📄 তিলাওয়াতের শ্রেষ্ঠ সময়
নামাজে তিলাওয়াত হচ্ছে শ্রেষ্ঠ তিলাওয়াত। ইমাম শাফেয়ি ও অন্যান্য ইমামদের মাজহাব হল, নামাজে দীর্ঘ রুকু-সেজদা করার চেয়ে দীর্ঘ কিরাতের মাধ্যমে কিয়াম দীর্ঘ করা উত্তম। নামাজের বাইরে রাতের তিলাওয়াত উত্তম। রাতের শুরুর ভাগের চেয়ে শেষ ভাগে তিলাওয়াত করা উত্তম। মাগরিব ও ইশার মাঝে কুরআন তিলাওয়াত করা ভালো।
দিনের তিলাওয়াতের মাঝে ফজরের পর পড়া সবচেয়ে উত্তম। কুরআন তিলাওয়াত যে কোন সময় করা যাবে; মাকরুহ হবে না। এমনকি নামাজের নিষিদ্ধ সময়গুলোতেও মাকরুহ হবে না।
আর ইবনে ইমাম আবু দাউদ রহ. হজরত মুআজ বিন রিফায়াহ রহ. এর সূত্রে তাঁর শায়খদের যে কথা বর্ণনা করেছেন। মুআজের শায়েখগণ আসরের পর তিলাওয়াত করা মাকরুহ মনে করতেন; তাঁরা বলতেন এটি ইহুদিদের পাঠের সময়- এ কথা অগ্রহণযোগ্য। এর কোন ভিত্তি নেই।
তিলাওয়াতের জন্য জুমুআর দিন, সোমবার, বৃহস্পতিবার ও আরাফার দিনকে নির্বাচন করা যায়। আর দশকের হিসাবে যিলহজ মাসের প্রথম দশক ও রমজান মাসের শেষ দশককে নির্বাচন করা যায়। আর মাসের হিসাবে রমজান মাসকে নির্বাচন করা যায়।
টিকাঃ
৩৯২. মুসনাদে দারিমি: ৩৫২৬।
📄 কুরআন খতম করার আদব ও দুআ
কুরআন খতম করার আদব ও তৎসংশ্লিষ্ট বিষয়
পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে, একাকী তিলাওয়াতকারীর জন্য নামাজে তিলাওয়াত করাই উত্তম। আর নামাজের বাইরে খতম করলে, যেমন যারা এক সঙ্গে জমায়েত হয়ে কুরআন খতম করে; তাদের জন্য উত্তম হলো, রাতের শুরুর ভাগে বা দিনের শুরুর ভাগে কুরআন খতম করা। কুরআন খতমের দিন রোজা রাখা মুস্তাহাব। তবে যদি সে দিনটি নিষিদ্ধ দিন হয় তাহলে রোজা রাখা যাবে না।
তালহা রহ., মুসাইব রহ. ও হাবিব রহ. থেকে বর্ণিত আছে- তারা কুরআন খতমের দিন রোজা রাখতেন। খতমে কুরআনের মজলিসে যারা কুরআন পড়তে পারে এবং যারা পারে না সকলেরই উপস্থিত থাকা চাই।
(২৭২) সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে-
أَمْرُ الْحَيَّضَ بِالْخُرُوجِ يَوْمَ الْعِيدِ لَيَشْهَدَنِ الْخَيْرَ وَدَعْوَةَ الْمُسْلِمِينَ.
অর্থ: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঋতুস্রাব অবস্থায় মহিলাদের ঈদগাহে যেতে আদেশ করতেন, যেন তারা কল্যাণকর কাজে শরিক হতে পারে এবং মুসলমানদের সঙ্গে দুআয় শরিক হতে পারে। ৩৯৩
(২৭৩) হজরত ইবনে আব্বাস রাদি. হতে বর্ণিত আছে, কুরআন তিলাওয়াতকারীকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য তিনি এক ব্যক্তিকে নিযুক্ত করতেন। যখন তিলাওয়াতকারী কুরআন খতম করতেন তখন ঐ ব্যক্তি আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমাকে সংবাদ দিতেন। ফলে তিনি কুরআন খতমের মজলিসে এসে উপস্থিত হতেন। ৩৯৪
(২৭৪) হজরত আনাস রাদি. এর শাগরেদ বিশিষ্ট তাবেয়ি ইমাম কাতাদা রহ. বর্ণনা করেন যে, হজরত আনাস রাদি. যখন কুরআন খতম করতেন, তখন পরিবারবর্গকে একত্র করে দুআ করতেন। ৩৯৫
সহিহ সনদে বিশিষ্ট তাবেয়ি হাকাম বিন উতাইবা রহ. থেকে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, মুজাহিদ ও আবদাহ বিন আবু লাইলা রহ. আমার কাছে এসে বললেন, আমরা আপনার কাছে এসেছি কুরআন খতম করার জন্য। কুরআন খতমের সময় দুআ কবুল হয়।
অপর বর্ণনায় আছে- হাকাম বিন উতবা রহ. বলতেন, কুরআন খতমের সময় দুআ কবুল হয়। মুজাহিদ রহ. থেকে সহিহ সনদে বর্ণিত আছে- সাহাবায়ে কেরাম কুরআন খতমের সময় একত্রিত হতেন। তাঁরা বলতেন, কুরআন খতমের সময় আল্লাহর রহমত নাজিল হয়।
কুরআন খতমের পর দুআ করা গুরুত্বপূর্ণ মুস্তাহাব আমল
কুরআন খতমের পরে দুআ করা গুরুত্বপূর্ণ একটি মুস্তাহাব আমল। পূর্বের অধ্যায়ে এ সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে।
(২৭৫) হজরত হুমাইদ আরাজ রহ. থেকে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন-
مَنْ قَرَأَ الْقُرْآنَ ثُمَّ دَعَا أَمَّنَ عَلَى دَعَائِهِ أَرْبَعَةُ آلَافُ مَلَكِ.
অর্থ: যে ব্যক্তি কুরআন খতমের পর দুআ করে, তার দুআতে চার হাজার ফেরেশতা আমিন আমিন বলতে থাকেন। ৩৯৬
দুআর কতিপয় আদব
দুআয় কাকুতি-মিনতি করা। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুআ করা। ব্যাপক অর্থবোধক শব্দে দুআ করা। দুআ করা পরকালের বিষয়ে; মুসলমানদের বিষয়ে; মুসলমানদের রাষ্ট্রপ্রধানের বিষয়ে; সকল আমির-উমারাদের বিষয়ে; তাদের আনুগত্যের বিষয়ে; তাদের অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাকার বিষয়ে; ভালো ও তাকওয়ার কাজে সহযোগিতার বিষয়ে; সত্য প্রতিষ্ঠা ও সত্যের ওপর সকলেই ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিষয়ে; ধর্মের শত্রু ও সকল বিরুদ্ধচারীদের ওপর বিজয় লাভের বিষয়ে।
আমি 'আদাবুল কুরা' নামক কিতাবে এবিষয়ে কিছু ইঙ্গিত দিয়েছি। সেখানে ছোট একটি দুআও উল্লেখ করেছি। কেউ চাইলে সেখান থেকে মুখস্ত করে নেবে।
খতম থেকে ফারেগ হওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে আরেক খতম শুরু করে দেয়া মুস্তাহাব। পূর্ববর্তী মহান মনীষীগণ এটিকে মুস্তাহাব বলেছেন। তারা দলিল পেশ করেন নিচের হাদিসটি দিয়ে-
(২৭৬) হজরত আনাস রাদি. বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
خَيْرُ الأَعْمَالِ الْحَلَّ وَالرِّحْلَةُ، قِيْلَ: وَمَا هُمَا؟ قَالَ: افْتِتَاحُ الْقُرْآنَ وَخَتْمَهُ.
অর্থ: সর্বোত্তম আমল হল, হিল ও রিহলা। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! হিল ও রিহলা কি? তিনি বললেন, কুরআনে কারিম খতম করা ও শেষ করা। ৩৯৭
টিকাঃ
৩৯৩. সহিহ বুখারি: ৯৭৪, সহিহ মুসলিম: ৮৯০, সুনানে আবু দাউদ: ১১৩৬, সুনানে তিরমিজি: ৫৩৯, সুনানে নাসাঈ ৩/১৮০-১৮১।
৩৯৪. সুনানে দারিমি: ৩৫১৫। হাদিসটি আমলযোগ্য দুর্বল।
৩৯৫. আলফুতুহাত ৩/২৪৪। মওকুফ সহিহ হাদিস।
৩৯৬. সুনানে দারিমি ২/৪৭০। হাদিসটি আমলযোগ্য দুর্বল।
৩৯৭. সুনানে তিরমিজি: ২৯৩৯। হাদিসটি আমলযোগ্য দুর্বল।
📄 রাতের অজিফা না পড়ে ঘুমিয়ে গেলে করণীয়
(২৭৭) হজরত উমর বিন খাত্তাব রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
مَنْ نَامَ عَنْ حِزْبِهِ مِنَ اللَّيْلِ، أَوْ عَنْ شَيْءٍ مِنْهُ، فَقَرَأَهُ فِيْمَا بَيْنَ صَلَاةِ الْفَجْرِ وَصَلَاةِ الظُّهْرِ كُتِبَ لَهُ كَأَنَّمَا قَرَأَهُ مِنَ اللَّيْلِ.
অর্থ: যে ব্যক্তি রাতের অজিফা বা কিছু অংশ না পড়ে ঘুমিয়ে যায়, অতঃপর তা ফজর ও জুহরের নামাজের মধ্যবর্তী সময়ে আদায় করে নেয়, তাহলে রাতে পড়েছে বলেই গণ্য হবে। ৩৯৮
টিকাঃ
৩৯৮. সহিহ মুসলিম: ৭৪৭।
📄 কুরআন সংক্ষেপণে যত্নবান হওয়ার নির্দেশ
কুরআন সংরক্ষণে যত্নবান হওয়ার নির্দেশ ও ভুলে যাওয়ার প্রতি ধমকি
(২৭৮) হজরত আবু মুসা আশআরি রাদি. থেকে বর্ণিত, নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
تَعَاهَدُوا هَذَا الْقُرْآنَ، فَوَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَهُوَ أَشَدُّ تَفَلُّنَا مِنَ الْإِبِلِ فِي عُقُلِهَا.
অর্থ: তোমরা কুরআন মুখস্থ রাখার ব্যাপারে তোমরা প্রতিজ্ঞা করো। যাঁর হাতে মুহাম্মদের প্রাণ আমি সে মহান সত্তার শপথ করে বলছি, কুরআনের মুখস্থ সুরা বা আয়াতসমূহ মানুষের মন থেকে পা বাঁধা উটের চেয়েও অধিক পলায়নপর। ৩৯৯
(২৭৯) হজরত আবদুল্লাহ বিন উমর রাদি. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
إِنَّمَا مَثَلُ صَاحِبِ الْقُرْآنِ كَمَثَلِ صَاحِبِ الْإِبِلِ الْمُعَقَّلَةِ ، إِنْ عَاهَدَ عَلَيْهَا أَمْسَكَهَا وَإِنْ أَطْلَقَهَا ذَهَبَتْ.
অর্থ: কুরআনের হিফজকারীর দৃষ্টান্ত হল পা বাঁধা উট। যদি এর মালিক এটির প্রতি লক্ষ্য রাখে তাহলে ধরে রাখতে পারবে। আর যদি তার বাঁধন খুলে দেয়, তাহলে সেটি ছাড়া পেয়ে চলে যাবে। ৪০০
(২৮০) হজরত আনাস ডবন মালেক রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
عُرِضَتْ عَلَيَّ أُجُورُ أُمَّتِي حَتَّى الْقَذَاةُ يُخْرِجُهَا الرَّجُلُ مِنَ الْمَسْجِدِ، وَعُرِضَتْ عَلَيَّ ذُنُوبُ أُمَّتِي فَلَمْ أَرَ ذَنْبًا أَعْظَمَ مِنْ سُوْرَةٍ مِنَ الْقُرْآنِ أَوْ آيَةٍ أُوْتِيَهَا رَجُلٌ ثُمَّ نَسِيَهَا.
অর্থ: আমার উম্মতের সকল সাওয়াব আমার সামনে পেশ করা হল, এমনকি মসজিদ হতে ময়লা দূর করার সাওয়াবও। আর আমার উম্মতের গুনাহও আমার সামনে পেশ করা হল। কুরআনের কোন সুরা বা আয়াত মুখস্থ করার পর তা ভুলে যাওয়ার চাইতে বড় গুনাহ আমি সেখানে দেখিনি। ৪০১
(২৮১) হজরত সাদ বিন উবাদা রাদি. থেকে বর্ণিত, নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
מَنْ قَرَأَ الْقُرْآنَ ثُمَّ نَسِيَهُ لَقِيَ اللَّهَ تَعَالَى يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَجْذَمَ.
অর্থ: যে ব্যক্তি কুরআন হিফয করেছে, অতঃপর তা ভুলে গেছে, কেয়ামতের দিন সে কুষ্ঠরোগী অবস্থায় আল্লাহ তাআলার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। ৪০২
টিকাঃ
৩৯৯. সহিহ বুখারি: ৫০৩৩, সহিহ মুসলিম: ৭৯১।
৪০০. সহিহ বুখারি: ৫০৩১, সহিহ মুসলিম: ৭৮৯, মুয়াত্তা মালেক ১/২০২, সুনানে নাসাঈ ২/১৫৪।
৪০১. সুনানে আবু দাউদ: ৪৬১, সুনানে তিরমিজি: ২৯১।
৪০২. সুনানে আবু দাউদ: ১৪৭৪, সুনানে দারিমি: ৩৩৮৩, মুসনাদে আহমাদ ৫/৩২৭।