📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 ইমাম দারেমীর কিতাবের প্রশংসা

📄 ইমাম দারেমীর কিতাবের প্রশংসা


তবে আমি স্পষ্ট বর্ণনা করছি যে, তাদের তা'ওয়ীল হুবহু মিররীসীর তা'ওয়ীল। এটার প্রমাণ ইমাম বুখারীর সময়কালের প্রসিদ্ধ ইমাম দারেমী (১৭৬) স্বীয় رد عثمان بن سعيد، على الكاذب العنيد، فيما افترى على الله في التوحيد কিতাবে এসব তা'ওয়ীল হুবহু বিশর আল-মিররীসীর বলে উল্লেখ করেছেন। যাতে তিনি মিররীসী থেকে এমনসব বক্তব্য বর্ণনা করেছেন যা প্রমাণ করে যে, মিররীসী পরবর্তী যারাই এ বিষয়ে তার সাথে সংযুক্ত হয়েছে সে তাদের থেকে নিয়ম-নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বেশি পারঙ্গম, অনুরূপ মা'কূল (১৭৭) ও মানকূল (১৭৮) সম্বন্ধে অধিক অবগত। অতঃপর দারেমী স্বীয় বক্তব্য দ্বারা সেগুলো খণ্ডন করেছেন; যা কোনো বিবেকের যুক্তিতে পারঙ্গম মেধাবী ব্যক্তি অধ্যয়ন করলে সহজেই জানতে পারবে যে, সালাফে সালেহীন বস্তুত কোন নীতির ওপর ছিলেন। আর তার নিকট সালাফগণের তরীকার প্রামাণ্যতা শক্তিশালী হওয়া এবং তাদের বিরোধীদের তরীকার প্রমাণ দুর্বল হওয়া সহজেই ফুটে উঠবে।

টিকাঃ
১৭৬. তিনি হচ্ছেন উসমান ইবন সা'ঈদ ইবন খালেদ ইবন সা'ঈদ আদ-দারেমী আস-সিজিস্তানী, আবু সা'ঈদ, আল-ইমাম, আল-আল্লামাহ। তিনি ছিলেন বিদ'আতীদের চক্ষুশূল ও গলার কাঁটা। সুন্দর মুনাযারার ক্ষমতাপ্রাপ্ত, প্রমাণ উপস্থাপনে সিদ্ধহস্ত। হাদীস সংগ্রহে অধিক সফরকারী। তার মৃত্যু ছিল ২৮০ হিজরীতে। তিনি জাহমিয়্যাহ ও মু'তাযিলাদের আকীদাহ'র খণ্ডনে দু'টি গ্রন্থ লিখেছেন। আর- রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ, আর-রাদ্দু আলাল বিশর আল-মিররীসী। আকীদাহ'র ছাত্রদের জন্য এ দু'টি গ্রন্থ না পড়ার কোনো বিকল্প নেই। শাইখুল ইসলাম ও তার ছাত্র ইবনুল কাইয়্যেম এ দু'টি গ্রন্থ পড়ার জন্য অসিয়ত করতেন। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৩/৬২১); ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুয়ুশ, পৃ. ২৩১; ইবন আব্দুল হাদী, রিসালাতুল লাতীফাতুন ফী আহাদীসি মুতাফাররাক্বাতিন দ্বা'য়িফাতিন, পৃ. ৭৪-৭৬।
১৭৭. অর্থাৎ বিবেকের যুক্তিভিত্তিক প্রমাণাদি।
১৭৮. অর্থাৎ কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমা'র দলীল-প্রমাণাদি।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 মিররীসীয়াহদের নিন্দায় উম্মতের ইযমদের ঐকমত্য

📄 মিররীসীয়াহদের নিন্দায় উম্মতের ইযমদের ঐকমত্য


অতঃপর যখন কেউ দেখবে যে, হিদায়াতের ইমামগণ মিররীসীর নিন্দায় একমত, এমনকি তাদের অধিকাংশই তাদেরকে কাফের ও গোমরাহ বলেছেন। (১৮০) আর যখন কেউ জানতে পারবে যে, পরবর্তীদের মাঝে প্রচলিত এসব বক্তব্য মূলত মিররীসীর মতবাদই, তখন আল্লাহ যাকে হিদায়াত দিতে চান তার জন্য হিদায়াত স্পষ্ট হয়ে যাবে। ওলা হাওলা ওলা কুউয়াতা ইল্লা-বিল্লাহ।
এ ব্যাপারে ফাতওয়া বিস্তৃত করার সুযোগ নেই। আমি প্রাথমিক বিষয়গুলোর দিকে ইঙ্গিত করলাম মাত্র। আর বুদ্ধিমান তো যাচাই-বাছাই ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই পথ চলে।

টিকাঃ
১৭৯. অর্থাৎ যারা বিশর আল-মিররীসী আল-জাহমীর অনুসারী। পরবর্তীকালে যারাই জাহমিয়্যাদের রদ্দ করেছেন তারা বিশর আল-মারিসী ও তার অনুসারীদের দল মিররীসীয়্যাহকে জাহমিয়্যাদের মুখপাত্র হিসেবে তাদের বক্তব্য বগুন করেছেন। অবশ্য অধিকাংশ গ্রন্থকার মিররীসী ফির্কাকে মুরজিয়াদের একটি ফির্কা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। দেখুন, ইবনু খাল্লিকান, ওফায়াতুল আ'ইয়ান (১/২৫১); আশআরী, মাকালাতুল ইসলামিয়‍্যীন, পৃ. ১৪০; বাগদাদী, আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক্ক, পৃ. ২৩২।
১৮০. এ বিষয়ে সালাফদের বক্তব্য অগণিত। যেমন, ইয়াযীদ ইবন হারূন বলেন, মিররীসী, তার রক্ত হালাল, তাকে হত্যা করতে হবে। তিনি আরও বলেন, আমি বাগদাদবাসীকে বিশর আল-মিররীসী হত্যার যোগ্য তা একাধিকবার বলেছি। [দেখুন, তারীখে বাগদাদ (৭/৬৩)] শাবাবাহ ইবন সুওয়ার বলেন, আমার, আবুন নম্বর হাশেম ইবন কাসেম ও অন্যান্য ফকীহগণের ঐকমত্য হয়েছিল যে, মিররীসী কাফের, নাস্তিক। আমরা মত দিয়েছিলাম যে, তাকে তাওবার জন্য ডাকা হবে, যদি তাওবা করে তো ভালো, নতুবা তার গর্দান উড়িয়ে দেয়া হবে। [আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ, আস-সুন্নাহ (১/১২৪)] মাররূযী বলেন, আমি আবু আব্দুল্লাহকে (আহমাদ ইবন হাম্বলকে) বলতে শুনেছি, তার কাছে মিররীসীর আলোচনা করা হলো, তখন তিনি বললেন, তার বাপ ইয়াহুদী ছিল, তুমি মনে কর সে আর কী হবে?! [দেখুন, যাহাবী, মীযানুল ই'তিদাল (১/৩২৩); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১০/২০১)]
আরও আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, কোনো কোনো ইয়াহুদী মুসলিমদের কাউকে কাউকে মিররীসীর দ্বারা তাদের দীনের পথভ্রষ্টতা ও বিনষ্ট করার বিষয়টি বর্ণনা করে সাবধান করেছিল। আবু ইয়া'কুব ইসহাক ইবন ইবরাহীম লুলু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন আমি এক রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম, এমতাবস্থায় দেখতে পেলাম বিশর আল-মিররীসীকে, লোকেরা তার ওপর জড়ো হয়ে আছে। এমন সময় এক ইয়াহূদী সে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল, তখন আমি তাকে বলতে শুনেছি, 'সাবধান। সে যেন তোমাদের' ওপর তোমাদের কিতাব নষ্ট না করে দেয়, যেমন তার পিতা আমাদের ওপর তাওরাতকে বিনষ্ট করে দিয়েছিল। অর্থাৎ তার বাপ ইয়াহুদী ছিল।' [দেখুন, তারীখে বাগদাদ (৭/৬১)] তার ব্যাপারে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, আশ'আরী, মাকালাতুল ইসলামিয়ীন, পৃ. ১৪০; বাগদাদী, আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক্তি, পৃ. ২৩২।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 সালাফে সালেহীনের মত বর্ণনায় যেসব গ্রন্থ গুরুত্ব প্রদান করেছে তার কিছুর বর্ণনা

📄 সালাফে সালেহীনের মত বর্ণনায় যেসব গ্রন্থ গুরুত্ব প্রদান করেছে তার কিছুর বর্ণনা


আর এ বিষয়ে সালাফে সালেহীনের বক্তব্য অসংখ্য কিতাবে বিদ্যমান রয়েছে। এখানে সামান্য কয়েকটি উল্লেখ করা হলো: লালেকাঈ (১৮১) এর আস-সুনান (১৮২), ইবন বাত্তাহ (১৮৩) এর আল-ইবানাহা (১৮৪), আবু যর হারাওয়ী (১৮৫) এর আস-সুন্নাহ, আবু 'উমার আত-ত্বলামানকী (১৮৬) এর 'আল-উসূল, ইবনু আবদিল বার (১৮৭) এর বক্তব্য, বাইহাকী (১৮৮) এর আল-আসমা ওয়াস সিফাত। তারও পূর্বে ইমাম তাবারানী (১৮৯) এর আস-সুন্নাহ, অনুরূপ ইমাম আবুশ শাইখ আল-আসফাহানী (১৯০), আবু আব্দুল্লাহ ইবন মানদাহ [আল-আসাফাহানী] (১৯১), আবু আহমাদ আল-আসসাল আল-আসফাহানী (১৯২) এর গ্রন্থসমূহ। তাছাড়া তারও আগেকার গ্রন্থ খাল্লাল (১৯৩) এর আস-সুন্নাহ (১৯৪), ইবন খুযাইমাহ এর আত-তাওহীদ (১৯৫), আবুল আব্বাস ইবন সুরাইজ (১৯৬) এর বক্তব্য, অনুরূপ একাধিক ইমামের (১৯৭) আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ। (১৯৮) তারও পূর্বে আব্দুল্লাহ ইবন ইমাম আহমাদ এর আস-সুন্নাহ (২০০), ইমাম আবু বকর ইবনুল আছরম (২০১) এর আস-সুন্নাহ, ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (২০২) এর আস-সুন্নাহ, ইমাম মাররূযী (২০৩) এর আস-সুন্নাহ (২০৪), ইমাম আবু দাউদ আস- সিজিস্তানী এর আস-সুন্নাহ (২০৫), ইমাম ইবন আবী শাইবাহ (২০৬) এর আস-সুন্নাহ (২০৭), ইমাম আবু বকর ইবন আবি আসিম (২০৮) এর আস-সুন্নাহ, ইমাম বুখারীর উস্তাদ আব্দুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ আল-জু'ফীর (২০৯) কিতাব আর-রাদ্দু 'আলাল জাহমিয়্যাহ, ইমাম বুখারী (২১০) এর খালকু আফ'আলিল ইবাদ, ইমাম উসমান ইবন সা'ঈদ আদ-দারেমী এর আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ, বিখ্যাত মুনাযারা 'হাইদাহ' (২১১) গ্রন্থকার ইমাম আব্দুল আযীয আল-মাক্কী (২১২) কর্তৃক জাহমিয়্যাদের খণ্ডন করে প্রদত্ত তার বক্তব্য, ইমাম নু'আইম ইবন হাম্মাদ আল-খুযা'ঈ (২১৩) এর বক্তব্য, তদ্রূপ ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল, ইমাম ইসহাক ইবন রাহওয়াইহ, ইমাম ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ (২১৪), ইমাম ইয়াহইয়া ইবন ইয়াহইয়া আন-নাইসাপূরী (২১৫) ও তাদের অনুরূপ লোকদের বক্তব্য। তাদের পূর্বে ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক, তার মতো অনেকের গ্রন্থ, তাছাড়া আরও অনেক কিছু আছে।
তাছাড়া আমাদের নিকট নক্কলী (২১৬) এবং আক্বলী (২১৭) দলীলের যে বিরাট সমাহার রয়েছে তা এ স্থানে সংকুলন হবে না। আর আমি এটাও জানি যে, কালামপন্থীদের অনেক সংশয়- সন্দেহ আছে, কিন্তু ফাতওয়াতে সেগুলো উল্লেখ করা সম্ভব নয়। (২১৮) সুতরাং যে এগুলো (২১৯) দেখবে এবং তাদের সংশয়গুলো স্পষ্ট করার ইচ্ছা করবে, তার জন্য সেটা অনেক সহজ হিসেবে দেখা দিবে। আর যেহেতু (আল্লাহর গুণ অস্বীকার করার) এদের এ মতবাদ তথা তা'ত্বীল (২২০) (নিষ্ক্রিয়করণ) ও তা'ওয়ীল (অপব্যাখ্যাকরণ) মূলনীতিটি গৃহীত হয়েছে মুশরিক, ইয়াহূদী এবং সাবেয়ীদের শিষ্যদের থেকে, তাহলে একজন মুমিনের মন বা একজন বুদ্ধিমানের মন কীভাবে প্রশান্তি পেতে পারে তাদের পথ গ্রহণ করে যারা হয় অভিশপ্ত নতুবা পথভ্রষ্ট? আর কীভাবেই তারা ছেড়ে দিতে পারে তাদের পথ, যাদের ওপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছিলেন? যারা হচ্ছেন- নবী, শহীদ এবং নেককার লোক। (২২১)

টিকাঃ
১৮১. তিনি হচ্ছেন, হিবাতুল্লাহ ইবনুল হাসান ইবন মানসূর আর-রাযী আত-তাবারী আল-লালেকাঈ। আবুল কাসেম, শাফে'য়ী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। তার বিখ্যাত উস্তাদগণের মধ্যে রয়েছেন, আল-ইসফারাঈনী, আবু মাসউদ আদ-দিমাশকী, আবু তাহের আল-মুখাল্লাস প্রমুখ। যিনি তার যুগে শাফেয়ীদের মাযহাবের ইমাম ছিলেন। তার ছাত্রদের মধ্যে বিখ্যাত হচ্ছেন আল-খত্বীব আল- বাগদাদী, আবুল হাসান আলী ইবনুল হুসাইন আল-উকবারী প্রমুখ। তিনি হিজরী ৪১৮ সালে মারা যান। তার রয়েছে অনেকগুলো গ্রন্থ। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, শারহু উসূলি ই'তিক্কাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ, আসমাউ রিজালিস সহীহাইন, কারামাতু আওলিয়ায়িল্লাহ, শারহু কিতাবি উমার ইবনিল খাত্তাব ইলা নাসারা আশ-শাম ইত্যাদি। দেখুন, তারিখে বাগদাদ (১৪/৮০); যাহাবী, তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ (৩/১০৮৩); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৭/৪১৯); ইবন কাসীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (১২/২৪); মুকাদ্দিমাতু কিতাব শারহু উসূলি ই'তিক্কাদি আহলিস সুন্নাহ।
১৮২ কিতাবটির নাম নিয়ে যথেষ্ট মতভেদ হয়েছে; ১- কারো কারে মতে, কিতাবটির নাম 'কিতাবুস সুন্নাহ'। [ইবন কাসীর, বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (১২/২৪); ইবন হাজার, ফাতহুল বারী (১/৪৭)] ২- কারও কারও মতে, কিতাবুস সুনান, [ইবন তাইমিয়‍্যাহ, ফাতাওয়া আল-হামওয়িয়্যাহ আল- কুবরা] ৩- কারও কারও নিকট, শারহুস সুন্নাহ, [খত্বীব আল-বাগদাদী, তারিখু মাদীনাতিস সালাম (১৪/৭০); ইবনুল 'ইমাদ, শাযরাতুয যাহাব (৩/২১১)] ৪- শারহু ই'তিক্বাদি আহলিস সুন্নাহ, [যাহাবী, আল-উলু লিল, 'আলিয়ি‍্যল আযীম (২/১৩১০)] ৫- শারহু হুজাজি উসূলি ই'তিক্বাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ [আবু শামাহ, আল-বা'য়িস আলা ইনকারিল হাওয়াদিস, পৃ. ১০-১১] ৬- শারহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ [আহমাদ সা'দ হামদান আল-গামেদী, বর্তমান তাহকীকের ভূমিকা]
সম্ভবত নামটি বড় হওয়ায় প্রত্যেকে একটি অংশ বর্ণনা করেছেন। পরবর্তীতে বর্তমান নামটিই বইয়ের উপর লেখা হয়; কারণ পাণ্ডুলিপির উপর এ নামটিই লেখা ছিল। ইমাম লালেকাঈ তার এ গ্রন্থটি রচনার দু'টি কারণ বর্ণনা করেছেন: এক. অনেক আলেম তার কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন যেন তিনি এমন একটি কিতাব লেখেন যাতে আহলুল হাদীস তথা আহলুস সুন্নাহ'র আকীদাহ'র ব্যাখ্যা দিতে পারেন। দুই, যখন তিনি দেখলেন যে, মানুষরা তৎকালীন আধুনিক জ্ঞান নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, ফলে প্রাচীন গ্রন্থগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে, যার উপর ইসলামী শরী'আত দাঁড়িয়ে আছে, যার দিকে সালাফে সালেহীনের আলেমগণ আহ্বান জানাতেন, যে পথে চলে তারা হিদায়াত পেতেন, যার ওপর তারা নির্ভর করতেন। [দেখুন, লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ, পৃ. (১/২৮)]
১৮৩, তিনি হচ্ছেন আবু আব্দুল্লাহ উবায়দুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ ইবন মুহাম্মাদ ইবন হামদান ইবন বাত্তাহ আস-সুলামী, আল-উকবারী আল-হাম্বলী, যাকে 'ইবন বাত্তাহ' উপাধীতে ডাকা হয় তারই কোনো এক পূর্বপুরুষের নাম অনুসারে। বাল্যকালেই ইলম অর্জনের জন্য সফর করেন। তিনি হাদীস শুনেছেন ইবন মানী' আল-বাগাওয়ী থেকে বাগদাদে, ইমাম আহমাদের মুসনাদের বর্ণনাকারী আবু বকর আল-কাত্বী'ঈর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছেন, আরও শুনেছেন আবু আব্দুল্লাহ আল-মুহামেলী, আবু বকর আব্দুল আযীয গোলাম আল-খাল্লাল, ইবন সা'য়েদ প্রমুখ থেকে। আর তার থেকে হাদীস শুনেছেন আবু নু'আইম আল-আসফাহানী, আবু তালেব আল-'উশারী প্রমুখ। তার রয়েছে অনেক গ্রন্থ। তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, রিসালাতুন ফী ইবত্বালিল হিয়াল, 'আশ-শারহু ওয়াল ইবানাহ আলা উসূলিস সুন্নাতি ওয়াদ দিয়ানাহ' যা আল-ইবানাতুস সুগরা নামে বিখ্যাত। দেখুন, তারীখে বাগদাদ (১০/৩৭১); যাইলু ত্বাবাক্বাতুল হানাবিলাহ (৪/১৫৪); শাযরাতুয যাহাব (৩/১২২); অনুরূপ কিতাব আশ-শারহু ওয়াল ইবানাহ এর ভূমিকায় শাইখ রিদ্বা না'সান এর বক্তব্য। ইবন বাত্তাহ রাহিমাহুল্লাহর গ্রন্থ লেখার নিয়ম হচ্ছে মুহাদ্দেসীনের পদ্ধতি। যেমনটি করতেন আবু বকর আল-আজুররী তার আশ-শরী'আহ গ্রন্থে। [মাজমূ' ফাতাওয়া (৬/৫২-৫৩)] তার জন্ম সন হিজরী ৩০৪, আর তিনি হিজরী ৩৭৮ সালে মারা যান।
১৮৪. এখানে ইবন বাত্তার অপর বড় গ্রন্থটির কথাই বলা হচ্ছে, যার নাম 'আল-ইবানাহ আন শরী'আতিল ফিরাকিন নাজিয়াহ ওয়া মুজানাবাতিল ফিরাক্কিল মাযম্মাহ' বা কখনো কখনো শুধু 'আল-ইবানাহ' বলা হলেও মূলত তা 'আল-ইবানাহ আল-কুবরা' নামে বেশি পরিচিত। এটির তাহক্বীক করেছেন শাইখ রিদ্বা না'সান, উসমান ইথিওবী ও ইউসুফ আল-ওয়াবেল। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এ গ্রন্থ থেকে প্রচুর বর্ণনা করতেন। যেমন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/৪২, ৩৭৬, ৩৯৬), (৬/৪০২, ৪০৪, ৪১২, ৪১৫, ৪১৯), (৭/১৮০, ৬৬০) আরও বহু জায়গায় তিনি অনেক উদ্ধৃতি এখান থেকে নিয়েছেন।
১৮৫. তিনি হচ্ছেন আবু যর আব্দুল্লাহ (মতান্তরে 'আব্দ যেমটি যাহাবী বলেছেন] ইবন আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ আল-আনসারী আল-হারাওয়ী, আল-মালেকী। তবে তিনি মৌলিকভাবে আশআরী মতবাদের লোক ছিলেন। তিনি কাদ্বী আবু বকর ইবনুত ত্বাইয়্যেব থেকে ইলমুল কালাম এর সবক নিয়েছিলেন। তার অন্যান্য উস্তাদগণের অন্যতম হচ্ছেন দারাকুতনী, আবু ইসহাক আল-মুস্তামেল্লী, আবু ইসহাক্ক আদ-দীনাওয়ারী প্রমুখ। তার থেকে বর্ণনা করেছেন আবুল ওয়ালীদ আল-বাজী, মূসা ইবন আলী আস-সাক্বলী প্রমুখ। তার থেকে ইজাযতের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন (প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের হাফেযদ্বয়) ইবন আব্দুল বার ও খত্বীব আল-বাগদাদী।
অনেক বড় পরহেযগার, দানশীল ও নেককার লোক ছিলেন। যাহাবী বলেন, তিনি বাগদাদের সুন্নাহ ও হাদীস নিয়ে মু'তাযিলা, রাফেযা ও কাদরিয়াদের সাথে বিতর্ক করতেন।... তিনি সহীহ বুখারীর একজন বর্ণনাকারী ছিলেন। ইমাম বুখারী থেকে তিনজন তা বর্ণনা করেছেন, আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ ইবন হাম্মুওইয়াহ ইবন ইউসুফ ইবন আ'ইয়ুন আল-মুসতামিল্লী, হামাওয়ী ও কুশমুইহানী। তিনি এ তিনজন থেকে এটি বর্ণনা করেছেন। [ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৭/৫৫৬)]
তার জন্ম ৩৫৫ হিজরী, মৃত্যু ৪৩৪ বা ৪৩৫ হিজরী। তার রচিত গ্রন্থাবলির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, আল-জামে'উ, আদ-দু'আউ, ফাদ্বায়েলুল কুরআন, দালায়েলুন নবুওয়াহ, আর কিতাবুস সুন্নাহ, যা ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ উপরে বর্ণনা করেছেন। তবে কিতাবটি বর্তমানে হারিয়ে যাওয়া গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। দেখুন, তারীখে বাগদাদ (১১/১৪১); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৭/৫৫৪); তাযকিরাতুল হুফফায (৩/১১০৩); ইবনুল 'ইমাদ, শাযরাতুয যাহাব (৩/২৫৪)।
১৮৬. তিনি হচ্ছেন আবু 'উমার আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহ আল-মু'আফেরী, আল-আন্দালুসী আত্ব-ত্বালামানকী। তাকে ত্বালামাঙ্ক শহরের দিকে সম্পৃক্ত করে ত্বালামাঙ্কী বলা হয়। মালেকী ইমামগণের অন্যতম। অত্যন্ত দৃঢ় ইমাম ছিলেন। স্পেনের মানুষ তার ইলম দ্বারা অনেক উপকৃত হয়েছেন। ইবন বাশকুওয়াল বলেন, 'তিনি ছিলেন বিদ'আতীদের বিরুদ্ধে উন্মুক্ত তরবারীর মতো, তাদের দমনকারী, শরী'আতের ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন, আল্লাহর ব্যাপারে কঠোর...' ৪২৯ হিজরীতে মারা যান। তার গ্রন্থাবলির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, আল-উসূল [যেমনটি উপরে এসেছে] বা আল-ওসূল ইলা মা'রিফাতিল উসূল। [দারউত তা'আরুদ্ব (৬/২৫০); ইবনুল কাইয়্যেম, আস-সাওয়া'য়িকুল মুরসালাহ (৪/১২৮৪); যাহাবী, আল-উলু, পৃ. ১৭৮] তবে সম্ভবত গ্রন্থটি হারিয়ে যাওয়া গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৭/৫৬৬); আল-ইবার (৩/১৬৮); সাফাদী, আল-ওয়াফী বিল ওফায়াত (৮/৩২); ইবনুল 'ইমাদ, শামরাতুয যাহাব (৩/২৪৩)।
১৮৭. তিনি হচ্ছেন আবু 'উমার ইউসুফ ইবন আব্দুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল বার আন-নামেরী আল-আন্দালুসী, আল-কুরতুবী আল-মালেকী। প্রতীচ্য দেশের হাফেয। তিনি ছিলেন ইমাম, আলেম, সুন্নাহ ও ইত্তেবার ব্যক্তি। যাহাবী তার সম্পর্কে বলেন, "তিনি আকীদাহ'র ক্ষেত্রে সালাফে সালেহীনের মাযহাবে ছিলেন। কখনও ইলমুল কালামে প্রবেশ করেননি..." ইমাম ইবন আব্দুল বার স্পেনে বসবাস করেন ও সেখানেই হিজরী ৪৩৬ হিজরীতে মারা যান। তার রচিত গ্রন্থসমূহের অন্যতম হচ্ছে, আত-তামহীদ, আল-ইস্তেযকার, আল-ইস্তী'আব, জামে'উ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাছলিহী, আল-ইস্তেক্কা ইত্যাদি। [দেখুন, ইবনু খাল্লিকান, ওফায়াতুল আ'ইয়ান (৭/৬৬); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৮/১৫৩); ইবার (৩/২৫৫); ইবন কাসীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (১২/১০৪)] ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, আবু হামেদ আল-গাযালী কালামশাস্ত্রের নিন্দায় যা বর্ণনা করেছেন তা ইমাম ইবন আব্দুল বার এর কিতাব 'জামে'উ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাদ্বলিহী' থেকে নকল করেছেন। [দারউত তা'আরুদ্ব (৭/১৫৬-১৫৭)] এখানে ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ ইবন আব্দুল বার এর যে বক্তব্যের কথা বলেছেন তা তার তামহীদ কিতাবের সপ্তম খণ্ডে এসেছে।
১৮৮. তিনি হচ্ছেন হাফেয আবু বকর আহমাদ ইবনুল হুসাইন ইবন আলী আল-ফক্বীহ, আশ-শাফে'য়ী। ইমাম হাকেম এর বড় ছাত্রদের একজন। আর বাইহাক্ব হচ্ছে নাইসাপূর এর একটি গুচ্ছগ্রামের নাম। হিজরী ৩৮৪ তে জন্ম, আর হিজরী ৪৫৮ সালে মৃত্যু। অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন, যেমন: আস- সুনানুল কুবর দশ খণ্ডে, আস-সুনানুস সগীর অনেক খণ্ডে, শু'আবুল ঈমান, দালায়েলুন নবুওয়াহ, আল-আসমা ওয়াস সিফাত, আল-ই'তিক্কাদ ইত্যাদি। দেখুন, ইবনু খাল্লিকান, ওফায়াতুল আ'ইয়ান (১/৭৫); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৮/১৬৩); তাযকিরাতুল হুফফায (২/১১৩২); ইবনুল 'ইমাদ, শাযরাতুয যাহাব (৩/৩০৪)। আকীদায় তিনি অধিকাংশ জায়গায় আশ'আরী ছিলেন। কারণ তিনি তার উস্তাদ ইবন ফুওরাক দ্বারা বেশি প্রভাবিত ছিলেন ও তার কন্যাকে বিবাহ করেছিলেন। ইবন তাইমিয়‍্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
"ইমাম বাইহাক্বী যখন আকীদাহ'র গ্রন্থ লেখতে চাইলেন তখন তিনি ইমাম আহমাদের আকীদাহ লিখতে চাইলেন। কিন্তু তিনি তা লিখার ক্ষেত্রে আবুল ফদ্বল আব্দুল ওয়াহিদ ইবন আবিল হাসান আত-তামীমীর বর্ণনায় নির্ভর করেন। বস্তুত এ তামীমীর বর্ণনা সরাসরি ইমাম আহমাদের শব্দ নয়। তামীমী ফিকহের বর্ণনার মত ইমাম আহমাদ থেকে নিজ ভাষায় তা বর্ণনা করতেন। ফলে তামীমীর এসব বর্ণনায় অনেক মুনকার শব্দ প্রবেশ করে, যার কারণে বাইহাকী বেশ কিছু স্থানে সহীহ আকীদাহ'র বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। অথচ তিনি মনে করছিলেন যে, এটা ইমাম আহমাদের মত। বাস্তবে তা ইমাম আহমাদের মত নয়।" [দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৪/১৭৬), (৬/৫৩), (১২/৩৬৭); আল-মুস্তাদরাক আলাল ফাতাওয়া (১/৮৫)]
বাইহাক্বী রাহিমাহুল্লাহর 'আল-আসমা ওয়াস সিফাত' যাহেদ কাউসারী কর্তৃক যে তাহকীক রয়েছে তা ভুল ও তাহরীফ বা বিকৃতিতে ভরপুর। পরবর্তীতে এটি বিশুদ্ধ তাহকীকে অন্যদের থেকে দু খণ্ডে বের হয় তা যথাযথ।
ইমাম বাইহাক্বীর আকীদাহ'র অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা আমি আমার "রহমান আরশের উপর উঠেছেন” গ্রন্থে করেছি। সেখানে দেখার অনুরোধ থাকল।
১৮৯. তিনি হচ্ছেন আবুল কাসেম সুলাইমান ইবন আহমাদ আল-লাখমী আত-ত্বাবারানী। হাদীসের ইমামগণের মধ্যে বড় একজন ইমাম। তিনি আবু যরআহ আদ-দিমাশকী, ইসহাক্ক ইবন ইবরাহীম আদ-দাবারী, ইদ্রীস ইবন জা'ফার আল-'আত্ত্বার প্রমুখ থেকে হাদীস বর্ণনা করেন। তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেন ইবন মান্দাহ, আবু বকর ইবন মারদুওইয়াহ, আবু নু'আইম আল-আসফাহানী প্রমুখ। তার রচিত গ্রন্থাবলির মধ্যে বিখ্যাত হচ্ছে, আল-মু'জামুল কাবীর, আল-মু'জামুল আওসাত্ব ও আল-মু'জামুস সগীর। আসফাহানে ৬০ বছর হাদীসের অধ্যাপনা করেন। তার জন্ম হিজরী ২৬০ সালে আর মৃত্যু হিজরী ৩৬০ সালে। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৬/১১৯)। তার যে গ্রন্থের কথা এখানে ইমাম ইবন তাইমিয়‍্যাহ বলছেন তা হারিয়ে যাওয়া কিতাবের অন্তর্ভুক্ত। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ তার এ কিতাব থেকে অনেক বেশি চয়ন করেছেন। যেমন, দারউত তা'আরুদ্ব (৭/১০৮); আত-তিস'ঈনিয়্যাহ (১/৩৬৫), (২/৩৯০, ৬৯৬); মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/৩৭৯), (৪/৫৩৯), (৩৩/১৭৩)। অনুরূপ ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম এ গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত করেছেন। [হাদীউল আরওয়াহ (২/৬৪৩); উদ্দাতুস সাবেরীন, পৃ. ৫৩৮] ইমাম ইবন হাজার আল-আসকালানী তার 'তাজরীদু আসানীদিল কুতুবিল মাশহূরাহ' গ্রন্থে এ কিতাবটির কথা তার সনদে উল্লেখ করেছেন। আর তিনি তার ফাতহুল বারীতে সেখান থেকে বর্ণনা নিয়ে এসেছেন। [ফাতহুল বারী (৫/১৮৩), (৮/১৯৯)] দেখুন, ইবনু খাল্লিকান, ওফায়াতুল আ'ইয়ান (২/৪০৭); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৬/১১৯); তাযকিরাতুল হুফফায (৩/৯১২); ইবন হাজার, লিসানুল মীযান (৩/৭৩); আল-কাত্তানী, আর-রিসালাতুল মুস্তাতরাফাহ, পৃ. ৩৮।
১৯০, তিনি হচ্ছেন আবুশ শাইখ, আবু মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ ইবন জা'ফর আল-আসফাহানী। সুন্নাহ ও ইত্তেবাতে প্রসিদ্ধ। হাদীস শোনার জন্য বিভিন্ন দেশে সফর করেন। তাফসীরশাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন।
তার সম্পর্কে ইমাম যাহাবী বলেন, তিনি আমলকারী আলেমগণের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, সুন্নাহ'র অনুসরণ করতেন। জন্ম হিজরী ২৭৪ সালে, আর মৃত্যু ৩৬৯ হিজরী সালে।
তার রচিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, সাওয়াবুল আ'মাল। অনুরূপ আস-সুন্নাহ, যেদিকে ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ ইঙ্গিত করেছেন, তবে বর্তমানে তা হারিয়ে যাওয়া কিতাবসমূহের অন্তর্ভুক্ত। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এ গ্রন্থ থেকে তার একাধিক গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন। যেমন, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/১০৫), (৬/৩৭৬-৩৭৭); দারউত তা'আরুদ্ব (৭/১০৮); আত-তিস'ঈনিয়‍্যাহ (১/৩১৫), (২/৩৯৪, ৪২২); মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/৩৭৯), (৬/৫৩২), (১৭/৭৫)। অনুরূপভাবে ইবনুল কাইয়্যেম রাহিমাহুল্লাহ সে গ্রন্থ থেকে বর্ণনা করেছেন। দেখুন, যাদুল মাআদ (৩/৬৭৮)। এ গ্রন্থটিকে আবু সা'দ আস-সাম'আনী 'আস-সুন্নাতুল ওয়াছিহাহ' নামকরণ করেছেন। দেখুন, আত-তাহবীর ফিল মু'জামিল কাবীর (১/১৯০)। তবে ইমাম আবুশ শাইখ এর 'আখলাকুন নবী ও আদাবুহু' গ্রন্থের মুহাক্কিক সালেহ আল-ওনাইয়‍্যান বলেন, কিতাবটি হারিয়ে যাওয়া কিতাবের মধ্যে গণ্য। অনুরূপ তার গ্রন্থসমূহের অন্যতম হচ্ছে, 'কিতাবুল 'আযামাহ' যা কয়েক খণ্ডে তাহকীকসহ ছাপা হয়েছে।
১৯১. তিনি হচ্ছেন আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক্ক ইবন মুহাম্মাদ ইবন ইয়াহইয়া ইবন মানদাহ, আল-আবাদী, আল-আসফাহানী, আল-হাফেয, আল-মুহাদ্দিস। তার যমানার সবচেয়ে বড় পরিব্রাজক। ইমাম যাহাবী তার সম্পর্কে বলেন, আমি তার চেয়ে কাউকে বড় পরিব্রাজক দেখিনি। তার থেকে বড় হাদীস বিশারদও দেখিনি। সাথে সাথে তার ছিল প্রচণ্ড ধীশক্তি ও নির্ভরযোগ্যতা। আমার কাছে এ মর্মে খবর রয়েছে যে, তার শিক্ষক সংখ্যা এক হাজার সাতশত জন।
তিনি পুরো তেত্রিশ বছর হাদীস ও ইলমের জন্য সফর করেন। তার জন্ম হয়েছিল হিজরী ৩১০ সালে, আর মৃত্যু ৩৯৫ হিজরী সালে।
তিনি হাদীস শুনেছেন, আবু সা'ঈদ ইবনুল আ'রাবী, আবুল আব্বাস আল-আসাম্ম প্রমুখ থেকে। আর তার থেকে হাদীস শুনেছেন আবু আব্দুল্লাহ আল-হাকিম, হামযাহ ইবন ইউসুফ আস-সাহমী, আবু নু'আইম আল-আসফাহানী প্রমুখ। ইমাম আবু নু'আইম এর কাছে ইবন মানদাহ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি জবাব দেন, তিনি তো পাহাড়সমূহের একটি পাহাড় ছিলেন। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ তার একাধিক গ্রন্থে ইবন মানদাহ এর কিতাবুস সুন্নাহ এর উল্লেখ করেছেন। যেমন, শারহুস আসফাহানিয়‍্যাহ, পৃ. ২০৭; আত-তিস'ঈনিয়‍্যাহ (১/১৬৬); মিনহাজুস সুন্নাহ (২/৩৬৫); মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/৩৭৯), (৫/৪১৩), (১৭/৭৫)।
তার গ্রন্থাবলির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, কিতাবুল ঈমান, কিতাবুত তাওহীদ, কিতাবুস সিফাত, কিতাবুর রাদ্দি 'আলাল জাহমিয়্যাহ। আর কিতাবুস সুন্নাহ, যার দিকে ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ উপরে ইঙ্গিত করেছেন।
দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৭/২৮); তাযকিরাতুল হুফফায (৩/১০৩১); মীযানুল ই'তিদাল ৩/৪৭৯; ইবন হাজার, লিসানুল মীযান ৫/৭০; কাত্তানী, আর-রিসালাতুল মুস্তাত্বরাফাহ পৃ. ৩৮।
১৯২. তিনি হচ্ছেন আবু আহমাদ মুহাম্মাদ ইবন আহমাদ ইবন ইবরাহীম ইবন সুলাইমান আল-'আসসাল আল-আসফাহানী, আল-ক্বাদ্বী, যিনি আসসাল নামে সমধিক পরিচিত। তিনি হাদীস বর্ণনা করেন, মুহাম্মাদ ইবন উসমান ইবন আবী শাইবাহ, হাসান ইবন আলী আস-সাররী প্রমুখ থেকে। আর তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেন, ইবন আদী, ইবন মানদাহ, ইবন মারদুওইয়াহ প্রমুখ। ইবন মান্দাহ বলেন, আমি দু'বার সারা দুনিয়া সফর করেছি, তবে কোথাও আসসালের দৃষ্টান্ত পাইনি। তার রচিত অনেক গ্রন্থের অন্যতম হচ্ছে, কিতাবু তাফসীরিল কুরআন, কিতাব আত-তারীখ, কিতাব আল-আমসাল, কিতাবুল আযামাহ। আর তার রয়েছে কিতাবুস সুন্নাহ; যার কথা ইবন তাইমিয়্যাহ এখানে বর্ণনা করেছেন। তাছাড়া অন্যত্রও তিনি তা বর্ণনা করেছেন, যেমন, দারউত তা'আরুদ্ব (৭/১০৮); আত-তিস'ঈনিয়‍্যাহ (১/১৬৬)।
দেখুন, খত্বীব আল-বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ (১/২৭০); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৬/৬); আল-ইবার (২/২৮২); ইবনুল 'ইমাদ, শাযরাতুয যাহাব (২/৩৮০)।
১৯৩. তিনি হচ্ছেন ইমাম আবু বকর আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ ইবন হারুন ইবন ইয়াযীদ আল-খাল্লাল। হাম্বলীদের শাইখ, তাদের ইমাম ও আলেম। খাল্লাল শব্দের অর্থ ভিনেগার তৈরিকারী; কারণ তিনি তা করতেন। তিনি ইমাম আহমাদের অনেক ছাত্রের কাছ থেকে ইলম ও ফিকহ নিয়েছেন। আবু বকর আল-মাররূযীর হাত থেকে হাদীস নিয়েছেন, অনুরূপ তার উস্তাদদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন হারব আল-কিরমানী, ইমাম আহমাদের দু' সন্তান সালেহ ও আব্দুল্লাহ। তার থেকে বর্ণনা পাওয়া একটি বড় মূল্যবান সম্পদ; কারণ তার থেকে এসব বর্ণনা নিয়ে এসেছেন, তারই দাস আব্দুল আযীয ইবন জা'ফর, যিনি গোলাম আস-খাল্লাল নামে প্রসিদ্ধ। তিনি খাল্লাল এর আস-সুন্নাহ কিতাবটির বর্ণনাকারী। ইমাম আহমাদের মাসআলাসমূহ জমা করার জন্য অনেক কষ্ট করেছেন, অনেক দেশ সফর করেছেন। এমনকি ইমাম যাহাবী বলেন, তার আগে ইমাম আহমাদের আলাদা কোনো মাযহাব ছিল না। তিনিই ইমাম আহমাদ এর মাসআলাসমূহকে সাজিয়ে লিখেন। তার সম্পর্কে ইবন নাসেরউদ্দীন বলেন, তিনি একজন পরিব্রাজক, প্রশস্ত ইলমের অধিকারী, কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবায়ে কিরাম ও সালাফদের বক্তব্য ও পদাঙ্ক জমা করার ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্ব প্রদান করেছেন। তার জন্ম হিজরী ২৩৪ সালে আর মৃত্যু হিজর ৩১১ সালে। তার রয়েছে অনেক গ্রন্থ, তন্মধ্যে বিখ্যাত হচ্ছে, আল-জামে'উ লি উলুমি আহমাদ, এ গ্রন্থটি সম্পর্কে ইবন কাসীর বলেন, 'ইমাম আহমাদ এর মাযহাবে এ গ্রন্থের মত আর কোনো গ্রন্থ লেখা হয়নি।' এছাড়া তার অন্যান্য গ্রন্থ হচ্ছে আল-'ইলাল, আত-ত্বাবাক্বাত ইত্যাদি।
দেখুন, আবু ইয়া'লা, ত্বাবাক্বাতুল হানাবিলাহ (২/১২); খত্নীবে বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ (৫/১১২); ইমাম যাহাবী, তাযকিরাতুল হুফফায (৩/৭৮৫); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৪/২৯৭)।
১৯৪. আস-সুন্নাহ নামক এ গ্রন্থটি সম্পর্কে বলা হয় যে, তা তার অন্য গ্রন্থ আল-জামে'উ লি উলূমি আহমাদ এর অংশ। যেমনটি হাজী খলীফা তাঁর কাশফুয যুনূন গ্রন্থে বলেছেন (১/৫৭৬); ব্রকেলম্যান, তারীখু আল আদাবিল আরাবী (২/৩১৪); ফুয়াদ সিযকীন, তারীখ আত-তুরাস আল-আরাবী (৩/৩৩৩)। তবে অন্যরা সেটাকে আলাদা গ্রন্থই বলেছেন। এ কিতাবটি সম্পর্কে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়‍্যাহ রাহিমাহুল্লাহ যা বলেছেন তা যথার্থ, তিনি এ কিতাব থেকে তার অনেক গ্রন্থে বর্ণনা এনেছেন। যেমন, আল-ইস্তিকামাহ (১/২০৫); আস-সাফাদিয়‍্যাহ (২/১৬৪); আসাব'ঈনিয়‍্যাহ (বুগইয়াতুল মুরতাদ) (পৃ. ৪৭০); বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/৩৪৯, ৪২৮, ৪৩০), (২/১৬১, ১৬২, ১৬৩, ২১৩, ৩৪৯, ৪১৭); মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/৩২২, ৩২৪), (৬/১৬১), (৭/৪৪৬, ৬৬০), (৮/১০৩, ৪০৭)। তাছাড়া তিনি এ কিতাবের ভূয়শী প্রশংসা করে বলেন, 'এটি হচ্ছে ইমাম আহমাদ থেকে দীনী উসূলী মাসআলার বর্ণনার ক্ষেত্রে একটি পূর্ণ গ্রন্থ; যদিও এখানে যা আছে তার চেয়েও বাড়তি কথা অন্যত্র আছে। যেমনিভাবে ইলমের ওপর তার লেখা গ্রন্থটি একটি পরিপূর্ণ গ্রন্থ; যাতে উসূলে ফিকহ সম্পর্কে ইমাম আহমাদের কথাকে একত্রিত করা হয়েছে।' [মাজমূ' ফাতাওয়া (৭/৩৯০)]
অন্যত্র তিনি বলেন, 'আবু বকর আহমদ ইবন হারুন আল-খাল্লাল, তিনিই সে ব্যক্তি যিনি উসূলুদ দীন তথা আকীদাহ, উসূলে ফিকহ, ফিকহ, অনুরূপ আদাব, আখলাক, যুহদ, রাক্কায়িক, ইলালিল হাদীস, তারীখ ইত্যাদি ইসলামী ইলম সংক্রান্ত ইমাম আহমাদের কথা একত্রিত করেছেন।' [মাজমু' ফাতাওয়া (১২/৩২৫)]
ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, 'এ গ্রন্থে তিনি ইমাম আহমাদের যাবতীয় ভাষ্য ও বক্তব্য জমা করেছেন। যেমনটি বাইহাকী জমা করেছিলেন তার "জামে'উন নুসূস মিন কালামিশ শাফেয়ী" গ্রন্থে। এ দু'টি গ্রন্থ অত্যন্ত সম্মানিত, যা থেকে আলেম কখনো অমুখাপেক্ষী হতে পারে না। [ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমাউল জুয়ুশিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ২০২]
বর্তমানে ইমাম খাল্লালের আস-সুন্নাহ নামীয় এ কিতাবটির একটি অংশ তাহকীক হয়ে বের হয়েছে। সে অংশ তাহকীক করেছেন শাইখ ড. আতিয়্যাহ আতীক আয-যাহরানী, যার পৃষ্ঠা সংখ্যা ৬০৮। এতে আহলুল হাদীসদের মতো করে মাসআলা লিপিবদ্ধ করা হয়। বাকী অংশ এখনো আলোর মুখ দেখেনি।
১৯৫. ইমামুল আয়িম্মাহ ইবন বুযাইমাহ রাহিমাহুল্লাহর এ গ্রন্থটির পূর্ণ নাম, কিতাবুত তাওহীদ ওয়া ইসবাতু সিফাতির রাব্ব। এ গ্রন্থটি আকীদাহ'র একটি আকর গ্রন্থ। পরবর্তী প্রত্যেক আলেম এ গ্রন্থ থেকে তথ্য চয়ন করেছেন। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এ গ্রন্থ থেকে তার অনেক গ্রন্থে তথ্য উপাত্ত এনেছেন। যেমন, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/৫৭০), (২/৪৩৬, ৪৩৯); মাজমু ফাতাওয়া (৩/১৯২), (৬/৪৬৭, ৪৯৭)।
যারা নব্য জাহমিয়্যাহ, যারা কট্টর আশ'আরী ও কট্টর মাতুরিদী এ কিতাবটি তাদের গলার কাঁটা হয়ে আছে। তারা এটা সহ্য করতে পারছে না; কারণ তিনি এ কিতাবে আল্লাহর সিফাত সাব্যস্ত করার জন্য যাবতীয় হাদীসের সন্নিবেশ করেছেন। এজন্য দেখা যায় ইবন ফুওরাক, রাযী ও কাউসারীরা এ কিতাবকে কিতাবুশ শির্ক বলে, আর তারা এর গ্রন্থকারকে মুশাব্বিহ, মুমাসসিল, মুজাসসিম ইত্যাদি যা ইচ্ছা গালি-গালাজ করে। আলহামদুলিল্লাহ, তাদের সেসব সন্দেহ যথাযথ উত্তর দিয়েছেন ড. সাদেক সালিম সাদেক তার "নুবযাতুন লাতীফাতুন ফী রাদ্দি বা'দ্বি তাশগীবাতিল মু'আত্ত্বিলাতি আলাল ইমাম ইবন খুযাইমাহ ওয়া কিতাবুত তাওহীদ"।
১৯৬, তিনি হচ্ছেন আবুল আব্বাস আহমাদ ইবন 'উমার ইবন সুরাইজ আল-বাগদাদী, আশ-শাফেয়ী। সে সময়কার সবচেয়ে বড় আকীদাহ'র আলেম ও সুন্নাহ'র অনুসারী। তিনি হাদীস শুনেছেন হাসান ইবন মুহাম্মাদ আয-যা'ফরানী (শাফেয়ীর ছাত্র), আবু দাউদ আস-সিজিস্তানী, আব্বাস ইবন মুহাম্মাদ আদ- দূরী প্রমুখ থেকে। আর তার থেকে হাদীস শুনেছেন আবুল কাসেম আত-ত্বাবারানী, আবু আহমাদ ইবন গিত্বরীফ আল-জুরজানী প্রমুখ। আবু ইসহাক্ক ইসফারায়ীনী বলতেন, আমরা আবুল আব্বাসের সাথে ফিকহের প্রকাশ্য দিক নিয়ে চলতাম, তার সূক্ষ্মতার বিষয়টিতে শরীক হতে পারতাম না। ইবন সুরাইজ বলতেন, ফিকহ শিখতে এসে কালাম শিক্ষায় রত হওয়া খুব কম সংখ্যককেই আমি সফল হতে দেখেছি। সে ফিকহের জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। কালামের অভিষ্ট লক্ষ্যে তো পৌঁছতে পারেই না। তার মৃত্যু হয়েছিল হিজরী ৩০৬ সালে। দেখুন, খত্নীবে বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ (৪/২৭৮); ইবনু খাল্লিকান, ওফায়াতুল আ'ইয়ান (১/৬৬); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৪/২০১); ইবনুল 'ইমাদ, শাযরাতুয যাহাব (২/২৪৭)। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ তার থেকে অনেক মাসআলা বর্ণনা করেছেন। যেমন, বায়ানু তালবীসুল জাহমিয়্যাহ (২/৫৬২); মাজমূ' ফাতাওয়া (১৭/১০০, ১০৪, ৩০৫); দারউত তা'আরুদ্ব (৭/১৮৫); আত-তিস'ঈনিয়‍্যাহ (৩/৭৮৯)।
১৯৭, কোনো কোনো নুসখায় এসেছে, যেমন ইমাম বুখারী ও তার উস্তাদ আব্দুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ আল- জু'ফীর লেখা গ্রন্থ।
১৯৮. 'আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ' বা জাহমিয়্যাদের মতবাদ খণ্ডণ করে এ শিরোনামে অনেক গ্রন্থ রচিত হয়েছে, যেমন, ১- ইমাম আহমাদ এর আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়‍্যাহ ২- ইমাম ইবন আবী হাতেম এর আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ ৩- ইমাম বুখারী এর আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ ৪- ইমাম ইবন মানদাহ এর আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়‍্যাহ ৫- ইমাম দারেমী এর আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ ৬- ইমাম ইবন কুতাইবাহ এর আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ ইত্যাদি।
১৯৯. তিনি হচ্ছেন আবু আব্দুর রহমান আব্দুল্লাহ ইবন ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল। তার পিতার হাতে বড় হন। তার কাছ থেকে সকল হাদীস শুনেন। সেজন্য তিনি তার পিতার হাদীসের অধিক বর্ণনাকারী। তার সম্পর্কে খতীব আল-বাগদাদী বলেন, তিনি ছিলেন প্রামাণ্য, নির্ভরযোগ্য ও সমঝদার লোক। তার জন্ম হিজরী ২১৩ আর মৃত্যু হিজরী ২৯০ সালে। তার রচিত গ্রন্থাবলির অন্যতম হচ্ছে, মাসায়েলে ইমাম আহমাদ বিরিওয়ায়াতে আব্দিল্লাহ, আল-ইলাল, ফাদ্বায়িলে উসমান ইবন আফফান ইত্যাদি। দেখুন, খত্নীবে বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ (১/৩৭৫); আবু ইয়া'লা, ত্বাবাক্বাতুল হানাবিলাহ (১/১৮০); যাহাবী, আল-ইবার (২/৮৬); কাত্তানী, আর-রিসালাতুল মুস্তাত্বরাফাহ, পৃ. ৩৭।
২০০. আব্দুল্লাহ ইবন ইমাম আহমাদ এর আস-সুন্নাহ গ্রন্থটি দু' খণ্ডে ছাপা হয়েছে, যা ড. মুহাম্মাদ সা'ঈদ আল-ক্বাহত্বানীর তাহকীকে বের হয়েছে, যা ৬৪৮ পৃষ্ঠায় সমাপ্ত। এ গ্রন্থটি সালাফী ও সহীহ আকীদাহ'র অন্যতম উৎসগ্রন্থ। এটি অনেকাংশেই ইমাম লালেকাঈ এর শারহু উসূলি ই'তিক্বাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ' গ্রন্থ এবং ইমাম ইবন বাত্তাহ এর 'আল-ইবানাহ'র মতোই। যাতে সনদের মাধ্যমে আকীদাহ'র বর্ণনাগুলো তুলে ধরা হয়েছে। তবে আব্দুল্লাহ ইবন ইমাম আহমাদ এর এ গ্রন্থটির একটি বিশেষত্ব হচ্ছে এতে জাহমিয়্যাদের ওপর রদ্দ করার বিষয়টি বিস্তৃতভাবে এসেছে। উল্লেখ্য যে, শাইখ সালেহ ফাউযান, শাইখ সালেহ আলে আশ-শাইখ ও শাইখ ইবন জিবরীন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এ গ্রন্থে ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ সংক্রান্ত বর্ণনাগুলো প্রথম সংস্করণে ছিল না; কারণ সেগুলো আলেমগণের কাছে প্রক্ষিপ্ত মনে হয়েছিল। পরবর্তীতে যারা এটিকে তাহকীক করে বের করেছেন তারা এ অংশ জুড়ে দিয়ে ভালো কাজ করেননি। দেখুন, https://www.youtube.com/watch?v=CO4bMIHEt_k https://www.youtube.com/watch?v=_WBOFCI3uhs https://www.youtube.com/watch?v=ossD7gqlIJw https://www.youtube.com/watch?v=xWJoolhFLfU
২০১. তিনি হচ্ছেন আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ ইবন হানে', আল-আসরম, আত-ত্বায়ী, ইমাম আহমাদের ছাত্র ও তার হাম্বলী মাযহাবের বর্ণনাকারী। তার মৃত্যু হিজরী ২৭৩ সালে। তিনি হাদীস শুনেছেন আবু নু'আইম, 'আফফান, কা'নাবী প্রমুখ থেকে। তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেন নাসায়ী তার সুনানে, মূসা ইবন হারুন, ইয়াইয়া ইবন স্বা'য়েদ প্রমুখ। আবু বকর আল-খাল্লাল বলেন, আসরম অত্যন্ত সম্মানিত ও হাফেয ছিলেন। যাহাবী বলেন, তিনি অত্যন্ত জাগ্রত লোক ছিলেন; এমনকি তাকে ইয়াহইয়া ইবন মা'ঈন ও ইয়াহইয়া ইবন আইয়্যুব আল-মুকাবেরী বলেন, আসরমের বাপ-মায়ের একজন মনে হয় জিন্ন ছিলেন। তাঁর রচিত গ্রন্থাবলির অন্যতম হচ্ছে, কিতাবুস সুনান, মুসান্নাফ ফী 'ইলালিল হাদীস ও কিতাবুস সুন্নাহ। উপরে শাইখুল ইসলাম এর দিকেই ইঙ্গিত করেছেন। তবে এ কিতাবটি বর্তমানে হারানো কিতাবের অন্তর্ভুক্ত। অবশ্য হাম্বলীদের গ্রন্থে আসরমের এসব তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে। দেখুন, আস-সুন্নাহ লিল খাল্লাল (১/১৪৪, ১৫২), (২/৩৫৯, ৪০২, ৪১৫, ৪৩৩, ৪৪৫); অনুরূপ ইবন বাত্তাহ, আল-ইবানাহ (২/২৪০), (৩/৫৯, ১৫৬, ২০৫, ৩৩০)। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ অনেক স্থানে এ কিতাবটি থেকে বর্ণনা এনেছেন। যেমন, শারহ আল-আসফাহানিয়‍্যাহ পৃ. ২০৬; মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/৪২, ৩৭৭), (৭/২৫৪, ৬৬৭); মিনহাজুস সুন্নাহ (২/৩৬৫); দারউত তা'আরুদ্ব (২/২৩); আর তিনি এ কিতাবের (৭/১০৮) পৃষ্ঠায় তার নাম দিয়েছেন কিতাবুস সুন্নাহ ওয়ার রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ। ইবনুল কাইয়্যেম এ কিতাব থেকে বর্ণনা করেছেন, ইজতিমা'উল জুয়ুশ, পৃ. ২৬৯; অনুরূপ নূনিয়াহতেও উল্লেখ করেছেন। দেখুন, আবু ইয়া'লা, ত্বাবাক্বাতুল হানাবিলাহ (১/৬৬); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১২/৬২৩); ইবনুল 'ইমাদ, শাযরাতুয যাহাব (২/১৪১); কাত্তানী, আর-রিসালাতুল মুস্তাত্বরাফাহ, পৃ. ৩৭।
২০২. তিনি হচ্ছেন আবু আলী হাম্বল ইবন ইসহাক ইবন হাম্বল আশ-শাইবানী। তিনি ইমাম আহমাদের চাচাতো ভাই ও তার ছাত্র। তিনি হাদীস শুনেছেন সুলাইমান ইবন হারব, আবু নুআইম প্রমুখ থেকে। আর তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেন ইবন স্বা'য়েদ, আবু বকর আল-খাল্লাল। তার রচিত গ্রন্থাবলির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, কিতাবুল ফিতান, কিতাবুল মিহনাহ ইত্যাদি। তার মৃত্যু হিজরী ২৭৩ সালে। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৩/৫১)।
ইবন তাইমিয়্যাহ হাম্বল এর এ গ্রন্থ আস-সুন্নাহ'র কথা কয়েকটি গ্রন্থে নিয়ে এসেছেন, যেমন, শারহ আল-আসফাহানিয়‍্যাহ, পৃ. ২০৬; আত-তিস'ঈনিয়‍্যাহ (১/১৬৩); মাজমূ' ফাতাওয়া (১৭/৭৪); শারহু হাদীসিন নুযূল (১৬/৪০৪)। খাল্লাল বলেন, হাম্বল ইমাম আহমদ থেকে বেশ কিছু বর্ণনা সুন্দরভাবে করেছেন, তবে কিছু বর্ণনায় আশ্চর্য অপরিচিত জিনিস নিয়ে এসেছেন। দেখুন, আবু ইয়া'লা, ত্বাবাক্বাতুল হানাবিলাহ (১/৩৮৪)। যাহাবী বলেন, ইমাম আহমাদ থেকে অনেক বর্ণনা করেছেন তবে তিনি একক কিছু বর্ণনা করেছে আর সেটাতে অগ্রহণযোগ্য অপরিচিত কিছু জিনিস নিয়ে এসেছেন। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৩/৫২)। ইবন তাইমিয়্যাহ দৃঢ়ভাবে নির্দিষ্ট করে বলেন, খাল্লাল ও তার সাথী আবু বকর আব্দুল আযীয গোলাম খাল্লাল তারা দু'জনে হাম্বল যা এককভাবে বর্ণনা করেছেন তা অস্বীকার করে থাকেন। অন্যরা এসব বর্ণনার কোনো কোনোটি গ্রহণ করে থাকেন, যেমন আবু আব্দুল্লাহ ইবন হামেদ। দেখুন, আল- ইস্তেকামাহ (১/৭৫)। ইবন তাইমিয়্যাহ আরও বলেন, হাম্বল বেশ কিছু বর্ণনা এককভাবে বর্ণনা করেছেন যাতে অন্যরা তাকে ভুল করেছে বলে থাকেন। যেমন খাল্লাল ও তার ছাত্র গোলাম খাল্লাল। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (১৬/৪০৫)। ইবন রাজাব বলেন, আবু বকর আল-খাল্লাল ও তার গোলাম খাল্লাল তারা দু'জন সেসব বর্ণনা যা ইমাম আহমাদ থেকে হাম্বল এককভাবে বর্ণনা করেছেন তা গ্রহণ করতেন না। দেখুন, ফাতহুল বারী (৫/৯৭)। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে, হাম্বল ইমাম আহমাদ থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি আল্লাহর বাণী 'وجاء ريك এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, অর্থাৎ তার নির্দেশ এসেছে ও তার ক্ষমতা এসেছে। আলেমগণ বলেন, এটাতে হাম্বল ইমাম আহমাদ এর ওপর ভুল করে এ তথ্য পেশ করেছেন।
২০৩. তিনি হচ্ছেন আবু বকর আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ ইবনুল হাজ্জাজ আল-মাররূযী (মারও জয এর দিকে সম্পর্ক করে)। তিনি ইমাম আহমাদ এর বড় ও সম্মানিত ছাত্রদের একজন ছিলেন। ইমাম আহমদ থেকে অনেক ইলম বর্ণনা করেছেন। খত্বীব আল-বাগদাদী বলেন, তিনি আহমাদ ইবন হাম্বলের ছাত্রদের মধ্যে অগ্রণী, তার পরহেযগারী ও ফযীলতের কারণে। আহমাদ তাকে নিয়ে প্রশান্তি পেতেন ও খুশি হতেন। ইমাম আহমাদ এর মৃত্যু হলে তিনিই তার চক্ষু বন্ধ করে দেন ও গোসল প্রদান করেন। যাহাবী বলেন, তিনি সুন্নাহ'র ইমাম ছিলেন, বিদ'আতীদের ওপর খড়গহস্ত ছিলেন, সুন্নাতের অনুসরণে প্রাণপন ছিলেন। বাগদাদের মানুষের মাঝে তার অনেক সম্মান ছিল। তার মৃত্যু হয়েছিল ২৭৫ হিজরীতে। দেখুন, আবু ইয়া'লা, ত্বাবাক্বাতুল হানাবিলাহ (১/৫৬); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৩/১৭৩); তাযকিরাতুল হুফফায (২/৬৩১); সাফাদী, আল-ওয়াফী বিল ওফায়াত (৭/৩৯৩)।
২০৪. তার সুন্নাহ নামীয় কোনো গ্রন্থ পাওয়া যায়নি। সম্ভবত অন্যান্য কিতাবে তার থেকে বর্ণিত সুন্নাহ ও আকীদাহ সংক্রান্ত বর্ণনাগুলোই ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ উদ্দেশ্য নিয়েছেন।
২০৫, ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ ইমাম আবু দাউদের যে কিতাব আস-সুন্নাহ'র কথা বলছেন তার অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। সম্ভবত তার সুনান গ্রন্থে তিনি আকীদাহ'র ওপর ৩২টি অধ্যায় রচনা করেছেন ও হাদীস নিয়ে এসেছেন, তাই উদ্দেশ্য নিয়ে থাকবেন। সেখানে তিনি আকীদাহ'র ওপর ১৭৬টি হাদীস নিয়ে এসেছেন। তাছাড়া ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ সে সুনান আবি দাউদ থেকেই তার বিভিন্ন গ্রন্থে হাদীস ও আছার নিয়ে এসেছেন। যেমন, শারহ আল-আসফাহানিয়‍্যাহ, পৃ. ২০৬; মাজমূ' ফাতাওয়া (১৭/৭৪); আত-তিস'ঈনিয়‍্যাহ (১/১৩০)। তিনি কখনও কখনও ইমাম আবু দাউদের কিতাবুস সুনান এর চয়নকৃত অংশকে 'আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ' নামেও অভিহিত করেন।
২০৬. তিনি হচ্ছেন আবু বকর আব্দুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ ইবন আল-কাযী আবু শাইবাহ ইবরাহীম ইবন উসমান আল-আবাসী। ইমাম, পাহাড়, জগতবাসীর জন্য মাইলফলক। তিনি হাদীস শুনেছেন শারীক ইবন আব্দুল্লাহ আল-কাযী থেকে, যিনি তার বড় উস্তাদদের অন্যতম, অনুরূপ ইবনুল মুবারক, ইবন উয়াইনাহ থেকে। আর তার থেকে হাদীস শুনেছেন বুখারী, মুসলিম প্রমুখ। ফাল্লাস বলেন, আমি আবু বকর ইবন আবী শাইবাহ এর মতো ধীশক্তি সম্পন্ন কাউকে দেখিনি। তিনি আলী ইবনুল মাদীনীর সাথে আমাদের কাছে আগমন করেন, তখন তিনি শাইবানীর চারশত হাদীস নিজ মুখস্থ থেকে বর্ণনা করে উঠেন। ইমাম আবু উবাইদ বলেন, চারজনের কাছে সকল হাদীসের সনদ গিয়ে শেষ হয়েছে। তবে আবু বকর ইবন আবী শাইবাহ তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনবরত বর্ণনা করতে সমর্থ ছিলেন। আহমদ ইবন হাম্বল তাদের মাঝে বেশি ফকীহ ছিলেন। ইয়াহইয়া ইবন মা'ঈন ছিলেন তাদের মধ্যে হাদীসের বেশি একত্রিতকারী। আর আলী ইবনুল মাদীনী, তিনি তাদের মাঝে হাদীসের অধিক জ্ঞানী ছিলেন। তিনি রচনা করেছেন আল-মুসান্নাফ, আল-মুসনাদ, আত-তাফসীর। তার মৃত্যু হয়েছিল হিজরী ২৩৫ সালে। দেখুন, ইবন আবি হাতেম, আল-জারহু ওয়াত তা'দীল (৫/১৬০); ইমাম যাহাবী, তাযকিরাতুল হুফফায (২/৪৩২); সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১১/১২২); ইবনুল 'ইমাদ, শাযরাতুয যাহাব (২/৮৫)।
২০৭. কিতাব আস-সুন্নাহ নামীয় তার কোনো গ্রন্থ খুঁজে পাওয়া যায়নি। সম্ভবত তার অন্যান্য গ্রন্থে আকীদাহ বিষয়ক যা এসেছে সেটাই এখানে বলা উদ্দেশ্য।
২০৮. তিনি হচ্ছেন আবু বকর আহমাদ ইবন আমর আদ-দ্বাহহাক ইবন মাখলাদ আশ-শাইবানী আল- বসরী, বড় মাপের হাফেয, বহু গ্রন্থ প্রণেতা। তিনি হাদীস শুনেছেন আবুল ওয়ালীদ আত-ত্বায়ালিসী, মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহ ইবন নুমাইর প্রমুখ থেকে। আর তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন আবুশ শাইখ আল-আসফাহানী, আবু বকর আল-কাব্বাব প্রমুখ। আবু সা'ঈদ ইবনুল আ'রাবী বলেন, আবু বকর ইবন আবী আসেম, তার ব্যাপারে তো আমি শুনেছি, তিনি শাকীক আল-বালাখী থেকে এক হাজার মাসআলা মুখস্থ করেছেন। তিনি হাদীস ও ফিকহের হাফেয বলে পরিচিত। তার মত ছিল প্রকাশ্য অর্থের ওপর চলা ও কিয়াস বাদ দেয়া। হিজরী ২৮৭ সালে তিনি মারা যান। দেখুন, যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৩/৪৩০)। তার সুন্নাহ গ্রন্থ থেকে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ অনেক তথ্য নিয়েছেন। যেমন, আস-সারেমুল মাসলূল (১/২৩৮); বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়‍্যাহ (১/৪৮); মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/১২১); (৬/৩৮০), (১০/২৬১), (১৪/৪২০)। ইমাম ইবন কাসীর এ গ্রন্থের অনেক প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, 'কিতাবুস সুন্নাহ, ফী আহাদীসিস সিফাত আলা ত্বারীকাতিস সালাফ'। দেখুন, আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ (১১/৯৬)। এ গ্রন্থটি ছাপা হয়েছে। প্রথমে শাইখ মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানীর তাহকীক ও তাখরীজসহ এক খণ্ডে। পরে ড. ফয়সাল আল-জাওয়াবিরাহ এর তাহকীকে দু' খণ্ডে বের হয়েছে। গ্রন্থকার এতে মুহাদ্দিসদের পদ্ধতিতে অধ্যায় বিন্যাস ও হাদীস নিয়ে এসেছেন।
২০৯. তিনি হচ্ছেন আবু জা'ফর আব্দুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহ ইবন জা'ফর ইবন ইয়ামান আল- জু'ফী, তাদের মাওলা, আল-বুখারী। তাকে মুসনিদি বলা হতো; কারণ তিনি মুসনাদ হাদীসের প্রতি অধিক গুরুত্ব প্রদান করতেন। তিনি হাদীস শুনেছেন ইবন 'উয়াইনাহ, আব্দুর রাযযাক প্রমুখ থেকে। তার থেকে হাদীস শুনেছেন ইমাম বুখারী, ইমাম যুহলী, আবু যুর'আহ আর-রামী প্রমুখ। হাকেম বলেন, তিনি তার সময়ে মা ওয়ারাআন নাহর এর ইমাম ছিলেন। ইমাম বুখারীর দাদা এ মুসনাদীর দাদা ইয়ামান এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। তার মৃত্যু হয়েছিল হিজরী ২২৯ সালে। তার এ গ্রন্থ 'আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ' এর অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। যদিও ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ তার ফাতাওয়া আল-কুবরাতে এর কথা উল্লেখ করেছেন। (৫/১৫) দেখুন, ইবন আবি হাতেম, আল-জারহু ওয়াত তা'দীল ৫/১৬২; ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা ১০/৬৫৮; ইবন হাজার, তাহযীবুত তাহযীব ৬/৯।
২১০. তিনি হচ্ছেন আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবন ইসমা'ঈল ইবন ইবরাহীম আল-জু'ফী আল-বুখারী। সহীহ বুখারীর গ্রন্থকার। আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদীস। তিনি তার যুগের বড় বড় হাফেযদের থেকে হাদীস শুনেছেন। যেমন, আহমাদ ইবন হাম্বল, ইবনুল মাদীনী, ইবন রাহওয়াই, যুহলী প্রমুখ। আর তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন অনেকেই যেমন, মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ, তিরমিযী, আবু হাতিম আর রাযী প্রমুখ। তার হিফয, ইলম, মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে উম্মতের সকলের ঐকমত্য রয়েছে। তাঁর উস্তাদ মুহাম্মাদ আল-বীকান্দী ইমাম মুহাম্মাদ ইবন ইসমা'ঈলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, যদি তুমি না থাকতে তাহলে আমি বুখারায় বসবাস করা উত্তম মনে করতাম না। নু'আইম ইবন হাম্মাদ বলেন, মুহাম্মাদ ইবন ইসমা'ঈল এ উম্মতের ফক্বীহ। ইসহাক্ব ইবন রাহওয়াইহ বলেন, তোমরা এ যুবক থেকে হাদীস লেখ; যদি এ যুবক হাসান বসরীর সময়ে থাকতো তবে অবশ্যই মানুষ তার মুখাপেক্ষী হতো হাদীস ও হাদীসের ফিকহের ব্যুৎপত্তির কারণে।
তিনি হিজরী ২৫৬ সালে মারা যান। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১২/৩৯১)। ইমাম বুখারীর গ্রন্থসমূহের মধ্যে সহীহ বুখারীর একটি অধ্যায় রয়েছে, আর-রাদ্দু 'আলাল জাহমিয়্যাহ। তাছাড়া তার বড় আরেকটি গ্রন্থ আকীদাহ'র ওপর তার মজবুতির জানান দিচ্ছে। সেটি হচ্ছে, খালকু আফ'আলিল ইবাদ। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ ও আকীদাহ'র গ্রন্থ, যা ইমাম বুখারী থেকে ইমাম মুহাম্মাদ ইবন ইউসুফ আল-ফেরাবরী বর্ণনা করেছেন। যিনি সহীহ বুখারীরও বর্ণনাকারী। অনুরূপভাবে খালকু আফ'আলিল ইবাদ গ্রন্থটি ইমাম ইউসুফ ইবন রাইহান ইবন আব্দুস সামাদও বর্ণনা করেছেন। দেখুন, খত্নীবে বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ (২/১৭); মিযযী, তাহযীবুল কামাল (১৪/৪৫১)।
খালকু আফ'আলিল ইবাদ গ্রন্থটির মৌলিকভাবে তিনটি অংশ রয়েছে: এক. আল্লাহর কথা বলা সাব্যস্তকরণ, আর কুরআন যে আল্লাহর বাণী, সৃষ্ট নয়, সেটা সাব্যস্তকরণ। দুই. তাকদীর সাব্যস্তকরণ ও আল্লাহ তা'আলার ইলম সাব্যস্তকরণ। তিন. বান্দার যাবতীয় কাজ আল্লাহর সৃষ্ট এটা স্যান্তকরণ। দেখুন, দারউত তা'আরুদ্ব (১/২৬২)।
ইমাম বুখারীর সকল গ্রন্থের প্রতি শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ'র ব্যাপক আগ্রহ ও গুরুত্ব ছিল। বিশেষ করে খালকু আফ'আলিল ইবাদ গ্রন্থের বিষয়ে; কারণ এখানে অনেক বেশি পরিমাণ সালাফদের বক্তব্য ও তাদের আসার বর্ণনা করা হয়েছে। উদাহরণত তিনি এ গ্রন্থ থেকে এনেছেন তার গ্রন্থসমূহে, দারউত তা'আরুত্ব (২/২৪), (৭/১০৮-১০৯); বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৩/৪১৭-৪২৩), (৫২৫-৫৩০), (৫/৩৬৬-৩৬৯, ৪০৫); আত-তিস'ঈনিয়্যাহ (১/২৪৩-২৪৯, ২৬০- ২৬১); মিনহাজুস সুন্নাহ (২/৬৪০); মাজমু ফাতাওয়া (১৮/২২৭, ৪০৭), (৫/১৮৩), (১২/৩৩৩, ৫০৮-৫০৯)।
তাছাড়া এ গ্রন্থ থেকে ইমাম লালেকাঈও শারহু উসূলি ই'তিক্বাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আত গ্রন্থে অনেক আছার বর্ণনা করেছেন (৩/৫৪৯); তবে তিনি সেটার নাম রেখেছেন, আর-রাদ্দু আলাল কাদরিয়্যাহ।
এ গ্রন্থটি পড়ার কারণে ইমাম মিযযীকে জেলে যেতে হয়েছে। তিনি ইবন তাইমিয়াহ'র সমর্থনে এ গ্রন্থটি পড়ছিলেন, কিন্তু তখনকার আশায়েরা সম্প্রদায় তাকে রাষ্ট্র প্রধানের মাধ্যমে জেলে পুরানোর ব্যবস্থা করে। দেখুন, ইবন হাজার, আদ-দুরারুল কামিনাহ (৬/২৩০); শাওকানী, আল-বাদরুত ত্বালে' (২/৩৫৩)। অনুরূপভাবে আল্লামা বা'লী রাহিমাহুল্লাহকেও এ কিতাব পড়ার কারণে জেলে যেতে হয়েছিল। দেখুন, আস-সাখাওয়ী, আদ-দ্বাওয়ল লামে'উ (৫/৩)।
২১১. হাইদাহ কিতাবটি আব্দুল আযীয আল-কিনানীর দিকে সম্পৃক্ত করার বিষয়টি মতভেদপূর্ণ। তার অনেকগুলো পাণ্ডুলিপি রয়েছে। [ফুয়াদ সিযকীন (৪/৬৬)] ইমাম যাহাবী এ কিতাবটিকে আব্দুল আযীয আল কিন্দীর হওয়া সম্পর্ক সন্দেহ পোষণ করেছেন। দেখুন, ইমাম যাহাবী, মীযানুল ই'তিদাল (২/৬৩৯)। তাজুদ্দীন সুবুকীও তা বলেছেন। [তাজউদ্দীন আস-সুবুকী, তাবাক্বাতুশ শাফে'ঈয়্যাহ আল-কুবরা (১/২৬৬)]
কিন্তু ইমাম খতীব আল-বাগদাদী, ইবন আল-জাওযী ও ইবন হাজার দৃঢ়ভাবে তা আব্দুল আযীয কিনানীর বলে নির্ধারণ করেন। [খত্বীবে বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ (১০/৪৪৯); ইবন আল-জাওযী, আল-মুনতাযাম (১১/৬৭); ইবন হাজার, তাহযীবুত তাহযীব (৬/৩৬৪); আত-তাক্বরীব, পৃ. ৩৫৯] অনুরূপ ইবনুল 'ইমাদ ও ইমাম ইবন বাত্তাহ সেটিকে আব্দুল আযীয কিনানীর গ্রন্থ বলে উল্লেখ করেন। [ইবনুল 'ইমাদ, শাযরাতুয যাহাব (২/৯৫); ইবন বাত্তাহ (২/২২৫-২৪)] অনুরূপভাবে যাহাবী অন্য জায়গায় এ কিতাবটি আব্দুল আযীয আল-কিনানীর বলে উল্লেখ করেছেন। [আল-ইবার (১/৩৪১); তারীখুল ইসলাম (৫/৮৭৩)] তবে ইবনুস সুবুকীর বিরোধিতার কারণ আকীদাগতভাবে এতে আল্লাহর গুণাবলির ব্যাপারে আশআরী মতবাদের বিরোধী কথা থাকা।
জামীল সালীবা এ গ্রন্থটির তাহকীকের সময় সেটিকে আব্দুল আযীয আল-কিনানীর বলেই সাব্যস্ত করেছেন এবং যারা এ ব্যাপারে সন্দেহ করেছে তাদের সন্দেহের অপনোদন করেছেন। আমাদের শাইখ ড. আলী নাসের ফাকীহী গ্রন্থটির তাহকীকের সময়ও সেটিকে আব্দুল আযীয আল-কিনানীর সাব্যস্ত করেছেন।
ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এ কিতাব থেকে প্রচুর বর্ণনা করেছেন এবং সেটি আব্দুল আযীয কিনানীর দিকেই সম্পৃক্ত করেছেন। যেমন, দারউ তা'আরুদ (২/২৪৫-২৯৪), (৬/১১৫); বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (২/৩৪১); মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/৩১৪), (৬/১৬৬, ৩২৪-৩২৫)। ইমাম মিযযী রাহিমাহুল্লাহও এ গ্রন্থ তার দিকে সম্পৃক্ত করেছেন। [মিযযী, তাহযীবুল কামাল (১৮/২২০)]
২১২. তিনি হচ্ছেন আব্দুল আযীয ইবন ইয়াহইয়া ইবন আব্দুল আযীয আল-কিনানী আল-মাক্কী আশ-শাফেয়ী। দাউদ আয-যাহেরী বলেন, আব্দুল আযীয ইমাম শাফেয়ীর সাহচর্য নিয়েছিলেন কিছুদিন। খত্বীব বলেন, তিনি ইলম ও ফছলে পূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। তার বেশ কিছু গ্রন্থ রয়েছে। তিনি শাফেয়ীর কাছে ফিকহের জ্ঞান অর্জন করেন ও তার সাহচর্যে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি ইবন উয়াইনাহ ও অপর একদল থেকে হাদীস বর্ণনা করেন। তার থেকে আবুল 'আইনা, হুসাইন ইবনুল ফাদ্বল আল-বাজালী, আবু বকর ইয়া'কূব ইবন ইবরাহীম আত-তামীমী হাদীস বর্ণনা করেন। তিনি বাগদাদে হিজরী ২৩০ অথবা ২৪০ সালে মারা যান। তার শরীর অসুন্দর হওয়ার কারণে তাকে গূল বলা হতো। তার মাঝে ও বিশর আল-মারিসীর মাঝে খলীফা মামুনের দরবারে কুরআনে কারীমের সৃষ্ট হওয়া না হওয়া বিষয়ে বিতর্ক অনুষ্ঠান হয়েছিল। সে বিতর্কের আলোচনা একটি গ্রন্থ হিসেবে বের হয়েছে, যার নাম হচ্ছে 'আল-হাইদাতু ওয়াল ই'তিযার। দেখুন, খত্বীবে বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ (১০/৪৪৯); ইমাম যাহাবী, মীযানুল ই'তিদাল (২/৬৩৯); তাজউদ্দীন আস-সুবুকী, ত্বাবাক্বাতুশ শাফে'ঈয়্যাহ আল-কুবরা (২/১৪৪); ইবন হাজার, তাহযীবুত তাহযীব (৬/৩৬৩); যিরিকলী, আল-আ'লাম (৪/২৯)।
২১৩. তিনি হচ্ছেন আবু আব্দুল্লাহ নু'আইম ইবন হাম্মাদ ইবন মু'আওয়িয়াহ, আবু আব্দুল্লাহ আল-খুযা'ঈ আল-মারওয়াযী। বড় আলেমগণের অন্তর্ভুক্ত। তিনি হাদীস বর্ণনা করেন ইবনুল মুবারক, সুফইয়ান ইবন উয়াইনাহ প্রমুখ থেকে। আর তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেন ইয়াহইয়া ইবন মা'ঈন, যুহলী প্রমুখ। তিনি বিদ'আতীদের ব্যাপারে কঠোর ছিলেন বিশেষ করে জাহমিয়াদের ওপর। সালেহ ইবন মিসমার বলেন, নু'আইম বলেছেন, আমি জাহমিয়্যাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম, যখন তাদের বক্তব্য জানলাম তখন হাদীস অন্বেষণ করতে শুরু করলাম। তখন বুঝতে পারলাম যে জাহমিয়্যাদের সর্বশেষ কথা হচ্ছে তা'ত্বীল বা স্রষ্টাকে নাম, গুণ ও কর্মশূন্য করা। ইমাম আহমাদ বলেন, তিনি জাহমিয়্যাদের ওপর খড়গহস্ত ছিলেন। তাকেও কুরআন সৃষ্ট কি সৃষ্ট নয় এ মাসআলায় পরীক্ষায় নিপতিত হতে হয়েছে। কিন্তু তিনি কুরআনকে সৃষ্ট বলতে রাযী হননি। ২২৮ অথবা ২২৯ হিজরীতে কয়েদখানায় বন্দী অবস্থায় মারা যান। তিনি তার জিঞ্জীরসহ দাফন করার অসিয়ত করেন এবং বলেন, আমি বাদী হয়ে থাকবো। তার হাদীসের বর্ণনার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। ইমাম যাহাবী বলেন, নু'আইম বড় আলেমগণের অন্তর্ভুক্ত। তবে আমার অন্তর তার বর্ণনার দিকে সায় দেয় না। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১০/৫৯৫)।
আলেমগণের অনেকেই নু'আইম ইবন হাম্মাদ থেকে আল্লাহর সিফাত, বিদ'আতী ও তাদের নিন্দা সংক্রান্ত অনেক বর্ণনা নিয়ে এসেছেন। যেমন, আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ, আস-সুন্নাহ (১/১২৫); বুখারী, খালকু আফ'আলিল ইবাদ, পৃ. ৮৫; ইবন বাত্তাহ, আল-ইবানাহ (৩/১৪৬); ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমু' ফাতাওয়া (২/৪৯২), (৫/১১০, ১৯৬, ২৬৩, ৫৩৫), (৮/২৩), (১০/৩০৩), (১১/৪৮২), (১২/৩৬৫)। অনুরূপ ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুয়ুש, পৃ. ২২১; শিফাউল আলীল, অধ্যায় ২১; যাহাবী, আল-উলু (২/১০৯২, ১০৯৩); ইবন হাজার, ফাতহুল বারী (১৩/৩৬৮, ৩৭৮, ৩৮১, ৪৯৪, ৫৩২) প্রমুখ।
বর্ণিত আছে যে, তিনি জাহমিয়্যাহদের রদ্দ করার জন্য তেরোটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। দেখুন, ইবন সা'দ, আত-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা (৭/৫১৯); খতীবে বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ (১৩/৩০৬); ইমাম যাহাবী, তাযকিরাতুল হুফফায (২/৪১৮); ইবন হাজার, তাহযীবুত তাহযীব (১০/৪৫৮)।
২১৪. সম্ভবত এর দ্বারা ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-কাত্তান উদ্দেশ্য। তিনি হচ্ছেন ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ ইবন ফাররূখ আল-কাত্তান আত-তামীমী। আবু সা'ঈদ। হাফেযে হাদীসদের একজন। সিক্কাহ ও হুজ্জাহ। তিনি ইমাম মালেক ও শু'বাহ ইবনুল হাজ্জাজ এর সমসাময়িক। তিনি বসরাবাসীদের অন্তর্ভুক্ত। তিনি ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ'র মত অনুযায়ী ফাতওয়া দিতেন। বালখী তার কিছু ভুল ধরেছে। তার কোনো গ্রন্থের হদিস পাওয়া যায়নি। তবে কাশফুয যুনূন এর লেখক তার একটি কিতাবের নাম 'আল-মাগাযী' উল্লেখ করেন। আহমাদ ইবন হাম্বল বলেন, আমার দু'চোখ ইয়াহইয়া আল-কাত্তানের মতো কাউকে দেখেনি। হাদীসের বিখ্যাত ছয় কিতাবের সকল গ্রন্থকারই তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তার জন্ম হিজরী ১২০ সালে, আর মৃত্যু হিজরী ১৯৮ সালে। দেখুন, যিরিকলী, আল-আ'লাম (৮/১৪৭)।
২১৫. তিনি হচ্ছেন আবু যাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবন ইয়াহইয়া ইবন বকর ইবন আব্দুর রহমান আত-তামীমী আন-নাইসাপূরী। ইসলামের বড় ইমামদের একজন। তিনি হাদীস বর্ণনা করেছেন মালেক, লাইস প্রমুখ থেকে। আর তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন বুখারী, মুসলিম, উসমান ইবন সা'ঈদ আদ- দারেমী, যুহলী প্রমুখ। ইসহাক ইবন রাহওয়াইহ বলেন, আমি ইয়াহইয়া ইবন ইয়াহইয়ার মতো কাউকে দেখিনি। আর আমি মনে করি না তিনি নিজের মতো কাউকে দেখেছেন। তিনি আরও বলেন, যেদিন ইয়াহইয়া ইবন ইয়াহইয়া মারা গেলেন সেদিন তিনি দুনিয়াবাসীদের ইমাম ছিলেন। ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল বলেন, ইয়াহইয়া ইবন ইয়াহইয়া তার নিজের মতো কাউকে দেখেননি, আর লোকেরাও তার মতো কাউকে দেখেনি। তার জন্ম হয়েছিল হিজরী ১৪২ সালে, আর মৃত্যু হয়েছিল হিজরী ২২৬ সালে। দেখুন, ইবন আবি হাতেম, আল-জারহু ওয়াত তা'দীল (৯/১৯৭); ইমাম যাহাবী, তাযকিরাতুল হুফফায (২/৪১৫); সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১০/৫১২); ইবনুল 'ইমাদ, শাযরাতুয যাহাব (২/৫৯)। তিনি তাদের ওপর এতই ক্রোধান্বিত ছিলেন যে, তিনি জাহমিয়্যাদের বক্তব্যকে মারাত্মক গণ্য করতেন, এমনকি তাদের বক্তব্য বর্ণনাকেও ঘৃণা করতেন।
২১৬. কুরআন ও হাদীসের দলীল।
২১৭. বিবেকের যুক্তিপ্রসূত প্রমাণাদি।
২১৮. বস্তুত এ সংক্ষিপ্ত ফাতাওয়া এতসব জায়গা হওয়ার কথা নয়। বিশেষ করে তিনি এ ফাতাওয়াটি লিখেছেন একটি প্রশ্নের উত্তরে। আর যোহর ও আসরের মাঝে এক বৈঠকে। যদি কালামশাস্ত্রবিদ তথা মু'তাযিলা, আশায়েরা ও মাতুরিয়াদের বক্তব্য ও সন্দেহের উত্তরের বিষয়টি বলেন তবে ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ সেগুলোর উত্তর দিয়েছেন তার অনেক গ্রন্থে। যেমন, দারউত তা'আরুদ্ব, মিনহাজুস সুন্নাহ, আস-সাফাদিয়্যাহ, নাকছুত তা'সীস ইত্যাদিতে।
২১৯. অর্থাৎ উপরে বর্ণিত গ্রন্থ ও গ্রন্থকারের বক্তব্যসমূহ দেখবে।
২২০. যারাই আল্লাহর গুণ অস্বীকার করতো বা অর্থহীন করতো অথবা অপব্যাখ্যা করতো সালাফে সালেহীন তাদের সকলকে মু'আত্তিলা বলতো। [ইবন তাইমিয়্যাহ (৫/৩২৯)]
২২১. অথচ আল্লাহ তা'আলা কুরআনে কারীমে এদেরকে অনুসরণ করারই নির্দেশ আমাদের দিয়েছেন। তিনি বলেন, "তারাই তো ওরা যাদেরকে আল্লাহ হিদায়াত দিয়েছেন সুতরাং তোমরা তাদের হিদায়াতের অনুসরণ কর।" [সূরা আল-আন'আম: ৯০]

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 আল্লাহর সিফাত এর ব্যাপারে হকপন্থীদের সংক্ষিপ্ত নীতি

📄 আল্লাহর সিফাত এর ব্যাপারে হকপন্থীদের সংক্ষিপ্ত নীতি


অতঃপর এ ব্যাপারে সামগ্রিক ও সার্বজনীন কথা হচ্ছে: আল্লাহকে সে গুণে গুণান্বিত করা যে গুণে তিনি নিজেকে গুণান্বিত করেছেন, তাঁর রাসূল যে গুণে গুণান্বিত করেছেন আর প্রথম যুগের অগ্রবর্তীগণ যে গুণে গুণান্বিত করেছেন (২২২), (এগুলো সাব্যস্ত করতে গিয়ে) কুরআন-হাদীসকে অতিক্রম করা যাবে না। (২২৩)
ইমাম আহমদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন: لا يوصف الله إلا بما وصف به نفسه، أو بما وصفه به رسوله صلى الله عليه وسلم لا يتجاوز القرآن والحديث .
"আল্লাহকে কেবল সেসব গুণে গুণান্বিত করা হবে, যাতে তিনি নিজেকে গুণান্বিত করেছেন, অথবা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে গুণান্বিত করেছেন, এ ব্যাপারে কুরআন ও হাদীস অতিক্রম করা যাবে না।” (২২৪)
সালাফে সালেহীনের নীতি (২২৫) হচ্ছে, তারা আল্লাহকে এমনসব গুণে গুণান্বিত করতেন যা দিয়ে তিনি নিজেকে গুণান্বিত করেছেন। অনুরূপ তাঁর রাসূল তাঁকে যা দিয়ে গুণান্বিত করেছেন, কোনো প্রকার বিকৃতি কিংবা নিষ্ক্রিয়করণ ব্যতীতই, তদ্রূপ কোনো প্রকার ধরণ নির্ধারণ কিংবা উদাহরণ সাব্যস্ত ব্যতীতই। (২২৬) আর আমরা জানি যে আল্লাহ যে গুণে নিজেকে গুণান্বিত করেছেন তা সত্য, তাতে নেই কোনো কুঞ্ঝটিকা বা প্রহেলিকা বা প্রহসন। বরং বক্তার কথা দ্বারা যেভাবে তার উদ্দেশ্য বুঝা যায় সেগুলোর অর্থও সেভাবে বুঝা যায়। বিশেষ করে বক্তা যখন স্বীয় বক্তব্যের ব্যাপারে সর্বাপেক্ষা অবগত এবং স্বীয় জ্ঞানের বর্ণনাদানের ক্ষেত্রে বেশি বাগ্মী আর ব্যক্ত করা, পরিচয়দান ও পথপ্রদর্শনের ব্যাপারে সর্বাপেক্ষা বেশি কল্যাণকামি।
তদুপরি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা, কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নেই, না তাঁর নাম ও গুণসহ পবিত্রসত্তায়, না তার কার্যাবলিতে। (২২৭) কাজেই যেমন আমরা এই ইয়াকীন রাখি যে, নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলার প্রকৃত জাতিসত্তা রয়েছে, আবার তাঁর প্রকৃত কর্ম (ফে'ল) রয়েছে, তেমনি তাঁর প্রকৃত সিফাত (গুণাবলি)ও রয়েছে। আর তাঁর মতো কিছুই নেই, তাঁর সত্তায়ও না, গুণেও না, কর্মেও না।
সুতরাং প্রত্যেক ঐ জিনিস যা ত্রুটি (নুকছানী) বা নতুন (হুদুস ২২৮) হওয়া আবশ্যক করে তা থেকে প্রকৃতপক্ষেই আল্লাহ মুক্ত ও পবিত্র; কেননা আল্লাহ হচ্ছেন সর্বোচ্চ পরিপূর্ণতার অধিকারী। আর তাঁর জন্য হুদুস তথা নতুন সৃষ্টি হওয়া নিষিদ্ধ। কারণ, তাঁর জন্য 'আদাম বা না থাকা অসম্ভব। আর হুদূস (নতুন সৃষ্টি) তার পূর্বে 'আদাম (না থাকা) আবশ্যক করে। আবার মুহদাস (নতুন সৃষ্টি) মুহদিস (সৃষ্টিকারী) এর প্রতি মুখাপেক্ষী, তেমনি আল্লাহ তা'আলা তো নিজেই (ওয়াজিবুল ওজুদ (২২৯) তথা) আবশ্যিক অস্তিত্বের অধিকারী। (২৩০)

সালাফগণের নীতি সাদৃশ্যস্থাপন ও নিষ্ক্রিয়করণের মাঝামাঝি অবস্থানে
সালাফে সালেহীনের অনুসৃত পন্থা হচ্ছে তা'ত্নীল (নিষ্ক্রিয়করণ) ও তামসীল (সাদৃশ্যস্থাপন) এর মাঝামাঝি। সুতরাং তারা আল্লাহর কোনো গুণকে মাখলুকের গুণের মতো বলে না, যেমন আল্লাহর সত্তাকে কোনো মাখলুকের সত্তার মতো বলে না। তিনি নিজে তাঁর যে গুণ বর্ণনা করেছেন বা তাঁর রাসূল তাঁর যে গুণ বর্ণনা করেছেন সেগুলো তারা নাকচ করে না। তাই তারা তাঁর সুন্দর নামসমূহ এবং উন্নত গুণাবলিকে নিষ্ক্রিয় বলে না, কথাকে তার স্থান থেকে সরিয়ে দেয় না, আল্লাহর নামসমূহ ও আয়াতসমূহে ইলহাদ (২৩১) (বিকৃতি) করে না।

এটার বর্ণনা যে, তা'ত্বীল (নিষ্ক্রিয়করণ) তামসীল (তুলনা প্রদান)কে আবশ্যক করে, অনুরূপ তামসীল প্রদান করা তা'জ্বীল করাকে আবশ্যক করে
তা'তীলকারী ও তামসীলকারী সম্প্রদায়দ্বয়ের প্রত্যেকেই তা'ত্বীল ও তামসীল সাব্যস্তকারী। তা'ত্বীল বা (আল্লাহর নাম ও গুণকে) নিষ্ক্রিয়কারীগণ আল্লাহর নামের ও গুণের সেই অর্থই বুঝে যা মাখলুকের জন্য উপযোগী, এ কারণে তারা সে মাফহুম (বুঝ) কে নাকচ করে যেতে থাকে। ফলে তারা তা'ত্বীল ও তামসীল উভয়টিকেই একত্রিত করে। আগে তামসীল করে, পরে তা'ত্বীল করে। এর মাধ্যমে তারা আল্লাহর সিফাত ও নাম দ্বারা যা বুঝা যায় তাকে তাঁর সৃষ্টির নাম ও সিফাতের বুঝের সাথে তুলনা করে ও সাদৃশ্য প্রদান করে। আবার এর মাধ্যমে তারা আল্লাহর জন্য উপযোগী নাম ও গুণকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। (২৩২)
কেননা যখন কেউ বলে, "যদি আল্লাহ 'আরশের উপরে হন তাহলে তিনি হয়তো 'আরশের থেকে বড় হবেন অথবা ছোট অথবা সমান হবেন। আর এগুলো সবই অসম্ভব (২৩৩);" অনুরূপ কোনো বাক্য। (এটা কীভাবে তা'ত্বীল ও তামসীলকে একত্রিত করে? তার বর্ণনা হচ্ছে,) সে লোকটি মূলত মহান আল্লাহর 'আরশের উপরে উঠাকে তেমনি বুঝেছে যেমন কোনো জিসম (দেহ)-র উপরে অন্য কোনো জিসম উঠে থাকে। বস্তুত তার (দেহের উপর দেহ থাকার) এ বুঝটির আবশ্যকতা পূর্বের বুঝ (কোনো কিছু অপর কোনো কিছুর উপরে থাকলে সেটা বড় বা ছোট বা সমান হতে হবে) অনুসারেই হয়েছে (যা সৃষ্টির ওপর সৃষ্টির থাকার সাথে যথাযথ)। কিন্তু (স্রষ্টা কোনো কিছুর উপরে থাকার বিষয়টি এমন নয়, তাই) যদি বলা হতো, মহান আল্লাহ 'আরশের উপর উঠেছেন এমন প্রকার উপরে উঠা যা তাঁর মহত্বের সাথে উপযোগী এবং তাঁর জন্য বিশেষিতা (২৩৪), তাহলে ('আরশে উঠার) সাথে এমন কোনো বাতিল আবশ্যকতা ('আরশের চেয়ে বড় কিংবা ছোট কিংবা সমান হওয়ার) বিষয়টি অবশ্যম্ভাবী করে না; যা নাকচ করা ওয়াজিব হবে (কেননা তা তো সৃষ্টির জন্য আবশ্যক, স্রষ্টার জন্য নয়)। (২৩৫)
এটা তখন সাদৃশ্য স্থাপনকারীর ঐ কথার মতো হয়ে যায়, যে বলে থাকে, যদি সৃষ্টিকুলের কোনো স্রষ্টা থাকবেন তবে সে হয়তো জাওহার (২৩৬) (মৌলবস্তু) হবে, নতুবা আরদ্ব (২৩৭) (গুণবাচক) হবে। (২৩৮) [অথচ জাওহার বা 'আরদ্ব' কোনোটি হওয়া আল্লাহর জন্য অসম্ভব। (২৩৯)] যেহেতু সকল অস্তিত্বই এ দুটির মধ্যে সীমাবদ্ধ। (২৪০) অনুরূপ মুমাসসিল বা সাদৃশ্যস্থাপনকারীর কথা (২৪১): যখন তিনি [আল্লাহ] 'আরশের উপর উঠবেন তখন এটি মানুষের খাট বা নৌকার উপর উঠার মতোই ধরে নিতে হবে। যেহেতু 'ইসতিওয়া' (উপরে উঠা) এভাবে ছাড়া জানা যায় না।
এভাবে স্পষ্ট হলো যে, এ দুটি চিন্তাতেই রয়েছে তামসীল বা সাদৃশ্য স্থাপন, আর এ দু'টি চিন্তাতেই রয়েছে আল্লাহর সিফাতের স্বরূপকে নিষ্ক্রিয়করণ। প্রথমটির (২৪২) সমস্যা হচ্ছে সে প্রকৃত 'ইসতিওয়া'র সকল নামকে নিষ্ক্রিয় করেছে। আর দ্বিতীয়টির (২৪৩) সমস্যা হচ্ছে সে এমন এক 'ইস্তেওয়া' সাব্যস্ত করেছে যা কেবল মাখলুকের জন্য নির্দিষ্ট। (২৪৪)

মহান আল্লাহর জন্য 'উর্ধ্বে থাকা' ও 'উপরে উঠা' এ গুণদ্বয় সাব্যস্তকরণ
আর মীমাংসাপূর্ণ কথা হচ্ছে, যার ওপর মধ্যমপন্থী উম্মত রয়েছে যে, নিশ্চয় আল্লাহ আরশের উপরে উঠেছেন (২৪৫), তাঁর শানের সাথে উপযোগী এবং তাঁর জন্যই খাসভাবে। কাজেই যেমন তিনি 'আলীম' সকল বিষয়ে অবগত, তিনি 'ক্বাদীর' সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান, তিনি ('সামী')' সর্বদ্রষ্টা, ('বাসীর') সর্বশ্রোতা ইত্যাদি। আর আল্লাহর ইলম (জ্ঞান) ও কুদরত (ক্ষমতা) (২৪৬) এর ক্ষেত্রে এমন কোনো 'আরদ্ব' (২৪৭) এর বৈশিষ্ট্য সাব্যস্ত করা জায়েয নেই যা কোনো সৃষ্টির ইলম ও কুদরতের জন্য প্রযোজ্য; তেমনিভাবে মহান আল্লাহ 'আরশের উপরে (২৪৮), তাঁর জন্য মাখলুকের ফাউক্বিয়্যাত তথা মাখলুকের ওপর মাখলুক হওয়ার বৈশিষ্ট্য ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট আবশ্যিক বিষয়সমূহ সাব্যস্ত করা জায়েয নেই।

সালাফে সালেহীনের মাযহাব বিবেকের যুক্তি ও কুরআন-সুন্নাহ'র ভাষ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ
আর জেনে রাখ যে, স্পষ্ট আক্কল (বিবেকের স্পষ্ট যুক্তি) এবং বিশুদ্ধ নকল (কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদীসে) আসা দলীলে এমন কিছু নেই যা সালাফি তরীকার ভিন্ন হওয়া আবশ্যক করে। তবে হক্কের ওপর (২৪৯) আপতিত সংশয় নিরসন করার আলোচনা এ সংক্ষিপ্ত পরিসরে সংকুলান হবে না। কাজেই যে অন্তরে সংশয় রয়েছে, আর সে তা নিরসনের ইচ্ছা করে তাহলে সেটা সহজ ও সরল।

টিকাঃ
২২২. অর্থাৎ সাহাবায়ে কিরাম।
২২৩. কুরআন ও হাদীসে যা নেই তা সাব্যস্ত করা যাবে না। কারণ, আকীদাহ হচ্ছে তাওকীফী, তথা কুরআন ও সুন্নাহ'র দেয়া তথ্যনির্ভর। মুসলিম এ ব্যাপারে নস বা ভাষ্যের সাথেই চলবে, সেখানে বিবেকের যুক্তি বা ইজতিহাদ দিয়ে চলার সুযোগ নেই। যারাই যুক্তির পিছনে চলেছে তারাই এ ময়দানে পথভ্রষ্টতায় নিপতিত হয়েছে।
২২৪. ইবন কুদামাহ আল-মাক্বদেসী তা বর্ণনা করেছেন, লুম'আতুল ই'তিক্বাদ, পৃ. ৯; অনুরূপ তাহরীমুন নাযর ফী কুতুবিল কালাম, পৃ. ৩৮-৩৯। অনুরূপ তা রয়েছে ইবন বাত্তাহ এর আল-ইবানাহ (৩/৩২৬); মাজমূ' ফাতাওয়া (১৬/৪৭২) গ্রন্থদ্বয়েও।
২২৫. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ তার অধিকাংশ গ্রন্থে প্রায়শই এ বাক্য ব্যবহার করে থাকেন। যেমন, আল-আকীদাতুল ওয়াসেত্বিয়‍্যাহ, পৃ. ১১; আর-রিসালাতুত তাদমুরিয়‍্যাহ, পৃ. ৭; মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/২৫৭, ২৬৩), (৬/৩৮, ৫১৫, ৫১৮), (১১/২৫০, ৪৭৯), (১২/৭৩, ৫৭৫), (১৩/১৬০, ৩০৫)। অনুরূপ বয়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/১০৫-১০৬); আস-সাফাদিয়্যাহ (১/১০৩), (২/৩১৪)।
২২৬. চারটি শব্দ আরবীতে এসেছে। চারটি অনুবাদ চারটি আলাদা শব্দে করা হয়েছে। শব্দ চারটি হচ্ছে, ১- তাহরীফ= বিকৃতি। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ তাহরীফ ব্যবহার করেছেন তা'ওয়ীল বলেননি। কারণ কালামশাস্ত্রবিদরা যা করেছে তা তা'ওয়ীল বা ব্যাখ্যা নয় বরং তা তাহরীফ বা বিকৃতি। আর তাহরীফ শব্দটি কুরআনে যত নিন্দিত হিসেবে এসেছে। তা'ওয়ীল শব্দটি তত নয়। আর যেহেতু কুরআন ও সুন্নাহকে আমরা মানদণ্ড ধরবো, তাই তার বিপরীত বস্তুকে তাহরীফ বলা ব্যতীত গত্যন্তর নেই। [ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/১৬৫, ১৯৫)] ২- তা'ত্বীল= নিষ্ক্রিয়করণ। খালি করা বা মুক্ত করা। উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহকে তার সিফাত মুক্ত করা, আর সেগুলোকে আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত হওয়াকে অস্বীকার করা। কুরআনে এটাকে ইলহাদ হিসেবে বলা হয়েছে। ৩- তাকয়ীফ= ধরণ নির্ধারণ করা। শব্দটি সালাফে সালেহীনের মুখ নিঃসৃত। ইমাম রাবী'আহ, মালেক সুফইয়ান ইবন উয়াইনাহ সবাই এ তাকয়ীফকে অস্বীকার করেছেন। ৪- তামসীল= সাদৃশ্য স্থাপন বা উদাহরণ প্রদান উভয়টিই নিষিদ্ধ, যা কুরআনের ভাষ্য থেকে সরাসরি নিষেধ এসেছে। আল্লাহ বলেন, "কোনো কিছুই তার সদৃশ নয়, তিনি সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা।” [সূরা আশ-শূরা: ১১]
২২৭. অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার সাথে সদৃশ সাব্যস্ত করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ সত্তা, নাম, গুণ ও কর্ম, এ চারটির কোনোটিতেই তাঁর সাথে কাউকে সদৃশ বলার সুযোগ নেই।
২২৮. হুদুস বলতে দু'টি বিষয় বুঝায়: ১- যার অস্তিত্বের জন্য কার্যকারণ লাগে।
২- যার অস্তিত্বের জন্য প্রথম এমন কিছুর প্রয়োজন হয়, যা ইতোপূর্বে নাই ছিল। দেখুন, আল-মুবীন ফী শারহি মা'আনী আলফাযিল হুকামায়ি ওয়াল মুতাকাল্লিমীন, পৃ. ১১৯। উভয় অর্থেই আল্লাহ তা'আলার জন্য তা প্রযোজ্য হবে না। তবে এর দ্বারা আল্লাহর কর্মগত গুণ, অর্থাৎ আল্লাহ কর্তৃক যখন ইচ্ছা তখন কিছু করাকে অস্বীকার করা যাবে না। কারণ এসব গুণের ক্ষমতা তার পূর্বাহ্নেই ছিল, তিনি যখন ইচ্ছা তা করবেন, তার প্রকাশ ঘটাবেন। সেখানে আল্লাহর কর্মগত গুণগুলোকে হুদুস নাম দিয়ে তা অস্বীকার করা যাবে না।
২২৯. ওয়াজিবুল ওজুদ হচ্ছে, তিনি স্বয়ং অপর সবকিছু থেকে অমুখাপেক্ষী, কাদীম, সর্বপ্রাচীন (আযালী), যার নতুন হওয়া কিংবা নাই হওয়া অসম্ভব। দেখুন, ইবন তাইম্যিাহ, আত-তাদমুরিয়‍্যাহ, পৃ. ১৬-১৭; থানওয়ী, কাশশাফু ইসত্বিলাহাতিল ফুনূন (২/১৩৩১, ১৩৩৪)।
২৩০. অর্থাৎ তিনটি কারণে মহান আল্লাহ হুদুস বা কার্যকারণের প্রয়াজনীয়তা থেকে মুক্ত; এক. কারণ, 'হুদুস' হতে হলে তার আগে 'নাই' হওয়ার আবশ্যকতা থাকবে, আর আল্লাহর জন্য 'নাই' সময় বা অবস্থান কল্পনা করাও নিষিদ্ধ। দুই. কারণ, 'হুদুস' বলে তার জন্য 'মুহদিস' অস্তিত্বে আনয়নকারীর প্রয়োজন হয়, যা আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা নিষিদ্ধ। তিনি. কারণ, তিনি স্বয়ং ওয়াজিবুল ওজুদ বা তাঁর জন্য আবশ্যিক অস্তিত্ব থাকা জরুরী বা যার অস্তিত্ব আবশ্যক। হুদুস তার সাথে সাংঘর্ষিক।
২৩১. 'ইলহাদ' শব্দের মূল অর্থ, একদিকে ঝুঁকে যাওয়া, যুলুম করা ও বক্রপথ অবলম্বন করা। এজন্যই যেসব কবর সোজা খনন করার পর নিচে গিয়ে কিবলার দিকে ঝুঁকে দেয়া হয় সেগুলোকে লাহদ কবর বলা হয়। [দেখুন, ইবন মানযূর, লিসানুল আরব (৩/৩৮৯)] এখানে আল্লাহর নাম ও আয়াতসমূহে ইলহাদ বলতে বুঝানো হয়েছে, সেগুলোর যেমন আছে তেমন না রেখে অন্য দিকে ফিরিয়ে দেয়া ও মিথ্যারোপ করা। আল্লাহ বলেন, "আর আল্লাহর রয়েছে সুন্দর সুন্দর নামসমূহ, সুতরাং তোমরা সে নামসমূহ দিয়ে তাঁকে আহ্বান কর, আর যারা তাঁর নামসমূহে বক্রপথ অবলম্বন করে, তারা যে কাজ করে তার শাস্তি তাদেরকে প্রদান করা হবে।" [সূরা আল- আ'রাফ: ১৮০] [দেখুন, তাফসীর আত-ত্বাবারী (৯/১৩৩-১৩৪); তাফসীর ইবন কাসীর (৩/৫১৭)]
আর আল্লাহর নামের ক্ষেত্রে ইলহাদ কয়েক প্রকার: প্রথমত: আল্লাহর নামসমূহের কোনো কিছু অস্বীকার করা অথবা নামসমূহ যেসব সিফাত (গুণ) ও হুকুম-আহকাম শামিল করে আছে তার মধ্যে কোনো বিষয় অস্বীকার করা। যেমনটি করেছে জাহমিয়‍্যাহ সম্প্রদায় ও অন্যান্য আহলে তা'ত্বীল তথা আল্লাহর গুণসমূহ অকার্যকর বলে ধারণাকারী সম্প্রদায়। এটা এ জন্য ইলহাদ (অস্বীকার) যে, আল্লাহর নামসমূহ ও তা যেসব হুকুম-আহকাম এবং আল্লাহর জন্য উপযুক্ত গুণসমূহকে শামিল করছে তার প্রতি ঈমান আনা ওয়াজিব। অতএব, এসবের মধ্যে কোনো কিছু অস্বীকার করার অর্থ, যা ওয়াজিব তা থেকে বিচ্যুত হয়ে অন্য দিকে ঝুঁকে যাওয়া। দ্বিতীয়ত: আল্লাহর নামসমূহ এমন গুণ-নির্দেশক করে দেয়া যা সৃষ্টিজীবের গুণ সদৃশ। যেমনটি করেছে আহলে তাশবীহ তথা আল্লাহর গুণসমূহকে সৃষ্টিজীবের গুণসদৃশকারী সম্প্রদায়। এটা এ কারণে যে, অর্থগতভাবে তাশবীহ (সাদৃশ্যকরণ) একটি বাতিল বিষয়। কুরআন- সুন্নাহ'র কোনো ভাষ্য এ বিষয়টিকে নির্দেশ করতে পারে না, বরং কুরআন-সুন্নাহ'র ভাষ্যসমূহ এ বিষয়টিকে বাতিল হওয়ার ওপর প্রমাণবহ অতএব আল্লাহর গুণসমূহকে সৃষ্টিকুলের গুণের সাথে তাশবীহ তথা সাদৃশ্যবোধক করে দেয়ার অর্থ আল্লাহর নামের ব্যাপারে যা ওয়াজিব ও যথার্থ তা থেকে বিচ্যুতি। তৃতীয়ত: আল্লাহ তা'আলার ওপর এমন নাম প্রয়োগ করা যা আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং নিজের ওপর প্রয়োগ করেননি। যেমন খ্রিস্টান সম্প্রদায় আল্লাহর ওপর (পিতা) নাম প্রয়োগ করেছে। আর দার্শনিকরা তাঁর ওপর প্রয়োগ করেছে (কার্যকরী কারণ) নাম। এটা এ জন্য বিচ্যুতি যে, আল্লাহর নামসমূহ ওহীনির্ভর। অতএব আল্লাহ তা'আলার ওপর এমন নাম প্রয়োগ করা যা তিনি নিজের ওপর প্রয়োগ করেননি, নামের ব্যাপারে যা ওয়াজিব ও যথার্থ তা থেকে বিচ্যুতি। তা ছাড়া এ প্রয়োগকৃত নামগুলো স্বয়ং বাতুলতাপূর্ণ, যা থেকে আল্লাহ তা'আলা পবিত্র।
চতুর্থত: আল্লাহর নামসমূহ থেকে উৎকলিত করে কোনো উপাস্য বস্তুর নাম রাখা। যেমন-এক বর্ণনা মতে- মুশরিকরা আল্লাহ তা'আলার 'আল আযীয' নাম থেকে উৎকলিত করে তাদের মূর্তি আল উয্যার নাম রেখেছে। আল্লাহ তা'আলার 'ইলাহ' নাম থেকে উৎকলিত করে তাদের মূর্তি 'লাত' এর নাম রেখেছে। অতএব, তারা আল্লাহ তা'আলার নামসমূহ থেকে উৎকলিত করে তাদের উপাস্যসমূহের নাম রেখেছে। এটা এ কারণে ইলহাদ যে, আল্লাহর নামসমূহ কেবল তাঁর জন্যই সুনির্দিষ্ট।
অতএব, যেভাবে ইবাদত ও সত্য উলুহিয়াত আল্লাহর জন্য সুনির্দিষ্ট এবং আকাশ ও পৃথিবীতে তাঁরই মহিমা বর্ণিত, অনুরূপভাবে সুন্দরতম নামসমূহ তাঁর জন্যই সুনির্ধারিত। সুতরাং এ নামগুলো যেভাবে আল্লাহর জন্য সুনির্দিষ্ট করা হয় সেভাবে এগুলোর দ্বারা অন্য কারও নাম রাখা, নাম বিষয়ে যা ওয়াজিব ও উচিত তা থেকে বিচ্যুতি।
আল্লাহর নামসমূহের সব ধরনের বিকৃতিই হারাম; কেননা আল্লাহ তা'আলা বিকৃতিসাধনকারীদের হুঁশিয়ার করে বলেছেন: "আর তাদেরকে বর্জন কর যারা তাঁর নামে বিকৃতি ঘটায়। তারা যা করত অচিরেই তাদেরকে তার প্রতিফল দেয়া হবে।” [সূরা আল আ'রাফ: ১৮০] এ বিকৃতিকরণের মধ্যে শরী'আতের দলিলের নিরিখে কোনোটি শির্কী আবার কোনোটি কুফরী।
২৩২. বিস্তারিত দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/২০৯)।
২৩৩. এসব সন্দেহ আশ'আরী ও মাতুরিদী মতবাদের লোকেরা পেশ করে থাকে। যার দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য আল্লাহ সর্বোচ্চ সত্তা ও 'আরশের উপর উঠার গুণ অস্বীকার করা। দেখুন, তাদের গ্রন্থে এসব সন্দেহ, নাইসাপুরী, আল-গুনইয়া ফী উসুলিদ্দীন, পৃ. ৭৪; গাযালী, কাওয়া'য়িদুল ই'তিক্কাদ, পৃ. ১৬৮।
২৩৪. যেমনটি নবী-রাসূল, সাহাবায়ে কিরাম, সালাফে সালেহীন ও ইমামগণ সাব্যস্ত করেছেন।
২৩৫. এ আলোচনার মাধ্যমে যেকোনো মু'আত্ত্বিল যে তা'ত্বীল ও তামসীল উভয়টিই করেছে তা প্রমাণিত হলো। কারণ সে তাত্বীল করার আগে তামসীল করে নেয়।
২৩৬. জাওহার হচ্ছে এমন মৌলবস্তু, যা জায়গা জুড়ে আছে। তবে তা দু'ভাগে বিভক্ত: ক. বাসীত্ব বা সূক্ষ্ম যা তখনকার দার্শনিকদের পরিভাষায় 'আল-জাওহারুল ফারদ' বা অনু-পরমানু বুঝায়। তা এমন এক সত্তা যাতে আর ভাগ চলে না, বাস্তব কর্মের মাধ্যমেও নয়, ক্ষমতার দিক থেকেও নয়। খ. মুরাক্কাব বা যৌগিক; আর তা হচ্ছে জিসিম বা দেহ। যা দুই বা ততোধিক 'আল-জাওহার আল ফারদ' তথা অণু-পরামাণু দ্বারা ঘটিত। তাতে বাড়তি কিছু নেই।
২৩৭. 'আরদ্ব হচ্ছে এমন বস্তু যা অবশিষ্ট থাকা সম্ভব নয়, অন্যের ওপর নির্ভর করে, অন্যের উপরে অবস্থান করে টিকে থাকে, যা জাওহার ও জিসিম এর মধ্যে কেবল প্রকাশ পায়। অপর কোনো জাওহার ও জিসিমে পরিণত হলে তা বাতিল হয়ে যায়। আল্লাহর গুণাবলিকে কি 'আরদ্ব বলা যাবে? বস্তুত আল্লাহর গুণাবলিকে আরদ্ব বলা এটি কালামশাস্ত্রবিদদের আবিষ্কার। এটাকে সরাসরি হা বা না বলা যাবে না। উদ্দেশ্য জিজ্ঞাসা করতে হবে, তারপর যদি তা ভুল অর্থে পরিচালিত হয়, যেমন আরদ্ব বলতে বুঝায় যা নিঃশেষ হয়ে যায় তবে সে অর্থে আল্লাহর সিফাতকে 'আরদ্ব বলা শব্দ ও অর্থ উভয় দিক থেকেই অস্বীকার করা হবে। আর যদি বিশুদ্ধ অর্থ করা হয় আর তা আল্লাহর গুণের সাথে উপযোগী বিবেচিত হয় তবে সেটার অর্থকে অস্বীকার করা হবে না। কিন্তু শব্দ স্বীকার করা হবে। [বিস্তারিত দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ' ফাতাওয়া (৬/৯০-৯১, ১০৩-১০৪)] ইমাম হাফেয কিওয়ামুস সুন্নাহ আবুল কাসেম আল-আসবাহানী বলেন, 'সালাফগণ জাওহার ও আরদ্ব নিয়ে কথা বলতে অস্বীকার করেছেন। তারা বলেছেন, সাহাবায়ে কিরাম ও তাবে'য়ীনে 'ইযাম এর যুগে এসব ছিল না। তাই হতে পারে তারা এগুলো জানা সত্ত্বেও চুপ ছিলেন, তাহলে আমাদের জন্যও এ ব্যাপারে চুপ থাকার সুযোগ সৃষ্টি হয়ে যায় যেমনটি তারা চুপ ছিলেন, নতুবা তারা এসব না জেনে চুপ ছিলেন, তাহলে তারা যা জানেননি, দীনের ব্যাপারে সেগুলো আমাদের না জানলেও চলবে। [আল-হুজ্জাতু ফী বায়ানিল মাহাজ্জাহ (১/৯৯-১০০)]
২৩৮. মুমাসসিল বা সাদৃশ্য স্থাপনকারীর বক্তব্য এখানে শেষ।
২৩৯. অথচ... এ বক্তব্যটুকু ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহর পক্ষ থেকে কথার মাঝখানে এসেছে। কারণ ইবন তাইমিয়্যাহ'র নিকট এটা অসম্ভব হলেও মুমাসসিল বা সাদৃশ্য স্থাপনকারীর নিকট জাওহার বা 'আরদ্ব হওয়া আল্লাহর জন্য অসম্ভব নয়।
২৪০. অর্থাৎ মুমাসসিল বা সাদৃশ্য স্থাপনকারী বলছে যে, সকল অস্তিত্বই এ দুটির একটি হবেই, সুতরাং আল্লাহর জন্য তা সাব্যস্ত করা দোষণীয় নয়। সুতরাং আল্লাহর সিফাতগুলো মানুষের সিফাতের মতোই। [নাউযুবিল্লাহ] এভাবে মুমাসসিল আল্লাহর সিফাতকে নিজের মত করে বুঝে নিয়ে দু'টি কাজ করেছে, এক. সে আল্লাহকে তামসীল করেছে। জাওহার বা 'আরদ্ব যা সৃষ্টির গুণ, আল্লাহকে সেটার অধীন করে নিয়েছে। দুই. সে তামসীল করার মাধ্যমে আল্লাহর গুণসমূহের প্রকৃত অর্থকে নিষ্ক্রিয় করে নিয়েছে। এভাবেই একজন মুমাসসিল তামসীল ও তা'জ্বীল দু'টোই করে থাকে।
২৪১. এখানে ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ আরেকটি উদাহরণ নিয়ে এসেছেন, যার মাধ্যমে সাদৃশ্য স্থাপনকারীর যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। মুমাসসিলের দেয়া যুক্তির মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, সে তামসীল করেছে, যার পরিণতি দাঁড়িয়েছে তাত্বীল, অর্থাৎ তামসীল করার মাধ্যমে এ গুণের আসল অর্থকে নিষ্ক্রিয়করণ করা হয়ে গেছে।
২৪২. অর্থাৎ মু'আত্তিল। যে ইস্তিওয়া এর প্রকৃত সকল অর্থকে নিষ্ক্রিয় করেছে। কারণ ইস্তিওয়া এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে, উপরে উঠা ও ঊর্ধ্বে উঠা। যেমনটি কুরআনে এসেছে, 'আর জুদী পাহাড়ের উপর উঠল।' [সূরা হূদ: ৪৪] আরও এসেছে, 'যাতে তোমরা তার পিঠসমূহের উপর উঠতে পার।' [সূরা আয- যুখরুফ: ১৩]
২৪৩. অর্থাৎ মুমাসসিল। যে ইস্তেওয়া এর অর্থকে সৃষ্টির কারও মত করে সাব্যস্ত করে নিয়েছে। তার মতে, উপরে উঠা বলতে সৃষ্টি কর্তৃক কোনো কিছুর উপরে উঠা। [নাউযুবিল্লাহ]
২৪৪. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ অন্যত্র বলেন, 'জেনে রাখ, যারাই 'ইস্তেওয়া' বা উপরে উঠার গুণ ও অনুরূপ [কর্মবাচক] গুণগুলোকে অস্বীকার করেছে, যদি তুমি সে কারণটি উদ্ঘাটন করতে গবেষণা কর তবে দেখতে পাবে, তারা আয়াত থেকে কোনো সৃষ্টি কর্তৃক কিছুর উপরে উঠাকেই অর্থ হিসেবে ধরে নিয়েছে, অথবা এমনভাবে উপরে উঠা ধরে নিয়েছে যাতে হুদুস (নতুনত্ব) বা নকস (ত্রুটি) মিশ্রিত হয়। তারপর তাদের বিপরীত মতের লোকদের থেকে তা বর্ণনা করে (অথচ তারা তা বলেনি) তারপর তারা সেটা বাতিল করার নিমিত্তে যাবতীয় দলীল প্রমাণাদির সমাহার ঘটায়। তারপর বলে, এর দ্বারা নির্দিষ্ট হয়ে গেল যে, 'ইস্তেওয়া' শব্দটিকে ইস্তীইলা' অর্থে নিতে হবে। অর্থাৎ ইস্তেওয়া অর্থ উপরে উঠা না নিয়ে 'ইস্তীইলা' বা করায়ত্ব করার অর্থে নিতে হবে। [আত-তিস'ঈনিয়্যাহ (২/৫৬৮)]
২৪৫. এখানে বিতর্ক পরবর্তী আশ'আরী মতবাদের লোকদের সাথে, যারা আল্লাহর 'আরশের উপর উঠাকে অস্বীকার করে থাকে।
২৪৬. উল্লেখ্য যে, আশায়েরারা ইলম, কুদরত, শোনা, দেখা এগুলো সহ জীবন, ইচ্ছা, কালামে নফসী গুণসমূহ সাব্যস্ত করে থাকে, তারা বলে থাকে, এগুলো বিবেকের যুক্তি দ্বারা সাব্যস্ত হয়, অন্যগুলো নয়।
২৪৭. ইতোপূর্বে আরদ্ব এর ব্যাখ্যা চলে গেছে যে সৃষ্টিতে 'আরদ্ব' বলতে বুঝায় যা অবশিষ্ট থাকে না বা ক্ষণস্থায়ী।
২৪৮. কারণ আল্লাহ তা'আলা যে ইস্তেওয়া বা উপরে উঠার কথা বলেছেন তা তো বিশেষ ধরনের উপরে উঠা, সেটার ধরণ আমাদের জানা নেই, যেমনটি আমরা আল্লাহর ইলম, কুদরত ও শোনার ক্ষেত্রে বলি যে, এটি আল্লাহর জন্য বিশেষ ধরনের ইলম, কুদরত ও শোনা, যার প্রকৃত ধরণ আমরা জানি না। [এ ব্যাপারে বিস্তারিত দেখুন, শাইখুল ইসলামের আত-তাদমুরিয়‍্যাহ গ্রন্থের চতুর্থ নীতি]
২৪৯. অর্থাৎ সালাফদের আকীদাহ হচ্ছে হক্ক যার ওপর অনেকে বিবেকের যুক্তি দাঁড় করিয়ে সন্দেহে নিপতিত হতে পারে। সেসব অস্বচ্ছ যুক্তিকে দলীল মনে করে অনেক কালামশাস্ত্রবিদ সন্দেহে দোদুল্যমান হয়ে আছে। তাদের এসব সন্দেহ নিরসনের জন্য আরও বেশি লেখা দরকার যা এখানে তিনি নিয়ে আসেননি। তবে শাইখুল ইসলাম এ বিষয়ে ১১ খণ্ডের এক বিশাল গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার নাম 'দারউ তা'আরুদ্বিল আকলি ওয়ান নাকলি'। সে গ্রন্থে তিনি এসব লোকদের সন্দেহের জবাব দিয়েছেন, যারা কুরআন ও হাদীসে আসা আল্লাহর গুণ বিষয়ক ভাষ্যের সাথে তাদের বিবেকের যুক্তির মতবিরোধ দাবি করেছিল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00