📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 যারা আল্লাহ তাআলার সর্বোচ্চ থাকার গুণটি অস্বীকার করে, তাদের সপক্ষে কুরআন, সুন্নাহ কিংবা কোনো একজন সালাফে সালেহের কারো থেকে দলীল পাওয়া যাবে না

📄 যারা আল্লাহ তাআলার সর্বোচ্চ থাকার গুণটি অস্বীকার করে, তাদের সপক্ষে কুরআন, সুন্নাহ কিংবা কোনো একজন সালাফে সালেহের কারো থেকে দলীল পাওয়া যাবে না


এভাবে আল্লাহর কিতাব, তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ, সালাফে সালেহীন তথা সাহাবায়ে কিরাম ও তাদের সুন্দর অনুসারী তাবে'য়ীন, আইম্মায়ে মুজতাহিদীন, যারা মতভেদ ও প্রবৃত্তি অনুসারীদের যুগ পেয়েছে তাদের কারো কাছ থেকে একটি হরফও বর্ণিত হয়নি যা (নস বা যাহের তথা) প্রকাশ্য-পরোক্ষ কোনোভাবেই তার ব্যতিক্রম।
তাদের কেউ কোনো দিন বলেনি, আল্লাহ আসমানের উপর না, বা তিনি 'আরশের উপরে নন, বা তিনি সত্তাগতভাবে সর্বত্র বিরাজমান। এটাও বলেননি যে, সকল স্থান তার জন্য সমান; এটাও বলেননি যে, তিনি বিশ্বের ভেতরেও না বা বাইরেও না, তার সাথে সংযুক্তও না আবার পৃথকও না। এও বলেনি যে, আঙ্গুল ইত্যাদি ইন্দ্রিয় দ্বারা তার প্রতি ইঙ্গিত করা জায়েয নেই।
বরং জাবের রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত আছে যে, তিনি 'আরাফাতের দিন বিশাল জনসমুদ্রের সামনে ভাষণদানকালে বলেছিলেন: "সাবধান আমি কি পৌঁছাতে পেরেছি? তারা বলল: হ্যাঁ। তখন তিনি আকাশের দিকে আঙ্গুল উঁচু করে সেটাকে তাদের প্রতি ঝুঁকিয়ে বললেন: হে আল্লাহ, আপনি সাক্ষী থাকুন।" এটা তিনি কয়েকবার বললেন। অনুরূপ প্রমাণাদি আরও অনেক রয়েছে।

টিকাঃ
৯২. এটি এমন এক প্রমাণ যা শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ তাঁর 'আল-আকীদাতুল ওয়াসেত্বিয়্যাহ' এর মুনাযারায় চ্যালেঞ্জ হিসেবে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। তিনি তাদেরকে বলেছিলেন, 'আমি এখানে যা লিখেছি, তার বিরোধিতাকারীদের সকলকে চ্যালেঞ্জ দিচ্ছি, তিন বছর পর্যন্ত; যদি আমি যা বর্ণনা করেছি তার বিপরীত একটি বক্তব্য কোনো সালাফে সালেহীনের কাছ থেকে আনতে পারে, তবে অবশ্যই আমি আমার বক্তব্য থেকে ফিরে আসব। আর আমার উপরও কর্তব্য থাকলো, আমি যা লিখেছি, তার সপক্ষে প্রথম তিন যুগের সকল গোষ্ঠী থেকে বর্ণনা উপস্থিত করবো যা আমার বর্ণিত বক্তব্যকে সমর্থন করবে, সেসব বর্ণনা আনব হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী, হাম্বলী, আশ'আরী ও আহলুল হাদীস প্রমুখের কাছ থেকে। [মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/১৯৭), (৩/১৬৯)] বরং তিনি আরও বলেন, "যে কেউ সালাফে সালেহীনের কাছ থেকে আমার বর্ণিত আকীদাহ'র বিপরীতে একটি কথা নিয়ে আসবে পারবে, আমি সেটাতে তার অনুসরণ করবো।” [মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/২০৬)]
৯৩. যেমনটি বলে থাকে হুলুলী গোষ্ঠী, যারা মনে করে স্রষ্টা সৃষ্টির অভ্যন্তরে প্রবেশ করে আছেন।
৯৪. যেমনটি বলে থাকে সীমালঙ্ঘনকারী মু'আত্বিলা সম্প্রদায়, যারা সৃষ্টিকে স্রষ্টাশূন্য করে থাকে।
৯৫. শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ অন্যত্র বলেন, যারা বলে আল্লাহ তা'আলা জগতের ভিতরেও নন আবার বাইরেও নন, আর যারা বলে, আল্লাহ তা'আলা সর্বত্র বিরাজমান, এ দু'টি বক্তব্যই একই তাক থেকে বের হয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার জন্য উপরে থাকা ও 'আরশের উপরে উঠা অস্বীকার করে কুরআন ও হাদীসে আসা এতদসংক্রান্ত ভাষ্যসমূহকে তা'ত্নীল বা অর্থশূন্য করা। [বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৫/৫১)] তিনি আরও বলেন, 'আল্লাহ তা'আলা সর্বত্র বিরাজমান' এ কথাটি জাহমিয়্যাদের মধ্যে যারা ইবাদতগুজার ও সূফীদের বক্তব্য। আর 'আল্লাহ তা'আলা জগতের বাইরেও নয় ভিতরেও নয়' এ কথাটি জাহমিয়্যাদের মধ্যে যারা কাلامশাস্ত্রে পারদর্শী ও যারা মুনাযারা করতে অভ্যস্ত তাদের বক্তব্য। আর সেজন্যই বলা হয়ে থাকে, 'কালামশাস্ত্রে পারদর্শী জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়ের লোকেরা কিছুরেই ইবাদত করে না, আর সূফীশাস্ত্রে বিশ্বাসী জাহমিয়্যারা সবকিছুর ইবাদত করে'। [মাজমূ' ফাতাওয়া (২/২৯৮)] বরং তিনি আরও বলেছেন, তাদের অনেকের কাছ থেকেই উপরোক্ত দু'টি বক্তব্যই পাওয়া যায়। যখন কারও সাথে মুনাযারা করে তখন পরস্পর বিরোধী উভয় প্রকার অবস্থা থেকে আল্লাহকে মুক্ত করে বলে, তিনি জগতের ভিতরেও নন, জগতের বাইরেও নন। আর যখন ইবাদত করে ও দাসত্ব করতে চায় তখন বলে, তিনি সর্বত্র বিরাজমান, তাঁর থেকে কোনো স্থান মুক্ত নয়, বরং স্পষ্টভাষায় হুলুল বা সর্বত্র সকল সৃষ্টিতে তার প্রবেশ করার কথা বলে থাকে, এমনকি চতুষ্পদ জন্তুর অভ্যন্তরে বলেও মত প্রকাশ করে। বরং আরও অগ্রসর হয়ে ইত্তেহাদ বা সকল কিছুতেই তিনি একাকার হয়ে যাওয়ার কথাও বলে থাকেন, আবার আরও অগ্রসর হয়ে ওয়াহদাতুল ওজুদ বা সর্বেশ্বরবাদের কথাও বলে থাকেন, ফলে তাদের মতে তাঁর অস্তিত্ব তো সকল সৃষ্টির অস্তিত্বই। আলাদা কিছু নয়। (নাউযুবিল্লাহ) [বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/৭); মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/২৭২)] তারপর তিনি এটা সাব্যস্ত করেছেন যে, 'কোনো কিছু জগতের বাইরেও নয়, আবার ভিতরেও নয়' এমন জিনিসের যে অস্তিত্ব নেই তা ফিত্বরী বা স্বভাবজাত ও অত্যাবশ্যক জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। [বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/৩০৭, ৩১২)] দূর্ভাগ্যবশত: পরবর্তী কালামশাস্ত্রবিদ আশ'আরী ও মাতুরিদীদের গ্রন্থেও এ বক্তব্য দেখতে পাওয়া যায়। তিনি আরও বলেন, যারা বলে 'তিনি জগতের ভিতরেও নন, বাইরেও নন' তারা কখনও তাদের মত খণ্ডন করতে পারবে না যারা বলে 'তিনি সর্বত্র বিরাজমান'। কারণ যদি সে এমন কোনো কিছুর অস্তিত্ব সাব্যস্ত করা বৈধ মনে করে যা জগতের ভিতরেও নয়, বাইরেও নয়, যার প্রতি ইঙ্গিত করে দেখানো যায় না, সে এভাবে নেগেটিভ হওয়ার কারণে তাদের কথা অস্বীকার করতে পারবে না, যারা বলে 'তিনি সর্বত্র বিরাজমান'। [দারুউত তা'আরুদ্ব (৬/১৪৪-১৪৫)]
৯৬. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ অন্যত্র বর্ণনা করেছেন যে, ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে দেখানো দ্বারা চাক্ষুষ বা প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্যভাবে কোনো কিছু অনুভব করাকে বুঝায়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'যখন ঈসা তাদের থেকে কুফরী আঁচ করতে পারল' [সূরা আলে ইমরান: ৫২], অনুরূপ আল্লাহর বাণী, 'আর তাদের পূর্বে আমরা বহু প্রজন্মকে ধ্বংস করেছি, তাদের কারও কোনো কিছুর অনুভব কি আপনি পাচ্ছেন? [সূরা মারইয়াম: ৯৮] আর জানা কথা যে, সকল মানুষকেই আল্লাহ তা'আলা ফিত্বরাত তথা স্বভাবজাত জ্ঞান দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, আর ফিত্বরাত বা স্বভাবজাত জ্ঞানে মানুষ এটা বুঝতে পারে যে, যা কোনোভাবেই অনুভূত হয় না, প্রকাশ্যও না, অপ্রকাশ্যভাবেও না, তার কোনো অস্তিত্ব নেই। [আত-তিস'ঈনিয়্যাহ (১/২৫৮)] তারপর শাইখুল ইসলাম এটা স্পষ্ট করে বলেছেন যে, উপরের দিকে আল্লাহর দিকে দো'আ ও অন্য সময় ইঙ্গিত করে দেখানো সেটা হাত দিয়ে হোক কিংবা ইঙ্গিত দিয়ে হোক, অথবা চোখ দিয়ে হোক বা অন্য কিছু দিয়ে হোক এমন সব ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ইঙ্গিতের অন্তর্ভুক্ত যা নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে মুতাওয়াতির তথা নিরবিচ্ছিন্ন সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত সুন্নাহ'র মাধ্যমে সাব্যস্ত হয়েছে। আর তার ওপর মুসলিম ও অমুসলিম সবার ঐকমত্য লক্ষ্য করা যায়। [বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৪/৪৯৭)] তিনি আরও বলেন, সকল সালাফে সালেহীন ও সিফাত সাব্যস্তকারীগণ এ মত পোষণ করেন যে, আল্লাহ তা'আলাকে দেখা সম্ভব, তাঁর দর্শন হতে পারে, তাঁকে অনুভব করা যেতে পারে। সর্বপ্রথম তাঁকে অনুভব করা যাবে না এটা বলেছিল জাহম ইবন সাফওয়ান, যখন সে বৌদ্ধ মুশরিকদের সাথে মুনাযারা করছিল। [বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৩/৫৬৬)] তিনি আরও বলেন, মহান আল্লাহর দিকে ইঙ্গিত করা তাকে আহ্বান করার পূর্ণতা প্রদান করে। কারণ তা তাঁর 'সামাদ' এর প্রতিফলন, সামাদ অর্থ হচ্ছে, যার কাছে বান্দারা ধাবিত হয়। আর জানা কথা যে, ভিতর, বাহির, অন্তর ও সারা শরীর মহান আল্লাহর উদ্দেশ্য নিবেদিত হওয়া শুধু অন্তর তাঁর দিকে নিবেদিত হওয়া থেকে উত্তম। সুতরাং তাঁর দিকে ইঙ্গিত করে দো'আ করা অবশ্যই তাঁর সামাদ গুণের পূর্ণতাজ্ঞাপক। তাই সামাদ নামটি তা দাবি করে থাকে। সুতরাং তাঁর অস্তিত্ব থাকাই আবশ্যক করে যে, তিনি অবশ্যই পৃথক সত্তা, আর পৃথক সত্তার দিকে ইঙ্গিত হওয়াই স্বাভাবিক চাহিদা। আর তিনি যেহেতু 'সামাদ' উদ্দেশ্য সত্তা সেহেতে তার দাবি হচ্ছে এমন দো'আ করা যাতে তাঁর প্রতি ইঙ্গিত থাকবে। আর তাই তিনি ব্যতীত অন্য কারও দিকে ইঙ্গিত করে দো'আ করা তাঁর সাথে শির্ক করা বলে গণ্য হবে, তাঁর তাওহীদ থেকে তাঁকে বের করে তার সাথে শরীক করা গণ্য হবে। [বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (২/৪৫০)] এভাবে যারা আল্লাহকে জগতের ভিতরেও নয়, বাইরেও নয়, ইঙ্গিতও করা যায় না, এরূপ কথা তাঁর জন্য বলে থাকে তাদের মধ্যকার অধিকাংশ কালামশাস্ত্রবিদদেরকেই দেখা যায় যে, তারা আল্লাহর জন্য ইবাদত করে না, তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করে না, তাঁর অভিমুখী হয় না। বরং তারা যদি সালাতও আদায় করে, সালাত পড়ে অমনোযোগী অন্তর নিয়ে, আর যদি আল্লাহকে ডাকে তো অনিবিষ্ট মনে ডাকে। [বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৪/৫৫৪)]
৯৭. হাদীসটি জাবের রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু কর্তৃক বর্ণিত বিদায় হজের বর্ণনায় একটি বড় হাদীসের অংশ। দেখুন, সহীহ মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ১২১৮।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 সিফাত অস্বীকারকারীদের কথা সত্য হলে যেসব মারাত্মক প্রশ্ন আপতিত হয়

📄 সিফাত অস্বীকারকারীদের কথা সত্য হলে যেসব মারাত্মক প্রশ্ন আপতিত হয়


সুতরাং কুরআন-সুন্নাহ’র এসব ও অনুরূপ ভাষ্য দ্বারা প্রমাণিত এসব সিফাতগুলোকে অস্বীকার ও নাকচকারীদের কথার মধ্যেই যদি হক বা সত্য থেকে থাকে, যদি কুরআন ও সুন্নাহ থেকে নস বা যাহির ভাষ্য থেকে যা বুঝা যায় তাতে হক্ক না থাকে, তাহলে আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও উম্মতের উত্তম লোকদের জন্য এটা কীভাবে জায়েয হতে পারে যে, তারা সর্বদা সত্যের বিপরীত কথা বলে থাকেন? অতঃপর তারা যা সত্য সঠিক কথা, যা বিশ্বাস করা আবশ্যক, তা তারা স্পষ্ট করে প্রকাশ করলেন না বা তার দিকে পথপ্রদর্শনও করলেন না, নস হিসেবেও নয়, যাহের হিসেবেও নয় (এটা কীভাবে সম্ভব?)।
অবশেষে রোম-পারস্যের জাত ইয়াহূদী-খ্রিস্টানদের বাচ্চা এবং দার্শনিকরা এসে জাতিকে সঠিক আকীদাহ বয়ান করল যে আকীদাহ বিশ্বাস গ্রহণ করা সকলের ওপর আবশ্যক। (এটা কীভাবে সম্ভব?)।
যদি এসব দার্শনিক যা বলে তাই আবশ্যকীয় বিশ্বাসের বিষয় হতো, অথচ তা জানতে তারা কেবল তাদের বুদ্ধি-বিবেকের ওপর নির্ভর করেছে, আর তাদের বিবেকের যুক্তির মাধ্যমে তারা কুরআন-সুন্নাহ'য় নস বা যাহিরভাবে যা কিছু এসেছে তা খণ্ডন করতে সক্ষম হয়ে যায়, তাহলে এ বিচারে তো কুরআন-সুন্নাহ ব্যতীত থাকাই মানুষের জন্য বেশি হিদায়াতের কারণ হতে হয়, কুরআন-সুন্নাহ না থাকলেই তাদের জন্য তা বেশি উপকারী বিবেচিত হতে হয়। বরং কুরআন-সুন্নাহ থাকাটাই তো তখন দীনের মূল বিষয়ের জন্য নিছক ক্ষতিকর সাব্যস্ত হতে হয়ে।

টিকাঃ
৯৮. কারণ কুরআন-সুন্নাহ’য় ও সাহাবায়ে কিরামের বক্তব্যে অনবরত এসব গুণ সাব্যস্ত করা হয়েছে। কুরআনের ভাষ্য, হাদীসের বক্তব্য, সাহাবায়ে কিরাম কি তাহলে সত্যের বিপরীতে কথা বললেন?
৯৯. আর যেহেতু এটি একটি স্পষ্ট মিথ্যা ও অসত্য বিষয় তাই এসব কাফের, দার্শনিক, কালামশাস্ত্রবিদদের বাচ্চাদের দেয়া আকীদাহ-বিশ্বাস আবশ্যক বিষয় হতে পারে না। সুতরাং কুরআন ও সুন্নাহ ও সালাফে সালেহীনের কথাকেই প্রাধান্য দিতে হবে। তাই হিদায়াত নিতে হবে কুরআন ও সুন্নাহ'র নস বা যাহির ভাষ্য থেকেই। কারণ আল্লাহ তা'আলা কুরআন ও সুন্নাহকে দিয়েছেন আমাদের হিদায়াত ও উপকারের জন্য। এসব কাلامশাস্ত্রবিদদের বক্তব্য ইসলামে আগমনের পূর্বে কুরআন ও সুন্নাহ ইসলামের অনুসারীদেরকে হিদায়াত প্রদান করেছে। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ'র বক্তব্যের সারকথা হচ্ছে, যদি কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফে সালেহীনের বক্তব্যে সাব্যস্ত করা আল্লাহর নাম ও গুণকে সাব্যস্ত না করা এবং বিকৃত করার জন্য আসা কাফের পারস্য, রোমের অনুসারীদের বক্তব্য, ইয়াহুদী, নাসারাদের মতবাদ, দার্শনিক ও কালামশাস্ত্রবিদদের মতামতকে প্রাধান্য দিতে হয়, তাদের কথাকেই চূড়ান্ত সত্য বলতে হয়, তাহলে মানুষদেরকে কুরআন, সুন্নাহ ব্যতীত ছাড়াই বেশি হিদায়াত ও তাদের উপকার প্রদানের জন্য অধিক উত্তম হতো। এর দ্বারা তো মনে হচ্ছে যে, রাসূলই তাদের জন্য পথভ্রষ্টতার যাবতীয় কারণ প্রতিষ্ঠা করলেন! নাউযুবিল্যাহ। তাদের অনেকেই মনে করে থাকে, আল্লাহর কাلام ও রাসূলের বাণী মানুষদেরকে পথভ্রষ্ট করে দিয়েছে অথবা তাদের বিবেক ও দীন নষ্ট করে দিয়েছে, তাদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর ঈমানের ব্যাপারে হক্কের বিপরীত বিশ্বাস গ্রহণ করতে বাধ্য করেছে অথবা তাদেরকে হক্কের ব্যাপারে সন্দেহ ও সংশয়ে নিপতিত করেছে অথবা তাদেরকে ভীষণ সমস্যার বেড়াজালে নিক্ষেপ করছে; কারণ যখন তারা হক্ক জানতে বিবেক খরচ করেছে তখন এসব কুরআন ও সুন্নাহ'র ভাষ্যকে ভিন্ন অর্থে প্রবাহিত করা, মানুষদেরকে এসব ভাষ্যের দাবি ও চাহিদা থেকে অন্য দিকে ফেরানো, যারা তাদের দেয়া মতবাদ মেনে নেয় না, নবী-রাসূলদের অনুসারী বিশাল জনগোষ্ঠী যখন তাদের সাথে শত্রুতা করে, তাদেরকে দমন করা ইত্যাদির ক্ষেত্রে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। [নাউযুবিল্লাহ] শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়‍্যাহ আরও বলেন, আল্লাহর সিফাত অস্বীকারকারী অধিকাংশ জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়ের লোক বলে থাকে, কুরআন ও সুন্নাহ'য় আসা সিফাত সাব্যস্তকারী ভাষ্যসমূহ ও অনুরূপ আখেরাত কেন্দ্রিক ভাষ্যসমূহ, যেগুলোকে তারা মুশকিল ও মুতাশাবিহ নাম দিয়ে থাকে। সেগুলো অবতরণ করার উপকারিতা হচ্ছে, এগুলো নিয়ে আলেমগণ ইজতিহাদ করে সেগুলোকে তার বাহ্যিক অর্থ ও স্পষ্ট চাহিদা থেকে অন্য খাতে প্রবাহিত করা। যার মাধ্যমে আত্মা ইজতিহাদের কষ্ট অনুভব করবে, চিন্তাজগত উন্মোচিত হবে, আর এর বিপরীতে যে হক্ক আছে তা লাভ করার জন্য যৌক্তিক দলীল-প্রমাণাদি প্রস্তুত করা সম্ভব হবে। তাই তাদের নিকট প্রকৃত অবস্থা হচ্ছে, রাসূলগণ সৃষ্টিকূলকে এমনসব জিনিস জানিয়েছেন যাতে হক্ক স্পষ্ট হবে না, ইলম অর্জিত হবে না, হিদায়াত বুঝা যাবে না। বরং এর দ্বারা কেবল বাতিলই প্রমাণিত হবে, এর দ্বারা শুধু পথভ্রষ্টতাই বুঝা যাবে; যাতে করে রাসূলের বক্তব্য দ্বারা সৃষ্টিকুলের উপকৃত হওয়া নিবদ্ধ থাকবে রাসূল যা প্রকাশ করেছেন, যা সৃষ্টিকুলকে বুঝিয়েছেন, তা খণ্ডন করতে প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। আর এ কারণে তারা এমন সব গবেষণায় আত্মনিয়োগ করবে যার মাধ্যমে হক চিনতে পারবে, কেননা রাসূল তাদের জন্য হক্ক জানার ক্ষেত্রে কোনো প্রমাণই প্রতিষ্ঠা করেননি, অনুরূপ রাসূল তাঁর বাণীতে সে হক্ক চেনার জন্য সামান্যতম কিছুই স্পষ্ট করে বর্ণনা করেননি। [দারউত তা'আরুদ্ব (৫/৩৬৫-৩৬৬)] তাদের কথার আরো দাবি হচ্ছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা কিছু বলেছেন তা দ্বারা কেবল তাদেরকে পথভ্রষ্টতার দিকেই ঠেলে দেয়াই উদ্দেশ্য ছিল। হিদায়াত তো তারা কেবল তাদের বিবেকের যুক্তির মাধ্যমেই অর্জন করবে। যার অনিবার্য ফল হচ্ছে, রাসূল তাদের জন্য পথভ্রষ্টতার পথ রচনা করেছেন, হিদায়াতের কিছুই তাদের জন্য প্রতিষ্ঠা করেননি। তাদের হিদায়াতের বিষয়টি তাদের নিজেদের দিকেই ন্যস্ত করে দিয়েছেন। তাদের বক্তব্যের স্পষ্ট দাবি হচ্ছে, লোকদেরকে জাহেলিয়াতের অন্ধকারে ছেড়ে দেয়াই উত্তম ছিল এ রিসালাত থেকে; কারণ এ রিসালাত তাদের কোনো কাজে আসেনি, বরং তাদের ক্ষতি করেছে। [আল-কায়েদাতুল মারাকিশিয়‍্যাহ, পৃ. ৫১]

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 সিফাত অস্বীকারকারীদের কথার দাবি

📄 সিফাত অস্বীকারকারীদের কথার দাবি


কেননা এদের কথা অনুযায়ী (আল্লাহর পরিচয় ও গুণাবলির ব্যাপারে) প্রকৃত কথা হচ্ছে, হে লোকেরা! তোমরা আল্লাহর পরিচয় ও তার গুণাবলির ক্ষেত্রে যা তাঁর জন্য উপযোগী, সাব্যস্ত করা কিংবা না-করা, এটার জ্ঞান কুরআন-সুন্নাহ'য় খোঁজ করো না এবং সালাফদের কথায়ও না বরং তোমরা গবেষণা করে দেখো। তারপর যেটা তাঁর জন্য তোমাদের যুক্তিতে উপযোগী পাও তা তাঁর জন্য সাব্যস্ত কর। চাই সেটা কুরআন ও সুন্নাহ'য় থাক বা না থাক। আর যে সিফাত তোমাদের যুক্তির মাধ্যমে তাঁর জন্য উপযোগী না পাও, সেটা তার জন্য সাব্যস্ত করো না।

টিকাঃ
১০০. আর যেহেতু এটা বাতিল কথা, সুতরাং সিফাত অস্বীকারকারী কাফের পারস্য-রোমের অনুসারী, ইয়াহূদী-নাসারাদের মতবাদ, দার্শনিক ও কালামশাস্ত্রবিদদের দেয়া মতামতের মাধ্যমে আল্লাহর নাম ও গুণ অস্বীকার করা কিংবা অর্থহীন করার নীতিকে কখনও গ্রহণ করা যেতে পারে না।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 সিফাত অস্বীকারকারীদের বিভিন্ন গোত্র ও তাদের নীতি

📄 সিফাত অস্বীকারকারীদের বিভিন্ন গোত্র ও তাদের নীতি


অতঃপর যেখানে যুক্তি কোনো কিছু সাব্যস্ত কিংবা অসাব্যস্ত কোনোটিই করে না, সেখানে তারা দু'টি দলে বিভক্ত:

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00