📄 এই ফতওয়ার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, যারা আল্লাহর সিফাত তা’বীল করে তাদের মত খণ্ডন করা
এই ফতোয়ায় যাদের মতকে আমরা খণ্ডন করার ইচ্ছা করেছি তারা এসব শেষে বর্ণিত সম্প্রদায়। যেহেতু প্রথম গোষ্ঠীর লোকদের থেকে মানুষের ভেগে যাওয়া প্রকাশ্য। কিন্তু এরা তাদের থেকে ভিন্ন। কেননা বিভিন্ন জায়গায় তারা সুন্নাহ’র সহযোগী হিসেবে নিজেদেরকে প্রচার-প্রসার করে বেড়ায়। অথচ প্রকৃতপক্ষে তারা না ইসলামের সহযোগিতা করেছে, আর না দার্শনিকদের নীতিকে ভাঙ্গতে পেরেছে। বরঞ্চ দার্শনিকরা এসব মুতাকাল্লিমদের (আশায়েরা ও মাতুরিদীদের) কে সিফাতের বক্তব্যে তারা যা বলেছে (আল্লাহর ও তার রাসূলের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে আসার পরও তা’ওয়ীল করা) অনুরূপ বক্তব্য (শারীরিক) পুনরুত্থানের ব্যাপারে মেনে নিতে বাধ্য করেছে। তারা বলে: আমরা অবশ্যম্ভাবীভাবে জানি যে, রাসূলগণ শারীরিক পুনরুত্থান নিয়ে এসেছিলেন। আর আমরা তাতে (তার ওপর শারীরিক পুনরুত্থান এর ওপর ঈমান আনতে) বাধা প্রদানকারী সংশয়সমূহে (এর অসারতা) জেনেছি।
আর আহলুস সুন্নাতগণ এদেরকে বলেন: আমরা আবশ্যিকভাবে জেনেছি যে, রাসূল সিফাত সাব্যস্তকরণ নিয়ে এসেছিলেন। আর (জানা কথা যে) পুনরুত্থান সংক্রান্ত নস বা ভাষ্যসমূহের চেয়ে আল্লাহর কিতাবে সিফাত সংক্রান্ত নস বা ভাষ্যসমূহ অনেক বেশি ও বড়। আহলে সুন্নাত তাদেরকে আরও বলে, এটা জ্ঞাত কথা যে, আরবের মুশরিকগণ পুনরুত্থান অস্বীকার করলেও সিফাতকে অস্বীকার করত না। তারা পুনরুত্থানের বিষয়টি নিয়ে রাসূলের বিরুদ্ধে নেমেছিল, তাঁর সাথে মুনাযারা ও বিবাদে লিপ্ত হয়েছিল। কিন্তু সিফাত নিয়ে আরবের কেউ কোনো দিন বিরোধিতা করেনি।
তাই জানা গেল যে, আক্কল (বুদ্ধি-বিবেকের যুক্তি) পুনরুত্থানের স্বীকৃতি দেয়ার চেয়ে সিফাতের স্বীকৃতি দেয় অনেক শক্তভাবে। এতদসত্ত্বেও এটা কীভাবে সম্ভব যে, তিনি সিফাত সম্বন্ধে যা জানিয়েছেন তা যেমনটি জানিয়েছেন তেমনটি নয়, আর মা’আদ তথা পুনরুত্থান সম্বন্ধে যা জানিয়েছেন তা যেমনটি জানিয়েছেন তেমনই?
তদুপরি জানা গেছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহলে কিতাবদেরকে কিতাব পরিবর্তন ও বিকৃত করার জন্য নিন্দা করেছেন। আর এটা জ্ঞাত যে, তাওরাত আল্লাহর সিফাতের আলোচনায় ভরপুর। সুতরাং এগুলো যদি বিকৃতি ও পরিবর্তন হতো, তাহলে তাদের এ কাজটির নিন্দা করা আরও অধিক উপযুক্ত হতো। বরং তারা যখন রাসূলের সামনে আল্লাহর সিফাতের উল্লেখ করত, বিমুগ্ধ হয়ে ও সত্যায়ন করে তিনি হাসতেন, সেটা কীভাবে হলো? রাসূল তাদের ওপর কখনো এমন কোনো দোষারোপ করেননি যে দোষারোপ করে থাকে সিফাত নাকচকারীরা সিফাত সাব্যস্তকারীগণের ওপর। যেমন, সিফাত নাকচকারীরা সিফাত সাব্যস্তকারীদের ওপর তাজসীম (দেহবাদী) ও তাশবীহ (সাদৃশ্যপ্রদানকারী) ইত্যাদি শব্দের তকমা লাগায়। বরং তিনি তাদেরকে দোষারোপ করেছেন তাদের এ কথার কারণে যে, ﴿يَدُ اللَّهِ مَغْلُولَةٌ﴾ "আল্লাহর হাত রুদ্ধ।” [সূরা আল- মায়েদাহ: ৬৪] এবং ﴿إِنَّ اللَّهَ فَقِيرٌ وَنَحْنُ أَغْنِيَاءُ﴾ “নিশ্চয় আল্লাহ ফকীর, আর আমরা ধনী।” [সূরা আলে ইমরান: ১৮১] এবং তাদের কথা: আল্লাহর আসমান-যমীন সৃষ্টি করে বিশ্রাম নিয়েছেন। তখন আল্লাহ বললেন: ﴿وَلَقَدْ خَلَقْنَا السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ وَمَا مَسَّنَا مِن لُّغُوبٍ﴾ [ق: ٣٨] "আর অবশ্যই আমরা আসমানসমূহ, যমীন ও তাদের অন্তর্বর্তী সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছি ছয় দিনে; আর আমাকে কোনো ক্লান্তি স্পর্শ করেনি।” [সূরা ক্বাফ: ৩৮]
আর কুরআন ও হাদীসে উল্লিখিত সিফাতের মতো সিফাতে তাওরাতও ভরপুর। অথচ তাওরাতে সরাসরি আখেরাতের আলোচনা কুরআনের মতো এত স্পষ্ট করে নেই। সুতরাং দুই কিতাবে উল্লিখিত সিফাত তা’ওয়ীল করা জায়েয হলে এক কিতাবে উল্লিখিত মা’আদ (পুনরুত্থান)-এর তা’ওয়ীল করা আরও বেশি উপযুক্ত।
আর দ্বিতীয়টি তথা মা’আদ-পুনরুত্থান এর তা’ওয়ীল করা বাতিল হওয়া রাসূলের দীন থেকে জানা আবশ্যিক বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। তাহলে প্রথমটি (সিফাতের ভাষ্যসমূহে) তা’ওয়ীল করার বিষয়টি বাতিল হওয়া অধিক উপযুক্ত।
টিকাঃ
২৮০. অর্থাৎ আহলুত তা’ওয়ীল। যারা আল্লাহর গুণাবলি সংক্রান্ত আয়াতসমূহের ব্যাপারে অপব্যাখ্যার নীতি অবলম্বন করেছে। স্বাভাবিক অর্থ থেকে সেগুলোকে দূরবর্তী বিরল অর্থে নিয়ে গেছে, অথবা নতুন অর্থ তৈরি করে নিয়েছে।
২৮১. অর্থাৎ আহলুত তাখয়ীল। কারণ ঈমানদার সাধারণত কখনও ঈমানিয়্যাতের ব্যাপারে তাদের মতবাদকে মেনে নিবে না। কেউ রাসূল সম্পর্কে তাদের এ জঘন্য কথা সহজে মানুষের মাঝে বলতে সাহস করবে না। মানুষকে যদি বলা হয় রাসূলগণ কল্পনা করে কথা বলেছেন বা রাসূলগণ বাস্তব অবস্থার বিপরীতে জনগণকে তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য মিথ্যা বলেছেন, তাহলে ন্যূনতম ঈমানের অধিকারী তার বিরুদ্ধে সকল ক্ষমতা প্রয়োগ করবে। তাই তারা তাদের কথা গোপন করে রাখে, কেবল তাদের নিজস্ব বলয়ে সেটা বলে থাকে। ফলে তাদের দ্বারা সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু দ্বিতীয় গোষ্ঠী, অর্থাৎ তা’ওয়ীলকারীদের দ্বারা দুনিয়ায় যত সর্বনাশ ছড়িয়ে পড়েছে, সুতরাং তাদেরকে এখানে রদ্দ করা হবে।
২৮২. অর্থাৎ আহলুত তা’ওয়ীল বা আল্লাহর সিফাতের অপব্যাখ্যাকারীদের অবস্থা মারাত্মক। এদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সুস্পষ্ট। এরাই হচ্ছে মু’তাযিলা, আশ’আরী, মাতুরিদী সম্প্রদায়।
২৮৩. যেসব স্থানে আশায়েরা, মাতুরিদী সম্প্রদায় আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের সহযোগী হয়েছে, তা হচ্ছে: ১- কবীরা গুণাহগার এর মাসআলা। ২- কবর ও হাশরের বিভিন্ন অবস্থা ও কর্মের বর্ণনা। ৩- খিলাফত ও ইমামতের মাসআলা। ৪- সাহাবীগণের ন্যায়পরায়ণ হওয়ার মাসআলা। ৫- দার্শনিক, কারামিত্বা, বাতেনিয়াদের বিরুদ্ধে তারা তাদের ক্ষমতা নিয়ে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের সাথে দাঁড়িয়েছে। যদিও প্রকৃতপক্ষে তারা না দার্শনিকদের অস্ত্র ভাঙ্গতে পেরেছে আর না তারা ইসলামকে সাহায্য করতে পেরেছে। বস্তুত তারা ইসলামের শত্রু ইয়াহুদী-নাসারা ও দার্শনিকদের সামনে দাঁড়ানোর মতো যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি।
২৮৪. আহলুত তা’ওয়ীল বলতে আমরা কাদেরকে বুঝিয়েছি তা ইতোপূর্বে ব্যক্ত করেছি, তাদের মধ্যে প্রথমেই মু’তাযিলা, তারপর আশায়েরা, তারপর মাতুরিদিয়্যা সম্প্রদায়, তাছাড়া আরও কিছু অখ্যাত সম্প্রদায়ও রয়েছে। এরা সাধারণত আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের সাথে অবস্থান করে। নিজেদেরকে আহলুস সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত বলার জন্য সচেষ্ট থাকে। ক্ষণে ক্ষণে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের সহযোগিতার দাবি করে। কিন্তু তারা তিনটি মৌলিক কারণে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আত থেকে বাইরে চলে গেছে: ১- তারা বিবেকের যুক্তিকে কুরআন ও সুন্নাহ’র ভাষ্যের ওপর প্রাধান্য দেয়। ২- তারা আকীদার ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ খবরে ওয়াহিদকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করে না। ৩- তারা তা’ওয়ীল বা অপব্যাখ্যার নীতি। অর্থাৎ যাবতীয় মুতাওয়াতির (কুরআন ও সুন্নাহ মুতাওয়াতিরাহ) কে আক্কলের বিপরীত হলে অবশ্যই তা’ওয়ীল করে নিতে হবে। এছাড়াও আকীদাহ’র প্রতিটি অধ্যায়েই আরও কিছু বিষয়ে আশায়েরাহ ও মাতুরিদিয়্যাহদের মতবাদ আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের বিরোধী, যেমন:
আকীদাহ গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের মতাদর্শ হচ্ছে, ১- বিবেকের যুক্তিকে কুরআন-সুন্নাহ’র ভাষ্যের ওপর প্রাধান্য দিতে হবে। ২- যেসব ভাষ্য মুতাওয়াতির সেগুলো যদি বিবেকের যুক্তির বিপরীত হয় তবে সেগুলোকে তা’ওয়ীল করতে হবে। ৩- আকীদাহকে দু’ভাগে ভাগ করা, আকলিয়াত (আল্লাহ সম্পর্কিত বিষয়াদি) ও সাম’ইয়াত (মৃত্যু পরবর্তী বিষয়াদি)। ৪- খবরে ওয়াহিদ আকীদাতে দলীল না হওয়া, তবে সাম’ইয়াতে তা দ্বারা দলীল নেয়া যাবে। ৫- তাদের এক গোষ্ঠী, যেমন গাযালীর মতে সূফী কাশফ ও যাওক কুরআন ও সুন্নাহর ভাষ্যের ওপর প্রাধান্য পাবে। এর জন্য কুরআন ও সুন্নাহর ভাষ্যকে তা’ওয়ীল করা যাবে, যাতে তার সাথে সামঞ্জস্য বিধান করা যায়। [রিসালাতুল ইলম আল-লাদুন্নী, কুবরা আল- ইয়াক্বীনীয়াত) ৬- কুরআন ও সুন্নাহ’র ভাষ্যের দাবি ধারণার জন্ম দেয়, দৃঢ় ইলমের ফায়েদা দেয় না। যতক্ষণ না তা দশটি দোষ থেকে মুক্ত হচ্ছে... ৭- অপর দিকে বিবেকের যুক্তি অনুযায়ী হলে দুর্বল ও বানোয়াট হাদীসও দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য।
একজন মানুষের প্রথম কর্তব্য অধ্যায়ে ১- প্রথম কর্তব্য, চিন্তা-গবেষণা বা চিন্তা-গবেষণার প্রতি ইচ্ছা, অথবা সন্দেহ করা, অথবা সন্দেহের ইচ্ছা করা। ২- মুকাল্লিদের ঈমান শুদ্ধ না হওয়া। ৩- স্রষ্টা ও সৃষ্টির আলাদা অস্তিত্বে বিশ্বাসী না হওয়া, তথা আল্লাহকে সৃষ্টি থেকে আলাদা করে ‘আরশের উপর না মানা।
ঈমান অধ্যায়ে ১- ঈমানের অভিধানিক অর্থ শুধু বিশ্বাস বলা। ২- ঈমানের শর’য়ী অর্থ নির্ধারণে ভুল করা তথা আমলকে ঈমানের রুকনের অন্তর্ভুক্ত না করণে। ৩- ঈমান বাড়া ও কমার নীতিতে।
কুফর অধ্যায়ে ১- কুফরী হওয়ার সকল শর্তপূরণ ও বাঁধা অপসারণের পরও কুফরীর বিধান বলতে দ্বিধা করা।
২- কুফরী হওয়ার জন্য বিশ্বাস থাকা বাধ্য করা অর্থাৎ কর্মগত কুফরীকে কুফরী মনে না করা।
৩- কুফরী হওয়ার জন্য মুখে কুফরী করার স্বীকৃতি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কুফরী না বলা।
□ তাওহীদ অধ্যায়ে ১- তাওহীদুর রুবুবিয়্যাতে স্রষ্টার অস্তিত্ব সাব্যস্ত করার নীতিতে ভুল পন্থা অবলম্বন। স্রষ্টার অস্তিত্ব সাব্যস্ত করতে মরিয়া হয়ে উঠা, অথচ তা ফিত্বরী ব্যাপারে। স্রষ্টার অস্তিত্ব সাব্যস্ত করার জন্য দলীল ‘হুদুস ওয়াল কিদাম’ ব্যবহার করা, যা বিতর্কিত।
২- তাওহীদুল আসমা ওয়াস সিফাতে আল্লাহর গুণাবলি সবগুলো কিংবা আংশিককে অস্বীকার কিংবা অপব্যাখ্যা।
৩- তাওহীদুল উলুহিয়্যাহকে তাওহীদের সংজ্ঞায় না নেয়া। ফলে তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ’র ব্যাপারে এসেছে চরম ঔদাসিন্য।
৪- ইলাহ ও রব একই অর্থে নেয়া।
□ শির্ক অধ্যায়ে ১- আল্লাহর অস্তিত্ব মেনে নেয়ার পরে অন্য কাউকে পরিচালক বা কর্তৃত্বকারী মেনে নিলেও শির্ক না বলা। যেমন, গাউস, কুতুব, নুকাবা, নুজাবা ইত্যাদি বিশ্বাস করা।
২- আল্লাহর গুণাবলি অন্যদের মাঝে দাবি করার পরও শির্ক না বলা।
৩- আল্লাহর ইবাদতে অন্য কাউকে শরীক করলেও মুশরিক না বলা; যতক্ষণ পর্যন্ত না তাকে রুবুবিয়্যাতের গুণ না দেয়।
□ নবুওয়াত অধ্যায়ে ১- নবুওয়াত একান্ত আল্লাহর ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। সেখানে নবীর মাঝে কোনো গুণ থাকা আবশ্যক নয়।
২- নবী-রাসূলদের নবুওয়াতের প্রমাণ শুধু মু’জিযায় সীমাবদ্ধ মনে করা।
৩- মু’জিযা, কারামাত ও জাদু, গণকবাজির মধ্যে পার্থক্য করার মানদণ্ড সঠিক না হওয়া।
৪- ওহীর ব্যাপারে ফয়েয হওয়া নীতিতে বিশ্বাসী হওয়া।
৫- কুরআন প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর এমন কালাম নয় যা দিয়ে তিনি কথা বলেছেন, এমনটি বলা।
৬- আল্লাহর কালামের স্বর ও বর্ণ নেই বলা।
□ আখেরাত অধ্যায়ে ১- হাশরের মাঠে আল্লাহর আগমন অস্বীকার করা।
২- আল্লাহকে দেখার অর্থ অনুভব করা বলে বিশ্বাস করা।
□ কাদা ও কাদর অধ্যায়ে ১- আল্লাহর ইচ্ছাকে প্রবল করে বান্দার ইচ্ছাকে প্রভাবহীন করা, যা জাবরে মা’নাউওয়ী বলে খ্যাত।
২- বান্দার কর্মকাণ্ডকে ‘কাসব’ নাম দেয়া, যার ব্যাখ্যা পৃথিবীর অসার বস্তুর একটি।
৩- তাকদীরকে মুবরাম ও মু’আল্লাক দু’ভাগে ভাগ করা।
৪- তাওফীক অর্থ আনুগত্য করার ক্ষমতা সৃষ্টি করা, আর বঞ্চিত করার অর্থ হচ্ছে গুনাহ করার ক্ষমতা সৃষ্টি করা। সরাসরি কাউকে ভালো কিংবা মন্দ করার সুযোগ দেয়া সাব্যস্ত না করা।
৫- বান্দার কর্মের সাথে কার্যকারণের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করা। যেমনে এটা বলা যে, আগুনের কাছে পুড়ে গেছে, আগুনের কারণে পুড়েনি।
৬- আল্লাহ তা’আলার কর্মকাণ্ডের হিকমত অস্বীকার করা।
২৮৫. সুতরাং যে কারণে তোমরা আল্লাহর নাম ও গুণে তা’ওয়ীল বা অপব্যাখ্যা করতে চাচ্ছ সেই একই কারণে আমরা শারীরিক পুনরুত্থান সাব্যস্তকারী ভাষ্যসমূহেরও তা’ওয়ীল করতে বাধ্য।
২৮৬. অর্থাৎ শারীরিক পুনরুত্থান সম্পর্কিত দার্শনিকদের সন্দেহের অসারতা আমরা জেনেছি। তারপরও হে মুতাকাল্লিমরা, তোমরা আল্লাহর গুণের ব্যাপারে যা বল, আমরাও অনুরূপ কথা বলতে পারি পুনরায় উত্থান সংক্রান্ত বিষয়ে।
২৮৭. অর্থাৎ আশায়েরা ও মাতুরিদীদেরকে।
২৮৮. সহীহ বুখারীতে এসেছে [(৫/২৯১), হাদীস নং ২৬৮৫], ইবন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা বলেন, "তোমরা কীভাবে আহলে কিতাবদের জিজ্ঞাসা কর? অথচ তোমাদের কিতাব যা তার নবীর ওপর নাযিল করা হয়েছে তা আল্লাহ সম্পর্কে সবচেয়ে নবীন খবরটি প্রদান করে, যা পুরাতন হয়ে যায়নি। আর আল্লাহ তোমাদেরকে জানিয়েছেন যে, আহলে কিতাবরা আল্লাহর কিতাবে যা এসেছে তাতে পরিবর্তন-পরিবর্ধন করেছে, তাদের হাতের কিতাবকে বিনষ্ট করেছে..."। তাছাড়া মহান আল্লাহ বলেন, "অতঃপর তাদের অংগীকার ভংগের জন্য আমরা তাদেরকে লা’নত করেছি ও তাদের হৃদয় কঠিন করেছি; তারা শব্দগুলোকে আপন স্থান থেকে বিকৃত করে এবং তাদেরকে যে উপদেশ দেয়া হয়েছিল তার একাংশ তারা ভুলে গেছে। আর আপনি সবসময় তাদের অল্প সংখ্যক ছাড়া সকলকেই বিশ্বাসঘাতকতা করতে দেখতে পাবেন, কাজেই তাদেরকে ক্ষমা করুন এবং উপেক্ষা করুন। নিশ্চয় আল্লাহ মুহসিনদেরকে ভালোবাসেন।” [সূরা আল-মায়েদাহ: ১৩] আরও বলেন, "অতঃপর তাদের মধ্যে যারা যালিম ছিল তাদেরকে যা বলা হয়েছিল, তার পরিবর্তে তারা অন্য কথা বলল। কাজেই আমরা আসমান থেকে তাদের প্রতি শাস্তি পাঠালাম, কারণ তারা যুলুম করত।" [সূরা আল-আ’রাফ: ১৬২]
২৮৯. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এটা সাব্যস্ত করেছেন যে, প্রাচীন আহলে কিতাবরা কখনও তাওরাতে আসা আল্লাহর সিফাতগুলোকে অস্বীকার করতো না। তবে পূর্ববর্তী আহলে কিতাবরা আল্লাহর গুণাবলিতেও বিকৃতি সাধন করেছে যখন তাদের মাঝে জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়ের মত সম্প্রদায়ের উদ্ভব হলো, যেমন দার্শনিক মূসা ইবন মাইমূন ও তার মত লোকদের আগমন ঘটে অথবা মু’তাযিলা সম্প্রদায়ের মতো লোকদের উদ্ভব হলো যেমন আবু ইয়া’কুব আল-বাসরী ও তার মতো লোকদের উত্থান হয়। [দারউ তা’আরুদ্বিল আকলি ওয়ান নাকটি (৭/৯৪)] ইবন তাইমিয়্যাহ আরও বলেছেন, ইয়াহূদীদের সাথে মু’তাযিলাদের অনেক যোগাযোগ ছিল, তাদের মাঝে কর্মগত মিলও প্রচুর। ইয়াহুদীরা মু’তাযিলাদের পাঁচ মূলনীতি পাঠ করে থাকে।
২৯০. কিন্তু কুরআনে কারীমে বা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসে আহলে কিতাবদের কিভাবে আল্লাহর নাম ও গুণ সংক্রান্ত ভাষ্যগুলোর কোনো নিন্দা আসেনি। বরং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখে সেগুলোর সত্যায়ন এসেছে।
২৯১. এর দ্বারা সে হাদীসের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যেখানে এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এক ইয়াহুদী পণ্ডিত এসে বললো, হে মুহাম্মাদ, অথবা বললো, হে আবুল কাসেম, নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন আসমানসমূহকে এক আঙুলের উপর রাখবেন, যমীনসমূহকে অপর আঙুলের উপর রাখবেন, পাহাড় ও গাছ অন্য আঙুলের উপর রাখবেন, পানি ও মাটি অপর আঙুলের উপর রাখবেন, আর সকল সৃষ্টিকে এক আঙুলের উপর রাখবেন, তারপর সেগুলো নাড়বেন এবং বলবেন, আমি রাজা, আমি রাজা। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ইয়াহূদী পণ্ডিত যা বলেছে তা শুনে আশ্চর্য হয়ে তাকে সত্যায়ন করে হাসলেন। তারপর পড়লেন, "আর তারা আল্লাঙ্কে যথোচিত সম্মান করেনি অথচ কিয়ামতের দিন সমস্ত যমীন থাকবে তাঁর হাতের মুঠিতে এবং আসমানসমূহ থাকবে ভাঁজ করা অবস্থায় তাঁর ডান হাতে। পবিত্র ও মহান তিনি, তারা যাদেরকে শরীক করে তিনি তাদের ঊর্ধ্বে।” [সূরা আয-যুমার: ৬৭]
২৯২. আল্লাহর কুরআন ও রাসূলের হাদীসে ইয়াহুদীদের ওপর তখনি দোষারোপ করেছে যখন তারা আল্লাহর সিফাতকে অস্বীকার করেছে। যখন কোনো সিফাতের ব্যাপারে বিরুপ মন্তব্য করেছে। যেমন, আল্লাহর হাত রুদ্ধ বলার কারণে আল্লাহ তাদেরকে ধমক দিয়েছেন।
২৯৩. আল্লাহর প্রতি অসম্মানজনক গুণ প্রয়োগ করার কারণে তাদের নিন্দা করা হয়েছে। কোনো সম্মানসূচক গুণ প্রদানের কারণে তাদের নিন্দা আসেনি।
২৯৪. এখানেও যেহেতু আল্লাহর প্রতি অসম্মানজনক গুণ প্রদান করা হয়েছে, তাই আল্লাহ তা’আলা সেটা নাকচ করে আয়াত নাযিল করেছেন।
২৯৫. অর্থাৎ তাওরাত ও কুরআনে।
২৯৬. কারণ কুরআনেই বিশদভাবে মা’আদ বা পুনরুত্থানের কথা এসেছে। তাওরাতে তার কেবল সাধারণ বর্ণনাই স্থান পেয়েছে।
২৯৭. অর্থাৎ মা’আদ বা পুনরুত্থান সংক্রান্ত ভাষ্য ও তথ্যসমূহ কোনোভাবে তা’ওয়ীল করা বাতিল হওয়ার বিষয়টি আবশ্যিকভাবে জানা বিষয়।
২৯৮. অর্থাৎ যদি রাসূলের দীনের মাঝে অকাট্যভাবে জানা যায় যে, পুনরুত্থান সংক্রান্ত নস বা ভাষ্যগুলোতে কোনো প্রকার তা’ওয়ীল চলবে না, তাহলে সিফাতের আয়াতসমূহে তা’ওয়ীল বাতিল হওয়ার বিষয়টি আরও বেশি উত্তমরূপে জানা যায়।
এই ফতোয়ায় যাদের মতকে আমরা খণ্ডন করার ইচ্ছা করেছি তারা এসব শেষে বর্ণিত সম্প্রদায়। যেহেতু প্রথম গোষ্ঠীর লোকদের থেকে মানুষের ভেগে যাওয়া প্রকাশ্য। কিন্তু এরা তাদের থেকে ভিন্ন। কেননা বিভিন্ন জায়গায় তারা সুন্নাহ’র সহযোগী হিসেবে নিজেদেরকে প্রচার-প্রসার করে বেড়ায়। অথচ প্রকৃতপক্ষে তারা না ইসলামের সহযোগিতা করেছে, আর না দার্শনিকদের নীতিকে ভাঙ্গতে পেরেছে। বরঞ্চ দার্শনিকরা এসব মুতাকাল্লিমদের (আশায়েরা ও মাতুরিদীদের) কে সিফাতের বক্তব্যে তারা যা বলেছে (আল্লাহর ও তার রাসূলের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে আসার পরও তা’ওয়ীল করা) অনুরূপ বক্তব্য (শারীরিক) পুনরুত্থানের ব্যাপারে মেনে নিতে বাধ্য করেছে। তারা বলে: আমরা অবশ্যম্ভাবীভাবে জানি যে, রাসূলগণ শারীরিক পুনরুত্থান নিয়ে এসেছিলেন। আর আমরা তাতে (তার ওপর শারীরিক পুনরুত্থান এর ওপর ঈমান আনতে) বাধা প্রদানকারী সংশয়সমূহে (এর অসারতা) জেনেছি।
আর আহলুস সুন্নাতগণ এদেরকে বলেন: আমরা আবশ্যিকভাবে জেনেছি যে, রাসূল সিফাত সাব্যস্তকরণ নিয়ে এসেছিলেন। আর (জানা কথা যে) পুনরুত্থান সংক্রান্ত নস বা ভাষ্যসমূহের চেয়ে আল্লাহর কিতাবে সিফাত সংক্রান্ত নস বা ভাষ্যসমূহ অনেক বেশি ও বড়। আহলে সুন্নাত তাদেরকে আরও বলে, এটা জ্ঞাত কথা যে, আরবের মুশরিকগণ পুনরুত্থান অস্বীকার করলেও সিফাতকে অস্বীকার করত না। তারা পুনরুত্থানের বিষয়টি নিয়ে রাসূলের বিরুদ্ধে নেমেছিল, তাঁর সাথে মুনাযারা ও বিবাদে লিপ্ত হয়েছিল। কিন্তু সিফাত নিয়ে আরবের কেউ কোনো দিন বিরোধিতা করেনি।
তাই জানা গেল যে, আক্কল (বুদ্ধি-বিবেকের যুক্তি) পুনরুত্থানের স্বীকৃতি দেয়ার চেয়ে সিফাতের স্বীকৃতি দেয় অনেক শক্তভাবে। এতদসত্ত্বেও এটা কীভাবে সম্ভব যে, তিনি সিফাত সম্বন্ধে যা জানিয়েছেন তা যেমনটি জানিয়েছেন তেমনটি নয়, আর মা’আদ তথা পুনরুত্থান সম্বন্ধে যা জানিয়েছেন তা যেমনটি জানিয়েছেন তেমনই?
তদুপরি জানা গেছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহলে কিতাবদেরকে কিতাব পরিবর্তন ও বিকৃত করার জন্য নিন্দা করেছেন। আর এটা জ্ঞাত যে, তাওরাত আল্লাহর সিফাতের আলোচনায় ভরপুর। সুতরাং এগুলো যদি বিকৃতি ও পরিবর্তন হতো, তাহলে তাদের এ কাজটির নিন্দা করা আরও অধিক উপযুক্ত হতো। বরং তারা যখন রাসূলের সামনে আল্লাহর সিফাতের উল্লেখ করত, বিমুগ্ধ হয়ে ও সত্যায়ন করে তিনি হাসতেন, সেটা কীভাবে হলো? রাসূল তাদের ওপর কখনো এমন কোনো দোষারোপ করেননি যে দোষারোপ করে থাকে সিফাত নাকচকারীরা সিফাত সাব্যস্তকারীগণের ওপর। যেমন, সিফাত নাকচকারীরা সিফাত সাব্যস্তকারীদের ওপর তাজসীম (দেহবাদী) ও তাশবীহ (সাদৃশ্যপ্রদানকারী) ইত্যাদি শব্দের তকমা লাগায়। বরং তিনি তাদেরকে দোষারোপ করেছেন তাদের এ কথার কারণে যে, ﴿يَدُ اللَّهِ مَغْلُولَةٌ﴾ "আল্লাহর হাত রুদ্ধ।” [সূরা আল- মায়েদাহ: ৬৪] এবং ﴿إِنَّ اللَّهَ فَقِيرٌ وَنَحْنُ أَغْنِيَاءُ﴾ “নিশ্চয় আল্লাহ ফকীর, আর আমরা ধনী।” [সূরা আলে ইমরান: ১৮১] এবং তাদের কথা: আল্লাহর আসমান-যমীন সৃষ্টি করে বিশ্রাম নিয়েছেন। তখন আল্লাহ বললেন: ﴿وَلَقَدْ خَلَقْنَا السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ وَمَا مَسَّنَا مِن لُّغُوبٍ﴾ [ق: ٣٨] "আর অবশ্যই আমরা আসমানসমূহ, যমীন ও তাদের অন্তর্বর্তী সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছি ছয় দিনে; আর আমাকে কোনো ক্লান্তি স্পর্শ করেনি।” [সূরা ক্বাফ: ৩৮]
আর কুরআন ও হাদীসে উল্লিখিত সিফাতের মতো সিফাতে তাওরাতও ভরপুর। অথচ তাওরাতে সরাসরি আখেরাতের আলোচনা কুরআনের মতো এত স্পষ্ট করে নেই। সুতরাং দুই কিতাবে উল্লিখিত সিফাত তা’ওয়ীল করা জায়েয হলে এক কিতাবে উল্লিখিত মা’আদ (পুনরুত্থান)-এর তা’ওয়ীল করা আরও বেশি উপযুক্ত।
আর দ্বিতীয়টি তথা মা’আদ-পুনরুত্থান এর তা’ওয়ীল করা বাতিল হওয়া রাসূলের দীন থেকে জানা আবশ্যিক বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। তাহলে প্রথমটি (সিফাতের ভাষ্যসমূহে) তা’ওয়ীল করার বিষয়টি বাতিল হওয়া অধিক উপযুক্ত।
টিকাঃ
২৮০. অর্থাৎ আহলুত তা’ওয়ীল। যারা আল্লাহর গুণাবলি সংক্রান্ত আয়াতসমূহের ব্যাপারে অপব্যাখ্যার নীতি অবলম্বন করেছে। স্বাভাবিক অর্থ থেকে সেগুলোকে দূরবর্তী বিরল অর্থে নিয়ে গেছে, অথবা নতুন অর্থ তৈরি করে নিয়েছে।
২৮১. অর্থাৎ আহলুত তাখয়ীল। কারণ ঈমানদার সাধারণত কখনও ঈমানিয়্যাতের ব্যাপারে তাদের মতবাদকে মেনে নিবে না। কেউ রাসূল সম্পর্কে তাদের এ জঘন্য কথা সহজে মানুষের মাঝে বলতে সাহস করবে না। মানুষকে যদি বলা হয় রাসূলগণ কল্পনা করে কথা বলেছেন বা রাসূলগণ বাস্তব অবস্থার বিপরীতে জনগণকে তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য মিথ্যা বলেছেন, তাহলে ন্যূনতম ঈমানের অধিকারী তার বিরুদ্ধে সকল ক্ষমতা প্রয়োগ করবে। তাই তারা তাদের কথা গোপন করে রাখে, কেবল তাদের নিজস্ব বলয়ে সেটা বলে থাকে। ফলে তাদের দ্বারা সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু দ্বিতীয় গোষ্ঠী, অর্থাৎ তা’ওয়ীলকারীদের দ্বারা দুনিয়ায় যত সর্বনাশ ছড়িয়ে পড়েছে, সুতরাং তাদেরকে এখানে রদ্দ করা হবে।
২৮২. অর্থাৎ আহলুত তা’ওয়ীল বা আল্লাহর সিফাতের অপব্যাখ্যাকারীদের অবস্থা মারাত্মক। এদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সুস্পষ্ট। এরাই হচ্ছে মু’তাযিলা, আশ’আরী, মাতুরিদী সম্প্রদায়।
২৮৩. যেসব স্থানে আশায়েরা, মাতুরিদী সম্প্রদায় আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের সহযোগী হয়েছে, তা হচ্ছে: ১- কবীরা গুণাহগার এর মাসআলা। ২- কবর ও হাশরের বিভিন্ন অবস্থা ও কর্মের বর্ণনা। ৩- খিলাফত ও ইমামতের মাসআলা। ৪- সাহাবীগণের ন্যায়পরায়ণ হওয়ার মাসআলা। ৫- দার্শনিক, কারামিত্বা, বাতেনিয়াদের বিরুদ্ধে তারা তাদের ক্ষমতা নিয়ে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের সাথে দাঁড়িয়েছে। যদিও প্রকৃতপক্ষে তারা না দার্শনিকদের অস্ত্র ভাঙ্গতে পেরেছে আর না তারা ইসলামকে সাহায্য করতে পেরেছে। বস্তুত তারা ইসলামের শত্রু ইয়াহুদী-নাসারা ও দার্শনিকদের সামনে দাঁড়ানোর মতো যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি।
২৮৪. আহলুত তা’ওয়ীল বলতে আমরা কাদেরকে বুঝিয়েছি তা ইতোপূর্বে ব্যক্ত করেছি, তাদের মধ্যে প্রথমেই মু’তাযিলা, তারপর আশায়েরা, তারপর মাতুরিদিয়্যা সম্প্রদায়, তাছাড়া আরও কিছু অখ্যাত সম্প্রদায়ও রয়েছে। এরা সাধারণত আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের সাথে অবস্থান করে। নিজেদেরকে আহলুস সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত বলার জন্য সচেষ্ট থাকে। ক্ষণে ক্ষণে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের সহযোগিতার দাবি করে। কিন্তু তারা তিনটি মৌলিক কারণে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আত থেকে বাইরে চলে গেছে: ১- তারা বিবেকের যুক্তিকে কুরআন ও সুন্নাহ’র ভাষ্যের ওপর প্রাধান্য দেয়। ২- তারা আকীদার ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ খবরে ওয়াহিদকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করে না। ৩- তারা তা’ওয়ীল বা অপব্যাখ্যার নীতি। অর্থাৎ যাবতীয় মুতাওয়াতির (কুরআন ও সুন্নাহ মুতাওয়াতিরাহ) কে আক্কলের বিপরীত হলে অবশ্যই তা’ওয়ীল করে নিতে হবে। এছাড়াও আকীদাহ’র প্রতিটি অধ্যায়েই আরও কিছু বিষয়ে আশায়েরাহ ও মাতুরিদিয়্যাহদের মতবাদ আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের বিরোধী, যেমন:
আকীদাহ গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের মতাদর্শ হচ্ছে, ১- বিবেকের যুক্তিকে কুরআন-সুন্নাহ’র ভাষ্যের ওপর প্রাধান্য দিতে হবে। ২- যেসব ভাষ্য মুতাওয়াতির সেগুলো যদি বিবেকের যুক্তির বিপরীত হয় তবে সেগুলোকে তা’ওয়ীল করতে হবে। ৩- আকীদাহকে দু’ভাগে ভাগ করা, আকলিয়াত (আল্লাহ সম্পর্কিত বিষয়াদি) ও সাম’ইয়াত (মৃত্যু পরবর্তী বিষয়াদি)। ৪- খবরে ওয়াহিদ আকীদাতে দলীল না হওয়া, তবে সাম’ইয়াতে তা দ্বারা দলীল নেয়া যাবে। ৫- তাদের এক গোষ্ঠী, যেমন গাযালীর মতে সূফী কাশফ ও যাওক কুরআন ও সুন্নাহর ভাষ্যের ওপর প্রাধান্য পাবে। এর জন্য কুরআন ও সুন্নাহর ভাষ্যকে তা’ওয়ীল করা যাবে, যাতে তার সাথে সামঞ্জস্য বিধান করা যায়। [রিসালাতুল ইলম আল-লাদুন্নী, কুবরা আল- ইয়াক্বীনীয়াত) ৬- কুরআন ও সুন্নাহ’র ভাষ্যের দাবি ধারণার জন্ম দেয়, দৃঢ় ইলমের ফায়েদা দেয় না। যতক্ষণ না তা দশটি দোষ থেকে মুক্ত হচ্ছে... ৭- অপর দিকে বিবেকের যুক্তি অনুযায়ী হলে দুর্বল ও বানোয়াট হাদীসও দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য।
একজন মানুষের প্রথম কর্তব্য অধ্যায়ে ১- প্রথম কর্তব্য, চিন্তা-গবেষণা বা চিন্তা-গবেষণার প্রতি ইচ্ছা, অথবা সন্দেহ করা, অথবা সন্দেহের ইচ্ছা করা। ২- মুকাল্লিদের ঈমান শুদ্ধ না হওয়া। ৩- স্রষ্টা ও সৃষ্টির আলাদা অস্তিত্বে বিশ্বাসী না হওয়া, তথা আল্লাহকে সৃষ্টি থেকে আলাদা করে ‘আরশের উপর না মানা।
ঈমান অধ্যায়ে ১- ঈমানের অভিধানিক অর্থ শুধু বিশ্বাস বলা। ২- ঈমানের শর’য়ী অর্থ নির্ধারণে ভুল করা তথা আমলকে ঈমানের রুকনের অন্তর্ভুক্ত না করণে। ৩- ঈমান বাড়া ও কমার নীতিতে।
কুফর অধ্যায়ে ১- কুফরী হওয়ার সকল শর্তপূরণ ও বাঁধা অপসারণের পরও কুফরীর বিধান বলতে দ্বিধা করা।
২- কুফরী হওয়ার জন্য বিশ্বাস থাকা বাধ্য করা অর্থাৎ কর্মগত কুফরীকে কুফরী মনে না করা।
৩- কুফরী হওয়ার জন্য মুখে কুফরী করার স্বীকৃতি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কুফরী না বলা।
□ তাওহীদ অধ্যায়ে ১- তাওহীদুর রুবুবিয়্যাতে স্রষ্টার অস্তিত্ব সাব্যস্ত করার নীতিতে ভুল পন্থা অবলম্বন। স্রষ্টার অস্তিত্ব সাব্যস্ত করতে মরিয়া হয়ে উঠা, অথচ তা ফিত্বরী ব্যাপারে। স্রষ্টার অস্তিত্ব সাব্যস্ত করার জন্য দলীল ‘হুদুস ওয়াল কিদাম’ ব্যবহার করা, যা বিতর্কিত।
২- তাওহীদুল আসমা ওয়াস সিফাতে আল্লাহর গুণাবলি সবগুলো কিংবা আংশিককে অস্বীকার কিংবা অপব্যাখ্যা।
৩- তাওহীদুল উলুহিয়্যাহকে তাওহীদের সংজ্ঞায় না নেয়া। ফলে তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ’র ব্যাপারে এসেছে চরম ঔদাসিন্য।
৪- ইলাহ ও রব একই অর্থে নেয়া।
□ শির্ক অধ্যায়ে ১- আল্লাহর অস্তিত্ব মেনে নেয়ার পরে অন্য কাউকে পরিচালক বা কর্তৃত্বকারী মেনে নিলেও শির্ক না বলা। যেমন, গাউস, কুতুব, নুকাবা, নুজাবা ইত্যাদি বিশ্বাস করা।
২- আল্লাহর গুণাবলি অন্যদের মাঝে দাবি করার পরও শির্ক না বলা।
৩- আল্লাহর ইবাদতে অন্য কাউকে শরীক করলেও মুশরিক না বলা; যতক্ষণ পর্যন্ত না তাকে রুবুবিয়্যাতের গুণ না দেয়।
□ নবুওয়াত অধ্যায়ে ১- নবুওয়াত একান্ত আল্লাহর ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। সেখানে নবীর মাঝে কোনো গুণ থাকা আবশ্যক নয়।
২- নবী-রাসূলদের নবুওয়াতের প্রমাণ শুধু মু’জিযায় সীমাবদ্ধ মনে করা।
৩- মু’জিযা, কারামাত ও জাদু, গণকবাজির মধ্যে পার্থক্য করার মানদণ্ড সঠিক না হওয়া।
৪- ওহীর ব্যাপারে ফয়েয হওয়া নীতিতে বিশ্বাসী হওয়া।
৫- কুরআন প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর এমন কালাম নয় যা দিয়ে তিনি কথা বলেছেন, এমনটি বলা।
৬- আল্লাহর কালামের স্বর ও বর্ণ নেই বলা।
□ আখেরাত অধ্যায়ে ১- হাশরের মাঠে আল্লাহর আগমন অস্বীকার করা।
২- আল্লাহকে দেখার অর্থ অনুভব করা বলে বিশ্বাস করা।
□ কাদা ও কাদর অধ্যায়ে ১- আল্লাহর ইচ্ছাকে প্রবল করে বান্দার ইচ্ছাকে প্রভাবহীন করা, যা জাবরে মা’নাউওয়ী বলে খ্যাত।
২- বান্দার কর্মকাণ্ডকে ‘কাসব’ নাম দেয়া, যার ব্যাখ্যা পৃথিবীর অসার বস্তুর একটি।
৩- তাকদীরকে মুবরাম ও মু’আল্লাক দু’ভাগে ভাগ করা।
৪- তাওফীক অর্থ আনুগত্য করার ক্ষমতা সৃষ্টি করা, আর বঞ্চিত করার অর্থ হচ্ছে গুনাহ করার ক্ষমতা সৃষ্টি করা। সরাসরি কাউকে ভালো কিংবা মন্দ করার সুযোগ দেয়া সাব্যস্ত না করা।
৫- বান্দার কর্মের সাথে কার্যকারণের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করা। যেমনে এটা বলা যে, আগুনের কাছে পুড়ে গেছে, আগুনের কারণে পুড়েনি।
৬- আল্লাহ তা’আলার কর্মকাণ্ডের হিকমত অস্বীকার করা।
২৮৫. সুতরাং যে কারণে তোমরা আল্লাহর নাম ও গুণে তা’ওয়ীল বা অপব্যাখ্যা করতে চাচ্ছ সেই একই কারণে আমরা শারীরিক পুনরুত্থান সাব্যস্তকারী ভাষ্যসমূহেরও তা’ওয়ীল করতে বাধ্য।
২৮৬. অর্থাৎ শারীরিক পুনরুত্থান সম্পর্কিত দার্শনিকদের সন্দেহের অসারতা আমরা জেনেছি। তারপরও হে মুতাকাল্লিমরা, তোমরা আল্লাহর গুণের ব্যাপারে যা বল, আমরাও অনুরূপ কথা বলতে পারি পুনরায় উত্থান সংক্রান্ত বিষয়ে।
২৮৭. অর্থাৎ আশায়েরা ও মাতুরিদীদেরকে।
২৮৮. সহীহ বুখারীতে এসেছে [(৫/২৯১), হাদীস নং ২৬৮৫], ইবন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা বলেন, "তোমরা কীভাবে আহলে কিতাবদের জিজ্ঞাসা কর? অথচ তোমাদের কিতাব যা তার নবীর ওপর নাযিল করা হয়েছে তা আল্লাহ সম্পর্কে সবচেয়ে নবীন খবরটি প্রদান করে, যা পুরাতন হয়ে যায়নি। আর আল্লাহ তোমাদেরকে জানিয়েছেন যে, আহলে কিতাবরা আল্লাহর কিতাবে যা এসেছে তাতে পরিবর্তন-পরিবর্ধন করেছে, তাদের হাতের কিতাবকে বিনষ্ট করেছে..."। তাছাড়া মহান আল্লাহ বলেন, "অতঃপর তাদের অংগীকার ভংগের জন্য আমরা তাদেরকে লা’নত করেছি ও তাদের হৃদয় কঠিন করেছি; তারা শব্দগুলোকে আপন স্থান থেকে বিকৃত করে এবং তাদেরকে যে উপদেশ দেয়া হয়েছিল তার একাংশ তারা ভুলে গেছে। আর আপনি সবসময় তাদের অল্প সংখ্যক ছাড়া সকলকেই বিশ্বাসঘাতকতা করতে দেখতে পাবেন, কাজেই তাদেরকে ক্ষমা করুন এবং উপেক্ষা করুন। নিশ্চয় আল্লাহ মুহসিনদেরকে ভালোবাসেন।” [সূরা আল-মায়েদাহ: ১৩] আরও বলেন, "অতঃপর তাদের মধ্যে যারা যালিম ছিল তাদেরকে যা বলা হয়েছিল, তার পরিবর্তে তারা অন্য কথা বলল। কাজেই আমরা আসমান থেকে তাদের প্রতি শাস্তি পাঠালাম, কারণ তারা যুলুম করত।" [সূরা আল-আ’রাফ: ১৬২]
২৮৯. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এটা সাব্যস্ত করেছেন যে, প্রাচীন আহলে কিতাবরা কখনও তাওরাতে আসা আল্লাহর সিফাতগুলোকে অস্বীকার করতো না। তবে পূর্ববর্তী আহলে কিতাবরা আল্লাহর গুণাবলিতেও বিকৃতি সাধন করেছে যখন তাদের মাঝে জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়ের মত সম্প্রদায়ের উদ্ভব হলো, যেমন দার্শনিক মূসা ইবন মাইমূন ও তার মত লোকদের আগমন ঘটে অথবা মু’তাযিলা সম্প্রদায়ের মতো লোকদের উদ্ভব হলো যেমন আবু ইয়া’কুব আল-বাসরী ও তার মতো লোকদের উত্থান হয়। [দারউ তা’আরুদ্বিল আকলি ওয়ান নাকটি (৭/৯৪)] ইবন তাইমিয়্যাহ আরও বলেছেন, ইয়াহূদীদের সাথে মু’তাযিলাদের অনেক যোগাযোগ ছিল, তাদের মাঝে কর্মগত মিলও প্রচুর। ইয়াহুদীরা মু’তাযিলাদের পাঁচ মূলনীতি পাঠ করে থাকে।
২৯০. কিন্তু কুরআনে কারীমে বা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসে আহলে কিতাবদের কিভাবে আল্লাহর নাম ও গুণ সংক্রান্ত ভাষ্যগুলোর কোনো নিন্দা আসেনি। বরং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখে সেগুলোর সত্যায়ন এসেছে।
২৯১. এর দ্বারা সে হাদীসের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যেখানে এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এক ইয়াহুদী পণ্ডিত এসে বললো, হে মুহাম্মাদ, অথবা বললো, হে আবুল কাসেম, নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন আসমানসমূহকে এক আঙুলের উপর রাখবেন, যমীনসমূহকে অপর আঙুলের উপর রাখবেন, পাহাড় ও গাছ অন্য আঙুলের উপর রাখবেন, পানি ও মাটি অপর আঙুলের উপর রাখবেন, আর সকল সৃষ্টিকে এক আঙুলের উপর রাখবেন, তারপর সেগুলো নাড়বেন এবং বলবেন, আমি রাজা, আমি রাজা। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ইয়াহূদী পণ্ডিত যা বলেছে তা শুনে আশ্চর্য হয়ে তাকে সত্যায়ন করে হাসলেন। তারপর পড়লেন, "আর তারা আল্লাঙ্কে যথোচিত সম্মান করেনি অথচ কিয়ামতের দিন সমস্ত যমীন থাকবে তাঁর হাতের মুঠিতে এবং আসমানসমূহ থাকবে ভাঁজ করা অবস্থায় তাঁর ডান হাতে। পবিত্র ও মহান তিনি, তারা যাদেরকে শরীক করে তিনি তাদের ঊর্ধ্বে।” [সূরা আয-যুমার: ৬৭]
২৯২. আল্লাহর কুরআন ও রাসূলের হাদীসে ইয়াহুদীদের ওপর তখনি দোষারোপ করেছে যখন তারা আল্লাহর সিফাতকে অস্বীকার করেছে। যখন কোনো সিফাতের ব্যাপারে বিরুপ মন্তব্য করেছে। যেমন, আল্লাহর হাত রুদ্ধ বলার কারণে আল্লাহ তাদেরকে ধমক দিয়েছেন।
২৯৩. আল্লাহর প্রতি অসম্মানজনক গুণ প্রয়োগ করার কারণে তাদের নিন্দা করা হয়েছে। কোনো সম্মানসূচক গুণ প্রদানের কারণে তাদের নিন্দা আসেনি।
২৯৪. এখানেও যেহেতু আল্লাহর প্রতি অসম্মানজনক গুণ প্রদান করা হয়েছে, তাই আল্লাহ তা’আলা সেটা নাকচ করে আয়াত নাযিল করেছেন।
২৯৫. অর্থাৎ তাওরাত ও কুরআনে।
২৯৬. কারণ কুরআনেই বিশদভাবে মা’আদ বা পুনরুত্থানের কথা এসেছে। তাওরাতে তার কেবল সাধারণ বর্ণনাই স্থান পেয়েছে।
২৯৭. অর্থাৎ মা’আদ বা পুনরুত্থান সংক্রান্ত ভাষ্য ও তথ্যসমূহ কোনোভাবে তা’ওয়ীল করা বাতিল হওয়ার বিষয়টি আবশ্যিকভাবে জানা বিষয়।
২৯৮. অর্থাৎ যদি রাসূলের দীনের মাঝে অকাট্যভাবে জানা যায় যে, পুনরুত্থান সংক্রান্ত নস বা ভাষ্যগুলোতে কোনো প্রকার তা’ওয়ীল চলবে না, তাহলে সিফাতের আয়াতসমূহে তা’ওয়ীল বাতিল হওয়ার বিষয়টি আরও বেশি উত্তমরূপে জানা যায়।
📄 তৃতীয় গোত্র: আপেক্ষত তাজহীল তথা নবী-রাসূলদের আনীত সিফাত বিষয়ক জ্ঞানসমূহের ব্যাপারে অজ্ঞতার নীতির অনুসারী
আর তৃতীয় গোষ্ঠী তারা হচ্ছে, আহলুত তাজহীল তথা [নবী-রাসূলদের আনীত সিফাত বিষয়গুলোতে] অজ্ঞতার নীতির অনুসরণকারী। সুন্নাহ’র সাথে সম্পৃক্ত ও সালাফদের অনুসরণের দাবীদার অনেকেই এ নীতি অবলম্বন করে থাকে। তারা বলে: সিফাতের আয়াত যেগুলো আল্লাহ নাযিল করেছিলেন সেগুলোর অর্থ রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতেন না, জিবরীলও এসব আয়াতের অর্থ সম্পর্কে ওয়াকিফহাল ছিলেন না, উম্মতের প্রথম সারীর অগ্রবর্তীগণও এগুলোর অর্থ সম্পর্কে পরিচিতি লাভ করেননি।
অনুরূপভাবে হাদীসে উল্লিখিত আল্লাহর সিফাতের ব্যাপারেও তাদের এই বক্তব্য যে, আল্লাহ ব্যতীত কেউ সেগুলোর অর্থ ও উদ্দেশ্য জানেন না। অথচ রাসূলই প্রথম তা দিয়ে কথা বলেছেন। সুতরাং তাদের কথা অনুযায়ী রাসূল এমন বাক্য নিয়ে কথা বলেছেন যার অর্থ তিনি নিজেই জানতেন না।
এদের ধারণা, তারা আল্লাহর বাণী: ﴿وَمَا يَعْلَمُ تَأْوِيلَهُ إِلَّا اللَّهُ﴾ [آل عمران: ٧] “অথচ আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ এর ব্যাখ্যা জানে না।” [সূরা আলে ইমরান: ০৭] এর অনুসারী। কেননা সালাফদের অনেকেই আল্লাহ () শব্দের উপর ওয়াক্ফ করেছেন।
বস্তুত এটি বিশুদ্ধ ওয়াক্ফ্ফ। কিন্তু তারা (আহলুত তাজহীল) কালামের অর্থ ও ব্যাখ্যার মাঝে পার্থক্য করেনি, অনুরূপভাবে যে তা'ওয়ীল একমাত্র আল্লাহ জানেন সেটা বুঝতে পারেননি। তাই তারা ধারণা করেছে যে, কিতাবুল্লাহ থেকে উল্লিখিত তা’ওয়ীলই পরবর্তীদের কথায় ব্যবহৃত তা’ওয়ীল। ফলে তারা ভুলে পতিত হয়েছে;
টিকাঃ
২৯৯. শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ অন্যত্র এদেরকে ‘আহলুত তাম্বলীল ওয়াততাজহীল’ এ নামে নামকরণ করেন। দেখুন, দারউত তা’আরুদ্ব (১/১৫)। আবার কখনও কখনও তাদেরকে যাহেরিয়্যাহও বলতেন। দেখুন, মাজমূ’ ফাতাওয়া (১৬/৪১৪); তাদেরকে কেউ কেউ আহলে তাফওয়ীদ্ব ও উম্মিয়্যাহ নামেও অভিহিত করে। দেখুন, জাওয়াবুল ই’তিরাদ্বাতিল মিসরিয়্যাহ, পৃ. ২৩।
৩০০. ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, তাদের কথার প্রকৃত অর্থ এটা দাঁড়ায় যে, নবী-রাসূলগণ জাহেল, পথভ্রষ্ট। তারা জানতো না সেসব আয়াতের অর্থ যাতে আল্লাহ তার নিজেকে গুণান্বিত করেছেন এবং নবীদের কথাও তার অনুসারীরা বুঝতো না।
তারপর তিনি বলেন, এদের মধ্যে কেউ কেউ বলে, এসব ভাষ্য দ্বারা যা উদ্দেশ্য তা তার প্রকাশ্য দাবি ও বুঝের বিপরীত। কোনো নবী, ফিরিশতা, সাহাবী কিংবা আলেম এগুলোর উদ্দেশ্য জানে না, যেমনিভাবে তারা জানে না কিয়ামত কবে হবে। আবার তাদের মধ্যে আরেক দল বলে, বরং প্রকাশ্য অর্থের ওপর চালিয়ে নেয়া হবে, প্রকাশ্য অর্থের ওপর বহন করা হবে, তা সত্ত্বেও এগুলোর প্রকৃত অর্থ আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। এভাবে তারা স্ববিরোধিতায় লিপ্ত হয়েছে, একদিকে বলছে তার একটি ব্যাখ্যা আছে প্রকাশ্য অর্থের বিপরীতে, আবার বলছে প্রকাশ্য অর্থের ওপর চালিয়ে নেয়া হবে। এ বিষয়টি ইবন আক্বীল যাম্মুত তা’ওয়ীল গ্রন্থে তার উস্তাদ আবু ইয়া’লার দোষ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। দেখুন, দারউত তা’আরুদ্ব (১/১৫-১৬), (৫/৩৮১), (৭/৩৪-৩৫); মাজমূ’ ফাতাওয়া (১৩/২৮৫), (১৭/৩৬১)। ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, আহলুত তাজহীল বা এগুলোর অর্থ জানা যায় না দাবি করা গোষ্ঠী তাদের এ নীতিকে দু’টি কায়েদার ওপর সাজিয়েছে, ১. এ ভাষ্যগুলো মুতাশাবিহ। ২. মুতাশাবিহ এর প্রকৃত অর্থ আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। এ দুটি কায়েদার ওপর ভর করে তারা সাহাবী-মুহাজির ও আনসারসহ সকল তাবে’য়ী ও ইমামদেরকে এসব বিষয়ে অজ্ঞ হিসেবে তুলে ধরেছে। ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, তারা তিনটি ভুল করেছে, প্রথমত: তারা মুতাশাবিহ নির্ধারণে ভুল করেছে। দ্বিতীয়ত: তারা আয়াতগুলোকে মুতাশাবিহাতের অন্তর্ভুক্ত করেছে। তৃতীয়ত: তারা মুতাশাবিহাতের অর্থ কেবল আল্লাহই জানে বলছে। এভাবে তিনটি ভূমিকাতেই ভুল করেছে। এ নীতিতে আসার কারণে তারা কুরআন থেকে শিক্ষা নিতে পারেনি, কুরআন নিয়ে গবেষণা থেকে মাহরুম হয়েছে, অথচ এর মাধ্যমেই ঈমান প্রতিষ্ঠিত হবে, অন্তরসমূহ আল্লাহর পরিচয়ে সিক্ত হবে। ফলে তারা আল্লাহর নাযিল করা কিছু শব্দের উচ্চারণ করে থাকে যার অর্থ তারা বুঝে না, তারা মনে করে থাকে যে, এগুলো নাযিল হয়েছে কেবল তিলাওয়াত ও ইবাদত করার জন্য, এগুলোর অর্থ বুঝা, শিক্ষা নেয়া, চিন্তা ও গবেষণা করার প্রয়োজন নেই। [আস-সাওয়া’য়িকুর মুরসালাহ (২/৪২৩-৪২৪)]
৩০১. ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, তারা (আহলুত তাজহীল) বলে, সিফাত বিষয়ক আয়াতসমূহ এমন কিছু ভাষ্য যা কিছু শব্দের সমষ্টি, যার অর্থ জানা যায় না। আমরা জানি না আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এর দ্বারা কী উদ্দেশ্য নিয়েছেন। তবে আমরা এগুলোকে শব্দ আকারে পড়বো, যার কোনো অর্থ নেই। আমরা এটা জানবো যে, এর একটা ব্যাখ্যা আছে যা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। যদি আমাদের কাছে এমন কোনো কিছু আসে আমরা সেটাকে কোনো প্রকার সাদৃশ্য কিংবা তুলনা হিসেবে বিশ্বাস করবো না। আমরা সেগুলোর অর্থ জানি না, কেউ যদি সেগুলোর কোনো ব্যাখ্যা করে তবে সেটার বিরোধিতা করবো, সেগুলোর জ্ঞান আল্লাহর কাছেই সোপর্দ করবো। [আস-সাওয়া’য়িকুল মুরসালাহ (২/৪২২)]
৩০২. যারা এখানে ওয়াক্বফ করেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন, ইবন ‘উমার, এক বর্ণনায় ইবন আব্বাস, আয়েশা, উরওয়াহ ইবনুয যুবাইর, ‘উমার ইবন আব্দুল আযীয, আবুশ শা’ছা, আবু নাহীক। আর এ মতই গ্রহণ করেছেন কিসাঈ, ফাররা, আখফাশ, আবু উবাইদ, আবু হাতেম, আসমা’ঈ ও সা’লাব। আর তা পছন্দ করেছেন ইবন জারীর, ইবন কুদামাহ, বাগাওয়ী, আব্দুল কাহের আল- বাগদাদী, শাওকানী ও শানকীত্বী।
৩০৩. অর্থাৎ তারা দু’টি ভুল করেছে: এক. বাক্যের অর্থ ও ব্যাখ্যার মধ্যে পার্থক্য করতে পারেনি। বাক্যের অর্থ জানা গেলেও বিস্তারিত ধরণ অনেক সময় জানা যায় না। এখানেও তারা ভুল করেছে। এসব সিফাতের আয়াতসমূহের অর্থ আরবী ভাষাতে একেবারেই সরল। এগুলোর অর্থ বুঝতে কোনো কষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই। আরবরা অহরহ এগুলো তাদের ভাষায় ব্যবহার করেছে। তাহলে অর্থ না জানার কিছু নেই। হ্যাঁ, অবশ্যই তাফসীর বা ধরণ বুঝা কঠিন। কারণ যার গুণ বর্ণনা করা হচ্ছে তাকে তো কেউ দেখেনি, তাই তার গুণের ধরণ বুঝা সহজ নয়। সেটাই হলো তাফসীর। এ তাফসীর, যা তা’ওয়ীল এর একটি অর্থ, সেটা আল্লাহর ওপর সোপর্দ করে অর্থ করতে পারতো, কিন্তু তারা সেটা না করে ভুল করেছে। দুই. কুরআনের আয়াতে এখানে যে তা’ওয়ীল একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা দ্বারা বুঝানো হয়েছে প্রকৃত অবস্থা বা আসল স্বরূপ। নিঃসন্দেহে সেটা একমাত্র আল্লাহ জানেন। এ তা’ওয়ীল এর অর্থ সেটা নয় যা পরবর্তী কালের লোকেরা তা’ওয়ীল শব্দের জন্য নির্ধারণ করেছে। তারা তা’ওয়ীল বলতে দূরবর্তী কোনো অর্থ বুঝে গিয়েছে যা কোনো কারণে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। এ অর্থটির অস্তিত্ব কুরআন, সুন্নাহ ও সালাফদের বক্তব্যে নেই। তাই তাদের এ ভুলটি হয়েছিল আয়াতে আসা তা’ওয়ীল শব্দটির অর্থ নির্ধারণে।
৩০৪. বস্তুত আল্লাহর কুরআন, রাসূলের হাদীস ও সাহাবায়ে কিরামের বক্তব্যে তা’ওয়ীল বলে দু’টি জিনিসকে বুঝানো হয়: এক. সাধারণভাবে কোনো কিছুর অর্থ বুঝা। দুই. প্রকৃত গুঢ় রহস্য বা তত্ত্ব লাভ করা। অপরাপর অর্থটি পরবর্তীদের পরিভাষা।
আর তৃতীয় গোষ্ঠী তারা হচ্ছে, আহলুত তাজহীল তথা [নবী-রাসূলদের আনীত সিফাত বিষয়গুলোতে] অজ্ঞতার নীতির অনুসরণকারী। সুন্নাহ’র সাথে সম্পৃক্ত ও সালাফদের অনুসরণের দাবীদার অনেকেই এ নীতি অবলম্বন করে থাকে। তারা বলে: সিফাতের আয়াত যেগুলো আল্লাহ নাযিল করেছিলেন সেগুলোর অর্থ রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতেন না, জিবরীলও এসব আয়াতের অর্থ সম্পর্কে ওয়াকিফহাল ছিলেন না, উম্মতের প্রথম সারীর অগ্রবর্তীগণও এগুলোর অর্থ সম্পর্কে পরিচিতি লাভ করেননি।
অনুরূপভাবে হাদীসে উল্লিখিত আল্লাহর সিফাতের ব্যাপারেও তাদের এই বক্তব্য যে, আল্লাহ ব্যতীত কেউ সেগুলোর অর্থ ও উদ্দেশ্য জানেন না। অথচ রাসূলই প্রথম তা দিয়ে কথা বলেছেন। সুতরাং তাদের কথা অনুযায়ী রাসূল এমন বাক্য নিয়ে কথা বলেছেন যার অর্থ তিনি নিজেই জানতেন না।
এদের ধারণা, তারা আল্লাহর বাণী: ﴿وَمَا يَعْلَمُ تَأْوِيلَهُ إِلَّا اللَّهُ﴾ [آل عمران: ٧] “অথচ আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ এর ব্যাখ্যা জানে না।” [সূরা আলে ইমরান: ০৭] এর অনুসারী। কেননা সালাফদের অনেকেই আল্লাহ () শব্দের উপর ওয়াক্ফ করেছেন।
বস্তুত এটি বিশুদ্ধ ওয়াক্ফ্ফ। কিন্তু তারা (আহলুত তাজহীল) কালামের অর্থ ও ব্যাখ্যার মাঝে পার্থক্য করেনি, অনুরূপভাবে যে তা'ওয়ীল একমাত্র আল্লাহ জানেন সেটা বুঝতে পারেননি। তাই তারা ধারণা করেছে যে, কিতাবুল্লাহ থেকে উল্লিখিত তা’ওয়ীলই পরবর্তীদের কথায় ব্যবহৃত তা’ওয়ীল। ফলে তারা ভুলে পতিত হয়েছে;
টিকাঃ
২৯৯. শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ অন্যত্র এদেরকে ‘আহলুত তাম্বলীল ওয়াততাজহীল’ এ নামে নামকরণ করেন। দেখুন, দারউত তা’আরুদ্ব (১/১৫)। আবার কখনও কখনও তাদেরকে যাহেরিয়্যাহও বলতেন। দেখুন, মাজমূ’ ফাতাওয়া (১৬/৪১৪); তাদেরকে কেউ কেউ আহলে তাফওয়ীদ্ব ও উম্মিয়্যাহ নামেও অভিহিত করে। দেখুন, জাওয়াবুল ই’তিরাদ্বাতিল মিসরিয়্যাহ, পৃ. ২৩।
৩০০. ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, তাদের কথার প্রকৃত অর্থ এটা দাঁড়ায় যে, নবী-রাসূলগণ জাহেল, পথভ্রষ্ট। তারা জানতো না সেসব আয়াতের অর্থ যাতে আল্লাহ তার নিজেকে গুণান্বিত করেছেন এবং নবীদের কথাও তার অনুসারীরা বুঝতো না।
তারপর তিনি বলেন, এদের মধ্যে কেউ কেউ বলে, এসব ভাষ্য দ্বারা যা উদ্দেশ্য তা তার প্রকাশ্য দাবি ও বুঝের বিপরীত। কোনো নবী, ফিরিশতা, সাহাবী কিংবা আলেম এগুলোর উদ্দেশ্য জানে না, যেমনিভাবে তারা জানে না কিয়ামত কবে হবে। আবার তাদের মধ্যে আরেক দল বলে, বরং প্রকাশ্য অর্থের ওপর চালিয়ে নেয়া হবে, প্রকাশ্য অর্থের ওপর বহন করা হবে, তা সত্ত্বেও এগুলোর প্রকৃত অর্থ আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। এভাবে তারা স্ববিরোধিতায় লিপ্ত হয়েছে, একদিকে বলছে তার একটি ব্যাখ্যা আছে প্রকাশ্য অর্থের বিপরীতে, আবার বলছে প্রকাশ্য অর্থের ওপর চালিয়ে নেয়া হবে। এ বিষয়টি ইবন আক্বীল যাম্মুত তা’ওয়ীল গ্রন্থে তার উস্তাদ আবু ইয়া’লার দোষ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। দেখুন, দারউত তা’আরুদ্ব (১/১৫-১৬), (৫/৩৮১), (৭/৩৪-৩৫); মাজমূ’ ফাতাওয়া (১৩/২৮৫), (১৭/৩৬১)। ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, আহলুত তাজহীল বা এগুলোর অর্থ জানা যায় না দাবি করা গোষ্ঠী তাদের এ নীতিকে দু’টি কায়েদার ওপর সাজিয়েছে, ১. এ ভাষ্যগুলো মুতাশাবিহ। ২. মুতাশাবিহ এর প্রকৃত অর্থ আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। এ দুটি কায়েদার ওপর ভর করে তারা সাহাবী-মুহাজির ও আনসারসহ সকল তাবে’য়ী ও ইমামদেরকে এসব বিষয়ে অজ্ঞ হিসেবে তুলে ধরেছে। ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, তারা তিনটি ভুল করেছে, প্রথমত: তারা মুতাশাবিহ নির্ধারণে ভুল করেছে। দ্বিতীয়ত: তারা আয়াতগুলোকে মুতাশাবিহাতের অন্তর্ভুক্ত করেছে। তৃতীয়ত: তারা মুতাশাবিহাতের অর্থ কেবল আল্লাহই জানে বলছে। এভাবে তিনটি ভূমিকাতেই ভুল করেছে। এ নীতিতে আসার কারণে তারা কুরআন থেকে শিক্ষা নিতে পারেনি, কুরআন নিয়ে গবেষণা থেকে মাহরুম হয়েছে, অথচ এর মাধ্যমেই ঈমান প্রতিষ্ঠিত হবে, অন্তরসমূহ আল্লাহর পরিচয়ে সিক্ত হবে। ফলে তারা আল্লাহর নাযিল করা কিছু শব্দের উচ্চারণ করে থাকে যার অর্থ তারা বুঝে না, তারা মনে করে থাকে যে, এগুলো নাযিল হয়েছে কেবল তিলাওয়াত ও ইবাদত করার জন্য, এগুলোর অর্থ বুঝা, শিক্ষা নেয়া, চিন্তা ও গবেষণা করার প্রয়োজন নেই। [আস-সাওয়া’য়িকুর মুরসালাহ (২/৪২৩-৪২৪)]
৩০১. ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, তারা (আহলুত তাজহীল) বলে, সিফাত বিষয়ক আয়াতসমূহ এমন কিছু ভাষ্য যা কিছু শব্দের সমষ্টি, যার অর্থ জানা যায় না। আমরা জানি না আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এর দ্বারা কী উদ্দেশ্য নিয়েছেন। তবে আমরা এগুলোকে শব্দ আকারে পড়বো, যার কোনো অর্থ নেই। আমরা এটা জানবো যে, এর একটা ব্যাখ্যা আছে যা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। যদি আমাদের কাছে এমন কোনো কিছু আসে আমরা সেটাকে কোনো প্রকার সাদৃশ্য কিংবা তুলনা হিসেবে বিশ্বাস করবো না। আমরা সেগুলোর অর্থ জানি না, কেউ যদি সেগুলোর কোনো ব্যাখ্যা করে তবে সেটার বিরোধিতা করবো, সেগুলোর জ্ঞান আল্লাহর কাছেই সোপর্দ করবো। [আস-সাওয়া’য়িকুল মুরসালাহ (২/৪২২)]
৩০২. যারা এখানে ওয়াক্বফ করেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন, ইবন ‘উমার, এক বর্ণনায় ইবন আব্বাস, আয়েশা, উরওয়াহ ইবনুয যুবাইর, ‘উমার ইবন আব্দুল আযীয, আবুশ শা’ছা, আবু নাহীক। আর এ মতই গ্রহণ করেছেন কিসাঈ, ফাররা, আখফাশ, আবু উবাইদ, আবু হাতেম, আসমা’ঈ ও সা’লাব। আর তা পছন্দ করেছেন ইবন জারীর, ইবন কুদামাহ, বাগাওয়ী, আব্দুল কাহের আল- বাগদাদী, শাওকানী ও শানকীত্বী।
৩০৩. অর্থাৎ তারা দু’টি ভুল করেছে: এক. বাক্যের অর্থ ও ব্যাখ্যার মধ্যে পার্থক্য করতে পারেনি। বাক্যের অর্থ জানা গেলেও বিস্তারিত ধরণ অনেক সময় জানা যায় না। এখানেও তারা ভুল করেছে। এসব সিফাতের আয়াতসমূহের অর্থ আরবী ভাষাতে একেবারেই সরল। এগুলোর অর্থ বুঝতে কোনো কষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই। আরবরা অহরহ এগুলো তাদের ভাষায় ব্যবহার করেছে। তাহলে অর্থ না জানার কিছু নেই। হ্যাঁ, অবশ্যই তাফসীর বা ধরণ বুঝা কঠিন। কারণ যার গুণ বর্ণনা করা হচ্ছে তাকে তো কেউ দেখেনি, তাই তার গুণের ধরণ বুঝা সহজ নয়। সেটাই হলো তাফসীর। এ তাফসীর, যা তা’ওয়ীল এর একটি অর্থ, সেটা আল্লাহর ওপর সোপর্দ করে অর্থ করতে পারতো, কিন্তু তারা সেটা না করে ভুল করেছে। দুই. কুরআনের আয়াতে এখানে যে তা’ওয়ীল একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা দ্বারা বুঝানো হয়েছে প্রকৃত অবস্থা বা আসল স্বরূপ। নিঃসন্দেহে সেটা একমাত্র আল্লাহ জানেন। এ তা’ওয়ীল এর অর্থ সেটা নয় যা পরবর্তী কালের লোকেরা তা’ওয়ীল শব্দের জন্য নির্ধারণ করেছে। তারা তা’ওয়ীল বলতে দূরবর্তী কোনো অর্থ বুঝে গিয়েছে যা কোনো কারণে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। এ অর্থটির অস্তিত্ব কুরআন, সুন্নাহ ও সালাফদের বক্তব্যে নেই। তাই তাদের এ ভুলটি হয়েছিল আয়াতে আসা তা’ওয়ীল শব্দটির অর্থ নির্ধারণে।
৩০৪. বস্তুত আল্লাহর কুরআন, রাসূলের হাদীস ও সাহাবায়ে কিরামের বক্তব্যে তা’ওয়ীল বলে দু’টি জিনিসকে বুঝানো হয়: এক. সাধারণভাবে কোনো কিছুর অর্থ বুঝা। দুই. প্রকৃত গুঢ় রহস্য বা তত্ত্ব লাভ করা। অপরাপর অর্থটি পরবর্তীদের পরিভাষা।
📄 তা’বীল এর বিবিধ অর্থ
কেননা তা’ওয়ীল শব্দটি তিনটি উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়:
টিকাঃ
৩০৫. তা’ওয়ীল শব্দটির আভিধানিক অর্থ, ১) পরিণাম ও সর্বশেষ অবস্থা, ২) পরিবর্তন ও পরিবর্তিত রূপ। ৩) ব্যাখ্যা। ৪) স্পষ্ট বর্ণনা। [দেখুন, তাহযীবুল লুগাহ, মু’জামু মাক্কায়ীসুল লুগাহ (১/১৫৯-১৬০), তাজুল ‘আরূস (৭/২১৬), ইবন মানযূর (লিসানুল আরব ১১/৩৩)। আর পরিভাষায় তা’ওয়ীল শব্দটি সম্পর্কে ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এটি বর্তমানে মুশতারাক শব্দে পরিণত হয়েছে। মুশতারাক শব্দ হচ্ছে এমন সব শব্দ যেগুলো একাধিক অর্থে সমভাবে ব্যবহৃত হয়, তখন স্থান-কাল-পাত্র ভেদে অর্থ নির্ধারিত হয়। এখানে তা’ওয়ীল শব্দটির কুরআনিক একটি অর্থ রয়েছে, সালাফে সালেহীন একটি অর্থে ব্যবহার করেছেন, আবার পরবর্তীরা আরেকটি অর্থে সেটাকে নিয়ে গেছে। যে কারণে এসব আয়াত যার কাছে যেভাবে পৌঁছেছে আর তার মাথায় তা’ওয়ীল শব্দের যে অর্থ ঘুরপাক খাচ্ছে সে সেটাকে উক্ত অর্থে ব্যবহার করে কুরআনে আসা তা’ওয়ীল শব্দের ব্যাখ্যা করেছে। [ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ’ ফাতাওয়া (১৩/২৮৪-২৮৬)] সংক্ষেপিত। আরও দেখুন, দারউত তা’আরুদ্ব [(৯/২৪); সাফাদিয়্যাহ (১/২৮৮)]।
৩০৬. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ অন্যত্র বলেন, তা’ওয়ীল শব্দটি সম্পর্কে মানুষ দু’ প্রান্তিক সীমানায় রয়েছে। এক, কেউ কেউ তার নিন্দায় গ্রন্থ রচনা করেছে। (যেমন কাযী আবু ইয়া’লা, ইবত্বালুত তা’ওয়ীলাত ফী আখবারিস সিফাত, অনুরূপ ইবন কুদামাহ, যামুত তা’ওয়ীল) দুই, অপর পক্ষ তা’ওয়ীল করার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করেছে, (যেমন, আবু বকর ইবনু ফুওরাক তার মুশকিলুল হাদীস ওয়া বায়ানিহী গ্রন্থে)। বরং তাদের মধ্যকার কেউ কেউ তা’ওয়ীল করা ওয়াজিবও বলেছে। তারপর ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এসে সেটার আসল অর্থ ও কখন তা গ্রহণযোগ্য হবে আর কখন হবে না, তা স্পষ্ট করে দেন। [দেখুন, মাজমূ’ ফাতাওয়া (১২/২৮৮), (৫/৩৪৯-৩৫০); দারউত তা’আরুদ্ব (৫/২৩৭); আত-তাদমুরিয়্যাহ, পৃ. ৮৯-]
কেননা তা’ওয়ীল শব্দটি তিনটি উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়:
টিকাঃ
৩০৫. তা’ওয়ীল শব্দটির আভিধানিক অর্থ, ১) পরিণাম ও সর্বশেষ অবস্থা, ২) পরিবর্তন ও পরিবর্তিত রূপ। ৩) ব্যাখ্যা। ৪) স্পষ্ট বর্ণনা। [দেখুন, তাহযীবুল লুগাহ, মু’জামু মাক্কায়ীসুল লুগাহ (১/১৫৯-১৬০), তাজুল ‘আরূস (৭/২১৬), ইবন মানযূর (লিসানুল আরব ১১/৩৩)। আর পরিভাষায় তা’ওয়ীল শব্দটি সম্পর্কে ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এটি বর্তমানে মুশতারাক শব্দে পরিণত হয়েছে। মুশতারাক শব্দ হচ্ছে এমন সব শব্দ যেগুলো একাধিক অর্থে সমভাবে ব্যবহৃত হয়, তখন স্থান-কাল-পাত্র ভেদে অর্থ নির্ধারিত হয়। এখানে তা’ওয়ীল শব্দটির কুরআনিক একটি অর্থ রয়েছে, সালাফে সালেহীন একটি অর্থে ব্যবহার করেছেন, আবার পরবর্তীরা আরেকটি অর্থে সেটাকে নিয়ে গেছে। যে কারণে এসব আয়াত যার কাছে যেভাবে পৌঁছেছে আর তার মাথায় তা’ওয়ীল শব্দের যে অর্থ ঘুরপাক খাচ্ছে সে সেটাকে উক্ত অর্থে ব্যবহার করে কুরআনে আসা তা’ওয়ীল শব্দের ব্যাখ্যা করেছে। [ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ’ ফাতাওয়া (১৩/২৮৪-২৮৬)] সংক্ষেপিত। আরও দেখুন, দারউত তা’আরুদ্ব [(৯/২৪); সাফাদিয়্যাহ (১/২৮৮)]।
৩০৬. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ অন্যত্র বলেন, তা’ওয়ীল শব্দটি সম্পর্কে মানুষ দু’ প্রান্তিক সীমানায় রয়েছে। এক, কেউ কেউ তার নিন্দায় গ্রন্থ রচনা করেছে। (যেমন কাযী আবু ইয়া’লা, ইবত্বালুত তা’ওয়ীলাত ফী আখবারিস সিফাত, অনুরূপ ইবন কুদামাহ, যামুত তা’ওয়ীল) দুই, অপর পক্ষ তা’ওয়ীল করার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করেছে, (যেমন, আবু বকর ইবনু ফুওরাক তার মুশকিলুল হাদীস ওয়া বায়ানিহী গ্রন্থে)। বরং তাদের মধ্যকার কেউ কেউ তা’ওয়ীল করা ওয়াজিবও বলেছে। তারপর ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এসে সেটার আসল অর্থ ও কখন তা গ্রহণযোগ্য হবে আর কখন হবে না, তা স্পষ্ট করে দেন। [দেখুন, মাজমূ’ ফাতাওয়া (১২/২৮৮), (৫/৩৪৯-৩৫০); দারউত তা’আরুদ্ব (৫/২৩৭); আত-তাদমুরিয়্যাহ, পৃ. ৮৯-]
📄 তা’বীল শব্দটি পরবর্তী লোকেদের পরিভাষায়
পরবর্তীদের অধিকাংশের পরিভাষায় তা’ওয়ীল হচ্ছে- কোনো শব্দের অর্থকে তার অপ্রাধান্যপ্রাপ্ত সম্ভাবনার দিকে সরিয়ে নেয়া, এমন দলীলের কারণে যা তার সাথে যুক্ত থাকে।
সুতরাং তাদের নিকট, যাহির শব্দের চাহিদা অনুযায়ী অর্থে ব্যবহৃত শব্দ তা’ওয়ীল নয়। তাদের ধারণা- তা’ওয়ীল শব্দ দ্বারা আল্লাহর উদ্দেশ্য এটাই। আর নস এর এমন তা’ওয়ীল রয়েছে যা তার মাদলুল (শব্দ দ্বারা বুঝা যায়) এর বিপরীত, যা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। তা’ওয়ীলকারীরাও জানে না অথবা তা’ওয়ীলকারীরা জানে।
আবার এদের অনেকের বক্তব্য, শব্দ তার যাহির বা প্রকাশ্য অর্থের ওপর প্রযোজ্য হবে। কাজেই তার যাহির উদ্দেশ্য হবে। অথচ তারা বলে: নিশ্চয় এর একটি তা’ওয়ীল আছে যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। নিঃসন্দেহে এটি পরস্পর বিরোধী কথা, যাতে সুন্নাহ’র সাথে সম্পৃক্ত চার ইমামের অনুসারী ও অন্যান্য অনেকেই পতিত হয়েছেন।
টিকাঃ
৩০৭. (এমন দলীলের কারণে বা তার সাথে যুক্ত থাকে), এ অংশটুকু থাকলে সেটা তা’ওয়ীলের গ্রহণযোগ্য পারিভাষিক অর্থ হতে পারে, যা উসূলবিদগণ ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, যারা আল্লাহর সিফাতের তা’ওয়ীল করে তারা এ অংশটুকু বা এ শর্তটুকু বেমালুম ভুলে যায়। তারা কেবল আক্বলী তথা বিবেকের যুক্তির শরণাপন্ন হয়ে সিফাতের আয়াতসমূহকে তার আসল প্রাধান্যপ্রাপ্ত অর্থ থেকে অপ্রাধান্যপ্রাপ্ত অর্থের দিকে নিয়ে যায়, যা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাই আমাদের কাছে স্পষ্ট হলো যে, পরবর্তী এ পরিভাষা কুরআন ও হাদীসে আসেনি। সুতরাং কুরআন ও হাদীসের শব্দে আসা তা’ওয়ীল হিসেবে এ অর্থ সর্বোতভাবে অগ্রহণযোগ্য।
৩০৮. এমন দলীল যাতে দু’টি অর্থ করার সুযোগ থাকে, একটি প্রকাশ্য অর্থ, আরেকটি দূরবর্তী অর্থ। প্রকাশ্য অর্থকে যাহের বলা হয়। আর অপ্রকাশ্য বা দূরবর্তী অর্থকে মুআওয়াল বলা হয়। এটি পরবর্তী লোকদের পরিভাষা।
৩০৯. যেমন ইস্তেওয়া শব্দের অর্থ ‘আলা ও ইরতাফা’আ বা স্বা’আদা, (উপরে উঠা, ঊর্ধ্বে উঠা, আরোহন করা) এদের নিকট তা’ওয়ীল নয়। অথচ এটা অ’ওয়ীল। এটার সারকথা হচ্ছে, শব্দ থেকে যা বুঝা যায় তা, সালাফে সালেহীনের নিকট তা’ওয়ীল বা সরল অর্থ (যা তাফসীর হিসেবে খ্যাত)। কিন্তু যারা পরবর্তীদের বুঝ অনুযায়ী তা’ওয়ীল করে আর যারা তাফওয়ীর করে তারা এটাকে তা’ওয়ীল মনে করে না।
৩১০. অর্থাৎ পূর্বে বর্ণিত তাদের বক্তব্য, যাতে বলা হয়েছে, তা’ওয়ীল হচ্ছে কোনো শব্দের অর্থকে তার অপ্রাধান্যপ্রাপ্ত সম্ভাবনার দিকে সরিয়ে নেয়া, এমন দলীলের কারণে যা তার সাথে যুক্ত থাকে। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তা’ওয়ীল বলতে ‘কোনো শব্দের অর্থকে তার অপ্রাধান্যপ্রাপ্ত সম্ভাবনার দিকে সরিয়ে নেয়া, এমন দলীলের কারণে যা তার সাথে যুক্ত থাকে অথবা পরবর্তী দলীলের ওপর ভিত্তি করে অথবা শুধু কোনো এক প্রকার দলীলের ওপর নির্ভর করে’ এ অর্থে ব্যবহার করা পরবর্তী লোকদের পরিভাষা। সালাফে সালেহীনের কারও শব্দে তা’ওয়ীল দ্বারা এ পারিভাষিক অর্থটি উদ্দেশ্য ছিল না। পরবর্তীতে এ অর্থটি এত বেশি প্রচার ও প্রসার পায় যে, তারা মনে করতে থাকে যে, কুরআনে কারীমে আসা তা’ওয়ীলকে এ অর্থেই গ্রহণ করতে হবে। তারা বলতে থাকে, "আর তার তা’ওয়ীল কেবল আল্লাহই জানেন" (সূরা আলে ইমরান: ০৭] এর অর্থ সেটাই যা তারা পরবর্তীতে পরিভাষা হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। তারপর তাদের একদল বলে উক্ত অর্থটি আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না, আরেক দল বলে উক্ত অর্থটি ইলমে দৃঢ় লোকেরা জানে। ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, নিঃসন্দেহে উভয় দলই ভুলের ওপর আছে। কারণ এটার কোনো বাস্তবতা নেই। বরং তা বাতিল। আল্লাহ ভালো করেই জানেন যে, এটা তাঁর উদ্দেশ্য না, আর তিনি তা উদ্দেশ্য নেননি। [মাজমূ’ ফাতাওয়া (৫/৩৪৯-৩৫০), শারহু হাদীসিন নুযূল]
৩১১. কুরআন ও সুন্নাহ’য় আসা সিফাত সংক্রান্ত নস বা ভাষ্যসমূহের এমন তা’ওয়ীল করতে হবে যাতে প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করার সুযোগ না থাকে। এটাকে তারা তা’ওয়ীল নাম দিয়েছে। এ কারণে তারা প্রতিটি সিফাত বিষয়ক আয়াত ও হাদীসের জন্য দূরবর্তী একটি অর্থ নির্ধারণ করে সেটা জানাকেই ইলম হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান সাব্যস্ত করে। আর যারা প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করে তাদের প্রতি কুফর এর সম্পৃক্ততা প্রদান করে।
৩১২. এতটুকুতে আহলুত তা’ওয়ীল ও আহলুত তাজহীল একমত। শেষ পর্যন্ত তারা এমন সব তা’ওয়ীল নামীয় অপব্যাখ্যার শরণাপন্ন হয় যা তাদেরকে কারামিত্বা, বাতেনী, জাহমীদের অপব্যাখ্যার দিকে নিয়ে যায়। [মাজমূ’ ফাতাওয়া]
৩১৩. এতটুকু কেবল আহলুত তাজহীলের মত। যদিও প্রকৃত অর্থে এটা আহলুত তা’ওয়ীলদেরও মত। কারণ তারাও প্রকাশ্য অর্থকে অগ্রহণযোগ্য মনে করে থাকে। তারা আরও মনে করে থাকে যে এগুলো মুতাশাবিহ। এগুলোর অর্থ কেবল আল্লাহ জানেন। আমরা যা করছি তা কেবল সাওয়াবের আশায় করছি।
৩১৪. আহলুত তাজহীল তথা তাফওয়ীদ্ব নীতির অনুসরণকারীদের দু’টি মত রয়েছে। তাদের একদল বলে তা’ওয়ীলকারীরা সে অর্থটি জানতে পারবে, অপর দলটি বলে তা’ওয়ীলকারীরাও তা জানতে পারে না।
৩১৫. তাদের এ স্ববিরোধিতার বিষয়টি ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ তার অনেক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। যেমন তিনি বলেন, ‘তারপর তাদের কেউ কেউ বলে, এর দ্বারা যা উদ্দেশ্য তা তার প্রকাশ্য অর্থ ও বুঝের বিপরীত। এর দ্বারা কী উদ্দেশ্য তা কোনো নবী, ফিরিশতা কিংবা সাহাবী কিংবা কোনো আলেম জানতে পারেন না। যেমন তারা জানে না, কিয়ামত কবে হবে। তাদের আরেক দল বলে, বরং এগুলোকে তার প্রকাশ্য অবস্থার ওপর নেয়া হবে, প্রকাশ্য রূপে বহন করা হবে, তবে আল্লাহ ব্যতীত কেউ তার তা’ওয়ীল জানে না। এভাবে তারা স্ববিরোধিতায় লিপ্ত হয়, কারণ তারা এগুলোর এমন একটি তা’ওয়ীল সাব্যস্ত করছে যা তার প্রকাশ্য অর্থের বিরোধী, তারপরও বলছে যে, এগুলোকে প্রকাশ্য অর্থে নেয়া হবে। [দারউত তাআরুদ্ব (১/১৬), (৫/৩৮১)]
ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, "... অতঃপর এরা মারাত্মক নিকৃষ্ট ধরনের স্ববিরোধিতায় লিপ্ত হলো, যখন তারা বললো, এগুলোকে তার প্রকাশ্য অর্থে নেয়া হবে, তারপর বললো, এর তা’ওয়ীল যা প্রকাশ্য রূপের বিপরীত হবে তা বাতিল, তা সত্ত্বেও এর তা’ওয়ীল আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ জানে না। কীভাবে তারা এর তা’ওয়ীল সাব্যস্ত করছে আর বলছে সেটাকে প্রকাশ্য অর্থেই নিতে হবে, আরও বলছে, সেটার প্রকাশ্য অর্থ উদ্দেশ্য নয়, কেবল রব্ব সুবহানাহু ওয়া তা’আলাই সেটার তা’ওয়ীল জানেন। স্ববিরোধিতার নযীর হিসেবে এটা কি নিকৃষ্ট নয়? বস্তুত তারা তিন জায়গায় ভুল করেছে, মুতাশাবিহ নির্ধারণে, এ সিফাতের আয়াতগুলোকে মুতাশাবিহ এর অন্তর্ভুক্ত করার মধ্যে আর মুতাশাবিহ এর অর্থ একমাত্র আল্লাহই জানেন বলার মধ্যে।" (দেখুন, আস-সাওয়া’য়িকুল মুরসালাহ (২/৪২৩-৪২৪)]
পরবর্তীদের অধিকাংশের পরিভাষায় তা’ওয়ীল হচ্ছে- কোনো শব্দের অর্থকে তার অপ্রাধান্যপ্রাপ্ত সম্ভাবনার দিকে সরিয়ে নেয়া, এমন দলীলের কারণে যা তার সাথে যুক্ত থাকে।
সুতরাং তাদের নিকট, যাহির শব্দের চাহিদা অনুযায়ী অর্থে ব্যবহৃত শব্দ তা’ওয়ীল নয়। তাদের ধারণা- তা’ওয়ীল শব্দ দ্বারা আল্লাহর উদ্দেশ্য এটাই। আর নস এর এমন তা’ওয়ীল রয়েছে যা তার মাদলুল (শব্দ দ্বারা বুঝা যায়) এর বিপরীত, যা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। তা’ওয়ীলকারীরাও জানে না অথবা তা’ওয়ীলকারীরা জানে।
আবার এদের অনেকের বক্তব্য, শব্দ তার যাহির বা প্রকাশ্য অর্থের ওপর প্রযোজ্য হবে। কাজেই তার যাহির উদ্দেশ্য হবে। অথচ তারা বলে: নিশ্চয় এর একটি তা’ওয়ীল আছে যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। নিঃসন্দেহে এটি পরস্পর বিরোধী কথা, যাতে সুন্নাহ’র সাথে সম্পৃক্ত চার ইমামের অনুসারী ও অন্যান্য অনেকেই পতিত হয়েছেন।
টিকাঃ
৩০৭. (এমন দলীলের কারণে বা তার সাথে যুক্ত থাকে), এ অংশটুকু থাকলে সেটা তা’ওয়ীলের গ্রহণযোগ্য পারিভাষিক অর্থ হতে পারে, যা উসূলবিদগণ ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, যারা আল্লাহর সিফাতের তা’ওয়ীল করে তারা এ অংশটুকু বা এ শর্তটুকু বেমালুম ভুলে যায়। তারা কেবল আক্বলী তথা বিবেকের যুক্তির শরণাপন্ন হয়ে সিফাতের আয়াতসমূহকে তার আসল প্রাধান্যপ্রাপ্ত অর্থ থেকে অপ্রাধান্যপ্রাপ্ত অর্থের দিকে নিয়ে যায়, যা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাই আমাদের কাছে স্পষ্ট হলো যে, পরবর্তী এ পরিভাষা কুরআন ও হাদীসে আসেনি। সুতরাং কুরআন ও হাদীসের শব্দে আসা তা’ওয়ীল হিসেবে এ অর্থ সর্বোতভাবে অগ্রহণযোগ্য।
৩০৮. এমন দলীল যাতে দু’টি অর্থ করার সুযোগ থাকে, একটি প্রকাশ্য অর্থ, আরেকটি দূরবর্তী অর্থ। প্রকাশ্য অর্থকে যাহের বলা হয়। আর অপ্রকাশ্য বা দূরবর্তী অর্থকে মুআওয়াল বলা হয়। এটি পরবর্তী লোকদের পরিভাষা।
৩০৯. যেমন ইস্তেওয়া শব্দের অর্থ ‘আলা ও ইরতাফা’আ বা স্বা’আদা, (উপরে উঠা, ঊর্ধ্বে উঠা, আরোহন করা) এদের নিকট তা’ওয়ীল নয়। অথচ এটা অ’ওয়ীল। এটার সারকথা হচ্ছে, শব্দ থেকে যা বুঝা যায় তা, সালাফে সালেহীনের নিকট তা’ওয়ীল বা সরল অর্থ (যা তাফসীর হিসেবে খ্যাত)। কিন্তু যারা পরবর্তীদের বুঝ অনুযায়ী তা’ওয়ীল করে আর যারা তাফওয়ীর করে তারা এটাকে তা’ওয়ীল মনে করে না।
৩১০. অর্থাৎ পূর্বে বর্ণিত তাদের বক্তব্য, যাতে বলা হয়েছে, তা’ওয়ীল হচ্ছে কোনো শব্দের অর্থকে তার অপ্রাধান্যপ্রাপ্ত সম্ভাবনার দিকে সরিয়ে নেয়া, এমন দলীলের কারণে যা তার সাথে যুক্ত থাকে। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তা’ওয়ীল বলতে ‘কোনো শব্দের অর্থকে তার অপ্রাধান্যপ্রাপ্ত সম্ভাবনার দিকে সরিয়ে নেয়া, এমন দলীলের কারণে যা তার সাথে যুক্ত থাকে অথবা পরবর্তী দলীলের ওপর ভিত্তি করে অথবা শুধু কোনো এক প্রকার দলীলের ওপর নির্ভর করে’ এ অর্থে ব্যবহার করা পরবর্তী লোকদের পরিভাষা। সালাফে সালেহীনের কারও শব্দে তা’ওয়ীল দ্বারা এ পারিভাষিক অর্থটি উদ্দেশ্য ছিল না। পরবর্তীতে এ অর্থটি এত বেশি প্রচার ও প্রসার পায় যে, তারা মনে করতে থাকে যে, কুরআনে কারীমে আসা তা’ওয়ীলকে এ অর্থেই গ্রহণ করতে হবে। তারা বলতে থাকে, "আর তার তা’ওয়ীল কেবল আল্লাহই জানেন" (সূরা আলে ইমরান: ০৭] এর অর্থ সেটাই যা তারা পরবর্তীতে পরিভাষা হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। তারপর তাদের একদল বলে উক্ত অর্থটি আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না, আরেক দল বলে উক্ত অর্থটি ইলমে দৃঢ় লোকেরা জানে। ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, নিঃসন্দেহে উভয় দলই ভুলের ওপর আছে। কারণ এটার কোনো বাস্তবতা নেই। বরং তা বাতিল। আল্লাহ ভালো করেই জানেন যে, এটা তাঁর উদ্দেশ্য না, আর তিনি তা উদ্দেশ্য নেননি। [মাজমূ’ ফাতাওয়া (৫/৩৪৯-৩৫০), শারহু হাদীসিন নুযূল]
৩১১. কুরআন ও সুন্নাহ’য় আসা সিফাত সংক্রান্ত নস বা ভাষ্যসমূহের এমন তা’ওয়ীল করতে হবে যাতে প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করার সুযোগ না থাকে। এটাকে তারা তা’ওয়ীল নাম দিয়েছে। এ কারণে তারা প্রতিটি সিফাত বিষয়ক আয়াত ও হাদীসের জন্য দূরবর্তী একটি অর্থ নির্ধারণ করে সেটা জানাকেই ইলম হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান সাব্যস্ত করে। আর যারা প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করে তাদের প্রতি কুফর এর সম্পৃক্ততা প্রদান করে।
৩১২. এতটুকুতে আহলুত তা’ওয়ীল ও আহলুত তাজহীল একমত। শেষ পর্যন্ত তারা এমন সব তা’ওয়ীল নামীয় অপব্যাখ্যার শরণাপন্ন হয় যা তাদেরকে কারামিত্বা, বাতেনী, জাহমীদের অপব্যাখ্যার দিকে নিয়ে যায়। [মাজমূ’ ফাতাওয়া]
৩১৩. এতটুকু কেবল আহলুত তাজহীলের মত। যদিও প্রকৃত অর্থে এটা আহলুত তা’ওয়ীলদেরও মত। কারণ তারাও প্রকাশ্য অর্থকে অগ্রহণযোগ্য মনে করে থাকে। তারা আরও মনে করে থাকে যে এগুলো মুতাশাবিহ। এগুলোর অর্থ কেবল আল্লাহ জানেন। আমরা যা করছি তা কেবল সাওয়াবের আশায় করছি।
৩১৪. আহলুত তাজহীল তথা তাফওয়ীদ্ব নীতির অনুসরণকারীদের দু’টি মত রয়েছে। তাদের একদল বলে তা’ওয়ীলকারীরা সে অর্থটি জানতে পারবে, অপর দলটি বলে তা’ওয়ীলকারীরাও তা জানতে পারে না।
৩১৫. তাদের এ স্ববিরোধিতার বিষয়টি ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ তার অনেক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। যেমন তিনি বলেন, ‘তারপর তাদের কেউ কেউ বলে, এর দ্বারা যা উদ্দেশ্য তা তার প্রকাশ্য অর্থ ও বুঝের বিপরীত। এর দ্বারা কী উদ্দেশ্য তা কোনো নবী, ফিরিশতা কিংবা সাহাবী কিংবা কোনো আলেম জানতে পারেন না। যেমন তারা জানে না, কিয়ামত কবে হবে। তাদের আরেক দল বলে, বরং এগুলোকে তার প্রকাশ্য অবস্থার ওপর নেয়া হবে, প্রকাশ্য রূপে বহন করা হবে, তবে আল্লাহ ব্যতীত কেউ তার তা’ওয়ীল জানে না। এভাবে তারা স্ববিরোধিতায় লিপ্ত হয়, কারণ তারা এগুলোর এমন একটি তা’ওয়ীল সাব্যস্ত করছে যা তার প্রকাশ্য অর্থের বিরোধী, তারপরও বলছে যে, এগুলোকে প্রকাশ্য অর্থে নেয়া হবে। [দারউত তাআরুদ্ব (১/১৬), (৫/৩৮১)]
ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, "... অতঃপর এরা মারাত্মক নিকৃষ্ট ধরনের স্ববিরোধিতায় লিপ্ত হলো, যখন তারা বললো, এগুলোকে তার প্রকাশ্য অর্থে নেয়া হবে, তারপর বললো, এর তা’ওয়ীল যা প্রকাশ্য রূপের বিপরীত হবে তা বাতিল, তা সত্ত্বেও এর তা’ওয়ীল আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ জানে না। কীভাবে তারা এর তা’ওয়ীল সাব্যস্ত করছে আর বলছে সেটাকে প্রকাশ্য অর্থেই নিতে হবে, আরও বলছে, সেটার প্রকাশ্য অর্থ উদ্দেশ্য নয়, কেবল রব্ব সুবহানাহু ওয়া তা’আলাই সেটার তা’ওয়ীল জানেন। স্ববিরোধিতার নযীর হিসেবে এটা কি নিকৃষ্ট নয়? বস্তুত তারা তিন জায়গায় ভুল করেছে, মুতাশাবিহ নির্ধারণে, এ সিফাতের আয়াতগুলোকে মুতাশাবিহ এর অন্তর্ভুক্ত করার মধ্যে আর মুতাশাবিহ এর অর্থ একমাত্র আল্লাহই জানেন বলার মধ্যে।" (দেখুন, আস-সাওয়া’য়িকুল মুরসালাহ (২/৪২৩-৪২৪)]