📄 সালাফে সালেহীন তথা সাহাবায়ে কিরাম ও তাদের সুন্দর অনুসারীদের পক্ষ থেকে দীনের মৌলিক নীতিমালা ও শাখা-প্রশাখাসমূহের বর্ণনায় ত্রুটি করা অপছন্দ
অতঃপর এটাও অসম্ভব যে, সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্মগুলো, যে প্রজন্মের প্রথমটিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ করা হয়েছে (সাহাবায়ে কিরাম), তারপর যারা তাদের সাথে সম্পৃক্ত (তাবে'য়ীনে 'ইযাম), তারপর যারা তাদের সাথে সম্পৃক্ত (তাবে তাবেয়ীন), তারা এমন হবে যে, তারা এ ব্যাপারে স্পষ্ট সত্য কিছু জানবে না এবং বলবে না; কেননা এর বিপরীতে হয় তাদের না জানা ও না-বলা অথবা সত্যের বিপরীত বিশ্বাস করা ও বলা। আর উভয়টিই নিষিদ্ধ।
প্রথমটি এ কারণে নিষিদ্ধ যে, যার অন্তরে ইলমের জন্য সামান্য তলব ও স্পৃহা আছে বা ইবাদতের আগ্রহ আছে- এ বিষয়ে অনুসন্ধান করা, এটার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা এবং এ ব্যাপারে সত্যটা জানা তার সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য ও সর্বোচ্চ কাঙ্খিত বিষয় হবে। অর্থাৎ মহান রব্ব আল্লাহর ব্যাপারে কী বিশ্বাস থাকা উচিত, তবে রবের ধরণ বা তার গুণের স্বরূপ সম্পর্কে নয়। বস্তুত আল্লাহর ব্যাপারে জানার আগ্রহের চাইতে কোনো বিষয়ে জানার আগ্রহ কোনো বিশুদ্ধ আত্মার চাহিদা হতে পারে না।
আসলে এটি স্বভাবজাত জ্ঞাত বিষয়। শক্তিশালী চাহিদা বিদ্যমান থাকা অবস্থায় সে কীভাবে কল্পনা করতে পারে যে, সেই চাহিদা হতে ঐসব মহৎ ব্যক্তিবর্গ তাদের সমগ্র যুগব্যাপী পিছিয়ে ছিলেন। এটা সংগঠিত হতে পারে না তার মধ্যেও যে সৃষ্টির সেরা নির্বোধ, তাদের মধ্যে আল্লাহ থেকে অধিক বিমুখ, দুনিয়া অর্জনে বেশি বোকা এবং আল্লাহর স্মরণ থেকে সবচেয়ে উদাসীন। তাহলে সালাফে সালেহীনের মধ্যে কীভাবে তা হতে পারে?
আর [দ্বিতীয়টি অর্থাৎ] তারা এ ব্যাপারে সত্যবিহীন বিষয়ে বিশ্বাসী ছিলেন বা তার প্রবক্তা ছিলেন, এটা কোনো মুসলিম বিশ্বাস করতে পারে না, আর না পারে ঐ সম্প্রদায়ের সম্পর্কে অবগত কোনো বুদ্ধিমান সেটা মেনে নিতে।
বস্তুত এ ব্যাপারে তাদের থেকে বর্ণিত কথা এ ব্যাপারে এতো বেশি যে, তা এ ফাতওয়া বা তার কয়েকগুণ কলেবরে লিপিবদ্ধ করা সম্ভব নয়। সেটা যে অনুসন্ধান ও খোঁজ করবে সেই জানতে পারবে।
টিকাঃ
১৬. অর্থাৎ আকীদাহ'র বিষয়ে সাধারণভাবে, আর বিশেষ করে আল্লাহর নাম ও গুণের অধ্যায়ে।
১৭. একটি হাদীসের দিকে ইঙ্গিত, যাতে ইসলামের প্রথম তিন প্রজন্মের প্রশংসা করা হয়েছে। তাদেরকে উত্তম প্রজন্ম বলে ঘোষণা করা হয়েছে। বুখারী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ৩৬৫০; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২৫৩৫। তিন উত্তম প্রজন্ম বলতে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ'র মত হচ্ছে, সাহাবী, তাবে'য়ী, তাবে তাবেয়ীন উদ্দেশ্য। এ মতটি পোষণ করেছেন, নাওয়াওয়ী, আবুত তাইয়্যেব, হাফেয ইবন হাজার, ইবন বায রাহিমাহুমুল্লাহ। তবে তাবে'য়ী ও তাবে তাবে'য়ীদের ব্যাপারে অধিকাংশদের কথাই ধর্তব্য। বিস্তারিত দেখুন, সাখাওয়ীর আল-মাজমূ'উল মুগীস (২/৬৯৯); ইবনুল আসীর, আন-নিহায়াহ (৪/৫১); ইবন মানযূর, লিসানুল 'আরব (১৩/৩৩৩); নাওয়াওয়ী, শারহু মুসলিম (১৬/৮৫); ইবন হাজার, ফাতহুল বারী (৭/৫); আযীমাবাদী, আউনুল মা'বুদ (১২/৪১০); ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমু' ফাতাওয়া (১০/৩৫৭)।
১৮. অর্থাৎ আল্লাহর সত্তার ব্যাপারে, তাঁর নাম-গুণের ব্যাপারে, তাঁর কর্মের ব্যাপারে জানার বিষয়ে।
১৯. স্বভাবজাত বলে, আল্লাহ তা'আলা মানব মনে যে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দিয়ে তাকে সমৃদ্ধ করেছেন তা বুঝানো হয়েছে। আরবীতে তা ফিত্বরী জ্ঞান বলা হয়। কুরআন ও সুন্নাহ'য় এসেছে যে, আল্লাহ তা'আলা বান্দাকে এক প্রকার ফিত্বরী জ্ঞান দিয়েছেন, যার মাধ্যমে সে তার রব্বকে চিনতে পারে, যার মাধ্যমে ভালোকে ভালো আর মন্দকে মন্দ বুঝতে পারে। যদি তা বিভিন্ন কারণে তা পরিবর্তিত না হয়ে যায় তবে সেটা মানুষকে অনেক মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যার।
২০. অর্থাৎ সালাফে সালেহীন তথা সাহাবায়ে কিরাম ও তাদের সুন্দর অনুসারী উত্তম প্রজন্মসমূহের সৎ লোকগণ।
২১. অর্থাৎ সালাফে সালেহীন তথা সাহাবায়ে কিরাম ও তাদের সুন্দর অনুসারী উত্তম প্রজন্মসমূহের সৎ লোকগণ।
২২. অর্থাৎ আল্লাহর সত্তার ব্যাপারে, তাঁর নাম-গুণের ব্যাপারে, তাঁর কর্মের ব্যাপারে জানার বিষয়ে।
📄 সালাফে সালেহীনের নীতিই হচ্ছে অধিক নিরাপদ, অধিক জ্ঞানসমৃদ্ধ ও অধিক প্রজ্ঞাপূর্ণ
আর এটা জায়েয হতে পারে না যে, খালাফ বা পরবর্তীরা সালাফ বা পূর্ববর্তীদের থেকে বেশি অবগত, যেমনটি বলে থাকে পূর্ববর্তীদের মর্যাদা সম্পর্কে অনবহিত কোনো কোনো নির্বোধ। বরং সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এবং তার প্রতি বিশ্বাসীদের সম্পর্কেও প্রকৃত অবগতি অর্জন করেনি; যখন সে বলে, পূর্ববর্তীদের পথ ও পদ্ধতি অধিক নিরাপদ, আর পরবর্তীদের পদ্ধতি অধিকতর বিজ্ঞ ও সুদৃঢ়।
টিকাঃ
২৩. খালাফ বলে সাধারণত আপেক্ষিকভাবে পরে আসা লোকদেরকে বুঝানো হয়। বিশেষ অর্থে কারও কারও মতে, যারা ইসলামের প্রথম তিন প্রজন্মের পরে এসেছে তাদেরকে বুঝানো হবে। আবার কখনও কখনও পরবর্তী যারাই প্রথম তিন প্রজন্মের মতামতের বিরোধিতা করবে তাদেরকে বুঝানো হয়ে থাকে।
২৪. সালাফ বলে সাধারণত আপেক্ষিকভাবে পূর্বসূরীদের বুঝানো হয়ে থাকে। বিশেষ অর্থে, প্রথম তিন প্রজন্মের লোকদেরকে সাধারণত বুঝানো হবে। অর্থাৎ সাহাবীগণের যুগ, তাবেয়ীদের যুগ ও তাবে তাবেয়ীনদের যুগ। আবার কারও কারও মতে এ শব্দটি কেবল সাহাবীগণের জন্য প্রযোজ্য। আবার গাযালীর মতে, কেবল সাহাবী ও তাবে'য়ীদের জন্য প্রযোজ্য। তবে প্রথম মতটি বেশি প্রচলিত। আবার কখনও কখনও যারাই সাহাবায়ে কিরামের মানহাজ বা পথ ও পন্থা অনুযায়ী চলবে তাদেরকে সালাফ বা সালাফী বলা হবে, যদিও তারা অনেক পরে আগমন করুন না কেন।
২৫. আশায়েরা ও মাতুরিদী সম্প্রদায় যখন দেখলো যে, আল্লাহ তা'আলার নাম, গুণ ও কর্ম সংক্রান্ত সালাফে সালেহীনের বক্তব্য তাদের নেতৃবর্গের বক্তব্যের বিপরীত, তখন তারা বলতে লাগলো, সালাফ বা পূর্ববর্তীদের বক্তব্য ছিল অধিক নিরাপত্তা বলয়ে, কিন্তু খালাফ বা পরবর্তীদের বক্তব্য হচ্ছে অধিক জ্ঞানমার্গের। এখানে শাইখুল ইসলাম বিভিন্নভাবে তাদের এ বক্তব্য খণ্ডন করছেন।
২৬. এ বক্তব্যটি সাধারণভাবে কালামশাস্ত্রবিদদের মধ্যে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। আশ'আরী, মাতুরিদীদের মধ্যে এটির প্রচলন বেশি। আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের ইমামগণ যুগ যুগ ধরে এ মিথ্যা বক্তব্যের খণ্ডনে বক্তব্য দিয়েছেন এবং যারা এ সর্বনাশা মিথ্যা বক্তব্যটি বলেছে তাদের অজ্ঞতা ও ভ্রান্তি তুলে ধরেছেন। এ বক্তব্যটি আমরা দেখতে পাই ইবন হাজার এর নিকট, ফাতহুল বারী (১৩/৩৫২); অনুরূপ যাবীদীর নিকট, ইতহাফুস সাদাতিল মুত্তাকীন (২/১১২); বাইজুরীর নিকট, শারহু জাওহারাতিত তাওহীদ, পৃ. ৯১। বস্তুত আশ'আরী ও মাতুরিদীরা যখন দেখল যে, তাদের বক্তব্য সালাফে সালেহীনের নীতির বিরুদ্ধে যাচ্ছে তখনই তারা এ মিথ্যা বক্তব্যটি আবিষ্কারের মাধ্যমে নিজেদের বিনষ্ট পণ্য প্রচার-প্রসারে নেমে পড়ে।
📄 যারা খালাফ বা পরবর্তীদের পদ্ধতিকে সালাফ তথা পূর্ববর্তীদের পদ্ধতির ওপর প্রাধান্য দেয় তাদের ভুলের মূল উৎস
কেননা এসব বিদ'আতী যারা খালাফ তথা পরবর্তী লোক (দার্শনিক ও কালামশাস্ত্রবিদ) ও তাদের পদাঙ্ক অনুসারীদের পদ্ধতিকে সালাফ তথা পূর্ববর্তীদের তরীকার ওপর প্রাধান্য দেয়, এ ভুলটি তাদের ওপর এভাবে এসেছে যে, তারা ধারণা করে: পূর্ববর্তী সালাফগণের তরীকা হচ্ছে নিছক কুরআন ও হাদীসের শব্দাবলির প্রতি ঈমান। (তাদের ধারণা অনুযায়ী) পূর্ববর্তী সালাফগণ কুরআন ও সুন্নাহ'র শব্দ পড়তো কিন্তু এগুলোর কোনো বুঝ-জ্ঞান তাদের ছিল না। (এদের মতানুযায়ী) পূর্ববর্তী সালাফগণ ছিলেন ঐসব উম্মী বা নিরক্ষর লোকদের অবস্থানে যাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন:
﴿وَمِنْهُمْ أُمِّيُّونَ لَا يَعْلَمُونَ الْكِتَابَ إِلَّا أَمَانِيَّ) [البقرة: ٧٨] "আর তাদের মধ্যে এমন কিছু নিরক্ষর লোক আছে যারা শুধু উচ্চারণ করে পড়া ছাড়া কিতাব সম্পর্কে কিছুই জানে না।” [সূরা আল-বাকারাহ: ৭৮] আর পরবর্তী খালাফদের পদ্ধতি হচ্ছে: কুরআন ও হাদীসের ভাষ্যের এমন কিছু অর্থ ও উদ্দেশ্য খুঁজে বের করা; যেগুলো স্বীয় হাকীকত বর্জিত হয়ে বিভিন্ন রূপকার্থে ও দুষ্প্রাপ্য অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
টিকাঃ
২৭. শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ তাদের এসব মিথ্যা দাবিকে ছয়টি প্রমাণ দিয়ে খণ্ডন করেছেন। দেখুন, [মাজমু' ফাতাওয়া (৫/১৫৬-১৬৩)]
২৮. নিঃসন্দেহে তাদের এ ধারণা উম্মতের সালাফে সালেহীন তথা সাহাবায়ে কিরামের ওপর মিথ্যা ও অপবাদ। ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, "সাহাবায়ে কিরাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কুরআনের শব্দ ও অর্থ উভয়টিই গ্রহণ করেছেন। বরং তারা শব্দের চেয়েও অর্থের প্রতি বেশি গুরুত্ব প্রদান করতেন। তারা আগে অর্থ গ্রহণ করতেন তারপর শব্দ...।” [মুখতাসারুস সাওয়া'য়িক (২/৩৩৯)]
২৯. কুরআন ও সুন্নাহ'র ভাষ্যকে রূপক অর্থে ব্যবহার করা যাবে কি না তা নির্ভর করছে রূপকের আশ্রয় নেয়ার কারণ উদ্ঘাটনের মাঝেই। যারা আল্লাহর নাম ও গুণের অর্থ করতে গিয়ে সমস্যা অনুভব করেছে, যারা মনে করেছে প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করলে তো সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য হওয়া আবশ্যক করে তাই এ সাদৃশ্য থেকে বাঁচার জন্য রূপক অর্থের দিকে ধাবিত হয়েছে। বস্তুত আল্লাহর নাম ও গুণ সাব্যস্ত করতে গেলে তাতে সাদৃশ্য এসে যায় এ দাবিটি অসত্য। এটা তাদের স্বল্প বুঝ ও অপরিপক্ক যুক্তির কারণেই হচ্ছে। কারণ স্রষ্টার অস্তিত্ব ও সৃষ্টির অস্তিত্ব সাব্যস্ত করতে যেমন উভয়ের সাদৃশ্য হওয়া জরুরী হয় না, তেমনি স্রষ্টার নাম ও গুণ সাব্যস্ত করতে গেলেও তাতে সৃষ্টির অনুরূপ হওয়া জরুরী হয় না। কারণ সত্তা অনুযায়ী তার নাম ও গুণ হয়ে থাকে। সুতরাং যদি বলা হয়, এসব নাম ও গুণ স্রষ্টার জন্য যেভাবে উপযোগী সেভাবে সাব্যস্ত করা হবে তাহলে আর সমস্যা থাকে না। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ'র "আর-রিসালাহ আত-তাদমুরিয়্যাহ" দেখা যেতে পারে।
📄 কালামশাস্ত্রবিদরা অজ্ঞতা ও মিথ্যাকে একসাথে করেছে
এই বিনষ্ট ধারণা তাদেরকে উক্ত বক্তব্য দানে বাধ্য করেছে যার সারকথা হচ্ছে, ইসলামকে পিছনে ছুড়ে ফেলা। তারা পূর্ববর্তী সালাফদের পদ্ধতির ওপর মিথ্যারোপ করেছে আর পরবর্তী খালাফদের পদ্ধতি সঠিক বলার মাধ্যমে পথভ্রষ্টতাকে গ্রহণ করে নিয়েছে। এভাবে তারা সালাফদের পদ্ধতির ব্যাপারে তাদের ওপর মিথ্যারোপ করার মাধ্যমে অজ্ঞতার পরিচয় প্রদান করেছে আর পরবর্তী খালাফদের পদ্ধতিকে সঠিক বলার মাধ্যমে অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তিকে একত্রিত করেছে।
এর কারণ, তারা বিশ্বাস করে যে, মূলত কুরআন ও সুন্নাহ'র এসব নস বা ভাষ্য কোনো সিফাতের ওপর প্রমাণবহ নয়; কেননা তারা এসব ক্ষেত্রে ঐ খারাপ সন্দেহের মধ্যে নিপতিত যাতে তারা স্বীয় কাফের ভ্রাতৃবর্গের সাথে একাত্ম হয়েছে। যখন তারা মূলতই সিফাতগুলো নাকচ হওয়ায় বিশ্বাসী হলো, আবার এসব নস বা ভাষ্যের অবশ্যই কোনো একটি অর্থ করতে হয়, তখন তারা দুটো অবস্থার মধ্যে দ্বিধাযুক্ত রয়ে গেল। প্রথমত: শব্দের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন এবং অর্থকে (আল্লাহর কাছে) সোপর্দ করা। যার নাম দিয়েছে তারা পূর্ববর্তীদের তরীকা। দ্বিতীয়ত: শব্দকে কৃত্রিমতা অবলম্বন করে বিভিন্ন অর্থের দিকে সরিয়ে দেয়া, যাকে তারা নাম দিয়েছে পরবর্তীদের তরীকা। ফলে এই বাতিল চিন্তাটি (উপরোক্ত দু'টি পদ্ধতি) বিনষ্ট যুক্তি (আক্কল) এবং কুরআন-হাদীসের শব্দ (যাকে পরিভাষায় সাম' বলা হয়) এর সাথে কুফরীর সমন্বয়ে জন্মলাভ করলো। কেননা আল্লাহর সিফাত নাকচ করার ক্ষেত্রে তারা কতিপয় বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়ের ওপর নির্ভর করেছে। যেগুলোকে তারা ধারণা করেছে স্পষ্ট প্রমাণ অথচ তা কতিপয় সংশয়-সন্দেহ ছাড়া কিছুই নয়। আর কুরআন-হাদীসের শব্দ তথা সাম'ঈ বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে তারা সেসব কথাকে তার স্থান থেকে সরিয়ে বিকৃত করে দিয়েছে।
সুতরাং তাদের বিষয়টি যখন এই দুটি কুফরী মুকাদ্দিমাহ বা ভূমিকার ওপর নির্ভরশীল, তখন তার (দু'টি) মারাত্মক সর্বনাশা নতীজা বা ফলাফল বের হলো:
এক. প্রথম যুগের অগ্রবর্তীদেরকে (সালাফদেরকে) মূর্খ মনে করা, তাদের বোকা মনে করা এবং এ বিশ্বাস করা যে, তারা ছিলেন সাধারণ (আম) নেককারদের মধ্যকার নিরক্ষর সম্প্রদায়। আল্লাহ সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞানের সাগরে ডুবতে পারেনি এবং ঐশ্বরিক জ্ঞানের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয় বুঝতে পারেনি। [নাউযুবিল্লাহ]
টিকাঃ
৩০. অর্থাৎ যেভাবে কাফের ও মুশরিক সম্প্রদায় মনে করে যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের এসব বাণীতে আল্লাহর গুণাবিল ও কর্ম সংক্রান্ত কোনো কিছু নেই। পরবর্তী লোকগুলোও এসব আয়াতকে আল্লাহর নাম, গুণ ও কর্ম সাব্যস্ত করে বলে মনে করছে না। তবে যেহেতু এ আয়াত ও হাদীসসমূহকে কেউ ভুল বুঝে আল্লাহর গুণাবলি সাব্যস্ত করতে পারে, তাই তারা সেগুলোর দূরবর্তী অর্থ করে সেগুলোকে তার আসল অর্থ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে হবে এমন কাজ আরম্ভ করলো। এটাই তাদের তথাকথিত তা'ওয়ীল।
৩১. দু'টি মিথ্যা ও কুফরী মুকাদ্দিমা হচ্ছে, এক. সালাফগণের নীতি ছিল, শুধু কুরআন ও সুন্নাহ'র শব্দের ওপর ঈমান আনা, তারা অর্থ বুঝতো না, তারা নিরক্ষর লোকদের মতো ছিল। আর তা নিরাপদ নীতি। দুই. খালাফদের নীতি হচ্ছে, কুরআন ও সুন্নাহ'র এসব ভাষ্যের বাহ্যিক অর্থ থেকে ফিরিয়ে বিভিন্ন প্রকার রূপক ও বিরল অর্থ খুঁজে বের করার ব্যবস্থা করা। আর তা হচ্ছে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার নীতি।
৩২. মুকাদ্দিমা ও নতীজা এ দু'টি মানতিক শাস্ত্রের পরিভাষা। তবে সাধারণত তা বুঝার জন্য যে উদাহরণটি পেশ করা হয় তা হচ্ছে, কেউ বললো, পৃথিবী ধ্বংসশীল এটা প্রমাণ কর। তখন অপরজন দু'টি মুকাদ্দিমা এনে এর ফল হিসেবে তা প্রমাণ করতে চেষ্টা করে থাকেন, যেমন: পৃথিবী পরিবর্তনশীল, আর যা পরিবর্তনশীল তা ধ্বংসশীল, সুতরাং পৃথিবী ধ্বংসশীল। মনে রাখতে হবে, ফলাফল তখনই বিশুদ্ধ হবে যখন মুকাদ্দিমা বা ভূমিকার বক্তব্য পুরোপুরি সত্য হবে। উপরে [মতন] এ বর্ণিত কালামশাস্ত্রবিদদের নীতিতে দু'টি মুকাদ্দিমাই ভুল, অজ্ঞতাপূর্ণ ও মিথ্যা ছিল। শাইখুল ইসলাম পরবর্তীতে তা খণ্ডন করেন।