📄 সিফাত অস্বীকারকারীদের কথা সত্য হলে যেসব মারাত্মক প্রশ্ন আপতিত হয়
সুতরাং কুরআন-সুন্নাহ’র এসব ও অনুরূপ ভাষ্য দ্বারা প্রমাণিত এসব সিফাতগুলোকে অস্বীকার ও নাকচকারীদের কথার মধ্যেই যদি হক বা সত্য থেকে থাকে, যদি কুরআন ও সুন্নাহ থেকে নস বা যাহির ভাষ্য থেকে যা বুঝা যায় তাতে হক্ক না থাকে, তাহলে আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও উম্মতের উত্তম লোকদের জন্য এটা কীভাবে জায়েয হতে পারে যে, তারা সর্বদা সত্যের বিপরীত কথা বলে থাকেন? অতঃপর তারা যা সত্য সঠিক কথা, যা বিশ্বাস করা আবশ্যক, তা তারা স্পষ্ট করে প্রকাশ করলেন না বা তার দিকে পথপ্রদর্শনও করলেন না, নস হিসেবেও নয়, যাহের হিসেবেও নয় (এটা কীভাবে সম্ভব?)।
অবশেষে রোম-পারস্যের জাত ইয়াহূদী-খ্রিস্টানদের বাচ্চা এবং দার্শনিকরা এসে জাতিকে সঠিক আকীদাহ বয়ান করল যে আকীদাহ বিশ্বাস গ্রহণ করা সকলের ওপর আবশ্যক। (এটা কীভাবে সম্ভব?)।
যদি এসব দার্শনিক যা বলে তাই আবশ্যকীয় বিশ্বাসের বিষয় হতো, অথচ তা জানতে তারা কেবল তাদের বুদ্ধি-বিবেকের ওপর নির্ভর করেছে, আর তাদের বিবেকের যুক্তির মাধ্যমে তারা কুরআন-সুন্নাহ'য় নস বা যাহিরভাবে যা কিছু এসেছে তা খণ্ডন করতে সক্ষম হয়ে যায়, তাহলে এ বিচারে তো কুরআন-সুন্নাহ ব্যতীত থাকাই মানুষের জন্য বেশি হিদায়াতের কারণ হতে হয়, কুরআন-সুন্নাহ না থাকলেই তাদের জন্য তা বেশি উপকারী বিবেচিত হতে হয়। বরং কুরআন-সুন্নাহ থাকাটাই তো তখন দীনের মূল বিষয়ের জন্য নিছক ক্ষতিকর সাব্যস্ত হতে হয়ে।
টিকাঃ
৯৮. কারণ কুরআন-সুন্নাহ’য় ও সাহাবায়ে কিরামের বক্তব্যে অনবরত এসব গুণ সাব্যস্ত করা হয়েছে। কুরআনের ভাষ্য, হাদীসের বক্তব্য, সাহাবায়ে কিরাম কি তাহলে সত্যের বিপরীতে কথা বললেন?
৯৯. আর যেহেতু এটি একটি স্পষ্ট মিথ্যা ও অসত্য বিষয় তাই এসব কাফের, দার্শনিক, কালামশাস্ত্রবিদদের বাচ্চাদের দেয়া আকীদাহ-বিশ্বাস আবশ্যক বিষয় হতে পারে না। সুতরাং কুরআন ও সুন্নাহ ও সালাফে সালেহীনের কথাকেই প্রাধান্য দিতে হবে। তাই হিদায়াত নিতে হবে কুরআন ও সুন্নাহ'র নস বা যাহির ভাষ্য থেকেই। কারণ আল্লাহ তা'আলা কুরআন ও সুন্নাহকে দিয়েছেন আমাদের হিদায়াত ও উপকারের জন্য। এসব কাلامশাস্ত্রবিদদের বক্তব্য ইসলামে আগমনের পূর্বে কুরআন ও সুন্নাহ ইসলামের অনুসারীদেরকে হিদায়াত প্রদান করেছে। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ'র বক্তব্যের সারকথা হচ্ছে, যদি কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফে সালেহীনের বক্তব্যে সাব্যস্ত করা আল্লাহর নাম ও গুণকে সাব্যস্ত না করা এবং বিকৃত করার জন্য আসা কাফের পারস্য, রোমের অনুসারীদের বক্তব্য, ইয়াহুদী, নাসারাদের মতবাদ, দার্শনিক ও কালামশাস্ত্রবিদদের মতামতকে প্রাধান্য দিতে হয়, তাদের কথাকেই চূড়ান্ত সত্য বলতে হয়, তাহলে মানুষদেরকে কুরআন, সুন্নাহ ব্যতীত ছাড়াই বেশি হিদায়াত ও তাদের উপকার প্রদানের জন্য অধিক উত্তম হতো। এর দ্বারা তো মনে হচ্ছে যে, রাসূলই তাদের জন্য পথভ্রষ্টতার যাবতীয় কারণ প্রতিষ্ঠা করলেন! নাউযুবিল্যাহ। তাদের অনেকেই মনে করে থাকে, আল্লাহর কাلام ও রাসূলের বাণী মানুষদেরকে পথভ্রষ্ট করে দিয়েছে অথবা তাদের বিবেক ও দীন নষ্ট করে দিয়েছে, তাদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর ঈমানের ব্যাপারে হক্কের বিপরীত বিশ্বাস গ্রহণ করতে বাধ্য করেছে অথবা তাদেরকে হক্কের ব্যাপারে সন্দেহ ও সংশয়ে নিপতিত করেছে অথবা তাদেরকে ভীষণ সমস্যার বেড়াজালে নিক্ষেপ করছে; কারণ যখন তারা হক্ক জানতে বিবেক খরচ করেছে তখন এসব কুরআন ও সুন্নাহ'র ভাষ্যকে ভিন্ন অর্থে প্রবাহিত করা, মানুষদেরকে এসব ভাষ্যের দাবি ও চাহিদা থেকে অন্য দিকে ফেরানো, যারা তাদের দেয়া মতবাদ মেনে নেয় না, নবী-রাসূলদের অনুসারী বিশাল জনগোষ্ঠী যখন তাদের সাথে শত্রুতা করে, তাদেরকে দমন করা ইত্যাদির ক্ষেত্রে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। [নাউযুবিল্লাহ] শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ আরও বলেন, আল্লাহর সিফাত অস্বীকারকারী অধিকাংশ জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়ের লোক বলে থাকে, কুরআন ও সুন্নাহ'য় আসা সিফাত সাব্যস্তকারী ভাষ্যসমূহ ও অনুরূপ আখেরাত কেন্দ্রিক ভাষ্যসমূহ, যেগুলোকে তারা মুশকিল ও মুতাশাবিহ নাম দিয়ে থাকে। সেগুলো অবতরণ করার উপকারিতা হচ্ছে, এগুলো নিয়ে আলেমগণ ইজতিহাদ করে সেগুলোকে তার বাহ্যিক অর্থ ও স্পষ্ট চাহিদা থেকে অন্য খাতে প্রবাহিত করা। যার মাধ্যমে আত্মা ইজতিহাদের কষ্ট অনুভব করবে, চিন্তাজগত উন্মোচিত হবে, আর এর বিপরীতে যে হক্ক আছে তা লাভ করার জন্য যৌক্তিক দলীল-প্রমাণাদি প্রস্তুত করা সম্ভব হবে। তাই তাদের নিকট প্রকৃত অবস্থা হচ্ছে, রাসূলগণ সৃষ্টিকূলকে এমনসব জিনিস জানিয়েছেন যাতে হক্ক স্পষ্ট হবে না, ইলম অর্জিত হবে না, হিদায়াত বুঝা যাবে না। বরং এর দ্বারা কেবল বাতিলই প্রমাণিত হবে, এর দ্বারা শুধু পথভ্রষ্টতাই বুঝা যাবে; যাতে করে রাসূলের বক্তব্য দ্বারা সৃষ্টিকুলের উপকৃত হওয়া নিবদ্ধ থাকবে রাসূল যা প্রকাশ করেছেন, যা সৃষ্টিকুলকে বুঝিয়েছেন, তা খণ্ডন করতে প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। আর এ কারণে তারা এমন সব গবেষণায় আত্মনিয়োগ করবে যার মাধ্যমে হক চিনতে পারবে, কেননা রাসূল তাদের জন্য হক্ক জানার ক্ষেত্রে কোনো প্রমাণই প্রতিষ্ঠা করেননি, অনুরূপ রাসূল তাঁর বাণীতে সে হক্ক চেনার জন্য সামান্যতম কিছুই স্পষ্ট করে বর্ণনা করেননি। [দারউত তা'আরুদ্ব (৫/৩৬৫-৩৬৬)] তাদের কথার আরো দাবি হচ্ছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা কিছু বলেছেন তা দ্বারা কেবল তাদেরকে পথভ্রষ্টতার দিকেই ঠেলে দেয়াই উদ্দেশ্য ছিল। হিদায়াত তো তারা কেবল তাদের বিবেকের যুক্তির মাধ্যমেই অর্জন করবে। যার অনিবার্য ফল হচ্ছে, রাসূল তাদের জন্য পথভ্রষ্টতার পথ রচনা করেছেন, হিদায়াতের কিছুই তাদের জন্য প্রতিষ্ঠা করেননি। তাদের হিদায়াতের বিষয়টি তাদের নিজেদের দিকেই ন্যস্ত করে দিয়েছেন। তাদের বক্তব্যের স্পষ্ট দাবি হচ্ছে, লোকদেরকে জাহেলিয়াতের অন্ধকারে ছেড়ে দেয়াই উত্তম ছিল এ রিসালাত থেকে; কারণ এ রিসালাত তাদের কোনো কাজে আসেনি, বরং তাদের ক্ষতি করেছে। [আল-কায়েদাতুল মারাকিশিয়্যাহ, পৃ. ৫১]
📄 সিফাত অস্বীকারকারীদের কথার দাবি
কেননা এদের কথা অনুযায়ী (আল্লাহর পরিচয় ও গুণাবলির ব্যাপারে) প্রকৃত কথা হচ্ছে, হে লোকেরা! তোমরা আল্লাহর পরিচয় ও তার গুণাবলির ক্ষেত্রে যা তাঁর জন্য উপযোগী, সাব্যস্ত করা কিংবা না-করা, এটার জ্ঞান কুরআন-সুন্নাহ'য় খোঁজ করো না এবং সালাফদের কথায়ও না বরং তোমরা গবেষণা করে দেখো। তারপর যেটা তাঁর জন্য তোমাদের যুক্তিতে উপযোগী পাও তা তাঁর জন্য সাব্যস্ত কর। চাই সেটা কুরআন ও সুন্নাহ'য় থাক বা না থাক। আর যে সিফাত তোমাদের যুক্তির মাধ্যমে তাঁর জন্য উপযোগী না পাও, সেটা তার জন্য সাব্যস্ত করো না।
টিকাঃ
১০০. আর যেহেতু এটা বাতিল কথা, সুতরাং সিফাত অস্বীকারকারী কাফের পারস্য-রোমের অনুসারী, ইয়াহূদী-নাসারাদের মতবাদ, দার্শনিক ও কালামশাস্ত্রবিদদের দেয়া মতামতের মাধ্যমে আল্লাহর নাম ও গুণ অস্বীকার করা কিংবা অর্থহীন করার নীতিকে কখনও গ্রহণ করা যেতে পারে না।
📄 সিফাত অস্বীকারকারীদের বিভিন্ন গোত্র ও তাদের নীতি
অতঃপর যেখানে যুক্তি কোনো কিছু সাব্যস্ত কিংবা অসাব্যস্ত কোনোটিই করে না, সেখানে তারা দু'টি দলে বিভক্ত:
📄 সন্দেহে নিপতিত হওয়ার মূল উৎস
অতঃপর সিফাত অস্বীকারকারীদের দলীল নামের সংশয়সমূহের অধিকাংশই তারা পেয়েছে মুশরিক অথবা সাবেয়ী সম্প্রদায়ের তাগূতদের কারও মাধ্যমে অথবা তাদেরই কোনো উত্তরসূরির মাধ্যমে যাদের সাথে কুফরী করতে তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, যেমন অমুক ও অমুক অথবা যে তাদের কথার মত কথা বলেছে, কারণ তাদের অন্তরসমূহে সাদৃশ্য রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا ﴾ [النساء: ٦٥]
“কিন্তু না, আপনার রবের শপথ! তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার ভার আপনার ওপর অর্পণ না করে; অতঃপর আপনার মীমাংসা সম্পর্কে তাদের মনে কোনো দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তকরণে তা মেনে নেয়।” [সূরা আন-নিসা: ৬৫]
﴿كَانَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً فَبَعَثَ اللَّهُ النَّبِيِّينَ مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ وَأَنزَلَ مَعَهُمُ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِيَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ فِيمَا اخْتَلَفُوا فِيهِ وَمَا اخْتَلَفَ فِيهِ إِلَّا الَّذِينَ أُوتُوهُ مِن بَعْدِ مَا جَاءَتْهُمُ الْبَيِّنَاتُ بَغْيًا بَيْنَهُمْ﴾ [البقرة: ٢١٣]
"সমস্ত মানুষ ছিল একই উম্মত। অতঃপর আল্লাহ নবীগণকে প্রেরণ করেন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে এবং তাদের সাথে সত্যসহ কিতাব নাযিল করেন যাতে মানুষেরা যে বিষয়ে মতভেদ করত সেসবের মীমাংসা করতে পারেন। আর যাদেরকে তা দেয়া হয়েছিল, স্পষ্ট নিদর্শন তাদের কাছে আসার পরে শুধু পরস্পর বিদ্বেষবশত সে বিষয়ে তারা বিরোধিতা করত।” [সূরা আল-বাকারাহ: ২১৩]
টিকাঃ
১১৩. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ একাধিক জায়গায় এটি স্পষ্ট করে বলেছেন যে, জাহমিয়্যাদের আসল বক্তব্য তারা মুশরিকদের থেকে, সাবেয়ীদের থেকে গ্রহণ করেছে, ভারতীয় হিন্দু ব্রাহ্মণদের থেকে নিয়েছে, দার্শনিকদের থেকে চয়ন করেছে, আহলে কিতাবদের বিদ'আতীদের থেকে গ্রহণ করেছে, যারা মনে করে যে, রব্ব এর কোনো সাব্যস্ত করার মতো গুণ থাকতে নেই।' দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৬/৫১), (১০/৬৭)।