📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 ইবন খফীফ কর্তৃক মহান আল্লাহর দু’ হাত ও দু’ পা সাব্যস্তকরণ

📄 ইবন খফীফ কর্তৃক মহান আল্লাহর দু’ হাত ও দু’ পা সাব্যস্তকরণ


[ইবন খাফীফ কর্তৃক মহান আল্লাহর দু' হাত ও দু' পা সাব্যস্তকরণ] তারপর তিনি বলেন, আল্লাহ তা'আলা তাঁর মুমিন বান্দাদের কাছে নিজের পরিচয় দিয়েছেন যে, তাঁর রয়েছে দুটি হাত (৭২৬) যেগুলো তিনি রহমতসহ প্রশস্ত করে রেখেছেন। এরপর তিনি এ সংক্রান্ত হাদীসসমূহ উল্লেখ করেন। তারপর তিনি উমাইয়া ইবন আবিস সালতের কবিতা উল্লেখ করেন।
﴿يلقى في النار وتقول هل من مزيد؟ حتى يضع فيها رجله﴾ “জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হতেই থাকবে, আর জাহান্নাম বলতেই থাকবে, 'আরও বেশি আছে?' [সূরা ক্বাফ: ৩০] (৭২৭) অবশেষে তিনি তাতে তাঁর পা রাখবেন।' এ হচ্ছে বুখারীর বর্ণনা। অপর বর্ণনায় এসেছে, »يضع عليها قدمه« "তিনি তাতে তাঁর পা রাখবেন। (৭২৮(
তারপর তিনি [ইবন খাফীফ] বর্ণনা করলেন, যা মুসলিম আল-বাত্বীন (৭২৯) বর্ণনা করেছেন ইবন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে যে, "কুরসী হচ্ছে দু' পায়ের জায়গা। আর আরশ, তার পরিমাণ তো আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না।"
তারপর তিনি [ইবন খাফীফ] বর্ণনা করেন মুসলিম আল- বাত্বীন এর বক্তব্য(৭৩০), সুদ্দী (৭৩১)র বক্তব্য, ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ(৭৩২), আবু মালেক (৭৩৩) এর বক্তব্য।

টিকাঃ
৭২৬. আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আহ মহান আল্লাহর জন্য দু'টি হাত সাব্যস্ত করেন, যা বাস্তবেই হাত অন্যকিছু নয়, তবে তার প্রকৃত স্বরূপ আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। আর সেটা সাব্যস্ত করতে হবে যেভাবে সেটা তার জন্য উপযুক্ত হবে সেভাবে। কোনো প্রকার নিষ্ক্রীয়করণ, ধরণ নির্ধারণ, কিংবা সাদৃশ্য প্রদান করা যাবে না।
৭২৭. ইবন তাইমিয়‍্যাহ রাহিমাহুল্লাহকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, এ আয়াতে অনুরূপ এমন হাদীসে 'আরও বেশি আছে' এ কথা বলে কী বুঝানো হয়েছে? উত্তরে তিনি বলেন, বলা হয়ে থাকে যে, হাদীসে 'আরও বেশি আছে' বলে বুঝানো হয়েছে যে, আমার মধ্যে আর বাড়তি ধারণ ক্ষমতা নেই। তবে তিনি সিদ্ধান্ত দিয়ে বলেন, বস্তুত জাহান্নাম 'আরও বেশি আছে কি? এটা বলে বেশি চাইবে। অর্থাৎ আরও বাড়তি কিছু আছে যা দিয়ে আমাকে যোগান দেয়া হবে? (আল্লাহ আমাদেরকে জাহান্নামের আগুন ও জাহান্নামী হওয়া থেকে আশ্রয় দিন), বরং বাড়তি বলে এখানে জিন্ন ও মানবদের মধ্য থেকে আল্লাহ যা বাড়িয়ে দিবেন তা চাওয়া হচ্ছে। যেমনটি বুখারী ও মুসলিমে আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে এসেছে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, জাহান্নামে অনবরত ফেলা হতে থাকবে, আর জাহান্নাম বলতে থাকবে, আরও বেশি আছে কী? অবশেষে মহান রব্ব তাতে তাঁর পা রাখবেন। অপর বর্ণনায় এসেছে, তার উপরে তাঁর পা রাখবেন। তখন তার একাংশ অপর অংশের সাথে মিশে যাবে, আর জাহান্নাম বলবে, কাত্ব, কাত্ব অর্থাৎ পূর্ণ হয়ে গেছি। অপর যখন জাহান্নাম বলবে, আমি যথেষ্ট হয়েছি, আমি যথেষ্ট হয়েছি, তখন তার কাছে যা ফেলা হয়েছে সেটা তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে। তারপর আর বলবে না, 'আরও বেশি আছে কী'? বরং তখন তা পূর্ণ হয়ে যাবে, কারণ তার একাংশ অপর অংশের সাথে মিশে যাবে। তখন আল্লাহ সেটাকে তার ভেতরে যারা রয়েছে তাদের জন্য প্রশস্ততাকে সংকীর্ণ করে দিবেন। কারণ তিনি মানুষ ও জিন্ন দিয়ে জাহান্নাম ও জান্নাত উভয়টিকেই পূর্ণ করার ওয়াদা করেছিলেন। জাহান্নাম তো প্রশস্ত, সেটা যতক্ষণ আল্লাহ তা'আলা তার মাঝে যারা আছে তাদের নিয়ে সংকীর্ণ না করে দিবেন ততক্ষণ সেটা পূর্ণ হবে না। দেখুন, মাজমু' ফাতাওয়া (১৬/৪৬-৪৭)।
৭২৮. বুখারী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ৪৮৪৮, ৪৮৪৯, ৪৮৫০; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২৮৪৮।
৭২৯. তিনি হচ্ছেন আবু আব্দুল্লাহ মুসলিম ইবন ইমরান, বলা হয়ে থাকে ইবন আবী ইমরান আল- বাত্বীন, আল-কৃষ্ণী। তিনি হাদীস বর্ণনা করছেন আত্বা, মুজাহিদ, সা'ঈদ ইবন জুবাইর থেকে। তাকে আহমাদ, ইবন মা'ঈন, আবু হাতেম ও নাসায়ী নির্ভরযোগ্য বলেছেন। ইবন হাজার এর স্তর বিন্যাস অনুযায়ী ষষ্ঠ স্তরের বর্ণনাকারী। দেখুন, মিযযী, তাহযীবুল কামাল (৩/১৩২৬); ইবন হাজার, তাহযীবুত তাহযীব (১০/১৩৪); তাক্বরীবুত তাহযীব, পৃ. ৫৩০।
৭৩০, এর আছারটি বর্ণনা করেছন ইবন জারীর আত-ত্বাবারী, জামে'উল বায়ান (৩/১০), নং ৫৭৯২; সেখানে এসেছে, মুসলিম আল-বাত্বীন বলেন, কুরসী দু' পায়ের স্থান। অনুরূপ তা বর্ণনা করেছেন ইবন কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল 'আযীম (১/৪৫৭)।
৭৩১. তিনি হচ্ছেন আবু মুহাম্মাদ ইসমা'ঈল ইবন 'আব্দুর রহমান ইবন আবী কারীমাহ আল-কুফী আস-সুদ্দী, কুরাইশদের একজন মুক্তদাস। তাফসীর শাস্ত্রের ইমাম। তিনি আনাস ও ইবন সীরীন থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। 'ইজলী বলেন, তিনি নির্ভরযোগ্য, তাফসীরের আলেম, তাফসীরের বর্ণনাকারী। ইমাম যাহাবী তার প্রশংসা করে বলেন, ইমাম ও মুফাসসির।
সুদ্দী শব্দের সাধারণ অর্থ হচ্ছে কোনো বাঁধে অবস্থানকারী। তাকে 'সুদ্দী' বলার কারণ সম্পর্কে বলা হয়, তিনি মদীনার এমন এক জায়গায় বসবাস করতেন যে জায়গাকে বলা হতো 'সাদ্দ'। তিনি হিজরী ১২৭ সালে মারা যান। দেখুন, ইবন সান্দ, আত-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা (৬/৩২৩); সাম'আনী, আল- আনসাব (৩/২৩৮); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৫/২৬৪); ইবন হাজার, তাহযীবুত তাহযীব (১/৩১৩)।
এখানে সুদ্দীর যে আছারটির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে তা বর্ণনা করেছেন ইবন জারীর আত-ত্বাবারী, জামে'উল বায়ান (৩/১০)। সেখানে সুদ্দী বলেন, আসমান ও যমীন কুরসীর অভ্যন্তরে। আর কুরসী 'আরশের সামনে। আর তা (কুরসী) হচ্ছে দু' পায়ের স্থান। আর সুয়ূত্বী আদ-দুররুল মানসূর গ্রন্থে বলেন (২/১৮) যে, এটি ইবন আবী হাতেমও সুদ্দী থেকে বর্ণনা করেছেন। অনুরূপ আরও বর্ণনা করেছেন ইবন কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম (১/৪৫৭)।
৭৩২. তিনি হচ্ছেন আবু আব্দুল্লাহ ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ ইবন কামিল, আল-ইয়ামানী, আয-যিমারী আস-সান'আনী। তিনি হাম্মাম ইবন মুনাব্বিহ এর ভাই। কোনো কোনো সাহাবীর সাথে তার সাক্ষাত হয়েছে এবং তাদের থেকে ইলম অর্জন করেছেন। তার জন্ম হয়েছে হিজরী ৩৪ সালে, উসমান ইবন 'আফফান রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুর খিলাফতকালে। তিনি ইবাদত ও যুহদে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। ওয়ায করতেন এবং হিকমতের কথা বলতেন। তার প্রসিদ্ধ বাণীর মধ্যে রয়েছে, ১- মুমিন কোনো দিকে দৃষ্টি দেয় শিক্ষা নেয়ার জন্য, কথা বলে বুঝার জন্য, চুপ থাকে নিরাপদ থাকার জন্য। ২- ঈমান হচ্ছে উলঙ্গ, তার পোষাক হচ্ছে তাকওয়া, তার সৌন্দর্য হচ্ছে লজ্জা, তার সম্পদ হচ্ছে ফিকহ। তিনি হিজরী ১১০ সালে মারা যান। দেখুন, ইবন সা'দ, আত-ত্বাবাকাতুল কুবরা (৫/৫৪৩); আবু নু'আইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া (৪/২৩); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৪/৫৪৪)। তিনি এখানে যে আছারটির দিকে ইঙ্গিত করছেন তা বর্ণনা করেছেন: আবুশ শাইখ, আল-আযামাহ (২/৬২৩); সেখানকার শব্দ হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা 'আরশ ও কুরসী নূর থেকে সৃষ্টি করেছেন, বাইতুল মা'মুর ফাঁপা মুক্তা থেকে সৃষ্টি করেছেন, 'আরশ কুরসীর সাথে লাগোয়া। তাছাড়া এ বর্ণনাটি সূযুত্বী তার আদ-দুররুল মানসূর গ্রন্থেও এনেছেন, (২/১৭); অনুরূপ আব্দুল্লাহ ইবন ইমাম আহমাদ, তার আস-সুন্নাহ (১/৪৭৭), নং ১০৯২; যাহাবী, আল-আরবা'ঈন, পৃ. ১২৫-১২৬।
৭৩৩. তিনি হচ্ছেন আবু মালেক গাযওয়ান আল-গিফারী, আল-কুফী, কুনিয়াতেই প্রসিদ্ধ। তিনি বর্ণনা করেছেন 'আম্মার ইবন ইয়াসির, ইবন আব্বাস, বারা ইবন আযিব রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুম থেকে। আর তার থেকে বর্ণনা করেছেন ইসমা'ঈল ইবন সামী', ইসমা'ঈল ইবন আব্দুর রহমান আস-সুদ্দী, হুসাইন ইবন আব্দুর রহমান, সালামাহ ইবন কুহাইল। ইবন আবী খাইসামাহ বলেন, আমি ইয়াহইয়া ইবন মা'ঈনকে আবু মালেক সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, সে তো গিফারী, কৃষ্ণী, নির্ভরযোগ্য। ইয়াহইয়া ইবন মা'ঈন তাকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন, ইবন হিব্বান তাকে নির্ভরযোগ্যদের মধ্যে গন্য করেছেন। তার থেকে আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইবন হাজার এর বর্ণনাকারীদের স্তর বিন্যাস অনুযায়ী তৃতীয় স্তরের বর্ণনাকারী। দেখুন, ইবন হিব্বান, আস-সিক্কات (৫/২৯৩); মিযযী, তাহযীবুল কামাল (২/১০৮৯); ইবন হাজার, তাহযীবুত তাহযীব (৮/২৪৫); ইবন হাজার, তাক্বরীবুত তাহযীব, পৃ. ৪৪২। এখানে ইবন খাফীফ যে আছারটির দিকে ইঙ্গিত করেছেন তা বর্ণনা করেন ইবন আবী হাতেম, আত-তাফসীর, হাদীস নং ২৬০২; আব্দুল্লাহ ইবন ইমাম আহমাদ, আস-সুন্নাহ (১/৩০৩), নং ৫৮৯; সেখানকার শব্দ হচ্ছে, আর কুরসী 'আরশের নিচে, তিনি আরও বলেন, তিনি আল্লাহ তাঁর মহান পদ মুবারক কুরসীর উপরে রেখেছেন। তাছাড়া বর্ণনাটি আরও যারা এনেছেন, তারা হচ্ছেন আবুশ শাইখ, আল-আযামাহ (২/৫৫১); বাইহাক্বী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (২/২৯৫-২৯৬), নং ৮৫৭; সামান্য শব্দের হেরফের রয়েছে; সুয়ূত্বী, আদ-দুররুল মানসূর (২/১৭), আব্দ ইবন হুমাইদ ও ইবন আবী হাতেম এর বরাতে; ইবন কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম (১/৪৫৭); ইবন হাজার, ফাতহুল বারী (১৩/৪১১); যাহাবী, আল-আরবা'ঈন, পৃ. ১২৬।
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ইবন আব্বাস, মুসলিম আল-বাত্বীন, সুদ্দী, এদের বর্ণনাগুলো কেবল নিজেদের মত বা ইজতিহাদ করে দিয়েছেন তা হতে পারে না; কারণ এতে আল্লাহর পক্ষ থেকে সংবাদ দেয়া হচ্ছে, আর আল্লাহর ব্যাপারে ইজতিহাদ করে কোনো কথা বলা অগ্রহণযোগ্য। বরং এটা স্পষ্ট যে, তারা এগুলো কোনো বিশেষ কোনো ভাষ্যের ওপর ভিত্তি করেই বলে থাকবেন। সম্ভবত তাদের নির্ভরতার স্থানটি হচ্ছে সে হাদীস যাতে বর্ণিত হয়েছে যে, "আল্লাহ তা'আলা তাতে তার পা রাখবেন।' শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, 'অনুরূপভাবে কোনো কোনো আলেম নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ ও অন্যান্যদের থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তারা বিনা ইলমে কুরআনের তাফসীর করার ব্যাপারে কঠোর ছিলেন।... অবশেষে বলেন, তাহলে তাদের ব্যাপারে এটা ধারণা করা যায় না যে, তারা কুরআনকে বিনা ইলম অথবা নিজেদের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা করবেন।..." মুকাদ্দিমাতু উসূলিত তাফসীর লি শাইখিল ইসলাম, পৃ. ৩৮।

[ইবন খাফীফ কর্তৃক মহান আল্লাহর দু' হাত ও দু' পা সাব্যস্তকরণ] তারপর তিনি বলেন, আল্লাহ তা'আলা তাঁর মুমিন বান্দাদের কাছে নিজের পরিচয় দিয়েছেন যে, তাঁর রয়েছে দুটি হাত (৭২৬) যেগুলো তিনি রহমতসহ প্রশস্ত করে রেখেছেন। এরপর তিনি এ সংক্রান্ত হাদীসসমূহ উল্লেখ করেন। তারপর তিনি উমাইয়া ইবন আবিস সালতের কবিতা উল্লেখ করেন।
﴿يلقى في النار وتقول هل من مزيد؟ حتى يضع فيها رجله﴾ “জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হতেই থাকবে, আর জাহান্নাম বলতেই থাকবে, 'আরও বেশি আছে?' [সূরা ক্বাফ: ৩০] (৭২৭) অবশেষে তিনি তাতে তাঁর পা রাখবেন।' এ হচ্ছে বুখারীর বর্ণনা। অপর বর্ণনায় এসেছে, »يضع عليها قدمه« "তিনি তাতে তাঁর পা রাখবেন। (৭২৮(
তারপর তিনি [ইবন খাফীফ] বর্ণনা করলেন, যা মুসলিম আল-বাত্বীন (৭২৯) বর্ণনা করেছেন ইবন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে যে, "কুরসী হচ্ছে দু' পায়ের জায়গা। আর আরশ, তার পরিমাণ তো আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না।"
তারপর তিনি [ইবন খাফীফ] বর্ণনা করেন মুসলিম আল- বাত্বীন এর বক্তব্য(৭৩০), সুদ্দী (৭৩১)র বক্তব্য, ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ(৭৩২), আবু মালেক (৭৩৩) এর বক্তব্য।

টিকাঃ
৭২৬. আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আহ মহান আল্লাহর জন্য দু'টি হাত সাব্যস্ত করেন, যা বাস্তবেই হাত অন্যকিছু নয়, তবে তার প্রকৃত স্বরূপ আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। আর সেটা সাব্যস্ত করতে হবে যেভাবে সেটা তার জন্য উপযুক্ত হবে সেভাবে। কোনো প্রকার নিষ্ক্রীয়করণ, ধরণ নির্ধারণ, কিংবা সাদৃশ্য প্রদান করা যাবে না।
৭২৭. ইবন তাইমিয়‍্যাহ রাহিমাহুল্লাহকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, এ আয়াতে অনুরূপ এমন হাদীসে 'আরও বেশি আছে' এ কথা বলে কী বুঝানো হয়েছে? উত্তরে তিনি বলেন, বলা হয়ে থাকে যে, হাদীসে 'আরও বেশি আছে' বলে বুঝানো হয়েছে যে, আমার মধ্যে আর বাড়তি ধারণ ক্ষমতা নেই। তবে তিনি সিদ্ধান্ত দিয়ে বলেন, বস্তুত জাহান্নাম 'আরও বেশি আছে কি? এটা বলে বেশি চাইবে। অর্থাৎ আরও বাড়তি কিছু আছে যা দিয়ে আমাকে যোগান দেয়া হবে? (আল্লাহ আমাদেরকে জাহান্নামের আগুন ও জাহান্নামী হওয়া থেকে আশ্রয় দিন), বরং বাড়তি বলে এখানে জিন্ন ও মানবদের মধ্য থেকে আল্লাহ যা বাড়িয়ে দিবেন তা চাওয়া হচ্ছে। যেমনটি বুখারী ও মুসলিমে আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে এসেছে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, জাহান্নামে অনবরত ফেলা হতে থাকবে, আর জাহান্নাম বলতে থাকবে, আরও বেশি আছে কী? অবশেষে মহান রব্ব তাতে তাঁর পা রাখবেন। অপর বর্ণনায় এসেছে, তার উপরে তাঁর পা রাখবেন। তখন তার একাংশ অপর অংশের সাথে মিশে যাবে, আর জাহান্নাম বলবে, কাত্ব, কাত্ব অর্থাৎ পূর্ণ হয়ে গেছি। অপর যখন জাহান্নাম বলবে, আমি যথেষ্ট হয়েছি, আমি যথেষ্ট হয়েছি, তখন তার কাছে যা ফেলা হয়েছে সেটা তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে। তারপর আর বলবে না, 'আরও বেশি আছে কী'? বরং তখন তা পূর্ণ হয়ে যাবে, কারণ তার একাংশ অপর অংশের সাথে মিশে যাবে। তখন আল্লাহ সেটাকে তার ভেতরে যারা রয়েছে তাদের জন্য প্রশস্ততাকে সংকীর্ণ করে দিবেন। কারণ তিনি মানুষ ও জিন্ন দিয়ে জাহান্নাম ও জান্নাত উভয়টিকেই পূর্ণ করার ওয়াদা করেছিলেন। জাহান্নাম তো প্রশস্ত, সেটা যতক্ষণ আল্লাহ তা'আলা তার মাঝে যারা আছে তাদের নিয়ে সংকীর্ণ না করে দিবেন ততক্ষণ সেটা পূর্ণ হবে না। দেখুন, মাজমু' ফাতাওয়া (১৬/৪৬-৪৭)।
৭২৮. বুখারী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ৪৮৪৮, ৪৮৪৯, ৪৮৫০; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২৮৪৮।
৭২৯. তিনি হচ্ছেন আবু আব্দুল্লাহ মুসলিম ইবন ইমরান, বলা হয়ে থাকে ইবন আবী ইমরান আল- বাত্বীন, আল-কৃষ্ণী। তিনি হাদীস বর্ণনা করছেন আত্বা, মুজাহিদ, সা'ঈদ ইবন জুবাইর থেকে। তাকে আহমাদ, ইবন মা'ঈন, আবু হাতেম ও নাসায়ী নির্ভরযোগ্য বলেছেন। ইবন হাজার এর স্তর বিন্যাস অনুযায়ী ষষ্ঠ স্তরের বর্ণনাকারী। দেখুন, মিযযী, তাহযীবুল কামাল (৩/১৩২৬); ইবন হাজার, তাহযীবুত তাহযীব (১০/১৩৪); তাক্বরীবুত তাহযীব, পৃ. ৫৩০।
৭৩০, এর আছারটি বর্ণনা করেছন ইবন জারীর আত-ত্বাবারী, জামে'উল বায়ান (৩/১০), নং ৫৭৯২; সেখানে এসেছে, মুসলিম আল-বাত্বীন বলেন, কুরসী দু' পায়ের স্থান। অনুরূপ তা বর্ণনা করেছেন ইবন কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল 'আযীম (১/৪৫৭)।
৭৩১. তিনি হচ্ছেন আবু মুহাম্মাদ ইসমা'ঈল ইবন 'আব্দুর রহমান ইবন আবী কারীমাহ আল-কুফী আস-সুদ্দী, কুরাইশদের একজন মুক্তদাস। তাফসীর শাস্ত্রের ইমাম। তিনি আনাস ও ইবন সীরীন থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। 'ইজলী বলেন, তিনি নির্ভরযোগ্য, তাফসীরের আলেম, তাফসীরের বর্ণনাকারী। ইমাম যাহাবী তার প্রশংসা করে বলেন, ইমাম ও মুফাসসির।
সুদ্দী শব্দের সাধারণ অর্থ হচ্ছে কোনো বাঁধে অবস্থানকারী। তাকে 'সুদ্দী' বলার কারণ সম্পর্কে বলা হয়, তিনি মদীনার এমন এক জায়গায় বসবাস করতেন যে জায়গাকে বলা হতো 'সাদ্দ'। তিনি হিজরী ১২৭ সালে মারা যান। দেখুন, ইবন সান্দ, আত-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা (৬/৩২৩); সাম'আনী, আল- আনসাব (৩/২৩৮); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৫/২৬৪); ইবন হাজার, তাহযীবুত তাহযীব (১/৩১৩)।
এখানে সুদ্দীর যে আছারটির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে তা বর্ণনা করেছেন ইবন জারীর আত-ত্বাবারী, জামে'উল বায়ান (৩/১০)। সেখানে সুদ্দী বলেন, আসমান ও যমীন কুরসীর অভ্যন্তরে। আর কুরসী 'আরশের সামনে। আর তা (কুরসী) হচ্ছে দু' পায়ের স্থান। আর সুয়ূত্বী আদ-দুররুল মানসূর গ্রন্থে বলেন (২/১৮) যে, এটি ইবন আবী হাতেমও সুদ্দী থেকে বর্ণনা করেছেন। অনুরূপ আরও বর্ণনা করেছেন ইবন কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম (১/৪৫৭)।
৭৩২. তিনি হচ্ছেন আবু আব্দুল্লাহ ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ ইবন কামিল, আল-ইয়ামানী, আয-যিমারী আস-সান'আনী। তিনি হাম্মাম ইবন মুনাব্বিহ এর ভাই। কোনো কোনো সাহাবীর সাথে তার সাক্ষাত হয়েছে এবং তাদের থেকে ইলম অর্জন করেছেন। তার জন্ম হয়েছে হিজরী ৩৪ সালে, উসমান ইবন 'আফফান রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুর খিলাফতকালে। তিনি ইবাদত ও যুহদে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। ওয়ায করতেন এবং হিকমতের কথা বলতেন। তার প্রসিদ্ধ বাণীর মধ্যে রয়েছে, ১- মুমিন কোনো দিকে দৃষ্টি দেয় শিক্ষা নেয়ার জন্য, কথা বলে বুঝার জন্য, চুপ থাকে নিরাপদ থাকার জন্য। ২- ঈমান হচ্ছে উলঙ্গ, তার পোষাক হচ্ছে তাকওয়া, তার সৌন্দর্য হচ্ছে লজ্জা, তার সম্পদ হচ্ছে ফিকহ। তিনি হিজরী ১১০ সালে মারা যান। দেখুন, ইবন সা'দ, আত-ত্বাবাকাতুল কুবরা (৫/৫৪৩); আবু নু'আইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া (৪/২৩); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৪/৫৪৪)। তিনি এখানে যে আছারটির দিকে ইঙ্গিত করছেন তা বর্ণনা করেছেন: আবুশ শাইখ, আল-আযামাহ (২/৬২৩); সেখানকার শব্দ হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা 'আরশ ও কুরসী নূর থেকে সৃষ্টি করেছেন, বাইতুল মা'মুর ফাঁপা মুক্তা থেকে সৃষ্টি করেছেন, 'আরশ কুরসীর সাথে লাগোয়া। তাছাড়া এ বর্ণনাটি সূযুত্বী তার আদ-দুররুল মানসূর গ্রন্থেও এনেছেন, (২/১৭); অনুরূপ আব্দুল্লাহ ইবন ইমাম আহমাদ, তার আস-সুন্নাহ (১/৪৭৭), নং ১০৯২; যাহাবী, আল-আরবা'ঈন, পৃ. ১২৫-১২৬।
৭৩৩. তিনি হচ্ছেন আবু মালেক গাযওয়ান আল-গিফারী, আল-কুফী, কুনিয়াতেই প্রসিদ্ধ। তিনি বর্ণনা করেছেন 'আম্মার ইবন ইয়াসির, ইবন আব্বাস, বারা ইবন আযিব রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুম থেকে। আর তার থেকে বর্ণনা করেছেন ইসমা'ঈল ইবন সামী', ইসমা'ঈল ইবন আব্দুর রহমান আস-সুদ্দী, হুসাইন ইবন আব্দুর রহমান, সালামাহ ইবন কুহাইল। ইবন আবী খাইসামাহ বলেন, আমি ইয়াহইয়া ইবন মা'ঈনকে আবু মালেক সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, সে তো গিফারী, কৃষ্ণী, নির্ভরযোগ্য। ইয়াহইয়া ইবন মা'ঈন তাকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন, ইবন হিব্বান তাকে নির্ভরযোগ্যদের মধ্যে গন্য করেছেন। তার থেকে আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইবন হাজার এর বর্ণনাকারীদের স্তর বিন্যাস অনুযায়ী তৃতীয় স্তরের বর্ণনাকারী। দেখুন, ইবন হিব্বান, আস-সিক্কات (৫/২৯৩); মিযযী, তাহযীবুল কামাল (২/১০৮৯); ইবন হাজার, তাহযীবুত তাহযীব (৮/২৪৫); ইবন হাজার, তাক্বরীবুত তাহযীব, পৃ. ৪৪২। এখানে ইবন খাফীফ যে আছারটির দিকে ইঙ্গিত করেছেন তা বর্ণনা করেন ইবন আবী হাতেম, আত-তাফসীর, হাদীস নং ২৬০২; আব্দুল্লাহ ইবন ইমাম আহমাদ, আস-সুন্নাহ (১/৩০৩), নং ৫৮৯; সেখানকার শব্দ হচ্ছে, আর কুরসী 'আরশের নিচে, তিনি আরও বলেন, তিনি আল্লাহ তাঁর মহান পদ মুবারক কুরসীর উপরে রেখেছেন। তাছাড়া বর্ণনাটি আরও যারা এনেছেন, তারা হচ্ছেন আবুশ শাইখ, আল-আযামাহ (২/৫৫১); বাইহাক্বী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (২/২৯৫-২৯৬), নং ৮৫৭; সামান্য শব্দের হেরফের রয়েছে; সুয়ূত্বী, আদ-দুররুল মানসূর (২/১৭), আব্দ ইবন হুমাইদ ও ইবন আবী হাতেম এর বরাতে; ইবন কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম (১/৪৫৭); ইবন হাজার, ফাতহুল বারী (১৩/৪১১); যাহাবী, আল-আরবা'ঈন, পৃ. ১২৬।
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ইবন আব্বাস, মুসলিম আল-বাত্বীন, সুদ্দী, এদের বর্ণনাগুলো কেবল নিজেদের মত বা ইজতিহাদ করে দিয়েছেন তা হতে পারে না; কারণ এতে আল্লাহর পক্ষ থেকে সংবাদ দেয়া হচ্ছে, আর আল্লাহর ব্যাপারে ইজতিহাদ করে কোনো কথা বলা অগ্রহণযোগ্য। বরং এটা স্পষ্ট যে, তারা এগুলো কোনো বিশেষ কোনো ভাষ্যের ওপর ভিত্তি করেই বলে থাকবেন। সম্ভবত তাদের নির্ভরতার স্থানটি হচ্ছে সে হাদীস যাতে বর্ণিত হয়েছে যে, "আল্লাহ তা'আলা তাতে তার পা রাখবেন।' শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, 'অনুরূপভাবে কোনো কোনো আলেম নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ ও অন্যান্যদের থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তারা বিনা ইলমে কুরআনের তাফসীর করার ব্যাপারে কঠোর ছিলেন।... অবশেষে বলেন, তাহলে তাদের ব্যাপারে এটা ধারণা করা যায় না যে, তারা কুরআনকে বিনা ইলম অথবা নিজেদের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা করবেন।..." মুকাদ্দিমাতু উসূলিত তাফসীর লি শাইখিল ইসলাম, পৃ. ৩৮।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 ইমাম আবুল হাসান আল-আশ‘আরীর বক্তব্য তার ‘আল-ইবানাহ’ গ্রন্থে

📄 ইমাম আবুল হাসান আল-আশ‘আরীর বক্তব্য তার ‘আল-ইবানাহ’ গ্রন্থে


আবুল হাসান আশ‘আরী তার রচিত গ্রন্থ, যার নাম তিনি দিয়েছেন, ‘আল-ইবানাহ ফী উসূলিদ দিয়ানাহ’(১০৪), যেটি সম্পর্কে তার ছাত্ররা বলেছেন যে, এটি তাঁর সর্বশেষ কিতাব, আর তাঁর প্রতি দোষারোপকারীদের প্রতিবাদে যে গ্রন্থের ওপর নির্ভর করা হয় সে কিতাবে তিনি বলেন:

টিকাঃ
৯৩৪. উপরে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়াহ'র ভাষ্য অনুযায়ী কিতাবটির নাম দেখানো হয়েছে, আল-ইবানাহ ফী উসুলিদ দিয়ানাহ। কিন্তু এ কিতাবটি কয়েকটি মুদ্রণে ‘আল-ইবানাহ ‘আন উসূলিদ দিয়ানাহ’ এভাবে ছাপা হয়েছে। যার কোনো কোনোটি তাহক্বীককৃত, আবার কোনো কোনোটি তাহক্বীক ছাড়াই। তন্মধ্যে বর্তমানে যেগুলো প্রসিদ্ধ তা হচ্ছে,
১- আল-ইবানাহ আন উসূলিদ দিয়ানাহ, তাহকীক ড. ফাওকীয়াহ বিনতে হুসাইন মাহমূদ, প্রথম ছাপা, ১৩৯৭ হিজরী, দারুল আনসার। এ ছাপার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তাতে একাধিক পাণ্ডুলিপির ওপর নির্ভর করা হয়েছে। আর তাতে ইমাম আবুল হাসান আল-আশআরীর ব্যাপারে ব্যাপক আলোচনা স্থান পেয়েছে। যদিও এ ছাপায় কিছু দৃষ্টি আকর্ষণীয় বিষয় আছে, আর তার বড়টি হচ্ছে, এমন একক নুসখাকে মূল ধরা হয়েছে যাতে বাড়তি অনেক কথা স্থান পেয়েছে যা অন্যান্য কপিগুলোতে নেই। আরেক সমস্যা হচ্ছে এ বাড়তি অংশ মূল কিতাবের অংশ হিসেবে প্রবিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। এসব বাড়তি কথার কোনো কোনো অংশ সালাফে সালেহীনের মানহাজ বিরোধী, যা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, তা কিতাবের মানহাজ পরিপন্থী। ড. আব্দুর রহমান সালেহ আলে মাহমূদ এ মুদ্রিত কপিটির দোষগুলো বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। দেখুন, মাওকাফু ইবন তাইমিয়্যাহ মিনাল আশা’য়িরাহ (১/৩৫২-৩৫৫)।
২- ড. সালেহ আল-উসাইমী, তিনি এ কিতাবটির সুন্দর তাহকীক করেছেন। এটি সবচেয়ে চমৎকার। এতে তিনি ড. ফাওকীয়ার তাহকীকের ভুলগুলো তুলে ধরেছেন। দেখুন, পৃ. ১২২-১৩৩।
৩- আরেকটি ছাপা যা ইমাম মুহাম্মাদ ইবন সা'উদ আল-ইসলামিয়্যাহ কর্তৃক ১৪০০ হিজরী সালে সম্পন্ন হয়েছে, যাতে কোনো তাহকীক বা টাকা নেই।
৪- আরেকটি ছাপা যা মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক মদীনার তৎকালীন শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস শাইখ হাম্মাদ আল-আনসারীর ভূমিকাসহ বের হয়েছে, এতেও কোনো তাহকীক বা টীকা নেই। বস্তুত এ কিতাবটির ব্যাপারে মানুষের বিতর্ক চরমে। কারণ এ কিতাবের বক্তব্য পরবর্তী আশ‘আরী মতবাদের লোকদের আকীদাহ-বিশ্বাস পরিপন্থী। বিশেষ সিফাতে খাবরিয়‍্যাহ তথা আল্লাহর কুরআন ও রাসূলের হাদীসে আসা সিফাতের ব্যাপারে ইমাম আশ‘আরীর এ কিতাবের বক্তব্য পরবর্তী আশ‘আরী মতবাদের লোকদের নীতির সরাসরি বিরোধী। কারণ এ কিতাবে তাদের নীতির বাইরে আল্লাহর জন্য সত্তাগত সর্বোচ্চ সত্তা হওয়া এবং ‘আরশের উপরে উঠা সাব্যস্ত করার পাশাপাশি প্রায় সকল সিফাতে যাতিয়্যাহ ও সিফাতে ফিলিয়্যাহ সাব্যস্ত করা হয়েছে।
আল-ইবানাহ ও ইমাম আশ‘আরী: এ কিতাবটি যে ইমাম আবুল হাসান আল-আশ‘আরীর রচনা এ ব্যাপারে প্রাচীনকালের আশঙ্খারী মতবাদের কারও দ্বিমত ছিল না। যারা যারা এ কিতাবটি ইমাম আবুল হাসান আল-আশ‘আরীর বলে উল্লেখ করেছেন, তারা হচ্ছেন, ১- ইমাম বাইহাক্কী, আল-ই‘তিক্বাদ, পৃ. ১০৮। ২- আৰু ‘উসমান আস-সাবুনী, যেমনটি বর্ণনা করেছেন ইবন আসাকির, তাবয়ীনু কাযিবিল মুফতারী, পৃ. ৬৭৮; আরও দেখুন, ইবন রাজাব, ফাতহুল বারী (৫/১০২)। ৩- ইবন আসাকির, তাবঈনি কাযিবিল মুফতারী, পৃ. ৩৮৮-৩৮৯। ৪- আল-বাকেল্লানী, শারহুল ইবানাহ। এটি মূলত ইমাম আবুল হাসান আল-আশ‘আরীর গ্রন্থের ব্যাখ্যা। ৫- ইবন ফারহূন, আদ-দীবাজুল মুযাহহাব, পৃ. ১৯৩। ৬- ইবনুল ‘ইমাদ, শাযরাতুয যাহাব (২/৩০৩)। আর বলেছেন এটি তার সর্বশেষ কিতাব। ৭- আবুল কাসেম আব্দুল মালেক ইবন ‘ঈসা ইবন দারবাস আশ-শাফেয়ী, আয-যাব্বু আন আবিল হাসান আশ‘আরী। ৮- আবু আলী আল-হাসান ইবন আলী ইবন ইবরাহীম আল-ফারেসী। ৯- শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, তিনি এ কিতাবের ব্যাপারে অনেক গুরুত্ব দিতেন। এজন্য এ কিতাব থেকে তিনি বহু অধ্যায় নিজের অনেক কিতাবে নিয়ে এসেছেন। যেমন, দারউত তা‘আরুদ্ব (২/১৬), (৫/৬), (৭/১০৩), (১০/২৬২)। বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/৪২০), (২/১৫, ২৭, ৩৩৪, ৩৪৮, ৩৯৭)। মাজমূ‘ ফাতাওয়া (৩/১২, ২০৫), (৫/১৪৪, ১৮৬, ১৮৮), (৬/৫২), (১২/২০৩, ৩৬৩), (১৩/১৭৪), (১৬/৯১)।
১০- ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা‘উল জুয়ূশ পৃ. ২৮৬; আস-সাওয়ায়িকুল মুরসালাহ (৪/১২৪৩)।
১১- ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা (১৫/৯০); আল-আরশ ১৯২, ১৯৫, ১৯৭; যাহাবী, আল-‘উলু লিল ‘আলিয়িয়ল ‘আযীম (২/১২৪৫), নং ৪৯৮। তিনি আরও বর্ণনা করেছেন যে, ইমাম নাওয়াওয়ী স্বহস্তে তার পাণ্ডুলিপি লিখেছেন।
১২- ইবন কাসীর, ত্বাবাক্বাতুল ফুকাহা আশাফে‘ইয়‍্যাহ (১/২০৫), জীবনী নং ৯৩। সেখানে তিনি এটাও বর্ণনা করেছেন যে, ইমাম আবুল হাসান আল-আশ‘আরীর জীবনের তিনটি স্তর ছিল। সর্বশেষ স্তরে এসে তিনি এ গ্রন্থটি লিখেছেন।
১৩- ইবন আব্দুল হাদী আল-মাক্কদেসী, আল-কালামু আলা মাসআলাতিল ইস্তিওয়া আলাল ‘আরশি, পৃ. ৭৩।
১৪- সাফাদী, আল-ওয়াফী বিল ওফায়াত (১২/১১), (১৯/১১৭)।
১৫- তাজউদ্দীন আস-সুবুকী, ত্বাবাক্বাতুশ শাফে‘ঈয়্যাহ আল-কুবরা (১/১৩৩)।
১৬- ইবন রাজাব, ফাতহুল বারী (৫/১০২)।
১৭- ইবনু হাজার, লিসানুল মীযান (৪/৪৮৭)।
১৮- মার‘ঈ ইবন ইউসুফ আল-কারামী, আক্বাওয়ীলুস সিক্কাত, পৃ. ১৪৫।
১৯- সাফারীনী, লাওয়ামি‘উল আনওয়ার আল-বাহিয়‍্যাহ ১/২২, ৬৭, ১৯৭, ২৪০।
২০- আস-সাইয়্যেদ মুরতাদ্বা আয- যাবীদী, ইতহাফুস সাদাতিল মুত্তাকীন (২/৩-৪) (দারুল ফিকর)।
২১- খাইরুদ্দীন আল-আলুসী, জালাউল ‘আইনাইন, পৃ. ২৪৭, ২৫২।
সর্বোপরি এ কিতাবের রয়েছে অনেক পাণ্ডুলিপি। সকলেই কিতাবটিকে ইমাম আবুল হাসান আল-আশ‘আরীর বলে দাবি করেছেন। আর যারা সেসব কিতাবের পাণ্ডুলিপি লিখেছেন তারা বিখ্যাত আলেমে দীন ও মুসান্নিফীনে কুতুবে দীন। তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন ইমাম নাওয়াওয়ী। যা এর সত্যতার একটি বড় প্রমাণ।
বরং ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রাহিমাহুল্লাহ ইমাম আবুল হাসান আশ‘আরী রাহিমাহুল্লাহ’র ছাত্রদের এ ব্যাপারে ঐক্য বর্ণনা করেছেন যে, আল-ইবানাহ ইমাম আশ‘আরীর রচিত গ্রন্থ। দেখুন, আহকামু আহলিয যিম্মাহ (২/১১৩৮)।
এত দলীল-প্রমাণের পরও বর্তমান সময়ের কোনো কোনো লেখককে দেখা যায় প্রাচ্যবিদ কারও কারও দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এ কিতাবকে ইমাম আবুল হাসান আল-আশ‘আরীর দিকে সম্পৃক্ত করতে সন্দেহ প্রকাশ করতে। তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ড. আব্দুর রহমান বাদাওয়ী, মাযাহিবুল ইসলামিয়‍্যীন (১/৫১৭-৫১৮)। অনুরূপ প্রাচ্যবিদদের মধ্যে প্রাচ্যবিদ মুকার্থী, আলার। আর যাহেদ কাউসারী তথা পরবর্তী আশ‘আরীদের মত হচ্ছে ইমাম আশ‘আরী এ গ্রন্থটি হাম্বলীদের খুশি করার জন্য লিখেছেন। কারণ তিনি বাগদাদে প্রবেশ করে ইমাম বারবাহারীর মজলিসে বসার পর যখন বললেন যে, তিনি জাহমিয়্যাহ, মু‘তাযিলা প্রমুখদের বিরুদ্ধে রদ্দ করেছেন, তখন বারবাহারী বললেন, আমি তো এসব কিছুকে কোনো কাজই মনে করছি না, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য এগুলো বড় কাজ নয়। বিশুদ্ধ আকীদাহ ও সুন্নাহ’র প্রসারে কাজ যা হবে সেটাই কাজ। তখন নাকি ইমাম আশ‘আরী সেখানকার হাম্বলীদের খুশি করার জন্য এটা লিখেছিলেন।
না’ঊযুবিল্লাহ, ‘তা’আস্সুব’ বা গোঁড়ামী মানুষকে কত অন্ধ করে দেখুন, তারা তাদের ইমামকে মুনাফিক বানিয়ে ছাড়লো। তারপরও ইমামের কাছে থাকা হক্ক গ্রহণ করতে রাযী হলো না। এভাবেই শয়তান তার অনুসারীদের নিয়ে খেলা করে থাকে। আমরা বিশ্বাস করি যে, নিশ্চয় ইমাম আশ‘আরী হক্ক বুঝেই এ কিতাব রচনা করেছেন, কোনো কপটতা করার জন্য নয়। আল্লাহ এসব গোঁড়াদেরকে হিদায়াত দিন।
এর বিপরীতে এ কিতাবের প্রশংসা যারা করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন, ১- ইমাম বাইহাক্বী রাহিমাহুল্লাহ্ ২- ইমাম ইবন আসাকির রাহিমাহুল্লাহ। ৩- অনুরূপ ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ।
তিনি যখন আশ‘আরী মতবাদের লোকদের আলোচনা করছিলেন তখন বলেন, “আর আশ‘আরীদের মধ্যে যারা বলে যে, ‘আল-ইবানাহ’ কিতাবটি ইমাম আশ‘আরী জীবনের শেষাংশে লিখেছেন, আর তার কাছ থেকে এর বিপরীত কিছু এর পর প্রকাশ পায়নি, তাকে আহলুস সুন্নাহ এর অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য করা হবে।” মাজমু' ফাতাওয়া (৬/৩৫৯)। ৪- তদ্রূপ ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রাহিমাহুল্লাহ। তিনি ইমাম আশ‘আরীর কিছু বাণী উদ্ধৃত করার পর বলেন, “এ হচ্ছে তার ভাষ্য, যা তার সবচেয়ে সম্মানিত কিতাবে ও বড় কিতাবে এসেছে, যা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত বর্ণনায়, আর তা তার থেকে প্রসিদ্ধ, যা ‘আল-ইবানাহ’ নামে প্রসিদ্ধ। যার ওপর নির্ভর করেছেন তার ব্যাপারে বেশি জ্ঞানী, তার থেকে প্রতিরোধকারী আহলুল হাদীস আলেম ইমাম আবুল কাসেম ইবন আসাকির। কারণ ইবন আসাকির তার ‘তাবয়ীনি কাযিবিল মুফতারী’ গ্রন্থে এ কিতাবের ওপর নির্ভর করেছেন এবং এ কিতাবকে ইমাম আশ‘আরীর বড় মর্যাদার বিষয় বলে বর্ণনা করেছেন।” ইবনুল কাইয়্যেম, আস-সাওয়া’য়িকুল মুরসালাহ (৪/১২৮১-১২৮২)।
৫- ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ। তিনি বলেন, “যদি আমাদের মুতাকাল্লিম ভাইয়েরা (আশ‘আরীদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন) তারা যদি আবুল হাসান এর এ মতগুলোই সর্বশেষ মত হিসেবে গ্রহণ করতো আর সেগুলোকে আবশ্যকভাবে গ্রহণ করতো, তবে তারা তো অবশ্যই ভালো কাজটিই করতো।” যাহাবী, আল-‘উলু লিল ‘আলিয়্যিল ‘আযীম (২/১২৫৫)।
৬- অনুরূপ ইমাম ইবন রাজাব রাহিমাহুল্লাহ। তিনি বলেন, “...আর তার কিতাব, যার নাম আল-ইবানাহ, এটি তার মর্যাদাপূর্ণ কিতাবের অন্তর্ভুক্ত। তার ওপরই আলেমগণ তার মতামত বর্ণনার ব্যাপারে নির্ভর করে থাকে এবং তা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে থাকেন। যেমন বাইহাকী, আবু উসমান আস-সাবুনী, আবুল কাসেম ইবন আসাকির প্রমুখ। আর এ কিতাবটির ব্যাখ্যাই করেছেন কাযী আবু বকর ইবনুল বাকেল্লানী।” ইবন রাজাব, ফাতহুল বারী (৫/১০২)।
তাছাড়া প্রখ্যাত আলেমগণের অনেকে স্পষ্ট করে ঘোষণা করেছেন যে, এ ‘আল-ইবানাহ’ কিতাবটি ইমাম আশ‘আরী তার শেষ জীবনে সর্বশেষ কাজ হিসেবে করেছেন, যেমন, ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/১৩৬); ইবনুল ‘ইমাদ, শাযরাতুয যাহাব (৪/১৩১); ইবন কাসীর, তাবাক্বাতুল ফুক্বাহাউশ শাফে’য়ি‍্যীন (১/২০৫); নু’আন খাইরুদ্দীন আল-আলুসী, জালাউল ‘আইনাইন, পৃ. ৪৬২ প্রমুখ।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 পরিচ্ছেদে: আহলে হক ও আহলুস সুন্নাহ’র বক্তব্য স্পষ্টকরণ:

📄 পরিচ্ছেদে: আহলে হক ও আহলুস সুন্নাহ’র বক্তব্য স্পষ্টকরণ:


যদি কেউ বলে যে, তোমরা মু‘তাযিলা, ক্বাদারিয়া), জাহমিয়্যাহ, হারুরিয়া, রাফেযী, মুরজিয়াদের কথা অস্বীকার করে থাক তাহলে তোমরা যা বলো এবং তোমরা যে দীন অনুসরণ করো তা আমাদের জানিয়ে দাও।

টিকাঃ
৯৩৫. কাদারিয়‍্যাহ বলতে সাধারণত তাদেরকে বুঝায়, যারা বিশ্বাস করে যে, বান্দা নিজের কর্ম নিজে সৃষ্টি করে থাকে। আর তারা মূলত মু‘তাযিলা নামে খ্যাত। তাদেরকে কখনও কখনও কাদারিয়‍্যাহ-মু‘তাযিলা নামে একসাথেও বলা হয়। কিন্তু যখন কেউ বলে মু‘তাযিলা ও কাদারিয়‍্যাহ তখন সেখানে কাদারিয়‍্যাহ শব্দ দিয়ে জাবরিয়াদের বুঝানো হয়। যারা বান্দার কোনো কাজের ক্ষমতা স্বীকার করে না।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 ইমাম আশ‘আরী কর্তৃক ইমাম আহমাদ এর আকীদাহ ধারণ করার স্পষ্ট ঘোষণা

📄 ইমাম আশ‘আরী কর্তৃক ইমাম আহমাদ এর আকীদাহ ধারণ করার স্পষ্ট ঘোষণা


তাহলে তাকে বলা হবে, আমরা যে কথা বলি এবং আমরা যে দীন অনুসরণ করি তা হলো আমরা ধারণ করি যা আমাদের প্রভুর বাণী, নবীর সুন্নত, আর যা সাহাবী, তাবে‘য়ী ও হাদীসের ইমামদের থেকে বর্ণিত হয়ে এসেছে, আমরা তা শক্তভাবে আঁকড়ে ধরি। আর যা ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (আল্লাহ তার চেহারা উজ্জ্বল করুন, মর্যাদা উন্নত করুন) বলেছেন আমরাও তাই বলি। তার কথার বিপরীত যাদের কথা হবে আমরা তাদের বিরোধিতা করি। কেননা তিনি হচ্ছেন শ্রেষ্ঠ ইমাম, পরিপূর্ণ নেতা, যার মাধ্যমে আল্লাহ সত্যকে প্রস্ফুটিত করেছেন এবং ভ্রষ্টতাকে তুলে দিয়েছেন, মানহাজ তথা পথ-পন্থাকে প্রকাশ করে দিয়েছেন। তাঁর মাধ্যমে বিদ‘আতীদের বিদ‘আত, বক্রপথ অবলম্বনকারীদের বক্রতা, সংশয়ীদের সংশয় উপড়ে ফেলেছেন। তাই আল্লাহর রহমত সেই অগ্র নেতা মহা সম্মানিত, মহান ব্যক্তি, বড় সমঝদার ব্যক্তির ওপর আপতিত হোক。
মোটকথা, আমরা স্বীকার করি আল্লাহকে, তাঁর ফিরিশতাদেরকে, তার কিতাবসমূহকে, তাঁর রাসূলগণকে, আর তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে যা নিয়ে এসেছিলেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে নির্ভরযোগ্য সূত্রে যা বর্ণিত হয়েছে সেগুলোকে। তার কোনোটাই আমরা প্রত্যাখ্যান করি না। নিশ্চয় আল্লাহ এক, তিনি ব্যতীত সত্য কোনো ইলাহ নেই। তিনি অদ্বিতীয়, অমুখাপেক্ষী। গ্রহণ করেননি স্ত্রী ও সন্তান। নিশ্চয় মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল। তাকে তিনি হিদায়াত ও দীন সহ প্রেরণ করেছেন সকল দীনের ওপর বিজয়ী করার জন্য। নিশ্চয় জান্নাত ও জাহান্নাম সত্য। কিয়ামত ঘটবে, কবরস্থকে আল্লাহ পুনরুত্থিত করবেন。
নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর ‘আরশের উপরে সমুন্নত হয়ে আছেন। যেমনটি তিনি বলেন, الرَّحْنُ عَلَى الْعَرْشِ أَسْتَوَى “রহমান ‘আরশের উপর উঠেছেন।” [সূরা ত্বা-হা: ০৫] তাঁর রয়েছে চেহারা, যেমন তিনি বলেন, وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ والإكرام "আর অবিনশ্বর শুধু আপনার রবের (সত্তাসহ) চেহারা, যিনি মহিমাময়, মহানুভব।" [সূরা আর-রহমান: ২৭] তাঁর রয়েছে ধরণ অজানা দুটি হাত। যেমনটি তিনি বলেছেন, بَلْ يَدَاهُ مَبْسُوطَنَانِ يُنفِقُ كَيْفَ يَشَاءُ "বরং আল্লাহর উভয় হাতই প্রসারিত; যেভাবে ইচ্ছা তিনি দান করেন।" [সূরা আল-মায়েদাহ: ৬৪] আর তাঁর রয়েছে দুটি চোখ, যেগুলোর ধরণ অজানা। যেমন তিনি বলেন, تجْرِي بِأَعْيُنِنَا "সে জাহাজ চলত আমাদের চোখের সামনে।" [সূরা আল-ক্বামার: ১৪] আর আমরা আরও স্বীকার করি যে, ‘যে ধারণা করবে যে, আল্লাহর নাম তিনি ভিন্ন অন্য কিছু, সে তো পথভ্রষ্ট।” আর তিনি [আশ‘আরী] ফিরাকের বর্ণনায় যা বলেছেন, (মাকালাতুল ইসলামিয়‍্যীন গ্রন্থে) সেটার মতো এখানেও উল্লেখ করেন। তারপর বলেন, নিশ্চয় ইসলাম ঈমান থেকে প্রশস্ত। কাজেই প্রত্যেক ইসলাম ঈমান নয়। (১০৭) আর আমরা দীন হিসাবে বিশ্বাস করি যে, নিশ্চয় আল্লাহ কলবসমূহকে উলটপালট করেন, যা মহান আল্লাহর আঙ্গুলসমূহের দু’ আঙুলের মাঝে রয়েছে。
আরও বিশ্বাস করি যে, নিশ্চয় মহান আল্লাহ, তিনি এক আঙ্গুলের উপর আসমানকে রাখবেন আর যমীনসমূহকে অপর আঙ্গুলের উপর রাখবেন। যেমনটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সহীহ বর্ণনায় এসেছে。
শেষে [আশ‘আরী] বলেন, নিশ্চয় ঈমান হচ্ছে কথা ও কাজের নাম। তা বাড়ে ও কমে। আর নির্ভরযোগ্য সূত্রে ন্যায়পরায়ণ থেকে ন্যায়পরায়ণের মাধ্যম হয়ে সর্বশেষ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত গিয়ে শেষ হওয়া সকল বিশুদ্ধ হাদীস ও আছারসমূহ আমরা মেনে নিই。
শেষে বলেন, আর আমরা হাদীস বর্ণনাকারীদের দ্বারা সুসাব্যস্ত করা যাবতীয় বর্ণনাসমূহকে সত্য বলে মেনে নিই, যাতে আল্লাহ কর্তৃক দুনিয়ার আসমানে নেমে আসাকে সাব্যস্ত করা হয়েছে। আর মহান রব বলতে থাকেন, ‘কোনো যাঞ্চাকারী আছে কী? কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছে কী?’ অনুরূপ যাবতীয় বিষয় যা তারা বর্ণনা দ্বারা নিয়ে এসেছেন এবং সাব্যস্ত করেছেন, যা বক্রপথ অবলম্বনকারী ও ভ্রষ্টপথের অনুসারীদের পদ্ধতির বিপরীত。
আর আমাদের নিজেদের মাঝে মতানৈক্য হলে আমাদের রবের কিতাব কুরআন, আমাদের নবীর সুন্নাহ, মুসলিমদের ইজমা‘, আর যা এর মত রয়েছে সেগুলোর দিকে প্রত্যাবর্তন করি। দীনের মধ্যে কোনো বিদ‘আতের প্রচলন করি না, যা করার জন্য তিনি আমাদের অনুমতি দেননি। আর আমরা যা জানি না তা আল্লাহর ব্যাপারে বলি না।
আর আমরা বলি যে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন আল্লাহ (হাশরের মাঠে) আসবেন। যেমনটি তিনি বলেছেন, "وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا ﴾ [الفجر: ২২] "এবং যখন আপনার রব আগমন করবেন আর সারিবদ্ধভাবে ফিরিশতাগণও (উপস্থিত হবে)।" [সূরা আল-ফাজর: ২২] আর আল্লাহ যেমন চান তেমনিভাবে তিনি তাঁর বান্দাদের নিকটবর্তী হন।
যেমনটি তিনি বলেছেন, "وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ [ق: ১৬] "আর আমরা তার গ্রীবাস্থিত ধমনী থেকেও অধিক নিকটবর্তী।" [সূরা, ক্বাফ: ১৬] আরও যেমন বলেছেন, "ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّى فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى ﴾ [আন-নাজম: ৯,৮] "তারপর তিনি তার কাছাকাছি হলেন, অতঃপর খুব কাছাকাছি, ফলে তাদের মধ্যে দু’ ধনুকের ব্যবধান রইল অথবা তারও কম।" [সূরা আন-নাজম: ৯-৮] অতঃপর তিনি বলেন, আমরা আমাদের যে কথা উল্লেখ করেছি, আর যা উল্লেখ করিনি, অবশিষ্ট রয়েছে, সে সবের একটি একটি করে দলীলসহ উল্লেখ করব। অতঃপর তিনি এ বিষয়ে আলোচনা করেন যে, আল্লাহকে দেখা যাবে, সেটার ওপর প্রমাণও পেশ করেছেন। তারপর তিনি এ বিষয়ে আলোচনা করেন যে, কুরআন সৃষ্ট নয়, সেটার ওপর দলীলও পেশ করেন। তারপর যে কেউ কুরআন নিয়ে কথা বলা থেকে বিরত থাকে এবং বলে আমি সেটাকে মাখলুক বা সৃষ্টও বলি না, অসৃষ্টও বলি না, সে ব্যক্তির বিষয়ে তিনি আলোচনা করেন এবং তার বক্তব্য খণ্ডন করেন।

টিকাঃ
৯৩৬. ইসলাম ও ঈমান বিষয়ক মাসআলা, আর এ দু’টি কি একটি অপরটির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে? আবু জা‘ফর মুহাম্মাদ ইবন আলী আল-বাকের রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘এ হচ্ছে ইসলাম, তারপর তিনি একটি বড় বৃত্ত আঁকলেন। তারপর তিনি সে বড় বৃত্তের মাঝখানে ছোট্ট একটি বৃত্ত এঁকে বললেন, এ হচ্ছে ঈমান। বস্তুত ইসলাম ও ঈমান এ দু’টির মাঝে ব্যাপকতা ও বিশেষতার সম্পর্ক। বলা হয়ে থাকে, যখন এ দুটি একসাথ হয় তখনই তা ভিন্ন ভিন্ন অর্থ দিতে আরম্ভ করে, আর যখন আলাদা থাকে তখন একটি অপরটির সমার্থে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ যখন কোথাও ইসলামের সাথে ঈমান ব্যবহৃত হয় তখন ঈমান বলতে বুঝাবে কেবল সেসব আমল যা অন্তরের সাথে সম্পৃক্ত হয় যেমন আল্লাহর ওপর ঈমান, ফিরিশিতাদের ওপর ঈমান, কিতাবের ওপর ঈমান, রাসূলগণের ওপর ঈমান, আখেরাতের ওপর ঈমান, শেষ দিবসের ওপর ঈমান, তাক্বদীরের ওপর ঈমান। আর তখন ইসলাম বলতে বুঝাবে প্রকাশ্য আমলসমূহ, কালেমা তাইয়্যেবার শাহাদাত, কালেমায়ে রিসালাতের শাহাদাত, সালাত, যাকাত, সাওম, হজ ইত্যাদি। এ বিস্তারিত অবস্থানটিই আমরা হাদীসে জিবরীল নামে খ্যাত রাসূলের মুখ নিঃসৃত বাণীতে পার্থক্য হিসেবে দেখতে পাই। যখন জিবরীল ‘আলাইহিস সালাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইসলাম, ঈমান ও ইহসান সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন। হাদীসটি দেখুন, বুখারী, আল-জামে‘উস সহীহ, হাদীস নং (১/১১৪), নং ৫০; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ৮। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরীলের হাদীসে ইসলাম কাকে বলা হবে, ঈমান কাকে বলা হবে আর ইহসান কাকে বলা হবে এগুলোর মধ্যে পার্থক্য করেছেন। বরং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম দীনের তিনটি স্তর নির্ধারণ করেছেন, সর্বোচ্চ স্তর ইহসান, মধ্যম স্তর ঈমান, আর তার পরে হচ্ছে ইসলাম। সুতরাং প্রত্যেক মুহসিন অবশ্যই মুমিন, আর প্রত্যেক মুমিন অবশ্যই মুসলিম, কিন্তু প্রত্যেক মুমিন ব্যক্তি মুহসিন নয়, অনুরূপ প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তি মুমিন নাও হতে পারে। তবে এ পার্থক্য দ্বারা এটা আবশ্যক হয় না যে, তার একটি অপরটি থেকে সম্পূর্ণভাবে পৃথক হয়ে যাবে。
তারপর ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, ইহসান স্বয়ং ব্যাপক বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত হলেও ব্যক্তিদের দিক থেকে ঈমানের চেয়ে বিশেষায়িত। অনুরূপ ঈমান স্বয়ং ব্যাপক বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত হলেও ব্যক্তিদের দিক থেকে ইসলামের চেয়ে বিশেষায়িত। সুতরাং ইহসানের অভ্যন্তরে ঈমান প্রবেশ করবে, আর ঈমানের অভ্যন্তরে ইসলাম প্রবেশ করবে। কিন্তু মুহসিনগণ মুমিনগণের তুলনায় বিশেষায়িত, আর মুমিনগণ মুসলিমগণের তুলনায় বিশেষায়িত। দেখুন, ঈমান, পৃ. ১-৭; ২৪৩, ৩০২, ৩৫০।
এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন, শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, আল-ঈমান, পৃ. ১-১০, ১৫৩-১৬৩, ২৪৬ ও তৎপরবর্তী, ইবন আবিল ইযা, শারহুত ত্বাহাওয়িয়্যাহ (২/৪৮৮-৪৯৪)।
৯৩৭. ‘প্রতিটি ইসলাম ঈমান নয়’ এ কথাটির অর্থ ইসলাম বিভিন্ন কারণে কোনো মানুষের জন্য ব্যবহার করা যায়, যা ঈমানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। যেমন এক প্রকার ইসলাম হচ্ছে তা যার ওপর সাওয়াব হয়, যার কারণে কুফরী ও নিফাক্বী থেকে বের হয়ে যায়, যেমন বেদুঈনদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, “বেদুঈনরা বলে, ‘আমরা ঈমান আনলাম’। বলুন, ‘তোমরা ঈমান আননি, বরং তোমরা বল, ‘আমরা আত্মসমর্পণ করেছি’, কারণ ঈমান এখনো তোমাদের অন্তরে প্রবেশ করেনি। আর যদি তোমরা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর তবে তিনি তোমাদের আমলসমূহের সাওয়াব সামান্য পরিমাণও লাঘব করবেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’।” [সূরা আল-হুজুরাত: ১৪] আরেক প্রকার ইসলাম আছে যাতে কেউ মৃত্যু থেকে বেঁচে যায়, যেমন মুনাফিকদের ইসলামের পরিচয়। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, আল-ঈমান, পৃ. ৩৩২, ৩৪২, ৩৯৭।
৯৩৮. ইমাম আশ‘আরী রাহিমাহুল্লাহ এখানে আল্লাহ কর্তৃক বান্দার নৈকট্য লাভের বিষয়টিকে ব্যাপক হিসেবে নিয়েছেন। বিশুদ্ধ কথা হচ্ছে, আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য বিশেষ গুণ। সেটা ‘সাথে থাকা’র মত ব্যাপক গুণ নয়। এ মাসআলাটি ইতোপূর্বে বর্ণিত হয়েছে।
৯৩৯. আমরা পূর্বে এ আয়াতের আলোচনায় জানিয়েছি যে, প্রাধান্যপ্রাপ্ত মতে এখানে ‘ফিরিশতাদের’ বুঝানো হয়েছে। এখানে আল্লাহকে বুঝানো হয়নি। এ বিষয়ে আরও দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৬/৩০)।
৯৪০. সম্ভবত ইমাম আশ‘আরী রাহিমাহুল্লাহ এখানে ‘দুনুও’ বা নিকটে হওয়া দ্বারা আল্লাহ কর্তৃক তাঁর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটবর্তী হওয়া বুঝেছেন, যা ইবন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমা ও মুকাতিল ইবন সুলাইমান থেকে একটি বর্ণনায় এসেছে। দেখুন, ইবন জারীর আত-তাবারী, জামেউল বায়ান ‘আন তা’ওয়ীলে আয়িল কুরআন (২২/৫০২); ইবনুল জাওযী, যাদুল মাসীর (৮/৬৫-৬৬); কুরতুবী, আল-জামে‘ লি আহকামিল কুরআন (১৭/৮৯); সুয়ূত্বী, আদ-দুররুল মানসূর (৭/৬৪৫)।
কিন্তু এ আয়াতের তাফসীরে বিশুদ্ধ মত হচ্ছে, এখানে জিবরীল ‘আলাইহিস সালাম কর্তৃক মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটবর্তী হওয়াকে বুঝানো হয়েছে। আর এটিই অধিকাংশ সাহাবী, তাবে‘য়ী যেমন কাতাদাহ, হাসান আল-বসরী, রবী ইবন আনাস প্রমুখের মত। ইবন আতিয়্যাহ আল- আন্দালুসী বলেন, এটিই অধিকাংশের মত। দেখুন, আল-মুহাররার আল-ওয়াজীয় (১৪/৮৯-৯০)। ইবন কাসীর বলেন, ‘এখানে নিকটে হওয়া দ্বারা জিবরীলকে বুঝানো হয়েছে। যেমনটি বুখারী ও মুসলিমে সাব্যস্ত হয়েছে। [বুখারী, আল-জামে‘উস সহীহ, হাদীস নং ৩২৩৫, ৪৮৫৬; মুসলিম, আস- সহীহ, হাদীস নং ১৭৪, ১৭৭] আর তা উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা, ইবন মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু, থেকে বর্ণিত। তাছাড়া তা সহীহ মুসলিমে আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত। [মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ১৭৫] আর সাহাবায়ে কিরামের মধ্য থেকে এ আয়াতকে এ হাদীস দ্বারা তাফসীর করার ব্যাপারে কোনো বিরোধিতা পাওয়া যায়নি, তাই সেটাই প্রাধান্য পাবে।’ ইবন কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম (৫/৮)।
অন্যত্র ইবন কাসীর বলেন, মুফাসসিরগণের মতামত থেকে বিশুদ্ধটি হচ্ছে, বরং অকাট্যভাবে এটাই বলা হবে যে, এ আয়াতে যাকে নিকটে আসা বুঝানো হয়েছে তিনি জিবরীল ‘আলাইহিস সালাম। যেমনটি বুখারী ও মুসলিম তাদের সহীহ গ্রন্থে আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করেছেন, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘এ হচ্ছে জিবরীল।’ সুতরাং এ হাদীস সকল বাদানুবাদের পথ বন্ধ করে দিয়েছে, আর সংশয় দূর করে দিয়েছে।’ ইবন কাসীর, আল-ফুসূল ফী সীরাতির রাসূল, পৃ. ২৬১। আর এখানে ইবন কাসীর রাহিমাহুল্লাহ যে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ‘তা ইমাম মুসলিমের বর্ণিত শব্দ। দেখুন, মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ১৭৭। এজন্য আমাদের উস্তাদগণের উস্তাদ শাইখ মুহাম্মাদ আল-আমীন আশ-শানক্কীত্বী বলেন, ‘তিনি হচ্ছেন জিবরীল এটাই তাহকীকী কথা, মহান আল্লাহ নন।’ দেখুন, আশ-শানকীত্বী, আদ্বওয়াউল বায়ান (৩/১০)।
এখানে একটি বিষয়ে সাবধান করা দরকার, তা হচ্ছে, সূরা আন-নাজম এর এ আয়াতে বর্ণিত ‘দুনুও’ ও ‘তাদাল্লী’ বা ‘নিকটে আসা ও কাছে আসা’ এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক ইসরা ও মি‘রাজের রাত্রির ব্যাপারে বর্ণিত ‘দুনুও’ ও ‘তাদাল্লী’ এক নয়। কারণ সূরা আন- নাজম এর আয়াতে জিবরীল কর্তৃক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে আসা ও কাছে থাকা বুঝানো হয়েছে, যেমনটি আয়েশা ও ইবন মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহুম ‘আনহা বলেছেন, আর আয়াতের পূর্বাপর বিশ্লেষণ তার ওপরই প্রমাণবহ। কারণ আল্লাহ বলেন, “তাকে শিক্ষা দান করেছেন প্রচণ্ড শক্তিশালী।” [সূরা আন-নাজম: ০৫] এটা অবশ্যই জিবরীল, এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই, তারপর বলা হয়েছে “সৌন্দর্যপূর্ণ সত্তা। অতঃপর তিনি স্থির হয়েছিলেন, আর তিনি ছিলেন ঊর্ধ্বদিগন্তে, তারপর তিনি তার কাছাকাছি হলেন, অতঃপর খুব কাছাকাছি।” [সূরা আন-নাজম: ৬-৮] এটাও জিবরীলই হবেন; যাতে করে সর্বনামগুলো এক দিকে প্রর্ত্যাবর্তন করানো যায়। আর তা হচ্ছে শক্তিশালী শিক্ষক, যিনি অত্যন্ত সুন্দর জিবরীল ‘আলাইহিস সালাম।
কিন্তু ইসরা ও মি‘রাজের হাদীসে আসা ‘দুনুও’ ও ‘তাদাল্লী’ বা নিকটে আসা ও কাছে হওয়ার বিষয়টিতে এটাই সুস্পষ্ট যে, সেখানে মহান রাব্বুল আলামীন কর্তৃক মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে আসা বুঝানো হয়েছে। সূরা আন-নাজমে মোটেই সেটার দিকে ইঙ্গিত করা হয়নি।’ দেখুন, ইবনুল কাইয়্যেম, যাদুল মা‘আদ (৩/৩৮)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00