📄 আস সবূর
‘আস সবুর’ বলা হয় ওই সত্তাকে যিনি অপরাধীদের শান্তি প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার তাড়াহুড়া করেন না। তিনি একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। কারণ হতে পারে, তারা পাপের পথ ছেড়ে অনুশোচনাদগ্ধ হৃদয়ে ফিরে আসবে। বিগত কর্মকাণ্ডের ওপর ক্ষমাপ্রার্থনা করে আল্লাহমুখী হবে।...
কেননা, আল্লাহর রহমত বিশালতা ও ব্যাপকতার বিচারে তার ক্রোধ ও প্রতাপকেও ছাড়িয়ে গেছে। একজন বান্দা যখন তাওবা ও ইসতিগফারের পথ ধরবে তখন সে অনুভব করবে যে, আল্লাহর রহমত তার দিকে তীব্রগতিতে ছুটে আসছে। কেননা তিনি তার কোনো সৃষ্টিকে দণ্ডিত করার নিয়তে সৃষ্টি করেননি।
আসুন, আল্লাহর বান্দা হিসেবে আমরা নিজেদেরকে ধৈর্য ও সংযমের উপাদানে গড়ে তুলি। আসুন, আল্লাহর পথে আহ্বানকালে কোনো ধরনের তীর্যক মন্তব্য বা আঘাতের সম্মুখীন হলে হাসিমুখে bরণ করে নিই। আসুন, দাঁত চেপে সত্যের অনুসরণ ও মিথ্যা বর্জনের ওপর বলিষ্ঠ থাকি। আসুন, আমরা কোনো অপরাধীকে শাস্তি প্রদানে উদগ্রীব না হই; বরং তাকে ফিরে আসার অবকাশ করে দিই। তবেও আমরা হবো 'আস সবুর' আল্লাহর ধৈর্যশীল বান্দা।
**তাওবার অনুপম গল্প**
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খন্দক যুদ্ধ থেকে ফেরামাত্রই মুসলিম বাহিনীকে 'বনু কুরাইযা'-এর ইয়াহুদিদের ওপর আক্রমণ করার নির্দেশ দিলেন। কারণ তারা চুক্তি ভঙ্গ করে মুশরিকদের সঙ্গে আঁতাত করে ছিলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে সঙ্গে নিয়ে তাদের মজবুত কেল্লার চারপাশে অবরোধ করলেন।
তখন ইয়াহুদিরা দূত মারফত প্রস্তাব পেশ করলো যে, আপনি আমাদের কাছে 'আবু লুবাবা ইবন্ আবদিল মুনযির-কে প্রেরণ করুন। আমরা এ বিষয়ে তার সঙ্গে কিছু পরামর্শ করতে ইচ্ছুক। হযরত আবু লুবাবা ছিলেন, একজন মুসলিম রণযোদ্ধা। তবে তার সঙ্গে ইয়াহুদিদের মিত্রতা চুক্তি ছিলো।
নবীজি তাদের প্রস্তাব মেনে নিয়ে হযরত আবু লুবাবা রাদি.-কে প্রেরণ করলেন। ইয়াহুদিরা তার সঙ্গে একান্ত বৈঠকে মিলিত হলো। সেখানে তারা জিজ্ঞেস করলো- হে আবু লুবাবা! আপনি কি আমাদেরকে মুহাম্মাদ- এর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বলেন?
তিনি বললেন- হ্যাঁ। সেটাই করো। এ কথা বলে তিনি মুসলিম বাহিনীর দিকে হাতের ইশারা করলেন। অর্থাৎ ইঙ্গিতে তিনি বুঝালেন, বাগে পেলে তারা তোমাদের হত্যা করবে।
তৎক্ষণাৎ আবু লুবাবা বুঝতে পারলেন, তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সঙ্গে খিয়ানত করে ফেলেছেন। এখন যে কোনো মুহূর্তে তাঁর ওপর আল্লাহর শাস্তি নেমে আসতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ঘোষণা করে দিলেন- যতোক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ আমার তাওবা কবুল না করবেন, আমি আমার এ মুখ নিয়ে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে হাজির হবো না।
এ কথা বলে তিনি নিজেকে মসজিদে নববীর একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে ফেললেন। বললেন- তাওবা কবুল না হওয়া পর্যন্ত আমি এ স্থান ছেড়ে কোথাও যাবো না।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু লুবাবার এ কাণ্ড সম্পর্কে অবহিত হয়ে বললেন- যদি সে আমার কাছে আসতো তাহলে আমি তার জন্যে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতাম। তবে সে যেহেতু কাণ্ডটি ঘটিয়ে ফেলেছে কাজেই আল্লাহর সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত আমি তার বাঁধন খুলে দেবো না।
এভাবে আবু লুবাবা একাধারে ছয় রাত স্বেচ্ছাবন্দি ছিলেন। নামাযের সময় হলে বাঁধন খুলে কাতারে এসে হাজির হতেন। বাকিটা সময় হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বন্দি থাকতেন।
অবশেষে সপ্তম রাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর তাওবা কবুলের ঘোষণা এলো। লোকেরা তখন তাকে তাওবা কবুলের সুসংবাদ শুনিয়ে বললো- এবার তুমি নিজেকে মুক্ত করো।
তখন আবু লুবাবা বললেন- একমাত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার এ বাঁধন খুলবেন।
ফজরের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে তাঁর হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দিলেন। তখন হযরত আবু লুবাবা রাদি. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার পাপের আরো কিছু প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই। আমার মালিকানায় যতো সম্পদ আছে তার সমুদয় আমি আল্লাহর রাস্তায় সদকা করার সংকল্প করেছি। আপনি অনুমতি দিলে এখুনি তা এনে আপনার পদতলে হাজির করবো।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আবু লুবাবা! তুমি যদি তোমার পূর্ণ সম্পদের এক তৃতীয়াংশ সদকা করো তাহলে সেটাই তোমার জন্যে যথেষ্ট হবে।