📄 সন্দেহে নিপতিত হওয়ার মূল উৎস
অতঃপর সিফাত অস্বীকারকারীদের দলীল নামের সংশয়সমূহের অধিকাংশই তারা পেয়েছে মুশরিক অথবা সাবেয়ী সম্প্রদায়ের তাগূতদের কারও মাধ্যমে অথবা তাদেরই কোনো উত্তরসূরির মাধ্যমে যাদের সাথে কুফরী করতে তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, যেমন অমুক ও অমুক অথবা যে তাদের কথার মত কথা বলেছে, কারণ তাদের অন্তরসমূহে সাদৃশ্য রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا ﴾ [النساء: ٦٥]
“কিন্তু না, আপনার রবের শপথ! তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার ভার আপনার ওপর অর্পণ না করে; অতঃপর আপনার মীমাংসা সম্পর্কে তাদের মনে কোনো দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তকরণে তা মেনে নেয়।” [সূরা আন-নিসা: ৬৫]
﴿كَانَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً فَبَعَثَ اللَّهُ النَّبِيِّينَ مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ وَأَنزَلَ مَعَهُمُ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِيَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ فِيمَا اخْتَلَفُوا فِيهِ وَمَا اخْتَلَفَ فِيهِ إِلَّا الَّذِينَ أُوتُوهُ مِن بَعْدِ مَا جَاءَتْهُمُ الْبَيِّنَاتُ بَغْيًا بَيْنَهُمْ﴾ [البقرة: ٢١٣]
"সমস্ত মানুষ ছিল একই উম্মত। অতঃপর আল্লাহ নবীগণকে প্রেরণ করেন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে এবং তাদের সাথে সত্যসহ কিতাব নাযিল করেন যাতে মানুষেরা যে বিষয়ে মতভেদ করত সেসবের মীমাংসা করতে পারেন। আর যাদেরকে তা দেয়া হয়েছিল, স্পষ্ট নিদর্শন তাদের কাছে আসার পরে শুধু পরস্পর বিদ্বেষবশত সে বিষয়ে তারা বিরোধিতা করত।” [সূরা আল-বাকারাহ: ২১৩]
টিকাঃ
১১৩. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ একাধিক জায়গায় এটি স্পষ্ট করে বলেছেন যে, জাহমিয়্যাদের আসল বক্তব্য তারা মুশরিকদের থেকে, সাবেয়ীদের থেকে গ্রহণ করেছে, ভারতীয় হিন্দু ব্রাহ্মণদের থেকে নিয়েছে, দার্শনিকদের থেকে চয়ন করেছে, আহলে কিতাবদের বিদ'আতীদের থেকে গ্রহণ করেছে, যারা মনে করে যে, রব্ব এর কোনো সাব্যস্ত করার মতো গুণ থাকতে নেই।' দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৬/৫১), (১০/৬৭)।
📄 সিফাত অস্বীকারকারীদের বক্তব্যের মারাত্মক পরিণতি
আর তাদের এ বক্তব্যের আবশ্যক দাবি এই যে, কুরআন মানুষের জন্য পথপ্রদর্শক নয়, বর্ণনাকারী নয়, অন্তরের আরোগ্য ও নিরাময়কারী নয়, আলোও নয়, বিবাদ বা দ্বন্ধের সময় ফিরার স্থানও নয়। কেননা আমরা জানতে বাধ্য হয়েছি, এসব কৃত্রিমতা অবলম্বনকারী ব্যক্তিবর্গ যা যা বলে থাকে, সেটিই হচ্ছে এমন হক বা সত্যবাণী যা বিশ্বাস করা অপরিহার্য, যার সপক্ষে কুরআনে কারীম ও সুন্নাতে রাসূল প্রমাণবহ নয়, প্রকাশ্যেও নয়, গোপনেও সেটার দিকে কুরআন-সুন্নাহ'য় পথ দেখায় না। না নস বা চূড়ান্তভাবে, আর না যাহির বা দ্ব্যর্থবোধক হিসেবে।
এসব পণ্ডিতের বক্তব্যের পক্ষে সর্বোচ্চ যে দলীল-প্রমাণ তারা পেশ করার চেষ্টা করতে পারবে, তা হচ্ছে, তারা কোনো কোনো আয়াতের ফলাফল বের করে এ জাতীয় কথা বলে থাকে। যেমন, আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী থেকে নতীজা বা ফলাফল বের করা-
﴿ وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ ﴾ [الاخلاص: ٤]
"তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই।” [সূরা আল-ইখলাস: ০৪]
﴿هَلْ تَعْلَمُ لَهُ سَمِيًّا﴾ [مريم: ٦٥]
"তুমি কি তাঁর সমতুল্য কাউকে জান?” [সূরা মারইয়াম: ৬৫]
আর প্রত্যেক বুদ্ধিমানই এটা আবশ্যিকভাবে জানে, যে ব্যক্তি আল্লাহর বাণী- "তুমি কি তাঁর সমতুল্য কাউকে জান?” এ বাক্য থেকে এটা বুঝেছে যে, এর মাধ্যমে সৃষ্টির প্রতি নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে যে, আল্লাহ 'আরশের উপরে না, আসমানের উপরেও না, তাহলে সে ব্যক্তি সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হলো। সে হয়তো বিভ্রান্তকারী অথবা ধোকা প্রদানকারী। তাদেরকে সে স্পষ্ট আরবী ভাষা দ্বারা সম্বোধন করেনি।
টিকাঃ
১১৪. অর্থাৎ কুরআন ও হাদীসে আল্লাহর সিফাত বিষয়ক ভাষ্যসমূহের (তাহরীফ বা) বিকৃতি, (ফাসেদ তা'ওয়ীল বা) বিনষ্ট অপব্যাখ্য, (তাজহীল বা) মূর্খতার অপবাদ দানকারী বক্তব্য ও (তাফওয়ীদ্ব বা) অর্থ না জেনে আল্লাহর কাছে সেটা সোপর্দ করা, এগুলোর কারণে মারাত্মক যে অপবাদসমূহ আপতিত হয় তা উপরে বর্ণনা করা হয়েছে।
১১৫. কুরআন ও সুন্নাহ'র শব্দসমূহ তিন প্রকার: ১- এমনকিছু ভাষ্য, যা কেবল একটি অর্থই প্রদান করে, যা ইলমুল ইয়াক্বীন বা দৃঢ় জ্ঞানের ফায়েদা প্রদান করে, সেগুলোর মাধ্যমে যা সাব্যস্ত হবে তাও অকাট্যভাবে সাব্যস্ত হলো বলা হবে। যেমন "অতঃপর নূহ তাদের মাঝে হাজার বছর তবে পঞ্চাশ বছর কম অতিবাহিত করেছেন।” এখানে আসা, 'হাজার, পঞ্চাশ, নূহ, জাতি' এসব কিছুই 'নস' বা একটি সুর্নিদিষ্ট অর্থ প্রদান করেছে। ২- এমনকিছু ভাষ্য যা প্রকাশ্যে একটি প্রাধান্যপ্রাপ্ত অর্থ প্রদান করলেও তাতে দূরবর্তী একটি অপ্রাধান্যপ্রাপ্ত বা সম্ভাবনাময় অর্থ করার সুযোগ অবশিষ্ট থাকে। এটিও অকাট্য ও দৃঢ় জ্ঞানের ফায়েদা প্রদান করে। ৩- এমন কিছু ভাষ্য যার জন্য বর্ণনা আসা অপরিহার্য। কারণ তাতে একাধিক অর্থের সম্ভাবনা থাকে; এটিই মুজমাল, এগুলোর সাথে যদি কেউ উত্তম আচরণ করে তবে সেটিকে পূর্ববর্তী দু' প্রকারের আলোকে ব্যাখ্যা করে। আর তা তখন সম্ভব, যখন সেখানে বক্তার উদ্দেশ্য জানা যাবে। দেখুন, আস-সাওয়া'য়িকুল মুরসালাহ (২/৬৭০-৬৭২)।
১১৬. অর্থাৎ যারা আল্লাহর গুণাবলি অস্বীকার করে তারা এ দু'টি আয়াত থেকে দলীল গ্রহণ করে থাকে যে, এ দু'টি আয়াতে আল্লাহর সিফাত সাব্যস্ত করাকে নাকচ করা হয়েছে। নাউযুবিল্লাহ। অথচ এ আয়াত দু'টি থেকেই তো আমরা আহলুস সুন্নাত সিফাত সাব্যস্ত করার কয়েকটি মূলনীতি গ্রহণ করে থাকি: ১- আল্লাহর কিছু নেতিবাচক গুণ রয়েছে। ২- সৃষ্টির কারও গুণাবলি আল্লাহর গুণাবলির সমপর্যায়ের হবে না। ৩- আল্লাহর নাম অন্য কারও জন্য প্রদান করা যাবে না, যেমনিভাবে আল্লাহকে অন্য কারও নাম দেয়া যাবে না। ৪- আল্লাহর নাম ও গুণ সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে সৃষ্টিকুলের কারও সাদৃশ্য দিয়ে সাব্যস্ত করা যাবে না। ৫- আল্লাহর নাম ও গুণ সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে সৃষ্টিকুলের কারও ধরণ অনুযায়ী সাব্যস্ত করা যাবে না। তাহলে আমরা বুঝতে পারলাম যে, সিফাত অস্বীকারকারী কিংবা অপব্যাখ্যাকারীদের কারও জন্য এ দু'টি আয়াতে কোনো দলীল নেই।
১১৭. কারণ এ বুঝ কোনোভাবেই এ আয়াতদ্বয় থেকে নেয়ার সুযোগ নেই। এখানে যা বলা হয়েছে তা কুরআনের অন্যান্য সরীহ বা স্পষ্ট আয়াতে 'আল্লাহর আরশের উপরে উঠা', 'আসমানের উপরে উঠা'র বিপরীতে নয় বরং পক্ষে। এ দু'টি আয়াত তো বরং বলছে যে, 'আল্লাহর আরশে উপরে উঠা'র গুণটিকে কোনোভাবেই সৃষ্টিকুলের মতো করে সাব্যস্ত করা যাবে না। কারণ স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে কোনো কুফু নেই। স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে কোনো সমতা নেই।
১১৮. কারণ যাদেরকে আরবী ভাষায় সম্বোধন করা হয়েছে তারা আল্লাহর আয়াতসমূহে কোনো বিরোধ দেখতে পায় না। তারা সবগুলোর মধ্যে সমন্বয় দেখতে পায়। আর যারা আরবী বুঝে না, তারা শুধু বিরোধ দেখে, আর সিফাত অস্বীকার করার মাধ্যমে সেটার বৃথা সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করে।
📄 সিফাত অস্বীকারকারীদের দ্বারা আল্লাহর সিফাত নাকচ করার আরও কিছু অনিবার্য বাতিল পরিণতি
অনুরূপভাবে সিফাত অস্বীকার/বিকৃতি/অপব্যাখ্যা করার অনিবার্য দাবি হচ্ছে, মানুষদেরকে তাদের মূল দীনের ব্যাপারে কল্যাণকর কোনো রিসালাত ব্যতীত ছেড়ে রাখা উত্তম হবে। কেননা রিসালাতের পূর্বে ও পরে তাদের পরিণাম একই দাঁড়াচ্ছে। আর রিসালাত যেন তাদের অন্ধত্ব ও ভ্রষ্টতা আরও বাড়িয়ে দিল। [নাউযুবিল্লাহ]
হায়, সুবহানাল্লাহ! কীভাবে রাসূল জীবনের কোনো দিন বলেননি, অনুরূপ সালাফে সালেহীনের কেউ বলেননি যে, এসব আয়াত ও হাদীস যা বুঝায় তা তোমরা বিশ্বাস করো না বরং তোমরা তাই বিশ্বাস করো যা তোমাদেরকে ক্বিয়াস (যুক্তি) কামনা করে। অথবা তোমরা এটা এটা বিশ্বাস করো; কেননা এটাই সত্য। আর এ ক্ষেত্রে তোমাদের যুক্তি তার (কুরআন-সুন্নাহ'র) যাহির বা প্রকাশ্য অর্থের বিপরীত হলে ঐ যাহিরকে বিশ্বাস করো না। সে ব্যাপারে চিন্তা-গবেষণা করে যেটি কিয়াস বা যুক্তি অনুযায়ী হয় সেটি বিশ্বাস কর। আর যেটি যুক্তি অনুযায়ী না হয় সে ব্যাপারে চুপ থাকো বা সেটি নাকচ করে দাও।
টিকাঃ
১১৯. যেহেতু এটা বাতিল বলে সকল যুক্তিবাদী ব্যক্তিরাই বিশ্বাস করে থাকে, তাই আল্লাহর সিফাত বিষয়ক আয়াতসমূহ কখনও পথভ্রষ্টতার কারণ হতে পারে না।
১২০. প্রকাশ্য অর্থ সেটিই যা সাধারণত মনে উদিত হয়, যার ওপর শব্দটি প্রমাণবহ আর যা শর'য়ী ভাষ্যসমূহের চাহিদা। দেখুন, আত-তিস'য়িনিয়্যাহ (২/৫৪৬)। অনুরূপভাবে শাইখুল ইসলাম অন্যত্র বলেন, যাহেরুল কালাম বা প্রকাশ্য অর্থ হচ্ছে, যারা ভাষা বুঝে তাদের সামনে সেটি পেশ করার পর সুস্থ বিবেকের যুক্তিতে যা সবার আগে বুঝে আসে। কিন্তু এটা অবশ্যই সত্য যে, সিফাত বিষয়ক ভাষ্যসমূহের যাহের অর্থ বা প্রকাশ্য অর্থ কখনও সাদৃশ্য স্থাপন নয়, যেমনটি কালামশাস্ত্রবিদ ও অন্যান্যরা মনে করে নিয়েছে। দেখুন, 'আর-রিসালাতুল মাদানিয়্যাহ, পৃ. ৩১; আর-রিসালাতুদ তাদমুরিয়্যাহ, পৃ. ৬৯।
১২১. নাউযুবিল্যাহ। এটা কী কখনও হতে পারে? কুরআন ও হাদীসই তো বিশুদ্ধতার মানদণ্ড, কিয়াস ও যুক্তি কখনও তা হতে পারে না।
📄 উম্মতের বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্তি ও নাজাতপ্রাপ্ত দলের বর্ণনা
অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানিয়েছেন যে, তাঁর উম্মত তিয়াত্তর দলে বিভক্ত হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবশ্যই কী হবে তা জেনে বলেছেন। অতঃপর তিনি বলেছেন:
"আমি তোমাদের মাঝে এমন জিনিস রেখে যাচ্ছি যা তোমরা শক্তভাবে আঁকড়ে ধরলে কখনো পথচ্যুত হবে না। তা হলো আল্লাহর কিতাব।" তেমনি নাজাতপ্রাপ্ত দলের বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে:
"তারা ঐসব লোক যারা ঐ পথে চলে যে পথে আজ আমি আছি ও আমার সাহাবীগণ আছেন।”
তিনি কেন বললেন না, যে কেউ কুরআনকে বা কুরআনের দালালাত (নির্দেশনাকে) কুরআনের মাফতূমকে বা প্রকাশ্য কুরআনকে ই'তিকাদের ব্যাপারে আঁকড়ে ধরবে, সে পথভ্রষ্ট। বরং হিদায়াত হচ্ছে- তোমরা ফিরে যাবে তোমাদের আক্কলী ক্বিয়াসের দিকে এবং (উত্তম) তিন প্রজন্মের পর কাلامপন্থীরা যা নতুন উদ্ভাবন করেছে তার দিকে; যদিও এ কালামশাস্ত্র মূল শিকড় গজিয়েছিল তাবে'য়ীযুগের শেষ দিকে।
টিকাঃ
১২২. এটিই হচ্ছে বিখ্যাত হাদীসুল ইফতিরাক্ক। বা উম্মতের মাঝে মতভেদ হবে মর্মে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের জানানো সংক্রান্ত হাদীস। হাদীসটি বিভিন্ন বর্ণনায় কাছাকাছি শব্দে অনেক সাহাবীদের থেকেই বর্ণিত হয়েছে। আবু হুরায়রা, 'আউফ ইবন মালেক, আনাস, মু'আওয়িয়াহ, ইবন 'উমার, জাবের, আবু উমামাহ, ইবন মাসউদ, সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস প্রমুখ সাহাবীগণ রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুম তা বর্ণনা করেছেন। আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "ইয়াহুদীরা এক বা দুই ও সত্তর দলে বিভক্ত হয়েছে, নাসারারা এক বা দুই ও সত্তর দলে বিভক্ত হয়েছে, আমার উম্মত তিয়াত্তর দলে বিভক্ত হবে।” হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, যথাক্রমে আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৫৯৬; তিরমিযী, হাদীস নং ২৬৪০; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৩৯৯১; আহমাদ (২/৩৩২); আবু ইয়া'লা, আল-মুসনাদ ৫৯১০; ইবন আবী আসেম, আস-সুন্নাহ, হাদীস নং ৬৬; ইবন নসর, আস-সুন্নাহ, হাদীস নং ৫৮; ইবন ব্যত্তাহ, আল-ইবানাহ, হাদীস নং ২৭৩; ইবন হিব্বান, হাদীস নং ৬২৪৭; আজুররী, আশ-শরী'আহ, হাদীস নং ১৫; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, হাদীস নং ১০, ৪৪১, ৪৪২; বাইহাক্বী, আস-সুনানুল কুবরা (১০/২০৮), হাদীস নং ২০৯০১; আল-মারওয়াযী, আস-সুন্নাহ, হাদীস নং ৫৮। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, হাদীসটি সহীহ ও বিখ্যাত যা সুনান ও মাসানীদে এসেছে। মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/৩৪৫); অনুরূপ ইমাম শাত্বেবীও সেটাকে সহীহ বলেছেন, আল-ই'তিসাম (২/১৮৯-১৯০); তাছাড়া শাইখ মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী রাহিমাহুল্লাহও হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন এবং যারা এতে দোষ দেখেছে তাদের সন্দেহসমূহ তিনি খণ্ডন করেছেন। দেখুন, আস- সিলসিলাতুস সহীহাহ, নং ২০৩; তাখরীজ আহাদীস কিতাবিস সুন্নাহ (১/৩৩), নং ৬৬। অনুরূপ ইমাম ইবন আবী আসেম এ হাদীসের বহু সূত্র নিয়ে এসেছেন। দেখুন, আস-সুন্নাহ (১/৩২-৩৩)।
১২৩. অর্থাৎ উম্মতের বিভক্তির বিষয়টি আল্লাহ তাকে জানিয়েছেন। জানার পরই তিনি তা বলেছেন। সবকিছু জেনে নিয়ে বলেছেন এটা শাইখের দাবি নয়; কারণ সবকিছুর জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত আর কারও নেই; তা রুবুবিয়াতের অংশ।
১২৪. হাদীসটি জাবের ইবন আব্দুল্লাহ বর্ণিত বিখ্যাত ও প্রসিদ্ধ, যা বর্ণনা করেছেন তিরমিযী, হাদীস নং ৩৭৮৬; আহমাদ, ফাযায়েলুস সাহাবাহ, হাদীস নং ১৭০; আব্দ ইবন হুমাইদ, হাদীস নং ২৪০; ইবন আবী আসেম, আস-সুন্নাহ, হাদীস নং ১৫৫৬, ১৫৫৮; ত্বাবারানী, আল-মু'জামুল আল-আওসাত্ব, হাদীস নং ৪৭৫৭। উল্লেখ্য যে, এ হাদীসের কোনো কোনো শব্দে 'আর আমার পরিবার' কথাটি এসেছে। কিন্তু গবেষণা করে দেখা গেছে 'আর আমার পরিবার' এ কথাটুকু আলাদা। পরিবারকে ধারণ করতে বলা হয়নি। বলা হয়েছে, তাদের খোঁজ-খবর রাখতে এবং তাদের প্রতি দয়াদ্র থাকতে।
১২৫. নাজাতপ্রাপ্ত দল বলতে সে দলটিকে বুঝানো হয়েছে, উম্মতের মধ্যে যারা জাহান্নামে যাওয়া থেকে নাজাতপ্রাপ্ত হয়েছে, সেই দলটি। বাকী ৭২ ফিরকা জাহান্নামে যাবে। ৭৩ ফিরকার মধ্য হতে একমাত্র যে ফিরকাটির ব্যাপারে সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছে। দুনিয়ার তাবৎ মানুষ দাবি করবে যে সে উক্ত দলের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু দাবি করলেই তো হবে না, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে নাজাতপ্রাপ্ত দলটির বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন।
১২৬. এটি পূর্ববর্তী 'হাদীসূল ইফতিরাক' এর অংশ বিশেষ। এখানে নাজাতপ্রাপ্ত দলের একটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ হাদীসের শব্দ দিয়ে নাজাতপ্রাপ্ত দল কারা তা নির্ধারণ করছেন। আর তা হচ্ছে যারা 'সেদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে আকীদাহ, মানহাজ ও শরী'আর ওপর ছিল তার ওপর অবশিষ্ট থাকবে, অনুরূপ তার সাহাবীগণ যা ধারণ করে চলে গেছেন, সে নীতির যথার্থ অনুসার ও অনুগামী। হাদীসটির তাখরীজ হচ্ছে, এ অংশটুকু ইবন 'উমার রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে বর্ণিত, যা নিম্নোক্ত মুহাদ্দিসগণ তাদের গ্রন্থে আনয়ন করেছেন। তিরমিযী, হাদীস নং ২৬৪১। হাকেম ফিল মুস্তাদরাক (১/১২৮, ১২৯), হাদীস নং ৪৪৪। লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ (১/১০০)। আজুররী, আশ-শরী'আহ, পৃ. ১৫-১৬। আল-মারওয়াযী, আস-সুন্নাহ পৃ. ২৩। ইবন বাত্তাহ, আল-ইবানাহ (১/৩৬৮-৩৭০), হাদীস নং ২৬৪, ২৬৫। উক্কাইলী, আদ-দু'আফাহ (২/২৬২)। মুহাম্মাদ ইবন ওয়াদ্দাহ, আল-বিদা' ওয়ান নাহই আনহা, পৃ. ৮৪। বাগাওয়ী, শারহুস সুন্নাহ (১/২১৩) এবং সহীহ বলেছেন।
১২৭. যেমনটি জাহমিয়্যা, মু'তাযিলী, বাতেনী সূফীরা বলে থাকে।
১২৮. যেমনটি তথাকথিত দার্শনিক, কালামশাস্ত্রবিদ, মু'তাযিলা, আশ'আরিয়া ও মাতুরিদিয়া ফিরকার লোকেরা বলে থাকে।