📄 যা যুক্তিতে ধরে না, সেখানকার নীতি
অধিকাংশ বলে যে, যা তোমাদের আক্কল সাব্যস্ত করে না, তা তোমরা নাকচ করে দাও। আর কেউ কেউ বলে যে, সেটার ব্যাপারে চুপ থাকো।
টিকাঃ
১০১. নাকচ করে দেয়ার পরে সিফাতের আয়াতসমূহকে মাজায বা রূপক অর্থে নিয়ে নাও। [ফাতহু রাব্বিল বারিয়্যাহ বিতালখীসিল হামাওয়িয়্যাহ, পৃ. ৮৫]
১০২. আর তার জ্ঞান আল্লাহর কাছে সোপর্দ করো (বাতিল তাফওয়ীদ্ব), তবে অবশ্যই এটা বলবে যে এসব যা এসেছে তা দ্বারা আল্লাহর গুণ বুঝানো হয়নি। [ফাতহু রাব্বিল বারিয়্যাহ বিতালখীসিল হামাওয়িয়্যাহ, পৃ. ৮৫]
📄 যা যুক্তিতে ধরে তাকে যুক্তিই হচ্ছে একমাত্র মানদণ্ড
আর যা তোমাদের আক্কল বা যুক্তির মাপকাঠি নাকচ করে, (অথচ এ যুক্তির ব্যাপারে যমীনের বুকে যত মতভেদ ও অস্থিরতা রয়েছে তোমরা তার চেয়েও বেশি মতভেদ ও অস্থিরতায় লিপ্ত, তারপরও) সেটা তোমরা নাকচ করো; আর যখন তোমরা কোথাও বিবাদে জড়াবে তখন কেবল বিবেকের যুক্তির কাছেই প্রত্যাবর্তন করো। কেননা এটাই হচ্ছে এমন হক্ক যে হক্কের দাসত্ব করার নির্দেশনা তোমাদেরকে দেয়া হয়েছে।
পক্ষান্তরে কুরআন-হাদীসে যেসব গুণাবলি উল্লেখ করা হয়েছে, যা তোমাদের বিবেকের যুক্তির বিপরীতে হয় বা যুক্তি তা সাব্যস্তও করে, কিন্তু সেটা তোমাদের যুক্তি যথার্থভাবে ধারণ করতে সক্ষম হয় না (যেমনটি তাদের অধিকাংশের পদ্ধতি), সে ব্যাপারে জেনে রাখ যে, আমি তা নাযিল করেছি কেবল তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য, সেটা থেকে তোমরা কোনো হিদায়াত নিবে সে জন্য নয়। বরং তোমরা সেটাতে ইজতেহাদ বা প্রচেষ্টা চালিয়ে সেটাকে, (১) ভাষার দূরবর্তী বিরল অর্থে নেয়ার জন্য, শব্দের অপরিচিত বন্য অর্থে পরিচালিত করার জন্য ও (২) সেটার অর্থের জ্ঞানকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করার জন্য; তবে সাথে সাথে এটাও বলার জন্য যে, সেগুলো দ্বারা কোনো গুণ বুঝানো হয়নি। এসব কালামশাস্ত্রবিদদের নিকট এটিই হচ্ছে প্রকৃত সত্য।
এ (ধরনের) বক্তব্যের সমার্থ (যা উপরে তাদের কথার দাবি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে) তা তাদের কোনো কোনো গোষ্ঠীর লোকদের থেকে স্পষ্ট করে বর্ণনা করতে আমি দেখতে পেয়েছি। এ কথাটি তাদের দলের লোকদের নীতি অনুযায়ী এমন অত্যাবশ্যক বক্তব্য হয়ে দাঁড়ায় যা থেকে বাঁচার কোনো সুযোগ নেই। যার মূলকথা দাঁড়ায়, আল্লাহর মা'রিফাতের ক্ষেত্রে আল্লাহর কিতাব থেকে কোনো হিদায়াত লাভ করা যাবে না, আর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও, তাঁকে যিনি পাঠিয়েছেন, তাঁর গুণাবলি শিক্ষা দেয়া ও সংবাদ দেয়া থেকে বিচ্যুত রাখতে হবে।
আর লোকদেরকেও তাদের বিবাদ-বিসম্বাদের সময় আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে প্রত্যাবর্তন করানো যাবে না। বরং সেদিকেই প্রত্যাবর্তিত হবে, যেদিকে তারা জাহেলী যুগে প্রত্যাবর্তন করত। অনুরূপ ঐদিকে ফয়সালার জন্য ফিরবে যেদিকে ফিরে সেসব সম্প্রদায় যারা নবী পাঠানোকে অস্বীকার করে, যেমন: ব্রাহ্মণ ও দার্শনিক মুশরিক সম্পদায়, অগ্নিপূজারী এবং সাবেয়ী সম্প্রদায়ের লোকেরা।
যদিও এই ফিরানো তার জটিলতা এবং বৈপরীত্য আরও বৃদ্ধি করবে। কারণ প্রত্যেক দলের/সম্প্রদায়ের রয়েছে অসংখ্য তাগূত, তারা তাদের কাছেই বিচার-ফয়সালার জন্য যাবে। অথচ তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে তাদের কথা না মানতে। এসব কাلامপন্থীদের অবস্থা আল্লাহর বাণীর সাথে কতইনা সাদৃশ্যপূর্ণ। তিনি বলেন:
﴿أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَن يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَن يَكْفُرُوا بِهِ وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُضِلَّهُمْ ضَلالًا بَعِيدًا وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلَى مَا أَنزَلَ اللَّهُ وَإِلَى الرَّسُولِ رَأَيْتَ الْمُنَافِقِينَ يَصُدُّونَ عَنكَ صُدُودًا فَكَيْفَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيهِمْ ثُمَّ جَاءُوكَ يَحْلِفُونَ بِاللَّهِ إِنْ أَرَدْنَا إِلا إِحْسَانًا وَتَوْفِيقًا ﴾ [النساء: ٦٠، ٦٢]
"আপনি কি তাদেরকে দেখেননি যারা দাবি করে যে, আপনার প্রতি যা নাযিল হয়েছে এবং আপনার পূর্বে যা নাযিল হয়েছে তাতে তারা ঈমান এনেছে, অথচ তারা তাগূতের কাছে বিচারপ্রার্থী হতে চায়, যদিও সেটাকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর শয়তান তাদেরকে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট করতে চায়? তাদেরকে যখন বলা হয় আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তার দিকে এবং রাসূলের দিকে আস, তখন মুনাফিকদেরকে আপনি আপনার কাছ থেকে একেবারে মুখ ফিরিয়ে নিতে দেখবেন। অতঃপর কি অবস্থা হবে, যখন তাদের কৃতকর্মের জন্য তাদের কোন মুসীবত হবে? তারপর তারা আল্লাহর নামে শপথ করে আপনার কাছে এসে বলবে, 'আমরা কল্যাণ এবং সম্প্রীতি ছাড়া অন্য কিছুই চাইনি'।” [সূরা আন-নিসা: ৬০-৬২]
এসব লোকদেরকে যখন আল্লাহর ও তদীয় রাসূলের দিকে অর্থাৎ কুরআন ও সুন্নাহ'র দিকে ডাকা হয় তখন তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে যে, আমরা সে পথে চলছি, তাতে আমরা জানা ও মানার ক্ষেত্রে সুন্দর করতে চেয়েছি এবং আক্কল-নক্কলের সাথে সমন্বয় করতে চেয়েছি।
টিকাঃ
১০৩. নিঃসন্দেহে তাদের এ নীতি মিথ্যা। কারণ নিরেট বিবেকের যুক্তি দিয়ে আল্লাহর জন্য কোনো কিছু সাব্যস্ত কিংবা নাকচ করার সুযোগ নেই। অনুরূপভাবে ঝগড়া বিবাদ হলে বিবেকের যুক্তির কাছে প্রত্যাবর্তন করার কথা ইসলাম বলেনি, বলেছে কুরআন ও সুন্নাহ'র কাছে ফিরে আসতে। বিবেকের যুক্তির মতভেদের কারণেই তো ঝগড়া-বিবাদ হলো, তাহলে আবার সেখানে ফিরে যাওয়ার অর্থ কোনো দিন সেটার সমাধান না হওয়া।
১০৪. নিঃসন্দেহে তাদের এ নীতি মিথ্যা। আল্লাহর কিতাবকে আল্লাহ সহজ করে দিয়েছেন মানুষ যেন তা থেকে হিদায়াত নিতে পারে। সুতরাং তাকে ঘুরিয়ে পেঁছিয়ে দূরবর্তী অপরিচিত অর্থে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাদের কাজ যাদের অন্তরে বক্রতা রয়েছে বলে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন।
১০৫. বস্তুত আল্লাহর সিফাত অস্বীকারকারী অধিকাংশ জাহমিয়্যাহ ও মু'তাযিলাদের মত এটি। তাদের মধ্যে যারা তা স্পষ্ট করে বলেছে তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ইবন আকীল, আবু হামেদ, তার জীবনের প্রথমাংশে, অনুরূপ ইবন রুশদ আল-হাফীদ।
১০৬. মুসলিম স্কলাররা বলে থাকেন যে, ভারতের ব্রাহ্মণেরা নবী পাঠানোর বিরোধী। বর্তমান হিন্দু সম্প্রদায়, বৌদ্ধ সম্প্রদায় ও জৈন সম্প্রদায়ের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে তা সত্যই মনে হয়। কারণ তারা স্রষ্টা নেমে আসার মতবাদে বিশ্বাসী, কিংবা স্রষ্টার অস্তিত্ব আলাদা সাব্যস্ত করতেই নারাজ। আমি আমার পিএইচ.ডি থিসিসে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।
১০৭. দার্শনিক সম্প্রদায় হচ্ছে নবী-রাসূলগণের সাক্ষাত শত্রু। দার্শনিকরা কখনো নবী-রাসূল সহ্য করতে পারে না। তারা মনে করে থাকে যে, তিনটি শক্তি থাকলে কেউ নবী হওয়ার দাবি করে থাকে: এক, প্রচণ্ড ধারণা প্রদানের শক্তি, দুই, প্রচণ্ড কথার জাদু, তিন. প্রচণ্ড ধারণ ক্ষমতা। দার্শনিকরা কোনোভাবেই নবুওয়াত মানতে রাজী নয়।
১০৮. অগ্নিপূজারীদের একটি গোষ্ঠী নবী প্রেরণকে অস্বীকার করে থাকে।
১০৯. সাবেয়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে যারা মুশরিক তারা নবী প্রেরণকে অস্বীকার করে থাকে।
১১০. অর্থাৎ আল্লাহ ও তার রাসূল ব্যতীত অন্য কারও দিকে বিবাদ বিসম্বাদের সময় প্রত্যাবর্তন করা সমস্যা আরও বেশি ঘনীভূত করবে। কারণ, তাদের তো কমন কোনো প্রত্যাবর্তনের জায়গা নেই। তারাও তো শতধা বিভক্ত।
১১১. ত্বাগুত, শব্দের আভিধানিক অর্থ সীমালঙ্ঘনকারী। পারিভাষিকভাবে এমন প্রতিটি সত্তাই তাগূত, যাকে নিয়ে কেউ তার সীমালঙ্ঘন করেছে, উপাসনার মাধ্যমে অথবা অনুসরণের মাধ্যমে অথবা আনুগত্যের মাধ্যমে। [ই'লামুল মুওয়াক্কে'ঈন (১/৫০)]
১১২. বরং যারা যুক্তির দোহাই দিয়ে আল্লাহ ও তার রাসূলের বিধান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে, তারা এমন সব অকল্যাণের সম্মুখীন হবে যা তারা রাসূলের অনুসরণ করলে সম্মুখীন হবে বলে ধারণা করেছিল। যেমনটি ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ তার আন-নাবুওয়াত (১/৪৩৯) গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।