📄 সালাফে সালেহীনের পথ থেকে বক্রপথে অবস্থানকারীদের শ্রেণিবিভাগ
আর যারা সালাফদের পথ থেকে বিচ্যুত তারা তিন গ্রুপ: (১) নবী-রাসূলদের আনীত বিষয়গুলোতে বিস্তর কল্পনার অপবাদ প্রদানকারী, (২) নবী-রাসূলদের আনীত বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে তা’ওয়ীল তথা অপব্যাখ্যার নীতি অনুসারী, এবং (৩) নবী-রাসূলদের আনীত বিষয়গুলোর ব্যাপারে অজ্ঞতার নীতি অনুসারী।
[প্রথম গোষ্ঠী: নবী-রাসূলদের আনীত বিষয়গুলোতে বিস্তর কল্পনার অপবাদ প্রদানকারী] নবী রাসূলগণ কর্তৃক আনীত বিষয়গুলোর ব্যাপারে নবী রাসূলগণের ওপর বিস্তর কল্পনার অপবাদ প্রদানকারীরা হচ্ছে- দার্শনিক সম্প্রদায় এবং তাদের পথে কালামপন্থী ও তথাকথিত ফকীহরা যারা বলে, নিশ্চয় আল্লাহ ও শেষ দিনের ওপর ঈমানের বিষয়ে রাসূল যা উল্লেখ করেছেন তা দ্বারা উদ্দেশ্য কেবল প্রকৃত অবস্থার একটি কাল্পনিক রূপ প্রদান করা; যাতে তা দ্বারা সাধারণ জনগণ উপকার লাভ করেন। এটা নয় যে, তা দ্বারা তিনি সত্যকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন বা সৃষ্টিকে পথ দেখিয়েছেন বা হাকীকতকে ফুটিয়ে তুলেছেন। এরা আবার দুই ভাগে বিভক্ত:
• কেউ কেউ বলে, রাসূল হাকীকতকে তার আসলরূপে জানতেন না, বরং কিছু ইলাহী দার্শনিক আছে যারা সেটা জানে। তেমনি জানে এমন কিছু লোকও যাদেরকে তারা আউলিয়া নামে আখ্যায়িত করেছে। তারা মনে করে, দার্শনিক ও আউলিয়াদের কেউ কেউ আল্লাহ ও শেষ দিন সম্বন্ধে রাসূলদের থেকে বেশি অবগত। এটি হচ্ছে ঘোর নাস্তিক টাইপের দার্শনিক ও বাতেনী ফির্কার মতবাদ। যে বাতেনীগুলোর কেউ শীয়া বাতেনীয়া সম্প্রদায়ের আর কেউ সূফী বাতেনীয়া সম্প্রদায়ের। • আবার তাদের কেউ কেউ বলেন, বরং রাসূল সেটা জানতেন কিন্তু বর্ণনা করেননি। বরং বলেছেন তার বিপরীত কথা। আর তিনি চেয়েছেন মানুষ যেন হক্ক (সত্যের) বিপরীতটিই বুঝে; কারণ হকের বিপরীতে থাকার মধ্যে সৃষ্টিকুলের জন্য কল্যাণ ও স্বার্থ রয়েছে।
এরা আরও বলে, রাসূলের ওপর আবশ্যক হচ্ছে মানুষকে তাজসীম (দেহ সাব্যস্ত করা)-র বিশ্বাসের দিকে আহ্বান করা, যদিও সেটা বাতিল। তেমনি এটা বিশ্বাস করতে মানুষদেরকে জানাবেন যে, শরীরসহ পুনরুত্থান হবে, যদিও তা বাতিল। অনুরূপ এটা বিশ্বাস করতে যে, জান্নাতীরা খাওয়া-দাওয়া করবে যদিও তা বাতিল। তারা বলে: কেননা এই পদ্ধতিতে ছাড়া অন্য কোনোভাবে সৃষ্টিকে দাওয়াত দেয়া সম্ভব নয়, এটা মিথ্যা তবে বান্দাদের স্বার্থে। এ হচ্ছে আল্লাহ ও আখেরাতের ওপর ঈমানের বিষয়ে আগত নসসমূহের ব্যাপারে তাদের বক্তব্য।
আর আমল বা কর্মের ক্ষেত্রে: তাদের কেউ কেউ সেটা বাস্তব অর্থে স্বীকার করে, আবার কেউ কেউ উপরের মতো এক্ষেত্রেও বলে যে, আমলের জন্য সাধারণ শ্রেণি আদিষ্ট, বিশেষ শ্রেণি নয়। এটাই হচ্ছে দীনদ্রোহী বাতেনি ফিরকাহ, ইসমাঈলিয়্যাহ ও তাদের মতো লোকদের মতাদর্শ।
টিকাঃ
২৬৯. যদি এসব গ্রুপের লোকেরা সাক্ষ্য দিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলের চেয়ে বড় জ্ঞানী, সবচেয়ে বড় কল্যাণকামী, সবচেয়ে বড় স্পষ্টভাষী বর্ণনাকারী, তাহলে তারা এসব ধ্যান- ধারণা কিংবা বিকৃতি কিংবা মূর্খতার দলে যোগ দিত না।
২৭০. ইবনুল কাইয়্যেম আল্লাহর সিফাত বিষয়ে মানুষদেরকে বিস্তারিত পাঁচভাবে বিভক্ত করেছেন: ১- তা’ওয়ীল পদ্ধতির অনুসারী। ২- কল্পনাকারী অপবাদ প্রদানকারীদের অনুসারী। ৩- মূর্খতার অপবাদ প্রদানকারী সম্প্রদায়। ৪- তাশবীহ ও তামসীল বা সাদৃশ্য ও উদাহরণ প্রদানকারী সম্প্রদায় ৫- সঠিক পথের অনুসারী সম্প্রদায়। বিস্তারিত দেখুন আস-সাওয়া’য়িকুল মুরসালাহ (২/৪১৮)।
২৭১. ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, তারা হচ্ছে ঐ সম্প্রদায়, যারা বিশ্বাস করে যে, রাসূলগণ সৃষ্টির মাঝে কখনও হক্ক কথা প্রকাশ করেননি। কারণ সেটা প্রাপ্ত হওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। তাদের কাছে এ ব্যাপারে এক প্রকার কল্পনা ভর করছিল, তারা সে কল্পনাকে বাহিক্য জিনিসে ব্যক্ত করেছিলেন মাত্র। [আস-সাওয়া’য়িকুল মুরসালাহ (২/৪১৮-৪১৯)] ইবনুল তাইমিয়্যাহ বলেন, ইবন সীনা ও তার মত কিছু দার্শনিক এ ধরনের কথা দিয়ে তাদের মূলনীতি দাঁড় করিয়েছে, যেমন ইবন সীনা তার আর-রিসালাতুল উদ্বহুওয়িয়্যাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। [দারউত তা’আরুদ্ব (১/১)]
২৭২. ক্বারামিত্বা ও দার্শনিকদের মত হচ্ছে, রাসূলগণ এসব বিষয় জানতেন না। তারা বলে নবীর চেয়ে দার্শনিক ভালো জানে। নবীর কাজই হচ্ছে মানুষদেরকে নিজের কল্পনার জগতে নিয়ে যাওয়া। তাদের নিকট নবুওয়াত সাধারণ মানুষের জন্য শ্রেষ্ঠ হতে পারে, তবে সেটা জ্ঞানী-গুণী ও মারেফাতের দাবীদারদের নিকট নয়। ফারাবী ও তার মত যারা আছে যেমন, মুবাশ্বির ইবন ফাতিক ও তার মত ইসমা’ঈলী সম্পদ্রয়ায়ের লোকেরা বলে থাকে। [ফাতাওয়া (৪/৯৮-৯৯), (১৯/১৫৬)]
২৭৩. বাতেনী ফির্কা বলা হয় এজন্য যে, তারা মনে করে কুরআন ও সুন্নাহ’র ভাষ্যের একটি গোপন অর্থ রয়েছে যা প্রকাশ্য অর্থের বিপরীত। বাতেনীদের মধ্যে যারা অত্যন্ত ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত তারা হচ্ছে, কারামিতা, যাদেরকে সীমালঙ্ঘনকারী শিয়াদের মধ্যে গণ্য করা হয়। শাহরাস্তানী বলেন, তাদের যেসব উপাধী রয়েছে তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, বাতেনিয়্যা, কারামিত্বা, মুযদাকিয়্যাহ। তাদের নেতারা তাদের কিছু বক্তব্যকে দার্শনিকদের বক্তব্যের সাথে মিশিয়ে দিয়েছে। [আল-মিলাল ওয়ান নিহাল (১/২২৮)]
২৭৪. সূফী বলা হয়, কারণ তারা সূফ পরিধান করত। সূফ মানে পশমের মোটা কাপড়। প্রাথমিক দিকে যারা দুনিয়াবিমুখ হতো, বেশি ইবাদত করতো তাদেরকে সূফী বলা হতো। তবে সেটা প্রথম তিন উত্তম যুগে প্রসিদ্ধ ছিল না। বিষয়টি প্রথমে পরহেযগারী ও তাকওয়ার চর্চাতে থাকলেও কালক্রমে সেটি বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘনে রূপ নেয়। এমনকি তাদের অনেকেই দীনের গণ্ডী থেকে বের হয়ে যায়। পরবর্তীতে তারাই নতুন করে কুরআন ও হাদীসের গোপন ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছিল। তাদের বিখ্যাত বাড়াবাড়িকারী লোকদের মধ্যে রয়েছে, ইবন আরাবী, হাল্লাজ, ইবন সাব’ঈন ও অন্যান্যরা। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ’ ফাতাওয়া (১১/৫)।
২৭৫. ইবন তাইমিয়্যাহ স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন যে, এ মতটি মৌলিকভাবে কিছু দার্শনিক ও বাতেনী ফির্কার লোকদের। যেমন, ইসমা’ঈলী সম্প্রদায়ের নাস্তিকদের, ইখওয়ানুস সাফার রাসায়িল লিখকদের, ফারাবীর, ইবন সীনার, হত্যাকৃত সোহরাওয়ার্দীর, ইবন রুশদ আল-হাফীদের। অনুরূপভাবে তা সেসব সুফী মুলহিদদের মতও, যারা তাদের তাসাউফের পূর্বসূরী কুরআন ও সুন্নাহ’র অনুসারী শাইখদের মত থেকে বের হয়ে গেছে। যেমন ইবন আরাবী, ইবন সাব’ঈন, ইবনুত তুফাইল; যে ব্যক্তি হাই ইবন ইয়াক্কযান এর রিসালা লিখেছিল। [দারউত তা’আরুদ্ব (১/১০- ১১)]
এরা মনে করে কল্পনার বিষয়টি রাসূলের বক্তব্যে, তবে ইলমে নয়। [ফাতাওয়া (১৯/১৫৬)] ইবন তাইমিয়্যাহ আরও বলেন, এরা চেয়েছিল রাসূল মিথ্যা বলবেন স্বার্থের জন্য এমনটি বলতে, বিনা স্বার্থে বলবেন না এমনটি বলতে, কিন্তু তারা এর মাধ্যমে মারাত্মক খারাপ কর্মে লিপ্ত হয়েছে; কারণ তাদের কথার অর্থ হচ্ছে রাসূল মানুষদেরকে সংশয়ে নিক্ষেপ করেছেন, অন্ধকারে রেখেছেন, সৃষ্টিকে ভ্রষ্ট করেছেন, বরং বাতিল প্রকাশ করেছেন আর হক্ক গোপন করেছেন। (নাউযুবিল্লাহ) দেখুন, মাজমু’ ফাতাওয়া (৪/৯৮), (১৯/১৫৭); দারউত তা’আরুদ্ব (৫/৬০-৭৩)।
২৭৬. এ নীতিটি অবলম্বন করেছে ইবন সীনা, ইবন রুশদ আল-হাফীদ। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ইবন রুশদ বাতেনী ফির্কার লোকদের অন্তর্ভুক্ত, যারা মনে করে প্রকাশ্য শরী’আতের বাতেনী একটি ব্যাখ্যা রয়েছে যা যাহেরী শরী’আতের বিরোধী। দেখুন, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (২/১৬৬)।
২৭৭. অর্থাৎ প্রকাশ্য আমল যেমন সালাত, সাওম, হজ, যাকাত, সৎকাজ, সালাম, দো’আ, যিকির ইত্যাদি।
📄 প্রথম গোত্র: নবী-রাসূলদের আনীত বিষয়গুলোতে বিশুদ্ধ কল্পনার অপবাদ প্রদানকারী
নবী রাসূলগণ কর্তৃক আনীত বিষয়গুলোর ব্যাপারে নবী রাসূলগণের ওপর বিস্তর কল্পনার অপবাদ প্রদানকারীরা হচ্ছে- দার্শনিক সম্প্রদায় এবং তাদের পথে কালামপন্থী ও তথাকথিত ফকীহরা যারা বলে, নিশ্চয় আল্লাহ ও শেষ দিনের ওপর ঈমানের বিষয়ে রাসূল যা উল্লেখ করেছেন তা দ্বারা উদ্দেশ্য কেবল প্রকৃত অবস্থার একটি কাল্পনিক রূপ প্রদান করা; যাতে তা দ্বারা সাধারণ জনগণ উপকার লাভ করেন। এটা নয় যে, তা দ্বারা তিনি সত্যকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন বা সৃষ্টিকে পথ দেখিয়েছেন বা হাকীকতকে ফুটিয়ে তুলেছেন। এরা আবার দুই ভাগে বিভক্ত:
• কেউ কেউ বলে, রাসূল হাকীকতকে তার আসলরূপে জানতেন না, বরং কিছু ইলাহী দার্শনিক আছে যারা সেটা জানে। তেমনি জানে এমন কিছু লোকও যাদেরকে তারা আউলিয়া নামে আখ্যায়িত করেছে। তারা মনে করে, দার্শনিক ও আউলিয়াদের কেউ কেউ আল্লাহ ও শেষ দিন সম্বন্ধে রাসূলদের থেকে বেশি অবগত। এটি হচ্ছে ঘোর নাস্তিক টাইপের দার্শনিক ও বাতেনী ফির্কার মতবাদ। যে বাতেনীগুলোর কেউ শীয়া বাতেনীয়া সম্প্রদায়ের আর কেউ সূফী বাতেনীয়া সম্প্রদায়ের। • আবার তাদের কেউ কেউ বলেন, বরং রাসূল সেটা জানতেন কিন্তু বর্ণনা করেননি। বরং বলেছেন তার বিপরীত কথা। আর তিনি চেয়েছেন মানুষ যেন হক্ক (সত্যের) বিপরীতটিই বুঝে; কারণ হকের বিপরীতে থাকার মধ্যে সৃষ্টিকুলের জন্য কল্যাণ ও স্বার্থ রয়েছে।
এরা আরও বলে, রাসূলের ওপর আবশ্যক হচ্ছে মানুষকে তাজসীম (দেহ সাব্যস্ত করা)-র বিশ্বাসের দিকে আহ্বান করা, যদিও সেটা বাতিল। তেমনি এটা বিশ্বাস করতে মানুষদেরকে জানাবেন যে, শরীরসহ পুনরুত্থان হবে, যদিও তা বাতিল। অনুরূপ এটা বিশ্বাস করতে যে, জান্নাতীরা খাওয়া-দাওয়া করবে যদিও তা বাতিল। তারা বলে: কেননা এই পদ্ধতিতে ছাড়া অন্য কোনোভাবে সৃষ্টিকে দাওয়াত দেয়া সম্ভব নয়, এটা মিথ্যা তবে বান্দাদের স্বার্থে। এ হচ্ছে আল্লাহ ও আখেরাতের ওপর ঈমানের বিষয়ে আগত নসসমূহের ব্যাপারে তাদের বক্তব্য।
আর আমল বা কর্মের ক্ষেত্রে: তাদের কেউ কেউ সেটা বাস্তব অর্থে স্বীকার করে, আবার কেউ কেউ উপরের মতো এক্ষেত্রেও বলে যে, আমলের জন্য সাধারণ শ্রেণি আদিষ্ট, বিশেষ শ্রেণি নয়। এটাই হচ্ছে দীনদ্রোহী বাতেনি ফিরকাহ, ইসমাঈলিয়্যাহ ও তাদের মতো লোকদের মতাদর্শ।
টিকাঃ
২৬৯. যদি এসব গ্রুপের লোকেরা সাক্ষ্য দিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলের চেয়ে বড় জ্ঞানী, সবচেয়ে বড় কল্যাণকামী, সবচেয়ে বড় স্পষ্টভাষী বর্ণনাকারী, তাহলে তারা এসব ধ্যান- ধারণা কিংবা বিকৃতি কিংবা মূর্খতার দলে যোগ দিত না।
২৭০. ইবনুল কাইয়্যেম আল্লাহর সিফাত বিষয়ে মানুষদেরকে বিস্তারিত পাঁচভাবে বিভক্ত করেছেন: ১- তা’ওয়ীল পদ্ধতির অনুসারী। ২- কল্পনাকারী অপবাদ প্রদানকারীদের অনুসারী। ৩- মূর্খতার অপবাদ প্রদানকারী সম্প্রদায়। ৪- তাশবীহ ও তামসীল বা সাদৃশ্য ও উদাহরণ প্রদানকারী সম্প্রদায় ৫- সঠিক পথের অনুসারী সম্প্রদায়। বিস্তারিত দেখুন আস-সাওয়া’য়িকুল মুরসালাহ (২/৪১৮)।
২৭১. ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, তারা হচ্ছে ঐ সম্প্রদায়, যারা বিশ্বাস করে যে, রাসূলগণ সৃষ্টির মাঝে কখনও হক্ক কথা প্রকাশ করেননি। কারণ সেটা প্রাপ্ত হওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। তাদের কাছে এ ব্যাপারে এক প্রকার কল্পনা ভর করছিল, তারা সে কল্পনাকে বাহিক্য জিনিসে ব্যক্ত করেছিলেন মাত্র। [আস-সাওয়া’য়িকুল মুরসালাহ (২/৪১৮-৪১৯)] ইবনুল তাইমিয়্যাহ বলেন, ইবন সীনা ও তার মত কিছু দার্শনিক এ ধরনের কথা দিয়ে তাদের মূলনীতি দাঁড় করিয়েছে, যেমন ইবন সীনা তার আর-রিসালাতুল উদ্বহুওয়িয়্যাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। [দারউত তা’আরুদ্ব (১/১)]
২৭২. ক্বারামিত্বা ও দার্শনিকদের মত হচ্ছে, রাসূলগণ এসব বিষয় জানতেন না। তারা বলে নবীর চেয়ে দার্শনিক ভালো জানে। নবীর কাজই হচ্ছে মানুষদেরকে নিজের কল্পনার জগতে নিয়ে যাওয়া। তাদের নিকট নবুওয়াত সাধারণ মানুষের জন্য শ্রেষ্ঠ হতে পারে, তবে সেটা জ্ঞানী-গুণী ও মারেফাতের দাবীদারদের নিকট নয়। ফারাবী ও তার মত যারা আছে যেমন, মুবাশ্বির ইবন ফাতিক ও তার মত ইসমা’ঈলী সম্পদ্রয়ায়ের লোকেরা বলে থাকে। [ফাতাওয়া (৪/৯৮-৯৯), (১৯/১৫৬)]
২৭৩. বাতেনী ফির্কা বলা হয় এজন্য যে, তারা মনে করে কুরআন ও সুন্নাহ’র ভাষ্যের একটি গোপন অর্থ রয়েছে যা প্রকাশ্য অর্থের বিপরীত। বাতেনীদের মধ্যে যারা অত্যন্ত ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত তারা হচ্ছে, কারামিতা, যাদেরকে সীমালঙ্ঘনকারী শিয়াদের মধ্যে গণ্য করা হয়। শাহরাস্তানী বলেন, তাদের যেসব উপাধী রয়েছে তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, বাতেনিয়্যা, কারামিত্বা, মুযদাকিয়্যাহ। তাদের নেতারা তাদের কিছু বক্তব্যকে দার্শনিকদের বক্তব্যের সাথে মিশিয়ে দিয়েছে। [আল-মিলাল ওয়ান নিহাল (১/২২৮)]
২৭৪. সূফী বলা হয়, কারণ তারা সূফ পরিধান করত। সূফ মানে পশমের মোটা কাপড়। প্রাথমিক দিকে যারা দুনিয়াবিমুখ হতো, বেশি ইবাদত করতো তাদেরকে সূফী বলা হতো। তবে সেটা প্রথম তিন উত্তম যুগে প্রসিদ্ধ ছিল না। বিষয়টি প্রথমে পরহেযগারী ও তাকওয়ার চর্চাতে থাকলেও কালক্রমে সেটি বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘনে রূপ নেয়। এমনকি তাদের অনেকেই দীনের গণ্ডী থেকে বের হয়ে যায়। পরবর্তীতে তারাই নতুন করে কুরআন ও হাদীসের গোপন ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছিল। তাদের বিখ্যাত বাড়াবাড়িকারী লোকদের মধ্যে রয়েছে, ইবন আরাবী, হাল্লাজ, ইবন সাব’ঈন ও অন্যান্যরা। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ’ ফাতাওয়া (১১/৫)।
২৭৫. ইবন তাইমিয়্যাহ স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন যে, এ মতটি মৌলিকভাবে কিছু দার্শনিক ও বাতেনী ফির্কার লোকদের। যেমন, ইসমা’ঈলী সম্প্রদায়ের নাস্তিকদের, ইখওয়ানুস সাফার রাসায়িল লিখকদের, ফারাবীর, ইবন সীনার, হত্যাকৃত সোহরাওয়ার্দীর, ইবন রুশদ আল-হাফীদের। অনুরূপভাবে তা সেসব সুফী মুলহিদদের মতও, যারা তাদের তাসাউফের পূর্বসূরী কুরআন ও সুন্নাহ’র অনুসারী শাইখদের মত থেকে বের হয়ে গেছে। যেমন ইবন আরাবী, ইবন সাব’ঈন, ইবনুত তুফাইল; যে ব্যক্তি হাই ইবন ইয়াক্কযান এর রিসালা লিখেছিল। [দারউত তা’আরুদ্ব (১/১০- ১১)]
এরা মনে করে কল্পনার বিষয়টি রাসূলের বক্তব্যে, তবে ইলমে নয়। [ফাতাওয়া (১৯/১৫৬)] ইবন তাইমিয়্যাহ আরও বলেন, এরা চেয়েছিল রাসূল মিথ্যা বলবেন স্বার্থের জন্য এমনটি বলতে, বিনা স্বার্থে বলবেন না এমনটি বলতে, কিন্তু তারা এর মাধ্যমে মারাত্মক খারাপ কর্মে লিপ্ত হয়েছে; কারণ তাদের কথার অর্থ হচ্ছে রাসূল মানুষদেরকে সংশয়ে নিক্ষেপ করেছেন, অন্ধকারে রেখেছেন, সৃষ্টিকে ভ্রষ্ট করেছেন, বরং বাতিল প্রকাশ করেছেন আর হক্ক গোপন করেছেন। (নাউযুবিল্লাহ) দেখুন, মাজমু’ ফাতাওয়া (৪/৯৮), (১৯/১৫৭); দারউত তা’আরুদ্ব (৫/৬০-৭৩)।
২৭৬. এ নীতিটি অবলম্বন করেছে ইবন সীনা, ইবন রুশদ আল-হাফীদ। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ইবন রুশদ বাতেনী ফির্কার লোকদের অন্তর্ভুক্ত, যারা মনে করে প্রকাশ্য শরী’আতের বাতেনী একটি ব্যাখ্যা রয়েছে যা যাহেরী শরী’আতের বিরোধী। দেখুন, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (২/১৬৬)।
২৭৭. অর্থাৎ প্রকাশ্য আমল যেমন সালাত, সাওম, হজ, যাকাত, সৎকাজ, সালাম, দো’আ, যিকির ইত্যাদি।
নবী রাসূলগণ কর্তৃক আনীত বিষয়গুলোর ব্যাপারে নবী রাসূলগণের ওপর বিস্তর কল্পনার অপবাদ প্রদানকারীরা হচ্ছে- দার্শনিক সম্প্রদায় এবং তাদের পথে কালামপন্থী ও তথাকথিত ফকীহরা যারা বলে, নিশ্চয় আল্লাহ ও শেষ দিনের ওপর ঈমানের বিষয়ে রাসূল যা উল্লেখ করেছেন তা দ্বারা উদ্দেশ্য কেবল প্রকৃত অবস্থার একটি কাল্পনিক রূপ প্রদান করা; যাতে তা দ্বারা সাধারণ জনগণ উপকার লাভ করেন। এটা নয় যে, তা দ্বারা তিনি সত্যকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন বা সৃষ্টিকে পথ দেখিয়েছেন বা হাকীকতকে ফুটিয়ে তুলেছেন। এরা আবার দুই ভাগে বিভক্ত:
• কেউ কেউ বলে, রাসূল হাকীকতকে তার আসলরূপে জানতেন না, বরং কিছু ইলাহী দার্শনিক আছে যারা সেটা জানে। তেমনি জানে এমন কিছু লোকও যাদেরকে তারা আউলিয়া নামে আখ্যায়িত করেছে। তারা মনে করে, দার্শনিক ও আউলিয়াদের কেউ কেউ আল্লাহ ও শেষ দিন সম্বন্ধে রাসূলদের থেকে বেশি অবগত। এটি হচ্ছে ঘোর নাস্তিক টাইপের দার্শনিক ও বাতেনী ফির্কার মতবাদ। যে বাতেনীগুলোর কেউ শীয়া বাতেনীয়া সম্প্রদায়ের আর কেউ সূফী বাতেনীয়া সম্প্রদায়ের। • আবার তাদের কেউ কেউ বলেন, বরং রাসূল সেটা জানতেন কিন্তু বর্ণনা করেননি। বরং বলেছেন তার বিপরীত কথা। আর তিনি চেয়েছেন মানুষ যেন হক্ক (সত্যের) বিপরীতটিই বুঝে; কারণ হকের বিপরীতে থাকার মধ্যে সৃষ্টিকুলের জন্য কল্যাণ ও স্বার্থ রয়েছে।
এরা আরও বলে, রাসূলের ওপর আবশ্যক হচ্ছে মানুষকে তাজসীম (দেহ সাব্যস্ত করা)-র বিশ্বাসের দিকে আহ্বান করা, যদিও সেটা বাতিল। তেমনি এটা বিশ্বাস করতে মানুষদেরকে জানাবেন যে, শরীরসহ পুনরুত্থان হবে, যদিও তা বাতিল। অনুরূপ এটা বিশ্বাস করতে যে, জান্নাতীরা খাওয়া-দাওয়া করবে যদিও তা বাতিল। তারা বলে: কেননা এই পদ্ধতিতে ছাড়া অন্য কোনোভাবে সৃষ্টিকে দাওয়াত দেয়া সম্ভব নয়, এটা মিথ্যা তবে বান্দাদের স্বার্থে। এ হচ্ছে আল্লাহ ও আখেরাতের ওপর ঈমানের বিষয়ে আগত নসসমূহের ব্যাপারে তাদের বক্তব্য।
আর আমল বা কর্মের ক্ষেত্রে: তাদের কেউ কেউ সেটা বাস্তব অর্থে স্বীকার করে, আবার কেউ কেউ উপরের মতো এক্ষেত্রেও বলে যে, আমলের জন্য সাধারণ শ্রেণি আদিষ্ট, বিশেষ শ্রেণি নয়। এটাই হচ্ছে দীনদ্রোহী বাতেনি ফিরকাহ, ইসমাঈলিয়্যাহ ও তাদের মতো লোকদের মতাদর্শ।
টিকাঃ
২৬৯. যদি এসব গ্রুপের লোকেরা সাক্ষ্য দিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলের চেয়ে বড় জ্ঞানী, সবচেয়ে বড় কল্যাণকামী, সবচেয়ে বড় স্পষ্টভাষী বর্ণনাকারী, তাহলে তারা এসব ধ্যান- ধারণা কিংবা বিকৃতি কিংবা মূর্খতার দলে যোগ দিত না।
২৭০. ইবনুল কাইয়্যেম আল্লাহর সিফাত বিষয়ে মানুষদেরকে বিস্তারিত পাঁচভাবে বিভক্ত করেছেন: ১- তা’ওয়ীল পদ্ধতির অনুসারী। ২- কল্পনাকারী অপবাদ প্রদানকারীদের অনুসারী। ৩- মূর্খতার অপবাদ প্রদানকারী সম্প্রদায়। ৪- তাশবীহ ও তামসীল বা সাদৃশ্য ও উদাহরণ প্রদানকারী সম্প্রদায় ৫- সঠিক পথের অনুসারী সম্প্রদায়। বিস্তারিত দেখুন আস-সাওয়া’য়িকুল মুরসালাহ (২/৪১৮)।
২৭১. ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, তারা হচ্ছে ঐ সম্প্রদায়, যারা বিশ্বাস করে যে, রাসূলগণ সৃষ্টির মাঝে কখনও হক্ক কথা প্রকাশ করেননি। কারণ সেটা প্রাপ্ত হওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। তাদের কাছে এ ব্যাপারে এক প্রকার কল্পনা ভর করছিল, তারা সে কল্পনাকে বাহিক্য জিনিসে ব্যক্ত করেছিলেন মাত্র। [আস-সাওয়া’য়িকুল মুরসালাহ (২/৪১৮-৪১৯)] ইবনুল তাইমিয়্যাহ বলেন, ইবন সীনা ও তার মত কিছু দার্শনিক এ ধরনের কথা দিয়ে তাদের মূলনীতি দাঁড় করিয়েছে, যেমন ইবন সীনা তার আর-রিসালাতুল উদ্বহুওয়িয়্যাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। [দারউত তা’আরুদ্ব (১/১)]
২৭২. ক্বারামিত্বা ও দার্শনিকদের মত হচ্ছে, রাসূলগণ এসব বিষয় জানতেন না। তারা বলে নবীর চেয়ে দার্শনিক ভালো জানে। নবীর কাজই হচ্ছে মানুষদেরকে নিজের কল্পনার জগতে নিয়ে যাওয়া। তাদের নিকট নবুওয়াত সাধারণ মানুষের জন্য শ্রেষ্ঠ হতে পারে, তবে সেটা জ্ঞানী-গুণী ও মারেফাতের দাবীদারদের নিকট নয়। ফারাবী ও তার মত যারা আছে যেমন, মুবাশ্বির ইবন ফাতিক ও তার মত ইসমা’ঈলী সম্পদ্রয়ায়ের লোকেরা বলে থাকে। [ফাতাওয়া (৪/৯৮-৯৯), (১৯/১৫৬)]
২৭৩. বাতেনী ফির্কা বলা হয় এজন্য যে, তারা মনে করে কুরআন ও সুন্নাহ’র ভাষ্যের একটি গোপন অর্থ রয়েছে যা প্রকাশ্য অর্থের বিপরীত। বাতেনীদের মধ্যে যারা অত্যন্ত ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত তারা হচ্ছে, কারামিতা, যাদেরকে সীমালঙ্ঘনকারী শিয়াদের মধ্যে গণ্য করা হয়। শাহরাস্তানী বলেন, তাদের যেসব উপাধী রয়েছে তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, বাতেনিয়্যা, কারামিত্বা, মুযদাকিয়্যাহ। তাদের নেতারা তাদের কিছু বক্তব্যকে দার্শনিকদের বক্তব্যের সাথে মিশিয়ে দিয়েছে। [আল-মিলাল ওয়ান নিহাল (১/২২৮)]
২৭৪. সূফী বলা হয়, কারণ তারা সূফ পরিধান করত। সূফ মানে পশমের মোটা কাপড়। প্রাথমিক দিকে যারা দুনিয়াবিমুখ হতো, বেশি ইবাদত করতো তাদেরকে সূফী বলা হতো। তবে সেটা প্রথম তিন উত্তম যুগে প্রসিদ্ধ ছিল না। বিষয়টি প্রথমে পরহেযগারী ও তাকওয়ার চর্চাতে থাকলেও কালক্রমে সেটি বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘনে রূপ নেয়। এমনকি তাদের অনেকেই দীনের গণ্ডী থেকে বের হয়ে যায়। পরবর্তীতে তারাই নতুন করে কুরআন ও হাদীসের গোপন ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছিল। তাদের বিখ্যাত বাড়াবাড়িকারী লোকদের মধ্যে রয়েছে, ইবন আরাবী, হাল্লাজ, ইবন সাব’ঈন ও অন্যান্যরা। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ’ ফাতাওয়া (১১/৫)।
২৭৫. ইবন তাইমিয়্যাহ স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন যে, এ মতটি মৌলিকভাবে কিছু দার্শনিক ও বাতেনী ফির্কার লোকদের। যেমন, ইসমা’ঈলী সম্প্রদায়ের নাস্তিকদের, ইখওয়ানুস সাফার রাসায়িল লিখকদের, ফারাবীর, ইবন সীনার, হত্যাকৃত সোহরাওয়ার্দীর, ইবন রুশদ আল-হাফীদের। অনুরূপভাবে তা সেসব সুফী মুলহিদদের মতও, যারা তাদের তাসাউফের পূর্বসূরী কুরআন ও সুন্নাহ’র অনুসারী শাইখদের মত থেকে বের হয়ে গেছে। যেমন ইবন আরাবী, ইবন সাব’ঈন, ইবনুত তুফাইল; যে ব্যক্তি হাই ইবন ইয়াক্কযান এর রিসালা লিখেছিল। [দারউত তা’আরুদ্ব (১/১০- ১১)]
এরা মনে করে কল্পনার বিষয়টি রাসূলের বক্তব্যে, তবে ইলমে নয়। [ফাতাওয়া (১৯/১৫৬)] ইবন তাইমিয়্যাহ আরও বলেন, এরা চেয়েছিল রাসূল মিথ্যা বলবেন স্বার্থের জন্য এমনটি বলতে, বিনা স্বার্থে বলবেন না এমনটি বলতে, কিন্তু তারা এর মাধ্যমে মারাত্মক খারাপ কর্মে লিপ্ত হয়েছে; কারণ তাদের কথার অর্থ হচ্ছে রাসূল মানুষদেরকে সংশয়ে নিক্ষেপ করেছেন, অন্ধকারে রেখেছেন, সৃষ্টিকে ভ্রষ্ট করেছেন, বরং বাতিল প্রকাশ করেছেন আর হক্ক গোপন করেছেন। (নাউযুবিল্লাহ) দেখুন, মাজমু’ ফাতাওয়া (৪/৯৮), (১৯/১৫৭); দারউত তা’আরুদ্ব (৫/৬০-৭৩)।
২৭৬. এ নীতিটি অবলম্বন করেছে ইবন সীনা, ইবন রুশদ আল-হাফীদ। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ইবন রুশদ বাতেনী ফির্কার লোকদের অন্তর্ভুক্ত, যারা মনে করে প্রকাশ্য শরী’আতের বাতেনী একটি ব্যাখ্যা রয়েছে যা যাহেরী শরী’আতের বিরোধী। দেখুন, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (২/১৬৬)।
২৭৭. অর্থাৎ প্রকাশ্য আমল যেমন সালাত, সাওম, হজ, যাকাত, সৎকাজ, সালাম, দো’আ, যিকির ইত্যাদি।
📄 দ্বিতীয় গোত্র: নবী-রাসূলদের আনীত বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে তা’বীল তথা অপব্যাখ্যার নীতি অবলম্বনকারী
এবার তা’ওয়ীল বা ব্যাখ্যাপন্থীদের বক্তব্য হচ্ছে- আল্লাহর সিফাতের ব্যাপারে বর্ণিত নসসমূহের দ্বারা রাসূল মানুষদেরকে বাতিল ই'তিকাদের উদ্দেশ্যে করেননি বরং তিনি এগুলোর দ্বারা বিভিন্ন অর্থ উদ্দেশ্য করেছেন। তবে উদ্দেশ্যসমূহ তাদেরকে বর্ণনা করেননি। এ ব্যাপারে তাদের কোনো নির্দেশনাও দেননি, বরং তিনি চেয়েছেন তারা গবেষণা করে স্বীয় আক্কল দ্বারা সেগুলো জেনে নিবে, অতঃপর সেগুলোকে তার মূল অর্থ হতে সরিয়ে নেয়ার জন্য যাবতীয় চেষ্টা নিবদ্ধ করবে। আর এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, তাদেরকে পরীক্ষা করা বা এটা দিয়ে মেধা ও বুদ্ধিকে ক্লান্ত বানানো, যাতে এসব ভাষ্যে আগত বাক্যকে তার অর্থ ও চাহিদা থেকে দূরে সরানো যায়। তারা সত্যকে (এর মাধ্যমে সরাসরি জানতে পারবে না, কেবল) জানবে অন্যদিক দিয়ে। এ গোষ্ঠী হচ্ছে মুতাকাল্লিমীন (কালামশাস্ত্রবিদ), জাহমিয়্যাহ, মু’তাযিলা ও তাদের কোনো কিছুতে যারা প্রবেশ করেছে এমনসব গোষ্ঠীসমূহ।
টিকাঃ
২৭৮. মুতাযিলা হচ্ছে এমন একটি ফির্কা যারা তাদের মতবাদ নিয়ে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের সাথে বিরোধিতা করেছে। এ গোষ্ঠীর প্রধান ও প্রথম যে তাদের নীতি বিন্যাস করেছে সে হচ্ছে ওয়াসিল ইবন আত্বা। তাদেরকে মু’তাযিলা বলার কারণ হচ্ছে ওয়াসিল ইবন আত্বা ও হাসান বসরীর মাঝে কবীরা গুনাহকারীর হুকুম নিয়ে মতভেদ হয়। ওয়াসিল বললো, কবীরা গুনাহকারী ঈমান ও কুফরীর মাঝখানে অবস্থান করবে, তারপর সে হাসান বসরীর মজলিস ত্যাগ করে অন্যত্র বসে পড়ে। তখন হাসান বসরী তাদেরকে বলেন, ই’তাযালা ‘আন্না’ বা আমাদের থেকে পৃথক হয়ে গেছে। মু’তাযিলাদের অনেক ফের্কা রয়েছে, তবে সবাই যেসব বিষয়ে একমত তা হচ্ছে, ১- আল্লাহর কোনো গুণ নেই। ২- কুরআন সৃষ্ট জিনিস। ৩- বান্দা তার নিজের কর্ম নিজে সৃষ্টি করে। ৪- তাকদীরের কিছু অংশ অস্বীকার। ৫- কবিরাহ গুণাহকারী ঈমানদারও নয়, কাফেরও নয়, এ দুয়ের মাঝখানে, তবে আখেরাতে জাহান্নামের অধিবাসী। ৬- তাদের রয়েছে পাঁচটি নীতি; সেগুলোর দ্বারা তারা অনেক বিশুদ্ধ আকীদাহ নষ্ট করে দিয়েছে। সেগুলো হচ্ছে, আত-তাওহীদ, যার মূল অর্থ তাদের কাছে আল্লাহর সিফাত অস্বীকার করা। আল-আদল, যার অর্থ তাকদীরের মাঝে আল্লাহর ইচ্ছা ও সৃষ্টিতে বান্দার কর্ম হয় তা অস্বীকার করা। আল-মানযিলাতু বাইনাল মানযিলাতাইন, যার অর্থ কবীরা গুণাহকারী ঈমান থেকে বেরিয়ে গেছে। আল-ওয়া’দু ওয়াল ও’য়ীদু, যার অর্থ কবীরা গুণাহকারী যদি তাওবা না করে মারা যায় তবে তার ওপর আল্লাহর ওয়াদা জাহান্নাম প্রদান করা আল্লাহর ওপর ওয়াজিব। সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ, যার অর্থ যালিম সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে হবে, যারা তাদের মতের বিরুদ্ধে (আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আত) তাদেরকে দমন করতে হবে। দেখুন, শাহরাস্তানী, আল-মিলাল ওয়ান নিহাল (১/৫৬); বাগদাদী, আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক, পৃ. ৯৩; ইসফারায়ীনী, আত-তাবসীর ফিদ-দীন, পৃ. ৩৭; রাযী, ই’তিক্বাদাতু ফিরাক্কিল মুসলিমীন ওয়াল মুশরিকীন, পৃ. ৩৮; সাকসাকী, আল-বুরহান ফী মা’রিফাতি আক্বায়িদি আহলিল আদইয়ান, পৃ. ৪৯; মালাজ্বী, আত-তাম্বীহ ওয়ার রাদ্দ, পৃ. ৩৫।
২৭৯. যেমন, কুল্লাবিয়্যা, সালেমিয়্যাহ, কাররামিয়্যাহ, শিয়া, পরবর্তী আশ’আরী সম্প্রদায় ও মাতুরিদী সম্প্রদায়। [দারউ তা’আরুদ্ব আল-আক্কল ওয়ান নাকল (১/১৩)]
এবার তা’ওয়ীল বা ব্যাখ্যাপন্থীদের বক্তব্য হচ্ছে- আল্লাহর সিফাতের ব্যাপারে বর্ণিত নসসমূহের দ্বারা রাসূল মানুষদেরকে বাতিল ই'তিকাদের উদ্দেশ্যে করেননি বরং তিনি এগুলোর দ্বারা বিভিন্ন অর্থ উদ্দেশ্য করেছেন। তবে উদ্দেশ্যসমূহ তাদেরকে বর্ণনা করেননি। এ ব্যাপারে তাদের কোনো নির্দেশনাও দেননি, বরং তিনি চেয়েছেন তারা গবেষণা করে স্বীয় আক্কল দ্বারা সেগুলো জেনে নিবে, অতঃপর সেগুলোকে তার মূল অর্থ হতে সরিয়ে নেয়ার জন্য যাবতীয় চেষ্টা নিবদ্ধ করবে। আর এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, তাদেরকে পরীক্ষা করা বা এটা দিয়ে মেধা ও বুদ্ধিকে ক্লান্ত বানানো, যাতে এসব ভাষ্যে আগত বাক্যকে তার অর্থ ও চাহিদা থেকে দূরে সরানো যায়। তারা সত্যকে (এর মাধ্যমে সরাসরি জানতে পারবে না, কেবল) জানবে অন্যদিক দিয়ে। এ গোষ্ঠী হচ্ছে মুতাকাল্লিমীন (কালামশাস্ত্রবিদ), জাহমিয়্যাহ, মু’তাযিলা ও তাদের কোনো কিছুতে যারা প্রবেশ করেছে এমনসব গোষ্ঠীসমূহ।
টিকাঃ
২৭৮. মুতাযিলা হচ্ছে এমন একটি ফির্কা যারা তাদের মতবাদ নিয়ে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের সাথে বিরোধিতা করেছে। এ গোষ্ঠীর প্রধান ও প্রথম যে তাদের নীতি বিন্যাস করেছে সে হচ্ছে ওয়াসিল ইবন আত্বা। তাদেরকে মু’তাযিলা বলার কারণ হচ্ছে ওয়াসিল ইবন আত্বা ও হাসান বসরীর মাঝে কবীরা গুনাহকারীর হুকুম নিয়ে মতভেদ হয়। ওয়াসিল বললো, কবীরা গুনাহকারী ঈমান ও কুফরীর মাঝখানে অবস্থান করবে, তারপর সে হাসান বসরীর মজলিস ত্যাগ করে অন্যত্র বসে পড়ে। তখন হাসান বসরী তাদেরকে বলেন, ই’তাযালা ‘আন্না’ বা আমাদের থেকে পৃথক হয়ে গেছে। মু’তাযিলাদের অনেক ফের্কা রয়েছে, তবে সবাই যেসব বিষয়ে একমত তা হচ্ছে, ১- আল্লাহর কোনো গুণ নেই। ২- কুরআন সৃষ্ট জিনিস। ৩- বান্দা তার নিজের কর্ম নিজে সৃষ্টি করে। ৪- তাকদীরের কিছু অংশ অস্বীকার। ৫- কবিরাহ গুণাহকারী ঈমানদারও নয়, কাফেরও নয়, এ দুয়ের মাঝখানে, তবে আখেরাতে জাহান্নামের অধিবাসী। ৬- তাদের রয়েছে পাঁচটি নীতি; সেগুলোর দ্বারা তারা অনেক বিশুদ্ধ আকীদাহ নষ্ট করে দিয়েছে। সেগুলো হচ্ছে, আত-তাওহীদ, যার মূল অর্থ তাদের কাছে আল্লাহর সিফাত অস্বীকার করা। আল-আদল, যার অর্থ তাকদীরের মাঝে আল্লাহর ইচ্ছা ও সৃষ্টিতে বান্দার কর্ম হয় তা অস্বীকার করা। আল-মানযিলাতু বাইনাল মানযিলাতাইন, যার অর্থ কবীরা গুণাহকারী ঈমান থেকে বেরিয়ে গেছে। আল-ওয়া’দু ওয়াল ও’য়ীদু, যার অর্থ কবীরা গুণাহকারী যদি তাওবা না করে মারা যায় তবে তার ওপর আল্লাহর ওয়াদা জাহান্নাম প্রদান করা আল্লাহর ওপর ওয়াজিব। সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ, যার অর্থ যালিম সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে হবে, যারা তাদের মতের বিরুদ্ধে (আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আত) তাদেরকে দমন করতে হবে। দেখুন, শাহরাস্তানী, আল-মিলাল ওয়ান নিহাল (১/৫৬); বাগদাদী, আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক, পৃ. ৯৩; ইসফারায়ীনী, আত-তাবসীর ফিদ-দীন, পৃ. ৩৭; রাযী, ই’তিক্বাদাতু ফিরাক্কিল মুসলিমীন ওয়াল মুশরিকীন, পৃ. ৩৮; সাকসাকী, আল-বুরহান ফী মা’রিফাতি আক্বায়িদি আহলিল আদইয়ান, পৃ. ৪৯; মালাজ্বী, আত-তাম্বীহ ওয়ার রাদ্দ, পৃ. ৩৫।
২৭৯. যেমন, কুল্লাবিয়্যা, সালেমিয়্যাহ, কাররামিয়্যাহ, শিয়া, পরবর্তী আশ’আরী সম্প্রদায় ও মাতুরিদী সম্প্রদায়। [দারউ তা’আরুদ্ব আল-আক্কল ওয়ান নাকল (১/১৩)]
📄 এই ফতওয়ার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, যারা আল্লাহর সিফাত তা’বীল করে তাদের মত খণ্ডন করা
এই ফতোয়ায় যাদের মতকে আমরা খণ্ডন করার ইচ্ছা করেছি তারা এসব শেষে বর্ণিত সম্প্রদায়। যেহেতু প্রথম গোষ্ঠীর লোকদের থেকে মানুষের ভেগে যাওয়া প্রকাশ্য। কিন্তু এরা তাদের থেকে ভিন্ন। কেননা বিভিন্ন জায়গায় তারা সুন্নাহ’র সহযোগী হিসেবে নিজেদেরকে প্রচার-প্রসার করে বেড়ায়। অথচ প্রকৃতপক্ষে তারা না ইসলামের সহযোগিতা করেছে, আর না দার্শনিকদের নীতিকে ভাঙ্গতে পেরেছে। বরঞ্চ দার্শনিকরা এসব মুতাকাল্লিমদের (আশায়েরা ও মাতুরিদীদের) কে সিফাতের বক্তব্যে তারা যা বলেছে (আল্লাহর ও তার রাসূলের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে আসার পরও তা’ওয়ীল করা) অনুরূপ বক্তব্য (শারীরিক) পুনরুত্থানের ব্যাপারে মেনে নিতে বাধ্য করেছে। তারা বলে: আমরা অবশ্যম্ভাবীভাবে জানি যে, রাসূলগণ শারীরিক পুনরুত্থান নিয়ে এসেছিলেন। আর আমরা তাতে (তার ওপর শারীরিক পুনরুত্থান এর ওপর ঈমান আনতে) বাধা প্রদানকারী সংশয়সমূহে (এর অসারতা) জেনেছি।
আর আহলুস সুন্নাতগণ এদেরকে বলেন: আমরা আবশ্যিকভাবে জেনেছি যে, রাসূল সিফাত সাব্যস্তকরণ নিয়ে এসেছিলেন। আর (জানা কথা যে) পুনরুত্থান সংক্রান্ত নস বা ভাষ্যসমূহের চেয়ে আল্লাহর কিতাবে সিফাত সংক্রান্ত নস বা ভাষ্যসমূহ অনেক বেশি ও বড়। আহলে সুন্নাত তাদেরকে আরও বলে, এটা জ্ঞাত কথা যে, আরবের মুশরিকগণ পুনরুত্থান অস্বীকার করলেও সিফাতকে অস্বীকার করত না। তারা পুনরুত্থানের বিষয়টি নিয়ে রাসূলের বিরুদ্ধে নেমেছিল, তাঁর সাথে মুনাযারা ও বিবাদে লিপ্ত হয়েছিল। কিন্তু সিফাত নিয়ে আরবের কেউ কোনো দিন বিরোধিতা করেনি।
তাই জানা গেল যে, আক্কল (বুদ্ধি-বিবেকের যুক্তি) পুনরুত্থানের স্বীকৃতি দেয়ার চেয়ে সিফাতের স্বীকৃতি দেয় অনেক শক্তভাবে। এতদসত্ত্বেও এটা কীভাবে সম্ভব যে, তিনি সিফাত সম্বন্ধে যা জানিয়েছেন তা যেমনটি জানিয়েছেন তেমনটি নয়, আর মা’আদ তথা পুনরুত্থান সম্বন্ধে যা জানিয়েছেন তা যেমনটি জানিয়েছেন তেমনই?
তদুপরি জানা গেছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহলে কিতাবদেরকে কিতাব পরিবর্তন ও বিকৃত করার জন্য নিন্দা করেছেন। আর এটা জ্ঞাত যে, তাওরাত আল্লাহর সিফাতের আলোচনায় ভরপুর। সুতরাং এগুলো যদি বিকৃতি ও পরিবর্তন হতো, তাহলে তাদের এ কাজটির নিন্দা করা আরও অধিক উপযুক্ত হতো। বরং তারা যখন রাসূলের সামনে আল্লাহর সিফাতের উল্লেখ করত, বিমুগ্ধ হয়ে ও সত্যায়ন করে তিনি হাসতেন, সেটা কীভাবে হলো? রাসূল তাদের ওপর কখনো এমন কোনো দোষারোপ করেননি যে দোষারোপ করে থাকে সিফাত নাকচকারীরা সিফাত সাব্যস্তকারীগণের ওপর। যেমন, সিফাত নাকচকারীরা সিফাত সাব্যস্তকারীদের ওপর তাজসীম (দেহবাদী) ও তাশবীহ (সাদৃশ্যপ্রদানকারী) ইত্যাদি শব্দের তকমা লাগায়। বরং তিনি তাদেরকে দোষারোপ করেছেন তাদের এ কথার কারণে যে, ﴿يَدُ اللَّهِ مَغْلُولَةٌ﴾ "আল্লাহর হাত রুদ্ধ।” [সূরা আল- মায়েদাহ: ৬৪] এবং ﴿إِنَّ اللَّهَ فَقِيرٌ وَنَحْنُ أَغْنِيَاءُ﴾ “নিশ্চয় আল্লাহ ফকীর, আর আমরা ধনী।” [সূরা আলে ইমরান: ১৮১] এবং তাদের কথা: আল্লাহর আসমান-যমীন সৃষ্টি করে বিশ্রাম নিয়েছেন। তখন আল্লাহ বললেন: ﴿وَلَقَدْ خَلَقْنَا السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ وَمَا مَسَّنَا مِن لُّغُوبٍ﴾ [ق: ٣٨] "আর অবশ্যই আমরা আসমানসমূহ, যমীন ও তাদের অন্তর্বর্তী সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছি ছয় দিনে; আর আমাকে কোনো ক্লান্তি স্পর্শ করেনি।” [সূরা ক্বাফ: ৩৮]
আর কুরআন ও হাদীসে উল্লিখিত সিফাতের মতো সিফাতে তাওরাতও ভরপুর। অথচ তাওরাতে সরাসরি আখেরাতের আলোচনা কুরআনের মতো এত স্পষ্ট করে নেই। সুতরাং দুই কিতাবে উল্লিখিত সিফাত তা’ওয়ীল করা জায়েয হলে এক কিতাবে উল্লিখিত মা’আদ (পুনরুত্থান)-এর তা’ওয়ীল করা আরও বেশি উপযুক্ত।
আর দ্বিতীয়টি তথা মা’আদ-পুনরুত্থান এর তা’ওয়ীল করা বাতিল হওয়া রাসূলের দীন থেকে জানা আবশ্যিক বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। তাহলে প্রথমটি (সিফাতের ভাষ্যসমূহে) তা’ওয়ীল করার বিষয়টি বাতিল হওয়া অধিক উপযুক্ত।
টিকাঃ
২৮০. অর্থাৎ আহলুত তা’ওয়ীল। যারা আল্লাহর গুণাবলি সংক্রান্ত আয়াতসমূহের ব্যাপারে অপব্যাখ্যার নীতি অবলম্বন করেছে। স্বাভাবিক অর্থ থেকে সেগুলোকে দূরবর্তী বিরল অর্থে নিয়ে গেছে, অথবা নতুন অর্থ তৈরি করে নিয়েছে।
২৮১. অর্থাৎ আহলুত তাখয়ীল। কারণ ঈমানদার সাধারণত কখনও ঈমানিয়্যাতের ব্যাপারে তাদের মতবাদকে মেনে নিবে না। কেউ রাসূল সম্পর্কে তাদের এ জঘন্য কথা সহজে মানুষের মাঝে বলতে সাহস করবে না। মানুষকে যদি বলা হয় রাসূলগণ কল্পনা করে কথা বলেছেন বা রাসূলগণ বাস্তব অবস্থার বিপরীতে জনগণকে তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য মিথ্যা বলেছেন, তাহলে ন্যূনতম ঈমানের অধিকারী তার বিরুদ্ধে সকল ক্ষমতা প্রয়োগ করবে। তাই তারা তাদের কথা গোপন করে রাখে, কেবল তাদের নিজস্ব বলয়ে সেটা বলে থাকে। ফলে তাদের দ্বারা সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু দ্বিতীয় গোষ্ঠী, অর্থাৎ তা’ওয়ীলকারীদের দ্বারা দুনিয়ায় যত সর্বনাশ ছড়িয়ে পড়েছে, সুতরাং তাদেরকে এখানে রদ্দ করা হবে।
২৮২. অর্থাৎ আহলুত তা’ওয়ীল বা আল্লাহর সিফাতের অপব্যাখ্যাকারীদের অবস্থা মারাত্মক। এদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সুস্পষ্ট। এরাই হচ্ছে মু’তাযিলা, আশ’আরী, মাতুরিদী সম্প্রদায়।
২৮৩. যেসব স্থানে আশায়েরা, মাতুরিদী সম্প্রদায় আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের সহযোগী হয়েছে, তা হচ্ছে: ১- কবীরা গুণাহগার এর মাসআলা। ২- কবর ও হাশরের বিভিন্ন অবস্থা ও কর্মের বর্ণনা। ৩- খিলাফত ও ইমামতের মাসআলা। ৪- সাহাবীগণের ন্যায়পরায়ণ হওয়ার মাসআলা। ৫- দার্শনিক, কারামিত্বা, বাতেনিয়াদের বিরুদ্ধে তারা তাদের ক্ষমতা নিয়ে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের সাথে দাঁড়িয়েছে। যদিও প্রকৃতপক্ষে তারা না দার্শনিকদের অস্ত্র ভাঙ্গতে পেরেছে আর না তারা ইসলামকে সাহায্য করতে পেরেছে। বস্তুত তারা ইসলামের শত্রু ইয়াহুদী-নাসারা ও দার্শনিকদের সামনে দাঁড়ানোর মতো যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি।
২৮৪. আহলুত তা’ওয়ীল বলতে আমরা কাদেরকে বুঝিয়েছি তা ইতোপূর্বে ব্যক্ত করেছি, তাদের মধ্যে প্রথমেই মু’তাযিলা, তারপর আশায়েরা, তারপর মাতুরিদিয়্যা সম্প্রদায়, তাছাড়া আরও কিছু অখ্যাত সম্প্রদায়ও রয়েছে। এরা সাধারণত আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের সাথে অবস্থান করে। নিজেদেরকে আহলুস সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত বলার জন্য সচেষ্ট থাকে। ক্ষণে ক্ষণে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের সহযোগিতার দাবি করে। কিন্তু তারা তিনটি মৌলিক কারণে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আত থেকে বাইরে চলে গেছে: ১- তারা বিবেকের যুক্তিকে কুরআন ও সুন্নাহ’র ভাষ্যের ওপর প্রাধান্য দেয়। ২- তারা আকীদার ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ খবরে ওয়াহিদকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করে না। ৩- তারা তা’ওয়ীল বা অপব্যাখ্যার নীতি। অর্থাৎ যাবতীয় মুতাওয়াতির (কুরআন ও সুন্নাহ মুতাওয়াতিরাহ) কে আক্কলের বিপরীত হলে অবশ্যই তা’ওয়ীল করে নিতে হবে। এছাড়াও আকীদাহ’র প্রতিটি অধ্যায়েই আরও কিছু বিষয়ে আশায়েরাহ ও মাতুরিদিয়্যাহদের মতবাদ আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের বিরোধী, যেমন:
আকীদাহ গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের মতাদর্শ হচ্ছে, ১- বিবেকের যুক্তিকে কুরআন-সুন্নাহ’র ভাষ্যের ওপর প্রাধান্য দিতে হবে। ২- যেসব ভাষ্য মুতাওয়াতির সেগুলো যদি বিবেকের যুক্তির বিপরীত হয় তবে সেগুলোকে তা’ওয়ীল করতে হবে। ৩- আকীদাহকে দু’ভাগে ভাগ করা, আকলিয়াত (আল্লাহ সম্পর্কিত বিষয়াদি) ও সাম’ইয়াত (মৃত্যু পরবর্তী বিষয়াদি)। ৪- খবরে ওয়াহিদ আকীদাতে দলীল না হওয়া, তবে সাম’ইয়াতে তা দ্বারা দলীল নেয়া যাবে। ৫- তাদের এক গোষ্ঠী, যেমন গাযালীর মতে সূফী কাশফ ও যাওক কুরআন ও সুন্নাহর ভাষ্যের ওপর প্রাধান্য পাবে। এর জন্য কুরআন ও সুন্নাহর ভাষ্যকে তা’ওয়ীল করা যাবে, যাতে তার সাথে সামঞ্জস্য বিধান করা যায়। [রিসালাতুল ইলম আল-লাদুন্নী, কুবরা আল- ইয়াক্বীনীয়াত) ৬- কুরআন ও সুন্নাহ’র ভাষ্যের দাবি ধারণার জন্ম দেয়, দৃঢ় ইলমের ফায়েদা দেয় না। যতক্ষণ না তা দশটি দোষ থেকে মুক্ত হচ্ছে... ৭- অপর দিকে বিবেকের যুক্তি অনুযায়ী হলে দুর্বল ও বানোয়াট হাদীসও দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য।
একজন মানুষের প্রথম কর্তব্য অধ্যায়ে ১- প্রথম কর্তব্য, চিন্তা-গবেষণা বা চিন্তা-গবেষণার প্রতি ইচ্ছা, অথবা সন্দেহ করা, অথবা সন্দেহের ইচ্ছা করা। ২- মুকাল্লিদের ঈমান শুদ্ধ না হওয়া। ৩- স্রষ্টা ও সৃষ্টির আলাদা অস্তিত্বে বিশ্বাসী না হওয়া, তথা আল্লাহকে সৃষ্টি থেকে আলাদা করে ‘আরশের উপর না মানা।
ঈমান অধ্যায়ে ১- ঈমানের অভিধানিক অর্থ শুধু বিশ্বাস বলা। ২- ঈমানের শর’য়ী অর্থ নির্ধারণে ভুল করা তথা আমলকে ঈমানের রুকনের অন্তর্ভুক্ত না করণে। ৩- ঈমান বাড়া ও কমার নীতিতে।
কুফর অধ্যায়ে ১- কুফরী হওয়ার সকল শর্তপূরণ ও বাঁধা অপসারণের পরও কুফরীর বিধান বলতে দ্বিধা করা।
২- কুফরী হওয়ার জন্য বিশ্বাস থাকা বাধ্য করা অর্থাৎ কর্মগত কুফরীকে কুফরী মনে না করা।
৩- কুফরী হওয়ার জন্য মুখে কুফরী করার স্বীকৃতি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কুফরী না বলা।
□ তাওহীদ অধ্যায়ে ১- তাওহীদুর রুবুবিয়্যাতে স্রষ্টার অস্তিত্ব সাব্যস্ত করার নীতিতে ভুল পন্থা অবলম্বন। স্রষ্টার অস্তিত্ব সাব্যস্ত করতে মরিয়া হয়ে উঠা, অথচ তা ফিত্বরী ব্যাপারে। স্রষ্টার অস্তিত্ব সাব্যস্ত করার জন্য দলীল ‘হুদুস ওয়াল কিদাম’ ব্যবহার করা, যা বিতর্কিত।
২- তাওহীদুল আসমা ওয়াস সিফাতে আল্লাহর গুণাবলি সবগুলো কিংবা আংশিককে অস্বীকার কিংবা অপব্যাখ্যা।
৩- তাওহীদুল উলুহিয়্যাহকে তাওহীদের সংজ্ঞায় না নেয়া। ফলে তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ’র ব্যাপারে এসেছে চরম ঔদাসিন্য।
৪- ইলাহ ও রব একই অর্থে নেয়া।
□ শির্ক অধ্যায়ে ১- আল্লাহর অস্তিত্ব মেনে নেয়ার পরে অন্য কাউকে পরিচালক বা কর্তৃত্বকারী মেনে নিলেও শির্ক না বলা। যেমন, গাউস, কুতুব, নুকাবা, নুজাবা ইত্যাদি বিশ্বাস করা।
২- আল্লাহর গুণাবলি অন্যদের মাঝে দাবি করার পরও শির্ক না বলা।
৩- আল্লাহর ইবাদতে অন্য কাউকে শরীক করলেও মুশরিক না বলা; যতক্ষণ পর্যন্ত না তাকে রুবুবিয়্যাতের গুণ না দেয়।
□ নবুওয়াত অধ্যায়ে ১- নবুওয়াত একান্ত আল্লাহর ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। সেখানে নবীর মাঝে কোনো গুণ থাকা আবশ্যক নয়।
২- নবী-রাসূলদের নবুওয়াতের প্রমাণ শুধু মু’জিযায় সীমাবদ্ধ মনে করা।
৩- মু’জিযা, কারামাত ও জাদু, গণকবাজির মধ্যে পার্থক্য করার মানদণ্ড সঠিক না হওয়া।
৪- ওহীর ব্যাপারে ফয়েয হওয়া নীতিতে বিশ্বাসী হওয়া।
৫- কুরআন প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর এমন কালাম নয় যা দিয়ে তিনি কথা বলেছেন, এমনটি বলা।
৬- আল্লাহর কালামের স্বর ও বর্ণ নেই বলা।
□ আখেরাত অধ্যায়ে ১- হাশরের মাঠে আল্লাহর আগমন অস্বীকার করা।
২- আল্লাহকে দেখার অর্থ অনুভব করা বলে বিশ্বাস করা।
□ কাদা ও কাদর অধ্যায়ে ১- আল্লাহর ইচ্ছাকে প্রবল করে বান্দার ইচ্ছাকে প্রভাবহীন করা, যা জাবরে মা’নাউওয়ী বলে খ্যাত।
২- বান্দার কর্মকাণ্ডকে ‘কাসব’ নাম দেয়া, যার ব্যাখ্যা পৃথিবীর অসার বস্তুর একটি।
৩- তাকদীরকে মুবরাম ও মু’আল্লাক দু’ভাগে ভাগ করা।
৪- তাওফীক অর্থ আনুগত্য করার ক্ষমতা সৃষ্টি করা, আর বঞ্চিত করার অর্থ হচ্ছে গুনাহ করার ক্ষমতা সৃষ্টি করা। সরাসরি কাউকে ভালো কিংবা মন্দ করার সুযোগ দেয়া সাব্যস্ত না করা।
৫- বান্দার কর্মের সাথে কার্যকারণের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করা। যেমনে এটা বলা যে, আগুনের কাছে পুড়ে গেছে, আগুনের কারণে পুড়েনি।
৬- আল্লাহ তা’আলার কর্মকাণ্ডের হিকমত অস্বীকার করা।
২৮৫. সুতরাং যে কারণে তোমরা আল্লাহর নাম ও গুণে তা’ওয়ীল বা অপব্যাখ্যা করতে চাচ্ছ সেই একই কারণে আমরা শারীরিক পুনরুত্থান সাব্যস্তকারী ভাষ্যসমূহেরও তা’ওয়ীল করতে বাধ্য।
২৮৬. অর্থাৎ শারীরিক পুনরুত্থান সম্পর্কিত দার্শনিকদের সন্দেহের অসারতা আমরা জেনেছি। তারপরও হে মুতাকাল্লিমরা, তোমরা আল্লাহর গুণের ব্যাপারে যা বল, আমরাও অনুরূপ কথা বলতে পারি পুনরায় উত্থান সংক্রান্ত বিষয়ে।
২৮৭. অর্থাৎ আশায়েরা ও মাতুরিদীদেরকে।
২৮৮. সহীহ বুখারীতে এসেছে [(৫/২৯১), হাদীস নং ২৬৮৫], ইবন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা বলেন, "তোমরা কীভাবে আহলে কিতাবদের জিজ্ঞাসা কর? অথচ তোমাদের কিতাব যা তার নবীর ওপর নাযিল করা হয়েছে তা আল্লাহ সম্পর্কে সবচেয়ে নবীন খবরটি প্রদান করে, যা পুরাতন হয়ে যায়নি। আর আল্লাহ তোমাদেরকে জানিয়েছেন যে, আহলে কিতাবরা আল্লাহর কিতাবে যা এসেছে তাতে পরিবর্তন-পরিবর্ধন করেছে, তাদের হাতের কিতাবকে বিনষ্ট করেছে..."। তাছাড়া মহান আল্লাহ বলেন, "অতঃপর তাদের অংগীকার ভংগের জন্য আমরা তাদেরকে লা’নত করেছি ও তাদের হৃদয় কঠিন করেছি; তারা শব্দগুলোকে আপন স্থান থেকে বিকৃত করে এবং তাদেরকে যে উপদেশ দেয়া হয়েছিল তার একাংশ তারা ভুলে গেছে। আর আপনি সবসময় তাদের অল্প সংখ্যক ছাড়া সকলকেই বিশ্বাসঘাতকতা করতে দেখতে পাবেন, কাজেই তাদেরকে ক্ষমা করুন এবং উপেক্ষা করুন। নিশ্চয় আল্লাহ মুহসিনদেরকে ভালোবাসেন।” [সূরা আল-মায়েদাহ: ১৩] আরও বলেন, "অতঃপর তাদের মধ্যে যারা যালিম ছিল তাদেরকে যা বলা হয়েছিল, তার পরিবর্তে তারা অন্য কথা বলল। কাজেই আমরা আসমান থেকে তাদের প্রতি শাস্তি পাঠালাম, কারণ তারা যুলুম করত।" [সূরা আল-আ’রাফ: ১৬২]
২৮৯. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এটা সাব্যস্ত করেছেন যে, প্রাচীন আহলে কিতাবরা কখনও তাওরাতে আসা আল্লাহর সিফাতগুলোকে অস্বীকার করতো না। তবে পূর্ববর্তী আহলে কিতাবরা আল্লাহর গুণাবলিতেও বিকৃতি সাধন করেছে যখন তাদের মাঝে জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়ের মত সম্প্রদায়ের উদ্ভব হলো, যেমন দার্শনিক মূসা ইবন মাইমূন ও তার মত লোকদের আগমন ঘটে অথবা মু’তাযিলা সম্প্রদায়ের মতো লোকদের উদ্ভব হলো যেমন আবু ইয়া’কুব আল-বাসরী ও তার মতো লোকদের উত্থান হয়। [দারউ তা’আরুদ্বিল আকলি ওয়ান নাকটি (৭/৯৪)] ইবন তাইমিয়্যাহ আরও বলেছেন, ইয়াহূদীদের সাথে মু’তাযিলাদের অনেক যোগাযোগ ছিল, তাদের মাঝে কর্মগত মিলও প্রচুর। ইয়াহুদীরা মু’তাযিলাদের পাঁচ মূলনীতি পাঠ করে থাকে।
২৯০. কিন্তু কুরআনে কারীমে বা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসে আহলে কিতাবদের কিভাবে আল্লাহর নাম ও গুণ সংক্রান্ত ভাষ্যগুলোর কোনো নিন্দা আসেনি। বরং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখে সেগুলোর সত্যায়ন এসেছে।
২৯১. এর দ্বারা সে হাদীসের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যেখানে এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এক ইয়াহুদী পণ্ডিত এসে বললো, হে মুহাম্মাদ, অথবা বললো, হে আবুল কাসেম, নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন আসমানসমূহকে এক আঙুলের উপর রাখবেন, যমীনসমূহকে অপর আঙুলের উপর রাখবেন, পাহাড় ও গাছ অন্য আঙুলের উপর রাখবেন, পানি ও মাটি অপর আঙুলের উপর রাখবেন, আর সকল সৃষ্টিকে এক আঙুলের উপর রাখবেন, তারপর সেগুলো নাড়বেন এবং বলবেন, আমি রাজা, আমি রাজা। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ইয়াহূদী পণ্ডিত যা বলেছে তা শুনে আশ্চর্য হয়ে তাকে সত্যায়ন করে হাসলেন। তারপর পড়লেন, "আর তারা আল্লাঙ্কে যথোচিত সম্মান করেনি অথচ কিয়ামতের দিন সমস্ত যমীন থাকবে তাঁর হাতের মুঠিতে এবং আসমানসমূহ থাকবে ভাঁজ করা অবস্থায় তাঁর ডান হাতে। পবিত্র ও মহান তিনি, তারা যাদেরকে শরীক করে তিনি তাদের ঊর্ধ্বে।” [সূরা আয-যুমার: ৬৭]
২৯২. আল্লাহর কুরআন ও রাসূলের হাদীসে ইয়াহুদীদের ওপর তখনি দোষারোপ করেছে যখন তারা আল্লাহর সিফাতকে অস্বীকার করেছে। যখন কোনো সিফাতের ব্যাপারে বিরুপ মন্তব্য করেছে। যেমন, আল্লাহর হাত রুদ্ধ বলার কারণে আল্লাহ তাদেরকে ধমক দিয়েছেন।
২৯৩. আল্লাহর প্রতি অসম্মানজনক গুণ প্রয়োগ করার কারণে তাদের নিন্দা করা হয়েছে। কোনো সম্মানসূচক গুণ প্রদানের কারণে তাদের নিন্দা আসেনি।
২৯৪. এখানেও যেহেতু আল্লাহর প্রতি অসম্মানজনক গুণ প্রদান করা হয়েছে, তাই আল্লাহ তা’আলা সেটা নাকচ করে আয়াত নাযিল করেছেন।
২৯৫. অর্থাৎ তাওরাত ও কুরআনে।
২৯৬. কারণ কুরআনেই বিশদভাবে মা’আদ বা পুনরুত্থানের কথা এসেছে। তাওরাতে তার কেবল সাধারণ বর্ণনাই স্থান পেয়েছে।
২৯৭. অর্থাৎ মা’আদ বা পুনরুত্থান সংক্রান্ত ভাষ্য ও তথ্যসমূহ কোনোভাবে তা’ওয়ীল করা বাতিল হওয়ার বিষয়টি আবশ্যিকভাবে জানা বিষয়।
২৯৮. অর্থাৎ যদি রাসূলের দীনের মাঝে অকাট্যভাবে জানা যায় যে, পুনরুত্থান সংক্রান্ত নস বা ভাষ্যগুলোতে কোনো প্রকার তা’ওয়ীল চলবে না, তাহলে সিফাতের আয়াতসমূহে তা’ওয়ীল বাতিল হওয়ার বিষয়টি আরও বেশি উত্তমরূপে জানা যায়।
এই ফতোয়ায় যাদের মতকে আমরা খণ্ডন করার ইচ্ছা করেছি তারা এসব শেষে বর্ণিত সম্প্রদায়। যেহেতু প্রথম গোষ্ঠীর লোকদের থেকে মানুষের ভেগে যাওয়া প্রকাশ্য। কিন্তু এরা তাদের থেকে ভিন্ন। কেননা বিভিন্ন জায়গায় তারা সুন্নাহ’র সহযোগী হিসেবে নিজেদেরকে প্রচার-প্রসার করে বেড়ায়। অথচ প্রকৃতপক্ষে তারা না ইসলামের সহযোগিতা করেছে, আর না দার্শনিকদের নীতিকে ভাঙ্গতে পেরেছে। বরঞ্চ দার্শনিকরা এসব মুতাকাল্লিমদের (আশায়েরা ও মাতুরিদীদের) কে সিফাতের বক্তব্যে তারা যা বলেছে (আল্লাহর ও তার রাসূলের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে আসার পরও তা’ওয়ীল করা) অনুরূপ বক্তব্য (শারীরিক) পুনরুত্থানের ব্যাপারে মেনে নিতে বাধ্য করেছে। তারা বলে: আমরা অবশ্যম্ভাবীভাবে জানি যে, রাসূলগণ শারীরিক পুনরুত্থান নিয়ে এসেছিলেন। আর আমরা তাতে (তার ওপর শারীরিক পুনরুত্থান এর ওপর ঈমান আনতে) বাধা প্রদানকারী সংশয়সমূহে (এর অসারতা) জেনেছি।
আর আহলুস সুন্নাতগণ এদেরকে বলেন: আমরা আবশ্যিকভাবে জেনেছি যে, রাসূল সিফাত সাব্যস্তকরণ নিয়ে এসেছিলেন। আর (জানা কথা যে) পুনরুত্থান সংক্রান্ত নস বা ভাষ্যসমূহের চেয়ে আল্লাহর কিতাবে সিফাত সংক্রান্ত নস বা ভাষ্যসমূহ অনেক বেশি ও বড়। আহলে সুন্নাত তাদেরকে আরও বলে, এটা জ্ঞাত কথা যে, আরবের মুশরিকগণ পুনরুত্থান অস্বীকার করলেও সিফাতকে অস্বীকার করত না। তারা পুনরুত্থানের বিষয়টি নিয়ে রাসূলের বিরুদ্ধে নেমেছিল, তাঁর সাথে মুনাযারা ও বিবাদে লিপ্ত হয়েছিল। কিন্তু সিফাত নিয়ে আরবের কেউ কোনো দিন বিরোধিতা করেনি।
তাই জানা গেল যে, আক্কল (বুদ্ধি-বিবেকের যুক্তি) পুনরুত্থানের স্বীকৃতি দেয়ার চেয়ে সিফাতের স্বীকৃতি দেয় অনেক শক্তভাবে। এতদসত্ত্বেও এটা কীভাবে সম্ভব যে, তিনি সিফাত সম্বন্ধে যা জানিয়েছেন তা যেমনটি জানিয়েছেন তেমনটি নয়, আর মা’আদ তথা পুনরুত্থান সম্বন্ধে যা জানিয়েছেন তা যেমনটি জানিয়েছেন তেমনই?
তদুপরি জানা গেছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহলে কিতাবদেরকে কিতাব পরিবর্তন ও বিকৃত করার জন্য নিন্দা করেছেন। আর এটা জ্ঞাত যে, তাওরাত আল্লাহর সিফাতের আলোচনায় ভরপুর। সুতরাং এগুলো যদি বিকৃতি ও পরিবর্তন হতো, তাহলে তাদের এ কাজটির নিন্দা করা আরও অধিক উপযুক্ত হতো। বরং তারা যখন রাসূলের সামনে আল্লাহর সিফাতের উল্লেখ করত, বিমুগ্ধ হয়ে ও সত্যায়ন করে তিনি হাসতেন, সেটা কীভাবে হলো? রাসূল তাদের ওপর কখনো এমন কোনো দোষারোপ করেননি যে দোষারোপ করে থাকে সিফাত নাকচকারীরা সিফাত সাব্যস্তকারীগণের ওপর। যেমন, সিফাত নাকচকারীরা সিফাত সাব্যস্তকারীদের ওপর তাজসীম (দেহবাদী) ও তাশবীহ (সাদৃশ্যপ্রদানকারী) ইত্যাদি শব্দের তকমা লাগায়। বরং তিনি তাদেরকে দোষারোপ করেছেন তাদের এ কথার কারণে যে, ﴿يَدُ اللَّهِ مَغْلُولَةٌ﴾ "আল্লাহর হাত রুদ্ধ।” [সূরা আল- মায়েদাহ: ৬৪] এবং ﴿إِنَّ اللَّهَ فَقِيرٌ وَنَحْنُ أَغْنِيَاءُ﴾ “নিশ্চয় আল্লাহ ফকীর, আর আমরা ধনী।” [সূরা আলে ইমরান: ১৮১] এবং তাদের কথা: আল্লাহর আসমান-যমীন সৃষ্টি করে বিশ্রাম নিয়েছেন। তখন আল্লাহ বললেন: ﴿وَلَقَدْ خَلَقْنَا السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ وَمَا مَسَّنَا مِن لُّغُوبٍ﴾ [ق: ٣٨] "আর অবশ্যই আমরা আসমানসমূহ, যমীন ও তাদের অন্তর্বর্তী সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছি ছয় দিনে; আর আমাকে কোনো ক্লান্তি স্পর্শ করেনি।” [সূরা ক্বাফ: ৩৮]
আর কুরআন ও হাদীসে উল্লিখিত সিফাতের মতো সিফাতে তাওরাতও ভরপুর। অথচ তাওরাতে সরাসরি আখেরাতের আলোচনা কুরআনের মতো এত স্পষ্ট করে নেই। সুতরাং দুই কিতাবে উল্লিখিত সিফাত তা’ওয়ীল করা জায়েয হলে এক কিতাবে উল্লিখিত মা’আদ (পুনরুত্থান)-এর তা’ওয়ীল করা আরও বেশি উপযুক্ত।
আর দ্বিতীয়টি তথা মা’আদ-পুনরুত্থান এর তা’ওয়ীল করা বাতিল হওয়া রাসূলের দীন থেকে জানা আবশ্যিক বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। তাহলে প্রথমটি (সিফাতের ভাষ্যসমূহে) তা’ওয়ীল করার বিষয়টি বাতিল হওয়া অধিক উপযুক্ত।
টিকাঃ
২৮০. অর্থাৎ আহলুত তা’ওয়ীল। যারা আল্লাহর গুণাবলি সংক্রান্ত আয়াতসমূহের ব্যাপারে অপব্যাখ্যার নীতি অবলম্বন করেছে। স্বাভাবিক অর্থ থেকে সেগুলোকে দূরবর্তী বিরল অর্থে নিয়ে গেছে, অথবা নতুন অর্থ তৈরি করে নিয়েছে।
২৮১. অর্থাৎ আহলুত তাখয়ীল। কারণ ঈমানদার সাধারণত কখনও ঈমানিয়্যাতের ব্যাপারে তাদের মতবাদকে মেনে নিবে না। কেউ রাসূল সম্পর্কে তাদের এ জঘন্য কথা সহজে মানুষের মাঝে বলতে সাহস করবে না। মানুষকে যদি বলা হয় রাসূলগণ কল্পনা করে কথা বলেছেন বা রাসূলগণ বাস্তব অবস্থার বিপরীতে জনগণকে তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য মিথ্যা বলেছেন, তাহলে ন্যূনতম ঈমানের অধিকারী তার বিরুদ্ধে সকল ক্ষমতা প্রয়োগ করবে। তাই তারা তাদের কথা গোপন করে রাখে, কেবল তাদের নিজস্ব বলয়ে সেটা বলে থাকে। ফলে তাদের দ্বারা সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু দ্বিতীয় গোষ্ঠী, অর্থাৎ তা’ওয়ীলকারীদের দ্বারা দুনিয়ায় যত সর্বনাশ ছড়িয়ে পড়েছে, সুতরাং তাদেরকে এখানে রদ্দ করা হবে।
২৮২. অর্থাৎ আহলুত তা’ওয়ীল বা আল্লাহর সিফাতের অপব্যাখ্যাকারীদের অবস্থা মারাত্মক। এদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সুস্পষ্ট। এরাই হচ্ছে মু’তাযিলা, আশ’আরী, মাতুরিদী সম্প্রদায়।
২৮৩. যেসব স্থানে আশায়েরা, মাতুরিদী সম্প্রদায় আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের সহযোগী হয়েছে, তা হচ্ছে: ১- কবীরা গুণাহগার এর মাসআলা। ২- কবর ও হাশরের বিভিন্ন অবস্থা ও কর্মের বর্ণনা। ৩- খিলাফত ও ইমামতের মাসআলা। ৪- সাহাবীগণের ন্যায়পরায়ণ হওয়ার মাসআলা। ৫- দার্শনিক, কারামিত্বা, বাতেনিয়াদের বিরুদ্ধে তারা তাদের ক্ষমতা নিয়ে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের সাথে দাঁড়িয়েছে। যদিও প্রকৃতপক্ষে তারা না দার্শনিকদের অস্ত্র ভাঙ্গতে পেরেছে আর না তারা ইসলামকে সাহায্য করতে পেরেছে। বস্তুত তারা ইসলামের শত্রু ইয়াহুদী-নাসারা ও দার্শনিকদের সামনে দাঁড়ানোর মতো যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি।
২৮৪. আহলুত তা’ওয়ীল বলতে আমরা কাদেরকে বুঝিয়েছি তা ইতোপূর্বে ব্যক্ত করেছি, তাদের মধ্যে প্রথমেই মু’তাযিলা, তারপর আশায়েরা, তারপর মাতুরিদিয়্যা সম্প্রদায়, তাছাড়া আরও কিছু অখ্যাত সম্প্রদায়ও রয়েছে। এরা সাধারণত আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের সাথে অবস্থান করে। নিজেদেরকে আহলুস সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত বলার জন্য সচেষ্ট থাকে। ক্ষণে ক্ষণে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের সহযোগিতার দাবি করে। কিন্তু তারা তিনটি মৌলিক কারণে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আত থেকে বাইরে চলে গেছে: ১- তারা বিবেকের যুক্তিকে কুরআন ও সুন্নাহ’র ভাষ্যের ওপর প্রাধান্য দেয়। ২- তারা আকীদার ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ খবরে ওয়াহিদকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করে না। ৩- তারা তা’ওয়ীল বা অপব্যাখ্যার নীতি। অর্থাৎ যাবতীয় মুতাওয়াতির (কুরআন ও সুন্নাহ মুতাওয়াতিরাহ) কে আক্কলের বিপরীত হলে অবশ্যই তা’ওয়ীল করে নিতে হবে। এছাড়াও আকীদাহ’র প্রতিটি অধ্যায়েই আরও কিছু বিষয়ে আশায়েরাহ ও মাতুরিদিয়্যাহদের মতবাদ আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের বিরোধী, যেমন:
আকীদাহ গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের মতাদর্শ হচ্ছে, ১- বিবেকের যুক্তিকে কুরআন-সুন্নাহ’র ভাষ্যের ওপর প্রাধান্য দিতে হবে। ২- যেসব ভাষ্য মুতাওয়াতির সেগুলো যদি বিবেকের যুক্তির বিপরীত হয় তবে সেগুলোকে তা’ওয়ীল করতে হবে। ৩- আকীদাহকে দু’ভাগে ভাগ করা, আকলিয়াত (আল্লাহ সম্পর্কিত বিষয়াদি) ও সাম’ইয়াত (মৃত্যু পরবর্তী বিষয়াদি)। ৪- খবরে ওয়াহিদ আকীদাতে দলীল না হওয়া, তবে সাম’ইয়াতে তা দ্বারা দলীল নেয়া যাবে। ৫- তাদের এক গোষ্ঠী, যেমন গাযালীর মতে সূফী কাশফ ও যাওক কুরআন ও সুন্নাহর ভাষ্যের ওপর প্রাধান্য পাবে। এর জন্য কুরআন ও সুন্নাহর ভাষ্যকে তা’ওয়ীল করা যাবে, যাতে তার সাথে সামঞ্জস্য বিধান করা যায়। [রিসালাতুল ইলম আল-লাদুন্নী, কুবরা আল- ইয়াক্বীনীয়াত) ৬- কুরআন ও সুন্নাহ’র ভাষ্যের দাবি ধারণার জন্ম দেয়, দৃঢ় ইলমের ফায়েদা দেয় না। যতক্ষণ না তা দশটি দোষ থেকে মুক্ত হচ্ছে... ৭- অপর দিকে বিবেকের যুক্তি অনুযায়ী হলে দুর্বল ও বানোয়াট হাদীসও দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য।
একজন মানুষের প্রথম কর্তব্য অধ্যায়ে ১- প্রথম কর্তব্য, চিন্তা-গবেষণা বা চিন্তা-গবেষণার প্রতি ইচ্ছা, অথবা সন্দেহ করা, অথবা সন্দেহের ইচ্ছা করা। ২- মুকাল্লিদের ঈমান শুদ্ধ না হওয়া। ৩- স্রষ্টা ও সৃষ্টির আলাদা অস্তিত্বে বিশ্বাসী না হওয়া, তথা আল্লাহকে সৃষ্টি থেকে আলাদা করে ‘আরশের উপর না মানা।
ঈমান অধ্যায়ে ১- ঈমানের অভিধানিক অর্থ শুধু বিশ্বাস বলা। ২- ঈমানের শর’য়ী অর্থ নির্ধারণে ভুল করা তথা আমলকে ঈমানের রুকনের অন্তর্ভুক্ত না করণে। ৩- ঈমান বাড়া ও কমার নীতিতে।
কুফর অধ্যায়ে ১- কুফরী হওয়ার সকল শর্তপূরণ ও বাঁধা অপসারণের পরও কুফরীর বিধান বলতে দ্বিধা করা।
২- কুফরী হওয়ার জন্য বিশ্বাস থাকা বাধ্য করা অর্থাৎ কর্মগত কুফরীকে কুফরী মনে না করা।
৩- কুফরী হওয়ার জন্য মুখে কুফরী করার স্বীকৃতি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কুফরী না বলা।
□ তাওহীদ অধ্যায়ে ১- তাওহীদুর রুবুবিয়্যাতে স্রষ্টার অস্তিত্ব সাব্যস্ত করার নীতিতে ভুল পন্থা অবলম্বন। স্রষ্টার অস্তিত্ব সাব্যস্ত করতে মরিয়া হয়ে উঠা, অথচ তা ফিত্বরী ব্যাপারে। স্রষ্টার অস্তিত্ব সাব্যস্ত করার জন্য দলীল ‘হুদুস ওয়াল কিদাম’ ব্যবহার করা, যা বিতর্কিত।
২- তাওহীদুল আসমা ওয়াস সিফাতে আল্লাহর গুণাবলি সবগুলো কিংবা আংশিককে অস্বীকার কিংবা অপব্যাখ্যা।
৩- তাওহীদুল উলুহিয়্যাহকে তাওহীদের সংজ্ঞায় না নেয়া। ফলে তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ’র ব্যাপারে এসেছে চরম ঔদাসিন্য।
৪- ইলাহ ও রব একই অর্থে নেয়া।
□ শির্ক অধ্যায়ে ১- আল্লাহর অস্তিত্ব মেনে নেয়ার পরে অন্য কাউকে পরিচালক বা কর্তৃত্বকারী মেনে নিলেও শির্ক না বলা। যেমন, গাউস, কুতুব, নুকাবা, নুজাবা ইত্যাদি বিশ্বাস করা।
২- আল্লাহর গুণাবলি অন্যদের মাঝে দাবি করার পরও শির্ক না বলা।
৩- আল্লাহর ইবাদতে অন্য কাউকে শরীক করলেও মুশরিক না বলা; যতক্ষণ পর্যন্ত না তাকে রুবুবিয়্যাতের গুণ না দেয়।
□ নবুওয়াত অধ্যায়ে ১- নবুওয়াত একান্ত আল্লাহর ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। সেখানে নবীর মাঝে কোনো গুণ থাকা আবশ্যক নয়।
২- নবী-রাসূলদের নবুওয়াতের প্রমাণ শুধু মু’জিযায় সীমাবদ্ধ মনে করা।
৩- মু’জিযা, কারামাত ও জাদু, গণকবাজির মধ্যে পার্থক্য করার মানদণ্ড সঠিক না হওয়া।
৪- ওহীর ব্যাপারে ফয়েয হওয়া নীতিতে বিশ্বাসী হওয়া।
৫- কুরআন প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর এমন কালাম নয় যা দিয়ে তিনি কথা বলেছেন, এমনটি বলা।
৬- আল্লাহর কালামের স্বর ও বর্ণ নেই বলা।
□ আখেরাত অধ্যায়ে ১- হাশরের মাঠে আল্লাহর আগমন অস্বীকার করা।
২- আল্লাহকে দেখার অর্থ অনুভব করা বলে বিশ্বাস করা।
□ কাদা ও কাদর অধ্যায়ে ১- আল্লাহর ইচ্ছাকে প্রবল করে বান্দার ইচ্ছাকে প্রভাবহীন করা, যা জাবরে মা’নাউওয়ী বলে খ্যাত।
২- বান্দার কর্মকাণ্ডকে ‘কাসব’ নাম দেয়া, যার ব্যাখ্যা পৃথিবীর অসার বস্তুর একটি।
৩- তাকদীরকে মুবরাম ও মু’আল্লাক দু’ভাগে ভাগ করা।
৪- তাওফীক অর্থ আনুগত্য করার ক্ষমতা সৃষ্টি করা, আর বঞ্চিত করার অর্থ হচ্ছে গুনাহ করার ক্ষমতা সৃষ্টি করা। সরাসরি কাউকে ভালো কিংবা মন্দ করার সুযোগ দেয়া সাব্যস্ত না করা।
৫- বান্দার কর্মের সাথে কার্যকারণের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করা। যেমনে এটা বলা যে, আগুনের কাছে পুড়ে গেছে, আগুনের কারণে পুড়েনি।
৬- আল্লাহ তা’আলার কর্মকাণ্ডের হিকমত অস্বীকার করা।
২৮৫. সুতরাং যে কারণে তোমরা আল্লাহর নাম ও গুণে তা’ওয়ীল বা অপব্যাখ্যা করতে চাচ্ছ সেই একই কারণে আমরা শারীরিক পুনরুত্থান সাব্যস্তকারী ভাষ্যসমূহেরও তা’ওয়ীল করতে বাধ্য।
২৮৬. অর্থাৎ শারীরিক পুনরুত্থান সম্পর্কিত দার্শনিকদের সন্দেহের অসারতা আমরা জেনেছি। তারপরও হে মুতাকাল্লিমরা, তোমরা আল্লাহর গুণের ব্যাপারে যা বল, আমরাও অনুরূপ কথা বলতে পারি পুনরায় উত্থান সংক্রান্ত বিষয়ে।
২৮৭. অর্থাৎ আশায়েরা ও মাতুরিদীদেরকে।
২৮৮. সহীহ বুখারীতে এসেছে [(৫/২৯১), হাদীস নং ২৬৮৫], ইবন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা বলেন, "তোমরা কীভাবে আহলে কিতাবদের জিজ্ঞাসা কর? অথচ তোমাদের কিতাব যা তার নবীর ওপর নাযিল করা হয়েছে তা আল্লাহ সম্পর্কে সবচেয়ে নবীন খবরটি প্রদান করে, যা পুরাতন হয়ে যায়নি। আর আল্লাহ তোমাদেরকে জানিয়েছেন যে, আহলে কিতাবরা আল্লাহর কিতাবে যা এসেছে তাতে পরিবর্তন-পরিবর্ধন করেছে, তাদের হাতের কিতাবকে বিনষ্ট করেছে..."। তাছাড়া মহান আল্লাহ বলেন, "অতঃপর তাদের অংগীকার ভংগের জন্য আমরা তাদেরকে লা’নত করেছি ও তাদের হৃদয় কঠিন করেছি; তারা শব্দগুলোকে আপন স্থান থেকে বিকৃত করে এবং তাদেরকে যে উপদেশ দেয়া হয়েছিল তার একাংশ তারা ভুলে গেছে। আর আপনি সবসময় তাদের অল্প সংখ্যক ছাড়া সকলকেই বিশ্বাসঘাতকতা করতে দেখতে পাবেন, কাজেই তাদেরকে ক্ষমা করুন এবং উপেক্ষা করুন। নিশ্চয় আল্লাহ মুহসিনদেরকে ভালোবাসেন।” [সূরা আল-মায়েদাহ: ১৩] আরও বলেন, "অতঃপর তাদের মধ্যে যারা যালিম ছিল তাদেরকে যা বলা হয়েছিল, তার পরিবর্তে তারা অন্য কথা বলল। কাজেই আমরা আসমান থেকে তাদের প্রতি শাস্তি পাঠালাম, কারণ তারা যুলুম করত।" [সূরা আল-আ’রাফ: ১৬২]
২৮৯. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এটা সাব্যস্ত করেছেন যে, প্রাচীন আহলে কিতাবরা কখনও তাওরাতে আসা আল্লাহর সিফাতগুলোকে অস্বীকার করতো না। তবে পূর্ববর্তী আহলে কিতাবরা আল্লাহর গুণাবলিতেও বিকৃতি সাধন করেছে যখন তাদের মাঝে জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়ের মত সম্প্রদায়ের উদ্ভব হলো, যেমন দার্শনিক মূসা ইবন মাইমূন ও তার মত লোকদের আগমন ঘটে অথবা মু’তাযিলা সম্প্রদায়ের মতো লোকদের উদ্ভব হলো যেমন আবু ইয়া’কুব আল-বাসরী ও তার মতো লোকদের উত্থান হয়। [দারউ তা’আরুদ্বিল আকলি ওয়ান নাকটি (৭/৯৪)] ইবন তাইমিয়্যাহ আরও বলেছেন, ইয়াহূদীদের সাথে মু’তাযিলাদের অনেক যোগাযোগ ছিল, তাদের মাঝে কর্মগত মিলও প্রচুর। ইয়াহুদীরা মু’তাযিলাদের পাঁচ মূলনীতি পাঠ করে থাকে।
২৯০. কিন্তু কুরআনে কারীমে বা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসে আহলে কিতাবদের কিভাবে আল্লাহর নাম ও গুণ সংক্রান্ত ভাষ্যগুলোর কোনো নিন্দা আসেনি। বরং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখে সেগুলোর সত্যায়ন এসেছে।
২৯১. এর দ্বারা সে হাদীসের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যেখানে এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এক ইয়াহুদী পণ্ডিত এসে বললো, হে মুহাম্মাদ, অথবা বললো, হে আবুল কাসেম, নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন আসমানসমূহকে এক আঙুলের উপর রাখবেন, যমীনসমূহকে অপর আঙুলের উপর রাখবেন, পাহাড় ও গাছ অন্য আঙুলের উপর রাখবেন, পানি ও মাটি অপর আঙুলের উপর রাখবেন, আর সকল সৃষ্টিকে এক আঙুলের উপর রাখবেন, তারপর সেগুলো নাড়বেন এবং বলবেন, আমি রাজা, আমি রাজা। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ইয়াহূদী পণ্ডিত যা বলেছে তা শুনে আশ্চর্য হয়ে তাকে সত্যায়ন করে হাসলেন। তারপর পড়লেন, "আর তারা আল্লাঙ্কে যথোচিত সম্মান করেনি অথচ কিয়ামতের দিন সমস্ত যমীন থাকবে তাঁর হাতের মুঠিতে এবং আসমানসমূহ থাকবে ভাঁজ করা অবস্থায় তাঁর ডান হাতে। পবিত্র ও মহান তিনি, তারা যাদেরকে শরীক করে তিনি তাদের ঊর্ধ্বে।” [সূরা আয-যুমার: ৬৭]
২৯২. আল্লাহর কুরআন ও রাসূলের হাদীসে ইয়াহুদীদের ওপর তখনি দোষারোপ করেছে যখন তারা আল্লাহর সিফাতকে অস্বীকার করেছে। যখন কোনো সিফাতের ব্যাপারে বিরুপ মন্তব্য করেছে। যেমন, আল্লাহর হাত রুদ্ধ বলার কারণে আল্লাহ তাদেরকে ধমক দিয়েছেন।
২৯৩. আল্লাহর প্রতি অসম্মানজনক গুণ প্রয়োগ করার কারণে তাদের নিন্দা করা হয়েছে। কোনো সম্মানসূচক গুণ প্রদানের কারণে তাদের নিন্দা আসেনি।
২৯৪. এখানেও যেহেতু আল্লাহর প্রতি অসম্মানজনক গুণ প্রদান করা হয়েছে, তাই আল্লাহ তা’আলা সেটা নাকচ করে আয়াত নাযিল করেছেন।
২৯৫. অর্থাৎ তাওরাত ও কুরআনে।
২৯৬. কারণ কুরআনেই বিশদভাবে মা’আদ বা পুনরুত্থানের কথা এসেছে। তাওরাতে তার কেবল সাধারণ বর্ণনাই স্থান পেয়েছে।
২৯৭. অর্থাৎ মা’আদ বা পুনরুত্থান সংক্রান্ত ভাষ্য ও তথ্যসমূহ কোনোভাবে তা’ওয়ীল করা বাতিল হওয়ার বিষয়টি আবশ্যিকভাবে জানা বিষয়।
২৯৮. অর্থাৎ যদি রাসূলের দীনের মাঝে অকাট্যভাবে জানা যায় যে, পুনরুত্থান সংক্রান্ত নস বা ভাষ্যগুলোতে কোনো প্রকার তা’ওয়ীল চলবে না, তাহলে সিফাতের আয়াতসমূহে তা’ওয়ীল বাতিল হওয়ার বিষয়টি আরও বেশি উত্তমরূপে জানা যায়।