📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 হাযা যদি জানতাম, কোন আক্কল দিয়ে কুরআন-সুন্নাহকে ওজন করা হবে?

📄 হাযা যদি জানতাম, কোন আক্কল দিয়ে কুরআন-সুন্নাহকে ওজন করা হবে?


[যারা তা’ওয়ীল বা অপব্যাখ্যার আশ্রয় নেয় তাদের মানহাজ নষ্ট হওয়ার প্রমাণ] এদের কথা ভ্রান্ত হওয়ার দলীল হিসেবে তোমার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, আক্কল যেটাকে অসম্ভব সাব্যস্ত করে সে ব্যাপারে তাদের কোনো চলমান মূলনীতি নেই। বরং তাদের মধ্য থেকে একজনের আক্কল যা অসম্ভব সাব্যস্ত করে, অন্যজনের আক্কল সেটাকে জায়েয বা আবশ্যক সাব্যস্ত করে।
হায়! যদি জানতাম, কোন আক্কল দিয়ে কুরআন-সুন্নাহকে ওজন করা হবে?
তাইতো ইমাম মালেক ইবন আনাসের ওপর আল্লাহ সন্তুষ্ট হোন, যেখানে তিনি বলেছেন: «أو كلما جاءنا رجل أجدل من رجل تركنا ما جاء به جبريل إلى محمد صلى الله عليه وسلم الجدل هؤلاء؟». "যখনই আমাদের নিকট এমন কোনো তর্কবাদী লোক আগমন করবে যে অন্যের চেয়ে তর্কে বেশি পটু, তখনই কি আমরা ওদের তর্কের কারণে মুহাম্মাদের নিকট জিবরীলের আনিত বিধান ছেড়ে দিব?”

টিকাঃ
২৫৬. ইমাম উসমান ইবন সা’ঈদ আদ-দারেমী এটা সাব্যস্ত করছেন যে, মা’কূল বা ‘যে জিনিস আকলে ধরে’ তা সকল মানুষের নিকট এমন নির্দিষ্ট একটি জিনিস নয়; বরং প্রত্যেকের নিকটেই তা ভিন্ন। [দেখুন, আরাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ, পৃ. ১২৭]
২৫৭. ইবনুল কাইয়্যেম রাহিমাহুল্লাহ এ কথাটির ব্যাখ্যা করে বলেন, তোমাদের কাদের আক্কলকে এ ব্যাপারে মাপকাঠি ধরব যে, তার সাথে মিলে গেলে নিব ও তার প্রকাশ্য অর্থের ওপর রাখব, আর যা তার বিরোধী হবে তা পরিত্যাগ করব অথবা তা’ওয়ীল করব বা তাফওয়ীদ্ব করব? এরিস্টটল ও তার অনুসারীদের আক্কলের কাছে? নাকি প্লেটো ও তার অনুসারীদের আক্কলের কাছে? নাকি পিথাগোরাসের আক্কলের কাছে? নাকি এম্পেদোক্লিসের আক্কলের কাছে, নাকি সক্রেটিস এর আক্কলের কাছে? নাকি থেমিস্টিউসের আক্কলের কাছে, নাকি ফিলিপপুত্র আলেক্সান্দারের আক্কলের কাছে? নাকি ফারাবীর আক্কলের কাছে? নাকি জাহম ইবন সাফওয়ানের আকলের কাছে? নাকি নাযযাম এর আক্কলের কাছে, নাকি ‘আল্লাফ এর আক্কলের কাছে? নাকি জুব্বাঈর আক্কলের কাছে? নাকি বিশর আল-মিররীসীর আক্কলের কাছে? নাকি ইসকাকীর আক্কলের কাছে? নাকি হুসাইন আন-নাজ্জার এর আক্কলের কাছে? নাকি আবু ইয়াকুব আশ-শাহহাম এর আক্কলের কাছে? নাকি আবুল হুসাইন আল-খাইয়াত্ব এর আক্কলের কাছে? নাকি আবুল কাসেম আল-বালাখীর আক্কলের কাছে? নাকি সুমামাহ ইবন আশরাস এর আক্কলের কাছে? নাকি জা’ফর ইবন মুবাশ্বির এর আকলের কাছে?
নাকি জা’ফর ইবন হারব এর আক্কলের কাছে? নাকি আবুল হুসাইন আস-সালেহীর আক্কলের কাছে? নাকি আবুল হুসাইন আল-বাসরীর আক্কলের কাছে? নাকি আবু মু’আয আত-তুমনীর আক্কলের কাছে? নাকি মা’মার ইবন ‘আব্বাদ এর আক্কলের কাছে? নাকি হিশাম আল-ফুত্বী এর আক্কলের কাছে? নাকি ‘আব্বাদ ইবন সুলাইমান এর আক্কলের কাছে? নাকি পরবর্তীতে যারা এসেছে তাদের আক্কলের ব্যাপারে তোমাদের সন্তুষ্টি রয়েছে? যারা কয়েক আক্কলকে পরিমার্জন করে সেগুলোর খিচুড়ি তৈরি করেছে, যারা নিজেদের জন্য আলাদা মতবাদ দাঁড় করিয়েছে, পূর্ববর্তীদের মতবাদে সন্তুষ্ট হতে পারেনি? এই যে, তোমাদের নিকট শ্রেষ্ঠ! ব্যক্তি, মুহাম্মাদ ইবন ‘উমার আর-রাযী, তার কোন আক্কল দিয়ে তুমি ওহীর ভাষ্যের বিশুদ্ধতা পরিমাপ করবে? তোমরা ভালো করে দেখতে পাচ্ছ যে, তার গ্রন্থসমূহে সে সর্বদা অস্থির থাকে, এতই অস্থির যে, সে কোনো মতের ওপরই সুস্থির থাকে না। সুতরাং তোমরা তার বিবিধ আক্কলের মধ্য হতে একটি আক্কল তোমরা আমাকে নির্ধারণ করে দাও যার ওপর সে স্থির ছিল, তারপর সেটাকে আমার জন্য মানদণ্ড করে দাও। নাকি তোমরা শির্ক, কুফর ও ইলহাদ এর সহযোগী নাসিরুদ্দীন আত-তৃসীর আক্কলের কাছে আমাকে যেতে বল? কারণ তার আলাদা আক্কল রয়েছে যে আক্কলের মাধ্যমে সে তার পূর্ববর্তী মুলহিদদের আক্কলের বিরোধিতা করেছে তবে সে আক্কলের মাধ্যমে সে রাসূলের অনুসারীদের আক্কলের কাছে পৌঁছতে পারেনি। নাকি তোমরা সন্তুষ্ট হও আমি যেন কারামেত্বা, বাতেনিয়া ও ইসমাঈলিয়‍্যাদের আক্কলের কাছে যাব? নাকি যাব সর্বেশ্বরবাদের প্রবক্তা ইত্তেহাদিয়্যাদের আক্কলের কাছে? এসব এবং তাদের মত অসংখ্য দাবিদার যারা বলে চলেছে; তাদের আক্কলই সবচেয়ে স্পষ্ট, তাদের বিরোধীরা স্পষ্ট আকলের বিরোধিতা করছে (তাদের কাছে যাব?) এ হচ্ছে তাদের আক্কল, এ আক্কল সমষ্টি তাদের কিতাবে লিখিত, তাদের লোকদের থেকে বর্ণিত। যদি এ তালিকা লম্বা হওয়ার আশঙ্কা না থাকতো তবে আমরা একটি একটি করে তাদের আক্কলের প্রকৃত অবস্থা তোমাদের কানে ঢেলে দিতাম, অবশ্য যারা বিভিন্ন ফির্কার ইতিহাস লিখেছে, তারা তা পেশ করেছে। যদি তোমরা চাও তবে সেগুলো জমা করতে পার অথবা সেখান থেকে একটি আক্কল এনে তাকে ওহী ও যা রাসুলগণ নিয়ে এসেছেন সেগুলোর জন্য মানদণ্ড করে নাও।
যদি এটি করতে অসমর্থ হও তবে তাদের ওযর গ্রহণ কর, যারা আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের সুন্নাত, তারা যার নাম দিয়ে থাকে ‘আল-আদিল্লাহ আল-লাফযিয়্যাহ’ বা ‘আক্ষরিক দলীল’, এগুলোকে যারা সেসব অস্থির আক্কলগুলোর ওপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে। এগুলো যে অস্থির তা তাদেরই কিছু লোকের সাক্ষ্য দ্বারা স্বীকৃত আর তা যে অস্থির ও পরস্পর বিরোধী তার ওপর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাহায্যকারী ঈমানদারদের সাক্ষ্যও প্রদত্ত। তাই তাদের কথা গ্রহণ করো, যারা বলে থাকে যে, আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের সুন্নাত সঠিক জ্ঞান ও দৃঢ় বিশ্বাসে উপনীত করে। যারা বলে, এসব অস্থির ও পরস্পর বিরোধী আকলসমূহ কেবল সন্দেহ, পেরেশানী, সংশয় ও বহুমুখী মূর্খতারই জন্ম দেয়। তাই যখন তারা দেখে যে, কুরআন ও সুন্নাহ’র ভাষ্যের সাথে এদের কারও আকলের বিরোধিতা দেখা দিয়েছে তখন তারা কেবল স্পষ্ট কুরআন ও সুন্নাহকে গ্রহণ করে আর এসব আক্কলকে পদতলে ফেলে পিষ্ট করে, সেখানেই রাখে যেখানে আল্লাহ এদেরকে ও এদের প্রবক্তাদের রেখেছেন। [আস-সাওয়া’য়িকুল মুরসালাহ (২/৭৮৩-৭৮৪)]
২৫৮. এটি ইমাম মালেক থেকে বর্ণনা করেছেন, যথাক্রমে, আবু নু’আইম, আল-হিলইয়া (৬/৩২৪); আল-হারাওয়ী, যাম্মুল কারাম, নং ৮৫৫-৮৫৭; যাহাবী, আস-সিয়ার (৮/৮৮); লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই’তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা’আহ (১/১৪৪); যাহাবী, আল-উলু, পৃ. ১০০; আলবানী বলেন, এর সনদ বিশুদ্ধ। মুখতাসারুল উলু, পৃ. ১৪০; আর সুযুত্বী তা তার মিফতাহুল জান্নাত গ্রন্থে তা আনয়ন করেছেন।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 তা’বীল বা অপব্যাখ্যাকারীদের মতামত খণ্ডন

📄 তা’বীল বা অপব্যাখ্যাকারীদের মতামত খণ্ডন


আর তাদের প্রত্যেকে অন্যজনকে যা দ্বারা বিতর্ক করেছে নিজেও তার দ্বারা বিতর্কিত হয়েছে। আর তা বিভিন্নভাবে লক্ষণীয়:
প্রথমত: এই বর্ণনা দিয়ে যে, আক্কল (বিবেকের যুক্তি) এসব গুণাবলি সাব্যস্ত করাকে অসম্ভব বলে না।
দ্বিতীয়ত: এ ব্যাপারে বর্ণিত নস তথা কুরআন ও সুন্নাহ’র ভাষ্যগুলো তা’ওয়ীল (স্বাভাবিক অর্থ বাদ দিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দূরবর্তী অর্থে নিয়ে যাওয়া) এর সম্ভাবনা রাখে না।
তৃতীয়ত: এটি অকাট্যভাবে জানা গেছে যে, এগুলো রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়ে এসেছিলেন, যেমন তিনি পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, রমযানের সাওম নিয়ে এসেছিলেন।
সুতরাং এগুলো যারা আল্লাহর গুণাবলির ব্যাপারে তা’ওয়ীল করে সেগুলোকে অন্যদিকে ফিরিয়ে দেয়, তাদের দ্বারা এগুলোকে অন্যদিকে সরিয়ে দেয়া কারামিতা ও বাতেনীয়া ফের্কার লোকদের দ্বারা হজ, সাওম, সালাত ও নবুওয়াতে আসা অন্যান্য বিধানকে অপব্যাখ্যা করার মতোই।
চতুর্থত: এই বর্ণনা দেয়া যে, স্পষ্ট আক্কল (বুদ্ধি-বিবেকের যুক্তি) নস তথা কুরআন ও হাদীসের ভাষ্য দ্বারা সাব্যস্ত বিষয়গুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যদিও নস তথা কুরআন ও হাদীসের ভাষ্যে এমন বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে যে বিস্তারিত রূপ আক্কল বুঝতে অক্ষম, বরং আক্কল সেটাকে সংক্ষিপ্ত আকারে বুঝতে সক্ষম। এছাড়াও আরও বিভিন্নভাবে তা’ওয়ীলের অসারতা বুঝা যায়।
তাছাড়া এ পথের বড় বড় রথি মহারথি তথা বিচরণকারী বিশিষ্টজনেরা স্বীকৃতি দিয়েছে যে, ঐশী বিষয়ের অধিকাংশ ক্ষেত্রে আক্কল ইয়াক্বীন তথা নিশ্চিত জানার পথ দেখায় না।
সুতরাং বিষয়টি যখন এরূপ তখন এসবের জ্ঞান নবুওয়াতের মাধ্যমে লাভ করা অপরিহার্য।

টিকাঃ
২৫৯. তা’ওয়ীল এর অনুবাদ এখানে অপব্যাখ্যা করার কারণ হচ্ছে, বস্তুত তা’ওয়ীল নামে কালামশাস্ত্রবিদরা যা করে তা ব্যাখ্যা নয়, অপব্যাখ্যা। কেননা তা’ওয়ীল নাম দিয়ে দূরবর্তী অর্থ খুঁজে বের করা আল্লাহর কালাম ও আল্লাহর সিফাতের অপব্যাখ্যা করা ছাড়া আর কিছু নয়।
২৬০. তা’ওয়ীল শব্দের দু’টি অর্থ, এক. তাফসীর বা ব্যাখ্যা। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘এ হচ্ছে সে কর্মের ব্যাখ্যা যে ব্যাপারে আপনি সবর করতে সমর্থ হচ্ছিলেন না’ [সূরা আল-কাহফ: ৮২] দুই. তাফসীর অর্থ প্রকৃত অবস্থা, যেদিকে তা প্রত্যাবর্তন করবে। যেমন আল্লাহ বলেন, ইউসুফ ‘আলাইহিস সালাম বলেন, ‘হে আমার প্রিয় পিতা, এ হচ্ছে আমার স্বপ্নের প্রকৃত অবস্থা, যে স্বপ্ন আমি আগে দেখেছিলাম।’ [সূরা ইউসুফ: ১৯] আর আল্লাহর বাণী: "তিনিই আপনার প্রতি এই কিতাব নাযিল করেছেন যার কিছু আয়াত ‘মুহকাম’, এগুলো কিতাবের মূল; আর অন্যগুলো ‘মুতাশাবিহ্’, সুতরাং যাদের অন্তরে বক্রতা রয়েছে শুধু তারাই ফেতনা এবং তা’ওয়ীল তথা ভুল ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে মুতাশাবিহাতের অনুসরণ করে। অথচ আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কেউ এর ব্যাখ্যা জানে না। আর যারা জ্ঞানে সুগভীর তারা বলে, ‘আমরা এগুলোতে ঈমান রাখি, সবই আমাদের রবের কাছ থেকে এসেছে এবং জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন লোকেরা ছাড়া আর কেউ উপদেশ গ্রহণ করে না।" [সূরা আলে ইমরান: ০৭] এ আয়াতে মুতাশাবিহাত আয়াতসমূহের তা’ওয়ীল এর উপরোক্ত দু’টি অর্থও হতে পারে। ১- তা’ওয়ীল শব্দের অর্থ তাফসীর হবে, "যদি জ্ঞানে সুগভীর লোকেরা এটার অর্থ জানে" ধরা হয়। ২- তা’ওয়ীল শব্দের অর্থ প্রকৃত অবস্থা হবে, যদি এর অর্থ "কেবল আল্লাহ জানে" এ কথার মধ্যেই থেমে যাওয়া হয়।
এখানে উল্লেখ্য যে, মুতাকাল্লিম তথা মু’তাযিলা, আশায়েরা ও মাতুরিদী সম্প্রদায় তা’ওয়ীল এর আরেকটি অর্থ করে থাকে যা কখনো এটার অর্থ ছিল না। বরং তারা নিজেরা তা আবিষ্কার করেছে। সেটি হচ্ছে,
তিন. শব্দকে তার নিকটবর্তী অর্থ থেকে দূরবর্তী অর্থে নিয়ে যাওয়া, কোনো কারণ সেখানে বিদ্যমান থাকায়, যা তাকে আসল অর্থে নিতে বাঁধা দিচ্ছে।
বস্তুত তা’ওয়ীল এর এ অর্থটি তাদের বানানো অর্থ। কুরআন, সুন্নাহ, সালাফদের বক্তব্য ও ভাষ্য থেকে তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। কালামশাস্ত্রবিদরা এ তা’ওয়ীলের ওপর ভিত্তি করেই আল্লাহর নাম ও সিফাতের অপব্যাখ্যায় নিজেদের নিয়োজিত রেখেছে। এটাকে তা’ওয়ীল না বলে তাহরীফ বা বিকৃতি বা ইলহাদ বলাই শ্রেয়।
২৬১. কারামিতা শব্দটি হামদান কুরমুত্ব এর নাম অনুযায়ী বলা হয়। যে এ ফির্কার প্রধান প্রতিষ্ঠাতা। কুরমুত্ব অর্থ বক্রতা বা সংকীর্ণতা থাকা। তার পায়ে বা চলনে সমস্যা থাকায় তাকে কুরমুত্ব বলা হতো। প্রথম জীবনে সে কৃষ্ণার একজন কৃষক ছিল। [বাগদাদী, আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক, পৃ. ৩১৪] সে তার দাওয়াতের মাধ্যমে বিরাট জনগোষ্ঠীকে পথভ্রষ্ট করেছিল। বিশাল একদল লোকের জমায়েত সে তৈরি করেছিল। তারা ২১৮ হিজরী সনে মু’তাদ্বাদ এর খিলাফতকালে খলীফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, বাহরাইন (বর্তমান সৌদী আরবের পূর্বাঞ্চল) শাসন করে, যমীনের বুকে ফিতনা -ফাসাদে ভরপুর করে দেয়, হাজীদের লুট করে, চুরি করে, ডাকাতি করে, রক্ত প্রবাহিত করে, বাইতুল্লাহকে হালাল করে দেয়, হাজারে আসওয়াদ তুলে নিয়ে বাহরাইন তথা আল-আহসা ও দাম্মাম এলাকায় নিয়ে যায়।
এ ফির্কা বস্তুত বাতেনী ফির্কা। তারা শরী’আত মানে না, মাহরাম নারীকেও হালাল মনে করে, দীনের অত্যাবশ্যক জিনিসকেও অস্বীকার করে, শরী’আতের বিধি-বিধানের এমনসব তা’ওয়ীল বা অপব্যাখ্যা করে যা কখনও দীন মেনে নেয় না। বিবেক সায় দেয় না। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ এখানে সেসব তা’ওয়ীলের দিকে ইঙ্গিত করছেন।
বিস্তারিত দেখুন, বাগদাদী, আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক, পৃ. ২৬৬; আল-আসফারায়ীনী, আত- তাবসীর ফিদ-দীন, পৃ. ৮০; মালাজ্বী, আত-তাম্বীহ ওয়ার রাদ্দ, পৃ. ২১-২২; আস-সাকসাকী, আল- বুরহান ফী আকায়িদি আহলিল আদইয়ান, পৃ. ৮০-৮১; রাযী, ই’তিক্বাদাতু ফিরাকিল মুসলিমীন ওয়াল মুশরিকীন, পৃ. ৭৯; ইবনুল জাওযী, রিসালাতুন ফিল কারামাত্বাহ; বালাযুরী, মু’জামুল বুলদান (১/৩৪৬)।
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, কারামাত্বিয়া বাতেনী ফিরকার লোকেরা শিয়াবাদ অবলম্বন করত। [আস-সাফাদিয়‍্যাহ (১/২৮৫); বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (২/৮১)] তারা তাদের নিজেদের মাঝে নতুন নতুন পরিভাষার উদ্ভব ঘটায়, যা পরবর্তীতে মুসলিমদের মাঝে প্রচার-প্রসার ঘটে। এর মাধ্যমে তাদের উদ্দেশ্য সাবেয়ী মুশরিক, দ্বিত্ববাদী মাজুস ও দার্শনিকদের মতের প্রচার-প্রসার করা। [আস-সাব’ঈনিয়‍্যাহ, (বুগইয়াতুল মুরতাদ) পৃ. ১৯৩, ৩১৫] ইবন তাইমিয়্যাহ আরও বলেন, তাদের আসল গ্রন্থ হচ্ছে ‘রাসায়িলু ইখওয়ানিস সাফা’। তাদের নেতারা মূলত মুনাফিক। [আস-সাব’ঈনিয়‍্যাহ, পৃ. ৩২৯, ৩৪১; বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/৩৭৪)] বস্তুত এরা বাহাত্তর ফিরকার বাইরের লোক। তারা কোনোভাবেই ঈমানদার নয়।
২৬২. বাতেনীয়া: এরা একটি ফির্কা বা উপদল, যারা বাহাত্তর ফিরকার বাইরের লোক। বাতেনী শব্দের অর্থ গোপন। এদেরকে বাতেনী বলা হয়, কারণ তারা দাবি করে যে শরী’আতের প্রত্যেকটি ভাষ্যের প্রকাশ্য অর্থ ও অপ্রকাশ্য অর্থ রয়েছে। তারা আরও মনে করে সাধারণ মানুষের জন্যই কেবল বাহ্যিক অর্থ উদ্দেশ্য। কিন্তু যে কেউ বাতেনী ইলমে অগ্রসর হয়েছে তার জন্য বাহ্যিক যাবতীয় তাক্বলীফ রহিত হয়ে গেছে। শরী’আতের বিধি-নিষেধ তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। তারা শরী’আতের বাহ্যিক নির্দেশনার নাম দিয়েছে ‘আল-আগলাল’ বা জিঞ্জীর। তারা বলে আল্লাহর বাণী, ‘আর তিনি তাদের উপর থেকে বোঝা লাঘব করবেন এবং সেসব জিঞ্জীরও যা তাদের উপর রয়েছে।’ [সূরা আল- আ’রাফ: ১৫৭] এর দ্বারা তাদের তথাকথিত মতবাদ বুঝানো হয়েছে। তাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে শরী’আত বাতিল করা। তারা জান্নাত ও জাহান্নাম অস্বীকার করে থাকে, বরং তাদের অধিকাংশ লোক স্রষ্টার অস্তিত্বই অস্বীকার করে থাকে। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ তাদের বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, ‘বাতেনী ফির্কার লোকেরা দু’ শ্রেণিতে বিভক্ত:
১- যারা বলে থাকে, কুরআন ও সুন্নাহ’র প্রকাশ্য অর্থের পাশাপাশি বাতেনী বা গোপন অর্থও রয়েছে, যে গোপন অর্থ প্রকাশ্য অর্থের বিপরীত। সাধারণত তাদেরকেই বাতেনী বলা হয়। তারা আবার দু’ শ্রেণিতে বিভক্ত: ক. তারা ইসলামের প্রকাশ্য কর্মকাণ্ড যেমন সালাত, সাওম, হজ ইত্যাদিতেও বাতেনী অর্থ আবিষ্কার করে থাকে, তারা বলে থাকে; হারাম হওয়ার যেসব ভাষ্য রয়েছে তা তার প্রকাশ্য অর্থে নয়, সেগুলো দিয়ে সাধারণ মানুষদের নিয়ন্ত্রণ করা উদ্দেশ্য। শাইখুল ইসলাম বলেন, বস্তুত এরাই যিন্দীক শ্রেণি, এরাই মুনাফিক, এ ব্যাপারে আলেমগণ একমত। সূফী যিন্দীক হুলুলী ও ওয়াহদাতুল ওজুদীরা এই শ্রেণিভুক্ত। শাইখুল ইসলাম উপরে এ শ্রেণিকেই উদ্দেশ্য নিয়েছেন।
খ. যারা জ্ঞানের ক্ষেত্রে (আকীদাহ’র ক্ষেত্রে) প্রকাশ্য বক্তব্যের বিপরীত গোপন বক্তব্য ও ভাষ্য নির্ধারণ করেন। যদিও আমলি বিষয়সমূহে তারা প্রকাশ্য রূপকে মেনে নেন। এ হচ্ছে মূলত বাতেনী ফির্কার মধ্যে যারা দর্শন চর্চা করে তাদের মত। আলেমগণ বলেন, মুসলিমদের মাঝে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ইসলাম থেকে বের হয়ে যাওয়া দল হচ্ছে এরা। বরং তারা দাজ্জালের চেয়েও জঘন্য। সর্বপ্রথম এ মতের দিকে আহ্বান জানিয়েছিল উবাইদুল্লাহ ইবন মাইমূন আল-ক্বাদ্দাহ। সে ইমাম জা’ফর সাদেক এর ক্রীতদাস ছিল। খলীফা মামুনের সময় তার উদ্ভব হয়েছিল। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, নাক্বদূত তা’সীস (১/২৫৯-২৬০); ইসফারায়ীনী, আত-তাবসীর ফিদ দীন, পৃ. ৮৩; ইবনুল জাওযী, রিসালাতুন ফিল কারামাত্বাহ, পৃ. ৩৬; রাসায়িলি ইখওয়ানুস সাফা, পৃ. ১৩৮-১৪৪; ইবন আরাবী হাতেমী, আল-ফতুহাতুল মাক্কিয়্যাহ (৪/২৬৩-২৬৬, ২৭১, ২৭৫)।
২- যারা গোপন আমল ও ইলমের কথা বলে থাকে। তবে তারা বলে এগুলোর সাথে প্রকাশ্য অর্থের মিল রয়েছে। তারা আবার অন্যান্য আলেমগণের সাথে একমত যে, যারাই বলবে এসব শরী’আতের বিধি-নিষেধের প্রকাশ্য রূপের সাথে গোপন রূপের বৈপরিত্য রয়েছে তারা মুনাফিক। এরাই তাসাওউফের অনুসারী বলে বিখ্যাত। দেখুন, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (২/১৬৭)।
২৬৩. যেমন আখেরাতের ওপর ঈমানের বিষয়টি। আখেরাতের দিন আসবে ও অবশ্যম্ভাবী হওয়ার বিষয়টি বিবেক বুঝতে সক্ষম। কারণ দুনিয়াতে ভালো কিংবা মন্দ করেছে সেটার জবাবদিহীতা না থাকার বিষয়টিতে সুস্থ বিবেক শায় দেয় না। বরং বিবেকের যুক্তি তা সাব্যস্ত করে, কিন্তু বিস্তারিত বর্ণনা সে কখনো দাঁড় করাতে পারে না, তা ওহীর মাধ্যমেই কেবল বর্ণিত হতে পারে।
২৬৪. যেমনটি ইবন রুশদ আল-হাফীদ এ স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। [ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউত তা’আরুদ্ব (১/১৬২)]

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী ও উম্মতের জন্য সবচেয়ে বেশি কল্যাণকামী

📄 রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী ও উম্মতের জন্য সবচেয়ে বেশি কল্যাণকামী


মুমিনদের নিকট জ্ঞাত যে, নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হিদায়াত ও সত্য দীনসহ পাঠিয়েছেন যাতে তিনি সকল দীনের ওপর বিজয়ী করতে পারেন। আর সাক্ষী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট। আর তিনি মানুষদেরকে আল্লাহ ও শেষ দিনের ওপর ঈমানের জন্য যেসব বিষয় সংবাদ দিয়েছেন সেগুলো অবশ্যই তাদেরকে স্পষ্ট বর্ণনা করে দিয়েছেন। আর আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমানের অন্তর্ভুক্ত বিষয় হচ্ছে, সৃষ্টির সূচনা ও সমাপ্তির ওপর ঈমান। আর সেটা হচ্ছে সৃষ্টি ও পুনরুত্থানের ওপর ঈমান, যেমনটি উভয়কে একত্রিত করেছেন আল্লাহ তাঁর এই বাণীতে:
﴿وَمِنَ النَّاسِ مَن يَقُولُ آمَنَّا بِاللَّهِ وَبِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَمَا هُم بِمُؤْمِنِينَ ﴾ [البقرة: ٨]
"আর মানুষের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যারা বলে, ‘আমরা আল্লাহ্ ও শেষ দিবসে ঈমান এনেছি’, অথচ তারা মুমিন নয়।" [সূরা আল-বাকারাহ: ০৮] এবং
﴿مَا خَلْقُكُمْ وَلَا بَعْثُكُمْ إِلَّا كَنَفْسٍ وَاحِدَةٍ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ ﴾ [لقمان: ٢٨]
"তোমাদের সবার সৃষ্টি ও পুনরুত্থান একটি প্রাণীর সৃষ্টি ও পুনরুত্থানেরই অনুরূপ। নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সম্যক দ্রষ্টা।” [সূরা লোকমান: ২৮]
﴿وَهُوَ الَّذِي يَبْدَأُ الْخَلْقَ ثُمَّ يُعِيدُهُ ﴾ [الروم: ٢٧]
"আর তিনি-ই, যিনি সৃষ্টিকে শুরুতে অস্তিত্বে আনয়ন করেন, তারপর তিনি সেটা পুনরাবৃত্তি করবেন।” [সূরা আর-রূম: ২৭]
আর আল্লাহ স্বীয় রাসূলের জবানে আল্লাহ ও শেষ দিনের ওপর ঈমানের বিষয়ে বর্ণনা দিয়েছেন যা দ্বারা তিনি তাঁর বান্দাদেরকে পথ দেখিয়েছেন এবং তার মাধ্যমে তাঁর কী উদ্দেশ্য সেটা উন্মুক্ত করে দিয়েছেন।
আর মুমিনদের জানা যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ ব্যাপারে সকলের চেয়ে অধিক অবগত, সকলের চেয়ে অধিক উম্মতের কল্যাণকামী, বক্তব্য প্রদান ও বর্ণনা করে দেয়ার ক্ষেত্রে সকলের চেয়ে বিশুদ্ধভাষী বরং সকল সৃষ্টির মধ্যে অধিকতর জ্ঞানী, কল্যাণকামী ও স্পষ্টভাষী, তাঁর ক্ষেত্রে জ্ঞান, ক্ষমতা ও ইচ্ছার পরিপূর্ণতা একত্রিত হয়েছিল। আর এটা জ্ঞাত যে, বক্তা বা কর্তার জ্ঞান, ক্ষমতা ও ইচ্ছা যখন পূর্ণতা লাভ করে তখন তার বক্তব্য ও কর্ম তেমনি পূর্ণতা লাভ করে, আর অপূর্ণতা তখন আসে যখন তার জ্ঞান অপূর্ণ থাকে কিংবা জ্ঞান প্রকাশ করতে অক্ষম হয়, নতুবা সেটা প্রকাশের ইচ্ছা তার না থাকে।
আর রাসূল তো জ্ঞানের পূর্ণতার ক্ষেত্রে সবার শীর্ষে, স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেয়ার পরিপূর্ণ ইচ্ছা থাকার ক্ষেত্রেও শীর্ষে। আর স্পষ্টভাবে পৌঁছানোর ক্ষমতা থাকার ক্ষেত্রেও শীর্ষে। আর পূর্ণ ক্ষমতা ও সামর্থ্য এবং দৃঢ় ইচ্ছা থাকা ইচ্ছাকৃত বিষয়ের অস্তিত্ব লাভ হওয়া আবশ্যক করে।
সুতরাং অকাট্যভাবে জানা গেল যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ ও আখেরাতের ওপর ঈমানের ব্যাপারে যা কিছু বর্ণনা দিয়েছেন তা দিয়ে তিনি যা কিছু বর্ণনা করার ইচ্ছা করেছেন সে উদ্দেশ্য যথাযথভাবে সাধিত হয়েছে। আর তিনি যা বর্ণনা করার ইচ্ছা করেছেন সেটা তার জ্ঞান অনুযায়ীই সম্পন্ন হয়েছে। আর এ ব্যাপারে তাঁর জ্ঞান তো সকল জ্ঞানের চেয়ে পরিপূর্ণ। সুতরাং যে ব্যক্তি ধারণা করবে যে, এ ব্যাপারে অন্য কেউ রাসূলের থেকে বেশি অবগত, রাসূলের থেকে পূর্ণ বয়ানকারী অথবা সৃষ্টির হিদায়াতের ব্যাপারে রাসূলের থেকে বেশি আগ্রহী, সে নাস্তিক; সে মুমিন নয়। অপরদিকে সাহাবী, তাবে’য়ী এবং তাদেরকে যারা সুন্দরভাবে অনুসরণ করেছেন আর যারা সালাফদের পথে ছিলেন তারা এ অধ্যায়ে সিরাতুল মুস্তাকীমের পথেই অবস্থান করেছেন।

টিকাঃ
২৬৫. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এটা সাব্যস্ত করেছেন যে, ইলম বা জ্ঞান তো সেটাই, যার সঠিক হওয়ার ওপর দলীল রয়েছে। আর উপকারী ইলম তখনই হবে যখন তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে নিয়ে আসা জ্ঞান হবে। তিনি আরও বলেন, কখনও কখনও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ ছাড়াও ইলম পাওয়া যেতে পারে তবে তা অবশ্যই দুনিয়াবী ইলম হবে, যেমন ডাক্তারী বিদ্যা, অঙ্কশাস্ত্র, কৃষিকাজ, ব্যবসা। কিন্তু ইলাহী বিদ্যা, দীনী জ্ঞান, এসব জ্ঞানের কেবল একমাত্র উৎস হচ্ছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম। সকল সৃষ্টির মাঝে রাসূলই এ বিষয় সবচেয়ে বেশি জানেন। সৃষ্টিকে তা শিক্ষা দেয়ার জন্য তাঁর ঐকান্তিক আগ্রহ প্রচণ্ড, সৃষ্টির সবার চেয়ে তা বর্ণনা করতে ও পরিচিতি তুলে ধরতেও তিনি বেশি সক্ষম। সুতরাং তিনি জ্ঞান, কুদরত, ইরাদা এ তিনটিতে সকলের উপরে। আর এ তিনটির মাধ্যমেই উদ্দেশ্য পূর্ণতা লাভ করে। রাসূল ব্যতীত অন্যরা হয় তার জ্ঞানে সমস্যা বা বিকৃতি থাকবে, অথবা সে তা শিক্ষা দিতে আগ্রহের ঘাটতি থাকবে, ফলে সে শিক্ষা দিবে না, কোনো অনুরাগ কিংবা বিরাগের কারণে, ভয়ে কিংবা অন্য কোনো কারণে, অথবা সে তার বর্ণনার ক্ষমতায় ত্রুটি থাকবে। তার বর্ণনা অন্তরে যা উপলব্ধি করেছে তা বলতে অক্ষম। [দেখুন, মাজমু’ ফাতাওয়া (১৩/১৩৬)]
২৬৬. এ কায়েদা বা নীতিটি ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ অনেক ক্ষেত্রেই উল্লেখ করে থাকেন। প্রচুর পরিমাণে গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করে থাকেন। কারণ, দৃঢ় ইচ্ছার সাথে পূর্ণ ক্ষমতা উদ্দেশ্য বিষয়টির অস্তিত্ব বাস্তবে রূপ নেয়। যেমন, ভালোবাসা যখন প্রবল হবে তখন যদি কোনো বাঁধা ও ক্ষমতার ঘাটতি না থাকবে তখন সেটার প্রভাব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে পড়বেই। তদ্রূপ অন্তরে ঈমান থাকলে তার প্রভাব মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে প্রকাশ পাবেই।
ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এ নীতিটি সাব্যস্ত করেছেন যে, প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অবস্থার মাঝে সমন্বয় হলে অনেক সমস্যার সমাধান এমনিতেই হয়ে যায়। [ফাতাওয়া (৭/৩৭০)] তিনি এ নীতিটি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বলেন, কোনো কাজ করার দৃঢ় ইচ্ছা আর তার সাথে যদি পূর্ণ ক্ষমতার সংমিশ্রণ ঘটে তবে তাতে নির্ধারিত বিষয়টি ঘটা আবশ্যক হয়ে পড়ে। [ফাতাওয়া (৭/৬৪৫)]
২৬৭. অন্যত্র শাইখুল ইসলাম বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক যে বর্ণনা এসেছে তা দু’ভাবে পেশ করা হয়েছে: এক. তিনি এ বর্ণনার ক্ষেত্রে বিবেকের যুক্তি সম্পন্ন আকলী দলীল উল্লেখ করেছেনা। আর কুরআনে কারীম সেসব আক্কলী দলীল ও দৃঢ় বিশ্বাস আনয়নকারী প্রমাণাদিতে পরিপূর্ণ, যার মাধ্যমে আল্লাহর পরিচয় লাভ করা যায়, দীনের উদ্দেশ্যসমূহ স্পষ্ট হয়। দুই. তিনি শুধু বিভিন্ন বিষয়ের সংবাদ প্রদান করেছেন; কারণ তিনি স্পষ্ট নিদর্শন ও দৃঢ় প্রমাণাদি প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়েছেন যে, তিনি আল্লাহর রাসূল। আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রচারক। তিনি সত্য ব্যতীত আর কিছু বলেন না। আল্লাহ তা'আলাও তাঁর সত্যতার ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছেন, তিনি তাঁর বান্দাদেরকে জানিয়েছেন, তাদেরকে সংবাদ দিয়েছেন যে, রাসূল আল্লাহর কাছ থেকে যা বর্ণনা করেন ও প্রচার করেন তাতে সত্য ও সত্যয়ণকৃত। [ইবন তাইমিয়্যাহ, ফাতাওয়া (১৩/১৩৬-১৩৭)]
২৬৮. কারণ তারা কখনো মনে করেনি যে, রাসূলের চেয়ে অন্য কেউ বেশি জ্ঞানী, বেশি বর্ণনার অধিকারী, উম্মতের প্রতি বেশি যত্নবান হতে পারবেন। সুতরাং তাদের পথই সঠিক পথ ও হক্ক পথ। যারা এ মত থেকে আলাদা হয়ে গেছে তারা কয়েক শ্রেণিতে বিভক্ত। আগত অংশে ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ পথভ্রষ্টদের শ্রেণিবিভাগ করছেন। তাদের কমন ভুল হচ্ছে তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর উপরোক্ত কোনো এক বিষয়ে অপর কাউকে অধিক অগ্রগণ্য মনে করেছে।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 সালাফে সালেহীনের পথ থেকে বক্রপথে অবস্থানকারীদের শ্রেণিবিভাগ

📄 সালাফে সালেহীনের পথ থেকে বক্রপথে অবস্থানকারীদের শ্রেণিবিভাগ


আর যারা সালাফদের পথ থেকে বিচ্যুত তারা তিন গ্রুপ: (১) নবী-রাসূলদের আনীত বিষয়গুলোতে বিস্তর কল্পনার অপবাদ প্রদানকারী, (২) নবী-রাসূলদের আনীত বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে তা’ওয়ীল তথা অপব্যাখ্যার নীতি অনুসারী, এবং (৩) নবী-রাসূলদের আনীত বিষয়গুলোর ব্যাপারে অজ্ঞতার নীতি অনুসারী।
[প্রথম গোষ্ঠী: নবী-রাসূলদের আনীত বিষয়গুলোতে বিস্তর কল্পনার অপবাদ প্রদানকারী] নবী রাসূলগণ কর্তৃক আনীত বিষয়গুলোর ব্যাপারে নবী রাসূলগণের ওপর বিস্তর কল্পনার অপবাদ প্রদানকারীরা হচ্ছে- দার্শনিক সম্প্রদায় এবং তাদের পথে কালামপন্থী ও তথাকথিত ফকীহরা যারা বলে, নিশ্চয় আল্লাহ ও শেষ দিনের ওপর ঈমানের বিষয়ে রাসূল যা উল্লেখ করেছেন তা দ্বারা উদ্দেশ্য কেবল প্রকৃত অবস্থার একটি কাল্পনিক রূপ প্রদান করা; যাতে তা দ্বারা সাধারণ জনগণ উপকার লাভ করেন। এটা নয় যে, তা দ্বারা তিনি সত্যকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন বা সৃষ্টিকে পথ দেখিয়েছেন বা হাকীকতকে ফুটিয়ে তুলেছেন। এরা আবার দুই ভাগে বিভক্ত:
• কেউ কেউ বলে, রাসূল হাকীকতকে তার আসলরূপে জানতেন না, বরং কিছু ইলাহী দার্শনিক আছে যারা সেটা জানে। তেমনি জানে এমন কিছু লোকও যাদেরকে তারা আউলিয়া নামে আখ্যায়িত করেছে। তারা মনে করে, দার্শনিক ও আউলিয়াদের কেউ কেউ আল্লাহ ও শেষ দিন সম্বন্ধে রাসূলদের থেকে বেশি অবগত। এটি হচ্ছে ঘোর নাস্তিক টাইপের দার্শনিক ও বাতেনী ফির্কার মতবাদ। যে বাতেনীগুলোর কেউ শীয়া বাতেনীয়া সম্প্রদায়ের আর কেউ সূফী বাতেনীয়া সম্প্রদায়ের। • আবার তাদের কেউ কেউ বলেন, বরং রাসূল সেটা জানতেন কিন্তু বর্ণনা করেননি। বরং বলেছেন তার বিপরীত কথা। আর তিনি চেয়েছেন মানুষ যেন হক্ক (সত্যের) বিপরীতটিই বুঝে; কারণ হকের বিপরীতে থাকার মধ্যে সৃষ্টিকুলের জন্য কল্যাণ ও স্বার্থ রয়েছে।
এরা আরও বলে, রাসূলের ওপর আবশ্যক হচ্ছে মানুষকে তাজসীম (দেহ সাব্যস্ত করা)-র বিশ্বাসের দিকে আহ্বান করা, যদিও সেটা বাতিল। তেমনি এটা বিশ্বাস করতে মানুষদেরকে জানাবেন যে, শরীরসহ পুনরুত্থান হবে, যদিও তা বাতিল। অনুরূপ এটা বিশ্বাস করতে যে, জান্নাতীরা খাওয়া-দাওয়া করবে যদিও তা বাতিল। তারা বলে: কেননা এই পদ্ধতিতে ছাড়া অন্য কোনোভাবে সৃষ্টিকে দাওয়াত দেয়া সম্ভব নয়, এটা মিথ্যা তবে বান্দাদের স্বার্থে। এ হচ্ছে আল্লাহ ও আখেরাতের ওপর ঈমানের বিষয়ে আগত নসসমূহের ব্যাপারে তাদের বক্তব্য।
আর আমল বা কর্মের ক্ষেত্রে: তাদের কেউ কেউ সেটা বাস্তব অর্থে স্বীকার করে, আবার কেউ কেউ উপরের মতো এক্ষেত্রেও বলে যে, আমলের জন্য সাধারণ শ্রেণি আদিষ্ট, বিশেষ শ্রেণি নয়। এটাই হচ্ছে দীনদ্রোহী বাতেনি ফিরকাহ, ইসমাঈলিয়‍্যাহ ও তাদের মতো লোকদের মতাদর্শ।

টিকাঃ
২৬৯. যদি এসব গ্রুপের লোকেরা সাক্ষ্য দিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলের চেয়ে বড় জ্ঞানী, সবচেয়ে বড় কল্যাণকামী, সবচেয়ে বড় স্পষ্টভাষী বর্ণনাকারী, তাহলে তারা এসব ধ্যান- ধারণা কিংবা বিকৃতি কিংবা মূর্খতার দলে যোগ দিত না।
২৭০. ইবনুল কাইয়্যেম আল্লাহর সিফাত বিষয়ে মানুষদেরকে বিস্তারিত পাঁচভাবে বিভক্ত করেছেন: ১- তা’ওয়ীল পদ্ধতির অনুসারী। ২- কল্পনাকারী অপবাদ প্রদানকারীদের অনুসারী। ৩- মূর্খতার অপবাদ প্রদানকারী সম্প্রদায়। ৪- তাশবীহ ও তামসীল বা সাদৃশ্য ও উদাহরণ প্রদানকারী সম্প্রদায় ৫- সঠিক পথের অনুসারী সম্প্রদায়। বিস্তারিত দেখুন আস-সাওয়া’য়িকুল মুরসালাহ (২/৪১৮)।
২৭১. ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, তারা হচ্ছে ঐ সম্প্রদায়, যারা বিশ্বাস করে যে, রাসূলগণ সৃষ্টির মাঝে কখনও হক্ক কথা প্রকাশ করেননি। কারণ সেটা প্রাপ্ত হওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। তাদের কাছে এ ব্যাপারে এক প্রকার কল্পনা ভর করছিল, তারা সে কল্পনাকে বাহিক্য জিনিসে ব্যক্ত করেছিলেন মাত্র। [আস-সাওয়া’য়িকুল মুরসালাহ (২/৪১৮-৪১৯)] ইবনুল তাইমিয়্যাহ বলেন, ইবন সীনা ও তার মত কিছু দার্শনিক এ ধরনের কথা দিয়ে তাদের মূলনীতি দাঁড় করিয়েছে, যেমন ইবন সীনা তার আর-রিসালাতুল উদ্বহুওয়িয়্যাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। [দারউত তা’আরুদ্ব (১/১)]
২৭২. ক্বারামিত্বা ও দার্শনিকদের মত হচ্ছে, রাসূলগণ এসব বিষয় জানতেন না। তারা বলে নবীর চেয়ে দার্শনিক ভালো জানে। নবীর কাজই হচ্ছে মানুষদেরকে নিজের কল্পনার জগতে নিয়ে যাওয়া। তাদের নিকট নবুওয়াত সাধারণ মানুষের জন্য শ্রেষ্ঠ হতে পারে, তবে সেটা জ্ঞানী-গুণী ও মারেফাতের দাবীদারদের নিকট নয়। ফারাবী ও তার মত যারা আছে যেমন, মুবাশ্বির ইবন ফাতিক ও তার মত ইসমা’ঈলী সম্পদ্রয়ায়ের লোকেরা বলে থাকে। [ফাতাওয়া (৪/৯৮-৯৯), (১৯/১৫৬)]
২৭৩. বাতেনী ফির্কা বলা হয় এজন্য যে, তারা মনে করে কুরআন ও সুন্নাহ’র ভাষ্যের একটি গোপন অর্থ রয়েছে যা প্রকাশ্য অর্থের বিপরীত। বাতেনীদের মধ্যে যারা অত্যন্ত ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত তারা হচ্ছে, কারামিতা, যাদেরকে সীমালঙ্ঘনকারী শিয়াদের মধ্যে গণ্য করা হয়। শাহরাস্তানী বলেন, তাদের যেসব উপাধী রয়েছে তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, বাতেনিয়‍্যা, কারামিত্বা, মুযদাকিয়্যাহ। তাদের নেতারা তাদের কিছু বক্তব্যকে দার্শনিকদের বক্তব্যের সাথে মিশিয়ে দিয়েছে। [আল-মিলাল ওয়ান নিহাল (১/২২৮)]
২৭৪. সূফী বলা হয়, কারণ তারা সূফ পরিধান করত। সূফ মানে পশমের মোটা কাপড়। প্রাথমিক দিকে যারা দুনিয়াবিমুখ হতো, বেশি ইবাদত করতো তাদেরকে সূফী বলা হতো। তবে সেটা প্রথম তিন উত্তম যুগে প্রসিদ্ধ ছিল না। বিষয়টি প্রথমে পরহেযগারী ও তাকওয়ার চর্চাতে থাকলেও কালক্রমে সেটি বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘনে রূপ নেয়। এমনকি তাদের অনেকেই দীনের গণ্ডী থেকে বের হয়ে যায়। পরবর্তীতে তারাই নতুন করে কুরআন ও হাদীসের গোপন ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছিল। তাদের বিখ্যাত বাড়াবাড়িকারী লোকদের মধ্যে রয়েছে, ইবন আরাবী, হাল্লাজ, ইবন সাব’ঈন ও অন্যান্যরা। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ’ ফাতাওয়া (১১/৫)।
২৭৫. ইবন তাইমিয়্যাহ স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন যে, এ মতটি মৌলিকভাবে কিছু দার্শনিক ও বাতেনী ফির্কার লোকদের। যেমন, ইসমা’ঈলী সম্প্রদায়ের নাস্তিকদের, ইখওয়ানুস সাফার রাসায়িল লিখকদের, ফারাবীর, ইবন সীনার, হত্যাকৃত সোহরাওয়ার্দীর, ইবন রুশদ আল-হাফীদের। অনুরূপভাবে তা সেসব সুফী মুলহিদদের মতও, যারা তাদের তাসাউফের পূর্বসূরী কুরআন ও সুন্নাহ’র অনুসারী শাইখদের মত থেকে বের হয়ে গেছে। যেমন ইবন আরাবী, ইবন সাব’ঈন, ইবনুত তুফাইল; যে ব্যক্তি হাই ইবন ইয়াক্কযান এর রিসালা লিখেছিল। [দারউত তা’আরুদ্ব (১/১০- ১১)]
এরা মনে করে কল্পনার বিষয়টি রাসূলের বক্তব্যে, তবে ইলমে নয়। [ফাতাওয়া (১৯/১৫৬)] ইবন তাইমিয়্যাহ আরও বলেন, এরা চেয়েছিল রাসূল মিথ্যা বলবেন স্বার্থের জন্য এমনটি বলতে, বিনা স্বার্থে বলবেন না এমনটি বলতে, কিন্তু তারা এর মাধ্যমে মারাত্মক খারাপ কর্মে লিপ্ত হয়েছে; কারণ তাদের কথার অর্থ হচ্ছে রাসূল মানুষদেরকে সংশয়ে নিক্ষেপ করেছেন, অন্ধকারে রেখেছেন, সৃষ্টিকে ভ্রষ্ট করেছেন, বরং বাতিল প্রকাশ করেছেন আর হক্ক গোপন করেছেন। (নাউযুবিল্লাহ) দেখুন, মাজমু’ ফাতাওয়া (৪/৯৮), (১৯/১৫৭); দারউত তা’আরুদ্ব (৫/৬০-৭৩)।
২৭৬. এ নীতিটি অবলম্বন করেছে ইবন সীনা, ইবন রুশদ আল-হাফীদ। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ইবন রুশদ বাতেনী ফির্কার লোকদের অন্তর্ভুক্ত, যারা মনে করে প্রকাশ্য শরী’আতের বাতেনী একটি ব্যাখ্যা রয়েছে যা যাহেরী শরী’আতের বিরোধী। দেখুন, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (২/১৬৬)।
২৭৭. অর্থাৎ প্রকাশ্য আমল যেমন সালাত, সাওম, হজ, যাকাত, সৎকাজ, সালাম, দো’আ, যিকির ইত্যাদি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00