📄 ইমাম আব্দুর রহমান ইবন মাহদীর বক্তব্য
অনুরূপভাবে তিন (আব্দুল্লাহ ইবন আহমদ) প্রসিদ্ধ ইমাম আব্দুর রহমান ইবন মাহদী(৪৮৭) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: "প্রবৃত্তির অনুসারীদের মধ্য হতে জাহমীদের চেয়ে নিকৃষ্ট আর কেউ নেই। তারা ঘুরেফিরে এটাই বলে যে, উপরে কিছুই নেই। আল্লাহর কসম, আমি মনে করি যে, তাদের পরস্পর বিবাহ ও উত্তরাধিকারিত্ব নেই।(৪৮৮)”
অনুরূপভাবে আবদুর রহমান ইবন আবি হাতীম স্বীয় 'আর-রাদ্দু 'আলাল জাহমিয়্যাহ' গ্রন্থে আব্দুর রহমান ইবন মাহদী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, "জাহম ও তার অনুসারীরা বলতে চায় যে, আল্লাহ তা'আলা মূসার সাথে কথা বলেননি। তারা বলতে চায় যে, আসমানের উপর কিছুই নেই।(৪৮৯) আর আল্লাহ 'আরশের উপর নন। আমি মনে করি, তাদের তাওবা করানো। তা না করলে তাদেরকে হত্যা করা হবে।"(৪৯০)
টিকাঃ
৪৮৭. তিনি হচ্ছেন আবু সা'ঈদ আব্দুর রহমান ইবন মাহদী ইবন হাসসান ইবন আব্দুর রহমান আল-আম্বরী, আল-বসরী। দীনের বড় ইমাম, হাদীসের সনদ ও মতনের সমালোচনাকারী বড় আলেম। তিনি হাদীস শুনেছেন সুফইয়ান, শু'বা প্রমুখ থেকে। আর তার থেকে হাদীস শুনেছেন ইবনুল মাদীনী, ইবন মা'ঈন, আহমাদ, ইসহাক প্রমুখ। ছোটকাল থেকেই ইলম অন্বেষণ করেন, আলেমগণ তাঁর উপর প্রশংসার বাণী দিয়েছেন প্রচুর পরিমাণে। তার সম্পর্কে শাফে'য়ী বলেন, 'এ বিষয়ে তার সমপর্যায়ের কাউকে আমি জানি না'। আলী ইবনুল মাদীনী তার সম্পর্কে বলেন, যদি আমি কাবার রুকনে ইবরাহীমী ও মাকামে ইবরাহীমীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে বলতে চাই যে, আমি আব্দুর রহমান ইবন মাহদীর চেয়ে হাদীসে অভিজ্ঞ কাউকে জানি না তাহলে অবশ্যই বলতে পারি। আইয়্যুব ইবনুল মুতাওয়াক্কিল বলেন, আমরা যখন দীন ও দুনিয়া একত্রে দেখতে চাইতাম তখন আমরা আব্দুর রহমান ইবন মাহদীর ঘরে যেতাম। ইমাম যাহাবী বলেন, তিনি ইমাম, হুজ্জত, ইলম ও আমলে আদর্শ। তার জন্ম হিজরী ১৩৫ সালে, আর মৃত্যু হিজরী ১৯৮ সালে। দেখুন, ইবন সা'দ, আত-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা (৭/২৯৭); আবু নু'আইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া (৯/৩); খত্নীবে বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ (১০/২৪০); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৯/১৯২); ইবনুল 'ইমাদ, শাযরাতুয যাহাব (১/৩৫৫)।
৪৮৮. এ আছারটি দেখুন, ১- খাল্লাল, আস-সুন্নাহ। ২- আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ, আস-সুন্নাহ (১/১২০-১২১), নং ১৪৭। ৩- লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ ১/৩২০। ৪- বুখারী, খালকু আফ'আলিল ইবাদ, পৃ. ৩৪-৩৫। ৫- শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউত তা'আরুষ (৬/২৬১)।
৪৮৯. অর্থাৎ তাদের শেষ দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে, তারা কিছুর ইবাদত করবে না। জাহমিয়্যাদের মুনাযির ও তাদের কালামশাস্ত্রবিদরা বলে, নিশ্চয় আল্লাহ, তিনি জগতের ভেতরেও নন, জগতের বাইরেও নন। বস্তুত এটি হচ্ছে অস্তিত্বহীনের গুণ, যাকে জিনিস বা বস্তু বা ব্যক্তি কিছুই বলা যায় না।
৪৯০. আছারটি যারা নিয়ে এসেছেন তাদের অন্যতম হচ্ছেন, ১- বাইহাক্বী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (১/৩৮৬), সেখানে এসেছে, আবু আব্দুল্লাহ আল-হাফেয ও আবু সা'ঈদ ইবন আবী 'আমর থেকে বর্ণিত, তারা দু'জনে বলেন, আমাদেরকে বর্ণনা শুনিয়েছেন আবুল আব্বাস মুহাম্মাদ ইবন ইয়া'কূব, তিনি বলেন, আমাদেরকে বর্ণনা শুনিয়েছেন মুহাম্মাদ ইবন আলী আল-ওয়াররাক্ব, তিনি বলেন, আমাদেরকে বর্ণনা করেছেন 'আমর ইবনুল আব্বাস, তিনি বলেন, আমি আব্দুর রহমান ইবন মাহদীকে বলতে শুনেছি... তারপর তা বর্ণনা করেন। ২- আব্দুল্লাহ ইবন ইমাম আহমাদ, আস-সুন্নাহ (১/১১৯-১২০), নং ৪৪, ৪৮। ৩- লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ (১/৩১৬-৩১৭)। ৪- বুখারী, খালকু আফ'আলিল ইবাদ, পৃ. ৮৩। ৫- ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমু' ফাতাওয়া (৫/১৮৪)। ৬- ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউত তা'আরুদ্ব (৬/২৬১)। শাইখুল ইসলাম বলেন, প্রামাণ্য সনদ দিয়ে বর্ণিত। ৭- ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুয়ুশ, পৃ. ২১৪। ৮- আবু দাউদ, মাসায়িলুল ইমাম আহমাদ, পৃ. ২৬২। ৯- আর তা ইমাম যাহাবী বর্ণনা করেছেন, আল-উলু, পৃ. ১১৮ এবং বলেছেন, একাধিক ব্যক্তি তা আব্দুর রহমান ইবন মাহদী থেকে সহীহ সনদে নিয়ে এসেছেন। ১০- তাছাড়া যাহাবী আরও বর্ণনা করেছেন তাঁর আরবা'ঈন গ্রন্থে, পৃ. ৮১। ১১- অনুরূপ আরও বর্ণনা করেছেন ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা গ্রন্থে (৯/১৯৯-২০০)।
📄 ইমাম আ‘মাশ’ই এর বক্তব্য
ইমাম আসমা'ঈ(৪৯১) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "জাহামের স্ত্রী আগমন করে দাবাগীনে(৪৯২) অবতরণ করল। তখন তার নিকট এক ব্যক্তি বলল: আল্লাহ 'আরশের উপরে। সে (স্ত্রী) বলল: সীমাবদ্ধের(৪৯৩) ওপর সীমাবদ্ধ।(৪৯৪) আসমা'ঈ বললেন: এ কথায় সে কাফের হয়ে গেছে।"(৪৯৫)
টিকাঃ
৪৯১, তিনি হচ্ছেন আবু সা'ঈদ আব্দুল মালেক ইবন ক্বারীব ইবন আব্দুল মালেক ইবন আলী ইবন আসমা', আল-আসমা'ঈ, আল-বসরী। ভাষা ও সাহিত্যে যার কথা প্রমাণ। তিনি হাদীস শুনেছেন ইবন 'আওন, সুলাইমান আত-তাইমী, আবু 'আমর ইবনুল 'আলা প্রমুখ থেকে। তার থেকে হাদীস শুনেছেন আবু উবাইদ, ইবন মা'ঈন, ইসহাক ইবন ইবরাহীম আল-মাওসেলী, আবু হাতেম আর-রাযী প্রমুখ। শাফে'য়ী বলেন, আরবদের কেউ আসমা'ঈর মতো সুন্দর ইবারতে কথা ফুটিয়ে তুলতে পারেনি। ইমাম আহমাদ তার সুন্নাতের ওপর থাকার ভূয়শী প্রশংসা করেছেন। ইয়াহইয়া ইবন মা'ঈন বলেন, আসমা'ঈ তার সাহিত্যের বিষয়টি ভালোই জানতেন। তার সম্পর্কে যাহাবী বলেন, আল-ইমাম, আল- আল্লামা, আল-হাফেয, হুজ্জাতুল আদব, লিসানুল আরব।' তিনি হিজরী ২১৬ সালে মারা যান। দেখুন, বুখারী, আত-তারীখুল কাবীর (৫/৪২৮); খত্বীবে বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ (১০/৪১০); ইবনু খাল্লিকান, ওফায়াতুল আ'ইয়ান (৩/১৭০); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১০/১৭৫); ইবন হাজার, তাহযীবুত তাহযীব (৬/৪১৫)।
৪৯২. সম্ভবত এটি একটি জায়গার নাম। যেখানে চামড়া শিল্প প্রক্রিয়াজাত করা হতো। একবচন দাব্বাগ।
৪৯৩. এটি প্রাক্তন জাহমিয়্যাদের পথভ্রষ্টকারী একটি যুক্তি, যার কারণে তারা আল্লাহকে 'আরশের উপর থাকা অস্বীকার করে। তারা বলে, আল্লাহ যদি 'আরশের উপর থাকেন তো সীমাবদ্ধ হয়ে যাবেন। তখন 'আরশও সীমাবদ্ধ আর তার উপর আল্লাহও সীমাবদ্ধ। বর্তমানেও অধিকাংশ আশ'আরী ও মাতুরিদী সম্প্রদায়ের কুরআন ও সুন্নাহ'র ভাষ্যকে এমন যুক্তি তুলে ধরে অস্বীকার করে। ইতোপূর্বে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ তাদের এ সন্দেহের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, "তাদের বক্তা যখন বলে, যদি আল্লাহ 'আরশের উপর হোন তখন আবশ্যিকভাবে তাঁকে 'আরশের চেয়ে বড় হতে হবে, অথবা....”। সেখানে এ সন্দেহের জবাব দেয়া হয়েছিল যে, এটা তো সৃষ্টির ক্ষেত্রে এমনটি কিয়াস করে বলা যায়, স্রষ্টার ক্ষেত্রে এ ধরনের কিয়াস নিঃসন্দেহে পথভ্রষ্টতা।
৪৯৪. সম্ভবত আসমা'ঈ এ মহিলার বিরুদ্ধে এজন্য গিয়েছিলেন যে, সে আল্লাহ তা'আলার জন্য ইস্তেওয়া 'আলাল 'আরশ বা 'আরশের উপরে উঠা গুণটি অস্বীকার করেছে। যেন সে বলছে, যে কেউ বলবে যে আল্লাহ 'আরশের উপর, সে তো এর মাধ্যমে আল্লাহকে সীমাবদ্ধতার গুণে গুণান্বিত করলো। হদ্দ (সীমা) বিষয়ে প্রথমেই আমাদেরকে কিছু বিষয় একমত হতে হবে, তা হচ্ছে, ১- হদ্দ আল্লাহর কোনো সিফাত বা গুণ নয়। ২- হদ্দ শব্দটি সালাফগণের কেউই আল্লাহর জন্য ব্যবহার করেননি। ৩- হদ্দ শব্দটি কুরআন ও সুন্নাহ'র কোথাও সাব্যস্ত করা হয়নি, আবার অসাব্যস্তও করা হয়নি। ৪- মতভেদটি হচ্ছে, আল্লাহর জন্য 'হদ্দ' বা সীমা শব্দ ব্যবহার করা যাবে কি না? এটা দিয়ে আল্লাহর সম্পর্কে কোনো সংবাদ দেয়া যাবে কি না? তাই সঠিক কথা হচ্ছে, 'হদ' বা 'সীমাবদ্ধ' এ শব্দটি একটি 'মুজমাল' বা ব্যাখ্যা সাপেক্ষ সংক্ষিপ্ত শব্দ। কখনও কখনও তা দ্বারা বিশুদ্ধ অর্থ গ্রহণ করা যায়, আবার তা দ্বারা বাতিল অর্থও গ্রহন করা যায়। এজন্য ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে এটা বলা সাব্যস্ত হওয়াও প্রমাণিত, আবার অসাব্যস্ত হওয়াও প্রমাণিত। আর জাহমিয়্যারা সর্বদা বলে 'তাঁর কোনো সীমা' নেই। তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, এটা অস্বীকার করা যে, 'আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টিকুল থেকে পৃথক', আল্লাহ তা'আলা জগতের উপরে। কারণ তাদের মতে এটা বললে তাঁর জন্য হদ্দ বা সীমা নির্ধারণ হয়ে যায়। যারা আল্লাহর জন্য 'হদ' শব্দটি ব্যবহার করেছেন তাদের দ্বারা হদ্দ শব্দটি ব্যবহারের কারণ হচ্ছে, জাহমিয়্যাহ ও মু'আত্তিলা সম্প্রদায় যখন আল্লাহর জন্য সর্বোর্ধ্বে থাকার গুণটি অস্বীকার করলো, তখন কোনো কোনো আহলুস সুন্নাত সে ঊর্ধ্ব ও উপরকে বুঝানোর জন্য 'দিক' শব্দটি ব্যবহার করে। অনুরূপভাবে যখন জাহমিয়্যারা আল্লাহ ও তার সৃষ্টির মাঝে পার্থক্য করা অস্বীকার করলো, তখন কোনো কোনো আহলুস সুন্নাত সে পার্থক্য করার জন্য 'হদ্দ' শব্দটি ব্যবহার করে। এজন্য শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, "এ শব্দটি দিয়ে আমরা কুরআন ও সুন্নাহ'য় না আসা অতিরিক্ত কোনো গুণ সাব্যস্ত করছি না, বরং এর দ্বারা মহান আল্লাহর অস্তিত্বকে সৃষ্টির সাথে মিশিয়ে দেয়ার যে অপচেষ্টা বাতিলপন্থী, আল্লাহর সিফাত অস্বীকারকারী গোষ্ঠীর লোকেরা করেছে আমরা সেটাকে খণ্ডন করে মহান আল্লাহর আলাদা অস্তিত্ব সাব্যস্ত করাকে বুঝিয়েছি। [ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৩/৪৮)] সালাফদের মধ্যে যারা হদ্দ বা সীমা সাব্যস্ত করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন, ১- ইমাম উসমান ইবন সা'ঈদ আদ-দারেমী। ২- ইমাম ইবনুল মুবারক। [বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/৪৪৩)] ৩- ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল। ৪- ইমাম ইসহাক্ক ইবন রাহওয়াইহি ৫- ইমাম আবুল হাসান আদ-দিশতী। ৬- ইয়াহইয়া ইবন 'আম্মার আস-সিজিস্তানী প্রমুখ।
তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলার এমন সীমা আছে যার দ্বারা সৃষ্টিকুল থেকে আলাদা। তাঁর মাঝে ও সৃষ্টিকুলের মাঝে ভিন্নতা ও পৃথকতা রয়েছে। তিনি সৃষ্টিকুলের সাথে মিলে মিশে নেই। বরং তাঁর কাছে নির্দেশ উঠে ও তাঁর থেকে নাযিল হয়। আর তাঁর জন্য আগমন করা ও আসা বিশুদ্ধ ইত্যাদি গুণাবলি, যা আল্লাহ ও বান্দার মাঝে পৃথকতা সাব্যস্ত করছে। তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, এ হিসেবে হদ্দ বা সীমা হচ্ছে, এমন কিছু গুণাবলি ও পরিমাণ সাব্যস্ত করা, যা দিয়ে অন্য বস্তু থেকে আলাদা হওয়া প্রমাণিত হবে। বস্তুত কুরআন ও সুন্নাহ এটার ওপর প্রমাণবহ যে, আল্লাহ তা'আলার এমন হদ্দ বা সীমা রয়েছে যার মাধ্যমে তিনি সৃষ্টিকুল থেকে সম্পূর্ণভাবে আলাদা বৈশিষ্ট্যের অধিকারী এবং তিনি সকল মুহদাস বা নতুন কিছু থেকে পৃথক গুণে গুণান্বিত। তাহলে এ অর্থে আল্লাহর জন্য হদ্দ সাব্যস্ত করা অবশ্যই বিশুদ্ধ।
তাছাড়া আরেকটি অর্থেও হদ্দ সাব্যস্ত করা বিশুদ্ধ আর তা হচ্ছে, আল্লাহর নিজের যাত ও সিফাত এর অবশ্যই সীমা রয়েছে, কিন্তু তিনি ব্যতীত অন্য কেউ তা জানে না। এ হিসেবেও হদ্দ সাব্যস্ত করা না জায়েয হবে। যেমনটি ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ তার দারউত তা'আরুদ্ব ও বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ গ্রন্থদ্বয়ে সাব্যস্ত করেছেন।
অনুরূপভাবে স্থান হিসেবেও হদ্দ সাব্যস্ত করা যাবে। কারণ আল্লাহ জানিয়েছেন যে, তিনি 'আরশের উপর রয়েছেন। আর 'আরশ অবশ্যই একটি স্থান। সুতরাং জাহমিয়্যারা সেটা অস্বীকার করার জন্য হদ্দ বা মাকান ব্যবহারের দোষ তুলে ধরলেও আমরা তা ব্যবহার থেকে বিরত হবো না। যেমনটি ইমাম উসমান ইবন সা'ঈদ আদ-দারেমী বলেছেন। দেখুন, নাক্বদ্বুদ দারেমী আলা বিশর আল- মিররীসী, পৃ. ২২৩-২২৪। অনুরূপ মাজমূ' ফাতাওয়া ও রাসায়িলি ইবন উসাইমীন (৭/১৯৩)।
আর এ মতের বিপরীতে সালাফগণের মধ্য হতে যারা হদ্দ বা সীমা সাব্যস্ত করেননি, তাদের মধ্যে রয়েছেন,
১- ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল। হাম্বল ও ইসহাকের বর্ণনায়।
২- ইমাম ত্বাহাউই।
৩- ইমাম আবু সুলাইমান আল-খাত্তাবী।
৪- ইমাম আবু নসর আস-সাজযী।
তবে এর দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, মহান আল্লাহকে জ্ঞান ও আয়ত্ত্ব করতে অসমর্থ হওয়া। তাঁকে কারও জ্ঞান ও চোখ কোনোভাবেই আয়ত্ত্ব করতে পারবে না।
তাছাড়া তাঁর গুণের প্রকৃত স্বরূপও কেউ উদ্ধার করতে পারবে না। এটা সৃষ্টির পক্ষে অসম্ভব বিষয়। অনুরূপভাবে কেউ যেন রাব্বুল আলামীনের আকার-আকৃতি নির্ধারণ না করে বসে।
উপরোক্ত তিনটি কারণে তারা হদ্দ সাব্যস্ত করতে নিষেধ করে থাকেন।
কিন্তু জাহমিয়্যাহ ও তাদের অনুসারীরা হদ্দ শব্দটি ব্যবহার করতে নিষেধ করার মাধ্যমে কয়েকটি উদ্দেশ্য নিয়ে থাকে যা পুরোপুরিই বাতিল:
এক. স্রষ্টাকে সৃষ্টি থেকে আলাদা না করা।
দুই. স্রষ্টাকে জগতের ভেতরেও নয় বাইরেও নয় এটা সাব্যস্ত করা।
তিন, স্রষ্টার 'আরশের উপর উঠাকে অস্বীকার করা।
চার, স্রষ্টা কর্তৃক নিকটতম আসমানে নেমে আসাকে অস্বীকার করা।
পাঁচ. স্রষ্টা কর্তৃক হাশরের মাঠে আগমনকে অস্বীকার করা।
ছয়. স্রষ্টাকে আখেরাতে দেখতে পাওয়া অস্বীকার করা ইত্যাদি।
এসবই বাতিলপন্থীদের শব্দের অসৎ ব্যবহার। আল্লাহ আমাদেরকে হিফাযত করুন। আমীন।
সুতরাং কেউ যদি হদ্দ শব্দটি আল্লাহর জন্য ব্যবহার করা যাবে কি না তা জিজ্ঞেস করে তাকে প্রশ্ন করা হবে, তার কাছে হদ্দ শব্দটির অর্থ কী? তার ব্যক্ত করা অর্থ অনুযায়ী তাকে জবাব দেয়া হবে। অর্থাৎ এক কথায় উত্তর দেয়া চলবে না।
বিস্তারিত দেখা যেতে পারে, ১- রাদ্দু ইমাম আদ-দারেমী আলা বিশর আল-মিররীসী, পৃ. ২৩। ২- ইবন তাইমিয়্যাহ, নাক্বদুত তা'সীস (১/৪২৬-৪৪৬), (২/১৭০-১৭২)। ৩- ইবনুল কাইয়্যেম, মুখতাসারুস সাওয়া'য়িক (১/১৭৩)। ৪- ইবন আবিল ইয্য আল-হানাফী, শারহুল আকীদাহ আত-ত্বাহাওয়িয়্যাহ (১/২৬৩)।
৪৯৫. আছারটি নিয়ে এসেছেন, ১- যাহাবী, আল-উলু, পৃ. ২/১০৪১, নং ৩৯৭; সেখানে বলা হয়েছে, আমাদের নিকট আসমা'ঈর কাছ থেকে পৌঁছেছে যে, তিনি বলেছেন, তারপর তিনি তা বর্ণনা করলেন। আরও দেখুন, মুখতাসারুল উলু, পৃ. ১৭০-১৭১। ২- যাহাবী, আল-আরবা'ঈন, পৃ. ৮১। ৩- ইজতিমা'ঊল জুয়ুশ, পৃ. ২২৫। ইবনুল কাইয়্যেম এটা নিয়ে আসার পরে টীকা দিয়ে বলেন, তাহলে জানা গেল যে, এ মতাদর্শ মূল সূত্রপাত এ লোক (জাহম) ও তার স্ত্রী। তার জন্য কতই না উপযোগী আল্লাহর বাণী: "অচিরে সে দগ্ধ হবে লেলিহান আগুনে, আর তার স্ত্রীও- যে ইন্ধন বহন করে।" [সূরা আল-মাসাদ: ৩-৪]
📄 আসেম ইবন আলী ইবন আসেম এর বক্তব্য
ইমাম আহমদ, ইমাম বুখারী ও তাদের স্তরের লোকদের শিক্ষক, ইমাম আসেম ইবন আলী(৪৯৬) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: "আমি এক জাহমীর সাথে মুনাযারা করেছি। তার কথা থেকে ফুটে উঠল যে, উপরে কোনো রব আছে এটার ওপর সে ঈমান রাখে না।" (৪৯৭)
টিকাঃ
৪৯৬. তিনি হচ্ছেন আবুল হুসাইন 'আসেম ইবন আলী ইবন আসেম ইবন সুহাইব, আল-ওয়াসেত্বী, আল-কুরাশী, আত-তাইমী, তাদের মাওলা। বড় হাদীসের ইমামদের একজন। তিনি হাদীস বর্ণনা করেছেন ইকরিমাহ ইবন 'আম্মার, ইবন আবী যি'ব, শু'বাহ ইবনুল হাজ্জাজ প্রমুখ থেকে। তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন আহমাদ ইবন হাম্বল, বুখারী, আবু দাউদ প্রমুখ। তাঁর সম্পর্কে ইয়াহইয়া ইবন মা'ঈন বলেন, আসেম ইবন আলী ইবন আসেম মুসলিমদের সর্দার। তার সম্পর্কে যাহাবী বলেন, আসেম ইবন আলী ইবন আসেম ছিলেন এমন ব্যক্তি যিনি খালকুল কুরআনের বিপর্যয়ের সময় দীনের পক্ষ থেকে প্রতিরোধ করেছিলেন। এমনকি ইমাম আহমাদ বলেন, ইসলামের তিনি এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলেন যে, দাঁড়ানোর বিনিময়ে আশা করি আল্লাহ তাকে জান্নাত দিয়ে প্রতিদান দিবেন। আবুল হুসাইন ইবনুল মুনাদী বলেন, তিনি বাগদাদের মাসজিদ আর-রুসাফাতে হাদীসে দারস প্রদান করতেন। তার মজলিসে এক লক্ষের মতো মানুষ হাজির হতো। হিজরী ২২১ সালে তিনি মারা যান। দেখুন, খত্নীবে বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ (১২/২৪৭); ইমাম যাহাবী, তাযকিরাতুল হুফফায (১/৩৯৭); সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৯/২৬২); যিরিকলী, আল-আ'লাম (৩/২৪৮)।
৪৯৭. এ আছারটি আরও যারা নিয়ে এসেছেন, তাদের অন্যতম হচ্ছেন, ১- আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ, আস-সুন্নাহ নং ১৯১। ২- ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউত তা'আরুত্ব (৬/২৬১); বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (২/৪৩, ৮৩)। ৩- ইমাম যাহাবী, আল-উলু (২/১০৬৯)। ৪- ইবনুল কাইয়্যম, ইজতিমা'উল জুয়ুশ, পৃ. ২১৭; আস-সাওয়া'য়িকুল মুরসালাহ (৪/১২৯৬)।
📄 ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহ’র বক্তব্য
ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল বলেন, আমাদেরকে সুরাইজ ইবনুন নু'মান(৪৯৮) জানিয়েছেন, তিনি বলেন, "আমি আব্দুল্লাহ ইবন নাফে' আস-সায়েগকে(৪৯৯) বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেন: আমি মালেক ইবন আনাসকে বলতে শুনেছি যে, আল্লাহ আসমানের উপরে, আর তাঁর জ্ঞান সর্বত্র। কোনো স্থানই তাঁর জ্ঞানের বাইরে নয়।”(৫০০)
টিকাঃ
৪৯৮. তিনি হচ্ছেন আবুল হাসান সুরাইজ ইবন মারওয়ান আল-জাওহারী, আল-লু'লু'য়ী, আল-বাগদাদী, তার আসল হচ্ছে খোরাসান থেকে। তিনি নির্ভরযোগ্য, তবে সামান্য ধারণার অনুবর্তী হতেন। যাহাবী তার সম্পর্কে বলেন, প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিসদের অন্তর্ভুক্ত। তার মৃত্যু হিজরী ২১৭ সালে। দেখুন, খত্নীবে বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ (৯/২১৭); ইবন আবি হাতেম, আল-জারহু ওয়াত তা'দীল (৪/৩০৪); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১০/২১৯); খাযরাজী, খুলাসাতু তাযহীবি তাহযীবিল কামাল (১/৩৬৫); ইবন হাজার, তাক্বরীবুত তাহযীব, পৃ. ২২৯।
৪৯৯. তিনি হচ্ছেন আবু মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ ইবন নাফে' আস-সায়েগ আল-মাখযুমী, মাওলাহুম, আল- মাদানী। মদীনার বড় ফকীহগণের একজন। অনুরূপ ইমাম মালেকের ছাত্রদের একজন। তিনি ইমাম মালেকের সাথে সর্বদা থাকতেন। এমনকি তার থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, আমি চল্লিশ বছর ইমাম মালেকের সাথী হয়েছিলাম, তবে তার থেকে কিছু লিখিনি, শুধু হিফয করতাম। তার সম্পর্কে ইমাম আহমাদ বলেন, তিনি মালেক এর মতামতের হিফযকারী। আর তিনিই মদীনা বাসীদেরকে ইমাম মালেকের ফিকহ শিখিয়েছেন। নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী। তার কিতাব বিশুদ্ধ। তার ধীশক্তিতে সামান্য কমতি আছে। তিনি হিজরী ২০৬ সালে মারা যান। দেখুন, ইবন সা'দ, আত-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা (৫/৪৩৮); কাযী ইয়াদ্ব, তারতীবুল মাদারিক (১/৩৫৬); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১০/৩৭১); ইবনুল 'ইমাদ, শাযরাতুয যাহাব (২/১৫); ইবন হাজার, তাক্বরীবুত তাহযীব, পৃ. ৩২৬।
৫০০. এ আছারটি যারা নিয়ে এসেছেন তারা হচ্ছেন, ১- আব্দুল্লাহ ইবন ইমাম আহমাদ, আস-সুন্নাহ (১/১০৬-১০৭); তিনি বলেন, আমাকে আমার পিতা বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমাদেরকে বর্ণনা করেছেন সুরাইজ ইবনুন নু'মান, তিনি বলেন, আমাকে জানিয়েছেন আব্দুল্লাহ ইবন নাফে'... তিনি বলেন, মালেক বলেন,... তারপর তিনি তা বর্ণনা করেন, সেখানে বাড়তি আছে, তারপর তিনি তিলাওয়াত করলেন, "আপনি কি লক্ষ্য করেন না যে, আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে আল্লাহ তা জানেন? তিন ব্যক্তির মধ্যে এমন কোনো গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থ জন হিসেবে তিনি থাকেন না এবং পাঁচ ব্যক্তির মধ্যেও হয় না যাতে ষষ্ঠজন হিসেবে তিনি থাকেন না। তারা এর চেয়ে কম হোক বা বেশি হোক তিনি তো তাদের সঙ্গেই আছেন তারা যেখানেই থাকুক না কেন। তারপর তারা যা করে, তিনি তাদেরকে কিয়ামতের দিন তা জানিয়ে দিবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত।" [সূরা আল-মুজাদালাহ: ০৭] ২- আবু দাউদ, মাসায়িলি ইমাম আহমাদ, পৃ. ৬৩। ৩- ইবন মানদাহ, কিতাবুত তাওহীদ (৩/৩০৭)। ৪- আজুররী, আশ-শরী'আহ, পৃ. ২৮৯। তিনি দু' পদ্ধতিতে ইমাম আহমাদ থেকে বর্ণনা করেছেন। ৫- ইবন আব্দুল বার, আত-তামহীদ (৭/১৩৮)। ৬- ইবন আব্দুল যার, আল-ইস্তেকা, পৃ. ৩৫। ৭- লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ (২/৪০১)।