📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 ইবন আবী যামানীন কর্তৃক আল্লাহর গদীর আলোচনা

📄 ইবন আবী যামানীন কর্তৃক আল্লাহর গদীর আলোচনা


অতঃপর তিনি বলেন: অধ্যায়: পর্দার ওপর ঈমান(৫৩১)
তিনি বলেন, আহলুস সুন্নাহের কথা হচ্ছে- নিশ্চয় আল্লাহ সৃষ্টিকুল থেকে পৃথক। পর্দার দ্বারা তিনি তাদের থেকে আড়াল। সুতরাং যালিমরা যা বলে তার থেকে আল্লাহ বিশাল ঊর্ধ্বে।
كَبُرَتْ كَلِمَةً تَخْرُجُ مِنْ أَفْوَاهِهِمْ إِن يَقُولُونَ إِلَّا كَذِبًا ﴾ [الكهف: ٥]
"তাদের মুখ থেকে বের হওয়া বাক্য কী সাংঘাতিক! তারা তো শুধু মিথ্যাই বলে।” [সূরা আল-কাহফ: ০৫] আর তিনি(৫৩৩) হাজাব তথা পর্দার অনেক হাদীস উল্লেখ করেন(৫০৪)।

টিকাঃ
৫৩১. ইবন আবী যামানীন, উসূলুস সুন্নাহ (১/২৬৪)।
৫৩২. আহলুস সুন্নাতে ওয়াল জামা'আতের আকীদাহ হচ্ছে আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৃষ্টি থেকে পর্দার আড়ালে রয়েছেন। দুনিয়ার জগতে কেউ তাঁকে দেখতে সমর্থ নয়। কারণ এসব চোখ ও এসব শরীর ধ্বংস হওয়ার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। সুতরাং মানুষ দুনিয়া থাকাকালীন যদি আল্লাহ তাঁর পর্দা উন্মুক্ত করেন তবে তাঁর চেহারার নূর যতটুকু তাঁর চোখ যাবে সৃষ্টির ততটুকু পুড়িয়ে দিবে। আর সেভাবে চূর্ণ হয়ে যাবে যেভাবে মূসার পাহাড় চূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। এ পর্দাগুলোর প্রকৃত ধরণ ও পরিমাণ একমাত্র আল্লাহই জানেন। কিন্তু কিয়ামতের দিন এমন চোখগুলো জুড়ে দেয়া হবে যা হবে স্থায়ী, তখন সেটাতে এমন ক্ষমতা দেয়া হবে যা দুনিয়ার জীবনে দেয়া হয়নি। ফলে তখন সে চোখগুলো আসমান ও যমীনের স্রষ্টা ও অভাব পূরণকারীর দিকে তাকাতে সমর্থ হবে। কুরআন ও সুন্নাহ'য় আল্লাহর পর্দা সাব্যস্ত করা হয়েছে। যেমন, ১- আল্লাহর বাণী: "আর কোনো মানুষেরই এমন মর্যাদা নেই যে, আল্লাহ তার সাথে কথা বলবেন ওহীর মাধ্যম ছাড়া, অথবা পর্দার আড়াল ছাড়া, অথবা এমন দূত প্রেরণ ছাড়া, যে দূত তাঁর অনুমতিক্রমে তিনি যা চান তা ওহী করেন, তিনি সর্বোচ্চ, হিকমতওয়ালা।” [সূরা আশ-শূরা: ৫১]
২- সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীস, আবু মূসা আল-আশ'আরী রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে পাঁচটি বাণী নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি বললেন, "নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা ঘুমান না, আর ঘুমানো তাঁর জন্য শোভনীয়ও নয়, তিনি ইনসাফের দণ্ড নিচু করে ও উপরে উঠান, তাঁর কাছে রাতের আমল দীনের আমলের আগে উঠানো হয়, আর দিনের আমল রাতের আমলের আগে উঠানো হয়। তাঁর পর্দা হচ্ছে নূরের, অপর বর্ণনায়, নার বা আগুনের। যদি তিনি তার পর্দা উন্মুক্ত করতেন তবে তার চেহারার উজ্জ্বল্য তাঁর সৃষ্টির যতটুকুতে তার চোখ পড়তো ততটুকু পুড়িয়ে দিত।” [মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ১৭৯]
৩- ইমাম উসমান ইবন সা'ঈদ আদ-দারেমী, আবুশ শাইখ ও বাইহাক্বী রাহিমাহুল্লাহ ইবন 'উমার রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে মাওকূফ সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, "আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৃষ্টি থেকে চারটি পর্দার আড়াল গ্রহণ করেছেন। আগুন, অন্ধকার, আলো ও অন্ধকার।” [উসমান ইবন সা'ঈদ আদ-দারেমী, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ, নং ১১৮; আবুশ শাইখ, আল-আযামাহ, নং ২৬৮; বাইহাক্বী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (২/১২৬), নং ৬৯৩] শাইখ নাসিরুদ্দীন আলবানী রাহিমাহুল্লাহ আছারটির সনদকে সহীহ বলেছেন। কোনো কোনো বিদ'আতী আল্লাহর জন্য পর্দা সাব্যস্ত করে না। ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, জাহমিয়‍্যারা কোনোভাবেই আল্লাহর হিজাব আছে স্বীকার করে না; কারণ তিনি তাদের নিকট আরশের উপর নেই। [ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ' ফাতাওয়া (৬/১০)]
বস্তুত কুরআন, সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কিরাম ও তাবে'য়ীনে 'ইযাম থেকে পর্দার ব্যাপারে অনেক ভাষ্য এসেছে। ইমামগণ যুগ যুগ ধরে তাদের গ্রন্থে এ বিষয়ের ওপর অধ্যায় বিন্যাস করে তাতে এর উপর প্রমাণবহ নস ও আছার নিয়ে এসেছেন। যেমন, ইমাম দারেমী রাহিমাহুল্লাহ তার আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ গ্রন্থে পৃ. ৬০-৬২, অধ্যায়: পর্দা গ্রহণ, তারপর তিনি এর ওপর বেশ কিছু আয়াত-হাদীস ও আছার নিয়ে এসেছেন। তারপর বলেন, 'আর এমন কে আছে যে মহা অধিপতি যে পর্দা দ্বারা আড়াল নিয়েছেন তার পরিমাণ নির্ধারণ করতে যাবে? আর কে জানতে পারবে সেটা কী রকম? একমাত্র তিনিই তো তা জানেন যিনি সকল কিছুকে ইলম দিয়ে পরিবেষ্টন করে আছেন এবং সবকিছুকে সংখ্যায় গুনে রেখেছেন। সুতরাং এতেও প্রমাণ রয়েছে যে, তিনি সৃষ্টি থেকে আলাদা, তাদের থেকে পর্দার আড়ালে। জিবরীল তাঁর নৈকট্যপ্রাপ্ত হওয়া সত্ত্বেও সেসব পর্দার নিকটে যাওয়ার সামর্থ রাখে না।... আরও দেখুন, মাজমু' ফাতাওয়া (৬/১০-১১)। কোনো কোনো বিদ'আতপন্থী লোকেরা আল্লাহর পর্দার অপব্যাখ্যা দাঁড় করে তা অস্বীকার করে। যেমন, ১- বাইহাক্বী বলেন, হিজাব বা পর্দা মূলত সৃষ্টির দিকে প্রত্যাবর্তিত স্রষ্টার নয়। [আল-আসমা ওয়াস সিফাত (২/১২৬, ২৯৩)] ২- রাযী তার তা'সীসুত তাক্বদীস গ্রন্থে পৃ. ১৩২ বলেন, আল্লাহর জন্য প্রকৃত পর্দা হওয়া অসম্ভব; কারণ পর্দা বা আড়াল বলতে বুঝায় এমন দেহ যা দু'টি দেহের মাঝখানে অবস্থান নেয়। তাই আমাদের নিকট পর্দার অর্থ, আল্লাহ তাঁকে দেখা সম্পৃক্ত কিছু বান্দার মাঝে সৃষ্টি করবেন না। আর যারা আল্লাহকে দেখা অস্বীকার করে তাদের নিকট পর্দার অর্থ, আল্লাহ তা'আলা তাঁর দয়া ও অনুগ্রহ বান্দার কাছে পৌছাবেন না।
ইবন তাইমিয়‍্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এর যথার্থ জবাব দেন এবং বর্ণনা করেন যে, এ তা'ওয়ীস বা অপব্যাখ্যা দু'টিই বাতিল। কারণ দেখা সৃষ্টি না করা তো নিছক অস্তিত্বহীন জিনিস। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তাঁর পর্দা হচ্ছে নূরের। তাহলে কীভাবে নিছক অস্তিত্বহীন জিনিস নূর হতে পারে? আর কীভাবেই এটা বলা যায় যে, "অতঃপর তিনি তাঁর পর্দা উন্মুক্ত করবেন তখন তারা তাঁর দিকে তাকাবে"। যে জিনিস নিছক অস্তিত্বহীন সেটাকে উন্মুক্ত কীভাবে করা যায়? তারপর এটি আমাদেরকে জানাও পৃথিবীর কোন ভাষায় কোনো নিছক অস্তিত্বহীন জিনিসকে 'হাজাব' বা পর্দা বলা হয়? আর জানা কথা যে, 'হিজাব' এর বিপরীত হচ্ছে 'হিজাবহীন'। তাহলে নিছক অস্তিত্বহীনকে কি এ গুণ দেয়া যায় যে, এটা হিজাব নয়? যদি হিজাব অস্তিত্বহীনকে বলা হতো তাহলে তো সেটা না হওয়ার দাবি হচ্ছে অস্তিত্বে আসা। তখন অস্তিত্বশীল বস্তু হয়ে দাঁড়াবে অস্তিত্বহীনের গুণ। আর এটা তো অত্যাবশ্যকভাবে নিষিদ্ধ।” দেখুন, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৬/৩৩৫- ৩৩৬)।
আবার অনেকে হিজাব এর অন্য তা'ওয়ীল বা অপব্যাখ্যাও করে, যেমন বিশর আল-মিররীসী সেগুলো নিয়ে এসেছে। কিন্তু ইমাম আবু সা'ঈদ আদ-দারেমী সেগুলো নিয়ে এসে একটি একটি করে খণ্ডন করেছেন। দেখুন, উসমান ইবন সা'ঈদ আদ-দারেমী, আর-রাদ্দু আলাল বিশর আল-মিররীসী (২/২৪৮).... অনুরূপ আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ, পৃ. ৭১-৭৩।
৫৩৩. অর্থাৎ ইমাম ইবন আবী যামানীন রাহিমাহুল্লাহ।
৫৩৪. এ হিজাব বা পর্দার কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম মি'রাজের রাত্রে আল্লাহকে দেখতে পাননি। সহীহ হাদীসে এসেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনি কি আল্লাহকে দেখেছেন? তিনি বললেন, সেখানে তো নূর ছিল, কীভাবে আমি তাকে দেখতে পাব'। [মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ১৭৮] অপর বর্ণনায় এসেছে, 'আমি তো কেবল নূর দেখতে পেয়েছি।' [মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ১৭৮; ইবন হিব্বান, আস-সহীহ (১/২৫৫); ইবন আবী আসেম, আস-সুন্নাহ, হাদীস নং ৪৪১; ইবন খুযাইমাহ, আত-তাওহীদ (২/৫১২)] এ ব্যাপারে বিদ'আতপন্থীদের বিকৃতি ও সেটার জবাব দেখুন, মাজমু' ফাতাওয়া (৬/৫০৭-৫০৮), (৩/৩৮৬-৩৯); ইবনুল কাইয়্যেম, যাদুল মা'আদ (৩/৩৭)।

অতঃপর তিনি বলেন: অধ্যায়: পর্দার ওপর ঈমান(৫৩১)
তিনি বলেন, আহলুস সুন্নাহের কথা হচ্ছে- নিশ্চয় আল্লাহ সৃষ্টিকুল থেকে পৃথক। পর্দার দ্বারা তিনি তাদের থেকে আড়াল। সুতরাং যালিমরা যা বলে তার থেকে আল্লাহ বিশাল ঊর্ধ্বে।
كَبُرَتْ كَلِمَةً تَخْرُجُ مِنْ أَفْوَاهِهِمْ إِن يَقُولُونَ إِلَّا كَذِبًا ﴾ [الكهف: ٥]
"তাদের মুখ থেকে বের হওয়া বাক্য কী সাংঘাতিক! তারা তো শুধু মিথ্যাই বলে।” [সূরা আল-কাহফ: ০৫] আর তিনি(৫৩৩) হাজাব তথা পর্দার অনেক হাদীস উল্লেখ করেন(৫০৪)।

টিকাঃ
৫৩১. ইবন আবী যামানীন, উসূলুস সুন্নাহ (১/২৬৪)।
৫৩২. আহলুস সুন্নাতে ওয়াল জামা'আতের আকীদাহ হচ্ছে আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৃষ্টি থেকে পর্দার আড়ালে রয়েছেন। দুনিয়ার জগতে কেউ তাঁকে দেখতে সমর্থ নয়। কারণ এসব চোখ ও এসব শরীর ধ্বংস হওয়ার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। সুতরাং মানুষ দুনিয়া থাকাকালীন যদি আল্লাহ তাঁর পর্দা উন্মুক্ত করেন তবে তাঁর চেহারার নূর যতটুকু তাঁর চোখ যাবে সৃষ্টির ততটুকু পুড়িয়ে দিবে। আর সেভাবে চূর্ণ হয়ে যাবে যেভাবে মূসার পাহাড় চূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। এ পর্দাগুলোর প্রকৃত ধরণ ও পরিমাণ একমাত্র আল্লাহই জানেন। কিন্তু কিয়ামতের দিন এমন চোখগুলো জুড়ে দেয়া হবে যা হবে স্থায়ী, তখন সেটাতে এমন ক্ষমতা দেয়া হবে যা দুনিয়ার জীবনে দেয়া হয়নি। ফলে তখন সে চোখগুলো আসমান ও যমীনের স্রষ্টা ও অভাব পূরণকারীর দিকে তাকাতে সমর্থ হবে। কুরআন ও সুন্নাহ'য় আল্লাহর পর্দা সাব্যস্ত করা হয়েছে। যেমন, ১- আল্লাহর বাণী: "আর কোনো মানুষেরই এমন মর্যাদা নেই যে, আল্লাহ তার সাথে কথা বলবেন ওহীর মাধ্যম ছাড়া, অথবা পর্দার আড়াল ছাড়া, অথবা এমন দূত প্রেরণ ছাড়া, যে দূত তাঁর অনুমতিক্রমে তিনি যা চান তা ওহী করেন, তিনি সর্বোচ্চ, হিকমতওয়ালা।” [সূরা আশ-শূরা: ৫১]
২- সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীস, আবু মূসা আল-আশ'আরী রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে পাঁচটি বাণী নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি বললেন, "নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা ঘুমান না, আর ঘুমানো তাঁর জন্য শোভনীয়ও নয়, তিনি ইনসাফের দণ্ড নিচু করে ও উপরে উঠান, তাঁর কাছে রাতের আমল দীনের আমলের আগে উঠানো হয়, আর দিনের আমল রাতের আমলের আগে উঠানো হয়। তাঁর পর্দা হচ্ছে নূরের, অপর বর্ণনায়, নার বা আগুনের। যদি তিনি তার পর্দা উন্মুক্ত করতেন তবে তার চেহারার উজ্জ্বল্য তাঁর সৃষ্টির যতটুকুতে তার চোখ পড়তো ততটুকু পুড়িয়ে দিত।” [মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ১৭৯]
৩- ইমাম উসমান ইবন সা'ঈদ আদ-দারেমী, আবুশ শাইখ ও বাইহাক্বী রাহিমাহুল্লাহ ইবন 'উমার রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে মাওকূফ সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, "আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৃষ্টি থেকে চারটি পর্দার আড়াল গ্রহণ করেছেন। আগুন, অন্ধকার, আলো ও অন্ধকার।” [উসমান ইবন সা'ঈদ আদ-দারেমী, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ, নং ১১৮; আবুশ শাইখ, আল-আযামাহ, নং ২৬৮; বাইহাক্বী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (২/১২৬), নং ৬৯৩] শাইখ নাসিরুদ্দীন আলবানী রাহিমাহুল্লাহ আছারটির সনদকে সহীহ বলেছেন। কোনো কোনো বিদ'আতী আল্লাহর জন্য পর্দা সাব্যস্ত করে না। ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, জাহমিয়‍্যারা কোনোভাবেই আল্লাহর হিজাব আছে স্বীকার করে না; কারণ তিনি তাদের নিকট আরশের উপর নেই। [ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ' ফাতাওয়া (৬/১০)]
বস্তুত কুরআন, সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কিরাম ও তাবে'য়ীনে 'ইযাম থেকে পর্দার ব্যাপারে অনেক ভাষ্য এসেছে। ইমামগণ যুগ যুগ ধরে তাদের গ্রন্থে এ বিষয়ের ওপর অধ্যায় বিন্যাস করে তাতে এর উপর প্রমাণবহ নস ও আছার নিয়ে এসেছেন। যেমন, ইমাম দারেমী রাহিমাহুল্লাহ তার আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ গ্রন্থে পৃ. ৬০-৬২, অধ্যায়: পর্দা গ্রহণ, তারপর তিনি এর ওপর বেশ কিছু আয়াত-হাদীস ও আছার নিয়ে এসেছেন। তারপর বলেন, 'আর এমন কে আছে যে মহা অধিপতি যে পর্দা দ্বারা আড়াল নিয়েছেন তার পরিমাণ নির্ধারণ করতে যাবে? আর কে জানতে পারবে সেটা কী রকম? একমাত্র তিনিই তো তা জানেন যিনি সকল কিছুকে ইলম দিয়ে পরিবেষ্টন করে আছেন এবং সবকিছুকে সংখ্যায় গুনে রেখেছেন। সুতরাং এতেও প্রমাণ রয়েছে যে, তিনি সৃষ্টি থেকে আলাদা, তাদের থেকে পর্দার আড়ালে। জিবরীল তাঁর নৈকট্যপ্রাপ্ত হওয়া সত্ত্বেও সেসব পর্দার নিকটে যাওয়ার সামর্থ রাখে না।... আরও দেখুন, মাজমু' ফাতাওয়া (৬/১০-১১)। কোনো কোনো বিদ'আতপন্থী লোকেরা আল্লাহর পর্দার অপব্যাখ্যা দাঁড় করে তা অস্বীকার করে। যেমন, ১- বাইহাক্বী বলেন, হিজাব বা পর্দা মূলত সৃষ্টির দিকে প্রত্যাবর্তিত স্রষ্টার নয়। [আল-আসমা ওয়াস সিফাত (২/১২৬, ২৯৩)] ২- রাযী তার তা'সীসুত তাক্বদীস গ্রন্থে পৃ. ১৩২ বলেন, আল্লাহর জন্য প্রকৃত পর্দা হওয়া অসম্ভব; কারণ পর্দা বা আড়াল বলতে বুঝায় এমন দেহ যা দু'টি দেহের মাঝখানে অবস্থান নেয়। তাই আমাদের নিকট পর্দার অর্থ, আল্লাহ তাঁকে দেখা সম্পৃক্ত কিছু বান্দার মাঝে সৃষ্টি করবেন না। আর যারা আল্লাহকে দেখা অস্বীকার করে তাদের নিকট পর্দার অর্থ, আল্লাহ তা'আলা তাঁর দয়া ও অনুগ্রহ বান্দার কাছে পৌছাবেন না।
ইবন তাইমিয়‍্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এর যথার্থ জবাব দেন এবং বর্ণনা করেন যে, এ তা'ওয়ীস বা অপব্যাখ্যা দু'টিই বাতিল। কারণ দেখা সৃষ্টি না করা তো নিছক অস্তিত্বহীন জিনিস। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তাঁর পর্দা হচ্ছে নূরের। তাহলে কীভাবে নিছক অস্তিত্বহীন জিনিস নূর হতে পারে? আর কীভাবেই এটা বলা যায় যে, "অতঃপর তিনি তাঁর পর্দা উন্মুক্ত করবেন তখন তারা তাঁর দিকে তাকাবে"। যে জিনিস নিছক অস্তিত্বহীন সেটাকে উন্মুক্ত কীভাবে করা যায়? তারপর এটি আমাদেরকে জানাও পৃথিবীর কোন ভাষায় কোনো নিছক অস্তিত্বহীন জিনিসকে 'হাজাব' বা পর্দা বলা হয়? আর জানা কথা যে, 'হিজাব' এর বিপরীত হচ্ছে 'হিজাবহীন'। তাহলে নিছক অস্তিত্বহীনকে কি এ গুণ দেয়া যায় যে, এটা হিজাব নয়? যদি হিজাব অস্তিত্বহীনকে বলা হতো তাহলে তো সেটা না হওয়ার দাবি হচ্ছে অস্তিত্বে আসা। তখন অস্তিত্বশীল বস্তু হয়ে দাঁড়াবে অস্তিত্বহীনের গুণ। আর এটা তো অত্যাবশ্যকভাবে নিষিদ্ধ।” দেখুন, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৬/৩৩৫- ৩৩৬)।
আবার অনেকে হিজাব এর অন্য তা'ওয়ীল বা অপব্যাখ্যাও করে, যেমন বিশর আল-মিররীসী সেগুলো নিয়ে এসেছে। কিন্তু ইমাম আবু সা'ঈদ আদ-দারেমী সেগুলো নিয়ে এসে একটি একটি করে খণ্ডন করেছেন। দেখুন, উসমান ইবন সা'ঈদ আদ-দারেমী, আর-রাদ্দু আলাল বিশর আল-মিররীসী (২/২৪৮).... অনুরূপ আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ, পৃ. ৭১-৭৩।
৫৩৩. অর্থাৎ ইমাম ইবন আবী যামানীন রাহিমাহুল্লাহ।
৫৩৪. এ হিজাব বা পর্দার কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম মি'রাজের রাত্রে আল্লাহকে দেখতে পাননি। সহীহ হাদীসে এসেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনি কি আল্লাহকে দেখেছেন? তিনি বললেন, সেখানে তো নূর ছিল, কীভাবে আমি তাকে দেখতে পাব'। [মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ১৭৮] অপর বর্ণনায় এসেছে, 'আমি তো কেবল নূর দেখতে পেয়েছি।' [মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ১৭৮; ইবন হিব্বান, আস-সহীহ (১/২৫৫); ইবন আবী আসেম, আস-সুন্নাহ, হাদীস নং ৪৪১; ইবন খুযাইমাহ, আত-তাওহীদ (২/৫১২)] এ ব্যাপারে বিদ'আতপন্থীদের বিকৃতি ও সেটার জবাব দেখুন, মাজমু' ফাতাওয়া (৬/৫০৭-৫০৮), (৩/৩৮৬-৩৯); ইবনুল কাইয়্যেম, যাদুল মা'আদ (৩/৩৭)।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 ইবন আবী যামানীন কর্তৃক আল্লাহর অবতরণ করার সম্পর্কে দেয়া বক্তব্য

📄 ইবন আবী যামানীন কর্তৃক আল্লাহর অবতরণ করার সম্পর্কে দেয়া বক্তব্য


অতঃপর তিনি বলেন: অধ্যায়: অবতীর্ণ হওয়ার ওপর ঈমান(৫৩৫)
তিনি বলেন, আহলুস সুন্নাহের কথা হচ্ছে- নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা নিকটতম আসমানে অবতীর্ণ হন। কোনো সীমা নির্ধারণ ছাড়াই তারা এতে ঈমান রাখে। (৫৩৭)
আর তিনি(৫৩৮) ইমাম মালেক ও অন্যান্যদের(৫৩৯) সূত্রে হাদীস উল্লেখ করেন, অবশেষে বলেন: আমাকে সংবাদ দিয়েছেন ওয়াহাব(৫৪০), তিনি ইবন ওদ্দাহ(৫৪১) থেকে, তিনি যুহাইর ইবন 'আব্বাদ(৫৪২) থেকে, তিনি বলেন: আমি যেসব শাইখদের পেয়েছি তাদের মধ্যে রয়েছে মালেক, সুফইয়ান, ফুযাইল ইবন ইয়াদ্ব, ঈসা(৫৪৩) ও ইবনুল মুবারক এবং ওকী(৫৪৪)। তারা বলেন: নিশ্চয় (আল্লাহর) অবতরণ করা সত্য।” (৫৪৫)
ইবন ওদ্দাহ বলেন: আমি ইউসুফ ইবন 'আদীকে(৫৪৬) আল্লাহর অবতরণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন: হ্যাঁ, আমি সেটা বিশ্বাস করি, তবে সে ব্যাপারে কোনো সীমা বর্ণনা করি না।
আবার ইবন মাঈনকে(৫৪৭) এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন: হ্যাঁ, আমি তা বিশ্বাস করি, তবে কোনো সীমা নির্ধারণ করি না। (৫৪৮)

টিকাঃ
৫৩৫. ইবন আবী যামানীন, উসূলুস সুন্নাহ (১/২৭৮)।
৫৩৬. আল্লাহ কর্তৃক নিকটতম আসমানে অবতরণ এটি আল্লাহ একটি গুণ যা সিফাতে ফি'লিয়্যাহ ইখতিয়ারিয়‍্যাহ নামে বিখ্যাত। এ গুণটিকে অন্যান্য গুণের মতোই সাব্যস্ত করতে হবে। বলতে হবে, আল্লাহ তা'আলার মহত্ব ও বড়ত্বের জন্য উপযোগী ভাবে তিনি নিকটতম আসমানে অবতরণ করেন, তবে সেটার ধরণ আমাদের জানা নেই। আমরা তাঁর অবতরণ করার গুণটিকে নিষ্ক্রীয়করণ করি না, অপব্যাখ্যাও দাঁড় করাই না। আলেমগণ এ গুণটির বর্ণনার জন্য অধ্যায় ও অনুচ্ছেদ বিন্যাস করেছেন। বরং তাদের অনেকেই এর ওপর আলাদা গ্রন্থ লিখেছেন। ইমাম আজুররী তার আশ-শরী'আহ গ্রন্থে পৃ. ৩০৬ বলেন, অধ্যায়: ঈমান ও সত্যায়ন করতে হবে যে মহান আল্লাহ নিকটতম আসমানে প্রতি রাতে অবতরণ করেন। তারপর বলেন, এর ওপর ঈমান আনা ফরয, বিবেকবান মুসলিমের জন্য কখনও এটা বলা শোভনীয় নয় যে, তিনি কীভাবে অবতরণ করেন? আর এ গুণটিকে মু'তাযিলারা ব্যতীত কেউ অস্বীকার করে না। হক্বপন্থীরা সর্বদা বলে, এর ওপর ঈমান আনা ফরয, কোনো প্রকার ধরণ নির্ধারণ ছাড়াই। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সহীহভাবে হাদীস এসেছে যে, 'নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা প্রতি রাতে নিকটতম আসমানে নেমে আসেন।... তারপর তিনি এতদসংক্রান্ত আছারগুলো একে একে বর্ণনা করেন। অনুরূপ ইমাম ইবন খুযাইমাহ তাঁর কিতাবুত তাওহীদে (১/২৮৯-২৯০) বলেন, অধ্যায়: সেসব সংবাদের বর্ণনায় যা প্রতিষ্ঠিত সহীহ সুন্নাহতে সাব্যস্ত হয়েছে, মহান রব্ব কর্তৃক প্রতি রাতে নিকটতম আসমানে নাযিল হওয়ার ওপর, যা হিজায ও ইরাকের আলেমগণ নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন, আমরা এসব সংবাদ ও হাদীসের সত্যতার ওপর সাক্ষ্য দেই, এমন সাক্ষ্য যা মুখের স্বীকৃতির মাধ্যমে অন্তরের সত্যায়নের মাধ্যমে, এসব হাদীসে রব্ব কর্তৃক অবতরণ করার যে সংবাদ দেয়া হয়েছে যা দৃঢ়তার সাথে বিশ্বাস করার ওপর। তবে আমরা কোনো রকম ধরণ নির্ধারণ করি না। কারণ আমাদের নবী আমাদের জন্য আমাদের রব্ব আমাদের স্রষ্টা কর্তৃক নিকটতম আসমানে নাযিল হওয়ার ধরণ বর্ণনা করেননি। তবে আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি অবতরণ করেন। তারপর বলেন, সুতরাং আমরা সেটা বলি ও সেটা বিশ্বাস করি যা এসব হাদীসে অবতরণের ব্যাপারে এসেছে, ধরণ বর্ণনার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার কৃত্রিমতা বা ভনিতার আশ্রয় গ্রহণ করি না।.... তারপর বলেন, এসব হাদীসে যা স্পষ্ট হলো, প্রকাশ পেলো ও বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত হলো তা হচ্ছে, নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা নিকটতম আসমানের উপরে, যা আমাদের নবী আমাদের জানিয়েছেন যে, আল্লাহ তা'আলা সেখানে নেমে আসেন। কারণ আরবী ভাষায় এটা বলা অসম্ভব যে, নিচ থেকে উপরের দিকে অবতরণ করেছে। হাদীসসমূহের ভাষ্যের দাবি হচ্ছে অবতরণ হয় উপর থেকে নিচের দিকে।... তারপর তিনি এর ওপর প্রমাণবাহী আছারসমূহ বর্ণনা করেন। ইমাম দারেমী তাঁর 'আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়ি‍্যাহ' গ্রন্থে পৃ. ৬৩, ৭৯ বলেন, অধ্যায়: অবতরণ। তারপর তিনি এতসংক্রান্ত আছার ও নসসমূহ উল্লেখ করেন। তারপর বলেন, সুতরাং এসব হাদীস তার সবগুলোতে বা অধিকাংশে এসেছে যে, রব্ব সুবাহানাহু ওয়া তা'আলা এসব স্থানে অবতরণ করেন। এসব হাদীস ও আছারে আসা বর্ণনার ওপর বিশ্বাস ও ঈমান আনার উপরেই আমি আমাদের ফিকহ ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন উস্তাদদের পেয়েছি। তাদের কেউই তা অস্বীকার করতেন না। তাদের কেউ তা বর্ণনা করতেও পিছপা হতেন না। তারপর তিনি বলেন, আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভাষ্য যে আল্লাহ তা'আলা নিকটতম আসমানে নেমে আসেন তাঁর এ কথার ওপর ঈমান আনা ফরয। মহান রব্বকে যা তিনি করেন তাতে জিজ্ঞেস করা যায় না যে, কীভাবে করবেন? বরং তাদেরকেই প্রশ্ন করা হবে।...." অনুরূপভাবে ইমাম দারাকুত্বনী রাহিমাহুল্লাহ আলাদা করে একটি কিতাব রচনা করেছেন যার নাম দিয়েছেন, "কিতাবুন নুযূল"; যাতে তিনি আল্লাহ তা'আলার অবতরণ সংক্রান্ত হাদীসগুলো একে একে নিয়ে এসেছেন। কিতাবটি ইমাম দারাকুতনীরই আরেক কিতাব 'আস-সিফাত' এর সাথে একত্রে ছাপা হয়েছে, যা আমাদের উস্তাদ শাইখ ড. আলী ইবন মুহাম্মাদ নাসের ফাকীহী কর্তৃক তাহকীক করা।
অনুরূপভাবে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ আল্লাহর অবতরণ সংক্রান্ত বর্ণিত হাদীসটির ব্যাখ্যায় পূর্ণ একখণ্ড গ্রন্থ রচনা করেছেন যার নাম দিয়েছেন, 'শারহু হাদীসিন নুযূল'। বস্তুত নুযুল বা অবতরণ সংক্রান্ত হাদীসগুলো মুতাওয়াতির পর্যায়ের; সুতরাং তা অস্বীকার করা কিংবা তাতে ত্রুটি খুঁজে দোষ প্রদান করা অসম্ভব। দেখুন, ইবনুল কাইয়্যেম, মুখতাসারুস সাওয়া'য়িক (২/২১৭-২১৮); যাহাবী, আল-উলু, পৃ. ৭৯; ইবন তাইমিয়্যাহ, শারহু হাদীসিন নুযূল, পৃ. ৫; ইবন আব্দিল বার, আত-তামহীদ (৭/১২৮-১২৯); আবু ইসমা'ঈল আস-সাবৃনী, আকীদাতুস সালাফ আসহাবিল হাদীস, পৃ. ২৬।
৫৩৭. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, সালাফে সালেহীন ও ইমামগণের মতাদর্শ হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা নিকটতম আসমানে অবতরণ করলেও তিনি 'আরশের উপর অবশ্যই রয়েছেন। তিনি কখনও তাঁর সৃষ্টির নিচে নন। কখনও সৃষ্টিকুলের দ্বারা তিনি পরিবেষ্টিত হন না। বরং তিনি সর্বোচ্চ পবিত্র সত্তা। নিকটে থাকলেও উপরে, উপরে থাকলেও বিশেষভাবে নিকটে। আর এ জন্যই একাধিক সালাফে সালেহীন ইজমা' বর্ণনা করেছেন যে, তিনি আল্লাহ কখনও আসমানের অভ্যন্তরে নন। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউত তা'আরুদ্ব (৭/৭)। আর সেজন্যই সালাফে সালেহীনের কেউ কখনও তাঁর অবতরণকে 'সত্তাগত' বলেননি। সুতরাং কেউ যদি সেটা বলে থাকে তবে ভুলই বলেছে অথবা স্বয়ং অবতরণ করেন এটা বুঝানোর জন্য বলেছেন।
৫৩৮. অর্থাৎ ইমাম ইবন আবী যামানীন রাহিমাহুল্লাহ।
৫৩৯. যেমন তিনি বলেন, আমাকে হাদীস শুনিয়েছেন সা'ঈদ ইবন ফাহলুল, তিনি আল-'আক্কী থেকে, তিনি ইবন বুকাইর থেকে, তিনি বলেন, আমাকে হাদীস শুনিয়েছেন মালেক, তিনি ইবন শিহাব থেকে, তিনি আবু আব্দিল্লাহ আল-আগার ও আবু সালামাহ ইবন আব্দির রহমান থেকে, তিনি আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে, নিশ্চয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "আমাদের মহান ও বরকতময় রব্ব প্রতি রাতে নিকটতম আসমানে নেমে আসেন, যখন রাতের শেষ এক- তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকে, তারপর বলেন, কে আমাকে ডাকবে, ফলে আমি তার ডাকে সাড়া দিব? কে আমার কাছে কিছু চাইবে, ফলে আমি তাকে প্রদান করব? কে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে ফলে আমি তাকে ক্ষমা করে দিব।" বুখারী, আল-জামে'উস সহীহ (৩/২৯), হাদীস নং ১১৪৫; মুসলিম, আস-সহীহ (১/৫২১), হাদীস নং ৭৫৮।
৫৪০. তিনি হচ্ছেন আবু হাযম ওয়াহাব ইবন מסררה ইবন মুফরিজ ইবন বাকার, আত-তাইমী, আল- আন্দালুসী, আল-হিজাযী, আল-মালেকী। তিনি ইবন ওদ্দাহ থেকে ইবন আবী শাইবাহ এর মুসনাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন।
তার সম্পর্কে ইমাম যাহাবী বলেন, তিনি ফিকহের শিরোমনি হাদীস ও তার রিজাল সম্পর্কে তীক্ষ্ম দিব্যদৃষ্টি সম্পন্ন লোক ছিলেন। সাথে সাথে পরহেযগারী, তাকওয়া ইত্যাদিতেও বিখ্যাত। তার শহরে যাবতীয় ফতোয়া তার উপরেই গড়াত। তিনি হিজরী ৩৪৬ সালে মারা যান। দেখুন, মুহাম্মাদ ইবন ফাতূহ আল-হামীদী, জাযওয়াতুল মুক্কতাবিস, পৃ. ৩৬০; ইবনুল ফারাদ্বী, তারীখে উলামায়ে আন্দালুস (২/১৬৫-১৬৬); ইমাম যাহাবী, তাযকিরাতুল হুফফায (৩/৮৯০); সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৫/৫৫৬)।
৫৪১. তিনি হচ্ছেন আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবন ওদ্দাহ ইবন বাযী', আল-মারওয়ানী, আল-কুরতুবী। আন্দালুসের বড় নৃপতি আব্দুর রহমান ইবন মু'আওয়িয়াহ আদ-দাখিল এর মাওলা। তিনি হাদীস শুনেছেন ইবন মা'ঈন, ইসমা'ঈল ইবন আবী উওয়াইস প্রমুখ থেকে। আর তার থেকে শুনেছেন আহমাদ ইবন খালেদ আল-জাব্বাব, কাসেম ইবন আসবাগ প্রমুখ। তার সম্পর্কে ইবনুল ফারাদ্বী বলেন, 'তিনি ছিলেন হাদীসশাস্ত্রের পণ্ডিত, হাদীসের বিভিন্ন সূত্র সম্পর্কে দক্ষ, হাদীসের ইলাল সম্পর্কে মত দেয়ার অধিকারী, ইবাদতকারীদের অনেক ঘটনা বর্ণনাকারী ও দুনিয়াবিমুখ, ইলম প্রচার-প্রসারে সবরকারী, পবিত্র চরিত্রের অধিকারী মানুষ। যার মাধ্যমে আল্লাহ স্পেনবাসীর উপকার করেছেন। ইবনুল জাব্বাব তার সম্মান করতেন, তার আক্কল ও ফদ্বল এর প্রশংসা করতেন, তার ওপর কাউকে অগ্রণী করতেন না। তবে তিনি অনেক সময় ধারণাবশত অনেক সহীহ হাদীসকে হাদীস মনে করতেন না। তার রচিত একটি গ্রন্থ বিখ্যাত, তা হচ্ছে বাবু মা জাআ ফিল বিদা'য়ি। হিজরী ২৮৭ সালে তার মৃত্যু; অপর মতে ২৮৬; আর ইমাম যাহাবী মীযানুল ই'তিদালে বলেছেন ২৮০ এর দিকে। প্রথম মতটিই বিশুদ্ধ। দেখুন, ইবনুল ফারাদ্বী, তারীখু উলামায়িল আন্দালুস (২/১৫-১৭); ইবন উমাইরাহ, বুগইয়াতুল মুলতামিস, পৃ. ১৩৩; ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৩/৪৪৫)।
৫৪২. তিনি হচ্ছেন মুহাইর ইবন আব্বাদ ইবন মালীহ ইবন যুহাইর আর-রুওয়াসী, আল-কৃষ্ণী। তিনি প্রখ্যাত ইমাম ওকী' ইবনুল জাররাহ এর চাচাতো ভাই। হাদীস বর্ণনা করেছেন মালেক, ইবন 'উয়াইনাহ, ইবনুল মুবারক প্রমুখ থেকে। আর তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন আবু হাতেম আর-রাযী, মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহ ইবন 'আম্মার, তারা দু'জন তাকে নির্ভরযোগ্যও বলেছেন। তার থেকে আরও হাদীস বর্ণনা করেছেন আবু যুর'আহ আদ-দিমাশকী প্রমুখ। সালেহ জাযারাহ বলেন, তিনি সাদূক (হাসানুল হাদীস) ছিলেন। ইবনু আব্দিল বার তাকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন। অনুরূপ আবু যুর'আহ ও ইবন আবিল হুওয়ারী তাকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন। হিজরী ২৩৮ সালে তার মৃত্যু হয়। দেখুন, ইমাম যাহাবী, মীযানুল ই'তিদাল (২/৮৩); সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১১/৩৮৩); ইবন হাজার, তাহযীবুত তাহযীব (৩/৩৪৪)।
৫৪৩. তিনি হচ্ছেন 'আবু আমর ঈসা ইবন ইউনুস ইবন আবী ইসহাক্ব, আল-হামাদানী, আস-সাবী'ঈ, আল-কৃষ্ণী। তিনি হাদীস গ্রহণ করেছেন সুলাইমান আত-তাইমী, হিশাম ইবন উরওয়া প্রমুখ থেকে। আর তার থেকে হাদীস গ্রহণ করেছেন হাম্মাদ ইবন সালামাহ, আবু বকর ইবন আবী শাইবাহ, ইসহাক ইবন রাহওয়াইহ প্রমুখ। তিনি এক বছর হজ করতেন আরেক বছর জিহাদ করতেন। সীমান্তে অবস্থান করা পছন্দ করতেন। ইমাম, আদর্শ ও হাফেয। তার সম্পর্কে যাহাবী বলেন, প্রশস্ত ইলমের অধিকারী, অধিক সফরকারী, সম্মান ও মর্যাদায় পরিপূর্ণ'। বলা হয়ে থাকে, তিনি ইবন 'উয়াইনাহ এর সাথে সাক্ষাৎ করতে যান, তখন ইবন 'উয়াইনাহ তাকে বলেন, স্বাগতম ফকীহ ইবনুল ফকীহ ইবনুল ফকীহকে। হিজরী ১৮৭ সালে তার মৃত্যু হয়। দেখুন, খত্নীবে বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ (১১/১৫২); ইমাম যাহাবী, তাযকিরাতুল হুফফায (১/২৭৯); সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৮/৪৮৯)।
৫৪৪. তিনি হচ্ছেন আবু সুফইয়ান ওকী' ইবনুল জাররাহ ইবন মালীহ আর-রুওয়াসী, আল-কৃষ্ণী। ইসলামের বড় হাফেয ও আলেমগণের অন্যতম। তার সময়ের লোকদের ইমাম। পরহেযগারী ও ইবাদতে প্রসিদ্ধ। তিনি হাদীস শুনেছেন হিশাম ইবন উরওয়া ও আল-আ'মাশ প্রমুখ থেকে। তার থেকে হাদীস শুনেছেন সাওরী (তার উস্তাদ), ইবনুল মুবারক, আব্দুর রহমান ইবন মাহদী, আলী ইবনুল মাদীনী, আহমাদ ইবন হাম্বল, ইবন মা'ঈন প্রমুখ। তার সম্পর্কে ইমাম আহমাদ বলেন, আমি ওকী' এর মতো কাউকে ইলম জমাকারী ও হিফয সম্পাদনকারী দেখিনি। ইমাম যাহাবী বলেন, তিনি ছিলেন, ইলমের সমুদ্র, হিফযের ইমাম; আহমাদ তাকে খুব সম্মান করতেন ও তার মর্যাদা তুলে ধরতেন। ইবন মা'ঈন বলেন, ওকী' যেন তার সময়ের আওযা'ঈ। হিজরী ১৯৬ সালে তিনি মারা যান। দেখুন, ইবন সা'দ, আত-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা (৬/৩৯৪); আবু নু'আইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া (৮/৩৬৮); খত্নীবে বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ (১৩/৪৪৬); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৯/১৪০)।
৫৪৫. এ আছারটি ইবন আবী যামানীন ছাড়া আরও যারা তাদের কিতাবে এনেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন, ১- শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, শারহু হাদীসিন নুযূল, পৃ. ১৮৮। ২- শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/৫৬)।
৫৪৬. তিনি হচ্ছেন, আবু ইয়া'কুব ইউসুফ ইবন 'আদী ইবন যুরাইক্ব আত-তাইমী আল-কুফী। তার সময়ের বড় আলেমগণের একজন। তিনি হাদীস বর্ণনা করেছেন শারীক, আবিল আহওয়াস, 'আমর ইবন আবিল মিকদাম ও মালেক ইবন আনাস প্রমুখ থেকে। আর তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন বুখারী, আবু যুর'আহ, আবু হাতেম প্রমুখ। আবু যুর'আহ বলেন, সিক্কাহ বা নির্ভরযোগ্য। ব্যবসায়ের জন্য মিসরে যান এবং হিজরী ২৩২ সালে সেখানে মারা যান। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১০/৪৮৪); ইবন হাজার, তাহযীবুত তাহযীব (৪/১৮৯); ইবনুল 'ইমাদ, শাযরাতুয যাহাব (২/৭৫)।
৫৪৭. তিনি হচ্ছেন আবু যাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবন মা'ঈন ইবন 'আওন ইবন যিয়াদ ইবন সাত্ত্বাম আল- মুররী, তাদের মাওলা, আল-বাগদাদী। হাদীস শুনেছেন ইসমা'ঈল ইবন 'উলাইয়্যাহ, ইসমা'ঈল ইবন মুজালিদ ইবন সা'ঈদ, হাম্মাদ ইবন উসামাহ, সুফইয়ান ইবন 'উয়াইনাহ, 'আব্দুল্লাহ ইবন রাজা আল-মাক্কী, আব্দুর রহমান ইবন মাহদী প্রমুখ। তার থেকে হাদীস গ্রহণ করেন বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, ইবরাহীম ইবন ইয়া'কুব আল-জাওযাজানী, আহমাদ ইবন হাম্বল, আবু ঘুর'আহ আর-রাযী ও আবু যুর'আহ আদ-দিমাশকী প্রমুখ। তিনি ছিলেন আলেম ও ইমাম। রিজালশাস্ত্রের মহাপণ্ডিত। রিজালশাস্ত্রের কিতাবসমূহ তার বক্তব্য ও মন্তব্যে ভরপুর। বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, আমি নিজ হাতে দশ লক্ষ হাদীস লিখেছি। আলী ইবনুল মাদীনী বলেন, ইয়াহইয়া ইবন মা'ঈন যা লিখেছেন তা কোনো ব্যক্তি লিখেছেন বলে আমি জানি না। তার জন্ম হয়েছিল হিজরী ১৫৮ সালে, আর মৃত্যু হয়েছিল হিজরী ২৩৩ সালে। দেখুন, ইবন আবি হাতেম, আল-জারহু ওয়াত তা'দীল (১/৩১৪); খত্নীবে বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ (১৪/১৭৭); ইবনু খাল্লিকান, ওফায়াতুল আ'ইয়ান (৬/১৩৯); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১১/৭১)।
৫৪৮. আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আলেমগণ এ বিষয়টির স্বীকৃতি দিয়েছেন যে, মহান আল্লাহ কর্তৃক নিকটতম আসমানে নেমে আসা সংক্রান্ত হাদীসগুলো মুতাওয়াতির সূত্র দ্বারা সাব্যস্ত, এ গুণটি জাহমিয়্যাদের ওপর অনেক কঠিন আঘাত।

অতঃপর তিনি বলেন: অধ্যায়: অবতীর্ণ হওয়ার ওপর ঈমান(৫৩৫)
তিনি বলেন, আহলুস সুন্নাহের কথা হচ্ছে- নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা নিকটতম আসমানে অবতীর্ণ হন। কোনো সীমা নির্ধারণ ছাড়াই তারা এতে ঈমান রাখে। (৫৩৭)
আর তিনি(৫৩৮) ইমাম মালেক ও অন্যান্যদের(৫৩৯) সূত্রে হাদীস উল্লেখ করেন, অবশেষে বলেন: আমাকে সংবাদ দিয়েছেন ওয়াহাব(৫৪০), তিনি ইবন ওদ্দাহ(৫৪১) থেকে, তিনি যুহাইর ইবন 'আব্বাদ(৫৪২) থেকে, তিনি বলেন: আমি যেসব শাইখদের পেয়েছি তাদের মধ্যে রয়েছে মালেক, সুফইয়ান, ফুযাইল ইবন ইয়াদ্ব, ঈসা(৫৪৩) ও ইবনুল মুবারক এবং ওকী(৫৪৪)। তারা বলেন: নিশ্চয় (আল্লাহর) অবতরণ করা সত্য।” (৫৪৫)
ইবন ওদ্দাহ বলেন: আমি ইউসুফ ইবন 'আদীকে(৫৪৬) আল্লাহর অবতরণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন: হ্যাঁ, আমি সেটা বিশ্বাস করি, তবে সে ব্যাপারে কোনো সীমা বর্ণনা করি না।
আবার ইবন মাঈনকে(৫৪৭) এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন: হ্যাঁ, আমি তা বিশ্বাস করি, তবে কোনো সীমা নির্ধারণ করি না। (৫৪৮)

টিকাঃ
৫৩৫. ইবন আবী যামানীন, উসূলুস সুন্নাহ (১/২৭৮)।
৫৩৬. আল্লাহ কর্তৃক নিকটতম আসমানে অবতরণ এটি আল্লাহ একটি গুণ যা সিফাতে ফি'লিয়্যাহ ইখতিয়ারিয়‍্যাহ নামে বিখ্যাত। এ গুণটিকে অন্যান্য গুণের মতোই সাব্যস্ত করতে হবে। বলতে হবে, আল্লাহ তা'আলার মহত্ব ও বড়ত্বের জন্য উপযোগী ভাবে তিনি নিকটতম আসমানে অবতরণ করেন, তবে সেটার ধরণ আমাদের জানা নেই। আমরা তাঁর অবতরণ করার গুণটিকে নিষ্ক্রীয়করণ করি না, অপব্যাখ্যাও দাঁড় করাই না। আলেমগণ এ গুণটির বর্ণনার জন্য অধ্যায় ও অনুচ্ছেদ বিন্যাস করেছেন। বরং তাদের অনেকেই এর ওপর আলাদা গ্রন্থ লিখেছেন। ইমাম আজুররী তার আশ-শরী'আহ গ্রন্থে পৃ. ৩০৬ বলেন, অধ্যায়: ঈমান ও সত্যায়ন করতে হবে যে মহান আল্লাহ নিকটতম আসমানে প্রতি রাতে অবতরণ করেন। তারপর বলেন, এর ওপর ঈমান আনা ফরয, বিবেকবান মুসলিমের জন্য কখনও এটা বলা শোভনীয় নয় যে, তিনি কীভাবে অবতরণ করেন? আর এ গুণটিকে মু'তাযিলারা ব্যতীত কেউ অস্বীকার করে না। হক্বপন্থীরা সর্বদা বলে, এর ওপর ঈমান আনা ফরয, কোনো প্রকার ধরণ নির্ধারণ ছাড়াই। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সহীহভাবে হাদীস এসেছে যে, 'নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা প্রতি রাতে নিকটতম আসমানে নেমে আসেন।... তারপর তিনি এতদসংক্রান্ত আছারগুলো একে একে বর্ণনা করেন। অনুরূপ ইমাম ইবন খুযাইমাহ তাঁর কিতাবুত তাওহীদে (১/২৮৯-২৯০) বলেন, অধ্যায়: সেসব সংবাদের বর্ণনায় যা প্রতিষ্ঠিত সহীহ সুন্নাহতে সাব্যস্ত হয়েছে, মহান রব্ব কর্তৃক প্রতি রাতে নিকটতম আসমানে নাযিল হওয়ার ওপর, যা হিজায ও ইরাকের আলেমগণ নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন, আমরা এসব সংবাদ ও হাদীসের সত্যতার ওপর সাক্ষ্য দেই, এমন সাক্ষ্য যা মুখের স্বীকৃতির মাধ্যমে অন্তরের সত্যায়নের মাধ্যমে, এসব হাদীসে রব্ব কর্তৃক অবতরণ করার যে সংবাদ দেয়া হয়েছে যা দৃঢ়তার সাথে বিশ্বাস করার ওপর। তবে আমরা কোনো রকম ধরণ নির্ধারণ করি না। কারণ আমাদের নবী আমাদের জন্য আমাদের রব্ব আমাদের স্রষ্টা কর্তৃক নিকটতম আসমানে নাযিল হওয়ার ধরণ বর্ণনা করেননি। তবে আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি অবতরণ করেন। তারপর বলেন, সুতরাং আমরা সেটা বলি ও সেটা বিশ্বাস করি যা এসব হাদীসে অবতরণের ব্যাপারে এসেছে, ধরণ বর্ণনার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার কৃত্রিমতা বা ভনিতার আশ্রয় গ্রহণ করি না।.... তারপর বলেন, এসব হাদীসে যা স্পষ্ট হলো, প্রকাশ পেলো ও বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত হলো তা হচ্ছে, নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা নিকটতম আসমানের উপরে, যা আমাদের নবী আমাদের জানিয়েছেন যে, আল্লাহ তা'আলা সেখানে নেমে আসেন। কারণ আরবী ভাষায় এটা বলা অসম্ভব যে, নিচ থেকে উপরের দিকে অবতরণ করেছে। হাদীসসমূহের ভাষ্যের দাবি হচ্ছে অবতরণ হয় উপর থেকে নিচের দিকে।... তারপর তিনি এর ওপর প্রমাণবাহী আছারসমূহ বর্ণনা করেন। ইমাম দারেমী তাঁর 'আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়ি‍্যাহ' গ্রন্থে পৃ. ৬৩, ৭৯ বলেন, অধ্যায়: অবতরণ। তারপর তিনি এতসংক্রান্ত আছার ও নসসমূহ উল্লেখ করেন। তারপর বলেন, সুতরাং এসব হাদীস তার সবগুলোতে বা অধিকাংশে এসেছে যে, রব্ব সুবাহানাহু ওয়া তা'আলা এসব স্থানে অবতরণ করেন। এসব হাদীস ও আছারে আসা বর্ণনার ওপর বিশ্বাস ও ঈমান আনার উপরেই আমি আমাদের ফিকহ ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন উস্তাদদের পেয়েছি। তাদের কেউই তা অস্বীকার করতেন না। তাদের কেউ তা বর্ণনা করতেও পিছপা হতেন না। তারপর তিনি বলেন, আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভাষ্য যে আল্লাহ তা'আলা নিকটতম আসমানে নেমে আসেন তাঁর এ কথার ওপর ঈমান আনা ফরয। মহান রব্বকে যা তিনি করেন তাতে জিজ্ঞেস করা যায় না যে, কীভাবে করবেন? বরং তাদেরকেই প্রশ্ন করা হবে।...." অনুরূপভাবে ইমাম দারাকুত্বনী রাহিমাহুল্লাহ আলাদা করে একটি কিতাব রচনা করেছেন যার নাম দিয়েছেন, "কিতাবুন নুযূল"; যাতে তিনি আল্লাহ তা'আলার অবতরণ সংক্রান্ত হাদীসগুলো একে একে নিয়ে এসেছেন। কিতাবটি ইমাম দারাকুতনীরই আরেক কিতাব 'আস-সিফাত' এর সাথে একত্রে ছাপা হয়েছে, যা আমাদের উস্তাদ শাইখ ড. আলী ইবন মুহাম্মাদ নাসের ফাকীহী কর্তৃক তাহকীক করা।
অনুরূপভাবে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ আল্লাহর অবতরণ সংক্রান্ত বর্ণিত হাদীসটির ব্যাখ্যায় পূর্ণ একখণ্ড গ্রন্থ রচনা করেছেন যার নাম দিয়েছেন, 'শারহু হাদীসিন নুযূল'। বস্তুত নুযুল বা অবতরণ সংক্রান্ত হাদীসগুলো মুতাওয়াতির পর্যায়ের; সুতরাং তা অস্বীকার করা কিংবা তাতে ত্রুটি খুঁজে দোষ প্রদান করা অসম্ভব। দেখুন, ইবনুল কাইয়্যেম, মুখতাসারুস সাওয়া'য়িক (২/২১৭-২১৮); যাহাবী, আল-উলু, পৃ. ৭৯; ইবন তাইমিয়্যাহ, শারহু হাদীসিন নুযূল, পৃ. ৫; ইবন আব্দিল বার, আত-তামহীদ (৭/১২৮-১২৯); আবু ইসমা'ঈল আস-সাবৃনী, আকীদাতুস সালাফ আসহাবিল হাদীস, পৃ. ২৬।
৫৩৭. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, সালাফে সালেহীন ও ইমামগণের মতাদর্শ হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা নিকটতম আসমানে অবতরণ করলেও তিনি 'আরশের উপর অবশ্যই রয়েছেন। তিনি কখনও তাঁর সৃষ্টির নিচে নন। কখনও সৃষ্টিকুলের দ্বারা তিনি পরিবেষ্টিত হন না। বরং তিনি সর্বোচ্চ পবিত্র সত্তা। নিকটে থাকলেও উপরে, উপরে থাকলেও বিশেষভাবে নিকটে। আর এ জন্যই একাধিক সালাফে সালেহীন ইজমা' বর্ণনা করেছেন যে, তিনি আল্লাহ কখনও আসমানের অভ্যন্তরে নন। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউত তা'আরুদ্ব (৭/৭)। আর সেজন্যই সালাফে সালেহীনের কেউ কখনও তাঁর অবতরণকে 'সত্তাগত' বলেননি। সুতরাং কেউ যদি সেটা বলে থাকে তবে ভুলই বলেছে অথবা স্বয়ং অবতরণ করেন এটা বুঝানোর জন্য বলেছেন।
৫৩৮. অর্থাৎ ইমাম ইবন আবী যামানীন রাহিমাহুল্লাহ।
৫৩৯. যেমন তিনি বলেন, আমাকে হাদীস শুনিয়েছেন সা'ঈদ ইবন ফাহলুল, তিনি আল-'আক্কী থেকে, তিনি ইবন বুকাইর থেকে, তিনি বলেন, আমাকে হাদীস শুনিয়েছেন মালেক, তিনি ইবন শিহাব থেকে, তিনি আবু আব্দিল্লাহ আল-আগার ও আবু সালামাহ ইবন আব্দির রহমান থেকে, তিনি আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে, নিশ্চয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "আমাদের মহান ও বরকতময় রব্ব প্রতি রাতে নিকটতম আসমানে নেমে আসেন, যখন রাতের শেষ এক- তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকে, তারপর বলেন, কে আমাকে ডাকবে, ফলে আমি তার ডাকে সাড়া দিব? কে আমার কাছে কিছু চাইবে, ফলে আমি তাকে প্রদান করব? কে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে ফলে আমি তাকে ক্ষমা করে দিব।" বুখারী, আল-জামে'উস সহীহ (৩/২৯), হাদীস নং ১১৪৫; মুসলিম, আস-সহীহ (১/৫২১), হাদীস নং ৭৫৮।
৫৪০. তিনি হচ্ছেন আবু হাযম ওয়াহাব ইবন מסררה ইবন মুফরিজ ইবন বাকার, আত-তাইমী, আল- আন্দালুসী, আল-হিজাযী, আল-মালেকী। তিনি ইবন ওদ্দাহ থেকে ইবন আবী শাইবাহ এর মুসনাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন।
তার সম্পর্কে ইমাম যাহাবী বলেন, তিনি ফিকহের শিরোমনি হাদীস ও তার রিজাল সম্পর্কে তীক্ষ্ম দিব্যদৃষ্টি সম্পন্ন লোক ছিলেন। সাথে সাথে পরহেযগারী, তাকওয়া ইত্যাদিতেও বিখ্যাত। তার শহরে যাবতীয় ফতোয়া তার উপরেই গড়াত। তিনি হিজরী ৩৪৬ সালে মারা যান। দেখুন, মুহাম্মাদ ইবন ফাতূহ আল-হামীদী, জাযওয়াতুল মুক্কতাবিস, পৃ. ৩৬০; ইবনুল ফারাদ্বী, তারীখে উলামায়ে আন্দালুস (২/১৬৫-১৬৬); ইমাম যাহাবী, তাযকিরাতুল হুফফায (৩/৮৯০); সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৫/৫৫৬)।
৫৪১. তিনি হচ্ছেন আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবন ওদ্দাহ ইবন বাযী', আল-মারওয়ানী, আল-কুরতুবী। আন্দালুসের বড় নৃপতি আব্দুর রহমান ইবন মু'আওয়িয়াহ আদ-দাখিল এর মাওলা। তিনি হাদীস শুনেছেন ইবন মা'ঈন, ইসমা'ঈল ইবন আবী উওয়াইস প্রমুখ থেকে। আর তার থেকে শুনেছেন আহমাদ ইবন খালেদ আল-জাব্বাব, কাসেম ইবন আসবাগ প্রমুখ। তার সম্পর্কে ইবনুল ফারাদ্বী বলেন, 'তিনি ছিলেন হাদীসশাস্ত্রের পণ্ডিত, হাদীসের বিভিন্ন সূত্র সম্পর্কে দক্ষ, হাদীসের ইলাল সম্পর্কে মত দেয়ার অধিকারী, ইবাদতকারীদের অনেক ঘটনা বর্ণনাকারী ও দুনিয়াবিমুখ, ইলম প্রচার-প্রসারে সবরকারী, পবিত্র চরিত্রের অধিকারী মানুষ। যার মাধ্যমে আল্লাহ স্পেনবাসীর উপকার করেছেন। ইবনুল জাব্বাব তার সম্মান করতেন, তার আক্কল ও ফদ্বল এর প্রশংসা করতেন, তার ওপর কাউকে অগ্রণী করতেন না। তবে তিনি অনেক সময় ধারণাবশত অনেক সহীহ হাদীসকে হাদীস মনে করতেন না। তার রচিত একটি গ্রন্থ বিখ্যাত, তা হচ্ছে বাবু মা জাআ ফিল বিদা'য়ি। হিজরী ২৮৭ সালে তার মৃত্যু; অপর মতে ২৮৬; আর ইমাম যাহাবী মীযানুল ই'তিদালে বলেছেন ২৮০ এর দিকে। প্রথম মতটিই বিশুদ্ধ। দেখুন, ইবনুল ফারাদ্বী, তারীখু উলামায়িল আন্দালুস (২/১৫-১৭); ইবন উমাইরাহ, বুগইয়াতুল মুলতামিস, পৃ. ১৩৩; ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৩/৪৪৫)।
৫৪২. তিনি হচ্ছেন মুহাইর ইবন আব্বাদ ইবন মালীহ ইবন যুহাইর আর-রুওয়াসী, আল-কৃষ্ণী। তিনি প্রখ্যাত ইমাম ওকী' ইবনুল জাররাহ এর চাচাতো ভাই। হাদীস বর্ণনা করেছেন মালেক, ইবন 'উয়াইনাহ, ইবনুল মুবারক প্রমুখ থেকে। আর তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন আবু হাতেম আর-রাযী, মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহ ইবন 'আম্মার, তারা দু'জন তাকে নির্ভরযোগ্যও বলেছেন। তার থেকে আরও হাদীস বর্ণনা করেছেন আবু যুর'আহ আদ-দিমাশকী প্রমুখ। সালেহ জাযারাহ বলেন, তিনি সাদূক (হাসানুল হাদীস) ছিলেন। ইবনু আব্দিল বার তাকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন। অনুরূপ আবু যুর'আহ ও ইবন আবিল হুওয়ারী তাকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন। হিজরী ২৩৮ সালে তার মৃত্যু হয়। দেখুন, ইমাম যাহাবী, মীযানুল ই'তিদাল (২/৮৩); সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১১/৩৮৩); ইবন হাজার, তাহযীবুত তাহযীব (৩/৩৪৪)।
৫৪৩. তিনি হচ্ছেন 'আবু আমর ঈসা ইবন ইউনুস ইবন আবী ইসহাক্ব, আল-হামাদানী, আস-সাবী'ঈ, আল-কৃষ্ণী। তিনি হাদীস গ্রহণ করেছেন সুলাইমান আত-তাইমী, হিশাম ইবন উরওয়া প্রমুখ থেকে। আর তার থেকে হাদীস গ্রহণ করেছেন হাম্মাদ ইবন সালামাহ, আবু বকর ইবন আবী শাইবাহ, ইসহাক ইবন রাহওয়াইহ প্রমুখ। তিনি এক বছর হজ করতেন আরেক বছর জিহাদ করতেন। সীমান্তে অবস্থান করা পছন্দ করতেন। ইমাম, আদর্শ ও হাফেয। তার সম্পর্কে যাহাবী বলেন, প্রশস্ত ইলমের অধিকারী, অধিক সফরকারী, সম্মান ও মর্যাদায় পরিপূর্ণ'। বলা হয়ে থাকে, তিনি ইবন 'উয়াইনাহ এর সাথে সাক্ষাৎ করতে যান, তখন ইবন 'উয়াইনাহ তাকে বলেন, স্বাগতম ফকীহ ইবনুল ফকীহ ইবনুল ফকীহকে। হিজরী ১৮৭ সালে তার মৃত্যু হয়। দেখুন, খত্নীবে বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ (১১/১৫২); ইমাম যাহাবী, তাযকিরাতুল হুফফায (১/২৭৯); সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৮/৪৮৯)।
৫৪৪. তিনি হচ্ছেন আবু সুফইয়ান ওকী' ইবনুল জাররাহ ইবন মালীহ আর-রুওয়াসী, আল-কৃষ্ণী। ইসলামের বড় হাফেয ও আলেমগণের অন্যতম। তার সময়ের লোকদের ইমাম। পরহেযগারী ও ইবাদতে প্রসিদ্ধ। তিনি হাদীস শুনেছেন হিশাম ইবন উরওয়া ও আল-আ'মাশ প্রমুখ থেকে। তার থেকে হাদীস শুনেছেন সাওরী (তার উস্তাদ), ইবনুল মুবারক, আব্দুর রহমান ইবন মাহদী, আলী ইবনুল মাদীনী, আহমাদ ইবন হাম্বল, ইবন মা'ঈন প্রমুখ। তার সম্পর্কে ইমাম আহমাদ বলেন, আমি ওকী' এর মতো কাউকে ইলম জমাকারী ও হিফয সম্পাদনকারী দেখিনি। ইমাম যাহাবী বলেন, তিনি ছিলেন, ইলমের সমুদ্র, হিফযের ইমাম; আহমাদ তাকে খুব সম্মান করতেন ও তার মর্যাদা তুলে ধরতেন। ইবন মা'ঈন বলেন, ওকী' যেন তার সময়ের আওযা'ঈ। হিজরী ১৯৬ সালে তিনি মারা যান। দেখুন, ইবন সা'দ, আত-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা (৬/৩৯৪); আবু নু'আইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া (৮/৩৬৮); খত্নীবে বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ (১৩/৪৪৬); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৯/১৪০)।
৫৪৫. এ আছারটি ইবন আবী যামানীন ছাড়া আরও যারা তাদের কিতাবে এনেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন, ১- শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, শারহু হাদীসিন নুযূল, পৃ. ১৮৮। ২- শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/৫৬)।
৫৪৬. তিনি হচ্ছেন, আবু ইয়া'কুব ইউসুফ ইবন 'আদী ইবন যুরাইক্ব আত-তাইমী আল-কুফী। তার সময়ের বড় আলেমগণের একজন। তিনি হাদীস বর্ণনা করেছেন শারীক, আবিল আহওয়াস, 'আমর ইবন আবিল মিকদাম ও মালেক ইবন আনাস প্রমুখ থেকে। আর তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন বুখারী, আবু যুর'আহ, আবু হাতেম প্রমুখ। আবু যুর'আহ বলেন, সিক্কাহ বা নির্ভরযোগ্য। ব্যবসায়ের জন্য মিসরে যান এবং হিজরী ২৩২ সালে সেখানে মারা যান। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১০/৪৮৪); ইবন হাজার, তাহযীবুত তাহযীব (৪/১৮৯); ইবনুল 'ইমাদ, শাযরাতুয যাহাব (২/৭৫)।
৫৪৭. তিনি হচ্ছেন আবু যাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবন মা'ঈন ইবন 'আওন ইবন যিয়াদ ইবন সাত্ত্বাম আল- মুররী, তাদের মাওলা, আল-বাগদাদী। হাদীস শুনেছেন ইসমা'ঈল ইবন 'উলাইয়্যাহ, ইসমা'ঈল ইবন মুজালিদ ইবন সা'ঈদ, হাম্মাদ ইবন উসামাহ, সুফইয়ান ইবন 'উয়াইনাহ, 'আব্দুল্লাহ ইবন রাজা আল-মাক্কী, আব্দুর রহমান ইবন মাহদী প্রমুখ। তার থেকে হাদীস গ্রহণ করেন বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, ইবরাহীম ইবন ইয়া'কুব আল-জাওযাজানী, আহমাদ ইবন হাম্বল, আবু ঘুর'আহ আর-রাযী ও আবু যুর'আহ আদ-দিমাশকী প্রমুখ। তিনি ছিলেন আলেম ও ইমাম। রিজালশাস্ত্রের মহাপণ্ডিত। রিজালশাস্ত্রের কিতাবসমূহ তার বক্তব্য ও মন্তব্যে ভরপুর। বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, আমি নিজ হাতে দশ লক্ষ হাদীস লিখেছি। আলী ইবনুল মাদীনী বলেন, ইয়াহইয়া ইবন মা'ঈন যা লিখেছেন তা কোনো ব্যক্তি লিখেছেন বলে আমি জানি না। তার জন্ম হয়েছিল হিজরী ১৫৮ সালে, আর মৃত্যু হয়েছিল হিজরী ২৩৩ সালে। দেখুন, ইবন আবি হাতেম, আল-জারহু ওয়াত তা'দীল (১/৩১৪); খত্নীবে বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ (১৪/১৭৭); ইবনু খাল্লিকান, ওফায়াতুল আ'ইয়ান (৬/১৩৯); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১১/৭১)।
৫৪৮. আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আলেমগণ এ বিষয়টির স্বীকৃতি দিয়েছেন যে, মহান আল্লাহ কর্তৃক নিকটতম আসমানে নেমে আসা সংক্রান্ত হাদীসগুলো মুতাওয়াতির সূত্র দ্বারা সাব্যস্ত, এ গুণটি জাহমিয়্যাদের ওপর অনেক কঠিন আঘাত।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 ইবন আবী যামানীন কর্তৃক আল্লাহর সর্বোচ্চ সত্তা হওয়ার ওপর কিছু দলীল উপস্থাপন

📄 ইবন আবী যামানীন কর্তৃক আল্লাহর সর্বোচ্চ সত্তা হওয়ার ওপর কিছু দলীল উপস্থাপন


মুহাম্মাদ [ইবন আবি যামানীন] বলেন: এ হাদীস বর্ণনা করে যে, আল্লাহ আসমানে 'আরশের উপরে, যমীনে নয়। এটা আল্লাহর কিতাব এবং অসংখ্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
يُدَبِّرُ الْأَمْرَ مِنَ السَّمَاءِ إِلَى الْأَرْضِ ثُمَّ يَعْرُجُ إِلَيْهِ ﴾ [السجدة: ৫]
"তিনি আসমান থেকে যমীন পর্যন্ত সমুদয় বিষয় পরিচালনা করেন, তারপর তাঁর সমীপে উঠে যায়।” [সূরা আস-সাজদাহ: ০৫]
তিনি আরও বলেন:
أَمِنتُم مَّن فِي السَّمَاءِ أَن يَخْسِفَ بِكُمُ الْأَرْضَ فَإِذَا هِيَ تَمُورُ أَمْ أَمِنتُم مَّن فِي السَّمَاءِ أَن يُرْسِلَ عَلَيْكُمْ حَاصِبًا فَسَتَعْلَمُونَ كَيْفَ نَذِيرٍ ﴾ [الملك: ১৬, ১৭]
"তোমরা কি ভাবনামুক্ত হয়ে গেছ যে, আকাশের উপর(৫৫০) যিনি আছেন তিনি তোমাদেরকে ভূগর্ভে বিলীন করে দিবেন, অতঃপর তা কাঁপতে থাকবে। না তোমরা নিশ্চিন্ত হয়ে গেছ যে, আকাশের উপর যিনি আছেন, তিনি তোমাদের উপর প্রস্তর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, অতঃপর তোমরা জানতে পারবে কেমন ছিল আমার সতর্কবাণী। [সূরা আল-মুলক: ১৬, ১৭]
তিনি আরও বলেন:
إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ وَالْعَمَلُ الصَّالِحُ يَرْفَعُهُ ﴾ [فاطر: ১০]
"তাঁরই দিকে পবিত্র বাণীসমূহ উঠে যায় আর সৎ আমল তিনিই তা উঠিয়ে নেন।” [সূরা ফাতির: ১০]
তিনি আরও বলেন:
وَهُوَ الْقَاهِرُ فَوْقَ عِبَادِهِ ﴾ [الانعام: ১৮]
"আর তিনিই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণকারী তাঁর বান্দাদের উপর।” [সূরা আল-আন'আম: ১৮]
তিনি আরও বলেন:
يَعِيسَى إِنِّي مُتَوَفِّيكَ وَرَافِعُكَ إِلَى [ال عمران: ৫৫]
"হে 'ঈসা! নিশ্চয় আমি আপনাকে পরিগ্রহণ করব, আমার নিকট আপনাকে উঠিয়ে নিব।" [সূরা আলে ইমরান: ৫৫]
তিনি আরও বলেন;
بَل رَّفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ﴾ [النساء: ১৫৮]
"বরং আল্লাহ্ তাকে তাঁর নিকট তুলে নিয়েছেন।” [সূরা আন-নিসা: ১৫৮]
আর তিনি(৫৫১) ইমাম মালিক এর সূত্রে ঐ দাসীর কথা উল্লেখ করেন যাতে নবীজি সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন:
«أَيْنَ اللَّهُ ؟ قَالَتْ: فِي السَّمَاءِ، قَالَ: «مَنْ أَنَا؟» قَالَتْ: أَنْتَ رَسُولُ اللَّهِ، قَالَ: «أَعْتِقْهَا، فَإِنَّهَا مُؤْمِنَةٌ».
"আল্লাহ কোথায়? সে বলল আসমানের উপর। তিনি বললেন: আমি কে? সে বলল: আপনি আল্লাহর রাসূল। তিনি বললেন: তাকে মুক্ত করে দাও; কেননা সে মুমিন দাসী।”(৫৫২)
তিনি(৫৫৩) বলেন, এ ধরনের আরও অসংখ্য হাদীস রয়েছে। সুতরাং তিনি কতইনা পবিত্র, যার জ্ঞান যমীনস্থ সবকিছু সম্পর্কে যেমন আসমানস্থ সবকিছু সম্পর্কেও তেমন। তিনি ভিন্ন সত্য কোনো মা'বুদ নেই, তিনি সুউচ্চ, মহান।

টিকাঃ
৫৪৫৯. ইবন আবী যামানীন, উসূলুস সুন্নাহ (১/৩০২)।
৫৫০. আয়াতে বর্ণিত 'সামা' অর্থ যদি ঊর্ধ্বালোক অর্থ করা হয়, তাহলে 'ফী' অর্থ 'মধ্যে' করা যায়। আর যদি 'সামা' অর্থ আসমান নামীয় একটি দেহ বিশিষ্ট স্তর ধরা হয় তখন 'ফী' অর্থ করা হবে 'উপরে'। আরবী ভাষায় এর বহু নযীর আছে। আর কুরআনে কারীমেও সে রকম ব্যবহার এসেছে।
৫৫১. অর্থাৎ ইবন আবী যামানীন রাহিমাহুল্লাহ।
৫৫২. মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ৫৩৭। ইতোপূর্বে এর তাখরীজ চলে গেছে।
৫৫৩. অর্থাৎ ইবন আবী যামানীন রাহিমাহুল্লাহ তার উসূলুস সুন্নাহ গ্রন্থে।

মুহাম্মাদ [ইবন আবি যামানীন] বলেন: এ হাদীস বর্ণনা করে যে, আল্লাহ আসমানে 'আরশের উপরে, যমীনে নয়। এটা আল্লাহর কিতাব এবং অসংখ্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
يُدَبِّرُ الْأَمْرَ مِنَ السَّمَاءِ إِلَى الْأَرْضِ ثُمَّ يَعْرُجُ إِلَيْهِ ﴾ [السجدة: ৫]
"তিনি আসমান থেকে যমীন পর্যন্ত সমুদয় বিষয় পরিচালনা করেন, তারপর তাঁর সমীপে উঠে যায়।” [সূরা আস-সাজদাহ: ০৫]
তিনি আরও বলেন:
أَمِنتُم مَّن فِي السَّمَاءِ أَن يَخْسِفَ بِكُمُ الْأَرْضَ فَإِذَا هِيَ تَمُورُ أَمْ أَمِنتُم مَّن فِي السَّمَاءِ أَن يُرْسِلَ عَلَيْكُمْ حَاصِبًا فَسَتَعْلَمُونَ كَيْفَ نَذِيرٍ ﴾ [الملك: ১৬, ১৭]
"তোমরা কি ভাবনামুক্ত হয়ে গেছ যে, আকাশের উপর(৫৫০) যিনি আছেন তিনি তোমাদেরকে ভূগর্ভে বিলীন করে দিবেন, অতঃপর তা কাঁপতে থাকবে। না তোমরা নিশ্চিন্ত হয়ে গেছ যে, আকাশের উপর যিনি আছেন, তিনি তোমাদের উপর প্রস্তর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, অতঃপর তোমরা জানতে পারবে কেমন ছিল আমার সতর্কবাণী। [সূরা আল-মুলক: ১৬, ১৭]
তিনি আরও বলেন:
إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ وَالْعَمَلُ الصَّالِحُ يَرْفَعُهُ ﴾ [فاطر: ১০]
"তাঁরই দিকে পবিত্র বাণীসমূহ উঠে যায় আর সৎ আমল তিনিই তা উঠিয়ে নেন।” [সূরা ফাতির: ১০]
তিনি আরও বলেন:
وَهُوَ الْقَاهِرُ فَوْقَ عِبَادِهِ ﴾ [الانعام: ১৮]
"আর তিনিই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণকারী তাঁর বান্দাদের উপর।” [সূরা আল-আন'আম: ১৮]
তিনি আরও বলেন:
يَعِيسَى إِنِّي مُتَوَفِّيكَ وَرَافِعُكَ إِلَى [ال عمران: ৫৫]
"হে 'ঈসা! নিশ্চয় আমি আপনাকে পরিগ্রহণ করব, আমার নিকট আপনাকে উঠিয়ে নিব।" [সূরা আলে ইমরান: ৫৫]
তিনি আরও বলেন;
بَل رَّفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ﴾ [النساء: ১৫৮]
"বরং আল্লাহ্ তাকে তাঁর নিকট তুলে নিয়েছেন।” [সূরা আন-নিসা: ১৫৮]
আর তিনি(৫৫১) ইমাম মালিক এর সূত্রে ঐ দাসীর কথা উল্লেখ করেন যাতে নবীজি সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন:
«أَيْنَ اللَّهُ ؟ قَالَتْ: فِي السَّمَاءِ، قَالَ: «مَنْ أَنَا؟» قَالَتْ: أَنْتَ رَسُولُ اللَّهِ، قَالَ: «أَعْتِقْهَا، فَإِنَّهَا مُؤْمِنَةٌ».
"আল্লাহ কোথায়? সে বলল আসমানের উপর। তিনি বললেন: আমি কে? সে বলল: আপনি আল্লাহর রাসূল। তিনি বললেন: তাকে মুক্ত করে দাও; কেননা সে মুমিন দাসী।”(৫৫২)
তিনি(৫৫৩) বলেন, এ ধরনের আরও অসংখ্য হাদীস রয়েছে। সুতরাং তিনি কতইনা পবিত্র, যার জ্ঞান যমীনস্থ সবকিছু সম্পর্কে যেমন আসমানস্থ সবকিছু সম্পর্কেও তেমন। তিনি ভিন্ন সত্য কোনো মা'বুদ নেই, তিনি সুউচ্চ, মহান।

টিকাঃ
৫৪৫৯. ইবন আবী যামানীন, উসূলুস সুন্নাহ (১/৩০২)।
৫৫০. আয়াতে বর্ণিত 'সামা' অর্থ যদি ঊর্ধ্বালোক অর্থ করা হয়, তাহলে 'ফী' অর্থ 'মধ্যে' করা যায়। আর যদি 'সামা' অর্থ আসমান নামীয় একটি দেহ বিশিষ্ট স্তর ধরা হয় তখন 'ফী' অর্থ করা হবে 'উপরে'। আরবী ভাষায় এর বহু নযীর আছে। আর কুরআনে কারীমেও সে রকম ব্যবহার এসেছে।
৫৫১. অর্থাৎ ইবন আবী যামানীন রাহিমাহুল্লাহ।
৫৫২. মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ৫৩৭। ইতোপূর্বে এর তাখরীজ চলে গেছে।
৫৫৩. অর্থাৎ ইবন আবী যামানীন রাহিমাহুল্লাহ তার উসূলুস সুন্নাহ গ্রন্থে।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 ইবন আবী যামানীন কর্তৃক আল্লাহর নাম ও গুণ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য

📄 ইবন আবী যামানীন কর্তৃক আল্লাহর নাম ও গুণ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য


এর পূর্বে তিনি আল্লাহ নাম ও সিফাতের প্রতি ঈমান সম্পর্কে বলেন: "জেনে রাখো! আল্লাহ সম্পর্কে এবং তাঁর নবী-রাসূলগণ যা নিয়ে এসেছিলেন সে সম্পর্কে যারা জ্ঞানী তারা মনে করেন, আল্লাহ নিজের ব্যাপারে যা বলেননি তা না জানাই ইলম এবং যেদিকে আহ্বান করেননি, তা করতে অপরাগ হওয়াই ঈমান। আর তারা تو সেখানেই থেমে যান যেখানে তিনি স্বীয় কিতাবে তাঁর নবীর যবানীর মাধ্যমে থামিয়ে দিয়েছেন। আর মহান আল্লাহ বলেছেন বলেছেন- তিনি সর্বাপেক্ষা সত্যবাদী-
﴿كُلُّ شَيْءٍ هَالِكُ إِلَّا وَجْهَهُ ﴾ [القصص: ٨٨]
“আল্লাহর চেহারাসহ সত্তা ছাড়া সমস্ত কিছুই ধ্বংসশীল।”(৫৫৫) [সূরা আল-কাসাস: ৮৮]
﴿قُلْ أَيُّ شَيْءٍ أَكْبَرُ شَهَدَةٌ قُلِ اللَّهُ شَهِيدٌ بَيْنِي وَبَيْنَكُمْ﴾ [الانعام: ١٩]
"বলুন, 'কোন জিনিস(৫৫৬) সবচেয়ে বড় সাক্ষী'? বলুন, 'আল্লাহ আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষ্যদাতা'(৫৫৭)।” [সূরা আল-আন'আম: ১৯]
তিনি আরও বলেন:
﴿وَيُحَذِّرُكُمُ اللَّهُ نَفْسَهُ﴾ [آل عمران : ٣٠]
"আল্লাহ তাঁর নিজের সত্তা(৫৫৮) সম্বন্ধে তিনি তোমাদেরকে সাবধান করছেন।” [সূরা আলে ইমরান: ৩০]
অন্যত্র বলেন:
﴿فَإِذَا سَوَّيْتُهُ وَنَفَخْتُ فِيهِ مِن رُّوحِي) [الحجر: ٢٩] [ص: ۷۲]
"অতঃপর যখন আমি তাকে সুন্দর সুসম করব(৫৫৯) আর তাতে আমার রূহ(৫৬০) ফুঁকে(৫৬১) দেব।” [সূরা আল-হিজর: ২৯; সূরা স্বদ: ৭২]
তিনি অন্যত্র বলেন:
"কারণ আপনি আমাদের চোখের সামনেই আছেন।”(৫৬২) [সূরা আন-তূর: ৪৮]
তিনি আরও বলেন:
﴿وَلِتُصْنَعَ عَلَى عَيْنِي) [طه: ٣٩]
"আর যাতে আপনি আমার চোখের সামনে প্রতিপালিত হন।”(৫৬৩) [সূরা ত্বা-হা: ৩৯]
তিনি অন্যত্র বলেন:
﴿وَقَالَتِ الْيَهُودُ يَدُ اللَّهِ مَغْلُولَةٌ غُلَّتْ أَيْدِيهِمْ وَلُعِنُوا بِمَا قَالُوا بَلْ يَدَاهُ مَبْسُوطَتَانِ﴾ [المائدة: ٦٤]
"আর ইয়াহুদীরা বলে, 'আল্লাহর হাত(৫৬৪) রুদ্ধ'। তাদের হাতই রুদ্ধ করা হয়েছে এবং তারা যা বলে সে জন্য তারা অভিশপ্ত, বরং আল্লাহর উভয় হাতই প্রসারিত।”(৫৬৫) [সূরা আল-মায়েদাহ: ৬৪]
তিনি অন্যত্র বলেন:
﴿وَالْأَرْضُ جَمِيعًا قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيمَةِ﴾ [الزمر: ৬৭]
“কিয়ামতের দিন সমস্ত যমীন থাকবে তাঁর হাতের মুঠিতে(৫৬৬)।” [সূরা আয-যুমার: ৬৭]
তিনি অন্যত্র বলেন:
﴿إِنَّنِي مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى﴾ [طٰه: ٤٦]
“আমি তো আপনাদের সংগে আছি, আমি শুনি ও আমি দেখি।(৫৬৭)” [সূরা ত্বা-হা: ৪৬]
তিনি অন্যত্র বলেন:
﴿وَكَلَّمَ اللهُ مُوسَى تَكْلِيمًا﴾ [النساء: ١٦٤]
“আর অবশ্যই আল্লাহ মূসার সাথে যথাযথভাবে কথা বলেছেন(৫৬৮)।” [সূরা আন-নিসা: ১৬৪]
তিনি আরও বলেন:
﴿اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ﴾ [النور: ٣٥]
“আল্লাহ্ আসমানসমূহ ও যমীনের নূর।(৫৬৯)” [সূরা আন-নূর: ৩৫]
তিনি আরও বলেন,
﴿اللهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ﴾ [البقرة: ٢٥٥]
“আল্লাহ্, তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ্ নেই। তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক(৫৭০)।” [সূরা আল-বাকারাহ: ২৫৫]
তিনি আরও বলেন,
﴿هُوَ الْأَوَّلُ وَالْآخِرُ وَالظَّاهِرُ وَالْبَاطِنُ﴾ [الحديد: ٣]
“তিনিই আদি, অন্ত, সবকিছুর উপরে এবং নিকটে(৫৭১)।” [সূরা আল-হাদীদ: ০৩]
এরূপ আরও বহু আয়াত কুরআনে রয়েছে(৫৭২)।
সুতরাং মহান বরকতময় সত্তা যিনি আসমান ও যমীনের নূর, যেমনটি তিনি তাঁর নিজের ব্যাপারে জানিয়েছেন। আর তাঁর রয়েছে চেহারা, নফস বা সত্তা(৫৭৩) ইত্যাদি। তিনি শোনেন, দেখেন, কথা বলেন। তিনি প্রথম, তাঁর পূর্বে কিছুই নেই। তিনি স্থায়ী, সর্বশেষ, তাঁর পরে কিছুই নেই। তিনি উপরে, সবকিছুর উপরে, তিনি নিকটে, সৃষ্টির ব্যাপারে তার ইলম খুবই সুক্ষ্ম। “তিনি সবকিছু সম্পর্কে সবিশেষ জ্ঞানী।” [সূরা আল- বাকারাহ: ২৯], তিনি কাইয়্যুম বা চিরস্থায়ী, হাইয়্যুন বা চিরঞ্জীব, তন্দ্রা ও নিদ্রা তাঁকে স্পর্শ করে না।
অতঃপর তিনি সিফাত সংক্রান্ত অনেকগুলো হাদীস উল্লেখ করে বলেন(৫৭৪): এগুলো আমাদের প্রভুর সিফাত যা তিনি স্বীয় কিতাবে এবং তার নবী হাদীসে বর্ণনা করেছেন। যেগুলোর মধ্যে নেই কোনো সীমানা নির্ধারণ, সাদৃশ্যকরণ ও পরিমাণ বর্ণনা। “তাঁর মতো কিছুই নেই। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” [সূরা আশ-শূরা: ১১] কোনো চোখই তাঁকে দেখেনি যে তিনি কেমন তা সীমিত করবে। (৫৭৫) কিন্তু অন্তরসমূহ তাঁকে ঈমানের হাকীকতে দেখেছে(৫৭৬) ।(৫৭৭)

টিকাঃ
৫৫৪. ইবন আবী যামানীন, উসুলুস সুন্নাহ (১/১০১)।
৫৫৫. এটি আল্লাহর সত্তাগত গুণ 'চেহারা' এর ওপর প্রমাণ। যদিও চেহারার সাথে সত্তাও অন্তর্ভুক্ত। কারণ যে সত্তার চেহারা নেই সে সত্তাকে চেহারার দিকে সম্পৃক্ত করা যায় না। [খালেদ আল-মুসলিহ, শারহুল হামাওয়িয়‍্যাহ] আয়াতের আরেকটি বিশুদ্ধ অর্থ হচ্ছে, সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে তবে কেবল তাই অবশিষ্ট থাকবে যা আল্লাহর চেহারা দর্শন লাভের উদ্দেশ্য করা হয়েছে। [খালেদ আল-মুসলিহ, শারহুল হামাওয়িয়‍্যাহ]
৫৫৬. এর দ্বারা বুঝা গেল যে, আল্লাহ তা'আলাকে 'শাই' বস্তু বা বিষয় বলা যাবে। তবে সেটা গুণ হিসেবে নয়, ইখবার বা সংবাদ হিসেবে। আয়াতে শেষে সাক্ষ্য হওয়া আল্লাহর একটি গুণ।
৫৫৭. আয়াত থেকে আল্লাহর 'শহীদ' নামটি সাব্যস্ত হচ্ছে।
৫৫৮. এখানে নফস বলে আল্লাহর সত্তাকেই বুঝানো হয়েছে। তাই বিশুদ্ধ মতে এ আয়াতটি সিফাতের আয়াত নয়।
৫৫৯. এখান থেকে আল্লাহর আরেকটি কর্মগত গুণ সাব্যস্ত হচ্ছে, তা হচ্ছে 'তাসওয়িয়াহ' আর তা হাত দিয়ে করেছেন, তাই সত্তাগত আরেকটি গুণ সাব্যস্ত হচ্ছে তা হচ্ছে হাত।
৫৬০. এ আয়াতে আসা রূহ কী আল্লাহর সিফাত? বস্তুত 'রূহ' আল্লাহর সিফাত হিসেবে এখানে যেমন আসেনি তেমনি কুরআন ও সহীহ হাদীসের কোথাও আসেনি। কুরআনে কারীমের কয়েক জায়গায় 'রূহ' হিসেবে জিবরীলকে ও 'ঈসাকে উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। আর উভয়েই সৃষ্ট আলাদা সত্তা। নিয়ম হচ্ছে, কোনো স্বতন্ত্র সত্তা যদি আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করা হয়, তখন সেটা আল্লাহর গুণ হয় না। সেটা হয় আল্লাহর সৃষ্টি। কারণ, আল্লাহর দিকে কোনো কিছু সম্পৃক্ত হওয়া তিন ভাবে হতে পারে: ১- সত্তার দিকে অপর সত্তার সম্পর্ক। ২- আল্লাহর সত্তার দিকে গুণের সম্পর্ক। কোনো সত্তার সাথে যদি এমন কিছুকে সম্পৃক্ত করে দেয়া হয় যার আলাদা কোনো অস্তিত্ব নেই, তাহলে সেটা হয় মাওসূফের সাথে সিফাতের সম্পর্ক, সত্তার সাথে গুণের সম্পর্ক। যেমন, 'কুদরাতুল্লাহ' (আল্লাহর কুদরত) 'রহমাতুল্লাহ' (আল্লাহর রহমত) 'ইয়াদুল্লাহ' (আল্লাহর হাত) কারণ এগুলো আলাদা সত্তা হিসেবে পাওয়া যায় না। আর যখনই সৃষ্ট আলাদা সত্তার কোনো কিছু আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করা হয়, তখন সেটা হয়, মালিকের দিকে মালিকানার সম্পৃক্ততা। স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যকার সম্পর্ক দেখানো। সে সম্পৃক্ততা সাধারণত সম্মানিত করার জন্য হয়ে থাকে। যেমন, বাইতুল্লাহ, (আল্লাহর ঘর), নাকাতুল্লাহ (আল্লাহর উষ্ট্রী)। আর জানা কথা যে, ঘর ও উষ্ট্রী উভয়টিই সৃষ্ট আলাদা জিনিস। তাই আল্লাহর সাথে সেটার সম্পৃক্ততা মালিকের সাথে মালিকানার, স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির। সে হিসেবে কুরআনে কারীমের যেখানে যেখানে 'রূহ' শব্দটি এসেছে, যেমন, [সূরা আন-নিসা: ১৭১; সূরা আল-হিজর: ২৯; স্বদ ৭২; সূরা মারইয়াম, ১৭; সূরা আস-সাজদাহ: ০৯] অনুরূপ হাদীসেও 'ঈসা আলাইহিস সালাম ও জিবরীলের ব্যাপারে আল্লাহর 'রূহ' ব্যবহৃত হয়েছে, এসব স্থানে রূহ অবশ্যই সৃষ্ট জিনিস। তাই সৃষ্ট জিনিসের সাথে আল্লাহর সম্পৃক্ত হওয়া হচ্ছে মালিকের সাথে মালিকানার সম্পৃক্ততা, স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির সম্পৃক্ততা, তা স্রষ্টার সাথে গুণের সম্পৃক্ততা নয়। তাই উপরে বর্ণিত আয়াত ও হাদীসে আসা 'রূহ' আল্লাহর গুণ নয়, বরং সৃষ্টি। এর বাইরে রূহ শব্দটি কোথাও আল্লাহর জন্য কুরআনে কারীম ও হাদীসে গুণ হিসেবে আসেনি। [বিস্তারিত জানার জন্য দেখা যেতে পারে, মাজমূ' ফাতাওয়া (৯/২৯০); ইবনুল কাইয়্যেম, কিতাবুর রূহ, পৃ. ৫০০] ৩- আল্লাহর সাথে কোনো কর্মের সম্পর্ক। এটা দু'ভাবে বিভক্ত, এক. যদি সে কর্মটি একান্তভাবে স্রষ্টার সাথেই সম্পৃক্ত থেকে যায়, তার মাধ্যমে অন্য কোনো সত্তার অস্তিত্ব না আসে, তবে সেটাকে বলা হবে কর্মবাচক গুণ। যেমন, 'আরশের উপর উঠা, নিকটতম আসমানে নেমে আসা, হাশরের মাঠে আগমন, কারো ওপর সন্তুষ্ট হওয়া, কারো ক্রোধান্বিত হওয়া ইত্যাদি। দুই, আর যদি সে কর্মের মাধ্যমে ওপর একটি ভিন্ন সত্তার সূত্রপাত হয় তবে সেটাকে আল্লাহর কর্ম বলা হবে। যেমন, আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন, আল্লাহ পানি বর্ষণ করেছেন।
৫৬১. বুঝা গেল রূহ ফুঁকে দেয়া আল্লাহর একটি কাজ, যা তিনি করেছেন।
৫৬২. এখানে আল্লাহর সত্তাগত একটি গুণ সাব্যস্ত করা হচ্ছে, আর তা হচ্ছে আল্লাহর চোখ।
৫৬৩. এ আয়াত থেকেও আল্লাহর সত্তাগত গুণ 'চোখ' সাব্যস্ত হচ্ছে।
৫৬৪. এ আয়াতে আল্লাহর একটি গুণ সাব্যস্ত করা হয়েছে, তা হচ্ছে: আল্লাহর হাত।
৫৬৫. গ্রন্থকার শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ অন্যত্র 'হাত প্রসারিত করা'র অর্থ করেছেন 'বেশি দান করা ও প্রশস্তভাবে খরচ করা'। তিনি আরও বলেন, দু'হাত তাওরাত ও অন্যান্য নবুওয়াতেও সাব্যস্ত করা হয়েছে; যেমনিভাবে তা কুরআনে এসেছে। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, আল-জাওয়াবুস সহীহ (৪/৪১২); মাজমূ' ফাতাওয়া (৬/৩৬৩)।
৫৬৬. এ আয়াতে আল্লাহর একটি সত্তাগত গুণ সাব্যস্ত করা হয়েছে, তা হচ্ছে হাতের কজা বা মুষ্ঠি।
৫৬৭. এ আয়াতে আল্লাহর তিনটি কর্মগত গুণ সাব্যস্ত হচ্ছে, তা হলো, আল্লাহ কর্তৃক আরশের উপর থেকেও বান্দার সাথে থাকা, তাঁর শোনা ও দেখা। অর্থাৎ শোনা ও দেখার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা সকল বান্দার সাথে আছেন। আর তাঁর বিশেষ বান্দাদের সাথে আরও একটু অতিরিক্ত হিসাবে সাথে আছে আছেন তা হচ্ছে, সাহায্য-সহযোগিতা করা।
৫৬৮. এ আয়াতে আল্লাহর একটি গুণ সাব্যস্ত করা হয়েছে। তা হচ্ছে কথা বলা। আল্লাহর এ গুণটি সত্তাগত ও কর্মগত উভয় প্রকারের।
৫৬৯. এ আয়াত থেকে সাব্যস্ত হচ্ছে যে আল্লাহর জন্য 'নূর' নামটি সাব্যস্ত হবে। যেমনটি সিদ্ধান্ত দিয়েছেন শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ তার বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ গ্রন্থে (২/৪২০) এবং ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুয়ুশ, পৃ. ৪৪।
৫৭০. এ আয়াতে অনেকগুলো নাম ও গুণ রয়েছে। যেমন: ইলাহিয়াহ গুণ, হায়াত গুণ, কাইয়্যুমিয়‍্যাহ গুণ। এ গুণগুলো সত্তাগত।
৫৭১. এখানে চারটি নাম ও কমপক্ষে চারটি সত্তাগত গুণ সাব্যস্ত করা হয়েছে। বস্তুত এ আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ কর্তৃক বান্দাহকে সর্বদিক থেকে পরিবেষ্টন করে রাখা প্রমাণিত হচ্ছে। স্থান হোক কিংবা কাল হোক সবদিক থেকে বান্দা সবসময় ও সবজায়গায় আল্লাহর পরিবেষ্টনীর ভেতর রয়েছে। এ যেন অপর আয়াতের তাফসীর যেখানে আল্লাহ বলেছেন, 'ওয়াল্লাহু বিকুল্লি শাইয়িন মুহীত্ব' বা "আর আল্লাহ সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছেন।" [সূরা ফুসসিলাত: ৫৪] এ পরিবেষ্টন, জ্ঞান, ক্ষমতা, তত্ত্বাবধান ও পরিচর্যার মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে।
৫৭২. অর্থাৎ যেখানে আল্লাহর সিফাত সাব্যস্ত করা হয়েছে এমন বহু আয়াত রয়েছে কুরআনে কারীমে।
৫৭৩. এখানে 'নাফস' বলে আল্লাহর সত্তাকে বুঝানো হয়েছে। এটিই অধিকাংশ আলেমের মত। যেমনটি বেশ কিছু নস তথা কুরআন ও হাদীসের ভাষ্যে এসেছে। যেমন, আল্লাহর বাণী, "মুমিনগণ যেন মুমিনগণ ছাড়া কাফেরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। আর যে কেউ এরূপ করবে তার সাথে আল্লাহর কোনো সম্পর্ক থাকবে না; তবে ব্যতিক্রম, যদি তোমরা তাদের নিকট থেকে আত্মরক্ষার জন্য সতর্কতা অবলম্বন কর। আর আল্লাহ তাঁর নিজ সত্তার ব্যাপারে তোমাদেরকে সাবধান করছেন এবং আল্লাহর দিকেই প্রত্যাবর্তন।” [সূরা আলে ইমরান: ২৮], অনুরূপ "আর যারা আমাদের আয়াতসমূহে ঈমান আনে, তারা যখন আপনার কাছে আসে তখন তাদেরকে আপনি বলুন, 'তোমাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক', তোমাদের রব তাঁর নিজ সত্তার ওপর দয়া লিখে নিয়েছেন। তোমাদের মধ্যে কেউ অজ্ঞতাবশত যদি খারাপ কাজ করে, তারপর তাওবা করে এবং সংশোধন করে, তবে নিশ্চয় তিনি (আল্লাহ) ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা আল-আন'আম: ৫৪] আর হাদীসে কুদসীতে এসেছে, "... অতঃপর যদি আমাকে তার নিজ সত্তায় স্মরন করে আমিও তাকে নিজ সত্তায় স্মরণ করি" ইত্যাদি ভাষ্যসমূহে।
ইমাম উসমান ইবন সা'ঈদ আদ-দারেমী বলেন, "আর আল্লাহর নফস বলে স্বয়ং আল্লাহকে বুঝানো হয়েছে। সত্তাতে সকল সিফাত একত্রিত হয়, যদি সত্তা অস্তিত্বহীন হয়ে যায় তখন সবকিছু অস্তিত্বহীন হয়ে যায়। [আর-রাদ্দু 'আলাল বিশর আল-মিররীসী (২/৮৪৭-৮৪৮)]
ইবন তাইমিয়্যাহ অন্যত্র বলেন, 'আর তাঁর নফস বলতে তাঁর সত্তাকেই বুঝানো হয়েছে। [মাজমু' ফাতাওয়া (১৪/১৯৬)]
অন্যত্র তিনি বলেন, "অধিকাংশ আলেমের নিকট নফস বলে স্বয়ং আল্লাহকেই বুঝানো হয়েছে যা তাঁর সেই সত্তা যা সকল গুণে গুণান্বিত। এখানে নফস বলে এমন কোনো সত্তা বুঝানো হয়নি যা গুণ থেকে মুক্ত; আবার নফস দ্বারা সত্তার কোনো গুণকেও বুঝানো হয়নি। কোনো কোনো মানুষ নফসকে সিফাত বা গুণ গণ্য করে থাকে, আবার আরেক গোষ্ঠী এটাকে গুণমুক্ত একটি সত্তা মনে করে থাকে। উভয় মতই ভুল।” [মাজমূ' ফাতাওয়া (৯/২৯২); আরও দেখুন, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৭/৪২৬)]
যারা যাত বা সত্তা বলে একটি সিফাত সাব্যস্ত করে থাকে তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন, কাযী আবু ইয়া'লা, যেমনটি এসেছে তাঁর ইবত্বালুত তা'ওয়িলাত গ্রন্থে (২/৪৪২-৪৪৭)। সেটার ওপর তিনি 'নাফস' আসা আয়াতগুলো দিয়েই দলীল দিয়েছেন; অনুরূপ তিনি ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বলের একটি মত থেকেও সেটার দলীল নিয়েছেন যা ইমাম আহমাদ তার 'আর-রাদ্দু আলায যানাদিক্বাতি ওয়াল জাহমিয়্যাহ' গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।
তারপর তিনি বলেন, 'অতঃপর যদি কেউ বলে, এখানে 'নাফস' দ্বারা সিফাত সাব্যস্ত করা হচ্ছে না, এর দ্বারা তো কেবল 'যাত' বা সত্তাকের বুঝানো হচ্ছে, যেমন আরবরা বলে থাকেন, 'হাযা নাফসুল আমর', (এটা তো সে কাজটিই) তারা এর দ্বারা সে কাজটিই বুঝায়, এটা বুঝায় না যে কাজের 'নাফস' আছে।... বলা হবে যে এটা ভুল; কারণ [১] যদি 'নাফস' বলে যাত বা সত্তা বুঝানো জায়েয হয় তাহলে হায়াত (জীবন) ও বাক্কা (স্থায়ী) বলেও সত্তা বুঝানো সম্ভব। তাই তখন বলা যাবে যে, যাতু হাইয়াহ, যাতু বাকীয়‍্যাহ। আর আমরা আর সকল সিফাত সাব্যস্তকারীরা এভাবে একমত যে, আল্লাহ তা'আলা জীবন দ্বারা জীবিত, অবশিষ্ট থাকা দ্বারা স্থায়ী। তাই সে হিসাবে বলা জায়েয হবে যে, তিনি নফসসহ সত্তা। [২] তাছাড়া আরও একটি কারণ হচ্ছে, তখন আল্লাহর ব্যাপারে বলা জায়েয হবে যে, আল্লাহ হচ্ছেন নাফস। [৩] তখন এভাবে আহ্বান করে বলাও জায়েয হতে হয়, 'হে নফস, আমাদের ক্ষমা করুন।' অথচ উম্মতের ইজমা’ হয়েছে যে এটা বলা যাবে না।' এ হচ্ছে 'নাফস'কে গুণ বলার ব্যাপারে কাযী আবু ইয়া'লার ব্যাখ্যা। অথচ তা শুদ্ধ নয়। আয়াতসমূহে 'নাফস' শব্দটি তাকীদের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। আর- [১] হায়াত ও বাক্কা শব্দদ্বয় তাকীদের জন্য ব্যবহৃত হয় না। [২] এটা তো তা'কীদ হিসেবে এসেছে। যাতে মুআক্কাদ অবশিষ্টই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। [৩] তা'কীদকে ডাকা হয় না, মুআক্কাদকেই ডাকা হয়।
৫৭৪. ইবন আবী যামানীন, উসুলুস সুন্নাহ, পৃ. ১৬৬।
৫৭৫. সাধারণত কেউ কোনো কিছু দেখতে পেলে বলতে পারে যে, সেটা কেমন। দুনিয়ার বুকে জাগ্রত অবস্থায় কেউ আল্লাহকে দেখতে পায়নি; সুতরাং কীভাবে সে আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান দিয়ে তাঁকে পরিবেষ্টন করবে? অনুরূপ কথা ইবন কুদামাহ রাহিমাহুল্লাহ তার লুম'আতুল ই'তিক্বাদেও বলেছেন, 'তাকে কোনো বিবেক চিন্তা করে উদাহরণ পেশ করতে পারে না, অনুরূপ কোনো কলব তাঁকে ছবির মত ধারণা করতে পারে না, "তাঁর মতো কোনো কিছু নেই, আর তিনি সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা [সূরা আশ-শূরা: ১১]। সুতরাং এখানেও তিনি কুরআন ও সুন্নাহ’য় আসা আল্লাহর গুণাবলিকে কোনো প্রকার উদাহরণ কিংবা ধরণ নির্ধারণ ব্যতীতই সাব্যস্ত করেছেন।
৫৭৬. এখানে যা বলা হয়েছে তা সেটাই প্রমাণ করছে যে কথাটি শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ অন্য জায়গায় বলেছেন, তিনি বলেন, 'যে কেউ দাবি করবে যে, সে তার রব্বকে মৃত্যুর পূর্বে তার দু চোখে দেখেছে, আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের নিকট তার দাবি অবশ্যই বাতিল।... তবে যারা আল্লাহর প্রকৃত ঈমানদার বান্দা তারা আল্লাহর পরিচয়, কলবের দৃঢ়তা ও সেটার দর্শন ও আলোর মাধ্যমে যা লাভ করে তার রয়েছে অনেক স্তর। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরীলকে বলেছেন, ইহসান হচ্ছে, তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যেন তুমি তাঁকে দেখছ, আর যদি তা করতে না পার, তবে এমনভাবে করবে যেন তিনি তোমাকে দেখছেন। [আল-ওয়াসিয়্যাতুল কুবরা, পৃ. ২৭; তাহক্বীক্ব: আল-হামূদ] বস্তুত সেটা তখনই হবে যখন কেউ আল্লাহর কিতাবে আসা আল্লাহর যাবতীয় নাম ও গুণাবলি, অনুরূপ আল্লাহর রাসূলের হাদীসে আসা আল্লাহর যাবতীয় নাম ও গুণাবলির প্রতি অকাট্য ঈমান রাখবে, এমন দৃঢ় বিশ্বাস রাখবে যাতে কোনো সংশয় ও সন্দেহ প্রবেশ করার সুযোগ থাকবে না। যখন এগুলোর ধরণ নির্ধারণ ও উদাহরণ পেশ নিয়ে অযথা কৃত্তিমতা অবলম্বন করবে না। তখনই সে তার অন্তরে রাব্বুল আলামীনের নাম ও গুণকে দেখবে এমনভাবে যা চোখের দেখার চেয়েও বড় আকারে ধরা দিবে, বিশেষ করে যখন ঈমানী চেতনার সাথে তার সম্পৃক্ততা থাকবে। বর্ণিত আছে যে, উরওয়া ইবনুষ যুবাইর রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু ইবন 'উমার রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমার কাছে তার কন্যার বিয়ের ব্যাপারে প্রস্তাব পেশ করেন, তখন ইবন 'উমার রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা তাওয়াফরত অবস্থায় ছিলেন। ইবন 'উমার রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা বললেন, তুমি কি এখন মহিলাদের ব্যাপারে আলোচনা করছ? অথচ আমরা এখন তাওয়াফে আল্লাহর দর্শনে ব্যস্ত আছি? এ প্রকাশ একজন মানুষের আল্লাহর ওপর ঈমান ও তার পরিচয় লাভ ও ভালোবাসা অনুযায়ী হয়ে থাকে; আর তাই তা মানুষের অবস্থা হিসেবে ভিন্ন ভিন্ন প্রকার হতে পারে। দেখুন, শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, শারহু হাদীসিন নুযূল, পৃ. ১২৩-১৩৪।
৫৭৭. এখানে এসে ইবন আবী যামানীন থেকে উদ্ধৃত অংশ শেষ হয়েছে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এখানে ইমাম আবি যামানীন এর উসূলুস সুন্নাহ গ্রন্থ থেকে আল্লাহর 'আরশ, কুরসী, অবতরণ ও 'আরশের উপর থাকা এতসংক্রান্ত বড় একটি অংশ নিয়ে এসেছেন। তবে কোথাও কোথাও তিনি কথা সংক্ষেপ করেছেন।

এর পূর্বে তিনি আল্লাহ নাম ও সিফাতের প্রতি ঈমান সম্পর্কে বলেন: "জেনে রাখো! আল্লাহ সম্পর্কে এবং তাঁর নবী-রাসূলগণ যা নিয়ে এসেছিলেন সে সম্পর্কে যারা জ্ঞানী তারা মনে করেন, আল্লাহ নিজের ব্যাপারে যা বলেননি তা না জানাই ইলম এবং যেদিকে আহ্বান করেননি, তা করতে অপরাগ হওয়াই ঈমান। আর তারা تو সেখানেই থেমে যান যেখানে তিনি স্বীয় কিতাবে তাঁর নবীর যবানীর মাধ্যমে থামিয়ে দিয়েছেন। আর মহান আল্লাহ বলেছেন বলেছেন- তিনি সর্বাপেক্ষা সত্যবাদী-
﴿كُلُّ شَيْءٍ هَالِكُ إِلَّا وَجْهَهُ ﴾ [القصص: ٨٨]
“আল্লাহর চেহারাসহ সত্তা ছাড়া সমস্ত কিছুই ধ্বংসশীল।”(৫৫৫) [সূরা আল-কাসাস: ৮৮]
﴿قُلْ أَيُّ شَيْءٍ أَكْبَرُ شَهَدَةٌ قُلِ اللَّهُ شَهِيدٌ بَيْنِي وَبَيْنَكُمْ﴾ [الانعام: ١٩]
"বলুন, 'কোন জিনিস(৫৫৬) সবচেয়ে বড় সাক্ষী'? বলুন, 'আল্লাহ আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষ্যদাতা'(৫৫৭)।” [সূরা আল-আন'আম: ১৯]
তিনি আরও বলেন:
﴿وَيُحَذِّرُكُمُ اللَّهُ نَفْسَهُ﴾ [آل عمران : ٣٠]
"আল্লাহ তাঁর নিজের সত্তা(৫৫৮) সম্বন্ধে তিনি তোমাদেরকে সাবধান করছেন।” [সূরা আলে ইমরান: ৩০]
অন্যত্র বলেন:
﴿فَإِذَا سَوَّيْتُهُ وَنَفَخْتُ فِيهِ مِن رُّوحِي) [الحجر: ٢٩] [ص: ۷۲]
"অতঃপর যখন আমি তাকে সুন্দর সুসম করব(৫৫৯) আর তাতে আমার রূহ(৫৬০) ফুঁকে(৫৬১) দেব।” [সূরা আল-হিজর: ২৯; সূরা স্বদ: ৭২]
তিনি অন্যত্র বলেন:
"কারণ আপনি আমাদের চোখের সামনেই আছেন।”(৫৬২) [সূরা আন-তূর: ৪৮]
তিনি আরও বলেন:
﴿وَلِتُصْنَعَ عَلَى عَيْنِي) [طه: ٣٩]
"আর যাতে আপনি আমার চোখের সামনে প্রতিপালিত হন।”(৫৬৩) [সূরা ত্বা-হা: ৩৯]
তিনি অন্যত্র বলেন:
﴿وَقَالَتِ الْيَهُودُ يَدُ اللَّهِ مَغْلُولَةٌ غُلَّتْ أَيْدِيهِمْ وَلُعِنُوا بِمَا قَالُوا بَلْ يَدَاهُ مَبْسُوطَتَانِ﴾ [المائدة: ٦٤]
"আর ইয়াহুদীরা বলে, 'আল্লাহর হাত(৫৬৪) রুদ্ধ'। তাদের হাতই রুদ্ধ করা হয়েছে এবং তারা যা বলে সে জন্য তারা অভিশপ্ত, বরং আল্লাহর উভয় হাতই প্রসারিত।”(৫৬৫) [সূরা আল-মায়েদাহ: ৬৪]
তিনি অন্যত্র বলেন:
﴿وَالْأَرْضُ جَمِيعًا قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيمَةِ﴾ [الزمر: ৬৭]
“কিয়ামতের দিন সমস্ত যমীন থাকবে তাঁর হাতের মুঠিতে(৫৬৬)।” [সূরা আয-যুমার: ৬৭]
তিনি অন্যত্র বলেন:
﴿إِنَّنِي مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى﴾ [طٰه: ٤٦]
“আমি তো আপনাদের সংগে আছি, আমি শুনি ও আমি দেখি।(৫৬৭)” [সূরা ত্বা-হা: ৪৬]
তিনি অন্যত্র বলেন:
﴿وَكَلَّمَ اللهُ مُوسَى تَكْلِيمًا﴾ [النساء: ١٦٤]
“আর অবশ্যই আল্লাহ মূসার সাথে যথাযথভাবে কথা বলেছেন(৫৬৮)।” [সূরা আন-নিসা: ১৬৪]
তিনি আরও বলেন:
﴿اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ﴾ [النور: ٣٥]
“আল্লাহ্ আসমানসমূহ ও যমীনের নূর।(৫৬৯)” [সূরা আন-নূর: ৩৫]
তিনি আরও বলেন,
﴿اللهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ﴾ [البقرة: ٢٥٥]
“আল্লাহ্, তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ্ নেই। তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক(৫৭০)।” [সূরা আল-বাকারাহ: ২৫৫]
তিনি আরও বলেন,
﴿هُوَ الْأَوَّلُ وَالْآخِرُ وَالظَّاهِرُ وَالْبَاطِنُ﴾ [الحديد: ٣]
“তিনিই আদি, অন্ত, সবকিছুর উপরে এবং নিকটে(৫৭১)।” [সূরা আল-হাদীদ: ০৩]
এরূপ আরও বহু আয়াত কুরআনে রয়েছে(৫৭২)।
সুতরাং মহান বরকতময় সত্তা যিনি আসমান ও যমীনের নূর, যেমনটি তিনি তাঁর নিজের ব্যাপারে জানিয়েছেন। আর তাঁর রয়েছে চেহারা, নফস বা সত্তা(৫৭৩) ইত্যাদি। তিনি শোনেন, দেখেন, কথা বলেন। তিনি প্রথম, তাঁর পূর্বে কিছুই নেই। তিনি স্থায়ী, সর্বশেষ, তাঁর পরে কিছুই নেই। তিনি উপরে, সবকিছুর উপরে, তিনি নিকটে, সৃষ্টির ব্যাপারে তার ইলম খুবই সুক্ষ্ম। “তিনি সবকিছু সম্পর্কে সবিশেষ জ্ঞানী।” [সূরা আল- বাকারাহ: ২৯], তিনি কাইয়্যুম বা চিরস্থায়ী, হাইয়্যুন বা চিরঞ্জীব, তন্দ্রা ও নিদ্রা তাঁকে স্পর্শ করে না।
অতঃপর তিনি সিফাত সংক্রান্ত অনেকগুলো হাদীস উল্লেখ করে বলেন(৫৭৪): এগুলো আমাদের প্রভুর সিফাত যা তিনি স্বীয় কিতাবে এবং তার নবী হাদীসে বর্ণনা করেছেন। যেগুলোর মধ্যে নেই কোনো সীমানা নির্ধারণ, সাদৃশ্যকরণ ও পরিমাণ বর্ণনা। “তাঁর মতো কিছুই নেই। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” [সূরা আশ-শূরা: ১১] কোনো চোখই তাঁকে দেখেনি যে তিনি কেমন তা সীমিত করবে। (৫৭৫) কিন্তু অন্তরসমূহ তাঁকে ঈমানের হাকীকতে দেখেছে(৫৭৬) ।(৫৭৭)

টিকাঃ
৫৫৪. ইবন আবী যামানীন, উসুলুস সুন্নাহ (১/১০১)।
৫৫৫. এটি আল্লাহর সত্তাগত গুণ 'চেহারা' এর ওপর প্রমাণ। যদিও চেহারার সাথে সত্তাও অন্তর্ভুক্ত। কারণ যে সত্তার চেহারা নেই সে সত্তাকে চেহারার দিকে সম্পৃক্ত করা যায় না। [খালেদ আল-মুসলিহ, শারহুল হামাওয়িয়‍্যাহ] আয়াতের আরেকটি বিশুদ্ধ অর্থ হচ্ছে, সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে তবে কেবল তাই অবশিষ্ট থাকবে যা আল্লাহর চেহারা দর্শন লাভের উদ্দেশ্য করা হয়েছে। [খালেদ আল-মুসলিহ, শারহুল হামাওয়িয়‍্যাহ]
৫৫৬. এর দ্বারা বুঝা গেল যে, আল্লাহ তা'আলাকে 'শাই' বস্তু বা বিষয় বলা যাবে। তবে সেটা গুণ হিসেবে নয়, ইখবার বা সংবাদ হিসেবে। আয়াতে শেষে সাক্ষ্য হওয়া আল্লাহর একটি গুণ।
৫৫৭. আয়াত থেকে আল্লাহর 'শহীদ' নামটি সাব্যস্ত হচ্ছে।
৫৫৮. এখানে নফস বলে আল্লাহর সত্তাকেই বুঝানো হয়েছে। তাই বিশুদ্ধ মতে এ আয়াতটি সিফাতের আয়াত নয়।
৫৫৯. এখান থেকে আল্লাহর আরেকটি কর্মগত গুণ সাব্যস্ত হচ্ছে, তা হচ্ছে 'তাসওয়িয়াহ' আর তা হাত দিয়ে করেছেন, তাই সত্তাগত আরেকটি গুণ সাব্যস্ত হচ্ছে তা হচ্ছে হাত।
৫৬০. এ আয়াতে আসা রূহ কী আল্লাহর সিফাত? বস্তুত 'রূহ' আল্লাহর সিফাত হিসেবে এখানে যেমন আসেনি তেমনি কুরআন ও সহীহ হাদীসের কোথাও আসেনি। কুরআনে কারীমের কয়েক জায়গায় 'রূহ' হিসেবে জিবরীলকে ও 'ঈসাকে উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। আর উভয়েই সৃষ্ট আলাদা সত্তা। নিয়ম হচ্ছে, কোনো স্বতন্ত্র সত্তা যদি আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করা হয়, তখন সেটা আল্লাহর গুণ হয় না। সেটা হয় আল্লাহর সৃষ্টি। কারণ, আল্লাহর দিকে কোনো কিছু সম্পৃক্ত হওয়া তিন ভাবে হতে পারে: ১- সত্তার দিকে অপর সত্তার সম্পর্ক। ২- আল্লাহর সত্তার দিকে গুণের সম্পর্ক। কোনো সত্তার সাথে যদি এমন কিছুকে সম্পৃক্ত করে দেয়া হয় যার আলাদা কোনো অস্তিত্ব নেই, তাহলে সেটা হয় মাওসূফের সাথে সিফাতের সম্পর্ক, সত্তার সাথে গুণের সম্পর্ক। যেমন, 'কুদরাতুল্লাহ' (আল্লাহর কুদরত) 'রহমাতুল্লাহ' (আল্লাহর রহমত) 'ইয়াদুল্লাহ' (আল্লাহর হাত) কারণ এগুলো আলাদা সত্তা হিসেবে পাওয়া যায় না। আর যখনই সৃষ্ট আলাদা সত্তার কোনো কিছু আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করা হয়, তখন সেটা হয়, মালিকের দিকে মালিকানার সম্পৃক্ততা। স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যকার সম্পর্ক দেখানো। সে সম্পৃক্ততা সাধারণত সম্মানিত করার জন্য হয়ে থাকে। যেমন, বাইতুল্লাহ, (আল্লাহর ঘর), নাকাতুল্লাহ (আল্লাহর উষ্ট্রী)। আর জানা কথা যে, ঘর ও উষ্ট্রী উভয়টিই সৃষ্ট আলাদা জিনিস। তাই আল্লাহর সাথে সেটার সম্পৃক্ততা মালিকের সাথে মালিকানার, স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির। সে হিসেবে কুরআনে কারীমের যেখানে যেখানে 'রূহ' শব্দটি এসেছে, যেমন, [সূরা আন-নিসা: ১৭১; সূরা আল-হিজর: ২৯; স্বদ ৭২; সূরা মারইয়াম, ১৭; সূরা আস-সাজদাহ: ০৯] অনুরূপ হাদীসেও 'ঈসা আলাইহিস সালাম ও জিবরীলের ব্যাপারে আল্লাহর 'রূহ' ব্যবহৃত হয়েছে, এসব স্থানে রূহ অবশ্যই সৃষ্ট জিনিস। তাই সৃষ্ট জিনিসের সাথে আল্লাহর সম্পৃক্ত হওয়া হচ্ছে মালিকের সাথে মালিকানার সম্পৃক্ততা, স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির সম্পৃক্ততা, তা স্রষ্টার সাথে গুণের সম্পৃক্ততা নয়। তাই উপরে বর্ণিত আয়াত ও হাদীসে আসা 'রূহ' আল্লাহর গুণ নয়, বরং সৃষ্টি। এর বাইরে রূহ শব্দটি কোথাও আল্লাহর জন্য কুরআনে কারীম ও হাদীসে গুণ হিসেবে আসেনি। [বিস্তারিত জানার জন্য দেখা যেতে পারে, মাজমূ' ফাতাওয়া (৯/২৯০); ইবনুল কাইয়্যেম, কিতাবুর রূহ, পৃ. ৫০০] ৩- আল্লাহর সাথে কোনো কর্মের সম্পর্ক। এটা দু'ভাবে বিভক্ত, এক. যদি সে কর্মটি একান্তভাবে স্রষ্টার সাথেই সম্পৃক্ত থেকে যায়, তার মাধ্যমে অন্য কোনো সত্তার অস্তিত্ব না আসে, তবে সেটাকে বলা হবে কর্মবাচক গুণ। যেমন, 'আরশের উপর উঠা, নিকটতম আসমানে নেমে আসা, হাশরের মাঠে আগমন, কারো ওপর সন্তুষ্ট হওয়া, কারো ক্রোধান্বিত হওয়া ইত্যাদি। দুই, আর যদি সে কর্মের মাধ্যমে ওপর একটি ভিন্ন সত্তার সূত্রপাত হয় তবে সেটাকে আল্লাহর কর্ম বলা হবে। যেমন, আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন, আল্লাহ পানি বর্ষণ করেছেন।
৫৬১. বুঝা গেল রূহ ফুঁকে দেয়া আল্লাহর একটি কাজ, যা তিনি করেছেন।
৫৬২. এখানে আল্লাহর সত্তাগত একটি গুণ সাব্যস্ত করা হচ্ছে, আর তা হচ্ছে আল্লাহর চোখ।
৫৬৩. এ আয়াত থেকেও আল্লাহর সত্তাগত গুণ 'চোখ' সাব্যস্ত হচ্ছে।
৫৬৪. এ আয়াতে আল্লাহর একটি গুণ সাব্যস্ত করা হয়েছে, তা হচ্ছে: আল্লাহর হাত।
৫৬৫. গ্রন্থকার শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ অন্যত্র 'হাত প্রসারিত করা'র অর্থ করেছেন 'বেশি দান করা ও প্রশস্তভাবে খরচ করা'। তিনি আরও বলেন, দু'হাত তাওরাত ও অন্যান্য নবুওয়াতেও সাব্যস্ত করা হয়েছে; যেমনিভাবে তা কুরআনে এসেছে। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, আল-জাওয়াবুস সহীহ (৪/৪১২); মাজমূ' ফাতাওয়া (৬/৩৬৩)।
৫৬৬. এ আয়াতে আল্লাহর একটি সত্তাগত গুণ সাব্যস্ত করা হয়েছে, তা হচ্ছে হাতের কজা বা মুষ্ঠি।
৫৬৭. এ আয়াতে আল্লাহর তিনটি কর্মগত গুণ সাব্যস্ত হচ্ছে, তা হলো, আল্লাহ কর্তৃক আরশের উপর থেকেও বান্দার সাথে থাকা, তাঁর শোনা ও দেখা। অর্থাৎ শোনা ও দেখার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা সকল বান্দার সাথে আছেন। আর তাঁর বিশেষ বান্দাদের সাথে আরও একটু অতিরিক্ত হিসাবে সাথে আছে আছেন তা হচ্ছে, সাহায্য-সহযোগিতা করা।
৫৬৮. এ আয়াতে আল্লাহর একটি গুণ সাব্যস্ত করা হয়েছে। তা হচ্ছে কথা বলা। আল্লাহর এ গুণটি সত্তাগত ও কর্মগত উভয় প্রকারের।
৫৬৯. এ আয়াত থেকে সাব্যস্ত হচ্ছে যে আল্লাহর জন্য 'নূর' নামটি সাব্যস্ত হবে। যেমনটি সিদ্ধান্ত দিয়েছেন শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ তার বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ গ্রন্থে (২/৪২০) এবং ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুয়ুশ, পৃ. ৪৪।
৫৭০. এ আয়াতে অনেকগুলো নাম ও গুণ রয়েছে। যেমন: ইলাহিয়াহ গুণ, হায়াত গুণ, কাইয়্যুমিয়‍্যাহ গুণ। এ গুণগুলো সত্তাগত।
৫৭১. এখানে চারটি নাম ও কমপক্ষে চারটি সত্তাগত গুণ সাব্যস্ত করা হয়েছে। বস্তুত এ আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ কর্তৃক বান্দাহকে সর্বদিক থেকে পরিবেষ্টন করে রাখা প্রমাণিত হচ্ছে। স্থান হোক কিংবা কাল হোক সবদিক থেকে বান্দা সবসময় ও সবজায়গায় আল্লাহর পরিবেষ্টনীর ভেতর রয়েছে। এ যেন অপর আয়াতের তাফসীর যেখানে আল্লাহ বলেছেন, 'ওয়াল্লাহু বিকুল্লি শাইয়িন মুহীত্ব' বা "আর আল্লাহ সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছেন।" [সূরা ফুসসিলাত: ৫৪] এ পরিবেষ্টন, জ্ঞান, ক্ষমতা, তত্ত্বাবধান ও পরিচর্যার মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে।
৫৭২. অর্থাৎ যেখানে আল্লাহর সিফাত সাব্যস্ত করা হয়েছে এমন বহু আয়াত রয়েছে কুরআনে কারীমে।
৫৭৩. এখানে 'নাফস' বলে আল্লাহর সত্তাকে বুঝানো হয়েছে। এটিই অধিকাংশ আলেমের মত। যেমনটি বেশ কিছু নস তথা কুরআন ও হাদীসের ভাষ্যে এসেছে। যেমন, আল্লাহর বাণী, "মুমিনগণ যেন মুমিনগণ ছাড়া কাফেরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। আর যে কেউ এরূপ করবে তার সাথে আল্লাহর কোনো সম্পর্ক থাকবে না; তবে ব্যতিক্রম, যদি তোমরা তাদের নিকট থেকে আত্মরক্ষার জন্য সতর্কতা অবলম্বন কর। আর আল্লাহ তাঁর নিজ সত্তার ব্যাপারে তোমাদেরকে সাবধান করছেন এবং আল্লাহর দিকেই প্রত্যাবর্তন।” [সূরা আলে ইমরান: ২৮], অনুরূপ "আর যারা আমাদের আয়াতসমূহে ঈমান আনে, তারা যখন আপনার কাছে আসে তখন তাদেরকে আপনি বলুন, 'তোমাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক', তোমাদের রব তাঁর নিজ সত্তার ওপর দয়া লিখে নিয়েছেন। তোমাদের মধ্যে কেউ অজ্ঞতাবশত যদি খারাপ কাজ করে, তারপর তাওবা করে এবং সংশোধন করে, তবে নিশ্চয় তিনি (আল্লাহ) ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা আল-আন'আম: ৫৪] আর হাদীসে কুদসীতে এসেছে, "... অতঃপর যদি আমাকে তার নিজ সত্তায় স্মরন করে আমিও তাকে নিজ সত্তায় স্মরণ করি" ইত্যাদি ভাষ্যসমূহে।
ইমাম উসমান ইবন সা'ঈদ আদ-দারেমী বলেন, "আর আল্লাহর নফস বলে স্বয়ং আল্লাহকে বুঝানো হয়েছে। সত্তাতে সকল সিফাত একত্রিত হয়, যদি সত্তা অস্তিত্বহীন হয়ে যায় তখন সবকিছু অস্তিত্বহীন হয়ে যায়। [আর-রাদ্দু 'আলাল বিশর আল-মিররীসী (২/৮৪৭-৮৪৮)]
ইবন তাইমিয়্যাহ অন্যত্র বলেন, 'আর তাঁর নফস বলতে তাঁর সত্তাকেই বুঝানো হয়েছে। [মাজমু' ফাতাওয়া (১৪/১৯৬)]
অন্যত্র তিনি বলেন, "অধিকাংশ আলেমের নিকট নফস বলে স্বয়ং আল্লাহকেই বুঝানো হয়েছে যা তাঁর সেই সত্তা যা সকল গুণে গুণান্বিত। এখানে নফস বলে এমন কোনো সত্তা বুঝানো হয়নি যা গুণ থেকে মুক্ত; আবার নফস দ্বারা সত্তার কোনো গুণকেও বুঝানো হয়নি। কোনো কোনো মানুষ নফসকে সিফাত বা গুণ গণ্য করে থাকে, আবার আরেক গোষ্ঠী এটাকে গুণমুক্ত একটি সত্তা মনে করে থাকে। উভয় মতই ভুল।” [মাজমূ' ফাতাওয়া (৯/২৯২); আরও দেখুন, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৭/৪২৬)]
যারা যাত বা সত্তা বলে একটি সিফাত সাব্যস্ত করে থাকে তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন, কাযী আবু ইয়া'লা, যেমনটি এসেছে তাঁর ইবত্বালুত তা'ওয়িলাত গ্রন্থে (২/৪৪২-৪৪৭)। সেটার ওপর তিনি 'নাফস' আসা আয়াতগুলো দিয়েই দলীল দিয়েছেন; অনুরূপ তিনি ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বলের একটি মত থেকেও সেটার দলীল নিয়েছেন যা ইমাম আহমাদ তার 'আর-রাদ্দু আলায যানাদিক্বাতি ওয়াল জাহমিয়্যাহ' গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।
তারপর তিনি বলেন, 'অতঃপর যদি কেউ বলে, এখানে 'নাফস' দ্বারা সিফাত সাব্যস্ত করা হচ্ছে না, এর দ্বারা তো কেবল 'যাত' বা সত্তাকের বুঝানো হচ্ছে, যেমন আরবরা বলে থাকেন, 'হাযা নাফসুল আমর', (এটা তো সে কাজটিই) তারা এর দ্বারা সে কাজটিই বুঝায়, এটা বুঝায় না যে কাজের 'নাফস' আছে।... বলা হবে যে এটা ভুল; কারণ [১] যদি 'নাফস' বলে যাত বা সত্তা বুঝানো জায়েয হয় তাহলে হায়াত (জীবন) ও বাক্কা (স্থায়ী) বলেও সত্তা বুঝানো সম্ভব। তাই তখন বলা যাবে যে, যাতু হাইয়াহ, যাতু বাকীয়‍্যাহ। আর আমরা আর সকল সিফাত সাব্যস্তকারীরা এভাবে একমত যে, আল্লাহ তা'আলা জীবন দ্বারা জীবিত, অবশিষ্ট থাকা দ্বারা স্থায়ী। তাই সে হিসাবে বলা জায়েয হবে যে, তিনি নফসসহ সত্তা। [২] তাছাড়া আরও একটি কারণ হচ্ছে, তখন আল্লাহর ব্যাপারে বলা জায়েয হবে যে, আল্লাহ হচ্ছেন নাফস। [৩] তখন এভাবে আহ্বান করে বলাও জায়েয হতে হয়, 'হে নফস, আমাদের ক্ষমা করুন।' অথচ উম্মতের ইজমা’ হয়েছে যে এটা বলা যাবে না।' এ হচ্ছে 'নাফস'কে গুণ বলার ব্যাপারে কাযী আবু ইয়া'লার ব্যাখ্যা। অথচ তা শুদ্ধ নয়। আয়াতসমূহে 'নাফস' শব্দটি তাকীদের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। আর- [১] হায়াত ও বাক্কা শব্দদ্বয় তাকীদের জন্য ব্যবহৃত হয় না। [২] এটা তো তা'কীদ হিসেবে এসেছে। যাতে মুআক্কাদ অবশিষ্টই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। [৩] তা'কীদকে ডাকা হয় না, মুআক্কাদকেই ডাকা হয়।
৫৭৪. ইবন আবী যামানীন, উসুলুস সুন্নাহ, পৃ. ১৬৬।
৫৭৫. সাধারণত কেউ কোনো কিছু দেখতে পেলে বলতে পারে যে, সেটা কেমন। দুনিয়ার বুকে জাগ্রত অবস্থায় কেউ আল্লাহকে দেখতে পায়নি; সুতরাং কীভাবে সে আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান দিয়ে তাঁকে পরিবেষ্টন করবে? অনুরূপ কথা ইবন কুদামাহ রাহিমাহুল্লাহ তার লুম'আতুল ই'তিক্বাদেও বলেছেন, 'তাকে কোনো বিবেক চিন্তা করে উদাহরণ পেশ করতে পারে না, অনুরূপ কোনো কলব তাঁকে ছবির মত ধারণা করতে পারে না, "তাঁর মতো কোনো কিছু নেই, আর তিনি সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা [সূরা আশ-শূরা: ১১]। সুতরাং এখানেও তিনি কুরআন ও সুন্নাহ’য় আসা আল্লাহর গুণাবলিকে কোনো প্রকার উদাহরণ কিংবা ধরণ নির্ধারণ ব্যতীতই সাব্যস্ত করেছেন।
৫৭৬. এখানে যা বলা হয়েছে তা সেটাই প্রমাণ করছে যে কথাটি শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ অন্য জায়গায় বলেছেন, তিনি বলেন, 'যে কেউ দাবি করবে যে, সে তার রব্বকে মৃত্যুর পূর্বে তার দু চোখে দেখেছে, আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের নিকট তার দাবি অবশ্যই বাতিল।... তবে যারা আল্লাহর প্রকৃত ঈমানদার বান্দা তারা আল্লাহর পরিচয়, কলবের দৃঢ়তা ও সেটার দর্শন ও আলোর মাধ্যমে যা লাভ করে তার রয়েছে অনেক স্তর। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরীলকে বলেছেন, ইহসান হচ্ছে, তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যেন তুমি তাঁকে দেখছ, আর যদি তা করতে না পার, তবে এমনভাবে করবে যেন তিনি তোমাকে দেখছেন। [আল-ওয়াসিয়্যাতুল কুবরা, পৃ. ২৭; তাহক্বীক্ব: আল-হামূদ] বস্তুত সেটা তখনই হবে যখন কেউ আল্লাহর কিতাবে আসা আল্লাহর যাবতীয় নাম ও গুণাবলি, অনুরূপ আল্লাহর রাসূলের হাদীসে আসা আল্লাহর যাবতীয় নাম ও গুণাবলির প্রতি অকাট্য ঈমান রাখবে, এমন দৃঢ় বিশ্বাস রাখবে যাতে কোনো সংশয় ও সন্দেহ প্রবেশ করার সুযোগ থাকবে না। যখন এগুলোর ধরণ নির্ধারণ ও উদাহরণ পেশ নিয়ে অযথা কৃত্তিমতা অবলম্বন করবে না। তখনই সে তার অন্তরে রাব্বুল আলামীনের নাম ও গুণকে দেখবে এমনভাবে যা চোখের দেখার চেয়েও বড় আকারে ধরা দিবে, বিশেষ করে যখন ঈমানী চেতনার সাথে তার সম্পৃক্ততা থাকবে। বর্ণিত আছে যে, উরওয়া ইবনুষ যুবাইর রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু ইবন 'উমার রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমার কাছে তার কন্যার বিয়ের ব্যাপারে প্রস্তাব পেশ করেন, তখন ইবন 'উমার রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা তাওয়াফরত অবস্থায় ছিলেন। ইবন 'উমার রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা বললেন, তুমি কি এখন মহিলাদের ব্যাপারে আলোচনা করছ? অথচ আমরা এখন তাওয়াফে আল্লাহর দর্শনে ব্যস্ত আছি? এ প্রকাশ একজন মানুষের আল্লাহর ওপর ঈমান ও তার পরিচয় লাভ ও ভালোবাসা অনুযায়ী হয়ে থাকে; আর তাই তা মানুষের অবস্থা হিসেবে ভিন্ন ভিন্ন প্রকার হতে পারে। দেখুন, শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, শারহু হাদীসিন নুযূল, পৃ. ১২৩-১৩৪।
৫৭৭. এখানে এসে ইবন আবী যামানীন থেকে উদ্ধৃত অংশ শেষ হয়েছে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এখানে ইমাম আবি যামানীন এর উসূলুস সুন্নাহ গ্রন্থ থেকে আল্লাহর 'আরশ, কুরসী, অবতরণ ও 'আরশের উপর থাকা এতসংক্রান্ত বড় একটি অংশ নিয়ে এসেছেন। তবে কোথাও কোথাও তিনি কথা সংক্ষেপ করেছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00