📄 যারা তা’বীল বা অপব্যাখ্যা করে তাদের অস্থিরতা
অতঃপর এ বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহ ও উম্মতের সালাফে সালেহীনের বিরোধিতাকারী ও বিপরীতমুখী অবস্থানকারী যারা এ অধ্যায়ে তা'ওয়ীল তথা অপব্যাখ্যাকারী রয়েছে তারা জটিল সংশয়ের মাঝে হাবুডুবু খাচ্ছে। (২৫০) কেননা;
* যে ব্যক্তি (জান্নাতে আল্লাহকে) দেখা যাবার বিষয়টি অস্বীকার করে (২৫১), সে মনে করে যে, আক্কল (বুদ্ধকে অস্বীকার করা হবে না। কিন্তু শব্দ স্বীকার করা হবে। [বিস্তারিত দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ' ফাতাওয়া (৬/৯০-৯১, ১০৩-১০৪)] ইমাম হাফেয কিওয়ামুস সুন্নাহ আবুল কাসেম আল-আসবাহানী বলেন, 'সালাফগণ জাওহার ও আরদ্ব নিয়ে কথা বলতে অস্বীকার করেছেন। তারা বলেছেন, সাহাবায়ে কিরাম ও তাবে'য়ীনে 'ইযام এর যুগে এসব ছিল না। তাই হতে পারে তারা এগুলো জানা সত্ত্বেও চুপ ছিলেন, তাহলে আমাদের জন্যও এ ব্যাপারে চুপ থাকার সুযোগ সৃষ্টি হয়ে যায় যেমনটি তারা চুপ ছিলেন, নতুবা তারা এসব না জেনে চুপ ছিলেন, তাহলে তারা যা জানেননি, দীনের ব্যাপারে সেগুলো আমাদের না জানলেও চলবে। [আল-হুজ্জাতু ফী বায়ানিল মাহাজ্জাহ (১/৯৯-১০০)]
২৩৮. মুমাসসিল বা সাদৃশ্য স্থাপনকারীর বক্তব্য এখানে শেষ।
২৩৯. অথচ... এ বক্তব্যটুকু ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহর পক্ষ থেকে কথার মাঝখানে এসেছে। কারণ ইবন তাইমিয়্যাহ'র নিকট এটা অসম্ভব হলেও মুমাসসিল বা সাদৃশ্য স্থাপনকারীর নিকট জাওহার বা 'আরদ্ব হওয়া আল্লাহর জন্য অসম্ভব নয়।
২৪০. অর্থাৎ মুমাসসিল বা সাদৃশ্য স্থাপনকারী বলছে যে, সকল অস্তিত্বই এ দুটির একটি হবেই, সুতরাং আল্লাহর জন্য তা সাব্যস্ত করা দোষণীয় নয়। সুতরাং আল্লাহর সিফাতগুলো মানুষের সিফাতের মতোই। [নাউযুবিল্লাহ] এভাবে মুমাসসিল আল্লাহর সিফাতকে নিজের মত করে বুঝে নিয়ে দু'টি কাজ করেছে, এক. সে আল্লাহকে তামসীল করেছে। জাওহার বা 'আরদ্ব যা সৃষ্টির গুণ, আল্লাহকে সেটার অধীন করে নিয়েছে। দুই. সে তামসীল করার মাধ্যমে আল্লাহর গুণসমূহের প্রকৃত অর্থকে নিষ্ক্রিয় করে নিয়েছে। এভাবেই একজন মুমাসসিল তামসীল ও তা'জ্বীল দু'টোই করে থাকে।
২৪১. এখানে ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ আরেকটি উদাহরণ নিয়ে এসেছেন, যার মাধ্যমে সাদৃশ্য স্থাপনকারীর যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। মুমাসসিলের দেয়া যুক্তির মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, সে তামসীল করেছে, যার পরিণতি দাঁড়িয়েছে তাত্বীল, অর্থাৎ তামসীল করার মাধ্যমে এ গুণের আসল অর্থকে নিষ্ক্রিয়করণ করা হয়ে গেছে।
২৪২. অর্থাৎ মু'আত্তিল। যে ইস্তিওয়া এর প্রকৃত সকল অর্থকে নিষ্ক্রিয় করেছে। কারণ ইস্তিওয়া এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে, উপরে উঠা ও ঊর্ধ্বে উঠা। যেমনটি কুরআনে এসেছে, 'আর জুদী পাহাড়ের উপর উঠল।' [সূরা হূদ: ৪৪] আরও এসেছে, 'যাতে তোমরা তার পিঠসমূহের উপর উঠতেি-বিবেকের যুক্তি) সেটাকে অসম্ভব মনে করে, আর সে মনে করে যে এটাতে তা'ওয়ীল করা ছাড়া উপায় নেই।
* আর যে এটা অসম্ভব মনে করে যে, আল্লাহর জ্ঞান ও ক্ষমতা আছে, অনুরূপ অসম্ভব মনে করে যে, আল্লাহর এমন কালাম বা বাণী রয়েছে যা সৃষ্টি নয় ইত্যাদি(২৫২), সে বলে, নিশ্চয় তার আক্কল বা বিবেকের যুক্তি এগুলো অসম্ভব মনে করে। তাই সে এগুলার তা'ওয়ীল বা অপব্যাখ্যা করতে বাধ্য।
* বরং যে এটা অস্বীকার করে যে, বাস্তবে দেহের হাশর (পুনরুত্থান) আছে এবং জান্নাতে প্রকৃত অর্থে খাওয়া-দাওয়া আছে (২৫৩), সে মনে করে যে, আক্কল বা বিবেকের যুক্তি এটা অসম্ভব ভাবে, তাই সে তা'ওয়ীল করতে বাধ্য।
* তেমনি যে ব্যক্তি মনে করে যে, আল্লাহ 'আরশের উপরে নেই(২৫৪), সে মনে করে যে, আক্কল বা বিবেকের যুক্তি এটাকে অসম্ভব মনে করে এবং তাই সে [এটার] তা'ওয়ীল করতে বাধ্য। (২৫৫)
টিকাঃ
২৫০. কোনো নিয়মনীতিতে তারা নিজেদেরকে সুস্থির রাখতে পারছে না। তাদের একেকজনের তা'ওয়ীলের কারণ একেক রকম। একজনের কাছে যা বিবেকের যুক্তিতে ধরে, অপরজনের কাছে তা বিবেকের যুক্তিতে ধরে না, যা প্রমাণ করে যে মানুষের বিবেকের যুক্তি কখনও সমান হয় না, সেখানে কমন কোনো বিষয়ও নেই।
২৫১. যেমনটি জাহমিয়্যাহ ও মু'তাযিলারা মনে করে থাকে, অনুরূপ তাদের অনুসারী খারেজী ও রাফেদ্বী মতবাদের লোকেরা।
২৫২. যেমনটি জাহমিয়্যাহ ও মু'তাযিলারা মনে করে থাকে।
২৫৩. যেমনটি তথাকথিত দার্শনিক মতবাদে বিশ্বাসীরা ও তাদের অনুসারী কট্টর বাতেনী ফির্কার লোকেরা মনে করে থাকে।
২৫৪. যেমনটি মনে করে থাকে, জাহমিয়্যাহ, মু'তাযিলা, আশায়েরা, মাতুরিদিয়্যাহ প্রভৃতি ভ্রান্ত ও বিদ'আতী দলসমূহ।
২৫৫. তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, কোন জিনিস বিবেকের যুক্তি ধরে না সে ব্যাপারে তাদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। অথচ তারা সবাই বিবেকের যুক্তি নিয়েই চলার দাবি করে। তথাকথিত দার্শনিকরা শারীরিক পুনরুত্থানকে অস্বীকার করে এ দাবিতে যে, তা যুক্তিতে ধরে না, অথচ মু'তাযিলা, আশায়েরা ও মাতুরিদীরা সেটাকে যুক্তিতে ধরে বলে থাকেন। অনুরূপভাবে মু'তাযিলারা, যারা আল্লাহর ইলম, কুদরত, সৃষ্ট নয় এমন বাণী অস্বীকার পার।' [সূরা আয- যুখরুফ: ১৩]
২৪৩. অর্থাৎ মুমাসসিল। যে ইস্তেওয়া এর অর্থকে সৃষ্টির কারও মত করে সাব্যস্ত করে নিয়েছে। তার মতে, উপরে উঠা বলতে সৃষ্টি কর্তৃক কোনো কিছুর উপরে উঠা। [নাউযুবিল্লাহ]
২৪৪. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ অন্যত্র বলেন, 'জেনে রাখ, যারাই 'ইস্তেওয়া' বা উপরে উঠার গুণ ও অনুরূপ [কর্মবাচক] গুণগুলোকে অস্বীকার করেছে, যদি তুমি সে কারণটি উদ্ঘাটন করতে গবেষণা কর তবে দেখতে পাবে, তারা আয়াত থেকে কোনো সৃষ্টি কর্তৃক কিছুর উপরে উঠাকেই অর্থ হিসেবে ধরে নিয়েছে, অথবা এমনভাবে উপরে উঠা ধরে নিয়েছে যাতে হুদুস (নতুনত্ব) বা নকস (ত্রুটি) মিশ্রিত হয়। তারপর তাদের বিপরীত মতের লোকদের থেকে তা বর্ণনা করে (অথচ তারা তা বলেনি) তারপর তারা সেটা বাতিল করার নিমিত্তে যাবতীয় দলীল প্রমাণাদির সমাহার ঘটায়। তারপর বলে, এর দ্বারা নির্দিষ্ট হয়ে গেল যে, 'ইস্তেওয়া' শব্দটিকে ইস্তীইলা' অর্থে নিতে হবে। অর্থাৎ ইস্তেওয়া অর্থ উপরে উঠা না নিয়ে 'ইস্তীইলা' বা করায়ত্ব করার অর্থে নিতে হবে। [আত-তিস'ঈনিয়্যাহ (২/৫৬৮)]
অতঃপর এ বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহ ও উম্মতের সালাফে সালেহীনের বিরোধিতাকারী ও বিপরীতমুখী অবস্থানকারী যারা এ অধ্যায়ে তা'ওয়ীল তথা অপব্যাখ্যাকারী রয়েছে তারা জটিল সংশয়ের মাঝে হাবুডুবু খাচ্ছে। (২৫০) কেননা;
* যে ব্যক্তি (জান্নাতে আল্লাহকে) দেখা যাবার বিষয়টি অস্বীকার করে (২৫১), সে মনে করে যে, আক্কল (বুদ্ধি-বিবেকের যুক্তি) সেটাকে অসম্ভব মনে করে, আর সে মনে করে যে এটাতে তা'ওয়ীল করা ছাড়া উপায় নেই।
* আর যে এটা অসম্ভব মনে করে যে, আল্লাহর জ্ঞান ও ক্ষমতা আছে, অনুরূপ অসম্ভব মনে করে যে, আল্লাহর এমন কালাম বা বাণী রয়েছে যা সৃষ্টি নয় ইত্যাদি (২৫২), সে বলে, নিশ্চয় তার আক্কল বা বিবেকের যুক্তি এগুলো অসম্ভব মনে করে। তাই সে এগুলার তা'ওয়ীল বা অপব্যাখ্যা করতে বাধ্য।
* বরং যে এটা অস্বীকার করে যে, বাস্তবে দেহের হাশর (পুনরুত্থান) আছে এবং জান্নাতে প্রকৃত অর্থে খাওয়া-দাওয়া আছে (২৫৩), সে মনে করে যে, আক্কল বা বিবেকের যুক্তি এটা অসম্ভব ভাবে, তাই সে তা'ওয়ীল করতে বাধ্য।
* তেমনি যে ব্যক্তি মনে করে যে, আল্লাহ 'আরশের উপরে নেই (২৫৪), সে মনে করে যে, আক্কল বা বিবেকের যুক্তি এটাকে অসম্ভব মনে করে এবং তাই সে [এটার] তা'ওয়ীল করতে বাধ্য। (২৫৫)
টিকাঃ
২৫০. কোনো নিয়মনীতিতে তারা নিজেদেরকে সুস্থির রাখতে পারছে না। তাদের একেকজনের তা'ওয়ীলের কারণ একেক রকম। একজনের কাছে যা বিবেকের যুক্তিতে ধরে, অপরজনের কাছে তালের কাছে? নাকি আবু মু'আয আত-তুমনীর আক্কলের কাছে? নাকি মা'মার ইবন 'আব্বাদ এর আক্কলের কাছে? নাকি হিশাম আল-ফুত্বী এর আক্কলের কাছে? নাকি 'আব্বাদ ইবন সুলাইমান এর আক্কলের কাছে? নাকি পরবর্তীতে যারা এসেছে তাদের আক্কলের ব্যাপারে তোমাদের সন্তুষ্টি রয়েছে? যারা কয়েক আক্কলকে পরিমার্জন করে সেগুলোর খিচুড়ি তৈরি করেছে, যারা নিজেদের জন্য আলাদা মতবাদ দাঁড় করিয়েছে, পূর্ববর্তীদের মতবাদে সন্তুষ্ট হতে পারেনি? এই যে, তোমাদের নিকট শ্রেষ্ঠ! ব্যক্তি, মুহাম্মাদ ইবন 'উমার আর-রাযী, তার কোন আক্কল দিয়ে তুমি ওহীর ভাষ্যের বিশুদ্ধতা পরিমাপ করবে? তোমরা ভালো করে দেখতে পাচ্ছ যে, তার গ্রন্থসমূহে সে সর্বদা অস্থির থাকে, এতই অস্থির যে, সে কোনো মতের ওপরই সুস্থির থাকে না। সুতরাং তোমরা তার বিবিধ আক্কলের মধ্য হতে একটি আক্কল তোমরা আমাকে নির্ধারণ করে দাও যার ওপর সে স্থির ছিল, তারপর সেটাকে আমার জন্য মানদণ্ড করে দাও। নাকি তোমরা শির্ক, কুফর ও ইলহাদ এর সহযোগী নাসিরুদ্দীন আত-তৃসীর আক্কলের কাছে আমাকে যেতে বল? কারণ তার আলাদা আক্কল রয়েছে যে আক্কলের মাধ্যমে সে তার পূর্ববর্তী মুলহিদদের আক্কলের বিরোধিতা করেছে তবে সে আক্কলের মাধ্যমে সে রাসূলের অনুসারীদের আক্কলের কাছে পৌঁছতে পারেনি। নাকি তোমরা সন্তুষ্ট হও আমি যেন কারামেত্বা, বাতেনিয়া ও ইসমাঈলিয়্যাদের আক্কলের কাছে যাব? নাকি যাব সর্বেশ্বরবাদের প্রবক্তা ইত্তেহাদিয়্যাদের আক বিবেকের যুক্তিতে ধরে না, যা প্রমাণ করে যে মানুষের বিবেকের যুক্তি কখনও সমান হয় না, সেখানে কমন কোনো বিষয়ও নেই।
২৫১. যেমনটি জাহমিয়্যাহ ও মু'তাযিলারা মনে করে থাকে, অনুরূপ তাদের অনুসারী খারেজী ও রাফেদ্বী মতবাদের লোকেরা।
২৫২. যেমনটি জাহমিয়্যাহ ও মু'তাযিলারা মনে করে থাকে।
২৫৩. যেমনটি তথাকথিত দার্শনিক মতবাদে বিশ্বাসীরা ও তাদের অনুসারী কট্টর বাতেনী ফির্কার লোকেরা মনে করে থাকে।
২৫৪. যেমনটি মনে করে থাকে, জাহমিয়্যাহ, মু'তাযিলা, আশায়েরা, মাতুরিদিয়্যাহ প্রভৃতি ভ্রান্ত ও বিদ'আতী দলসমূহ।
২৫৫. তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, কোন জিনিস বিবেকের যুক্তি ধরে না সে ব্যাপারে তাদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। অথচ তারা্কলের কাছে? এসব এবং তাদের মত অসংখ্য দাবিদার যারা বলে চলেছে; তাদের আক্কলই সবচেয়ে স্পষ্ট, তাদের বিরোধীরা স্পষ্ট আকলের বিরোধিতা করছে (তাদের কাছে যাব?) এ হচ্ছে তাদের আক্কল, এ আক্কল সমষ্টি তাদের কিতাবে লিখিত, তাদের লোকদের থেকে বর্ণিত। যদি এ তালিকা লম্বা হওয়ার আশঙ্কা না থাকতো তবে আমরা একটি একটি করে তাদের আক্কলের প্রকৃত অবস্থা তোমাদের কানে ঢেলে দিতাম, অবশ্য যারা বিভিন্ন ফির্কার ইতিহাস লিখেছে, তারা তা পেশ করেছে। যদি তোমরা চাও তবে সেগুলো জমা করতে পার অথবা সেখান থেকে একটি আক্কল এনে তাকে ওহী ও যা রাসুলগণ নিয়ে এসেছেন সেগুলোর জন্য মানদণ্ড করে নাও।
যদি এটি করতে অসমর্থ হও তবে তাদের সবাই বিবেকের যুক্তি নিয়েই চলার দাবি করে। তথাকথিত দার্শনিকরা শারীরিক পুনরুত্থানকে অস্বীকার করে এ দাবিতে যে, তা যুক্তিতে ধরে না, অথচ মু'তাযিলা, আশায়েরা ও মাতুরিদীরা সেটাকে যুক্তিতে ধরে বলে থাকেন। অনুরূপভাবে মু'তাযিলারা, যারা আল্লাহর ইলম, কুদরত, সৃষ্ট নয় এমন বাণী অস্বীকার করে, তাদের যুক্তি হলো যে, তা যুক্তিতে ধরে না, অথচ আশায়েরা ও মাতুরিদীদের নিকট তা যুক্তিতে ধরে। আবার মু'তাযিলারা, যারা আখেরাতে আল্লাহকে দেখা যাবে না বলে তাদের যুক্তি হলো, যুক্তিতে তা গ্রহণযোগ্য মনে হয় না, অথচ আশায়েরা ও মাতুরিদীরা সেটাকে যুক্তিগ্রাহ্য মনে করে থাকেন। অপরদিকে আহলুল হক্করা, সালাফীরা, চার ইমাম ও তাদের অনুসারী সহীহ আকীদাহ'র অনুসারীরা বিশ্বাস করে থাকেন আল্লাহ 'আরশের উপর উঠেছেন, অথচ অন্যান্য সকল ফির্কা বলে থাকেন যে, আল্লাহ কর্তৃক তাঁর 'আরশের উপর উঠা যুক্তিতে ধরে না, তাই তা'ওয়ীল করতে হবে। তাই কোনটি বিবেকের যুক্তি সমর্থন করে আর কোনটি সমর্থন করে না তাতে এত মতভেদ থাকার অর্থই হচ্ছে, বিবেকের যুক্তি কোনটি ধরবে আর কোনটি ধরবে না তা একজন থেকে অন্যজনের ব্যাপারে আলাদা থাকতে বাধ্য। আনাসের যা বিবেকে ধরে, আনাসের বাপের তা বিবেকে নাও ধরতে পারে, তাই বলে যা আনাসের বাপের বিবেকে ধরে না, তা নিষিদ্ধ বলার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। সুতরাং যুক্তির প্রতি না ঝুঁকে কুরআন ও হাদীসের ভাষ্যে যা এসেছে তা মেনে নেয়াই হচ্ছে বুদ্ধিমানের কাজ। অন্যথা সর্বদা পথভ্রষ্টতা তাকে ঘিরে থাকবে।
📄 তা’বীল বা অপব্যাখ্যার আশ্রয় নেয়া তাদের মানহাজ নষ্ট হওয়ার প্রমাণ
এদের কথা ভ্রান্ত হওয়ার দলীল হিসেবে তোমার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, আক্কল যেটাকে অসম্ভব সাব্যস্ত করে সে ব্যাপারে তাদের কোনো চলমান মূলনীতি নেই। বরং তাদের মধ্য থেকে একজনের আক্কল যা অসম্ভব সাব্যস্ত করে, অন্যজনের আক্কল সেটাকে জায়েয বা আবশ্যক সাব্যস্ত করে। (২৫৬)
হায়! যদি জানতাম, কোন আক্কল দিয়ে কুরআন-সুন্নাহকে ওজন করা হবে? (২৫৭)
তাইতো ইমাম মালেক ইবন আনাসের ওপর আল্লাহ সন্তুষ্ট হোন, যেখানে তিনি বলেছেন:
«أو كلما جاءنا رجل أجدل من رجل تركنا ما جاء به جبريل إلى محمد صلى الله عليه وسلم الجدل هؤلاء؟».
"যখনই আমাদের নিকট এমন কোনো তর্কবাদী লোক আগমন করবে যে অন্যের চেয়ে তর্কে বেশি পটু, তখনই কি আমরা ওদের তর্কের কারণে মুহাম্মাদের নিকট জিবরীলের আনিত বিধান ছেড়ে দিব?” (২৫৮)
টিকাঃ
২৫৬. ইমাম উসমান ইবন সা'ঈদ আদ-দারেমী এটা সাব্যস্ত করছেন যে, মা'কূল বা 'যে জিনিস আকলে ধরে' তা সকল মানুষের নিকট এমন নির্দিষ্ট একটি জিনিস নয়; বরং প্রত্যেকের নিকটেই তা ভিন্ন। [দেখুন, আরাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ, পৃ. তো বিশেষ ধরনের উপরে উঠা, সেটার ধরণ আমাদের জানা নেই, যেমনটি আমরা আল্লাহর ইলম, কুদরত ও শোনার ক্ষেত্রে বলি যে, এটি আল্লাহর জন্য বিশেষ ধরনের ইলম, কুদরত ও শোনা, যার প্রকৃত ধরণ আমরা জানি না। [এ ব্যাপারে বিস্তারিত দেখুন, শাইখুল ইসলামের আত-তাদমুরিয়্যাহ গ্রন্থের চতুর্থ নীতি]
এদের কথা ভ্রান্ত হওয়ার দলীল হিসেবে তোমার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, আক্কল যেটাকে অসম্ভব সাব্যস্ত করে সে ব্যাপারে তাদের কোনো চলমান মূলনীতি নেই। বরং তাদের মধ্য থেকে একজনের আক্কল যা অসম্ভব সাব্যস্ত করে, অন্যজনের আক্কল সেটাকে জায়েয বা আবশ্যক সাব্যস্ত করে। (২৫৬)
হায়! যদি জানতাম, কোন আক্কল দিয়ে কুরআন-সুন্নাহকে ওজন করা হবে? (২৫৭)
তাইতো ইমাম মালেক ইবন আনাসের ওপর আল্লাহ সন্তুষ্ট হোন, যেখানে তিনি বলেছেন: «أو كلما جاءنا رجل أجدل من رجل تركنا ما جاء به جبريل إلى محمد صلى الله عليه وسلم الجدل هؤلاء؟».
"যখনই আমাদের নিকট এমন কোনো তর্ক ওযর গ্রহণ কর, যারা আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের সুন্নাত, তারা যার নাম দিয়ে থাকে 'আল-আদিল্লাহ আল-লাফযিয়্যাহ' বা 'আক্ষরিক দলীল', এগুলোকে যারা সেসব অস্থির আক্কলগুলোর ওপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে। এগুলো যে অস্থির তা তাদেরই কিছু লোকের সাক্ষ্য দ্বারা স্বীকৃত আর তা যে অস্থির ও পরস্পর বিরোধী তার ওপর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাহায্যকারী ঈমানদারদের সাক্ষ্যও প্রদত্ত। তাই তাদের কথা গ্রহণ করো, যারা বলে থাকে যে, আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের সুন্নাত সঠিক জ্ঞান ও দৃঢ় বিশ্বাসে উপনীত করে। যারা বলে, এসব অস্থির ও পরস্পর বিরোধী আকলসমূহ কেবল সন্দেহ, পেরেশানী, সংশয় ও বহুমুখী মূর্খতারই জন্ম দেয়। তাই যখন তারা দেখে যে, কুরআন ও সুন্নাহ'র ভাষ্যের সাথে এদের কারও আকলের বিরোধিতা দেখা দিয়েছে তখন তারা কেবল স্পষ্ট কুরআন ও সুন্নাহকে গ্রহণ করে আর এসব আক্কলকে পদতলে ফেলে পিষ্ট করে, সেখানেই রাখে যেখানে আল্লাহ এদেরকে ও এদের প্রবক্তাদের রেখেছেন। [আস-সাওয়া'য়িকুল মুরসালাহ (২/৭৮৩-৭৮৪)]
২৫৮. এটি ইমাম মালেক থেকে বর্ণনা করেছেন, যথাক্রমে, আবু নু'আইম, আল-হিলইয়া (৬/৩২৪); আল-হারাওয়ী, যাম্মুল কারাম, নং ৮৫৫-৮৫৭; যাহাবী, আস-সিয়ার (৮/৮৮); লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ (১/১৪৪); যাহাবী, আল-উলু, পৃ. ১০০; আলবানী বলেন, এর সনদ বিশুদ্ধ। মুখতাসারুল উলু, পৃ. ১৪০; আর সুযুত্বী তা তার মিফতাহুল জান্নাত গ্রন্থে তা আনয়ন করেছেন।
📄 হাযা যদি জানতাম, কোন আক্কল দিয়ে কুরআন-সুন্নাহকে ওজন করা হবে?
[যারা তা’ওয়ীল বা অপব্যাখ্যার আশ্রয় নেয় তাদের মানহাজ নষ্ট হওয়ার প্রমাণ] এদের কথা ভ্রান্ত হওয়ার দলীল হিসেবে তোমার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, আক্কল যেটাকে অসম্ভব সাব্যস্ত করে সে ব্যাপারে তাদের কোনো চলমান মূলনীতি নেই। বরং তাদের মধ্য থেকে একজনের আক্কল যা অসম্ভব সাব্যস্ত করে, অন্যজনের আক্কল সেটাকে জায়েয বা আবশ্যক সাব্যস্ত করে।
হায়! যদি জানতাম, কোন আক্কল দিয়ে কুরআন-সুন্নাহকে ওজন করা হবে?
তাইতো ইমাম মালেক ইবন আনাসের ওপর আল্লাহ সন্তুষ্ট হোন, যেখানে তিনি বলেছেন: «أو كلما جاءنا رجل أجدل من رجل تركنا ما جاء به جبريل إلى محمد صلى الله عليه وسلم الجدل هؤلاء؟». "যখনই আমাদের নিকট এমন কোনো তর্কবাদী লোক আগমন করবে যে অন্যের চেয়ে তর্কে বেশি পটু, তখনই কি আমরা ওদের তর্কের কারণে মুহাম্মাদের নিকট জিবরীলের আনিত বিধান ছেড়ে দিব?”
টিকাঃ
২৫৬. ইমাম উসমান ইবন সা’ঈদ আদ-দারেমী এটা সাব্যস্ত করছেন যে, মা’কূল বা ‘যে জিনিস আকলে ধরে’ তা সকল মানুষের নিকট এমন নির্দিষ্ট একটি জিনিস নয়; বরং প্রত্যেকের নিকটেই তা ভিন্ন। [দেখুন, আরাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ, পৃ. ১২৭]
২৫৭. ইবনুল কাইয়্যেম রাহিমাহুল্লাহ এ কথাটির ব্যাখ্যা করে বলেন, তোমাদের কাদের আক্কলকে এ ব্যাপারে মাপকাঠি ধরব যে, তার সাথে মিলে গেলে নিব ও তার প্রকাশ্য অর্থের ওপর রাখব, আর যা তার বিরোধী হবে তা পরিত্যাগ করব অথবা তা’ওয়ীল করব বা তাফওয়ীদ্ব করব? এরিস্টটল ও তার অনুসারীদের আক্কলের কাছে? নাকি প্লেটো ও তার অনুসারীদের আক্কলের কাছে? নাকি পিথাগোরাসের আক্কলের কাছে? নাকি এম্পেদোক্লিসের আক্কলের কাছে, নাকি সক্রেটিস এর আক্কলের কাছে? নাকি থেমিস্টিউসের আক্কলের কাছে, নাকি ফিলিপপুত্র আলেক্সান্দারের আক্কলের কাছে? নাকি ফারাবীর আক্কলের কাছে? নাকি জাহম ইবন সাফওয়ানের আকলের কাছে? নাকি নাযযাম এর আক্কলের কাছে, নাকি ‘আল্লাফ এর আক্কলের কাছে? নাকি জুব্বাঈর আক্কলের কাছে? নাকি বিশর আল-মিররীসীর আক্কলের কাছে? নাকি ইসকাকীর আক্কলের কাছে? নাকি হুসাইন আন-নাজ্জার এর আক্কলের কাছে? নাকি আবু ইয়াকুব আশ-শাহহাম এর আক্কলের কাছে? নাকি আবুল হুসাইন আল-খাইয়াত্ব এর আক্কলের কাছে? নাকি আবুল কাসেম আল-বালাখীর আক্কলের কাছে? নাকি সুমামাহ ইবন আশরাস এর আক্কলের কাছে? নাকি জা’ফর ইবন মুবাশ্বির এর আকলের কাছে?
নাকি জা’ফর ইবন হারব এর আক্কলের কাছে? নাকি আবুল হুসাইন আস-সালেহীর আক্কলের কাছে? নাকি আবুল হুসাইন আল-বাসরীর আক্কলের কাছে? নাকি আবু মু’আয আত-তুমনীর আক্কলের কাছে? নাকি মা’মার ইবন ‘আব্বাদ এর আক্কলের কাছে? নাকি হিশাম আল-ফুত্বী এর আক্কলের কাছে? নাকি ‘আব্বাদ ইবন সুলাইমান এর আক্কলের কাছে? নাকি পরবর্তীতে যারা এসেছে তাদের আক্কলের ব্যাপারে তোমাদের সন্তুষ্টি রয়েছে? যারা কয়েক আক্কলকে পরিমার্জন করে সেগুলোর খিচুড়ি তৈরি করেছে, যারা নিজেদের জন্য আলাদা মতবাদ দাঁড় করিয়েছে, পূর্ববর্তীদের মতবাদে সন্তুষ্ট হতে পারেনি? এই যে, তোমাদের নিকট শ্রেষ্ঠ! ব্যক্তি, মুহাম্মাদ ইবন ‘উমার আর-রাযী, তার কোন আক্কল দিয়ে তুমি ওহীর ভাষ্যের বিশুদ্ধতা পরিমাপ করবে? তোমরা ভালো করে দেখতে পাচ্ছ যে, তার গ্রন্থসমূহে সে সর্বদা অস্থির থাকে, এতই অস্থির যে, সে কোনো মতের ওপরই সুস্থির থাকে না। সুতরাং তোমরা তার বিবিধ আক্কলের মধ্য হতে একটি আক্কল তোমরা আমাকে নির্ধারণ করে দাও যার ওপর সে স্থির ছিল, তারপর সেটাকে আমার জন্য মানদণ্ড করে দাও। নাকি তোমরা শির্ক, কুফর ও ইলহাদ এর সহযোগী নাসিরুদ্দীন আত-তৃসীর আক্কলের কাছে আমাকে যেতে বল? কারণ তার আলাদা আক্কল রয়েছে যে আক্কলের মাধ্যমে সে তার পূর্ববর্তী মুলহিদদের আক্কলের বিরোধিতা করেছে তবে সে আক্কলের মাধ্যমে সে রাসূলের অনুসারীদের আক্কলের কাছে পৌঁছতে পারেনি। নাকি তোমরা সন্তুষ্ট হও আমি যেন কারামেত্বা, বাতেনিয়া ও ইসমাঈলিয়্যাদের আক্কলের কাছে যাব? নাকি যাব সর্বেশ্বরবাদের প্রবক্তা ইত্তেহাদিয়্যাদের আক্কলের কাছে? এসব এবং তাদের মত অসংখ্য দাবিদার যারা বলে চলেছে; তাদের আক্কলই সবচেয়ে স্পষ্ট, তাদের বিরোধীরা স্পষ্ট আকলের বিরোধিতা করছে (তাদের কাছে যাব?) এ হচ্ছে তাদের আক্কল, এ আক্কল সমষ্টি তাদের কিতাবে লিখিত, তাদের লোকদের থেকে বর্ণিত। যদি এ তালিকা লম্বা হওয়ার আশঙ্কা না থাকতো তবে আমরা একটি একটি করে তাদের আক্কলের প্রকৃত অবস্থা তোমাদের কানে ঢেলে দিতাম, অবশ্য যারা বিভিন্ন ফির্কার ইতিহাস লিখেছে, তারা তা পেশ করেছে। যদি তোমরা চাও তবে সেগুলো জমা করতে পার অথবা সেখান থেকে একটি আক্কল এনে তাকে ওহী ও যা রাসুলগণ নিয়ে এসেছেন সেগুলোর জন্য মানদণ্ড করে নাও।
যদি এটি করতে অসমর্থ হও তবে তাদের ওযর গ্রহণ কর, যারা আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের সুন্নাত, তারা যার নাম দিয়ে থাকে ‘আল-আদিল্লাহ আল-লাফযিয়্যাহ’ বা ‘আক্ষরিক দলীল’, এগুলোকে যারা সেসব অস্থির আক্কলগুলোর ওপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে। এগুলো যে অস্থির তা তাদেরই কিছু লোকের সাক্ষ্য দ্বারা স্বীকৃত আর তা যে অস্থির ও পরস্পর বিরোধী তার ওপর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাহায্যকারী ঈমানদারদের সাক্ষ্যও প্রদত্ত। তাই তাদের কথা গ্রহণ করো, যারা বলে থাকে যে, আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের সুন্নাত সঠিক জ্ঞান ও দৃঢ় বিশ্বাসে উপনীত করে। যারা বলে, এসব অস্থির ও পরস্পর বিরোধী আকলসমূহ কেবল সন্দেহ, পেরেশানী, সংশয় ও বহুমুখী মূর্খতারই জন্ম দেয়। তাই যখন তারা দেখে যে, কুরআন ও সুন্নাহ’র ভাষ্যের সাথে এদের কারও আকলের বিরোধিতা দেখা দিয়েছে তখন তারা কেবল স্পষ্ট কুরআন ও সুন্নাহকে গ্রহণ করে আর এসব আক্কলকে পদতলে ফেলে পিষ্ট করে, সেখানেই রাখে যেখানে আল্লাহ এদেরকে ও এদের প্রবক্তাদের রেখেছেন। [আস-সাওয়া’য়িকুল মুরসালাহ (২/৭৮৩-৭৮৪)]
২৫৮. এটি ইমাম মালেক থেকে বর্ণনা করেছেন, যথাক্রমে, আবু নু’আইম, আল-হিলইয়া (৬/৩২৪); আল-হারাওয়ী, যাম্মুল কারাম, নং ৮৫৫-৮৫৭; যাহাবী, আস-সিয়ার (৮/৮৮); লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই’তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা’আহ (১/১৪৪); যাহাবী, আল-উলু, পৃ. ১০০; আলবানী বলেন, এর সনদ বিশুদ্ধ। মুখতাসারুল উলু, পৃ. ১৪০; আর সুযুত্বী তা তার মিফতাহুল জান্নাত গ্রন্থে তা আনয়ন করেছেন।
📄 তা’বীল বা অপব্যাখ্যাকারীদের মতামত খণ্ডন
আর তাদের প্রত্যেকে অন্যজনকে যা দ্বারা বিতর্ক করেছে নিজেও তার দ্বারা বিতর্কিত হয়েছে। আর তা বিভিন্নভাবে লক্ষণীয়:
প্রথমত: এই বর্ণনা দিয়ে যে, আক্কল (বিবেকের যুক্তি) এসব গুণাবলি সাব্যস্ত করাকে অসম্ভব বলে না।
দ্বিতীয়ত: এ ব্যাপারে বর্ণিত নস তথা কুরআন ও সুন্নাহ’র ভাষ্যগুলো তা’ওয়ীল (স্বাভাবিক অর্থ বাদ দিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দূরবর্তী অর্থে নিয়ে যাওয়া) এর সম্ভাবনা রাখে না।
তৃতীয়ত: এটি অকাট্যভাবে জানা গেছে যে, এগুলো রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়ে এসেছিলেন, যেমন তিনি পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, রমযানের সাওম নিয়ে এসেছিলেন।
সুতরাং এগুলো যারা আল্লাহর গুণাবলির ব্যাপারে তা’ওয়ীল করে সেগুলোকে অন্যদিকে ফিরিয়ে দেয়, তাদের দ্বারা এগুলোকে অন্যদিকে সরিয়ে দেয়া কারামিতা ও বাতেনীয়া ফের্কার লোকদের দ্বারা হজ, সাওম, সালাত ও নবুওয়াতে আসা অন্যান্য বিধানকে অপব্যাখ্যা করার মতোই।
চতুর্থত: এই বর্ণনা দেয়া যে, স্পষ্ট আক্কল (বুদ্ধি-বিবেকের যুক্তি) নস তথা কুরআন ও হাদীসের ভাষ্য দ্বারা সাব্যস্ত বিষয়গুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যদিও নস তথা কুরআন ও হাদীসের ভাষ্যে এমন বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে যে বিস্তারিত রূপ আক্কল বুঝতে অক্ষম, বরং আক্কল সেটাকে সংক্ষিপ্ত আকারে বুঝতে সক্ষম। এছাড়াও আরও বিভিন্নভাবে তা’ওয়ীলের অসারতা বুঝা যায়।
তাছাড়া এ পথের বড় বড় রথি মহারথি তথা বিচরণকারী বিশিষ্টজনেরা স্বীকৃতি দিয়েছে যে, ঐশী বিষয়ের অধিকাংশ ক্ষেত্রে আক্কল ইয়াক্বীন তথা নিশ্চিত জানার পথ দেখায় না।
সুতরাং বিষয়টি যখন এরূপ তখন এসবের জ্ঞান নবুওয়াতের মাধ্যমে লাভ করা অপরিহার্য।
টিকাঃ
২৫৯. তা’ওয়ীল এর অনুবাদ এখানে অপব্যাখ্যা করার কারণ হচ্ছে, বস্তুত তা’ওয়ীল নামে কালামশাস্ত্রবিদরা যা করে তা ব্যাখ্যা নয়, অপব্যাখ্যা। কেননা তা’ওয়ীল নাম দিয়ে দূরবর্তী অর্থ খুঁজে বের করা আল্লাহর কালাম ও আল্লাহর সিফাতের অপব্যাখ্যা করা ছাড়া আর কিছু নয়।
২৬০. তা’ওয়ীল শব্দের দু’টি অর্থ, এক. তাফসীর বা ব্যাখ্যা। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘এ হচ্ছে সে কর্মের ব্যাখ্যা যে ব্যাপারে আপনি সবর করতে সমর্থ হচ্ছিলেন না’ [সূরা আল-কাহফ: ৮২] দুই. তাফসীর অর্থ প্রকৃত অবস্থা, যেদিকে তা প্রত্যাবর্তন করবে। যেমন আল্লাহ বলেন, ইউসুফ ‘আলাইহিস সালাম বলেন, ‘হে আমার প্রিয় পিতা, এ হচ্ছে আমার স্বপ্নের প্রকৃত অবস্থা, যে স্বপ্ন আমি আগে দেখেছিলাম।’ [সূরা ইউসুফ: ১৯] আর আল্লাহর বাণী: "তিনিই আপনার প্রতি এই কিতাব নাযিল করেছেন যার কিছু আয়াত ‘মুহকাম’, এগুলো কিতাবের মূল; আর অন্যগুলো ‘মুতাশাবিহ্’, সুতরাং যাদের অন্তরে বক্রতা রয়েছে শুধু তারাই ফেতনা এবং তা’ওয়ীল তথা ভুল ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে মুতাশাবিহাতের অনুসরণ করে। অথচ আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কেউ এর ব্যাখ্যা জানে না। আর যারা জ্ঞানে সুগভীর তারা বলে, ‘আমরা এগুলোতে ঈমান রাখি, সবই আমাদের রবের কাছ থেকে এসেছে এবং জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন লোকেরা ছাড়া আর কেউ উপদেশ গ্রহণ করে না।" [সূরা আলে ইমরান: ০৭] এ আয়াতে মুতাশাবিহাত আয়াতসমূহের তা’ওয়ীল এর উপরোক্ত দু’টি অর্থও হতে পারে। ১- তা’ওয়ীল শব্দের অর্থ তাফসীর হবে, "যদি জ্ঞানে সুগভীর লোকেরা এটার অর্থ জানে" ধরা হয়। ২- তা’ওয়ীল শব্দের অর্থ প্রকৃত অবস্থা হবে, যদি এর অর্থ "কেবল আল্লাহ জানে" এ কথার মধ্যেই থেমে যাওয়া হয়।
এখানে উল্লেখ্য যে, মুতাকাল্লিম তথা মু’তাযিলা, আশায়েরা ও মাতুরিদী সম্প্রদায় তা’ওয়ীল এর আরেকটি অর্থ করে থাকে যা কখনো এটার অর্থ ছিল না। বরং তারা নিজেরা তা আবিষ্কার করেছে। সেটি হচ্ছে,
তিন. শব্দকে তার নিকটবর্তী অর্থ থেকে দূরবর্তী অর্থে নিয়ে যাওয়া, কোনো কারণ সেখানে বিদ্যমান থাকায়, যা তাকে আসল অর্থে নিতে বাঁধা দিচ্ছে।
বস্তুত তা’ওয়ীল এর এ অর্থটি তাদের বানানো অর্থ। কুরআন, সুন্নাহ, সালাফদের বক্তব্য ও ভাষ্য থেকে তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। কালামশাস্ত্রবিদরা এ তা’ওয়ীলের ওপর ভিত্তি করেই আল্লাহর নাম ও সিফাতের অপব্যাখ্যায় নিজেদের নিয়োজিত রেখেছে। এটাকে তা’ওয়ীল না বলে তাহরীফ বা বিকৃতি বা ইলহাদ বলাই শ্রেয়।
২৬১. কারামিতা শব্দটি হামদান কুরমুত্ব এর নাম অনুযায়ী বলা হয়। যে এ ফির্কার প্রধান প্রতিষ্ঠাতা। কুরমুত্ব অর্থ বক্রতা বা সংকীর্ণতা থাকা। তার পায়ে বা চলনে সমস্যা থাকায় তাকে কুরমুত্ব বলা হতো। প্রথম জীবনে সে কৃষ্ণার একজন কৃষক ছিল। [বাগদাদী, আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক, পৃ. ৩১৪] সে তার দাওয়াতের মাধ্যমে বিরাট জনগোষ্ঠীকে পথভ্রষ্ট করেছিল। বিশাল একদল লোকের জমায়েত সে তৈরি করেছিল। তারা ২১৮ হিজরী সনে মু’তাদ্বাদ এর খিলাফতকালে খলীফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, বাহরাইন (বর্তমান সৌদী আরবের পূর্বাঞ্চল) শাসন করে, যমীনের বুকে ফিতনা -ফাসাদে ভরপুর করে দেয়, হাজীদের লুট করে, চুরি করে, ডাকাতি করে, রক্ত প্রবাহিত করে, বাইতুল্লাহকে হালাল করে দেয়, হাজারে আসওয়াদ তুলে নিয়ে বাহরাইন তথা আল-আহসা ও দাম্মাম এলাকায় নিয়ে যায়।
এ ফির্কা বস্তুত বাতেনী ফির্কা। তারা শরী’আত মানে না, মাহরাম নারীকেও হালাল মনে করে, দীনের অত্যাবশ্যক জিনিসকেও অস্বীকার করে, শরী’আতের বিধি-বিধানের এমনসব তা’ওয়ীল বা অপব্যাখ্যা করে যা কখনও দীন মেনে নেয় না। বিবেক সায় দেয় না। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ এখানে সেসব তা’ওয়ীলের দিকে ইঙ্গিত করছেন।
বিস্তারিত দেখুন, বাগদাদী, আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক, পৃ. ২৬৬; আল-আসফারায়ীনী, আত- তাবসীর ফিদ-দীন, পৃ. ৮০; মালাজ্বী, আত-তাম্বীহ ওয়ার রাদ্দ, পৃ. ২১-২২; আস-সাকসাকী, আল- বুরহান ফী আকায়িদি আহলিল আদইয়ান, পৃ. ৮০-৮১; রাযী, ই’তিক্বাদাতু ফিরাকিল মুসলিমীন ওয়াল মুশরিকীন, পৃ. ৭৯; ইবনুল জাওযী, রিসালাতুন ফিল কারামাত্বাহ; বালাযুরী, মু’জামুল বুলদান (১/৩৪৬)।
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, কারামাত্বিয়া বাতেনী ফিরকার লোকেরা শিয়াবাদ অবলম্বন করত। [আস-সাফাদিয়্যাহ (১/২৮৫); বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (২/৮১)] তারা তাদের নিজেদের মাঝে নতুন নতুন পরিভাষার উদ্ভব ঘটায়, যা পরবর্তীতে মুসলিমদের মাঝে প্রচার-প্রসার ঘটে। এর মাধ্যমে তাদের উদ্দেশ্য সাবেয়ী মুশরিক, দ্বিত্ববাদী মাজুস ও দার্শনিকদের মতের প্রচার-প্রসার করা। [আস-সাব’ঈনিয়্যাহ, (বুগইয়াতুল মুরতাদ) পৃ. ১৯৩, ৩১৫] ইবন তাইমিয়্যাহ আরও বলেন, তাদের আসল গ্রন্থ হচ্ছে ‘রাসায়িলু ইখওয়ানিস সাফা’। তাদের নেতারা মূলত মুনাফিক। [আস-সাব’ঈনিয়্যাহ, পৃ. ৩২৯, ৩৪১; বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/৩৭৪)] বস্তুত এরা বাহাত্তর ফিরকার বাইরের লোক। তারা কোনোভাবেই ঈমানদার নয়।
২৬২. বাতেনীয়া: এরা একটি ফির্কা বা উপদল, যারা বাহাত্তর ফিরকার বাইরের লোক। বাতেনী শব্দের অর্থ গোপন। এদেরকে বাতেনী বলা হয়, কারণ তারা দাবি করে যে শরী’আতের প্রত্যেকটি ভাষ্যের প্রকাশ্য অর্থ ও অপ্রকাশ্য অর্থ রয়েছে। তারা আরও মনে করে সাধারণ মানুষের জন্যই কেবল বাহ্যিক অর্থ উদ্দেশ্য। কিন্তু যে কেউ বাতেনী ইলমে অগ্রসর হয়েছে তার জন্য বাহ্যিক যাবতীয় তাক্বলীফ রহিত হয়ে গেছে। শরী’আতের বিধি-নিষেধ তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। তারা শরী’আতের বাহ্যিক নির্দেশনার নাম দিয়েছে ‘আল-আগলাল’ বা জিঞ্জীর। তারা বলে আল্লাহর বাণী, ‘আর তিনি তাদের উপর থেকে বোঝা লাঘব করবেন এবং সেসব জিঞ্জীরও যা তাদের উপর রয়েছে।’ [সূরা আল- আ’রাফ: ১৫৭] এর দ্বারা তাদের তথাকথিত মতবাদ বুঝানো হয়েছে। তাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে শরী’আত বাতিল করা। তারা জান্নাত ও জাহান্নাম অস্বীকার করে থাকে, বরং তাদের অধিকাংশ লোক স্রষ্টার অস্তিত্বই অস্বীকার করে থাকে। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ তাদের বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, ‘বাতেনী ফির্কার লোকেরা দু’ শ্রেণিতে বিভক্ত:
১- যারা বলে থাকে, কুরআন ও সুন্নাহ’র প্রকাশ্য অর্থের পাশাপাশি বাতেনী বা গোপন অর্থও রয়েছে, যে গোপন অর্থ প্রকাশ্য অর্থের বিপরীত। সাধারণত তাদেরকেই বাতেনী বলা হয়। তারা আবার দু’ শ্রেণিতে বিভক্ত: ক. তারা ইসলামের প্রকাশ্য কর্মকাণ্ড যেমন সালাত, সাওম, হজ ইত্যাদিতেও বাতেনী অর্থ আবিষ্কার করে থাকে, তারা বলে থাকে; হারাম হওয়ার যেসব ভাষ্য রয়েছে তা তার প্রকাশ্য অর্থে নয়, সেগুলো দিয়ে সাধারণ মানুষদের নিয়ন্ত্রণ করা উদ্দেশ্য। শাইখুল ইসলাম বলেন, বস্তুত এরাই যিন্দীক শ্রেণি, এরাই মুনাফিক, এ ব্যাপারে আলেমগণ একমত। সূফী যিন্দীক হুলুলী ও ওয়াহদাতুল ওজুদীরা এই শ্রেণিভুক্ত। শাইখুল ইসলাম উপরে এ শ্রেণিকেই উদ্দেশ্য নিয়েছেন।
খ. যারা জ্ঞানের ক্ষেত্রে (আকীদাহ’র ক্ষেত্রে) প্রকাশ্য বক্তব্যের বিপরীত গোপন বক্তব্য ও ভাষ্য নির্ধারণ করেন। যদিও আমলি বিষয়সমূহে তারা প্রকাশ্য রূপকে মেনে নেন। এ হচ্ছে মূলত বাতেনী ফির্কার মধ্যে যারা দর্শন চর্চা করে তাদের মত। আলেমগণ বলেন, মুসলিমদের মাঝে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ইসলাম থেকে বের হয়ে যাওয়া দল হচ্ছে এরা। বরং তারা দাজ্জালের চেয়েও জঘন্য। সর্বপ্রথম এ মতের দিকে আহ্বান জানিয়েছিল উবাইদুল্লাহ ইবন মাইমূন আল-ক্বাদ্দাহ। সে ইমাম জা’ফর সাদেক এর ক্রীতদাস ছিল। খলীফা মামুনের সময় তার উদ্ভব হয়েছিল। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, নাক্বদূত তা’সীস (১/২৫৯-২৬০); ইসফারায়ীনী, আত-তাবসীর ফিদ দীন, পৃ. ৮৩; ইবনুল জাওযী, রিসালাতুন ফিল কারামাত্বাহ, পৃ. ৩৬; রাসায়িলি ইখওয়ানুস সাফা, পৃ. ১৩৮-১৪৪; ইবন আরাবী হাতেমী, আল-ফতুহাতুল মাক্কিয়্যাহ (৪/২৬৩-২৬৬, ২৭১, ২৭৫)।
২- যারা গোপন আমল ও ইলমের কথা বলে থাকে। তবে তারা বলে এগুলোর সাথে প্রকাশ্য অর্থের মিল রয়েছে। তারা আবার অন্যান্য আলেমগণের সাথে একমত যে, যারাই বলবে এসব শরী’আতের বিধি-নিষেধের প্রকাশ্য রূপের সাথে গোপন রূপের বৈপরিত্য রয়েছে তারা মুনাফিক। এরাই তাসাওউফের অনুসারী বলে বিখ্যাত। দেখুন, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (২/১৬৭)।
২৬৩. যেমন আখেরাতের ওপর ঈমানের বিষয়টি। আখেরাতের দিন আসবে ও অবশ্যম্ভাবী হওয়ার বিষয়টি বিবেক বুঝতে সক্ষম। কারণ দুনিয়াতে ভালো কিংবা মন্দ করেছে সেটার জবাবদিহীতা না থাকার বিষয়টিতে সুস্থ বিবেক শায় দেয় না। বরং বিবেকের যুক্তি তা সাব্যস্ত করে, কিন্তু বিস্তারিত বর্ণনা সে কখনো দাঁড় করাতে পারে না, তা ওহীর মাধ্যমেই কেবল বর্ণিত হতে পারে।
২৬৪. যেমনটি ইবন রুশদ আল-হাফীদ এ স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। [ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউত তা’আরুদ্ব (১/১৬২)]