📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 যারা খালাফ বা পরবর্তীদের পদ্ধতিকে সালাফ তথা পূর্ববর্তীদের পদ্ধতির ওপর প্রাধান্য দেয় তাদের ভুলের মূল উৎস

📄 যারা খালাফ বা পরবর্তীদের পদ্ধতিকে সালাফ তথা পূর্ববর্তীদের পদ্ধতির ওপর প্রাধান্য দেয় তাদের ভুলের মূল উৎস


কেননা এসব বিদ'আতী যারা খালাফ তথা পরবর্তী লোক (দার্শনিক ও কালামশাস্ত্রবিদ) ও তাদের পদাঙ্ক অনুসারীদের পদ্ধতিকে সালাফ তথা পূর্ববর্তীদের তরীকার ওপর প্রাধান্য দেয়, এ ভুলটি তাদের ওপর এভাবে এসেছে যে, তারা ধারণা করে: পূর্ববর্তী সালাফগণের তরীকা হচ্ছে নিছক কুরআন ও হাদীসের শব্দাবলির প্রতি ঈমান। (তাদের ধারণা অনুযায়ী) পূর্ববর্তী সালাফগণ কুরআন ও সুন্নাহ'র শব্দ পড়তো কিন্তু এগুলোর কোনো বুঝ-জ্ঞান তাদের ছিল না। (এদের মতানুযায়ী) পূর্ববর্তী সালাফগণ ছিলেন ঐসব উম্মী বা নিরক্ষর লোকদের অবস্থানে যাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন:
﴿وَمِنْهُمْ أُمِّيُّونَ لَا يَعْلَمُونَ الْكِتَابَ إِلَّا أَمَانِيَّ) [البقرة: ٧٨] "আর তাদের মধ্যে এমন কিছু নিরক্ষর লোক আছে যারা শুধু উচ্চারণ করে পড়া ছাড়া কিতাব সম্পর্কে কিছুই জানে না।” [সূরা আল-বাকারাহ: ৭৮] আর পরবর্তী খালাফদের পদ্ধতি হচ্ছে: কুরআন ও হাদীসের ভাষ্যের এমন কিছু অর্থ ও উদ্দেশ্য খুঁজে বের করা; যেগুলো স্বীয় হাকীকত বর্জিত হয়ে বিভিন্ন রূপকার্থে ও দুষ্প্রাপ্য অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

টিকাঃ
২৭. শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ তাদের এসব মিথ্যা দাবিকে ছয়টি প্রমাণ দিয়ে খণ্ডন করেছেন। দেখুন, [মাজমু' ফাতাওয়া (৫/১৫৬-১৬৩)]
২৮. নিঃসন্দেহে তাদের এ ধারণা উম্মতের সালাফে সালেহীন তথা সাহাবায়ে কিরামের ওপর মিথ্যা ও অপবাদ। ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, "সাহাবায়ে কিরাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কুরআনের শব্দ ও অর্থ উভয়টিই গ্রহণ করেছেন। বরং তারা শব্দের চেয়েও অর্থের প্রতি বেশি গুরুত্ব প্রদান করতেন। তারা আগে অর্থ গ্রহণ করতেন তারপর শব্দ...।” [মুখতাসারুস সাওয়া'য়িক (২/৩৩৯)]
২৯. কুরআন ও সুন্নাহ'র ভাষ্যকে রূপক অর্থে ব্যবহার করা যাবে কি না তা নির্ভর করছে রূপকের আশ্রয় নেয়ার কারণ উদ্ঘাটনের মাঝেই। যারা আল্লাহর নাম ও গুণের অর্থ করতে গিয়ে সমস্যা অনুভব করেছে, যারা মনে করেছে প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করলে তো সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য হওয়া আবশ্যক করে তাই এ সাদৃশ্য থেকে বাঁচার জন্য রূপক অর্থের দিকে ধাবিত হয়েছে। বস্তুত আল্লাহর নাম ও গুণ সাব্যস্ত করতে গেলে তাতে সাদৃশ্য এসে যায় এ দাবিটি অসত্য। এটা তাদের স্বল্প বুঝ ও অপরিপক্ক যুক্তির কারণেই হচ্ছে। কারণ স্রষ্টার অস্তিত্ব ও সৃষ্টির অস্তিত্ব সাব্যস্ত করতে যেমন উভয়ের সাদৃশ্য হওয়া জরুরী হয় না, তেমনি স্রষ্টার নাম ও গুণ সাব্যস্ত করতে গেলেও তাতে সৃষ্টির অনুরূপ হওয়া জরুরী হয় না। কারণ সত্তা অনুযায়ী তার নাম ও গুণ হয়ে থাকে। সুতরাং যদি বলা হয়, এসব নাম ও গুণ স্রষ্টার জন্য যেভাবে উপযোগী সেভাবে সাব্যস্ত করা হবে তাহলে আর সমস্যা থাকে না। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ'র "আর-রিসালাহ আত-তাদমুরিয়‍্যাহ" দেখা যেতে পারে।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 কালামশাস্ত্রবিদরা অজ্ঞতা ও মিথ্যাকে একসাথে করেছে

📄 কালামশাস্ত্রবিদরা অজ্ঞতা ও মিথ্যাকে একসাথে করেছে


এই বিনষ্ট ধারণা তাদেরকে উক্ত বক্তব্য দানে বাধ্য করেছে যার সারকথা হচ্ছে, ইসলামকে পিছনে ছুড়ে ফেলা। তারা পূর্ববর্তী সালাফদের পদ্ধতির ওপর মিথ্যারোপ করেছে আর পরবর্তী খালাফদের পদ্ধতি সঠিক বলার মাধ্যমে পথভ্রষ্টতাকে গ্রহণ করে নিয়েছে। এভাবে তারা সালাফদের পদ্ধতির ব্যাপারে তাদের ওপর মিথ্যারোপ করার মাধ্যমে অজ্ঞতার পরিচয় প্রদান করেছে আর পরবর্তী খালাফদের পদ্ধতিকে সঠিক বলার মাধ্যমে অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তিকে একত্রিত করেছে।
এর কারণ, তারা বিশ্বাস করে যে, মূলত কুরআন ও সুন্নাহ'র এসব নস বা ভাষ্য কোনো সিফাতের ওপর প্রমাণবহ নয়; কেননা তারা এসব ক্ষেত্রে ঐ খারাপ সন্দেহের মধ্যে নিপতিত যাতে তারা স্বীয় কাফের ভ্রাতৃবর্গের সাথে একাত্ম হয়েছে। যখন তারা মূলতই সিফাতগুলো নাকচ হওয়ায় বিশ্বাসী হলো, আবার এসব নস বা ভাষ্যের অবশ্যই কোনো একটি অর্থ করতে হয়, তখন তারা দুটো অবস্থার মধ্যে দ্বিধাযুক্ত রয়ে গেল। প্রথমত: শব্দের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন এবং অর্থকে (আল্লাহর কাছে) সোপর্দ করা। যার নাম দিয়েছে তারা পূর্ববর্তীদের তরীকা। দ্বিতীয়ত: শব্দকে কৃত্রিমতা অবলম্বন করে বিভিন্ন অর্থের দিকে সরিয়ে দেয়া, যাকে তারা নাম দিয়েছে পরবর্তীদের তরীকা। ফলে এই বাতিল চিন্তাটি (উপরোক্ত দু'টি পদ্ধতি) বিনষ্ট যুক্তি (আক্কল) এবং কুরআন-হাদীসের শব্দ (যাকে পরিভাষায় সাম' বলা হয়) এর সাথে কুফরীর সমন্বয়ে জন্মলাভ করলো। কেননা আল্লাহর সিফাত নাকচ করার ক্ষেত্রে তারা কতিপয় বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়ের ওপর নির্ভর করেছে। যেগুলোকে তারা ধারণা করেছে স্পষ্ট প্রমাণ অথচ তা কতিপয় সংশয়-সন্দেহ ছাড়া কিছুই নয়। আর কুরআন-হাদীসের শব্দ তথা সাম'ঈ বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে তারা সেসব কথাকে তার স্থান থেকে সরিয়ে বিকৃত করে দিয়েছে।
সুতরাং তাদের বিষয়টি যখন এই দুটি কুফরী মুকাদ্দিমাহ বা ভূমিকার ওপর নির্ভরশীল, তখন তার (দু'টি) মারাত্মক সর্বনাশা নতীজা বা ফলাফল বের হলো:
এক. প্রথম যুগের অগ্রবর্তীদেরকে (সালাফদেরকে) মূর্খ মনে করা, তাদের বোকা মনে করা এবং এ বিশ্বাস করা যে, তারা ছিলেন সাধারণ (আম) নেককারদের মধ্যকার নিরক্ষর সম্প্রদায়। আল্লাহ সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞানের সাগরে ডুবতে পারেনি এবং ঐশ্বরিক জ্ঞানের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয় বুঝতে পারেনি। [নাউযুবিল্লাহ]

টিকাঃ
৩০. অর্থাৎ যেভাবে কাফের ও মুশরিক সম্প্রদায় মনে করে যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের এসব বাণীতে আল্লাহর গুণাবিল ও কর্ম সংক্রান্ত কোনো কিছু নেই। পরবর্তী লোকগুলোও এসব আয়াতকে আল্লাহর নাম, গুণ ও কর্ম সাব্যস্ত করে বলে মনে করছে না। তবে যেহেতু এ আয়াত ও হাদীসসমূহকে কেউ ভুল বুঝে আল্লাহর গুণাবলি সাব্যস্ত করতে পারে, তাই তারা সেগুলোর দূরবর্তী অর্থ করে সেগুলোকে তার আসল অর্থ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে হবে এমন কাজ আরম্ভ করলো। এটাই তাদের তথাকথিত তা'ওয়ীল।
৩১. দু'টি মিথ্যা ও কুফরী মুকাদ্দিমা হচ্ছে, এক. সালাফগণের নীতি ছিল, শুধু কুরআন ও সুন্নাহ'র শব্দের ওপর ঈমান আনা, তারা অর্থ বুঝতো না, তারা নিরক্ষর লোকদের মতো ছিল। আর তা নিরাপদ নীতি। দুই. খালাফদের নীতি হচ্ছে, কুরআন ও সুন্নাহ'র এসব ভাষ্যের বাহ্যিক অর্থ থেকে ফিরিয়ে বিভিন্ন প্রকার রূপক ও বিরল অর্থ খুঁজে বের করার ব্যবস্থা করা। আর তা হচ্ছে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার নীতি।
৩২. মুকাদ্দিমা ও নতীজা এ দু'টি মানতিক শাস্ত্রের পরিভাষা। তবে সাধারণত তা বুঝার জন্য যে উদাহরণটি পেশ করা হয় তা হচ্ছে, কেউ বললো, পৃথিবী ধ্বংসশীল এটা প্রমাণ কর। তখন অপরজন দু'টি মুকাদ্দিমা এনে এর ফল হিসেবে তা প্রমাণ করতে চেষ্টা করে থাকেন, যেমন: পৃথিবী পরিবর্তনশীল, আর যা পরিবর্তনশীল তা ধ্বংসশীল, সুতরাং পৃথিবী ধ্বংসশীল। মনে রাখতে হবে, ফলাফল তখনই বিশুদ্ধ হবে যখন মুকাদ্দিমা বা ভূমিকার বক্তব্য পুরোপুরি সত্য হবে। উপরে [মতন] এ বর্ণিত কালামশাস্ত্রবিদদের নীতিতে দু'টি মুকাদ্দিমাই ভুল, অজ্ঞতাপূর্ণ ও মিথ্যা ছিল। শাইখুল ইসলাম পরবর্তীতে তা খণ্ডন করেন।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 খালাফ মূলত কারা?

📄 খালাফ মূলত কারা?


বিশেষ করে খালাফ বলে নিছক এক শ্রেণির কালামশাস্ত্রবিদদের বুঝানো হয়ে থাকে। [তারা কীভাবে পূর্ববর্তীদের থেকে বেশি জানবে?] [কালামশাস্ত্রবিদদের অন্যতম গুণ হচ্ছে অস্থিরতা ও সন্দেহে নিপতিত থাকা] দীনের ক্ষেত্রে যাদের অস্থিরতাই বেশি, আল্লাহ সম্পর্কে যাদের জ্ঞান অনেক পুরু পর্দার আবরণে ঢাকা, আর যাদের পদচারণার শেষ জায়গা এবং তাদের সর্বশেষ পরিণতি সম্পর্কে অবগত জনৈক পণ্ডিত বলেন: [মুহাম্মাদ ইবন আবিল কাসিম আব্দুল কারীম আশ-শাহরাস্তানী(র স্বীকৃতি)]
"আমার জীবন, আমি সকল শিক্ষালয় প্রদক্ষিণ করেছি এবং আমার দৃষ্টি চালিয়েছি ঐসব জ্ঞানকেন্দ্রের মাঝে।
আমি তো দেখতে পেয়েছি কেবল তাদেরকে থুতনীর নিচে হাত রেখে পেরেশান হয়ে থাকতে অথবা অনুশোচনাকারীর ন্যায় দাঁত কাটতে।"
আর তারাই স্বীয় কিতাবসমূহে এসবের বর্ণনা দিয়েছে, নিজেদের ওপর স্বীকৃতি দিয়েছে অন্যের কবিতাকে উদাহরণরূপে পেশ করে অথবা নিজে সেগুলো রচনা করে, যেমন তাদের এক শীর্ষ নেতার বক্তব্য: [ইমাম রাযীর স্বীকৃতি]
"সকল বুদ্ধির সর্বশেষ পদক্ষেপ শৃঙ্খল বেষ্টিত আর জগদ্বাসীর অধিকাংশ প্রচেষ্টা ভ্রান্ত পথে পরিচালিত।
আমাদের আত্মাসমূহ আমাদের দেহের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ, আমাদের দুনিয়ার শেষ পরিণতি কষ্ট ও বিপদে পরিবেষ্টিত।
আমাদের সারা জীবনের গবেষণা থেকে কেবল এ উপকার-ই পেয়েছি যে, এ ক্ষেত্রে শুধু বলা হয়েছে ও বলা হলো, এসবই আমরা একত্রিত করেছি।"
অবশ্যই আমি কালামপদ্ধতি এবং দার্শনিকপন্থা নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করেছি; কিন্তু যা পেয়েছি তা হচ্ছে এটি কোনো অসুস্থকে সুস্থ করতে পারে না এবং কোনো পিপাসার্তের পিপাসাও নিবারণ করতে পারে না। আর আমি কুরআনের তরীকাকে সবচেয়ে নিকটবর্তী তরীকা হিসেবে দেখেছি। ইসবাতের (সাব্যস্তকরণের) ক্ষেত্রে আমি পড়ি:
"রহমান 'আরশের উপরে উঠেছেন।” [সূরা ত্বা-হা: ০৫]
"তার দিকে ভালো কথা উত্থিত হয়" [সূরা ফাতির: ১০] নফীর (নাকচকরণ) ক্ষেত্রে আমি পড়ি:
"তাঁর মতো কিছুই নেই।” [সূরা আশ-শূরা: ১১]
"তারা জ্ঞান দ্বারা তাঁকে বেষ্টন করতে পারে না।" [সূরা ত্বা-হা: ১১০] আমার মতো জ্ঞান অভিজ্ঞতা যারা অর্জন করে তারা আমার মতো জানতে পারবে।
[ইমামুল হারামাইন আল-জুওয়াইনীর স্বীকৃতি] তাদের (দার্শনিক) অন্য একজন বলেছেন: "আমি তো বিশাল সাগরে ডুব দিয়েছিলাম। আর আমি ইসলামপন্থী ও তাদের জ্ঞানকে ছেড়ে দিয়েছিলাম। আর তারা যেটা আমাকে নিষেধ করেছিল তাতে লিপ্ত হয়েছিলাম। আর এখন আমাকে যদি আমার রব স্বীয় রহমত দ্বারা প্রতিকার না করেন তাহলে দুর্ভোগ অমুকের জন্য), আর আমিতো মারা যাব আমার মায়ের বিশ্বাসের ওপর।"
[ইমাম গাযালী বক্তব্য] তাদের আরেকজন বলেছেন: "মৃত্যুর মুহূর্তে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সন্দেহে থাকে কালামশাস্ত্রবিদগণ।"
[খালাফ তথা পরবর্তী লোকেরা সালাফ তথা সাহাবী ও তাদের সুন্দর অনুসারীদের থেকে বেশি জানা অসম্ভব] অতঃপর সালাফদের বিরোধী এসব কালামশাস্ত্রবিদদের বিষয়টি যখন নিশ্চিতভাবে পরীক্ষা করা হবে, তখন দেখা যাবে যে, তাদের নিকট আল্লাহ সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান এবং নির্ভেজাল মা'রেফাতের ভালো কিছু নেই। আর না তারা আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান ও মা'রেফাতের ছিটে ফোটার অধিকারী হতে পেরেছে। তাহলে কীভাবে এসব পর্দাগ্রস্ত নীচু পশ্চাদপদ হতাশাগ্রস্ত দুর্বলেরা আল্লাহ এবং তাঁর নামসমূহের ব্যাপারে অধিক জ্ঞানবান হতে পারে? কীভাবে তারা আল্লাহর সত্তা ও তাঁর আয়াতসমূহের ক্ষেত্রে তাদের থেকে অধিক মজবুত হবে যারা প্রথম যুগের অগ্রবর্তী মুহাজির ও আনসার এবং যারা সুন্দরভাবে তাদেরকে অনুসরণ করেছেন? যারা ছিলেন নবীদের উত্তরাধিকারী, রাসূলগণের খলীফা, হিদায়াতের তারকা, অন্ধকারের প্রদীপ। যাদের দ্বারা আল্লাহর কিতাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং কিতাবের মাধ্যমে তারাও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিতাব তাদেরকে নিয়ে কথা বলেছে এবং তারা কিতাব দ্বারা কথা বলেছেন। যাদেরকে আল্লাহ এমন জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দান করেছিলেন যার মাধ্যমে তারা সকল নবীদের অনুসারীদের ওপর খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ঐসকল জাতির ওপর শ্রেষ্ঠত্বের বিষয় তো আরও সুস্পষ্ট, যাদের কোনো কিতাব-ই নেই। আর তারা জ্ঞানের হাকীকত ও হাকীকতের গোপন বিষয় এতটা আয়ত্ত্ব করেছিলেন যে, যদি তুমি তার সাথে অন্যদের প্রজ্ঞা একত্রিত কর, তাহলে যে মোকাবেলা করতে চায় সে লজ্জিত হবে।
অতঃপর জাতির সর্বাপেক্ষা উত্তম প্রজন্ম (সালাফগণ) কীভাবে জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় ঐসব তুচ্ছ (খালাফ) দের থেকে বেশি ঘাটতিযুক্ত হতে পারে? বিশেষ করে আল্লাহ, তাঁর নাম ও আয়াতের বিধানের ব্যাপারে ঐসব তুচ্ছদের ক্ষেত্রে সালাফগণের দিক থেকে? আর কীভাবেই বা সেসব দার্শনিকদের বাচ্চারা, ভারত ও গ্রীকা এর অনুসারীরা, অগ্নি উপাসক ও মুশরিকদের উত্তরাধিকারীরা, ইয়াহূদী খ্রিস্টানা সাবেয়ী সম্প্রদায়ের বিভ্রান্তরা এবং তাদের সমজাতীয় ও সমগোত্রীয়রা আল্লাহ সম্পর্কে নবীদের ওয়ারিশ কুরআনের অনুসারী ও ঈমানদারদের থেকে বেশি জ্ঞানী হতে পারে?

টিকাঃ
৩৩. তিনি হচ্ছেন আবুল ফাতহ মুহাম্মাদ ইবন আবুল কাসিম আব্দুল কারীম আশ-শাহরাস্তানী। জন্ম ৪৭৯ হিজরী, মৃত্যু ৫৪৮ হিজরী। দার্শনিক, কালামশাস্ত্রবিদদের ইমাম, তুলানমূলক ধর্মের পথিকৃত ও দার্শনিকদের পথের পথিক, তাকে আল-আফদ্বাল লক্কব দেয়া হয়। জন্ম হয়েছিল শাহরাস্তানে, যা নাইসাপুর ও খাওয়ারিযম এর মাঝখানের একটি জায়গার নাম। তারপর ৫১০ হিজরীতে বাগদাদ গমন করেন, সেখানে তিন বছর অবস্থান করে নিজ দেশে ফিরে যান এবং সেখানেই মারা যান। তার রচিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, আল-মিলাল ওয়ান নিহাল, নিহায়াতুল ইক্কদাম ফী ইলমিল কালাম, আল-ইরশাদ ইলা আকায়িদিল ইবাদ প্রমুখ। [যিরিকলী, আল-আ'লাম (৬/২১৫)]
৩৪. ইবন তাইমিয়‍্যাহ রাহিমাহুল্লাহ কবিতাদ্বয়ের ব্যাখ্যায় বলেন, সকল দুনিয়া ঘুরে সে সবশেষে দু'দল লোককে দেখেছে, একদল শুধু সন্দেহে দোদুল্যমান, আরেকদল একটি বিশ্বাস করে আবার পরক্ষণেই সেটার ভুল দেখা দেয়ায় লজ্জিত হয়ে পড়ে। প্রথম দলটিকে জাহেলে বাসীত (সাধারণ মূর্খ), আর দ্বিতীয় দলটি জাহেল মুরাক্কাব (গণ্ড মূর্খ) বলা যায়। [মিনহাজুস সুন্নাহ (৫/২৭০)]
৩৫. এটি শাহরাস্তানী নিয়ে এসেছেন। দেখুন তার গ্রন্থ, আল-মিলাল ওয়ান নিহাল (১/১৭৩)। তিনি একজন বড় মাপের কালামশাস্ত্রবিদ ছিলেন। নিজে সারা জীবন যার পিছনে ছুটেছেন শেষ জীবনে সেটার অসারতা তুলে ধরেছেন। তার ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ'র গ্রন্থ মিনহাজুস সুন্নাহ (৫/২৬৯); দারউত তা'আরুদ্ব (১/১৫৯), (২/৩১৫), (৫/১৭৯), (৭/৪০৩); মাজমূ' ফাতাওয়া (১২/৫৭২), (৩৩/১৭২)। এ দু'টি কবিতা শাহরাস্তানী আনয়ন করলেও এর প্রবক্তা সম্পর্কে কয়েকটি মত দেখা যায়: কারও কারও মতে, তা আবু বকর মুহাম্মাদ ইবন বাজাহ এর বক্তব্য। কারও কারও মতে, তা শাহরাস্তানীর বক্তব্যই। যেমনটি ইবন আবিল ইয্য আল-হানাফী তার শারহুত ত্বাহাওয়িয়্যাহ গ্রন্থে বলেছেন। [শারহুত ত্বহাওয়িয়্যাহ (১/২৪৪)] কারও কারও মতে, তা আবু আলী ইবন সীনার বক্তব্য। [ত্বাশ কুবরী যাদাহ, মিফতাহু দারিস সা'আদাহ (১/২৯৯)] আরও দেখা যেতে পারে, ইবনু খাল্লিকান, ওফায়াতুল আ'ইয়ান (৪/২৭৪); ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউত তা'আরুদ্ব (১/১৫৯); মিনহাজুস সুন্নাহ (৫/২৭১); মাজমু' ফাতাওয়া (৪/৭৩)।
৩৬. তিনি হচ্ছেন, মুহাম্মাদ ইবন 'উমার ইবন হাসান ইবনুল হুসাইন, আত-তাইমী, আল-বিকরী। আবু আব্দুল্লাহ, ফখরুদ্দীন আর-রাযী। জন্ম ৫৪৪ হিজরী, মৃত্যু ৬০৬ হিজরী। তাকে বলা হয় ইমাম, মুফাসসির, আক্বলী ও নকলী বিষয়ে তার সময়কার একক ব্যক্তিত্ব। বংশের দিক থেকে কুরাশী, মূল অবস্থান ত্বাবারিস্তানে, তার জন্ম হয়েছিল রাই শহরে, রাই শহরের সাথে সম্পৃক্ততার কারণে তাকে রাযী বলা হয়। তাকে 'ইবন খতীব আর-রাই'ও বলা হয়। হিরাতে তার মৃত্যু হয়। তার জীবদ্দশাতেই লোকেরা তার গ্রন্থ পড়ার জন্য আগ্রহী ছিল। অনেক গ্রন্থ তিনি রচনা করেছেন, যেমন, তাফসীর মাফাতীহ আল-গাইব, মা'আলিম ফী উসূলিদ দীন, মুহাসসালু আফকারিল মুতাকাদ্দিমীন, ওয়াল মুতাআখখেরীন মিনাল উলামায়ি ওয়াল হুকামায়ি ওয়াল মুতাকাল্লিমীন, আসাসুত তাক্বদীস, আল-মাত্বালিব আল-আলীয়া, আল-মাহসূল ফী ইলমিল উসূল, আস-সিররুল মাকতূম ফী মুখাত্বাবাতিন নজুম প্রভৃতি। ইমাম যাহাবী তার সম্পর্কে বলেন, তার গ্রন্থসমূহে ব্যাপক বালা-মুসিবত রয়েছে, জাদুবিদ্যা, সুন্নাহ'র বিরোধিতা রয়েছে। আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন; কারণ তিনি ভালো হয়ে মারা গিয়েছিলেন। গোপন বিষয়টি আল্লাহর হাতে সোপর্দ করলাম। মাযহাবের দিক থেকে তিনি শাফেয়ী মাযহাবের, আকীদাহ'র দিক থেকে তিনি আশ'আরী মতবাদের। বলা হয়ে থাকে, শেষ জীবনে তিনি সালাফী আকীদায় ফিরে আসার ঘোষণা দিয়েছিলেন। [ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (২১/৫০০)]
৩৭. ফখরুদ্দীন রাযী (মৃ. ৬০৬ হিজরী) তাঁর জীবনের শেষাংশে ৬০৪ হিজরীতে লিখিত 'রিসালাতু যাম্মি লাযযাতিদ দুনিয়া' পুস্তিকার উপসংহারে উক্ত বক্তব্য প্রদান করেন। পুস্তিকাটি ব্রিল, লেইডেন থেকে প্রকাশিত Ayman Shihadeh, The Teleological Ethics of Fakhr al-Din al-Razi (Leiden, The Netherlands: Brill, 2006) গ্রন্থের পরিশিষ্টে মুদ্রিত। সুতরাং শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ তার বক্তব্যে সত্যবাদী ছিলেন তা প্রমাণিত হলো। তাছাড়া এ বক্তব্য বিখ্যাত কালামশাস্ত্রবিদ সুবুকী তার তাবাক্বাতুশ শাফে'ঈয়্যাহ আল-কুবরা (৫/৪০) এ বর্ণনা করেছেন। অনুরূপভাবে লিসানুদ্দীন ইবনুল খত্বীব (মৃ. ৭৭৬ হিজরী), তার আল-ইহাত্বাহ ফী আখবারি গারনাত্বাহ গ্রন্থে (২/২২২) তা সনদসহ রাযী থেকে বর্ণনা করেছেন। ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেছিলেন, রাযী তার আকসামুল লাযযাত গ্রন্থে তা বলেছেন (মাজমু' ফাতাওয়া (৪/৭৩); বায়ানু তালবীষিল জাহমিয়্যাহ (৮/৫২৯-৫৩০); দারউত তা'আরুদ্ব (১/১৬০); মিনহাজুস সুন্নাহ (৫/২৭১); মাজমূ' রাসায়িলিল কুবরা (১/৯৭, ১৮৫)। অনুরূপ ইবনুল কাইয়্যেম বর্ণনা করেছেন তার ইজতিমা'উল জুয়ুশ, পৃ. ৩০৪। ইবন আবিল ইয্য আল-হানাফী, শারহুত ত্বাহাওয়িয়্যাহ (২/২৪৪)। তাছাড়া ইবন খাল্লিকান তার ওফায়াতুল আ'ইয়ান (৪/২৫০) গ্রন্থেও তা রাযীর দিকে সম্পৃক্ত করেছেন। শাইখ ড. মুহাম্মাদ রাশাদ সালেম তার দারউত তা'আরুদ্ব (১/৬০) এর টীকায় বলেন, 'আকসামুল লাযযাত' গ্রন্থটি ভারতীয় কোনো এক লাইব্রেরিতে পাণ্ডুলিপি আকারে রয়েছে। রাযীর বিস্তারিত অবস্থা জানতে পড়ুন, শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ'র বক্তব্য, (মাজমু' ফাতাওয়া ৪/২৮; বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (১/১২৯); মিনহাজুস সুন্নাহ (৫/২৭২); ইবনুল কাইয়্যেম, আস-সাওয়া'য়িকুল মুরসালাহ (২/৬৬৬)।
৩৮. তিনি হচ্ছেন আব্দুল মালেক ইবন আব্দুল্লাহ ইবন ইউসুফ ইবন মুহাম্মাদ, আল-জুওয়াইনী, যার উপাধী ছিল ইমামুল হারামাইন, রুকনুদ্দীন। কুনিয়াত আবুল মাআলী। পরবর্তীদের মধ্য বড় জ্ঞানী। শাফেয়ী মাযহাবের লোক। জন্ম ৪১৯ হিজরীতে জুওয়াইন অঞ্চলে, যা নাইসাপুরে অবস্থিত। তারপর তিনি বাগদাদ সফর করেন, তারপর মক্কায়, সেখানে চার বছর অবস্থান করেন, তারপর মদীনা, সেখানে ফতোয়া ও দারস প্রদান করেন। তারপর তিনি নাইসাপূরে ফিরে আসেন, ওযীর নিযামুল মুলক তার জন্য নাইসাপুরে মাদরাসাতুন নিযামিয়্যাহ প্রতিষ্ঠা করেন। তার দরসে বড় বড় আলেমগণ হাযির হতেন। তার গ্রন্থসমূহের অন্যতম হচ্ছে, গিয়াসুল উমাম ফিততাইয়াসিয যুলাম। আল-বুরহান ফী উসুলিল ফিকহ, আশ-শামেল, আল-ইরশাদ, ওয়ারাকাত, মুগীসুল খালক। তিনি নাইসাপুরে ৪৭৮ হিজরীতে মারা যান। [দেখুন, আল-আ'লাম (৪/১৬০)]
৩৯. অর্থাৎ তার নিজের জন্য।
৪০. 'মায়ের বিশ্বাস' বলার কারণ হচ্ছে, সাধারণত যারা ফিত্বরাত বা স্বভাবজাত দীনের ওপর বড় হয়, তারা আল্লাহর ব্যাপারে সহীহ আকীদাহ-বিশ্বাসে থাকেন। সাহাবায়ে কিরামের মতো স্বাভাবিক আল্লাহ প্রদত্ত আকীদাহ ধারণ করেন। তারা কালামশাস্ত্রের মতো নাপাক জিনিস দিয়ে নিজেদের আকীদাহ- বিশ্বাসকে বিনষ্ট করেননি। [দেখুন, আল-মু'আল্লেমী, আত-তানকীল (২/২৩৩)]
৪১. আবুল মা'আলী আল-জুয়াইনী তা বলেছেন, যা ইমাম যাহাবী তাঁর সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৮/৪৭১) এ বর্ণনা করেছেন। তাছাড়া সুবুকী তা ইমামুল হারামাইন থেকে বর্ণনা করেছেন, ত্বাবাকাতুশ শাফে'ইয়‍্যাহ আল-কুবরা (৩/২৬০); ইবনুল ইমাদ আল-হাম্বলী, শাযারাতুয যাহাব (৩/৩৬১)। আরও দেখা যায়, ইবন তাইমিয়্যাহ, ফাতাওয়া (৪/৭৩); মিনহাজুস সুন্নাহ (৫/২৬৯)।
৪২. তিনি হচ্ছেন মুহাম্মাদ ইবন মুহাম্মাদ ইবন মুহাম্মাদ আল-গাযালী আত-ত্বসী। আবু হামেদ, যাকে কবরপূজারীরা হুজ্জাতুল ইসলাম উপাধী দিয়ে থাকে। দার্শনিক, সূফী, উসূলী, তর্কবিদ। জন্ম ৪৫০ হিজরী, আর মৃত্যু হিজরী ৫০৫ সালে। জন্ম ও মৃত্যু উভয়টিই ত্বাবেরানে, যা খুরাসানের একটি এলাকা। তারপর তিনি নাইসাপূর যান, তারপর বাগদাদে, তারপর হিজায অঞ্চলে, তারপর শাম তারপর মিশর দেশে। তারপর তার দেশে ফিরে আসেন। 'যা' এর উপর তাশদীদ দিয়ে উচ্চারণ করলে তার সম্পর্ক হয় কাপড় বুনন শিল্পের দিকে, আর 'যা' এর উপর ফাতহা দিয়ে হালকা করে পড়লে সেটা তুস এলাকার একটি জায়গার নাম। আর এটাই বিশুদ্ধ। তিনি অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন, তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, এহইয়াউ উলুমিদ্দীন, তাহাফুত আল-ফালাসিফাহ, আল-ইকৃতিসাদ ফিল ই'তিক্বাদ ইত্যাদি। প্রথম জীবনে দার্শনিকদের পথে চলেছেন, পরে কালামশাস্ত্রবিদদের পথে, পরে সূফীদের পথে, আর মৃত্যুর পূর্বে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আহ এর আকীদাহ অনুসারে চলে মারা যান। [যিরিকলী, আল-আ'লাম (৭/২২-২৩)]
৪৩. এ বর্ণনাটি ইবন তাইমিয়্যাহ অন্যত্র সরাসরি গাযালী থেকে বর্ণনা করেছেন। মাজমূ' ফাতাওয়া (৪/২৮); নাকদুল মানত্বিক, পৃ. ২৫; অনুরূপ ইবনুল কাইয়্যেমও তা গাযালী থেকে উদ্ধৃত করেছেন। [মাদারিজুস সালেকীন (৩/৪৩৭)] গাযালী রাহিমাহুল্লাহ জীবনের শেষাংশে সহীহ আকীদাহ ও মানহাজের ওপর ফিরে এসেছিলেন। সর্বশেষে তিনি কালামশাস্ত্রের ব্যাপারে মানুষদের সাবধান করতেন। বিস্তারিত দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, জামে'উর রাসায়িল (১/১৬৯); যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৯/৩২৫-৩২৬)।
৪৪. অর্থাৎ সালাফে সালেহীন তথা সাহাবায়ে কিরাম ও তাদের সুন্দর অনুসারীগণ।
৪৫. অর্থাৎ আল্লাহর কিতাবের প্রচার-প্রসার তাদের মাধ্যমেই হয়েছে, আর কিতাবও তাদের প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণ হয়েছে।
৪৬. অর্থাৎ পূর্ববর্তীদের ইলমের সাথে পরবর্তীদের ইলমের তুলনামূলক আলোচনার কোনো সুযোগ নেই। সাহাবায়ে কিরামের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা জগতের সকলের জ্ঞান ও প্রজ্ঞার চেয়ে বেশি ছিল।
৪৭. সাধারণত কালামশাস্ত্রবিদ মুসলিমরা দর্শনশাস্ত্র বলতে বুঝে, যা এরিস্টটল দিয়েছে, তারা তাকে প্রথম শিক্ষক বলে। তারা ফারাবীকে দ্বিতীয় শিক্ষক বলে। পক্ষান্তরে ইবন সীনাকে তৃতীয় শিক্ষক হিসেবে গ্রহণ করে। তাদের নিকট যদি কেউ এ তিনজনকে না মানে তবে সে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার জগতে ঢুকতে পারেনি। নাউযুবিল্লাহ। অথচ তাদের মধ্যে এরিস্টটল তো কাফের মুশরিক ও মুলহিদ, তার কাছে পৃথিবী অবিনশ্বর। ইবন সীনা মনে করত আল্লাহর অস্তিত্ব কেবল নামমাত্র। তারা ফিরিশতাদের অস্তিত্বে বিশ্বাসী নয়, মনে করে তা কেবল নবীর কল্পনাশক্তির ব্যবহার, কিতাব বলতে বুঝায় নবম গোলক থেকে যা উৎসারিত হয় তা। নবী বলতে বুঝায় যারা প্রচুর ধারণা ও খেয়ালের বশবর্তী হতে পারে। আখেরাত বলতে তাদের কাছে কিছু নেই। বিস্তারিত দেখুন, ইবন হাযম, আল-ফাসলু (১/৯৪); আশ-শাহরাস্তানী, আল-মিলাল (২/৩৬৯-৫৩৮); রাযী, ই'তিক্বাদু ফিরাক্কিল মুসলিমীন ওয়াল মুশরিকীন, পৃ. ৯১; ইবনুল কাইয়্যেম, ইগাসাতুল লাহফান (২/২৫৬-২৬৮); হিদায়াতুল হায়ারা, পৃ. ৯; ইবন তাইমিয়্যাহ দারউত তা'আরুদ্ব (১/১২২); ইবন আবিল ইয্য, শারহুত ত্বাহাওয়িয়‍্যাহ; আন-নাশশার, আল-ফিকরুল ফালসাফী ফিল ইসলাম, পৃ. ১১-।
৪৮. ভারত বলতে বর্তমানে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও বর্তমান ভারত সবটাকেই বুঝানো হচ্ছে। এই অঞ্চলকে ভারত, ইন্ডিয়া ও হিন্দুস্তান বলা হয়। এর কারণ অনুসন্ধানে অনেক মত এসেছে। ১- মুসলিম ঐতিহাসিকগণ ভারতবর্ষের নাম হিন্দ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাদের মতে, হিন্দ ও সিন্দ দু'ভাই ছিলেন, যাদের পিতা ছিলেন বুওকীর, তার পিতা ইয়াক্বত্বিন, তার পিতা হাম, যিনি নূহ 'আলাইহিস সালামের সন্তান। ২- অন্যান্য ঐতিহাসিকগণ বিভিন্ন মত দিয়েছেন। যেমন, (ক) পৌরাণিক যুগের সাগর বংশের সন্তান রাজা ভরতের নাম থেকে আমাদের দেশের নামটি এসেছে ভারত বা ভারতবর্ষ। বিষ্ণু পুরাণে বলা হয়েছে, মহাসাগরের উত্তরে এবং বরফে ঢাকা পাহাড়ের দক্ষিণে অর্থাৎ হিমালয়ের দক্ষিণে অবস্থিত দেশের নাম ভারতবর্ষ এবং এই দেশের মানুষকে অভিহিত করা হয়েছে 'ভারতসন্ততি' রূপে। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের গ্রিক লেখক হেরডটাস-এর মতে ভারতের জনসংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। সেই কারণে ভারত নামের সঙ্গে বর্ষ শব্দটি যোগ করে দেয়া হয়। (খ) ঐতিহাসিক ড. রামশরণ শর্মার মতে ভরত নামে এক প্রাচীন উপজাতির নাম অনুসারে এই দেশের নাম ভারতবর্ষ হয়েছে। (গ) কলিঙ্গ সম্রাট খারবেল-এর হস্তিগুম্ফা শিলালিপিতে 'ভারধবস' শব্দের ব্যবহার দেখা যায় এবং এই নাম গুপ্ত যুগে ভারতবর্ষ নামে খ্যাত হয়েছিল। (ঘ) প্রাচীন পারসিক লিপিতে 'সপ্ত সিন্ধু'কে বলা হয়েছে হপ্ত হিন্দু। সিন্ধু তীরবর্তী বসবাসকারী মানুষকে বিদেশীরা হিন্দু বলত এবং তার থেকেই হিন্দুস্তান কথাটি এসেছে। গ্রিকরা সিন্ধুকে বলত ইন্দাস (Indus) আর এই Indus কথাটি থেকে ইন্ডিয়া (INDIA) কথাটি এসেছে। সে যাই হোক, ভারতবর্ষীয়রা তাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করতে সমর্থ হয়নি। তাই সেখানে মানুষের চিন্তাজগতে অনেক কথাই আসবে। এ ব্যাপারে আমার পিএইচ.ডি থিসিসে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। ড. আবুবকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া লিখিত "আল-হিন্দুসিয়‍্যাহ ওয়া তাআসসুরু বা'দিল ফিরাক্কিল ইসলামিয়্যাতি বিহা" গ্রন্থটি দেখা যায়। হিন্দুস্তানের দর্শন মৌলিকভাবে ছয়টি যা ষড়দর্শন নামে খ্যাত। এগুলোর মধ্যে বেদান্ত দর্শন সারা দুনিয়ায় প্রভাব ফেলেছে। এ দর্শনেরই প্রতিফলন হচ্ছে, অহংবাদ, সোহংবাদ ও সর্বেশ্বরবাদ যা আরবীতে হুলুল, ইত্তেহাদ ও ওয়াহদাতুল ওজুদ নামে খ্যাত হয়েছে। এসব দর্শন আরবী অনুবাদ হওয়ার পর ব্যাপকভাবে মানুষ তা দ্বারা প্রভাবিত হতে শুরু করে।
৪৯. গ্রীক কারা? আরবী ভাষায় তার নাম ইউনান, যার পূর্ব নাম ছিল 'হিলাস' বা আলাস, যা বর্তমানে ইউরোপের একটি রাষ্ট্র, যা বলকান উপদ্বীপের দক্ষিণপার্শ্ব, যার উত্তর দিকে বুলগেরিয়া ও সার্বিয়া, পূর্বদিকে তুরস্ক, দক্ষিণ দিকে ভূমধ্য সাগর, আর পশ্চিমে গ্রীক সাগর। প্রাচীন এক সভ্যতার নাম। তারা প্রাথমিক পর্যায়ে প্রাকৃতিক বিভিন্ন নিদর্শন যেমন: সমুদ্র, সূর্য, চাঁদ, আলো ইত্যাদির পূজা করত। পরবর্তীতে তারা দর্শনের দিকে বেশি ঝুঁকে যায়। তাদের দার্শনিকদের মধ্যে বিখ্যাত ছিল, থলেস, সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল। পরবর্তীতে সেখানে খ্রিস্টধর্ম প্রবেশ করে। বর্তমানে তারা ইউরোপে খ্রিস্টধর্মের প্রতিনিধত্ব করে।
৫০. অগ্নি উপাসক সম্প্রদায়, আরবীতে তাদেরকে মাজুস বলা হয়। কুরআনে কারীমে যেসব ধর্মের নাম এসেছে এটি তার একটি। বলা হয়ে থাকে, তাদের নবী ছিল এবং কিতাবও ছিল। তাদের নবীর নাম তারা যরাদশত বলে থাকে, আর তাদের কিতাবের নাম আবেস্তা। বর্তমানে তাদের অবস্থার প্রচুর বিকৃতি ঘটেছে। তাদের কয়েকটি ফির্কা রয়েছে। যরথুস্ত্র, মুযদাক, খুররাম, মিসখিয়্যাহ, মানিয়্যাহ। তবে তাদের সংখ্যা অনেক কম, প্রভাব অনেক বেশি। ইরান ও ভারতে তাদের অবস্থান লক্ষণীয়। তাদের অধিকাংশই দু' ইলাহে বিশ্বাস করে, আলো ও অন্ধকার। যদিও উভয় ইলাহকে প্রাচীন বলে না, নূর প্রাচীন, অন্ধকার নবীন।
৫১. মুসা 'আলাইহিস সালামের উম্মতকে বর্তমানে ইয়াহূদী বলা হয়। তাদের গ্রন্থ তাওরাত। তাছাড়া তারা তালমূদ নামক গোপন গ্রন্থেরও অনুসরণ করে থাকে। বর্তমানে তাদের অধিকাংশই ইসরাঈলে বসবাস করে। এরা দুনিয়ার সকল অপকর্মের হোতা। তাদের মাধ্যমে দুনিয়ার অশান্তি বিরাজিত।
৫২. এরা 'ঈসা 'আলাইহিস সালামের অনুসারী বলে নিজেদের দাবি করে থাকে। তারা 'ঈসা 'আলাইহিস সালামকে ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে। তাদের বর্তমান ফির্কাসমূহ হচ্ছে, ক্যাথলিক, প্রটেস্ট্যান্ট ও অর্থোডক্স। এদের প্রতিটি ফির্কাই পথভ্রষ্ট।
৫৩. সাবেয়ী শব্দের মূল অর্থ হচ্ছে এক দীন থেকে বের হয়ে অপর দীন গ্রহণকারী। তাদের আদি বাসস্থান হচ্ছে ইরাকের হাররান এলাকা, যেখানে আল্লাহ তা'আলা ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে পাঠিয়েছিলেন। তারা আকাশের তারকারাজির পূজা করত। তারা দু'ভাবে বিভক্ত; এক. তাওহীদবাদী সাবেয়ী, তাদের সংখ্যা হাতে গোনা। দুই. মুশরিক সাবেয়ী, তারাই সংখ্যায় বেশি। কুরআনে কারীমে আল্লাহ তাআলা সাবেয়ী ধর্মের নাম বর্ণনা করেছেন। এসব ধর্ম সম্পর্কে জানার জন্য তুলনামূলক ধর্মের ওপর আমার রচিত দু'টি গ্রন্থ দেখা যেতে পারে: ১- তুলনামূলক ধর্ম ও মুসলিম মনীষা, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন কর্তৃক প্রকাশিত। ২- বিশ্বের প্রধান ধর্মসমূহ, যা বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট ফর ইসলামিক থট কর্তৃক প্রকাশিত।
৫৪. শাইখুল ইসলাম কর্তৃক কালামশাস্ত্রবিদদের বক্তব্য 'সালাফদের পদ্ধতি নিরাপদ, খালাফদের পদ্ধতি জ্ঞান ও প্রজ্ঞাপূর্ণ' এর খণ্ডন করে যা বর্ণনা করেছেন তা এখানে সমাপ্ত হয়েছে। যদি কারও এর চেয়ে বেশি খণ্ডন জানার ইচ্ছা করে তবে শাইখুল ইসলামের গ্রন্থ 'মাজমূ' ফাতাওয়া' এর (৪/১৫৭), (৫/১৫৬) ও তার পরবর্তী অংশ, দারউত তা'আরুদ্ব (৫/৩৭৮) ও তার পরবর্তী অংশ দেখা যেতে পারে। তাছাড়া ইমাম ইবন রাজাব আল-হাম্বলী এ ব্যাপারে একটি আলাদা গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার নাম দিয়েছেন, বায়ানু ফাদ্বলি ইলমিস সালাফি আলা ইলমিল খালাফি।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 কালামশাস্ত্রবিদদের অন্যতম গুণ হচ্ছে অস্থিরতা ও সন্দেহে নিপতিত থাকা

📄 কালামশাস্ত্রবিদদের অন্যতম গুণ হচ্ছে অস্থিরতা ও সন্দেহে নিপতিত থাকা


দীনের ক্ষেত্রে যাদের অস্থিরতাই বেশি, আল্লাহ সম্পর্কে যাদের জ্ঞান অনেক পুরু পর্দার আবরণে ঢাকা, আর যাদের পদচারণার শেষ জায়গা এবং তাদের সর্বশেষ পরিণতি সম্পর্কে অবগত জনৈক পণ্ডিত বলেন:

দীনের ক্ষেত্রে যাদের অস্থিরতাই বেশি, আল্লাহ সম্পর্কে যাদের জ্ঞান অনেক পুরু পর্দার আবরণে ঢাকা, আর যাদের পদচারণার শেষ জায়গা এবং তাদের সর্বশেষ পরিণতি সম্পর্কে অবগত জনৈক পণ্ডিত বলেন:

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00