📄 অন্যের প্রশংসা করা
জ্ঞাতব্য, মানুষের স্তুতি গাওয়া ও গুণগান করা এটি কখনো প্রশংসিত ব্যক্তির সামনাসামনি হয়, কখনো আবার তার অনুপস্থিতিতে হয়। ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে প্রশংসা করাতে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে প্রশংসাকারী যদি প্রশংসার ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন করে এবং মিথ্যার আশ্রয় নেয়, তাহলে উক্ত প্রশংসা মিথ্যাশ্রিত হওয়ার কারণে হারাম, স্রেফ প্রশংসার কারণে নয়। এই প্রশংসা তখন মুস্তাহাব, যখন তা মিথ্যাশ্রিত হবে না, এতে কল্যাণ নিহিত থাকবে এবং তা প্রশংসিত ব্যক্তিকে আত্মগর্বে পতিত করার আশঙ্কা থাকবে না।
ব্যক্তির সামনাসামনি প্রশংসা করা: কিছু হাদিস বৈধ ও মুস্তাহাব বলে, আবার কিছু হাদিস নিষিদ্ধের দাবী রাখে। উলামায়ে কেরাম বলেন, বিরোধপূর্ণ এই হাদিসসমূহের মাঝে সমন্বয় সাধনে বলা হবে: যদি প্রশংসিত ব্যক্তি পরিপূর্ণ ঈমান, পরিচ্ছন্ন বিশ্বাস, আত্মশুদ্ধি এবং পরিপূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী হয় যে, আত্মগর্বে লিপ্ত হবে না, বিমোহিত হবে না এবং আত্মপ্রবঞ্চনায়ও লিপ্ত হবে না; তাহলে তার উপস্থিতিতে প্রশংসা করা না হারাম, না মাকরুহ। আর যদি তার ব্যাপারে উক্ত বিষয়ের কোনো একটির আশঙ্কা থাকে, তাহলে তার প্রশংসা করা গুরুতর মাকরুহ।
নিষিদ্ধের কিছু হাদিস
(৬৯৩) হজরত মিকদাদ রাদি. থেকে বর্ণিত-
أَنَّ رَجُلًا جَعَلَ يَمْدَحُ عُثْمَانَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ، فَعَمَدَ الْمِقْدَادُ ، فَجَثَا عَلَى رُكْبَتَيْهِ، فَجَعَلَ يَحْثُوْ فِي وَجْهِهِ الْحَصْبَاءَ، فَقَالَ لَهُ عُثْمَانُ: مَا شَأْنُكَ؟ فَقَالَ: إِنَّ رَسُوْلُ اللهِ، صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِذَا رَأَيْتُمُ الْمَدَّاحِيْنَ فَاحْتُوْا فِي وُجُوهِهِمُ التراب.
অর্থ: এক লোক উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর (সামনে) প্রশংসা করতে লাগলে হজরত মিকদাদ রাদি. জানু পেতে বসলেন (কারণ তিনি ছিলেন মোটা মানুষ) এবং প্রশংসাকারীর মুখে পাথরকুচি নিক্ষেপ করতে লাগলেন। উসমান রাদি. তাকে বললেন, তোমার কী হল হে মিকদাদ? উত্তরে তিনি বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা (সামনাসামনি) অতিমাত্রায় প্রশংসাকারীদেরকে দেখলে তাদের চেহারায় মাটি নিক্ষেপ করবে। ৯৭১
(৬৯৪) হজরত আবু মুসা আশআরি রাদি. থেকে বর্ণিত-
سَمِعَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَجُلًا يُثْنِي عَلَى رَجُلٍ وَيُطْرِيْهِ فِي مَدْحِهِ، فَقَالَ: أَهْلَكْتُمْ - أَوْ قَطَعْتُمْ - ظَهْرَ الرَّجُلِ.
অর্থ: নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে অপর ব্যক্তির অতিমাত্রায় প্রশংসা করতে শুনে বললেন, তোমরা ধ্বংস করে দিলে কিংবা (বলেছেন,) তোমরা লোকটির মেরুদণ্ড ভেঙ্গে ফেললে। ৯৭২
(৬৯৫) হজরত আবু বাকরা রাদি. হতে বর্ণিত-
أَنَّ رَجُلًا ذُكِرَ عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَأَثْنَى عَلَيْهِ رَجُلٌ خَيْرًا، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : وَيْحَكَ، قَطَعْتَ عُنُقَ صَاحِبِكَ - يَقُوْلُهُ مِرَارًا - إِنْ كَانَ أَحَدُكُمْ مَادِحًا لَا مَحَالَةَ، فَلْيَقُلْ : أَحْسِبُ كَذَا وَكَذَا. إِنْ كَانَ يُرَى أَنَّهُ كَذَلِكَ، وَحَسِيْبُهُ اللهُ، وَلَا يُزَكِّي عَلَى اللهِ، أَحَدًا.
অর্থ: নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মুখে এক ব্যক্তির আলোচনা হলে এক লোক তার প্রশংসা করল। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আফসোস তোমার জন্য! তুমি তোমার সাথীর গলা কেটে ফেললে। এ কথা তিনি কয়েকবার বললেন। (তারপর বললেন:) যদি তোমাদের কাউকে প্রশংসা করতেই হয়, তবে বলবে: আমি তার ব্যাপারে এমন এমন ধারণা পোষণ করি, যদি সে তাকে এমন ভাবে। তার প্রকৃত হিসাবকারী হলেন আল্লাহ তাআলা। আল্লাহর তুলনায় কেউ কারো সঠিক প্রশংসা করতে পারে না। ৯৭৩
প্রশংসা বৈধতার কিছু হাদিস
প্রশংসা বৈধতার হাদিস অসংখ্য, তন্মধ্য থেকে কয়েকটি নিম্নরূপ:
১. সহিহ হাদিসে বর্ণিত, হজরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে লক্ষ্য করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
مَا ظَنُّكَ بِاثْنَيْنِ اللَّهُ ثَالِثُهُمَا؟
অর্থ: হে আবু বকর! ঐ দুই ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার কী ধারণা আল্লাহ যাদের তৃতীয় জন?৯৭৪
২. অন্য হাদিসে এসেছে- )لَسْتَ مِنْهُمْ(
অর্থ: হে আবু বকর! তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নও, অর্থাৎ যারা অহঙ্কারবশে পরিধেয় বস্ত্র মাটিতে হেঁচড়িয়ে চলে, তুমি তাদের মতো নও। ১৯৭৫
৩. অন্য হাদিসে এসেছে-
يَا أَبَا بَكْرٍ، لَا تَبْكِ، إِنَّ أَمَنَّ النَّاسِ عَلَيَّ فِي صُحْبَتِهِ وَمَالِهِ أَبُو بَكْرٍ، وَلَوْ كُنْتُ مُتَّخِذًا مِنْ أُمَّتِي خَلِيْلًا لَا تَخَذْتُ أَبَا بَكْرٍ خَلِيْلًا.
অর্থ: নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: হে আবু বকর! তুমি কাঁদবে না। নিজের সাহচর্য ও সম্পদ দিয়ে যিনি আমার প্রতি সবচেয়ে বেশি অনুগ্রহ করেছেন, তিনি হলেন আবু বকর। যদি আমি কোনো উম্মাতকে খলিল (অন্তরঙ্গ বন্ধু) রূপে গ্রহণ করতাম, তবে আবু বকরকে গ্রহণ করতাম। ৯৭৬
৪. অন্য হাদিসে এসেছে-
أَرْجُوْ أَنْ تَكُوْنَ مِنْهُمْ.
অর্থ: হে আবু বকর! আমি আশা করি তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে। অর্থাৎ যাদেরকে জান্নাতের সব দরজা থেকে প্রবেশের জন্য ডাকা হবে। ৯৭৭
৫. অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে:
ائْذَنْ لَهُ، وَبَشِّرْهُ بِالْجَنَّةِ.
অর্থ: তাকে (আবু বকর) ভিতরে আসার অনুমতি দাও এবং তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও। ৯৭৮
৬. অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
اثْبُتْ أُحُدُ؛ فَمَا عَلَيْكَ إِلَّا نَبِيُّ، أَوْ صِدِّيقُ، أَوْ شَهِيدَانِ.
অর্থ: হে উহুদ! থেমে যাও। তোমার বুকে একজন নবি, একজন সিদ্দিক এবং দুজন শহিদ দণ্ডায়মান। ৯৭৯
৭. নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন-
دَخَلْتُ الْجَنَّةَ، فَرَأَيْتُ قَصْرًا ، فَقُلْتُ: لِمَنْ هَذَا؟ فَقَالَ : لِعُمَرَ، فَأَرَدْتُ أَنْ أَدْخُلَهُ فَأَنْظُرَ إِلَيْهِ، فَذَكَرْتُ غَيْرَتَكَ. فَقَالَ عُمَرُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: بِأَبِي وَأُنِّي يَا رَسُوْلَ اللهِ، أَعَلَيْكَ أَغَارُ ؟
অর্থ: আমি জান্নাতে প্রবেশ করে একটি প্রাসাদ দেখতে পেলাম। জিজ্ঞাসা করলাম: এই প্রাসাদটি কার? তারা জানালেন: উমরের। আমি এতে প্রবেশ করে দেখার ইচ্ছা করলাম, তখন তোমার (উমর) আত্মসম্মানবোধের কথা মনে পড়ে গেল। উমর রাদি. বললেন, আমার পিতা-মাতা আপনার ওপর উৎসর্গ হোক হে আল্লাহর রাসুল! আপনার কাছেও কি আত্মসম্মানবোধ দেখাতে পারি? ৯৮০
৮. আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
لَقِيَكَ الشَّيْطَانُ سَالِكًا فَجًّا إِلَّا سَلَكَ فَجًّا غَيْرَ فَجِّكَ
অর্থ: হে উমর! তুমি যে পথে চল, শয়তান কখনও সে পথে চলে না; বরং সে তোমার পথ ছেড়ে অন্য পথে চলে। ৯৮১
৯. অন্য হাদিসে এসেছে-
ائْذَنَ لِعُثْمَانِ وَبَشِّرْهُ بِالْجَنَّةِ.
অর্থ: উসমানের জন্য দরজা খুলে দাও এবং তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও। ৯৮২
১০. অন্য হাদিসে রয়েছে, নবিজি হজরত আলিকে বলেছেন-
أَنْتَ مِنِّي وَأَنَا مِنْكَ.
অর্থ: তুমি আমার এবং আমি তোমার। ৯৮৩
১১. অন্য হাদিসে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজরত আলিকে বলেন-
أَمَا تَرْضَى أَنْ تَكُوْنَ مِنِّي بِمَنْزِلَةِ هَارُوْنَ مِنْ مُوسَى؟
অর্থ: তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, যেভাবে হজরত হারুন আলাইহিস সালাম হজরত মুসা আলাইহিস সালামের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন, তুমিও আমার স্থলাভিষিক্ত। ৯৮৪
১২. অন্য হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিলাল রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলেছিলেন-
سَمِعْتُ دَفَ نَعْلَيْكَ بَيْنَ يَدَيَّ فِي الْجَنَّةِ.
অর্থ: মেরাজের রাতে আমি জান্নাতে তোমার পাদুকার আওয়াজ শুনেছি। ৯৮৫
১৩. নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজরত উবাই বিন কাবকে বলেছেন-
لِيَهْنِكَ الْعِلْمُ أَبَا الْمُنْذِرِ.
অর্থ: হে আবুল মুনজির! তোমার জ্ঞান উপকারী হোক। ৯৮৬
১৪. অন্য হাদিসে নবিজি আবদুল্লাহ বিন সালামকে বলেছেন-
أَنْتَ عَلَى الْإِسْلَامِ حَتَّى تَمُوْتَ.
অর্থ: তুমি আমৃত্যু ইসলামের ওপর অবিচল থাকবে। ৯৮৭
১৫. অন্য হাদিসে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক আনসারি সাহাবিকে বলেন-
ضَحِكَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ - أَوْ عَجِبَ - مِنْ فَعَالِكُمَا.
অর্থ: আল্লাহ তাআলা তোমাদের (দম্পতির) গত রাতের কাণ্ড দেখে হেসে দিয়েছেন কিংবা বলেছেন খুশি হয়েছেন (বর্ণনাকারীর সন্দেহ)। ৯৮৮
১৬. অন্য হাদিসে এসেছে, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারি সাহাবিদেরকে বললেন-
أَنْتُمْ مِنْ أَحَبِّ النَّاسِ إِلَيَّ.
অর্থ: তোমরা আমার কাছে সর্বাধিক প্রিয় মানুষ। ৯৮৯
১৭. অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, নবিজি আবদুল কায়েস বংশের প্রতিনিধি দলের নেতা আশাজ্জকে বলেছিলেন-
إِنَّ فِيْكَ خَصْلَتَيْنِ يُحِبُّهُمَا اللَّهُ: الْحِلْمُ، وَالْأَنَاةُ.
অর্থ: তোমার মাঝে এমন দুটি মহৎ গুণ আছে, যা আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন: সহিষ্ণুতা ও ধীরতা। ১৯৯০
ইমাম নববি রহ. বলেন, ব্যক্তির সামনাসামনি প্রশংসার বৈধতা সংক্রান্ত উপরোল্লিখিত প্রতিটি হাদিসই সহিহ হিসাবে প্রসিদ্ধ। এ কারণে এগুলোর নকলকারী ও কিতাবের নাম উল্লেখ করিনি। এছাড়াও নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যক্তির সামনে তার প্রশংসা করেছেন এমন নজির অহরহ আছে। অপরদিকে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন এবং পরবর্তী উলামায়ে কেরাম ও অনুসরণীয় ইমামগণ-কর্তৃক ব্যক্তির সামনাসামনি প্রশংসা করার দৃষ্টান্ত: গণনাতীত। আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন।
ইমাম আবু হামিদ গাজালি রহ. স্বীয় "ইহয়াউ উলুমিদ্দিন” গ্রন্থের জাকাত অধ্যায়ের শেষদিকে (১/২২৯) উল্লেখ করেন- সাদাকাহ গ্রহীতার জন্য পর্যবেক্ষণ করা উচিত: দানকারী যদি প্রশংসা কুড়ানো ও সুখ্যাতির আশা রাখে গ্রহণকারী সাদাকার বিষয়টি গোপন রাখবে। কেননা তার প্রাপ্যেও পরিশোধ হল, তাকে জুলুমের ওপর সাহায্য না করা। আর দানকারীকর্তৃক কৃতজ্ঞতা তলব করা জুলুম। যদি সাদাকাহকারীর বিষয়ে জানা যায় যে, সে প্রশংসা কুড়ানো ও লৌকিকতা পছন্দ করে না এবং এর আশাবাদীও নয়, তাহলে দানগ্রহীতার জন্য তার কৃতজ্ঞতা আদায় করা এবং দানের বিষয়টি প্রকাশ করা উচিত। হজরত সুফিয়ান সাওরি রহ. বলেন, যে ব্যক্তি নিজেকে অনুধাবন করল, মানুষের প্রশংসা করায় তার যায় আসে না।
ইমাম আবু হামিদ গাজালি আরো বলেন- আত্মপর্যবেক্ষক ব্যক্তিকে এই তাৎপর্যের সূক্ষ্মতার প্রতি দৃষ্টি রাখা চাই। কেননা, এই সূক্ষ্মতার প্রতি অবহেলার সাথে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমল; শয়তানের হাসির পাত্র। অধিক ক্লান্তি ও স্বল্প উপকারের কারণ। এ ধরনের জ্ঞানের ব্যাপারে বলা হয়েছে- আধ্যাত্মিকতার একটি মাসআলা শেখা এক বছরের (নফল) ইবাদতের চেয়ে উত্তম। কেননা, এই জ্ঞানের মাধ্যমে জীবনের ইবাদত প্রাণলাভ করে। আর এ সম্পর্কে অজ্ঞতা দ্বারা সারা জীবনের ইবাদত মৃত ও অকেজো হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা তাওফিকদাতা।
আত্মপ্রশংসা ও নিজের উত্তম গুণের আলোচনা
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
فَلَا تُزَكُّوا أَنْفُسَكُمْ.
অর্থ: সুতরাং তোমরা নিজেদেরকে পবিত্র মনে কর না। ৯৯১
জ্ঞাতব্য, নিজের ভালো গুণগান প্রকাশ করা দুই প্রকার: নিন্দিত এবং নন্দিত। অহঙ্কার প্রদর্শন, নিজের বড়ত্ব প্রকাশ এবং সমকালীনদের থেকে স্বতন্ত্রভাবে ফুটিয়ে তুলতে আত্মপ্রশংসা করা নিন্দিত। আর দীনি স্বার্থে করা নন্দিত। এটা এভাবে যে, সে সৎ কাজের আদেশদাতা, অসৎ কাজ থেকে বারণকারী, কল্যাণকামী, কল্যাণের দিকে ইঙ্গিতবাহী, শিক্ষাদাতা, শিষ্টাচার শিক্ষাদাতা, ধর্মপ্রচারক, উপদেশদাতা, দুজনের মধ্যে পারস্পরিক সন্ধি স্থাপনকারী, নিজেকে অনিষ্ট থেকে হেফাজতকারী অথবা এরকম অন্য কিছু হওয়ার কারণে নিজের উত্তম কীর্তন উল্লেখ করল। এই নিয়তে যে, যাতে হয় এটা তার কথার গ্রহণযোগ্যতা এবং তার আলোচনার নির্ভরতার মাধ্যম। অথবা আমি যে কথা বলছি, তা তোমরা অন্যদের কাছে পাবে না। অতএব, একে সংরক্ষণ কর ইত্যাদি। এ অর্থে অগণিত অধ্যাদেশ বিদ্যমান। যেমন- নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: আমি নবি, মিথ্যাবাদী নই। ৯৯২ কেয়ামাতের দিন আমি সকল আদম-সন্তানের সরদার হব। ৯৯৩ কেয়ামতের দিন আমিই সর্বপ্রথম জমি বিদীর্ণ হয়ে পুনরুত্থিত হব। ৯৯৪ তোমাদের চেয়ে আমিই আল্লাহকে বেশি জানি ও অধিক ভয় করি। ৯৯৫ আমি আমার রবের পক্ষ হতে পানাহার করা অবস্থায় রাত অতিবাহিত করি। ৯৯৬ -এ জাতীয় আরো অনেক হাদিস বিদ্যমান।
নবি হজরত ইউসুফ আ. বলেছিলেন-
اِجْعَلْنِي عَلَى خَزَائِنِ الْأَرْضِ إِنِّي حَفِيظٌ عَلِيمٌ.
অর্থ: আমাকে দেশের ধন-ভাণ্ডারে নিযুক্ত করুন। আমি বিশ্বস্ত, আমি অধিক জ্ঞানবান। ৯৯৭ -নবি হজরত শুআইব আ. বলেছিলেন-
سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّلِحِينَ.
অর্থ: ইনশাআল্লাহ তুমি আমাকে সদাচারী পাবে। ৯৯৮
(৬৯৬) অবরুদ্ধকালে হজরত উসমান রাদি. বলেছিলেন-
أَلَسْتُمْ تَعْلَمُونَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ، صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: مَنْ جَهَزَ جَيْشَ الْعُسْرَةِ فَلَهُ الْجَنَّةُ؟ فَجَهَزْتُهُمْ أَلَسْتُمْ تَعْلَمُوْنَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ، صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: مَنْ حَفَرَ بِثْرُ رُوْمَةَ فَلَهُ الْجَنَّةُ؟ فَحَفَرْتُهَا، فَصَدَّقُوْهُ بِمَا قَالَ.
অর্থ: আপনারা কি জানেন না যে, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি তাবুকের যুদ্ধে সেনাদের সামগ্রীর ব্যবস্থা করে দিবে, তার জন্য জান্নাত অবধারিত। অতঃপর আমিই তা করে দেইনি?! আপনারা কি জানেন না যে, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি রূমার কুপটি খনন করে দিবে, তার জন্য জান্নাত অবধারিত। অতঃপর আমি তা খনন করে দেইনি?! অতঃপর সাহাবিগণ তার কথার সত্যায়ন করেন। ১৯৯
(৬৯৭) হজরত সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস রাদি. থেকে বর্ণিত, যখন কুফাবাসী তাঁর ব্যাপারে খলিফা হজরত উমর বিন খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুর সমীপে নালিশ করেছিল। তারা বলেছিল, তিনি ঠিকমত নামাজ আদায় করেন না। তখন তিনি বলেছিলেন-
وَاللهِ، إِنِّي لَأَوَّلُ رَجُلٍ مِنَ الْعَرَبِ رَمَى بِسَهُم فِي سَبِيلِ اللَّهِ، وَلَقَدْ كُنَّا نَغْزُوْ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ، صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
অর্থ: আল্লাহর শপথ, আমিই আরবদের প্রথম ব্যক্তি যে আল্লাহর রাস্তায় তীর নিক্ষেপ করেছে। আমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে থেকেই লড়াই করেছি....। ১০০০
(৬৯৮) হজরত আলি রাদি. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন-
وَالَّذِي فَلَقَ الْحَبَّةَ، وَبَرَأَ النَّسَمَةَ إِنَّهُ لَعَهْدُ النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَيَّ أَنْ لَا يُحِبَّنِي إِلَّا مُؤْمِنٌ، وَلَا يُبْغِضَنِي إِلَّا مُنَافِقٌ.
অর্থ: সে সত্তার শপথ! যিনি বীজ থেকে অঙ্কুরোদগম করেন এবং জীবকুল সৃষ্টি করেন, আমার সাথে নিরক্ষর নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিশ্রুতি: আমাকে মুমিন ব্যক্তিই ভালোবাসবে এবং মুনাফিক ব্যক্তিই আমার সঙ্গে শত্রুতা পোষণ করবে। ১০০১
(৬৯৯) হজরত আবু ওয়ায়েল হতে বর্ণিত, তিনি বলেন-
خَطَبَنَا عَبْدُ اللهِ، فَقَالَ: وَاللهِ، لَقَدْ أَخَذْتُ مِنْ فِي رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِضْعًا وَسَبْعِينَ سُوْرَةً، وَ لَقَدْ عَلِمَ أَصْحَابُ رَسُوْلِ اللَّهِ، صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنِّي مِنْ أَعْلَمِهِمْ بِكِتَابِ اللهِ ، وَمَا أَنَا بِخَيْرِهِمْ. وَلَوْ أَعْلَمُ أَنَّ أَحَدًا أَعْلَمُ مِنِّي لَرَحَلْتُ إِلَيْهِ .
অর্থ: একদা হজরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রাদি. আমাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে গিয়ে বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি সত্তরের অধিক সুরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যবানি থেকে মুখস্থ করেছি। আল্লাহর কসম! অবশ্যই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবিরা মনে করেন যে, আমি তাদের মাঝে আল্লাহর কিতাব সম্বন্ধে অধিক জ্ঞাত; অথচ আমি তাদের মধ্যে সর্বোত্তম নই। যদি আমি এমন কারো ব্যাপারে অবগত হতাম, যে আমার চেয়ে বেশি জ্ঞানী, তাহলে আমি অবশ্যই (জ্ঞানার্জনে) তার দিকে রওনা করতাম।
অথবা ( فِدَاكَ أَبِي وَأَنِّي )ফিন্দাকা আবি ওয়া উম্মি: আমার মাতা-পিতা আপনার জন্য উৎসর্গিত হোক) ইত্যাদি বলাতে কোনো অসুবিধা নেই। বিষয়টি বহু সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, আমি সংক্ষেপণের উদ্দেশ্যে এগুলো বিলুপ্ত করে দিয়েছি।
নারী বেগানা পুরুষের সাথে হবে রুক্ষভাষী
কোনো মহিলার যদি ক্রয়-বিক্রয় ইত্যাদি যে সমস্ত ক্ষেত্রে গাইরে মাহরামের সাথে কথা বলার অবকাশ রয়েছে, সেখানে তাকে রুক্ষ ও পুরু কণ্ঠে কথা বলা উচিত; কোমলতা অবলম্বন করবে না। কেননা এতে উক্ত পুরুষ তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আমাদের ইমাম আবুল হাসান ওয়াহিদি স্বীয় 'আলবাসিত' গ্রন্থে লিখেছেন- আমাদের উলামায়ে কেরাম বলেন, মহিলার জন্য গাইরে মাহরাম কারো সাথে কর্কশ কণ্ঠে কথা বলা মুস্তাহাব। কেননা এটা মানসিক অস্থিরতার অধিকতর দূরবর্তী। অনুরূপভাবে বিবাহ-সম্পর্কের ভিত্তিতে মাহরামের সাথেও কোমলতা পরিহার করে কথা বলা বিধেয়। আপনি কি লক্ষ্য করেননি যে, আল্লাহ তাআলা নবি পত্নীদেরকে এ বিষয়ে তাগিদি নির্দেশ দিয়েছেন, অথচ তারা উম্মাহর জন্য স্থায়ী হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন-
يُنِسَاءَ النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مِّنَ النِّسَاءِ إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ.
অর্থ: হে নবি পত্নীগণ! তোমরা অন্য নারীদের মতো নও; যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তবে পরপুরুষের সাথে কোমল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বল না, ফলে সেই ব্যক্তি কুবাসনা করে বসবে, যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে। ১০০৪
ইমাম নববি বলেন, নারীর পুরু কণ্ঠে কথা বলার বিষয়ে ইমাম ওয়াহিদি যা বলেছেন, আমাদের অন্যান্য উলামায়ে কেরামও এমনই বলেছেন। আমাদের শায়খ ইবরাহিম মারওয়াজি বলেন, নারীর পুরু কণ্ঠে কথা বলার পদ্ধতি এরকম হবে যে, হাতের পৃষ্ঠদেশ মুখে রেখে কথার উত্তর প্রদান করবে। আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন।
এছাড়াও ওয়াহিদির বক্তব্য যে, এক্ষেত্রে বৈবাহিকসূত্রে মাহরাম বেগানা পুরুষের ন্যায়; দুর্বল এবং আমাদের উলামায়ে কেরামের দৃষ্টিতে অপ্রসিদ্ধ একটি মত। কেননা, এমন ব্যক্তি দর্শন ও নির্জনের ক্ষেত্রে আত্মীয়-সম্বন্ধীয় মাহরামের মতো। বাকি রইল উম্মাহাতুল মুমিনিনের বিষয়, তো তারা স্রেফ বিবাহ হারাম হওয়া এবং তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ক্ষেত্রে মা। তাই তো তাদের মেয়েদের বিয়ে করা বৈধ ছিল। ১০০৫ আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন।
টিকাঃ
৯৭১. সহিহ মুসলিম: ৩০০২, সুনানে আবু দাউদ: ৪৮০৪, সুনানে তিরমিজি: ৪০৯৫, সুনানে ইবনে মাজাহঃ ৩৭৪২।
৯৭২. সহিহ বুখারি: ২৬৬৩, সহিহ মুসলিম: ৩০০১, মুসনাদে আহমাদ ৪/৪১২।
৯৭৩. সহিহ বুখারি: ৬০৬১, সহিহ মুসলিম: ৩০০০, সুনানে আবু দাউদ: ৪৮০৫, মুসনাদে আহমাদ ৫/৪১, সুনানে ইবনে মাজাহঃ ৩৭৪৪, আমাল: ২৩৯, নাসাঈ।
৯৭৪. সহিহ বুখারি: ৩৬৫৩, সহিহ মুসলিম: ২৩৮১।
৯৭৫. সহিহ বুখারি: ৬০৬২, সুনানে আবু দাউদ: ৪০৮৫, সুনানে সুগরা ৮/২০৮।
৯৭৬. সহিহ বুখারি: ৪৬৬, সহিহ মুসলিম: ২৩৮২। আল্লাহর নৈকট্যশীলরা যতই আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করেন, দুনিয়ার প্রতি তাদের ঘৃণা ততই বৃদ্ধি পেতে থাকে। আর নবিগণ হলেন আল্লাহর সবচেয়ে বেশি অন্তরঙ্গ, আবার এই হাদিস ওফাতের আগমূহুর্তের। তাই এমনি বলেছেন। অন্যথায় আবু বকর নবিজির সুখে-দুঃখের বন্ধু ছিলেন।
৯৭৭. সহিহ বুখারি: ১৮৯৭, সহিহ মুসলিম: ১০২৭।
৯৭৮. সহিহ বুখারি: ৩৬৭৪, সহিহ মুসলিম: ২৪০৩।
৯৭৯. সহিহ বুখারি: ৩৬৭৫, সুনানে আবু দাউদ: ৪৬৫১, সুনানে তিরমিজি: ৩৬৯৭।
৯৮০. সহিহ বুখারি: ৩৬৭৯, সহিহ মুসলিম: ২৩৯৪।
৯৮১. সহিহ বুখারি: ৩২৯৪, সহিহ মুসলিম: ২৩৯৬।
৯৮২. সহিহ বুখারি: ৩৬৭৪, সহিহ মুসলিম: ২৪০৩।
৯৮৩. সহিহ বুখারি: ২৬৯৯, সহিহ ইবনে হিব্বান: ৪৮৭৩, সুনানে তিরমিজি: ৩৭১৬।
৯৮৪. সহিহ বুখারি: ৩৭০৬, সহিহ মুসলিম ৩১/২৪০৪।
৯৮৫. সহিহ বুখারি: ১১৪৯, সহিহ মুসলিম: ২৫৫৮।
৯৮৬. সহিহ মুসলিম: ৮১০, মুসতাদরাকে হাকেম ৩/৪০৪, সুনানে আবু দাউদ: ১৪৬০।
৯৮৭. সহিহ বুখারি: ৩৮১৩, সহিহ মুসলিম ১৪৮/২৪৮৪।
৯৮৮. সহিহ বুখারি: ৩৭৯৮, সহিহ মুসলিম: ২০৫৪।
৯৮৯. সহিহ বুখারি: ৩৭৮৫, সহিহ মুসলিম: ২৫০৮।
৯৯০. সহিহ মুসলিম ১৭/২৫, সহিহ ইবনে হিব্বান: ৭২০৪, সুনানে তিরমিজি: ২০১১, সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪১৮৮।
৯৯১. সুরা নাজম: ৩২।
৯৯২. সহিহ বুখারি: ২৮৬৪, সহিহ মুসলিম: ১৭৭৬।
৯৯৩. সহিহ মুসলিম: ২২৭৮, সুনানে আবু দাউদ: ৪৬৭৩, সুনানে তিরমিজি-:৩১৪৮, সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪৩০৮।
৯৯৪. সহিহ বুখারি: ২৪১২, সহিহ মুসলিম: ২২৭৮।
৯৯৫. সহিহ বুখারি: ২০, সহিহ মুসলিম: ২৩৫৬।
৯৯৬. সহিহ বুখারি: ১৯৬৪, সহিহ মুসলিম: ১১০৫, মুসনাদে আহমাদ ২/৩৭৭।
৯৯৭. সুরা ইউসুফ: ৫৫।
৯৯৮. সুরা কাসাস: ২৭।
৯৯৯. সহিহ বুখারি: ২৭৭৮।
১০০০. সহিহ বুখারি: ৩৭২৮, সহিহ মুসলিম: ২৯৬৬।
১০০১. সহিহ মুসলিম: ৭৮, সুনানে তিরমিজি: ৩৭৩৭, সুনানে নাসাঈ ৮/১৮৭।
১০০৪. সুরা আহজাব: ৩২।
১০০৫. পর্দার ক্ষেত্রে তারা বেগানা আওরতের মতো।