📄 জাহম ইবন দিহরাম কর্তৃক তার বেদুঈ উস্তাদ বানের পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হওয়া
আর জা'দ ইবন দিরহাম-ইতোপূর্বে- হাররান ভূখণ্ডের অধিবাসী ছিল। তাদের মধ্যে নমরুদ ও কিন'আনী ধর্মের অবশিষ্ট অনেক সাবেয়ী ও দার্শনিক ছিল, যাদের জাদুর ব্যাপারে পরবর্তী কেউ কেউ পুস্তক রচনা করেছেন। আর নমরুদ হচ্ছে- মুশরিক কালদানী সাবেয়ীদের রাজা, যেমন পারসীয় ও অগ্নি উপাসকদের বাদশাহ কিসরা, মিশরের বাদশাহ ফির'আউন, হাবশার খ্রিস্টান বাদশা নাজ্জাশী। এটা জাতিবাচক নাম, ব্যক্তিবাচক নাম নয়।
সাবেয়ীদের অধিকাংশই ছিল মুশরিক, আর তাদের মধ্যকার জ্ঞানী বলতে দার্শনিকদেরই বুঝায়। যদিও তাদের কেউ কেউ আল্লাহ ও আখেরাতের ওপর ঈমান রাখত। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿إِنَّ الَّذِينَ ءَامَنُوا وَالَّذِينَ هَادُوا وَالنَّصَرَى وَالصَّابِئِينَ مَنْ ءَامَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَهُمْ أَجْرُهُمْ عِندَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ ﴾ [البقرة: ٦٢]
"নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে, যারা ইয়াহূদী হয়েছে এবং নাসারা ও সাবেয়ীরা যারাই আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, তাদের জন্য পুরস্কার রয়েছে তাদের রব্ব এর কাছে। আর তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।” [সূরা আল-বাকারাহ: ৬২]
অনুরূপ অন্য আয়াতে বলেন,
﴿إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَادُوا وَالصَّبِئُونَ وَالنَّصَارَى مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ ﴾ [المائدة: ٦٩]
“নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং যারা ইয়াহূদী হয়েছে, আর সাবেয়ী ও নাসারাদের মধ্যে যারা আল্লাহ্ ও শেষ দিনের ওপর ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।” [সূরা আল-মায়েদাহ: ৬৯]
তবে সাবেয়ীদের অনেকেই অথবা অধিকাংশই কাফের অথবা মুশরিক। যেমনিভাবে অনেক ইয়াহুদী ও নাসারা তাদের দীনে পরিবর্তন ও বিকৃতি সাধন করেছে, কাফির ও মুশরিকে পরিণত হয়েছে, অনুরূপভাবে সেসব সাবেয়ী যারা তখন বর্তমান ছিল, তারা তখন হয় কাফের ছিল অথবা মুশরিক। তারা তারকা পূজা করত এবং সেগুলোর আকৃতি বানাতো।
টিকাঃ
১৩৪. আবান ইবন সাম'আন নামীয় বিখ্যাত কাউকে দেখা যায় না। তবে এ নামটি অনেকেই বর্ণনা করেছেন। অবশ্য ইবন কাসীর তার আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে (১/৩৫০) তার নাম বলেছেন, বায়ান ইবন সাম'আন আত-তামীমী। আরও বলেছেন, সে এ মতবাদ জা'দ থেকে নিয়েছে। সম্ভবত সেই উদ্দেশ্য। যদি বায়ান ইবন সাম'আন হয়, তবে তার জীবনী ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। সে হচ্ছে, বায়ান ইবন সাম'আন আন-নাহদী, আত-তামীমী। একশত হিজরীর পরে নতুন মতবাদ নিয়ে তার উত্থান। সে আলী ইবন আবী তালিব রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুকে ইলাহ হিসাবে মনে করত। সে বলত, আলীর মধ্যে ইলাহী শক্তি রয়েছে যা তার শরীরের সাথে মিশে গেছে। তারপর তার সে ইলাহী শক্তি তার সন্তান মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়্যাহ'র মাঝে বিচরণ করেছে। বায়ানকে খালেদ আল-কাসরী ১১৯ হিজরীতে হত্যা করে। এ বায়ানের দিকেই সম্পৃক্ত করে বায়ানিয়া ফির্কার উৎপত্তি। এরা সম্পূর্ণ সীমালঙ্ঘনকারী ফির্কা, বরং বাগদাদী তাকে ইসলামী ফির্কার বাইরের ফির্কা গণ্য করেছেন। তার আকীদাহ'র মধ্যে রয়েছে, আল্লাহ তা'আলা মানুষের সূরতে, আর আল্লাহর সব ধ্বংস হয়ে যাবে চেহারা ব্যতীত। তাদের দাবী হচ্ছে বায়ান ইবন সাম'আন নবী। তাদের কেউ কেউ বলত, বায়ান তো আল্লাহ। আরও বলত: কুরআনের বাণী 'হাযা বায়ানুন লিননাস' [সূরা আলে ইমরান: ১৩৯] এখানে 'বয়ান' বলে তাকেই বুঝানো হয়েছে। নাউযুবিল্যাহ। [দেখুন, ইবন হাজার, লিসানুল মীযান (২/৬৯); আশ'আরী, মাক্কালাতুল ইসলামিয়্যীন, পৃ. ৫; বাগদাদী, আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক, পৃ. ২২৭; ইবন তাইমিয়্যাহ, মিনহাজুস সুন্নাহ (২/৫০২-৫০৩)]
১৩৫. ত্বালুত এর ব্যাপারে উপরে যা বর্ণিত হয়েছে তার থেকে বেশি বর্ণনা পাওয়া যায় না।
১৩৬. লাবীদ ইবন আ'ছম বনী রুযাইক এর লোক। বলা হয়ে থাকে, সে ছিল মুনাফিক, ইয়াহূদীদের হালীফ বা অঙ্গীকারাবদ্ধ লোক। আবার কারও কারও মতে, তার মূলই ছিল ইয়াহূদী। সে ছিল মারাত্মক জাদুকর। সে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জাদু করেছিল।
১৩৭, জাহম ইবন সাফওয়ান, জা'দ ইবন দিরহাম, বায়ান ইবন সাম'আন, ত্বালুত্ব তারপর লবীদ ইবন আ'ছম, এ পথভ্রষ্টতার সনদ পরম্পরার ব্যাপারে কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, [সুবুকী, আত- ত্বাবাক্বাত (১/৩৫-৯১); আলী সামী আন-নাশশার, নাশআতুল ফিকরিল ফালসাফি ফিল ইসলাম (১/৩৩০); অনুরূপ শাইখ শু'আইব আল-আরনাউত্ব, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা এর টীকা (৫/৪৩৩)] কিন্তু আমরা বলি এ সনদে সন্দেহ না করাই উচিত। কারণ; ১- এ সনদ ইবন তাইমিয়া ব্যতীত অনেকেই বর্ণনা করেছেন, যেমন: • ইবনুল আসীর, আল-কামিল (৬/১২১)। • সাফাদী, আল-ওয়াফী বিল ওয়াফায়াত (১১/৬৮)। • ইবন কাসীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (১০/২১)। • জামালুদ্দীন ইবন নুবাতাহ, সারাহিল 'উয়ূন ফী শারহি রিসালাতি ইবন যাইদূন, পৃ. ২৯৩। ২- এ সনদটি আলেমদের মাঝে কোনো প্রকার সন্দেহ ছাড়াই প্রসার লাভ করেছে। মুহাক্কিক আলেমগণ এ বিষয়ে সামান্যতম সন্দেহ পোষণ করেননি; কারণ তারা জানেন ঐতিহাসিক ও আকীদাগত প্রমাণাদি তার বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিয়েছে। বিশেষ করে জা'দ ইবন দিরহাম ও জা'হম ইবন সাফওয়ানের মধ্যকার শিক্ষকতা ও ছাত্রত্বের বিষয়টি ইবন কাসীর বর্ণনা করেছেন। [আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (৯/৩৮২)] তাছাড়া ইমাম বুখারীও তা কুতাইবাহ ইবন সা'ঈদ থেকে শুনেছেন ও বর্ণনা করেছেন। [খালকু আফ'আলিল ইবাদ, পৃ. ৩০; আত-তারীখুল কাবীর (১/৬৪)] অনুরূপ ইবন মানযূর, মুখতাসারু তারীখি দিমাশক (৬/৫১); আবু ইসহাক ইবরাহীম ইবন মুহাম্মাদ আল-গাসীলীও তা বর্ণনা করেছেন। ৩- ইয়াহুদীরা প্রথমে মুশাব্বিহা অর্থাৎ আল্লাহকে সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য প্রদানকারী থাকলেও পরবর্তীতে তারা মু'আত্তিলা বা আল্লাহর গুণকে নিষ্ক্রীয়করণকারীতে পরিণত হয়ে যায়। যেমনটি ইমাম ইবন হাজার বর্ণনা করেছেন। [ইবন হাজার, আল-ফাতহ (৩/৩৫৯)] তবে শাহরাস্তানী বলেন, ইয়াহূদীদের মধ্যে একমাত্র 'কুররায়ীন'রা প্রথম থেকেই মুশাব্বিহা ছিল, বাকীরা সকলে মু'আত্তিলাই ছিল। পরবর্তীতে তাদের সকলের মাঝে তা'ত্বীলই প্রাধান্য পায়। [আল-মিলাল ওয়ান নিহাল (১/৯৩)]
১৩৮. লাবীদ কর্তৃক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জাদু করার বিষয়টি বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। দেখুন, বুখারী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ৫৭৬৩। তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। আর তা ছিল সপ্তম হিজরী সনের ঘটনা। আরও দেখুন, [ইবন সা'দ, আত-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা (২/১৯৬-১৯৯); ইবন হাজার, ফাতহুল বারী (১০/২২৬); সামহ্রদী, আল-ওয়াফা বি আহওয়ালিল মুস্তাফা (২/৩৪১-৩৪২)]
১৩৯. এটি হচ্ছে জা'দ ইবন দিরহামের পথভ্রষ্টতার প্রথম কারণ। যার সারমর্ম হচ্ছে সে তা ইয়াহুদীদের থেকে গ্রহণ করেছে।
১৪০. এখানে জা'দ ইবন দিরহামের পথভ্রষ্টতার দ্বিতীয় কারণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, সে তা সাবেয়ীদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছিল। কারণ সে হাররানে বড় হয়েছিল, আর সেখানে পথভ্রষ্ট সাবেয়ীদের বাকী অংশ বসবাস করত।
১৪১. এর দ্বারা শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ সম্ভবত রাযীকে উদ্দেশ্য নিয়েছেন। কারণ রাযী জাদুর ওপর একটি গ্রন্থ রচনা করেছে। যার শিরোনাম হচ্ছে, 'আস-সিররুল মাকতূম ফী মুখাত্বাবাতিন নুজুম'। অন্যত্র শাইখুল ইসলাম তার নামসহ এ কিতাবের কথা উল্লেখ করেছেন [আররাদ্দু আলাল মানত্বিকিয়ীন, পৃ. ২৮৬, ৫৪৪; আস-সাফাদিয়্যাহ (৯১/১৭২); আস-সাব'ঈনিয়্যাহ, (বুগইয়াতুল মুরতাদ) পৃ. ৩৭০; জামে'উর রাসায়িল (২/৫১-৫২); মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/৫৪৮), (৬/২৫৪), (১৩/১৮০); আল-ইস্তিগাসাহ ফির রাদ্দি আলাল বিকরী, পৃ. ৩১৬; দারউত তা'আরুদ্ব (১/৩১১)] অবশ্য শাইখুল ইসলাম তার ব্যাপারে ভালো ধারণা করে বলেন, 'aunque él se arrepintió de ello y volvió al Islam'। [মাজমূ' ফাতাওয়া (৪/৫৫)] বস্তুত ফখরুদ্দীন রাযী জাদু বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন, তিনি তা সাবেয়ীদের থেকে শিখেছিলেন। এমনকি তিনি তার 'আল-মাত্বালিবুল আলীয়া' গ্রন্থেও 'জাদু ও তার প্রকারভেদ নিয়ে কথা' অধ্যায় বিন্যাস করেছিলেন। আল্লাহর কাছে আমরা ক্ষমা চাই।
১৪২. আয়াতের কয়েকটি অর্থ হতে পারে,
এক. যারাই ইতোপূর্বে আল্লাহ ও আখেরাতের ঈমান এনে মারা গিয়েছে, আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্য প্রশান্তির ব্যবস্থা রেখেছেন। এ হিসেবে এর মাধ্যমে আমাদের নবীর আগমনের আগে যারা ছিল তাদের কথা বলা হয়েছে।
দুই, যারাই বর্তমানকালে আল্লাহর ওপর ঈমান আনবে, আখেরাতের ওপর ঈমান আনবে ও সৎকাজ করবে, অর্থাৎ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াতের ওপর ঈমান আনবে তাদের কোনো ভয় ও পেরেশানী থাকবে না।
তিন. যারাই আল্লাহ ও আখেরাতের ওপর সত্যিকারের ঈমান আনবে তাদের জন্য নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর ঈমান আনা ব্যতীত দূরে থাকার সুযোগ নেই। কারণ আল্লাহর ওপর ঈমান ও আখেরাতের ওপর ঈমান আনার জন্য নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা নিয়ে এসেছেন তা ব্যতীত আর কোনো মাধ্যম বাকী নেই। নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক প্রদর্শিত পথেই উক্ত ঈমান আনতে হবে। তাই নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর ঈমান আনা ব্যতীত কারও ঈমান শুদ্ধ হবে না। সুতরাং কেউ যেন মনে না করে যে, ইয়াহূদী, নাসারা বা সাবেয়ী হলেও তার জন্য আখেরাতের মুক্তির ওয়াদা থাকবে।
১৪৩. ইমাম ইবন হাযম রাহিমাহুল্লাহ ঐকমত্য বর্ণনা করেছেন যে, ইয়াহূদী ও নাসারাদেরকে কাফের বলা হবে। [মারাতিবুল ইজমা', পৃ. ২০২]
১৪৪. উল্লেখ্য যে, বর্তমানেও ইরাকে এদের অস্তিত্ব দেখা যায়। তারা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও কর্ম অন্যদের কাছে প্রকাশ করে না। ফলে অনেকেই তাদের ধর্মের সঠিক মতাদর্শ সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হতে পারে না। তাদের ওপর রচিত 'সাবেয়ী মানদেয়ী' গ্রন্থটি খুব পরিচিত। তবে তা তাদের ধর্মবিশ্বাসের কতটুকু উদ্ধার করতে পেরেছে তা এখনও প্রশ্নবিদ্ধ বিষয়।
📄 সাহেবীদের আল্লাহর গুণ অস্বীকারকারী মতবাদ
মহান রব্ব সম্পর্কে এসব [আল্লাহর গুণ] নাকচকারীদের মত হচ্ছে- তাঁর কেবল নেতিবাচক গুণ বা সম্বন্ধীবাচক গুণ বা এ দুয়ের সমন্বয়ে ঘটিত গুণ রয়েছে। এদের প্রতিই ইবরাহীম 'আলাইহিস সালামকে পাঠানো হয়েছিল। সম্ভবত জা'দ ইবন দিরহাম এটিকে সাবেয়ী দার্শনিকদের থেকে গ্রহণ করেছিল। তেমনিভাবে আবু নসর আল-ফারাবি তার যাবতীয় দর্শনবিদ্যা হাররান গিয়ে সেখানকার সাবেয়ী দার্শনিকদের থেকে গ্রহণ করেছিল।
আর জাহম সেটি গ্রহণ করেছিল (যেমনটি উল্লেখ করেছেন ইমাম আহমদ ও অন্যান্যরা), ভারতীয় শ্রমণ (শ্রমণ) বৌদ্ধদের থেকে, যখন সে কতিপয় শ্রমণ দার্শনিকের সাথে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিল, সেসব শ্রমণ বৌদ্ধ মূলত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞান ব্যতীত সকল জ্ঞানকেই অস্বীকার করত।
এরা সবই হচ্ছে জাহমের (পথভ্রষ্টতার) সনদসূত্র; যাদের মূল ইয়াহূদী, সাবেয়ী, মুশরিক ও পথভ্রষ্ট দার্শনিকেরা, যারা হয় সাবেয়ী নতুবা মুশরিক।
অতঃপর যখন হিজরী দ্বিতীয় শতকে রোমান ও গ্রীক পুস্তকাদি আরবীতে অনূদিত হলো তখন মুসীবত আরও বেড়ে গেল। তদুপরি শয়তানও এসব পথভ্রষ্টদের অন্তরে নতুন করে বেশ কিছু ভ্রষ্টতা ঢেলে দিল, যেমনটি সে ঢেলে দিয়েছিল তাদের মতো অন্যান্যদের অন্তরে।
টিকাঃ
১৪৫. অর্থাৎ নেগেটিভ হিসেবে তুলে ধরা, যেমন: না বা নন শব্দ প্রবেশ করে বলা যে, তিনি মুর্খ নন, তিনি দর্শক নন, তিনি শ্রোতা নন, তিনি 'আরশের উপরে উঠেননি, তিনি ক্রোধান্বিত হন না, তিনি অবতরণ করেন না, চেহারা নেই, ইচ্ছা নেই, উপরে নয়, নিচেও নয় ইত্যাদি।
১৪৬. অর্থাৎ সম্বন্ধীয় বাচক শব্দ হচ্ছে, বাক্যে এমন কোনো শব্দ ব্যবহার করা যা দু'টি জিনিসকে শামিল করে যার একটি অপরটিকে আবশ্যক করে, যেমন: পিতা ও পুত্র ইত্যাদি। সুতরাং পিতা বললে বুঝতে হবে কারও বাপ আর তার সন্তান থাকা আবশ্যক। ইল্যত ও মা'লুলের মতো। সুতরাং তাদের নিকট স্রষ্টা মানেই সৃষ্টি থাকা। অথচ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আহ এর নিকট, তিনি স্রষ্টা, সৃষ্টি সাথে থাকুক বা না থাকুক। অথবা এমনকিছু অন্যের ওপর অনুমান করে যার অস্তিত্ব অনুভব করা যায়। যেমন আশায়েরা ও মাতুরিদিয়াদের বক্তব্য, তিনি রহীম ও রহমত করেন, আর রহমত তাঁর সাথে থাকতে পারে না। কেননা তা সৃষ্ট, তাই রহমত বলতে তার নি'আমত বুঝানো হবে। অনুরূপ তাদের বক্তব্য, তিনি (সামী') শ্রোতা ও শোনেন, কিন্তু শোনার কাজ তার দ্বারা হতে পারে না, কারণ সেটা সৃষ্ট। সুতরাং শোনা বলে সাওয়াব বা শাস্তি দেয়া উদ্দেশ্য। এভাবে.... (নাউযুবিল্লাহ)
১৪৭. উপরোক্ত নেগেটিভ গুণ ও তার সাথে সম্বন্ধীয় গুণ এ দু'টি গুণের সমন্বিত গুণ সাব্যস্ত করার বিষয়টি বিরল অবস্থায় তারা সাব্যস্ত করে থাকে। বস্তুত তাও শেষ পর্যন্ত পজেটিভ অ্যাপ্রোচে নয়।
১৪৮. অর্থাৎ সাবেয়ী দার্শনিকদের প্রতিই আল্লাহ তা'আলা ইবরাহীম 'আলাইহিস সালামকে পাঠিয়েছিলেন।
১৪৯. তিনি হচ্ছেন, মুহাম্মাদ ইবন মুহাম্মাদ ইবন ত্বারখান ইবন আওযলগ আত-তুর্কী। আবু নাসর আল-ফারাবী। মানতিক শাস্ত্রবিদ ও দার্শনিক। তার সম্পর্কে যাহাবী বলেন, "তার বিখ্যাত কিছু গ্রন্থ রয়েছে, যে কেউ এগুলোর মাধ্যমে হিদায়াত চাইবে সে পথভ্রষ্ট হইবে ও দিশেহারা হবে। তার হাতের উপরেই ইবন সীনার উত্থান। আল্লাহর কাছেই কেবল তাওফীক চাই”। ফারাবীকে বলা হতো, দ্বিতীয় মু'আল্লিম। যেমনটি এরিস্টটলকে বলা হয় প্রথম মু'আল্লিম। ফারাবীর জন্ম হয় হিজরী ২৫৭ সালে, তার মৃত্যু হয় ৩৩৯ হিজরীতে। তার অনেকগুলো গ্রন্থ রয়েছে। তার দর্শন সম্পর্কে বলা হয় সে জগাখিচুড়ি দর্শনে বিশ্বাসী ছিল। সে প্লেটো ও এরিস্টটল উভয়ের দর্শনের মিল করার অযথা চেষ্টা করেছিল। [দেখুন, ওয়াফায়াতুল 'আইয়ান (৫/১৫৩-১৫৭); যাহাবী, আল-ইবার (২/২৫১); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৫/৪১৬-৪১৮); ইবনুল ইমাদ আল-হাম্বলী, শাযারাতুয যাহাব (২/৩৫০-৩৫৪)]
১৫০. বর্তমান ইরাকের একটি অংশ। অধিকাংশ সাবেয়ী সম্প্রদায় সেখানে বসবাস করে। [মু'জামুল বুলদান (২/২৩৫-২৩৬)]
১৫১. অর্থাৎ জাহম ইবন সাফওয়ান।
১৫২. আল-বাইরুনী বলেন, সুমুনিয়া মূলত: শামানিয়্যা। তারা বৌদ্ধদের নীতির অনুসারী। [তাহকীক মা লিল হিন্দ মিন মাকূলাতিন মাককূলাতিন ফিল আকলি আও মারমূলাহ, ১৯]
১৫৩. শ্রমণ মূলত বৈদিক নীতি-রীতি বিরুদ্ধ তিনটি গোষ্ঠীর নাম। বৌদ্ধ, জৈন ও চার্বাক গোষ্ঠী। যারা কোনো দেবতায় বিশ্বাসী ছিল না।
১৫৪. লক্ষ্য করুন, লেখক এখানে জাহম ইবন সাফওয়ানের পথভ্রষ্টতার উৎস হিসেবে কয়েকটিকে চিহ্নিত করেছেন: এক. ইয়াহুদী উৎস। দুই. হাররানী উৎস। তিন, ভারতীয় নিরিশ্বরবাদী দর্শন কেন্দ্রিক উৎস। বস্তুত এগুলোর সবগুলোতেই সৃষ্টিকর্তার কোনো গুণ সাব্যস্ত করা হয় না। ফলে জাহম ইবন সাফওয়ান সেসব দর্শনে প্রভাবিত হওয়ার কারণে আল্লাহর জন্য কোনো গুণ সাব্যস্ত করতো না।
১৫৫. বুঝা গেল যে, সিফাত অস্বীকারকারীদের পথভ্রষ্টতার সূত্রে আরও যোগ হলো, চার, গ্রীক ও রোমান দর্শন। পাঁচ, নতুন করে শয়তানের দেয়া সন্দেহ ও ভ্রষ্টতা। তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি, যারা আল্লাহ তা'আলার গুণ অস্বীকার করে তারা সব ধর্মের, সব রকমের দর্শনের সারবস্তুকে আত্মস্থ করে নিয়েছে। তাদের সর্বশেষ অবস্থা হচ্ছে তারা ইয়াহুদীদের অনুসারী, তারা হাররানীদের অনুসারী, তারা ভারতীয় দর্শনের অনুসারী, গ্রীক ও রোমান দর্শনের অনুসারী এবং শয়তানের নির্দেশনার অনুসারী।
📄 ইমামগণ কর্তৃক বিশর আল-মিররীসী ও তার অনুসারীদের নিন্দা
অতঃপর হিজরী দ্বিতীয় শতকের মধ্যে এসব উক্তি যা সালাফে সালেহীনের নিকট "জাহমিয়্যাহ মতবাদ” নামে পরিচিত, বিশর ইবন গিয়াস আল-মিররীসী (১৪৮) এবং তাঁর সমপর্যায়ের অন্যান্যদের কারণে বিরক্তি লাভ করে। আর তখন তাঁদের নিন্দা ও ভ্রষ্টতা বর্ণনায় ইমামদের অনেক উক্তি বর্ণিত হয়েছে। যেমন বলেছেন: মালেক (১৪৯), সুফিয়ান ইব্ন উয়াইয়ানা (১৫০), ইবনুল মুবারক্ব (১৫১), আবু ইউসুফ (১৫২), শাফেয়ী (১৬১), আহমাদ (১৬২), ইসহাক্ব (১৬৩), ফুদ্ধাইল ইবন 'ইয়াদ্ব (১৬৪), বিশর আল হাফী (১৬৫) প্রমুখ।
বর্তমানে মানুষদের হাতে যেসব তা'ওয়ীল (অপব্যাখ্যা) সমূহ বিদ্যমান রয়েছে, যেমন সেসব তা'ওয়ীল যার অধিকাংশই আবু বকর ইবন ফুওরাক (১৬৬) স্বীয় 'কিতাবুত তা'ওয়ীলাত' (كتاب التأويلات) গ্রন্থে (১৬৭) উল্লেখ করেছেন (১৬৮)। তার অনুরূপ আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবন 'উমার আর-রাযী (১৬৯) 'তা'সীসুত তাকদীস' (تاسيس التقديس) গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন (১৭০) আর এগুলো হুবহু পাওয়া গেছে তারা ব্যতীত অন্যান্য লোকদের বক্তব্যে (১৭১) যেমন, আবু আলী আল-জুব্বায়ী (১৭২), আব্দুল জব্বার ইবন আহমাদ আল-হামাদানী (১৭৩), আবুল হুসাইন আল-বসরী (১৭৪), আবুল ওফা ইবন 'আকীল (১৭৫), আবু হামিদ আল-গাযালী প্রমুখদের কথায় সেসবের অনেক পাওয়া যায়। এগুলো সবই হুবহু বিশর আল-মিররীসী স্বীয় কিতাবে যা উল্লেখ করেছিলেন তাই। যদিও এদের কারো কারো থেকে তা'ওয়ীলের রদ ও বাতিলকরণে অনেক বক্তব্য রয়েছে। বিভিন্ন বিষয়ে তাদের সুন্দর সুন্দর কথাও আছে।
টিকাঃ
১৪৮. তিনি হচ্ছেন বিশর ইব্ন সিয়াস ইব্ন আবী কারীমা আব্দুর রহমান আল-ফিরিস্তী, আল-আদাব্লী, তাঁদের মাওলা। তাঁর কুনিয়াত আবু আব্দুর রহমান। মু’তামিলী, ফক্বীহ্, দর্শনশাস্ত্রে অভিজ্ঞ, যিম্মী বংশে তাঁকে দোষারোপ করা হয়। মু’তামিলাহ গোত্রের প্রধান। সে ইমানের ক্ষেত্রে ইরজা বা মুরজিয়া ছিল। কাজী আবু ইউসুফ থেকে যিক্হের জ্ঞান অর্জন করে। কিন্তু সে পরবর্তীতে জাহমিয়াদের মতবাদ গ্রহণ করে নেয়। হারুন-অর-রশীদ এর সমকালে কষ্ট পেয়েছিল। তার দাদা ছিল ইবনুল খাত্তাবের দাস। কারও কারও মতে তার বাপ ইয়াহুদী ছিল। তবে সে বাগদাদের অধিবাসী ছিল, সেখানে মারীস নামক এলাকার বাসিন্দা ছিল। প্রায় ৯০ বছর বয়সে মৃত্যু ১৯৮ হিজরী। বলা হয়ে থাকে, সে ছিল বেঁটে, কুৎসিত, ময়লা কাপড়ে অবস্থান করতো, লম্বা চুল রাখতো, বড় মাথা ও কান বিশিষ্ট। তার বেশ কিছু গ্রন্থ ছিল, তবে ইমাম উসমান ইব্ন সাঈদ আদ-দারিমী তার মতবাদগুলো খণ্ডনে গ্রন্থ রচনা করেছেন। [যিরিক্লী, আল-আ’লাম (২/২৬-৬৬)]
১৪৯. তিনি হচ্ছেন মালেক ইব্ন আনাস ইব্ন মালেক আল-আসবারী আল-হিময়ারী। আবু আব্দুল্লাহ্, আছহুস সুন্নাত ওয়াুয়াল জামা’আতের চার ইমামের এক ইমাম। তার দিকেই মালেকী মাযহাব সম্পর্ক করা হয়। জন্ম হিজরী ৯০ সালে মদীনায়। আবার মৃত্যুও হয় হিজরী ১৭৯ সালে মদীনায়। দ্বীনের ব্যাপারে অত্যন্ত সুদৃঢ় ও মজবুত ব্যক্তি ছিলেন। আমীর বাদশাহদের ধার ধারতেন না। তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছিল ফলে তাকে আঘাত করা হয়েছিল যার কারণে তার কাঁধ খুলে গিয়েছিল। খলীফা রশীদ তাকে বাড়িতে নিয়ে জ্ঞান অর্জন করতে চাইলে তিনি সাফ বলে দেন, ইলমের কাছেই আসতে হয়। তারপর খলীফা যখন ইমাম মালেককে মাদারাসায় গিয়ে বসলেন তখন ইমাম মালেক বললেন, আমীরুল মুমিনীন, ইলমের সম্মান করা মানে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্মান করা। আপনি এভাবে বসতে পারেন না। ফলে ইমাম মালেককে সামনে ছাত্রের মতো বসে গেলেন। ইমাম মালেকের গ্রন্থসমূহের মধ্যে বিখ্যাত হচ্ছে মুওয়াত্তা। [দেওবুন, যিরিক্লী, আল-আ’লাম (৫/২৫৬-২৫৮)]
১৫০. তিনি হচ্ছেন ইমাম সুফিয়ান ইব্ন উয়াইয়ানা ইব্ন মাইমুন আল-হিলালী আল-কুফী, আবু মুহাম্মাদ। মক্কার হারামের মুহাদ্দিস। তবে মাওলাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ১০৭ হিজরীতে কুফার জন্ম। কিন্তু তিনি মক্কায় অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি হাফেয, অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য, প্রশস্ত ইলম, বিশাল সম্মানের অধিকারী ছিলেন। শাফেয়ী বলেন, যদি মালেক আর সুফিয়ান না হতো তবে হিজাযের ইলম চলে যেতো। তার এক চক্ষু কানা ছিল। সত্তরবার হজ করেন। তার "আল-জামে’উ ফিল হাদীস" একটি গ্রন্থ রয়েছে। তাফসীরেও তার বিশাল অবদান আছে। তিনি হিজরী ১৯৮ সালে মারা যান। [যিরিক্লী, আল-আ’লাম (৩/৩০৫-৩০৬)]
১৫১. তিনি হচ্ছেন আব্দুল্লাহ্ ইবনুল মুবারক ইব্ন ওয়াদিহ্ আল-হানযালী, মাওলা হিসাবে আত-তামীমী, আল-মারওয়াযী। কুনিয়ত আবু আব্দুর রহমান। অনেক গ্রন্থ ও সফরের অধিকারী ছিলেন। সারা জীবন সফরে কাটিয়ে দেন। কখনও হজ্জ্ব কখনও জিহাদ আর কখনও ব্যবসায়ী হিসেবে কাটিয়েছেন। তার জীবনে হাদীস, ফিক্বহ্, আরবী ভাষা, ইতিহাস, বীরত্ব, দানশীলতার সমাহার ঘটেছিল। তিনি খুরাসানের ফোয়ার পথে মারা যান। তার রয়েছে, কিতাবুল জিহাদ আর সম্ভবত এ বিষয়ে প্রথম তিনি স্বতন্ত্র গ্রন্থ লিখেন। [যিরিক্লী, আল-আ’লাম (৪/১১৫)]
১৫২. আবু ইউসুফ ইয়াকুব ইব্ন ইবরাহীম ইব্ন হাবীব আল-কুফী, আবু হানিফার কাছে ফিক্বহ শিখেছেন, লম্বা সময় তাঁর সাথে ছিলেন। তিনি হিশাম ইব্ন উরওয়া, ইয়াহইয়া ইব্ন সাঈদ আল-আনসারী প্রমুখ থেকে হাদীস শুনেছেন। তাঁর থেকে ইব্ন মাঈন, আহমাদ ইব্ন হাম্বল হাদীস শুনেছেন। আহমাদ ইব্ন হাম্বল বলেন, প্রথম যখন হাদীস লেখা শুরু করি তখন ইমাম আবু ইউসুফের কাছে যেতাম, তিনি আবু হানীফা ও মুহাম্মাদের চেয়ে মুহাদ্দিসগণের প্রতি বেশি ঝুঁকতেন। ইয়াহইয়া ইবন ইয়াহইয়া আত-তাইমী বলেন, আমি আবু ইউসুফকে তার মৃত্যুর সময় বলতে শুনেছি, যা কিছু আমি ফতোয়া দিয়েছি তার সবকিছু থেকে ফিরে আসলাম, তবে যা কুরআন ও সুন্নাহ'র অনুযায়ী হবে সেগুলো ব্যতীত। অন্য বর্ণনায়, যা কুরআন অনুযায়ী হবে এবং যার মুসলিমগণ একমত হয়েছেন। মৃত্যু হিজরী ১৮২। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৮/৪৭০)।
১৬১. তিনি হচ্ছেন আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবন ইদরীস ইবনুল আব্বাস আল-কুরাশী আল-মুত্তালেবী আশ- শাফেয়ী। ইসলামের বিখ্যাত চার ইমামের একজন। তিনি হাদীস শুনেছেন মালেক, ইবন উয়াইনাহ প্রমুখ থেকে। তার থেকে হাদীস শুনেছেন হুমাইদী, আবু উবাইদ আল-কাসেম ইবন সাল্লাম, আহমাদ ইবন হাম্বল প্রমুখ। শাফেয়ী বলেন, সাত বছর বয়সে আমি কুরআন হিফয করেছি, দশ বছর বয়সে আমি মুওয়াত্তা হিফয করেছি। আহমাদ ইবন হাম্বল বলেন, আল্লাহ তা'আলা মানুষের জন্য প্রতি শতকের শুরুতে এমন একজন লোক মনোনিত করেন যে মানুষদের রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুনান শিক্ষা দিবে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে মিথ্যা প্রতিহত করবে। তিনি বলেন, আমরা দেখলাম, প্রথম শতকে 'উমার ইবন আব্দুল আযীয, আর দ্বিতীয় শতকে ইমাম শাফেয়ী। তিনি হিজরী ২০৪ সালে মারা যান। [ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১০/৫)]
১৬২. তিনি হচ্ছেন আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ ইবন হাম্বল ইবল হিলাল ইবন আসাদ ইবন ইদরীস ইবন আব্দুল্লাহ আশ-শাইবানী, আল-মারওয়াযী, আল-বাগদাদী। তার কুনিয়ত হচ্ছে, আবু আব্দুল্লাহ। হাদীস ও ফিকহের ইমাম। হাম্বলী মাযহাবের প্রধান ব্যক্তিত্ব। তার মা তাকে পেটে নিয়ে বাগদাদে আসেন, সেখানেই হিজরী ১৬৪ সালের রবিউল আউয়াল মাসে তার জন্ম হয়। সেখানেই বড় হন। ইলম অন্বেষণ করেন, সেখানকার মুহাদ্দিসদের থেকে হাদীস শুনেন। তারপর কূফা যান, বসরা, মক্কা, মাদীনা, ইয়ামেন, শাম, জাযীরাহ গমন করেন। বাগদাদের ২৪১ সালের রবিউল আউয়াল মাসে মারা যান। তার গ্রন্থসমূহের অন্যতম হচ্ছে আল-মুসনাদ, কিতাবুয যুহদ ইত্যাদি। [ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৮/৪৫-৯৭)]
১৬৩. তিনি হচ্ছেন আবু ইয়া'কুব ইসহাক্ক ইবন ইবরাহীম ইবন মাখলাদ আল-হানযালী, যাকে সবাই ইবন রাহওয়িয়াহ নামে চেনে। ইসলামের প্রখ্যাত ইমামগণের একজন। তিনি হাদীস শুনেছেন ইবন উয়াইনাহ, ইবন মাহদী, প্রমুখ থেকে। তার থেকে হাদীস শুনেছেন, আয-যুহলী, আল-বুখারী, মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ প্রমুখ। যখন ইসহাক্ব ইবন রাহওয়িয়াহ মারা যান তখন মুহাম্মাদ ইবন আসলাম আত-তৃসী বলেন, আমি ইসহাকের চেয়ে কাউকে বেশি আল্লাহর ভয়কারী দেখিনি। মহান আল্লাহ বলেন, "আল্লাহকে তো কেবল তারাই ভয় করবে তারা হচ্ছেন আলেম সম্প্রদায়"। তিনি আরও বলেন, তিনি ছিলেন যুগের আলেমগণের বেশি জ্ঞানী, সুফইয়ান আস-সাওরী জীবিত থাকলে তার কাছে আসার প্রয়োজন পড়ত। হাম্বল বলেন, আবু আব্দুল্লাহকে ইসহাক্ক সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ইসহাক্ক সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়? ইসহাক্ক আমাদের নিকট ইমাম। অনুরূপ ইমাম আহমাদ বলেছেন, দুনিয়াতে ইসহাকের সমতুল্য কাউকে আমি দেখি না। তিনি হিজরী ২৩৮ সালে মারা যান। ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১১/৩৫৮)।
১৬৪. তিনি হচ্ছেন আবু আলী আল-ফুদ্ধাইল ইবন 'ইয়াদ্ব ইবন মাসউদ ইবন বিশর। ইমাম, আলেম, যাহেদ, ওয়া'য়িয। তিনি হাদীস শুনেছেন মানসূর, আ'মাশ প্রমুখ থেকে। তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেন, ইবনুল মুবারক, কাত্তান, ইবন মাহদী প্রমুখ। ইবনুল মুবারক বলেন, আমি সবচেয়ে বড় ইবাদতগুজার মানুষ হিসেবে দেখেছি আব্দুল আযীয ইবন আবী রুওয়াদকে। আর সবচেয়ে পরহেযগার মানুষ দেখেছি ফুদ্ধাইল ইবন 'ইয়াদ্বকে। সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী পেয়েছি সুফইয়ান আস- সাওরীকে, সবচেয়ে বড় ফকীহ পেয়েছি আবু হানীফাকে, তার মতো ফিকহে কাউকে দেখিনি। নম্বর ইবন শুমাইল বলেন, আমি রশীদকে বলতে শুনেছি, আমি আলেমদের মাঝে ভয়ানক হিসেবে মালেক ছাড়া কাউকে দেখিনি, পরহেযগারীতে ফুদ্ধাইলের মতো কাউকে দেখিনি। হিজরী ১৮৭ সালে তিনি মারা যান। ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৮/৩৭২)।
১৬৫. তিনি হচ্ছেন আবু নসর বিশর ইবনুল হারেস ইবন আব্দুর রহমান আল-মারওয়াযী, হাফী উপাধিতে বিখ্যাত। তৎকালীন বড় যাহেদ ও আবেদ। তিনি হাদীস শুনেছেন মালেক, হাম্মাদ ইবন যায়েদ প্রমুখ থেকে, তার থেকে হাদীস শুনেছেন আহমাদ আদ-দাওরাকী, সিররী আস-সাক্বত্বী প্রমুখ। যাহাবী বলেন, খুব কমই মুসনাদ হাদীস বর্ণনা করেছেন। নিজেকে নিন্দা করতেন বেশি। পরহেযগারী ও ইখলাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিলেন। তারপর তিনি তার কিতাবসমূহ দাফন করে ফেলেন। ইবরাহীম আল-হারবী বলেন, বাগদাদ নগরী বিশরের মতো পূর্ণ বিবেকসম্পন্ন, জিহ্বার হিফাযতকারী কাউকে বের করেনি। যেন তার প্রতিটি চুলের নিচে আক্কল ছিল। মানুষ তার পিছনে পঞ্চাশ বছর চলেছে। তবে তার কাছে কোনো মানুষের গীবত পায়নি। তার থেকে উৎকৃষ্ট কাউকে আমি দেখিনি। মৃত্যু হিজরী ২২৭ সালে। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১০/৪৬৯)।
১৬৬. তিনি হচ্ছেন আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান ইবন ফুওরাক, আল-আনসারী, আল-আসবাহানী। আশ'আরী, কালামশাস্ত্রবিদ। আবুল হাসান আল-আশ'আরীর ছাত্র আবুল হাসান আল-বাহেলীর কাছে আশ'আরী মতবাদের দীক্ষা নেন। তিনি কাররামিয়্যাদের ওপর কঠোর ছিলেন। বলা হয়ে থাকে, তিনি বিশ্বাস করতেন, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাত তার মৃত্যুর সাথে সাথে শেষ হয়ে গেছে। সেজন্য সুলতান মাহমূদ সবুক্তগীন তাকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করে। তার মৃত্যু সন ছিল হিজরী ৪০৬। তার অনেকগুলো গ্রন্থ রয়েছে। তবে তার গ্রন্থের বড় সমস্যা হচ্ছে তিনি শুধু সমস্যা দেখেন। হাদীসের একটিকে আরেকটির বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য অনবরত তা'ওয়ীল করতেন। বিস্তারিত দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৭/২১৪)।
১৬৭. ড. ফুয়াদ সিযকীন বলেন, (তারীখুত তুরাস ৪/৫২-৫৩) আমি এ পর্যন্ত এ গ্রন্থের ১৪টি নাম পেয়েছি। তবে সেটি বর্তমানে মুশকিলুল হাদীস ওয়া বায়ানুহু নামে দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ থেকে ছাপা হয়েছে।
১৬৮. গ্রন্থটির লেখক আবু বকর ইবন ফুওরাক ইমাম বাকেল্লাণীর সমসাময়িক ছিলেন। ইবন ফুওরাক ইমাম বাকেল্লানীর চেয়েও হাদীসশাস্ত্রে বেশি শ্রম ব্যয় করেন। ইমাম বাইহাক্বী তারই ছাত্র ছিলেন। ইবন ফুওরাক আল্লাহর জন্য সিফাতে খবরিয়্যাহ তথা যেসব গুণের কথা কুরআন ও সুন্নাহ'য় এসেছে সেগুলো সাব্যস্ত করতেন। তিনি আল্লাহর জন্য চেহারা, দু' হাত, চোখ সাব্যস্ত করতেন। এগুলোকে তা'ওয়ীল করতে নিষেধ করতেন। এগুলোকে 'জারেহা' বা অঙ্গ বলতেন না। এগুলোকে দেহ বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বলা থেকেও মানা করতেন। তবে তিনি আল্লাহর জন্য সিফাতে ইখতিয়ারিয়্যাহ তথা তাঁর ইচ্ছাকৃত কর্মবাচক গুণগুলোকে অস্বীকার করতেন এ কারণে যে, তার মতে এগুলো 'হুলুলুল হাওয়াদিস' বা স্রষ্টার ওপর নতুন আপতিত বিষয়। তার পদ্ধতি ছিল হাদীস দিয়ে সিফাতের সূক্ষ্ম বিষয়ে দলীল গ্রহণ করা। কিন্তু তিনি মনে করতেন খবরে ওয়াহিদ (যে হাদীসের সনদ মুতাওয়াতির নয়) তা দৃঢ় বিশ্বাস ও জ্ঞানের ফায়েদা দেয় না। বরং তার মতে তা দ্বারা কেবল ধারণা জন্মায়। দেখুন, মুশকিলুল হাদীস পৃ. ২২, ৬৮, ১০০, ১৭১, ২০৬, ১২৩, ২০৫। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ ইবন ফুওরাকের এ গ্রন্থ সম্পর্কে বলেন, এতদসত্বেও এতে যেসব সহীহ হাদীসের তা'ওয়ীল দেখা যায় তা সরাসরি বিশর আল-মারিসী ও তার মত অপর জাহমিয়্যাদের তা'ওয়ীল এর হুবহু সংকলন। [দারউত তা'আরুদ্ব (৫/২৩৭)] অন্যত্র তিনি বলেন, আর আবু বকর ইবন ফুওরাক তার কিতাবে বিশর আল-মারিসী ও তার পরবর্তী লোকদের সেসব তা'ওয়ীল একত্রিত করেছেন যা তার কিতাবের জন্য উপযোগী বিবেচনা করেছেন। তবে তিনি নিজে বিশরের মতো জাহমিয়্যাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। কারণ তিনি কিছু সিফাত সাব্যস্ত করেছেন যা বিশর সাব্যস্ত করেনি। তার আগে আবুল হাসান ইবন মাহদী আত-ত্বাবারীও তা'ওয়ীল করে একটি গ্রন্থ লিখেছিলেন। তার পদ্ধতি আবু বকর ইবন ফুওরাকের পদ্ধতির চেয়ে উত্তম। [বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৭/১৫৩-১৫৪)]
আল্লামা মু'আল্লেমী বলেন, বস্তুত ইবন ফুওরাক জাহমিদের পদ্ধতিতে চলেছিলেন, তিনি তার এ কিতাবে ইবনুস সালজীর নীতি অনুসরণ করেন। কারণ তিনি সিফাতের আয়াতসমূহের বিকৃতি সাধন করেন, হাদীসের মাঝে ত্রুটি প্রদানের চেষ্টা করেন। [আত-তানকীল (১/২৪২)] ইবন ফুওরাকের কিতাবে যেসব মারাত্মক সমস্যা দেখা যায় তা হচ্ছে: ১) প্রতিটি হাদীসকে তা'ওয়ীল করার অপচেষ্টা করা হয়েছে। তিনি এ কাজকে আহলুল হাদীসদের একটি কাজ হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। কারণ তার নিকট আহলুল হাদীসদের কাজ দু'টি: ক) হাদীস বর্ণনা করবে, সনদ যাচাই করবে, সহীহ ও দুর্বল আলাদা করবে। খ) হাদীস বর্ণনার বিভিন্ন অবস্থা যাচাই করবে, মানদণ্ড দাঁড় করাবে, মূল থেকে শাখা বের করবে, সন্দেহকারীদের সন্দেহ দূর করবে। আর তিনি নিজে এ কাজটি করাকে আহলুল হাদীসদের কাজ বলে এসব তা'ওয়ীলের গ্রহণযোগ্যতা দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। বস্তুত এভাবে অপব্যাখ্যা দাঁড় করানো কোনো মুহাদ্দিস তো নয় কোনো মুসলিমের কাজই নয়। ইবন ফুওরাকের এসব তা'ওয়ীল এত বেশি পরিমাণ তাহরীফ তথা বিকৃতির পর্যায়ে গিয়েছিল যে, তার একনিষ্ঠ অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও যাহেদ কাউসারী এসব তা'ওয়ীলের অনেকগুলোর ব্যাপারে আপত্তি জানাতে বাধ্য হয়েছিল। দেখুন, বাইহাক্বীর আল-আসমা ওয়াস সিফাতের উপর যাহেদ কাউসারীর টীকা, পৃ. ৪৫২, ৫১৮।
২) সহীহ, দ্বায়ীফ, বানোয়াট সব রকমের হাদীসকে একসাথে মিশিয়ে ফেলেছিল। ফলে সে সবগুলোকেই তা'ওয়ীল করেছিল, যেন তা'ওয়ীল করা তার জন্য বাধ্যতামূলক কাজ ছিল। নাউযুবিল্লাহ। [তার কিছু নমূনা দেখুন, ড. আব্দুর রহমান সালেহ আলে মাহমূদ এর গ্রন্থ মাওকাফু ইবন তাইমিয়্যাহ মিনাল আশা'য়েরা (২/৫৬২); ড. আব্দুর রাযযাক মা'আশ, মাসালিকি আহলিস সুন্নাতি ফী মা আশকালা মিন নুসূসিল আকীদাহ (২/৩০)]
১৬৯. তিনিই ফখরুদ্দীন রাযী, যার জীবনী ইতোপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।
১৭০. রাযী এ গ্রন্থটি তৎকালীন বাদশাহ আস-সুলতানুল আদিল সাইফুদ্দীন আবু বকর ইবন আইয়্যুব ইবন শাযী এর জন্য লিখেছিলেন। এ বাদশাহ অত্যন্ত উত্তম চরিতের লোক ছিলেন। [ইবন কাসীর, আল- বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (১৩/৯৪)] রাযীর লেখা এ গ্রন্থ 'আসাসুত তাক্বদীস' এটাকে তিনি চারভাগে ভাগ করেছেন: প্রথম ভাগ, আল্লাহ দেহবাদ থেকে মুক্ত। দ্বিতীয় ভাগ, হাদীস ও আয়াতসমূহের মধ্য হতে যা মুতাশাবিহাত তার তা'ওয়ীল। তৃতীয় ভাগ, সালাফদের মাযহাব নির্ধারণ চতুর্থ ভাগ, সালাফদের মাযহাবের শাখা নির্ধারণ। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ এ গ্রন্থটির খণ্ডনে "নাকদুত তা'সীস" নামে এক বিশাল গ্রন্থ রচনা করেন। ইবন তাইমিয়াহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এ গ্রন্থে রাযী জাহমিয়্যাদের দলীল-প্রমাণাদি এত বেশি পরিমাণ জমা করেছে যা জাহমিয়্যারাও তাদের কোনো গ্রন্থে জমা করেছে বলে দেখা যায়নি। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৬/২৮৯)। এ গ্রন্থের খণ্ডন করে ইবন তাইমিয়্যাহ অন্যান্য স্থানে আরও যা বলেছেন, তা দেখুন, মিনহাজুস সুন্নাহ (২/২১৬, ৩৫১, ৫৫৬); দারউত তা'আরুদ্ব (১/৪); আসসাব'ঈনিয়্যাহ (বুগইয়াতুল মুরতাদ), পৃ. ২০১; আত-তিস'ঈনিয়্যাহ (২/২১৬); মাজমূ' ফাতাওয়া (৪/৭১-৭২)।
১৭১. অর্থাৎ পূর্ববর্তী পথভ্রষ্ট কিছু সম্প্রদায়ের কাছে। পূর্বে যেসব সন্দেহ জাহমিয়্যাহ, মু'তাযিলাদের কাছে ছিল, সেসব সন্দেহ হুবহু এসে পরবর্তী আশ'আরী মতবাদের লোকদের গ্রন্থে প্রকাশ পেয়েছে, যা দ্বারা বুঝা গেল যে, জাহমিয়্যাহ ও মু'তাযিলাদের বিরোধিতা করতে করতে কখন যে তারা জাহমিয়্যাহ ও মু'তাযিলাদের বক্তব্য ও সন্দেহগুলো আত্মস্ত করে নিয়েছে তা তারা নিজেরাও বুঝতে পারেনি।
১৭২. তিনি হচ্ছেন আবু আলী মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল ওয়াহহাব ইবন সালাম আল-জুব্বাঈ, মু'তাযিলাদের একজন বড় আলেম। তার থেকেই সর্বপ্রথম আবুল আশ'আরী মু'তাযিলা মতবাদ গ্রহণ করে। জুব্বাঈ এসব গ্রহণ করেছে তার শিক্ষক আবু ইউসুফ ইয়া'কূব ইবন আব্দুল্লাহ আল-বসরী থেকে, তখন তিনি বসরায় মু'তাযিলাদের প্রধান ছিলেন। তার তিন ভাই বিষয়ক মুনাযারা সারা দুনিয়া খ্যাত। ৩০৩ হিজরীতে মারা যায়। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৪/১৮৩)।
১৭৩. তিনি হচ্ছেন আবুল হাসান আব্দুল জাব্বার ইবন আহমাদ ইবন আব্দুল জাব্বার আল-হামাযানী, প্রথমে সে ভিন্ন মতাদর্শের ছিল, কিছু দিন মু'তাযিলাদের মজলিসে হাজির হয়ে পুরো মু'তাযিলা হয়ে যায়। মৃত্যু ৪১৫ হিজরী। ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৭/২৪৪)।
১৭৪. তিনি হচ্ছেন আবুল হুসাইন আল-বসরী, মুহাম্মাদ ইবন আলী ইবনুত তাইয়্যেব, আল-বসরী। বড় ধরনের বাগ্মী ছিলেন। মু'তাযিলাদের লেখক ও ওকীল। মৃত্যু ৪৩৬ হিজরী বাগদাদে। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৭/৫৮৭)।
১৭৫. তিনি হচ্ছেন, আবুল ওফা আলী ইবন আকীল ইবন মুহাম্মাদ ইবন আকীল আল-বাগদাদী। আবুল ওফা আল-হাম্বলী। তিনি তার অনেক গ্রন্থে তা'ওয়ীল করেছেন। হাম্বলী হওয়া সত্ত্বেও আকীদাহ'র ক্ষেত্রে অনেকটা মু'তাযিলী। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৯/৪৪৩)।
📄 ইমাম দারেমীর কিতাবের প্রশংসা
তবে আমি স্পষ্ট বর্ণনা করছি যে, তাদের তা'ওয়ীল হুবহু মিররীসীর তা'ওয়ীল। এটার প্রমাণ ইমাম বুখারীর সময়কালের প্রসিদ্ধ ইমাম দারেমী (১৭৬) স্বীয় رد عثمان بن سعيد، على الكاذب العنيد، فيما افترى على الله في التوحيد কিতাবে এসব তা'ওয়ীল হুবহু বিশর আল-মিররীসীর বলে উল্লেখ করেছেন। যাতে তিনি মিররীসী থেকে এমনসব বক্তব্য বর্ণনা করেছেন যা প্রমাণ করে যে, মিররীসী পরবর্তী যারাই এ বিষয়ে তার সাথে সংযুক্ত হয়েছে সে তাদের থেকে নিয়ম-নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বেশি পারঙ্গম, অনুরূপ মা'কূল (১৭৭) ও মানকূল (১৭৮) সম্বন্ধে অধিক অবগত। অতঃপর দারেমী স্বীয় বক্তব্য দ্বারা সেগুলো খণ্ডন করেছেন; যা কোনো বিবেকের যুক্তিতে পারঙ্গম মেধাবী ব্যক্তি অধ্যয়ন করলে সহজেই জানতে পারবে যে, সালাফে সালেহীন বস্তুত কোন নীতির ওপর ছিলেন। আর তার নিকট সালাফগণের তরীকার প্রামাণ্যতা শক্তিশালী হওয়া এবং তাদের বিরোধীদের তরীকার প্রমাণ দুর্বল হওয়া সহজেই ফুটে উঠবে।
টিকাঃ
১৭৬. তিনি হচ্ছেন উসমান ইবন সা'ঈদ ইবন খালেদ ইবন সা'ঈদ আদ-দারেমী আস-সিজিস্তানী, আবু সা'ঈদ, আল-ইমাম, আল-আল্লামাহ। তিনি ছিলেন বিদ'আতীদের চক্ষুশূল ও গলার কাঁটা। সুন্দর মুনাযারার ক্ষমতাপ্রাপ্ত, প্রমাণ উপস্থাপনে সিদ্ধহস্ত। হাদীস সংগ্রহে অধিক সফরকারী। তার মৃত্যু ছিল ২৮০ হিজরীতে। তিনি জাহমিয়্যাহ ও মু'তাযিলাদের আকীদাহ'র খণ্ডনে দু'টি গ্রন্থ লিখেছেন। আর- রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ, আর-রাদ্দু আলাল বিশর আল-মিররীসী। আকীদাহ'র ছাত্রদের জন্য এ দু'টি গ্রন্থ না পড়ার কোনো বিকল্প নেই। শাইখুল ইসলাম ও তার ছাত্র ইবনুল কাইয়্যেম এ দু'টি গ্রন্থ পড়ার জন্য অসিয়ত করতেন। দেখুন, ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৩/৬২১); ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুয়ুশ, পৃ. ২৩১; ইবন আব্দুল হাদী, রিসালাতুল লাতীফাতুন ফী আহাদীসি মুতাফাররাক্বাতিন দ্বা'য়িফাতিন, পৃ. ৭৪-৭৬।
১৭৭. অর্থাৎ বিবেকের যুক্তিভিত্তিক প্রমাণাদি।
১৭৮. অর্থাৎ কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমা'র দলীল-প্রমাণাদি।