📄 ইমাম মালেক, সুফইয়ান আস-সাওরী, আওযাই ও লাইস ইবন সাদ এর বক্তব্য
ওয়ালীদ ইবন মুসলিম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "আমি ইমাম মালেক ইবন আনাস, সুফইয়ান আস-সাওরী, লাইস ইবন সা'দ ও আওযা'ঈকে সিফাতের হাদীসের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তারা বললেন: যেভাবে এসেছে সেভাবে চালিয়ে দাও।” অন্য বর্ণনায় আছে, তারা বলেন: “এগুলো যেভাবে এসেছে সেভাবেই কোনো ধরণ নির্ধারণ ছাড়া চালিয়ে দাও।”
তাদের কথা “যেভাবে এসেছে সেভাবে চালিয়ে দাও” মুআত্তিলাদের (অর্থ নিষ্ক্রিয়কারীদের) মত খণ্ডন করে, আর “কোনো ধরণ বর্ণনা ছাড়া” একথা মুমাসসিলাদের (তুলনাকারীদের) মত খণ্ডন করে। যুহরী ও মাকহুল তাবে'য়ীযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী, বাকী চারজন তাবে-তাবে'য়ীযুগের দুনিয়ার ইমাম। তাদের স্তরের মধ্যে আছেন, হাম্মাদ ইবন যায়েদ, হাম্মাদ ইবন সালামাহ প্রমুখ।
টিকাঃ
৩৫০. তিনি হচ্ছেন আবুল আব্বাস ওয়ালিদ ইবন মুসলিম আদ-দামেশকী। শাম দেশের তৎকালীন সময়ের বড় আলেমগণের একজন। তিনি হাদীস শুনেছেন মুহাম্মাদ ইবন 'আজলান, ইবন জুরাইজ, আওযা'ঈ প্রমুখ থেকে। আর তার থেকে হাদীস শুনেছেন লাইস ইবন সা'দ, বাকিয়্যাহ ইবনুল ওয়ালীদ (তারা উভয়েই তার উস্তাদ), আব্দুল্লাহ ইবন ওয়াহাব, আবু মিসহার, আহমাদ ইবন হাম্বল প্রমুখ। আহমাদ ইবন হাম্বল বলেন, আমি শাম দেশীয় কাউকে ওয়ালিদ ইবন মুসলিমের চেয়ে বড় বিবেকবান দেখিনি। হিজরী ১৯৪ বা ১৯৫ সালে তার মৃত্যু হয়। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৯/২১১)।
৩৫১. আল-খাল্লাল, আস-সুন্নাহ পৃ. ১৫৯; ইবন মানদাহ, আত-তাওহীদ (৩/১১৫), নং ৫২০; (৩/৩০৭) নং ৮৯৫; সাবুনী, আকীদাতুস সালাফ, পৃ. ৫৬; দারাকুতনী, আস-সিফাত, পৃ. ৭৫; লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ (৩/৫২৭), নং ৯৩; আজুররী, আশ-শরী'আহ, পৃ. ৩১৫; ইবন বাত্তাহ, আল-ইবানাহ; বাইহাক্বী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (২/১৯৮); ই'তিক্বাদ, পৃ. ৫৭; ইবন আব্দুল বার, আত-তামহীদ (৭/১৫৮); আল-ইস্তিকা, পৃ. ৩৬; ইবন কুদামা, যাম্মুত তা'ওয়ীল, পৃ. ২০; যাহাবী, আল-উলু, পৃ. ১০৫; আল-আরবা'ঈন, পৃ. ৮২, আল-আসকাহানী, আল-হুজ্জাহ (১/৪৩৮); আবু ইয়া'লা, ইবতালুত তা'ওয়ীলাত (১/৪৭)।
৩৫২. তিনি হচ্ছেন আবু ইসমা'ইল হাম্মাদ ইবন যায়েদ ইবন দিরহাম আল-আযদী। হাদীসের ইমামগণের একজন বড় ইমাম। তিনি হাদীস শুনেছেন আমর ইবন দীনার, সাবেত আল-বুনানী, আইয়্যুব আস-সাখতিয়ানী প্রমুখ থেকে। আর তার থেকে হাদীস শুনেছেন সুফইয়ান, শু'বাহ (উভয়ে তার শিক্ষক), ইবন মাহদী প্রমুখ। ইবন মা'ঈন বলেন, হাম্মাদ ইবন যাইদের মতো প্রামাণ্য আর কেউ নেই। আহমাদ ইবন হাম্বল বলেন, হাম্মাদ ইবন যায়েদ দীনের মধ্যে মুসলিমদের ইমামগণের একজন। তিনি আমার নিকট হাম্মাদ ইবন সালামাহ থেকে অধিক প্রিয়। আব্দুর রহমান ইবন মাহদী বলেন, আমি সুন্নাত (আদর্শ, আকীদাহ ও মানহাজে) ও হাদীসে অধিক জ্ঞানী যাকেই দেখেছি তাকে পেয়েছি যে সে সুন্নাতে হাম্মাদের ইবন যায়েদ এর মাধ্যমে প্রবেশ করেছে।
হিজরী ১৭৯ সালে তার মৃত্যু হয়। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৭/৪৫৬)। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তিনি দীনের বড় ইমামদের একজন। [বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৩/৫২৩)]
অন্যত্র তিনি বলেন, হাম্মাদ ইবন যায়েদ বিখ্যাত সুন্নাহ'র ইমামগণের একজন। যার স্তর হচ্ছে, মালেক, সাওরী, আওযা'ঈ, হাম্মাদ ইবন সালামাহ, লাইস ইবন সা'দের সময়কার ও তাদের মত ইমাম হওয়ার দিক থেকে। বরং তিনি সুন্নাহ'র আলেমগণের নিকট সাওরী থেকে সুন্নাহ সম্পর্কে বেশি অভিজ্ঞ। যদিও সাওরী তার থেকে ইলম ও যুহদে বেশি এগিয়ে। আর তিনি হাদীস বিশারদগণের নিকট হাম্মাদ ইবন সালামাহ থেকেও অধিক পরিমাণে হাদীসের হাফেয। যদিও হাম্মাদ (ইবন সালামাহ) তার থেকে পরহেযগারীতে বেশি বিখ্যাত ও সুন্নাহ'র দিকে আহ্বানে বেশি অগ্রণী। তিনি সে সময়কার বসরার ইমাম যখন বসরা ছিল ইসলামের আলেমদের মিলনমেলা। [মাজমূ' ফাতাওয়া]
৩৫৩. তিনি হচ্ছেন আবু সালামাহ হাম্মাদ ইবন সালামাহ ইবন দীনার আল-বসরী আন-নাহওয়ী, আল- বায্যায, আল-খিরাক্বী, আল-বাত্বায়িনী, রবীআহ ইবন মালেক এর পরিবারের মাওলা। ইসলামের বড় ইমামগণের অন্যতম। তিনি হাদীস শুনেছেন ইবন আবী মুলাইকাহ (তিনি তার বড় শাইখ), সাবেত আল বুনানী, কাতাদাহ ইবন দি'আমাহ প্রমুখ থেকে। আর তার থেকে হাদীস শুনেছেন ইবন জুরাইজ, ইবনুল মুবারক, ইয়াহইয়া আল-কাত্তান, ইবন মাহদী প্রমুখ। ওহাইব ইবন খালেদ বলেন, হাম্মাদ ইবন সালামাহ আমাদের নেতা ও আমাদের মধ্যকার বেশি জ্ঞানী। আব্দুর রহমান ইবন মাহদী বলেন, যদি হাম্মাদ ইবন সালামাহকে বলা হয়, তুমি তো আগামী দিন মারা যাবে তাতে তার আমলে আর বাড়ানোর কোনো ক্ষমতা তার নেই (এত বেশি আমল করতেন যে, আর বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই)। যাহাবী বলেন, তিনি ইলমের সমুদ্রের মধ্য হতে একটি সমুদ্র ছিলেন। তবে তার কিছু ওয়াহম বা ধারণা বশবর্তী হওয়া বর্ণনা রয়েছে, যদিও প্রশস্ত বর্ণনার তুলনায় সেটা কিছুই না। তিনি ইনশা- আল্লাহ সাদৃক বর্ণনাকারী। তিনি হাম্মাদ ইবন যায়েদের মত এত দৃঢ় ছিলেন না। হিজরী ১৬৭ সালে তার মৃত্যু হয়। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৭/৪৪৭)। ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল বলেন, আমি বিদ'আতী ও মতভেদকারীদের বিপক্ষে হাম্মাদ ইবন সালামাহর মত এত কঠোর কাউকে দেখিনি। অনুরূপ আল্লাহকে আখেরাতে দেখতে পাওয়া ও কাদরিয়া-মু'তাযিলাদের বক্তব্য খণ্ডন করার ব্যাপারে তার চেয়ে বেশি বর্ণনাকারী কাউকে পাইনি। দেখুন, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৩/৭১৪)। ইবন তাইমিয়্যাহ আরও বলেন, মু'তাযিলা ফির্কার জাহেয ইমাম হাম্মাদ ইবন সালামাহ ও বসরার কাযী মু'আয ইবন মু'আয এর বিরুদ্ধে বাজে মন্তব্য করতো। অথচ এতে তাদের কোনো দোষ ছিল না। মূল কারণ হচ্ছে, হাম্মাদ ইবন সালামাহ সিফাত সংক্রান্ত হাদীসগুলো জমা করতেন এবং সেগুলোর প্রচার-প্রসার করতেন, আর মু'আয যখন বিচারক হলেন তখন তিনি জাহমিয়্যাহ ও কাদরিয়াদের সাক্ষ্য গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালেন। অতঃপর বিষয়টি খলীফা হারুন-অর- রশীদের দরবারে উঠল। যখন তিনি হাম্মাদ ইবন সালামার সাথে একত্রিত হলেন আর বিস্তারিত জানলেন তখন খলীফা হারুন তাকে সম্মান করলেন এবং সুন্নাহ'র প্রচার-প্রসারের জন্য তার প্রশংসা করলেন। দেখুন, আত-তিস'ঈনিয়্যাহ (২/৩৭৫)। ইবন আবী ইয়া'লা ও ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুমাল্লাহ দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেছেন যে, হাম্মাদ ইবন সালামাহ রাহিমাহুল্লাহ সিফাত সংক্রান্ত একটি গ্রন্থ প্রণয়ন করেছিলেন। দেখুন, ইবত্বালুত তা'ওয়ীলাত (১/৫০); আত-তিস'ঈনিয়্যাহ (১/১৫৯)।
৩৫৪. তিনি হচ্ছেন আবুল কাসেম আব্দুল আযীয ইবন আলী ইবন আহমাদ ইবনুল ফাদ্বাল ইবন শাকার আল-বাগদাদী আল-আযজী। তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেন খত্বীব আল-বাগদাদী, কাযী আবু ইয়া'লা প্রমুখ। সিফাত এর তার একটি অগোছালো গ্রন্থ রয়েছে। খতীব বলেন, আমরা তার থেকে হাদীস লিখেছি। তিনি সাদুক ছিলেন, অনেক কিতাবের অধিকার ছিলেন। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৮/১৮)।
৩৫৫. তিনি হচ্ছেন আবু আব্দুল্লাহ মুত্বাররিফ ইবন আব্দুল্লাহ ইবনুশ শিখখীর আল-হারশী আল-আমেরী আল-বসরী। বড় আলেমগণের একজন। তিনি হাদীস বর্ণনা করেছেন তার পিতা, আলী, আম্মার, আবু যর, উসমান প্রমুখ থেকে। আর তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন, হাসান বসরী, সাবেত আল-বুনানী, ক্বাতাদাহ প্রমুখ। 'ইজলী বলেন, তিনি নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন। বসরাতে ইবনুল আস'আসের ফিতনা থেকে তিনি এবং ইবন সীরীন ব্যতীত কেউ নাজাত পায়নি। আর কৃফাতে খাইসামাহ ইবন আব্দুর রহমান ও ইবরাহীম আন-নাখ'য়ী ব্যতীত কেউ নাজাত পায়নি। (বাকী সবাই আব্দুর রহমান ইবন আস'আস এর ফিতনায় পড়ে হাজ্জাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে জীবন বিসর্জন দেয়। আলেমগণ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্ষমতা না থাকলে বের হওয়াকে ফেতনা বলে অভিহিত করেন। যাহাবী বলেন, তিনি ছিলেন নির্ভরযোগ্য, তার ছিল পরহেজগারী, বিবেক ও আদব। হিজরী ১৫ সালে তিনি মারা যান। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৫/১১৪)।
৩৫৬. ইমাম আজুররীর আশ-শরী'আহতে এসেছে, ‘দীনের মধ্যে পথভ্রষ্টতা অবলম্বনকারীদের কথা আলোচনা করা হলো’। [আশ-শরী'আহ, বর্ণনা নং ৯২, ১৩৯]
৩৫৭. তিনি হচ্ছেন আবু হাফস ‘উমার ইবন আব্দুল আযীয ইবন মারওয়ান ইবনুল হাকাম ইবন আবিল আস ইবন উমাইয়্যাহ ইবন আব্দশামস ইবন আব্দ মান্নাফ ইবন কুসাই ইবন কিলাব আল-কুরাশী আল-উমাওয়ী আল-মাদানী ও আল-মিসরী। দীনদার, সঠিক পথের পথিক, পরহেযগার খলীফা। তিনি একবার আনাস ইবন মালিক রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুর ইমামতি করলেন তখন আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন, আমি এ যুবকের মতো কাউকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের মতো সালাত আদায়কারী দেখিনি। তিনি ছিলেন নির্ভরযোগ্য ও আমানতদার। তার ছিল পরহেযগারী, ফিকহ। অনেক হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইনসাফকারী ইমাম ছিলেন, আল্লাহ তার ওপর রহমত করুন ও তার ওপর সন্তুষ্ট হোন।
যাহাবী বলেন, এ লোকটি উত্তম চরিত্রে নমুনা ছিলেন, পূর্ণ বিবেকের অধিকারী ছিলেন, উত্তম চলন, বলন, ভালো প্রশাসক ছিলেন। তার ঐকান্তিক ইচ্ছা ছিল যতটুকু সম্ভব ইনসাফ কায়েম করবেন। ইলমে ছিলেন পরিপূর্ণ, ফিকহের জ্ঞানে ভরপুর সত্তা, বুদ্ধিমত্তা ও বুঝের দিক সর্বদা ছিল প্রকাশিত। সর্বাদা আল্লাহর কাছে কান্নাকারী ও তাঁরই কাছে প্রত্যাবর্তনকারী। আল্লাহর জন্য সর্বদা দণ্ডায়মান, একনিষ্ঠ ও দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তি, যদিও তিনি খিলাফতের দায়িত্ব নিযুক্ত। সর্বদা হকের সাথে কথা বলতেন অথচ তার সাহায্যকারী খুবই কম ছিল।
তার মৃত্যু হয়েছিল হিজরী ১০১ সালে। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৫/১১৪)। ইমাম শাত্বেবী বলেন, ‘উমার ইবন আব্দুল আযীযের উপরোক্ত বক্তব্য যুগ যুগ ধরে আলেমগণের যত্নধন্য ছিল। তারা তা মুখস্থ করে রাখতেন, মালেক এ বাণীটি খুবই পছন্দ করতেন। দেখুন, আল- ই'তিসাম (১/১৪৫); আল-মুওয়াফাক্বাত (৪/৪৬১)।
ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ অন্যত্র বলেন, মালেক বহুবার এ বাণীটি ‘উমার ইবন আব্দুল আযীয থেকে উদ্ধৃত করেছন। দেখুন, মাজমূ’ ফাতাওয়া (১৯/১৭৮)।
কাযী ইয়াছ বলেন, মালেক যখন ‘উমার ইবন আব্দুল আযীয থেকে এ বাণীটি উদ্ধৃত করতেন তখন খুশিতে বাগবাগ হয়ে যেতেন। দেখুন, তারতীবুল মাদারিক (১/১৭২)।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, মালেক ইবন আনাস সহ ইমামগণ সর্বদা এ বাণীটি অত্যন্ত পছন্দ করে এসেছেন। তারা সেটাকে সর্বদা বর্ণনা করতেন। দেখুন, ই’লামুল মুওয়াকে’ঈন (৬/২৮)। তাছাড়া ইমাম শাত্বেবী আরও বলেন, এ বাণী সুন্নাত এর অনেকগুলো মূলনীতিকে ধারণ করে আছে। যেমন: বিদ’আতের মুলোৎপাটন, সুন্নাহ’র অনুসারীর প্রশংসা, সুন্নাহ’র বিরোধিতাকারীর নিন্দা ইত্যাদি। দেখুন, আল-ই'তিসাম (১/১৪৫-১৪৬)।
৩৫৮. অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের খলীফায়ে রাশেদগণ। কারণ অন্যদের সেটার অধিকার নেই। কিন্তু খলীফায়ে রাশেদগণকে অনুসরণ করার জন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "তোমাদের ওপর কর্তব্য হচ্ছে আমার আদর্শ আঁকড়ে ধরা, আমার পরে যেসব খলীফায়ে রাশেদ আসবে, যারা হিদায়াতের ওপর থাকবে ও হিদায়াত করবে, তাদের আদর্শকে আঁকড়ে ধরা, সেগুলোকে গোড়ালীর দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরবে।” [আবু দাউদ, আস-সুনান, হাদীস নং ৪৬০৭; ইবন মাজাহ, আস-সুনান, হাদীস নং ৪২; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হাদীস নং ১৭১৪৪; দারেমী, আস-সুনান, হাদীস নং ৯৬; ইবন আবী আসেম, আস-সুন্নাহ, আস-সুনান, ৫৪] ইমাম শাত্বেবী বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরে তার উত্তম উত্তরসূরী উম্মতের অভিভাবকগণ (খলীফায়ে রাশেদগণ) যা করবে তা সবই উম্মতের জন্য সুন্নাত হিসেবে গ্রহণ করা হবে। তা কখনও বিদ'আত বলা হবে না, যদিও আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের হাদীসে সেসব ব্যাপারে বিশেষ কোনো ভাষ্য জানা না যায়। দেখুন, আল-ই'তিসাম (১/১৪৬)। যুবাইর ইবনুল 'আওয়াম রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু তার ছেলে আব্দুল্লাহকে বলেন, যখন তার কাছে অভিযোগ আসলো যে, ইরাকবাসীদের কিছু লোক তার কাছে কুরআনের বিভিন্ন অংশের ব্যাখ্যায় বিবাদ করেছে, তখন তিনি বললেন, "কুরআন অনেক জাতি গোষ্ঠীই পড়েছে, প্রত্যেকেই তাদের প্রবৃত্তি অনুসারে সেটার ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছে এবং বিভিন্ন স্থানে ভুল করে চলেছে। সুতরাং তারা যখন তোমার কাছে আসবে তখন তুমি তাদেরকে আবু বকর ও 'উমার রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমার রীতি- নীতি দিয়ে বিতর্ক করবে; কারণ তারা এটা অস্বীকার করতে পারবে না যে আবু বকর ও 'উমার তাদের চেয়ে বেশি কুরআন জানতেন। আব্দুল্লাহ বলেন, এরপর যখন এরা আবার আমার সাথে আবার তর্ক করতে আসলো তখন আমি আবু বকর ও 'উমারের কর্মকাণ্ড দিয়ে দলীল দিতে লাগলাম, তখন আল্লাহর শপথ করে বলছি, তারা আমার সাথে দাঁড়াতেই পারলো না, বসতেই সক্ষম হলো না।" [ইবন বাত্তাহ, আল-ইবানাহ (২/৬২০)] ইমাম শাত্বেবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আলেমগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরের খলীফাদের কর্মকাণ্ডের দিকে দৃষ্টি দেয়ার প্রয়োজন বোধ করলো, যাতে করে এটা বুঝা তাদের জন্য সহজ হয়ে যায় যে, এটিই ছিল সর্বশেষ আমল যায় ওপর নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম মারা গিয়েছিলেন, তার ওপর কোনো রহিতকারী বিধান আপতিত হয়নি; কারণ সাহাবায়ে কিরাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম নতুন থেকে নতুনতর কর্মকাণ্ডই সর্বদা গ্রহণ করতেন। দেখুন, আল-ই'তিসাম (১/১৪৭)।
৩৫৯. মুমিন বলতে এখানে সাহাবায়ে কিরাম যা গ্রহণ করেছেন সে ইজমা'র কথা বুঝানো হয়েছে। সুতরাং কেউ যদি সাহাবায়ে কিরামের ইজমা' গ্রহণ না করে তবে সে নিজেকে ধ্বংসের মুখোমুখি করলো। কুরআনে কারীমে আল্লাহ তা'আলা তাই বলেছেন, "আর তোমাদের নারীদের মধ্যে যারা ব্যভিচার করে তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের মধ্য থেকে চারজন সাক্ষী তলব করবে। যদি তারা সাক্ষ্য দেয় তবে তাদেরকে ঘরে অবরুদ্ধ করবে, যে পর্যন্ত না তাদের মৃত্যু হয় বা আল্লাহ তাদের জন্য অন্য কোনো ব্যবস্থা করেন।" [সূরা আন-নিসা: ১৫]
৩৬০. আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ, আস-সুন্নাহ, হাদীস নং ৭৬৬; ফাসাওয়ী, আল-মা'রিফাতু ওয়াত তারীখ, (৩/৪৮৮); ইবন বাত্তাহ, আল-ইবানাহ (১/৩৫২-৩৫৩), নং ২৩০, ২৩১; লালেকাঈ, শারহে উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাহ নং ১৩৪; খত্বীব আল-বাগদাদী, আল-ফকীহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ (১/৪৩৫-৪৩৬), নং ৪৫৫; ইবন আব্দুল বার, জামে'উ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাদ্বলিহী (২/৩৫৭), নং ১২১৮।
ওয়ালীদ ইবন মুসলিম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "আমি ইমাম মালেক ইবন আনাস, সুফইয়ান আস-সাওরী, লাইস ইবন সা'দ ও আওযা'ঈকে সিফাতের হাদীসের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তারা বললেন: যেভাবে এসেছে সেভাবে চালিয়ে দাও।” অন্য বর্ণনায় আছে, তারা বলেন: “এগুলো যেভাবে এসেছে সেভাবেই কোনো ধরণ নির্ধারণ ছাড়া চালিয়ে দাও।”
তাদের কথা “যেভাবে এসেছে সেভাবে চালিয়ে দাও” মুআত্তিলাদের (অর্থ নিষ্ক্রিয়কারীদের) মত খণ্ডন করে, আর “কোনো ধরণ বর্ণনা ছাড়া” একথা মুমাসসিলাদের (তুলনাকারীদের) মত খণ্ডন করে। যুহরী ও মাকহুল তাবে'য়ীযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী, বাকী চারজন তাবে-তাবে'য়ীযুগের দুনিয়ার ইমাম। তাদের স্তরের মধ্যে আছেন, হাম্মাদ ইবন যায়েদ, হাম্মাদ ইবন সালামাহ প্রমুখ।
টিকাঃ
৩৫০. তিনি হচ্ছেন আবুল আব্বাস ওয়ালিদ ইবন মুসলিম আদ-দামেশকী। শাম দেশের তৎকালীন সময়ের বড় আলেমগণের একজন। তিনি হাদীস শুনেছেন মুহাম্মাদ ইবন 'আজলান, ইবন জুরাইজ, আওযা'ঈ প্রমুখ থেকে। আর তার থেকে হাদীস শুনেছেন লাইস ইবন সা'দ, বাকিয়্যাহ ইবনুল ওয়ালীদ (তারা উভয়েই তার উস্তাদ), আব্দুল্লাহ ইবন ওয়াহাব, আবু মিসহার, আহমাদ ইবন হাম্বল প্রমুখ। আহমাদ ইবন হাম্বল বলেন, আমি শাম দেশীয় কাউকে ওয়ালিদ ইবন মুসলিমের চেয়ে বড় বিবেকবান দেখিনি। হিজরী ১৯৪ বা ১৯৫ সালে তার মৃত্যু হয়। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৯/২১১)।
৩৫১. আল-খাল্লাল, আস-সুন্নাহ পৃ. ১৫৯; ইবন মানদাহ, আত-তাওহীদ (৩/১১৫), নং ৫২০; (৩/৩০৭) নং ৮৯৫; সাবুনী, আকীদাতুস সালাফ, পৃ. ৫৬; দারাকুতনী, আস-সিফাত, পৃ. ৭৫; লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ (৩/৫২৭), নং ৯৩; আজুররী, আশ-শরী'আহ, পৃ. ৩১৫; ইবন বাত্তাহ, আল-ইবানাহ; বাইহাক্বী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (২/১৯৮); ই'তিক্বাদ, পৃ. ৫৭; ইবন আব্দুল বার, আত-তামহীদ (৭/১৫৮); আল-ইস্তিকা, পৃ. ৩৬; ইবন কুদামা, যাম্মুত তা'ওয়ীল, পৃ. ২০; যাহাবী, আল-উলু, পৃ. ১০৫; আল-আরবা'ঈন, পৃ. ৮২, আল-আসকাহানী, আল-হুজ্জাহ (১/৪৩৮); আবু ইয়া'লা, ইবতালুত তা'ওয়ীলাত (১/৪৭)।
৩৫২. তিনি হচ্ছেন আবু ইসমা'ইল হাম্মাদ ইবন যায়েদ ইবন দিরহাম আল-আযদী। হাদীসের ইমামগণের একজন বড় ইমাম। তিনি হাদীস শুনেছেন আমর ইবন দীনার, সাবেত আল-বুনানী, আইয়্যুব আস-সাখতিয়ানী প্রমুখ থেকে। আর তার থেকে হাদীস শুনেছেন সুফইয়ান, শু'বাহ (উভয়ে তার শিক্ষক), ইবন মাহদী প্রমুখ। ইবন মা'ঈন বলেন, হাম্মাদ ইবন যাইদের মতো প্রামাণ্য আর কেউ নেই। আহমাদ ইবন হাম্বল বলেন, হাম্মাদ ইবন যায়েদ দীনের মধ্যে মুসলিমদের ইমামগণের একজন। তিনি আমার নিকট হাম্মাদ ইবন সালামাহ থেকে অধিক প্রিয়। আব্দুর রহমান ইবন মাহদী বলেন, আমি সুন্নাত (আদর্শ, আকীদাহ ও মানহাজে) ও হাদীসে অধিক জ্ঞানী যাকেই দেখেছি তাকে পেয়েছি যে সে সুন্নাতে হাম্মাদের ইবন যায়েদ এর মাধ্যমে প্রবেশ করেছে।
হিজরী ১৭৯ সালে তার মৃত্যু হয়। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৭/৪৫৬)। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তিনি দীনের বড় ইমামদের একজন। [বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৩/৫২৩)]
অন্যত্র তিনি বলেন, হাম্মাদ ইবন যায়েদ বিখ্যাত সুন্নাহ'র ইমামগণের একজন। যার স্তর হচ্ছে, মালেক, সাওরী, আওযা'ঈ, হাম্মাদ ইবন সালামাহ, লাইস ইবন সা'দের সময়কার ও তাদের মত ইমাম হওয়ার দিক থেকে। বরং তিনি সুন্নাহ'র আলেমগণের নিকট সাওরী থেকে সুন্নাহ সম্পর্কে বেশি অভিজ্ঞ। যদিও সাওরী তার থেকে ইলম ও যুহদে বেশি এগিয়ে। আর তিনি হাদীস বিশারদগণের নিকট হাম্মাদ ইবন সালামাহ থেকেও অধিক পরিমাণে হাদীসের হাফেয। যদিও হাম্মাদ (ইবন সালামাহ) তার থেকে পরহেযগারীতে বেশি বিখ্যাত ও সুন্নাহ'র দিকে আহ্বানে বেশি অগ্রণী। তিনি সে সময়কার বসরার ইমাম যখন বসরা ছিল ইসলামের আলেমদের মিলনমেলা। [মাজমূ' ফাতাওয়া]
৩৫৩. তিনি হচ্ছেন আবু সালামাহ হাম্মাদ ইবন সালামাহ ইবন দীনার আল-বসরী আন-নাহওয়ী, আল- বায্যায, আল-খিরাক্বী, আল-বাত্বায়িনী, রবীআহ ইবন মালেক এর পরিবারের মাওলা। ইসলামের বড় ইমামগণের অন্যতম। তিনি হাদীস শুনেছেন ইবন আবী মুলাইকাহ (তিনি তার বড় শাইখ), সাবেত আল বুনানী, কাতাদাহ ইবন দি'আমাহ প্রমুখ থেকে। আর তার থেকে হাদীস শুনেছেন ইবন জুরাইজ, ইবনুল মুবারক, ইয়াহইয়া আল-কাত্তান, ইবন মাহদী প্রমুখ। ওহাইব ইবন খালেদ বলেন, হাম্মাদ ইবন সালামাহ আমাদের নেতা ও আমাদের মধ্যকার বেশি জ্ঞানী। আব্দুর রহমান ইবন মাহদী বলেন, যদি হাম্মাদ ইবন সালামাহকে বলা হয়, তুমি তো আগামী দিন মারা যাবে তাতে তার আমলে আর বাড়ানোর কোনো ক্ষমতা তার নেই (এত বেশি আমল করতেন যে, আর বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই)। যাহাবী বলেন, তিনি ইলমের সমুদ্রের মধ্য হতে একটি সমুদ্র ছিলেন। তবে তার কিছু ওয়াহম বা ধারণা বশবর্তী হওয়া বর্ণনা রয়েছে, যদিও প্রশস্ত বর্ণনার তুলনায় সেটা কিছুই না। তিনি ইনশা- আল্লাহ সাদৃক বর্ণনাকারী। তিনি হাম্মাদ ইবন যায়েদের মত এত দৃঢ় ছিলেন না। হিজরী ১৬৭ সালে তার মৃত্যু হয়। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৭/৪৪৭)। ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল বলেন, আমি বিদ'আতী ও মতভেদকারীদের বিপক্ষে হাম্মাদ ইবন সালামাহর মত এত কঠোর কাউকে দেখিনি। অনুরূপ আল্লাহকে আখেরাতে দেখতে পাওয়া ও কাদরিয়া-মু'তাযিলাদের বক্তব্য খণ্ডন করার ব্যাপারে তার চেয়ে বেশি বর্ণনাকারী কাউকে পাইনি। দেখুন, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৩/৭১৪)। ইবন তাইমিয়্যাহ আরও বলেন, মু'তাযিলা ফির্কার জাহেয ইমাম হাম্মাদ ইবন সালামাহ ও বসরার কাযী মু'আয ইবন মু'আয এর বিরুদ্ধে বাজে মন্তব্য করতো। অথচ এতে তাদের কোনো দোষ ছিল না। মূল কারণ হচ্ছে, হাম্মাদ ইবন সালামাহ সিফাত সংক্রান্ত হাদীসগুলো জমা করতেন এবং সেগুলোর প্রচার-প্রসার করতেন, আর মু'আয যখন বিচারক হলেন তখন তিনি জাহমিয়্যাহ ও কাদরিয়াদের সাক্ষ্য গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালেন। অতঃপর বিষয়টি খলীফা হারুন-অর- রশীদের দরবারে উঠল। যখন তিনি হাম্মাদ ইবন সালামার সাথে একত্রিত হলেন আর বিস্তারিত জানলেন তখন খলীফা হারুন তাকে সম্মান করলেন এবং সুন্নাহ'র প্রচার-প্রসারের জন্য তার প্রশংসা করলেন। দেখুন, আত-তিস'ঈনিয়্যাহ (২/৩৭৫)। ইবন আবী ইয়া'লা ও ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুমাল্লাহ দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেছেন যে, হাম্মাদ ইবন সালামাহ রাহিমাহুল্লাহ সিফাত সংক্রান্ত একটি গ্রন্থ প্রণয়ন করেছিলেন। দেখুন, ইবত্বালুত তা'ওয়ীলাত (১/৫০); আত-তিস'ঈনিয়্যাহ (১/১৫৯)।
৩৫৪. তিনি হচ্ছেন আবুল কাসেম আব্দুল আযীয ইবন আলী ইবন আহমাদ ইবনুল ফাদ্বাল ইবন শাকার আল-বাগদাদী আল-আযজী। তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেন খত্বীব আল-বাগদাদী, কাযী আবু ইয়া'লা প্রমুখ। সিফাত এর তার একটি অগোছালো গ্রন্থ রয়েছে। খতীব বলেন, আমরা তার থেকে হাদীস লিখেছি। তিনি সাদুক ছিলেন, অনেক কিতাবের অধিকার ছিলেন। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৮/১৮)।
৩৫৫. তিনি হচ্ছেন আবু আব্দুল্লাহ মুত্বাররিফ ইবন আব্দুল্লাহ ইবনুশ শিখখীর আল-হারশী আল-আমেরী আল-বসরী। বড় আলেমগণের একজন। তিনি হাদীস বর্ণনা করেছেন তার পিতা, আলী, আম্মার, আবু যর, উসমান প্রমুখ থেকে। আর তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন, হাসান বসরী, সাবেত আল-বুনানী, ক্বাতাদাহ প্রমুখ। 'ইজলী বলেন, তিনি নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন। বসরাতে ইবনুল আস'আসের ফিতনা থেকে তিনি এবং ইবন সীরীন ব্যতীত কেউ নাজাত পায়নি। আর কৃফাতে খাইসামাহ ইবন আব্দুর রহমান ও ইবরাহীম আন-নাখ'য়ী ব্যতীত কেউ নাজাত পায়নি। (বাকী সবাই আব্দুর রহমান ইবন আস'আস এর ফিতনায় পড়ে হাজ্জাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে জীবন বিসর্জন দেয়। আলেমগণ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্ষমতা না থাকলে বের হওয়াকে ফেতনা বলে অভিহিত করেন। যাহাবী বলেন, তিনি ছিলেন নির্ভরযোগ্য, তার ছিল পরহেজগারী, বিবেক ও আদব। হিজরী ১৫ সালে তিনি মারা যান। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৫/১১৪)।
৩৫৬. ইমাম আজুররীর আশ-শরী'আহতে এসেছে, ‘দীনের মধ্যে পথভ্রষ্টতা অবলম্বনকারীদের কথা আলোচনা করা হলো’। [আশ-শরী'আহ, বর্ণনা নং ৯২, ১৩৯]
৩৫৭. তিনি হচ্ছেন আবু হাফস ‘উমার ইবন আব্দুল আযীয ইবন মারওয়ান ইবনুল হাকাম ইবন আবিল আস ইবন উমাইয়্যাহ ইবন আব্দশামস ইবন আব্দ মান্নাফ ইবন কুসাই ইবন কিলাব আল-কুরাশী আল-উমাওয়ী আল-মাদানী ও আল-মিসরী। দীনদার, সঠিক পথের পথিক, পরহেযগার খলীফা। তিনি একবার আনাস ইবন মালিক রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুর ইমামতি করলেন তখন আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন, আমি এ যুবকের মতো কাউকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের মতো সালাত আদায়কারী দেখিনি। তিনি ছিলেন নির্ভরযোগ্য ও আমানতদার। তার ছিল পরহেযগারী, ফিকহ। অনেক হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইনসাফকারী ইমাম ছিলেন, আল্লাহ তার ওপর রহমত করুন ও তার ওপর সন্তুষ্ট হোন।
যাহাবী বলেন, এ লোকটি উত্তম চরিত্রে নমুনা ছিলেন, পূর্ণ বিবেকের অধিকারী ছিলেন, উত্তম চলন, বলন, ভালো প্রশাসক ছিলেন। তার ঐকান্তিক ইচ্ছা ছিল যতটুকু সম্ভব ইনসাফ কায়েম করবেন। ইলমে ছিলেন পরিপূর্ণ, ফিকহের জ্ঞানে ভরপুর সত্তা, বুদ্ধিমত্তা ও বুঝের দিক সর্বদা ছিল প্রকাশিত। সর্বাদা আল্লাহর কাছে কান্নাকারী ও তাঁরই কাছে প্রত্যাবর্তনকারী। আল্লাহর জন্য সর্বদা দণ্ডায়মান, একনিষ্ঠ ও দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তি, যদিও তিনি খিলাফতের দায়িত্ব নিযুক্ত। সর্বদা হকের সাথে কথা বলতেন অথচ তার সাহায্যকারী খুবই কম ছিল।
তার মৃত্যু হয়েছিল হিজরী ১০১ সালে। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৫/১১৪)। ইমাম শাত্বেবী বলেন, ‘উমার ইবন আব্দুল আযীযের উপরোক্ত বক্তব্য যুগ যুগ ধরে আলেমগণের যত্নধন্য ছিল। তারা তা মুখস্থ করে রাখতেন, মালেক এ বাণীটি খুবই পছন্দ করতেন। দেখুন, আল- ই'তিসাম (১/১৪৫); আল-মুওয়াফাক্বাত (৪/৪৬১)।
ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ অন্যত্র বলেন, মালেক বহুবার এ বাণীটি ‘উমার ইবন আব্দুল আযীয থেকে উদ্ধৃত করেছন। দেখুন, মাজমূ’ ফাতাওয়া (১৯/১৭৮)।
কাযী ইয়াছ বলেন, মালেক যখন ‘উমার ইবন আব্দুল আযীয থেকে এ বাণীটি উদ্ধৃত করতেন তখন খুশিতে বাগবাগ হয়ে যেতেন। দেখুন, তারতীবুল মাদারিক (১/১৭২)।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, মালেক ইবন আনাস সহ ইমামগণ সর্বদা এ বাণীটি অত্যন্ত পছন্দ করে এসেছেন। তারা সেটাকে সর্বদা বর্ণনা করতেন। দেখুন, ই’লামুল মুওয়াকে’ঈন (৬/২৮)। তাছাড়া ইমাম শাত্বেবী আরও বলেন, এ বাণী সুন্নাত এর অনেকগুলো মূলনীতিকে ধারণ করে আছে। যেমন: বিদ’আতের মুলোৎপাটন, সুন্নাহ’র অনুসারীর প্রশংসা, সুন্নাহ’র বিরোধিতাকারীর নিন্দা ইত্যাদি। দেখুন, আল-ই'তিসাম (১/১৪৫-১৪৬)।
৩৫৮. অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের খলীফায়ে রাশেদগণ। কারণ অন্যদের সেটার অধিকার নেই। কিন্তু খলীফায়ে রাশেদগণকে অনুসরণ করার জন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "তোমাদের ওপর কর্তব্য হচ্ছে আমার আদর্শ আঁকড়ে ধরা, আমার পরে যেসব খলীফায়ে রাশেদ আসবে, যারা হিদায়াতের ওপর থাকবে ও হিদায়াত করবে, তাদের আদর্শকে আঁকড়ে ধরা, সেগুলোকে গোড়ালীর দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরবে।” [আবু দাউদ, আস-সুনান, হাদীস নং ৪৬০৭; ইবন মাজাহ, আস-সুনান, হাদীস নং ৪২; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হাদীস নং ১৭১৪৪; দারেমী, আস-সুনান, হাদীস নং ৯৬; ইবন আবী আসেম, আস-সুন্নাহ, আস-সুনান, ৫৪] ইমাম শাত্বেবী বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরে তার উত্তম উত্তরসূরী উম্মতের অভিভাবকগণ (খলীফায়ে রাশেদগণ) যা করবে তা সবই উম্মতের জন্য সুন্নাত হিসেবে গ্রহণ করা হবে। তা কখনও বিদ'আত বলা হবে না, যদিও আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের হাদীসে সেসব ব্যাপারে বিশেষ কোনো ভাষ্য জানা না যায়। দেখুন, আল-ই'তিসাম (১/১৪৬)। যুবাইর ইবনুল 'আওয়াম রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু তার ছেলে আব্দুল্লাহকে বলেন, যখন তার কাছে অভিযোগ আসলো যে, ইরাকবাসীদের কিছু লোক তার কাছে কুরআনের বিভিন্ন অংশের ব্যাখ্যায় বিবাদ করেছে, তখন তিনি বললেন, "কুরআন অনেক জাতি গোষ্ঠীই পড়েছে, প্রত্যেকেই তাদের প্রবৃত্তি অনুসারে সেটার ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছে এবং বিভিন্ন স্থানে ভুল করে চলেছে। সুতরাং তারা যখন তোমার কাছে আসবে তখন তুমি তাদেরকে আবু বকর ও 'উমার রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমার রীতি- নীতি দিয়ে বিতর্ক করবে; কারণ তারা এটা অস্বীকার করতে পারবে না যে আবু বকর ও 'উমার তাদের চেয়ে বেশি কুরআন জানতেন। আব্দুল্লাহ বলেন, এরপর যখন এরা আবার আমার সাথে আবার তর্ক করতে আসলো তখন আমি আবু বকর ও 'উমারের কর্মকাণ্ড দিয়ে দলীল দিতে লাগলাম, তখন আল্লাহর শপথ করে বলছি, তারা আমার সাথে দাঁড়াতেই পারলো না, বসতেই সক্ষম হলো না।" [ইবন বাত্তাহ, আল-ইবানাহ (২/৬২০)] ইমাম শাত্বেবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আলেমগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরের খলীফাদের কর্মকাণ্ডের দিকে দৃষ্টি দেয়ার প্রয়োজন বোধ করলো, যাতে করে এটা বুঝা তাদের জন্য সহজ হয়ে যায় যে, এটিই ছিল সর্বশেষ আমল যায় ওপর নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম মারা গিয়েছিলেন, তার ওপর কোনো রহিতকারী বিধান আপতিত হয়নি; কারণ সাহাবায়ে কিরাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম নতুন থেকে নতুনতর কর্মকাণ্ডই সর্বদা গ্রহণ করতেন। দেখুন, আল-ই'তিসাম (১/১৪৭)।
৩৫৯. মুমিন বলতে এখানে সাহাবায়ে কিরাম যা গ্রহণ করেছেন সে ইজমা'র কথা বুঝানো হয়েছে। সুতরাং কেউ যদি সাহাবায়ে কিরামের ইজমা' গ্রহণ না করে তবে সে নিজেকে ধ্বংসের মুখোমুখি করলো। কুরআনে কারীমে আল্লাহ তা'আলা তাই বলেছেন, "আর তোমাদের নারীদের মধ্যে যারা ব্যভিচার করে তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের মধ্য থেকে চারজন সাক্ষী তলব করবে। যদি তারা সাক্ষ্য দেয় তবে তাদেরকে ঘরে অবরুদ্ধ করবে, যে পর্যন্ত না তাদের মৃত্যু হয় বা আল্লাহ তাদের জন্য অন্য কোনো ব্যবস্থা করেন।" [সূরা আন-নিসা: ১৫]
৩৬০. আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ, আস-সুন্নাহ, হাদীস নং ৭৬৬; ফাসাওয়ী, আল-মা'রিফাতু ওয়াত তারীখ, (৩/৪৮৮); ইবন বাত্তাহ, আল-ইবানাহ (১/৩৫২-৩৫৩), নং ২৩০, ২৩১; লালেকাঈ, শারহে উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাহ নং ১৩৪; খত্বীব আল-বাগদাদী, আল-ফকীহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ (১/৪৩৫-৪৩৬), নং ৪৫৫; ইবন আব্দুল বার, জামে'উ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাদ্বলিহী (২/৩৫৭), নং ১২১৮।
📄 আল্লাহর আরশের উপর উঠার ব্যাপারে রবী‘আহ ইবন আবী আবদির রহমানের বক্তব্য
ইমাম খাল্লাল বিশ্বস্ত সনদে সুফিয়ান ইবন 'উয়াইনা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, "রবী'আহ ইবন আবী আব্দির রহমান কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: আল্লাহর বাণী 'রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন' সম্পর্কে। কীভাবে তিনি উঠেছেন? তিনি বললেন, ইস্তিওয়া শব্দটির অর্থ অজানা নয় (অর্থাৎ উপরে উঠা), কিন্তু 'কাইফ' বা ধরণ বিবেকের আওতা বহির্ভূত। আল্লাহর পক্ষ থেকে রিসালাতের বার্তা এসেছে, রাসূলের ওপর দায়িত্ব স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেয়া, আর আমাদের দায়িত্ব একে সত্য বলে মেনে নেয়া।” আর এই একই বক্তব্য রবী'আহ এর ছাত্র মালিক ইবন আনাস থেকে বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হয়ে এসেছে।
টিকাঃ
৩৬১. তিনি হচ্ছেন আবু উসমান রবী'আহ ইবন আবী আব্দির রহমান ফাররূখ, মদীনার মুফতী, তৎকালীন যুগের শ্রেষ্ঠ আলেম। বলা হয়, আবু আব্দির রহমান আল-কুরাশী আত-তাইমী, তাদের মাওলা। যিনি রবী'আ আর-রাই নামে প্রসিদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন আলে মুনকাদির পরিবারের দাস। তিনি হাদীস বর্ণনা করেছেন সা'ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যেব, 'আত্বা ইবন ইয়াসার প্রমুখ থেকে। আর তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেন, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-আনসারী, সুলাইমান আত-তাইমী, মালেক ইবন আনাস প্রমুখ। ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ বলেন, রবী'আহ ইবন আবি আব্দির রহমান থেকে সাবধানী কাউকে আমি দেখিনি। উবাইদুল্লাহ ইবন 'উমার বলেন, তিনি আমাদের কঠিন জায়গার লোক, আমাদের আলেম ও আমাদের মধ্যকার শ্রেষ্ঠ মানুষ। হিজরী ১৩৬ সালে তিনি মারা যান। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৬/৮৯)।
৩৬২. লালেকাঈ, শারহু উসৃলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ (২/৩৯৮); বাইহাক্বী, আল- আসমা ওয়াস সিফাত (২/১৫১); ঈজলী, তারিখুস সিক্কাত, পৃ. ১৫৮, নং ৪৩১; যাহাবী, আল-উলু, পৃ. ৯৮, তবে সুফইয়ান সাওরী থেকে। ইবন কুদামা আল-মাক্বদেসী, আল-উলু, পৃ. ১৬৪।
৩৬৩. আল্লাহর পক্ষ থেকে রিসালাতের বার্তা এসেছে... এ কথাটি ইমাম রবী'আহ ছাড়াও একাধিক মনিষী থেকে বর্ণিত হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন, ইমাম যুহরী ও আওযা'ঈ। দেখুন, আবু নু'আইম, আল-হিলইয়া (৩/৩৬৯); সাবুনী, আকীদাতুস সালাফ আসহাবুল হাদীস, পৃ. ২৪৯; বুখারী, কিতাবুত তাওহীদ, তা'লীক হিসেবে যুহরী থেকে, কিতাবুত তাওহীদ, অধ্যায় নং ৪৬।
ইমাম খাল্লাল বিশ্বস্ত সনদে সুফিয়ান ইবন 'উয়াইনা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, "রবী'আহ ইবন আবী আব্দির রহমান কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: আল্লাহর বাণী 'রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন' সম্পর্কে। কীভাবে তিনি উঠেছেন? তিনি বললেন, ইস্তিওয়া শব্দটির অর্থ অজানা নয় (অর্থাৎ উপরে উঠা), কিন্তু 'কাইফ' বা ধরণ বিবেকের আওতা বহির্ভূত। আল্লাহর পক্ষ থেকে রিসালাতের বার্তা এসেছে, রাসূলের ওপর দায়িত্ব স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেয়া, আর আমাদের দায়িত্ব একে সত্য বলে মেনে নেয়া।” আর এই একই বক্তব্য রবী'আহ এর ছাত্র মালিক ইবন আনাস থেকে বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হয়ে এসেছে।
টিকাঃ
৩৬১. তিনি হচ্ছেন আবু উসমান রবী'আহ ইবন আবী আব্দির রহমান ফাররূখ, মদীনার মুফতী, তৎকালীন যুগের শ্রেষ্ঠ আলেম। বলা হয়, আবু আব্দির রহমান আল-কুরাশী আত-তাইমী, তাদের মাওলা। যিনি রবী'আ আর-রাই নামে প্রসিদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন আলে মুনকাদির পরিবারের দাস। তিনি হাদীস বর্ণনা করেছেন সা'ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যেব, 'আত্বা ইবন ইয়াসার প্রমুখ থেকে। আর তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেন, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-আনসারী, সুলাইমান আত-তাইমী, মালেক ইবন আনাস প্রমুখ। ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ বলেন, রবী'আহ ইবন আবি আব্দির রহমান থেকে সাবধানী কাউকে আমি দেখিনি। উবাইদুল্লাহ ইবন 'উমার বলেন, তিনি আমাদের কঠিন জায়গার লোক, আমাদের আলেম ও আমাদের মধ্যকার শ্রেষ্ঠ মানুষ। হিজরী ১৩৬ সালে তিনি মারা যান। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৬/৮৯)।
৩৬২. লালেকাঈ, শারহু উসৃলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ (২/৩৯৮); বাইহাক্বী, আল- আসমা ওয়াস সিফাত (২/১৫১); ঈজলী, তারিখুস সিক্কাত, পৃ. ১৫৮, নং ৪৩১; যাহাবী, আল-উলু, পৃ. ৯৮, তবে সুফইয়ান সাওরী থেকে। ইবন কুদামা আল-মাক্বদেসী, আল-উলু, পৃ. ১৬৪।
৩৬৩. আল্লাহর পক্ষ থেকে রিসালাতের বার্তা এসেছে... এ কথাটি ইমাম রবী'আহ ছাড়াও একাধিক মনিষী থেকে বর্ণিত হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন, ইমাম যুহরী ও আওযা'ঈ। দেখুন, আবু নু'আইম, আল-হিলইয়া (৩/৩৬৯); সাবুনী, আকীদাতুস সালাফ আসহাবুল হাদীস, পৃ. ২৪৯; বুখারী, কিতাবুত তাওহীদ, তা'লীক হিসেবে যুহরী থেকে, কিতাবুত তাওহীদ, অধ্যায় নং ৪৬।
📄 ইস্তেওয়া বা ‘আরশের উপর উঠার বিষয়ে ইমাম মালেক এর বক্তব্য
তন্মধ্যে, যা বর্ণনা করেছেন আবুশ শাইখ আল-আসফাহানী ও আবু বকর আল-বাইহাক্বী রাহিমাহুমাল্লাহ ইয়াহইয়া ইবন ইয়াহইয়া থেকে। তিনি বলেন, আমরা ইমাম মালিক ইবন আনাসের নিকট ছিলাম। তখন এক লোক এসে বলল: يا أبا عبد الله الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى كيف استوى؟، فأطرق مالك برأسه حتى علاه الرحضَاء ثم قال: «الاستواء غير مجهول، والكيف غير معقول، والإيمان به واجب، والسؤال عنه بدعة، وما أراك إلا مبتدعا، ثم أمر به أن يخرج
"হে আবু আব্দুল্লাহ! "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন" কীভাবে তিনি উঠেছেন? ইমাম মালেক তখন মাথা নিচু করে রাখলেন, এমনকি তাঁর উপর ঘামের ফোটা দেখা গেল। তারপর তিনি বললেন: 'ইস্তেওয়া' অজ্ঞাত নয়, এর 'ধরণ' জানা বিবেক-বুদ্ধির আওতার মধ্যে নয়, এর ওপর ঈমান আনা ওয়াজিব, এর ধরণ সম্পর্কে প্রশ্ন করা বিদ'আত।"
আমি তোমাকে বিদ'আতী দেখতে পাচ্ছি। তখন তাকে বের করে দেয়ার নির্দেশ দিলেন।
টিকাঃ
৩৬৪. কোনো অর্বাচিন মনে করতে পারে যে, মালেক রাহিমাহুল্লাহ সিফাতের আয়াত সম্পর্কে সর্বসাধারণ উম্মতের সাথে কথা বলাকেই অপছন্দ করেছেন। এটি নিঃসন্দেহে মালেক রাহিমাহুল্লাহ'র ওপর অপবাদ। কুরআনে আল্লাহ তা'আলা সিফাতের আয়াত অনেক বেশি পরিমাণ বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাদীসে ব্যাপকভাবে আল্লাহর সিফাতের বিস্তৃত বর্ণনা কোনো প্রকার রাখঢাক ছাড়াই করেছেন। সাহাবায়ে কিরামও সিফাতের আয়াত নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছেন। এগুলো দিয়ে ওয়ায করেছেন। এগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর পরিচয় লাভ করেছেন ও পরিচয় প্রদান করেছেন। সাহাবায়ে কিরামের সুন্দর অনুসারী তাবেয়ীগণও এসব আয়াত ও হাদীসের ব্যাখ্যা করেছেন। তাদের কারও কাছ থেকেই এসব আয়াত ও হাদীসের ব্যাপারে পলায়ণপর মানসিকতার কিছু বর্ণিত হয়নি। তাবে তাবে'য়ীগণ ব্যাপকভাবে তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহর সিফাতের আলোচনা করতেন। তাদের কারও কাছ থেকেই এভাবে আসেনি যে, এগুলো নিয়ে আলোচনা করা যাবে না, তাহলে মালেক রাহিমাহুল্লাহ কেন সিফাতের আয়াত ও হাদীসের আলোচনা অপছন্দ করবেন?
কিছু মানুষ রয়েছে যারা সর্বদা ভুল বুঝ দাঁড় করাতে অভ্যস্ত। তারা একটি স্বাভাবিক স্পষ্ট কথাকেও অস্পষ্ট বানাতে বদ্ধপরিকর। তাদের অন্তরে বক্রতা থাকায় তারা সবকিছুতে বক্রতা পছন্দ করে। তারা আল্লাহর পরিচয় লাভের একমাত্র মাধ্যমকে বিতর্কিত করে মানুষদের কাছে আল্লাহর পরিচয়ের ক্ষেত্রে চোরাগলি নীতি অবলম্বন করতে চায়। ইসলাম কখনও এমন নয় যে তাতে আল্লাহর পরিচয়ের বিষয়টিকে সর্বসাধারণের কাছ থেকে গোপন করতে হবে। এটা তো খ্রিস্টানদের ত্রিত্ববাদের পরিচয়ের বিষয় নয় যে, সর্বসাধারণের কাছ থেকে গোপন করতে হবে। ইসলামের সবার জন্য সকল আকীদাহ ও শরী'আহ উন্মুক্ত। আর আল্লাহর নাম ও গুণের বিষয়গুলোও এমন নয় যে, তা সাধারণ মানুষের বুঝে আসবে না বা তাদের জন্য ঈমানী ক্ষতির কারণ হবে। কারণ আল্লাহ তা'আলা বান্দার হিদায়াত চান, আর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামও তাঁর উম্মতের জন্য কল্যাণকামী ও স্পষ্টভাষী। যদি আল্লাহর গুণাবলিতে আল্লাহর দীনের জন্য হিদায়াতের বিষয় না হতো তাহলে এগুলো এত ব্যাপক আকারে কুরআন ও সুন্নাহ'য় আসতো না।
বস্তুত আল্লাহর গুণাবলি সংক্রান্ত আয়াত ও হাদীসের আলোচনা জনসম্মুখে করা যাবে না এমন কথা আল্লাহ ও আখেরাতের ওপর ঈমানদার সাধারণ কেউ কোনো দিন বলেনি। ইমামরা তো তা মোটেও বলেননি। এটি মূলত তাদের মত হতে পারে যারা ইসলামী শরী'আতের মৌলিক নীতি ও আকীদাহ থেকে বের হয়ে গেছে যেমন, রাফেযী সম্প্রদায়, জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়, খারেজী হারূরী সম্প্রদায় ও তাদের মত যারা পরবর্তীতে এসেছে সেসব সম্প্রদায়।
কোনো কোনো সালাফ থেকে যদি এসব আয়াত ও হাদীসের আলোচনা সীমিত করার কথা বলা হয়ে থাকে তবে তা ছিল বিশেষ বিশেষ সময়ে, যেমনিভাবে তাদের কেউ কেউ ফিকহ ও বিধি-বিধান সংক্রান্ত আয়াত ও হাদীসও কখনও কখনও বর্ণনা করা বিরত থাকত। অনুরূপ বিশেষ কোনো সময় তাকদীর এর মাসআলা, ঈমান, বিধি-বিধান ও ধমকিসংক্রান্ত আয়াত ও হাদীসের আলোচনা না করতে দেখা যেত। তাহলে বুঝা গেল, বিশেষ কারণে কেউ কথা না বলার বিষয়টি কেবল আল্লাহর নাম ও গুণের সাথে সম্পর্কিত নয়, সেটি অন্যান্য অধ্যায়েও বিশেষ কারণে কেউ কেউ কথা বলেনি। তাই আল্লাহর নাম ও গুণের আয়াত ও হাদীসের আলোচনাকে আলাদাভাবে নিষেধ করার কোনো অর্থ হয় না।
তাছাড়া কোনো সঙ্গত কারণে যখন কেউ কেউ কোনো কোনো বিষয়ে আলোচনা করত না, উক্ত সময়েও সেসব আয়াত ও হাদীসের আলোচনা অন্যরা ঠিকই করেছে। সকলেই যে তা বর্ণনা করা থেকে বিরত ছিল তা নয়। কারণ কারও কারও কাছে হয়ত মনে হতে পারে যে, এসব আয়াত ও হাদীসের আলোচনা করলে ক্ষতি হতে পারে, কিন্তু অপর আলেমগণের মতে সেগুলোর আলোচনা ক্ষতির কারণ নয় বরং উপকারী বিষয়। সুতরাং কখনও কখনও হয়ত উভয় শ্রেণির লোক এ বিষয়ে বিতর্কও করতে পারে। [দেখুন, আত-তাস'ঈনিয়্যাহ (১/১৪৯-১৫১)]
এ তো গেল সাধারণ কথা। বিশেষ করে ইমাম মালেকের এ বাণীর মাঝে কোনোক্রমেই আল্লাহর গুণাবলি আলোচনা না করার প্রতি উৎসাহ দেয়া হয়নি বা আলোচনা করা তিনি অপছন্দ করেননি। বরং ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহ তো তা বর্ণনাই করেছেন। তিনি তো বলেই দিলেন যে, এগুলোর অর্থ জানা আছে, ধরণ জানা নেই। যারা ধরণ সম্পর্কে প্রশ্ন করবে কেবল তাদেরকেই বিদ'আতী ও মজলিসে উপস্থিত থাকার অনুপযুক্ত ঘোষণা করেছেন।
হ্যাঁ, এ ব্যাপারে মালেক রাহিমাহুল্লাহ'র জন্য এ ওযর পেশ করা যেতে পারে যে, মালেক রাহিমাহুল্লাহ মনে করেছিলেন, ধরনের কথা উপস্থিত কারও কারও অন্তরে সন্দেহে উদ্রেক করতে পারে, তার বিবেক সমস্যাগ্রস্ত হতে পারে। কারণ সাধারণত মানুষকে যে জিনিস থেকে নিষেধ করা হয় সেটার প্রতি আগ্রহ একটু বেশি হয়ে যায়, কিন্তু সবার তা হয় না। কিন্তু তাই বলে ইমাম মালেক এর কথাকে অপব্যাখ্যা করে এটা সাব্যস্ত করার চেষ্টা করা যে, তিনি আল্লাহর সিফাত সংক্রান্ত আয়াত ও হাদীসের আলোচনা করাই পছন্দ করেননি, এমন কথা বলা ইমাম মালেকের ওপর মিথ্যাচার ও তাকে তার পূর্ববর্তী আলেমদের মত ও আদর্শ থেকে ভিন্ন হিসেবে প্রচার করা, যা কখনও ভালো কাজ নয়। কারণ এসব আয়াত ও হাদীসের আলোচনা ইমাম মালেকের চেয়ে যারা মুসলিমগণের নিকট অনেক বেশি সম্মানিত ও মর্যাদাসম্পন্ন তারা করেছেন, যেমন আব্দুল্লাহ ইবন 'উমার, আবু হুরায়রা, ইবন আব্বাস, 'আত্বা ইবন আবী রাবাহ। অনুরূপ ইমাম মালেকের সমকক্ষরাও সেসব আয়াত ও হাদীসের আলোচনা করেছে যেমন সুফইয়ান আস-সাওরী, লাইস ইবন সা'দ, সুফইয়ান ইবন উয়াইনাহ। আর নিঃসন্দেহে ইমাম সাওরী হাদীস সম্পর্কে ইমাম মালেক থেকে বেশি জানেন ও বেশি সংরক্ষণকারী। তিনি এতে মালেকের চেয়েও কম ভুল করেন। যদিও মালেক রাহিমাহুল্লাহ কার থেকে হাদীস নিবেন তা চয়ন করে নিতে সিদ্ধহস্ত। আর লাইস, তিনি তো যেমনটি ইমাম শাফে'য়ী বলেছেন, তিনি মালেকের চেয়েও বড় ফকীহ, তবে তার ছাত্ররা তাকে বিনষ্ট করে ফেলেছে। মোটকথা: ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহ'র কথাকে অপব্যাখা করে সিফাত সংক্রান্ত আয়াত ও হাদীসের আলোচনা না করার ব্যাপক নীতি বের করা সর্বৈব মিথ্যা ও নিকৃষ্ট অপবাদ ছাড়া কিছুই নয়। [দেখুন, আত-তিস'ঈনিয়্যাহ (৩/৯৩৬); আরও দেখা যেতে পারে, ইবন আব্দিল বার, আত-তামহীদ (৭/১৫১)...; ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৮/১০৪)]
৩৬৫. ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহ বিদ'আতীদের ব্যাপারে কঠোর ছিলেন। তিনি তার মজলিসে বিদ'আতীদের বসার অনুমতি দিতেন না। বিদ'আতীদেরকে তার সাথে বিতর্ক করার সুযোগ দিতেন না। তাদেরকে মজলিস থেকে অপমান করে বের করে দিতেন। বস্তুত মদীনা সমাজের লোকেরা কখনও বিদ'আতকে প্রশ্রয় দেয়নি। আর তিনি তাদের মাঝেই বড় হয়েছেন।
৩৬৬. লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ (২/৩৯৮); বাইহাক্বী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (২/১৫০-১৫১); ই'তিক্কাদ পৃ. ৫৬; দারেমী, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ, পৃ. ৩৩; আবু ইসমা'ঈল আস-সাবুনী, আকীদাতুস সালাফ আসহাবুল হাদীস, পৃ. ১৭-১৯; ইবন আব্দুল বার, আত-তামহীদ (৭/১৫১); আবু নু'আইম, আল-হিলইয়া (৬/৩২৫-৩২৬); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৮/৮৯-৯০, ৯৫); আল-উলু, পৃ. ১০৩-১০৪। ইবন কুদামা, লুম'আতুল ই'তিক্বাদ, পৃ. ৪; ইসবাতি সিফাতিল উলু, পৃ. ১৭২-১৭৩; সুয়ূত্বী, আদ-দুররুল মানসূর (৩/৪৭৩); বাগাওয়ী, শারহুস সুন্নাহ (১/১৭১০)। ইমাম ইবন হাজার আল-আসকালানী এর সনদকে উত্তম বলেছেন, ফাতহুল বারী (১৩/৪০৭)।
তন্মধ্যে, যা বর্ণনা করেছেন আবুশ শাইখ আল-আসফাহানী ও আবু বকর আল-বাইহাক্বী রাহিমাহুমাল্লাহ ইয়াহইয়া ইবন ইয়াহইয়া থেকে। তিনি বলেন, আমরা ইমাম মালিক ইবন আনাসের নিকট ছিলাম। তখন এক লোক এসে বলল: يا أبا عبد الله الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى كيف استوى؟، فأطرق مالك برأسه حتى علاه الرحضَاء ثم قال: «الاستواء غير مجهول، والكيف غير معقول، والإيمان به واجب، والسؤال عنه بدعة، وما أراك إلا مبتدعا، ثم أمر به أن يخرج
"হে আবু আব্দুল্লাহ! "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন" কীভাবে তিনি উঠেছেন? ইমাম মালেক তখন মাথা নিচু করে রাখলেন, এমনকি তাঁর উপর ঘামের ফোটা দেখা গেল। তারপর তিনি বললেন: 'ইস্তেওয়া' অজ্ঞাত নয়, এর 'ধরণ' জানা বিবেক-বুদ্ধির আওতার মধ্যে নয়, এর ওপর ঈমান আনা ওয়াজিব, এর ধরণ সম্পর্কে প্রশ্ন করা বিদ'আত।"
আমি তোমাকে বিদ'আতী দেখতে পাচ্ছি। তখন তাকে বের করে দেয়ার নির্দেশ দিলেন।
টিকাঃ
৩৬৪. কোনো অর্বাচিন মনে করতে পারে যে, মালেক রাহিমাহুল্লাহ সিফাতের আয়াত সম্পর্কে সর্বসাধারণ উম্মতের সাথে কথা বলাকেই অপছন্দ করেছেন। এটি নিঃসন্দেহে মালেক রাহিমাহুল্লাহ'র ওপর অপবাদ। কুরআনে আল্লাহ তা'আলা সিফাতের আয়াত অনেক বেশি পরিমাণ বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাদীসে ব্যাপকভাবে আল্লাহর সিফাতের বিস্তৃত বর্ণনা কোনো প্রকার রাখঢাক ছাড়াই করেছেন। সাহাবায়ে কিরামও সিফাতের আয়াত নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছেন। এগুলো দিয়ে ওয়ায করেছেন। এগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর পরিচয় লাভ করেছেন ও পরিচয় প্রদান করেছেন। সাহাবায়ে কিরামের সুন্দর অনুসারী তাবেয়ীগণও এসব আয়াত ও হাদীসের ব্যাখ্যা করেছেন। তাদের কারও কাছ থেকেই এসব আয়াত ও হাদীসের ব্যাপারে পলায়ণপর মানসিকতার কিছু বর্ণিত হয়নি। তাবে তাবে'য়ীগণ ব্যাপকভাবে তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহর সিফাতের আলোচনা করতেন। তাদের কারও কাছ থেকেই এভাবে আসেনি যে, এগুলো নিয়ে আলোচনা করা যাবে না, তাহলে মালেক রাহিমাহুল্লাহ কেন সিফাতের আয়াত ও হাদীসের আলোচনা অপছন্দ করবেন?
কিছু মানুষ রয়েছে যারা সর্বদা ভুল বুঝ দাঁড় করাতে অভ্যস্ত। তারা একটি স্বাভাবিক স্পষ্ট কথাকেও অস্পষ্ট বানাতে বদ্ধপরিকর। তাদের অন্তরে বক্রতা থাকায় তারা সবকিছুতে বক্রতা পছন্দ করে। তারা আল্লাহর পরিচয় লাভের একমাত্র মাধ্যমকে বিতর্কিত করে মানুষদের কাছে আল্লাহর পরিচয়ের ক্ষেত্রে চোরাগলি নীতি অবলম্বন করতে চায়। ইসলাম কখনও এমন নয় যে তাতে আল্লাহর পরিচয়ের বিষয়টিকে সর্বসাধারণের কাছ থেকে গোপন করতে হবে। এটা তো খ্রিস্টানদের ত্রিত্ববাদের পরিচয়ের বিষয় নয় যে, সর্বসাধারণের কাছ থেকে গোপন করতে হবে। ইসলামের সবার জন্য সকল আকীদাহ ও শরী'আহ উন্মুক্ত। আর আল্লাহর নাম ও গুণের বিষয়গুলোও এমন নয় যে, তা সাধারণ মানুষের বুঝে আসবে না বা তাদের জন্য ঈমানী ক্ষতির কারণ হবে। কারণ আল্লাহ তা'আলা বান্দার হিদায়াত চান, আর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামও তাঁর উম্মতের জন্য কল্যাণকামী ও স্পষ্টভাষী। যদি আল্লাহর গুণাবলিতে আল্লাহর দীনের জন্য হিদায়াতের বিষয় না হতো তাহলে এগুলো এত ব্যাপক আকারে কুরআন ও সুন্নাহ'য় আসতো না।
বস্তুত আল্লাহর গুণাবলি সংক্রান্ত আয়াত ও হাদীসের আলোচনা জনসম্মুখে করা যাবে না এমন কথা আল্লাহ ও আখেরাতের ওপর ঈমানদার সাধারণ কেউ কোনো দিন বলেনি। ইমামরা তো তা মোটেও বলেননি। এটি মূলত তাদের মত হতে পারে যারা ইসলামী শরী'আতের মৌলিক নীতি ও আকীদাহ থেকে বের হয়ে গেছে যেমন, রাফেযী সম্প্রদায়, জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়, খারেজী হারূরী সম্প্রদায় ও তাদের মত যারা পরবর্তীতে এসেছে সেসব সম্প্রদায়।
কোনো কোনো সালাফ থেকে যদি এসব আয়াত ও হাদীসের আলোচনা সীমিত করার কথা বলা হয়ে থাকে তবে তা ছিল বিশেষ বিশেষ সময়ে, যেমনিভাবে তাদের কেউ কেউ ফিকহ ও বিধি-বিধান সংক্রান্ত আয়াত ও হাদীসও কখনও কখনও বর্ণনা করা বিরত থাকত। অনুরূপ বিশেষ কোনো সময় তাকদীর এর মাসআলা, ঈমান, বিধি-বিধান ও ধমকিসংক্রান্ত আয়াত ও হাদীসের আলোচনা না করতে দেখা যেত। তাহলে বুঝা গেল, বিশেষ কারণে কেউ কথা না বলার বিষয়টি কেবল আল্লাহর নাম ও গুণের সাথে সম্পর্কিত নয়, সেটি অন্যান্য অধ্যায়েও বিশেষ কারণে কেউ কেউ কথা বলেনি। তাই আল্লাহর নাম ও গুণের আয়াত ও হাদীসের আলোচনাকে আলাদাভাবে নিষেধ করার কোনো অর্থ হয় না।
তাছাড়া কোনো সঙ্গত কারণে যখন কেউ কেউ কোনো কোনো বিষয়ে আলোচনা করত না, উক্ত সময়েও সেসব আয়াত ও হাদীসের আলোচনা অন্যরা ঠিকই করেছে। সকলেই যে তা বর্ণনা করা থেকে বিরত ছিল তা নয়। কারণ কারও কারও কাছে হয়ত মনে হতে পারে যে, এসব আয়াত ও হাদীসের আলোচনা করলে ক্ষতি হতে পারে, কিন্তু অপর আলেমগণের মতে সেগুলোর আলোচনা ক্ষতির কারণ নয় বরং উপকারী বিষয়। সুতরাং কখনও কখনও হয়ত উভয় শ্রেণির লোক এ বিষয়ে বিতর্কও করতে পারে। [দেখুন, আত-তাস'ঈনিয়্যাহ (১/১৪৯-১৫১)]
এ তো গেল সাধারণ কথা। বিশেষ করে ইমাম মালেকের এ বাণীর মাঝে কোনোক্রমেই আল্লাহর গুণাবলি আলোচনা না করার প্রতি উৎসাহ দেয়া হয়নি বা আলোচনা করা তিনি অপছন্দ করেননি। বরং ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহ তো তা বর্ণনাই করেছেন। তিনি তো বলেই দিলেন যে, এগুলোর অর্থ জানা আছে, ধরণ জানা নেই। যারা ধরণ সম্পর্কে প্রশ্ন করবে কেবল তাদেরকেই বিদ'আতী ও মজলিসে উপস্থিত থাকার অনুপযুক্ত ঘোষণা করেছেন।
হ্যাঁ, এ ব্যাপারে মালেক রাহিমাহুল্লাহ'র জন্য এ ওযর পেশ করা যেতে পারে যে, মালেক রাহিমাহুল্লাহ মনে করেছিলেন, ধরনের কথা উপস্থিত কারও কারও অন্তরে সন্দেহে উদ্রেক করতে পারে, তার বিবেক সমস্যাগ্রস্ত হতে পারে। কারণ সাধারণত মানুষকে যে জিনিস থেকে নিষেধ করা হয় সেটার প্রতি আগ্রহ একটু বেশি হয়ে যায়, কিন্তু সবার তা হয় না। কিন্তু তাই বলে ইমাম মালেক এর কথাকে অপব্যাখ্যা করে এটা সাব্যস্ত করার চেষ্টা করা যে, তিনি আল্লাহর সিফাত সংক্রান্ত আয়াত ও হাদীসের আলোচনা করাই পছন্দ করেননি, এমন কথা বলা ইমাম মালেকের ওপর মিথ্যাচার ও তাকে তার পূর্ববর্তী আলেমদের মত ও আদর্শ থেকে ভিন্ন হিসেবে প্রচার করা, যা কখনও ভালো কাজ নয়। কারণ এসব আয়াত ও হাদীসের আলোচনা ইমাম মালেকের চেয়ে যারা মুসলিমগণের নিকট অনেক বেশি সম্মানিত ও মর্যাদাসম্পন্ন তারা করেছেন, যেমন আব্দুল্লাহ ইবন 'উমার, আবু হুরায়রা, ইবন আব্বাস, 'আত্বা ইবন আবী রাবাহ। অনুরূপ ইমাম মালেকের সমকক্ষরাও সেসব আয়াত ও হাদীসের আলোচনা করেছে যেমন সুফইয়ান আস-সাওরী, লাইস ইবন সা'দ, সুফইয়ান ইবন উয়াইনাহ। আর নিঃসন্দেহে ইমাম সাওরী হাদীস সম্পর্কে ইমাম মালেক থেকে বেশি জানেন ও বেশি সংরক্ষণকারী। তিনি এতে মালেকের চেয়েও কম ভুল করেন। যদিও মালেক রাহিমাহুল্লাহ কার থেকে হাদীস নিবেন তা চয়ন করে নিতে সিদ্ধহস্ত। আর লাইস, তিনি তো যেমনটি ইমাম শাফে'য়ী বলেছেন, তিনি মালেকের চেয়েও বড় ফকীহ, তবে তার ছাত্ররা তাকে বিনষ্ট করে ফেলেছে। মোটকথা: ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহ'র কথাকে অপব্যাখা করে সিফাত সংক্রান্ত আয়াত ও হাদীসের আলোচনা না করার ব্যাপক নীতি বের করা সর্বৈব মিথ্যা ও নিকৃষ্ট অপবাদ ছাড়া কিছুই নয়। [দেখুন, আত-তিস'ঈনিয়্যাহ (৩/৯৩৬); আরও দেখা যেতে পারে, ইবন আব্দিল বার, আত-তামহীদ (৭/১৫১)...; ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৮/১০৪)]
৩৬৫. ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহ বিদ'আতীদের ব্যাপারে কঠোর ছিলেন। তিনি তার মজলিসে বিদ'আতীদের বসার অনুমতি দিতেন না। বিদ'আতীদেরকে তার সাথে বিতর্ক করার সুযোগ দিতেন না। তাদেরকে মজলিস থেকে অপমান করে বের করে দিতেন। বস্তুত মদীনা সমাজের লোকেরা কখনও বিদ'আতকে প্রশ্রয় দেয়নি। আর তিনি তাদের মাঝেই বড় হয়েছেন।
৩৬৬. লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ (২/৩৯৮); বাইহাক্বী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (২/১৫০-১৫১); ই'তিক্কাদ পৃ. ৫৬; দারেমী, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ, পৃ. ৩৩; আবু ইসমা'ঈল আস-সাবুনী, আকীদাতুস সালাফ আসহাবুল হাদীস, পৃ. ১৭-১৯; ইবন আব্দুল বার, আত-তামহীদ (৭/১৫১); আবু নু'আইম, আল-হিলইয়া (৬/৩২৫-৩২৬); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৮/৮৯-৯০, ৯৫); আল-উলু, পৃ. ১০৩-১০৪। ইবন কুদামা, লুম'আতুল ই'তিক্বাদ, পৃ. ৪; ইসবাতি সিফাতিল উলু, পৃ. ১৭২-১৭৩; সুয়ূত্বী, আদ-দুররুল মানসূর (৩/৪৭৩); বাগাওয়ী, শারহুস সুন্নাহ (১/১৭১০)। ইমাম ইবন হাজার আল-আসকালানী এর সনদকে উত্তম বলেছেন, ফাতহুল বারী (১৩/৪০৭)।
📄 রবী‘আহ ও মালেক এর বক্তব্য, ‘ইস্তেওয়া অজানা নয়’ এ কথার উদ্দেশ্য
কাজেই রবী'আহ ও মালিকের বক্তব্য: "ইসতিওয়া অজ্ঞাত নয়, এর ধরণ জানা বিবেকের আওতাভুক্ত বিষয় নয়, এর ওপর ঈমান আনা ওয়াজিব।" এটি অন্য ইমামদের বক্তব্যের সাথে সামঞ্জস্যশীল যে, "এগুলোকে তোমরা কোনো ধরণ নির্ধারণ ব্যতিরেকে যেভাবে এসেছে সেভাবে চালিয়ে দাও।" তারা তো কেবল নাকচ করেছেন সিফাতের কাইফিয়্যত তথা ধরণ ও পদ্ধতির জ্ঞানকে, মূল সিফাতের বাস্তব অর্থকে নাকচ করেননি। যদি সালাফগণ আল্লাহর শানের সাথে উপযুক্ত যে অর্থ সেটা না বুঝে শুধু কেবল শব্দের প্রতি ঈমান আনয়ন করতো তাহলে তারা বলতেন না "ইসতিওয়া অজানা নয়, এর ধরণ বিবেক দিয়ে প্রাপ্ত হওয়ার বিষয় নয়" এবং বলতেন না "যেভাবে এসেছে সেভাবে চালিয়ে দাও ধরণ (কাইফিয়্যাত) নির্ধারণ ছাড়া।" কেননা "ইসতিওয়া” শব্দটি তখন তো জ্ঞাতই হতো না, বরং আরবী বর্ণমালার অর্থের মতো অজ্ঞাতই হতো।
টিকাঃ
৩৬৭. অর্থাৎ সালাফগণ ‘ধরণ’ এর জ্ঞান অস্বীকার করেছেন, তারা এর অর্থকে অস্বীকার করেননি। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, সালাফে সালেহীন থেকে এ কথা বিখ্যাত যে, মহান আল্লাহর সিফাত এর ব্যাপারে ‘কী ধরনের’ বা ধরণ কী? তা প্রশ্ন করা যাবে না। অনুরূপ মহান আল্লাহর কর্মের ব্যাপারেও ‘কেন’? এ প্রশ্ন করা যাবে না। তিনি আরও বলেছেন, সালাফে সালেহীন ও ইমামগণ যেমন মালিক রাহিমাহুল্লাহ, তারা বর্তমান সময়ে আমাদের নিকট মহান আল্লাহর সিফাত এর ‘ধরণ’ জানা না থাকার কথা বলেছেন। তবে ‘ধরণ’ এর একটি বাস্তব অবস্থা রয়েছে তা কেউ অস্বীকার করেনি। অথচ অনেক জাহমিয়্যাহ ও মু'তাযিলা এসব সিফাতের ব্যাপারে তারা যা জেনেছে বা বলেছে তার বাইরে সেগুলোর বাস্তব ও হাকীকতই অস্বীকার করে থাকে। দেখুন, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/১৯৭)। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ সিফাতের হাকীকত ও বাস্তব ‘ধরণ’ থাকাকে অস্বীকার করেননি। বরং বাস্তব ধরণ জানা থাকাকে অস্বীকার করেছেন। সুতরাং এসব সিফাতকে তার হাকীকী তথা বাস্তব অর্থেই নিতে হবে, কোনোরূপ রূপক অর্থের পিছনে ছুটা যাবে না। ধরণকে রূপক বানানো যাবে না। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এটাই ইমাম ইবন আব্দুল বার রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেন। দেখুন, জামে'উর রাসায়িল (৮/১৮৬)।
৩৬৮. কারণ দেখা যাচ্ছে কোনো কোনো কুটতর্কের লোক, আরবী ভাষা জ্ঞানে স্বল্পতার অধিকারী ব্যক্তিকে দেখা যায় তারা ইমাম মালিক এ বক্তব্য ‘ইস্তেওয়া অজানা নয়’ এর অর্থ করছে, ইস্তেওয়া শব্দটি আরবী ভাষার শব্দ, এ শব্দটি অজানা নয়। এর মাধ্যমে তারা বুঝাতে চাচ্ছে এখানে ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ ‘ইস্তেওয়া’ এর অর্থ অজানা নয়’ এটা বুঝাননি। নাউযুবিল্লাহ, শুধু তর্কের খাতিরে তর্ক করে তারা ইমামদের বক্তব্যের স্পষ্ট ভাষ্যকেও অপব্যাখ্যা করে যাচ্ছে। এখানে বিরুদ্ধবাদীদের একটি সন্দেহ তুলে ধরা হয়েছে, যায় চারটি জবাব শাইখুল ইসলাম প্রদান করবেন।
৩৬৯. বিদ'আতীদের মধ্যে আহলুত তাজহীল (যারা মনে করে সিফাতের আয়াত ও হাদীসগুলোর অর্থ জানা যায় না’) তারা যেহেতু ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহ’র বাণীটি থেকে ‘অর্থ না জানার’ দলীল হিসেবে পেশ করে তাই ইমাম ইবন তাইমিয়াহ রাহিমাহুল্লাহ ইমাম মালেকের সে বাণীর আলোচনা করেই তাদের কুপোকাত করছেন। এটাকে বলা হয় কালবুদ দলীল।
৩৭০. ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, ‘মালেক রাহিমাহুল্লাহ এটা বর্ণনা করলেন যে, ‘ইস্তিওয়া’ এর অর্থ জানা আছে। (তা হচ্ছে উপরে উঠা), তার ধরণ অজানা। সুতরাং অজানা ধরণ হচ্ছে সে "তা'ওয়ীল" বা "পূর্ণ বিবরণ" বা "মূলরূপ” যা একমাত্র আল্লাহই জানেন। আর ‘ইস্তেওয়া’ ও অন্যান্য শব্দ থেকে যা বুঝা যায় তা তো সে ‘তাফসীর’ যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল বর্ণনা করেছেন। [দারউত তা'আরুদ্ব (১/২৮৭)]
অন্য জায়গায় বলেন, ‘তিনি বর্ণনা করে দিলেন যে, তাঁর ইস্তেওয়া (তথা উপরে উঠা) এর ধরণ বান্দাদের অজানা। তবে ধরণ নেই এমন কথা বলা হয়নি। বরং বান্দাদের কাছে সেটার জ্ঞান নেই এটাই ঘোষণা করেছেন।’ [দারউত তা'আরুদ্ব (২/৩৫)]
৩৭১. এ হচ্ছে প্রথম জাওয়াব। যার মূলকথা হচ্ছে, আরবী বর্ণমালার কোনো সুনির্দিষ্ট অর্থ হয় না। এগুলোর ব্যপারে কারো পক্ষ থেকে বলা হয় না যে, এগুলো অজানা নয়। বরং তারা কেউ এগুলোর অর্থ জানে না। কিন্তু ‘ইস্তেওয়া’ শব্দটির অর্থ হয় এটা আরবী ভাষা যারা জানে তারা সবাই বলতে বাধ্য। সুতরাং যখন ‘ইস্তেওয়া’ সম্পর্কে বলা হলো যে, এটি অজানা নয়, তখন সহজেই এটা বুঝা যায় যে, তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে এগুলোর অর্থ ও উদ্দেশ্য অজানা নয়। বরং এ শব্দগুলোর অর্থই উদ্দেশ্য।
কাজেই রবী'আহ ও মালিকের বক্তব্য: "ইসতিওয়া অজ্ঞাত নয়, এর ধরণ জানা বিবেকের আওতাভুক্ত বিষয় নয়, এর ওপর ঈমান আনা ওয়াজিব।" এটি অন্য ইমামদের বক্তব্যের সাথে সামঞ্জস্যশীল যে, "এগুলোকে তোমরা কোনো ধরণ নির্ধারণ ব্যতিরেকে যেভাবে এসেছে সেভাবে চালিয়ে দাও।" তারা তো কেবল নাকচ করেছেন সিফাতের কাইফিয়্যত তথা ধরণ ও পদ্ধতির জ্ঞানকে, মূল সিফাতের বাস্তব অর্থকে নাকচ করেননি। যদি সালাফগণ আল্লাহর শানের সাথে উপযুক্ত যে অর্থ সেটা না বুঝে শুধু কেবল শব্দের প্রতি ঈমান আনয়ন করতো তাহলে তারা বলতেন না "ইসতিওয়া অজানা নয়, এর ধরণ বিবেক দিয়ে প্রাপ্ত হওয়ার বিষয় নয়" এবং বলতেন না "যেভাবে এসেছে সেভাবে চালিয়ে দাও ধরণ (কাইফিয়্যাত) নির্ধারণ ছাড়া।" কেননা "ইসতিওয়া” শব্দটি তখন তো জ্ঞাতই হতো না, বরং আরবী বর্ণমালার অর্থের মতো অজ্ঞাতই হতো।
টিকাঃ
৩৬৭. অর্থাৎ সালাফগণ ‘ধরণ’ এর জ্ঞান অস্বীকার করেছেন, তারা এর অর্থকে অস্বীকার করেননি। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, সালাফে সালেহীন থেকে এ কথা বিখ্যাত যে, মহান আল্লাহর সিফাত এর ব্যাপারে ‘কী ধরনের’ বা ধরণ কী? তা প্রশ্ন করা যাবে না। অনুরূপ মহান আল্লাহর কর্মের ব্যাপারেও ‘কেন’? এ প্রশ্ন করা যাবে না। তিনি আরও বলেছেন, সালাফে সালেহীন ও ইমামগণ যেমন মালিক রাহিমাহুল্লাহ, তারা বর্তমান সময়ে আমাদের নিকট মহান আল্লাহর সিফাত এর ‘ধরণ’ জানা না থাকার কথা বলেছেন। তবে ‘ধরণ’ এর একটি বাস্তব অবস্থা রয়েছে তা কেউ অস্বীকার করেনি। অথচ অনেক জাহমিয়্যাহ ও মু'তাযিলা এসব সিফাতের ব্যাপারে তারা যা জেনেছে বা বলেছে তার বাইরে সেগুলোর বাস্তব ও হাকীকতই অস্বীকার করে থাকে। দেখুন, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/১৯৭)। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ সিফাতের হাকীকত ও বাস্তব ‘ধরণ’ থাকাকে অস্বীকার করেননি। বরং বাস্তব ধরণ জানা থাকাকে অস্বীকার করেছেন। সুতরাং এসব সিফাতকে তার হাকীকী তথা বাস্তব অর্থেই নিতে হবে, কোনোরূপ রূপক অর্থের পিছনে ছুটা যাবে না। ধরণকে রূপক বানানো যাবে না। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এটাই ইমাম ইবন আব্দুল বার রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেন। দেখুন, জামে'উর রাসায়িল (৮/১৮৬)।
৩৬৮. কারণ দেখা যাচ্ছে কোনো কোনো কুটতর্কের লোক, আরবী ভাষা জ্ঞানে স্বল্পতার অধিকারী ব্যক্তিকে দেখা যায় তারা ইমাম মালিক এ বক্তব্য ‘ইস্তেওয়া অজানা নয়’ এর অর্থ করছে, ইস্তেওয়া শব্দটি আরবী ভাষার শব্দ, এ শব্দটি অজানা নয়। এর মাধ্যমে তারা বুঝাতে চাচ্ছে এখানে ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ ‘ইস্তেওয়া’ এর অর্থ অজানা নয়’ এটা বুঝাননি। নাউযুবিল্লাহ, শুধু তর্কের খাতিরে তর্ক করে তারা ইমামদের বক্তব্যের স্পষ্ট ভাষ্যকেও অপব্যাখ্যা করে যাচ্ছে। এখানে বিরুদ্ধবাদীদের একটি সন্দেহ তুলে ধরা হয়েছে, যায় চারটি জবাব শাইখুল ইসলাম প্রদান করবেন।
৩৬৯. বিদ'আতীদের মধ্যে আহলুত তাজহীল (যারা মনে করে সিফাতের আয়াত ও হাদীসগুলোর অর্থ জানা যায় না’) তারা যেহেতু ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহ’র বাণীটি থেকে ‘অর্থ না জানার’ দলীল হিসেবে পেশ করে তাই ইমাম ইবন তাইমিয়াহ রাহিমাহুল্লাহ ইমাম মালেকের সে বাণীর আলোচনা করেই তাদের কুপোকাত করছেন। এটাকে বলা হয় কালবুদ দলীল।
৩৭০. ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, ‘মালেক রাহিমাহুল্লাহ এটা বর্ণনা করলেন যে, ‘ইস্তিওয়া’ এর অর্থ জানা আছে। (তা হচ্ছে উপরে উঠা), তার ধরণ অজানা। সুতরাং অজানা ধরণ হচ্ছে সে "তা'ওয়ীল" বা "পূর্ণ বিবরণ" বা "মূলরূপ” যা একমাত্র আল্লাহই জানেন। আর ‘ইস্তেওয়া’ ও অন্যান্য শব্দ থেকে যা বুঝা যায় তা তো সে ‘তাফসীর’ যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল বর্ণনা করেছেন। [দারউত তা'আরুদ্ব (১/২৮৭)]
অন্য জায়গায় বলেন, ‘তিনি বর্ণনা করে দিলেন যে, তাঁর ইস্তেওয়া (তথা উপরে উঠা) এর ধরণ বান্দাদের অজানা। তবে ধরণ নেই এমন কথা বলা হয়নি। বরং বান্দাদের কাছে সেটার জ্ঞান নেই এটাই ঘোষণা করেছেন।’ [দারউত তা'আরুদ্ব (২/৩৫)]
৩৭১. এ হচ্ছে প্রথম জাওয়াব। যার মূলকথা হচ্ছে, আরবী বর্ণমালার কোনো সুনির্দিষ্ট অর্থ হয় না। এগুলোর ব্যপারে কারো পক্ষ থেকে বলা হয় না যে, এগুলো অজানা নয়। বরং তারা কেউ এগুলোর অর্থ জানে না। কিন্তু ‘ইস্তেওয়া’ শব্দটির অর্থ হয় এটা আরবী ভাষা যারা জানে তারা সবাই বলতে বাধ্য। সুতরাং যখন ‘ইস্তেওয়া’ সম্পর্কে বলা হলো যে, এটি অজানা নয়, তখন সহজেই এটা বুঝা যায় যে, তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে এগুলোর অর্থ ও উদ্দেশ্য অজানা নয়। বরং এ শব্দগুলোর অর্থই উদ্দেশ্য।