📄 ইবন খফীফ কর্তৃক মহান আল্লাহর ‘নূর’ সাব্যস্ত করা
[ইবন খাফীফ কর্তৃক মহান আল্লাহর 'নূর' সাব্যস্ত করা]
অনুরূপ আল্লাহ তাঁর কুরআনে আমাদের জন্য যে জানিয়েছেন, আর যা দিয়ে তিনি নিজেকে গুণান্বিত করেছেন, অনুরূপ সুন্নাতুর রাসূলেও যা বিশুদ্ধ আকারে এসেছে, তন্মধ্যে রয়েছে, তিনি বলেছেন اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ﴾ [النور: ٣٥ "আল্লাহ আসমান ও যমীনের নূর।"(৭১৬) [সূরা আন-নূর: ৩৫] তারপর তিনি এর পরপরই বলেছেন, نُورٌ عَلَى نُورٍ) [النور: ٣٥]
তেমনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দো'আয় বলতেন: أنت نور السماوات والأرض "আপনি আসমান এবং যমীনের নূর।”(৭১৭)
তারপর আবু আব্দুল্লাহ ইবন খাফীফ উল্লেখ করেছেন আবু মূসার হাদীস: حجابه النور - أو النار- لو كشفه لأحرقت سبحات وجهه ما انتهى إليه بصره من خلقه "তাঁর পর্দা হচ্ছে নূর বা আগুন, যদি তিনি সেটা খুলে দিতেন তাহলে তাঁর দৃষ্টির শেষ পর্যন্ত সকল মাখলুক তাঁর চেহারার উজ্জ্বলতায় পুড়ে যেত।”(৭১৮) তিনি বলেন, سبحات وجهه হচ্ছে তার ঔজ্জ্বল্য, মহত্ব ও নূর। তিনি সেটা খলীল ও আবু উবাইদ থেকে বর্ণনা করেন। (৭১৯)
আরও বলেন, আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন: نور السماوات من نور وجهه অর্থ আসমানের যত আলো তা হচ্ছে তাঁর চেহারার উজ্জ্বল আলো থেকে। (৭২০)
টিকাঃ
৭১৬, ইবন খাফীফ এটা সাব্যস্ত করতে চেয়েছেন যে, আল্লাহর নামসমূহের অন্যতম হচ্ছে নূর। আর তা এমন নূর যা আল্লাহর মর্যাদা ও মহত্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেটা অপর কোনো নূরের মতো নয়। কুরআনে কারীম ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসে আল্লাহ তা'আলার পরিচয় তুলে ধরে বলা হয়েছে, নিশ্চয় আল্লাহ নূর, তাঁর রয়েছে নূর, তাঁর পর্দা হচ্ছে নূরের। সালাফদের মধ্যে যদি কারো থেকে এ বর্ণনা পাওয়া যায় যে, তারা এ আয়াতের তাফসীরে এটা বলেছেন যে, 'আল্লাহ আসমানসমূহ ও যমীনের অধিবাসীদের হিদায়াতকারী' তাহলে এটা বুঝে নিতে হবে যে, এটি আয়াতের একটি তাফসীর, যেটাকে উপজীব্য করে আল্লাহ তা'আলার স্বয়ং 'নূর' হওয়াকে অস্বীকার করা যাবে না। কারণ আরবরা যখন কোনো কিছুর তাফসীর বা ব্যাখ্যা করে তখন তারা যেটার ব্যাখ্যা করা হচ্ছে সেটার বিবিধ নাম বা কিছু প্রকার বর্ণনা করে থাকেন, যা দ্বারা উক্ত জিনিসের অপরাপর গুণাবলি সাব্যস্ত হওয়াকে না করে না। দেখুন, শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমু' ফাতাওয়া (৬/৩৯০)।
কিন্তু পরবর্তীদের মধ্যে যারা আল্লাহর নূর সাব্যস্ত না করে সেটার তা'ওয়ীল করে বলে যে, এর অর্থ হিদায়াতকারী অথবা আলোকিতকারী অথবা সৌন্দর্যমণ্ডিতকারী, তাদের এ ব্যাখ্যা কখনও বিশুদ্ধ হবে না; কারণ তারা আসল অর্থ 'নূর' সাব্যস্ত না করার জন্য দূরবর্তী অর্থ গ্রহণ করে।
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, 'নূর' নামটি স্রষ্টার জন্যও সত্য আর সৃষ্টির জন্যও সত্য। স্বয়ং সে সত্তার জন্যও তা বলা যাবে যার সাথে তার অস্তিত্ব এসেছে, অনুরূপভাবে কোনো কিছুর গুণ হিসেবেও বলা যাবে, যার সাথে তার অস্তিত্ব রয়েছে, তদ্রূপ তারও গুণ হতে পারে যেটা সে অন্যের কাছ থেকে পেয়েছে, যেমন আলোকরশ্মির প্রতিবিম্ব। আর আল্লাহর বাণী, "আল্লাহ আসমান ও যমীনের নূর, তাঁর নূরের উদাহরণ এমন যেন একটি (বদ্ধ দেয়ালের খোপে থাকা) তাক, যাতে চেরাগ রাখা আছে।” [সূরা আন-নূর: ৩৫] এখানে তিন প্রকার নূরের কথাই আছে। প্রথমেই জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে তিনি নূর, আরও বলা হয়েছে যে তাঁর রয়েছে নূর, আরও বলা হয়েছে যে তিনি যেন তাকের উপরে থাকা চেরাগ। আর জানা কথা যে, তাকের উপরে থাকা চেরাগে এমন নূর রয়েছে যা তার নিজের উপর নির্ভর করে আছে, আর সেটার এমন নূরও রয়েছে যা তার থেকে উৎসারিত হয়ে যমীন ও দেয়ালে পড়েছে। দেখুন, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৮/৭৫-৭৬)।
ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ স্পষ্ট করে এটা সাব্যস্ত করছেন যে, বেশিরভাগ সৃষ্টির অভিমত হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং নূর, এমনকি যারা আল্লাহর গুণাবলি অস্বীকার করে সেসব জাহমিয়্যারাও তাকে নূর বলে স্বীকৃতি দিত। তবে এটা বলা যে, আল্লাহ তা'আলা তিনিই স্বয়ং সূর্যের, চাঁদের, আগুনের আলো, এমন কথা কোনো মুসলিম বলে না। দেখুন, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৮/৬৬-৬৭)। অনুরূপভাবে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ এটাও স্পষ্ট করে বলেছেন যে, অন্য কোনো সত্তার দিকে যখন 'নূর' সম্পৃক্ত করা হবে তখন সেটা আর আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করা হবে না। সুতরাং দুনিয়ার চেরাগের আলোকে কখনো আল্লাহর আলো বলা যাবে না। মাজমু' ফাতাওয়া (৬/৩৯২)।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, 'নূর' আল্লাহর দিকে দু'ভাবে সম্পৃক্ত হতে পারে: এক. সিফাতকে মাওসূফের দিকে সম্পৃক্ত করা, অর্থাৎ গুণকে তার গুণান্বিত সত্তার দিকে সম্পৃক্ত করা, যেমন আল্লাহর বাণী, "আর যমীন আলোকিত হয়ে গেছে তার রবের নূরে।" [সূরা আয-যুমার: ৬৯] অনুরূপ হাদীস বা আছারে এসেছে, "আর আমি আপনার চেহারার নূরের আশ্রয় নিচ্ছি, যে নূরের আলোতে সকল অন্ধকার উদ্ভাসিত হয়েছে।” [দ্বিয়া আল-মাকদেসী, আল-আহাদীসুল মুখতারাহ (৯/১৮১); তাবারানী, আদ-দু'আ, হাদীস নং ১০৩৬; আল-মু'জামুল কাবীর (১৩/৭৩)] দুই. ফা'য়েলকে মাফ'উলের দিকে সম্পৃক্ত করা, অর্থাৎ কর্মকে তার কর্তার দিকে সম্পৃক্ত করা। যেমন আল্লাহর বাণী, "তাঁর নূর যেন তাকের উপর থাকা একটি চেরাগ।” [সূরা আন-নূর: ৩৫] অনুরূপ হাদীস বা আছারে এসেছে, 'মুমিনের অন্তরে আল্লাহর নূরের উদাহরণ' সেটা এ অর্থে যে, তিনিই সেটা প্রদান করেন, তিনিই সেটার বান্দার অন্তরে সঞ্চার করে দেন। দেখুন, ইজতিমা'উল জুয়ুশিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৪৫ ও তার পরবর্তী পৃষ্ঠা।
সুতরাং আমরা বুঝতে পারলাম যে, ১- আল্লাহ তা'আলার একটি নাম 'আন-নূর'। [শাইখ আব্দুল্লাহ আল-গুনাইমান, শারহু কিতাবিত তাওহীদ মিন সহীহিল বুখারী (১/১৭০-১৭৭); শাইখ আলাওয়ী আস-সাক্কাফ, সিফাতুল্লাহিল ওয়ারিদা ফিল কিতাবি ওয়াস সুন্নাহ, পৃ. ২৬০-২৬১] সুতরাং তিনি আল্লাহ নূর যে নূরের মাধ্যমে তিনি সবকিছুকে হিদায়াত দিয়েছেন।
২- আল্লাহ তাআলার একটি সত্তাগত গুণ হচ্ছে 'নূর'। [শাইখ আলাওয়ী আস-সাক্কাফ, সিফাতুল্লাহিল ওয়ারিদা ফিল কিতাবি ওয়াস সুন্নাহ, পৃ. ২৫৯-২৬১] তাঁর গুণ হিসেবে তা তাঁর দিকে সম্বন্ধ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, "তাঁর নূরের উদাহরণ হচ্ছে...।" [সূরা আন-নূর: ৩৫] অনুরূপ আল্লাহ তা'আলা বলেন, "আর যমীন উদ্ভাসিত হলো তার রবের নূরে।" [সূরা আয-যুমার: ৬৯] ৩- আল্লাহ তা'আলার চেহারাও নূরের। [মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ১৭৯; ইবন মাজাহ, আস-সুনান, হাদীস নং ১৯৫] হাদীসে আরও এসেছে, "আপনার চেহারার নূরের উসীলার আশ্রয় নিচ্ছি”। আরও এসেছে, "আসমান ও যমীনের আলো তাঁর চেহারার আলো হতে।” [শাইখ আব্দুল্লাহ আল-গুনাইমান, শারহু কিতাবিত তাওহীদ মিন সহীহিল বুখারী (১/১৭০-১৭৭)]
৪- আল্লাহ তা'আলার পর্দাও নূরের। [মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ১৭৯]
৪- আল্লাহ তা'আলার নূর যে সৃষ্টির উপর পড়েছে সেই ঈমানদার হবে, আর যার উপর পড়েনি, সে ঈমানদার হয়নি। [তিরমিযী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ২৬৪২]
৫- আসমান ও যমীনের যত নূর সবই তাঁর থেকে প্রাপ্ত। যেমনটি আল্লাহ তা'আলা সূরা আন-নূরে বলেছেন, "তাঁর নূরের উদাহরণ হচ্ছে চেরাগদানী, যাতে রয়েছে চেরাগ।" [সূরা আন-নূর: ৩৫; আরও দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৬/৩৮৬)] এখন প্রশ্ন হচ্ছে এটা কি তাঁর গুণ? শাইখ আব্দুল্লাহ গুনাইমান বলেন, এটা তাঁর সিফাত বা গুণ নয়। [শাইখ আব্দুল্লাহ আল-গুনাইমান, শারহু কিতাবিত তাওহীদ মিন সহীহিল বুখারী (১/১৭০-১৭৭)] আর যদি 'আল্লাহ আসমান ও যমীনের নূর' বলে সেটাকে সিফাতী নূর ধরা হয় তবে সে নূরের ধরণ আমরা জানি না। এটাই শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যার বক্তব্য থেকে বুঝা যায়। দেখুন, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৫/৪৮৬-৪৯৩)। আরও দেখুন, https://www.alukah.net/ web/refai/0/123379/ কিন্তু সর্বাবস্থায় কোনোক্রমেই এ নূর বলতে সূর্য কিংবা চন্দ্র অথবা কোনো বিদ্যুত বা তারকা বা চেরাগের আলো বুঝানো হয়নি। [শাইখ আব্দুল্লাহ আল-গুনাইমান, শারহু কিতাবিত তাওহীদ মিন সহীহিল বুখারী (১/১৭০-১৭৭)]
৬- হাশরের মাঠের যমীন যে নূরে আলোকিত হবে তাও আল্লাহ তা'আলার নূর। [সূরা আয-যুমার: ৬৯] ইবন তাইমিয়্যাহ এখানে সৃষ্ট নূর অর্থ করা যাবে না। [মাজমূ' ফাতাওয়া (৬/৩৯২)]
৭- জান্নাতও আলোকিত হবে আল্লাহ তা'আলার 'আরশের নুরের দ্বারা, আর 'আরশের নূর তো আল্লাহর চেহারার নূর থেকে প্রাপ্ত। [ইবন মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু তা বর্ণনা করেছেন। দারেমী, আর-রাদ্দু আলাল মিররীসী, পৃ. ৪৪৯; ইবন মান্দাহ, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ, পৃ. ৯৯; ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, হাদীসটি ত্বাবারানী তার মু'জামে বর্ণনা করেছেন ও তার আস-সুন্নাহতে বর্ণনা করেছনে। ইজতিমা'উল জুযূশ, পৃ. ৬। আরও দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৪/৩১২); শাইখ আব্দুল্লাহ আল-গুনাইমান, শারহুল আকীদাহ আল-ওয়াসেত্বিয়্যাহ (৭/৫)। আর যারা 'আল্লাহু নূরুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বি' এ আয়াতটিকে 'আল্লাহু নাওয়ারাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বি' এমন করে পড়ে আয়াতের অর্থ করেছে যে, الله نور السموات والأرض "আল্লাহ আসমান ও যমীনকে আলোকিত করেছেন।" এটা অগ্রহণযোগ্য। ইমাম ইবন বুযাইমাহ এটাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং এট গ্রহণযোগ্য কোনো কিরাআত নয় বলে ঘোষণা করেছেন। দেখুন, ইবন খুযাইমাহ, কিতাবুত তাওহীদ (১/৭৮-৭৯)।
আর যারা আল্লাহ তা'আলার সিফাত বা গুণ হিসেবে 'নূর' সাব্যস্ত করেননি, [যেমন, ফখরুদ্দীন রাযী, শারহু আসমায়িল্লাহিল হুসনা, পৃ. ৩৪৭-৩৪৮ ও অন্যান্য গ্রন্থ; অনুরূপ গাযালী, তার আল-মাকসাদুল আসনা, পৃ. ১৪৬ ও মিশকাতুল আনওয়ার] তারা সেটার অপব্যাখ্যা করে বলেছেন এর অর্থ, আল্লাহ আসমান ও যমীনের হিদায়াতকারী অথবা আলোকিতকারী অথবা সংশোধনকারী। এ জাতীয় অপব্যাখ্যাকারীদের যাবতীয় সন্দেহের জবাব শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ তার বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ কিতাবে প্রদান করেছেন। দেখুন, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৫/৪৮৬-৪৯৩)। আর ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রাহিমাহুল্লাহ চৌদ্দটি উপায়ে এসব অপব্যাখ্যা খণ্ডন করে সাব্যস্ত করেছেন যে, আল্লাহর রয়েছে নূর গুণ।
দেখুন, মুখতাসারুস সাওয়া'য়িক (২/১৮৮-২০৫); মার'ঈ ইবন ইউসুফ আল-হাম্বলী, আক্বাওয়ীলুস সিকাত ফী তা'ওয়ীলিল আসমা ওয়াস সিফাত, পৃ. ১৯৪-১৯৬; আরও দেখুন, শাইখ আব্দুল্লাহ আল-গুনাইমান, শারহু কিতাবিত তাওহীদ মিন সহীহিল বুখারী, পৃ. ১৬৯-১৭৭।
৭১৭. বুখারী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ৭৩৮৫; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ৭৬৯।
৭১৮. হাদীসটির তাখরীজ ইতোপূর্বে চলে গেছে।
৭১৯. দেখা যেতে পারে, খলীল ইবন আহমাদ আল-ফারাহীদী, আল-আইন (৩/১৫২); আবু উবাইদ, গারীবুল হাদীস (৩/১৭৩)।
৭২০. এটি আরও বর্ণনা করেছেন ইমাম ইবন মানদাহ, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ, পৃ. ৯৯; তার শব্দ হচ্ছে,
إن ربكم ليس عنده ليل ولا نهار، ونور السماوات نور من نور وجهه "তোমাদের রব্ব, তাঁর কাছে তো কোনো রাত বা দিন নেই। আর আসমানসমূহ ও যমীনের যত আলো সবই তাঁর চেহারার উজ্জ্বল আলো থেকে একটি আলো"। আছারটি ইমাম বাইহাক্বীও বর্ণনা করেছেন, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (২/৩৭); তারপর বলেছেন, এটি মাওকূফ, আর এর বর্ণনাকারীগণ প্রসিদ্ধ নন। অনুরূপভাবে আসারটি ইমাম ইবন কাসীরও নিয়ে এসেছেন, তাফসীর ইবন কাসীর (৬/৬১); সেখানে এসেছে, نور العرش من نور وجهه "আরশের নূর তাঁর চেহারার নূরের উজ্জ্বল্য থেকে"। অনুরূপ আরো বর্ণনা করেন ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম, মুখতাসারুস সাওয়া'য়িক (২/১৯৩)।
[ইবন খাফীফ কর্তৃক মহান আল্লাহর 'নূর' সাব্যস্ত করা]
অনুরূপ আল্লাহ তাঁর কুরআনে আমাদের জন্য যে জানিয়েছেন, আর যা দিয়ে তিনি নিজেকে গুণান্বিত করেছেন, অনুরূপ সুন্নাতুর রাসূলেও যা বিশুদ্ধ আকারে এসেছে, তন্মধ্যে রয়েছে, তিনি বলেছেন اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ﴾ [النور: ٣٥ "আল্লাহ আসমান ও যমীনের নূর।"(৭১৬) [সূরা আন-নূর: ৩৫] তারপর তিনি এর পরপরই বলেছেন, نُورٌ عَلَى نُورٍ) [النور: ٣٥]
তেমনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দো'আয় বলতেন: أنت نور السماوات والأرض "আপনি আসমান এবং যমীনের নূর।”(৭১৭)
তারপর আবু আব্দুল্লাহ ইবন খাফীফ উল্লেখ করেছেন আবু মূসার হাদীস: حجابه النور - أو النار- لو كشفه لأحرقت سبحات وجهه ما انتهى إليه بصره من خلقه "তাঁর পর্দা হচ্ছে নূর বা আগুন, যদি তিনি সেটা খুলে দিতেন তাহলে তাঁর দৃষ্টির শেষ পর্যন্ত সকল মাখলুক তাঁর চেহারার উজ্জ্বলতায় পুড়ে যেত।”(৭১৮) তিনি বলেন, سبحات وجهه হচ্ছে তার ঔজ্জ্বল্য, মহত্ব ও নূর। তিনি সেটা খলীল ও আবু উবাইদ থেকে বর্ণনা করেন। (৭১৯)
আরও বলেন, আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন: نور السماوات من نور وجهه অর্থ আসমানের যত আলো তা হচ্ছে তাঁর চেহারার উজ্জ্বল আলো থেকে। (৭২০)
টিকাঃ
৭১৬, ইবন খাফীফ এটা সাব্যস্ত করতে চেয়েছেন যে, আল্লাহর নামসমূহের অন্যতম হচ্ছে নূর। আর তা এমন নূর যা আল্লাহর মর্যাদা ও মহত্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেটা অপর কোনো নূরের মতো নয়। কুরআনে কারীম ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসে আল্লাহ তা'আলার পরিচয় তুলে ধরে বলা হয়েছে, নিশ্চয় আল্লাহ নূর, তাঁর রয়েছে নূর, তাঁর পর্দা হচ্ছে নূরের। সালাফদের মধ্যে যদি কারো থেকে এ বর্ণনা পাওয়া যায় যে, তারা এ আয়াতের তাফসীরে এটা বলেছেন যে, 'আল্লাহ আসমানসমূহ ও যমীনের অধিবাসীদের হিদায়াতকারী' তাহলে এটা বুঝে নিতে হবে যে, এটি আয়াতের একটি তাফসীর, যেটাকে উপজীব্য করে আল্লাহ তা'আলার স্বয়ং 'নূর' হওয়াকে অস্বীকার করা যাবে না। কারণ আরবরা যখন কোনো কিছুর তাফসীর বা ব্যাখ্যা করে তখন তারা যেটার ব্যাখ্যা করা হচ্ছে সেটার বিবিধ নাম বা কিছু প্রকার বর্ণনা করে থাকেন, যা দ্বারা উক্ত জিনিসের অপরাপর গুণাবলি সাব্যস্ত হওয়াকে না করে না। দেখুন, শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমু' ফাতাওয়া (৬/৩৯০)।
কিন্তু পরবর্তীদের মধ্যে যারা আল্লাহর নূর সাব্যস্ত না করে সেটার তা'ওয়ীল করে বলে যে, এর অর্থ হিদায়াতকারী অথবা আলোকিতকারী অথবা সৌন্দর্যমণ্ডিতকারী, তাদের এ ব্যাখ্যা কখনও বিশুদ্ধ হবে না; কারণ তারা আসল অর্থ 'নূর' সাব্যস্ত না করার জন্য দূরবর্তী অর্থ গ্রহণ করে।
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, 'নূর' নামটি স্রষ্টার জন্যও সত্য আর সৃষ্টির জন্যও সত্য। স্বয়ং সে সত্তার জন্যও তা বলা যাবে যার সাথে তার অস্তিত্ব এসেছে, অনুরূপভাবে কোনো কিছুর গুণ হিসেবেও বলা যাবে, যার সাথে তার অস্তিত্ব রয়েছে, তদ্রূপ তারও গুণ হতে পারে যেটা সে অন্যের কাছ থেকে পেয়েছে, যেমন আলোকরশ্মির প্রতিবিম্ব। আর আল্লাহর বাণী, "আল্লাহ আসমান ও যমীনের নূর, তাঁর নূরের উদাহরণ এমন যেন একটি (বদ্ধ দেয়ালের খোপে থাকা) তাক, যাতে চেরাগ রাখা আছে।” [সূরা আন-নূর: ৩৫] এখানে তিন প্রকার নূরের কথাই আছে। প্রথমেই জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে তিনি নূর, আরও বলা হয়েছে যে তাঁর রয়েছে নূর, আরও বলা হয়েছে যে তিনি যেন তাকের উপরে থাকা চেরাগ। আর জানা কথা যে, তাকের উপরে থাকা চেরাগে এমন নূর রয়েছে যা তার নিজের উপর নির্ভর করে আছে, আর সেটার এমন নূরও রয়েছে যা তার থেকে উৎসারিত হয়ে যমীন ও দেয়ালে পড়েছে। দেখুন, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৮/৭৫-৭৬)।
ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ স্পষ্ট করে এটা সাব্যস্ত করছেন যে, বেশিরভাগ সৃষ্টির অভিমত হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং নূর, এমনকি যারা আল্লাহর গুণাবলি অস্বীকার করে সেসব জাহমিয়্যারাও তাকে নূর বলে স্বীকৃতি দিত। তবে এটা বলা যে, আল্লাহ তা'আলা তিনিই স্বয়ং সূর্যের, চাঁদের, আগুনের আলো, এমন কথা কোনো মুসলিম বলে না। দেখুন, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৮/৬৬-৬৭)। অনুরূপভাবে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ এটাও স্পষ্ট করে বলেছেন যে, অন্য কোনো সত্তার দিকে যখন 'নূর' সম্পৃক্ত করা হবে তখন সেটা আর আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করা হবে না। সুতরাং দুনিয়ার চেরাগের আলোকে কখনো আল্লাহর আলো বলা যাবে না। মাজমু' ফাতাওয়া (৬/৩৯২)।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, 'নূর' আল্লাহর দিকে দু'ভাবে সম্পৃক্ত হতে পারে: এক. সিফাতকে মাওসূফের দিকে সম্পৃক্ত করা, অর্থাৎ গুণকে তার গুণান্বিত সত্তার দিকে সম্পৃক্ত করা, যেমন আল্লাহর বাণী, "আর যমীন আলোকিত হয়ে গেছে তার রবের নূরে।" [সূরা আয-যুমার: ৬৯] অনুরূপ হাদীস বা আছারে এসেছে, "আর আমি আপনার চেহারার নূরের আশ্রয় নিচ্ছি, যে নূরের আলোতে সকল অন্ধকার উদ্ভাসিত হয়েছে।” [দ্বিয়া আল-মাকদেসী, আল-আহাদীসুল মুখতারাহ (৯/১৮১); তাবারানী, আদ-দু'আ, হাদীস নং ১০৩৬; আল-মু'জামুল কাবীর (১৩/৭৩)] দুই. ফা'য়েলকে মাফ'উলের দিকে সম্পৃক্ত করা, অর্থাৎ কর্মকে তার কর্তার দিকে সম্পৃক্ত করা। যেমন আল্লাহর বাণী, "তাঁর নূর যেন তাকের উপর থাকা একটি চেরাগ।” [সূরা আন-নূর: ৩৫] অনুরূপ হাদীস বা আছারে এসেছে, 'মুমিনের অন্তরে আল্লাহর নূরের উদাহরণ' সেটা এ অর্থে যে, তিনিই সেটা প্রদান করেন, তিনিই সেটার বান্দার অন্তরে সঞ্চার করে দেন। দেখুন, ইজতিমা'উল জুয়ুশিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৪৫ ও তার পরবর্তী পৃষ্ঠা।
সুতরাং আমরা বুঝতে পারলাম যে, ১- আল্লাহ তা'আলার একটি নাম 'আন-নূর'। [শাইখ আব্দুল্লাহ আল-গুনাইমান, শারহু কিতাবিত তাওহীদ মিন সহীহিল বুখারী (১/১৭০-১৭৭); শাইখ আলাওয়ী আস-সাক্কাফ, সিফাতুল্লাহিল ওয়ারিদা ফিল কিতাবি ওয়াস সুন্নাহ, পৃ. ২৬০-২৬১] সুতরাং তিনি আল্লাহ নূর যে নূরের মাধ্যমে তিনি সবকিছুকে হিদায়াত দিয়েছেন।
২- আল্লাহ তাআলার একটি সত্তাগত গুণ হচ্ছে 'নূর'। [শাইখ আলাওয়ী আস-সাক্কাফ, সিফাতুল্লাহিল ওয়ারিদা ফিল কিতাবি ওয়াস সুন্নাহ, পৃ. ২৫৯-২৬১] তাঁর গুণ হিসেবে তা তাঁর দিকে সম্বন্ধ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, "তাঁর নূরের উদাহরণ হচ্ছে...।" [সূরা আন-নূর: ৩৫] অনুরূপ আল্লাহ তা'আলা বলেন, "আর যমীন উদ্ভাসিত হলো তার রবের নূরে।" [সূরা আয-যুমার: ৬৯] ৩- আল্লাহ তা'আলার চেহারাও নূরের। [মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ১৭৯; ইবন মাজাহ, আস-সুনান, হাদীস নং ১৯৫] হাদীসে আরও এসেছে, "আপনার চেহারার নূরের উসীলার আশ্রয় নিচ্ছি”। আরও এসেছে, "আসমান ও যমীনের আলো তাঁর চেহারার আলো হতে।” [শাইখ আব্দুল্লাহ আল-গুনাইমান, শারহু কিতাবিত তাওহীদ মিন সহীহিল বুখারী (১/১৭০-১৭৭)]
৪- আল্লাহ তা'আলার পর্দাও নূরের। [মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ১৭৯]
৪- আল্লাহ তা'আলার নূর যে সৃষ্টির উপর পড়েছে সেই ঈমানদার হবে, আর যার উপর পড়েনি, সে ঈমানদার হয়নি। [তিরমিযী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ২৬৪২]
৫- আসমান ও যমীনের যত নূর সবই তাঁর থেকে প্রাপ্ত। যেমনটি আল্লাহ তা'আলা সূরা আন-নূরে বলেছেন, "তাঁর নূরের উদাহরণ হচ্ছে চেরাগদানী, যাতে রয়েছে চেরাগ।" [সূরা আন-নূর: ৩৫; আরও দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৬/৩৮৬)] এখন প্রশ্ন হচ্ছে এটা কি তাঁর গুণ? শাইখ আব্দুল্লাহ গুনাইমান বলেন, এটা তাঁর সিফাত বা গুণ নয়। [শাইখ আব্দুল্লাহ আল-গুনাইমান, শারহু কিতাবিত তাওহীদ মিন সহীহিল বুখারী (১/১৭০-১৭৭)] আর যদি 'আল্লাহ আসমান ও যমীনের নূর' বলে সেটাকে সিফাতী নূর ধরা হয় তবে সে নূরের ধরণ আমরা জানি না। এটাই শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যার বক্তব্য থেকে বুঝা যায়। দেখুন, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৫/৪৮৬-৪৯৩)। আরও দেখুন, https://www.alukah.net/ web/refai/0/123379/ কিন্তু সর্বাবস্থায় কোনোক্রমেই এ নূর বলতে সূর্য কিংবা চন্দ্র অথবা কোনো বিদ্যুত বা তারকা বা চেরাগের আলো বুঝানো হয়নি। [শাইখ আব্দুল্লাহ আল-গুনাইমান, শারহু কিতাবিত তাওহীদ মিন সহীহিল বুখারী (১/১৭০-১৭৭)]
৬- হাশরের মাঠের যমীন যে নূরে আলোকিত হবে তাও আল্লাহ তা'আলার নূর। [সূরা আয-যুমার: ৬৯] ইবন তাইমিয়্যাহ এখানে সৃষ্ট নূর অর্থ করা যাবে না। [মাজমূ' ফাতাওয়া (৬/৩৯২)]
৭- জান্নাতও আলোকিত হবে আল্লাহ তা'আলার 'আরশের নুরের দ্বারা, আর 'আরশের নূর তো আল্লাহর চেহারার নূর থেকে প্রাপ্ত। [ইবন মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু তা বর্ণনা করেছেন। দারেমী, আর-রাদ্দু আলাল মিররীসী, পৃ. ৪৪৯; ইবন মান্দাহ, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ, পৃ. ৯৯; ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, হাদীসটি ত্বাবারানী তার মু'জামে বর্ণনা করেছেন ও তার আস-সুন্নাহতে বর্ণনা করেছনে। ইজতিমা'উল জুযূশ, পৃ. ৬। আরও দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৪/৩১২); শাইখ আব্দুল্লাহ আল-গুনাইমান, শারহুল আকীদাহ আল-ওয়াসেত্বিয়্যাহ (৭/৫)। আর যারা 'আল্লাহু নূরুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বি' এ আয়াতটিকে 'আল্লাহু নাওয়ারাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বি' এমন করে পড়ে আয়াতের অর্থ করেছে যে, الله نور السموات والأرض "আল্লাহ আসমান ও যমীনকে আলোকিত করেছেন।" এটা অগ্রহণযোগ্য। ইমাম ইবন বুযাইমাহ এটাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং এট গ্রহণযোগ্য কোনো কিরাআত নয় বলে ঘোষণা করেছেন। দেখুন, ইবন খুযাইমাহ, কিতাবুত তাওহীদ (১/৭৮-৭৯)।
আর যারা আল্লাহ তা'আলার সিফাত বা গুণ হিসেবে 'নূর' সাব্যস্ত করেননি, [যেমন, ফখরুদ্দীন রাযী, শারহু আসমায়িল্লাহিল হুসনা, পৃ. ৩৪৭-৩৪৮ ও অন্যান্য গ্রন্থ; অনুরূপ গাযালী, তার আল-মাকসাদুল আসনা, পৃ. ১৪৬ ও মিশকাতুল আনওয়ার] তারা সেটার অপব্যাখ্যা করে বলেছেন এর অর্থ, আল্লাহ আসমান ও যমীনের হিদায়াতকারী অথবা আলোকিতকারী অথবা সংশোধনকারী। এ জাতীয় অপব্যাখ্যাকারীদের যাবতীয় সন্দেহের জবাব শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ তার বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ কিতাবে প্রদান করেছেন। দেখুন, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৫/৪৮৬-৪৯৩)। আর ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রাহিমাহুল্লাহ চৌদ্দটি উপায়ে এসব অপব্যাখ্যা খণ্ডন করে সাব্যস্ত করেছেন যে, আল্লাহর রয়েছে নূর গুণ।
দেখুন, মুখতাসারুস সাওয়া'য়িক (২/১৮৮-২০৫); মার'ঈ ইবন ইউসুফ আল-হাম্বলী, আক্বাওয়ীলুস সিকাত ফী তা'ওয়ীলিল আসমা ওয়াস সিফাত, পৃ. ১৯৪-১৯৬; আরও দেখুন, শাইখ আব্দুল্লাহ আল-গুনাইমান, শারহু কিতাবিত তাওহীদ মিন সহীহিল বুখারী, পৃ. ১৬৯-১৭৭।
৭১৭. বুখারী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ৭৩৮৫; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ৭৬৯।
৭১৮. হাদীসটির তাখরীজ ইতোপূর্বে চলে গেছে।
৭১৯. দেখা যেতে পারে, খলীল ইবন আহমাদ আল-ফারাহীদী, আল-আইন (৩/১৫২); আবু উবাইদ, গারীবুল হাদীস (৩/১৭৩)।
৭২০. এটি আরও বর্ণনা করেছেন ইমাম ইবন মানদাহ, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ, পৃ. ৯৯; তার শব্দ হচ্ছে,
إن ربكم ليس عنده ليل ولا نهار، ونور السماوات نور من نور وجهه "তোমাদের রব্ব, তাঁর কাছে তো কোনো রাত বা দিন নেই। আর আসমানসমূহ ও যমীনের যত আলো সবই তাঁর চেহারার উজ্জ্বল আলো থেকে একটি আলো"। আছারটি ইমাম বাইহাক্বীও বর্ণনা করেছেন, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (২/৩৭); তারপর বলেছেন, এটি মাওকূফ, আর এর বর্ণনাকারীগণ প্রসিদ্ধ নন। অনুরূপভাবে আসারটি ইমাম ইবন কাসীরও নিয়ে এসেছেন, তাফসীর ইবন কাসীর (৬/৬১); সেখানে এসেছে, نور العرش من نور وجهه "আরশের নূর তাঁর চেহারার নূরের উজ্জ্বল্য থেকে"। অনুরূপ আরো বর্ণনা করেন ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম, মুখতাসারুস সাওয়া'য়িক (২/১৯৩)।
📄 ইবন খফীফ কর্তৃক মহান আল্লাহর জন্য ‘হায়াত’ বা জীবন গুণ সাব্যস্তকরণ
[ইবন খাফীফ কর্তৃক মহান আল্লাহর জন্য 'হায়াত' বা জীবন গুণ সাব্যস্তকরণ] তারপর তিনি বলেন, তেমনি নস দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে যে, তিনি জীবিত। আর তিনি উল্লেখ করেছেন আল্লাহ তা'আলার বাণী: ﴿الْحَيُّ الْقَيُّومُ﴾( "তিনি চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী।” [সূরা আল- বাকারাহ: ২৫৫; সূরা আলে ইমরান: ০২]
আর হাদীস: »يا حي يا قيوم برحمتك أستغيث "হে চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী, আপনার রহমতের মাধ্যমে আমি সাহায্য প্রার্থনা করছি।"(৭২১)
টিকাঃ
৭২১. হাদীসটি বর্ণনা করেন, তিরমিযী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ৩৫২৪; হাকিম, আল- মুস্তাদরাক (১/৫০৯); বাইহাক্বী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (১/১৯২); ত্বাবারানী, আল-ম'জামুস সগীর (১/১৫৯)। হাদীসটি আলবানী হাসান বলেছেন, আত-তাওয়াসুল আনওয়া'উহু ওয়া আহকামুহু, পৃ. ৩০।
[ইবন খাফীফ কর্তৃক মহান আল্লাহর জন্য 'হায়াত' বা জীবন গুণ সাব্যস্তকরণ] তারপর তিনি বলেন, তেমনি নস দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে যে, তিনি জীবিত। আর তিনি উল্লেখ করেছেন আল্লাহ তা'আলার বাণী: ﴿الْحَيُّ الْقَيُّومُ﴾( "তিনি চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী।” [সূরা আল- বাকারাহ: ২৫৫; সূরা আলে ইমরান: ০২]
আর হাদীস: »يا حي يا قيوم برحمتك أستغيث "হে চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী, আপনার রহমতের মাধ্যমে আমি সাহায্য প্রার্থনা করছি।"(৭২১)
টিকাঃ
৭২১. হাদীসটি বর্ণনা করেন, তিরমিযী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ৩৫২৪; হাকিম, আল- মুস্তাদরাক (১/৫০৯); বাইহাক্বী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (১/১৯২); ত্বাবারানী, আল-ম'জামুস সগীর (১/১৫৯)। হাদীসটি আলবানী হাসান বলেছেন, আত-তাওয়াসুল আনওয়া'উহু ওয়া আহকামুহু, পৃ. ৩০।
📄 ইবন খফীফ কর্তৃক মহান আল্লাহর চেহারা সাব্যস্তকরণ
[ইবন খাফীফ কর্তৃক মহান আল্লাহর চেহারা সাব্যস্তকরণ] ইবন খাফীফ বলেন, আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের কাছে পরিচিত হয়েছেন যা দ্বারা তার মধ্যে রয়েছে যে, তিনি নিজের বর্ণনা দিয়েছেন যে, তাঁর চেহারা আছে (৭২২), যা মহত্ব ও সম্মানের গুণে গুণান্বিত। এভাবে তিনি নিজের জন্য চেহারা সাব্যস্ত করেছেন। আর তিনি অনেকগুলো আয়াত নিয়ে এসেছেন। (৭২৩) আর পূর্বে বর্ণিত আবু মূসার হাদীস উল্লেখ করেন। (৭২৪) অতঃপর তিনি বলেন যে, এই হাদীসে আছে যে, তিনি ঘুমান না, যা কুরআনের প্রকাশ্য আয়াতের সাথে সামঞ্জস্যশীল। সে আয়াতটি হচ্ছে, ﴿لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ لَّهُ ﴾ [البقرة: ٢٥٥] “তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না, নিদ্রাও নয়।” [সূরা আল-বাকারাহ: ২৫৫] (আবু মূসা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুর) হাদীস থেকে আরও জানা গেল যে, তাঁর রয়েছে চেহারা যা আলোকোজ্জ্বলতার গুণে গুণান্বিত। আরও জানা গেল যে, তাঁর রয়েছে চোখ, যেমনটি আমাদেরকে তিনি তাঁর কিতাবে জানিয়েছেন যে তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।
অতঃপর ইবন খাফীফ সেসব হাদীস উল্লেখ করেছেন যাতে আল্লাহর চেহারা প্রমাণিত হয়। (৭২৫) আর তাঁর শ্রবণ ও দর্শন সাব্যস্ত হয়। আর সেসব আয়াতও উল্লেখ করেছেন যার মাধ্যমে তা প্রমাণিত হয়।
টিকাঃ
৭২২. আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আকীদাহ হচ্ছে, আল্লাহর রয়েছে চেহারা যা বাস্তবেই, আর সেটা তাঁর মর্যাদার সাথে উপযুক্ত করে সাব্যস্ত করা হবে। কোনো প্রকার বিকৃতি সাধন না করে, নিষ্ক্রীয়করণ না করে, ধরণ নির্ধারণ না করে এবং সাদৃশ্য স্থাপন না করে। আর এ গুণটি কুরআন ও সহীহ হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত। আর যারা আল্লাহর সিফাতকে নিষ্ক্রীয়করণ করে সেসব মু'তাযিলা, জাহমিয়্যাহ ও তাদের অনুসারী কালামশাস্ত্রবিদরা এটাকে অপব্যাখ্যা করে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করে, এখানে চেহারা বলে পবিত্র সত্তাকে বুঝানো হয়েছে। আবার অপর কেউ কেউ অপব্যাখ্যা করে বলে, চেহারা বলে অস্তিত্বকে বুঝানো হয়েছে। আবার কেউ কেউ এটার অপব্যাখ্যা করে বলে এর দ্বারা সাওয়াব ও সন্তুষ্টি বুঝানো হয়েছে। এসব অপব্যাখ্যা নিঃসন্দেহে বাতিল। কুরআন ও হাদীসের প্রমাণ এগুলোকে অসার করে দেয়। তাছাড়া আরবী ভাষাতেও তা আসে না। এখানে এসব কিছুর সমালোচনা ও খণ্ডন করার স্থান সংকুলান হবে না। ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম ছাব্বিশটি পদ্ধতিতে এসব অপব্যাখ্যার অপনোদন করেছেন। তাছাড়া তিনি ব্যতীত অন্য আলেমগণও তা খণ্ডন করেছেন। দেখুন, ইবন খুযাইমাহ, আত-তাওহীদ (১/২৪-৪৪); ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ' ফাতাওয়া (৬/৫১); ইবনুল কাইয়্যেম, মুখতাসারুস সাওয়া'য়িক (২/১৭৪-১৮৮); বাইহাক্বী, আল-ই'তিক্বাদ, পৃ. ২৯- ৩০; ইবন মানদাহ, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ, পৃ. ৯৪; বাকেল্লাণী, আত-তামহীদ, পৃ. ২৯৫- ২৯৮; আশ'আরী, মাকালাতুল ইসলামিয়ীন, পৃ. ১৮৯; বাগদাদী, উসূলুদ্দীন, পৃ. ১০৯-১১০; মার'ঈ ইবন ইউসুফ আল-হাম্বলী, আক্বাওয়ীলুস সিক্কাত, পৃ. ১৪১-১৪৬; আশ-শানক্বীত্বী, আদওয়াউল বায়ান (৭/৭৫)। আর যারা এসব তা'ওয়ীল করেছে তাদের সম্পর্কে জানার জন্য দেখুন, ইবনুল জাওযী, দাফ'উ শুবাহিত তাশবীহ, পৃ. ৩১; যামাখশারী, আল-কাশশাফ (৪/৬৪); কাযী আব্দুল জাব্বার, শারহুল উসূলিল খামসা, পৃ. ২২৭; বদরুদ্দীন ইবন জামা'আহ, ঈযাহুদ দলীল ফী কাত্ব'য়ি হুজাজি আহলিত তা'ত্বীল, পৃ. ১২০-১২২; ফখরুদ্দীন আর-রাযী, আত-তাফসীরুল কাবীর (১/৪৫৪); কুরতুবী, তাফসীর (১৭/১৬৫)।
৭২৩. তন্মধ্যে আছে আল্লাহর বাণী, ]۲۷ :وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ ﴾ [الرحمن﴿ “আর অবিনশ্বর শুধু আপনার রবের চেহারা, যিনি মহিমাময়, মহানুভব।" [সূরা আর-রহমান: ২৭] ও আল্লাহর বাণী, :لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَكُلُّ شَيْءٍ حَالِكُ إِلَّا وَجْهَةٌ﴾ [القصص "তিনি ছাড়া অন্য কোনো সত্য ইলাহ্ নেই। ]۸۸ আল্লাহর সত্তা ছাড়া সমস্ত কিছুই ধ্বংসশীল।" [সূরা আল-ক্বাসাস: ৮৮] এ আয়াতসমূহ স্পষ্টভাবে আল্লাহর চেহারা সাব্যস্ত করছে।
৭২৪. হাদীসটি ইতোপূর্বে আবু মূসা আশ'আরী রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে। তাতে এসেছে, 'তাঁর পর্দা হচ্ছে নূরের অথবা আগুনের...। উক্ত হাদীসের শুরুতে এসেছে, "নিশ্চয় আল্লাহ ঘুমান না, আর ঘুমানো তাঁর জন্য শোভনীয়ও নয়।" আল-হাদীস।
৭২৫. এসব হাদীসের অধিকাংশই ইবন খুযাইমাহ রাহিমাহুল্লাহ তার কিতাবুত তাওহীদে বর্ণনা করেছেন। দেখুন, (১/২৭-৪৪)।
[ইবন খাফীফ কর্তৃক মহান আল্লাহর চেহারা সাব্যস্তকরণ] ইবন খাফীফ বলেন, আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের কাছে পরিচিত হয়েছেন যা দ্বারা তার মধ্যে রয়েছে যে, তিনি নিজের বর্ণনা দিয়েছেন যে, তাঁর চেহারা আছে (৭২২), যা মহত্ব ও সম্মানের গুণে গুণান্বিত। এভাবে তিনি নিজের জন্য চেহারা সাব্যস্ত করেছেন। আর তিনি অনেকগুলো আয়াত নিয়ে এসেছেন। (৭২৩) আর পূর্বে বর্ণিত আবু মূসার হাদীস উল্লেখ করেন। (৭২৪) অতঃপর তিনি বলেন যে, এই হাদীসে আছে যে, তিনি ঘুমান না, যা কুরআনের প্রকাশ্য আয়াতের সাথে সামঞ্জস্যশীল। সে আয়াতটি হচ্ছে, ﴿لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ لَّهُ ﴾ [البقرة: ٢٥٥] “তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না, নিদ্রাও নয়।” [সূরা আল-বাকারাহ: ২৫৫] (আবু মূসা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুর) হাদীস থেকে আরও জানা গেল যে, তাঁর রয়েছে চেহারা যা আলোকোজ্জ্বলতার গুণে গুণান্বিত। আরও জানা গেল যে, তাঁর রয়েছে চোখ, যেমনটি আমাদেরকে তিনি তাঁর কিতাবে জানিয়েছেন যে তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।
অতঃপর ইবন খাফীফ সেসব হাদীস উল্লেখ করেছেন যাতে আল্লাহর চেহারা প্রমাণিত হয়। (৭২৫) আর তাঁর শ্রবণ ও দর্শন সাব্যস্ত হয়। আর সেসব আয়াতও উল্লেখ করেছেন যার মাধ্যমে তা প্রমাণিত হয়।
টিকাঃ
৭২২. আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আকীদাহ হচ্ছে, আল্লাহর রয়েছে চেহারা যা বাস্তবেই, আর সেটা তাঁর মর্যাদার সাথে উপযুক্ত করে সাব্যস্ত করা হবে। কোনো প্রকার বিকৃতি সাধন না করে, নিষ্ক্রীয়করণ না করে, ধরণ নির্ধারণ না করে এবং সাদৃশ্য স্থাপন না করে। আর এ গুণটি কুরআন ও সহীহ হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত। আর যারা আল্লাহর সিফাতকে নিষ্ক্রীয়করণ করে সেসব মু'তাযিলা, জাহমিয়্যাহ ও তাদের অনুসারী কালামশাস্ত্রবিদরা এটাকে অপব্যাখ্যা করে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করে, এখানে চেহারা বলে পবিত্র সত্তাকে বুঝানো হয়েছে। আবার অপর কেউ কেউ অপব্যাখ্যা করে বলে, চেহারা বলে অস্তিত্বকে বুঝানো হয়েছে। আবার কেউ কেউ এটার অপব্যাখ্যা করে বলে এর দ্বারা সাওয়াব ও সন্তুষ্টি বুঝানো হয়েছে। এসব অপব্যাখ্যা নিঃসন্দেহে বাতিল। কুরআন ও হাদীসের প্রমাণ এগুলোকে অসার করে দেয়। তাছাড়া আরবী ভাষাতেও তা আসে না। এখানে এসব কিছুর সমালোচনা ও খণ্ডন করার স্থান সংকুলান হবে না। ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম ছাব্বিশটি পদ্ধতিতে এসব অপব্যাখ্যার অপনোদন করেছেন। তাছাড়া তিনি ব্যতীত অন্য আলেমগণও তা খণ্ডন করেছেন। দেখুন, ইবন খুযাইমাহ, আত-তাওহীদ (১/২৪-৪৪); ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ' ফাতাওয়া (৬/৫১); ইবনুল কাইয়্যেম, মুখতাসারুস সাওয়া'য়িক (২/১৭৪-১৮৮); বাইহাক্বী, আল-ই'তিক্বাদ, পৃ. ২৯- ৩০; ইবন মানদাহ, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ, পৃ. ৯৪; বাকেল্লাণী, আত-তামহীদ, পৃ. ২৯৫- ২৯৮; আশ'আরী, মাকালাতুল ইসলামিয়ীন, পৃ. ১৮৯; বাগদাদী, উসূলুদ্দীন, পৃ. ১০৯-১১০; মার'ঈ ইবন ইউসুফ আল-হাম্বলী, আক্বাওয়ীলুস সিক্কাত, পৃ. ১৪১-১৪৬; আশ-শানক্বীত্বী, আদওয়াউল বায়ান (৭/৭৫)। আর যারা এসব তা'ওয়ীল করেছে তাদের সম্পর্কে জানার জন্য দেখুন, ইবনুল জাওযী, দাফ'উ শুবাহিত তাশবীহ, পৃ. ৩১; যামাখশারী, আল-কাশশাফ (৪/৬৪); কাযী আব্দুল জাব্বার, শারহুল উসূলিল খামসা, পৃ. ২২৭; বদরুদ্দীন ইবন জামা'আহ, ঈযাহুদ দলীল ফী কাত্ব'য়ি হুজাজি আহলিত তা'ত্বীল, পৃ. ১২০-১২২; ফখরুদ্দীন আর-রাযী, আত-তাফসীরুল কাবীর (১/৪৫৪); কুরতুবী, তাফসীর (১৭/১৬৫)।
৭২৩. তন্মধ্যে আছে আল্লাহর বাণী, ]۲۷ :وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ ﴾ [الرحمن﴿ “আর অবিনশ্বর শুধু আপনার রবের চেহারা, যিনি মহিমাময়, মহানুভব।" [সূরা আর-রহমান: ২৭] ও আল্লাহর বাণী, :لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَكُلُّ شَيْءٍ حَالِكُ إِلَّا وَجْهَةٌ﴾ [القصص "তিনি ছাড়া অন্য কোনো সত্য ইলাহ্ নেই। ]۸۸ আল্লাহর সত্তা ছাড়া সমস্ত কিছুই ধ্বংসশীল।" [সূরা আল-ক্বাসাস: ৮৮] এ আয়াতসমূহ স্পষ্টভাবে আল্লাহর চেহারা সাব্যস্ত করছে।
৭২৪. হাদীসটি ইতোপূর্বে আবু মূসা আশ'আরী রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে। তাতে এসেছে, 'তাঁর পর্দা হচ্ছে নূরের অথবা আগুনের...। উক্ত হাদীসের শুরুতে এসেছে, "নিশ্চয় আল্লাহ ঘুমান না, আর ঘুমানো তাঁর জন্য শোভনীয়ও নয়।" আল-হাদীস।
৭২৫. এসব হাদীসের অধিকাংশই ইবন খুযাইমাহ রাহিমাহুল্লাহ তার কিতাবুত তাওহীদে বর্ণনা করেছেন। দেখুন, (১/২৭-৪৪)।
📄 ইবন খফীফ কর্তৃক মহান আল্লাহর দু’ হাত ও দু’ পা সাব্যস্তকরণ
[ইবন খাফীফ কর্তৃক মহান আল্লাহর দু' হাত ও দু' পা সাব্যস্তকরণ] তারপর তিনি বলেন, আল্লাহ তা'আলা তাঁর মুমিন বান্দাদের কাছে নিজের পরিচয় দিয়েছেন যে, তাঁর রয়েছে দুটি হাত (৭২৬) যেগুলো তিনি রহমতসহ প্রশস্ত করে রেখেছেন। এরপর তিনি এ সংক্রান্ত হাদীসসমূহ উল্লেখ করেন। তারপর তিনি উমাইয়া ইবন আবিস সালতের কবিতা উল্লেখ করেন।
﴿يلقى في النار وتقول هل من مزيد؟ حتى يضع فيها رجله﴾ “জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হতেই থাকবে, আর জাহান্নাম বলতেই থাকবে, 'আরও বেশি আছে?' [সূরা ক্বাফ: ৩০] (৭২৭) অবশেষে তিনি তাতে তাঁর পা রাখবেন।' এ হচ্ছে বুখারীর বর্ণনা। অপর বর্ণনায় এসেছে, »يضع عليها قدمه« "তিনি তাতে তাঁর পা রাখবেন। (৭২৮(
তারপর তিনি [ইবন খাফীফ] বর্ণনা করলেন, যা মুসলিম আল-বাত্বীন (৭২৯) বর্ণনা করেছেন ইবন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে যে, "কুরসী হচ্ছে দু' পায়ের জায়গা। আর আরশ, তার পরিমাণ তো আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না।"
তারপর তিনি [ইবন খাফীফ] বর্ণনা করেন মুসলিম আল- বাত্বীন এর বক্তব্য(৭৩০), সুদ্দী (৭৩১)র বক্তব্য, ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ(৭৩২), আবু মালেক (৭৩৩) এর বক্তব্য।
টিকাঃ
৭২৬. আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আহ মহান আল্লাহর জন্য দু'টি হাত সাব্যস্ত করেন, যা বাস্তবেই হাত অন্যকিছু নয়, তবে তার প্রকৃত স্বরূপ আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। আর সেটা সাব্যস্ত করতে হবে যেভাবে সেটা তার জন্য উপযুক্ত হবে সেভাবে। কোনো প্রকার নিষ্ক্রীয়করণ, ধরণ নির্ধারণ, কিংবা সাদৃশ্য প্রদান করা যাবে না।
৭২৭. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, এ আয়াতে অনুরূপ এমন হাদীসে 'আরও বেশি আছে' এ কথা বলে কী বুঝানো হয়েছে? উত্তরে তিনি বলেন, বলা হয়ে থাকে যে, হাদীসে 'আরও বেশি আছে' বলে বুঝানো হয়েছে যে, আমার মধ্যে আর বাড়তি ধারণ ক্ষমতা নেই। তবে তিনি সিদ্ধান্ত দিয়ে বলেন, বস্তুত জাহান্নাম 'আরও বেশি আছে কি? এটা বলে বেশি চাইবে। অর্থাৎ আরও বাড়তি কিছু আছে যা দিয়ে আমাকে যোগান দেয়া হবে? (আল্লাহ আমাদেরকে জাহান্নামের আগুন ও জাহান্নামী হওয়া থেকে আশ্রয় দিন), বরং বাড়তি বলে এখানে জিন্ন ও মানবদের মধ্য থেকে আল্লাহ যা বাড়িয়ে দিবেন তা চাওয়া হচ্ছে। যেমনটি বুখারী ও মুসলিমে আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে এসেছে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, জাহান্নামে অনবরত ফেলা হতে থাকবে, আর জাহান্নাম বলতে থাকবে, আরও বেশি আছে কী? অবশেষে মহান রব্ব তাতে তাঁর পা রাখবেন। অপর বর্ণনায় এসেছে, তার উপরে তাঁর পা রাখবেন। তখন তার একাংশ অপর অংশের সাথে মিশে যাবে, আর জাহান্নাম বলবে, কাত্ব, কাত্ব অর্থাৎ পূর্ণ হয়ে গেছি। অপর যখন জাহান্নাম বলবে, আমি যথেষ্ট হয়েছি, আমি যথেষ্ট হয়েছি, তখন তার কাছে যা ফেলা হয়েছে সেটা তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে। তারপর আর বলবে না, 'আরও বেশি আছে কী'? বরং তখন তা পূর্ণ হয়ে যাবে, কারণ তার একাংশ অপর অংশের সাথে মিশে যাবে। তখন আল্লাহ সেটাকে তার ভেতরে যারা রয়েছে তাদের জন্য প্রশস্ততাকে সংকীর্ণ করে দিবেন। কারণ তিনি মানুষ ও জিন্ন দিয়ে জাহান্নাম ও জান্নাত উভয়টিকেই পূর্ণ করার ওয়াদা করেছিলেন। জাহান্নাম তো প্রশস্ত, সেটা যতক্ষণ আল্লাহ তা'আলা তার মাঝে যারা আছে তাদের নিয়ে সংকীর্ণ না করে দিবেন ততক্ষণ সেটা পূর্ণ হবে না। দেখুন, মাজমু' ফাতাওয়া (১৬/৪৬-৪৭)।
৭২৮. বুখারী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ৪৮৪৮, ৪৮৪৯, ৪৮৫০; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২৮৪৮।
৭২৯. তিনি হচ্ছেন আবু আব্দুল্লাহ মুসলিম ইবন ইমরান, বলা হয়ে থাকে ইবন আবী ইমরান আল- বাত্বীন, আল-কৃষ্ণী। তিনি হাদীস বর্ণনা করছেন আত্বা, মুজাহিদ, সা'ঈদ ইবন জুবাইর থেকে। তাকে আহমাদ, ইবন মা'ঈন, আবু হাতেম ও নাসায়ী নির্ভরযোগ্য বলেছেন। ইবন হাজার এর স্তর বিন্যাস অনুযায়ী ষষ্ঠ স্তরের বর্ণনাকারী। দেখুন, মিযযী, তাহযীবুল কামাল (৩/১৩২৬); ইবন হাজার, তাহযীবুত তাহযীব (১০/১৩৪); তাক্বরীবুত তাহযীব, পৃ. ৫৩০।
৭৩০, এর আছারটি বর্ণনা করেছন ইবন জারীর আত-ত্বাবারী, জামে'উল বায়ান (৩/১০), নং ৫৭৯২; সেখানে এসেছে, মুসলিম আল-বাত্বীন বলেন, কুরসী দু' পায়ের স্থান। অনুরূপ তা বর্ণনা করেছেন ইবন কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল 'আযীম (১/৪৫৭)।
৭৩১. তিনি হচ্ছেন আবু মুহাম্মাদ ইসমা'ঈল ইবন 'আব্দুর রহমান ইবন আবী কারীমাহ আল-কুফী আস-সুদ্দী, কুরাইশদের একজন মুক্তদাস। তাফসীর শাস্ত্রের ইমাম। তিনি আনাস ও ইবন সীরীন থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। 'ইজলী বলেন, তিনি নির্ভরযোগ্য, তাফসীরের আলেম, তাফসীরের বর্ণনাকারী। ইমাম যাহাবী তার প্রশংসা করে বলেন, ইমাম ও মুফাসসির।
সুদ্দী শব্দের সাধারণ অর্থ হচ্ছে কোনো বাঁধে অবস্থানকারী। তাকে 'সুদ্দী' বলার কারণ সম্পর্কে বলা হয়, তিনি মদীনার এমন এক জায়গায় বসবাস করতেন যে জায়গাকে বলা হতো 'সাদ্দ'। তিনি হিজরী ১২৭ সালে মারা যান। দেখুন, ইবন সান্দ, আত-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা (৬/৩২৩); সাম'আনী, আল- আনসাব (৩/২৩৮); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৫/২৬৪); ইবন হাজার, তাহযীবুত তাহযীব (১/৩১৩)।
এখানে সুদ্দীর যে আছারটির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে তা বর্ণনা করেছেন ইবন জারীর আত-ত্বাবারী, জামে'উল বায়ান (৩/১০)। সেখানে সুদ্দী বলেন, আসমান ও যমীন কুরসীর অভ্যন্তরে। আর কুরসী 'আরশের সামনে। আর তা (কুরসী) হচ্ছে দু' পায়ের স্থান। আর সুয়ূত্বী আদ-দুররুল মানসূর গ্রন্থে বলেন (২/১৮) যে, এটি ইবন আবী হাতেমও সুদ্দী থেকে বর্ণনা করেছেন। অনুরূপ আরও বর্ণনা করেছেন ইবন কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম (১/৪৫৭)।
৭৩২. তিনি হচ্ছেন আবু আব্দুল্লাহ ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ ইবন কামিল, আল-ইয়ামানী, আয-যিমারী আস-সান'আনী। তিনি হাম্মাম ইবন মুনাব্বিহ এর ভাই। কোনো কোনো সাহাবীর সাথে তার সাক্ষাত হয়েছে এবং তাদের থেকে ইলম অর্জন করেছেন। তার জন্ম হয়েছে হিজরী ৩৪ সালে, উসমান ইবন 'আফফান রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুর খিলাফতকালে। তিনি ইবাদত ও যুহদে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। ওয়ায করতেন এবং হিকমতের কথা বলতেন। তার প্রসিদ্ধ বাণীর মধ্যে রয়েছে, ১- মুমিন কোনো দিকে দৃষ্টি দেয় শিক্ষা নেয়ার জন্য, কথা বলে বুঝার জন্য, চুপ থাকে নিরাপদ থাকার জন্য। ২- ঈমান হচ্ছে উলঙ্গ, তার পোষাক হচ্ছে তাকওয়া, তার সৌন্দর্য হচ্ছে লজ্জা, তার সম্পদ হচ্ছে ফিকহ। তিনি হিজরী ১১০ সালে মারা যান। দেখুন, ইবন সা'দ, আত-ত্বাবাকাতুল কুবরা (৫/৫৪৩); আবু নু'আইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া (৪/২৩); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৪/৫৪৪)। তিনি এখানে যে আছারটির দিকে ইঙ্গিত করছেন তা বর্ণনা করেছেন: আবুশ শাইখ, আল-আযামাহ (২/৬২৩); সেখানকার শব্দ হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা 'আরশ ও কুরসী নূর থেকে সৃষ্টি করেছেন, বাইতুল মা'মুর ফাঁপা মুক্তা থেকে সৃষ্টি করেছেন, 'আরশ কুরসীর সাথে লাগোয়া। তাছাড়া এ বর্ণনাটি সূযুত্বী তার আদ-দুররুল মানসূর গ্রন্থেও এনেছেন, (২/১৭); অনুরূপ আব্দুল্লাহ ইবন ইমাম আহমাদ, তার আস-সুন্নাহ (১/৪৭৭), নং ১০৯২; যাহাবী, আল-আরবা'ঈন, পৃ. ১২৫-১২৬।
৭৩৩. তিনি হচ্ছেন আবু মালেক গাযওয়ান আল-গিফারী, আল-কুফী, কুনিয়াতেই প্রসিদ্ধ। তিনি বর্ণনা করেছেন 'আম্মার ইবন ইয়াসির, ইবন আব্বাস, বারা ইবন আযিব রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুম থেকে। আর তার থেকে বর্ণনা করেছেন ইসমা'ঈল ইবন সামী', ইসমা'ঈল ইবন আব্দুর রহমান আস-সুদ্দী, হুসাইন ইবন আব্দুর রহমান, সালামাহ ইবন কুহাইল। ইবন আবী খাইসামাহ বলেন, আমি ইয়াহইয়া ইবন মা'ঈনকে আবু মালেক সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, সে তো গিফারী, কৃষ্ণী, নির্ভরযোগ্য। ইয়াহইয়া ইবন মা'ঈন তাকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন, ইবন হিব্বান তাকে নির্ভরযোগ্যদের মধ্যে গন্য করেছেন। তার থেকে আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইবন হাজার এর বর্ণনাকারীদের স্তর বিন্যাস অনুযায়ী তৃতীয় স্তরের বর্ণনাকারী। দেখুন, ইবন হিব্বান, আস-সিক্কات (৫/২৯৩); মিযযী, তাহযীবুল কামাল (২/১০৮৯); ইবন হাজার, তাহযীবুত তাহযীব (৮/২৪৫); ইবন হাজার, তাক্বরীবুত তাহযীব, পৃ. ৪৪২। এখানে ইবন খাফীফ যে আছারটির দিকে ইঙ্গিত করেছেন তা বর্ণনা করেন ইবন আবী হাতেম, আত-তাফসীর, হাদীস নং ২৬০২; আব্দুল্লাহ ইবন ইমাম আহমাদ, আস-সুন্নাহ (১/৩০৩), নং ৫৮৯; সেখানকার শব্দ হচ্ছে, আর কুরসী 'আরশের নিচে, তিনি আরও বলেন, তিনি আল্লাহ তাঁর মহান পদ মুবারক কুরসীর উপরে রেখেছেন। তাছাড়া বর্ণনাটি আরও যারা এনেছেন, তারা হচ্ছেন আবুশ শাইখ, আল-আযামাহ (২/৫৫১); বাইহাক্বী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (২/২৯৫-২৯৬), নং ৮৫৭; সামান্য শব্দের হেরফের রয়েছে; সুয়ূত্বী, আদ-দুররুল মানসূর (২/১৭), আব্দ ইবন হুমাইদ ও ইবন আবী হাতেম এর বরাতে; ইবন কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম (১/৪৫৭); ইবন হাজার, ফাতহুল বারী (১৩/৪১১); যাহাবী, আল-আরবা'ঈন, পৃ. ১২৬।
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ইবন আব্বাস, মুসলিম আল-বাত্বীন, সুদ্দী, এদের বর্ণনাগুলো কেবল নিজেদের মত বা ইজতিহাদ করে দিয়েছেন তা হতে পারে না; কারণ এতে আল্লাহর পক্ষ থেকে সংবাদ দেয়া হচ্ছে, আর আল্লাহর ব্যাপারে ইজতিহাদ করে কোনো কথা বলা অগ্রহণযোগ্য। বরং এটা স্পষ্ট যে, তারা এগুলো কোনো বিশেষ কোনো ভাষ্যের ওপর ভিত্তি করেই বলে থাকবেন। সম্ভবত তাদের নির্ভরতার স্থানটি হচ্ছে সে হাদীস যাতে বর্ণিত হয়েছে যে, "আল্লাহ তা'আলা তাতে তার পা রাখবেন।' শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, 'অনুরূপভাবে কোনো কোনো আলেম নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ ও অন্যান্যদের থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তারা বিনা ইলমে কুরআনের তাফসীর করার ব্যাপারে কঠোর ছিলেন।... অবশেষে বলেন, তাহলে তাদের ব্যাপারে এটা ধারণা করা যায় না যে, তারা কুরআনকে বিনা ইলম অথবা নিজেদের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা করবেন।..." মুকাদ্দিমাতু উসূলিত তাফসীর লি শাইখিল ইসলাম, পৃ. ৩৮।
[ইবন খাফীফ কর্তৃক মহান আল্লাহর দু' হাত ও দু' পা সাব্যস্তকরণ] তারপর তিনি বলেন, আল্লাহ তা'আলা তাঁর মুমিন বান্দাদের কাছে নিজের পরিচয় দিয়েছেন যে, তাঁর রয়েছে দুটি হাত (৭২৬) যেগুলো তিনি রহমতসহ প্রশস্ত করে রেখেছেন। এরপর তিনি এ সংক্রান্ত হাদীসসমূহ উল্লেখ করেন। তারপর তিনি উমাইয়া ইবন আবিস সালতের কবিতা উল্লেখ করেন।
﴿يلقى في النار وتقول هل من مزيد؟ حتى يضع فيها رجله﴾ “জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হতেই থাকবে, আর জাহান্নাম বলতেই থাকবে, 'আরও বেশি আছে?' [সূরা ক্বাফ: ৩০] (৭২৭) অবশেষে তিনি তাতে তাঁর পা রাখবেন।' এ হচ্ছে বুখারীর বর্ণনা। অপর বর্ণনায় এসেছে, »يضع عليها قدمه« "তিনি তাতে তাঁর পা রাখবেন। (৭২৮(
তারপর তিনি [ইবন খাফীফ] বর্ণনা করলেন, যা মুসলিম আল-বাত্বীন (৭২৯) বর্ণনা করেছেন ইবন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে যে, "কুরসী হচ্ছে দু' পায়ের জায়গা। আর আরশ, তার পরিমাণ তো আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না।"
তারপর তিনি [ইবন খাফীফ] বর্ণনা করেন মুসলিম আল- বাত্বীন এর বক্তব্য(৭৩০), সুদ্দী (৭৩১)র বক্তব্য, ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ(৭৩২), আবু মালেক (৭৩৩) এর বক্তব্য।
টিকাঃ
৭২৬. আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আহ মহান আল্লাহর জন্য দু'টি হাত সাব্যস্ত করেন, যা বাস্তবেই হাত অন্যকিছু নয়, তবে তার প্রকৃত স্বরূপ আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। আর সেটা সাব্যস্ত করতে হবে যেভাবে সেটা তার জন্য উপযুক্ত হবে সেভাবে। কোনো প্রকার নিষ্ক্রীয়করণ, ধরণ নির্ধারণ, কিংবা সাদৃশ্য প্রদান করা যাবে না।
৭২৭. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, এ আয়াতে অনুরূপ এমন হাদীসে 'আরও বেশি আছে' এ কথা বলে কী বুঝানো হয়েছে? উত্তরে তিনি বলেন, বলা হয়ে থাকে যে, হাদীসে 'আরও বেশি আছে' বলে বুঝানো হয়েছে যে, আমার মধ্যে আর বাড়তি ধারণ ক্ষমতা নেই। তবে তিনি সিদ্ধান্ত দিয়ে বলেন, বস্তুত জাহান্নাম 'আরও বেশি আছে কি? এটা বলে বেশি চাইবে। অর্থাৎ আরও বাড়তি কিছু আছে যা দিয়ে আমাকে যোগান দেয়া হবে? (আল্লাহ আমাদেরকে জাহান্নামের আগুন ও জাহান্নামী হওয়া থেকে আশ্রয় দিন), বরং বাড়তি বলে এখানে জিন্ন ও মানবদের মধ্য থেকে আল্লাহ যা বাড়িয়ে দিবেন তা চাওয়া হচ্ছে। যেমনটি বুখারী ও মুসলিমে আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে এসেছে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, জাহান্নামে অনবরত ফেলা হতে থাকবে, আর জাহান্নাম বলতে থাকবে, আরও বেশি আছে কী? অবশেষে মহান রব্ব তাতে তাঁর পা রাখবেন। অপর বর্ণনায় এসেছে, তার উপরে তাঁর পা রাখবেন। তখন তার একাংশ অপর অংশের সাথে মিশে যাবে, আর জাহান্নাম বলবে, কাত্ব, কাত্ব অর্থাৎ পূর্ণ হয়ে গেছি। অপর যখন জাহান্নাম বলবে, আমি যথেষ্ট হয়েছি, আমি যথেষ্ট হয়েছি, তখন তার কাছে যা ফেলা হয়েছে সেটা তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে। তারপর আর বলবে না, 'আরও বেশি আছে কী'? বরং তখন তা পূর্ণ হয়ে যাবে, কারণ তার একাংশ অপর অংশের সাথে মিশে যাবে। তখন আল্লাহ সেটাকে তার ভেতরে যারা রয়েছে তাদের জন্য প্রশস্ততাকে সংকীর্ণ করে দিবেন। কারণ তিনি মানুষ ও জিন্ন দিয়ে জাহান্নাম ও জান্নাত উভয়টিকেই পূর্ণ করার ওয়াদা করেছিলেন। জাহান্নাম তো প্রশস্ত, সেটা যতক্ষণ আল্লাহ তা'আলা তার মাঝে যারা আছে তাদের নিয়ে সংকীর্ণ না করে দিবেন ততক্ষণ সেটা পূর্ণ হবে না। দেখুন, মাজমু' ফাতাওয়া (১৬/৪৬-৪৭)।
৭২৮. বুখারী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ৪৮৪৮, ৪৮৪৯, ৪৮৫০; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২৮৪৮।
৭২৯. তিনি হচ্ছেন আবু আব্দুল্লাহ মুসলিম ইবন ইমরান, বলা হয়ে থাকে ইবন আবী ইমরান আল- বাত্বীন, আল-কৃষ্ণী। তিনি হাদীস বর্ণনা করছেন আত্বা, মুজাহিদ, সা'ঈদ ইবন জুবাইর থেকে। তাকে আহমাদ, ইবন মা'ঈন, আবু হাতেম ও নাসায়ী নির্ভরযোগ্য বলেছেন। ইবন হাজার এর স্তর বিন্যাস অনুযায়ী ষষ্ঠ স্তরের বর্ণনাকারী। দেখুন, মিযযী, তাহযীবুল কামাল (৩/১৩২৬); ইবন হাজার, তাহযীবুত তাহযীব (১০/১৩৪); তাক্বরীবুত তাহযীব, পৃ. ৫৩০।
৭৩০, এর আছারটি বর্ণনা করেছন ইবন জারীর আত-ত্বাবারী, জামে'উল বায়ান (৩/১০), নং ৫৭৯২; সেখানে এসেছে, মুসলিম আল-বাত্বীন বলেন, কুরসী দু' পায়ের স্থান। অনুরূপ তা বর্ণনা করেছেন ইবন কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল 'আযীম (১/৪৫৭)।
৭৩১. তিনি হচ্ছেন আবু মুহাম্মাদ ইসমা'ঈল ইবন 'আব্দুর রহমান ইবন আবী কারীমাহ আল-কুফী আস-সুদ্দী, কুরাইশদের একজন মুক্তদাস। তাফসীর শাস্ত্রের ইমাম। তিনি আনাস ও ইবন সীরীন থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। 'ইজলী বলেন, তিনি নির্ভরযোগ্য, তাফসীরের আলেম, তাফসীরের বর্ণনাকারী। ইমাম যাহাবী তার প্রশংসা করে বলেন, ইমাম ও মুফাসসির।
সুদ্দী শব্দের সাধারণ অর্থ হচ্ছে কোনো বাঁধে অবস্থানকারী। তাকে 'সুদ্দী' বলার কারণ সম্পর্কে বলা হয়, তিনি মদীনার এমন এক জায়গায় বসবাস করতেন যে জায়গাকে বলা হতো 'সাদ্দ'। তিনি হিজরী ১২৭ সালে মারা যান। দেখুন, ইবন সান্দ, আত-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা (৬/৩২৩); সাম'আনী, আল- আনসাব (৩/২৩৮); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৫/২৬৪); ইবন হাজার, তাহযীবুত তাহযীব (১/৩১৩)।
এখানে সুদ্দীর যে আছারটির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে তা বর্ণনা করেছেন ইবন জারীর আত-ত্বাবারী, জামে'উল বায়ান (৩/১০)। সেখানে সুদ্দী বলেন, আসমান ও যমীন কুরসীর অভ্যন্তরে। আর কুরসী 'আরশের সামনে। আর তা (কুরসী) হচ্ছে দু' পায়ের স্থান। আর সুয়ূত্বী আদ-দুররুল মানসূর গ্রন্থে বলেন (২/১৮) যে, এটি ইবন আবী হাতেমও সুদ্দী থেকে বর্ণনা করেছেন। অনুরূপ আরও বর্ণনা করেছেন ইবন কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম (১/৪৫৭)।
৭৩২. তিনি হচ্ছেন আবু আব্দুল্লাহ ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ ইবন কামিল, আল-ইয়ামানী, আয-যিমারী আস-সান'আনী। তিনি হাম্মাম ইবন মুনাব্বিহ এর ভাই। কোনো কোনো সাহাবীর সাথে তার সাক্ষাত হয়েছে এবং তাদের থেকে ইলম অর্জন করেছেন। তার জন্ম হয়েছে হিজরী ৩৪ সালে, উসমান ইবন 'আফফান রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুর খিলাফতকালে। তিনি ইবাদত ও যুহদে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। ওয়ায করতেন এবং হিকমতের কথা বলতেন। তার প্রসিদ্ধ বাণীর মধ্যে রয়েছে, ১- মুমিন কোনো দিকে দৃষ্টি দেয় শিক্ষা নেয়ার জন্য, কথা বলে বুঝার জন্য, চুপ থাকে নিরাপদ থাকার জন্য। ২- ঈমান হচ্ছে উলঙ্গ, তার পোষাক হচ্ছে তাকওয়া, তার সৌন্দর্য হচ্ছে লজ্জা, তার সম্পদ হচ্ছে ফিকহ। তিনি হিজরী ১১০ সালে মারা যান। দেখুন, ইবন সা'দ, আত-ত্বাবাকাতুল কুবরা (৫/৫৪৩); আবু নু'আইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া (৪/২৩); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৪/৫৪৪)। তিনি এখানে যে আছারটির দিকে ইঙ্গিত করছেন তা বর্ণনা করেছেন: আবুশ শাইখ, আল-আযামাহ (২/৬২৩); সেখানকার শব্দ হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা 'আরশ ও কুরসী নূর থেকে সৃষ্টি করেছেন, বাইতুল মা'মুর ফাঁপা মুক্তা থেকে সৃষ্টি করেছেন, 'আরশ কুরসীর সাথে লাগোয়া। তাছাড়া এ বর্ণনাটি সূযুত্বী তার আদ-দুররুল মানসূর গ্রন্থেও এনেছেন, (২/১৭); অনুরূপ আব্দুল্লাহ ইবন ইমাম আহমাদ, তার আস-সুন্নাহ (১/৪৭৭), নং ১০৯২; যাহাবী, আল-আরবা'ঈন, পৃ. ১২৫-১২৬।
৭৩৩. তিনি হচ্ছেন আবু মালেক গাযওয়ান আল-গিফারী, আল-কুফী, কুনিয়াতেই প্রসিদ্ধ। তিনি বর্ণনা করেছেন 'আম্মার ইবন ইয়াসির, ইবন আব্বাস, বারা ইবন আযিব রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুম থেকে। আর তার থেকে বর্ণনা করেছেন ইসমা'ঈল ইবন সামী', ইসমা'ঈল ইবন আব্দুর রহমান আস-সুদ্দী, হুসাইন ইবন আব্দুর রহমান, সালামাহ ইবন কুহাইল। ইবন আবী খাইসামাহ বলেন, আমি ইয়াহইয়া ইবন মা'ঈনকে আবু মালেক সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, সে তো গিফারী, কৃষ্ণী, নির্ভরযোগ্য। ইয়াহইয়া ইবন মা'ঈন তাকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন, ইবন হিব্বান তাকে নির্ভরযোগ্যদের মধ্যে গন্য করেছেন। তার থেকে আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইবন হাজার এর বর্ণনাকারীদের স্তর বিন্যাস অনুযায়ী তৃতীয় স্তরের বর্ণনাকারী। দেখুন, ইবন হিব্বান, আস-সিক্কات (৫/২৯৩); মিযযী, তাহযীবুল কামাল (২/১০৮৯); ইবন হাজার, তাহযীবুত তাহযীব (৮/২৪৫); ইবন হাজার, তাক্বরীবুত তাহযীব, পৃ. ৪৪২। এখানে ইবন খাফীফ যে আছারটির দিকে ইঙ্গিত করেছেন তা বর্ণনা করেন ইবন আবী হাতেম, আত-তাফসীর, হাদীস নং ২৬০২; আব্দুল্লাহ ইবন ইমাম আহমাদ, আস-সুন্নাহ (১/৩০৩), নং ৫৮৯; সেখানকার শব্দ হচ্ছে, আর কুরসী 'আরশের নিচে, তিনি আরও বলেন, তিনি আল্লাহ তাঁর মহান পদ মুবারক কুরসীর উপরে রেখেছেন। তাছাড়া বর্ণনাটি আরও যারা এনেছেন, তারা হচ্ছেন আবুশ শাইখ, আল-আযামাহ (২/৫৫১); বাইহাক্বী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (২/২৯৫-২৯৬), নং ৮৫৭; সামান্য শব্দের হেরফের রয়েছে; সুয়ূত্বী, আদ-দুররুল মানসূর (২/১৭), আব্দ ইবন হুমাইদ ও ইবন আবী হাতেম এর বরাতে; ইবন কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম (১/৪৫৭); ইবন হাজার, ফাতহুল বারী (১৩/৪১১); যাহাবী, আল-আরবা'ঈন, পৃ. ১২৬।
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ইবন আব্বাস, মুসলিম আল-বাত্বীন, সুদ্দী, এদের বর্ণনাগুলো কেবল নিজেদের মত বা ইজতিহাদ করে দিয়েছেন তা হতে পারে না; কারণ এতে আল্লাহর পক্ষ থেকে সংবাদ দেয়া হচ্ছে, আর আল্লাহর ব্যাপারে ইজতিহাদ করে কোনো কথা বলা অগ্রহণযোগ্য। বরং এটা স্পষ্ট যে, তারা এগুলো কোনো বিশেষ কোনো ভাষ্যের ওপর ভিত্তি করেই বলে থাকবেন। সম্ভবত তাদের নির্ভরতার স্থানটি হচ্ছে সে হাদীস যাতে বর্ণিত হয়েছে যে, "আল্লাহ তা'আলা তাতে তার পা রাখবেন।' শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, 'অনুরূপভাবে কোনো কোনো আলেম নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ ও অন্যান্যদের থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তারা বিনা ইলমে কুরআনের তাফসীর করার ব্যাপারে কঠোর ছিলেন।... অবশেষে বলেন, তাহলে তাদের ব্যাপারে এটা ধারণা করা যায় না যে, তারা কুরআনকে বিনা ইলম অথবা নিজেদের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা করবেন।..." মুকাদ্দিমাতু উসূলিত তাফসীর লি শাইখিল ইসলাম, পৃ. ৩৮।