📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 ‘আল-ফাতওয়া আল-হামাউইয়্যাহ আল-কুবরা’ এর অনুবাদক ও সম্পাদক এর ভুমিকা

📄 ‘আল-ফাতওয়া আল-হামাউইয়্যাহ আল-কুবরা’ এর অনুবাদক ও সম্পাদক এর ভুমিকা


বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
সকল হামদ আল্লাহর জন্য, আমরা তাঁরই ভালোবাসা মিশ্রিত প্রশংসা করি, তাঁর কাছেই সাহায্য চাই, তাঁর কাছেই ক্ষমা প্রার্থনা করি। আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই আমাদের আত্মার যাবতীয় অনিষ্ট থেকে, আমাদের কর্মকাণ্ডের যাবতীয় পাপ থেকে, যাকে আল্লাহ হিদায়াত দেন তাকে পথভ্রষ্টকারী কেউ নেই। যাকে আল্লাহ পথভ্রষ্ট করেন তাকে হিদায়াত দেয়ার কেউ নেই। আর আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল।
يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ ٱتَّقُوا۟ رَبَّكُمُ ٱلَّذِى خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَٰحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَآءً ۚ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ ٱلَّذِى تَسَآءَلُونَ بِهِۦ وَٱلْأَرْحَامَ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا﴿النساء: ١﴾
"হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবের তাকওয়া অবলম্বন কর যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন ও তার থেকে তার স্ত্রীকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের দুজন থেকে বহু নর-নারী ছড়িয়ে দেন; আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর যাঁর নামে তোমরা একে অপরের কাছে নিজ নিজ হক দাবি কর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর রক্ত-সম্পর্কিত আত্মীয়ের ব্যাপারেও। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ওপর পর্যবেক্ষক।" [সূরা আন-নিসা: ০১]
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ ٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِۦ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ ﴿ال عمران: ١০২﴾
"হে মুমিনগণ! তোমরা যথার্থভাবে আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং তোমরা মুসলিম (পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণকারী) না হয়ে কোনো অবস্থায় মারা যেও না।" [সূরা আলে ইমরান: ১০২]
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ ٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ وَقُولُوا۟ قَوْلًا سَدِيدًا * يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَٰلَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَن يُطِعِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا ﴿الاحزاب: ۷০، ۷۱﴾
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং সঠিক কথা বল; তাহলে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের কাজ সংশোধন করবেন এবং তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।" [সূরা আল-আহযাব: ৭০-৭১]
তারপর কথা হলো...,
এ উম্মতের ওপর আল্লাহর অসীম নি'আমত হচ্ছে যে, তিনি তাদেরকে সর্বশেষ ও সর্বোত্তম রাসূল প্রদান করেছেন, সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব দিয়েছেন, তাদের দীনকে পূর্ণ করে দিয়েছেন, যে দীনকে কিয়ামত পর্যন্ত আগত সকল মানুষের জন্য একমাত্র অবশ্য পালনীয় করে মনোনীত করেছেন, যা ব্যতীত কারো কাছ থেকে অন্য কিছু গ্রহণ করবেন না, যে দীনকে আগের ও পরের সবার জনা পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন, যাতে এর মাধ্যমে তাদের ওপর তাঁর প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন ও দা'ঈদের সাওয়াবের অধিকারী করতে পারেন।
আল্লাহর অগণিত নি'আমতের মধ্যে একটি হচ্ছে তিনি এ উম্মতের আকীদা-বিশ্বাস ও তার যাবতীয় প্রমাণাদিকে কুরআন ও সুন্নাহর অধীন করে দিয়েছেন, যা অত্যন্ত প্রকাশ্য ও স্পষ্টভাবে সেগুলোকে এমনভাবে প্রমাণ করেছে যে, সাধারণ মানুষের পক্ষেও তা বুঝা ও তা আকঁড়ে ধরা সহজ করে দিয়েছেন। সেখানে কোনো ধাঁধাঁ বা অস্পষ্টতার সুযোগ নেই। আল্লাহ বলেন, "আর অবশ্যই আমরা কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি উপদেশ গ্রহণের জন্য; অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি?" [সূরা আল-কামার: ১৭]
যেহেতু কিয়ামতের কিছু আগ পর্যন্ত এ দীনকে আল্লাহ তা'আলা সংরক্ষণ করবেন তাই তিনি প্রতি যুগেই এ দীনের হিফাযতের জন্য একদল সত্যবাদী মুমিন-মুখলিস বান্দাকে প্রস্তুত রেখেছেন, তাদেরকে হক্ক বুঝার সুযোগ দিয়েছেন, হক্কের জন্য জীবনের দামী ও উত্তম সবকিছু ব্যয় করার মন-মানসিকতা দিয়েছেন। তারা এ দীনের মধ্যে যারা বাড়াবাড়ি, সীমালঙ্ঘন, বাতিলের অনুপ্রবেশ কিংবা জাহেলদের অপব্যাখ্যা প্রবেশ করাতে চাইবে, তাদের সামনে এরা বাঁধার বিন্ধাচল হয়ে দাঁড়াবে, সেসব ভ্রষ্টতা থেকে দীনকে হিফাযতের জন্য সর্বস্ব নিয়োগ করবে, যার মাধ্যমে সেসব লোকের যাবতীয় সর্বনাশা কর্মকাণ্ড থেকে দীনকে পবিত্র রাখবেন, যাদেরকে শয়তান পথভ্রষ্ট করে দিয়েছে, ফলে তারা স্পষ্ট প্রমাণাদি দেখার পরও তা থেকে চোখ বুজে থাকবে, স্পষ্ট নিদর্শনাবলি শোনা থেকে কানে তালা দিয়ে রাখবে, নিজেরা এমন কঠিন পথে চলবে যা সম্পূর্ণভাবে সমস্যাসঙ্কুল। এভাবে তারা পথভ্রষ্টতার অতল গহ্বরে নিমজ্জিত হয়ে হারিয়ে যাবে, যদিও তারা মনে করছে তারা উত্তম পদ্ধতি গ্রহণ করছে, দৃঢ়পথে চলার চেষ্টা করছে।
এসব পথভ্রষ্ট, দিকহারা লোকদের বিরুদ্ধে সর্বদা আল্লাহর ওয়াদাকৃত সাহায্যপ্রাপ্ত গোষ্ঠী, নাজাতপ্রাপ্ত দল সর্বদা সোচ্চার হয়ে দাঁড়িয়েছে, যারা হকের ঝাণ্ডাকে বুলন্দ করেছে, তারা সর্বদা থেকেছে বিখ্যাত, প্রকাশ্য ও দলীল-প্রমাণে বিজয়ী সম্প্রদায়, তারা সারা দুনিয়ার প্রতিটি অঞ্চলে বাতিল গোষ্ঠী, দল ও ফির্কারসমূহের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। ফলে বাতিলের প্রাসাদ ও ঘর ধ্বংস ও পর্যুদস্ত হয়েছে।
ইসলামের আকীদার ওপর সবচেয়ে বড় যে ঘূর্ণিঝড়টি বয়ে গেছে তা হচ্ছে সেসব সন্দেহের ডামাঢোল যা গ্রিক-দার্শনিক, সাবেয়ীরা পিটিয়েছে, আর সেটার ক্ষতিকর দিক জেনে বা না জেনে সেসব পথভ্রষ্ট দার্শনিকদের অনুসারী কালামশাস্ত্রবিদরা বাজিয়েছে। এভাবে তারা নিজেরা পথভ্রষ্ট হয়েছে, উম্মতে মুসলিমাহকে পথভ্রষ্টতার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।
কিন্তু আল্লাহর সাহায্যপ্রাপ্ত গোষ্ঠীর বাহিনীর লোকেরা তাদের সেসব আক্রমণ যথাযথভাবে প্রতিহত করার জন্য অবস্থান গ্রহণ করেছে। তারা প্রত্যেক অঞ্চল থেকেই তথাকথিত দার্শনিক ও কালামশাস্ত্রবিদদের ভয়াল আক্রমণকে মুকাবিলা করার জন্য পরস্পর শিশাঢালা প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়েছে। তারা উক্ত রোগ বিস্তার লাভ করার আগেই তার মূলোৎপাটনে ছিল সোচ্চার। তারা তাদের বিরুদ্ধে মুনাযারা করেছে, কিতাব রচনা করেছে, আলোচনা করেছে; যার মাধ্যমে তারা মুসলিমদের সামনে এ বিশাল বিপদের ভয়াবহতা ও তাদের ষড়যন্ত্রের ব্যাপারটি প্রকাশ করে দিয়েছে। ফলে আল্লাহর সাহায্যের সু বাতাস সেসব বাতিলকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে।
উম্মতের যেসব সিপাহসালার তাদের সর্বস্ব নিয়ে এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ। যখন চতুর্দিকে মূর্খতা ছড়িয়ে পড়েছিল, বিদ'আত ও প্রবৃত্তির অনুসরণ প্রসার লাভ করেছিল, মতভেদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল, সহীহ আকীদার চিহ্নসমূহ মিটে যেতে আরম্ভ করেছিল, সালাফদের মতাদর্শ নিশ্চিহ্ন হতে যাচ্ছিল, সেগুলো কেবল ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছিল, সালাফী মানহাজের লোকদের পক্ষে কোনো লোকই দাঁড়ানোর চিন্তা করা বাদ দিয়েছিল, বাতিল পুরো ময়দান দখল করে বসেছিল, তারা যা ইচ্ছা করা ও বলার মতো স্বেচ্ছাচারিতা প্রদর্শন করে যাচ্ছিল, তাদের বিকৃত চিন্তাধারার প্রচার ও প্রসারে সর্বশক্তি নিয়োগ করছিল, তাদের বিষ-বাষ্প সবদিকে বিদ্যুতের মত প্রচার করে চলেছিল।
এ সময় আশ'আরী সম্প্রদায় তাদের মিথ্যা আকীদা-বিশ্বাস নিয়ে মানুষদেরকে বিভ্রান্ত করা শুরু করেছিল, তাদের ক্ষমতা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিল, শাসকগোষ্ঠীর আনুকূল্য ও সার্বিক সহযোগিতা পাচ্ছিল, তাদের মতামতকে আলেম ও সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলে ধরছিল, নিজেদেরকে 'আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আত' হওয়ার মিথ্যা দাবি করে যাচ্ছিল, আর সে মিথ্যা দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল, নিজেদেরকে একমাত্র সত্য বলে প্রচার করতে নেমেছিল, ফলে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে, কেউ তাদের সমালোচনা কিংবা ভুল ধরার সামান্যতম সাহসও প্রকাশ করার হিম্মত রাখছিল না, যদি কেউ তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলার দুঃসাহস দেখাতো তখনই তাকে বিভিন্নভাবে খারাপ বিশেষণের বানে জর্জরিত করছিল। কখনও কাফের আবার কখনও দীনবিরোদী আখ্যা দিচ্ছিল।
এ তীব্র অন্ধকারে, বিশ্বের এর ধ্বংসাত্মক অবস্থায় একটি আলো বিশাল আকার ধারণ করে উক্ত অন্ধকারকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল, একটি তারকা উদিত হয়ে সে অন্ধকারকে খানখান করে দিয়েছিল, সে আলো ও সে তারকাটি আর কেউ নয়, আমাদের ইমাম শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ।
আল্লাহ তা'আলা এ দীনকে হিফাযতের দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি কুরআন ও সুন্নাহকে আমাদের জন্য সংরক্ষণ করেছেন। "নিশ্চয় আমরা যিকির নাযিল করেছি, আর নিশ্চয় আমরা তা যথাযথ সংরক্ষণকারী।” এ হিফয ও সংরক্ষণের একটি মাধ্যম হচ্ছে এমন কিছু লোক জোগাড় করে দিয়েছেন যারা কুরআন, সুন্নাহকে সংরক্ষণ করেছেন, যারা কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক ব্যাখ্যার প্রসার করেছেন, কুরআন ও সুন্নাহ থেকে সকল প্রকার বিকৃতি, মিথ্যাচার ও অগ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন, শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ।
শাইখুল ইসলাম যখন এ ধরাধামের প্রতি চোখ খুলে তাকালেন তখন দেখলেন সবকিছু বিপর্যস্ত ও সমস্যাগ্রস্ত, সেসবকে সংস্কার ও নতুন রূপ দেয়া জরুরী। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে তিনি একা কী করবেন? কিন্তু তিনি উপলব্ধি করলেন যে পরিণাম সুনির্ধারিত, ফলাফল অবশ্যম্ভাবী। তিনি বুঝতে সক্ষম হলেন যে তাকে হক্ক নিয়ে দাঁড়াতেই হবে, হক যিনি বলেন, তিনি একাই উম্মত বা জাতি। এ পথের একাকিত্ব, বন্ধু-বান্ধবহীনতা তাকে তাঁর ইপ্সিত কাজ থেকে পিছপা করেনি, একাই সকল প্রকার অনাচার, শির্ক, বিদ'আত, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেন। বাতিলের বিরুদ্ধে সর্বদিক থেকে হামলা করলেন। তাদের কেল্লা ও দূর্গগুলোতে আঘাত হানলেন। এসবের পিছনে কাজ করেছে তাঁর মজবুত ঈমান ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ইচ্ছাশক্তি। মানুষদের তিনি কুরআন ও সুন্নাহর অসি ও মসির মাধ্যমে সঠিক পথের আহ্বান জানালেন, তাদেরকে ডাকলেন এ দু'টির পরিচ্ছন্ন সুমিষ্ট পানিতে অবগাহন করার জন্য, যাতে নেই কোনো পঙ্কিলতা, যাতে কারও ময়লার বালতি পড়ে হয়নি তা কলঙ্কিত।
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহর এ সংস্কার ও তাজদীদী কর্মকাণ্ডকে বাতিল সহজভাব গ্রহণ করেনি, বাতিল তখন তার সকল কেল্লা থেকে একযোগে তাঁর বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ও মারমুখি হয়ে একের পর এক আঘাতে জর্জরিত করতে লেগে গেল। কিন্তু স্বল্প সময়ের মধ্যেই তারা বুঝতে পারলো যে, তাদের কাঁচের তৈরী প্রসাদ শীশাঢালা প্রাচীরের সামনে ভেঙ্গে পড়তে আরম্ভ করেছে, তাদের ওপরই তাদের গৃহের ছাদ ভেঙ্গে পড়তে শুরু করেছে, যমীন তাদের নিয়ে ডেবে যাচ্ছে।
আল্লাহর শপথ, তিনি ইসলামের ইতিহাসে উম্মতে মুসলিমাহকে অন্ধকার অবস্থায় সঠিক পথের দিশা দেয়ার জন্য লোকদের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তন্মধ্যে তিন ব্যক্তি ছিলেন বেশি প্রসিদ্ধ। এক. আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু, যিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর উম্মতের মাঝে ছড়িয়ে পড়া দীন ত্যাগের বড় ফিতনাকে যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছেন। দুই. ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ যিনি জাহমিয়্যাহ, মু'তাযিলা ও অন্যান্য ফির্কার আক্রমনের বিরুদ্ধে পর্বতসম দাঁড়িয়েছিলেন। তিন. শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, যিনি বড় ফিতনার যুগে, দীনত্যাগকারী, শরী'আতের বিধান বাস্তবায়ন পরিত্যাগকারী মোগল-তাতারদের বিরুদ্ধে সব রকমের জিহাদ করেছেন। জাহমিয়্যাহ, মু'তাযিলা, আশ'আরিয়‍্যাহ, মাতুরিদিয়্যাদের বিরুদ্ধে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। শিয়াদের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন। তাসাওউফপন্থী বাতিল ব্যক্তি ও ফির্কার যাবতীয় সন্দেহের অপনোদন করেছেন।
তার মত এমন ব্যক্তিত্ব শত্রুবিহীন থাকবে এটা অস্বাভাবিক; তাই তো দেখতে পাই তৎকালীন এসব ফির্কার লোকের তার বিরুদ্ধে শাসকগোষ্ঠীকে ক্ষেপিয়ে তুলে। তার বিরুদ্ধে শত প্রকার ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে আরম্ভ করে, যার মাধ্যমে তারা আল্লাহর নূরকে ফুঁৎকারে নিভিয়ে দিতে চাইলো, কিন্তু আল্লাহ তো তাঁর নূর পূর্ণ করবেন বলে ওয়াদা করেছেন।
শাইখুল ইসলামের কাছে লোকেরা বিভিন্ন প্রশ্ন করতে আরম্ভ করে। তিনি তাদেরকে জবাব দিতে থাকেন। তেমনি একটি প্রশ্ন ছিল এ পুস্তিকাটির মূল বিষয়। শামদেশ তথা বর্তমান সিরিয়ার 'হামাহ' অঞ্চল থেকে কিছু লোক শাইখুল ইসলামকে 'আল্লাহর গুণাবলি সংক্রান্ত কিছু আয়াত ও হাদীস সম্পর্কে প্রশ্ন করে সেখানে কী আকীদা-বিশ্বাস গ্রহণ করতে হবে, কোন মানহাজের ওপর চলতে হবে তা নির্ধারণ করে দিতে বলেন, যার কারণে শাইখুল ইসলাম এ গ্রন্থটি রচনা করেন।
এ গ্রন্থটি রচনাকাল সম্পর্কে সকল বর্ণনা প্রায় ঐক্যসূত্রে বলে যে, সেটা ছিল হিজরী ৬৯৮ সালের রবিউল মাসের শুরুতে।
শাইখুল ইসলাম বলেন, 'আমাকে অনেকদিন আগে প্রশ্ন করা হয়েছিল, সময়টি ছিল ৬৯০ হিজরী এর কিছু পরে, তখন 'হামাহ' এলাকা থেকে আল্লাহর গুণ সংক্রান্ত কিছু আয়াত ও হাদীস বিষয়ে কিছু প্রশ্ন করা হয়েছিল, আমি তখন সেটার উত্তর অন্যদের থেকে নিতে বলি, কিন্তু তারা বারবার চাইল, আমিই যেন সেটার জবাব দিই, অতঃপর আমি সে জবাবটি লিখেছিলাম যোহর ও আসরের মাঝখানে একটি বসায়'.....।(১) তাছাড়া ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম ও ইমাম ইবন আব্দিল হাদীও উল্লেখ করেছেন যে, শাইখুল ইসলাম এ ফতোয়াটি লিখেছেন যোহর ও আসরের মধ্যকার সময়ে, কোনো এক বসায়। (২)
গ্রন্থে আলোচিত বিশেষ বিষয়সমূহ
এ গ্রন্থে আলোচিত বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে,
১- সিফাত সংক্রান্ত কিছু আয়াত ও হাদীসের ব্যাপারে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের নীতির দলীলভিত্তিক বর্ণনা।
২- সিফাতে খবরিয়‍্যাহ বা কুরআন ও সুন্নায় সাব্যস্ত আল্লাহর গুণাবলির বিষয়ে আলোচনা, যাতে তিনি আশ'আরী-মাতুরিদীদের মতবাদ খণ্ডন করেছেন এবং আহলুস সুন্নাতের মতাদর্শকে সাব্যস্ত করেছেন।
৩- সিফাতের ক্ষেত্রে মানুষের মাঝে প্রচলিত বিভিন্ন শ্রেণি ও তাদের বক্তব্যের সারকথা পেশ করা ও তার মধ্যে যা বাতিল তার অসারতা প্রমাণ করা।
গ্রন্থের ধারাবাহিকতায় আলোচ্য বিষয়সমূহ
এ গ্রন্থে যেসব বিষয়ের আলোচনা স্থান পেয়েছে তা ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করলে নিম্নোক্তরূপ দাঁড়ায়,
১- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈমানের অধ্যায়টি যথাযথ ও সুদৃঢ় করার পরেই কেবল দুনিয়া থেকে প্রস্থান করেছেন। আর আল্লাহর নাম ও গুণের বিষয়টি ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। বরং তা দীনের মূল, অন্তর যা অর্জন না করে কখনো প্রশান্ত হতে পারে না।
২- সাহাবায়ে কিরামের মতো বিদ্বান ব্যক্তিবর্গ আকীদার বিষয়াবলি, বিশেষ করে আল্লাহর সত্তা, নাম, গুণ ও কর্ম সম্পর্কে না জেনেই ঈমানদার হয়েছেন এমনটি অসম্ভব বিষয়।
৩- যারা বলে 'সালাফদের পদ্ধতি নিরাপদ, খালাফদের পদ্ধতি বিজ্ঞতা ও সুদৃঢ়' তাদের এ বক্তব্যের খণ্ডন। যাতে শাইখুল ইসলাম এটি স্পষ্ট করেছেন যে, যারা এ উপরোক্ত বক্তব্যটি দিয়েছে তারা সম্পূর্ণ ভুলের ওপর রয়েছে। কারণ, তারা সালাফদের ইলমের গভীরতা উপলব্ধি করতে পারেনি, সালাফগণকে অজ্ঞ বানিয়েছে, সালাফদের ওপর আল্লাহর নাম ও গুণ না বুঝার অপবাদ চাপিয়েছে, এর বিপরীতে তারা খালাফ তথা কালামশাস্ত্রবিদদেরকে আলেম বানিয়েছে, তাদের মতামতকে অকাট্য হিসেবে গ্রহণ করেছে। আর এখানেই রয়েছে যত পথভ্রষ্টতা।
৪- খালাফ তথা কালামশাস্ত্রবিদরা যে সারা জীবন বিভ্রান্তির পথে চলেছে সেটার প্রমাণ হিসেবে শেষ জীবনে এসে বড় বড় কালামশাস্ত্রবিদদের দ্বারা সেটার স্বীকৃতির বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
৫- উপরোক্ত ভূমিকার পরে আল্লাহর গুণাবলির আলোচনা করেন। প্রথমেই আল্লাহর 'উলু' বা ঊর্ধ্বে থাকার গুণটি কুরআন, সুন্নাহ দ্বারা সাব্যস্ত করেন, তারপর তা সাহাবায়ে কিরামের বক্তব্য, তাবে'য়ীদের আছার, সকল গ্রহণযোগ্য ইমামগণের কথা থেকে তুলে ধরেন।
৬- তারপর আল্লাহর 'উলু' বা ঊর্ধ্বে হওয়ার বিষয়টি মুতাওয়াতির হওয়ার প্রমাণ পেশ করেন। বরং এটাও সাব্যস্ত করেন যে, আল্লাহর ঊর্ধ্বে থাকা অত্যাবশ্যক জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত, যা ফিত্বরাত বা মানব মনের স্বাভাবিক প্রকৃতি সর্বদা স্বীকৃতি প্রদান করে।
৭- তারপর তিনি বলেন, কুরআন, সুন্নাহ ও সালাফে সালেহীন থেকে একটি বাণীও পাওয়া যাবে না, যা আল্লাহর ঊর্ধ্বে না থাকার ওপর প্রমাণবহ।
৮- তারপর তিনি যারা সিফাত বা আল্লাহর গুণাবলি অস্বীকার করে তাদের বক্তব্যে খণ্ডন করার দিকে দৃষ্টি প্রদান করেন। তাদের বক্তব্যের কী অর্থ দাঁড়ায় সেটা তুলে ধরার মাধ্যমে সেসব বক্তব্যের অসারতা প্রকাশ করে দেন। কারণ, যারা সিফাত অস্বীকার করে তাদের বক্তব্যের অর্থ দাঁড়ায়, 'হে আল্লাহর বান্দারা, তোমরা আল্লাহর মারেফাত লাভ, তাঁর জন্য কী গুণ থাকা আবশ্যক আর কী গুণ তাঁর থেকে না করতে হবে তার জন্য কুরআন, হাদীস ও সালাফে সালেহীনের বক্তব্যের দ্বারস্ত হয়ো না, বরং সেটার জন্য তোমাদের বিবেকের দাবির দিকে প্রত্যাবর্তন কর'। নাউযুবিল্লাহ, তাদের এ বক্তব্য যে সম্পূর্ণরূপে বাতিল তার প্রমাণ হচ্ছে,
* এর মাধ্যমে এটা আবশ্যক হয় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে সত্তার গুণাবলি বর্ণনা থেকে পিছপা হয়েছিলেন যিনি তাকে পাঠিয়েছেন।
* আরও আবশ্যক হয় যে, আল্লাহর কিতাব মানুষের জন্য হিদায়াতের আধার নয়, তাতে হিদায়াত নেই, তাতে অন্তরের আরোগ্য নেই, তাতে নূর নেই, বিবাদের সময়কার সমাধানও তাতে নেই।
* আরও আবশ্যক হয় যে, মানুষদেরকে নবুওয়াত ও রিসালাত ব্যতীত ছেড়ে দেয়াই উত্তম কাজ হতো; কারণ তাদের বক্তব্য অনুযায়ী নবুওয়াত ও রিসালাতের আগে ও পরের অবস্থা একই পর্যায়ের।
এসব কারণে যারা কুরআন ও সুন্নায় আসা সিফাতসমূহ অস্বীকার করে তাদের বক্তব্য সম্পূর্ণরূপে বাতিল।
৯- তারপর শাইখুল ইসলাম সিফাত নিষ্ক্রিয়াকারীদের মূল উৎস ও সূত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান দেন যে, সিফাত অস্বীকার করার পটভূমি ছিল অমুসলিম এলাকায়। প্রথম তা শুরু করেছিল জা'দ ইবন দিরহাম, তার থেকে তা গ্রহণ করেছিল জাহম ইবন সাফওয়ান, ফলে তার দিকেই তা সম্পৃক্ত হয়; কারণ সে এটার প্রচার-প্রসার করেছিল। বলা হয়ে থাকে যে, জা'দ ইবন দিরহাম সেটা গ্রহণ করেছিল বায়ান ইবন সাম'আন থেকে, সে তা নিয়েছিল লাবীদ ইবন আ'সাম এর বোনের ছেলে ত্বালুত থেকে, আর ত্বালুত তা নিয়েছিল লাবীদ ইবন আ'সাম ইয়াহুদী থেকে, যে ইয়াহুদী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জাদু করেছিল। আরও বলা হয়ে থাকে যে, জা'দ ছিল হাররানের অধিবাসী, যা ছিল সাবেয়ী ধর্মমত ও তথাকথিত দার্শনিক লোকদের চারণভূমি। তাই হতে পারে জা'দ ইবন দিরহাম সেখান থেকেই তা গ্রহণ করে থাকবে।
১০-তারপর শাইখুল ইসলাম বর্ণনা করেন যে, আজ আশ'আরী, মাতুরিদী ও অন্যান্য ফির্কার মাঝে যেসব তা'ওয়ীল নামীয় অপব্যাখ্যা পাওয়া যায়, আর যা ইবন ফুওরাক এর 'তাওয়ীলাত' গ্রন্থে ও রাযীর 'আসাসুত তাক্বদীস' গ্রন্থে দেখা যায়, তা হুবহু সেসব তা'ওয়ীল তথা অপব্যাখ্যা যা ইতোপূর্বে বিশর আল-মিররীসী প্রচার-প্রসার করেছিল। আর তৎকালীন আলেমগণ 'বিশর আল-মিররিসী' এর মতামত খণ্ডন করে গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।
১১- তারপর শাইখুল ইসলাম সেসব গ্রন্থের নাম বর্ণনা করেন, যাতে আল্লাহর নাম ও গুণের ব্যাপারে সালাফে সালেহীনের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।
১২- তারপর শাইখুল ইসলাম আল্লাহর নাম ও গুণের ব্যাপারে সালাফে সালেহীনের বক্তব্যের সারকথা তুলে ধরে বলেন, 'আল্লাহকে সেসব গুণ দিয়ে গুণান্বিত করা হবে, যা দিয়ে তিনি নিজেকে গুণান্বিত করেছেন আর যা দিয়ে তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে গুণান্বিত করেছেন এবং যা দিয়ে সাহাবায়ে কিরাম আল্লাহকে গুণান্বিত করেছেন। এ ব্যাপারে কুরআন ও হাদীসের ভাষ্য অতিক্রম করা যাবে না।' তারপর শাইখুল ইসলাম উপরোক্ত মূলনীতিটির ব্যাখ্যা করেন এবং সেসব নীতির বর্ণনা করেন যার ওপর সালাফে সালেহীনের মতাদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, আর তা হচ্ছে,
* আল্লাহর গুণাবলি 'তাওক্বীফী' বা কুরআন ও সুন্নাহর মাধ্যমে জানিয়ে দেয়ার মাধ্যমেই কেবল অর্জিত হতে হবে।
* আল্লাহ তা'আলা যেসব গুণাবলি দিয়ে তাঁর নিজেকে গুণান্বিত করেছেন তা হক্ক ও যথাযথ, তার প্রকৃত অর্থেই নিতে হবে, সেখানে কোনো ধাঁধা কিংবা অস্পষ্টতা নেই। যেভাবে বক্তার বক্তব্যের উদ্দেশ্য বুঝা যায় সেভাবেই এগুলোর অর্থ বুঝা যায়।
* এসব গুণাবলি সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে চারটি নিষিদ্ধ জিনিস থেকে দূরে থাকতে হবে।
সুতরাং আল্লাহর জন্য গুণ সাব্যস্ত করার সময় দুটি অবস্থান থেকে দূরে থাকতে হবে:
এক, তামসীল, সৃষ্টির কারও গুণের মত করে সাব্যস্ত করা যাবে না।
দুই. তাকয়ীফ, ধরণ নির্ধারণ করা যাবে না।
আর আল্লাহকে সৃষ্টির কারও গুণ থেকে মুক্ত করার সময়েও দুটি অবস্থান থেকে দূরে থাকতে হবে:
এক. তাহরীফ, বিকৃতি সাধন করা যাবে না। অর্থ কিংবা শব্দ, কিংবা উভয়টি।
দুই, তা'ত্বীল, অর্থশূন্য কিংবা নিষ্ক্রীয়করণ করা যাবে না।
সালাফগণের মতাদর্শ নিষ্ক্রীয়করণ কিংবা সাদৃশ্যতা প্রদান এ দুটি নীতির মাঝে সম্পূর্ণ আলাদা বিশুদ্ধ এক নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত।
১৩-তারপর শাইখুল ইসলাম এটা সাব্যস্ত করে দেখিয়েছেন যে, নিষ্ক্রীয়কারী ও সাদৃশ্য প্রদানকারী উভয় সম্প্রদায়ই নিষ্ক্রীয়করণ ও সাদৃশ্য প্রদানকে একসাথ করেছে।
* তন্মধ্যে যারা নিষ্ক্রীয়করণ করেছে, তারা আল্লাহর নাম ও গুণাবলির প্রকৃত অর্থ না বুঝে সেটাকে সৃষ্টির নাম ও গুণাবলির মত বুঝেছে, তারপর তারা অস্বীকার ও নিষ্ক্রীয়করণ করতে শুরু করে দিয়েছে।
* আর যারা সাদৃশ্য প্রদান করেছে, তারা স্রষ্টাকে সৃষ্টির মতো মনে করে বসেছে, এভাবে তারা আল্লাহ তা'আলা যে প্রকৃত গুণাবলির হক্কদার ছিল তা থেকে তাঁকে নিষ্ক্রীয় করেছে।
১৪- তারপর শাইখুল ইসলাম বর্ণনা করেন যে, কুরআন, সুন্নাহ বিরোধী ফির্কাসমূহ যেমন, দার্শনিক, জাহমিয়া, মু'তাযিলা, আশায়েরা ও মাতুরিদিয়া ফির্কাসমূহ, তারা আল্লাহর নাম ও গুণাবলির যাই অস্বীকার করেছে, এ ব্যাপারে তাদের কমন বক্তব্য হচ্ছে, 'এগুলো বিবেক বিরোধী'। অথচ তারাই আবার এ বিবেক বিরোধী হওয়ার নীতি নির্ধারণে নিজেদের মধ্যে প্রচণ্ড মতবিরোধে লিপ্ত, একদল যা বিবেক বিরোধী মনে করে অপরদল তা বিবেক বিরোধী মনে করে না। তাই শাইখুল ইসলাম বলেন, 'তাহলে কোন বিবেক দিয়ে কুরআন ও হাদীসের ভাষ্যকে মূল্যায়ণ করা হবে?'
১৫-তারপর শাইখুল ইসলাম বর্ণনা করেন যে, এ ব্যাপারে আবশ্যক হচ্ছে নবুওয়াতী নীতির অনুসরণ। অর্থাৎ কুরআন, সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা। আল্লাহ যা বর্ণনা করেছেন তা বলা, রাসূল যা বলেছেন তা গ্রহণ করা।
১৬-তারপর শাইখুল ইসলাম বর্ণনা করেন যে, যারা কুরআন ও সুন্নাহর বিরোধী তারা তিনটি উপদলে বিভক্ত:
এক. 'আহলুত তাখয়ীল' বা ধারণাবাদী গোষ্ঠী, তারা হচ্ছে তথাকথিত দার্শনিক ও তাদের অনুসারী কিছু কালামশাস্ত্রবিদ ও সূফী সম্প্রদায়। তাদের মত হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর ওপর ঈমান ও আখেরাতের ওপর ঈমানের ব্যাপারে যা যা বলেছেন সবই খেয়াল বা প্রশস্ত ধারণা প্রদান করেছেন, যাতে জনগণ তা দ্বারা উপকৃত হতে পারে, তিনি হক্ক বর্ণনা করেননি। (নাউযুবিল্লাহ)।
দুই, 'আহলুত তাওয়ীল' বা অপব্যাখ্যাকারী গোষ্ঠী। এরা হচ্ছে কালামশাস্ত্রবিদ সম্প্রদায়। তাদের মত হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর গুণাবলি সংক্রান্ত ভাষ্যসমূহের অর্থ বর্ণনা করেননি, সৃষ্টির কাউকেও সেগুলোর অর্থ সম্পর্কে ধারণা প্রদান করেননি, বরং 'তিনি চেয়েছেন, তারা যেন গবেষণা করে তা থেকে হক্ক অর্থ বিবেক দিয়ে বের করে নেয়, তারপর সিফাত সংক্রান্ত সেসব ভাষ্যকে তাদের সাধ্যমত অন্য দিকে ফিরিয়ে দেয়'। (নাউযুবিল্লাহ)। তারপর শাইখুল ইসলাম বলেন, এ ফাতাওয়া (আল-হামাওয়িয়্যাহ) দ্বারা কেবল এ সম্প্রদায়ের মতামত খণ্ডন করাকে উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে।
তিন, 'আহলুত তাজহীল' বা আজ্ঞেয়বাদী গোষ্ঠী। যারা বলে থাকে যে, আল্লাহর সিফাত সংক্রান্ত এসব ভাষ্যের অর্থ আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ জানে না। তিনিই কেবল তা জানেন। তাদের মতের অর্থ দাঁড়ায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামও এগুলোর অর্থ জানতেন না, অনুরূপভাবে জিবরীলও তা বুঝতেন না।
১৭- তারপর শাইখুল ইসলাম প্রসঙ্গের বাইরে গিয়ে 'তাওয়ীল' শব্দের তিন অর্থের বিস্তারিত দালিলিক বর্ণনা তুলে ধরেন। আরও বর্ণনা করেন যে, কালামশাস্ত্রবিদরা 'তা'ওয়ীল' দ্বারা যা বুঝে থাকে ও বুঝিয়ে থাকে তা হচ্ছে, 'শব্দকে তার প্রাধান্যপ্রাপ্ত অর্থ থেকে ফিরিয়ে অপ্রাধান্যপ্রাপ্ত অর্থের দিকে ধাবিত করা'। অথচ এটি কোনোভাবেই কুরআন ও সুন্নায় আসা তা'ওয়ীল শব্দের অর্থ নয়।
১৮-তারপর শাইখুল ইসলাম পূর্বের ও পরের ইমামগণ থেকে আল্লাহর সিফাতসংক্রান্ত অনেকগুলো উদ্ধৃতি উপস্থাপন করেন। আর সেগুলোতে নিজের টীকা সংযোজন করেন। তিনি প্রখ্যাত চার মাযহাবের ইমামগণের বক্তব্য আনয়ন করেন। আশ'আরী মতবাদের প্রাথমিক যুগের লোকদের বক্তব্যও উল্লেখ করেন। এমনকি তাসাওউফ এর বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের বক্তব্যও নিয়ে আসেন।
১৯- এসব বক্তব্য আনয়ন করার পর শাইখুল ইসলাম আল্লাহর 'ঊর্ধ্বে থাকা' ও 'আরশের উপর উঠা' এ গুণ দুটোর ওপর দলীল আনয়ন করেন। তারপর আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক বান্দার 'সাথে থাকা' গুণটির ওপর দলীল-প্রমাণাদি তুলে ধরেন। তারপর এ 'সাথে থাকা' গুণের সাথে ঊর্ধ্বে থাকা ও আরশের উপর থাকা' গুণের সমন্বয় নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি স্পষ্ট করতে সক্ষম হন যে, এগুলোর মধ্যে কোনো বিরোধ নেই; কারণ 'সাথে থাকা' কোনো ভাষাতেই সর্বদা স্পর্শ করা, কিংবা পাশাপাশি অবস্থান করা আবশ্যক করে না। বরং সেটির অর্থ অবস্থা ও অবস্থান অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।
২০-তারপর শাইখুল ইসলাম স্পষ্ট করেন যে, 'ফিস সামায়ি' বা 'আসমানে থাকা' এর অর্থ আসমান তাকে ঘিরে থাকা বুঝায় না। যে কেউ তা ধারণা করবে সে যদি তা অন্য কারো থেকে বর্ণনা করে তবে মিথ্যা বলেছে, আর যদি নিজে তার রব্ব সম্পর্কে এমন বিশ্বাস করে তবে পথভ্রষ্ট হয়েছে।
২১- এরপর শাইখুল ইসলাম একটি বিখ্যাত মাসআলার সমাধান করেছেন, তা হচ্ছে; কুরআন ও সুন্নাহর প্রকাশ্য অর্থ উদ্দেশ্য কি না? তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, 'প্রকাশ্য অর্থ' কথাটি ব্যাখ্যাসাপেক্ষ্য শব্দ; যাতে হক্ক অর্থ ও বাতিল অর্থ উভয়টি নেয়ার সুযোগ রয়েছে। সুতরাং যতক্ষণ প্রকাশ্য অর্থ বলতে কী বুঝানো হচ্ছে তা স্পষ্ট না করা হবে তখন এককথায় সেটার উত্তর দেয়া যাবে না।
২২-তারপর শাইখুল ইসলাম রাহিমাহুল্লাহ সিফাত সংক্রান্ত কুরআন ও সুন্নাহর ভাষ্যসমূহের 'প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করা বা না করা'র ব্যাপারে তাবৎ মানুষের ছয়টি অবস্থান তুলে ধরেন:
• দুটি গোষ্ঠী বলে, তারা প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করে থাকে, যদিও তাদের বক্তব্য এক নয়। এরা দু' ভাগে বিভক্ত:
এক. আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আহ, যারা সে প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করে যা আল্লাহর জন্য উপযোগী এবং যা কুরআন, সুন্নাহ ও সালাফে সালেহীনের বক্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্ট।
দুই. মুশাব্বিহা বা সাদৃশ্য প্রদানকারী গোষ্ঠী, যারা এগুলোকে সৃষ্টির মতো করে প্রকাশ্য অর্থ নির্ধারণ করে থাকে।
• আরও দুটি গোষ্ঠী বলে, তারা প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণের বিরোধী, যদিও তাদের বক্তব্য এক নয়। এরা দু' ভাগে বিভক্ত:
এক. সেসব মু'তাত্তিলা বা নিষ্ক্রীয়কারী সম্প্রদায়, যারা কোনো না কোনোভাবে এগুলোকে সিফাত বা গুণ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না, নিজেরা তা'ওয়ীল করে অপ্রকাশ্য অর্থ দাঁড় করায়। যেমন, জাহমিয়‍্যাহ ও মু'তাযিলা সম্প্রদায়। আর আশ'আরী ও মাতুরিদী সম্প্রদায়ের কিছু লোক। এদেরকে বলা হয় আহলুত তা'ওয়ীল।
দুই. সেসব গোষ্ঠী, যারা এসব ভাষ্যের প্রকাশ্য অর্থ করাকে অস্বীকার করে বলে এর অর্থ, তবে তারা এ ব্যাপারে একমত যে, এগুলো দ্বারা সিফাত সাব্যস্ত করা উদ্দেশ্য নয়। তারা এগুলোর কোনো অর্থই সাব্যস্ত করে না। যেমন, আশ'আরী ও মাতুরিদী সম্প্রদায়ের কিছু লোক। এদেরকে বলা হয় আহলুত তাফওয়ীদ্ব।
আরও দুটি গোষ্ঠী রয়েছে, যারা এ ব্যাপারে মৌনতা বা চুপ থাকার নীতি অবলম্বন করেছে। যদিও তাদের উভয়ের বক্তব্য এক নয়। এরা দু' ভাবে বিভক্ত:
এক. যারা বলে, এগুলো দ্বারা আল্লাহর সম্মান ও মর্যাদার সাথে উপযোগী অর্থ উদ্দেশ্য নেয়া যেতে পারে আবার এগুলো দ্বারা আল্লাহর গুণাবলি উদ্দেশ্য নাও হতে পারে।
দুই, যারা বলে, এ ব্যাপারে হ্যাঁ কিংবা না কিছুই বলতে চায় না। তারা কেবল এসব আয়াতের তেলাওয়াত ও এসব হাদীসের পাঠ ও খতম করার মাধ্যমেই নিজেদেরকে সীমাবদ্ধ রাখতে চায়।
বস্তুত এ ব্যাপারে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আত ব্যতীত প্রতিটি গোষ্ঠীই বাতিল ও পথভ্রষ্ট। এরা আল্লাহর তাওহীদুল আসমা ওয়াস সিফাতের অধ্যায়ে বিভ্রান্ত, দিকভ্রষ্ট ও কুফরীতে লিপ্ত রয়েছে।
২৩-কিতাবের শেষে এসে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ কালামশাস্ত্র ও ও যারা তাতে প্রবেশ করেছে তাদেরকে তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করেন:
এক. যারা কালামশাস্ত্রে নিজেদেরকে প্রবিষ্ট করায়নি। এরা নিরাপত্তা ও প্রশান্তিতে রয়েছে।
দুই, যারা কালামশাস্ত্রে নিজেদেরকে প্রবিষ্ট করিয়েছে, তার শেষে পৌঁছেছে। এরা কালামশাস্ত্রের অসারতা বুঝতে সক্ষম হয়েছে। এজন্য শেষ জীবনে সেটা থেকে ফিরে আসার ঘোষণা দিয়েছে ও আফসোস করেছে।
তিন, যারা কালামশাস্ত্রের মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে। এরা সবচেয়ে বিপদে রয়েছে। আগের দু' শ্রেণি যতটুকু নিরাপত্তা প্রাপ্ত তারা ততটুকু নিরাপদ হতে পারেনি। তারা নিজেরা কালামশাস্ত্র বুঝতে সক্ষম হয়নি, কেবল তাদের বড় বড় উস্তাদদের বুজকে নিয়ে মাত্রাতিরিক্তি বাড়াবাড়ি ও মতকে নিয়ে অতি ধারণার বশবর্তী হয়ে পথভ্রষ্টতায় অবস্থান করে নিয়েছে।
২৪-অতঃপর শাইখুল ইসলাম এরপর দুনিয়া নষ্ট করা চার শ্রেণির লোকের কথা উল্লেখ করেছেন: অর্ধ কালামশাস্ত্রবিদ, যার দ্বারা দীন ও আকীদা নষ্ট হয়। অর্ধ ভাষাবিদ, যার দ্বারা ভাষা নষ্ট হয়। অর্ধ ফকীহ, যার দ্বারা দেশ ও শরী'আত বিনষ্ট হয়। অর্ধ ডাক্তার, যার দ্বারা মানুষের শরীর বিনষ্ট হয়।
২৫-তারপর শাইখুল ইসলাম আল্লাহর গুণাবলির ক্ষেত্রে পথভ্রষ্টতার আসল কারণসমূহ বর্ণনা করেন। আর সবশেষে পথভ্রষ্টদেরকে তাদের পথভ্রষ্টতা থেকে প্রত্যাবর্তন করার জন্য কায়োমনেবাক্যে আল্লাহর শরণাপন্ন হওয়ার আহ্বান জানানোর মাধ্যমে তাঁর গ্রন্থটির সমাপ্তি টানেন।
ফাতওয়া আল-হামাউইয়্যাহ সম্পর্কে কালামশাস্ত্রবিদদের অবস্থান
ইলমুল কালাম এর পরিচিতি
আল-কালাম' অর্থ কথা, বাক্য, বক্তব্য, বিতর্ক ইত্যাদি। গ্রীক 'লগস' শব্দ থেকে কালাম শব্দটি গৃহীত হয়েছে। লগস শব্দটির অর্থ বাক্য, যুক্তিবৃত্তি, পরিকল্পনা ইত্যাদি। লগস শব্দ থেকে লজিক শব্দটির উৎপত্তি, যার অর্থ তর্কশাস্ত্র বা যুক্তিবিদ্যা। সম্ভবত মূল অর্থের দিকে লক্ষ্য রেখে হিজরী দ্বিতীয় শতকের আরব পণ্ডিতগণ লজিক শব্দের আরবী প্রতিশব্দ হিসেবে 'ইলমুল কালাম' (কথাশাস্ত্র) পরিভাষা ব্যবহার করেন। পরবর্তীকালে এই অর্থে 'ইলমুল মানতিক' শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যার আভিধানিক অর্থও 'কথাশাস্ত্র'। মোটকথা 'ইলমুল কালাম' বা 'ইলমূল মানতিক' বলতে 'দর্শনশাস্ত্র' বা 'তর্কশাস্ত্র' ভিত্তিক ধর্মতাত্ত্বিক আলোচনা বা গবেষণা বুঝানো হয়।
প্রাচীন যুগ থেকে দার্শনিকগণ মানবীয় যুক্তি, বুদ্ধি, জ্ঞান বা দর্শনের মাধ্যমে মানবীয় ইন্দ্রিয়ের অজ্ঞাত বিষয়সমূহ নিয়ে গবেষণা করেছেন। স্রষ্টা, সৃষ্টি, সৃষ্টির প্রকৃতি, স্রষ্টার প্রকৃতি, কর্ম, বিশেষণ ইত্যাদি বিষয়ে যুক্তি-তর্ক দিয়ে তারা অনেক কথা বলেছেন। এ সকল বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তিতর্ক মানুষকে অত্যন্ত আকর্ষিত করলেও তা কোনো সত্যে পৌঁছাতে পারে না। কারণ, মানুষ যুক্তি বা জ্ঞান দিয়ে স্রষ্টার অস্তিত্ব অনুভব করতে বা নিশ্চিত হতে পারে। কিন্তু স্রষ্টার প্রকৃতি, কর্ম, বিশেষণ, স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়ে চূড়ান্ত সত্যে পৌঁছাতে পারে না। এজন্য কখনোই দার্শনিকগণ এ সকল বিষয়ে একমত হতে পারেননি। তাদের গবেষণা ও বিতর্ক অন্ধের হাতি দেখার মতোই হয়েছে।(৩)
ইলমুল কালাম কীভাবে ও কখন মুসলিমদের মাঝে প্রসারিত হয়?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে মুসলিম সমাজে 'ইলমুল কালাম' দর্শনশাস্ত্র বা 'ইলমুল মানতিক' তর্কশাস্ত্রের কোনো পরিচিতি ছিল না। দ্বিতীয় হিজরী শতক থেকে বিশেষত ১৩২ হিজরী (৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ) সালে আব্বাসী খিলাফতের প্রতিষ্ঠার পর মুসলিম উম্মাহর মধ্যে গ্রীক, ভারতীয় ও পারসিক দর্শন প্রচার লাভ করে। তখন মূলধারার তাবে'য়ীগণ ও তাদের অনুসারীগণ আকীদাহ-বিশ্বাস বা গাইবী বিষয়ে 'ইলমুল কালাম' তথা দার্শনিক বিতর্ক কঠিনভাবে অপছন্দ করতেন। কারণ, তারা বিশ্বাস করতেন যে আকীদাহ-বিশ্বাস বা গাইবী বিষয়ে ওহী তথা আল-কুরআন ও সহীহ হাদীসের ওপর নির্ভর করা এবং ওহীর নিদের্শনাকে চূড়ান্ত বলে মেনে নেয়াই মুমিনের মুক্তির পথ। তারা আল-কুরআন, সহীহ হাদীস ও সাহাবীগণের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে আকীদাহ চর্চা করেছেন। এর বিপরীতে দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা নির্ভর আকীদাহ চর্চা কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। এমনকি তারা সঠিক আকীদাহ প্রমাণের জন্যও দর্শননির্ভর বিতর্ক নিষেধ করেছেন। কারণ, সালাফে সালেহীনের আকীদাহ চর্চা ও ইলমুল কালামের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য ওহী এবং আক্কল-এর।
সালাফে সালেহীনের আকীদাহ চর্চা ওহী নির্ভর, বিশেষত কুরআন, হাদীস ও 'আছার' বা সাহাবীগণের বক্তব্য নির্ভর। পক্ষান্তরে ইলমুল কালামের আকীদাহ চর্চা 'আক্কল' বোধশক্তি বা বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি ও দর্শননির্ভর। সালাফে সালেহীনের বক্তব্য সর্বদা নিম্নরূপ: "তোমার বিশ্বাস এরূপ হতে হবে; কারণ কুরআনে, হাদীসে বা সাহাবীগণের বক্তব্যে এরূপ বলা হয়েছে।" পক্ষান্তরে ইলমুল কালামের বক্তব্য নিম্নরূপ: "তোমাকে এরূপ বিশ্বাস করতে হবে; কারণ জ্ঞান, বিবেক ও যুক্তি এটিই প্রমাণ করে।"
ইলমুল কালাম চর্চার কিছু ক্ষতিকর দিক
ইলমুল কালাম' 'ইলমুল মানতিক' তথা দর্শনশাস্ত্র চর্চা মুসলিমদের কাঁধে চাপার ফলে কাদারিয়া, জাবারিয়া, জাহমিয়া, মু'তাযিলা, আশ'আরী, মাতুরিদী ইত্যাদি ভ্রান্ত মতবাদের জন্ম হয়। ফলে ওহী তথা কুরআন-সুন্নাহ নির্ভর, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কিরামের অনুসারী, সহীহ আকীদায় বিশ্বাসী আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আলেমগণ বিভিন্ন সময় এরূপ বাতিল ফিরকা দ্বারা নির্যাতিত-নিপীড়িত হয়েছেন। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল রাহিমাহুল্লাহকে নির্যাতন করার ঘটনা কার অজানা? পথভ্রষ্ট মু'তাযিলা ফিরকার আলেম, হানাফী মাযহাবের অনুসারী, বিচারপতি আহমাদ ইবন আবী দুআদ এর নির্দেশে আব্বাসী খলিফা মু'তাসিমের সম্মুখে ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল রাহিমাহুল্লাহকে নির্মমভাবে বেত্রাঘাত করা হয়েছে। এই সম্মানিত ইমামকে দীর্ঘদিন বন্দী রাখা হয়েছে। তার অপরাধ কী ছিল? তিনি মু'তাযিলা পথভ্রষ্টদের কুফরী আকীদায় বিশ্বাসী ছিলেন না। মু'তাযিলা পথভ্রষ্টরা বিভিন্ন রকমের ভ্রান্ত আকীদায় বিশ্বাসী ছিল, তারা বলতো: কুরআন সৃষ্ট বা মাখলুক এবং আখেরাতে আল্লাহকে দেখা যাবে না। আর ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ বলতেন: "কুরআন আল্লাহর কালাম এবং আল্লাহর সিফাত-গুণ। আল্লাহ যেমন সৃষ্ট নন তাঁর কালামও সৃষ্ট নয়। আর কুরআন-হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, আখেরাতে মুমিনগণ আল্লাহ তা'আলাকে দেখবেন"। মূলত এটাই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের সহীহ আকীদাহ। ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ'র আকীদাহও তা-ই।
আফসোসের বিষয় এই যে, বহু পূর্বকাল থেকেই কিছুলোক নিজেদেরকে ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ'র মাযহাবের অনুসারী বলে দাবি করে আসছেন। অথচ তারা ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ'র সহীহ আকীদায় বিশ্বাসী নন। এমনকি যারা ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ'র সহীহ আকীদায় বিশ্বাসী তাদেরকে এই নামদারী হানাফীরা বাতিল বলে ফাতোয়া দিয়ে নির্যাতন করে থাকেন। পথভ্রষ্ট মু'তাযিলা ফিরকার আলেম, হানাফী মাযহাবের অনুসারী, বিচারপতি আহমাদ ইবন আবী দুআদ-এর নাম এই দাবির চমৎকার উদাহরণ। এই নরাধম হানাফী হওয়া সত্ত্বেও ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ'র সহীহ আকীদায় বিশ্বাসী ছিল না। বরং ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ যিনি ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ'র ন্যায় সহীহ আকীদায় বিশ্বাসী, তাকে এই হতভাগা বিচারপতি 'মুশরিক' বলে কতলের নির্দেশ দিয়েছিল। এমনকি এই নরপশু নিজে ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ'র রক্তের দায় বহন করার ঘোষণা দিয়েছিল। (৪)
ইলমুল কালাম' দর্শনশাস্ত্র চর্চা মুসলিম সমাজে চেপে বসার কারণে পরবর্তীতে আশ'আরী মাতুরিদী নামে ভ্রান্ত মতবাদের জন্ম হয়। এই মতবাদের আলেমরা আল-কুরআন ও সহীহ হাদীসে বর্ণিত আল্লাহ তা'আলার অনেক সিফাতকে অস্বীকার করেন। এমনকি ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহ তা'আলার যেসব সিফাত বা গুণাবলিকে স্বীকার করেন সেসব সিফাতকেও তারা অপব্যাখ্যার মাধ্যমে অস্বীকার করেন। হানাফী, মালিকী ও শাফেয়ী মাযহাবের কিছু লোক আশ'আরী মাতুরিদী আকীদাহ গ্রহণ করে ফেলেন। আর তারা ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালিক ও ইমাম শাফে'য়ী রাহিমাহুমুল্লাহ'র সত্য-সঠিক সহীহ আকীদাকে বর্জন করেন। ইন্না-লিল্লাহি ওয়া ইন্না-ইলাইহি রাজিউন। তবে অধিকাংশ হাম্বলী মাযহাবের অনুসারীগণ তাদের ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ'র সহীহ আকীদায় অটল থাকেন।
আশ'আরী মাতুরিদীরা আল্লাহ তা'আলার যেসব সিফাত বা গুণাবলিকে অস্বীকার করেন সেসবের কয়েকটি হলো: আল্লাহ তা'আলার চেহারা, হাত, 'আরশের উপরে উঠা, শেষ রাতে নিকটতম আসমানে অবতরণ করা, ক্রোধ, সন্তুষ্টি, ভালোবাসা ইত্যাদি। এসব অস্বীকার করার কারণ হলো, আকীদাহ চর্চার ক্ষেত্রে তাদের ওপর 'ইলমুল কালাম' তথা দর্শন নামক অপছায়া পড়েছে।
দর্শন-কালামশাস্ত্রের নিন্দায় ইমামগণের বক্তব্য
সালাফে সালেহীন ইমামগণ 'ইলমুল কালাম' দর্শনশাস্ত্র বা 'ইলমুল মানতিক' তর্কশাস্ত্রের নিন্দা করে গিয়েছেন। যেমন, ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ'র পুত্র হাম্মাদ বলেন: এক শুক্রবারে আবু হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) আমার হাত ধরে মসজিদে প্রবেশ করেন।... তিনি দীন (আকীদাহ) বিষয়ে বিতর্কে (কালাম চর্চায়) লিপ্ত একদল মানুষের নিকট দিয়ে গমন করেন এবং আমাকে বলেন: বেটা! যে ব্যক্তি এ শাস্ত্রে পারদর্শিতা অর্জন করবে সে যিনদীক (ধর্মত্যাগী ও ধর্ম অবমাননাকারী) বলে আখ্যায়িত হবে এবং ইসলামের পরিমণ্ডল থেকে বহির্ভূত বলে গণ্য হবে। এভাবে সে এমন অবস্থায় পৌঁছাবে যে, তার দ্বারা কোনো কল্যাণ সাধিত হবে না।...হাম্মাদ ইবন আবী হানীফা বলেন: আমি এরূপ বিতর্কের বিষয়ে খুবই আগ্রহী ছিলাম। শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর এ কথার পরে আমি এ জাতীয় বিতর্ককে পরিত্যাগ করি।
ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ'র ছাত্র নূহ ইবন আবী মারইয়াম বলেন: "আমি আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহকে বললাম: মানুষেরা ইলমুল কালামে (স্রষ্টার অস্তিত্ব, অনাদিত্ব ও বিশেষণ প্রমাণে) 'আরদ্ব' (অমৌল-পরনির্ভর) 'জিসম' (দেহ) ইত্যাদি বিষয়ক আলোচনা উদ্ভাবন করেছে। এগুলোর বিষয়ে আপনার মত কী?
তিনি বলেন: এগুলো দার্শনিকদের কথাবার্তা। তোমার দায়িত্ব হাদীসের ওপর নির্ভর করা এবং পূর্ববর্তীদের (সাহাবী-তাবে'য়ীদের) তরীকা অনুসরণ করা। সাবধান! সকল নব-উদ্ভাবিত বিষয় বর্জন করবে; কারণ তা বিদ'আত।"
ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ'র ছাত্রগণও ইলমুল কালাম চর্চা নিষেধ করতে থাকেন। ইমাম আবু ইউসুফ রাহিমাহুল্লাহ (১৮৯ হি.) তাঁর ছাত্র ইলমুল কালামের বিশেষজ্ঞ ও মু'তাযিলী পণ্ডিত বিশর আল-মাররীসী (২১৮ হি.)-কে বলেন: "কালামের জ্ঞানই হলো প্রকৃত অজ্ঞতা আর কালাম সম্পর্কে অজ্ঞতাই হলো প্রকৃত জ্ঞান। ইলমুল কালামে সুখ্যাতির অর্থ তাকে যিনদীক বা অবিশ্বাসী-ধর্মত্যাগী বলা হবে।"
ইমাম আবু ইউসুফ রাহিমাহুল্লাহ আরও বলেন: “যে ব্যক্তি ইলমুল কালাম শিক্ষা করবে সে যিনদীকে পরিণত হবে।"
ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু ২০৪ হি.) বলেন "যারা ইলমুল কালাম চর্চা করে তাদের বিষয়ে আমার আদেশ এই যে, তাদেরকে খেজুরের ডাল ও জুতা দিয়ে পেটাতে হবে, এভাবে মহল্লায় মহল্লায় ও গোত্র-গোষ্ঠীসমূহের মধ্যে ঘুরিয়ে বেড়াতে হবে এবং বলতে হবে: যারা কুরআন ও সুন্নাহ ছেড়ে ইলমুল কালামে মনোনিবেশ করে তাদের এ শাস্তি।"(*)
এভাবে প্রসিদ্ধ চার মুজতাহিদ ইমাম এবং দ্বিতীয়-তৃতীয় হিজরী শতকের সকল প্রসিদ্ধ আলেম, ইমাম, ফকীহ ও মুহাদ্দিস অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ইলমুল কালামের নিন্দা করেছেন। পরবর্তী যুগে ইমাম আবু হানীফা ও অন্যান্য ইমামের অনুসারী অনেক আলেম আহলুস সুন্নাতের আকীদাহ ব্যাখ্যার জন্য ইলমুল কালাম চর্চা করেছেন। বিভ্রান্ত ফিরকাসমূহের বিভ্রান্তির উত্তর প্রদানের প্রয়োজনেই তারা ইলমুল কালামের পরিভাষা ও পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন বলে তারা উল্লেখ করেছেন। তবে তারা ইলমুল কালামের 'দার্শনিক অপছায়া' থেকে বের হতে পারেননি। তাদের আলোচনায় সর্বদা কুরআন, হাদীস বা ওহীর বক্তব্যের চেয়ে যুক্তি-তর্ক ও দর্শন প্রাধান্য পেয়েছে।
ইমামগণ বা সালাফে সালেহীনের আকীদাহ চর্চা ওহী নির্ভর, বিশেষত হাদীস ও 'আছার' বা সাহাবীগণের বক্তব্য নির্ভর। পক্ষান্তরে ইলমুল কালাম 'আক্কল' অর্থাৎ জ্ঞানেন্দ্রিয়, বোধশক্তি বা বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি ও দর্শননির্ভর।
'ইলমুল কালাম' এর বিপরীতে ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ'র ভূমিকা
শাইখুল ইসলাম, মুজাদ্দিদ, ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ'র যামানায় 'ইলমুল কালাম' দর্শনশাস্ত্র বা 'ইলমূল মানতিক' তর্কশাস্ত্র খুব গুরুত্ব সহকারে চর্চা করা হতো। অথচ এ বিদ্যার উৎস কুরআনও নয় হাদীসও নয়। এমনকি মক্কা-মদীনা থেকে আগতও নয়। বরং ইউনান গ্রীক থেকে আমদানী কৃত শুদ্ধ ও ভুলে ভরা কিছু পেচানো কথাবার্তা মাত্র। হিজরী সপ্তম শতাব্দিতে দর্শন-কালামশাস্ত্রের তোড়জোড় খুব বেশি ছিল। হিজরী ষষ্ঠ শতাব্দিতেও এর প্রভাব ছিল। 'এমনকি মুসলিমগণ কুরআন-সুন্নাহ অধ্যয়ন ছেড়ে গ্রীক দর্শন বা কালামশাস্ত্র নিয়ে ব্যস্ত হওয়া (এবং এর ফলে সালাফে সালেহীনের সহীহ আকীদাহ থেকে বিচ্যুত হয়ে দলে দলে বিভক্তি) ৬৫৬ হিজরীতে তাতারীদের দ্বারা বাগদাদ ধ্বংসের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শাইখুল ইসলাম ইবন দাকীকুল ঈদ রাহিমাহুল্লাহ এই কারণটি চিহ্নিত করেছেন'।
হিজরী সপ্তম শতাব্দিতে ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ দর্শন-কালামশাস্ত্রের জয়-জয়কার সর্বত্র দেখতে পান। ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ দর্শন-কালামশাস্ত্র শুধু পড়েননি বরং এর ভেতরকার ত্রুটি-বিচ্যুতি সম্পর্কেও অবগত বিজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি দর্শন-কালামশাস্ত্রের দুর্বলতা ও ভুল-ভ্রান্তি অতি নিপুণ হাতে লিপিবদ্ধ করেন। দার্শনিকদের কাল্পনিক অট্টালিকায় প্রচণ্ড ভূমিকম্প সৃষ্টি করেন। কালামবিদ তথা মুতাকাল্লিমীনের চোখে আঙ্গুলি দিয়ে তাদের ভুল-ত্রুটি দেখিয়ে দেন।
ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ কালামশাস্ত্রের মূলনীতিগুলোর মধ্যে বেশ কিছু মূলনীতিকে সংজ্ঞা, প্রমাণ ও যুক্তিগত দিক থেকে ত্রুটিপূর্ণ সাব্যস্ত করে সেগুলোকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি এই ব্যাপারে বৃহদাকারের গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার লিখিত 'দারউ তা'আরুদিল আক্কল ওয়ান নাক্কল' গ্রন্থটির ভূমিকায় উল্লিখিত বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা রয়েছে।
শাইখুল ইসলাম বলেন, আমি বহু পূর্ব থেকেই জানি যে, ইউনানী মানতিক মেধাবীদের কোনো প্রয়োজনে আসবে না আর মেধাহীনদেরও কোনো উপকার সাধন করবে না। তবে আমি আগে মনে করতাম যে, মানতিকের সূত্রাবলি সঠিক। পরে আমার নিকট ধরা পড়ল যে, মানতিকের অনেক সূত্রাবালিতে ভুলও রয়েছে। এ ব্যাপারে আমি লিখেছিও বটে।
আমি যখন আলেক্সান্দ্রিয়াতে ছিলাম তখন এমন অনেকের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে, যারা তর্কশাস্ত্রবিদদের ভয়ানক মুকাল্লিদ-অন্ধ অনুসারী। ফলে আমি তাদেরকে এই শাস্ত্রের অজ্ঞতা ও ভ্রষ্টতা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান করি। আমি এই বিষয়ে যোহর ও আসরের মধ্যবর্তী সময়ে এক বৈঠকে মানতিকের ব্যাপারে একটি রচনা লিপিবদ্ধ করেছিলাম। 'ইলমুল কালাম' 'ইলমুল মানতিক' তথা দর্শনশাস্ত্র ভিত্তিক আকীদাহ চর্চার ফলে কাদারিয়া, জাবরিয়া, জাহমিয়া, মু'তাযিলা, আশ'আরী, মাতুরিদী ইত্যাদি ভ্রান্ত মতবাদ সৃষ্টি হয়। ফলে কুরআন-সুন্নাহ নির্ভর, সহীহ আকীদায় বিশ্বাসী আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আলেমগণ বাতিল ফিরকা দ্বারা নির্যাতিত-নিপীড়িত হন। ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ'র ন্যায় শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহও 'ইলমুল কালাম' 'ইলমুল মানতিক' তথা দর্শনশাস্ত্র ভিত্তিক আকীদাহ চর্চাকারী বাতিল ফিরকার ভ্রান্ত আলেমদের দ্বারা নির্যাতিত হন। তিনি আশ'আরী-মাতুরিদী আকীদার আলেমদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে বহুবার কারাগারে আবদ্ধ হয়েছেন। এমনকি বিশ্ববিখ্যাত এই মুজাদ্দিদ আলিমে-দীন কারাগারেই মারা গেছেন। কারণ, আশ'আরী-মাতুরিদী আকীদার পথভ্রষ্ট আলেমগণই তখন কাজী-বিচারপতি পদে নিযুক্ত ছিলেন।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ এবং তার পূর্বপুরুষগণ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অন্যতম ইমাম, বিশ্ববরেণ্য আলেম, ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ'র অনুসারী ছিলেন। ফলে তারা আকীদাহ ও আমল উভয় ক্ষেত্রে সত্য-সঠিক বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ তখনো চল্লিশ বৎসর বয়সে পদার্পণ করেননি। সিরিয়ার একটি শহর 'হামাত' থেকে আল্লাহ তা'আলার সিফাত-গুণাবলি সম্পর্কে ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞাসা করা হয়। তিনি যোহর ও আসরের মধ্যবর্তী সময়ের ভিতরে 'ফাতওয়া আল-হামাউইয়্যাহ' নামে গুরুত্বপূর্ণ আমাদের এ পুস্তকটি রচনা করেন। তিনি এতে আল্লাহর সিফাত-গুণাবলি বিষয়ে আল-কুরআন ও সহীহ হাদীসভিত্তিক সালাফে সালেহীনের অনুসৃত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আকীদাহ লিপিবদ্ধ করেন। বস্তুত কুরআন, সুন্নাহ, সালাফে সালেহীন, চার ইমামের আকীদাহ এবং ইমাম ইবন তাইমিয়‍্যাহ রাহিমাহুল্লাহ'র আকীদাহ'র মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ আকীদাহ হামাউইয়্যাহ এবং আকীদাতুল ওয়াসিত্বিয়াহ নামে দু'টি কিতাব রচনা করার পর বলেন: "যারা আমার বিরোধিতা করছেন, আমি তাদের সকলকে তিন বৎসরের সময় দিলাম; তারা যদি আমার লিখিত আকীদাহ'র একটি হরফও 'কুরুনে সালাসা'-সোনালী তিন যুগের লোকদের একজনেরও বিপরীত বলে প্রমাণ করতে পারেন তাহলে আমি তা থেকে রুজু-প্রত্যাবর্তন করবো।”
আহলুল কালামের মাঝে শাইখুল ইসলামের লেখা ফাতওয়া আল-হামাউইয়্যাহ আল- কুষরার প্রতিক্রিয়া
ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ আল-কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে ফাতাওয়া আল- হামাওয়িয়্যাহ লেখার পর 'ইলমুল কালাম' দর্শনশাস্ত্রের কালো ছায়ায় গড়ে উঠা আশ'আরী- মাতুরিদী আকীদায় বিশ্বাসী বিদ'আতী আলেমরা তার বিরুদ্ধে ক্ষেপে যান। কারণ, তারা দীর্ঘদিন যাবৎ সাধারণ মুসলিমগণকে এই বিভ্রান্ত আকীদাহ শিক্ষা দিয়ে আসছেন। এখন কুরআন-সুন্নাহর আলোকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম, তাবে'য়ীন ও চার ইমামের সহীহ আকীদাহ প্রচার করলে তারা বিপদে পড়বেন। তাদের গোমরাহী প্রকাশ পেয়ে যাবে। তারা জনগণের আক্রোশে পড়বেন। জনগণকে সঠিক ইসলামী আকীদাহ'র পরিবর্তে বিদ'আতী আকীদাহ শিখানো হলো কেন এর কৈফিয়ত দিতে হবে। তাদেরকে গণ-আদালতে আসামী হিসেবে দাঁড়াতে হবে। অপদস্থ ও লাঞ্ছিত হয়ে আশ'আরী-মাতুরিদীর ভ্রান্ত আকীদাহ বর্জন করে সালাফে সালেহীনের সঠিক আকীদাহ গ্রহণ করতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, জনসাধারণ জেনে যাবে যে, আশ'আরী-মাতুরিদী আকীদাহ ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ'র আকীদাহ নয়। ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ'র আকীদাহও নয়। ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ'র আকীদাহও নয়। ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ'র আকীদাহও নয়। বরং তাদের আকীদাহ হলো সালাফে সালেহীনের সঠিক ইসলামী আকীদাহ, যা ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ লিপিবদ্ধ করেছেন। এই সত্য প্রকাশ পেলে আশ'আরী-মাতুরিদী আকীদাহ'য় বিশ্বাসী আলেমগণ বিপদে পড়বেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কিরাম, তাবেয়ীন, বিখ্যাত চার ইমাম তথা সালাফে সালেহীনের সহীহ ইসলামী আকীদাহ'র বিপরীতে জনসাধারণকে আশ'আরী-মাতুরিদীর বিদ'আতী আকীদাহ শিক্ষা দেয়ার অভিযোগ উঠবে। তখন আলেমরা কী বলে গণবিদ্রোহ থেকে নাজাত লাভ করবেন? বিদ'আতী আলেমরা এই ভয়ে ভীত হয়ে পড়লেন। তারা নিজেদেরকে গণবিদ্রোহ থেকে বাঁচানোর জন্য ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ'র বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন শুরু করলেন। এ ব্যাপারে তারা দু'টি পদ্ধতি অবলম্বন করলেন:
এক. সরাসরি বিরোধিতা
শাইখ আলামুদ্দীন আল-বিরযালী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ৬৯৮ হিজরী সনের রবিউল আউয়াল মাসের প্রথম দিকে ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ'র বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয় এবং মাস ব্যাপী চলতে থাকে।
আন্দোলনকারী বিদ'আতীরা ইমামের বিরুদ্ধে সিরিয়ার নায়েব সুলতানের নিকট নালিশ দিতে চাইল। কিন্তু তারা জানে যে, নায়েব সুলতান ইমামের জ্ঞান সমুদ্রের তলদেশ থেকে মণি-মুক্তা আহরণকারী। কারণ, কিছুদিন পূর্বে নুজুমীরা ইমামের বিরুদ্ধে নায়েব সুলতানের নিকট নালিশ দিয়েছিল। কিন্তু পরিণাম ফল সম্পূর্ণ উল্টো হয়েছে।
ঘটনাটি হলো এই যে, ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ নুজুমী-জ্যোতিষী বা তারকা দেখে ভবিষ্যতের সংবাদ প্রদানকারীদের কার্যকলাপের প্রতিবাদ করেন। তিনি বলেন, চন্দ্র-সূর্য ও গ্রহ- নক্ষত্রের বিভিন্ন অবস্থার কারণে মানুষের জীবনে সুখ-দুঃখ, উত্থান-পতন, উন্নতি-অবনতি ইত্যাদি ঘটে না। তাছাড়া নক্ষত্র দেখে কেউ কারো ভবিষ্যতের কোনো কথা বলতে পারে না। জ্যোতিষীরা আনুমানিক কথা বলে থাকে। ফলে তাদের একশ' কথার মধ্যে এক-দু'টি কথা কখনো বাস্তবে পরিণত হয়। জ্যোতিষীদের কথা ও কাজে বিশ্বাস করা তাওহীদ পরিপন্থী বিষয়। তাওহীদপন্থী মুসলিমরা জ্যোতিষীদের কথা কখনো বিশ্বাস করতে পারেন না।
ফলে জ্যোতিষীরা নায়েব সুলতান আমীর সাইফুদ্দীন জাগান এর নিকট ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ'র বিরুদ্ধে নালিশ দেয়। সুলতান তাকে তলব করেন। তিনি সুলতানের দরবারে উপস্থিত হয়ে নুজুমী-জ্যোতিষীদের অসারতা ফুটিয়ে তুলেন। এতে নায়েব সুলতান সন্তুষ্ট হন এবং ইমামের প্রতি উচ্চধারণা পোষণ করেন এবং মাঝে মাঝে তাকে ইলমী বিষয়ে আলাচনা শুনিয়ে ইসলামী জ্ঞান দানের অনুরোধ জানান।
উল্লিখিত ঘটনার কারণে বিদ'আতীরা নায়েব সুলতানের নিকট ইমামের বিরুদ্ধে নালিশ দেয়ার সাহস পায়নি। তারা দামেশকের কাজী-বিচারক ও ফকীহ-মুফতীগণের নিকট গিয়ে ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ'র বিরুদ্ধে মিথ্যা কথা-বার্তা বর্ণনা করে তাদেরকে ক্ষেপিয়ে তুলতে চেষ্টা করে।
তারা বলে যে, তিনি বলেন, আল্লাহর জিসিম-দেহ রয়েছে (নাউযুবিল্লাহ)। অথচ ইমামের বক্তব্য হলো আল্লাহর গুণাবলি কুরআন-হাদীসে যতটুকু পাওয়া যায় ততটুকু যেভাবে বর্ণিত হয়েছে সেভাবে বিশ্বাস করতে হবে। কোনো রকম বিকৃতি, অস্বীকৃতি বা অপব্যাখ্যার আশ্রয় নেয়া যাবে না। আবার কোনো গুণের ধরন-গঠন মুখে প্রকাশ বা অন্তরে কল্পনাও করা যাবে না। এমনকি কোনো গুণকে মাখলুক বা সৃষ্টির কোনো কিছুর সাথে উপমা-তুলনা বা সাদৃশ্য পেশ করা যাবে না। কেননা, আল্লাহর মতো কোনো কিছুই নেই। আল্লাহ তা'আলার গুণাবলি তেমনই, যেমন তাঁর জন্য শোভনীয়। যেমন, ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহকে আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপরে উঠার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলো। তখন তিনি বলেন, আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপরে উঠেছেন এ কথা আমাদের জানা আছে। তবে উপরে উঠার ধরন-গঠন আমাদের অজানা। জানা বিষয়ে ঈমান রাখা ওয়াজিব। আর অজানা বিষয়ে প্রশ্ন করা বিদ'আত।
শাইখুল ইসলামের বিরোধী চক্রের সাথে জালালুদ্দীন আবুল আব্বাস আহমাদ ইবন কাজী হুসামুদ্দীন রুমী হানাফী (মৃত্যু ৭৪৫ হি.) একমত হন। তিনি বিরোধী চক্রের সাথে দারুল হাদীস আশরাফিয়া মাদ্রাসায় এসে ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহকে সেখানে উপস্থিত হতে লোক পাঠান। কিন্তু জালালুদ্দীন হানাফীর ডাকে ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ সাড়া দেননি। বরং তিনি কাজীকে তার দায়িত্ব কর্তব্যের পরিধি দেখিয়ে দেন। তিনি তাকে লিখে পাঠান যে, কে কোন আকীদাহ পোষণ করে তা আপনার বিচারের আওতাধীন বিষয় নয়। সুলতান তো আপনাকে মানুষের ঝগড়া-বিবাদ ফায়সালার দায়িত্ব দিয়েছেন মাত্র।
ইমামের লিখিত চিরকুট হানাফী কাজীর নিকট পৌঁছলে বিদ'আতীরা তাকে উত্তেজিত করে তুলতে চেষ্টা করলো। তারা বললো, কাজী সাহেব! দেখুন, তিনি আপনার ডাকে সাড়া দেননি। বরং আপনাকে কীভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
হানাফী কাজী তখন 'ইবন তাইমিয়্যাহর আকীদাহ সঠিক নয়' বলে শহরে প্রচার করার আদেশ দিলেন। ফলে তার আদেশে শহরের কোথাও কোথাও তা প্রচার করা শুরু হলো।
নায়েব সুলতান সাইফুদ্দীন জাগান সঙ্গে সঙ্গে একদল পুলিশ পাঠিয়ে দিলেন। তারা প্রচারকারী ও তাদের সঙ্গী সাথীদেরকে বেত্রাঘাত করতে থাকেন। তারা চরমভাবে লাঞ্ছিত-অপদস্থ হয়ে এলোপাথাড়ি দৌড়ে আত্মরক্ষা করে।
অতঃপর নায়েব সুলতান এই অপকর্মের হোতা ও তার সঙ্গীদেরকে দরবারে তলব করেন। হতভাগা বিদ'আতীরা নায়েব সুলতানের দরবারে হাযির হতে সাহস পায়নি। নায়েব সুলতানের আদেশে সরকারি লোকজন তাদেরকে সারা শহরে খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু তারা ভয়ে আত্মগোপন করে ফেলে। তারা নিরুপায় হয়ে বদরুদ্দীন আতাবাগীর শরণাপন্ন হয়। তারা তার বাড়িতে গিয়ে ঘটিত বিষয় থেকে দায়মুক্ত করে দিতে নিবেদন জানায়। বদরুদ্দীন আতাবাগী নায়েব সুলতানের ক্রোধ প্রশমিত হওয়ার পর বিষয়টি মীমাংসা করে দেন।
ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ'র আকীদাহ নিয়ে প্রথম বৈঠক
৬৯৮ হিজরী সনের ১৩ই রবিউল আউয়াল শুক্রবার ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ জুমু'আর সালাতের পর জামে উমাওয়ীতে তাফসীর পেশ করেন। তিনি সেদিন সূরা আল-কামারের ৪নং আয়াত "নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী" এই আয়াতের তাফসীর পেশ করেছিলেন। সেদিন তাফসীরে বহু লোকের সমাগম হয়েছিল। তখন ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ'র আকীদাহ প্রসঙ্গটি দামেশকের সবচেয়ে বহুল আলোচিত বিষয় হিসেবে স্থান পায়।
তিনি আল্লাহ তা'আলার গুণাবলি সম্পর্কে কী আকীদাহ পোষণ করেন বা তিনি আকীদায়ে হামাওয়িয়‍্যাহ পুস্তকে কী লিখেছেন তা জানার জন্য সকলের মধ্যে কৌতূহল দেখা দেয়। তাই ১৪ই রবিউল আউয়াল শনিবার কাজী ইমামুদ্দীন শাফে'য়ী রাহিমাহুল্লাহ'র বৈঠকখানায় দামেশকের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে শাইখুল ইসলাম মুজাদ্দিদে যামান মুজতাহিদ ইমাম ইবন তাইমিয়‍্যাহ উপস্থিত হয়ে তার লিখিত আকীদায়ে হামাওয়িয়্যাহ পুস্তকের ব্যাখ্যা প্রদান করেন। সকাল বেলা বৈঠক আরম্ভ হয় এবং রাতের এক-তৃতীয়াংশ সময় পর্যন্ত বৈঠক চলতে থাকে। দীর্ঘ বৈঠকে তার পুস্তক পাঠ করা হয়। যেখানেই কোনো প্রশ্ন দেখা দেয় সেখানেই তিনি ব্যাখ্যা প্রদান করেন।
তার ব্যাখ্যাকে হাকিম-বিচারকের পক্ষ থেকে অথবা উপস্থিত কারো তরফ থেকে কোনো ধরনের ইনকার বা প্রত্যাখ্যান করা হয়নি। পরিশেষে কাজী ইমামুদ্দীন শাফে'য়ী একথা ঘোষণা করলেন যে, কেউ যদি শাইখুল ইসলামের আকীদাহ'র ব্যাপারে কটুক্তি করে তাহলে তাকে শাস্তি দেয়া হবে।
কেননা তাঁর লিখিত আকীদাহ আল-কুরআন ও সহীহ হাদীসভিত্তিক। তিনি আকীদাহ হামাওয়িয়‍্যাহ পুস্তকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কিরাম, তাবেয়ীন, মুজতাহিদ ইমামগণ তথা সালাফে সালেহীনের সঠিক ইসলামী আকীদাহ লিপিবদ্ধ করেছেন।
সেদিন বিরোধী চক্র তার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সকল প্রকার ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত করতে কোনো ধরনের ত্রুটি করেনি। তিনি উপযুক্ত উত্তর দিতে ব্যর্থ হলে তাকে কী ধরনের শাস্তি দেয়া হতে পারে তা নিয়ে আলোচনা জমজমাট ছিল। তাদের মুখ থেকে এমন জঘন্য উক্তি বের হচ্ছিল যা প্রকাশ করাও লজ্জাজনক। তবে উক্ত ঘটনার পরিণাম ফল শাইখুল ইসলামের জন্য খুবই লাভজনক হয়েছে বলে নেক ও উত্তম লোকদের ধারণা, যা লিখতে চাইলে স্বতন্ত্র পুস্তক হবে।
বিরোধীরা সোচ্ছার হয়ে উঠলো
উপরে যা আলোচনা করা হলো তা ছিল ৬৯৮ হিজরী সনের কথা। ৭০৫ হিজরী সনে বিরোধীরা আবার নতুনভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। ইতোমধ্যে শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ তাতারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ব্যাপক পরিচিতি ও সুনাম-সুখ্যাতি অর্জন করেছেন। কিসরোয়ান পর্বতবাসী শিয়াদের বিরুদ্ধে সফল অভিযান চালিয়ে সকলকে তাক লাগিয়ে বীর-বাহাদুরী ও বিচক্ষণতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি ভ্রান্ত পীর-ফকীরের ঝুলি-ঝালা ও গোপন কারামত সব ফাঁস করে দিয়েছেন। তিনি পাথর পূজার ছোট বড় বহু আস্তানা উচ্ছেদ করে শির্ক নির্মূলের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। দর্শন-কালামশাস্ত্রের বহু মূলনীতির ভ্রান্ততা ফুটিয়ে তুলে গ্রন্থ রচনা করেছেন। জ্যোতিষীদের মিথ্যা বাহাদুরী জনসাধারণ ও সরকারি মহলে প্রকাশ করেছেন। খারেজী, রাফেযী, জাহমিয়্যাহ, জাবরিয়‍্যাহ, কাদারিয়‍্যাহ, আশ'আরী, মাতুরিদী ইত্যাদি ভ্রান্ত ফিরকার বিরুদ্ধে লিখনী, বক্তৃতা ও বাহাস-বিতর্ক করে সত্যকে সুপ্রতিষ্ঠিত ও মিথ্যাকে ভূলুণ্ঠিত করার সংগ্রাম করে যাচ্ছিলেন। তাই এসব আকীদার ধারক-বাহকরা মিসর সরকারের উচ্চ মহলের সাথে একত্রিত হয়ে ইবন তাইমিয়াহ রাহিমাহুল্লাহ'র বিরুদ্ধে কঠিন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। তারা মিসরের বিচারপতি ও উলামায়ে কিরামকে শাইখুল ইসলামের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার চেষ্টা চালায়। সে প্রচার করে যে, তিনি বিদ'আতী, খারাপ আকীদাহ'র লোক। সকলে মিলে মিসরের সুলতানের নিকট ইমাম ইবন তাইমিয়‍্যাহ'র বিরুদ্ধে নালিশ দেন। মিসরের সুলতান তখন শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবন তাইমিয়াহ'র আকীদাহ-বিশ্বাস তদন্ত করার প্রয়োজন অনুভব করলেন।
ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ'র আকীদাহ নিয়ে দ্বিতীয় বৈঠক
মিসরের সুলতান সিরিয়ার নায়েব সুলতানকে শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ'র আকীদাহ-বিশ্বাস ভালোভাবে পরীক্ষা করে রিপোর্ট প্রদানের ফরমান লিখে পাঠান। মিসরের সুলতানের ফরমান পেয়ে সিরিয়ার নায়েব সুলতান ৭০৫ হিজরী সনের ৮ই রজব সোমবার দামেশকে ইমাম ইবন তাইমিয়াহ রাহিমাহুল্লাহ'র আকীদাহ পরীক্ষা করার জন্য মুনাযারাহ-অনুসন্ধান বৈঠকের আয়োজন করেন। উক্ত বৈঠকে মিসরের আমীর চার মাযহাবের কাজী ও তাদের সহযোগী, মুফতী, মাশায়েখ, আলেম-উলামা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে আমন্ত্রণ জানান। নায়েব সুলতানের সভাপতিত্বে সরকারি ভবনে বৈঠক শুরু হয়। সে বৈঠকেও শাইখুল ইসলাম তাদেরকে লা জাওয়াব করে দেন।
ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ'র আকীদাহ নিয়ে তৃতীয় বৈঠক
প্রথম দিনের অসমাপ্ত বৈঠক তিনদিন পর ১২ রজব শুক্রবার দ্বিতীয় দফা বর্ধিত আকারে অনুষ্ঠিত হয়। এতে শাইখ সাফী উদ্দীন হিন্দী আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবন আব্দুর রহিম শাফে'য়ী আল-মুতাকাল্লিম (মৃত্যু ৭১৫ হি.)-কে শাইখুল ইসলামের সাথে বাহাস করতে আনা হয়। তিনি সেদিন বিরোধীদের শীর্ষ ব্যক্তি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি তাদের মাঝে দর্শন-কালামশাস্ত্রে পারদর্শী ব্যক্তি। তিনি শাইখুল ইসলামের সাথে সাধ্যমতো বাহাস করেন। কিন্তু শাইখুল ইসলামের সাথে বেশি সময় টিকতে পারেননি। শাইখুল ইসলাম তাকে অপারগ ও নিশ্চুপ করে দেন। এভাবে হেরে গিয়ে তারা অন্যভাবে এগিয়ে আসল।
দ্বিতীয় পদ্ধতি: মিথ্যাচার করে গ্রন্থ রচনার পদ্ধতি
এ পদ্ধতির প্রথম লেখক হিসেবে ধরা হয় ইবন জাহবলকে। তার পূর্ণ নাম হচ্ছে, শিহাবুদ্দীন আহমাদ ইবন ইয়াহইয়া ইবন ইসমা'ঈল ইবন তাহের ইবন জাহবল আশ- শাফেয়ী। ইবন জাহবল চেষ্টা করেছিলেন শাইখুল ইসলামের ফাতাওয়া আল-হামাওয়িয়‍্যাহ এর রদ্দ করতে। তার এ গ্রন্থটি শাইখুল ইসলামের শত্রু ও সালাফী আকীদার শত্রু তাজউদ্দীন আস-সুবুকী তার ত্বাবাক্বাতুশ শাফে'ঈয়্যাহ আল-কুবরা গ্রন্থে পুরোপুরি নিয়ে আসেন। কিন্তু যারা সহীহ আকীদাহ সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন তারা এ গ্রন্থ পড়লে সহজেই সেটার অসারতা বুঝতে পারবেন। গ্রন্থটিকে তিনি একটি ভূমিকা ও তিনটি অংশে বিভক্ত করেন। ভূমিকাতে যারা আল্লাহর জন্য দিক সাব্যস্ত করবে তাদেরকে 'হাশাওয়িয়‍্যাহ' উপাধি দিয়ে অযথা মিথ্যারোপ করতে থাকে। তারপর যখন মূল আলোচনায় আসল, তখন প্রথমেই তার ধারণা মোতাবেক আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আকীদাহ তুলে ধরল, যা কখনও দলীল দ্বারা প্রমাণ করা হয়নি, কেবল দাবি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বরং কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবায়ে কিরামের আছার এর বিরোধিতা করে কালামশাস্ত্রবিদদের আকীদাকে বিশুদ্ধ প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। তারপর শাইখুল ইসলামের ওপর রদ্দ করার অযাচিত চেষ্টা করেছে। যাতে তিনি কোনো দলীল না এনে শাইখুল ইসলামের আনীত আয়াত, হাদীস, আছার এর বিবেকপ্রসূত জবাব প্রদান করেছে। কখনও কখনও সালাফদের কথার বিপরীতে সূফী সম্প্রদায়ের অসমর্থিত কিছু বক্তব্য উপস্থাপন করেছে। এ গ্রন্থে লেখকের বড় অস্ত্র হচ্ছে শাইখুল ইসলামের বিরুদ্ধে অসত্য তথ্য প্রদানের অভিযোগ প্রদান ও বিবেকপ্রসূত আপত্তি উপস্থাপন।
আলহামদুলিল্লাহ, পরবর্তীতে শাইখ আহমাদ ইবন ইবরাহীম ইবন ঈসা তার 'তানবীহুন নাবীহ ওয়াল গাবী' গ্রন্থে ইবন জাহবল এসব সন্দেহ ও অপবাদের বিস্তারিত জবাব দিয়েছেন।
তাছাড়া শাইখুল ইসলাম নিজেও তার 'জাওয়াবুল ই'তিরাদ্বাতুল মিসরিয়‍্যাহ আলাল ফাতওয়াল হামাওয়িয়্যাহ' গ্রন্থে সেসব সন্দেহের উত্তর দিয়েছেন। যদিও সেটি সরাসরি উক্ত গ্রন্থের রদ্দ নয়। কিন্তু শাইখুল ইসলাম তখনকার সময়ের লোকদের কিছু সন্দেহের উত্তর প্রদান করেছেন অথবা হতে পারে শাইখুল ইসলাম নিজেই ইবন জাহবলের সেসব অপবাদের উত্তর দিয়েছেন।
শাইখুল ইসলামের বিরোধীরা তার বিরুদ্ধে যেসব মিথ্যা অভিযোগ প্রদান করেছে তার সারকথা হচ্ছে,
১- তিনি আল্লাহর জন্য দিক সাব্যস্ত করার মাধ্যমে তাকে সৃষ্টির মুখাপেক্ষী করেছেন।
২- তিনি আল্লাহকে 'আরশের উপর সাব্যস্ত করার মাধ্যমে আল্লাহকে সৃষ্টির মুখাপেক্ষী করেছেন।
৩- তিনি আল্লাহকে আসমানের অভ্যন্তরে সাব্যস্ত করেছেন।
৪- তিনি আল্লাহ তা'আলাকে সীমাবদ্ধ করেছেন।
৫- তিনি আল্লাহর এসব গুণাবলি সাব্যস্ত করার মাধ্যমে আল্লাহকে সৃষ্টির সদৃশ সাব্যস্ত করেছেন।
৬- তিনি নিজেও অপব্যাখ্যা করেছেন।
এসব সন্দেহ ও অপবাদের উত্তর আমরা শাইখুল ইসলামের গ্রন্থ থেকেই প্রদান করব:
আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপর উঠা, 'আরশের উপর অবস্থান করা ও এ জাতীয় অন্যান্য সিফাতে খবরিয়্যাহ এর ব্যাপারে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহর ওপর আরোপিত বিভিন্ন অভিযোগ ও তার জবাব
দুর্ভাগ্যবশত শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহর মত এ মর্দে মুজাহিদের ওপর মিথ্যাচারের পর মিথ্যাচার করা হয়েছে। কেউ তাকে দেহবাদী মুজাসসিমা বলেছে। কেউ তাকে বলেছে মুসাব্বিহা বা সাদৃশ্য স্থাপনকারী। কেউ বলেছে, তিনি আল্লাহকে 'আরশের উপর মানুষের বসার মতো বসার কথা বলেছেন। কেউ বলেছে, তিনি আল্লাহর নিকটতম আসমানে অবতরণ করাকে মানুষের মতো করে অবতরণ করার কথা বলেছেন। বস্তুত এসবই তার ওপর মিথ্যাচার। তিনি কখনও এমন কথা বলেননি। শত্রুরা সব সময়েই মিথ্যাচার করে মজা পায়। আমরা শাইখুল ইসলামের কিছু বক্তব্য উল্লেখ করব, যার মাধ্যমে প্রমাণিত হবে যে, তিনি এসব কিছু বলেননি। যেমন- তিনি বলেন,
১- আল্লাহ তা'আলা জগতের উপরে, জগত থেকে পৃথক, সৃষ্টিকুল তাকে সীমাবদ্ধ করতে পারে না, তাকে জায়গা দিতে পারে না, তিনি 'আরশ বা অন্য কিছুর মুখাপেক্ষী নন, তদুপরি তিনি 'আরশের উপরে, সৃষ্টিকুল থেকে আলাদা, তাদের অনুরূপ নয়, তাদের উপর যা ঘটা বৈধ তাঁর উপর তা বৈধ নয়।(৬)
২- নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপর, তিনি 'আরশের ভেতরে নন অথবা 'আরশের প্রতি তাঁর মুখাপেক্ষিতাও নেই।(৭)
৩- আল্লাহ তা'আলা তিনি স্রষ্টা, তিনি সবকিছু থেকে অমুখাপেক্ষী, তিনি তাঁর সত্তা, গুণ ও কর্মের জন্য তাঁর থেকে আলাদা কোনো কিছুর মুখাপেক্ষী নন। বরং যা কিছুই তাঁর থেকে আলাদা তা-ই তাঁর মুখাপেক্ষী। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা এই পৃথক জিনিস থেকে সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী, সেই পৃথক সৃষ্টিই বরং তাঁর মুখাপেক্ষী। সুতরাং তিনি নিত্য-নতুন যেসব কাজ নিজের সত্তা দ্বারা সম্পন্ন করেন সেসব কাজ করতে তাঁর থেকে পৃথক কোনো কিছুর প্রতি মোটেও মুখাপেক্ষী নন।(৮)
৪. আল্লাহ তা'আলাকে কোনো কিছুর সাথে তুলনা করা যাবে না, ফলে তুলনাকৃত সত্তা ও বস্তু দু'টি কিয়াস করার বিধানের ক্ষেত্রে সমান হয়ে যাবে; বরং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা প্রত্যেকটি প্রশংসার সবচেয়ে বেশি হকদার এবং মন্দ ও নিন্দনীয় বিষয় থেকে অনেক দূরে। সুতরাং এমন পরিপূর্ণ খাঁটি-নির্ভেজাল গুণাবলি থেকে যেকোনো ধরনের ত্রুটিমুক্ত গুণের প্রসঙ্গ আসলে তিনি এককভাবে তার সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত হকদার হবেন, অন্যদিকে ত্রুটিপূর্ণ অপরিপক্ক গুণাবলি থেকে যেকোনো ধরনের গুণের প্রসঙ্গ আসলে তার প্রত্যেকটি থেকে তাঁকে পবিত্র বা মুক্ত ঘোষণা করাটা অধিক বাঞ্চনীয় হবে।(৯)
৫. রূহ তথা আত্মার ব্যাপারে বলা হয় যে, যখন মানুষ ঘুমায়, তখন রূহ ঊর্ধ্বে গমন করে; আর এটা সত্ত্বেও তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মধ্যে থাকে, সম্পূর্ণভাবে তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে না। রূহের ব্যাপারে কথিত এই ঊর্ধ্বে গমনকে দৃশ্যমান বস্তুসমূহের ঊর্ধ্বে গমনের সাথে তুলনা করা যাবে না। কারণ, দৃশ্যমান বস্তু যখন এক জায়গা থেকে অন্য কোনো জায়গায় গমন করে, তখন তা প্রথম জায়গা থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়; আর তার ওপরের দিকে চলাচলটা হয় এক জায়গা থেকে অন্য কোনো জায়গায় প্রস্থানের চলাচল। আর রূহের ঊর্ধ্বে গমন ও নিচে অবতরণের বিষয়টি ঐ রকম নয়।
সুতরাং মহান রব আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার ব্যাপারে যখন তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেন যে, তিনি (আল্লাহ) প্রত্যেক রাতে নিকটতম আসমানে অবতরণ করেন এবং 'আরাফার দিন হাজীগণের নিকটবর্তী হন, তখন এর থেকে এটা আবশ্যক হয় না যে, এ কাজগুলো আমাদের সামনে দৃশ্যমান বস্তুর অবতরণের মতো কোনো কর্মকাণ্ডের শ্রেণিভুক্ত হবে; যেগুলোতে সাধারণত এক জায়গা খালি করা এবং অপর জায়গাতে অবস্থান আবশ্যক করে। কারণ, রূহের অবতরণ ও ঊর্ধ্বে গমনও তো এটাকে আবশ্যক করে না; তাহলে জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ তা'আলার ব্যাপারে এমন কথা কীভাবে প্রযোজ্য হবে?! অনুরূপভাবে ফেরেশতাগণ কর্তৃক এ জাতীয় ঊর্ধ্বে গমন ও নিচে অবতরণের বিষয় রয়েছে। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম (আল্লাহর জন্য) যেসব নাম ও গুণাবলি (সিফাত) ঠিক করেছেন, তা অস্বীকার করা বৈধ হবে না; আরও বৈধ হবে না এগুলোকে সৃষ্টিসমূহের গুণাবলির সাথে তুলনা করা; বিশেষ করে সৃষ্টিসমূহের মধ্য থেকে আমরা যাকে দেখতে পাই না, তার সাথে তুলনা করা। কারণ, আমরা সৃষ্টিসমূহের মধ্য থেকে যাকে দেখতে পাই না, তার জন্য যেসব নাম ও গুণাবলি সাব্যস্ত আছে, সৃষ্টিসমূহের মধ্য থেকে যাকে আমরা দেখতে পাই, তার সাথে যখন তা সাদৃশ্যপূর্ণ ও লাগসই নয়, তাহলে তা কীভাবে জগতসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহর সাথে মানানসই হতে পারে, যিনি যাবতীয় সৃষ্টির পারস্পরিক সদৃশ্যতা বা সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ার ধ্যান-ধারণা থেকে বহু দূরে?! প্রত্যেক সৃষ্টিই আরেক সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হতে পারে; কিন্তু স্রষ্টার কোনো কিছুই তার সৃষ্টির সাথে তুলনা হতে পারে না; তিনি পবিত্র, মহিমান্বিত এবং যালিমরা যা বলে তা থেকে তিনি বহু ঊর্ধ্বে।(১০)
৬. অকাট্যভাবে যা বলা অপরিহার্য তা হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা যেসব গুণাবলি দ্বারা তাঁর নিজেকে গুণান্বিত করেছেন, সেগুলোতে সৃষ্টির কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়; لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ সুতরাং যে ব্যক্তি তাঁকে সৃষ্টির কোনো কিছুর গুণাবলির সাথে তুলনা করবে, সে ব্যক্তি চরম ভুল করবে; ঐ ব্যক্তির মতো যে বলে, আল্লাহ অবতরণ করার অর্থ: আল্লাহ নড়াচড়া করেন ও প্রস্থান করেন যেমনিভাবে মানুষ বাড়ির ছাদের উপর থেকে নিচে অবতরণ করে। যেমন ঐ ব্যক্তির কথা, যে বলে: আল্লাহ অবতরণ করার অর্থ 'আরশ তাঁর থেকে খালি বা মুক্ত হয়ে যায়; ফলে তাঁর অবতরণ করার বিষয়টি হবে এক জায়গাকে খালি করে অন্য জায়গাকে ব্যস্ত রাখা। এটা তো বাতিল কথা, মহান রবকে এর থেকে মুক্ত ও পবিত্র রাখা ওয়াজিব.........। কারণ, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা ঘোষণা করেছেন যে, তিনি সর্বোচ্চ সুমহান, তিনি বলেন: )سَبَحٍ أَسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى﴿ “আপনি আপনার সুমহান রবের নামের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করুন” [সূরা আল-আ'লা: ০১]...। সুতরাং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা সকল কিছুর চেয়ে সর্বোচ্চে, তেমনিভাবে তিনি সবকিছুর চেয়ে বড়; ফলে তিনি যদি বিশ্বজগতের কোনো কিছুর নিচে অবস্থান নেন, তাহলে তাঁর কিছু সৃষ্টির অবস্থান হবে তাঁর উপরে এবং তিনি তখন সর্বোচ্চ থাকবেন না; আর এটা তিনি নিজেকে যেভাবে গুণান্বিত করে বর্ণনা করেছেন তার বিপরীত।(১১)
৭. 'আরশ ও অন্যান্য সৃষ্টির ঊর্ধ্বে তাঁর অবস্থান করা, সেগুলোর প্রতি তাঁর প্রয়োজন বা অভাব অনুভব করাকে আবশ্যক করে না; কারণ, আসমানের অবস্থান পৃথিবীর অনেক উপরে, অথচ সে তার প্রতি মুখাপেক্ষী নয়; আবার বায়ুর অবস্থানও যমীনের উপরে, অথচ বাতাসও যমীনের মুখাপেক্ষী নয়; অনুরূপভাবে ফেরেশতাগণের অবস্থানও যমীনের উপরে, অথচ তারাও যমীনের নিকট কোনো কিছুতে মুখাপেক্ষী নয়। সুতরাং ঊর্ধ্বে অবস্থানকারী সৃষ্টি যখন নিচে অবস্থানকারীর প্রতি মুখাপেক্ষী হওয়াকে অপরিহার্য করে না, তখন সর্বোচ্চে অবস্থানকারী, সকল কিছুর স্রষ্টা, সকল বস্তুর থেকে মুখাপেক্ষিতাহীন সত্তা আল্লাহ তা'আলা গোটা সৃষ্টিজগতের উপরে থাকা সত্ত্বেও তাদের প্রতি তিনি কোনো প্রকারের মুখাপেক্ষিতা ও প্রয়োজনের দ্বারস্থ নন।
৮. এটা আরও উত্তমভাবে বুঝা যায়। (১২)
নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর আকাশসমূহের উপরে, তাঁর 'আরশের উপরে, তাঁর সৃষ্টি থেকে পৃথক; কোনো বিদ্যমান বস্তুর দ্বারা তাঁর সীমাবদ্ধ বা পরিবেষ্টিত হওয়ার বিষয়টি অসম্ভব......। আরও অসম্ভব তাঁর সৃষ্টিসমূহের কোনো কিছুর প্রতি তাঁর মুখাপেক্ষিতা; 'আরশের প্রতিও নয় এবং তা ব্যতীত অন্য কোনো কিছুর প্রতিও নয়; বরং তিনি তাঁর কুদরত তথা শক্তিমত্তা দ্বারা 'আরশ ও তার বহনকারীগণের ধারক-বাহক। কারণ, সৃষ্টিজগৎ থেকে পৃথক সত্তা, সেগুলোর উপরে অবস্থানকারীর জন্য এটা অসম্ভব যে, তিনি সৃষ্টিসমূহের কোনো কিছুর অভ্যন্তরভাগে অবস্থান করবেন।(১৩)
৯. 'আরশকে যখন দিক, স্থান কিংবা জুড়ে থাকা জায়গা নামকরণ করা হয়, তখন আল্লাহ তা'আলাই কিন্তু তার রব ও স্রষ্টা; আর 'আরশ আল্লাহ তা'আলার মুখাপেক্ষী, যেমনিভাবে সৃষ্টি তার স্রষ্টার প্রতি মুখাপেক্ষী। আল্লাহ সকল দিক থেকেই 'আরশ থেকে মুখাপেক্ষিতাহীন। (১৪)
১০. আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত সাব্যস্ত করেন যে, আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপরে আছেন; আর 'আরশের বাহকগণ তাদের অন্যদের চেয়ে আল্লাহর খুব নিকটবর্তী; আর উপরের আসমানে অবস্থানকারী ফেরেশতাগণ দ্বিতীয় আকাশে অবস্থানকারী ফেরেশতাগণের চেয়ে আল্লাহর বেশি কাছাকাছি (১৫), আর নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যখন আকাশের দিকে ঊর্ধ্বে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন তাঁর ঊর্ধ্বে গমনের মাধ্যমে তিনি ক্রমান্বয়ে তাঁর প্রভুর খুব নিকটবর্তী হতে থাকেন; আর তাঁর ঊর্ধ্বে গমনের বিষয়টি ছিল আল্লাহর দিকে, নিছক তাঁর সৃষ্টিকুলের কোনো এক সৃষ্টির দিকে নয়। অনুরূপভাবে সালাত আদায়কারীর রূহ আল্লাহর নিকটবর্তী হয় সাজদার মধ্যে, যদিও তার শরীর নিচে পড়ে থাকে। কুরআন-সুন্নাহর বক্তব্য এর ওপরই প্রমাণবহ। (১৬)
১১. কুরআন-সুন্নাহর বক্তব্যগুলোর সব ক'টিই এটি প্রমাণ করছে যে, আল্লাহ তা'আলা সকল সৃষ্টির উপর, ঊর্ধ্বে এবং তিনি 'আরশের উপরে উঠেছেন। আল্লাহ তা'আলাকে 'আরশের উপর উঠেছেন' এ গুণে গুণান্বিত করা হলে, কোনো ভ্রান্ত ধারণাকারী বাক্তি মনে করতে পারে যে, তাঁর উপরে উঠার বিষয়টি মানুষ কর্তৃক নৌযানে ও গৃহপালিত জন্তুর পিঠে উঠার মতোই; যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন: (وَجَعَلَ لَكُم مِّنَ الْفُلْكِ وَالْأَنْعَامِ مَا تَرْكَبُونَ لِتَسْتَوُوا عَلَى هُورِهِ ) জন্য সৃষ্টি করেছেন এমন নৌযান ও গৃহপালিত জন্তু যাতে তোমরা আরোহণ করে থাক; যাতে তোমরা এর পিঠে চড়তে পার..." [সূরা আয-যুখরুফ: ১২-১৩]। তারপর সে (ভ্রান্ত চিন্তাবিদ) চিন্তা করে যে, তিনি (আল্লাহ) যখন 'আরশের উপর উঠেন, তখন তিনি তার মুখাপেক্ষী হয়ে যান, যেমনিভাবে নৌযান ও গৃহপালিত জন্তু উপর আরোহণকারী ব্যক্তি এসব বাহনের মুখাপেক্ষী হয়; ফলে যদি নৌযান ছিদ্র হয় বা ফেটে যায়, তাহলে তাতে আরোহণকারী ব্যক্তি নিচে পড়ে যাবে; আবার বাহন হিসেবে গ্রহণ করা প্রাণিটি যদি হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়, তাহলে তাতে আরোহণকারী ব্যক্তি ছিটকে পড়ে যাবে। সুতরাং এর ওপর কিয়াস করে বলা হয়; যদি 'আরশ না থাকে, তাহলে মহান রব আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা নিচে পড়ে যাবেন (না'উযু বিল্লাহ) ...
বস্তুত এ ভুল বা বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে 'আরশের উপর আল্লাহর আরোহণ করার প্রকৃত অর্থ ও তাৎপর্য অনুধাবন করার ক্ষেত্রে তার ভুলের কারণে; কেননা সে ধারণা করেছে যে, এটা 'আরশের উপর উঠার বিষয়টি মানুষ কর্তৃক নৌযানে ও গৃহপালিত জন্তুর পিঠে উঠার মতোই।
অথচ এই (اِسْتِوَاءٌ বা উপরে উঠা) শব্দটির মধ্যে এমন কিছু নেই, যা এই রকম অর্থ নির্দেশ করে; কারণ আল্লাহ তাঁর মহান সত্তার দিকে (اِسْتِوَاءٌ উপরে উঠা) শব্দটিকে সম্পর্কযুক্ত করেছেন, যেমনিভাবে তিনি তাঁর সকল কর্মকাণ্ড ও গুণাবলিকে স্বীয় সত্তার প্রতি সম্পর্কযুক্ত করেছেন....। তিনি উন্মুক্তভাবে শুধু (اِسْتِوَاءٌ উপরে উঠা) শব্দটিকে উল্লেখ করেননি, যা সৃষ্টির জন্য উপযোগী হতে পারে; আবার তিনি এটাকে এমন ব্যাপকভাবেও উল্লেখ করেননি যা সৃষ্টিকুলকে অন্তর্ভুক্ত করবে; (যেমনটি তিনি অন্যান্য সকল গুণের ক্ষেত্রেও অনুরূপ উন্মুক্ত কিংবা ব্যাপক নীতি অবলম্বন করেননি) বরং তিনি اِسْتِوَءٌ )উপরে উঠা) শব্দটিকে তাঁর মহান সত্তার দিকে সম্পৃক্ত করে উল্লেখ করেছেন।
সুতরাং (ধরে নেয়া অসম্ভব বস্তু হওয়ার পরও) যদি মেনে নেয়া হয় যে, তিনি তাঁর সৃষ্টির মতো (আল্লাহ এর থেকে মহান ও পবিত্র), তাহলে তাঁর (اِسْتِوَاءٌ উপরে উঠা) এর বিষয়টি সৃষ্টির (اِسْتِوَاءٌ উপরে উঠা) এর মতো হতে পারত; কিন্তু বাস্তবে যেহেতু তিনি তাঁর সৃষ্টির সদৃশ নন; বরং দৃঢ়ভাবে জানা গেল যে, তিনি সৃষ্টির মুখাপেক্ষী হওয়া থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত এবং তিনি 'আরশ ও অন্য সবকিছুর স্রষ্টা; আর তিনি ভিন্ন বাকি সবকিছু তাঁর মুখাপেক্ষী; আর তিনি যাবতীয় কিছুর অভাব ও প্রয়োজন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত; তাই বুঝা গেল যে, তিনি বিশেষ (اِسْتِوَءُ উপরে উঠা) এর কথা বলেছেন, যা একান্তভাবে তাঁর সাথে সম্পৃক্ত; তিনি তার এ (اِسْتِوَءُ উপরে উঠা) গুণটিকে এমনভাবে বর্ণনা করেননি যা অন্যকে অন্তর্ভুক্ত করবে, আর তা (অন্যের) জন্য উপযোগীও নয়; যেমনিভাবে তিনি তাঁর জ্ঞান, শক্তি-সামর্থ্য, তাঁর দেখা, শ্রবণ করা এবং তাঁর সৃষ্টি করার ব্যাপারে শুধু তাই উল্লেখ করেছেন যা তাঁর সাথে বিশেষভাবে নির্দিষ্ট; সুতরাং কীভাবে এ ধারণা করা জায়েয হবে যে, তিনি যখন 'আরশের উপর উঠেছেন তখন তিনি 'আরশের মুখাপেক্ষী হয়ে যান, (কীভাবে এ ধারণা করা জায়েয হবে যে,) যদি 'আরש পড়ে যায়, তাহলে তিনি তার উপর থেকে পড়ে যাবেন (নাউযুবিল্লাহ)। তিনি পবিত্র, মহিমান্বিত এবং যালিম ও অবিশ্বাসীগণ যা বলে, তিনি তা থেকে বহু ঊর্ধ্বে।
ঐ ব্যক্তি নিরেট মূর্খ ও পথভ্রষ্ট ছাড়া আর কিছুই নয়, যে ব্যক্তি এ জাতীয় বুঝ বুঝেছে ও ধারণা করেছে অথবা সে মনে করতে পারে যে, তার এ ধারণা করা বুঝটি শব্দের বাহ্যিকরূপ ও অর্থ অথবা জগতসমূহের প্রতিপালকের ব্যাপারে এ রকম ধারণা করাটাকে জায়েয মনে করে, যিনি সৃষ্টিকুল থেকে সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী! বরং যদি ধরে নেয়া হয় যে, যদি কোনো জাহিল ব্যক্তি এরকম উপলব্ধি ও চিন্তা-ভাবনা করে, তাহলে তাকে স্পষ্টভাবে বলে দিতে হবে যে, এরকম চিন্তা করাটা বৈধ নয়; তাকে আরও বলে দিতে হবে যে, আল্লাহর জন্য ব্যবহৃত اِسْتِوَاءُ )উপরে উঠা) শব্দটি এরকম কিছু বুঝায় না; যেমনিভাবে মহান রব কর্তৃক তাঁর নিজকে যা দ্বারা বিশেষিত ও গুণান্বিত করেছেন সেসব গুণের ক্ষেত্রেও অনুরূপ কিছু বুঝায় না। (১৭)
১২. নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করেছেন এমনভাবে, যার এক অংশ আরেক অংশের উপর কিন্তু তিনি তার উপরের সৃষ্টিকে নিচের সৃষ্টির মুখাপেক্ষী করেননি; যেমন, বায়ু যমীনের উপরে, অথচ সে যমীন কর্তৃক তাকে বহন করার মুখাপেক্ষী নয়; আবার মেঘমালাও যমীনের উপরে, অথচ সেও মুখাপেক্ষী নয় যমীন কর্তৃক তাকে বহন করার; আবার আকাশসমূহও যমীনের উপরে, অথচ আকাশগুলোও যমীন কর্তৃক তাদেরকে বহন করার মুখাপেক্ষী নয়।
অতএব, সকল কিছুর সুমহান প্রতিপালক ও মালিক যখন তাঁর সকল সৃষ্টির উপরে, তখন কীভাবে আবশ্যক হবে তাঁর সৃষ্টিকুলের প্রতি, অথবা তাঁর 'আরশের প্রতি তাঁর মুখাপেক্ষী হওয়ার বিষয়টি?! অথবা কীভাবে সৃষ্টির উপরে তাঁর থাকা এ মুখাপেক্ষিতা আবশ্যক করবে? অথচ তা সৃষ্টিকুলের মধ্যে আবশ্যক নয়!
আর এটা জানা কথা যে, যখন কোনো সৃষ্টির জন্য অন্যের প্রতি মুখাপেক্ষিহীনতা প্রমাণিত, তখন সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা অন্য কারো মুখাপেক্ষী না হওয়ার বিষয়টি আরও বেশি সত্য ও উত্তমরূপে প্রমাণিত। (১৮)
১৩. আল্লাহ তা'আলার বাণী: ﴿ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ﴾ "তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠলেন" [সূরা আল-আ'রাফ: ৫৪], অর্থাৎ তিনি 'আরশের উপরে হওয়ার বিষয়টি এটা দাবি করে না যে, তাঁর اِسْتِوَاءُ তথা উপরে উঠার বিষয়টি সৃষ্টির اِسْتِواءُ )উপরে উঠা) এর মতো হতে হবে। (১৯)
১৪. আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক তাঁর 'আরশের উপর (استواء) (আরোহণ) এর বিষয়টি বাস্তব এবং বান্দা কর্তৃক নৌযানের উপর (استواء) (আরোহণ) এর বিষয়টিও বাস্তব; কিন্তু সৃষ্টিকর্তার (استواء) (আরোহণ) টি সৃষ্টিকুলের (استواء) (আরোহণ) এর মতো নয়; কারণ, আল্লাহ তা'আলা কোনো কিছুর অভাব ও প্রয়োজন অনুভব করেন না এবং তিনি কোনো কিছুর মুখাপেক্ষী নন; বরং তিনি সবকিছু থেকে সম্পূর্ণ অভাবমুক্ত। বরং আল্লাহ তা'আলা 'আরশ ও তার বহনকারী ফেরেশতাগণকে তাঁর কুদরতের মাধ্যমে বহন বা ধারণ করেন এবং তিনি আসমানসমূহ ও যমীনকে ধারণ করেন, যাতে তারা স্থানচ্যুত না হয়।
সুতরাং যে ব্যক্তি ধারণা করবে যে, ইমামগণের বক্তব্য, 'আল্লাহ তা'আলা বাস্তবেই তাঁর 'আরশের উপর উঠেছেন' এটা দাবি করে যে, তাঁর (استواء) (উপরে উঠার বিষয়)টি হবে বান্দা কর্তৃক নৌযান ও গবাদি পশুর পিঠের উপর (استواء) (উপরে উঠার) মতো, তাহলে সেই ব্যক্তির নিকট অবশ্যই তাদের অপর বক্তব্য: আল্লাহ তা'আলার রয়েছে বাস্তব জ্ঞান, বাস্তব শ্রবণ ও দৃষ্টি এবং বাস্তব কথাবার্তা; এগুলোরও অর্থ হওয়া দাবি করবে যে, তাঁর জ্ঞান, শ্রবণ, দেখা ও কথাবার্তা হবে সৃষ্টিকুলের জ্ঞান, শ্রবণ, দেখা ও কথাবার্তার মতো। (নাউযুবিল্লাহ) (২০)
১৫. যে ব্যক্তি বলে: আল্লাহর 'ইলম (জ্ঞান) আমার 'ইলমের মতো অথবা তাঁর শক্তি আমার শক্তির মতো অথবা তাঁর কথাবার্তা আমার কথাবার্তার মতো অথবা তাঁর ইচ্ছা, ভালোবাসা, সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টি আমার ইচ্ছা, ভালোবাসা, সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির মতো অথবা 'আরশের উপর তাঁর আরোহণ করাটা আমার (কোনো কিছুতে) আরোহণ করার মতো অথবা তাঁর অবতরণ করাটা আমার অবতরণ করার মতো অথবা তাঁর আগমন করা আমার আগমনের মতো ইত্যাদি ইত্যাদি। সুতরাং এভাবে সে আল্লাহ তা'আলাকে তাঁর সৃষ্টির সাথে তুলনা করল। (আল্লাহ তা'আলা তাদের এ জাতীয় কথাবার্তা থেকে পবিত্র ও মহান) যে ব্যক্তি এমন কথা বলল, সে পথভ্রষ্ট, খবীস, মিথ্যুক ও বাজে লোক, শুধু তাই নয়, বরং সে কাফির।
আবার যে ব্যক্তি বলে: আল্লাহর কোনো 'ইলম (জ্ঞান), শক্তি, কথাবার্তা, ইচ্ছা, শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি নেই; নেই তাঁর কোনো ভালোবাসা, সন্তুষ্টি, অসন্তুষ্টি, আরোহণ করা, আগমন ও অবতরণ করার মতো কোনো বিষয়, তাহলে সে আল্লাহর সুন্দর সুন্দর নামসমূহ এবং মহান গুণাবলিকে অবজ্ঞা করল; আর আল্লাহর নাম ও নিদর্শনসমূহ অবিশ্বাস করল। আর এ জাতীয় ব্যক্তিও পথভ্রষ্ট, খবীস, মিথ্যুক ও বাজে লোক এবং কাফির। (২১)
১৬. আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাঁর আসমানসমূহের উপরে অবস্থিত তাঁর 'আরশের উপরে আছেন, তিনি তাঁর সৃষ্টি থেকে পৃথক; তাঁর সত্তা থেকে তাঁর সৃষ্টিসমূহের মধ্যে কোনো কিছুই নেই এবং তাঁর সৃষ্টিসমূহের মধ্য থেকে কোনো কিছুই তাঁর সত্তার মধ্যে নেই। আর তিনি সম্পূর্ণ পবিত্র মহান; তিনি 'আরশ ও গোটা সৃষ্টিজগৎ থেকে অমুখাপেক্ষী ও প্রয়োজন মুক্ত; তিনি তাঁর সৃষ্টিরাজির নিকট থেকে কোনো কিছুর প্রয়োজন অনুভব করেন না; বরং তিনি স্বীয় কুদরত বা ক্ষমতা বলে 'আরש ও 'আরש বহনকারী ফেরেশতাগণের ধারক ও বাহক।
আর আল্লাহ তা'আলা বিশ্বজগতকে কতগুলো স্তরে সৃষ্টি করেছেন; তিনি তার উপরের স্তরকে নিচের স্তরের প্রতি মুখাপেক্ষী করেননি; সুতরাং আকাশ মুখাপেক্ষী নয় বাতাসের প্রতি এবং বাতাস মুখাপেক্ষী নয় যমীনের প্রতি। আর সর্বোচ্চ সুমহান হলেন আসমানসমূহ, যমীন ও উভয়ের মাঝখানে যা কিছু আছে সবকিছুর প্রতিপালক আল্লাহ তা'আলা; যিনি নিজেকে বর্ণনা করেছেন তাঁর বাণীর মাধ্যমে, তিনি বলেন:
وَمَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِهِ وَالْأَرْضُ جَمِيعًا قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَالسَّمَوَاتُ مَطْوِيَّتُ بِيَمِينِهِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ ﴾ [الزمر: ٦٧]
"তারা আল্লাহকে যথোচিত সম্মান করেনি, অথচ কিয়ামতের দিন সমস্ত যমীন থাকবে তাঁর হাতের মুঠিতে এবং আসমানসমূহ থাকবে ভাঁজ করা অবস্থায় তাঁর ডান হাতে। পবিত্র ও মহান তিনি, তারা যাদেরকে শরীক করে তিনি তাদের ঊর্ধ্বে।” [সূরা আয-যুমার: ৬৭]
তিনি বহন করা অথবা বহন ছাড়া অন্য কিছুর মুখাপেক্ষী হওয়া থেকে অনেক মহান, বড় ও অমুখাপেক্ষী ও সর্বোচ্চ সুমহান সত্তা; বরং তিনি হলেন এক-অদ্বিতীয়, 'আস- সামাদ' (তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন, সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী), যিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি; আর তাঁর সমতুল্য কেউই নেই; যিনি ছাড়া বাকি যত কিছু আছে, সকলেই তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষী; আর তিনি ছাড়া বাকি যত কিছু আছে, সকলের কাছ থেকেই তিনি প্রয়োজন মুক্ত।(২২)
১৭. নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপর এমনভাবে আছেন, যেভাবে থাকা তাঁর সম্মান ও মহত্ত্বের সাথে মানানসই। আর আমি বলি না যে, তাঁর (আল্লাহর) উপরের থাকার অবস্থা সেরকম, যেরূপ সৃষ্টির উপরে সৃষ্টির অবস্থান হয়ে থাকে, যেমনটি সাদৃশ্যবাদীরা বলে থাকে; আবার এ কথাও বলা যাবে না যে, আকাশসমূহের উপরে কোনো 'রব' নেই এবং 'আরশের উপরে কোনো 'রব' নেই, যেমনটি নাস্তিক জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায় বলে থাকে। বরং একথা বলা হবে যে, তিনি (আল্লাহ) তাঁর আকাশসমূহের উপরে অবস্থিত তাঁর 'আরশের উপরে আছেন, তাঁর সৃষ্টি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। (২৩)
১৮. আল্লাহ তা'আলা যা হারাম ঘোষণা করেছেন, তন্মধ্যে অন্যতম একটি বিষয় হলো কোনো ব্যক্তি কর্তৃক আল্লাহর ব্যাপারে এমন কথা বলা, যা সে জানে না; যেমন, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে খুব জোরালোভাবে কোনো হাদীস বর্ণনা করে, অথচ সে তার (বক্তব্যের) বিশুদ্ধতা সম্পর্কে জানে না, অথবা সে আল্লাহ তা'আলাকে এমন কতগুলো গুণাবলি দ্বারা বিশেষিত করে, যেগুলোর সমর্থনে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো কিতাব নাযিল হয়নি এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে বর্ণিত কোনো হাদীসও নেই; চাই সে গুণাবলির বর্ণনাটি নেতিবাচক ও অর্থশূন্য জ্ঞাপকই হোক না কেন, যেমন জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়ের বক্তব্য: আল্লাহ 'আরশের উপরেও নেই, আবার আকাশসমূহের উপরেও নেই; তাঁকে আখেরাতে দেখা যাবে না; তিনি কথা বলেন না, ভালোবাসেন না এবং এ জাতীয় আরও অনেক কথা, যার দ্বারা তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর মিথ্যারোপ করে অথবা সেই গুণাবলির বর্ণনাটি ইতিবাচক ও উপমা জাতীয় হোক, যেমন কেউ বলে: তিনি যমীনে হাঁটাহাঁটি করেন অথবা তিনি সৃষ্টির সাথে বসেন অথবা তারা নিজ চোখে তাঁকে দেখতে পাচ্ছে অথবা আকাশসমূহ তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করে ও পরিবেষ্টন করে নেয় অথবা তিনি তাঁর সৃষ্টিসমূহের মধ্যে প্রবেশ করে আছেন, এগুলো ছাড়াও আল্লাহর ওপর অনুরূপ আরও বিভিন্ন প্রকার মিথ্যাচার। (২৪)
১৯. 'মাকান' (স্থান) বলতে বুঝানো হয় এমন কিছু, যাকে কোনো কিছু বেষ্টন করে রাখে; আল্লাহকে কোনো সৃষ্টি পরিবেষ্টন করতে পারে না অথবা 'মাকান' বলতে এমন কিছু উদ্দেশ্য, যার প্রতি অবস্থান করা ব্যক্তি মুখাপেক্ষী হয়; আল্লাহ কোনো বস্তুর প্রতি মুখাপেক্ষী নন। আবার কখনও কখনো 'মাকান' (স্থান) বলতে এমন কিছুকে বুঝায়, যার উপরে কিছু থাকে; আর আল্লাহ হলেন তাঁর 'আরশের উপরে, যা তাঁর আসমানসমূহের উপরে অবস্থিত। (২৫)
২০. যখন মুমিন ব্যক্তিকে বিকৃতি ও অর্থশূন্যতা, অথবা উপমা দেয়া থেকে দূরে রাখা হবে, তখন সে সঠিক পথে চলতে সমর্থ হয়। কারণ কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমা দ্বারা জানা গেছে, যা সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি দ্বারাও জানা যায় যে, আল্লাহ তা'আলা "কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়” না তাঁর সত্তায়; না তাঁর গুণাবলিতে; না তাঁর কর্মকাণ্ডে। সুতরাং সৃষ্টিসমূহের বৈশিষ্ট্যগুলো থেকে কোনো কিছুর সাথে তাঁকে বিশেষিত করা জায়েয হবে না; কারণ তিনি পরিপূর্ণতার চূড়ান্ত রূপ দ্বারা বিশেষিত, যাবতীয় ত্রুটি বা অপূর্ণতা থেকে তিনি পবিত্র। সুতরাং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা সকল প্রকারের অভাব ও প্রয়োজন থেকে মুক্ত; তিনি ব্যতীত যাবতীয় কিছু তাঁর মুখাপেক্ষী। যে ব্যক্তি বলল: কুরআনে আল্লাহর সাথে কোনো কিছুর তুলনা করার সমর্থন সম্পৃক্ত কথা রয়েছে, সে কুরআনের ওপর মিথ্যারোপ করল; আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার বাণীর মধ্যে এমন কিছু নেই যা এ জাতীয় কিছুর দ্বারা তাঁকে বিশেষিত করাকে সমর্থন করে; বরং কখনও কখনও মানুষ তার খারাপ বুঝের কারণে এ জাতীয় কথাবার্তা বলে; ফলে কখনও কখনও সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী থেকে এমনসব অর্থ বুঝে নিয়েছে, যা থেকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলাকে পবিত্র করা ফরয। কিন্তু আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীতে মিথ্যারোপকারীর অবস্থা হলো এমন, যেমন বলা হয়ে থাকে:
কত ব্যক্তিকেই দেখা যায় যে সে বিশুদ্ধ কথার দোষ ধরছে, অর্থ তার বিপদটি এসেছে দুর্বল বা বিকৃত বুঝের কারণে। (১৯)
২১. মহান 'রব' সার্বিকভাবে তিনি ভিন্ন যাবতীয় সৃষ্টির নিকট কোনো কিছুর মুখাপেক্ষী হওয়ার মতো দুর্বলতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র। যে ব্যক্তি মনে করে: তিনি 'আরশের প্রতি অথবা 'আরש বহনকারী ফেরেশতাগণের প্রতি মুখাপেক্ষী, তাহলে সে হলো জাহিল পথভ্রষ্ট। বরং তিনি হলেন স্বয়ংসম্পূর্ণ; আর তিনি ছাড়া বাকি যত কিছু আছে, সকল কিছু সবদিক থেকে তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষী। আর তিনি হলেন এমন সত্তা, যিনি কারও মুখাপেক্ষী নন, সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী; আর তিনি সকল কিছুর অভাব ও প্রয়োজন থেকে মুক্ত; আর তিনি ছাড়া বাকি সকল কিছু চরম অভাবী হিসেবে তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে: يَسْأَلُهُ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ كُلَّ يَوْمٍ هُوَ فِي شَأْنٍ “আসমানসমূহ ও যমীনে যারা আছে, সবাই তাঁর কাছে প্রার্থী, তিনি প্রত্যহ গুরুত্বপূর্ণ কাজে রত।” [সূরা আর-রাহমান: ২৯](২৭)
২২. নিশ্চয় রূহ যদি তা এমন জিনিস হয় যা মানুষের মাঝে অবস্থিত থাকে, জীবিত থাকে, উপলব্ধি করে, ক্ষমতা রাখে, শ্রবণ করে, দেখতে পায়, ঊর্ধ্বে গমন করে, অবতরণ করে, যায়, আসে এবং এ জাতীয় আরও বৈশিষ্ট্য বা গুণাবলি নিয়ে অবস্থান করে, অথচ তখন তার ধরন-প্রকৃতি ও সীমা-পরিসীমা নির্ণয়ে বিবেক-বুদ্ধি সীমাবদ্ধতার বেড়াজালে আটকে যায়; কারণ তারা কখনও তার কোনো নজীর বা নমুনা, দেখতে পায়নি। কেননা বস্তুর প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে উপলব্ধি করা যায়- হয় তা সরাসরি দেখার মাধ্যমে অথবা তার নমুনা প্রত্যক্ষ করার মাধ্যমে। সুতরাং যখন রূহটি সৃষ্টিকুলের মধ্যে তার কোনো দৃশ্যমান নমুনা ছাড়াই এসব গুণাবলি দ্বারা বিশেষিত হতে পারে, তখন সৃষ্টিকর্তা (আল্লাহ) তো আরও উত্তমভাবেই তাঁর সৃষ্টিকুল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তাঁর মর্যাদার সাথে মানানসই উপযুক্ত নাম ও গুণাবলি দ্বারা বিশেষিত হতে পারেন; আর বুদ্ধিজীবী সমাজ যেখানে রূহের ধরন-প্রকৃতি ও সীমা-পরিসীমা নির্ণয়ে ব্যর্থ, সেখানে তারা আরও চরমভাবে ব্যর্থ হবে তাঁর (সৃষ্টিকর্তার) ধরন-প্রকৃতি অথবা সীমা-পরিসীমা নির্ণয় করতে।
সুতরাং যে ব্যক্তি রূহের গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্যকে না বলবে, সে রূহ অস্বীকারকারী নাস্তিক বলে গণ্য হবে; আর যে ব্যক্তি রূহকে দৃশ্যমান কোনো সৃষ্টির সাথে তুলনা করবে সে অজ্ঞ ও উপমা পেশকারী হিসেবে বিবেচিত হবে, অথচ বাস্তবে রূহের অস্তিত্ব সত্যিকার অর্থেই সেটার যাবতীয় গুণাবলিসহ প্রমাণিত, তাহলে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার গুণাবলিকে না বলা ব্যক্তি তো আরও উত্তমভাবেই অস্বীকারকারী নাস্তিক বলে গণ্য হবে; আর যে ব্যক্তি অজ্ঞের মতো তাঁকে তাঁর সৃষ্টির সাথে কিয়াস করে তুলনা করবে, সেও নাস্তিক বলে গণ্য হবে; অথচ আল্লাহ তা'আলা তিনি পবিত্র, প্রকৃত অর্থে তাঁর অস্তিত্ব তাঁর সকল নাম ও গুণসহ সত্যিকার অর্থেই প্রমাণিত। (২৮)
২৩. আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক ('আরশের উপর) আরোহণকে এমন বৈশিষ্ট্যে ও গুণাগুণে অনুধাবন ও উপলব্ধি করা জায়েয হবে না, যেসব বৈশিষ্ট্য সৃষ্টির জন্য সাব্যস্ত হয়, যা সৃষ্টিকর্তার (আল্লাহর) জন্য নয়।(২৯)
২৪. নিশ্চয় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা সৃষ্টিকুল কর্তৃক তাঁকে পরিবেষ্টন করা থেকে অথবা সৃষ্টিকুলের মধ্য থেকে 'আরশ ও অন্য যেকোনো সৃষ্টির প্রতি মুখাপেক্ষী হওয়া থেকে পবিত্র। আর জাহিলদের মধ্য থেকে যে ধারণা করে যে, তিনি (আল্লাহ) যখন দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন, তখন 'আরש তাঁর উপরে থাকে এবং তিনি তখন বিশ্বজগতের দুই স্তরের মাঝখানে পরিবেষ্টিত হয়ে যান, তাহলে তার কথাটি সালাফে সালেহীনের 'ইজমা' এর খিলাফ হওয়ার সাথে সাথে কুরআন ও সুন্নাহর পরিপন্থী বলে গণ্য হবে।
২৫. যখন নূরের তৈরি ফেরেশতাগণ খান না ও পান করেন না, বরং তারা পানাহারের মুখাপেক্ষী নন, মানুষের মতো তাদের পেট নেই; তারা কথা বলেন, শ্রবণ করেন, দেখেন, ঊর্ধ্বে গমন করেন এবং নিচে অবতরণ করেন, যেমনটি সাব্যস্ত আছে (কুরআন-সুন্নাহর) বিশুদ্ধ নস তথা বক্তব্যের দ্বারা; অথচ তাদের এ অবস্থা সত্ত্বেও তাদের এসব গুণাবলি ও কর্মকাণ্ডকে মানুষের গুণাবলি ও কর্মকাণ্ডের সাথে তুলনা করা হয় না; সুতরাং সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টিকুলের সাথে তাঁর ভিন্নতা ও বৈপরীত্যের বিষয়টি ফেরেশতা ও মানুষের মধ্যকার ভিন্নতা ও বৈপরীত্যের চেয়ে অনেকে গুণ বেশি; অথচ তারা (ফেরেশতা ও মানুষ) উভয়ে মাখলুক' (সৃষ্টি); আর সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার সাথে সৃষ্টির সদৃশের চেয়ে মাখলুকের সাথে মাখলুকের সাদৃশ্যতার বিষয়টি অনেক বেশি কাছাকাছি হওয়ার কথা। (তারপরও তাদের মধ্যে সেটার তুলনা চলে না, তাহলে সৃষ্টার সাথে সৃষ্টির কোনো সাদৃশ্যতা কীভাবে আসতে পারে?) অনুরূপভাবে আদম সন্তানের রূহও শ্রবণ করে, দেখে, কথা বলে, নিচে অবতরণ করে এবং ঊর্ধ্বে গমন করে, যেমনিভাবে এ বিষয়টিও সাব্যস্ত আছে বিশুদ্ধ নস ও সুস্পষ্ট যুক্তির দ্বারা; আর এটা সত্ত্বেও তার (রূহের) গুণাবলি ও কর্মকাণ্ডসমূহ শরীরের গুণাবলি ও কর্মকাণ্ডসমূহের মতো নয়। সুতরাং যখন এ কথা বলা জায়েয হবে না যে, রূহের গুণাবলি ও কর্মকাণ্ডসমূহ দেহের গুণাবলি ও কর্মকাণ্ডসমূহের মতোই, যে দেহ ও রূহের সমন্বয়ে মূলত মানুষের অস্তিত্ব; আবার মানুষের রূহ যখন তার নিজ দেহের সদৃশ নয়, তখন মহান 'রব' আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা এবং তাঁর গুণাবলি ও কর্মকাণ্ডসমূহকে দেহ এবং তার গুণাবলি ও কর্মকাণ্ডসমূহের সাথে সদৃশ মনে করাটা কীভাবে জায়েয হবে?!!(৩০)
২৬. যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার বাণী: ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ "তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠলেন” [সূরা আল-ফুরকান: ৫৯] থেকে এমন বুঝ গ্রহণ করল, যা সৃষ্টির সাথে খাস (নির্দিষ্ট), যেমনটি সে অনুধাবন করে আল্লাহ তা'আলার বাণী: (استويت أَنتَ وَمَن مَّعَكَ عَلَى الْفُلْكِ ) "অতঃপর যখন আপনি ও আপনার সঙ্গীরা নৌযানের উপরে উঠবেন" [সূরা আল-মুমিনূন: ২৮] থেকে, তাহলে তো সে ব্যক্তি তার এ বুঝটি গ্রহণ করেছে তার মন্দ উপলব্ধি ও বুদ্ধির দৈন্যতা থেকে; আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বর্ণনার সীমাবদ্ধতা থেকে নয়; কারণ শব্দের বাহ্যিকতা প্রমাণ করে ইস্তিওয়া ( উপরে উঠা) শব্দটি মহান আল্লাহ তা'আলার সাথে সম্পর্কযুক্ত, যেমনিভাবে দ্বিতীয় আয়াতে ইস্তিওয়া (উপরে উঠা) শব্দটি বান্দার সাথে সম্পর্কযুক্ত। আর যখন ('আরশে) আরোহণকারী আল্লাহ (নৌযানে) আরোহণকারী বান্দার সদৃশ নন, তখন আল্লাহর ইস্তিওয়া (আরোহণ) বান্দার ইস্তিওয়া (আরোহণ) এর সাথে আদৌ সাদৃশ্যপূর্ণ হবে না।
যখন বান্দা যার উপর আরোহণ করবে, তার অভাববোধ করবে, সে তার উপর বহনকৃত হওয়ার মুখাপেক্ষী; আর মহান 'রব' আল্লাহ তা'আলা তিনি ব্যতীত বাকি সকল কিছুর অভাব ও প্রয়োজন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত; আর 'আরש ও অন্যান্য সকল কিছু তাঁর মুখাপেক্ষী; আর তিনি ঐ মহান সত্তা, যিনি 'আরש ও 'আরশ বহনকারীগণকে বহন করেন; মুখাপেক্ষী বান্দা যেটার উপর আরোহন করছে সেটার প্রতি মুখাপেক্ষী হওয়া আবশ্যক করে না যে, যিনি সবকিছু থেকে সম্পূর্ণভাবে অমুখাপেক্ষী, বরং সবকিছু তারই মুখাপেক্ষী, সে মহান রব্ব যার উপর আরোহন করবেন তার প্রতি মুখাপেক্ষী হবেন।
আর মহান আল্লাহ তা'আলার বাণীর মধ্যে বাহ্যিকভাবে এমন কিছু নেই যা থেকে এটা বুঝা যাবে যে, যেভাবে সৃষ্ট জিনিসকে বহন করতে বহনকারী ইত্যাদি লাগে তেমনি আল্লাহর জন্যও তা লাগবে, বরং সে এ ধারণা তার কাছে এসেছে তার মন্দ বুঝ থেকে, শব্দের নির্দেশনা থেকে নয়।
কিন্তু যখন কোনো কল্পনাকারী তার নিজের মধ্যে কল্পনা করে বলে: আল্লাহ তার মতো, তখন সে কল্পনা করবে তাঁর (আল্লাহর) আরোহণ তার আরোহণের মতো। আর যখন সে বুঝতে পারবে যে, কোনো কিছুই আল্লাহর সদৃশ নয়, না তাঁর আপন সত্তার মধ্যে, না তাঁর গুণাবলি ও কর্মকাণ্ডের মধ্যে, তখন সে জানতে পারবে যে, তাঁর (আল্লাহর) আরোহণ করাটা তার আরোহণের মতো নয়, আবার তাঁর (আল্লাহর) আসা-যাওয়াটা তার আসা-যাওয়ার মতো নয়; যেমনিভাবে সে জানতে পারবে যে, তাঁর (আল্লাহর) 'ইলম, শক্তিমত্তা, সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টি তার ইলম, শক্তি, সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির মতো নয়।
সুতরাং মহান 'রব' আল্লাহ তা'আলার গুণাবলি তাঁর জন্যই সুনির্দিষ্ট; আর মাখলুক (সৃষ্টি) এর গুণাবলি মাখলুকের জন্যই সুনির্দিষ্ট; উভয়ের মধ্যে কোনো প্রকারের অংশীদারিত্ব নেই এবং এক মাখলুকের গুণাবলির মধ্যেও আরেক মাখলুকের প্রকারের অংশীদারিত্ব নেই। (৩১)
২৭. আল্লাহ তা'আলার বাণী: )الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى( "দয়াময় (আল্লাহ) 'আরশের উপর উঠেছেন” [সূরা ত্বা-হা: ০৫] আল্লাহ কর্তৃক আরোহণ করাটা মাখলুক (সৃষ্টি) এর আরোহণ করার মতো বলা, অথবা এমন আরোহণের মতো করে ব্যাখ্যা করা, যা নতুন করে সংঘটিত হওয়া অথবা ত্রুটিপূর্ণ হওয়া দাবি করে। এমনটি কেবল পথভ্রষ্ট মুশাব্বিহা (সাদৃশ্য স্থাপনকারী) ও মুজাসসিমা (দেহবাদী) সম্প্রদায় থেকে বর্ণনা করা হয়, আর এটা কুরআনিক দলীল ও যুক্তিনির্ভর প্রমাণ দ্বারা অকাট্যভাবে বাতিল ও অগ্রহণযোগ্য কথা।
অথবা এমন কথা বলা: আসলে বাস্তবে ('আরশে) আরোহণ করা বলতে এখানে কিছু নেই, 'আরশের উপরে কোনো ইলাহ নেই এবং আসমানসমূহের উপরে কোনো 'রব' নেই; তাহলে এটা হলো পথভ্রষ্ট নাস্তিক জাহমিয়্যাদের অভিমত। আর এ মতটিও দীন ইসলামের আবশ্যকীয়ভাবে অর্জিত জ্ঞানের ভিত্তিতে চূড়ান্তভাবে বাতিল। যারা নবীর ইলমের ধারক ও যে স্বাভাবিক প্রকৃতির ওপর আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৃষ্টিকুলকে অস্তিত্ব দিয়েছেন যে, তার স্রষ্টা তার উপর, যেমনটি তাদের স্বীকৃতি যে, তিনি তাদের রব, তাদের সকলের দৃষ্টিতে জাহমিয়্যাদের কথা বাতিল।
অথবা এমন কথা বলা: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা 'আরশের উপর এমনভাবে উঠেছেন, যা তাঁর মর্যাদার জন্য উপযুক্ত এবং তাঁর বড়ত্ব ও মহত্ত্বের সাথে মানানসই; আর তিনি তাঁর সৃষ্টি থেকে আলাদাভাবে তাঁর আসমানসমূহের উপরে অবস্থিত 'আরশের উপরে আছেন এবং তিনি নিজেই 'আরশ ও 'আরশ বহনকারী ফেরেশতাগণের ধারক ও বাহক; আর اِسْتِوَاءُ )আরোহণ) এর বিষয়টি জ্ঞাত (মা'লুম) এবং তার ধরন-প্রকৃতির বিষয়টি অজ্ঞাত (মাজহুল), তার প্রতি ঈমান রাখা ওয়াজিব এবং তা নিয়ে প্রশ্ন করাটা বিদ'আত। বস্তুত এমনটি বলাই হচ্ছে মুসলিমগণের মাযহাব বা অভিমত; আর এটাই নির্ভেজাল স্বভাব-প্রকৃতিতে অবস্থানকারী সকল মুসলিমের নিকট اِسْتِوَاءُ )আরোহণ) শব্দের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা, যা বিকৃত হয়ে নাস্তিকতার দিকে যায়নি এবং যা মোড় ঘুরিয়ে সাদৃশ্য স্থাপনের দিকেও যায়নি। (৩২)
২৮. যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহর মধ্যে বেশি বেশি নজর দিবে, সে নিশ্চিতভাবে জানতে পারবে যে, তিনি তার উম্মতের কাছে এটা ঢেলে দিয়েছেন যে, তোমরা তোমাদের যে প্রতিপালকের ইবাদত কর, তিনি সকল কিছুর উপরে, 'আরশের উপরে এবং আকাশসমূহের উপরে রয়েছেন; আরও জানতে পারবে যে, সকল সালাফে সালেহীনের এই আকীদা-বিশ্বাসই ছিল, যেমনিভাবে তারা বিশ্বাস করতেন যে নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা সকল বিষয়ে অবগত আছেন এবং তিনি সকল কিছুর ওপর ক্ষমতাবান। সালাফে সালেহীনের কারও নিকট থেকে এমন একটি শব্দও বর্ণিত হয়নি, যা এর বিপরীত কিছু প্রমাণ করে। আবার যুগ যুগ ধরে কোনো দিন তাদের মধ্য থেকে কেউ বলেননি যে, আমাদের 'রব' 'আরশের উপরে নেই, অথবা তিনি 'আরশের উপরে উঠেননি, অথবা তাঁর (আল্লাহর) 'আরশের উপর আরোহণ করার বিষয়টি সৃষ্টির কারো সমুদ্রের উপর আরোহণ করার মতো। ইত্যাদি জাহমিয়াদের যেসব বাজে কথা রয়েছে; অনুরূপ সালাফে সালেহীনের কেউ বলেননি যে, তাঁর (আল্লাহর 'আরশের উপর) আরোহণ করাটাকে মাখলুক (সৃষ্টি) এর আরোহণ করার সাথে তুলনীয়। অনুরূপ তাঁর জন্য এমন কোনো গুণ সাব্যস্ত করেননি, যা নতুন করে সংঘটিত হওয়া অথবা ত্রুটিপূর্ণ হওয়া দাবি করে। (৩০)
২৯. "আল্লাহ আসমানে" অথবা "আল্লাহ আসমানে নয়" -এ বিষয়ে অনেকেই বিতর্কে লিপ্ত হয়।
তন্মধ্যে যারা সাব্যস্ত করে তারা বলেন: আল্লাহ আসমানে, যেমনটি এর সমর্থনে (কুরআন-সুন্নাহর) কতগুলো 'নস' (বক্তব্য) এসেছে; আর এগুলো এ অর্থে প্রমাণ করে যে, তিনি তাঁর সৃষ্টিকুল থেকে আলাদা, আসমানসমূহের উপরে অবস্থিত তাঁর 'আরশের উপর আছেন।
আর যারা 'আল্লাহ আসমানে হওয়া' অস্বীকার করে, তারা বলেন: আল্লাহ আসমানের মধ্যে নন, তাদের উদ্দেশ্য হলো: আকাশ তাঁকে ঘিরে রাখে না, সীমাবদ্ধ করে না এবং তাঁকে বহন করে না; তাঁকে উপরে তুলে ধরে না। সন্দেহ নেই, এই অর্থটিও সঠিক; কারণ তাঁকে তাঁর সৃষ্টিকুল সীমাবদ্ধ গণ্ডিতে আবদ্ধ করতে পারে না, বরং তাঁর 'কুরসী' আসমানসমূহ ও যমীনকে পরিব্যাপ্ত করে আছে; আর 'আরশের মধ্যে কুরসীর অবস্থানটা একটি বিরাট ময়দানে ফেলে দেয়া একটি আংটির মতো। অনুরূপভাবে তিনি অন্য কারও প্রতি মুখাপেক্ষী নন; বরং তিনি তাঁর সৃষ্টির দ্বারস্থ হওয়া থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত, তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক, তিনি 'আস-সামাদ' (তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন, সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী)।
সুতরাং উপরোক্ত দু'টি অর্থের মধ্যে কোনো বিরোধ বা বৈপরীত্য নেই; কিন্তু তারা ভুল করেছেন এমন শব্দকে 'না' করার ক্ষেত্রে, যা কুরআন ও সুন্নাহ নিয়ে এসেছে এবং আরও ভুল করেছেন ধারণা ও কল্পনায় প্রবেশ করে যে, তার (শব্দের) উন্মুক্ত ব্যবহার ভ্রান্ত অর্থের দিক-নির্দেশ করে।
আবার কখনও কখনও তাদের কারও কারও এ ওযর রয়েছে যে, যখন তারা দেখেছে কেউ কেউ 'আসমানে আছে' বলে এ শব্দটিকে এমন নিঃশর্তভাবে ব্যবহার করতে দেখেন যারা এর অর্থ করে থাকেন আসমান তাঁকে বহন করে অথবা তাঁকে ছায়া দেয়; এমতাবস্থায় যারা এ অর্থের ভুল ধরে, তাহলে সে অবশ্যই সঠিক কাজটিই করেছে। তন্মধ্যে প্রথম ব্যক্তি (যিনি আসমানে আছেন বলেন) তিনি শব্দের ব্যবহারে সঠিক কাজটি করেছেন কারণ কুরআন ও সুন্নাহর ভাষ্যে এভাবে নিঃশর্তভাবে এসেছে, আর সে পূর্বে গত হওয়া অর্থেও সঠিক ছিল; কারণ সেটিই তো কুরআন ও সুন্নাহর ভাষ্যে প্রমাণকৃত সত্য অর্থ। তবে তাদের কেউ কেউ দ্বিতীয় শব্দ (আল্লাহ আসমানে নেই) এটা যারা গ্রহণ করে তাদেরকে কাফির পর্যন্ত বলে, এটাতে তারা ভুল করে; যখন সে লোকের উদ্দেশ্য হয় বিশুদ্ধ অর্থ; কারণ যে কেউ বিশুদ্ধ অর্থ উদ্দেশ্য নেয় তাকে কোনো শব্দের কারণে কাফের বলা যায় না, যদিও সে অন্যায় করে কিংবা নিষিদ্ধ কোনো কাজ করে ফেলে।
আর যে বা যারা তাঁর কথা 'তিনি আকাশে নেই' এর ব্যাখ্যা করেন এই অর্থে; নিরেট শূন্যতা ছাড়া 'আরশের উপরে আসলে কিছুই নেই(**); আর আসমানসমূহের উপরেও কিছুই নেই; আর সেখানে উপাসনা করার মতো কোনো ইলাহও নেই; আর সেখানে নেই কোনো 'রব', যাকে ডাকা হবে এবং যার কাছে কিছু চাওয়া হবে; আর সেখানে নেই কোনো সৃষ্টিকর্তা, যিনি সৃষ্টিজগৎ সৃষ্টি করেছেন; আবার নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আসলেই মিরাজের রাত্রিতে (ঊর্ধ্বে গমনে) তাঁর প্রতিপালকের নিকট নিয়ে যাওয়া হয়নি(***), ঐসব (অপব্যাখ্যাকারীরা) হলো পথভ্রষ্ট জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়, যারা নবীগণের ইজমা' এবং বুদ্ধিমান সম্প্রদায়ের স্বভাবজাত- প্রকৃতির বিরোধী। (৩৬)
৩০. যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টিকুলের ভিতরে আছেন, সৃষ্টিসমূহ তাঁকে বেষ্টন করে আছে, আকাশসমূহ তাঁকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে, সৃষ্টিসমূহের কিছু অংশ তাঁর উপরে এবং কিছু অংশ তাঁর নিচে, সেই ব্যক্তি বিদ'আতকারী পথভ্রষ্ট বলে বিবেচিত হবে।
আর যদি সে বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ তা'আলা এমন কিছুর মুখাপেক্ষী, যা তাঁকে বহন করবে- 'আরশ বা অন্য কিছু, তাহলে সেই ব্যক্তিও বিদ'আতকারী পথভ্রষ্ট বলে বিবেচিত হবে। আর অনুরূপভাবে যদি সে আল্লাহর গুণাবলিকে সৃষ্টিসমূহের গুণাবলির মতো মনে করে এবং বলে, আল্লাহ কর্তৃক ('আরশে) আরোহণ করার বিষয়টি সৃষ্টি কর্তৃক (কোনো কিছুতে) আরোহণ করার মতো অথবা তাঁর অবতরণের বিষয়টি সৃষ্টির অবতরণের মতো ইত্যাদি ইত্যাদি, তাহলে সেও বিদ'আতকারী পথভ্রষ্ট। কারণ, সুস্থ বিবেক-বুদ্ধিসহ কুরআন ও সুন্নাহ প্রমাণ করে যে, কোনো কিছুতেই সৃষ্টিকুল আল্লাহ তা'আলার সদৃশ হতে পারে না এবং আরও প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তা'আলা সকল কিছুর অভাব ও প্রয়োজন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত; আবার এটাও প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টিসমূহের (সীমানা) থেকে আলাদা হয়ে ভিন্নভাবে তার উপরে অবস্থান করেন।
আর যদি সে বিশ্বাস করে যে, সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টিকুল থেকে ভিন্ন আলাদা; তিনি তাঁর আকাশসমূহের উপরে অবস্থিত তাঁর 'আরশের উপরে অবস্থান করেন তাঁর সৃষ্টিজগৎ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে; তাঁর সৃষ্টিকুলের মধ্যে তাঁর সত্তা থেকে কোনো কিছুই নেই; আবার তাঁর সত্তার মধ্যেও তাঁর সৃষ্টিকুলের মধ্য থেকে কোনো কিছুই নেই। আর আল্লাহ তা'আলা 'আরশসহ বাকি যত কিছু আছে, সবকিছুর প্রয়োজন থেকে মুক্ত; তিনি সৃষ্টিকুলের কোনো কিছুর প্রতি মুখাপেক্ষী নন; বরং তিনি তাঁর 'আরশের উপর আরোহণ করার সাথে সাথে তাঁর কুদরতের মাধ্যমে 'আরש ও 'আরש বহনকারী ফেরেশতাগণকে বহন বা ধারণ করেন; আর সৃষ্টির আরোহণের সাথে আল্লাহর আরোহণ করার বিষয়টিকে তুলনা করা যাবে না;
বরং আল্লাহ তা'আলার জন্য তাই সাব্যস্ত করা যাবে, নাম ও গুণাবলি থেকে যা তিনি তাঁর নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন। আর যদি সে সৃষ্টিসমূহের সাথে তাঁর তুলনা করা থেকে দূরে থাকে এবং এই জ্ঞান রাখে যে, কোনো কিছুই আল্লাহর সদৃশ নয়, না তাঁর আপন সত্তার মধ্যে, না তাঁর গুণাবলি ও কর্মকাণ্ডের মধ্যে, তাহলে সে তার আকীদা-বিশ্বাসে সঠিক বলে বিবেচিত হবে এবং তার আকীদা উম্মতের সালাফে সালেহীন ও ইমামগণের আকীদার মতো হবে। (৩৭)
৩১. মহান 'রব' আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৃষ্টিকুলের মধ্য থেকে কোনো কিছুর প্রতি মুখাপেক্ষী হবেন, এমনটা সম্ভব হতে পারে না, না 'আরশের প্রতি, না অন্য কিছুর প্রতি; এটাও সম্ভব নয় যে, বিদ্যমান কোনো বস্তু তাঁকে বেষ্টন করে রাখতে পারে; কারণ তিনি সর্বোপরে প্রকাশ্য। সুতরাং তাঁর উপরে কোনো কিছুই নেই ...।
তাছাড়া তিনি সকল কিছুর অভাব ও প্রয়োজন থেকে মুক্ত; আর তিনি ব্যতীত যাবতীয় কিছু তাঁর মুখাপেক্ষী। আর এ জন্যই আল্লাহ তা'আলা যা দ্বারা নিজেকে বিশেষিত করেছেন, তা কিছুতেই সৃষ্টিকুলের গুণাবলির সদৃশ হতে পারে না, যেমনিভাবে তাঁর সত্তা সৃষ্টিসমূহের সত্তার মতো হয় না। সুতরাং তিনি তাঁর 'আরশের উপর অবস্থান করছেন, যেমনটি তিনি তাঁর নিজ সম্পর্কে আমাদেরকে অবহিত করেছেন, অথচ তিনি 'আরশের প্রতি মুখাপেক্ষী নন।
খাট, নৌযান বা প্রাণীর উপর আরোহণকারী মাখলুক (সৃষ্টি) এর নিচে যা আছে তা যদি চলে যায়, তাহলে তার প্রতি মুখাপেক্ষী থাকার কারণে সে পড়ে যাবে; কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তিনি ছাড়া বাকি সকল কিছুর অভাব ও প্রয়োজন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত; তিনি তাঁর কুদরতের মাধ্যমে 'আরশ ও 'আরש বহনকারী ফেরেশতাগণকে বহন করেন। (৩৮)
৩২. আল্লাহ তা'আলা তিনি ভিন্ন যাবতীয় সকল কিছুর অভাব ও প্রয়োজন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। আর তিনি ছাড়া বাকি সকল কিছু সামগ্রিক দিক থেকে তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষী; কারণ তিনি হলেন 'আস-সামাদ' (তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন, সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী), সকল কিছুর প্রয়োজন থেকে তিনি সম্পূর্ণ মুক্ত এবং বাকি সকল কিছুই তাঁর মুখাপেক্ষী।
সুতরাং যে ব্যক্তি বলবে: তিনি কোনো না কোনোভাবে সৃষ্টির মুখাপেক্ষী সে ব্যক্তি নিরেট মিথ্যাবাদী, মিথ্যারোপকারী, কাফির। সে কীভাবে বলতে পারে যে, তিনি সকল কিছুর মুখাপেক্ষী?! অথচ তিনি পবিত্র, মহিমান্বিত এবং যালিমরা যা বলে তা থেকে তিনি বহু ঊর্ধ্বে। (৩৯)
৩৩. প্রবৃত্তির অনুসারীদের মধ্য থেকে যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে, তারা আল্লাহর বাণী, তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী এবং প্রথম সারির মুসলিম সাহাবী ও তাবে'য়ীগণের বাণী থেকে "আল্লাহর গুণাবলি বিষয়" এ শুধু এমন অর্থই অনুধাবন করে, যা সৃষ্টির সাথে মানায়, সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সাথে মানায় না। অতঃপর তারা এ ব্যাপারে আল্লাহর বাণী ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী পেলে সেসব বাণীকে বিকৃত করে উপস্থাপন করতে চায়; আর যখন তারা এ বিষয়টি তাবে'য়ীগণের বাণীর মধ্যে পায়, তখন তারা তাঁদের ওপর মিথ্যা আরোপ করে এবং তাদের ভ্রান্ত বুঝ ও উপলব্ধি অনুযায়ী তাদের (তাবেয়ীদের) থেকে তা বর্ণনা করে, অথবা তাদের বক্তব্যের মধ্যে শব্দ বাড়িয়ে দেয় এবং পরিমাণ ও গুণগতভাবে তা পরিবর্তন করে ফেলে, যেমনটি আমরা তাদের মুখ থেকে শুনতে পাই এবং তাদের বই-পুস্তকে দেখতে পাই। (৪০) আর এটা সামগ্রিকভাবে বর্ণনা করা হলো ঐসব ব্যক্তিবর্গের জন্য, যারা তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবে; আর প্রকৃত বিষয়টি আমি যা বর্ণনা ও উপস্থাপন করেছি, তার চেয়ে বেশি। (৪১)
৩৪. এটা অকাট্যভাবে প্রমাণিত যে, কোনো কিছুই আল্লাহর সদৃশ নয়, না তাঁর আপন সত্তার মধ্যে, না তাঁর গুণাবলি ও কর্মকাণ্ডের মধ্যে। আর সৃষ্টিকুলের সাথে তাঁর ভিন্নতা ও তাদের অংশীদারিত্ব থেকে তাঁর পবিত্রতার বিষয়টি অনেক বড় ও মহান বিষয়, ঐ বুঝ ও চিন্তাধারা থেকে, তাঁর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জ্ঞানীগণ যতটুকু বুঝতে পেরেছেন এবং বর্ণনাকারীগণ যতটুকু বর্ণনা করতে পেরেছেন। আর এমন প্রত্যেক গুণকে তাঁর থেকে অবশ্যই দূরে রাখতে হবে, যা নতুন করে সংঘটিত হওয়া অথবা ত্রুটিপূর্ণ হওয়া দাবি করে। (৪২)
৩৫. যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে বা বলে, আল্লাহ তা'আলা 'আরশ কর্তৃক তাঁকে বহন করার মুখাপেক্ষী, অথবা তিনি কোনো আসমান বেষ্টিত আছেন, যেখানে আসমান তাঁকে ছায়া দিচ্ছে, অথবা তিনি তাঁর সৃষ্টিকুলের মধ্য থেকে কোনো কিছুর মধ্যে পরিবেষ্টিত, অথবা তিনি তাঁর সৃষ্টিজগতের কোনো দিক বা পক্ষ দ্বারা ঘেরাও হয়ে আছেন, তাহলে সেই ব্যক্তি ভ্রান্ত পথভ্রষ্ট বলে বিবেচিত হবে।
আর যে ব্যক্তি বলে: 'আরশের উপরে কোনো 'রব' নেই এবং আকাশসমূহের উপরে কোনো সৃষ্টিকর্তা নেই, বরং সেখানে শুধুই শূন্যতা, তাহলে সেই ব্যক্তি নাস্তিক, জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহকে অস্বীকারকারী এবং ঐ ফিরআউনের মত বলে বিবেচিত হবে, যে বলেছিল:
(يَهَمَنُ ابْنِ لِي صَرْحًا لَّعَلَّى أَبْلُغُ الْأَسْبَابَ أَسْبَابَ السَّمَوَاتِ فَأَطَّلِعَ إِلَى إِلَهِ مُوسَى وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ كَذِبًا) [غافر: ٣٦، ٣٧]
“হে হামান! আমার জন্য তুমি নির্মাণ কর এক সুউচ্চ প্রাসাদ যাতে আমি অবলম্বন পাই -আসমানে আরোহণের অবলম্বন, যেন দেখতে পাই মূসার ইলাহকে; আর নিশ্চয় আমি তাকে মিথ্যাবাদী মনে করি।" [সূরা গাফির: ৩৬-৩৭]
বরং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত ও উম্মতের সালাফে সালেহীন এ বিষয়ে একমত যে, তিনি (আল্লাহ) তাঁর আকাশসমূহের উপরে অবস্থিত তাঁর 'আরশের উপরে তাঁর সৃষ্টিজগৎ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা; তাঁর সত্তার মধ্যে তাঁর সৃষ্টিকুলের মধ্য থেকে কোনো কিছুই নেই, আবার তাঁর সৃষ্টিকুলের মধ্যেও তাঁর সত্তা থেকে কোনো কিছুই নেই; আর এ কথার সমর্থনে কুরআন ও সুন্নাহর 'নস' রয়েছে এবং রয়েছে উম্মতের সালাফে সালেহীন ও সুন্নাহর ইমামগণের 'ইজমা'। এমনকি পূর্বের ও পরের সকল মুমিন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত ও উম্মতের সালাফে সালেহীন এ বিষয়ে একমত যে, যে ব্যক্তি إِسْتِوَا )আরোহণ) এর ব্যাখ্যা করবে "আধিকার বা দখল করা" অর্থে, অথবা এমন কোনো অর্থে ব্যাখ্যা করবে যা "আল্লাহ তাঁর আকাশসমূহের উপরে থাকাকে অস্বীকার করে, তাহলে সেই ব্যক্তি পথভ্রষ্ট জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়ের লোক বলে বিবেচিত হবে। (৪৩)
৩৬. মহান 'রব' আল্লাহ তা'আলা সকল দিক থেকে যাবতীয় কিছুর অভাব ও প্রয়োজন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। আর তিনি ব্যতীত সকল কিছু সর্বদিক থেকে তাঁর মুখাপেক্ষী; আর এটা হলো তাঁর নাম 'আস-সামাদ' এর অর্থ। কারণ, 'আস-সামাদ' হলো এমন এক সত্তা, প্রত্যেক বস্তু স্বীয় দৈন্যতার কারণে যাঁর মুখাপেক্ষী হয় এবং অপর দিকে যিনি সবকিছুর অভাব ও প্রয়োজন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত, তিনি কোনো কিছুর মুখাপেক্ষী হন না। সুতরাং কীভাবে সৃষ্টিকূল থেকে কোনো কিছু তাঁর অবলম্বন বা নির্ভরতা হতে পারে? (৪৪)
৩৭. আল্লাহ তা'আলা নিজেকে বিশেষিত করে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি তাঁর 'আরশের উপর উঠেছেন; আর তিনি তাঁর কিতাবের সাতটি আয়াতে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন। আবার তিনি তাঁর কোনো কোনো সৃষ্টিকে اسْتِوَاءُ )আরোহণ) শব্দ দ্বারা বিশেষভাবে বর্ণনা করেছেন; যেমন তাঁর বাণী: لِتَسْتَوُراً عَلَى ظُهُورِهِ "যাতে তোমরা এর পিঠে স্থির হয়ে বসতে পার” [সূরা আয-যুখরুফ: ১৩], তাঁর বাণী (فَإِذَا اسْتَوَيْتَ أَنتَ وَمَن مَّعَكَ عَلَى الْفُلْكِ) “অতঃপর যখন আপনি ও আপনার সঙ্গীরা নৌযানের উপরে উঠবেন [সূরা আল-মুমিনূন: ২৮] এবং তাঁর বাণী: وَاسْتَوَتْ (عَلَى الْجُودِي "আর নৌকা জুদী পর্বতের উপর উঠলো" [সূরা হূদ: ৪৪]। আর আল্লাহর إِسْتِوَاءُ )আরোহণ) অন্যদের إِسْتِوَاء এর মতো নয়। (৪৫)
৩৮. আবশ্যকীয় ব্যাপারে হলো, আল্লাহ তা'আলা তাঁর আপন সত্তার জন্য যা সাব্যস্ত করেছেন তা সাব্যস্ত করা এবং তাঁর সৃষ্টির সাথে সদৃশ স্থাপন না করা। সুতরাং যে ব্যক্তি বলে: আল্লাহর কোনো 'ইলম (জ্ঞান) নেই; নেই কোনো শক্তি, দয়া ও কথাবার্তা। তিনি ভালোবাসেন না, সন্তুষ্ট হন না; তিনি আহ্বান করেন না, গোপনে কথা বলেন না, আরোহণ করেন না, তাহলে সেই ব্যক্তি হবে নাস্তিক, অস্বীকারকারী, আল্লাহকে অস্তিত্বহীন শূন্যতা ও জড়পদার্থের সাথে উপমা দানকারী।
আবার যে ব্যক্তি বলবে: তাঁর (আল্লাহর) জ্ঞান আমার জ্ঞানের মতো, অথবা তাঁর শক্তি আমার শক্তির মতো, অথবা তাঁর ভালোবাসা আমার ভালোবাসার মতো, অথবা তাঁর সন্তুষ্টি আমার সন্তুষ্টির মতো, অথবা তাঁর দুই হাত আমার দুই হাতের মতো, অথবা তাঁর اِسْتِوَاءُ (আরোহণ) আমার اِسْتِقْرَاءُ (আরোহণ) এর মতো, তাহলে সেই ব্যক্তি আল্লাহকে প্রাণির সাথে তুলনাকারী ও সাদৃশ্যদানকারী বলে গণ্য হবে। বরং জরুরীভাবে আবশ্যক হলো কোনো রকম উপমা ও সাদৃশ্য প্রদান ছাড়াই এ গুণগুলো সাব্যস্ত করা এবং কোনো প্রকারের অর্থহীন করা ছাড়াই তাঁকে পবিত্র ঘোষণা করা।(৩৬)
৩৯. এমন কাউকে আমরা জানি না, যে বলে: তিনি (আল্লাহ) তাঁর সৃষ্টিকুলের মধ্য থেকে কোনো কিছুর মুখাপেক্ষী, অথবা তাঁর সৃষ্টিসমূহ ছাড়া অন্য কোনো কিছুর মুখাপেক্ষী। আবার কেউ এ কথাও বলে না যে, আল্লাহ তা'আলা 'আরশের মুখাপেক্ষী, অথচ তিনি হলেন 'আরশের স্রষ্টা; আর সৃষ্টি মুখাপেক্ষী হয় স্রষ্টার, স্রষ্টা মুখাপেক্ষী হয় না সৃষ্টির; আবার তাঁর কুদরতের মাধ্যমেই 'আরש ও বাকি যাবতীয় সৃষ্টি স্থায়ী হয়েছে; আর তিনি 'আরশের প্রয়োজনীয়তা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত; তিনি ভিন্ন সকল সৃষ্টি তাঁর মুখাপেক্ষী।
আর যখন আল্লাহ 'আরশের উপরে, তখন তাঁর জন্য 'আরশের মুখাপেক্ষী হওয়া আবশ্যক নয়; কারণ আল্লাহ তা'আলা বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করেছেন এমনভাবে, যার এক অংশ আরেক অংশের উপর এবং তিনি তার উপরের সৃষ্টিকে নিচের সৃষ্টির মুখাপেক্ষী করেননি। সুতরাং বায়ু যমীনের উপরে, অথচ সে তার মুখাপেক্ষী নয়। অনুরূপভাবে মেঘমালাও তার (যমীনের) উপরে, অথচ সেও তার মুখাপেক্ষী নয়। অনুরূপভাবে আকাশসমূহ মেঘমালা, বাতাস ও যমীনের উপর, অথচ আসমান এগুলোর মুখাপেক্ষী নয়; আর 'আরש হলো আসমানসমূহ ও যমীনের উপর, অথচ সে এগুলোর মুখাপেক্ষী নয়। অতএব, কীভাবে সকল সৃষ্টির স্রষ্টা সুমহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিকুলের মুখাপেক্ষী হবেন, অথচ তাঁর অবস্থান হলো সকল সৃষ্টির উপরের উপরে?!
আর আমরা জানি যে, আল্লাহ তা'আলা হলেন সকল কিছুর সৃষ্টিকর্তা; আর তাঁর অনুগ্রহ বা সাহায্য ছাড়া প্রকৃতপক্ষে কারও কোনো উপায় ও শক্তি সামর্থ্য নেই। আর যে শক্তি 'আরশ ও 'আরש বহনকারী ফেরেশতাগণের মধ্যে আছে, তিনি তার স্রষ্টা; বরং আমরা বলব: তিনি 'আরশ বহনকারী ফেরেশতাগণের কর্মকাণ্ডসমূহের স্রষ্টা। সুতরাং তিনি যখন এই সকল কিছুরই সৃষ্টিকর্তা এবং তাঁর অনুগ্রহ বা সাহায্য ছাড়া প্রকৃতপক্ষে কারও কোনো উপায় ও শক্তি-সামর্থ্য নেই, তখন তাঁর পক্ষে অন্যের দ্বারস্থ ও মুখাপেক্ষী হওয়া একেবারেই অসম্ভব।
আমরা বলিনি যে, তিনি (আল্লাহ) অন্যের মুখাপেক্ষী; বরং তিনি নিরন্তর 'আরশ ও অন্য সবকিছুর অভাব ও প্রয়োজন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত; কিন্তু আমরা বলি: নিশ্চয় তিনি সকল কিছুর উপর ক্ষমতাবান। সুতরাং যখন আমরা তাঁকে এর ওপর ক্ষমতাবান বলে সাব্যস্ত করব, তখন এটা তাঁর জন্য শক্তি-সামর্থ্যের পরিপূর্ণতা সম্পন্ন একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ গুণ হয়ে যাবে, অন্যদের প্রতি মুখাপেক্ষিতাসহ নয়। (৩৭)
৪০. মহান রব আল্লাহ তা'আলা এমন পরিপূর্ণ গুণাবলির দ্বারা গুণান্বিত, যার উপরে আর কোনো গুণ হতে পারে না; সকল প্রকারের ত্রুটি ও অপূর্ণতা থেকে এবং পরিপূর্ণ গুণাবলির কোনো কিছুর সাথে তাঁর সদৃশ হওয়া থেকে তিনি সম্পূর্ণ পবিত্র ও মুক্ত। তিনি পুরোপুরিই অপূর্ণ বা ত্রুটিপূর্ণ যাবতীয় গুণাবলি থেকে মুক্ত। আর তাঁর পরিপূর্ণ গুণাবলি, কোনো কিছুই সেগুলোতে তাঁর সদৃশ হয় না; এমনকি সে ক্ষেত্রে কোনো কিছু তাঁর কাছাকাছিও হয় না। আর আল্লাহকে পবিত্র ঘোষণার বিষয়টি দু' প্রকারের বিষয়কে শামিল করে: অপূর্ণতা বা ত্রুটি না থাকা এবং পরিপূর্ণ গুণাবলির ক্ষেত্রে অন্যকে তাঁর সদৃশ মনে না করা। (৪৮)
৪১. আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা মহাপরিপূর্ণতার অধিকারী। তাঁর পক্ষে যে কোনোভাবেই অন্যের মুখাপেক্ষী হওয়া অসম্ভব; কারণ যদি তিনি কোনো কিছুতে অন্যের দ্বারস্থ হন, তাহলে তো তিনি অন্যের মুখাপেক্ষী হলেন। অথচ জরুরি বিষয় হলো: হয় তাঁর জন্য পরিপূর্ণতার বিষয়টি সাব্যস্ত করা অথবা যা কিছু তাঁর পরিপূর্ণতাকে খাট বা ত্রুটিযুক্ত করে, তা দূর করা। (৪৯)
৪২. মহান রব আল্লাহ তা'আলা যাবতীয় অপূর্ণতা ও ত্রুটি থেকে পবিত্র এবং তিনি এমন পরিপূর্ণতার গুণের দ্বারা গুণান্বিত, যার মধ্যে কোনো প্রকারের কমতি বা ত্রুটি নেই; আর পরিপূর্ণ গুণাবলির ক্ষেত্রে তাঁর গুণাবলির মধ্য থেকে কোনো কিছুকে সৃষ্টিসমূহের কোনো গুণের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ করা থেকে তিনি সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র। সুতরাং তাঁর গুণাবলির মধ্য থেকে কোনো কিছুতেই তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই, না তাঁর কর্মকাণ্ডের মধ্যে, না তাঁর শক্তি-সামর্থ্যের মধ্যে, না তাঁর ইচ্ছা-আকাঙ্খার মধ্যে, না তাঁর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির মধ্যে, না তাঁর সৃষ্টি নৈপুণ্যের মধ্যে, না তাঁর إِسْتِوَاءُ (আরোহণ) এর মধ্যে, না তাঁর আসা-যাওয়ার মধ্যে, না তাঁর অবতরণের মধ্যে এবং না এগুলো ছাড়া অন্য কোনো গুণের মধ্যে, যার দ্বারা তিনি স্বয়ং নিজেকে বিশেষিত করেছেন অথবা যার দ্বারা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে গুণান্বিত করেছেন; বরং সালাফে সালেহীন কোনো রকম বিকৃতি, অর্থশূন্যতা, ধরণ নির্ধারণ ও তুলনা করা ছাড়াই আল্লাহ তা'আলাকে এমন গুণাবলি দ্বারা বিশেষিত করেন, যার দ্বারা আল্লাহ স্বয়ং নিজেকে বিশেষিত করেছেন অথবা যার দ্বারা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে গুণান্বিত করেছেন। সুতরাং তাঁর গুণাবলি থেকে এমন কোনো গুণকে তাঁর (আল্লাহর) থেকে প্রত্যাখ্যান বা না করেন না, যা তিনি তাঁর নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন এবং তাঁরা তাঁর গুণাবলিকে সৃষ্টিকুলের গুণাবলির সাথে সদৃশ স্থাপন করেন না। অতএব, (এসব গুণাবলি) অস্বীকারকারী মু'আত্ত্বিল বা অর্থশূন্যকারী, নিষ্ক্রীয়কারী; আর যারা অর্থশূন্যকারী ও নিষ্ক্রীয়কারী তারা অস্তিত্বহীনের ইবাদত করে। অপরদিকে সদৃশ স্থাপনকারীরা তো উপমা প্রদানকারী; আর যারা উপমা প্রদানকারী তারা তো মূর্তির পূজা করে।
সালাফে সালেহীনের মতাদর্শ হলো: কোনো প্রকার সদৃশ স্থাপন করা ছাড়াই (গুণাবলি) সাব্যস্ত করা এবং কোনো রকম অর্থহীন করা ছাড়াই তাঁকে পবিত্র বলে জানা। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন: )لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ “কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়" এটা উপমা প্রদানকারীদের দাবির খণ্ডন। তিনি আরও বলেন: وَهُوَ )السّمِيعُ الْبَصِيرُ "আর তিনি সর্বশ্রাতা, সর্বদ্রষ্টা” এটা নাস্তিকদের জবাব। (৫০)
৪৩. যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার গুণাবলি থেকে এমন বুঝ অনুধাবন করে, যা নতুন কিছু সংঘটনকে আবশ্যকীয়ভাবে দাবি করে এবং সৃষ্টিকুলের গুণাবলির সাথে সদৃশ হয়, অতঃপর এটাকে আল্লাহ থেকে অস্বীকার করার চেষ্টা করল, তাহলে সে ব্যক্তি (আল্লাহকে সৃষ্টির সাথে) তুলনা করল এবং (আল্লাহর গুণকে) অর্থহীন করল; বরং এ ব্যাপারে আবশ্যক হলো, আল্লাহ তা'আলাকে শুধু এমন গুণাবলি দ্বারাই বিশেষিত করা, যা দ্বারা তিনি (আল্লাহ) স্বয়ং নিজেকে গুণান্বিত করেছেন, অথবা যা দ্বারা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বিশেষিত করেছেন; আমরা কুরআন ও হাদীস অতিক্রম করব না। তাছাড়া আমরা জেনে নিব যে, কোনো কিছুই আল্লাহ তা'আলার সদৃশ নয়; না তাঁর আপন সত্তাতে, না তাঁর গুণাবলিতে, না তাঁর কর্মকাণ্ডসমূহে। সৃষ্টিকুলের জ্ঞান-বুদ্ধি তাঁর (অস্তিত্ব ও বৈশিষ্ট্যের) প্রকৃত ধরণ অনুধাবন করতে সক্ষম নয় এবং তাদের মুখের ভাষা তাঁর গুণাবলি নাগাল পাওয়ার ক্ষমতা রাখে না )سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُونَ وَسَلَامٌ عَلَى الْمُرْسَلِينَ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ “তারা যা আরোপ করে, তা থেকে পবিত্র ও মহান আপনার রব, সকল ক্ষমতার অধিকারী। আর শান্তি বর্ষিত হোক রাসূলদের প্রতি! আর সকল প্রশংসা সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহরই প্রাপ্য।” [সূরা আস-সাফফাত: ১৮০-১৮২] (৫১)
৪৪. আল্লাহ তা'আলাকে এমন গুণাবলি দ্বারা বিশেষিত করা হবে, যা দ্বারা তিনি (আল্লাহ) স্বয়ং নিজেকে গুণান্বিত করেছেন, অথবা যা দ্বারা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বিশেষিত করেছেন, কুরআন ও হাদীসে আসার সীমা অতিক্রম করা যাবে না এবং এর মধ্যে অতীতের 'ইলম ও ঈমানওয়ালা সালাফে সালেহীনের পথ অনুসরণ করা হবে। আর কুরআন ও সুন্নাহ থেকে অনুধাবন করা অর্থসমূহ কোনো প্রকার সন্দেহের উদ্রেক হওয়ার অজুহাতে বাদ দেয়া যাবে না; কারণ এটা করা হলে তা হবে কথাগুলো স্থানচ্যুত করে বিকৃত করার পর্যায়ভুক্ত। আবার সেসব গুণ বুঝা ও সাব্যস্ত করা থেকে মুখ ফিরিয়েও থাকা যাবে না, তাহলে তা হবে এমন পর্যায়ভুক্ত, যারা তাদের রবের আয়াতসমূহ স্মরণ করিয়ে দিলে তার ওপর অন্ধ এবং বধিরের মতো পড়ে থাকে; আর কুরআন নিয়ে চিন্তা-গবেষণা ছেড়ে দেয়া যাবে না, তাহলে তা হবে এমন পর্যায়ভুক্ত, যারা শুধু পড়া ব্যতীত আল্লাহর কুরআন সম্পর্কে কিছুই জানে না। (৩২)
৪৫. জাহিল-মূর্খ বাক্তি কালামশাস্ত্রবিদদের একথা দ্বারা বিভ্রান্ত হয়ে যায়: (কালামশাস্ত্রবিদের কথা হচ্ছে) 'আরবগণ اِسْتِواۂ )আরোহণ) শব্দটিকে গঠন করেছে মানুষ কর্তৃক ঘরের উপর, অথবা নৌযানের উপর উঠা, অথবা জুদী পর্বতের উপর নৌকা স্থির হওয়া এবং এ জাতীয় কোনো কোনো সৃষ্টির আরোহণ বা স্থির হওয়ার অর্থে। (অর্থাৎ স্রষ্টার জন্য নয়, কেবল সৃষ্টির জন্য এটা আরবদের ভাষায় এসেছে।)
বস্তুত তাদের এ কথা গ্রহণযোগ্য নয়; যে ব্যক্তি ধারণা করবে যে, এই إِسْتِوَ (আরোহণ) যখন বাস্তব বা প্রকৃত অর্থে হবে, তখন তা সৃষ্টিকুলের গুণাবলি থেকে কোনো কিছুকে শামিল করবে, অথচ 'নস' তাকে আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করেছে, তাহলে সেই ব্যক্তি ভাষার অর্থ অনুধাবনে এবং (ভাষার) হাকীকত (প্রকৃত অর্থ) ও মাজায (রূপক অর্থ) বুঝার ক্ষেত্রে গণ্ডমূর্খ বলে বিবেচিত হবে।
মূলত এসব গণ্ডমূর্খরা তাদের বুঝ বা উপলব্ধির সূচনাতেই তারা সৃষ্টিকর্তার গুণাবলিকে সৃষ্টিকুলের গুণাবলির সাথে তুলনা করে; অতঃপর তারা এটাকে অস্বীকার করে ও অর্থশূন্য করে। ফলে তারা এর থেকে শুধু এমন অর্থই অনুধাবন করে, যা সৃষ্টিকুলের জন্য খাস (নির্দিষ্ট) এবং এর প্রকৃত অর্থকে প্রত্যাখ্যান করে; আর তখন মহান রবের বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি থেকে তিনি (আল্লাহ) যার যোগ্য ও উপযুক্ত, তারা তা অস্বীকার করতে থাকে এবং আল্লাহর নাম ও আয়াতসমূহ অবিশ্বাস করে। আবার তারা বের হয়ে যায় যুক্তিনির্ভর কিয়াস ও শরী'আতসম্মত বক্তব্যের গণ্ডী থেকেও; ফলে তাদের হাতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না, না কোনো সুস্পষ্ট যুক্তি এবং না কোনো বিশুদ্ধ দলীল-প্রমাণ। (৫৩)
৪৬. আল্লাহ তা'আলা বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করার পূর্বে তিনি একাই ছিলেন, যিনি মহাপবিত্র, যাঁর কোনো শরীক (অংশীদার) নেই; তারপর যখন তিনি সৃষ্টিজগৎ সৃষ্টি করলেন, তখন তিনি জগতকে তাঁর সত্তার মধ্যে সৃষ্টি করেননি যে, তিনি সৃষ্টিকুলের জন্য স্থান হবেন; আবার তিনি আলাদা সৃষ্টি করে তাঁর সত্তাকে জগতের মধ্যে শামিলও করে দেননি যে, তিনি সৃষ্টিকুলের প্রতি মুখাপেক্ষী ও নির্ভরশীল থাকবেন; বরং তাঁর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করেই তিনি জগতকে বানিয়েছেন। ফলে তিনি তার উপরে থাকলেন এবং তা হলো উপরের দিক।(৫৪)
৪৭. মহান রব আল্লাহ তা'আলার সত্তা থেকে যা 'না' করা বা দূর করা আবশ্যক, তা হলো: সৃষ্টিকুলের বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্য থেকে কোনো কিছুর দ্বারা তাঁকে বিশেষিত করা, যেমনিভাবে আবশ্যক হলো সৃষ্টিকর্তার বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্য থেকে কোনো কিছুর দ্বারা মাখলুক (সৃষ্টি) কে বিশেষিত না করা অথবা বান্দার জন্য এমন কিছু সাব্যস্ত না করা, যাতে তার সাথে রবের সদৃশ হয়ে যায়। (৫৫)
৪৮. বিদ্যমান অস্তিত্বসম্পন্ন কোনো বস্তু আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার সদৃশ নয়; আর সৃষ্টিকুলের গুণাবলির ক্ষেত্রে তাদের সাথে তাঁর ভিন্নতা ও বৈপরীত্বের বিষয়টি অনেক বড় ব্যবধানের, সৃষ্টিকুলের একের সাথে আরেক সৃষ্টির ভিন্নতা ও বৈপরীত্বের চেয়ে। আর তিনি সৃষ্টিসমূহের কোনো কিছুর সদৃশ হওয়া থেকে অথবা তাঁর গুণাবলির ক্ষেত্রে তিনি তার (সৃষ্টির) কাছাকাছি হওয়ার চেয়ে অনেক বড় ও মহান।(৫৬)
৪৯. মানুষের আত্মা যখন তার নিকট সবচেয়ে নিকটতম বস্তু, এমনকি তা তার প্রবৃত্তি কামনা-বাসনার প্রতীক, অথচ সে তার ধরণ সম্পর্কে কিছুই জানে না এবং তার বাস্তব রূপকে সে জ্ঞান-বুদ্ধির ছকে আয়ত্ত বা হৃদয়ঙ্গম করতে পারে না, তখন সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ তা'আলার ধরণ সম্পর্কে বান্দা আরও উত্তমভাবেই না জানার কথা এবং তার জ্ঞান আল্লাহর প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে মোটেই উপলব্ধি ও হৃদয়ঙ্গম করতে পারবে না।(৫৭)
৫০. নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টিকুলকে সৃষ্টি করার পূর্বেও বিদ্যমান ছিলেন, তারপর তিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তারপর তিনি তাদের মধ্যে প্রবেশ করেননি এবং তাঁর নিজের মধ্যেও তিনি তাদেরকে শামিল করে নেননি। সুতরাং তাঁর সৃষ্টিকুলের মধ্যে তাঁর সত্তা থেকে কোনো কিছুই নেই; আবার তাঁর সত্তার মধ্যেও তাঁর সৃষ্টিকুলের মধ্য থেকে কোনো কিছুই নেই।(৫৮)
৫১. যে ব্যক্তি প্রশ্ন করে: তিনি কীভাবে নিকটতম আসমানে অবতরণ করেন? তখন তাকে বলা হবে: তিনি কেমন? তারপর সে যখন বলে: আমি তাঁর ধরণ সম্পর্কে জানি না। তখন তাকে বলা হবে: তাহলে আমরাও অবতরণের ধরণ-প্রকৃতি সম্পর্কে জানি না; কারণ 'সিফাত' (গুণ) সম্পর্কে জানাটা আবশ্যক করে 'মাউসূফ' (বিশেষিত বস্তু) সম্পর্কে জানা; আর তা (গুণ সম্পর্কে জানা) তো তার (মাউসূফ বা গুণান্বিত সম্পর্কে জানা এর) শাখা ও অনুগামী। সুতরাং তুমি কীভাবে আমার নিকট দাবি কর বা জানতে চাও তাঁর শ্রবণ, দেখা, কথাবার্তা, আরোহণ ও অবতরণের ধরণ-প্রকৃতির জ্ঞান সম্পর্কে, অথচ তুমি তাঁর সত্তার ধরণ সম্পর্কেই কিছু জান না?!(৫৮)
৫২. আল্লাহ তা'আলা বলেন: )وَاسْتَوَتْ عَلَى الْجُودِيَ﴿ "আর নৌকা জুদী পর্বতের উপর স্থির হলো” [সূরা হূদ: ৪৪]; তিনি আরও বলেন: )فَأَسْتَوَى عَلَى سُوقِهِ "তারপর কাণ্ডের উপর দাঁড়ায় দৃঢ়ভাবে” [সূরা আল-ফাতহ: ২৯]; তিনি আরও বলেন: )فَإِذَا اسْتَوَيْتَ أَنتَ وَمَن مَّعَكَ عَلَى الْفُلْكِ "অতঃপর যখন আপনি ও আপনার সঙ্গীরা নৌযানের উপরে স্থির হবেন” [সূরা আল-মুমিনূন: ২৮] এবং তিনি আরও বলেন: لِتَسْتَوُ۫ا عَلَى ظُهُورِهِۦ﴿ "যাতে তোমরা এর পিঠে স্থির হতে পার” [সূরা আয-যুখরুফ: ১৩] এই জাতীয় সব ক'টি اِسْتِ (আরোহণ) শামিল করে আরোহণকারী কর্তৃক আরোহণকৃত বস্তুর প্রতি মুখাপেক্ষী হওয়ার বিষয়টিকে; কারণ, তার নিচে যদি তা (আরোহণকৃত বস্তু) না থাকে, তাহলে সে নিশ্চিত পড়ে যাবে। কিন্তু আল্লাহর বাণীঃ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ "তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন” [সূরা আল-আ'রাফ: ৫৪] এখানে আল্লাহ তা'আলা 'আরশ ও অন্য সকল কিছুর অভাব ও প্রয়োজন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত; বরং তিনি তাঁর মহান কুদরতের মাধ্যমে 'আরশ ও 'আরশের বহনকারী ফেরেশতাগণকে ধারণ বা বহন করেন।
সুতরাং اِسْتِ শব্দটি সৃষ্টিকুলের জন্য হলে এমন কতগুলো অর্থকে আবশ্যক করে, যেগুলো থেকে আল্লাহ তা'আলা পবিত্র। এমনভাবে তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন, যা তাঁর পক্ষ থেকে আরশের প্রতি কোনো রকমের মুখাপেক্ষিতা ছাড়াই সংঘটিত হয়েছে। বরং 'আরשসহ সকল কিছুই সর্বদিক থেকে তাঁর মুখাপেক্ষী। (৬০)
৫৩. আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার কর্মকাণ্ড ও বিষয়াদির মধ্য থেকে কোনো কিছুতেই তাঁর কোনো সমকক্ষ কেউ নেই; কারণ তিনি বিস্তারিতভাবেই পরিপূর্ণ গুণাবলি দ্বারা গুণান্বিত এবং সে ক্ষেত্রে তাঁর উপমা দান ও তুলনা করা থেকে তিনি সম্পূর্ণ পবিত্র। আবার তিনি সাধারণভাবে যাবতীয় ত্রুটি, কমতি ও অপরিপূর্ণতা থেকে পবিত্র; কারণ তাঁকে অপরিপূর্ণতা দ্বারা বিশেষিত ও গুণান্বিত করাটা বড় বাতিল ও ভিত্তিহীন বিষয়, অপরদিকে তাঁর পরিপূর্ণতার বিষয়টি তাঁর পবিত্র সত্তার অপরিহার্য বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। (৬১)
৫৪. মুসলিমগণ মধ্যমপন্থা অবলম্বনে কোনো রকম বিকৃতি, অর্থশূন্যতা, ধরণ নির্ধারণ ও উপমা প্রদান করা ছাড়াই আল্লাহ তা'আলাকে এমন গুণাবলি দ্বারা গুণান্বিত করেন, যার দ্বারা তিনি তাঁর নিজকে গুণান্বিত করেছেন এবং যার দ্বারা তাঁর রাসূলগণ তাঁকে গুণান্বিত করেছেন। তারা তাঁকে পরিপূর্ণ গুণাবলির দ্বারা বিশেষিত করেছেন এবং তারা এমন যাবতীয় ত্রুটি ও অসম্পূর্ণতা থেকে তাঁকে পবিত্র ঘোষণা করেছেন, যা সৃষ্টিকর্তার জন্য মানানসই নয় এবং যার দ্বারা সাধারণত শুধু সৃষ্টিকেই গুণান্বিত করা হয়। সুতরাং তারা তাঁকে জীবন, 'ইলম (জ্ঞান), শক্তি-সামর্থ্য, রহমত (দয়া), 'আদল (ন্যায়), ইহসান ইত্যাদির দ্বারা বিশেষিত করেন এবং তারা তাঁকে মৃত্যু, ঘুম-নিদ্রা, জাহল (অজ্ঞতা), অক্ষমতা, যুলুম, ধ্বংস বা বিনাশ ইত্যাদি থেকে পবিত্র ও মুক্ত বলে ঘোষণা করেন। তাছাড়া তারা জানেন ও বিশ্বাস করেন যে, তাঁর পরিপূর্ণ গুণাবলির কোনো কিছুতে তাঁর কোনো সদৃশ নেই। সুতরাং তাঁর জানার মতো করে কেউ জানে না, তাঁর শক্তি-সামর্থ্যের মতো করে কেউ শক্তি-সামর্থ্য রাখে না, তাঁর দয়ার মতো করে কেউ দয়া করতে পারে না, তাঁর শ্রবণের মতো করে কেউ শ্রবণ করে না, তাঁর দেখার মতো করে কেউ দেখতে পায় না, তাঁর সৃষ্টির মতো করে কেউ সৃষ্টি করতে পারে না, তাঁর اِسْتِ (আরোহণ) করার মতো করে কেউ আরোহণ করতে পারে না, তাঁর আগমনের মতো করে কেউ আগমন করতে পারে না এবং তাঁর অবতরণের মতো করে কেউ অবতরণ করতে পারে না। (১৯)
৫৫. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: [(আল্লাহ) আকাশে] অর্থাৎ উপরে; তাদের উদ্দেশ্য এই নয় যে, তিনি আকাশমণ্ডলীর অভ্যন্তরভাগের মধ্যে; বরং আকাশ মানে ঊর্ধ্বে। আর তিনি যখন 'আরশের উপরে, তখন তিনি সর্বোচ্চে, মহাঊর্ধ্বে এবং সেখানে কোনো সৃষ্টি নেই; এমনকি মহান 'রব' সেখানে সৃষ্টিকুলের কোনো কোনো কিছুর মধ্যে সীমাবদ্ধ বা বেষ্টিত নন এবং তিনি কোনো বিদ্যমান দিকের মধ্যেও আবদ্ধ নন; বরং অস্তিত্ব তো রয়েছে কেবল স্রষ্টা ও সৃষ্টির। আর সৃষ্টিকর্তার অবস্থান তাঁর সৃষ্টিসমূহ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি সকলের উপরের উপরে। সুতরাং তিনি কোনো সৃষ্টির মধ্যেই নন, চাই ঐ সৃষ্টিকে কোনো 'দিক' বলে অভিহিত করা হোক, অথবা কোনো 'দিক' বলে অভিহিত করা না হোক।(৬৩)
৫৬. সুতরাং যে ব্যক্তি বলে: তিনি (আল্লাহ) 'আরশের উপর উঠেছেন সম্রাট কর্তৃক (সিংহাসনে) উঠার মতো এমনভাবে যে, তিনি 'আরশের প্রতি মুখাপেক্ষী, তাহলে এটা হবে ঘৃণ্য উপমা; কারণ আল্লাহ তা'আলা তিনি ভিন্ন বাকি সকল কিছুর অভাব ও প্রয়োজন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। আর 'আরש ও বাকি সকল সৃষ্টি সামগ্রিক দিক থেকে আল্লাহ তা'আলার মুখাপেক্ষী। আর তিনি তাঁর কুদরতের মাধ্যমে 'আরש ও তার বনহকারী ফেরেশতাগণকে ধারণ বা বহন করেন।(৬৪)
এভাবে ইবন তাইমিয়্যাহ'র বক্তব্য থেকে আমরা আল্লাহর গুণাবলির ব্যাপারে বাতিলপন্থী জাহমী, মু'তাযিলী, আশ'আরী ও মাতুরিদী সম্প্রদায়ের আরোপিত সন্দেহসমূহের জবাব দেয়ার চেষ্টা করেছি। তাঁর এসব বক্তব্য কত মহৎ ও শক্তিশালী কথা! কত ব্যাপক অর্থবহ কথা! কত উপকারী বক্তব্য! কত বিশুদ্ধ বাণী! কত বলিষ্ঠ ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ কথা! কত অগ্রাধিকার পাওয়ার মতো বক্তব্য! তার থেকে হক ও সত্যের আলোসমূহ জ্বলজ্বল করছে। আর ইনসাফের চাদরে তাকে বিচার-বিশ্লেষণ ও যাচাই-বাছাইয়ের পোশাকে মুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কোনো দিক থেকে তাতে কোনো প্রকারের সন্দেহ ও সংশয় নেই।
আল্লাহ তা'আলা শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ'র প্রতি রহম করুন! কারণ, তাঁর বক্তব্যটি সুস্পষ্ট হক এবং বিশুদ্ধ সত্য, যা প্রকাশ পেয়েছে নিরেট স্বচ্ছ মেধা এবং বিশ্বস্ত গভীর জ্ঞান থেকে। তার বিশ্লেষণ ও নিরীক্ষণ কত অলঙ্কারপূর্ণ! আর তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও সংশোধন পরিমার্জন কত পরিপূর্ণ!
এ অধ্যায়ের উপসংহারে আমি শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ'র ওপর মিথ্যা অপবাদ আরোপকারীদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি আল্লাহ তা'আলার এ বাণীটি: ﴿وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًا ﴾ [الأحزاب: ٥٨] "আর যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে কষ্ট দেয় যা তারা করেনি তার জন্য; নিশ্চয় তারা অপবাদ ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করলো।” [সূরা আল-আহযাব: ৫৮]
তাদেরকে আরও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ বাণী:
وَمَنْ قَالَ فِي مُؤْمِنٍ مَا لَيْسَ فِيهِ أَسْكَنَهُ اللهُ رَدْغَةَ الْبَالِ حَتَّى يَخْرُجَ بِمَا قَالَ
"আর যে ব্যক্তি কোনো ঈমানদারের এমন দোষ বলে বেড়ায় যা তার মধ্যে নেই, সে ব্যক্তিকে আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামীদের আবর্জনার মধ্যে বসবাস করাবেন, যতক্ষণ না সে (তাওবা করে) তার কথা প্রত্যাহার করবে।"(৬৫)
আর رَدْغَة الخبال এর অর্থ: জাহান্নামীদের নির্যাস বা আবর্জনা, যেমনটি নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন। (৬৬)
আর আমি তাদেরকে তাওবা করার জন্য আহ্বান করি ঐদিন আগমনের পূর্বে, যেদিন লজ্জা বা অনুশোচনা কোনো উপকারে আসবে না।
গ্রন্থটির মূল দাবি
কুরআন ও সুন্নাহকে সালাফে সালেহীনের মানহাজে বুঝতে হবে
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ তাঁর সকল গ্রন্থে যে বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন ও যার জন্য তার জীবনকে উৎসর্গ করেছেন তা হচ্ছে সালাফী মানহাজ; কারণ আমরা জানি যে, বিশুদ্ধ থাকতে হলে সালাফী মানহাজ না গ্রহণ করার কোনো বিকল্প নেই। তাই সালাফী মানহাজ নিয়ে নিম্নে কিছু আলোচনা পেশ করা হলো:
যেকোনো ধর্মাবলম্বীকে যদি আপনি জিজ্ঞেস করেন যে, তুমি কার অনুসরণ কর? তবে সে অবশ্যই তাদের ধর্মের প্রধান ব্যক্তি ও তার সহচরদের দিকেই অঙ্গুলী নির্দেশ করবে। জাগতিক ধর্মের মধ্যে হিন্দুদের জিজ্ঞেস করলে ঋষী-মহাঋষীদের কথাই বলবে। বৌদ্ধদের জিজ্ঞেস করলে বৌদ্ধ ও তার একান্ত সহচরদের জীবনকেই তাদের আদর্শ হিসেবে বর্ণনা করবে। জৈনদের জিজ্ঞেস করলে মহাবীর ও তার মতদেরকেই তাদের অনুসরণযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে জানাবে। শিখদের জন্য গুরু নানক ও তার সহচররাই অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। এর বাইরে যারা আসমানী কিতাবের অনুসরণের দাবিদার তাদের মধ্যকার ইয়াহুদীদের কাছে আদর্শ হচ্ছে মূসা 'আলাইহিস সালাম ও তার সাথীরা সবচেয়ে সঠিক মানুষ, তাদের অনুসরণ ও অনুকরণকেই তারা ধর্মের সঠিক নীতি বলে আপনাকে জানাবে। যদি নাসারাদের জিজ্ঞেস করেন যে, তোমরা তোমাদের ধর্মের মাঝে কাদের অনুসরণ করাকে নিরাপদ মনে কর? তবে তারা অবশ্য বলবে, যিশু (ঈসা) ও তার সাথী হাওয়ারীদেরকেই মনে করি। ঠিক একই নিয়ম-নীতি অনুযায়ী আমরা ইসলামের ব্যাপারে কাদের নীতি অবলম্বন করতে হবে, কাদের অবস্থান আমাদের জন্য অবশ্য অনুকরণীয় তার ব্যাপারে নিশ্চিতভাবে বলা আবশ্যক হবে যে, তারা হচ্ছেন রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর অনুসারী সাহাবায়ে কিরাম রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুম।
আর সেজন্যই যারা এ পন্থা ধারণ করে তাদেরকে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আত বলে। কেননা তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত ও সাহাবায়ে কিরামের পদাঙ্ক অনুসরণের বাইরে যায় না।
সাহাবায়ে কিরাম হচ্ছেন এ উম্মতের জন্য সালাফ বা উত্তম পূর্বসূরী। কুরআনে কারীম ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতকে বুঝতে গিয়ে যারা এ সম্মানিত উত্তরসূরীদেরকে যথাযথভাবে অনুসরণ করবে তারাই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আহ। কিয়ামত পর্যন্ত যারাই এ নীতি সুন্দরভাবে মেনে চলবে, সাহাবায়ে কিরামের সকলের দিকে সম্পৃক্ত করে তাদেরকে সালাফী বলা হবে। যেমনিভাবে তাদেরকে নাজাতপ্রাপ্ত গোষ্ঠী, সাহায্যপ্রাপ্ত সম্প্রদায়, আছারের অনুসারী, হাদীসের অনুসারী ইত্যাদি নাম প্রদান করা হয়। এ সম্পর্ক কোনো ব্যক্তি বিশেষের দিকে নয়, কোনো নতুন মতাদর্শের দিকে নয়। এর সম্পৃক্ততা তো কেবল সাহাবায়ে কিরামের ব্যাপক ও প্রাচীন মানহাজ বা বিশুদ্ধ পদ্ধতির অনুসরণের দিকে। তাই তারাই সালাফী মানহাজের অনুসারী বলে বিবেচিত হবে যারা,
* সাহাবায়ে কিরামের আকীদায় থাকবে।
* সাহাবায়ে কিরামের আমল ও কর্মে থাকবে।
* সাহাবায়ে কিরামের আখলাক-চরিত্রে থাকবে।
* সাহাবায়ে কিরাম যা থেকে দলীল গ্রহণ করতেন তার ওপর থাকবে।
* সাহাবায়ে কিরাম যেভাবে দলীল গ্রহণ করতেন সেভাবে দলীল গ্রহণ করবে।
* সাহাবায়ে কিরাম আত্মশুদ্ধির যে পদ্ধতি অবলম্বন করবে তারা সে পদ্ধতির অনুসরণ করবে।
* সাহাবায়ে কিরাম যে পদ্ধতিতে রাসূলকে ভালোবাসতেন তারাও সে পদ্ধতিতে রাসূলকে ভালোবাসবে।
* সাহাবায়ে কিরাম যে পদ্ধতিতে ও যেদিকে দাওয়াত দিতেন তারাও সে পদ্ধতিতে দাওয়াত প্রদান করবে।
* সাহাবায়ে কিরাম দুনিয়ার কর্তৃত্ব ও নেতৃত্বের ব্যাপারে যে নীতি অবলম্বন করেছেন তারাও সে নীতিতে অবস্থান করবে।
* সাহাবায়ে কিরাম ভিন্ন মতাবলম্বীদের সাথে যে নীতি অবলম্বন করতেন তারারও একই ধরনের নীতিতে অবস্থান করবে।
সুতরাং যদি দীনে ইসলামের ওপর টিকে থাকতে হয়, যদি সঠিক পদ্ধতিটির অনুসরণ করতে হয় তবে কোনোক্রমেই সাহাবায়ে কিরাম ও তাদের সুন্দর অনুসারীদের মতাদর্শের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
ইসলামের ইতিহাসে যারাই পথভ্রষ্ট হয়েছে তারাই উপরোক্ত পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার কারণে হয়েছে। যেমন, নতুন মত ও পথে চলার কারণে খারেজী, রাফেযী, মু'তাযিলী, কাদারী, জাবরী, মুরজী ইত্যাদি ফির্কাসমূহের উদ্ভব ঘটেছে। অনুরূপভাবে একক ব্যক্তি বিশেষের মতবাদ অনুসরণের কারণে জাহমিয়া, আশ'আরিয়্যাহ, মাতুরিদিয়্যাহ ইত্যাদি ফির্কাসমূহ্যের উৎপত্তি হয়েছিল।
তাই যদি ইসলামের সঠিক মতাদর্শে থাকতে হয় তবে আমাদেরকে সালাফে সালেহীনের মতাদর্শকে অনুসরণ করতেই হবে, তার বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আর এ বিষয়টিকে দু'ভাবে সাব্যস্ত করা যায়:
এক. কুরআন ও সুন্নায় আসা দলীল-প্রমাণাদির মাধ্যমে সাব্যস্ত হওয়া
তন্মধ্যে কুরআনে কারীমে যেমন: ১- সাহাবায়ে কিরামের আকীদাহ ও আমলের ওপর আল্লাহর সন্তুষ্টি প্রকাশক ভাষ্যসমূহ:
(وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُم بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهَرُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ) [التوبة: ١٠٠]
"আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা ইহসানের সাথে তাদের অনুসরণ করে আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন। আর তিনি তাদের জন্য তৈরি করেছেন জান্নাত, যার নিচে নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। এ তো মহাসাফল্য।" [সূরা আত-তাওবাহ: ১০০]
(مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ وَأَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ تَرَتَهُمْ رُكَّعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِم مِّنْ أَثَرِ السُّجُودِ ذَلِكَ مَثَلُهُمْ فِي التَّوْرَنَةِ وَمَثَلُهُمْ فِي الْإِنجِيلِ كَزَرْعٍ أَخْرَجَ شَطْقَهُ فَتَازَرَهُ فَاسْتَغْلَظَ فَاسْتَوَى عَلَى سُوقِهِ، يُعْجِبُ الزُّرَّاعَ لِيَغِيظَ بِهِمُ الْكُفَّارُ وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ ءَامَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ مِنْهُم مَّغْفِرَةٌ وَأَجْرًا عَظِيمًا) [الفتح: ٢٩]
"মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল; আর তাঁর সহচরগণ কাফেরদের প্রতি কঠোর, তাদের পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল; আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় আপনি তাদেরকে রুকু ও সাজদায় অবনত দেখবেন। তাদের লক্ষণ তাদের মুখমণ্ডলে সাজদার প্রভাবে পরিস্ফুট; এটাই তাওরাতে তাদের দৃষ্টান্ত। আর ইঞ্জীলে তাদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে এমন একটি চারাগাছ, যা থেকে নির্গত হয় কচিপাতা, তারপর তা শক্ত ও পুষ্ট হয় এবং পরে কাণ্ডের উপর দাঁড়ায় দৃঢ়ভাবে যা চাষীর জন্য আনন্দদায়ক। এভাবে আল্লাহ মুমিনদের সমৃদ্ধি দ্বারা কাফিরদের অন্তর্জালা সৃষ্টি করেন। যারা ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ক্ষমা ও মহাপ্রতিদানের।" [সূরা আল-ফাতহ: ২৯]
(لَّقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَنزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ وَأَثْبَهُمْ فَتْحًا قَرِيبًا) [الفتح: ١٨]
"অবশ্যই আল্লাহ মুমিনগণের ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন, যখন তারা গাছের নিচে আপনার কাছে বাই'আত গ্রহণ করেছিল, অতঃপর তাদের অন্তরে যা ছিল তা তিনি জেনে নিয়েছেন; ফলে তিনি তাদের ওপর প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাদেরকে আসন্ন বিজয়ে পুরস্কৃত করলেন।” [সূরা আল-ফাতহ: ১৮]
২- সাহাবায়ে কিরামের ঈমানকে মানদণ্ড হিসেবে ঘোষণা করে আসা ভাষ্য:
فَإِنْ ءَامَنُوا بِمِثْلِ مَا ءَامَنتُم بِهِ، فَقَدِ اهْتَدَوا وَإِن تَوَلَّوْا فَإِنَّمَا هُمْ فِي شِقَاقٍ فَسَيَكْفِيكَهُمُ اللَّهُ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ ﴾ [البقرة: ١٣٧]
"অতঃপর তোমরা যেরূপ ঈমান এনেছ তারাও যদি সেরূপ ঈমান আনে, তবে নিশ্চয় তারা হিদায়াত পাবে। আর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তারা বিরোধিতায় লিপ্ত। সুতরাং তাদের বিপক্ষে আপনার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। আর তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।” [সূরা আল-বাকারাহ: ১৩৭]
৩- সাহাবায়ে কিরামের মত ও পথের বাইরে যাওয়া জাহান্নামে দগ্ধ হওয়ার কারণ:
وَمَن يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا ﴾ [النساء: ١١٥]
"আর কারো নিকট সৎপথ প্রকাশ হওয়ার পর সে যদি রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের পথ ছাড়া অন্য পথ অনুসরণ করে, তবে যেদিকে সে ফিরে যায় সে দিকেই তাকে আমরা ফিরিয়ে দিব এবং তাকে জাহান্নামে দগ্ধ করাব, আর তা কতই না মন্দ আবাস!" [সূরা আন-নিসা: ১১৫]
৪- সাহাবায়ে কিরাম সর্বোত্তম জাতির সর্বোত্তম প্রজন্ম হওয়া:
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَوْ ءَامَنَ أَهْلُ الْكِتَابِ لَكَانَ خَيْرًا لَّهُمْ مِنْهُمُ الْمُؤْمِنُونَ وَأَكْثَرُهُمُ الْفَاسِقُونَ ﴾ [آل عمران: ١١٠]
"তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবজাতির জন্য যাদের বের করা হয়েছে; তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দিবে, অসৎকাজে নিষেধ করবে এবং আল্লাহর ওপর ঈমান আনবে। আর আহলে কিতাবগণ যদি ঈমান আনতো তবে তা ছিল তাদের জন্য ভালো। তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক মুমিন আছে; কিন্তু তাদের অধিকাংশই ফাসেক।” [সূরা আলে ইমরান: ১১০]
وَكَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا وَمَا جَعَلْنَا الْقِبْلَةَ الَّتِي كُنتَ عَلَيْهَا إِلَّا لِنَعْلَمَ مَن يَتَّبِعُ الرَّسُولَ مِمَّن يَنقَلِبُ عَلَى عَقِبَيْهِ وَإِن كَانَتْ لَكَبِيرَةٌ إِلَّا عَلَى الَّذِينَ هَدَى اللَّهُ وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُضِيعَ إِيمَانَكُمْ إِنَّ اللَّهَ بِالنَّاسِ لَرَءُوفٌ رَّحِيمٌ ﴾ [البقرة: ١٤٣]
"আর এভাবে আমরা তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী জাতিতে পরিণত করেছি, যাতে তোমরা মানবজাতির ওপর সাক্ষী হও এবং রাসূল তোমাদের ওপর সাক্ষী হতে পারেন। আর আপনি এ যাবত যে কিবলা অনুসরণ করছিলেন সেটাকে আমরা এ উদ্দেশ্যে কিবলায় পরিণত করেছিলাম যাতে প্রকাশ করে দিতে পারি কে রাসূলের অনুসরণ করে এবং কে পিছনে ফিরে যায়? আল্লাহ যাদেরকে হিদায়াত করেছেন তারা ছাড়া অন্যদের ওপর এটা নিশ্চিত কঠিন। আল্লাহ এরূপ নন যে, তোমাদের ঈমানকে ব্যর্থ করে দিবেন। নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা আল-বাকারাহ: ১৪৩]
৫- সাহাবায়ে কিরাম দীনের দিকে প্রত্যাবর্তনকারী, তাদের পথ অনুসরণ করতে আল্লাহ আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,
﴿وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَيَّ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ﴾ [لقمان: ١٥]
"আর যে আমার অভিমুখী হয়েছে তার পথ অনুসরণ কর। তারপর তোমাদের ফিরে আসা আমারই কাছে, তখন তোমরা যা করতে সে বিষয়ে আমি তোমাদেরকে অবহিত করব।” [সূরা লোকমান: ১৫]
৬- আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে সত্যবাদীদের সাথে থাকতে বলেছেন, আর সাহাবায়ে কিরাম প্রথম সত্যবাদী হিসেবে আল্লাহর পক্ষ থেকে সত্যায়ণকৃত। আল্লাহ বলেন,
﴿أَجَعَلْتُمْ سِقَايَةَ الْحَاجِّ وَعِمَارَةَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ كَمَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَجَاهَدَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ لَا يَسْتَوُونَ عِندَ اللَّهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ ﴾ [التوبة: ١٩]
"হাজীদের জন্য পানি পান করানো ও মসজিদুল হারাম আবাদ করাকে তোমরা কি তার মতো বিবেচনা কর, যে আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান এনেছে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে? তারা আল্লাহর কাছে সমান নয়। আর আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে হিদায়াত দেন না।” [সূরা আত-তাওবাহ: ১৯]
৭- সাহাবায়ে কিরামের ব্যাপারে আল্লাহর সাক্ষ্য রয়েছে যে, তারা কখনও পরিবর্তন হয়নি। যেমন আল্লাহ বলেন,
﴿مِنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللَّهَ عَلَيْهِ فَمِنْهُم مَّن قَضَى نَحْبَهُ وَمِنْهُم مَّن يَنتَظِرُ وَمَا بَدَّلُوا تَبْدِيلًا ﴾ [الاحزاب: ٢٣]
"মুমিনদের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহর সাথে তাদের করা অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে, তাদের কেউ কেউ (অঙ্গীকার পূর্ণ করে) মারা গেছে এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষায় রয়েছে। তারা তাদের অঙ্গীকারে কোনো পরিবর্তন করেনি।” [সূরা আল-আহযাব: ২৩]
৮- সাহাবায়ে কিরাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের পথের ওপর ছিলেন বলে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ বলেন,
﴿أَفَأَمِنُوا أَن تَأْتِيَهُمْ غَشِيَةٌ مِّنْ عَذَابِ اللَّهِ أَوْ تَأْتِيَهُمُ السَّاعَةُ بَغْتَةً وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ ﴾ [يوسف: ١٠٧]
"তবে কি তারা আল্লাহর সর্বগ্রাসী শাস্তি হতে বা তাদের অজান্তে কিয়ামতের আকস্মিক উপস্থিতি হতে নিরাপদ হয়ে গেছে?" [সূরা ইউসুফ: ১০৭]
অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসেও সাহাবায়ে কিরামের বুঝকে গ্রহণ করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। যেমন,
৯- বিদ'আত ও শির্কের ছড়াছড়ি দেখা দিলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ ও খোলাফায়ে রাশেদার আদর্শ আঁকড়ে ধরতে বলা হয়েছে। রাসূল বলেন,
أُوصِيكُمْ بِتَقْوَى اللَّهِ وَالسَّمْعِ وَالطَّاعَةِ، وَإِنْ عَبْدٌ حَبَشِي، فَإِنَّهُ مَنْ يَعِضُ مِنْكُمْ يَرَى اخْتِلَافًا كَثِيرًا، وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الأُمُورِ فَإِنَّهَا ضَلَالَةٌ فَمَنْ أَدْرَكَ ذَلِكَ مِنْكُمْ فَعَلَيْهِ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ، عَضُوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِدِ
"আমি তোমাদেরকে আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করার এবং (নেতার আদেশ) শ্রবণ ও মান্য করার উপদেশ দিচ্ছি, যদিও সে (নেতা) হাবশী ক্রীতদাস হয়ে থাকে। তোমাদের মধ্যে যারা বেঁচে থাকবে, তারা বহু বিভেদ-বিসম্বাদ প্রত্যক্ষ করবে। তোমরা নতুন নতুন বিষয় আবিষ্কার করা হতে দূরে থাকবে। কেননা তা গুমরাহী। তোমাদের মধ্যে কেউ সে যুগ পেলে সে যেন আমার সুন্নাতে ও সৎপথপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নাতে দৃঢ়ভাবে অবিচল থাকে। তোমরা এসব সুন্নাতকে চোয়ালের দাঁতের সাহায্যে শক্তভাবে আঁকড়ে ধর।”(৬৭)
১০-রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তম প্রজন্মকে অনুসরণ করার নির্দেশনা দিয়ে বলেছেন,
خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِي، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ، ثُمَّ يَجِيءُ أَقْوَامٌ تَسْبِقُ شَهَادَةُ أَحَدِهِمْ يَمِينَهُ، وَيَمِينُهُ شَهَادَتَهُ
"আমার যুগের লোকেরাই সর্বোত্তম ব্যক্তি, অতঃপর যারা তাদের নিকটবর্তী। অতঃপর যারা তাদের নিকটবর্তী এরপরে এমন সব ব্যক্তি আসবে যারা কসম করার আগেই সাক্ষ্য দিবে, আবার সাক্ষ্য দেয়ার আগে কসম করে বসবে।”(৬৮)
১১- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিতনা ও সমস্যার সময় পুনরায় সাহাবায়ে কিরামের কর্মকাণ্ডের দিকে প্রত্যাবর্তন করতে নির্দেশ দিয়েছেন,
إِنَّهَا سَتَكُونُ فِتْنَةٌ ، فَقَالُوا : فَكَيْفَ لَنَا يَا رَسُولَ اللهِ ؟ وَكَيْفَ نَصْنَعُ ؟ قَالَ: «تَرْجِعُونَ إِلَى أَمْرِكُمُ الْأَوَّلِ
"অবশ্যই ফিতনা সংঘটিত হবে। তখন সাহাবায় কিরাম বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের তখন কী হবে? আমরা তখন কী করব? তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তোমরা তোমাদের প্রথম অবস্থার দিকে প্রত্যাবর্তন করবে'।”(৬৯)
১২-রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের বিভক্তির ব্যাপারে পূর্বাহ্নে আমাদেরকে সাবধান করে তাঁর আদর্শ ও সাহাবায়ে কিরামের আদর্শ অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছেন, তিনি বলেন,
لَيَأْتِيَنَّ عَلَى أُمَّتِي مَا أَتَى عَلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ حَذْوَ النَّعْلِ بِالنَّعْلِ، حَتَّى إِنْ كَانَ مِنْهُمْ مَنْ أَتَى أُمَّهُ عَلَانِيَّةٌ لَكَانَ فِي أُمَّتِي مَنْ يَصْنَعُ ذَلِكَ، وَإِنَّ بني إسرائيل تَفَرَّقَتْ عَلَى ثِنْتَيْنِ وَسَبْعِينَ مِلَّةَ، وَتَفْتَرِقُ أُمَّتِي عَلَى ثَلَاثٍ وَسَبْعِينَ مِلَّةً، كُلُّهُمْ فِي النَّارِ إِلَّا مِلَّةً وَاحِدَةٌ ، قَالُوا: وَمَنْ هِيَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: «مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي
"বনী ইসরাঈল যে অবস্থায় পতিত হয়েছিল, নিঃসন্দেহে আমার উম্মতও সেই অবস্থার সম্মুখীন হবে, যেমন এক জোড়া জুতার একটি আরেকটির মতো হয়ে থাকে। এমনকি তাদের মধ্যে কেউ যদি প্রকাশ্যে তার মায়ের সাথে ব্যভিচার করে থাকে, তবে আমার উম্মতের মধ্যেও কেউ তাই করবে। আর বনী ইসরাঈল ৭২ দলে বিভক্ত হয়েছিল। আমার উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে। শুধু একটি দল ছাড়া তাদের সবাই জাহান্নামী হবে। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে দল কোনটি? তিনি বললেন: আমি ও আমার সাহাবীগণ যার ওপর প্রতিষ্ঠিত।"(৭০)
১৩-রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীগণকে সুস্পষ্ট পথের ওপর রেখে গেছেন, যা দাবি করে যে তাদের পথেই পরবর্তীদেরকে চলতে হবে। তিনি বলেন,
قَدْ تَرَكْتُكُمْ عَلَى الْبَيْضَاءِ لَيْلُهَا كَنَهَارِهَا ، لَا يَزِيغُ عَنْهَا بَعْدِي إِلَّا هَالِكٌ، مَنْ يَعِشُ مِنْكُمْ فَسَيَرَى اخْتِلَافًا كَثِيرًا، فَعَلَيْكُمْ بِمَا عَرَفْتُمْ مِنْ سُنَّتِي، وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ، عَضُوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِدِ، وَعَلَيْكُمْ بِالطَّاعَةِ، وَإِنْ عَبْدًا حَبَشِيًّا، فَإِنَّمَا الْمُؤْمِنُ كَالْجَمَلِ الْأَنفِ، حَيْثُمَا قِيدَ انْقَادَه
"আমি তোমাদের আলোকিত দীনের ওপর রেখে যাচ্ছি, তার রাত তার দিনের মতই (উজ্জ্বল)। আমার পরে নিজেকে ধ্বংসকারীই কেবল এ দীন ছেড়ে বিপথগামী হবে। তোমাদের মধ্যে যে বেঁচে থাকবে সে অচিরেই অনেক মতবিরোধ দেখতে পাবে। অতএব, তোমাদের ওপর তোমাদের নিকট পরিচিত আমার আদর্শ এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদীনের আদর্শ অনুসরণ করা অবশ্য কর্তব্য। তোমরা তা শক্তভাবে দাঁত দিয়ে আকড়ে ধরে থাকবে। তোমরা অবশ্যই আনুগত্য করবে, যদি হাবশী গোলামও (তোমাদের নেতা নিযুক্ত) হয়। কেননা মুমিন ব্যক্তি হচ্ছে নাসারন্ধ্রে লাগাম পরানো উটতুল্য। লাগাম ধরে যে দিকেই তাকে টানা হয়, সে দিকেই যেতে বাধ্য হয়।”(৭১)
দুই. বিবেক ও বাস্তবতার যুক্তিতে সাব্যস্ত হওয়া
আর তা কয়েকভাবে বর্ণনা করা যেতে পারে,
১- সাহাবায়ে কিরাম কুরআন নাযিল হওয়া প্রত্যক্ষ করেছেন। তারা সেটার অর্থ বুঝে নিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তারা দেখেছেন ও তাঁর থেকে সরাসরি শুনেছেন। সুতরাং তাদের বুঝই হবে সঠিক বুঝ।
২- সাহাবায়ে কিরাম জ্ঞান অর্জনের ব্যাপারে খুবই আন্তরিক ছিলেন, তারা ছোট বড় সবকিছু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে জানার ব্যাপারে সর্বদা সচেষ্ট থাকতেন। সুতরাং তাদের মতামত সর্বদা সঠিক হবে এটাই স্বাভাবিক।
৩- সাহাবায়ে কিরাম যা শুনতেন তার ওপরই আমল করতেন, তারা না জেনে আমল করেছেন এমনটি বলা যাবে না। অনুরূপভাবে না জেনে কোনো কিছু বিশ্বাস করতেন সেটা বলাও হবে তাদের প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করা।
৪- সাহাবায়ে কিরাম তাবে'য়ীদের কাছে তাদের ইলম পৌঁছানোর ব্যাপারে সর্বদা চেষ্টা চালিয়ে যেতেন যা প্রমাণ করে যে, এ ইলম বিশুদ্ধ ইলম, আর তা অনুসরণ করে যেতে হবে।
৫- সাহাবায়ে কিরাম আরবী ভাষা সবচেয়ে ভালো বুঝতেন। সুতরাং অন্যদের চেয়ে দীনও তারা ভালো বুঝবেন এটাই স্বাভাবিক।
৬- সাহাবায়ে কিরাম বিবেকের দিক থেকেও বিশাল বিবেকের অধিকারী ছিলেন। তাদের বিবেকের সাথে কারো বিবেকের তুলনাই চলে না।
৭- সাহাবায়ে কিরামের সকলেই ছিলেন ন্যায়পরায়ণ, তাদের মতো ন্যায়পরায়ণ মানুষ আর কোনো দিন আসবে না। আর স্বাভাবিকভাবেই ন্যায়পরায়ণদের কথা, কাজ ও নীতি মানুষ গ্রহণ করে থাকে।
৮- সাহাবায়ে কিরাম ভনিতা বা কৃত্রিমতা পছন্দ করতেন না। তাদের দীনের ব্যাপারে কেবল হক কথাই বলবেন এটাই স্বাভাবিক। সুতরাং তাদের মতামতই গ্রহণ করে নিতে হবে।
৯- সাহাবায়ে কিরামের মতামত গ্রহণযোগ্য হওয়ার কারণেই পরবর্তী ফকীহ ও মুহাদ্দিসগণ তাদের মতামতকে সংরক্ষণ করেছেন।
১০- সাহাবায়ে কিরাম যা বিশ্বাস করে জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছেন, যার ওপর থেকে ফিতনা থেকে বেঁচে গিয়েছেন, আমরা যদি সেটার বাইরে এক বিন্দুও না যাই তাতে আমাদের দীনের কোনো ক্ষতি হবে না। সুতরাং সাহাবায়ে কিরামকে সুন্দরভাবে অনুসরণ করে যেতেই হবে। তাদেরকে যারা সুন্দরভাবে অনুসরণ করে তাঁরাই প্রকৃত সালাফী।
• তাছাড়া সালাফে সালেহীনের অনুসরণ করার জন্য সাহাবায়ে কিরাম ও ইমামগণের বক্তব্য অনেক। যেমন,
১১- হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন, হে কারীসাহেবরা, তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তীদের পথের অনুসরণ কর, আল্লাহর শপথ করে বলছি, যদি তোমরা সেটার ওপর দৃঢ়ভাবে অবস্থান করতে পার, তবে অনেক দূর অগ্রণী হয়ে যাবে, আর যদি তা ছেড়ে ডানে-বামে যাও তবে অবশ্যই পথভ্রষ্টতার বহুদূর চলে যাবে। (৭২)
২- ইবন মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন, ইলম উঠে যাওয়ার আগে তা শিখে নাও,... আর তোমাদের ওপর কর্তব্য হচ্ছে আগের লোকদের মত গ্রহণ করা। (১৯)
৩- ইবন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা একজনকে ওসিয়ত করে বলেন, 'তোমার ওপর কর্তব্য হচ্ছে দীনের ওপর দৃঢ়তা অবলম্বন, প্রথম যারা চলে গেছে তাদের কর্মকাণ্ডের অনুসরণ, কোনো বিদ'আত করো না। (৯৩)
৪- 'উমার ইবন আব্দুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'তোমাদের ওপর কর্তব্য হচ্ছে সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরা,.. আর তোমরা সাহাবায়ে কিরাম যেখানে অবস্থান করেছেন সেখানে অবস্থান করবে'... যদি বল যে, পরে তো অনেক কিছু ঘটেছে, তবে মনে রেখ যে, তারা কেবল আদর্শচ্যুত হওয়ার কারণেই নতুন কিছু আবিষ্কার করেছে..(*)
৫- ইমাম আওযা'ঈ বলেন, 'তুমি সুন্নাত এর নিজেকে ধৈর্য ধারণ করাও, আর সাহাবায়ে কিরাম যেখানে অবস্থান করেছেন সেখানে অবস্থান কর... তুমি সালাফে সালেহীনের পথ অবলম্বন কর'...। (৭৬) ইমাম আওযা'ঈ আরও বলেন, 'তুমি সালাফগণের আসার অনুসরণ কর, যদিও মানুষ তোমাকে ত্যাগ করে বসে'। (৭৭)
৬- ইমাম মালেক বলেন, 'আমরা বিদ'আতীদের পিছনে সালাত পড়ি না'... 'আর সুন্নাতকে মেনে নেয়া, সালাফদের ব্যাখ্যাকে গ্রহণ করাই আমাদের কাজ।' [ইজতিমা'উল জুয়ুশ: ১৫৫। তিনি আরও বলেন, 'এ উম্মতের পরবর্তীদেরকে তাই সংশোধন করতে পারে যা পূর্ববর্তীদেরকে সংশোধন করেছে'। (৭৮)
• অনুরূপভাবে সালাফে সালেহীনের অনুসরণের ওপর ইজমাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ ব্যাপারে যারা ইজমা বর্ণনা করেছেন তাদের মধ্যে ইবন তাইমিয়্যাহ অন্যতম। (৭৯) সুতরাং সালাফে সালেহীনের মতাদর্শ মেনে চলা ফরয। তাদের মত ও পথের বাইরে যাওয়ার অর্থই হচ্ছে নিজেকে পথভ্রষ্টতায় নিপতিত করা। আল্লাহ আমাদেরকে সালাফে সালেহীনের মত ও পথ অনুসরণের মাধ্যমে যাবতীয় ফিতনা থেকে বাঁচিয়ে রাখুন। আমীন।

টিকাঃ
১. নাক্বদ্ভুত তা'সীস; ইবন আব্দুল হাদী, আল-উকূদুদ দুররিয়‍্যাহ, পৃ. ১৯৮-২০১; ইবন কাসীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (১৪/৪); ইবন হাজার, আদ-দুরারুল কামিনাহ (১/১৫৫)।
২. ইবন আব্দুল হাদী, আল-উকুদুদ দুররিয়্যাহ, পৃ. ৬৭; ইবনুল কাইয়্যেম, আসামাউ মুয়াল্লিফাতি শাইখিল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, পৃ. ২০।
৩. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রাহিমাহুল্লাহ, আল-ফিকহুল আকবর, বঙ্গানুবাদ, পৃ. ১৪৮।
৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৭৫-২৭৬।
(*) এভাবে প্রসিদ্ধ চার মুজতাহিদ ইমাম এবং দ্বিতীয়-তৃতীয় হিজরী শতকের সকল প্রসিদ্ধ আলেম, ইমাম, ফকীহ ও মুহাদ্দিস অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ইলমুল কালামের নিন্দা করেছেন।
৬. মাজমূ'উল ফাতাওয়া (৫/৩০৭)।
৭. দার'উ তা'আরুদ্বিল আকলি ওয়ান নাকল (৬/৩১৫)।
৮. দার'উ তা'আরুদ্বিল আকল ওয়ান্ নাকল (২/২৩২)।
৯. দারউ তা'আরুদিল 'আকল ওয়ান্ নাকল (৭/১৫৪)।
১০. মাজমূ' আল-ফাতাওয়া (১৭/৩৪৯-৩৫০)।
১১. শারহু হাদীসিন-নুযূল, পৃ. ৪৫৯।
১২. দারউ তা'আরুদিল 'আকল ওয়ান্ নাকল (৬/৩১৩)।
১৩. দারউ তা'আরুদিল 'আকল ওয়ান্ নাকল (৭/১৫-১৬)।
১৪. দারউ তা'আরুদিল 'আকল ওয়ান্ নাকল (৭/১৭)।
১৫. ইমাম আবু সা'ঈদ আদ-দারেমী রাহিমাহুল্লাহ 'আন-নাকদু' নামক গ্রন্থে (পৃ. ২৯০-২৯১) বলেন, "এমন প্রত্যেক কিছু যা আকাশের খুব কাছাকাছি, তা আল্লাহ তা'আলারও খুব কাছাকাছি; আর আল্লাহর সকল সৃষ্টির প্রতি তাঁর নৈকট্যের বিষয়টি একই রকম, চাই তাদের অবস্থান নিকটে হউক অথবা দূর সীমানায় হউক; তাঁর সৃষ্টির কোনো কিছুই তাঁর থেকে দূরে নয়; যদিও কিছু সৃষ্টি অপর কিছু সৃষ্টি থেকে তাঁর খুব কাছাকাছি..... আর অনুরূপভাবে ফেরেশতাগণ কর্তৃক আল্লাহ তা'আলার নিকটবর্তী হওয়ার বিষয়টিও; 'আরש বহনকারী ফেরেশতাগণ বাকি সকল ফেরেশতার চেয়ে তাঁর খুব কাছাকাছি, যাদের অবস্থান আকাশসমূহের মধ্যে বিভিন্ন আকাশে। আর সাত আকাশের চেয়ে 'আরש তাঁর খুব কাছাকাছি; আর এসবের প্রতি আল্লাহর নৈকট্যের বিষয়টি একই রকম। আর এটাই যৌক্তিক বক্তব্য বা ধারণা। তবে যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে না যে, 'আরশের উপরে 'ইলাহ' রয়েছেন, সেই ব্যক্তির কথা ভিন্ন।
১৬. মাজমূ'উ আল-ফাতাওয়া (৬/৭)।
১৭. মাজমূ'উ আল-ফাতাওয়া (৩/৪৯-৫১)।
১৮. আর-রিসালাহ আত-তাদমুরিয়্যাহ, পৃ. ৮৪-৮৫।
১৯. মাজমূ'উ আল-ফাতাওয়া (৩/৪৬)।
২০. মাজমূ'উ আল-ফাতাওয়া (৫/১৯৯)।
২১. মাজমূ'উ আল-ফাতাওয়া (১১/৪৮২)।
২২. মাজমূ' ফাতাওয়া (১/৩৬৭)।
২৩. মাজমূ'উ ফাতাওয়া (৩/২০৭-২০৮)।
২৪. মাজমূ'উ ফাতাওয়া (৩/৪২৫)।
২৫. আল-ইস্তিকামাহ (১/১২৭)।
২৬. মাজমূ'উ আল-ফাতাওয়া (৬/৩৯৯-৪০০)।
২৭. মাজমূ' ফাতাওয়া (১৬/৪২৮)।
২৮. আর-রিসালাহ আত-তাদমুরিয়্যাহ, পৃ. ৫৬-৫৭।
২৯. মাজমূ' ফাতাওয়া (৩৩/১৮৫)।
৩০. মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/৩৫৪)।
৩১. আল-জাওয়াব আস-সহীহ লিমান বাদ্দালা দীন আল-মাসীহ (৪/৪২৬-৪২৮)।
৩২. মাজমু' ফাতাওয়া (৩৩/১৭৭-১৭৯)।
৩৩. মাজমূ' ফাতাওয়া (৩৩/১৮৩)।
৩৪. মাজমূ' ফাতাওয়া (১৯/১৪০-১৪১)।
৩৫. মাজমূ' ফাতাওয়া (৪/৫৯)।
৩৬. মাজমূ' ফাতাওয়া (১৯/১৪০-১৪১)।
৩৭. মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/২৬২-২৬৩); আরও দেখুন: আর-রিসালাহ আত-তাদমুরিয়‍্যাহ, পৃ. ৬৬-৬৮; আল-জাওয়াব আস-সহীহ লিমান বাদ্দালা দীন আল-মাসীহ (৪/৩১৮-৩১৮); মিনহাজুস্ সুন্নাহ (২/৩২৩-৩২৪)।
৩৮. আল-জাওয়াব আস-সহীহ লিমান বাদ্দালা দীন আল-মাসীহ (৩/৪৯১-৪৯২)।
৩৯. আল-জাওয়াব আস-সহীহ লিমান বাদ্দালা দীন আল-মাসীহ (৪/৩৭৭-৩৭৮)।
৪০. মাজমূ' ফাতাওয়া (৩৩/১৭০)।
৪১. দারউ তা'আরুদিল 'আকল ওয়ান্ নাকল (৫/২৫৭)।
৪২. মাজমূ' ফাতাওয়া (৩৩/১৭৫)।
৪৩, আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা (৬/৪৬৮)।
৪৪. আল-জাওয়াব আস-সহীহ লিমান বাদ্দালা দীন আল-মাসীহ (৪/২৯৮-২৯৯)।
৪৫. আর-রিসালাহ আত-তাদমুরিয়‍্যাহ, পৃ. ২৯।
৩৬. আর-রিসালাহ আত-তাদমুরিয়‍্যাহ, পৃ. ৩০।
৪৭. মিনাহজুস সুন্নাহ (২/৬৪৬-৬৪৭)।
৪৮. মিনহাজুস্ সুন্নাহ (২/১৫৬-১৫৭)।
৪৯. মিনহাজুস্ সুন্নাহ (২/১৬০)।
৫০. মাজমূ' ফাতাওয়া (৮/৪৩১-৪৩২)।
৫১. মাজমূ' ফাতাওয়া (১২/৩৭৫)।
৫২. মাজমূ'উ আল-ফাতাওয়া (১৩/৩০৫)।
৫৩. মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/২০৮-২০৯)।
৫৪. আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা (৬/৩৫৭)।
৫৫. মিনহাজুস্ সুন্নাহ (২/৫৯৫)।
৫৬. মাজমূ' ফাতাওয়া (৫/২৮১)।
৫৭. মাজমু' ফাতাওয়া (৯/২৯৮)।
৫৮. মাজমূ' ফাতাওয়া (১১/৪৮৪)।
৫৯. মাজমু' ফাতাওয়া (৩/২৫)।
৬০. মাজমূ' ফাতাওয়া (১৭/৩৭৯)।
৬১. মাজমূ' ফাতাওয়া (১২/৫৯২)।
৬২. আল-জাওয়াব আস-সহীহ লিমান বাদ্দালা দীন আল-মাসীহ (২/১৪২-১৪৩)।
৬৩. আল-জাওয়াব আস-সহীহ লিমান বাদ্দালা দীন আল-মাসীহ (৪/৩১৭)।
৬৪. বায়ানু তালবীস আল-জাহমিয়‍্যাহ (৮/৫৪২)।
৬৫. আহমাদ, আল-মুসনাদ (২/৭০); আবু দাউদ, আস-সুনান, হাদীস নং ৩৫৯৭; হাকেম, আল-মুসতাদরাক (২/২৭) এবং তিনি হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
৬৬. মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২০০২।
৬৭. তিরমিযী, আল-জামেউস সহীহ, হাদীস নং ২৬৭৬।
৬৮. বুখারী, আল-জামেউস সহীহ, হাদীস নং ২৬৫২।
৬৯. তাবারানী, আল-কাবীর (৩/২৪৯)।
৭০. তিরমিযী, আল-জামেউস সহীহ, হাদীস নং ২৬৪১।
৭১. ইবন মাজাহ, আস-সুনান, হাদীস নং ৪৩।
৭২. বুখারী, আল-জামেউস সহীহ, হাদীস নং ৭২৮২।
৭৩. দারেমী, আস-সুনান (১/৬৬), (১/১৬৪)।
৭৪. ইবন বাত্তাহ, আল-ইবানাহ (১/৩১৯)।
৭৫. আবু দাউদ, আস-সুনান (১২/৩৬৫); আজুররী, আশ-শরী'আহ: ৫৩৯।
৭৬. আবু নু'আইম, আল-হিলইয়া (৬/১৪৩)।
৭৭. আজুররী, আশ-শরী'আহ: ১২৭।
৭৮. কাযী ইয়াদ্ব, আশ-শিফা (২/৭১)।
৭৯. মাজমু' ফাতাওয়া (৪/১৫৮)।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 ঐ ফাতওয়াটির বৃত্তান্ত

📄 ঐ ফাতওয়াটির বৃত্তান্ত


গ্রন্থকার শাইখুল ইসলাম, আল্লাহ স্বীয় রহমতে তাকে আবৃত করুন। তাকে হামা শহর থেকে ফাতওয়া জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, আল্লাহর কুরআনুল কারীমে এবং তাঁর রাসূলের সহীহ হাদীসে বর্ণিত আল্লাহর সিফাত তথা গুণাবলির প্রতি ঈমান বা বিশ্বাসের স্বরূপ কিরূপ? যেমন: 'আরশের উপর উঠা, সমুন্নত থাকা, দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করা ইত্যাদি।
এগুলো কি বাহ্যিক অর্থে ব্যবহৃত হবে নাকি এগুলোর তা'ওয়ীল বা দূরবর্তী অর্থ দিয়ে ব্যাখ্যা করা আবশ্যক?
তখন তিনি এর উত্তরে তাই বলেছিলেন যা বলেছিলেন ইমাম মালিক ইবন আনাস এবং তার শাইখ রবী'আহ। আর তা হলো:
"ইস্তিওয়া শব্দটি (র অর্থ) জ্ঞাত, তার ধরন অজ্ঞাত এবং এ সম্পর্কে প্রশ্ন করা বিদ'আত।” আর নিশ্চয় এটা তাই যার ওপর ছিলেন অনুসৃত ইমামগণ এবং তাদের পূর্বের সাহাবী ও তাবেয়ীগণ।
এ ফাতওয়া শুনে তা'ওয়ীল প্রবক্তারা উত্তেজিত হয়ে উঠল।
তখন শাইখুল ইসলাম এই ইসলামী আলোচনাকে আরও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরার কথা ভাবলেন। তিনি চার মাযহাবের অনুসারী এবং সূফীপন্থী বিশিষ্ট আলেমদের থেকে বর্ণিত মহৎ দ্ব্যর্থহীন বক্তব্যসমূহ এই ফাতওয়ার সাথে সংযুক্ত করেন। যেমন, ইবন যামানীন আল-আন্দালুসী আল-মালেকী এর বক্তব্য, সূফী আমর ইবন উসমান আল-মাক্কী এর বক্তব্য ইত্যাদি। তখন এই সংযুক্তি সাধনের পর ফাতওয়াটি বিশালভাবে বিস্তৃতি লাভ করল। এটার নাম দেয়া হলো "আল-ফাতওয়া আল-হামাউইয়‍্যাহ আল-কুবরা” যাতে এটা পূর্বের ফাতওয়া থেকে স্বতন্ত্র হয় যা পরবর্তী “আল-ফাতওয়া আল-হামাউইয়্যাহ আস-সুগরা” নামে পরিচিতি পেয়েছিল।
এ মহৎ ফাতওয়াটি উর্দু ভাষায় অনূদিত হয় এবং মূল ফাতওয়ার সাথে ভারতের লাবিন্নুর শহরে ১২৯১ হিজরীতে ভূপালের রাজা নওয়াব সিদ্দীক হাসান খানের নির্দেশে মুদ্রিত হয়। এরপর কাতারের বাদশাহ কাসিম বিন মুহাম্মাদ বিন সানি এর অর্থায়নে ১৩২২ হিজরীতে ভারতের অমৃতসরে মুদ্রিত হয় আল-কুরআন ও সুন্নাহ মুদ্রণালয়ে অন্যান্য মুদ্রণের সঙ্গে। পরবর্তী বছর ১৩২৩ হিজরীতে মিশরে মুদ্রিত হয়। অতঃপর আমাদের বন্ধু আল্লামা মুহাম্মাদ আবদুর রায্যাক হামযা এর তত্ত্বাবধানে ১৩৫১ হিজরীতে আমাদের সালাফিয়্যাহ মুদ্রণালয় মক্কা শাখা মুদ্রণ করে। অতঃপর ১৩৭৩ হিজরীতে শাইখ আহমাদ শাকির এর তত্ত্বাবধানে কায়রোর দারুল মা'আরিফ মুদ্রণালয়ে মুদ্রিত হয়। এখন পর্যন্ত এর মুদ্রণ চলমান রয়েছে।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক আল্লাহর ওপর ঈমানের অধ্যায়টিতে কী বিশ্বাস করতে হবে আর কী বলতে হবে সেটাকে সুন্দরকরণ

📄 রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক আল্লাহর ওপর ঈমানের অধ্যায়টিতে কী বিশ্বাস করতে হবে আর কী বলতে হবে সেটাকে সুন্দরকরণ


সুতরাং বুদ্ধি-বিবেক ও দীনের দিক দিয়ে এটা অসম্ভব যে, ঐ উজ্জ্বল প্রদীপ(৬) যার মাধ্যমে আল্লাহ মানুষদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে আনয়ন করেছেন, তার সাথে সত্য সহকারে কিতাব নাযিল করেছেন; যাতে তিনি লোকদের মাঝে তাদের কৃত মতভেদসমূহের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। আর মানুষদেরকে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন তাদের সকল দীনের বিষয়, যাতে তারা মতভেদ করেছে, সেটাকে তার প্রতি প্রেরিত কিতাব ও হিকমতের দিকে ফিরিয়ে দিতে। (৭) আর তিনি তো আল্লাহর পথের দিকে তাঁরই নির্দেশে বুঝেশুনে মানুষদেরকে দাওয়াত দেন। আর আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি তাঁর ও তাঁর উম্মতের জন্য দীনকে পূর্ণ করে দিয়েছেন এবং তাদের প্রতি তাঁর নি'আমত পরিপূর্ণ করেছেন। এহেন অবস্থায় এটা অসম্ভব যে, তিনি আল্লাহর প্রতি ঈমান ও তাঁর সম্পর্কে জানার বিষয়টিকে সন্দেহপূর্ণ, সাদৃশ্যপূর্ণ ও ভেজাল অবস্থায় রেখে যাবেন, আর আল্লাহর সুন্দর নাম ও উচ্চ গুণাবলির ক্ষেত্রে কোনটা ওয়াজিব৮), কোনটা জায়েয(৯) এবং কোনটা নিষিদ্ধ তা পার্থক্য করে দিবেন না। (১০)

টিকাঃ
০৬. আল্লাহ বলেন, "হে নবী! অবশ্যই আমরা আপনাকে পাঠিয়েছি সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে এবং আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর দিকে আহ্বানকারী ও উজ্জ্বল প্রদীপরূপে।” [সূরা আল-আহযাব: ৪৫-৪৬] আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সূর্যের সাথে তুলনা করে উজ্জ্বল প্রদীপ বলা হয়েছে; কারণ সারা দুনিয়া তাঁর দ্বারা আলোকিত হয়েছে, তাঁর শরী'আতের মাধ্যমে প্রদীপ্ত হয়েছে। ইতোপূর্বে তা কুফরীর অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। [আশ-শিফা (১/৩১৯); ইবন কাসীর (৬/৪৩১)]
০৭. এটি ঈমানদারদের বৈশিষ্ট্য যে, তারা মতভেদ হলে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ'র দিকে ফিরে আসে।
০৮. উদাহরণত পূর্ণতাজ্ঞাপক যাবতীয় গুণাবলি, যেমন: জীবন, জ্ঞান, ক্ষমতা ইত্যাদি।
০৯, উদাহরণত কর্মবাচক গুণাবলি। অর্থাৎ এগুলো সাব্যস্ত করা; কারণ এগুলোর কথা কুরআন ও সুন্নাহ'য় এসেছে, যেমন: আগমন করা, অবতরণ করা, উপরে উঠা।
১০, উদাহরণত ত্রুটিপূর্ণ অর্থ প্রদান করে এমনসব গুণাবলি, যেমন: তন্দ্রা, ঘুম, খাওয়া-দাওয়া, পান করা ইত্যাদি।

📘 আল ফাতওয়া আল হামাউয়্যাহ আল কুবরা > 📄 মহান আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের মর্যাদা

📄 মহান আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের মর্যাদা


আর দীনের ক্ষেত্রে যা উম্মতের জন্য উপকারী, তা যত ক্ষুদ্রই হোক তার সবই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে শিক্ষা দেয়ার বিষয়টি সাব্যস্ত হওয়ার পর এটা অসম্ভব যে, তিনি তাদেরকে এটা শিক্ষা দেননি যা তারা তাদের প্রভু, মাবুদ, বিশ্বজাহানের প্রভু সম্পর্কে মুখে বলবে এবং অন্তরে বিশ্বাস করবে। যার জ্ঞান হচ্ছে সকল জ্ঞানের শীর্ষে, যার ইবাদত হচ্ছে সবচেয়ে উন্নত উদ্দেশ্য, যার নিকট পৌঁছানোই হচ্ছে চূড়ান্ত লক্ষ্য। বরং এটা নবীর দাওয়াতের সার এবং আসমানী রিসালাতের মাখন। সুতরাং যার অন্তরে সামান্য পরিমাণ ঈমান ও হিকমত আছে সে কীভাবে কল্পনা করতে পারে যে, রাসূল থেকে সকল বিষয়ের পরিপূর্ণ বিবরণ সংঘটিত হয়নি? অতঃপর যখন তার থেকে সেটা যথাযথভাবেই সুসম্পন্ন হয়েছে বলে সাব্যস্ত হলো, তাহলে এটা অসম্ভব যে, তাঁর শ্রেষ্ঠ উম্মত এবং উৎকৃষ্ট প্রজন্ম সাহাবায়ে কিরাম এ অধ্যায়ে অতিরিক্তকরণের মাধ্যমে বা ঘাটতিকরণের মাধ্যমে ত্রুটি করেছেন।

টিকাঃ
১৪. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হাদীস নং ২১৩৬১; বাযযার, আল-মুসনাদ, হাদীস নং ৩৮৯৭; ত্বাবারানী, আল-কাবীর (২/১৫৫), নং ৩১৯২। তবে মুসনাদে আহমাদের শব্দ হচ্ছে, لَقَدْ تَرَكْنَا مُحَمَّدٌ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَمَا يُحَرِّكُ طَائِرٌ جَنَاحَيْهِ فِي السَّمَاءِ إِلَّا أَذْكَرَنَا مِنْهُ عِلْمًا "অবশ্যই আমাদেরকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনভাবে ছেড়ে গেছেন যে, আকাশে কোনো পাখি তার দু' ডানা মেলে উড়ছে সেটার ব্যাপারেও আমাদেরকে জ্ঞান প্রদান করেছেন।”
১৫. বুখারী, আল-জামে'উস সহীহ, হাদীস নং ৩১৯২। হাদীসটি সহীহ মুসলিমেও এসেছে, হাদীস নং ২৮৯১। উভয়ের শব্দ কাছাকাছি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00