📄 এটার বর্ণনা যে, তা’বীল (নিষ্ক্রিয়করণ) তামসীল (তুলনা প্রদান) কে আবশ্যক করে, অনুরূপ তামসীল প্রদান করা তা’তীল করাকে আবশ্যক করে
তা'তীলকারী ও তামসীলকারী সম্প্রদায়দ্বয়ের প্রত্যেকেই তা'ত্বীল ও তামসীল সাব্যস্তকারী। তা'ত্বীল বা (আল্লাহর নাম ও গুণকে) নিষ্ক্রিয়কারীগণ আল্লাহর নামের ও গুণের সেই অর্থই বুঝে যা মাখলুকের জন্য উপযোগী, এ কারণে তারা সে মাফহুম (বুঝ) কে নাকচ করে যেতে থাকে। ফলে তারা তা'ত্বীল ও তামসীল উভয়টিকেই একত্রিত করে। আগে তামসীল করে, পরে তা'ত্বীল করে। এর মাধ্যমে তারা আল্লাহর সিফাত ও নাম দ্বারা যা বুঝা যায় তাকে তাঁর সৃষ্টির নাম ও সিফাতের বুঝের সাথে তুলনা করে ও সাদৃশ্য প্রদান করে। আবার এর মাধ্যমে তারা আল্লাহর জন্য উপযোগী নাম ও গুণকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। (২৩২)
কেননা যখন কেউ বলে, "যদি আল্লাহ 'আরশের উপরে হন তাহলে তিনি হয়তো 'আরশের থেকে বড় হবেন অথবা ছোট অথবা সমান হবেন। আর এগুলো সবই অসম্ভব (২৩৩);" অনুরূপ কোনো বাক্য। (এটা কীভাবে তা'ত্বীল ও তামসীলকে একত্রিত করে? তার বর্ণনা হচ্ছে,) সে লোকটি মূলত মহান আল্লাহর 'আরশের উপরে উঠাকে তেমনি বুঝেছে যেমন কোনো জিসম (দেহ)-র উপরে অন্য কোনো জিসম উঠে থাকে। বস্তুত তার (দেহের উপর দেহ থাকার) এ বুঝটির আবশ্যকতা পূর্বের বুঝ (কোনো কিছু অপর কোনো কিছুর উপরে থাকলে সেটা বড় বা ছোট বা সমান হতে হবে) অনুসারেই হয়েছে (যা সৃষ্টির ওপর সৃষ্টির থাকার সাথে যথাযথ)। কিন্তু (স্রষ্টা কোনো কিছুর উপরে থাকার বিষয়টি এমন নয়, তাই) যদি বলা হতো, মহান আল্লাহ 'আরশের উপর উঠেছেন এমন প্রকার উপরে উঠা যা তাঁর মহত্বের সাথে উপযোগী এবং তাঁর জন্য বিশেষিতা (২৩৪), তাহলে ('আরশে উঠার) সাথে এমন কোনো বাতিল আবশ্যকতা ('আরশের চেয়ে বড় কিংবা ছোট কিংবা সমান হওয়ার) বিষয়টি অবশ্যম্ভাবী করে না; যা নাকচ করা ওয়াজিব হবে (কেননা তা তো সৃষ্টির জন্য আবশ্যক, স্রষ্টার জন্য নয়)। (২৩৫)
এটা তখন সাদৃশ্য স্থাপনকারীর ঐ কথার মতো হয়ে যায়, যে বলে থাকে, যদি সৃষ্টিকুলের কোনো ছিলেন, তাহলে আমাদের জন্যও এ ব্যাপারে চুপ থাকার সুযোগ সৃষ্টি হয়ে যায় যেমনটি তারা চুপ ছিলেন, নতুবা তারা এসব না জেনে চুপ ছিলেন, তাহলে তারা যা জানেননি, দীনের ব্যাপারে সেগুলো আমাদের না জানলেও চলবে। [আল-হুজ্জাতু ফী বায়ানিল মাহাজ্জাহ (১/৯৯-১০০)]
২৩৮. মুমাসসিল বা সাদৃশ্য স্থাপনকারীর বক্তব্য এখানে শেষ।
২৩৯. অথচ... এ বক্তব্যটুকু ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহর পক্ষ থেকে কথার মাঝখানে এসেছে। কারণ ইবন তাইমিয়্যাহ'র নিকট এটা অসম্ভব হলেও মুমাসসিল বা সাদৃশ্য স্থাপনকারীর নিকট জাওহার বা 'আরদ্ব হওয়া আল্লাহর জন্য অসম্ভব নয়।
২৪০. অর্থাৎ মুমাসসিল বা সাদৃশ্য স্থাপনকারী বলছে যে, সকল অস্তিত্বই এ দুটির একটি হবেই, সুতরাং আল্লাহর জন্য তা সাব্যস্ত করা দোষণীয় নয়। সুতরাং আল্লাহর সিফাতগুলো মানুষের সিফাতের মতোই। [নাউযুবিল্লাহ] এভাবে মুমাসসিল আল্লাহর সিফাতকে নিজের মত করে বুঝে নিয়ে দু'টি কাজ করেছে, এক. সে আল্লাহকে তামসীল করেছে। জাওহার বা 'আরদ্ব যা সৃষ্টির গুণ, আল্লাহকে সেটার অধীন করে নিয়েছে। দুই. সে তামসীল করার মাধ্যমে আল্লাহর গুণসমূহের প্রকৃত অর্থকে নিষ্ক্রিয় করে নিয়েছে। এভাবেই একজন মুমাসসিল তামসীল ও তা'জ্বীল দু'টোই করে থাকে।
২৪১. এখানে ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ আরেকটি উদাহরণ নিয়ে এসেছেন, যার মাধ্যমে সাদৃশ্য স্থাপনকারীর যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। মুমাসসিলের দেয়া যুক্তির মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, সে তামসীল করেছে, যার পরিণতি দাঁড়িয়েছে তাত্বীল, অর্থাৎ তামসীল করার মাধ্যমে এ গুণের আসল অর্থকে নিষ্ক্রিয়করণ করা হয়ে গেছে।
২৪২. অর্থাৎ মু'আত্তিল। যে ইস্তিওয়া এর প্রকৃত সকল অর্থকে নিষ্ক্রিয় করেছে। কারণ ইস্তিওয়া এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে, উপরে উঠা ও ঊর্ধ্বে উঠা। যেমনটি কুরআনে এসেছে, 'আর জুদী পাহাড়ের উপর উঠল।' [সূরা হূদ: ৪৪] আরও এসেছে, 'যাতে তোমরা তার পিঠসমূহের উপর উঠতে পার।' [সূরা আয- যুখরুফ: ১৩]
২৪৩. অর্থাৎ মুমাসসিল। যে ইস্তেওয়া এর অর্থকে সৃষ্টির কারও মত করে সাব্যস্ত করে নিয়েছে। তার মতে, উপরে উঠা বলতে সৃষ্টি কর্তৃক কোনো কিছুর উপরে উঠা। [নাউযুবিল্লাহ]
২৪৪. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ অন্যত্র বলেন, 'জেনে রাখ, যারাই 'ইস্তেওয়া' বা উপরে উঠার গুণ ও অনুরূপ [কর্মবাচক] গুণগুলোকে অস্বীকার করেছে, যদি তুমি সে কারণটি উদ্ঘাটন করতে গবেষণা কর তবে দেখতে পাবে, তারা আয়াত থেকে কোনো সৃষ্টি কর্তৃক কিছুর উপরে উঠাকেই অর্থ হিসেবে ধরে নিয়েছে, অথবা এমনভাবে উপরে উঠা ধরে নিয়েছে যাতে হুদুস (নতুনত্ব) বা নকস (ত্রুটি) মিশ্রিত হয়। তারপর তাদের বিপরীত মতের লোকদের থেকে তা বর্ণনা করে (অথচ তারা তা বলেনি) তারপর তারা সেটা বাতিল করার নিমিত্তে যাবতীয় দলীল প্রমাণাদির সমাহার ঘটায়। তারপর বলে, এর দ্বারা নির্দিষ্ট হয়ে গেল যে, 'ইস্তেওয়া' শব্দটিকে ইস্তীইলা' অর্থে নিতে হবে। অর্থাৎ ইস্তেওয়া অর্থ উপরে উঠা না নিয়ে 'ইস্তীইলা' বা করায়ত্ব করার অর্থে নিতে হবে। [আত-তিস'ঈনিয়্যাহ (২/৫৬৮)]
📄 মহান আল্লাহর জন্য ‘উর্ধ্বে থাকা’ ও ‘উপরে উঠা’ এ গুণদ্বয় সাব্যস্তকরণ
আর মীমাংসাপূর্ণ কথা হচ্ছে, যার ওপর মধ্যমপন্থী উম্মত রয়েছে যে, নিশ্চয় আল্লাহ আরশের উপরে উঠেছেন (২৪৫), তাঁর শানের সাথে উপযোগী এবং তাঁর জন্যই খাসভাবে। কাজেই যেমন তিনি 'আলীম' সকল বিষয়ে অবগত, তিনি 'ক্বাদীর' সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান, তিনি স্রষ্টা থাকবেন তবে সে হয়তো জাওহার (২৩৬) (মৌলবস্তু) হবে, নতুবা আরদ্ব (২৩৭) (গুণবাচক) হবে। (২৩৮) [অথচ জাওহার বা 'আরদ্ব' কোনোটি হওয়া আল্লাহর জন্য অসম্ভব। (২৩৯)] যেহেতু সকল অস্তিত্বই এ দুটির মধ্যে সীমাবদ্ধ। (২৪০) অনুরূপ মুমাসসিল বা সাদৃশ্যস্থাপনকারীর কথা (২৪১): যখন তিনি [আল্লাহ] 'আরশের উপর উঠবেন তখন এটি মানুষের খাট বা নৌকার উপর উঠার মতোই ধরে নিতে হবে। যেহেতু 'ইসতিওয়া' (উপরে উঠা) এভাবে ছাড়া জানা যায় না।
এভাবে স্পষ্ট হলো যে, এ দুটি চিন্তাতেই রয়েছে তামসীল বা সাদৃশ্য স্থাপন, আর এ দু'টি চিন্তাতেই রয়েছে আল্লাহর সিফাতের স্বরূপকে নিষ্ক্রিয়করণ। প্রথমটির (২৪২) সমস্যা হচ্ছে সে প্রকৃত 'ইসতিওয়া'র সকল নামকে নিষ্ক্রিয় করেছে। আর দ্বিতীয়টির (২৪৩) সমস্যা হচ্ছে সে এমন এক 'ইস্তেওয়া' সাব্যস্ত করেছে যা কেবল মাখলুকের জন্য নির্দিষ্ট। (২৪৪)
টিকাঃ
২৩২. বিস্তারিত দেখুন, মাজ ('সামী')' সর্বদ্রষ্টা, ('বাসীর') সর্বশ্রোতা ইত্যাদি। আর আল্লাহর ইলম (জ্ঞান) ও কুদরত (ক্ষমতা) (২৪৬) এর ক্ষেত্রে এমন কোনো 'আরদ্ব' (২৪৭) এর বৈশিষ্ট্য সাব্যস্ত করা জায়েয নেই যা কোনো সৃষ্টির ইলম ও কুদরতের জন্য প্রযোজ্য; তেমনিভাবে মহান আল্লাহ 'আরশের উপরে (২৪৮), তাঁর জন্য মাখলুকের ফাউক্বিয়্যাত তথা মাখলুকের ওপর মাখলুক হওয়ার বৈশিষ্ট্য ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট আবশ্যিক বিষয়সমূহ সাব্যস্ত করা জায়েয নেই।
টিকাঃ
২৪৫. এখানে বিতর্ক পরবর্তী আশ'আরী মতবাদের লোকদের সাথে, যারা আল্লাহর 'আরশের উপর উঠাকে অস্বীকার করে থাকে।
২৪৬. উল্লেখ্য যে, আশায়েরারা ইলম, কুদরত, শোনা, দেখা এগুলো সহ জীবন, ইচ্ছা, কালামে নফসী গুণসমূহ সাব্যস্ত করে থাকে, তারা বলে থাকে, এগুলো বিবেকের যুক্তি দ্বারা সাব্যস্ত হয়, অন্যগুলো নয়।
২৪৭. ইতোপূর্বে আরদ্ব এর ব্যাখ্যা চলে গেছে যে সৃষ্টিতে 'আরদ্ব' বলতে বুঝায় যা অবশিষ্ট থাকে না বা ক্ষণস্থায়ী।
২৪৮. কারণ আল্লাহ তা'আলা যে ইস্তেওয়া বা উপরে উঠার কথা বলেছেন তা তোমূ' ফাতাওয়া (৫/২০৯)।
২৩৩. এসব সন্দেহ আশ'আরী ও মাতুরিদী মতবাদের লোকেরা পেশ করে থাকে। যার দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য আল্লাহ সর্বোচ্চ সত্তা ও 'আরশের উপর উঠার গুণ অস্বীকার করা। দেখুন, তাদের গ্রন্থে এসব সন্দেহ, নাইসাপুরী, আল-গুনইয়া ফী উসুলিদ্দীন, পৃ. ৭৪; গাযালী, কাওয়া'য়িদুল ই'তিক্কাদ, পৃ. ১৬৮।
২৩৪. যেমনটি নবী-রাসূল, সাহাবায়ে কিরাম, সালাফে সালেহীন ও ইমামগণ সাব্যস্ত করেছেন।
২৩৫. এ আলোচনার মাধ্যমে যেকোনো মু'আত্ত্বিল যে তা'ত্বীল ও তামসীল উভয়টিই করেছে তা প্রমাণিত হলো। কারণ সে তাত্বীল করার আগে তামসীল করে নেয়।
২৩৬. জাওহার হচ্ছে এমন মৌলবস্তু, যা জায়গা জুড়ে আছে। তবে তা দু'ভাগে বিভক্ত: ক. বাসীত্ব বা সূক্ষ্ম যা তখনকার দার্শনিকদের পরিভাষায় 'আল-জাওহারুল ফারদ' বা অনু-পরমানু বুঝায়। তা এমন এক সত্তা যাতে আর ভাগ চলে না, বাস্তব কর্মের মাধ্যমেও নয়, ক্ষমতার দিক থেকেও নয়। খ. মুরাক্কাব বা যৌগিক; আর তা হচ্ছে জিসিম বা দেহ। যা দুই বা ততোধিক 'আল-জাওহার আল ফারদ' তথা অণু-পরামাণু দ্বারা ঘটিত। তাতে বাড়তি কিছু নেই।
২৩৭. 'আরদ্ব হচ্ছে এমন বস্তু যা অবশিষ্ট থাকা সম্ভব নয়, অন্যের ওপর নির্ভর করে, অন্যের উপরে অবস্থান করে টিকে থাকে, যা জাওহার ও জিসিম এর বিশেষ ধরনের উপরে উঠা, সেটার ধরণ আমাদের জানা নেই, যেমনটি আমরা আল্লাহর ইলম, কুদরত ও শোনার ক্ষেত্রে বলি যে, এটি আল্লাহর জন্য বিশেষ ধরনের ইলম, কুদরত ও শোনা, যার প্রকৃত ধরণ আমরা জানি না। [এ ব্যাপারে বিস্তারিত দেখুন, শাইখুল ইসলামের আত-তাদমুরিয়্যাহ গ্রন্থের চতুর্থ নীতি]
আর মীমাংসাপূর্ণ কথা হচ্ছে, যার ওপর মধ্যমপন্থী উম্মত রয়েছে যে, নিশ্চয় আল্লাহ আরশের উপরে উঠেছেন (২৪৫), তাঁর শানের সাথে উপযোগী এবং তাঁর জন্যই খাসভাবে। কাজেই যেমন তিনি 'আলীম' সকল বিষয়ে অবগত, তিনি 'ক্বাদীর' সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান, তিনি ('সামী')' সর্বদ্রষ্টা, ('বাসীর') সর্বশ্রোতা ইত্যাদি। আর আল্লাহর ইলম (জ্ঞান) ও কুদরত (ক্ষমতা) (২৪৬) এর ক্ষেত্রে এমন কোনো 'আরদ্ব' (২৪৭) এর বৈশিষ্ট্য সাব্যস্ত করা জায়েয নেই যা কোনো সৃষ্টির ইলম ও কুদরতের জন্য প্রযোজ্য; তেমনিভাবে মহান আল্লাহ 'আরশের উপরে (২৪৮), তাঁর জন্য মাখলুকের ফাউক্বিয়্যাত তথা মাখলুকের ওপর মাখলুক হওয়ার বৈশিষ্ট্য ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট আবশ্যিক বিষয়সমূহ সাব্যস্ত করা জায়েয নেই।
টিকাঃ
২৪৫. এখানে বিতর্ক পরবর্তী আশ'আরী মতবাদের লোকদের সাথে, যারা আল্লাহর 'আরশের উপর উঠাকে অস্বীকার করে থাকে।
২৪৬. উল্লেখ্য যে, আশায়েরারা ইলম, কুদরত, শোনা, দেখা এগুলো সহ জীবন, ইচ্ছা, কালামে নফসী গুণসমূহ সাব্যস্ত করে থাকে, তারা বলে থাকে, এগুলো বিবেকের যুক্তি দ্বারা সাব্যস্ত হয়, অন্যগুলো নয়।
২৪৭. ইতোপূর্বে আরদ্ব এর ব্যাখ্যা চলে গেছে যে সৃষ্টিতে 'আরদ্ব' বলতে বুঝায় যা অবশিষ্ট থাকে না বা ক্ষণস্থায়ী।
২৪৮. কারণ আল্লাহ তা'আলা যে ইস্তেওয়া বা উপরে উঠার কথা বলেছেন তা করে, তাদের যুক্তি হলো যে, তা যুক্তিতে ধরে না, অথচ আশায়েরা ও মাতুরিদীদের নিকট তা যুক্তিতে ধরে। আবার মু'তাযিলারা, যারা আখেরাতে আল্লাহকে দেখা যাবে না বলে তাদের যুক্তি হলো, যুক্তিতে তা গ্রহণযোগ্য মনে হয় না, অথচ আশায়েরা ও মাতুরিদীরা সেটাকে যুক্তিগ্রাহ্য মনে করে থাকেন। অপরদিকে আহলুল হক্করা, সালাফীরা, চার ইমাম ও তাদের অনুসারী সহীহ আকীদাহ'র অনুসারীরা বিশ্বাস করে থাকেন আল্লাহ 'আরশের উপর উঠেছেন, অথচ অন্যান্য সকল ফির্কা বলে থাকেন যে, আল্লাহ কর্তৃক তাঁর 'আরশের উপর উঠা যুক্তিতে ধরে না, তাই তা'ওয়ীল করতে হবে। তাই কোনটি বিবেকের যুক্তি সমর্থন করে আর কোনটি সমর্থন করে না তাতে এত মতভেদ থাকার অর্থই হচ্ছে, বিবেকের যুক্তি কোনটি ধরবে আর কোনটি ধরবে না তা একজন থেকে অন্যজনের ব্যাপারে আলাদা থাকতে বাধ্য। আনাসের যা বিবেকে ধরে, আনাসের বাপের তা বিবেকে নাও ধরতে পারে, তাই বলে যা আনাসের বাপের বিবেকে ধরে না, তা নিষিদ্ধ বলার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। সুতরাং যুক্তির প্রতি না ঝুঁকে কুরআন ও হাদীসের ভাষ্যে যা এসেছে তা মেনে নেয়াই হচ্ছে বুদ্ধিমানের কাজ। অন্যথা সর্বদা পথভ্রষ্টতা তাকে ঘিরে থাকবে।
📄 সালাফে সালেহীনের মাযহাব বিশেষের যুক্তি ও কুরআন-সুন্নাহ’র ভাষ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ
আর জেনে রাখ যে, স্পষ্ট আক্কল (বিবেকের স্পষ্ট যুক্তি) এবং বিশুদ্ধ নকল (কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদীসে) আসা দলীলে এমন কিছু নেই যা সালাফি তরীকার ভিন্ন হওয়া আবশ্যক করে। তবে হক্কের ওপর (২৪৯) আপতিত সংশয় নিরসন করার আলোচনা এ সংক্ষিপ্ত পরিসরে সংকুলান হবে না। কাজেই যে অন্তরে সংশয় রয়েছে, আর সে তা নিরসনের ইচ্ছা করে তাহলে সেটা সহজ ও সরল।
টিকাঃ
২৪৯. অর্থাৎ সালাফদের আকীদাহ হচ্ছে হক্ক যার ওপর অনেকে বিবেকের যুক্তি দাঁড় করিয়ে সন্দেহে নিপতিত হতে পারে। সেসব অস্বচ্ছ যুক্তিকে দলীল মনে করে অনেক কালামশাস্ত্রবিদ সন্দেহে দোদুল্যমান হয়ে আছে। তাদের এসব সন্দেহ নিরসনের জন্য আরও বেশি লেখা দরকার যা এখানে তিনি নিয়ে আসেননি। তবে শাইখুল ইসলাম এ বিষয়ে ১১ খণ্ডের এক বিশাল গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার নাম 'দারউ তা'আরুদ্বিল আকলি ওয়ান মধ্যে কেবল প্রকাশ পায়। অপর কোনো জাওহার ও জিসিমে পরিণত হলে তা বাতিল হয়ে যায়। আল্লাহর গুণাবলিকে কি 'আরদ্ব বলা যাবে? বস্তুত আল্লাহর গুণাবলিকে আরদ্ব বলা এটি কালামশাস্ত্রবিদদের আবিষ্কার। এটাকে সরাসরি হা বা না বলা যাবে না। উদ্দেশ্য জিজ্ঞাসা করতে হবে, তারপর যদি তা ভুল অর্থে পরিচালিত হয়, যেমন আরদ্ব বলতে বুঝায় যা নিঃশেষ হয়ে যায় তবে সে অর্থে আল্লাহর সিফাতকে 'আরদ্ব বলা শব্দ ও অর্থ উভয় দিক থেকেই অস্বীকার করা হবে। আর যদি বিশুদ্ধ অর্থ করা হয় আর তা আল্লাহর গুণের সাথে উপযোগী বিবেচিত হয় তবে সেটার অর্থ নাকলি'। সে গ্রন্থে তিনি এসব লোকদের সন্দেহের জবাব দিয়েছেন, যারা কুরআন ও হাদীসে আসা আল্লাহর গুণ বিষয়ক ভাষ্যের সাথে তাদের বিবেকের যুক্তির মতবিরোধ দাবি করেছিল।
আর জেনে রাখ যে, স্পষ্ট আক্কল (বিবেকের স্পষ্ট যুক্তি) এবং বিশুদ্ধ নকল (কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদীসে) আসা দলীলে এমন কিছু নেই যা সালাফি তরীকার ভিন্ন হওয়া আবশ্যক করে। তবে হক্কের ওপর (২৪৯) আপতিত সংশয় নিরসন করার আলোচনা এ সংক্ষিপ্ত পরিসরে সংকুলান হবে না। কাজেই যে অন্তরে সংশয় রয়েছে, আর সে তা নিরসনের ইচ্ছা করে তাহলে সেটা সহজ ও সরল।
টিকাঃ
২৪৯. অর্থাৎ সালাফদের আকীদাহ হচ্ছে হক্ক যার ওপর অনেকে বিবেকের যুক্তি দাঁড় করিয়ে সন্দেহে নিপতিত হতে পারে। সেসব অস্বচ্ছ যুক্তিকে দলীল মনে করে অনেক কালামশাস্ত্রবিদ সন্দেহে দোদুল্যমান হয়ে আছে। তাদের এসব সন্দেহ নিরসনের জন্য আরও বেশি লেখা দরকার যা এখানে তিনি নিয়ে আসেননি। তবে শাইখুল ইসলাম এ বিষয়ে ১১ খণ্ডের এক বিশাল গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার নাম 'দারউ তা'আরুদ্বিল আকলি ওয়ান নাকলি'। সে গ্রন্থে তিনি এসব লোকদের সন্দেহের জবাব দিয়েছেন, যারা কুরআন ও হাদীসে আসা আল্লাহর গুণ বিষয়ক ভাষ ১২৭]
২৫৭. ইবনুল কাইয়্যেম রাহিমাহুল্লাহ এ কথাটির ব্যাখ্যা করে বলেন, তোমাদের কাদের আক্কলকে এ ব্যাপারে মাপকাঠি ধরব যে, তার সাথে মিলে গেলে নিব ও তার প্রকাশ্য অর্থের ওপর রাখব, আর যা তার বিরোধী হবে তা পরিত্যাগ করব অথবা তা'ওয়ীল করব বা তাফওয়ীদ্ব করব? এরিস্টটল ও তার অনুসারীদের আক্কলের কাছে? নাকি প্লেটো ও তার অনুসারীদের আক্কলের কাছে? নাকি পিথাগোরাসের আক্কলের কাছে? নাকি এম্পেদোক্লিসের আক্কলের কাছে, নাকি সক্রেটিস এর আক্কলের কাছে? নাকি থেমিস্টিউসের আক্কলের কাছে, নাকি ফিলিপপুত্র আলেক্সান্দারের আক্কলের কাছে? নাকি ফারাবীর আক্কলের কাছে? নাকি জাহম ইবন সাফওয়ানের আকলের কাছে? নাকি নাযযام এর আক্কলের কাছে, নাকি 'আল্লাফ এর আক্কলের কাছে? নাকি জুব্বাঈর আক্কলের কাছে, নাকি বিশর আল-মিররীসীর আক্কলের কাছে? নাকি ইসকাকীর আক্কলের কাছে? নাকি হুসাইন আন-নাজ্জার এর আক্কলের কাছে? নাকি আবু ইয়াকুব আশ-শাহহাম এর আক্কলের কাছে? নাকি আবুল হুসাইন আল-খাইয়াত্ব এর আক্কলের কাছে? নাকি আবুল কাসেম আল-বালাখীর আক্কলের কাছে? নাকি সুমামাহ ইবন আশরাস এর আক্কলের কাছে? নাকি জা'ফর ইবন মুবাশ্বির এর আকলের কাছে?
নাকি জা'ফর ইবন হারব এর আক্কলের কাছে? নাকি আবুল হুসাইন আস-সালেহীর আক্কলের কাছে? নাকি আবুল হুসাইন আল-বাসরীর আক্ক্যের সাথে তাদের বিবেকের যুক্তির মতবিরোধ দাবি করেছিল।
📄 যারা তা’বীল বা অপব্যাখ্যা করে তাদের অস্থিরতা
অতঃপর এ বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহ ও উম্মতের সালাফে সালেহীনের বিরোধিতাকারী ও বিপরীতমুখী অবস্থানকারী যারা এ অধ্যায়ে তা'ওয়ীল তথা অপব্যাখ্যাকারী রয়েছে তারা জটিল সংশয়ের মাঝে হাবুডুবু খাচ্ছে। (২৫০) কেননা;
* যে ব্যক্তি (জান্নাতে আল্লাহকে) দেখা যাবার বিষয়টি অস্বীকার করে (২৫১), সে মনে করে যে, আক্কল (বুদ্ধকে অস্বীকার করা হবে না। কিন্তু শব্দ স্বীকার করা হবে। [বিস্তারিত দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ' ফাতাওয়া (৬/৯০-৯১, ১০৩-১০৪)] ইমাম হাফেয কিওয়ামুস সুন্নাহ আবুল কাসেম আল-আসবাহানী বলেন, 'সালাফগণ জাওহার ও আরদ্ব নিয়ে কথা বলতে অস্বীকার করেছেন। তারা বলেছেন, সাহাবায়ে কিরাম ও তাবে'য়ীনে 'ইযام এর যুগে এসব ছিল না। তাই হতে পারে তারা এগুলো জানা সত্ত্বেও চুপ ছিলেন, তাহলে আমাদের জন্যও এ ব্যাপারে চুপ থাকার সুযোগ সৃষ্টি হয়ে যায় যেমনটি তারা চুপ ছিলেন, নতুবা তারা এসব না জেনে চুপ ছিলেন, তাহলে তারা যা জানেননি, দীনের ব্যাপারে সেগুলো আমাদের না জানলেও চলবে। [আল-হুজ্জাতু ফী বায়ানিল মাহাজ্জাহ (১/৯৯-১০০)]
২৩৮. মুমাসসিল বা সাদৃশ্য স্থাপনকারীর বক্তব্য এখানে শেষ।
২৩৯. অথচ... এ বক্তব্যটুকু ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহর পক্ষ থেকে কথার মাঝখানে এসেছে। কারণ ইবন তাইমিয়্যাহ'র নিকট এটা অসম্ভব হলেও মুমাসসিল বা সাদৃশ্য স্থাপনকারীর নিকট জাওহার বা 'আরদ্ব হওয়া আল্লাহর জন্য অসম্ভব নয়।
২৪০. অর্থাৎ মুমাসসিল বা সাদৃশ্য স্থাপনকারী বলছে যে, সকল অস্তিত্বই এ দুটির একটি হবেই, সুতরাং আল্লাহর জন্য তা সাব্যস্ত করা দোষণীয় নয়। সুতরাং আল্লাহর সিফাতগুলো মানুষের সিফাতের মতোই। [নাউযুবিল্লাহ] এভাবে মুমাসসিল আল্লাহর সিফাতকে নিজের মত করে বুঝে নিয়ে দু'টি কাজ করেছে, এক. সে আল্লাহকে তামসীল করেছে। জাওহার বা 'আরদ্ব যা সৃষ্টির গুণ, আল্লাহকে সেটার অধীন করে নিয়েছে। দুই. সে তামসীল করার মাধ্যমে আল্লাহর গুণসমূহের প্রকৃত অর্থকে নিষ্ক্রিয় করে নিয়েছে। এভাবেই একজন মুমাসসিল তামসীল ও তা'জ্বীল দু'টোই করে থাকে।
২৪১. এখানে ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ আরেকটি উদাহরণ নিয়ে এসেছেন, যার মাধ্যমে সাদৃশ্য স্থাপনকারীর যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। মুমাসসিলের দেয়া যুক্তির মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, সে তামসীল করেছে, যার পরিণতি দাঁড়িয়েছে তাত্বীল, অর্থাৎ তামসীল করার মাধ্যমে এ গুণের আসল অর্থকে নিষ্ক্রিয়করণ করা হয়ে গেছে।
২৪২. অর্থাৎ মু'আত্তিল। যে ইস্তিওয়া এর প্রকৃত সকল অর্থকে নিষ্ক্রিয় করেছে। কারণ ইস্তিওয়া এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে, উপরে উঠা ও ঊর্ধ্বে উঠা। যেমনটি কুরআনে এসেছে, 'আর জুদী পাহাড়ের উপর উঠল।' [সূরা হূদ: ৪৪] আরও এসেছে, 'যাতে তোমরা তার পিঠসমূহের উপর উঠতেি-বিবেকের যুক্তি) সেটাকে অসম্ভব মনে করে, আর সে মনে করে যে এটাতে তা'ওয়ীল করা ছাড়া উপায় নেই।
* আর যে এটা অসম্ভব মনে করে যে, আল্লাহর জ্ঞান ও ক্ষমতা আছে, অনুরূপ অসম্ভব মনে করে যে, আল্লাহর এমন কালাম বা বাণী রয়েছে যা সৃষ্টি নয় ইত্যাদি(২৫২), সে বলে, নিশ্চয় তার আক্কল বা বিবেকের যুক্তি এগুলো অসম্ভব মনে করে। তাই সে এগুলার তা'ওয়ীল বা অপব্যাখ্যা করতে বাধ্য।
* বরং যে এটা অস্বীকার করে যে, বাস্তবে দেহের হাশর (পুনরুত্থান) আছে এবং জান্নাতে প্রকৃত অর্থে খাওয়া-দাওয়া আছে (২৫৩), সে মনে করে যে, আক্কল বা বিবেকের যুক্তি এটা অসম্ভব ভাবে, তাই সে তা'ওয়ীল করতে বাধ্য।
* তেমনি যে ব্যক্তি মনে করে যে, আল্লাহ 'আরশের উপরে নেই(২৫৪), সে মনে করে যে, আক্কল বা বিবেকের যুক্তি এটাকে অসম্ভব মনে করে এবং তাই সে [এটার] তা'ওয়ীল করতে বাধ্য। (২৫৫)
টিকাঃ
২৫০. কোনো নিয়মনীতিতে তারা নিজেদেরকে সুস্থির রাখতে পারছে না। তাদের একেকজনের তা'ওয়ীলের কারণ একেক রকম। একজনের কাছে যা বিবেকের যুক্তিতে ধরে, অপরজনের কাছে তা বিবেকের যুক্তিতে ধরে না, যা প্রমাণ করে যে মানুষের বিবেকের যুক্তি কখনও সমান হয় না, সেখানে কমন কোনো বিষয়ও নেই।
২৫১. যেমনটি জাহমিয়্যাহ ও মু'তাযিলারা মনে করে থাকে, অনুরূপ তাদের অনুসারী খারেজী ও রাফেদ্বী মতবাদের লোকেরা।
২৫২. যেমনটি জাহমিয়্যাহ ও মু'তাযিলারা মনে করে থাকে।
২৫৩. যেমনটি তথাকথিত দার্শনিক মতবাদে বিশ্বাসীরা ও তাদের অনুসারী কট্টর বাতেনী ফির্কার লোকেরা মনে করে থাকে।
২৫৪. যেমনটি মনে করে থাকে, জাহমিয়্যাহ, মু'তাযিলা, আশায়েরা, মাতুরিদিয়্যাহ প্রভৃতি ভ্রান্ত ও বিদ'আতী দলসমূহ।
২৫৫. তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, কোন জিনিস বিবেকের যুক্তি ধরে না সে ব্যাপারে তাদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। অথচ তারা সবাই বিবেকের যুক্তি নিয়েই চলার দাবি করে। তথাকথিত দার্শনিকরা শারীরিক পুনরুত্থানকে অস্বীকার করে এ দাবিতে যে, তা যুক্তিতে ধরে না, অথচ মু'তাযিলা, আশায়েরা ও মাতুরিদীরা সেটাকে যুক্তিতে ধরে বলে থাকেন। অনুরূপভাবে মু'তাযিলারা, যারা আল্লাহর ইলম, কুদরত, সৃষ্ট নয় এমন বাণী অস্বীকার পার।' [সূরা আয- যুখরুফ: ১৩]
২৪৩. অর্থাৎ মুমাসসিল। যে ইস্তেওয়া এর অর্থকে সৃষ্টির কারও মত করে সাব্যস্ত করে নিয়েছে। তার মতে, উপরে উঠা বলতে সৃষ্টি কর্তৃক কোনো কিছুর উপরে উঠা। [নাউযুবিল্লাহ]
২৪৪. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ অন্যত্র বলেন, 'জেনে রাখ, যারাই 'ইস্তেওয়া' বা উপরে উঠার গুণ ও অনুরূপ [কর্মবাচক] গুণগুলোকে অস্বীকার করেছে, যদি তুমি সে কারণটি উদ্ঘাটন করতে গবেষণা কর তবে দেখতে পাবে, তারা আয়াত থেকে কোনো সৃষ্টি কর্তৃক কিছুর উপরে উঠাকেই অর্থ হিসেবে ধরে নিয়েছে, অথবা এমনভাবে উপরে উঠা ধরে নিয়েছে যাতে হুদুস (নতুনত্ব) বা নকস (ত্রুটি) মিশ্রিত হয়। তারপর তাদের বিপরীত মতের লোকদের থেকে তা বর্ণনা করে (অথচ তারা তা বলেনি) তারপর তারা সেটা বাতিল করার নিমিত্তে যাবতীয় দলীল প্রমাণাদির সমাহার ঘটায়। তারপর বলে, এর দ্বারা নির্দিষ্ট হয়ে গেল যে, 'ইস্তেওয়া' শব্দটিকে ইস্তীইলা' অর্থে নিতে হবে। অর্থাৎ ইস্তেওয়া অর্থ উপরে উঠা না নিয়ে 'ইস্তীইলা' বা করায়ত্ব করার অর্থে নিতে হবে। [আত-তিস'ঈনিয়্যাহ (২/৫৬৮)]
অতঃপর এ বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহ ও উম্মতের সালাফে সালেহীনের বিরোধিতাকারী ও বিপরীতমুখী অবস্থানকারী যারা এ অধ্যায়ে তা'ওয়ীল তথা অপব্যাখ্যাকারী রয়েছে তারা জটিল সংশয়ের মাঝে হাবুডুবু খাচ্ছে। (২৫০) কেননা;
* যে ব্যক্তি (জান্নাতে আল্লাহকে) দেখা যাবার বিষয়টি অস্বীকার করে (২৫১), সে মনে করে যে, আক্কল (বুদ্ধি-বিবেকের যুক্তি) সেটাকে অসম্ভব মনে করে, আর সে মনে করে যে এটাতে তা'ওয়ীল করা ছাড়া উপায় নেই।
* আর যে এটা অসম্ভব মনে করে যে, আল্লাহর জ্ঞান ও ক্ষমতা আছে, অনুরূপ অসম্ভব মনে করে যে, আল্লাহর এমন কালাম বা বাণী রয়েছে যা সৃষ্টি নয় ইত্যাদি (২৫২), সে বলে, নিশ্চয় তার আক্কল বা বিবেকের যুক্তি এগুলো অসম্ভব মনে করে। তাই সে এগুলার তা'ওয়ীল বা অপব্যাখ্যা করতে বাধ্য।
* বরং যে এটা অস্বীকার করে যে, বাস্তবে দেহের হাশর (পুনরুত্থান) আছে এবং জান্নাতে প্রকৃত অর্থে খাওয়া-দাওয়া আছে (২৫৩), সে মনে করে যে, আক্কল বা বিবেকের যুক্তি এটা অসম্ভব ভাবে, তাই সে তা'ওয়ীল করতে বাধ্য।
* তেমনি যে ব্যক্তি মনে করে যে, আল্লাহ 'আরশের উপরে নেই (২৫৪), সে মনে করে যে, আক্কল বা বিবেকের যুক্তি এটাকে অসম্ভব মনে করে এবং তাই সে [এটার] তা'ওয়ীল করতে বাধ্য। (২৫৫)
টিকাঃ
২৫০. কোনো নিয়মনীতিতে তারা নিজেদেরকে সুস্থির রাখতে পারছে না। তাদের একেকজনের তা'ওয়ীলের কারণ একেক রকম। একজনের কাছে যা বিবেকের যুক্তিতে ধরে, অপরজনের কাছে তালের কাছে? নাকি আবু মু'আয আত-তুমনীর আক্কলের কাছে? নাকি মা'মার ইবন 'আব্বাদ এর আক্কলের কাছে? নাকি হিশাম আল-ফুত্বী এর আক্কলের কাছে? নাকি 'আব্বাদ ইবন সুলাইমান এর আক্কলের কাছে? নাকি পরবর্তীতে যারা এসেছে তাদের আক্কলের ব্যাপারে তোমাদের সন্তুষ্টি রয়েছে? যারা কয়েক আক্কলকে পরিমার্জন করে সেগুলোর খিচুড়ি তৈরি করেছে, যারা নিজেদের জন্য আলাদা মতবাদ দাঁড় করিয়েছে, পূর্ববর্তীদের মতবাদে সন্তুষ্ট হতে পারেনি? এই যে, তোমাদের নিকট শ্রেষ্ঠ! ব্যক্তি, মুহাম্মাদ ইবন 'উমার আর-রাযী, তার কোন আক্কল দিয়ে তুমি ওহীর ভাষ্যের বিশুদ্ধতা পরিমাপ করবে? তোমরা ভালো করে দেখতে পাচ্ছ যে, তার গ্রন্থসমূহে সে সর্বদা অস্থির থাকে, এতই অস্থির যে, সে কোনো মতের ওপরই সুস্থির থাকে না। সুতরাং তোমরা তার বিবিধ আক্কলের মধ্য হতে একটি আক্কল তোমরা আমাকে নির্ধারণ করে দাও যার ওপর সে স্থির ছিল, তারপর সেটাকে আমার জন্য মানদণ্ড করে দাও। নাকি তোমরা শির্ক, কুফর ও ইলহাদ এর সহযোগী নাসিরুদ্দীন আত-তৃসীর আক্কলের কাছে আমাকে যেতে বল? কারণ তার আলাদা আক্কল রয়েছে যে আক্কলের মাধ্যমে সে তার পূর্ববর্তী মুলহিদদের আক্কলের বিরোধিতা করেছে তবে সে আক্কলের মাধ্যমে সে রাসূলের অনুসারীদের আক্কলের কাছে পৌঁছতে পারেনি। নাকি তোমরা সন্তুষ্ট হও আমি যেন কারামেত্বা, বাতেনিয়া ও ইসমাঈলিয়্যাদের আক্কলের কাছে যাব? নাকি যাব সর্বেশ্বরবাদের প্রবক্তা ইত্তেহাদিয়্যাদের আক বিবেকের যুক্তিতে ধরে না, যা প্রমাণ করে যে মানুষের বিবেকের যুক্তি কখনও সমান হয় না, সেখানে কমন কোনো বিষয়ও নেই।
২৫১. যেমনটি জাহমিয়্যাহ ও মু'তাযিলারা মনে করে থাকে, অনুরূপ তাদের অনুসারী খারেজী ও রাফেদ্বী মতবাদের লোকেরা।
২৫২. যেমনটি জাহমিয়্যাহ ও মু'তাযিলারা মনে করে থাকে।
২৫৩. যেমনটি তথাকথিত দার্শনিক মতবাদে বিশ্বাসীরা ও তাদের অনুসারী কট্টর বাতেনী ফির্কার লোকেরা মনে করে থাকে।
২৫৪. যেমনটি মনে করে থাকে, জাহমিয়্যাহ, মু'তাযিলা, আশায়েরা, মাতুরিদিয়্যাহ প্রভৃতি ভ্রান্ত ও বিদ'আতী দলসমূহ।
২৫৫. তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, কোন জিনিস বিবেকের যুক্তি ধরে না সে ব্যাপারে তাদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। অথচ তারা্কলের কাছে? এসব এবং তাদের মত অসংখ্য দাবিদার যারা বলে চলেছে; তাদের আক্কলই সবচেয়ে স্পষ্ট, তাদের বিরোধীরা স্পষ্ট আকলের বিরোধিতা করছে (তাদের কাছে যাব?) এ হচ্ছে তাদের আক্কল, এ আক্কল সমষ্টি তাদের কিতাবে লিখিত, তাদের লোকদের থেকে বর্ণিত। যদি এ তালিকা লম্বা হওয়ার আশঙ্কা না থাকতো তবে আমরা একটি একটি করে তাদের আক্কলের প্রকৃত অবস্থা তোমাদের কানে ঢেলে দিতাম, অবশ্য যারা বিভিন্ন ফির্কার ইতিহাস লিখেছে, তারা তা পেশ করেছে। যদি তোমরা চাও তবে সেগুলো জমা করতে পার অথবা সেখান থেকে একটি আক্কল এনে তাকে ওহী ও যা রাসুলগণ নিয়ে এসেছেন সেগুলোর জন্য মানদণ্ড করে নাও।
যদি এটি করতে অসমর্থ হও তবে তাদের সবাই বিবেকের যুক্তি নিয়েই চলার দাবি করে। তথাকথিত দার্শনিকরা শারীরিক পুনরুত্থানকে অস্বীকার করে এ দাবিতে যে, তা যুক্তিতে ধরে না, অথচ মু'তাযিলা, আশায়েরা ও মাতুরিদীরা সেটাকে যুক্তিতে ধরে বলে থাকেন। অনুরূপভাবে মু'তাযিলারা, যারা আল্লাহর ইলম, কুদরত, সৃষ্ট নয় এমন বাণী অস্বীকার করে, তাদের যুক্তি হলো যে, তা যুক্তিতে ধরে না, অথচ আশায়েরা ও মাতুরিদীদের নিকট তা যুক্তিতে ধরে। আবার মু'তাযিলারা, যারা আখেরাতে আল্লাহকে দেখা যাবে না বলে তাদের যুক্তি হলো, যুক্তিতে তা গ্রহণযোগ্য মনে হয় না, অথচ আশায়েরা ও মাতুরিদীরা সেটাকে যুক্তিগ্রাহ্য মনে করে থাকেন। অপরদিকে আহলুল হক্করা, সালাফীরা, চার ইমাম ও তাদের অনুসারী সহীহ আকীদাহ'র অনুসারীরা বিশ্বাস করে থাকেন আল্লাহ 'আরশের উপর উঠেছেন, অথচ অন্যান্য সকল ফির্কা বলে থাকেন যে, আল্লাহ কর্তৃক তাঁর 'আরশের উপর উঠা যুক্তিতে ধরে না, তাই তা'ওয়ীল করতে হবে। তাই কোনটি বিবেকের যুক্তি সমর্থন করে আর কোনটি সমর্থন করে না তাতে এত মতভেদ থাকার অর্থই হচ্ছে, বিবেকের যুক্তি কোনটি ধরবে আর কোনটি ধরবে না তা একজন থেকে অন্যজনের ব্যাপারে আলাদা থাকতে বাধ্য। আনাসের যা বিবেকে ধরে, আনাসের বাপের তা বিবেকে নাও ধরতে পারে, তাই বলে যা আনাসের বাপের বিবেকে ধরে না, তা নিষিদ্ধ বলার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। সুতরাং যুক্তির প্রতি না ঝুঁকে কুরআন ও হাদীসের ভাষ্যে যা এসেছে তা মেনে নেয়াই হচ্ছে বুদ্ধিমানের কাজ। অন্যথা সর্বদা পথভ্রষ্টতা তাকে ঘিরে থাকবে।