📄 রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী ও উম্মতের জন্য সবচেয়ে বেশি কল্যাণকামী
মুমিনদের নিকট জ্ঞাত যে, নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হিদায়াত ও সত্য দীনসহ পাঠিয়েছেন যাতে তিনি সকল দীনের ওপর বিজয়ী করতে পারেন। আর সাক্ষী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট। আর তিনি মানুষদেরকে আল্লাহ ও শেষ দিনের ওপর ঈমানের জন্য যেসব বিষয় সংবাদ দিয়েছেন সেগুলো অবশ্যই তাদেরকে স্পষ্ট বর্ণনা করে দিয়েছেন। আর আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমানের অন্তর্ভুক্ত বিষয় হচ্ছে, সৃষ্টির সূচনা ও সমাপ্তির ওপর ঈমান। আর সেটা হচ্ছে সৃষ্টি ও পুনরুত্থানের ওপর ঈমান, যেমনটি উভয়কে একত্রিত করেছেন আল্লাহ তাঁর এই বাণীতে:
﴿وَمِنَ النَّاسِ مَن يَقُولُ آمَنَّا بِاللَّهِ وَبِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَمَا هُم بِمُؤْمِنِينَ ﴾ [البقرة: ٨]
"আর মানুষের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যারা বলে, ‘আমরা আল্লাহ্ ও শেষ দিবসে ঈমান এনেছি’, অথচ তারা মুমিন নয়।" [সূরা আল-বাকারাহ: ০৮] এবং
﴿مَا خَلْقُكُمْ وَلَا بَعْثُكُمْ إِلَّا كَنَفْسٍ وَاحِدَةٍ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ ﴾ [لقمان: ٢٨]
"তোমাদের সবার সৃষ্টি ও পুনরুত্থান একটি প্রাণীর সৃষ্টি ও পুনরুত্থানেরই অনুরূপ। নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সম্যক দ্রষ্টা।” [সূরা লোকমান: ২৮]
﴿وَهُوَ الَّذِي يَبْدَأُ الْخَلْقَ ثُمَّ يُعِيدُهُ ﴾ [الروم: ٢٧]
"আর তিনি-ই, যিনি সৃষ্টিকে শুরুতে অস্তিত্বে আনয়ন করেন, তারপর তিনি সেটা পুনরাবৃত্তি করবেন।” [সূরা আর-রূম: ২৭]
আর আল্লাহ স্বীয় রাসূলের জবানে আল্লাহ ও শেষ দিনের ওপর ঈমানের বিষয়ে বর্ণনা দিয়েছেন যা দ্বারা তিনি তাঁর বান্দাদেরকে পথ দেখিয়েছেন এবং তার মাধ্যমে তাঁর কী উদ্দেশ্য সেটা উন্মুক্ত করে দিয়েছেন।
আর মুমিনদের জানা যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ ব্যাপারে সকলের চেয়ে অধিক অবগত, সকলের চেয়ে অধিক উম্মতের কল্যাণকামী, বক্তব্য প্রদান ও বর্ণনা করে দেয়ার ক্ষেত্রে সকলের চেয়ে বিশুদ্ধভাষী বরং সকল সৃষ্টির মধ্যে অধিকতর জ্ঞানী, কল্যাণকামী ও স্পষ্টভাষী, তাঁর ক্ষেত্রে জ্ঞান, ক্ষমতা ও ইচ্ছার পরিপূর্ণতা একত্রিত হয়েছিল। আর এটা জ্ঞাত যে, বক্তা বা কর্তার জ্ঞান, ক্ষমতা ও ইচ্ছা যখন পূর্ণতা লাভ করে তখন তার বক্তব্য ও কর্ম তেমনি পূর্ণতা লাভ করে, আর অপূর্ণতা তখন আসে যখন তার জ্ঞান অপূর্ণ থাকে কিংবা জ্ঞান প্রকাশ করতে অক্ষম হয়, নতুবা সেটা প্রকাশের ইচ্ছা তার না থাকে।
আর রাসূল তো জ্ঞানের পূর্ণতার ক্ষেত্রে সবার শীর্ষে, স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেয়ার পরিপূর্ণ ইচ্ছা থাকার ক্ষেত্রেও শীর্ষে। আর স্পষ্টভাবে পৌঁছানোর ক্ষমতা থাকার ক্ষেত্রেও শীর্ষে। আর পূর্ণ ক্ষমতা ও সামর্থ্য এবং দৃঢ় ইচ্ছা থাকা ইচ্ছাকৃত বিষয়ের অস্তিত্ব লাভ হওয়া আবশ্যক করে।
সুতরাং অকাট্যভাবে জানা গেল যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ ও আখেরাতের ওপর ঈমানের ব্যাপারে যা কিছু বর্ণনা দিয়েছেন তা দিয়ে তিনি যা কিছু বর্ণনা করার ইচ্ছা করেছেন সে উদ্দেশ্য যথাযথভাবে সাধিত হয়েছে। আর তিনি যা বর্ণনা করার ইচ্ছা করেছেন সেটা তার জ্ঞান অনুযায়ীই সম্পন্ন হয়েছে। আর এ ব্যাপারে তাঁর জ্ঞান তো সকল জ্ঞানের চেয়ে পরিপূর্ণ। সুতরাং যে ব্যক্তি ধারণা করবে যে, এ ব্যাপারে অন্য কেউ রাসূলের থেকে বেশি অবগত, রাসূলের থেকে পূর্ণ বয়ানকারী অথবা সৃষ্টির হিদায়াতের ব্যাপারে রাসূলের থেকে বেশি আগ্রহী, সে নাস্তিক; সে মুমিন নয়। অপরদিকে সাহাবী, তাবে’য়ী এবং তাদেরকে যারা সুন্দরভাবে অনুসরণ করেছেন আর যারা সালাফদের পথে ছিলেন তারা এ অধ্যায়ে সিরাতুল মুস্তাকীমের পথেই অবস্থান করেছেন।
টিকাঃ
২৬৫. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এটা সাব্যস্ত করেছেন যে, ইলম বা জ্ঞান তো সেটাই, যার সঠিক হওয়ার ওপর দলীল রয়েছে। আর উপকারী ইলম তখনই হবে যখন তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে নিয়ে আসা জ্ঞান হবে। তিনি আরও বলেন, কখনও কখনও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ ছাড়াও ইলম পাওয়া যেতে পারে তবে তা অবশ্যই দুনিয়াবী ইলম হবে, যেমন ডাক্তারী বিদ্যা, অঙ্কশাস্ত্র, কৃষিকাজ, ব্যবসা। কিন্তু ইলাহী বিদ্যা, দীনী জ্ঞান, এসব জ্ঞানের কেবল একমাত্র উৎস হচ্ছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম। সকল সৃষ্টির মাঝে রাসূলই এ বিষয় সবচেয়ে বেশি জানেন। সৃষ্টিকে তা শিক্ষা দেয়ার জন্য তাঁর ঐকান্তিক আগ্রহ প্রচণ্ড, সৃষ্টির সবার চেয়ে তা বর্ণনা করতে ও পরিচিতি তুলে ধরতেও তিনি বেশি সক্ষম। সুতরাং তিনি জ্ঞান, কুদরত, ইরাদা এ তিনটিতে সকলের উপরে। আর এ তিনটির মাধ্যমেই উদ্দেশ্য পূর্ণতা লাভ করে। রাসূল ব্যতীত অন্যরা হয় তার জ্ঞানে সমস্যা বা বিকৃতি থাকবে, অথবা সে তা শিক্ষা দিতে আগ্রহের ঘাটতি থাকবে, ফলে সে শিক্ষা দিবে না, কোনো অনুরাগ কিংবা বিরাগের কারণে, ভয়ে কিংবা অন্য কোনো কারণে, অথবা সে তার বর্ণনার ক্ষমতায় ত্রুটি থাকবে। তার বর্ণনা অন্তরে যা উপলব্ধি করেছে তা বলতে অক্ষম। [দেখুন, মাজমু’ ফাতাওয়া (১৩/১৩৬)]
২৬৬. এ কায়েদা বা নীতিটি ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ অনেক ক্ষেত্রেই উল্লেখ করে থাকেন। প্রচুর পরিমাণে গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করে থাকেন। কারণ, দৃঢ় ইচ্ছার সাথে পূর্ণ ক্ষমতা উদ্দেশ্য বিষয়টির অস্তিত্ব বাস্তবে রূপ নেয়। যেমন, ভালোবাসা যখন প্রবল হবে তখন যদি কোনো বাঁধা ও ক্ষমতার ঘাটতি না থাকবে তখন সেটার প্রভাব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে পড়বেই। তদ্রূপ অন্তরে ঈমান থাকলে তার প্রভাব মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে প্রকাশ পাবেই।
ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এ নীতিটি সাব্যস্ত করেছেন যে, প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অবস্থার মাঝে সমন্বয় হলে অনেক সমস্যার সমাধান এমনিতেই হয়ে যায়। [ফাতাওয়া (৭/৩৭০)] তিনি এ নীতিটি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বলেন, কোনো কাজ করার দৃঢ় ইচ্ছা আর তার সাথে যদি পূর্ণ ক্ষমতার সংমিশ্রণ ঘটে তবে তাতে নির্ধারিত বিষয়টি ঘটা আবশ্যক হয়ে পড়ে। [ফাতাওয়া (৭/৬৪৫)]
২৬৭. অন্যত্র শাইখুল ইসলাম বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক যে বর্ণনা এসেছে তা দু’ভাবে পেশ করা হয়েছে: এক. তিনি এ বর্ণনার ক্ষেত্রে বিবেকের যুক্তি সম্পন্ন আকলী দলীল উল্লেখ করেছেনা। আর কুরআনে কারীম সেসব আক্কলী দলীল ও দৃঢ় বিশ্বাস আনয়নকারী প্রমাণাদিতে পরিপূর্ণ, যার মাধ্যমে আল্লাহর পরিচয় লাভ করা যায়, দীনের উদ্দেশ্যসমূহ স্পষ্ট হয়। দুই. তিনি শুধু বিভিন্ন বিষয়ের সংবাদ প্রদান করেছেন; কারণ তিনি স্পষ্ট নিদর্শন ও দৃঢ় প্রমাণাদি প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়েছেন যে, তিনি আল্লাহর রাসূল। আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রচারক। তিনি সত্য ব্যতীত আর কিছু বলেন না। আল্লাহ তা'আলাও তাঁর সত্যতার ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছেন, তিনি তাঁর বান্দাদেরকে জানিয়েছেন, তাদেরকে সংবাদ দিয়েছেন যে, রাসূল আল্লাহর কাছ থেকে যা বর্ণনা করেন ও প্রচার করেন তাতে সত্য ও সত্যয়ণকৃত। [ইবন তাইমিয়্যাহ, ফাতাওয়া (১৩/১৩৬-১৩৭)]
২৬৮. কারণ তারা কখনো মনে করেনি যে, রাসূলের চেয়ে অন্য কেউ বেশি জ্ঞানী, বেশি বর্ণনার অধিকারী, উম্মতের প্রতি বেশি যত্নবান হতে পারবেন। সুতরাং তাদের পথই সঠিক পথ ও হক্ক পথ। যারা এ মত থেকে আলাদা হয়ে গেছে তারা কয়েক শ্রেণিতে বিভক্ত। আগত অংশে ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ পথভ্রষ্টদের শ্রেণিবিভাগ করছেন। তাদের কমন ভুল হচ্ছে তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর উপরোক্ত কোনো এক বিষয়ে অপর কাউকে অধিক অগ্রগণ্য মনে করেছে।
📄 সালাফে সালেহীনের পথ থেকে বক্রপথে অবস্থানকারীদের শ্রেণিবিভাগ
আর যারা সালাফদের পথ থেকে বিচ্যুত তারা তিন গ্রুপ: (১) নবী-রাসূলদের আনীত বিষয়গুলোতে বিস্তর কল্পনার অপবাদ প্রদানকারী, (২) নবী-রাসূলদের আনীত বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে তা’ওয়ীল তথা অপব্যাখ্যার নীতি অনুসারী, এবং (৩) নবী-রাসূলদের আনীত বিষয়গুলোর ব্যাপারে অজ্ঞতার নীতি অনুসারী।
[প্রথম গোষ্ঠী: নবী-রাসূলদের আনীত বিষয়গুলোতে বিস্তর কল্পনার অপবাদ প্রদানকারী] নবী রাসূলগণ কর্তৃক আনীত বিষয়গুলোর ব্যাপারে নবী রাসূলগণের ওপর বিস্তর কল্পনার অপবাদ প্রদানকারীরা হচ্ছে- দার্শনিক সম্প্রদায় এবং তাদের পথে কালামপন্থী ও তথাকথিত ফকীহরা যারা বলে, নিশ্চয় আল্লাহ ও শেষ দিনের ওপর ঈমানের বিষয়ে রাসূল যা উল্লেখ করেছেন তা দ্বারা উদ্দেশ্য কেবল প্রকৃত অবস্থার একটি কাল্পনিক রূপ প্রদান করা; যাতে তা দ্বারা সাধারণ জনগণ উপকার লাভ করেন। এটা নয় যে, তা দ্বারা তিনি সত্যকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন বা সৃষ্টিকে পথ দেখিয়েছেন বা হাকীকতকে ফুটিয়ে তুলেছেন। এরা আবার দুই ভাগে বিভক্ত:
• কেউ কেউ বলে, রাসূল হাকীকতকে তার আসলরূপে জানতেন না, বরং কিছু ইলাহী দার্শনিক আছে যারা সেটা জানে। তেমনি জানে এমন কিছু লোকও যাদেরকে তারা আউলিয়া নামে আখ্যায়িত করেছে। তারা মনে করে, দার্শনিক ও আউলিয়াদের কেউ কেউ আল্লাহ ও শেষ দিন সম্বন্ধে রাসূলদের থেকে বেশি অবগত। এটি হচ্ছে ঘোর নাস্তিক টাইপের দার্শনিক ও বাতেনী ফির্কার মতবাদ। যে বাতেনীগুলোর কেউ শীয়া বাতেনীয়া সম্প্রদায়ের আর কেউ সূফী বাতেনীয়া সম্প্রদায়ের। • আবার তাদের কেউ কেউ বলেন, বরং রাসূল সেটা জানতেন কিন্তু বর্ণনা করেননি। বরং বলেছেন তার বিপরীত কথা। আর তিনি চেয়েছেন মানুষ যেন হক্ক (সত্যের) বিপরীতটিই বুঝে; কারণ হকের বিপরীতে থাকার মধ্যে সৃষ্টিকুলের জন্য কল্যাণ ও স্বার্থ রয়েছে।
এরা আরও বলে, রাসূলের ওপর আবশ্যক হচ্ছে মানুষকে তাজসীম (দেহ সাব্যস্ত করা)-র বিশ্বাসের দিকে আহ্বান করা, যদিও সেটা বাতিল। তেমনি এটা বিশ্বাস করতে মানুষদেরকে জানাবেন যে, শরীরসহ পুনরুত্থান হবে, যদিও তা বাতিল। অনুরূপ এটা বিশ্বাস করতে যে, জান্নাতীরা খাওয়া-দাওয়া করবে যদিও তা বাতিল। তারা বলে: কেননা এই পদ্ধতিতে ছাড়া অন্য কোনোভাবে সৃষ্টিকে দাওয়াত দেয়া সম্ভব নয়, এটা মিথ্যা তবে বান্দাদের স্বার্থে। এ হচ্ছে আল্লাহ ও আখেরাতের ওপর ঈমানের বিষয়ে আগত নসসমূহের ব্যাপারে তাদের বক্তব্য।
আর আমল বা কর্মের ক্ষেত্রে: তাদের কেউ কেউ সেটা বাস্তব অর্থে স্বীকার করে, আবার কেউ কেউ উপরের মতো এক্ষেত্রেও বলে যে, আমলের জন্য সাধারণ শ্রেণি আদিষ্ট, বিশেষ শ্রেণি নয়। এটাই হচ্ছে দীনদ্রোহী বাতেনি ফিরকাহ, ইসমাঈলিয়্যাহ ও তাদের মতো লোকদের মতাদর্শ।
টিকাঃ
২৬৯. যদি এসব গ্রুপের লোকেরা সাক্ষ্য দিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলের চেয়ে বড় জ্ঞানী, সবচেয়ে বড় কল্যাণকামী, সবচেয়ে বড় স্পষ্টভাষী বর্ণনাকারী, তাহলে তারা এসব ধ্যান- ধারণা কিংবা বিকৃতি কিংবা মূর্খতার দলে যোগ দিত না।
২৭০. ইবনুল কাইয়্যেম আল্লাহর সিফাত বিষয়ে মানুষদেরকে বিস্তারিত পাঁচভাবে বিভক্ত করেছেন: ১- তা’ওয়ীল পদ্ধতির অনুসারী। ২- কল্পনাকারী অপবাদ প্রদানকারীদের অনুসারী। ৩- মূর্খতার অপবাদ প্রদানকারী সম্প্রদায়। ৪- তাশবীহ ও তামসীল বা সাদৃশ্য ও উদাহরণ প্রদানকারী সম্প্রদায় ৫- সঠিক পথের অনুসারী সম্প্রদায়। বিস্তারিত দেখুন আস-সাওয়া’য়িকুল মুরসালাহ (২/৪১৮)।
২৭১. ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, তারা হচ্ছে ঐ সম্প্রদায়, যারা বিশ্বাস করে যে, রাসূলগণ সৃষ্টির মাঝে কখনও হক্ক কথা প্রকাশ করেননি। কারণ সেটা প্রাপ্ত হওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। তাদের কাছে এ ব্যাপারে এক প্রকার কল্পনা ভর করছিল, তারা সে কল্পনাকে বাহিক্য জিনিসে ব্যক্ত করেছিলেন মাত্র। [আস-সাওয়া’য়িকুল মুরসালাহ (২/৪১৮-৪১৯)] ইবনুল তাইমিয়্যাহ বলেন, ইবন সীনা ও তার মত কিছু দার্শনিক এ ধরনের কথা দিয়ে তাদের মূলনীতি দাঁড় করিয়েছে, যেমন ইবন সীনা তার আর-রিসালাতুল উদ্বহুওয়িয়্যাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। [দারউত তা’আরুদ্ব (১/১)]
২৭২. ক্বারামিত্বা ও দার্শনিকদের মত হচ্ছে, রাসূলগণ এসব বিষয় জানতেন না। তারা বলে নবীর চেয়ে দার্শনিক ভালো জানে। নবীর কাজই হচ্ছে মানুষদেরকে নিজের কল্পনার জগতে নিয়ে যাওয়া। তাদের নিকট নবুওয়াত সাধারণ মানুষের জন্য শ্রেষ্ঠ হতে পারে, তবে সেটা জ্ঞানী-গুণী ও মারেফাতের দাবীদারদের নিকট নয়। ফারাবী ও তার মত যারা আছে যেমন, মুবাশ্বির ইবন ফাতিক ও তার মত ইসমা’ঈলী সম্পদ্রয়ায়ের লোকেরা বলে থাকে। [ফাতাওয়া (৪/৯৮-৯৯), (১৯/১৫৬)]
২৭৩. বাতেনী ফির্কা বলা হয় এজন্য যে, তারা মনে করে কুরআন ও সুন্নাহ’র ভাষ্যের একটি গোপন অর্থ রয়েছে যা প্রকাশ্য অর্থের বিপরীত। বাতেনীদের মধ্যে যারা অত্যন্ত ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত তারা হচ্ছে, কারামিতা, যাদেরকে সীমালঙ্ঘনকারী শিয়াদের মধ্যে গণ্য করা হয়। শাহরাস্তানী বলেন, তাদের যেসব উপাধী রয়েছে তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, বাতেনিয়্যা, কারামিত্বা, মুযদাকিয়্যাহ। তাদের নেতারা তাদের কিছু বক্তব্যকে দার্শনিকদের বক্তব্যের সাথে মিশিয়ে দিয়েছে। [আল-মিলাল ওয়ান নিহাল (১/২২৮)]
২৭৪. সূফী বলা হয়, কারণ তারা সূফ পরিধান করত। সূফ মানে পশমের মোটা কাপড়। প্রাথমিক দিকে যারা দুনিয়াবিমুখ হতো, বেশি ইবাদত করতো তাদেরকে সূফী বলা হতো। তবে সেটা প্রথম তিন উত্তম যুগে প্রসিদ্ধ ছিল না। বিষয়টি প্রথমে পরহেযগারী ও তাকওয়ার চর্চাতে থাকলেও কালক্রমে সেটি বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘনে রূপ নেয়। এমনকি তাদের অনেকেই দীনের গণ্ডী থেকে বের হয়ে যায়। পরবর্তীতে তারাই নতুন করে কুরআন ও হাদীসের গোপন ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছিল। তাদের বিখ্যাত বাড়াবাড়িকারী লোকদের মধ্যে রয়েছে, ইবন আরাবী, হাল্লাজ, ইবন সাব’ঈন ও অন্যান্যরা। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ’ ফাতাওয়া (১১/৫)।
২৭৫. ইবন তাইমিয়্যাহ স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন যে, এ মতটি মৌলিকভাবে কিছু দার্শনিক ও বাতেনী ফির্কার লোকদের। যেমন, ইসমা’ঈলী সম্প্রদায়ের নাস্তিকদের, ইখওয়ানুস সাফার রাসায়িল লিখকদের, ফারাবীর, ইবন সীনার, হত্যাকৃত সোহরাওয়ার্দীর, ইবন রুশদ আল-হাফীদের। অনুরূপভাবে তা সেসব সুফী মুলহিদদের মতও, যারা তাদের তাসাউফের পূর্বসূরী কুরআন ও সুন্নাহ’র অনুসারী শাইখদের মত থেকে বের হয়ে গেছে। যেমন ইবন আরাবী, ইবন সাব’ঈন, ইবনুত তুফাইল; যে ব্যক্তি হাই ইবন ইয়াক্কযান এর রিসালা লিখেছিল। [দারউত তা’আরুদ্ব (১/১০- ১১)]
এরা মনে করে কল্পনার বিষয়টি রাসূলের বক্তব্যে, তবে ইলমে নয়। [ফাতাওয়া (১৯/১৫৬)] ইবন তাইমিয়্যাহ আরও বলেন, এরা চেয়েছিল রাসূল মিথ্যা বলবেন স্বার্থের জন্য এমনটি বলতে, বিনা স্বার্থে বলবেন না এমনটি বলতে, কিন্তু তারা এর মাধ্যমে মারাত্মক খারাপ কর্মে লিপ্ত হয়েছে; কারণ তাদের কথার অর্থ হচ্ছে রাসূল মানুষদেরকে সংশয়ে নিক্ষেপ করেছেন, অন্ধকারে রেখেছেন, সৃষ্টিকে ভ্রষ্ট করেছেন, বরং বাতিল প্রকাশ করেছেন আর হক্ক গোপন করেছেন। (নাউযুবিল্লাহ) দেখুন, মাজমু’ ফাতাওয়া (৪/৯৮), (১৯/১৫৭); দারউত তা’আরুদ্ব (৫/৬০-৭৩)।
২৭৬. এ নীতিটি অবলম্বন করেছে ইবন সীনা, ইবন রুশদ আল-হাফীদ। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ইবন রুশদ বাতেনী ফির্কার লোকদের অন্তর্ভুক্ত, যারা মনে করে প্রকাশ্য শরী’আতের বাতেনী একটি ব্যাখ্যা রয়েছে যা যাহেরী শরী’আতের বিরোধী। দেখুন, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (২/১৬৬)।
২৭৭. অর্থাৎ প্রকাশ্য আমল যেমন সালাত, সাওম, হজ, যাকাত, সৎকাজ, সালাম, দো’আ, যিকির ইত্যাদি।
📄 প্রথম গোত্র: নবী-রাসূলদের আনীত বিষয়গুলোতে বিশুদ্ধ কল্পনার অপবাদ প্রদানকারী
নবী রাসূলগণ কর্তৃক আনীত বিষয়গুলোর ব্যাপারে নবী রাসূলগণের ওপর বিস্তর কল্পনার অপবাদ প্রদানকারীরা হচ্ছে- দার্শনিক সম্প্রদায় এবং তাদের পথে কালামপন্থী ও তথাকথিত ফকীহরা যারা বলে, নিশ্চয় আল্লাহ ও শেষ দিনের ওপর ঈমানের বিষয়ে রাসূল যা উল্লেখ করেছেন তা দ্বারা উদ্দেশ্য কেবল প্রকৃত অবস্থার একটি কাল্পনিক রূপ প্রদান করা; যাতে তা দ্বারা সাধারণ জনগণ উপকার লাভ করেন। এটা নয় যে, তা দ্বারা তিনি সত্যকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন বা সৃষ্টিকে পথ দেখিয়েছেন বা হাকীকতকে ফুটিয়ে তুলেছেন। এরা আবার দুই ভাগে বিভক্ত:
• কেউ কেউ বলে, রাসূল হাকীকতকে তার আসলরূপে জানতেন না, বরং কিছু ইলাহী দার্শনিক আছে যারা সেটা জানে। তেমনি জানে এমন কিছু লোকও যাদেরকে তারা আউলিয়া নামে আখ্যায়িত করেছে। তারা মনে করে, দার্শনিক ও আউলিয়াদের কেউ কেউ আল্লাহ ও শেষ দিন সম্বন্ধে রাসূলদের থেকে বেশি অবগত। এটি হচ্ছে ঘোর নাস্তিক টাইপের দার্শনিক ও বাতেনী ফির্কার মতবাদ। যে বাতেনীগুলোর কেউ শীয়া বাতেনীয়া সম্প্রদায়ের আর কেউ সূফী বাতেনীয়া সম্প্রদায়ের। • আবার তাদের কেউ কেউ বলেন, বরং রাসূল সেটা জানতেন কিন্তু বর্ণনা করেননি। বরং বলেছেন তার বিপরীত কথা। আর তিনি চেয়েছেন মানুষ যেন হক্ক (সত্যের) বিপরীতটিই বুঝে; কারণ হকের বিপরীতে থাকার মধ্যে সৃষ্টিকুলের জন্য কল্যাণ ও স্বার্থ রয়েছে।
এরা আরও বলে, রাসূলের ওপর আবশ্যক হচ্ছে মানুষকে তাজসীম (দেহ সাব্যস্ত করা)-র বিশ্বাসের দিকে আহ্বান করা, যদিও সেটা বাতিল। তেমনি এটা বিশ্বাস করতে মানুষদেরকে জানাবেন যে, শরীরসহ পুনরুত্থان হবে, যদিও তা বাতিল। অনুরূপ এটা বিশ্বাস করতে যে, জান্নাতীরা খাওয়া-দাওয়া করবে যদিও তা বাতিল। তারা বলে: কেননা এই পদ্ধতিতে ছাড়া অন্য কোনোভাবে সৃষ্টিকে দাওয়াত দেয়া সম্ভব নয়, এটা মিথ্যা তবে বান্দাদের স্বার্থে। এ হচ্ছে আল্লাহ ও আখেরাতের ওপর ঈমানের বিষয়ে আগত নসসমূহের ব্যাপারে তাদের বক্তব্য।
আর আমল বা কর্মের ক্ষেত্রে: তাদের কেউ কেউ সেটা বাস্তব অর্থে স্বীকার করে, আবার কেউ কেউ উপরের মতো এক্ষেত্রেও বলে যে, আমলের জন্য সাধারণ শ্রেণি আদিষ্ট, বিশেষ শ্রেণি নয়। এটাই হচ্ছে দীনদ্রোহী বাতেনি ফিরকাহ, ইসমাঈলিয়্যাহ ও তাদের মতো লোকদের মতাদর্শ।
টিকাঃ
২৬৯. যদি এসব গ্রুপের লোকেরা সাক্ষ্য দিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলের চেয়ে বড় জ্ঞানী, সবচেয়ে বড় কল্যাণকামী, সবচেয়ে বড় স্পষ্টভাষী বর্ণনাকারী, তাহলে তারা এসব ধ্যান- ধারণা কিংবা বিকৃতি কিংবা মূর্খতার দলে যোগ দিত না।
২৭০. ইবনুল কাইয়্যেম আল্লাহর সিফাত বিষয়ে মানুষদেরকে বিস্তারিত পাঁচভাবে বিভক্ত করেছেন: ১- তা’ওয়ীল পদ্ধতির অনুসারী। ২- কল্পনাকারী অপবাদ প্রদানকারীদের অনুসারী। ৩- মূর্খতার অপবাদ প্রদানকারী সম্প্রদায়। ৪- তাশবীহ ও তামসীল বা সাদৃশ্য ও উদাহরণ প্রদানকারী সম্প্রদায় ৫- সঠিক পথের অনুসারী সম্প্রদায়। বিস্তারিত দেখুন আস-সাওয়া’য়িকুল মুরসালাহ (২/৪১৮)।
২৭১. ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, তারা হচ্ছে ঐ সম্প্রদায়, যারা বিশ্বাস করে যে, রাসূলগণ সৃষ্টির মাঝে কখনও হক্ক কথা প্রকাশ করেননি। কারণ সেটা প্রাপ্ত হওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। তাদের কাছে এ ব্যাপারে এক প্রকার কল্পনা ভর করছিল, তারা সে কল্পনাকে বাহিক্য জিনিসে ব্যক্ত করেছিলেন মাত্র। [আস-সাওয়া’য়িকুল মুরসালাহ (২/৪১৮-৪১৯)] ইবনুল তাইমিয়্যাহ বলেন, ইবন সীনা ও তার মত কিছু দার্শনিক এ ধরনের কথা দিয়ে তাদের মূলনীতি দাঁড় করিয়েছে, যেমন ইবন সীনা তার আর-রিসালাতুল উদ্বহুওয়িয়্যাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। [দারউত তা’আরুদ্ব (১/১)]
২৭২. ক্বারামিত্বা ও দার্শনিকদের মত হচ্ছে, রাসূলগণ এসব বিষয় জানতেন না। তারা বলে নবীর চেয়ে দার্শনিক ভালো জানে। নবীর কাজই হচ্ছে মানুষদেরকে নিজের কল্পনার জগতে নিয়ে যাওয়া। তাদের নিকট নবুওয়াত সাধারণ মানুষের জন্য শ্রেষ্ঠ হতে পারে, তবে সেটা জ্ঞানী-গুণী ও মারেফাতের দাবীদারদের নিকট নয়। ফারাবী ও তার মত যারা আছে যেমন, মুবাশ্বির ইবন ফাতিক ও তার মত ইসমা’ঈলী সম্পদ্রয়ায়ের লোকেরা বলে থাকে। [ফাতাওয়া (৪/৯৮-৯৯), (১৯/১৫৬)]
২৭৩. বাতেনী ফির্কা বলা হয় এজন্য যে, তারা মনে করে কুরআন ও সুন্নাহ’র ভাষ্যের একটি গোপন অর্থ রয়েছে যা প্রকাশ্য অর্থের বিপরীত। বাতেনীদের মধ্যে যারা অত্যন্ত ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত তারা হচ্ছে, কারামিতা, যাদেরকে সীমালঙ্ঘনকারী শিয়াদের মধ্যে গণ্য করা হয়। শাহরাস্তানী বলেন, তাদের যেসব উপাধী রয়েছে তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, বাতেনিয়্যা, কারামিত্বা, মুযদাকিয়্যাহ। তাদের নেতারা তাদের কিছু বক্তব্যকে দার্শনিকদের বক্তব্যের সাথে মিশিয়ে দিয়েছে। [আল-মিলাল ওয়ান নিহাল (১/২২৮)]
২৭৪. সূফী বলা হয়, কারণ তারা সূফ পরিধান করত। সূফ মানে পশমের মোটা কাপড়। প্রাথমিক দিকে যারা দুনিয়াবিমুখ হতো, বেশি ইবাদত করতো তাদেরকে সূফী বলা হতো। তবে সেটা প্রথম তিন উত্তম যুগে প্রসিদ্ধ ছিল না। বিষয়টি প্রথমে পরহেযগারী ও তাকওয়ার চর্চাতে থাকলেও কালক্রমে সেটি বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘনে রূপ নেয়। এমনকি তাদের অনেকেই দীনের গণ্ডী থেকে বের হয়ে যায়। পরবর্তীতে তারাই নতুন করে কুরআন ও হাদীসের গোপন ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছিল। তাদের বিখ্যাত বাড়াবাড়িকারী লোকদের মধ্যে রয়েছে, ইবন আরাবী, হাল্লাজ, ইবন সাব’ঈন ও অন্যান্যরা। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ’ ফাতাওয়া (১১/৫)।
২৭৫. ইবন তাইমিয়্যাহ স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন যে, এ মতটি মৌলিকভাবে কিছু দার্শনিক ও বাতেনী ফির্কার লোকদের। যেমন, ইসমা’ঈলী সম্প্রদায়ের নাস্তিকদের, ইখওয়ানুস সাফার রাসায়িল লিখকদের, ফারাবীর, ইবন সীনার, হত্যাকৃত সোহরাওয়ার্দীর, ইবন রুশদ আল-হাফীদের। অনুরূপভাবে তা সেসব সুফী মুলহিদদের মতও, যারা তাদের তাসাউফের পূর্বসূরী কুরআন ও সুন্নাহ’র অনুসারী শাইখদের মত থেকে বের হয়ে গেছে। যেমন ইবন আরাবী, ইবন সাব’ঈন, ইবনুত তুফাইল; যে ব্যক্তি হাই ইবন ইয়াক্কযান এর রিসালা লিখেছিল। [দারউত তা’আরুদ্ব (১/১০- ১১)]
এরা মনে করে কল্পনার বিষয়টি রাসূলের বক্তব্যে, তবে ইলমে নয়। [ফাতাওয়া (১৯/১৫৬)] ইবন তাইমিয়্যাহ আরও বলেন, এরা চেয়েছিল রাসূল মিথ্যা বলবেন স্বার্থের জন্য এমনটি বলতে, বিনা স্বার্থে বলবেন না এমনটি বলতে, কিন্তু তারা এর মাধ্যমে মারাত্মক খারাপ কর্মে লিপ্ত হয়েছে; কারণ তাদের কথার অর্থ হচ্ছে রাসূল মানুষদেরকে সংশয়ে নিক্ষেপ করেছেন, অন্ধকারে রেখেছেন, সৃষ্টিকে ভ্রষ্ট করেছেন, বরং বাতিল প্রকাশ করেছেন আর হক্ক গোপন করেছেন। (নাউযুবিল্লাহ) দেখুন, মাজমু’ ফাতাওয়া (৪/৯৮), (১৯/১৫৭); দারউত তা’আরুদ্ব (৫/৬০-৭৩)।
২৭৬. এ নীতিটি অবলম্বন করেছে ইবন সীনা, ইবন রুশদ আল-হাফীদ। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ইবন রুশদ বাতেনী ফির্কার লোকদের অন্তর্ভুক্ত, যারা মনে করে প্রকাশ্য শরী’আতের বাতেনী একটি ব্যাখ্যা রয়েছে যা যাহেরী শরী’আতের বিরোধী। দেখুন, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (২/১৬৬)।
২৭৭. অর্থাৎ প্রকাশ্য আমল যেমন সালাত, সাওম, হজ, যাকাত, সৎকাজ, সালাম, দো’আ, যিকির ইত্যাদি।
নবী রাসূলগণ কর্তৃক আনীত বিষয়গুলোর ব্যাপারে নবী রাসূলগণের ওপর বিস্তর কল্পনার অপবাদ প্রদানকারীরা হচ্ছে- দার্শনিক সম্প্রদায় এবং তাদের পথে কালামপন্থী ও তথাকথিত ফকীহরা যারা বলে, নিশ্চয় আল্লাহ ও শেষ দিনের ওপর ঈমানের বিষয়ে রাসূল যা উল্লেখ করেছেন তা দ্বারা উদ্দেশ্য কেবল প্রকৃত অবস্থার একটি কাল্পনিক রূপ প্রদান করা; যাতে তা দ্বারা সাধারণ জনগণ উপকার লাভ করেন। এটা নয় যে, তা দ্বারা তিনি সত্যকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন বা সৃষ্টিকে পথ দেখিয়েছেন বা হাকীকতকে ফুটিয়ে তুলেছেন। এরা আবার দুই ভাগে বিভক্ত:
• কেউ কেউ বলে, রাসূল হাকীকতকে তার আসলরূপে জানতেন না, বরং কিছু ইলাহী দার্শনিক আছে যারা সেটা জানে। তেমনি জানে এমন কিছু লোকও যাদেরকে তারা আউলিয়া নামে আখ্যায়িত করেছে। তারা মনে করে, দার্শনিক ও আউলিয়াদের কেউ কেউ আল্লাহ ও শেষ দিন সম্বন্ধে রাসূলদের থেকে বেশি অবগত। এটি হচ্ছে ঘোর নাস্তিক টাইপের দার্শনিক ও বাতেনী ফির্কার মতবাদ। যে বাতেনীগুলোর কেউ শীয়া বাতেনীয়া সম্প্রদায়ের আর কেউ সূফী বাতেনীয়া সম্প্রদায়ের। • আবার তাদের কেউ কেউ বলেন, বরং রাসূল সেটা জানতেন কিন্তু বর্ণনা করেননি। বরং বলেছেন তার বিপরীত কথা। আর তিনি চেয়েছেন মানুষ যেন হক্ক (সত্যের) বিপরীতটিই বুঝে; কারণ হকের বিপরীতে থাকার মধ্যে সৃষ্টিকুলের জন্য কল্যাণ ও স্বার্থ রয়েছে।
এরা আরও বলে, রাসূলের ওপর আবশ্যক হচ্ছে মানুষকে তাজসীম (দেহ সাব্যস্ত করা)-র বিশ্বাসের দিকে আহ্বান করা, যদিও সেটা বাতিল। তেমনি এটা বিশ্বাস করতে মানুষদেরকে জানাবেন যে, শরীরসহ পুনরুত্থان হবে, যদিও তা বাতিল। অনুরূপ এটা বিশ্বাস করতে যে, জান্নাতীরা খাওয়া-দাওয়া করবে যদিও তা বাতিল। তারা বলে: কেননা এই পদ্ধতিতে ছাড়া অন্য কোনোভাবে সৃষ্টিকে দাওয়াত দেয়া সম্ভব নয়, এটা মিথ্যা তবে বান্দাদের স্বার্থে। এ হচ্ছে আল্লাহ ও আখেরাতের ওপর ঈমানের বিষয়ে আগত নসসমূহের ব্যাপারে তাদের বক্তব্য।
আর আমল বা কর্মের ক্ষেত্রে: তাদের কেউ কেউ সেটা বাস্তব অর্থে স্বীকার করে, আবার কেউ কেউ উপরের মতো এক্ষেত্রেও বলে যে, আমলের জন্য সাধারণ শ্রেণি আদিষ্ট, বিশেষ শ্রেণি নয়। এটাই হচ্ছে দীনদ্রোহী বাতেনি ফিরকাহ, ইসমাঈলিয়্যাহ ও তাদের মতো লোকদের মতাদর্শ।
টিকাঃ
২৬৯. যদি এসব গ্রুপের লোকেরা সাক্ষ্য দিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলের চেয়ে বড় জ্ঞানী, সবচেয়ে বড় কল্যাণকামী, সবচেয়ে বড় স্পষ্টভাষী বর্ণনাকারী, তাহলে তারা এসব ধ্যান- ধারণা কিংবা বিকৃতি কিংবা মূর্খতার দলে যোগ দিত না।
২৭০. ইবনুল কাইয়্যেম আল্লাহর সিফাত বিষয়ে মানুষদেরকে বিস্তারিত পাঁচভাবে বিভক্ত করেছেন: ১- তা’ওয়ীল পদ্ধতির অনুসারী। ২- কল্পনাকারী অপবাদ প্রদানকারীদের অনুসারী। ৩- মূর্খতার অপবাদ প্রদানকারী সম্প্রদায়। ৪- তাশবীহ ও তামসীল বা সাদৃশ্য ও উদাহরণ প্রদানকারী সম্প্রদায় ৫- সঠিক পথের অনুসারী সম্প্রদায়। বিস্তারিত দেখুন আস-সাওয়া’য়িকুল মুরসালাহ (২/৪১৮)।
২৭১. ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, তারা হচ্ছে ঐ সম্প্রদায়, যারা বিশ্বাস করে যে, রাসূলগণ সৃষ্টির মাঝে কখনও হক্ক কথা প্রকাশ করেননি। কারণ সেটা প্রাপ্ত হওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। তাদের কাছে এ ব্যাপারে এক প্রকার কল্পনা ভর করছিল, তারা সে কল্পনাকে বাহিক্য জিনিসে ব্যক্ত করেছিলেন মাত্র। [আস-সাওয়া’য়িকুল মুরসালাহ (২/৪১৮-৪১৯)] ইবনুল তাইমিয়্যাহ বলেন, ইবন সীনা ও তার মত কিছু দার্শনিক এ ধরনের কথা দিয়ে তাদের মূলনীতি দাঁড় করিয়েছে, যেমন ইবন সীনা তার আর-রিসালাতুল উদ্বহুওয়িয়্যাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। [দারউত তা’আরুদ্ব (১/১)]
২৭২. ক্বারামিত্বা ও দার্শনিকদের মত হচ্ছে, রাসূলগণ এসব বিষয় জানতেন না। তারা বলে নবীর চেয়ে দার্শনিক ভালো জানে। নবীর কাজই হচ্ছে মানুষদেরকে নিজের কল্পনার জগতে নিয়ে যাওয়া। তাদের নিকট নবুওয়াত সাধারণ মানুষের জন্য শ্রেষ্ঠ হতে পারে, তবে সেটা জ্ঞানী-গুণী ও মারেফাতের দাবীদারদের নিকট নয়। ফারাবী ও তার মত যারা আছে যেমন, মুবাশ্বির ইবন ফাতিক ও তার মত ইসমা’ঈলী সম্পদ্রয়ায়ের লোকেরা বলে থাকে। [ফাতাওয়া (৪/৯৮-৯৯), (১৯/১৫৬)]
২৭৩. বাতেনী ফির্কা বলা হয় এজন্য যে, তারা মনে করে কুরআন ও সুন্নাহ’র ভাষ্যের একটি গোপন অর্থ রয়েছে যা প্রকাশ্য অর্থের বিপরীত। বাতেনীদের মধ্যে যারা অত্যন্ত ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত তারা হচ্ছে, কারামিতা, যাদেরকে সীমালঙ্ঘনকারী শিয়াদের মধ্যে গণ্য করা হয়। শাহরাস্তানী বলেন, তাদের যেসব উপাধী রয়েছে তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, বাতেনিয়্যা, কারামিত্বা, মুযদাকিয়্যাহ। তাদের নেতারা তাদের কিছু বক্তব্যকে দার্শনিকদের বক্তব্যের সাথে মিশিয়ে দিয়েছে। [আল-মিলাল ওয়ান নিহাল (১/২২৮)]
২৭৪. সূফী বলা হয়, কারণ তারা সূফ পরিধান করত। সূফ মানে পশমের মোটা কাপড়। প্রাথমিক দিকে যারা দুনিয়াবিমুখ হতো, বেশি ইবাদত করতো তাদেরকে সূফী বলা হতো। তবে সেটা প্রথম তিন উত্তম যুগে প্রসিদ্ধ ছিল না। বিষয়টি প্রথমে পরহেযগারী ও তাকওয়ার চর্চাতে থাকলেও কালক্রমে সেটি বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘনে রূপ নেয়। এমনকি তাদের অনেকেই দীনের গণ্ডী থেকে বের হয়ে যায়। পরবর্তীতে তারাই নতুন করে কুরআন ও হাদীসের গোপন ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছিল। তাদের বিখ্যাত বাড়াবাড়িকারী লোকদের মধ্যে রয়েছে, ইবন আরাবী, হাল্লাজ, ইবন সাব’ঈন ও অন্যান্যরা। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ’ ফাতাওয়া (১১/৫)।
২৭৫. ইবন তাইমিয়্যাহ স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন যে, এ মতটি মৌলিকভাবে কিছু দার্শনিক ও বাতেনী ফির্কার লোকদের। যেমন, ইসমা’ঈলী সম্প্রদায়ের নাস্তিকদের, ইখওয়ানুস সাফার রাসায়িল লিখকদের, ফারাবীর, ইবন সীনার, হত্যাকৃত সোহরাওয়ার্দীর, ইবন রুশদ আল-হাফীদের। অনুরূপভাবে তা সেসব সুফী মুলহিদদের মতও, যারা তাদের তাসাউফের পূর্বসূরী কুরআন ও সুন্নাহ’র অনুসারী শাইখদের মত থেকে বের হয়ে গেছে। যেমন ইবন আরাবী, ইবন সাব’ঈন, ইবনুত তুফাইল; যে ব্যক্তি হাই ইবন ইয়াক্কযান এর রিসালা লিখেছিল। [দারউত তা’আরুদ্ব (১/১০- ১১)]
এরা মনে করে কল্পনার বিষয়টি রাসূলের বক্তব্যে, তবে ইলমে নয়। [ফাতাওয়া (১৯/১৫৬)] ইবন তাইমিয়্যাহ আরও বলেন, এরা চেয়েছিল রাসূল মিথ্যা বলবেন স্বার্থের জন্য এমনটি বলতে, বিনা স্বার্থে বলবেন না এমনটি বলতে, কিন্তু তারা এর মাধ্যমে মারাত্মক খারাপ কর্মে লিপ্ত হয়েছে; কারণ তাদের কথার অর্থ হচ্ছে রাসূল মানুষদেরকে সংশয়ে নিক্ষেপ করেছেন, অন্ধকারে রেখেছেন, সৃষ্টিকে ভ্রষ্ট করেছেন, বরং বাতিল প্রকাশ করেছেন আর হক্ক গোপন করেছেন। (নাউযুবিল্লাহ) দেখুন, মাজমু’ ফাতাওয়া (৪/৯৮), (১৯/১৫৭); দারউত তা’আরুদ্ব (৫/৬০-৭৩)।
২৭৬. এ নীতিটি অবলম্বন করেছে ইবন সীনা, ইবন রুশদ আল-হাফীদ। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ইবন রুশদ বাতেনী ফির্কার লোকদের অন্তর্ভুক্ত, যারা মনে করে প্রকাশ্য শরী’আতের বাতেনী একটি ব্যাখ্যা রয়েছে যা যাহেরী শরী’আতের বিরোধী। দেখুন, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (২/১৬৬)।
২৭৭. অর্থাৎ প্রকাশ্য আমল যেমন সালাত, সাওম, হজ, যাকাত, সৎকাজ, সালাম, দো’আ, যিকির ইত্যাদি।
📄 দ্বিতীয় গোত্র: নবী-রাসূলদের আনীত বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে তা’বীল তথা অপব্যাখ্যার নীতি অবলম্বনকারী
এবার তা’ওয়ীল বা ব্যাখ্যাপন্থীদের বক্তব্য হচ্ছে- আল্লাহর সিফাতের ব্যাপারে বর্ণিত নসসমূহের দ্বারা রাসূল মানুষদেরকে বাতিল ই'তিকাদের উদ্দেশ্যে করেননি বরং তিনি এগুলোর দ্বারা বিভিন্ন অর্থ উদ্দেশ্য করেছেন। তবে উদ্দেশ্যসমূহ তাদেরকে বর্ণনা করেননি। এ ব্যাপারে তাদের কোনো নির্দেশনাও দেননি, বরং তিনি চেয়েছেন তারা গবেষণা করে স্বীয় আক্কল দ্বারা সেগুলো জেনে নিবে, অতঃপর সেগুলোকে তার মূল অর্থ হতে সরিয়ে নেয়ার জন্য যাবতীয় চেষ্টা নিবদ্ধ করবে। আর এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, তাদেরকে পরীক্ষা করা বা এটা দিয়ে মেধা ও বুদ্ধিকে ক্লান্ত বানানো, যাতে এসব ভাষ্যে আগত বাক্যকে তার অর্থ ও চাহিদা থেকে দূরে সরানো যায়। তারা সত্যকে (এর মাধ্যমে সরাসরি জানতে পারবে না, কেবল) জানবে অন্যদিক দিয়ে। এ গোষ্ঠী হচ্ছে মুতাকাল্লিমীন (কালামশাস্ত্রবিদ), জাহমিয়্যাহ, মু’তাযিলা ও তাদের কোনো কিছুতে যারা প্রবেশ করেছে এমনসব গোষ্ঠীসমূহ।
টিকাঃ
২৭৮. মুতাযিলা হচ্ছে এমন একটি ফির্কা যারা তাদের মতবাদ নিয়ে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের সাথে বিরোধিতা করেছে। এ গোষ্ঠীর প্রধান ও প্রথম যে তাদের নীতি বিন্যাস করেছে সে হচ্ছে ওয়াসিল ইবন আত্বা। তাদেরকে মু’তাযিলা বলার কারণ হচ্ছে ওয়াসিল ইবন আত্বা ও হাসান বসরীর মাঝে কবীরা গুনাহকারীর হুকুম নিয়ে মতভেদ হয়। ওয়াসিল বললো, কবীরা গুনাহকারী ঈমান ও কুফরীর মাঝখানে অবস্থান করবে, তারপর সে হাসান বসরীর মজলিস ত্যাগ করে অন্যত্র বসে পড়ে। তখন হাসান বসরী তাদেরকে বলেন, ই’তাযালা ‘আন্না’ বা আমাদের থেকে পৃথক হয়ে গেছে। মু’তাযিলাদের অনেক ফের্কা রয়েছে, তবে সবাই যেসব বিষয়ে একমত তা হচ্ছে, ১- আল্লাহর কোনো গুণ নেই। ২- কুরআন সৃষ্ট জিনিস। ৩- বান্দা তার নিজের কর্ম নিজে সৃষ্টি করে। ৪- তাকদীরের কিছু অংশ অস্বীকার। ৫- কবিরাহ গুণাহকারী ঈমানদারও নয়, কাফেরও নয়, এ দুয়ের মাঝখানে, তবে আখেরাতে জাহান্নামের অধিবাসী। ৬- তাদের রয়েছে পাঁচটি নীতি; সেগুলোর দ্বারা তারা অনেক বিশুদ্ধ আকীদাহ নষ্ট করে দিয়েছে। সেগুলো হচ্ছে, আত-তাওহীদ, যার মূল অর্থ তাদের কাছে আল্লাহর সিফাত অস্বীকার করা। আল-আদল, যার অর্থ তাকদীরের মাঝে আল্লাহর ইচ্ছা ও সৃষ্টিতে বান্দার কর্ম হয় তা অস্বীকার করা। আল-মানযিলাতু বাইনাল মানযিলাতাইন, যার অর্থ কবীরা গুণাহকারী ঈমান থেকে বেরিয়ে গেছে। আল-ওয়া’দু ওয়াল ও’য়ীদু, যার অর্থ কবীরা গুণাহকারী যদি তাওবা না করে মারা যায় তবে তার ওপর আল্লাহর ওয়াদা জাহান্নাম প্রদান করা আল্লাহর ওপর ওয়াজিব। সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ, যার অর্থ যালিম সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে হবে, যারা তাদের মতের বিরুদ্ধে (আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আত) তাদেরকে দমন করতে হবে। দেখুন, শাহরাস্তানী, আল-মিলাল ওয়ান নিহাল (১/৫৬); বাগদাদী, আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক, পৃ. ৯৩; ইসফারায়ীনী, আত-তাবসীর ফিদ-দীন, পৃ. ৩৭; রাযী, ই’তিক্বাদাতু ফিরাক্কিল মুসলিমীন ওয়াল মুশরিকীন, পৃ. ৩৮; সাকসাকী, আল-বুরহান ফী মা’রিফাতি আক্বায়িদি আহলিল আদইয়ান, পৃ. ৪৯; মালাজ্বী, আত-তাম্বীহ ওয়ার রাদ্দ, পৃ. ৩৫।
২৭৯. যেমন, কুল্লাবিয়্যা, সালেমিয়্যাহ, কাররামিয়্যাহ, শিয়া, পরবর্তী আশ’আরী সম্প্রদায় ও মাতুরিদী সম্প্রদায়। [দারউ তা’আরুদ্ব আল-আক্কল ওয়ান নাকল (১/১৩)]
এবার তা’ওয়ীল বা ব্যাখ্যাপন্থীদের বক্তব্য হচ্ছে- আল্লাহর সিফাতের ব্যাপারে বর্ণিত নসসমূহের দ্বারা রাসূল মানুষদেরকে বাতিল ই'তিকাদের উদ্দেশ্যে করেননি বরং তিনি এগুলোর দ্বারা বিভিন্ন অর্থ উদ্দেশ্য করেছেন। তবে উদ্দেশ্যসমূহ তাদেরকে বর্ণনা করেননি। এ ব্যাপারে তাদের কোনো নির্দেশনাও দেননি, বরং তিনি চেয়েছেন তারা গবেষণা করে স্বীয় আক্কল দ্বারা সেগুলো জেনে নিবে, অতঃপর সেগুলোকে তার মূল অর্থ হতে সরিয়ে নেয়ার জন্য যাবতীয় চেষ্টা নিবদ্ধ করবে। আর এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, তাদেরকে পরীক্ষা করা বা এটা দিয়ে মেধা ও বুদ্ধিকে ক্লান্ত বানানো, যাতে এসব ভাষ্যে আগত বাক্যকে তার অর্থ ও চাহিদা থেকে দূরে সরানো যায়। তারা সত্যকে (এর মাধ্যমে সরাসরি জানতে পারবে না, কেবল) জানবে অন্যদিক দিয়ে। এ গোষ্ঠী হচ্ছে মুতাকাল্লিমীন (কালামশাস্ত্রবিদ), জাহমিয়্যাহ, মু’তাযিলা ও তাদের কোনো কিছুতে যারা প্রবেশ করেছে এমনসব গোষ্ঠীসমূহ।
টিকাঃ
২৭৮. মুতাযিলা হচ্ছে এমন একটি ফির্কা যারা তাদের মতবাদ নিয়ে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের সাথে বিরোধিতা করেছে। এ গোষ্ঠীর প্রধান ও প্রথম যে তাদের নীতি বিন্যাস করেছে সে হচ্ছে ওয়াসিল ইবন আত্বা। তাদেরকে মু’তাযিলা বলার কারণ হচ্ছে ওয়াসিল ইবন আত্বা ও হাসান বসরীর মাঝে কবীরা গুনাহকারীর হুকুম নিয়ে মতভেদ হয়। ওয়াসিল বললো, কবীরা গুনাহকারী ঈমান ও কুফরীর মাঝখানে অবস্থান করবে, তারপর সে হাসান বসরীর মজলিস ত্যাগ করে অন্যত্র বসে পড়ে। তখন হাসান বসরী তাদেরকে বলেন, ই’তাযালা ‘আন্না’ বা আমাদের থেকে পৃথক হয়ে গেছে। মু’তাযিলাদের অনেক ফের্কা রয়েছে, তবে সবাই যেসব বিষয়ে একমত তা হচ্ছে, ১- আল্লাহর কোনো গুণ নেই। ২- কুরআন সৃষ্ট জিনিস। ৩- বান্দা তার নিজের কর্ম নিজে সৃষ্টি করে। ৪- তাকদীরের কিছু অংশ অস্বীকার। ৫- কবিরাহ গুণাহকারী ঈমানদারও নয়, কাফেরও নয়, এ দুয়ের মাঝখানে, তবে আখেরাতে জাহান্নামের অধিবাসী। ৬- তাদের রয়েছে পাঁচটি নীতি; সেগুলোর দ্বারা তারা অনেক বিশুদ্ধ আকীদাহ নষ্ট করে দিয়েছে। সেগুলো হচ্ছে, আত-তাওহীদ, যার মূল অর্থ তাদের কাছে আল্লাহর সিফাত অস্বীকার করা। আল-আদল, যার অর্থ তাকদীরের মাঝে আল্লাহর ইচ্ছা ও সৃষ্টিতে বান্দার কর্ম হয় তা অস্বীকার করা। আল-মানযিলাতু বাইনাল মানযিলাতাইন, যার অর্থ কবীরা গুণাহকারী ঈমান থেকে বেরিয়ে গেছে। আল-ওয়া’দু ওয়াল ও’য়ীদু, যার অর্থ কবীরা গুণাহকারী যদি তাওবা না করে মারা যায় তবে তার ওপর আল্লাহর ওয়াদা জাহান্নাম প্রদান করা আল্লাহর ওপর ওয়াজিব। সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ, যার অর্থ যালিম সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে হবে, যারা তাদের মতের বিরুদ্ধে (আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আত) তাদেরকে দমন করতে হবে। দেখুন, শাহরাস্তানী, আল-মিলাল ওয়ান নিহাল (১/৫৬); বাগদাদী, আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক, পৃ. ৯৩; ইসফারায়ীনী, আত-তাবসীর ফিদ-দীন, পৃ. ৩৭; রাযী, ই’তিক্বাদাতু ফিরাক্কিল মুসলিমীন ওয়াল মুশরিকীন, পৃ. ৩৮; সাকসাকী, আল-বুরহান ফী মা’রিফাতি আক্বায়িদি আহলিল আদইয়ান, পৃ. ৪৯; মালাজ্বী, আত-তাম্বীহ ওয়ার রাদ্দ, পৃ. ৩৫।
২৭৯. যেমন, কুল্লাবিয়্যা, সালেমিয়্যাহ, কাররামিয়্যাহ, শিয়া, পরবর্তী আশ’আরী সম্প্রদায় ও মাতুরিদী সম্প্রদায়। [দারউ তা’আরুদ্ব আল-আক্কল ওয়ান নাকল (১/১৩)]