📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 আল্লাহর সিফাত এর ব্যাপারে হকপন্থীদের সংক্ষিপ্ত নীতি

📄 আল্লাহর সিফাত এর ব্যাপারে হকপন্থীদের সংক্ষিপ্ত নীতি


অতঃপর এ ব্যাপারে সামগ্রিক ও সার্বজনীন কথা হচ্ছে: আল্লাহকে সে গুণে গুণান্বিত করা যে গুণে তিনি নিজেকে গুণান্বিত করেছেন, তাঁর রাসূল যে গুণে গুণান্বিত করেছেন আর প্রথম যুগের অগ্রবর্তীগণ যে গুণে গুণান্বিত করেছেন (২২২), (এগুলো সাব্যস্ত করতে গিয়ে) কুরআন-হাদীসকে অতিক্রম করা যাবে না। (২২৩)
ইমাম আহমদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন: لا يوصف الله إلا بما وصف به نفسه، أو بما وصفه به رسوله صلى الله عليه وسلم لا يتجاوز القرآن والحديث .
"আল্লাহকে কেবল সেসব গুণে গুণান্বিত করা হবে, যাতে তিনি নিজেকে গুণান্বিত করেছেন, অথবা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে গুণান্বিত করেছেন, এ ব্যাপারে কুরআন ও হাদীস অতিক্রম করা যাবে না।” (২২৪)
সালাফে সালেহীনের নীতি (২২৫) হচ্ছে, তারা আল্লাহকে এমনসব গুণে গুণান্বিত করতেন যা দিয়ে তিনি নিজেকে গুণান্বিত করেছেন। অনুরূপ তাঁর রাসূল তাঁকে যা দিয়ে গুণান্বিত করেছেন, কোনো প্রকার বিকৃতি কিংবা নিষ্ক্রিয়করণ ব্যতীতই, তদ্রূপ কোনো প্রকার ধরণ নির্ধারণ কিংবা উদাহরণ সাব্যস্ত ব্যতীতই। (২২৬) আর আমরা জানি যে আল্লাহ যে গুণে নিজেকে গুণান্বিত করেছেন তা সত্য, তাতে নেই কোনো কুঞ্ঝটিকা বা প্রহেলিকা বা প্রহসন। বরং বক্তার কথা দ্বারা যেভাবে তার উদ্দেশ্য বুঝা যায় সেগুলোর অর্থও সেভাবে বুঝা যায়। বিশেষ করে বক্তা যখন স্বীয় বক্তব্যের ব্যাপারে সর্বাপেক্ষা অবগত এবং স্বীয় জ্ঞানের বর্ণনাদানের ক্ষেত্রে বেশি বাগ্মী আর ব্যক্ত করা, পরিচয়দান ও পথপ্রদর্শনের ব্যাপারে সর্বাপেক্ষা বেশি কল্যাণকামি।
তদুপরি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা, কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নেই, না তাঁর নাম ও গুণসহ পবিত্রসত্তায়, না তার কার্যাবলিতে। (২২৭) কাজেই যেমন আমরা এই ইয়াকীন রাখি যে, নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলার প্রকৃত জাতিসত্তা রয়েছে, আবার তাঁর প্রকৃত কর্ম (ফে'ল) রয়েছে, তেমনি তাঁর প্রকৃত সিফাত (গুণাবলি)ও রয়েছে। আর তাঁর মতো কিছুই নেই, তাঁর সত্তায়ও না, গুণেও না, কর্মেও না।
সুতরাং প্রত্যেক ঐ জিনিস যা ত্রুটি (নুকছানী) বা নতুন (হুদুস ২২৮) হওয়া আবশ্যক করে তা থেকে প্রকৃতপক্ষেই আল্লাহ মুক্ত ও পবিত্র; কেননা আল্লাহ হচ্ছেন সর্বোচ্চ পরিপূর্ণতার অধিকারী। আর তাঁর জন্য হুদুস তথা নতুন সৃষ্টি হওয়া নিষিদ্ধ। কারণ, তাঁর জন্য 'আদাম বা না থাকা অসম্ভব। আর হুদূস (নতুন সৃষ্টি) তার পূর্বে 'আদাম (না থাকা) আবশ্যক করে। আবার মুহদাস (নতুন সৃষ্টি) মুহদিস (সৃষ্টিকারী) এর প্রতি মুখাপেক্ষী, তেমনি আল্লাহ তা'আলা তো নিজেই (ওয়াজিবুল ওজুদ (২২৯) তথা) আবশ্যিক অস্তিত্বের অধিকারী। (২৩০)

সালাফগণের নীতি সাদৃশ্যস্থাপন ও নিষ্ক্রিয়করণের মাঝামাঝি অবস্থানে
সালাফে সালেহীনের অনুসৃত পন্থা হচ্ছে তা'ত্নীল (নিষ্ক্রিয়করণ) ও তামসীল (সাদৃশ্যস্থাপন) এর মাঝামাঝি। সুতরাং তারা আল্লাহর কোনো গুণকে মাখলুকের গুণের মতো বলে না, যেমন আল্লাহর সত্তাকে কোনো মাখলুকের সত্তার মতো বলে না। তিনি নিজে তাঁর যে গুণ বর্ণনা করেছেন বা তাঁর রাসূল তাঁর যে গুণ বর্ণনা করেছেন সেগুলো তারা নাকচ করে না। তাই তারা তাঁর সুন্দর নামসমূহ এবং উন্নত গুণাবলিকে নিষ্ক্রিয় বলে না, কথাকে তার স্থান থেকে সরিয়ে দেয় না, আল্লাহর নামসমূহ ও আয়াতসমূহে ইলহাদ (২৩১) (বিকৃতি) করে না।

এটার বর্ণনা যে, তা'ত্বীল (নিষ্ক্রিয়করণ) তামসীল (তুলনা প্রদান)কে আবশ্যক করে, অনুরূপ তামসীল প্রদান করা তা'জ্বীল করাকে আবশ্যক করে
তা'তীলকারী ও তামসীলকারী সম্প্রদায়দ্বয়ের প্রত্যেকেই তা'ত্বীল ও তামসীল সাব্যস্তকারী। তা'ত্বীল বা (আল্লাহর নাম ও গুণকে) নিষ্ক্রিয়কারীগণ আল্লাহর নামের ও গুণের সেই অর্থই বুঝে যা মাখলুকের জন্য উপযোগী, এ কারণে তারা সে মাফহুম (বুঝ) কে নাকচ করে যেতে থাকে। ফলে তারা তা'ত্বীল ও তামসীল উভয়টিকেই একত্রিত করে। আগে তামসীল করে, পরে তা'ত্বীল করে। এর মাধ্যমে তারা আল্লাহর সিফাত ও নাম দ্বারা যা বুঝা যায় তাকে তাঁর সৃষ্টির নাম ও সিফাতের বুঝের সাথে তুলনা করে ও সাদৃশ্য প্রদান করে। আবার এর মাধ্যমে তারা আল্লাহর জন্য উপযোগী নাম ও গুণকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। (২৩২)
কেননা যখন কেউ বলে, "যদি আল্লাহ 'আরশের উপরে হন তাহলে তিনি হয়তো 'আরশের থেকে বড় হবেন অথবা ছোট অথবা সমান হবেন। আর এগুলো সবই অসম্ভব (২৩৩);" অনুরূপ কোনো বাক্য। (এটা কীভাবে তা'ত্বীল ও তামসীলকে একত্রিত করে? তার বর্ণনা হচ্ছে,) সে লোকটি মূলত মহান আল্লাহর 'আরশের উপরে উঠাকে তেমনি বুঝেছে যেমন কোনো জিসম (দেহ)-র উপরে অন্য কোনো জিসম উঠে থাকে। বস্তুত তার (দেহের উপর দেহ থাকার) এ বুঝটির আবশ্যকতা পূর্বের বুঝ (কোনো কিছু অপর কোনো কিছুর উপরে থাকলে সেটা বড় বা ছোট বা সমান হতে হবে) অনুসারেই হয়েছে (যা সৃষ্টির ওপর সৃষ্টির থাকার সাথে যথাযথ)। কিন্তু (স্রষ্টা কোনো কিছুর উপরে থাকার বিষয়টি এমন নয়, তাই) যদি বলা হতো, মহান আল্লাহ 'আরশের উপর উঠেছেন এমন প্রকার উপরে উঠা যা তাঁর মহত্বের সাথে উপযোগী এবং তাঁর জন্য বিশেষিতা (২৩৪), তাহলে ('আরশে উঠার) সাথে এমন কোনো বাতিল আবশ্যকতা ('আরশের চেয়ে বড় কিংবা ছোট কিংবা সমান হওয়ার) বিষয়টি অবশ্যম্ভাবী করে না; যা নাকচ করা ওয়াজিব হবে (কেননা তা তো সৃষ্টির জন্য আবশ্যক, স্রষ্টার জন্য নয়)। (২৩৫)
এটা তখন সাদৃশ্য স্থাপনকারীর ঐ কথার মতো হয়ে যায়, যে বলে থাকে, যদি সৃষ্টিকুলের কোনো স্রষ্টা থাকবেন তবে সে হয়তো জাওহার (২৩৬) (মৌলবস্তু) হবে, নতুবা আরদ্ব (২৩৭) (গুণবাচক) হবে। (২৩৮) [অথচ জাওহার বা 'আরদ্ব' কোনোটি হওয়া আল্লাহর জন্য অসম্ভব। (২৩৯)] যেহেতু সকল অস্তিত্বই এ দুটির মধ্যে সীমাবদ্ধ। (২৪০) অনুরূপ মুমাসসিল বা সাদৃশ্যস্থাপনকারীর কথা (২৪১): যখন তিনি [আল্লাহ] 'আরশের উপর উঠবেন তখন এটি মানুষের খাট বা নৌকার উপর উঠার মতোই ধরে নিতে হবে। যেহেতু 'ইসতিওয়া' (উপরে উঠা) এভাবে ছাড়া জানা যায় না।
এভাবে স্পষ্ট হলো যে, এ দুটি চিন্তাতেই রয়েছে তামসীল বা সাদৃশ্য স্থাপন, আর এ দু'টি চিন্তাতেই রয়েছে আল্লাহর সিফাতের স্বরূপকে নিষ্ক্রিয়করণ। প্রথমটির (২৪২) সমস্যা হচ্ছে সে প্রকৃত 'ইসতিওয়া'র সকল নামকে নিষ্ক্রিয় করেছে। আর দ্বিতীয়টির (২৪৩) সমস্যা হচ্ছে সে এমন এক 'ইস্তেওয়া' সাব্যস্ত করেছে যা কেবল মাখলুকের জন্য নির্দিষ্ট। (২৪৪)

মহান আল্লাহর জন্য 'উর্ধ্বে থাকা' ও 'উপরে উঠা' এ গুণদ্বয় সাব্যস্তকরণ
আর মীমাংসাপূর্ণ কথা হচ্ছে, যার ওপর মধ্যমপন্থী উম্মত রয়েছে যে, নিশ্চয় আল্লাহ আরশের উপরে উঠেছেন (২৪৫), তাঁর শানের সাথে উপযোগী এবং তাঁর জন্যই খাসভাবে। কাজেই যেমন তিনি 'আলীম' সকল বিষয়ে অবগত, তিনি 'ক্বাদীর' সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান, তিনি ('সামী')' সর্বদ্রষ্টা, ('বাসীর') সর্বশ্রোতা ইত্যাদি। আর আল্লাহর ইলম (জ্ঞান) ও কুদরত (ক্ষমতা) (২৪৬) এর ক্ষেত্রে এমন কোনো 'আরদ্ব' (২৪৭) এর বৈশিষ্ট্য সাব্যস্ত করা জায়েয নেই যা কোনো সৃষ্টির ইলম ও কুদরতের জন্য প্রযোজ্য; তেমনিভাবে মহান আল্লাহ 'আরশের উপরে (২৪৮), তাঁর জন্য মাখলুকের ফাউক্বিয়্যাত তথা মাখলুকের ওপর মাখলুক হওয়ার বৈশিষ্ট্য ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট আবশ্যিক বিষয়সমূহ সাব্যস্ত করা জায়েয নেই।

সালাফে সালেহীনের মাযহাব বিবেকের যুক্তি ও কুরআন-সুন্নাহ'র ভাষ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ
আর জেনে রাখ যে, স্পষ্ট আক্কল (বিবেকের স্পষ্ট যুক্তি) এবং বিশুদ্ধ নকল (কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদীসে) আসা দলীলে এমন কিছু নেই যা সালাফি তরীকার ভিন্ন হওয়া আবশ্যক করে। তবে হক্কের ওপর (২৪৯) আপতিত সংশয় নিরসন করার আলোচনা এ সংক্ষিপ্ত পরিসরে সংকুলান হবে না। কাজেই যে অন্তরে সংশয় রয়েছে, আর সে তা নিরসনের ইচ্ছা করে তাহলে সেটা সহজ ও সরল।

টিকাঃ
২২২. অর্থাৎ সাহাবায়ে কিরাম।
২২৩. কুরআন ও হাদীসে যা নেই তা সাব্যস্ত করা যাবে না। কারণ, আকীদাহ হচ্ছে তাওকীফী, তথা কুরআন ও সুন্নাহ'র দেয়া তথ্যনির্ভর। মুসলিম এ ব্যাপারে নস বা ভাষ্যের সাথেই চলবে, সেখানে বিবেকের যুক্তি বা ইজতিহাদ দিয়ে চলার সুযোগ নেই। যারাই যুক্তির পিছনে চলেছে তারাই এ ময়দানে পথভ্রষ্টতায় নিপতিত হয়েছে।
২২৪. ইবন কুদামাহ আল-মাক্বদেসী তা বর্ণনা করেছেন, লুম'আতুল ই'তিক্বাদ, পৃ. ৯; অনুরূপ তাহরীমুন নাযর ফী কুতুবিল কালাম, পৃ. ৩৮-৩৯। অনুরূপ তা রয়েছে ইবন বাত্তাহ এর আল-ইবানাহ (৩/৩২৬); মাজমূ' ফাতাওয়া (১৬/৪৭২) গ্রন্থদ্বয়েও।
২২৫. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ তার অধিকাংশ গ্রন্থে প্রায়শই এ বাক্য ব্যবহার করে থাকেন। যেমন, আল-আকীদাতুল ওয়াসেত্বিয়‍্যাহ, পৃ. ১১; আর-রিসালাতুত তাদমুরিয়‍্যাহ, পৃ. ৭; মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/২৫৭, ২৬৩), (৬/৩৮, ৫১৫, ৫১৮), (১১/২৫০, ৪৭৯), (১২/৭৩, ৫৭৫), (১৩/১৬০, ৩০৫)। অনুরূপ বয়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/১০৫-১০৬); আস-সাফাদিয়্যাহ (১/১০৩), (২/৩১৪)।
২২৬. চারটি শব্দ আরবীতে এসেছে। চারটি অনুবাদ চারটি আলাদা শব্দে করা হয়েছে। শব্দ চারটি হচ্ছে, ১- তাহরীফ= বিকৃতি। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ তাহরীফ ব্যবহার করেছেন তা'ওয়ীল বলেননি। কারণ কালামশাস্ত্রবিদরা যা করেছে তা তা'ওয়ীল বা ব্যাখ্যা নয় বরং তা তাহরীফ বা বিকৃতি। আর তাহরীফ শব্দটি কুরআনে যত নিন্দিত হিসেবে এসেছে। তা'ওয়ীল শব্দটি তত নয়। আর যেহেতু কুরআন ও সুন্নাহকে আমরা মানদণ্ড ধরবো, তাই তার বিপরীত বস্তুকে তাহরীফ বলা ব্যতীত গত্যন্তর নেই। [ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/১৬৫, ১৯৫)] ২- তা'ত্বীল= নিষ্ক্রিয়করণ। খালি করা বা মুক্ত করা। উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহকে তার সিফাত মুক্ত করা, আর সেগুলোকে আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত হওয়াকে অস্বীকার করা। কুরআনে এটাকে ইলহাদ হিসেবে বলা হয়েছে। ৩- তাকয়ীফ= ধরণ নির্ধারণ করা। শব্দটি সালাফে সালেহীনের মুখ নিঃসৃত। ইমাম রাবী'আহ, মালেক সুফইয়ান ইবন উয়াইনাহ সবাই এ তাকয়ীফকে অস্বীকার করেছেন। ৪- তামসীল= সাদৃশ্য স্থাপন বা উদাহরণ প্রদান উভয়টিই নিষিদ্ধ, যা কুরআনের ভাষ্য থেকে সরাসরি নিষেধ এসেছে। আল্লাহ বলেন, "কোনো কিছুই তার সদৃশ নয়, তিনি সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা।” [সূরা আশ-শূরা: ১১]
২২৭. অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার সাথে সদৃশ সাব্যস্ত করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ সত্তা, নাম, গুণ ও কর্ম, এ চারটির কোনোটিতেই তাঁর সাথে কাউকে সদৃশ বলার সুযোগ নেই।
২২৮. হুদুস বলতে দু'টি বিষয় বুঝায়: ১- যার অস্তিত্বের জন্য কার্যকারণ লাগে।
২- যার অস্তিত্বের জন্য প্রথম এমন কিছুর প্রয়োজন হয়, যা ইতোপূর্বে নাই ছিল। দেখুন, আল-মুবীন ফী শারহি মা'আনী আলফাযিল হুকামায়ি ওয়াল মুতাকাল্লিমীন, পৃ. ১১৯। উভয় অর্থেই আল্লাহ তা'আলার জন্য তা প্রযোজ্য হবে না। তবে এর দ্বারা আল্লাহর কর্মগত গুণ, অর্থাৎ আল্লাহ কর্তৃক যখন ইচ্ছা তখন কিছু করাকে অস্বীকার করা যাবে না। কারণ এসব গুণের ক্ষমতা তার পূর্বাহ্নেই ছিল, তিনি যখন ইচ্ছা তা করবেন, তার প্রকাশ ঘটাবেন। সেখানে আল্লাহর কর্মগত গুণগুলোকে হুদুস নাম দিয়ে তা অস্বীকার করা যাবে না।
২২৯. ওয়াজিবুল ওজুদ হচ্ছে, তিনি স্বয়ং অপর সবকিছু থেকে অমুখাপেক্ষী, কাদীম, সর্বপ্রাচীন (আযালী), যার নতুন হওয়া কিংবা নাই হওয়া অসম্ভব। দেখুন, ইবন তাইম্যিাহ, আত-তাদমুরিয়‍্যাহ, পৃ. ১৬-১৭; থানওয়ী, কাশশাফু ইসত্বিলাহাতিল ফুনূন (২/১৩৩১, ১৩৩৪)।
২৩০. অর্থাৎ তিনটি কারণে মহান আল্লাহ হুদুস বা কার্যকারণের প্রয়াজনীয়তা থেকে মুক্ত; এক. কারণ, 'হুদুস' হতে হলে তার আগে 'নাই' হওয়ার আবশ্যকতা থাকবে, আর আল্লাহর জন্য 'নাই' সময় বা অবস্থান কল্পনা করাও নিষিদ্ধ। দুই. কারণ, 'হুদুস' বলে তার জন্য 'মুহদিস' অস্তিত্বে আনয়নকারীর প্রয়োজন হয়, যা আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা নিষিদ্ধ। তিনি. কারণ, তিনি স্বয়ং ওয়াজিবুল ওজুদ বা তাঁর জন্য আবশ্যিক অস্তিত্ব থাকা জরুরী বা যার অস্তিত্ব আবশ্যক। হুদুস তার সাথে সাংঘর্ষিক।
২৩১. 'ইলহাদ' শব্দের মূল অর্থ, একদিকে ঝুঁকে যাওয়া, যুলুম করা ও বক্রপথ অবলম্বন করা। এজন্যই যেসব কবর সোজা খনন করার পর নিচে গিয়ে কিবলার দিকে ঝুঁকে দেয়া হয় সেগুলোকে লাহদ কবর বলা হয়। [দেখুন, ইবন মানযূর, লিসানুল আরব (৩/৩৮৯)] এখানে আল্লাহর নাম ও আয়াতসমূহে ইলহাদ বলতে বুঝানো হয়েছে, সেগুলোর যেমন আছে তেমন না রেখে অন্য দিকে ফিরিয়ে দেয়া ও মিথ্যারোপ করা। আল্লাহ বলেন, "আর আল্লাহর রয়েছে সুন্দর সুন্দর নামসমূহ, সুতরাং তোমরা সে নামসমূহ দিয়ে তাঁকে আহ্বান কর, আর যারা তাঁর নামসমূহে বক্রপথ অবলম্বন করে, তারা যে কাজ করে তার শাস্তি তাদেরকে প্রদান করা হবে।" [সূরা আল- আ'রাফ: ১৮০] [দেখুন, তাফসীর আত-ত্বাবারী (৯/১৩৩-১৩৪); তাফসীর ইবন কাসীর (৩/৫১৭)]
আর আল্লাহর নামের ক্ষেত্রে ইলহাদ কয়েক প্রকার: প্রথমত: আল্লাহর নামসমূহের কোনো কিছু অস্বীকার করা অথবা নামসমূহ যেসব সিফাত (গুণ) ও হুকুম-আহকাম শামিল করে আছে তার মধ্যে কোনো বিষয় অস্বীকার করা। যেমনটি করেছে জাহমিয়‍্যাহ সম্প্রদায় ও অন্যান্য আহলে তা'ত্বীল তথা আল্লাহর গুণসমূহ অকার্যকর বলে ধারণাকারী সম্প্রদায়। এটা এ জন্য ইলহাদ (অস্বীকার) যে, আল্লাহর নামসমূহ ও তা যেসব হুকুম-আহকাম এবং আল্লাহর জন্য উপযুক্ত গুণসমূহকে শামিল করছে তার প্রতি ঈমান আনা ওয়াজিব। অতএব, এসবের মধ্যে কোনো কিছু অস্বীকার করার অর্থ, যা ওয়াজিব তা থেকে বিচ্যুত হয়ে অন্য দিকে ঝুঁকে যাওয়া। দ্বিতীয়ত: আল্লাহর নামসমূহ এমন গুণ-নির্দেশক করে দেয়া যা সৃষ্টিজীবের গুণ সদৃশ। যেমনটি করেছে আহলে তাশবীহ তথা আল্লাহর গুণসমূহকে সৃষ্টিজীবের গুণসদৃশকারী সম্প্রদায়। এটা এ কারণে যে, অর্থগতভাবে তাশবীহ (সাদৃশ্যকরণ) একটি বাতিল বিষয়। কুরআন- সুন্নাহ'র কোনো ভাষ্য এ বিষয়টিকে নির্দেশ করতে পারে না, বরং কুরআন-সুন্নাহ'র ভাষ্যসমূহ এ বিষয়টিকে বাতিল হওয়ার ওপর প্রমাণবহ অতএব আল্লাহর গুণসমূহকে সৃষ্টিকুলের গুণের সাথে তাশবীহ তথা সাদৃশ্যবোধক করে দেয়ার অর্থ আল্লাহর নামের ব্যাপারে যা ওয়াজিব ও যথার্থ তা থেকে বিচ্যুতি। তৃতীয়ত: আল্লাহ তা'আলার ওপর এমন নাম প্রয়োগ করা যা আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং নিজের ওপর প্রয়োগ করেননি। যেমন খ্রিস্টান সম্প্রদায় আল্লাহর ওপর (পিতা) নাম প্রয়োগ করেছে। আর দার্শনিকরা তাঁর ওপর প্রয়োগ করেছে (কার্যকরী কারণ) নাম। এটা এ জন্য বিচ্যুতি যে, আল্লাহর নামসমূহ ওহীনির্ভর। অতএব আল্লাহ তা'আলার ওপর এমন নাম প্রয়োগ করা যা তিনি নিজের ওপর প্রয়োগ করেননি, নামের ব্যাপারে যা ওয়াজিব ও যথার্থ তা থেকে বিচ্যুতি। তা ছাড়া এ প্রয়োগকৃত নামগুলো স্বয়ং বাতুলতাপূর্ণ, যা থেকে আল্লাহ তা'আলা পবিত্র।
চতুর্থত: আল্লাহর নামসমূহ থেকে উৎকলিত করে কোনো উপাস্য বস্তুর নাম রাখা। যেমন-এক বর্ণনা মতে- মুশরিকরা আল্লাহ তা'আলার 'আল আযীয' নাম থেকে উৎকলিত করে তাদের মূর্তি আল উয্যার নাম রেখেছে। আল্লাহ তা'আলার 'ইলাহ' নাম থেকে উৎকলিত করে তাদের মূর্তি 'লাত' এর নাম রেখেছে। অতএব, তারা আল্লাহ তা'আলার নামসমূহ থেকে উৎকলিত করে তাদের উপাস্যসমূহের নাম রেখেছে। এটা এ কারণে ইলহাদ যে, আল্লাহর নামসমূহ কেবল তাঁর জন্যই সুনির্দিষ্ট।
অতএব, যেভাবে ইবাদত ও সত্য উলুহিয়াত আল্লাহর জন্য সুনির্দিষ্ট এবং আকাশ ও পৃথিবীতে তাঁরই মহিমা বর্ণিত, অনুরূপভাবে সুন্দরতম নামসমূহ তাঁর জন্যই সুনির্ধারিত। সুতরাং এ নামগুলো যেভাবে আল্লাহর জন্য সুনির্দিষ্ট করা হয় সেভাবে এগুলোর দ্বারা অন্য কারও নাম রাখা, নাম বিষয়ে যা ওয়াজিব ও উচিত তা থেকে বিচ্যুতি।
আল্লাহর নামসমূহের সব ধরনের বিকৃতিই হারাম; কেননা আল্লাহ তা'আলা বিকৃতিসাধনকারীদের হুঁশিয়ার করে বলেছেন: "আর তাদেরকে বর্জন কর যারা তাঁর নামে বিকৃতি ঘটায়। তারা যা করত অচিরেই তাদেরকে তার প্রতিফল দেয়া হবে।” [সূরা আল আ'রাফ: ১৮০] এ বিকৃতিকরণের মধ্যে শরী'আতের দলিলের নিরিখে কোনোটি শির্কী আবার কোনোটি কুফরী।
২৩২. বিস্তারিত দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/২০৯)।
২৩৩. এসব সন্দেহ আশ'আরী ও মাতুরিদী মতবাদের লোকেরা পেশ করে থাকে। যার দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য আল্লাহ সর্বোচ্চ সত্তা ও 'আরশের উপর উঠার গুণ অস্বীকার করা। দেখুন, তাদের গ্রন্থে এসব সন্দেহ, নাইসাপুরী, আল-গুনইয়া ফী উসুলিদ্দীন, পৃ. ৭৪; গাযালী, কাওয়া'য়িদুল ই'তিক্কাদ, পৃ. ১৬৮।
২৩৪. যেমনটি নবী-রাসূল, সাহাবায়ে কিরাম, সালাফে সালেহীন ও ইমামগণ সাব্যস্ত করেছেন।
২৩৫. এ আলোচনার মাধ্যমে যেকোনো মু'আত্ত্বিল যে তা'ত্বীল ও তামসীল উভয়টিই করেছে তা প্রমাণিত হলো। কারণ সে তাত্বীল করার আগে তামসীল করে নেয়।
২৩৬. জাওহার হচ্ছে এমন মৌলবস্তু, যা জায়গা জুড়ে আছে। তবে তা দু'ভাগে বিভক্ত: ক. বাসীত্ব বা সূক্ষ্ম যা তখনকার দার্শনিকদের পরিভাষায় 'আল-জাওহারুল ফারদ' বা অনু-পরমানু বুঝায়। তা এমন এক সত্তা যাতে আর ভাগ চলে না, বাস্তব কর্মের মাধ্যমেও নয়, ক্ষমতার দিক থেকেও নয়। খ. মুরাক্কাব বা যৌগিক; আর তা হচ্ছে জিসিম বা দেহ। যা দুই বা ততোধিক 'আল-জাওহার আল ফারদ' তথা অণু-পরামাণু দ্বারা ঘটিত। তাতে বাড়তি কিছু নেই।
২৩৭. 'আরদ্ব হচ্ছে এমন বস্তু যা অবশিষ্ট থাকা সম্ভব নয়, অন্যের ওপর নির্ভর করে, অন্যের উপরে অবস্থান করে টিকে থাকে, যা জাওহার ও জিসিম এর মধ্যে কেবল প্রকাশ পায়। অপর কোনো জাওহার ও জিসিমে পরিণত হলে তা বাতিল হয়ে যায়। আল্লাহর গুণাবলিকে কি 'আরদ্ব বলা যাবে? বস্তুত আল্লাহর গুণাবলিকে আরদ্ব বলা এটি কালামশাস্ত্রবিদদের আবিষ্কার। এটাকে সরাসরি হা বা না বলা যাবে না। উদ্দেশ্য জিজ্ঞাসা করতে হবে, তারপর যদি তা ভুল অর্থে পরিচালিত হয়, যেমন আরদ্ব বলতে বুঝায় যা নিঃশেষ হয়ে যায় তবে সে অর্থে আল্লাহর সিফাতকে 'আরদ্ব বলা শব্দ ও অর্থ উভয় দিক থেকেই অস্বীকার করা হবে। আর যদি বিশুদ্ধ অর্থ করা হয় আর তা আল্লাহর গুণের সাথে উপযোগী বিবেচিত হয় তবে সেটার অর্থকে অস্বীকার করা হবে না। কিন্তু শব্দ স্বীকার করা হবে। [বিস্তারিত দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ' ফাতাওয়া (৬/৯০-৯১, ১০৩-১০৪)] ইমাম হাফেয কিওয়ামুস সুন্নাহ আবুল কাসেম আল-আসবাহানী বলেন, 'সালাফগণ জাওহার ও আরদ্ব নিয়ে কথা বলতে অস্বীকার করেছেন। তারা বলেছেন, সাহাবায়ে কিরাম ও তাবে'য়ীনে 'ইযাম এর যুগে এসব ছিল না। তাই হতে পারে তারা এগুলো জানা সত্ত্বেও চুপ ছিলেন, তাহলে আমাদের জন্যও এ ব্যাপারে চুপ থাকার সুযোগ সৃষ্টি হয়ে যায় যেমনটি তারা চুপ ছিলেন, নতুবা তারা এসব না জেনে চুপ ছিলেন, তাহলে তারা যা জানেননি, দীনের ব্যাপারে সেগুলো আমাদের না জানলেও চলবে। [আল-হুজ্জাতু ফী বায়ানিল মাহাজ্জাহ (১/৯৯-১০০)]
২৩৮. মুমাসসিল বা সাদৃশ্য স্থাপনকারীর বক্তব্য এখানে শেষ।
২৩৯. অথচ... এ বক্তব্যটুকু ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহর পক্ষ থেকে কথার মাঝখানে এসেছে। কারণ ইবন তাইমিয়্যাহ'র নিকট এটা অসম্ভব হলেও মুমাসসিল বা সাদৃশ্য স্থাপনকারীর নিকট জাওহার বা 'আরদ্ব হওয়া আল্লাহর জন্য অসম্ভব নয়।
২৪০. অর্থাৎ মুমাসসিল বা সাদৃশ্য স্থাপনকারী বলছে যে, সকল অস্তিত্বই এ দুটির একটি হবেই, সুতরাং আল্লাহর জন্য তা সাব্যস্ত করা দোষণীয় নয়। সুতরাং আল্লাহর সিফাতগুলো মানুষের সিফাতের মতোই। [নাউযুবিল্লাহ] এভাবে মুমাসসিল আল্লাহর সিফাতকে নিজের মত করে বুঝে নিয়ে দু'টি কাজ করেছে, এক. সে আল্লাহকে তামসীল করেছে। জাওহার বা 'আরদ্ব যা সৃষ্টির গুণ, আল্লাহকে সেটার অধীন করে নিয়েছে। দুই. সে তামসীল করার মাধ্যমে আল্লাহর গুণসমূহের প্রকৃত অর্থকে নিষ্ক্রিয় করে নিয়েছে। এভাবেই একজন মুমাসসিল তামসীল ও তা'জ্বীল দু'টোই করে থাকে।
২৪১. এখানে ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ আরেকটি উদাহরণ নিয়ে এসেছেন, যার মাধ্যমে সাদৃশ্য স্থাপনকারীর যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। মুমাসসিলের দেয়া যুক্তির মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, সে তামসীল করেছে, যার পরিণতি দাঁড়িয়েছে তাত্বীল, অর্থাৎ তামসীল করার মাধ্যমে এ গুণের আসল অর্থকে নিষ্ক্রিয়করণ করা হয়ে গেছে।
২৪২. অর্থাৎ মু'আত্তিল। যে ইস্তিওয়া এর প্রকৃত সকল অর্থকে নিষ্ক্রিয় করেছে। কারণ ইস্তিওয়া এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে, উপরে উঠা ও ঊর্ধ্বে উঠা। যেমনটি কুরআনে এসেছে, 'আর জুদী পাহাড়ের উপর উঠল।' [সূরা হূদ: ৪৪] আরও এসেছে, 'যাতে তোমরা তার পিঠসমূহের উপর উঠতে পার।' [সূরা আয- যুখরুফ: ১৩]
২৪৩. অর্থাৎ মুমাসসিল। যে ইস্তেওয়া এর অর্থকে সৃষ্টির কারও মত করে সাব্যস্ত করে নিয়েছে। তার মতে, উপরে উঠা বলতে সৃষ্টি কর্তৃক কোনো কিছুর উপরে উঠা। [নাউযুবিল্লাহ]
২৪৪. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ অন্যত্র বলেন, 'জেনে রাখ, যারাই 'ইস্তেওয়া' বা উপরে উঠার গুণ ও অনুরূপ [কর্মবাচক] গুণগুলোকে অস্বীকার করেছে, যদি তুমি সে কারণটি উদ্ঘাটন করতে গবেষণা কর তবে দেখতে পাবে, তারা আয়াত থেকে কোনো সৃষ্টি কর্তৃক কিছুর উপরে উঠাকেই অর্থ হিসেবে ধরে নিয়েছে, অথবা এমনভাবে উপরে উঠা ধরে নিয়েছে যাতে হুদুস (নতুনত্ব) বা নকস (ত্রুটি) মিশ্রিত হয়। তারপর তাদের বিপরীত মতের লোকদের থেকে তা বর্ণনা করে (অথচ তারা তা বলেনি) তারপর তারা সেটা বাতিল করার নিমিত্তে যাবতীয় দলীল প্রমাণাদির সমাহার ঘটায়। তারপর বলে, এর দ্বারা নির্দিষ্ট হয়ে গেল যে, 'ইস্তেওয়া' শব্দটিকে ইস্তীইলা' অর্থে নিতে হবে। অর্থাৎ ইস্তেওয়া অর্থ উপরে উঠা না নিয়ে 'ইস্তীইলা' বা করায়ত্ব করার অর্থে নিতে হবে। [আত-তিস'ঈনিয়্যাহ (২/৫৬৮)]
২৪৫. এখানে বিতর্ক পরবর্তী আশ'আরী মতবাদের লোকদের সাথে, যারা আল্লাহর 'আরশের উপর উঠাকে অস্বীকার করে থাকে।
২৪৬. উল্লেখ্য যে, আশায়েরারা ইলম, কুদরত, শোনা, দেখা এগুলো সহ জীবন, ইচ্ছা, কালামে নফসী গুণসমূহ সাব্যস্ত করে থাকে, তারা বলে থাকে, এগুলো বিবেকের যুক্তি দ্বারা সাব্যস্ত হয়, অন্যগুলো নয়।
২৪৭. ইতোপূর্বে আরদ্ব এর ব্যাখ্যা চলে গেছে যে সৃষ্টিতে 'আরদ্ব' বলতে বুঝায় যা অবশিষ্ট থাকে না বা ক্ষণস্থায়ী।
২৪৮. কারণ আল্লাহ তা'আলা যে ইস্তেওয়া বা উপরে উঠার কথা বলেছেন তা তো বিশেষ ধরনের উপরে উঠা, সেটার ধরণ আমাদের জানা নেই, যেমনটি আমরা আল্লাহর ইলম, কুদরত ও শোনার ক্ষেত্রে বলি যে, এটি আল্লাহর জন্য বিশেষ ধরনের ইলম, কুদরত ও শোনা, যার প্রকৃত ধরণ আমরা জানি না। [এ ব্যাপারে বিস্তারিত দেখুন, শাইখুল ইসলামের আত-তাদমুরিয়‍্যাহ গ্রন্থের চতুর্থ নীতি]
২৪৯. অর্থাৎ সালাফদের আকীদাহ হচ্ছে হক্ক যার ওপর অনেকে বিবেকের যুক্তি দাঁড় করিয়ে সন্দেহে নিপতিত হতে পারে। সেসব অস্বচ্ছ যুক্তিকে দলীল মনে করে অনেক কালামশাস্ত্রবিদ সন্দেহে দোদুল্যমান হয়ে আছে। তাদের এসব সন্দেহ নিরসনের জন্য আরও বেশি লেখা দরকার যা এখানে তিনি নিয়ে আসেননি। তবে শাইখুল ইসলাম এ বিষয়ে ১১ খণ্ডের এক বিশাল গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার নাম 'দারউ তা'আরুদ্বিল আকলি ওয়ান নাকলি'। সে গ্রন্থে তিনি এসব লোকদের সন্দেহের জবাব দিয়েছেন, যারা কুরআন ও হাদীসে আসা আল্লাহর গুণ বিষয়ক ভাষ্যের সাথে তাদের বিবেকের যুক্তির মতবিরোধ দাবি করেছিল।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 সালাফগণের নীতি সাদৃশ্যস্থাপন ও নিষ্ক্রিয়করণের মাঝামাঝি অবস্থানে

📄 সালাফগণের নীতি সাদৃশ্যস্থাপন ও নিষ্ক্রিয়করণের মাঝামাঝি অবস্থানে


সালাফে সালেহীনের অনুসৃত পন্থা হচ্ছে তা'তীল (নিষ্ক্রিয়করণ) ও তামসীল (সাদৃশ্যস্থাপন) এর মাঝামাঝি। সুতরাং তারা আল্লাহর কোনো গুণকে মাখলুকের গুণের মতো বলে না, যেমন আল্লাহর সত্তাকে কোনো মাখলুকের সত্তার মতো বলে না। তিনি নিজে তাঁর যে গুণ বর্ণনা করেছেন বা তাঁর রাসূল তাঁর যে গুণ বর্ণনা করেছেন সেগুলো তারা নাকচ করে না। তাই তারা তাঁর সুন্দর নামসমূহ এবং উন্নত গুণাবলিকে নিষ্ক্রিয় বলে না, কথাকে তার স্থান থেকে সরিয়ে দেয় না, আল্লাহর নামসমূহ ও আয়াতসমূহে ইলহাদ (২৩১) (বিকৃতি) করে না।

টিকাঃ
২৩১. 'ইলহাদ' শব্দের মূল অর্থ, একদিকে ঝুঁকে যাওয়া, যুলুম করা ও বক্রপথ অবলম্বন করা। এজন্যই যেসব কবর সোজা খনন করার পর নিচে গিয়ে কিবলার দিকে ঝুঁকে দেয়া হয় সেগুলোকে লাহদ কবর বলা হয়। [দেখুন, ইবন মানযূর, লিসানুল আরব (৩/৩৮৯)] এখানে আল্লাহর নাম ও আয়াতসমূহে ইলহাদ বলতে বুঝানো হয়েছে, সেগুলোর যেমন আছে তেমন না রেখে অন্য দিকে ফিরিয়ে দেয়া ও মিথ্যারোপ করা। আল্লাহ বলেন, "আর আল্লাহর রয়েছে সুন্দর সুন্দর নামসমূহ, সুতরাং তোমরা সে নামসমূহ দিয়ে তাঁকে আহ্বান কর, আর যারা তাঁর নামসমূহে বক্রপথ অবলম্বন করে, তারা যে কাজ করে তার শাস্তি তাদেরকে প্রদান করা হবে।" [সূরা আল- আ'রাফ: ১৮০] [দেখুন, তাফসীর আত-ত্বাবারী (৯/১৩৩-১৩৪); তাফসীর ইবন কাসীর (৩/৫১৭)]
আর আল্লাহর নামের ক্ষেত্রে ইলহাদ কয়েক প্রকার: প্রথমত: আল্লাহর নামসমূহের কোনো কিছু অস্বীকার করা অথবা নামসমূহ যেসব সিফাত (গুণ) ও হুকুম-আহকাম শামিল করে আছে তার মধ্যে কোনো বিষয় অস্বীকার করা। যেমনটি করেছে জাহমিয়‍্যাহ সম্প্রদায় ও অন্যান্য আহলে তা'ত্বীল তথা আল্লাহর গুণসমূহ অকার্যকর বলে ধারণাকারী সম্প্রদায়। এটা এ জন্য ইলহাদ (অস্বীকার) যে হলো যে, এ দুটি চিন্তাতেই রয়েছে তামসীল বা সাদৃশ্য স্থাপন, আর এ দু'টি চিন্তাতেই রয়েছে আল্লাহর সিফাতের স্বরূপকে নিষ্ক্রিয়করণ। প্রথমটির (২৪২) সমস্যা হচ্ছে সে প্রকৃত 'ইসতিওয়া'র সকল নামকে নিষ্ক্রিয় করেছে। আর দ্বিতীয়টির (২৪৩) সমস্যা হচ্ছে সে এমন এক 'ইস্তেওয়া' সাব্যস্ত করেছে যা কেবল মাখলুকের জন্য নির্দিষ্ট। (২৪৪)

টিকাঃ
২৩২. বিস্তারিত দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/২০৯)।
২৩৩. এসব সন্দেহ আশ'আরী ও মাতুরিদী মতবাদের লোকেরা পেশ করে থাকে। যার দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য আল্লাহ সর্বোচ্চ সত্তা ও 'আরশের উপর উঠার গুণ অস্বীকার করা। দেখুন, তাদের গ্রন্থে এসব সন্দেহ, নাইসাপুরী, আল-গুনইয়া ফী উসুলিদ্দীন, পৃ. ৭৪; গাযালী, কাওয়া'য়িদুল ই'তিক্কাদ, পৃ. ১৬৮।
২৩৪. যেমনটি নবী-রাসূল, সাহাবায়ে কিরাম, সালাফে সালেহীন ও ইমামগণ সাব্যস্ত করেছেন।
২৩৫. এ আলোচনার মাধ্যমে যেকোনো মু'আত্ত্বিল যে তা'ত্বীল ও তামসীল উভয়টিই করেছে তা প্রমাণিত হলো। কারণ সে তাত্বীল করার আগে তামসীল করে নেয়।
২৩৬. জাওহার হচ্ছে এমন মৌলবস্তু, যা জায়গা জুড়ে আছে। তবে তা দু'ভাগে বিভক্ত: ক. বাসীত্ব বা সূক্ষ্ম যা তখনকার দার্শনিকদের পরিভাষায় 'আল-জাওহারুল ফারদ' বা অনু-পরমানু বুঝায়। তা এমন এক সত্তা যাতে আর ভাগ চলে না, বাস্তব কর্মের মাধ্যমেও নয়, ক্ষমতার দিক থেকেও নয়। খ. মুরাক্কাব বা যৌগিক; আর তা হচ্ছে জিসিম বা দেহ। যা দুই বা ততোধিক 'আল-জাও, আল্লাহর নামসমূহ ও তা যেসব হুকুম-আহকাম এবং আল্লাহর জন্য উপযুক্ত গুণসমূহকে শামিল করছে তার প্রতি ঈমান আনা ওয়াজিব। অতএব, এসবের মধ্যে কোনো কিছু অস্বীকার করার অর্থ, যা ওয়াজিব তা থেকে বিচ্যুত হয়ে অন্য দিকে ঝুঁকে যাওয়া। দ্বিতীয়ত: আল্লাহর নামসমূহ এমন গুণ-নির্দেশক করে দেয়া যা সৃষ্টিজীবের গুণ সদৃশ। যেমনটি করেছে আহলে তাশবীহ তথা আল্লাহর গুণসমূহকে সৃষ্টিজীবের গুণসদৃশকারী সম্প্রদায়। এটা এ কারণে যে, অর্থগতভাবে তাশবীহ (সাদৃশ্যকরণ) একটি বাতিল বিষয়। কুরআন- সুন্নাহ'র কোনো ভাষ্য এ বিষয়টিকে নির্দেশ করতে পারে না, বরং কুরআন-সুন্নাহ'র ভাষ্যসমূহ এ বিষয়টিকে বাতিল হওয়ার ওপর প্রমাণবহ অতএব আল্লাহর গুণসমূহকে সৃষ্টিকুলের গুণের সাথে তাশবীহ তথা সাদৃশ্যবোধক করে দেয়ার অর্থ আল্লাহর নামের ব্যাপারে যা ওয়াজিব ও যথার্থ তা থেকে বিচ্যুতি। তৃতীয়ত: আল্লাহ তা'আলার ওপর এমন নাম প্রয়োগ করা যা আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং নিজের ওপর প্রয়োগ করেননি। যেমন খ্রিস্টান সম্প্রদায় আল্লাহর ওপর (পিতা) নাম প্রয়োগ করেছে। আর দার্শনিকরা তাঁর ওপর প্রয়োগ করেছে (কার্যকরী কারণ) নাম। এটা এ জন্য বিচ্যুতি যে, আল্লাহর নামসমূহ ওহীনির্ভর। অতএব আল্লাহ তা'আলার ওপর এমন নাম প্রয়োগ করা যা তিনি নিজের ওপর প্রয়োগ করেননি, নামের ব্যাপারে যা ওয়াজিব ও যথার্থ তা থেকে বিচ্যুতি। তা ছাড়া এ প্রয়োগকৃত নামগুলো স্বয়ং বাতুলতাপহার আল ফারদ' তথা অণু-পরামাণু দ্বারা ঘটিত। তাতে বাড়তি কিছু নেই।
২৩৭. 'আরদ্ব হচ্ছে এমন বস্তু যা অবশিষ্ট থাকা সম্ভব নয়, অন্যের ওপর নির্ভর করে, অন্যের উপরে অবস্থান করে টিকে থাকে, যা জাওহার ও জিসিম এর মধ্যে কেবল প্রকাশ পায়। অপর কোনো জাওহার ও জিসিমে পরিণত হলে তা বাতিল হয়ে যায়। আল্লাহর গুণাবলিকে কি 'আরদ্ব বলা যাবে? বস্তুত আল্লাহর গুণাবলিকে আরদ্ব বলা এটি কালামশাস্ত্রবিদদের আবিষ্কার। এটাকে সরাসরি হা বা না বলা যাবে না। উদ্দেশ্য জিজ্ঞাসা করতে হবে, তারপর যদি তা ভুল অর্থে পরিচালিত হয়, যেমন আরদ্ব বলতে বুঝায় যা নিঃশেষ হয়ে যায় তবে সে অর্থে আল্লাহর সিফাতকে 'আরদ্ব বলা শব্দ ও অর্থ উভয় দিক থেকেই অস্বীকার করা হবে। আর যদি বিশুদ্ধ অর্থ করা হয় আর তা আল্লাহর গুণের সাথে উপযোগী বিবেচিত হয় তবে সেটার অর্থকে অস্বীকার করা হবে না। কিন্তু শব্দ স্বীকার করা হবে। [বিস্তারিত দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ' ফাতাওয়া (৬/৯০-৯১, ১০৩-১০৪)] ইমাম হাফেয কিওয়ামুস সুন্নাহ আবুল কাসেম আল-আসবাহানী বলেন, 'সালাফগণ জাওহার ও আরদ্ব নিয়ে কথা বলতে অস্বীকার করেছেন। তারা বলেছেন, সাহাবায়ে কিরাম ও তাবে'য়ীনে 'ইযام এর যুগে এসব ছিল না। তাই হতে পারে তারা এগুলো জানা সত্ত্বেও চুপূর্ণ, যা থেকে আল্লাহ তা'আলা পবিত্র।
চতুর্থত: আল্লাহর নামসমূহ থেকে উৎকলিত করে কোনো উপাস্য বস্তুর নাম রাখা। যেমন-এক বর্ণনা মতে- মুশরিকরা আল্লাহ তা'আলার 'আল আযীয' নাম থেকে উৎকলিত করে তাদের মূর্তি আল উয্যার নাম রেখেছে। আল্লাহ তা'আলার 'ইলাহ' নাম থেকে উৎকলিত করে তাদের মূর্তি 'লাত' এর নাম রেখেছে। অতএব, তারা আল্লাহ তা'আলার নামসমূহ থেকে উৎকলিত করে তাদের উপাস্যসমূহের নাম রেখেছে। এটা এ কারণে ইলহাদ যে, আল্লাহর নামসমূহ কেবল তাঁর জন্যই সুনির্দিষ্ট।
অতএব, যেভাবে ইবাদত ও সত্য উলুহিয়াত আল্লাহর জন্য সুনির্দিষ্ট এবং আকাশ ও পৃথিবীতে তাঁরই মহিমা বর্ণিত, অনুরূপভাবে সুন্দরতম নামসমূহ তাঁর জন্যই সুনির্ধারিত। সুতরাং এ নামগুলো যেভাবে আল্লাহর জন্য সুনির্দিষ্ট করা হয় সেভাবে এগুলোর দ্বারা অন্য কারও নাম রাখা, নাম বিষয়ে যা ওয়াজিব ও উচিত তা থেকে বিচ্যুতি।
আল্লাহর নামসমূহের সব ধরনের বিকৃতিই হারাম; কেননা আল্লাহ তা'আলা বিকৃতিসাধনকারীদের হুঁশিয়ার করে বলেছেন: "আর তাদেরকে বর্জন কর যারা তাঁর নামে বিকৃতি ঘটায়। তারা যা করত অচিরেই তাদেরকে তার প্রতিফল দেয়া হবে।” [সূরা আল আ'রাফ: ১৮০] এ বিকৃতিকরণের মধ্যে শরী'আতের দলিলের নিরিখে কোনোটি শির্কী আবার কোনোটি কুফরী।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 এটার বর্ণনা যে, তা’বীল (নিষ্ক্রিয়করণ) তামসীল (তুলনা প্রদান) কে আবশ্যক করে, অনুরূপ তামসীল প্রদান করা তা’তীল করাকে আবশ্যক করে

📄 এটার বর্ণনা যে, তা’বীল (নিষ্ক্রিয়করণ) তামসীল (তুলনা প্রদান) কে আবশ্যক করে, অনুরূপ তামসীল প্রদান করা তা’তীল করাকে আবশ্যক করে


তা'তীলকারী ও তামসীলকারী সম্প্রদায়দ্বয়ের প্রত্যেকেই তা'ত্বীল ও তামসীল সাব্যস্তকারী। তা'ত্বীল বা (আল্লাহর নাম ও গুণকে) নিষ্ক্রিয়কারীগণ আল্লাহর নামের ও গুণের সেই অর্থই বুঝে যা মাখলুকের জন্য উপযোগী, এ কারণে তারা সে মাফহুম (বুঝ) কে নাকচ করে যেতে থাকে। ফলে তারা তা'ত্বীল ও তামসীল উভয়টিকেই একত্রিত করে। আগে তামসীল করে, পরে তা'ত্বীল করে। এর মাধ্যমে তারা আল্লাহর সিফাত ও নাম দ্বারা যা বুঝা যায় তাকে তাঁর সৃষ্টির নাম ও সিফাতের বুঝের সাথে তুলনা করে ও সাদৃশ্য প্রদান করে। আবার এর মাধ্যমে তারা আল্লাহর জন্য উপযোগী নাম ও গুণকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। (২৩২)
কেননা যখন কেউ বলে, "যদি আল্লাহ 'আরশের উপরে হন তাহলে তিনি হয়তো 'আরশের থেকে বড় হবেন অথবা ছোট অথবা সমান হবেন। আর এগুলো সবই অসম্ভব (২৩৩);" অনুরূপ কোনো বাক্য। (এটা কীভাবে তা'ত্বীল ও তামসীলকে একত্রিত করে? তার বর্ণনা হচ্ছে,) সে লোকটি মূলত মহান আল্লাহর 'আরশের উপরে উঠাকে তেমনি বুঝেছে যেমন কোনো জিসম (দেহ)-র উপরে অন্য কোনো জিসম উঠে থাকে। বস্তুত তার (দেহের উপর দেহ থাকার) এ বুঝটির আবশ্যকতা পূর্বের বুঝ (কোনো কিছু অপর কোনো কিছুর উপরে থাকলে সেটা বড় বা ছোট বা সমান হতে হবে) অনুসারেই হয়েছে (যা সৃষ্টির ওপর সৃষ্টির থাকার সাথে যথাযথ)। কিন্তু (স্রষ্টা কোনো কিছুর উপরে থাকার বিষয়টি এমন নয়, তাই) যদি বলা হতো, মহান আল্লাহ 'আরশের উপর উঠেছেন এমন প্রকার উপরে উঠা যা তাঁর মহত্বের সাথে উপযোগী এবং তাঁর জন্য বিশেষিতা (২৩৪), তাহলে ('আরশে উঠার) সাথে এমন কোনো বাতিল আবশ্যকতা ('আরশের চেয়ে বড় কিংবা ছোট কিংবা সমান হওয়ার) বিষয়টি অবশ্যম্ভাবী করে না; যা নাকচ করা ওয়াজিব হবে (কেননা তা তো সৃষ্টির জন্য আবশ্যক, স্রষ্টার জন্য নয়)। (২৩৫)
এটা তখন সাদৃশ্য স্থাপনকারীর ঐ কথার মতো হয়ে যায়, যে বলে থাকে, যদি সৃষ্টিকুলের কোনো ছিলেন, তাহলে আমাদের জন্যও এ ব্যাপারে চুপ থাকার সুযোগ সৃষ্টি হয়ে যায় যেমনটি তারা চুপ ছিলেন, নতুবা তারা এসব না জেনে চুপ ছিলেন, তাহলে তারা যা জানেননি, দীনের ব্যাপারে সেগুলো আমাদের না জানলেও চলবে। [আল-হুজ্জাতু ফী বায়ানিল মাহাজ্জাহ (১/৯৯-১০০)]
২৩৮. মুমাসসিল বা সাদৃশ্য স্থাপনকারীর বক্তব্য এখানে শেষ।
২৩৯. অথচ... এ বক্তব্যটুকু ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহর পক্ষ থেকে কথার মাঝখানে এসেছে। কারণ ইবন তাইমিয়্যাহ'র নিকট এটা অসম্ভব হলেও মুমাসসিল বা সাদৃশ্য স্থাপনকারীর নিকট জাওহার বা 'আরদ্ব হওয়া আল্লাহর জন্য অসম্ভব নয়।
২৪০. অর্থাৎ মুমাসসিল বা সাদৃশ্য স্থাপনকারী বলছে যে, সকল অস্তিত্বই এ দুটির একটি হবেই, সুতরাং আল্লাহর জন্য তা সাব্যস্ত করা দোষণীয় নয়। সুতরাং আল্লাহর সিফাতগুলো মানুষের সিফাতের মতোই। [নাউযুবিল্লাহ] এভাবে মুমাসসিল আল্লাহর সিফাতকে নিজের মত করে বুঝে নিয়ে দু'টি কাজ করেছে, এক. সে আল্লাহকে তামসীল করেছে। জাওহার বা 'আরদ্ব যা সৃষ্টির গুণ, আল্লাহকে সেটার অধীন করে নিয়েছে। দুই. সে তামসীল করার মাধ্যমে আল্লাহর গুণসমূহের প্রকৃত অর্থকে নিষ্ক্রিয় করে নিয়েছে। এভাবেই একজন মুমাসসিল তামসীল ও তা'জ্বীল দু'টোই করে থাকে।
২৪১. এখানে ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ আরেকটি উদাহরণ নিয়ে এসেছেন, যার মাধ্যমে সাদৃশ্য স্থাপনকারীর যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। মুমাসসিলের দেয়া যুক্তির মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, সে তামসীল করেছে, যার পরিণতি দাঁড়িয়েছে তাত্বীল, অর্থাৎ তামসীল করার মাধ্যমে এ গুণের আসল অর্থকে নিষ্ক্রিয়করণ করা হয়ে গেছে।
২৪২. অর্থাৎ মু'আত্তিল। যে ইস্তিওয়া এর প্রকৃত সকল অর্থকে নিষ্ক্রিয় করেছে। কারণ ইস্তিওয়া এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে, উপরে উঠা ও ঊর্ধ্বে উঠা। যেমনটি কুরআনে এসেছে, 'আর জুদী পাহাড়ের উপর উঠল।' [সূরা হূদ: ৪৪] আরও এসেছে, 'যাতে তোমরা তার পিঠসমূহের উপর উঠতে পার।' [সূরা আয- যুখরুফ: ১৩]
২৪৩. অর্থাৎ মুমাসসিল। যে ইস্তেওয়া এর অর্থকে সৃষ্টির কারও মত করে সাব্যস্ত করে নিয়েছে। তার মতে, উপরে উঠা বলতে সৃষ্টি কর্তৃক কোনো কিছুর উপরে উঠা। [নাউযুবিল্লাহ]
২৪৪. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ অন্যত্র বলেন, 'জেনে রাখ, যারাই 'ইস্তেওয়া' বা উপরে উঠার গুণ ও অনুরূপ [কর্মবাচক] গুণগুলোকে অস্বীকার করেছে, যদি তুমি সে কারণটি উদ্ঘাটন করতে গবেষণা কর তবে দেখতে পাবে, তারা আয়াত থেকে কোনো সৃষ্টি কর্তৃক কিছুর উপরে উঠাকেই অর্থ হিসেবে ধরে নিয়েছে, অথবা এমনভাবে উপরে উঠা ধরে নিয়েছে যাতে হুদুস (নতুনত্ব) বা নকস (ত্রুটি) মিশ্রিত হয়। তারপর তাদের বিপরীত মতের লোকদের থেকে তা বর্ণনা করে (অথচ তারা তা বলেনি) তারপর তারা সেটা বাতিল করার নিমিত্তে যাবতীয় দলীল প্রমাণাদির সমাহার ঘটায়। তারপর বলে, এর দ্বারা নির্দিষ্ট হয়ে গেল যে, 'ইস্তেওয়া' শব্দটিকে ইস্তীইলা' অর্থে নিতে হবে। অর্থাৎ ইস্তেওয়া অর্থ উপরে উঠা না নিয়ে 'ইস্তীইলা' বা করায়ত্ব করার অর্থে নিতে হবে। [আত-তিস'ঈনিয়্যাহ (২/৫৬৮)]

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 মহান আল্লাহর জন্য ‘উর্ধ্বে থাকা’ ও ‘উপরে উঠা’ এ গুণদ্বয় সাব্যস্তকরণ

📄 মহান আল্লাহর জন্য ‘উর্ধ্বে থাকা’ ও ‘উপরে উঠা’ এ গুণদ্বয় সাব্যস্তকরণ


আর মীমাংসাপূর্ণ কথা হচ্ছে, যার ওপর মধ্যমপন্থী উম্মত রয়েছে যে, নিশ্চয় আল্লাহ আরশের উপরে উঠেছেন (২৪৫), তাঁর শানের সাথে উপযোগী এবং তাঁর জন্যই খাসভাবে। কাজেই যেমন তিনি 'আলীম' সকল বিষয়ে অবগত, তিনি 'ক্বাদীর' সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান, তিনি স্রষ্টা থাকবেন তবে সে হয়তো জাওহার (২৩৬) (মৌলবস্তু) হবে, নতুবা আরদ্ব (২৩৭) (গুণবাচক) হবে। (২৩৮) [অথচ জাওহার বা 'আরদ্ব' কোনোটি হওয়া আল্লাহর জন্য অসম্ভব। (২৩৯)] যেহেতু সকল অস্তিত্বই এ দুটির মধ্যে সীমাবদ্ধ। (২৪০) অনুরূপ মুমাসসিল বা সাদৃশ্যস্থাপনকারীর কথা (২৪১): যখন তিনি [আল্লাহ] 'আরশের উপর উঠবেন তখন এটি মানুষের খাট বা নৌকার উপর উঠার মতোই ধরে নিতে হবে। যেহেতু 'ইসতিওয়া' (উপরে উঠা) এভাবে ছাড়া জানা যায় না।
এভাবে স্পষ্ট হলো যে, এ দুটি চিন্তাতেই রয়েছে তামসীল বা সাদৃশ্য স্থাপন, আর এ দু'টি চিন্তাতেই রয়েছে আল্লাহর সিফাতের স্বরূপকে নিষ্ক্রিয়করণ। প্রথমটির (২৪২) সমস্যা হচ্ছে সে প্রকৃত 'ইসতিওয়া'র সকল নামকে নিষ্ক্রিয় করেছে। আর দ্বিতীয়টির (২৪৩) সমস্যা হচ্ছে সে এমন এক 'ইস্তেওয়া' সাব্যস্ত করেছে যা কেবল মাখলুকের জন্য নির্দিষ্ট। (২৪৪)

টিকাঃ
২৩২. বিস্তারিত দেখুন, মাজ ('সামী')' সর্বদ্রষ্টা, ('বাসীর') সর্বশ্রোতা ইত্যাদি। আর আল্লাহর ইলম (জ্ঞান) ও কুদরত (ক্ষমতা) (২৪৬) এর ক্ষেত্রে এমন কোনো 'আরদ্ব' (২৪৭) এর বৈশিষ্ট্য সাব্যস্ত করা জায়েয নেই যা কোনো সৃষ্টির ইলম ও কুদরতের জন্য প্রযোজ্য; তেমনিভাবে মহান আল্লাহ 'আরশের উপরে (২৪৮), তাঁর জন্য মাখলুকের ফাউক্বিয়্যাত তথা মাখলুকের ওপর মাখলুক হওয়ার বৈশিষ্ট্য ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট আবশ্যিক বিষয়সমূহ সাব্যস্ত করা জায়েয নেই।

টিকাঃ
২৪৫. এখানে বিতর্ক পরবর্তী আশ'আরী মতবাদের লোকদের সাথে, যারা আল্লাহর 'আরশের উপর উঠাকে অস্বীকার করে থাকে।
২৪৬. উল্লেখ্য যে, আশায়েরারা ইলম, কুদরত, শোনা, দেখা এগুলো সহ জীবন, ইচ্ছা, কালামে নফসী গুণসমূহ সাব্যস্ত করে থাকে, তারা বলে থাকে, এগুলো বিবেকের যুক্তি দ্বারা সাব্যস্ত হয়, অন্যগুলো নয়।
২৪৭. ইতোপূর্বে আরদ্ব এর ব্যাখ্যা চলে গেছে যে সৃষ্টিতে 'আরদ্ব' বলতে বুঝায় যা অবশিষ্ট থাকে না বা ক্ষণস্থায়ী।
২৪৮. কারণ আল্লাহ তা'আলা যে ইস্তেওয়া বা উপরে উঠার কথা বলেছেন তা তোমূ' ফাতাওয়া (৫/২০৯)।
২৩৩. এসব সন্দেহ আশ'আরী ও মাতুরিদী মতবাদের লোকেরা পেশ করে থাকে। যার দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য আল্লাহ সর্বোচ্চ সত্তা ও 'আরশের উপর উঠার গুণ অস্বীকার করা। দেখুন, তাদের গ্রন্থে এসব সন্দেহ, নাইসাপুরী, আল-গুনইয়া ফী উসুলিদ্দীন, পৃ. ৭৪; গাযালী, কাওয়া'য়িদুল ই'তিক্কাদ, পৃ. ১৬৮।
২৩৪. যেমনটি নবী-রাসূল, সাহাবায়ে কিরাম, সালাফে সালেহীন ও ইমামগণ সাব্যস্ত করেছেন।
২৩৫. এ আলোচনার মাধ্যমে যেকোনো মু'আত্ত্বিল যে তা'ত্বীল ও তামসীল উভয়টিই করেছে তা প্রমাণিত হলো। কারণ সে তাত্বীল করার আগে তামসীল করে নেয়।
২৩৬. জাওহার হচ্ছে এমন মৌলবস্তু, যা জায়গা জুড়ে আছে। তবে তা দু'ভাগে বিভক্ত: ক. বাসীত্ব বা সূক্ষ্ম যা তখনকার দার্শনিকদের পরিভাষায় 'আল-জাওহারুল ফারদ' বা অনু-পরমানু বুঝায়। তা এমন এক সত্তা যাতে আর ভাগ চলে না, বাস্তব কর্মের মাধ্যমেও নয়, ক্ষমতার দিক থেকেও নয়। খ. মুরাক্কাব বা যৌগিক; আর তা হচ্ছে জিসিম বা দেহ। যা দুই বা ততোধিক 'আল-জাওহার আল ফারদ' তথা অণু-পরামাণু দ্বারা ঘটিত। তাতে বাড়তি কিছু নেই।
২৩৭. 'আরদ্ব হচ্ছে এমন বস্তু যা অবশিষ্ট থাকা সম্ভব নয়, অন্যের ওপর নির্ভর করে, অন্যের উপরে অবস্থান করে টিকে থাকে, যা জাওহার ও জিসিম এর বিশেষ ধরনের উপরে উঠা, সেটার ধরণ আমাদের জানা নেই, যেমনটি আমরা আল্লাহর ইলম, কুদরত ও শোনার ক্ষেত্রে বলি যে, এটি আল্লাহর জন্য বিশেষ ধরনের ইলম, কুদরত ও শোনা, যার প্রকৃত ধরণ আমরা জানি না। [এ ব্যাপারে বিস্তারিত দেখুন, শাইখুল ইসলামের আত-তাদমুরিয়‍্যাহ গ্রন্থের চতুর্থ নীতি]

আর মীমাংসাপূর্ণ কথা হচ্ছে, যার ওপর মধ্যমপন্থী উম্মত রয়েছে যে, নিশ্চয় আল্লাহ আরশের উপরে উঠেছেন (২৪৫), তাঁর শানের সাথে উপযোগী এবং তাঁর জন্যই খাসভাবে। কাজেই যেমন তিনি 'আলীম' সকল বিষয়ে অবগত, তিনি 'ক্বাদীর' সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান, তিনি ('সামী')' সর্বদ্রষ্টা, ('বাসীর') সর্বশ্রোতা ইত্যাদি। আর আল্লাহর ইলম (জ্ঞান) ও কুদরত (ক্ষমতা) (২৪৬) এর ক্ষেত্রে এমন কোনো 'আরদ্ব' (২৪৭) এর বৈশিষ্ট্য সাব্যস্ত করা জায়েয নেই যা কোনো সৃষ্টির ইলম ও কুদরতের জন্য প্রযোজ্য; তেমনিভাবে মহান আল্লাহ 'আরশের উপরে (২৪৮), তাঁর জন্য মাখলুকের ফাউক্বিয়্যাত তথা মাখলুকের ওপর মাখলুক হওয়ার বৈশিষ্ট্য ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট আবশ্যিক বিষয়সমূহ সাব্যস্ত করা জায়েয নেই।

টিকাঃ
২৪৫. এখানে বিতর্ক পরবর্তী আশ'আরী মতবাদের লোকদের সাথে, যারা আল্লাহর 'আরশের উপর উঠাকে অস্বীকার করে থাকে।
২৪৬. উল্লেখ্য যে, আশায়েরারা ইলম, কুদরত, শোনা, দেখা এগুলো সহ জীবন, ইচ্ছা, কালামে নফসী গুণসমূহ সাব্যস্ত করে থাকে, তারা বলে থাকে, এগুলো বিবেকের যুক্তি দ্বারা সাব্যস্ত হয়, অন্যগুলো নয়।
২৪৭. ইতোপূর্বে আরদ্ব এর ব্যাখ্যা চলে গেছে যে সৃষ্টিতে 'আরদ্ব' বলতে বুঝায় যা অবশিষ্ট থাকে না বা ক্ষণস্থায়ী।
২৪৮. কারণ আল্লাহ তা'আলা যে ইস্তেওয়া বা উপরে উঠার কথা বলেছেন তা করে, তাদের যুক্তি হলো যে, তা যুক্তিতে ধরে না, অথচ আশায়েরা ও মাতুরিদীদের নিকট তা যুক্তিতে ধরে। আবার মু'তাযিলারা, যারা আখেরাতে আল্লাহকে দেখা যাবে না বলে তাদের যুক্তি হলো, যুক্তিতে তা গ্রহণযোগ্য মনে হয় না, অথচ আশায়েরা ও মাতুরিদীরা সেটাকে যুক্তিগ্রাহ্য মনে করে থাকেন। অপরদিকে আহলুল হক্করা, সালাফীরা, চার ইমাম ও তাদের অনুসারী সহীহ আকীদাহ'র অনুসারীরা বিশ্বাস করে থাকেন আল্লাহ 'আরশের উপর উঠেছেন, অথচ অন্যান্য সকল ফির্কা বলে থাকেন যে, আল্লাহ কর্তৃক তাঁর 'আরশের উপর উঠা যুক্তিতে ধরে না, তাই তা'ওয়ীল করতে হবে। তাই কোনটি বিবেকের যুক্তি সমর্থন করে আর কোনটি সমর্থন করে না তাতে এত মতভেদ থাকার অর্থই হচ্ছে, বিবেকের যুক্তি কোনটি ধরবে আর কোনটি ধরবে না তা একজন থেকে অন্যজনের ব্যাপারে আলাদা থাকতে বাধ্য। আনাসের যা বিবেকে ধরে, আনাসের বাপের তা বিবেকে নাও ধরতে পারে, তাই বলে যা আনাসের বাপের বিবেকে ধরে না, তা নিষিদ্ধ বলার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। সুতরাং যুক্তির প্রতি না ঝুঁকে কুরআন ও হাদীসের ভাষ্যে যা এসেছে তা মেনে নেয়াই হচ্ছে বুদ্ধিমানের কাজ। অন্যথা সর্বদা পথভ্রষ্টতা তাকে ঘিরে থাকবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00