📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 কুরআনে কারীম থেকে প্রমাণিত যে, আল্লাহ তাআলা সকল সৃষ্টির উপরে

📄 কুরআনে কারীম থেকে প্রমাণিত যে, আল্লাহ তাআলা সকল সৃষ্টির উপরে


আর যখন ব্যাপারটি তেমনি হলো, তাহলে [আমরা বলছি যে,] আল্লাহর কিতাব শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এবং রাসূলের সুন্নাত শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, অতঃপর সাহাবী-তাবেয়ীদের সকল কথা এবং ইমামদের সকল বাণী, সবটাই পরিপূর্ণ এমন জিনিস দ্বারা যা হয় নস অথবা যাহির এ ক্ষেত্রে যে, আল্লাহ তা'আলা সত্তাগতভাবে সবকিছুর উপরে, সবকিছুর ঊর্ধ্বে, তিনি 'আরশের উপরে, আসমানের উপরে। যেমন তাঁর বাণী:
﴿إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ وَالْعَمَلُ الصَّالِحُ يَرْفَعُهُ ﴾ [ফাত্বির: ১০] "তাঁরই দিকে পবিত্র বাণীসমূহ উঠে যায় এবং সৎকাজ, তিনি তা উপরে উঠিয়ে নেন।” [সূরা ফাতির: ১০]
﴿إِنِّي مُتَوَقِّيكَ وَرَافِعُكَ إِلَيَّ﴾ [আল ইমরান: ৫৫] "নিশ্চয় আমি আপনাকে পরিগ্রহণ করব, আমার দিকে আপনাকে উঠিয়ে নিব।” [সূরা আলে ইমরান: ৫৫]
﴿أَمِنتُم مَّن فِي السَّمَاءِ أَن يَخْسِفَ بِكُمُ الْأَرْضَ فَإِذَا هِيَ تَمُورُ أَمْ أَمِنتُم مِّن فِي السَّمَاءِ أَن يُرْسِلَ عَلَيْكُمْ حَاصِبًا﴾ [আল মুলক: ১৬, ১৭] "তোমরা কি এ থেকে নির্ভয় হয়েছ যে, যিনি আসমানের উপর রয়েছেন তিনি তোমাদেরকে সহ যমীনকে ধ্বসিয়ে দিবেন, অতঃপর তা হঠাৎ করেই থরথর করে কাঁপতে থাকবে? অথবা তোমরা কি এ থেকে নির্ভয় হয়েছ যে, আসমানের উপর যিনি রয়েছেন তিনি তোমাদের উপর কঙ্করবর্ষী ঝঞ্ঝা পাঠাবেন?” [সূরা আল-মুলক: ১৬-১৭]
"বরং আল্লাহ তাকে তাঁর দিকে উঠিয়ে নিয়েছেন।” [সূরা আন-নিসা: ১৫৮]
"ফিরিশতা এবং রূহ আল্লাহর দিকে ঊর্ধ্বগামী হয়।” [সূরা আল-মা'আরিজ: ০৪]
"তিনি আসমান থেকে যমীন পর্যন্ত সমুদয় বিষয় পরিচালনা করেন, তারপর সবকিছুই তাঁর সমীপে উত্থিত হবে।” [সূরা আস-সাজদাহ: ০৫] ، ﴿يَخَافُونَ رَبَّهُم مِّن فَوْقِهِمْ﴾ [النحل : ৫০]
"তারা ভয় করে তাদের উপরস্থ তাদের রবকে।” [সূরা আন-নাহল: ৫০]
﴿ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ ﴾ [يونس : ৩] "তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠলেন।” [সূরা ইউনুস: ০৩; সূরা আল-আ'রাফ: ৫৪] (সূরা আর-রা'দ: ০২; সূরা আল-ফুরক্বান: ৫৯; সূরা আস-সাজদাহ: ০৪; সূরা আল-হাদীদ: ০৪) এই ছয় জায়গায়।
﴿الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى﴾ [طه: ٥] "রহমান 'আরশের উপরে উঠেছেন।” [সূরা ত্বা-হা: ০৫]
﴿يَهَمَنُ ابْنِ لِي صَرْحًا لَعَلِّي أَبْلُغُ الْأَسْبَابَ أَسْبَابَ السَّمَوَاتِ فَأَطَّلِعَ إِلَى إِلَهِ مُوسَى وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ كَذِبًا) [غافر: ٣৬، ৩৭] "হে হামান! আমার জন্য তুমি নির্মাণ কর এক সুউচ্চ প্রাসাদ যাতে আমি অবলম্বন পাই- আসমানে আরোহনের অবলম্বন, যেন দেখতে পাই মূসার ইলাহকে; আর নিশ্চয় আমি তাকে মিথ্যাবাদী মনে করি।” [সূরা গাফির: ৩৬-৩৭]
"এটা প্রজ্ঞাময়, চিরপ্রশংসিতের কাছ থেকে নাযিলকৃত।” [সূরা ফুসসিলাত: ৪২]
“নিশ্চয় এটা আপনার রবের কাছ থেকে যথাযথভাবে নাযিলকৃত।” [সূরা আল-আন'আম: ১১৪] ইত্যাদি আরও অনেক যেগুলো কষ্ট ব্যতিরেকে গণনা করা যায় না।

টিকাঃ
৬০. নস দ্বারা বুঝায় এমন বাক্য যা কেবল একটি অর্থই প্রদান করে, যাতে অন্য অর্থ করার সম্ভাবনা বা সুযোগ নেই।
৬১. যাহির দ্বারা বুঝায় এমন বাক্য যাতে দু'টি অর্থ হতে পারে, তবে তন্মধ্যে একটি অপরটি থেকে বেশি প্রকাশ্য; যেটি বেশি প্রকাশ্য তা-ই যাহির।
৬২. অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা সত্তাগতভাবে সবকিছুর উপরে থাকার বিষয়টি সাব্যস্ত করার জন্য কোনো তা'ওয়ীল বা অপব্যাখ্যার আশ্রয় নেয়া লাগে না। তা মুহকাম আয়াত-হাদীস, নস আয়াত-হাদীস ও যাহির আয়াত-হাদীস দ্বারাই সাব্যস্ত করা হবে।
৬৩. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ অন্যত্র বলেন, দুনিয়ার মানুষের সামনে যখন ফির'আউন কর্তৃক মুসার ওপর মিথ্যারোপ করার ঘটনা বর্ণনা করা হয় তখন তারা হয় মুহাম্মাদী-মুসাওয়ী হবে নতুবা তারা হবে ফির'আওনী। যখন মূসা বলেছিলেন, তার রব্ব আল্লাহ উপরে, যখন মূসা বলেছিলেন, তার রব্ব তার সাথে কথা বলেছেন, যখন মূসা বলেছিলেন, তার একজন সৃষ্টিকর্তা আছে, তখন দুনিয়ার মানুষ হয় তাকে অনুসরণ করে সত্যায়ন করবে অথবা ফির'আউনকে অনুসরণ করে মুসার ওপর মিথ্যারোপ করবে। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপরোক্ত তিনটি বিষয়েই মূসা 'আলাইহিস সালামকে সত্যায়ন করেছেন। [মাজমূ' ফাতাওয়া (১২/৩৫১)]

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত থেকে মুতাওয়াতির তথা নিরবচ্ছিন্ন পদ্ধতিতে সংগৃহীত বর্ণনা দ্বারা “আল্লাহর সত্তাগতভাবে সর্বোচ্চ থাকা” গুণটি প্রমাণিত

📄 রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত থেকে মুতাওয়াতির তথা নিরবচ্ছিন্ন পদ্ধতিতে সংগৃহীত বর্ণনা দ্বারা “আল্লাহর সত্তাগতভাবে সর্বোচ্চ থাকা” গুণটি প্রমাণিত


তেমনি রয়েছে অসংখ্য সহীহ ও হাসান হাদীস যা কষ্ট ছাড়া গণনা করা যায় না। যেমন, রাসূলের স্বীয় রবের দিকে উত্থিত হওয়ার মি'রাজের কাহিনী, আল্লাহর নিকট থেকে ফিরিশতাদের অবতরণ করা, তাঁর দিকে তাদের আরোহন করা, দিনে- রাতে ফিরিশতাদের পরপর তোমাদের মাঝ থেকে অবস্থানের পর উঠা-নামা করা, যারা তোমাদের সাথে ছিল তারা তোমাদের থেকে বের হয়ে উঠে যাওয়া এবং তাদেরকে আল্লাহর জিজ্ঞাসাবাদ, যদিও তিনি তাদের সম্পর্কে ভালো জানেন, অনুরূপ খারেজীদেরদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহীহ হাদীস:
"তোমরা কি আমাকে আমানতদার মানবে না, অথচ আসমানের উপর যিনি আছেন আমি তাঁর পক্ষ থেকে আমানতদার। আমার কাছে সকাল বিকাল আসমানের খবর আসে?” ঝাড়ফুঁকের হাদীস যেটি আবু দাউদ ও অন্যান্যরা বর্ণনা করেছেন:
"হে আমাদের রব্ব, যিনি আসমানের উপরে রয়েছেন, আল্লাহ! আপনার নাম অতীব পবিত্র, আপনার যাবতীয় নির্দেশ আসমান-যমীনে কার্যকর। আপনার রহমত যেমন আকাশে বিদ্যমান, তেমন যমীনেও রহমত বর্ষণ করুন! আমাদের পাপ ও অপরাধসমূহ ক্ষমা করুন। আপনি পবিত্র বান্দাদের রব, আপনার দয়া থেকে দয়া বর্ষণ করুন এবং এ রোগের জন্য আপনার আরোগ্য ব্যবস্থা থেকে রোগমুক্তি দিন।" রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
"তোমাদের কেউ অসুস্থ হলে বা তার ভাই অসুস্থ হলে সে যেন বলে: হে আমাদের রব্ব আল্লাহ, যিনি আসমানের উপর রয়েছেন......।" এরপর রাসূল তা উল্লেখ করেন। অনুরূপ ইমাম আহমদ, আবু দাউদ ও অন্যান্যদের বর্ণিত (আও'আল বা) শিং বিশিষ্ট পাহাড়ী ছাগল সংক্রান্ত হাদীসে এসেছে:
"আর তার উপরে 'আরশ। আর আল্লাহ 'আরশের উপরে। তিনি তোমাদের অবস্থা জানেন।” আর এ হাদীসটি সুনান গ্রন্থকারগণ বর্ণনা করেছেন, যেমন আবু দাউদ, ইবন মাজাহ, তিরমিযী ও অন্যান্যগণ।
বস্তুত হাদীসটি দু'টি বিখ্যাত ত্বরীকায় বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং কোনো এক ত্বরীকার বর্ণনায় দোষ হওয়ার দ্বারা অপর ত্বরীকায় দোষ আসবে না। কারণ হাদীসটি ইমামুল আয়িম্মাহ ইবন খুযাইমাহ তাঁর কিতাবুত তাওহীদে বর্ণনা করেছেন, যাতে তিনি শর্ত রেখেছিলেন যে, তাতে তিনি কেবল ন্যায়পরায়ণ কর্তৃক ন্যায়পরায়ণের মাধ্যম হয়ে যা বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অকর্তিত সূত্রে এসেছে, তাই কেবল নিয়ে আসবেন।
অন্য হাদীসে তিনি যে ক্রীতদাসীকে বললেন: "আল্লাহ কোথায়? সে বলল: আসমানের উপরে। তিনি বললেন: আমি কে? সে বলল: আপনি আল্লাহর রাসূল। তিনি বললেন: তাকে মুক্ত করে দাও; কেননা সে ঈমানদার।”
"আল্লাহর সকল সৃষ্টিকে সৃষ্টি করে 'আরশের উপরে তার নিকটে একটি কিতাবে লিখে দিলেন: নিশ্চয় আমার রহমত আমার ক্রোধের অগ্রগামী হয়েছে।”
"তাকে নিয়ে আসমানের উপর উঠে যায়, যেখানে আল্লাহ আছেন।”
আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুর কবিতা যেটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীকৃতি দিয়েছিলেন:
"আমি সাক্ষ্য দিলাম যে, আল্লাহর ওয়াদা সত্য এবং জাহান্নাম কাফেরদের আবাসস্থল। নিশ্চয় 'আরশ পানির উপরে, আর 'আরশের উপরে রয়েছেন বিশ্ব জাহানের প্রতিপালক।"
উমাইয়্যাহ ইবন আবিস সালত সে অথবা অন্য কেউ নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে তার কবিতা পাঠ করলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেটাকে উত্তম বলে বললেন: »آمن شعره وكفر قلبه "তার কবিতা ঈমান এনেছে, আর তার অন্তর কুফুরী করেছে।"
"তারা আল্লাহকে মর্যাদা দিয়েছে, আর তিনি মর্যাদার যোগ্য। আমাদের রব্ব আসমানের উপর আছেন, তিনি হচ্ছেন মহান, উঁচু প্রাসাদ নির্মাণের মাধ্যমে, যিনি সকল মানুষের অগ্রবর্তী। তিনি আসমানের উপর বিন্যস্ত করেছেন খাট; দীর্ঘ ও উঁচু, কোনো চোখ তাঁকে দেখতে পায় না। তার নিচে ফিরিশতাগণ মাথা নুইয়ে ঘাড় বাঁকা করে রয়েছেন।"
"নিশ্চয় আল্লাহ চিরঞ্জীব, সম্মানিত, বান্দা যখন দুই হাত তাঁর দিকে উঠায় তখন তিনি তা শূন্য অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন।"
অন্য হাদীসে: "সে তার দুই হাত আসমানের দিকে প্রসারিত করে বলতে থাকে: হে আমার রব্ব, হে আমার রব্ব....।” ইত্যাদি ইত্যাদি যেগুলোর সংখ্যা আল্লাহ ছাড়া গণনা করা যায় না। মুতাওয়াতির পর্যায়ের হাদীস যা দ্বরূরী বা নিশ্চিত জ্ঞানের ফায়দা দেয় যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, নিশ্চয় আল্লাহ 'আরশের উপরে, আর সেটা আসমানের উপরে। আল্লাহ এ স্বভাবের উপরেই আরব-অনারব, মুসলিম-অমুসলিম সকলকে সৃষ্টি করেছেন, তবে শয়তান যদি কাউকে তার স্বভাব থেকে সরিয়ে দেয় সেটা ব্যতিক্রম।

টিকাঃ
৬৪. সহীহ হাদীস বলতে বুঝায়, যে হাদীসের সনদ সংযুক্ত, বর্ণনাকারী ন্যায়পরায়ণ, পূর্ণ ধীশক্তিসম্পন্ন, সনদের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত একই অবস্থায় থাকবে, আর তার সনদ ও মতন শায বা বিরল ও প্রচ্ছন্ন ত্রুটিপূর্ণতা থেকে মুক্ত থাকবে। [তাদরীবুর রাওয়ী (১/৬৩)]
৬৫. হাসান হাদীস বলতে বুঝায়, যে হাদীসের সনদ সংযুক্ত, বর্ণনাকারী ন্যায়পরায়ণ, স্বল্প ধীশক্তিসম্পন্ন, সনদের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত একই অবস্থায় থাকবে, আর তার সনদ ও মতন শায বা বিরল ও প্রচ্ছন্ন ত্রুটিপূর্ণতা থেকে মুক্ত থাকবে। [তাদরীবুর রাওয়ী (১/১৫৯)]
৬৬. বুখারী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ৩৪৯; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ১৬৩; আবু যর রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু বর্ণিত।
৬৭. অনুরূপ হাদীস আমরা দেখি, মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২৬৯০; অনুরূপ, বুখারী, আল- জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ৬৪০৮।
৬৮. বুখারী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ৫৫৫, ৩২২৩, ৭৪২৯, ৭৪৮৬; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ৬৩২; আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু বর্ণিত।
৬৯. খারেজীদের সম্পর্কে জানার জন্য আমার 'ফিরাক বিশ্বকোষ' দেখা যেতে পারে। সাধারণত খারেজী বলতে বুঝায়, যাদের মধ্যে কয়েকটি বিষয়ের সমাহার ঘটে: ১- সকল কবিরা গুনাহের কারণে কাফের বলা। ২- রাষ্ট্র ও সরকারের বিরুদ্ধে কবীরা গোনাহের কারণে বিদ্রোহ করা বা বিদ্রোহের জন্য সর্বদা লেগে থাকা। ৩- বয়সে নবীন ও আক্কল-বুদ্ধিতে কম থাকা। ৪- মুসলিমদের মধ্যে অপব্যাখ্যার আশ্রয় নিয়ে হত্যার নীতি চালু করা। ৫- ফিকহের ক্ষেত্রে দুর্বল থাকা। অর্থাৎ গভীর জ্ঞান না থাকা, ভাসা ভাসা নলেজ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়া। ৬- অপরের ওপর ইসলাম কায়েমের জন্য ব্যস্ত থাকা। ৭- দীনী কর্মকাণ্ডের সময় প্রাধান্য দেয়ার নীতির ব্যাপারে অন্ধ থাকা। ৮- বড় বড় আলেমগণের মতের বিরোধিতা করা ও তাদেরকে খারাপ গুণ যথা মুরজিয়া, দরবারী ইত্যাদি বলা। ৯- নফল কাজের ব্যাপারেও বাড়াবাড়ি করা। ১০- জিহাদের আয়াত ও হাদীসকে নিঃশর্তভাবে বাস্তবায়নের কথা বলা।
৭১. বুখারী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ২৮৯২; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ১০৬৪; আবু সা'ঈদ আল-খুদরী রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুর হাদীস।
৭২. তিনি হচ্ছেন, আবু দাউদ সুলাইমান ইবন আশ'আস ইবন শাদ্দাদ ইবন 'আমর ইবন আমের আল- আযদী আস-সিজিস্তানী। তার কিতাবুস সুনান দ্বারা তিনি সারা দুনিয়ায় বিখ্যাত। জন্ম ২০২ হিজরী, মৃত্যু ২৭৫ হিজরী। তার সম্পর্কে ইমাম যাহাবী বলেন, তিনি সালাফে সালেহীনের মতাদর্শে ছিলেন, সুন্নাহ'র অনুসরণ ও তার প্রতি আত্মসমর্পনে অসাধারণ। কালামশাস্ত্র নিয়ে কথা বলা ত্যাগ করতেন। আবু হাতেম বলেন, 'আবু দাউদ হচ্ছে দুনিয়ার ইমামগণের একজন, যারা ফিকহ, ইলম, হিফয, ইবাদত, পরহেযগারী ও দৃঢ়তার ক্ষেত্রে তিনিই ইমাম। হাদীস একত্রিত করেছেন, গ্রন্থ লিখেছেন এবং সুনান ও হাদীস থেকে প্রতিরোধ করেছেন। দেখুন, ইবন আবি হাতেম, আল-জারহু ওয়াত তা'দীল (৪/১০১); খত্নীবে বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ (৯/৫৫); ইবনু খাল্লিকান, ওফায়াতুল আ'ইয়ান (২/৪০৪); ইমাম যাহাবী, তাযকিরাতুল হুফফায (২/৫৯১); সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৩/২০৩)।
৭২. আবু দাউদ, আস-সুনান, হাদীস নং ৩৮৯২; নাসা'য়ী, আল-কুবরা, হাদীস নং ১০৮৭৪; আমালুল ইয়াওমি ওয়াল লাইলাহ, হাদীস নং ১০৩৭; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হাদীস নং ২৩৯৫৭; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক (১/৪৯৪), (৪/২৪৩)।
৭৩. আবু দাউদ, আস-সুনান, হাদীস নং ৪৭২৩; তিরমিযী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ৩৩২০; ইবন মাজাহ, আস-সুনান, হাদীস নং ১৯৩; আহমাদ, আল-মুসনাদ, হাদীস নং ১৭৭০; ইবন আবী আসেম (১/২৫৪), নং ৫৭৮; ইবন আবী শাইবাহ, আল-আরশ, পৃ. ৫৫; ইবন খুযাইমাহ আত- তাওহীদ (১/৩৩৪); আদ-দারেমী, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যহ, পৃ. ২৪; আজুররী, আশ-শরী'আহ ২৯২; আল-লালেকা'ঈ, শারহু উসুলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাহ (৩/৩৯০), নং ৬৫১; হাকিম, আল- মুস্তাদরাক (২/২৮৭, ৫০০); বাইহাকী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (২/১৪২); আল-উল্কাইলী, আদ- দু'আফা (২/২৮৪); ইবন আব্দিল বার, আত-তামহীদ (৭/১৪০); আবু নু'আইম, আখবারু আসবাহান (২/২); মিযযী, তাহযীবুল কামাল (২/৭১৯); আবুল আলা আল-হামাযানী, যিকরুল ই'তিক্কাদ ও যাম্মুল ইখতিলাক্ব, পৃ. ৬৭-৬৮, নং ১৯; ইবনুল জাওযী, আল-ইলালুল মুতানাহিয়াহ (১/৮); মুনযিরী, মুখতাসারুস সুনান (৭/৯৩)। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ হাদীসটিকে বিস্তারিত গবেষণার পর হাসান বলেছেন। দেখুন, মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/১৩৯, ১৯২)। ইমাম ইবনুল কাইয়্যেমও তার শাইখের অনুসরণ করেছেন।
৭৪. সুনান গ্রন্থকারগণ বলতে ইমাম আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী ও ইবন মাজাহ এর সুন্নাহ গ্রন্থসমূহকে বুঝানো হয়।
৭৫. তিনি হচ্ছেন মুহাম্মাদ ইবন ইয়াযীদ, আবু আব্দুল্লাহ ইবন মাজাহ আল-কাযওয়ীনী। আল-ইমাম, আল-হাফেয। সুনান গ্রন্থকারদের একজন। জন্ম হিজরী ২০৯ সালে এবং মৃত্যু ২৭৩ হিজরী সালে। তার সম্পর্কে যাহাবী বলেন, ইবন মাজাহ ছিলেন হাদীসের শুদ্ধাশুদ্ধির সমালোচক, সত্যবাদী ও প্রশস্ত জ্ঞানের অধিকারী। দেখুন, ইবনু খাল্লিকান, ওফায়াতুল আ'ইয়ান (৪/২৭৯); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (২/৫১); ইবন হাজার, তাহযীবুত তাহযীব (৯/৫৩০); ইবনুল 'ইমাদ, শাযরাতুয যাহাব (২/১)।
৭৬. তিনি হচ্ছেন মুহাম্মাদ ইবন 'ঈসা ইবন সাওরাহ আত-তিরমিযী, ইমাম, হাফেয। তিনি তার আল- জামে'উস সহীহ এর জন্য সমধিক পরিচিত যা সুনান আত-তিরমিযী নামে খ্যাত।
৭৭. তিনি হচ্ছেন, আল-ইমাম, আল-হাফেয, আল-হুজ্জাহ মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক্ক ইবন ইসহাক আবু বকর আস-সুলামী আন-নাইসাপূরী আশ-শাফেয়ী। আহলুস সুন্নাহ'র ইমাম। তার কিতাব আত-তাওহীদ সেটার ওপর প্রমাণবহ। তিনি তার সময়কার মুহাদ্দিসগণ থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন, যেমন আলী ইবন হুজর, আহমাদ ইবন মানী', মুহাম্মাদ ইবন বাশশার প্রমুখ। তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন ইবন হিব্বান, ইবন আদী প্রমুখ। হাফেয আবু আলী আন-নাইসাপূরী বলেন, আমি ইবন খুযাইমার মতো বড় কাউকে দেখিনি। ইমাম যাহাবী তার ওপর টীকা দিয়ে বলেন, তিনি এমন কথা বললেন, অথচ তিনি তো নাসায়ীকেও দেখেছেন (অর্থাৎ তাহলে তিনি নাসায়ী থেকেও উত্তম)। ইমাম দারা কুতনী বলেন, ইবন খুযাইমাহ ইমাম, প্রামাণ্য, তার দৃষ্টান্ত নেই। হাকেম বলেন, ইমামুল আয়িম্মাহ ইবন খুযাইমার ফযীলত আমার কাছে বেশ কিছু কাগজে লেখা আছে। ইবন সুরাইজ বলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস থেকে খুটিয়ে খুটিয়ে নুকতা ও ফায়েদা বের করতেন। তার জন্ম হিজরী ২২৩ সালে। আর মৃত্যু হিজরী ৩১১ সালে। তাঁর গ্রন্থ সংখ্যা ১৪০টির উপরে। তার উপরে রয়েছে মাসায়িল। সেটাও শত খণ্ডে। ইবন খুযাইমার প্রতি মানুষের বড় উঁচু ধারণা সর্বদা ছিল। লোকদের অন্তরে তাঁর সুন্নাতের অনুসরণ, ইলম ও দীনের কারণে সর্বদা সম্মান ও মর্যাদা বহমান। দেখুন, ইমাম যাহাবী, তাযকিরাতুল হুফফায (২/৭২০); আল-ইবার (২/১৪৯); সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৪/৩৬৫); ইবনুল 'ইমাদ, শাযরাতুয যাহাব (২/২৬২)।
৭৮. এটি অনেক মর্যাদাবান একটি গ্রন্থ। ইমামগণ সবাই এ গ্রন্থের প্রশংসা করেছেন। এ কিতাবের পূর্ণনাম 'কিতাবুত তাওহীদ ওয়া ইসবাতু সিফাতির রাব্বি আয্যা ওয়া জাল্লা।
৭৯. ইমাম ইবন খুযাইমাহ এ শর্তটি তাঁর কিতাবুত তাওহীদের শুরুতে (১/১১) উল্লেখ করেছেন। উপরে বর্ণিত হাদীসটি হাদীসুল আও'আল নামে বিখ্যাত।
৮০. মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ৫৩৭; মু'আওয়িয়াহ ইবনুল হিকাম আস-সুলামী বর্ণিত হাদীস।
৮১. বুখারী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ৪৭০৭; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২৭৫১।
৮২. একটি বড় হাদীসের অংশ যা বর্ণনা করেছেন ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৪২৬৩; আহমাদ, হাদীস নং ৮৭৬৯; ত্বাবারী, মুসনাদে 'উমার ইবনুল খাত্তাব (২/৫০৩); সহীহুল জামে'উ, হাদীস নং ১৯৬৮; মুখতাসারুল উলু, পৃ. ৭৫; মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস নং ১৬২৭।
৮৩. উসমান ইবন সা'ঈদ আদ-দারেমী, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ, পৃ. ৫৬, নং ৮২; ইবন আসাকির, তারিখু দামিশক (২৮/১১২, ১১৪); ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১/২৩৮); তাজুদ্দীন আস-সুবুকী, ত্বাবাক্বাতুশ শাফে'ঈয়্যাহ আল-কুবরা (২/২৬৪); ইবন আব্দুল বার, আল-ইস্তী'আব (২/২৮৭); যাহাবী, আল-উলু (১/৪৩৮), নং ৭৪; নাওয়াওয়ী, আল-মাজমূ' (২/১৬৩); ইবন কুদামা, আল-উলু, পৃ. ১৪৫-১৫০; ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুয়ুশ আল-ইসলামিয়‍্যাহ, পৃ. ১২১-১২২; ইবন আবিল ইয্য, শারহুত ত্বাহাওয়িয়্যাহ (২/৩৬৭-৩৬৮); দারা কুতনী, আস-সুনান (১/১২১)।
৮৪. কারণ যা খুব ভারী, তা বহন করতে মাথা বাঁকা করে রাখতে হয়।
৮৫. এগুলো উমাইয়্যাহ ইবন আবিস সালতের কবিতা। তার দিকে অনেকেই সম্পৃক্ত করেছেন। যেমন, তার দিওয়ানে রয়েছে, পৃ. ৩৩-৩৪; ইবন কাসীর, বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (১/১২), (২/২২৯); ইবন মানযূর, তাহযীবে তারীখে দিমাশক (৩/১২৬)। অনুরূপ তা ফাকেহী তার আখবারু মক্কা গ্রন্থে নিয়ে এসেছেন, বর্ণনা নং ১৯৭৩; ইবন আব্দুল বার, আত-তামহীদ (৪/৭); যাহাবী, আল-উলু (১/৪৪৯), নং ৭৬।
৮৬. আবু দাঊদ, আস-সুনান, হাদীস নং ১৪৮৮; তিরমিযী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ৩৫৫৬; ইবন মাজাহ, আস-সুনান, হাদীস নং ৩৮৬৫; ইবন হিব্বান, আস-সহীহ, হাদীস নং ৮৭৬; হান্নাদ ইবনুস সারী, আয-যুহদ ১৩৬১; শিহাব আল-মুসনাদ ১১১১; বাইহাকী, আল-কুবরা (২/২১১); আব্দুর রাযযাক, আল- মুসান্নাফ, হাদীস নং ৩২৫০, ১৯৬৪৮; ত্বাবারানী, আল-আওসাত্ব, হাদীস নং ৪৫৯১; ইবন আবী শাইবাহ, আল-মুসান্নাফ (১০/৩৪০); হাকিম, আল-মুস্তাদরাক (১/৪৯৭); বাগাওয়ী, শারহুস সুন্নাহ (৫/১৮৫), নং ১৩৮৫; ইবন আদী, আল-কামিল (২/৫৯৫); খত্বীব, তারিখু বাগদাদ (৩/২৩৫-২৩৬)। ইবন হাজার বলেন, এর সনদ জাইয়্যেদ। আলবানী বলেন, সহীহ। মুখতাসারুল 'উলু, পৃ. ৯৭০।
৮৭. মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ১০১৫। যদি বিদ'আতীরা বলে, উপরের দিকে হাত উঠানোর কারণ হচ্ছে তা দো'আর জন্য কিবলা নির্ধারণ করা হয়েছে। উত্তর হবে, ১- এটাকে দো'আর জন্য কিবলা হওয়ার জন্য মানুষকে সেদিকে হাত তুলতে হয়, এর সপক্ষে দলীল লাগবে। ২- একথা ইতোপূর্বে কেউ বলেনি। সুতরাং তা বিদ'আতী চিন্তাধারা প্রসূত। যার সপক্ষে সালাফদের কোনো বক্তব্য নেই। ৩- দো'আ ও সালাতের কিবলা একই। আকাশকে দো'আর কিবলা নির্ধারণ করার কোনো দলীল নেই। ৪- কিবলা তো সেটাই যার দিকে কোনো মানুষ মুখ ফিরায়; সেট নয় যেটার দিকে হাত ফিরায়। যদি আসমানই কিবলা হতো তবে দো'আকারীকে আকাশের দিকে তাকিয়ে দোআ করার বিষয়টি অনুমোদিত হয়ে আসত। ৫- হাদীসে হাত উঠানোর সাথে আল্লাহর ফেরৎ না দেয়ার সম্পর্ক তৈরি করা হয়েছে, যা দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যায় যে, মহান আল্লাহ তাঁর 'আরশের উপরে থাকার কারণেই মানুষ সে দিকে দো'আ করে।
৮৮. মুতাওয়াতির এমন হাদীসকে বলা হয়, যা এমন সংখ্যক লোক বর্ণনা করেছেন, যাদের সত্যতার ওপর অত্যাবশ্যকীয় জ্ঞান অর্জিত হয়, সেটা বর্ণনাকারীদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই পর্যায়ে থাকতে হবে। মুতাওয়াতির দু' প্রকার: এক. শব্দগত মুতাওয়াতির; যাতে শব্দ ও অর্থ উভয়টিই নিরবিচ্ছিন্ন সন্দেহহীন। যেমন হাদীস, যে কেউ আমার ওপর মিথ্যারোপ করবে সে যেন তার বাসস্থান জাহান্নামে বানিয়ে নেয়। দুই, অর্থগত মুতাওয়াতির; যা এমন লোকদের মাধ্যমে বর্ণিত হওয়া, যাদের সত্যতার ব্যাপারে জ্ঞান অর্জনে কোনো বাধা আসে না। যেমন দো'আর সময় হাত উঠানো, কবীরা গুনাহকারীদের জন্য রাসূলের সুপারিশ করার বিষয় সংক্রান্ত হাদীসগুলো।
৮৯. কোনো বিষয়ের জ্ঞান কয়েক প্রকার অর্জিত হতে পারে, এক. অত্যাবশ্যকভাবে অর্জিত জ্ঞান: এ রকম জ্ঞানকে অস্বীকার করা যায় না। যেমন দুই চারের অর্ধেক। দুই. চিন্তা-গবেষণা ভিত্তিক জ্ঞান: যেমন, বিদ্যুৎ ও রূহের অস্তিত্বের বিষয়টি।
৯০. এ জন্য ইবন তাইমিয়্যাহ অন্যত্র বর্ণনা করেছেন যে, আশ'আরী মতবাদের প্রাথমিক অনুসারীরা আল্লাহ তা'আলা সবকিছুর উপর থাকার বিষয়টি স্বীকার করতেন, তারা সেটা অস্বীকার করতেন না। কারণ এ জ্ঞান ফিত্বরী জ্ঞান, অত্যাবশ্যক জ্ঞান, বলা মাত্রই বুঝার মত জ্ঞান। [বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়‍্যাহ (৪/৩০০)]
৯১. যারা এ বিষয়টিকে একত্র করেছে, তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন, আমাদের শাইখ, শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ তার এ গ্রন্থে, অনুরূপ ইবনুল কাইয়্যেম তার ইজতিমা'উল জুয়ুশ ও তাহযীবুস সুনান; যাহাবী তার আল-আরবা'ঈন, আল-উলু, আল-আরশ; ইমাম লালেকা'ঈ, শারহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ; ইবন কুদামাহ আল-মাকদেসী, ইসবাতু সিফাতিল উলু; ইবন আব্দুল হাদী আল-মাক্বদেসী, ইসবাতু সিফাতিল ইস্তিওয়া প্রমুখ। বিস্তারিত জানার জন্য আমার "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন" গ্রন্থটি দেখা যেতে পারে।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 যারা আল্লাহ তাআলার সর্বোচ্চ থাকার গুণটি অস্বীকার করে, তাদের সপক্ষে কুরআন, সুন্নাহ কিংবা কোনো একজন সালাফে সালেহের কারো থেকে দলীল পাওয়া যাবে না

📄 যারা আল্লাহ তাআলার সর্বোচ্চ থাকার গুণটি অস্বীকার করে, তাদের সপক্ষে কুরআন, সুন্নাহ কিংবা কোনো একজন সালাফে সালেহের কারো থেকে দলীল পাওয়া যাবে না


এভাবে আল্লাহর কিতাব, তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ, সালাফে সালেহীন তথা সাহাবায়ে কিরাম ও তাদের সুন্দর অনুসারী তাবে'য়ীন, আইম্মায়ে মুজতাহিদীন, যারা মতভেদ ও প্রবৃত্তি অনুসারীদের যুগ পেয়েছে তাদের কারো কাছ থেকে একটি হরফও বর্ণিত হয়নি যা (নস বা যাহের তথা) প্রকাশ্য-পরোক্ষ কোনোভাবেই তার ব্যতিক্রম।
তাদের কেউ কোনো দিন বলেনি, আল্লাহ আসমানের উপর না, বা তিনি 'আরশের উপরে নন, বা তিনি সত্তাগতভাবে সর্বত্র বিরাজমান। এটাও বলেননি যে, সকল স্থান তার জন্য সমান; এটাও বলেননি যে, তিনি বিশ্বের ভেতরেও না বা বাইরেও না, তার সাথে সংযুক্তও না আবার পৃথকও না। এও বলেনি যে, আঙ্গুল ইত্যাদি ইন্দ্রিয় দ্বারা তার প্রতি ইঙ্গিত করা জায়েয নেই।
বরং জাবের রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত আছে যে, তিনি 'আরাফাতের দিন বিশাল জনসমুদ্রের সামনে ভাষণদানকালে বলেছিলেন: "সাবধান আমি কি পৌঁছাতে পেরেছি? তারা বলল: হ্যাঁ। তখন তিনি আকাশের দিকে আঙ্গুল উঁচু করে সেটাকে তাদের প্রতি ঝুঁকিয়ে বললেন: হে আল্লাহ, আপনি সাক্ষী থাকুন।" এটা তিনি কয়েকবার বললেন। অনুরূপ প্রমাণাদি আরও অনেক রয়েছে।

টিকাঃ
৯২. এটি এমন এক প্রমাণ যা শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ তাঁর 'আল-আকীদাতুল ওয়াসেত্বিয়্যাহ' এর মুনাযারায় চ্যালেঞ্জ হিসেবে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। তিনি তাদেরকে বলেছিলেন, 'আমি এখানে যা লিখেছি, তার বিরোধিতাকারীদের সকলকে চ্যালেঞ্জ দিচ্ছি, তিন বছর পর্যন্ত; যদি আমি যা বর্ণনা করেছি তার বিপরীত একটি বক্তব্য কোনো সালাফে সালেহীনের কাছ থেকে আনতে পারে, তবে অবশ্যই আমি আমার বক্তব্য থেকে ফিরে আসব। আর আমার উপরও কর্তব্য থাকলো, আমি যা লিখেছি, তার সপক্ষে প্রথম তিন যুগের সকল গোষ্ঠী থেকে বর্ণনা উপস্থিত করবো যা আমার বর্ণিত বক্তব্যকে সমর্থন করবে, সেসব বর্ণনা আনব হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী, হাম্বলী, আশ'আরী ও আহলুল হাদীস প্রমুখের কাছ থেকে। [মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/১৯৭), (৩/১৬৯)] বরং তিনি আরও বলেন, "যে কেউ সালাফে সালেহীনের কাছ থেকে আমার বর্ণিত আকীদাহ'র বিপরীতে একটি কথা নিয়ে আসবে পারবে, আমি সেটাতে তার অনুসরণ করবো।” [মাজমূ' ফাতাওয়া (৩/২০৬)]
৯৩. যেমনটি বলে থাকে হুলুলী গোষ্ঠী, যারা মনে করে স্রষ্টা সৃষ্টির অভ্যন্তরে প্রবেশ করে আছেন।
৯৪. যেমনটি বলে থাকে সীমালঙ্ঘনকারী মু'আত্বিলা সম্প্রদায়, যারা সৃষ্টিকে স্রষ্টাশূন্য করে থাকে।
৯৫. শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ অন্যত্র বলেন, যারা বলে আল্লাহ তা'আলা জগতের ভিতরেও নন আবার বাইরেও নন, আর যারা বলে, আল্লাহ তা'আলা সর্বত্র বিরাজমান, এ দু'টি বক্তব্যই একই তাক থেকে বের হয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার জন্য উপরে থাকা ও 'আরশের উপরে উঠা অস্বীকার করে কুরআন ও হাদীসে আসা এতদসংক্রান্ত ভাষ্যসমূহকে তা'ত্নীল বা অর্থশূন্য করা। [বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৫/৫১)] তিনি আরও বলেন, 'আল্লাহ তা'আলা সর্বত্র বিরাজমান' এ কথাটি জাহমিয়্যাদের মধ্যে যারা ইবাদতগুজার ও সূফীদের বক্তব্য। আর 'আল্লাহ তা'আলা জগতের বাইরেও নয় ভিতরেও নয়' এ কথাটি জাহমিয়্যাদের মধ্যে যারা কাلامশাস্ত্রে পারদর্শী ও যারা মুনাযারা করতে অভ্যস্ত তাদের বক্তব্য। আর সেজন্যই বলা হয়ে থাকে, 'কালামশাস্ত্রে পারদর্শী জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়ের লোকেরা কিছুরেই ইবাদত করে না, আর সূফীশাস্ত্রে বিশ্বাসী জাহমিয়্যারা সবকিছুর ইবাদত করে'। [মাজমূ' ফাতাওয়া (২/২৯৮)] বরং তিনি আরও বলেছেন, তাদের অনেকের কাছ থেকেই উপরোক্ত দু'টি বক্তব্যই পাওয়া যায়। যখন কারও সাথে মুনাযারা করে তখন পরস্পর বিরোধী উভয় প্রকার অবস্থা থেকে আল্লাহকে মুক্ত করে বলে, তিনি জগতের ভিতরেও নন, জগতের বাইরেও নন। আর যখন ইবাদত করে ও দাসত্ব করতে চায় তখন বলে, তিনি সর্বত্র বিরাজমান, তাঁর থেকে কোনো স্থান মুক্ত নয়, বরং স্পষ্টভাষায় হুলুল বা সর্বত্র সকল সৃষ্টিতে তার প্রবেশ করার কথা বলে থাকে, এমনকি চতুষ্পদ জন্তুর অভ্যন্তরে বলেও মত প্রকাশ করে। বরং আরও অগ্রসর হয়ে ইত্তেহাদ বা সকল কিছুতেই তিনি একাকার হয়ে যাওয়ার কথাও বলে থাকেন, আবার আরও অগ্রসর হয়ে ওয়াহদাতুল ওজুদ বা সর্বেশ্বরবাদের কথাও বলে থাকেন, ফলে তাদের মতে তাঁর অস্তিত্ব তো সকল সৃষ্টির অস্তিত্বই। আলাদা কিছু নয়। (নাউযুবিল্লাহ) [বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/৭); মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/২৭২)] তারপর তিনি এটা সাব্যস্ত করেছেন যে, 'কোনো কিছু জগতের বাইরেও নয়, আবার ভিতরেও নয়' এমন জিনিসের যে অস্তিত্ব নেই তা ফিত্বরী বা স্বভাবজাত ও অত্যাবশ্যক জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। [বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/৩০৭, ৩১২)] দূর্ভাগ্যবশত: পরবর্তী কালামশাস্ত্রবিদ আশ'আরী ও মাতুরিদীদের গ্রন্থেও এ বক্তব্য দেখতে পাওয়া যায়। তিনি আরও বলেন, যারা বলে 'তিনি জগতের ভিতরেও নন, বাইরেও নন' তারা কখনও তাদের মত খণ্ডন করতে পারবে না যারা বলে 'তিনি সর্বত্র বিরাজমান'। কারণ যদি সে এমন কোনো কিছুর অস্তিত্ব সাব্যস্ত করা বৈধ মনে করে যা জগতের ভিতরেও নয়, বাইরেও নয়, যার প্রতি ইঙ্গিত করে দেখানো যায় না, সে এভাবে নেগেটিভ হওয়ার কারণে তাদের কথা অস্বীকার করতে পারবে না, যারা বলে 'তিনি সর্বত্র বিরাজমান'। [দারুউত তা'আরুদ্ব (৬/১৪৪-১৪৫)]
৯৬. ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ অন্যত্র বর্ণনা করেছেন যে, ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে দেখানো দ্বারা চাক্ষুষ বা প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্যভাবে কোনো কিছু অনুভব করাকে বুঝায়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'যখন ঈসা তাদের থেকে কুফরী আঁচ করতে পারল' [সূরা আলে ইমরান: ৫২], অনুরূপ আল্লাহর বাণী, 'আর তাদের পূর্বে আমরা বহু প্রজন্মকে ধ্বংস করেছি, তাদের কারও কোনো কিছুর অনুভব কি আপনি পাচ্ছেন? [সূরা মারইয়াম: ৯৮] আর জানা কথা যে, সকল মানুষকেই আল্লাহ তা'আলা ফিত্বরাত তথা স্বভাবজাত জ্ঞান দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, আর ফিত্বরাত বা স্বভাবজাত জ্ঞানে মানুষ এটা বুঝতে পারে যে, যা কোনোভাবেই অনুভূত হয় না, প্রকাশ্যও না, অপ্রকাশ্যভাবেও না, তার কোনো অস্তিত্ব নেই। [আত-তিস'ঈনিয়্যাহ (১/২৫৮)] তারপর শাইখুল ইসলাম এটা স্পষ্ট করে বলেছেন যে, উপরের দিকে আল্লাহর দিকে দো'আ ও অন্য সময় ইঙ্গিত করে দেখানো সেটা হাত দিয়ে হোক কিংবা ইঙ্গিত দিয়ে হোক, অথবা চোখ দিয়ে হোক বা অন্য কিছু দিয়ে হোক এমন সব ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ইঙ্গিতের অন্তর্ভুক্ত যা নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে মুতাওয়াতির তথা নিরবিচ্ছিন্ন সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত সুন্নাহ'র মাধ্যমে সাব্যস্ত হয়েছে। আর তার ওপর মুসলিম ও অমুসলিম সবার ঐকমত্য লক্ষ্য করা যায়। [বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৪/৪৯৭)] তিনি আরও বলেন, সকল সালাফে সালেহীন ও সিফাত সাব্যস্তকারীগণ এ মত পোষণ করেন যে, আল্লাহ তা'আলাকে দেখা সম্ভব, তাঁর দর্শন হতে পারে, তাঁকে অনুভব করা যেতে পারে। সর্বপ্রথম তাঁকে অনুভব করা যাবে না এটা বলেছিল জাহম ইবন সাফওয়ান, যখন সে বৌদ্ধ মুশরিকদের সাথে মুনাযারা করছিল। [বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৩/৫৬৬)] তিনি আরও বলেন, মহান আল্লাহর দিকে ইঙ্গিত করা তাকে আহ্বান করার পূর্ণতা প্রদান করে। কারণ তা তাঁর 'সামাদ' এর প্রতিফলন, সামাদ অর্থ হচ্ছে, যার কাছে বান্দারা ধাবিত হয়। আর জানা কথা যে, ভিতর, বাহির, অন্তর ও সারা শরীর মহান আল্লাহর উদ্দেশ্য নিবেদিত হওয়া শুধু অন্তর তাঁর দিকে নিবেদিত হওয়া থেকে উত্তম। সুতরাং তাঁর দিকে ইঙ্গিত করে দো'আ করা অবশ্যই তাঁর সামাদ গুণের পূর্ণতাজ্ঞাপক। তাই সামাদ নামটি তা দাবি করে থাকে। সুতরাং তাঁর অস্তিত্ব থাকাই আবশ্যক করে যে, তিনি অবশ্যই পৃথক সত্তা, আর পৃথক সত্তার দিকে ইঙ্গিত হওয়াই স্বাভাবিক চাহিদা। আর তিনি যেহেতু 'সামাদ' উদ্দেশ্য সত্তা সেহেতে তার দাবি হচ্ছে এমন দো'আ করা যাতে তাঁর প্রতি ইঙ্গিত থাকবে। আর তাই তিনি ব্যতীত অন্য কারও দিকে ইঙ্গিত করে দো'আ করা তাঁর সাথে শির্ক করা বলে গণ্য হবে, তাঁর তাওহীদ থেকে তাঁকে বের করে তার সাথে শরীক করা গণ্য হবে। [বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (২/৪৫০)] এভাবে যারা আল্লাহকে জগতের ভিতরেও নয়, বাইরেও নয়, ইঙ্গিতও করা যায় না, এরূপ কথা তাঁর জন্য বলে থাকে তাদের মধ্যকার অধিকাংশ কালামশাস্ত্রবিদদেরকেই দেখা যায় যে, তারা আল্লাহর জন্য ইবাদত করে না, তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করে না, তাঁর অভিমুখী হয় না। বরং তারা যদি সালাতও আদায় করে, সালাত পড়ে অমনোযোগী অন্তর নিয়ে, আর যদি আল্লাহকে ডাকে তো অনিবিষ্ট মনে ডাকে। [বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (৪/৫৫৪)]
৯৭. হাদীসটি জাবের রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু কর্তৃক বর্ণিত বিদায় হজের বর্ণনায় একটি বড় হাদীসের অংশ। দেখুন, সহীহ মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ১২১৮।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 সিফাত অস্বীকারকারীদের কথা সত্য হলে যেসব মারাত্মক প্রশ্ন আপতিত হয়

📄 সিফাত অস্বীকারকারীদের কথা সত্য হলে যেসব মারাত্মক প্রশ্ন আপতিত হয়


সুতরাং কুরআন-সুন্নাহ’র এসব ও অনুরূপ ভাষ্য দ্বারা প্রমাণিত এসব সিফাতগুলোকে অস্বীকার ও নাকচকারীদের কথার মধ্যেই যদি হক বা সত্য থেকে থাকে, যদি কুরআন ও সুন্নাহ থেকে নস বা যাহির ভাষ্য থেকে যা বুঝা যায় তাতে হক্ক না থাকে, তাহলে আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও উম্মতের উত্তম লোকদের জন্য এটা কীভাবে জায়েয হতে পারে যে, তারা সর্বদা সত্যের বিপরীত কথা বলে থাকেন? অতঃপর তারা যা সত্য সঠিক কথা, যা বিশ্বাস করা আবশ্যক, তা তারা স্পষ্ট করে প্রকাশ করলেন না বা তার দিকে পথপ্রদর্শনও করলেন না, নস হিসেবেও নয়, যাহের হিসেবেও নয় (এটা কীভাবে সম্ভব?)।
অবশেষে রোম-পারস্যের জাত ইয়াহূদী-খ্রিস্টানদের বাচ্চা এবং দার্শনিকরা এসে জাতিকে সঠিক আকীদাহ বয়ান করল যে আকীদাহ বিশ্বাস গ্রহণ করা সকলের ওপর আবশ্যক। (এটা কীভাবে সম্ভব?)।
যদি এসব দার্শনিক যা বলে তাই আবশ্যকীয় বিশ্বাসের বিষয় হতো, অথচ তা জানতে তারা কেবল তাদের বুদ্ধি-বিবেকের ওপর নির্ভর করেছে, আর তাদের বিবেকের যুক্তির মাধ্যমে তারা কুরআন-সুন্নাহ'য় নস বা যাহিরভাবে যা কিছু এসেছে তা খণ্ডন করতে সক্ষম হয়ে যায়, তাহলে এ বিচারে তো কুরআন-সুন্নাহ ব্যতীত থাকাই মানুষের জন্য বেশি হিদায়াতের কারণ হতে হয়, কুরআন-সুন্নাহ না থাকলেই তাদের জন্য তা বেশি উপকারী বিবেচিত হতে হয়। বরং কুরআন-সুন্নাহ থাকাটাই তো তখন দীনের মূল বিষয়ের জন্য নিছক ক্ষতিকর সাব্যস্ত হতে হয়ে।

টিকাঃ
৯৮. কারণ কুরআন-সুন্নাহ’য় ও সাহাবায়ে কিরামের বক্তব্যে অনবরত এসব গুণ সাব্যস্ত করা হয়েছে। কুরআনের ভাষ্য, হাদীসের বক্তব্য, সাহাবায়ে কিরাম কি তাহলে সত্যের বিপরীতে কথা বললেন?
৯৯. আর যেহেতু এটি একটি স্পষ্ট মিথ্যা ও অসত্য বিষয় তাই এসব কাফের, দার্শনিক, কালামশাস্ত্রবিদদের বাচ্চাদের দেয়া আকীদাহ-বিশ্বাস আবশ্যক বিষয় হতে পারে না। সুতরাং কুরআন ও সুন্নাহ ও সালাফে সালেহীনের কথাকেই প্রাধান্য দিতে হবে। তাই হিদায়াত নিতে হবে কুরআন ও সুন্নাহ'র নস বা যাহির ভাষ্য থেকেই। কারণ আল্লাহ তা'আলা কুরআন ও সুন্নাহকে দিয়েছেন আমাদের হিদায়াত ও উপকারের জন্য। এসব কাلامশাস্ত্রবিদদের বক্তব্য ইসলামে আগমনের পূর্বে কুরআন ও সুন্নাহ ইসলামের অনুসারীদেরকে হিদায়াত প্রদান করেছে। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ'র বক্তব্যের সারকথা হচ্ছে, যদি কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফে সালেহীনের বক্তব্যে সাব্যস্ত করা আল্লাহর নাম ও গুণকে সাব্যস্ত না করা এবং বিকৃত করার জন্য আসা কাফের পারস্য, রোমের অনুসারীদের বক্তব্য, ইয়াহুদী, নাসারাদের মতবাদ, দার্শনিক ও কালামশাস্ত্রবিদদের মতামতকে প্রাধান্য দিতে হয়, তাদের কথাকেই চূড়ান্ত সত্য বলতে হয়, তাহলে মানুষদেরকে কুরআন, সুন্নাহ ব্যতীত ছাড়াই বেশি হিদায়াত ও তাদের উপকার প্রদানের জন্য অধিক উত্তম হতো। এর দ্বারা তো মনে হচ্ছে যে, রাসূলই তাদের জন্য পথভ্রষ্টতার যাবতীয় কারণ প্রতিষ্ঠা করলেন! নাউযুবিল্যাহ। তাদের অনেকেই মনে করে থাকে, আল্লাহর কাلام ও রাসূলের বাণী মানুষদেরকে পথভ্রষ্ট করে দিয়েছে অথবা তাদের বিবেক ও দীন নষ্ট করে দিয়েছে, তাদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর ঈমানের ব্যাপারে হক্কের বিপরীত বিশ্বাস গ্রহণ করতে বাধ্য করেছে অথবা তাদেরকে হক্কের ব্যাপারে সন্দেহ ও সংশয়ে নিপতিত করেছে অথবা তাদেরকে ভীষণ সমস্যার বেড়াজালে নিক্ষেপ করছে; কারণ যখন তারা হক্ক জানতে বিবেক খরচ করেছে তখন এসব কুরআন ও সুন্নাহ'র ভাষ্যকে ভিন্ন অর্থে প্রবাহিত করা, মানুষদেরকে এসব ভাষ্যের দাবি ও চাহিদা থেকে অন্য দিকে ফেরানো, যারা তাদের দেয়া মতবাদ মেনে নেয় না, নবী-রাসূলদের অনুসারী বিশাল জনগোষ্ঠী যখন তাদের সাথে শত্রুতা করে, তাদেরকে দমন করা ইত্যাদির ক্ষেত্রে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। [নাউযুবিল্লাহ] শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়‍্যাহ আরও বলেন, আল্লাহর সিফাত অস্বীকারকারী অধিকাংশ জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়ের লোক বলে থাকে, কুরআন ও সুন্নাহ'য় আসা সিফাত সাব্যস্তকারী ভাষ্যসমূহ ও অনুরূপ আখেরাত কেন্দ্রিক ভাষ্যসমূহ, যেগুলোকে তারা মুশকিল ও মুতাশাবিহ নাম দিয়ে থাকে। সেগুলো অবতরণ করার উপকারিতা হচ্ছে, এগুলো নিয়ে আলেমগণ ইজতিহাদ করে সেগুলোকে তার বাহ্যিক অর্থ ও স্পষ্ট চাহিদা থেকে অন্য খাতে প্রবাহিত করা। যার মাধ্যমে আত্মা ইজতিহাদের কষ্ট অনুভব করবে, চিন্তাজগত উন্মোচিত হবে, আর এর বিপরীতে যে হক্ক আছে তা লাভ করার জন্য যৌক্তিক দলীল-প্রমাণাদি প্রস্তুত করা সম্ভব হবে। তাই তাদের নিকট প্রকৃত অবস্থা হচ্ছে, রাসূলগণ সৃষ্টিকূলকে এমনসব জিনিস জানিয়েছেন যাতে হক্ক স্পষ্ট হবে না, ইলম অর্জিত হবে না, হিদায়াত বুঝা যাবে না। বরং এর দ্বারা কেবল বাতিলই প্রমাণিত হবে, এর দ্বারা শুধু পথভ্রষ্টতাই বুঝা যাবে; যাতে করে রাসূলের বক্তব্য দ্বারা সৃষ্টিকুলের উপকৃত হওয়া নিবদ্ধ থাকবে রাসূল যা প্রকাশ করেছেন, যা সৃষ্টিকুলকে বুঝিয়েছেন, তা খণ্ডন করতে প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। আর এ কারণে তারা এমন সব গবেষণায় আত্মনিয়োগ করবে যার মাধ্যমে হক চিনতে পারবে, কেননা রাসূল তাদের জন্য হক্ক জানার ক্ষেত্রে কোনো প্রমাণই প্রতিষ্ঠা করেননি, অনুরূপ রাসূল তাঁর বাণীতে সে হক্ক চেনার জন্য সামান্যতম কিছুই স্পষ্ট করে বর্ণনা করেননি। [দারউত তা'আরুদ্ব (৫/৩৬৫-৩৬৬)] তাদের কথার আরো দাবি হচ্ছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা কিছু বলেছেন তা দ্বারা কেবল তাদেরকে পথভ্রষ্টতার দিকেই ঠেলে দেয়াই উদ্দেশ্য ছিল। হিদায়াত তো তারা কেবল তাদের বিবেকের যুক্তির মাধ্যমেই অর্জন করবে। যার অনিবার্য ফল হচ্ছে, রাসূল তাদের জন্য পথভ্রষ্টতার পথ রচনা করেছেন, হিদায়াতের কিছুই তাদের জন্য প্রতিষ্ঠা করেননি। তাদের হিদায়াতের বিষয়টি তাদের নিজেদের দিকেই ন্যস্ত করে দিয়েছেন। তাদের বক্তব্যের স্পষ্ট দাবি হচ্ছে, লোকদেরকে জাহেলিয়াতের অন্ধকারে ছেড়ে দেয়াই উত্তম ছিল এ রিসালাত থেকে; কারণ এ রিসালাত তাদের কোনো কাজে আসেনি, বরং তাদের ক্ষতি করেছে। [আল-কায়েদাতুল মারাকিশিয়‍্যাহ, পৃ. ৫১]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00