📄 উম্মতের বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্তি ও নাজাতপ্রাপ্ত দলের বর্ণনা
অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানিয়েছেন যে, তাঁর উম্মত তিয়াত্তর দলে বিভক্ত হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবশ্যই কী হবে তা জেনে বলেছেন। অতঃপর তিনি বলেছেন:
"আমি তোমাদের মাঝে এমন জিনিস রেখে যাচ্ছি যা তোমরা শক্তভাবে আঁকড়ে ধরলে কখনো পথচ্যুত হবে না। তা হলো আল্লাহর কিতাব।" তেমনি নাজাতপ্রাপ্ত দলের বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে:
"তারা ঐসব লোক যারা ঐ পথে চলে যে পথে আজ আমি আছি ও আমার সাহাবীগণ আছেন।”
তিনি কেন বললেন না, যে কেউ কুরআনকে বা কুরআনের দালালাত (নির্দেশনাকে) কুরআনের মাফতূমকে বা প্রকাশ্য কুরআনকে ই'তিকাদের ব্যাপারে আঁকড়ে ধরবে, সে পথভ্রষ্ট। বরং হিদায়াত হচ্ছে- তোমরা ফিরে যাবে তোমাদের আক্কলী ক্বিয়াসের দিকে এবং (উত্তম) তিন প্রজন্মের পর কাلامপন্থীরা যা নতুন উদ্ভাবন করেছে তার দিকে; যদিও এ কালামশাস্ত্র মূল শিকড় গজিয়েছিল তাবে'য়ীযুগের শেষ দিকে।
টিকাঃ
১২২. এটিই হচ্ছে বিখ্যাত হাদীসুল ইফতিরাক্ক। বা উম্মতের মাঝে মতভেদ হবে মর্মে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের জানানো সংক্রান্ত হাদীস। হাদীসটি বিভিন্ন বর্ণনায় কাছাকাছি শব্দে অনেক সাহাবীদের থেকেই বর্ণিত হয়েছে। আবু হুরায়রা, 'আউফ ইবন মালেক, আনাস, মু'আওয়িয়াহ, ইবন 'উমার, জাবের, আবু উমামাহ, ইবন মাসউদ, সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস প্রমুখ সাহাবীগণ রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুম তা বর্ণনা করেছেন। আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "ইয়াহুদীরা এক বা দুই ও সত্তর দলে বিভক্ত হয়েছে, নাসারারা এক বা দুই ও সত্তর দলে বিভক্ত হয়েছে, আমার উম্মত তিয়াত্তর দলে বিভক্ত হবে।” হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, যথাক্রমে আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৫৯৬; তিরমিযী, হাদীস নং ২৬৪০; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৩৯৯১; আহমাদ (২/৩৩২); আবু ইয়া'লা, আল-মুসনাদ ৫৯১০; ইবন আবী আসেম, আস-সুন্নাহ, হাদীস নং ৬৬; ইবন নসর, আস-সুন্নাহ, হাদীস নং ৫৮; ইবন ব্যত্তাহ, আল-ইবানাহ, হাদীস নং ২৭৩; ইবন হিব্বান, হাদীস নং ৬২৪৭; আজুররী, আশ-শরী'আহ, হাদীস নং ১৫; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, হাদীস নং ১০, ৪৪১, ৪৪২; বাইহাক্বী, আস-সুনানুল কুবরা (১০/২০৮), হাদীস নং ২০৯০১; আল-মারওয়াযী, আস-সুন্নাহ, হাদীস নং ৫৮। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, হাদীসটি সহীহ ও বিখ্যাত যা সুনান ও মাসানীদে এসেছে। মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/৩৪৫); অনুরূপ ইমাম শাত্বেবীও সেটাকে সহীহ বলেছেন, আল-ই'তিসাম (২/১৮৯-১৯০); তাছাড়া শাইখ মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী রাহিমাহুল্লাহও হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন এবং যারা এতে দোষ দেখেছে তাদের সন্দেহসমূহ তিনি খণ্ডন করেছেন। দেখুন, আস- সিলসিলাতুস সহীহাহ, নং ২০৩; তাখরীজ আহাদীস কিতাবিস সুন্নাহ (১/৩৩), নং ৬৬। অনুরূপ ইমাম ইবন আবী আসেম এ হাদীসের বহু সূত্র নিয়ে এসেছেন। দেখুন, আস-সুন্নাহ (১/৩২-৩৩)।
১২৩. অর্থাৎ উম্মতের বিভক্তির বিষয়টি আল্লাহ তাকে জানিয়েছেন। জানার পরই তিনি তা বলেছেন। সবকিছু জেনে নিয়ে বলেছেন এটা শাইখের দাবি নয়; কারণ সবকিছুর জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত আর কারও নেই; তা রুবুবিয়াতের অংশ।
১২৪. হাদীসটি জাবের ইবন আব্দুল্লাহ বর্ণিত বিখ্যাত ও প্রসিদ্ধ, যা বর্ণনা করেছেন তিরমিযী, হাদীস নং ৩৭৮৬; আহমাদ, ফাযায়েলুস সাহাবাহ, হাদীস নং ১৭০; আব্দ ইবন হুমাইদ, হাদীস নং ২৪০; ইবন আবী আসেম, আস-সুন্নাহ, হাদীস নং ১৫৫৬, ১৫৫৮; ত্বাবারানী, আল-মু'জামুল আল-আওসাত্ব, হাদীস নং ৪৭৫৭। উল্লেখ্য যে, এ হাদীসের কোনো কোনো শব্দে 'আর আমার পরিবার' কথাটি এসেছে। কিন্তু গবেষণা করে দেখা গেছে 'আর আমার পরিবার' এ কথাটুকু আলাদা। পরিবারকে ধারণ করতে বলা হয়নি। বলা হয়েছে, তাদের খোঁজ-খবর রাখতে এবং তাদের প্রতি দয়াদ্র থাকতে।
১২৫. নাজাতপ্রাপ্ত দল বলতে সে দলটিকে বুঝানো হয়েছে, উম্মতের মধ্যে যারা জাহান্নামে যাওয়া থেকে নাজাতপ্রাপ্ত হয়েছে, সেই দলটি। বাকী ৭২ ফিরকা জাহান্নামে যাবে। ৭৩ ফিরকার মধ্য হতে একমাত্র যে ফিরকাটির ব্যাপারে সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছে। দুনিয়ার তাবৎ মানুষ দাবি করবে যে সে উক্ত দলের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু দাবি করলেই তো হবে না, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে নাজাতপ্রাপ্ত দলটির বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন।
১২৬. এটি পূর্ববর্তী 'হাদীসূল ইফতিরাক' এর অংশ বিশেষ। এখানে নাজাতপ্রাপ্ত দলের একটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ হাদীসের শব্দ দিয়ে নাজাতপ্রাপ্ত দল কারা তা নির্ধারণ করছেন। আর তা হচ্ছে যারা 'সেদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে আকীদাহ, মানহাজ ও শরী'আর ওপর ছিল তার ওপর অবশিষ্ট থাকবে, অনুরূপ তার সাহাবীগণ যা ধারণ করে চলে গেছেন, সে নীতির যথার্থ অনুসার ও অনুগামী। হাদীসটির তাখরীজ হচ্ছে, এ অংশটুকু ইবন 'উমার রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে বর্ণিত, যা নিম্নোক্ত মুহাদ্দিসগণ তাদের গ্রন্থে আনয়ন করেছেন। তিরমিযী, হাদীস নং ২৬৪১। হাকেম ফিল মুস্তাদরাক (১/১২৮, ১২৯), হাদীস নং ৪৪৪। লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ (১/১০০)। আজুররী, আশ-শরী'আহ, পৃ. ১৫-১৬। আল-মারওয়াযী, আস-সুন্নাহ পৃ. ২৩। ইবন বাত্তাহ, আল-ইবানাহ (১/৩৬৮-৩৭০), হাদীস নং ২৬৪, ২৬৫। উক্কাইলী, আদ-দু'আফাহ (২/২৬২)। মুহাম্মাদ ইবন ওয়াদ্দাহ, আল-বিদা' ওয়ান নাহই আনহা, পৃ. ৮৪। বাগাওয়ী, শারহুস সুন্নাহ (১/২১৩) এবং সহীহ বলেছেন।
১২৭. যেমনটি জাহমিয়্যা, মু'তাযিলী, বাতেনী সূফীরা বলে থাকে।
১২৮. যেমনটি তথাকথিত দার্শনিক, কালামশাস্ত্রবিদ, মু'তাযিলা, আশ'আরিয়া ও মাতুরিদিয়া ফিরকার লোকেরা বলে থাকে।
📄 সিফাত নিষ্ক্রিয়কারী বা নাকচকারীদের বক্তব্যের উৎসস্থল
বস্তুত সিফাতকে নিষ্ক্রিয়করণ করার এ মতবাদটি গ্রহণ করা হয়েছে মুশরিক ও ইয়াহুদীদের শিষ্যদের থেকে এবং পথভ্রষ্ট দীন বিরোধীদের থেকে; কেননা প্রথম যে ব্যক্তি ইসলামের মধ্যে একথা বলেছে বলে প্রমাণিত আছে অর্থাৎ 'আল্লাহ তাঁর 'আরশের উপর হাকীকীভাবে (বাস্তবে) নেই বরং তিনি 'আরশের উপর কর্তৃত্ব অর্জন করেছেন ইত্যাদি, প্রথমে একথা প্রকাশ পায় যার থেকে সে হচ্ছে জা'দ ইবন দিরহাম।
তার থেকে জাহম ইবন সাফওয়ান এটি গ্রহণ করে প্রচার-প্রসার করে। ফলে জাহমিয়্যাহ মতবাদ তার দিকে সম্পর্কিত করা হয়। আর বলা হয়, জা'দ তার বক্তব্য গ্রহণ করার ক্ষেত্রে তাদের ওয়ারিস।
টিকাঃ
১২৯. অর্থাৎ যারা আল্লাহর গুণাবলি সাব্যস্ত করা বা না করার ক্ষেত্রে যুক্তি কিয়াসের দিকে ঝুঁকেছে এবং কুরআন-হাদীসের প্রকাশ্য অর্থ নেয়া যাবে না এ নীতিটি সর্বপ্রথম কারা মুসলিমদের মধ্যে অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে তার বর্ণনা।
১৩০. জা'দ ইবন দিরহাম, সে মূলত একজন দাস ছিল। তার মূল ছিল খুরাসান থেকে। সে মারওয়ান আল-হিমার বা সর্বশেষ উমাইয়্যা খলীফা মারওয়ানের শিক্ষক ছিল। পথভ্রষ্ট, বিদ'আতী। সর্বপ্রথম সে বলেছিল, আল্লাহ ইবরাহীমকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেননি, মূসা 'আলাইহিস সালামের সাথে কথা বলেননি। আর কথা বলা নাকি তাঁর জন্য জায়েযও নয়। নাউযুবিল্লাহ। ১২৪ হিজরীতে খালেদ আব্দুল্লাহ আল-কাসরী তাকে কুফাতে কুরবানীর ঈদের দিন হত্যা করেন। যখন তিনি মানুষদের ভাষণ দিচ্ছিলেন, তরপর বললেন, হে মানুষেরা, তোমরা কুরবানী কর, আল্লাহ তোমাদের কুরবানী কবুল করুন, তবে আমি জা'দ ইবন দিরহামকে দিয়ে কুরবানী করব, সে মনে করেছে আল্লাহ ইবরাহীমকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেননি, মূসার সাথে কথা বলেননি। জা'দ যা বলেছে তা থেকে আল্লাহ কতই না পবিত্র। তারপর তিনি মিম্বর থেকে নেমে এসে জা'দকে যবাই করেন। এ ঘটনা ইমাম বুখারী তার 'খালকু আফ'আলিল ইবাদ' নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেন, পৃ. ২৯, ৩০; অনুরূপ বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা (১০/২০৫-২০৬); আজুররী, আশ-שরী'আহ, পৃ. ৯৭-৩২৮; দারেমী উসমান ইবন সা'ঈদ, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ, পৃ. ১৭, ৮২; লালেকাঈ, শারহু উসুলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ (১/৩১৯); আন-নাজ্জাদ, আর-রাদ্দু আলা মান ইয়াকুলু আল-কুরআনু মাখলুকুন, পৃ. ৫৪, নং ৭২; ইবন বাত্তাহ, আল-ইবানাহ; আল-খাল্লাল, আস-সুন্নাহ, আয-যাহাবী, আল-উলু, পৃ. ১০০। ইবন কাসীর বলেন, এ ঘটনাটি বড় বড় হাফেযরা বর্ণনা করেছেন, যেমন: বুখারী, ইবন আবী হাতেম, বাইহাক্কী, আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ ও ইবন আসাকির। ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, "আর সে জন্যই জা'দ ইবন দিরহামকে কুরবানী দিল খালেদ আল-কাসরী, আর সেটা ছিল মানুষের কুরবানীর দিন। যখন সে বলল ইবরাহীম আল্লাহর বন্ধু নয়, অনুরূপ মূসাও আল্লাহর সাথে কথা বলেননি।” [নুনিয়াতু ইবনিল কাইয়্যেম পৃ. ৭; কাসীদার শুরুর অধ্যায়] এ জা'দ ইবন দিরহামের ছাত্র ছিল জাহম ইবন সাফওয়ান। জাহম এ ভ্রান্ত মতবাদটি জা'দ থেকেই নিয়েছিল। দেখুন, যাহাবী, মীযানুল ই'তিদাল (১/১৮৫); ইবন হাজার, লিসানুল মীযান (২/১০৫); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৫/৪৩৩); ইবন কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (৯/৩৫০), (১০/১৯); ইবন তাইমিয়্যাহ, আল-ফাতাওয়া (১২/৩৫০-৩৫১), (১০/৬৬); দারেমী, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ, পৃ. ১৭।
১৩১. জাহম ইবন সাফওয়ান, আবু মুহরিয আর-রাসেবী, তাদের দাস, মূলত সামারকান্দ থেকে। জাহমিয়্যাদের মূল। তার দিকেই জাহমিয়্যাহ ফির্কার লোকদের সম্পৃক্ত করা হয়। পথভ্রষ্ট, বিদ'আতী। উম্মতের মধ্যে বড় অকল্যাণ সৃষ্টিকারী। তা'ত্বীল তথা আল্লাহর গুণ অস্বীকারকারী, আল্লাহর নাম ও গুণ সবই অস্বীকার করত। সে মনে করত কুরআন সৃষ্ট। সে অপরদিক থেকে মানুষের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে জাবর বা মানুষ তা করতে বাধ্য বলত। সে বলত যে জান্নাত ও জাহান্নাম ধ্বংস হয়ে যাবে। সে প্রতিটি বিদ'আতের কিছু অংশ গ্রহণ করেছে। ১২৮ হিজরীতে সিলম ইবন আহওয়ায আল-কিরমানী তাকে হত্যা করেন। তখন তিনি মার্ড প্রদেশের গভর্নর ছিলেন। দেখুন, যাহাবী, মীযানুল ই'তিদাল (২/১৯৭); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (৬/২৬-২৭); ইবন হাজার, লিসানুল মীযান (২/১৪২); ইবন কাসীর, বিদায়াহ ওয়ান নিহায়া (৯/৩৫০); যিরিকলী, আল-আ'লাম (২/১৪১)।
১৩২. জাহমিয়্যাহ, পথভ্রষ্ট একটি ফিরকা। তারা পূর্বোক্ত জাহম ইবন সাফওয়ানের অনুসারী। সে বলত, মানুষের কোনো ক্ষমতা নেই, মানুষ বাধ্য। অনুরূপ কোনো প্রাণীরই কোনো ক্ষমতা নেই ও পছন্দ করে কাজ করার সুযোগ নেই। সে বিশ্বাস করতো যে, জান্নাত ও জাহান্নাম লয়প্রাপ্ত হবে। আরও মনে করতো যে, ঈমান শুধু জানার নাম। আর সে কুরআনকে বানানো বলে বিশ্বাস করত। আর সে আল্লাহর সকল নাম ও গুণ অস্বীকার করত। পরবর্তীতে জাহমিয়্যাহ নামটি কম-বেশ আল্লাহর নাম ও গুণ অস্বীকারকারীদের সবার জন্যই প্রযোজ্য হয়ে বলা হয়, অমুক জাহমিয়্যাদের আকীদাহ গ্রহণ করেছে। কারণ এরা সবাই নাম ও গুণ অস্বীকার করার ক্ষেত্রে তাদের ওয়ারিস। দেখুন, আল-বাগদাদী, আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক, পৃ. ১৯৯; আশ'আরী, মাক্বালাতুল ইসলামিয়্যীন, পৃ. ২৭৯-২৮০; আল-ইসফারায়ীনী, আত-তাবসীর ফিদ দীন, পৃ. ৬৩-৬৪; আস-সাকসাকী, আল-বুরহান ফী মা'রিফাতি আকায়িদি আহলিল আদইয়ান, পৃ. ৩৪-৩৫।
১৩৩. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "এ মতবাদ যে, 'আরশের উপর আল্লাহ নেই, এটা ইসলামে সর্বপ্রথম জা'দ ইবন দিরহাম ও জাহম ইবন সাফওয়ান এবং তার অনুসারীরা আমদানী করে বিদ'আত হিসেবে চালু করে। উম্মতের লোকদের নিকট তারা সৃষ্টির সর্বনিকৃষ্ট প্রবৃত্তির অনুসারী। সালাফে সালেহীন তাদেরকে কাফের বলতেন, যদিও নির্দিষ্ট করে একজনকে কাফের বলতেন না। সালাফগণ বলতেন, আমরা ইয়াহূদী ও নাসারাদের বক্তব্য বর্ণনা করতে পারি, কিন্তু জাহমিয়্যাদের বক্তব্য বর্ণনা করতে পারি না। সালাফগণ আরও বলতেন, মুসলিম, ইয়াহূদী ও নাসারা সবাই একমত যে, আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপরে, অথচ জাহমিয়্যারা বলে, তিনি 'আরশের উপর নন।” বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/৪১৭)। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ আরও সাব্যস্ত করলেন যে, ইসলামে সর্বপ্রথম যে ব্যক্তি এটা বলেছে যে, আল্লাহ কারও সাথে কথা বলেননি, আল্লাহ তার বান্দাদের ভালোবাসেন না, সে হচ্ছে জা'দ ইবন দিরহাম। আর তাই সে অস্বীকার করত যে, আল্লাহ ইবরাহীমকে অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছেন, আর মুসার সাথে কথা বলেছেন। দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ' ফাতাওয়া (৮/৩৫৭), (১০/৬৬, ৬৯৭) (১২/২৬)। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ আরও উল্লেখ করেছেন যে, "প্রথম যার থেকে কুরআনকে সৃষ্ট বলা হয়েছে সে হচ্ছে জা'দ ইবন দিরহাম ও তার শিষ্য জাহম ইবন সাফওয়ান।” দেখুন, মাজমু' ফাতওয়া (১২/৩০১)। তিনি আরও বলেন, "বলা হয়ে থাকে, ইসলামে প্রথম যে ব্যক্তি তা'ত্বীল বা আল্লাহকে গুণশুণ্যকরণের কথা বলেছে, যা মূলত ফির'আউনের কথা ছিল, সে হচ্ছে জা'দ ইবন দিরহাম।” দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (১৩/১৭৭)। অন্য জায়গায় বিদ'আতের সূচনা (যেমন মু'তাযিলাদের বিদ'আত) বর্ণনা করার সময় বলেন, "তখন পর্যন্ত আল্লাহর গুণাবলি অস্বীকার করার মত বিদ'আত চালু হয়েছিল না, অবশেষে প্রকাশ হল জা'দ ইবন দিরহাম, সে সর্বপ্রথম তার প্রকাশ ঘটাল...।” দেখুন, ফাতাওয়া (১৪/৩৫০)। অন্যত্র বলেন, "যে শির্কের বিরোধিতা করেছেন খলীল ইবরাহীম, যার ওপর সেখানকার লোকেরা তার শত্রুতা করেছিল, সেখানকার লোকেরাই আল্লাহর গুণ ও কর্ম অস্বীকারকারীদের ইমাম বিবেচিত হলো। ইসলামে প্রথম যে ব্যক্তি আল্লাহর গুণ অস্বীকার করেছিল সে হচ্ছে জা'দ ইবন দিরহাম, সে ছিল (সর্বশেষ উমাইয়া খলীফা) মারওয়ান ইবন মুহাম্মাদের শিক্ষক। ইমাম আহমাদ বলেন, বলা হয় এ জা'দ ইবন দিরহাম ছিল হাররান এলাকার। তার থেকেই জাহম ইবন সাফওয়ান আল্লাহর গুণ অস্বীকার করার মতবাদটি গ্রহণ করে। আর হাররানে ছিল বেশ কিছু সাবেয়ী বুদ্ধিজীবি ও দার্শনিক নেতৃবৃন্দ, সেসব বিকৃত দীনের অবশিষ্ট লোক, যারা শির্ক করতো, আল্লাহর গুণ ও কর্ম অস্বীকার করতো। [দারউত তা'আরুদ্ব (১/৩১৩)] বরং ইমাম লালেকাঈ রাহিমাহুল্লাহ থেকেও তিনি বর্ণনা করেন যে, উম্মতের মাঝে এ ব্যাপারে কোনো মতভেদ নেই যে, জা'দ সর্বপ্রথম আল্লাহর গুণ অস্বীকার করার মতবাদ দাঁড় করায়, তারপর জাহম তার অনুসরণ করে। [ফাতাওয়া (১২/৪২০)] ইমাম লালেকাঈ তিনি নিজেও ইমাম ইবন আবী হাতেম থেকে বর্ণনা করেছেন যে, প্রথম যে ব্যক্তি আল্লাহর গুণ অস্বীকার করেছে সে হচ্ছে জা'দ ইবন দিরহাম। [শারহু উসুলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ (৩/৩৮২)] তাছাড়া ইতোপূর্বেকার যারা যারা জা'দ ইবন দিরহামকেই আল্লাহর গুণ অস্বীকার করার জনক বলেছে তারা হচ্ছেন, ইমাম উসমান ইবন সা'ঈদ আদ-দারেমী, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যা, পৃ. ৭; আবু ইসমাঈল আল-হারওয়ী আল-আনসারী, যাম্মুল কালাম, পৃ. ৩০৪। পরবর্তীদের মাঝে যারা তা উল্লেখ করেছেন, তারা হচ্ছেন ইমাম ইবন কাসীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (৯/৩৫০); যাহাবী, তারীখুল ইসলাম (৩/২১৮)। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ আরও বলেন, উমাইয়াদের ওপর জা'দ এর বিদ'আতের করুণ পরিণতি আপতিত হয়েছে। কারণ এটি ছিল সেসব কারণের একটি যার দরুন তাদের সাম্রাজ্যের পতন হয়েছিল। [মাজমূ' ফাতাওয়া (১৩/১৮২)] ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, আর তার মাথার উপরই আল্লাহ তা'আলা বনী উমাইয়্যাদের রাজত্ব ও খিলাফত ছিনিয়ে নিয়েছেন, তাদেরকে সারা পৃথিবীতে বিক্ষিপ্ত করে দিয়েছেন, সম্পূর্ণরূপে টুকরা টুকরা করেছেন, তাদের শিক্ষক (জা'দ ইবন দিরহাম) এর কারণে, যে ছিল আল্লাহর গুণ অস্বীকারকারী ও আল্লাহর গুণকে নিষ্ক্রীয়কারী। [আস-সাওয়া'য়িকুল মুরসালাহ (৩/১০৭১)]
📄 জাহম ইবন দিহরাম কর্তৃক তার বেদুঈ উস্তাদ বানের পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হওয়া
আর জা'দ ইবন দিরহাম-ইতোপূর্বে- হাররান ভূখণ্ডের অধিবাসী ছিল। তাদের মধ্যে নমরুদ ও কিন'আনী ধর্মের অবশিষ্ট অনেক সাবেয়ী ও দার্শনিক ছিল, যাদের জাদুর ব্যাপারে পরবর্তী কেউ কেউ পুস্তক রচনা করেছেন। আর নমরুদ হচ্ছে- মুশরিক কালদানী সাবেয়ীদের রাজা, যেমন পারসীয় ও অগ্নি উপাসকদের বাদশাহ কিসরা, মিশরের বাদশাহ ফির'আউন, হাবশার খ্রিস্টান বাদশা নাজ্জাশী। এটা জাতিবাচক নাম, ব্যক্তিবাচক নাম নয়।
সাবেয়ীদের অধিকাংশই ছিল মুশরিক, আর তাদের মধ্যকার জ্ঞানী বলতে দার্শনিকদেরই বুঝায়। যদিও তাদের কেউ কেউ আল্লাহ ও আখেরাতের ওপর ঈমান রাখত। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿إِنَّ الَّذِينَ ءَامَنُوا وَالَّذِينَ هَادُوا وَالنَّصَرَى وَالصَّابِئِينَ مَنْ ءَامَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَهُمْ أَجْرُهُمْ عِندَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ ﴾ [البقرة: ٦٢]
"নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে, যারা ইয়াহূদী হয়েছে এবং নাসারা ও সাবেয়ীরা যারাই আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, তাদের জন্য পুরস্কার রয়েছে তাদের রব্ব এর কাছে। আর তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।” [সূরা আল-বাকারাহ: ৬২]
অনুরূপ অন্য আয়াতে বলেন,
﴿إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَادُوا وَالصَّبِئُونَ وَالنَّصَارَى مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ ﴾ [المائدة: ٦٩]
“নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং যারা ইয়াহূদী হয়েছে, আর সাবেয়ী ও নাসারাদের মধ্যে যারা আল্লাহ্ ও শেষ দিনের ওপর ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।” [সূরা আল-মায়েদাহ: ৬৯]
তবে সাবেয়ীদের অনেকেই অথবা অধিকাংশই কাফের অথবা মুশরিক। যেমনিভাবে অনেক ইয়াহুদী ও নাসারা তাদের দীনে পরিবর্তন ও বিকৃতি সাধন করেছে, কাফির ও মুশরিকে পরিণত হয়েছে, অনুরূপভাবে সেসব সাবেয়ী যারা তখন বর্তমান ছিল, তারা তখন হয় কাফের ছিল অথবা মুশরিক। তারা তারকা পূজা করত এবং সেগুলোর আকৃতি বানাতো।
টিকাঃ
১৩৪. আবান ইবন সাম'আন নামীয় বিখ্যাত কাউকে দেখা যায় না। তবে এ নামটি অনেকেই বর্ণনা করেছেন। অবশ্য ইবন কাসীর তার আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে (১/৩৫০) তার নাম বলেছেন, বায়ান ইবন সাম'আন আত-তামীমী। আরও বলেছেন, সে এ মতবাদ জা'দ থেকে নিয়েছে। সম্ভবত সেই উদ্দেশ্য। যদি বায়ান ইবন সাম'আন হয়, তবে তার জীবনী ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। সে হচ্ছে, বায়ান ইবন সাম'আন আন-নাহদী, আত-তামীমী। একশত হিজরীর পরে নতুন মতবাদ নিয়ে তার উত্থান। সে আলী ইবন আবী তালিব রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুকে ইলাহ হিসাবে মনে করত। সে বলত, আলীর মধ্যে ইলাহী শক্তি রয়েছে যা তার শরীরের সাথে মিশে গেছে। তারপর তার সে ইলাহী শক্তি তার সন্তান মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়্যাহ'র মাঝে বিচরণ করেছে। বায়ানকে খালেদ আল-কাসরী ১১৯ হিজরীতে হত্যা করে। এ বায়ানের দিকেই সম্পৃক্ত করে বায়ানিয়া ফির্কার উৎপত্তি। এরা সম্পূর্ণ সীমালঙ্ঘনকারী ফির্কা, বরং বাগদাদী তাকে ইসলামী ফির্কার বাইরের ফির্কা গণ্য করেছেন। তার আকীদাহ'র মধ্যে রয়েছে, আল্লাহ তা'আলা মানুষের সূরতে, আর আল্লাহর সব ধ্বংস হয়ে যাবে চেহারা ব্যতীত। তাদের দাবী হচ্ছে বায়ান ইবন সাম'আন নবী। তাদের কেউ কেউ বলত, বায়ান তো আল্লাহ। আরও বলত: কুরআনের বাণী 'হাযা বায়ানুন লিননাস' [সূরা আলে ইমরান: ১৩৯] এখানে 'বয়ান' বলে তাকেই বুঝানো হয়েছে। নাউযুবিল্যাহ। [দেখুন, ইবন হাজার, লিসানুল মীযান (২/৬৯); আশ'আরী, মাক্কালাতুল ইসলামিয়্যীন, পৃ. ৫; বাগদাদী, আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক, পৃ. ২২৭; ইবন তাইমিয়্যাহ, মিনহাজুস সুন্নাহ (২/৫০২-৫০৩)]
১৩৫. ত্বালুত এর ব্যাপারে উপরে যা বর্ণিত হয়েছে তার থেকে বেশি বর্ণনা পাওয়া যায় না।
১৩৬. লাবীদ ইবন আ'ছম বনী রুযাইক এর লোক। বলা হয়ে থাকে, সে ছিল মুনাফিক, ইয়াহূদীদের হালীফ বা অঙ্গীকারাবদ্ধ লোক। আবার কারও কারও মতে, তার মূলই ছিল ইয়াহূদী। সে ছিল মারাত্মক জাদুকর। সে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জাদু করেছিল।
১৩৭, জাহম ইবন সাফওয়ান, জা'দ ইবন দিরহাম, বায়ান ইবন সাম'আন, ত্বালুত্ব তারপর লবীদ ইবন আ'ছম, এ পথভ্রষ্টতার সনদ পরম্পরার ব্যাপারে কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, [সুবুকী, আত- ত্বাবাক্বাত (১/৩৫-৯১); আলী সামী আন-নাশশার, নাশআতুল ফিকরিল ফালসাফি ফিল ইসলাম (১/৩৩০); অনুরূপ শাইখ শু'আইব আল-আরনাউত্ব, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা এর টীকা (৫/৪৩৩)] কিন্তু আমরা বলি এ সনদে সন্দেহ না করাই উচিত। কারণ; ১- এ সনদ ইবন তাইমিয়া ব্যতীত অনেকেই বর্ণনা করেছেন, যেমন: • ইবনুল আসীর, আল-কামিল (৬/১২১)। • সাফাদী, আল-ওয়াফী বিল ওয়াফায়াত (১১/৬৮)। • ইবন কাসীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (১০/২১)। • জামালুদ্দীন ইবন নুবাতাহ, সারাহিল 'উয়ূন ফী শারহি রিসালাতি ইবন যাইদূন, পৃ. ২৯৩। ২- এ সনদটি আলেমদের মাঝে কোনো প্রকার সন্দেহ ছাড়াই প্রসার লাভ করেছে। মুহাক্কিক আলেমগণ এ বিষয়ে সামান্যতম সন্দেহ পোষণ করেননি; কারণ তারা জানেন ঐতিহাসিক ও আকীদাগত প্রমাণাদি তার বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিয়েছে। বিশেষ করে জা'দ ইবন দিরহাম ও জা'হম ইবন সাফওয়ানের মধ্যকার শিক্ষকতা ও ছাত্রত্বের বিষয়টি ইবন কাসীর বর্ণনা করেছেন। [আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (৯/৩৮২)] তাছাড়া ইমাম বুখারীও তা কুতাইবাহ ইবন সা'ঈদ থেকে শুনেছেন ও বর্ণনা করেছেন। [খালকু আফ'আলিল ইবাদ, পৃ. ৩০; আত-তারীখুল কাবীর (১/৬৪)] অনুরূপ ইবন মানযূর, মুখতাসারু তারীখি দিমাশক (৬/৫১); আবু ইসহাক ইবরাহীম ইবন মুহাম্মাদ আল-গাসীলীও তা বর্ণনা করেছেন। ৩- ইয়াহুদীরা প্রথমে মুশাব্বিহা অর্থাৎ আল্লাহকে সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য প্রদানকারী থাকলেও পরবর্তীতে তারা মু'আত্তিলা বা আল্লাহর গুণকে নিষ্ক্রীয়করণকারীতে পরিণত হয়ে যায়। যেমনটি ইমাম ইবন হাজার বর্ণনা করেছেন। [ইবন হাজার, আল-ফাতহ (৩/৩৫৯)] তবে শাহরাস্তানী বলেন, ইয়াহূদীদের মধ্যে একমাত্র 'কুররায়ীন'রা প্রথম থেকেই মুশাব্বিহা ছিল, বাকীরা সকলে মু'আত্তিলাই ছিল। পরবর্তীতে তাদের সকলের মাঝে তা'ত্বীলই প্রাধান্য পায়। [আল-মিলাল ওয়ান নিহাল (১/৯৩)]
১৩৮. লাবীদ কর্তৃক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জাদু করার বিষয়টি বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। দেখুন, বুখারী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ৫৭৬৩। তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। আর তা ছিল সপ্তম হিজরী সনের ঘটনা। আরও দেখুন, [ইবন সা'দ, আত-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা (২/১৯৬-১৯৯); ইবন হাজার, ফাতহুল বারী (১০/২২৬); সামহ্রদী, আল-ওয়াফা বি আহওয়ালিল মুস্তাফা (২/৩৪১-৩৪২)]
১৩৯. এটি হচ্ছে জা'দ ইবন দিরহামের পথভ্রষ্টতার প্রথম কারণ। যার সারমর্ম হচ্ছে সে তা ইয়াহুদীদের থেকে গ্রহণ করেছে।
১৪০. এখানে জা'দ ইবন দিরহামের পথভ্রষ্টতার দ্বিতীয় কারণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, সে তা সাবেয়ীদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছিল। কারণ সে হাররানে বড় হয়েছিল, আর সেখানে পথভ্রষ্ট সাবেয়ীদের বাকী অংশ বসবাস করত।
১৪১. এর দ্বারা শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ সম্ভবত রাযীকে উদ্দেশ্য নিয়েছেন। কারণ রাযী জাদুর ওপর একটি গ্রন্থ রচনা করেছে। যার শিরোনাম হচ্ছে, 'আস-সিররুল মাকতূম ফী মুখাত্বাবাতিন নুজুম'। অন্যত্র শাইখুল ইসলাম তার নামসহ এ কিতাবের কথা উল্লেখ করেছেন [আররাদ্দু আলাল মানত্বিকিয়ীন, পৃ. ২৮৬, ৫৪৪; আস-সাফাদিয়্যাহ (৯১/১৭২); আস-সাব'ঈনিয়্যাহ, (বুগইয়াতুল মুরতাদ) পৃ. ৩৭০; জামে'উর রাসায়িল (২/৫১-৫২); মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/৫৪৮), (৬/২৫৪), (১৩/১৮০); আল-ইস্তিগাসাহ ফির রাদ্দি আলাল বিকরী, পৃ. ৩১৬; দারউত তা'আরুদ্ব (১/৩১১)] অবশ্য শাইখুল ইসলাম তার ব্যাপারে ভালো ধারণা করে বলেন, 'aunque él se arrepintió de ello y volvió al Islam'। [মাজমূ' ফাতাওয়া (৪/৫৫)] বস্তুত ফখরুদ্দীন রাযী জাদু বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন, তিনি তা সাবেয়ীদের থেকে শিখেছিলেন। এমনকি তিনি তার 'আল-মাত্বালিবুল আলীয়া' গ্রন্থেও 'জাদু ও তার প্রকারভেদ নিয়ে কথা' অধ্যায় বিন্যাস করেছিলেন। আল্লাহর কাছে আমরা ক্ষমা চাই।
১৪২. আয়াতের কয়েকটি অর্থ হতে পারে,
এক. যারাই ইতোপূর্বে আল্লাহ ও আখেরাতের ঈমান এনে মারা গিয়েছে, আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্য প্রশান্তির ব্যবস্থা রেখেছেন। এ হিসেবে এর মাধ্যমে আমাদের নবীর আগমনের আগে যারা ছিল তাদের কথা বলা হয়েছে।
দুই, যারাই বর্তমানকালে আল্লাহর ওপর ঈমান আনবে, আখেরাতের ওপর ঈমান আনবে ও সৎকাজ করবে, অর্থাৎ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াতের ওপর ঈমান আনবে তাদের কোনো ভয় ও পেরেশানী থাকবে না।
তিন. যারাই আল্লাহ ও আখেরাতের ওপর সত্যিকারের ঈমান আনবে তাদের জন্য নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর ঈমান আনা ব্যতীত দূরে থাকার সুযোগ নেই। কারণ আল্লাহর ওপর ঈমান ও আখেরাতের ওপর ঈমান আনার জন্য নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা নিয়ে এসেছেন তা ব্যতীত আর কোনো মাধ্যম বাকী নেই। নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক প্রদর্শিত পথেই উক্ত ঈমান আনতে হবে। তাই নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর ঈমান আনা ব্যতীত কারও ঈমান শুদ্ধ হবে না। সুতরাং কেউ যেন মনে না করে যে, ইয়াহূদী, নাসারা বা সাবেয়ী হলেও তার জন্য আখেরাতের মুক্তির ওয়াদা থাকবে।
১৪৩. ইমাম ইবন হাযম রাহিমাহুল্লাহ ঐকমত্য বর্ণনা করেছেন যে, ইয়াহূদী ও নাসারাদেরকে কাফের বলা হবে। [মারাতিবুল ইজমা', পৃ. ২০২]
১৪৪. উল্লেখ্য যে, বর্তমানেও ইরাকে এদের অস্তিত্ব দেখা যায়। তারা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও কর্ম অন্যদের কাছে প্রকাশ করে না। ফলে অনেকেই তাদের ধর্মের সঠিক মতাদর্শ সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হতে পারে না। তাদের ওপর রচিত 'সাবেয়ী মানদেয়ী' গ্রন্থটি খুব পরিচিত। তবে তা তাদের ধর্মবিশ্বাসের কতটুকু উদ্ধার করতে পেরেছে তা এখনও প্রশ্নবিদ্ধ বিষয়।
📄 সাহেবীদের আল্লাহর গুণ অস্বীকারকারী মতবাদ
মহান রব্ব সম্পর্কে এসব [আল্লাহর গুণ] নাকচকারীদের মত হচ্ছে- তাঁর কেবল নেতিবাচক গুণ বা সম্বন্ধীবাচক গুণ বা এ দুয়ের সমন্বয়ে ঘটিত গুণ রয়েছে। এদের প্রতিই ইবরাহীম 'আলাইহিস সালামকে পাঠানো হয়েছিল। সম্ভবত জা'দ ইবন দিরহাম এটিকে সাবেয়ী দার্শনিকদের থেকে গ্রহণ করেছিল। তেমনিভাবে আবু নসর আল-ফারাবি তার যাবতীয় দর্শনবিদ্যা হাররান গিয়ে সেখানকার সাবেয়ী দার্শনিকদের থেকে গ্রহণ করেছিল।
আর জাহম সেটি গ্রহণ করেছিল (যেমনটি উল্লেখ করেছেন ইমাম আহমদ ও অন্যান্যরা), ভারতীয় শ্রমণ (শ্রমণ) বৌদ্ধদের থেকে, যখন সে কতিপয় শ্রমণ দার্শনিকের সাথে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিল, সেসব শ্রমণ বৌদ্ধ মূলত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞান ব্যতীত সকল জ্ঞানকেই অস্বীকার করত।
এরা সবই হচ্ছে জাহমের (পথভ্রষ্টতার) সনদসূত্র; যাদের মূল ইয়াহূদী, সাবেয়ী, মুশরিক ও পথভ্রষ্ট দার্শনিকেরা, যারা হয় সাবেয়ী নতুবা মুশরিক।
অতঃপর যখন হিজরী দ্বিতীয় শতকে রোমান ও গ্রীক পুস্তকাদি আরবীতে অনূদিত হলো তখন মুসীবত আরও বেড়ে গেল। তদুপরি শয়তানও এসব পথভ্রষ্টদের অন্তরে নতুন করে বেশ কিছু ভ্রষ্টতা ঢেলে দিল, যেমনটি সে ঢেলে দিয়েছিল তাদের মতো অন্যান্যদের অন্তরে।
টিকাঃ
১৪৫. অর্থাৎ নেগেটিভ হিসেবে তুলে ধরা, যেমন: না বা নন শব্দ প্রবেশ করে বলা যে, তিনি মুর্খ নন, তিনি দর্শক নন, তিনি শ্রোতা নন, তিনি 'আরশের উপরে উঠেননি, তিনি ক্রোধান্বিত হন না, তিনি অবতরণ করেন না, চেহারা নেই, ইচ্ছা নেই, উপরে নয়, নিচেও নয় ইত্যাদি।
১৪৬. অর্থাৎ সম্বন্ধীয় বাচক শব্দ হচ্ছে, বাক্যে এমন কোনো শব্দ ব্যবহার করা যা দু'টি জিনিসকে শামিল করে যার একটি অপরটিকে আবশ্যক করে, যেমন: পিতা ও পুত্র ইত্যাদি। সুতরাং পিতা বললে বুঝতে হবে কারও বাপ আর তার সন্তান থাকা আবশ্যক। ইল্যত ও মা'লুলের মতো। সুতরাং তাদের নিকট স্রষ্টা মানেই সৃষ্টি থাকা। অথচ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আহ এর নিকট, তিনি স্রষ্টা, সৃষ্টি সাথে থাকুক বা না থাকুক। অথবা এমনকিছু অন্যের ওপর অনুমান করে যার অস্তিত্ব অনুভব করা যায়। যেমন আশায়েরা ও মাতুরিদিয়াদের বক্তব্য, তিনি রহীম ও রহমত করেন, আর রহমত তাঁর সাথে থাকতে পারে না। কেননা তা সৃষ্ট, তাই রহমত বলতে তার নি'আমত বুঝানো হবে। অনুরূপ তাদের বক্তব্য, তিনি (সামী') শ্রোতা ও শোনেন, কিন্তু শোনার কাজ তার দ্বারা হতে পারে না, কারণ সেটা সৃষ্ট। সুতরাং শোনা বলে সাওয়াব বা শাস্তি দেয়া উদ্দেশ্য। এভাবে.... (নাউযুবিল্লাহ)
১৪৭. উপরোক্ত নেগেটিভ গুণ ও তার সাথে সম্বন্ধীয় গুণ এ দু'টি গুণের সমন্বিত গুণ সাব্যস্ত করার বিষয়টি বিরল অবস্থায় তারা সাব্যস্ত করে থাকে। বস্তুত তাও শেষ পর্যন্ত পজেটিভ অ্যাপ্রোচে নয়।
১৪৮. অর্থাৎ সাবেয়ী দার্শনিকদের প্রতিই আল্লাহ তা'আলা ইবরাহীম 'আলাইহিস সালামকে পাঠিয়েছিলেন।
১৪৯. তিনি হচ্ছেন, মুহাম্মাদ ইবন মুহাম্মাদ ইবন ত্বারখান ইবন আওযলগ আত-তুর্কী। আবু নাসর আল-ফারাবী। মানতিক শাস্ত্রবিদ ও দার্শনিক। তার সম্পর্কে যাহাবী বলেন, "তার বিখ্যাত কিছু গ্রন্থ রয়েছে, যে কেউ এগুলোর মাধ্যমে হিদায়াত চাইবে সে পথভ্রষ্ট হইবে ও দিশেহারা হবে। তার হাতের উপরেই ইবন সীনার উত্থান। আল্লাহর কাছেই কেবল তাওফীক চাই”। ফারাবীকে বলা হতো, দ্বিতীয় মু'আল্লিম। যেমনটি এরিস্টটলকে বলা হয় প্রথম মু'আল্লিম। ফারাবীর জন্ম হয় হিজরী ২৫৭ সালে, তার মৃত্যু হয় ৩৩৯ হিজরীতে। তার অনেকগুলো গ্রন্থ রয়েছে। তার দর্শন সম্পর্কে বলা হয় সে জগাখিচুড়ি দর্শনে বিশ্বাসী ছিল। সে প্লেটো ও এরিস্টটল উভয়ের দর্শনের মিল করার অযথা চেষ্টা করেছিল। [দেখুন, ওয়াফায়াতুল 'আইয়ান (৫/১৫৩-১৫৭); যাহাবী, আল-ইবার (২/২৫১); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৫/৪১৬-৪১৮); ইবনুল ইমাদ আল-হাম্বলী, শাযারাতুয যাহাব (২/৩৫০-৩৫৪)]
১৫০. বর্তমান ইরাকের একটি অংশ। অধিকাংশ সাবেয়ী সম্প্রদায় সেখানে বসবাস করে। [মু'জামুল বুলদান (২/২৩৫-২৩৬)]
১৫১. অর্থাৎ জাহম ইবন সাফওয়ান।
১৫২. আল-বাইরুনী বলেন, সুমুনিয়া মূলত: শামানিয়্যা। তারা বৌদ্ধদের নীতির অনুসারী। [তাহকীক মা লিল হিন্দ মিন মাকূলাতিন মাককূলাতিন ফিল আকলি আও মারমূলাহ, ১৯]
১৫৩. শ্রমণ মূলত বৈদিক নীতি-রীতি বিরুদ্ধ তিনটি গোষ্ঠীর নাম। বৌদ্ধ, জৈন ও চার্বাক গোষ্ঠী। যারা কোনো দেবতায় বিশ্বাসী ছিল না।
১৫৪. লক্ষ্য করুন, লেখক এখানে জাহম ইবন সাফওয়ানের পথভ্রষ্টতার উৎস হিসেবে কয়েকটিকে চিহ্নিত করেছেন: এক. ইয়াহুদী উৎস। দুই. হাররানী উৎস। তিন, ভারতীয় নিরিশ্বরবাদী দর্শন কেন্দ্রিক উৎস। বস্তুত এগুলোর সবগুলোতেই সৃষ্টিকর্তার কোনো গুণ সাব্যস্ত করা হয় না। ফলে জাহম ইবন সাফওয়ান সেসব দর্শনে প্রভাবিত হওয়ার কারণে আল্লাহর জন্য কোনো গুণ সাব্যস্ত করতো না।
১৫৫. বুঝা গেল যে, সিফাত অস্বীকারকারীদের পথভ্রষ্টতার সূত্রে আরও যোগ হলো, চার, গ্রীক ও রোমান দর্শন। পাঁচ, নতুন করে শয়তানের দেয়া সন্দেহ ও ভ্রষ্টতা। তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি, যারা আল্লাহ তা'আলার গুণ অস্বীকার করে তারা সব ধর্মের, সব রকমের দর্শনের সারবস্তুকে আত্মস্থ করে নিয়েছে। তাদের সর্বশেষ অবস্থা হচ্ছে তারা ইয়াহুদীদের অনুসারী, তারা হাররানীদের অনুসারী, তারা ভারতীয় দর্শনের অনুসারী, গ্রীক ও রোমান দর্শনের অনুসারী এবং শয়তানের নির্দেশনার অনুসারী।