তারা ইলম বা জ্ঞানের দিক থেকে গভীর জ্ঞানের অধিকারী, বুঝের দিক থেকে প্রশস্ত বুঝের অধিকারী, লৌকিকতা তাদের মাঝে ছিল শূন্যের কোঠায়, তারা এসব হাদীসের ব্যাখ্যার ব্যাপারে চুপ থাকা কোনোভাবেই অজ্ঞতা বা অপারঙ্গমতা থেকে নয়, সুতরাং যে ব্যক্তি সাহাবায়ে কিরাম যা দিয়ে যথেষ্ট হয়েছে তা দিয়ে নিজেকে যথেষ্ট না করবে সে তো ব্যর্থ হয়েছে ও ক্ষতিগ্রস্ততায় লিপ্ত হয়েছে। [২/৯৪৫]
৮৭০. মুওয়াত্তার ব্যাখ্যাগ্রন্থ বলে বুঝানো হয়েছে, ইমাম আব্দুল বার এর সুবিখ্যাত গ্রন্থ 'আত-তামহীদ লিমা ফিল মুওয়াত্তা মিনাল মা'আনী ওয়াল আসানীদ'। এটি একটি অতীব প্রয়োজনীয় গ্রন্থ। বর্তমানে এটি ২৩ খণ্ডে ছাপা হয়েছে। ইবন আব্দুল বার রাহিমাহুল্লাহ এ গ্রন্থটি ৩০ বছরে লেখেছেন। যুগ যুগ ধরে ইমামগণ এ কিতাবের প্রশংসা করেছেন। আবু মুহাম্মাদ ইবন হাযম বলেন, আমাদের সঙ্গী আবু 'উমার এর 'আত-তামহীদ', হাদীসের ফিকহে যে কিতাবের মতো আর কোনো গ্রন্থ আছে কিনা আমার জানা নেই, এর থেকে উত্তম তো দূরের কথা। দেখুন রাসায়িলি ইবন হাযম (২/১৭৯)। আবু আলী আল-গাসসানী বলেন, 'কিতাবুত তামহীদ' এর মতো কিতাব তার আগে কেউ লিখেনি।' ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৮/১৫৭)। ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, এ বিষয়ে একটি সবচেয়ে মানসম্মত গ্রন্থ। মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/২২০); কখনও কখনও বলেছেন, এটি এ বিষয়ে লেখা সবচেয়ে সম্মানিত গ্রন্থ। মাজমু' ফাতাওয়া (৩/২৬৩)। ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ ইমাম ইয্যুদ্দীন ইবন আব্দিস সালামের বক্তব্য, 'আমি ইসলামের কিতাবের মধ্যে ইলমের দিক থেকে ইবন হাযমের মুহাল্লা, ইবন কুদামার মুগনীর মত কিতাব দেখিনি' এটুকু উদ্ধৃত করার পর ইমাম যাহাবী বলেন, শাইখ ইয্যুদ্দীন সত্য বলেছেন, তৃতীয়টি হচ্ছে বাইহাকীর আস-সুনানুল কাবীর, আর চতুর্থটি হচ্ছে, ইবন আব্দিল বার এর আত- তামহীদ। যে কেউ এ চারটি দিওয়ান (বড় গ্রন্থ) তার কাছে একত্রিত করতে পারবে, সে যদি বুদ্ধিমান মুফতি হয়, আর তাতে নিয়মিত নজর বুলাতে থাকে তবে সে ব্যক্তি সত্যিকারের আলেম হয়ে যাবে।' ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৮/১৯৩)।
৮৭১. নুযূল এর হাদীস বলতে, মহান আল্লাহ কর্তৃক প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে নিকটতম আসমানে নেমে আসার বিষয়ে বর্ণিত হাদীসটি বুঝানো হয়েছে যা আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু কর্তৃক বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "আমাদের রব, তিনি বরকতময় ও সুউচ্চ, প্রতি রাতে নিকটতম আসমানে নেমে আসেন..."। হাদীসটির তাখরীজ আগে চলে গেছে।
৮৭২. ইবন আব্দুল বার এ হাদীসটির বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন, যা বর্তমান তামহীদ কিতাবের ৭ম খণ্ডে ১২৮ পৃষ্ঠা থেকে ১৫৯ পৃষ্ঠা পর্যন্ত বিস্তৃত।
৮৭৩. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন যে, যারা বলে 'আল্লাহর সর্বত্র বিরাজমান' এ কথাটি মূলত জাহমিয়্যাদের মধ্যে যারা ইবাদত কর্মে লিপ্ত তারা বলে, অর্থাৎ মু'তাযিলাদের মধ্যকার ইবাদত ও তাসাওউফে প্রসিদ্ধ তারাই বলে থাকে। আর তাদের মধ্য থেকে প্রসিদ্ধ আরেকটি কথা, 'তিনি আল্লাহ জগতের ভিতরেও নন, জগতের বাইরেও নন,' এ বক্তব্য তাদের মধ্যকার যারা তর্কবাগীশ ও তাদের মধ্যকার কালামশাস্ত্রবিদদের। সেজন্য বলা হয়ে থাকে, জাহমীদের মধ্যকার কালাম শাস্ত্রবিদরা কিছুরই ইবাদত করে না, আর জাহমিয়্যাদের মধ্যকার সূফীরা সবকিছুর ইবাদত করে থাকে। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (২/২৯৮)। বরং শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ অন্যত্র বলেন, তাদের অনেকের মধ্যে এ দু'টি পরস্পর বিরোধী বক্তব্যের সমাহার ঘটেছে। তারা যখন গবেষণা করতে নামে তখন আল্লাহকে বিপরীতমুখী দু'টি গুণ প্রদান করে, অর্থাৎ তখন তারা বলে, 'তিনি জগতের বাইরেও নন, জগতের ভিতরেও নন।' আর যখন ইবাদত করার চিন্তা করে তখন বলে, 'তিনি সব জায়গায়, তার থেকে কোনো কিছু বিমুক্ত নয়।' এমনকি তাদের মধ্য হতে কেউ কেউ স্পষ্ট করে বলে, তিনি সকল অস্তিত্বশীল বস্তুতে প্রবিষ্ট হয়ে আছেন। জীব-জন্তু ও অন্যান্য সবকিছুতে। বরং তারা বলে সবকিছুতে তিনি একাকার হয়ে আছেন। বরং আরও অগ্রসর হয়ে বলেন, সত্তা তো একটিই, অর্থাৎ স্রষ্টা তো অস্তিত্বশীল বস্তুই। দেখুন, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/৭); মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/২৭২)।
৮৭৪. যেমন, আল্লাহর বাণী, "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন।” [সূরা ত্বা-হা: ০৫], অনুরূপ তাঁর বাণী, "আল্লাহ, যিনি আসমানসমূহ, যমীন ও এ দু'য়ের অন্তর্বর্তী সবকিছু সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে। তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন। তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো অভিভাবক নেই এবং সুপারিশকারীও নেই; তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?" [সূরা আস-সাজদাহ: ০৪], অনুরূপ আল্লাহর বাণী, "তারপর তিনি আসমানের প্রতি ইচ্ছে করলেন, যা (পূর্বে) ছিল ধোঁয়া। অতঃপর তিনি ওটাকে (আসমান) ও যমীনকে বললেন, 'তোমরা উভয়ে আস ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়।' তারা বলল, 'আমরা আসলাম অনুগত হয়ে'।" [সূরা ফুসসিলাত: ১১]
৮৭৫. এ অবশ্যম্ভাব্যতার কথা যা তিনি বর্ণনা করেছেন তা হচ্ছে, আরব হোক আজম হোক যারাই তাওহীদের অনুসারী, তাদের যখনই কোনো সমস্যা হয় বা বিপদ হয়, তখনই তারা তাদের হাতসমূহ আসমানের দিকে তুলে ধরে, এর মাধ্যমে তারা তাদের রবের সাহায্য কামনা করে। আত-তামহীদ (৭/১৩৪)।
৮৭৬. ইবন আব্দিল বার রাহিমাহুল্লাহ'র পূর্ণ বক্তব্য নিয়ে আসা হলে তা বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করবে, তিনি বলেন, 'আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপরে থাকা, সাত আসমানে উপরে হওয়ার আরেকটি প্রমাণ হচ্ছে, আরব হোক, অনারব হোক, তাওহীদবাদীদের যখন কোনো সমস্যা দেখা দেয় অথবা তাদের কোনো বিপদ আসে, তারা তাদের চেহারাকে আসমানের দিকে উঠিয়ে তাদের রবের কাছে উদ্ধার কামনা করতে থাকে, এটি সাধারণ ও বিশেষ লোকদের মাঝে এতই প্রসিদ্ধ যে, এটি বর্ণনা করার অতিরিক্ত প্রমাণ উপস্থাপনের প্রয়োজন হয় না। কারণ এটি এমন এক অবশ্যম্ভাবী কাজ যা করতে কেউ তাদেরকে ধমক দেয়নি, আর কোনো মুসলিমও তা কোনো দিন মানতে অস্বীকার করেনি। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে দাসীকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, যাকে তার মনিব মুক্ত করতে চেয়েছিলেন যদি সে ঈমানদার হয়, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে পরীক্ষা করে বলেন, 'আল্লাহ কোথায়?' তখন সে দাসী উপরের দিকে ইঙ্গিত করলো। তারপর তিনি দাসীকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কে? সে বললো, আল্লাহর রাসূল। তখন রাসূল বললেন, তুমি তাকে স্বাধীন করে দাও, সে তো ঈমানদার।' এখানে দেখা যাচ্ছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিছক আকাশের দিকে মাথা তোলাকেই যথেষ্ট হিসেবে নিয়েছেন; তিনি এটাকেই অন্য সবকিছু জিজ্ঞাসা করা থেকে যথেষ্ট মনে করেছেন।' আত-তামহীদ (৭/১৩৪)।
৮৭৭. 'আল্লাহর ইলম সব জায়গায়' এ বক্তব্যটি সাহাবায়ে কিরাম ও তাদের পরবর্তী সুন্দর উত্তরসূরীদের কাছ থেকে এসেছে। যেমন, ১) ইবন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে বর্ণিত হয়েছে। দেখুন, আবুল কাসেম আত-তাইমী, আল-হুজ্জাহ ফী বায়ানিল মাহাজ্জাহ (২/১১৪), নং ৬৩। ২) অনুরূপভাবে তা আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকেও এসেছে। ৩) দ্বাহহাক ইবন মুযাহিম থেকেও এসেছে। দেখুন, ইবন আব্দিল বার, আত-তামহীদ (৭/১৩৯); ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুযূশ, পৃ. ১৪৮। ৪) তদ্রূপ তা ইমাম মালেক ইবন আনাস থেকেও এসেছে। দেখুন, আব্দুল্লাহ ইবন ইমাম আহমাদ, আস-সুন্নাহ ১১, ৫৩২; লালেকাঈ, শারহু উসুলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ, নং ৬৭৩; ইবন বাত্তাহ, আল-ইবানাহ (৩/১৫৩), নং ১১০; ইবন কুদামাহ, ইসবাতু সিফাতিল উলু, পৃ. ১১৫। ৫) তাছাড়া তা ইমাম আবু যুর'আহ থেকেও এসেছে, দেখুন, যাহাবী, আল-'উলু লিল 'আলিয়ি্যল 'আযীম (২/১১৫৩); নং ৪৬৫; ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুয়ূশ, পৃ. ২৩৪। আর ইমাম ইবন আব্দিল বার এর এ বক্তব্য আরও যারা উদ্ধৃত করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন, শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, দারুউত তা'আরুদ্ব (৬/২৫৪-২৫৬); বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (২/৩৯); মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/২২১); ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুয়ূশ, পৃ. ১৪৮; আস-সাওয়া'য়িকুল মুরসালাহ (৪/১২৮৮); যাহাবী, আল-'উলু লিল 'আলিয়ি্যল আযীম (২/১৩২৫), নং ৫৩১।
৮৭৮. অর্থাৎ কোনো প্রকার আয়ত্ত্ব করার কথা বলেননি। যেমনটি আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: "তাঁকে কোনো চোখ আয়ত্ব করতে সক্ষম নয়।" [সূরা আল-আন'আম: ১০৩] দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু ভালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৩/৭০৮)।
৮৭৯. ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ ইবন আব্দিল বার থেকে এতটুকু উদ্ধৃত করার পর বলেন, 'আল্লাহর শপথ করে বলছি, তিনি সত্য বলেছেন; কারণ যে কেউ গুণাবলির অপব্যাখ্যা করে সেগুলো থেকে যা কিছু কুরআন ও হাদীসে এসেছে তা রূপকের ওপর ফেলে দেয়, তখন এভাবে সেগুলোকে না করার মাধ্যমে সে মূলত আল্লাহ তা'আলাকে অস্বীকার করে বসে, তাঁকে অস্তিত্বহীনের সাথে সাদৃশ্য প্রদান করে। যেমন হাম্মাদ ইবন যায়েদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, 'জাহমিয়্যাদের উদাহরণ হচ্ছে এমন লোকদের মত, যারা বলেছে যে আমাদের বাড়ীতে খেজুর গাছ আছে। বলা হলো, সে গাছের কি ডালপালা আছে? বললো, না। প্রশ্ন করা হলো, সে গাছের কি ডালের গোড়া আছে? সে বলল, না। তারপর বলা হলো, সে গাছের কি কাঁচা খেজুর ও পাকা খেজুর আছে? সে বলল, না। তারপর বলা হলো, আচ্ছা সে গাছের কি কাণ্ড আছে? সে বলল, না। তখন তাকে বলা হলো, আসলে তোমাদের বাড়ীতে খেজুর গাছই নেই।' ইমাম যাহাবী বলেন, আমি বলি, আল্লাহ তা'আলার সিফাত অস্বীকারকারীদের অবস্থা এমনই। তারা বলে যে আমাদের উপাস্য হচ্ছেন আল্লাহ। তবে তিনি কোনো কালে নন, জায়গায় নন, দেখা যায় না, শুনেন না, তিনি দেখেন না, তিনি কথা বলেন না, তিনি সন্তুষ্ট হন না, তিনি রাগ করেন না, তিনি ইচ্ছা করেন না, তিনি ... না, তিনি...না, আর বলে, তিনি তো সকল গুণ থেকে পবিত্র।
বরং আমরা বলি, মহান পবিত্র আল্লাহ, তিনি সর্বোচ্চ সত্তা, মহান সত্তা, শ্রোতা, দর্শক, ইচ্ছাকারী, যিনি মূসার সাথে কথা বলেছেন, ইবরাহীমকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাঁকে আখেরাতে দেখা যাবে, সেসব গুণে গুণান্বিত যা দিয়ে তিনি নিজেকে গুণান্বিত করেছেন অথবা তা দিয়ে তাঁকে তার রাসূল গুণান্বিত করেছেন, তিনি সৃষ্টিকুলের মতো হওয়া থেকে পবিত্র, অস্বীকারকারীদের অস্বীকার থেকে মুক্ত, তাঁর মতো কোনো কিছু নেই, তিনি সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা।' যাহাবী, আল-'উলু লিল 'আলিয়্যিল 'আযীম (২/১৩২৬-১৩২৭)।
৮৮০. দেখুন, আত-তামহীদ (৭/১২৮)...। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এখানে সংক্ষেপে তা এনেছেন。
📄 ইমাম বাইহাকী রাহিমাহুল্লাহ’র বক্তব্য
তার যুগে ছিলেন হাফেয আবু বকর আল-বাইহাক্বী। যদিও তিনি আবুল হাসান আশ'আরীর কালামপন্থী ছাত্রদেরকেই অভিভাবক হিসেবে নিয়েছেন আর তিনি তাদের পক্ষে কথা বলে তাদের প্রতিরোধ করেছেন। তিনি স্বীয় "আল-আসমা ওয়াস সিফাত" (১৮৮২) কিতাবে বলেন, "অধ্যায়: দু'হাত সিফাত হিসেবে সাব্যস্ত করা, অঙ্গ(৮৮০) হিসেবে নয়।” যেহেতু এ ব্যাপারে সত্যবাদী সংবাদ দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন: يَتَإِبْلِيسُ مَا مَنَعَكَ أَن تَسْجُدَ لِمَا خَلَقْتُ بِيَدَى﴾ [ص: ٧٥] "হে ইবলীস! আমি যাকে আমার দু'হাতে সৃষ্টি করেছি, তার প্রতি সাজদাবনত হতে তোমাকে কিসে বাধা দিল?" [সূরা স্বদ: ৭৫] তিনি অন্যত্র বলেন, ﴿بَلْ يَدَاهُ مَبْسُوطَتَانِ} [المائدة: ٦٤] “বরং আল্লাহর উভয় হাতই প্রসারিত।" [সূরা আল-মায়েদাহ: ৬৪]
এবং এ প্রসঙ্গে বিশুদ্ধ হাদীসে যা বর্ণিত হয়েছে। যেমন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বক্তব্য, যা শাফা'আত সংক্রান্ত একাধিক হাদীসে এসেছে, يا آدم أنت أبو البشر خلقك [الله] بيده "হে আদম! আপনি মানুষের পিতা, আল্লাহ নিজ হাতে আপনাকে সৃষ্টি করেছেন।"(১৮৮৪)
অনুরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী, যা বুখারী ও মুসলিমে এসেছে, أنت موسى اصطفاك الله بكلامه، وخط لك الألواح بيده "আপনি হচ্ছেন সেই মূসা, যাকে আল্লাহ স্বীয় কথা বলার জন্য মনোনীত করেছেন, আপনার জন্য নিজ হাতে তখতাসমূহ লিখেছেন।”
অন্য বর্ণনায় : «وكتب لك التوراة بيده» "আপনার জন্য তিনি নিজ হাতে তাওরাত লিখেছেন।”(৮৮৫)
অনুরূপ যা সহীহ মুসলিমে এসেছে যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা "وغرس كرامة أوليائه في جنة عدن بيده "স্বীয় হাতে জান্নাতে আদনে তার বন্ধুদের সম্মান গেঁথে দিয়েছেন”(৮৮৬)
অনুরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী تكون الأرض يوم القيامة خُبْزَة واحدة يتكفاها الجبار بيده، كما يتكفى أحدكم خبزته في السفر، نُزُلًا لأهل الجنة» যমীন (৮৮৭) একটি রুটি হবে, মহা শক্তিধর আল্লাহ তাকে ঘুরাবেন, যেমন তোমাদের কেউ স্বীয় দস্তরখানে অথবা সফরে রুটি হাতে ঘুরিয়ে বানিয়ে নেয়, জান্নাতীদের মেহমানদারীর জন্য।"(৮৮৮)
তিনি আরও কিছু হাদীসে উল্লেখ করেন, যেমন: بيدي الأمر« "আমার হাতে সমস্ত কিছু”।(৮৮৯) এবং والخير بيديك« "সকল কল্যাণ আপনার দু' হাতে”(৮৯০) «إن الله يبسط يده بالليل ليتوب مسيء النهار، ويبسط يده بالنهار ليتوب مسيء الليل» অনুরূপ «والذي نفس محمد بيده "এবং যাঁর হাতে মুহাম্মদের প্রাণ।” (৮৯১) আল্লাহ স্বীয় হাত রাতের বেলায় প্রসারিত করে দেন যাতে দিনের অপরাধীরা তাওবা করতে পারে।” (৮৯২)
«المقسطون عند الله على منابر من نور عن يمين الرحمن وكلتا يديه يمين» রহমানের ডানপাশে নূরের মিম্বারের উপর থাকবে, আর তার উভয় হাতই ডান(৮৯৩)।”(৮৯৪) অনুরূপ রাসূলের বাণী,
﴿يَطْوِي اللَّهُ السَّمَاوَاتِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ثُمَّ يَأْخُذُهُنَّ بِيَدِهِ الْيُمْنَى ثُمَّ يَقُولُ: أَنَا الْمَلِكُ، أَيْنَ الْجَبَّارُونَ؟ أَيْنَ الْمُتَكَبِّرُونَ؟ ثُمَّ يَطْوِي الْأَرَضِينَ بِشِمَالِهِ، ثُمَّ يَقُولُ: أَنَا الْمَلِكُ، أَيْنَ الْجَبَّارُونَ؟ أَيْنَ الْمُتَكَبِّرُونَ؟﴾
“কিয়ামতের দিন আল্লাহ আসমানসমূহকে ভাঁজ করে ডান হাতে ধরে রাখবেন। অতঃপর বলবেন, আমিই রাজাধিরাজ, কোথাও জবরদস্তিকারীরা? কোথায় অহংকারীরা। তারপর তিনি যমীনগুলোকে ভাঁজ করে বাম হাতে রেখে বলবেন, আমিই রাজাধিরাজ, কোথায় জবরদস্তিকারীরা? কোথায় অহংকারীরা?” (৮৯৫)
আর তাঁর বাণী,
﴿يَمِينُ اللَّهِ مَلْأَى لَا يَغِيضُهَا نَفَقَةٌ، سَحَّاءُ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ، أَرَأَيْتُمْ مَا أَنْفَقَ مُنْذُ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ، فَإِنَّهُ لَمْ يَغِضْ مَا فِي يَمِينِهِ، وَعَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ، وَبِيَدِهِ الْأُخْرَى الْقَبْضُ يَخْفِضُ وَيَرْفَعُ
“আল্লাহর ডান হাত পরিপূর্ণ, খরচের কারণে কমতি হয় না, রাত-দিন অনবরত ঢেলে খরচকারী, তোমরা কি দেখনি আসমান ও যমীন সৃষ্টির পর থেকে তিনি যা খরচ করে আসছেন তা তার ডান হাতে যা আছে তা থেকে একটুও কমায়নি এবং তার ‘আরশ পানির উপরে। আর তার অপর হাতে পাল্লা(৮৯৬), যা নিচু করেন এবং উঁচু করেন (৮১৭)।”(৮৯৮) এসব হাদীসের সবই সহীহ গ্রন্থসমূহে বর্ণিত।
এরপর তিনি [বাইহাকী] আরও উল্লেখ করেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী, إن الله لما خلق آدم، قال له ويداه مقبوضتان اختر أيهما شئت. قال: اخترت يمين ربي، وكلتا يدي ربي يمين مباركة "আল্লাহ তা'আলা আদমকে সৃষ্টি করে বললেন, যখন আল্লাহর দুহাত মুষ্টিবদ্ধ ছিল, যেটি ইচ্ছে বাছাই কর। আদম বললেন, আমি প্রভুর ডান হাত বাছাই করলাম। আর আমার প্রভুর উভয় হাত ডান, বরকতময়।”(৮৯৯)
অনুরূপ অপর হাদীস, إن الله لما خلق آدم مسح على ظهره بیده "আল্লাহ আদমকে সৃষ্টি করে তার পিঠে নিজের হাত দিয়ে মুছে নেন।”(১০০)
তাছাড়া এ প্রকারের আরও অনেক হাদীস তিনি উল্লেখ করেন। অতঃপর বাইহাক্বী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তবে উম্মতের পূর্ববর্তী আলেমগণ উপরে বর্ণিত আয়াত ও হাদীস যা আমরা লিখেছি তার কোনো ব্যাখ্যা করেননি। আর তিনি 'আরশের উপর উঠা ও অন্যান্য সিফাতে খাবারিয়্যাহ বা কুরআন ও হাদীসের সংবাদের মাধ্যমে প্রাপ্ত সিফাতসমূহের ব্যাপারেও অনুরূপ কথাই বলেছেন। (৯০১) অথচ তিনি পরবর্তী কোনো কোনো আলেমের কথাও বর্ণনা করেছেন। (৯০২)
টিকাঃ
৮৮১, তিনি হচ্ছেন আবুল হাসান আলী ইবন ইসমা'ঈল ইবন আবি বিশর ইবন সালেম আল-আশ'আরী। তার কুনিয়াত আবুল হাসান নামেই প্রসিদ্ধ। তার বংশলতিকা আবু মূসা আল-আশ'আরী রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুর কাছে গিয়ে শেষ হয়। তার পিতা ইসমা'ঈল হাদীস ও সুন্নাহ'র অনুসারী ও হাদীসবেত্তা ছিলেন। কারণ তিনি তার মৃত্যুর সময় তার ছেলেকে দেখার জন্য প্রখ্যাত মুহাদ্দিস যাকারিয়্যাহ ইবন ইয়াহইয়া আস-সাজীর দায়িত্বে প্রদান করেন। তবে আশ'আরী রাহিমাহুল্লাহ মুহাদ্দিসদের থেকে হাদীস বর্ণনায় প্রসিদ্ধি লাভ করেননি। সামান্য কিছু বর্ণনা দেখা যায় যা তিনি তার তাফসীরে কোনো কোনো শাইখ থেকে বর্ণনা করেছেন। ইমাম আশ'আরী প্রচুর গ্রন্থ প্রণয়ন করেন; বলা হয়ে থাকে, যার পরিমাণ পঞ্চান্নটির মতো। যেমনটি ইমাম ইবন হাযম উল্লেখ করেছেন। আবার কারও কারও মতে তার গ্রন্থের সংখ্যা তিনশত আশিটির মত। দেখুন, তাজউদ্দীন আস-সুবুকী, ত্বাবাক্বাতুশ শাফে'ঈয়্যাহ আল-কুবরা (৩/৩৫৯)।
তার সম্পর্কে ইমাম যাহাবী বলেন, আবুল হাসান এর ছিল অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা, ইলমের ক্ষেত্রে তার ছিল সামুদ্রিক গভীরতা। তার অনেক ভালো কাজ ও উত্তম গ্রন্থ রয়েছে, যা তার ইলমের প্রশস্ততার প্রমাণ দেয়।
তার জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যাপারে এটা সর্বজন স্বীকৃত যে, ইমাম আশ'আরী প্রথম জীবনে মু'তাযিলাদের মতের ওপর বড় হয়ে উঠেন। জীবনের একটি বিরাট সময় তাদের মাঝেই কাটান। সেখানে তিনি তার মায়ের স্বামী আবু আলী আল-জুব্বাঈ এর শিষ্যত্ব বরণ করেন, যিনি তৎকালীন সমাজের বড় মু'তাযিলী ছিলেন। ইবন 'আসাকির প্রমুখ লিখেছেন যে, তিনি মু'তাযিলাদের মতবাদের ওপর চল্লিশ বছর বা তার কাছাকাছি সময় কাটিয়েছিলেন। তখন তিনি তাদের মতবাদের জ্ঞানে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন যে, তিনি তাতে গ্রন্থও রচনা করতে সমর্থ হয়েছিলেন। দেখুন, ইবন আসাকির, তাবয়ীনু কাযিবিল মুফতারী, পৃ. ১৩১।
তারপর তিনি সবার সামনে মু'তাযিলাদের মতবাদ থেকে ফিরে আসার ঘোষণা প্রদান করেন। আরও জানিয়ে দেন যে, তিনি তার পূর্ববর্তী সকল মতামত থেকে প্রত্যাবর্তন করলেন।
আবু বকর আস-সাইরাফী বলেন, মু'তাযিলারা তাদের মাথা উঁচু করেছিল, অবশেষে আল্লাহ তা'আলা আবুল হাসান আল-আশ'আরীর প্রাদুর্ভাব ঘটালেন ফলে তিনি তাদেরকে পরাস্ত করলেন। মু'তাযিলা মতবাদ পরিত্যাগের পর তার জীবনের বাঁক নির্ধারণে আলেমগণ মতভেদ করেছেন, সেটি কি একটি নাকি দু'টি।
কারও কারও মতে, মু'তাযিলা মতবাদ ত্যাগের পর তিনি দু'টি স্তর অতিক্রম করেছেন। তারা আবার দু' মতে বিভক্ত: ক. আশ'আরী রাহিমাহুল্লাহ মু'তাযিলা মতবাদ ত্যাগ করার পর ইবন কুল্লাবের মতের দিকে প্রত্যাবর্তন করেন, তারপর সালাফে সালেহীনের মতের দিকে প্রত্যাবর্তন করেন, যা ইবন কাসীর রাহিমাহুল্লাহ'র একটি বক্তব্য দ্বারা সমর্থিত। খ. আশ'আরী রাহিমাহুল্লাহ মু'তাযিলা মতবাদ ত্যাগ করার পর সালাফে সালেহীনের মতের দিকে প্রত্যাবর্তন করেন। তারপর তিনি সালাফ ও মুতাকাল্লিমদের মতামতের মাঝামাঝিতে অবস্থান করেন। এটি আশ'আরী মতবাদের লোকদের দাবি, বিশেষ করে যাহিদ কাউসারী ও তার মতো সীমালঙ্ঘনকারীদের বক্তব্য।
তবে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, "আর আবুল হাসান আল-আশ'আরী যখন তিনি মু'তাযিলাদের মতবাদ থেকে ফিরে আসলেন, তখন তিনি ইবন কুল্যাবের মত গ্রহণ করলেন, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল হাদীসের মতের দিকে ঝুঁকলেন, ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বলের দিকে নিজেকে সম্পৃক্ত করলেন, যেমনটি তিনি তার সকল গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, যেমন: আল-ইবানাহ, আল-মুওজায ও মাক্কালাত প্রভৃতি..সে সময় তিনি আহলুস সুন্নাহ ও হাদীসের সাথে যেমন চলেছেন তেমনি তার মাঝে কালামশাস্ত্রবিদদের বেশ কিছু মতামতও তেমনি অবশিষ্ট ছিল...।"
অন্যত্র তিনি বলেন, 'আর আশ'আরী ও তার মত অন্যান্যরা তারা সালাফে সালেহীন ও জাহমিয়্যাহদের মাঝখানে বারযাখে তথা ব্যবধানে অবস্থান করতে থাকলেন, তারা এদের থেকে বিশুদ্ধ কথা যেমন গ্রহণ করতেন, তেমনি আবার ওদের থেকে আক্বলী মূলনীতিও গ্রহণ করতেন, যা তারা বিশুদ্ধ মনে করতেন, অথচ তা ছিল বিনষ্ট। তাই মানুষের মাঝে অনেককেই দেখা যায় তার মাঝে থাকা সালাফী নীতির কারণে তাঁর দিকে ঝুঁকে যেতে, আবার আরেক গোষ্ঠীকে দেখা যায় তার কাছে থাকা বিদ'আতী ও জাহমী নীতির কারণে তার দিকে ঝুঁকে যেতে, যেমন আবুল মা'আলী ও তার অনুসারীরা।
ড. আব্দুর রহমান সালেহ আলে মাহমূদ ইমাম আবুল হাসান আল-আশ'আরীর ব্যক্তিত্ব নিয়ে বিস্তারিত স্টাডি করেছেন, যা ১৬২ পৃষ্ঠা ব্যাপী। যাতে তিনি এ সিদ্ধান্তের উপনীত হয়েছেন যে, তিনি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের মতামতের অনেক নিকটবর্তী হয়েছিলেন। তবে তাঁর কাছে শেষ পর্যন্তও ইবন কুল্লাবের মতবাদের বেশ কিছু নীতি অবশিষ্ট ছিল।
ইমাম যাহাবী বলেন, আমি আকীদাহ'র বিষয়ে আবুল হাসানের চারটি গ্রন্থ দেখেছি, যাতে তিনি আল্লাহর গুণাবলির ব্যাপারে সালাফে সালেহীনের নীতি বর্ণনা করেছেন। তাতে তিনি যা বলেছেন তন্মধ্যে রয়েছে, "এ গুণাবলি সংক্রান্ত আয়াত ও হাদীসগুলো যেভাবে এসেছে সেভাবে চালিয়ে নেয়া হবে।" তারপর তিনি বলেন, আর আমিও তা বলি, এটাকে দীন হিসেবে গ্রহণ করি, কোনো প্রকার তা'ওয়ীল এর আশ্রয় গ্রহণ করা হবে না।
ইমাম আশ'আরীর জন্ম হয়েছিল হিজরী ২৬০ সালে, আর মৃত্যু হয়েছিল হিজরী ৩২০ সালে অথবা ৩২৪ সালে।
তার অনেক গ্রন্থাবলির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, 'মাকালাতুল ইসলামিয়্যীন ওয়া ইখতিলাফুল মুসাল্লীন', আল-লুমা' ফির রাদ্দি আলা আহলিয যাইগে ওয়াল বিদা', রিসালাতুন ইলা আহলিস সাগার, আল-ইবানাহ 'আন উসূলিদ দিয়ানাহ, আর-রুইয়াতু বিল আবসার, আন-নাক্কছু আলাল জুব্বাঈ ইত্যাদি। দেখুন, খত্নীবে বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ (১১/৩৪৬); ইবনু খাল্লিকান, ওফায়াতুল আ'ইয়ান (৩/২৮৪); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৫/৮৫); ইবনুল 'ইমাদ, শাযরাতুয যাহাব (২/৩০৩); ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আকলি ওয়ান নাকলি (২/১৬); মাজমু' ফাতাওয়া (১৬/৪৭১); আব্দুর রহমান সালেহ আলে মাহমূদ, মাওকাফু ইবন তাইমিয়্যাহ মিনাল আশায়েরাহ (১/৩৬৩); আরও দেখুন, ইবন আসাকির, তাবয়ীনু কাযিবিল মুফতারী।
৮৮২. ইমাম বাইহাক্বী রাহিমাহুল্লাহ এর 'আল-আসমা ওয়াস সিফাত' গ্রন্থটি অনেকবার মুদ্রিত হয়েছে। তন্মধ্যে কোনো কোনোটি এক খণ্ডে প্রকাশিত, যা মুহাম্মাদ যাহেদ আল-কাউসারীর টীকা ও তত্ত্বাবধানে বের হয়েছে, দারু এহইয়াউত তুরাসিল আরাবী থেকে যা ইবারত বিকৃতি, অপব্যাখ্যা, সালাফী আলেমদের প্রতি কটাক্ষ ও গালি-গালাজে ভর্তি।
আবার কোনো কোনোটি দু' খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে, যা ইমাদুদ্দীন আহমাদ হায়দার এর তাহক্কীকে, প্রথম সংস্করণ, ১৪০৫ হিজরী, দারুল কিতাবিল আরাবী থেকে। তবে এটাতে মুহাম্মাদ যাহেদ আল-কাউসারীর পদাঙ্ক অনুসরণ করা হয়েছে।
উপরের দু'টি ছাপাতেই ইচ্ছাকৃতভাবে সালাফদের বক্তব্যকে বিকৃত করা হয়েছে। যেমন, ইমাম মালেকের বক্তব্যকে বিকৃত করা হয়েছে। প্রচুর পরিমাণ ফাসিদ তা'ওয়ীলের আশ্রয় নেয়া হয়েছে। সালাফে সালেহীন ইমামদের গালি-গালাজ করা হয়েছে। আর কাউসারীর অধিকাংশ টীকা ছিল অনেক মাসআলায় ইমাম বাইহাক্বীর উদ্দেশ্যের বিপরীত। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানার জন্য দেখা যেতে পারে, গবেষক আলী আল-ফুহাইদ কর্তৃক রচিত যাহেদ কাউসারী ওয়া আরাউহুল ই'ভিক্কাদিয়্যাহ, পৃ. ৭৯।
সর্বশেষ তাহক্বীক বের হয়েছে আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ আল-হাশেদী এর মাধ্যমে, দু' খণ্ডে যা মাকতাবাতুস সাওয়াদী বি জিদ্দাহ থেকে ছাপা হয়েছে। এটিই উত্তম তাহক্বীক।
ইমাম বাইহাক্বীর এ গ্রন্থটির প্রশংসা করেছেন অনেকে আলেমই। যেমন ইমাম যাহাৰী যখন বাইহাক্বীর জীবনী আলোচনা করেন তখন তিনি এ কিতাবটির ব্যাপারে বলেন, "তিনি এমন সব কিতাব রচনা করেছেন যার মতো কেউ রচনা করেনি, তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, আল-আসমা ওয়াস সিফাত, যা দু'টি খণ্ডে রচিত।" ইমাম যাহাবী, তাযকিরাতুল হুফফায (৩/১১৩২)।
তাছাড়া ইমাম বাইহাক্বীর এর গ্রন্থটি পরবর্তী আশ'আরী মতবাদের লোকদের কাছেও মর্যাদাপূর্ণ ও জনপ্রিয়। যেমন তাদের গ্রন্থকার তাজুদ্দীন আস-সুবুকী বলেন, 'আর তার কিতাব 'আল-আসমা ওয়াস সিফাত' আমি সেটার কোনো নযীর দেখতে পাই না।' তাজউদ্দীন আস-সুবুকী, ত্বাবাক্বাতুশ শাফে'ঈয়্যাহ আল-কুবরা (৪/৯)। তাদেরই আরেকজন বদরুদ্দীন ইবন জামা'আহ বলেন, 'এ কিতাবটি জামে' ও মানে' অর্থাৎ স্বয়ংসম্পূর্ণ ও অন্য কিছুর প্রয়োজনীয়তা হ্রাস করে।' ঈদ্বাহুদ দলীল ফী কাত'য়ি হুজাজি আহলিত তা'ত্বীল, পৃ. ৭১।
এ গ্রন্থে বাইহাক্বীর নিয়ম হচ্ছে, তিনি সনদসহ হাদীস ও আছার সংকলন করে নিয়ে আসেন। সেগুলোকে তার বক্তাদের পর্যন্ত সনদসহ পৌঁছে দিতেন। সাথে কিছু আয়াতও আনয়ন করেন যা দিয়ে তিনি যা এনেছেন তার সপক্ষে দলীল পেশ করেন। তারপর এসব ভাষ্যের ফিকহ, অর্থ ও উদ্দেশ্যের ব্যাপারে আলেমগণের অনেক বক্তব্য উদ্ধৃত করতেন। বিশেষ করে আশ'আরী আলেমদের বক্তব্য। এ কিতাবটি যারাই পড়বে তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ধরা দিবে যে তিনি তার উস্তাদ ইবন ফুওরাক দ্বারা সবিশেষ প্রভাবিত। কারণ তিনি কিতাবটি রচনাই করেছেন তার উস্তাদ আবু মানসূর মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আল-উসূলীর নির্দেশে। যাতে তা দ্বারা আশ'আরী মতবাদের খেদমত করা যায়, যেমনটি বাইহাক্বী স্বয়ং বর্ণনা করেছেন তার এ কিতাবের ভূমিকায় (২/৬০)।
তিনি কিতাবটিকে বিভিন্ন অধ্যায়ে বিন্যাস করেন। যার শুরুটি ছিল, 'ইসবাতু আসমায়িল্লাহি তা'আলা যিকরুহু বিদালালাতিল কিতাবি ওয়াস সুন্নাতি ওয়া ইজমা'য়িল উম্মাতি' আর সর্বশেষটি ছিল, বাবু ই'আদাতুল খালকি।
তার নিয়ম হচ্ছে, তিনি কোনো অধ্যায়ে আয়াত ও হাদীস আনার পরে তার কোনো কোনোটির ব্যাপারে ব্যাপক কথা বলতেন, এর মাধ্যমে তিনি হাদীসের খেদমত থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে হাদীসের তা'ওয়ীল করার মাধ্যমে আকীদাহ'র অধ্যায়সমূহে মুহাদ্দিসগণের ধারার বিপরীতে তা'ওয়ীলী ধারার প্রচলন ঘটালেন। বরং শুধু নিজের আকীদাহ-বিশ্বাসের কারণে বহু হাদীসের অপব্যাখ্যা করেছেন। যেমন দেখুন, ২/২৯, ৫৭, ১৬৮, ১৯৪-১৯৫।
ইমাম বাইহাক্বী এ কিতাবটিতে প্রচুর পরিমাণে তার উস্তাদ আবু আব্দুল্লাহ আল-হুসাইন ইবন আল-হাসান আল-হালীমী আল-জুরজানী থেকে উদ্ধৃতি এনেছেন, যিনি মা ওয়ারা আন নাহর এর একজন। বড় কালামশাস্ত্রবিদ আশ'আরী আলেম ছিলেন। এমনকি এসব উদ্ধৃতি শত স্থানের উপরে হবে। তাছাড়া তিনি আরও অনেক আশ'আরী মতবাদের আলেমগণ থেকে উদ্ধৃতি এনেছেন যেমন, আবু ইসহাক আল-ইসফারায়িনী (১/২৯৩), আবু বকর ইবনুস সিবগী (১/৩২২), আবুল হাসান আত-তাবারী (২/১৭২, ২৮১, ৩০৮, ৪১২, ৪২১) প্রমুখ।
তবে ইমাম বাইহাক্বী সব জায়গায় তা'ওয়ীল বা অপব্যাখ্যা করেছেন তা নয়। অনেক জায়গায় তিনি পরবর্তী আশ'আরী মতবাদের লোকদের মতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। যেমন তিনি বেশ কিছু সিফাত কোনো প্রকার তা'ওয়ীল ছাড়াই সাব্যস্ত করেছেন। যেমন, চেহারা, চোখ। (২/৮১, ১১৪, ১১৮)। আরও বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, আমার লেখা গ্রন্থ, "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন"। শিরোনাম: বাইহাক্বীর বক্তব্য। আরও দেখুন, আমার উস্তাদজী ড. আহমাদ আতিয়্যাহ আল-গামেদী রাহিমাহুল্লাহ'র লেখা গ্রন্থ 'বাইহাকী ওয়া মাওকিফুহু মিনাল ইলাহিয়াত', আর ড. আব্দুর রহমান সালেহ আলে মাহমূদ এর 'মাওকিফু ইবন তাইমিয়্যাহ মিনাল আশা'য়িরাহ' গ্রন্থটি।
৮৮৩. আল্লাহর সত্তাগত গুণাবলিকে 'জারেহাহ' বা অঙ্গ বলা যাবে কি না এ ব্যাপারে পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। আর এটিও বর্ণনা করা হয়েছে যে, শব্দটি মুজমাল বা ব্যাখ্যাসাপেক্ষ্য শব্দ। কখনও কখনও বাইহাক্বী এটা ব্যবহার করে হক্ককে অস্বীকার করেছেন। যেমন তিনি আঙ্গুল, পিণ্ডলী ও পায়ের ব্যাপারে 'জারেহা' বা অঙ্গের দোহাই দিয়ে তা অস্বীকার করার জন্য খাত্তাবী ও অন্যান্যদের বক্তব্য নিয়ে এসেছেন। তবে কখনও কখনও তিনি 'জারেহা' বা অঙ্গ না বলে আল্লাহর অনুরূপ সত্তাগত গুণাবলি কোনো প্রকার তা'ওয়ীল ব্যতীতই সাব্যস্ত করেছেন। যেমন দু'হাত, চেহারা ও চোখ। বস্তুত তার সমস্যা ছিল তার উস্তাদ ইবন ফুওরাক দ্বারা প্রভাবিত হওয়া; না হয় তিনি অন্যান্য মুহাদ্দিসগণের মতই সকল সিফাত সাব্যস্ত করতেন বলে আমাদের বিশ্বাস।
৮৮৪. বুখারী, আল-জামেউস সহীহ, হাদীস নং ৩৩৪০, ৪৭১২; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ১৯৪, আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে। আর বুখারী অন্যত্রও তা সংকলন করেছেন, আনাস ইবন মালিক রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে, হাদীস নং ৭৫১৬।
৮৮৫. এর তাখরীজ পূর্বে চলে গেছে।
৮৮৬. মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ১৮৯।
৮৮৭. অর্থাৎ দুনিয়ার যমীন।
৮৮৮. বুখারী, আল-জামেউস সহীহ, হাদীস নং ৬৫২০; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২৭৯২। যমীন রুটি হওয়ার বিষয়ে বেশ কিছু আছারও আমরা দেখতে পাই। যেমন, ১- ইমাম ইবন জারীর আত-তাবারী তার তাফসীরে (১৭/৪৯), সা'ঈদ ইবন জুবাইর রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি আল্লাহর বাণী "যেদিন এ যমীন পরিবর্তিত হয়ে অন্য যমীন হবে এবং আসমানসমূহও; আর মানুষ উন্মুক্তভাবে উপস্থিত হবে এক, একচ্ছত্র অধিপতি আল্লাহর সামনে।” [সূরা ইবরাহীম: ৪৮] এর তাফসীরে বলেন, 'যমীনকে সাদা-শুভ্র একটি রুটিতে পরিণত করা হবে। ঈমানদার তার পায়ের নিচ থেকে তা খাবে।' ২- অনুরূপ ইমাম তাবারী আরও সংকলন করেন মুহাম্মাদ ইবন কা'ব আল-কুরাযী অথবা মুহাম্মাদ ইবন ক্বাইস থেকে, তিনি উপরোক্ত সূরা ইবরাহীম এর ৪৮ নং আয়াতের তাফসীরে বলেন, 'একটি রুটি হবে, মুমিনগণ যা তাদের পায়ের নিচ থেকে খাবে'। ৩- তাদের মত বক্তব্য আরও বর্ণিত হয়েছে আবু জা'ফর মুহাম্মাদ ইবন আলী ইবন বাক্কের থেকেও। দেখুন, আস-সাম'আনী, আত-তাফসীর (৩/১২৫); বাগাওয়ী, আত-তাফসীর (৪/৩৬২); ইবন কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম (৪/৫২১); কুরতুবী, আল-জামে'উ লি আহকামিল কুরআন (৯/৩৮৪)। ৪- অনুরূপ বর্ণনা ইমাম বাইহাকীর কাছে ইকরিমাহ রাহিমাহুল্লাহ থেকেও এসেছে। তবে তার সনদ দুর্বল। দেখুন, ইবন হাজার, ফাতহুল বারী (১১/৩৭৩)।
৮৮৯. বুখারী, আল-জামেউস সহীহ, হাদীস নং ৪৮২৬, ৭৫৯১। তার শব্দ হচ্ছে, 'বনী আদম আমাকে কষ্ট দেয়, সে কালকে গালি দেয়, অথচ আমি কাল, আমার কাছেই সকল কিছুর চাবিকাঠি, আমিই রাত- দিন পরিবর্তন করি।'
৮৯০. বুখারী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ৩৩৪৫, ৩৩৪৮, ৬৫৩০, ৭৫১৮; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২২২। আবু সা'ঈদ আল-খুদরী রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুর বর্ণনায়, অনুরূপ মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ৭৭1।
৮৯১. বস্তুত তা অনেক হাদীসেই এসেছে, উদাহরণত: ইমাম বুখারী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ৬৬৪, ১৯০৪; ইমাম মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ১১৫১, যা আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু কর্তৃক বর্ণিত হাদীস। অনুরূপ বুখারী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ২৬১৫; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২৪৬৯। যা আনাস ইবন মালিক রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু বর্ণিত হাদীস।
৮৯২. মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২৭৫৯, যা আবু মূসা আল-আশ'আরী রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু বর্ণিত হাদীস।
৮৯৩. মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ১৮২৭, যা আব্দুল্লাহ ইবন 'আমর রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু বর্ণিত হাদীস।
৮৯৪. আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আত এ ব্যাপারে একমত যে, আল্লাহ তা'আলার দু'টি হাত রয়েছে। আর তাঁর এক হাতকে 'ইয়ামীন' বা ডান বা বরকতময় বলা হবে। যেমন, কুরআনে কারীমে আল্লাহ তা'আলা বলেন, "আর আসমানসমূহ তার ডান হাতে পেঁছানো থাকবে।" [সূরা আয-যুমার: ৬৭] অনুরূপ একাধিক হাদীসে 'ইয়ামীন' এসেছে। তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, যা ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এ ফতোয়ায় বর্ণনা করেছেন। তাঁর অপর হাতকে কোনো কোনো হাদীসে 'শামাল' নামকরণ করা হয়েছে। যেমন মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২৭৮৮, ইবন 'উমার রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে বর্ণিত। আবার কোনো কোনো বর্ণনায় 'ইয়াসার' এসেছে। যেমন, আব্দুল্লাহ ইবন ইমাম আহমাদ, আস-সুন্নাহ, হাদীস নং ১০৫৯; বাযযার, কাশফুল আসতার, হাদীস নং ২১৪৪, আবুদ দারদা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু বর্ণিত হাদীস। আবার মুসনাদে আহমাদের এর বর্ণনায় এসেছে, 'কাতিফাহুল ইউসরা' এসেছে। হাদীস নং ২৭৪৮৮। হাদীসটিকে শাইখ আল-আলবানী রাহিমাহুল্লাহ সহীহ বলেছেন। আস-সহীহাহ, হাদীস নং ৪৯। এখানে হাদীসের ভাষ্য, 'আর তাঁর উভয় হাতই ডান' এর অর্থ সম্পর্কে দু'টি মত রয়েছে: এক. অপর হাতটি অবশ্যই বাম হাত বলা হবে, তবে হাদীসে অপর হাদীসে ইয়ামীন বলার অর্থ, ১- বরকতময় বুঝানো। কারণ আল্লাহর প্রতিটি হাতেই কল্যাণ ও বরকত রয়েছে, যাতে করে কেউ ডানের বিপরীতে অন্য হাতে বরকত নেই মনে না করে। দেখুন, ইবন কুতাইবাহ, তা'ওয়ীলু মুখতালাফুল হাদীস, পৃ. ১৪২; ইবনুল আসীর, আন-নিহায়াহ ফী গারীবিল হাদীস (২/৩৪৫-৩৪৬); ইবন মানযূর, লিসানুল 'আরাব (১৩/৪৫৯)। ২- কারও কারও মতে, এটি আদব রক্ষার্থে বলা হয়েছে। কারণ আমাদের মাঝে বাম হাত দুর্বল থাকে বা অমর্যাদাপূর্ণ বুঝায়। তাই সেটা থেকে মুক্ত রাখার জন্য বলা হয়েছে, উভয় হাতই ইয়ামীন। এ মতটিই গ্রহণ করেছেন, উসমান ইবন সা'ঈদ আদ-দারেমী রাহিমাহুল্লাহ। দেখুন, আর-রাদ্দু আলাল বিশর আল-মিররীসী (২/৬৯৮); কাযী আৰু ইয়া'লা, ইবত্বালুত তা'ওয়ীলাত, পৃ. ১৭৬। দুই. কোনো কোনো আলেম প্রাধান্য দেয়ার নীতি অবলম্বন করে অপর হাতটিকে শামাল বা ইউসরা বলতে রাযী হননি। তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন ইমাম আবু বকর ইবন খুযাইমাহ, কিতাবুত তাওহীদ (১/১০২, ১২৭); আবু বকর আল-বাইহাকী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (২/১৩৯); কুরতুবী, আল-মুফহিম (৭/৩৯২-৩৯৩)।
তবে প্রথম মতটি আমার কাছে বেশি প্রিয়। আমার প্রিয় শাইখ আব্দুল্লাহ গুনাইমান এ মতের পক্ষেই বলতেন।
এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, আল-গামেদী, আল-বাইহাক্বী ও মাওকিফুহু মিনাল ইলাহিয়াত, পৃ. ২৫৬; সুলাইমান আদ-দুবাইখী, আহাদীসুল আকীদাহ আল্লাতী ইউহিমু যাহেরুহাত তা'আরুদ্ব ফিস সাহীহাইন, পৃ. ২৮০।
৮৯৫. মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২৭৮৮, যা আব্দুল্লাহ ইবন 'উমার রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুর বর্ণিত হাদীস।
৮৯৬. এখানে উপরে শব্দটি এসেছে, 'আল-কাসত্ব'। কিন্তু সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় তার শব্দ হচ্ছে 'আল-কাবদু'। আবার সহীহ বুখারীর এক স্থানে এসেছে, 'আল-ফাইদু' আও আল-ক্বাবন্ধু' এভাবে সন্দেহের সাথে। যদি 'আল-ক্বাবন্ধু' হয় তখন অর্থ হবে রূহ হরণ করা। আর যদি 'আল- ফায়দু' হয় তখন অর্থ হবে প্রশস্ত রিযিক। তবে 'আল-ফায়ছু' শব্দের চেয়ে 'আল-কাবন্ধু' শব্দটি বেশি বিখ্যাত। দেখুন, ইবন হাজার, ফাতহুল বারী (১৩/৩৯৫)।
৮৯৭. সহীহ বুখারীর আরেক বর্ণনায় এসেছে, 'তার হাতে মীযান বা ওজনের পাল্লা, তিনি সেটাকে নিচু করেন ও উপরে উঠান। দেখুন, হাদীস নং ৪৬৮৪। আবার অপর বর্ণনায় এসেছে, 'আর তার অপর হাতে মীযান বা ওজনের পাল্লা, তিনি নিচু করেন ও উপরে উঠান। দেখুন, হাদীস নং ৭৪১১। এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলা হয়, রিযিক নির্ধারণ করা, যার জন্য ইচ্ছা তার রিযিক সংকুচিত করেন, আর যার জন্য ইচ্ছা তা প্রশস্ত করেন। কখনও কখনও এ দু'টি দ্বারা উদ্দেশ্য নেয়া যেতে পারে যাবতীয় তাক্বদীর নিয়ন্ত্রণ, সৃষ্টি, সম্মান, মর্যাদা, অসম্মান ইত্যাদি। দেখুন, নাওয়াওয়ী, শারহু মুসলিম (৭/৮১)।
৮৯৮. বুখারী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ৭৪১১, ৭৪১৯; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ৯৯৩।
৮৯৯. তিরমিযী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ৩৩৬৮; ইবন হিব্বান, আস-সহীহ, হাদীস নং ৬১৬৭; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক (১/১৩২); বাইহাকী, আল-কুবরা (১০/১৪৭), যা আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু বর্ণিত হাদীস। তিরমিযী বলেন, এ হাদীসটি উক্ত দিক দিয়ে হাসানুন গারীব। তবে তা একাধিক সূত্রে আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে এসেছে। হাদীসটিকে শাইখ আবু আব্দির রহমান মুহাম্মাদ নাসেরউদ্দীন আলবানী সহীহ বলেছেন। দেখুন, সহীহুল জামে', হাদীস নং ৫২০৯; মিশকাত, হাদীস নং ৪৬৬২।
৯০০. মালেক, মুওয়াত্তা (২/৯৮); আহমাদ, আল-মুসনাদ, হাদীস নং ৩১১; আবু দাউদ, আস-সুনান, হাদীস নং ৪৭০৩; তিরমিযী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ৩০৭৫; নাসায়ী, আল-কুবরা, হাদীস নং ১১১৯০; ইবন হিব্বান, আস-সহীহ, হাদীস নং ৬১৬৬; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক (১/৮০), (২/৩৫৪, ৫৯৩)। তবে এর সনদ দুর্বল। ইবন আব্দুল বার, আত-তামহীদ (৬/৩); আলবানী, আস-সিলসিলাহ আদ-দ্ব'য়ীফাহ, নং ৩০৭১।
৯০২. বাইহাক্বী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত ২/৪৩-৬২, ১৫০।
৯০৩. অর্থাৎ বাইহাক্বী অনেক জায়গাতেই কালামশাস্ত্রবিদদের নীতি পাশ কাটিয়ে আল্লাহর বেশ কিছু গুণাবলি কোনো প্রকার তা'ওয়ীল ব্যতীতই সাব্যস্ত নন্দিত কাজ করেছেন। কিন্তু তিনি কোথাও কোথাও নিন্দিত তা'ওয়ীল নীতিটি অবলম্বন করেছেন। আবার কখন কখনও এসব সিফাতের অর্থ তাফওয়ীদ্ব বা অর্থ না করার নিন্দিত নীতিও অবলম্বন করেছেন। সর্বদা নন্দিত সঠিক পথটিতে থাকতে সমর্থ হননি। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে দেখুন, আমার উস্তাদজী ড. আহমাদ আতিয়্যাহ আল-গামেদী রাহিমাহুল্লাহর এর আল-বাইহাকী ও মাওকাফুহু মিনাল ইলাহিয়াত গ্রন্থটি। আরও দেখুন, ড. আহমাদ আল-কাযী এর মাযহাবু আহলিত তাফওয়ীদ্ব গ্রন্থটির পৃ. ২১১-২১৬। আরও দেখা যেতে পারে, আমার গ্রন্থ "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন" এর বাইহাকীর বক্তব্য。
তার যুগে ছিলেন হাফেয আবু বকর আল-বাইহাক্বী। যদিও তিনি আবুল হাসান আশ'আরীর কালামপন্থী ছাত্রদেরকেই অভিভাবক হিসেবে নিয়েছেন আর তিনি তাদের পক্ষে কথা বলে তাদের প্রতিরোধ করেছেন। তিনি স্বীয় "আল-আসমা ওয়াস সিফাত" (১৮৮২) কিতাবে বলেন, "অধ্যায়: দু'হাত সিফাত হিসেবে সাব্যস্ত করা, অঙ্গ(৮৮০) হিসেবে নয়।” যেহেতু এ ব্যাপারে সত্যবাদী সংবাদ দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন: يَتَإِبْلِيسُ مَا مَنَعَكَ أَن تَسْجُدَ لِمَا خَلَقْتُ بِيَدَى﴾ [ص: ٧٥] "হে ইবলীস! আমি যাকে আমার দু'হাতে সৃষ্টি করেছি, তার প্রতি সাজদাবনত হতে তোমাকে কিসে বাধা দিল?" [সূরা স্বদ: ৭৫] তিনি অন্যত্র বলেন, ﴿بَلْ يَدَاهُ مَبْسُوطَتَانِ} [المائدة: ٦٤] “বরং আল্লাহর উভয় হাতই প্রসারিত।" [সূরা আল-মায়েদাহ: ৬৪]
এবং এ প্রসঙ্গে বিশুদ্ধ হাদীসে যা বর্ণিত হয়েছে। যেমন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বক্তব্য, যা শাফা'আত সংক্রান্ত একাধিক হাদীসে এসেছে, يا آدم أنت أبو البشر خلقك [الله] بيده "হে আদম! আপনি মানুষের পিতা, আল্লাহ নিজ হাতে আপনাকে সৃষ্টি করেছেন।"(১৮৮৪)
অনুরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী, যা বুখারী ও মুসলিমে এসেছে, أنت موسى اصطفاك الله بكلامه، وخط لك الألواح بيده "আপনি হচ্ছেন সেই মূসা, যাকে আল্লাহ স্বীয় কথা বলার জন্য মনোনীত করেছেন, আপনার জন্য নিজ হাতে তখতাসমূহ লিখেছেন।”
অন্য বর্ণনায় : «وكتب لك التوراة بيده» "আপনার জন্য তিনি নিজ হাতে তাওরাত লিখেছেন।”(৮৮৫)
অনুরূপ যা সহীহ মুসলিমে এসেছে যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা "وغرس كرامة أوليائه في جنة عدن بيده "স্বীয় হাতে জান্নাতে আদনে তার বন্ধুদের সম্মান গেঁথে দিয়েছেন”(৮৮৬)
অনুরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী تكون الأرض يوم القيامة خُبْزَة واحدة يتكفاها الجبار بيده، كما يتكفى أحدكم خبزته في السفر، نُزُلًا لأهل الجنة» যমীন (৮৮৭) একটি রুটি হবে, মহা শক্তিধর আল্লাহ তাকে ঘুরাবেন, যেমন তোমাদের কেউ স্বীয় দস্তরখানে অথবা সফরে রুটি হাতে ঘুরিয়ে বানিয়ে নেয়, জান্নাতীদের মেহমানদারীর জন্য।"(৮৮৮)
তিনি আরও কিছু হাদীসে উল্লেখ করেন, যেমন: بيدي الأمر« "আমার হাতে সমস্ত কিছু”।(৮৮৯) এবং والخير بيديك« "সকল কল্যাণ আপনার দু' হাতে”(৮৯০) «إن الله يبسط يده بالليل ليتوب مسيء النهار، ويبسط يده بالنهار ليتوب مسيء الليل» অনুরূপ «والذي نفس محمد بيده "এবং যাঁর হাতে মুহাম্মদের প্রাণ।” (৮৯১) আল্লাহ স্বীয় হাত রাতের বেলায় প্রসারিত করে দেন যাতে দিনের অপরাধীরা তাওবা করতে পারে।” (৮৯২)
«المقسطون عند الله على منابر من نور عن يمين الرحمن وكلتا يديه يمين» রহমানের ডানপাশে নূরের মিম্বারের উপর থাকবে, আর তার উভয় হাতই ডান(৮৯৩)।”(৮৯৪) অনুরূপ রাসূলের বাণী,
﴿يَطْوِي اللَّهُ السَّمَاوَاتِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ثُمَّ يَأْخُذُهُنَّ بِيَدِهِ الْيُمْنَى ثُمَّ يَقُولُ: أَنَا الْمَلِكُ، أَيْنَ الْجَبَّارُونَ؟ أَيْنَ الْمُتَكَبِّرُونَ؟ ثُمَّ يَطْوِي الْأَرَضِينَ بِشِمَالِهِ، ثُمَّ يَقُولُ: أَنَا الْمَلِكُ، أَيْنَ الْجَبَّارُونَ؟ أَيْنَ الْمُتَكَبِّرُونَ؟﴾
“কিয়ামতের দিন আল্লাহ আসমানসমূহকে ভাঁজ করে ডান হাতে ধরে রাখবেন। অতঃপর বলবেন, আমিই রাজাধিরাজ, কোথাও জবরদস্তিকারীরা? কোথায় অহংকারীরা। তারপর তিনি যমীনগুলোকে ভাঁজ করে বাম হাতে রেখে বলবেন, আমিই রাজাধিরাজ, কোথায় জবরদস্তিকারীরা? কোথায় অহংকারীরা?” (৮৯৫)
আর তাঁর বাণী,
﴿يَمِينُ اللَّهِ مَلْأَى لَا يَغِيضُهَا نَفَقَةٌ، سَحَّاءُ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ، أَرَأَيْتُمْ مَا أَنْفَقَ مُنْذُ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ، فَإِنَّهُ لَمْ يَغِضْ مَا فِي يَمِينِهِ، وَعَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ، وَبِيَدِهِ الْأُخْرَى الْقَبْضُ يَخْفِضُ وَيَرْفَعُ
“আল্লাহর ডান হাত পরিপূর্ণ, খরচের কারণে কমতি হয় না, রাত-দিন অনবরত ঢেলে খরচকারী, তোমরা কি দেখনি আসমান ও যমীন সৃষ্টির পর থেকে তিনি যা খরচ করে আসছেন তা তার ডান হাতে যা আছে তা থেকে একটুও কমায়নি এবং তার ‘আরশ পানির উপরে। আর তার অপর হাতে পাল্লা(৮৯৬), যা নিচু করেন এবং উঁচু করেন (৮১৭)।”(৮৯৮) এসব হাদীসের সবই সহীহ গ্রন্থসমূহে বর্ণিত।
এরপর তিনি [বাইহাকী] আরও উল্লেখ করেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী, إن الله لما خلق آدم، قال له ويداه مقبوضتان اختر أيهما شئت. قال: اخترت يمين ربي، وكلتا يدي ربي يمين مباركة "আল্লাহ তা'আলা আদমকে সৃষ্টি করে বললেন, যখন আল্লাহর দুহাত মুষ্টিবদ্ধ ছিল, যেটি ইচ্ছে বাছাই কর। আদম বললেন, আমি প্রভুর ডান হাত বাছাই করলাম। আর আমার প্রভুর উভয় হাত ডান, বরকতময়।”(৮৯৯)
অনুরূপ অপর হাদীস, إن الله لما خلق آدم مسح على ظهره بیده "আল্লাহ আদমকে সৃষ্টি করে তার পিঠে নিজের হাত দিয়ে মুছে নেন।”(১০০)
তাছাড়া এ প্রকারের আরও অনেক হাদীস তিনি উল্লেখ করেন। অতঃপর বাইহাক্বী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তবে উম্মতের পূর্ববর্তী আলেমগণ উপরে বর্ণিত আয়াত ও হাদীস যা আমরা লিখেছি তার কোনো ব্যাখ্যা করেননি। আর তিনি 'আরশের উপর উঠা ও অন্যান্য সিফাতে খাবারিয়্যাহ বা কুরআন ও হাদীসের সংবাদের মাধ্যমে প্রাপ্ত সিফাতসমূহের ব্যাপারেও অনুরূপ কথাই বলেছেন। (৯০১) অথচ তিনি পরবর্তী কোনো কোনো আলেমের কথাও বর্ণনা করেছেন। (৯০২)
টিকাঃ
৮৮১, তিনি হচ্ছেন আবুল হাসান আলী ইবন ইসমা'ঈল ইবন আবি বিশর ইবন সালেম আল-আশ'আরী। তার কুনিয়াত আবুল হাসান নামেই প্রসিদ্ধ। তার বংশলতিকা আবু মূসা আল-আশ'আরী রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুর কাছে গিয়ে শেষ হয়। তার পিতা ইসমা'ঈল হাদীস ও সুন্নাহ'র অনুসারী ও হাদীসবেত্তা ছিলেন। কারণ তিনি তার মৃত্যুর সময় তার ছেলেকে দেখার জন্য প্রখ্যাত মুহাদ্দিস যাকারিয়্যাহ ইবন ইয়াহইয়া আস-সাজীর দায়িত্বে প্রদান করেন। তবে আশ'আরী রাহিমাহুল্লাহ মুহাদ্দিসদের থেকে হাদীস বর্ণনায় প্রসিদ্ধি লাভ করেননি। সামান্য কিছু বর্ণনা দেখা যায় যা তিনি তার তাফসীরে কোনো কোনো শাইখ থেকে বর্ণনা করেছেন। ইমাম আশ'আরী প্রচুর গ্রন্থ প্রণয়ন করেন; বলা হয়ে থাকে, যার পরিমাণ পঞ্চান্নটির মতো। যেমনটি ইমাম ইবন হাযম উল্লেখ করেছেন। আবার কারও কারও মতে তার গ্রন্থের সংখ্যা তিনশত আশিটির মত। দেখুন, তাজউদ্দীন আস-সুবুকী, ত্বাবাক্বাতুশ শাফে'ঈয়্যাহ আল-কুবরা (৩/৩৫৯)।
তার সম্পর্কে ইমাম যাহাবী বলেন, আবুল হাসান এর ছিল অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা, ইলমের ক্ষেত্রে তার ছিল সামুদ্রিক গভীরতা। তার অনেক ভালো কাজ ও উত্তম গ্রন্থ রয়েছে, যা তার ইলমের প্রশস্ততার প্রমাণ দেয়।
তার জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যাপারে এটা সর্বজন স্বীকৃত যে, ইমাম আশ'আরী প্রথম জীবনে মু'তাযিলাদের মতের ওপর বড় হয়ে উঠেন। জীবনের একটি বিরাট সময় তাদের মাঝেই কাটান। সেখানে তিনি তার মায়ের স্বামী আবু আলী আল-জুব্বাঈ এর শিষ্যত্ব বরণ করেন, যিনি তৎকালীন সমাজের বড় মু'তাযিলী ছিলেন। ইবন 'আসাকির প্রমুখ লিখেছেন যে, তিনি মু'তাযিলাদের মতবাদের ওপর চল্লিশ বছর বা তার কাছাকাছি সময় কাটিয়েছিলেন। তখন তিনি তাদের মতবাদের জ্ঞানে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন যে, তিনি তাতে গ্রন্থও রচনা করতে সমর্থ হয়েছিলেন। দেখুন, ইবন আসাকির, তাবয়ীনু কাযিবিল মুফতারী, পৃ. ১৩১।
তারপর তিনি সবার সামনে মু'তাযিলাদের মতবাদ থেকে ফিরে আসার ঘোষণা প্রদান করেন। আরও জানিয়ে দেন যে, তিনি তার পূর্ববর্তী সকল মতামত থেকে প্রত্যাবর্তন করলেন।
আবু বকর আস-সাইরাফী বলেন, মু'তাযিলারা তাদের মাথা উঁচু করেছিল, অবশেষে আল্লাহ তা'আলা আবুল হাসান আল-আশ'আরীর প্রাদুর্ভাব ঘটালেন ফলে তিনি তাদেরকে পরাস্ত করলেন। মু'তাযিলা মতবাদ পরিত্যাগের পর তার জীবনের বাঁক নির্ধারণে আলেমগণ মতভেদ করেছেন, সেটি কি একটি নাকি দু'টি।
কারও কারও মতে, মু'তাযিলা মতবাদ ত্যাগের পর তিনি দু'টি স্তর অতিক্রম করেছেন। তারা আবার দু' মতে বিভক্ত: ক. আশ'আরী রাহিমাহুল্লাহ মু'তাযিলা মতবাদ ত্যাগ করার পর ইবন কুল্লাবের মতের দিকে প্রত্যাবর্তন করেন, তারপর সালাফে সালেহীনের মতের দিকে প্রত্যাবর্তন করেন, যা ইবন কাসীর রাহিমাহুল্লাহ'র একটি বক্তব্য দ্বারা সমর্থিত। খ. আশ'আরী রাহিমাহুল্লাহ মু'তাযিলা মতবাদ ত্যাগ করার পর সালাফে সালেহীনের মতের দিকে প্রত্যাবর্তন করেন। তারপর তিনি সালাফ ও মুতাকাল্লিমদের মতামতের মাঝামাঝিতে অবস্থান করেন। এটি আশ'আরী মতবাদের লোকদের দাবি, বিশেষ করে যাহিদ কাউসারী ও তার মতো সীমালঙ্ঘনকারীদের বক্তব্য।
তবে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, "আর আবুল হাসান আল-আশ'আরী যখন তিনি মু'তাযিলাদের মতবাদ থেকে ফিরে আসলেন, তখন তিনি ইবন কুল্যাবের মত গ্রহণ করলেন, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল হাদীসের মতের দিকে ঝুঁকলেন, ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বলের দিকে নিজেকে সম্পৃক্ত করলেন, যেমনটি তিনি তার সকল গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, যেমন: আল-ইবানাহ, আল-মুওজায ও মাক্কালাত প্রভৃতি..সে সময় তিনি আহলুস সুন্নাহ ও হাদীসের সাথে যেমন চলেছেন তেমনি তার মাঝে কালামশাস্ত্রবিদদের বেশ কিছু মতামতও তেমনি অবশিষ্ট ছিল...।"
অন্যত্র তিনি বলেন, 'আর আশ'আরী ও তার মত অন্যান্যরা তারা সালাফে সালেহীন ও জাহমিয়্যাহদের মাঝখানে বারযাখে তথা ব্যবধানে অবস্থান করতে থাকলেন, তারা এদের থেকে বিশুদ্ধ কথা যেমন গ্রহণ করতেন, তেমনি আবার ওদের থেকে আক্বলী মূলনীতিও গ্রহণ করতেন, যা তারা বিশুদ্ধ মনে করতেন, অথচ তা ছিল বিনষ্ট। তাই মানুষের মাঝে অনেককেই দেখা যায় তার মাঝে থাকা সালাফী নীতির কারণে তাঁর দিকে ঝুঁকে যেতে, আবার আরেক গোষ্ঠীকে দেখা যায় তার কাছে থাকা বিদ'আতী ও জাহমী নীতির কারণে তার দিকে ঝুঁকে যেতে, যেমন আবুল মা'আলী ও তার অনুসারীরা।
ড. আব্দুর রহমান সালেহ আলে মাহমূদ ইমাম আবুল হাসান আল-আশ'আরীর ব্যক্তিত্ব নিয়ে বিস্তারিত স্টাডি করেছেন, যা ১৬২ পৃষ্ঠা ব্যাপী। যাতে তিনি এ সিদ্ধান্তের উপনীত হয়েছেন যে, তিনি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের মতামতের অনেক নিকটবর্তী হয়েছিলেন। তবে তাঁর কাছে শেষ পর্যন্তও ইবন কুল্লাবের মতবাদের বেশ কিছু নীতি অবশিষ্ট ছিল।
ইমাম যাহাবী বলেন, আমি আকীদাহ'র বিষয়ে আবুল হাসানের চারটি গ্রন্থ দেখেছি, যাতে তিনি আল্লাহর গুণাবলির ব্যাপারে সালাফে সালেহীনের নীতি বর্ণনা করেছেন। তাতে তিনি যা বলেছেন তন্মধ্যে রয়েছে, "এ গুণাবলি সংক্রান্ত আয়াত ও হাদীসগুলো যেভাবে এসেছে সেভাবে চালিয়ে নেয়া হবে।" তারপর তিনি বলেন, আর আমিও তা বলি, এটাকে দীন হিসেবে গ্রহণ করি, কোনো প্রকার তা'ওয়ীল এর আশ্রয় গ্রহণ করা হবে না।
ইমাম আশ'আরীর জন্ম হয়েছিল হিজরী ২৬০ সালে, আর মৃত্যু হয়েছিল হিজরী ৩২০ সালে অথবা ৩২৪ সালে।
তার অনেক গ্রন্থাবলির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, 'মাকালাতুল ইসলামিয়্যীন ওয়া ইখতিলাফুল মুসাল্লীন', আল-লুমা' ফির রাদ্দি আলা আহলিয যাইগে ওয়াল বিদা', রিসালাতুন ইলা আহলিস সাগার, আল-ইবানাহ 'আন উসূলিদ দিয়ানাহ, আর-রুইয়াতু বিল আবসার, আন-নাক্কছু আলাল জুব্বাঈ ইত্যাদি। দেখুন, খত্নীবে বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ (১১/৩৪৬); ইবনু খাল্লিকান, ওফায়াতুল আ'ইয়ান (৩/২৮৪); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৫/৮৫); ইবনুল 'ইমাদ, শাযরাতুয যাহাব (২/৩০৩); ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আকলি ওয়ান নাকলি (২/১৬); মাজমু' ফাতাওয়া (১৬/৪৭১); আব্দুর রহমান সালেহ আলে মাহমূদ, মাওকাফু ইবন তাইমিয়্যাহ মিনাল আশায়েরাহ (১/৩৬৩); আরও দেখুন, ইবন আসাকির, তাবয়ীনু কাযিবিল মুফতারী।
৮৮২. ইমাম বাইহাক্বী রাহিমাহুল্লাহ এর 'আল-আসমা ওয়াস সিফাত' গ্রন্থটি অনেকবার মুদ্রিত হয়েছে। তন্মধ্যে কোনো কোনোটি এক খণ্ডে প্রকাশিত, যা মুহাম্মাদ যাহেদ আল-কাউসারীর টীকা ও তত্ত্বাবধানে বের হয়েছে, দারু এহইয়াউত তুরাসিল আরাবী থেকে যা ইবারত বিকৃতি, অপব্যাখ্যা, সালাফী আলেমদের প্রতি কটাক্ষ ও গালি-গালাজে ভর্তি।
আবার কোনো কোনোটি দু' খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে, যা ইমাদুদ্দীন আহমাদ হায়দার এর তাহক্কীকে, প্রথম সংস্করণ, ১৪০৫ হিজরী, দারুল কিতাবিল আরাবী থেকে। তবে এটাতে মুহাম্মাদ যাহেদ আল-কাউসারীর পদাঙ্ক অনুসরণ করা হয়েছে।
উপরের দু'টি ছাপাতেই ইচ্ছাকৃতভাবে সালাফদের বক্তব্যকে বিকৃত করা হয়েছে। যেমন, ইমাম মালেকের বক্তব্যকে বিকৃত করা হয়েছে। প্রচুর পরিমাণ ফাসিদ তা'ওয়ীলের আশ্রয় নেয়া হয়েছে। সালাফে সালেহীন ইমামদের গালি-গালাজ করা হয়েছে। আর কাউসারীর অধিকাংশ টীকা ছিল অনেক মাসআলায় ইমাম বাইহাক্বীর উদ্দেশ্যের বিপরীত। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানার জন্য দেখা যেতে পারে, গবেষক আলী আল-ফুহাইদ কর্তৃক রচিত যাহেদ কাউসারী ওয়া আরাউহুল ই'ভিক্কাদিয়্যাহ, পৃ. ৭৯।
সর্বশেষ তাহক্বীক বের হয়েছে আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ আল-হাশেদী এর মাধ্যমে, দু' খণ্ডে যা মাকতাবাতুস সাওয়াদী বি জিদ্দাহ থেকে ছাপা হয়েছে। এটিই উত্তম তাহক্বীক।
ইমাম বাইহাক্বীর এ গ্রন্থটির প্রশংসা করেছেন অনেকে আলেমই। যেমন ইমাম যাহাৰী যখন বাইহাক্বীর জীবনী আলোচনা করেন তখন তিনি এ কিতাবটির ব্যাপারে বলেন, "তিনি এমন সব কিতাব রচনা করেছেন যার মতো কেউ রচনা করেনি, তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, আল-আসমা ওয়াস সিফাত, যা দু'টি খণ্ডে রচিত।" ইমাম যাহাবী, তাযকিরাতুল হুফফায (৩/১১৩২)।
তাছাড়া ইমাম বাইহাক্বীর এর গ্রন্থটি পরবর্তী আশ'আরী মতবাদের লোকদের কাছেও মর্যাদাপূর্ণ ও জনপ্রিয়। যেমন তাদের গ্রন্থকার তাজুদ্দীন আস-সুবুকী বলেন, 'আর তার কিতাব 'আল-আসমা ওয়াস সিফাত' আমি সেটার কোনো নযীর দেখতে পাই না।' তাজউদ্দীন আস-সুবুকী, ত্বাবাক্বাতুশ শাফে'ঈয়্যাহ আল-কুবরা (৪/৯)। তাদেরই আরেকজন বদরুদ্দীন ইবন জামা'আহ বলেন, 'এ কিতাবটি জামে' ও মানে' অর্থাৎ স্বয়ংসম্পূর্ণ ও অন্য কিছুর প্রয়োজনীয়তা হ্রাস করে।' ঈদ্বাহুদ দলীল ফী কাত'য়ি হুজাজি আহলিত তা'ত্বীল, পৃ. ৭১।
এ গ্রন্থে বাইহাক্বীর নিয়ম হচ্ছে, তিনি সনদসহ হাদীস ও আছার সংকলন করে নিয়ে আসেন। সেগুলোকে তার বক্তাদের পর্যন্ত সনদসহ পৌঁছে দিতেন। সাথে কিছু আয়াতও আনয়ন করেন যা দিয়ে তিনি যা এনেছেন তার সপক্ষে দলীল পেশ করেন। তারপর এসব ভাষ্যের ফিকহ, অর্থ ও উদ্দেশ্যের ব্যাপারে আলেমগণের অনেক বক্তব্য উদ্ধৃত করতেন। বিশেষ করে আশ'আরী আলেমদের বক্তব্য। এ কিতাবটি যারাই পড়বে তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ধরা দিবে যে তিনি তার উস্তাদ ইবন ফুওরাক দ্বারা সবিশেষ প্রভাবিত। কারণ তিনি কিতাবটি রচনাই করেছেন তার উস্তাদ আবু মানসূর মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আল-উসূলীর নির্দেশে। যাতে তা দ্বারা আশ'আরী মতবাদের খেদমত করা যায়, যেমনটি বাইহাক্বী স্বয়ং বর্ণনা করেছেন তার এ কিতাবের ভূমিকায় (২/৬০)।
তিনি কিতাবটিকে বিভিন্ন অধ্যায়ে বিন্যাস করেন। যার শুরুটি ছিল, 'ইসবাতু আসমায়িল্লাহি তা'আলা যিকরুহু বিদালালাতিল কিতাবি ওয়াস সুন্নাতি ওয়া ইজমা'য়িল উম্মাতি' আর সর্বশেষটি ছিল, বাবু ই'আদাতুল খালকি।
তার নিয়ম হচ্ছে, তিনি কোনো অধ্যায়ে আয়াত ও হাদীস আনার পরে তার কোনো কোনোটির ব্যাপারে ব্যাপক কথা বলতেন, এর মাধ্যমে তিনি হাদীসের খেদমত থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে হাদীসের তা'ওয়ীল করার মাধ্যমে আকীদাহ'র অধ্যায়সমূহে মুহাদ্দিসগণের ধারার বিপরীতে তা'ওয়ীলী ধারার প্রচলন ঘটালেন। বরং শুধু নিজের আকীদাহ-বিশ্বাসের কারণে বহু হাদীসের অপব্যাখ্যা করেছেন। যেমন দেখুন, ২/২৯, ৫৭, ১৬৮, ১৯৪-১৯৫।
ইমাম বাইহাক্বী এ কিতাবটিতে প্রচুর পরিমাণে তার উস্তাদ আবু আব্দুল্লাহ আল-হুসাইন ইবন আল-হাসান আল-হালীমী আল-জুরজানী থেকে উদ্ধৃতি এনেছেন, যিনি মা ওয়ারা আন নাহর এর একজন। বড় কালামশাস্ত্রবিদ আশ'আরী আলেম ছিলেন। এমনকি এসব উদ্ধৃতি শত স্থানের উপরে হবে। তাছাড়া তিনি আরও অনেক আশ'আরী মতবাদের আলেমগণ থেকে উদ্ধৃতি এনেছেন যেমন, আবু ইসহাক আল-ইসফারায়িনী (১/২৯৩), আবু বকর ইবনুস সিবগী (১/৩২২), আবুল হাসান আত-তাবারী (২/১৭২, ২৮১, ৩০৮, ৪১২, ৪২১) প্রমুখ।
তবে ইমাম বাইহাক্বী সব জায়গায় তা'ওয়ীল বা অপব্যাখ্যা করেছেন তা নয়। অনেক জায়গায় তিনি পরবর্তী আশ'আরী মতবাদের লোকদের মতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। যেমন তিনি বেশ কিছু সিফাত কোনো প্রকার তা'ওয়ীল ছাড়াই সাব্যস্ত করেছেন। যেমন, চেহারা, চোখ। (২/৮১, ১১৪, ১১৮)। আরও বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, আমার লেখা গ্রন্থ, "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন"। শিরোনাম: বাইহাক্বীর বক্তব্য। আরও দেখুন, আমার উস্তাদজী ড. আহমাদ আতিয়্যাহ আল-গামেদী রাহিমাহুল্লাহ'র লেখা গ্রন্থ 'বাইহাকী ওয়া মাওকিফুহু মিনাল ইলাহিয়াত', আর ড. আব্দুর রহমান সালেহ আলে মাহমূদ এর 'মাওকিফু ইবন তাইমিয়্যাহ মিনাল আশা'য়িরাহ' গ্রন্থটি।
৮৮৩. আল্লাহর সত্তাগত গুণাবলিকে 'জারেহাহ' বা অঙ্গ বলা যাবে কি না এ ব্যাপারে পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। আর এটিও বর্ণনা করা হয়েছে যে, শব্দটি মুজমাল বা ব্যাখ্যাসাপেক্ষ্য শব্দ। কখনও কখনও বাইহাক্বী এটা ব্যবহার করে হক্ককে অস্বীকার করেছেন। যেমন তিনি আঙ্গুল, পিণ্ডলী ও পায়ের ব্যাপারে 'জারেহা' বা অঙ্গের দোহাই দিয়ে তা অস্বীকার করার জন্য খাত্তাবী ও অন্যান্যদের বক্তব্য নিয়ে এসেছেন। তবে কখনও কখনও তিনি 'জারেহা' বা অঙ্গ না বলে আল্লাহর অনুরূপ সত্তাগত গুণাবলি কোনো প্রকার তা'ওয়ীল ব্যতীতই সাব্যস্ত করেছেন। যেমন দু'হাত, চেহারা ও চোখ। বস্তুত তার সমস্যা ছিল তার উস্তাদ ইবন ফুওরাক দ্বারা প্রভাবিত হওয়া; না হয় তিনি অন্যান্য মুহাদ্দিসগণের মতই সকল সিফাত সাব্যস্ত করতেন বলে আমাদের বিশ্বাস।
৮৮৪. বুখারী, আল-জামেউস সহীহ, হাদীস নং ৩৩৪০, ৪৭১২; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ১৯৪, আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে। আর বুখারী অন্যত্রও তা সংকলন করেছেন, আনাস ইবন মালিক রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে, হাদীস নং ৭৫১৬।
৮৮৫. এর তাখরীজ পূর্বে চলে গেছে।
৮৮৬. মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ১৮৯।
৮৮৭. অর্থাৎ দুনিয়ার যমীন।
৮৮৮. বুখারী, আল-জামেউস সহীহ, হাদীস নং ৬৫২০; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২৭৯২। যমীন রুটি হওয়ার বিষয়ে বেশ কিছু আছারও আমরা দেখতে পাই। যেমন, ১- ইমাম ইবন জারীর আত-তাবারী তার তাফসীরে (১৭/৪৯), সা'ঈদ ইবন জুবাইর রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি আল্লাহর বাণী "যেদিন এ যমীন পরিবর্তিত হয়ে অন্য যমীন হবে এবং আসমানসমূহও; আর মানুষ উন্মুক্তভাবে উপস্থিত হবে এক, একচ্ছত্র অধিপতি আল্লাহর সামনে।” [সূরা ইবরাহীম: ৪৮] এর তাফসীরে বলেন, 'যমীনকে সাদা-শুভ্র একটি রুটিতে পরিণত করা হবে। ঈমানদার তার পায়ের নিচ থেকে তা খাবে।' ২- অনুরূপ ইমাম তাবারী আরও সংকলন করেন মুহাম্মাদ ইবন কা'ব আল-কুরাযী অথবা মুহাম্মাদ ইবন ক্বাইস থেকে, তিনি উপরোক্ত সূরা ইবরাহীম এর ৪৮ নং আয়াতের তাফসীরে বলেন, 'একটি রুটি হবে, মুমিনগণ যা তাদের পায়ের নিচ থেকে খাবে'। ৩- তাদের মত বক্তব্য আরও বর্ণিত হয়েছে আবু জা'ফর মুহাম্মাদ ইবন আলী ইবন বাক্কের থেকেও। দেখুন, আস-সাম'আনী, আত-তাফসীর (৩/১২৫); বাগাওয়ী, আত-তাফসীর (৪/৩৬২); ইবন কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম (৪/৫২১); কুরতুবী, আল-জামে'উ লি আহকামিল কুরআন (৯/৩৮৪)। ৪- অনুরূপ বর্ণনা ইমাম বাইহাকীর কাছে ইকরিমাহ রাহিমাহুল্লাহ থেকেও এসেছে। তবে তার সনদ দুর্বল। দেখুন, ইবন হাজার, ফাতহুল বারী (১১/৩৭৩)।
৮৮৯. বুখারী, আল-জামেউস সহীহ, হাদীস নং ৪৮২৬, ৭৫৯১। তার শব্দ হচ্ছে, 'বনী আদম আমাকে কষ্ট দেয়, সে কালকে গালি দেয়, অথচ আমি কাল, আমার কাছেই সকল কিছুর চাবিকাঠি, আমিই রাত- দিন পরিবর্তন করি।'
৮৯০. বুখারী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ৩৩৪৫, ৩৩৪৮, ৬৫৩০, ৭৫১৮; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২২২। আবু সা'ঈদ আল-খুদরী রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুর বর্ণনায়, অনুরূপ মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ৭৭1।
৮৯১. বস্তুত তা অনেক হাদীসেই এসেছে, উদাহরণত: ইমাম বুখারী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ৬৬৪, ১৯০৪; ইমাম মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ১১৫১, যা আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু কর্তৃক বর্ণিত হাদীস। অনুরূপ বুখারী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ২৬১৫; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২৪৬৯। যা আনাস ইবন মালিক রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু বর্ণিত হাদীস।
৮৯২. মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২৭৫৯, যা আবু মূসা আল-আশ'আরী রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু বর্ণিত হাদীস।
৮৯৩. মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ১৮২৭, যা আব্দুল্লাহ ইবন 'আমর রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু বর্ণিত হাদীস।
৮৯৪. আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আত এ ব্যাপারে একমত যে, আল্লাহ তা'আলার দু'টি হাত রয়েছে। আর তাঁর এক হাতকে 'ইয়ামীন' বা ডান বা বরকতময় বলা হবে। যেমন, কুরআনে কারীমে আল্লাহ তা'আলা বলেন, "আর আসমানসমূহ তার ডান হাতে পেঁছানো থাকবে।" [সূরা আয-যুমার: ৬৭] অনুরূপ একাধিক হাদীসে 'ইয়ামীন' এসেছে। তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, যা ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এ ফতোয়ায় বর্ণনা করেছেন। তাঁর অপর হাতকে কোনো কোনো হাদীসে 'শামাল' নামকরণ করা হয়েছে। যেমন মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২৭৮৮, ইবন 'উমার রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে বর্ণিত। আবার কোনো কোনো বর্ণনায় 'ইয়াসার' এসেছে। যেমন, আব্দুল্লাহ ইবন ইমাম আহমাদ, আস-সুন্নাহ, হাদীস নং ১০৫৯; বাযযার, কাশফুল আসতার, হাদীস নং ২১৪৪, আবুদ দারদা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু বর্ণিত হাদীস। আবার মুসনাদে আহমাদের এর বর্ণনায় এসেছে, 'কাতিফাহুল ইউসরা' এসেছে। হাদীস নং ২৭৪৮৮। হাদীসটিকে শাইখ আল-আলবানী রাহিমাহুল্লাহ সহীহ বলেছেন। আস-সহীহাহ, হাদীস নং ৪৯। এখানে হাদীসের ভাষ্য, 'আর তাঁর উভয় হাতই ডান' এর অর্থ সম্পর্কে দু'টি মত রয়েছে: এক. অপর হাতটি অবশ্যই বাম হাত বলা হবে, তবে হাদীসে অপর হাদীসে ইয়ামীন বলার অর্থ, ১- বরকতময় বুঝানো। কারণ আল্লাহর প্রতিটি হাতেই কল্যাণ ও বরকত রয়েছে, যাতে করে কেউ ডানের বিপরীতে অন্য হাতে বরকত নেই মনে না করে। দেখুন, ইবন কুতাইবাহ, তা'ওয়ীলু মুখতালাফুল হাদীস, পৃ. ১৪২; ইবনুল আসীর, আন-নিহায়াহ ফী গারীবিল হাদীস (২/৩৪৫-৩৪৬); ইবন মানযূর, লিসানুল 'আরাব (১৩/৪৫৯)। ২- কারও কারও মতে, এটি আদব রক্ষার্থে বলা হয়েছে। কারণ আমাদের মাঝে বাম হাত দুর্বল থাকে বা অমর্যাদাপূর্ণ বুঝায়। তাই সেটা থেকে মুক্ত রাখার জন্য বলা হয়েছে, উভয় হাতই ইয়ামীন। এ মতটিই গ্রহণ করেছেন, উসমান ইবন সা'ঈদ আদ-দারেমী রাহিমাহুল্লাহ। দেখুন, আর-রাদ্দু আলাল বিশর আল-মিররীসী (২/৬৯৮); কাযী আৰু ইয়া'লা, ইবত্বালুত তা'ওয়ীলাত, পৃ. ১৭৬। দুই. কোনো কোনো আলেম প্রাধান্য দেয়ার নীতি অবলম্বন করে অপর হাতটিকে শামাল বা ইউসরা বলতে রাযী হননি। তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন ইমাম আবু বকর ইবন খুযাইমাহ, কিতাবুত তাওহীদ (১/১০২, ১২৭); আবু বকর আল-বাইহাকী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (২/১৩৯); কুরতুবী, আল-মুফহিম (৭/৩৯২-৩৯৩)।
তবে প্রথম মতটি আমার কাছে বেশি প্রিয়। আমার প্রিয় শাইখ আব্দুল্লাহ গুনাইমান এ মতের পক্ষেই বলতেন।
এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, আল-গামেদী, আল-বাইহাক্বী ও মাওকিফুহু মিনাল ইলাহিয়াত, পৃ. ২৫৬; সুলাইমান আদ-দুবাইখী, আহাদীসুল আকীদাহ আল্লাতী ইউহিমু যাহেরুহাত তা'আরুদ্ব ফিস সাহীহাইন, পৃ. ২৮০।
৮৯৫. মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২৭৮৮, যা আব্দুল্লাহ ইবন 'উমার রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুর বর্ণিত হাদীস।
৮৯৬. এখানে উপরে শব্দটি এসেছে, 'আল-কাসত্ব'। কিন্তু সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় তার শব্দ হচ্ছে 'আল-কাবদু'। আবার সহীহ বুখারীর এক স্থানে এসেছে, 'আল-ফাইদু' আও আল-ক্বাবন্ধু' এভাবে সন্দেহের সাথে। যদি 'আল-ক্বাবন্ধু' হয় তখন অর্থ হবে রূহ হরণ করা। আর যদি 'আল- ফায়দু' হয় তখন অর্থ হবে প্রশস্ত রিযিক। তবে 'আল-ফায়ছু' শব্দের চেয়ে 'আল-কাবন্ধু' শব্দটি বেশি বিখ্যাত। দেখুন, ইবন হাজার, ফাতহুল বারী (১৩/৩৯৫)।
৮৯৭. সহীহ বুখারীর আরেক বর্ণনায় এসেছে, 'তার হাতে মীযান বা ওজনের পাল্লা, তিনি সেটাকে নিচু করেন ও উপরে উঠান। দেখুন, হাদীস নং ৪৬৮৪। আবার অপর বর্ণনায় এসেছে, 'আর তার অপর হাতে মীযান বা ওজনের পাল্লা, তিনি নিচু করেন ও উপরে উঠান। দেখুন, হাদীস নং ৭৪১১। এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলা হয়, রিযিক নির্ধারণ করা, যার জন্য ইচ্ছা তার রিযিক সংকুচিত করেন, আর যার জন্য ইচ্ছা তা প্রশস্ত করেন। কখনও কখনও এ দু'টি দ্বারা উদ্দেশ্য নেয়া যেতে পারে যাবতীয় তাক্বদীর নিয়ন্ত্রণ, সৃষ্টি, সম্মান, মর্যাদা, অসম্মান ইত্যাদি। দেখুন, নাওয়াওয়ী, শারহু মুসলিম (৭/৮১)।
৮৯৮. বুখারী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ৭৪১১, ৭৪১৯; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ৯৯৩।
৮৯৯. তিরমিযী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ৩৩৬৮; ইবন হিব্বান, আস-সহীহ, হাদীস নং ৬১৬৭; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক (১/১৩২); বাইহাকী, আল-কুবরা (১০/১৪৭), যা আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু বর্ণিত হাদীস। তিরমিযী বলেন, এ হাদীসটি উক্ত দিক দিয়ে হাসানুন গারীব। তবে তা একাধিক সূত্রে আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে এসেছে। হাদীসটিকে শাইখ আবু আব্দির রহমান মুহাম্মাদ নাসেরউদ্দীন আলবানী সহীহ বলেছেন। দেখুন, সহীহুল জামে', হাদীস নং ৫২০৯; মিশকাত, হাদীস নং ৪৬৬২।
৯০০. মালেক, মুওয়াত্তা (২/৯৮); আহমাদ, আল-মুসনাদ, হাদীস নং ৩১১; আবু দাউদ, আস-সুনান, হাদীস নং ৪৭০৩; তিরমিযী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ৩০৭৫; নাসায়ী, আল-কুবরা, হাদীস নং ১১১৯০; ইবন হিব্বান, আস-সহীহ, হাদীস নং ৬১৬৬; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক (১/৮০), (২/৩৫৪, ৫৯৩)। তবে এর সনদ দুর্বল। ইবন আব্দুল বার, আত-তামহীদ (৬/৩); আলবানী, আস-সিলসিলাহ আদ-দ্ব'য়ীফাহ, নং ৩০৭১।
৯০২. বাইহাক্বী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত ২/৪৩-৬২, ১৫০।
৯০৩. অর্থাৎ বাইহাক্বী অনেক জায়গাতেই কালামশাস্ত্রবিদদের নীতি পাশ কাটিয়ে আল্লাহর বেশ কিছু গুণাবলি কোনো প্রকার তা'ওয়ীল ব্যতীতই সাব্যস্ত নন্দিত কাজ করেছেন। কিন্তু তিনি কোথাও কোথাও নিন্দিত তা'ওয়ীল নীতিটি অবলম্বন করেছেন। আবার কখন কখনও এসব সিফাতের অর্থ তাফওয়ীদ্ব বা অর্থ না করার নিন্দিত নীতিও অবলম্বন করেছেন। সর্বদা নন্দিত সঠিক পথটিতে থাকতে সমর্থ হননি। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে দেখুন, আমার উস্তাদজী ড. আহমাদ আতিয়্যাহ আল-গামেদী রাহিমাহুল্লাহর এর আল-বাইহাকী ও মাওকাফুহু মিনাল ইলাহিয়াত গ্রন্থটি। আরও দেখুন, ড. আহমাদ আল-কাযী এর মাযহাবু আহলিত তাফওয়ীদ্ব গ্রন্থটির পৃ. ২১১-২১৬। আরও দেখা যেতে পারে, আমার গ্রন্থ "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন" এর বাইহাকীর বক্তব্য。
📄 কাযী আবু ইয়া‘লা রাহিমাহুল্লাহ’র বক্তব্য
কাযী আবু ইয়া'লা (৯০৪) স্বীয় "ইবত্বালুত তা'ওয়ীলাত লি আখবারিস সিফাত" গ্রন্থে বলেন, "এসব বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করা এবং সেগুলোর তা'ওয়ীল বা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে লিপ্ত হওয়া জায়েয নেই; বরং সেগুলোকে প্রকাশ্য অর্থেই গ্রহণ করা হবে, তার অর্থ হবে সিফাতুল্লাহ, যা আল্লাহর পবিত্র সত্তায় সংযুক্ত হয়। তিনি আরও বলেন, সিফাত দু' প্রকার। সিফাতে যাত, সিফাতে ফি'ল। সিফাতে যাত: যা কখনও তাঁর থেকে আলাদা হয় না, তাঁর সাথে অবিচ্ছেদ্য। যেমন: জীবন, কুদরত, ইলম, ইচ্ছা, কথা বলা, শ্রবণ করা, দেখা। আর সিফাতে ফি'ল হচ্ছে: সৃষ্টি করা, রিযিক দেয়া, কাজ করা, আগমন করা, অবতরণ করা।(৯০৫)
তার গ্রন্থে বলেন, "সিফাতগুলো সাব্যস্ত করা ফরয। আর তা'ওয়ীল করা বাতিল। এই দলীলটি প্রমাণ করে যে, আল্লাহর সিফাতকে তার প্রকাশ্য অর্থ থেকে সরিয়ে নেয়া জায়েয নয়। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «لا تباغضوا» "তোমরা পরস্পর হিংসা করো না"(৯০৬), «لا تحاسدوا» "তোমরা পরস্পর বিদ্বেষ রেখো না"(৯০৭),«لا تدابروا» "তোমরা একে অপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না"(৯০৮) ইত্যাদি। এবং তিনি ইমাম আহমাদ, মাকতূল(৯০৯), মালেক, সাওরী, আওযা'ঈ, লাইস, হাম্মাদ ইবন যায়েদ, হাম্মাদ ইবন সালামাহ, সুফইয়ান ইবন 'উয়াইনাহ, ফুদ্ধাইল ইবন 'ইয়াছ, ওকী', আব্দুর রহমান ইবন মাহদী, আল- আসওয়াদ ইবন সালেম (৯১০), ইসহাক্ব ইবন রাহওয়াইহ, আবু উবাইদ, মুহাম্মাদ ইবন জারীর আত-ত্বাবারী প্রমুখদের এ অধ্যায়ে যেসব বক্তব্য রয়েছে তার কিছু অংশ উল্লেখ করেন। তাদের সকলের কথার শব্দ বর্ণনা করাতে দীর্ঘতার সম্ভাবনা রয়েছে। (৯১১) শেষে তিনি [কাযী ইয়া'লা] বলেন, "এগুলোর তা'ওয়ীল (বা অপব্যাখ্যা) করা বাতিল হওয়ার বিষয়টি একথা দ্বারা বুঝা যায় যে, সাহাবীগণ এবং তাদের পরে তাবেয়ীগণ সেগুলোকে প্রকাশ্য অর্থের ওপর প্রয়োগ করেছিলেন। কোনো তা'ওয়ীল বা দূরবর্তী অর্থের দিকে যাননি। (৯১২) আবার সেগুলোকে তারা প্রকাশ্য থেকেও অন্য দিকে সরিয়ে নেননি। সুতরাং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ জায়েয হলে তারাই আগে করতেন; কারণ তাতে (তথাকথিত) সাদৃশ্য তিরোহিত হতো আর সন্দেহ সংশয় দূরীভূত হতো। (৯১৩)
টিকাঃ
৯০৪. তিনি হচ্ছেন কাযী আবু ইয়া'লা মুহাম্মাদ ইবনুল হুসাইন ইবন মুহাম্মাদ আল-বাগদাদী আল-হাম্বলী, যাকে সবাই কাযী আবু ইয়া'লা নামেই চিনে। হাম্বলী মাযহাবের ইমামগণের একজন। হাম্বলী মাযহাবের বড় ইমাম আবু আব্দুল্লাহ ইবন হামেদ এর হাতে ফিকহের জ্ঞান অর্জন করেন। তারপর খলীফা আল-কায়েম বি আমরিল্লাহ এর অধীন বিচারক পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। হাম্বলী মাযহাবে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন ফলে সে সময় তাকে মাযহাবের প্রধান ইমাম বলা হতো।
ইমাম যাহাবী তার প্রশংসা করে বলেন, তিনি ফাতওয়া দিয়েছেন, পড়িয়েছেন, তার কাছেই ফিকহের নেতৃত্ব গিয়ে ঠেকেছে। তার সময়ে তিনি ইরাকের বড় আলেম ছিলেন, তাছাড়া তিনি কুরআনের ইলম, তাফসীর, মুনাযারা উসূল ইত্যাদিতেও ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। আর আকীদাহ ও উসূলের ক্ষেত্রে তার মাযহাবের ব্যাপারে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "...আর তৃতীয় প্রকার লোক, যারা হাদীস ও আছার শুনেছে, তাদের কাছে সালাফদের মাযহাব অনেক মহৎ মনে হয়েছে, কিন্তু তারা কালামশাস্ত্রবিদ জাহমিয়্যাহদের সাথে অবশিষ্ট কিছু মূলনীতিতে একমত থেকে গিয়েছিল, কারণ তাদের কাছে কুরআন, হাদীস ও আছার এর ক্ষেত্রে তেমন অভিজ্ঞতা ছিল না যেমন অভিজ্ঞতা ছিল সুন্নাহ ও হাদীসের ইমামগণের। সহীহ ও দুর্বলের মাঝে পার্থক্য করা ও জানার ব্যাপারেও নয়, সেগুলোর অর্থ বুঝার ক্ষেত্রেও নয়। তাই তারা জাহমিয়্যাদের কোনো কোনো বিবেকের যুক্তি প্রসূত মূলনীতিকে বিশুদ্ধ মনে করে নিয়েছিল, আর মনে করতো সিফাত সংক্রান্ত এসব ভাষ্যের মাঝে স্ববিরোধিতা বিদ্যমান। এ হচ্ছে আবু বকর ইবন ফুওরাক, কাযী আবু ইয়া'লা ও কাযী ইবন আকীল অনুরূপ আলেমগণের অবস্থা।..... এরপর শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, তারা মাঝে মাঝে তাফওয়ীদ্ব তথা আল্লাহর গুণাবলি সংক্রান্ত ভাষ্যসমূহের অর্থ না করার নীতি অবলম্বন করেছে, আবার বলেছে: এগুলোকে প্রকাশ্য অর্থে নিয়ে যেতে হবে, এসব ব্যাপারে যেমনটি করেছে কাষী আবু ইয়া'লা ও তার মতো কিছু লোক।" শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউত তা'আরুদ্ব বাইনাল আক্কলি ওয়ান নাকলি (৭/৩৫)। তার জন্ম হয়েছিল হিজরী ৩৮০ সালে। মৃত্যু হয়েছিল হিজরী ৪৫৮ সালে। তার রয়েছে অনেক গ্রন্থ। তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, মাসায়িলুল ঈমান, আহকামুল কুরআন, আল-উদ্দাহ ফী উসূলিল ফিকহ,
৯০৫. এ ব্যাপারে ইতোপূর্বে আলোচনা চলে গেছে।
৯০৬. বুখারী, আল-জামেউস সহীহ, হাদীস নং ৬০৬৫; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২৫৫৯।
৯০৭. বুখারী, আল-জামেউস সহীহ, হাদীস নং ৫১৪৩; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২৫৫৯।
৯০৮. বুখারী, আল-জামেউস সহীহ, হাদীস নং ৬০৭৬; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২৫৫৯।
৯০৯. তিনি হচ্ছেন মাকহুল ইবন আবি মুসলিম শোহরাব ইবন শাযিল। তার জীবনী পূর্বে বর্ণিত হয়েছে।
৯১০. তিনি হচ্ছেন আবু মুহাম্মাদ আসওয়াদ ইবন সালেম আল-আবেদ। হাদীস শুনেছেন হাম্মাদ ইবন যায়েদ, ইবন উয়াইনাহ, ইসমা'ঈল ইবন উলাইয়্যাহ, মু'তামির ইবন সুলাইমান প্রমুখ থেকে। আর তার থেকে হাদীস শুনেছেন, হাতেম ইবনুল লাইস আল-জাওহারী, আব্দুল ওয়াহহাব ইবন আব্দুল হাকাম আল-ওয়াররাক্ব, মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহ আল-মুখাররামী প্রমুখ। তিনি কল্যাণকর কাজে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তাকে মা'রূফ কারখীর সাথে উল্লেখ করা হয়। কারণ তাদের দু'জনের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্ব, মিল ও মহব্বত ছিল। ইবাদত ও পরহেযগারীতে প্রসিদ্ধ। বিদ'আতীদের থেকে দূরে থাকতেন, তাদের ঘৃণা করতেন। সর্বদা ইবাদতে লিপ্ত থাকতেন। মুহাম্মাদ ইবন জারীর আত-ত্বাবারী বলেন, আসওয়াদ ইবন সালেম সিকাহ বা নির্ভরযোগ্য, পরহেযগার ও উৎকৃষ্ট মানুষ ছিলেন। হিজরী ২১৩ বা ২১৪ তে তার মৃত্যু হয়। দেখুন, খত্নীবে বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ (৭/৩৫); ইবন আবি হাতেম, আল-জারহু ওয়াত তা'দীল (২/২৯৪)।
৯১১. আমাদের শাইখ ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ তিনি স্বয়ং এদের থেকে বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। এখানে আবু ইয়া'লা রাহিমাহুল্লাহ সেসব মনীষী থেকে তা তার গ্রন্থে নিয়ে এসেছেন। দেখুন, ইবত্বালুত তা'ওয়ীলাত (১/৪৪-৫৮)।
৯১২. মোটকথা: কাযী আবু ইয়া'লা রাহিমাহুল্লাহ কালামশাস্ত্রবিদদের পদ্ধতি, যারা এসব ভাষ্যের তা'ওয়ীল বা অপব্যাখ্যা করে থাকে, তাদের নীতির বিরোধিতা করেছেন। তিনি ইবন ফুওরাক এর তা'ওয়ীলকে বাতিল ও অসার সাব্যস্ত করেছেন। সিফাত সংক্রান্ত সকল ভাষ্যকে যাহের অর্থে নিয়েছেন। তবে তিনি তাঁর কিতাবে এমন কিছু হাদীস দিয়ে দলীল দিয়েছেন যা আসলে সাব্যস্ত নয়। আবার তিনি এ কিতাবে একাধিক স্থানে আহলুত তাজহীল ও আহলুত তাফওয়ীদ্ব এর নীতিও অনুসরণ করেছেন। তিনি অর্থও না জানা থাকার কথা বলে তার কিতাব ও নিজেকে বিতর্কিত করেছেন। এ ব্যাপারে জানার জন্য দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আক্কলি ওয়ান নাকলি (৫/২৩৭), (৭/৩৪); আহমাদ আল-ক্বাদী, মাযহাবু আহলিত তাফওয়ীদ্ব, পৃ. ২০৬-২১১।
৯১৩. কাযী আবু ইয়া'লা এখানে আরো বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এরপর তিনি বলেন, বরং তাদের থেকে এমনসব বর্ণনা এসেছে যা তা'ওয়ীল বাতিল হওয়ার প্রমাণ বহন করে। তারপর সাহাবায়ে কিরাম থেকে বহু আসার বর্ণনা করেছেন যা তাওয়ীল না করার ওপর প্রমাণবহ। যেমন, উম্মে সালামাহ, আয়েশাহ, আব্দুল্লাহ ইবন সালাম, আনাস ইবন মালিক, আবু সা'ঈদ আল-খুদরী রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুম। তারপর তিনি তা'ওয়ীল বাতিল সাব্যস্ত করার জন্য প্রধান কিছু দলীল নিয়ে এসেছেন। সে আলোচনার অধীন অনেক শাখা-প্রশাখা, উদাহরণ ইত্যাদি প্রদান করেন। সেগুলোকে সংক্ষেপ করলে সংক্ষেপে তিনটি প্রমাণের অধীন করা যায়। এক. কুরআনের আয়াত দু' প্রকার: ১- মুহকাম, যেসব আয়াত অত্যন্ত মজবুত ও সুদৃঢ় অর্থ প্রদান করে; যার অর্থ প্রকাশিত। তাতে তা'ওয়ীল করার কিছু নেই। ২- মুতাশাবিহ, যার প্রকৃত ব্যাখ্যা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। তাহলে তা'ওয়ীলের জায়গা কোথায়? দুই, আবুল হাসান আল-আশ'আরী ও তার সঙ্গী ও ছাত্ররা যেমন কাযী আবু বকর আল-বাকেল্লানী, আবু বকর মুহাম্মাদ ইবন হাসান ইবন ফুওরাক, আবু আলী ইবন শাযান, তারা এমনসব সিফাত সাব্যস্ত করেছেন যার প্রকৃত অর্থ বোধগম্য নয়, তারা সেটাকে ভাষার বিভিন্ন চাহিদার দিকে নিয়ে যাননি, যেমন, চেহারা, দু হাত, চোখ (সিফাতে খাবারিয়্যাহ)। তারা তো সেগুলোকে তা'ওয়ীল করেননি। তাদের পরে কিছু লোক এসে এগুলোকে তা'ওয়ীল করেছে। তিন. শব্দকে তার প্রকাশ্য অর্থে নেয়ার অর্থই হচ্ছে সেটাকে প্রকৃত অর্থে ব্যবহার করা। যে কেউ সেটা থেকে তা'ওয়ীল করে অন্য অর্থে নিয়ে যাবে তিনি তো সেটাকে হাকীকত থেকে মাজায বা রূপক অর্থে নিয়ে গেলেন। আর আল্লাহর সিফাতকে মাজায বা রূপক করে নেয়া জায়েয নয়। এ হচ্ছে কাযী আবু ইয়া'লার যুক্তিগুলোর সার কথা। দেখুন, ইবত্বালুত তাওয়ীলাত (১/৫৯-৭৬)।