📄 আমর ইবন উসমান আল-মাকীর বক্তব্য
['আমর ইবন উসমান আল-মাক্বীর বক্তব্য] অনুরূপভাবে 'আমর ইবন উসমান আল-মাক্কী তার "আত-তা'আররুফ বি আহওয়ালিল 'ইবাদি ওয়াল মুতা'আব্বেদীন” নামক গ্রন্থে বলেন, অধ্যায়: “তাওবাকারীদের জন্য শয়তান যা নিয়ে আসে।” তিনি উল্লেখ করেন যে, সে তাদেরকে কঠিন নৈরাশ্যের মধ্যে নিপতিত করে, অতঃপর ধোঁকা ও দীর্ঘ আশার মধ্যে, অতঃপর তাওহীদের মধ্যে । অতঃপর তিনি বলেন, শয়তান সবচেয়ে বড় যে প্রবঞ্চনা দেয় তা হচ্ছে, তাওহীদের মধ্যে সন্দেহে নিপতিত করার মাধ্যমে অথবা আল্লাহর সিফাতের মধ্যে সেগুলোকে তুলনা করার মাধ্যমে, সাদৃশ্য দানের মাধ্যমে বা সেগুলোকে অস্বীকার ও নিষ্ক্রিয়করণের মাধ্যমে।
অতঃপর তিনি ('আমর ইবন উসমান আল-মাক্কী) ওয়াসওয়াসার হাদীস উল্লেখ করে বলেন, জেনে রেখ! (আল্লাহ তোমাকে দয়া করুন) যা কিছু তোমার হৃদয়ে ধারণা সৃষ্টি করে বা তোমার চিন্তার স্থলে উদিত হয় অথবা তোমার অন্তরে পেশ হওয়ার জায়গায় কল্পনায় আসে, যেমন- সৌন্দর্য, উজ্জ্বলতা, চাকচিক্য, শোভা অথবা দৃশ্যমান কোনো ছায়া, বা শরীর হিসেবে ফুটে উঠা কোনো কায়া, সে সবকিছু থেকে আল্লাহ অবশ্যই ভিন্ন। বরং তিনি অনেক মহান, অনেক শ্রেষ্ঠ ও বড়। তুমি কি শোন না যে, তিনি বলেছেন: لَيْسَ كَيْثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ) [الشورى: ١١ "তাঁর মতো কিছুই নেই। তিনি সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা।” [সূরা আশ-শূরা: ১১] এবং وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ ) [الاخلاص: ٤ “তাঁর সমতুল্য কেউই নেই।” [সূরা আল-ইখলাস: ০৪] অর্থাৎ নেই কোনো সদৃশ, তুলনার যোগ্য, সমকক্ষ ও উদাহরণ। তুমি কি জানো না যে, তিনি যখন পাহাড়ের প্রতি নিজেকে উদ্ভাসিত করলেন, তখন পাহাড় তাঁর ভয়ের প্রচণ্ডতায় ও সুউচ্চ ক্ষমতায় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। কাজেই যেমন তিনি কোনো কিছুতে উদ্ভাসিত হলে তা চূর্ণ হয়ে যায়। তেমনি কেউ তাঁর সম্পর্কে ধারণা করে কিছু নির্ধারণ করলে ধ্বংস হয়ে যাবে।
সুতরাং আল্লাহ তাঁর কিতাবে নিজেই নিজের ব্যাপারে তাঁর মত আর কেউ নেই বলে যা বর্ণনা দিয়েছেন তা দিয়ে তুমি সাদৃশ্য প্রদান, তুলনাদান, উপমা পেশ, সমকক্ষ নির্ধারণ করা প্রতিহত কর।
অতঃপর যদি তুমি এটি আঁকড়ে ধর এবং তা (সাদৃশ্য প্রদান, তুলনাদান, উপমা পেশ, সমকক্ষ নির্ধারণ করা) থেকে বিরত থাক, তাহলে দেখবে সে (শয়ত্বান) তোমার কাছে পবিত্র, মহান আল্লাহর কিতাবে ও তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে সাব্যস্তকৃত আল্লাহর গুণকে নিষ্ক্রীয়করণের জন্য এসে বলবে, তিনি যদি এসব গুণে গুণান্বিত হবেন, অথবা তুমি যদি তাকে এসব গুণে গুণান্বিত করো, তবে তো সাদৃশ্য প্রদান আবশ্যক হয়ে যায়। শয়তানের এ কুমন্ত্রণার জবাবে তাকে তুমি মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করো; কেননা সে তো অভিশপ্ত, সে তোমাকে পদস্খলন ঘটাতে চায়, তোমাকে পথভ্রষ্ট করে নাস্তিক বিভ্রান্ত সিফাত অস্বীকারকারীদের অন্তর্ভুক্ত করতে চায়।
অতঃপর জেনে রাখ! (মহান আল্লাহ তোমাকে রহম করুন) নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা এক সত্তা, অন্য একজনের মতো না, একক, অমুখাপেক্ষী, কাউকে জন্ম দেননি, তাকেও জন্ম দেয়া হয়নি, তার সমকক্ষ কেউ নেই। ...
শেষে তিনি ('আমর ইবন উসমান আল-মাক্কী) বলেন, "আল্লাহর জন্য উন্নত আলোকোজ্জ্বল নামসমূহ সাব্যস্ত রয়েছে, যেটা সৃষ্টির আদিতে বাস্তবে সত্যতার সাথেই তাঁর ছিল।
এমন কোনো গুণ তিনি উদ্ভব করেননি যা থেকে তিনি খালি ছিলেন, অথবা এমন নামেরও উদ্ভব করেননি যা থেকে তিনি মুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন হাদী, অচিরেই হিদায়াত করবেন। তিনি ছিলেন সৃষ্টিকর্তা, অচিরেই সৃষ্টি করবেন; তিনি ছিলেন রিযিকদাতা, অচিরেই রিযিক দান করবেন; তিনি ছিলেন ক্ষমাশীল, অচিরেই তিনি ক্ষমা করবেন; তিনি ছিলেন কর্তা, অচিরেই তিনি করবেন। তিনি তাঁর ইসতিওয়া সিফাতটিতে গুণান্বিত, এটা তিনি তখনও ঘটাননি। অবশ্যই তাঁর থেকে এ গুণটি হওয়া আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল যে অচিরেই তা হবে। তাঁর কর্মসমূহের মধ্যে তাঁকে এ (আরোহনকারী) নাম দেয়া হবে।
অনুরূপ আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا ﴾ [الفجر: ٢٢] "আর আপনার রব্ব আসবেন এবং ফেরেশতাগণও কাতারে কাতারে আসবেন।” [সূরা আল-ফাজর: ২২] এর অর্থ, নিশ্চয় অচিরেই তিনি আসবেন, তবে আসার দ্বারা 'আগমনকারী' নাম উদ্ভাবন করেননি। শুধু কর্মটি আসার সময় পর্যন্ত প্রলম্বিত। সুতরাং তিনি আগমন করেছেন তথা অচিরেই আগমন করবেন। তাঁর আসাটা এমনভাবে অস্তিত্বে রয়েছে যার সাথে কোনো স্বরূপ নির্ধারণ ও সাদৃশ্যদান যুক্ত নেই। কেননা সেটা রবুবিয়াত বা প্রভুত্বের কাজ; কাজেই মা'বুদের স্বরূপ উদঘাটনের মধ্যে প্রবেশের ইচ্ছা করলেই বুদ্ধি পেরেশান হবে, মন বিচ্ছিন্ন হবে। কাজেই তুমি দুদিকের একদিকেও যেও না। না নিষ্ক্রীয়কারী হও, আর না হও সাদৃশ্যপ্রদানকারী। আর আল্লাহর জন্য তাতেই সন্তুষ্ট থাকো যাতে তিনি নিজের জন্য সন্তুষ্ট হয়েছেন। আর তুমি তার নিজের ব্যাপারে তার সংবাদে অনুগত আত্মসমর্পণকারী বিশ্বাসী হয়ে থেমে যাও। সেখানে কোনো প্রকার ভিন্নতা আনার চেষ্টায় যাবে না, অনুরূপ গভীরে তালাশের চেষ্টায়ও রত হবে না। শেষে তিনি বলেন, "কাজেই মহান আল্লাহ তিনিই বলেছেন, “আমি আল্লাহ”, গাছ না। তিনিই আগন্তুক হওয়ার পূর্বেই আগমনকারী। তাঁর নির্দেশ নয়, তিনি স্বয়ং আসবেন আখেরাতে স্বীয় বন্ধুদের সামনে উদ্ভাসিত হয়ে , এতে তাদের চেহারা শুভ্রোজ্জ্বল হবে , অস্বীকারকারীদের দলীল-প্রমাণ তাতে ব্যর্থ হবে। মহান আল্লাহ সর্বস্থানের উপরে, তাঁর 'আরশের উপরে সমুন্নত, যাবতীয় মহৎ সম্মানের সাথে। যিনি মূসা 'আলাইহিস সালামের সাথে যথাযথভাবে কথা বলেছেন। তাকে তাঁর নিদর্শনাবলি দেখিয়েছেন। অতঃপর মূসা 'আলাইহিস সালাম আল্লাহর কালাম শুনেছিলেন; কারণ তিনি তাকে আলাপের মাধ্যমে নৈকট্য দান করেছিলেন। তাঁর কালাম বা বাণী সৃষ্ট হওয়া, উদ্ভাবিত হওয়া, লালিত- পালিত হওয়া থেকে পবিত্র। তিনি সৃষ্টিকুলের ওয়ারিশ , তাদের আওয়াজ শ্রবণকারী, স্বীয় চোখে তাদের দেহ অবলোকনকারী, তাঁর দুহাত বিস্তৃত, তাঁর হাত তাঁর নি'আমত নয়। আদমকে সৃষ্টি করে তার মধ্যে তার রূহ ফুঁকে দিয়েছেন, এটা তাঁর নির্দেশ । কোনো শরীরের মধ্যে অনুপ্রবেশ হওয়া, মিশে যাওয়া, তার সাথে লেগে যাওয়া থেকে অতি পবিত্র, অনেক ঊর্ধ্বে। তিনি ইচ্ছাকারী, তাঁর ইচ্ছা আছে। তিনি জ্ঞানী, তাঁর জ্ঞান আছে। স্বীয় দু' হাত রহমত নিয়ে বিস্তৃত। প্রতি রাতে নিকটবর্তী আসমানে অবতরণকারী, যাতে তাঁর বান্দারা ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য লাভ করতে পারে আর যাতে তারা তাঁর নৈক্যের ব্যাপারে আগ্রহী হয়। তিনি অতি নিকটবর্তী, তাঁর সে নৈকট্যের মাধ্যমে তিনি ঘাড়ের শিরার চেয়েও অধিক নিকটবর্তী, তিনি ঊর্ধ্বে থাকার মাধ্যমে সকল দূরবর্তী স্থান থেকে দূরবর্তী। তিনি মানুষের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নন।
অবশেষে তিনি বলেন: ﴿إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ وَالْعَمَلُ الصَّالِحُ يَرْفَعُهُ ﴾ [فاطر: ١০] “তাঁরই দিকে পবিত্র বাণীসমূহ উঠে যায়, আর সৎ আমল তিনি তো তা (তার দিকে) উঠিয়ে নেন।” [সূরা ফাতির: ১০] এবং
﴿أَمِنتُم مَّن فِي السَّمَاءِ أَن يَخْسِفَ بِكُمُ الْأَرْضَ فَإِذَا هِيَ تَمُورُ أَمْ أَمِنتُم مِّن فِي السَّمَاءِ أَن يُرْسِلَ عَلَيْكُمْ حَاصِبًا ﴾ [الملك: ١٦، ١٧]
"তোমরা কি এ থেকে নির্ভয় হয়েছ যে, যিনি আসমানের ওপর রয়েছেন তিনি তোমাদেরকে সহ যমীনকে ধ্বসিয়ে দিবেন, অতঃপর তা হঠাৎ করেই থরথর করে কাঁপতে থাকবে? অথবা তোমরা কি এ থেকে নির্ভয় হয়েছ যে, আসমানের উপর যিনি রয়েছেন তিনি তোমাদের উপর কংকরবর্ষী ঝঞ্ঝা পাঠাবেন?" [সূরা আল-মুলক: ১৬-১৭] তিনি যেমনিভাবে আসমানের উপর আছেন তেমনি তিনি যমীনে থাকার থেকে পবিত্র ও ঊর্ধ্বে।
টিকাঃ
৬২৮. তিনি হচ্ছেন, আবু আব্দুল্লাহ 'আমর ইবন উসমান ইবন কুরাব ইবন গুসাস, আল-মাক্কী। সূফীদের বড় শাইখ। তিনি হাদীস শুনেছেন ইউনুস ইবন আব্দিল আ'লা, রবী' ইবন সুলাইমান প্রমুখ থেকে। ফিকহের বড় আলেম। জুনাইদ এর সাথীত্ব বরণ করেছিলেন। বাগদাদে বসবাস করেছেন। তারপর সেখানেই হিজরী ২৯৭ সালে তার মৃত্যু হয়। তিনি বিভিন্ন প্রদেশে চিঠি লিখে হাল্লাজের ওপর লা'নত করেন এবং তার সম্পর্কে মানুষদেরকে সাবধান করেন। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ তার প্রশংসা করেন। আরও উল্লেখ করেন যে, তিনি তাসাওউফের শাইখদের মধ্যে বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন, যিনি সিফাত সাব্যস্ত করতেন আর জাহমিয়্যাহ ও হুলুলিয়্যাহ সম্প্রদায়ের কর্মকাণ্ড অস্বীকার করতেন। দেখুন, আবু নু'আইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া (১০/২৯১); যিকরু আখবারি আসবাহান (২/৩৩); খত্নীবে বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ (১৪/১৩৬), নং ৬৬২৬; ইবনুল মুলাক্কিন, ত্বাবাক্বাতুল আওলিয়া, পৃ. ৩৪৪; ইবনুল 'ইমাদ, শাযরাতুয যাহাব (২/২২৫); ইবন কাসীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (১১/১৩৫); ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউত তা'আরুদ্ব (৫/৪-৯), (৬/২২২৬)।
৬২৯. এ গ্রন্থটি বর্তমানে হারিয়ে যাওয়া গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। তবে যারাই 'আমর ইবন উসমান এর জীবনী লিখেছেন তারা সবাই উল্লেখ করেছেন যে, তাসাওউফে তার বেশ কিছু রচিত গ্রন্থ ছিল। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ 'আমর ইবন উসমান এর এ গ্রন্থ থেকে তার বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৫/৫৯-৬০) গ্রন্থে বেশ কিছু তথ্য এনেছেন, সেখানে তিনি এ গ্রন্থের নাম দিয়েছেন, আদাবুল মুরীদীন ওয়াত তা'আররুফ লি আহওয়ালিল উব্বাদ। অনুরূপ ইমাম যাহাবী তার আল-উলু গ্রন্থে (২/১২২৫), নং ৪৮৯ এ তথ্য বর্ণনা করেছেন। সেখানে তিনি গ্রন্থের নাম দিয়েছেন 'আদাবুল মুরীদীন।
৬৩০. অর্থাৎ তাদের জন্য যেসব ওয়াসওয়াসা বা কুমন্ত্রণা নিয়ে আসে তার বর্ণনা। দেখুন, বায়ানু ভালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৫/৬০)।
৬৩১. এ কথার ব্যাখ্যা করেছেন ইবন তাইমিয়্যাহ তার বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৫/৬০); ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুয়ুশ, পৃ. ২৭৪। তারা বলেন, "আর তৃতীয় দিক, যে দিক থেকে শয়তান মানুষের কাছে আসে, যখন তারা তার কথা মানতে অস্বীকার করে, আর তারা আল্লাহর নির্দেশকে আকঁড়ে ধরে, তখন শয়তান তাদের কাছে কুমন্ত্রণা নিয়ে আসে। সে তখন স্রষ্টার ব্যাপারেই তাদেরকে সন্দিহান করে তোলে, যাতে তাদের মাঝে তাওহীদের মূলনীতিই বিনষ্ট করতে পারে।"
৬৩২. বাস্তবে এ তিনটি অস্ত্র দিয়ে আজও শয়তান জাহমিয়্যাহ, মু'তাযিলা, আশায়েরা ও মাতুরিদিয়া সম্প্রদায়কে ঘায়েল করেছে। আজ পর্যন্ত তারা এ তিনটির মাঝে পড়ে আছে। আল্লাহর সিফাতকে অস্বীকার করার জন্য প্রথমে তামসীল বা তাশবীহ প্রদান করে তারপর সেটাকে তা'ত্বীল করে।
৬৩৩. ওয়াসওয়াসার হাদীস বলতে সম্ভবত বুঝাচ্ছেন যা সহীহ মুসলিমে আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে একদল লোক এসে জানতে চাইলেন, 'আমরা আমাদের অন্তরে এমনসব জিনিস পাই, আমাদের কেউ তা উচ্চারণ করাও বড় গুনাহের মনে করি'। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তোমরা কি তা পেয়েছ? তারা বললেন, হ্যাঁ। তখন রাসূল বললেন, 'এ হচ্ছে সুস্পষ্ট ঈমান'। [মুসলিম, আস-সহীহ (১/১১৯), হাদীস নং ১৩২; আবু দাউদ, আস-সুনান (৫/৩৩৬), হাদীস নং ৫১১১; ইবন আবী আসেম, আস-সুন্নাহ (১/২৯৫), হাদীস নং ৬৫৪; আবুল কাসেম আল-আসফাহানী, আল-হুজ্জাহ (২/২৮৫)]
৬৩৪. এখানে তিনি সূরা আল-আ'রাফের ১৪৩ নং আয়াতে মূসা 'আলাইহিস সালাম কর্তৃক আল্লাহকে দেখার আব্দার করার পরে আল্লাহ তা'আলা পাহাড়ে তাঁর উজ্জ্বল আলো ফেললে তাঁর কী অবস্থা হয়েছিল তাই তুলে ধরছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, "আর মূসা যখন আমাদের নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হলেন এবং তার রব তার সাথে কথা বললেন, তখন তিনি বললেন, 'হে আমার রব্ব! আমাকে দর্শন দান করুন, আমি আপনাকে দেখব'। তিনি বললেন, 'আপনি আমাকে দেখতে পাবেন না। আপনি বরং পাহাড়ের দিকেই তাকিয়ে দেখুন, সেটা যদি নিজের জায়গায় স্থির থাকে তবে আপনি আমাকে দেখতে পাবেন।' যখন তাঁর রব্ব পাহাড়ে জ্যোতি প্রকাশ করলেন তখন তা পাহাড়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করল এবং মূসা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লেন। যখন তিনি জ্ঞান ফিরে পেলেন তখন বললেন, 'মহিমাময় আপনি, আমি অনুতপ্ত হয়ে আপনার কাছে তাওবাহ করছি এবং মুমিনদের মধ্যে আমিই প্রথম'।” [সূরা আল-আ'রাফ: ১৪৩]
৬৩৫. অর্থাৎ আল্লাহকে দেখার আব্দার করার কারণে যেহেতু পাহাড়ে তাঁর উদ্ভাসন পড়লো পাহাড় চূর্ণ হয়ে গেল, সেহেতু যে কেউ আল্লাহকে দেখার জন্য অন্তরে আল্লাহর উদ্ভাসন কামনা করে সেখানে কোনো প্রকার (তাশবীহ) সাদৃশ্য, (তামসীল) উদাহরণ, (নাযীর) দৃষ্টান্ত, ও (মুসাওয়ী) সমপর্যায়ের কিছু আসবে তখন তার অন্তর চূর্ণ হয়ে যাবে।
এ ধরনের তাফসীরকে বলা হয় তাফসীরে ইশারী বা সূফীদের ইঙ্গিতপূর্ণ তাফসীর। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এগুলো অনেকটা ফকীহগণের কিয়াসের মতো। তা শুদ্ধও হতে পারে, আবার অশুদ্ধও হতে পারে। আবার তিনি স্পষ্ট করেও বলেছেন যে, এসবের অধিকাংশই তাফসীরের পর্যায়ে পড়ে না। বরং এগুলোকে শিক্ষা নেয়ার উপকরণ ও কিয়াসের মতো মনে করতে হবে। এগুলো জ্ঞানের একটি বিশুদ্ধ পদ্ধতিও হয়। যেমন, আল্লাহর বাণী, "যারা সম্পূর্ণ পবিত্র তারা ছাড়া অন্য কেউ তা স্পর্শ করে না।" [সূরা আল-ওয়াকি'আহ: ৭৯] এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী "ফেরেশতারা এমন ঘরে প্রবেশ করেন না যেখানে কুকুর থাকে”। [বুখারী, আল- জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ৩২২৫; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২১০৬] যদি কুরআনের কাগজ ধরতেই 'পবিত্ররা ব্যতীত কেউ তা স্পর্শ করতে না পারে' [সূরা আল-ওয়াকি'আহ: ৭৯] তাহলে সেসব কাগজে লিখা বাণীর মর্মার্থ পবিত্র অন্তরবিশিষ্ট ব্যক্তিরা ছাড়া অন্যরা কীভাবে প্রাপ্ত হবে? যদি ফিরিশতা এমন ঘরে প্রবেশ না করে যেখানে কুকুর রয়েছে, তাহলে যেসব মর্মার্থ ফিরিশতারা পছন্দ করে সেগুলো এমন অন্তরে প্রবেশ করবে না যেগুলোতে নিন্দিত কুকুরের চরিত্র রয়েছে। আর ফিরিশতারাও তাদের কাছে আসে না। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, আস-সাব'ঈনিয়্যাহ, (বুগইয়াতুল মুরতাদ) পৃ. ২১৬; ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/৫৫১); শারহু হাদীসিন নুযুল; জামে'উল মাসায়িল (৪/৬৫)।
ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এ ধরনের তাফসীর সম্পর্কে বলেন, এর মধ্যকার যে কথাগুলো স্বয়ং বিশুদ্ধ ও যথাযথ, কিন্তু সেগুলোর পক্ষে যদি কেউ কুরআন ও সুন্নাহ'র এমন সব শব্দ দিয়ে প্রমাণ নেয়ার চেষ্টা করে যা আসলেই বাহ্যিকভাবে তা বুঝায় না, সেগুলোকেই বলা হয় 'ইশারাত' (ইঙ্গিতপূর্ণ) বা 'হাক্বায়িকুত তাফসীর' (হাক্বীক্বতের তাফসীর)। ইমাম আবু আব্দুর রহমান আস- সুলামী এ অধ্যায়ে অনেক বেশি লিখেছেন। অনেকের কাছে এ বিষয়টি সন্দেহপূর্ণ মনে হতে পারে; কেননা এর অর্থ ও মর্মটি বিশুদ্ধ; এর ওপর কুরআন ও সহীহ হাদীসের প্রমাণ রয়েছে, কিন্তু সমস্যা হচ্ছে যে আয়াতের ক্ষেত্রে এরা যা বলছে এ আয়াত থাকে তা কীভাবে গ্রহণ করা হবে? বস্তুত এ সমস্ত তাফসীর দু' প্রকার: প্রথম প্রকার: যদি বলা হয় এ অর্থগুলো এ শব্দ দ্বারা উদ্দেশ্য, তবে নিঃসন্দেহে তা আল্লাহর ওপর মিথ্যা অপবাদ। যেমন কেউ বলল, 'তাযবাহু বাক্বারাহ' [সূরা আল-বাক্বারাহ: ৬৭] অর্থ আত্মাকে নিঃশেষ করে দাও, 'ইযহাব ইলা ফির'আউন' [সূরা ত্বা-হা: ২৪] অর্থ 'কলব বা হৃদয়। 'ওয়াল্লাযীনা মা'আহু' অর্থ আবু বকর, 'আশিদ্দাউ আলাল কুফফার' অর্থ উমার, 'রুহামাউ বাইনাহুম' অর্থ উসমান, 'তারাহুম রুক্কা'আন সুজ্জাদান' এর অর্থ আলী [সূরা আল-ফাতহ: ২৯] এ রকম অর্থ করে যদি বলে যে এগুলো আরবী শব্দ থেকে বুঝা যায় তবে সে আল্লাহর ওপর মিথ্যারোপ করলো, হয় ইচ্ছা করে নতুবা ভুল করে মিথ্যারোপ করলো।
দ্বিতীয় প্রকার: আর যদি এ অর্থগুলোকে শিক্ষা অর্জন ও কিয়াস আকারে গ্রহণ করে, শব্দের দাবি হিসেবে নয়, তবে এটি কিয়াস এর অন্তর্ভুক্ত। তখন ফকীহগণ যেটাকে 'কিয়াস' বলে থাকেন সেটাই তাফসীরবিদগণের নিকট 'ইশারা' বলে বিবেচিত হবে। আর এ ধরনের 'ইশারা' বা ইঙ্গিতপূর্ণ অর্থ শুদ্ধও হতে পারে আবার বাতিলও হতে পারে, যেমনিভাবে কিয়াস কখনও শুদ্ধ হয় আবার কখনও তা বাতিল হয়। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (১৩/২৪০)। ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রাহিমাহুল্লাহ যখন 'ফিরিশতারা প্রবেশ করে না...' এ হাদীস আলোচনা করলেন তখন বললেন, 'যদি কুকুর ও ছবি ফিরিশতাদেরকে ঘরে প্রবেশ করতে বাঁধা প্রদান করে, তাহলে রব্ব এর মা'রিফাত এমন অন্তরে কীভাবে প্রবেশ করবে যা প্রবৃত্তির কুকুর ও প্রবৃত্তির ছবিতে পূর্ণ হয়ে আছে?... এ জাতীয় 'ইশারা' বা ইঙ্গিতপূর্ণ ব্যাখ্যা বিশুদ্ধ। এগুলো ফকীহগণের কিয়াসের মতোই। বরং ফকীহগণের অনেক কিয়াসের চেয়েও তা বেশি বিশুদ্ধ। দেখুন, ইবনুল কাইয়্যেম, আল-কালামু আলা মাসআলাতি সামা' পৃ. ৩৯৭-৩৯৮ সংক্ষিপ্তাকারে। আলেমগণ এ ধরনের ইশারী তাফসীর ও ইশারী ব্যাখ্যা নিয়ে দু'টি মতে বিভক্ত। বিশুদ্ধ কথা হচ্ছে উপরে ইবন তাইমিয়্যাহ ও ইবনুল কাইয়েম রাহিমাহুমাল্লাহ থেকে ইতোপূর্বে যা আমরা উল্লেখ করেছি তাই। সূফীদের তাফসীরে ইশারী বিষয়ে বিস্তারিত দেখা যেতে পারে, ড. মুহাম্মাদ হুসাইন আয-যাহাবী, আত-তাফসীর ওয়াল মুফাসসিরূন (২/৩৮১); ড. খালেদ আব্দুর রহমান আল-'আক্ক, উসুলুত তাফসীর ওয়া ক্বাওয়া'য়িদুস্থ, পৃ. ২০৫; ড. জ্বাহের মুহাম্মাদ ইয়া'কুব, আসবাবুল খাত্বা ফিত তাফসীর (২/৭৪০)।
৬৩৬. এর দ্বারা তার উদ্দেশ্য আল্লাহর সর্বোচ্চ ও সর্বোজ্জ্বল সত্তা হওয়ার কথা বলা।
৬৩৭. আল্লাহ তা'আলার সকল গুণকে 'কাদীম' বলা সঠিক নয়। কারণ তাঁর কর্মগত গুণগুলো তিনি তাঁর ইচ্ছা অনুসারে যখন ইচ্ছা তখন তিনি করেন। তবে কর্মের মূল সূত্র 'কাদীম' কিন্তু সেটার একক কোনো কাজ নতুন করে সংঘটিত হয়। যেমনটি শাইখ আব্দুর রহমান আস-সা'দী বলেন, 'কর্মগত গুণগুলোর আসল অবশ্যই 'ক্বাদীম' যা সর্বদা ছিল ও সর্বদা থাকবে। আর তার একক কোনো অংশ সর্বদা নতুনভাবে সংঘটিত হবে তাঁর ইচ্ছা অনুসারে'। [আজওয়িবাতুস সা'দিয়্যাহ, পৃ. ১৩৯]
৬৩৮. আল্লাহর সত্তাগত গুণের ব্যাপারে এটি সঠিক কথা। কিন্তু আল্লাহর কর্মগত পছন্দ করা গুণের ব্যাপারে এটি যথাযথ নয়। কারণ আল্লাহর কর্মগত পছন্দ করা গুণগুলো তিনি যখন ইচ্ছা তখন করবেন এটাই হচ্ছে তাঁর পূর্ণতার ওপর প্রমাণ। বস্তুত আল্লাহর কর্মের ব্যাপারে মানুষ তিনভাগে বিভক্ত: ১- জাহমিয়্যাহ, মু'তাযিলা ও তাদের অনুসারীদের মতে, আল্লাহর কোনো গুণই নেই, সবই আল্লাহ থেকে আলাদা কর্ম বা সৃষ্টি। ২- কুল্লাবিয়্যাহ সম্প্রদায় দু'টি নীতিতে বিশ্বাসী। হয় এসব কর্ম আল্লাহর সত্তার সাথেই সম্পৃক্ত আর সত্তার মতোই 'ক্বাদীম' (সত্তাগত গুণ)। অথবা এগুলো আল্লাহ থেকে আলাদা কর্ম, তাঁর সত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট নয় (সৃষ্টি)। ৩- অধিকাংশ আসহাবুল হাদীস ও আহলে কালামদের একটি গোষ্ঠীর মত হচ্ছে, আল্লাহর সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড তিন প্রকার: এক, যা সত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট, (সত্তাগত গুণ) দুই. যা সত্তা থেকে আলাদা কর্ম (সৃষ্টি) তিন, আরেকটি প্রকার রয়েছে যা উপরের দু' শ্রেণির লোক উল্লেখ করেনি, তা হচ্ছে, আল্লাহর সত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট এমন কিছু কর্ম যা তিনি যখন ইচ্ছা তখন ঘটিয়ে থাকেন। আর সেগুলো ভিন্ন সত্তায় পরিণত হয়নি। যেমন আরশের উপরে উঠা, নিকটতম আসমানে অবতরণ, সন্তুষ্ট হওয়া, রাগ করা ইত্যাদি। এরা আবার দু'ভাগে বিভক্ত: ক. যারা এ তৃতীয় প্রকার কর্মটিকে সম্পূর্ণ নতুন বা 'হাদেস' বলে থাকে; তারা হচ্ছে কাররামিয়্যাহ সম্প্রদায়। খ. যারা এ তৃতীয় প্রকার কর্মটিকে মৌলিকভাবে (তিনি আল্লাহ সবকিছু করতে সক্ষম এ হিসেবে) 'ক্বাদীম' তবে এর এককটি অনুষ্ঠিত হওয়ার দিক থেকে হাদেস। তারা মৌলিকভাবে 'হাদেস' হওয়া ও বিশেষ একক 'হাদেস' হওয়ার মধ্যে পার্থক্য করে থাকেন। আর তাই হচ্ছে অধিকাংশ আসহাবুল হাদীস ও তাদের অনুসারীগণের মত। তারা বলেন, কোনো জিনিসের প্রকার অবশিষ্ট থাকা ও নির্দিষ্ট একক অবশিষ্ট থাকা এক কথা নয়। তারা উদাহরণ দিয়ে বলে থাকেন, জান্নাতের নি'আমতগুলোর প্রকার-প্রকরণ কখনও নিঃশেষ হবে না, কিন্তু তা থেকে যা একবার খাওয়া হবে সে একক তো আর অবশিষ্ট থাকবে না। অপরদিকে সব 'হাদেস' নিঃশেষ হয়ে যাবে এমন নয়। নির্দিষ্ট কোনো হাদেসও অবশিষ্ট থাকে, যেমন মানুষের রূহ; তা অবশ্যই 'হাদেস', আগে ছিল না, পরে অস্তিত্বে এসেছে। কিন্তু সেগুলো অবশিষ্ট থাকবে (সুতরাং 'হাদেস' হলেই সেটা ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে সেটা সঠিক নয়)। দেখুন, দারউত তা'আরুদ্ব (২/১৪৭-১৪৮)।
৬৩৯. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আল্লাহর (সিফাতে ইখতিয়ারিয়্যাহ) পছন্দনীয় কর্মগত গুণগুলো যখন অস্তিত্বে আসে তখন সেটি আল্লাহর পূর্ণগুণের অর্থজ্ঞাপক হয়। সেগুলো অস্তিত্বে আসার আগে সে পূর্ণতার অর্থ প্রদান করতো না। যেমন আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক মূসা 'আলাইহিস সালামের সাথে কথা বলা, তাকে ডাকা। এখানে যখন আল্লাহ তা'আলা নবী মূসাকে ডেকেছেন তখন সেটি পূর্ণ গুণের অর্থজ্ঞাপক হয়েছে। যদি মূসা 'আলাইহিস সালাম সেখানে আসার আগে তাকে ডাকতেন তবে সেটা অপূর্ণ বলে বিবেচিত হতো। সুতরাং আল্লাহর গুণ যখন যেটা তিনি অস্তিত্বে আনয়ন করেন তখন সেটা পূর্ণতার ওপর প্রমাণবহ থাকে। অস্তিত্বে আসার আগে সেটি পূর্ণতা জ্ঞাপক নয়। বরং যে সময় অস্তিত্বে আসা তার হিকমত ও প্রজ্ঞার চাহিদা বলে বিবেচিত হয় সেসময়ের আগে তা অস্তিত্বে আসা অপূর্ণতার ওপরই প্রমাণবহ। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৬/২৪১)।
৬৪০. অর্থাৎ এ গুণগুলো দ্বারা তিনি সর্বদা গুণান্বিত ছিলেন, আযালী কাল থেকেই। কখনও তিনি এগুলো থেকে মুক্ত ছিলেন না। এজন্যই ইবন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা আল্লাহর বাণী, "আল্লাহ হলেন ক্ষমাশীল ও দয়ার্দ্র", অনুরূপ আল্লাহর বাণী, "আর আল্লাহ হলেন সর্বজ্ঞ ও সর্ববিজ্ঞ", এবং অনুরূপ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলতেন, তিনি সর্বদা এগুলো দ্বারা গুণান্বিত ছিলেন, এখনো আছেন এবং সর্বদা থাকবেন। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া ৫/৫৩৮-৫৩৯, ৫৫২-৫৫৩।
৬৪১. বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। সত্য হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপর উঠেছেন, পূর্বে তিনি 'আরশের উপর ছিলেন না। যেমনটি 'তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠলেন' [সূরা আল-আ'রাফ, ৫৪ সূরা ইউনুস: ৩; সূরা আর-রা'দ: ২; সূরা ত্বা-হা: ০৫; সূরা আল-ফুরক্বান: ৫৯; সূরা আস-সাজদাহ: ০৪; সূরা আল-হাদীদ: ০৪] এ আয়াতের বাহ্যিক অর্থের দ্বারা সাব্যস্ত হচ্ছে। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৬/১৫০)। সুতরাং ইমাম 'আমর ইবন উসমান আল-মক্কীর উপরোক্ত বক্তব্য থেকে হয়ত কারো মনে হতে পারে যে, তিনি আল্লাহর 'আরশের উপর উঠাকে সত্তাগত গুণ বলেছেন। আসলে কিন্তু তা নয়, বস্তুত তা কর্মগত গুণ। ইস্তেওয়া বা 'আরশের উপর উঠা তাঁর একটি গুণ, যা তিনি তাঁর ইচ্ছা ও ক্ষমতায় করেছেন। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/২১৬, ৫২৩, ৪১০)। ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, 'যারা 'ইস্তেওয়া'কে আল্লাহর সত্তাগত গুণ বলেন তারা এ তা'ওয়ীল করে থাকে যে, তিনি 'আরশের উপর ক্ষমতাবান হলেন। বস্তুত এটা শুদ্ধ নয়; কারণ যেহেতু ক্ষমতা তার পূর্বেই ছিল, সর্বদাই তিনি সম্মানের দিক থেকে উপরে ছিলেন; সুতরাং বুঝা গেল যে, যারা এ গুণটিকে সত্তাগত গুণ বলেছেন তাদের বক্তব্য অতিশয় দুর্বল; কারণ: ১- আল্লাহ বলেছেন, 'তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠলেন'। আর 'তারপর' অর্থই হচ্ছে তা পরে করেছেন। ২- আল্লাহ তা'আলা এর আগে বলেছেন, সৃষ্টি করেছেন.... উপরে উঠেছেন। সুতরাং একটি ক্রিয়ার উপর আরেকটি ক্রিয়ার 'আত্বফ' বা সংযুক্তি স্থাপন করেছেন। যাতে বুঝা যায় তা কর্মই ছিল যেমনটি সৃষ্টি একটি কর্ম। অর্থাৎ সৃষ্টি করেছেন তারপর উঠেছেন। [মাজমূ' ফাতাওয়া (১৬/৩৯৫)] এখানে অবশ্য 'আমর ইবন উসমান আল-মাক্কীর কথার আরেকটি অর্থ করা যায়, তা হচ্ছে, তিনি আল্লাহ 'আরশের উপর উঠা' এটা না করেও পরিপূর্ণ ছিলেন, এটা করে পূর্ণ হয়েছেন এমন নয়, তাহলে সে অর্থ শুদ্ধ হবে।
৬৪২. এর দ্বারা 'আমর ইবন উসমান আল-মাক্কীর উদ্দেশ্য যদি এটা হয় যে আল্লাহ তা'আলা আযাল বা পূর্ব থেকেই পূর্ণতার গুণে গুণান্বিত তাহলে সেটা বিশুদ্ধ অর্থ। কিন্তু যদি এটা মনে করে থাকেন যে মহান আল্লাহর কর্মকাণ্ড নতুন করে হয় না, তাহলে তার কথা অগ্রহণযোগ্য।
৬৪৩. এটিও সঠিক নয়। কারণ কর্ম যখন কর্তা ইচ্ছা করেন তখনই হয়। কর্তা ইচ্ছা করার আগেই কর্ম হয়ে আছে এমন কথা বলা ঠিক নয়। সম্ভবত 'আমর ইবন উসমান আল-মাক্কী রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহর কর্মগত সিফাতকেও প্রাচীন মনে করতেন।
৬৪৪. অর্থাৎ আল্লাহ বাণীতে যেখানে আল্লাহ বলেছেন, “অতঃপর যখন মূসা আগুনের কাছে পৌঁছলেন তখন উপত্যকার ডান পাশে বরকতময় ভূমির উপর অবস্থিত সুনির্দিষ্ট গাছের দিক থেকে তাকে ডেকে বলা হল, 'হে মূসা! আমিই আল্লাহ, সৃষ্টিকুলের রব্ব।” [সূরা আল-কাসাস: ৩০] এর মাধ্যমে জাহমিয়্যাহ ও পরবর্তী মু'তাযিলাদের বক্তব্যের খণ্ডন রয়েছে, যারা বলে থাকে যে উপরোক্ত বাণী গাছ থেকেই এসেছে, আল্লাহ থেকে নয়। কেননা তারা আল্লাহর বান্দাকে সৃষ্ট বলে থাকে, গুণ বলে না। তাদের কথার দাবি হচ্ছে গাছই বলেছে, "হে মূসা নিশ্চয় আমিই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন"! দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (১৬/১৫৩); ইবন আবিল ইয্য, শারহুত ত্বাহাওয়িয়্যাহ (১/১৮২); ইবনুল কাইয়্যেম, নূনিয়্যাহ, হাররাসের ব্যাখ্যাসহ (১/১১৪-১১৫)।
৬৪৫. বক্তব্যটি বিবিধ অর্থের সম্ভাবনাময়। তবে বিশুদ্ধ কথা হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের মাঠে আসবেন, আগমনকারী না থাকার পরে। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (১৬/১৫১)। যেমনটি ইবন তাইমিয়্যাহ'র বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ গ্রন্থে এসেছে, 'তিনি আগমনকারী হবেন, আগমনকারী না থাকার পরে। তবে এ অর্থটি (যা উপরে বর্ণিত হয়েছে এবং যা বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ গ্রন্থে এসেছে) বর্তমান ফাতওয়া আল-হামাউইয়্যাহ এর সকল ছাপা ও ইমাম যাহাবীর আল-'উলু লিল 'আলিয়্যিল 'আযীম গ্রন্থে যা এসেছে তার বিপরীত। সেখানে এসেছে, 'তিনি আগমনকারী হবেন, আগমনকারী হওয়ার আগেই'। [শাইখ, ড. আব্দুল আযীয আলে আব্দুল লতীফ, আত-তা'লীক আলাল ফাতাওয়া আল-হামওয়িয়্যাহ আল-কুবরা, পৃ. ১৭১] অবশ্য কেউ কেউ বুঝেছেন যে, তিনি (আমর ইবন উসমান আল-মাক্কী) এখানে আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক হাশরের মাঠে আগমনের জন্য 'জাআ' বা অতীতকালের ক্রিয়া ব্যবহারের কারণ বর্ণনা করছেন। [সূরা আল-ফাজর: ২২] আর তা হচ্ছে তিনি আগমনকারী গুণে গুণান্বিত হবেন যেভাবে তাঁর জন্য উপযোগী সে রকম করে, যদিও সে কর্মটি এখনও ঘটেনি, কারণ তা ঘটা অবশ্যম্ভাবী। যেমনটি আল্লাহ তা'আলা কুরআনের অন্যত্রও বলেছেন, 'আল্লাহ নির্দেশ এসে গেছে সুতরাং তোমরা সেটাকে নিয়ে তাড়াতাড়ি করো না' [সূরা আন-নাহল: ০১] এখানেও কাফেরদের শাস্তি আসার বিষয়টি অবশ্যম্ভাবী হওয়ায় অতীত কালের ক্রিয়া 'আতা' ব্যবহার করা হয়েছে। আবার কেউ কেউ বুঝেছেন, মহান আল্লাহ যেভাবে ক্ষমা করার আগেও ক্ষমা করার গুণে গুণান্বিত, দয়া করার আগেও দয়া করার গুণে গুণান্বিত সে হিসেবে আল্লাহ তা'আলা হাশরের মাঠে আসার আগেই 'আগমনকারী' গুণটি তাঁর জন্য ব্যবহার করা যাবে, কারণ তা ঘটা অবশ্যম্ভাবী। [আল- ফাতাওয়া আল-হামাওয়িয়্যাহ'র ওপর হামাদ আত-তুয়াইজরীর ব্যাখ্যা, পৃ. ৩৮৩]
৬৪৬. এর মাধ্যমে আশায়েরাদের অপব্যাখ্যাকে খণ্ডন করা হয়েছে। কারণ তাদের কেউ কেউ বলে থাকে যে, হাশরের মাঠে আল্লাহর আসার অর্থ তাঁর নির্দেশ আসা। তাছাড়া তাঁর নির্দেশ তো সর্বদাই আসছে তাহলে কিয়ামতের দিন সেটাকে আলাদা করে বর্ণনা করার কী প্রয়োজন? তদ্রূপ যদি তোমরা এভাবে শব্দ উহ্য ধরে নিয়ে অর্থ করে যাও তাহলে তোমরা যে সাতটি গুণ সাব্যস্ত করেছ সেখানেও উহ্য ধরা যাবে। যদি সেখানে ধরতে তোমরা রাযী না হও তাহলে অন্যত্রও এভাবে শব্দ উহ্য ধরতে পার না। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (১৬/৪১৯)।
৬৪৭. যেমন কুরআনে কারীমে এসেছে, "সেদিন কিছু মুখ উজ্জল হবে এবং কিছু মুখ কালো হবে; যাদের মুখ কালো হবে (তাদেরকে বলা হবে), 'তোমরা কি ঈমান আনার পর কুফরী করেছিলে? সুতরাং তোমরা শাস্তি ভোগ কর, যেহেতু তোমরা কুফরী করতে'।" [সূরা আলে ইমরান: ১০৬] আরও এসেছে, "সেদিন কোনো কোনো মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে।" [সূরা আল-কিয়ামাহ: ২২] আরও এসেছে, "পরিণামে আল্লাহ তাদেরকে রক্ষা করবেন সে দিনের অনিষ্ট হতে এবং তাদেরকে প্রদান করবেন হাস্যোজ্জ্বলতা ও উৎফুল্লতা।" [সূরা আল-ইনসান: ১১] আরও এসেছে, "আপনি তাদের মুখমণ্ডলে স্বাচ্ছন্দ্যের দীপ্তি দেখতে পাবেন।" [সূরা আল-মুত্বাফফিফীন: ২৪]
৬৪৮. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এটা স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন যে, নবীদের নবুওয়াতের ওপর প্রমাণাদিকে কুরআনে কারীমে তিনটি নামে অভিহিত করা হয়েছে: ১- আয়াত বা নিদর্শনাবলি। ২- বারাহীন বা প্রমাণাদি। ৩- বাইয়্যেনাত বা স্পষ্টকারী দলীল। দেখুন, আন-নাবুওয়াত (২/৮২৮-৮২৯)।
৬৪৯. যেমন আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় যমীন ও তার উপর যারা আছে তাদের চূড়ান্ত মালিকানা আমাদেরই থাকবে এবং আমাদেরই কাছে তারা প্রত্যাবর্তিত হবে।” [সূরা মারইয়াম: ৪০] অন্যত্র বলেন, "আর আমরা বহু জনপদকে ধ্বংস করেছি যার বাসিন্দারা নিজেদের ভোগ-সম্পদের অহংকার করত! এগুলোই তো তাদের ঘরবাড়ী; তাদের পর এগুলোতে লোকজন সামান্যই বসবাস করেছে। আর আমরাই তো চুড়ান্ত ওয়ারিশ (প্রকৃত মালিক)!" [সূরা আল-ক্বাসাস: ৫৮] অন্যত্র বলেন, "আর আমরাই জীবন দান করি ও মৃত্যু ঘটাই এবং আমরাই চুড়ান্ত মালিকানার অধিকারী।" [সূরা আল- হিজর: ২৩] এসব আয়াতে ওয়ারিস হওয়ার অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা সকল সৃষ্টির ওপর ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন হওয়া লিখে দিয়েছেন, মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা ব্যতীত কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। সুতরাং তিনিই সকল সৃষ্টির একমাত্র ওয়ারিস। এ অবস্থায় যেন তিনিই যমীনের বুকে যারা আছে তাদের সবার ওয়ারিস হলেন।
৬৫০. এখানেও দেখা যাচ্ছে, তিনি আশা'য়েরা ও মাতুরিদিয়াদের মত খণ্ডন করেছেন। কারণ আমরা জানি যে, আশা'য়েরা ও মাতুরিদিয়ারা 'ইয়াদ' এর অর্থ হাত না করে 'নি'আমত' করে থাকে।
৬৫১. সম্ভবত এখানে নির্দেশ দ্বারা বুঝিয়েছেন সূরা বনী ইসরাঈলের ৮৫ নং আয়াতের কথা বলেছেন। যেখানে রূহকে আল্লাহর নির্দেশের একটি বলা হয়েছে। কিন্তু সে রূহকে অনেকেই মানুষের রূহ বললেও সকলে এ ব্যাপারে একমত নয়। তবে একটি কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, এখানে 'আমর' বা নির্দেশ বলে 'মা'মুর' বা 'নির্দেশদ্বারা সৃষ্ট' এটা বুঝানো হয়েছে। কারণ আল্লাহর 'আমর' তার বাণী। আর তার বাণী দ্বারা সৃষ্ট জিনিসই রূহ। 'আমর' বা নির্দেশ তো বাণী, যা কখনো সৃষ্ট নয়। আর রূহ অবশ্যই সৃষ্ট জিনিস। বিষয়টি অন্য জায়গাতেও প্রযোজ্য। আর রূহ তাঁর সিফাতও নয়।
৬৫২. 'লেগে যাওয়া' কথাটি অতিরিক্ত। তিনি যদি তা না বলতেন তবে অনেক ভালো হতো। কারণ এ শব্দটি কুরআন ও হাদীসের ভাষ্য দ্বারা সাব্যস্ত হয়নি আবার নিষেধও করা হয়নি। বরং এভাবে 'লেগে যাওয়া থেকে পবিত্র' কথাটি বিশুদ্ধ না হওয়াই বেশি যৌক্তিক। কারণ আল্লাহ তা'আলা নিজ হাতে জান্নাতু আদনের গাছ লাগিয়েছেন, আদমকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন, নিজ হাতে তাওরাত লিখেছেন ইত্যাদি দ্বারা বুঝা যায় সৃষ্টির সাথে লেগে যাওয়া দোষণীয় নয়। তাছাড়া তিনি 'আরশের উপর সত্তাগতভাবে থাকা দ্বারা প্রকাশ্যভাবে সেটার উপরে থাকাকে অস্বীকার করে না। যা থেকে বুঝা গেল যে এ শেষোক্ত বাক্য 'লেগে থাকা থেকে পবিত্র' এটা বলা যাবে না। বরং এখানে চুপ থাকা আবশ্যক। তাই এটি সাব্যস্ত কিংবা অসাব্যস্ত কিছুই করা যাবে না। [সালেহ আব্দুল আযীয আলে আশ-শাইখ, শারহুল হামাওয়িয়্যাহ, পৃ. ৭৫]
৬৫৩. অর্থাৎ আল্লাহ ও তাঁর কোনো গুণ সৃষ্টির কারও অভ্যন্তরে প্রবেশ করা, কোনো শরীরে মিশে যাওয়া, কারও সাথে লেগে যাওয়া থেকে পবিত্র। আদম সৃষ্টির পরে যে ফুঁক ও নির্দেশ দানের মাধ্যমে তাতে রূহের সঞ্চার করেছেন তা অবশ্যই সৃষ্ট। মহান আল্লাহর কোনো অংশ সৃষ্টির অভ্যন্তরে থাকার কথা ঈমানদার কখনো বলতে পারে না।
৬৫৪. আল্লাহ 'আমর ইবন উসমান' রাহিমাহুল্লাহকে ক্ষমা করুন, তিনি সম্ভবত সূরা 'ক্বাফ' এর ১৬ নং আয়াতের মাধ্যমে দলীল নিয়ে ‘ঘাঁড়ের রগের নিকটবর্তী’ বলে আল্লাহ তা'আলাকে বুঝাতে চেয়েছেন। অথচ আমরা ইতোপূর্বে জেনেছি যে, আল্লাহর নৈকট্য কেবল বিশেষ লোকদের জন্য হয়, আর তা হয় সাড়া দেয়া ও সাওয়াব দেয়া এ দু'টির জন্য। এভাবে সর্বসাধারণের ব্যাপারে আসা ‘কুরব’ দ্বারা আল্লাহকে বুঝানো হয়নি, আল্লাহর বাহিনী ফিরিশতাদেরকে বুঝানো হয়েছে। এ ব্যাপারে তাফসীরে ইবনে কাসীর দেখা যেতে পারে। তাছাড়া এটিই শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ বিভিন্ন গ্রন্থে সাব্যস্ত করেছেন।
৬৫৫. আল্লাহ 'আমর ইবন উসমান' রাহিমাহুল্লাহকে ক্ষমা করুন। আমরা আগেই জেনেছি যে, আল্লাহ তা'আলাকে দূরবর্তী গুণে গুণান্বিত করা যাবে না। এ গুণটি আল্লাহর জন্য কুরআন ও হাদীসে সাব্যস্ত হয়নি।
৬৫৬. 'আমর ইবন উসমান আল-মাক্কী রাহিমাহুল্লাহ'র এ বক্তব্য যে গ্রন্থ থেকে শাইখুল ইসলাম নিয়েছেন তা বর্তমানে হারিয়ে গেছে। তবে অন্য যেসব কিতাবে তা এসেছে তন্মধ্যে রয়েছে: ১- আবু নু'আইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া (১০/২৯১-২৯২)। ২- খতীব বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ (১/২২৩-২৩৪)। ৩- সুলামী, ত্বাবাক্বাতুস সূফিয়্যাহ, পৃ. ২০২। ৪- যাহাবী, আল-'উলু লিল 'আলিয়ি্যল 'আযীম, পৃ. ১৫৫। ৫- মুখতাসারুল উলু, ২২৯-২৩০। ৬- ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুয়ুশ, পৃ. ২৭৪। ৭- ইবনুল 'ইমাদ, শাযরাতুয যাহাব (২/২২৬)। ৮- মানাওয়ী, আল-কাওয়াকিবুদ দুররিয়্যাহ ফী তারাজিমিস সাদাতিস সূফিয়্যাহ, পৃ. ২৫৯। ৯- শা'রানী, আত-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা (১/৯৮)। তবে অনেকে সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন। আবার কেউ কেউ বিস্তারিত নিয়ে এসেছেন।
['আমর ইবন উসমান আল-মাক্বীর বক্তব্য] অনুরূপভাবে 'আমর ইবন উসমান আল-মাক্কী তার "আত-তা'আররুফ বি আহওয়ালিল 'ইবাদি ওয়াল মুতা'আব্বেদীন” নামক গ্রন্থে বলেন, অধ্যায়: “তাওবাকারীদের জন্য শয়তান যা নিয়ে আসে।” তিনি উল্লেখ করেন যে, সে তাদেরকে কঠিন নৈরাশ্যের মধ্যে নিপতিত করে, অতঃপর ধোঁকা ও দীর্ঘ আশার মধ্যে, অতঃপর তাওহীদের মধ্যে । অতঃপর তিনি বলেন, শয়তান সবচেয়ে বড় যে প্রবঞ্চনা দেয় তা হচ্ছে, তাওহীদের মধ্যে সন্দেহে নিপতিত করার মাধ্যমে অথবা আল্লাহর সিফাতের মধ্যে সেগুলোকে তুলনা করার মাধ্যমে, সাদৃশ্য দানের মাধ্যমে বা সেগুলোকে অস্বীকার ও নিষ্ক্রিয়করণের মাধ্যমে।
অতঃপর তিনি ('আমর ইবন উসমান আল-মাক্কী) ওয়াসওয়াসার হাদীস উল্লেখ করে বলেন, জেনে রেখ! (আল্লাহ তোমাকে দয়া করুন) যা কিছু তোমার হৃদয়ে ধারণা সৃষ্টি করে বা তোমার চিন্তার স্থলে উদিত হয় অথবা তোমার অন্তরে পেশ হওয়ার জায়গায় কল্পনায় আসে, যেমন- সৌন্দর্য, উজ্জ্বলতা, চাকচিক্য, শোভা অথবা দৃশ্যমান কোনো ছায়া, বা শরীর হিসেবে ফুটে উঠা কোনো কায়া, সে সবকিছু থেকে আল্লাহ অবশ্যই ভিন্ন। বরং তিনি অনেক মহান, অনেক শ্রেষ্ঠ ও বড়। তুমি কি শোন না যে, তিনি বলেছেন: لَيْسَ كَيْثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ) [الشورى: ١١ "তাঁর মতো কিছুই নেই। তিনি সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা।” [সূরা আশ-শূরা: ১১] এবং وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ ) [الاخلاص: ٤ “তাঁর সমতুল্য কেউই নেই।” [সূরা আল-ইখলাস: ০৪] অর্থাৎ নেই কোনো সদৃশ, তুলনার যোগ্য, সমকক্ষ ও উদাহরণ। তুমি কি জানো না যে, তিনি যখন পাহাড়ের প্রতি নিজেকে উদ্ভাসিত করলেন, তখন পাহাড় তাঁর ভয়ের প্রচণ্ডতায় ও সুউচ্চ ক্ষমতায় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। কাজেই যেমন তিনি কোনো কিছুতে উদ্ভাসিত হলে তা চূর্ণ হয়ে যায়। তেমনি কেউ তাঁর সম্পর্কে ধারণা করে কিছু নির্ধারণ করলে ধ্বংস হয়ে যাবে।
সুতরাং আল্লাহ তাঁর কিতাবে নিজেই নিজের ব্যাপারে তাঁর মত আর কেউ নেই বলে যা বর্ণনা দিয়েছেন তা দিয়ে তুমি সাদৃশ্য প্রদান, তুলনাদান, উপমা পেশ, সমকক্ষ নির্ধারণ করা প্রতিহত কর।
অতঃপর যদি তুমি এটি আঁকড়ে ধর এবং তা (সাদৃশ্য প্রদান, তুলনাদান, উপমা পেশ, সমকক্ষ নির্ধারণ করা) থেকে বিরত থাক, তাহলে দেখবে সে (শয়ত্বান) তোমার কাছে পবিত্র, মহান আল্লাহর কিতাবে ও তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে সাব্যস্তকৃত আল্লাহর গুণকে নিষ্ক্রীয়করণের জন্য এসে বলবে, তিনি যদি এসব গুণে গুণান্বিত হবেন, অথবা তুমি যদি তাকে এসব গুণে গুণান্বিত করো, তবে তো সাদৃশ্য প্রদান আবশ্যক হয়ে যায়। শয়তানের এ কুমন্ত্রণার জবাবে তাকে তুমি মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করো; কেননা সে তো অভিশপ্ত, সে তোমাকে পদস্খলন ঘটাতে চায়, তোমাকে পথভ্রষ্ট করে নাস্তিক বিভ্রান্ত সিফাত অস্বীকারকারীদের অন্তর্ভুক্ত করতে চায়।
অতঃপর জেনে রাখ! (মহান আল্লাহ তোমাকে রহম করুন) নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা এক সত্তা, অন্য একজনের মতো না, একক, অমুখাপেক্ষী, কাউকে জন্ম দেননি, তাকেও জন্ম দেয়া হয়নি, তার সমকক্ষ কেউ নেই। ...
শেষে তিনি ('আমর ইবন উসমান আল-মাক্কী) বলেন, "আল্লাহর জন্য উন্নত আলোকোজ্জ্বল নামসমূহ সাব্যস্ত রয়েছে, যেটা সৃষ্টির আদিতে বাস্তবে সত্যতার সাথেই তাঁর ছিল।
এমন কোনো গুণ তিনি উদ্ভব করেননি যা থেকে তিনি খালি ছিলেন, অথবা এমন নামেরও উদ্ভব করেননি যা থেকে তিনি মুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন হাদী, অচিরেই হিদায়াত করবেন। তিনি ছিলেন সৃষ্টিকর্তা, অচিরেই সৃষ্টি করবেন; তিনি ছিলেন রিযিকদাতা, অচিরেই রিযিক দান করবেন; তিনি ছিলেন ক্ষমাশীল, অচিরেই তিনি ক্ষমা করবেন; তিনি ছিলেন কর্তা, অচিরেই তিনি করবেন। তিনি তাঁর ইসতিওয়া সিফাতটিতে গুণান্বিত, এটা তিনি তখনও ঘটাননি। অবশ্যই তাঁর থেকে এ গুণটি হওয়া আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল যে অচিরেই তা হবে। তাঁর কর্মসমূহের মধ্যে তাঁকে এ (আরোহনকারী) নাম দেয়া হবে।
অনুরূপ আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا ﴾ [الفجر: ٢٢] "আর আপনার রব্ব আসবেন এবং ফেরেশতাগণও কাতারে কাতারে আসবেন।” [সূরা আল-ফাজর: ২২] এর অর্থ, নিশ্চয় অচিরেই তিনি আসবেন, তবে আসার দ্বারা 'আগমনকারী' নাম উদ্ভাবন করেননি। শুধু কর্মটি আসার সময় পর্যন্ত প্রলম্বিত। সুতরাং তিনি আগমন করেছেন তথা অচিরেই আগমন করবেন। তাঁর আসাটা এমনভাবে অস্তিত্বে রয়েছে যার সাথে কোনো স্বরূপ নির্ধারণ ও সাদৃশ্যদান যুক্ত নেই। কেননা সেটা রবুবিয়াত বা প্রভুত্বের কাজ; কাজেই মা'বুদের স্বরূপ উদঘাটনের মধ্যে প্রবেশের ইচ্ছা করলেই বুদ্ধি পেরেশান হবে, মন বিচ্ছিন্ন হবে। কাজেই তুমি দুদিকের একদিকেও যেও না। না নিষ্ক্রীয়কারী হও, আর না হও সাদৃশ্যপ্রদানকারী। আর আল্লাহর জন্য তাতেই সন্তুষ্ট থাকো যাতে তিনি নিজের জন্য সন্তুষ্ট হয়েছেন। আর তুমি তার নিজের ব্যাপারে তার সংবাদে অনুগত আত্মসমর্পণকারী বিশ্বাসী হয়ে থেমে যাও। সেখানে কোনো প্রকার ভিন্নতা আনার চেষ্টায় যাবে না, অনুরূপ গভীরে তালাশের চেষ্টায়ও রত হবে না। শেষে তিনি বলেন, "কাজেই মহান আল্লাহ তিনিই বলেছেন, “আমি আল্লাহ”, গাছ না। তিনিই আগন্তুক হওয়ার পূর্বেই আগমনকারী। তাঁর নির্দেশ নয়, তিনি স্বয়ং আসবেন আখেরাতে স্বীয় বন্ধুদের সামনে উদ্ভাসিত হয়ে , এতে তাদের চেহারা শুভ্রোজ্জ্বল হবে , অস্বীকারকারীদের দলীল-প্রমাণ তাতে ব্যর্থ হবে। মহান আল্লাহ সর্বস্থানের উপরে, তাঁর 'আরশের উপরে সমুন্নত, যাবতীয় মহৎ সম্মানের সাথে। যিনি মূসা 'আলাইহিস সালামের সাথে যথাযথভাবে কথা বলেছেন। তাকে তাঁর নিদর্শনাবলি দেখিয়েছেন। অতঃপর মূসা 'আলাইহিস সালাম আল্লাহর কালাম শুনেছিলেন; কারণ তিনি তাকে আলাপের মাধ্যমে নৈকট্য দান করেছিলেন। তাঁর কালাম বা বাণী সৃষ্ট হওয়া, উদ্ভাবিত হওয়া, লালিত- পালিত হওয়া থেকে পবিত্র। তিনি সৃষ্টিকুলের ওয়ারিশ , তাদের আওয়াজ শ্রবণকারী, স্বীয় চোখে তাদের দেহ অবলোকনকারী, তাঁর দুহাত বিস্তৃত, তাঁর হাত তাঁর নি'আমত নয়। আদমকে সৃষ্টি করে তার মধ্যে তার রূহ ফুঁকে দিয়েছেন, এটা তাঁর নির্দেশ । কোনো শরীরের মধ্যে অনুপ্রবেশ হওয়া, মিশে যাওয়া, তার সাথে লেগে যাওয়া থেকে অতি পবিত্র, অনেক ঊর্ধ্বে। তিনি ইচ্ছাকারী, তাঁর ইচ্ছা আছে। তিনি জ্ঞানী, তাঁর জ্ঞান আছে। স্বীয় দু' হাত রহমত নিয়ে বিস্তৃত। প্রতি রাতে নিকটবর্তী আসমানে অবতরণকারী, যাতে তাঁর বান্দারা ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য লাভ করতে পারে আর যাতে তারা তাঁর নৈক্যের ব্যাপারে আগ্রহী হয়। তিনি অতি নিকটবর্তী, তাঁর সে নৈকট্যের মাধ্যমে তিনি ঘাড়ের শিরার চেয়েও অধিক নিকটবর্তী, তিনি ঊর্ধ্বে থাকার মাধ্যমে সকল দূরবর্তী স্থান থেকে দূরবর্তী। তিনি মানুষের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নন।
অবশেষে তিনি বলেন: ﴿إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ وَالْعَمَلُ الصَّالِحُ يَرْفَعُهُ ﴾ [فاطر: ١০] “তাঁরই দিকে পবিত্র বাণীসমূহ উঠে যায়, আর সৎ আমল তিনি তো তা (তার দিকে) উঠিয়ে নেন।” [সূরা ফাতির: ১০] এবং
﴿أَمِنتُم مَّن فِي السَّمَاءِ أَن يَخْسِفَ بِكُمُ الْأَرْضَ فَإِذَا هِيَ تَمُورُ أَمْ أَمِنتُم مِّن فِي السَّمَاءِ أَن يُرْسِلَ عَلَيْكُمْ حَاصِبًا ﴾ [الملك: ١٦، ١٧]
"তোমরা কি এ থেকে নির্ভয় হয়েছ যে, যিনি আসমানের ওপর রয়েছেন তিনি তোমাদেরকে সহ যমীনকে ধ্বসিয়ে দিবেন, অতঃপর তা হঠাৎ করেই থরথর করে কাঁপতে থাকবে? অথবা তোমরা কি এ থেকে নির্ভয় হয়েছ যে, আসমানের উপর যিনি রয়েছেন তিনি তোমাদের উপর কংকরবর্ষী ঝঞ্ঝা পাঠাবেন?" [সূরা আল-মুলক: ১৬-১৭] তিনি যেমনিভাবে আসমানের উপর আছেন তেমনি তিনি যমীনে থাকার থেকে পবিত্র ও ঊর্ধ্বে।
টিকাঃ
৬২৮. তিনি হচ্ছেন, আবু আব্দুল্লাহ 'আমর ইবন উসমান ইবন কুরাব ইবন গুসাস, আল-মাক্কী। সূফীদের বড় শাইখ। তিনি হাদীস শুনেছেন ইউনুস ইবন আব্দিল আ'লা, রবী' ইবন সুলাইমান প্রমুখ থেকে। ফিকহের বড় আলেম। জুনাইদ এর সাথীত্ব বরণ করেছিলেন। বাগদাদে বসবাস করেছেন। তারপর সেখানেই হিজরী ২৯৭ সালে তার মৃত্যু হয়। তিনি বিভিন্ন প্রদেশে চিঠি লিখে হাল্লাজের ওপর লা'নত করেন এবং তার সম্পর্কে মানুষদেরকে সাবধান করেন। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ তার প্রশংসা করেন। আরও উল্লেখ করেন যে, তিনি তাসাওউফের শাইখদের মধ্যে বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন, যিনি সিফাত সাব্যস্ত করতেন আর জাহমিয়্যাহ ও হুলুলিয়্যাহ সম্প্রদায়ের কর্মকাণ্ড অস্বীকার করতেন। দেখুন, আবু নু'আইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া (১০/২৯১); যিকরু আখবারি আসবাহান (২/৩৩); খত্নীবে বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ (১৪/১৩৬), নং ৬৬২৬; ইবনুল মুলাক্কিন, ত্বাবাক্বাতুল আওলিয়া, পৃ. ৩৪৪; ইবনুল 'ইমাদ, শাযরাতুয যাহাব (২/২২৫); ইবন কাসীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (১১/১৩৫); ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউত তা'আরুদ্ব (৫/৪-৯), (৬/২২২৬)।
৬২৯. এ গ্রন্থটি বর্তমানে হারিয়ে যাওয়া গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। তবে যারাই 'আমর ইবন উসমান এর জীবনী লিখেছেন তারা সবাই উল্লেখ করেছেন যে, তাসাওউফে তার বেশ কিছু রচিত গ্রন্থ ছিল। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ 'আমর ইবন উসমান এর এ গ্রন্থ থেকে তার বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৫/৫৯-৬০) গ্রন্থে বেশ কিছু তথ্য এনেছেন, সেখানে তিনি এ গ্রন্থের নাম দিয়েছেন, আদাবুল মুরীদীন ওয়াত তা'আররুফ লি আহওয়ালিল উব্বাদ। অনুরূপ ইমাম যাহাবী তার আল-উলু গ্রন্থে (২/১২২৫), নং ৪৮৯ এ তথ্য বর্ণনা করেছেন। সেখানে তিনি গ্রন্থের নাম দিয়েছেন 'আদাবুল মুরীদীন।
৬৩০. অর্থাৎ তাদের জন্য যেসব ওয়াসওয়াসা বা কুমন্ত্রণা নিয়ে আসে তার বর্ণনা। দেখুন, বায়ানু ভালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৫/৬০)।
৬৩১. এ কথার ব্যাখ্যা করেছেন ইবন তাইমিয়্যাহ তার বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৫/৬০); ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুয়ুশ, পৃ. ২৭৪। তারা বলেন, "আর তৃতীয় দিক, যে দিক থেকে শয়তান মানুষের কাছে আসে, যখন তারা তার কথা মানতে অস্বীকার করে, আর তারা আল্লাহর নির্দেশকে আকঁড়ে ধরে, তখন শয়তান তাদের কাছে কুমন্ত্রণা নিয়ে আসে। সে তখন স্রষ্টার ব্যাপারেই তাদেরকে সন্দিহান করে তোলে, যাতে তাদের মাঝে তাওহীদের মূলনীতিই বিনষ্ট করতে পারে।"
৬৩২. বাস্তবে এ তিনটি অস্ত্র দিয়ে আজও শয়তান জাহমিয়্যাহ, মু'তাযিলা, আশায়েরা ও মাতুরিদিয়া সম্প্রদায়কে ঘায়েল করেছে। আজ পর্যন্ত তারা এ তিনটির মাঝে পড়ে আছে। আল্লাহর সিফাতকে অস্বীকার করার জন্য প্রথমে তামসীল বা তাশবীহ প্রদান করে তারপর সেটাকে তা'ত্বীল করে।
৬৩৩. ওয়াসওয়াসার হাদীস বলতে সম্ভবত বুঝাচ্ছেন যা সহীহ মুসলিমে আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে একদল লোক এসে জানতে চাইলেন, 'আমরা আমাদের অন্তরে এমনসব জিনিস পাই, আমাদের কেউ তা উচ্চারণ করাও বড় গুনাহের মনে করি'। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তোমরা কি তা পেয়েছ? তারা বললেন, হ্যাঁ। তখন রাসূল বললেন, 'এ হচ্ছে সুস্পষ্ট ঈমান'। [মুসলিম, আস-সহীহ (১/১১৯), হাদীস নং ১৩২; আবু দাউদ, আস-সুনান (৫/৩৩৬), হাদীস নং ৫১১১; ইবন আবী আসেম, আস-সুন্নাহ (১/২৯৫), হাদীস নং ৬৫৪; আবুল কাসেম আল-আসফাহানী, আল-হুজ্জাহ (২/২৮৫)]
৬৩৪. এখানে তিনি সূরা আল-আ'রাফের ১৪৩ নং আয়াতে মূসা 'আলাইহিস সালাম কর্তৃক আল্লাহকে দেখার আব্দার করার পরে আল্লাহ তা'আলা পাহাড়ে তাঁর উজ্জ্বল আলো ফেললে তাঁর কী অবস্থা হয়েছিল তাই তুলে ধরছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, "আর মূসা যখন আমাদের নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হলেন এবং তার রব তার সাথে কথা বললেন, তখন তিনি বললেন, 'হে আমার রব্ব! আমাকে দর্শন দান করুন, আমি আপনাকে দেখব'। তিনি বললেন, 'আপনি আমাকে দেখতে পাবেন না। আপনি বরং পাহাড়ের দিকেই তাকিয়ে দেখুন, সেটা যদি নিজের জায়গায় স্থির থাকে তবে আপনি আমাকে দেখতে পাবেন।' যখন তাঁর রব্ব পাহাড়ে জ্যোতি প্রকাশ করলেন তখন তা পাহাড়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করল এবং মূসা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লেন। যখন তিনি জ্ঞান ফিরে পেলেন তখন বললেন, 'মহিমাময় আপনি, আমি অনুতপ্ত হয়ে আপনার কাছে তাওবাহ করছি এবং মুমিনদের মধ্যে আমিই প্রথম'।” [সূরা আল-আ'রাফ: ১৪৩]
৬৩৫. অর্থাৎ আল্লাহকে দেখার আব্দার করার কারণে যেহেতু পাহাড়ে তাঁর উদ্ভাসন পড়লো পাহাড় চূর্ণ হয়ে গেল, সেহেতু যে কেউ আল্লাহকে দেখার জন্য অন্তরে আল্লাহর উদ্ভাসন কামনা করে সেখানে কোনো প্রকার (তাশবীহ) সাদৃশ্য, (তামসীল) উদাহরণ, (নাযীর) দৃষ্টান্ত, ও (মুসাওয়ী) সমপর্যায়ের কিছু আসবে তখন তার অন্তর চূর্ণ হয়ে যাবে।
এ ধরনের তাফসীরকে বলা হয় তাফসীরে ইশারী বা সূফীদের ইঙ্গিতপূর্ণ তাফসীর। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এগুলো অনেকটা ফকীহগণের কিয়াসের মতো। তা শুদ্ধও হতে পারে, আবার অশুদ্ধও হতে পারে। আবার তিনি স্পষ্ট করেও বলেছেন যে, এসবের অধিকাংশই তাফসীরের পর্যায়ে পড়ে না। বরং এগুলোকে শিক্ষা নেয়ার উপকরণ ও কিয়াসের মতো মনে করতে হবে। এগুলো জ্ঞানের একটি বিশুদ্ধ পদ্ধতিও হয়। যেমন, আল্লাহর বাণী, "যারা সম্পূর্ণ পবিত্র তারা ছাড়া অন্য কেউ তা স্পর্শ করে না।" [সূরা আল-ওয়াকি'আহ: ৭৯] এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী "ফেরেশতারা এমন ঘরে প্রবেশ করেন না যেখানে কুকুর থাকে”। [বুখারী, আল- জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ৩২২৫; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২১০৬] যদি কুরআনের কাগজ ধরতেই 'পবিত্ররা ব্যতীত কেউ তা স্পর্শ করতে না পারে' [সূরা আল-ওয়াকি'আহ: ৭৯] তাহলে সেসব কাগজে লিখা বাণীর মর্মার্থ পবিত্র অন্তরবিশিষ্ট ব্যক্তিরা ছাড়া অন্যরা কীভাবে প্রাপ্ত হবে? যদি ফিরিশতা এমন ঘরে প্রবেশ না করে যেখানে কুকুর রয়েছে, তাহলে যেসব মর্মার্থ ফিরিশতারা পছন্দ করে সেগুলো এমন অন্তরে প্রবেশ করবে না যেগুলোতে নিন্দিত কুকুরের চরিত্র রয়েছে। আর ফিরিশতারাও তাদের কাছে আসে না। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, আস-সাব'ঈনিয়্যাহ, (বুগইয়াতুল মুরতাদ) পৃ. ২১৬; ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/৫৫১); শারহু হাদীসিন নুযুল; জামে'উল মাসায়িল (৪/৬৫)।
ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এ ধরনের তাফসীর সম্পর্কে বলেন, এর মধ্যকার যে কথাগুলো স্বয়ং বিশুদ্ধ ও যথাযথ, কিন্তু সেগুলোর পক্ষে যদি কেউ কুরআন ও সুন্নাহ'র এমন সব শব্দ দিয়ে প্রমাণ নেয়ার চেষ্টা করে যা আসলেই বাহ্যিকভাবে তা বুঝায় না, সেগুলোকেই বলা হয় 'ইশারাত' (ইঙ্গিতপূর্ণ) বা 'হাক্বায়িকুত তাফসীর' (হাক্বীক্বতের তাফসীর)। ইমাম আবু আব্দুর রহমান আস- সুলামী এ অধ্যায়ে অনেক বেশি লিখেছেন। অনেকের কাছে এ বিষয়টি সন্দেহপূর্ণ মনে হতে পারে; কেননা এর অর্থ ও মর্মটি বিশুদ্ধ; এর ওপর কুরআন ও সহীহ হাদীসের প্রমাণ রয়েছে, কিন্তু সমস্যা হচ্ছে যে আয়াতের ক্ষেত্রে এরা যা বলছে এ আয়াত থাকে তা কীভাবে গ্রহণ করা হবে? বস্তুত এ সমস্ত তাফসীর দু' প্রকার: প্রথম প্রকার: যদি বলা হয় এ অর্থগুলো এ শব্দ দ্বারা উদ্দেশ্য, তবে নিঃসন্দেহে তা আল্লাহর ওপর মিথ্যা অপবাদ। যেমন কেউ বলল, 'তাযবাহু বাক্বারাহ' [সূরা আল-বাক্বারাহ: ৬৭] অর্থ আত্মাকে নিঃশেষ করে দাও, 'ইযহাব ইলা ফির'আউন' [সূরা ত্বা-হা: ২৪] অর্থ 'কলব বা হৃদয়। 'ওয়াল্লাযীনা মা'আহু' অর্থ আবু বকর, 'আশিদ্দাউ আলাল কুফফার' অর্থ উমার, 'রুহামাউ বাইনাহুম' অর্থ উসমান, 'তারাহুম রুক্কা'আন সুজ্জাদান' এর অর্থ আলী [সূরা আল-ফাতহ: ২৯] এ রকম অর্থ করে যদি বলে যে এগুলো আরবী শব্দ থেকে বুঝা যায় তবে সে আল্লাহর ওপর মিথ্যারোপ করলো, হয় ইচ্ছা করে নতুবা ভুল করে মিথ্যারোপ করলো।
দ্বিতীয় প্রকার: আর যদি এ অর্থগুলোকে শিক্ষা অর্জন ও কিয়াস আকারে গ্রহণ করে, শব্দের দাবি হিসেবে নয়, তবে এটি কিয়াস এর অন্তর্ভুক্ত। তখন ফকীহগণ যেটাকে 'কিয়াস' বলে থাকেন সেটাই তাফসীরবিদগণের নিকট 'ইশারা' বলে বিবেচিত হবে। আর এ ধরনের 'ইশারা' বা ইঙ্গিতপূর্ণ অর্থ শুদ্ধও হতে পারে আবার বাতিলও হতে পারে, যেমনিভাবে কিয়াস কখনও শুদ্ধ হয় আবার কখনও তা বাতিল হয়। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (১৩/২৪০)। ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রাহিমাহুল্লাহ যখন 'ফিরিশতারা প্রবেশ করে না...' এ হাদীস আলোচনা করলেন তখন বললেন, 'যদি কুকুর ও ছবি ফিরিশতাদেরকে ঘরে প্রবেশ করতে বাঁধা প্রদান করে, তাহলে রব্ব এর মা'রিফাত এমন অন্তরে কীভাবে প্রবেশ করবে যা প্রবৃত্তির কুকুর ও প্রবৃত্তির ছবিতে পূর্ণ হয়ে আছে?... এ জাতীয় 'ইশারা' বা ইঙ্গিতপূর্ণ ব্যাখ্যা বিশুদ্ধ। এগুলো ফকীহগণের কিয়াসের মতোই। বরং ফকীহগণের অনেক কিয়াসের চেয়েও তা বেশি বিশুদ্ধ। দেখুন, ইবনুল কাইয়্যেম, আল-কালামু আলা মাসআলাতি সামা' পৃ. ৩৯৭-৩৯৮ সংক্ষিপ্তাকারে। আলেমগণ এ ধরনের ইশারী তাফসীর ও ইশারী ব্যাখ্যা নিয়ে দু'টি মতে বিভক্ত। বিশুদ্ধ কথা হচ্ছে উপরে ইবন তাইমিয়্যাহ ও ইবনুল কাইয়েম রাহিমাহুমাল্লাহ থেকে ইতোপূর্বে যা আমরা উল্লেখ করেছি তাই। সূফীদের তাফসীরে ইশারী বিষয়ে বিস্তারিত দেখা যেতে পারে, ড. মুহাম্মাদ হুসাইন আয-যাহাবী, আত-তাফসীর ওয়াল মুফাসসিরূন (২/৩৮১); ড. খালেদ আব্দুর রহমান আল-'আক্ক, উসুলুত তাফসীর ওয়া ক্বাওয়া'য়িদুস্থ, পৃ. ২০৫; ড. জ্বাহের মুহাম্মাদ ইয়া'কুব, আসবাবুল খাত্বা ফিত তাফসীর (২/৭৪০)।
৬৩৬. এর দ্বারা তার উদ্দেশ্য আল্লাহর সর্বোচ্চ ও সর্বোজ্জ্বল সত্তা হওয়ার কথা বলা।
৬৩৭. আল্লাহ তা'আলার সকল গুণকে 'কাদীম' বলা সঠিক নয়। কারণ তাঁর কর্মগত গুণগুলো তিনি তাঁর ইচ্ছা অনুসারে যখন ইচ্ছা তখন তিনি করেন। তবে কর্মের মূল সূত্র 'কাদীম' কিন্তু সেটার একক কোনো কাজ নতুন করে সংঘটিত হয়। যেমনটি শাইখ আব্দুর রহমান আস-সা'দী বলেন, 'কর্মগত গুণগুলোর আসল অবশ্যই 'ক্বাদীম' যা সর্বদা ছিল ও সর্বদা থাকবে। আর তার একক কোনো অংশ সর্বদা নতুনভাবে সংঘটিত হবে তাঁর ইচ্ছা অনুসারে'। [আজওয়িবাতুস সা'দিয়্যাহ, পৃ. ১৩৯]
৬৩৮. আল্লাহর সত্তাগত গুণের ব্যাপারে এটি সঠিক কথা। কিন্তু আল্লাহর কর্মগত পছন্দ করা গুণের ব্যাপারে এটি যথাযথ নয়। কারণ আল্লাহর কর্মগত পছন্দ করা গুণগুলো তিনি যখন ইচ্ছা তখন করবেন এটাই হচ্ছে তাঁর পূর্ণতার ওপর প্রমাণ। বস্তুত আল্লাহর কর্মের ব্যাপারে মানুষ তিনভাগে বিভক্ত: ১- জাহমিয়্যাহ, মু'তাযিলা ও তাদের অনুসারীদের মতে, আল্লাহর কোনো গুণই নেই, সবই আল্লাহ থেকে আলাদা কর্ম বা সৃষ্টি। ২- কুল্লাবিয়্যাহ সম্প্রদায় দু'টি নীতিতে বিশ্বাসী। হয় এসব কর্ম আল্লাহর সত্তার সাথেই সম্পৃক্ত আর সত্তার মতোই 'ক্বাদীম' (সত্তাগত গুণ)। অথবা এগুলো আল্লাহ থেকে আলাদা কর্ম, তাঁর সত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট নয় (সৃষ্টি)। ৩- অধিকাংশ আসহাবুল হাদীস ও আহলে কালামদের একটি গোষ্ঠীর মত হচ্ছে, আল্লাহর সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড তিন প্রকার: এক, যা সত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট, (সত্তাগত গুণ) দুই. যা সত্তা থেকে আলাদা কর্ম (সৃষ্টি) তিন, আরেকটি প্রকার রয়েছে যা উপরের দু' শ্রেণির লোক উল্লেখ করেনি, তা হচ্ছে, আল্লাহর সত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট এমন কিছু কর্ম যা তিনি যখন ইচ্ছা তখন ঘটিয়ে থাকেন। আর সেগুলো ভিন্ন সত্তায় পরিণত হয়নি। যেমন আরশের উপরে উঠা, নিকটতম আসমানে অবতরণ, সন্তুষ্ট হওয়া, রাগ করা ইত্যাদি। এরা আবার দু'ভাগে বিভক্ত: ক. যারা এ তৃতীয় প্রকার কর্মটিকে সম্পূর্ণ নতুন বা 'হাদেস' বলে থাকে; তারা হচ্ছে কাররামিয়্যাহ সম্প্রদায়। খ. যারা এ তৃতীয় প্রকার কর্মটিকে মৌলিকভাবে (তিনি আল্লাহ সবকিছু করতে সক্ষম এ হিসেবে) 'ক্বাদীম' তবে এর এককটি অনুষ্ঠিত হওয়ার দিক থেকে হাদেস। তারা মৌলিকভাবে 'হাদেস' হওয়া ও বিশেষ একক 'হাদেস' হওয়ার মধ্যে পার্থক্য করে থাকেন। আর তাই হচ্ছে অধিকাংশ আসহাবুল হাদীস ও তাদের অনুসারীগণের মত। তারা বলেন, কোনো জিনিসের প্রকার অবশিষ্ট থাকা ও নির্দিষ্ট একক অবশিষ্ট থাকা এক কথা নয়। তারা উদাহরণ দিয়ে বলে থাকেন, জান্নাতের নি'আমতগুলোর প্রকার-প্রকরণ কখনও নিঃশেষ হবে না, কিন্তু তা থেকে যা একবার খাওয়া হবে সে একক তো আর অবশিষ্ট থাকবে না। অপরদিকে সব 'হাদেস' নিঃশেষ হয়ে যাবে এমন নয়। নির্দিষ্ট কোনো হাদেসও অবশিষ্ট থাকে, যেমন মানুষের রূহ; তা অবশ্যই 'হাদেস', আগে ছিল না, পরে অস্তিত্বে এসেছে। কিন্তু সেগুলো অবশিষ্ট থাকবে (সুতরাং 'হাদেস' হলেই সেটা ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে সেটা সঠিক নয়)। দেখুন, দারউত তা'আরুদ্ব (২/১৪৭-১৪৮)।
৬৩৯. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আল্লাহর (সিফাতে ইখতিয়ারিয়্যাহ) পছন্দনীয় কর্মগত গুণগুলো যখন অস্তিত্বে আসে তখন সেটি আল্লাহর পূর্ণগুণের অর্থজ্ঞাপক হয়। সেগুলো অস্তিত্বে আসার আগে সে পূর্ণতার অর্থ প্রদান করতো না। যেমন আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক মূসা 'আলাইহিস সালামের সাথে কথা বলা, তাকে ডাকা। এখানে যখন আল্লাহ তা'আলা নবী মূসাকে ডেকেছেন তখন সেটি পূর্ণ গুণের অর্থজ্ঞাপক হয়েছে। যদি মূসা 'আলাইহিস সালাম সেখানে আসার আগে তাকে ডাকতেন তবে সেটা অপূর্ণ বলে বিবেচিত হতো। সুতরাং আল্লাহর গুণ যখন যেটা তিনি অস্তিত্বে আনয়ন করেন তখন সেটা পূর্ণতার ওপর প্রমাণবহ থাকে। অস্তিত্বে আসার আগে সেটি পূর্ণতা জ্ঞাপক নয়। বরং যে সময় অস্তিত্বে আসা তার হিকমত ও প্রজ্ঞার চাহিদা বলে বিবেচিত হয় সেসময়ের আগে তা অস্তিত্বে আসা অপূর্ণতার ওপরই প্রমাণবহ। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৬/২৪১)।
৬৪০. অর্থাৎ এ গুণগুলো দ্বারা তিনি সর্বদা গুণান্বিত ছিলেন, আযালী কাল থেকেই। কখনও তিনি এগুলো থেকে মুক্ত ছিলেন না। এজন্যই ইবন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা আল্লাহর বাণী, "আল্লাহ হলেন ক্ষমাশীল ও দয়ার্দ্র", অনুরূপ আল্লাহর বাণী, "আর আল্লাহ হলেন সর্বজ্ঞ ও সর্ববিজ্ঞ", এবং অনুরূপ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলতেন, তিনি সর্বদা এগুলো দ্বারা গুণান্বিত ছিলেন, এখনো আছেন এবং সর্বদা থাকবেন। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া ৫/৫৩৮-৫৩৯, ৫৫২-৫৫৩।
৬৪১. বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। সত্য হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপর উঠেছেন, পূর্বে তিনি 'আরশের উপর ছিলেন না। যেমনটি 'তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠলেন' [সূরা আল-আ'রাফ, ৫৪ সূরা ইউনুস: ৩; সূরা আর-রা'দ: ২; সূরা ত্বা-হা: ০৫; সূরা আল-ফুরক্বান: ৫৯; সূরা আস-সাজদাহ: ০৪; সূরা আল-হাদীদ: ০৪] এ আয়াতের বাহ্যিক অর্থের দ্বারা সাব্যস্ত হচ্ছে। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৬/১৫০)। সুতরাং ইমাম 'আমর ইবন উসমান আল-মক্কীর উপরোক্ত বক্তব্য থেকে হয়ত কারো মনে হতে পারে যে, তিনি আল্লাহর 'আরশের উপর উঠাকে সত্তাগত গুণ বলেছেন। আসলে কিন্তু তা নয়, বস্তুত তা কর্মগত গুণ। ইস্তেওয়া বা 'আরশের উপর উঠা তাঁর একটি গুণ, যা তিনি তাঁর ইচ্ছা ও ক্ষমতায় করেছেন। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/২১৬, ৫২৩, ৪১০)। ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, 'যারা 'ইস্তেওয়া'কে আল্লাহর সত্তাগত গুণ বলেন তারা এ তা'ওয়ীল করে থাকে যে, তিনি 'আরশের উপর ক্ষমতাবান হলেন। বস্তুত এটা শুদ্ধ নয়; কারণ যেহেতু ক্ষমতা তার পূর্বেই ছিল, সর্বদাই তিনি সম্মানের দিক থেকে উপরে ছিলেন; সুতরাং বুঝা গেল যে, যারা এ গুণটিকে সত্তাগত গুণ বলেছেন তাদের বক্তব্য অতিশয় দুর্বল; কারণ: ১- আল্লাহ বলেছেন, 'তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠলেন'। আর 'তারপর' অর্থই হচ্ছে তা পরে করেছেন। ২- আল্লাহ তা'আলা এর আগে বলেছেন, সৃষ্টি করেছেন.... উপরে উঠেছেন। সুতরাং একটি ক্রিয়ার উপর আরেকটি ক্রিয়ার 'আত্বফ' বা সংযুক্তি স্থাপন করেছেন। যাতে বুঝা যায় তা কর্মই ছিল যেমনটি সৃষ্টি একটি কর্ম। অর্থাৎ সৃষ্টি করেছেন তারপর উঠেছেন। [মাজমূ' ফাতাওয়া (১৬/৩৯৫)] এখানে অবশ্য 'আমর ইবন উসমান আল-মাক্কীর কথার আরেকটি অর্থ করা যায়, তা হচ্ছে, তিনি আল্লাহ 'আরশের উপর উঠা' এটা না করেও পরিপূর্ণ ছিলেন, এটা করে পূর্ণ হয়েছেন এমন নয়, তাহলে সে অর্থ শুদ্ধ হবে।
৬৪২. এর দ্বারা 'আমর ইবন উসমান আল-মাক্কীর উদ্দেশ্য যদি এটা হয় যে আল্লাহ তা'আলা আযাল বা পূর্ব থেকেই পূর্ণতার গুণে গুণান্বিত তাহলে সেটা বিশুদ্ধ অর্থ। কিন্তু যদি এটা মনে করে থাকেন যে মহান আল্লাহর কর্মকাণ্ড নতুন করে হয় না, তাহলে তার কথা অগ্রহণযোগ্য।
৬৪৩. এটিও সঠিক নয়। কারণ কর্ম যখন কর্তা ইচ্ছা করেন তখনই হয়। কর্তা ইচ্ছা করার আগেই কর্ম হয়ে আছে এমন কথা বলা ঠিক নয়। সম্ভবত 'আমর ইবন উসমান আল-মাক্কী রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহর কর্মগত সিফাতকেও প্রাচীন মনে করতেন।
৬৪৪. অর্থাৎ আল্লাহ বাণীতে যেখানে আল্লাহ বলেছেন, “অতঃপর যখন মূসা আগুনের কাছে পৌঁছলেন তখন উপত্যকার ডান পাশে বরকতময় ভূমির উপর অবস্থিত সুনির্দিষ্ট গাছের দিক থেকে তাকে ডেকে বলা হল, 'হে মূসা! আমিই আল্লাহ, সৃষ্টিকুলের রব্ব।” [সূরা আল-কাসাস: ৩০] এর মাধ্যমে জাহমিয়্যাহ ও পরবর্তী মু'তাযিলাদের বক্তব্যের খণ্ডন রয়েছে, যারা বলে থাকে যে উপরোক্ত বাণী গাছ থেকেই এসেছে, আল্লাহ থেকে নয়। কেননা তারা আল্লাহর বান্দাকে সৃষ্ট বলে থাকে, গুণ বলে না। তাদের কথার দাবি হচ্ছে গাছই বলেছে, "হে মূসা নিশ্চয় আমিই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন"! দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (১৬/১৫৩); ইবন আবিল ইয্য, শারহুত ত্বাহাওয়িয়্যাহ (১/১৮২); ইবনুল কাইয়্যেম, নূনিয়্যাহ, হাররাসের ব্যাখ্যাসহ (১/১১৪-১১৫)।
৬৪৫. বক্তব্যটি বিবিধ অর্থের সম্ভাবনাময়। তবে বিশুদ্ধ কথা হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের মাঠে আসবেন, আগমনকারী না থাকার পরে। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (১৬/১৫১)। যেমনটি ইবন তাইমিয়্যাহ'র বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ গ্রন্থে এসেছে, 'তিনি আগমনকারী হবেন, আগমনকারী না থাকার পরে। তবে এ অর্থটি (যা উপরে বর্ণিত হয়েছে এবং যা বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ গ্রন্থে এসেছে) বর্তমান ফাতওয়া আল-হামাউইয়্যাহ এর সকল ছাপা ও ইমাম যাহাবীর আল-'উলু লিল 'আলিয়্যিল 'আযীম গ্রন্থে যা এসেছে তার বিপরীত। সেখানে এসেছে, 'তিনি আগমনকারী হবেন, আগমনকারী হওয়ার আগেই'। [শাইখ, ড. আব্দুল আযীয আলে আব্দুল লতীফ, আত-তা'লীক আলাল ফাতাওয়া আল-হামওয়িয়্যাহ আল-কুবরা, পৃ. ১৭১] অবশ্য কেউ কেউ বুঝেছেন যে, তিনি (আমর ইবন উসমান আল-মাক্কী) এখানে আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক হাশরের মাঠে আগমনের জন্য 'জাআ' বা অতীতকালের ক্রিয়া ব্যবহারের কারণ বর্ণনা করছেন। [সূরা আল-ফাজর: ২২] আর তা হচ্ছে তিনি আগমনকারী গুণে গুণান্বিত হবেন যেভাবে তাঁর জন্য উপযোগী সে রকম করে, যদিও সে কর্মটি এখনও ঘটেনি, কারণ তা ঘটা অবশ্যম্ভাবী। যেমনটি আল্লাহ তা'আলা কুরআনের অন্যত্রও বলেছেন, 'আল্লাহ নির্দেশ এসে গেছে সুতরাং তোমরা সেটাকে নিয়ে তাড়াতাড়ি করো না' [সূরা আন-নাহল: ০১] এখানেও কাফেরদের শাস্তি আসার বিষয়টি অবশ্যম্ভাবী হওয়ায় অতীত কালের ক্রিয়া 'আতা' ব্যবহার করা হয়েছে। আবার কেউ কেউ বুঝেছেন, মহান আল্লাহ যেভাবে ক্ষমা করার আগেও ক্ষমা করার গুণে গুণান্বিত, দয়া করার আগেও দয়া করার গুণে গুণান্বিত সে হিসেবে আল্লাহ তা'আলা হাশরের মাঠে আসার আগেই 'আগমনকারী' গুণটি তাঁর জন্য ব্যবহার করা যাবে, কারণ তা ঘটা অবশ্যম্ভাবী। [আল- ফাতাওয়া আল-হামাওয়িয়্যাহ'র ওপর হামাদ আত-তুয়াইজরীর ব্যাখ্যা, পৃ. ৩৮৩]
৬৪৬. এর মাধ্যমে আশায়েরাদের অপব্যাখ্যাকে খণ্ডন করা হয়েছে। কারণ তাদের কেউ কেউ বলে থাকে যে, হাশরের মাঠে আল্লাহর আসার অর্থ তাঁর নির্দেশ আসা। তাছাড়া তাঁর নির্দেশ তো সর্বদাই আসছে তাহলে কিয়ামতের দিন সেটাকে আলাদা করে বর্ণনা করার কী প্রয়োজন? তদ্রূপ যদি তোমরা এভাবে শব্দ উহ্য ধরে নিয়ে অর্থ করে যাও তাহলে তোমরা যে সাতটি গুণ সাব্যস্ত করেছ সেখানেও উহ্য ধরা যাবে। যদি সেখানে ধরতে তোমরা রাযী না হও তাহলে অন্যত্রও এভাবে শব্দ উহ্য ধরতে পার না। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (১৬/৪১৯)।
৬৪৭. যেমন কুরআনে কারীমে এসেছে, "সেদিন কিছু মুখ উজ্জল হবে এবং কিছু মুখ কালো হবে; যাদের মুখ কালো হবে (তাদেরকে বলা হবে), 'তোমরা কি ঈমান আনার পর কুফরী করেছিলে? সুতরাং তোমরা শাস্তি ভোগ কর, যেহেতু তোমরা কুফরী করতে'।" [সূরা আলে ইমরান: ১০৬] আরও এসেছে, "সেদিন কোনো কোনো মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে।" [সূরা আল-কিয়ামাহ: ২২] আরও এসেছে, "পরিণামে আল্লাহ তাদেরকে রক্ষা করবেন সে দিনের অনিষ্ট হতে এবং তাদেরকে প্রদান করবেন হাস্যোজ্জ্বলতা ও উৎফুল্লতা।" [সূরা আল-ইনসান: ১১] আরও এসেছে, "আপনি তাদের মুখমণ্ডলে স্বাচ্ছন্দ্যের দীপ্তি দেখতে পাবেন।" [সূরা আল-মুত্বাফফিফীন: ২৪]
৬৪৮. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এটা স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন যে, নবীদের নবুওয়াতের ওপর প্রমাণাদিকে কুরআনে কারীমে তিনটি নামে অভিহিত করা হয়েছে: ১- আয়াত বা নিদর্শনাবলি। ২- বারাহীন বা প্রমাণাদি। ৩- বাইয়্যেনাত বা স্পষ্টকারী দলীল। দেখুন, আন-নাবুওয়াত (২/৮২৮-৮২৯)।
৬৪৯. যেমন আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় যমীন ও তার উপর যারা আছে তাদের চূড়ান্ত মালিকানা আমাদেরই থাকবে এবং আমাদেরই কাছে তারা প্রত্যাবর্তিত হবে।” [সূরা মারইয়াম: ৪০] অন্যত্র বলেন, "আর আমরা বহু জনপদকে ধ্বংস করেছি যার বাসিন্দারা নিজেদের ভোগ-সম্পদের অহংকার করত! এগুলোই তো তাদের ঘরবাড়ী; তাদের পর এগুলোতে লোকজন সামান্যই বসবাস করেছে। আর আমরাই তো চুড়ান্ত ওয়ারিশ (প্রকৃত মালিক)!" [সূরা আল-ক্বাসাস: ৫৮] অন্যত্র বলেন, "আর আমরাই জীবন দান করি ও মৃত্যু ঘটাই এবং আমরাই চুড়ান্ত মালিকানার অধিকারী।" [সূরা আল- হিজর: ২৩] এসব আয়াতে ওয়ারিস হওয়ার অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা সকল সৃষ্টির ওপর ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন হওয়া লিখে দিয়েছেন, মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা ব্যতীত কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। সুতরাং তিনিই সকল সৃষ্টির একমাত্র ওয়ারিস। এ অবস্থায় যেন তিনিই যমীনের বুকে যারা আছে তাদের সবার ওয়ারিস হলেন।
৬৫০. এখানেও দেখা যাচ্ছে, তিনি আশা'য়েরা ও মাতুরিদিয়াদের মত খণ্ডন করেছেন। কারণ আমরা জানি যে, আশা'য়েরা ও মাতুরিদিয়ারা 'ইয়াদ' এর অর্থ হাত না করে 'নি'আমত' করে থাকে।
৬৫১. সম্ভবত এখানে নির্দেশ দ্বারা বুঝিয়েছেন সূরা বনী ইসরাঈলের ৮৫ নং আয়াতের কথা বলেছেন। যেখানে রূহকে আল্লাহর নির্দেশের একটি বলা হয়েছে। কিন্তু সে রূহকে অনেকেই মানুষের রূহ বললেও সকলে এ ব্যাপারে একমত নয়। তবে একটি কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, এখানে 'আমর' বা নির্দেশ বলে 'মা'মুর' বা 'নির্দেশদ্বারা সৃষ্ট' এটা বুঝানো হয়েছে। কারণ আল্লাহর 'আমর' তার বাণী। আর তার বাণী দ্বারা সৃষ্ট জিনিসই রূহ। 'আমর' বা নির্দেশ তো বাণী, যা কখনো সৃষ্ট নয়। আর রূহ অবশ্যই সৃষ্ট জিনিস। বিষয়টি অন্য জায়গাতেও প্রযোজ্য। আর রূহ তাঁর সিফাতও নয়।
৬৫২. 'লেগে যাওয়া' কথাটি অতিরিক্ত। তিনি যদি তা না বলতেন তবে অনেক ভালো হতো। কারণ এ শব্দটি কুরআন ও হাদীসের ভাষ্য দ্বারা সাব্যস্ত হয়নি আবার নিষেধও করা হয়নি। বরং এভাবে 'লেগে যাওয়া থেকে পবিত্র' কথাটি বিশুদ্ধ না হওয়াই বেশি যৌক্তিক। কারণ আল্লাহ তা'আলা নিজ হাতে জান্নাতু আদনের গাছ লাগিয়েছেন, আদমকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন, নিজ হাতে তাওরাত লিখেছেন ইত্যাদি দ্বারা বুঝা যায় সৃষ্টির সাথে লেগে যাওয়া দোষণীয় নয়। তাছাড়া তিনি 'আরশের উপর সত্তাগতভাবে থাকা দ্বারা প্রকাশ্যভাবে সেটার উপরে থাকাকে অস্বীকার করে না। যা থেকে বুঝা গেল যে এ শেষোক্ত বাক্য 'লেগে থাকা থেকে পবিত্র' এটা বলা যাবে না। বরং এখানে চুপ থাকা আবশ্যক। তাই এটি সাব্যস্ত কিংবা অসাব্যস্ত কিছুই করা যাবে না। [সালেহ আব্দুল আযীয আলে আশ-শাইখ, শারহুল হামাওয়িয়্যাহ, পৃ. ৭৫]
৬৫৩. অর্থাৎ আল্লাহ ও তাঁর কোনো গুণ সৃষ্টির কারও অভ্যন্তরে প্রবেশ করা, কোনো শরীরে মিশে যাওয়া, কারও সাথে লেগে যাওয়া থেকে পবিত্র। আদম সৃষ্টির পরে যে ফুঁক ও নির্দেশ দানের মাধ্যমে তাতে রূহের সঞ্চার করেছেন তা অবশ্যই সৃষ্ট। মহান আল্লাহর কোনো অংশ সৃষ্টির অভ্যন্তরে থাকার কথা ঈমানদার কখনো বলতে পারে না।
৬৫৪. আল্লাহ 'আমর ইবন উসমান' রাহিমাহুল্লাহকে ক্ষমা করুন, তিনি সম্ভবত সূরা 'ক্বাফ' এর ১৬ নং আয়াতের মাধ্যমে দলীল নিয়ে ‘ঘাঁড়ের রগের নিকটবর্তী’ বলে আল্লাহ তা'আলাকে বুঝাতে চেয়েছেন। অথচ আমরা ইতোপূর্বে জেনেছি যে, আল্লাহর নৈকট্য কেবল বিশেষ লোকদের জন্য হয়, আর তা হয় সাড়া দেয়া ও সাওয়াব দেয়া এ দু'টির জন্য। এভাবে সর্বসাধারণের ব্যাপারে আসা ‘কুরব’ দ্বারা আল্লাহকে বুঝানো হয়নি, আল্লাহর বাহিনী ফিরিশতাদেরকে বুঝানো হয়েছে। এ ব্যাপারে তাফসীরে ইবনে কাসীর দেখা যেতে পারে। তাছাড়া এটিই শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ বিভিন্ন গ্রন্থে সাব্যস্ত করেছেন।
৬৫৫. আল্লাহ 'আমর ইবন উসমান' রাহিমাহুল্লাহকে ক্ষমা করুন। আমরা আগেই জেনেছি যে, আল্লাহ তা'আলাকে দূরবর্তী গুণে গুণান্বিত করা যাবে না। এ গুণটি আল্লাহর জন্য কুরআন ও হাদীসে সাব্যস্ত হয়নি।
৬৫৬. 'আমর ইবন উসমান আল-মাক্কী রাহিমাহুল্লাহ'র এ বক্তব্য যে গ্রন্থ থেকে শাইখুল ইসলাম নিয়েছেন তা বর্তমানে হারিয়ে গেছে। তবে অন্য যেসব কিতাবে তা এসেছে তন্মধ্যে রয়েছে: ১- আবু নু'আইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া (১০/২৯১-২৯২)। ২- খতীব বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ (১/২২৩-২৩৪)। ৩- সুলামী, ত্বাবাক্বাতুস সূফিয়্যাহ, পৃ. ২০২। ৪- যাহাবী, আল-'উলু লিল 'আলিয়ি্যল 'আযীম, পৃ. ১৫৫। ৫- মুখতাসারুল উলু, ২২৯-২৩০। ৬- ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুয়ুশ, পৃ. ২৭৪। ৭- ইবনুল 'ইমাদ, শাযরাতুয যাহাব (২/২২৬)। ৮- মানাওয়ী, আল-কাওয়াকিবুদ দুররিয়্যাহ ফী তারাজিমিস সাদাতিস সূফিয়্যাহ, পৃ. ২৫৯। ৯- শা'রানী, আত-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা (১/৯৮)। তবে অনেকে সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন। আবার কেউ কেউ বিস্তারিত নিয়ে এসেছেন।
['আমর ইবন উসমান আল-মাক্বীর বক্তব্য] অনুরূপভাবে 'আমর ইবন উসমান আল-মাক্কী তার "আত-তা'আররুফ বি আহওয়ালিল 'ইবাদি ওয়াল মুতা'আব্বেদীন” নামক গ্রন্থে বলেন, অধ্যায়: “তাওবাকারীদের জন্য শয়তান যা নিয়ে আসে।” তিনি উল্লেখ করেন যে, সে তাদেরকে কঠিন নৈরাশ্যের মধ্যে নিপতিত করে, অতঃপর ধোঁকা ও দীর্ঘ আশার মধ্যে, অতঃপর তাওহীদের মধ্যে । অতঃপর তিনি বলেন, শয়তান সবচেয়ে বড় যে প্রবঞ্চনা দেয় তা হচ্ছে, তাওহীদের মধ্যে সন্দেহে নিপতিত করার মাধ্যমে অথবা আল্লাহর সিফাতের মধ্যে সেগুলোকে তুলনা করার মাধ্যমে, সাদৃশ্য দানের মাধ্যমে বা সেগুলোকে অস্বীকার ও নিষ্ক্রিয়করণের মাধ্যমে।
অতঃপর তিনি ('আমর ইবন উসমান আল-মাক্কী) ওয়াসওয়াসার হাদীস উল্লেখ করে বলেন, জেনে রেখ! (আল্লাহ তোমাকে দয়া করুন) যা কিছু তোমার হৃদয়ে ধারণা সৃষ্টি করে বা তোমার চিন্তার স্থলে উদিত হয় অথবা তোমার অন্তরে পেশ হওয়ার জায়গায় কল্পনায় আসে, যেমন- সৌন্দর্য, উজ্জ্বলতা, চাকচিক্য, শোভা অথবা দৃশ্যমান কোনো ছায়া, বা শরীর হিসেবে ফুটে উঠা কোনো কায়া, সে সবকিছু থেকে আল্লাহ অবশ্যই ভিন্ন। বরং তিনি অনেক মহান, অনেক শ্রেষ্ঠ ও বড়। তুমি কি শোন না যে, তিনি বলেছেন: لَيْسَ كَيْثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ) [الشورى: ١١ "তাঁর মতো কিছুই নেই। তিনি সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা।” [সূরা আশ-শূরা: ১১] এবং وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ ) [الاخلاص: ٤ “তাঁর সমতুল্য কেউই নেই।” [সূরা আল-ইখলাস: ০৪] অর্থাৎ নেই কোনো সদৃশ, তুলনার যোগ্য, সমকক্ষ ও উদাহরণ। তুমি কি জানো না যে, তিনি যখন পাহাড়ের প্রতি নিজেকে উদ্ভাসিত করলেন, তখন পাহাড় তাঁর ভয়ের প্রচণ্ডতায় ও সুউচ্চ ক্ষমতায় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। কাজেই যেমন তিনি কোনো কিছুতে উদ্ভাসিত হলে তা চূর্ণ হয়ে যায়। তেমনি কেউ তাঁর সম্পর্কে ধারণা করে কিছু নির্ধারণ করলে ধ্বংস হয়ে যাবে।
সুতরাং আল্লাহ তাঁর কিতাবে নিজেই নিজের ব্যাপারে তাঁর মত আর কেউ নেই বলে যা বর্ণনা দিয়েছেন তা দিয়ে তুমি সাদৃশ্য প্রদান, তুলনাদান, উপমা পেশ, সমকক্ষ নির্ধারণ করা প্রতিহত কর।
অতঃপর যদি তুমি এটি আঁকড়ে ধর এবং তা (সাদৃশ্য প্রদান, তুলনাদান, উপমা পেশ, সমকক্ষ নির্ধারণ করা) থেকে বিরত থাক, তাহলে দেখবে সে (শয়ত্বান) তোমার কাছে পবিত্র, মহান আল্লাহর কিতাবে ও তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে সাব্যস্তকৃত আল্লাহর গুণকে নিষ্ক্রীয়করণের জন্য এসে বলবে, তিনি যদি এসব গুণে গুণান্বিত হবেন, অথবা তুমি যদি তাকে এসব গুণে গুণান্বিত করো, তবে তো সাদৃশ্য প্রদান আবশ্যক হয়ে যায়। শয়তানের এ কুমন্ত্রণার জবাবে তাকে তুমি মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করো; কেননা সে তো অভিশপ্ত, সে তোমাকে পদস্খলন ঘটাতে চায়, তোমাকে পথভ্রষ্ট করে নাস্তিক বিভ্রান্ত সিফাত অস্বীকারকারীদের অন্তর্ভুক্ত করতে চায়।
অতঃপর জেনে রাখ! (মহান আল্লাহ তোমাকে রহম করুন) নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা এক সত্তা, অন্য একজনের মতো না, একক, অমুখাপেক্ষী, কাউকে জন্ম দেননি, তাকেও জন্ম দেয়া হয়নি, তার সমকক্ষ কেউ নেই। ...
শেষে তিনি ('আমর ইবন উসমান আল-মাক্কী) বলেন, "আল্লাহর জন্য উন্নত আলোকোজ্জ্বল নামসমূহ সাব্যস্ত রয়েছে, যেটা সৃষ্টির আদিতে বাস্তবে সত্যতার সাথেই তাঁর ছিল।
এমন কোনো গুণ তিনি উদ্ভব করেননি যা থেকে তিনি খালি ছিলেন, অথবা এমন নামেরও উদ্ভব করেননি যা থেকে তিনি মুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন হাদী, অচিরেই হিদায়াত করবেন। তিনি ছিলেন সৃষ্টিকর্তা, অচিরেই সৃষ্টি করবেন; তিনি ছিলেন রিযিকদাতা, অচিরেই রিযিক দান করবেন; তিনি ছিলেন ক্ষমাশীল, অচিরেই তিনি ক্ষমা করবেন; তিনি ছিলেন কর্তা, অচিরেই তিনি করবেন। তিনি তাঁর ইসতিওয়া সিফাতটিতে গুণান্বিত, এটা তিনি তখনও ঘটাননি। অবশ্যই তাঁর থেকে এ গুণটি হওয়া আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল যে অচিরেই তা হবে। তাঁর কর্মসমূহের মধ্যে তাঁকে এ (আরোহনকারী) নাম দেয়া হবে।
অনুরূপ আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا ﴾ [الفجر: ٢٢] "আর আপনার রব্ব আসবেন এবং ফেরেশতাগণও কাতারে কাতারে আসবেন।” [সূরা আল-ফাজর: ২২] এর অর্থ, নিশ্চয় অচিরেই তিনি আসবেন, তবে আসার দ্বারা 'আগমনকারী' নাম উদ্ভাবন করেননি। শুধু কর্মটি আসার সময় পর্যন্ত প্রলম্বিত। সুতরাং তিনি আগমন করেছেন তথা অচিরেই আগমন করবেন। তাঁর আসাটা এমনভাবে অস্তিত্বে রয়েছে যার সাথে কোনো স্বরূপ নির্ধারণ ও সাদৃশ্যদান যুক্ত নেই। কেননা সেটা রবুবিয়াত বা প্রভুত্বের কাজ; কাজেই মা'বুদের স্বরূপ উদঘাটনের মধ্যে প্রবেশের ইচ্ছা করলেই বুদ্ধি পেরেশান হবে, মন বিচ্ছিন্ন হবে। কাজেই তুমি দুদিকের একদিকেও যেও না। না নিষ্ক্রীয়কারী হও, আর না হও সাদৃশ্যপ্রদানকারী। আর আল্লাহর জন্য তাতেই সন্তুষ্ট থাকো যাতে তিনি নিজের জন্য সন্তুষ্ট হয়েছেন। আর তুমি তার নিজের ব্যাপারে তার সংবাদে অনুগত আত্মসমর্পণকারী বিশ্বাসী হয়ে থেমে যাও। সেখানে কোনো প্রকার ভিন্নতা আনার চেষ্টায় যাবে না, অনুরূপ গভীরে তালাশের চেষ্টায়ও রত হবে না। শেষে তিনি বলেন, "কাজেই মহান আল্লাহ তিনিই বলেছেন, “আমি আল্লাহ”, গাছ না। তিনিই আগন্তুক হওয়ার পূর্বেই আগমনকারী। তাঁর নির্দেশ নয়, তিনি স্বয়ং আসবেন আখেরাতে স্বীয় বন্ধুদের সামনে উদ্ভাসিত হয়ে , এতে তাদের চেহারা শুভ্রোজ্জ্বল হবে , অস্বীকারকারীদের দলীল-প্রমাণ তাতে ব্যর্থ হবে। মহান আল্লাহ সর্বস্থানের উপরে, তাঁর 'আরশের উপরে সমুন্নত, যাবতীয় মহৎ সম্মানের সাথে। যিনি মূসা 'আলাইহিস সালামের সাথে যথাযথভাবে কথা বলেছেন। তাকে তাঁর নিদর্শনাবলি দেখিয়েছেন। অতঃপর মূসা 'আলাইহিস সালাম আল্লাহর কালাম শুনেছিলেন; কারণ তিনি তাকে আলাপের মাধ্যমে নৈকট্য দান করেছিলেন। তাঁর কালাম বা বাণী সৃষ্ট হওয়া, উদ্ভাবিত হওয়া, লালিত- পালিত হওয়া থেকে পবিত্র। তিনি সৃষ্টিকুলের ওয়ারিশ , তাদের আওয়াজ শ্রবণকারী, স্বীয় চোখে তাদের দেহ অবলোকনকারী, তাঁর দুহাত বিস্তৃত, তাঁর হাত তাঁর নি'আমত নয়। আদমকে সৃষ্টি করে তার মধ্যে তার রূহ ফুঁকে দিয়েছেন, এটা তাঁর নির্দেশ । কোনো শরীরের মধ্যে অনুপ্রবেশ হওয়া, মিশে যাওয়া, তার সাথে লেগে যাওয়া থেকে অতি পবিত্র, অনেক ঊর্ধ্বে। তিনি ইচ্ছাকারী, তাঁর ইচ্ছা আছে। তিনি জ্ঞানী, তাঁর জ্ঞান আছে। স্বীয় দু' হাত রহমত নিয়ে বিস্তৃত। প্রতি রাতে নিকটবর্তী আসমানে অবতরণকারী, যাতে তাঁর বান্দারা ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য লাভ করতে পারে আর যাতে তারা তাঁর নৈক্যের ব্যাপারে আগ্রহী হয়। তিনি অতি নিকটবর্তী, তাঁর সে নৈকট্যের মাধ্যমে তিনি ঘাড়ের শিরার চেয়েও অধিক নিকটবর্তী, তিনি ঊর্ধ্বে থাকার মাধ্যমে সকল দূরবর্তী স্থান থেকে দূরবর্তী। তিনি মানুষের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নন।
অবশেষে তিনি বলেন: ﴿إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ وَالْعَمَلُ الصَّالِحُ يَرْفَعُهُ ﴾ [فاطر: ١০] “তাঁরই দিকে পবিত্র বাণীসমূহ উঠে যায়, আর সৎ আমল তিনি তো তা (তার দিকে) উঠিয়ে নেন।” [সূরা ফাতির: ১০] এবং
﴿أَمِنتُم مَّن فِي السَّمَاءِ أَن يَخْسِفَ بِكُمُ الْأَرْضَ فَإِذَا هِيَ تَمُورُ أَمْ أَمِنتُم مِّن فِي السَّمَاءِ أَن يُرْسِلَ عَلَيْكُمْ حَاصِبًا ﴾ [الملك: ١٦، ١٧]
"তোমরা কি এ থেকে নির্ভয় হয়েছ যে, যিনি আসমানের ওপর রয়েছেন তিনি তোমাদেরকে সহ যমীনকে ধ্বসিয়ে দিবেন, অতঃপর তা হঠাৎ করেই থরথর করে কাঁপতে থাকবে? অথবা তোমরা কি এ থেকে নির্ভয় হয়েছ যে, আসমানের উপর যিনি রয়েছেন তিনি তোমাদের উপর কংকরবর্ষী ঝঞ্ঝা পাঠাবেন?" [সূরা আল-মুলক: ১৬-১৭] তিনি যেমনিভাবে আসমানের উপর আছেন তেমনি তিনি যমীনে থাকার থেকে পবিত্র ও ঊর্ধ্বে।
টিকাঃ
৬২৮. তিনি হচ্ছেন, আবু আব্দুল্লাহ 'আমর ইবন উসমান ইবন কুরাব ইবন গুসাস, আল-মাক্কী। সূফীদের বড় শাইখ। তিনি হাদীস শুনেছেন ইউনুস ইবন আব্দিল আ'লা, রবী' ইবন সুলাইমান প্রমুখ থেকে। ফিকহের বড় আলেম। জুনাইদ এর সাথীত্ব বরণ করেছিলেন। বাগদাদে বসবাস করেছেন। তারপর সেখানেই হিজরী ২৯৭ সালে তার মৃত্যু হয়। তিনি বিভিন্ন প্রদেশে চিঠি লিখে হাল্লাজের ওপর লা'নত করেন এবং তার সম্পর্কে মানুষদেরকে সাবধান করেন। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ তার প্রশংসা করেন। আরও উল্লেখ করেন যে, তিনি তাসাওউফের শাইখদের মধ্যে বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন, যিনি সিফাত সাব্যস্ত করতেন আর জাহমিয়্যাহ ও হুলুলিয়্যাহ সম্প্রদায়ের কর্মকাণ্ড অস্বীকার করতেন। দেখুন, আবু নু'আইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া (১০/২৯১); যিকরু আখবারি আসবাহান (২/৩৩); খত্নীবে বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ (১৪/১৩৬), নং ৬৬২৬; ইবনুল মুলাক্কিন, ত্বাবাক্বাতুল আওলিয়া, পৃ. ৩৪৪; ইবনুল 'ইমাদ, শাযরাতুয যাহাব (২/২২৫); ইবন কাসীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (১১/১৩৫); ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউত তা'আরুদ্ব (৫/৪-৯), (৬/২২২৬)।
৬২৯. এ গ্রন্থটি বর্তমানে হারিয়ে যাওয়া গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। তবে যারাই 'আমর ইবন উসমান এর জীবনী লিখেছেন তারা সবাই উল্লেখ করেছেন যে, তাসাওউফে তার বেশ কিছু রচিত গ্রন্থ ছিল। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ 'আমর ইবন উসমান এর এ গ্রন্থ থেকে তার বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৫/৫৯-৬০) গ্রন্থে বেশ কিছু তথ্য এনেছেন, সেখানে তিনি এ গ্রন্থের নাম দিয়েছেন, আদাবুল মুরীদীন ওয়াত তা'আররুফ লি আহওয়ালিল উব্বাদ। অনুরূপ ইমাম যাহাবী তার আল-উলু গ্রন্থে (২/১২২৫), নং ৪৮৯ এ তথ্য বর্ণনা করেছেন। সেখানে তিনি গ্রন্থের নাম দিয়েছেন 'আদাবুল মুরীদীন।
৬৩০. অর্থাৎ তাদের জন্য যেসব ওয়াসওয়াসা বা কুমন্ত্রণা নিয়ে আসে তার বর্ণনা। দেখুন, বায়ানু ভালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৫/৬০)।
৬৩১. এ কথার ব্যাখ্যা করেছেন ইবন তাইমিয়্যাহ তার বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৫/৬০); ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুয়ুশ, পৃ. ২৭৪। তারা বলেন, "আর তৃতীয় দিক, যে দিক থেকে শয়তান মানুষের কাছে আসে, যখন তারা তার কথা মানতে অস্বীকার করে, আর তারা আল্লাহর নির্দেশকে আকঁড়ে ধরে, তখন শয়তান তাদের কাছে কুমন্ত্রণা নিয়ে আসে। সে তখন স্রষ্টার ব্যাপারেই তাদেরকে সন্দিহান করে তোলে, যাতে তাদের মাঝে তাওহীদের মূলনীতিই বিনষ্ট করতে পারে।"
৬৩২. বাস্তবে এ তিনটি অস্ত্র দিয়ে আজও শয়তান জাহমিয়্যাহ, মু'তাযিলা, আশায়েরা ও মাতুরিদিয়া সম্প্রদায়কে ঘায়েল করেছে। আজ পর্যন্ত তারা এ তিনটির মাঝে পড়ে আছে। আল্লাহর সিফাতকে অস্বীকার করার জন্য প্রথমে তামসীল বা তাশবীহ প্রদান করে তারপর সেটাকে তা'ত্বীল করে।
৬৩৩. ওয়াসওয়াসার হাদীস বলতে সম্ভবত বুঝাচ্ছেন যা সহীহ মুসলিমে আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে একদল লোক এসে জানতে চাইলেন, 'আমরা আমাদের অন্তরে এমনসব জিনিস পাই, আমাদের কেউ তা উচ্চারণ করাও বড় গুনাহের মনে করি'। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তোমরা কি তা পেয়েছ? তারা বললেন, হ্যাঁ। তখন রাসূল বললেন, 'এ হচ্ছে সুস্পষ্ট ঈমান'। [মুসলিম, আস-সহীহ (১/১১৯), হাদীস নং ১৩২; আবু দাউদ, আস-সুনান (৫/৩৩৬), হাদীস নং ৫১১১; ইবন আবী আসেম, আস-সুন্নাহ (১/২৯৫), হাদীস নং ৬৫৪; আবুল কাসেম আল-আসফাহানী, আল-হুজ্জাহ (২/২৮৫)]
৬৩৪. এখানে তিনি সূরা আল-আ'রাফের ১৪৩ নং আয়াতে মূসা 'আলাইহিস সালাম কর্তৃক আল্লাহকে দেখার আব্দার করার পরে আল্লাহ তা'আলা পাহাড়ে তাঁর উজ্জ্বল আলো ফেললে তাঁর কী অবস্থা হয়েছিল তাই তুলে ধরছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, "আর মূসা যখন আমাদের নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হলেন এবং তার রব তার সাথে কথা বললেন, তখন তিনি বললেন, 'হে আমার রব্ব! আমাকে দর্শন দান করুন, আমি আপনাকে দেখব'। তিনি বললেন, 'আপনি আমাকে দেখতে পাবেন না। আপনি বরং পাহাড়ের দিকেই তাকিয়ে দেখুন, সেটা যদি নিজের জায়গায় স্থির থাকে তবে আপনি আমাকে দেখতে পাবেন।' যখন তাঁর রব্ব পাহাড়ে জ্যোতি প্রকাশ করলেন তখন তা পাহাড়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করল এবং মূসা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লেন। যখন তিনি জ্ঞান ফিরে পেলেন তখন বললেন, 'মহিমাময় আপনি, আমি অনুতপ্ত হয়ে আপনার কাছে তাওবাহ করছি এবং মুমিনদের মধ্যে আমিই প্রথম'।” [সূরা আল-আ'রাফ: ১৪৩]
৬৩৫. অর্থাৎ আল্লাহকে দেখার আব্দার করার কারণে যেহেতু পাহাড়ে তাঁর উদ্ভাসন পড়লো পাহাড় চূর্ণ হয়ে গেল, সেহেতু যে কেউ আল্লাহকে দেখার জন্য অন্তরে আল্লাহর উদ্ভাসন কামনা করে সেখানে কোনো প্রকার (তাশবীহ) সাদৃশ্য, (তামসীল) উদাহরণ, (নাযীর) দৃষ্টান্ত, ও (মুসাওয়ী) সমপর্যায়ের কিছু আসবে তখন তার অন্তর চূর্ণ হয়ে যাবে।
এ ধরনের তাফসীরকে বলা হয় তাফসীরে ইশারী বা সূফীদের ইঙ্গিতপূর্ণ তাফসীর। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এগুলো অনেকটা ফকীহগণের কিয়াসের মতো। তা শুদ্ধও হতে পারে, আবার অশুদ্ধও হতে পারে। আবার তিনি স্পষ্ট করেও বলেছেন যে, এসবের অধিকাংশই তাফসীরের পর্যায়ে পড়ে না। বরং এগুলোকে শিক্ষা নেয়ার উপকরণ ও কিয়াসের মতো মনে করতে হবে। এগুলো জ্ঞানের একটি বিশুদ্ধ পদ্ধতিও হয়। যেমন, আল্লাহর বাণী, "যারা সম্পূর্ণ পবিত্র তারা ছাড়া অন্য কেউ তা স্পর্শ করে না।" [সূরা আল-ওয়াকি'আহ: ৭৯] এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী "ফেরেশতারা এমন ঘরে প্রবেশ করেন না যেখানে কুকুর থাকে”। [বুখারী, আল- জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ৩২২৫; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২১০৬] যদি কুরআনের কাগজ ধরতেই 'পবিত্ররা ব্যতীত কেউ তা স্পর্শ করতে না পারে' [সূরা আল-ওয়াকি'আহ: ৭৯] তাহলে সেসব কাগজে লিখা বাণীর মর্মার্থ পবিত্র অন্তরবিশিষ্ট ব্যক্তিরা ছাড়া অন্যরা কীভাবে প্রাপ্ত হবে? যদি ফিরিশতা এমন ঘরে প্রবেশ না করে যেখানে কুকুর রয়েছে, তাহলে যেসব মর্মার্থ ফিরিশতারা পছন্দ করে সেগুলো এমন অন্তরে প্রবেশ করবে না যেগুলোতে নিন্দিত কুকুরের চরিত্র রয়েছে। আর ফিরিশতারাও তাদের কাছে আসে না। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, আস-সাব'ঈনিয়্যাহ, (বুগইয়াতুল মুরতাদ) পৃ. ২১৬; ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/৫৫১); শারহু হাদীসিন নুযুল; জামে'উল মাসায়িল (৪/৬৫)।
ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এ ধরনের তাফসীর সম্পর্কে বলেন, এর মধ্যকার যে কথাগুলো স্বয়ং বিশুদ্ধ ও যথাযথ, কিন্তু সেগুলোর পক্ষে যদি কেউ কুরআন ও সুন্নাহ'র এমন সব শব্দ দিয়ে প্রমাণ নেয়ার চেষ্টা করে যা আসলেই বাহ্যিকভাবে তা বুঝায় না, সেগুলোকেই বলা হয় 'ইশারাত' (ইঙ্গিতপূর্ণ) বা 'হাক্বায়িকুত তাফসীর' (হাক্বীক্বতের তাফসীর)। ইমাম আবু আব্দুর রহমান আস- সুলামী এ অধ্যায়ে অনেক বেশি লিখেছেন। অনেকের কাছে এ বিষয়টি সন্দেহপূর্ণ মনে হতে পারে; কেননা এর অর্থ ও মর্মটি বিশুদ্ধ; এর ওপর কুরআন ও সহীহ হাদীসের প্রমাণ রয়েছে, কিন্তু সমস্যা হচ্ছে যে আয়াতের ক্ষেত্রে এরা যা বলছে এ আয়াত থাকে তা কীভাবে গ্রহণ করা হবে? বস্তুত এ সমস্ত তাফসীর দু' প্রকার: প্রথম প্রকার: যদি বলা হয় এ অর্থগুলো এ শব্দ দ্বারা উদ্দেশ্য, তবে নিঃসন্দেহে তা আল্লাহর ওপর মিথ্যা অপবাদ। যেমন কেউ বলল, 'তাযবাহু বাক্বারাহ' [সূরা আল-বাক্বারাহ: ৬৭] অর্থ আত্মাকে নিঃশেষ করে দাও, 'ইযহাব ইলা ফির'আউন' [সূরা ত্বা-হা: ২৪] অর্থ 'কলব বা হৃদয়। 'ওয়াল্লাযীনা মা'আহু' অর্থ আবু বকর, 'আশিদ্দাউ আলাল কুফফার' অর্থ উমার, 'রুহামাউ বাইনাহুম' অর্থ উসমান, 'তারাহুম রুক্কা'আন সুজ্জাদান' এর অর্থ আলী [সূরা আল-ফাতহ: ২৯] এ রকম অর্থ করে যদি বলে যে এগুলো আরবী শব্দ থেকে বুঝা যায় তবে সে আল্লাহর ওপর মিথ্যারোপ করলো, হয় ইচ্ছা করে নতুবা ভুল করে মিথ্যারোপ করলো।
দ্বিতীয় প্রকার: আর যদি এ অর্থগুলোকে শিক্ষা অর্জন ও কিয়াস আকারে গ্রহণ করে, শব্দের দাবি হিসেবে নয়, তবে এটি কিয়াস এর অন্তর্ভুক্ত। তখন ফকীহগণ যেটাকে 'কিয়াস' বলে থাকেন সেটাই তাফসীরবিদগণের নিকট 'ইশারা' বলে বিবেচিত হবে। আর এ ধরনের 'ইশারা' বা ইঙ্গিতপূর্ণ অর্থ শুদ্ধও হতে পারে আবার বাতিলও হতে পারে, যেমনিভাবে কিয়াস কখনও শুদ্ধ হয় আবার কখনও তা বাতিল হয়। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (১৩/২৪০)। ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রাহিমাহুল্লাহ যখন 'ফিরিশতারা প্রবেশ করে না...' এ হাদীস আলোচনা করলেন তখন বললেন, 'যদি কুকুর ও ছবি ফিরিশতাদেরকে ঘরে প্রবেশ করতে বাঁধা প্রদান করে, তাহলে রব্ব এর মা'রিফাত এমন অন্তরে কীভাবে প্রবেশ করবে যা প্রবৃত্তির কুকুর ও প্রবৃত্তির ছবিতে পূর্ণ হয়ে আছে?... এ জাতীয় 'ইশারা' বা ইঙ্গিতপূর্ণ ব্যাখ্যা বিশুদ্ধ। এগুলো ফকীহগণের কিয়াসের মতোই। বরং ফকীহগণের অনেক কিয়াসের চেয়েও তা বেশি বিশুদ্ধ। দেখুন, ইবনুল কাইয়্যেম, আল-কালামু আলা মাসআলাতি সামা' পৃ. ৩৯৭-৩৯৮ সংক্ষিপ্তাকারে। আলেমগণ এ ধরনের ইশারী তাফসীর ও ইশারী ব্যাখ্যা নিয়ে দু'টি মতে বিভক্ত। বিশুদ্ধ কথা হচ্ছে উপরে ইবন তাইমিয়্যাহ ও ইবনুল কাইয়েম রাহিমাহুমাল্লাহ থেকে ইতোপূর্বে যা আমরা উল্লেখ করেছি তাই। সূফীদের তাফসীরে ইশারী বিষয়ে বিস্তারিত দেখা যেতে পারে, ড. মুহাম্মাদ হুসাইন আয-যাহাবী, আত-তাফসীর ওয়াল মুফাসসিরূন (২/৩৮১); ড. খালেদ আব্দুর রহমান আল-'আক্ক, উসুলুত তাফসীর ওয়া ক্বাওয়া'য়িদুস্থ, পৃ. ২০৫; ড. জ্বাহের মুহাম্মাদ ইয়া'কুব, আসবাবুল খাত্বা ফিত তাফসীর (২/৭৪০)।
৬৩৬. এর দ্বারা তার উদ্দেশ্য আল্লাহর সর্বোচ্চ ও সর্বোজ্জ্বল সত্তা হওয়ার কথা বলা।
৬৩৭. আল্লাহ তা'আলার সকল গুণকে 'কাদীম' বলা সঠিক নয়। কারণ তাঁর কর্মগত গুণগুলো তিনি তাঁর ইচ্ছা অনুসারে যখন ইচ্ছা তখন তিনি করেন। তবে কর্মের মূল সূত্র 'কাদীম' কিন্তু সেটার একক কোনো কাজ নতুন করে সংঘটিত হয়। যেমনটি শাইখ আব্দুর রহমান আস-সা'দী বলেন, 'কর্মগত গুণগুলোর আসল অবশ্যই 'ক্বাদীম' যা সর্বদা ছিল ও সর্বদা থাকবে। আর তার একক কোনো অংশ সর্বদা নতুনভাবে সংঘটিত হবে তাঁর ইচ্ছা অনুসারে'। [আজওয়িবাতুস সা'দিয়্যাহ, পৃ. ১৩৯]
৬৩৮. আল্লাহর সত্তাগত গুণের ব্যাপারে এটি সঠিক কথা। কিন্তু আল্লাহর কর্মগত পছন্দ করা গুণের ব্যাপারে এটি যথাযথ নয়। কারণ আল্লাহর কর্মগত পছন্দ করা গুণগুলো তিনি যখন ইচ্ছা তখন করবেন এটাই হচ্ছে তাঁর পূর্ণতার ওপর প্রমাণ। বস্তুত আল্লাহর কর্মের ব্যাপারে মানুষ তিনভাগে বিভক্ত: ১- জাহমিয়্যাহ, মু'তাযিলা ও তাদের অনুসারীদের মতে, আল্লাহর কোনো গুণই নেই, সবই আল্লাহ থেকে আলাদা কর্ম বা সৃষ্টি। ২- কুল্লাবিয়্যাহ সম্প্রদায় দু'টি নীতিতে বিশ্বাসী। হয় এসব কর্ম আল্লাহর সত্তার সাথেই সম্পৃক্ত আর সত্তার মতোই 'ক্বাদীম' (সত্তাগত গুণ)। অথবা এগুলো আল্লাহ থেকে আলাদা কর্ম, তাঁর সত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট নয় (সৃষ্টি)। ৩- অধিকাংশ আসহাবুল হাদীস ও আহলে কালামদের একটি গোষ্ঠীর মত হচ্ছে, আল্লাহর সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড তিন প্রকার: এক, যা সত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট, (সত্তাগত গুণ) দুই. যা সত্তা থেকে আলাদা কর্ম (সৃষ্টি) তিন, আরেকটি প্রকার রয়েছে যা উপরের দু' শ্রেণির লোক উল্লেখ করেনি, তা হচ্ছে, আল্লাহর সত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট এমন কিছু কর্ম যা তিনি যখন ইচ্ছা তখন ঘটিয়ে থাকেন। আর সেগুলো ভিন্ন সত্তায় পরিণত হয়নি। যেমন আরশের উপরে উঠা, নিকটতম আসমানে অবতরণ, সন্তুষ্ট হওয়া, রাগ করা ইত্যাদি। এরা আবার দু'ভাগে বিভক্ত: ক. যারা এ তৃতীয় প্রকার কর্মটিকে সম্পূর্ণ নতুন বা 'হাদেস' বলে থাকে; তারা হচ্ছে কাররামিয়্যাহ সম্প্রদায়। খ. যারা এ তৃতীয় প্রকার কর্মটিকে মৌলিকভাবে (তিনি আল্লাহ সবকিছু করতে সক্ষম এ হিসেবে) 'ক্বাদীম' তবে এর এককটি অনুষ্ঠিত হওয়ার দিক থেকে হাদেস। তারা মৌলিকভাবে 'হাদেস' হওয়া ও বিশেষ একক 'হাদেস' হওয়ার মধ্যে পার্থক্য করে থাকেন। আর তাই হচ্ছে অধিকাংশ আসহাবুল হাদীস ও তাদের অনুসারীগণের মত। তারা বলেন, কোনো জিনিসের প্রকার অবশিষ্ট থাকা ও নির্দিষ্ট একক অবশিষ্ট থাকা এক কথা নয়। তারা উদাহরণ দিয়ে বলে থাকেন, জান্নাতের নি'আমতগুলোর প্রকার-প্রকরণ কখনও নিঃশেষ হবে না, কিন্তু তা থেকে যা একবার খাওয়া হবে সে একক তো আর অবশিষ্ট থাকবে না। অপরদিকে সব 'হাদেস' নিঃশেষ হয়ে যাবে এমন নয়। নির্দিষ্ট কোনো হাদেসও অবশিষ্ট থাকে, যেমন মানুষের রূহ; তা অবশ্যই 'হাদেস', আগে ছিল না, পরে অস্তিত্বে এসেছে। কিন্তু সেগুলো অবশিষ্ট থাকবে (সুতরাং 'হাদেস' হলেই সেটা ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে সেটা সঠিক নয়)। দেখুন, দারউত তা'আরুদ্ব (২/১৪৭-১৪৮)।
৬৩৯. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আল্লাহর (সিফাতে ইখতিয়ারিয়্যাহ) পছন্দনীয় কর্মগত গুণগুলো যখন অস্তিত্বে আসে তখন সেটি আল্লাহর পূর্ণগুণের অর্থজ্ঞাপক হয়। সেগুলো অস্তিত্বে আসার আগে সে পূর্ণতার অর্থ প্রদান করতো না। যেমন আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক মূসা 'আলাইহিস সালামের সাথে কথা বলা, তাকে ডাকা। এখানে যখন আল্লাহ তা'আলা নবী মূসাকে ডেকেছেন তখন সেটি পূর্ণ গুণের অর্থজ্ঞাপক হয়েছে। যদি মূসা 'আলাইহিস সালাম সেখানে আসার আগে তাকে ডাকতেন তবে সেটা অপূর্ণ বলে বিবেচিত হতো। সুতরাং আল্লাহর গুণ যখন যেটা তিনি অস্তিত্বে আনয়ন করেন তখন সেটা পূর্ণতার ওপর প্রমাণবহ থাকে। অস্তিত্বে আসার আগে সেটি পূর্ণতা জ্ঞাপক নয়। বরং যে সময় অস্তিত্বে আসা তার হিকমত ও প্রজ্ঞার চাহিদা বলে বিবেচিত হয় সেসময়ের আগে তা অস্তিত্বে আসা অপূর্ণতার ওপরই প্রমাণবহ। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৬/২৪১)।
৬৪০. অর্থাৎ এ গুণগুলো দ্বারা তিনি সর্বদা গুণান্বিত ছিলেন, আযালী কাল থেকেই। কখনও তিনি এগুলো থেকে মুক্ত ছিলেন না। এজন্যই ইবন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা আল্লাহর বাণী, "আল্লাহ হলেন ক্ষমাশীল ও দয়ার্দ্র", অনুরূপ আল্লাহর বাণী, "আর আল্লাহ হলেন সর্বজ্ঞ ও সর্ববিজ্ঞ", এবং অনুরূপ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলতেন, তিনি সর্বদা এগুলো দ্বারা গুণান্বিত ছিলেন, এখনো আছেন এবং সর্বদা থাকবেন। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া ৫/৫৩৮-৫৩৯, ৫৫২-৫৫৩।
৬৪১. বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। সত্য হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপর উঠেছেন, পূর্বে তিনি 'আরশের উপর ছিলেন না। যেমনটি 'তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠলেন' [সূরা আল-আ'রাফ, ৫৪ সূরা ইউনুস: ৩; সূরা আর-রা'দ: ২; সূরা ত্বা-হা: ০৫; সূরা আল-ফুরক্বান: ৫৯; সূরা আস-সাজদাহ: ০৪; সূরা আল-হাদীদ: ০৪] এ আয়াতের বাহ্যিক অর্থের দ্বারা সাব্যস্ত হচ্ছে। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৬/১৫০)। সুতরাং ইমাম 'আমর ইবন উসমান আল-মক্কীর উপরোক্ত বক্তব্য থেকে হয়ত কারো মনে হতে পারে যে, তিনি আল্লাহর 'আরশের উপর উঠাকে সত্তাগত গুণ বলেছেন। আসলে কিন্তু তা নয়, বস্তুত তা কর্মগত গুণ। ইস্তেওয়া বা 'আরশের উপর উঠা তাঁর একটি গুণ, যা তিনি তাঁর ইচ্ছা ও ক্ষমতায় করেছেন। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/২১৬, ৫২৩, ৪১০)। ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, 'যারা 'ইস্তেওয়া'কে আল্লাহর সত্তাগত গুণ বলেন তারা এ তা'ওয়ীল করে থাকে যে, তিনি 'আরশের উপর ক্ষমতাবান হলেন। বস্তুত এটা শুদ্ধ নয়; কারণ যেহেতু ক্ষমতা তার পূর্বেই ছিল, সর্বদাই তিনি সম্মানের দিক থেকে উপরে ছিলেন; সুতরাং বুঝা গেল যে, যারা এ গুণটিকে সত্তাগত গুণ বলেছেন তাদের বক্তব্য অতিশয় দুর্বল; কারণ: ১- আল্লাহ বলেছেন, 'তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠলেন'। আর 'তারপর' অর্থই হচ্ছে তা পরে করেছেন। ২- আল্লাহ তা'আলা এর আগে বলেছেন, সৃষ্টি করেছেন.... উপরে উঠেছেন। সুতরাং একটি ক্রিয়ার উপর আরেকটি ক্রিয়ার 'আত্বফ' বা সংযুক্তি স্থাপন করেছেন। যাতে বুঝা যায় তা কর্মই ছিল যেমনটি সৃষ্টি একটি কর্ম। অর্থাৎ সৃষ্টি করেছেন তারপর উঠেছেন। [মাজমূ' ফাতাওয়া (১৬/৩৯৫)] এখানে অবশ্য 'আমর ইবন উসমান আল-মাক্কীর কথার আরেকটি অর্থ করা যায়, তা হচ্ছে, তিনি আল্লাহ 'আরশের উপর উঠা' এটা না করেও পরিপূর্ণ ছিলেন, এটা করে পূর্ণ হয়েছেন এমন নয়, তাহলে সে অর্থ শুদ্ধ হবে।
৬৪২. এর দ্বারা 'আমর ইবন উসমান আল-মাক্কীর উদ্দেশ্য যদি এটা হয় যে আল্লাহ তা'আলা আযাল বা পূর্ব থেকেই পূর্ণতার গুণে গুণান্বিত তাহলে সেটা বিশুদ্ধ অর্থ। কিন্তু যদি এটা মনে করে থাকেন যে মহান আল্লাহর কর্মকাণ্ড নতুন করে হয় না, তাহলে তার কথা অগ্রহণযোগ্য।
৬৪৩. এটিও সঠিক নয়। কারণ কর্ম যখন কর্তা ইচ্ছা করেন তখনই হয়। কর্তা ইচ্ছা করার আগেই কর্ম হয়ে আছে এমন কথা বলা ঠিক নয়। সম্ভবত 'আমর ইবন উসমান আল-মাক্কী রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহর কর্মগত সিফাতকেও প্রাচীন মনে করতেন।
৬৪৪. অর্থাৎ আল্লাহ বাণীতে যেখানে আল্লাহ বলেছেন, “অতঃপর যখন মূসা আগুনের কাছে পৌঁছলেন তখন উপত্যকার ডান পাশে বরকতময় ভূমির উপর অবস্থিত সুনির্দিষ্ট গাছের দিক থেকে তাকে ডেকে বলা হল, 'হে মূসা! আমিই আল্লাহ, সৃষ্টিকুলের রব্ব।” [সূরা আল-কাসাস: ৩০] এর মাধ্যমে জাহমিয়্যাহ ও পরবর্তী মু'তাযিলাদের বক্তব্যের খণ্ডন রয়েছে, যারা বলে থাকে যে উপরোক্ত বাণী গাছ থেকেই এসেছে, আল্লাহ থেকে নয়। কেননা তারা আল্লাহর বান্দাকে সৃষ্ট বলে থাকে, গুণ বলে না। তাদের কথার দাবি হচ্ছে গাছই বলেছে, "হে মূসা নিশ্চয় আমিই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন"! দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (১৬/১৫৩); ইবন আবিল ইয্য, শারহুত ত্বাহাওয়িয়্যাহ (১/১৮২); ইবনুল কাইয়্যেম, নূনিয়্যাহ, হাররাসের ব্যাখ্যাসহ (১/১১৪-১১৫)।
৬৪৫. বক্তব্যটি বিবিধ অর্থের সম্ভাবনাময়। তবে বিশুদ্ধ কথা হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের মাঠে আসবেন, আগমনকারী না থাকার পরে। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (১৬/১৫১)। যেমনটি ইবন তাইমিয়্যাহ'র বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ গ্রন্থে এসেছে, 'তিনি আগমনকারী হবেন, আগমনকারী না থাকার পরে। তবে এ অর্থটি (যা উপরে বর্ণিত হয়েছে এবং যা বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ গ্রন্থে এসেছে) বর্তমান ফাতওয়া আল-হামাউইয়্যাহ এর সকল ছাপা ও ইমাম যাহাবীর আল-'উলু লিল 'আলিয়্যিল 'আযীম গ্রন্থে যা এসেছে তার বিপরীত। সেখানে এসেছে, 'তিনি আগমনকারী হবেন, আগমনকারী হওয়ার আগেই'। [শাইখ, ড. আব্দুল আযীয আলে আব্দুল লতীফ, আত-তা'লীক আলাল ফাতাওয়া আল-হামওয়িয়্যাহ আল-কুবরা, পৃ. ১৭১] অবশ্য কেউ কেউ বুঝেছেন যে, তিনি (আমর ইবন উসমান আল-মাক্কী) এখানে আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক হাশরের মাঠে আগমনের জন্য 'জাআ' বা অতীতকালের ক্রিয়া ব্যবহারের কারণ বর্ণনা করছেন। [সূরা আল-ফাজর: ২২] আর তা হচ্ছে তিনি আগমনকারী গুণে গুণান্বিত হবেন যেভাবে তাঁর জন্য উপযোগী সে রকম করে, যদিও সে কর্মটি এখনও ঘটেনি, কারণ তা ঘটা অবশ্যম্ভাবী। যেমনটি আল্লাহ তা'আলা কুরআনের অন্যত্রও বলেছেন, 'আল্লাহ নির্দেশ এসে গেছে সুতরাং তোমরা সেটাকে নিয়ে তাড়াতাড়ি করো না' [সূরা আন-নাহল: ০১] এখানেও কাফেরদের শাস্তি আসার বিষয়টি অবশ্যম্ভাবী হওয়ায় অতীত কালের ক্রিয়া 'আতা' ব্যবহার করা হয়েছে। আবার কেউ কেউ বুঝেছেন, মহান আল্লাহ যেভাবে ক্ষমা করার আগেও ক্ষমা করার গুণে গুণান্বিত, দয়া করার আগেও দয়া করার গুণে গুণান্বিত সে হিসেবে আল্লাহ তা'আলা হাশরের মাঠে আসার আগেই 'আগমনকারী' গুণটি তাঁর জন্য ব্যবহার করা যাবে, কারণ তা ঘটা অবশ্যম্ভাবী। [আল- ফাতাওয়া আল-হামাওয়িয়্যাহ'র ওপর হামাদ আত-তুয়াইজরীর ব্যাখ্যা, পৃ. ৩৮৩]
৬৪৬. এর মাধ্যমে আশায়েরাদের অপব্যাখ্যাকে খণ্ডন করা হয়েছে। কারণ তাদের কেউ কেউ বলে থাকে যে, হাশরের মাঠে আল্লাহর আসার অর্থ তাঁর নির্দেশ আসা। তাছাড়া তাঁর নির্দেশ তো সর্বদাই আসছে তাহলে কিয়ামতের দিন সেটাকে আলাদা করে বর্ণনা করার কী প্রয়োজন? তদ্রূপ যদি তোমরা এভাবে শব্দ উহ্য ধরে নিয়ে অর্থ করে যাও তাহলে তোমরা যে সাতটি গুণ সাব্যস্ত করেছ সেখানেও উহ্য ধরা যাবে। যদি সেখানে ধরতে তোমরা রাযী না হও তাহলে অন্যত্রও এভাবে শব্দ উহ্য ধরতে পার না। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (১৬/৪১৯)।
৬৪৭. যেমন কুরআনে কারীমে এসেছে, "সেদিন কিছু মুখ উজ্জল হবে এবং কিছু মুখ কালো হবে; যাদের মুখ কালো হবে (তাদেরকে বলা হবে), 'তোমরা কি ঈমান আনার পর কুফরী করেছিলে? সুতরাং তোমরা শাস্তি ভোগ কর, যেহেতু তোমরা কুফরী করতে'।" [সূরা আলে ইমরান: ১০৬] আরও এসেছে, "সেদিন কোনো কোনো মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে।" [সূরা আল-কিয়ামাহ: ২২] আরও এসেছে, "পরিণামে আল্লাহ তাদেরকে রক্ষা করবেন সে দিনের অনিষ্ট হতে এবং তাদেরকে প্রদান করবেন হাস্যোজ্জ্বলতা ও উৎফুল্লতা।" [সূরা আল-ইনসান: ১১] আরও এসেছে, "আপনি তাদের মুখমণ্ডলে স্বাচ্ছন্দ্যের দীপ্তি দেখতে পাবেন।" [সূরা আল-মুত্বাফফিফীন: ২৪]
৬৪৮. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এটা স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন যে, নবীদের নবুওয়াতের ওপর প্রমাণাদিকে কুরআনে কারীমে তিনটি নামে অভিহিত করা হয়েছে: ১- আয়াত বা নিদর্শনাবলি। ২- বারাহীন বা প্রমাণাদি। ৩- বাইয়্যেনাত বা স্পষ্টকারী দলীল। দেখুন, আন-নাবুওয়াত (২/৮২৮-৮২৯)।
৬৪৯. যেমন আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় যমীন ও তার উপর যারা আছে তাদের চূড়ান্ত মালিকানা আমাদেরই থাকবে এবং আমাদেরই কাছে তারা প্রত্যাবর্তিত হবে।” [সূরা মারইয়াম: ৪০] অন্যত্র বলেন, "আর আমরা বহু জনপদকে ধ্বংস করেছি যার বাসিন্দারা নিজেদের ভোগ-সম্পদের অহংকার করত! এগুলোই তো তাদের ঘরবাড়ী; তাদের পর এগুলোতে লোকজন সামান্যই বসবাস করেছে। আর আমরাই তো চুড়ান্ত ওয়ারিশ (প্রকৃত মালিক)!" [সূরা আল-ক্বাসাস: ৫৮] অন্যত্র বলেন, "আর আমরাই জীবন দান করি ও মৃত্যু ঘটাই এবং আমরাই চুড়ান্ত মালিকানার অধিকারী।" [সূরা আল- হিজর: ২৩] এসব আয়াতে ওয়ারিস হওয়ার অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা সকল সৃষ্টির ওপর ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন হওয়া লিখে দিয়েছেন, মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা ব্যতীত কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। সুতরাং তিনিই সকল সৃষ্টির একমাত্র ওয়ারিস। এ অবস্থায় যেন তিনিই যমীনের বুকে যারা আছে তাদের সবার ওয়ারিস হলেন।
৬৫০. এখানেও দেখা যাচ্ছে, তিনি আশা'য়েরা ও মাতুরিদিয়াদের মত খণ্ডন করেছেন। কারণ আমরা জানি যে, আশা'য়েরা ও মাতুরিদিয়ারা 'ইয়াদ' এর অর্থ হাত না করে 'নি'আমত' করে থাকে।
৬৫১. সম্ভবত এখানে নির্দেশ দ্বারা বুঝিয়েছেন সূরা বনী ইসরাঈলের ৮৫ নং আয়াতের কথা বলেছেন। যেখানে রূহকে আল্লাহর নির্দেশের একটি বলা হয়েছে। কিন্তু সে রূহকে অনেকেই মানুষের রূহ বললেও সকলে এ ব্যাপারে একমত নয়। তবে একটি কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, এখানে 'আমর' বা নির্দেশ বলে 'মা'মুর' বা 'নির্দেশদ্বারা সৃষ্ট' এটা বুঝানো হয়েছে। কারণ আল্লাহর 'আমর' তার বাণী। আর তার বাণী দ্বারা সৃষ্ট জিনিসই রূহ। 'আমর' বা নির্দেশ তো বাণী, যা কখনো সৃষ্ট নয়। আর রূহ অবশ্যই সৃষ্ট জিনিস। বিষয়টি অন্য জায়গাতেও প্রযোজ্য। আর রূহ তাঁর সিফাতও নয়।
৬৫২. 'লেগে যাওয়া' কথাটি অতিরিক্ত। তিনি যদি তা না বলতেন তবে অনেক ভালো হতো। কারণ এ শব্দটি কুরআন ও হাদীসের ভাষ্য দ্বারা সাব্যস্ত হয়নি আবার নিষেধও করা হয়নি। বরং এভাবে 'লেগে যাওয়া থেকে পবিত্র' কথাটি বিশুদ্ধ না হওয়াই বেশি যৌক্তিক। কারণ আল্লাহ তা'আলা নিজ হাতে জান্নাতু আদনের গাছ লাগিয়েছেন, আদমকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন, নিজ হাতে তাওরাত লিখেছেন ইত্যাদি দ্বারা বুঝা যায় সৃষ্টির সাথে লেগে যাওয়া দোষণীয় নয়। তাছাড়া তিনি 'আরশের উপর সত্তাগতভাবে থাকা দ্বারা প্রকাশ্যভাবে সেটার উপরে থাকাকে অস্বীকার করে না। যা থেকে বুঝা গেল যে এ শেষোক্ত বাক্য 'লেগে থাকা থেকে পবিত্র' এটা বলা যাবে না। বরং এখানে চুপ থাকা আবশ্যক। তাই এটি সাব্যস্ত কিংবা অসাব্যস্ত কিছুই করা যাবে না। [সালেহ আব্দুল আযীয আলে আশ-শাইখ, শারহুল হামাওয়িয়্যাহ, পৃ. ৭৫]
৬৫৩. অর্থাৎ আল্লাহ ও তাঁর কোনো গুণ সৃষ্টির কারও অভ্যন্তরে প্রবেশ করা, কোনো শরীরে মিশে যাওয়া, কারও সাথে লেগে যাওয়া থেকে পবিত্র। আদম সৃষ্টির পরে যে ফুঁক ও নির্দেশ দানের মাধ্যমে তাতে রূহের সঞ্চার করেছেন তা অবশ্যই সৃষ্ট। মহান আল্লাহর কোনো অংশ সৃষ্টির অভ্যন্তরে থাকার কথা ঈমানদার কখনো বলতে পারে না।
৬৫৪. আল্লাহ 'আমর ইবন উসমান' রাহিমাহুল্লাহকে ক্ষমা করুন, তিনি সম্ভবত সূরা 'ক্বাফ' এর ১৬ নং আয়াতের মাধ্যমে দলীল নিয়ে ‘ঘাঁড়ের রগের নিকটবর্তী’ বলে আল্লাহ তা'আলাকে বুঝাতে চেয়েছেন। অথচ আমরা ইতোপূর্বে জেনেছি যে, আল্লাহর নৈকট্য কেবল বিশেষ লোকদের জন্য হয়, আর তা হয় সাড়া দেয়া ও সাওয়াব দেয়া এ দু'টির জন্য। এভাবে সর্বসাধারণের ব্যাপারে আসা ‘কুরব’ দ্বারা আল্লাহকে বুঝানো হয়নি, আল্লাহর বাহিনী ফিরিশতাদেরকে বুঝানো হয়েছে। এ ব্যাপারে তাফসীরে ইবনে কাসীর দেখা যেতে পারে। তাছাড়া এটিই শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ বিভিন্ন গ্রন্থে সাব্যস্ত করেছেন।
৬৫৫. আল্লাহ 'আমর ইবন উসমান' রাহিমাহুল্লাহকে ক্ষমা করুন। আমরা আগেই জেনেছি যে, আল্লাহ তা'আলাকে দূরবর্তী গুণে গুণান্বিত করা যাবে না। এ গুণটি আল্লাহর জন্য কুরআন ও হাদীসে সাব্যস্ত হয়নি।
৬৫৬. 'আমর ইবন উসমান আল-মাক্কী রাহিমাহুল্লাহ'র এ বক্তব্য যে গ্রন্থ থেকে শাইখুল ইসলাম নিয়েছেন তা বর্তমানে হারিয়ে গেছে। তবে অন্য যেসব কিতাবে তা এসেছে তন্মধ্যে রয়েছে: ১- আবু নু'আইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া (১০/২৯১-২৯২)। ২- খতীব বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ (১/২২৩-২৩৪)। ৩- সুলামী, ত্বাবাক্বাতুস সূফিয়্যাহ, পৃ. ২০২। ৪- যাহাবী, আল-'উলু লিল 'আলিয়ি্যল 'আযীম, পৃ. ১৫৫। ৫- মুখতাসারুল উলু, ২২৯-২৩০। ৬- ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুয়ুশ, পৃ. ২৭৪। ৭- ইবনুল 'ইমাদ, শাযরাতুয যাহাব (২/২২৬)। ৮- মানাওয়ী, আল-কাওয়াকিবুদ দুররিয়্যাহ ফী তারাজিমিস সাদাতিস সূফিয়্যাহ, পৃ. ২৫৯। ৯- শা'রানী, আত-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা (১/৯৮)। তবে অনেকে সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন। আবার কেউ কেউ বিস্তারিত নিয়ে এসেছেন।