📄 তা’বীল এর বিবিধ অর্থ
কেননা তা’ওয়ীল শব্দটি তিনটি উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়:
টিকাঃ
৩০৫. তা’ওয়ীল শব্দটির আভিধানিক অর্থ, ১) পরিণাম ও সর্বশেষ অবস্থা, ২) পরিবর্তন ও পরিবর্তিত রূপ। ৩) ব্যাখ্যা। ৪) স্পষ্ট বর্ণনা। [দেখুন, তাহযীবুল লুগাহ, মু’জামু মাক্কায়ীসুল লুগাহ (১/১৫৯-১৬০), তাজুল ‘আরূস (৭/২১৬), ইবন মানযূর (লিসানুল আরব ১১/৩৩)। আর পরিভাষায় তা’ওয়ীল শব্দটি সম্পর্কে ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এটি বর্তমানে মুশতারাক শব্দে পরিণত হয়েছে। মুশতারাক শব্দ হচ্ছে এমন সব শব্দ যেগুলো একাধিক অর্থে সমভাবে ব্যবহৃত হয়, তখন স্থান-কাল-পাত্র ভেদে অর্থ নির্ধারিত হয়। এখানে তা’ওয়ীল শব্দটির কুরআনিক একটি অর্থ রয়েছে, সালাফে সালেহীন একটি অর্থে ব্যবহার করেছেন, আবার পরবর্তীরা আরেকটি অর্থে সেটাকে নিয়ে গেছে। যে কারণে এসব আয়াত যার কাছে যেভাবে পৌঁছেছে আর তার মাথায় তা’ওয়ীল শব্দের যে অর্থ ঘুরপাক খাচ্ছে সে সেটাকে উক্ত অর্থে ব্যবহার করে কুরআনে আসা তা’ওয়ীল শব্দের ব্যাখ্যা করেছে। [ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ’ ফাতাওয়া (১৩/২৮৪-২৮৬)] সংক্ষেপিত। আরও দেখুন, দারউত তা’আরুদ্ব [(৯/২৪); সাফাদিয়্যাহ (১/২৮৮)]।
৩০৬. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ অন্যত্র বলেন, তা’ওয়ীল শব্দটি সম্পর্কে মানুষ দু’ প্রান্তিক সীমানায় রয়েছে। এক, কেউ কেউ তার নিন্দায় গ্রন্থ রচনা করেছে। (যেমন কাযী আবু ইয়া’লা, ইবত্বালুত তা’ওয়ীলাত ফী আখবারিস সিফাত, অনুরূপ ইবন কুদামাহ, যামুত তা’ওয়ীল) দুই, অপর পক্ষ তা’ওয়ীল করার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করেছে, (যেমন, আবু বকর ইবনু ফুওরাক তার মুশকিলুল হাদীস ওয়া বায়ানিহী গ্রন্থে)। বরং তাদের মধ্যকার কেউ কেউ তা’ওয়ীল করা ওয়াজিবও বলেছে। তারপর ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এসে সেটার আসল অর্থ ও কখন তা গ্রহণযোগ্য হবে আর কখন হবে না, তা স্পষ্ট করে দেন। [দেখুন, মাজমূ’ ফাতাওয়া (১২/২৮৮), (৫/৩৪৯-৩৫০); দারউত তা’আরুদ্ব (৫/২৩৭); আত-তাদমুরিয়্যাহ, পৃ. ৮৯-]
কেননা তা’ওয়ীল শব্দটি তিনটি উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়:
টিকাঃ
৩০৫. তা’ওয়ীল শব্দটির আভিধানিক অর্থ, ১) পরিণাম ও সর্বশেষ অবস্থা, ২) পরিবর্তন ও পরিবর্তিত রূপ। ৩) ব্যাখ্যা। ৪) স্পষ্ট বর্ণনা। [দেখুন, তাহযীবুল লুগাহ, মু’জামু মাক্কায়ীসুল লুগাহ (১/১৫৯-১৬০), তাজুল ‘আরূস (৭/২১৬), ইবন মানযূর (লিসানুল আরব ১১/৩৩)। আর পরিভাষায় তা’ওয়ীল শব্দটি সম্পর্কে ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এটি বর্তমানে মুশতারাক শব্দে পরিণত হয়েছে। মুশতারাক শব্দ হচ্ছে এমন সব শব্দ যেগুলো একাধিক অর্থে সমভাবে ব্যবহৃত হয়, তখন স্থান-কাল-পাত্র ভেদে অর্থ নির্ধারিত হয়। এখানে তা’ওয়ীল শব্দটির কুরআনিক একটি অর্থ রয়েছে, সালাফে সালেহীন একটি অর্থে ব্যবহার করেছেন, আবার পরবর্তীরা আরেকটি অর্থে সেটাকে নিয়ে গেছে। যে কারণে এসব আয়াত যার কাছে যেভাবে পৌঁছেছে আর তার মাথায় তা’ওয়ীল শব্দের যে অর্থ ঘুরপাক খাচ্ছে সে সেটাকে উক্ত অর্থে ব্যবহার করে কুরআনে আসা তা’ওয়ীল শব্দের ব্যাখ্যা করেছে। [ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ’ ফাতাওয়া (১৩/২৮৪-২৮৬)] সংক্ষেপিত। আরও দেখুন, দারউত তা’আরুদ্ব [(৯/২৪); সাফাদিয়্যাহ (১/২৮৮)]।
৩০৬. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ অন্যত্র বলেন, তা’ওয়ীল শব্দটি সম্পর্কে মানুষ দু’ প্রান্তিক সীমানায় রয়েছে। এক, কেউ কেউ তার নিন্দায় গ্রন্থ রচনা করেছে। (যেমন কাযী আবু ইয়া’লা, ইবত্বালুত তা’ওয়ীলাত ফী আখবারিস সিফাত, অনুরূপ ইবন কুদামাহ, যামুত তা’ওয়ীল) দুই, অপর পক্ষ তা’ওয়ীল করার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করেছে, (যেমন, আবু বকর ইবনু ফুওরাক তার মুশকিলুল হাদীস ওয়া বায়ানিহী গ্রন্থে)। বরং তাদের মধ্যকার কেউ কেউ তা’ওয়ীল করা ওয়াজিবও বলেছে। তারপর ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এসে সেটার আসল অর্থ ও কখন তা গ্রহণযোগ্য হবে আর কখন হবে না, তা স্পষ্ট করে দেন। [দেখুন, মাজমূ’ ফাতাওয়া (১২/২৮৮), (৫/৩৪৯-৩৫০); দারউত তা’আরুদ্ব (৫/২৩৭); আত-তাদমুরিয়্যাহ, পৃ. ৮৯-]
📄 তা’বীল শব্দটি পরবর্তী লোকেদের পরিভাষায়
পরবর্তীদের অধিকাংশের পরিভাষায় তা’ওয়ীল হচ্ছে- কোনো শব্দের অর্থকে তার অপ্রাধান্যপ্রাপ্ত সম্ভাবনার দিকে সরিয়ে নেয়া, এমন দলীলের কারণে যা তার সাথে যুক্ত থাকে।
সুতরাং তাদের নিকট, যাহির শব্দের চাহিদা অনুযায়ী অর্থে ব্যবহৃত শব্দ তা’ওয়ীল নয়। তাদের ধারণা- তা’ওয়ীল শব্দ দ্বারা আল্লাহর উদ্দেশ্য এটাই। আর নস এর এমন তা’ওয়ীল রয়েছে যা তার মাদলুল (শব্দ দ্বারা বুঝা যায়) এর বিপরীত, যা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। তা’ওয়ীলকারীরাও জানে না অথবা তা’ওয়ীলকারীরা জানে।
আবার এদের অনেকের বক্তব্য, শব্দ তার যাহির বা প্রকাশ্য অর্থের ওপর প্রযোজ্য হবে। কাজেই তার যাহির উদ্দেশ্য হবে। অথচ তারা বলে: নিশ্চয় এর একটি তা’ওয়ীল আছে যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। নিঃসন্দেহে এটি পরস্পর বিরোধী কথা, যাতে সুন্নাহ’র সাথে সম্পৃক্ত চার ইমামের অনুসারী ও অন্যান্য অনেকেই পতিত হয়েছেন।
টিকাঃ
৩০৭. (এমন দলীলের কারণে বা তার সাথে যুক্ত থাকে), এ অংশটুকু থাকলে সেটা তা’ওয়ীলের গ্রহণযোগ্য পারিভাষিক অর্থ হতে পারে, যা উসূলবিদগণ ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, যারা আল্লাহর সিফাতের তা’ওয়ীল করে তারা এ অংশটুকু বা এ শর্তটুকু বেমালুম ভুলে যায়। তারা কেবল আক্বলী তথা বিবেকের যুক্তির শরণাপন্ন হয়ে সিফাতের আয়াতসমূহকে তার আসল প্রাধান্যপ্রাপ্ত অর্থ থেকে অপ্রাধান্যপ্রাপ্ত অর্থের দিকে নিয়ে যায়, যা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাই আমাদের কাছে স্পষ্ট হলো যে, পরবর্তী এ পরিভাষা কুরআন ও হাদীসে আসেনি। সুতরাং কুরআন ও হাদীসের শব্দে আসা তা’ওয়ীল হিসেবে এ অর্থ সর্বোতভাবে অগ্রহণযোগ্য।
৩০৮. এমন দলীল যাতে দু’টি অর্থ করার সুযোগ থাকে, একটি প্রকাশ্য অর্থ, আরেকটি দূরবর্তী অর্থ। প্রকাশ্য অর্থকে যাহের বলা হয়। আর অপ্রকাশ্য বা দূরবর্তী অর্থকে মুআওয়াল বলা হয়। এটি পরবর্তী লোকদের পরিভাষা।
৩০৯. যেমন ইস্তেওয়া শব্দের অর্থ ‘আলা ও ইরতাফা’আ বা স্বা’আদা, (উপরে উঠা, ঊর্ধ্বে উঠা, আরোহন করা) এদের নিকট তা’ওয়ীল নয়। অথচ এটা অ’ওয়ীল। এটার সারকথা হচ্ছে, শব্দ থেকে যা বুঝা যায় তা, সালাফে সালেহীনের নিকট তা’ওয়ীল বা সরল অর্থ (যা তাফসীর হিসেবে খ্যাত)। কিন্তু যারা পরবর্তীদের বুঝ অনুযায়ী তা’ওয়ীল করে আর যারা তাফওয়ীর করে তারা এটাকে তা’ওয়ীল মনে করে না।
৩১০. অর্থাৎ পূর্বে বর্ণিত তাদের বক্তব্য, যাতে বলা হয়েছে, তা’ওয়ীল হচ্ছে কোনো শব্দের অর্থকে তার অপ্রাধান্যপ্রাপ্ত সম্ভাবনার দিকে সরিয়ে নেয়া, এমন দলীলের কারণে যা তার সাথে যুক্ত থাকে। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তা’ওয়ীল বলতে ‘কোনো শব্দের অর্থকে তার অপ্রাধান্যপ্রাপ্ত সম্ভাবনার দিকে সরিয়ে নেয়া, এমন দলীলের কারণে যা তার সাথে যুক্ত থাকে অথবা পরবর্তী দলীলের ওপর ভিত্তি করে অথবা শুধু কোনো এক প্রকার দলীলের ওপর নির্ভর করে’ এ অর্থে ব্যবহার করা পরবর্তী লোকদের পরিভাষা। সালাফে সালেহীনের কারও শব্দে তা’ওয়ীল দ্বারা এ পারিভাষিক অর্থটি উদ্দেশ্য ছিল না। পরবর্তীতে এ অর্থটি এত বেশি প্রচার ও প্রসার পায় যে, তারা মনে করতে থাকে যে, কুরআনে কারীমে আসা তা’ওয়ীলকে এ অর্থেই গ্রহণ করতে হবে। তারা বলতে থাকে, "আর তার তা’ওয়ীল কেবল আল্লাহই জানেন" (সূরা আলে ইমরান: ০৭] এর অর্থ সেটাই যা তারা পরবর্তীতে পরিভাষা হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। তারপর তাদের একদল বলে উক্ত অর্থটি আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না, আরেক দল বলে উক্ত অর্থটি ইলমে দৃঢ় লোকেরা জানে। ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, নিঃসন্দেহে উভয় দলই ভুলের ওপর আছে। কারণ এটার কোনো বাস্তবতা নেই। বরং তা বাতিল। আল্লাহ ভালো করেই জানেন যে, এটা তাঁর উদ্দেশ্য না, আর তিনি তা উদ্দেশ্য নেননি। [মাজমূ’ ফাতাওয়া (৫/৩৪৯-৩৫০), শারহু হাদীসিন নুযূল]
৩১১. কুরআন ও সুন্নাহ’য় আসা সিফাত সংক্রান্ত নস বা ভাষ্যসমূহের এমন তা’ওয়ীল করতে হবে যাতে প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করার সুযোগ না থাকে। এটাকে তারা তা’ওয়ীল নাম দিয়েছে। এ কারণে তারা প্রতিটি সিফাত বিষয়ক আয়াত ও হাদীসের জন্য দূরবর্তী একটি অর্থ নির্ধারণ করে সেটা জানাকেই ইলম হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান সাব্যস্ত করে। আর যারা প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করে তাদের প্রতি কুফর এর সম্পৃক্ততা প্রদান করে।
৩১২. এতটুকুতে আহলুত তা’ওয়ীল ও আহলুত তাজহীল একমত। শেষ পর্যন্ত তারা এমন সব তা’ওয়ীল নামীয় অপব্যাখ্যার শরণাপন্ন হয় যা তাদেরকে কারামিত্বা, বাতেনী, জাহমীদের অপব্যাখ্যার দিকে নিয়ে যায়। [মাজমূ’ ফাতাওয়া]
৩১৩. এতটুকু কেবল আহলুত তাজহীলের মত। যদিও প্রকৃত অর্থে এটা আহলুত তা’ওয়ীলদেরও মত। কারণ তারাও প্রকাশ্য অর্থকে অগ্রহণযোগ্য মনে করে থাকে। তারা আরও মনে করে থাকে যে এগুলো মুতাশাবিহ। এগুলোর অর্থ কেবল আল্লাহ জানেন। আমরা যা করছি তা কেবল সাওয়াবের আশায় করছি।
৩১৪. আহলুত তাজহীল তথা তাফওয়ীদ্ব নীতির অনুসরণকারীদের দু’টি মত রয়েছে। তাদের একদল বলে তা’ওয়ীলকারীরা সে অর্থটি জানতে পারবে, অপর দলটি বলে তা’ওয়ীলকারীরাও তা জানতে পারে না।
৩১৫. তাদের এ স্ববিরোধিতার বিষয়টি ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ তার অনেক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। যেমন তিনি বলেন, ‘তারপর তাদের কেউ কেউ বলে, এর দ্বারা যা উদ্দেশ্য তা তার প্রকাশ্য অর্থ ও বুঝের বিপরীত। এর দ্বারা কী উদ্দেশ্য তা কোনো নবী, ফিরিশতা কিংবা সাহাবী কিংবা কোনো আলেম জানতে পারেন না। যেমন তারা জানে না, কিয়ামত কবে হবে। তাদের আরেক দল বলে, বরং এগুলোকে তার প্রকাশ্য অবস্থার ওপর নেয়া হবে, প্রকাশ্য রূপে বহন করা হবে, তবে আল্লাহ ব্যতীত কেউ তার তা’ওয়ীল জানে না। এভাবে তারা স্ববিরোধিতায় লিপ্ত হয়, কারণ তারা এগুলোর এমন একটি তা’ওয়ীল সাব্যস্ত করছে যা তার প্রকাশ্য অর্থের বিরোধী, তারপরও বলছে যে, এগুলোকে প্রকাশ্য অর্থে নেয়া হবে। [দারউত তাআরুদ্ব (১/১৬), (৫/৩৮১)]
ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, "... অতঃপর এরা মারাত্মক নিকৃষ্ট ধরনের স্ববিরোধিতায় লিপ্ত হলো, যখন তারা বললো, এগুলোকে তার প্রকাশ্য অর্থে নেয়া হবে, তারপর বললো, এর তা’ওয়ীল যা প্রকাশ্য রূপের বিপরীত হবে তা বাতিল, তা সত্ত্বেও এর তা’ওয়ীল আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ জানে না। কীভাবে তারা এর তা’ওয়ীল সাব্যস্ত করছে আর বলছে সেটাকে প্রকাশ্য অর্থেই নিতে হবে, আরও বলছে, সেটার প্রকাশ্য অর্থ উদ্দেশ্য নয়, কেবল রব্ব সুবহানাহু ওয়া তা’আলাই সেটার তা’ওয়ীল জানেন। স্ববিরোধিতার নযীর হিসেবে এটা কি নিকৃষ্ট নয়? বস্তুত তারা তিন জায়গায় ভুল করেছে, মুতাশাবিহ নির্ধারণে, এ সিফাতের আয়াতগুলোকে মুতাশাবিহ এর অন্তর্ভুক্ত করার মধ্যে আর মুতাশাবিহ এর অর্থ একমাত্র আল্লাহই জানেন বলার মধ্যে।" (দেখুন, আস-সাওয়া’য়িকুল মুরসালাহ (২/৪২৩-৪২৪)]
পরবর্তীদের অধিকাংশের পরিভাষায় তা’ওয়ীল হচ্ছে- কোনো শব্দের অর্থকে তার অপ্রাধান্যপ্রাপ্ত সম্ভাবনার দিকে সরিয়ে নেয়া, এমন দলীলের কারণে যা তার সাথে যুক্ত থাকে।
সুতরাং তাদের নিকট, যাহির শব্দের চাহিদা অনুযায়ী অর্থে ব্যবহৃত শব্দ তা’ওয়ীল নয়। তাদের ধারণা- তা’ওয়ীল শব্দ দ্বারা আল্লাহর উদ্দেশ্য এটাই। আর নস এর এমন তা’ওয়ীল রয়েছে যা তার মাদলুল (শব্দ দ্বারা বুঝা যায়) এর বিপরীত, যা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। তা’ওয়ীলকারীরাও জানে না অথবা তা’ওয়ীলকারীরা জানে।
আবার এদের অনেকের বক্তব্য, শব্দ তার যাহির বা প্রকাশ্য অর্থের ওপর প্রযোজ্য হবে। কাজেই তার যাহির উদ্দেশ্য হবে। অথচ তারা বলে: নিশ্চয় এর একটি তা’ওয়ীল আছে যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। নিঃসন্দেহে এটি পরস্পর বিরোধী কথা, যাতে সুন্নাহ’র সাথে সম্পৃক্ত চার ইমামের অনুসারী ও অন্যান্য অনেকেই পতিত হয়েছেন।
টিকাঃ
৩০৭. (এমন দলীলের কারণে বা তার সাথে যুক্ত থাকে), এ অংশটুকু থাকলে সেটা তা’ওয়ীলের গ্রহণযোগ্য পারিভাষিক অর্থ হতে পারে, যা উসূলবিদগণ ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, যারা আল্লাহর সিফাতের তা’ওয়ীল করে তারা এ অংশটুকু বা এ শর্তটুকু বেমালুম ভুলে যায়। তারা কেবল আক্বলী তথা বিবেকের যুক্তির শরণাপন্ন হয়ে সিফাতের আয়াতসমূহকে তার আসল প্রাধান্যপ্রাপ্ত অর্থ থেকে অপ্রাধান্যপ্রাপ্ত অর্থের দিকে নিয়ে যায়, যা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাই আমাদের কাছে স্পষ্ট হলো যে, পরবর্তী এ পরিভাষা কুরআন ও হাদীসে আসেনি। সুতরাং কুরআন ও হাদীসের শব্দে আসা তা’ওয়ীল হিসেবে এ অর্থ সর্বোতভাবে অগ্রহণযোগ্য।
৩০৮. এমন দলীল যাতে দু’টি অর্থ করার সুযোগ থাকে, একটি প্রকাশ্য অর্থ, আরেকটি দূরবর্তী অর্থ। প্রকাশ্য অর্থকে যাহের বলা হয়। আর অপ্রকাশ্য বা দূরবর্তী অর্থকে মুআওয়াল বলা হয়। এটি পরবর্তী লোকদের পরিভাষা।
৩০৯. যেমন ইস্তেওয়া শব্দের অর্থ ‘আলা ও ইরতাফা’আ বা স্বা’আদা, (উপরে উঠা, ঊর্ধ্বে উঠা, আরোহন করা) এদের নিকট তা’ওয়ীল নয়। অথচ এটা অ’ওয়ীল। এটার সারকথা হচ্ছে, শব্দ থেকে যা বুঝা যায় তা, সালাফে সালেহীনের নিকট তা’ওয়ীল বা সরল অর্থ (যা তাফসীর হিসেবে খ্যাত)। কিন্তু যারা পরবর্তীদের বুঝ অনুযায়ী তা’ওয়ীল করে আর যারা তাফওয়ীর করে তারা এটাকে তা’ওয়ীল মনে করে না।
৩১০. অর্থাৎ পূর্বে বর্ণিত তাদের বক্তব্য, যাতে বলা হয়েছে, তা’ওয়ীল হচ্ছে কোনো শব্দের অর্থকে তার অপ্রাধান্যপ্রাপ্ত সম্ভাবনার দিকে সরিয়ে নেয়া, এমন দলীলের কারণে যা তার সাথে যুক্ত থাকে। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তা’ওয়ীল বলতে ‘কোনো শব্দের অর্থকে তার অপ্রাধান্যপ্রাপ্ত সম্ভাবনার দিকে সরিয়ে নেয়া, এমন দলীলের কারণে যা তার সাথে যুক্ত থাকে অথবা পরবর্তী দলীলের ওপর ভিত্তি করে অথবা শুধু কোনো এক প্রকার দলীলের ওপর নির্ভর করে’ এ অর্থে ব্যবহার করা পরবর্তী লোকদের পরিভাষা। সালাফে সালেহীনের কারও শব্দে তা’ওয়ীল দ্বারা এ পারিভাষিক অর্থটি উদ্দেশ্য ছিল না। পরবর্তীতে এ অর্থটি এত বেশি প্রচার ও প্রসার পায় যে, তারা মনে করতে থাকে যে, কুরআনে কারীমে আসা তা’ওয়ীলকে এ অর্থেই গ্রহণ করতে হবে। তারা বলতে থাকে, "আর তার তা’ওয়ীল কেবল আল্লাহই জানেন" (সূরা আলে ইমরান: ০৭] এর অর্থ সেটাই যা তারা পরবর্তীতে পরিভাষা হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। তারপর তাদের একদল বলে উক্ত অর্থটি আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না, আরেক দল বলে উক্ত অর্থটি ইলমে দৃঢ় লোকেরা জানে। ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, নিঃসন্দেহে উভয় দলই ভুলের ওপর আছে। কারণ এটার কোনো বাস্তবতা নেই। বরং তা বাতিল। আল্লাহ ভালো করেই জানেন যে, এটা তাঁর উদ্দেশ্য না, আর তিনি তা উদ্দেশ্য নেননি। [মাজমূ’ ফাতাওয়া (৫/৩৪৯-৩৫০), শারহু হাদীসিন নুযূল]
৩১১. কুরআন ও সুন্নাহ’য় আসা সিফাত সংক্রান্ত নস বা ভাষ্যসমূহের এমন তা’ওয়ীল করতে হবে যাতে প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করার সুযোগ না থাকে। এটাকে তারা তা’ওয়ীল নাম দিয়েছে। এ কারণে তারা প্রতিটি সিফাত বিষয়ক আয়াত ও হাদীসের জন্য দূরবর্তী একটি অর্থ নির্ধারণ করে সেটা জানাকেই ইলম হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান সাব্যস্ত করে। আর যারা প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করে তাদের প্রতি কুফর এর সম্পৃক্ততা প্রদান করে।
৩১২. এতটুকুতে আহলুত তা’ওয়ীল ও আহলুত তাজহীল একমত। শেষ পর্যন্ত তারা এমন সব তা’ওয়ীল নামীয় অপব্যাখ্যার শরণাপন্ন হয় যা তাদেরকে কারামিত্বা, বাতেনী, জাহমীদের অপব্যাখ্যার দিকে নিয়ে যায়। [মাজমূ’ ফাতাওয়া]
৩১৩. এতটুকু কেবল আহলুত তাজহীলের মত। যদিও প্রকৃত অর্থে এটা আহলুত তা’ওয়ীলদেরও মত। কারণ তারাও প্রকাশ্য অর্থকে অগ্রহণযোগ্য মনে করে থাকে। তারা আরও মনে করে থাকে যে এগুলো মুতাশাবিহ। এগুলোর অর্থ কেবল আল্লাহ জানেন। আমরা যা করছি তা কেবল সাওয়াবের আশায় করছি।
৩১৪. আহলুত তাজহীল তথা তাফওয়ীদ্ব নীতির অনুসরণকারীদের দু’টি মত রয়েছে। তাদের একদল বলে তা’ওয়ীলকারীরা সে অর্থটি জানতে পারবে, অপর দলটি বলে তা’ওয়ীলকারীরাও তা জানতে পারে না।
৩১৫. তাদের এ স্ববিরোধিতার বিষয়টি ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ তার অনেক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। যেমন তিনি বলেন, ‘তারপর তাদের কেউ কেউ বলে, এর দ্বারা যা উদ্দেশ্য তা তার প্রকাশ্য অর্থ ও বুঝের বিপরীত। এর দ্বারা কী উদ্দেশ্য তা কোনো নবী, ফিরিশতা কিংবা সাহাবী কিংবা কোনো আলেম জানতে পারেন না। যেমন তারা জানে না, কিয়ামত কবে হবে। তাদের আরেক দল বলে, বরং এগুলোকে তার প্রকাশ্য অবস্থার ওপর নেয়া হবে, প্রকাশ্য রূপে বহন করা হবে, তবে আল্লাহ ব্যতীত কেউ তার তা’ওয়ীল জানে না। এভাবে তারা স্ববিরোধিতায় লিপ্ত হয়, কারণ তারা এগুলোর এমন একটি তা’ওয়ীল সাব্যস্ত করছে যা তার প্রকাশ্য অর্থের বিরোধী, তারপরও বলছে যে, এগুলোকে প্রকাশ্য অর্থে নেয়া হবে। [দারউত তাআরুদ্ব (১/১৬), (৫/৩৮১)]
ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, "... অতঃপর এরা মারাত্মক নিকৃষ্ট ধরনের স্ববিরোধিতায় লিপ্ত হলো, যখন তারা বললো, এগুলোকে তার প্রকাশ্য অর্থে নেয়া হবে, তারপর বললো, এর তা’ওয়ীল যা প্রকাশ্য রূপের বিপরীত হবে তা বাতিল, তা সত্ত্বেও এর তা’ওয়ীল আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ জানে না। কীভাবে তারা এর তা’ওয়ীল সাব্যস্ত করছে আর বলছে সেটাকে প্রকাশ্য অর্থেই নিতে হবে, আরও বলছে, সেটার প্রকাশ্য অর্থ উদ্দেশ্য নয়, কেবল রব্ব সুবহানাহু ওয়া তা’আলাই সেটার তা’ওয়ীল জানেন। স্ববিরোধিতার নযীর হিসেবে এটা কি নিকৃষ্ট নয়? বস্তুত তারা তিন জায়গায় ভুল করেছে, মুতাশাবিহ নির্ধারণে, এ সিফাতের আয়াতগুলোকে মুতাশাবিহ এর অন্তর্ভুক্ত করার মধ্যে আর মুতাশাবিহ এর অর্থ একমাত্র আল্লাহই জানেন বলার মধ্যে।" (দেখুন, আস-সাওয়া’য়িকুল মুরসালাহ (২/৪২৩-৪২৪)]
📄 তা’বীল শব্দটি অধিকাংশ মুফাসসিরগণের নিকট
তা’ওয়ীল এর দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে, কালামের তাফসীর, কোনো বাক্যের ব্যাখ্যা, চাই সেটা যাহিরের সাথে সামঞ্জস্যশীল হোক বা না হোক। অধিকাংশ মুফাসসির ও অন্যান্যদের পরিভাষায় এটাই তা’ওয়ীল এর অর্থ।
এই তা’ওয়ীল মজবুত ইলমধারীরা জানেন। আর এটা ঐ ওয়াকফ অনুযায়ী, সালাফদের মাঝে যারা ﴿وَالرَّاسِخُونَ فِي الْعِلْمِ﴾ এর ওপর ওয়াক্ফ করেছেন। যেমনটি ইবন 'আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে বর্ণিত হয়েছে। আরও বর্ণিত হয়েছে, মুজাহিদ, মুহাম্মাদ ইবন জা'ফর ইবনুয যুবাইর, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক্ব, ইবনু কুতাইবাহ প্রমুখ থেকে। বস্তুত উভয় বক্তব্যই এক বিবেচনায় সঠিক। যেমনটি আমরা সেটাকে অন্যত্র বিস্তারিত বর্ণনা করেছি। আর এজন্যই ইবনু আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে এটাও এসেছে, ওটাও এসেছে। আর উভয়টিই হক্ক ও যথাযথ।
টিকাঃ
৩১৬. তিনি হচ্ছেন মুজাহিদ ইবন জাবার, আবুল হাজ্জাজ আল-মাক্কী, সায়েব ইবন আবিস সায়েব এর ক্রীতদাস। মাখযুমী বংশের সাথে সম্পৃক্ত। একদিকে তিনি কিরাআতের শাইখ, তাফসীরের শাইখ, ইবন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমার বড় ছাত্রদের একজন। তিনি তার থেকেই তাফসীর ও কুরআন গ্রহণ করেছেন। তার থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি পুরো কুরআনকে ইবন আব্বাসের কাছে ত্রিশবার পেশ করেছি। অপর বর্ণনায় এসেছে, আমি ইবন আব্বাসের কাছে কুরআনকে এমনভাবে পেশ করেছি যে, প্রতিটি আয়াতের পরেই থেমে থেমে জেনেছি এ আয়াত কিসের ব্যাপারে এবং কী হয়েছিল। তিনি হিজরী ১০৩ বা ১০৪ সালে মারা যান। দেখুন, ইবন সা'দ, আত-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা (৫/৪৬৬); ইমাম যাহাবী, তাযকিরাতুল হুফফায (১/৮৬); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৪/৪৪৯); ইবন হাজার, তাহযীবুত তাহযীব (১০/৪২)।
৩১৭. তিনি হচ্ছেন মুহাম্মাদ ইবন জা'ফর ইবনুয যুবাইর ইবনুল 'আওয়াম আল-আসাদী আল-মাদানী। মদীনার ফকীহগণের একজন ও তাদের কারীদের অন্যতম। ইবন সা'দ বলেন, তিনি আলেম ছিলেন আর তার কাছে কিছু হাদীস ছিল। দারাকুত্বনী তাকে সিকাহ তথা নির্ভরযোগ্য বলেছেন। হিজরী ১১০ সালের তার মৃত্যু হয়। দেখুন, ইবন হাজার, তাহযীবুত তাহযীব (৯/৯৩); ইবন সা'দ, আত-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা (পরবর্তী আলাদা অংশ, পৃ. ১১২।
৩১৮. তিনি হচ্ছেন, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক ইবন ইয়াসার, আল-হাফেয, ইতিহাস সংবাদ ও সীরাতের বর্ণনাকারী। মদীনার অধিবাসী। হাদীসের হাফেযদের অন্যতম। তার দাদা ইয়াসার ছিল 'আইনুত তামার' এর যুদ্ধের কয়েদি। হিজরী ১৫০ সালে তার জন্ম। কারও কারও মতে ১৫১ সালে, অপর কারও মতে ১৫২ সালে। ইমাম শাফেয়ী তার প্রশংসা করেছেন এবং বলেছেন, কেউ যদি মাগাযী বা রাসূলের যুদ্ধ বিদ্যা সম্পর্কে সমুদ্রের মতো জ্ঞানী হতে চায় তবে সে যেন মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক এর পরিবারভুক্ত হয়। ইমাম যাহাবী বলেন, তিনি মাগাযীর জ্ঞানে আল্লামা। তার হাদীস বর্ণনার ব্যাপারে অনেক বক্তব্য এসছে। একদল তাকে গ্রহণযোগ্য অপরদল তাকে ত্রুটিপূর্ণ বলেছেন। ইমাম যাহাবী বলেন, একাধিক কারণে ইবন ইসহাকের হাদীসভিত্তিক বর্ণনা গ্রহণের ব্যাপারে আলেমগণকে হাত গুটিয়ে নিতে দেখেছি। সেসব কারণের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, তার শিয়াপ্রীতি, কাদরপ্রীতি, হাদীসে তাদলীস। তবে সাদৃক ছিলেন সেটা অস্বীকার করার জো নেই। হাফেয ইবন হাজার বলেন, তিনি সাদৃক বা হাসান হাদীসের বর্ণনাকারী, তাদলীস বা দোষ-ত্রুটি গোপন করে বর্ণনা করতেন। শিয়াপ্রীতির দোষ প্রদান করা আছে এবং কাদর বা তাকদীর অস্বীকারকারীদের মতের প্রতি অনুরক্ত পাওয়া গেছে।
দেখুন, খত্বীবে বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ (১/২১৪); ইমাম যাহাবী, তাযকিরাতুল হুফফায (১/১৭২); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৭/৩৩); ইবনু হাজার, তাহযীবুত তাহযীব (৯/৩৮); তাক্বরীবুত তাহযীব, পৃ. ৪৬৭; যাহাবী, মীযানুল ই'তিদাল (৩/৪৬৮)।
৩১৯. তিনি হচ্ছেন আবু মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ ইবনু মুসলিম ইবনু কুতাইবাহ, আদ-দীনাওয়ারী। অনেক গ্রন্থ প্রণেতা। অনেক বিষয়ের পণ্ডিত। আরবী সাহিত্য ও ইতিহাসের ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তার রচিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, গরীবুল কুরআন, আল-ক্বিরাআত, ই'রাবুল কুরআন, 'উয়ূনুল আখবার, মুশকিলুল কুরআন। হিজরী ২৭৬ সালে হঠাৎ করে মারা যান। তার সম্পর্কে খত্বীব আল-বাগদাদী বলেন, তিনি ছিলেন নির্ভরযোগ্য ও দীনদার উৎকৃষ্ট মানুষ। দেখুন, খত্বীবে বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ (১০/১৭০); ইমাম যাহাবী, মীযানুল ই'তিদাল (২/৫০৩); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৩/২৯৬); ইবনু খাল্লিকান, ওফায়াতুল আ'ইয়ান (৩/৪২)।
৩২০. আরও যারা এর সাথে ঐকমত্য পোষণ করেছেন তারা হচ্ছেন, আবু নাজীহ, রবী', কাসেম ইবনু মুহাম্মাদ, দাহহাক। আর তা পছন্দ করেছে, আবু জা'ফর আন-নাহহাস, আবু সুলাইমান আদ-দিমাশকী, আবুল হাসান আল-আশ'আরী, আন-নাওয়াওয়ী, ইবনুল হাজেব, খত্নীব আল-বাগদাদী। দেখুন, তাফসীর তাবারী (৩/১৮৩); তাফসীর ইবনু কাসীর (২/৭-৮); সুয়ুত্বী, আদ-দুররুল মানছুর (২/১৫১-১৫২); ইবনুন নাহহাস, ই'রাবুল কুরআন (১/৩৫৬); মা'আনিল কুরআন (১/৩৫৩); ইবনু ক্বতাইবাহ, তা'ওয়ীলু মুশকিলুল কুরআন, পৃ. ৭২; আহকামুল কুরআন (২/২৮৩); খত্বীব আল-বাগদাদী, আল-ফক্বীহ ওয়ার মুতাফাকিহ (১/৬৩); নাওয়াওয়ী, শারহু মুসলিম (১৬/২১৮); সুয়ূত্বী, আল-ইতক্কান (২/৪); আব্দুল কাহের আল-বাগদাদী, উসুলুদ্দীন, পৃ. ২২৩।
৩২১. যেমন, মাজমূ' ফাতাওয়া (১৩/২৭৫, ২৮৪-২৮৫), (৫/২৩৪-৩৪৭-৩৪৯), (১৬/৪০৭-৪২২); মাজমূ'আতর রাসায়িলুল কুবরা (২/১৭-২১); আত-তাদমুরিয়্যাহ, ৯০-৯১।
৩২২. বস্তুত আয়াতের এখানে ওয়াকফের ব্যাপারে সালাফে সালেহীনের দু'টি মত রয়েছে: এক. শুধু 'ইল্লাল্লাহ' এর উপর ওয়াকফ করতে হবে। তখন আয়াতের অর্থ হবে, এর তা'ওয়ীল একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ জানে না। তখন 'যারা ইলমে মজবুত' তা থেকে মুবতাদা বা নতুন বাক্য শুরু হবে, আর 'তারা বলে আমরা এসবের উপরই ঈমান আনলাম' [সূরা আলে ইমরান: ০৭] দুই. একসাথে মিলিয়ে পড়া, "এর তা'ওয়ীল জানে না কেউ আল্লাহ ছাড়া আর যারা ইলমে মজবুত তারা ব্যতীত। তারা বলে, আমরা এর ওপর ঈমান আনলাম"। [সূরা আলে ইমরান: ০৭] সেটার খবর হবে। তখন আয়াতের অর্থ হবে, এর তা'ওয়ীল কেউ জানে না, আল্লাহ ব্যতীত ও যারা ইলমে মজবুত তারা ব্যতীত, তারা জানা সত্ত্বেও বলে, আমরা এসবের ওপর ঈমান আনলাম, এসবই আমাদের রবের পক্ষ থেকে এসেছে.... [দেখুন, তাফসীর তাবারী (৬/২০১); তাফসীরে বাগাওয়ী (২/১০); তাফসীর আল-কুরতুবী (৪/১৬); তাফসীর ইবনু কাসীর (২/১০); সুয়ূত্বী, আদ-দুররুল মানছুর (২/১৫১); আশ-শানকীত্বী, আদ্বওয়াউল বায়ান (১/১৯১); ইবনু তাইমিয়্যাহ, আর-রিসালাতুত তাদমুরিয়্যাহ, পৃ. ৯০]
ইবনু তাইমিয়্যা বেশ কিছু জায়গায় বলেছেন, উভয় অর্থটি সঠিক। তাই, যখন আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ এর তা'ওয়ীল জানে না এখানে (ওয়াক্ফ করা বা) থামা হবে, তখন অর্থ হবে মুতাশাবিহ এর প্রকৃত অর্থ, যার দিকে এর সর্বশেষ প্রত্যাবর্তন, সর্বশেষ পরিণতি তা কেবল আল্লাহই জানেন। আর যখন 'রাসেখুনা ফিল ইলম' বা 'ইলমে মজবুত লোকেরাও সেটার তাওয়ীল জানে' সেটা সহ মিলিয়ে পড়া হবে তখন অর্থ হবে, এর সাধারণ অর্থ আলেমরাও জানে। দেখুন, [ইবনু তাইমিয়্যাহ, দারউত তা'আরুদ্ব (১/২০৭-২০৮); ফাতাওয়া (৫/২৩৪); আস-সাফাদিয়্যাহ (১/২৯১)] আরও দেখুন, ইবনুল কাইয়্যেমের বক্তব্য। [আস-সাওয়া'য়িকুল মুরসালাহ (৩/৯২১)]
📄 তা’বীল শব্দটি যে অর্থে কুরআন ও সুন্নাহ’য় এসেছে
আর (তা’ওয়ীল) এর তৃতীয় অর্থ: তা’ওয়ীল হচ্ছে ঐ হাকীকত তথা প্রকৃত সত্য, যে দিকে কথা ফিরে যায়, যদিও তা যাহির (প্রকাশ্য) অর্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। সুতরাং জান্নাতে খাওয়া-দাওয়া, পোশাক-পরিচ্ছেদ, বিবাহ-শাদী ইত্যাদি যেগুলোর সংবাদ আল্লাহ দিয়েছেন সেগুলো প্রকৃত সত্য এবং স্বয়ং যা বিদ্যমান তা-ই। এমনটি নয়, মস্তিষ্ক দ্বারা যার বিভিন্ন অর্থ কল্পনা করা হয় ও জিহ্বা দ্বারা ব্যক্ত করা হয়।
বস্তুত কুরআনের ভাষায় বর্ণিত তা’ওয়ীল এটাই। যেমন আল্লাহ তা’আলার বাণীতে ইউসুফ 'আলাইহিস সালাম বলেছিলেন: ﴿يَا أَبَتِ هَذَا تَأْوِيلُ رُؤْيَايَ مِن قَبْلُ قَدْ جَعَلَهَا رَبِّي حَقًّا﴾ [يوسف: ١٠٠] ।
“(৩২৪) হে আমার প্রিয় পিতা! এটাই আমার আগেকার স্বপ্নের ব্যাখ্যা; আমার রব এটা সত্যে পরিণত করেছেন।” [সূরা ইউসুফ: ১০০]
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন: ﴿هَلْ يَنظُرُونَ إِلَّا تَأْوِيلَهُ يَوْمَ يَأْتِي تَأْوِيلُهُ يَقُولُ الَّذِينَ نَسُوهُ مِن قَبْلُ قَدْ جَاءَتْ رُسُلُ رَبِّنَا بِالْحَقِّ﴾ [الأعراف: ٥٣] ، “তারা কি শুধু সে প্রকৃত পরিণামের অপেক্ষা করে? যেদিন সে প্রকৃত পরিণাম প্রকাশ পাবে, সেদিন যারা আগে সেটার কথা ভুলে গিয়েছিল তারা বলবে, আমাদের রবের রাসূলগণ তো সত্যবাণী নিয়ে এসেছিলেন।” [সূরা আল-আ'রাফ: ৫৩]
অন্য আয়াতে: ﴿فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا﴾ [النساء: ٥٩] “অতঃপর কোনো বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটলে তা উপস্থাপিত কর আল্লাহ্ ও রাসূলের নিকট, যদি তোমরা আল্লাহ ও আখেরাতে ঈমান এনে থাক। এ পন্থাই উত্তম এবং পরিণামে প্রকৃষ্টতর।” [সূরা আন- নিসা: ৫৯] এ হচ্ছে সে তা’ওয়ীল বা প্রকৃত অবস্থা যা আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ জানে না।
টিকাঃ
৩২৩. অর্থাৎ এ অর্থের দিক থেকে তা’ওয়ীল এর জন্য যাহের বা প্রকাশ্য অর্থের বিরোধী হওয়া জরুরী নয়।
৩২৪. অর্থাৎ স্বপ্নের সর্বশেষ পরিণতি। যেখানে এসে স্বপ্নের ব্যাখ্যার প্রকৃত সত্য রূপ প্রকাশ পেলো।
৩২৫. তিনি হচ্ছেন আব্দুর রায্যাক ইবন হাম্মাম ইবন নাফে' আল-হিমইয়ারী আস-সান'আনী। তার যমানার সবচেয়ে বড় হাফেযদের অন্তর্ভুক্ত। তিনি হাদীস শুনেছেন হিশাম ইবন হাসসান, উবাইদুল্লাহ ইবন 'উমার, তার ভাই আব্দুল্লাহ, ইবন জুরাইজ, মা'মার প্রমুখ থেকে, তবে তিনি মা'মার থেকে বেশি নিয়েছেন। আর তার থেকে হাদীস গ্রহণ করেন তার শিক্ষক সুফইয়ান ইবন উয়াইনাহ, মু'তামির ইবন সুলাইমান, আহমাদ ইবন হাম্বল, ইবন রাহওয়াইহি, ইবন মা'ঈন, ইবনুল মাদীনী প্রমুখ। আব্দুর রায্যাক বলেন, আমি আট বছর মা'মারের সঙ্গী ছিলাম। হিশাম ইবন ইউসুফ বলেন, আব্দুর রায্যাক আমাদের মধ্যে বড় আলেম ও বড় হাফেয। তিনি হিজরী ২১১ সালে মারা যান। তার গ্রন্থসমূহের অন্যতম হচ্ছে, মুসান্নাফ, তাফসীর। বলা হয়ে থাকে, আব্দুর রায্যাক সতেরো হাজার হাদীস মুখস্থ জানতেন। দেখুন, ইবন সা'দ, আত-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা (৫/৫৪৮); ইবনু খাল্লিকান, ওফায়াতুল আ'ইয়ান (৩/২১৬); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৯/৫৬৩); ইবন হাজার, তাহযীবুত তাহযীব (৬/৩১০)।
৩২৬. অন্যান্যগণের মধ্যে অবশ্যই রয়েছেন ইবন জারীর আত-তাবারী।
৩২৭. দেখুন, তাবারী, তাফসীর (১/৩৪); ইবন কাসীর, তাফসীর (১/১৮), (২/৭); আরও দেখুন, সুয়ূত্বীর আদ-দুররুল মানসূর (২/১৫১-১৫২)।